উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

৩. ব্যবস্থা ভালই

অকুর ব্যবস্থা ভালই করেছে। দু দিন কেটে গিয়েছে। অকুর রাত্রে রান্না করে, তাপসের জন্য দুপুরের ভাতও জল দিয়ে রেখে দেয়। ভোরবেলা বেরিয়ে যায়। তাপস কুটোকাটি জ্বেলে চা তৈরি করে নেয়। দিবানিদ্রার কোনও প্রশ্নই নেই। ও যেন স্থান কাল ভুলে গিয়েছে। ডুবে গিয়েছে পাণ্ডুলিপির মধ্যে। অকুর। ফিরে এসে, রান্না খাওয়ার পরে তাপস মোমবাতি জ্বেলে রাত্রেও অনুবাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ওর মনের মধ্যেও একটা উত্তেজনা যা ওর ঘুম পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছে। যখন নিতান্ত শরীর এলিয়ে পড়ে, তখন একটু ঘুমিয়ে নেয়। বিশেষ করে মধ্য রাত্রের পরে ঘুমিয়ে শেষ রাত্রে জেগে ওঠে তখন পাণ্ডুলিপির লেখক। বৈদূর্যকান্তির অস্তিত্ব যেন ওর কাছে বাস্তব হয়ে ওঠে। শুধু মানুষটিকেই যে দেখতে পায়, তা না। তার মনের গভীরে যেন ও ডুবে যায় এবং নিজের জীবনের সঙ্গে কেমন একটা একাকার বোধ জন্মায়।

শেষ রাত্রের প্রচ্ছন্ন আলো, আকাশের বুকে ক্রমে হারিয়ে যাওয়া অবশিষ্ট কয়েকটি তারা, পাখির। ডাক, গঙ্গার ছলছলানি, এ সবের মধ্যে সেই কাল ফিরে আসে। পাণ্ডুলিপির ঘটনার আবিষ্টতা কাটিয়ে উঠতে পারে না। প্রাতঃকৃত্যাদি, অন্ধকার থাকতে থাকতেই স্নান করে নেওয়া, এ সমস্তই যেন একটা ঘোরের মধ্যে ঘটে। বৈদূর্যকান্তি ওর মস্তিষ্কের কোষে কোষে এমনভাবে বিদ্ধ হয়ে আছেন, যেন তিনি তাপসের মধ্যে একটি অলৌকিক অস্তিত্বের মতো বিরাজ করছেন। যে কারণে স্থান কাল কোনও কিছুই আর ওকে স্পর্শ করছে না। পাণ্ডুলিপির অনুবাদের মধ্যেই ওর সহজ বিচরণ চলছে।…

রাত্রি পোহাইল। সারা রাত্র গভীর নিদ্রায় যাপন করিয়াছি, এমন বলা যায় না। নিধনের ভয় আর ছিল না। ভবতারণ খুড়া বা শ্যামকান্তি সে সংকল্প ত্যাগ করিয়াছিল। তথাপি আমার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল না। নাটুকে বিশ্বাস ছিল। তা ছাড়া দুযাকে আমি নিজে সারা রাত্রি জাগিয়ে আমার কাছে থাকিতে বলিয়াছিলাম। সে অন্যথা করে নাই, আমার নির্দেশের ইঙ্গিত সে বুঝিতে পারিয়াছিল। সে এখনও আমার পূর্ণ বশে আছে। তাহার চিত্ত পরিবর্তনের কোনও কারণও ছিল না। অন্য দুই পাইক এবং পরমেশ ভট্টাচার্য সারা রাত্রি জাগিয়াই কাটাইয়াছে।

আমি বাঁচিয়া উঠিলাম, কিন্তু নিদ্রা হয় তো আমাকে চিরকালের জন্য ত্যাগ করিতে উদ্যত হইয়াছে। নিদ্ৰা আসিয়াছে, আবার ভাঙিয়াছে। আর তাকাইয়া দেখিয়াছি। আমার অদূরে একটি প্রদীপ জ্বলিতেছে। দু এবং দুই পাইক নড়িয়া চড়িয়া বসিয়াছে। অন্যান্যরা আমার শিয়রের দিকে দক্ষিণে নিদ্রা যাইতেছিল। আমার পক্ষে দেখা সম্ভব ছিল না। নিদ্রা আসিয়া আমাকে গ্রাস করিতেছিল। উহা নিদ্রার ঘোর মাত্র। কেবলই গৃহের স্বপ্ন দেখিতেছিলাম। আর নিদ্রা ভাঙিয়া যাইতেছিল। কখনও স্বপ্নের মধ্যে দেখিতেছিলাম, চুম্বকীর সঙ্গে পাশা খেলিতেছি। চুম্বকী তাহার প্রকৃত নাম নহে। প্রকৃত নাম ইন্দুমতী। আমার চৌদ্দ বছর বয়সে তার সঙ্গে আমার বিবাহ হইয়াছিল। সে আমার প্রথম স্ত্রী নহে৷ এগারো বছর বয়সেই আমার প্রথম বিবাহ দেওয়া হইয়াছিল। বারো বছর বয়সে আবার একটি। কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয়ার সঙ্গে আমার কখনও সংসার করা হইয়া ওঠেনাই। প্রথমা বিবাহের পরে পিত্রালয়ে গিয়া বিসূচিকা রোগে মারা গিয়াছিল। দ্বিতীয়া পিত্রালয়ে যাইবার পরে, তাহাকে আর কখনই আনা হয় নাই। কেন আনা হয় নাই, আমি জিজ্ঞাসা করি নাই। কারণ আমার জিজ্ঞাসা করিবার বয়স বা অবকাশ কোনওটাই তখন হয় নাই। চৌদ্দ বছর বয়সে আবার বিবাহ। এই তিনটি বিবাহ পিতামহ দিয়াছিলেন। একমাত্র সেই সময়েই আমি জানিতে পারি, দ্বিতীয়া পত্নীকে না আনার কারণ ছিল, তাহাদের পরিবারের একটি কলঙ্কিত ঘটনা।

এখন আমার কাছে তাহা আর কলঙ্কিত বলিয়া মনে হয় না। পিতামহের মুখে শুনিয়াছিলাম, দ্বিতীয়া পত্নীর মা তাহার বড় জামাইয়ের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হইয়াছিল। সেই ব্যভিচারের কথা প্রচার হইয়া গিয়াছিল। ইহাতে আমার দ্বিতীয়া পত্নীর কোনও দোষ থাকিতে পারে বলিয়া মনে করি না। পিতারও থাকিতে পারে বলিয়া মনে করি না। এ সব বর্তমানের মনের কথা। তখন এইরকম ভাবি নাই। চৌদ্দ বছর বয়সে মুরশিদাবাদ হইতে ফিরিয়া আসিবার পরে ইন্দুমতীর সঙ্গে আমার বিবাহ হইয়াছিল। সে আমার অপেক্ষা ছ বছরের ছোট ছিল। আমরা কুলীন ছিলাম। কুলচন্দ্রিকার ব্যাখ্যা বর্ণনা করিয়া এখন আর সপ্তশতী মেলবন্ধন ইত্যাদি বিষয় ছাইভস্ম বলিয়া মনে হয়। উহার বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখি না। অতঃপর ত্রিশ বছর বয়সে, আবার একটি বিবাহ করিয়াছিলাম। কুলীন কন্যাটির বয়স তখন তেরো হইয়াছিল। নাম লক্ষণা। এই বিবাহ দিয়াছিলেন আমার পিতা। আমার মায়েরও বিশেষ ইচ্ছা ছিল। সত্য। কথা, লক্ষণাকে বিবাহ করিতে আমারও অসম্মতি ছিল না। বিবাহের মাত্র কয়েক মাস আগে, তাহাকে এক বার দেখিবার সুযোগ হইয়াছিল। বাবা তখন মুরশিদাবাদে নায়েবি সুবাদার সরকারের কাজ সম্পূর্ণ ত্যাগ করিয়া, আমার উপর দিয়াছিলেন। নিজে বংশবাটি রাজবাড়ির সেরেস্তায় কাজ করিতেছিলেন। আমাকে কখনও কখনও বংশবাটিতে পিতার কাছে যাইতে হইত। সেরেস্তারই এক কর্মচারী বন্ধুবিহারী চট্টোপাধ্যায় পিতার বিশেষ প্রীতিভাজন বন্ধু স্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বংশবাটিরও বাসিন্দা ছিলেন। আমার পিতা এবং চট্টোপাধ্যায় উভয়েই ন্যায় সাংখ্য তন্ত্র ইত্যাদি লইয়া অবসর সময়ে চর্চা করিতেন। শুনিয়াছিলাম, বন্ধুবিহারী শুদ্ধ শ্রোত্রিয় বংশের সন্তান ছিলেন। ত্রিবেণীর জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের চতুম্পাঠীতে আমি সাত বছর বয়সে সংস্কৃত পাঠ করিতে আসিয়াছিলাম। সরাসরি তাঁহার নিকট আমার সংস্কৃত শিক্ষা হয় নাই। তাহার পৌত্র ঘনশ্যামের কাছে সংস্কৃত শিক্ষা করিয়াছি। কিন্তু সেই মহাপণ্ডিতকে আমি অনেক বারই দেখিয়াছি। শুনিয়াছিলাম এই বংশের সঙ্গে বন্ধুবিহারী চট্টোপাধ্যায়ের বংশের সম্পর্ক ছিল। খনের চাটুয্যের সঙ্গে কী রূপে এই পালধি কাশ্যপ গোত্রীয়দের বংশগত সম্পর্ক থাকিতে পারে, তাহা আমার জানা ছিল না। কিন্তু জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের বংশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। ইহা আমার মনে বিশেষ একটি ক্রিয়া করিয়াছিল। তাহা ছাড়া, বিবাহের কয়েক মাস আগে, একদিন দুপুরে খাওয়ার নিমন্ত্রণ পাইয়া, পিতার সহিত আমি বন্ধুবিহারী চট্টোর বাড়ি গিয়াছিলাম। তখন আমি লক্ষণাকে দুই-এক মুহূর্তের জন্য দেখিয়াছিলাম। সুন্দরীকে দেখিয়া উদ্ভিন্নযৌবনা মনে হইয়াছিল। ভাবিয়াছিলাম বিবাহিতা। দুই মুহূর্তের দেখায়, সে সধবা কি কুমারী, বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। বাড়ির ভিতর যাইবার সময় সহসা সে আমার সামনে পড়িয়া গিয়াছিল। সেই কয়েক মুহূর্ত। তারপরেই লক্ষণা দৌড়িয়া ঘরের মধ্যে অদৃশ্য হইয়াছিল।

ইন্দুমতীকে যখন বিবাহ করিয়াছিলাম, তখন তাহার বয়স আট। আমার পিতামহের রুচিকে প্রশংসা করিতেই হইবে। কেবল ফুলিয়া মেলের ভরদ্বাজ গোত্রীয় বংশের কুলীন কন্যা নহে, ইন্দুমতী দেখিতেও অতি রূপসী ছিল। তপ্তকাঞ্চনবর্ণা, বিশালাক্ষী, অনধিক উন্নত নাসা, বিম্বোষ্ঠা। আমার স্পষ্ট মনে আছে, মা যখন ইন্দুমতীকে বরণ করিয়া কোলে তুলিয়া লইয়াছিলেন, তখন বলিয়া উঠিয়াছিলেন, রূপ দেখিয়া ভয় লাগে। ঈশ্বর ইহাকে যেন সুমতি দেন, রূপের অহংকার যেন না জন্মায়, তাহা হইলে সংসারের মঙ্গল হইবে না। মা কেন এ কথা বলিয়াছিলেন, পরে বুঝিতে পারিয়াছিলাম। রূপসীদের রূপের অহংকার থাকিলে, সে নিজেকে লইয়া মত্ত থাকে। সংসারের ও গুরুজনদের প্রতি অবজ্ঞা জন্মায়, স্বামীকে বশে রাখিয়া স্বেচ্ছাচারিণী হয়। ইহা অভিজ্ঞতার ফল। কিন্তু ইন্দুমতীর সে অহংকার ছিল না। সর্ব সুলক্ষণা বলিতে যাহা বুঝায়, ক্রমে তাহার মধ্যে তাহাই বিকশিত হইয়াছিল। আমার গর্ভধারিণী তাহাকে নিজের মনের মত করিয়া গড়িয়া তুলিয়াছিলেন।

চৌদ্দ বৎসর বয়সে ইন্দুমতীকে দেখিয়া আমিও মুগ্ধ হইয়াছিলাম। কিন্তু সে তখন বালিকা মাত্র। আমার প্রথম যৌবনের বিকাশ ঘটিয়াছিল। মুরশিদাবাদ, কাশিমবাজার ও সৈদাবাদে যাতায়াত করিয়া, নরনারীর মিলন সম্পর্কে আমার কিছু অভিজ্ঞতা জন্মিয়াছিল। সে অভিজ্ঞতা আদৌ সুখের ও সুস্থ ছিল না। পিতামহ বা পিতার মুখে যে মুরশিদাবাদের কথা শুনিয়াছি, আমার সময়ে তাহার অনেক পরিবর্তন হইয়াছিল। সুবাদার অর্থাৎ নবাব তখন ইংরেজের বেতনভোগী নায়েব সুবাদার। তাহাদের আত্মীয়বর্গ পরিবারগুলির, আমার সমবয়সি যে সব সন্তানের সঙ্গে পরিচয় হইয়াছিল, তাহারা সকলেই ছিল সুরা ও কামাসক্ত। বারাঙ্গনার অভাব ছিল না। লেখাপড়ায় বা শরীর চর্চায় তাহাদের উৎসাহ ছিল না। অথচ তাহাদের অনেকের সঙ্গেই আমার মেলামেশা ছিল। তাহারা এত দূর অধঃপতিত ছিল, বয়সে বড় বারাঙ্গনাদের গৃহে আনিয়া তাহাদের সংসর্গ করিত।

পিতামহ এ সবই জানিতেন। আমাকে স্পষ্ট করিয়া সব বলিয়া সাবধান করিয়া দিয়াছিলেন। তাহার প্রয়োজন ছিল না। কারণ আমার কখনও সেইরূপ প্রবৃত্তি হইত না। কিন্তু নবাব পরিবারের সেই সব সন্তানেরা ছিল অত্যন্ত নির্লজ্জ। আমার চোখের সামনে তাহারা বারাঙ্গনাদের সঙ্গে, নগ্ন উল্লসিত পশুর ন্যায় আচরণ করিত। আমাকে প্ররোচিত করিত। চলিয়া আসিতে চাহিলে বাধা দিত। তাহাদের হিন্দু মুসলমান আড়কাঠি ছিল, যাহারা নতুন নতুন গণিকাদের সন্ধান আনিয়া দিত। অবশ্য আড়কাঠিরা বলিত, উহারা গণিকা নহে, গৃহস্থ কন্যা।

