উপন্যাস
গল্পগ্রন্থ

বারান্দার খোলা দরজার সামনে

‘আসতে পারি?’ বারান্দার খোলা দরজার সামনে তিতির দাঁড়িয়ে।

আসু–ওহ, এসো। আমি ওকে ডাকলাম। তিতির এল, ওর চোখ আমার দিকে, কিন্তু কী একটা চেঞ্জ যেন দেখছি ওর চেহারায়। পোশাকে না, অথচ কী একটা চেঞ্জ

কী দেখছেন বলুন তো?

ওহ, আশ্চর্য, কিছুই না, কপালে একটা হালকা গোলাপি রঙের টিপ এঁকেছে। বললাম, কপালে টিপটা তুমি এখন পরে এলে, না?

আশ্চর্য, এত সূক্ষ্ম আপনার দৃষ্টি?’ বলতে বলতে ও টেবলের সামনে এল, বলল, আর দিনের বেলা। রাস্তার ওপরে, আপনাকে যে যা খুশি করে যাবে, আপনি তাই করে যেতে দেবেন?

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তার মানে?

তাই তো ঘটেছে। লায়লী সিং এসে আপনাকে যা খুশি তাই করে চলে গেল, আপনি কিছুই বললেন না?’ তিতির যেন সিরিয়াস একটা অ্যালিগেশন নিয়ে এল। আমি প্রথমটা কিছু বলতেই পারলাম না। কয়েক সেকেন্ড পরে বললাম, সিচুয়েশনটা তুমি বুঝতে পারছ না। আমি আনমাইন্ডফুলি হাঁটছিলাম, আমি ভাবতেই পারিনি, হঠাৎ কোথা থেকে কী ঘটে গেল।

আপনি লায়লী সিং-এর চুলের মুঠি ধরে, এক থাপ্পড় মারলেন না কেন?

মানে? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে দেখলাম, তিতিরের চোখে মুখে রাগ যেন ইয়ে, মানে দপদপ করছে।

তিতির রীতিমতো শার্প ভয়েসে বলল, মানে আবার কী, আপনি যেই দেখলেন, আপনাকে জড়িয়ে ধরে সে ওই সব করছে, আপনি কেন ওকে একটা ধাক্কা মারলেন না, ফেলে দিলেন না? তারপরে যা হয় হত, দেখা যেত।

কী অ্যাবসার্ড কথা বলছে তিতির! ওকে ঠিক এতটা হেডস্ট্রং তো আমার মনে হয়নি। জিজ্ঞেস করলাম, হোয়ার আই হ্যাড দ্যাট অপরচুনিটি? তা ছাড়া, এক জন–সে যাই হোক–এক জন মহিলাকে আমি হিট করার কথা ভাবতে পারি না।

তার মানে আপনি– তিতির থেমে গেল, মুখটা এক বার নামাল, আবার তুলল, বলল, আপনি এনজয় করেছিলেন।

হোয়াট এ ডিসকভারি! আমি বলে উঠলাম, আর কেমন যেন মেজাজটা, যা আমার হয় না, খারাপ হয়ে গেল, আমি ওর কাছ থেকে সরে গেলাম। মনে হল, শি টু ইজ ম্যাড এগেন, এও একটা ম্যাডনেস ছাড়া আর কিছু না। আমি বারান্দায় বেরিয়ে এলাম, লাল করবী গাছটা যেখানে উঠে এসেছে, তার সামনে রেলিং ধরে দাঁড়ালাম, কিন্তু আমার খারাপ লাগছে, এভাবে তিতিরের কাছ থেকে চলে আসার জন্য। আমার ওকে বোঝাতে পারা উচিত ছিল, বাট অলমোস্ট আমার মুখে একটা থাপ্পড় মারার মতো হঠাৎ এমনভাবে কথাটা বলেছে, যা আটার ননসেন্স, নিজেকে সামলাতে পারলাম না। এখন ভারী খারাপ লাগছে।

হঠাৎ একটি হাত আমার বাঁ দিকে রেলিঙের ওপরে দেখতে পেলাম, আর পাশ ফিরে দেখলাম, তিতির আমার থেকে ফুট খানেক দুরে দাঁড়িয়ে আছে, মুখ নামিয়ে নীচের দিকে দেখছে। আমি ওর দিকে তাকাতেই, ও মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল, ওর মুখটা অন্য রকম দেখাচ্ছে, যেন ছায়া পড়েছে মুখে। নিচু স্বরে কেমন একটা দুঃখ ফুটল ওর, বলল, অন্যায় হয়ে গেছে, বুঝতে পারিনি। রাগ করেছেন?

না না। আমি তাড়াতাড়ি বললাম, আমার খুব খারাপ লাগছে, আমি তোমাকে ব্যাপারটা ইয়ে– মানে–মানে বোঝাতে পারিনি। আমি কখনও মিথ্যা বলি না।

বুঝতে পারছি।’ তিতির বলল।

আমি বললাম, আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই যদি একটা ইনসিডেন্ট ঘটে যায়, আমি কী করতে পারি বলল।

তিতির বলল, আর বলতে হবে না, আমি বুঝতে পেরেছি। বলেই তিতির যেন কেমন এক রকম করে হেসে উঠল, আর মনে হল, ওর মুখের স্বাভাবিক রং ফিরে এসেছে, এবং দৃষ্টির সেই ডিপ অথচ ঝলকানো ভাবটাও। ও একটু সরে গিয়ে, ঘাড় ঝাঁকিয়ে ডেকে বলল, ঘরে আসুন।

বলতে বলতে ও আমার ঘরের দিকে গেল, আর ওর পিছনে যেতে যেতে মনে হল, তিতির যেন কেমন মিস্টিরিয়াস হয়ে উঠেছে, এতক্ষণ ও যেন আমার সঙ্গে ইয়ে–ওটাকে বলে, রহস্য করল একটা। আমি ঘরে ঢুকতে, তিতির সিগারেটের প্যাকেট খুলে সিগারেট বের করল একটা। তারপরে টেবলের ড্রয়ার খুলে একটা লাইটার বের করল, যেটা খুবই চেনা, আমি ব্যবহার করতাম। তিতির আমার সামনে এগিয়ে এসে সিগারেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নিন।

আমি ভেবেছিলাম, ও নিজেই বুঝি স্মোক করতে যাচ্ছে। সেটা অস্বাভাবিক কিছু না, অনেক মেয়েরাই স্মোক করে। আমি সিগারেটটা নিয়ে ঠোঁটে তুলতেই, তিতির লাইটারটা জ্বালল। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এতে ফুয়েল ছিল?

তিতির আগুনের শিসটা আমার সিগারেটের সামনে তুলে বলল, ছিল না, আমি ভরেছি।

 আমি সিগারেট ধরালাম। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি স্মোক করো?

এখনও না।’ তিতির ফুঁ দিয়ে শিসটা নেভাল। ভবিষ্যতে করবে কি না, সে কথা জিজ্ঞেস করে কোনও লাভ নেই।

তিতির বলল, ঘটনাটা যখন প্রথম শুনি, আমি মনে করেছিলাম, সত্যি। সত্যিই আপনি ও রকম কাজ করেছেন। কিন্তু আপনি কিন্তু সত্যি সৌভাগ্যবান।

সৌভাগ্যবান! তার মানে কী, আমার কী সৌভাগ্য তিতির দেখতে পেল। জিজ্ঞেস করলাম, সেটা কী রকম?

তিতির বলল, আপনি আপনার সোসাইটি আর ফ্যামিলি থেকে স্বতন্ত্র, বিচ্ছিন্ন।

স্বতন্ত্র, বিচ্ছিন্ন, দুটো রীতিমতো কঠিন বাংলা কথা শুনে, আমি তিতিরের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তাকিয়ে রইলাম, মানে ভাবলাম, তিতিরের আসল ইয়েটা কী বক্তব্যটা।

তিতির আবার বলল, কিন্তু হাউ, এটা সম্ভব হল কী করে, বুঝতে পারি না। আপনি তো এ ফ্যামিলিতেই জন্মেছেন, মানুষ হয়েছেন?

হ্যাঁ, তা-ই তো।’

 স্ট্রেঞ্জ! আপনার এ কথা মনে হয়নি, এ বাড়ির কারোর সঙ্গে আপনার কোনও মিল নেই?

হবে না কেন, হয়েছে। কিন্তু এ বাড়ির কারোর সঙ্গেই কারোর মিল নেই, সবাই এক-এক রকম।

তা জানি, তবু মিল ছাড়াও পদ্ম হয়, তা জানেন তো?

পদ্ম? ওহ, য়ু মিন কবিতা? হ্যাঁ, অমিল–মানে গদ্যকবিতা হয়।

 কিন্তু তারও একটা ছন্দের মিল আছে।’

 শুওর, থাকতেই হবে, এমনকী আমি গদ্য ছন্দের গানও শুনেছি।

আপনি ছাড়া, আপনাদের ফ্যামিলির সকলের মধ্যেই সে রকম একটা মিল আছে, গদ্য কবিতার ছন্দের মতো। সেইজন্যই আপনাকে আমি স্বতন্ত্র বলেছি।

ওহ, আচ্ছা!’ বলেও আমি সমস্ত ব্যাপারটা ভাবতে চাইলাম। তিতির ব্যাপারটাকে ঠিক কী আউটলুকে বিচার করছে, আমি পুরোটা ধরে উঠতে পারছি না।

তিতির বলে উঠল, কী হল, চিন্তিত হয়ে পড়লেন?

ভাবছি।

নো, প্লিজ।’ বলে তিতির হেসে উঠল, আর এই প্রথম আমি দেখলাম, তিতিরের জামার কাটটা অদ্ভুত, কেন না, এখন আঁচলটা হঠাৎ খসে গিয়েছে, দেখলাম, ওর সবুজ জামাটার গলা ঘটির মতো গোল, গলা ঘিরে আছে, কিন্তু স্লিভলেস।

তিতির জিজ্ঞেস করল, নীচে যাবেন না?

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, নীচে কোথায়?

আপনাদের বাড়িরই নীচের ঘরে?

কেন?

বাহ্, সেখানেই তো যত মজা। ড্রিঙ্ক টেবলে কত মজার মজার কথা হয়, আমি এনজয় করি। আপনাদের বাড়ির নীচের তলা তো সন্ধেবেলা একটি হরেক জিনিসের কারখানা।

তা ঠিক, জানি, সন্ধেবেলা আমাদের বাড়ির নীচের তলার পরিবেশ অদ্ভুত। অনেকটা, অনেক নাটকের দৃশ্যের মতো। কিন্তু তিতির–তিতির কী এনজয় করে? জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি ড্রিঙ্ক করো নাকি?

