৬. আকাশ পরিষ্কার

কুসুমের মৃত্যুর দু দিন পরেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। রোদ উঠল, আর সেই সঙ্গে ঠাণ্ডাও পড়ল। কিন্তু আমি মাটি খননের কাজে যেতে পারলাম না। করিক জানতে এসেছিল, এখন কাজ হবে কি না। বলেছি, খবর দেব। সামনে অগ্রহায়ণ মাস। ধান কাটার মরশুম পড়বে। তখন তোক নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে, সে জন্যেই ওদের একটু তাড়া।

কিন্তু কী করব। পারি না যে! একটা চকিত ব্যথা ও বিস্ময়ে মন যেন অবশ হয়ে গেছে। কুসুম মারা গেছে, তাই ওর প্রেমে আমি আবিষ্ট হয়েছি, এরকম কোনও বোধই আমার নেই। আমার পক্ষে তা সম্ভবও নয়। কিন্তু একটা কথা কিছুতেই ভুলতে পারছিনে, কুসুমের কাছে জগৎ সংসার কত ভয়ের, কী নিষ্ঠুর ছিল! ছোট একটি প্রাণ নিয়ে কত সন্তর্পণে তাকে কঠিন বেড়ার মধ্যে লুকিয়ে ফিরতে হয়েছে। কুসুম মরে প্রমাণ করল, জীবধর্মের কোনও বয়স নেই, মানুষের শাসন তার মনোজগতের দরজায় শুধু প্রহরীর কাজ করে। ভিতরে কখনও প্রবেশমাত্র পায় না।

পিসির অবস্থা বর্ণনা করা যায় না। তিনি যে বাড়িতে আর টিকতে পারছেন না, বুঝতে পারছি। কাজ হয়ে গেলেই বাড়ির বাইরে চলে যান। আর এ বাড়িতে, সবখানে, সবকিছুতেই কুসুমের হাত ছোঁয়ানো। কুসুম কলরব করত, হাসত, ছুটত, কাজ করত, এ বাড়িতে, মানুষের সাড়া শব্দ বলতে সেটাই ছিল। কুসুম ছিল বলেই পিসিকেও সবসময় কথা বলতে হত। এখন পিসির একটা কথাও শুনতে পাইনে। পিসি বাড়িতে আছেন কি না তাই এক এক সময় বুঝতে পারিনে। আমার সঙ্গে কুসুমের বিষয় কোনও কথাই হয় না। বুঝতে পারি, খাবার সময় হলে পিসি যখন আমাকে ডাকেন, তখন তাঁর গলা রুদ্ধ হয়ে আসে। খেতে দিয়ে পিসি রান্না ঘরের দরজার কোণটার দিকে তাকান, যেখান থেকে কুসুম চেয়ে চেয়ে আমার খাওয়া দেখত। সন্ধ্যাবেলায় ঘরে বাতি দেবার সময় হলেই কুসুমের কথা আমার মনে পড়ে যায়। তাড়াতাড়ি আমি নিজেই যাই পিসির ঘরে, পিসিও সেই সময়েই বাতি নিয়ে এগিয়ে আসেন। তখন দুজনেই বুঝতে পারি, কুসুম আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের মেঝেয়, যেখানে বিছানা পেতে কুসুমকে নিয়ে পিসি শুতেন, ঠিক সেখানেই পিসির বিছানা পাতা হয়।

এখন মনে পড়ছে, পিসি কত দিন বলেছেন, দ্যাখ কুসি, তুই আর ছেলেমানুষটি নাই বাপু যে, কোলের শিশুর মতন সারারাত আমাকে আকড়ে শুয়ে থাকবি। কিংবা, ই কী মেয়ে বল দিকি, বাছুরের মতন সারারাত বুকে মুখ গুঁজে থাকবি? এই স্নেহের বকুনিতে কুসুম বোধ হয় একটু লজ্জা পেত, বলত, হ্যাঁ, বলেছে তোমাকে, আমি মুখ গুঁজে থাকি।..আশ্চর্য! আশ্চর্য! কুসুম যে সত্যি শিশুই ছিল। আর এখন পিসির বিছানার খালি জায়গাটা হাতড়ে হাতড়ে হয়তো তাঁর ঘুম আসে না।

আরও কয়েক দিন পরে, আমাদের হেড পণ্ডিত মহাশয়ের বড় মেয়ে রাজুদিদি এলেন। পুরো নাম রাজেশ্বরী, নিঃসন্তান বিধবা, আমার থেকে বছর দশেকের বড়। পিসি তাঁকে নিয়ে আমার সামনে এসে বললেন, টুপান, রাজু এখন থেকে রান্নাবান্না করবে, ও তোর দিদির মতন এ বাড়িতে থাকবে, বুঝলি?

আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, নিশ্চয়। রাজুদির যদি কষ্ট বা অসুবিধে না হয়—

রাজুদি বলে উঠলেন, কষ্ট কী ভাই, আসলে তোমাকে একটি দিদির ভার নিতে হবে।

আমি বুঝতে পারলাম, আমিষ ঘরে আমার জন্যে পিসির রান্না করতে কষ্ট হচ্ছে। বললাম, ভার বলছেন কেন রাজুদি। নিজের দিদি নেই, একজন দিদি সংসারে থাকতে পারেন না? রাজুদি বললেন, বেঁচে থাকো ভাই।

তারপরে হঠাৎ হেসে বললেন, বাবা হেড পণ্ডিত হতে পারেন, নামটা কিন্তু ভাই ভুল রেখেছিলেন। কোথায় যে আমি রাজেশ্বরী, বুঝতে পারি না।

হয়তো অন্তরে, আমি মনে মনে বললাম। কিন্তু চোখ নামিয়ে চুপ করে রইলাম। তখনও আমার আসল কথা শোনা বাকি ছিল।

পিসি হঠাৎ বললেন, অরে টুপান, আমি বাবা একটু রামপুরহাটে যাব।

রামপুরহাট?

–হ্যাঁ, তোর পিসেমশায়ের ভিটেয় একবার যাব।

এত দিন বাদে, এই বয়সে পিসি আবার শ্বশুরবাড়ি যাবেন। সেই জন্যেই তবে রাজুদিকে ডাকা। এক মুহূর্তের জন্যে মনটা গুটিয়ে গেল, আহত ব্যথায় চুপ করে রইলাম। তারপরে মনে হল, সত্যকেই স্বাভাবিকভাবে স্বীকার করি। ভুলে যাই কেন, কুসুম বিনা পিসির দিন কেমন কাটছে। এমনিতেই তো বাড়িতে থাকতে পারছেন না।

আমি কথা বলবার আগেই পিসি বললেন, রাগ করলি টুপান।

তাড়াতাড়ি বললাম, না না, রাগ করব কেন পিসি। তোমার কষ্ট হচ্ছে, আমি জানি। ভাবছি, এত কাল বাদে, রামপুরহাটে গিয়ে তোমার ভাল লাগবে?

পিসি বললেন, যাই তো। তারপর কাছ থেকে চলে যেতে যেতে বললেন, তুই একটা বে থাও করলি না, কী বা করি।…

দু দিন পরে পিসি চলে গেলেন। দেখলাম, পিসির ঘরে আলনায়, কুসুমের জামাকাপড়গুলি আর নেই।

.

আবার মাটি কাটার কাজ শুরু হল। কিন্তু অত্যন্ত অনিয়মিত। ধান কাটা-তোলা নিয়েই করিকরা বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত হয়ে থাকে। কয়েক দিন পর একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। ধান ভোলা শুধু নয়, এর পরে মাড়াই ঝাড়াই আছে। স্থির হল এ দিকটা একেবারে মিটুক তারপরে ওদিকটা হবে। করিকরা ছাড়া হবে না, কারণ ওরাই মাটি কাটার কাজটা একটু শিখে নিয়েছে। করিক টুডু নিজেও খুব সাবধানী বটে। অতএব, আপাতত একেবারে বন্ধ রইল কাজ।

কুসুমের মৃত্যুর পরে, তিন দিন ভবেনদের বাড়ি যাইনি। ভবেন রোজই এসেছে। সে আমার সঙ্গে কুসুমকে দাহ করতেও গিয়েছিল। শ্মশানে, মধ্যরাত্রে লালপাড় বাসন্তী রং শাড়ি পড়া কুসুমকে, বাতি সামনে নিয়ে নিবিষ্ট হয়ে দেখেছিল ভবেন। তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। শ্মশানযাত্রীরা সকলেই সেই কান্নায় অবাক ও বিব্রত বোধ করেছিল। আমি ভবেনকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, ভবেনের বুকে কান্না অনেক জমেছিল, কুসুমের মৃত্যুতে সেই জমাট অশ্রু গলবার অবকাশ হয়েছিল।

তিন দিন পর যেদিন প্রথম গিয়েছিলাম মাঠের পথ থেকেই দেখেছি, ঝিনুক দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই তিন দিন ঝিনুক ইন্দিরকে দিয়ে ডাকতে পাঠায়নি। ভবেনকে বলে পাঠায়নি। নিজেও যায়নি। এটা ঝিনুকের পক্ষে আশ্চর্যই বলতে হবে। শালঘেরিতে ফিরে আসার পর, সেই বোধ হয় প্রথম, বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও, ঝিনুক তিন দিন চুপচাপ নিষ্ক্রিয় থেকেছে।

রবিবার বলেই ভেবেছিলাম, ভবেন নিশ্চয় বাড়িতে আছে। বেলা এগারোটায় আনিদি রান্নায় ব্যস্ত। আমি দোতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠে দেখেছিলাম, ঝিনুক সিঁড়ির মুখে দরজাতে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি কাছে যেতে ও আমাকে যাবার জন্য পাশ দিয়েছিল। জানি ও আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। আমার মুখের প্রতিটি রেখার দর্পণে, ভিতরটাকে দেখতে চাইছিল। কিন্তু অস্বীকার করব না, সেদিন আমার মুখ নিভাঁজ শক্ত হয়ে ছিল। দরজা খোলা ঘরের দিকে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভব বাড়ি নেই?

ঝিনুক, অনেকটা স্তিমিত গলায় বলেছিল, না, কিছুক্ষণ আগে বেরিয়েছে। তোমার ওখানে যায়নি?

–না তো। তবে আমি বেরিয়েছি অনেকক্ষণ, করিকদের পাড়ায় গেছলাম একটু।

ঝিনুক বলেছিল, বসবে চলো।

আমি আগে আগে ঘরে গিয়ে ঢুকেছিলাম। পিছনে ঝিনুক। বলেছিল, চা খাবে নাকি?

দাও।

 –একটু বসো, আসছি।

ঝিনুকের চলে যাবার অস্পষ্ট শব্দ শুনেছিলাম। আয়নার দিকে ফিরে, নিজেকে আমার চোখে পড়েছিল। কয়েক দিন ক্ষুর পড়েনি গালে। চুলগুলিও অবিন্যস্ত। জামাকাপড়ের অবস্থাও তথৈব চ। আয়নার দিক থেকে ফিরে, খাটের পাশ দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। বাইরে রোদ ছিল। কার্তিক মাসে মনে হয়েছিল যেন, শ্রাবণে বর্ষার পরে রোদ উঠেছে। সবকিছুই, মাঠ ঘাট গাছপালা উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। কিন্তু মেঘের পরে এই রোদের মধ্যে, ঠিক যেন প্রসন্নতার আমেজ ছিল না। একটা বিমর্ষতার ছায়া। হয়তো কার্তিকের অসময়ের বর্ষা বলেই। কিংবা বিমর্ষতা আমার মনেই ছিল।

বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠেছিলাম, ঝিনুক আমার কাছেই। আমি ফিরে তাকাইনি। একটু নড়েচড়ে উঠেছিলাম।

ঝিনুকের গলা শোনা গিয়েছিল, তুমি সে দিন যাবার কতক্ষণ পরে মারা গেল?

 বললাম, দু-তিন ঘণ্টা হবে বোধ হয়।

অচৈতন্য ছিল?

না, পুরোপুরি জ্ঞান ছিল মনে হয়। একটা ঘোর অবশ্য ছিল।

ঝিনুক চুপ করে ছিল একটু। আমি জানতাম, কীসের কৌতূহলে ও আগ্রহে ঝিনুক মরে যাচ্ছে। কুসুমের মৃত্যু প্রাক সন্ধ্যায়। ঝিনুক আমাকে যা বলেছিল, সে বিষয়ে আমার উপলব্ধির সত্যাসত্য জানতে চাইছিল ও।

আমি আবার বলেছিলাম, মনে হল, একটা ভয় আর উত্তেজনার ধাক্কায় কুসুম হঠাৎ মারা গেল।

 ঝিনুক বলেছিল, সেটা কী রকম টোপনদা?

আমি কুসুমের মৃত্যুর হুবহু দৃশ্য বর্ণনা করেছিলাম। বলেছিলাম, কুসুম আমার হাতটা ওর মুখের ওপর টেনে নেবার পর থেকে বারে বারে তোমার নামই করেছে, ঝিনুকদি ঝিনুকদি। এক বার বললে, আমি মরে যাব টোপনদা, আমি আর থাকতে পাব না। তারপরে আমার মনে হল, ও শুধু তোমাকেই দেখতে পাচ্ছিল। এক বার ভয় পেয়ে হঠাৎ উঠে পড়ল, আর অস্থির চোখে তাকিয়ে বলে উঠল, ঝিনুকদি ঝিনুকদি। আমি তাড়াতাড়ি ওকে কোলের কাছে নিয়ে বললাম, ঝিনুকদি এখানে নেই কুসুম। কুসুমের গলা নিভে যেতে লাগল, বলল, ঝিনুকদি রাগ করবে টোপনদা…সেই ওর শেষ কথা।

কথা শেষ হতেই ঝিনুক আমার জামাটা শক্ত মুঠিতে আঁকড়ে ধরেছিল। ঠিক যেমন করে, মরবার পরমুহূর্তে কুসুম ধরেছিল। আমি ফিরে তাকিয়ে দেখিনি, হয়তো ঝিনুক কাঁদছিল, কাঁপছিল রুদ্ধশ্বাস হয়ে।

আমারও বুকের কাছে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে, যেন একটা ব্যথা ধরে যাচ্ছিল। কিন্তু অস্বীকার করতে পারব না, ঝিনুকের জন্যে কোনও সমবেদনাই আমার জাগছিল না। বরং একটা বিরাগ ও বিতৃষ্ণাই যেন বোধ করছিলাম। এমনকী, আমার মনে হয়েছিল, ঝিনুকের প্রতি একটা ঘৃণা জেগে উঠছে। কুসুমের মৃত্যুর দায় থেকে ঝিনুককে আমি কিছুতেই, মন থেকে একেবারে রেহাই দিতে পারছিলাম না। হয়তো, এটাও জীবধর্মের মধ্যেই পড়ে, কিন্তু তার কুটিলতা এত নিষ্ঠুর গভীর কেন? আমার চোখের সামনে, কুসুমের প্রতি ঝিনুকের প্রতিটি ব্যবহার ভেসে উঠছিল। জানিনে, আমার অদেখায় আরও কী ব্যবহার করেছে ঝিনুক। কেন? কেন? ঝিনুক যেখানে রাজরাজেশ্বরী, সেখানে কুসুমের মতো একটা সামান্য মেয়ের প্রতি এমন নির্মমতা কেন?

