উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

৮. আজ বাড়িতে ছোটখাটো উৎসব

০৮.

দু বছর এভাবে কেটেছে। আজ বাড়িতে ছোটখাটো উৎসবই বলতে হবে। রমুদার বন্ধুরা এসেছে। সজল, মিহির, বিপ্লব, শ্যামল, রাখী আর ঋতা। আমার কেমন ইচ্ছা না থাকলেও, রমুদা আর দীপুর। কথাতেই, বীথি আর দীপাকেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। ওরাও এসেছে। দুজন ছাড়া সবাই আমার চেনা। সজল আর ঋতা আমার চোখে নতুন। ওদের নাম শুনেছি রমুদার মুখে। বিশেষ করে ঋতার নাম। রমুদা যাকে বলে প্রেম’ তা এই ঋতার সঙ্গেই। শুনেছিলাম, ঋতা নাকি সুন্দরী। আজ দেখছি, ঋতা কেবল সুন্দরী নারূপসী বলতে যা বোঝায়, তা-ই। সত্যি ও সুন্দরী। বড় বড় চোখ, টিকোলো নাক, মুখোনি। মিষ্টি। লম্বা তেমন না। স্বাস্থ্যটা ভাল। শুনেছি, ওদের অবস্থা তেমন ভাল না। তবু আজ ঋতা সরষেফুল রঙের সিলকের শাড়ি পরে এসেছে। বেশ মানিয়েছে। আমার সঙ্গে রমুদা পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

সজলের সঙ্গেও দিয়েছে। দেবার সময় বলল, তোকে তো সজলের নাম বলেছি।

আমি ঘাড় নেড়ে জানালাম, হ্যাঁ।

এই সেই সজল।

 বলেই সজলের দিকে তাকিয়ে, রমুদা ভুরু কাঁপিয়ে বলল, কী, ঠিক বলেছিলাম?

সজল আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। বলল, একজাক্ট।

কী একজাক্ট, কিছুই বুঝলাম না। আমি রমুদার দিকে তাকালাম। রমুদা এক বার আমার দিকে, আর এক বার সজলের দিকে দেখতে লাগল। মুখে চাপা হাসি। ওর গোঁফ এখন বেশ স্পষ্ট। ঠোঁটের নীচে হেঁটে, ওপর থেকে একটু কামিয়ে, আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। রমুদা দেখতে আগের থেকে বড় হয়েছে, সুন্দর হয়েছে; আমার ভাষায়, পাজি’ হয়েছে।

সজল রমুদার থেকে মাথায় আর একটু লম্বা। মাখন রঙের ট্রাউজার, পায়ে নতুন ধরনের কাবলি, আগে এ রকম কখনও দেখিনি, গায়ে শার্টের রং অনেকটা ঋতার শাড়ির মতো। গায়ের রং শ্যাম, চোখ দুটো বেশ বড়, নাকটা টিকোলো। মুখে মেয়েলি ছাপ আছে। চুলের সিঁথি প্রায় দেখা যায় না, দু পাশ থেকে টেনে তুলে দিয়েছে। কুচকুচে কালো চুল খুব কোঁচকানো নয় বটে, কিন্তু কোঁচকানো। চোখের তারা দুটোও খুব কালো। এখনও ওর গোঁফ রমুদার মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।

কিন্তু সজল ঠোঁট টিপে হেসে, আমার দিকে অমন করে তাকিয়ে কী দেখছে! চোখের চাউনিতে রীতিমতো যেন দুষ্টুমি মাখানো। একজাক্ট বলল কেন! কিন্তু আমার কেমন লজ্জা করছে, আর সজলের চাউনি দেখে মনে মনে রাগও হচ্ছে। বড় বড় কালো চিকচিক করা চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, একটি ফাজিল। আমি রমুদার দিকে তাকিয়ে, বিরক্ত হয়ে বললাম, কী বলবি বল, তাকিয়ে আছিস কেন?

সজল বলে উঠল, আমি বলব?’

