উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

৩. মুখে হাত চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে

০৩.

কতক্ষণ এই একভাবে মুখে হাত চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। জুতোর শব্দ পেয়ে, মুখ থেকে তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে, আঁচল দিয়ে চোখ মুছলাম। ডাক শুনতে পেলাম, যমুনা!

সামনে চেয়ে দেখলাম রমুদা। ওর চোখে মুখে একটা উদ্বেগের ছাপ। আমার খুব কাছে এসে বলল, কী হয়েছে রে?

বললাম, কিছু হয়নি৷

রমু আমার মুখের দিকে তবু একটু সময় তাকিয়ে রইল। জিজ্ঞেস করল, কেন এসেছিল ও? কী বলতে এসেছিল তোকে?

এমন কিছু না। এমনি কয়েকটা কথা বলতে এসেছিল।

তুই কাঁদছিলি কেন?

এমনি।

ও কি তোকে কোনও ভয় দেখাতে এসেছিল?

আমি তাড়াতাড়ি বললাম, না না, ভয় আবার কী দেখাবে।

রমুদা বলল, ওদের কথা কিছু বলা যায় না। যাবার সময় আমার সঙ্গে একটা কথা বলল না। এক বার তাকাল না পর্যন্ত। এরা কী? কী ভাবে, কীভাবে চলে!

রমুদার এ সব কথার জবাব আমি কিছু জানি না। শুধু এটুকু অনুমান করতে পারি, সুবীর রমুদার কথা একদম ভুলেই গিয়েছিল। সে যে আছে, সেটাই বোধ হয় ওর মনে ছিল না।

রমু আবার বলল, সুবীর যতক্ষণ ঘরের মধ্যে ছিল, ততক্ষণ একটা ছেলে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। এমন একটা লম্বা জামা গায়ে দিয়ে এসেছে, দেখে বোঝবার উপায় নেই, ভেতরে কিছু লুকিয়ে রেখেছে কি না।

আমি জানি, সুবীরের পক্ষে একলা কোথাও যাওয়া সম্ভব না। যে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, সে সুবীরকে পাহারা দেবার জন্যই দাঁড়িয়ে ছিল। হয়তো তার কাছে কোনও অস্ত্র ছিল। হয়তো কেন, নিশ্চয়ই ছিল। সেটাই স্বাভাবিক। আমি বললাম, তোর বোধ হয় খাওয়া হয়নি রমুদা। তুই খেতে যা।

যাব যাব, আগে বলে নিই, শোন না।

রমুদার মধ্যে এখনও বেশ উত্তেজনার ভাব রয়েছে। অনেকক্ষণ ধরেই ওর একটা উত্তেজনার মধ্যে কেটেছে। বলল, অনেক দিন বাদে আমি ওকে দেখলাম। চেহারাটা যেন একদম বদলে গেছে। চেনাই যায় না। সুবীর তো দারুণ দেখতে ছিল! ভেরি হ্যান্ডসাম আর স্মার্ট, আর ও তো বেশ বড়লোকের ছেলে, গাড়িতে আসত, বন্ধুদের খুব খাওয়াত, দারুণ গ্ল্যামার…যাক গে, সে কথা বলছি না। এখন একদম চেনাই যায় না।

