উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

২. আমি উঠে দাঁড়ালাম

০২.

আমি উঠে দাঁড়ালাম। টেবিলের ওপরে হাতঘড়িতে সময় দেখলাম। রাত্রি দশটা বেজে পনেরো মিনিট হয়েছে। এ সময়ে, আমার ঘরের দরজায় কে শব্দ করতে পারে। সবাই জানে, আমি শুতে চলে এসেছি। এখন মামার খাবার সময়। মামা কি হরিকে দিয়ে আমাকে ডাকতে পাঠিয়েছেন। কিন্তু হরিকে তো বলে দিয়েছি, আমি বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি। আমাকে যেন খেতে না ডাকে। বলার সময় হরি আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। খেয়ে আসার কথাটা বোধ হয় বিশ্বাস করেনি। না করুক, আমি হরির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে, মামিমার ঘরের দিকে ফিরে তাকিয়েছিলাম। তখন রাত্রি আটটা বেজেছিল। মামিমার ঘরে আলো জ্বলছিল। মামার কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। তখনও ফেরেননি। কারোরই কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না।

মামিমার ঘরের দিকে তাকিয়েও, আমি সেদিকে যাইনি। হরির কাছে পার পাওয়া যাবে, মামিমার কাছে পার পাওয়া যাবে না। তাই হরির দিকে ফিরে বলেছিলাম, আমি শুতে যাচ্ছি, খুব ঘুম পাচ্ছে। আমাকে খাবার জন্য ডেকো না। বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি।

হরি ছেলেটা ভালমানুষ। আমাদেরই বয়সি হবে, একটু বড়ও হতে পারে। এ বাড়িতে ও আমার আগে এসেছে। এগারো বছর বয়সে নাকি এসেছিল।

খট খট খট। দরজায় আবার শব্দ হল। এ বার আর একটু জোরে। মামা নিজেই বোধ হয় ডাকতে এসেছেন। দীপু রমুদের কেউ নয় তো? ওরা তো বাড়িতে কত রাত্রে আসে, কখন খায়, কোনও ঠিক থাকে না। দীপু আর রমু, আমার মামাতো ভাই। ওরা হয়তো আজ তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। এসে শুনেছে, আমি না খেয়ে শুতে চলে এসেছি। তাই ডাকতে এসেছে। কিন্তু আমি তো হরিকে বলেই এসেছি–আমি শুতে যাচ্ছি। জানালা-দরজাও বন্ধ করে দিয়েছি, যাতে বাইরে আলো না যায়। যেন সবাই মনে করে, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি।

কিন্তু এত যখন দরজা ধাক্কাধাক্কি, তখন খুলতেই হবে। আমি এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলোম। একটা হাত এগিয়ে এল, পরদা সরে গেল। দেখলাম, রমু দাঁড়িয়ে আছে। রমুর সঙ্গে আমার চোখাচোখি হল। ও আমার দিকে এক বার ভাল করে দেখল, আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত। রমুকে দেখে মনে হচ্ছে, ও এইমাত্র বাইরে থেকে এসেছে। এখনও বাইরের পোশাক ছাড়েনি, পায়ে এখনও জুতো। ওর কপালে গালে গলায় ঘাম ঝরছে। বুকের কাছে শার্টের বোতাম খোলা। দেখলাম ঘামে ভিজে বুকটাও চকচক করছে। রমু আমার থেকে দু বছরের বড়। ওকে আমি রমুদা তুই’ বলি। ওর চোখের চাউনিটা যেন কী রকম। আমার দিকে দেখে, মুখ ফিরিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। আবার আমার দিকে ফিরল।

পলকের মধ্যেই আমার মনে একটা ঝিলিক হেনে গেল। জিজ্ঞেস করলাম, কী, পুলিশ এসেছে?

রমু ঘাড় নেড়ে বলল, না। তুই কি ঘুমোচ্ছিলি?