আস্তে আস্তে ঝিনুকের মুঠি শিথিল হয়েছিল। আমার জামা ছেড়ে দিয়েছিল সে। একটা নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। কিন্তু ও কেঁদে কিছু বলেনি। নিচু গলায় যেন দূর থেকে বলেছিল, আমি জানি, তুমি কী ভাবছ টোপনদা। কিন্তু কী করব, আমি পারিনি। সব জেনেও, কেন যে ভয় পেয়েছি, আমি জানি না। তুমি যা বলো, হিংসা-রাগ-ভয়, এ সবই আমার মধ্যে ছিল।

আমি মুখ না ফিরিয়েই বলেছিলাম, এটা নীচতাও বটে।

এক মুহূর্ত থেমে ঝিনুক বলেছিল, হ্যাঁ, নীচতাও বটে। যে মুহূর্তে আমি কুসুমকে দেখে বুঝেছি, ও মনে মনে তোমাকে সবকিছু সঁপে দিয়ে বসে আছে, সেই মুহূর্ত থেকে, ভীষণ শত্রুর মতো ওকে দেখেছি। ওকে আর একটুও সহ্য করতে পারিনি। আজ তোমাকে বলি, ওর এক উপোসের দিনে, ওকে আমি শিবের মন্দিরে গিয়ে ধরেছিলাম। আমি জানতাম, উপোসের দিনে, মন্দিরে, ও আমাকে মিথ্যে কথা বলতে পারবে না। ডেঙা শিবের নিঝুম মন্দিরে, আমাকে দেখেই ওর মুখ শুকিয়ে গেছল। বাঘ দেখলেও মানুষ এত ভয় পায় না। আমি ওর হাত চেপে ধরে, মন্দিরের ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়ে বলেছিলাম, ঠাকুরকে ছুঁয়ে বল, টোপনদাকে তুই কী চোখে দেখিস? মিথ্যে বললে তোর টোপনদার অকল্যাণ হবে।কুসুম শিউরে কেঁপে উঠে, ফুঁপিয়ে উঠল। বলল, বলব, বলব ঝিনুকদি।বলে কাঁদতে লাগল। আমি বুঝতে পারছিলাম, তবু ছাড়িনি। বলেছিলাম, টোপনদাকে তুই ভালবাসি? কুসুম মাথা নেড়ে বলেছিল, হ্যাঁ, বলেছিলাম, কী রকম সেটা? মেয়েমানুষ যেমন স্বামীকে ভালবাসে? কুসুম উপুড় হয়ে কেঁদে উঠে বলেছিল, হ্যাঁ, হ্যাঁ।তারপরেই আমার পা জড়িয়ে ধরে বলেছিল ঝিনুকদি, এ কথা টোপনদাকে বোলো না, তোমার পায়ে পড়ি। তা হলে টোপনদা আমাকে মেরে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে। সে কিছুই জানে না। জগতে যে কেউ কোনওদিন জানতে পারবে, ভাবিনি। ঝিনুকদি, তুমি কী করে জানলে জানি না। তুমি যা বলবে, তাই শুনব, কিন্তু এ কথা কাক পক্ষীকেও বোলো না।..

আমি আর শুনতে পারছিলাম না। বিস্ময় ব্যথা ও ঘৃণা আমার বুকের মধ্যে উছলে উঠছিল। বলে উঠেছিলাম, চুপ, চুপ করো ঝিনুক। তোমার কাছে এ সব আমি শুনব আশা করিনি।

–কেন করনি।

 ঝিনুকের স্পষ্ট নিচু গলায় শোনা গিয়েছিল, কেন করনি। নীচ বলো, হীন বলো, আমার সব এক জায়গা থেকেই ঘটছে। যেখান থেকেই দেখ, যে ভাবেই দেখ, একটা জায়গা থেকেই আমার চলাফেরার সুতো নাড়ানাড়ি, একখানেই মরিবাঁচি, আমার উপায় নেই। তাতে আমাকে ভাল কি মন্দ দেখায়, নীচ বা উচ্চ বোঝায়, আমি জানি না। আমার সবটা দেখেও তুমি, এটা বোঝ না?

বলতে বলতে ঝিনুকের গলায় কেমন একটা ঝংকার বেজে উঠেছিল। না থেমে ও বলেছিল, তুমি আমাকে বকতে পার, মারতে পার, তোমাকে একটুও দোষ দেব না। কিন্তু এটুকু বিশ্বাস করো, কুসুমের মরণটা তো তবু তোমরা কোনওদিন ভুলবে, আমার চিরদিনই বাজবে। কারণ-কারণ কুসুম আর আমি যে এক পুকুরেই নিজেদের মুখ দেখেছি, আমরা দুজনেই তো নিজেদের সবথেকে বেশি চিনেছি। তাই ওকে আমি ঘৃণা যত করেছি, ও মরে যাওয়ায় কষ্ট আমার তত বেশি।

ঝিনুক চুপ করেছিল। আমি তখনও বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু কিছুই দেখছিলাম না। ঝিনুকের কথাগুলিই আমার কানে বাজছিল। আমি ওর দিকে ফিরে তাকিয়েছিলাম।

ঝিনুক আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। মুখ ফেরাতেই, ওর সঙ্গে চোখাচোখি হয়েছিল। না, ঝিনুক কাঁদছিল না, তার পরিবর্তে যেন এক গভীর স্বপ্নবেশ ছিল ওর চোখে। রক্তাভ ঠোঁট দুটি খোলা, তার ফাঁকে ঝকঝকে দাঁতের সারি দেখা যাচ্ছিল। সেই রৌদ্র যেন দুপুরের আভায় চলকাচ্ছিল। এত কাছে, প্রায় ওর নিশ্বাস অনুভব করছিলাম আমার গায়ে। আমি জানতাম, সেই ওর সবথেকে করুণতম রূপ। ঝিনুককে যে চেনে, সেই জানে, ওর ওই ভঙ্গিটি সবথেকে অসহায়।

ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে সহসা আমারও আবেগের মুখ খুলে গিয়েছিল। ওর শেষের কথাটা আমারই কথা হয়ে উঠেছিল। দেখেছিলাম আমার ঘৃণা, আমারই আসক্তি হয়ে সুমুখে দাঁড়িয়ে। তৃষ্ণা ও বিতৃষ্ণার একী লীলা। আমার বিরাগ ও বিতৃষ্ণার উত্তাপ নিভতে পেল না, তার আগেই সমস্ত প্রাণ আবেগের ঢেউয়ে উপছে পড়েছিল। আমি চোখ ফেরাতে পারিনি।

ঝিনুক একটি হাত তুলে দিয়েছিল আমার বুকের ওপরে। আর সেই মুহূর্তেই আর একটা আলোড়ন লেগেছিল আমার বুকে। কী যে বলতে চেয়েছিলাম, জানিনে। একটা অন্যতর যাতনায়, চোখ ফিরিয়ে আবার বাইরের দিকে তাকিয়েছিলাম। প্রায় অস্ফুট স্খলিত স্বরে বলেছিলাম, বাড়ি যাই ঝিনুক।

ঝিনুক বলেছিল, না।

ফিরে তাকিয়েছিলাম। ততক্ষণে ঝিনুক আমার সেই নিয়তির আসনে ফিরে এসেছিল। বুকে হাত দিয়ে, ঠেলে খাটের কাছে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল আমাকে বলেছিল, বসো, চা করে নিয়ে আসি। জল এতক্ষণ গরম হয়ে গেছে।

বলে, চলে যেতে যেতে হঠাৎ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমার দিকে ফিরে তাকিয়েছিল। কী যেন বলবে মনে হয়েছিল, কারণ ঝিনুকের ঠোঁট নড়ে উঠেছিল। কিন্তু কিছু না বলে, অত্যন্ত দ্রুত, প্রায় ছুটে অদৃশ্য হয়েছিল। তারপরে ঝিনুক এসেছিল অনেক দেরিতে। অন্তত কয়েক প্রস্থ চা তৈরির সময় কেটে গিয়েছিল। ইতিমধ্যে ভবেন ফিরে এসেছিল।

.

কিন্তু বারে বারে আমি যে মহাকালের কথা বলেছি, প্রতি বাঁকে বাঁকে, যার ভেরি বেজে উঠেছে, নিবিড় অন্ধকারে আলোর ঝলকে জীবন অভিজ্ঞ হয়েছে, তার নিরন্তরতার অনেক মহালগ্নই তখনও বাকি ছিল।

অগ্রহায়ণ ও পৌষ, দু মাস প্রায় তামাইয়ের খননের কাজ বন্ধ গেছে। মুনিষ মজুরেরাই যে শুধু ব্যস্ত ছিল, তা নয়। আমাকেও মরাইয়ে শেষ ধান তোলা পর্যন্ত বাড়িতে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। তারপরে এল, অনেক কাজের শেষে একটু বিরতি। ধান কাটা-তোলা ইত্যাদির পর সবাই একটু বিশ্রাম চায়। এ সময়ে আশেপাশে অনেক মেলা হয়। তবু মাঘ মাসে আর বসে থাকতে পারলাম না। অন্তত নিজে যতক্ষণ না পুরোপুরি নিরাশ হচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি নিরস্ত হব না। যদিও গোবিন্দবাবুর কথার পরে, আমার সংশয় এখন গভীর। তবু এতগুলি প্রাচীন নিদর্শন যেখানে পাওয়া যায়, সেখানে কিছুই নেই, এই সিদ্ধান্তে আসতে পারছিনে। ঝিনুকের বাবা উপীনকাকা এই গ্রামেই জন্মেছেন, আজন্ম বাস করেছেন তাঁর সারা জীবনের অভিজ্ঞতায়, তিনিও বিশ্বাস করতেন, তামাইয়ের মাটির গর্ভের অন্ধকারে একটা সুদূর অতীতের অস্তিত্ব যেন নিশ্ৰুপ হয়ে রয়েছে। তাঁকে আমি কথা দিয়েছিলাম, তামাইয়ের নীচে যদি কোনও অতীত থেকে থাকে, তাকে আমি উদ্ধার করব। তা ছাড়া, সংশয়ের নিরসন না হওয়া পর্যন্ত, আমার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থাও কিছু স্থির করা যাচ্ছে না।

ভবেন এখনও চায়, আমি ইস্কুলে একটা কাজ নিই। তাতে আমার একেবারেই ইচ্ছে নেই। সব কাজ সকলের জন্যে নয়।

রাজুদি কী ভেবে আমাদের সংসারে এসেছিলেন, জানিনে। সুখী হননি, বোঝা যায়। একদিন বললেন, রাত্রে তো তুমি প্রায়ই ঝিনুকের ওখানে খেয়ে আস। শুধু শুধু বেঁধে কেন কষ্ট করি।

রাজুদিকে কৈফিয়ত দিতে পারিনে যে, অনিচ্ছাতেও খেয়ে আসতে হয়। বলি, ভবেনটা ছাড়ে না।

রাজুদি বললেন, আগে বললেই তো পারে। তা হলে আর খাবার দাবার নষ্ট হয় না। কথাটা ঠিক। আমি চেষ্টা করি যাতে আগের থেকেই রাজুদিকে বলা যায়। কিন্তু সেটা কার্যকরী হয় না। আজকাল বাড়িতে প্রায়ই পাড়ার মহিলাদের দ্বিপ্রহরিক আড্ডা বসে। রাজুদির একাকিত্ব ঘোচাতেই এই আড্ডা। কেন যেন সন্দেহ হয়, এই আড্ডার আলোচনায় আমি ভবেন ঝিনুক, কেউ বাদ যায় না।

ঝিনুক আর আসে না আমাদের বাড়িতে সেটা এক রকম ভাল। রাজুদিকে আমার একটু ভয় করে। যদিও গ্রাম জীবনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে, তবু আমার বিষয়ে যে সকলের চোখেমুখে একটা কথা থমকে রয়েছে, তা জানি। ঝিনুক এখন এলে, হয়তো আর থমকে থাকবে না।

পিসির দু-তিনখানা চিঠি এসেছে। সবই ধানের হিসাব, মুনিষদের চরিত্র বর্ণনা, কে রকম মানুষ কে চোর, কে সাধু, কে ফাঁকিবাজ। আমি তো হিমসিম খেয়ে গেছি এ দু মাস। ধান তোলা-পাড়ার ব্যাপারে পিসিই সবকিছু করতেন। কুসুমও সে বিষয়ে অত্যন্ত কর্মঠ সাহায্যকারিণী ছিল। কত ধান এল, কী মাপজোক হল, কতটা ভাগে যাচ্ছে, কতটা নিজেদের, এবং বিক্রি করার জন্যে আলাদা ধানই বা কী পরিমাণ থাকছে, এই শত শতমন ধানের হিসেব করা যে কী প্রাণান্তকর। অথছ পিসি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামে নামে হিসেব বলে যেতেন। কুসুম পেনসিল দিয়ে খাতায় টুকে টুকে রাখত। তার মধ্যেই মাপের ওজন, হিসেবের গরমিল, সবই ধরা পড়ত। এবারে অঘোর জ্যাঠা যদি আমাকে সাহায্য না করতেন, কিছুতেই পারতাম না। তাঁর অবিশ্যি একটু স্বার্থ ছিল। অভাবে পড়লে, জোগান পাবেন। তার জন্যে বেশি ধান ফেরত বা সুদ দিতে হবে না। বাবার আমল থেকেই এটা চলে আসছে।

মাঘ মাসে তামাইয়ের খনন আবার শুরু হল। এবার কেমন একটা সন্দেহ হল, নদীর কাছ থেকে সরে গিয়ে সন্ধানের সীমা নির্ধারণ করলাম। অনেকখানি চাষের জমিও তার মধ্যে সংলগ্ন হল। জায়গাটাও, অনুচ্চ ঢিবির মতো। মাঝে মধ্যে ছোটখাটো খানা খন্দ। কিছুটা দক্ষিণে গিয়ে, জমিটা নেমে গেছে। অনেকখানি নেমে আবার উঠেছে।

করিক টুডুকে কাজে লাগিয়ে, ভবেনকে দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে, আমি কয়েক দিনের জন্যে আকোন চলে গেলাম। শুধু শালঘেরিতে নয়, আকোনেও আমার সন্দেহ নিরসন করতে চাই। প্রতিদিন যাতায়াতে বাইশ মাইল হাঁটতে পারব না বলে, আকোনে থাকাই স্থির।

যাবার আগে ঝিনুকের চোখে যেন কেমন একটা ভীরু ব্যাকুলতা দেখতে পেলাম। যেটা ওর চোখে নতুন। আমি জেলে যাবার আগে এ রকম দেখেছিলাম। যাবার আগে ও বলল, তুমি চলে যাচ্ছ?

