১২. পত্রাবলী ২২৫-২৩৪

২২৫*

C/o E. T. Sturdy,রিডিং, ইংলণ্ড
২৪ অক্টোবর,১৮৯৫

প্রিয় আলাসিঙ্গা,
‘ব্রহ্মবাদিনের’ দুটি সংখ্যা পেলাম—বেশ হয়েছে—এইরূপ করে চল। কাগজের প্রচ্ছদপট একটু ভাল করবার চেষ্টা কর, আর সংক্ষিপ্ত সম্পাদকীয় মন্তব্যগুলির ভাষাটা আর একটু হালকা অথচ ভাবগুলি একটু চটকদার করবার চেষ্টা কর। গুরুগম্ভীর ভাষা ও ছাঁদ কেবল প্রধান প্রধান প্রবন্ধগুলির জন্য রেখে দাও। মিঃ স্টার্ডি কয়েকটি প্রবন্ধ লিখবেন। আমি তোমাকে কয়েকখানা কাগজও পাঠাচ্ছি—তার মধ্যে দুখানা যথাক্রমে ধর্মমহাসভা ও মিশনরীগণ সম্বন্ধে। কাগজখানা ইংলিশ চার্চের উন্নতিশীল সম্প্রদায়ের অন্যতম মুখপত্র। আমার অনুমান—সম্পাদকপত্নী আমাকে এগুলি পাঠিয়ে দিয়েছেন, কারণ তাঁর বৈঠকখানায় আমি শীঘ্র বক্তৃতা দেব। সম্পাদকের নাম মিঃ হাউইস—তিনি ইংলিশ চার্চের একজন বিখ্যাত পুরোহিত।

ইতোমধ্যেই এখানে আমার প্রথম বক্তৃতা হয়ে গেছে, আর ‘স্ট্যাণ্ডার্ড’ কাগজের মন্তব্য পড়লেই বুঝতে পারবে, লোকে তা কেমন ভালভাবে নিয়েছে। ‘স্ট্যাণ্ডার্ড’ রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের বিশেষ শক্তিশালী কাগজগুলির মধ্যে অন্যতম। আগামী মঙ্গলবার লণ্ডনে গিয়ে ৮০ ওকলি ষ্ট্রীট, (Chelsea, London, S.W.) ঠিকানায় একমাস থাকব। তারপর আমেরিকায় ফিরে গিয়ে আবার আগামী গ্রীষ্মে এখানে আসব। এ পর্যন্ত দেখছ, ইংলণ্ডে সুন্দরভাবে বীজ বপন করা হয়েছে। আমার অনুপস্থিতিতে মিঃ স্টাডি—আমার এক সন্ন্যাসী গুরুভ্রাতা, যিনি শীঘ্রই এখানে আসছেন, তাঁর সঙ্গে মিলে ক্লাসগুলি চালাবেন।

সাহস অবলম্বন কর ও কাজ করে যাও। ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করে যাও—এই একমাত্র উপায়। আমি দ্বিতীয়বার আমেরিকা থেকে তোমাদের যে টাকা পাঠিয়েছি, তা সম্ভবতঃ নিরাপদে পৌঁছেছে। ঐ টাকার প্রাপ্তিস্বীকার আমেরিকায় করবে, কারণ এই পত্র তোমাদের নিকট পৌঁছবার পূর্বেই আমি আমেরিকায় ফিরব। তোমাদের অবশ্য আমার 19W. 38th Street, নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা—এই ঠিকানাটা মনে আছে। তোমরা অবশ্য কেভার্শ্যাম ইত্যাদি ঠিকানায় মিঃ স্টার্ডিকে পত্র লিখবে এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ পত্রব্যবহার করবে। মান্দ্রাজের সঙ্গে পত্রব্যবহারের প্রতিনিধি হবে তুমি, কলিকাতায় মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, আমেরিকায় মিস মেরী ফিলিপ‍্‍স্‌, নিউ ইয়র্ক—এইরূপ চলতে থাকুক। এখন কাগজটার দিকে পুরোপুরি মনোযোগ দাও। এটা যাতে দৃঢ়প্রতিষ্ঠিত হয়, তার চেষ্টা কর। মিঃ স্টার্ডি সময়ে সময়ে লিখবেন—আমিও লিখব। এখন আমি আর টাকা পাঠাতে পারব না—ইংলণ্ডে বক্তৃতা দিয়ে পয়সা পাওয়া যায় না, সুতরাং আমাকে এখানে সব টাকা খরচ করতে হয়েছে, এক পয়সাও লাভ হয়নি। ক্রমে ক্রমে এখানে এমন বন্ধু পাব, যারা সাময়িক পত্র প্রভৃতির জন্য টাকা খরচ করবে। কাজ করে চল—ধৈর্য, পবিত্রতা, সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করে যাও—এই ক-টি বিষয় মনে রেখো। লণ্ডনে মেননের সঙ্গে আমার কয়েকবার দেখা হয়েছিল। এখন কাগজখানাকে দাঁড় করবার জন্য সমগ্র শক্তি প্রয়োগ কর। যতদিন পর্যন্ত তুমি সরল ও পবিত্র থাকবে, ততদিন পর্যন্ত কখনও বিফল হবে না; মা তোমায় ত্যাগ করবেন না, তোমার ওপর তাঁর সর্বপ্রকার শুভাশিস বর্ষিত হবে। ইতি