এখনও না।

স্মোকের মতে, একই উত্তর, যদিও সোজাসুজি না বলছে না। আবার বলল, এই এক বছরে, অনেকেরই সঙ্গে আমার পরিচয় হয়ে গেছে, তাদের কথাবার্তা শুনতে আমার খুব মজা লাগে। সিনেমা, থিয়েটারের থেকেও। আপনি কখনও যান না?

হ্যাঁ, গেছি, মাঝে মাঝে মন্দ লাগে না, মজাও পাওয়া যায়, কিন্তু রোজ রোজ ভাল লাগার মতো কিছু আছে বলে মনে হয়নি।

তিতির আমার চোখের দিকে ওর সেই চোখে তাকিয়ে, দু-এক সেকেন্ড চুপ করে রইল, আর ঠোঁট টিপে হাসল। বলল, এখন আমার কী মনে হচ্ছে জানেন?

কী?

 এ ফ্যামিলির লোকদের সঙ্গে, তাদের ঝি-চাকরের যা আন্ডারস্ট্যন্ডিং আপনার তাও নেই।

 সে আবার কী, ঝি-চাকরের সঙ্গে আন্ডারস্ট্যান্ডিং?

বুঝলেন না? ঝি-চাকররা তাদের মনিবদের বোঝে, মনিবরা তাদের বোঝেন, কিন্তু আপনি সেখানেও একসেপশন, আপনি তাদের বোঝেন না, তারাও আপনাকে বোঝে না। ওরা কী মনে করে জানেন? দিল্লির ঘটনা যা রটেছিল, তা-ই সত্যি।

আমি অবাক হয়ে বললাম, তাই নাকি? কিন্তু এ সব নিয়ে ভাববার কথা আমার মনেই হয়নি।

ন্যাচারেলি।

এ বার আমার ইয়ে, মানে খেয়াল হল, ও বেলা সবাই যেন আমার দিকে কেমন করে দেখছিল। নমস্কার ইত্যাদি করা বা হাসা সত্ত্বেও, ওদের সকলেরই দৃষ্টি কেমন এক রকম ছিল, যেন আমাকে নতুন একটা মানুষ দেখছে। বললাম, হ্যাঁ, সকালবেলা ওদের তাকানো আর এক্সপ্রেশন দেখে, আমি একটু অবাক হয়েছিলাম।

তিতির যেন অবাক হয়ে, ভুরু কুঁচকে, ঘাড় কাত করে, আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তাই নাকি?

 হ্যাঁ, তোমার কথায় এখন ক্লিয়ার হয়ে গেল।বলে আমি হাসলাম, সিগারেটে টান দিলাম।

তিতির এখনও চোখ নামায়নি, দেখছে, কেন? আমি চোখ ফিরিয়ে নেব কি না ভাবছি, ও বলল, আপনি কি মিস্টিরিয়াস না আর কিছু, আমি বুঝতে পারছি না।’

আমি বললাম, বাবা ছাড়া, আর সকলেই আমাকে একটু ইয়ে মানে বোকা ভাবে।

তিতির কোনও জবাব দিল না, কিন্তু কিছু না বলে, আনমাইন্ডফুল দৃষ্টিতে বাইরের বারান্দার দিকে তাকাল, আর আমার হঠাৎ কথাটা মনে পড়ে যেতেই, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওহ, তিতিতির, ওবেলা তুমি হিরাকে কী বলছিলে? আমি ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। আর হিরাটা যেন কেমন বদলে গেছে এই তিন বছরে।

তিতির আমার দিকে তাকিয়ে বলল মনে হচ্ছে আপনার? মনে করে দেখুন, ওবেলা আপনাকে আমি, সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যাবার কথা বলেছিলাম কিনা? সেটা হিরার জন্যই বলেছিলাম। হিরা এ বাড়িতে সাত বছর বয়সে এসেছিল, এখন কুড়ি। ওর বয়সের সঙ্গে ও বদলেছে, তার সঙ্গে বদলেছে এ বাড়ির চাকর, খানসামা, ঠাকুরদের জগৎটাও। শি ইজ ইন

তিতির থেমে গেল, কী যেন শুনল একটু পাশ ফিরে, তারপরে হঠাৎ দরজার দিকে যেতে যেতে বলল, আমি মেসোমশাইকে খাবার দিয়ে আসছি।’

তা ঠিক, বাবা বরাবরই বিকালে ফিরে এসে স্নান করে কিছু খাবার খান। আজ তার ব্যতিক্রম হয়ে গেল, আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে চা-পান। কিন্তু তিতির কী শুনতে পেল যে, এ রকম করে ছুটে গেল। আমি তো কিছু শুনতে পাইনি। দিল্লি যাবার আগে দেখেছি, বৈদ্যনাথ খানসামাই মেইনলি বাবার দেখাশোনা করত, এখন সেটা তিতির করছে, বোঝা গেল। বাবার ঘরটা তো আমার একটা ঘর ছাড়িয়ে, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পরে, সেকেন্ড। তিতির আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হঠাৎ-ই কী এমন শুনতে পেল। অবিশ্যি অনেকেই এ রকম পায়, বৈদ্যনাথকেও দেখেছি, যেখানেই থাকুক, বাবার দরকারের সময়ে, সে ঠিক হাজির হয়েছে। কিন্তু তিতির যেন কী বলছিল, বলতে বলতে সাডেনলি চলে গেল হ্যাঁ, মনে পড়েছে, শি ইজ ইন’–মানে হিরার কথা বলছিল, হিরা ইজ ইন–হোয়াট? লাভ? ডেঞ্জার? ডায়লেমা? অনেক কিছুই হতে পারে। তার আগের কথাগুলো যেন কী বলছিলা, হিরা সাত বছর বয়সে এ বাড়িতে এসেছিল, এখন কুড়ি, এখন ও বদলেছে, ওর সঙ্গে ঠাকুর, চাকর, খানসামাদের জগৎটাও। অদ্ভুত। কথাটার মধ্যে কেমন একটা অদ্ভুত মিনিং আছে বলে মনে হচ্ছে না? হিরার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আর একটা জগৎও বদলে গিয়েছে। চাকর, ঠাকুর, খানসামাদের জগৎ। হোয়াট কাইন্ড অব চেঞ্জ, বদলে যাওয়াটা কী রকম? আমি সত্যি রীতিমতো কিউরিয়াস হয়ে উঠছি–ঘরটা কেমন অন্ধকার হয়ে এসেছে, সন্ধের ছায়া নেমেছে। আমি সরে গিয়ে সুইচ টিপলাম, আলো জ্বলল, আর এই প্রথম দেখলাম, আমার ঘরের আলো নতুন শেডে ঢাকা। নন-ট্রান্সপারেন্ট কাচের চৌকো শেডের গায়ে, ট্রান্সপারেন্ট রানিং হর্স, আলো বেশ সফট। আর একটা সুইচ টিপলাম, আর এক দিকে আর একটা শেড, তার গায়ে ট্রান্সপারেন্ট ফুলের গুচ্ছ, দুইয়ে মিলে কী দাঁড়ায়, জানি না, কিন্তু দেখতে সত্যি সুন্দর লাগছে। আমার ঘরের যে অনেক চেঞ্জ হয়েছে, এই শেড দুটোও তার কারণ, ওবেলা আমার চোখে পড়েনি, দেওয়ালের গায়ে সেই ছবি দুটোর দিকে দেখলাম, আলোয় একটা নতুন এফেক্ট এসেছে। বড় বেশি সুন্দর লাগছে না ঘরটাকে? এত সুন্দর ঘরে আমি থাকিনি, এমনকী আমার খাটের ওপর বিছানায় পাতা বেড কভারটাও যেন কেমন হয়ে উঠেছে। এমনিতেই সেটা সুন্দর, কোন দেশের তৈরি, আমি জানি না, কিন্তু এখন আলোয়, বিছানাটা যেন বদলে গিয়েছে, যা মনের মধ্যেও কেমন একটা ইয়ে এফেক্ট সৃষ্টি করে। তিতির। হ্যাঁ, তিতির অনেক কথা বলছিল তখন, আমাকে আর আমাদের ফ্যামিলির বিষয়ে, অনেকটা হিরার সঙ্গে একটা জগৎ বদলে যাওয়ার মতোই, মিনিংফুল গদ্যকবিতার ছন্দের অমিলের মিল। তার মানে, ও কী বলতে চাইছিল? পার্সোনালিটির যে কোনও তফাতই থাক, আসলে, আমাদের ফ্যামিলির বাকি সকলের মধ্যে একটা মিল আছে? আমার তা নেই? তার মানে কী? আমি একেবারে ইয়ে–ওটাকে বলে বংশছাড়া? তা আবার তিতির ঢুকল ঘরের মধ্যে, আমি বলে উঠলাম, হ্যাঁ, শি ইজ ইন–?

তিতির ওর সেই চোখে, অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। ঘরের আলোয়, ওকেও যেন অন্য রকম দেখাচ্ছে, ওর সবুজ শাড়ি, জামা ব্যাকব্রাশ টানা চুল আর পিছন থেকে উঁকি দেওয়া খোঁপা আর ওর মুখের আর হাতের রং আর কপালের ফোঁটা, সবই যেন কেমন বদলে গিয়েছে, এবং চোখের পাতার ছায়ার নীচে আমি ওর চোখের তারা দুটো দেখতে পাচ্ছি না। ও যেন–সেই কী বলে–একটা আনরিয়্যাল অ-অপরূপ ছবি। বলে উঠল, মানে?

আমি বললাম, হিরার কথা বলতে বলতে হঠাৎ চলে গেলে, শি ইজ ইন–হোয়াট?

তিতির অল্প একটা শব্দ করে হেসে উঠে বলল, তখন থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা-ই ভাবছেন নাকি?

না, আরও অনেক কথাই ভাবছিলাম, কিন্তু হিরার কথা যেভাবে তুমি বলছিলে, আমি খুব কিউরিয়াস হয়ে উঠেছি, ভাবতে চেষ্টা করছিলাম, শি ইজ ইন হোয়াট? লাভ? ডেঞ্জার? ডায়লেমা? এমনি সব।

যে তিনটি বললেন, হিরা সেই তিনটিতেই পড়েছে বলে তিতির টেবলের দিকে দেখল, বলল, এখনও কাপ-ডিশগুলো নিয়ে যায়নি। আপনি বসুন।’

পরের কথাগুলো আমার কানে ঢুকল না, তিতির যেন কেমন মিস্টিরিয়াস হয়ে উঠেছে। আমি চেয়ারে বসলাম, তিতির ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, আমি ভাবলাম, হিরা ভালবাসায়, বিপদে, ওটাকে কী বলেসংশয়, সংশয়ে পড়েছে একসঙ্গে? অদ্ভুত তো? এ রকম হয় নাকি? এক মিনিট না যেতেই, তিতির ফিরে এল, ওর পিছনে পিছনে হিরা। হিরা এখন লাল রঙের শাড়ি পরেছে, কাপড় দিয়ে সারা গা ভাল করে ঢাকা, তবু বুকের কাছে আঁচলটা টেনে টেনে ধরছে। ও প্রায় কালো, একটু শর্ট, শরীরটা যাকে বলে ম্যাসিভা, এ ছাড়া আমার আর কিছু মনে হচ্ছে না, কিন্তু ওর মাথা-নিচু সেই খুবই। লাজুক ভাবটা আছে। ওর চকচকে মাথার চুলে, চকচকে খোঁপা, কানে দুটো চিকচিক করে কী দুলছে, হাতেও বোধ হয় চুড়ি, যা আমার ও বেলা চোখে পড়েনি, এখন বিশেষ করে পড়ল, তিতিরের মুখে ওর বিষয়ে অদ্ভুত কথা শুনে। ও টেবলের ওপর থেকে কাপ-ডিশগুলো ট্রেতে তুলে নিয়ে, দরজার দিকে চলে গেল, তিতির বলল, যা বলেছি, তা মনে রেখো। ও রকম জড়ভূতের মতো থেকো না, বুঝলে?