আমি সজলের মুখের দিকে তাকালাম। সজল খুব গম্ভীর হয়ে উঠল, ভুরু জোড়া তুলে, চোখ একটু বড় করে, আমার মাথার ওপর দিয়ে সামনে তাকাল। যেন বিশেষ কিছু বলবে বলে, কিছু ভাবছে। আমার খুব অবাক লাগছে। কী বলতে চায় সজল। সজল উচ্চারণ করল, মানে।

আবার চুপ করল, রমুদাকে চোখের কোণ দিয়ে এক বার দেখে নিল। বলল, রমু আমাকে বলছিল, তুমি নাকি লিজার মতো দেখতে। তুমি তার চেয়ে অনেক সুন্দর, দারুণ

রাগে, আমার মুখে রক্ত ছুটে এল। আমি তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরে, অন্য দিকে চলে গেলাম। পিছন থেকে ওরা দুজনে হো হো করে হেসে উঠল। আমি আর থাকতে পারলাম না। থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে বললাম, দ্যাখ রমুদা, এ সব অসভ্যতা আমি একটুও ভালবাসি না।

বলেই আমি আবার নীচের সিঁড়ির দিকে চলে গেলাম। রমুদার হাসি শুনতে পেলাম, এবং সঙ্গে সঙ্গে সজলের ধমক, এই, অসভ্যের মতো হাসিস না।’

রমুদা আরও জোরে হেসে উঠল। তার মানে, সজল আমাকেই ঠাট্টা করল। মনে মনে বললাম, পাজি, অসভ্য।

রমুদা চিৎকার করে উঠল, যমুনা শোন, শুনে যা।’

কাঁচকলা, আমার বয়ে গিয়েছে। আমি সিঁড়ি দিয়ে, সোজা নীচে নেমে, রান্নাঘরে মামিমার কাছে চলে গেলাম। রান্নার লোক আছে, সে ভালই রাঁধে। তবু আজ রমুদার বন্ধুদের জন্য, মামিমা নিজেই কিছু। কিছু রান্না করছেন। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কী রে, চলে এলি?

বললাম, এমনি। তুমি কী করছ, দেখতে এলাম।

মামিমা বললেন, তুই তো পাকা গিন্নি, সবই রান্না করতে পারিস।

 বললাম, হ্যাঁ, তোমাকে আমি বলেছি!’

বলবি কেন, জানি তো, ঠাকুরঝি অসুখে পড়লে, তুই বাড়িতে সবাইকে বেঁধে খাওয়াতিস।

 ও রকম ডাল-ভাত সবাই রান্না করতে পারে।

মামিমা আবার রান্নায় ব্যস্ত হলেন। দুটো উনোনে রান্না চলছে। হরি স্যালাড তৈরি করছে। পেঁয়াজ টমাটো গাজর শশা ইত্যাদি সবই বেশ নকশা করে কাটছে। ওটা ও ভাল পারে। আমি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। খাবার ঘরে এলাম। ফ্রিজ খুলে, বোতল থেকে একটু জল খেলাম। জানালার পরদা সরিয়ে রাস্তার দিকে তাকালাম। ও ঘর থেকে রাস্তা দেখা যায়। কিন্তু রাস্তার কিছুই দেখছি না। এখনও আমার ভিতরটা রাগে ভরে আছে। মিহির, বিপ্লব, শ্যামল ওরা কোনও দিন এ রকম কথা বলেনি। সজল প্রথম দিন এসেই এ রকম বলল। ভারী পাজি। নিশ্চয়ই রমুদা ওকে আগে কিছু বলেছে। কী বলেছে, বুঝতেই পারছি। সবই আমার পিছনে লাগার ফিকির।

এই যমুনা, তুই এখানে কী করছিস?

বীথি এসে আমার পাশে দাঁড়াল। বললাম, এমনি দাঁড়িয়ে আছি।

কেন রে। মামিমা বকেছেন নাকি?

না তো।

তবে তোর মুখটা ও রকম দেখাচ্ছে কেন?

 কী রকম আবার দেখাবে, কিছুই না।

ওপরে চল, সবাই তোকে খুঁজছে।

কে খুঁজছে?

ঋতা, রাখী সবাই খুঁজছে।

ওরা কোথায়?

রমুদা? সব ছাদে গেছে।

আমি বীথির সঙ্গে ওপরে গেলাম। ঋতা আর রাখী বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। ঋতা জিজ্ঞেস করল, কোথায় গেছলে যমুনা? কাজ করছিলে?