তোমার
বিবেকানন্দ

২২৬

[স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে লিখিত]

C/o E. T. Sturdy, রিডিং,
ইংলণ্ড
১৮৯৫

প্রিয় শশী,
তোমার চিঠি, চুনীবাবুর চিঠি, সাণ্ডেলের চিঠি পূর্বে পাইয়াছি। রাখালের চিঠি আজ পাইলাম। রাখাল gravel-এ (পাথরিতে) ভুগিয়াছে শুনিয়া দুঃখিত হইলাম। বোধ হয়, বদহজমের কারণ হইয়া থাকিবে। … মঠের business (কাজকর্ম) মাষ্টার মহাশয় যদি রাজী হন, তাঁকে দিয়ে করাবে, অথবা হুটকোকে দিয়ে। সাণ্ডেলকে তার সংসার দেখতে বলবে, মঠের কাজে-টাজে বৃথা সময় সে ব্যয় না করে। হুটকোর দেনা শোধ হয়ে গেছে; এখন মাথা মুড়িয়ে নিতে বলবে। … আমি আধা জলে-স্থলে লোক চাই না।

হরমোহনকে বলবে, লেকচার-ফেকচার এখন আমার কিছুই নাই। সুরেশ দত্তের এক ‘নারদসূত্র’ তোমরা পাঠিয়েছিলে। কেন, দুনিয়ায় কি আর নারদসংহিতা ছাপা ছিল না? … হরমোহন কি-একটা Lord (লর্ড) রামকৃষ্ণ পরমহংস করেছে? Lordটা আবার কি—English Lord না Duke?

রাখালকে বলবে, লোকে যা হয় বলুক গে। ‘লোক না পোক’। ভাবের ঘরে তোমাদের চুরি না থাকে এবং Jesuitism-এর (কপটতার) দিক্ মাড়াবে না। Orthodox (আনুষ্ঠানিক) পৌরাণিক হিন্দু আমি কোন্ কালে, বা আচারী হিন্দু কোন্‌ কালে? I do not pose as one৮৫ বাঙালীরাই আমাকে মানুষ করলে, টাকাকড়ি দিয়ে পাঠালে, এখনও আমাকে এখানে পরিপোষণ করছে—অহ হ!!! তাদের মন জুগিয়ে কথা বলতে হবে—না? বাঙালীরা কি বলে না বলে, ওসব কি গ্রাহ্যের মধ্যে নিতে হয় নাকি? ওদের দেশে বার বছরের মেয়ের ছেলে হয়! যাঁর জন্মে ওদের দেশ পবিত্র হয়ে গেল, তাঁর একটা সিকি পয়সার কিছু করতে পারলে না, আবার লম্বা কথা! বাঙলাদেশে বুঝি যাব আর মনে করেছ? ওরা ভারতবর্ষের নাম খারাপ করেছে। … মঠ করতে হয় পশ্চিমে রাজপুতানায়, পাঞ্জাবে even (এমন কি) বোম্বায়ে। বাঙালী! … লণ্ডনে কতকগুলো কাফ্রির মত—আবার টুপি-টাপা মাথায় দিয়ে ঘুরতে দেখতে পাই। কালো হাতে খানা ছুঁলে ইংরেজরা খায় না—এই আদর! ঝি-চাকরের দলে ইয়ারকি দিয়ে দেশে গিয়ে বড়লোক হয়!! রাম! রাম! আহার গেঁড়ি গুগলি, পান প্রস্রাব-সুবাসিত পুকুরজল, ভোজনপাত্র ছেঁড়া কলাপাতা এবং ছেলের মলমূত্র-মিশ্রিত ভিজে মাটির মেজে, বিহার পেত্নী শাঁকচুন্নীর সঙ্গে, বেশ দিগম্বর কৌপীন ইত্যাদি, মুখে যত জোর! ওদের মতামতে কি আসে যায় রে ভাই? তোরা আপনার কাজ করে যা। মানুষের কি মুখ দেখিস, ভগবানের মুখ দেখ্‌।

শরৎ ভাষ্য-মাষ্যগুলো Dictionary (অভিধান) দেখে একরকম এদের পড়িয়ে দিতে পারবে তো, গীতা উপনিষদ্?—না শুধুই বৈরাগ্যি? শুধু বৈরাগ্যির কি আর কাল আছে? নিধে পেলা সকলেই কি রামকৃষ্ণ পরমহংস হয় রে ভাই! শরৎ বোধ হয় এতদিনে রওনা হয়েছে। একখানা ‘পঞ্চদশী’, একখানা ‘গীতা’ (যতগুলো পার ভাষ্য-সহিত), একখানা কাশীর ছাপা নারদ ও শাণ্ডিল্য-সূত্র (সুরেশ দত্তর ছাপা এক ছত্রে আঠারটা ভুল, মানে হয় না), পঞ্চদশীর যদি তর্জমা (ভাল, হাবাতে নয়) থাকে ও শাঙ্কর ভাষ্যের কালীবর বেদান্তবাগীশের তর্জমা ও পাণিনিসূত্রের বা কাশিকাবৃত্তি বা ফণিভাষ্যের যদি কোন বাঙলা বা ইংরেজী (এলাহাবাদের শ্রীশ বসুর) তর্জমা থাকে তো পাঠাবে।