হিরা মুখ ফিরিয়ে ঘাড় কাত করল, আর খুব তাড়াতাড়ি আমার দিকে এক বার দেখল, মুখ ফিরিয়ে চলে গেল। আমি তিতিরের দিকে তাকালাম।

তিতির যেন একটু নিশ্চিন্ত হয়ে, আমার সামনে চেয়ারে এসে বসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, জড়ভূতের মতো থেকো না মানে বুঝলাম না।

তিতির ওর সেই ডিপ অথচ ঝলকানো চোখে, দরজার দিকে এক বার ইশারা করে দেখিয়ে বলল, এখন যে রকম করছিল, ওটাকেই জড়ভূত ভাব বলে, যেন ভয়ে একেবারে কেঁচো হয়ে আছে, মুখ তুলতে পারছে না, সবসময়ই আড়ষ্ট। ওকে ইজি হতে বললাম, আর বলে দিয়েছি, এখন থেকে ও বেশির ভাগ সময় ওপরেই থাকবে, আপনার দেখাশোনা করবে।

আমার? হিরা? কে–কেন? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। বিশেষ এক জনকে, আমার দেখাশোনা কখনও করতে হয়নি। তিতির এ রকম একটা নিয়ম চালাতে চেষ্টা করছে কেন?

আমার অবাক হওয়াটাকে তিতির যেন তেমন একটা ইয়ে করল না, বলল, হিরাকে আমি একটু সেপারেট রাখতে চাই, এত দিন সে রকম কোনও চান্স পাচ্ছিলাম না, এখন আপনার দেখাশোনার নাম করে, বেশির ভাগ সময় ওকে দোতলায় রাখব। মেসোমশাইয়ের সঙ্গেও আমার কথা হয়ে গিয়েছে।

আমি ইতিমধ্যেই হা করেছিলাম, বললাম, তাই নাকি?

তিতির ঘাড় কঁকিয়ে বলল, হ্যাঁ। তখন যে আপনাকে বলছিলাম, হিরার তিনটেই হয়েছে, সেজন্যই ওকে একটু সরিয়ে রাখবার দরকার হয়েছে।

তিতির আমার চোখের দিকে তাকাল। এখন কাছাকাছি আমি ওর চোখের তারা দুটো দেখতে পাচ্ছি। আমি এখনও হা করে আছি। তিতির বলল, জানেন তো, প্রেমে পড়লে অনেক সময় বিপদে পড়তে হয়, বিপদে পড়লে, মনে নানান সংশয় আসে?

আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, না তো।

 তিতির যেন অনেকটা কাচের টুনটুন শব্দের মতো একটু হেসে উঠল, এক বার চোখের পাতা নামাল, আবার আমার দিকে তাকাল, বলল, আপনার কোনও অভিজ্ঞতা নেই?

নাথিং অব দ্য কাইন্ড।বলে আমি হঠাৎ তিতিরের বিষয়ে কিউরিয়াস হয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার আছে?

তিতির বোধ হয় এক্সপেক্ট করেনি, আমি এ রকম একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি, কারণ ওর সেই চোখে প্রথমে একটা চমকানো অবাক দৃষ্টি দেখলাম, তারপরে ওর মুখের রংটা কেমন বদলে গেল, ও মুখ নামিয়ে নিল, মাথা নেড়ে বলল, না।

ওর ভাবভঙ্গি থেকে আমি বুঝতে পারলাম না, সত্যি বলল না মিথ্যা বলল। আমি বললাম, আমারও না।

তিতির চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হ্যাঁইয়ে–ডেঞ্জার আর ডায়লেমাটা কী, আর উইথ হুম শি ইজ ইন লাভ?

সন্তোষ। তিতির বলল, কিন্তু কমপিটিটর অনেক।

কমপিটিটর মানে– প্র-প্রতিদ্বন্দ্বী?

হ্যাঁ, শিভালরি আর জেলাসি রয়েছে অনেকের মধ্যে। এ সব আপনি বোঝেন তো?’ তিতির ঘাড় কাত করে, আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

আমি একটু থতিয়ে গিয়ে বললাম, তা মানে, হ্যাঁ, অবকোর্স আই আন্ডারস্ট্যান্ড।

তিতির ঠোঁট টিপে হাসল, আর যেন স্বস্তিবোধ করল, (আমাকে ও কী ভাবছে, জানি না।) বলল, এদের মধ্যে ঠাকুর জানকী হল সবথেকে ডেঞ্জারাস, কিন্তু সবথেকে বেশি ঠাণ্ডা আর অমায়িক।

অমায়িক?

হ্যাঁ, অমায়িক বোঝেন না, অমায়িক?

 হ্যাঁ, হ্যাঁ, তা বুঝি, কিন্তু ডেঞ্জারাস অথচ অমায়িক, মানে?

 সেইজন্যই ডেঞ্জারাস বলছি। সে সব সময়েই হিরাকে ভাল ভাল উপদেশ দেয়, বলে, বয়সের রক্ত গরমে, মেয়েরা অনেক কিছু করে বসে, তাদের ফুসলে ফাঁসলে (বুঝতে পারছি না।) ছোঁড়ারা খারাপ করে দেয়, তারপরে ফেলে চলে যায়। তার মানে সন্তোষের বিষয়ে ও সব বলে। অথচ জানকীর বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে, দেশে ওর বউ, ছেলে, মেয়ে, এমনকী নাতি, নাতনিও আছে। সে হিরাকে বলেছে, গ্রামে তার জমিজমা আছে, সে সব সে হিরার নামে লিখে দেবে, হিরাকে সে সুখে রাখবে।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

তিতিরের ভুরু কুঁচকে উঠল, খানিকটা যেন বিরক্ত হয়ে বলল, কেন আবার, বোঝেন না, সে চায় হিরাকে সে তার কাছে রাখবে–প্রেম।

প্রেম?

হ্যাঁ, জানকীও হিরার প্রেমে পড়েছে। সে হিরাকে বোঝায় ধর্মের কথা, মেয়েদের কী ভাবে চলতে হয়, সতী কাকে বলে–মানে ভার্জিনিটি, বুঝেছেন তো? (আমি ঘাড় কাত করলাম।) তবু জানকী যখন দেখে ভাল কথায় কাজ হচ্ছে না, তখন সে ঠাণ্ডাভাবেই বলে, ভাল কথায় কাজ না হলে, হিরাকে সে এই জগৎ থেকে সরিয়ে দেবে।

কী করে? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

খাবারের সঙ্গে বিষটিষ মিশিয়ে দিতে পারে। জানকী-ই তো ওদের সবাইকে রান্না করে খেতে দেয়।

এ সব কি তিতির সত্যি বলছে? আমি ভাবতে পারি না, একটা লোক একটা মেয়েকে না পেলে বিষ দিয়ে মেরে ফেলতে পারে, আবার ভাল ভাল অ্যাডভাইসনা, সেটা হতে পারে, অ্যাডভাইসটা পসিবল, আমার মিস্টার জে. বিশওয়াসের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি ভাল অ্যাডভাইস করেন, আবার দিস ইজ লাইফ’ বলে ইয়ে করতে পারেন, মানে কাল রাত্রে ট্রেনে যা করেছিলেন, আমি এখনও যার মানে জানি না।

তিতির আবার বলল, রূপচাঁদ ড্রাইভারও হিরাকে চায়–চায় মানে বিয়ে করতেই চায়, সে এখনও গোলমাল? কীসের গোলমাল?

তিতির নাক কুঁচকে, ঠোঁট দুটো কেমন যেন ইয়ে–ফুলে উঠল, আর চোখের দৃষ্টিতে কেমন একটা নালিশ, ঘাড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, আপনি কিছু বোঝেন না। আজকাল এ রকম মানুষ আছে নাকি, এ গোলমালের মানে কী? গোলমাল মানে গোলমাল, রূপচাঁদ মতিয়ার বয়ফ্রেন্ড, বুঝেছেন? তা আপনি লাভ বলুন বা যা খুশি, ওদের একটা রিলেশন আছে, সবাই জানে। হয়তো রূপচাঁদকে হিরা বিয়ে করত, যদি না মতিয়ার ব্যাপারটা থাকত, এটা হচ্ছে হিরার ডায়লেমা, কী করবে? আফটার অল সন্তোষ সারভেন্ট ছাড়া কিছু না, সে এখানে খায় থাকে, জামাকাপড় পায়, সামান্য মাইনে পায়, তার পক্ষে ওয়াইফ মেনটেন করা সম্ভব না। কিন্তু ঠিক ভালবাসা বলতে যা বোঝায়, সন্তোষের সঙ্গেই হিরার সেটা আছে।’

আমার একটা নতুন জিজ্ঞাসা মনে জাগল, জিজ্ঞেস করলাম, ঠিক ভালবাসাটা কী, মানে ভালবাসাটা কী ব্যাপার?