বললাম, না, এমনি একটু নীচে গেছলাম।

ঋতা বলল, চলো, তোমার ঘরে গিয়ে বসি।

আমার ঘরে যাবার আগে, আমি মামিমার ঘরের পাশের ঘরের ভেজানো দরজাটা ঠেলে এক বার উঁকি দিলাম। এ ঘরে কেউ থাকে না। যা ভেবেছিলাম, তা-ই। দীপু আর দীপা বসে বসে কথা বলছে। জিজ্ঞেস করলাম, তোদের গল্প শেষ হয়নি?

দীপু বলল, না।

দরজাটা আবার টেনে দিয়ে চলে এলাম। দীপু আর দীপার ওপরে আমার খুব রাগ হয়। কী এত গল্প যে ওরা করে, ভেবে পাই না। দুজনে দুজনকে পেলে, আর কারোকে চায় না। ওদের গল্প করা আর শেষ হয় না। সকলে এক জায়গায় রয়েছে, ওরা সেখানে নেই। এও সেই রমুদার প্রেম’ হচ্ছে কি না, কে জানে! আমার ঘরে এলাম। বীথি ঋতা রাখী, ওরা আমার খাটের ওপর ছড়িয়ে বসেছে। বীথি ওদের দুজনের থেকে ছোট। তবু বেশ মেতে উঠেছে। রাখী কী একটা ইংরেজি সিনেমার গল্প বলছে, তাই নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে। রাখী লেখাপড়ায় খুব ভাল। বিশেষ করে ইংরেজি খুব ভাল জানে। ওদের বাড়িতেও ইংরেজি বেশি চলে। ওর কথাবার্তার ধরন-ধারণও একটু আলাদা। পোশাকে বেশে, চলনে বলনে, একটু মেমসাহেবি ভাব। ও বলছে, ওহ, সো ডেয়ারিং, কী বলব! আমি ভাবলাম, মেয়েটা বুঝি গায়ের থেকে ব্রা প্যান্টিও খুলে ফেলবে।

ঋতা হেসে উঠে বলল, খোলেনি তো?

রাখী বলল, গড সেভড আস।

 বীথি বলে উঠল, তারপরে কী হল? এসথারের সঙ্গে ছেলেটার বিয়ে হল?

 রাখী বলল, না। বিয়ে হল ওর থেকে বয়সে অনেক বড়, এক কোটিপতির সঙ্গে।

 বীথি বলে উঠল, বিচ্ছিরি, এ আমার ভাল লাগল না।

ঋতা রাখী হেসে উঠল।

.

কিছুক্ষণ পরেই খাবার ডাক পড়ল। আমি আগে নীচে গেলাম। মামিমা বললেন, বিন্দু, তুই একটু পরে বসবি, আমার সঙ্গে ওদের পরিবেশন করবি।

বললাম, আচ্ছা।

আমি খাবার ঘরে গেলাম। গোটা বাড়িটা রান্নার সুগন্ধে ভরে গিয়েছে। খাবার টেবিলটা মস্ত বড়। দশ জন একসঙ্গে খেতে বসতে পারে। মামার বন্ধুরা প্রায় রাত্রেই, এই টেবিলে বসে খাওয়াদাওয়া করেন। ওপরেও একটা ছোট খাবার টেবিল আছে। রাত্রে আমরা প্রায়ই ওপরে খেয়ে নিই, নীচে এসে খাওয়া হয় না। মামার বন্ধুরা থাকেন।

মামার কথা আমার মনে পড়ছে। এ সময় বাড়িতে থাকলে বেশ হত। কাজের জন্য থাকতে পারলেন না। বলে গিয়েছেন, ফাঁক পেলে এক বার এসে ঘুরে যাবেন। টেবিলের ওপরে প্লেট সাজানো হয়ে গিয়েছে, খাবারের পাত্রগুলো পাশের একটা ছোট টেবিলে রাখা হয়েছে। সিঁড়িতে সকলের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। সবাই এসে একসঙ্গে ঘরে ঢুকল। মামিমা বললেন, বসে পড়ো সবাই।

রমুদা আমার পাশ দিয়ে যাবার সময়, পিঠে একটা খোঁচা দিয়ে গেল। আমি বলে উঠলাম, মামিমা, এ বার কিন্তু রমুদাকে আমি মারব।

মামিমা মুরগি দিয়ে রান্না ভাতভাজা পরিবেশন করতে করতে বললেন, মার, আমাকে বলছিস কেন?