—গুলোকে টাকাকড়ির কাজে একদম বিশ্বাস করবে না; অত কাঞ্চন ত্যাগ করতে হবে না। নিজেরা কড়িপাতির খরচ-আদায় সমস্ত করবে। মধো—যা বলি করে যা, ওস্তাদি চালাস না আর আমার ওপর। এখন তোদের বাঙালীদের বল দিকি, আমাকে একখানা ‘বাচস্পত্য’ অভিধান পাঠিয়ে দিতে—দেখি বচনবাগীশের দল! ইংরেজের দেশে ধর্মকর্মের কাজ বড়ই ধীরে ধীরে। এরা হয় গোঁড়া, না হয় নাস্তিক। গোঁড়াগুলো আবার অমনি ‘নমো নমো’ ধর্ম করে, ‘Patriotism (স্বদেশপ্রীতি) আমাদের ধর্ম,’ —এই মাত্র।

বই আমেরিকায় পাঠাবে। C/o Miss Mary Philips, 19W. 38th Street, New York U.S. America—ঐ হল আমার আমেরিকার address (ঠিকানা)। নভেম্বর মাসের শেষাশেষি আমেরিকায় যাব, অতএব বইপত্র ঐখানে পাঠাবে। শরৎ যদি পত্রপাঠ ছেড়ে থাকে তাহলেই আমার সঙ্গে দেখা হবে, নতুবা নয়। Business is business৮৬—ছেলেখেলা নয়। Sturdy (স্টার্ডি) সাহেব তাকে নিয়ে এসে ঘরে রাখবে ইত্যাদি। আমি এবার ইংলণ্ডে খালি একটু খবর নিতে এসেছি; আসছে গরমিকালে কিছু বেশী রকম হুজুগ করবার চেষ্টা করা যাবে। তারপর next winter India (পরবর্তী শীতে ভারতে)।

তোমার উপর আমার এখনও বিশ্বাস আছে। খেতড়ির রাজা যা কিছু খবর চান, তুমি নিজে লিখবে, অন্য কাউকেই জানতে পর্যন্ত দেবে না। যে সকল লোক আমাদের সহিত interested (আগ্রহান্বিত) তাদের regularly (নিয়মিতভাবে) চিঠিপত্র লিখবে। Interest (আগ্রহ) জাগিয়ে রাখবে। বাঙলাদেশময় জায়গায় জায়গায় centre (কেন্দ্র) করবার চেষ্টা কর। তোমরা তো কোন কিছু এ পর্যন্ত করে উঠতে পারলে না দেখছি; খালি বচন ঝাড়ছ! তোমারই যেন শরীর খারাপ, বাকীগুলো করছে কি? খালি আমরা লর্ড রামকৃষ্ণের শিষ্য! বলি, ও লর্ড রামকৃষ্ণ ব্যাপারটা কি হে? হরমোহনটা তো আধপাগলা বৈ নয়—ও একটা কি লর্ড রামকৃষ্ণ লেখে বল তো? লর্ড, ডিউক আবার কি হে? খেপাগুলোর জ্বালায় অস্থির! এখন এই পর্যন্ত। পরের চিঠিতে হালচাল লিখব। Sturdy (স্টার্ডি) সাহেবটি বড়ই ভাল, ভারি গোঁড়া বৈদান্তিক, সংস্কৃত একটু আধটু বোঝে। বহুৎ পরিশ্রম করলে তবে একটু আধটু কাজ হয় এ-সব দেশে—বড়ই শক্ত কাজ, আর শীতে বাদলে। তার উপর এখানে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান। ইংরেজরা লেকচার-ফেকচার শুনতে একটি পয়সাও দেয় না। যদি শুনতে আসে তো তোমার ভাগ্যি, যেমন আমাদের দেশে। তার ওপর এদেশে সাধারণে আমায় জানেও না এখন। তার ওপর ভগবান্-টগবান্ বললে ওরা পালিয়ে যায়, বলে—ঐ রে পাদ্রী বুঝি! তুমি বসে বসে একটা কাজ কর—ঋগ্বেদ থেকে আরম্ভ করে সামান্য পুরাণ তন্ত্র পর্যন্ত সৃষ্টি প্রলয় সম্বন্ধে, জাতি সম্বন্ধে, স্বর্গ নরক আত্মা মন বুদ্ধি ইত্যাদি, ইন্দ্রিয় মুক্তি সংসার (পুনর্জন্ম) সম্বন্ধে কে কি বলে, একত্র করতে থাক। ছেলেখেলা করলে কি হয়? Real scholarly work (রীতিমত পাণ্ডিত্যপূর্ণ বই) চাই। Material (উপাদান) যোগাড় হচ্ছে আসল কাজ। সকলকে আমার ভালবাসা। ইতি

নরেন্দ্র

২২৭*

[মিঃ স্টার্ডিকে লিখিত]

৮০ ওকলি ষ্ট্রীট, লণ্ডন
৩১ অক্টোবর, ১৮৯৫, বৈকাল ৫টা

প্রিয় বন্ধু,
এইমাত্র দুইজন যুবক ভদ্রলোক, মিঃ সিলভারলক এবং তাঁহার বন্ধু চলে গেলেন। মিস মূলার তো আজ বিকালে এসেছিলেন এবং এঁদের আসার সঙ্গে সঙ্গে চলে যান।

