উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

৭. সজল এল

০৭.

সজল এল। বাড়িতে আজ ভোজ, উৎসব। রমুদা হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছে, ফাস্ট ডিভিশন। রমুদার বন্ধুরা এসেছে কয়েকজন। সজল মিহির বিপ্লব শ্যামল এবং রাখী আর ঋতা। মিহিরের বোন রাখী। শ্যামলের বোন ঋতা। ওরা সকলেই হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছে। মিহির আর শ্যামলের বাড়িতে রমুদার অনেক দিনের যাতায়াত, তাই ওদের বোনেরাও আজ নিমন্ত্রিত। ঋতা ছাড়া, এবং সজল ছাড়া, আর সবাইকেই আমি আগে দেখেছি। ওরা এ বাড়িতে আগেও এসেছে।

সবথেকে বড় কথা, সজল আজ এসেছে। যদিও এই আসা নিয়ে, আজ আমার কোনও চিন্তাই নেই। রমুদার অন্যান্য বন্ধুরা যেমন আসে, আর একজন তেমনি এসেছে, এইটুকুই জানি। কিন্তু আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই বলছি, এ দিনটি কোনও দিন ভুলিনি। ভুলবও না। অথচ ঘটবার মতো কিছু ঘটলও না।

কিন্তু তার আগে, কয়েকটি বছরের কথা একটুখানি বলে নিই। কলকাতায় আসার সেই প্রথম দিনের ঘটনার পরে, কয়েক দিনের মধ্যেই রমুদার সঙ্গে আবার আমার ভাব হয়ে গিয়েছিল। রমুদা কয়েক দিন আমার সঙ্গে কথা বলেনি। গম্ভীর হয়ে, আমার পাশ দিয়ে চলে যেত। আমার কেমন খারাপ লাগত। মামিমার চোখে কিছুই পড়েনি। তা হলে হয়তো আগেই কথা বলা হয়ে যেত। আমার লজ্জা করত। অথচ এ কথাও ঠিক, চুমো খাওয়াটা আমি কোনও মতেই মেনে নিতে পারিনি, পারব না। তবু রমুদাদের বাড়িতে আছি, ও আমার সঙ্গে কথা বলে না, পাশ কাটিয়ে চলে যায়, কেমন যেন নিজেকে অপরাধী লাগছিল। দীপুকে বলেছিলাম। দীপু আবার সেই রকম, ঘাড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছিল, না বলুক, তাতে কী হয়েছে?

আমার খুব খারাপ লাগে। মামিমা জানলে কী ভাববে?

মা আবার কী ভাববে! দাদাকে বকে দেবে। তা হলে মাকে-ই বলে দিস।

আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠেছি, না। মামিমাকে বলিস না। তুই রমুদাকে আমার সঙ্গে কথা বলতে বলিস।

ও আমার কথা শুনবে না।

তবু বলিস।

তুই বলতে পারিস না?

রাগ করে যদি?

কাঁচকলা করবে।

দীপুর সঙ্গে এ কথা বলার পরদিনই, রমুদা ইস্কুল থেকে বাড়ি ফিরে, খাবার খেয়ে, আবার যখন বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন ওদের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। রমুদা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা আঁচড়াচ্ছিল। আয়নাতেই আমাকে দেখতে পেয়ে, ফিরে তাকিয়েছিল। আবার সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। বলেছিলাম, রমুদা, তুমি আমার সঙ্গে কথা বলো না কেন?

রমুদা বলল, তুই-ই তো আমার ওপর রেগে গেছিস।

এখন তো আমার আর রাগ নেই।

সেদিনে রেগে গেলি কেন? আমি কি তোর সঙ্গে প্রেম করতে গেছলাম!

কথাটা শুনেই আমার মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। পিসতুতো বোনের সঙ্গে কেউ আবার প্রেম করে নাকি। তা ছাড়া রমুদা প্রেম করবে, তাও আমি ভাবতে চাইনি। আমি তো ওর বোন, তা ছাড়া কোনও মেয়ের সঙ্গেই ও প্রেম করতে পারে না। প্রেমের নিশ্চয়ই একটা বয়স আছে, আমার ধারণা তাই ছিল। বলেছিলাম, প্রেম করতে যাবে কেন। তা আবার কেউ করে নাকি?

রমুদার স্পষ্ট জবাব, কেন করবে না। আমি তো করি।

আমি হাঁ করে রমুদার মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। রমুদার স্বাস্থ্য অবিশ্যি খুবই ভাল। পনেরো বছরেই ও বেশ লম্বা হয়ে উঠেছিল, দেখে বেশ শক্ত সমর্থ মনে হত। গোঁফের সবুজ রেখা দেখা দিয়েছিল ঠোঁটের ওপর। মুখটা মামিমার মতো একটু গোল ধাঁচের। রমুদা আবার বলেছিল, ও রকম হাঁ করে তাকিয়ে আছিস কেন!

আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, তুমি যে বললে, তুমি প্রেম করো।

হ্যাঁ করি তো, কী হয়েছে। আমার মতো অনেক ছেলেই প্রেম করে।

এতটা অবিশ্যি আমার জানা ছিল না। নিজের দাদাকে কোনওদিন প্রেম করতে দেখিনি। বন্ধুদের দেখেছি, কিন্তু তাদের প্রেমিকরা রমুদার থেকে বয়সে বড় ছিল। আমাদের দেখে যারা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে বা দোকানে বসে শিস দিত, গান করত, তারাও রমুদার থেকে বড় বলেই আমার ধারণা। আমার ভাবতেও সাহস হচ্ছিল না, রমুদা যার সঙ্গে প্রেম করে, তাকে চুমো খায়। সে কথা জিজ্ঞেস করবার সাহস একেবারেই ছিল না। বলেছিলাম, আমি ও সব জানি না। তুমি আমার সঙ্গে কথা বলো।

তুই রাগ করেছিলি কেন! একটা চুমো তো খেয়েছিলাম মাত্র।

আমার ও সব একদম ভাল লাগে না।

তা লাগবে কেন–তুই তো একটা গেঁয়ো গোঁয়ার মেয়ে।

আমি কথাটা মেনে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। রমুদা আমার মাথায় একটা আলতো করে চাটি মেরে বলেছিল, আচ্ছা বলব। তোকে তো সত্যি এলিজাবেথের মতো দেখতে।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে কে?

 ছবির হিরোইন, ইংরেজি ছবির। তুই কিছুই জানিস না।

ছবি মানে সিনেমা, রমুদার মুখেই প্রথম শুনেছিলাম। বলেছিল, তার মুখের সঙ্গে তোর আদল আছে।

সে তো মেমসাহেব।

হলই বা, মেয়ে তো। আমার তাকে খুব ভাল লাগে।

 এই পর্যন্তই সেদিন কথা হয়েছিল। রমুদার আমি পিসতুতো বোন। কিন্তু ওর ভাল লাগা, সাগরপারের চিত্রাভিনেত্রীর মতো আমাকে দেখতে–সেই কারণে, আমাকে ওর আরও বেশি ভাল লাগে। সেই জন্য ও আমাকে আরও অনেক বার আদর করার চেষ্টা করেছে। আমি তফাত থেকেছি। এখনও ওর মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয়, আমাকে একটু আদর করে! আমি যে ওর বোন, পিসতুতো বোন, সেটা যেন ওর কাছে কিছুই না। কী করে ওর মনটা এ রকম হল, জানি না। পরে আমি এক দিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমি যে তোর পিসতুতো বোন, সেটা তুই ভুলে যাস?

কয়েক মাস পর থেকেই, ওকে আমি তুই’ বলতে আরম্ভ করেছিলাম। ও জবাব দিয়েছিল, তাতে কী হয়েছে। বোনকে চুমো খাওয়া যায় না?

বলেছিলাম, না।

ও সব তুই ভাবিস। আমি ও সব ভাবি না। আমার ভাল লাগলে, আমি সবাইকেই চুমো খেতে পারি।’

সবাইকে?

হ্যাঁ, সবাইকে।

রমুদার কথাবার্তা এমন পাকা পাকা, যেন ও তখন আর ষোলো বছরের একটা ছেলে না। রমুদা একটু বেশি পেকেছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই বয়সে, আমি যতটা ভীতি-বিহ্বল হয়ে ভাবতাম, ততটা না। আবার বলেছিল, তা বলে সবার সঙ্গে তো আর আমি প্রেম করি না।

আমার মুখ দিয়ে আপনিই বেরিয়ে গিয়েছিল, প্রেম ছাড়া চুমো খাওয়া যায়?

 রমুদা হেসে বলেছিল, তুই একটা বোকা।

হয়তো তাই, আমার জানা ছিল না। কিন্তু রমুদার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা তখন বেশ সহজ হয়ে উঠেছিল। আমি কৌতূহলিত হয়ে, অবাক গলায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা রমুদা, তুই কি সত্যি প্রেম করিস নাকি?

করি তো।

ভয় করে না?

কেন, ভয় করবে কেন?

যদি কেউ জানতে পারে?

 জানতে পারবে কেন। শুধু আমার বন্ধু জানে, যার বোন।

 সে কিছু বলে না?

 বলবে আবার কী!

কী করো তোমরা?

