উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

যতই সন্ধে ঘনিয়ে আসছে

অশ্লীল – উপন্যাস

যতই সন্ধে ঘনিয়ে আসছে, ভদ্রলোকের মুখ ততই যেন শক্ত হয়ে উঠছে। যাকে বলে তেড়িয়া ভাব, সেই রকম। জানি না, এর পরে, আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে, এই কুপে থেকে বের করে দেবেন কি না। দিলেও আমার কিছু করার সাধ্য নেই। আমাকে করিডরেই রাত কাটাতে হবে। এমন না যে, চেয়ার কার কমপার্টমেন্টে গিয়ে, কোনও চেয়ারে বসে, রাতটা কাটিয়ে দিতে পারব। আমার মতো লোকের পক্ষে যতটা জানা সম্ভব, সেই হিসাবে জানি, এই পুরো এয়ারকন্ডিশন্ড এক্সপ্রেস ট্রেনে একটি খালি সিট নেই, একটিও চার বা দুই জনের কুপে খালি নেই। সব একেবারে ভরাভরতি, সেই কী একটা কথা যেন আছে, বর্ষার জলে ভরে ওঠা পুকুরকে বলে কী কথাটা? আহ, মমতা কাকিমার মুখে যে কথাটা প্রায়ই শুনেছি। কী কথাটা? মমতা কাকিমা বাঙাল-মানে পূর্ববাংলার মেয়ে, কিন্তু অনেকের মতে, তিনি বাঙাল’ বললে চটে যান না, যেমন আমাকে কেউ ঘটি বললে আমার বেশ মজা লাগে। ঘটি। আমি একটা ঘটি, কী তার মানে, আমি কিছুই জানি না, কিন্তু আমি যেন একটা ঘটি, পেতলের বা অ্যালুমিনিয়ামের, ভাবলেই হাসি পায়, আর মজা লাগে। অথচ বাঙাল শব্দের একটা বিশেষ অর্থ আছে, কার বইয়ে যেন পড়েছিলাম, বঙ্গ+আল, বঙাল–মানে বাঙাল। অবিশ্যি জানি না, বঙ্গ+আ বঙাল থেকেই বাঙাল কথাটা এসেছে কি না, তবে এটা জানি বাঙালদের শব্দের স্টক আমাদের থেকে অনেক বেশি। সেজন্যই বোধ হয় মমতা কাকিমাকে কেউ বাঙাল বললে, তিনি ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলেন, বাঙালরা ছিল, তাই তরে গেলে। খুব সত্যি কথা। বাংলা ভাষার শব্দের স্টক আজকাল অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছে, আর সেটা পুব বাংলার মানুষদের জন্যই। কিন্তু সেই কথাটা–মমতা কাকিমা যেটা বলেন–সেই কথাটা–এমন অস্বস্তি হয়, ইচ্ছা করে, মারি এক থাপ্পড় নিজের গালে, অথবা যদি পেতাম ‘মেমারি’ বলে বস্তুটাকে নিজের শরীরের মধ্যে কোথাও, এক রামচিমটি কেটে, উল্লুকটার ঝুঁটি নেড়ে আহ, যাক, এত দূর আর যেতে হল না, মনে পড়ে গিয়েছে, কেন না, মমতা কাকিমার পান খাওয়া সেই সুন্দর লাল ঠোঁট দুটো চোখের সামনে ভেসে উঠল কি না, তাতেই মনে পড়ে গেল, কথাটা টইটুম্বুর। টই-টুমবুর, মানে একেবারে ভরাভরতি, মানে এই গাড়িটা যাত্রীতে ভরা টইটুম্বুর। কোথাও একটু জায়গা পাওয়া যাবে না। কিন্তু ভদ্রলোকের হাবভাব আমার মোটেই সুবিধার মনে হচ্ছে না। মুখের ভাব যে কেবল তেড়িয়া হয়ে উঠছে, তা না। যত বারই চোখ তুলে তাকাতে গিয়েছি, উনি আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে দেখছেন। চোখে চোখ পড়লেই, দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু এমনভাবে ঘাড়ে ঝটকা দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, আর প্রকাণ্ড শরীরটাকে নড়িয়ে-চড়িয়ে বসবার ভঙ্গি বদল করছেন, আর তার জন্য ওঁর খুব সুন্দর ছাপা সিল্কের লুঙ্গিতে, র সিল্কের জামায় খসখস শব্দ হচ্ছে, গদি মসমঁসিয়ে উঠছে, আমি মোটেই স্বস্তি বোধ করছি না। এমনিতেই ওঁর মুখটা চৌকো আর মোটা তুমবো তুমবো মতো, ফরসা আর লালচে রং, চোখের কোলগুলো ফোলা ফোলা, এবং চোখ দুটোও লাল, রেগে টং হলে যেমন হয়। না, শুধু রাগ-ই বা বলছি কেন, একটা–একটা মানে, একটা ঘৃণা আর আক্রোশের ভাব–অর্থাৎ যাকে বলে অভিব্যক্তি, যেন রয়েছে।

কেন যে তপনকাকা আমাকে এই এসি কোচের, সিঙল কুপে-তে টিকেট কেটে তুলে দিলেন! চেয়ার কারের টিকেট কেটে দিলেই পারতেন, আমি অনেক লোকের সঙ্গে, অনেকের অনেক কথা শুনতে শুনতে, বেশ জার্নি করতে পারতাম। রাত্রে শোয়া? কোনও দরকার ছিল না। একটা রাত না শুলে মরে যাব না। কিন্তু টাকা? আমাদের যে অনেক টাকা, তপনকাকার অনেক টাকা। আমি যত খারাপ আর পাজি আর বদমাইশ আর নোংরা চরিত্রের ছেলে হই, (মাস চারেক আগে সেটা প্রমাণ হয়েছে, আমি খারাপ, আমার একেবারে বারোটা বেজে গিয়েছে। আমাকে তো এ রকম আরামেই ভ্রমণ করতে হবে। প্লেনে আসতে রাজি হইনি, তা-ই এই এসি কোচের সিঙল কুপে-তে আমাকে মরতে আসতে হয়েছে। তা ছাড়া আর কী বলব। এ রকম ঠাণ্ডা একটা খুপরির মধ্যে আমি আর এই ভদ্রলোক, আমার কাছে তো এখন মনে হচ্ছে, একটা গুহার মধ্যে বাঘের পাশে বসে আছি। অথচ মাত্র পাঁচ দিন আগেও, দুমাস আমি কোথায় ছিলাম? যাকে বলে সশ্রম কারাদণ্ড, তাই তো ভোগ করছিলাম, আর আজ আমি ভারতবর্ষের একটা সেরা এয়ারকন্ডিশন্ড গাড়ির সিঙল কুপেতে বসে, কলকাতা যাচ্ছি। বোঝো।

ওহ বাবা, আবার ভদ্রলোকের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল, আর সেই ছোট ঘোট লাল চোখে রাগ, আক্রোশ, ঘৃণা এবং পায়ের ওপর পা বদলাতে গিয়ে সিল্কের লুঙ্গির সেই খসখস এবং গদির সেই মসমস শব্দ, যেন আমাকেই পিষে মারছেন। সন্ধে যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই উনি যেন কেমন ‘ভয়ংকর হয়ে উঠছেন, অন্তত আমার সেই রকমই মনে হচ্ছে। অবিশ্যি কারণ একেবারে নেই, তা বলব না, কারণ উনি আমাকে চেনেন, আমিও ওঁকে চিনি, আর আমার সশ্রম কারাদণ্ডের কথাও উনি জানেন, মানে বলতে গেলে, আমাকে অভিযুক্ত করা এবং শাস্তি দেবার পিছনে ওঁরও যথেষ্ট অবদান আছে। অবদানই বলতে হবে, কারণ সবাই জানে, উনি আসলে একটি মহৎ কাজই করেছেন। কিন্তু এখন এ রকম করছেন কেন, আর সন্ধে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ রকম হয়ে উঠছেন কেন। আমি তো শান্তভাবেই বসে আছি, বই পড়ছি, এবং এমনকী আমি আগে এসে জানালার ধারে বসেছিলাম বলে, আমাকে সরে যেতে বলেছেন, আমি সরে গিয়েছি, উনিই জানালার ধারে বসে আছেন, আর চার মাস আগেও সবাই জানত, আমি বরাবরই শান্ত, বাধ্য। এখন হয়তো অনেকে আর ওটা বিশ্বাস করতে চাইবে না। কিন্তু আমি তো জানি, আমি যে আমি, সেই আমিই আছি, সেই আদি ও অকৃত্রিম মদনমোহন। শান্ত বাধ্য বলতে যে আমি গল্পগুজব, হাসিঠাট্টা করতে ভালবাসি না, তা না। এমনকী আমি পড়াশোনায়ও বরাবর ভাল ছিলাম, এখনও বই ছাড়া আমার চলে না, যদিও কিনা, আমাদের বাড়ির লোকেরা, বা আত্মীয়স্বজনরা সকলেই আমাকে কেমন যেন বোকা বোকা ভাবে। নির্বোধ যাকে বলে। অথচ সত্যি আমি তা না, আমি নিজে তা ভালই জানি, এবং এও জানি, এ কথা কারোকে বলা চলে না, বিশ্বাস করো, আমি সত্যি বোকা না। এখন তো অবিশ্যি সবই বদলিয়ে গিয়েছে। এখন আমি বোকা তো বটেই, তার ওপরে দুর্নাম জুটেছে, আমি খারাপ চরিত্রের ছেলে, নোংরা, বদমাইশ। আমাকে দিয়ে এ সংসারে আর কিছুই হবে না। তপনকাকার দাদা সবিতামোহন তো পরিষ্কার আমার মুখের ওপরেই বলে দিয়েছেন, বদমাইশি করতে হলে চালাক হওয়া দরকার। বোকা বদমাইশদের ওষুধ একমাত্র উত্তমমধ্যম। উত্তমমধ্যম মানে মার। তা হবে হয়তো। সত্যি, কী যে হয়ে গেল একটা ব্যপার।

উহ্ মিস্টার জে. বিশওয়াস্ আবার আমার দিকে সে রকম করে তাকিয়ে দেখলেন, এবং সেই শব্দ, ঘাড়ে ঝটকা। ব্যাপারটা এবার যেন একটু ঘন ঘন হচ্ছে। প্রথমে কুপে-তে ঢুকেই মিস্টার জে. বিশওয়াস যেন একটা ঘেয়ো কুকুর দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। দু চোখে রাগ, ঘৃণা, বিরক্তি, কী না ছিল। তখন তিনি ট্রাউজার, টাই, কোট ইত্যাদি পরেছিলেন এবং চোখে চশমা ছিল, আর কপালের সামনে থেকে। কলপ উঠে যাওয়া বাদামি চুল ভালভাবে পাট করা ছিল। কয়েক সেকেন্ড সেই রকম ভাবে তাকিয়ে থেকে, চোখ থেকে চশমাটা যেন হেঁ মারার মতো ছিনিয়ে খুলে নিয়ে, প্রায় ধমকে উঠেছিলেন, তুমি? এখানে?

আমি যে রকম শান্তভাবে বলে থাকি, সেভাবেই বলেছিলাম, কলকাতায় যাচ্ছি।

মিস্টার জে. বিশওয়াস–মানে জগত বিশ্বাস, (উনি নিজে কখনও বিশ্বাস উচ্চারণ করেন না, নিজেকে বিশওয়াস বলেন।) তারপরেও কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে সেইভাবেই তাকিয়েছিলেন, এবং কিছু যেন ভেবেছিলেন, এবং শব্দ করেছিলেন, হুম! শব্দের মধ্যে রাগ স্পষ্ট ছিল। পিছনেই দরজার সামনে, কুলি ওঁর সুটকেস নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। মিস্টার জে. বিশওয়াস সুটকেসটা কুলিকে রাখতে ইঙ্গিত করে, কোটের পকেট থেকে কিছু খুচরা পয়সা বের করে দিয়েছিলেন। কুলিটা একটু হেসে কপালে হাত ঠেকিয়েছিল, হাসিটা কেমন যেন খোশামোদের হাসির মতো দেখাচ্ছিল, এবং আবার হাত পেতে বলেছিল, হুজোর।

তার মানে, সে আরও বেশি পয়সা চেয়েছিল, উনি জোরে ধমকে উঠেছিলেন, ভাগো।

কুলিটা যে ভয় পেয়েছিল, আমি তার মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম। সে কেবল মিস্টার জে বিশওয়াস সাহেবের মুখের দিকে এক বার দেখে, মাথা নিচু করে চলে গিয়েছিল। কুলিরা অনেক সময়েই খুব অন্যায় করে, বিরক্ত করে, বলা যায়, পেজোমি করে, কিন্তু তখন কুলিটার জন্য আমার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কুলিটা চলে যেতেই তিনি কোট খুলে কুপের দেওয়ালে আয়নার পাশে হুকে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, টাইটার নট আলগা করে দিয়েছিলেন, এবং নিজেকে আয়নায় দেখছিলেন। উনি বেশ চওড়া, শক্ত, মোটাসোটা লোক, তবে বেশ বেঁটে। বেঁটে বললে অনেকে চটে যান, আমি মনে মনে বলেই বলতে সাহস পেয়েছিলাম। মিস্টার জে. বিশওয়াস তার কপালের সামনে চুল দেখতে দেখতে বেশ রাগ রাগ গম্ভীর স্বরেই হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিলেন, ওটা কী বই পড়ছ?

