উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

৫. মুরশিদাবাদ যাইবার পথে

মুরশিদাবাদ যাইবার পথে, যখন একটি কৃষক পরিবারের কাজ করিতেছি, তখনই গ্রামের একটি পরিবারের দুর্দশা দেখিলাম। সমস্ত ধান মাঠ হইতে তুলিবার আগেই, জমিদারের পাইকরা আসিয়া সর্বস্ব তুলিয়া লইয়া যাইতে লাগিল। ইহাদের খাজনা নাকি অনেক বাকি পড়িয়াছিল। সমস্ত ধানেও তাহা শোধ করিবার উপায় ছিল না। হাল বলদ গোরু বাছুর, এমনকী ঘরের সামান্য বস্ত্র কথা মাদুর চুপড়ি কুলা কিছুই নিতে বাকি রাখিল না। কাঁসার দুই-একখানি বাসন, স্ত্রীলোকদের গলায় সামান্য পুতির মালা, রং ও সীসার বালা পর্যন্ত কাড়িয়া লইল।

পরিবারের পুরুষরা পাইকদের পায়ে পড়িয়া কঁদিতে লাগিল। স্ত্রীলোকেরা লজ্জা বিসর্জন দিয়া, অনাবৃত বুক চাপড়াইয়া, বাঁশের খুঁটিতে মাথা ঠুকিয়া রক্তপাত করিল। কিন্তু ঈশ্বরের কাছে কোনও প্রার্থনা জানাইল না। বরং বলিল, ঈশ্বর বলিয়া যদি কেহ থাকিত, তবে এ রূপ হইত না। যে বিধাতা ইহা চাহিয়া দেখিতেছে, সেই অনামুখোর মুখে ছাই পড়ুক। অবস্থান্তরে ঈশ্বরের মুখে ছাই দিতে কুণ্ঠা নাই। কারণ সংকটকালেই মানুষের হৃদয়ে সত্যের আবির্ভাব হয়। ঈশ্বরের কোনও অস্তিত্ব নাই, এই সত্যই ইহাতে প্রকাশ পাইতেছে।

এইরূপ দুর্দশা নতুন নহে। চিরকালই দেখিয়া আসিয়াছি। চিরকালের দেখার মধ্যে ইহাকে অনিবার্য ভাবিয়া নির্বিকার ও উদাসীন থাকিতাম। এখন আর সেই চোখে দেখিতে পারিতেছি না। প্রবলের অত্যাচারের সামনে, ভয় কী নির্মম সংক্রামক, তাহাও যেন এই প্রথম অনুভব করিলাম। ইহাও নিয়তির বিধানের মতো বোধ হইতেছে।

মুরশিদাবাদ আমাকে কেন টানিতেছে, জানি না। পূর্ব লীলাক্ষেত্র দেখিবার বিন্দুমাত্র বাসনা আমার মনে নাই। তথাপি আমি মুরশিদাবাদের দিকেই চলিলাম। নগরের প্রান্তে পৌঁছাইতে সন্ধ্যা হইয়া গেল। এখন নগরে প্রবেশ করিতে গেলে, থানাদারের হাতে পড়িতে হইতে পারে। গ্রামের অভ্যন্তরে প্রবেশ মুখেই, একটি গৃহে আলো জ্বলিতে দেখিয়া সামনে গিয়া দাঁড়াইলাম। মাটির প্রাচীরের গায়ে দরজাটি খোলা। ভিতরের উঠোনে কাহাকেও দেখিতে পাইলাম না। কী করিব, ইতস্তত করিতেছি, এই সময়ে একটি স্ত্রীলোক ভিতরের এক পাশ হইতে দরজার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। সন্ধ্যার আবছায়ায় তাহাকে প্রৌঢ়া বিধবা বলিয়া বোধ হইল। কিন্তু কণ্ঠস্বরটি ভাঙা অথচ বিদ্বিষ্ট। জিজ্ঞাসা করিল, কে তুমি, কী চাও। আমার জবাবের পূর্বেই উঠোনের অপর দিকের ঘর হইতে অন্য এক রমণীর স্বর ভাসিয়া আসিল, কে আসিয়াছে।

দরজার সামনের স্ত্রীলোকটি জবাব দিল, চিনি না। ভিতরের রমণীর স্বর শোনা গেল, চোর নাকি? এই সন্ধ্যাবেলাতেই সিঁদ কাটিতে আসিয়াছে। কথার পরেই রমণীর হাসি শোনা গেল।

আমি বলিলাম, চোর তস্কর কিছুই নহি৷ অনেক দূর হইতে আসিতেছি। কিন্তু এখন নগরে প্রবেশ করিতে সাহস পাইতেছি না, থানাদার আটকাইয়া গারদে পুরিতে পারে। যাহাই হউক, আমি গ্রামের। মধ্যে যাইতেছি, রাত্রিটা কেহ নিশ্চয় দয়া করিয়া আশ্রয় দিবে।

আমার কথা শেষ হইবার আগেই ভিতরের রমণীর স্বর ভাসিয়া আসিল, মা, উহাকে আমার কাছে লইয়া আয়। দরজার স্ত্রীলোকটি বিরক্ত হইয়া বলিল, কী দরকার। যমেরা কখন আসিয়া পড়িবে, ঠিক নাই। এই অপরিচিতকে কেন বাড়ির মধ্যে ডাকিতেছিস। উত্তরে রমণীর তীক্ষ্ণস্বর শোনা গেল, তোকে যাহা বলিতেছি, তাহাই কর। তারপরে নিজের হুঁকা লইয়া তামাকু টানিতে যা।

আমি বিষয়টি কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। স্ত্রীলোকটি দরজা হইতে সরিয়া বলিল, এস। আমি দরজা অতিক্রম করিয়া উঠানে পা দিলাম। স্ত্রীলোকটির পিছনে পিছনে, আলোকিত ঘরটির দিকে যাইতে যাইতে লক্ষ করিলাম, আরও দুইটি ঘর রহিয়াছে। সে ঘর দুইটি নিতান্তই ছোট আর নিচু। আমি যে ঘরের পিড়ার উপর উঠিলাম, উহা ভাল চারচালা বাংলা ঘর। ঘরের দরজার সামনে গিয়া দাঁড়াইতে, ভিতরে দক্ষিণে লক্ষ পড়িল। একটি খট্রার (খাট) উপরে, বিছানো সুশয্যায় এক যুবতী, গালে হাত রাখিয়া কাত হইয়া শুইয়া রহিয়াছে। বৃহৎ আয়তনের চৌকোনা সীসকের (কাচের) আধারে উজ্জ্বল মোমবাতি জ্বলিতেছে। ঘরের মধ্যে উগ্র আতরের গন্ধ বহিতেছে।

সন্ধ্যাবেলায় গৃহস্থের বাড়ির পক্ষে দৃশ্যটি একান্তই বিপরীত। বাহিরে তুলসীতলা দেখি নাই, বাতিও দেখি নাই। এই সময়ে কোনও গৃহবধূ খাটে এই রকম শুইয়া থাকে না। মনে হইল তাহার অঙ্গে জামদানি শাড়ি ও কাঁচুলি রহিয়াছে। লোটন খোঁপায় সোনার কাটা পাতার দু-একটি ঝুমকা দেখা যাইতেছে। শরীরে যৌবন উপছাইয়া পড়িতেছে। কোমরে যথার্থ রুপার কিঙ্কিণি, আলতা পরা পায়ে খাগমল, হাতে চুড়ি ও বলয়, গলায় সোনার চন্দ্রহার। চোখে কাজল, কপালে সিন্দুরের ফোঁটা কিন্তু মাথায় ঘোমটা নাই। প্রথমে আমার মনে হইল, ধনী মুসলমান রমণী হইবে। কিন্তু তাহার কথায় কিছু পূর্বাভাস পাওয়া যাইত, তাহা পাই নাই। তাহা ছাড়া, ঘরের শাল খুঁটিতে একটি দুর্গা প্রতিমার পট ঝুলিতেছে। অবশ্য উহা মুসলমানের ঘরেও অনেক সময় দেখা যায়। বিশেষ করিয়া, যে হিন্দু রমণী মুসলমানকে বিবাহ। করিয়াছে, তাহার ঘরে এ রকম পট থাকা অস্বাভাবিক নহে।

রমণী যে অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থাতেই হাসিয়া বলিস, চোর না হইলেও তুমি নিশ্চয় রাতকানা ভিক্ষুক। চোখে দেখিতে পাও তো৷ বলিলাম, পাই। রাতকানাও সাজি নাই, তা হইলে আগেই নগরের পথে পথে ফিরিতাম। কিন্তু নগরে প্রবেশ করিতে দেরি হইয়া গিয়াছে। আজকাল থানাদাররা অকারণে নানা প্রকার সন্দেহ করে। সেইজন্যই স্থির করিয়াছি, রাত্রিটা গ্রামে যাপন করিয়া, ভোরবেলা নগরে যাইব। রমণী হাসিয়া বলিল, গ্রামেও যাইতে পারিবে না। কোনও এক সাহেবকে কে দুই দিন আগে রাত্রে গায়ে জল ঢালিয়া দিয়াছে, তাহার ফলে, গ্রামে তিন গোরা আলাদা থানা বসাইয়াছে। গ্রামের লোকদের ধরিয়া লইয়া গিয়া মারপিট করিতেছে। ভাবিতেছে, উত্তর দেশ হইতে (রংপুর) চুয়াড়েরা বুঝি মুরশিদাবাদে ধাওয়া করিয়া আসিয়াছে। গ্রামের লোকেরা তটস্থ হইয়া রহিয়াছে। কেহ ঘরের বাহিরে আসিতে সাহস পাইতেছে না। একমাত্র আমার জার দত্তজা মহাশয়টি গ্রামে লাঠি ঘুরাইয়া বেড়াইতেছে, সে মুরশিদাবাদে নতুন কুঠির বাবু হইয়াছে, গ্রামটিও তাহার তালুক। তিন গোরা তাহার বাড়িতেই থানা বসাইয়াছে।

