উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

৩. পঁচাত্তরের এমারজেন্সির সময়

সময়টা ভাল ছিল না। পঁচাত্তরের এমারজেন্সির সময়। ইস্কুলে রাজনীতির চক্র গড়ে উঠেছিল। ক্ষমতাশালী দল কোনও নীতি নিয়ম মানতে রাজি ছিল না। যোগ্য শিক্ষকদের অসম্মান করা হচ্ছিল। অযোগ্যদের আস্ফালন বেড়ে উঠেছিল। নোংরা রেষারেষি আর প্রতিযোগিতায় ইস্কুলের আবহাওয়া বিষিয়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক দলের বেপরোয়া বহিরাগতরা ইস্কুলের ব্যাপারে মাথা গলাচ্ছিল। যারা ভাল করে বাংলা বলতে শেখেনি, ইস্কুলে ঢুকে তারা মাতব্বরি করছিল। শংকরের অবস্থা হয়েছিল সবথেকে অস্বস্তিকর, কারণ সেই সব মাতব্বরেরা ওকে তাদের নিজেদের লোক বলে চালাতে চাইছিল।

শংকর প্রধান শিক্ষক হতে অস্বীকার করেছিল। শিক্ষক প্রতিনিধি হিসাবে কমিটি মেম্বার হতেও আপত্তি জানিয়েছিল। ওকে নিয়ে দ্রুকুটি সন্দেহ আর বিস্ময় দেখা দিয়েছিল। সুযোগ সুবিধা চায় না, নিজের অবস্থা গুছিয়ে নিতে চায় না, ক্ষমতা প্রতিপত্তি চায় না। এমন লোক তো সুবিধার নয়। এ লোক তো বিপজ্জনক! মহিমা বউদিও শংকরকে সমর্থন করতে পারেননি। তাঁরা ওকে বোঝাতেও চেয়েছিলেন। শুধু তো শংকরের ভাল না, তাদেরও যে মঙ্গল হবে, উপকার হবে।

শংকর বিষণ্ণ হেসেছিল। মহিমা বউদির মঙ্গল করার জন্য, অমঙ্গলের সঙ্গে হাত মেলানো ওর পক্ষে সম্ভব ছিল না। অথচ সে কথা তাদের মুখ ফুটে বলার মতো স্পষ্টবাদিতা ওর ছিল না। জীবনকে দেখার একটা নীতি ও নিয়ম ও মেনে নিয়েছিল। ও শান্তিপ্রিয় বটে, তা আপসের দ্বারা সম্ভব ছিল না। সোচ্চার প্রতিবাদে ইস্কুলের পরিস্থিতিকে বদলাতে না পারার জন্য ওকে পলাতক বলা যেতে পারে। কিন্তু ও জানত পরিস্থিতি বদলানো যাবে না, অশুভ পরিবেশকে ডেকে আনা হবে। প্রতিবাদের একমাত্র পথ ছিল, সেই ইস্কুল থেকে চলে যাওয়া।

শংকর তাই করেছিল। খবরের কাগজে, শালচিতি নামে এক প্রাচীন গ্রামের উচ্চমাধ্যমিক ইস্কুলের বিজ্ঞাপন দেখে দরখাস্ত করেছিল। ডাক পেতে দেরি হয়নি। ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে চাকরিও পেয়েছিল। আগের ইস্কুলে ইস্তফা দিয়ে ও চলে এসেছিল এই শালচিতি গ্রামে। সেক্রেটারি দেবতোষ চট্টোপাধ্যায় ধনী ব্যক্তি, বয়স প্রায় শংকরের মতোই। সামান্য দু-চার বছরের বড় হতে পারে। শংকরকে তার খুব ভাল লেগে গিয়েছিল। সেই গ্রামের মধ্যে এক মুখুজ্জে ব্রাহ্মণের বাড়ির একটি দোতলা খড়ের চাল মাটির ঘর ভাড়ার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল। নিজের দাদার ছেলেমেয়েদের পড়ানো এবং রাত্রে খাওয়া, অন্য এক কায়স্থ বাড়িতে সকালে ছেলেমেয়ের পড়ানোর পরিবর্তে দুপুরে খাওয়া, সবই তার ব্যবস্থানুযায়ী হয়েছিল।

শংকর বুঝেছিল, দেবতোষ কেবল প্রাচীন জমিদার বাড়ির সন্তান না, শাসকদলের একজন হোমরা-চোমরা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। গ্রামে তার চ্যালাচামুণ্ডাদেরই প্রতিপত্তি। সান্ত্বনা ছিল এই, ইস্কুলের আবহাওয়া খারাপ ছিল না। শংকর যার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল, তিনিও স্থানীয় লোক ছিলেন না। নিতান্ত বার্ধক্যবশত চাকরি ছেড়ে গিয়েছিলেন। ইস্কুলের সব শিক্ষকরা শংকরকে খুশি মনে নিয়েছিল, এমন না। তবে অনেকেই নিয়েছিল। তার মধ্যে রাখালবাবু একজন, যিনি এখন এম. এল. এ.। তিনি একজন বিশেষ দলের নেতা বটে, কিন্তু এমন সাদাসিধে সর্বজনমান্য লোক, একটা বিরল ঘটনা। দেবতোষের মতো বিরুদ্ধ দলের লোকও তার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে। ক্ষমতায় যখন ছিল তখনও করত, এখনও করে।

যাই হোক, ছিয়াত্তরের পর এই উনআশির প্রথম মাসে, অনেক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। সেই পরিবর্তনের ঝাপটা শংকরের গায়েও লেগেছে। অনেক সময় মনে হয়েছে, হয়তো ওকে শালচিতি ছেড়ে চলে যেতে হবে। হয়নি। এখনও টিকে আছে। পরিস্থিতি সব দিক থেকে অনুকূল না হলেও, হয়তো থাকতে পারবে, শংকরের আশা।

.

গ্রামের ভিতরে ঢোকার প্রধান দুটি সড়ক, বেশ চওড়া। ঘনবসতি গ্রামের ভিতর দিয়ে সড়ক দুটি এক জায়গায় গিয়ে মিলেছে, উত্তরের প্রান্তে। উত্তরের প্রান্তে একটি আঁকাবাঁকা ছোট নদী, নাম চিতি। চিতির ধারে ধারে এক সময়ে বড় বড় গাছের ঘন বন ছিল। আস্তে আস্তে অনেক ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। বন বিভাগ গাছ-চোরদের কোনও কালেই কোথাও সামলাতে পারে না। চিতির ধারেই ফারাকে ফারাকে তিনটি শ্মশান। সড়ক দুটি মিলেছে চিতির ধারে, গ্রামের পূর্ব সীমান্তে। গোরুর গাড়ি, জিপ অনায়াসেই সড়কের ওপর দিয়ে চলে। অঘ্রাণ পৌষ মাঘ ফায়ূন চৈত্র, বর্ষার আগে পর্যন্ত, এমনকী লরিও চলে, এবং নদী পেরিয়ে কাঁচা চওড়া সড়কের ওপর দিয়ে পুবে চলে যায় হুগলি জেলার ভিতরে।

জাতীয় সড়ক থেকে একটি বড় রাস্তা গ্রামে ঢুকেছে, চণ্ডীতলার মোড় দিয়ে, যে চণ্ডীতলার মোড়ে দুলালের চায়ের দোকানে শংকর বিকালে চা খাচ্ছিল। আর একটা বড় রাস্তা ঢুকেছে, চণ্ডীতলা থেকে পশ্চিমে এগিয়ে। শংকরের পক্ষে গ্রামে ঢোকার সেটাই আপাতত কাছের রাস্তা। গন্তব্য পশ্চিমপাড়ায় যাবারও এটা সংক্ষিপ্ত রাস্তা। এই মোড়েও চায়ের দোকান, মুদিখানা ও একটি ছোট মিষ্টি আর তেলেভাজার দোকান আছে। প্রত্যেক দোকানেই হ্যারিকেন জ্বলছে। চাদর মুড়ি দেওয়া ছায়ামূর্তিরা সব গায়ে গায়ে বসে দোকানগুলোতে কথাবার্তা বলছে। গাঁজাচ্ছে বললেই ঠিক হয়। শালচিতিতে আজ। সন্ধ্যারাত্রে সকলের আলোচ্য বিষয় একটাই। বুধাইয়ের মৃত্যুর থেকেও, বদির বউয়ের টাকা পাওয়া। এ সব খবর হাওয়ার আগে ওড়ে।

শংকর অন্ধকারে অনায়াসেই পশ্চিমপাড়ায় চাটুয্যে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। পুরনো প্রাচীন দোতলা বাড়িটার চৌহদ্দি অনেকখানি। অন্ধকারে থামওয়ালা বাড়িটার দরজা জানালা সবই প্রায় বন্ধ, একটা অস্পষ্ট অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার দক্ষিণে দুটি মন্দিরের চূড়া, নিবিড় ঘন গাছপালার মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে, এবং তারা ভরা আকাশের গায়ে তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চাটুয্যেদের সাতপুরুষ আগে প্রতিষ্ঠিত সর্বাণীদেবী ও মহাকালীর মন্দির। গ্রাম্য দেবী ও সিদ্ধেশ্বরীর মন্দির আরও পুবের ভিতরে।

চাটুয্যেদের প্রাচীন থামওয়ালা চক মেলানো বাড়ির পাশেই হাল আমলের নতুন দোতলা বাড়ি। তার অধিকাংশ দরজা জানালা বন্ধ থাকলেও, নীচের বাইরের ঘরের কাচের জানালায় আলো দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ থাকলে লোহার গ্রিলের গেটের মাথায় আলো থাকত। বাগান, গ্যারেজ, সামনের ছাদ আঁটা বারান্দা সবই দেখা যেত। এখনও যে একেবারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, এমন না। শংকরের অন্ধকার সয়ে যাওয়া চোখে সবই অস্পষ্ট ভাসছে। পুরনো জমিদার বাড়ি বলতে যেটিকে বোঝায়, সেখানে এখন দেবতোষ চট্টোপাধ্যায়ের জ্যেঠামশাই সপরিবারে থাকেন। পিতৃহীন দেবতোষ আর তার দাদা মনতোষ, সাবেক বাড়ির প্রায় গায়েই নতুন বাড়ি করেছে।