তিতির থমকে গেল, চুপ করে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, ঠিক সেই রকম, যেন কিছু খুঁজছে। প্রায় কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পরে বলল, জানি না। আমি বলতে চাইছি, সবাইকে বাদ দিয়ে, হিরা মন থেকে সন্তোষকেই চায়, কিন্তু সন্তোষের আর্থিক অবস্থা ওকে চিন্তায় ফেলেছে, রূপচাঁদ যদি মতিয়ার সঙ্গে ইনভলভড না থাকত, তা হলে হিরা ভাল না বাসলেও রূপচাঁদকেই বিয়ে করত, তাতে ওর প্রেস্টিজ বাড়ত, ভালভাবে থাকতেও পারত। এ নিয়ে রূপচাঁদের সঙ্গে সন্তোষের প্রায়ই ঝগড়া লাগে, দু-একবার হাতাহাতিও হয়ে গেছে, কিন্তু কথাটা কেউ-ই মেসোমশাইয়ের কানে তুলতে সাহস পাচ্ছে না। আপনি সব বুঝতে পারছেন, না আমি শুধু বকে মরছি।’

তিতির আমাকে কী ভাবে? আশ্চর্য! হয়তো কোনও কোনও বাংলা কথার মানে আমি সবসময়ে বুঝতে পারি না, কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটাই বুঝতে পারছি, এবং আমার মনে হচ্ছে, আমি একটা অদ্ভুত গল্প শুনছি, যা আমাদের বাড়ির ব্যাপার বলে ভাবতেই পারছি না। বললাম, নিশ্চয়ই পারছি।’

মনে হল, তিতির আমার কথাটা বিশ্বাস করেছে। বলল, এ ছাড়াও ব্যাপার আছে। নাথু তিন-চারদিন তকে তকে থেকে, (বুঝলাম না।) রাত্রে অন্ধকারে হিরাকে জাপটে ধরেছে, তবে সেটা খানিকটা ছিঁচকে (বুঝলাম না।) চোরের মতো কাজ। ওকে বুলডগ মার্কা দেখালেও, নেড়ি কুকুরের থেকে বেশি কিছু না। ইভন হি ক্যান্নট রেপ হিরা, চান্স পেয়ে গেলে, মাঝে মধ্যে সে ও রকম করবে, বাট নট ডেঞ্জারাস, ডেঞ্জারাস ইজ মতিয়া, মতিয়া অ্যান্ড জানকী।

ও বেলাও মতিয়াকে দেখেছি, তার বয়স এখন প্রায় ত্রিশ ছাড়িয়ে গিয়েছে, তাকে বেশ লম্বা-চওড়া বলা যায়, রং ফরসা, নাকে সোনার কী একটা পরে, সবসময়ে খুব সেজেগুজে থাকে। রূপচাঁদকে এখনও দেখিনি, বোধ হয় সে বাবাকে নিয়ে গিয়েছিল, তার বয়স সাতাশ-আটাশের বেশি না, গায়ের রংটা কালো কুচকুচে, কিন্তু ইয়ে, বেশ হেলদি আর স্মার্ট আর হাসি-খুশি। তাকে আমি মতিয়ার সঙ্গে ঠিক মেলাতে পারছি না, যদিও জানি, তিতির আমাকে বাজে কথা বলবে না। জিজ্ঞেস করলাম, হোয়াই ইজ মতিয়া ডেঞ্জারাস?

তিতির বলল, ন্যাচারেলি হবে। মতিয়ার স্বামী ফিটন চালায়। সে আর একটা বিয়ে করেছে। মতিয়াকে সে আর নেবে না, মতিয়ারও আর কোনও শেল্টার নেই, যে কারণে মেসোমশাই ওকে রেখে দিয়েছেন, প্রাকটিক্যালি কোনও কাজ না থাকা সত্ত্বেও। বাট আফটার অল শি ইজ এ উওম্যান, শি হ্যাজ ডিজায়ার, আর–।

আমি আবার না জিজ্ঞেস করে পারলাম না, ওটা, মানে ওই ডিজায়ারটা কি থাকতেই হবে, এসেনশিয়ালি?

তিতির আবার আমার চোখের দিকে সেইভাবে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল, যেন কিছু খুঁজছে, তারপর বলল, জানি না। লোকে তা-ই বলে।

তিতির কিন্তু বলেছিল, আফটার অল শি ইজ এ উওম্যান, শি হ্যাঁজ ডিজায়ার–কথাটার মধ্যে কেমন ইয়ে, একটা ওর নিজের বিশ্বাসের ছাপ ফুটে উঠছে না? ঠিক যেন লোকের কথা ও বলেনি।

তিতির আবার বলল, রূপচাঁদ ওকে মাঝে মাঝে শাড়ি, জামা, সাবান, তেল, স্নো, পাউডার এ সব প্রেজেন্ট করে, লুকিয়ে কখনও-সখনও সিনেমা দেখতেও যায়। হিরাকে যদি সে বিয়ে করে, তা হলে মতিয়া ওকে সব দিক থেকেই হারাবে, এই নিয়ে আজকাল প্রায়ই রূপচাঁদের সঙ্গে মতিয়ার ঝগড়া বিবাদ হয়, মাঝে এক দিন মতিয়া রূপচাঁদকে ঝগড়া করে কামড়েও দিয়েছিল।

কামড়ে দিয়েছিল? আমি প্রায় আঁতকে উঠলাম।

 তিতির একটুওকে বলে উদ্বিগ্ন না হয়ে বলল, হ্যাঁ। সেটা এমন কিছুনা, (আশ্চর্য!) মতিয়ার রেগে ওঠা, কান্নাকাটি করা, ঝগড়া করা, কামড়ে দেওয়া, এগুলো অলমোস্ট ন্যাচারেল, (ন্যাচারেল!) কিন্তু ক্ষেপে গিয়ে ও যদি এক দিন হিরাকে অ্যাটাক করে, বঁটি দিয়ে গলায় কোপ বসিয়েই দেয়–অনেক বার বলেছে, ও হিরাকেবঁটি দিয়ে কাটবে, সেটাই হল ভয়ের। তার চেয়ে ভয়ের হল, ঠাকুর জানকী। ও হিরাকে সবসময় চোখে চোখে রাখবার চেষ্টা করে, নিজের কাছে কাজে আটকে রাখে, যদিও রান্নার কাজে সাহায্যের জন্য আলাদা ঝি আছে, আর সবসময় মেয়েদের ধর্ম কী, তাই বোঝায়, খুব রেগে গেলে, ঠাণ্ডা গলায় বলে, আমার কথা না শুনলে জগৎ থেকে সরিয়ে দেব। হি ইজ মোর ডেঞ্জারাস, ধর্মের কথা বলে, অথচ বয়েস অনেক হয়ে গেছে, কোনও দিক থেকেই হিরাকে সে খুশি করতে পারে না, খুশি করতে পারার মতো কথাবার্তাও বলে না, অথচ ওকে নিয়ে রাখতে চায়। কী বুঝলেন?

বুঝলাম, একটা খুব ইয়ে, ওয়াস্ট ব্যাপার হচ্ছে। কিন্তু ওবেলা তুমি হিরাকে বাড়াবাড়ির কথা কী বলছিলে?

তিতিরের চোখে যেন লাইটনিং হল, বলল, মনে রেখেছেন দেখছি।

বললাম, হ্যাঁ, আমার সামনেই তখন বললে কিনা।

তিতির বলল, সন্তোষের সঙ্গে ও প্রায়ই বাড়াবাড়ি করে ফেলে, হয়তো সকলের সামনেই দুজনে হাসাহাসি করে, হাত টানাটানিও করে।

হাত টানাটানি মানে?

তিতির হঠাৎ আমার হাত ধরে টান দিয়ে বলল, এইরকম।

আমি যাকে বলে, চমকে হাতটা টেনে নিলাম, তিতিরের দিকে তাকিয়ে, ফ্ল্যাবারগাস্টেড হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এর মানে কী?

তিতির আবার প্রায় সেই রকম চোখে তাকাল, তারপরে বলল, আপনাকে ধরে লায়লী সিং যা করতে চাইত, তা-ই, বুঝেছেন?’ বলে ঘাড় কাত করে, অনেকটা যেন চোখের কোণে তারা দুটো এনে আমার দিকে তাকাল–অদ্ভুত দেখাচ্ছে ওকে।

আমি বললাম, বুঝেছি।

তিতির বলল, বাট হিরা অ্যান্ড সন্তোষ ইজ নট পারভারটেড। নীচে যাবেন?

বলতে বলতে ও উঠে দাঁড়াল, এক পলকের জন্যই আমি ওর খোলা পেট একটু দেখতে পেলাম, যদিও ও নাভির নীচে শাড়ি বাঁধেনি, পেটের খানিকটা খোলা। আমি বললাম, যাব। আচ্ছা, একটা ইয়ে আমার খুব জানতে ইচ্ছা হয়। কেন এ রকম হয়?

কীসের?

এই যে হিরাকে নিয়ে এ সব? বয়সের জন্য?

 তা খানিকটা, হিরা যত দিন ছোট ছিল, তত দিন কিছু হয়নি। যতই বড় হতে লাগল, ততই সবাই ওকে ঘিরে ধরতে লাগল।

এটা কি ইনএভিটেবল? হতেই হবে?

তিতির যেন এ বার কেমন চিন্তিত হয়ে পড়ল, ঘোড়া-ছোটা কাচের শেডের দিকে মুখ তুলে তাকাল, তারপরে বলল, উমম, তা ইনেভিটেবল কি না জানি না, অনেক ক্ষেত্রেই এ রকম দেখা যায়। অবিশ্যি তার ডিফারেন্ট ফর্ম আছে, সোশ্যাল স্ট্রাকচারের ওপর নির্ভর করে। তবে এদের মধ্যে যদি আপনি আমাকে সবথেকে খারাপ কে বলতে বলেন, হি ইজ জানকী, আর এই জানকীদের চেহারা আর কথা প্রায় সব সমাজেই একরকম। জানকী ভোরবেলা স্নান করে, পূজা করে, কপালে ফোঁটা কাটে, তারপরে কাজ করতে যায়, তার মুখে কেউ একটিও খারাপ কথা–আই মিন স্ল্যাং অর এনি ভালগার কথা কেউ কখনও শোনেনি, যা বাকিরা প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদের সময় বলে থাকে। সে কোনও দিন নাথুর মতো করবে না, সন্তোষের মতো পাগলামি করবে না, রূপচাঁদের মতো হিরোয়িজ করবে না, গরমমশলা গুঁড়োতে বলে, এক নজরে হিরার দিকে তাকিয়ে থাকবে, তারপরে হঠাৎ বলে উঠবে, তোকে দেখলে বুকের মধ্যে কেমন যেন খাবি খেতে থাকে।

বলেই তিতির খিলখিল করে হেসে, এক দিকে হেলে পড়ল, যে কারণে ওর শাড়ির আঁচল খসে পড়ল, আর আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, খাবি খেতে থাকে মানে?

তিতির ওর পাঁচ আঙুলের অদ্ভুত ভঙ্গি করে দেখাল, এ রকম করতে থাকে।

বুঝতে পারলাম না কিছুই, এবং ও এখনও হাসছে, বোধ হয় জানকীর সেই চেহারা আর বলার ভঙ্গিটা ওর মনে পড়ছে। আশ্চর্য, বাইরে থেকে দেখলে, বোঝার উপায় নেই, আমাদের এ বাড়িতে এত সব কাণ্ডকারখানা চলেছে। যাকে বলে, রীতিমতো একটা ফিকশন–শুধু ফিকশন না, প্রায় মিষ্ট্রি আর ক্রাইমের মতো ঘটনা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাবা কি এ সব জানেন?