এমন চমকে উঠেছিলাম ওঁর জিজ্ঞাসায়, কারণ আমার খেয়ালই ছিল না যে, আমি বই পড়ছিলাম, আমার কোলের ওপরে একটা বই রয়েছে। আমাকে কেউ তো সেই যাকে বলে সি অফ বা গুডবাই বা বিদায় দিতে আসেনি। তপনকাকার ড্রাইভার আমাকে স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে, সুটকেসটা নামিয়ে দিয়েই চলে গিয়েছিল। আমি আমার কুপে দেখে, ঠিক মতো টিকেট দেখিয়ে উঠে, জানালার ধারে বসে বই পড়ছিলাম। আমার দু সেকেন্ড দেরি হয়েছিল জবাব দিতে, বলেছিলাম, এটা গর্কির মামা’

আমার কথা শেষ হবার আগেই, মিস্টার জে. বিশওয়াস বলে উঠেছিলেন, মাদার, গর্কিজ মাদার! গুড, ভেরি গুড, গ্রেট বুক, য়ু শুড রিড দ্যাট বুক।

মালভা! মিস্টার জে. বিশওয়াস যেন আঁতকে উঠেছিলেন। তারপরেই, কী বলব, ঠিক যেন বাঘের মতো গর্জন করে উঠেছিলেন, মালভা? যু আর রিডিং দ্যাট স্টোরি?

আমি বুঝতে পারিনি, কেন মিস্টার জগট বিশওয়াস, (ওঁর নামের উচ্চারণটা উনি এ রকমই করেন, আমি শুনেছি, ‘জগট’) এতটা–মানে যাকে বলে ক্ষেপে ওঠা, তা-ই উঠেছিলেন। কারণ আমার ধারণা ছিল, আমি একটা জগৎ (এক্ষেত্রে ‘জগট’ না।) বিখ্যাত গল্প পড়ছিলাম। তাই আমি ভেবেছিলাম, উনি বোধ হয় কিছু একটা ভুল করেছেন। আমি যে ম্যাকসিম গর্কির বিখ্যাত গল্প মাল পড়ছি, উনি হয়তো সেটা ঠিক ধরতে পারেননি, কিন্তু, তা-ই বা হয় কী করে। উনি তো মালভার নাম উচ্চারণ করলেন, শুনতে ভুল করিনি, অথচ রাগে ওঁর চোখ দুটো যেন ধকধক করছিল, সেই চোখের দিকে চেয়ে থাকা কঠিন, আর ভীষণ রাগেই উনি যেন কথাও বলতে পারছিলেন না। তবু আমি খানিকটা ভুল ভাঙাবার মতো করেই, একটু হেসে বলেছিলাম, আজ্ঞে হ্যাঁ, মানে দ্যাট ফেমাস স্টোরি অব

শাট আপ৷ মিস্টার জে, বিশওয়াস আমাকে এক ধমক দিয়ে উঠেছিলেন। আমি এমন ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, আর বুকের মধ্যে এমন করছিল, ভেবেছিলাম, আমাকে হয়তো একটা থাপ্পড় মেরেই দেবেন, কেন না ওঁর শক্ত, মোটা শরীর নিয়ে আমার দিকে এক পা এগিয়ে এসেছিলেন, এবং রেগে ধমকেই বলেছিলেন, য়ু ডোন্ট ট্রাই টু টি মি, হুইচ অ্যান্ড হোয়াট স্টোরি ইজ ফেমাস। আমি জানি, এটাই তোমার কাছে ফেমাস স্টোরি হবে, ইট ফিটস য়ু, দিস অবসিন ফিলদি স্টোরি।

ভীষণ অবাক হলেও যে গায়ের মধ্যে কেঁপে, কী রকম একটা ঘুলিয়ে ওঠার মতো হয়, আমার তা আগে জানা ছিল না। আমি কোনও রকমে উচ্চারণ করতে পেরেছিলাম, অবসিন? ফিলদি?

মিস্টার জে. বিশওয়াস তার স্বরে একটা জোর ধাক্কা দিয়ে বলেছিলেন, অবকোর্স। যেখানে বাবা আর ছেলে একটা মেয়েমানুষের (মেয়েমানুষ! মিস্টার জে. বিশওয়াস উচ্চারণ করতে পারলেন।) জন্য পশুর মতো মারামারি করতে পারে, আর তাই দেখে সেই মেয়েটা লুটিয়ে পড়ে হাসতে পারে, দ্যাট ইজ অবসিন, হান্ড্রেড পার্সেন্ট অবসিন।

আমার মনে হয়েছিল, সমস্ত শরীরটা কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে, আমার জ্ঞান লোপ পেয়ে যাচ্ছে, তবু আমি বুঝতে পারছিলাম, অবাক না, আসলে যাকে বলে অসহায়–্যা, অসহায় প্রতিবাদেই আমার গায়ের মধ্যে কেঁপে উঠেছিল, এবং আমি একটা নিকৃষ্ট উল্লুকের মতো আবার বলেছিলাম, কিন্তু দেখুন, পেটি বুর্জোয়া বাবা আর ছেলের মাঝখানে, আসলে মালভা চরিত্র, আর সেই বেকার আর দু-দু-দুর্জয়।

আমার কথা শেষ হতে পারেনি, তার আগেই মিস্টার জে. বিশওয়াস ঠ্যাং ফাঁক করে দাঁড়িয়ে, কেমন একটা বাঘা চ্যালেঞ্জের ভঙ্গিতে, ঘাড় একটু কাত করে আমার দিকে সোজা তর্জনী তুলে ঠিক বাঘের মতোই নিচু স্বরে যেন গরগর করে উঠেছিলেন, আর য়ু টিচিং মি ইজ ইট?

আমি তাড়াতাড়ি ঘাড় নেড়ে বলেছিলাম, আজ্ঞে না।

 তিনি তেমনিভাবেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ডু য়ু নো হু অ্যাম আই?

আজ্ঞে হ্যাঁ, মিস্টার জগট বিশওয়াস, এবং একজন বিরাট কেন্দ্রীয়

লিভ ইট। য়ু নো, প্রাইম মিনিস্টার টেকস অ্যাডভাইস ফ্রম মি, নট ওনলি অন ইকনমিকস, অলসো অন আর্ট অ্যান্ড লিটারেচর?’

না, জানতাম না, আমি শুধু জানতাম, উনি অর্থ বিভাগের একজন বিশিষ্ট কর্মচারী, আমার বাবা বা তপনকাকাদের বিশিষ্ট বন্ধু, যদিও উনি আমার বাবার থেকে বয়সে কিছু ছোট, কিন্তু কলকাতায় আমার বাবার সঙ্গে এক টেবলে বসে ড্রিঙ্ক করেন। তাই আমি হা করে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে, ঘাড় নেড়ে বলেছিলাম, আঁ-আজ্ঞে না।

উনি তর্জনী নেড়ে, যেন আমাকে খোঁচা দিচ্ছেন, এমনিভাবে বলেছিলেন, তা হলে জেনে রাখো। জেনে রাখো প্রাইম মিনিস্টার আমার কাছ থেকে মার্কসিস্ট ইকনমিকস সম্পর্কে অ্যাডভাইস নেন, কারণ আমি জানি, আমি ছাড়া তাঁকে মার্কসিজম অ্যান্ড মার্কসিস্ট ইকনমি বোঝাবার কেউ নেই, বিকজ আয়াম দ্য ওনলি ম্যান, হু ইজ এ ডিক্লেয়ার্ড মার্কসিস্ট, এভরিবডি নোজ দ্যাট, ডু য়ু ফলো মি?

আমি হা করেই ঘাড় কাত করে বলেছিলাম, আজ্ঞে হ্যাঁ। আমার জবাব শোনার মেজাজ ওঁর মোটেই ছিল না, উনি বলে চলেছিলেন, আর তুমি এটা নিশ্চয়ই জানো, আমি ইংরেজি আর বাংলায় আর্ট অ্যান্ড লিটারেচরের ওপর প্রায়ই লিখে থাকি, আর সেটা প্রগ্রেসিভ আউটলুক নিয়ে?

প্রগ্রেসিভ আউটলুক মানে, উনি বোধ হয় প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তখন, উচ্চারণ করা দূরে থাকুক, মনে মনে ভাবতেও আমার ভয় করছিল, ওঁর যে দু-একটা লেখা আমি। পড়েছিলাম, সেগুলো এতই অশিক্ষিত, আর–আর ওটাকে কী যেন বলে, হ্যাঁ, আত্মম্ভরিতায় পরিপূর্ণ, আমি পড়তে পড়তে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। অথচ উনি যে অনেক পড়েছেন, তা ওঁর লেখা পড়লে বোঝ যায়, কিন্তু যখন বিচারকের মতো রায় দেন, ঠিক যেন একটা তলোয়ার দিয়ে ঝপাং করে কোপ বসিয়ে দেন। ওহ, দেরি হয়ে যাচ্ছিল জবাব দিতে, আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠেছিলাম, আজ্ঞে হ্যাঁ।

উনি তখন ফাঁক করা ঠ্যাং সোজা করেছিলেন, আর তর্জনী নামিয়ে নিয়েছিলেন। আমি যে কী স্বস্তিবোধ করেছিলাম, ইচ্ছা করছিল, যা কখনও করিনি, তা-ই করি, ভগবানকে ডাকি। তারপরে উনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ঘাড় দোলাতে দোলাতে, ঠোঁটের কোণ কুঁকড়ে বলেছিলেন, অ্যান্ড হু ইজ দ্য ব্লান্ডারার, য়ু নো? লেনিন।

লেনিন?’ উচ্চারণ করবার ক্ষমতা প্রায় না থাকলেও, কোনও রকমে করেছিলাম।

ইয়েস, লেনিন। তিনি যদি গর্কিকে বলতেন, মালভা গল্পটা তাঁর সাহিত্যকৃত্য থেকে বাদ দিতে, তা হলে নিশ্চয়ই গর্কি তা করতেন। গর্কি তা করেছিলেন, যেমন স্কাই ব্লু বা আরিকোয়াটেড লাভ-এর মতো গল্প, যা বুর্জোয়া দোষে দুষ্ট, গর্কি তার লিটারেরি ক্রিয়েশন হিসাবে অবসোলিট করেছিলেন, ডু য়ু নো দ্যাট?

জানি, কিন্তু মালভা যে বুর্জোয়া দোষে দুষ্ট, জীবনে আজই আমি প্রথম শুনেছিলাম, কিন্তু মিস্টার জে. বিশওয়াসকে সে কথা বলবার সাহস আমি পাচ্ছিলাম না। কেবল বলেছিলাম, জানি।

তিনি যেন ঠোঁটে একটু হাসি ফোঁটাবার ভাব করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বই দুটো পড়েছ বোধ হয়?

হ্যাঁ।

তৎক্ষণাৎ ওঁর মুখ শক্ত হয়ে উঠেছিল, তা তো পড়বেই, তা তো পড়বেই, তোমার মতো ছেলের তো ও সবই পড়তে ভাল লাগবে, তা না হলে দিল্লির রাস্তায় পাবলিকলি কেউ ও রকম অবসিনিটি আর ইমমরাল ব্যাপার করে না। তা ঘানি টেনেও এখন মালভার সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো দুরন্ত যৌবন আর ককেট্রি আর ভোলাপচুয়াসনেস চুষে চুষে এনজয় করছ, না?

ককেট্রি আর ভোলাপচুয়াসনেস বলতে তিনি কী মনে করেছিলেন? যাকে বলে ছে-ছেছেনালি (তাই তো, না কি?) আর স্বৈরিণীতন্ত্রতা? মালভা সম্পর্কে আমি এ সব ভাবতে পারি না। কিন্তু চুষে চুষে এনজয় করার মানেই বা কী। পড়তে পড়তে আবার চোষা যায় নাকি? সে কথা জিজ্ঞেস করার সাহস আমার ছিল না, কারণটা তিনি নিজেই বলে দিয়েছিলেন, কারণটা আর কিছুই না, উনি যে আমার অন্যায় আর কারাবাসের ব্যাপারটা জানেন। আমি বলেছিলাম, না, মানে পড়ছিলাম।

জানি। মুখ থাবাড়ি দিয়ে একরকমের কথা বলার ভাব আছে, সেভাবে কথাটা উচ্চারণ করে তিনি আমার সামনে থেকে সরে গিয়ে, সুটকেসটা টেনে তুলে ধপাস করে গদির ওপর ফেলেছিলেন। পারলে বোধ হয় আমাকেই ওভাবে ফেলতেন, এ রকম একটা ভাব। আর হুকুমের স্বরে আমার দিকে না তাকিয়েই বলেছিলেন, জানালার ধারটা ছেড়ে বসো।

আমি উঠে দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু বসার জায়গা ছিল না, কারণ যেদিকটায় সরে বসতে পারি, সেদিকটার অনেকখানি জুড়ে মিস্টার জে. বিশওয়াসের বেশ বড়, কিন্তু হালকা বিলাতি সুটকেসটা ছিল। পকেট থেকে চাবি বের করে সুটকেস খুলতে খুলতে, না তাকিয়েই বলেছিলেন, তোমার মতো ছেলে, কী জন্য কী পড়ে, তা আমি জানি।

