উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

অপরিণত

অপরিণত 

ছোট ছেলে অনাথের বিয়ে হয়ে গেল। তার ঘর নির্বাচন হল, দোতলার সেই শেষ প্রান্তে, উত্তর-পূর্ব কোণে। যেখানে জানালার গরাদে বকুল গাছের ঝাড়ালো ডাল এসে পড়েছে। আর এক জানালায় হাত বাড়ালে স্বর্ণচাঁপার বড় বড় পাতা। তা ছাড়া আম জাম নারকেলের তো কথাই নেই। দোতলার এ অংশটা একেবারে বাগানের মধ্যেই ঢুকে গিয়েছে বলা যায়। যে বাড়ির সামনের অংশে, একান্নবর্তী পরিবারের অনেক কলরব আর হট্টগোল অনবরতই শোনা যায়, আর সদর অংশে সব সময়েই বাইরের লোকের আনাগোনায় প্রায় অফিস-কাছারির ব্যস্ততা, বাগানসংলগ্ন অংশটাকে সে বাড়ি থেকে একেবারে আলাদা বলে মনে হয়। উত্তর-পূর্ব কোণ নির্জন, ছায়াচ্ছিন্ন। কলরব যেটুকু আছে, সেটুকু পাখির। তাদের কলকাকলি সারাটা দিনই শোনা যায়। পাখির ভাষা শেখার ইচ্ছে যদি কারুর থাকে, তবে সে এসে এ বাড়ির এ অংশে বাস করতে পারে। পাখিদের দুর্বোধ্য কিচিরমিচির শব্দ শুনতে শুনতে, একদিন তা সুবোধ্য ভাষাময় হয়ে উঠবেই। 

অবিশ্যি, নির্জনতা, ছায়া, পাখির কলকাকলি এ সবে অনাথের কিছুই যায় আসে কি না সন্দেহ। কারণ ও সব চিন্তা তার মাথায় কোনওদিন আগে আসেনি এবং তাকে কেউ কখনও প্রকৃতির বিছানো আঁচলটিতে এলিয়ে বসতে দেখেনি। 

যদিও অনাথের চোখ দুটি বেশ বড়, ভাসা ভাসা এবং প্রায় কাব্যময়। কিন্তু মাত্র চব্বিশ বছরের স্বল্পভাষী অনাথকে দেখলেই কেমন যেন মূক অসহায় ও বিষণ্ণ বলে মনে হয়। যেন, কথা বলতে গিয়ে তার বলা হয় না। দিশেহারা হয়ে পড়ে। দুচোখ মেলে তাকাতে গিয়ে চোখ নত হয়ে আসে। কিন্তু দেহে। সে শক্ত পুষ্ট স্বাস্থ্যবান। শার্ট প্যান্ট পরে, মাথায় শোলা হ্যাট চাপিয়ে, সাইকেলে চড়ে সে যখন তাদের নিজেদেরই ছোট ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে ছোটর্সাহেব’ হিসেবে যায়, তখন তাকে রীতিমতো স্মার্ট দেখায়। কিন্তু হেডক্লার্ক এসে যদি বলেন, স্যার, শেঠ রোলিং মিল তো আমাদের মালগুলো রিজেক্ট করেছে, আপনাকে একবার ওদের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে হয়, তা হলেই অনাথ ভীষণ অনাথ হয়ে পড়ে। বলে, তা তো বলতেই হবে। নিশ্চয়, কিন্তু আপনি ওটা মেজদাকে, আর না হয়, মানে আমারই করা উচিত, তা নইলে বাবা আবার রাগ করবেন।তারপরে করুণ গলায় অনুরোধ করে, আচ্ছা বড়বাবু, ওটা আপনিই কোনওরকমে ম্যানেজ করে দিন। শেঠ রোলিং-এর ম্যানেজার লোকটা বড্ড রাগি, আমাকে খালি ধমকায়। 

