উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

৪. শংকরের টর্চের আলো

শংকরের টর্চের আলো প্রথমে পড়ল ডান দিকের একটি ডোবার দিকে। শালচিতির লোকেরা এ রকম ডোবাকে গড়াও বলে। ডোবা পেরিয়েই, ডান দিকে বাইরের বাড়ির উঠোন, অন্ধকারে যার সবখানি দেখা যায় না। পুব মুখে একটি আটচালা। শংকরের বাড়িওয়ালা মুখুজ্জেদের এই আটচালাতেই। পূজা পার্বণ হয়। তবে নামেই আটচালা। খড়ের চালের মাঝখানে খড় নেই, বড় বড় ফাঁক। মাটি দিয়ে ইটের গাঁথনির থাম যতগুলো থাকার কথা, তা নেই। বাঁশ দিয়ে কোনও রকমে ঠেকো দিয়ে রাখা হয়েছে। আটচালাটা আসলে পূজাপার্বণের স্থান না। তার পাশেই একটি উঁচু ছাওয়া চারচাল মাটির ঘর আছে। সেটিকেই ঠাকুর দালান বলা হয়। সব কিছুরই পড়ো পড়ো অবস্থা। কারণ মুখুজ্জেদের নিজেদের অবস্থাই পড়তি। এক সময়ে নাকি দোল দুর্গোৎসব হত। শংকর এসে অবধি সে সব কিছুই দেখেনি। বিশেষ বিশেষ পার্বণে বাড়ির বউয়েরা উপোস করে, ঘট পূজা করে। নৈবেদ্যের পাত্রগুলো দেখলেই দারিদ্রের ছবিটা আর অস্পষ্ট থাকে না।

বাইরের উঠোনের বাঁ দিকে একটি বড় জামরুল গাছ। আটচালার পাশ দিয়েই, ভিতর বাড়িতে ঢোকার মুখে, শংকরের মাটির দোতলার ঘর। বাড়ির ভিতরেও সামনে পিছনে দুটো উঠোন, চারপাশে যখন যেমন প্রয়োজন ঘর তোলা হয়েছে। সবই শরিকানায় ভাগাভাগি। ভিতর বাড়িতে ঢোকার একটি হঁটের পাঁচিলের গায়ে একটা দরজা ছিল। বাড়ি ঘিরেও ছিল ইঁটের পাঁচিল, যদিও ঘর সবই মাটির আর খড়ের চালের। কিন্তু ইটের পাঁচিল এখন নানা জায়গায় ভেঙে পড়েছে। দরজার কাঠের পাল্লা দুটো নেই।

শংকরের একটাই সৌভাগ্য, তাকে ভিতরে বাড়িতে ঢুকতে হয় না। তার ঘরে ঢোকার দরজা বাইরের উঠোনের দিকে। আসলে আটচালা সংলগ্ন, শংকরের বর্তমান মাটির দোতলাটি আগে মুখুজ্জেদের বৈঠকখানা ছিল। নীচের ঘরে বাড়ির কর্তা বৈঠক করতেন, বিশ্রামের সময় ওপরে যেতেন। কিন্তু সে কর্তাও নেই। সে দিনকালও নেই। দোতলা বৈঠকখানা ঘরটি এখন মুখুজ্জেদের তিন শরিকের সম্পত্তি। শংকর পনেরো টাকা ভাড়া দেয়। কিন্তু তিন শরিককে আলাদা আলাদা পাঁচ টাকা করে দিতে হয়। দেবতোষই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তাও, প্রথমে শংকরকে ভাড়া দিতে আপত্তি ছিল, কারণ সে কায়স্থ, শালচিতির ব্রাহ্মণদের ভাষায় শুদ্দুর। আপত্তির কারণটা অবিশ্যি, গ্রাম সমাজের ভয়। দিনকালের আধুনিকতা, জাতপাতের বড় বড় যত কথাই হোক, গ্রামের বাইরের চেহারার পরিবর্তন। হলেও, ভিতরের চেহারার পরিবর্তন উনিশ-বিশ। তবে, প্রস্তাবক ছিল স্বয়ং দেবতোষ চাটুয্যে, গ্রামের একজন মাতব্বর, জমিদার বাড়ির ছেলে। শংকর যুবক হলেও, সে যে একজন শিক্ষিত মানুষ, এটা সে বোঝাতে পেরেছিল। তা ছাড়া, পনেরোটা টাকাও কম না।

শংকরের সেই প্রথম গ্রামের অভিজ্ঞতা। মাটির ঘরের দোতলা হতে পারে, তাও ওর জানা ছিল না। মাটির সিঁড়ি, বারো ধাপে তিনটি বাঁক। এমনকী জানালাও আছে। খুব ছোট দুটো জানালা। কিন্তু আলো আসে, বাতাসও আসে। দরজা বন্ধ করে দিলে নীচের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক থাকে না। এমনকী, ঘরের এক কোণে ছোটখাটো প্রাকৃতিক কর্মের জায়গাও আছে। কিন্তু শংকর রাতবিরেতেও কখনও সেই প্রাকৃতিক আগারটি ব্যবহার করতে পারে না। কেন না ওটার কোনও আড়াল নেই, যাকে বলা যায় অ্যাটাচড ইউরিনাল। সে রকম প্রয়োজন হলে, ও দরজা খুলে বাইরেই যায়। যদিও গ্রীষ্মকাল ছাড়া, ওপরের ঘরে ও কখনওই রাত্রি বাস করে না। বর্ষাকালে খড়ের চাল দিয়ে জল চুঁইয়ে পড়ে। নীচের ঘরে তা পড়ে না। তবে, বাথরুম পায়খানা বলতে যা বোঝায়, তার কোনও অস্তিত্বই নেই।

শংকর প্রথম যখন এসেছিল, রীতিমতো সংকটে পড়ে গিয়েছিল। বাড়ির কাছে পিঠেই দুটো ডোবা ও বাঁশঝাড় আর আঁকুড় গাছের ঝোঁপ ঝাড়। মেয়ে পুরুষরা ভাগাভাগি করে, প্রাতঃকৃত্যাদির জন্য সেখানে যাতায়াত করে। শংকরের পক্ষে সেটা ছিল অসম্ভব। সত্তরের দশকেও গ্রামে ওই রকম প্রিমিটিভ ব্যবস্থা থাকতে পারে, কলকাতার কৈশোরের ও যৌবনের প্রারম্ভে নিজেকে গ্যারিবন্ডি স্বপ্নে দেখা, যুবকটি ভাবতে পারেনি। সে সংকট থেকে উদ্ধারের পথটা ও নিজে আবিষ্কার করতে পারেনি। এ মুখুজ্জে বাড়িরই বড় তরফের সেজো ছেলে গজানন ওকে পথ বাতলে দিয়েছিল, শুনেন ক্যানে মাস্টারবাবু, উ সব গড়া ডোবার ধারে আপনি যেতে পারবেন নাই। আপনি উত্তর বাগে চিতির ধারে জঙ্গলে চল্যে যান। টুকুস হাঁটতে হবে বটে, তবে শান্তিতে কাজ সারতে পারবেন।

গজাননের উপদেশ খুবই কাজে লেগেছিল। কেবল প্রাকৃতিক কাজ না, জায়গা বুঝে, চিতির বিস্তার যেখানে চওড়া, জল কিছু গভীর, শংকর সেখানে একেবারে স্নান সেরে ফিরে আসে। প্রাতঃভ্রমণ থেকে শুরু করে, স্নান, এখন বেশ ভালই লাগে। গ্রাম জীবনের এ অভিজ্ঞতাটা এখন খারাপ লাগে না। আটত্রিশ বছরের জীবনে, অনেক পরিবর্তনের মধ্যে, এ পরিবর্তনটা এখন আর ওকে বিচলিত করে না। কেবল মানিয়ে নেওয়া না, বরং ভালই লাগে।

মল্লিকার কাছে পরিচয় পেয়ে, দেবতোষ শংকরকে অনুরোধ করেছিল, তাদের বাড়িতে থাকতে। শংকর বিনয়ের সঙ্গে তা অস্বীকার করেছে। বলেছে, দেবতোষবাবু, চাকরির ব্যাপারে আপনি আমাকে যাচাই করে নিয়েছেন, আমার নিজেকেও একটু যাচাই করতে দিন। এতকাল কেবল গ্রামের কথা শুনেই এসেছি, আর অনেক বড় বড় কথা বলেছি। দেখি না, আমিও আর দশজন গ্রামের বাঙালির মতো জীবনটাকে কাটাতে পারি কি না। আপনি মল্লিকাকেও একটু বুঝিয়ে বলবেন।

দেবতোষ তথাপি নানা কথা বলেছিল। মল্লিকার মুখে শংকরের অতীত জীবনযাপনের কথা শুনে, সহজে ছাড়তে চায়নি। তথাপি ছাড়তে হয়েছিল। শংকরের স্বভাবসিদ্ধ হাসি ও নম্রতার মধ্যে একটা দৃঢ়তা ছিল। দেবতোষ আর মল্লিকা, দুজনেই তা বুঝেছিল।

শংকর টর্চ লাইট জ্বেলে, নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতেই, ভিতর বাড়ির মেয়ে পুরুষ শিশুদের নানা স্বর শুনতে পেল। এ সময়ে বাড়ির পুরুষেরা অধিকাংশই বাউরিপাড়া থেকে একটু মেজাজ শরিফ করে ফিরে আসে। কেউ কেউ দেরিতেও ফেরে। ঝগড়াঝাঁটি, হাসি, মাতালের প্রলাপ, শিশুর কান্না, সব মিলিয়ে এই সময়টা বাড়ির ভিতর মোটামুটি বেশ সরগরম থাকে। তবে বেশিক্ষণ না। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই, অর্থাৎ রাত্রি নটা বাজার আগেই, গোটা বাড়ি নিঝুম হয়ে যাবে।

শংকর অন্যান্য দিন যখন ফেরে, রাত্রি ন’টার পরে ফেরে। বাড়ির ভিতরটা তখন নিশ্ৰুপ থাকে। কারণ বেশিক্ষণ বাতি জ্বালিয়ে রাখার মতো বিলাসিতা প্রায় কোনও শরিকেরই নেই। ভোরের অন্ধকারেই আবার সবাই জেগে ওঠে। শংকর আটচালার পাশ দিয়ে, ভিতর বাড়ির দরজার পাশেই, ওর নিজের ঘরের দাওয়ায় টর্চের আলো ফেলল। তার আগেই ওর চোখে পড়েছে, দাওয়ার ওপরে ঘরের দরজার কাছে, টিম টিম করে একটা চৌকো লণ্ঠন জ্বলছে। লণ্ঠনের পাশে, প্রায় কাঁথার মতো মোটা কিছু গায়ে জড়িয়ে যে মূর্তিটি বসে ছিল, টর্চের আলোয় তাকেও চিনতে পারল। টর্চের আলো না থাকলেও, গজাননকে চিনতে অসুবিধা হবার কথা না। এ সময়ে গজানন রোজই তার ঘরের দরজার সামনে বসে থাকে। শংকর নিজে কোনও দিন ঘরে তালা লাগাবার কথা না ভাবলেও, গজানন ছাড়বার পাত্র না। তার এক কথা, আপনার কি মাথা খারাপ হঁইচে মাস্টারবাবু, ঘর খোলা রেখ্যে বাইরে যাবেন?