সজলের গম্ভীর গলা শোনা গেল, এই রমু, দুষ্টুমি করিস না।

 শ্যামল বলে উঠল, ও বাব্বা, সজল একেবারে ঠাকুরদা হয়ে গেলি যে?

সজল সেইভাবেই আবার বলে উঠল, না না, আমি ও সব পছন্দ করি না।

এ বার মামিমাও হেসে উঠলেন। সজলকে এক বার তাকিয়ে দেখলেন। আমি অবিশ্যি সজলের দিকে এক বারও তাকাচ্ছি না। মামিমা বললেন, বিন্দু, তুই সবাইকে মাছের ফ্রাই দে।–কেউ টমাটো বা চিলি সস নিলে নিয়ে নিয়ো।

মিহির বলল, আমার চিলি চাই।

 ঋতা বলল, আমারও।

আয়োজন অনেক। মাছের মাথা দিয়ে ডাল, দু রকম নিরামিষ তরকারি, চিংড়ি মাছের মালাইকারি, তারপরেও মুরগির মাংস। মাছ ভাজা দিয়ে, আমি ডালের পাত্র নিয়ে এলাম। মামিমা নিরামিষ তরকারি নিয়ে এলেন। সব রান্নার নাম করে বললেন, যার যেটা ভাল লাগবে, সে সেটাই খাবে।

রাখী বলল, মাসিমা, হায়ার সেকেন্ডারিতে এই খাওয়াচ্ছেন। এর পরে যখন রমু বি. এসসি. পাশ করবে?

মামিমা বললেন, যা খেতে চাইবে, তাই খাওয়াব।

সজলের গলা শোনা গেল, তা হলে আমি কেবল করলা ভাতে ভাত খাব।

সবাই হো হো করে হেসে উঠল। ভীষণ পাজি ছেলেটা। মামিমা বললেন, কেন, শুধু করলা ভাতে কেন?

সজল বলল, তেতো খেতে খুব ভালবাসি কিনা, তাই।

 বীথি বলল, রমুর বিয়ের সময় তো তা হলে কথাই নেই, দারুণ খাওয়া হবে।

 দেখলাম, বীথি এক বার ঋতার দিকে তাকাল, আর এক বার রমুদার দিকে। রমুদা মুখ টিপে হাসছে। ওর হাসি দেখলে হাসি পায়। ঋতার মুখটা একটু লাল হল। মুখ তুলল না।

যমুনা, আমাকে একটু পটলের তরকারি দাও তো।

সজলের গলা। কী পাজি। মামিমার কাছে চাইতে পারল না! মামিমা বললেন, দে বিন্দু, ওকে একটু তরকারি দে।

রমু বলল, তরকারি খেয়ে পেট ভরাচ্ছিস কেন। মাছ খা।

আমি সজলকে তরকারি দিলাম। ও মামিমাকে বলে উঠল, মাসিমা, যমুনার মুখটা কী রকম শুকনো দেখাচ্ছে।

মামিমা বললেন, হ্যাঁ, বেলা হয়েছে তো, খিদে পেয়েছে।

আমি বলে উঠলাম, মোটেই না।

আমি রমুদার দিকে দেখলাম। হাসছে। এত রাগ হচ্ছে আমার! সজল আবার বলল, মাসিমা তা হলে ভুল বুঝেছেন, যমুনার খিদে পায়নি।

মামিমা বললেন, আমাদের বিন্দু গ্রামের মেয়ে, ও অনেক কিছু সহ্য করতে পারে।

সজল বলল, ওহ, গেঁয়ো!

কয়েকজন হেসে উঠল। ঋতা বলল, মনে হচ্ছে, সজল যমুনাকে লেগপুল করছে।

 মামিমা আমার দিকে দেখে বললেন, আমারও তাই মনে হচ্ছে।

সজল তাড়াতাড়ি বলল, না না, আমি কারোর পা ধরে টানাটানি করতে পারি না।

আবার সবাই হাসল। মনে মনে বললাম, ছ্যাঁচড়া। মামিমা আমাকে বললেন, চিংড়ি মাছ আরও। কারোর লাগলে দে। আমি মুরগির দোপেঁয়াজিটা নিয়ে আসছি।

সেটা তখনও রান্নাঘরে। মামিমা রান্নাঘরে গেলেন। শ্যামল বলল, দোপেঁয়াজি কেন, চার পেঁয়াজি হয় না?