হেড ক্লার্ক জানেন, ছোটসাহেব এ কথাই বলবেন, এবং তাকে মেজোসাহেবের শরণাপন্ন হতে হয়। শেষ পর্যন্ত কথাটা বড়কর্তা অর্থাৎ বাবার কানে ওঠেই। তারপরে রাত্রে, বাড়িতে কর্তার ঘরে ডাক পড়ে। শেঠ রোলিং-এর ম্যানেজারের ধমক খেতে হয় না বটে, বাবার ধমক থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। বাবা শশাঙ্কশেখর বলেন, তুমি যে সব বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দাও, আর তোমার গতিবিধি দেখে তো মনে হয় না, তুমি এতটা গোবেচারা। কাজের বেলা তোমার এরকম কেন হয়? এ সব হচ্ছে দায় এড়াবার চেষ্টা, ফাঁকি দেবার মতলব। তোমাকে আরও সিরিয়স হতে হবে। বাজে কাজে দড়, আসল কাজে অষ্টরম্ভা, এ সব আমি দুচোখে দেখতে পারিনে।’ 

এরকম ধমকের পরেও অনাথের নত মাথা ওঠে না। যেন বড় অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শশাঙ্কবাবুকেই ধমকে অনুমতি দিতে হয়, এখন যাও, একটু চিন্তা করোগে। 

যাই হোক, উত্তর পূর্ব বাগানের হাতায়, ঘরের নির্বাচনটা শশাঙ্কবাবুরই বলা যায়। তিনি তাঁর স্বাভাবিক গাম্ভীর্য এবং তাচ্ছিল্যভরেই বলেছিলেন, ছোট আর ছোটর বউকে বাগানের দিকের ঘরে পাঠিয়ে দাও। 

হয়তো তিনি কিছু ভেবে বললেনি। যদিও বড় বউ, মেজো বউ ও বাড়ির সবাই কিছু না ভেবে পারল না। কিন্তু শশাঙ্কশেখরের কথার কোনও নড়চড় হবার জো নেই এ বাড়িতে। বিপত্নীক শশাঙ্কশেখর অত্যন্ত রাশভারী লোক। একটু হয়তো সেকেলে, কিন্তু উদারতাও আছে। ভদ্রলোকের ধনসম্পত্তির কাহিনী, এ ছোট মফস্বল শহরে প্রায় রূপকথার পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনেকের ধারণা তিনি কোটিপতি। কেউ কেউ গুণে গেঁথেই বলে দেয়, কত লক্ষ টাকা তাঁর ব্যাঙ্কে আছে এবং ছোট ছোট চারটি কারখানার মূল্য কত। তবে এ সব পৈতৃক সম্পত্তি নয়। শশাঙ্কবাবু নিজেই সারা জীবন খেটে এই বিশাল সম্পত্তি করেছেন। 

বাড়িতে তাঁর সঙ্গে নির্ভয়ে কথা বলার লোক মাত্র একজন আছে। তাঁর বিধবা দিদি, বাষট্টি বছরের কিরণবালা। একজনের ষাট, আর একজনের বাষট্টি। কিরণই সব দেখাশোনা করেন। ভাই-বোনের খুব ভাব। রাত্রে যখন শশাঙ্ক খেতে বসেন, কিরণ তখন একলা থাকেন ভাইয়ের কাছে। বউমাদের আসর সেখানে জমে না। তখন ভাই-বোনের কথা শুনলে বোঝা যায়, তাঁদের ছেলেবেলাটা আজও যায়নি। পুরনো দিনের গল্প করতে করতে তাঁরা সময় ভুলে যান, হাসেন, কখনও গম্ভীর চুপচাপ হয়ে যান। যত কথা, সব ভাইবোনে।

দিদির কাছে শশাঙ্কশেখর একটি অভিযোগ প্রায়ই করেন। বলেন, আচ্ছা দিদি, বলতে পার, বড় আর মেজোর আক্কেলখানা কী? আমার এই এত বড় বাড়িটা কি আরও বাড়িয়ে বড় করতে হবে?’ বড় আর মেজো বলতে তাঁরই দুই ছেলে শশীনাথ, দীননাথ। 

কিরণবালা কিশোরীর মতো খিলখিল করে হেসে বলেন, তোর যেমন কথা শশাঙ্ক? ওদের কী দোষ? ও তো মা ষষ্ঠীর দান, ওরা কী করবে? 