শংকর হেসে বলেছিল, আমার আর চুরি যাবার ভয় কী আছে গজানন। জামাকাপড়?

জামাকাপড়?’ গজানন তার তিরিশ-বত্রিশ বছরের অকাল বার্ধক্যের কালো মুখ কুঁচকে বলেছিল, মায় গামছাটা পর্যন্ত শালারা লিয়ে লিবেক, একটা ছুঁচো ইঁদুরকেও বিশ্বাস নাই। তা ছাড়া, টাকা পয়সা কুথা রাখবেন? টাকে বেঁধে লিয়ে তো ঘুরবেন নাই? আপনার উ বাসো ভেঙে সব লিয়ে যাবেকগা।

শংকরের সে ভাবনাটা নেই, কারণ ইস্কুলের মাইনে পাবার পরে, সব টাকাটা পোস্ট অফিসে জমা থাকে। নিজের খরচের জন্য যৎসামান্য টাকা ওর নিজের কাছেই থাকে। খরচের মধ্যে সকালবেলার চা মুড়ি। সস্তা দামের দু-তিন প্যাকেট সিগারেট আর দেশলাই, বাকি টুকটাক সামান্য খরচ। যেমন স্বয়ং এই গজাননের জন্যই দৈনিক চার-আট আনা বরাদ্দ আছে। যে বাউরি বুড়ি রুকুদিদি ঘর দরজা আঁটপাট দিয়ে মোছে, তার মাস মাইনে আট টাকা ছাড়াও, মাঝে মধ্যে দু-এক টাকা দিতে হয়। সংসারে কারোরই। যেমন প্রয়োজনের শেষ নেই, রুকুদিদিরই বা থাকবে কেন?

তবে খাবার জলটা গজানন নিজেই এনে দেয়। শংকর হলই বা কায়স্থের ছেলে, তা বলে বাউরির হাতের জল তো খাওয়া চলে না। অতএব শুদুর’ শংকরের খাবার জলটা গজানন মুখুজ্জে নিজেই টিউবওয়েল থেকে এনে দেয়। প্রথম দিকে শংকরকে ব্রাহ্মণ বাড়িতে ঘর ভাড়া দিতে যে প্রতিরোধটা ছিল, সেটা নিতান্তই গ্রামের মুখরক্ষার জন্য। এখন এই মুখুজ্জে বাড়ির সব শরিকই মোটামুটি শংকরের প্রতি প্রসন্ন। জাতপাতের কথাটাও কেউ তোলে না।

কিন্তু গজানন যে কেমন করে প্রথম থেকেই শংকরের এক রকমের অভিভাবক হয়ে উঠেছিল, শংকর নিজেও খেয়াল করেনি। রুকুবুড়ির ঘর সাফ করা হয়ে গেলেই, আর সব দায়দায়িত্ব গজাননের হাতে। এমনকী ঘরের তালার চাবিও গজানন নিজের কাছে রাখে, এবং শংকরকে কোনও দিনই ঘরে ঢুকতে অসুবিধা ভোগ করতে হয়নি।

কী করে যে গজাননের সংসার চলে, শংকর ভেবে উঠতে পারে না। শরিকি ভাগাভাগি তো আছেই, তা ছাড়াও নিজেদের ভাইয়ে ভাইয়ে আলাদা। গজাননের মুখেই শুনেছে, তার ভাগে পৌনে চার বিঘা জমি আছে। কিন্তু পরিবারটি তার এ বয়সেই, ছেলেমেয়ে নিয়ে আধ ডজনে দাঁড়িয়েছে। পৌনে বিঘায় একটি গোটা পরিবারের সারা বছর কেমন করে চলে, শংকর ভেবে উঠতে না পারলেও, চোখের সামনেই দেখছে। তাও গজানন বলে, মাস্টারবাবু, মা সিদ্ধেশ্বরীর কী কিরপা গ, ভাগ্যে শালা জমি আমি বর্গা দেই নাই। দিলে, ই বারে ল্যাংটা হয়ে, মাথা চাপড়ে মরতে হতো। মজুরি দিয়ে চাষ করাই, নিজেও খাঁটি, তাই রক্ষা।

শংকর জানে, তা ছাড়াও গজানন বসে থাকার লোক না। হাটে বাটে নানা রকমের কেনাবেচা করে। অবিশ্যি নিজের কোনও ব্যবসা নেই, পরের হয়ে খাটে। তাতে কিছু জোটে। আর শংকরের কাছ থেকে। চার আনা আট আনা পায়, সেটা খরচ হয় বাউরিপাড়াতেই। আধপেটা, এমনকী উপবাসেও চলতে পারে, ওই দ্রব্যটি না হলে চলে না। শংকর লক্ষ করেছে, এটা প্রায় ঘরে ঘরেই চলে। বিশেষ করে, জাতপাত বাদ দিয়ে দরিদ্রদের মধ্যে মদের ওপর ঝোঁকটা বেশি। এটা কেবল গ্রামে না, শংকর শহরের শিল্পাঞ্চলেও একই চিত্র দেখেছে। হতাশা, অসহায়তা হয়তো এর মূল কারণ। গজাননের ভাষায়, ওই দ্রব্যটি খিদেও মেটায়, উ সব আপনি বুঝতে লারবেন। তবে চোলা মূলার থেকে, হাড়িয়া ভাল। লঙ্কা পুড়িয়ে নুন মাখিয়ে, এক পাত্তর খেলে, একটা বেলা পেটে দম থাকে।

অবিশ্যি গজাননকে পয়সা দেওয়াটাও শংকরের একটা সংকটের বিষয়। কারণ প্রায়ই তার বউ এসে দাবি করে, পয়সাটা গজাননকে না দিয়ে তার হাতে দেওয়াই উচিত। এ উচিত অনুচিতের বিচার করা শংকরের পক্ষে অসম্ভব। মাঝখান থেকে গজাননের বউও একজন দাবিদার হয়ে উঠেছে। ফলাফলটা ভাল হয়নি। কারণ মুখুজ্জে বাড়ির সকলেরই এমন একটা মনোভাব আছে, শংকরের কাছে হাত পাতলে কিছু পাওয়া যাবে। শংকর সে রকম গৌরীসেনের ভূমিকা নিতে পারে না। অতএব, মুখুজ্জে বাড়ির সকলের কাছে তার সমান কদর নেই।

শংকর গজাননের ওপর থেকে টর্চের আলো সরিয়ে জিজ্ঞেস করল, কতক্ষণ গজানন?

 অনেকক্ষণ গ মাস্টারবাবু। গজাননের স্বর বেশ জড়ানো, এক বার থানার দিকে গেইছিলাম, আপনাকে দেখতে পাই নাই। বুইতে পারলাম, আপনি তালে চাটুয্যে বাড়িতে পড়তে চলে গেইচেন, একেবারে খাওয়া সেরে ফিরবেন।

না, আজ আর পড়ানো হয়নি, খেয়েই এসেছি। শংকর দাওয়ায় উঠল।

গজানন লণ্ঠনটার সলতে একটু বাড়াল। কিন্তু অন্ধকার তেমন সরল না। সে দাঁড়িয়ে লণ্ঠনটা তুলে, শংকরের দিকে আধবোজা লাল চোখ মেলে বলল, আপনার নাকি খুব চোট লেগেছে শুনলাম?

গজানন বাঁ হাতে লণ্ঠন নিয়ে, ডান হাতে জামার পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুলে দিল। সে জানে, শীতের সময় শংকর নীচের ঘরেই শোবে। শংকর টর্চ লাইট জ্বালিয়ে ঘরের মধ্যে ফেলল। গজানন আগে ঘরে ঢুকল। মোটা কাঁথার ঢাকার নীচে জামার পকেট থেকে দেশলাই বের করার শব্দ হল। কোথায় হ্যারিকেন থাকে, গজাননের তা জানা। সে দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে, হ্যারিকেন জ্বালাল। তারপরে শংকরের দিকে তাকাল, বলল, ই বাবা, ই যে দেখছি কপালে মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা? আর আপনি বলছেন, কিছুই হয় নাই?

শংকরের সামান্য একটি আলনা, একটি খাঁটিয়া, একটি সুটকেস আর টিনের তোরঙ্গ, আসবাব বলতে এই আছে। জলের কুঁজো, গেলাস, দুই-একটি থালা বাটি গেলাস, চা চিনি মুড়ির কৌটাবাটা। সে গজাননের কথার কোনও জবাব না দিয়ে, টর্চটা খাঁটিয়ার ওপর রেখে, গায়ের চাদরটা খুলে আগে আলনায় রাখল। তারপরে বলল, গজানন, আজ আর কথাবার্তা বলতে ভাল লাগছে না, এখন আমি শুয়ে পড়ব। তুমি এখন যাও, কাল কথা হবে।

গজানন বলল, তা হবেক, কিন্তুক বিস্তর কথা শুন্যে এলাম মাস্টারবাবু। সে সব কথা আমার পেটের মধ্যে গজগজ করছে।

শংকর জানে, কী কথা। বদির বউকে টাকা পাইয়ে দেওয়া ইত্যাদি বিষয় ছাড়া, আজ আর কোনও কথা থাকতে পারে না। শংকর বলল, পেটের গজগজানিটা আজ কোনও রকমে সামলাও, কাল সব দেখা হবে।’

এমন সময় বাইরের দাওয়ায় কার পায়ের শব্দ শোনা গেল। শংকর মুখ ফিরিয়ে দেখল, গজাননের স্ত্রী। কিন্তু সে একা না, তার পিছনে গজাননের বড় দাদার একুশ-বাইশ বছরের অবিবাহিতা মেয়ে ললিতার মুখও অস্পষ্ট দেখা গেল। গজাননের স্ত্রী চণ্ডীকে নিয়ে শংকরের তেমন দুশ্চিন্তা নেই, কিন্তু ললিতাকে দেখে ও মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠল। বলল, গজানন, এখন সবাইকে যেতে বলল, আমি দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ব।

গজানন কিছু বলবার আগেই, চণ্ডীকে পেরিয়ে ললিতা ঘরের ভিতর এক পা বাড়িয়ে দিল, বলল, তাড়িয়ে দিচ্ছেন ক্যানে মাস্টারবাবু, একটু দেখে যাই। খবরটা শোনা ইস্তক ছটফট করছিলাম।

ললিতার কথাবার্তার ধরনই এ রকম। একটা বিদ্রোহের ভাব আছে, এবং কথা তার চোখে মুখে। শংকরের জন্য তার মাথাব্যথাও একটু বেশি, আর সে মাথাব্যথা সে কারোকে লুকিয়ে দেখায় না। আবার বলল, বড়লোক চাটুয্যে বাড়িতে সেবাটা না হয় ভালই ইচে, আমরা কি একেবারে পর? একটু দেখতেও আসব নাই? কী বলো গো খুড়ি?