এঁদের একজন ইঞ্জিনীয়র, আর একজন শস্যের ব্যবসা করেন। দর্শন ও বিজ্ঞানের অনেক গ্রন্থ এঁরা পড়েছেন এবং উভয়ে শাস্ত্রের আধুনিকতম সিদ্ধান্তগুলির সঙ্গে হিন্দুদিগের প্রাচীন চিন্তাধারার অপূর্ব মিল দেখে বিস্মিত হয়েছেন। দুজনেই চমৎকার লোক—বেশ বুদ্ধিমান ও পণ্ডিত। একজন গীর্জার সঙ্গে সম্বন্ধ ত্যাগ করেছেন, আর একজন করবেন কিনা আমায় জিজ্ঞাসা করলেন।

এঁদের সঙ্গে আলাপ হবার পর দুটি জিনিষ আমার মনে জাগছে। প্রথমতঃ ঐ বইখানি আমাদের তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। এর ভেতর দিয়ে আমরা এমন একদল লোকের সংস্পর্শে আসতে পারব, যাঁরা দার্শনিক ভিত্তিতে ধর্মকে গ্রহণ করেন এবং অলৌকিকতা একদম পছন্দ করেন না। দ্বিতীয়তঃ এঁরা দুজনেই আমার ধর্মের আনুষ্ঠানিক দিকটা জানতে চান। এতে আমার চোখ খুলেছে। জগতের সাধারণ লোক চায়—কোন প্রকার অবলম্বন। বস্তুতঃ সাধারণভাবে বলতে গেলে অনুষ্ঠানের মধ্যে যখন দর্শন (Philosophy) রূপপরিগ্রহ করে, তখনই তাকে ‘ধর্ম’ বলা হয়। তাই ধর্মমন্দির ও কিছু ক্রিয়াকলাপ থাকা নিতান্তই আবশ্যক অর্থাৎ আমাদের যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি কিছু ক্রিয়াকলাপ ঠিক করে ফেলতে হবে।

যদি আপনি শনিবার সকালে বা তার পূর্বে আসতে পারেন, তবে আমরা ‘এসিয়াটিক সোসাইটিতে’ যাব, কিম্বা আপনিই আমার জন্য ‘হেমাদ্রিকোষ’ নামক গ্রন্থখানি সংগ্রহ করতে পারেন; ঐ পুস্তকে আমরা যা চাই, তা পাব। উপনিষদ‍গুলিও নিয়ে আসবেন। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যুকালের মধ্যে আমরা একটা কিছু অপূর্ব সিদ্ধান্ত সুদৃঢ় করে ধরতে পারব; অসম্বদ্ধ দার্শনিক মতবাদ মানবজীবনের উপর কোনই প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

আমরা যদি আমাদের ক্লাসগুলি শেষ হবার আগেই বইটি শেষ করে ফেলতে পারি এবং দু-একটি অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে সেটি সর্বসাধারণের মধ্যে প্রকাশ করতে পারি, তবে বইখানি চালু হয়ে যাবে। এরা চায় সঙ্ঘবদ্ধ হতে, আর চায় ক্রিয়াকলাপ। আর ঠিক এটিই একটি কারণ, যার জন্য ‘—’রা পাশ্চাত্য জনসাধারণের উপর কোনদিনই প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।

‘নৈতিক সমিতি’র প্রস্তাবে সম্মত হওয়ায় তারা আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আর একখানা পত্র লিখেছে এবং তাদের একখানা ফরমও পাঠিয়েছে। তাদের ইচ্ছা যে, আমি একখানা বই সঙ্গে নিয়ে যাই এবং তা থেকে দশ মিনিট পাঠ করি। আপনি দয়া করে গীতার অনুবাদ এবং বৌদ্ধ জাতকের অনুবাদটি নিয়ে আসবেন কি? আপনার সঙ্গে দেখা না করে আমি এ বিষয়ে কিছুই করব না। আমার ভালবাসা ও শুভেচ্ছা জানবেন। ইতি

বিবেকানন্দ

২২৮*

৮০ ওকলি ষ্ট্রীট, লণ্ডন
৩১ অক্টোবর, ১৮৯৫

প্রিয় জো জো,
শুক্রবার সানন্দে তোমার ওখানে মধ্যাহ্নভোজন এবং এলবেমার্লে মিঃ কয়েটের সহিত আলাপ করব।

মিসেস ও মিস নেটার নামে দু-জন আমেরিকান মহিলা—মাতা ও কন্যা—গত রাত্রের ক্লাসে যোগদান করেন। তাঁরা যথার্থ অনুরক্ত বলে মনে হয়। মিস চেমিয়ার্সের ওখানে যে ক্লাস হত তা শেষ হল। আগামী শনিবার রাত্রি থেকে আমার বাসাতেই হবে। আমার ক্লাসের জন্য দু-একখানা চলনসই বড় ঘর পাব, আশা করি। মন‍্‍কিওর কন‍্‍ওয়ের নৈতিক সমিতির (Moncure Conway’s Ethical Society) নিমন্ত্রণে ১০ তারিখে তাদের ওখানে বক্তৃতা দেব। আগামী মঙ্গলবার ব্যাল‍্‍বোয়া সমিতিতে (Balboa Society) বক্তৃতা। প্রভু সাহায্য করবেন। শনিবার তোমার সঙ্গে বেরুতে পারব কিনা ঠিক নেই। তবুও শহরের বাইরে তোমার খুবই ভাল লাগবে, তা ছাড়া মিঃ ও মিসেস স্টার্ডি অতি চমৎকার লোক।

