উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

৪. দরজা বন্ধ করে দিয়ে

০৪.

দরজা বন্ধ করে দিয়ে, টেবিলের সামনে বসলাম। এই তো সজল আমার সামনে। ওর ছোট বড় চিঠিগুলো, একটা একটা করে আমার সামনে সাজানো। এগুলোই বারে বারে আমার চোখ টেনে নিচ্ছে মন টেনে নিচ্ছে। শুরুতে তাই ওর শেষ চিঠির মাঝখান থেকে আরম্ভ করেছিলাম। মাঝখানের সেই কথাটাই বারে বারে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, মানুষই শক্তির উৎস।..তারপরেও অনেক কথা।

কিন্তু সজলের চিঠি এখন থাক। আমার নিজেকে দেখতে আসাই তো আমার জীবনে সজলকে চিনতে চিনতে আসা। ওর চিঠিগুলো তো কেবল চিঠি না। ওগুলো আমার জীবনেরও অংশ। চিঠিগুলো আসুক তাদের নিজের সময়ে, সন তারিখের হিসাবে।

কিন্তু কী কঠিন কাজ। এত কথা লিখলাম, আরও অনেক কথা বাকি। আমি সাহিত্য করতে বসিনি। নিতান্ত নিজের কথা লিখতে বসেছি। তবু আজ মনে হচ্ছে, একটু সাহিত্য করবার ক্ষমতা থাকলে, ক্ষতি কী ছিল। আশাপূর্ণা দেবী বা প্রতিভা বসু হবার দরকার নেই। ওঁদের মতো গল্প উপন্যাস কোনও দিন লিখতে পারব না। নিজের জীবন নিয়ে, আর যাই হোক, ও সব চলে না। আর আত্মজীবনী বা জীবনস্মৃতি? নমস্কার। ও সব তো লেখা হয়–অপরের জীবনে কাজে লাগবে বলে। অন্যদের জীবন সম্পর্কে জ্ঞান দান করবে, উদ্বুদ্ধ করবে। সে সব জীবন হল মহৎ, কর্মময়, নিষ্পাপ এবং নিটোল। কেবল আলো আছে, কালো নেই। ব্যক্তিজীবনে জ্ঞান আছে, গ্লানি নেই। আঘাত দুঃখ ব্যথা বেদনা সবকিছুতেই পুণ্যের ছোঁয়া। পাপের লেশ নেই। ছেলেবেলায় মা যেমন করে বলত, তেমনি করে বলতে ইচ্ছা করছে, আ হতভাগী! সত্যি, হা হতভাগী, আমার জীবনে কালো আছে, গ্লানি আছে, পাপ আছে। কোনও কাজও করে উঠতে পারিনি।

বাংলায় এম-এ পাশ! কোনও কাজে লাগল না গো, জীবন আমার বিফলে গেল।–এই রকম গান গেয়ে বলতে ইচ্ছা করছে। কর্ম বলতে যা বোঝায়, এটা কি জীবনের সে রকম একটা কাজ। একটুও মনে হয় না। আমি বলি, সত্যিকারের কাজ হল, যযাগিনী হয়ে নিঠুর হরিকে খুঁজতে যাওয়া। কাজকে এত বড় করে কবে দেখলাম! কাজকে চিনতে শিখলাম কবে! না, আমার কর্মও নেই। আমার জীবন-মরণ পরশ রতন কাচের সমান ভেল৷ কষ্ট হচ্ছে, চোখে জল আসতে চাইছে। হঠাৎ বড় সত্যি বলে মনে হচ্ছে কিনা কথাগুলো। সব দিক থেকেই বড় সত্যি।

না, যাকে বলে আত্মজীবনী’, আমার এ লেখা তা নয়। আসলে এ হল, ভাবতে ভাবতে, না, লিখতে লিখতে নিজেকে দেখা। এ অপরের জন্য না। একেবারেই নিজের জন্য। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যেমন নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি, এও তেমনি। এও এক রকমের আয়না। সেই বাউল গানের মতো আরশিনগরের পড়শি। নিজের কাছে আমিও যে একজন পড়শি। সেই পড়শিকে দেখা। জীবনের এতকাল তো পড়শি হয়ে কাটিয়ে এলাম। আর কত কাল!

.

কোথা থেকে শুরু করব! কবে থেকে? যবে থেকে সজলকে দেখলাম? নাকি যবে থেকে কলকাতায় এলাম। এই মহাতীর্থ কলকাতা, হ্যাঁ, আমার কাছে কলকাতা মহাতীর্থই বটে। মহাতীর্থ শ্মশানকে যেমন মহাতীর্থ বলা হয়, কলকাতা আমার কাছে তেমনি। শুনেছি, মহাশ্মশান তাকে বলা হয়, যে শ্মশানে চিতা কখনও নেভে না। সেই হিসাবে কেওড়াতলা আর নিমতলাই তো আছে। যে শহরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, যে শহরে মারি মড়ক অ্যাকসিডেন্ট খুন প্রতিদিন লেগে আছে, সেই শহরের শ্মশানের চিতা নেভে না। কিন্তু কেওড়াতলা আর নিমতলা কি মহাতীর্থ! তা নয়। মহাতীর্থের সংজ্ঞা আলাদা। তার কোনও সঠিক ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। শুধু এইটুকু বুঝি, সেই মহাশ্মশানই মহাতীর্থ, যে মহাশ্মশান সাধকের সাধনপীঠ। যেখানে চিতার আগুনের পাশে বসে, নির্ভীক সাধক তাঁর আসনে অটল। তিনি শোকমুক্ত, সুখমুক্ত। মৃত্যু সেখানে গভীর সংকেতবহ। জীবনের মূল্য গভীর অর্থবহ। সেখানে ভয়ংকরের মধ্যে সুন্দর আর প্রেম অবস্থান করে। শিব তো শ্মশানবাসী।