কী আবার করব। হাসি-গল্প, কথা বলি, আর–আর–।

রমুদার মতো ছেলের মুখেও কথা আটকে যেতে দেখেছিলাম। ঢোক গিলে বলেছিল, আর সবাইকে লুকিয়ে একটা চুমো খাই।

কথাটা শুনে যেন আমিই লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিলাম। রমুদার সেই বন্ধু বা প্রেমিকা রাগ করে কি না, তা জিজ্ঞেস করবার দরকার ছিল না। সে যে কী করে, তা আমার আগেই জানা ছিল। আমি রমুদাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। ইতিমধ্যে আমার অভিজ্ঞতা তো অনেক বেড়েছে। এখন আমার পনেরো বছর বয়েস। এসেছিলাম তেরোতে। এখন আমার অনেক বন্ধু। তারা অবিশ্যি সবই মেয়ে। ছেলেদের সঙ্গে মেশবার কোনও ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু ইস্কুলের বন্ধুদের কাছে, ছেলেদের কথা আমাকে অনেক শুনতে হয়। আগেই বলেছি, কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতা কম কিছু না। বরং আরও বেশি। এক এক সময় ভেবে অবাক হই, সকলেরই ছেলে বন্ধু আছে, আমারই কেবল নেই! সেটাও সত্যি নয়। আমার মতোও অনেক মেয়ে আছে, যারা ও সব কিছুই করে না। যারা আমারই মতো ছেলেদের এড়িয়ে চলতে চায়।

এমন একটা সময়ে প্রথমে কলকাতা এসেছিলাম, যখন ইস্কুলে ভরতি হতে পারিনি। বাড়িতে বসেই প্রায় পাঁচ মাস পড়েছি। ইতিমধ্যে কৃষ্ণনগরের ইস্কুল থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট আনানো হয়েছিল। এখন আমি নিয়মিত ছাত্রী। ভয় ছিল, আমার একটা বছর হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ পরীক্ষা দিতে পারিনি। কিন্তু ভরতির সময়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। তাতে ভালভাবেই পাশ করে গিয়েছিলাম। আমার ইস্কুল বাড়ি থেকে বেশি দূরে না। আমি এখন গাড়িতে করে ইস্কুলে যাই। ইস্কুলের গাড়িও আছে, কিন্তু আমি বাড়ির গাড়িতেই যাই।

মামার এখন দুটো গাড়ি। একটা গাড়ি নিয়ে তিনি নিজে চলে যান তাঁর কারখানায়। আর একটা গাড়ি বাড়িতেই থাকে। রমুদা দীপু আর আমাকে ইস্কুলে পৌঁছে দেয়। প্রথম প্রথম কেমন একটা আড়ষ্ট বোধ করতাম। গাড়ি চাপতেই আড়ষ্ট লাগত। কয়েক মাসে, রোজই প্রায় গাড়ি চেপে চেপে, খানিকটা সহজ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ইস্কুলে যেতে কেমন আড়ষ্ট লেগেছিল। গাড়ি চেপে ইস্কুলে যাবার কথা কোনও দিন ভাবিনি। ইস্কুলের মেয়েদের অনেকের ধারণা ছিল, আমি বড়লোকের মেয়ে। অনেক মেয়ে, প্রথম দিকে, তার জন্যে একটু ঠাট্টা বিদ্রূপও করত। অনেকে মিশতে চাইত না। যাদের সঙ্গে আমার মিশতে ইচ্ছা করত, তাদের সঙ্গে মেশা হত না। যাদের সঙ্গে ইচ্ছা করত না, তারা অনেকে যেচে কথা বলত।

পরে অবিশ্যি সবই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। আমাদের একটা আলাদা দল তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এখনও সেই দলটাই আছে। আমরা ক্লাস নাইনে পড়ি। মাঝে মাঝে কেউ দলত্যাগ করে, আবার নতুন কেউ আসে। আমাদের মধ্যে ঝগড়া হয়, কথা বন্ধ হয়, আবার ভাব হয়, হাসাহাসিও হয়। আমার সব বন্ধুদেরই মামিমা চেনেন। সকলেই কখনও না কখনও আমাদের বাড়িতে এসেছে। আমিও ওদের বাড়িতে যাই। তবে একলা যেতে পারি না। রাস্তাঘাট অনেক চিনে নিয়েছি। ইস্কুলের রাস্তা, কাছাকাছি বন্ধুদের বাড়ির রাস্তা। কিন্তু মামিমা আমাকে একলা ছেড়ে দেন না। গাড়ি দিয়ে আসে, নিয়ে আসে। মামিমাও কখনও কখনও যান। রমুদা দীপুও যায়।