ভালবাসা, আশীর্বাদ জানবে। ইতি

বিবেকানন্দ

পুনশ্চ—আমার জন্য কিছু নিরামিষ তরকারির ব্যবস্থা রেখ। ভাতের তেমন পক্ষপাতী নই, রুটি হলেও বেশ চলবে। আজকাল যা নিরামিষাশী হয়েছি, বলবার নয়।

২২৯

[স্বামী ব্রহ্মানন্দকে লিখিত]

C/o E. T. Sturdy
কেভার্শ্যাম, রিডিং, ইংলণ্ড
১৮৯৫

অভিন্নহৃদয়েষু,
তোমার ও সান্যালের পত্রে সবিশেষ অবগত হইলাম। তোমার চিঠি লেখার দুইটি দোষ—বিশেষ তোমার। প্রথম—যে-সকল কাজের কথা জিজ্ঞাসা করি, প্রায় তার কোনটিরই জবাব থাকে না; দ্বিতীয়—জবাব লেখায় অত্যন্ত বিলম্ব। তোমরা তো ঘরে বসে আছ ভায়া! আমাকে এ বিদেশে পেটের চেষ্টা করতে হয়, আবার দিনরাত খাটতে হয়; তার উপর লাটিমের মত ঘুরে বেড়ান। … আমি এখন বেশ বুঝতে পারছি যে, আমায় একা কাজ করতে হবে।

শশী সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত বটে; কিন্তু তোমরা খালি শশীর আসা সম্ভব কিনা তাই বিচার করছ। … এ সকল হল মহাবিলাসী বাবুর দেশ; নখের কোণে একটু ময়লা থাকলে তাকে স্পর্শ করে না। শরৎ আসতে না চায় সারদাকে পাঠাবে। অথবা মান্দ্রাজে লিখে কোন লোক পাঠাবে। প্রায় দু-মাস পূর্বে আমি এ-বিষয়ে লিখেছি। তারকদা শেষ পত্রে লিখেন যে, পর মেলে (ডাকে) এ-বিষয়ে সবিশেষ জানাবে। কিন্তু এখনও দেখছি তার কিছুই ঠিকানা হয় নাই। আশা ছিল—আমি থাকতে থাকতেই কেউ আসবে; কিন্তু এখনও তো কিছুই ঠিকানা নাই, এবং দু-বছরে এক-একটা সংবাদ আসে। Business is business—অর্থাৎ কাজকর্ম তৎপর করতে হয়, গড়িমসির কাজ নয়। আসছে সপ্তাহের শেষে আমি আমেরিকায় যাব। অতএব যে আসবে, তার সঙ্গে সাক্ষাতের কোন আশা নাই।

গিরিশবাবু আমার কাজে সহায়তা করতে পারবেন—কেমন করে? আমি চাই সংস্কৃত-জানা লোক, অর্থাৎ বই-টই তর্জমা করতে সহায়তা করে স্টার্ডিকে, আমার অনুপস্থিতিতে স্টার্ডির সঙ্গে বইপত্র তর্জমা করে—এই মাত্র। অধিক আমি আশা করি না। … কেবল এই দরকার, আমার অনুপস্থিতিকালে একটু আধটু সংস্কৃত পড়ায় বা তর্জমা করে—এই বস্, আবার কি করবে? গিরিশবাবু এদেশে বেড়িয়ে যান না, বেশ কথা। ইংলণ্ড ও আমেরিকা ঘুরে যেতে ৩০০০ টাকা মাত্র পড়বে। যত লোক এ-সব দেশে আসে, ততই ভাল। তবে ঐ টুপিপরা হতভাগাদের দেখলে গা জ্বলে। ভূত কালো—আবার সাহেব! ভদ্রলোকের মত দেশী কাপড়-চোপড় পর বাবা, তা না হয়ে ঐ জানোয়ারী রূপ!

আর কেন, হরি বল! এখানে সমস্তই ব্যয়, আয় এক পয়সাও নাই। স্টার্ডি আমার জন্য অনেক টাকা খরচ করেছে। এখানে লেকচারে আমাদের দেশের মত উল্টে ঘর থেকে খরচ করতে হয়। তবে অনেকদিন করলে ও খাতির জমে গেলে খরচটা পুষিয়ে যায়। টাকাকড়ি সেই যা প্রথম বৎসর আমেরিকায় করি (তারপর হাতে এক পয়সাও নিই না), তা প্রায় ফুরিয়ে গেল; আমেরিকায় পঁহুছিবার মত মাত্র আছে। আমার এই ঘুরে ঘুরে লেকচার করে শরীর অত্যন্ত nervous (স্নায়ুপ্রধান) হয়ে পড়েছে—প্রায় ঘুম হয় না, ইত্যাদি। তার উপর একলা। দেশের লোকের কথা কি বল? কেউ না একটা পয়সা দিয়ে এ-পর্যন্ত সহায়তা করেছে, না একজন সাহায্য করতে এগিয়েছে। এ সংসারে সকলেই সাহায্য চায়—এবং যত কর ততই চায়। তারপর যদি আর না পার তো তুমি চোর!