জমিদারি অনেক কাল গত। কিন্তু জ্যাঠামশাই হরতোষ চাটুয্যে পুরনো বাড়িতে এখনও সাবেক চালচলন বজায় রাখার চেষ্টা করেন। যদিও তা সম্ভব না। দেবতোষের নতুন বাড়ির মতো, গাড়ি, টিভি, টেলিফোন না ঢুকলেও, ছেলেমেয়ে বউ নাতি-নাতনিদের চালচলন বদলে গিয়েছে। চাটুয্যেরা এখন। বলতে গেলে বড় জোতদার। একান্নবর্তী পরিবারে ভাঙন ধরেছে অনেক কাল আগেই। এখন জমি বাঁচাতে সকলেই ভিন্ন। এমনকী দেবতোষ মনতোষ দুই ভাইও ভিন্ন, অন্যথায় মাথা পিছু যে জমি প্রাপ্য তা রাখা যায় না। অবিশ্যি এ দুভাইয়ের আলাদা সংসারের নলচে আড়ালে যে একান্নবর্তী পরিবার বিরাজ করছে, তা বাইরে থেকে প্রমাণ করা কঠিন। তা ছাড়া আছে সর্বাণী ও মহাকালীর দেবোত্তর ভূমি ও সম্পত্তি। মন্দিরের বিগ্রহেরা সোনারুপোর অলংকার সাজতে পারে। সম্পত্তি ভোগ করতে পারে না। এ সত্যটা সবাই জানে। কিন্তু ধর্মের দাবিটা মেনে নিতে হয়েছে সব দলের শাসকদেরই। তবে সাম্প্রতিক ভূমি রাজস্বের নিয়মানুযায়ী, চাটুয্যেরা প্রাইভেট দেবোত্তরের একত্রিশ বিঘার বেশি রাখেনি। রাখতে গেলে এস্টেটের বিষয় এসে পড়ে, সিকিউরিটি জমা দিতে হয়, একজন ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে এস্টেট চালাতে হয়, তাকে বেতনও দিতে হয়। অথচ ভূমির পরিমাণ, একত্রিশ বিঘার বদলে মাত্র একান্ন বিঘা বরাদ্দ। বাড়তি কুড়ি বিঘার জন্য চাটুয্যেরা এস্টেট, সিকিউরিটি, একজন আইনজীবী ম্যানেজার, ইত্যাদির ঝামেলা পোয়াতে চায়নি। তার পরিবর্তে বেনামি জমি নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি আর গোষ্ঠীর সঙ্গে চোরাই কারবারের লুকোচুরি খেলা, বিবাদ বচসা সংঘর্ষেই সবাই যেন বেশ স্বাভাবিক। সোনা রুপো টাকা লুকিয়ে রাখা যায়, বেনামিতে জমি কেমন করে লুকিয়ে রাখা যায়, শংকর কোনও দিন ভেবে কূলকিনারা পায়নি। দেবতোষ হেসে বলেছে, সরষের মধ্যে যদি ভূত থাকতে পারে, বেনামিতে জমি থাকতে পারবে না কেন? ও সব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে মাথা খারাপ করবেন না।

শংকর মাথা ঘামায়নি, কেন না ওটা ওর কাছে অনাবশ্যক। ও গ্রিলের গেটের ছিটকিনি খুলতেই, মনে হল নীচের বাইরের ঘরের বন্ধ কাচের জানালায় কারোর ছায়া দেখা গেল। ও গেটের ভিতরে ঢুকে, ছিটকিনি বন্ধ করতেই বাইরের ঘরের দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল। ফিরে তাকিয়ে দেখল, ঘরের আলো বাইরে এসে পড়েছে। দুধারে বাগানের মাঝখানে কাঁকর বিছানো চওড়া রাস্তা দিয়ে কয়েক পা এগোতেই, দুটি মূর্তি ছুটে এল। মনতোষের বছর দশেকের ছেলে আর আট বছরের মেয়ে। চাদু আর বেবি। সঁদুরই উদ্বিগ্ন গলা প্রথম শোনা গেল, মাস্টারকাকা, আপনাকে নাকি গাড়ি চাপা দিয়েছে?

বেবি ইতিমধ্যে শংকরের কাছে এসে ওর হাত চেপে ধরেছে, হ্যাঁ, মাস্টারকাকার মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা!

শংকর দুজনেরই হাত ধরে বাইরের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, আমাকে গাড়ি চাপা দেয়নি, এমনি একটু লেগেছে। গাড়ি চাপা পড়েছে বাউরিপাড়ার বদি বাউরির ছেলে বুধাই।

সে খবর আমরা আগেই পেয়েছি। বাইরের ঘর থেকে, ডান দিকে ভিতরে ঘরে যাবার দরজায় দাঁড়িয়ে মল্লিকা, দেবতোষের স্ত্রী, তার চোখে মুখে উদ্বেগ, গলার স্বরে উদ্বেগ। কিন্তু আপনার লাগাটা তো সামান্য মনে হচ্ছে না। ভেতরে আসুন।

শংকর চোখ তুলে তাকাল। মল্লিকা দরজার পাশে সরে দাঁড়াল। লাল পাড়ের চওড়া তাঁতের শাড়ি, মাথার মাঝখান পর্যন্ত ঘোমটা টানা, আটপৌরে ধরনে পরা। গায়ের জামাটা সবুজ গরম কাপড়ের। পড়ার ঘরটা পাশের ডান দিকেই। বাইরের ঘরে হ্যাজাকের আলো জ্বলছে, মাঝখানে রাখা একটা উঁচু টেবিলের ওপরে। পাশের ঘরের হ্যারিকেনের আলো সেই তুলনায় স্তিমিত। শংকর চাঁদু আর বেবিকে নিয়ে পাশের ঘরে গেল। মল্লিকা সরে গেল ঘরের এক প্রান্তে। শংকর বাগানের বন্ধ জানালা ঘেঁষে পড়ার টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, তা একটু লেগেছে। হাসপাতালের ডাক্তারবাবু আমাকে দেখেছেন। আসলে ছেলেটাকে বাঁচাবার জন্যই আমার একটু লেগেছে। কিন্তু ছেলেটাকে বাঁচানো গেল না।

সে খবর গোটা গাঁয়ের লোক জেনে গেছে।মল্লিকা বলল, আপনার সঙ্গে সেজদার দেখা হয়নি? সেজদা হলেন দেবতোষের দাদা মনতোষ। পুরনো বাড়ির জ্যাঠামশাইয়ের বয়োজ্যেষ্ঠ পুত্রদের হিসাবে, মনতোষ চাটুয্যে বাড়ির সেজদা। সাবেকি ভাসুরঠাকুর সম্বোধন, ঘোমটার আড়াল, ইত্যাদি বর্তমান চাটুয্যে বাড়িতে অচল। শংকর অবাক হয়ে বলল, মনতোষবাবু আবার আমার খোঁজে গেছেন নাকি? কোথায় গেলেন?

চাঁদু বলল, থানায়।

শংকর বিব্রত অস্বস্তিতে বলল, কী দরকার ছিল? জানিনে কোন পথে গেছেন, দেখা হলে ভালই হত। কারোকে পাঠিয়ে এখনই ওঁকে ডেকে আনা উচিত। অকারণ আমার জন্য ওঁর থানায় ছোটার কোনও দরকার ছিল না।

সেজোবাবুর জন্য আপনি এত ভাবছেন কেন? ভিতরের দালানে যাবার দরজায় এসে দাঁড়াল মনতোষের স্ত্রী আরতি, উনি আপনাকে থানায় না দেখতে পেলে বাড়ি চলে আসবেন। আপনি বসুন। বরং চদু বেবি এখন ভেতরে যাক।

শংকরের ব্যান্ডেজের বাইরে দুচোখে অবাক জিজ্ঞাসা, বলল, ওরা ভেতরে যাবে কেন? পড়তে বসবে না?

শংকরের থেকে অধিকতর বিস্ময় মল্লিকা আর আরতির চোখে। দুজনে পরস্পরের দিকে দেখল। বিস্ময় চাদু আর বেবির চোখেও। চাঁদু বলে উঠল, মাস্টারকাকা আজও পড়াবেন?

কেন, আজ কী হয়েছে?’ শংকর হেসে বলল, কাল কি তোমাদের ইস্কুলে পড়া নেই?

মল্লিকা গম্ভীর স্বরে বলল, ইস্কুলের পড়া ওরা আজ নিজেরাই পড়ে নেবে, আপনাকে পড়াতে হবে না। আপনি বসুন।

এমন তো নয় যে রাত পোহালেই পরীক্ষা?’ আরতি বলল, এই শরীর নিয়ে পড়াতেই হবে, এমন কোনও কথা নেই।

শংকর খানিকটা অসহায় অস্বস্তিতে হেসে মল্লিকা আর আরতির দিকে দেখল। এগিয়ে গিয়ে বসল, চেয়ারে। চাঁদু আর বেবিকে বলল, তা হলে আজ মা কাকিমার কথাই থাক। পড়ার বইপত্র নিয়ে তোমরা ভেতরে যাও।

বেবি তখনও শংকরের হাত ধরে ছিল। চাঁদুরও এখনই এ ঘর ছেড়ে যাবার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু মা কাকিমা এবং স্বয়ং মাস্টারকাকার কথায় ওদের বই খাতা নিয়ে চলে যেতেই হল। শংকরের কাছে এই মুহূর্তের পরিবেশ অস্বস্তিকর। ও বুঝতে পারছে, চাঁদু বেবিকে সরিয়ে দেওয়াটা দুই জায়ের ইচ্ছাকৃত ব্যাপার।

মল্লিকার মতো আরতিরও নীল পাড় তাঁতের শাড়ি পরা। শাড়ির ওপরে জড়ানো একটি লাল রঙের মোটা সুতোর চাদর, যার এক অংশ মাথায় ঘোমটার মতো তোলা। নিতান্তই ঘরে ব্যবহারের জন্য, এবং বুকের দুপাশে ছড়ানো। মল্লিকার বয়স যদি তিরিশ হয়, আরতির পঁয়ত্রিশ। মল্লিকা উজ্জ্বল শ্যাম, টানা। চোখ, টিকোলো নাক, মেদহীন দীর্ঘ শরীরে ঔদ্ধত্য নেই। নম্র লাবণ্যের একটি স্নিগ্ধ ঢল যেন সর্বাঙ্গে উপছানো। সে নিঃসন্তান। সেই তুলনায় তিন সন্তানের জননী, আরতি দীর্ঘাঙ্গী না, অথচ ছিপছিপে। রং ফরসা, স্বাস্থ্যের দীপ্তিতে এমন একটা অনমনীয়তা, বয়স তাকে কোথাও যেন স্পর্শ করতে পারেনি। স্নিগ্ধতার থেকে রূপের ঝলকটাই বেশি। তার আয়ত কালো চোখ, ঠোঁট, নাক, সবই যেন, তীক্ষ্ণ, কাটা কাটা। মল্লিকাকে দেখলে মনে হয়, কোথায় একটা বিষাদের ছায়া ওকে ঘিরে আছে। আরতির আরক্ত ঠোঁটে, কালো চোখের তারায় স্ফুরিত হাসি যেন রুদ্ধ হয়ে আছে। অবকাশ পেলেই ঝিলিক হানবে। রূপের আঁচ ঝাঁঝ ঝলক, সবকিছুতেই যৌবনের ঝংকার। কিন্তু রূপ নিয়ে তার অহংকার বা বাঁচালতা নেই। সে বুদ্ধিমতী, গ্রামীণ সহজ সাবলীলতা তার কথায় ও আচরণে। সেই হিসাবে, মল্লিকার কথাবার্তা আচরণে কিছুটা গাম্ভীর্য, শহুরে শিক্ষার ছাপ স্পষ্ট।

শংকরদা, যে লোকটি গাড়ি চাপা দিয়েছে, সে নাকি আপনার কলকাতার বন্ধুর ভাই?’ মল্লিকা জিজ্ঞেস করল।

শংকর মুখ ফিরিয়ে মল্লিকার দিকে তাকাল, তারপরে আরতির দিকে। বলল, হ্যাঁ, এক রকম তাই বলা যায়।

আমি কি আপনার সে বন্ধুকে চিনি?’ মল্লিকা জিজ্ঞেস করল।

 শংকর বলল, জানি নে। তুমি কি কখনও প্রিয়ব্রতকে আমাদের আলিপুরের বাড়িতে দেখেছো?