আমাদের দলটাকে বলা যায়, মাঝামাঝি। অর্থাৎ মধ্যপন্থী। একদল মেয়ে আছে, ওরা রাজনীতির কথা বলে। নানান পার্টির কথা বলে। ইস্কুল স্ট্রাইকের কথা ওরা বলে। কয়েকটি মেয়ে আছে, এমনকী ইস্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে, ঠিক কলেজের বড় মেয়েদের মতো বক্তৃতা দেয়। আমার খুব অবাক লাগে, অবাক হয়ে ওদের কথা শুনি। তখন যেন বিশ্বাস করতে পারি না, ওরা আমাদের সঙ্গেই ইস্কুলে পড়ে। ওরা হেড মিস্ট্রেসকেও ভয় পায় না। ওদের খুব সাহস। অবিশ্যি স্ট্রাইক হলে, প্রায় সকলেই খুব খুশি। অন্যান্য ইস্কুলের মেয়েরাও এসে পড়ে। এমনকী ছেলেরাও আসে। কিন্তু ছেলেরা আমাদের ইস্কুল কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢোকে না। বাইরে থেকেই চিৎকার করে, সব বেরিয়ে এসো, বেরিয়ে এসো। কোনও কোনও পাজি ছেলে বলে, এই শুনছিস মেয়েগুলো, শীগগির বেরিয়ে আয়।’ বলে আবার নিজেরাই হাসাহাসি করে। আমরাও নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করি। আমার বন্ধুদের মধ্যেই কেউ হয়তো নিচু স্বরে বলে ওঠে, ও এখনই বাবা হয়ে গেছে।

কেউ হয়তো বলে, রাসকেলটাকে ধরে নিয়ে আয় তো কান ধরে।

বলে আমরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করি। সবকিছুই নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যারা রাজনীতি করে, তাদের সঙ্গে যেন ভাল করে মিশতে পারি না। দূর থেকেই, অনেকটা সমীহ করার ভাব নিয়ে ওদের দেখি। ওদের মধ্যে কেউ কেউ লেখাপড়ায়ও খারাপ না। বেশির ভাগই ভাল না। ওরা নাকি, ইস্কুলের বাইরেও পার্টি করে, মিছিলে মিটিং-এ যায়। ওদের মধ্যে রমা বলে একটি মেয়েকে আমার ভাল লাগে। ও আমাদের সঙ্গে মিশতেও পারে। ও অবিশ্যি বক্তৃতা দিতে পারে না। রাজনীতিতে খুব উৎসাহ। ওর দাদারা সবাই রাজনীতি করে। ওর কোন এক দাদা নাকি কোন একটা দলের এম এল এ।

আর একটা দল আছে। ওরা যে শুধু প্রেমিকা, তা না। ওরা যে কী, আমি তাই ভেবে পাই না। ওরা যে কী খারাপ খারাপ কথা বলতে পারে, ভাবা যায় না। ছেলেদের মতো শালা তো কথায় কথায় বলে। আরও এমন সব কথা বলে, যা অত্যন্ত ছোটলোক রকবাজগুলো বলে। কানে না শুনলে, বিশ্বাস করাই সম্ভব না। এ সব তো হল গালাগাল বা খিস্তি। যে সব গল্প ওরা বলাবলি করে, তাও ভয়ংকর। মনে হয়, ওদের কিছু জানতে বাকি নেই, করতে বাকি নেই; শুনলে মনে হয়, ওদের মাথার ওপরে কেউ নেই। ওরা নিজেরাই নিজেদের কত্রী। অথচ, সত্যি ওরা আমাদেরই বয়সি। কেউ হয়তো দু-এক বছরের বড় হতে পারে।

আমার মনে হয়, ইস্কুলের বাথরুমের দেওয়ালের লেখিকা ওরাই। সিনেমার গল্প লেগেই আছে। হিন্দি বেশি, বাংলা কম, ইংরেজি কিছু কিছু। ওদের নাকি সকলেরই বয়ফ্রেন্ড আছে। একজন না, একাধিক। ওরা একসঙ্গে রাস্তায় বেরোলে, সেটা একটা ভয়ের ব্যাপার। হাসবে, চিৎকার করবে, এবং কেউ তাকিয়ে দেখলে, তার বিষয়ে কথা বলবে। ওরা পুরুষদের ঠাট্টা করে বলে, ব্যাটা, কিশোরীভজা। কোথা থেকে ওরা এ সব কথা শেখে, তাও বুঝি না।

আমাদের মধ্যেও ছেলেদের নিয়ে কোনও কথা হয় না, তা বলব না। অনেক কথাই হয়। কে কেমন দেখতে, কার চাউনির কী উদ্দেশ্য, কাকে দেখে কী মনে হয়, এই সব কথা। অনেককে দেখে হাসি পায়, কারোকে দেখে রাগ হয়, কারোকে কারোকে ভালও লাগে। রাস্তায় হেঁটে আর কতটুকুই বা চলাফেরা করতে পারি। একলা তো প্রায় নয়ই। বন্ধুদের সঙ্গেই বেশি। তবে আমার শরীরের দিকে কেউ তাকালে, আগের মতো আড়ষ্ট হয়ে যাই না। মনে মনে রাগ হয়। বয়স্ক লোকেরা তাকালে বেশি রাগ হয়, ঘৃণা হয়, তখন একটা বীভৎস মুখ আমার মনে পড়ে যায়।

কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমার একটা অবাধ্যতা এবং প্রতিবাদ ঠিকই আছে। আমার কোনও কোনও বন্ধুর বাড়ি গিয়েছি। ওদের দাদাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। আমি একটি কি দুটির বেশি কথা কারোর সঙ্গে বলতে পারি না। তাও না বলতে পারলেই ভাল। সে জন্য আমার বন্ধুরা আমাকে একটু কথা শোনায়, ঠাট্টা করে বলে, তোর একটু রূপের গুমোর আছে যমুনা। তা যে নেই, কেমন করে ওদের বোঝাব! অথচ আমারই বন্ধুদের সঙ্গে, রমুদা আর দীপুর কত ভাব হয়ে গিয়েছে। দীপা নামে যে বন্ধুটি আছে, তার সঙ্গে তো দীপুর খুব ভাব। ওদের নামের এবং নামের ধ্বনির মিলের জন্যই কি না জানি না। দীপা আমাদের বাড়িতে এলেই দেখি, অন্য ঘরে গিয়ে, খালি দীপুর সঙ্গে গল্প করে। ইস্কুলেও দীপুর কথা জিজ্ঞেস করে। দীপুটাও সেই রকম। আমাকে দীপার কথা জিজ্ঞেস করে। বলে, যমুনা, দীপাকে এক দিন আসতে বলিস।

আমি ইচ্ছা করেই জিজ্ঞেস করি, কেন রে?

দীপু বলে, এমনি, কেন আবার। দীপা খুব ভাল মেয়ে।

দীপাকে মেয়েরা দীপুর বিষয় নিয়ে ঠাট্টা করে। দীপা গায়ে মাখে না, হাসে। ও-ও দীপুর মতোই বলে, দীপুকে নিয়ে এক দিন আমাদের বাড়িতে আসিস।

দীপু গিয়েছে, যায়ও। এখন আর আমার সঙ্গে যায় না, নিজে নিজেই চলে যায়। দীপুকে দীপার বাবা-মাও ভালবাসেন। না বাসার কোনও কারণ নেই। দীপু দেখতে সুন্দর, লেখাপড়ায় খুব ভাল। ওর চেহারার সঙ্গে মামার মিল আছে। মামার মুখ যেমন একটু মেয়েলি, সেইরকম।

মামিমাও দেখতে সুন্দর। তাঁর মুখ গোল ভাবের। রমুদা ছেলে বলে, মামিমার আদল পেয়েও, আজকাল ওর মুখটা চওড়া দেখায়।

আমার বন্ধু বীথির ভাব আবার রমুদার সঙ্গে। প্রথম দিন রমুদার সঙ্গে আলাপের পরে, বীথি অবিশ্যি বলেছিল, তোর রমুদাটা ভারী ফাজিল।

কেন, কী করেছে?

আমার দিকে তাকিয়ে গোঁফে তা দিচ্ছিল, আর মোটা গলায় কথা বলছিল।

হেসে বলেছিলাম, ও ওইরকম।

আবার বললে, তোমাকে দেখতে বেশ সুন্দর। আমার লজ্জা করছিল।

সত্যিই তো বলেছে, তুই সুন্দর।

 ও রকম আবার কেউ বলে নাকি। বলে মিটিমিটি হাসছিল।

তোকে ভাল লেগেছে।

যাহ, যমুনা তুই আজকাল খুব পাজি হয়েছিস।

আমি হেসে উঠেছিলাম। এখন তো দেখি, রমুদার সঙ্গে বীথির বেশ ভাব। দুজনে গল্প করে, আর হাসে। কোনও কোনও সময় ওদের খুনসুটিও করতে দেখা যায়। বীথি তখন মামিমাকে এসে বলে, দেখুন না মাসিমা, রমুদা কী রকম করছে!

কী করছে?

 যা-তা বলছে আমাকে।

 তুমিও বলো।

রমুদা হয়তো তখনই তাগ করে বীথিকে ধরবার জন্য। বীথিও ছুট দেয়। ওরা দুজনেই বেশ বন্ধু হয়ে গিয়েছে। তবে, আমার যত দূর ধারণা, রমুদা যাকে বলে প্রেম’,বীথির সঙ্গে সেটা বোধ হয় ওর হয়নি।

.