খুড়ি চণ্ডী কেবল বলল, দুশ্চিন্তা হয়।

গজানন বলল, ওই গ ললি, মাস্টারবাবুকে ইবারে শুত্যে দে, কাল যা দেখবার দেখিস।’ কিন্তু ললিতার নড়বার লক্ষণ দেখা গেল না।

.

শংকর জানে, ললিতা এক বার যখন ঘরের ভিতর পা বাড়িয়েছে, সে সহজে নড়বে না। দেখতে সে রূপসী না, কিন্তু কালো রঙের দীর্ঘ শরীরে, স্বাস্থ্যের দীপ্তিতে একটা ঔদ্ধত্য আছে। চোখ দুটি তেমন বড় না, উজ্জ্বল কালো চোখের তারায় এক রকমের খরতা আছে। সেই খরতা কেবল বিদ্রোহ বিবাদে না, বিদ্রুপে হাসি ঠাট্টায় এবং এমনকী লাস্যেও রীতিমতো ঝলক দেয়। চোখা নাক, ঈষৎ পুষ্ট ঠোঁট, সব মিলিয়ে মুখে একটা চটক আছে। সেই চটকের সঙ্গে আছে একটা প্রখর্য, যা ওর শরীরের ঔদ্ধত্যের সঙ্গে মানিয়ে গিয়েছে। হাসলে খারাপ দেখায় না, রাগলে উগ্রচণ্ডী। এমনিতে সহজে রাগে না। ওর কথাবার্তাই একটু ধারালো। পাড়ার মেয়ে বউয়েরা ওকে সহজে ঘাঁটায় না। কোনও কারণে রেগে গেলে, ললিতা ওর বাবা মা দাদাকেও মানে না। মুখে যা আসে, তা বলে দেয়। তবে বাবা মায়ের ভাষাও, কন্যার সঙ্গে বিবাদের পক্ষে আদৌ ভব্যতার ধার ধারে না। ওর বড় দাদাটির ভাষা আরও খারাপ। নিজের বোনকে বাউরি মাগি’ বলতে তার মুখে আটকায় না। তবে, ললিতা ছাড়বার পাত্রী না। দাদার মুখে ও রকম গালাগালির জবাবে, হাতে ওর খাড়ার বদলে বঁটি ওঠে। শংকর সে-মূর্তি দু-একবার দেখেছে।

দাদার বয়স গজাননের কাছাকাছি। বিয়ে করেছে, এবং ইতিমধ্যেই তিনটি সন্তানের জনক। নিজের বোনকে মুখে কোনও খারাপ কথা বলতে যেমন আটকায় না, তেমনি ভয়ও আছে। ললিতাকে সে মনে প্রাণে ভয় করে। ললিতা যখন বঁটি হাতে এগিয়ে আসে, তখন সে বাড়ি থেকে ছুটে পালায়। শংকর মুখুজ্জে বাড়ির অন্দরমহলে কখনও না ঢুকলেও, এটা বুঝতে পারে, ললিতার বউদি এমনিতে চুপচাপ থাকলেও, যুবতী ননদের বিরুদ্ধে স্বামীকে তাতানোর ব্যাপারে তার হাত আছে।

ললিতার এক দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আরও দুটি দাদা আছে। তাদের সঙ্গে ললিতার তেমন ঝগড়া-বিবাদ নেই। কারণটা বোধ হয়, তারা এখনও বিয়ে করেনি। বরং তাদের নিজেদের মধ্যে বিবাদ আছে। সেই বিবাদের পিছনে রয়েছে, গ্রামের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দলাদলি। দুই দাদা দুই দিকে।

সেই হিসাবে বিচার করতে গেলে, মুখুজ্জে বাড়িতে ঝগড়া-বিবাদ রোজকার ঘটনা। কখন কোন ঘরে, বা কোন শরিকে, কী কারণে ঝগড়া লাগবে, কেউ বলতে পারে না। ঝগড়া-বিবাদের সময় তারা নিজেরা চিৎকার করে এঁকে, ই কি বাউরি বাড়ি পাইচিস, যা মুখে আসবে, তাই বুলবি?’…যত মন্দ, সবই বাউরিদের। অথচ বাউরিপাড়ায় যারা ঝগড়া-বিবাদ করে, তারা গ্রামের মাতালের দল। এ মুখুজ্জে বাড়ির পুরুষরাও তা থেকে বাদ যায় না। সারা দিন বাউরিপাড়ায় একটা লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। সকলেই যে যার কাজে, হাটে বাজারে মাঠে পেটের দায়ে দৌড় ঝাঁপ করে বেড়ায়। সন্ধ্যার পরে তাদের ঘর সংসারের কাজ। শরীরও থাকে অবসাদগ্রস্ত। তবু ঝগড়াঝাটি হয় না, এমন না। তাদের ঝগড়া তাদের মতোই হয়। কিন্তু ভদ্রলোক বলে যারা পরিচয় দেয়, তাদের ঝগড়ার ভাষা বাউরিদের থেকে নিকৃষ্ট। তবুও বাউরিদের তুলনাটা না দিয়ে পারে না।

ললিতার বিবাদের ভাষা সেই রকম নিকৃষ্ট না। কিন্তু হাসি বা রাগের, যে কোনও কথার ধার বড় বেশি। পাড়ার মেয়ে বউরা সহজে তাকে ঘাঁটায় না, বরং কিছুটা ভয়ে-ভক্তিতে মানিয়ে গুনিয়ে চলে। অনেকের সঙ্গে ভাব ভালবাসা, সই মিতেনি চোখের বালি পাতানোও আছে। তথাপি, সবাই সমান না। কখনও কখনও কারও সঙ্গে লেগে গেলে আর রক্ষা নেই। ললিতার প্রতি শংকরের আকর্ষণ, বিকর্ষণ কোনওটাই নেই। কিন্তু পাড়ার কারও সঙ্গে বিবাদের সময় ওর মনে হয়েছে ললিতা পা বাড়িয়ে ঝগড়া করতে যায় না। সাপের ল্যাজে পা দিলে, সাপ যেমন ফোঁস করে ওঠে, ঘটনা ঘটে সেই রকম। কারণটাও বুঝতে অসুবিধা হয় না। ললিতার রূপ না থাক, একটা চটক আর স্বাস্থ্য আছে। নম্রতা তার আচার আচরণে কোথাও নেই, বরং হেসে দাপিয়ে রঙ্গিণী হতে পারে। অতএব, তার দেমাকটাই চোখে পড়ে। যাদের মাথায় এক বার বিধে গিয়েছে, ললিতা দেমাকি, তাদের সঙ্গে বিবাদ লেগেই আছে।

শংকর আরও অনুমান করতে পারে, ললিতাকে নিয়ে ঘরের বিবাদের কারণটা, ওর বয়স আর পাত্রস্থ না করতে পারার পারিবারিক সংকট ও উদ্বেগ। এর মূল সূত্র দারিদ্র ও অর্থাভাব, কোনও সন্দেহ নেই। একুশ বছর বয়সটাকে এখন আর অরক্ষণীয়া বলা চলে না, কিন্তু শহরে বা গ্রামে, সর্বত্রই। বিবাহযোগ্যা মেয়ে, মধ্যবিত্ত পরিবারে চিরকালই গলার কাঁটা। ললিতার এটাও একটা অপরাধ, এখনও কেন ওর বিয়ে হচ্ছে না। এত গরিবের ঘরের মেয়ের বিয়ে হচ্ছে, ললিতার কেন হয় না? অতএব, ললিতার নিজের দুর্ভাগ্যই বেশি দায়ী। এ কথা ওর বাবা মা দাদা, কেউ বলতে কসুর করে না। অথচ এ দুর্ভাগ্যের দায় ললিতা স্বীকার করতে চায় না। ও জানে দায়টা বাবা মা দাদারই।

ললিতা যদি ভীরু শান্তশিষ্ট মেয়ে হত, তা হলে হয়তো ঘরের কোণে বসে কাঁদত। নিজের ভাগ্যের জন্য নিজেকে দায়ী করে মৃত্যু কামনা করত। কিন্তু যে সব কটুক্তি আর অপমানকর কথা ওকে শুনতে হয়, চুপচাপ সে সব হজম করার পাত্রী ও না। মধ্যবিত্তের দারিদ্র যখন তার চরিত্রকে নিম্নগামী করে, সে যে কোনও পঙ্কে নামতে পারে। ললিতার প্রতি ওর বাবা মা দাদার কটুক্তির মধ্যে এমন ইঙ্গিতবাচক কথাও থাকে, এত বড় ধিঙ্গি মেয়ে তার নিজের পথ নিজেই দেখে নেয় না কেন। ইঙ্গিতবাচক কথাগুলোর ভাষা অবিশ্যি শেষ পর্যন্ত আর ইঙ্গিতবাচক পর্যায়ে থাকে না। অশ্লীল আর কদর্য হয়ে ওঠে। ললিতা বুনো ওলের বাঘা তেঁতুলের মতো সে সব কথার জবাব দেয়।

শংকরের ললিতার প্রতি আকর্ষণ-বিকর্ষণ কিছু না থাকলেও, ও যে চুপ করে অপমান সহ্য করে না। এতে ওর পূর্ণ সমর্থন আছে। এবং সেই সঙ্গেই, আপাত চোখে মুখরা দজ্জাল মেয়েটির প্রতি একটা করুণা বোধও ওর মনে আছে। হয় তো তা থাকত না, ললিতার চরিত্রের মধ্যে যদি কোনও মালিন্য বা হীনমন্যতা থাকত। ও নষ্ট চরিত্রের মেয়ে না, অথচ নষ্ট হবার সুযোগ রয়েছে ওর চারপাশে। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে, ললিতা ঘরে বাইরে এক বিরুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে।

শংকরের একমাত্র অস্বস্তি, ওকে নিয়ে ললিতার মাথাব্যথা। পারলে, গজাননের দায়িত্বটা ললিতা নিজের হাতেই নিত। কিন্তু না নিয়েও, ওর ছোট খুড়ো গজাননের ওপর যথেষ্ট প্রতিপত্তি আছে। প্রয়োজনে, গজাননের বিশেষ কোনও কাজ পড়ে গেলে, শংকরের ঘরের চাবি ললিতাকে দিয়ে যায়। কারণ নিজের স্ত্রী চণ্ডীর থেকেও, ভাইঝি ললিতার ওপর তার আস্থা বেশি। চাবির জন্য ললিতাকে খুঁজতে যেতে হয় না। গজাননের মতোই সে শংকরের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু শংকরের অস্বস্তি বাড়ে। সে কথাটা খুড়ো-ভাইঝি কেউ বুঝতে চায় না।

ললিতাকে দায়িত্ব দেওয়া না থাকলেও রুকুবুড়ির কাজের দেখাশোনাটা ও নিজে থেকেই নিয়েছে। এমনিতেও সকালে বিকালে, ইস্কুলের ছুটির দিনে, অন্যান্য সময়ে, ললিতা শংকরের ঘরের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। নিজের মুখ ফুটেই সে জানিয়েছে, শংকরের সকালবেলার চা নিজের হাতে তৈরি করে দিতে চায়। শংকর কোনও দিনই তা দেয়নি। মুখুজ্জে বাড়ির শরিকদের ভয় তো আছেই। তা ছাড়া, নিজের হাতে চা তৈরি করে খেতে সে ভালবাসে। কিন্তু ললিতা ছাড়বার পাত্রী না, বলে, চা বানাইতে দিবেন নাই ত, আপনার হাতের চা খাওয়াতে হবে।