সোজাসুজি মিথ্যা কথাটা বলতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

রমু তৎক্ষণাৎ আমার কথার কোনও জবাব দিল না। পরদাটা আর একটু তুলে ধরল। বাইরের দিকে আবার এক বার তাকাল। বলল, তোর সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছে।

অবাক লাগল। এত রাত্রে আমার সঙ্গে কে দেখা করতে আসবে! আসতে পারত, একজন। অনেক দিনই হঠাৎ, না জানিয়ে, এ রকম সময়ে সে এসে পড়ত। এর পরেও, আরও বেশি রাত্রেও কখনও কখনও এসেছে। হরি ছাড়া কেউ জানতে পারত না। দীপু রমুও কখনও কখনও টের পেয়েছে বা ওদের সঙ্গেই হয়তো সে এসেছে–এসে পড়ত। কেবল মামা-মামিমাই জানতে পারতেন না। আর সবাই মোটামুটি জানত। সেই আসাটা, ঠিক অভিসার না। সে এলে, আমি দরজাও বন্ধ করতাম না। সে নিজেও, বেশি রাত্রে এসে, দরজা বন্ধ করে আমার সঙ্গে দেখা করত না। আসলে দরজা বন্ধ করার কোনও দরকারই হত না। হরি বা রমু দীপু, কেউ আমাদের দরজায় পাহারা দিত না। কেবল হরি নীচের তলায়, বাইরের ঘরে অপেক্ষা করত। কখন সে চলে যাবে, কখন হরি দরজা বন্ধ করবে।

কিন্তু সে–সে তো আর আসবে না!

হঠাৎ আমার মনে হল, বাইরের বারান্দায় রমুর পাশ ঘেঁষে কেউ যেন সরে গেল। আমি তার পায়জামার নীচের অংশ, আর পায়ের স্যান্ডেল দেখতে পেলাম। তারপরেই একজন এসে আমার। দরজায় দাঁড়াল। রমু একটু সরে গেল। যাকে দেখলাম, তার পরনে পায়জামা নেই। ট্রাউজার আর শার্ট, পায়ে রবার সোলের জুতো।

সুবীর! সুবীর আমার দরজায় দাঁড়িয়ে। ওকে দেখা মাত্র, এক বার যেন আমার বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল। আমার পায়ের তলায় মাটিও যেন এক বার কেঁপে গেল। তারপরেই, বুঝতে পারলাম, আমার বুকের মধ্যে ছলাৎ ছলাৎ করছে। আমার ভিতরে যেন একটা তোলপাড় চলছে।

সুবীর আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও ওর চোখের দিকে চেয়ে আছি। হ্যাঁ, এই সেই চেহারা, দেখলেই মনে হয় যেন একটা আগুনের ঝলক। লম্বা শক্ত চেহারা। চওড়া কপাল, চওড়া আর শক্ত চোয়াল। মাথায় বড় বড় রুক্ষু চুল। কখনও চিরুনি পড়ে কিনা সন্দেহ। গোঁফ-দাড়ি কয়েক দিন কামানো হয়নি। চোখা নাক ধারালো চোখ। চোখ দুটো যেন সবসময়েই ঝকঝক করছে। অতিরিক্ত উজ্জ্বল। কিন্তু চোখের কোলে কালি। দেখলে মনে হয়, ঘুম নেই অনেকদিন। চোখের কোলের কালির জন্যই, চোখ দুটি যেন বেশি ঝকঝকে দেখায়। ওর একটা হাত ট্রাউজারের পকেটে, আর একটা হাত বাইরে।