 মামা-মামিমার কথা একটু বলি। কৃষ্ণনগরের কথা ভুলিনি। নিজের বাবা মা ভাইবোনদের কথাও না। সকলেই আমার জীবন ব্যাপিয়া। কিন্তু মামা-মামিমা যে কোনও দিন আমার এত আপন হয়ে উঠবেন ভাবিনি। ওঁদের স্নেহে আমি এত সহজ হয়ে উঠেছি, এক এক সময় ভুলেই যাই, আমি বাবা-মা ছাড়া আছি। রমুদা দীপু সবাইয়ের সঙ্গে এমনভাবে জীবন কাটছে, মনে হয় আমি যেন আমার পুরনো জীবনেই আছি। কেবল জায়গাটাই বদলেছে। কৃষ্ণনগরের বদলে কলকাতা। এখন কলকাতাকে আমার নিজের শহর বলে মনে হয়। আগে যেমন কলকাতাকে অচেনা বিদেশ বলে মনে হত, এখন তা হয় না।

মামিমা আমাকে তাঁর নিজের মতো করে সাজিয়েছেন। আমিও সেইভাবে সাজতে অভ্যস্ত হয়েছি। মামিমা আমাকে এখনও শাড়ি পরতে দেননি। চৌরঙ্গি পাড়ার দরজির কাছ থেকে নানা ডিজাইনের জামা জ্যাকেট ফ্রক অ্যান্ড স্ল্যাকস শেরোয়ানি তৈরি করিয়ে আনেন। আমি অবিশ্যি জামা জ্যাকেট ফ্রকই বেশি পরি। কোথাও বেড়াতে যেতে হলে অন্য পোশাক। অথচ শাড়িও কম নেই। মামিমার তেমন পছন্দ না। শাড়ি পরলে নাকি আমাকে অনেক বড় দেখায়। মামার আবার শাড়িই পছন্দ। বলেন, বাঙালির মেয়ে একটু ডাগর হয়ে উঠলে, শাড়ির তুল্য পোশাক নেই।

পোশাক নিয়ে মামা-মামিমার মধ্যে তর্ক হয়। মামিমা বলেন, তোমার মেয়েকে নিয়ে তুমি যখন বেরোবে, তখন শাড়ি পরিয়ে নিয়ে যেয়ো। মামা বলেন, নিশ্চয়ই যাব। কসমেটিকস-এর ব্যবহার আমার নিজের তেমন পছন্দ না। নিজেকে কেমন যেন বড় বেশি চোখে পড়ানোর মতো লাগে। মামিমার খুব ইচ্ছা, আমি সেইসব ব্যবহার করি। মামিমার সঙ্গে বেরোতে হলে, করতেই হয়। আগে চুল কাটার কথা ভাবতেও পারতাম না। আমার চুল খুব লম্বা ছিল। আমার সবকিছুই একটু বাড়ন্ত ছিল তো৷ মামিমা বলেন, এত লম্বা চুল কোনও কাজের না। এত লম্বা চুলের যত্ন নেওয়া যায় না। নিতে গেলে অনেক সময় লাগে। তাই এখন পিঠের কাছে চুল, সোজা করে কাটা। ইচ্ছামতো বেণী বাঁধা যায়, খুলে রাখলেও অসুবিধা হয় না। শখ হলে, আলাদা গুছি দিয়ে খোঁপাও বাঁধা যায়।

কোনও দিন হঠাৎ খুব সাজগোজ করলে, মামা আমার দিকে তাকিয়ে, হেসে ঘাড় নাড়েন, বলেন, বিন্দু, মামির পাল্লায় পড়ে তুই কলকাতার মেমসাহেব হয়ে গেছিস। মামিমা বলেন, আমার মেয়েকে আমি যেভাবেই সাজাই, তোমার কেন চোখ টাটায়। দেখতে কেমন লাগছে, তাই বলো। মামার জবাব, না সাজলেও আমাদের মেয়ে সুন্দর। রমুদা বা দীপু কাছে থাকলে, পিছনে লাগে। রমুদা বলে, হ্যাঁ, যমুনা একেবারে মিস ক্যালকাটা।‘ মামা হাঁক পাড়েন, রাখ তোর মিস ক্যালকাটা। যত সব ব্যাকডোরের শূর্পণখা।

মামা অপরিচিত লোকদের সামনে, আমার পরিচয় দেবার সময় সোজা বলে দেন, আমার মেয়ে। মামিমা আবার এতটা পারেন না। বলেন, বলতে গেলে আমার মেয়েই।মামা অফিস থেকে বাড়ি এসে আগে ডাকেন, বিন্দু কোথায় রে।না দেখতে পেলে তাঁর ভাল লাগে না। আমার একটু শরীর খারাপ করলে, মামিমার থেকে উনি বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। মাঝে মাঝে আমার পিছনেও লাগেন, বিন্দু, তোর যা একটা বিয়ে দেব না, দেখিস! দত্তবাড়িতে ও রকম ঘটা আর হয়নি। আমি লজ্জা পাই, গম্ভীর হয়ে বলি, আমি মোটে বিয়েই করব না। মামা বলেন, এমন ছেলে নিয়ে আসব, দেখবি ঠিক পছন্দ হয়ে যাবে। আমি পালিয়ে যাই। মামা-মামিমা হাসেন। কিন্তু আমি জানি, মামা চান, আমি যেন খুব ভালভাবে পড়াশুনো করি, সবসময়ে ভাল রেজাল্ট করতে পারি। তাঁর এবং মামিমার স্নেহ এবং আদরের মধ্যে, একটা সতর্ক দৃষ্টিও আছে আমার দিকে, আমি যেন কোনও বিপথে না যাই। খবর না দিয়ে, বন্ধুদের বাড়ি গিয়ে, কয়েক বার বকুনিও খেয়েছি।