উক্ত ঘটনা সমূহ দেখিয়া আমার এক প্রকার বিবমিষার উদ্রেক হইত। কিন্তু কৈশোর ও যৌবন সন্ধিতে, আমার শরীরে ও মনে উহার একটা প্রতিক্রিয়া হইত। প্রবৃত্তি না হইলেও, এই প্রতিক্রিয়া অস্বীকার করা যায় না। আমি নিয়মিত উহাদের পাশবিক লীলাস্থলে উপস্থিত থাকিতাম না। রেজা খার এক দৌহিত্রের সঙ্গে আমার কিঞ্চিৎ বেশি বন্ধুত্ব ছিল। সে-ই আমাকে জোর করিয়া লইয়া যাইত।

ইন্দুমতীকে দেখিয়া আমি মনে মনে নানা কল্পনা করিতাম। কিন্তু বালিকার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ কম হইত। আমাকে প্রায়ই মুরশিদাবাদে যাইতে হইত। ইন্দুমতীও পিত্রালয়ে যাইত। গৃহে থাকিলে সে প্রায় সময়েই মায়ের কাছে থাকিত। রাত্রে সে মায়ের কাছে শয়ন করিত। কিন্তু ক্রমেই সে বুঝিতে আরম্ভ করিয়াছিল, আমি তাহাকে দেখিবার জন্য ব্যাকুল হইতাম। প্রথমে সে লজ্জা পাইয়া মাথার ঘোমটা মুখ অবধি টানিয়া দিয়া পলাইত। কখনও ঘরের মধ্যে আমার সম্মুখে পড়িয়া গেলে, জড়সড় হইয়া পালাইবার পথ খুঁজিত। আমি তাহার হাত ধরিয়া কাছে টানিয়া বুকের কাছে স্পর্শ করিতাম। সে ভীত শশকের মতো ছটফট করিত। আমি হাসিয়া ছাড়িয়া দিতাম। তাহার পায়ের গুলুর গোটামলে ঘুংঘুর ছিল। ছাড়া পাইয়া, ঝমঝম শব্দে দৌড়িয়া পলাইত। ক্রমে সে আমার প্রতি আকৃষ্ট হইতে আরম্ভ করিয়াছিল। আমাকে দেখিলে, ঘোমটা টানিবার আগে, সে হাসিয়া, চোখের দ্যুতিতে বিধাইয়া নাকের নথে ঝিলিক দিয়া ঠোঁটের ভঙ্গি করিয়া পলাইত। ধরা পড়িলে, পলাইবার ভান করিত, সহসা পলাইত না। চুম্বন করিলে শাড়ির আঁচলে ঠোঁট মুছিয়া সলজ্জ ধ্বনি করিত, ছি।

এগারো বছর অতিক্রম করিতেই তাহার রজঃদর্শন হইয়াছিল। তারপরে তাহার সঙ্গে আমার সংসর্গ হইয়াছিল। তখন হইতে তাহাকে আমি চুম্বকী বলিয়া ডাকিতাম। চুম্বক পাথরের স্ত্রীলিঙ্গ হয় না, উহা অয়স্কান্তমণি। তথাপি আমি তাহাকে চুম্বকী বলিয়া ডাকিতাম। সে আমাকে উহার অর্থ জিজ্ঞাসা করিলে, আমি চুম্বকের আকর্ষণী শক্তির কথা বুঝাইয়া দিয়াছিলাম। তেরো বছর বয়সে তাহার প্রথম কন্যা সন্তান হইয়াছিল। সে কন্যার বিবাহ হইয়া গিয়াছে। কন্যার জন্মের পরে একটি পুত্র জন্মিয়া এক বৎসর পরে মারা যায়। তারপরে নাটুর জন্ম হয়। নাটুরও দুইটি বিবাহ দেওয়া হইয়াছে। ইন্দুমতী সুখী ছিল। আমিও সুখী ছিলাম। নাটুর জন্মের পরেও তেইশ বছর বয়সে ইন্দুমতীর আর একটি পুত্র হইয়াছিল। তাহার নাম নীলোজ্জলকান্তি, নীলু বলিয়া ডাকা হয়। তাহার এখন এগারো বছর বয়স। বিবাহের কথাবার্তা শুরু হইয়াছিল, তার মধ্যেই আমার জীবনে দুর্ঘটনা ঘটিয়া গেল।

ইন্দুমতীর যখন চব্বিশ বছর বয়স, আমার তিরিশ। আমি লক্ষণাকে বিবাহ করিয়া আনিলাম। বিবাহের আগেই ইন্দুমতী নাটু এবং নীলুকে লইয়া পিত্রালয়ে চলিয়া গিয়াছিল। লক্ষণাকে বিবাহের প্রস্তাব শুনিবার পর হইতেই, ইন্দুমতীর মুখ শুকাইয়াছিল। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে সে আর সপত্নীর আশঙ্কা করে নাই। মাঝে মাঝে নিজেই ঠাট্টা করিয়া বলিত, আমি আর কত কাল তোমাকে ধরিয়া রাখিব। আমার বয়স হইয়াছে। তুমি এখনও যথেষ্ট সতেজ সবল আছ। আর একটি বিবাহ কর।

জানিতাম ইহা ইন্দুমতীর মনের কথা নহে। সে বয়সের কথা বলিলেও, সন্তানদের জন্মের পরেও তাহাকে উদ্ভিন্নযৌবনা রূপসী বলিয়া বোধ হইত। তাহার রূপে ও স্বাস্থ্যে একটা খরতা ছিল। বয়সে কিঞ্চিৎ নম্রতা আসিলেও, তাহার স্বাস্থ্যে বিস্ময়কর উজ্জ্বল প্রভা ছিল। তাহার তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ নিষ্প্রভ হয় নাই। তাহাকে যুবতীর ন্যায় দেখাইত। সে নিজেও তাহা জানিত। বলিতে কী, এখন চৌত্রিশ বছর বয়সেও তাহাকে বাইশ-চব্বিশ বছরের বেশি মনে হয় না। দাসী নাপিতানীরা তো তাহার রূপ লইয়া কত কথাই বলিত। মা বাঁচিয়া থাকিয়া সংসারের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব করিতেন। অতএব ইন্দুমতী গৃহিণী হইয়া উঠিবার অবকাশ পায় নাই। শাশুড়ির নির্দেশে সংসার করিত, এবং আমার অতি আদরের সোহাগিনী বধূটিই ছিল। আমি তাহার রূপের প্রশংসা করিলে, সে বলিত, ইহা তোমারই সুখ সোহাগের দান। যদি সত্যই আমার রূপ ও স্বাস্থ্য থাকিয়া থাকে, ইহা তোমার সুখেরই কারণে। তোমার সুখই আমার রূপ।

ইন্দুমতী কথা বলিতে শিখিয়াছিল, না শিখিবার কোনও কারণ ছিল না। কিন্তু আমার সুখেই হোক বা তাহার নিজের সুখেই হোক, একমাত্র তাহাতেই, ওইরকম রূপ ও স্বাস্থ্য থাকিতে পারে না। ইহা জন্মসূত্রে পাওয়া। আমার বৈমাত্রেয় ভাই শ্যামকান্তির প্রথমা স্ত্রী ইন্দুমতীর সমবয়স্কা হইয়াও প্রায় প্রৌঢ়া হইয়াছিল। সে সুখী ছিল কি না জানি না। শ্যামকান্তির আরও দুইটি সংসার রহিয়াছে। অর্থাভাব বা সুখাদ্যের অভাব নাই। প্রথমা স্ত্রীর কর্তৃত্বও বেশি। কারণ শ্যামকান্তির মা আমার বিমাতা মারা গিয়াছেন। শ্যামকান্তির স্ত্রীরা সকলেই ইন্দুমতীকে ঈর্ষা করে। সংসার অতি অভিনব স্থান। আমার মাও যে ইন্দুমতীকে ঈর্ষা করিতেন তাহা বুঝা যাইত। এমনকী সম্প্রতি নাটুর দুই পত্নীও শাশুড়ির প্রতি ঈর্ষা পোষণ করে। চৌত্রিশ বছর বয়সের শাশুড়ির প্রতি এগারো বারো বছরের পুত্রবধূরা ঈর্ষা পোষণ করে, ইহা বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু সত্য।

লক্ষণাকে বিবাহ করিবার আগেও অনেক বারই আমার আরও বিবাহের প্রস্তাব আসিয়াছে। ইহা কিছু আশ্চর্যের বিষয় ছিল না। বরং এক স্ত্রী লইয়া সংসার যাপন করিতেছিলাম, হাতেই সকলে বিস্মিত হইত। আমার অপেক্ষা বয়সে বড়, দরিদ্র কুলীনও অনেক বেশি বিবাহ করিত। বৎসরের অধিকাংশ সময় বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন শ্বশুরালয়ে যাপন করিত। বংশবাটিতে লক্ষণাকে না দেখিলে, আবার বিবাহ করিতাম কি না, তাহাতে বিলক্ষণ সন্দেহ ছিল। সে নিতান্ত বালিকা হইলে, কখনই বিবাহ করিতাম না। তেরো বৎসর বয়স বড় কম নহে। কুলীন কন্যা বলিয়াই ওই বয়সে অনুঢ়া থাকা সম্ভব ছিল। কিন্তু বন্ধুবিহারী চট্টোঃ উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িয়াছিলেন। কুলীন সুপাত্রের সন্ধান পাইতেছিলেন না। আমাকে দেখিবার পরে, আমার পিতাকে অনুরোধ করিয়াছিলেন। পিতার কাছ হইতে শুনিয়া মাও ব্যগ্রতা প্রকাশ করিয়াছিলেন। তারপরে আমিও দেখিয়াছিলাম। ইহা আমার কাছে হস্পৰ্শ দোষ মনে না হইলেও, ইন্দুমতীর নিশ্চয়ই মনে হইয়াছিল।

বিবাহের প্রস্তাব শুনিয়া ইন্দুমতীর মুখ শুকাইয়াছিল। সে আমার মুখের দিকে তাকাইয়া দেখিয়াছিল। দৃষ্টিতে সংশয় ও জিজ্ঞাসা ছিল। কিন্তু মুখ ফুটিয়া কিছু জিজ্ঞাসা করে নাই। রাত্রে শয়ন ঘরে শয্যায় সাক্ষাৎ ঘটিলে রমণীর মনের প্রকৃত অবস্থা জানা যায়। যে ইন্দুমতী কোনও অবস্থাতেই আমাকে মিলনে বিমুখ করে নাই, লক্ষণাকে বিবাহের প্রস্তাব শুনিবার পরে, প্রথম দিনই আমার আকাঙ্ক্ষা মিটাইতে তাহার শরীরে অসুস্থতা বোধ হইয়াছিল। অথচ আমার প্রতি অনুরাগ দমন করিতেও পারে নাই। আত্মসমর্পণ করিলেও, আমার স্পর্শ মাত্র যাহার শরীরে রতি রাগের হিল্লোল বহিয়া যাইত, সেই রূপ দেখি নাই। শৃঙ্গারে অঙ্গ সঞ্চালনে অনীহা, নিতান্ত আমার সুখবিধানে, সংসর্গ করিয়াছিল। তেরো বছর ধরিয়া আমার সংসর্গে যাহার সকল লজ্জা ঘুচিয়া গিয়াছিল সেই চুম্বকী এমনকী সম্পূর্ণ বিবস্ত্রা হইতেও কুণ্ঠা দেখাইয়াছিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়াছিল। আমারও দীর্ঘশ্বাস পড়িয়াছিল। তাহার কষ্ট বুঝিতে পারিয়াছিলাম। কথার দ্বারা সান্ত্বনা দিতে চাহি নাই। সোহাগে আদরে ভুলাইতে চাহিয়াছিলাম। সে কাদিয়াছিল। যখন কথা বলিয়াছিলাম, সে হাসিয়াছিল। আমার অন্তরে তাহার স্থান সর্বোচ্চ। সে আমার চুম্বকী, এই কথা শুনিয়া আরও বেশি হাসিয়াছিল। আরও বেশি চোখের জলে ভাসিয়াছিল। বলিয়াছিল, আমার অনেক সৌভাগ্য, বহুকাল তোমাকে একলা লোগ করিয়াছি। অনেকের অনেক হিংসা কুড়াইয়াছি। আর আমাকে কেহ হিংসা করিবে না।

ইহা যে ইন্দুমতীর মনের কথা ছিল না, তাহা সামান্য বালকেও বুঝিতে পারে। হিংসার কথা সে মিথ্যা বলে নাই। ইতিপূর্বে তাহার প্রতি হিংসাবশত আমাদের পরিবারের বা অন্য পরিবারের স্ত্রীলোকেরা কেহ কিছু কটু কথা বলিলে সে আমাকে তাহা বলিয়া হাসিত। স্ত্রীলোকদের সকলেরই স্থির বিশ্বাস ছিল, সে আমাকে বশীকরণ করিয়াছে। এমনকী শ্যামকান্তির প্রথমা পত্নী তাহার কাছে আসিয়া বশীকরণের মন্ত্র ও করণ কারণ জানিবার জন্য বিশেষ অনুরোধ করিত। অনেক কান্নাকাটি করিত। ইন্দুমতী সত্যি কথা বলিয়া তাহার অসহায়তা জানাইলে, অবিশ্বাসে কুপিত ও ক্রুদ্ধ হইত। মুখের উপর বলিত, আমাকে বঞ্চিত করিলে। তোমারও চিরকাল এই রূপ সুখে কাটিবে না। মনে রাখিও, তুমি কুলীনের বউ। কবে একদিন হঠাৎ সপত্নী আসিয়া জুটিবে, তুমিও বলিতে পার না। এ সব কথা আমি ইন্দুমতীর কাছেই শুনিতাম।

ইন্দুমতী আমাকে শ্যামকান্তির প্রথমা পত্নীর সে কথা বলিতেও ভুলে নাই। কেবল তাহার দুঃখ, বশীকরণের বিষয়ে সকলেই তাহাকে ভুল বুঝিয়াছে। সে হাসিয়া বলিয়াছিল, এইবার হয় তো সকলের বিশ্বাস হইবে, আমি বশীকরণ করি নাই। করিয়া থাকিলেও তাহা বজ্র আঁটুনির ফস্কা গেরো ছাড়া কিছু নহে। বেচারি চাপিকে এখন সকলেই নাক কুঁচকাইয়া ঠোঁট বাঁকাইয়া বাক্যযন্ত্রণা দিতেছে। সে আমার কাছে আসিয়া কাঁদিয়া পড়িতেছে। আমি তাহাকে বলিয়াছি, তুই কাদিস কেন। ঈশ্বর তোর আমার সাক্ষী রহিয়াছে। উহাদের কথা কানে নিস না।