শংকরের না দিয়ে উপায় থাকে না। তা ছাড়া, প্রায় রোজই ললিতা শংকরের কাছে পয়সা চেয়ে নিয়ে, দেবীর মোড়ের তেলেভাজা দোকান থেকে তেলেভাজা কিনে নিয়ে আসে। শংকরকে দেয়। নিজেও ভাগ বসায়। যেমন ভাগ বসায় চা মুড়িতে। শংকরের সকালের খাবারে, বিলাসিতার মধ্যে ডিমভাজা থাকে। ললিতা তাতে ভাগ বসায় না। শংকর বোঝে, ললিতার চায়ের লোভটা আসল না, এক বার না এসে পারে না। ওদের ঘরে চা খাওয়া হয় অনেক সকালে।

শংকর তার অস্বস্তির কথা ললিতাকে বলেছে। ললিতার জবাব, ক্যানে, চুরি করে তো আপনার সঙ্গে ভাব জমাতে আসি নাই। আপনার অসোয়াস্তির কী আছে। একটা নিপাট ভালমানুষের কাছে আসতে ইচ্ছা করে, তাই আসি। লোকে যা খুশি তা বলুক, উয়াতে আমার কিছু যায় আসে না।

শংকর ললিতার সঙ্গে কথায় পারে না। হাল ছেড়ে দিয়েছে। যথাসম্ভব নির্বিকার থাকলেও ললিতা ওর নিজের মতোই যাওয়া-আসা করে। তবে, সময় কম, এবং দিনের বেলাতেই যা একটু যাতায়াত করে। রাত্রে কখনও আসে না। আজকের ঘটনাটা অবিশ্যি আলাদা, গজাননের স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে, বোধ হয় আগে থাকতেই আসবার জন্যে প্রস্তুত হয়েছিল। ললিতার কথাবার্তার মধ্যে এমনিতে কোনও তিক্ততা নেই। কিন্তু চাটুয্যে বাড়ির সম্পর্কে, শংকরকে খোঁচা না দিয়ে পারে না। শংকরের কাছে এখন সেটা, গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে।

গজাননের কথা শুনেও, ললিতা ঘরের মধ্যে ঢুকে বলল, মাস্টারবাবুকে জেগ্যে বসে থাকতে হবে নাই, ই ত আর বাসর ঘর লয় ওঁকে শুতে দিব নাই? একটা মন্দ কথা শুনলাম, সবাই বলা কওয়া করছে, আমাদের বাড়ি মানুষটা থাকে, একটা খবর লিব নাই? কী বল গো ছোট খুড়ি?

গজাননের স্ত্রী চণ্ডী বলল, নিজেদের লোকের মন্দ খবর শুনলে, মন ঠিক রাখা যায় নাই।

শংকর বলল, তা বেশ তো, খবর যা পাবার তা তো আগেই পেয়েছ। এখন আর কী দরকার?

মাস্টারবাবু আমাদের উপর রেগ্যেই আছে৷’ ললিতা বলল, একটা খবর লিতে এল্যে কি তাড়িয়ে দিতে হয়? আমাদের কি জানতে ইচ্ছা করে নাই?’ বলে এক বার পিছনে চণ্ডীর দিকে দেখে নিয়ে আবার বলল, তায় আবার যখন কানে এল্য, গাড়িঅলা লোকটা নাকি মাস্টারবাবুর বন্ধুর ভাই, কলকাতার চেনা মানুষ। সে কী কর্যে মাস্টারবাবুকে ধরে মারল্যে?

শংকর একটা সিগারেট ধরিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, কী করে জানলে, আমাকে সে মেরেছে?

ক্যানে, খবর শুনে আমি চণ্ডীতলার মোড়ে গেইচিলাম নাই?’ ললিতা শংকরের দিকে তাকিয়ে বলল, চায়ের দোকানি দুলাল নিজে আমাকে বুলল্যে, গাড়িঅলাটা গাড়ির দরজার ধাক্কা দিয়ে আপনাকে মেরেছে। আপনার গাল কপাল মাথা ফাটিয়ে দিইচে।

শংকর জানল, দুলাল ঘটনাটা ঠিকই দেখেছে, ললিতাও মিথ্যা শোনেনি। কপালের আর গালের সঙ্গে মাথাটাও জুড়ে দিয়েছে। শংকর বলল, তা দিয়েছে। তখন আমার বন্ধুর ভাই আমাকে চিনতে পারেনি। আর আমি তখন না আটকালে, লোকটা পালিয়ে যেত।

তা বুল্যে আপনি নিজের জীবনটা খোয়াইত্যে গেইচেলেন? ললিতার স্বরে উদ্বেগ, লোকটা যদি আপনাকে মেরে ফেলত্য?

চণ্ডী বলে উঠল, কী সব্বনেশে কথা গ বাবা! শংকর বলল, মেরে ফেলা কি এত সহজ? তবে হ্যাঁ, বদির ছেলেটাকে আমি বাঁচাতে পারলাম না।

আর সেই লোককে কিনা আপনি পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলেন? ললিতার খর চোখের তারা দুটো বড় হয়ে উঠল।

গজানন বলল, আর বুল্যে কী, জানচিস রে ললি, মাস্টারবাবু নিকি গাড়িঅলার কাছ থেকে টাকা খেয়্যেচে।

উ কথা আমি মরে গেইল্যেও বিশ্বাস করব নাই ছোট খুড়ো৷ ললিতা ওর স্বভাবসিদ্ধ ঝাঁজালো গলায় বলল, যারা রটাইচে, উ ডেঙরগুলানকে আমি চিনি। কিন্তু আমি অবাক হই, মাস্টারবাবু উ গাড়িঅলাকে বাঁচাত্যে গেলেন ক্যানে? শুনলাম নাকি উয়ার সঙ্গে দুই রোপসী মেয়ে ছিল! ললিতার চোখে সন্দেহের ছায়া।

শংকর হাসল। যার যেমন মন, সে সে-দিকটাই আগে ভাবে। ললিতার ধারণা রূপসীদের মুখ দেখে, সে অপরাধীকে ছেড়ে দিয়েছে। ও বলল, যারা ছিল তারা রূপসী কিনা, ভাল করে তাকিয়ে দেখিনি। তবে পুলিশের সঙ্গে ব্যবস্থা আমি করিনি। তুমি ওই ডেঙর না কী বললে, তারাই করেছে। আমি তখন থানায় ছিলাম না।

অই, শুনচ্য গ ছোট খুড়ো? ললিতার চোখ দপদপিয়ে উঠল, আর হাড়-হাভাতে শয়তানগুলান মাস্টারবাবুর নামে কী সব রটাইচ্যে।’

গজাননের হঠাৎ বীরত্ব জেগে উঠল, সে চিৎকার করে বলল, উ শালারা আমার সামনে কিছু বুলত্যে এল্যে উয়াদের জিভ ছিঁড়ে লিব।

শংকর হেসে বলল, ওদের জিব ছেঁড়া এত সহজ নয় গজানন, তা তুমি ভালই জানো। বেশি কিছু বলতে গেলে, ওরাই তোমার জিব ছিঁড়ে নেবে। তুমি ও সব কথার মধ্যে থাকতে যেয়ো না।

চণ্ডী মুখ ঝামটা দিল, ই, তুমি সব করবে। চুপ কর দি’নি?

ললিতা শংকরের দিকে দু পা এগিয়ে উৎকণ্ঠিত স্বরে বলল, কিন্তু এই যে মুখ মাথা ফাটিয়ে এলেন, এখন কী হবে?

কী আর হবে। শংকর হেসে বলল, হাসপাতালের ডাক্তার সেলাই করে ওষুধ-বিষুধ দিয়ে দিয়েছে। বেশি জ্বালা যন্ত্রণা হলে বা জ্বর-টর এলে, দু-একদিন ইস্কুলে যাওয়া হবে না, এই যা মুশকিল।

ললিতা বলল, মুশকিলের আবার কী আছে? দুটো দিন ঘরে শুয়ে থাকবেন। এমনও লয় দেখবার কেউ নাই। তবে হুঁ, ইয়ার মধ্যে একটা কথা আছে। আপনি অসুখ হয়ে ঘরে শুয়ে আছেন শুনলে, চাটুয্যে বাড়ির মোটরগাড়ি এসে আপনাকে উয়াদের ঘরে লিয়ে যাবে।’

কেন, এ রকম কখনও দেখেছ নাকি, আমার শরীর খারাপ হলে, বা ছুটিতে ঘরে থাকলে, চাটুয্যেদের গাড়ি এসে আমাকে তাদের ঘরে নিয়ে যায়?’ শংকর হেসে বলল।

ললিতা বলল, এ যাবত দেখি নাই, তবে উয়াদের সেবা আপনার ভাল লাগে, লিয়ে গেলেই বা কে কী বুলতে পারে?

এ বিষয়ে ললিতাকে বুঝিয়ে বলে কোনও লাভ নেই। চাটুয্যে বাড়ি সম্পর্কে বরাবরই ওর একটা বিরোধী মনোভাব আছে। সেটা কতখানি গরিব-বড়লোকের কারণে, তা আজও স্পষ্ট করে বোঝা যায়নি। এমনকী, মল্লিকা যে তার পুরনো পরিচিতা কলকাতার মেয়ে ললিতা তা জানে না। জানলে। চাটুয্যে বাড়ির ক্ষেত্রে, শংকরের সম্পর্ককে সে অনিবার্য ভাবেই একটা অন্য রূপ দিত। সে রূপটা মোটেই সুরূপ হত না, বরং একটা কলঙ্কের বোঝা চাপিয়ে দিত। এমনিতেই শংকর অনুমান করতে পারে, চাটুয্যেরা বড়লোক বলে, ললিতার তেমন মাথাব্যথা নেই। ওর আসল মাথাব্যথা, মল্লিকা আর আরতি। ওর কথাবার্তায় ধরনেই অনেক বার বুঝিয়ে দিয়েছে, চাটুয্যেদের ন’ আর সেজো বউয়ের সেবাটাই শংকরের আসল আকর্ষণ।

শংকর তর্ক করে না, হাসে। ললিতার সঙ্গে তর্ক করতে যাওয়া, বিষয়টিকে আরও মূল্য দেওয়া। এমনিতেই ললিতা নিজের মতো যুক্তি সৃষ্টি করতে অদ্বিতীয়া। বাবার শত্রু নেই, এ যুক্তি ললিতার কাছে খাটে না। সে বোবাকেও কথা বলাতে পারে।

শংকর হেসে বলল, গরিব মাস্টার আমি, একটা বাড়িতে পড়িয়ে এক বেলা খাই। এতে সেবার কথা কেন আসে জানি নে। তুমি যদি অন্যত্র একটা ব্যবস্থা দেখে দাও, সেখানেই না হয় পড়িয়ে এক বেলা খাব। অন্য এক বাড়িতে পড়িয়েও তো এক বেলা খাই।’

তবু চাটুয্যে বাড়ি বলে কথা! ললিতা ঘাড় বাঁকিয়ে, চোখের তারা ঘোরাল, শালচিতির জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের সেবা, সে কি সবাই দিতে পারে?