বললাম, দু-তিন দিনের জন্যে তো। সন্দেহজনক জায়গাগুলো কার মালিকানায় আছে, একটু দরাদরি করে কেনা দরকার।

ঝিনুক যেন কী বলতে চাইল, কিন্তু সামলে গেল। কী বলবার থাকতে পারে, ভেবে পাইনে। এ রকম পরিস্থিতি এলেই, নিজেকে বারে বারে প্রশ্ন করি, এভাবেই কি চিরকাল চলবে? তবু, কয়েক দিন ধরে, ঝিনুকের অবস্থাটা খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। জানিনে কী ঘটেছে।

আকোন চলে গেলাম। পরিচয়টা প্রথম বারেই সেরে গিয়েছিলাম। মোটামুটি আমাকে অনেকেই চেনে। বাবাকেই চেনে বেশি লোকে। আমার কাজের ব্যাপারে কেউ কেউ সন্দেহও প্রকাশ করল। তবু জমি বিক্রি করতে রাজি হল।

আকোনের তামাইয়ের ধারে আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে ঘুরে বেড়ালাম। সেখান থেকে কয়েকটা জিনিস পেয়েছিলাম, সেই জঙ্গুলে জায়গাটিকে অনেকে ধর্মঠাকুরের বাঁদাড় বলে। কতকাল থেকে বলে, তার কোনও হিসেব কেউ দিতে পারল না। বৈশাখে ধর্মঠাকুরের উৎসবের সময় বাঁদাড়ে মেলা হয়। তারপর সারা বছর পড়েই থাকে।

ধর্মঠাকুরের এই বাঁদাড়ে খুব বড় গাছ সামান্যই আছে। বাবলা ঝোঁপই বেশি। মাঝে মাঝে কিছু ভিন জাতের জঙ্গল। তামাইয়ের ধার থেকে প্রায় একটা খালের মতো শুকনো খাত বাঁদাড়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে। সেই খাতের কয়েক জায়গায় সুড়ং-এর মতো গর্ত ঢুকে গেছে বাঁদাড়ের ঢিবির ঢালুতে। শুনলাম রাখাল ছেলেপিলেরা কখনও কখনও খেলা করে এই গর্তের কাছে। তবে বুনো শুয়োরের আস্তানা ছাড়া ওগুলো আর কিছুই নয়।

অসম্ভব নাও হতে পারে, কাছে পিঠে বালি মেশানো মাটিতে শুয়োরের পায়ের দাগ রয়েছে। তবু একটা উদ্দেশ্য আছে বলেই হয়তো আমার আশা ও সন্দেহ, যুগপৎ ঝিলিক হেসে গেল। বারে বারেই মনে হতে লাগল, হয়তো এখানে কিছু আছে। এখানে এই সুড়ং-এর মতো গর্তগুলির অন্ধকারে আমাকে যেন কারা হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

প্রশ্ন উঠল ধর্মঠাকুরের বাঁদাড় নিয়ে। ধর্মস্থানের কোনও ক্ষতি করা চলবে না, এ কথা আমাকে আগেই জানানো হল। ধর্মস্থানের পরিধি সামান্যই। বিঘা খানেক তার সীমা। কিন্তু গোটা বাঁদাড়টা তা নয়। আমি যখন কথা দিলাম, ধর্মঠাকুরকে কোনওক্রমেই উদ্বাস্তু করব না, তখন সকলেই আশ্বস্ত হল। কিন্তু কথা উঠল, বাঁদাড় বিক্রি করবে কে? ওটা তো কারুর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। অতএব আবির্ভাব হল, আকোনের ইউনিয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের, বারোয়ারি কমিটির মেম্বারদের।

দুদিন ধরে একটি কথাই শুধু বারে বারে বলতে হল, এ কাজটা আমার ব্যক্তিগত কোনও লাভ লোকসানের ব্যাপার নয়। আকোনের একটা নিজস্ব কর্তব্যও আছে। যদি আবিষ্কার হয়, সেটা দেশের জন-সম্পদ বলেই বিবেচিত হবে। অনেক বিতণ্ডার পর সকলের অনুমতি পাওয়া গেল। আমাকে একটা লিখিত অনুমতিপত্রও সংগ্রহ করতে হল। বৈশাখে ধর্মঠাকুরের পূজা ও মেলা আছে। তার আগেই কাজ শুরু করব, কিংবা পরে সেটা স্থির করতে পারলাম না। শালঘেরিতে ফিরে গিয়েই স্থির করা যাবে। লোকজন সংগ্রহ করার দায়িত্বও আছে।

দিন চারেক পরে আকোন থেকে ফিরে আসার পথে, সহসা যেন আমার সমস্ত উৎসাহ নিভে যেতে লাগল। একটা বিমর্ষতায় মন আবিষ্ট হয়ে গেল। মনের এই ব্যাধিটা ইদানীং আমাকে আক্রমণ করতে শুরু করেছে। আমি আমার নিজের কার্যকারণ স্থির করতে পারি না। জীবনের সকল প্রয়োজনই অকারণ বলে বোধ হতে থাকে। কখনও মনে হয়, সবই ঠিক আছে। আবার কখনও কখনও সবই বেঠিক। জীবনধারণের বর্তমান কারণগুলি যেন অর্থহীন, তাতে আমার কোনও হাত নেই। নিরাশ বোধ করি, অসহায়তায় ভেঙে পড়ি যেন। নিজের কাছেই বিস্ময়ের অন্ত থাকে না, এরকম অবস্থায় যখন মনে হয়, আমি যদি শিশুদের মতো একটু প্রাণ খুলে কাঁদতে পারি, তা হলে হয়তো এ অবুঝ কষ্টের কিছু লাঘব হয়। কিন্তু তাই বা পারি কই। সে আপনা থেকে না ফাটলে, না গলে পড়লে, তার জন্য বুক চাপড়াতে পারি না।

মনের এ অবস্থাটা আমাকে অস্থির করে। আর আমি নিজেকে শান্ত করার জন্যে, নিজেকেই বোঝাতে থাকি। নানান বিচার বিশ্লেষণের কথা কাটাকাটি চলে। তার থেকে একটা সিদ্ধান্তেই বারে বারে এসে পৌঁছুই। জীবনের একটা সামগ্রিক ব্যর্থতার ভয় আমাকে নিয়ে খেলা করছে। তার হাত থেকে, তার ডানা মেলা ছায়ার বেষ্টনী থেকে আমি মুক্তি পাচ্ছি না। কিন্তু মুক্তি পেতে হবে, এই একটি কথার ওষুধ আমি আমার ব্যাধিগ্রস্ত শিরা উপশিরায় ঢেলে দিই তারই জোরে সুস্থতা ফিরে পাই।

শালঘেরিতে ফিরে, সন্ধ্যাবেলা ভবেনদের বাড়ি গিয়ে দেখলাম, ঝিনুক শয্যায়। ভবেন আর এক ঘরে চুপচাপ বসে। আবহাওয়াটা থমকানো, অস্বস্তিকর। এরকম আজকাল মাঝে মধ্যে দেখা যায়। জিজ্ঞেস করলে, ভবেন বলে, কই কিছু নয়তো। ঝিনুক অনেকক্ষণ স্তব্ধতার পর বলে, জানি না কিছু। বলে, ঝিনুক এমন করে তাকিয়ে থাকে, বুঝতে অসুবিধে হয় না, কোথায় কী ঘটেছে একটা। তারপরে আস্তে আস্তে আবার আবহাওয়া সহজ হয়। কিন্তু ঝিনুক ভবেনের সঙ্গে তখন প্রায় কথাই বলে না। ভবেন অনর্গল ঝিনুককে ডেকে ডেকে কথা বলে যায়। ঝিনুক যেন শুনতেই পায় না। দৃষ্টি পর্যন্ত ফেরায় না। ক্কচিৎ এক-আধটা ছোট জবাব দেয়।

ওরা দুজনে যদি আমাকে কিছু না বলতে চায়, আমি জোর করব না। বরং তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে নির্বিকার থাকবারই চেষ্টা করি। এবং এরকম ঘটনা দেখলেই, দু-একদিন আসা বন্ধ রাখি। কিন্তু ঝিনুক আর ভবেন তা রাখতে দেয় না।

আজও ভবেনকেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোরা ঝগড়া করেছিস নাকি?

 ভবেন তাড়াতাড়ি উঠে বলল, না তো।

তাকে নিয়ে ঝিনুকের ঘরে এসে বললাম, এ অসময়ে শুয়ে কেন, শরীর খারাপ?

ঝিনুক উঠে বলল, না শরীর ভালই, বসো।

 বললাম, কী যেন হয়েছে মনে হচ্ছে?

 ঝিনুক নিঃশব্দে উঠে গায়ের কাপড় বিন্যস্ত করতে লাগল। ভবেন বলে উঠল, কী আবার

ঝিনুক চকিতে এক বার ভবেনকে তীব্র দৃষ্টিতে দেখে, আমার দিকে ফিরে বলল, চা খাবে?

ভবেন বলল, আমি আনিদিকে বলে আসব ঝিনুক?

হয়তো ঝিনুকই বলতে যেত। ভবেনের কথা শুনেই যেন গুছিয়ে আবার বসল। আমাকে বলল, বসো।

ভবেন বেরিয়ে গেল। তারপরে আমার আবার জিজ্ঞেস করতে বাধে, কী হয়েছে? দেখি, ঝিনুকের মুখ শক্ত, কী একটা গভীর চিন্তায় যেন মগ্ন।

আমি বসলাম। আর সেই শব্দেই যেন ঝিনুক হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল। ইতিমধ্যেই সেই চোখে একটা ভীতি বিহ্বলতা ফুটে উঠেছে যেন।

ভবেন ফিরে এল। আকোনের কথা উঠল। এবং আস্তে আস্তে আবহাওয়া সহজ হয়ে উঠল। কিন্তু আমার ভিতরে একটা অস্বস্তি ও আড়ষ্টতা ক্রমে আরও চেপে আসতে লাগল।

মাঘ মাস শেষ হয়ে এল। শালঘেরির তামাই উপত্যকা প্রায় প্রমাণ করে এনেছে, অতীত স্মৃতি ধারণ বিষয়ে সে বন্ধ্যা। অসহায় পাখির কাছে যেমন করে আসন্ন সন্ধ্যার অন্ধকার ধীরে ধীরে নেমে আসতে থাকে, হতাশা তেমনি নেমে আসতে লাগল আমার চোখের সামনে।

ইতিমধ্যে ফাল্গুন এল। কোথাও কোথাও শিমুলের কাঁটা ডালে ফুল ধরে গেছে, পলাশে কুঁড়ি। শুকনো পাতায় আর পথের ধূলায় লাগল লুটোপুটি। দেখে মনে হয়, গাঢ় গৈরিক শালঘেরির আলখাল্লায় কে যেন রং ছিটিয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে।

দুদিন করিকদের কাজ দেখতে যাইনি। খবর কিছু থাকলে নিশ্চয় দিয়ে যেত সে। ইস্কুলের ছুটির ঘণ্টা শুনে দক্ষিণ পাড়ায় গেলাম। পথেই ভবেনের সঙ্গে দেখা। ও এত অন্যমনস্ক ছিল, আমাকে দেখতেই পায়নি। পিছন থেকে লক্ষ করলাম, ওর দৃষ্টি পুবে, তামাইয়ের দিকে, শালবনের মাথায়। কী এত দেখছিল ভবেন? বেলা শেষের রোদে আকাশটা গম্ভীর ও রক্তিম হয়ে উঠেছিল। আর তার বুকে শুক্লা একাদশীর অপূর্ণ চাঁদ। তখনও তার রং ধূসর লোহার মতো দেখাচ্ছিল। অন্ধকার যতই ঘনাবে, ততই সে তপ্ত লোহার মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, আলো ছড়াবে।

আমি খুব কাছে গিয়ে ডেকে বললাম, ভব, এত কী দেখছিস ও দিকে?

ভবেন চমকে ফিরে তাকাল। বলে উঠল, তুই?

একটা নিশ্বাস নিয়ে বলল, রাস্কেল!

বললাম, সেটা কোনও জবাব হল না। তুই আমাকে মাঝে মাঝে বলিস, আমি নাকি আজকাল কথা চাপতে শিখেছি। দেখছি, আমি শিখি বা না শিখি, তুই পুরো রপ্ত করেছিস।

ভবেন আবার বলল, রাস্কেল!

 আমার ঘাড়ে হাত রেখে বলল, তোর মতন যদি চাপতে পারতাম, তা হলে তো মানুষ হয়ে যেতাম।

–সেটা আবার কী রে?

–সেটা নিজেকে গোপন করতে পারা।

কিন্তু গোপন করতে পারার মধ্যে মনুষ্যত্বের সম্পর্কটা কী, বুঝলাম না।

ভবেন আমার দিকে তাকাল। ওর চোখ মুখ চেহারা সহসা বদলে গেল। ও অন্যদিকে চোখ রেখে বলল, সোজা করে বলব?

একটু যেন থতিয়ে গেলাম। তবু বললাম, বাঁকালে বুঝতে পারব না।

ভবেনের ঠোঁটের কোণে চকিতে একটু হাসির ঝিলিক দেখা গেল। বলল, তোর মতন অতখানি চাপবার সাহস নেই বলেই মনুষ্যত্বের কথা বলেছি।

আমি বলে উঠলাম, মানে?

ভবেন আমার চোখের দিকে তাকাল। বলল, মানে?

আমি কথা বলতে পারলাম না। আমরা দুজনেই দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। ভবেন যেন রুদ্ধশ্বাস হয়ে বলে উঠল, টোপন, তোর সাধ্য আছে, তোর সাধ্য আছে..।

আমি যেন অনেকটা বোকার মতো জোরে হেসে উঠে বললাম, কী সব বলছিস উল্লুক!

ভবেন জোরে হেসে উঠল। বলল, ওদিকে কেন তাকাচ্ছিলাম জানিস? ঝিনুক বলেছিল, আজ চাঁদ উঠলে, তামাইয়ের ধারে বেড়াতে যাবে।

তাই বুঝি?

–হ্যাঁ, এ বেলা তুই গেলেই তোকে বলবে বলে ঠিক করে রেখেছে।

 –আর তুই তাই, সন্ধে হতে না হতেই তাকিয়ে দেখছিস?

-ঝিনুকের খেয়াল তো। ভাবলাম, তুই হয়তো এতক্ষণে আমাদের বাড়ি চলে গেছিস, আর ঝিনুক তাগাদা দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।

আমি হাসলাম। চলতে চলতে, একটু পরে বললাম, যাবি নাকি?

ভবেন বলল, ঝিনুকের যদি আপত্তি না থাকে।

ঝিনুক তো বলেছে বলছিস।

–আমার যাওয়ার কথা বলছি।

 আমি ভবেনের দিকে তাকালাম। ভবেন নিঃশব্দে হাসল। আমি আবার বললাম, উল্লুক!