যুবতীর জার (উপপতি) কথায় বুঝিলাম, সে গ্রামের তালুকদার দত্তজার রক্ষিতা, অর্থাৎ গণিকা। ঘটনা শুনিয়া বুঝিলাম, সে মিথ্যা বলে নাই। সাহেবের গায়ে জল ঢালিয়া দিবার মতো সাহসী লোকও মুরশিদাবাদ নগরে আছে। এক দিক হইতে ভাগ্য ভালই বলিতে হইবে। গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করিলে আর রক্ষা ছিল না। অপরিচিত বহিরাগত, তদুপরি আমার চেহারা পোশাক দেখিয়া চুয়াড় ভাবিতেও পারে। কিন্তু আমি হাসিয়া বলিলাম, চুয়াড়েরা কী প্রকারে আসিবে। বিশ-বাইশ বছর আগেই তাহাদের দমন করা হইয়াছে।

যুবতী গণিকা আমার কথায় উচ্চতরালে হাসিয়া উঠিয়া বলিল, চুয়াড় দমনের কথা জানি না, তোমার মুখে শুনিলাম। কিছু উৎপাত ঘটিলেই চুয়াড়দের কথা শুনি, বর্গিদের কথাও শুনি। তোমার কথা শুনিয়া মনে হইতেছে, সত্যই তুমি নিতান্ত চোর ডাকাত নহ। তবে কিছুটা চুয়াড়ের মতো দেখাইতেছে। তোমার হাতে দণ্ড কমল থাকিলে সাধু সন্ন্যাসী মনে হইত। কিন্তু তুমি এখন কী করিবে। আমার এখানে যে কোনও সময়েই গোরারা আসিতে পারে। বলিতে বলিতে যুবতী উঠিয়া বসিল। আমি বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, তুমি তালুকের মালিক দত্তজার প্রেয়সী, তোমার এখানে গোরা আসিবে কেন।

যুবতী আবার খিলখিল হাসিতে লুটাইয়া পড়িয়া, একটা তাকিয়া তুলিয়া খাটের এক দিকে ছুড়িয়া দিল। তাহার অলংকারের ঝনাৎকার শোনা গেল। খাট হইতে নামিয়া আসিল, জামদানির আঁচল। লুটাইতেছে। দুই হাত ছড়াইয়া বলিল, দেখিতেছ না আমি কেমন বিবিটি সাজিয়া রহিয়াছি। সারা দিনে ও রাত্রে তিন গোরা প্রস্রাব পাইলেও এখানে ছুটিয়া আসে। ইহা আমার জারের হুকুম, গোরাদের খুশি রাখিতে হইবে। তাহারা দেশি সেপাই লইয়া যখন ইচ্ছা এক একজন আমার ঘরে আসিতেছে, রমণ করিতেছে, চলিয়া যাইতেছে। আমার শাড়ি ছাড়িবার সময় হয় না, উলঙ্গ শুইয়া থাকিলেই ভাল হয়। তাহারা আসিতেছে, রমণ করিতেছে, চলিয়া যাইতেছে। আর এক জন আসিবার ফাঁকে আমি খাইয়া লই। আবার একজন আসিয়া চলিয়া যায়। আমি কিঞ্চিৎ বিশ্রাম করি। আবার এক জন আসে, চলিয়া যায়, আমি কিঞ্চিৎ ঘুমাইতে চেষ্টা পাই। দুই দিন দিনে-রাত্রে এই রকম চলিতেছে। কিন্তু আমার দত্তজার হুকুম সাজিয়া থাকিতে হইবে। তাই সাজিয়া আছি। কিন্তু দেখ। আমার চোখের কোল বসিয়া গিয়াছে, উরু নাড়িতে পারিতেছি না।

যুবতী সমস্ত কথাগুলিই গ্রাম্য অশ্লীল ভাষায় বলিতেছিল। কিন্তু উহা প্রকৃত অর্থে অশ্লীল নহে, ঘটনার অবিকল বিবরণ। সে জার বলে নাই, রমণ বলে নাই, সবই অশ্লীল ইতর ভাষায় বলিল। গোরারা এক একজন আসিতেছে, ভোগ করিয়া চলিয়া যাইতেছে, সে খাইবার অবকাশ পাইতেছে, আবার গোরা আসিতেছে, ভোগ করিয়া চলিয়া যাইতেছে, সে বিশ্রাম করিতেছে, আবার গোরা আসিতেছে। শুনিতে শুনিতে আমার বিবমিষা হইতেছে। নৌকার দাঁড়ের কথা আমার মনে পড়িয়া গেল। ইহা যেন একরূপ সেই প্রকারের ঘটনা। মানুষের জীবনের মতে, কুচক্রী নিয়তির অমোঘ নির্দেশে চালিত হইতেছে। নিরন্তর কষ্টের মধ্যে, আহার বিশ্রাম নিদ্রার অবকাশ একমাত্র মুক্তির স্বাদ। যুবতী হাসিয়া বলিলেও আমি বুঝিতেছি, তাহার সমস্ত অন্তর ক্রোধে ঘৃণায় উথলাইয়া উঠিতেছে। শুনিয়া আমি নত মস্তক হইলাম।

যুবতী আরও নানা প্রকারে তাহার দেহের দুর্গতির ব্যাখ্যা করিল, যাহা শুনিয়া আমার বমনোদ্রেক হইল। তারপরে বলিল, তবে গোরারা বেশি রাত্রে আসিতে ভরসা পায় না। তাহারা আমার অন্য কোনও ঘরেও প্রবেশ করে না। তুমি ইচ্ছা করিলে, অন্য ঘরে রাত্রিটা থাকিতে পারো। কিছু খাইতেও দিতে পারি। তবে সাবধানে থাকিও, কোনও রকম শব্দ করিও না। বলিয়া সে তাহার মাকে ডাকিয়া বলিল, ইহাকে রাত্রে থাকিবার ব্যবস্থা করিয়া দে। কিন্তু দেখিস, জীবনভর বেশ্যাবৃত্তি করিয়া, আমাকে ডুবাইয়াছিস। লোভের বশে ইহাকে ধরাইয়া দিস না।

ইতিমধ্যে রাত্রির অন্ধকার ঘনাইয়া আসিয়াছিল। অন্যথায় আমি ফিরিয়া, পশ্চাতের কোনও গ্রামে চলিয়া যাইতাম। আমার দ্বিধা দেখিয়া যুবতী ভরসা দিয়া বলিল, তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। কাল ভোরে উঠিয়া চলিয়া যাইও।

মুরশিদাবাদকে দেখিয়া স্পষ্টই মনে হইল, পূর্বের তুলনায় নগরে নবাবি প্রতাপ ম্লান হইয়াছে। গঙ্গার তীর দ্রুত ভাঙিয়া যাইতেছে। অথচ সাহেবদের সৌধগুলি এক নতুন রূপ লইয়া, নগরের অন্য এক শ্রীবৃদ্ধি করিতেছে। মুরশিদাবাদ হইতে তুলনায়, কাশিমবাজারের উন্নতি লক্ষণীয়। সাহেবদের রেশম লবণ ও অন্যান্য ব্যবসায়ের কুঠি সবই এখানে। তাহাদের বড় বড় সৌধ কাশিমবাজারকে যেন নতুন রাজধানী করিয়া তুলিয়াছে। কিন্তু দেশীয় ব্যবসায়ীরা সর্বদাই সাহেবদের কাছে হাত জোড় করিয়া বেড়াইতেছে। আমার অল্প বয়সে অন্যান্য ফিরঙ্গিদের দেখিয়াছি, তাহারা কেহ নাই। লোকারণ্য আছে, কেবল ইংরাজদের কাজ করিবার জন্য। দেশীয় লোকদের দোকানগুলি দেখিলে, গ্রামের হাটের দোকানের চিত্র ভাসিয়া ওঠে। যাহা কিছু, সবই ইংরাজদের কুঠি, ব্যবসা, সৈন্যাবাসকে ঘিরিয়া আবর্তিত হইতেছে। নিতান্ত তাহাদের দালাল ও কর্মচারীরাই কিছু হকিয়া বেড়াইতেছে। তাহাদের অঙ্গেই একমাত্র জোব্বা আচকান পাগড়ি শোভা পাইতেছে। পালকিতে করিয়া গেলে, সাহেব দেখিলেই, বেহারাদের থামাইয়া দ্রুত পালকি হইতে বাহির হইয়া হুজুরে সেলাম ঠুকিতেছে।

চার-পাঁচ দিন কাশিমবাজারেই কাটিয়া গেল। পরিচিত প্রায় কাহাকেও দেখিলাম না। মুরশিদাবাদে যে সব গৃহে যাইতাম, যাহাদের চিনিতাম, তাহাদের দেখাও পাইলাম না। পাইলেও তাহারা আমাকে চিনিতে পারিত না, আমিও পরিচয় দিতাম না। কাশিমবাজারে গঙ্গার বড় বড় মালবাহী নৌকার মাঝিদের পয়সা দিয়া, তাহাদের সঙ্গেই খাইলাম। এই সব মাঝিরা অনেকেই পূর্ববঙ্গের মুসলমান। কথা আদৌ বুঝিতে পারি না। বাপফৈ আর ফুইসা (পয়সা) ছাড়া মুখে কথা নাই। নগরের অন্যান্যদের তুলনায় ইহাদের সঙ্গে অন্ন গ্রহণে সুবিধা ছিল। ইহারা ঠকাইবার চেষ্টা করে না। কেবল শুকনো মাছের ব্যঞ্জনটি মুখে গেলেই গলায় আটকাইয়া যায়। গন্ধে পেটের নাড়ি ছিঁড়িয়া আসে। কে জানে, কবে হয়তো মানুষের মাংসও খাইব। অতএব গন্ধ-স্বাদ সকলই আমার কাছে পরাস্ত হইল। মুসলমানের সঙ্গে আহার কিছু নতুন নহে। পূর্বেও মুরশিদাবাদে থাকিতে, কিছু খাদ্য গলাধঃকরণ করিয়াছি। পিতামহ বা পিতা বা গৃহে কেহ জানিত না।

পঞ্চম রাত্রেই সংকল্প করিলাম পরের দিন ভোরেই কাশিমবাজার ছাড়িয়া যাইব। নগর প্রান্তে জলঙ্গীর ধারে, এক তাঁতির ঘরে রাত্রি যাপন করিয়া, ভোরবেলা বাহির হইয়া পড়িলাম। পথে লোক চলাচল শুরু হইয়াছে। কেন জানি না, মনটা আবার গঙ্গার পশ্চিম কূলে টানিতেছিল। বিদ্যুচ্চমকের। মতো গৃহের ছবি ভাসিয়া উঠিতেছিল। ইন্দুমতী ও লক্ষণাকে দেখিতে ইচ্ছা হইতেছিল।