মল্লিকার ভাসা চোখে অন্যমনস্কতা। এক বার আরতির দিকে তাকাল, তারপরে মাথা নেড়ে বলল, মনে করতে পারছি নে।

শংকর বলল, তুমি বোধ হয় প্রিয়ব্রতকে চেনো না।

আপনি বন্ধুর ভাইকে বাঁচাবার জন্য, টাকা দিয়ে সব মিটমাট করিয়েছেন?’ মল্লিকার মুখ গম্ভীর।

 শংকর অবাক চোখে তাকাল, তারপরে হেসে বলল, টাকা দিয়ে মিটমাটের কথা আমি কিছুই জানিনে। গ্রামের মাতব্বররাই থানায় বসে সে ব্যবস্থা করেছে। ও আরতির দিকে তাকিয়ে বলল, বউদি, আপনি আমাকে একটু চা দিন।

আরতি তাড়াতাড়ি বাড়ির ভিতরে পা বাড়িয়ে বলল, এখুনি নিয়ে আসছি।

শংকর এক বার মল্লিকার দিকে দেখল। মল্লিকা ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল, বলল, হরি তা হলে মিথ্যা সংবাদ নিয়ে এসেছে।

হরি ও বাড়ির ভৃত্যদের প্রধান। শংকর বলল, হরিকে কেউ মিথ্যে বলেছে।

এই সময়ে বাইরের ঘরের দরজায় কড়া বেজে উঠল। মল্লিকা তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল। এই মল্লিকা শংকরের ছোট বোন প্রতিমার বন্ধু ছিল, একসঙ্গে পড়ত, এক সময়ে আলিপুরের বাড়ি যাতায়াত করত। শংকরের সঙ্গে পরিচয় ছিল সামান্য। বৈশিষ্ট্য কিছু ছিল না, ছোট বোনের আর দশটা বন্ধুর মতোই, মল্লিকার দিকে বিশেষ চোখে কখনও তাকাবার দরকার হয়নি। দেবতোষের সঙ্গে এ বাড়িতে এসে, প্রথম জানতে পেরেছিল, সেই সামান্য পরিচিতা, ছোট বোনের বন্ধু মল্লিকা চাটুয্যে বাড়ির ন’ বউ। শংকরকে শংকরদা বলে ডাকবার নির্দেশ বা অনুমতি মল্লিকাকে দিয়েছে তার স্বামী স্বয়ং দেবতোষ।

.

মনতোষ হন্তদন্ত হয়ে বাইরের ঘর থেকে কথা বলতে বলতেই ভিতরের ঘরে এসে ঢুকলেন। ওঁর বাইরের চেহারাটি খুবই সাদাসিধে। প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হিসাবে, অনেকটাই প্রৌঢ় মনে হয়। ছোট করে ছাটা মাথার চুলে বেশ পাক ধরেছে। গোঁফ জোড়াতেও। দীর্ঘ মেদহীন শরীর, খড়ঙ্গ নাসা বলতে যা বোঝায়, তাই। মোটা ভুরুর নীচে, চোখের কোলে ও কোণে ভাজ না পড়লে দেখা যেত, ওঁর চোখ দুটি বড়ই। রংও ফরসাই বলা যায়, গ্রামের রৌদ্র জলে কিছুটা তামাটে। ধুতি পাঞ্জাবি গায়ের পশমি আলোয়ান আর পায়ের পাম শু জাতীয় পাদুকায় সম্পন্নতার ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু পোশাকে ঔজ্জ্বল্যের অভাব, এবং একটা গ্রামীণ ছাপ স্পষ্ট। এমনিতে ওঁর চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, একজন গ্রাম্য চাষির সরলতা, আসলে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, সর্বদাই অনুসন্ধিৎসু, সময়ে অতি শাণিত। আসলে মানুষটি ধূর্ত ও চালাক, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, এ সবই তার বাইরের জীবনযাপনের, প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য বিষয় সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের, গ্রামীণ জীবনের বৈশিষ্ট্য। সংসারে, পিতা, স্বামী, ভাসুর, দাদা হিসাবে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত সহৃদয়, স্নেহপ্রবণ, কর্তব্যপরায়ণ।

মনতোষের ব্যস্ত গলা বাইরের ঘর থেকেই এগিয়ে এল, বলে আইবে? কী করে এল?’ বলতে বলতে পাশের ঘরে ঢুকে বললেন, কুন রাস্তা দিয়ে এল্যে মাস্টার? থানার রাস্তা তো একটাই।

মনতোষ আঞ্চলিক গ্রামীণ ভাষা থেকে মুক্ত হতে চেষ্টা করলেও, পুরোপুরি পেরে ওঠেন না। শংকর পশ্চিমের যে মোড় দিয়ে ঢুকেছে, সেই মোড়ের নাম সর্বাণীতলার মোড়। গ্রামের লোকেরা বলে, দেবীর মোড়। শংকর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি দেবীর মোড় দিয়ে এসেছি। আপনি কোথা দিয়ে গেলেন, আর গেলেনই বা কেন?

মনতোষ ভ্রুকুটি অবাক চোখে, পিছন ফিরে মল্লিকার দিকে তাকালেন, শুনেছ নবউমা, তোমার শংকরদার কথা শুনছ কি বটে, অ্যাঁ? গটা শালচিতি তোলাপাড়া হয়ে গেল, শংকর মাস্টার আর বদি বাউরির ব্যাটা গাড়ি চাপা পড়ে হাসপাতালে, তারপরে মাথায় মুখে ব্যান্ডেজ বেঁধে মাস্টার থানায়। ই খবর শুন্যে আমি ঘরকে বস্যে থাকতে পারি?’ তিনি আবার তাকালেন শংকরের দিকে।

মল্লিকা শংকরের দিকে তাকিয়ে হেসে মুখে আঁচল চাপা দিল। শংকর বলল, আপনি বসুন মনতোষবাবু?

তুমি বস। বলে মনতোষই শংকরের মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসলেন, বিত্তান্ত যা শোনবার, আমি সবই শুন্যে আইচি। ও, আমি দেবীর মোড় দিয়ে যাই নাই, গেছি চণ্ডীতলার মোড় দিয়ে। দুলালের মুখে শুনলাম, গাড়ি চালাচ্ছিল যে ছোঁড়া, উয়ার সঙ্গে তোমার মারপিট হইচে। উতেই তুমি জখম হয়েছ। তার আগেই বদির ব্যাটাটা গাড়ির তলায় চিড়ে চ্যাপটা?

শংকর স্বভাবসিদ্ধ হেসে বলল, তা একরকম ঠিকই শুনেছেন। আর ওই দুলালের সঙ্গে কথা বলতেই আপনার সময় লেগেছিল, সেইজন্যই পথে আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।

তা কী করব? মনতোষ দু হাত তুলে বললেন, দুলাল ব্যাটা যেভাবে সেজবাবু সেজবাবু বলে চেঁচাতে লাগলে, উয়ার কথা না শুন্যে যেতে পারছিলাম নাই।

মল্লিকা বলল, তার আগে হরি সব খবরই নিয়ে এসেছে। যে লোক গাড়ি চাপা দিয়েছে, সে নাকি শংকরদার বন্ধুর ভাই।

অই, সে কথা তুমি আমাকে কী বলবে গ ন বউমা? মনতোষ এক বার ভিতর দরজার কাছে মল্লিকাকে দেখে নিলেন। তোমার শংকরদার বন্ধুর ভাই, ভাইয়ের বউ, সব্বাইকে দেখ্যে এলাম। আর ওই উয়াদের পার্টির বাস্তু ঘুঘুগুলানকেও দেখে এলাম। থানার বড়বাবুর সঙ্গে সব্বাই আসর করে বসেছে। উদিকে বদির মরা ব্যাটাটাকে শ্মশানে নিয়ে যাবার তোড়জোড় চলছে। তবে একটা কাজ তুমি ভাল কর নাই শংকর।

মনতোষ শংকরকে কখনও মাস্টার বলে ডাকেন, কখনও শংকর। শংকর এ বার চেয়ারে বসে। জিজ্ঞেস করল, আমি আবার কী মন্দ কাজ করলাম?

মনতোষ কিছু বলবার আগেই আরতি ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকল। এগিয়ে এসে শংকরের সামনে টেবিলের ওপরে রাখল। মনতোষ আরতি, চায়ের কাপ, তারপর শংকরের দিকে তাকিয়ে, আবার আরতির দিকে ফিরে বললেন, গরম চা তো দিলে, কিন্তু লোকটার গায়ে একটা জামা ছাড়া আর তো কিছু নাই। আমার বা দেবুর একটা শাল চাদর যা-হক এন্যে দাও ক্যানে সেজো বউ।

শংকর বলল, না না, আমার তেমন শীত করছে না।

 আমি নিয়ে আসছি। মল্লিকা দ্রুত পায়ে বাড়ির ভিতরে চলে গেল।

 ইতিমধ্যে বাবার গলার শব্দ পেয়ে, চাদু আর বেবিও এসে দরজায় উঁকি দিচ্ছিল।

 শংকর জিজ্ঞেস করল, আমি কী মন্দ কাজ করেছি, বললেন না?

অই, ই, আমি শুনলাম, তোমার বন্ধুর ভাই বলে, তুমি নাকি টাকা পয়সা দিয়ে সব মিটমাট করাই দিয়েছ? মনতোষ সন্দিগ্ধ চোখে তাকালেন, বড়বাবুকে ঘুসঘাস খাইয়ে, বেশ মোটা টাকার লেনদেন করে বদির বিধবাকে দু হাজার টাকা দিয়ে, কী সব মুচলেকার টিপ মারা করাইছ?

শংকর হেসে চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিল, হরি এসে বাড়িতে আগেই এ রকম কথা বলেছে, আমি সেজো বউদি আর মল্লিকার মুখে শুনেছি।

তা হলেই বুঝ ক্যানে, গটা গাঁয়ে কথাটি কেমন রাষ্ট্র হয়েছে?’ মনতোষের চোখে মুখে অসন্তোষের ছায়া, তুমি কানে ই সবের মধ্যে জড়াতে গেলে?