… যা লিখতে হয় স্টার্ডিকে লিখবে—লোক পাঠাবার মতামত—যখন আসছে যুগে তোমরা সিদ্ধান্তয় উপস্থিত হবে। … শশীকে আমি বিশ্বাস করি, ভালবাসি। He is the only faithful and true man there (ওখানে সে-ই একমাত্র বিশ্বস্ত ও খাঁটি লোক)। তার ব্যামো-ফ্যামো সব প্রভুর কৃপায় ভাল হয়ে যাবে। তার সব ভার আমার। … ইতি

বিবেকানন্দ

২৩০*

[মিঃ স্টার্ডিকে লিখিত]

৮০ ওকলি ষ্ট্রীট, চেলসী
১ নভেম্বর, ১৮৯৫

প্রিয় বন্ধু,
ব্যালেরেন (Balleren) সোসাইটির টিকিটের সংখ্যা ৩৫। বিষয় হল—ভারতীয় দর্শন ও পাশ্চাত্য সমাজ, সভাপতির স্থান শূন্য।

আপনি সেগুলো আমাকে পাঠিয়ে দিতে বলেননি, তাই পাঠালাম না।

আপনার চিঠিগুলি ঠিকভাবেই পেয়েছি।

বিবেকানন্দ

২৩১*

[মিঃ স্টার্ডিকে লিখিত]

২ নভেম্বর, ১৮৯৫

প্রিয় বন্ধু,
আমার মনে হয়, আপনিই ঠিক; আমরা আমাদের নিজেদের পথে কাজ করে যাব আর যা ঘটে ঘটুক।

আপনাকে বক্তৃতাটির সারাংশ পাঠাচ্ছি।

রবিবার আসব, যদি বিশেষ কিছু বাধা না ঘটে।

প্রীতির সঙ্গে আপনার
বিবেকানন্দ

২৩২

[স্বামী অখণ্ডানন্দকে লিখিত]

লণ্ডন
১৩ নভেম্বর, ১৮৯৫

কল্যাণবরেষু—
তোমার পত্র পাইয়া সবিশেষ প্রীত হইলাম। যেরূপ কার্য করিতেছ, তাহা অতি উত্তম। রা—অতি উদার ও মুক্তহস্ত, কিন্তু তাই বলিয়া তাঁহার উপর অত্যাচার না হয়। শ্রীমান্—এর অর্থসংগ্রহ উত্তম সঙ্কল্প বটে, কিন্তু ভায়া, এ সংসার বড়ই বিচিত্র, কাম-কাঞ্চনের হাত এড়ান ব্রহ্মা বিষ্ণুরও দুষ্কর। টাকা-কড়ির সম্বন্ধ মাত্রেই গোলমালের সম্ভাবনা। অতএব মঠের নিমিত্ত অর্থ সংগ্রহ করা ইত্যাদি কাহাকেও করিতে দিবে না। রা—ছাড়া ভারতবর্ষের কোন গৃহস্থকে আমি এখনও নিঃসন্দেহে মিত্র বলিয়া জানি না। আমার বা আমাদের নামে কোন গৃহস্থকে মঠ বা কোন উপলক্ষে অর্থ সংগ্রহ করিতেছেন শুনিলেই সন্দেহ করিবে …। বিশেষ দরিদ্র গৃহস্থ লোকেরা অভাব পূরণের নিমিত্ত বহুবিধ ভান করে। অতএব যদি কখনও কোন ধনী বিশ্বাসী ভক্ত ও হৃদয়বান গৃহস্থ মঠাদি নির্মাণের জন্য উদ্যোগ করেন, অথবা সংগৃহীত অর্থ কোন ধনী এবং বিশ্বাসী গৃহস্থের নিকট জমা হয়—উত্তম কল্প, নতুবা হস্তক্ষেপ করিবে না—(জড়িত হইও না), উপরন্তু অন্যকে এ কার্যে বিরত করিবে। তুমি বালক, কাঞ্চনের মায়া বোঝ না। অবসরক্রমে মহানীতিপরায়ণ লোকও প্রতারক হয়। এই হচ্ছে সংসার। রা—কে টাকাকড়ি সম্বন্ধে কোন কথা বলিবে না।

পাঁচজন মিলে কোন কাজ করা আমাদের স্বভাব আদতেই নয়। এই জন্যই আমাদের দুর্দশা। He who knows how to obey, knows how to command. Learn obedience first. (যিনি হুকুম তামিল করতে জানেন, তিনিই হুকুম করতে জানেন। প্রথমে আজ্ঞাবহতা শিক্ষা কর।) এই সকল মহা স্বাধীনভাবপূর্ণ পাশ্চাত্য জাতিদের মধ্যে Obedience-এর (আজ্ঞাবহতার) ভাব সেই প্রকার বলবান্‌। আমরা সকলেই হম‍্‍বড়া, তাতে কখনও কাজ হয় না। মহা উদ্যম, মহাসাহস, মহাবীর্য এবং সকলের আগে মহতী আজ্ঞাবহতা—এই সকল গুণ ব্যক্তিগত ও জাতিগত উন্নতির একমাত্র উপায়। এই সকল গুণ আমাদের আদৌ নাই।

তুমি যে প্রকার কার্য করছ করে যাও—তবে পড়াশুনার উপর বিশেষ দৃষ্টি রাখিবে—ইতি। য—বাবু একখানি পত্রিকা হিন্দী ভাষায়—প্রেরণ করিয়াছেন। তাহাতে আমার চিকাগো স্পীচের অনুবাদ আলোয়ারের রা— পণ্ডিত করিয়াছেন। উভয়কেই বিশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাইবে।