আমরা আর একটু এগিয়ে যেতেই ভবেনদের দোতলা চোখে পড়ল। চিনতে ভুল হল না, দোতলার বারান্দায় লাল শাড়ি পরে ঝিনুক দাঁড়িয়ে রয়েছে। এবং সে ইতিমধ্যেই আমাদের দেখতেও পেয়েছে। বাড়ির পশ্চিমে রোদ নেমে গেছে। তাই পুবের বারান্দায় ছায়া। সেই ছায়ায়, ঝিনুক যেন ঝকঝক করছিল। আমার আর ভবেনের আপনা থেকেই চোখাচোখি হয়ে গেল।

এত টকটকে শাড়ি বড় একটা পরতে দেখি না ঝিনুককে। কাছে যেতে যেতে মনে হল, চুল বাঁধাও সাঙ্গ। পিছনে, খোঁপার কাছে ভেঙে পড়া ঘোমটা রয়েছে যেন। যত কাছে গেলাম, টের পেলাম, ঝিনুক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। ইন্দিরের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল গেটে। সে বলল, এই যে, বড় বউমা আপনকার কাছেই পাঠাচ্ছিলেন।

ঝিনুকের গলা ওপর থেকে ভেসে এল, তবু তুমি যাও ইন্দিরদা। রাজুদিকে বলে এসো, উনি আজ এখান থেকে খেয়ে ফিরবেন।

ইন্দির মাথা নিচু করে, ঘাড় নেড়ে শুনল। বলল, আচ্ছা মা।

ইন্দির মাথা নিচু করেই চলে গেল। ভবেন আমার দিকে তাকাল। আমি ভবেনের দিকে। দুজনেই বাড়ির ভিতরে ঢুকে দোতলায় উঠলাম। ভবেন বলল, তোমার প্ল্যানটা আমি পথেই টোপনকে বলে দিয়েছি।

ঝিনুক ফিরে তাকাল। এমন কিছুই সাজেনি। তবু যেন, ওর রৌদ্র রং-এর সঙ্গে রক্তের মতো লাল শাড়ি চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, ওর ছেলেবেলায় কোনও এক জ্যোতিষী বলেছিল, এ মেয়ে যেন কখনও হিরা ব্যবহার না করে। নীলা তো একেবারেই নয়। পান্না এর আদর্শ।

এখন ঝিনুককে দেখে আমার মনে হল, জ্যোতিষী ঠিকই বলেছিলেন। সবুজ পান্নাই ওর ভাল। সেই সঙ্গে উজ্জ্বল ঝকঝকে বর্ণের পোশাকও বারণ থাকলে ভাল হত। সবুজ শাড়ি পরলে ওকে অনেক শান্ত দেখাত। এখন যেন মনে হচ্ছে, রোদে রক্তে, মাখামাখি করে রয়েছে। অথচ, ও তো সত্যি সাজেনি। গায়ের জামাটা তো শালঘেরির তাঁতির হাতের গেরুয়া রং-এর মোটা কাপড়ের। অলংকারের মধ্যে সোনা বাঁধানো শাঁখা ও নোয়ার ওপরে কয়েক গাছা চুড়ি। গলায় একটি সোনার সরু চেন।

ঝিনুক বলল, যাবে তো?

এ ইচ্ছেটা তো নতুন নয়। তবু যে ঝিনুক দুপুরবেলা বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে তামাইয়ে শালবনে যেতে চায়নি, সেটাই যথেষ্ট। এভাবে যেতে চাইলে অসুবিধে নেই।

বললাম, হঠাৎ আজ বেড়াতে যাবার ইচ্ছে হল কেন?

ঝিনুক বলল, অনেক দিন কোথাও বেরুইনি। আজ একটু বেড়াতে ইচ্ছে করছে। ফেরবার পথে মার সঙ্গেও একটু দেখা করে আসব।

কথাটা মিথ্যে নয়। পিসি, কুসুম থাকতে ঝিনুক তবু মাঝে মধ্যেই আমাদের বাড়ি যেত। ইদানীং ওকে অনেক দিন কোথাও বেরুতে দেখিনি।

বললাম, তামাইয়ের ধারেই?

ঝিনুক বলল, শালবনে যদি যেতে চাও।

আমার বুকটা ধক করে উঠল। কিন্তু ভবেনের সামনে না হেসে পারলাম না। বললাম, জান, এ দেশে তাত ফুটে গেছে?

–তাতে কী?

 –এখন সাপ বেরোয়। শালবনের তো কথাই নেই, তামাইয়ের ধারেও।

আমাকে বাধা দিয়ে, ঝিনুক বলে উঠল, কালো নাগেরা সব ফণা মেলে বসে আছে, গেলেই ছুবলে দেবে। আমি বুঝি শালঘেরির মেয়ে নই যে, ফাল্গুন মাস পড়তে না পড়তে সাপের উৎপাতের খবর তোমার কাছে জানতে হবে?

ভবেনের দিকে তাকালাম। সে বলল, বোস এবার।

 বললাম, যাবি নাকি তা হলে?

ভবেন চোখ বড় বড় করে বলল, আমি?

 ঝিনুক ভবেনের দিকে তাকাল। বলল, আপত্তি আছে?

ভবেন হেসে উঠে বলল, আপত্তি কীসের? বললেই যাই।

আমি ভবেনকে উল্লুক বলতে যাচ্ছিলাম, তার আগেই আনিদি বৈকালিক জলখাবার ও চা নিয়ে এল।

সূর্য ডুব দিয়েছে, আকাশে তার রক্তাভা লেগে রয়েছে এখনও। পুবের শালবনের আকাশের সীমা সীসার মতো দেখাচ্ছে। অনেক দিনের পুরনো পিতলের পাত্রকে মাজলেও যেমন তার মালিন্য ছাড়ে না, চাঁদকে দেখাচ্ছে সেরকম। পাখিরা শব্দ করছে কম, উড়ে চলেছে বেশি। বাসার কাছে গিয়ে দল বেঁধে সবাই একবার হেঁকে ডেকে বিদায় নেবে।

যেতে যেতে আমি আর ভবেন ছেলেবেলার কথা বলছিলাম। ঝিনুক চুপ করে হয়তো শুনছিল কিন্তু ওর দৃষ্টি ছিল তামাইয়ের ওপারে। ওপারে, শালবনের পাশের রাস্তা দিয়ে সারি বেঁধে কয়েকটা মোষের গাড়ি চলেছে শালের গুঁড়ি বোঝাই করে। মোষের গলায় ঘন্টা বাজছে টিং টিং শব্দে।

ভবেনকে দেখে আমার মনটা খুশি হয়ে উঠছিল। ও খুব হাসছে। কথা বলছে কিন্তু ঝিনুকের দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না। ভবেন অনেক দিন এরকম বেড়াতে আসতে চেয়েছে। ঝিনুকের আপত্তিতেই তা হয়ে ওঠেনি।

আমরা সেই বড় পাথরটার কাছে এসে থামলাম। আমি আর ভবেন। ঝিনুক আরও এগিয়ে যেতে লাগল। এগিয়ে একেবারে ঢালুর সীমানায় গিয়ে দাঁড়াল।

এবার ফাল্গুনেও তামাইয়ে বেশ জল। কার্তিকে বাদলা গেল, তাই বসন্তকালেও তামাইয়ের শুকোতে গড়িমসি। প্রায় হাঁটু ডোবানো গভীর। অন্যান্য বছর এ সময়ে পায়ের পাতা ডোবে। জলের কলকল শব্দ বাজছে। যেন তামাই কোনও এক অজানা কাল থেকে একটা কাহিনী বলতে শুরু করেছিল, কোনওদিন তার শেষ হয় না।

ভবেন বলল, এখানে এলে তোর কী মনে হয় টোপন?

–ছেলেবেলার কথা ভীষণ মনে হয়।

 ভবেন নিচু উচ্ছ্বসিত সুরে বলে উঠল, আমার সমস্ত জীবনটাই যেন পাক খেয়ে ওঠে। আশ্চর্য, আমি যেন কী রকম নিশিপাওয়া হয়ে যাই টোপন। মনে হয়, এখানে কোথায় কী ভাবে যেন ঘোরাফেরা করেছি, ঠিক মনে করতে পারি না।

আমি বিস্মিত হয়ে ভবেনের দিকে তাকালাম। ভবেন সামনের দিকে চেয়ে রয়েছে। ওর মুখে সেই নিশিঘোরেরই ছায়া যেন। আমি ওকে ঠিক বুঝতে পারলাম না। কেবল চকিতে এক বার সেই কথাগুলি, শালঘেরিতে ফিরে আসার পরের দিনের সকালবেলায় ভবেনের কথাগুলি বিদ্যুতের মতো ঝিলিক খেয়ে গেল। ভবেনের সেই কথা, আমার আর ঝিনুকের সঙ্গে ও তামাইয়ের ধারে, ওপারে শালবনে অনেক দিন গেছে। সেই কথা, ঝিনুকের প্রতি আমার ভালবাসা দেখে কবে যেন ওরও একদিন ঝিনুককে ভালবাসতে সাধ গেল, আমার মতোই ঝিনুকের হাত ধরতে ইচ্ছে হল, চাইল, ঝিনুকও ওকে অসংকোচে গ্রহণ করুক। সেই সব দিনগুলিই কি আবর্তিত হয়ে উঠছে এখন ভবেনের মনে? সেই একই নিশিঘোর কি ওকে আচ্ছন্ন করে, তামাইয়ের ধারে এলে? তাই কি তিনজনের একসঙ্গে আসার কথা অনেক দিন, অনেক বার বলেছে ভবেন?

ভবেন যেন আমার কাছে কোনও জবাবের প্রত্যাশা করল না। মুখের দিকে তাকিয়ে এক বার হাসল। আবার বলে উঠল, একদিক থেকে ভাবতে গেলে জীবনটা খুবই সহজ, আর একদিক থেকে এত অসহজ, তার কোনও কূলকিনারা পাই না। আচ্ছা, এ দুয়ের মাঝখানে, মধ্যপন্থা বলে কিছু নেই?

আমি যে কী জবাব দেব ভেবে পেলাম না। কেবল একবার মনে হল, ভবেনের নিশ্চয় কোনও কষ্ট হচ্ছে। তাকে ভিতর থেকে তাড়না করছে। সেই তাড়নাতেই সে কথা বলে চলেছে। আমি শুধু ওর কাঁধে একটা হাত তুলে দিলাম।

ভবেন নিজেই আবার বলল, আমি পাগলের মতন বকছি। আমার বকতে ইচ্ছে করছে টোপন।

 আমি বললাম, বেশ তো, বক।

ভবেন হেসে চুপ করল। তারপর হঠাৎ ডেকে উঠল, ঝিনুক!

ঝিনুক ফিরে তাকাল।

ভবেন বলল, এসো, আমরা বসি।

ঝিনুক চকিতে এক বার আমার দিকে তাকাল। ধীর পায়ে এগিয়ে এল। এসে, পাথরে হেলান দিয়ে, জোড়াসন করে বসল। ভবেন তার পাশে বসে, আমাকে আর এক পাশে দেখিয়ে বলল, বস টোপন।

আমি বসলাম।

ছায়া ঘনিয়ে এল। একটা অস্পষ্টতায় ঢাকা পড়ে যেতে লাগল সর্বচরাচর। পশ্চিম আকাশের রক্তাভাও একটু একটু করে কালো হয়ে উঠল। খুব ধীরে ধীরে, শালবনের মাথায়, চাঁদ উজ্জ্বল হতে লাগল। এখনও তার আলো এসে যেন পৃথিবীকে স্পর্শ করেনি। অথচ গাঢ় অন্ধকার নেই।

আমরা তিনজনেই চুপচাপ, তাই হয়তো বেশি স্তব্ধ মনে হচ্ছিল। কেবল ঝি ঝির ডাক শোনা যাচ্ছে। তামাইয়ের কলকলানি নৈঃশব্দেরই একটা সুর যেন। ভবেন হঠাৎ একেবারে নীরব হয়ে গেছে। আমি ওর মুখ ঠিক দেখতে পাচ্ছিনে। ঝিনুকের চুলের হালকা গন্ধ আমার নাকে এসে লাগছে। এবং তা যেন একটা তীব্র কষ্টের মতো আমার বুকে বিঁধছে, নিশ্বাস আটকাচ্ছে।

এমন সময় আমাদের মাথার ওপর দিয়ে, একটা পাখি, পাখার মন্থর ঢেউয়ে, ধীরে ধীরে উড়ে গেল। শালবনের দিক থেকে এসে, গ্রামের দিকে গেল। আমি মুখ তুলে, পাখির কালো অবয়বটা দেখলাম। মুখ নামাতে গিয়ে দেখলাম, ঝিনুক আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ভবেন সামনে, তামাইয়ের দিকে।

একটা ছায়ামূর্তি সামনের মাঠে ভেসে উঠল। সে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসতে লাগল। আমার কাছে সবই যেন কেমন রহস্যময় কুহেলি বলে বোধ হতে লাগল। ছায়ামূর্তি আরও এগিয়ে এল। একেবারে কাছে আসতে চিনতে পারলাম করিক টুডু। জিজ্ঞেস করলাম, করিক নাকি?

–এগে। তুমার ঘরকে গেলাম, মাটো বুইললে, মাস্টেরবাবুর ঘরকে যেইছে। তো সিখান থিক্যা…।

ওর কথা শেষ হবার আগেই আমি উঠে দাঁড়ালাম। ভবেনকে বললাম, তোরা একটু বস, আমি আসছি ওর সঙ্গে কথা বলে।

ভবেন ঘাড় নেড়ে বলল, আচ্ছা।

ঝিনুকের মাথায় একটুও ঘোমটা নেই, সে যেন অপলক চোখে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে। ছায়া অস্পষ্টতায়, আমি ঠিক ওর চোখের ভাব বুঝতে পারলাম না। করিকের সঙ্গে এগিয়ে গেলাম।

করিক চলতে চলতে বলল, তুমার উঠবার দরকার ছিল নাই ঠাকুর। বুলতে আসছিলাম কী যে, যতখানি দাগ মেরে দিয়েছিলে, দুদিনের কাজের জন্যে, সবটা হয়ে যেইছে। তার মধ্যে।

আমি বাধা দিয়ে বললাম, কাল সকালে আমি গিয়ে বাকিটা দেগে দিয়ে আসব। তোমাদের এ দুদিনের রোজটা কি আজ রাত্রেই চাই, নাকি কাল সকালে দিলেই হবে?

করিক বলল, সে কাল বিহানেই হবে, আর একটো কথা কী, তুমি কি একবার সিখানে যাবে? একটা কী যেন বার হয়েছে মনে লেয়।

আমার বুকটা ধক করে উঠল। বের হয়েছে? কিছু জিজ্ঞেস করতে যেন সহসা স্বর ফুটল না। কারণ বিশ্বাস করতেই পারিনে আর। তাই, ও বিষয়টা উল্লেখ না করে বললাম, সেখানে এখন বাতি পাব কোথায়? আমি তো টর্চ নিয়ে বেরুইনি।

করিক বলল, সি আমাদিগের ঘর থিকা একটো কাঠ জ্বালিয়ে লিয়ে গেলেই হবে। উই তুমার গে নাবালের দিকটোয়–

আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, নাবালের দিকটায়?

করিক বলল, হ।

কী সেটা? কী মনে হয়?

 –হবেক গা তুমার একটা পাতর টাতর মতন কিছু।

–পাথর?