শংকর দুর্বল হেসে বলল, ললিতা তোমার কাছে তো আমি বরাবর হার মেনেই আছি। শরীরটা সত্যি ভাল লাগছে না, এ বার আমাকে শুতে দাও।

হ, শুয়ে পড়েন। ললিতার মুখ গম্ভীর, বিষণ্ণ চোখ শংকরের মুখের দিকে, ই সব কথা বুলতে আসি নাই, আপনাকে দেখতে আইচিলাম। খবরটা শোনা ইস্তক মনটা বড় আনচান করছিল। ভাল মানষের মন্দ করতে অনেকে আছে, দেখি ত। এখন ভগবান করুন, জ্বর যাতনা যেন না হয়। সে পিছন ফিরে ঘরের বাইরে চলে গেল।

গজানন বলল, হুঁ, শুয়ে পড়েন মাস্টারবাবু। দরজাটা বন্ধ করেন। চল ছোট বউ। চণ্ডী ললিতার সঙ্গেই বোধ হয় গিয়েছিল, গজাননের সেটা খেয়াল নেই। সে মাটির দেওয়ালের কুলুঙ্গিতে তালা চাবি রেখে, ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

শংকর একলা ঘরে, সিগারেট টানতে টানতে, এই মুহূর্তে ললিতার কথা ভাবল। মেয়েটা খারাপ না। কিন্তু ঘরে বাইরে কোথাও নিরাপত্তা নেই। এই অসহায়তা ওকে এক রকমের দুর্দমনীয় করে তুলেছে। ভাল ঘরবর-সংসার পেলে, এই ললিতাই সকলের প্রশংসার পাত্রী হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সংসারে কে কবে নিজের যথার্থ স্থান খুঁজে পেয়েছে। কোটিকে গোটিক, চোখে পড়ে না। ললিতার একটা সদগতি হলে, শংকর সুখী হবে।

শংকর সাধারণত সূর্যোদয়ের আগেই বিছানা ছেড়ে ওঠে। পরের দিন ঘুম ভেঙে, চোখ মেলে তাকিয়ে মনে হল, ঘরে আলোর ছড়াছড়ি। গায়ের কম্বলটা সরিয়ে ধড়মড় করে উঠতে গিয়েই, কপালের আর গালের ব্যথাটা রীতিমতো টনটনিয়ে উঠল। তা ছাড়া, মনে হল, সারা গায়েই কেমন একটা ব্যথা ও মাটির দেওয়ালের গায়ে খোলা জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল, বাইরে রোদ দেখে, ও আরও ব্যস্ত হয়ে উঠল। কিন্তু খাঁটিয়ার বিছানা থেকে নামতে গিয়ে অনুভব করল, সারা গায়ে হাতে পায়ে কেবল ব্যথা না, শরীরটা দুর্বলও লাগছে। এবং, শীতটাও যেন অন্যান্য দিনের তুলনায় একটু বেশি লাগছে।

গতকাল রাত্রে আর ধুতি খোলা হয়নি। গায়ের রক্ত-লাগা জামাটা খুলে, গেঞ্জি গায়ে দিয়ে শুয়েছিল। কিন্তু শীতটা বেশি অনুভূত হওয়ায়, খাঁটিয়া থেকে আস্তে আস্তে নেমে, ও আগে আলনা থেকে ঘরে গায়ে দেবার চাদরটা জড়িয়ে নিল। কুলুঙ্গির কাছে রাখা ছোট আয়নায় এক বার মুখটা দেখল। মুখটা কি ফুলেছে? বুঝতে পারল না। কিন্তু চোখের নীচের কোণ দুটো কেমন ফোলা দেখাচ্ছে। মুখে এক দিনের দাড়ি গোঁফে, একটা কালো ছাপ পড়েছে। মাথার সামনের চুল এসে পড়েছে কপালের ওপর বাঁধা ব্যান্ডেজের ওপর।

শংকর ব্যান্ডেজের ওপর থেকে আস্তে আস্তে চুলগুলো সরিয়ে, দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজাটা খুলল। প্রথমেই চোখে পড়ল, রুকুবুড়ির ইতিমধ্যেই দাওয়া ও নীচের সামান্য উঠোনটি নিকানো হয়ে গিয়েছে। নিকানো দাওয়ার ওপর বসে আছে চাটুয্যে বাড়ির বিশ্বস্ত পুরনো লোক হরি। তাকে কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই, খড়ের ঠাকুর দালানের উঠোনে ললিতাকে দেখা গেল। সে রুকুবুড়ির সঙ্গে কোনও কথা বলছে, কিন্তু দৃষ্টি এ দিকে।

হরি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, সেজবাবু পাঠাই দিলেন, কেমন আছেন, দেখতে।

খুব ভাল বুঝিনে। শংকর বলল, তুমি কখন এসেছ?

হরি বলল, তা এঁজ্ঞে অনেকক্ষণ হবে বটে, রোদ উঠবার আগে আইচি। ত দেখলাম, আপনি ঘুমাইচেন, আর ডাকা করি নাই।

ডাকলেই পারতে। শংকর বলল, যাই হোক, তুমি বাড়িতে গিয়ে বলো, শরীরটা তেমন সুবিধের নেই, আজকের দিনটা ভাবছি বিশ্রাম নেব। কিন্তু কেউ যেন ব্যস্ত না হন।

হরি বলল, আমি যেইয়ে খবর দিয়া করচি। ইয়ার পরে বাবু-মায়েরা বুঝবেন, কী করবেন। আমি এখন যাই।

হ এসো৷

হরি ঠাকুর দালানের উঠোনের দিকে এগিয়ে গেল। শংকর ঘরে ঢোকবার আগেই দেখল, রুকুবুড়ির আগে আগে ললিতা এগিয়ে আসছে। সে ফিরে না তাকিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল।

মুখ ফিরিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকতেই, শংকরের মনে হল, মাথাটা যেন ঘুরে গেল। এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে দাঁড়াল। না, যতখানি ভেবেছিল, ততটা কিছু না। মাথা ঘুরে পড়ে যাবার মতো অবস্থা হয়নি। আসলে শরীরটা দুর্বল লাগছে। খাঁটিয়ার বিছানা থেকে উঠতে গিয়েই এ দুর্বলতা অনুভব করেছিল। কিন্তু শীতটা যেন একটু বেশিই লাগছে। থেকে থেকে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। গায়ে একটা ব্যথাও রয়েছে। কপাল আর গালের ব্যথাটা যেন গতকালের তুলনায় কিঞ্চিৎ বেশি অনুভূত হচ্ছে।

কিন্তু শংকর দাঁড়াল না। ঘরের এক পাশে, ছোট এক মাটির মালসায়, ভেজা ন্যাকড়ায় জড়ানো নিমকাটির দাঁতন রয়েছে। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে, নিমকাটি চিবিয়ে দাঁত মাজাটাই ওর প্রথম কাজ। নিমের ডাল কেটে এনে, মালসার মধ্যে ভেজা ন্যাকড়ায় জড়িয়ে রাখাটা গজাননের কাজ। অথচ, কলকাতার একদা অতীত জীবনটাকে যদি গতজন্ম বলা যায়, সেই সময় বাসি মুখ ধোবার আগেই প্রাণটা চা চা করত। এখনও করে, তবে বাসি মুখে না। দাঁত মেজে মুখ না ধুয়ে, চা মুখে তোলবার কথা এখন যেন ভাবতেই পারে না। আগে কী করে বাসি মুখে চা খেত, সে কথা ভাবলে অবাক লাগে।

শংকরের প্রাত্যহিকতার মধ্যে, ভোরবেলা ঘুম ভেঙে এই ভাবেই শুরু হয়। নিমডালের দাঁতন দিয়ে সঁত মাজতে মাজতেই, জনতা স্টোভ ধরিয়ে, ছোট কেতলিতে চায়ের জল বসায়। জামরুল গাছের দিকে, দাওয়ার ওপরে রুকুবুড়ি বালতিতে মুখ ধোয়ার জল রেখে দেয়। শংকর মুখ ধুয়ে এসে, চা তৈরি করে। জনতা স্টোভ জ্বালানো নির্ভর করে কেরোসিন তেলের ওপর। অবিশ্যি সারা দিনে একবার মাত্র স্টোভ জ্বালাতে হয়। চায়ের জল ফোঁটাবার জন্য। তুলনায় রাত্রের দিকে হ্যারিকেন জ্বলে কিছু বেশি সময়ের জন্য। ঘুমোবার আগে, দুপুরে পৌঁছানো কলকাতার দুটো খবরের কাগজ, ইংরেজি আর বাংলা, আর এক বার পড়ে। সারাদিন সময় বিশেষ পাওয়া যায় না। খবরের কাগজ দুটো ইস্কুলে পৌঁছায়। তখন অন্যান্য শিক্ষক সহকর্মীরা কাগজ দুটো নিয়ে টানাটানি করে। খবরের কাগজ ছাড়াও থাকে কিছু বই। সে সব বই প্রধানত দেশি-বিদেশি সমাজতত্ত্বমূলক। ইতিহাসও ওর প্রিয় বিষয়। প্রাচীন এবং আধুনিক, দুই-ই। সমাজতত্ত্বের সঙ্গে ইতিহাসের যোগাযোগ দৃষ্টিকে অনেকখানি দূরগামী করতে সক্ষম হয়। অবিশ্যি সাহিত্যও ওর প্রিয় বিষয়। যাহা পাই তাহা খাই’ গোছের গোগ্রাসী পাঠক না। এক সময়ে ইংরেজি সাহিত্য ছাড়া পড়ত না। এখনও সে অভ্যাসটা একেবারে ত্যাগ করতে পারেনি। কিন্তু আজকাল বাংলা বইও ওর পাঠ্য তালিকার সংখ্যা অনেক বাড়িয়েছে।

সকালে এক বার স্টোভ জ্বালিয়ে চা, রাত্রে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে ঘণ্টা দেড়-দুই পড়া, সব মিলিয়ে কেরোসিনের খরচা এইটুকুই। ওর নিজের চলে যায়। পয়সার জন্য আটকায় না। মাঝে মাঝে গোটা অঞ্চলে কেরোসিনের অভাব দেখা দেয়। তখন শংকরকেও অভাবে পড়তে হয়। সেটা কালে-ভদ্রে। সবাই জানে, কেরোসিনের অভাব নেই। অভাব পয়সার। শালচিতির কোন ব্যবসায়ীর ঘরে কী আছে, গজাননের নখদর্পণে। টাকা পেলেই সে সব কিছু জোগাড় করে আনতে পারে। তবু শংকর একটা কাঠের তোলা উনুনের ব্যবস্থা রেখেছে। সবই অবিশ্যি গজানন আর রুকুবুড়ির ব্যবস্থা। ছোট ছোট আঁটি বেঁধে কাঠকুটোও রাখা আছে। মোমবাতিও কেনা আছে। কাজ চলবার মতো সব ব্যবস্থাই মজুদ।