সজল বলল, না।

কেন?

তা হলে ওটা পোড়া পেঁয়াজি হয়ে যাবে। চার বার করে ভাজলে পেঁয়াজ পুড়েই যায়।

শ্যামল ও সজলের কথার মধ্যেই সবাই হাসছিল। রাখী হঠাৎ বলল, তা হলে কি সিনেমায় যাওয়া হচ্ছে?

মিহির বলল, গেলেও ইভনিং শোতে। এত খেয়ে, এখুনি ছুটতে পারব না।

ঋতা বলল, আমি তো সোজা যমুনার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ব।

বিপ্লব এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি। এবার বলল, তা হবে না, সবাই এক ঘরে থাকব।

রাখী বলল, হ্যাঁ তাই।

রাখী আর ঋতা চোখাচোখি করে হাসল। আমি সবাইকে আবার চিংড়ি মাছ দিলাম। বীথিকে জোর করে একটা বেশি দিলাম। দীপু দীপা পাশাপাশি বসে খাচ্ছে। একটা কথাও বলছে না। ওরাই বেশ আছে।

সজল বলল, আমাদের বাঙালদের ভাইফোঁটার সময় বোনেরা কী বলে জানিস? শোন, যমুনা দ্যায় যমেরে ফোঁটা, আমরা দেই আমাগো ভাইয়েরে ফোঁটা।

বীথি এত জোরে হাসল, মুখের খাবার পড়ে গেল। আমার দিকে চেয়ে সবাই হাসছে। সজল আবার বলল, এই ঋতা, তোরা বাঙাল না?

ঋতা সঙ্গে সঙ্গে বলল, এই, তোকে তুই’ বলতে বারণ করেছি না?

সজলটা কী অসম্ভব পাজি! বলল, আ রে যা যা, রোয়াব দেখাসনে।

সকলের হাসির মধ্যেই, মামিমা এলেন। এসেই বললেন, বিন্দু, তোর প্লেট তো দেওয়াই আছে, তুই এবার বসে পড় বাবা।

আমি বললাম, থাক না, আমি পরে বসব।

মামিমা শুনলেন না, না, আর দেরি না, অনেক বেলা হয়েছে, বসে পড়। হরিকে ডেকে বললেন, তুই বিন্দুদিদিকে খেতে দে।

আর উপায় নেই, বসতেই হবে। সকলের খাওয়া দেখে, এখন আর আমার খিদে পাচ্ছে না। তা ছাড়া, বিশেষ করে সজলের সামনে আমার খেতে ইচ্ছা করছিল না। বারান্দার বেসিন থেকে হাত ধুয়ে এসে বসলাম। শুধু ভাতভাজা আর চিংড়ি মাছ নিলাম। ওদের হতে হতে আমারও খাওয়া প্রায় শেষ। আমার জন্য বীথি আর ঋতা একটু বসে রইল। তারপরে সবাই কলকল করতে করতে, আবার ওপরে চলে গেল। ঋতা আমাকে ধরে নিয়ে গেল। রমুদাদের ঘরে আমার যেতে ইচ্ছা করছিল না। ঋতা ছাড়ল না।

রমুদা ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। আমি, ঋতা, বীথি আর রাখী একটা খাটে বসলাম। আর একটাতে ওরা সবাই। রমুদা আলমারি খুলে, একটা বড় সিগারেটের প্যাকেট বের করল। বিপ্লব বলে উঠল, আহ হা, ফাইভ ফিফটি ফাইভ! তখন ছাদে দিসনি তো?

রমুদা বলল, খাবার পরের জন্য রেখে দিয়েছিলাম।

রমুদা আজকাল প্রায়ই সিগারেট খায়। প্রায়ই কেন, এখন বলতে গেলে, রোজই। আগের মতো, মাঝে-মধ্যে নয়। ওরা সবাই একটা করে সিগারেট নিল। রাখী বলে উঠল, রমু, তুই ম্যানার্স জানিস না। আগে আমাদের অফার করবি তো।

রমুদা জিজ্ঞেস করল, খাবি?

