উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

হতভাগ্য শিকার

হতভাগ্য শিকার

স্বামী স্ত্রী মুখোমুখি বসে আছে। ছোট ডাইনিং টেবিলের ওপরে, প্লেটে পড়ে আছে ভুক্তাবশিষ্ট মাখন টোস্টের শক্ত ধারওয়ালা টুকরোগুলো। চায়ের কাপ শূন্য।

সময় বিকাল সাড়ে পাঁচটা। প্রাইভেট কোম্পানির কোয়ার্টারের কম্পাউন্ডে, খোলা জায়গায়। দশ বারো বছরের একদল ছেলে ফুটবল খেলছে। বেশ বড় কম্পাউন্ড। বল পেটানোর দুমদাম শব্দের সঙ্গে, ওদের চিৎকার চেঁচামেচি ভেসে আসছে। কম্পাউন্ডের এক দিকে ছোটদের জন্য আছে দোলনা। শ্লোপিংবার। এমনকী ব্যাডমিন্টনের কোর্ট। এই গ্রীষ্মকালে যদিও কেউ ব্যাডমিন্টন খেলছে না। সেখানে প্যারাম্বুলেটারে শিশু নিয়ে পাক দিচ্ছে দুই-তিনজন আয়া। যদিও এদের আয়া ঠিক বলা যায় না। ঝি পর্যায়ে পড়ে। মাঝারি পোস্টের কর্মচারীরা বা তাদের স্ত্রীরা ঝিকে মেড-সারভেন্ট বলে। সময় বিশেষে আয়া।

কম্পাউন্ড ঘিরে দোতলা। ছোট ছোট দুই বেডরুমের ফ্ল্যাট অনেকগুলো। ছশো থেকে হাজার টাকা বেতন পায়, এ রকম কর্মচারীদের কোয়ার্টারস। উলটো দিকে তিন বেডরুমের বড় দোতলা কোয়ার্টারস। দু-তিন হাজারি বেতনধারী কর্মচারীদের কোম্পানির দেওয়া আস্তানা। এরা অফিসার। র‍্যাঙ্কে পড়ে। নিজেদের সাহেব মনে করে। ঝি-চাকরদের প্রতিও নির্দেশ, সাহেব বলে ডাকতে হবে। সাহেব গিন্নিকে, অতএব, মেমসাহেব।

দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদের কম্পাউন্ড কোয়ার্টারের দিকে, প্রথম শ্রেণীর কর্মচারীদের কোয়ার্টারের পিছন দিক। তাদের আরও বড় কম্পাউন্ড এ দিক থেকে দেখা যায় না। সেখানেও বড় কম্পাউন্ডে খেলার জায়গা আছে। অতিরিক্ত আছে একটি টেনিস লন, আর এক দিকে সারি সারি মোটর গ্যারেজ। কৌলীন্যের দিক থেকে এই ব্লককে প্রথম শ্রেণীর বলতে হবে। কিন্তু সর্বোচ্চ না।

সর্বোচ্চরা কখনও ওই রকম ব্লক বেসিসে ফ্ল্যাটে থাকে না। তাদের জন্য বাংলো। পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন, বাগান সংলগ্ন বাংলো। এর আবার এক রকম গরিবিয়ানা নামও আছে, যাকে বলে কটেজ। এরা কুটিরবাসী। কুঠি না। সেটা ছিল সেকালের আভিজাত্য। নীলকুঠি কিংবা চটকলের কুঠি। বর্তমানের আভিজাত্য কটেজ। এর সংখ্যা কম। সামনে বাগান। পিছনে টেনিস লন, ব্যাডমিন্টন কোর্ট। ঝি চাকর আয়াদের জন্য আলাদা ঘর। মোটর গ্যারেজ অবশ্যিই আছে। এরা ম্যানেজারিয়াল র‍্যাঙ্কে থেকে একজিকিউটিভ পদের লোক।

তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদেরও আলাদা কোয়ার্টারস আছে। চারতলা বড় ফ্ল্যাট বাড়ি। একটি বেডরুম, একটি বসার ছোট ঘর। খাবার ঘর আলাদা নেই। রান্নাঘর আছে। আর কেমন করে যেন এই সব ছোট ছোট খোপগুলোতেই জনসংখ্যার চাপও বেশি। এদেরও কম্পাউন্ড আছে। আয়তনে ছোট। বাচ্চাদের খেলবার জন্য সেখানেও দোলনা আছে, শ্লোপিংবার আছে।

বিহারের একটি শহরে, একটি বড় কারখানাকে ঘিরে, এই সব স্টাফ কোয়ার্টার, বড় রাস্তা, অফিস বিল্ডিং, মার্কেট প্লেস, সব মিলিয়ে একটি শহর। আর এই শহর, কোম্পানির স্টাফদের মধ্যে। আছে সর্ব ভারতীয় নানা ধর্মের লোক। যাকে বলে পুরোপুরি কমোপলিটন।

দ্বিতীয় শ্রেণীর কোয়ার্টারসের এক তলার ডাইনিং টেবিলে স্বামী-স্ত্রী মুখোমুখি বসে আছে। ভুক্তাবশিষ্ট টোস্টের টুকরো আর শূন্য চায়ের কাপ দেখলেই বোঝা যায়, স্বামী চাকরি থেকে ফিরে বিকালের টিফিন খেয়েছে। তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। মুখ কেবল চিন্তামগ্ন না, রীতিমতো থমথমে। তাকিয়ে আছে বাইরের জানালার দিকে। জানালার ওপরে পরদা, বাতাসে উড়ছে। কিন্তু সে যে বাইরের কিছুই দেখছে না, তার অন্যমনস্ক চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। পাজামার ওপরে গেঞ্জি গায়ে, অনধিক লম্বা দোহারা গড়নের স্বাস্থ্যবান পুরুষ। বয়স পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ হবে। মাথার চুল পাতলা, কপালে ও কানের কাছে কিছু রুপোলি রং ধরেছে। গায়ের রং ফরসা। নাক চোখা, একটু মোটা! বড় চোখ, চওড়া চোয়াল। গোঁফ দাড়ি কামানো।

স্ত্রীর বয়স অনধিক চল্লিশ। দেখায় আরও কম। ফরসা রং, টিকোলো না বলে, ঈষৎ বোঁচাই বলা যায়। কিন্তু চোখ দুটি টানা ও কালো। মেদবর্জিত দীর্ঘ শরীরে স্বাস্থ্যের দীপ্তি ও লাবণ্য নষ্ট হয়নি। স্লিভলেস জামা, সিনথেটিক ছাপা শাড়ি গায়ে। চোখে বোধ হয় কাজলের সামান্য রেখা টানা। ঠোঁট স্বাভাবিক রঙেই কিঞ্চিৎ লাল। কপালে লাল টিপ, সিঁথেয় সিঁদুর। চিন্তিত বিমর্ষ মুখ। তাকিয়ে আছে, মুখ নিচু করে স্বামীর মুখের দিকে।

স্বামী সিগারেটে একটা টান দিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, কিছু বলেছ নাকি?