এক দিন হঠাৎ কী কারণে, অফিস-আদালত ইস্কুল কলেজ, সব ছুটি হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ বীথির মাথায় এল, ম্যাটিনিতে সিনেমা দেখতে যাবে দল বেঁধে। আমি প্রথমে রাজি হইনি। পরে রাজি হয়েছিলাম। কাছের একটা হলে তখন কয়েক দিনের জন্য অযান্ত্রিক’ হচ্ছিল। দেখে যখন বাড়ি ফিরেছিলাম, সে কী কাণ্ড! ভাবলে এখনও আমার ভয় লাগে। ও রকম আর কোনও দিন করব না। অন্তত আরও বড় না হয়ে নয়। দেখেছিলাম, মামা-মামিমা উদ্বেগে উৎকণ্ঠায় অস্থির। রমুদা ও দীপু পর্যন্ত ভয়ে মুখ চুন করে বসে ছিল। আমাকে দেখতে পেয়েই, রাগে মামা-মামিমা প্রথমে কথাই বলেননি। রমুদা চোখ পাকিয়ে ঘুষি দেখিয়ে সরে গিয়েছিল। দীপু তো পারলে যেন মারত।

তারপরে শুরু হয়েছিল মামার বকুনি। মামার সেই আর এক চেহারা। বলেছিলেন, তোমার কোনও বন্ধুকে আর এ বাড়িতে আসতে দেওয়া হবে না। ইস্কুল ছাড়া আর কোথাও এক পা যাওয়া চলবে না।

ধরে মারেননি বটে। বেশ ধমকে বলেছিলেন, ফের এ রকম কোনও দিন হলে, চাটিয়ে তোমার দুই গাল লাল করে দেব।

মামার চিৎকার শুনে, রমুদা এসে পড়েছিল। কোপটা গিয়ে পড়েছিল ওর ওপরেও, এই যে, তোরাই হচ্ছিস এ সবের মূলে। যখন খুশি সিনেমায় যাওয়া, তোদের কাছেই শিখেছে। এখন থেকে নিয়ম করে দিচ্ছি, রবিবারের ম্যাটিনি শো ছাড়া, সিনেমায় যাওয়া চলবে না। তাও মাসে এক বার কি দু বার।

রমুদা অবাক অপরাধী মুখে এক বার আমার দিকে তাকিয়ে সরে পড়েছিল। আমার চোখে তখন জল। মামিমার রাগ তখন পড়ে গিয়েছিল। আমাকে নিয়ে অন্য ঘরে চলে গিয়েছিলেন। আমি কেঁদে উঠে বলেছিলাম, আর কোনও দিন এ রকম করব না। মামিমা তাঁর বুকের কাছে আমাকে টেনে। নিয়েছিলেন।

পরে অবিশ্যি সবই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। সেই সপ্তাহের রবিবারেই, বাড়ির সবাইকে নিয়ে মামা ডায়মন্ডহারবার গিয়েছিলেন। মামিমা মামাকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ছেলেমেয়ের মান ভাঙাতে ডায়মন্ডহারবার ছুটতে হল? মামা আমাকে আদর করে কাছে টেনে বলেছিলেন, কী চিন্তায় যে ফেলেছিলি বিন্দু, জানিস না। ও রকম করলে, আমার হার্টফেল হয়ে যাবে। শুনে আমার আরও কান্না পেয়েছিল।

মামা রোজ সন্ধের মধ্যেই অফিস থেকে ফেরেন। কিন্তু নীচের তলায়, রাত্রি দশটা সাড়ে দশটা অবধি লোকজন থাকে। নীচের দুটো বড় বড় ঘরে, সোফা চেয়ার ডিভান দিয়ে সাজানো। এক ঘরে মামার বিশেষ অন্তরঙ্গরা বসেন। আর এক ঘরে কাজের লোকেরা যাঁরা আসেন। মামার রাত্রের আত্মার মধ্যেও তাঁর ব্যবসার কাজ কিছু কিছু চলে। নানান ব্যবসায়ী, সরকারি অফিসাররা আসেন। দুই ঘরেই তখন মদ্যপান চলে। নানা রকম খাবার পরিবেশন করা হয়। খাবার নীচেই রান্না হয়। সন্ধেবেলার খাবারের জন্য, রোজ আলাদা বরাদ্দ করা থাকে। এ প্রায় প্রাত্যহিক ব্যাপার।