চাঁপি দুর স্ত্রী। জল না চলিলেও চাঁপি তাহার প্রিয় দাসী ছিল। শ্যামকান্তির স্ত্রীদের এবং অন্যান্যদের এই রকম বিশ্বাস ছিল, চাঁপিই গোপনে ইন্দুমতীকে বশীকরণের সকল ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিল। কারণ চাপির সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ ছিল। বশীকরণ করিবার জন্য এক শ্রেণীর বিশেষ স্ত্রীলোক ও ওঝা এবং বৈদ্য আছে। তবে এ বিষয়ে, ডাকিনী স্ত্রীলোকেরাই বিশেষ পারদর্শিনী। ওইসব বিদ্যা তাহাদের জানা আছে। চাপির পক্ষে তাহাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা ছিল। অতএব, সকলের বিশ্বাস, ইন্দুমতী তাহার সাহায্যেই বাহির হইতে বশীকরণের বিবিধ ব্যবস্থা করিয়াছিল। আমি জানিতাম, ইন্দুমতী বশীকরণ করাকে পাপ বলিয়া মনে করিত। তাহার বিশ্বাস, উহাতে স্বামীর অমঙ্গল ছাড়া মঙ্গল হয় না। সংসারেরও অমঙ্গল হইয়া থাকে।

কুলীনের ঘরে ঘরে নানা রকমের বশীকরণ করার নানা উপায়ের কথা আমিও শুনিয়াছি। সতীন শাশুড়ি ননদ, সবাইকেই বশীকরণের নানা প্রকরণের কথা শুনিলে, অবাক হইতে হয়। কখনও কখনও তাহা বীভৎস ডাইনি বিদ্যা বলিয়া মনে হইত। মড়ার খুলি, পাঁজরার হাড়, তন্ত্রের ভৈরবী চক্রের শুক্র শোণিত মিশ্রিত সিদ্ধবস্ত্র সিন্দুর ফুল, ইত্যাদি। ইহা তান্ত্রিকদের কাছেই পাওয়া সম্ভব ছিল। ডাইনি ওঝা বৈদ্যরাই এ সব তাহাদের সংগ্রহে রাখিত। আরও শুনিয়াছি, শ্মশানের ক্ষীরা (শসাঃ) কবর লিছাতি, (কবরের ওপর বিছানোকাপড়) কালো গোরুর গাঁজ, সাপের গায়ের এঁটুলি, জলো জোঁক, সাদা কাকের রক্ত। এই রকম আরও নানা কিছু বশীকরণের কাজে লাগিত। আমি নিজে ইন্দুমতীকে সে সব কথা বলিলে ইন্দুমতী হাসিয়া বলিত, তুমি শুনিয়াছ আমি স্বচক্ষে দেখিয়াছি। তোমার ভাইয়ের বউদের কাছেই দেখিয়াছি।

লক্ষ্মণার সঙ্গে বিবাহের দিন স্থির হইবার পরে ইন্দুমতী কয়েক দিন বাড়িতে ছিল। সে স্বাভাবিকভাবেই সংসারের নিত্য কাজ করিয়াছে। সকলের সঙ্গে হাসিয়া কথা বলিয়াছে। কিন্তু আমার সঙ্গে যখন রাত্রে শয়ন ঘরে তাহার সঙ্গে সাক্ষাৎ হইত, তখন তাহার পরিবর্তন লক্ষ করিতাম। তাহার সেই সুখ সোহাগ ঘূর্তি কিছুই ছিল না। আমি চাহিলে নিতান্ত সংসর্গ করিতে হয়, তাই করিত। এমন নহে যে কাঁদিয়াকাটিয়া অনর্থ করিত। তাহার মুখের ঔজ্জ্বল্য ছিল না, চোখের কোলে কালি। পড়িয়াছিল, কিছুটা নির্বিকার অন্যমনস্ক থাকিত। আমি সান্ত্বনার কথা বলিলে হাসিত, বলিত, তোমার কথা শুনিয়া হাসি পায়। যাহা অনেক আগেই ঘটিবার কথা, তাহা পরে ঘটিতে যাইতেছে। সংসারে যাহা প্রতি দিন ঘটিতেছে, তাহার বিষয়ে বলিবার কী আছে। আমি তোমাকে সুখী দেখিতে চাহি। ইহার অধিক কিছু চাহি না। বহুকাল একলা ভোগ করিয়া আমার অভ্যাস খারাপ হইয়া গিয়াছে। তাহাতে হয়তো মনটা একটু খারাপ হইয়াছে। কিন্তু সংসারে যাহা সত্য, তাহাকে মানিয়া লইতেই হয়। ভবিতব্য। কেহ খণ্ডাইতে পারে না। আমাকে কেহ হিংসা করিয়া শাপ দিয়াছে, তাহা বিশ্বাস করি না। এই গোটা গ্রামে আমার মতো সৌভাগ্যবতী কে আছে। আমি এখনও তাহা বিশ্বাস করি। তোমার কাছে আমার কিছুই গোপন করিবার নাই। এখন আমার যে অবস্থা দেখিতেছ, তাহার জন্য আমারও খারাপ লাগিতেছে। তুমি দুঃখ পাইতেছ। তুমি আমার অপেক্ষা সব বিষয়ে জ্ঞানী ও গুণী। সব বুঝিয়া আমাকে ক্ষমা করিও। মন হইতে ত্যাগ করিও না, এই ভিক্ষা চাই। তাহা হইলে জীবন্তে মরিব।

ইন্দুমতীর প্রতিটি কথাই সত্য। সে মিথ্যা বলে নাই, বরং সংসারের অভিজ্ঞতালব্ধ বাস্তবসম্মত কথা। বলিয়াছিল। কেবল তাহার অভিমানের কথা বলে নাই। কষ্টের কথা বলিয়াছিল। কিন্তু লক্ষণার সঙ্গে বিবাহের দিন স্থির হইবার পরে, সে আর এক দিনও আমার সঙ্গে পাশা খেলিতে বসে নাই। বিবাহের আগে পিত্রালয়ে সে গৃহে ভগ্নি ও ভ্রাতৃবধূদের কাছে সামান্য পাশাখেলা শিখিয়াছিল। আমি তাহাকে ভাল করিয়া শিখাইয়াছিলাম। এক বার শিখিলে ইহাতে কৌশলের বিষয় কিছু নাই। সবই দানের (চালের) উপর নির্ভর করে। দানের উপর কাহারও হাত থাকে না। উহা ভাগ্যের বিষয়। বাইরে অন্যান্যদের সঙ্গে চৌপড় (চারজনের) চলিত। ইন্দুমতীর সঙ্গে রং (দুজনের)। খেলার মধ্যে কৌশলের বিষয় কিছু না থাকিলেও ইন্দুমতীর ভাগ্য সর্বদা আমার অপেক্ষা ভাল ছিল। সেজন্য তাহাকে আমি ঠাট্টা করিয়া নর্দবাজীনী (নর্দবাজ ভাগ্যবান ভাল খেলোয়াড়) বলিতাম। ঘরে খেলিবার জন্য দুইটি ছক ছিল। একটি মোটা তসরের উপর রেশমের রং করা সুতায় তৈরি। অন্যটি ইন্দুমতী নিজে কাপড়ের উপর রঙিন সুতা ও সূঁচ দিয়া তৈরি করিয়াছিল। সাধারণে যে রূপ কথার মতো তৈরি করিত, ইন্দুমতীর হাতের কাজটি তাহা হইতে অনেক সুন্দর ছিল। যেন কাশ্মীরি শালের উপরে, শালকরের সূক্ষ্ম কাজের মতো তাহার ছকটি দেখিতে ছিল। তসর রেশমের ছকটি পিতামহ আমাকে দিয়াছিলেন, সেই সঙ্গে হাতির দাঁতের তিনটি শারি (দান চালবার তিনটি খুঁটি)। ইহা ছাড়া, হাতির হাড়েরও শারি ছিল। ছকের খুঁটিও ছিল দুই রকমের। বয়রার আর কাঠের। বয়রার খুঁটিগুলিও পিতামহের দান ছিল।

ইন্দুমতী যখন গজদন্তের শারিগুলি দুই হাতের মধ্যে লইয়া শব্দ করিয়া নাড়াচাড়া করিত, তখন আমার চোখে চোখ রাখিত। তাম্বুল রঞ্জিত ঠোঁটে যেন রহস্যের হাসি ফুটিত। সর্বক্ষণের জন্য নথ নাকে থাকিত না। নোলক ও নাকফুল (নাকচাবি) দুইটি তাহার নাসারন্ধ্রের সঙ্গে কাপিত। ঠোঁট নাড়িয়া কিছু বলিত। যেন দান দিবার আগে সে মন্ত্র পড়িয়া আমাকে সম্মোহিত করিত। তারপরে সহসা সসে পাঞ্জা দো এক ছয়ে দরজা খুল বলিয়া ধ্বনি করিয়া ঝটিতি শারি চালিয়া দিত। আমি তাকিয়া ফেলিয়া, মুখের ফরসির নল টানিতে ভুলিয়া, রুদ্ধশ্বাস হইয়া তাহার দানের অপেক্ষা করিতাম, আর বিস্মিত হইয়া দেখিতাম, শারিগুলি যেন তাহার হাতের ক্রীড়নকের মতো দুইটি পাঁচ ও একটি ছয়ে স্থির হইয়া রহিয়াছে। আমি বিস্ময় বিমূঢ় চোখে চুম্বকীর মুখের দিকে তাকাইতাম। তাহার চোখের কালো তারা। দুটিতে ঝিলিক হানিত। সে বাঁ হাতের তর্জনীটি গালে রাখিয়া বিজয়িনীর মতো আমার দিকে দেখিত। পরক্ষণেই খিলখিল করিয়া হাসিয়া লুটাইয়া পড়িত। বসিবার ভঙ্গি বদলাইতে গিয়া তার পায়ের মলে, হাতের চুড়ি ও রুলিতে হাসির শব্দের সঙ্গে ঐক্য রাখিয়া ঝনাৎকারে বাজিয়া উঠিত। সচরাচর আসন্ন বিকালে খেলা হইত তখন চুম্বকীর চুল খোলা থাকিত, আর বুকের স্খলিত আঁচলের সঙ্গে খোলা দীর্ঘ কেশ কাঁধে বুকে লুটাইত। জিজ্ঞাসা করিত, প্রভুর কী হইল।

আমি আবার শারিগুলির দিকে বিমূঢ় বিভ্রান্ত চোখে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিতাম, কী করিয়া এ রকম হইল। ইহা কি শকুনির শারি নাকি। কী মন্ত্রই বা আওড়াইলে। চুম্বকী আমার অবস্থা দেখিয়া ও কথা শুনিয়া, আবার হাসিয়া উঠিত। বলিত, শকুনির শারি হইবে কেন। ইহা তোমারও শারি। মন্ত্র কিছুই আওড়াই নাই, কেবল তোমার ধ্যান করিয়া দান দিয়াছি।

চুম্বকীর কাছে পরাজয়ে আমি সুখী হইতাম। তবে আমার জয়ের ইচ্ছাও প্রবল হইত। কিন্তু অধিকাংশ দিনে আমি পরাজিত হইতাম, আর চুম্বকীর উল্লাস দেখিয়া মনে মনে আমিও উল্লসিত হইতাম। তাহার দিকে চাহিয়া মুগ্ধ হইতাম। ক্রমাগত পরাজয়ের পরে হতাশ হইয়া আমার একমাত্র লক্ষ্য হইয়া উঠিত, চুম্বকীকে কাছে টানিয়া আদর ও সোহাগ করা।

চুম্বকীর দানে উহার হাত সহজেই খুলিয়া যাইত। আসলে সে আমার অপেক্ষা বেশি মনোযাগী ছিল। শারিগুলি লইয়া হাতের মধ্যে নাড়াচাড়া করিবার সময়, সে শারিগুলিকে এমন একটা সংস্থানে আনিত, এমন সাবধানে দান চালিত, তাহাতেই তাহার প্রার্থিত সংখ্যা মিলিয়া যাইত। সর্বদাই যে এরূপ হইত তাহা নহে। সে পরাজিতও হইত। পরাজিত হইলেই তাহার মুখ ভার হইয়া যাইত। এমনকী রাগিয়াও উঠিত। তখন আমার হাসিবার পালা আসিত। আমার হাসি দেখিয়া তাহার চোখে জল আসিয়া পড়িত। তথাপি বলিতেই হইবে, তাহার পাশার হাত ভাল। যে কারণে তাহাকে আমি নর্দবাজীনী বলিতাম। চুম্বকী ‘সসে’ উচ্চারণ করিত পাকা আরবিভাষী জুয়াড়ির মতো। আর আমি প্রায়ই দদূরম্ (জুয়া পুরুষের সিংহাসনহীন রাজ্য) বলিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিতাম। চন্দেল মদ্দেলের (মোগলাই ভাষা) চালের বদলে আমি সংস্কৃত প্রাচীন শব্দও ব্যবহার করিতাম৷ তিয়া দুরা নান্দী পুরা ইত্যাদিকে ত্রেতা পাবর নতি কট বলিয়া থাকিয়া থাকিয়া চিৎকার করিয়া উঠিতাম। আর নর্দাজীনী চুম্বকী আমার খুঁটিগুলিকে গ্রাস করিয়া লইত।

লক্ষণার সঙ্গে আমার বিবাহের দিন স্থির হইয়া যাইবার পরে, ইন্দুমতী পাশা খেলিতে বড় আলস্য বোধ করিত। তাহার শরীর ভাল থাকিত না। জোর করিয়া বসাইলে সে কেবলই হারিত। তারপরে বিবাহের পক্ষকাল আগে সে নীলু ও কোলের বৎসরেক পুত্রটিকে লইয়া পিত্রালয়ে চলিয়া গিয়াছিল। যাইবার পূর্বে হাসিয়া বলিয়াছিল, বহুকাল পরে পিত্রালয়ে যাইবার সুযোগ পাইলাম। কথাটা মিথ্যা বলে নাই, ওর হাসিটি কপট বলিয়া বোধ হইয়াছিল। যাইবার পূর্বে গৃহদেবতাকে এবং গুরুজনদের প্রণাম করিয়া, আমাকে একলা ঘরে প্রণাম করিয়া বিদায় লইতে আসিয়াছিল। বলিয়াছিল, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, শুভ কাজ যেন মঙ্গলমতো হয়। তুমি সুখে থাকিও সুস্থ থাকিও। পিতার বিবাহ পুত্রের দেখিতে নাই। নাটু ও পুত্রবধূ তোমার ভাইয়ের বাড়িতে কয়েক দিন থাকিবে। ফিরিয়া আসিলে উহাদের প্রতি লক্ষ রাখিও। আমাকে এক বছরের আগে এখানে আনিও না।

আমি তাহার সকল কথা মানিয়া লইলেও এক বছরের অঙ্গীকার করিতে পারি নাই। বলিয়াছিলাম, যথাসময়ে তোমাকে আনিবার ব্যবস্থা করিব। এক বছর কিংবা দুই বছর অথবা দুই মাস, তাহা আমি স্থির করিব। প্রণামের পরে তাহাকে আলিঙ্গনে বাঁধিয়া চুম্বন করিয়াছিলাম। সে শিথিল ঠোঁটে প্রতিদান দিয়াছিল। মুখ আরক্ত হইয়াছিল। চেষ্টা করিয়াও চোখের জল রোধ করিতে পারে নাই। কিন্তু যাইবার শেষ মুহূর্তে বলিয়া গিয়াছিল, আবার যখন ফিরিয়া আসিব তখন আর আমাকে চুম্বকী বলিয়া ডাকিও না।

যাইবার পূর্বে ইহাই তাহার শেষ কথা ছিল। আমাকে কিছু বলিবার সুযোগ না দিয়া ঘরের বাহিরে চলিয়া গিয়াছিল।

.