 শ্যুর।

রাখী একটা সিগারেট নিল। ঋতাকে দিতে গেলে, ও ঘাড় নাড়ল। কিন্তু বীথিটা নিয়ে নিল। রমুদা বলল, বীথি হচ্ছে রিয়্যাল স্পোর্ট। আমার খুব ভাল লাগে।

বীথি বলল, থাক, তোমার আর ভাল লাগতে হবে না।

 রমুদা আমাকে জিজ্ঞেস করল, ইয়েস, মিস মিত্র, আপনার চলবে?

বললাম, প্যাকেটটা সুদ্ধ দে।

কেন?

দে না।

সজল বলে উঠল, খবরদার রমু, উনুনে নিয়ে ফেলে দেবে।

রমুদা সামনে থেকে লাফ দিয়ে সরে গেল। আমি ঋতার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। কথাটা সজল একেবারে মিথ্যা বলেনি। জানালা গলিয়ে ফেলে দেবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু রাখী আর বীথি কি সত্যি সিগারেট খাবে নাকি? বিশেষ করে বীথির ওপরে আমার রাগ হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, তুই খেতে পারবি?

বীথি বলল, মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়া তো৷

রমুদার কাছ থেকে দেশলাই নিয়ে রাখী সিগারেট ধরাল, বীথিরটাও ধরিয়ে দিল। সকলের সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘর ভরে গেল। বীথিটা কাশছে। রাখী বেশ ভালভাবেই খাচ্ছে। এর আগে, আমি কোনও মেয়েকে সিগারেট খেতে দেখিনি। ঋতাকে বললাম, তুমি খেলে না কেন?

ঋতা বলল, খেয়ে দেখেছি, আমার মুখ তেতো হয়ে যায়, ভাল লাগে না।

 সিগারেট খাবার পরে, সবাই শোয়া আর আধশোয়া হয়ে পড়ল। আমিও ঋতার পাশে কাত হয়ে পড়েছি। মনে হচ্ছে, সবাই যেন ঘুমোচ্ছ। এ ঘরে নেই কেবল দীপু আর দীপা। ওদের শোয়া নেই, ঘুম নেই, কেবল কথা আর কথা। দীপাটা যেন আমার বন্ধু না, কেবল দীপুরই বন্ধু।

আধ ঘণ্টাও কাটল না। মিহির লাফ দিয়ে উঠল, ধুত্তোরিকা, ভাল লাগছে না। এই রমু!

বল।

রেকর্ড বাজা।

রমুদা উঠে ইংরেজি রেকর্ড বাজিয়ে দিল। সবাই উঠে বসল। সজল নেমে এসে বলল, নাচব। কে নাচবে আমার সঙ্গে!

রাখী নেমে গেল। ওরা দুজনে, হাতে হাত ধরে, কাঁধে হাত রেখে, দুটো খাটের মাঝখানে, মেঝেতে নাচতে লাগল। আমি বুঝি না, কিন্তু নাচটা ভালই হচ্ছে, মনে হল। সবাই দেখছে। আমি কখনও এভাবে নাচবার কথা ভাবতে পারি না। মিহির সমানে শিস দিয়ে চলেছে। রমুদা ঋতাকে আঙুলের ইশারায় ডাকল। ঋতা মাথা নাড়ল, নাক কোঁচকাল। বীথি বলল, যাও না!

ঋতা বলল, না, আমার এখন ভাল লাগছে না।

একটা রেকর্ড শেষ হতেই, আর একটা রেকর্ড বেজে উঠল। এ বার রাখী আর সজল, হাত ছেড়ে দিয়ে সামনাসামনি নাচতে লাগল। টুইস্ট। সজল আর রাখীর ভঙ্গি দেখে, আমার ভীষণ লজ্জা করতে লাগল। এ কী রকম নাচ! অসভ্যের মতো লাগছে। সজল দেখছি, এ সবে বেশ ওস্তাদ। রাখীও কম যায় না। এখন ঋতাও রমুদা আর মিহিরের সঙ্গে হাততালি দিচ্ছে। সজল হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দ করল গলা দিয়ে। রাখী চোখের তারা কাঁপিয়ে, ভুরু নাচাল। ওদের অঙ্গভঙ্গি সত্যি খারাপ লাগছে আমার, তাকিয়ে থাকতে পারছি না। অথচ চোখ ফেরাতেও পারছি না।

নাচ শেষ হলে রাখী এসে বসে পড়ল। সবাই হাততালি দিল। আমি দিলাম না। বিপ্লব বলল, সজল, তুই একটা গান কর। সেইটাও মাই গ্রিন ভার্জিন আইল্যান্ড।