তিতির হাসি থামার মুখে বলল, কিছুটা অনুমান করতে পারেন। ওঁর চোখকে সব ফাঁকি দিয়ে চলা কঠিন। কিংবা উনি হয়তো সব জেনেই চুপ করে আছেন, ডাজন্ট কেয়ার। আমি তো ওঁকে সুপারম্যান মনে করি।

তা ঠিক, সেটা মনে করাটা, খুব একটা আশ্চর্যের ব্যাপার না, তবে তিতির কী ভেবে বলছে, তা আমি জানি না। তখন বাবা আমার সঙ্গে কথা বলার সময়ে, যে ভাবে তিতিরের দিকে তাকাচ্ছিলেন, এবং তিতির হাসছিল, আমি ঠিক জানি না, দুজনের ইয়ে–মানে আ–আচরণবিধি কী। আমিও তো অনেকের মতো মনে মনে বাবাকে দেবাদিদেব বলি–যাকে সুপারম্যান বলা যায়। তিতিরের হাসির যে ওয়েভটা ছিল, সেটা ওর মুখে ছড়িয়ে গিয়ে, নিঃশব্দ হল, বলল, চলুন, নীচে যাই।

চলো।

তিতির আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে বলল, এ ভাবেই যাবেন–আই মিন এই পায়জামা, পাঞ্জাবি পরেই? এগুলো পরে তো শুয়েছিলেন।

আমি অবাক হয়ে বললাম, তাতে কী হয়েছে, বাড়িতে তো।

তিতির আমার মাথার দিকে দেখে, চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তা ঠিক, তবু সবাই বাইরের লোক তো। আপনি অন্তত চুলগুলো একটু শেপে নিয়ে আসুন।

আমি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম–হ্যাঁ, মাথাটাকে বুশি মনে হচ্ছে, চিরুনি চালিয়ে মোটামুটি একটা ফর্মে আনা দরকার। চিরুনি তুলে নিয়ে আঁচড়ালাম–খুবই বড় হয়ে গিয়েছে, প্রায় তিন মাসের চুল জমেছে, তবু তিতির অন্তত একটা কথা বলেনি, দাড়ি কামাননি কেন?’ দাড়ি কামাবে’, দাড়ি কামাবে’ আবার মনে পড়ল, এবং দিস ইজ লাইফ’–জানি না ঠাকুর জানকী কী বলে–তিতিরকে দেখতে পেলাম, ও আয়নায় আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অ্যাজ ইফ ওর চোখে খুবই একটা সার্চ মানে এনকোয়ারি। কেন? ও মুখ ফিরিয়ে নিল।

.

..আপনি বিশ্বাস করুন স্যার’ কথার মাঝপথেই থেমে গেলেন শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরি, এবং আমাদেরনা, আমার দিকে না, তিতিরের দিকেই বলা যায় তাকালেন, ওঁর চোখে মুখে হাসির স্পার্ক দেখা দিল, একটু যেন চোখের তারাও কেঁপে গেল, যে কারণে আমি তিতিরের দিকে এক বার দেখলাম, তিতিরের ঠোঁট টেপা একটু বা বাঁকানো, সেটা ঠিক হাসি কি না, জানি না। শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরি বললেন, আচ্ছা মহাদেবদা, আজ থাক, পরে হবে।

আমরা তখনও বাবার পিছনে। বাবা ঘাড় ফিরিয়ে আমাদের এক বার দেখে নিয়ে বললেন, আরে ওদের সামনে তোমার এত গোপনীয়তার কী আছে, ওরা তো গবা আর তিতির।

শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরি আমার দিকে দেখে, ভুরু কুঁচকে, বলে উঠলেন, গবা! মানে—

বাবা বললেন, তুমি কি আমার ছেলে গবাকেও ভুলে গেলে নাকি?

শ্রীকৃষ্ণনা, কৃষ্ণনা কেষ্টবাবু, বাবা ওঁকে কেষ্ট বলেই ডাকেন, কৃষ্ণবাবু আমার দিকে আবার তাকালেন, ওঁর চশমার ভিতরে চোখ দুটোর পাতা যেন কেমন ইয়ে, কুঁচকে, চোখ দুটো ছোট হয়ে গেল, বলে উঠলেন, ওহ, যে দিল্লিতে ছিল?

বাবা বললেন, হ্যাঁ।

মানে দিল্লির সেই–?

 হা, সেই মূর্তিমান অবসিন মদনমোহন, সাবজেক্ট ম্যাটার অব য়োর ওয়ার্ক।

কৃষ্ণবাবু যেন গোটা শরীরে কেমন গুটিয়ে গেলেন, মুখের হাসিতে একটা খুবই লাজুকতা, বললেন, কী যে বলেন।

তিতির হেসে উঠল, আর সেই রকম কাপ-ডিশের ঠুংঠুং শব্দের মতো শোনা গেল, কৃষ্ণবাবু তিতিরের দিকে দেখলেন। বাবা বললেন, কিন্তু ভবেন দত্ত তো তোমার মতে খুব ভাল লেখক, এ রিয়্যাল জিনিয়স, শিবসুন্দরের পূজারি, সে তোমার ঝি ভাগাল কী করে?

কৃষ্ণবাবু যেন আবার সারা শরীরে একটা অস্বস্তিবোধ করলেন, ঠিক আছে মহাদেবদা, পরে কথা হবে।বলেই তিনি সোফা থেকে ওঠবার উদ্যোগ করলেন।

বাবা বললেন, পরে-টরে না, এটা সামান্য ব্যাপার। ভাল ঝিয়ের খুবই অভাব কলকাতার বাজারে জানি, তবু ভবেন দত্তর ওপর তোমার এতটা রেগে যাবার কোনও কারণ নেই।

কারণ নেই?’ কৃষ্ণবাবু এতই ইয়ে, মানে–হার্ট হলেন বাবার কথা শুনে, আমার আর তিতিরের জন্য অস্বস্তি আর থাকল না, বললেন, তা বলে আমার ঝিকে নিয়ে যাবে?

নিয়ে যাবে মানেটা কী, ভবেন দত্তর মতো একজন সাহিত্যিক তোমার ঝিকে নিশ্চয়ই মোয়া হাতে দিয়ে যায়নি। তোমার ঝিয়ের বয়স কত ছিল?

তা ধরুন, সাতাশ-আটাশ হবে।

বাবা মাথা ঝাঁকালেন, আমি অবাক চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে তিতিরের দিকে তাকালাম। এখানেও মেড সারভেন্ট নিয়ে কথা হচ্ছে, তাও কিনা কৃষ্ণবাবুর মতো এক জন লোক, হু ইজ এ ফেমাস গান্ধীয়ান– মানে গান্ধী ফিলজফিকাল একটা কী সংস্থার সঙ্গেও উনি জড়িত, এবং দু-একটা বইও বোধ হয় লিখেছেন, তা ছাড়া উনি একজন শিল্প-সাহিত্যের গ্রেট সমালোচক, সে বিষয়ে অনেক বইও লিখেছেন, ভাল বক্তা, একজন ইয়ে কৃকৃ কৃতবিদ্য লোক। আর ভবেন দত্তও একজন এস্টাব্লিশড রাইটার, তার বই পড়তে আমারও ভাল লাগে। তাদের মতো দুজন লোকের মধ্যে ইয়ে নিয়ে! বাবার গলা শুনতে পেলাম, দ্যাখো কেষ্ট, তুমি আর ভবেন দত্ত এক পাড়ায় কাছাকাছি থাকো। যত দূর জানি, কলকাতায় ঝিয়েরা কেউ মুচলেকা দিয়ে চাকরি করে না। হয়তো ভবেন আরও বেশি টাকা দিয়েছে, তা-ই–।

মহাদেবদা, আপনি ভবেন দত্তর কথা জানেন না, ওর চরিত্র।

আহা, অত পার্সোনাল হচ্ছ কেন। তোমার মতে সে একজন জিনিয়স, বড় লেখক। এ সব কথা লাগিয়ে, ভবেন দত্তর চাকরির ক্ষতি করাটা কি ঠিক হবে, অ্যান্ড য়ু বিলিভ, আমি তা করতে যাব? ইমপসিবল! ভবেন দত্ত তোমার বন্ধু, একটা ঝিয়ের জন্য যদি সে বন্ধুবিচ্ছেদ করতে চায় তুমি কী করতে পারো?

কৃষ্ণবাবু খুবই ইয়ে মানে, যাকে বলে ক্ষুব্ধ আর হেল্পলেস চোখে বাবার দিকে তাকালেন, যেটা ওঁর সারা শরীরেও প্রায় ফুটে উঠল, বললেন, চাকরির ক্ষতি করতে বলছি না, কিন্তু এই একটা বিষয়ে ওর এমন ছোঁকছোঁকানি, (বুঝলাম না।) ওকে একটু স্নাবিং দেওয়া দরকার।

বাবা টেবলের ওপর থেকে কী একটা কাগজের তাড়া তুলে নিতে নিতে বললেন, সেটা তুমিই ওকে কোনওভাবে দাও না। তোমার তো অনেক ঘাঁতঘোঁত (বুঝলাম না।) জানা আছে।বলতে বলতে বাবা কাগজগুলোর পাতা ওলটাতে ওলটাতে, এক জায়গায় থেমে পড়তে লাগলেন।

কৃষ্ণবাবু যেন আরও হেল্পলেস হয়ে পড়লেন, বাবার মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড সেই রকম চোখে চুপ করে তাকিয়ে রইলেন, তারপরেই আমাদের দিকে, প্রথমে আমার দিকে তাকালেন, ভুরু দুটো কুঁচকে উঠল, তারপরেই তিতিরের দিকে তাকাতেই, চোখে মুখে সেই পার্ক। দেখলাম তিতিরও ওঁর দিকে তাকিয়ে আছে, যেন ঠোঁট টিপে হাসছে, কিন্তু ঠোঁট দুটো অনেকটা বেঁকে আছে, আর চোখ দুটো–আশ্চর্য, গোল দেখাচ্ছে। কৃষ্ণবাবু উঠলেন, বাবা কাগজ থেকে মুখ না তুলেই বললেন, চলে যেয়ো না, খেয়েটেয়ে যেয়ো।

হ্যাঁ দাদা, আমি অন্য ঘরে বসছি। যাবার সময়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ভাল আছ তো? আমি তিতিরের দিকে তাকালাম, তিতির আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে জিজ্ঞেস করছেন।

আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, আ–আমাকে? ভালভাল আছি।

কৃষ্ণবাবু জবাব শোনবার জন্য আমার দিকে তাকিয়েছিলেন না, ওঁর দৃষ্টি তখন তিতিরের দিকে, জিজ্ঞেস করলেন, রজনীর কী খবর?