…’পক্ষকাল পরে, লক্ষণাকে বিবাহ করিয়া আনিয়াছিলাম। ইন্দুমতীর শয়ন ঘর বন্ধ ছিল। লক্ষণার জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা হইয়াছিল। ইস্টক নির্মিত ঠাকুর দালানের সংলগ্ন বিপরীত দিকে যে ইস্টক নির্মিত গৃহ ছিল পিতামহ তাহা আমাকে দিয়াছিলেন। উহাতে দরদালান সহ চারটি ঘর ছিল। বাড়ির অন্দরে তাহা ছাড়া চারটি দোচালা ও চারচালা বাংলা ঘর ছিল। সবই শয়ন ও বাসের জন্য। মা নিজে একটি দোচালা বাংলা ঘরে থাকিতেন। নাটুকে পাকা ঘরের একটি দেওয়া হইয়াছিল। বাকি তিনটি আমার ছিল। মা চাহিয়াছিলেন, ইন্দুমতীর ঘরে লক্ষণাকে রাখিবেন আর ইন্দুমতীকে একটি চারচালার ঘরে পাঠাইবেন। আমি মায়ের কাছে আপত্তি প্রকাশ করিয়াছিলাম অবশ্যই লক্ষণার অজ্ঞাতে। পাশাপাশি তিনটি পাকা ঘরের মাঝেরটি খালি রাখিয়া পাশের একটি ঘরে লক্ষ্মণার শয়ন ঘর সাজানো হইয়াছিল।

মা যথেষ্ট আদর করিয়া লক্ষণাকে বরণ করিয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন, আমার বেদোর স্ত্রীভাগ্য ভাল। এই বধূটিও রূপে কিছু কম নহে। বরং ইহার রূপে খরতা নাই, ‘লক্ষ্মীশ্রী’ আছে। তবে যেহেতু লক্ষণার তেরো বছর বয়স হইয়াছিল সেই হেতু মা পূর্বেই একটি প্রায়শ্চিত্ত অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছিলেন। কারণ রজঃদর্শনের পরে লক্ষণার বিবাহ হইয়াছিল। অনুষ্ঠানটিতে পুরোহিতের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু মূলত স্ত্রী-আচার, স্বল্পক্ষণের অনুষ্ঠান ছিল। আমি কাছে না থাকিলেও জানিতাম লক্ষণাকে সেই অনুষ্ঠানে বহুতর অশ্লীল কথাবার্তা বলিয়া ঠাট্টা করা হইয়াছিল। শ্যামকান্তির স্ত্রীরা কালরাত্রিতেই ইন্দুমতীর বিরুদ্ধে লক্ষণাকে নানা কথা বলিয়াছিল। তাহার মনে ঈর্ষা জন্মাইতে চেষ্টা পাইয়াছিল।

আমার সৌভাগ্য বলিতে হইবে, লক্ষ্মণা প্রথম রাত্রেই আমাকে সেই সব কথা বলিয়াছিল। তাহার আচরণে নববধূর সলজ্জ কুণ্ঠা থাকিলেও কথাবার্তায় সহজ ছিল। পিত্রালয়ে সে কিছু ব্যাকরণ, শাস্ত্র ও কাব্য পাঠ করিয়াছিল। মা ঠিকই বলিয়াছিলেন। লক্ষণার রূপে খরতা ছিল না কিন্তু সে দেখিতে সুশ্রী ছিল। তপ্তকাঞ্চনবর্ণা না হোক, সুগৌরী আরক্ত চক্ষু উন্নত নাসা স্বাস্থ্যবতী ছিল। বাইরের প্রকৃতিতে তাহাকে গম্ভীর দেখাইলেও সে ছিল পরিহাসপ্রিয় বুদ্ধিমতী। সে প্রথমেই আমার চরিত্রটি বুঝিয়া লইতে চেষ্টা করিয়াছিল। আমার প্রয়োজন অপ্রয়োজন ভাল মন্দ জানিয়া লইয়াছিল।

শাস্ত্রে কহে স্ত্রীলোককে পূর্ণ বিশ্বাস করিতে নাই। স্ত্রীরা কহে, পুরুষকে বিশ্বাস করিবার কোনও কারণ নাই। উহারা স্বাধীন। শাস্ত্রের কথা সকলই অসার। নরনারী কে কী পরিস্থিতিতে কী রূপ আচরণ করে তাহা সকলই নির্ভর করে তাহার চারিত্রিক গঠনের মধ্যে। লক্ষণাকে আমার ভাল লাগিয়াছিল। তাহার সঙ্গে ভাবের গাঢ়তা জন্মাইতে দেরি হয় নাই। তাহার অহংকার ছিল না লোভ ছিল না, অন্তরটি সরল ছিল। সে অল্প কালের মধ্যেই আমার প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট হইয়াছিল। আমিও তাহার প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছিলাম। উভয়েই পরস্পরকে পাইয়া সুখী হইয়াছিলাম।

প্রথম কয়েক মাস আমি সকল কাজকর্ম ভুলিয়া লক্ষণার সঙ্গলাভের জন্য অতি মাত্রায় ব্যাকুল হইতাম। নতুন প্রেমের মত্ততায়, আমি লোকচক্ষুর কথা ভুলিয়া বালকের ন্যায় ব্যবহার করিতাম। যখন তখন অন্দরে আসিতাম। প্রয়োজন না থাকিলেও লক্ষণা যেখানে থাকিত সেখানে উপস্থিত হইতাম। লক্ষণা লজ্জা পাইত। ঘোমটা টানিয়া মুখ আড়াল করিত। দাসীরা দ্রুত সরিয়া যাইত। লক্ষণাও সরিয়া যাইতে বিলম্ব করিত না। কেবল ঠোঁট টিপিয়া চোখের ইশারা করিয়া যাইত। রাত্রে দেখা হইলে সে আমাকে ওই রূপ করিতে বারণ করিত। কিন্তু সে মনে মনে সুখী হইত। আমি বলিতাম, ইহা আমার দোষ নহে, তোমার। তুমি আমাকে গুণ করিয়াছ।

লক্ষণা আমার কথা শুনিয়া হাসিত। বলিত, আমি গুণ করিতে শিখি নাই। বরং মনে করি তুমিই আমাকে গুণ করিয়াছ। কে কাহাকে গুণ করিয়াছে ইহা লইয়া পরস্পরের মধ্যে নানারূপ বাদানুবাদ হইত। শেষ পর্যন্ত লক্ষণাকে আমি কী রূপ গুণ করিয়াছি তাহার ব্যাখ্যা করিতে গিয়া সে লজ্জায় লাল হইয়া চুপ করিয়া থাকিত। কারণ নিজের অন্তরের ব্যাকুলতার কথা সে ভাঙ্গিয়া বলিতে পারিত না। আমি প্রাণ খুলিয়া তাহার গুণ করিবার নানা রকম ব্যাখ্যা করিতাম। সে সব শুনিতে শুনিতে সে আমার পায়ের উপর মুখ খুঁজিয়া দিত। আমি সেই মুখ তুলিয়া চুম্বন করিতাম। এইভাবেই তাহাকে আমি গুণিনী বলিয়া ডাকিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম।

লক্ষণা মুচকি হাসিয়া বলিয়াছিল, মহাশয়ের ব্যাকরণে ভুল হইতেছে। লিঙ্গ বিচারে চুম্বকী যেমন হয় না, তেমনি গুণবতী কখনও গুণিনীও হয় না। তাহার মুখে চুম্বকী নাম শুনিয়া চমকাইয়া উঠিয়াছিলাম। আমি কাহারও সামনে ইন্দুমতীকে চুম্বকী বলিয়া ডাকিতাম না। অবশ্য এই রূপ ভাবাও ভুল ছিল। কখন কাহার সামনে হয় তো বলিয়াছি, নিজেরই মনে নাই। চাঁপির মুখ হইতেও প্রচার হইয়া থাকিতে পারে। আমাকে চমকাইয়া উঠিতে দেখিয়া লক্ষণা অপ্রস্তুত আড়ষ্ট ও ভীত হইয়া পড়িয়াছিল। তখন আর সে আমাকে আপনি সম্বোধন করিত না। আমিও আপনি সম্বোধন পছন্দ করিতাম না। সে অপরাধীর মতো জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, রাগ করিলে!

আমি তৎক্ষণাৎ হাসিয়া বলিয়াছিলাম, না রাগ করি নাই। তোমার মুখে নামটা শুনিয়া অবাক হইয়াছিলাম। হ্যাঁ, নাটুর মাকে আমি চুম্বকী বলিয়া ডাকি। আর এখন হইতে তোমাকে গুণিনী বলিয়া ডাকিব। তোমার ব্যাকরণ জ্ঞান এখানে কাজে লাগিবে না। ইহা অন্তরের সম্বোধন প্রাণের আকাঙ্ক্ষা। ব্যাকরণ গোল্লায় যাক। লক্ষণা হাসিয়া বলিয়াছিল, ব্যাকরণের কথা নিতান্তই কথার কথা, আদরের ডাক নামে কে কবে ব্যাকরণের কথা ভাবিয়াছে। আমি আজ হইতে তোমার গুণিনী হইলাম। তবে তুমি প্রাণের যে তাগিদে এই নাম রাখিলে, তাহাই যেন বিশ্বাস করিও। এ সৌভাগ্যের গুণ যেন কখনও কু বা কুহক চিন্তা করিও না।

লক্ষণার চিন্তা ভাবনার মধ্যে যথেষ্ট দূরদৃষ্টি প্রকাশ পাইত। ইহা তাহার বয়স ও শিক্ষার ফল। আমি তাহাকে লইয়াও প্রায়ই পাশা খেলিতে বসিতাম। সে ভাল পাশা খেলিতে জানিত না। শিখাইতে চেষ্টা করিতাম। তারপরে সে এক দিন নিজেই বলিয়াছিল, আমি প্রেমারা খেলিতে জানি। শুনিয়া আমি যুগপৎ বিস্মিত ও খুশি হইয়াছিলাম। প্রেমারা (পর্তুগিজদের তাস খেলা) আমি বাহিরে অন্যদের সঙ্গে খেলিতাম। ইন্দুমতীর প্রেমারা ভাল লাগিত না। দুইজনের পক্ষে চল্লিশটি তাস লইয়া খেলারও অসুবিধা ছিল। আমার কাছে প্রেমারার চল্লিশ গোছই ছিল। আঁশ যুক্ত মোটা কাগজের উপর শাটি বস্ত্র দিয়া তৈরি অঙ্কিত প্রেমারার তাস আমাকে মুরশিদাবাদের রেজা খাঁর সম্পর্কে দৌহিত্র ফিরোজ দিয়াছিল।

ইন্দুমতীর পক্ষে প্রেমারার বিবিধ নাম মনে রাখা বিরক্তিকর বোধ হইত। অথচ লক্ষণা সহজেই জাতুর স্রেফ দোস উ কেরোন্তা দিবর ইত্যাদি অনর্গল বলিতে পারিত। দুইজনে খেলিতে গেলে বাকি দুজনকে কল্পনা করিয়া, তাহাদের চাল আমাদের দুইজনকে দিতে হইত। এই খেলার মধ্যে প্রতিটি তাসের হিসাব রাখিতে হইত এবং ভাবিয়া চিন্তা করিয়া প্রেমারা খেলিতে হইত। লক্ষণা খেলায় এত তন্ময় হইয়া যাইত তাহার আর কিছুই মনে থাকিত না। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষণার জয় হইত। জিতিবার পরে সে আমার ভুল গণনাগুলি দেখাইয়া দিত। পাশা বা প্রেমারা যাহাই হউক, জুয়ায় আমি কোনও কালেই জিতিতে পারি নাই। কি বাহিরে, কি ঘরে। ইন্দুমতীর কাছে পাশায় হারিতাম। লক্ষ্মণার কাছে প্রেমারায়।

লক্ষণা জিতিলে ইন্দুমতীর মতো হাসিয়া লুটাইয়া পড়িত না। মুখের সামনে প্রেমারা তুলিয়া চোখ বুলাইত, মিটিমিটি হাসিত। আমার ভুল চাল দেখিলেই সে হতাশাসূচক শব্দ করিয়া উঠিত এবং বলিয়া উঠিত তুমি মোটে হিসাব রাখিয়া খেল না। ইতিপূর্বে কাতুর (সাত ছক্কা পাঞ্জা) খেলিয়াছিলে আমি কেরোন্তা (সাত ছফিরবু অর্থাৎ সাহেব বিবি গোলাম) দিয়া জিতিয়া ছিলাম। তার আগে নিজেই কেরোন্তা এক বার খেলিয়াছিলে। দুই হাত দেখিয়া খেলিতেছ। জানা উচিত ছিল বাকি ফিবরু সবই আমার হাতে রহিয়াছে। এক বার ভাল করিয়া ফরসি টানিয়া লও, আমি তামাকু সাজিয়া দিতেছি। না হইলে তোমার মগজ সাফ হইবে না। বলিয়া হাসিতে হাসিতে পাতাগুরিতে ঝু ঝু শব্দ করিয়া উঠিয়া যাইত। আমাকে তামাকু সাজিয়া দিত। ওই সময়ে তামাকু সাজিবার জন্য অন্য কাহাকেও ডাকা হইত না।

আমি বারে বারে হারিতে থাকিলে, লক্ষণার উৎসাহ নষ্ট হইয়া যাইত। জিজ্ঞাসা করিত, তোমাকে কবে মুরশিদাবাদ যাইতে হইবে। তাহার ধারণা ছিল, আমি কাজের চিন্তায় অন্যমনস্ক হইয়া হারিতাম। তাহা ঠিক নহে, যদিও আমাকে প্রায়ই মুরশিদাবাদ যাইতেই হইত। আমি মুরশিদাবাদ গেলে, লক্ষণার মন খারাপ হইত। সে আমাকে কালিদাসের মেঘদূত হইতে বিরহের শ্লোক পড়িয়া শুনাইত। তাহার আচরণে হাস্য লাস্য চটুলতা সকলই ছিল কিন্তু অতি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করিত না। ইন্দুমতীর মধ্যে অতি উচ্ছ্বাসের আচরণ প্রকাশ পাইত। তাহাতেই উহাকে মানাইত। লক্ষণাকে নিজের আচরণে যথার্থ মানাইত।

মুরশিদাবাদে যাইতে ক্রমেই আমার উৎসাহ কমিয়া আসিতেছিল। লক্ষণার জন্য নহে, কাজের জন্যই ক্রমে মুরশিদাবাদে যাওয়া আমার কাছে বিরক্তিকর বোধ হইত। লক্ষণাকে তাহা বলিতাম। মাঝে মাঝে সে ইন্দুমতীকে আনিবার কথা বলিত। বুঝিতাম সে মনে মনে সন্দেহ করিত আমি ইন্দুমতীর জন্য অন্যমনস্ক থাকি। প্রকৃত পক্ষে তাহা নহে। আমি প্রেমারায় লক্ষণার সঙ্গে যুঝিয়া উঠিতে পারিতাম না। তবে ইন্দুমতীকে ভুলিয়া যাই নাই। প্রায়ই তাহার কথা মনে হইত। একাদিক্রমে তাহার সঙ্গে দীর্ঘকাল কাটাইয়াছি। ফলত, লক্ষণার সঙ্গে তাহার প্রকৃতিগত মিল অমিলের প্রসঙ্গ মনে আসিত। লক্ষণাকে তাহা কখনও বলিতাম না। বরং হাসিয়া বলিতাম, সপত্নী দর্শনের জন্য কোনও স্ত্রীকে এমন ব্যগ্র দেখি না। লক্ষণাও হাসিয়া জবাব দিত, হ্যাঁ আমি ব্যগ্রই বলিতে পার। আজ না হউক কাল, তাহার সঙ্গেই আমাকে সংসার করিতে হইবে। তবে আর বেশি দেরি করিয়া কী লাভ। তোমার কি চুম্বকী দিদি ঠাকরুনকে কাছে পাইতে ইচ্ছা করে না!