বলেই তিনি এখন যে সুন্দর সিল্কের লুঙ্গিটা আর র-সিল্কের পাঞ্জাবিটা পরে আছেন, সে দুটো সিটের ওপর রেখেছিলেন, আর তখনই সুটকেসের মধ্যে এক জোড়া জনিওয়াকারের বোতল আমার চোখে পড়েছিল। ঠিক তখনই আমি সেই বিখ্যাত ফরাসি সেন্টটার গন্ধ পেয়েছিলাম কি না, মনে করতে পারি না, বা হয়তো প্রথমেই পেয়েছিলাম, উনি যখন কুপে-তে ঢুকেছিলেন, কিন্তু ওঁর রাগ আর অবাক হওয়া দেখে তা আমার মনেই জাগেনি। মমতা কাকিমা ওই সেন্টটা ব্যবহার করেন, আমি জানি, আরও অনেকে করে, আমাদের বাড়িতেও। মিস্টার জে. বিশওয়াস টাইয়ের নটটা পুরোপুরি না খুলে, খানিকটা ফাঁস বড় করে মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে বের করে নিয়েছিলেন। অলওপন শার্টের বোতাম খুলে, টাই আর শার্ট-কোট ঝোলানো হুকেতেই ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, প্রায় আমার গায়ে ধাক্কা মারার উপক্রম করে। আমি দেওয়ালের দিকে আরও চেপে না গেলে, হয়তো ধাক্কাই লাগত। তারপরেই তিনি লুঙ্গিটা নিয়ে মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে, নীচের দিকে নামিয়ে, সামনের অংশ দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে, ভিতরে হাত নামিয়ে নিয়েছিলেন। উনি যে ট্রাউজারের বোম খুলছেন, তা বুঝতে পেরে, আমি এক বার লেভেটরি আছে কি না, দরজার দিকে দেখেছিলাম, কেননা, হঠাৎ আমার মনে হয়েছিল, এ কুপে-তে বুঝি লেভেটরি আছে, তারপরে আমি মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই, আয়নায় নিজের মুখটা দেখতে পেয়েছিলাম। মনে পড়েছিল মমতা কাকিমা দাড়িটা কামিয়ে নিতে বলেছিলেন, কিন্তু হয়ে ওঠেনি, আর চুলগুলোও বেশ বড় হয়েছে। আমাকে লোকে বোকা বলুক, আর এখন খারাপ বা বদমাইশ বা চরিত্রহীন বলুক, আমার চেহারার নিন্দা কারোর মুখে কখনও শুনিনি, বরং–যাক গিয়ে, সে সব কথা মনে করেই বা কী হবে, এ চেহারাটাই বোধ হয় আমার কাল করেছে, আমার সর্বনাশ–যাক গিয়ে সে সব কথাও, এখন আমি খুব রোগা হয়ে গিয়েছি। মোটা কখনওই ছিলাম না, কিন্তু দু মাস সশ্রম কারাদণ্ড কারাদণ্ডের থেকেও কারাগার বলে জায়গাটার ভিতরের যা সব ব্যাপার, কারাদণ্ডের থেকে সে সবই আমাকে শেষ করে দিয়েছে। তার ওপরে আমি বেশ লম্বা, মিস্টার জে. বিশওয়াসের থেকে এক হাত বেশি তো বটেই। মমতা কাকিমা বলেন, ঢ্যাঙা, কখনও বা তেঢেঙে লম্বা। এ সবই অবিশ্যি আমাদের ঘটিদের কথা, আমার শুনতে বেশ লাগে। ইতিমধ্যে সঁতে লুঙ্গি কামড়ে ধরেই মিস্টার জে. বিশওয়াস বলতে আরম্ভ করেছিলেন, গর্কির লেখা যদি পড়তে হয়, পড়বে মাদার। সকলে সবকিছু হজম করতে পারে না। যদি পারতে, তা হলে তুমি ও রকম কাণ্ড করতে না। (কী বলব, আমি তো জানি, আমি ওঁকে কিছুতেই আমার অবস্থা বোঝাতে পারব না।) গর্কির মা পড়েছ?

বলেছিলাম, পড়েছি।

 কিন্তু তার রেজাল্ট কিছুই হয়নি, তা হলেই বুঝতে পারছ।বলতে বলতে তিনি ট্রাউজারটাও হুকে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। ওঁর মোটা পেশল আর ধূসর লোমশ গায়ে তখন বগল খোলা গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরা। পাঞ্জাবিটা পরতে পরতে বলেছিলেন, এই যেমন ধরো আমি, আমি লেডি চ্যাটারলিজ লাভার-এর আনএকসপারগেটেড এডিশন পড়েছি, (উনি এত বড় একজন সরকারি কর্মচারী, কী করে বলছেন, ও বইটা উনি পড়েছেন? ওটা একটা বেআইনি কাজ। অবিশ্যি বইটা আমিও পড়েছি, তপনকাকার একটা কপি আছে, কিন্তু আমি তো আর মিস্টার জে. বিশওয়াস না, একদিকে দায়িত্বশীল কর্মচারী, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শদাতা, এবং সাহিত্য-শিল্প সম্পর্কেও উপদেষ্টা এবং লেখক।) কিন্তু আমাকে। মোটেই কোনও দিক থেকে পারভার্ট বা কোরাপ্ট করতে পারেনি। আমি বলব, ইট’জ এ গ্রেট বুক, বাট নট ফর য়ু। তুমি যদি পড়তে, তা হলেই বইটা অবসিন হত, কেন না, তোমার মতো ছেলেকে বইটা খারাপ পথে নিয়ে যেত, তোমাকে কোরাপ্ট করাত, তোমার মতো ছেলেকে স্পেশালি, আর সেই কারণেই ইন্ডিয়াতে বইটা পোসক্রাইব করা হয়েছে।

ওঁকে আমি কী বলব, বুঝতে পারছি না। একজন ত্রিশ বছরের লোককে উনি ছেলে ছেলে বলে যাচ্ছেন–তা না হয় বলুন, ওঁর বয়স আমার থেকে কুড়ি-পঁচিশ বেশিই হবে, কিন্তু কী বলব ওঁকে, ওঁর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকা ছাড়া, কেননা উনি পত্র-পত্রিকায় যেমন প্রগতিশীল আউটলুকে লেখেন, বিচারকের মতো রায় দেন, সেইভাবেই বলে যাচ্ছেন, আনএকসপারগেটেড এডিশন অব লেডি চ্যাটারলিজ লাভার আমাকে খারাপ পথে নিয়ে যাবে, স্পেশালি আমার মতো ছেলেকেই কোরাপ্টেড করবে, সেইজন্যই বইটা ভারতে নিষিদ্ধ। অথচ বইটা গ্রেট, তার মানে, মালভা গল্প অশ্লীল। নেহাত আমি খারাপ কথা বলতে শিখিনি, এবং কারোকে কখনও খারাপ কিছু বলতেও পারি না, আমার বাধে, তা ছাড়া কারোকে সমালোচনা করতে আমি যেন কেমন লজ্জা বোধ করি, কেন না, আমি যেন কেমন– সেই ইয়ে–হ্যাঁ অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, যদিও জানি, এটাও অনেকে আমার দুর্বলতা মনে করবে, কারণ ট্রেনে, বাসে, কফিখানায়, ক্লাবে বা বাড়ির পার্টিতে, সবখানেই শতকরা নিরানব্বইজনই সমালোচক, আমি শুধু শুনেই যাই, কেন না পথ বাতলাবার বা রায় দেবার মতো হাজার হাজার রাস্তা আমার সত্যি জানা নেই। থাকলে মিস্টার জে. বিশওয়াসকে আমি বলতাম–বলতাম–আহ, একটা কিছু মনে আসছে না, ওঁর সেই গ্রেট বুক থেকেই একটা মোক্ষম গালাগালি আমার বেছে নিতে ইচ্ছা করছে। তার দরকার নেই, আমি বরং মনে মনে বলছি, লোকটা একটা ডাহা মিথ্যুক। মিথ্যুক, এই কথাই আমার মনে হচ্ছে, কারণ আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে, উনি ওঁর সেই গ্রেট বুকটি পড়েননি বা পড়ে থাকলেও, ভারতে আর জাপানে, লেডি চ্যাটারলির প্রেমিক’-এর নিষিদ্ধ অংশ বাতিল যে বইটি সবাই পড়ে থাকে, উনি সেটাই পড়েছেন, তা না হলে, মালভা সম্পর্কে কেউ এ কথা বলতে পারতেন না। এর ওপরে ওঁকে যদি আমি বলতাম, আমি সেই গ্রেট বুকের নিষিদ্ধ সংস্করণটি পড়েছি, তা হলে আমি ওঁর মোটা মোটা দুটো হাতের দিকে তাকিয়েছিলাম, যে হাতে উনি তখন স্যুটকেসের ভিতর থেকে টেনে বের করেছিলেন, একজন আমেরিকান লেখকের সেক্স অ্যান্ড ক্রাইম থ্রিলার একটি পকেট বই, যার ওপরের ছবিতে একটি মেয়ের ব্রা তার হাতের কনুইতে ঝুলছে, এবং যদিও সে অর্ধেক পিছন ফেরা, একটি পুরুষের শক্ত হাত তার কোমরের প্যান্ট খানিকটা টেনে নামিয়ে ফেলেছে। চকচকে বইটি এক হাতের থাবায় ধরে অন্য হাতে সুটকেসটা নীচে সিটের তলায় নামিয়ে দিয়ে, জানালার ধার ঘেঁষে বসেছিলেন, সেই খসখস মসমস শব্দ তুলে, যে- জানালার ধার থেকে উনি আমাকে বাঘের মতো ছাগলছানা তাড়া করেছিলেন। খেয়ালই করিনি, গাড়িটা কখন চলতে আরম্ভ করেছিল, কখন স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যমুনার ওপর ব্রিজ পার হতে আরম্ভ করেছিল। মনে মনে ইচ্ছা ছিল, আমি যমুনা নদী দেখব, নদীর দূরে আকাশ দেখব, এবং তাই দেখবার জন্য গদির অন্য প্রান্তে বসে আমি মাথা নিচু করেছিলাম, কিন্তু ব্রিজ তখন শেষ, যমুনা এক পলকের জন্য দেখা দিয়েই আমার দৃষ্টি থেকে সরে গিয়েছিল, তখনও রোদ চিকচিকে গাছপালা আর নগরের কিছু ইমারত আমার চোখে ভাসছিল, আর সে সময়েই আমি শুনতে পেয়েছিলাম, য়ু শু্যড লারন অ্যান্ড টেক লেসন ফ্রম একসপার্টস–আই মিন–সত্যিকারের পড়াশোনা করা লোক, যারা তোমাকে বোঝে, কী বই তোমার পড়া উচিত আর উচিত নয়। সে যাই হোক গে, তুমি এ ট্রেনে ট্রাভেল করছ কেন, তুমি তো এ খরচে প্লেনেই যেতে পারতে।

কথাটা অবিশ্যি আমারই জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, কারণ তিনি যে একজন মস্ত কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী, তা না, প্রধানমন্ত্রীকে নাকি মা-মার্কসীয় অর্থনীতির বিষয়ে উপদেশ দেন, এবং আর্ট অ্যান্ড লিটারেচর সম্পর্কেও তার মতো ব্যস্ত লোকের পক্ষে প্লেনে যাওয়াই তো উচিত ছিল। আমি জবাব দিয়েছিলাম, আমার তো তেমন তাড়াহুড়োর কিছু নেই, তাই ভাবলাম গাড়িতেই যাই। তবে মানে আমি ঠিক এভাবে যেতে চাইনি, চেয়ার কারেই চলে যেতে পারতাম, তপনকাকা কুপের টিকেট।

তপনকাকা? আমার কথার মাঝখানেই মিস্টার জে. বিশওয়াস বলে উঠেছিলেন, মানে আমাদের তপন সেন?

আশ্চর্য, উনি কি আমার তপনকাকাকেও ভুলে গিয়েছিলেন নাকি। আমি বলেছিলাম, মানে হ্যাঁ, তপনকাকা।

তপনটার কোনও দিন বুদ্ধিশুদ্ধি হবে না।’ বলেই তিনি বই খুলে পড়তে আরম্ভ করেছিলেন। তপনকাকা ওঁর বন্ধু, এ রকম কথা বলতেই পারেন, কিন্তু এ রকম ক্ষেত্রে কেন, তা বুঝতে পারিনি, কিছু জিজ্ঞেসও করিনি, অথচ আমার হাতের বইয়ের পাতাটা খুলব কি না, বুঝতে পারছিলাম না, উনি যদি আবার ধমকে ওঠেন। অবিশ্যি প্রায় বছর দশেক আগের একটি মজার ঘটনা আমার মনে পড়েছিল, যা আমাদের কলকাতার বাড়িতেই ঘটেছিল, এবং একই সঙ্গে, জানালাটা দূরে হলেও আমার চোখ টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, বাইরের বেলাশেষের রোদ-লাগা বাবলা বন, সবুজ মাঠ আর শস্যের খেত, রাখাল ছেলে। বা মেয়ের মহিষের দল নিয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়া, আর আশ্বিনের নীল আকাশ, নীচের অংশে কিছু বা লালের ছোঁয়া, কিন্তু বাংলার শরতের আকাশ তা না।

মাত্র কয়েক মিনিট বাইরে তাকিয়ে আমি মিস্টার জে. বিশওয়াসের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম, অথচ বাইরের পড়ন্ত বেলার ছবি দেখতে দেখতে কলকাতার বাড়ির সেই মজার ঘটনাও মনে পড়ছিল, যে কারণে আমি মনে মনে হাসছিলাম, তখনই কুপের দরজাটা খুলে গিয়েছিল, একজন মহিলা দাঁড়িয়েছিলেন খোলা দরজায়, তার চোখে তখনও মস্ত বড় গোল সানগ্লাস। লাল সোনালি রঙে মেশামিশি ম্যাকসির ওপরে রং মেলানো স্লিভলেস জ্যাকেট। আমার ঘ্রা-ঘ্রাণেন্দ্রিয় ভরে গিয়েছিল সেই, সেই ফরাসি সেন্টের গন্ধে, মিস্টার জে. বিশওয়াসের খুশি চলকানো গলা শোনা গিয়েছিল, আহ আ! তারপরেই টাকরায় জিভ ঠেকিয়ে তিনি যে শব্দটি করেছিলেন, আমার কানে তা বেজেছিল, ঠা ঠা এবং তার মানে কী, বুঝে ওঠার আগেই তিনি আবার বলে উঠেছিলেন, আই ওয়াজ থিংকিং অব য়ু। এভ্রি মোমেন্ট।