রমুদা বলে যাচ্ছে, আমি শুনে যাচ্ছি। অনেক বার শোনা কথা। আমার কানে যাচ্ছে, কিন্তু মনের মধ্যে ঢুকছে না। কিন্তু রমুদা অন্য প্রসঙ্গে এল। বলল, আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেছলাম, জানিস যমুনা। ট্রাম-রাস্তাটা পেরিয়ে, আমাদের পাড়ার রাস্তায় ঢুকেছি। হঠাৎ দেখি একটা লোক যেন হাওয়া থেকে বেরিয়ে এল, এসে আমার পাশে পাশে চলতে লাগল। আমার কেমন অস্বস্তি লাগল। আজকাল এমন দিনকাল হয়েছে, দিনেই হোক আর রাত্রেই হোক, একলা চলতে গিয়ে হঠাৎ পাশে অচেনা কেউ এসে দাঁড়ালে, কেমন ভয় ভয় লাগে। আমি লোকটার দিকে তাকালাম। সেও আমার দিকে তাকাল। মনে হল। যেন হাসল। তারপরেই শুনতে পেলাম, কী রে রমেন, চিনতে পারছিস? দেখিস যেন আমার নামটা উচ্চারণ করিস না। গলার স্বর শুনেই আমি চিনতে পারলাম, আর অমনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। সত্যি বলছি, আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। দেখলাম, সুবীরের একটা হাত ওর প্যান্টের পকেটে। সুবীর তা হলে আমাকে…ভাবতেই, কোনও দিকে ছুট দেব কি না ভাবলাম। তখনই ও ঠিক হুকুমের মতো বলে উঠল, দাঁড়াস না, চলতে থাক।আমি চলতে থাকলাম। সুবীর যেন আমার গা ঘেঁষে চলতে লাগল। আমি বলেই ফেললাম, তুই কি আমাকে? ও সে কথায় কান দিল না। বলল, যাক, তোকে পেয়ে ভালই হল। তোদের বাড়িতেই আমি যাচ্ছি।তাতে আমার ভয় একটুও কমল না। একটা ভয়ংকর কিছু করার জন্যই নিশ্চয় সুবীর যাচ্ছে। প্রথমে দীপুর কথা আমার মনে হল। দীপু সুবীরদের বিরুদ্ধে প্রায়ই কথা বলে। তারপরে বাবার কথা মনে হল, বাবাই হয়তো ওদের টারগেট। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের বাড়িতে কেন? বলল, যমুনার সঙ্গে এক বার দেখা করব। তৎক্ষণাৎ সজলের কথা আমার মনে পড়ল, ভাবলাম, তা হলে তুই ওদের টারগেট। জানি না, তোরা কী করছিস, কী তোদের ব্যাপার, আমার কেবল এই কথা মনে হল, ওরা তোকে শেষ করতে আসছে। আমি বললাম, যমুনা তো বোধ হয় বাড়ি নেই, ও বিকেলেই বেরিয়ে গেছে। সুবীর বলল, বেরিয়েছিল, এখন বাড়িতেই আছে। তার মানে তুই কখন বেরিয়েছিলি, কখন ফিরেছিস, সব খবরই ওর জানা। তোকে কী দরকার, সে কথা জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। আমি এক বার সুবীরের মুখের দিকে তাকালাম। ও রাস্তার সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ড্রিংক করেছিস? জিজ্ঞাসার ভঙ্গিটা এমন, আমি ঘাবড়ে গেলাম। নিশ্চয় গন্ধ পেয়েছে। বললাম, হ্যাঁ, ওই একটু–এক বন্ধুর বাড়ি গেছলাম। আমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করল, ও আজকাল খায়-টায় কিনা। একসময়ে আমরা একসঙ্গে কয়েক বার বিয়র-টিয়র খেয়েছি। কিন্তু জিজ্ঞেস করলাম না। কী জানি আবার কী ভেবে বসবে! ও বোধ হয় আজকাল আর খায় না (কথাটা বলার সময়ে রমুদা আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন আমাকে জিজ্ঞেস করছে, আমি জানি কি না। কিন্তু আমি কিছুই জানি না।) তারপরে বাড়িতে ঢোকবার মুখেই দেখি, কোথা থেকে আর একজন চলে এল। তার দিকে আমি ফিরে তাকাতে সুবীর বলল, ও আমার সঙ্গে আছে। রমেন, যমুনা যে ঘরে আছে, তুই আমাকে সে ঘরে নিয়ে চল। বাড়ির লোকজন কেউ যেন জানতে না পারে। তখনও আমার মনে এক চিন্তা, ও তোকে শেষ করতেই এসেছে। একটু সন্দেহও ছিল, একটা মেয়েকে কি ওরা মারবে? সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে আমি জিজ্ঞেস করে ফেললাম, যমুনাকে তোর কী দরকার? সুবীর আমার সে কথার কোনও জবাব দিল না, খালি বলল, যমুনার ঘরে নিয়ে চল। ও আমাকে রীতিমতো হুকুম করছিল, আমাকে আর কিছু বলার দরকার মনে করছিল না। দেখলাম, দোতলায় বাইরে কেউ নেই। দীপুর জন্যই আমার বিশেষ করে ভয় ছিল। তোর ঘরের এ দিকটা অন্ধকার ছিল। আমি সুবীরকে তোর দরজা দেখিয়ে বললাম, যমুনা এ ঘরে থাকে। ও আমাকে বলল, ন কর। ও নিজে কেন নক করল না জানি না, বোধ হয় অন্য কিছু সন্দেহ করছিল, তাই আমিই নক করলাম। তুই দরজা খুলে দিতেই সুবীর ভিতরে ঢুকল, দরজা বন্ধ করে দিল। আমি জানি না, সুবীরের ওটায় সায়লেন্সর লাগানো ছিল কি না। যাই হোক, এখন বুঝতে পারছি, ও তোকে মারতে আসেনি। কিন্তু যতক্ষণ সুবীর বাইরে আসছিল না, ততক্ষণ আমি যেন দম বন্ধ করে ছিলাম। ও কেন এসেছিল, কী বলতে এসেছিল?