কলকাতাও আমার কাছে সেই রকম মহাতীর্থ, সাধনপীঠ। এই মহাশ্মশানে সাধনা চলছে। কলকাতায় জন্মাইনি। কিন্তু কলকাতাকে যত দেখেছি, যত দেখছি, তত ভালবেসেছি, বাসছি। একটু আগে রমুদা রবীন্দ্রনাথের গানের কথা বলে গেল–তবে একলা চলো রে’না বলে, তবে দলকে চলো রে।কথাটা ও মিথ্যা বলেনি। কিন্তু তার মধ্যে ওর একটা রাগ আর বিদ্রূপ আছে। আমার রাগ আর বিদ্রূপ নেই, অথচ, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গাওয়ার চেয়ে, আমার গাইতে ইচ্ছা করে, আমার শ্মশান কলকাতা, আমি তোমায় ভালবাসি।

এই শ্মশানে এখন ভূত-প্রেতরা নাচছে। ডাকিনী-যোগিনীরা উল্লাসে চিৎকার করছে। কিন্তু সাধকরা সাধনায় মগ্ন হয়ে আছে। আমি এই সাধনপীঠের সাধিকা হতে পারিনি। সজল পেরেছিল। সজল এই সাধনপীঠের নির্ভীক সাধক। আমি জানি, সজল একলা না, ওর মতো আরও সাধক কলকাতায় আছে। তাই নমো নমো নমো কলকাতা, নমো নমোনমো মহাতীর্থ।

কলকাতাকে কত লোকে কত কী বলেছে। এখনও বলছে। কবি সাহিত্যিক রাজনৈতিক নেতা, সকলেই কিছু না কিছু বলছেন। শিল্পীরাও বাদ নেই। কলকাতার কত অজস্র ছবি আঁকা হচ্ছে তাঁদের পটে। কত বিচিত্র চিন্তা আর কল্পনার ছাপ সেই সব ছবিতে। সাধারণ মানুষেরাও কলকাতাকে নিশ্চয়ই অনেক কিছু বলে। কৃষ্ণের মতো কলকাতারও শতনাম।

মহাশ্মশান মহাতীর্থ, এ কি কেবল আমিই বললাম। মনে হয় না। হয়তো কখন কোথায় শুনেছি, মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছে। তা বলে আমি কলকাতাকে দুঃস্বপ্নের শহর’ বলব না, মিছিলের শহর’ বলব না। সে ধরনের কোনও স্বার্থ আমার নেই। জানি, এখন কলকাতাকে সবাই খারাপ বলে, নিন্দা করে। আগেকার শতনামের মধ্যে, অনেক প্রশস্তি থাকত, প্রশংসা থাকত। কলকাতাকে নিয়ে, সারা ভারতের অনেক উচ্ছ্বাস আর আবেগ ছিল। এখন নেই। এখন শুধু নিন্দা নিন্দা আর নিন্দা, কেবল ধিক্কার। আমি সে সব বিশ্বাস করি না। সে সব ধিক্কার আর নিন্দা শুনলে মনে হয়, ভারতের অন্য বড় বড় শহরগুলো পুণ্যভূমি, অধিবাসীরা সব পুণ্যবান।

হাসি পায়। তবু যদি কিছু জানতে বাকি থাকত। ভারতবর্ষের যে শহরে পার্লামেন্ট জিনিসটা আছে, মন্ত্রীরা আছে, এম পিরা আছে, সরকারি বড় বড় কর্মচারীরা আছে, আর সাংবাদিকরা আছে, সবাই মিলে কি সেটাকে স্বর্গরাজ্য করে তুলেছে নাকি? ওটাকে তো আমার বলতে ইচ্ছা করে, স্বার্থ আর চক্রান্তের শহর। সজল বলত নির্বীর্য মৌমাছিদের শহর। সজলের মতো এমন ভাল কথায় গভীর অর্থব্যঞ্জক কিছু আমি বলতে পারি না। কিন্তু নারীঘাতী শিশুঘাতী শহর’ বলতেই বা আপত্তি কী। হত্যা নিরবধি কি কেবল কলকাতায়। পার্লামেন্ট শহরে কি রোজ খুন কিছু কম হয়! বরং নারী আর শিশুহত্যা অনেক বেশি। কলঙ্ক কেবল রাধার নামে। আরও অনেক নাম সেই সব শহরকে দেওয়া যায়। কী লাভ। কলকাতাকে গালি দিলে সইতে পারি না। জানি, এই মহাশ্মশানের ভয়ংকর রূপ সকলের সহ্য হয় না। কিন্তু কলকাতা যে শুরুর শহর। তাই কলকাতার দায় অনেক বেশি। সেই জন্যই কলকাতা মহাতীর্থ। সেই বাউল গানের মতো আমার বলতে ইচ্ছা করে, যাহা নাই ভাণ্ডে, তাহা নাই ব্রহ্মাণ্ডে। যাহা নাই কলকাতায়, তাহা নাই ভারতে।