রিয়্যালি। মহিলা যেন গানের সুরে বলে উঠেছিলেন, এবং ঘাড়ে একটু দোলা লেগে যেতেই, আমি তার ঘাড়-ছাটা মোলায়েম কালো সুন্দর চুলের গোছায় দোলা লাগতে দেখেছিলাম। দরজাটা তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। রিয়্যালি’ বলবার সময় তাঁর ঝকঝকে দাঁত এক সেকেন্ডের জন্য দেখতে পেয়েছিলাম, তারপরেই তাঁর রং-মাখা ঠোঁট কেন যেন বেঁকে উঠেছিল, তিনি দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, দুটি হাত দুই জংঘার মাঝখানে জড়ো করে রেখে, যখন আমি তার রাঙানো নখের সুন্দর একটি আঙুলে সবুজ রঙের বড় পাথরের আংটি দেখতে পেয়েছিলাম, আর ডান হাতে মস্তবড় সোনার ঘড়ি, এবং তার পানা চরণের দিকে আমার চোখ পড়েছিল, রাঙানো নখ যে ফরসা পায়ে, প্রায় তার পোশাকের রঙেই রং মেলানো কেবল দুটি প্রজাপতি, কোথায় যে স্লিপারের স্ট্র্যাপ দেখতেই পাচ্ছিলাম না। মুহূর্তের মধ্যেই সিল্কের লুঙ্গির খসখস শব্দ শুনেছিলাম, মিস্টার জে. বিশওয়াস দরজার কাছে উঠে গিয়ে মহিলার একটি হাত টেনে ধরে বলেছিলেন, কাম, সিট ডাউন ফর এ কাপল অব মিনিটস, অ্যান্ড–

ওঁর কথা শেষ হবার আগেই মহিলা তার হাতটি ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন, আর চোখ থেকে প্রকাণ্ড সানগ্লাস খুলে নিয়েছিলেন, আর আমার বুকটা কেমন ধক করে উঠেছিল, আমি মহিলাকে চিনি। মহিলার চোখ দুটি, সেই যে একটা সুন্দর কথা আছে–সেই যে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানেও ব্যবহার করেছেন, না না, কালো হরিণ-টরিণ না, ডা-ডা-ডা-ড ডাগর চোখ, কুচকুচে কালো তারা, কিন্তু ভুরু কুঁচকে উঠেছিল, আমার দিকে তাঁর দৃষ্টি, দৃষ্টিতে জিজ্ঞাসা। কী করব, বুঝতে পারছিলাম না, আমার কি উঠে দাঁড়ানো উচিত, কিংবা তাঁকে না চেনাই আমার ভাল, যদিও তা অসম্ভব, কারণ উনি মমতা কাকিমার থেকে বয়সে ছোট হলেও বান্ধবী, ওঁরা সব মহিলারা কী একটা সমিতি করেন, অনেক বার সপ্তাহে অন্তত দু-তিনদিন মমতা কাকিমার কাছে ওঁকে আসতে দেখেছি, আমার সঙ্গে পরিচয় আছে, অনেক সময় অনেক কথাও হয়েছে, পরিষ্কার মনে করতে পারছিলাম (দু মাস সশ্রম কারাদণ্ডের পরে বিশেষ করে কারাগারের সেই পরিবেশে থেকে, আমি অনেক কিছুই হঠাৎ মনে করে উঠতে পারি না।) উনি মিসেস চ্যাটার্জি, না সুদীপ্তা। জেল থেকে বেরোবার পরে এই ট্রেনে প্রথম দেখা, সেজন্যই ওঁর ভুরু কুঁচকে উঠেছে কিনা বুঝতে পারছিলাম না, মানে আমার ওপর ঘৃণায় বা রাগে উনি ও রকম করে তাকিয়েছিলেন কি না, যে কারণে পরিচিতের মতো উঠে দাঁড়ানো উচিত কি না, বুঝতে না পেরে আমি বসেই ছিলাম, এবং মুখ ফিরিয়ে নেবার সময়েই মিস্টার জে, বিশওয়াসের গলা শুনতে পেয়েছিলাম, ক্যান য়ু ইমাজিন বিমি, হি ইজ দ্যাট ম্যান, মিস্টার এম. এম. মুকেজি, যার জন্য আমি এই সিঙল কুপেটা পুরোপুরি দখল করতে পারিনি। আমি তো মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বিশওয়াসের জন্যই সিঙল। কুপে চেয়েছিলাম, ওনলি ফর যু, মিসেস বিশওয়াসের যাবার কোনও ব্যাপারই নেই, বাট হিউম্?

মিস্টার জে. বিশওয়াস হঠাৎ থেমে গিয়েছিলেন, কারণ মিসেস চ্যাটার্জি হঠাৎ ওঁর দিকে চোখের তারা ঘুরিয়ে দেখেছিলেন, এবং তারপরেই আবার আমার দিকে। আমি তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে মিস্টার জে. বিশওয়াসের কথাগুলো বোঝবার চেষ্টা করছিলাম, আর তখনই তার গাঁক করে ওঠা গলা শুনতে পেয়েছিলাম, আই ডোন্ট কেয়ার ফর হিম এনি হাউ, দুটোই তো মাত্র সিঙল কুপে, তার মধ্যে আর একটি তুমি আর চ্যাটার্জি দখল করে বসে আছ, আর আমাকে এর সঙ্গে, ওহ, হোয়াট এ ক্রাইসিস, আই ওন্ট গেট য়ু ফর এ মিনিট…উম? নো, নো, আই ডোন্ট কেয়ার ফর হিম। জানি না, তুমি একে চেনো কি না—

ঠিক সে মুহূর্তেই কথার মাঝখানে মিসেস চ্যাটার্জির গান গেয়ে ওঠা গলার স্বর আমি শুনতে পেয়েছিলাম, হোয়াট ডু থু মিন, চেনো কি না? আই নো হিম ভেরি ওয়ে-এ এল, হি ইজ মদনমোহন–মানে মদনবাবু।

তারপরে আমি আর মুখ ফিরিয়ে, চুপ করে বসে থাকতে পারিনি, তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে, কপালে দু হাত ঠেকিয়ে নমস্কার করেছিলাম এবং দেখেছিলাম, ওঁর ভুরু কোঁচকানো নেই, ঠোঁটে হাসি, সেই–সেই চোখে জিজ্ঞাসা, এবং তিনি নিজেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, কলকাতায় যাচ্ছেন নাকি?

আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ’, কিন্তু পালটা ওঁকে জিজ্ঞেস করিনি, উনিও তাই যাচ্ছেন কি না, আর তখনই মিস্টার জে. বিশওয়াসের গলা শোনা গিয়েছিল, বাট বিমি, প্রোবাবলি য়ু রিমেমবার অব হিজ–

মিসেস চ্যাটার্জি তার সুন্দর ডানাসহ হাত তুলে বলেছিলেন, আই রিমেমবার এভ্রিথিং বিশওয়াস, য়ু প্লিজ বি সেনসিবল।তারপরেই তিনি আমাকে বসতে বলেছিলেন, বসুন বসুন’ এবং মিস্টার জে. বিশওয়াসের দিকে ফিরে বলেছিলেন, এসো, আমরাও বসি।

সেই মুহূর্তে জগট বিশওয়াসের চোখে আমার চোখ পড়ে গিয়েছিল, মনে হয়েছিল, দুটো বাঘের চোখ আর চোয়াল। কিন্তু মিসেস সুদীপ্তা চ্যাটার্জি যে ওঁকে তুমি’ করে বলেন, এটা ভাবতে পারিনি। অবিশ্যি আমি জানি-ই বা কী, ভাববার ক্ষমতাই বা কতটুকু, তা-ই মনে মনে অবাক হয়েছিলাম আরও বিশেষ করে, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির বয়স আমার থেকে বেশি হবে না বোধ হয়, হলেও দু-এক বছর। এখনও পরিষ্কার মনে আছে, (এত পরিষ্কার মনে থাকাটা উচিত কিনা, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।) বছর তিনেক আগে, মমতা কাকিমা প্রথম যখন আমার সঙ্গে মিসেস চ্যাটার্জির আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, দেখিস বিমি, (ভারী মিষ্টি, না?) আমার এই ভালমানুষ ভাসুরপোটির দিকে যেন নজর দিস নে।

মমতা কাকিমা বরাবরই একটু-একটু সেই যাকে বলে মুখফেঁড়, তা-ই কিংবা তারও কিছু বেশি, তার মুখে যেন কোনও কথাই আটকায় না, যে সব কথা আমি বোধ হয় কখনও মুখেই আনতে পারব না। মমতা কাকিমা আমার থেকে দশ বারো বছরের বড় তো নিশ্চয়, কিন্তু এমন অনায়াসে। এমন সব কথা আমাকে–থাক, তখন আমি আর সে সব কথা মনে করতে চাইছিলাম না, সুদীপ্তা চ্যাটার্জি, (নরোত্তম চ্যাটার্জি, একজন মস্ত বড় কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী, মিস্টার জে. বিশওয়াসের থেকে অবিশ্যি একটু ছোট, ডিপার্টমেন্টও আলাদা, তার স্ত্রী।) মমতা কাকিমার জবাবে, তার সেই সেই চোখে আমার দিকে দেখে বলেছিলেন, কেন মমতাদি, আমি বুঝি খালি হ্যান্ডসাম ইয়ংম্যানদের দিকে নজর দিয়ে বেড়াই?’ কথাটা শুনে আমিই লজ্জা পেয়েছিলাম, এবং সুদীপ্তা চ্যাটার্জি আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমাকে দেখে কি আপনার তাই মনে হয়? আমি তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলে উঠেছিলাম, না না না। শুনে, মমতা কাকিমা আর সুদীপ্তা চ্যাটার্জি দুজনেই হেসে উঠেছিলেন, মাঝখান থেকে আমাকেই কেমন একটা অস্বস্তিতে সরে যেতে হয়েছিল, যদিও তাতেও কিন্তু সে সব কথাও থাক, দেখেছিলাম, মিস্টার জে. বিশওয়াস, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির প্রায়। কটি কটিই তো বলে ওটাকে, কোমর আর পিঠের মাঝখানটা? সেইখানে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে জানালার ধারে বসিয়ে দিয়েছিলেন, এবং নিজেও সিল্কের লুঙ্গির খসখস শব্দ তুলে পাশে বসেছিলেন। বুঝতে পারছিলাম না, আমার সত্যি বসা উচিত কি না, তবু কোনও রকমে গদিতে খুব আস্তে বসেছিলাম। মিস্টার জে. বিশওয়াসের গলা তখন শোনা যাচ্ছিল, এনি হাউ, আই ট্রায়েড মাই বেস্ট টু হ্যাভ দিস সিঙল কুপে ফর মাই ওন, কিন্তু শুনলাম কে এক ভি.আই.পি. অলরেডি অর্ধেক মেরে বসে আছে, তার মানে তপন সেন-তপনই টিকেটটা কেটেছে, অথচ তোমার সঙ্গে কলকাতা যাবই-উম?

একটা জিজ্ঞাসার শব্দ করে মিস্টার জে. বিশওয়াস থেমে গিয়েছিলেন, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির গলা শুনতে পেয়েছিলাম, (কারণ আমি ওঁদের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম না।) এ সব কথার এখন আর কোনও দরকারই নেই। তুমি আমার সঙ্গেই কলকাতা যাচ্ছো। ইন দিস জার্নি, টাইম টু টাইম আই। শ্যাল মিট য়ুউ? হু রিয়্যালি, তা ছাড়া মদনবাবু ইজ এ ভেরি নাইস ইয়ংম্যান, ভেরি স্মার্ট অ্যান্ড অ্যাকোমডেটিং।

আমি জানি না, লজ্জায় না কীসে, আমার ঠাণ্ডা কুপের মধ্যেও গরম লাগতে আরম্ভ করেছিল যেন, আর ভীষণ অস্বস্তি, এবং হয়তো আরও কিছু আমার মনে হয়ে থাকবে, যা আমি বুঝতে পারি না, আমি ঘাড় ফিরিয়ে সুদীপ্তা চ্যাটার্জির দিকে তাকিয়েছিলাম, উনি আমার দিকে তাকিয়েই, সেই সেই চোখে হাসছিলেন, যা দেখে আমার সুন্দর লেগেছিল, বরাবরই লেগেছে, ওঁকে সব সময়েই আমার সিনেমার হিরোয়িনের মতো মনে হয়েছে, খুব রূপসী আর যৌ যৌ যৌবন ভরা, হিরোয়িনদের শরীরে যেমন থাকে, সত্যি ওঁর চোখ, মুখ, চুল বুক, কটি (আমি ওঁর খোলা নাভিও দেখেছি, যখন নাভির নীচে শাড়ি পরেন।) কোমর পা-পানা না, পাছা না, নিতম্ব উরু জঙ্ঘা, সবখানেই যৌবন যেন উপছে পড়ছে, কোনও পোশাকের ঢাকাটুকিই যেন মানতে চায় না, তাকালেই। আমার কেমন লজ্জা করে, বা সেটা আর কিছু, যে কারণে আমি তাকিয়ে থাকতে পারি না। আমি ওঁর আমার দিকে ঘাড় ফেরানো হাসিমুখের দিকে তাকাতেই, উনি ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তা-ই না মদনবাবু?