সহসা আমার সম্মুখে একজন ইংরাজ অশ্বারোহী আসিয়া পড়িল। সে আমাকে রাগত স্বরে কিছু বলিল। পাশেই জলঙ্গী নদী বহিতেছে। আমি নদীর কিনারায় গিয়া দাঁড়াইলাম। সাহেবের হাতে একটি চাবুক ছিল। সে চাবুক তুলিয়া আমাকে মারিল। আমি চাবুকটি ধরিয়া ফেলিলাম। সহসাই। আমার মস্তিষ্কে কী ঘটিয়া গেল। আমি সাহেবের অপর পার্শ্বে যাইয়া, প্রাণপণ শক্তিতে তাহার অশ্বটির পেটে আঘাত করিলাম। সাহেবের পদরক্ষিত মোজা (রেকাব) হইতে তাহার পাদুকা পরিহিত পা টানিয়া বাহির করিলাম। অশ্বটি হতচকিত হইয়া জলঙ্গীর জলের ঢালুতে লাফাইয়া পড়িল। আমি চাবুক মারিলাম। সাহেব ছিটকাইয়া দূরের জলে পড়িল। ঝটিতি চারিদিকে চাহিয়া দেখিলাম, কাছে কেহ নাই। চাবুকটি জলে ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলাম। দেখিলাম, সাহেব জলের টানে। ভাসিয়া ডুবিয়া যাইতেছে, আর তাহার অশ্বটি দ্বিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া নদীর ধার দিয়া ছুটিতেছে।

ইতিমধ্যে লোকজন ছুটিয়া আসিল। সকলেই কী হইল কী হইল চিৎকার করিতেছে। আমি বলিলাম, কিছুই বুঝিলাম না। সাহেবের অশ্বটি হঠাৎ লাফাইয়া দৌড় দিল, সাহেব জলে পড়িয়া গেল। তখন জলঙ্গীর জলে সাহেবের হাত দুইটি দুই-একবার দেখা দিয়া ডুবিয়া গেল। দুর্ভাগ্য সাঁতার জানে না। তোকজন বলাবলি করিতে লাগিল, নিশ্চয়ই অশ্বটি ক্ষেপিয়া গিয়াছিল, নতুবা এ রূপ হইবে কেন। কিন্তু কেহ সহসা জলে নামিল না। দৌড়াদৌড়ি করিয়া কুঠিতে খবর দিল। কয়েক সাহেব, সেপাই, বিস্তর লোক ছুটিয়া আসিল। কেহ কেহ জলে ঝাঁপাইয়া পড়িল। কিন্তু আমি জানি, ইতিমধ্যে সাহেবটির পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটিয়াছে। অথচ উহাকে হত্যা করিবার কথা মুহূর্ত পূর্বেও ভাবি নাই। যাহা ঘটিয়া গেল, তাহা আমাকে কোনও রকম বিচলিতও করিল না। সকলের সঙ্গে উদাস হইয়া জলঙ্গীর স্রোতের দিকে চাহিয়া রহিলাম। ক্রমে ভিড় বাড়িতে দেখিয়া আমি নগরের দিকে চলিতে লাগিলাম। এখন সেই মুহূর্তকালের ক্রোধের লেশও নাই। উত্তেজনা নাই, অনুশোচনা নাই। গামছা বাঁধা পুটলি লইয়া নির্বিকার উদাস হইয়া গঙ্গার দিকে অগ্রসর হইলাম।

.

মুরশিদাবাদ হইতে, নৌকাযোগে কাটোয়ায় আসিলাম। আমাকে পিতামহের দান সেই গৃহটি দেখিলাম। কেহ নাই, দরজা জানালা সবই বন্ধ। এখানে কেশব ভারতীর নিকট নিমাই মিশ্র সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়াছিলেন। যে নাপিত ক্ষৌরকার্য করিয়াছিল, তাহার নাম মধু। মধু নাপিতের সমাধি এখানে আছে। অনেক প্রসিদ্ধ বৈষ্ণবদের নিবাস কাটোয়ার দূরে অদূরে ছড়াইয়া রহিয়াছে। সেই কারণেই এখানে বৈষ্ণবদের প্রাদুর্ভাব বেশি।

ঘুরিতে ঘুরিতে প্রাচীন দৌলতখানা ও ভাঙিয়া পড়া মাটির গড়ের কাছে গিয়া দাঁড়াইলাম। এখনও একটি তোপ গড়ের প্রাচীরে রহিয়াছে। পিতামহ তাহার জীবনের শুরুতে এখানেই রাজস্ব বিভাগে কাজ করিতেন। কাছেই দেখিলাম, একটি বৈষ্ণবদের আখড়া রহিয়াছে। সেখানে গিয়া আখড়ার মহান্ত ভক্তানন্দ বাবাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ হইল। লোকটি যথেষ্ট বৃদ্ধ হইয়াছে। কিন্তু সে কোমর ডুবাইয়া বসিয়া ছিল একটি মাটির বড় জলভরা পাত্রের মধ্যে। কারণ কী, জিজ্ঞাসা করিয়া কিছুই জানিতে পারিলাম না। তাহাকে ঘিরিয়া ভক্তবৃন্দরা বসিয়া ছিল। তাহাদের মধ্যে ভেকধারী কয়েকজন নেড়িও ছিল। বাকি স্ত্রীলোকদের কেশ ও বিন্যাস ভালই ছিল। অধিকাংশই যুবতী। বাবাজিরা নানা বয়সের। সকলে ভেক নেয় নাই।

একজন ভাগবত পাঠ করিতেছিল। ভক্তানন্দ আমাকে বসিতে ইঙ্গিত করিল। আমি বসিয়া গেলাম। কিন্তু ভাগবত পাঠকটির উচ্চারণে প্রমাণ হইতেছিল, তাহার শিক্ষা সামান্য। আমি নিজেই উপযাচক হইয়া বলিলাম, পাঠ ঠিক হইতেছে না, আমাকে দাও। লোকটি বিরক্ত হইয়া আমার দিকে তাকাইল। ভক্তানন্দ যেন রুদ্ধ স্বরে গোঙাইয়া বলিল, তাহাই দাও। আমি ভাগবত পাঠ করিলাম। ভক্তানন্দ বড়ই আপ্লুত হইল। পূর্বের পাঠকটিও আমার প্রতি প্রসন্ন হইল। ভক্তানন্দের নির্দেশে আখড়ায় আমার বাস ও আহারের ব্যবস্থা হইয়া গেল।

কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝিতে পারিলাম আখড়ার সেবাদাসীদের সেবার প্রতি সকলেরই বিশেষ আকর্ষণ। গাঁজার গন্ধে আখড়ার বাতাস সর্বদাই মোদিত থাকে। এখানে মুসলমান ছাড়া, আর কোনও বর্ণ ভাগ নাই, জাতিপাতির বিচার নাই। সেবাদাসীদের সঙ্গ করণেও বিচার নাই, তবে বিবাদ বিসম্বাদ আছে। সংসার সমাজ হইতে পতিত পরিত্যক্ত নরনারীরাই এখানে ভিড় করিয়াছে। কোনও কোনও বিধবা রমণী স্বেচ্ছায় এখানে আসিয়া আশ্রয় লইয়াছে।

নিয়তির বিধানে দেখিলাম একটি যুবতী রমণী আমার প্রতি আকৃষ্ট হইল। প্রচুর গঞ্জিকা সেবনের সঙ্গে তাহার সঙ্গ মন্দ বোধ হইল না। সে আমাকে সাবধান করিয়া দিল, এখানে অধিকাংশ স্ত্রীলোকদের কুৎসিত ব্যাধি আছে, আমি যেন কাহারও সঙ্গে শয়ন না করি। কেবল তাহার সঙ্গেই শয়ন করিতে পারি, কারণ সে মাসাধিককাল এখানে আসিলেও কোনও পুরুষের সঙ্গে শয়ন করে নাই। সে মিথ্যা বলে নাই। সে স্বামীসহ আখড়ায় আসে নাই। সে পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় গৃহের বধূ। এক বছর তাহার স্বামী গত হইয়াছে। তাহার ভাসুর দেবরেরা তাহাকে ছিঁড়িয়া খাইবার উপক্রম করিতেছিল। শাশুড়িও বিস্তর গঞ্জনা করিতেছিল। ইহা কেবল তাহার যৌবন বয়সের জন্য নহে। তাহার কিছু কিঞ্চিৎ জমিজমাও ছিল। তাহার বাবা একজন পরম বৈষ্ণব ছিল। তাহার বৈষ্ণব ভক্তি ছিল। আখড়ার বাবাজি মোহন্তদের প্রতি তাহার অগাধ বিশ্বাস ছিল। সে এই ভক্তানন্দের আখড়ার নামে, নিজের জমির স্বত্ব লিখিয়া দিয়া, কৃষ্ণের সেবার জন্য এখানে আসিয়া আশ্রয় লইয়াছে। কিন্তু তাহার স্বপ্নভঙ্গ হইয়াছে। ধর্মস্থানে যে এমন পাপ আছে, সে ভাবিতে পারে নাই। তাহার ভাসুর দেবরদের অপেক্ষা এখানকার বেশির ভাগ বাবাজি আরও খারাপ। তাহার বিবেচনায়, বাবাজিদের অপেক্ষা আখড়ায় সে সব স্ত্রীলোক আসে, তাহারা জীবনের সব কিছু খাইয়া বসিয়াছে। সংসারের বিধিনিষেধ ত্যাগ করিয়া, নিজেদের যদৃচ্ছা যৌনক্ষুধা মিটাইবার জন্য আখড়ায় আসিয়া জুটিয়াছে। অনেকানেক ধনবানের বিধবা, যাহার তিন কাল গিয়া এক কালে ঠেকিয়াছে, তাহারাও নিতান্ত কামের তাড়না মিটাইতে আসিয়াছে। নিজেদের বালিকা কন্যাদের সঙ্গে জোয়ান বৈরাগীর কণ্ঠি বদল করিয়া, জামাই শাশুড়ি একত্র সহবাস করিতেছে। ভক্তানন্দ বাবাজির তো কথাই নাই। তিনি একজন অবতার বিশেষ। যাহার প্রতি তাঁহার ভোগেচ্ছা জাগ্রত হয়, তাহাকেই ভোগ। করেন। কিন্তু এখন উপদংশ রোগে আক্রান্ত হওয়ায় কেহ তাহার কাছে বিশেষ যাইতে চাহে না। যে সব স্ত্রীলোক নিতান্ত গরিব, কোথায় আশ্রয় খাদ্য নাই, সে-ই উহার বিকারের শিকার হয়। তাহারও সেই দশা হইত, কিন্তু সে সমস্ত শক্তি দিয়া তাহা রোধ করিয়াছে। ভয় দেখাইয়াছে, সে সমাজে ফিরিয়া গিয়া সকল কথা জানাইয়া দিবে। ইহা ব্যতীত, অনেক বাবাজি তাহাকে রক্ষা করিতে প্রয়াস পাইতেছে, তাহার কারণও ভোগ। তবে সে যে স্বেচ্ছায় আমার প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছে, ইহার কারণ, আমি সৎ বলিয়া সে বিবেচনা করিয়াছে। জানে না, সৎ-অসৎ বিবেচনা আমার নাই। আমি মনে মনে হাসিয়াছি, অথচ কেমন একটা ক্রোধ মনে জাগিয়াছে। ইহার কাছেই জানিলাম, ভক্তানন্দ উপদংশের ক্ষতের জ্বালা নিবারণ করিতে, ঠাণ্ডা জলে নিম্নাঙ্গ ডুবাইয়া রাখে। অনেকেই দুরারোগ্য উপদংশ ব্যাধিতে ভুগিতেছে। ভক্তানন্দ বাবাজি নিতান্ত ব্যাধির জ্বালায় জলে নিম্নাঙ্গ ডুবাইয়া বসিয়া থাকে। শুনিয়া হাসি সংবরণ করিতে পারি নাই।