আবার এ কথাও আমার বলতে ইচ্ছা করে, খুঁটে পোড়ে, গোবর হাসে, এমন দিন সবারি আসে। আজকের কলকাতা, কালকের সারা ভারতবর্ষ হয়ে উঠবে না, তা-ই বা কে জোর করে বলতে পারে। আজ যা কলকাতায়, কাল তাই ভারতে।

অতএব, নমস্কার আমার মহাতীর্থকে। যে যা খুশি তাই বলুক গিয়ে, কলকাতা-কলকাতা-ই। আমার কলকাতার তাতে কিছু যায় আসে না। কলকাতাকে নিয়ে সকলের মাথাব্যথার কারণ তো বুঝি। যা বলল, তাই বলল, কলকাতাকে আসলে কেউ ভুলতে পারে না। তাই প্রশংসা না করতে পারুক, নিন্দে করেই মনে রাখতে হয়।

কলকাতা আমার সুখ দুঃখ, শোক আনন্দ, প্রেম বিরহ। সজলকে তো কলকাতাতেই প্রথম দেখেছি, পেয়েছি। অতএব যবে থেকে কলকাতায়, তবে থেকেই শুরু করি। কলকাতার প্রথম দিন থেকে শুরু করি।

.

আজ থেকে কত বছর আগের কথা? তেরো বছর। তেরো বছরেরও কিছু বেশি। চৌদ্দয় পড়তে চলেছে, আজ পর্যন্ত নিয়ে, কলকাতায় এসেছিলাম। এসেছিলাম যখন, তখন আমারও তেরো বছর। তেরো বছর পুরোপুরি। তেরো বছর বয়সে কলকাতায় এলাম। কলকাতায় সেদিন কী বৃষ্টি! শুধু কলকাতায় না, বৃষ্টি পেয়েছিলাম পথে আসতে আসতেই। বাড়ি থেকে যখন বেরিয়েছিলাম, আকাশের অবস্থা তখন খারাপ ছিল না। তবে সেটা ছিল বর্ষাকাল। আমাদের বাড়ির দেশের আকাশে তখন মেঘ ছিল, রোদও ছিল। গুমোট গরম ছিল। সবসময়ে, সারা শরীর ঘামে ভেজা। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় মনে হয়নি, কলকাতায় এত বৃষ্টি।

মোটর গাড়িতে করে এসেছিলাম মামার সঙ্গে। কেন এসেছিলাম, সে কথাও বলতে হয়। তা না হলে সবটুকু বলা হয় না। নিতান্ত অভাবের দায়ে পড়ে কলকাতায় মামাবাড়ি আসতে হয়নি। অনাদরেও আসতে হয়নি। এখনও আমার বাবা মা বেঁচে আছেন। আগের তুলনায় বাবার অবস্থা এখন আরও ভাল। আমার ওপরে যে দাদা, সে এখন নদিয়া জেলার একজন বড় সরকারি কর্মচারী। তাই হেড কোয়ার্টার কৃষ্ণনগরে। এখন কৃষ্ণনগরের খাস শহরে, পাত্র বাজারের কাছে আমাদের নিজেদের বাড়ি। আগে ছিল কৃষ্ণনগর শহর থেকে দুরে, গ্রামের সীমায়। যেখান থেকে আমি প্রথম কলকাতায় এসেছিলাম। সে বাড়ি এখন অপরের আশ্রয় হয়েছে। সেখানে কেউ যায় না, থাকে না।

সঠিক বলতে পারব না, গত তেরো বছরের মধ্যে, বাবাও কেমন করে যেন তাঁর অবস্থাকে অনেকখানি ফিরিয়ে নিতে পেরেছিলেন। রহস্য যাই থাক, উন্নতির মূলে ডাকাতি ছিল না। তবে খুব সদুপায়ে হয়নি, তার কিছুটা আভাস আমার জানা আছে। এমন করে, নিজের বাবার সম্পর্কে বলতে বা। ভাবতে খুব খারাপ লাগে। নিজের কাছেই নিজের লজ্জা লাগে। ছোটও মনে হয়। তবু, আজ এই মুহূর্তে, নিজের কাছে, নিজে নিজে বলতে লজ্জা লাগছে না। আমি তো অন্য কারোর কাছে বলছি না। নিজের কাছে বলা।