ওহ, রমুদা এত কথা বলতে পারে! উত্তেজনা ওর ভিতরে রয়েছে বুঝতে পারছি, নেশার ঝোঁকটাও বোধ হয় রয়েছে। কিন্তু সুবীর কেন এসেছিল, কী বলেছে, সে কথা রমুদাকে বলবার দরকার নেই। বললাম, এখন কোনও কথা নয়।

রমুদা বলল, তুই আমার কাছে বলতে চাইছিস না।

এখন আমার এ সব কথা একটুও ভাল লাগছে না। বললাম, তুই খেতে যা রমুদা, অনেক রাত হয়েছে।

রমুদার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার একটু অবাক লাগল। ওর চোখ দুটো যেন এখন বেশি লাল দেখাচ্ছে। ও আমার চোখে চোখ রেখে, ঠায় তাকিয়ে আছে। ওর চোখে আর মুখে যেন রাগ জ্বলজ্বল করছে, আর দৃষ্টিতে একটা সন্দেহের ভাবও যেন রয়েছে। হঠাৎ রমুদা গলার স্বর নামিয়ে বলে উঠল, জানি, আমি সব জানি যমুনা।

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী জানিস?

রমুদা তর্জনী তুলে, আমার দিকে তাকিয়ে বলল, য়ু আর অলসো রেসপনসেবল।

 মানে?

মানে, তা-ই। আমাকে সজল বলেছিল।

বলেই রমুদা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সজলের নাম শোনা মাত্র, আমার গায়ের মধ্যে কেমন করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে, রমুদার কথা যেন একটা সাংঘাতিক কিছু ইঙ্গিত করল। আমি দরজার কাছে ছুটে গেলাম। রমুদার পথ আটকে দাঁড়িয়ে, ওর চোখের দিকে তাকালাম। মনে হল, ওর চোখে যেন একটা ঘৃণার ভাব। জিজ্ঞেস করলাম, কী বলেছিল, সজল তোমাকে কী বলেছিল?

রমুদা বলল, সে কথা আর এখন বলে কোনও লাভ নেই।

সজল বলেছিল রমুদাকে! সজল কী বলেছিল? আর এখনই রমুদা সে কথা বলছে, যখন সুবীর এসে ঘুরে গেল। রমুদার চোখে মুখে রাগ আর ঘৃণা। সজল কী বলেছে রমুদাকে! সজল তো রমুদার সঙ্গে ইদানীং ভাল করে মিশত না, কথা বলত না। রমুদাকে কিছু বলার প্রবৃত্তি তার ছিল বলে মনে হয়নি। এখন রমুদা বলছে, সজল ওকে বলে গিয়েছে। কী বলে গিয়েছে! আমি শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, সজল তোমাকে কী বলে গিয়েছে?