শশাঙ্কশেখর মাথা নাড়িয়ে বলেন, উঁহু, এখন আর সে সব দিন নেই দিদি। সবাই এ বিষয়ে চিন্তা করছে, কেবল তোমার এই ভাইপোদেরই আমি দেখছি, একেবারে নিশ্চিন্ত। এ কী কথা, অ্যাঁ? প্রতি বছরেই আমি শুনছি, বাড়িতে লোক বেড়েই যাচ্ছে। বারবাড়ির অফিস ঘরে পর্যন্ত একটু নিশ্চিন্ত হয়ে বসতে পারিনে। সেখানে গাদাখানেক গিয়ে, এটা হাতড়াবে ওটা ঘাঁটবে আর ঠাকুদ্দা ঠাকুদ্দা করে কান ঝালাপালা করবে।’

কিরণ বলেন, তা বললে কী হয়? লক্ষ্মীমন্ত সংসার, ঘর-ভরা তোর নাতি-নাতনি, তোর ভালবাসার ধন। 

শশাঙ্ক বলেন, এ তোমার ভুল দিদি। ভালবাসার ধন গুচ্ছের না হয়ে দু-একটি হলেও চলে। এ তো একেবারে বেপরোয়া ব্যাপার দেখছি। না, বেছেগুছে সুন্দরী আর রূপসী বউ এনেই দেখছি, কাল হয়েছে। 

কিরণবালা হেসে প্রায় গড়িয়ে পড়েন। বলেন, কালো কুচ্ছিত বউ হলে বুঝি আর ছেলেমেয়ে হত না? তোর যত আজেবাজে কথা। 

শশাঙ্ক বলেন, তুমি ওদের একটু বুঝিয়ে বলো দিদি।

কিরণ বলেন, ছি, ও কথা কি আবার বলা যায় না কি? 

অবিশ্যি শশাঙ্কশেখর নিজেও কোনওদিন বলতে পারেননি। যদিও ভাইবোনে এই আলোচনাটা প্রায়ই হয়। এবং এমনি আলোচনার মধ্যেই একদিন তাঁদের গম্ভীর কথাবার্তা শোনা গেল যে, ছোট অর্থাৎ অনাথের গতিবিধি নাকি সন্তোষজনক নয়। টাকা পয়সা দেদার খরচ করছে, হিসেব দিতে পারছে না। অতএব দেখেশুনে তাড়াতাড়ি একটি বিয়ে দেওয়া হল। বউটি আর দুই বউয়ের মতো রূপসীই হল। 

উত্তর-পূর্ব কোণের ঘরের হুকুম শুনে, বাড়ির সবাই ভাবলে, ছোটকে আসলে কর্তা শাস্তি দেবার জন্যেই ওই পিছনের নিঝুম নির্জনতায় নির্বাসন দিয়েছেন। কিন্তু শশাঙ্কশেখর ও সব একেবারেই ভাবছিলেন না। যদিও অনাথকে কয়েকটি কথা বলার জন্য ভারী ছটফট করছিলেন। কিন্তু মুখ ফুটে কিছুতেই বলতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত বলবেন বলেই স্থির করলেন। রাত্রে রোজই একবার অনাথকে কারখানার বিষয় রিপোর্ট করতে হয়। বিয়ের দিন দশেক পরেই অনাথকে হাতে পেয়ে, প্রথমেই শশাঙ্কশেখর বললেন, কারখানা ছাড়া তোমার বাইরে যাওয়া আমি বিশেষ পছন্দ করিনে। বাড়িতেই থাকবে, বুঝেছ? 

অনাথ ঘুট করে ঘাড় নেড়ে জানাল, হ্যাঁ। 

–আর

বলতে গিয়ে শশাঙ্কশেখরের গলা আটকে গেল। সোজাসুজি কিছুতেই বলতে পারলেন না। খালি বললেন, তোমার বড়দা আর মেজদাকে দেখছ তো। কী আর বলব। যাই হোক, দেখে শুনে তুমি শিক্ষা নাও। আর আমার কিছু বলার নেই।

অনাথ কী বুঝল; কে জানে। সে ঘাড় নেড়ে, গুটিগুটি পায়ে চলে গেল। শশাঙ্কশেখর খেতে বসে কিরণবালাকে বললেন, ছোটকে বলে দিয়েছি আজ, বড় মেজোর মতো কাণ্ড যেন সে না করে। 

কিরণবালা হাসলেন। বললেন, তা ওদের অমন এক পাশে সরিয়ে দিলি কেন?