স্মার্ট আমি না, অ্যাকোমডেটিং কাকে বলে, বিশেষ করে এ রকম ক্ষেত্রে, তাও আমার ঠিক জানা নেই, তাই আমি কেবল একটু, যাকে বলে বিব্রত লজ্জায় হাসতেই পেরেছিলাম, আর মিস্টার জে. বিশওয়াসের চোখে আমার চোখ পড়েছিল, আশ্চর্য বাঘের চোখে তখন একটা হাসি-হাসি ভাব, তার সঙ্গে কৌতূহলের একটা, একটা কী বলে—-আমি জানি না। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি খিলখিল করে হেসে উঠেছিলেন, আমি মুখটা ফিরিয়ে নিয়েছিলাম, এবং ওঁর গলা শুনতে পেয়েছিলাম, দেখেছ? তোমরা। ওকে মোটেই চেনো না, বোঝ না, আমার মতো তুমিও ওকে বন্ধু মনে করতে পারো, ওর সামনে ফ্রাংক আর ইজি হতে পারো? কী, জেলাস হচ্ছ নাকি? কিন্তু যা-ই বলল, মদনবাবুকে আমার ভীষণ ভাল লাগে, দেখেই বুঝতে পারছ, তোমাদের থেকে অনেক–আচ্ছা আচ্ছা, বলব না, ও রকম খোকনের মতো ঠোঁট ফুলিও না। তবে এটা ঠিক, ওর মাথায় কলঙ্কের বোঝাটা তোমরা, বিশেষ করে দিল্লির একটা কমিউনিটি হ্যাঁ, জঁদরেল কমিউনিটি জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে–আহ, ও কী হচ্ছে? আচ্ছা, ঠিক আছে, এ সব আর বলব না, কিন্তু তুমি মানছ তো, মদন খুব ভাল ছেলে?

আমার নিজেকে কেমন ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো মনে হচ্ছিল, অথচ উনি তো আমার প্রশংসাই করছিলেন, তবু আমার ভিতরটা যেন ছটফট করছিল, মনে হচ্ছিল, আমার একটা কিছু করা উচিত, কিন্তু কিছুই করতে পারছিলাম না, মিস্টার জে, বিশওয়াসের গলা শুনতে পেয়েছিলাম, হুঁ, তোমার কথা শুনে তা-ই তো মনে হচ্ছে।’

তারপরেই কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ, অথচ গদিটা যেন ঢেউয়ের মতো নড়ছিল, আর লুঙ্গির খসখস শব্দ এবং সুদীপ্তা চ্যাটার্জির গলা, নো, নট নাউ’ আর আমি এমনই একটা ইডিয়ট, ওঁদের দিকে তাকিয়েছিলাম, দেখেছিলাম মিস্টার জে. বিশওয়াস সুদীপ্তা চ্যাটার্জিকে পাশ ফিরে জড়িয়ে ধরেছেন, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির মুখ বা শরীরের অনেকখানি অংশ দেখতে পাচ্ছিলাম না, আমি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। তৎক্ষণাৎ সুদীপ্তা চ্যাটার্জির গলা শুনতে পেয়েছিলাম, না না, যাবেন না মদনবাবু, আপনি খুব ভাল ছেলে আমি জানি, বসুন।

মিস্টার জে. বিশওয়াস তখন তাঁর হাত সুদীপ্তা চ্যাটার্জির শরীর থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন, এবং বলেছিলেন, ও একটু বাইরে থেকে ঘুরেই আসুক না।’

সুদীপ্তা চ্যাটার্জি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, বলেছিলেন, দুষ্টুমি কোরো না। (মিস্টার জে, বিশওয়াসের মতো লোক দুষ্ট! দুষ্টুমি করতে পারেন! আমি তো ভাবতে পারি না।) লেভেটরিতে যাব বলে বেরিয়েছি। এখনও দিনের আলো রয়েছে, পরে আসব।’

বলতে বলতে তিনি আমার দিকে তাকিয়েছিলেন, আমিও ওঁর দিকেই তাকিয়েছিলাম, এবং চোখ ফেরাবার মুহূর্তেই মিস্টার জে. বিশওয়াসের গলা শুনতে পেয়েছিলাম, চ্যাটার্জি কি জানে, আমি এ গাড়িতে ট্রাভেল করছি?

মিসেস চ্যাটার্জি বলেছিলেন, সে রকম কিছু তো শুনিনি৷’ বলে তিনি আবার, সেই–সেই চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিলেন, এবং মিস্টার জে. বিশওয়াস বলে উঠেছিলেন, বিমি, এক মিনিট বসো, আমি বেয়ারাকে ডাকি, দুটো গেলাস আর দু টুকরো বরফ দিতে বলি, একটা ছোট স্কচ অন রক হয়ে যাক।

নো, নট নাউ, বোঝ না কেন?’ সুদীপ্তা চ্যাটার্জি চোখের পাতা কাঁপিয়ে, ভুরু কুঁচকেছিলেন। সেটাকে কী ভঙ্গি বলে, আমি জানি না, একটা ইশারার মতো মনে হয়েছিল, তা ছাড়া আরও কিছু, কেন না, ওঁর ম্যাকসি আর জ্যাকেটে কেমন যেন একটা ঢেউ খেলে গিয়েছিল, আর ওঁর বেশ কী বলে, সিনেমার হিরোয়িনদের মতো সুন্দর সুন্দর? তা হবে হয়তো, আসলে ওঁর বুক দুটো যেন জীবন্ত, কথা বলতে পারে–সত্যি জানি না, বুক কথা বলতে পারে কি না, মনে হয়েছিল, জ্যাকেটের বাইরে এসে বুক দুটো যেন কিছু বলতে চেয়েছিল। তারপরে আমার দিকে তাকিয়ে আবার হেসেছিলেন, এবং মিস্টার জে. বিশওয়াস জিজ্ঞেস করেছিলেন, চ্যাটার্জি কী করছে?

সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বলেছিলেন, ও তো মিস্টার অ্যান্ড মিসেস চন্দন সিং-এর সঙ্গে বসে গেছে।

শুনেই আমার শিরদাঁড়া বেয়ে যেন একটা কনকনে ঠাণ্ডা সাপ কিলবিল করে উঠেছিল, উঠতে উঠতে আমার ঘাড়ের রক্তের শিরায় যেন, সাপটা তার চেরা জিভ দিয়ে চাটছিল, মাথাটা খুলে পড়ে যাবে কি না ভাবছিলাম। মিস্টার জে. বিশওয়াসের গলা শোনা গিয়েছিল, বসে গেছে মানে?’ সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বলেছিলেন, বসে গেছে মানে, স্কচ অন রক নিয়ে। মিস্টার জে. বিশওয়াস জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিন্তু ওই সর্দার সর্দারনী এসে জুটল কোথা থেকে? সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বলেছিলেন, তা। জানি না। দেখলাম, চন্দন সিং লায়লী সিংকে নিয়ে ঢুকল, (সেই সাপটা যেন আমার ঘাড়ের শিরার। ভিতর দিয়ে, মস্তিষ্ক নামক পদার্থটির ভিতরে কিলবিল করে ঢোকবার চেষ্টা করছে–উহ, লায়লী। সিং!) বোতল গেলাস নিয়ে হই হই করে বসে গেল। আমাকে নিতে বলছিল, আমি নিইনি, একটু কথা বলে, তোমার এখানে চলে এসেছি, অ্যান্ড ইট ইজ অলরেডি টু-উ লেট।’ বলতে বলতেই তিনি আমার দিকে ফিরে বলেছিলেন, মদনবাবু কি জানতেন নাকি, লায়লী সিং আজ এ গাড়িতে যাচ্ছে।

আমি যেন সাপের ছোবল খাবার মতোই, যাকে বলে যন্ত্রণাকাতর, সেইভাবে বলে উঠেছিলাম, না, না–না। এবং আমার স্বরে বোধ হয় ভয়ও মেশানো ছিল, কিন্তু সুদীপ্তা চ্যাটার্জি খিলখিল করে হেসে উঠে আমার কাঁধে হাত দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, ভয় নেই, আমি ওদের কিছু বলব না, আপনি যে কত ইনোসেন্ট অ্যান্ড লাভেবল আমি তা জানি। দাড়ি কামাননি কেন? আমার নাকে তখন সেই ফরাসি সেন্টের গন্ধ, কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল, আর সেই–সেই চোখে হাসি, ওঁর গা আমার গায়ে প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর সাপটা–নাহ, সুদীপ্তা চ্যাটার্জি কোনও জবাব না চেয়েই, দরজাটা খুলে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, যাবার আগে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গিয়েছিলেন। কতক্ষণ আমি চলন্ত গাড়ির দোলানিতেও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, মনে করতে পারি না, কারণ মস্তিষ্কের মধ্যে সাপটা কিলবিল করতে করতে, কুণ্ডলী পাকিয়ে, যেন স্থির হয়ে গিয়েছিল, এবং লুঙ্গির খস খস শব্দে ফিরে তাকিয়ে দেখেছিলাম, মিস্টার জে. বিশওয়াস জানালার ধার ঘেঁষে বসে, তার সেই বইটা খুলে নিয়ে মুখ নিচু করে বসেছেন। তখনও অবিশ্যি আমার শিরদাঁড়ায়, ঘাড়ের রক্তের শিরায় একটা শিরশির ভাব রয়েছে, কিন্তু আমি সেটাকে ঝেড়ে ফেলবার চেষ্টা করে, আস্তে আস্তে সিটে বসেছিলাম, যাতে সিটে ঢেউ খেলে না যায়, ভীষণ নরম মাংসের মতো গদি কিনা। বাইরের দিকে আমার চোখ পড়েছিল, মনে হয়েছিল, গাছপালা, মাঠ, শস্যের খেত লাল আর সোনালি রঙে যেন চিকচিক করছে। ঠিক আগুন না, তবু আগুনের মতোই যেন। কিন্তু লায়লী সিং, মস্তিষ্ক নামক পদার্থটা সত্যি যেন কেমন গোরুর পায়ের মতো, একটা মাছি বসলে শরীরের চামড়া কেঁপে যায়, তেমনি সাপটা কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকলেও, একটা কী–একটা ভাইব্রেশনের মতো যেন বাজছে আর টেনে নিয়ে যাচ্ছে, সেই দু-দুদদুঃস্বপ্নের দিনটাতে, চার মাস আগে…….

.

আমি কনট সার্কাসে ভর দুপুরে, কিন্তু সত্যি গরম নেই, এ বছরটা হিমালয়ে বা দূর সমুদ্রে কী একটা অঘটন ঘটেছে, কিছুই জানি না, আবহাওয়া অফিসের লোকেরাও জানে কি না, জানি না, কিন্তু মে শেষ, জুনের শুরুতে বেলা দুটোয় দিল্লির রাস্তায় হিপিনিরা অনায়াসে খালি পায়ে হাঁটছিল, কুকুরের সঙ্গে। কুকুরের সঙ্গে মানে, এক হিপিনি রাস্তার একটি রোয়া-ওঠা ঝলসানো গা কুকুরকে, শাড়ির ছেঁড়া পাড় দিয়ে বেঁধে, (বেল্ট আর শিকলের বদলে) আদর করে সঙ্গে নিয়ে চলেছে, তার সঙ্গে আরও তিন হিপিনি, সকলেরই খালি পা, কুকুরটা তার মনিবান হিপিনির গা ঘেঁষে, যেন বড় সুখে ল্যাজ নেড়ে নেড়ে চলেছে। ওদের কেউ পরেছে হাফ প্যান্টের ওপর বুক খোলা শার্ট, কেউ বা পাতলা কাপড়ের ঘাঘরার ওপরে ময়লা অথচ ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি আর ভিতরে ওটাকে কী বলে–মেয়ে–মানে মহিলারা বুকে পরে, সে সব ওরা পরেনি। তা ছাড়া কেউ পান চিবিয়েছে, ঠোঁটে লাল ছোপ, কেউ কপালে এঁকেছে মস্ত সিঁদুরের টিপ। আমি দেখলাম হা করে, আরও অনেকেই দেখল, কিন্তু সকলেই হা করে না, হেসে, চোখের তারা অন্ধকারের চিতাবাঘের মতো করে। আমার যেন কেমন গা শিরশির করে, হিপি-হিপিনিদের দেখলেই, মনে হয় ওরা অতিমানব-মানবী, তবে সেজন্যই যে ওরা খালি পায়ে, জুন মাসে কনট সার্কাসের শান বাঁধানো চওড়া ফুটপাতের ওপর দিয়ে হাঁটতে পারছে, তা আমি বলি না, কারণ এ বছর জুন মাসে, অন্য বছরের তুলনায় দিল্লি অর্ধেকও তাতেনি। কেশর ফোলানো ক্ষুধার্ত সিংহের মতো দিল্লির গরম, দরজা জানালা বন্ধ করে, অন্ধকার ঘরে থাকতে হয়; এ বছর সিংহ ছুটি নিয়েছে, অথবা বলা যায়, ড্রাগনের নিশ্বাসের আগুনে খরতা প্রায় নেই বললেই চলে, কেবল আমি না, দিল্লির সব লোকেরাই এ ব্যাপার নিয়ে বলাবলি করছে। মমতা কাকিমা আজ সকালেও বলেছেন, আজকাল কলকাতায় দিল্লির থেকে বেশি গরম পড়ে।এ বছরের ব্যাপারে, কথাটা শতকরা সত্যি। সেই জন্যই মমতা কাকিমা এই দুপুরে বেরোলেন, গেলেন সফদরজং-এ ওঁর এক লেডি ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। আমাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, ওইটি মমতা কাকিমার একটি দোষ, যখন তখন যেখানে সেখানে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান, বোঝেন না, যে ওঁর মহিলা মহলের সামনে গিয়ে, আমি মোটেই স্বস্তি বোধ করি না, অথচ কী একটা আশ্চর্য ব্যাপার, আমি দেখছি, আজকাল মহিলারা পুরুষদের সামনে মোটেই অস্বস্তি বোধ করেন না। পুরুষরাও যে করেন, তা বলছি না, আমি করি, কারণ আমি যেন অগাধ জলে পড়ে যাই, ওঁদের আড্ডা গল্পের মাঝখানে কী বলব, কী করব, কিছুই ভেবে পাই, এবং আমি সত্যি একটা বাচ্চা ছেলেমানুষও না যে, মমতা কাকিমাকে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে, কিন্তু মমতা কাকিমার মুখে লেগেই আছে, চলো ঘুরে আসি।অবিশ্যি আমি বেকার, সারাদিন বই পড়া আর ঘুরে বেড়ানো ছাড়া, বলতে গেলে কিছুই করার নেই, এবং আমার দ্বারা কিছু হবার চান্স আছে কি না, সেই জন্যই বাবা তপনকাকার কাছে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কাকা মানে, কোনও বংশগত আত্মীয়তা নেই, তপনকাকারা সেন, আমরা মুখোপাধ্যায়, তপনকাকারা বরিশালের বদ্যি, আমরা পশ্চিম, বাংলার রাঢ়ের বামুন, কিন্তু আমার বাবা মহাদেব মুখোপাধ্যায় মহাশয় যেন দেবাদিদেব মহাদেব, কী রাজ্যের, কী কেন্দ্রের, অনেক আমলাকেই দেখি, বাবাকে খুব খাতির করতে, দাদা দাদা করতে, তা সে হোম, ফাইনান্স, ল, যে কোনও ডিপার্টমেন্টেরই হোক, এমনকী শিল্পী, সাহিত্যিক, গায়ক-গায়িকারাও বাবার বিশেষ বিশেষ কী বলে ওটাকে? প্রীতিভাজন, হ্যাঁ প্রীতিভাজন। সন্ধে হলেই বাড়ি গুলজার, সেলার ওপন হয়ে গেল, নরম গরম পানীয় চলল, এবং সবাই এক ঘরে এক জায়গায় না, নীচের তলায় বিভিন্ন ঘরে, বিভিন্ন দলের আড্ডা, বাবা কিন্তু মহাদেবের মতোই যে কৈলাসে সেই কৈলাসে, তাকে কখনও সন্ধের সময় বা রাত্রে বাড়ির বাইরে যেতে দেখি না, আমাদের বাড়িটাই একটা বিচিত্র আসর।