বললাম তো, সে কথা এখন আর বলে কোনও লাভ নেই।

 আছে। তোমাকে বলতে হবে, সজল কী বলেছিল। তুমি এক বার যখন বলেছ, তখন তোমাকে সবটাই বলতে হবে। আমাকে এ কথাই বা কেন বললে–য়ু আর অলসো রেসপনসেবল।

রমুদার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ওর সেই ঘৃণা বা রাগের ভাবটা যেন কমে এসেছে। আমার চোখের দিকে সোজা চোখ তুলে আর তাকাতে পারছে না। কিন্তু সজল কী বলেছে, সে কথা জানবার জন্য আমার ভিতরে যেন দপদপ করছে। আমার মনের অবস্থা অনেকটা মরিয়া হয়ে ওঠার মতো।

রমুদা বলল, সজল আমাকে একদিন বলছিল, ওর জীবনটা যদি আমার মতো হত, তা হলে নাকি ভাল হত।

তার মানে কী! তার সঙ্গে তোমার এ সব কথার সম্পর্ক কী!

সজল আরও বলেছিল, ওর কোনও বন্ধু নেই, ওকে কেউ ভালবাসে না, সমস্ত মিথ্যা। সবাই তুইও ওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিস।

আমি প্রায় ধমকে উঠলাম, মিথ্যা, মিথ্যা কথা বলছিস তুই রমুদা। তোকে কখনও সজল এ সব কথা বলেনি।

রমুদার গলায় তেমন জোর নেই, তবু বলল, বলেছে, তুইও শেষপর্যন্ত আর ওর সঙ্গে ছিলি না, তুইও।

আমি চিৎকার না করেও নিচু স্বরে শাসিয়ে উঠলাম, চুপ, চুপ কর তুই রমুদা। তুই একটা মিথ্যুক। চলে যা আমার সামনে থেকে, তোর পায়ে পড়ি রমুদা, চলে যা। সে কখনও তোকে এ সব কথা বলেনি, তুই আর এ সব কথা আমাকে শোনাসনি।

রমুদা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল। আমি দরজার কাছ থেকে সরে দাঁড়ালাম। রমুদার চোখে আবার যেন সেই রাগ আর ঘৃণার ভাবটা ফিরে এল। চোখ থেকে চোখ সরিয়ে, আমার আপাদমস্তক দেখল। তারপরে মুখ ফিরিয়ে বলে উঠল, বেচারি সজল।

আমার গলা দিয়ে আর্তনাদের মতো বেরিয়ে এল, রমুদা!

আমাকে মেরে ফেলতে চাইবি। মরতে আমি ভয় পাই সত্যি, কিন্তু আমার মতো ছেলেও একটু-আধটু সত্যি কথা বলতে পারে।

রমুদা কথাগুলো এমনভাবে বলছে, আমি বাধা দিতে পারছি না। রমুদা এভাবে কথা বলে না। ও যে সজলের বিষয়ে এভাবে বলতে পারে, আমার ধারণা ছিল না। মনে হচ্ছে, ওর রাগ আর ঘৃণার মধ্যে একটা নিশ্চিত কিছু আছে। তবু আমি না বলে পারলাম না, কিন্তু সজলের নাম করে, যে সব কথা তুমি