এখানে থাকিতে প্রবৃত্তি হইল না। ব্যাধির কথা জানিয়া ইস্তক প্রতিনিয়তই বিবমিষায় ভুগিতে লাগিলাম। খাদ্য খাইতে বিঘ্ন জন্মাইল। এই অবস্থায় একদিন সূর্যোদয়ের আগে, ভোরবেলা গঙ্গার ঘাটে যাইয়া দেখিলাম, ভক্তানন্দ জলের মধ্যে কোমর ডুবাইয়া বসিয়া রহিয়াছে। আমি তাহার নিকটে গেলাম। দেখিলাম, যন্ত্রণায় তাহার মুখ আকুঞ্চিত বিকৃত হইয়াছে। সারা জীবনে অনেক সেবাদাসী ভোগ করিয়া এখন তাহার মুল্য দিতেছে। আমি বলিলাম, বাবাজি, তোমার গঙ্গায় যাইবার সময় হইয়াছে। সে অতি কষ্টে বলিল, যাইতে পারিতেছি কোথায়? মুহূর্তেই আমার মনে কী উদয় হইল, নিজেই জানিতে পারিলাম না। ঘাটে নামিয়া তাহাকে গভীর জলে ঠেলিয়া দিলাম। কাশিমবাজারের। সাহেবকে জলে ডুবাইয়া মারার আগেও, আমার এমন বিদ্যুচ্চমকিত ইচ্ছা জাগিয়াছিল, অথচ কেন সেই ইচ্ছা হইয়াছিল নিজেও জানিতাম না। কাছে-পিঠে কেহ নাই। ভক্তানন্দ আর্তস্বরে চিৎকার করিয়া হাত তুলিয়া আমাকে ধরিতে প্রয়াস পাইল। আমি ধরা না দিয়া তাহার পা ধরিয়া আরও গভীর জলে লইয়া গেলাম। সে ডুবিয়া গেল। ভাসিবার এক বার চেষ্টা করিল মাত্র, পারিল না। অতলে ডুবিয়া গেল। আমি ডুব দিয়া স্নান করিয়া তীরে উঠিয়া আসিলাম।

তারপরেও কয়েক দিন আখড়ায় ছিলাম। ভক্তানন্দকে সকলেই অনেক সন্ধান করিয়াছে, পায় নাই। অবশেষে সকলে অনুমান করিল, মহাত্মাকে গঙ্গাই নিজের কোলে টানিয়া লইয়াছেন। আমার মনে কোনও বিকার জন্মে নাই। তবে ভক্তানন্দকে ডুবাইয়া মারিবার সময় একটা ক্রোধ সেই মুহূর্তে। জাগিয়াছিল। কিন্তু একটা অস্থিরতা আমাকে উদবেজিত করিতেছিল। সে অস্থিরতা কীসের। জানি না। আখড়া ত্যাগ করিবার সময় বারে বারেই এক বার গ্রামে যাইতে ইচ্ছা হইল। সম্ভবত পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় যুবতী বিধবাটিকে ভোগ করিয়া, আমার মনে পূর্বস্মৃতি জাগিয়াছিল। ইন্দুমতী ও লক্ষণার কথা ভাবিয়া মনে অনুশোচনা হইয়াছিল। সেই কারণেই মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্মিল, রাত্রের অন্ধকারে আত্মগোপন করিয়া এক বার দেখিয়া আসিতে ইচ্ছা হইল, ইন্দুমতী ও লক্ষণা কী করিতেছে। সংসারের রূপটি কেমন হইয়াছে। কিন্তু পারিলাম না। তাহারা আমার প্রতি যতই আসক্ত হউক, আমি সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইলে তাহারা ভয় পাইবে। আমি তাহাদের কাছে জীবিত নহি। মৃতও নহি। হয়তো এখনও তাহারা শোকে ভারাক্রান্ত। কিছুকাল পরে আর থাকিবে না। আমি এইরূপ ঘটনা দেখিয়াছি। আমি বর্ধমানের দিকে চলিতে লাগিলাম।

.

টাকাগুলি অদ্যাবধি সব নিঃশেষ হয় নাই। কাটোয়া হইতে বীরভূম, এবং সেখানে হইতে ক্ষীরপাই ও বিষ্ণুপুর ঘুরিয়া কয়েক মাস পরে আবার বর্ধমানে ফিরিয়া আসিলাম। এখন আমার মনে আত্মবিক্রয়ের বাসনা জাগিয়াছে। নিজেকে কাহারও কাছে দাস হিসাবে বিক্রয় করিবার মনস্থ করিয়া গ্রামে গ্রামে ঘুরিতে লাগিলাম। শেষপর্যন্ত কাটোয়া হইতে সাত ক্রোশ দূরে এক গ্রামে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। একটি প্রাচীন ইষ্টক নির্মিত গৃহের দরজায় গিয়া দাঁড়াইলাম। গৃহটি যেন নির্জন, প্রাণহীন। পরিত্যক্ত বোধ হইল। বাহিরের দিকে ঠাকুরদালানে কপোতেরা বাসা করিয়াছে।

বহির্বাটিটি দেখিয়া অনেকটা আমাদের গৃহের ন্যায় মনে হইল। কিন্তু কাছারি ঘর বলিয়া কিছু নাই। আমি বহির্বাটির দীর্ঘ ও উচ্চ পিড়ার দাওয়ায় উঠিয়া, একটি খোলা দরজার সামনে দাঁড়াইলাম। দেখিলাম, একজন বৃদ্ধ বৃহৎ কাষ্ঠাসনে বসিয়া জলচৌকির উপরে ঝুঁকিয়া খাগের কলমে কিছু লিখিতেছেন। তাঁহার সঙ্গে তসরের বস্ত্র ও একখণ্ড কার্পাস বস্ত্রের উত্তরীয়। উপবীত দেখা যাইতেছে। আমার দিকে মুখ তুলিয়া চাহিলেন, জিজ্ঞাসা করিলেন, কে।

আমি বলিলাম, মহাশয় আমি বড় দুর্ভাগা, আপনার নিকট আত্মবিক্ৰয়াৰ্থে আসিয়াছি। কৃপা করিয়া আমাকে ক্রয় করুন।

মহাশয় বিস্মিত ভ্রুকুঞ্চিত চোখে আমার আপাদমস্তক দেখিলেন। কলম রাখিয়া আমাকে ঘরের ভিতর ডাকিলেন। আমি কাছে গেলাম। তিনি আমার নামধাম পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি বলিলাম, আমার নাম রমাকান্ত। বাকি সবই ভুলিয়া গিয়াছি। মহাশয়ের দৃষ্টিতে অবিশ্বাস ও সন্দেহ। জাগিল। তাহার ব্যক্তিত্বপূর্ণ কঠিন তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, সে কীরূপ? কে তোমাকে আমার নিকট ভণ্ডামি করিতে পাঠাইল। আমি করজোড়ে বলিলাম, বিশ্বাস করুন, আমি ভণ্ড নহি। আমাকে কেহ পাঠায় নাই। আমি নানা দেশ ঘুরিতে ঘুরিতে এইমাত্র এই গ্রামে, প্রথমে আপনার নিকটেই। আসিয়াছি। আমি আপনার নাম জ্ঞাত নহি। আপনার গ্রামবাসী কাহাকেও কিছু জিজ্ঞাসা করি নাই। আমি একটি সৎ গৃহস্থকে সন্ধান করিতেছি, যেখানে আত্মবিক্রয় করিয়া, কাজ করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিব।

মহাশয় কাঁধের উত্তরীয়টি নামাইয়া রাখিয়া আবার আমার আপাদমস্তক তীক্ষ্ণ চোখে নিরীক্ষণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি তোমার বংশ জাতি পরিচয় সবই ভুলিয়া গিয়াছ। ইহা এক প্রকার ভোজবাজি বলিয়া বোধ হইতেছে। এরূপ এ কথা কেহ বিশ্বাস করিবে না। যাহা হউক, বলো এখন কোথা হইতে আসিতেছ। আমি বলিলাম, আপাতত কাটোয়া হইতে আসিয়াছি। বংশ জাতি পরিচয় কিছুই স্মরণ নাই। কয়েক বৎসর হইল, আমি এই রূপ ঘুরিয়া বেড়াইতেছি। কোথায় আমার বাড়ি, কী। পরিচয়, কিছুই জানি না। কয়েক বৎসর আগে আমি দেখিলাম, গঙ্গার তীরে তীরে ঘুরিয়া বেড়াইতেছি। অনেক ভাবিয়া স্মরণ করিতে চেষ্টা করিলাম, আমি কে, কোথা হইতে আসিয়াছি, আমার পিতামাতাই বা কে, কিছুই স্মরণ করিতে পারিলাম না। আমি একজন আত্মবিস্মৃত মানুষ। এমনকী দেখিলাম, কিছু। সনাতি মুদ্রা আমার বস্ত্রে বাঁধা রহিয়াছে। কী করিয়াই তাহা আসিল, কে দিল, কিছুই জানি না। পথে পথে ঘুরিয়া লোকের গৃহে পথে ঘাটে যখন যেরূপ কাজ মিলিয়াছে, তাহাতেই গ্রাসাচ্ছাদন করিয়াছি। আহার বাসস্থানের কোনও স্থিরতা নাই। তাই ভাবিলাম, কোনও সৎ ভদ্র গৃহস্থের কাছে আত্মবিক্রয় করিয়া জীবনধারণ করিব।