সমস্ত উত্তেজনা মুহূর্তে ছড়িয়ে গেল। প্রাকৃতিক কারণেই এখানকার ভূমিস্তরের নীচে কোথাও পাথর পাওয়াটা মোটেই আশ্চর্যের নয়। বরং খুবই স্বাভাবিক।

করিক বলল, আমি উ চাটাং মতন পাতা পাথরটার গায়ে কারুকে আর কোদাল মারতে দেই নাই। উয়ার গায়ে আর একটো পাতর, তুমি দেখলে পরে বুঝবে।

আমি দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। আর কোনও উৎসাহ ছিল না যাবার। বললাম, ঠিক আছে, আমি কাল সকালেই যাব, গিয়ে দেখব, কী আছে। টাকাও কালই পাবে।

করিক বলল, টাকা ক্যানে, তুমি ধান দিলেই তো চুকে যায়।

তা হয়তো চোকে। কিন্তু টাকার হিসেবে ধান মাপজোক করা, মরাই ভোলা একটা ঝামেলা। বললাম, টাকাই দেব। এখন আর ধানের হাঙ্গামা করতে পারব না।

–আচ্ছা, তবে তাই।

 করিক চলে গেল। আমি কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার চারপাশে কয়েকটা বিচ্ছিন্ন শাল মহুয়ার গাছ। বেশ খানিকটা চলে এসেছি। তামাইয়ের একটা বাঁকে চলে আসায় ভবেন, ঝিনুক আমার আড়ালে চলে গেছে। যেখানে মাটি খোঁড়া হচ্ছে, তার দূরত্ব প্রায় এক মাইল। করিকদের গ্রামটা তার কাছেই।

কিন্তু আমার মনে সেই দুর্বোধ, কিছু ঠিক করতে না পারা ভাবটা চেপে এসেছে। দুদিন থেকেই এই অস্থিরতার ছায়ায় আমি আবিষ্ট হয়েছিলাম। তিনজনে মিলে এই তামাইয়ের ধারে আসার কথা শোনা থেকে, প্রতিটি মুহূর্তে অসহায়তা, একটা ব্যর্থতার, অর্থহীনতার যাতনা তীব্র হয়ে উঠেছে ভিতরে ভিতরে। এক বার ভাবলাম, এখান থেকেই কি বাড়ি ফিরে যাব? এই আসার মধ্যে কোনও আনন্দ বোধ করছিনে। বরং একটা আড়ষ্টতার কষ্ট ও এক অজানা উত্তেজনার বিচিত্র সংমিশ্রণ ঘটছে।

ভূতগ্রস্তের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। আমাকে ঘিরে গাছের ছায়াগুলি স্পষ্ট হয়ে উঠল, জ্যোৎস্না উজ্জ্বল হল, তামাইয়ের গলায় একটানা উপকথার কলকলানি আর ঝিঁঝির ঝংকার নিবিড় হয়ে এল। আমি মনে মনে বারবার বলতে লাগলাম, এ অবস্থা ঠিক নয়, একটা গতি চাই, সহজ স্বচ্ছন্দ একটা গতি, যা আমাকে সবরকম অহৈতুকী থেকে মুক্তি দেবে, অস্পষ্টতা থেকে স্পষ্টতায়, অস্থিরতা থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেবে। আমি যাই, আমি ওদের কাছেই ফিরে যাই। আমি অস্বাভাবিক কিছু করতে পারিনে।

ফিরে চললাম। মোড় ফিরতেই, দুরে যেন আমি একটা ছায়া দেখতে পেলাম। কাছে এগিয়ে আসছে না, দ্রুতগামী ছায়াটা গ্রামের দিকে চলে যাচ্ছে। পাথরটার বিস্তৃতাকৃতি আমি এখন দেখতে পাচ্ছি, যে পাথরটার আড়ালে ওরা দুজন বসে আছে। দুরের ছায়াটা দেখতে দেখতে অদৃশ্য হয়ে গেল। পাথরটার কাছাকাছি এসে আমার পা দুটি আর একবার থমকে গেল। কোনও শব্দ নেই। ফিরে চলে যাব? স্বাভাবিক ভাবে নিশ্বাস ফেলতে পর্যন্ত আমার দ্বিধা হল, কিন্তু স্তব্ধ কেন? ওরা দুজনেই কি তা হলে অন্য কোথাও চলে গেল? না কি এই নির্জন নিবিড়তায় দুজনে বাঁধা পড়ে গেছে। মনে হতেই একটা তীক্ষ্ণ কষ্টে বিদ্ধ করল আমাকে। অন্যদিক থেকে তৎক্ষণাৎ কে যেন আমারই ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের একটি রেখা এঁকে দিল। ঈর্ষা! ঈর্ষা? তবে যে আমি মহতের মতো, অপরের মধ্যেই শুধু জীবধর্মের লক্ষণ আবিষ্কার করি?

আমি তাড়াতাড়ি ডেকে উঠলাম, কই রে, ভব কোনও সাড়াশব্দ পাচ্ছি না যে তোদের?

বলতে বলতে পাথরটাকে প্রদক্ষিণ করে, সামনে গিয়ে দেখলাম, পাথরে হেলান দিয়ে ঝিনুক একলা। ভবেন সেখানে নেই। জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় গেল ও?

আরও এক পা কাছে গেলাম। পাথরটার গায়ে ঝিনুকও যেন পাথরের মতোই নিশ্চল, নিশ্চুপ। তন্মুহুর্তেই লক্ষ পড়ল, ঝিনুক একেবারেই অবিন্যস্ত। ওর লাল শাড়ির আঁচল ধুলায় লুটানো। জামাটা কাঁধের কাছ থেকে ছিঁড়েই, ডানার কাছে নেমে গেছে। কয়েক গুছি চুল কপালে এসে পড়েছে, চুল খুলে গেছে। আলতা পরা পা দুইটি সামনে ছড়ানো। শাড়ি খানিকটা উঠে গিয়ে, সাদা শায়া দেখা যাচ্ছে। পায়ের স্যান্ডেল দুটো, দু দিকে ছিটকে গেছে। ঝিনুকের মুখ ঈষৎ পাশ ফেরানো, পাথরে কপাল ঠেকানো বলেই ওর ভেঙে পড়া খোঁপাটা আমি দেখতে পেলাম, এবং ও যে দ্রুত নিশ্বাসে প্রায় কাঁপছে, তা টের পেলাম। চাঁদের আলোতেও আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম, ঝিনুকের হাতে এবং গালের কাছে। ধুলো লেগে রয়েছে। একটা বিধ্বস্ত অবস্থা। যেন একটা ভয়ংকর কিছু এইমাত্র ঘটে গেছে।

আমি তৎক্ষণাৎ জানু পেতে বসে উৎকণ্ঠিত বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে ঝিনুক? ভব কোথায়?

ঝিনুক কোনও কথা বলল না। একভাবেই রইল। কিন্তু আমি অস্থির হয়ে উঠলাম। প্রায় চিৎকার করে ডেকে উঠলাম, ঝিনুক, ঝিনুক কী হয়েছে?

ঝিনুকের রুদ্ধ চুপিচুপি গলা শোনা গেল, আস্তে! আস্তে।

বলতে বলতে ওর একটা হাত মাটি ঘষটে ঘষটে আমার দিকে এগিয়ে আসতে চাইল। অবুঝ ভয়ে ও উত্তেজনায়, আমার নিজেকে স্থির রাখা অসম্ভব হয়ে উঠল। আমি ওর হাতটা চেপে ধরলাম। ঝিনুকের হাত ঠাণ্ডা, কিন্তু মূর্ছা রুগির মতো শক্তিতে আমার হাতটাও ধরল ও। কয়েক মুহূর্ত এমনিভাবেই কাটল। আমি চারপাশে একবার চোখ ফিরিয়ে দেখলাম। আবার ঝিনুকের হাতে ঝাঁকুনি দিয়ে ডাকলাম, ঝিনুক!

ঝিনুক ফিসফিস করে বলল, বলছি, বলছি। চুপ করে একটু বসো।

কী আশ্চর্য! এ অবস্থায় মানুষ কেমন করে শান্ত থাকবে বুঝতে পারিনে। তবু ঝিনুকের সমস্ত ভঙ্গি ও কথার মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল, যাতে আমার শান্ত না হয়ে উপায় ছিল না। এবং এটাও অনুভব করলাম, কোনও বাইরের বিপদ এসে এখানে হানা দেয়নি। তার থেকেও ভয়াবহ, ভিতরের কোনও বিপদ, একটা কিছু সর্বনাশ ঘটিয়াছে, কিন্তু সেটা কী? কী হতে পারে? ভবেন নিশ্চয় ঝিনুককে প্রহারে আঘাতে নির্জীব করে ফেলে রেখে যায়নি?

ঝিনুকের অস্ফুট গলা শোনা গেল, ও যে এরকম করবে, আমি বুঝতে পারিনি। লোকটা যেন কেমন হয়ে গেল! কেমন হয়ে গেল!…

বলতে বলতে ঝিনুকের গলা ডুবে গেল। ভাবলাম ঝিনুক কাঁদছে।

কিন্তু না, ওর দু চোখ অপলক, বিস্ময়ে, ভয়ে, উত্তেজনায় স্থির।

আমি বললাম, কী হয়েছে, কী হয়েছে?

ঝিনুক যেন আপন মনেই কিছু অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল, কিছুদিন ধরে ও যেন কী রকম করছিল, সময় পেলে সুযোগ পেলেই… কিন্তু..এতটা…এতটা?

কথা শেষ করতে পারল না। আমার বুকের ভিতরে সেই গুরু গুরু ধ্বনি বেজে উঠল। ভীষণ বেগে কী একটা ভয়ংকর সংবাদ যেন সে বয়ে নিয়ে আসছে। আমি সমস্ত দেহমন শক্ত করে, উৎকর্ণ হয়ে রইলাম।

ঝিনুক বলল, তুমি করিকের সঙ্গে চলে গেলে। ভবেনদা (বিয়ের আগে এই নামেই ডাকত) হঠাৎ আমার একটা হাত ধরল, ধরে কাছে টানল। আমার কেমন রাগ হয়ে গেল, আমি হাত টেনে নিতে গেলাম। কিছুদিন ধরেই, বাড়িতেও সে আমার সঙ্গে এ রকম করছিল। এই জোর করার প্রবৃত্তি তার আগে কখনও দেখিনি। হঠাৎ যেন কী হয়েছে, এত বছর বাদে সে যেন জোর করেই সব আদায় করতে চাইছে।…হাত টেনে নিতে গেলাম, ছাড়ল না। জোরে টেনে, গায়ের কাছে নিয়ে, আমাকে খ্যাপা পাগলের মতন আদর করতে লাগল। আমার গায়ের মধ্যে কী রকম করে উঠল। আমি হাত পা ছুঁড়ে, উঠতে চেষ্টা করলাম। রাগে আর ঘেন্নায় আমি অন্ধ হয়ে বললাম। যা তা বলতে গেলাম। কিন্তু ও কী রকম ভয়ংকর হয়ে গেল। আমার জামা টেনে, শাড়ি টেনে, মাটিতে ফেলে দিয়ে…উ!…

ঝিনুকের গলা যেন কেউ চেপে ধরল। বলতে বলতে ও আবার হাঁপাচ্ছে। আর আমি ভয়ে, বিস্ময়ে, উত্তেজনায়, উদ্বেল আবেগে মনে মনে বলতে লাগলাম, শালঘেরির মহাকাল! একী আশ্চর্য ঘটনা তুমি ঘটালে! একী ভয়ংকর অন্ধকারকে তুমি এক লহমায় আলোর বৃত্তে ছুঁড়ে দিলে।

ঝিনুক আবার বলল, আর ও বারে বারে কী সব বলছিল। সে সব কথা আমার কানে যাচ্ছিল না। আমি তখন এত মরিয়া হয়ে উঠেছি, যেন ওকে ছিঁড়ে ফেলব। ওর জামাটা এত জোরে টানলাম, ফাঁস করে সেটা ছিঁড়ে গেল। তারপরে, হঠাৎ ও উঠে দাঁড়াল। কী যেন বিড়বিড় করে বকল। আবার ঝুপ করে বসে আমার পায়ে হাত দিল, বলে উঠল, ঝিনুক কী করে ফেললাম! কী করে ফেললাম! টোপন এসে পড়বে, আমি পালাই, হে ভগবান, পালাই।… বলে দৌড়ে চলে গেল।

আমি যেন ঝিনুকের গলা আর ঠিক শুনতে পাচ্ছিলাম না। মনে মনে তেমনি বলতে লাগলাম, সত্যকে কী নিষ্ঠুর রূপে দেখালে! তোমার মহালয়ের ভেরি কী আচমকা বাজিয়ে দিলে। কী মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা তুমি দান করলে। অথচ ওরা বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী! তোমার অনিত্যের খেলায়, নিত্যকালের নির্দেশ কি এমনি করেই দেখা দেয়।

পরমুহূর্তেই ভবেনের জন্যে আমার মন শঙ্কায় ভরে উঠল। কিন্তু ঝিনুক আর একটা হাত তখুনি আমার হাতের ওপর তুলে দিল। বলল, এ আমি মানতে পারব না টোপনদা। জোর করা সইব না। তুমি আমাকে মায়ের কাছে পৌঁছে দাও।…  

ঝিনুক ওর মাথাটা প্রায় আমার বুকের কাছে ঘনিয়ে নিয়ে এল। আমি ঝিনুকের কাঁধে হাত দিয়ে ওকে সোজা করলাম। আমি নয়, কে যেন আমার ভিতর থেকে দৃঢ় স্বরে বলল, ঝিনুক, ঠিক হয়ে নাও, তাড়াতাড়ি ওঠো।

ঝিনুক আমার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। আঁচল তুলে, মুখ মুছে, বিন্যস্ত করল। আমার ভিতরে তখন একটা ভয়ংকর কাঁপন লেগেছে যেন। বললাম, তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে আমার সঙ্গে চলো, আর কথা বলবার সময় নেই।

ঝিনুক বলল, কোথায় যাব?

–তোমাদের বাড়িতে।

 –কোন বাড়িতে?

–তোমার শ্বশুরবাড়িতে। তাড়াতাড়ি তাড়াতাড়ি, আর একটুও সময় নেই। তোমাকে পৌঁছিয়ে আমাকে যেতে হবে।

ঝিনুকের যেন শ্বাস রুদ্ধ হয়ে এল। বলল, কোথায় যাবে?

ভবকে খুঁজতে। এসো তাড়াতাড়ি।

 ঝিনুক বলল, মার কাছে?

ওর কথা শেষ করতে দিলাম না। হাত ধরে টেনে বললাম, কোনও কথা নয়, তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো, নইলে আমাকে একলাই চলে যেতে হবে।

ঝিনুক যেন আশাহত যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে বলে উঠল, কেন, কেন টোপনদা, আমাকে আবার কেন তুমি ও বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছ টোপনদা।

ঝিনুক জলভরা চোখ নিয়ে আমার দিকে ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাকাল। আমি মুখ ফিরিয়ে ওর হাত ধরে চলতে আরম্ভ করলাম। বললাম, পথটা চুপ করে চলে এসো।

জানি ঝিনুকের কষ্ট হচ্ছে। আমি প্রায় ওকে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছি। বাড়িতে ঢোকবার আগে ওর হাত ছেড়ে দিলাম। ইন্দির কোথায় কে জানে। আনিদি নিশ্চয় রান্নাঘরে। ওপরে চলে গেলাম আমরা। ঘরের মধ্যে আলোর সামনে ঝিনুককে যখন দাঁড় করিয়ে দিলাম, তখন জলের দাগ ওর চোখে। কিন্তু বিস্ময় ও উৎকণ্ঠার শেষ নেই। আলোর সামনে এসে আমি স্পষ্ট দেখলাম, পথে আসতে আসতেই মূঢ় বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে।

মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এবার বললাম আমি, আর কখনও এত অবাক হয়েছ?