মামা যে মদ খান, এটা আমি আগে জানতাম না। প্রথমে খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাপারটা এমনিই সহজ, ঘাবড়াবার বা কিছু ভাববার অবকাশ ছিল না। কারণ মামিমা বা রমুদা ও দীপুকে ও সব নিয়ে কোনও কথাই বলতে শুনিনি। নিত্যকার ব্যাপার, দেখে দেখে অভ্যস্ত। ও বিষয়ে কারোর কোনও প্রশ্ন নেই। কেবল রমুদা মাঝে মাঝে বলে, এক দিন একটু স্কচ হুইস্কি খেয়ে দেখতে হবে।আমি বলি, খেয়ে দেখিস, মামাকে আমি বলে দেব।’রমুদা বলে, তুই জানতেই পারবি না।’রমুদাকে বিশ্বাস নেই। এই দু বছরের মধ্যেই, ওকে আমি কয়েক দিন সিগারেট টানতে দেখেছি। তাও আবার আমাকে ডেকে নিয়ে, দেখিয়ে দেখিয়ে। আমি ভয় দেখিয়ে বলেছি, যাই, মামিমাকে বলে দিয়ে আসি। রমুদা ভয় পেয়ে বলেছে, খবরদার যমুনা, তা হলে তোর রক্ষা নেই। তবে খাচ্ছিস কেন?’ বেশ মজা লাগে। কী মজা লাগে, ও-ই জানে।

যাই হোক, মামাকে কোনও দিন মাতাল হতে দেখিনি। আমাদের দেখবার অবকাশও কম। মামা যখন ওপরে আসেন, আমরা তখন যে যার ঘরে। মামিমাই শুধু মামার জন্য বসে থাকেন। নীচের আসরে, কাজের লোকজন না থাকলে, মামিমাও মাঝে মাঝে নীচে যান। তখন কেবল মামার বন্ধুরাই। থাকেন। মামার বন্ধুপত্নীরাও অনেকে এসে থাকেন। শুনেছি, তাঁরা কেউ কেউ ড্রিঙ্ক করেন। তখন খুব কৌতূহল হয় যে, নীচে গিয়ে দেখি। সাহস পাই না।

এমনিতে মামা-মামিমার মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ বিশেষ দেখতে পাই না। এক-একদিন মামা হঠাৎ তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে রাত্রে বেরিয়ে যান। ফেরেন অনেক রাত্রে। কখনও কখনও একেবারে সকাল করে ফেরেন। কোথায় যান জানি না। মামিমার মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে, মামার সঙ্গে কথা বলেন না। মামাকেও দেখি, চুপচাপ তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে, অফিসে বেরিয়ে যান। মামিমা শুধু আমাকে বলেন, তোর মামা কাল সারা রাত বাড়ি ফেরেনি। আমি জিজ্ঞেস করি, কোথায় গেছলেন? মামিমা রাগের সঙ্গে, বিরক্ত মুখে বলেন, কী জানি। কোনও বন্ধুর বাড়িতে আড্ডা দিয়েছে বোধ হয় সারা রাত।আমারও মনে হত, মামা অন্যায় করেছেন। মামিমার রাগটা যেন আমার মধ্যেও সংক্রামিত হয়। আমিও মামার সঙ্গে ভাল করে কথা বলি না। তারপরে যখন দেখি, মামিমার সঙ্গে আবার কথা হচ্ছে, তখন আমিও বলি।

মামাও সেটা বোঝেন। বলেন, কী রে বিন্দু, কথা বলছিস না কেন?

কী কথা বলব?

 কত কথাই তো বলিস। এখন চুপচাপ কেন!

 আমার ভাল লাগছে না।

 কেন?

কিছু না বলে চুপ করে থাকি। মামা হেসে বলেন, তুই আর তোর মামিমা দেখছি এক রকম।

আমার অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করে, বলি না। মামা নিজেই বলেন, সে দিন সারা রাত এক বন্ধুর বাড়িতে গল্প করেই কেটে গেল। বাড়িই ফিরতে পারলাম না।

আমি বলি, মামিমা সারা রাত ঘুমোতে পারেননি।

মামা যেন খুবই অসহায় বেচারির মতো হয়ে যান, বলেন, জানি তো। বন্ধুরা শোনে না, বোঝে না, কী যে করি। তোর মামিমাকেও বলেছি। তুইও একটু বলে দিস বিন্দু।

ঠিক সে সময়েই হয়তো পিছন থেকে মামিমার গলা শোনা যায়, থাক, আর মেয়েকে কাজে লাগাতে হবে না। মামা হেসে ওঠেন। আমি মামিমার দিকে তাকাই। মামিমার ঠোঁটের কোণে হাসি। তাড়াতাড়ি সরে পড়েন। এ রকম কিছু কিছু ব্যাপার ছাড়া, মামা ও মামিমার মধ্যে আর কোনও বিবাদ-বিসংবাদ দেখতে পাই না। মামাকেও খারাপ মানুষ মনে করতে পারি না।