শংকর হেসে বলল, এইটুকু সময়ের মধ্যে কথাটা কে বা কারা রটাল, আমি অবিশ্যি জানি না। তবে আপনাকে এটুকু বলতে পারি, আমার বন্ধুর ভাইয়ের সঙ্গে থানায় বসে টাকাপয়সা দিয়ে যখন সব মিটমাটের ব্যবস্থা হচ্ছিল, আমি তখন হাসপাতালে ছিলাম।

আঁ, অই, কী বলছে হে মাস্টার?’ মনতোষের চোখের চারপাশ কুঁচকে উঠল, দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হল।

শংকর বলল, হ্যাঁ। হাসপাতালের ডাক্তার তখন আমার কপালে সেলাই করে ওষুধ ইনজেকশন দিচ্ছিল। দুজনে একসঙ্গে থানায় গিয়ে শুনলাম, বদির বউকে দু হাজার টাকা দেবার কথা হয়েছে। ঘুসঘাসের কথা অবিশ্যি কিছু শুনিনি। সে ব্যবস্থার কথা শুনে ডাক্তার তো ক্ষেপেই লাল। থানার ওসির সঙ্গে কিছু কথা কাটাকাটিও হল। নিজের রিপোর্ট দিয়ে, সদরেও রিপোর্ট পাঠাবে বলে, গটগট করে বেরিয়ে চলে গেল।

হু, হু, ইবারে বুঝেছি।মনতোষ শক্ত মুখে মাথা ঝাঁকালেন, অর্থাৎ কিনা, তুমি আর ডাক্তার আসার আগেই ওই বাস্তু ঘুঘুগুলান–অই যাদের দেখলাম, থানায় বসে রইচে, গুইরাম, কার্তিক, শরৎ বেরা, তার উপরে আর শিবে চক্কোত্তিও, পার্টির নিডারবাবু।

মনতোষের কথা শেষ হবার আগেই শংকর হেসে উঠল। মনতোষ শক্ত মুখে ভুরু কুঁচকে তাকালেন, হাসছ ক্যানে? ইয়াতে হাসির কথা কী আছে?

আপনার বাস্তুঘুঘু শুনে হাসি পেল।’ শংকর আরতির দিকে তাকাল।

আরতিও তার কালো চোখের তারায় ও নাকছাবির হিরেতে ঝিলিক দিয়ে হাসছিল। মনতোষ চড়া স্বরে বেঁজে উঠলেন, ক্যানে বলব নাই বল। উয়াদের কি আমি চিনি না? উপোসি ছারপোকারা এখন নিজেদের সরকার করেছে, আর দুহাতে লুটেপুটে খাইচে। তোমাকে আমি বাজি রেখ্যে বলতে পারি, তোমার বন্ধুর ভাইয়ের কাছ থেকে, থানার বড়বাবুটি আর গুইরামের দলও টাকা খেয়েছে।

সে তো আপনার–’ শংকর কথা শেষ না করে চায়ের কাপে চুমুক দিল, আর ওর স্বভাবসিদ্ধ হাসি মুখে, কিঞ্চিৎ সংকোচের সঙ্গে বলল, যাদের দল যখন সরকার গড়ে, ক্ষমতায় থাকে, তারাই ও সব করে থাকে। ওটা তো নতুন কিছু না। অবিশ্যি আমি জানিনে গুইরাম, শিবু চক্রবর্তীরাও টাকা খেয়েছে কি না। তবে দারোগার কথা বলতে পারিনে। সেটা আপনিও ভাল জানেন, যখন যারা সরকার চালায়, পুলিশ তখন তার মন জুগিয়ে চলে।

শংকরের কথার মাঝখানেই, মনতোষ ঘাড় ঝাঁকিয়ে হাত তুলে কিছু বলতে চাইছিলেন। কিন্তু বলতে পারছিলেন না। তিনি বিব্রত রুষ্ট মুখে এক বার আরতির দিকে দেখলেন। শংকরের কথার মাঝখানেই মল্লিকা একটি পশমি শাল এনে ওর কাঁধের ওপর ছড়িয়ে দিল। মনতোষ বললেন, অই অই মাস্টার তোমার সেই এক কথা। যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। কথাটা আমি মানি হে, ত তুমি আমাদের দেবুকে কখনও অমন কাজ করতে দেখেছ? বল, তুমিই বল, দেবুকে তো তুমি ভাল চিন, উ কখনও গাঁয়ের লোককে ঠকাইছে?

শংকরের কথার মধ্যে কখনও কেউ জেদ বা ঝাঁজ দেখেনি। রাজনৈতিক বিষয়ে বা গ্রামের কোনও ঘটনায়, ও কখনও বক্তৃতাও করেনি। ওর বিশ্বাসের কথা ও হেসেই বলে। দেবতোষ যখন এম. এল. এ. ছিল, ইস্কুলের সেক্রেটারি ছিল, সেই তখন শংকরকে চাকরি দিয়েছিল। একজন চালচুলোহীন যুবককে গ্রামে বাস করার মতো সবরকম সুযোগ সুবিধা করে দিয়েছিল। তার পিছনে মল্লিকার হাতও ছিল অনেকখানি। শংকর চাকরি নিয়ে এখানে আসার পরেই, মল্লিকা ওকে চিনতে পেরেছিল। কিন্তু শংকর কখনওই দেবতোষের দলীয় রাজনীতিকে, আদর্শকে, কার্যকলাপকে সমর্থন করেনি। মুখোমুখি প্রতিবাদও করেনি। ভিতরে ভিতরে আপসহীন মনোভাব পোষণ করেছে। কখনও-সখনও কোনও কারণে দেবতোষের কাজে কর্মে ওর মতামত চাইলে, ও হেসে অনায়াসেই বলেছে, গরিব জনসাধারণের উপকার তো সবাই করতে চায়। স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে নানা দলের রেষারেষি। কমপিটিশানও কম দেখলাম না। কিছু মনে করবেন না দেবতোষবাবু, প্রাণ যায় উলুখাগড়াদেরই। আপনাদের রাজনীতিতে আমি নেই। আমার ভুল হলে, ক্ষমা করবেন। আপনারা বা আপনাদের যারা বিরোধী, তাদের কারোর মধ্যেই আমি বিশেষ তফাত কিছু দেখতে পাইনে। শহরেই বলুন আর গ্রামেই বলুন, নেতা আর দলগুলোর চ্যালাচামুণ্ডাদের শ্রেণী আর চরিত্র একই রকম। সকলেই গণতন্ত্রের কথা বলে, সকলেই সমাজতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে, বড়লোকেরা আরও বড়লোক হচ্ছে। আমি দেখি, লক্ষ লক্ষ গরিব রাজনীতি বোঝে না, তারা বড় অসহায়। আপনি ধরে নিতে পারেন, আমিও সেই রকম একজন অসহায়।

দেবতোষ হেসে বলেছে, আপনি এভাবে কথা বললে তো ভাই আপনার সঙ্গে কোনও কথাই চলে না। সত্যি কি আপনার কোনও রাজনৈতিক মতবাদ নেই? আমি অবিশ্যি আমার স্ত্রীর কাছে শুনেছি, এককালে আপনাদের অবস্থা খুব ভাল ছিল, আপনি ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিলেন, কিন্তু ও নাকি আপনাকে কখনও রাজনীতি করতে দেখেনি। তবু একটা মতবাদের প্রতি সমর্থন সকলেরই থাকে। আপনার কি সে রকমও কিছু নেই? কেননা, রাজনীতিকে বাদ দিয়ে এ যুগে কেউ চলতে পারে বলে আমার মনে হয় না।

শংকর হেসে বলেছে, আপনাদের গ্রামের গরিবদের মধ্যে কি বিশেষ কোনও রাজনৈতিক মতবাদ আছে? না কি, তারা দলের ব্যাপার-স্যাপার কিছু বোঝে? দুমুঠো খাবার আর নিশ্চিন্ত জীবনের জন্য তারা আপনাদের পেছনে পেছনে ঘোরে, আপনারা যা আশা দেন, তারা বিশ্বাস করে, ফল যে কী, তা আপনি আমি, আমরা সবাই দেখেছি। তবে, তবু যদি আপনি আমার মতামতের কথা জিজ্ঞেস করেন, তা হলে বলতে পারি, যাদের উপকারের জন্য শহরের আর গ্রামের আপনার মতো লোকেরা লড়াই করছেন, এটা শেষ কথা না। গরিবরা নিজেরাই একদিন হয়তো লড়বে, নেতাও হয়তো তাদের মধ্য থেকেই জন্মাবে। সেইদিন সবকিছুর চেহারা বদলে যাবে।

শংকরের মুখে কথাগুলো শুনে, দেবতোষের ফরসা মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শিক্ষিত ছেলে। কলকাতায় তাদের বাড়ি আছে। সে কলকাতা আর শালচিতি যাতায়াত করে। চাটুয্যে বংশে সে-ই একমাত্র রাজনীতি করে। কলকাতা তার প্রধান বিচরণভূমি, শালচিতিতেও সে বিরোধী দলের কথা বাদ দিলে কম জনপ্রিয় না। কলকাতার কলেজে পড়ার সময় থেকেই সে গ্রামের রাজনীতিতে হাত পাকিয়েছে। সেই সময়ে গ্রামে আরও একজন নেতা ছিলেন। গান্ধীবাদী নেতা, বয়স্ক, রাধানাথ বসু! স্বাধীনতার পরে, প্রথম সাধারণ নির্বাচনে রাধানাথ শালচিতির এম. এল. এ. নির্বাচিত হয়েছিলেন। দেবতোষ নিজেই বলেছে, কলকাতায় কলেজে পড়ার সময় সে বামপন্থী রাজনীতিতেই বিশ্বাসী ছিল। পরে তার সে বিশ্বাস ভেঙে যায়, সে হয়ে পড়েছিল রাধানাথের শিষ্য। শংকর বুঝতে পারে, শালচিতির জমিদার চাটুয্যে বংশের ছেলের পক্ষে সেটাই হয়তো ছিল অনিবার্য। একে সুবিধাবাদ বলা যায় কি না, শংকর জানে না, ওর ধারণা অনুযায়ী মনে জিজ্ঞাসা জাগে, একে কি শ্রেণী চরিত্রের লক্ষণ বলে?

যাই হোক, শংকরের হাসতে হাসতে বলা কথাগুলো শুনে, দেবতোষ মনে মনে নিশ্চয়ই উত্তেজিত হয়েছিল, অবাক হয়েছিল। তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কিছু কম ছিল না। বলেছিল, আপনি তো সাংঘাতিক কথা বললেন। অথচ বলছেন, আপনার কোনও রাজনৈতিক মতবাদ নেই? আপনার রাজনৈতিক মতবাদ ততো স্পষ্ট। আপনি কি কখনও কমিউনিস্ট পার্টি করেছেন নাকি? তা হলে তো দেখছি, আমি খাল কেটে ঘরে কুমির ঢুকিয়েছি। কথাটা বলে দেবতোষ হেসে উঠেছিল।

শংকর মাথা নেড়ে বলেছিল, না, আমি কখনও কমিউনিস্ট পার্টি করিনি। আপনাদের পার্টিও করিনি। কিন্তু জীবনের চারপাশেই তো রাজনীতি। মনে তার কোনও রি-অ্যাকশন হবে না, তা কখনও সম্ভব নয়। ভারত স্বাধীন হবার পর থেকে, রাজনৈতিক দলগুলোর কাণ্ডকারখানা দেখে, আমার এ রকম কথা মনে হয়েছে। মহাভারতে যদুবংশের কথাই ধরুন। আমি বলছি না, যদুবংশ ছিল সর্বহারা একটা শ্ৰেণী। কিন্তু সম্রাট জরাসন্ধ থেকে আর তার অনুচর রাজন্যবৃন্দ, কী ভাবে মথুরা থেকে যদুবংশকে তাড়িয়েছিল। বা ধরুন যদুবংশ ভয়েই পালিয়েছিল, প্রাণের তাগিদে। তাদের রক্ষা করার জন্য কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি, তাদেরই এক জন, কৃষ্ণ যদুবংশের উত্থান ঘটিয়েছিলেন। সেই হিসাবেই আমি বলছি, গরিবদের নেতা হয়তো গরিবদের মধ্য থেকেই একদিন জন্ম নেবে। তাদের উত্থান ঘটবে। তবে একটা কথা আমি বিশ্বাস করি, আমাদের এই সময়ে, সব দলের সব নেতাই যে গরিবদের নিয়ে কেবল নিজের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন, তা পুরোপুরি বিশ্বাস করিনে। ভাল লোকও নিশ্চয়ই আছেন। কিন্তু তাদের ক্ষমতাই বা কতটুকু?’ শংকর একটু থেমে বিব্রত হেসে বলেছিল, অবিশ্যি এ সব কথা আপনাকে বলার কোনও মানে হয় না, অনেকটা মায়ের কাছে মাসির গল্পের মতো শোনাচ্ছে।