অবিশ্যি বাবার কথা যে কেউ জানে না, তা বলি না। তাঁর উন্নতির সঙ্গে, আরও যে কজন উন্নতি করেছিল, তারা সবই জানে। বলতে গেলে, জানে বাংলা দেশের অনেক লোকেই। যারা খবরের কাগজ পড়ে। বাবার নাম না, ঘটনাটা কাগজে বেরিয়েছিল। যে ভদ্রলোকের নামে আসল দুর্নাম হয়েছিল, এক সময়ে তাঁকে খুব প্রতাপশালী লোক বলে জানতাম। অন্তত নদিয়া জেলার লোকেরা তাই জানত। আমার বাবাকে সেই ভদ্রলোক তুমি’ সম্বোধন করতেন। অথচ ভদ্রলোককে দেখে, বাবার থেকে বয়সে ছোট মনে হত। শুনেছি, ভদ্রলোকের সঙ্গে কংগ্রেস মন্ত্রীসভার যথেষ্ট ভাব ছিল। আমাদের বাড়িতে বসেই, অনেক সময় তিনি মন্ত্রীদের বিষয়ে কথাবার্তা বলতেন। মন্ত্রীদের নাম করে বলতেন, কখন কার সঙ্গে কী কথা হয়েছে।

ছেলেবেলায় সে সব কথা শুনে, আমার মনে এমন কিছু দাগ কাটত না। কারণ, মন্ত্রী ব্যাপারটা যে একটা দারুণ কিছু, তাঁদের সঙ্গে ওঠাবসা করেন, কথাবার্তা বলেন, তাঁরাও সব বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি, এ রকম কোনও ধারণা ছিল না। তিনি বলতেন, তাই মাঝে-মধ্যে হয়তো কানে যেত। অনেক পরে বুঝতে পেরেছি, তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিই ছিলেন। অবিশ্যি এমনিতেও তাঁকে বাড়ির বিশিষ্ট অতিথি হিসাবেই জানতাম। তিনি আমাদের বাড়ি এলে তাঁকে যথেষ্ট সমাদর করা হত। বাইরে যেমন বাবা, অন্দরে তেমনি মা, দুজনেই ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। শোনা যেত, অনঙ্গবাবু এসেছেন, অনঙ্গবাবু এসেছেন। হ্যাঁ, ভদ্রলোকের নাম অনঙ্গ ছিল। বেশ লম্বা চওড়া দোহারা চেহারা। গলার স্বর চড়া, একটু হাঁকডাক করা স্বভাবের লোক। তিনি আসতেন একটা জিপ গাড়িতে চেপে। এসেই বাজখাঁই মোটা গলায় ডাক দিতেন, কই হে মিত্তির, বাড়ি আছ নাকি?

অনঙ্গবাবুর কথায় রীতিমতো পূর্ববঙ্গীয় টান ছিল। তিনি পুব দেশেরই লোক। পার্টিশনের পরে সেখান থেকেই এসেছিলেন। যাই হোক, ভদ্রলোক মিথ্যাবাদী ছিলেন না। অন্তত মন্ত্রীদের সঙ্গে যে তাঁর যথেষ্ট দহরম ছিল, সেটা মিথ্যা ছিল না। আমার বাবার সঙ্গে অনঙ্গবাবুর কীভাবে পরিচয় হয়, তার কিছুই জানি না। আমার দশ-এগারো বছর বয়সের সময় থেকেই, তাঁকে আমাদের বাড়িতে আসতে দেখেছি। বাবার সঙ্গে তাঁর কী কথাবার্তা হয়, কিছুই বুঝতাম না। মাঝে মাঝে তাঁদের দুজনকেই কাগজপত্র খুলে বসতে দেখেছি। সে সব কাগজপত্র কীসের, তাও ঠিক জানতাম না। তাঁরা দুজনেই যে শুধু থাকতেন, তা না। কোনও কোনও সময় আরও কেউ কেউ থাকতেন। তাঁরা কেউ রানাঘাটের লোক, কেউ শান্তিপুর নবদ্বীপের লোকও ছিলেন।

কৃষ্ণনগর শহরে বাবার ছিল একটি কয়লার গোলা। গোলার সামনে একটি ছোট স্টেশনারি দোকান। সেই হিসাবে বাবাকে ব্যবসায়ী বলা যায়। কিন্তু দোকানের কেনাবেচা দেখাশোনা অন্য একজনই করত। সেই লোকটির নাম ছিল সাধু। লোকটি নামে সাধু, কাজেও সাধু। বাবাকে কোনও দিন ঠকায়নি। ঠকালে, আমাদের ছটি ভাইবোনকে নিয়ে, বাবার সংসার চলত না। আমরা তাকে সাধুদা বলে ডাকতাম। শুনেছি। মুড়াগাছায় তার বাড়ি। তিন কুলে কেউ নেই। ইস্কুলে নাকি ক্লাস টেন অবধি পড়েছিল। তার মা মারা যাবার পরে, মুড়াগাছার টান ফুরিয়েছিল। কৃষ্ণনগরে এসেছিল ভাগ্যের সন্ধানে। আর তার ভাগ্য নির্ধারক হিসাবে জুটেছিলেন আমার বাবা।