তোমার নিমিত্ত এক্ষণে লিখি, রাজপুতানায় একটি center (কেন্দ্র) করিবার বিশেষ যত্ন করিবে। জয়পুর বা আজমীর প্রভৃতি কোন central (মধ্যবর্তী) স্থানে হওয়া উচিত—তদনন্তর আলোয়াড়, খেতড়ি প্রভৃতি শহরে branch (শাখা) স্থাপন করিবে। সকলের সঙ্গে মিশিবে, কাহারও সহিত বিরোধ আবশ্যক নাই। পণ্ডিত না—জীকে আমার প্রেমালিঙ্গন দিবে, ঐ লোকটি খুব উদ্যমী—কালে বিশেষ কার্যক্ষম হইবে। মাঃ— সাহেব ও —জীকেও আমার যথাযোগ্য প্রেমসম্ভাষণ দিও। ঐ ‘ধর্মমণ্ডলী’ বলে কি একটা আজমীরে হয়েছে—সেটা ব্যাপার কি? বিশেষ লিখিবে।—বাবু লিখেন যে, তাঁহারা আমায় পত্রাদি লিখিয়াছেন, এ পর্যন্ত পাই নাই। … মঠ মড়ি কলকেতায় কি করবে? কাশীতে আড্ডা করিতে হইবে। সে-সকল অনেক মতলব আছে, পরন্তু অর্থসাপেক্ষ। ধীরে ধীরে প্রকাশ পাবে, খবরের কাগজে দেখে থাকবে যে, ইংলণ্ডে হুজ্জুক ধীরে ধীরে মাচছে। এদেশে সকল কাজ ধীরে ধীরে হয়। কিন্তু ইংরেজবাচ্ছা কোন কাজে হাত একবার দিলে আর ছাড়ে না। আমেরিকানরা চটপটে, কিন্তু অনেকটা খড়ের আগুনের মত। রামকৃষ্ণ পরমহংস অবতার ইত্যাদি সাধারণে প্রচার করিবে না। আলোয়াড়ে আমার কতকগুলো চেলাপত্র আছে, সেগুলোকে নিয়ে তদারক করবে, … মহাশক্তি তোমাতে আসবে, ভয় নাই—Be pure, have faith be obedient, (পবিত্র হও, বিশ্বাসী হও, আজ্ঞাবহ হও)।

ছেলের বে-র বিপক্ষে শিক্ষা দিবে! বালকের বে কোন শাস্ত্রে নাই। তবে ছোট ছোট মেয়ের বে-র বিপক্ষে এখন কিছু বলো না। ছেলের বে বন্ধ করতে পারলেই মেয়ের বে আপনা হতে বন্ধ হয়ে যাবে। মেয়েকে তো আর মেয়ে বে করবে না। লাহোর আর্য-সমাজের সেক্রেটারীকে লিখবে যে, অ-বলে যে একজন সন্ন্যাসী তাঁদের কাছে থাকতেন, তিনি এক্ষণে কোথায়? সে লোকটির বিশেষ সন্ধান করিবে। … ভয় কি?

বিবেকানন্দ

২৩৩*

[মিসেস লেগেটকে লিখিত]

লণ্ডন
১৮ নভেম্বর, ১৮৯৫

প্রিয় আলাসিঙ্গা,
‘ব্রহ্মবাদিন্‌’ সম্বন্ধে আমার গোটাকতক প্রস্তাব আছে। আমি ইতোমধ্যেই খবর পেয়েছি যে, আমেরিকায় ওর অনেকগুলি গ্রাহক হয়েছে। ইংলণ্ডেও তোমায় কতকগুলি গ্রাহক যোগাড় করে দেব। ইংলণ্ডে আমার কাজ বাস্তবিক খুব চমৎকার হয়েছে; আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেছি। ইংরেজরা খবরের কাগজে বেশী বকে না; কিন্তু নীরবে কাজ করে। আমেরিকা অপেক্ষা ইংলণ্ডে অনেক বেশী কাজ হবে বলেই আমার স্থির বিশ্বাস। দলে দলে লোক আসছে, কিন্তু এত লোকের জন্য তো আমার জায়গা নেই। সুতরাং বড় বড় সম্ভ্রান্ত মহিলা ও অন্যান্য সকলেই মেঝের উপর আসনপিঁড়ি হয়ে বসে। আমি তাদের কল্পনা করতে বলি যে, তারা যেন ভারতীয় আকাশের তলে শাখাপ্রশাখাসমন্বিত একটি বিস্তীর্ণ বটবৃক্ষের নীচে বসে আছে—তারা অবশ্য এ ভাবটা পছন্দই করে। আমাকে আগামী সপ্তাহেই এখান থেকে চলে যেতে হবে, তাই এরা ভারি দুঃখিত। কেউ কেউ ভাবছে, যদি এত শীঘ্র চলে যাই, তাহলে এখানকার কাজের ক্ষতি হবে। আমি কিন্তু তা মনে করি না। আমি কোন লোক বা জিনিষের উপর নির্ভর করি না—একমাত্র প্রভুই আমার ভরসা এবং তিনি আমার ভেতর দিয়ে কাজ করছেন।