না না, আপনি বলুন, আমি শুনছি। দেবতোষও সহজ হেসেই বলেছিল, আমি ধরেই নিচ্ছি, এ সব আপনার অভিজ্ঞতার কথা।

শংকর বলেছিল, এক জন অতি সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার কথা।

সেটা হয় তো ঠিক নয়’, দেবতোষ হেসে বলেছিল, সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে আপনার অভিজ্ঞতার ভাবনা চিন্তা আলাদা।

শংকর হেসেছিল, আপনি যা ভাবেন। আমাদের সরকারি আমলা, পুলিশ, এদের চরিত্র আপনার অজানা নয়। যাদের নিয়েই আপনারা রাজত্ব চালাবার চেষ্টা করুন, এদের তো বাদ দিতে পারবেন না। এদের সংশোধন করা কি সম্ভব? আপনারা যে, যে-দলেরই নেতা হন, আপনাদের পার্টিগুলো কি এমন সংহত, যে আপনাদের ক্যাডারদের দিয়ে আমলা পুলিশের জায়গা পূরণ করা যাবে? কিছু মনে করবেন না, আমি নিজেই বুঝি, আমার ভাবনা চিন্তা খুব স্পষ্ট নয়, হয়তো বাস্তবও নয়। কিন্তু বর্তমান অবস্থা দেখে, আমি কোনও আশাও দেখতে পাইনে।

এতটাই যখন ভাবতে পারেন তখন রাজনীতিতে নামতে চান না কেন?’ দেবতোষ জিজ্ঞেস করেছিল।

শংকর বলেছিল, ভাবা এক কথা, করা আর এক কথা। আমি অযোগ্য।

আপনি আমূল সংস্কারের কথা ভাবেন। দেবতোষ বলেছিল, যা বোধ হয় খুব সহজ নয়।

শংকর হেসে বলেছিল, না, আমূল সংস্কার নয়, আমি আমূল পরিবর্তনের কল্পনা করি। সহজ তো দূরের কথা, কবে হবে জানিনে।

তার মানে বিপ্লব?’ দেবতোষ ঘাড় বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়েছিল।

শংকর নিজের মতোই হেসে বলেছিল, কথাটা তো এখন মুখে মুখে ঘোরে। কেমন যেন হাস্যকর শোনায়। আজকাল তো এরও অনেক ব্যাখ্যা শুনি, আসল সংজ্ঞাটা কী, তাই বোঝা যায় না। দেশের কোটি কোটি গরিব মানুষ কজন বিপ্লব বোঝে, বলুন? আমিও সেই রকম একজন অবুঝ।

দেবতোষের সঙ্গে এ ধরনের কথাবার্তা এক দিনে হয়নি। নানা সময়ে নানা ভাবে হয়েছে। কিন্তু কোনও তিক্ততার সৃষ্টি কখনও হয়নি। একজন বিশেষ দলীয় নেতার কাছে, শংকরের কথা নিশ্চয়ই ভাল লাগবার কথা নয়। তাও সেই দলীয় নেতার বিরুদ্ধ-বিশ্বাস ধারণার কথা। সম্ভবত শংকরের কথাবার্তা আচার আচরণ, সর্বোপরি ওর রাজনীতি না করাই, কোনও তিক্ততার সৃষ্টি করেনি। এবং দেবতোষের সঙ্গে রাজনীতি বিষয়ে কথাবার্তার সময়ে মনতোষ, মল্লিকা আরতিও অনেক সময় উপস্থিত থেকেছে। অতএব ও যে দেবতোষের রাজনীতির আদৌ সমর্থক না, তা সকলেই জানে। এমনকী কথাবার্তায় শংকর, দেবতোষের প্রশ্নের জবাবে হাসতে হাসতেই বলেছে, আপনাদের সম্বন্ধে আমাকে যদি কিছু জিজ্ঞেস করেন, তা হলে বলতে হয়, গ্রামীণ জীবনে আপনারাই সবথেকে সুবিধাভোগী শ্রেণী অর্থাৎ আপনাদের মতো গ্রামীণ সুবিধাভোগী শ্রেণী সকলেই এক।

দেবতোষ জিজ্ঞেস করেছে, তা হলে আমাদের রাখালদা সম্পর্কে আপনি কী বলবেন? রাখালদাদের অবস্থা আমাদের থেকে খুব খারাপ নয়।

রাখাল রায়, বর্তমানে যিনি এম. এল. এ., তাঁর কথাই জিজ্ঞেস করেছে। শংকর বলেছে, শ্রেণীর দিক থেকে আপনারা দুজনেই আমার কাছে সমান। আপনাদের দল আলাদা। কিন্তু আজকাল তো সব দলের শ্লোগানই প্রায় এক রকম। তবে রাখালবাবুকে ব্যক্তিগত দিক থেকে আমি ভাল মনে করি। ওঁর সহনশীলতা, ভদ্রতা, দলের বিরুদ্ধ-লোকের কথাও শোনা বা যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করা, এ সবই ওঁর গুণ, সেইজন্যই হয়তো উনি দলের নেতা হয়েও, দলের অনেকের কাছে অপ্রিয়।

মনতোষ ফোড়ন কেটেছেন, ইয়ার মানে কী হে মাস্টার, নেতা হিসেবে আমার ভাইটি মন্দ লোক?

শংকর জানে, মনতোষ হলেন জমিজমা সম্পত্তি বিষয়ে অত্যন্ত আসক্ত সতর্ক ব্যক্তি। চাটুয্যেদের কোথায় কতখানি বেনামি জমি আছে, কোথায় কী ভাবে তার ব্যবস্থা করা আছে, সে সব দেবতোষের থেকে তিনিই ভাল জানেন। দেবতোষও দাদার সেই চরিত্র জানে, এবং জেনে নিশ্চিন্ত আছে। সে হেসে বলেছে, আপনার ভাইকে মন্দ লোক বলিনি। তবে রাখালদার থেকে বয়সটা অল্প তো৷ ওঁর ঝাঁজ আঁচ একটু বেশি। তবে একজন সাক্ষাৎ ভদ্রলোক তো বটেই। দলের চ্যালাচামুণ্ডাদের আর একটু সামলে রাখতে পারলে, লোকে খুশি হয়।

দেবতোষ হা হা করে হেসে উঠেছে, বেশ বলেছেন শংকরবাবু। কিন্তু রাখালদা কি তাঁর দলের ক্যাডারদের সামলে রাখতে পারছেন?

সেটা তো খুবই দুঃখের কথা।’ শংকর হেসে বলেছে, তবে সেটা আমাদের চোখে। দলের লোকের সঙ্গে ওঁর কী রকম আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে, তা আর আমরা জানছি কী করে?

দেবতোষ হেসে বলেছে, কথাটা বেশ ঘুরিয়ে নিলেন শংকরবাবু, সোজাসুজি কোনও মতামত দিলেন না। তবে রাখালদার বিষয়ে আপনাকে আমিই বলছি, আমার বিরোধী দলের হলেও, রাখালদার মতো সৎ লোক পাওয়া কঠিন, আপনার কথাই ঠিক, বড় ভাল মানুষ। তবে রাজনীতিতে ভাল মানুষের জায়গা আছে কি না, আপনি আমার থেকে বেশি জানেন।

শংকর ঠাট্টার সুরে হেসে বলেছে, তা হলে আপনাকে ভাল মানুষ বলব না?

এ কথা শুনে সবাই হেসে উঠেছে। দেবতোষ বলেছে, আপনার কথা শুনলে, আমাদের মধ্যে বনিবনা হওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু আপনার কথায় রাগ-ঝাল-খোঁচা নেই, বিষ নেই, ঝগড়া করা যায় না। তবে আপনি মশাই সাংঘাতিক লোক যাই বলুন। নবউ আপনাকে মোটেই চেনে না।

নবউ হল দেবতোষের স্ত্রী মল্লিকা। মল্লিকার জবাব, শংকরদাকে আমি যতটা দেখেছি, ও সব তোমাদের পলিটিকস কোনও দিন করতে দেখিনি। এ শংকরদাকেও আমি চিনিনে। শান্ত, ঠাণ্ডা, চুপচাপ, এমন তত ছিলেন না। হাসিখুশি টগবগে ছেলে, খেলাধুলো, ডিবেট, কত কী নিয়ে থাকতেন। শুনতাম বিলেত যাবেন, বিরাট কিছু করবেন। সবসময়ে ব্যস্ত। এমনকী শুনতাম ফিল্মের হিরোও হবেন।

শংকর হো হো করে হেসে উঠেছে, এবং হাসতে গিয়ে নিজের সেই অর্থহীন স্বপ্নের দিনগুলো বুকের মধ্যে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের খোঁচায় বিদ্ধ করেছে। দেবতোষ হেসে বলেছে, যাকে বলে একেবারে রোমান্টিক হিরো। তোমাদের দিকে ফিরে তাকাবার অবকাশ ছিল না।

মল্লিকার সহজ স্বীকারোক্তি, তা সত্যি। প্রতিমার সঙ্গে ওদের বাড়ি অনেক বার গেছি, শংকরদা আমাদের পাত্তাই দিতেন না।

শংকর বিব্রত লজ্জায় বলেছে, না না, তা নয়। তখনকার আমি যে কেমন ছিলাম, নিজেই এখন আর তা বুঝতে পারিনে।

যাই হোক শংকরের মনোভাব, এ বাড়ির সকলেরই জানা। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্কে ওর ধারণা দেবতোষের এবং এ বাড়ির বিষয়ে ওর দৃষ্টিভঙ্গি, কারোরই অজানা না। তথাপি কোনও তিক্ততার সৃষ্টি হয়নি। বরং শংকর জানে, যে হেতু ক্ষমতাসীন দেবতোষের আমলে ওর চাকরি হয়েছিল, দেবতোষের দাদার ছেলেমেয়েদের ও পড়ায়, রাত্রে খায়, এবং দেবতোষেরই ব্যবস্থায় এ গ্রামে ওর জীবনযাপন মোটামুটি একটা ধারায় চলেছে, দেবতোষের বিরোধী দলের কারোরই তা পছন্দ না। তার থেকেও বেশি, সকলের এমন একটা ধারণা, ও যেন দেবতোষেরই দলের লোক। অতএব কিছুটা বিদ্বেষ মনোভাবও আছে। অথচ শংকরের কিছু করার নেই। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওরও পরিবর্তন হবে–অর্থাৎ দেবতোষের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বিরোধীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে, এটাই সকলের ইচ্ছা। কিন্তু শংকরের পক্ষে তা সম্ভব নয়, তার কোনও মৌলিক কারণও। নেই। চালুনি এবং ছুঁচের, উভয়েরই ছিদ্র আছে। ওর কাছে সবাই সমান। এ মনোভাব অনেকের কাছে বিতর্কের বিষয় হতে পারে, ওর কাছে নয়। ও নিজেকে চেনে, বাকিদেরও বোঝে। ছাড়তে হলে, এ গ্রাম ছেড়ে, চাকরি ছেড়েই ওকে চলে যেতে হয়। তথাপি দেবতোষের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করার কোনও কারণ বা ঘটনা এখনও কিছু ঘটেনি। তেমন করে ছাড়তে হলে তো বনে গিয়েও আজ আর বাস করা সম্ভব না।