বাবাকে দোকানে বিশেষ বসতে দেখতাম না। কিন্তু বাড়িতেও কম থাকতেন। প্রায় সব সময়েই ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন। কোথায় কোথায় ঘুরতেন, তার সবটা জানতাম না। তবে নদিয়া জেলার অনেক জায়গাতেই ঘোরাঘুরি করতেন। মায়ের সঙ্গে কথাবার্তায় সে সব জানা যেত। আবার অনেক সময় গ্রামে গ্রামেও ঘুরে বেড়াতেন। বলে না দিলেও বুঝতে পারতাম, বাবার সেই ঘোরাঘুরির কাজের বিষয়, অনঙ্গবাবুর সঙ্গে জড়ানো। অথচ বাবাকে এমনিতে কখনও রাজনীতি করতে দেখিনি। অনঙ্গবাবু যেমন। করতেন। সবাই বলত, অনঙ্গবাবু কংগ্রেস করেন। তিনি যে মাঝে-মধ্যে দিল্লিও যান, সে কথা শুনেছি।

ভদ্রলোকটির কথা আজ যেন একটু বিশেষভাবে মনে পড়ছে। বাবার উন্নতির কথা বলতে গিয়ে, অনঙ্গবাবুর কথা না ভেবে পারছি না। আজ যখন দেখি, বাবা কৃষ্ণনগর শহরে দোতলা বাড়ি তৈরি করেছেন, শহরবাসী হয়েছেন, তখন সেই অনঙ্গবাবু কলকাতায় কোনও আত্মীয় বাড়িতে, নিতান্ত অভাবের মধ্যে বাস করছেন। শুনেছি, সামান্য কিছুদিনের জন্য তাকে হাজতবাসও করতে হয়েছিল! নদিয়া জেলায় তার প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়েছিল। এখন হয়তো সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে গিয়েছে। কিন্তু অনঙ্গবাবু আর যান না।

এ সব কথার অনেকটাই, আমি শুনেছি আমার ছোট বোনের কাছ থেকে। কলকাতার মানুষেরা অনঙ্গবাবুকে চেনে না, নিতান্ত তার ব্যক্তিগত পরিচিতেরা ছাড়া। কলকাতার মানুষ শুধু খবরের কাগজে। একটি ছোট খবর পড়েছিল, সরকার ও জনসাধারণের ছ’ লক্ষ টাকা তছরুপ। আজ থেকে কত বছর আগের ঘটনা এটা? বছর পাঁচ-ছয়ের বেশি না। জনসাধারণ আর সরকারি অর্থে, একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। গড়ে তুলেছিলেন বিশেষ ভাবে অনঙ্গবাবুই। তিনি না থাকলে সরকারি অর্থ পাওয়া যেত না। তাঁর সহযোগী বলা যাক বা তাঁর অনুচর বলা যাক, যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে আমার বাবা একজন।

বাবা আগেও রাজনীতি করতেন না, এখনও করেন না। কোনও দিনই করেননি। অথচ শহরের ওপরে তিনি একটি বাড়ি করেছেন। লোকে জানে, তার ছেলের চাকরির উন্নতিতেই এটা সম্ভব হয়েছে। কথাটা ভাবলে দাদার মুখটাও আমার মনে পড়ে যায়। দাদা কীভাবে নিয়েছে ব্যাপারটা? ও তো একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মচারী, পদটাও নিতান্ত ছোটখাটো না। ও নিজেও ভাল জানে, ওর উপার্জনের টাকায় বাবা বাড়িটা তৈরি করেননি। এমনকী কৃষ্ণনগরের লোকেরাও সেটা জানে।

আমার যেমন ভাবনা! দাদা আবার কী ভাববে। কী-ই বা ভাবতে পারে। শহরে একটা বাড়ি হয়েছে দেখে, নিশ্চয়ই মনে মনে খুশি হয়েছে। পরিবারের ইজ্জত তাতে বেড়েছে। কেন খুশি হবে না। আমি নিজেই বা কী ভেবেছি। পাপ? কই, সেরকমভাবে কোনও দিন মনে হয়েছে বলে তো মনে করতে পারি না। বরং নতুন বাড়িতে গিয়ে বেশ ভালই লেগেছে। গ্রিল ঘেরা দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে, ছোট বাগানের দিকে তাকিয়ে দেখেছি। যেখানে বাবা তার নিজের হাতে জুই আর বেল ফুলের গাছ লাগিয়েছেন। এক পাশে কাগজিলেবু গাছের ঝোপে চড়ুই পাখির ঝুটোপুটি খেলা দেখেছি। বাগানের পাঁচিল ঘেঁষে দুটো নারকেল গাছ। বাতাসে দোলানো চকচকে নারকেল পাতার ঝিলিমিলি দেখেছি। আমাদের পাঁচিলের বাইরে মস্ত বড় একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। তাতে রোদ-ঝলকানো থোকা থোকা ফুল দেখেছি। দেখে মনটা খুশিতে ভরে উঠেছে।