তিতির মাথাটা ঝাঁকাল, না শূন্যে একটা ধাক্কা মারল, বুঝলাম না, কিন্তু কিছু বলল না। কৃষ্ণবাবু ঘর। থেকে বেরিয়ে গেলেন, এবং তিতির যেন এতক্ষণ হাসি চেপে রেখেছিল, হঠাৎ চামচে চামচেয় বেজে ওঠার মতো শব্দে হেসে উঠল। বাবা ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে দেখলেন, মনে হল বাবার ঠোঁটেও হাসি, অথচ মোটা ভুরু কোঁচকানো, এবং আমার দিকেও এক বার দেখে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী হল পাখি?

কিছু না মেসোমশাই৷’হঠাৎ খুব ইমপার্সোনাল স্বরে তিতির জবাব দিল, যার ইয়েগুলো আমি ঠিক ধরতে পারছি না। বাবা বললেন, হুম, এসো, বসো তোমরা।

আমরা বাবার সামনে গেলাম, বাবা হঠাৎ ডেকে উঠলেন, বৈদ্য।

বৈদ্যনাথ খানসামা ঘরের দরজার কাছেই ছিল, তাড়াতাড়ি কাছে এসে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ।

বাবা বললেন, দ্যাখ ওই কেষ্টবাবু বোধ হয় অন্য কিছু ড্রিঙ্ক করবে না, ওকে একটু দিশি ওয়াইন দিতে বল। বিলিতি যেন না দেয়।

আজ্ঞে আচ্ছা। বৈদ্যনাথ বেরিয়ে গেল।

তিতির এক বার আমার দিকে দেখল, আমিও দেখলাম, এবং আমি ব্যাপারটা জানি। বাবা তার সন্ধের সমস্ত গেস্টদেরই ফরেন লিকার-মানে সত্যি ফরেন আর কী, বিলিতি যাকে বলে, স্কচ অথবা ফরাসি বা স্প্যানিশ, এই জাতীয় ড্রিঙ্ক অফার করেন না, তার মধ্যে একটা ইয়ে ক্লাসিফিকেশন আছেন। অনেককে ইন্ডিয়ান লিকার দেওয়া হয়। এ বাড়িতে সন্ধেয় যাঁরা আসেন, অলমোস্ট সকলেই ড্রিঙ্ক করেন, মনে হয়, যেন সেজন্যই সবাই আসেন, কেন তা জানি না। আমি বাবার ঘরটার এদিকে ওদিকে দেখছিলাম। এক রকমই আছে, কোনও চেঞ্জ দেখতে পাচ্ছি না। প্রায় একটা বল কাম লাউঞ্জ রুম বলা যায়, নীচের তলার সবথেকে বড় ঘর। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা, উত্তরের দেওয়াল ইয়ে, মানে যাকে বলা যায় অর্ধবৃত্তাকার, এবং সমস্ত দেওয়ালটাই গদিমোড়া নিচু আসন, আর ছোট ছোট ড্রিঙ্কস টেবল, ওপরের দিকে কাশ্মীরি ধরনের পেন্টিং করা, মেঝেটা লাল মোজাইকের। প্রায় চৌদ্দ ফুট ছেড়ে এসে, বাকি কুড়ি ফুট মেঝে কার্পেট মোড়া, তিন সেট সোফা। বাঁ দিকের লং দেওয়াল-আলমারিতে হারমোনিয়াম, তবলা, আর ওটাকে বলে মম-মৃদঙ্গ, আরও দু-একটা কী ইন্ডিয়ান ইনমেন্ট আছে। কোনও গায়ক এলে বা গানের আসর বসাতে হলে ওগুলো বের করা হয়। ডান দিকে রেকর্ড প্লেয়ার আর ডিসকের বক্স সাজানো, বাঁ দিকের দেওয়াল-আলমারিতে বই।

ওখানে মাঝে মধ্যে নাচ (বিদেশি) হয়, বিশেষ দিনের বিশেষ পার্টিতে। ক্রিসমাস আর নিউইয়ারস ডে-তে তো হয়ই, তা ছাড়াও বিশেষ কারণে।

গবা কোথাও বেরোবি নাকি?

বাবার গলা শুনে, তার দিকে ফিরে তাকালাম, এবং তারপরে তিতিরের দিকে প্রায় জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে, কারণ বাবার কথাটা–মানে কথার মোটিভটা আমি ঠিক বুঝতে পারিনি, কিন্তু তিতির আমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ যেন কেমন লজ্জা পেয়ে গেল, বাবার দিকে ফিরে বলল, না, উনি কোথাও বেরোবেন না।

বাবা ভুরু কুঁচকে তিতিরের দিকে তাকালেন, তারপরে আমার দিকে, আবার তিতিরের দিকে, আবার আমার দিকে, আবার তিতিরের দিকে, এবং শব্দ করলেন, উম?’ তারপরে আমার দিকে, হুম!’আবার তিতিরের দিকে, এবং তিতিরের মুখ হঠাৎ লাল দেখাল, ইয়ে, যাকে বলে ঝুপ করে বাবার পায়ের কাছে

বাবা তিতিরের পিঠের ওপর হাত রেখে, মনে হল, তাঁর পায়ের কাছে আরও ক্লোজলি ওকে টেনে নিলেন, বললেন, আরে না না, আই ডিড মিন নাথিং।

বাবা কিছু মিন করতে চেয়েছিলেন নাকি? আমি বুঝতে পারি নি, কিন্তু বাবা আর তিতিরের মধ্যে, খুব একটা ইয়ে মানে, এটাকে ইনটিমেসি বলা যায় কি না বুঝতে পারছি না, তবে এ রকমভাবে বাবার কাছে আদর কাড়তে, ফুচকিকেও কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। দে আর ভেরি ক্লোজ টু ইচ আদার, তাই না? বাবা তিতিরের চিবুক ধরে মুখ তুলে, ওর চোখের দিকে তাকালেন, বললেন, আই ওয়াজ এনজয়িং।

বলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বোস না গবা, কিছু ড্রিঙ্ক করবি নাকি?

আনএক্সপেকটেড কিছু না, বাবা বহু বারই আমাকে ড্রিঙ্ক অফার করেছেন, এবং জানেন, আমি ড্রিঙ্ক করি না, করব না। বললাম, না।

লিটল ভারমুথ?

উঁহু’ বলে আমি বাবার পাশের সোফায় বসলাম। তিতির আমার দিকে তাকাল, আমিও ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম, এখনও ওর মুখটা প্রায় লাল হয়েই আছে, এ বাবার হাঁটুর ওপর একটা হাত রেখেছে। বাবা তিতিরের দিকে তাকালেন। তিতির বলল, আমি তো সেই খাবার আগে, এক চুমুক।

বাবা যে ওকে কিছু জিজ্ঞেস করেছেন, তা বুঝতে পারিনি, আসলে চোখের দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করেছেন, তাই তিতির এই জবাব দিল। তিতির কি ড্রিঙ্ক করে নাকি? কথা শুনে মনে হচ্ছে, এক-আধ চুমুক ওয়াইন ড্রিঙ্ক করে বোধ হয়। সেটা তেমন ডেঞ্জারাস না, কিন্তু এ বাড়িতে যদি একটি লায়লী সিং বা সুদীপ্তা চ্যাটার্জি থাকে, তাহলে আ—আ—আমি যাব কোথায়? আনথিংকেবল! আমার মেরিয়নের কথা মনে পড়ে গেল, প্রায় তো একটা বাবালিকা, উহ, কী ড্রিংক করতে পারে, কিন্তু ওর পাগলামিটাও ছেলেমানুষের মতো দেখেছি, লায়লী সিংদের মতো না। মেরিয়নের কথা মনে পড়তেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, খোতের খবর কী? মেরিয়ন আর ওদের বাচ্চা ভাল আছে?

বাবা যেন একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ওদের কথা কি তোর মনে থাকে নাকি?

আমিও অবাক হলাম, বাবা আমাকে কী ভাবেন, ভাইবোনদের কথা আমার মনে থাকে না? মনে থাকে ঠিকই, কে কী করে না করে, আমি তা জানি না। ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম, এ আবার কী বলছ তুমি?

ঠিকই বলছি। তোকে দেখে তো কিছুই বোঝা যায় না, কেবল চেহারায় একটি রিয়্যাল মদনমোহন। কী বলো পাখি, গবা আমার থেকে দেখতে সুন্দর, না?

তিতির আমার দিকে দেখল, আর আমি সত্যি ইয়ে, লজ্জাই পেয়ে গেলাম, বাবা যে কী বলেন না। আসলে বাবা জানেন, উনি যাকে বলে, খুবই হ্যান্ডসাম–মানে, সুপুরুষ। তিতির বলল, আপনারা দুজনেই সুন্দর, দু রকমের।

আমি বাবাকে বললাম, তুমি যে কী বলো, কোনও মানে হয় না।

বাবা আমার কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, যত কথার মানে, তোর হয়। এনি হাউ, ওরা ভালই আছে। মেরিয়নের আর একটা বাচ্চা হয়েছে, মেয়ে। কিন্তু গবা, পাখি কী রকম বাবা আর ছেলের মন রাখল, দেখলি?’

বাবা তিতিরের দিকে তাকালেন, আমিও তাকালাম, তিতির মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, মোটেই না, আমি ঠিকই বলেছি।

বাবা হেসে উঠলেন, তার একটা হাত তিতিরের পিঠে, একটা হাত আমার কাঁধে। তিতির আমার দিকে তাকাল, ওর দৃষ্টিটা যেন কেমন, এক্সপ্রেশানটা ঠিক বুঝতে পারছি না, কিন্তু আমার মনের মধ্যে যেন কেমন করে উঠল, অনেকটা লাইটনিং অন দ্য ফার হরাইজন।

আহ্ হা মুখার্জি, এনজয়িং ফ্যামিলি লাইফ?’ মোটা ভারী গলার স্বর শোনা গেল পিছনে। আমরা সবাই তাকালাম। বাবা বলে উঠলেন, আরে অভয়, এসো এসো। আমার ছেলে দিল্লি থেকে অনেক দিন পর ফিরেছে, ওর সঙ্গে একটু কথা বলছিলাম।

অভয় গুপ্ত আমার দিকে দেখতে দেখতে এগিয়ে এলেন। উনি সবসময়েই ধুতি, পাঞ্জাবি ব্যবহার করেন, একজন এক্স-মিনিস্টার, আমাদের বাড়িতে অনেক বার দেখেছি, এবং উনি বাবার সঙ্গে এ ঘরেই বসেন। বললেন, দিল্লি থেকে মানে?

বাবা বললেন, হ্যাঁ, দিল্লি থেকে মানে আমার সেই ছেলে, মদনকে তুমি চেনো না?

নিশ্চয় নিশ্চয়। মোটাসোটা অভয় গুপ্ত আমার দিকে চেয়ে হাসলেন, ভুরু নাচালেন যেন আরও কিছু বললেন বা জিজ্ঞেস করলেন।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ভাল আছেন?