শংকর ঘরের একপাশে রাখা মালসার থেকে, ভেজা কাপড়ে ভিজানো নিমকাটির দাঁতন তুলে নিল। দাঁত মেজে, চা খেয়ে, সিগারেট ধরিয়ে, গামছা-জামাকাপড় নিয়ে গ্রামের ভিতরের রাস্তা দিয়ে চলে যায় চিতি নদীর ধারে। যাতায়াতের পথে এর ওর সঙ্গে কিছু কথাবার্তা, গ্রামের খবরাখবর লেনদেন চলে। ফিরে এসেই, ছাত্র পড়াতে যেতে হয়। ছাত্র পড়িয়ে, সেখানেই খেয়ে নিয়ে, সোজা ইস্কুলে চলে যায়। কিন্তু আজ সেই প্রাত্যহিকতায়, গোড়া থেকেই গোলমাল। শরীরটা কতখানি খারাপ হয়েছে, বোঝবার আগেই, মুখের ভিতর নিমের ডাল ঢুকিয়ে, কষের দাঁতে চিবোতে গিয়েই, গালের ক্ষতে ব্যথায় টনটনিয়ে উঠল। বিকৃত হয়ে উঠল মুখটা।

কী হল্য গ মাস্টারবাবু?’ দরজার সামনে থেকেই ললিতার উৎকণ্ঠিত স্বর শোনা গেল, দাঁত ব্যথা হইচে কি?’ বলতে বলতে সে ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়াল।

শংকর মুখের ভিতর থেকে নিমের ডাল বের করে, গালের ব্যান্ডেজের ওপর হাত রাখল। বলল, না, দাঁতে ব্যথা হয়নি। দাঁতন চিবোতে গিয়ে দেখছি, গালে লাগছে।’ও নিমের দাঁতনটা চোখের সামনে তুলে দেখল। হেসে বলল, দাতন দিয়ে দাঁত মাজা চলবে না দেখছি।

কিন্তু মাস্টারবাবু, আপনার মুখখানা ফুল্যে উঠেচে, চোখ দুটা ভিতরে ঢুকে গেইচে। ললিতা একেবারে শংকরের সামনে এসে দাঁড়াল, এবং অসংকোচে চিবুকের নীচে গলায় হাত স্পর্শ করে বলে উঠল, অই, যা ভেবেচি, গা বেশ গরম, জ্বর হইছে।’

শংকর দরজার কাছে গিয়ে, নিম দাঁতনটা বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। রুকুবুড়ি দাওয়ায় উঠে এল। এখন খাঁটিয়ার বিছানা গুটিয়ে, ঘর ঝাঁটপাট দিয়ে গোছাবে। সেও নিশ্চয় শংকরের ঘুম ভাঙবার, ও দরজা খোলার অপেক্ষায় ছিল। শংকর বলল, এসো রুকুদিদি। আমার জন্যে আজ তোমার দেরি হয়ে গেল।

তা হক ক্যানে, আমার ত দশ বাড়িতে কাজ করার নাই। রুকুবুড়ির দুই চোখে উদ্বেগ ও বিস্ময়, কাল রাত্তিরেই শুন্যেচি, বদির বিটা গাড়ি চাপা পড়ে মরেচ্যে, তুমারও খোয়র হইবে। কিন্তু তুমাকে এত মার মেরেচ্যে, গোটা মুখে কাপড় বান্দা!

শংকর ঘরের মধ্যে সরে আসতে আসতে বলল, কপালের লিখন রুকুদিদি। তুমি তোমার কাজ করো, আমি স্টোভ জ্বালিয়ে জল গরম করি।’

তার আগে আমি বালতিতে করে টেপা কল থেকে জল লিয়ে আসি।রুকুবুড়ি দাওয়ার অন্য দিকে যেতে যেতে আপন মনেই বকবক করতে লাগল, ভাল মানষের ই কী খোয়র বাবা! দোষ ধান্দা কিছু নাই, মানুষটাকে পিটাই করল্যে। ভগমানের কী বিচার, বুইতে পারি না।..

রুকুবুড়ি রোজ আগে জল আনে। শংকর চা খেয়ে, চিতির ধারে বেরিয়ে যাবার পরে সে ঘর দরজা বন্ধ করে গোছায়। শংকর খাঁটিয়ার বিছানার বালিশের পাশে রাখা দেশলাইটা নিয়ে স্টোভের কাছে এগিয়ে গেল। ললিতা আচমকা শংকরের হাত থেকে দেশলাইটা নিয়ে বলল, ই কাজটি আজ আপনাকে করতে হবে নাই। আপনি খাটে বসেনগা, আমি চায়ের জল চাপাই দিচ্ছি। যেমনটি বুলবেন, তেমনটি করব। গায়ে জ্বর জ্বালা ব্যথা লিয়ে আজও নিজের হাতে সব করতে হবে ক্যানে?

শংকর অস্বস্তি বোধ করল, বলল, আমার কোনও কষ্ট হত না।

জানি৷’ ললিতা স্টোভের সামনে বসে, পলতে বাড়িয়ে তুলল, আপনি সব পারেন। কিন্তু গায়ে জ্বর নিয়ে আপনি চা করে খাবেন, কাছে দাঁড়িয়ে উটি দেখতে পারব নাই। জল কতক্ষণ ফুট খেল্যে, কতটুনি চা দিব, বলে দেন, সেরকমটি করে দিব। তবে, আপনার চা করা আমার জানা হয়্যা গেইচে, না বুলে দিলেও পারব।

ললিতার কাছে থাকাটাই আসল কথা। কাছে দাঁড়িয়ে না দেখতে হলে, কোনও কথা ছিল না। কিন্তু রোজ সকালেই শংকরের চায়ের ভাগীদার হিসাবে ললিতা উপস্থিত থাকে। অতএব কাছে সে থাকতই। বিশেষ করে গতকাল রাত্রের ঘটনার পরে আজ ললিতা বোধ হয় অন্যান্য দিনের তুলনায় আরও সকালে এসে হাজির হয়েছে। শংকর জানে, গতকাল রাত্রে, ললিতা উদ্বেগ নিয়ে ফিরে গিয়েছিল। ও যতই এ জেদি মেয়েটিকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করুক, তাতে কিছু যায় আসে না। একুশ বছরের অবিবাহিতা মেয়েকে এ যুগে, সাবেক কালের অরক্ষণীয়া না ভাবলেও, গ্রামীণ সমাজ-জীবনের একটা দৃষ্টিভঙ্গি আছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে অবিবাহিত যুবক শংকরের ঘরে ললিতার যাতায়াতটা অনেকখানি নীতিবিগর্হিত।

কিন্তু শংকর ললিতাকে কোনও দিনই যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েও নিরস্ত করতে পারেনি। ললিতার এ ঘরে আসা, শংকরকে নিয়ে ভাবনা চিন্তা উদ্বেগ, সবই ওর নিজস্ব ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে কারোর কোনও বাধাকেই ললিতা মেনে নেয়নি। অবিশ্যি ওর বাবা দাদা খুড়ো, কেউ কোনও দিন বাধা দেয়নি। শংকরের মুখে অস্বস্তি ফুটল। নিরুপায় হয়ে, গম্ভীর মুখে খাঁটিয়ায় গিয়ে বসল। বলল, তোমাকে বললেও যখন শুনবে না, তখন কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।

জানেন ত কথা বাড়াইচেন ক্যানে? ললিতা ওর স্খলিত বাসি খোঁপায় ঝাপটা দিয়ে, পিছন ফিরে শংকরের দিকে তাকিয়ে হাসল, আগে কোন দিন কি আপনার ইস্টোভ ধরাইচি, না চা বানাইচি? রোজ আপনার হাতের চা খেয়ে যাই, আজ অসুখ শরীরে আমার হাতে খান।

শংকর বলল, কিন্তু স্টোভটা ধরাবার আগে, এক কেতলি জল বসাও। গরম জলে মুখ ধুয়ে, তারপরে চা খাব। মুশকিল হল, দাঁত মাজা। কোনও মাজন-টাজনও ঘরে নেই যে, দাঁত মাজব।

গুড়াকু দিয়ে দাঁত মাজবেন কি?’ ললিতা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, বলেন তো গুড়াকু ঘর থেকে লিয়ে আসি।

শংকর জানে, এখানে বালক বৃদ্ধ স্ত্রী পুরুষ, প্রায় সকলেই গুড়াকু ব্যবহার করে। সেটা কেবল দাঁত মাজার কারণে না, কিঞ্চিৎ নেশার ব্যাপারও আছে। বস্তুটির মধ্যে তামাকের মিশেল আছে। এ নেশা এ সব অঞ্চলের গ্রামে এমন ব্যাপক, কেবল মাঠে ঘাটে কাজ করা অল্পবয়সি বালকেরাই এর শিকার না, ইস্কুলে অনেক ছেলেও পকেটে গুড়াকুর কৌটা নিয়ে যায়। দশ বারো বছরের ছেলেও বাদ যায় না। বাধা দিয়ে, শাসন করে থামানোও মুশকিল। অনেক শিক্ষকরাও গুড়াকু ব্যবহার করেন। উঁচু ক্লাসের ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষকদের গুড়াকু লেনদেন, শংকর নিজের চোখেই দেখেছে। আসলে, এটাও গ্রাম সমাজের নীতিবোধের ওপর নির্ভর করে। গুড়াকু ব্যবহার করা কারোর কাছেই নিষিদ্ধ না। এবং নেশার বস্তু বলে স্বীকৃত না। অথচ, ব্যবহারকারী বালক বৃদ্ধ, সকলের কাছেই গুড়াকু অপ্রতিরোধ্য বস্তু। শংকর জানে, ললিতা গুড়াকু ব্যবহার করে না, কিন্তু ওদের বাড়ির মেয়ে পুরুষ প্রায় সকলেই ব্যবহার করে। বস্তুটির স্বাদ শংকরের জানা আছে, অরুচি তীব্র। বলল, না, তোমাকে আর গুড়াকু আনতে হবে না। জলটা গরম করে দাও, তা দিয়েই আমি মুখ ধুয়ে নেব।

আহ, মাস্টারবাবু, তবে এক কাজ করেন, লুন দিয়া দাঁত ঘষেন।’ললিতার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, উয়াতে দাঁত মাজা হব্যে, জ্বরের মুখে রস লাগবে।

রস সম্ভবত মুখের স্বাদের রুচির কথা। শংকরের কথাটা মনে ধরল। বলল, এটা একটা কাজের কথা বলেছ।’ বলে সে খাঁটিয়া থেকে নামতে উদ্যত হল।

বসেন না ক্যানে, আমি দিচ্ছি। ললিতা নিচু হয়ে কাঠের মুখ-ঢাকা চেনা বাটি থেকে খানিকটা নুন নিয়ে শংকরের কাছে এগিয়ে গেল, হাত পাতুন।

শংকর বাঁ হাত পেতে নুন নিল। ললিতা সরে গিয়ে, ঘোয়া কেতলি হাতে তুলে নিল। ঘরের এক কোণে রাখা কুঁজো থেকে, কেতলিতে জল গড়িয়ে ভরল। স্টোভের কাছে এসে বসে, দেশলাই জ্বালিয়ে, তোলা পলতে ধরাল। দেখতে দেখতেই আগুনের শিখা নীলচে হয়ে উঠল। ললিতা কেতলিটা চাপিয়ে দিল।

শংকরের পক্ষে বসে থাকা সম্ভব হল না। নুন দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে ও বাইরের দাওয়ায় গিয়ে দাঁড়াল।

.