আমার ছোট ভাই এখন আমেরিকায় আছে, সত্যি কথা বলতে কী, আমি জানি না ও সেখানে কী করে, শুধু এইটা জানি বা দেখেছি, ষোলো-সতেরো বছরের একটি আমেরিকান মেয়েকে ও বিয়ে করেছে, এখন নিশ্চয় উনিশ কুড়ি হয়েছে, বা একুশ, আমি ও রকম বয়সেই দেখেছিলাম, কারণ খোতে (আমার ছোট ভাইয়ের ডাক নাম, আমার ডাক নাম গবা, বড়দার ডাক নাম ঘোঁতন, বড়দির ডাক নাম তোতা, সবথেকে ছোট বোনের ডাক নাম ফুচকি, এবং এই সব খোতে, ঘোঁতন, তোতা আর ফুচকি, সকলেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে, গবারই কোনও দিক থেকে কোনও গতি হয়নি।) মেরিয়ানকে সেই বয়সেই প্রথম নুইয়র্ক থেকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিল, বলেছিল, মেরিয়ান ওর বউ। মেরিয়ান একেবারে টুকটুকে সুন্দর ছোট একটি মেয়ে, গাঢ় বাদামি রঙের চুল, পুষি বেড়ালের মতো চোখ, ছিপছিপে, একেবারে প্রথম দর্শনেই ঠোঁটে সিগারেট নিয়ে ঢুকেছিল, পরেছিল মিনি ফ্রক, কিন্তু খোতে যখন বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল, মেরিয়ান ঠোঁটের সিগারেট ঠোঁটেই রেখে, বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিল, এবং আমার পরিষ্কার মনে আছে, বাবা বলেছিলেন, তোফা! ছোট বউমাটি আমার বেশ হয়েছে। অবিশ্যি ইংরেজিতেই বলেছিলেন, তারপরে মেরিয়ানকে নিজের পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, খোতে, একে জোগাড় করলি কোথা থেকে? কথাটা আমার ঠিক পছন্দ হয়নি। খোতে জবাব দিয়েছিল, জোগাড় হয়ে গেল, আমাদের দেশের তুলনায় ওর বাবা বেশ বড়লোক। সাত দিন থাকব, আবার ইয়র্কে ফিরে যাব। তোমাদের বউ দেখাতে এসেছি। বাড়িতে একদিন একটা পার্টি দেবার কথা ভাবছি। বাবা বলেছিলেন, বাড়িতে পার্টি দেবার তুই কে? পার্টি দেব আমি। তুই তোর নিজের বন্ধুদের হিসাবটা দিয়ে দিস। তারপরে বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, দ্যাখ, গবা, খোতে তো বউ জুটিয়ে ফেলল। ঘোঁতনা তো দু ছেলেমেয়ের বাবা, তোতা তো আমাকে নাতির মুখ দেখিয়ে দিয়েছে, ফুচকিটা শুনছি কোন এক স্টুডেন্ট লিডরের সঙ্গে ঘুরছে-টুরছে, তার মানেই, হয়ে। গেল। তুই কী করবি? বাইরে-টাইরে যাবি নাকি?’ বাবার কথাবার্তাই ও রকম, আমি হেসে বলেছিলাম, বিয়ে করবার জন্য বাইরে যাব কেন। কাজকর্মের দরকার থাকলে যেতে পারি।’বাবা বলেছিলেন, তাও তুই যাবি বলে আমার মনে হয় না।তারপরে খোতে মেরিয়ানের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিয়েছিল, মেরিয়ান উঠে এসে আমার হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছিল, বলেছিল, হেলো ড্যাড–।’ খোতে তাড়াতাড়ি বলেছিল, নট ড্যাড, দাদা, মেজদামেজদা। মেরিয়ান একেবারে খুকিনা না, মানে বালিকা, লজ্জা না পেয়েই বলেছিল, হেলো মেইজডা। আমি কেবল হাসছিলাম, ভারী ভাল লাগছিল মেরিয়ানকে, আমাদের ফুচকির তখন প্রায় কুড়ি বছর বয়স, সে তুলনায় এ তো ছেলেমানুষ; এত ছেলেমানুষ একটি মেয়ের বিয়ে আমাদের দেশেই আজকাল হয় না, আর মেরিয়ান কিনা খোদ আমেরিকার মেয়ে! ভেবেছিলাম, খোতেটা করেছে কী! অবিশ্যি খোতের বয়সই বা তখন কত, হার্ডলি বাইশ-তেইশ। দেখা গিয়েছিল, মেরিয়ান আমাদের বিরাট বাড়িটার মধ্যে ছোটাছুটি লাগিয়ে দিয়েছিল, ওইটুকু মেয়ে চেন স্মোকার, হার্ড ড্রিঙ্কেও বেশ অভ্যন্ত। ফুচকির সঙ্গেও ওর বেশ ভালই জমেছিল, আমার নিজেকে কেমন যেন, একজন থিয়েটারের দর্শক বলে মনে হয়েছিল, মানে পরিবারের বাইরের লোক। তারপরে বিরাট পার্টিও হয়েছিল, সাত দিন পরে খাতে মেরিয়ানকে নিয়ে চলে গিয়েছিল। বড়দা (ঘোঁতন) ব্যবসা-ট্যাবসা মিলিয়ে কী একটা করেন, ঠিক জানি না, নিজেই একটা বাড়ি করেছেন বাঃ সাঃ রোডে, সেখানেই থাকেন, তোতা (বড়দি) বম্বেতে ওর স্বামীর সঙ্গে, ফুচকি শুনছি খুব রাজনীতি করছে, ওর স্বামীর নাম আমি জানি না, যুবনেতা হিসাবে নাকি খুব নামডাক। মা তো বছর দশেক আগেই মারা গিয়েছেন; বাবা, বলতে গেলে, কলকাতায় এখন একলা, এবং সত্যি বলতে কী, বাবাও যে কী করেন, আমি তার প্রায় প্রায় কেন, কিছুই ঠিক বুঝি না। বেলা বারোটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরোন, চারটে-সাড়ে চারটের মধ্যেই ফেরেন, অথচ তিনি যে অর্থবান এবং ওটাকে বলে, প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি, তা-ই। আমাদের একাধিক বাড়ি, গোটা তিনেক গাড়ি, চাকরবাকর, ঝি, ঠাকুর, খানসামা, বেয়ারা, বাবুর্চি নিয়ে ডজন খানেকের ওপর লোক, আর বাড়িতে মন্ত্রী, আমলা থেকে শুরু করে সব স্তরের লোকেরই যাতায়াত প্রচুর। তবে লক্ষ করে দেখেছি, হোম আর ফাইনালের আমলাদের যাতায়াতটা বোধ হয় একটু বেশি। আমার মনে হয়েছে, আমাদের পরিবারের সকলের মধ্যেই কোথায় একটা অদ্ভুত যোগাযোগের নিজেকে খুঁজে পাই না। পাই, পাই না একেবারে, তা বলব না, বাবাকে আমার কেমন যেন খুব ভাল লাগে, কারণ বাবা আমাকে বোধ হয় খানিকটা বোঝেন, বোঝেন যে, আমি একটু দিশাহারা ধরনের ছেলে, যে কারণে তিনি প্রায়ই আমাকে ভুরু নাচিয়ে নাচিয়ে হেসে বলেন, দ্যাখ গবা, তুই একটা নেহাত মাকাল ফল, আমার তা মনে হয় না। তার মানে, দেখতে ভাল অথচ কাজের না, আমাকে বাবার তা মনে হয় না। বাবা বলেন, আসলে তুই ছুরিটা তুলে নিতে ভয় পাচ্ছিস, বোর্ডের ঠিক জায়গাটাতে বেঁধাতে পারবি কি না। তাতে কী হয়েছে, এক চালে সবাই বাজিমাত করতে পারে না, ছুরিটা ছুঁড়েই দ্যাখ না। দু-একবার ফসকে যায়, লোকে হিড়িক দেবে, খবরের কাগজে কেচ্ছা বেরোবে, বেরোক গে, ও সব গায়ে মাখতে গেলে চলে না। সাহস চাই, সাহস। বাবা যে কী বলতে চান, আমি ঠিক বুঝেও যেন বুঝে উঠতে পারি না। তিনি আমাকে ইলেকশনে দাঁড়াতে বলেছেন, পার্টনারশিপে বিজনেস করতে বলেছেন, সরকারি বা বেসরকারি চাকরি নিতে বলেছেন, যেগুলোর রাস্তাঘাট আমার-আমার ঠিক ফেয়ার মনে হয়নি। কোনওটাই যখন হল না, বাবা বললেন, ঠিক আছে, তোর যেমন ভাল লাগে, তেমনি থাক, আমার কিছু বলবার নেই।

আমি মডার্ন হিস্টরি নিয়ে এম এ পাশ করেছি, কিন্তু কেন এ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেছি, আমি নিজেও তা ঠিক জানি না, অবিশ্যি আমি পরীক্ষায় কখনও ফেল করিনি, এবং এম এ অবধি ধৈর্য ধরে আমার দাদা, দিদি, ভাই বোনেরা কেউ-ই যায়নি, আর আমার মনে হয়েছে, ওটা আসলে ধৈর্যেরই অভাব, ওদের সব কিছুতেই ভীষণ তাড়াহুড়ো। ওদের যত বন্ধু বান্ধব, আমার তা নেই বললেই চলে, তার মানে আমি একটা, যাকে বলে, রোগ এলিফ্যান্ট, মোটেই না। আমার নিজেকে কখনওই পরাজিত মনে হয়নি, ঈর্ষাকাতরও না, এবং নিজেকে আমি কখনওই সুখী বোধ করিনি, অসুখীও বোধ করিনি, ঘরকুনো, গোমড়ামুখো বলতে যা বোঝায়, আমি তাও না। আমি পারি না তর্ক করতে। জেদ করতে, বাজি ধরতে, এবং বাইরের উত্তেজনা আমাকে তেমন ছোঁয় না, যে কারণে রাজনীতি বা খেলার মাঠে আমার কোনও টান নেই, কিন্তু আমার দিশাহারা নিশ্চেষ্ট ভাবের জন্য আমি মনে মনে কেমন ছটফট করি।