‘ব্রহ্মবাদিনে’র প্রত্যেক সংখ্যায় ভক্তি, যোগ ও জ্ঞান সম্বন্ধে কিছু লেখা বেরুন দরকার। দ্বিতীয়তঃ লেখার ধাঁজটা ভারি কটমটে—একটু যাতে স্বচ্ছ, সরস ও ওজস্বী হয়, তার চেষ্টা কর। গত সংখ্যায় ক্ষত্রিয়দের খুব বাড়ান হয়েছে, পরের সংখ্যায় ব্রাহ্মণদের খুব প্রশংসা কর, তার পরের সংখ্যায় বৈশ্যদের। কপট ও কাপুরুষ না হয়ে সকলকে খুশী কর। দৃঢ়তা ও পবিত্রতার সহিত নিজেদের ভাবগুলি আঁকড়ে ধরে থাক; আর এখন যেরূপ বাধাই আসুক না কেন, জগৎ অবশেষে তোমাদের কথা শুনবেই শুনবে। আরও কিছু বিজ্ঞাপন যোগাড়ের চেষ্টা কর—বিজ্ঞাপনের জোরেই কাগজ চলে। আমি তোমার জন্য ‘ভক্তি’ সম্বন্ধে বড় একটা কিছু লিখব; কিন্তু এটি মনে রেখো, বাঙালীদের ভাষায়—‘আমার মরবার পর্যন্ত সময় নেই’। দিবারাত্র কাজ, কাজ, কাজ। নিজের রুটির যোগাড় করতে হচ্ছে এবং আমার দেশকে সাহায্য করতে হচ্ছে—সব একলাই; আর তার দরুন শত্রুমিত্র সকলেরই কাছে কেবল গাল খাচ্ছি! যাই হোক, তোমরা তো শিশুমাত্র; আমাকে সব সহ্য করতে হবে।

কলিকাতা থেকে একজন সন্ন্যাসীকে ডেকে পাঠিয়েছি, তাকে লণ্ডনে কাজের জন্য রেখে যাব। আমেরিকার জন্য আর একজন আবশ্যক। তোমরা কি মান্দ্রাজ থেকে উপযুক্ত একজন কাউকে পাঠাতে পার না? অবশ্য তার খরচপত্র সব আমি দেব। তার ইংরেজী ও সংস্কৃত দুই-ই ভাল জানা চাই—ইংরেজীটি একটু বেশী। আবার তার খুব শক্ত লোক হওয়া দরকার—মেয়ে প্রভৃতির পাল্লায় পড়ে যেন বিগড়ে না যায়। অধিকন্তু তাকে সম্পূর্ণরূপে বিশ্বস্ত ও আজ্ঞাবহ হতে হবে। তোমার কি চলনসই সংস্কৃত জানা আছে? জি.জি. কিছু কিছু জানে। আমি আমার নিজের লোক চাই। গুরুভক্তিই সর্বপ্রকার আধ্যাত্মিক উন্নতির মূল। আমার আশঙ্কা, তুমি তোমার কাগজ ফেলে আসতে পারবে না। জি.জি. কি আসতে পারে? আমি দুজন লোককে এই দুই কেন্দ্রে রেখে যেতে চাই, তারপর ভারতে ফিরে গিয়ে তাদের অবসর দেবার জন্য নূতন নূতন লোক পাঠাব। বাস্তবিক আমি অবিরাম কাজ করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। যেরূপ কঠোর পরিশ্রম করেছি, আর কোন হিন্দুকে এরূপ করতে হলে সে এতদিন রক্তবমি করে মরে যেত। মেনন পূর্বের মতই বিশ্বস্ত ও অনুগত আছেন। তিনি প্রায়ই এসে আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করে থাকেন। আমাকে C/o Miss Mary Philips, 19W. 38th Street, New York—ঠিকানায় পত্র লিখো। আমি আগামী সপ্তাহে (আমেরিকা) যাচ্ছি এবং আগামী গ্রীষ্মে (এখানে) আবার ফিরব। ইতোমধ্যে কাকে পাঠাবে ভাবতে থাক। আমি দীর্ঘ বিশ্রামের জন্য ভারতে যেতে চাই। কিডি, ডাক্তার, সেক্রেটারী সাহেব, বালাজী এবং বাকী সকলকে আমার ভালবাসা জানাবে। সদা আমার ভালবাসা ও আশীর্বাদ জানবে। ইতি

তোমাদের
বিবেকানন্দ

পুঃ—‘ব্রহ্মবাদিনে’ বিবিধ সংবাদের একটা স্তম্ভ থাকা উচিত। একটি ভক্ত বৈরাগী shuffled off his mortal coil—এইরূপ ভাষা লিখো না। ভক্ত বৈরাগীর মৃত্যুর সঙ্গে এইরূপ বাক্যযোজনা একটু হাস্যোদ্দীপক।

২৩৪*

লণ্ডন
২১ নভেম্বর, ১৮৯৫

প্রিয় মিসেস বুল,
‘ব্রিটানিয়া’ জাহাজে আগামী ২৭ বুধবার (আমেরিকা) রওনা হচ্ছি। এখানে এ পর্যন্ত আমার যতটা কাজ হয়েছে, তা বেশ সন্তোষজনক; আমার বিশ্বাস আগামী গ্রীষ্মে চমৎকার কাজ করতে পারব। … ভালবাসাদি জানবে। ইতি

তোমাদের প্রীতিবদ্ধ
বিবেকানন্দ

বুকমার্ক করে রাখুন 0