না। স্ত্রী মুখ তুলল, বলেছি মানে, জিজ্ঞেস করেছি। যেমন লুকিয়ে ওর পকেট ঘাঁটি, সেই ভাবেই ঘাঁটতে গিয়ে দেখি, একটি দশ টাকার নোট। জিজ্ঞেস করলাম, তোর পকেটে এ টাকা এল কোথা থেকে? জবাব সেই একই, ও আমার টাকা নয়, এক বন্ধুর টাকা। আমার কাছে রেখেছে, আবার দিয়ে দেব।’

বিকাশ সেন। অর্থাৎ স্বামী, স্ত্রী মালবিকার চোখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। সেই কুটি-তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি দেখলে মনে হয়, সে মালবিকাকেই অপরাধী ভাবছে। জিজ্ঞেস করল, তারপর?

তারপর আর কী।’ মালবিকা একটা নিশ্বাস ফেলল, তোমার কথা মতো আমি জেরা করেছি। বলেছি, এর মানে কী? কিছুদিন ধরেই দেখছি তোর পকেটে প্রায়ই দশ-বিশ পঁচিশ টাকাও থাকছে। কখনও দামি চকোলেট। জিজ্ঞেস করলেই বলিস, অমুক বন্ধুর টাকা। তোর কাছে রেখে দিয়েছে। কেন? তোর বন্ধুরা কি বাড়ি থেকে টাকা চুরি করে তোর কাছে গচ্ছিত রাখে? ও কেমন হেসে চলে, সেই রকমই জবাব, তুমি কি ভাব আমার বন্ধুরা চোর? রণবীর চোপরা বড়লোকের ছেলে। বিনয় কেলকার, অজিত শ্রীবাস্তব, সুরজিৎ সিং এরা তো সবাই বড়লোক। কিন্তু আমি বুঝতে পারি, ওর হাসিটার মধ্যে স্বস্তি নেই। মিথ্যে কথা বানিয়ে বলছে। আমি জিজ্ঞেস করি আর এই সব ভাল ভাল চকোলেট? এ সবও কি তোর সেই বন্ধুরাই দেয়? জবাব দিতে গিয়ে ও কেমন বিব্রত হয়ে পড়ে। তোক গিলে হেসে জবাব দেয়, হ্যাঁ তা ছাড়া আর কে দেবে? বুডটো, বিরিজলাল, সৌগত, ওরা কি দেবে? ওদের অবস্থা তো আমাদের মতোই।

বিকাশের মুখ আরও চিন্তিত, গাম্ভীর্যে থমথমে হয়ে ওঠে, অথচ আশ্চর্য এই, ও যে সব বড়লোকের ঘরের বন্ধুদের কথা বলে, তারা কোনও দিন আমাদের বাড়ি আসে না। আমাদের সঙ্গে পরিচয়ও নেই। তারাই ওর কাছে টাকা রাখে। ওরাই ওকে দামি চকোলেট খাওয়ায়।

সে কথাও আমি বলেছি। মালবিকা বলল, তোর যে সব বন্ধুরা তোর কাছে টাকা রাখে, তোকে চকোলেট খাওয়ায়, তাদের বাড়িতে ডেকে আনিস না কেন? আমাদের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে পারিস না? আমি বেশ বুঝতে পারি ও মিথ্যে করে বলে, ওদের তো আমাদের বাড়িতে আসতে বলি। ওরা আসতে চায় না। না আসতে চাইলে আমি কী করব?

বিকাশ ঝাঁজের সঙ্গে বলল, বলবে, তা হলে তুমি ওদের সঙ্গে মিশতে পারবে না। আমি পছন্দ করছি না, তুমি ওদের সঙ্গে মেশো।

তুমি কি ভেবেছ, আমি সে কথা বলিনি?’মালবিকার চোখে মুখে একটা বিরক্তি ফুটে ওঠে, আমি পরিষ্কার বলেছি, যে বন্ধুরা তোমার বাড়িতে আসতে চায় না, তোমার বাবা মার সঙ্গে পরিচিত হতে চায় না, এমন বন্ধুদের সঙ্গে তা হলে তোমার মেশা উচিত নয়।

হুঁ, তার জবাবে শ্রীমান কী বলে?

শ্রীমানের জবাব সেই একই৷’মালবিকা বলল, বলে একসঙ্গে এক স্কুলে, এক ক্লাসে পড়ি। মিশতে চাইলে আমি কী করব? আমি তো ইচ্ছে করে ওদের সঙ্গে মিশতে যাই না। মালবিকা এক মুহূর্তের জন্য থামল, এবং আবার নিজের মন্তব্য করল, কিন্তু এটা আমি পরিষ্কার বুঝতে পারি। ও সত্যি কথা বলছে না। ও মুখে হাসি বজায় রাখবার চেষ্টা করে কিন্তু সেই হাসিতে অস্বস্তি। আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না। প্রত্যেকটা কথার জবাব দিতে গেলেই, এক বার করে ঢোক গেলে।

বিকাশ চুপচাপ চিন্তিত মুখে কয়েক বার সিগারেট টানল। মালবিকার ভিতরের অস্বস্তি আর উত্তেজনা টের পাওয়া যাচ্ছে, তার বারেবারে হাতের মুঠি পাকানো আর খোলা দেখে। বিকাশ টেবিলের ওপর রাখা ছাইদানিতে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে দিয়ে বলল, আচ্ছা মালা একটা বিষয়ে তুমি তো নিশ্চিত, ঝুনু তোমার সংসারের তবিল থেকে বা আমার পকেট থেকে টাকা সরাচ্ছে না?