দোতলা থেকে ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, যেখানে একদিকে দাঁড়ালে একটি পুকুর দেখা যায়। সেই পুকুরে বউ-ঝিদের স্নান করতে দেখে, বাসন মাজতে দেখে, নিজের ছেলেবেলার কথা ভীষণ মনে পড়ে গিয়েছে। কখন অন্যমনস্কভাবে চোখ ফিরিয়ে, পুকুরের ধারে সুপুরি আর নারকেল গাছগুলোর দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থেকেছি। তারপরে হঠাৎ টুনটুনির চড়া স্বরের শিস শুনে চমকে উঠেছি। খুশি হয়েছি, আমাদের শহরের বাড়ি দেখে, আমিও তো খুশিই হয়েছি। দোতলার জানালা মেলে দিয়ে, খাটের ওপর শুয়ে, দক্ষিণের বাতাস যখন গায়ে লাগিয়েছি, খুশি হয়েছি। আমার বাবার বৈভব দেখে খুশি হয়েছি। আমার মনে তো সে রকম কোনও কাটা খচখচিয়ে ওঠেনি।

তা হলে দাদারই বা উঠবে কেন। আমার ছোট দুটি বোন, দুটি ভাই তো আরও খুশি। শহরের বাড়ি বোধ হয় ওদের কাছে স্বপ্নই ছিল। আজ সেই শহরের ওরা শুধু বাসিন্দা না, শহরে ওদের নিজেদের বাড়ি। আমি অবিশ্যি সে স্বপ্ন আমার ছেলেবেলায় কোনও দিন দেখিনি। বাবা-মায়ের মুখে কিছু যদি শুনতাম, তা হলে একটা আশা থাকত। স্বপ্ন দেখতে পারতাম। তা, না-ই বা থাকল, না-ই বা দেখলাম। স্বপ্ন। কিন্তু খুশি হয়েছি, মনে মনে বেশ খুশি হয়েছি, শহরে আমাদের একটা বাড়ি হয়েছে।

আমি আর কৃষ্ণনগরে কতটুকুই বা যাই। এমন বেশি কিছু দুরে না। কিন্তু কলকাতা ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না। বছরে এক বার কি দু বার যাই। তাও কয়েক দিনের জন্য। আগে, চার-পাঁচ বছর আগে, আরও ঘন ঘন যেতাম। অন্তত দু মাসে এক বার। এখন বছরে এক বার। এ বছর তো এক দিনও যাওয়া হয়নি। নতুন বাড়িটার বয়সও বেশি না। বছর চারেক হল তৈরি হয়েছে। বাড়িতে গিয়ে খুশি হয়েছি, কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেই মনে হয়েছে, কলকাতাকে যেন অনেক দিন ছেড়ে রয়েছি। কৃষ্ণনগরের সঙ্গে আমি আর নিজেকে তেমন মেলাতে পারি না।

কেউ শুনলে না জানি কী ভাববে। ছিলাম তো এঁদো পাড়াগাঁয়ের মেয়ে। মায়ের আমি বড় মেয়ে। আমার অনেক দায় ছিল। তখন আমাদের ঝি-চাকরের সংসার ছিল না। মায়ের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে আমাকে কাজ করতে হত। ইস্কুলে যেতে হত, পড়া করতে হত। সেই মেয়ে আমি। কলকাতাকে পেয়ে বুঝি আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছি। আমার কথা কেউ শুনলে, সে তাই ভাববে। কিন্তু আসলে যে কলকাতা আমার কাছে কী, তা এক কথায় বোঝাব কেমন করে। এ লোভী আর আদেখলে মেয়ের হাতের পুতুল না। শরৎচন্দ্রের সেই গল্পের নাম দিয়ে বলতে ইচ্ছা করছে, কলকাতা হল এ অভাগীর স্বর্গ’। বোবার ভাষা। অন্ধের দৃষ্টি। জড়ের অনুভূতি।

থাক, এ কথা থাক। কৃষ্ণনগরের শহরের বাড়ির কথা বলছি। খুশি হয়েছি। কিন্তু পাপবোধ? কই, কখনও তো সে রকম কিছু বোধ করিনি। কিন্তু অনঙ্গবাবুর কথা মনে হলে, ভিতরটা যেন কালো হয়ে ওঠে। মুখটা যেন লুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছা করে। মনের মধ্যে টনটন করে। শুনেছি, সেই বিশাল সুপুরুষ চেহারার অনঙ্গবাবুর ফরসা রং নাকি কালি লেপা হয়েছে। ভীষণ রোগা হয়ে গিয়েছেন। কলকাতার পথে পথে ঘুরে বেড়ান। তার ছেলেমেয়েরা কলকাতারই আত্মীয়র বাড়িতে নাকি থাকে। তাও আবার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়। মন্ত্রীদের সঙ্গে ওঠাবসা তার অনেক দিনই ঘুচেছে। দিল্লি এখন তার কাছে দুরস্ত। আর এখন তো কোনও কথাই নেই। এখন এ রাজ্যে ঘন ঘন বদলি মন্ত্রীসভার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্কই নেই।

অনঙ্গবাবুর বিষয়ে, এ সব কথা আমার ছোট বোনের মুখে শুনেছি। জিজ্ঞেস করেছি, তুই জানলি কী করে? তিনি কি কৃষ্ণনগরে এসেছিলেন?

ছোট বোন বলেছে, না। বাবার কাছে শুনেছি।

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছি, বাবার কাছে?