তপনকাকা, মমতা কাকিমা কলকাতায় গেলেই আমাদের বাড়িতে যান, বাবাকে দাদা দাদা করেন, খানাপিনা হয়, ওঁদের সঙ্গে অনেক দিন থেকেই আমার পরিচয়। মমতা কাকিমা কেবল আমাকে না, বাবাকেও অনেক বার বলেছেন, দাদা, মদনকে আমার ওখানে দিল্লিতে নিয়ে যাই।’ তপনকাকা বলেছেন, মদনকে দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে দেখা যাক না, কিছু করা যায় কি না। আপনি অনুমতি করুন দাদা। বাবা বললেন, আমার অনুমতি করার কিছু নেই, গবা যদি যেতে চায়, নিয়ে যাও, টাকার যা দরকার লাগে, আমি তা পাঠিয়ে দেব।তপনকাকা জিভ কেটেছেন, মমতা কাকিমা বাবার দিকে, সে কী একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠোঁট ফোলাতেন, বলতেন, টাকার কথা আপনি বলতে পারলেন দাদা?’ বাবা হাসতেন। তার পরে বছর তিনেক আগে, আমি রাজি হয়ে গেলাম দিল্লিতে যেতে। সেই থেকে আমি দিল্লিতে, এবং দিল্লি আমার বেশ ভাল লেগেছিল। অনেক বাঙালির মুখেই যেমন শুনেছি, দিল্লি শহর দেখতে সুন্দর, কিন্তু হার্টলেস, মানে প্রাণহীন, (সে আবার কেমন, আমি তা জানি না।) আমার তা কখনওই মনে হয়নি। কলকাতার সঙ্গে দিল্লির নিশ্চয় অনেক তফাত আছে, আর তফাত আছে বলেই তো ভাল লাগে। একটা কলকাতা ছেড়ে যদি আর একটা কলকাতায় যেতে হয়, সেটা নিশ্চয় ভাল লাগবে না, একটা নতুন কোথাও সবাই যেতে চায়, এবং সেই হিসাবে, দিল্লিকে আমার বেশ ভাল লেগেছিল। আসলে যাকে বলে, বিশেষ জায়গার জন্য বিশেষ কাতরতা–যার কারণ বোধ হয়, সেই বিশেষ জায়গার সঙ্গে নিজেকে এমন করে মিলিয়ে ফেলা যে, মনে হয় অন্য কোথাও গেলে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, আমার সে রকম কিছু নেই। দিল্লিতে প্রাণের কোনও অভাব আছে বলে, আমার কখনও মনে হয়নি, অবিশ্যি আমি যদিও ঠিক জানি না, কোনও একটা শহরের প্রাণ নামে বস্তুটা কী। সব শহরেরই নিজস্ব কতগুলো কী বলে–প্যাটার্ন অব লাইফ আছে, যে কোনও একটার সঙ্গে জড়িয়ে গেলে, আর একটাকে মেনে নিতে অসুবিধা হয়। আমি সে রকম কোনও অসুবিধা বোধ করিনি, তার কারণ বোধ হয়, আমি কলকাতায়ও যে রকম প্রায় নিঃসঙ্গ ছিলাম, দিল্লিতেও প্রায় তাই। মমতা কাকিমা অবিশ্যি আমাকে প্রায় একলা থাকতে দিতেই চাইতেন না, তপনকাকাও নানান জায়গায় নিয়ে যেতে চান, নিয়ে গিয়েছেনও, আমি স্বস্তিবোধ করিনি। বিশেষত বড় বড় আমলা বা এম. পি. বা মন্ত্রী, এক কথায় বলতে পারি, ইমপসিবল। আমি একলা একলা ঘুরতে পারি, অনেক কিছু এনজয় করতে পারি। দিল্লির আশেপাশে দেখবার অনেক কিছুই আছে, ইতিহাসের ভাঙাচোরা, এলোমেলো ছড়ানো অনেক চিহ্ন, যা নতুন দিল্লির এদিকে ওদিকেই অনেক আছে, তা ছাড়া নানা রকমের লোকজন দেখতে আমার বেশ ভালই লাগত। তপনকাকার বাড়িতেই প্রায়ই পার্টি-টার্টি হয়, মমতা কাকিমার সমিতি আর সমিতির বাইরের মহিলাদের একটা বড় আড্ডা সেই বাড়ি। সব মিলিয়ে তিনটি বছর আমার ভালই কেটে যাচ্ছিল। মমতা কাকিমার অত্যাচার কিছুটা ছিল, কারণ মমতা কাকিমা ঠিক কাকিমার মতো ব্যবহার। করতেন না, অনেকটা অনেকটা কী বলব, বন্ধুর মতো, যে কারণে আগেই বলেছি, মমতা কাকিমা ভারী মুখফেঁড়, মুখে কোনও কথাই আটকায় না। যেমন বিনয়নগরের মিসেস ঘোষের মেয়ে, রত্নার সম্পর্কে হঠাৎ আমাকে একদিন বললেন, মেয়েটা কিন্তু দারুণ, দ্যাখো না, বঁড়শিতে গেঁথে তুলতে পার কি না। আমি অবাক, কথাই বলতে পারিনি, মমতা কাকিমা আমার গালে, আস্তে করে চিমটি কেটে দিয়ে বললেন, দ্যাখো মদন, ও রকম ন্যাকার মতো তাকিয়ে থেকো না। রত্না ঘোষকে তোমার ভাল লেগেছে, তোমার চাউনি দেখেই বুঝেছি, তাই বলছি, ছিপটা ফেলেই দ্যাখো না, গাঁথা যায় কি না।তার মানে কী? আমার সেই বাবার ছুরি ছুঁড়ে মারার কথা মনে পড়েছিল। এক-আধবার ফসকে যেতে পারে, তাতে কিছু কেচ্ছা রটনা হতে পারে, কিন্তু ও সব গায়ে মাখতে গেলে চলে না, বাবা এ রকমই বলেছিলেন, মমতা কাকিমার কথাও যেন অনেকটা সেই রকম, অথচ ছিপ ফেলে বঁড়শিতে গেঁথে রত্নাকে আমি তুলব কেমন করে! তা কি কখনও তোলা যায় নাকি! আমি কাকিমাকে বললাম, রত্নাকে। আমার ভাল লাগে, সে তো সত্যি কথা। কিন্তু ও কি মাছ নাকি যে ওকে আমি বঁড়শিতে গেঁথে তুলব?’ মমতা কাকিমা ভুরু কুঁচকে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন, তারপরেই হঠাৎ দেখি মুখ। শুঁকে’ বলেই আমার কাঁধে হাত দিয়ে উঁচু হয়ে, ওঁর নাকটা প্রায় আমার ঠোঁটে ঠেকিয়ে দিলেন; আমি চমকে উঠলাম, মমতা কাকিমা বললেন, হু, এখনও অন্নপ্রাশনের ভাতের গন্ধ রয়েছে ছেলের মুখে, এখনও কিছুটি বোঝে না। অথচ আসলে আমার মুখে তখন সিগারেটের গন্ধ, নিয়মিত না হলেও, অল্পস্বল্প ধূমপান করি, আর মমতা কাকিমা নিজেই আমার সিগারেট কিনে দেন, ফলে একটু বেশি দামি বিদেশি সিগারেট ধূমপান করা হয়, কারণ তপনকাকা আর আমার ব্র্যান্ড একই। আমার অবাক মুখের। দিকে তাকিয়ে, মমতা কাকিমা অদ্ভুত একরকম হেসে, (এই বয়সেও মমতা কাকিমা যথেষ্ট সুন্দরী, আর আর কী বলে, প্রায় যুবতীর মতোই দেখতে।)। বললেন, সত্যি মদন, অনেক বজ্জাত ছেলে দেখেছি, তোমার মতো দেখিনি। বঁড়শিতে গেঁথে তোলা কাকে বলে শিখিয়ে দেব? এসো, শিখিয়ে দিচ্ছি।বলেই। মমতা কাকিমা যা করলেন, আর যা বললেন, এখনও ভাবতে গেলে, মনে হয় আমার গায়ে একশো আট ডিগ্রি জ্বর এসে গিয়েছে, কিন্তু তারপরেই মমতা কাকিমা এত সহজ, সাবলীল আর কী বলে ওটাকে হা-হা-হাস্যময়ী, যে ব্যাপারটার মধ্যে কোনও ইয়েই যেন নেই–মানে মালিন্য। অথচ আমি এমন উল্লুক হয়ে যাই তাঁ, তা ছাড়া আর কিছু না, আমি মমতা কাকিমাকে ভয় পাই, কেন না, উনি যে কখন কী বলবেন, বা করবেন, তা আগে থেকে কিছুই বলা যায় না, ভাবা যায় না। এমনকী সোনা আর মুনা যখন বাড়িতে থাকে, মমতা কাকিমার দুই মেয়ে, যারা নৈনিতালে থেকে পড়াশোনা করে, পনেরো আর বারো যাদের বয়স, ওদের সামনেও মমতা কাকিমা একই রকম।

তাই বলছিলাম, মমতা কাকিমা ঠিক কাকিমার মতো ব্যবহার করেন না, বন্ধু বা তার থেকেও কিছু বেশি, যে কারণে, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার ভাষা আর ভঙ্গির কথা আগেই বলেছি, তারপরে লায়লী সিং-এর সঙ্গে, আলাপ করিয়ে দেবার ভাষা ও ভঙ্গি, কী বলে ওটাকে, সেই বেশ চলতি কথার মতো, আর এক কাঠি সরেস। সে ক্ষেত্রে ভাষাটা কেবল ইংরেজিতে, কিন্তু কানে আগুন জ্বালিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। লায়লী সিং সুদীপ্তা চ্যাটার্জির থেকে সব বিষয়েই আরও কয়েক ডিগ্রি ওপরে, কেন না, ও বলেছিল, আমার মুখের দিকে দেখে, এখনই চেখে দেখব নাকি? তারপরেই খিলখিল করে হেসে উঠে, আমার হাত চেপে ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছিল, সর্দারনির–মানে লায়লী সিং-এর সুন্দর হাতটিতে জোরও কম ছিল না, এবং তার চোখা নাক, টানা চোখ, রং মাখা লাল ঠোঁট আর নাকে সরু সোনার আধ ইঞ্চি ডায়মেটারের রিং, কাজল টানা চোখের তারার ঝঝলক, ফরসা মুখ যেন একটু লাল লাল দেখাচ্ছিল, আর একটা হালকা গন্ধ, হয়তো ওয়াইনের হতে পারে বা অন্য কোনও হার্ড ড্রিঙ্কসেরও অসম্ভব না, সব মিলিয়ে ওর সামনে আমি যেন গুটিয়ে যাচ্ছিলাম। ওর বয়সও মমতা কাকিমার থেকে কম, অন্তত আমার তা-ই ধারণা, হয়তো সুদীপ্তা চ্যাটার্জির থেকেও। কেন মনে। হয়েছিল, তা বলতে পারি না, কেন না, এমনিতে মমতা কাকিমা বা সুদীপ্তা চ্যাটার্জি যে কম সুন্দরী তা বলছি না, তবু লায়লী সিংকে আমার সাতাশ-আটাশ মনে হয়েছিল। লায়লী সিং নাভির নীচে গাঢ় সবুজ শাড়ি বেঁধেছিল, সবুজ কাচুলির মতো স্লিভলেস জামা, আর সবুজ গোল টিপ কপালে, সবুজ রঙের ফোমের হাতব্যাগ খুলে, লাল সোনালি রঙের সুন্দর কিংসাইজ সিগারেটের প্যাকেট বের করে আমাকে অফার করেছিল। কী করা উচিত ভেবে পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখেছিলাম, মমতা কাকিমা কখন ডাইনিং রুম থেকে চলে গিয়েছেন। (আমরা ডাইনিং রুমেই ছিলাম, লায়লী সিং সোজা সেখানেই চলে এসেছিল, পাশেই ড্রয়িংরুমে তপনকাকা এবং অন্য একটা মোটা গলার ইংরেজিতে কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল– চন্দন সিং-এর গলা, পরে আলাপ করতে গিয়ে জেনেছিলাম, চন্দন সিংও কেন্দ্রীয় সরকারের একজন মস্তবড় আমলা, মোম মাখানো গোঁফ-দাড়ি, মাথায় সবসময়েই নানা রঙের পাগড়ি, আর স্যুটেড বুটেড, মোটা ত্রিকোণ নটের টাই, কিন্তু ধূমপান করে না, এ বিষয়ে সে লায়লী সিং-এর থেকে ধার্মিক।) লায়লী সিং ঘাড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছিল, ডোঞ্চ ইউ স্মোক? আমি আমতা আমতা করে বলেছিলাম, আই মিন, ইয়েস, বাট নট রেগুলারলি–’আমার কথা শেষ হবার আগেই, লায়লী সিং বলে উঠেছিল, নাউ স্মোক ওয়ান অব মাই সিগারেটস ইরেগুলারলি।’ কথাটার সঠিক মানে কী, না বুঝেই আমি একটি সিগারেট তুলে নিয়েছিলাম, লায়লী সিংও ঠোঁটে সিগারেট গুঁজেছিল, এবং লাইটার দিয়ে আমার সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে নিজেরটা ধরিয়েছিল। ওর টানা দেখে বোঝা গিয়েছিল, ধূমপানে ও বেশ অভ্যস্ত, এবং ড্রিঙ্কসের ব্যাপারে ও সেই পাখির মতো, চাতকী–যদি চাতকের ফেমিনিন তা-ই বলা যায়। পরে দেখেছি, ওর মতো কোনও মেয়েই এত মদ্যপান করতে পারে না, অবিশ্যি তপনকাকার বাড়িতে এবং লায়লী সিং-এর নিজের বাড়িতে ছাড়া অন্য কোথাও দেখিনি। সেই থেকে শুরু এবং তারপরে অনেক বারই লায়লী সিং-এর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে তপনকাকার বাড়িতে বা ওদের নিজেদের বাড়িতে, অনেক বারই ওদের বাড়িতে আমাকে নিমন্ত্রণ করেছে। লায়লী সিং ভীষণ ভীষণ কথা বলতে পারে, যাকে বলে বেআবরু, মমতা কাকিমার অনেক ওপরে যায়, এবং আমাকে নিয়ে ও কয়েক বার নাচতে চেয়েছে, যা আমি মোটেই পারি না, ফলে আমাকে জড়িয়ে ধরে খানিকটা ঘুরপাক খাওয়া আর হুডযুদ্বু করা ছাড়া কিছুই হয়নি, অন্যেরা মজা পেয়েছে, হেসেছে, হাততালি দিয়েছে, বিশেষ করে চন্দন সিংও। লায়লী সিং ড্রিঙ্ক করার জন্যও আমাকে অনেক বার জোর করেছে, যা আমার সহ্য হয় না, হলে আমাদের বাড়িতে কোনও নিষেধ ছিল না, ফুচকি আর আমি ছাড়া, আমাদের বাড়ির সবাই ড্রিঙ্ক করে, কিন্তু লায়লী সিং-এর কাছে আমাকে দু-একবার হার মানতে হয়েছে, কষ্ট করে এক-আধ পেগ গিলতে হয়েছে, যদিও তাতে আমি মাতাল হইনি, এনজয় করিনি, আমার ভাল লাগে না। তা ছাড়া, কেউ বেশি ড্রিঙ্ক করলে, তাকে আমার কেমন যেন ভয় লাগে, আমি মাতালদের চোখে চোখ রাখতে পারি না, আমার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। লায়লী সিং-এর মাতলামিকে আমি ভয় পেতাম, এমনও কয়েক বার হয়েছে, তার কাছ থেকে পালাবার জন্য আমাকে লুকোচুরি খেলার মতো পালাতে হয়েছে বা ছুটতে হয়েছে, আর মমতা কাকিমারা সবাই সেটাকে একটা মজার খেলা পেয়ে হেসে গড়িয়ে পড়েছে, আর আমার প্রাণ যাবার দাখিল।