রাখী, রমুদা সবাই সায় দিয়ে উঠল। সজল টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। একটু কেশে, গান ধরল। ঠিক ইংরেজি গানের রেকর্ডের মতোই, ওর গলায় গান বেজে উঠল। গলাটা সত্যি মিষ্টি। ও কখনও চোখ বুজছে, কখনও তাকাচ্ছে। কখনও ঘাড় উঁচু করছে, আবার গানের সঙ্গে সঙ্গে নামিয়ে আনছে। শুনতে বেশ ভাল লাগছে। এ সবই যদি করে বেড়ায় তো পড়াশোনা করে কখন! অথচ, রমুদার থেকেও ওর হায়ার সেকেন্ডারি রেজাল্ট ভাল। গান শুনতে শুনতে মনে হল, সজল একেবারে তন্ময় হয়ে গিয়েছে।

গান শেষ হতে, আবার সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। রাখী বলে উঠল, বিউটিফুল, সজল তুমি একটা জিনিয়াস।

মিহির বলল, আর একটা।

না, আর পারব না। আমি একটা সিগারেট খাব।

রমুদা ওকে একটা সিগারেট দিল। ঋতা বলল, সজল, একটা রবীন্দ্রসংগীত কর।

 সজল সিগারেট ধরিয়ে বলল, তুই কর না, ভাল জানিস তো।

বাজে বকিস না। কর না।

 দাঁড়া, সিগারেট খেয়ে নিই।

আমি বীথির দিকে তাকালাম। ও ভাল রবীন্দ্রসংগীত করতে পারে। বীথি আমাকে চোখ টিপল, কিছু বলতে বারণ করছে। সজল সিগারেট নিভিয়ে দিয়ে গান ধরল: বিধি ডাগর আঁখি যদি দিয়েছিলে…।’ এবার আমি মনে মনে আরও অবাক হলাম। সজল রবীন্দ্রসংগীতও ভাল গাইতে পারে। ঠিক রেকর্ডের গানের মতোই শোনাচ্ছে। গান গাইতে গাইতে ওর সঙ্গে আমার দু বার চোখাচোখি হয়ে গেল। আর তাকাইনি। ওর ওপর আমার রাগ যায়নি। খেতে বসে সারাক্ষণই আমার পিছনে লেগেছে। কিন্তু গান গাইবার সময় সজল একেবারে তন্ময় হয়ে যায়। ওকে অন্য রকম দেখায়। ও যে দুষ্টামি ফাজলামি করতে পারে, গানের সময় মনে হয় না।

গান শেষ হয়ে গেলে বাইরে থেকে দরজায় শব্দ হল। আমি উঠে দরজা খুলে দেখলাম, হরি। বলল, এখন চা দেব?

রমুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোরা এখন চা খাবি?

খাব।

 হরিকে বললাম, নিয়ে আয়। মামিমা কোথায় রে?

ঘরে শুয়ে আছেন।

ইতিমধ্যে সিনেমার আলোচনা উঠেছে। কী ছবি দেখতে যাওয়া হবে, তাই নিয়ে কথাবার্তা চলছে। একটু পরেই চা এল। সজল চা খেয়ে বলল, আমার গলাটা এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমি আর একটা গান করব।

সবাই হাততালি দিয়ে সমর্থন করল। আমিও মনে মনে খুশিই হলাম। সজল চকিতে এক বার আমাকে দেখে নিল। তারপরেই গেয়ে উঠল, যমুনে, এই কি তুমি সেই যমুনে, প্রবাহিণী…আমি সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। পিছনে হাসি আর হাততালি শোনা গেল। কেউ কেউ ঘর থেকে বেরিয়ে এল। আমি একেবারে নীচে চলে গেলাম। মামার আলাদা বসবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। আর কিছুতেই সজলের সামনে যাব না। যাব না, যাব না, যাব না। ও ভেবেছে কী। খালি আমার পিছনে লাগছে!

কিছুক্ষণ পরেই দরজায় শব্দ হল। কয়েক বার হতেই জিজ্ঞেস করলাম, কে?