আমি এক বার সুবীরের ট্রাউজারের পকেটে রাখা হাতের দিকে তাকালাম। তারপরে আবার ওর চোখের দিকে। প্রায় এক মিনিটের বেশি সুবীর একভাবে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখল। আমিও ওকে দেখলাম। দেখতে দেখতে, নিজেকে একটু শান্ত করবার চেষ্টা করলাম। ভিতরে যে উত্তেজনাটা হঠাৎ জেগে উঠেছিল, একটু কমল। বুঝতে পারলাম, ঘরের বাইরে বারান্দায় আর একজন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। এখন বুঝতে পারছি, রমুদার চোখমুখের ভাব ও রকম দেখাচ্ছিল কেন। যেন একটা অস্বস্তি, দ্বিধা, একটু ভয় ভয় ভাব।

সুবীর এ বার ঘরের ভিতর দিকে একবার তাকাল। যেন কিছু বলবে, এইভাবে, আবার আমার মুখের দিকে তাকাল। ওর ঝকঝকে চোখ দুটো, যে চোখ সবসময়েই যেন কীসের এক দীপ্ত ভাবনায় জ্বলছে, যেন কেমন শান্ত হয়ে উঠল। যেন ওর চোখে হঠাৎ ছায়া পড়েছে, যেমন রোদের বুকে হঠাৎ মেঘের ছায়া পড়ে। তারপরে যেন ওর সারা মুখেই একটা ছায়া পড়ল। গম্ভীর আর ব্যথিত দেখাল ওকে।

তৎক্ষণাৎ আমার বুকে যেন আগুন জ্বলে উঠল। আমার ভিতরটা যেন ফুঁসে উঠল। আগুন জ্বলল আমার চোখেও। আমি বুঝতে পারছি, আমার মাথায় যেন কলকল করে রক্ত উঠছে। দাঁতে দাঁত চেপে বসছে। আমি জোরেই কথা বলতে গেলাম। কিন্তু ঝাঁঝালো অস্পষ্ট শোনাল আমার স্বর। জিজ্ঞেস করলাম, কী চাই?

দরজার কাছ থেকে আমি সরতে চাইনি। কিন্তু সুবীর আমার পাশ কাটিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। ওর গম্ভীর চাপা স্বর শোনা গেল, তোমাকে দেখতে এলাম।

আমি ঘরের মধ্যে সরে এসে, একভাবেই ওর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

সুবীর সেই মুহূর্তেই কোনও জবাব দিল না। আমার দিকে এক বার দেখে, ঘরের চারদিকে এক বার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল। রমু এসে ঘরের মধ্যে ঢুকল, দরজার এক পাশে দাঁড়াল। সুবীর ট্রাউজারের পকেট থেকে হাত বের করে নিল। কিন্তু পকেটটা ফুলেই রইল। আমি জানি, ওর পকেটে কী আছে। চোখের পলকে, ওর পকেট থেকে ওটা উঠে এসে, সাপের মতো এক ছোবলে সব শেষ করে দিতে পারে। ও কি সেইজন্য এ সময়ে আমার কাছে এসেছে!

সুবীর রমুর দিকে ফিরে বলল, রমেন, তুমি বাইরে যাও।

রমুদা এক বার আমার দিকে দেখল। তারপরে বাইরে চলে গেল। সুবীর আমার দিকে তাকাল। গম্ভীর আর নরম স্বরে বলল, তোমাকে এক বার না দেখতে এসে পারলাম না।

আমি তৎক্ষণাৎ যেন ছুরি বেঁধানোর মতো জিজ্ঞেস করলাম, কী দেখতে?

সুবীর কোনও কথা বলল না। আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে একটা নিশ্বাস ফেলল। ঠোঁটে ঠোঁট চাপল। আমি আবার বলে উঠলাম, আমি কী রকম বুক চাপড়ে, মাথার চুল ছিঁড়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদছি, তাই দেখতে?

সুবীর মাথা নেড়ে বলল, না। তুমি ওভাবে কাঁদবে না, আমি জানি।

তবে? শোকে আমি কেমন হয়েছি–তাই দেখতে?