লক্ষণার মুখে চুম্বকী দিদিঠাকরুন নাম এবং আমাকে পালটা জিজ্ঞাসা শুনিয়া তাহার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাইতাম। লক্ষণার সঙ্গে এক বছরের মধ্যেই এমন একটি সম্পর্ক গড়িয়া উঠিয়াছিল সহজে তাহাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভব ছিল না। স্পষ্ট জবাব না দিলেও, সে অনেক কথাই বুঝিতে পারিত। সে বুদ্ধিমতী ছিল। বলিতাম, হ্যাঁ চুম্বকীকে দেখিতে ইচ্ছা হয় বইকী। তবে গুণিনী এমন গুণ করিয়া রাখিয়াছে আপাতত চুম্বকীকে না হইলেও চলিবে। লক্ষণা বলিত, আমি এমন গুণিনী হইতে চাহি না। ইহা অনর্থের কথা।

প্রকৃতপক্ষে আমার মনোগত বাসনা ছিল অন্য রকম। আমি সুখ ও স্বস্তি দুইই চাহিয়াছিলাম। সেই জন্য স্থির করিয়া রাখিয়াছিলাম লক্ষণা যখন আমার কাছে থাকিবে, ইন্দুমতী তখন পিত্রালয়ে থাকিবে। ইন্দুমতী কাছে থাকিলে লক্ষণা পিত্রালয়ে থাকিবে। একদিন লক্ষণাকে তাহা স্পষ্ট করিয়াই বলিয়া ফেলিয়াছিলাম। লক্ষণা বিমর্ষ হাসিয়া বলিয়াছিল পত্নীরা সকলেই স্বামীকে চাহে। কুলীনের স্ত্রীরা। অনেকেই সারা জীবন পিত্রালয়ে থাকিয়া যায়। তোমার ক্ষেত্রে সে রূপ হওয়ার কোনও কারণ নাই। তুমি সপত্নী কোন্দলের ভয়ে চুম্বকী দিদি ঠাকরুনের সঙ্গে আমাকে একসঙ্গে সংসার করিতে দিতে চাহিতেছ না। কিন্তু আমার মনে হয়, তোমার ভয় অমূলক। তা ছাড়া এই রকমটি চিরকালের জন্য চলিতে পারে না। আমি দিদির সম্পর্কে যে রূপ শুনিয়াছি তাহাতে আমার মনে কোনও রকম দুশ্চিন্তা নাই।

আমি মনে মনে হাসিয়াছিলাম। আমার ভয় অমূলক, এ রকম বিশ্বাস করিতাম না। তবে ইহা বিশ্বাস করিতাম ইন্দুমতী ও লক্ষণার মধ্যে ঈর্ষা বিরোধ যাহাই থাকুক তাহাকে কখনও সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করিতে দিব না। লক্ষণাকে বলিয়াছিলাম, ভাবিয়া দেখিব। লক্ষণা হাসিয়া বলিয়াছিল, ইহা স্তোক বলিয়া মনে হইতেছে। ভাবিবার কিছু নাই। তোমার গুণিনী চুম্বকীকে গুণ করিবে আর চুম্বকী গুণিনীকে আকর্ষণ করিবে। আমি অট্ট হাসিয়া বলিয়াছিলাম, আর বৈদূৰ্য্য বন্দোঃ ব্যাটা আমের আঁটির ন্যায় গড়াগড়ি যাইবে। লক্ষণা হাসিয়া বলিয়াছিল, তা হইলেও হইতে পারে।

লক্ষণাকে বিবাহের পূর্ণ এক বছর পরে সে গর্ভবতী হইয়াছিল। এক বছর তিন মাস পরে সে পিত্রালয়ে গিয়াছিল। ইতিমধ্যেই ইন্দুমতীকে আনিবার দিনক্ষণ স্থির হইয়াছিল। আমি মুরশিদাবাদ চলিয়া গিয়াছিলাম। পক্ষকাল পরে ফিরিয়া, ইন্দুমতীকে দেখিয়াছিলাম। দেখিয়া অবাক হইয়াছিলাম। পঁচিশ অতিক্রম করিয়া ছাব্বিশ বছরের ইন্দুমতী যেন নতুন যৌবন ও রূপ লইয়া ফিরিয়া আসিয়াছিল। তাহাকে দেখিয়া আদৌ প্রোষিতভর্তৃকার ন্যায় শীর্ণ ক্লিন্ন দেখি নাই। এক বছর তিন মাস পরে তাহার সঙ্গে রাত্রে সাক্ষাতের সময় সে আমাকে প্রণাম করিয়াছিল। উভয়ে উভয়কে হইতে মাথা পর্যন্ত নিরীক্ষণ করিয়াছিলাম। ধৈর্যের বাঁধ আমারই আগে ভাঙ্গিয়াছিল। আমি ইন্দুমতীকে দুই হাতে টানিয়া লইয়া বলিয়াছিলাম, সাপ কি খোলস ছাড়াইয়া নতুন রূপ লইয়া আসিল।

ইন্দুমতী নিজেকে মুক্ত করিয়া লইয়া বলিয়াছিল, এক প্রকার তাহাই বলিতে পার। তবে এ সাপের বিষ নাই। আমি ব্যস্ত হইয়া বলিয়াছিলাম, তোমাকে সাপ বলি নাই। তোমার স্বাস্থ্য দেখিয়া বলিয়াছি। বিষ কোথায়, তুমি তো সুধারসের ভাণ্ড। ইন্দুমতী হাসিয়া বলিয়াছিল, এত তাড়াতাড়ি কথাটা বলিও না। এখনও এক সুধারসে তোমার আকণ্ঠ ভরিয়া রহিয়াছে। ইহা হয় তো তাহারই উদগার। না হইলে মুরশিদাবাদ হইতে ফিরিতে এত দেরি করিতে না। এখন স্থির হইয়া দাঁড়াও, তোমাকে একটু ভাল করিয়া দেখি। বুঝিয়াছিলাম ইন্দুমতীকে আনিতে পাঠাইয়া আমার মুরশিদাবাদ যাওয়াটা তাহার চোখে অন্য রকম ঠেকিয়াছে। সে ভাবিয়াছিল, আমি লক্ষণার বিরহ ঘুচাইতে এবং তাহার প্রতি বিমুখতাবশত মুরশিদাবাদ চলিয়া গিয়াছিলাম। তাহার পক্ষে এইরূপ ভাবাই হয় তো স্বাভাবিক। তথাপি বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছিলাম, মুরশিদাবাদে যাওয়ার বিশেষ প্রয়োজন ছিল, কিন্তু ওখানে পক্ষকাল কাটিয়া যাইবে ভাবি নাই। তুমি ভালই জান আমার আর মুরশিদাবাদে যাইতে ইচ্ছা করে না। এখন আর নবাবের কাজে পেটও ভরে না, ইজ্জতও নাই। ইন্দুমতী বলিয়াছিল, তাহাই হয় তো হইবে। আমারই কপাল মন্দ, আসিয়া তোমার দেখা পাই নাই। তবে দেখিতেছি এ বাড়ির বড় কর্তাদাদার চেহারাটি আরও মোহনীয় হইয়াছে। না হইবার কোনও কারণ নাই। শুনিয়াছি আমার অল্প বয়সি সপত্নীটি দেখিতে খুবই সুন্দরী, সেবাপরায়ণা। সকলের মুখে তাহার গুণগান। সে পাশা খেলিতে জানে না, প্রেমারায় বাঁধিয়াছিল।

ইন্দুমতীর কথা শুনিয়াই বুঝিয়াছিলাম কোনও কথা শুনিতেই তাহার বাকি নাই। হাসিয়া বলিয়াছিলাম, নেশা করিলে খোয়ারি কাটাইতে হয়। আমার পাশার জুটি চলিয়া গিয়াছিল, প্রেমারায় তাহাই ভুলিয়া থাকিতে চেষ্টা করিয়াছিলাম। ইন্দুমতী তাহার স্বভাবসিদ্ধ হাসি হাসিয়া বলিয়াছিল, প্রেমারা দিয়া পাশা ভুলিয়া থাকিবার চেষ্টা? সর্বনাশ, আমাকে ভুলিয়া যাও নাই তো! পাশার জুটি মন হইতে মুছিয়া যায় নাই তো। আমি আবার তাহাকে আলিঙ্গনে বাঁধিয়া বলিয়াছিলাম, চুম্বকী নর্দবাজীনী। পাশা আগে, প্রেমারা পরে। তুমি আমার আসল নেশা। খোয়ারি কাটানো অন্যটি কিঞ্চিৎ অধিকন্তু। তোমাকে কখনও ভুলিতে পারি!

এইরূপ অবস্থায় সকল পুরুষকেই চাটুবাক্যের আশ্রয় লইতে হয়। অবশ্য যদি প্রকৃতই আকর্ষণ থাকে। মিথ্যাও কিছু বলি নাই। সন্দেহ কী ইন্দুমতী বিশ্বাস করে নাই। কোনও রমণীই বিশ্বাস করে না। ইন্দুমতী বলিয়াছিল, আমার সৌভাগ্য ভুলিয়া যাও নাই। আমি জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, তোমার পিত্রালয়ের অন্নজলে কী বিশেষ গুণ আছে। তোমার রূপ ও স্বাস্থ্য যে নতুন প্রভা ছড়াইতেছে। ইন্দুমতী বলিয়াছিল, ইহা তোমার দৃষ্টির ভ্ৰম, মনের বিভ্রম। আমি যেমন ছিলাম তেমনই আছি।

যাহা হউক, অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই আমার আর ইন্দুমতীর মধ্যে পূর্বের প্রণয় প্রীতি ফিরিয়া আসিয়াছিল। মাঝে মাঝে সে লক্ষণার কথা তুলিত। সে সবই শুনিয়াছিল, কেবল লক্ষণার গুণিনী নামটি শোনে নাই। আমিও বলি নাই। ইতিমধ্যে নাটুর আর একটি বিবাহ দেওয়া হইয়াছিল। নববধূটি ফুলিয়ার কুলীন ঘোষাল পরিবারের এবং ইন্দুমতীর বাল্য সখীর কন্যা। এ বিবাহের প্রস্তাবটি সে আমার মা বাবাকে দিয়াছিল।

দেখিতে দেখিতেই এক বছর তিন মাস কাটিয়া গিয়াছিল। লক্ষণাকে পাঁচ মাসের পুত্র কোলে সহ শ্বশুরালয়ে আনা হইয়াছিল। আশঙ্কা করিয়াছিলাম আমার সুখ স্বস্তি দুই-ইনষ্ট হইবে। অবশ্য ইহা লইয়া কোনও পুরুষই ভাবিত হয় না। আমারও ভাবিবার কোনও কারণ ছিল না। কিন্তু সংসারে সকল পুরুষের মনএক রকম হয় না। এই বিষয়ে আমি কিছুতেই উদাসীন হইতে পারিতাম না।

সৌভাগ্যবশত, লক্ষণা মিথ্যা বলে নাই। তাহার সঙ্গে ইন্দুমতীর সম্পর্ক অল্প দিনের মধ্যেই ভাল হইয়া উঠিয়াছিল। ইহা যথার্থ কাহার গুণে বলিতে পারি না। তবে লক্ষণা ইন্দুমতীর কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করিয়াছিল। আমার অপেক্ষা ইন্দুমতীই যেন তাহার অধিক প্রিয়। গুণিনী নামটি সে নিজেই ইন্দুমতীকে প্রকাশ করিয়া দিয়াছিল। আর ইন্দুমতী লক্ষণার সামনেই আমাকে বিদ্রূপ করিয়াছিল। লক্ষণাকে একান্তে যখন জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, কেন বলিলে। সে উত্তর দিয়াছিল, বলিতে হয়। তুমি রাগ কর নাই তো।

আমি রাগ করি নাই। তবে ইন্দুমতীকে আমি নিজে বলিবার মনস্থ করিয়াছিলাম। লক্ষণার বলিয়া দিবার কারণটিও স্পষ্ট। সে ইন্দুমতীর মন জয় করিবার চেষ্টা করিতেছিল। এ লক্ষণটি ভাল। উভয়ের মধ্যে নিঃশব্দে একটি বিবাদের স্রোত বহিতে থাকিবে তাহা হইতে ইহা মন্দের ভাল। লক্ষণার বয়স কম হইলেও সে বুদ্ধিমতী। শান্তি বজায় রাখিবার সমস্ত রকম চেষ্টা করিত। ইন্দুমতীও কোনও অংশে কম বুদ্ধিমতী নহে। সে সবই বুঝিত, কিন্তু চেষ্টা করিয়াও লক্ষণাকে দূরে সরাইয়া রাখার উপায় ছিল না। আমি লক্ষ করিতাম, উহাদের তাহা বুঝিতে দিতাম না। ইন্দুমতী লক্ষণার শিশুপুত্রটিকে প্রায়ই নিজের হাতে স্নান করাইত, খাওয়াইত, সাজাইত। লক্ষণাও সবুকে–অর্থাৎ ইন্দুমতীর আড়াই বছরের তৃতীয় পুত্র সবিতাকান্তিকে সর্বদা নিজের হাতে খাওয়াইত পরাইত, কাছে কাছে রাখিত। আমার মায়ের বা বালিকা পুত্রবধুদেরও ইহা ভাল লাগিত না। অপর স্ত্রীলোকদের তো কথাই নাই।