শংকরকে হঠাৎ বাইরে চলে যেতে দেখে, ললিতার ভ্রুকুটি চোখে, উৎকণ্ঠা ফুটল। সেও স্টোভের কাছ থেকে উঠে, বাইরের রকে এসে জিজ্ঞেস করল, কী হল্য, মাস্টারবাবু, বমি পাইচে নাকি?

শংকর বাঁ হাত তুলে নাড়ল। রকের শেষ প্রান্তে, যেখানে মুখ ধোয়, সেখানে গিয়ে থুথু ফেলে বলল, বমি পাবে কেন? মুখে নুন দিতেই, ভেতরটা লালায় ভরে উঠেছিল।

তাই ভাল। ললিতা হাসল, আমি ভাবি কি লুন মুখে দিয়ে বমি পাইচে বা। অভ্যাস ত নাই!

শংকর দাঁত মাজতে মাজতে আর এক বার থুথু ফেলে বলল, তুমি জলটা দেখো, বেশি গরম কোরো না। আমি গরম জলে মুখ ধুয়ে নেব।

তা ক্যানে? আপনাকে আমি ফুটন্ত টগবগে জল দেব মুখ ধোবার লেগ্যে।

ললিতার মুখে হাসি লেগেই ছিল, আমি কি উ সব বুঝিসুঝি?’ বলে ঘরের দিকে পা বাড়িয়ে বলল, তবে মনে রাখবেন, হাত বাড়িয়ে আমার হাত থেকে লুন, লিয়েচেন, একটু গুণ গাইবেন।

শংকর রকের শেষ প্রান্ত থেকে ফিরে তাকাল। ললিতা তখন ঘরের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। ও নিজের মনে একটু অপ্রস্তুত হাসল। ভুলে যায়, ললিতার বোধ বুদ্ধি কিছু কম নেই। মুখ ধোয়ার জল কতটা গরম করা উচিত, সে কথা ওকে বলার দরকার ছিল না। সংসার বা ঘরকন্নায় অভিজ্ঞতা ওর কম না। কিন্তু যথাযোগ্য স্থানে সেগুলো কাজে লাগাবার উপায় নেই। অপরাধ তো ওর একটাই। বয়স হয়ে যাচ্ছে, অথচ বাবা দাদার ক্ষমতা অনুযায়ী একটা পাত্র জোগাড় করা যাচ্ছে না।

শংকরের ভাবনার মধ্যেই, অ্যালুমিনিয়ামের একমাত্র বড় মগে মুখ ধোবার জল নিয়ে ললিতা এগিয়ে এল, দ্যাখেন, ইয়াতে হবে কি না। কুসুম কুসুম থেকে একটু বেশি গরম করেছি। এই ঠাণ্ডা আর জ্বরের মুখে ই রকমটি সইবে।

হা হা, ঠিক আছে দাও। শংকর হাত বাড়িয়ে মগটা নিয়ে, রকের ওপর উপুড় হয়ে বসল।

ললিতা বলল, মুখে সাবান মাখবেন কি? দাড়ি তো কামাতে পারবেন নাই। মুখে সাবান মাখবেনই বা কুথায়? কঁচা ঘা, ভিজে গেল্যে আউড়ে উঠবে না?

ললিতার একটা কথাও মিথ্যা বা ভুল না। ডাক্তার সুজিতও বলে দিয়েছিল, অন্তত তিন দিন যেন ক্ষতে জল না লাগানো হয়। তা হলে সেপটিক হয়ে যেতে পারে। ললিতার ভাষায় সেপটিকই বোধ হয় আউড়ে ওঠা। তা ছাড়া শংকর প্রতি দিন সকালবেলা দাঁত মেজে সাবান দিয়ে মুখ ধোয়, চা খেয়ে দাড়ি কামিয়ে, চিতির ধারে যায়, ললিতার সে খেয়ালও আছে। স্বাভাবিক, কারণ শংকরের প্রতি দিনের সকালের শুরুটা, ওর চোখের সামনেই ঘটে। শংকর বলল, না, আজ আর সাবান মুখে লাগাবার উপায় নেই, দাড়িও কামাব না। মুখ ধুয়ে একটু গরম চা আর মুড়ি খাব। তারপরে ওষুধ খেতে হবে।

চায়ের জল বসিয়ে দিইচি। ললিতা ঘরের দিকে পা বাড়ালে।

শংকর মুখে জল দেবার উদ্যোগ করে বলল, রুকুদির জন্যও চায়ের জল নিয়ে কিন্তু।

না, লিব নাই৷ ললিতা ঘরের দরজার চৌকাঠে পা রেখে, রুষ্টস্বরে বলল, রুকুদিদি ত রোজ চা খায়, আজ খাবে নাই। আজ আমি চা বানাইচি যে!’ বলে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল।

শংকর আবার মনে মনে অপ্রস্তুত হাসল। ওর সকালের চায়ের ভাগীদার কেবল ললিতা না, রুকুবুড়িও। ললিতার তা না জানবার কথা না। মনে করিয়ে দেবার কোনও প্রয়োজন ছিল না। তথাপি ললিতার বোধ বুদ্ধি নিয়ে ওর ভুল হয়ে যায়। নুনের মুখে গরম জলটা যেন আরামদায়ক লাগল, মুখে জ্বরের বিস্বাদ ভাবটাও অনেকখানি কেটে গেল। মুখ ধুয়ে, গরম জলে হাত ভিজিয়ে চোখ দুটো সাবধানে পরিষ্কার করল।

এই সময়ে রুকুবুড়ি, বালতি ভরে জল নিয়ে রকের ওপর এনে রাখল। বলল, মুখ ধুয়ে লিলে মাস্টার? আমার জল আনতে দেরি হয়্যা গেল কি?

শংকর মগটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল, না, তোমার দেরি হয়নি রুকুদিদি। আমি আজ গরম জলে মুখ ধুয়েছি।

তাই আমি ভাবি কি জল আনতে দেরি হয়া গেল। রুকুবুড়ি তার জামাহীন গায়ের মোটা থানের আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ফোগলা দাতে হাসল।

ঘরের ভিতর থেকে ললিতার স্বর ভেসে এল, অই গ রুকুদিদি, তোমার জন্যে আজ চা হবে নাই।

রুকুবুড়ির মুখের ভাঁজে ঢেউ খেলল। এক বার তাকাল শংকরের দিকে। শংকর হেসে ঘরের মধ্যে ঢুকল। রুকুবুড়ি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ক্যানে গ লাতিন বামনি, দোষ কী করলাম?

দোষ তুমার না, আমার। ললিতা শাড়ির আঁচল দিয়ে ফুটন্ত কেতলির মুখ খুলে, চায়ের কৌটা থেকে আন্দাজ মতো চা ঢেলে দিল। আবার কেতলির মুখ বন্ধ করে দিয়ে, সঙ্গে সঙ্গেই কেতলি নামিয়ে, স্টোভের সামনে, ছোট একটা কাঠের পাটাতনের ওপর বসল। জ্বাল দেওয়া বাসি দুধের পাত্রটা স্টোভের ওপর বসিয়ে দিল। ঠিক শংকর যেমনটি করে। তারপরে দরজার দিকে তাকিয়ে রুকুবুড়িকে বলল, আজ তো আর তুমার মাস্টের চা বানাইচে না, আমি বানাইচি। আমি তুমার চায়ের জল লিতে ভুলে গেইচি।’ বলতে বলতে সে উঠে দাঁড়াল।

কথাটা সত্যি নয় রুকুদিদি, তুমি তোমার চায়ের পাত্তরটি নিয়ে এসো!’ শংকর তক্তপোশের ওপর বসে বলল। আমি ভেবেছিলাম, তোমার চায়ের জল নিতে ললিতা হয়তো ভুলে যাবে। সে কথা বলেছি বলেই, ওই কথা বলছে। আমি বলবার আগেই ললিতা তোমার চায়ের জল নিয়েছে।

রুকুবুড়ি ফোগলা দাতে হেসে ঘরের মধ্যে ঢুকল। তাই কি হয় গো মাস্টের, লাতিন বামনি আমার চায়ের জল লিতে ভুল্যে যাবেক? উয়ার মন লজরটি বড় সজাগ বটে।

তা বুললে কি হয় রুকুদিদি। ললিতা বাটিতে মুড়ি ঢেলে, শংকরের সামনে তক্তপোশে রেখে, আবার স্টোভের সামনে এগিয়ে গিয়ে বসল, আমরা গরিব মুখখু, আমাদের কি সব খেয়াল থাকে? উ সব থাকে বড়লোকের বাড়ির বউ-ঝিদের। স্টোভের ওপর উথলে ওঠা দুধের পাত্রটা, শাড়ির আঁচল দিয়ে ধরে নামাল। স্টোভের পলতে নামিয়ে দিয়ে, জোরে ফুঁ দিয়ে আগুন নিভিয়ে, আবার কল তুলে পলতে তুলে দিল। ধোঁয়া উঠে ঘরের মধ্যে কেরোসিনের আগুনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।

রুকুবুড়ি ঘরের এক কোণে রাখা তার নিজের কলাইয়ের গেলাসটি এনে, ললিতার সামনে বসিয়ে দিল। বলল, উ কথাটি আমি মানি নাই লাতিন বামনি। গরিব হওয়া, সে তো ভগমানের হাত। মুখখু তুমি লও।

ললিতা ঘাড় ফিরিয়ে পলকে এক বার শংকরকে দেখে নিল। তারপর শংকরের কাচের গেলাসে আগে চা ঘেঁকে ঢালতে ঢালতে বলল, উ তুমি জান নাই রুকুদিদি, গরিব হলেই মুখখু হয়। আর, সত্যি কথা বটে, আমি লেখাপড়া ত শিখি নাই।

শংকরের গেলাসে চিনি আর দুধ দিয়ে, চামচে নেড়ে, গেলাস তুলে তক্তপোশের ওপর মুড়ির বাটির কাছে রাখল।

তা বুলল্যে মানব ক্যানে লাতিন বামনি?’ রুকুদিদি ফোগলা দাতে হেসে বলল, নিজের চখে দেখেচি, তুমি ছেলেবেলায় ইস্কুলে পড়তে যেতে।

শংকর জানে, ললিতার নিজেকে গরিব মূর্খ বলার আসল লক্ষ্য চাটুয্যে বাড়ি। রুকুবুড়ির পক্ষে তা বোঝা সম্ভব না। বোধ হয়, ললিতা তা বুঝতে পেরেই, রুকুবুড়ির কথার কোনও জবাব না দিয়ে শংকরকে জিজ্ঞেস করল, মুড়ি কি এমন খাবেন, না একটু তেল নুন মেখ্যে দিব? বলেন তো তেলেভাজা কিনে লিয়ে আসতে পারি।

না, তেলেভাজা আজ আর খাব না। তোমরা খাও তো নিয়ে আসতে পার, পয়সা দিচ্ছি।’ শংকর তক্তপোশ থেকে নামবার উদ্যোগ করল।

ললিতা প্রায় শংকরের হাত ধরতে উদ্যত হয়ে বলল, না না, আমাদের তেলেভাজা লাগবে নাই, আপনি বসেন। মুড়িতে তেল নুন মেখ্যে দিব?