 ঝিনুক আমার প্রশ্নে কেঁপে উঠে বলল, না।

বললাম, অথচ ভবেনের কোনও দোষ নেই।

 আচ্ছন্নতার মধ্যেই ঝিনুকের ভ্রু কেঁপে গেল। বলল, দোষ নেই?

না। কেন, কীসের দোষ ঝিনুক? ভবেন তোমার বিবাহিত স্বামী, তোমাকে ভালবাসে, এত ভালবাসে যে সব দাবি বিসর্জন দিয়ে বছরের পর বছর তোমার মুখের দিকে চেয়ে রয়েছে, এটা কি দোষ? ছেলেখেলায় তুমিই মেতেছ। তারই ফল এটা।

–ছেলেখেলা?

নয়? সুস্থ সবল স্বাভাবিক একটা লোককে কোথায় টেনে নামিয়েছ, বুঝতে পারছ না?

আমি উত্তেজনায় শুধু নয়, একটা কান্নার আবেগেও যেন কাঁপছিলাম। কান্নাটা যে কীসের, তা বুঝতে পারছিলাম না।

ঝিনুক বলল, আমি টেনে নামিয়েছি?

আমি নিচু রুদ্ধস্বরে বললাম, হ্যাঁ, তুমি! তুমি তুমি তুমি! কেন ভবকে মানবে না, কেন সইবে না? কীসের যুক্তি তোমার?

ঝিনুক ঠোঁট নাড়তে লাগল। আমার কথাগুলিই পুনরাবৃত্তি করল ও। তারপর হঠাৎ মূছারুগির মতো ঘাড় দুলিয়ে বলে উঠল, না না আমি আর পারব না, পারব না টোপনদা। তুমি তো–

–পারতে হবে।

আমি চিৎকার করে উঠলাম। ঝিনুক চমকে, চোখ মেলে আমার দিকে তাকাল। এও বোধ হয় ওর নতুন অভিজ্ঞতা। আমাকে কখনও এত জোরে তীব্র চিৎকার করে উঠতে শোনেনি।

আমি গলার স্বর নামিয়ে বললাম, এই আমার শেষ কথা তোমাকে! এর পরেও যার চোখ খোলে না, তাকে আমি ব্যাধিগ্রস্ত মনে করি। এ তোমার এক আত্মসুখের ব্যাধি। কী অধিকার, কোন অধিকারে বলতে পার, এ অসম্ভবকে তুমি জইয়ে রেখে যাবে? তা হবে না।

আবার আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল ঝিনুক। উচ্চারণ করল, আত্মসুখ? ব্যাধি? কীসের আত্মসুখ!

–নিজের মনকে জিজ্ঞেস করো ঝিনুক। নিজের স্বামীর কাছে সঁপে না দেওয়াতেই, তোমার মনের সুখ ও শান্তি, এটাকেই তুমি তোমার শ্রেষ্ঠ কাজ, অপবিত্রতার বাধা বলে মনে করছ। কিন্তু এটা ভুল, মস্ত বড় ভুল। ওটা সুখশান্তি কর্তব্য পবিত্রতা, কিছুই নয়। এটা এক ধরনের পরপীড়ন, আত্মপীড়ন, আর–আর সকলের বিশ্বাসের মর্যাদা হানিকর।

শেষের কথাটা বলতে গিয়ে আমার গলার স্বর যেন ভেঙে বিকৃত হয়ে উঠল প্রায়।

 ঝিনুক উচ্চারণ করে উঠল, মর্যাদা হানিকর।

আমার গলার তেজ গেল। আমি প্রায় ফিসফিস স্বরে বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ ঝিনুক। ভব তোমাকে ভালবাসে বলে, কত দূর নেমেছ। ঝিনুক, আমি…আমিও কত নীচে নেমে গেছি। আজকের ঘটনায়, আমার নিজেকে সবথেকে হীন মনে হচ্ছে।

ঝিনুক এক মুহূর্ত কথা বলতে পারল না। কেবল ওর চোখ বেয়ে জল পড়ল। একটু পরে রুদ্ধস্বরে বলল, কিন্তু টোপনদা। টোপনদা, আমার কি তবে মর্যাদা বলে কিছু নেই? আমি কি তবে একটা–?

বাধা দিয়ে বলে উঠলাম, চুপ। চুপ ঝিনুক, তুমি যে মেয়েদের কথা বলতে যাচ্ছ, তাদের সমস্যা সামাজিক, তাদের দেহ বিক্রির কষ্টের সঙ্গে তোমার কোনও মিল নেই। তোমার সমস্যা একান্ত মানসিক। তার জন্যে যে সমাধান বেছে নিয়েছ, সেটা সতীধর্মও নয়, ভালবাসার মর্যাদাও তাতে বাড়েনা। মনের কষ্টের সঙ্গে সামঞ্জস্য ছাড়া আর কিছু করার নেই। কিন্তু আর দেরি করব না, আমি চললাম।

আমি ফিরে দাঁড়াতেই ঝিনুক ছিটকে এগিয়ে এসে, আর্তস্বরে ডাকল। দাঁড়াও, একটু দাঁড়াও।

–আর সময় নেই ঝিনুক। ভবকে আমার এখুনি খুঁজে দেখতে হবে।

ঝিনুক দুহাত দিয়ে শক্ত করে আমার জামা চেপে ধরল। বলল, একটু, একটুখানি টোপনদা, যা সব বললে এই কি তোমার মনের কথা?

–হ্যাঁ, এই আমার মন বলল, প্রাণ বলো, বিশ্বাস বলো, সবকিছুরই কথা।

ঝিনুক আমারই জামা দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরে কয়েক মুহূর্ত কান্নার বেগে নিঃশব্দে কাঁপতে লাগল। তারপরে মুখ তুলে, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, তবে তোমার জন্যে কী রাখব আমি? তোমাকে কী দেব?

 চোখের জলে ভেসে যাওয়া, চিরকালের একটি মেয়ে, আমার ভিতরের সকল দুর্বল দরজাগুলিকে আঘাত করে উঠল। বললাম, কী রাখনি আমার জন্যে। আর কী দেবে? যা তোমার দেবার, সেই তো দিয়েছ।

পেয়েছ?

 –পেয়েছি বইকী।

–তবে আর একটা কথা বলল। ভবেনদাকে খুঁজে পাবার পর কী হবে? তুমি চলে যাবে শালঘেরি থেকে?

হেসে উঠে আমি ঝিনুকের দিকে তাকালাম। এবার আমি ওর মাথায় একটা হাত রাখলাম। কিন্তু আমার গলার স্বর বন্ধ হয়ে এল। অস্ফুট স্বরেই বললাম, কোথায় যাব ঝিনুক? আমার সীমানার দাগ অনেকদিন পড়ে গেছে। তার বাইরে যাবার কোনও পথ আমার আর নেই।

ঝিনুক জানু পেতে বসে, আমাকে দুহাত দিয়ে ধরে, আমার হাঁটুর ওপরে মুখ চেপে রইল। তারপরে মেঝেয় উপুড় হয়ে পড়ল। হাত দুটি এলিয়ে পড়ল সামনে।

আমি ঝাপসা চোখে ঝিনুককে এক বার দেখে, পেছন ফিরে বেরিয়ে এলাম।

.

একাদশীর চাঁদ তখন আকাশের অনেকখানি ওপরে উঠে এসেছে। কিন্তু কোথায় খুঁজব ভবেনকে? আমার কেবলি মনে হচ্ছিল, ভবেনকে আমি জীবিত দেখতে পাব তো? মনে হতেই শিউরে উঠেছিলাম। ওর মনে যতখানি শক্তি ছিল, তার শেষ সীমায় যে ও পোঁছেছে আজ। এতক্ষণ ও নিজের সঙ্গে কীভাবে যুঝে চলেছে।

যে সব ইস্কুলমাস্টার বন্ধুর বাড়িতে ভবেনের যাতায়াত আছে, সব বাড়িতেই গেলাম। পেলাম না। তাতে প্রায় শালঘেরির সব পাড়াগুলিই ঘোরা হয়ে গেল। বাজারের দিকে দোকানপাটেও দেখলাম। শেষ পর্যন্ত আমাদের বাড়িও খোঁজ করলাম। কোথাও নেই। আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আবার ভবেনদের পাড়ার দিকেই পা বাড়িয়েছিলাম। সামনেই পড়ে গেল তারক। তাকেও জিজ্ঞেস করলাম, ভবেনকে সে দেখেছে কি না!

তারক খুব সুস্থ ছিল না। রুগ্ন শরীরে তার মদের মাত্রা হয়তো বেশিই হয়েছিল। কোনও রকমে মাথা তুলে বলল, টোয়েনদা? ভয়েনদার কথা–? হু…তা হ্যাঁ দেখেছি বইকী! পাকা রাস্তার ধারেই তো বসেছিলাম। ভয়েনদাকে যেন ইস্টিশানের দিকে যেতে দেখলাম।

আমি আর্তস্বরে উচ্চারণ করলাম, ইস্টিশান?

–হ্যাঁ, তাই। খুব যেন পা চালিয়ে গেল।

ও।

পরমুহূর্তেই সময়ের হিসেব করলাম। না কোনও গাড়ি তো এর মধ্যে যায়নি? একমাত্র মালগাড়ি যদি অতিক্রম করে। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল এক মুহূর্ত যেন চলচ্ছক্তিরহিত হয়ে গেলাম।

তারক বলে উঠল, বুইলেন টোয়োনদা, আমার মনে হয়, কুসির আত্মাটা বোধ হয়।

আমি চমকে উঠলাম, কে?

 তারক বলল, কুসুম, কুসুম।

সহসা যেন আমার সংবিৎ ফিরল। আমি এক বার উচ্চারণ করলাম, কুসুম। কিন্তু আমি অন্য কথা চিন্তা করছিলাম। ছুটে অঘোর জ্যাঠার বাড়ির দিকে গেলাম। কারণ, তাঁর বাড়িতেই, লাইটসহ সাইকেল আছে। গিয়ে দেখলাম, অঘোর জ্যাঠা নেই। সাইকেলটা চেয়ে নিয়ে ছুট দিলাম।

কী ভাবছি কিছু জানিনে। শুধু উৎকর্ণ হয়ে আছি একটা শব্দের আশঙ্কায়। আর কেবলি মনে হচ্ছে, যথেষ্ট দ্রুত যেতে পারছিনে। সাইকেল নিয়ে যখন স্টেশনে পা দিলাম, তখন সমস্ত স্টেশনটা যেন শ্মশানের মতো স্তব্ধ। বাইরে কোথাও কোনও বাতি নেই। কিন্তু চাঁদের আলোয় সবই দেখা যাচ্ছে। মানুষের চিহ্নও নেই। স্টেশনের ঘরে একটু আলোর ইশারা মাত্র। কাছে গিয়ে দেখলাম, ঘর বন্ধ। জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম। ভিতরে কমানো আলো। বচন শুয়ে আছে, কিন্তু ঘুমোয়নি। আমার সাড়া পেতেই জিজ্ঞেস করল, কে? এখন কুন গাড়ি নাই।

আমি বললাম, বচন, আমি টোপন, শালঘেরির টোপন।

বচন তাড়াতাড়ি উঠে বসল। বলল, অ, টোপনঠাকুর।

 বলে হেসে উঠল। উঠে দরজা খুলে দিয়ে বলল, তাই তো বুলি, জোড়ের পায়রা, একলা ক্যানে গ। ভবঠাকুর এই তো একটু আগে এল।

এসেছে? কোথায়?

ক্যানে, আমাদিগের পাগলা মাস্টারের ঘরকে গেল যে। তুমিও যাও।

স্টেশনমাস্টার বিজনবাবুর কোয়ার্টারে গেছে ভবেন? সাইকেলটা হাত থেকে প্রায় খুলে পড়ছিল। বললাম, সাইকেলটা ধরো, বচন, ঘুরে আসি।

বচন সাইকেল ধরে হেসে বলল, যাও যাও। পাগলা টাটুরা অখুন কবিতার বই পড় যেয়ে। আই বাপ? অত ছুটো নাই পড়ে হাত পা ভাঙবে যে!

স্টেশন থেকেই হাত কুড়ি দুরেই বিজনবাবুর কোয়ার্টার। আমি দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘর থেকে উঠানে আলো এসে পড়েছে, বিজনবাবুকে দেখতে পেলাম, উপুড় হয়ে, পিছন ফিরে কী ঘাঁটছেন, আর বলছেন, বচনের জন্যে আমার কিছুই ঠিক থাকে না। বসুন, না হয় শুয়েই পড়ুন। বইটা আমি ঠিক খুঁজে বার করব।

আমি এগিয়ে গিয়ে ঘরের ভিতরে উঁকি দিলাম। বিজনবাবুর খাঁটিয়ায় ভবেন দুহাতে মুখ ঢেকে বসে আছে। আমার গলা প্রায় বুজে আসছিল। ডেকে উঠলাম, ভব!

ভবেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো, মুখ থেকে হাত নামিয়ে, চমকে তাকাল। বিজনবাবুও ফিরলেন। বললেন, আপনিও এসে পড়েছেন, ভাল হয়েছে। ভবেনবাবু আজ দেহাভিসারের কবিতা শুনতে চাইছেন। তাই ভাবছি ডাউসেনের কবিতা শোনাই।

ভবেন স্থলিত গলায় কোনওরকমে বলল, তুই?

আমি কোনও জবাব না দিয়ে ভবেনের হাত ধরে টানলাম। ভবেনও আমার হাতটা আঁকড়ে ধরল। ফিসফিস করে বলল, কী করলাম, আমি টোপন!

বললাম, চুপ কর, বাইরে চল।

সহসা আমার মনে হল, ভবেনের একটা নৈতিক সমর্থনের প্রয়োজন এখন। আবার বললাম, কোনও অন্যায় করিসনি বাড়ি চল।

না না টোপন।

–শোন ভব, রাস্তায় যেতে যেতে কথা বলব।

বিজনবাবুর দিকে ফিরে বললাম, আজ যাচ্ছি বিজনবাবু। ডাউসেনের কবিতা আর একদিন এসে শুনব। স্টেশনে সাইকেলটা রইল। দুজনে যেতে পারব না। কাল একটু বচনকে দিয়ে পাঠিয়ে দেবেন দয়া করে।

বিজনবাবু অবাক হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, তা দেব। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক?

 বললাম, এমন কিছু নয়। পরে আসব, আজ যাচ্ছি।

শালঘেরির পথে পড়া পর্যন্ত কেউ আমরা একটা কথাও বলিনি। অনেকখানি চলে আসার পর ভবেন বলে উঠল, টোপন, তুই কি সব জানিস?

ভবেনের কাঁধে আমার হাত। বললাম, জানি।

ভবেন দ্রুত চাপা গলায় বলে উঠল, কেন এমন হল টোপন, কেন? আমি তো কখনও ভাবি নাই। বললাম, সেটাই স্বাভাবিক ভব। এর থেকেও ভয়ংকর কিছু ঘটেনি, সেটাই আমাদের সৌভাগ্য।

–এর থেকে ভয়ংকর আর কী ঘটতে পারত?