মহাশয় গভীর মনোযোগে, ভ্রূকুটি দৃষ্টিতে তাকাইয়া আমার সব কথা শুনিলেন, বলিলেন, তোমার ন্যায় আত্মবিস্মৃত ব্যক্তি দেখিয়াছি, কিন্তু তাহারা উন্মাদ হয়। আমি বলিলাম, আজ্ঞে আমি উন্মাদ নহি, আপনার যে রূপ ইচ্ছা পরীক্ষা করিয়া দেখিতে পারেন। ভণ্ড হইলে বিতাড়িত করিবেন। মহাশয় হাস্য করিয়া কহিলেন, বিতাড়ন করিয়া আমার কী সুসার হইবে। তুমি অর্থ লইয়া পলায়ন করিবে। আমি বলিলাম, আমি আমার বিক্রয়মূল্যের অর্থ দাবি করি না। তাহা আপনার কাছেই রক্ষিত থাকিবে। আমার কোনও ঋণ নাই, অতএব আমার টাকারও দরকার নাই। প্রয়োজন হইলে আপনার কাছ হইতে দুই চারি পয়সা চাহিয়া লব। আমি বহুতর স্বার্থপর কঠিন হৃদয় ব্যক্তি দেখিয়াছি, তাহাদের কাছে আহার বাসস্থানের বিনিময়ে বিশেষ অত্যাচারিত হইয়াছি। ভাগ্য ভাল, আত্মবিক্রয় করি নাই।

মহাশয় নীরবে আমার মুখের প্রতি কিছুক্ষণ চাহিয়া রহিলেন, জিজ্ঞাসা করিলেন, কী রূপে জানিলে, আমিও তোমার উপর অত্যাচার করিব না। আমি বলিলাম, না জানিয়াই আপনার কাছে আসিয়াছি। আমার নিয়তি আমাকে আপনার নিকট লইয়া আসিয়াছে। এখন আপনার যাহা বিবেচনা, অনুগ্রহ করিয়া আজ্ঞা করুন। তিনি আবার নীরবে আমার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে দেখিতে লাগিলেন। এমন সময় তাঁহার পিছনের দরজাটি খুলিয়া গেল। এক শ্যামাঙ্গিনী যুবতী ঘরের মধ্যে আমাকে দেখিয়াই দরজা টানিয়া বন্ধ করিল এবং আড়াল হইতে ডাকিল, বাবা আপনার আহারের সময় হইয়াছে, ভিতরে আসুন। মহাশয় পিছন ফিরিয়া ডাকিলেন, শিবি এক বার ভিতরে এসো।

আমি মহাশয়ের আচরণে বিস্মিত হইলাম। বাহিরের লোকের সামনে তিনি অন্দরবাসিনী স্ত্রীলোককে ডাকিতেছেন। আবার দরজা খুলিয়া গেল। সেই শ্যামাঙ্গিনী যুবতী দরজায় দাঁড়াইল। তাহার অঙ্গের শাড়িটি লাল পাড়যুক্ত সামান্য কার্পাস সুতার। অলংকার প্রায় কিছুই নাই। নাকে নোলক, হাতে লোহা ও শাখা। কানে কড়ি মাকড়ি, গলায় সরু হার। পায়ে মল নাই। মাথায় ঘোমটা টানা, চোখে ভ্রূকুটি বিস্ময়। নাতিদীর্ঘ, স্বাস্থ্যবতী, সধবা রমণীটির চোখ দুইটি আয়ত, উচ্চ নাসা, ঈষৎ পুষ্ট ঠোঁট। মহাশয় পিছন ফিরিয়া আমার কথা সবিস্তারে যুবতাঁকে বলিলেন। মহাশয়ের কথা শুনিতে শুনিতে যুবতীর চোখে ও মুখে নানা রূপ অভিব্যক্তি ফুটিতে লাগিল। মহাশয় আমার বক্তব্য সবিস্তারে বলিয়া মন্তব্য করিলেন, ইহার কথাবার্তায় শালীনতা ও বিনয়ের প্রকাশ দেখিতেছি। উন্মাদ বলিয়াও আপাতত বোধ হইতেছে না।

আমি যুবতীর বাবা’ সম্বোধনে উভয়কে পিতাপুত্ৰী জ্ঞান করিলাম। যুবতী বলিল, এই বিষয়ে সকলের সহিত আলোচনা করিয়া, যাহা বিবেচনা হয়, তাহা করিবেন। গ্রামস্থ সকলের সামনে ইহাকে উপস্থিত রাখিয়া কথা বলিবেন। পরে কাটোয়ার কাজি যাহা বলে, তাহাই হইতে পারে।

মহাশয় আমার দিকে ফিরিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কী কাজ করিতে পারিবে? আমি বলিলাম, দাসকে যাহা আদেশ করিবেন, তাহাই করিব। মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার কথাবার্তা শুনিয়া মনে হইতেছে, কিছু বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছ। চিঠিপত্র লিখিতে পারিবে? আমি এক মুহূর্ত দ্বিধা করিয়া বলিলাম, পারিব। মহাশয় ও তাহার কন্যার চোখে বিস্ময় ফুটিল। মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি আমাকে চণ্ডীকা কালিকা পুরাণাদি পাঠ করিয়া শুনাইতে পারিবে। বলিলাম, পারিব। ভৃত্যের কাজ হইতে শুরু করিয়া সকল কাজই পারিব। আমি আত্মবিস্মৃত, এই একমাত্র অভিশাপ লইয়া ঘুরিয়া মরিতেছি।

মহাশয় ও কন্যা পরস্পরের প্রতি বিস্মিত দৃষ্টি বিনিময় করিলেন। মহাশয় বলিলেন, আমি সদ্ববংশজাত উন্মাদ ব্যক্তি দেখিয়াছি, কিন্তু এ রূপ কখনও দেখি নাই। তুমি কি তোমার মূল্য নির্ধারণ করিয়াছ।

বলিলাম, না, আজ্ঞা মহাশয়, আমার কোনও বিবেচনা নাই। উহা আপনার বিবেচনাপ্রসূত। যুবতী বলিল, বাবা এখন ইহাকে অপেক্ষা করিতে বলুন। আপনি ভিতরে আহার করিতে চলুন। আপনার বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করিয়া, যাহা হয় করিবেন।

মহাশয় বলিলেন, তাহাই করি। তবে এই দ্বিপ্রহরে ইহাকে কিছু অন্নজল দাও। আমাকে বলিলেন, তুমি এই ঘরে বসো। বলিয়া তিনি গাত্রোত্থান করিয়া, কাষ্ঠাসন হইতে নামিয়া ভিতরে গেলেন। যুবতী এক বার আমাকে দেখিয়া পিতাকে অনুসরণ করিল। দরজাটি টানিয়া বন্ধ করিয়া দিয়া গেল।

বুঝিতে পারিলাম, শিবি নামী যুবতী আমাকে বিশ্বাস করিতে পারে নাই। অন্দরে পিতার সহিত আলোচনা করিবে। আমার কোনও ভয় নাই। এই গ্রামে পরিচিত কেহ থাকিলেও আমাকে চিনিতে পারিবে না। আমি ঘরের এক পাশে বসিলাম।

অপরাহ্নে কয়েক ব্যক্তি আসিলেন। ইতিমধ্যে আমাকে একটি প্রৌঢ়া স্ত্রীলোক পরিচ্ছন্ন কলাপাতায় অন্ন পরিবেশন করিয়াছিল। আমি গৃহস্থের নামটি তাহার জলচৌকিতে রাখা কাগজে দেখিয়া লইয়াছি। তাহার নাম অম্বিকাভূষণ ভট্টাচার্য, রাঢ়ীয় শ্রেণীর ভরদ্বাজ গোত্র, তর্কতীর্থ। উত্তম তুলট কাগজে দেখিলাম, মঙ্গলাচরণ করিয়া, আত্মপরিচয় লিখিয়া তিনি সর্বমঙ্গলা দেবীর উপাখ্যান সংস্কৃতে রচনা। করিতেছেন। মহাশয় আহারের পর সম্ভবত অন্দরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিয়া অপরাহে কয়েক ব্যক্তিকে লইয়া বহির্বাটি ঘরে প্রবেশ করিলেন। দেখিলেই বোঝা যায়, ইহারা গ্রামের ব্রাহ্মণ প্রধানগণ। সকলেই আমাকে নানা রূপ প্রশ্ন করিলেন। আমি অতি সতর্কতার সহিত সকলের সকল কথার উত্তর দিলাম।

নিয়তি অলক্ষ্যে হাস্য করিতেছিল কিনা জানি না, সকলেই আমার কথায় সন্তুষ্ট ও আশ্বস্ত হইলেন। পরের দিন আমাকে স্বহস্তে আত্মবিক্রয়পত্র লেখানো হইল। আমি বাংলায় আত্মবিক্রয়পত্র লিখিলাম। মুল্য একশত টাকা। পলায়ন করিলে, সরকার আমাকে যদৃচ্ছা শাস্তি প্রদান করিতে পারিবেন। সেই পত্র লইয়া তর্কতীর্থ মহাশয় সদলবলে আমাকে লইয়া কাটোয়ার কাজির নিকটে গেলেন। কাজি বিক্রয় কোবালায় সহিসাব্যস্ত করিয়া, কোম্পানির মুদ্রা ছাপিয়া দিলেন। আমি বিক্রয় হইয়া গেলাম।