সম্পর্কচ্ছেদের প্রশ্ন কি এখানেই সীমাবদ্ধ? শংকর নিজেকে অতিমানব ভাবে না। দেবতোষের প্রতি ওর কিছুটা কৃতজ্ঞতাবোধও আছে। অতি দুঃসময়ে সে শংকরকে শালচিতিতে চাকরি, জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তার মধ্যে কোনও আরোপিত শর্ত ছিল না। যাকে বলা যায়, দলীয় সমর্থনের শর্ত। তা ছাড়া, অস্বীকার করার উপায় নেই, এই পরিবারটির সঙ্গে ওর একটি প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। চাঁদু বেবি ওর স্নেহ কেড়েছে। সত্যি কথা, যে মল্লিকার দিকে অতীতে একদা ওর ফিরে তাকাবার অবকাশ ছিল না, আজ সেই মল্লিকা কেমন করে যেন ওর দৃষ্টিকে কোন এক অদৃশ্য থেকে আকর্ষণ করে রেখেছে। এ চিন্তাটা ওর মনে একটা বিব্রত বিষণ্ণতা ও অশান্তির সৃষ্টি করে। শংকরের। আজ এই বয়সে, শালচিতির চাটুয্যেবাড়ির অন্দরে, মনটা হঠাৎ বিষঃ বিস্ময়ে পিছন ফিরে তাকায়। মনে হয়, কী যেন ওর বুকের খাঁচায় অনাহুত ঘুরে ফিরে গিয়েছে, ও দেখতে পায়নি বা চায়নি। আজ বারে বারে সেই অনাহুতের দিকে তাকিয়ে মনটা বিমর্ষতায় ভরে ওঠে। কোন রাজনীতি আর সামাজিকতা দিয়ে, এই মানসিক অবস্থার বিচার হবে? আরতির হাসিখুশি প্রীতি ভরা বন্ধুত্বের ব্যবহার ওর মনে স্নিগ্ধতা এনে দেয়। মনতোষ জানেন, শংকর তাঁদের পরিবারের ক্ষতিকারক লোক না, সম্ভবত সেইজন্যই মনে মনে কিছুটা স্নেহ পোষণ করেন। সর্বোপরি, শংকর লোকের উপকারের জন্য কোনও আদর্শ নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই, অতএব সমালোচকের ভূমিকা বলতে ওর কিছু থাকা উচিত না। তোমার ওপর নাই ভুবনের ভার’ গানটির মতোই, এই পরিবারের বা গ্রামের কোনও কিছুকেই ও পরিবর্তন। করতে পারে না। যদিও ও নিজেকে জীবনের যতটা অসহায় ও নির্বিকার দর্শক বলতে চায়, তা সম্ভব না। প্রতিক্রিয়া অবিশ্যিই ঘটে, তবু নির্বিকার থাকতে হয়।

শংকর চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বলল, সেজদা, আমি কখনও বলিনি, দেবতোষবাবু গাঁয়ের লোকদের ঠকিয়েছেন। তবে মোদ্দা কথাটা তো আপনিও মানেন, যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ। আমি জানিনে, গুইরামের দল আমার বন্ধুর ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা খেয়েছে কি না, তবে দারোগার কথা আমি বলতে পারিনে।

দারোগা ত নিশ্চয় টাকা খেয়েছে। মনতোষ জোর দিয়ে বললেন, আমি হলপ করে বলতে পারি, ওই গুইরামের দলও টাকা খেয়েছে। তা না হলে তোমার বন্ধুর ভাইয়ের রেহাই ছিল না। বলেছি তো, উয়ারা হল্য উপোসি ছারপোকা। গুইরামের সাজগোজের বহরটা দেখেছ? ব্যাটা এই সিদিনেও দু বেলা ভাল করে খেতে পেত্য নাই, এখন কেমন চেকনাই মারছে। শিবে চক্কোত্তি গাঁ কাঁপিয়ে মোটর সাইকেল ফটফটিয়ে বেড়াচ্ছে। ই সব কোথা থেক্যে হচ্ছে, আমরা জানি নাই? বান বন্যায় যায় যাতির খয়রাতিতে পঞ্চায়েত আর অঞ্চল-প্রধানের হাতে লাখ লাখ টাকা, হিসাবের মা বাপ নাই। ইস্তক বি. ডি. ও., ওভারসিয়ার, দারোগা, সব টাকা খেয়ে ঢোল হচ্ছে, লোকে কি কিছু দেখছে নাই? আমরা কি কানা?

শংকর হেসে বলল, তা না হলে আর পোড়া দেশের লোকেরা কী জন্য রাজনীতি করবে, বলুন?

অই, তুমি কী বলতে চাও হে মাস্টার?’ মনতোষ ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, আমাদের দেবু কি উয়াদের মতন সরকারি টাকা খেয়েচ্যে?

শংকর হেসে আরতির দিকে তাকাল, তারপর মল্লিকার দিকে। শংকর কিছু বলবার আগেই আরতি মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, হঁ, মাস্টার ঠাকুরপো কি সে কথা বল্যেছে?ন’ ঠাকুরপোর দলের লোকেরা কি সব সাধু নাকি? তুমি জান নাই?

মনতোষ স্ত্রীর কথায় থমকে গেলেন। এমনিতে তাঁর যতই হাঁকডাক থাক, আরতি সচরাচর তার মধ্যে কোনও কথা বলে না। কিন্তু এক বার বললে, মনতোষ কেমন যেন অপ্রস্তুত আর নরম হয়ে যান। তিনি আরতির দিকে এক বার দেখে, টেবিলে চাপড় মেরে বললেন, তবে আমি বলে দিলাম মাস্টার, তোমার দুর্নাম কেউ রুখতে পারবে নাই। আমি উয়াদের চিনি। থানায় টাকা পয়সা লেনদেনের সব ব্যাপার উয়ারা তোমার ঘাড়ে চাপাবে। চাপাবে কী, এখন থেকেই রটাতে শুরু করেছে। ইয়ার পরে শুনবে, বন্ধুর ভাইকে বাঁচাতে তুমিই টাকা খেয়েছ।

শংকর বলল, সেজদা, কপালে যদি মিথ্যে কলঙ্ক থেকে থাকে, তবে তাই হবে। কিন্তু আমি তো জানি, কথাটা মিথ্যা।

তোমার জানা সব জানা নয় হে মাস্টার।মনতোষ উঠে দাঁড়ালেন, গাঁয়ের লোকের জানাজানি অন্য রকম। ক’ বছরে সেটা খানিক বুঝেছ, ইবারে আরও বুঝবে। আমি যাই, সন্ধে আহ্নিক কিছুই হয় নাই। তোমরা মাস্টারকে খাইয়ে দাও, আজ আর রাত কর নাই।

আরতি বলল, মাস্টার ঠাকুরপো ত বলছিল ছেলেমেয়েদের পড়াবে।

মনতোষ সন্দিগ্ধ অবাক চোখে আরতির দিকে তাকালেন, তারপরে মল্লিকার দিকে। মল্লিকা ঠোঁট টিপে হাসছিল। আরতির নাকের হিরায় ঝিলিক দিচ্ছিল। মনতোষ এক বার দেখলেন শংকরের দিকে। মুখ ফিরিয়ে বাড়ির ভিতরে যাবার দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, ই সব লেখাপড়া জানা পাগলদের আমি বুঝতে পারি নাই বাপু।

আরতি খিলখিল করে হেসে উঠল। মল্লিকা মুখে শাড়ির আঁচল চাপা দিল। শংকরও বিব্রত মুখে হাসল, বলল, সেজো বউদি, আমি বরং আজ যাই। আমার খিদে-টিদে তেমন নেই।

আরতি চকিতে এক বার ঘাড় ফিরিয়ে মল্লিকাকে দেখে নিয়ে বলল, কেন? জ্বর-টর এসেছে নাকি?

মল্লিকার চোখে উদ্বেগ। শংকর বলল, বোধ হয় না। তবে ডাক্তার বলছিল, জ্বর-টর একটু হতে পারে। সেইজন্যে না, আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।

কী রে ন’ তুই কী বুঝিস?’ আরতি মল্লিকার দিকে ব্যগ্র চোখে তাকাল।

মল্লিকা বলল, সে রকম বুঝলে, ভাত না হয় না খেলেন। দু-চারটে রুটি বা লুচি খান।

শংকর কিছু বলবার আগেই আরতি বলে উঠল, সেই ভাল। এ শরীরে আজ আর ভাত খেয়ে দরকার নাই, শরীর রসস্থ হবে। আমি যাই, বরং খান কয়েক লুচি ভাজি গিয়ে।

শংকর বলল, না সেজো বউদি, লুচি না। বরং খান দুই রুটি করে দিন।

আরতি তাকাল মল্লিকার দিকে। যেন মল্লিকার সম্মতিরই অপেক্ষা। মল্লিকা বলল, বলছেন যখন, তাই হোক। সেজদি থাকো, আমি যাচ্ছি।

না না, আমি যাচ্ছি, তুই থাক।আরতি দ্রুত বাড়ির ভিতরে চলে গেল।

.

শংকর টেবিলের দিকে মুখ নিচু করে দেখল, তারপরে মল্লিকার দিকে। মল্লিকা অপলক চোখে শংকরের দিকে তাকিয়ে ছিল। শংকরের কাছে, এমন মুহূর্তগুলো একটা বোবায় পাওয়া অসহায় অবস্থার মতো। শংকরের সামনে, এ রকম একাকী মল্লিকাও যেন কেমন হয়ে যায়। ওর চোখে মুখে একটা আবেগ ফুটে উঠতে থাকে, অথচ কথা বলতে পারে না। দুজনেই যেন একটা ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যায়। শেষপর্যন্ত শংকরকেই, এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে কথা খুঁজে বের করতে হয়, এবং হেসে কথা বলার উদ্যোগ করে। তথাপি হঠাৎ কোনও কথা জোগায় না। নির্বাক নৈঃশব্দের মধ্যেই যেন অনেক কথা বলা হয়ে যেতে থাকে, এবং আস্তে আস্তে মল্লিকার কালো ডাগর চোখে ও মুখে একটা বিষণ্ণ হাসি ফোটে। শংকরও হাসতে পেয়ে যেন কিঞ্চিৎ স্বস্তি বোধ করে। ও জিজ্ঞেস করল, দেবতোষবাবুর তো আজ কলকাতা থেকে ফেরার কথা ছিল, তাই না?