তোমার এই কথাটার জবাব আমি অনেক বার দিয়েছি। মালবিকার মুখ একটু গোমড়া হল, তোমার দেওয়া সংসার খরচের তবিলে, আমার পাই পয়সার খরচ পর্যন্ত টোকা থাকে। সেখান থেকে দশ-বিশ তো দূরের কথা, দুটো টাকা এদিক ওদিক হলে আমি টের পেতাম। আর তোমার পকেট হাতড়ানো? সে তো তুমিই ভাল জানেনা। তোমার কি মনে হয়েছে, তোমার মানিব্যাগের টাকার কোনও গোলমাল দেখা দিয়েছে?

বিকাশ চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল, না। আমার মানিব্যাগে কত টাকা আর থাকে? আমার হাত-খরচের মধ্যে তো সিগারেট কেনা। অফিসে যাই সাইকেল চেপে। স্কুটার ট্যাক্সি কোনও খরচই আমার নেই। প্রভিডেন্ট ফান্ড কেটে যা মাইনে পাই, সবই আমাদের টায়টিকে গোনা-গাথা টাকা। তুমি ঠিকই বলেছ, ঘর থেকে ও টাকা সরাচ্ছে না। তা হলে?

বিকাশ উৎকণ্ঠিত চোখে মালবিকার দিকে তাকাল। উৎকণ্ঠা মালবিকার চোখেও। তদুপরি ওর চোখে জল এসে পড়ল। কান্নারুদ্ধ স্বরে বলল, আমি ভাবতেই পারিনে, ঝুনু আমাদের ছেলে, পরের বাড়ি থেকে টাকা চুরি করছে। আমার একমাত্র ছেলে, লেখাপড়ায় ভাল, প্রত্যেক বছর ভাল ভাবে পাশ করে, একজন প্রাইভেট টিউটর পর্যন্ত ওর জন্যে রাখতে হয়নি। তুমি যেটুকু দেখিয়ে দাও, তাতেই ওর যথেষ্ট। টিচার আর আন্টিদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, সবাই ঝুনুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কোম্পানির যত কোয়ার্টারস আছে, যাদের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, আজ পর্যন্ত ওর সম্পর্কে কেউ একটি বাজে কথা বলেনি। বরং সবাই ওর আচরণে খুশি। বুডটের মা তো পরিষ্কার বলে, মালা, তোমার ঝুনুর মতো যদি আমার বুডটে হত, বেঁচে যেতাম। আমার ছেলে না করছে পড়াশোনা, বাজে ছেলেদের সঙ্গে মিশে মিশে গোল্লায় যাচ্ছে। আর ওর বাবা বাড়ি এসে আমাকে তড়পায়, তোমার জন্যই ছেলেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মালবিকা থামল, শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে আবার বলল, ঝুনু চুরি করছে, এটা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।’

বিকাশ সিগারেটে শেষ টান দিয়ে, ছাইদানিতে গুঁজে দিল। বলল, আমারও ঝুনুকে চোর ভাবতে বাধে। আর এ সব বিষয়ে, আমার যা অভিজ্ঞতা, কোনও ছেলে চুরি করতে শিখলে, আগে বাড়ি থেকেই। হাত পাকায়। তারপরে সে অন্য দিকে হাত বাড়ায়। কিন্তু ঝুনু কোনও দিনই বাড়ি থেকে একটা পয়সা না বলে নেয়নি। ওর সবথেকে বড় প্রমাণ, আমার মানিব্যাগ তো আমি যেখানে সেখানে রাখি। ও ইচ্ছে। করলেই সেখান থেকে না বলে পয়সা সরাতে পারে। তুমিও এমন কিছু সাবধানী নও, তোমারও সংসারের টাকা পয়সা অনেক সময় এদিকে ওদিকে পড়ে থাকে, কোনও দিনই।

তুমি গোড়ায় ভুল করেছ। মালবিকা বাধা দিয়ে বলল, ঝুনুর পকেটে দু-চার পয়সা বা দু-চার টাকা পাওয়া যায় না। দশ-বিশ-পঁচিশ–আমাদের কতটুকু সঙ্গতি? বাড়ির প্রশ্ন আসেই না। আর ওই রকম দামি চকোলেট। মুন্নাটা কত দিন আমার কাছে চকোলেট খেতে চেয়েছে। ওই রকম ভাল চকোলেট আমি আমার দুই ছেলেমেয়েকে কোনও দিন কিনে খাওয়াতে পারিনি। বিশেষ অকেশনে, জন্মদিনে বা কোনও পাল-পার্বণে বছরে দু-চার দিন হয় তো দিতে পারি। তাও ওই রকম দামি নয়।

বিকাশ বলল, আর ঝুনু তো সেই সব চকোলেট তার বোন মুন্নাকেই দেয়।

তাই তো দেয়। মালবিকা বলল, বোনকে তো অসম্ভব ভালবাসে। আবার বলে, আমার চকোলেট ভাল লাগে না। ওরা জোর করে দেয়। আমি ভাবি, ঠিক আছে, মুন্নাকে খাওয়াব।

বিকাশ আবার একটা সিগারেট ধরাল। এবং জিজ্ঞেস করল, ঝুনু সিগারেট খাওয়া ধরেনি তো?

আমার মনে হয় না! মালবিকার স্বরে দৃঢ়তা, তা হলে আমি গন্ধ পেতামই। আজকাল আমি রেগুলার ওর পকেট সার্চ করি। দেশলাই বা সিগারেটের তামাকের সামান্য গঁড়োও কোনও দিন পাইনি। ছেলেরা সিগারেট খেলেই ধরা পড়ে, বোঝা যায়। তা ছাড়া, সিগারেট খেতে হলে, বেশি টাকার দরকার কী? ধরেই যদি নিই, ঝুনু রোজ দু-চারটে সিগারেট লুকিয়ে খাচ্ছে, তার জন্য কত খরচ লাগে? না বাপু, আমি বিশ্বাস করিনে, ঝুনু সিগারেট খায়।

বিকাশ চিন্তিত মুখে খানিকক্ষণ চুপচাপ আবার সিগারেট টানল। বলল, আর একটা ব্যাপার আমার খুব সিগনিফিক্যান্ট মনে হয়েছে, তুমিও নিশ্চয় লক্ষ করেছ, টাকাগুলো যে ও কোথাও লুকিয়ে রাখবে, তাও নয়। ওর সে খেয়ালই থাকে না, ওর পকেটে টাকা আছে! তা নইলে ওর প্যান্টের পকেটে তুমি টাকা পেতে কেমন করে?