 শশাঙ্কশেখর বললেন, বড় বউমা আর মেজো বউমার ছোঁয়াচ বাঁচাবার জন্যে!

কিরণবালা ছোট মেয়েটির মতো না হেসে পারলেন না। কয়েকদিন পর কিরণ ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, কারখানায় কি কাজ কমে গেছে যে, ছোট রোজ দুপুরে বাড়ি চলে আসে, আর যায় না? 

শশাঙ্কশেখরের কোঁচকানো তে সন্দেহ দেখা দিল। বললেন, না, কাজ তো কম নেই? কেন, ছোট বুঝি আড্ডায় মেতেছে আবার? 

কিরণ বললেন, বাইরের আজ্ঞায় নয়। বাগানের কোণের ঘরে এসে ঢোকে, আর একদম বেরোয় না। 

শশাঙ্কশেখর কিছুটা আশ্বস্ত হলেও বিরক্ত হয়ে বললেন, উলটো ফল হল দেখছি। আবার ধাতানি দিতে হবে। তোমার ভাইপো কটি যে কী বস্তু, জানিনে।

তাও খানিকটা জানলেন। বিয়ের ঠিক তিন মাসের মুখে যখন কিরণবালা রাত্রে খাবার সময় ঘোষণা করলেন, ছোট বউমা বাপের বাড়ি যাবেন। 

দিদির এই কথাটার ভাবভঙ্গি এত পরিচিত যে, শশাঙ্কশেখর চমকে বললেন, মানে?

কিরণ বললেন, মানে, ছোট বউমার ছেলেপিলে হবে।

 তিক্ত ভ্রূকুটি হেনে শশাঙ্কশেখর কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপরে বললেন, এখনও তো নতুন বিয়ের গন্ধ যায়নি বাড়ি থেকে। এর মধ্যেই? এরা কি পাগল করে ছাড়বে নাকি?

কিরণবালা জোরে হাসলেন না ভাইয়ের মুখ দেখে। তার পর দিনই রাত্রে অনাথকে হাতে পেলেন শশাঙ্কশেখর। কিন্তু সেই একই দুরবস্থা। পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারলেন না। কাজকর্ম নিয়েই খালি ধমকালেন এবং বারেবারেই বললেন, তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি হবে কবে, জিজ্ঞেস করি? মগজে কি কিছু নেই? কী বলি আর কী চাই, কিছু বুঝতে পার না? এদিকে তো বাবা হতে চললে।

অনাথ তার সেই কোণের ঘরে গিয়ে, অত্যন্ত অসহায় করুণ মুখ করে খালি বলল, বাবা যে কী বলেন, কিছুই বুঝিনে। শুধু শুধু বকলেন। 

মীনা অর্থাৎ স্ত্রী বলল, শুধু শুধু বকবেন কেন? নিশ্চয়ই কোনও দোষ করেছ।বলে, জানলার ধারে দাঁড়িয়ে, একটি রাত-জাগা পাখির গান শুনতে লাগল। অনাথ যেন মূঢ় বিস্ময়ে ও কষ্টে তাকিয়ে রইল। স্ত্রীর দিকে। 

.

মীনা যখন ফিরে এল, তখন তার কোলে চার মাসের শিশু প্রায়। এক বছর বাদে ফিরল সে। ইতিমধ্যে অবশ্য অনাথ অনেকবার শ্বশুরবাড়ি গিয়েছে। কিন্তু কারখানায় যাতায়াত করেছে সময়মতো। 

মাঝে একদিন কিরণবালা শশাঙ্ককে বলেছিলেন, ছোট নাকি তার বউদিদের বলেছে, সে আর ছেলেপিলে চায় না। স্ত্রীর শরীর নাকি বড় খারাপ। 

শশাঙ্ক বলেছিলেন, যাক, তবু স্ত্রীর প্রতি মমতাবশতই যদি এদের চৈতন্য হয়, ভালই।

কিন্তু মীনা যেদিন ফিরে এল, সেদিন শশাঙ্কশেখর রাত্রে খেতে বসে দেখলেন, কিরণবালার মুখ অন্ধকার। শশাঙ্ক জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে দিদি? 