মল্লিকা বলল, বুঝতে পারি, আপনার আর এখানে থাকতে ইচ্ছে নেই।

 এটা আমার কথার জবাব হল না।’শংকর হাসল, তোমাকে তো অনেক বার বলেছি, আমার নিয়তি আমাকে এই শালচিতিতে নিয়ে আসছে।

শংকরের কথা শেষ হবার আগেই, মল্লিকার বিষণ্ণ হাসি চোখের কোণে জল চিকচিক করে ওঠে।

মল্লিকার চোখের কোণে জলের বিন্দু চিকচিক করে উঠতেই, শংকরের অস্বস্তি গম্ভীর হয়ে ওঠে। উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করে, কী হল? আমি তো নতুন কোনও কথা বলে, তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।

মল্লিকা দু হাতে দুই চোখের কোণ মুছল। মুখে বিষণ্ণ হাসি লেগেই ছিল। বলল, জানি, নতুন কথা বলেননি, কষ্টও দিতে চাননি। তবে আপনার মুখে নিয়তির কথা শুনলে, আমার কথাটাই সত্যি প্রমাণ হয়ে যায়। নিয়তি আপনাকে এই শালচিতি গ্রামে, বিশেষ করে এ বাড়িতে টেনে এনেছে। নিজের ইচ্ছেয় আপনি আসেননি। উপায় থাকলে আসতেনও না।

শংকরের বিব্রত হাসিতেও বিষণ্ণতার স্পর্শ লেগে আছে। সে বলল, আবার সেই পুরনো কথাটাই তোমাকে বলছি মল্লিকা। তুমি, আমি, আমরা, সংসারের অনেক মানুষকে দেখলেই মনে হয়, সবাই যে যার নিজের ইচ্ছেয় চলেছে। আসলে কথাটা তো সত্যি নয়, কত পরাক্রমশালী বড় বড় মানুষকে দেখে আমরা ধারণা করি, তার নিজের ইচ্ছে মতোই সে সব কিছু করে বেড়াচ্ছে। এ কথাটা আমি মন থেকে আজকাল আর মেনে নিতে পারিনে। এ কথাও বলিনে, আমার কথাই সবাইকে মানতে হবে। আমার চোখে, সবাই অবস্থা আর পরিবেশের দাস। যে মানুষ হাতে দণ্ড নিয়ে হুংকার করছে, আর যে মানুষ হায় হায় করে কাঁদছে, তারা সকলেই তাদের জীবনের ক্ষেত্রে অসহায়।শংকর কথা থামিয়ে শব্দ করে একটু হাসল, যাক গে, এ সব বড় জট পাকানো জটিল কথা, এক ধরনের প্রলাপ বলতে পার। তুমি নিজেই ভেবে দ্যাখো না, কখনও কি তুমি ভেবেছিলে, এই শালচিতির চাটুয্যে বাড়ির ন’ বউ হয়ে আসবে?’

না, তা কখনও ভাবিনি। মল্লিকা বলল, যখন এসেছিলাম, তখন আপনার মতোই আমি নিয়তির কথা ভেবেছিলাম। এখনও ভাবি। আপনিও ভাবেন, নিয়তিই আপনাকে এই শালচিতি গ্রামে নিয়ে এসেছে। কিন্তু আমার জীবনের নিয়তির বিধানকে, আজ আমার কাছে অনেকটা আশীর্বাদের মতো মনে হয়, তা নইলে এমন অদ্ভুত ঘটনা কেমন করে ঘটল, শালচিতির চাটুয্যে বাড়িতে আপনি আমার সামনে বসে আছেন? অথচ আপনার নিয়তি আপনাকে আশীর্বাদ তো করেই নি, বরং দুঃখ আর যন্ত্রণার মধ্যে এনে ফেলেছে।

শংকর মল্লিকার মুখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছিল। আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বলল, মল্লিকা, তোমার এ কথার জবাবও আমি অনেক বার দিয়েছি। আদর্শের কথা বলব না, কিন্তু জীবনে আমার কোনও বিশ্বাস নেই, তা নয়। আমি যদি রাজনীতি করতাম, তা হলে আজ এ বাড়িতে তোমার সামনে বসে থাকার কথা নয়, কারণ দেবতোষবাবুর রাজনীতির প্রতি আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস বা আস্থা নেই। রাজনীতি করিনে বলেই, এ বাড়িতে আমার ঠাই হয়েছে। দেবতোষবাবুও আমার ওপরে তেমন কোনও শর্ত আরোপ করেননি। আমি কাজ করি, খাঁটি, খাই। এ কথা কে বলতে পারে, যে যেখানে কাজ করে, খেটে খায়, সেখানে তার মনের মতো আদর্শ জায়গা হবে, বা মনের মতো মালিক হবে। সে দিক থেকে সেজো বউদির ছেলে মেয়েকে পড়িয়ে এ বাড়ির অন্নগ্রহণে আমার মনে কোনও গ্লানি নেই। কিন্তু তা ছাড়াও আর একটা কথা তোমাকে বলছি, সুখের কথা জানিনে, তোমাকে এ বাড়িতে দেখে, আমার অতীতটাই যেন একটা অবাক পরিবর্তনের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রতিমার বন্ধু হিসাবে তোমার দিকে কখনও তাকিয়ে দেখবার অবকাশ হয়নি। আজ তোমাকে এখানে দেখে, নিজের জীবনের মিথ্যে রোমান্টিকতা আমাকে বিদ্রূপ করে। আমার দুঃখ আর যন্ত্রণাটা তোমার কল্পনা মাত্র, তোমার সান্নিধ্যে এসে আমি আবার নিজেকে নতুন করে দেখতে শিখেছি। কিন্তু দোহাই, আমাকে ভুল বুঝো না যেন, এই দেখতে শেখার ব্যাপারটা, আসলে আমার ভেতরের সামান্যতা, নিতান্ত সাধারণ মানুষটাকে জানা।

ভয় নেই শংকরদা, আমার দ্বারা আপনার সম্মান কখনও নষ্ট হবে না। মল্লিকা বিষঃ হেসে কথাগুলো বললেও, ওর স্বরে বাষ্পেচ্ছাসের রুদ্ধতা গোপন রইল না। এক মুহূর্ত দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট চেপে চুপ করে, নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, তবে আমার মনের কথা তো আমার নিজেরই। মেয়েদেরও নিজের মনের চিন্তার স্বাধীনতা আছে। সে কথা বলে আপনাকে ব্যস্ত বিরক্তও করতে চাইনে। অনেক সময়ে, অনেক রকমে যে কথাটা বলতে চেয়েছি, আমার সে কথাটা রাখবেন। যত যাই। ঘটুক, এ বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করবেন না, এটা আমার-মল্লিকার রুদ্ধ স্বর বুকের গভীরে ডুবে গেল।

শংকরের মুখে অসহায় বিষণ্ণ হাসি। ও কোনও জবাব দেবার আগেই, বড় ঝকঝকে কাঁসার থালা হাতে নিয়ে, আরতি ভিতর বাড়ির দরজা দিয়ে ঢুকল। সে মল্লিকার দিকে চকিতে এক বার দেখল। তার হিরের নাকছাবির ঝলকে, ঠোঁটের কোণের হাসিটি অসম্পূর্ণ হলেও, খুব স্বাভাবিক ভাবেই শংকরের সামনে টেবিলের ওপর থালা বসিয়ে দিল। তার পিছনে পিছনেই এক গলা ঘোমটা টেনে, বাড়ির এক দাসী এক হাতে মিষ্টির বাটি আর এক হাতে জলের গেলাস নিয়ে দরজায় এসে দাঁড়াল। আরতি পিছন ফিরে দরজার দিকে যেতে যেতে শংকরকে বলল, নিন, গরম গরম খেতে শুরু করুন মাস্টার ঠাকুরপো। দরজার কাছে গিয়ে দাসীর হাত থেকে মিষ্টির বাটি আর জলের গেলাস এনে থালার দু পাশে রাখল। বিরাট বগি থালার ওপরে রাখা ডাল আর মাছের ঝোলের বাটিও নামিয়ে দিল। তা ছাড়াও রয়েছে থালার একপাশে বেগুন ভাজা। লুচির সংখ্যা কম করে এক ডজন, এবং তা থেকে খাঁটি গব্য। ঘৃতের গন্ধ ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।

শংকর অবাক চোখে তাকিয়ে সবই দেখছিল। বলল, কিন্তু সেজো বউদি, আমি তো আপনাকে খান। দুয়েক শুকনো রুটি সেঁকে দিতে বলেছিলাম। আপনি লুচি করতে গেলেন কেন?

ভেবে দেখলাম, ঘা শুকোবার জন্য আপনার এখন লুচি খাওয়াই দরকার। আরতি বলল।

আরতির চোখে ঠোঁটে নাকছাবিতে একসঙ্গেই ঝিলিক দিল। চোখ ঘুরিয়ে এক বার দেখল মল্লিকার দিকে, জানেন তো, মেয়েদের ছেলে হবার পরে, তাদের ঘি খেতে দেওয়া হয়। আমি সময় তো বেশি নিইনি।

মল্লিকা ইতিমধ্যে নিজেকে সামলে নিয়েছে। শংকর তার দিকে এক বার তাকিয়ে হেসে বলল, কিন্তু সেজো বউদি, আমি তো সদ্য প্রসূতি নই। আর শরীর ভাল থাকলেও, এতগুলো লুচি কখনও খেতে পারিনে। আপনি আর যাই করুন, খান চারেক লুচি রেখে বাকি সব তুলে নিন। আমার সত্যি খিদে নেই। আর এত মাছ মিষ্টিও আমি খেতে পারব না।

আরতি জিজ্ঞাসু চোখে মল্লিকার দিকে তাকাল। মল্লিকা ভুরু কুঁচকে বলল, তোমার মাস্টার ঠাকুরপোর সব ব্যাপারে কি আমাকে জবাব দিতে হবে নাকি? খেতে দিয়েছ তুমি, খাবেন উনি, যা করবার তোমরাই করো। আমি তো শংকরদার কথা মতো তোমাকে রুটি করতেই বলেছিলাম। তুমি নিজের ইচ্ছেয় লুচি করে এনেছ, আর নিজের ইচ্ছে মতো খাওয়াতে পারছ না?

তা আর পারছি কোথায় রে ন’?’ আরতি হুশ করে একটি কপট নিশ্বাস ফেলে বলল, মাস্টার ঠাকুরপোটি আমার মনের মতো মানুষ বটে, আমি তো তার মনের মতো নই। সে যা করবেন, সবই তোর মুখের দিকে তাকিয়ে করবেন। তোদের ভাত পুরনো চালের মতো বাড়ে, আমি নতুন চালের মতো গলে ধসে যাই। আমার কথায় কি কাজ হবে?

শংকর হা হা করে হেসে উঠতে গিয়ে, তাড়াতাড়ি কপালে হাত রাখল। খেয়াল ছিল না, কপালে। ক্ষতে সদ্য সেলাইয়ের যন্ত্রণাটা এখনও টনটন করছে। আরতি ঝটিতি শংকরের কপালে হাত ছোঁয়াতে গিয়েও, না ছুঁইয়ে, উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হল মাস্টার ঠাকুরপো, লাগল?