শোনা গেল, আমি ঋতা।

দরজা খুলে দিলাম। দেখলাম, সবাই দাঁড়িয়ে আছে। রাখী বলল, আমরা চলে যাচ্ছি।

সজলের দিকে তাকালাম না। সবাই নেমে এসেছে। দীপু আর দীপাও। কেবল বীথিকে দেখতে পেলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, মামিকে বলা হয়েছে?

ঋতা বলল, হ্যাঁ, ওঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছি। তুমি চলো আমাদের সঙ্গে।

 ঘাড় নেড়ে বললাম, আমি সিনেমা দেখব না।

 ও নাগরদোলনা চাপবে। সজল বলল, আর সবাই হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বাইরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আমি পিছন পিছন গেলাম। সবাই রাস্তায় নেমে যাবার পরে, সজল হঠাৎ চেঁচিয়ে ডেকে উঠল, যমুনা।

আমি ভুল করে ওর দিকে তাকালাম। সজল হেসে বলল, যাচ্ছি, আবার আসব, কেমন?

আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। সবাই হাসতে হাসতে চলে গেল। আমি আর এক বার মনে মনে বললাম, পাজি।

ওপরে গিয়ে, রমুদাদের ঘরে বীথিকে দেখতে পেলাম না। মামিমার ঘরেও নেই। আমার ঘরে গিয়ে দেখলাম, বীথি খাটের ওপর চুপচাপ বসে আছে। কাছে গিয়ে বললাম, কী রে, চুপচাপ বসে আছিস যে? ওদের সঙ্গে গেলি না?

না।

 বীথির মুখটা গম্ভীর, থমথম করছে। আমার দিকে তাকাল। মনে হল, ওর চোখ ছলছল করছে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে রে?

বীথির গলা ধরা ধরা, বলল, আমি একটা জিনিস দেখেছি।

কী?

 তুই নীচে যাবার পরে, সবাই ছাদে চলে গিয়েছিল; রমুদা আর ঋতা ছাড়া। আমি ওদের ডাকবার জন্য দোতলায় নেমে এসেছিলাম। ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম…।

বীথির গলা বন্ধ হয়ে গেল। চোখের কোণে জল জমে উঠল। আমি ওর কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলাম, কী দেখলি?

কান্নায় বীথির গলা ভেঙে এল, তবু বলল, রমুদা ঋতাকে চুমো খাচ্ছিল।

বীথি এবার ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলল। আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমার কাছে তো এ সংবাদ নতুন না। রমুদা আমাকে নিজেই তো বলেছে। ঋতার সঙ্গে নাকি ওর প্রেম’আছে, ও ঋতাকে চুমো খায়। কোনও দিন চোখে দেখিনি, তা হলেও জানি। অবাক হয়ে বললাম, তাতে কী হয়েছে?

বীথি কথা বলল না, কাঁদতে লাগল। বীথির কান্নার কোনও অর্থ বুঝতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, তোর রাগ হয়েছে?

বীথি ঘাড় নাড়ল। আবার জিজ্ঞেস করলাম, তবে? কষ্ট হয়েছে?

হ্যাঁ।

কেন?

জানি না।

 একটু পরে বীথি চোখমুখ মুছে চলে গেল। আজ বুঝতে পারলাম না, পরে বুঝেছি। অথচ তেরোর মনের অভিজ্ঞতায় আমার কত বিশ্বাস ছিল। পনেরোতে, বীথিকে আজ বুঝতে পারলাম না০। পরে বুঝেছি, এবং ভেবেছি, প্রেমের কান্না কাকে বলে, বীথির কান্নাতেই তা প্রথম দেখেছি। তারপরে আর দু বছর বীথি আমাদের বাড়ি আসেনি। পরে এসেছে, কিন্তু রমুদার সঙ্গে দেখা করেনি।

এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, অভিশাপ বলে কি কিছু আছে! যদি থেকে থাকে, তা হলে বলব, রমুদার জীবনে কিশোরী বীথির অভিশাপ লেগেছে। রমুদার আজকের জীবনটা অভিশপ্ত ছাড়া আর কিছু না।

কিন্তু এই দিনটির কথা আমার সেজন্য মনে নেই। ভাবতে ভাবতে মনে এল। বীথির কান্না কি আমার জীবনে কোথাও দাগ ফেলেছে। কোথাও না। আজ সজল এসেছিল। এই দিনটি তা-ই আমার জীবনে একটি চিরদিনের দাগ।