ঠিকই তো। মালবিকা বলল, সে বিষয়ে ও মোটেই সজাগ নয়। যে ছেলে বাইরে কোথাও থেকে টাকা চুরি করবে, সেই টাকা সে সাবধানে লুকিয়ে রাখবে। কিন্তু ঝুনু তো অনায়াসেই আমার কাছে ধরা পড়েছে। ধরো এক মাসের ওপর হয়ে গেছে, আমি প্রথম ওর প্যান্ট কাঁচতে দিতে গিয়ে দেখি, পকেটে একটা কুড়ি টাকার নোট। আমি তো হতবাক। ঝুনুর পকেটে কুড়ি টাকার নোট এল কোথা থেকে? ওকে কিছু না বলে আগে আমি আমার সংসার খরচের টাকার হিসাব করলাম। দেখলাম সেখানে কোনও গোলমাল নেই! প্রথম দিন যখন জিজ্ঞেস করলাম, ঝুনু টাকা কোথায় পেলি? সেই থেকে একই জবাব। অন্তত কিছু না হোক দশ বারো বার ওর পকেট থেকে ও রকম টাকা পেয়েছি। অবিশ্যি প্রথম দিন থেকে। সন্দেহ হবার পর, আমি ওর অজান্তে, পকেট সার্চ করেছি। করতে গিয়েই বুঝলাম, নিশ্চয়ই কোথাও একটা গোলমাল করছে। ঝানু চোর ছেলে কখনও চুরির টাকার ব্যাপারে ও রকম ক্যালাস হয় না। তার সবসময়েই ধরা পড়ার ভয় থাকে। আমি তো দেখি, ও ভুলেই যায়, ওর পকেটে টাকা আছে, বা চকোলেট আছে। প্যান্ট খুলে আলনায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়। যা ওর স্বভাব। স্কুল থেকে হোক, কোথাও গেলেটেলে হোক, বাড়ি এসেই জামা প্যান্ট খুলে ছুঁড়ে দেবে। বাড়িতে পরার বা শোবার ঢাউস পাজামা গলিয়ে পড়তে বসে। কত দিন কত বকাঝকা করেছি, ঝুনু যথেষ্ট বড় হয়েছে, একটু ডিসিপ্লিন শেখো। নিজের জামা প্যান্ট জুতো একটু গুছিয়ে রাখো। তা কোনও দিনই হয়নি। এ ব্যাপারে তোমরা বাবা ছেলে সমান।

বিকাশ অতি দুঃখেও হাসল, মিথ্যে বলনি মালা। চিরকালই পরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে রইলাম। তোমাকে বিয়ে করার আগে ছিলেন মা-বউদিরা। তারপর থেকে তুমি। চাকরি করে টাকা রোজগার করা ছাড়া সংসারে আমি একেবারে অকর্মণ্য। কিন্তু।

বিকাশ আবার চিন্তিত হয়ে পড়ল। এই সময়েই এক দল মেয়ে পাখিদের মতো কিচিরমিচির করে খাবার ঘরের টেবিলের কাছে এসে জড়ো হল। সকলেরই বয়স দশ থেকে বারো। মুন্নার বন্ধু। বোঝা গেল, খেলা নিয়ে ওদের মধ্যে একটা বিবাদ উপস্থিত হয়েছে। সবাই মালবিকাকেই বিশেষ করে হেঁকে ধরল। কেউ বলছে আন্টি, কেউ চাচিজি, কেউ কাকিমা। রুমাল-চোর খেলা নিয়েই তাদের মধ্যে। গোলমাল হয়েছে। যারা চোখ বেঁধে গোল হয়ে বসে থাকে, তারা কি কেউ সবসময়ের জন্য পেছনে হাত রাখতে পারে? তারা মাঝে মাঝে পিছনে হাত দিয়ে দেখবে, রুমাল রয়েছে কি না। সবসময় হাত দিয়ে রাখলে, সে তো টের পেয়ে যাবেই। তা হলে আর খেলার মজাটা কোথায়?

অভিযোগটা আসলে মুন্নাকে কেন্দ্র করেই। মুন্নার বয়স এখন বারো। ক্লাস সেভেনে পড়ে। ও বাবার মতো দেখতে হয়েছে। মেয়ে বলেই ওকে আরও ফরসা দেখায়। চেহারাটিও বেশ মিষ্টি। ও বলল, আমি মোটেই সবসময় পেছনে হাত রাখিনি। আমার যদি মনে হয়, আমার পেছনে রুমাল ফেলে গেছে, তা হলে দেখব না? পিঠে কিল খেতে কি ভাল লাগে?

না মুন্না, পিঠে কিল খাবার ভয় থাকলেও, তুমি সবসময় পেছনে হাত রাখতে পারো না!’ মালবিকা হেসে বলল, খেলার নিয়ম সবাইকেই মেনে চলতে হয়।

মুন্না ঠোঁট ফুলিয়ে, ভুরু কুঁচকে বাবার দিকে তাকাল। বিকাশ হেসে বলল, মা তো ঠিকই বলেছে। খেলতে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করতে নেই।

বাকি মেয়েরা সব হাততালি দিয়ে, কিচিরমিচির করে উঠল। মুন্না রেগে গিয়ে বন্ধুদের বলল, আমি আর খেলব না।’

না এটা তোমার অন্যায় মুন্না।’মালবিকা গম্ভীর মুখে বলল, বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করতে নেই। যাও, সবাই মিলে মিশে খেলা করোগে!

মুন্নাকে বন্ধুরা টেনে নিয়ে যেমন এসেছিল, আবার ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল। মালবিকা বলল, তোমার মেয়েটা পাজি আছে। অন্যায়ও করবে, আবার বন্ধুদের চোখও রাঙাবে।’

ওটাও বোধ হয় আমার স্বভাব। বিকাশ মালবিকার দিকে তাকিয়ে হাসল, যাক সব খারাপগুলোই ছেলেমেয়েরা আমার কাছ থেকে পেয়েছে। কিন্তু তোমার ছেলে?