রমুদা আমার দিকে ফিরে দাঁড়াল, বলল, আমি সত্যি বলছি, ও আমাকে কয়েক দিন আগে বলেছিল, রমু, মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবনটা তোর মতো হলেই বা ক্ষতি কী ছিল।যমুনা, আমি বুঝতে পারিনি, কেন সজল ও কথা বলেছিল। ভেবেছিলাম, ও আমাকে ঠাট্টা করছে। প্রায়ই তো আমাকে ঠাট্টা করে অনেক কথা বলত। আমি বলছি না, তার মধ্যে বিষ ছিল, কিন্তু ঠাট্টা করে প্রায়ই আমাকে ডন জুয়ান বলত, কিংবা, এই যে রমেনবাবু, আজকাল কার সঙ্গে লাভ অ্যাফেয়ার চলছে? কখনও বলত, আজকাল সুধা পান কী রকম চলছে রে রমু? এ রকম অনেক কথাই বলত। ও আমার বন্ধু, একসময়ে আমরা খুবই বন্ধু ছিলাম। ও অবিশ্যি বরাবরই আমার থেকে সব ব্যাপারে সিরিয়াস ছিল। আজকাল তো একেবারেই বদলে গিয়েছিল। এ বাড়িতে ও আমার কাছে বা দীপুর কাছে আর আসত না, তোর কাছেই আসত…।

রমুদা বলে চলেছে, আমি শুনে যাচ্ছি। শুনতে ভাল লাগছে। সজলের কথা বলছে রমুদা, সজলের নাম বলছে বার বার, আমার শুনতে ভাল লাগছে। আমার মনটা যেন একটা কেমন দোলায় দুলছে। আমি রমুদার মুখের দিকে তাকিয়ে শুনে যাচ্ছি, রমুদা বলে চলেছে, তখন মাঝে মাঝে বাড়িতেই দেখা হয়ে যেত। ইদানীং ও যেন কেমন হয়ে গেছল, অনেক সময় সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার সময় আমার পাশ দিয়ে চলে গেলেও, ফিরে তাকিয়ে দেখত না। সেটা যে রাগ করে, তা মনে হত না। কেমন যেন আনমাইন্ডফুল, আর–আর কী বলব, কেমন ডিপ্রেসড মনে হত। তার মধ্যেই যদি হঠাৎ কোনও দিন চোখাচোখি হয়ে যেত, তা হলেই হেসে উঠে হয়তো জিজ্ঞেস করত, এই যে রোমিও, কোথায় অভিসারে চললে? আমিও হয়তো ঠাট্টার ভাবেই জবাব দিয়েছি, যাই কোনও জুলিয়েটের খোঁজে। কিন্তু কয়েক দিন আগে, ওর সঙ্গে নীচের বসবার ঘরে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। ও আমার দিকে যেন খানিকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী রে সজল, কী দেখছিস? বলল, কিছু দেখছি না, ভাবছি। মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবনটা তোর মতো হলেই বা ক্ষতি কী ছিল? ও হাসছিল না, সেইরকম একটা আনমাইন্ডফুল ভাব। বললাম, ঠাট্টা করছিস? সজল বলল, না, ঠাট্টা করছি না। জীবন নিয়ে চিন্তার বাড়াবাড়িটা বোধ হয় ভাল না। সহজ হওয়া ভাল। আমি বললাম, আমি ভাই জীবন নিয়ে এত চিন্তা-ভাবনা করতে পারি না। চলে গেলেই হল। সেদিন সজলের মনটা নিশ্চয়ই অন্য রকম ছিল। আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা রমু, তুই কি সত্যি কোনও মেয়েকে কখনও ভালবাসিসনি?–আমি একটু অবাক হলাম। জানি, কেন সজল আমাকে ও কথা জিজ্ঞেস করল। আমাকে সবাই যা ভাবে, ও নিশ্চয় তাই ভাবে, আমি একটা ফিলান্ডারার। আমি অবিশ্যি জানি না, আমি সত্যি ফিলান্ডারার কি না। কিন্তু ভাল হয়তো বাসতে চেয়েছিলাম কিন্তু সে কথা থাক গে, বললাম, সজল, তোরা যাকে ভালবাসা বলিস, আমি বোধ হয় সে ভালবাসা বুঝি না, জানি না। সজল আমার চোখের দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইল। ও যে আমাকে দেখছে, তা আমার মনে হল না।

রমুদা থেমে গেল। আমি নিশ্বাস বন্ধ করে জিজ্ঞেস করলাম, তারপর?

 রমুদা বলল, তারপর ও আর কিছু বলল না।

আমি যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না, সজল আর কিছু বলেনি। জিজ্ঞেস করলাম, আর কিছু না?