ললিতার গায়ে সামান্য একটা রং-চটা পুরনো লাল ব্লাউজ, যার বোতামগুলোও সব নেই। ভিতরে কোনও অন্তর্বাস নেই। বুকের আঁচল সরে যাওয়ায় তার অটুট উদ্ধত বক্ষান্তরের অনেকখানি উন্মুক্ত। শংকরের দিকে হাত বাড়াতেই, জামার কাঁধের অনেকখানি সরে গেল। চকিতেই শংকরের চোখ ওর বুকের থেকে, চোখের ওপর ছুঁয়ে, অন্য দিকে সরে গেল। বলল, না, থাক।

ললিতার মুখে লজ্জার ছটা লাগলেও, তেমন বিব্রত হল না। বুকের আঁচলটা ভাল করে টেনে জড়িয়ে সরে গেল। শংকর জানে, ললিতার শাড়ি জামার অভাব। অন্যথায় এই শীতে গায়ে আরও কিছু জড়াত। কিন্তু চিত্রটি গরিব ঘরের ঘরকন্না করা ব্যস্ত মেয়েরই মতো অনাড়ম্বর সহজ। এতে ওর নিজেরও বিব্রত হবার কিছু নেই। সেই তুলনায়, এ দেশে পথে ঘাটে মেয়েদের নগ্নতা সবসময়েই চোখে পড়ে।

এই লাও রুকুদিদি, তোমার চা।’ ললিতা কলাইয়ের গেলাসটা বাড়িয়ে দিয়ে, মুড়ির টিনের ঢাকা খুলল, মুড়িও লাও।

রুকুবুড়ি তার ময়লা থানের আঁচল পাতল। ললিতা দুমুঠো মুড়ি তার আঁচলে দিয়ে দিল। রুকুবুড়ি গেলাসটা নিয়ে ঘরের বাইরে রকের এক পাশে গিয়ে বসল। শংকরও এ ভাবেই রোজ সকালে দেয়। অনেক সময় মুড়ি ললিতাও দেয়। তারপরে ও নিজের অ্যালুমিনিয়ামের গেলাসে চা ঢালল। ওর। গেলাসটা এ ঘরেই থাকে। নিজেই মুড়ির টিন থেকে এক মুঠো মুড়ি তুলে নিয়ে, টিনের মুখ ঢাকা দিয়ে দিল। আর শংকর মুখে মুড়ি দিয়ে চিবোতে গিয়েই, অস্ফুটে ব্যথাসূচক শব্দ করল। তাড়াতাড়ি চায়ের গেলাস তুলে চুমুক দিল। মুখের ভিতর মচমচে মুড়ি নরম হয়ে গেল।

কী হল?’ ললিতা উৎকণ্ঠিত জিজ্ঞাসু চোখে মুখ ফিরিয়ে শংকরের দিকে তাকাল।

 শংকর ঢোক গিলে হেসে বলল, মুড়ি চিবোতে গিয়ে, খেয়াল ছিল না। জোরে চাপ দিতেই, একটু ব্যথা লাগল। ও চোখের কোলে গালের হাড়ে ব্যান্ডেজের ওপর আলতো করে হাত বোলাল।

চা দিয়ে ভিজিয়ে খান ক্যানে। ললিতার মুখে উদ্বেগ ও অস্বস্তি, তা হলে লাগবে নাই।

শংকর বলল, ব্যথাটা তেমন বেশি নয়। আসলে মুখ নাড়তে গিয়ে চামড়ায় টান পড়লে, একটু লাগছে। আস্তে আস্তে চিবোলে লাগবে না। সে আর এক গাল মুড়ি মুখে পুরে দিয়ে আস্তে আস্তে চিবোতে লাগল। সামান্য ব্যথা বোধ হলেও তেমন কষ্ট হল না। আর এক ঢোক গিলে নিয়ে ললিতার দিকে তাকিয়ে হাসল, তুমি ও রকম করে তাকিয়ে রইলে কেন? চা খাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।

ললিতা কুটি চোখে তাকিয়ে অস্বস্তিতে হাসল। বাঁ হাতে অ্যালুমিনিয়ামের গরম গেলাস তুলে চায়ে চুমুক দিল। ডান হাতের মুঠি থেকে মুড়ি মুখে দিতে ভুলে গেল। বলল, মুড়ি চিবাইতেই এত লাগচে, দুফরে কী খাবেন?

দুপুরের ভাবনা তো ভাবছি না, সে যা হোক করে চলে যাবে। শংকর এক মুঠো মুড়ি মুখে দিয়ে আস্তে আস্তে একটু চিবিয়ে নিয়ে বলল, ভাবছি, তোমার খুড়োমশাই গজানন কখন আসবে। তার সকালবেলার পুজোপাট কি এখনও শেষ হয়নি?

গজাননের তিন ঘর যজমান আছে। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে, স্নান করে, আদ্যিকালের পুরনো নানা জায়গায় সেলাই করা একখানি তসরের থান পরে, গায়ে চাদর জড়িয়ে, নারায়ণ শিলা নিয়ে পুজো করতে বেরোয়। মাস গেলে সামান্য কিছু পায়। সেটাও তার উপার্জন। তা ছাড়া বিশেষ পূজা পার্বণে, ব্রাহ্মণীর জন্য লাল পাড় শাড়ি আর নিজের জন্য গামছাও জোটে। সকালে এই কাজ সেরে, তারপরে সে নানান ধান্দায় বেরিয়ে পড়ে। অবিশ্যি তার আগে এক বার শংকরের সঙ্গে দেখা করে যায়। এক কুঁজো পানীয় জল নিয়ে আসা, আর ঘরের চাবি নিয়ে, দরজা বন্ধ করা তার কাজ।

খুড়ো এখুনি এস্যে পড়বে।’ ললিতা মুড়ি চিবোতে চিবোতেই জবাব দিল, ক্যানে, আজ কি খুড়োর হাতে ভাত খাবেন?

শংকর চায়ের গেলাস তুলে চুমুক দিয়ে বলল, ভাতের কথা ভাবছিই না। গা যখন গরম হয়েছে, আজ আর ভাত খাব না। সেই জন্যই গজাননকে দরকার। বোস বাড়িতে একটা খবর পাঠানো দরকার, আজ পড়াতে যেতে পারব না, এ বেলা খাবও না। তা ছাড়া, ইস্কুলে একটা চিঠি লিখে পাঠাতে হবে, এ শরীর নিয়ে ছেলেদের পড়াতে পারব না। ছুটির দরখাস্ত পাঠাতে হবে।

বলেন ত উ কাজ আমিও করে দিতে পারি। ললিতা চায়ের গেলাসে চুমুক দিয়ে বলল।

শংকরের ভুরু কুঁচকে উঠল, চোখে অবাক জিজ্ঞাসা, তুমি যাবে বোস বাড়িতে খবর দিতে, আর ইস্কুলে দরখাস্ত পৌঁছতে?’

ক্যানে, কী হবে?’ ললিতার ঠোঁটে চোখে হাসি, পারব নাই নাকি?

শংকর জানে, ললিতা তা পারে। কিন্তু সে তো পাঠাতে পারে না। তার চা মুড়ি খাওয়া শেষ। তক্তপোশ থেকে নেমে ওষুধ রাখা কুলুঙ্গির কাছে গিয়ে বলল, তুমি হয় তো পার, আমি তোমাকে পাঠাতে পারি না। সে ওষুধগুলো বেছে নিয়ে রাংতার মোড়ক ছিঁড়ে, বড়ি বের করল।

ক্যানে পারবেন নাই? আমি মেয়ে, তাই?’ ললিতা উঠে তক্তপোশ থেকে শংকরের চায়ের গেলাস আর মুড়ির বাটি তুলে নিল।

শংকর এ বার খানিকটা বিরক্ত বিস্ময়েই ললিতার দিকে তাকাল, জিজ্ঞেস করল, তোমার কি মনে হয়, আমার হয়ে বোস বাড়িতে খবর দিতে যাওয়া, ইস্কুলে দরখাস্ত পৌঁছুতে যাওয়া–সবাই খুব ভাল চোখে দেখবে? তোমার লজ্জা করবে না?

ললিতা ঘরের দরজার দিকে পা বাড়িয়ে থমকে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে তাকাল শংকরের দিকে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ কিছু না বলে, রকে গিয়ে রুকুবুড়ির সামনে গেলাস বাটি রেখে বলল, এগুলো ধুয়ে রেখ্য রুকুদিদি।

রাখব। তুমার গেলাসটি কুথাকে রাখলে?’ রুকুবুড়ি জিজ্ঞেস করল।

ললিতা বলল, উটি আমিই ধুয়ে লিব।’ও ঘরে এসে ঢুকল। দেখল শংকর তখন কুঁজো থেকে আর একটা গেলাসে জল গড়াচ্ছে। ললিতা জিজ্ঞেস করল, কী করবেন?

শংকর জল ভরা গেলাস নিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ওষুধ খাচ্ছি।’বলে জল মুখে নিয়ে পর পর দুটি বড়ি গিলে নিল।

লজ্জার কথা বুলছিলেন মাস্টারবাবু?’ ললিতা স্টোভের কাছ থেকে নিজের চায়ের গেলাসটা তুলে নিল, তাকাল শংকরের দিকে, লজ্জা আছে কি নাই, উ তো জানি নাই। ত, আপনার কুন কাজ করতে আমার লজ্জা হয় না।

শংকর গম্ভীর স্বরে বলল, কিন্তু আমার করে। সব কাজ সবাইকে দিয়ে হয় না, এটা বোঝবার মতো বয়স তোমার হয়েছে। তুমি আমার জন্য বোস বাড়ি যাবে, ইস্কুলে যাবে, এ সব দেখলে লোকেই বা কী বলবে? কথা একটা বললেই হল?

আমার যা মনে হইছে, তাই বুলেচি।’ললিতা হাসি মুখেই জবাব দিল, লোকের কথায় আমার কিছু যায় আসে না। আসল কথাটা ক্যানে বুলচেন নাই মাস্টারবাবু?

কী আসল কথা?

আমাকে পাঠাইতে আপনার লজ্জা করে।

 তা করে বইকী৷ শংকর একটু কেঁজেই বলল, তোমার লজ্জা না করতে পারে, আমার করে।