দ্বিপ্রহরের অবকাশে মাঝে মধ্যে আমাদের যে খেলা চলিত তাহা বন্ধ হয় নাই। কিন্তু জোড়া ভাঙ্গিয়া তিনজন হইয়াছিলাম। উহাতে পাশা বা প্রেমারা কোনওটাই খেলা যাইত না। ভবতারণ খুড়ার বিবাহের সংখ্যা সাত। সংসার ছিল তিনটি। বাকি স্ত্রীদের সঙ্গে শ্বশুরালয়ে সাক্ষাৎ হইত। তিন জনের মধ্যে এক জন ইন্দুমতীর বয়সি। সে প্রায়ই আমাদের বাড়ি যাতায়াত করিত। সেই খুড়িটিকেই আমাদের খেলার জুটি করিয়া লওয়া হইয়াছিল। সে সপত্নী নিন্দার যথেষ্ট মুখর হইলেও আমাদের সঙ্গে মিশিতে পছন্দ করিত। সে নানা রকম হাসি ঠাট্টা কৌতুক ও গল্প করিত। কিন্তু আমি খুড়িটিকে ভয় পাইতাম। সে সুযোগ পাইলেই ইন্দুমতী ও লক্ষণার সঙ্গে বিরোধ বাধাইবার চেষ্টা করিত। বশীকরণের কথাও বলিত। আমি তাহা ইন্দুমতী ও লক্ষণার কাছ হইতেই শুনিতাম।

যাহা হউক, আমাদের খেলা বন্ধ হয় নাই। কোনও কোনও দিন রাত্রে দেখিতাম হয় তো লক্ষণার শোবার ঘরে, ইন্দুমতী ও লক্ষণা শুইয়া রহিয়াছে। অথবা ইন্দুমতীর ঘরে লক্ষণ। আমি উপস্থিত হইলেও তাহারা নিদ্রার ভান করিয়া পড়িয়া থাকিত। কখনও বলিত, আজ আমরা একসঙ্গে শুইব তুমি অন্য ঘরে যাও। ইহাও তাহাদের এক প্রকারের রসিকতা। আমিও তথাস্তু বলিয়া যখন যাহার ঘর খালি থাকিত তাহার ঘরে গিয়া শুইতাম। খেলাটির মধ্যে আসল কৌতুক ছিল যাহার শূন্য শয্যায় গিয়া আমি শুইতাম, সেই রাতে তাহারই সঙ্গে আমার রাত্রিবাস হইত। কারণ যাহার ঘর সে কিছুক্ষণ বাদেই ফিরিয়া আসিত। আমি যদি জিজ্ঞাসা করিতাম, ফিরিয়া আসিলে কেন। উত্তর পাইতাম, তোমাকে ঘুম পাড়াইতে আসিয়াছি।

কিন্তু যে যাহাই করুক উভয়ের মধ্যে যতই প্রীতির সম্পর্ক থাকুক, বুঝিতে পারিতাম পরস্পরের মধ্যে অন্তঃস্রোতে একটি দ্বন্দ্ব ছিলই। সম্ভবত ইহা প্রকৃতিগত। কোনও দিন দেখিতাম ইন্দুমতী ক্ষণে ক্ষণে বিরক্তি প্রকাশ করিতেছে। লক্ষণার মুখ থমথমে হইয়া রহিয়াছে। আমি তৃষ্ণীম্ভাব লইয়া থাকিতাম। তাহাকেও কিছু জিজ্ঞাসা করিতাম না। ইন্দুমতী যখন পাশার শারি লইয়া দুই হাতের মধ্যে নাড়াচাড়া করিত, তখন সে দান চালিবার পূর্বে ঠোঁট ও চোখের ভঙ্গি করিয়া আমার দিকে চাহিত। লক্ষণাও প্রেমারায় বসিয়া দাদবেল (যে তাস বাটে) হইয়া, তাস বণ্টনের পূর্বে সকলের অলক্ষিতে এক বার আমার দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে চাহিত। এ সকলের একটাই বক্তব্য। যে জিতিবে, আমি সেই রাত্রিটি তাহার ঘরে যাপন করিব।

আমার বহুতর কাজের মধ্যে, এই সব অবকাশ কম আসিত। তবুও জীবনযাপনের মধ্যে, এই সব ক্ষুদ্র বিষয় আমার মনকে উজ্জীবিত করিয়া রাখিত।

.

রাত্রি পোহাইল। সারা রাত্রে বারে বারেই নিদ্রা ভাঙ্গিয়া যাইতেছিল। শ্যামকান্তি ও ভবতারণ খুড়াকে বিশ্বাস ছিল না। দুর প্রতিই নির্ভর করিয়াছিলাম। নিদ্ৰা আসিলেও বারে বারেই স্বপ্ন দেখিতেছিলাম। অধিকাংশ স্বপ্নই ইন্দুমতী আর লক্ষণাকে লইয়া। কখনও দেখিতেছিলাম তাহাদের সঙ্গে খেলা করিতেছি। কখনও কৌতুক রঙ্গ রসে গল্প করিতেছি। কখনও মাকে দেখিতেছিলাম। নিজের অজ্ঞাতসারে স্বপ্নের মধ্যেই চোখে জল আসিতেছিল। চাহিয়া দেখিতেছিলাম, দুয়া ও দুই পাইক এবং পরমেশ ভট্টাচার্য বসিয়া রহিয়াছে। একটি প্রদীপ এক পাশে জ্বলিতেছে।

লক্ষণার এখন তেইশ বছর বয়স হইয়াছে। ইন্দুমতীর চৌত্রিশ। উভয়কে লইয়া আমি কী রূপ সুখে ছিলাম, স্বপ্নগুলি যেন বারে বারে তাহাই দেখাইয়া দিতেছিল। আর কষ্ট বোধ হইতেছিল। কাজের স্বপ্নও দেখিতেছিলাম। কিন্তু গৃহের স্বপ্নই বেশি। ইহাতে বোঝা যাইতেছিল সংসারের প্রতি আমার আকর্ষণ কত অধিক। ইদানীং আমি মুরশিদাবাদ যাওয়া ত্যাগ করিয়াছিলাম। সৌভাগ্যবশত নায়েবি সুবাদারের রাজস্ব বিভাগের কাজে কোনও ত্রুটি না রাখিয়া সসম্মানেই ইস্তফা দিয়াছিলাম। ইহা বড় শক্ত কাজ। সহজে নিষ্কৃতি পাওয়া কঠিন। ইংরাজের বেতনভোগী সুবাদারকে জমিদারের ন্যায় ইংরাজদের বহু টাকা নজরানা দিতে হইত। পরগনায় পরগনায় ঘুরিয়া সেই টাকা আমাকে শ্যামকান্তিকে ও আরও অনেককে সংগ্রহ করিতে হইত। রাজস্ব বিভাগের কাজে ইস্তফা দিবার পরে নিজেদের আড়াইখানি তালুকের স্বত্ব রক্ষার জন্যই প্রাণপণ চেষ্টা করিতে হইতেছিল। ইংরাজরা তালুকের খাজনা ক্রমেই বাড়াইতেছিল। তথাপি মুরশিদাবাদ হইতে নিষ্কৃতি পাইয়া, বিশেষ স্বস্তি বোধ করিয়াছিলাম। তালুকের নিজের অংশ দেখা-শোনা করিয়াও আমার অবকাশ বাড়িয়াছিল। অতএব গৃহে অবকাশ যাপনের সময়ও বেশি পাইতাম। সেই কারণে লক্ষণা ও ইন্দুমতীর সঙ্গও বেশি হইত। নিদ্রার মধ্যে তাহাদের স্বপ্নই বারে বারে দেখিতেছিলাম।

স্বপ্নের মূল কারণটি আমার অন্তরের মর্মান্তিক হতাশা। স্বপ্নভঙ্গে জাগিয়া উঠিয়া কয়েক বারই গলায় ও হাতের আঙ্গুলে স্পর্শ করিয়াছি। আঙ্গুলে আংটি বা গলায় মৃত্যুঞ্জয় সোনার হার যুক্ত মাদুলিটি ছিল না। না থাকিবারই কথা। যে মরিতে যাইতেছে তাহার অঙ্গে ভূষণ কেহ রাখে না। তবে মৃত্যুঞ্জয় মাদুলিটিকে হার মানাইয়া আমি আবার বাঁচিয়া উঠিয়াছি। এখন আমাকে মৃত্যুঞ্জয় বলিলেও বলা যাইতে পারে। কিন্তু এ বাঁচিয়া ওঠা আদৌ সুখের নহে। এক দিকে বাঁচিয়া উঠিবার প্রাণপণ প্রয়াস, অন্য দিকে ইহার ভবিষ্যৎ পরিণতি, এ সবই আমাকে সারা রাত্রি বিচলিত করিয়াছে। আর স্বপ্ন দেখিয়াছি। এ অবস্থার মধ্যেও আমি ভুলি নাই মল্লঘরের এক কোণে, পাথর বাটিতে কঁচা দুধের মধ্যে আমার দুটি আংটি ও মৃত্যুঞ্জয় মাদুলির হার রাখা ছিল। উহা ঘরে পৌঁছিয়াছে তো? অপরের হাতে পড়ে নাই তো? জাগিয়া উঠিয়া দুযাকে জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা হইল। কিন্তু প্রবৃত্তি হইল না। এখন আমি সকল জিজ্ঞাসার বাহিরে। তবে দু আমার সহসা অসুস্থতায় যতই ব্যস্ত হইয়া পড়ুক অন্য দুই পাইকের নজর ফাঁকি দিবার উপায় কাহারও ছিল না বলিয়াই মনে হয়। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের মধ্যে ভবতারণ খুড়াই এক মাত্র ব্যক্তি। সম্ভবত সে তাহা নিতে পারে নাই। বলা বাহুল্য পাথর বাটিতে কাঁচা দুধের মধ্যে, জ্যোতিষীর বারণে ধারণ করা আংটি কবচ মাদুলি ডুবাইয়া রাখাই নিয়ম। অন্যথায় উহা অশুচি হওয়ার সম্ভাবনা।

রাত্রি পোহাইয়া দিনের আলো ফুটিবার অনেক আগে হইতেই, ঘাটে স্নানার্থীদের নানা কলরব উচ্চৈঃস্বরে মন্ত্রপাঠ মাঝি মাল্লাদের হাঁকডাক চিৎকার শুনিতে ছিলাম। তাহার মধ্যেই পাখিদের কলরব শ্মশানযাত্রীদের হরিধ্বনিও কানে আসিতেছিল। রমণী-পুরুষ-শিশুর কান্না হাসি সব মিলিয়া মিশিয়া ত্রিবেণীর ঘাট যেন রাত্রি হইতেই কোলাহলপূর্ণ ছিল। আমি জাগিয়া থাকিয়াও চোখ বুজিয়া ছিলাম। ক্রমে গঙ্গার পূর্বাকাশে রক্তাভা ফুটিয়াছিল।

আমি নিজেই বাঁশের তৈরি চওড়া চালির বিছানা হইতে উঠিয়া বসিবার চেষ্টা করিলাম। পারিলাম না। দুযা ব্যস্ত হইয়া বলিল, কী করেন বড়কর্তা দাদা। এই দুর্বল শরীরে আপনি কেমন করিয়া উঠিবেন। আমি বলিলাম, তবে তুই আমাকে তুলিয়া ধর। আমি ঘাটের দক্ষিণে যাইব। দুযা বুঝিতে পারিল, আমি প্রাকৃতিক কর্ম করিতে যাইব। কিন্তু সে আমাকে স্পর্শ করা উচিত কি না স্থির করিতে পারিল না। নাটু ও ভবতারণ খুড়া আসিয়া আমার সামনে দাঁড়াইল। আমি তাহাদের দিকে হাত বাড়াইয়া দিলাম। নাটু সন্দেহ করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, উঠিতে পারিবেন? বলিলাম, পারিব। তখন সে ও ভবতারণ খুড়া দুই হাত বাড়াইয়া আমার দুই হাত ধরিল। তাহারা আকর্ষণ করিতেই আমি উঠিয়া দাঁড়াইলাম। মনে হইল মাথাটা ঘুরিয়া গেল। আমি চোখ বুজিয়া এক মুহূর্ত স্থির রহিলাম। শরীরে কোনও কষ্ট নাই, দুর্বল বোধ করিতেছি। উভয়ের কাঁধে হাত দিয়া, ধীরে ধীরে গঙ্গাযাত্রীর ঘাট হইতে বাহির হইলাম। দক্ষিণ দিকে সরস্বতীর ঢালু জমিতে ভ্যারেণ্ডা ও আশ্যাওড়ার জঙ্গলে গেলাম।

আমার গায়ে একটি কোঁচকানো নিমাস্তিন (হাফ হাতা পাঞ্জাবি) ও দুর্গন্ধযুক্ত ধুতি কোমরে জড়ানো। অজ্ঞান অবস্থায় মূত্রত্যাগই ইহার কারণ। জঙ্গলের ঢালুতে নামিতে নামিতে জিজ্ঞাসা করিলাম, আমাকে কবে এখানে লইয়া আসা হইয়াছে। নাটু জবাব দিল, আজ দুই রাত্রি পোহাইল। ইহার অর্থ গতকালই দ্বিপ্রহরে আমার জ্ঞান ফিরিয়া আসিয়াছিল। ঘাটে এক রাত্রি অজ্ঞান অবস্থায় কাটিয়াছে। তাহার আগের রাত্রিটি বৈদ্য মুরলীধর আমার চিকিৎসা করিয়া নিদান দিয়াছে। সম্ভবত রাত্রি প্রভাতেই আমাকে নৌকাযোগে এখানে লইয়া আসিয়াছে। অর্থাৎ পরশু। অথচ যে আঘাতের কারণে জ্ঞান হারাইয়াছিলাম। এখন সেই আঘাতের কোনও অনুভূতি নাই। বৈদ্য মুরলীধর কী ঔষধ দিয়াছিল, কে জানে। নিদান দিবার পূর্বে আমার মৃত্যুকে নিশ্চিত করিবার জন্য সম্ভবত বিষবড়ি প্রয়োগ করিয়াছিল। যখন আর। কোনও উপায় থাকে না তখন বিষবড়ি দেওয়াই সাব্যস্ত করা হয়। উহা এক প্রকার অন্ধের করাঘাতের মত। সন্ন্যাস রোগ ভাবিয়া যদি বড়ি প্রয়োগ করিয়া থাকে, তাহা হইলে বলিতে হয় আমার বাঁচা-মরা সম্পর্কে বৈদ্যও নিশ্চিত ছিল না। অথবা নিশ্চিত মৃত্যুর কথাই ভাবিয়াছিল। মুরলীধর যখন শুনিবে আমি বাঁচিয়া উঠিয়াছি, সে জিভে দাঁত কাটিয়া ঈশ্বরের অপার মহিমা গাহিবে। কারণ সে তো নিমিত্ত মাত্র। নিদান ঘোষণা করিলেও বাঁচা মরা ঈশ্বরের হাতে।