রমুদা বলল, আর কিছু না। সজল সিঁড়ির দিকে চলে গেল।

আমার মাথার মধ্যে, অনেকগুলো প্রশ্ন এসে বিধতে লাগল। সজল কেন ও কথা জিজ্ঞেস করেছিল? নিজের ভালবাসা নিয়ে কি ওর মনে কোনও প্রশ্ন জেগেছিল? তাই কি রমুদার মতো ছেলেকে সে ও কথা জিজ্ঞেস করেছিল। আমি বুঝতে পারছি, রমুদা এখন মিথ্যা কথা বলছে না। রমুদার কথা শুনে সজল কী ভেবেছিল? কী মনে করেছিল? তার কাছেও কি ভালবাসার বোধ অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল! তা হলে কি সজলের মনেনা, না, না, তা আমি ভাবতে পারি না। কয়েক দিন আগেও সজল যে চিঠি দিয়েছে, তাতেও লিখেছে-’ভালবাসাই শক্তি এবং সাহস। ভালবাসায় তো কেবল সুখের এবং আনন্দের অনুভূতিই থাকে না। ব্যথা আর চোখের জলে সে মাখামাখি করে থাকে। মানুষের হৃদয়ের ধন বলতে যেগুলোকে বুঝি, ভালবাসা তার মধ্যে এক-একটি মস্ত ধন। আমার সে ধন তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, কারোরই পারবে না। বিন্দু, কথাগুলো কি তোমার শোনা শোনা লাগছে? মনে হচ্ছে কি, বহুদিনের পুরনো বাসি কথা বলছি? তা হলে বলব, সত্যি, আমি নতুন কোনও কথা বলছি না। মানুষ যত প্রাচীন, আমার কথাও তাই। বিন্দু, এ কথা তোমাকে ছাড়া আর কাকে বলব!..

আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। এ কদিন সজলের চিঠিগুলো পড়ে পড়ে, সব কথা আমার মুখস্থ। শেষপর্যন্ত ভালবাসাই ওর মূলধন। দেখলাম, রমুদা চলে যাচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি ডাকলাম, রমুদা, শোন। কিন্তু বাকি যে কথাগুলো বললি, সেগুলো কী?

রমুদা জিজ্ঞেস করল, কোন কথা?

আমি বললাম, সজল বলেছে, ওকে কেউ ভালবাসে না, ওর কোনও বন্ধু নেই, সব মিথ্যা, আমরা সবাই ওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলাম!

রমুদা মাথা নেড়ে বলল, না, এ সব কথা সজল আমাকে বলেনি।

তবে কেন বললি?

বললাম, তার কারণ এ সব কথা আমার মনে হয়েছে। ওকে দেখে, ওর কথা শুনে, এ সব কথা আমার মনে হয়েছে। যমুনা, আমি মদ খাই, বাজে মেয়েদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াই, তা বলে কি আমি কিছুই বুঝি না? সব বোঝাবুঝিটা কি তোদেরই একচেটিয়া? সজল তো আমারই বন্ধু ছিল, এ বাড়িতে ওকে আমিই নিয়ে এসেছিলাম, তোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। কী দারুণ উইটি স্মার্ট হাসিখুশি ছিল। তোর মতো বরফ-জমাট মেয়ে, ওর উত্তাপেই–।

আমি বলে উঠলাম, থাক থাক, এ সব কথা থাক রমুদা। তোর কথা যা বলছিলি তা-ই বল।

রমুদার আবেগ থমকে গেল। একটু যেন হতাশ হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, না, বলব আর কী। আস্তে আস্তে সজলকে অন্য রকম হয়ে যেতে দেখলাম। ওর কথা শুনে, আর ওকে দেখে, ও সব কথা আমার মনে হয়েছে। আমি ভাই জানি না, একাকিত্ব কথাটা তোদের অভিধানে প্রতিক্রিয়াশীল কি না। আমি অবিশ্যি একা হতে ভয় পাই, ব্যাপারটা আমাকে ভীষণ হন্ট করে, সেইজন্য আমি কেবল সঙ্গী খুঁজে বেড়াই। ভাল পাই কি মন্দ পাই, তার কোনও বিচার আমি করি না। তবু মনে হয়, আমাকে যেন একটা রাক্ষস তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু আমি আর সজল অনেক তফাত। আমার মনে হয়েছিল, সজল নিজেকে বড় একা মনে করছে, ও ভীষণ একা হয়ে গেছে।

আমি উচ্চারণ করলাম, একা!