অভয় গুপ্ত বসতে বসতে তিতিরকে দেখলেন, আর ইয়ে–যদি বলা যায়, তা হলে কেমন যেন খুব বড় করে হাসলেন, বললেন, এই যে চিড়িয়া! একেবারে পদতলে বসে আছ?

তিতির হেসে বলল, হ্যাঁ।’ বলে উঠে দাঁড়াল।

অভয় গুপ্ত তিতিরের ফুট টু হেড দেখে, আমার দিকে ফিরে বললেন, আমরা কী করে ভাল থাকব বলো, তুমি যেখানে ছিলে, সেখানে সবই ভাল।

কেন্দ্র কিনা, গদি বড় নরম। তবে সব বেড়ালের ভাগ্যে সবসময় শিকে হেঁড়ে না। বাবা বললেন।

অভয় গুপ্ত বললেন, তা বলতে পারো। কিন্তু যাই বলল, য়ু ক্যান মেক এ ভলাপচুয়াস উয়োম্যান ফেথফুল বাট নট ওয়েস্টবেঙ্গল।

বাবা বললেন, হ্যাঁ, আঙুর ফল যে কখনও কখনও টক হয়, তা সবাই জানে। পশ্চিমবঙ্গকে তোমাদের রক্ষিতা না করতে পারলে চলবে কেন। বলে বাবা ডাক দিলেন, বৈদ্য।

যাই।‘ দরজার কাছে শব্দ হল, এবং বৈদ্যনাথ এল একেবারে রেডি হয়ে, ট্রের ওপরে স্কচের বোতল আর কোল্ড সোডা আর দুটো গেলাস নিয়ে। তিতির আমার দিকে তাকিয়ে, দরজার দিকে তাকাল। অভয় গুপ্ত বললেন, ও সব কথা থাক, একটু কাজের কথা আছে।

তিতির বলল, মেসোমশাই, আমরা যাচ্ছি।’

 বাবা বললেন, আচ্ছা। কিন্তু কেষ্টর পেছনে বেশি লেগো না।

তিতির সে কথার কোনও জবাব না দিয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে, দরজার দিকে এগোল। আমি বাবাকে বললাম, তোমরা বসো তা হলে।

বাবা বৈদ্যনাথের হুইস্কি ঢালা দেখতে দেখতে বললেন, হ্যাঁ।

আমি যেতে উদ্যত হতেই, অভয় গুপ্ত বললেন, তুমি কোনও কর্মের না মদন। সেই মা—

 নো অভয়, নো ভালগারিটি। বাবা বলে উঠলেন।

একটা দেশীয় শব্দ–।

হ্যাঁ, অনেকটা কান্ট্রি লিকারের মতো, বাট সামটাইমস দ্যাটজ অবসিন। তুমি একটা এক্স-মিনিস্টার মানুষ হয়ে এটা বোঝ না!

অভয় গুপ্ত যে কোনও ভালগার বা অবসিন কথা বলতে যাচ্ছিলেন, তা আমি মোটেই বুঝতে পারিনি। বাবা কী করে বুঝলেন জানি না। অভয় গুপ্ত আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিক আছে, না হয় লায়লী সিংকে বেটিই বলছি, সেই বেটিকে তুমি একেবারে এপাশে ওপাশে করে।

নো মোর অভয়।

 তা হলে আর আমার কিছু বলার নেই।

বলে তিনি গেলাস তুলে নিলেন, আমি একটু হেসে ঘরের বাইরে গেলাম, দেখলাম, তিতির হিরার সঙ্গে কথা বলছে। হিরা এক বার আমার দিকে দেখে, তিতিরের কথায় ঘাড় কাত করে, সিঁড়ির দিকে চলে গেল। দূরে ডাইনিং রুমের দরজার কাছে, বাইরে টেবলের সামনে দাঁড়িয়ে সন্তোষ কাচের গেলাস মুছতে মুছতে এ দিকে দেখছিল, তিতির তা দেখতে পাচ্ছিল না, আমার সঙ্গে সন্তোষের চোখাচোখি হতেই ও মুখ নামিয়ে নিল। নীচের বারান্দার পশ্চিমের এন্ডে, বাঁ দিকে রান্নাঘর, এখান থেকে দেখা যায় না। সেখানে এখন বাবার ফরমায়েশ অনুযায়ী খাবার তৈরি হচ্ছে, এবং এখন সেখানে জানকী ইদ্রিস মতিয়া, এরা সবাই আছে। রূপচাঁদও থাকতে পারে, যদি গাড়ি নিয়ে কোথাও না গিয়ে থাকে। কেবল বদ্রী বাড়ির ভিতরের ব্যাপারে বিশেষ থাকে না। নাথুকে অবিশ্যি গেটেই থাকতে হয়েছে।

চলুন, কেষ্টবাবুর কাছে যাই।’ তিতির বলল। ওর সেই চোখে, কেমন একটা ইয়ে দুষ্টুমি, যেন ইয়ে মানে, চিকচিক করছে।

আমি বললাম, বাবা যেন কী বলছিলেন?

মেসোমশাই ও রকম বলেন। আশ্চর্য, বাবার সঙ্গে তিতিরের একটা অদ্ভুত আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গিয়েছে বলে মনে হয়। বাবা তিতিরকে বোঝেন, পাখি বলে ডাকেন, তিতির বাবাকে বোঝে, অবিশ্যি মেসোমশাই বলে ডাকে। না, এ রকম চিন্তা করার কোনও মানে হচ্ছে না, কেন না, এটা আমার ভাববার বিষয় না।

আসুন।’ তিতির ঘাড় কঁকিয়ে আবার ডাকল। যাব? কৃষ্ণবাবু বোধ হয় আমাকে ঠিক পছন্দ করবেন না, বিরক্ত হবেন।

ওঁর হয়তো ভাল লাগবে না।

আমি বললাম। তিতিরের ভুরু কুঁচকে উঠল, থ্রো করার মতো বলল, সো হোয়াট? আপনি এ বাড়িতে যে ঘরে খুশি যাবেন, কেউ যদি রাগ বা বিরক্তি দেখায়, তাকে বাড়ি যেতে বলা হবে।

আমি তাড়াতাড়ি বললাম, না না, তার দরকার কী। লেট দেম, চলো যাই। তিতিরের সঙ্গে বারান্দা দিয়ে এগোলাম। আমি আবার কারোকে শক্ত কথা বলতে পারি না, ইনসাল্ট তো কখনই না। আমরা দুজনেই পরদা সরিয়ে একটা ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখলাম, কৃষ্ণবাবু কার সঙ্গে যেন গলার স্বর নামিয়ে কথা বলছেন, আর একজন, চশমা চোখে, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা গোবেচারির মতো প্রৌঢ় লোক এক কোণে চুপচাপ বসে আছেন, হাতে একটি কোকাকোলার বোতল। কৃষ্ণবাবু আমাদের না, তিতিরকে দেখতে পেয়েই খুশিতে ঝকমক (কথাটা ঠিক হল?) করে উঠলেন, প্রায় শাউট করলেন, এসো রজনীবালা, এসো।

প্রৌঢ় ভদ্রলোককে আমি চিনি না। কৃষ্ণবাবু যার সঙ্গে কথা বলছিলেন, তাঁকে চিনি, উনি লাইফ ইনশিওরেন্সের একজন অফিসার, নম রাম সিনহা। হুইস্কি (ইন্ডিয়ান–অবকোর্স।) পান করছেন, এবং কৃষ্ণবাবু ওয়াইন (ইন্ডিয়ান অলসো)। তিতির প্রৌঢ় ভদ্রলোকের দিকে তাকাল, ভদ্রলোক কোকাকোলার বোতলসহ উঠে দাঁড়ালেন, হাসলেন ভালমানুষের মতো, বললেন, আমার নাম দয়াল ব্যানার্জি, কথা প্রকাশনী–পাবলিশার, মহাদেবদার সঙ্গে এক বার দেখা করব, উনি জানেন আমাকে।

বোঝা গেল, তিতিরও ওঁকে চেনে না, আমিও কখনও দেখিনি। তিতির বলল, ওই কোণে দেখুন ভিজিটরস স্লিপ আর পেনসিল আছে, আপনার নামটা লিখে বাইরে চাকরকে দিয়ে পাঠিয়ে দিন।

দয়াল ব্যানার্জি তাই করলেন। তিতির কৃষ্ণবাবুর সামনে গিয়ে কেমন টেনে টেনে জিজ্ঞেস করল, কেষ্টবাবু, আপনার মেড-সারভেন্টের নাম কী ছিল?

কৃষ্ণবাবু রাম সিনহার দিকে এক বার দেখে, ভুরু কোঁচকালেন, তিতিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, মেড-সারভেন্টের নাম আবার ভদ্রলোকেরা মনে রাখে নাকি?

রাখে না বুঝি? তিতির ঘাড় কাত করে, স্বরে ঢেউ দিয়ে জিজ্ঞেস করল, দেখতে কেমন ছিল, সেটা মনে আছে?

আহ্ রজনী, কী হচ্ছে?’ বলে কৃষ্ণবাবু চশমার ফাঁক দিয়ে এক বার রাম সিনহাকে দেখলেন, বললেন, মহাদেবদার সঙ্গে থেকে থেকে তুমি যা-তা বলতে শিখেছ।

তাই বুঝি? তিতির ওর সেই চোখ, বড় করে, ঘাড় ঝাঁকাল।

কৃষ্ণবাবু হঠাৎ একটা ইয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন, মহাদেবদা অবিশ্যি কপাল করে এসেছেন। বলে তিনি তিতিরের দিকে যেন কেমন করে তাকালেন, তারপর উইংক করলেন রাম সিনহার দিকে তাকিয়ে। রাম সিনহা হেসে গেলাস তুলে চুমুক দিলেন। কৃষ্ণবাবু যেন কী একটা ইশারা করলেন, তার কথা শুনে যেন মনে হল, বাবা আর তিতিরকে নিয়ে যেন কিছু বললেন। তিতির হাসল, বলল, সত্যি, নিজেদের দিকে যদি একটু তাকিয়ে দেখতেন কেষ্টবাবু!