সুবীর একটু সময় আমার দিকে তাকিয়ে দেখল। বলল, সে সব কিছুই না। তোমার কাছে এক বার আসা উচিত বলে মনে হল। কেননা, আর যাই হোক, তুমি তো আমাদের বন্ধু।

আমার মনে হল, চিৎকার করে সুবীরের কথা থামিয়ে দিই। কিন্তু চিৎকার করা সম্ভব না। আমি বিদ্রূপ করে উচ্চারণ করলাম, বন্ধু?

নও?

কোনও দিনই না। কোনও দিনই তোমাদের বন্ধু ছিলাম না।

সুবীরের কোনও উত্তেজনা নেই। বলল, তুমি আমাকে আমাদের ভুল ভাবছ বলেই, এ সব কথা বলছ। আসলে আমরা এর জন্য দায়ী নই।

আমি বললাম, কে দায়ী আর কে দায়ী নয়, আমি তা ভাল ভাবেই জানি। আমাকে কিছু বলতে হবে না।

সুবীর বলল, তুমি আমাকে বিশ্বাস করছ না।

 কেন করব?

কেন করবে না? অবিশ্বাসের কাজ কি কখনও করতে দেখেছ?

সুবীরের ছায়াভরা মুখে একটা করুণ ভাব। আমি বললাম, অবিশ্বাসের কাজ কেন। যাদের যা করা উচিত, তারা তা-ই করেছে। তুমি তা-ই করেছ।

সুবীর বলল, আমি করিনি, আমরা করিনি। সমস্ত ব্যাপারটা ইনভেস্টিগেট করা হচ্ছে, কে করেছে, কীভাবে ঘটনাটা ঘটল।

আমি বললাম, সে সব জেনে আমার দরকার নেই। যা ঘটবার তাই ঘটেছে। সেটাও আগেই অনুমান। করা গিয়েছিল, এ ঘটনা ঘটতে পারে। ঠিক তাই ঘটেছে।

সুবীর বলল, সেই জন্যই তোমার অবিশ্বাস এত বেশি। আমি জানি, মনে মনে তুমি এ রকম একটা আশঙ্কা করেছিলে। হয়তো সজলও করেছিল।

সেটা খুব ভুল হয়নি।

অথচ আমাদের সে রকম কোনও ডিসিশনই ছিল না। তুমি হরিশদাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো।

আমি সুবীরের চোখের দিকে তাকালাম। বললাম, সবসময় সব কাজ কি ডিসিশনেই হয়? আমাকে কি তা-ই বিশ্বাস করতে হবে?

সুবীর বলল, তার মানে, তুমি তা হলে আমাকেই সন্দেহ করছ।

 বললাম, তাতে কিছু আসে যায় না।

সুবীর কিছু না বলে, কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে চেয়ে রইল। তারপরে ঘরের অন্য দিকে হেঁটে গেল। আমি এখন ওর পিছনটা দেখতে পাচ্ছি। আমার এই ঘর থেকে রাস্তা দেখা যায়। রাস্তার দিকে জানালা আছে। সুবীর বন্ধ জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। খড়খড়ি লাগানো জানালা। কাচের পাল্লা খোলা। সুবীর শব্দ না করে খুব আস্তে আস্তে খড়খড়ি একটু ফাঁক করল। ঝুঁকে পড়ে চোখ লাগিয়ে রাস্তার দিকে। দেখল।

আমি জানি, ও কী দেখছে। কিন্তু তার জন্য এখন আমার একটুও ভয় করছে না। অন্য দিন, অন্য সময়ে, সুবীরকে আমার এ ঘরে এ সময়ে আসতে দেখলে আমি শিউরে উঠতাম। একটা মুহূর্তও নিশ্চিন্ত হতে পারতাম না। কথা বলতে পারতাম না। দুশ্চিন্তায় আর ভয়ে অস্থির হয়ে উঠতাম। কিন্তু এখন আমার মাথায় সে সব নেই। এখনও ওকে আমি দেখছি, সন্দেহে দুলছি। দুলছি না, আমার মন বলছে, সন্দেহ ঠিকই করেছি। কেননা, আমার চিন্তার সঙ্গে সব মিলে যাচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম, সুবীর আমার কাছে আসতে পারে। এসে হয়তো বলবে, যা ঘটেছে তার জন্য ও দায়ী না। ও কিছুই জানে না।