ক্রমে জানিলাম, তর্কতীর্থ মহাশয়ের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি মোটামুটি ভালই আছে। তাহার কোনও পুত্র নাই। তিন কন্যা, তাহাদের সকলেরই কুলীন বংশে বিবাহ হইয়াছে। কিন্তু তৃতীয়া কন্যা বিংশবর্ষীয়া শিবানীকে তাহার বৃদ্ধ স্বামী গৃহে লইয়া যায় নাই। মাঝে মাঝে আসিয়া বৎসরের জামাইপ্রাপ্তি লইয়া যায়।

শিবানী প্রথম দিনে আমাকে নিতান্ত কৃষাণ-জাতীয় ভাবিয়া সামনে দাঁড়াইয়া কথা বলিতে দ্বিধা করে নাই। পরে আর আমার সামনে বিশেষ আসিত না। তর্কতীর্থ মহাশয় প্রথম দিকে কিছুদিন আমাকে ভৃত্যের কাজ করাইয়াছিলেন। পরে তাহার কী মনে হইয়াছে, গৃহভৃত্যের কাজ হইতে আমাকে নিস্তার দিয়াছেন। আমি লিখিতে পড়িতে পারি, তাহা ভোলেন নাই। তিনি প্রকৃতই আমার কাছে, প্রভাতে ও সন্ধ্যায় বসিয়া চণ্ডী ও কালিকাপুরাণ শুনিতে লাগিলেন। তাঁহার সর্বমঙ্গলা উপাখ্যান লেখনীর বিষয়ও আমাকে বলিয়াছেন। পড়িয়া শুনাইয়াছেন। আমার যে সব স্থানে নিতান্তই ত্রুটি মনে হইয়াছে, তাহা সবিনয়ে নিবেদন করিয়াছি। তিনি চমৎকৃত হইয়া আমাকে সাধুবাদ দিয়াছেন এবং তাহার ধারণার কথা ব্যক্ত করিয়াছেন, আমি নিশ্চয়ই কোনও সদ্ব্রাহ্মণবংশীয় সন্তান হইব। সর্পদংশনে বা মৃতজ্ঞানে হয় তো আমাকে গঙ্গায় নিক্ষেপ করা হইয়াছিল। অন্যথায় এরূপ হইতে পারে না।

এইভাবে বৎসরাধিক কাটিয়া গেল। বহির্বাটির একটি ঘরে আমার থাকিবার ব্যবস্থা হইয়াছিল। ঘরটি যথাযথ বাসোপযোগী করিয়া, বিছানা আয়না চিরুনি বস্ত্র গামছা সবই দেওয়া হইয়াছিল। একটি দাসী আসিয়া মাঝে মাঝে আমাকে শিবানীর আদেশ জ্ঞাপন করিয়া যাইত, যেন আমি চুলে ও শরীরে তেল জল ঠিকমতো ব্যবহার করি। মাথার চুল পূর্বেই কাটানো হইয়াছিল। বড় চুল আমি ছোট করিয়া ফেলিয়াছিলাম। দাড়ি কামাই নাই। শিবানীর প্রেরিত দাসী বলিত, দাড়ি রাখিবারই বা প্রয়োজন কী। ছোট দিদিঠাকরুন ইহা পছন্দ করেন না। না করিলেও আমার উপায় ছিল না। দাড়ি আমার ছদ্মবেশের কাজ করিত। ক্রমে ক্রমে বহির্বাটি হইতে বহির্বাটির অন্দরের দরদালানে আমাকে খাইতে দেওয়া হইত। অন্তরালে থাকিয়া শিবানী আমাকে লক্ষ করিত তাহা জানিতাম। অন্দরমহলে কখনই যাইতাম না। সে অনুমতিও আমার ছিল না। আমার বেশির ভাগ সময় তর্কতীর্থ মহাশয়ের সঙ্গেই কাটিত। কিন্তু শিবানী আমাকে যেন ছায়ার মতো অনুসরণ করিয়া লক্ষ করিত। কখনও দেখিতাম, আমার শয্যার উপরে সযত্নে তৈরি সুদর্শন কাঁথা রহিয়াছে। পুরনো বালিশের পরিবর্তে নতুন বালিশ আসিত। নিতান্ত খুঁইয়া ধুতির পরিবর্তে চিকন ধুতি ঘরে শোভা পাইত। কিন্তু আমি তাহা ব্যবহার করিতাম না, কারণ কৃষাণ রাখাল ও দাসীভৃত্যবৃন্দ সন্দেহ করিতে পারে।

মাঝে মাঝে শিবানীর কিশোরী দাসীটি আমাকে জিজ্ঞাসা করিত, সত্যই কি তুমি নিজের নামধাম কিছুই জান না! তুমি লেখাপড়া শিখিয়াছ, সে সব ভোল নাই, কেবল বংশ পরিচয় ভুলিয়া গিয়াছ। ইহা কী করিয়া হয়। আমি বুঝিতাম, শিবানী অন্তরালে থাকিয়া আমার উত্তর শুনিত। আমি দাসীটিকে বলিতাম, আমি অভিশপ্ত, সেইজন্যই সব ভুলিয়া গিয়াছি। কিন্তু মানুষ এক বার সাঁতার শিখিলে যেমন ভোলে না, বিদ্যাও সেই রকম ভোলা যায় না। দাসীটি আবার জিজ্ঞাসা করিত, বিবাহ করিয়াছিলে কি না, মনে করিতে পার। উত্তর দিলাম না।

ক্রমে তর্কতীর্থ মহাশয় আমার প্রতি নির্ভরশীল হইয়া পড়িতেছিলেন। তিন কন্যার জন্য তিনি কী কী বিষয় সম্পত্তি রাখিয়াছেন, সবই বলিতেন। আমাকে কন্যাদের সম্পত্তি দানপত্রও দেখাইয়াছেন। গঙ্গার পূর্বপারে, নদিয়ার চাকদহের সন্নিকটে ছোট কন্যা শিবানীর জন্য একটি ভদ্রাসন ও কিছু জমি। এবং এই বাড়ি দিয়াছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় শিবানীর কোনও সন্তানাদি হইল না। আর হইবার আশাও নাই। কারণ তাহার স্বামীটি বৃদ্ধ, বীরভূমের অধিবাসী। কাটোয়া হইতে সাত ক্রোশ উত্তরে শিবানীর শ্বশুরালয়।

এইভাবে দিন যাপনের মধ্যে ক্রমেই আমার মধ্যে ভাবান্তর উপস্থিত হইতে লাগিল। সেই সাহেব ও ভক্তানন্দ হত্যা আমার মনে পড়িলে একটা অস্থিরতা পাইয়া বসে। স্বগৃহে আর ফিরিয়া যাইবার কোনও ব্যাকুলতা বোধ করি না। বর্তমান অবস্থায় বাঁচিয়া থাকিবার অর্থ অনুসন্ধান করিতে বসিয়া কোনও কূল-কিনারা পাই না। অন্তরের মধ্যে সর্বব্যাপী একটা ক্রোধ, অথচ বিমর্ষতার অন্ধকারে সব কিছু ঢাকা পড়িয়া থাকে। মাঝে মাঝে জীবনকে নিরর্থক বোধ হয়, আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগে।

এইরূপ মানসিক অবস্থার মধ্যে সহসা একটি ঘটনা ঘটিল। আমার গঙ্গাযাত্রার পরে দেড় বৎসর অতিক্রম করিয়াছে। একদিন দ্বিপ্রহরে আহারের পরে কয়েক জন ব্যক্তির আগমন ঘটিল। তর্কতীর্থ মহাশয়ের সঙ্গে তাহাদের কী কথা হইল, কিছুই জানি না। শিবানীর কিশোরী দাসীটি আসিয়া আমাকে বাড়ির ভিতর ডাকিয়া লইয়া গেল। আমি ভিতরে গেলাম। শিবানী অন্দরের দরদালানে দাঁড়াইয়া আমাকে স্পষ্ট স্বরে ডাকিল, ভিতরে আসুন, কথা আছে।

আমি অত্যন্ত বিস্মিত হইয়া ঘরের ভিতরে গেলাম। এই প্রথম সে আমাকে সম্বোধন করিয়া ডাকিল, আপনি বলিয়া উচ্চারণ করিল। দেখিলাম, শিবানী বিশেষ উত্তেজিত। সর্বাঙ্গে ঘাম, ঘন নিশ্বাস বহিতেছে। বলিল, আমার স্বামী মরিয়াছে, শ্বশুরালয় হইতে আমাকে নিতে আসিয়াছে। আমি স্পষ্ট বুঝিতেছি উহারা আমাকে মৃতের সঙ্গে সহমরণে দিবার জন্যই এত কাল পরে নিতে আসিয়াছে। আপনি যে-ই হউন, আমাকে পরামর্শ দিন, আমি কী করিব।

আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া নিশপ রহিলাম। আমি কী বলিব, কিছুই স্থির করিতে পারিতেছি না। শিবানী অস্থির আবেগে বলিল, শীঘ্র বলুন। আপনি যাহা বলিবেন, তাহাই করিব। মরিতে যাইব, না বাঁচিব।

আমার বিস্মিত মনে তাহার কথাগুলি বিধিয়া গেল। কবে হইতে সে আমার প্রতি এত নির্ভরশীল হইয়াছে জানি না। নিজের পিতাকে না বলিয়া সে আমার মতামত জানিতে চাহিতেছে। আমার নিজের। বাঁচিবার প্রবল ইচ্ছার কথা মনে পড়িল, আর তৎক্ষণাৎ আমার ভিতর হইতে যেন কেহ বলিয়া উঠিল, যে বাঁচিতে চাহে, সে কেন মরিবে। তাহাকে আপন শক্তিতে বাঁচিতে হইবে। আমি বিংশবর্ষীয়া শিবানীর দিকে চাহিলাম। দেখিলাম শাড়ির আঁচলে আবৃত বক্ষযুগল যেন রুদ্ধশ্বাসে স্তব্ধ হইয়া রহিয়াছে, ওঠা-নামা করিতেছে না। আয়ত কালো চোখের অপলক দৃষ্টি আমার প্রতি। সেই দৃষ্টিতে অতিশয় উত্তেজনা, ব্যাকুলতা ও উৎকণ্ঠা। আমার মুখ দিয়া বাহির হইল, সহমরণ যদি আপনার নিকট আত্মহত্যা। বলিয়া মনে হয়, তবে কেন বাঁচিবেন না। বাঁচিতে হইলে আপনাকে নিজের শক্তিতে বাঁচিতে হইবে। শিবানীর চোখ জলে ভাসিল, বলিল, আর কিছু জানিতে চাহি না, আপনি আপনার ঘরে যান।