–অনেক কিছু। এ সংসারে অহরহই তো তা ঘটছে। মানুষ মানুষকে বিষ দিয়ে, গলা কেটে খুন পর্যন্ত করছে।

ভবেন সহসা কেঁপে উঠে আমার একটা হাত জোরে চেপে ধরল। কিন্তু কোনও কথা বলল না। হয়তো ভবেনেরই মনের কথা এটা। হয়তো আত্মহত্যার চিন্তা ওর মাথায় এসেছিল। কিংবা ঝিনুকের প্রাণসংহার।

আমি আবার বললাম, ভব, তুই আর আমি, দুজনকে ঘৃণা করে, বিবাদ করতে পারতাম, শত্রুর মতো লড়তে পারতাম।

ভবেন বলে উঠল, তা আমি পারতাম না টোপন। আমার বরাবর মনে হয়েছে, তোর কাছ থেকে যেন চুরি করেছি, তোর কাছে অপরাধ করেছি। তবু তোকে হারাইনি।

বলতে বলতে ওর গলার স্বর ডুবে যেতে লাগল। ডুবন্ত নিচু স্বরে বলল, টোপন, দুটো বছর ধরে দেখলাম, তুই টলিসন না, ভাঙিস না।

মনে মনে বললাম, কিন্তু ভিতরে ভিতরে অনেক ফেটেছে, চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে। তবু মাত্র এই একটা বিশ্বাস, অতি দুঃসহ যন্ত্রণাদায়ক এই একটি বিশ্বাসের মর্যাদায়ই তো বেঁচে আছি।

বললাম, চুপ কর। এ সব কথা আমরা অনেক বার বলাবলি করেছি।

ভবেন বলল, কিন্তু কেমন করে আমি ঝিনুকের কাছে ফিরে যাব?

বললাম, সংসারের আর দশজনের মতোই। হয়তো এর প্রয়োজন ছিল ভব। দ্যাখ, তুইও জানিস, আমিও জানি, শালঘেরিতে দু দণ্ডের জন্যে উপভোগ করার মতো মেয়ে আছে। তুই কোনওদিন সেখানে যাসনি। অথচ ক্ষুধা ছিল না, তা নয়। কিন্তু ক্ষুধা যখন প্রাণের শিকড়ে পাক দিয়ে রয়েছে, তখন তাকে ছাড়িয়ে যাওয়া যায় না। বোধ হয় এই একটা কারণে, মানুষ একেবারে পশু হয়ে যেতে পারে না। তবু ভয়, ঝিনুকের কাছে গিয়ে তোকে করজোড়ে ক্ষমা চাইতে হবে।

–ক্ষমা সে করবে কেন টোপন?

ক্ষমা কথাটা হয়তো ভুল বলছি। আসলে ওর ক্ষোভকে শান্ত করা। আর কেন ক্ষমা করবে! ভব, ঝিনুক যদি সংসারকে বিন্দুমাত্র চিনে থাকে, তা হলে ক্ষমা সে করবে। আর, আমি জানি, ঝিনুকের চোখের সামনে একটা কালো পরদা ছিল, সেটা আজ এক ধাক্কাতেই সরে গেছে। অনেক অন্ধকার এমনি করেই আচমকা কেটে যায়।

ভবেন চুপ করে রইল। দুজনেই আমরা চুপচাপ হাঁটতে লাগলাম। একাদশীর চাঁদ আমাদের মাথা ডিঙিয়ে যাবার উপক্রম করছে। দু পাশের মাঠই এখন প্রায় শূন্য। আগামী বর্ষার মুখ চেয়ে সে এখনও অপেক্ষা করবে, ফাটবে, চৌচির হবে, ধুলো ওড়াবে। মাঝে মাঝে মাঠের বুকে বিচিত্র খসখস শব্দ করে উঠছে। বন্য বরাহ বা খরগোশ হতে পারে। ইঁদুরের দল এখনও হয়তো বিচরণ করছে। দূরে লালঘেরির গ্রামের চিহ্ন অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

ভবেন হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। বলে উঠল, না, না টোপন, ঝিনুকের সামনে আমি যেতে পারব না।

ভবেন এক ভাবনাতেই নিমগ্ন ছিল। ওর হাত টেনে বললাম, সেটা আরও সাংঘাতিক ভুল হবে ভব।

ভবেন বলল, ঝিনুকের মুখখানি মনে পড়লেই আমার বুকের মধ্যে কেঁপে উঠছে।

আমি বললাম, তবে সেই কাঁপুনি নিয়েই যেতে হবে। কিন্তু যেতে হবে ভব, আজ রাত্রে এখুনি যেতে হবে।

কথাগুলি জোরের সঙ্গে বলছি এই কারণে, আমার কেবলি মনে হচ্ছে, সহসা একটা ভূমিকম্প হয়ে গেছে। তাতে ভাঙনের থেকে একটা চির খাওয়া ফাটলের রহস্যই প্রকাশ হয়ে পড়েছে। যত তাড়াতাড়ি পারা যায়, এবার ঘর সাজিয়ে নেওয়াই ভাল। যদি কিছু হারিয়ে থাকে, ক্ষতি হয়ে থাকে, তাকে মেনে নিতেই হবে।

ভবেন আবার বলে উঠল, আমি কী নীচ।

বললাম, এটা নীচতা নয়। এটা একটা যন্ত্রণার বিস্ফোরণ।

ভবেন যেন আমার কথা শুনতে পেল না। একভাবেই বলল, কিন্তু কী করব। আমার মান সম্মান বিদ্যা বুদ্ধি সব যে তুচ্ছ হয়ে যায়। ঝিনুক ছাড়া আমি আর কিছুই ভাবতে পারি না।

আমি হাসতে চাইলাম। কিন্তু যা আমার মুখে আঁকা পড়ল, সেটা হাসি কি না জানিনে। কেবল চলতে চলতে একটা তীক্ষ্ণ বিদ্ধ তীর যেন বুকের মধ্যে নড়েচড়ে উঠতে লাগল। বললাম, এই কথাটাই সহজ করে বলে, ঝিনুকের কাছে গিয়ে দাঁড়া।

বলে ভবেনের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ওর গালে জলের দাগ চিকচিক করছে। তাই তো স্বাভাবিক। ভবেনই তো এ সংসারের সবথেকে সহজ স্বচ্ছন্দগামী স্বাভাবিক মানুষ।

গ্রাম যত এগিয়ে এল, ভবেনের গতি তত মন্থর হয়ে এল। কিন্তু আমি ওকে থামতে দিলাম না। বাড়ির কাছে এসে ও শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরল। দেখলাম, বাড়িটার সামনে অন্ধকার। চাঁদের আলো পশ্চিমে চলে গেছে। দোতলার বারান্দায় ঝিনুক দাঁড়িয়ে আছে কি না, কে জানে।

আমি বললাম, হাত ছাড়, এবার তোকে একলাই যেতে হবে।

 ভবেন শ্বাসরুদ্ধ গলায় বলল, পারছি না টোপন।

–এটুকু পারতেই হবে ভব।

 আমি আমার হাত ছাড়িয়ে নিলাম। ভবেন পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। গেটের ভিতর দিয়ে, সামনের বড় মাঠ উঠোনে ঢুকতেই ও অদৃশ্য হল আমার চোখে। আর ইন্দিরের গলাও সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকে শোনা গেল, কে, বড়দা নাকি?

ভবেনের স্তিমিত গলা, হ্যাঁ।

 ইন্দিরের গলা, দ্যাখ দিকিনি, এত বড়–

আমি তাড়াতাড়ি হাঁটা ধরলাম। বাড়িতে ফিরব মনে করেও, তামাইয়ের দিকে এগিয়ে গেলাম। ওই তো পুব পাড়া, একটু যদি দাঁড়িয়ে তাকিয়ে খুঁজি দূর থেকে, তবে হয়তো হেঁতালগাছটি দেখতে পাই। হেঁতালের গন্ধ, বিষধর নাগের বিষ। কিন্তু আমাকে সে কেন তার তলায় জীবনের প্রথম স্বপ্নের আশ্রয় দিয়েছিল। আজ কি জীবনের এ অধ্যায়টিও হেঁতাল তার বিষনাশ চোখ দিয়ে দেখেছে।

সেই পাথরটার কাছেই এসে দাঁড়ালাম। ওপারে ঝিঁঝির ঝংকার। তামাইয়ের উপকথা উচ্চারিত হয়ে চলেছে। শালবন পূর্ব দিগন্তে, তাই জ্যোৎস্নায় এখন বন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আমি পাথরের গায়ে হাত দিলাম। এক বার নীচের দিকে তাকালাম। ব্যথা করে উঠলেও, একটা গভীর নিশ্বাস পড়ল আমার। ওই বন, নদী, এই পাথর, কাঁকুরে বাবলা ঝোঁপ মাঠ, এই আকাশ, এরা সকলেই আমার আজন্ম সঙ্গী, মনে হয়, এখন সকলেই আমার দিকে চেয়ে রয়েছে, সকলেই হাত বাড়িয়ে আমাকে স্পর্শ করছে। তাদেরও যেন আমার মতোই গভীর নিশ্বাস পড়ল। আমি জানি, তাদেরই অদৃশ্য মুখে, মহাকালের বিষাণ। অনেকদিন আমার বুকে গুরু গুরু শব্দে বেজেছে। আজ শালঘেরি এই জ্যোৎস্নায় যেন একটি করুণ, ব্যথা-বিধুর শান্ত প্রসন্নতায় সমাহিত।

আমি আমার তপ্ত মুখ দিয়ে, ঠোঁট দিয়ে, ঠাণ্ডা কঠিন পাথরটির বুকে স্পর্শ করলাম। এই কঠিন শিলায় কী স্নেহানুভূতি কী শান্তির স্পর্শ।

.

পরদিন ঘুম ভেঙে আগে অঘোর জ্যাঠার বাড়ি গেলাম সাইকেলের সংবাদ দিতে। তারপর কিছু খেয়ে নিয়ে, করিকদের টাকাসহ বেরিয়ে পড়লাম। গিয়ে দেখলাম, জনা সাতেক মেয়ে পুরুষ কাজ করছে। তার মধ্যে করিক টুডু সর্দার। সে ঘুরে ঘুরে দেখছে। হাতে একটা কোদাল অবিশ্যি আছে। আমাকে দেখে সে এগিয়ে এল। অন্যান্যরাও কাজ বন্ধ করে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। আমার কোনও উদ্যম ছিল না, উৎসাহও না।

করিকের হাতে হিসেব করে টাকা দিয়ে বললাম, এবার চলো, আকোনে একবার খুঁড়ে দেখে আসি। এখানে তো মোটামুটি দেখলাম। তুমি তোকজনের সঙ্গে কথা বলে রাখো, দু একদিনের মধ্যেই যাব।

করিক বলল, যেমন বুঝবে ঠাকুর। নাবালের দিকটা একবার দেখবে নাকি?

চলো।

 জমিখণ্ডটা ক্রমে যেদিকে ঢালুতে নেমে গেছে, সেই দিকে গেলাম। তার আশেপাশেই খোঁড়াখুঁড়ি হয়েছে। পরিখার মতো একটা সুড়ংএর মধ্যে নামিয়ে নিয়ে গেল করিক। অবাক হয়ে বললাম, এতটা নীচে পথ কেটেছ নাকি?

করিক বলল, তা ক্যানে? এখানে মাটি খানিকটা কাটতেই, এই গত্তখানি বার হয়ে পড়ল। আপনা থিকেই ঝুরঝুর করে মাটি ঝরে–গেল।

আমার বুকের মধ্যে ধকধকিয়ে উঠল। গর্ত আপনা থেকে বের হয়ে পড়েছে। লক্ষ পড়ল, পরিখার মতো সরু ফালিগর্ত ডাইনে বেঁকেছে। করিক সেদিকেই গেল, উই দেখ, সি চ্যাটাং পাতর, আর উয়ার গায়ে।

.

করিক কথা শেষ করতে পেল না। আমি সামনে এগিয়ে গিয়ে তীক্ষ্ণ চাপা সুরে প্রায় আর্তনাদ করে উঠলাম। আর্তনাদ নয়, আসলে সেটা হর্ষনাদ! অবিশ্বাস বিস্ময় আনন্দ সব মিলিয়ে, এক বিচিত্র শব্দ করে, হাত বাড়িয়ে আমি করিকের জামাটাই চেপে ধরলাম। বলে উঠলাম, পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে।

করিকের পাশ দিয়ে, তাকে ঠেলে আমি ছুটে গেলাম সেই, চ্যাটাং পাথরের দিকে। সেটা মাকড়া পাথরের মতো একটা শিলাখণ্ডই বটে। কিন্তু তার ওপরে আর একটা পাথর যেটা বলেছিল, সেটা আসলে বৃত্তাকার ইঁদারার অংশের মতো। মাটিতে বন্ধ হয়ে গেছে তার মুখ, কিন্তু ছাঁচে ফেলা মাটির পাড় ছাড়া তা আর কিছু নয়। তার গায়ে বিচিত্র ধরনের, যেন অনেকটা শিশুর হাতে কাঠি দিয়ে আঁকা, লতাপাতার চিত্রাঙ্কন হয়েছে। নীচের শিলাখণ্ড যে স্নানঘরের চাতাল, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কারণ শিলাখণ্ডের এক পাশে, প্রায় ছ ইঞ্চি গভীর এবং চার ইঞ্চি চওড়া, উত্তর দক্ষিণে লম্বা নালি রয়েছে। চাতাল এখনও সম্পূর্ণ মুক্ত হয়নি, মাটিতে ঢাকা পড়ে রয়েছে। এবং পশ্চিম দিকের মাটির গায়ে খানিকটা গোল মতো ওটা কী বেরিয়ে আছে? যেন অনেকটা বর্তমান যুগের মাটির জালার পেটের মতো দেখাচ্ছে। বাকি অধিকাংশটাই মাটির গায়ে প্রোথিত।

সহসা আমার সমস্ত গায়ে শিহরন খেলে গেল। আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। কোথায়! কোন যুগে? প্রাগৈতিহাসিক বা ঐতিহাসিক যুগে। এ কাদের ব্যবহৃত গৃহ প্রাঙ্গণে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর, বিংশ শতাব্দীর মানুষ আমি দাঁড়িয়ে আছি!

করিক বলল, তালে ঠাকুর, যা খুঁজে ফিরছিলে, তা পেয়েছ?

তখনও আমার মুখে কথা সরছিল না। মনে মনে বলছিলাম, হ্যাঁ পেয়েছি, আমার অতীতকে আমার বহু বহু দূরান্তে ফেলে আসা জীবনকে খুঁজে পেয়েছি। তামাইয়ের কলকলানি উপকথা ব্যর্থ যায়নি। আমাকে সে ছেলেবেলা থেকে যে দুর্বোধ ভাষায় এক পাতালপুরীর কাহিনী শুনিয়ে আসছিল, আজ তার সন্ধান মিলেছে।…আজ নয়, গতকাল সন্ধ্যাবেলাতেই প্রথম করিক টুডু বলেছিল। গতকালের সঙ্গে আজকের, আমার জীবনের এই দুই অধ্যায়ের সঙ্গে কি কোনও অদৃশ্য যোগসূত্র আছে?