হ্যাঁ, রমুদা বলল, একা, সজলকে ভীষণ একা একা মনে হয়েছে আমার। যমুনা, এমনকী এ কথাও আমার মনে হয়েছে, তুইও আর ওর সঙ্গে নেই, তুইও দূরে চলে গেছিস।

রমুদার কথার মাঝখানে আমার চিৎকার করে বাধা দিতে ইচ্ছা করল। প্রতিবাদ করে ওকে থামিয়ে দিতে চাইলাম। কিন্তু আমার মুখ থেকে কোনও কথা বেরোল না। কোনও শব্দ করতে পারলাম না। আমার নিজের মধ্যে একটা সংশয় আর সন্দেহ জেগে উঠল। সজলের মুখ আমার চোখের সামনে ভাসতে লাগল। সজলের স্বর আমার কানে বাজছে।

রমুদা আবার বলল, সজলের আর আমাদের সোনলিনেস আলাদা। আমরা সাধারণ মানুষ। আমি মনে করি, সব মানুষই একা। কিন্তু সেটাকে ভুলে থাকবার জন্য, আমরা কত কী করি, কেবল উত্তেজনা খুঁজে বেড়াই। আর রবীন্দ্রনাথ যে বলেছিলেন, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে, সে গানটার তো আর কোনও অর্থই নেই। বরং একটু বদলে দিয়ে, এ রকম গাইলেই ভাল হয়, তবে দলকে চলো রে।কারণ রবি ঠাকুরের একলা আদর্শের কথা, দলও আদর্শের কথা। এখন আর কেউ একলা চলার কথা বলে না, দলে চলার কথা বলে। সজলও আদর্শবাদী, সেটাই ওর সমস্যা।

রমুদা হঠাৎ থামল। একটু থেমে থেকে আবার বলল, যাক গে, অনেক কথা বলে ফেললাম। সজলের সম্পর্কে আমার যা মনে হয়েছিল, তা-ই বললাম। সজলকে দেখে মনে হত, ও যাদের সঙ্গে আছে, তাদের সঙ্গে থেকেও যেন আলাদা। যমুনা, তুই সজলকে ভালবাসিস, আমিও সজলকে ভালবাসি। তবে আমার ভালবাসা…চলি।

রমুদা পরদা ঠেলে চলে গেল। আমি তেমনি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। সজলের মুখ ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। সজল, সত্যি কি তুমি নিজেকে একলা ভাবছিলে, সত্যি কি তুমি একা হয়ে গিয়েছিলে? আমি–আমি কি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম!

সজল সে কথা কোনও দিন বলেনি। তাকে দেখে বোঝা যায়নি। কিন্তু আমি–আমি কি নিজেকে একটুও চিনি না। এই মুহূর্তে, আমি কি নিজেকে দেখতে পাচ্ছি না। আহ্, মনে হচ্ছে, একটা কঠিন কিছু আমার বুক থেকে গলার কাছে ঠেলে আসছে। আমি দাঁতে দাঁত চেপে, নিজেকে শক্ত করে রাখছি। না, এভাবে নিজেকে দেখব না। এ ভাবে নিজেকে টুকরো টুকরো কথায় আর জিজ্ঞাসায় ভাসিয়ে দেব না। পিছন থেকে দেখি, দেখতে দেখতে আসি। কোনও দিন নিজের জীবনের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে ভাবিনি। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, এক বার নিজেকে দেখি। সব কথার জবাব সেখানে আছে।