ঠিক তা-ই ঘটল। সুবীর এল, একই কথা বলল। আমার এ ঘরে ও কোনও দিন আসেনি। এ বাড়িতে কোনও দিন আসেনি। দীপু আর রমুর সঙ্গে ওর পরিচয় আছে। সে পরিচয় পুরনো বন্ধুত্বের। কলেজের বন্ধুত্ব আজ আর সে বন্ধুত্ব বোধ হয় নেই। এখন ওদের জগৎ আলাদা। ওদের কারোর সঙ্গে কারোর দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। রমুদা বোধ হয় অনেক দিন বাদে সুবীরকে দেখতে পেল। দেখে নিশ্চয় ভয় পেয়েছে, অবাকও হয়েছে।

সুবীর জানালার কাছ থেকে, আমার দিকে ফিরে দাঁড়াল। তারপর আস্তে আস্তে আমার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। আমি সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সুবীর এক বার আমার দিকে দেখে, আবার টেবিলের দিকে তাকাল। আমার দিকে না তাকিয়েই বলল, ও মনে হচ্ছে, এগুলো। সজলের চিঠি।

আমি কোনও জবাব দিলাম না। দরকার বোধ করলাম না। সুবীর বলল, ভয় নেই, নিয়ে নেব না।

বললাম, আমি নিতে দেবও না।

সুবীর বলল, আমার খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। খুব দেখতে ইচ্ছা করছে সজলের চিঠিগুলো। ওর চিঠিগুলো দেখলে, ওকে হয়তো আরও ভাল বুঝতে পারব। এখন মনে হচ্ছে, ওকে বোধ হয় খুব ভাল করে কখনও বুঝতে পারিনি।

আমি বিদ্রুপের সুরে বললাম, আশ্চর্য, বোঝবার দরকার ছিল নাকি?

সুবীর টেবিলের দিকে চোখ রেখে বলল, তুমি কী ভেবে বলছ, জানি না। সজলকে বোঝা মানে, ওর মতামতের কথা আমার জানাই ছিল। যে মতের সঙ্গে আমাদের কখনও মিলতে পারে না। আমি ব্যক্তিগত বোঝাবুঝির কথা বলছি।

ব্যক্তিগত বোঝাবুঝির কোনও দাম আছে বলে তো কখনও শুনিনি।

সুবীর যেন একটু থমকে গেল। একটু চুপ করে থেকে, তারপর বলল, তা অবিশ্যি নেই। একজন ব্যক্তিগতভাবে কত ভাল চরিত্রের মানুষ সেটা বড় কথা নয়। আসলে তার চিন্তা আর বিশ্বাস।

আমি বাধা দিয়ে বলে উঠলাম, থাক, ও সব কথা আমি অনেক শুনেছি, কথাগুলোর অর্থও আমার জানা আছে।

সুবীর আমার চোখের দিকে তাকাল। পলকের জন্য যেন ওর চোখ দুটি এক বার জ্বলে উঠল, চোয়াল শক্ত দেখাল। আবার সঙ্গে সঙ্গেই শান্ত হয়ে গেল। বলল, কিছুতেই আমাকে বিশ্বাস করতে পারছ না।

আমি কোনও জবাব দিলাম না। সুবীর আবার বলল, এখন তোমার মনের সে রকম অবস্থাও বোধ হয় নেই। পরে হয়তো বিশ্বাস করতে পারবে। তবে ব্যাপারটা কীভাবে ঘটেছে, তা আমরা দেখব। যে ঘটিয়েছে, তাকে যেভাবেই হোক, খুঁজে বের করব।