আমি চলিয়া আসিলাম। আমার মনে এখনও তাহার এই অভূতপূর্ব নির্ভরশীলতা, প্রথম বাক্যালাপ, দাসকে আপনি সম্বোধন, তোলপাড় করিতে লাগিল। তর্কতীর্থ মহাশয় অতি ব্যস্তভাবে গৃহমধ্যে প্রবেশ করিয়া শিবি শিবি বলিয়া ডাকিতে লাগিলেন। শিবানীকে খুঁজিয়া পাওয়া গেল না। আমি বহির্বাটির প্রাঙ্গণে গিয়া দেখিলাম, শিবানীর শ্বশুরালয় হইতে চারি বেহারার পালকি লইয়া দুই ব্যক্তি আসিয়াছে। আশেপাশের গৃহস্থ ব্যক্তিরা আসিয়া তাহাদের সঙ্গে কথা বলিতেছে। কিন্তু শিবানীকে কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া গেল না। শ্বশুরালয়ের লোকেরা বাড়ির অন্দরমহলে ঢুকিয়া দেখিতে চাহিল। তর্কতীর্থ আপত্তি করিলেন না। কিন্তু শিবানীর কোনও সন্ধান মিলিল না। তাহারা তর্কতীর্থ মহাশয়কে যৎপরোনাস্তি অপমান করিল। তর্কতীর্থ মহাশয়ও স্পষ্ট বলিলেন, আমার কন্যা বিধবা থাকিবে, তাহাতে তোমাদের আপত্তি কীসের। সে যদি আত্মগোপন করিয়া থাকে, দোষ দিতে পারি না। মৃত স্বামীর সহগামিনী হইতে না চাহিলে বলপ্রয়োগ করা যায় না। গ্রামের কেহ কেহ তাহাকে সমর্থন করিল। কেহ কেহ তৃষ্ণীম্ভাব গ্রহণ করিল। আবার কেহ কেহ তাহাকে যৎপরোনাস্তি অপমানকর কথা শুনাইল। এমনকী, তাহারা শিবানীর শ্বশুরালয়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে চারিদিকে শিবানীর সন্ধান করিয়া ফিরিল। গৃহের সর্বত্র তন্ন তন্ন করিয়া অনুসন্ধান করিল। আমাকে ও অপরাপর দাসী ভৃত্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করিল। ক্ষুব্ধ। নিরাশায় মন্তব্য করিল, তর্কতীর্থের অসতী কন্যাটি নিশ্চয়ই কাশিমবাজারের ইংরাজদের আশ্রয়ে চলিয়া গিয়াছে, অন্যথায় কোনও বৈষ্ণব আখড়ায় আত্মগোপন করিয়াছে। শুনিয়া আমার মনে বীতরাগ। জন্মাইল। ইংরাজ বা বৈষ্ণব আখড়ার আশ্রয়, কোনওটাই আমি অন্তর হইতে মানিয়া লইতে পারিলাম না। আবার ইহাও সত্য, এই সব হত্যাকারীদের হাত হইতে মুক্তি পাইবার আর কোনও পথ নাই। অথচ দেশে কি হিন্দু বিধবারা বাঁচিয়া নাই? অনেক বাঁচিয়া আছে। কিন্তু যাহাকে বলপ্রয়োগে মৃত স্বামীর সহিত জ্বলন্ত চিতায় পোড়াইয়া মারিবার সিদ্ধান্ত হয়, সেখানে রক্ষা পাওয়া দুষ্কর। আমি যুগপৎ উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা বোধ করিতে লাগিলাম। শিবানীর শ্বশুরালয়ের লোকেরা সন্ধ্যাকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়া পালকিসহ চলিয়া গেল। যাইবার সময় বিস্তর অপমানকর কথা বলিয়া গেল।

কিন্তু রাত্রির অন্ধকার নামিয়া আসা সত্ত্বেও শিবানীকে দেখা গেল না। তর্কতীর্থ মহাশয় উদ্বিগ্ন হইলেন। আমিও উদ্বেগবোধ করিতেছিলাম। এক সময়ে কিশোরী দাসীটি আমাকে অন্তরালে ডাকিয়া জানাইল, ছোট দিদিঠাকুরুন যথাস্থানে আছে, কিছু ভাবিও না। আমি সেই কথা তর্কতীর্থ মহাশয়কে জানাইলাম। তিনি উৎকণ্ঠিত আবেগে তৎক্ষণাৎ কন্যাকে দর্শন করিতে চাহিলেন। শিবানী অদৃশ্য হইতে আসিয়া উপস্থিত হইয়া পিতার পায়ে পড়িল। তর্কতীর্থ মহাশয় শিশুর ন্যায় কাঁদিয়াউঠিলেন। শিবানীও কঁদিতে লাগিল। সে পিতার পায়ে মুখ রাখিয়া আর্তস্বরে বলিল, বাবা আমার বাঁচিয়া থাকিবার সাধ রহিয়াছে। আমার এই পলায়নের জন্য আমাকে ক্ষমা করুন। তর্কতীর্থ মহাশয়ও কাঁদিয়াবলিলেন, তুমি। আমার কনিষ্ঠ সন্তান। নিজে বাঁচিয়া থাকিয়া আমিই বা কোন প্রাণে তোমাকে বৃদ্ধের চিতায় তুলিয়া দিয়া এই বয়সে বাঁচিয়া থাকিব। তোমার স্বামী ধনী ভূস্বামী ছিলেন। সম্ভবত বাঁচিয়া থাকিয়া তুমি সম্পত্তির। দাবি করিবে। এই আশঙ্কায় উহারা তোমাকে লইয়া যাইতে চাহিয়াছিল। আমি সব্রাহ্মণ, তোমাকে ক্ষমা করিতেছি। পিতা-পুত্রীর এই দৃশ্য দেখিয়া বহুকাল পরে আমার চোখও আর্দ্র হইয়া উঠিল। আমি সরিয়া গেলাম।

.

ইহার পরবর্তী ঘটনাবলীকে সমাজ সংসারের মানুষ নিশ্চয় কলঙ্কিত জ্ঞান করিয়া ধিক্কার দিবে। আমি দিব না। কলঙ্ক ও ধিক্কার দেওয়া অতি সহজ। যথার্থ অবস্থায় না পড়িলে, মানুষের চৈতন্য হয়। না। দেখিলাম, শিবানী ক্রমেই আমার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসিতে লাগিল। ইহাও নিয়তিরই এক বিষম ক্রীড়া। আমি শিবানীকে দূরে সরাইয়া দিতে পারিলাম না। অথচ আমার মনে গভীর দ্বিধা ও সংশয়। যাহা ক্রমেই অনিবার্য হইয়া উঠিতেছিল, তাহা আমার চিত্তে সুখ শান্তি উৎপাদন করিল না। সংসারে নিজেকে বহিরাগত ভাবিয়া, সমস্ত সংস্কারই ত্যাগ করিয়াছি। অতীতের মঙ্গলামঙ্গল বোধ নাই। তথাপি কেন এই দ্বিধা ও সংশয়।

শিবানীকে কেহই অপরূপ সুন্দরী বলিবে না। কিন্তু সে কুৎসিত নহে। অনতিদীর্ঘ, স্বাস্থ্যপুষ্ট শিবানী। দেখিতে সুশ্রী। কুড়িতে বুড়ি বলে, কিন্তু তাহার যৌবন যেন উপছাইয়া পড়িতেছে। সেই যৌবন আমাকে যতখানি আকর্ষণ করে, তদপেক্ষা তাহার অন্তরের শক্তিই অধিক আকর্ষণীয়। সে এমন অনায়াসে তাহাকে আমার কাছে নিবেদন করিল, আমি প্রত্যাখ্যান করিতে পারি নাই। তথাপি তাহাকে আমি স্মরণ করাইতে ভুলি নাই, আমি তাহাদের দাস, একজন অজ্ঞাতকুলশীল। শিবানী স্পষ্টই বলিয়াছে, আপনি কী রূপ দাস, তাহা আমি অনেক দিন আগেই বুঝিয়াছি। অজ্ঞাতকুলশীল বলিয়াও আপনাকে মনে করি না। আপনি আত্মবিস্মৃত মানুষ। কিন্তু আপনার আচার আচরণ শিক্ষা দীক্ষা প্রমাণ করিতেছে, আপনি কখনও দাস নহেন। বাবা বলিয়াছেন, আপনি উচ্চজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি, তাহার সর্বমঙ্গলা কাব্য সংশোধনের ক্ষমতা রাখেন। আমি গোপনে অনেক দিন আপনার চণ্ডী ও কালিকাপুরাণ পাঠ শুনিয়াছি, আর অবাক হইয়া। ভাবিয়াছি, আপনি নিশ্চয় শাপগ্রস্ত দেবতা।

আমি ঘোরতর প্রতিবাদ করিয়া বলিয়াছি, শাপগ্রস্ত কি না জানি না। আমি ঈশ্বরেও বিশ্বাস করি না। দেবতা সম্পর্কেও বিশ্বাস নাই। মনে করি, প্রকৃতির মধ্যে নিয়তি আত্মগোপন করিয়া আমাদের সকল বাস্তববোধ ও বিশ্বাসকে ভাঙিয়া চুরিয়া, তাহার ইচ্ছামতো চালিত করিতেছে। অন্যথায় আমিই বা কেন এমন আত্মবিস্মৃত হইব। অতঃপরেও এই অবিশ্বাসীর কাছে তুমি কি নিজেকে সমর্পণ করিতে পারিবে।