হ্যাঁ, বাবা যখন অনঙ্গবাবুর বিষয়ে মায়ের সঙ্গে বলে, তখন শুনি। তার নাকি এখন হা-ভিখিরির দশা।

শুনতে শুনতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছি। বাবার মুখটা তখন মনে পড়েছে। অনঙ্গবাবুর বিষয়ে বাবা কীভাবে কথা বলেন! বাবার মনে কি দুঃখ আছে অনঙ্গবাবুর জন্য! নাকি করুণা করে বলেন, দয়া করে বলেন। আমার জানতে ইচ্ছা করে, শুনতে ইচ্ছা করে। বাবার মনে কি কোনও পাপবোধ আছে? তাকে দেখলে অবিশ্যি কিছুই বোঝা যায় না। কোনও মানুষকে দেখলেই, বোধ হয় বোঝা যায় না, তার পাপবোধ আছে কি না। এখন বাবাকে দেখলে বেশ সুখী আর তৃপ্ত মানুষ বলে মনে হয়। এখন নিয়মিত কয়লার গোলায় যান। স্টেশনারি দোকানটা আরও বড় করা হয়েছে, রাস্তার ধারে পাকা ঘর করে স্টেশনারি দোকানটা বাড়ানো হয়েছে। কয়লার গোলার জমিটাও এখন আমাদের। বাবা ওটা কিনে নিয়েছেন। তার মানে, শহরের বুকে আরও অনেকখানি জমির স্বত্ত্ব, কম কথা না। ইচ্ছা করলে সেখানেও একটা বাড়ি তৈরি করা যায়।

কত টাকা বাবা পেয়েছিলেন? ছ লক্ষের কতটা তার হাতে এসেছিল? আরও কয়েকজন ভাগীদার তো নিশ্চয় ছিল। …না, এ সব ভাবার কোনও মানে হয় না। ভেবেই বা আমি কী করব। ভাবতে গেলে নিজেকেই কেমন ছোট লাগে! মোটের ওপর বাবাকে বেশ আত্মতৃপ্ত মানুষ বলে মনে হয়। সেই সাধুদা এখনও আছে। কয়লার গোলা আর দোকান, সে-ই চালায়। এখন একজন অবাঙালি কুলি গোলার কাজকর্ম করে। বাবা গিয়ে গদিতে বসেন। হিসাবপত্র দেখেন। দু বেলা দু বার যান। বেশির ভাগ সময় বাড়িতেই থাকেন। বাগানের গাছপালা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। মাঝে মাঝে আমার বিয়ের কথা বলেন। আমাকে কোনও দিন কিছু জিজ্ঞেস করেননি। মায়ের মুখে শুনতে পাই, বাবা নাকি আমার বিয়ের কথা। ভাবেন। মামার কাছে নাকি চিঠিপত্রও দু-একবার লিখেছেন। মামা আমাকে সে কথা কোনও দিনই বলেননি। শেষপর্যন্ত অবিশ্যি বাবার বক্তব্য, বড় মেয়ের ভাবনা আমার ভাববার দরকার নেই। তার যা করবার রমেশই করবে। ও মেয়ে তো বলতে গেলে এখন রমেশেরই মেয়ে।

রমেশ হল মামার নাম। বাবার এ কথায় আমি কোনও দোষ দেখি না। মামার মেয়ে হতে আমার কোনও আপত্তি নেই। মামা আমার কাছে বাবার চেয়ে কোনও অংশে ছোট নন, বরং বড়। বাবা আর মেয়ে হিসাবে, আমার নিজের বাবার সঙ্গে যে সম্পর্ক, যতখানি চেনাচিনি জানাজানি, তার চেয়ে আমার মামার সঙ্গে বেশি।

বাবা এখন দোকানে বসেন, বাগান দেখেন। আমার ছোট বোনের বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়েছেন। দাদার বিয়ের জন্য মেয়ে খোঁজাখুঁজি করছেন। বলেন, বাড়িতে একটি বউ না থাকলে মানায় না। আমার ছোট বোন মীনার বিয়ে, বলতে গেলে স্থির হয়েই গিয়েছে। গত বছরই শুনে এসেছিলাম, মীনা প্রেম করছে। মীনা নিজেই সে কথা আমাকে বলেছে। আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি। গত বছর যখন গিয়েছিলাম, বাড়িতে একটি নতুন ছেলেকে দেখেছিলাম। মীনাই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। ছেলেটি কলেজে লেকচারার। অবিশ্যি আমাদের দেশে যেমন রেওয়াজ। যে কলেজে পড়ায়, সে-ই প্রোফেসর, সেই ছেলেটিকেও সবাই সে রকম প্রোফেসর বলে জানে। তবে এইটুকু যা রক্ষে, ছেলেটি বুড়িয়ে যায়নি। কলেজে মাস্টারি করলেই যেমন, ধুতি পাঞ্জাবি চপ্পল, হাতে ব্যাগ আর একটা মেকি পাণ্ডিত্যের ভাব করে থাকে, সে রকম না। বেশ স্মার্ট আর হাসিখুশি। রাজনীতিও করে।

ছেলেটি চলে যাবার পরে মীনা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, অতীনকে তোমার কেমন লাগল?

যাকে বলে ধরতাই, কথার সুর আর ভঙ্গিতেই অনেক সময় তা ধরা পড়ে যায়। বলেছিলাম, আমার তো বেশ ভালই লাগল। কোন দিক দিয়ে জিজ্ঞেস করছিস?