কৃষ্ণবাবু বললেন, নিজেদের দিকেই তো তাকিয়ে আছি, আমাদের দেখবার জন্য তো আর পাখি। নেই।

অবকোর্স, হান্ড্রেড পার্সেন্ট ট্র। আমি ভাবছি, আপনারা যার মুণ্ডপাত করবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন, সেই অবসিন রাইটার ত্রিদিবেশ রায়কে, আপনার মেড-সারভেন্ট স্টোরিটা জানাব, উনি সুন্দর করে লিখতে পারবেন।’

এ সব ঘটনা আমি কিছুই জানি না। কৃষ্ণবাবুর মুখ শক্ত হয়ে উঠল, এবং ওঁর চোখ দুটোও চশমার ভিতরে কেমন যেন ইয়ে–লাল স্পার্ক করল। বললেন, মুণ্ডুপাত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছি মানে?’ বলে তিনি এক বার আমাকেও দেখে নিলেন।

লাগেননি? তিতিরের সারা শরীরটা যেন হেসে উঠল, বলল, উইকলি চারটে করে গালাগালির বক্তৃতা দিচ্ছেন, ত্রিদিবেশ রায়ের গোষ্ঠী উদ্ধার করছেন, পোস্টারিং করাচ্ছেন, প্রসেশন বের করাচ্ছেন, উঠে-পড়ে লাগেননি? কে আপনাদের ওই লোকটা নিজেকে আবার লেখক মনে করে? হারাণ মাল, হ্যাঁ, হারাণ মালকে দিয়ে অবসিনের মামলা দায়ের করে দিলেন।

কৃষ্ণবাবু রাগেই কিনা জানি না, যেন কথা বলতে গিয়ে কথা খুঁজে পেলেন না। কয়েক সেকেন্ড পরে হঠাৎ ধমকে ওঠার মতো বললেন, আমি হারাণকে দিয়ে মামলা দায়ের করিয়েছি? আই হেট টু ডু দ্যাট, তা হলে তো আমি ওর সাক্ষীই হতাম। হয়েছি? ও সব জানে তোমার ওই পাশের ঘরের জজ সাহেবরা, ওঁদের ধারণা, আইন দিয়ে সাহিত্যের বিচার হয়, আর ওই হারাণ মালদের ধারণা তাই। আই ডোন্ট বিলিভ দ্যাট। মাই ওয়ে অব ফাইটিং এগেন্সট অবসিনিটি–আলাদা। আমি সাহিত্য বুঝি, শিল্প বুঝি, আই নো হোয়াট ইজ মূল্যবোধ। হু ইজ ত্রিদিবেশ রায়? আমার মাথাব্যথা সাহিত্যের জন্য।’

তিতির যেন ঠাণ্ডা শরবত পান করার মতো সফট আর আরামের স্বরে বলল, আপনার লেখাগুলো পড়ি তো কেষ্টবাবু, পার্সোনাল গালাগাল কাকে বলে, তা জানি, পড়লে মনে হয়, কেমন যেন হিংসায় পুড়ে যাচ্ছেন। একজন গান্ধীয়ান হিসাবে, এতটা হিংসা কি ঠিক?

বাজে কথা বলো না রজনী। কৃষ্ণবাবু হাত তুলে, ফার্স্ট ফিঙ্গার দেখিয়ে বললেন, তা ছাড়া, মার্কসিস্ট থেকে শুরু করে, জনসংঘি, কে বাকি আছে, ত্রিদিবেশের বিরুদ্ধে বলছে না বা লিখছে না?

দ্যাটজ মোর ইন্টারেস্টিং!’ তিতির ওর সেই চোখে ইয়ে, মানে ঝিলিক ফুটিয়ে বলল, (এখন আমারও কেমন যেন সারপ্রাইজিং লাগছে।) কী করে ওটা সম্ভব হল বলুন তো? এমন ইউনিটি তো দেখা যায় না? সাহিত্যকে বাঁচাবার জন্য?

কৃষ্ণবাবু মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, নিশ্চয়ই।

তিতির এ বার খিলখিল করে হেসে উঠল। আমার দু-একটা কথা বলতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু মিস্টার জে. বিশওয়াসের কথা আমার মনে আছে, মালভা সম্পর্কে ওঁকে লিখতে বলেছিলাম বলে, কী রকম রেগে গিয়েছিলেন। রাম সিনহাও হঠাৎ তিতিরের সঙ্গে হো হো করে হাসতে লাগলেন। কৃষ্ণবাবু ভুরু কুঁচকে রাম সিনহাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি হাসছেন কেন?

রাম সিনহা হাসতে হাসতেই বললেন,  সিম্পলি রজনীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে।

আপনি ও সব ছাড়া কিছুই জানেন না। কৃষ্ণবাবু রেগে বললেন, আর তিতিরের দিকে ফিরে বললেন, তোমার এ হাসিটা তোমার বস মহাদেবদা বেশি এনজয় করতে পারতেন।

বস! বাবা তিতিরের বস হবেন কেন। তিতির ঘাড় কাত করে কৃষ্ণবাবুর দিকে তাকাল, ওর হাসিটা মুখে অন্যভাবে লেগে আছে, বলল, সত্যি? তা হলে সেটা আপনার মহাদেবদাকে বলে আসি।

তিতির দরজার দিকে পা বাড়াতেই, কৃষ্ণবাবু ডেকে উঠলেন, রজনী।

আশ্চর্য, কৃষ্ণবাবুর মুখ কেমন যেন পিটিফুল–হাসিটাও সেই রকম, এবং উনি দু হাত জোড় করে তিতিরের দিকে তাকালেন, আবার বললেন, প্লিজ!

তিতির ওঁর দিকে তাকাল, তারপরে রাম সিনহার দিকে তাকিয়ে আবার হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল, এবং সঙ্গে সঙ্গে রাম সিনহাও, কারণ উনি সিম্পলি তিতিরকে দেখে মুগ্ধ, কিন্তু মুগ্ধ লোক কি এরকমভাবে হাসেন। আমি প্রায় দর্শকের মতোই ব্যাপারটা দেখছি। কৃষ্ণবাবু এক বার আমার দিকে দেখলেন, তারপরে এক চুমুকে ইন্ডিয়ান ওয়াইন শেষ করে দিলেন, এবং ডাকলেন, দিবাকর।

দিবাকর আর এক জন সারভেন্ট, বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি, দরজায় দেখা দিল। কৃষ্ণবাবু। বললেন, ওয়াইন।

দিবাকর কোনও কথা না বলে চলে গেল। ঠিক এ সময়েই মিঃ ঝা ঢুকলেন, এবং ঢুকেই জিভ কেটে একটা অদ্ভুত শব্দ করলেন। তার চোখ লাল, কোঁচা লুটোচ্ছে, মুখ ইয়ে–মানে মুখের ভাব টায়ার্ড। কৃষ্ণবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, গুরুদেব, আপনি!’ বলেই বাইরের দিকে মুখ করে বললেন, দিবাকর, তুলসীপাতা আর বেলকাট নিয়ে এসো, শুচি হয়ে ঢুকি।

কৃষ্ণবাবু হঠাৎ মিঃ ঝাকে যা বললেন, তা আ–আমার পক্ষে উচ্চারণ করা সম্ভব না। তিতির আমার দিকে ফিরে বলল, চলুন বাইরে যাই।

ঠিক তা-ই, বাইরে যাওয়া উচিত, কিন্তু দরজার কাছে মিঃ ঝা তিতিরকে বললেন, চলে যাচ্ছ?

তিতির বলল, হ্যাঁ, তুলসীপাতা আর বেলকাট আমাদের সইবে না।

মিঃ ঝা, অচেনা মানুষকে দেখবার মতো করে, আমার দিকে তাকালেন, ভুরু দুটো এক বার কুঁচকে উঠল, তারপরে হঠাৎ আমাকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে শাউট করলেন, হা! মদন কবে এসেছ?

মিঃ ঝা ইয়ে মানে শর্ট ফিগার হলেও, এত জোরে চেপে ধরলেন, ছাড়ানো যাবে না বোধ হয়। ওঁর। সারা গায়ে ইয়ে মানে মদের গন্ধ। বললাম, আজই এসেছি।

মিঃ ঝা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, আহ্ মদন, কনট সার্কাসে তোমার বদলে যদি আমি থাকতাম।

তা হলে লায়লী সিং সত্যি রেপড হত।কৃষ্ণবাবু বলে উঠলেন।

মিঃ ঝা আমাকে ছেড়ে দিয়ে, হাত উলটে কোমরে রেখে, আর এক হাত কপালের পাশে রেখে, কেমন যেন একটা ভঙ্গি করলেন, এবং খানিকটা গানের সুরে বলে উঠলেন, আমি কাকে বলব কী?/হারিয়ে গেছে আমার মায়া নামে ঝি।

তিতির হঠাৎ আমার হাত ধরে টেনে বলল, আসুন।

কিছু আর বলবার বা শোনবার অবকাশ হল না, আমি তিতিরের সঙ্গে বাইরে চলে এলাম। কিন্তু মিঃ ঝাকে আমার বেশ লাগছিল। তিতির বলল, এখন ওখানে কান পাতা যাবে না।বলে আমার হাত ছেড়ে দিল, এবং তারপরে আমার মনে হল, খুব ইয়ে–মানে সহজেই তিতির আমার হাত ধরে টানল। মনে হচ্ছে, যেন অনেক দিন ধরে ওর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, অথচ আজ মাত্র ওবেলা ওকে আমি দেখেছি, অবিশ্যি তিতিরও তাই। কিন্তু যা আমার ভাবা উচিত না, একটা কৌতূহল যাকে বলে, বাবা আর তিতিরের–? না, দ্যাট’জ নট রিয়্যালি ফেয়ার। এ সব নিয়ে আমার চিন্তা করার কোনও মানে হয় না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, ওটা কি সত্যি নাকি, এ রকম একটা ইউনিটি হয়েছে দলগুলোর মধ্যে?

অবসিনিটির ব্যাপারে? তিতির বলল, হ্যাঁ, আপনি বুঝি কোনও খবর রাখেন না?’

আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, না, কিন্তু খুব আশ্চর্যের ব্যাপার তো? কী যেন লেখকের নাম বললে?

 ত্রিদিবেশ রায়।

কখনও নাম শুনি নি।

 তিতির হেসে বলল, সেটাও খুব আশ্চর্যের ব্যাপার। খবরের কাগজগুলোতে এই নিয়ে রোজই কিছু না কিছু লেখা হচ্ছে।

আমি তো খবরের কাগজ–।

ওহ, পড়েন না, ভুলেই গেছি।’

আমি একটু ইয়ে মানে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ভদ্রলোক সত্যি অবসিন লিখেছেন নাকি?

হোয়াট ইজ অবসিন, রিয়্যালি? তিতির ঘাড় কাত করে জিজ্ঞেস করল, আর আমি কেমন অ-অস্বস্তি বোধ করলাম, বললাম, জানি না।’

তিতির বলল, ইভন গড ডাজ নট নো। কিন্তু কলকাতার পথেঘাটে সো মেনি অবসিন বুকস, পোস্টার, এমনকী মানুষের চালচলন, এত ডার্টস, সে সব দেখে জেনে কি আমাদের এ সব নেতা কর্তাদের কিছু যায় আসে? তবে হঠাৎ ত্রিদিবেশ রায়ের বিরুদ্ধে এ জেহাদ কেন? তার মানে মৌচাকে ঢিল, আর ঢিলের চেহারাটা অবিশ্যিই খুব মধুর না, সো দে আর ইউনাইটেড। ও সব থাক, এখন চলুন, একটু ল অ্যান্ড হোম-এর রুমে যাই, কে কে এসেছেন দেখি।