শিবানী নির্দ্বিধায় বলিয়াছে, ভাবিয়া দেখিলে আপনার চিন্তার সঙ্গে কোনও প্রভেদ দেখিতেছি না। বাল্যে তো কত স্বপ্নই এই জীবনকে লইয়া দেখিয়াছি। সমস্তই মিথ্যা হইয়াছে। তবে তাহার জন্য আমি ঈশ্বরকে দোষ দিব না। ঈশ্বর আছেন, তিনিই আমার ভাগ্য চালিত করিতেছেন। ঈশ্বর না থাকিলে, আপনাকেই বা কেমন করিয়া পাইতাম। ইহাকে আমি মঙ্গলজনক বলিয়া মনে করি। ঈশ্বর যদি ইহাতে রোষ করেন, তাহা মাথা পাতিয়া লইব। আপনি আমাকে গ্রহণ করুন।

আমার চোখের সামনে ইন্দুমতী ও লক্ষণার মুখ ভাসিয়া উঠিয়াছিল। হারাইতেও বিলম্ব হয় নাই। ইহাও স্বীকার করিতে হইবে, শিবানীর প্রতি আমার আকাঙ্ক্ষা জন্মিয়াছিল। কিন্তু তর্কতীর্থ মহাশয় দুই মাসের মধ্যেই অসুস্থ হইয়া পড়িলেন। তাঁহার দৃষ্টি ছিল স্বচ্ছ। সম্ভবত তিনি আমার প্রতি কন্যার আচরণ দেখিয়া মনোভাব বুঝিয়াছিলেন। আমাকে প্রায়ই রোগশয্যায় ডাকিয়া কাঁদিয়া বলিতেন, তোমাকে আমি দাস রূপে দেখি না। তুমি বিদ্বান বিচক্ষণ বুদ্ধিমান। বিপদে আপদে আমার কন্যাটিকে রক্ষা করিও।

আমি ভাবিতাম, ঠোঁটের কোণে হাসিয়া নিয়তি আবার কোন দৈবের দিকে আমাকে টানিয়া লইয়া চলিয়াছে। নিয়তির সঙ্গে আমার মীমাংসা হইবে না। হইবার নহে, অতএব ভবিষ্যৎ জীবন-জিজ্ঞাসা আমার মধ্যে নিরন্তর আবর্তিত হইতেছে। যে জীবন আমার নহে, তাহার মধ্যেই সে আমাকে ঠেলিয়া দিতেছে। এমন ক্রীড়নকের জীবন কীরূপেই বা অতিবাহিত করিব।

তিন মাসের মধ্যে তর্কতীর্থ মহাশয় গত হইলেন। খবর পাইয়া শিবানীর দিদিরা ও ভগ্নিপতিরা। আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আমি তাঁহাদের নিকট দাসের মতো ব্যবহার করিলাম। গৃহের অন্যান্য দাসীভৃত্যের সামনেও, যথাসাধ্য দাসের মতো আচরণ করিতাম। ব্যতিক্রম ছিল, শিবানীর বাগদি বালিকা-দাসীটি। সে বিবাহিতা, স্বামী পরিত্যক্তা, শিবানীর সখীর ন্যায়। তর্কতীর্থ মহাশয়ের শ্রাদ্ধাদি হইল। গ্রামের ব্রাহ্মণ প্রধানদের ডাকিয়া, নিজ নিজ পিতৃসম্পত্তি বুঝিয়া লইল। তর্কতীর্থ মহাশয় তাহার দানপত্রে পূর্বেই তিন কন্যার প্রাপ্তি লিখিয়া রাখিয়াছিলেন। অতএব, কোনও প্রকার বিবাদ উপস্থিত হয় নাই। তাঁহারা বিদায় লইলে, শিবানীর আত্মপ্রকাশ ত্বরান্বিত হইল। সে গর্ভবতী হইল। গ্রামে বাস করা আর সম্ভব ছিল না।

তর্কতীর্থ মহাশয়ের শুভানুধ্যায়ী যাঁহারা ছিলেন, শিবানী তাঁহাদের ডাকিয়া জানাইল, এই গ্রামের সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় করিবে। তাহার প্রাপ্ত পৈতৃক সম্পত্তি, নদিয়ার ভদ্রাসনে গিয়া বাস করিবে। তাহারা সম্মতি দিলেন। গ্রামের অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরাই সমস্ত সম্পত্তি ক্রয় করিলেন। আমি ক্রীতদাস, অতএব ত্যাগের প্রশ্ন নাই। কেবল বাগদি দাসীটিকে সে সঙ্গে লইল।

.

শিবানী বুদ্ধিমতী, দূরদৃষ্টিসম্পন্না, তেজস্বিনী। নিতান্ত ভোগ বাসনায় সে আমাকে আশ্রয় করে নাই। সে বাঁচিতে চাহিয়াছে, এবং পূর্ণ রমণী হইয়া বাঁচিতে চাহিয়াছে। সে স্বেচ্ছাচারিণী নহে, কিন্তু সকল শাস্ত্রের উর্ধ্বে জীবনকে প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিয়াছে। কিন্তু আমি তো প্রতিষ্ঠা চাহি নাই। আমি কদাপি। আমার পরিচয় তাহাকে দিই নাই। আমাকে আত্মবিস্মৃত জানিয়াই সে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করিয়াছে। তাহার একটি পুত্রসন্তান হইয়াছে। সে আমাকে তাহার স্বামীর পরিচয় দিয়াছে এবং পৈতৃক সম্পত্তি ভোগ করিতেছে।

দেখিলাম সে বিধবা হইয়াও আমার সংসর্গ করিল। পুত্র জন্ম দিল। পূর্ণ সংসার পরিচালনা করিতে লাগিল। সে বলিল, আমি দ্বিচারিণী নহি। তুমিই আমার স্বামী এবং প্রথম ও শেষ পুরুষ। দয়া করিয়া আমাকে স্বৈরিণী ভাবিও না।

শিবানীর প্রতি আমার কোনও অবিশ্বাস ছিল না। কিন্তু নিয়তি নির্দেশের ক্রোধ আর আমার মধ্যে নাই। নিয়তি পরাস্ত হইল, কি আমি পরাস্ত হইলাম, জানি না। ঘৃণা আমার মনকে বিষাক্ত করিতেছে না। ক্রমে সমগ্র জীবনের মধ্যে আমার একটি উপলব্ধি জন্মিল, জন্মসূত্রেই মানুষ অসহায়। সে তাহার জীবনের নিয়ামক হইতে পারে না, জন্ম-মৃত্যুর মাঝখানে সে একান্তে পরাধীন। এই পরাধীনতার বোধ সমস্ত মানুষকে নিরন্তর অস্থির করিতেছে, নানা রূপে দংশন করিতেছে এবং সে গভীর জ্বালায় এই পরাধীনতার হাত হইতে মুক্তির উপায় খুঁজিতেছে। এই মুক্তির ক্রন্দনও জন্মমাত্র সূতিকাগারে নবজাতকের প্রথম কান্নায় ধ্বনিত হইয়া ওঠে।

এই পরাধীনতা আত্মিক, মুক্তির জন্য সংগ্রামও আত্মিক। এই মুক্তির সন্ধানই মানুষের চিরকালীন প্রবৃত্তি। ইহা মানবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু শিবানীর সঙ্গে সুখের গৃহবাসে, এই আত্মিক মুক্তির পথের সন্ধান পাইব না। তাহাকে আমি স্পষ্ট বলিলাম, আমি বিদায় চাই, তুমি বাধা দিও না।

শিবানী কাঁদিল, কিন্তু আমাকে বাধা দিল না। কেবল বলিল, তুমি কে, তাহা এক প্রকার জানিয়াছি, প্রকৃত জানি না। তুমি কীসের অন্বেষণে ফিরিতেছ, তাহাও আমার বোধগম্য নহে। আমি চিরদিন তোমার পথ চাহিয়া থাকিব, তোমার সন্তানকে তোমার মতো মানুষ করিবার চেষ্টা করিব। ইচ্ছা হইলে ফিরিয়া আসিও।

শিবানী একান্ত মানবী, তাহার শক্তিতে আমার গভীর বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা রহিয়াছে। তাহাকে বলিলাম, যাইবার আগে আমি আমার জীবনবৃত্তান্ত কিছু লিখিয়া যাইব..

.

তাপস অতি মগ্নাবস্থায়ও সহসা চমকে উঠল। ওর সামনে মোমবাতি জ্বলছে। এখনও পাণ্ডুলিপির শেষ কয়েকটি পক্তি অনুবাদ বাকি রয়েছে। কিন্তু সহসা একটা আলোর ঝিলিক গঙ্গার জলে দেখতে পেল। সেই আলোর ঝিলিক ঘরের পাল্লাবিহীন দরজার গায়ে পড়ল। কাদায় পায়ের শব্দ ও স্খলিত অস্পষ্ট গলার স্বর হঠাৎ শোনা গেল। কাদায় পায়ের শব্দ ক্রমেই এগিয়ে আসছে।

কে, বা কারা আসতে পারে? পুলিশ? অলক কল্যাণরা? তাপসের চোখের সামনে পয়েন্ট থ্রি এইট ভেসে উঠল। ও দ্রুত কাগজপত্র ব্যাগের মধ্যে ভরে নিল। ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দিল। কাদার ওপর পায়ের শব্দ আরও কাছে এগিয়ে আসছে। টর্চের আলোর ঝিলিক আবার দরজার কাছে ছোবল দিয়ে গেল।

তাপস মুহূর্তেই ব্যাগের মধ্যে সমস্ত কিছু ঢুকিয়ে নিয়ে, ব্যাগ হাতে উঠে দাঁড়াল। পার্টি বা পুলিশ, দুই-ই তার কাছে এখন নিয়তির রূপ নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পার্টির বর্তমান নীতি ও পুলিশের কাছে ও আত্মসমর্পণ করতে পারবে না। ভবিষ্যৎ সংগ্রামের জন্য ওকে বেঁচে থাকতে হবে। ও দরজার দিকে এগিয়ে গেল। গঙ্গার ভাঙা ঘাটের দিকে মাথা নিচু করে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগল।

পায়ের শব্দ গঙ্গাযাত্রীর ঘরের কাছে এগিয়ে আসছে। টর্চের আলোর ঝিলিক সাপের ছোবলের মতো ইতস্তত ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাপস অকুরের ঘুমভাঙা ঘড়ঘড়ে স্বর শুনতে পেল, কে?

তাপস ভাটা পড়া গঙ্গার নীচে নেমে, মাথা নিচু করে দ্রুত এগিয়ে গেল। পিছনে নানা স্বর ও পায়ের শব্দ ভেসে আসছে।