কিরণ কেঁদে ফেলে বললেন, অনাথ সর্বনাশ করে এসেছে। আমরা ভাবি সে বোকা। কিন্তু সে এমন কাজ করেছে যে, ছোট বউমার আর কোনওকালে ছেলেপিলে হবে না। কী যে ছাই মাথায় ঢুকিয়েছিস ছেলেটার। 

শশাঙ্কও কয়েক মুহূর্ত নীরব হয়ে রইলেন। অনাথের কাছ থেকে এতটা তিনি আশা করেননি। জিজ্ঞেস করলেন, কে বললে?’ 

কিরণ বললেন, বড় বউমা, মেজো বউমা, সবাই। আমি তো আর জিজ্ঞেস করতে পারিনে। আলোচনা শুনলুম, ঝি আমাকে সব বললে। 

শশাঙ্কশেখর মনে মনে খুশি হলেন। কিন্তু একটা অস্বস্তিও হতে লাগল তাঁর। অনাথ সম্পর্কে তাঁর যেন একটু শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। অনাথের সঙ্গে কথাবার্তা ব্যবহারেও একটু পরিবর্তন হল তাঁর। 

কিন্তু যতই দিন যেতে লাগল তিনি যেন একটু শঙ্কিত হয়ে উঠলেন। মনে হল, অনাথ যেন একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। প্রথম সন্তানটি যদি কোনও কারণে মারাই যায় তবে? বলা তো যায় না। মনে হতেই একদিন তিনি অনাথকে খুব ধমকালেন, সব তুমি বুঝে গেছ দুনিয়ার, না? নিজের ইচ্ছেয় সব করলেই হল? কারুর উপদেশ নিতে চাও না। আমাকে না জিজ্ঞেস করে কোনও কাজ আর করবে না। বলে দিলুম। 

অনাথ করুণভাবে স্ত্রীকে গিয়ে বলল, বেশ ছিলেন বাবা। আবার আজ বকে দিলেন।

মীনা বলল, বকার কাজ কিছু করেছ নিশ্চয়। দাও, আলনা থেকে খোকনের তোয়ালেটা দাও দেখি? 

মীনাকে নিষ্ঠুর মনে হল অনাথের।

 যাই হোক, প্রায় মাছ ছয়-সাতেকের মধ্যে অনাথের ব্যাপারটা সুস্থ ভাবেই মেনে নিলেন শশাঙ্কশেখর। এবং ভেবে খুশি হলেন, অনাথ ওর ওই একটি ছেলেকে ভালভাবে বাঁচাবার জন্যে সংসারে অনেককিছু শিখবে।

সেই কথাটিই সেদিন রাত্রে খেতে বসে, কিরণবালাকে বলতে যাচ্ছিলেন। তার আগেই কিরণবালা ঘোষণা করলেন, ছোট বউমা বাপের বাড়ি যাবেন। 

শশাঙ্কশেখর আধা চমক খেয়ে বললেন, কেন?

কিরণ একটু হেসে বললেন, তার ছেলেপিলে হবে। 

শশাঙ্কশেখরের হাত থেকে মাছের মুড়োটা প্রায় ছিটকে পড়ার অবস্থা। অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তা হলে যা শুনেছিলুম? 

কিরণ বললেন, ওটা নাকি বড় বউমা আর মেজো বউমার ঠাট্টা।

 শশাঙ্কশেখর তিক্ত গলায় বললেন, আমার তখনই বোঝা উচিত ছিল। এরা পাগল করে ছাড়বে।

আবার বাবার প্রচণ্ড ধমক খেয়ে অনাথ ভাবল, বাবা দুর্বোধ্য, স্ত্রী অকরুণ, সংসার নিষ্ঠুর।