আমি বললাম, তাতেও কিছু যায় আসেনা। যা ঘটবার তাই ঘটেছে, আরও ঘটবেও। সবাই যে রকম চলে, চলছে, চলবে, সেইরকম চলছে ও চলবে। পরিবর্তন কিছুই হবে না।

সুবীর আমার চোখের দিকে চোখ রেখে গম্ভীর স্বরে বলল, উলটো-পালটা কথা বলো না। আমরা আমাদের নীতি বাদ দিয়ে চলি না।

আমি বললাম, আমিও নীতির কথাই বলছি। নীতিটা কী, তাও আমার জানা আছে।

সুবীর যেন খানিকটা হতাশ হয়ে আমার কাছ থেকে সরে গেল। দুবার পায়চারি করল। হঠাৎ আমার মনে হল, শুধু একটা কথা বলতেই ও আসেনি। ওর আরও কিছু বলবার আছে। কিন্তু আমি আর দেরি করতে চাই না। রমু এখনও বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। কীভাবে ওর সঙ্গে সুবীরের দেখা হল জানি না। এখনও হয়তো খায়নি সে। আমাকে ঘরের মধ্যে সুবীরের সঙ্গে ছেড়ে দিয়ে বোধ হয় যেতেও পারছে না। যদিও তার কোনও কারণ নেই। সুবীর খুব বেশি কিছু করলে, কী করতে পারে। ওর পকেটের গুলি ভরা রিভলভারটা দিয়ে, আমাকে গুলি করে মারতে পারে। সে ভয় আমি করি না। সে ভয় আমি অনেক দিনই ছেড়েছি।

তবু আমি বললাম, তুমি এভাবে এলে কেন। তুমি জান, এতে কত বিপদ ঘটতে পারে?

সুবীর বলল, আমি খুব সাবধানেই এসেছি। সন্ধের থেকে আমাদের লোক এখানে ছড়িয়ে আছে।

বললাম, তোমার জন্য আমি কিছু বলছি না। আমার ভয় এই বাড়িটার জন্য। আমার ভয় মামার জন্য, দীপু আর রমুদার জন্য।

সুবীর বলল, ভয় নেই, আমি সব দিক দেখে আর ভেবেই এসেছি।

কথা বলতে বলতে সুবীর আমার দিকে এগিয়ে এল। টেবিলের দিকে আবার তাকাল। জিজ্ঞেস করল, কিছু লিখছিলে মনে হচ্ছে!

আমি টেবিলের কাছ থেকে একটুও না সরে, চুপ করে রইলাম। লিখছিলাম, সে কথা সুবীরকে বলবার দরকার নেই। লিখতে বসেছিলাম, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। বাঁধানো খোলা খাতার ওপরে কলম পড়ে রয়েছে, লেখাও রয়েছে।

সুবীর বলল, যাই হোক, তোমার বিশ্বাস অবিশ্বাস তোমার কাছে রইল। আমার আরও দু-একটা কথা আছে, সেগুলো বলে যাই।

আমি শোনবার জন্যই চুপ করে রইলাম। সুবীরের দিকে তাকালাম না। আমি দেখছি, আমার সব ধারণাগুলোই মিলে যাচ্ছে। সুবীর বলল, আমরা এখনও বিশ্বাস করি, সজল ভুল পথে চলছিল, ভুল চিন্তা করছিল।

আমি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেবার জন্য মুখ তুলতেই, সুবীর হাত তুলে বলল, আমাকে আগে শেষ করতে দাও। তুমি কী বলবে, তা আমি জানি। এর পরে, তুমি আমাদের সঙ্গে কী রকম সম্পর্ক রাখবে তা জানি না।

আমি বলে উঠলাম, সম্পর্কের পাট আমার শেষ হয়েছে।

সুবীর যেন আমার কথা শুনতেই পেল না। বলল, আমরা তোমার কাছ থেকে খারাপ কোনও কিছু আশা করি না। আমাদের ক্ষতি হয়, নিশ্চয়ই তুমি সে রকম কিছু করবে না।