আমি নাটু ও ভবতারণ খুড়ার অদূরেই জঙ্গলের গোড়া আঁকড়াইয়া ধরিয়া প্রাকৃতিক কর্ম করিলাম। দু আসিয়া তাহাদের পিছনে দাঁড়াইয়াছিল। আমি ইশারায় তাহাকে কাছে ডাকিলাম। ভবতারণ খুড়া তখন নাটুকে নিচু স্বরে বলিতেছিল, আমি পৈতা কানে জড়াই নাই। হাসি পাইয়াছিল। হাসিতে পারি নাই। উহারা এখন আমাকে স্পর্শ করিবে না। আমি দুয়ার হাত ধরিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলাম। জঙ্গলের ঢালুতে নামিয়া, সরস্বতীর ধারে গেলাম। কতগুলি মাল বোঝাই বড় নৌকা ও মাঝি মাল্লারা ছিল। এখনও উহাদের মাল বোঝাই করা বাকি আছে। সরস্বতী দিয়া ইহারা যাইবে না। পূর্বে নাকি এই নদী দিয়াই সপ্তগ্রামে যাইত। তখন ইহা বিশাল ও বেগবতী ছিল। সপ্তগ্রাম হইতে মেদিনীপুরের ভিতর দিয়া হাওড়ার কাছে আবার গঙ্গায় যাইয়া মিশিত। এখন দেখিয়া বিশ্বাস হয় না। কিছু পশ্চিমে একটি রজ্জ্ব নির্মিত সাঁকো আছে। উভয় তীরেই ঘন বন। ভিতর দিয়া পথ আছে। বংশবাটি যাইবার সময়, আমরা সাঁকো পার হইয়া জঙ্গলের ভিতরের পথ দিয়া যাইতাম। এইসব পণ্য বোঝাই নৌকা হুগলি সদর অথবা কলিকাতা যাইবে। দুকে বলিলাম, তুই আমার হাত ধরিয়া থাক। আমি ডুব দিয়া উঠিতেছি। সে সবলে আমার হাত ধরিয়া রহিল, যেন আমি স্রোতে ভাসিয়া না যাই। কিন্তু এখন যেন আমি তেমন। দুর্বল বোধ করিতেছি না। কয়েকটি ডুব দিয়া মনে হইল, শরীর যেন জুড়াইয়া গেল। নতুন শক্তি ফিরিয়া পাইলাম। কোমর জলে দাঁড়াইয়া নিমাস্তিন খুলিলাম। কোমরের কাপড়টি ধুইয়া আবার জড়াইলাম। ইতিমধ্যে কার্তিকের রৌদ্র উঠিয়াছে।

দুযার হাত ধরিয়াই ঘাটে ফিরিয়া আসিলাম। ভিজা কাপড় ছাড়া দরকার। আমি কিছু বলিবার আগেই নাটু অতিরিক্ত মাড় দেওয়া একটি পাড়হীন খুইয়া (খাদি) বস্ত্র দিল। ইহা তাঁতি পাড়ার সংগ্রহ। বুঝিলাম আমার মৃত্যুর পরে শবস্নান করাইয়া ঘৃত মাখাইয়া, এই কাপড়টি জড়াইয়া আমাকে চিতায় তোলা হইত। ইহাই স্বাভাবিক, শবদাহের জন্য সমস্ত সামগ্রীই লইয়া আসা হইয়াছে। আমি ভিজা কাপড় ছাড়িয়া সেই কাপড়টি কাছা দিয়া পরিলাম। মেঝের উপর বসিয়া প্রথমেই বড় ক্ষুধার উদ্রেক। হইল। আমি নাটুকে বলিলাম, কেবল দুধ নহে, আমাকে ফল মিষ্টি যাহা পার খাইতে দাও।

অনুমান করিতে অসুবিধা নাই, নাটুর কাছে নিশ্চয়ই কিছু অর্থকড়ি রহিয়াছে। শ্যামকান্তিও খালি হাতে আসে নাই। নিজেদের খাবার জন্য চাল ডাল রান্নার সরঞ্জামাদিও লইয়া আসিয়াছে। নাটু অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘটি ভরিয়া দুধ কলা ও ছানা চিনি আনিয়া দিল। নিজেদের সকলের জন্য দই চিড়া গুড় কলাও আনিল। সকলে একসঙ্গে সকালের খাবার খাইতে বসিলাম। দৃশ্যটি একদিক দিয়া বড়ই সুখের। কিন্তু আমার গলায় খাবার আটকাইয়া যাইতে লাগিল। মনে হইল বুক ভেদ করিয়া একটা শক্ত বস্তু গলার কাছে উঠিয়া আসিতেছে। চোখে জল আসিবার উপক্রম হইল। আমি নিজেকে সামলাইতে চেষ্টা করিলাম। এই ভাবাবেগের আর কোনও মূল্য নাই। কেবল নিজের অন্তরের দুর্বলতা প্রকাশ করা হইবে।

খাওয়া শেষ হইলে, হাত মুখ ধুইয়া সকলেই আমাকে ঘিরিয়া বসিল। সকলের দৃষ্টি আমার মুখের দিকে। সকলেই আমার মুখ হইতে কিছু শুনিতে চাহিতেছে। আমি গঙ্গার দিকে দেখিতেছিলাম। খাবার খাইয়া সুস্থ বোধ করিতেছিলাম। কিন্তু এখনও দুর্বলতা কাটে নাই। গতকালও গঙ্গার রৌদ্রোজ্জ্বল জলে চোখ রাখিতে কষ্ট হইয়াছিল। এখন সে কষ্ট নাই। কার্তিক মাসেও জলের রং গৈরিক বর্ণ। পৌষ মাঘ মাসের আগে জলের রং স্বচ্ছ ও নীল হইবে না। আমার বাল্যকালের তুলনায় গঙ্গা ক্ৰমে অগম্ভীর হইয়াছে। ইংরাজদের ফৌজি বন্দুক-জাহাজ আর এদিকে আসিতে পারে না। জলপথে মুরশিদাবাদ যাইতে হইলে বজরা করিয়া যাইতে হয়। উহা বিলাসভ্ৰমণ ছাড়া কাজের জন্য কেহ যায় না। চৈত্র বৈশাখ মাসে, এ অঞ্চলে কোথাও কোথাও ছোটখাটো চর জাগিয়া ওঠে। আরও উত্তরে শান্তিপুরের কাছে আরও বড় চর দেখা যায়। আমাদের গ্রাম হইতে কুন্তী নদী বাহিয়া গঙ্গায় নৌকা ভ্রমণ করিতে আসা একটি বিশেষ আমোদজনক ঘটনা। আবার প্রমোদজনক ঘটনাও বটে। গঙ্গাযাত্রীদেরও কুন্তী নদী দিয়া গঙ্গায় আসিতে হয়। যেমন আমাকেও লইয়া আসা হইয়াছে।

দেখিতেছি, মৎস্যজীবীদের নৌকা গঙ্গার বুকে তটের নিকটে ভাসিতেছে। বাঁশ পুতিয়া কোথাও জাল পাতিয়া রাখিয়াছে। এখনও দু-এক জায়গায় পাতিতেছে। খেয়া নৌকা পারাপার করিতেছে। ভাউলে করিয়া কেহ উত্তরে কেহ দক্ষিণে চলিতেছে। বাতাসের বেগ নাই। পালগুলি মাস্তুলে জড়ানো রহিয়াছে। গঙ্গার ওপারে কিছুটা দক্ষিণে কুমারহট্টহালিশহরের অংশবিশেষ দেখা যায়। গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে মন্দির চূড়া এবং বৃহৎ অট্টালিকার কিঞ্চিৎ লক্ষে আসে। বর্ধমান রাজবাড়ির প্রসাদপুষ্ট ঘোর শাক্ত রামপ্রসাদের সাধনস্থানও ওপারে। আকাশে শরৎকালের মতো সাদা মেঘ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ভাসিয়া বেড়াইতেছে। ক্ষীণ বাতাস এখনও উত্তরগামিনী হইয়া সহসাই যেন স্তব্ধ হইয়া যাইতেছে। ইহাতে অনুমিত হয় হেমন্তকাল উত্তর হইতে শীতের বার্তা লইয়া আসিতেছে। এক মাসও অতীত হয় নাই, দুর্গা পূজা হইয়া গিয়াছে। আমাদের বসতবাটি গ্রামটি আমাদেরই তালুক। পূজাও একটিই হইয়া থাকে। শ্যামকান্তি ও আমি পৃথগন্ন হইলেও দুর্গা পূজা উভয়ের মিলিত খরচেই হইয়া থাকে। তোক মারফত পত্র দ্বারা সকল আত্মীয়কুটুম্বদের নিমন্ত্রণ করা হয়। কোজাগরী পূর্ণিমা পর্যন্ত বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ভরা থাকে। প্রচুর অজা বলি হইয়া থাকে। তথাপি শত্ৰুবলিদানের প্রতীক স্বরূপ মানকচুর পাতায় ঢাকা একটি চাউলের গুঁড়া দিয়া তৈরি পুতুলকে বলি দেওয়া হয়। ইহাতে এক বছর পর্যন্ত শত্রুভয় হইতে মুক্ত থাকা। যায়। দশমীর দিন শবরোৎসবটি সর্বাপেক্ষা বেশি আকর্ষণীয়। এই দিনে সকলে গায়ে কাদা মাটি মাখিয়া গাছের পাতা, পাখির পালক ইত্যাদি দিয়া অদ্ভুত সাজ করে। নৃত্য করে আর পরস্পরকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দেয়। আমাকে কেহ গালি দিলে আমি যদি ফিরিয়া তাহাকে গালি না দিই, তবে আমার পাপ হইবে।

এই রূপ বিশ্বাস থাকায় শবরোৎসবটি বেশ জমিয়া ওঠে। এক সময়ে আমিও এই উৎসবে যোগ দিতাম। কয়েক বছর যাবৎ আর দিতাম না। উহা এক প্রকার অশ্রাব্য অশ্লীল ভাষার প্রতিযোগিতা। যাহা কিছু উৎসব সবই শাস্ত্র স্মৃতি নিবন্ধন হেতু। এই উৎসবে সকলে শবরের ন্যায় সাজে, ঢাকের বাজনার সঙ্গে অঙ্গভঙ্গি করিয়া নাচে আর চকার বকার সহ নানা রকম গান করে। কুন্তী নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে এই উৎসবের শেষ। এখনও সবই চোখের সামনে ভাসিতেছে। এইরূপ বলা যাইবে না, কেবল বাগদি হাড়ি ডোম ইহারাই উৎসবের দিন মদ্যপান করে। ব্রাহ্মণ অব্রাহ্মণ শূদ্র চণ্ডাল কেহই বাদ যায় না। অন্দরমহলে আড়ম্বরের সঙ্গে সিদ্ধিপাতার সঙ্গে নানা মশলা মিশাইয়া পানীয় প্রস্তুত হয়। স্ত্রী শিশু নির্বিশেষে সকলেই পান করে। আমিও করি। বৈদ্য মুরলীধরের তৈরি বিশেষ মাদকদ্রব্যও সেবন করি এবং বলিতে কি মত্ত অবস্থায় একই ঘরের মধ্যে লক্ষণা ও ইন্দুমতীকে লইয়া এইবারও নির্লজ্জ আচরণ করিয়াছি। কোজাগরী পূর্ণিমার দিন সারা রাত্রই পাশা খেলিয়া কাটিয়াছে। তারপরে কয়েক দিন বিশ্রামের পরে দুয়ার সঙ্গে মল্লঘরে গিয়েছিলাম। সেইখান হইতে অজ্ঞান অবস্থায় আজ আমি গঙ্গাযাত্রীর। ঘরে বসিয়া আছি। মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়াছি।

মল্লক্রীড়ায় বুকের আঘাতে অজ্ঞান হইবার পরে কী কী ঘটিয়াছে, তাহা আমি সবই চোখের সামনে। দেখিতে পাইতেছি। উহার বিবরণ জিজ্ঞাসা অনাবশ্যক। সকলে আমাকে ঘিরিয়া বসিয়া। কেন আমার। মুখের দিকে উৎসুক জিজ্ঞাসু চোখে দেখিতেছে, তাহাও জানি। তাহারা আমার কাছ হইতে কিছু শুনিতে চাহিতেছে। কিন্তু আমার কিছু বলিবার নাই। দৈবক্রমে বাঁচিয়া উঠিয়াছি–প্রকৃতপক্ষে ইহা দুর্দৈব এবং আমি তালুক ও সম্পত্তির বড় অংশীদার বৈদূৰ্য্যকান্তি বন্দ্যোঃ। ইহাদের নিকট বিশেষ প্রতাপশালী ছিলাম। অজ্ঞান অবস্থায় মারিয়া ফেলিবার মনস্থ করিয়াও আমার বাঁচিয়া উঠিবার শক্তি ও ইচ্ছার কাছে পরাজিত হইয়াছে। সকলেই আমার করুণার পাত্র ছিল, এখনও সেই রূপ ভাব দেখাইতেছে। অতঃপর আমি কী করিব সে বিষয়ে নিশ্চিত হইতে পারিতেছেনা। বিশেষ করিয়া শ্যামকান্তি ভবতারণ খুড়া ও নাটু। অবশ্যই পরমেশ ভট্টাচার্যও। তাহারা মনে মনে শঙ্কা গণিতেছে। অথচ আমি গতকালই নাটুকে বলিয়াছি, আমি সংসারের অমঙ্গলের কারণ হইব না।

যে মানুষ এক বার গঙ্গাযাত্রা করিয়াছে সে আর গৃহে ফিরিতে পারে না। ইহাতে সংসারের অমঙ্গল, সকলের অমঙ্গল। তাহাদের কাছে আমার আর কোনও অস্তিত্ব নাই। ইহার কোনও প্রায়শ্চিত্তবিধিও নাই। চার-পাঁচ বছর হইল, ত্রিবেণীর শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের মৃত্যু হইয়াছে। তিনি বাঁচিয়া থাকিলেও আমার গৃহে ফিরিবার কোনও বিধান দিতে পারিতেন কি না জানি না। আমার সংস্কৃত শিক্ষার গুরু ঘনশ্যামও অনেক আগেই গত হইয়াছেন। মুরশিদাবাদে পারসি শিখিয়া আসিয়া ইন্দুমতীকে বিবাহের পরেও আমি আবার তাহার কাছে তিন বছর সংস্কৃত পাঠ করিয়াছি। তাহারা ব্যতীত, আজ। এমন কেহ নাই যিনি শাস্ত্র ঘাঁটিয়া আমার গৃহে প্রত্যাবর্তনের কোনও বিধান দিতে পারেন। তাহারাও পারিতেন এমন কোনও স্থিরতা নাই।

কিন্তু সে বিধান পাইলেও, কিছুই করিবার থাকিত না। কারণ আমি জানি কোনও বিধানই আমার পরিবারের জ্ঞাতিবর্গের গ্রামবাসীদের ভয় ও শঙ্কা দূর করিতে পারিবে না। প্রতি মুহূর্তেই তাহাদের মনে হইবে আমি গঙ্গাযাত্রা প্রত্যাগত এক কায়া, অলৌকিক অমঙ্গলের প্রতিমূর্তি। আমাকে দেখিয়া তাহারা শিহরিয়া উঠিবে। আমাকে দেখিয়া দূরে সরিয়া যাইবে। গৃহমধ্যে আমার অবস্থান প্রেতের অবস্থান বলিয়া গণ্য হইবে। আমার সংস্পর্শেও কেহ আসিবে না। জীবিত থাকিয়াও তাহাদের কাছে আমি এক প্রকার মৃত। আমাকে স্পর্শ করা তো দূরের কথা, আমি কিছু স্পর্শ করিলেও তাহা বর্জিত হইবে।