মালবিকা আবার গম্ভীর হল, সেটা তো একটা একস্ট্রাঅরডিনারি ব্যাপার। যার মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি নে। ঝুনু আমার খাওয়া-ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এক মাসের ওপর ঘটনাটা প্রথম জানতে পেরেছি। তার আগে কত দিন ধরে এ রকম চলেছে, তা কে জানে?

তার থেকে খুব বেশি দিন আগের ব্যাপার বোধ হয় না। বিকাশ সিগারেটে টান দিয়ে বলল, তা হলে আরও আগেই ধরা পড়ে যেত। ও তো পকেটের টাকার ব্যাপারে ক্যালাস। আচ্ছা ও আজকাল বিকেলে কোথায় খেলতে যায়?

মালবিকা বলল, বড় গ্রাউন্ডে যায়। অন্তত আমাকে তো তাই বলে যায়।

হু!’ বিকাশ আবার চিন্তিত হল, আরও একটা ব্যাপার ভেবে দেখার আছে। চুরিই যদি করবে, টাকাগুলো দিয়ে ও কী করে? ছেলেরা তো অভাবেই চুরি করে। ওর কি সিনেমা দেখার নেশা হয়েছে?

মালবিকা মাথা নেড়ে বলল, সে সময় কোথায়? তা হলে ওকে স্কুল পালাতে হয়। নুন শো ছাড়া, স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখার সময় নেই। কিন্তু ওর স্কুলের অ্যাটেনডেন্স রিপোর্ট সব সময়েই ভাল। ম্যাটিনি শো দেখতে গেলেও ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পালাতে হয়। তা হলে বাড়ি ফিরতে দেরি হত। কিন্তু তা তো কোনও দিন হয় না। স্কুল থেকে ঠিক সময় মতো বাড়ি ফেরে। খায়, খেয়ে খেলতে যায়। ছটা থেকে সাড়ে ছ’টার মধ্যে বাড়ি চলে আসে। মাঝে মধ্যে দু-একদিন দেরি করে। হয়তো সাতটাও বেজে যায়। জিজ্ঞেস করলে বলে, অমুক বন্ধুর বাড়ি টেনে নিয়ে গেছল, নতুন গানের রেকর্ড শোনাবে বলে। ঝুনুর তো আবার একটু গান-বাজনার শখ আছে। আজ পর্যন্ত ওকে একটা রেকর্ডপ্লেয়ার কিনে দিতে পারলাম না। বলেছি, হায়ার সেকেন্ডারিটা পাশ কর, তারপরে যা তোক করে একটা রেকর্ডপ্লেয়ার কিনে দেব।’

কিছুই বুঝতে পারছি না। বিকাশ অসহায় ভাবে মাথা ঝাঁকাল, অথচ স্থির থাকতেও পারছি না। ঝুনুটা আমাকে পাগল করে ছাড়বে দেখছি। আচ্ছা মালা, তুমি কি ওর মধ্যে কোনও পরিবর্তন লক্ষ। করেছ?

মালবিকা একটু ভাবল, তারপর বলল, পরিবর্তন বলতে সে রকম কিছু চোখে পড়েনি। মাঝে মাঝে ওকে কেমন শুকনো আর গম্ভীর দেখায়। কিছু বলতে গেলেই রেগে যায়। গুম খেয়ে বসে থাকে। জিজ্ঞেস করলে প্রায় কিছু জবাবই দিতে চায় না। খুব চেপে ধরলে, খালি বলে, সব ডার্টি, আমি আর বাড়ি থেকে বেরোব না, কারোর সঙ্গে মিশব না, কারোর বাড়িও যাব না। এ সব কথা থেকে সহজেই। বোঝা যায় বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করে এসেছে। এক দিন তো আমাকে সোজাসুজি বলল, মা আমার আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করে না। বাবাকে বলো না, কোম্পানির কলকাতার অফিসে ট্রান্সফার নিয়ে নিতে?

তাই নাকি?’ বিকাশ অধিকতর চিন্তিত হয়ে পড়ল, এ কথাটা তো আমার মোটেই ভাল ঠেকছে না। তার মানে ওর আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না। নিশ্চয়ই ওর একটা কিছু মনে হয়েছে? সেটা। কী আমাদের জানতে হবে। শোনো মালা, আমি একটা কাজ করি। সাইকেলটা নিয়ে আমি এক বার। বড় গ্রাউন্ডে যাই, দেখি ঝুনু ওখানে খেলছে কি না। আর তুমি একটা কাজ করো তো। বন্ধুদের দেওয়া টাকা ও কি বন্ধুদের দেয়? চুরি যদি করে, তা হলে এমনও হতে পারে, ও বাড়িতেই কোথাও সে টাকা লুকিয়ে রাখে। তুমি একটু খোঁজ করে দেখো তো। ওর বইয়ের টেবিলের ড্রয়ার বা বইয়ের ভেতর, কোথাও টীকা পয়সা পাও কি না?

বিকাশ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। মালবিকাও উঠে দাঁড়াল, দেখছি। আমি তো ওর ড্রয়ার ঘেঁটে এমনিতেই দেখি, টাকা পয়সা কিছুই চোখে পড়েনি।

বিকাশ পাজামা গেঞ্জির ওপরে একটা পাঞ্জাবি চাপাল। বাড়ির পিছনে রান্নাঘরের বারান্দায় রাখা সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

.