মীনা স্পষ্ট করেই বলেছিল, তোমার ছোট ভগ্নিপতি হিসাবে!

আমি মুখ টিপে হেসে বলেছিলাম, খুব ভাল, তোর সঙ্গে বেশ মানাবে।

কিন্তু বাবার বোধ হয় তেমন পছন্দ না।

কেন?

 এইসব কলেজের মাস্টারদের নাকি কোনও ভবিষ্যৎ নেই।

আমি হেসে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভবিষ্যৎ নেই মানেটা কী। এরা বেঁচে থাকবে না?

মীনাও হেসেছিল। বলেছিল, তা নয়, বাবা বলতে চায়, এরা ইপেড, কোনও দিন টাকা-পয়সা করতে পারবে না, বড়লোক হতে পারবে না, আমাকে সুখে রাখতে পারবে না।

আমি বলেছিলাম, সেটা তো তোর ভাববার বিষয়।

মীনা বেশ জোরের সঙ্গেই ঘাড় ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছিল, তা তো নিশ্চয়ই। আমার যা ঠিক করবার, ঠিক করে ফেলেছি। বাবা যদি আপত্তি করে, তা হলে আমরা নিজেরাই বিয়ে করব। তোমার তা হলে ভাল লেগেছে অতীনকে?

আমার আবার হাসি পেয়েছিল। বলেছিলাম, আমার ভাল লাগায় কী যায় আসে। তোর ভাল লাগলেই হল।

তবু তোমার ভাল লেগেছে শুনে আমি হ্যাপি।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, মা কী বলে?

 মা তো এমনিতে অতীনের সঙ্গে ভালভাবেই কথাবার্তা বলে।

 কিছু বুঝতে পারে?

 কোন ব্যাপারে?

তোদের ব্যাপারে?

তা নিশ্চয়ই পারে। তবে মা মুখে কিছুই বলে না। ময়না (মীনার ছোট, আমার বোন) মাকে বলেছে। কিছু। তা না হলে আর বাবার কানে যাবে কী করে। বাবাও কিছু জানে বলেই, আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছে, এ সব কলেজে পড়ানো মাস্টারদের কিছু নেই, কোনও ভবিষ্যৎ নেই।

আমি বলেছিলাম, এখন তো বড় হচ্ছিস, যা ভাল বুঝবি করবি।

মীনা বলেছিল, তাই করব। আজকাল তো আমার কিছুই ভাল লাগে না। অনার্স করতে পারলাম না। বি. এ পাশ করে বসে আছি। এমনিতেও বাবা আমাকে কলকাতায় এম. এ পড়তে যেতে দিত না। কলকাতা না হোক, কল্যাণীতেও যেতে পারতাম। বাবার তাতে একদম ইচ্ছে ছিল না। এখন আমার করবার কিছুই নেই। এখন আর আমার পড়াশুনোতেও মন নেই। তার চেয়ে বিয়ে হয়ে গেলে, দিব্যি অতীনের সঙ্গে গিয়ে সংসার করতে পারতাম। সেই আমার ভাল৷

মীনা আর কিছু চায় না। অতীনের বউ হয়ে, ঘর-সংসার করবে, এইটুকুই ওর সাধ। খুবই সহজ আর সরল ব্যাপার। মীনার কথা শুনে, আমার খুব ভাল লেগেছিল। কোনও অস্পষ্টতা নেই, কোনও জটিলতা নেই। একটি ছেলেকে একটি মেয়ে বিয়ে করতে চায়, সংসার করতে চায়। তথাকথিত ভবিষ্যৎ বা বড়লোক হবার কোনও অ্যামবিশন নেই। অন্তত আপাতত নেই। তবু বাবা এখনও কেন চুপ করে আছেন, কে জানে। বোধ হয় দাদার বিয়েটা আগে দিতে চান। তারপরে মেয়ের বিয়ে। অথবা, কে জানে, বাবা হয়তো ভেবে বসে আছেন, কিছুদিন কাটিয়ে দিতে পারলে, মীনা নিজে থেকেই মত পরিবর্তন করবে। আমি অবিশ্যি তা বিশ্বাস করি না। মীনাকে আমি অকপট আর জেদি বলেই জানি। বাবা ওর সঙ্গে পারবেন না।

মীনার কথা শুনে, সজলের মুখ আমার মনে পড়ে গিয়েছিল। আমি কোনও দিন মীনার মতো সহজ করে এমন কথা বলতে পারলাম না। ভাবতে পারলাম না। অথচ–অথচ, সেই কথা তো আমার মনে আছে। সজল ওর দু হাত দিয়ে আমার মুখ তুলে ধরে বলেছিল, বিন্দু, কাজ করব, খাটব, খাব, তোমাকে নিয়ে সংসার করব, এমনি একটি সাধারণ মানুষ হওয়া ছাড়া আর আমার কী চাই। এর চেয়ে মহৎ আমি আর কিছু ভাবতে পারি না।’… আহ, না, না না, কঁদতে চাই না। চোখের দৃষ্টি কেন ঝাপসা হয়ে আসে!