অবিশ্বাস! সুবীর এখন আর আমাকে বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু আমি কোনও জবাব দিলাম না। ও আবার বলল, তোমাকে অবিশ্বাসের কিছু নেই। তবু মানুষের মনের কথা কিছু বলা যায় না। মন এক বার ভেঙে গেলে, তখন অনেক কিছুই ঘটতে পারে।

বললাম, যদি ক্ষতি করি, তবে তোমাদের ছুরি বন্দুক তো আছেই।

সুবীর একটু থেমে থেকে বলল, তা আছে। কিন্তু ক্ষতিটা ক্ষতিই। এ কথা তোমাকে আমি বললাম, আমাদের অনেকের মনের মধ্যেই এ রকম একটা চিন্তা এসেছে। আর

সুবীর থামল। আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম। সুবীর বলল, তোমার কাছে দুটো রিভলবার রয়েছে। ও দুটো আমাকে দিয়ে দাও।

আমি যেন চমকে উঠলাম, আর হঠাৎ মনে পড়ে গেল। আজ বিকেলে বাড়ি থেকে বেরোবার সময়েও ভেবেছিলাম, অস্ত্র দুটো নিয়ে বেরোব। কাছাকাছি কোনও পার্কের মধ্যে গিয়ে, পুকুরের জলে ফেলে দেব। ও দুটো জিনিস আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। যতই ভাবছিলাম, আমার ঘরে, খাটের নীচে, একটি বিশেষভাবে তৈরি বাক্সের মধ্যে ও দুটো জিনিস রয়েছে, এখনও রয়েছে, ততই যেন বিধছিল। আমি বলে উঠলাম, এখুনি এখুনি। দেরি হলে ও দুটো বোধ হয় আমি কোথাও ফেলে দিতাম।

আমি খাটের তলায় নিচু হয়ে ঢুকলাম। মনের মধ্যে একটা উত্তেজনা রয়েছে বলেই, মাথাটা বারে বারে ঠুকে গেল। সেকালের উঁচু খাট না, বেশ নিচু। একজন মানুষের পক্ষে ঢোকা মুশকিল। বাক্সটা হাতড়ে খুঁজে পেয়ে, ডালাটা ঠেলে দিলাম। ভিতরে হাত দিয়ে অস্ত্র দুটো বের করে নিলাম। মেঝের সঙ্গে ঘেঁষটে বেরিয়ে এসে, খাটের ওপর রেখে দিলাম। এখন আরও পরিষ্কার বুঝতে পারছি, সুবীর কেন এসেছে। শেষের কথাটাই বিশেষভাবে বলতে এসেছিল। আর এই রিভলবার দুটো নেবার জন্য।

খাটের ওপর অস্ত্র দুটো রেখে আমি সরে দাঁড়ালাম। দেখলাম, সুবীর আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখের দৃষ্টিটা অন্য রকম, যেন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বলল, আমাকে বললেই পারতে কোথায় আছে। আমি বের করে নিতাম। তোমার মুখে ধুলো লেগে গেছে।

আমি কিছু না বলে, আঁচল তুলে মুখ মুছলাম। সুবীর খাটের কাছে গিয়ে বিছানার ওপর থেকে রিভলভার দুটো তুলে নিল। একটু সময় নজর করে দেখল। দেখে আমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, এতে গুলি ভরা ছিল না, না?