চার মাস আগে–চার মাস সাত দিন হবে–আগে, আমি কনট সার্কাসে, একটু ছায়া দেখে, দুপুরে ঘুরছি, কখনও কোথাও দাঁড়িয়ে কিছু দেখছি, যেমন কুকুরওয়ালী হিপিনিদের, ভিড়ের অন্যান্য নরনারীদের, কেন না, আমি মমতা কাকিমার সঙ্গে সফদারজঙে তার সেই লেডি ডাক্তার বান্ধবীর বাড়ি যাইনি, বলেছিলাম, আমাকে কনট সার্কাসে নামিয়ে দিয়ে যান, আমি আমার এক জার্নালিস্ট বন্ধুর সঙ্গে দেখা করব।কথাটা একেবারে মিথ্যা না, আমার এক বন্ধু দিল্লির একটি ইংরেজি পত্রিকায় সাংবাদিকের চাকরি করে, এবং কনট সার্কাস থেকে আমি অলসভাবে ঘুরতে ঘুরতে, দেখতে দেখতে, কখনও বা দাঁড়িয়েও, সেই পত্রিকার অফিসের দিকেই যাচ্ছিলাম, আর দিল্লিতে জুন মাসে এমন আবহাওয়া, ভাবা যায় না, নেচারের কথা কিছুই বলা যায় না, আমি প্রথমে শুনলাম, মাদান, ওহ মাদান! শুনেই চিনতে পারলাম লায়লী সিং-এর গলা, মুখ ফেরাবার আগেই কনট সার্কাসের চলন্ত লাঞ্চ আওয়ারের জনতার সামনে, লায়লী সিং আমাকে জড়িয়ে ধরল, মনে করতে পারি না, কী রঙের কী পোশাক ও পরেছিল, ঠোঁট খুলে কথা বলবার আগেই, (উহ, অভাবিত অভাবিত!) আমার ঠোঁট ওর গ্রাসে, হাতের বন্ধন শক্ত, আমি যেন অন্ধ হয়ে গেলাম, হাসি আর নানান কথার রোল শুনতে পেলাম, নাকে উগ্র হুইস্কির গন্ধ পাচ্ছিলাম, এমনকী লায়লী সিং-এর শরীরের ঘেঁয়াও আমি অনুভব করতে পারছিলাম না, কেন না, আমার সে অনুভূতি ছিল না। সময়ের কোনও জ্ঞান ছিল না আমার, কত যুগ কেটে যাচ্ছিল, তারপরেই কে যেন লায়লী সিংকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, আর কী বলব, সপাটে আমার গালে একটা থাপ্পড়, এবং শুনতে পেলাম, রাসকেল, সানোফাবীচ, তেরেকো দেখ লেংগে। পলকেই দেখতে পেলাম চন্দন। সিংকে, তার রক্তবর্ণ চোখে রাগ আর ঘৃণা, লায়লী সিংকে নিয়ে ছুটে গিয়ে গাড়িতে উঠল, এঞ্জিনে শব্দ তুলে ছুটেই চলে গেল, আর আমাকে ঘিরে তখন জনতা, কী যে বলছিল, কিছুই জানি না, হয়তো কেউ আমাকে ধরে মারত, কিন্তু পুলিশ এসে পড়েছিল, এবং আমার হাত চেপে ধরে, গাড়িতে তুলে, সোজা থানায় নিয়ে গিয়েছিল। আমি কিছু বলবার চেষ্টা করতেই, গালে আবার এক থাপ্পড়, তারপরে হাজতের মধ্যে। ঘণ্টাখানেক পরে, হাজতের বাইরে অফিসে নিয়ে গিয়েছিল, আমার কিছু ভাববার ক্ষমতাই ছিল না। একজন অফিসার আমার নামধাম, ঠিকানা আর তপনকাকার নাম, টেলিফোন নাম্বার লিখে নিল, আমি কী অপরাধ করেছি, কিছুই বলল না, কিছু জিজ্ঞেসও করল না, পকেটের সামান্য টাকা পয়সা, হাতের ঘড়ি, হিরার আংটি, সিগারেটের প্যাকেট, দেশলাই আর রুমাল সব নিয়ে নিল, একটা কাগজে সই করিয়ে আবার হাজতে পুরে দিল।

ঘণ্টা দুয়েক পরেই তপনকাকা আর মমতা কাকিমা থানায় এলেন, হাজতের ভিতর থেকে তাদের দেখে আমার চোখে জল এসে গেল, কিছুতেই আটকে রাখতে পারলাম না, এমন মনে হল, মমতা কাকিমার চোখও জলে ভরে উঠল। তপনকাকা ব্যস্তভাবে অফিসে চলে গেলেন, আমাকে মমতা কাকিমা ঘটনার কথা জিজ্ঞেস করলেন, আমি সবই বললাম, শুনে মমতা কাকিমা বিরক্ত আর খানিকটা দুঃখের স্বরে বললেন, মদ গিললে লায়লীটার কোনও কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। ছি ছি, কী একটা কাণ্ড করে বসল। ওকে তো আর পুলিশ ধরবে না, তোমাকেই ধরে নিয়ে এসেছে।

একটু পরেই তপনকাকা হাজতের গরাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তাঁর মুখ গম্ভীর আর থমথম করছে, বললেন, মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা নিয়ে অনেক জল ঘোলা হবে। ওরা তোমাকে বেল দিতে রাজি না, কাল কোর্ট থেকে বেল নিতে হবে। আমি বললাম, কিন্তু তপনকাকা, আমি তো কিছুই করিনি, লায়লী সিং হঠাৎ এসে–তপনকাকা আমাকে বাধা দিয়ে বললেন, আমি সবই জানি, ওই স্পটে ছিল, এমন লোকের মুখ থেকে আমি ঘটনাটা সবই শুনেছি, কিন্তু এদের ব্যাপার-স্যাপার দেখে মনে হচ্ছে, তোমাকে ফাঁসিয়ে এরা লায়লী সিং-এর ইজ্জত বাঁচাবে। ঘটনাটা পাবলিকলি ঘটেছে, চাপা দেওয়াও যাবে না, আর দিল্লিতে চন্দন সিংদের হোন্ড অনেকখানি। এনি হাউ, আমি দেখছি কী করা যায়, তুমি নার্ভাস হয়ো না, মনে কর, একটা অ্যাকসিডেন্ট, এ ছাড়া আমি আর কী বলব। এখন মহাদেবদাকে (আমার বাবা) খবরটা কেমন করে জানাই, তাই ভাবছি।

মমতা কাকিমা বললেন, ওই স্পটে যারা ছিল, তারা যদি সাক্ষী দেয়, তবু কি কিছু হবে না? তপনকাকা বললেন, এত সহজে কি সাক্ষী পাওয়া যায়, না সাক্ষী দিতে কেউ আসতে চায়? লোকদের বয়ে গেছে, কাজকর্ম ছেড়ে তারা একটি বাঙালি ইয়ংম্যানকে বাঁচাতে আসবে।’ মমতা কাকিমা যাকে। বলে অসহায়-সেই রকম দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। তারপরে আজ কিছু করা না গেলে, পরের দিন কোর্টে দেখা হবে, এ কথা জানিয়ে, আর একটু সাহস দিয়ে তপনকাকা মমতা কাকিমাকে নিয়ে চলে। গেলেন। পরে শুনেছি, তপনকাকা ব্যাপারটাকে নিয়ে কোনও রকম প্রকাশ্যে কিছু হোক, সেটা বন্ধ করার জন্য চন্দন সিং-এর সঙ্গে সেই রাত্রেই কথা বলেছিলেন, চন্দন সিং নাকি তার জবাবে বলেছে, পুলিশ আমাকে ধরেছে, তার কিছু করার নেই, পুলিশ যা ভাল বুঝবে, তাই করবে। দুজনের মধ্যে কিছু তিক্ত কথা কাটাকাটিও হয়েছে, আমার মনে হয়, যার ফলে ব্যাপারটা খানিকটা জেদাজেদিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, এবং পরের দিন, নগর দায়রা আদালতে গভর্নমেন্ট প্রসিকিউটর এই বলে আমাকে অপরাধী হিসাবে পেশ করলেন যে, আমাকে ইমমর্যাল ট্রাফিকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে, কারণ আমি নাকি দিনের বেলা ভোলা রাস্তায়, একজন রেসপেক্টেবল মহিলার ওপর জোর করে অবসিন আচরণ করেছি। তপনকাকা আমার জন্য উকিল নিয়েই এসেছিলেন। সেই উকিল, আমার দোষ সমস্ত অস্বীকার করে, বেল প্রে করলেন। ম্যাজিস্ট্রেট তা নাকচ করে দিয়ে, আরও প্রমাণাদির জন্য, আরও তিন দিন হাজতবাসের নির্দেশ দিলেন, শুনে মনে হল, আমি বোধ হয় কোর্টেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব, কারণ হাজতের কথা আমার মনে পড়ছিল, সন্ধের পরে আরও বারো জন আসামিকে সেই ঘরে পাঠানো হয়েছিল, সকলেই অবাঙালি এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধে ধরা পড়েছে, চোলাই মদের ব্যবসা থেকে চুরি, রাহাজানি, এমনকী ধর্ষণের অপরাধীও ছিল, তারা আমাকে সারা রাত ঘুমোতে দেয়নি। আরও তিন দিন সেখানে থাকতে হবে ভাবতেই, আমি যেন অন্ধকার দেখছিলাম। কিন্তু আমাকে সেই হাজতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়নি, জেল হাজতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, থানার হাজতের থেকে সেটাকে, কী বলে, সেই–যাকে বলে–মন্দের ভাল। যাই হোক, তিন দিন পরে আমি কোর্টে বেল পেয়েছিলাম, ইতিমধ্যে খবরটা কাগজে বেরিয়ে গিয়েছিল, এবং দু-একটি কাগজে, কনট সার্কাসে দিনের বেলা অভূতপূর্ব দৃশ্য’ বলে, খানিকটা বিদ্রূপ করে প্রায় সত্যি ঘটনাই লিখেছিল, বাকি কাগজগুলো, বাঙালি যুবকের কীর্তি! এইরকমভাবে প্রসিকিউটরের ভাষায় সংবাদটা ছাপিয়েছিল। তারা আমার নাম ছাপিয়েছিল, লায়লী সিং-এর নাম ছাপেনি। কোর্ট থেকে বাড়ি ফিরে জানতে পেরেছিলাম, ইতিমধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে, ভিতরে ভিতরে চরম উত্তেজনা আর দলাদলির সৃষ্টি হয়েছে। তখনই প্রথম জানতে পেরেছিলাম, এই মিস্টার জগট বিশওয়াস আমার বিরুদ্ধে লেগেছিলেন, ভদ্রলোককে আমি তপনকাকার বাড়িতেই কয়েক বার দেখেছি, এবং আমার সঙ্গে সেখানেই প্রথম পরিচয়। ঘটনাটা নতুন করে ভাববার কিছু নেই, মামলা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়েছিল, এবং বোঝা যাচ্ছিল, ভিতরে ভিতরে ঘটনা এমনভাবে ঘটছিল যে আমার শাস্তি হবেই, এমনকী আমার বাবা দেবাদিদেব মহাদেব মুখোপাধ্যায়েরও ক্ষমতা ছিল না, আমাকে বাঁচাতে পারেন, কারণ দিল্লির একটি ক্ষমতাশালী গ্রুপ জেদ ধরে বসেছিল, আমাকে শাস্তি দেবেই। শাস্তি আমাকে পেতেও হয়েছে, দু মাস সশ্রম কারাদণ্ড, সেই নরকবাসের স্মৃতি আমি আর মনে করতে চাইনা, এবং বাবা কী ভেবে নাকি তপনকাকাকে জানিয়েছিলেন, হায়ার কোর্টে মুভ করার দরকার নেই, দণ্ডই যেন মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু তারপরে আমি আর দিল্লির রাস্তায় বেরোইনি। আজ তপনকাকার ড্রাইভার এসে আমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে গিয়েছে। এখন দেখছি, আমারই কুপে-তে মিস্টার জে. বিশওয়াস, সুদীপ্তা চ্যাটার্জির আবির্ভাব এবং শুনতে পেলাম, চন্দন সিং আর লায়লী সিং এ গাড়িতেই ট্রাভেল করছে। কেন? নতুন করে কিছু ঘটতে চলেছে নাকি? আমার মস্তিষ্কের মধ্যে সাপের কুণ্ডলীটা মাঝে মাঝে নড়ে উঠছে।