শেষ কথা

শেষ কথা – সৌভিক চক্রবর্তী ও দেবজ্যোতি

ভট্টাচার্য রুশ কল্পবিজ্ঞান, বিশেষত সোভিয়েত আমলের সায়েন্স ফিকশনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিরোধিতা। এখানেই পাশ্চাত্য (পড়ুন আমেরিকান) কল্পবিজ্ঞানের সঙ্গে তার প্রধান পার্থক্য। ভিক্টোরিয়ান আমলের ইংরেজি সাহিত্য যেভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তথা এম্পায়ার বিল্ডিং-এর জয়গান গেয়েছিল, ১৯৩০ এবং ‘৪০-এর দশকের আমেরিকান কল্পবিজ্ঞানও সেই একইভাবে দুনিয়াজুড়ে মার্কিনি প্রভাব বিস্তারের স্বপক্ষে কথা বলেছে। ‘নিউ ওয়েভ’ আন্দোলন পরবর্তী সময়েও অবস্থা খুব একটা বদলায়নি; হার্ড সায়েন্স ফিকশনের পরিবর্ত হিসেবে উঠে আসা ‘মানবদরদী’ সফট সায়েন্স ফিকশনও দিনের শেষে ‘কসমোপলিটান’ সাহিত্য হয়েই থেকে গিয়েছে। ব্রায়ান অলডিস, মাইকেল মুরকক, টমাস ডিশ, জে জি ব্যালার্ড, উরসুলা লেইন, জেমস টিপট্রি জুনিয়র-দের নবচেতনা, মানব মনের জটিলতার আড়ালে উঁকি দেওয়ার প্রচেষ্টা, মুক্ত যৌনতার উদযাপন, উগ্র নারীবাদের আবাহন –সবই পরিচালিত হয়েছে আদ্যন্ত শহুরে দৃষ্টিভঙ্গিতে, সাবঅল্টার্ন অর্থাৎ প্রান্তিক মানুষদের কথা, তাদের জীবনযুদ্ধ, তাদের জীবনবোধ খুব বেশি স্থান পায়নি সেখানে।

উলটোদিকে সোভিয়েত সায়েন্স ফিকশনের একটা বিরাট অংশে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষরাই নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। অধিকাংশ সময় তাদের ঘিরেই দানা বেঁধেছে গল্প, তাদের বক্তব্যই উঠে এসেছে লেখকের কলমে। এই গল্পের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে দুর্ভাগ্যবশত এই শ্রেণীর সোভিয়েত সায়েন্স ফিকশন, যা প্রায়শই সেদেশের প্রাতিষ্ঠানিকতার, এবং কখনো কখনো বৃহত্তর অর্থে মানবসভ্যতার যন্ত্রভিত্তিক প্রগতির বিরোধীতাও করে, কখনো সরাসরি, কখনো রূপকের আশ্রয়ে, তারা বাংলাভাষায় খুব একটা অনুদিত হয়নি। এমনকি সেখানকার নিজস্ব ভাষার বাইরে ইংরেজিতে অনুদিত হয়ে বৃহত্তর পাঠকসমাজের দরবারে এসে পৌঁছোবার জন্যও এই ধরণের সাহিত্যকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বিশ শতকের শেষের দিক পর্যন্ত।

এ বইতে সঙ্কলিত ছ’টি উপন্যাস ও ঔপন্যাসিকা তেমনই কিছু কাহিনির সংগ্রহ। ‘পক্ষিমিনার’ উপন্যাসটিতে, কমিউনিস্ট জমানায় মানুষের সুদীর্ঘলালিত ধর্ম ও আচারভিত্তিক সংস্কৃতি ও সামাজিক গঠনের বিপুল বৈচিত্র্যকে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের স্টিমরোলারের তলায় খুঁড়িয়ে ‘হোমোজেনাইজ’ করবার রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ও শিল্পময় প্রতিবাদ গড়ে উঠেছে রূপকথা হেন এক অসামান্য অ্যাডভেঞ্চারে।

‘মেফিস্টো’, রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক পেট্রিয়ার্ক হয়ে উঠে জনতার জীবন নিয়ে তাদের ‘মঙ্গলার্থে ছিনিমিনি খেলে তাকে ডিহিউম্যানাইজ করবার ফলে এক অন্য বিপ্লবে পেট্রিয়ার্ক ও জনতার দুই প্রতাঁকের যথাক্রমে পতন ও ট্র্যাজেডির ছবি আঁকা হয়েছে নিষ্ঠুর ঔদাসিন্যে।

‘দেউলিয়া গ্রহ’ উপন্যাস আবার শক্তিমান প্রগতির ডিহিউম্যানাইজিং প্রভাবের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আপাতদৃষ্টিতে দুর্বলতর মানবিকতার বিজয় ঘোষণা করেছে।

‘তুষারমানবের ডায়েরি’ এক বিচিত্র কাহিনি। আমাদের সভ্যতার স্তর থেকে কিছু এগিয়ে থাকা আর এক সভ্যতা যা কিনা ধ্বংসের মুখোমুখি এসে পৌঁছেছে, তার এক প্রতিভূর দৃষ্টিতে আমাদের সভ্যতা, তার প্রগতির মৃত্যুমুখী যাত্রা এই সবকিছুকে বিশ্লেষণ করে দেখায়।

‘যাচ্ছ কোথায় পিঁপড়েরা’ উপন্যাসে শক্তিমান ওপরতলার সামনে সাধারণ মানুষের নিতান্তই তুচ্ছ ও উপেক্ষিত জীবন ও দর্শনের মর্মান্তিক ছবি ফুটে ওঠে ভিনগ্রহী ও পার্থিবের ইন্টার-অ্যাকশনে।

‘সব গাছে পাখি ডাকে’ নিঃসন্দেহে এক রূপকধর্মী কাহিনি। হিংস্র, স্বার্থলোভী শিকারি লেইটার-এর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অজানা, অচেনা এক গ্রহের নিজস্ব উপায়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা ঔপনিবেশিক শোষকের বিরুদ্ধে উপনিবেশবাসী শোষিতের আবহমানকালের লড়াইয়েরই ইঙ্গিত দেয়। গল্প এগোলে আমরা দেখি, পুঁজিবাদের প্রতিভু শিকারির অমানবিক নিষ্ঠুরতার অনিচ্ছুক অথচ অসহায় দর্শক পাইলট ওয়ের্গ-ও একসময় খুঁজে পায় প্রতিবাদের ভাষা, নির্ভীকভাবে মানবিক নৈতিকতার পক্ষে দাঁড়িয়ে সে অস্বীকার করে ভোগবাদের সর্বগ্রাসী সত্তাকে। এখানেই অন্য মাত্রায় পৌঁছে যায় ‘এভরি ট্রি হ্যাজ ইটস বার্ড’, পাঠকের মনোরঞ্জনের খাতিরে লেখা নিছক এক কল্পবিজ্ঞান গল্পের বদলে হয়ে ওঠে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দিশারী এক অনন্যসাধারণ উপাখ্যান।