বিকাশ সেনের বাড়ি কলকাতার উত্তর উপকণ্ঠে। পৈতৃক বাড়ি। বাবা মা এখনও বেঁচে আছেন। ওর দুই দাদা কলকাতায় ভাল চাকরি করেন। ওকেই একমাত্র কলকাতার বাইরে, চাকরির জন্য। প্রবাস-জীবন যাপন করতে হয়। সেজন্য মনে কোনও দুঃখ বা ক্ষোভ ছিল না। চাকরিতে ওর ভবিষ্যৎ। উন্নতির নিশ্চিত সম্ভাবনা আছে। তার থেকেও বড় কথা, ওর সংসারে কোনও অশান্তি নেই। ঝুনুর বয়স। এখন ষোলো। হায়ার সেকেন্ডারিতে পড়ছে। পড়াশোনায় ভাল। হাসিখুশি। মুন্নাও সব দিক থেকে, মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমন মানুষ হওয়া উচিত, তাই হচ্ছে। মালবিকার কোনও অভিযোগ নেই। যা টাকা পায়, পাকা গিন্নির মতো সংসার চালায়। ঝগড়া বিবাদ মনকষাকষি কোনও কিছুই পরিবারে নেই? তবু বলতে হবে, বিকাশ আর মালবিকা সুখী দম্পতি। সব মিলিয়ে নিরুদ্বেগ শান্তির সংসার। কিন্তু গত দেড় মাস ধরে ঝুনুর ব্যাপারে, ওদের শান্তিপূর্ণ সংসার-তরী এক উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে আছড়ে পড়েছে। বাইরে থেকে সেটা বোঝা যায় না। কারণ বাইরের লোক ওদের পুত্র নিয়ে সংকটের কথা কিছুই জানে না।

বিকাশ সাইকেল চালিয়ে, বড় গ্রাউন্ডের ধারে রাস্তায় এল। সাইকেল থেকে নেমে, গ্রাউন্ডে ছেলেদের ফুটবল খেলার দিকে তাকাল। সে খুব ভালভাবে লক্ষ করে দেখল। খেলোয়াড়দের মধ্যে, ঝুনু কোথাও নেই। যে সব ছেলেরা খেলা দেখছিল, বা আশেপাশে ঘোরাফেরা করছিল, তাদের মধ্যেও ঝুনু নেই। অথচ ঝুনু বাড়িতে মাকে বলে বেরোয়, ও বড় গ্রাউন্ডে খেলতে যায়।

বিকাশ আরও ভাল করে খুঁটিয়ে প্রত্যেকটি ছেলেকে লক্ষ করে দেখল। ঝুনু কি কোনও দিনই বড় মাঠে আসে না? মিথ্যা কথা বলে? তা হলে ও কোথায় যায়?

বিকাশ ভাবতে ভাবতে সাইকেলে উঠে, চারপাশে আস্তে আস্তে চক্কর দিতে লাগল। হঠাৎ ওর। চোখে পড়ল, রণধীর চোপরা আর সুরজিৎ সিং ছেলে দুটি এক জায়গায় বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে! বিকাশ জানে, দুজনেই খুব বড় পোস্টের অফিসারের ছেলে। ঝুনু এদেরই নাম করে, এরাই। নাকি ওকে টাকা রাখতে দেয়। বিকাশ একটু ভেবে, মনস্থির করে ফেলল। রণবীর আর সুরজিৎ, দুজনের সামনে সাইকেল থেকে নামল। ওরা তাকাল বিকাশের দিকে! বিকাশ জানে দুজনেই পাঞ্জাবি। এক জন হিন্দু, আর এক জন শিখ। সুরজিতের মাথায় পাগড়ির মতো ঝুঁটি বাঁধা। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলে। ঝুনুও তাই পড়ে। বিকাশ হেসে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল, স্বপনকে তোমরা দেখেছ?

স্বপন হল ঝুনুর ভাল নাম। রণধীর আর সুরজিৎ স্বপনের বাপকে ভালই চেনে। রণধীর বলল, ও। তো আমাদের বাড়ি গেছল, কিন্তু আমার সঙ্গে বেরোয়নি। আমার দিদি ওকে নতুন রেকর্ডের গান শোনাবে বলছিল। এখন হয়তো ও আমাদের বাড়িতেই আছে। ডেকে আনব!

না না, কোনও দরকার নেই। বিকাশ যেন একটু নিশ্চিন্তই হল। তবু জানা গেল, বাজে কোনও লোকের সঙ্গে ঝুনু কোথাও যায়নি। চোপরা সাহেবের বাড়িতে, তাঁর মেয়ে ঝুনুর থেকে অনেক বড় স্নেহ করে, ভালবাসে, তবে, এই সুযোগে সে সংকোচ কাটিয়ে বিব্রত হেসে বলল, তোমরা স্বপনের বন্ধু, আমি জানি। তোমাদের কাছ থেকে আমি একটা কথা জানতে চাই। আশা করি, তোমরা আমাকে সত্যি বলবে।

রণধীর আর সুরজিৎ অবাক চোখে বিকাশের দিকে তাকাল। সুরজিৎ জিজ্ঞেস করল, কী কথা বলুন তো? নিশ্চয়ই আমরা সত্যি কথা বলব।’

আচ্ছা, তোমরা কি স্বপনকে প্রায়ই দশ-বিশ-পঁচিশ টাকা রাখতে দাও?’ বিকাশ তীক্ষ্ণ চোখে ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, আবার তোমাদের ও টাকা ফেরত দিয়ে দেয়?

রণধীর আর সুরজিৎ অবাক চোখে নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করল। রণধীর বেশ দৃঢ় স্বরে বলল, না তো, আমরা তো এ রকম টাকা স্বপনকে দিই না। ওকে টাকা রাখতেই বা দেব কেন? ও কি সে রকম কিছু বলেছে?

না, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম। বিকাশের মুখটা তখন কালো হয়ে উঠেছে। সে বুঝতে পারছে, তার মিথ্যা কথা ছেলে দুটি পরিষ্কার বুঝতে পারছে। কারণ ওদের চোখে সন্দেহ ও বিস্ময় ফুটে উঠেছে। বিকাশ বলল–মিথ্যা করেই বলল, টাকা কোনও দিন ওর কাছে দেখিনি। ও আমাদের মাঝে মাঝে বলে, আমার বন্ধুরা আমার কাছে টাকা রেখে দেয়। তাই জিজ্ঞেস করলাম। কথাটার মধ্যে তা হলে কোনও সত্যি নেই?