এই মুহূর্তেই উপীনকাকার কথা আমার মনে পড়ে গেল। উপীনকাকার মনেই মাটির তলায় অস্তিত্বের উদয় হয়েছিল। তিনিই প্রথমে সন্দেহ করেছিলেন। তাঁর অনুমান ব্যর্থ যায়নি।

বললাম, করিক, আমরা যা খুঁজছিলাম, এই বোধ হয় তাই। কিন্তু তুমি যদি একটু ভুল করতে, তবে সব ভেঙেচুরে নষ্ট হয়ে যেত।

করিক বলল, আমাকে কলাকেতার বাবু যেমনটি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তেমনটি করেছি।

 কিন্তু আমি আর দাঁড়াতে পারছিলাম না। কাকিমাকে খবর দিয়ে, তাড়াতাড়ি ডাকঘরে যেতে হবে। গোবিন্দবাবুকে এখুনি টেলিগ্রাম করে সংবাদ দিতে হবে। আমি চাতাল থেকে নেমে এলাম, হঠাত আমার নজরে পড়ল, পুবের মাটির মধ্যে কী যেন চকচক করছে। নিচু হয়ে কুড়িয়ে নিলাম। ছোট একটি সোনার থালা। মাটির দাগ আছে, কিন্তু কোথাও তার একটু মালিন্য নেই। যেন এই সেদিন কেউ ফেলে রেখে গেছে।

করিক চোখ বড় বড় করে বলল, সোনার নাকি ঠাকুর?

কোন যুগের স্বর্ণপাত্র? কার ব্যবহৃত? সে কে, কেমন দেখতে? কী তার সামাজিক পরিচয় ছিল? আমার সমস্ত গায়ের মধ্যে যেন বারে বারে কাঁটা দিয়ে উঠতে লাগল। আমি চলে যেতে ভরসা পেলাম না। করিকদের আমি ছোট করে দেখছিনে? মানুষের মধ্যে লোভ থাকেই। আমার অবর্তমানে, সোনার সন্ধানে হয়তো ওরা যেখানে সেখানে কোদাল চালাতে আরম্ভ করবে। তাতে ওরা কী পাবে জানিনে। কিন্তু অনেক বড় সর্বনাশ তাতে হয়ে যাবে।

বললাম, করিক, তুমি তাড়াতাড়ি ভবেনবাবুর বাড়িতে যাও। বলল, আমি তাকে ডেকে পাঠিয়েছি। খবর পাওয়া মাত্রই যেন চলে আসেন।

করিক কোদাল রেখে পরিখা থেকে উঠে চলে গেল। আমি সোনার পাত্রটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলাম। পাত্রের বুকে কয়েকটি অক্ষরে যেন কিছু লেখা রয়েছে। অপরিচিত অক্ষর। বিচিত্র ধরনের লিপি। কী কথা লেখা আছে, কী কথা! এত যুগ পরে, এবার কি বাংলা দেশও প্রমাণ করবে, সে অপ্রাচীন নয়। ভারতের প্রাগৈতিহাসিক ধরার সঙ্গে তার একাত্মতা কি এবার ঘোষিত হবে। এই অপরিচিত তামাই লিপি যেন তারই ইঙ্গিত করছে। আমি দু চোখ মেলে, পরিখার ভিতরে এক অনির্ণীত, অপরিচিত যুগের প্রতিটি রন্ধ্র দেখতে লাগলাম।…

.

ঝিনুকের দুটি রৌদ্র রং পায়ে, গাঢ় আলতার প্রলেপ। হাঁটু মুড়ে, বাঁ হাতে শরীরের ভার রেখে, একটু এলিয়ে বসেছে ও মাঝখানে দাবার ছক। তার দু পাশে আমি আর ভবেন। ভবেনের দোতলার শোবার ঘরেই আমরা বসেছি। ঝকঝকে লাল মেঝেয়, কিছু না পেতেই আমরা বসেছি। গ্রীষ্মকালে, ঠাণ্ডা মেঝেয় বসতেই ভাল লাগে। চকচকে মেঝেতে আমাদের অস্পষ্ট প্রতিবিম্ব পড়েছে।

ঝিনুকের ডান কাঁধের ওপর দিয়ে পিঙ্গল চুলের গোছা বুকের ওপরে টেনে রাখা হয়েছে। দুপুরে পান খেয়েছিল ও। ঠোঁটে তারই দাগ। ওর দৃষ্টি দাবার ছকের দিকেই, কিন্তু সেদিকেই দেখছে কি না, কে জানে। ওর চোখে যেন এক গভীর রহস্য। টিপে রাখা ঠোঁটে ঈষৎ হাসির মধ্যেও সেই রহস্যের ছায়া যেন। লাল পাড় হলুদ রং শাড়ি ওর পরনে। ওর এই কাপড়টা দেখলে আমার কুসুমের কথা মনে পড়ে যায়। শেষ দিন কুসুমের গায়ে এমনি একটি কাপড় ছিল। ঠিক এই রং। মৃত্যুর আগের দিন পিসি কাপড় বদলাবার সময়, সেই কাপড়টি কুসুমকে পরিয়ে দিয়েছিলেন।

বুঝতে পারিনে, কুসুম কি আরও সুন্দর হয়েছে? একটু কি পুষ্ট হয়েছে? না কি, আরও উজ্জ্বল হয়েছে? চোখের পল্লব নিশ্চয় মানুষের নতুন করে আর বড় হয় না, রং-এরও কম বেশি হয় না। ঝিনুকের যেন তাই হয়েছে। দীর্ঘপল্লব, কৃষ্ণকালো লাগছে। কাজল পরতে দেখেছি বলে তো কখনও মনে হয় না।

মাথায় ওর ঘোমটা নেই। পায়ের গোড়ালির গোছর কয়েক ইঞ্চি ছাড়িয়ে উঠেছে ওর লাল পাড়। পায়ের কাছেই ভবেন বসেছে। ভবেনেরও বাঁ হাতেই শরীরের ভার। বাঁ হাতটি ওর ঝিনুকের প্রায় হাঁটু স্পর্শ করে আছে। ওর কালো রংটা যেন উজ্জ্বল হয়েছে। আগের থেকে একটু মোটা হয়েছে। তাতে ওকে দেখতে সুন্দর হয়েছে। তা ছাড়া ভবেন এখন শালঘেরি-ইস্কুলের হেডমাস্টারের পদ পেয়েছে।

তা প্রায় তিন বছর তো অতিক্রম করে গেল। যে দিন প্রথম তামাইয়ের মাটির তলায় অতীতের সন্ধান মিলল, তার পরে তিন বছর চলে গেছে। সেটা ফাল্গুন মাসের প্রথম ছিল। এখন চৈত্রের মাঝামাঝি।

তামাই সারা ভারতবর্ষেই একটা প্রচণ্ড সাড়া জাগিয়েছে। আকোন এবং শালঘেরি, এ দু জায়গাতেই, প্রায় ছোটখাটো প্রাগৈতিহাসিক নগর আবিষ্কৃত হয়েছে। মহেঞ্জোদারোর মতো, তামাই উপত্যকার সেই প্রাচীন লিপিও উদ্ধার করা যায়নি। পৃথিবীর সকল লিপিবিশারদেরা এখন তামাইয়ের বাণী উদ্ধারের চেষ্টায় আছেন। তামাইয়ের প্রাপ্ত সোনা, রুপা, তামা ও মাটির সকল জিনিসই কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু অবশিষ্ট আমার বাড়িতেই আছে। আমার বাড়িটাই এখন তামাই জাদুঘরের শালঘেরির সংস্করণ। প্রতি দিনই দেশ দেশান্তরের লোকেরা আসেন দেখতে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার, শালঘেরিতে একটি তামাইভবন তৈরি করছেন। গভর্নমেন্টের পক্ষ থেকে, উপীনকাকার স্ত্রী, কাকিমাকেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কাকিমা একগলা ঘোমটা টেনে, সেই কাজ সমাধা করেছিলেন। জানতাম, অত বড় ঘোমটা আর কিছু নয়, শুধু চোখের জলকে আড়াল করবার জন্য।

গোবিন্দবাবু প্রায় এক বছর কাটিয়ে গেছেন শালঘেরিতে। টেলিগ্রাম পেয়েই তিনি ছুটে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে সঙ্গেই এসেছিলেন সংবাদপত্রের রিপোর্টার এবং ফটোগ্রাফাররা। তামাই শুধু ভারতবর্ষেই আলোড়ন তুলেছে, এ কথা ভুল। সারা পৃথিবীকেই বিস্মিত ও চকিত করেছে। গত দু-তিন বছরের মধ্যে যত বিদেশি পর্যটকেরা ভারতে এসেছেন, তাঁদের অনেকেই শালঘেরি ঘুরে গেছেন। শালঘেরি এখন একটি অতি পরিচিত নাম।

তামাইয়ের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে সর্বসাকুল্যে আটটি কঙ্কাল পাওয়া গেছে। প্রথম শালঘেরিতেই, একটি ঘরের মধ্যে দুটি কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়েছিল। আর ঘরের বাইরে, সম্ভবত দরজার কাছেই, আর একটি কঙ্কালও পাওয়া গেছে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ঘরের দুইজন পুরুষ, বাইরেরটি মেয়ে। মেয়েদের পোশাক হয়তো হাঁটু পর্যন্ত নামত। কারণ, হাঁটুর নীচে থেকে গোড়ালি পর্যন্ত অন্তত চারটি করে অলংকার প্রতি পায়ে ছিল। পুরুষদের এক জনের পাঁজরে গভীর আঘাতের চিহ্নও আবিষ্কৃত হয়েছে। আর এক জনের কোনও আঘাতের চিহ্নই পাওয়া যায়নি। তামার একটি বর্শাও ঘরের মধ্যে পাওয়া গেছে।

ওরা কি দ্বন্দ্ব যুদ্ধ করছিল? কিন্তু, যখন সমস্ত ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই এই কঙ্কাল পাওয়া গেছে, তখন কি দুজন মানুষের দ্বন্দ্বযুদ্ধের সময় বা সুযোগ ছিল? এ তো যেন একটা বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধের সময় থেকেই সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে কি একজন দিগ্বিজয়ী সৈনিক কোনও গৃহে এসে দম্পতীর উপরে হানা দিয়েছিল?

সেই পুরুষেরা কেমন দেখতে ছিল? আর মেয়েটি? তার রূপ, তার বর্ণ? মানুষের জীবন কি সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই সর্পিল আবর্তনের জটিলতায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছিল?

সে সিদ্ধান্তে আমি আসতে পারিনি। গোবিন্দবাবুর অনুরোধে ও নির্দেশে, তামাই সভ্যতা নাম দিয়ে একটি বই আমি লিখেছি। ভারতীয় প্রত্ন বিভাগ তার প্রকাশক, ইংরেজি অনুবাদও সেখান থেকেই করা হয়েছে। যদিও সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের কথাই আমাকে বলতে হয়েছে, তবু সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক ও চিন্তার জটিলতা বেড়ে ওঠার কথাই আমি বলেছি। এ বিষয়ে নৃতত্ত্ববিদ মর্গান-কেই আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে। ভবিষ্যতের একটা উৎপাদনের শক্তি, বণ্টন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে, আধুনিক জটিলতা একেবারে নিশ্চিহ্ন হবে।

তবু এই যে ঝিনুকের সামনে আজ বসে আছি, এখানে বসে বারে বারেই মনে হচ্ছে, হয়তো ভারতে একদিন মাইথলজির যুগও আবিষ্কৃত ও প্রমাণিত হবে। মানুষের ভিতরের গভীর গাঢ়তা, তার অতলতা কি কোনওদিন মাপা হবে?

.

ঝিনুক বলল, খেলছ না যে? চাল দাও।

ভবেন বলল, দাঁড়াও। গভর্নমেন্ট ওকে এখন পৃথিবী ভ্রমণে পাঠাচ্ছে, সেই চিন্তাতেই বোধ হয় মশগুল।

আমি হাসলাম। আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখলাম ঝিনুক আমার দিকে চেয়ে রয়েছে। ওদের দুজনের মাঝখানে আমাকে সত্যি যেন শ্রীহীন দেখাচ্ছে। একটা দাঁত অবশ্য আমি তামাইয়ের কাজে আছাড় খেয়ে ভেঙেছি। বৎসরাধিক সময়ের অসম্ভব পরিশ্রমে হয়তো শরীরটা একেবারেই ভেঙে গেছে। কালো হয়ে গেছি। কিন্তু মুখে এত অজস্র রেখা কে এঁকে দিল। চুলেই বা এমন পাক ধরল কেন। ইতিমধ্যেই ধূসর হয়ে গেছে মাথা। শীঘ্রই যে সাদা হয়ে উঠবে। তাতে সন্দেহ নেই।

প্রথম প্রথম ঝিনুক সাদা চুল তুলে দেবার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিত। বলতাম, বৃথা চেষ্টা, ওর যখন রং ফেরাবার ইচ্ছে হয়েছে, ফেরাতে দাও।

ঝিনুক বলত, তা বলে এ অসময়ে?

 বলতাম, ঠিক সময়ের কথা কে বলতে পারে। হয়তো সময় হয়েছে।

তা ছাড়া, রক্তপাত রোগও দেখা দিয়েছে আমার। চাঁদসীর চিকিৎসাতেও বিশেষ ফল দেখা যাচ্ছে না। নগেন ডাক্তারের অভিমত, সেই জন্যেই আমার চোখের কোলগুলি এমন গভীর কালো পরিখায় ডুবে যাচ্ছে। সেই জন্যেই দেহে এত অবসন্নতা।

আমি হেসে বাউল গানের কথা বললাম, কী দেখব ভূমণ্ডলে দেখি মন মণ্ডলে। ঝিনুক চোখ তোলে। ও গম্ভীর হলে আমি ভয় পাই। ওর চোখ দুটি এমন সন্ধ্যাতারার মতো সহসা স্থির কিন্তু করুণ হয়ে উঠলে, এখনও, এখনও কোনও এক ধ্বংসাবশেষে যেন সেই গুরু গুরু ধ্বনি স্তিমিত হয়ে বেজে ওঠে।

আমি আবার হেসে উঠলাম, এদিকে রণাঙ্গন যে স্তব্ধ। আমি তো দিয়েছি, তুই দে ভব।

 ভবেন বলল, আমি তো কিস্তি দিয়েছি। কিন্তু তোর বহাল তবিয়ত কীসের ভেবে পাচ্ছি না। ভয় পাস না?

বলে আবার কিস্তি দিল। আমি মন্ত্রী, গজ, নৌকা, ঘোড়া, সব নিয়ে সরে আসছি। ভবেন বুঝতে পারছেনা, ওর সময় ঘনিয়ে এসেছে। এবার আমি মারব। ভাবতে না ভাবতেই, গজ তুলে নিয়ে বললাম, মাত।

ভবেন বলে উঠল, আজ্ঞে না, রাস্তা আমি রেখেছি, এই দেখ।

দেখলাম, সত্যি তাই। চোখ তুলতেই ঝিনুকের সঙ্গে এক বার চোখাচোখি হল। ঝিনুকের হাঁটুর কাছে, ভবেন আঙুল দিয়ে আস্তে একটু খোঁচা দিল। ঝিনুক ভবেনের দিকে তাকাল। দুজনেই হাসল। ভবেন বলল, খুব ধরেছি আজ ব্যাটাকে।