যে চুম্বকী গুণিনী আমার দর্শনমাত্ৰ আপ্লুত হয়, আমাকে ফিরিয়া যাইতে দেখিলে তাহারাও আতঙ্কে দুরে সরিয়া যাইবে। ইহা আমি কল্পনার চোখে স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছি। আমার সঙ্গে রাত্রিবাস দুরের কথা আমার ছায়াও মাড়াইবে না। আর কখনই আমার সঙ্গে তাহারা পাশা প্রেমারা খেলিতে বসিবে না। আমার মা-ও তাহাই করিবেন। আমাকে দর্শন করাও তাহার কাছে অমঙ্গলকর হইবে। নাট, পুত্রবধূরা আমাকে দেখিয়া পলাইবে। আমার কোমল কচি শিশু পুত্রবধূদের ও পৌত্রটিকেও আমি আর বুকে লইয়া আদর করিতে পারিব না। প্রকৃতপক্ষে গৃহে আর আমার আশ্রয় মিলিবে না। আমাকে কেহ গ্রহণ করিবে না। অতএব, শাস্ত্রীয় বিধান আদৌ যদি কিছু থাকিয়াও থাকে তাহা কোনও কাজে লাগিবে না। এইরূপ অবস্থায় গৃহে প্রত্যাগমনের কোনও প্রশ্ন নাই। আমি চিরকালের জন্য পরিত্যক্ত হইয়াছি।

যাহাদের লইয়া আমার সুখের অন্ত ছিল না, সেই চুম্বকী ও গুণিনীর কাছে এখন আর আমার পূর্বের অস্তিত্ব নাই। অথচ এমন নহে যে, আমি মৃত অতএব তাহারা বিধবা হইবে, বা আমার কোনও পারলৌকিক শ্রাদ্ধাদি হইবে। ইন্দুমতী ও লক্ষণা এখন হইতে বারো বছর সধবার জীবন যাপনই করিবে। শাড়ি গহনা পরিধান করিবে, সিথায় সিন্দুর, পায়ে আলতা ও প্রসাধনা ইত্যাদি করিবে। মৎস্য ও মাংস আহার করিবে। তারপরেও আমার কোনও সন্ধান না মিলিলে, তাহারা বৈধব্য গ্রহণ করিবে। তখন পুত্রেরা আমার শ্রাদ্ধ করিবে। এ ক্ষেত্রে, এ রূপই বিধান। যদি আমি মরিয়াও যাই, সংবাদ না পাইলে, এই ব্যবস্থাই বলবৎ থাকিবে। আমার জন্য সকলেই কঁদিবে, কিন্তু আমার অদর্শনে অশঙ্কিত নিশ্চিন্ত থাকিবে।

আমার গর্ভধারিণী মা রহিলেন। ইন্দুমতী লক্ষণা রহিল, যাহাদের দীর্ঘদিন অদর্শনে কাতর হইতাম, দর্শনমাত্র আমার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হইয়া উঠিত, স্পর্শমাত্র প্রতিটি রক্তবিন্দু আলোড়িত হইত, তাহারা রহিল। আমার রক্তের পুতুলগুলি রহিল। পিতা গত পাঁচ বছর আগে, সমস্ত কাজকর্ম ত্যাগ করিয়া কাশীবাসী হইয়াছেন, তিনি রহিলেন। আমি জীবন্তে মৃত হইয়া রহিলাম। এই কারণেই শ্যামকান্তি, ভবতারণ খুড়া, এমনকী নাটুও আমার মৃত্যুই চাহিয়াছিল৷ তথাপি আমি বাঁচিয়া উঠিলাম। ইহা এক মহা দুদৈর্ব। এমনভাবে বাঁচিবার অপেক্ষা মরাই শ্রেয়। কিন্তু এক বার যখন প্রাণের স্পন্দন অনুভব করিলাম, তখন আর কিছুতেই মরিতে পারিলাম না। সর্বশক্তি নিয়োগ করিয়া বাঁচিয়া উঠিলাম। ইহাতেই প্রমাণ হয়, মানুষ কীরূপ প্রাণান্তকর অবস্থাতেও বাঁচিয়া থাকিতে চাহে। মানুষ মরিতে চাহে না। অথচ জীবিত থাকিয়াও সে তাহার জীবনের নিয়ামক হইতে পারে না। জন্মাবধি ভাবিতাম, আমিই আমার জীবনের নিয়ামক। এখন বুঝিতেছি, অলক্ষ্য নিয়তির নির্দেশে আমি চালিত হইতেছিলাম। এখনও হইতেছি। অমোঘ নিয়তির ক্রীড়নক ছাড়া নিজেকে আর কিছুই মনে হইতেছে না।

এখন যাহারা ঘিরিয়া বসিয়া উৎকণ্ঠিত জিজ্ঞাসু চোখে আমার মুখের দিকে তাকাইয়া রহিয়াছে, অতঃপর তাহাদের কিছুই বলিবার নাই। অথচ তাহারা নিশ্চিন্ত হইতে পারিতেছে না, ভাবিতেছে, আমি কী বলিব। পতিতকে উদ্ধার করা যায়। পিতামহের কাছে শুনিয়াছিলাম, জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন এক বার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দ্বারা পতিত এক ব্রাহ্মণকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। রাজা ইহাতে ক্রুদ্ধ হইয়া বহু পণ্ডিতকে ডাকিয়া বাজপেয় যজ্ঞ করিয়াছিলেন, জগন্নাথকে ডাকেন নাই। জগন্নাথ নিজেই একশো শিষ্যসহ রাজবাড়িতে অনিমন্ত্রিত হইয়া নিজের ব্যয়ে অবস্থান করেন। রাজা বিদ্রূপ করিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, যজ্ঞ কী রূপ হইল। জগন্নাথ উত্তর দিয়াছিলেন, যেখানে জগন্নাথ রবাহুত, সে যজ্ঞের মহিমার সীমা কী? পরে এই রাজাই এক বার জগন্নাথের সাহায্যে বিপদমুক্ত হইয়া, গলায় সোনার কুঠার বাঁধিয়া ক্ষমা চাহিয়াছিলেন।

আমি তো পতিত নহি। গঙ্গাযাত্ৰা করিয়া বাঁচিয়া উঠিয়াছি। মরিয়া বাঁচিয়া রহিয়াছি। অতএব গৃহে প্রত্যাগমনের আর কোনও উপায় নাই। আমার নিজের জীবনেই এ রূপ ঘটনা দেখিয়াছি। শুনিয়াছি, তাহারা গঙ্গার পূর্ব কূলে গিয়া কোথাও জীবন ধারণ করিয়াছে। কিন্তু আমার সমবয়সি কাহাকেও এইরূপ দেখি নাই। আমার বুক বিদারিত হইতেছে। গৃহের কথা ভাবিয়া দুঃখে ও যন্ত্রণায় অন্তর হাহাকার করিয়া উঠিতেছে। কিন্তু তাহা প্রকাশ করা নিরর্থক। গত রাত্রে, স্বপ্নের মধ্যে বারে বারেই চোখের জলে ভাসিয়াছি। আর কাঁদিবনা। চোখের জল শুকাইয়া তাহা প্রস্তরীভূত হইতেছে। আমি দৃষ্টি ফিরাইয়া সকলের মুখের দিকে চাহিয়া দেখিলাম। নাটুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমরা কি আজই গৃহে ফিরিয়া যাইতে চাও।

নাটু আমার প্রশ্নের যথার্থ অর্থ বুঝিতে না পারিয়া বিমূঢ় চোখে অন্যদের মুখের দিকে দেখিল। আমি বলিলাম, যেখানে আমার স্থান নাই, সেখানে আর ফিরিয়া যাইব না। অমঙ্গলের চিন্তার কোনও কারণ নাই। তোমরা ইচ্ছা করিলে এখনই ফিরিয়া যাইতে পার। এই কথা শুনিয়া দুয়া কাঁদিয়া উঠিয়া বলিল, হে বড় কর্তাদাদা, আপনাকে এখানে এ অবস্থায় রাখিয়া আমরা কেমন করিয়া ফিরিয়া যাইব?

দুযা সকল জানিয়াও পূর্বের অবস্থা ভুলিতে পারিতেছে না। আমি যে এখন অতীত মাত্র, সে তাহা উপলব্ধি করিতে পারিতেছে না। আমি বৈদূৰ্যকান্তি বন্দ্যোঃ, তালুকের অধিকারী, অনেক জমিদারের তুলনায় নিজের সম্মান রক্ষা করিয়া রাজস্বের দাবি মিটাইতে এ পর্যন্ত সক্ষমতা প্রমাণিত করিয়াছি, অথচ সে আমার প্রীতির পাত্র, এ সমস্তই তাহার মজ্জাগত। সে আমার ও তাহার সম্পর্কের পূর্বাবস্থা ভুলিতে পারিতেছে না। তাহার কাতরোক্তি আমার ভাই ও পুত্রের নিকট নিম্নবর্ণের মূর্খের ন্যায় বোধ হইতেছে। আমি বড় দুঃখে মনে মনে হাসিলাম। বলিলাম, কাঁদিস না। ইহাদের সঙ্গে ফিরিয়া গিয়া, তুই পূর্বের মতো নিজের কাজ করিবি, তোর বড় বাপাকে (নাটুকে) সবরকমে আগলাইয়া রাখিবি। তুই জানিস, আমার আর ফিরিয়া যাইবার উপায় নাই।

দুযা তথাপি কাঁদিতে লাগিল। বলিল, আমিই সকল সর্বনাশের মূল। সেইদিন যদি আপনার সঙ্গে কুস্তি করিতে না যাইতাম, তাহা হইলে এমন সর্বনাশ হইত না। বড় বাপাকে আপনি নিজের হাতে সমস্ত কাজকর্ম শিখাইয়াছেন, তিনি আপনার সকল কাজই করিতে পারিবেন। আমি আপনাকে ছাড়িয়া আর ফিরিতে চাহি না। আপনি যেখানে যাইবেন, আমি আপনার সঙ্গে যাইব।

দুযার কথা শুনিয়া আমার অন্তর বিদীর্ণ হইতে লাগিল। কিন্তু আমি নিজেকে শক্ত রাখিয়া সকলের মুখের দিকে চাহিয়া করুণ মুখে হাসিলাম। দু তাহা দেখিলে না। সে আপন মনে নিজের কথাই বলিতে লাগিল, সে দিন পশ্চিমের বাগানে যাইবার কালে, না জানি কী বাধাই পড়িয়াছিল। ঘর হইতে বাহির হইবার সময় আমার হোঁচট লাগে নাই, ডোম দেখি নাই, চিল উড়ে নাই, কাঠুরেকে কাঠ বহিতে দেখি নাই, মরা গাছে কোকিল ডাকে নাই, বাঁয়ে সাপ ডাইনে শেয়ালও দেখি নাই। তবে কেন এরূপ হইল। বড় কর্তাদাদা, আপনি কি কিছু দেখিয়াছিলেন?

 ঘর হইতে কোনও কাজে বাহির হইলে, যাহা যাহা দর্শনে অমঙ্গল সূচিত হয়, দুর চোখে তাহা কিছুই পড়ে নাই। আমার চোখেও পড়ে না। (আশ্চর্য, টিকটিকির ডাকের কথা নাই!) জন্মাবধি এই সব ঘটনাকে ঘরের বাহিরে যাওয়ার বাধাস্বরূপ মনে করিয়া আসিয়াছি, চিরকাল মানিয়াও আসিয়াছি। দৈব দুর্ঘটনা আমার জীবনেই ঘটিয়াছে। আমার চোখে ছানি পড়ে নাই, তখন দুযার আর কী করিবার আছে। বলিলাম, না আমি সেরূপ কিছু দেখি নাই, উহা ভাবিয়া কোনও লাভ নাই। এখন এই দৈবকেই মানিয়া লইতে হইবে। আমি কোথায় যাইব, কী করিব, তাহার কোনও স্থিরতা নাই, তোকে পালন করিবার যোগ্যতাও আমার আর নাই। তোর বউ ছেলেমেয়েরা রহিয়াছে, কাজ রহিয়াছে, তোকে ইহাদের সঙ্গেই ফিরিয়া যাইতে হইবে।

দুযা হাঁটুতে মাথা খুঁজিয়া কাঁদিতে লাগিল। শ্যামকান্তি ভবতারণ খুড়া নাটু সকলেই এখনও আমার মুখের দিকে উৎকণ্ঠিত জিজ্ঞাসু চোখে চাহিয়া আছে। আমি নাটুকে আবার বলিলাম, তোমাকে গতকালই বলিয়াছি, আমি সংসারের অমঙ্গলের কারণ হইব না। অকারণ ভয় করিও না, আমি আর গৃহে ফিরিয়া যাইব না। গঙ্গাযাত্রা করিয়া বাঁচিয়া উঠিয়াছি। এ ক্ষেত্রে আমি আর সম্পত্তির উত্তরাধিকারীও নহি, অতএব হকিকত লিখিবার প্রয়োজনও নাই। আমি বাঁচিয়া উঠিলাম। কিন্তু সমাজের বিধান অনুযায়ী তোমাদের কাছে আমি এখন মৃত। আমার গৃহে ফিরিবার উপায় নাই। ফিরিলে সকলে আমাকে দেখিয়া ভয়ে শিহরিত হইবে, কেহ আমাকে গ্রহণ করিতে পারিবে না। ইহার কী-ই বা প্রতিবাদ বিদ্রোহ আছে? নাই, অতএব ইহাই আমার নিয়তি। তোমাদের মঙ্গল হউক। সংসারের মঙ্গল হউক, ইহাই প্রার্থনা করি। ইচ্ছা করিলে তোমরা এখনই ফিরিয়া যাইতে পার।

নাটু কাঁদিয়া উঠিল, আমার পা জড়াইয়া ধরিল। বলিল, আপনি বাঁচিয়া থাকিতেই আমি পিতৃহারা হইলাম। আমার কাছে ইহার অধিক অমঙ্গলের কিছু নাই। নাটুর কান্না শুনিয়া আমার পিতৃপ্রাণ হাহাকার করিয়া উঠিল। কিন্তু আমি নিজেকে শক্ত রাখিয়া এক প্রকারের বৈরাগ্যের ভাব লইয়া তাহার মাথায় হাত রাখিলাম। বলিলাম, উঠিয়া বস, কাঁদিয়া লাভ নাই। নাটু উঠিয়া বসিল। স্পষ্টতই তাহাদের উৎকণ্ঠা দূর হইয়াছে। দুয়া ও দুই পাইক ব্যতীত সকলের মুখেই স্বস্তির ভাব প্রকাশ পাইতেছে। ভবতারণ খুড়া বলিল, দ্বিপ্রহরের রান্নার ব্যবস্থা হউক। ফিরিয়া যাইবার কথা পরে ভাবা যাইবে। সম্ভবত আজ আর ফিরিয়া যাওয়া যাইবে না। কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার রাত্রি, যাইতে রাত্রি হইলে ডাকাতের হাতে পড়িতে হইতে পারে। আগামীকাল সকালেই যাওয়া যাইবে।