বললাম, জানি না। যেমন পেয়েছিলাম, তেমনি রেখে দিয়েছি।

বলে আমি আমার লেখার টেবিলের কাছে সরে গেলাম। আমার খাতা কলম আর সজলের চিঠিগুলোর ওপরে চোখ পড়ল। কটাই বা চিঠি। কেন যে রেখে দিয়েছিলাম, তাও জানি না। সজল জানত, আমি চিঠিগুলো সবই নষ্ট করে ফেলি। অনেক চিঠিই নষ্ট করে ফেলেছি। ইদানীং আর নষ্ট করতাম না। সজলের চিঠির ব্যাপারটা আলাদা। আমার সঙ্গে দেখা হত, কথা হত, তবু সে আমাকে চিঠি লিখত। কিন্তু ও যখন একলা থাকত, হঠাৎ তখন ওর কিছু লিখতে ইচ্ছা করত। আর সেটা আমাকে উদ্দেশ করেই চিঠির ভঙ্গিতে লিখত। চিঠির ভঙ্গি বললাম, এই কারণে, অনেক সময় সেগুলো ঠিক চিঠি বলে মনে হত না। তাতে আমাদের দুজনের কথা কিছু থাকত না। কেবল আমাকে সম্বোধন করে, ওর মনে যে কথাগুলো আসত, সেই কথাগুলো লিখে যেত। একেবারে শেষের দিকে এসে, লিখত, এখন তোমার কাছে যেতে পারলে খুব ভাল লাগত। কিন্তু তুমি তো এখন ঘুমোচ্ছ। ঘুমাও। আমি বরং তোমার চোখের পাতায় একটু ঠোঁট বুলিয়ে রাখি। ঘুমোও।–সজল। পরের দিন চিঠিটা আমার হাতে দিয়ে বলত, কাল রাত্রে তোমাকে চিঠিটা লিখেছি। অনেক আবোল-তাবোল লিখেছি। নাও, পড়ে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ো৷

দিইনি। ইদানীং আর দিতাম না। এই তো সেইসব চিঠি।

 বিন্দু।

ডাকটা শুনেই যেন আমার পায়ের তলায় ভূমিকম্প হয়ে গেল। আমার সারা গায়ে একটা ধাক্কা লেগে গেল। ডাকটা যেন আমার কানে ঢোকেনি। সোজা আমার বুকে এসে বিঁধেছে। বিধে একটা চাপা পড়া ফোয়ারার মুখ খুলে গিয়েছে, আর আমার বুকের মধ্যে যেন অজস্র ধারায় কিছু ছড়িয়ে পড়ছে, শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমি দ্রুত ঘূরে দাঁড়ালাম। সুবীরের সঙ্গে আমার চোখাচোখি হল।

সুবীরের মুখে আলো পড়েনি। আলোর পিছনে ওর মুখ। আমি ওর মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না। অস্পষ্ট দুটি বিন্দুর মতো ওর চোখ দুটি দেখতে পাচ্ছি। ওর সমস্ত মূর্তিটাই আমার কাছে ঝাপসা লাগছে। আমি যেন ওকে ঠিক সুবীর বলে চিনতে পারছি না। আমি এখনও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না, সুবীর আমাকে ওই নাম ধরে ডেকেছে। কোনও দিন ডাকেনি। কোনও দিন ডাকতেও বলিনি। আমি চাইনি, আর কেউ ও নামে আমাকে ডাকুক, একজন ছাড়া। মনে মনে কখনও কোনও দিন চেয়েছি কি না, এই মূহুর্তে তা মনে করতে পারছি না।

সুবীর বলল, আমি যাচ্ছি।

বলে ও আর দাঁড়াল না। সোজা দরজার দিকে চলে গেল। পরদা তুলে ঘরের বাইরে চলে গেল। কিন্তু আমার কানে সেই ডাকটাই শুধু লেগে আছে। আমার বুকের অজস্র ধারার মধ্যে, শুধু একটাই শব্দ বাজছে, বিন্দু বিন্দু বিন্দু। যেন এটা আর এখন আমার নাম নয়। একটা মন্ত্রের মতো বাজছে।

কেন জানি না, হঠাৎ মনে হল, গলার কাছে কিছু ঠেলে আসছে। আমি দু হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলাম। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।