একদমই না।’ সুরজিৎ সজোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, আমরা স্বপনকে জিজ্ঞেস করব তো, কেন ও এ রকম ঠাট্টা করেছে।

বিকাশ সাইকেলে উঠতে উঠতে বলল, হ্যাঁ, জিজ্ঞেস কোরো। স্বপন আমাকে আর ওর মাকে চটাবার জন্যেই বোধ হয় এ রকম মজা করে।

বিকাশ সাইকেল চালিয়ে কোয়ার্টারগুলোর দিকে চলল। ওর মিথ্যা মধ্যবিত্ত ভদ্র হাসি আর মুখে নেই। শক্ত মুখ বিবর্ণ কালো হয়ে উঠেছে। ঝুনু এত দিন ধরে মিথ্যা বলে এসেছে, বাবা মাকে ঠকিয়েছে। অথচ ও এখনও লেখাপড়ায় সত্যি ভাল। এলাকার সমস্ত লোক–মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে ওর প্রশংসা করে। তা হলে ঝুনু কতটা খারাপ হলে, দিনের পর দিন বাবা মাকে মিথ্যা কথা বলে আসছে। এখন আর কোনও সন্দেহ নেই ও একটি পাকা চোর হয়েছে।

বিকাশ কোয়ার্টারের খোলা দরজা দিয়ে, সাইকেল নিয়ে ভিতরে ঢুকল। বসবার ঘরের দরজা দিয়ে পিছনে যেতে গিয়ে দেখল, খাবার টেবিলে মালবিকা মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে। বিকাশ সাইকেল রেখে, খাবার ঘরে এল। মালবিকা মুখ তুলে, বিকাশকে দেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। টেবিলের ওপর পড়ে আছে একটা সাদা খাম। বিকাশ জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে মালা?’

তুমি ভুল কিছু বলো নি৷ মালবিকা কান্নারুদ্ধ স্বরে বলল, আমি ওর বই-খাতা ঘেঁটে এই খামটা বের করেছি। খাম ভরতি নোট। তুমি দেখো।

বিকাশের মুখ আরও শক্ত ও কালো হয়ে উঠল। খামটা খুলে দেখল, দশ-বিশ-পাঁচ টাকার অনেকগুলো নোট। সব যোগ করলে তিন-চার শো টাকার মতো হবে। তার মধ্যে একটা কাগজও রয়েছে। ঝুনুর নিজের হাতে ইংরেজিতে লেখা, লজ্জা আর ঘৃণা ভরা এই টাকা। আর কিছু লেখা নেই।

তার মানে, চুরি! সেন বংশের ছেলে একটি পাকা চোর। নিজের অপরাধের কথা লিখে রাখতেও ভুল করেনি! রাগে দুঃখে বিকাশের চোখ দুটোও ছলছল করে উঠল। তারপরেই তার মুখ ভয়ংকর হয়ে উঠল। হাতের ঘড়ি দেখল। সাড়ে ছটা বাজে। বাইরে তখনও দিনের আলো আছে। তবে সন্ধ্যা আসন্ন। ঝুনুর আসবার সময় হয়েছে। মুন্না ঘরে ঢুকেছে।

বিকাশ বাঘের চাপা গর্জনের স্বরে বলল, মালা, তোমাকে আমি অনুরোধ করছি, তুমি মুন্নাকে নিয়ে ঘণ্টাখানেকের জন্য কারোর বাড়িতে বা যেখানে খুশি একটু ঘুরে এসো। আমি ঝুনুর সঙ্গে আজ একটা হেস্তনেস্ত করব।

মালবিকা কিছু বলবার চেষ্টা করল। বিকাশ টাকার খামটা ঝটিতি পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে বলল, প্লিজ মালা, আমার কথা রাখো। তুমি মুন্নাকে নিয়ে কোথাও চলে যাও। মুন্নার সামনে আমি কোনও সিনক্রিয়েট করতে চাই না। তুমি ওকে নিয়ে চলে যাও।

মালবিকার দুই চোখে উদ্বেগ ভয়। কিন্তু বিকাশের মূর্তি দেখে কিছু বলতে সাহস পেল না। চোখের জল মুছে, মুন্নাকে নিয়ে সে বেরিয়ে গেল।

.

বিকাশ প্রতিটি মিনিট খাঁচায় বন্দি বাঘের মতো বাইরের ঘরে পায়চারি করতে লাগল। টেবিলের ওপর পড়ে আছে একটা পুরনো ছাতার বেতের লাঠি। সে ঘন ঘন বাইরে তাকাচ্ছে, আর ক্রমাগত মুখ কঠিন হয়ে উঠছে। চোখ লাল। সে যেন স্বাভাবিক নেই।

ঝুনু ঘরে ঢুকল ছ’টা চল্লিশ মিনিটে। ছিপছিপে স্বাস্থ্যবান ষোলো বছরের কিশোর। মুখে এখনও গোঁফের রেখা দেখা দেয়নি। মায়ের বংশের মতোই লম্বা গড়ন পেয়েছে। মালবিকা ওকে ট্রাউজার পরতে দেয়। লাল ডোরা কাটা শার্ট, বটল গ্রিন ট্রাউজার পরা ঝুনু ঘরে ঢুকল। নিষ্পাপ সুন্দর মুখ। মাথায় একমাথা কালো চুল। যেন খেলেই ফিরছে, এ রকম উশকো খুশকো ভাব। নিজের হাতেই সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে বলল, এখনও আলো জ্বালোনি? মা কোথায়?

বিকাশ কোনও জবাব না দিয়ে, বাইরের ঘরের দরজাটা সজোরে বন্ধ করে, ছিটকিনি আটকে দিল। ঝুনু বাবার মুখের দিকে না তাকিয়ে খাবার ঘরে গিয়ে সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে, শোবার ঘরে ঢুকল। সেখানেও আলো জ্বালিয়ে, অবাক স্বরে বলল, একি মা বাড়িতে নেই নাকি?

বিকাশ ঘরে ঢুকে বলল, না নেই।

বিকাশের হাতে সেই ছাতার বাটের বেতের লাঠি। দু চোখ ধকধক জ্বলছে। পকেট থেকে খামটা বের করে ঝুনুর দিকে বাড়িয়ে দিল। ঝুনু অবাক চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে খামটা নিল। এই প্রথম। লক্ষ করল, বিকাশের জ্বলন্ত চোখ-মুখ। বিকাশ কেবল দাতে দাঁত পিষে উচ্চারণ করলে, মিথ্যুক! চোর!