হ্যাঁ, হাসতে গিয়ে কপাল ব্যথা যাকে বলে। শংকর বলল।

মল্লিকা আরতির দিকে তাকিয়ে হাসি চেপে বলল, সত্যি তোমার মুখে কোনও কথাই আটকায় না সেজদি। তোমার মনের মতো মাস্টার ঠাকুরপো আর তোমার মাঝখানে তো আমি বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে নেই। তোমাদের যেমন ইচ্ছে, তেমনি চললেই পার।

কথাটা কি বুকে হাত দিয়ে বললি না?’ আরতি তার নিজের বুকে হাত ঠেকিয়ে, চোখের কোণে তাকিয়ে হেসে বলল, আঁতের কথা না দাঁতের কথা, সেটুকুনি বুঝি। সত্যি সত্যি যিদিনে কেড়ে নেব, সিদিনে বুঝতে পারবি। তখন সেজদির রক্ত দিয়ে পায়ে আলতা পরবি। ঠোঁট টিপে তাকাল শংকরের দিকে।

শংকরের মুখে বিব্রত অস্বস্তির হাসি। জানে, সেজো বউদির কথার মধ্যে আদৌ কোনও সত্যি নেই, ঈর্ষা-বিষের বিন্দুও নেই, সবটাই ঠাট্টা। তবে সে নিজে একজন সংসার পটিয়সী নারী। মল্লিকার মন তার একেবারে অজানা না। এবং এটাও জানে, শংকর মল্লিকার সম্পর্কের মধ্যে পাপ বাসা বাঁধেনি। বরং শংকরকে কেন্দ্র করে, মল্লিকার প্রতি তার একটি সস্নেহ প্রশ্রয়ই আছে, যা শংকরের কাছে অতি অস্বস্তিকর। শংকর অনুমান করতে পারে না, আরতি নিজে কতটা সুখী। অসুখী হলেও, হাসির ছটায়, চোখের ঝিলিকে, স্বাস্থ্যের তারুণ্যের তরঙ্গে, সংসারে সে সর্বদাই চঞ্চল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইঙ্গিতবাচক ঠাট্টার কথায় সে কোনও সীমারেখা টানতে জানে না।

মল্লিকা বলল, কার কাছ থেকে কাকে কেড়ে নেবে সেজদি? তুমি কি আমার সতীন, যে তোমার রক্তে পায়ে আলতা পরব?

আরতি কিছু বলবার উদ্যোগ করতেই, শংকর তাড়াতাড়ি হাত জোড় করে বলল, সেজো বউদি, দোহাই চুপ করুন। আপনারা কে আমাকে কার কাছ থেকে কাড়বেন? আমি তো আপনাদের সকলের ভালবাসার আশ্রয়েই আছি৷’ আরতি ঠোঁট টিপে হেসে, শংকরের থালা থেকে খান কয়েক লুচি তুলে নিয়ে, চলে যেতে যেতে বলল, সকলের ভালবাসাটা ফাঁকির কথা। জোড়ায় পিরিত, জোড়ায় কিরিত, আমি তো তাই জানি। দরজা দিয়ে অদৃশ্য হবার আগে, তার রুদ্ধ হাসির ঝংকার শোনা গেল।

শংকর ভিতর দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল। আরতি অদৃশ্য হয়ে যাবার পরে, মুখ ফিরিয়ে তাকাল মল্লিকার দিকে।

মল্লিকা হেসে বলল, কী হল? খান।

হ্যাঁ, খাব তো নিশ্চয়ই। শংকর ফুলকো লুচিতে আঙুলের চাপ দিল, সেজো বউদির কথাগুলো এক এক সময় আমার মাথার মধ্যে কেমন ঝলমলিয়ে ওঠে। ওঁকে আমি এখনও বুঝতে পারিনে।

মল্লিকা বলল, সেজদিকে বোঝার কিছু নেই। তার মন আর মুখে আলাদা কিছু নেই, তা হলে ও রকম করে কেউ বলতে পারে না।

শংকর মুখে খাবার না তুলে আবার মল্লিকার দিকে তাকাল। মল্লিকাও তাকিয়ে ছিল। শংকর বলল, হয়তো তাই সত্যি, কিন্তু আমার অস্বস্তি হল, যার কোনও ভিত্তি নেই, সেই ব্যাপারটাকেই সেজো বউদি বড় বেশি স্পষ্ট আর প্রখর করে তুলতে চান।

মল্লিকার বিষণ্ণ আয়ত চোখের তারা দুটো এক মুহূর্তের জন্য দীপ্ত হয়ে উঠল। ঠোঁট টিপে তাকিয়ে রইল শংকরের দিকে। আস্তে আস্তে আবার ওর চোখে মুখে নম্র বিষণ্ণতার ছায়া নেমে এল। মুখ। ফিরিয়ে, ভিতর দরজার দিকে যেতে যেতে বলল, সত্যি, কোনও ভিত্তি যে নেই, এ কথা সেজদি কেন যে বুঝতে পারে না জানিনে। এ বার থেকে আমিই বলে দেব, সেজদি যেন এমন ভুল আর না করে।

মল্লিকা! শংকর অস্বস্তিকর অবাক স্বরে ডেকে উঠল, আমার কথাটা তুমি হয়তো বুঝতে পারনি। আমি কি বলতে চেয়েছি।

আপনি বলতে চেয়েছেন, যার কোনও ভিত্তি নেই। মল্লিকা ভিতরে যাবার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে বলল, কিন্তু কোনও ভিত্তি যে নেই, এ কথাটা আমারও জানা ছিল না শংকরদা।কথায় শেষের দিকে ওর স্বর ঝাপসা হয়ে এল।

শংকর কিছুটা ত্রস্ত ব্যগ্র স্বরে ডাকল, মল্লিকা!

মল্লিকা গম্ভীর মুখে, আয়ত চোখ তুলে তাকাল। শংকর বলল, আমি কথাটা হয় তো ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারিনি, অথচ ভেঙে বলতেও অস্বস্তি হয়। আমি ভিত্তির কার্যকারিতার কথাই বলতে চেয়েছিলাম। কথাটাকে জটিল করে তোলার কোনও কারণ নেই। আমার শরীরটাও ভাল লাগছে না, এত কথাও আমার বলতে ইচ্ছে করছে না। খিদে আমার নেই, আগেই বলেছিলাম, আমি বরং এখন যাই। সে চেয়ার ছেড়ে ওঠার উদ্যোগ করল।

দোহাই শংকরদা। মল্লিকা দ্রুত পায়ে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল, আমি সহজ কথাটাই হয় তো সবসময়ে সহজে বুঝে উঠতে পারিনে। আমাকে ক্ষমা করুন। আপনি না খেয়ে চলে গেলে, আমার লজ্জা সব থেকে বেশি।

শংকর চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়েও আবার বসল। ইতিমধ্যেই মনটা ওর নিজের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। কারণ, ও জানে, অনুভূতিসম্পন্ন মল্লিকা ওর কথাটা বুঝতে ভুল করেনি। এবং ভুল কথাটা বেরিয়েছে ওর মুখ থেকেই। আসলে নিজেকে কৃতজ্ঞ আর বিশ্বাসী ভাবতে গিয়ে, মনের গভীরের সত্যটাকেই ও অস্বীকার করতে চেয়েছে। কার্যকারিতা’ কথাটা নেহাতই জোড়াতালি দেওয়া। মল্লিকা আর ওর সম্পর্কের কোনও ভিত্তি নেই, এ কথাটা একেবারে অস্বীকার করার মতো মিথ্যা আর কিছু নেই। কিন্তু সে সম্পর্ক নিষ্ফল এক কষ্টকে নিরন্তর বাড়িয়ে তোলা ছাড়া, অন্য কোনও গতি নেই। শংকর ওর অতীত জীবনের কথা ভেবে, নিজেকে বিদ্রূপ করেই একটু হাসল, বলল, ক্ষমাটা আমারই চাওয়া উচিত, লজ্জা তোমাকে আমি কোনও রকমেই দিতে পারিনে।’ বলে সে খেতে আরম্ভ করল। খেতে খেতেই ও পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে গেল, তোমাকে তখন জিজ্ঞেস করছিলাম, দেবতোষবাবুর কথা। আজ তো ওঁর ফেরবার কথা ছিল।

ছিল, কিন্তু দুপুরে টেলিফোন করে জানিয়েছে, ফিরতে আরও দু দিন দেরি হবে। মল্লিকা বলল, ওর কাজের ব্যাপার-স্যাপার তো আমি কিছু বুঝিনে। দিল্লি থেকে নাকি কোন নেতা আসবে, তার সঙ্গে কথা বলবার জন্য দু দিন ফেরা হবে না।

শংকর খেতে খেতে কথাগুলো শুনল। মনে পড়ল, কেন্দ্রের সরকারি পাঁচমিশেলি দলে নানা বিতর্ক আর জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। নেতাদের মধ্যে পরস্পরের দোষারোপ শুরু হয়ে গিয়েছে। এটাই হয়তো স্বাভাবিক ছিল। নেতৃত্ব নিয়ে নিজেদের মধ্যে নির্লজ্জ নগ্ন দ্বন্দ্ব আর সম্পদ নিয়ে কাড়াকাড়ি, আত্মকেন্দ্রিকতা আর গোষ্ঠী পুষ্টিকরণ, কোনও কিছুতেই রাখ ঢাক নেই। দিল্লির বর্তমান চিত্র আদৌ শুভ না। কোনওকালেই কি ছিল? শংকর মনে মনে মাথা নেড়ে ভাবল, রাজনীতির বর্তমান গতিবিধি দেবতোষবাবুর দলের পক্ষে সৌভাগ্যের বিষয়।

শংকর সামান্য খেয়ে উঠে পড়ল। মল্লিকা উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, কিছুই যে খেলেন না?

আর পারছিনে। জলের গেলাস হাতে শংকর উঠে দাঁড়াল। ঘরের এক কোণে জাল দিয়ে ঘেরা নালি মুখের কাছে গিয়ে, হাত ধুয়ে, গেলাসে চুমুক দিয়ে জল খেল। ফিরে এসে টেবিলে গেলাস রেখে বলল, চলি।

মল্লিকা বলল, কাল সকালে হরিকে পাঠিয়ে খবর নেব, কেমন আছেন।

ভালই থাকব, এমন আর কী হয়েছে। শংকর হেসে বলল।

আরতি ঢুকল হাতে একটি টর্চ লাইট নিয়ে। এটা নিয়ে যান। ভাল যে কেমন আছেন, তা চোখ-মুখ দেখেই বুঝতে পারছি।’টর্চ লাইটটা শংকরের দিকে বাড়িয়ে দিল। খাবারের থালার দিকে তাকিয়ে, মুখ গম্ভীর করে বলল, খাবার রান্না করাই সার। তার ওপরে আবার দায়িত্ব দিয়ে গেছিন’য়ের ওপর। যেমন খাবার তেমনি পড়ে আছে।

মল্লিকা বলল, আমি কী করব? খেতে তো বললাম।

শুধু বলে কি আর খাওয়ানো যায়? আরতির চোখে ঝিলিক হানল, খাওয়াতে জানতে হয়।

 শংকর হাসতে হাসতে বাইরের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।