বলে অন্ধের মতো সেই শক্ত মোটা বেত দিয়ে ঝুনুকে পেটাতে আরম্ভ করল। এই আকস্মিক আক্রমণে ঝুনু যেন তেমন অবাক হল না। মার খেতে খেতে এক সময়ে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিকাশ তবু থামল না। সপ সপ শব্দে পিটিয়েই চলল। ঝুনু ক্রমেই কুঁকড়ে যেতে লাগল। মুখে গালে বাড়ি খেয়ে, ঠোঁট নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে।

বিকাশ দম নেবার জন্য থামল, এত দিন ধরে এই মিথ্যাচার? মিথ্যুক, চোর। তুই একটা চোর! আর এখনও তোর মা তা বিশ্বাস করে না? আমি তোকে খুন করে আজ জেলে যেতেও রাজি, তবু তোকে ছাড়ব না। কোথা থেকে, কাদের বাড়ি থেকে এ টাকা চুরি করেছিস, বল।

ঝুনুর পক্ষে জবাব দেওয়া সম্ভব ছিল না। বিকাশ জানত না, উগ্র হয়ে সে কী প্রচণ্ড মার মেরেছে ছেলেকে। সে আবার বেতটা তুলতে গিয়ে দেখল, ঝুনুর লাল ডোরা কাটা জামার কাঁধ পিঠে রক্তে ভিজে উঠেছে। বিকাশ থামল, এখনও বল, কোথা থেকে তুই এ টাকা চুরি করেছিস? এ চোরাই টাকা দিয়ে তুই দামি চকোলেট কিনে আনতিস। আর বন্ধুদের নাম করে আমাদের মিথ্যে কথা বলতিস।’

আমি চুরি করিনি। ঝুনুর গোঙানো স্বর শোনা গেল, বাবা তুমি আমাকে মেরে ফেলতে পারো, কিন্তু আমি চোর নই, চুরি করিনি।বলতে বলতে ঝুনু যন্ত্রণায় বিছানায় মুখ গুঁজে দিল।

বিকাশ সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। দেখল, ঝুনুর জামার লাল ডোরায় রক্তে মেশামেশি হয়ে যাচ্ছে। সে বেতটার দিকে এক বার তাকাল। বলল, তা হলে এ টাকা তুমি কোথা থেকে পেয়েছ। আমি সত্যি কথা শুনতে চাই।

ঝুনু কিছুক্ষণ পড়ে থেকে, মুখ ফিরিয়ে বলল, এ সব টাকা আমাকে দিয়েছেন শ্রীবাস্তব আন্টি, কেলকার আন্টি, চোপরা বহেন, রতিদিদি, মৃদুলা কাকিমা। তাঁরা আমাকে চকোলেটও দিতেন।

বিকাশ অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে বলল,কেন এঁরা তোমাকে টাকা চকোলেট দিতেন।

ঝুনু চুপ করে রইল। বিকাশ দেখছে, ঝুনুর শরীর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠছে। বিকাশের উগ্র ক্রোধ আর নেই। বরং মনের গভীরে একটা কষ্ট বোধ জেগে উঠছে। জিজ্ঞেস করল, বল কেন ওরা তোকে টাকা চকোলেট দিতেন?

তোমাকে আমি সে কথা বলতে পারব না বাবা।’ ঝুনু গোঙানো স্বরেই বলল, খুব নোংরা ব্যাপার। আমার আর এই নরকে থাকতে ইচ্ছে করছে না। বলেই ও কান্নায় ফুলে ফুলে উঠল।

বিকাশ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে তার গভীর বিস্ময় ও অন্যমনস্কতা। মনে পড়ল, টাকার খামে লিখে রাখা ঝুনুর সেই কথা, লজ্জা আর ঘৃণা ভরা এই টাকা।’ মুহূর্তেই বিকাশের চোখের সামনে থেকে একটা পরদা সরে গেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল, মিসেস শ্রীবাস্তব, মিসেস কেলকার, মিস চোপরা, মিঃ ঘোষের স্ত্রী মৃদুলার চেহারা। সে দেখতে পেল, ওই সব ভদ্রমহিলারা তাদের ক্ষুধা মেটাবার জন্য কী ভাবে একটি নিষ্পাপ ছেলেকে নিজেদের শিকার করে তুলেছে। ঘৃণায় তার সর্বাঙ্গ কুঁকড়ে উঠল। এই কলোনি জীবনের সাজানো গোছানো সুন্দর, শিক্ষায় দীক্ষায় সংস্কৃতি-সম্পন্ন সমাজের সেই নগ্ন চেহারাটা তাকে যেন কাঁপিয়ে দিল। মনে তার অসহায় অবাক জিজ্ঞাসা, এ কোন সমাজে আমরা বাস করছি? বাইরে থেকে যার কিছুই চেনা যায় না, বোঝা যায় না। অদৃশ্যে গভীরে সরীসৃপের মতো ক্লেদাক্ত জীবেরা বিচরণ করছে। অথচ বাইরে তারা কী আশ্চর্য নিটোল সুন্দর।

কলিং বেল বেজে উঠল। বিকাশ ঝুনুর দিকে এক বার দেখে, বাইরের ঘরে গেল। হাতের বেতটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। দরজা খুলে দিল! মালবিকা উৎকণ্ঠিত জিজ্ঞাসু চোখে বিকাশের দিকে তাকাল। বিকাশ জবাব দিতে গিয়ে দেখল, সে কথা বলতে পারছে না। গলায় তার স্বর নেই। তার দুই চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। কোনও রকমে উচ্চারণ করল, মালা তুমি একটু ঝুনুর কাছে যাও। ও যে কেন বলত, এখানে থাকতে চায় না, সেটা বড় দেরিতে বুঝলাম। আমি আগামীকালই আমার ট্রান্সফারের জন্য আবেদন করব। ঝুনুকে নিয়ে দু-একদিনের মধ্যেই আমি কলকাতায় যাব। ওকে সেখানেই রেখে আসব। তুমি যাও ওর কাছে।

বিকাশ বসবার ঘরের একটা চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ল। মুখ ঢাকল দু হাতে। মালবিকা ছুটে ঝুনুর কাছে গেল। দেখল, রক্তাক্ত ঝুনু বিছানায় পড়ে আছে। মালবিকা একটা আর্তধ্বনি করে, ঝুনুর গায়ের কাছে উপুড় হয়ে পড়ল, ডাকল ঝুনু।

ঝুনু মাকে দেখে, দু হাতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল।