২. ঘুম ভাঙল

ঘুম ভাঙল বেশ একটু বেলায়। জানালার ছিদ্র দিয়ে যেটুকু দেখা যায়, তাতেই বুঝলাম রোদ উঠে গেছে। একেবারেই যে হতচকিত হইনি, তা নয়। কিন্তু মুহূর্তমাত্র। তারপরেই বুঝেছি, জেলে নয় বাড়িতে। শালঘেরিতে আজ আমার অনেক দিনের পরে রাত্রি প্রভাত হল। কিন্তু যে গলাটা শুনে ঘুম ভেঙেছে, তার মিষ্টি তবু কর্কশ মেয়েলি আওয়াজ তখনও শুনতে পাচ্ছি; সাপ খেলা দেখবা গ! কালোমাণিকের লাচ দেখবা!…

ঘুম ভেঙেই সাপের কল্পনাটা ভাল লাগল না। কালো সরীসৃপের কল্পনায় গায়ের মধ্যে যেন শিউরে উঠল। আমার শালঘেরির ঘুম ভাঙার ডাক! তবু, কত যুগ পরে যেন সাপুড়ে বেদেনিদের ডাক শুনলাম। খেলা দেখাও হবে। এখনও দিন যায়নি। শীতকালের মধ্যে ওরা আরও অনেকদিন আসবে। কিংবা শালঘেরির সীমান্তেই হয়তো ওরা যাযাবর ডেরা বেঁধেছে কোথাও। পথে পথে অমন ডাক আরও অনেক শোনা যাবে।

চাদর মুড়ি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বোঝা গেল, ঘরদোর মোছা হয়ে গেছে। ঝট দেওয়া হয়ে গেছে উঠোন। কুসুমের ডুরে শাড়িখানিও উঠোনের দড়িতে মেলা হয়ে গেছে। অর্থাৎ স্নান সারা হয়ে গেছে ওর। কিংবা সকালবেলার গা ধোয়া। কিন্তু কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না। তবু পিসির গলা শুনতে পাচ্ছি যেন কোথায়।

উঠোনে নেমে এলাম। ঝকঝকে নীল আকাশ মাথার ওপরে। রাস্তার ওপারেই অঘোর চক্রবর্তীর বাড়ি। উত্তরে চক্রবর্তীদেরই জ্ঞাতি অশনি রায়ের পাকা মোকাম। দক্ষিণে তাকালে প্রথমেই নজরে পড়ে, তিন রাস্তার মোড়ে, সোজা আকাশমুখী দেবদারু গাছ। তারও পরে কতগুলি শালগাছ। শালঘেরির নামের মহিমাটা পুরোপুরি আছে। এমন পাড়া নেই, এমন রাস্তা নেই, যেখানে শালগাছ নেই।

দক্ষিণ দিকে তাকালে বোঝা যায়, গাছগুলি খুব তাড়াতাড়ি হারিয়ে গেছে আকাশে। কারণ, দক্ষিণে পুবে শালঘেরি ক্রমেই নামতে নামতে গিয়ে ঠেকেছে, শালঘেরির সীমানা তামাই নদীর ধারে।

শালঘেরিতে মাটি তার রূপের সীমানা বন্ধক রেখেছে। কোনওদিন প্রয়াগে যাইনি। শুনেছি, সেখানে গঙ্গা-যমুনার শ্যাম ও গেরুয়ার কূল বাঁধা। কেউ কাউকে নিয়ে রং-এ একাত্ম হয়নি। এই শালঘেরিতে এসে উত্তর পশ্চিমের পাথুরে রক্তাভা যেন আস্তে আস্তে ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। যেন জলে রং ধুয়ে গেছে। শালঘেরির দক্ষিণ সীমা পার হতে না হতেই, ধোয়া লালে যেন একটি ধূসরতার আভাস চোখে পড়ে। পাথর কমে আসে। কাঁকরের ছড়াছড়ি কমে যায়। কয়েক মাইলের মধ্যেই মাটি কালো হয়ে উঠেছে।

কিন্তু তামাই নদীর ওপারে লালের বিস্তারটা আর একটু বেশি। পাথুরে সীমা যেন গোঁয়ার্তুমি করে এগিয়ে গেছে আরও অনেকখানি। তারপরে একটা সুদীর্ঘ বাঁক নিয়ে, পুববন্দি করে ঘাড় গুঁজে খুঁজে উঠেছে উত্তরে। তামাইয়ের ওপারে ঘন শালবন।

কিন্তু না, এখানে দাঁড়িয়ে আর শালঘেরির রূপ চিন্তা করতে পারিনে। চোখেমুখে একটু জলের ছিটা দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। গোটা শালঘেরিকে আজ একবার প্রদক্ষিণ করে, তবে ঘরে ফেরা।

কুয়োতলা থেকে ফিরতে গিয়ে, চোখে পড়ল পিসি বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন। এগিয়ে গেলাম। ঝুড়ি দেখেই বোঝা গেল, মাছ নিয়ে এসেছে। কিন্তু সে মাছে পিসির মন ওঠেনি। তাই আর কোনও মাছ জেলে এনে দিতে পারবে কি না, তারই খোঁজখবর চলছে।

একলা পিসি নেই সেখানে। কুসুম তো আছেই। তা ছাড়া আশপাশের বাড়ির মেয়েরাও আছে দু-তিনজন, তার মধ্যে অঘোর জ্যাঠামশায়ের স্ত্রী। জ্যাঠাইমা বলে ডাকি তাঁকে। কাকিরা আমাকে দেখে ঘোমটা টেনেছেন। ওটা বয়স্ক ভাসুরপোর প্রতি সমীহ দেখান।

চক্রবর্তী জ্যাঠাইমা বললেন, এসেছিস বাবা ফিরে! এই মাত্তর ঠাকুরঝির মুখে শুনছিলাম। কত দিন পর!

আমি প্রণাম করলাম। মাথায় হাত দিয়ে বললেন, বেঁচে থাক বাবা। বেঁচে থাক।

 পাড়ার কাকিদেরও জনে জনে প্রণাম করতে হল। প্রণাম না করাতে যাঁদের আধুনিক বাতিক আছে, আমি সেই দলে পড়িনে। এ আমার রক্তে আছে। ভালমন্দ জিজ্ঞাসাবাদ হল খানিকক্ষণ। অঘোর জ্যাঠাও এসে উপস্থিত হলেন। ছোটখাটো ভিড় জমে গেল একটি আমাদের বাড়ির সামনে।

জেলেটি এতক্ষণে বলল আমাকে, চিনতে পারছেন গ দাদাঠাকুর। আমি জেলেপাড়ার বৈকুণ্ঠ।

বলে সে উপুড় হয়ে নমস্কার করল। অদর্শন একটা অস্পষ্টতা এনেছে। বললে আর চিনতে ভুল হয় না। তামাই নদীর জেলেপাড়ায় সবাই আমাকে চেনে। আমিও চিনি তাদের সবাইকে। কারণ তামাইয়ের তীরে তীরে আমার অনেক অজ্ঞাত অভুক্ত বেহিসেবি দিন কেটেছে ঘুরে ঘুরে। আরও কাটবে। সেজন্য আমি প্রস্তুত হয়েছি।

বললাম, মনে আছে বইকী। কেমন আছ বৈকুণ্ঠ?

বৈকুণ্ঠ বলল, দিনকাল বড় খারাপ। তা সে কথা থাক। আমি চলি, বড় মাছের লাগাড় দেখি আগে।

পিসি বলে উঠলেন, অ, মানুষ চিনছিস, অমনি ছুটছিস মাছের জন্যে। আর আমি বুড়ি যে এতক্ষণ চেঁচিয়ে মরে গেলাম, তখন তোর চেতন নাই।

বৈকুণ্ঠ যেতে যেতে বলল, বলতে নাগে ঠাকরুন, এ কি যে সে দাদাঠাকুর, জেল থিকে আইসছেন।

শহরনয় গ্রাম। রাস্তার ওপর হলেও সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ঢুকতে হয়। বেশ বুঝতে পারছি, আমার দুই ডানায় যেন দুটি পাখার কাঁপুনি লেগেছে। সে উড়তে চায়। উড়ে বেড়াতে চায় শালঘেরির আকাশে। মন আর স্থির থাকতে চায় না।

কুসুম বলল, টোপনদা, নিমের দাঁতন চাই?

–দে।

নিমের দাঁতন দিয়ে কুসুম বলল, চা খাবে?

বিলক্ষণ। কিন্তু এ বাড়িতে বাবা কোনওদিন চা খেতেন না। পিসিকে আমার জন্যে বরাবর চায়ের ব্যবস্থা রাখতে হত। আর সেয়ানা বয়সেও বাবাকে সেটা না লুকিয়ে খেলে চলত না। টের পেলে যে রাগারাগি করতেন তা নয়। সংস্কারে লাগত তাঁর। চাকে কোনওদিনই ভাল নজরে দেখেননি। যদি জানতে পারতেন, শ্রীমান প্রতি দিন বাড়িতে অন্তত দুবার চা পান করেন, তা হলে, মুখে কিছু না বললেও মনে মনে অসন্তুষ্ট হতেন। কিংবা এ শুধু আমারই ধারণা। বাবা হয়তো জানতেন সবই। জেনেও না জানার ভান করে, চুপ করে থাকতেন।

বললাম, চায়ের ব্যবস্থা সব আছে তো?

কুসুম বলল, জেটি সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। কাল রাতে আমাকে বলে রেখেছে, সকালে মুখ ধুয়ে উঠেই তুমি চা খাবে।

বললাম, তবে আর দেরি নয়, শিগগির চাপিয়ে দি গে যা।

বলে দাঁতন করতে করতেই একটু অবাক হয়ে বললাম, আমার দিকে তাকিয়ে কী দেখছিস রে কুসুম?

কুসুম হেসে মরে গেল। মুখে আঁচল চেপে, হাসি সামলে সে বলল, কী আবার? তোমাকেই দেখছি।

আমাকে দেখার কী আছে?

কুসুম সে কথার কোনও জবাব না দিয়ে বলল, জেলে গেলে বুঝি মানুষ ফরসা হয় টোপনদা?

-কেন রে, আমি কি একেবারে কালীকেষ্ট ছিলাম নাকি?

–ছিলে না? তুমি আমার চেয়ে কালো ছিলে।

তবে এখনও তাই আছি।

 ইস! তুমি এখন কী ফরসা হয়ে গেছ। আমার চেয়ে অনেক ফরসা হয়ে গেছ।

 যে দেশে মেয়ের রং কালো হলে বরের ঘটকেরা মুখ ফেরায়, সেই দেশের মেয়েরা রং নিয়ে চিরদিন অশান্তিতে মরে। শুধু তাই কেন? ফরসা হতে ইচ্ছে যায় সকলের। সুন্দর হওয়ার ইচ্ছে। কুসুম জানে, ওকে দেখতে এসে কেউ কালো বলবে না বটে। ফরসাও বলবে না। তাই জেলে গেলেও লোকে ফরসা হয় নাকি, এ বিস্মিত প্রশ্ন ওর মনে জেগেছে।

পিসি যেন কী কাজে ব্যস্ত ছিলেন ঘরে। বাইরে এসে বললেন, হ্যাঁ, তা গায়ের রংটা তোর এক পোঁছ। ঘষে মেজে দিয়েছে জেলখানা থেকে।

বললাম, পিসি, এ তো তোমাদের গাঁয়ের জল নয়। মেশিনে শুদ্ধ করে নেওয়া কলকাতার জল। মানুষের আসল রং ধুয়ে দেয়, তাকে আর চিনতে দেয় না।

পিসি বললেন, তবে এদিককার মেয়েগুলনকে বের আগে কিছুদিন কলকাতায় রেখে দিলে হয়।

আমি বললাম কুসুমকে, দ্যাখ কুসুম, জেলখানায় যাস তো বল। মেমসাহেব সেজে আসবি, রাজপুত্তুর বরের আর অভাব হবে না।

কুসুমের জবাব পাওয়া গেল, ঝাঁটা মারো রাজপুত্তুরের মাথায়। আমার চাই না। তুমি এখন তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে এসো দিকি। চায়ের জল আমার হয়ে এল।

অমনি পিসি ছুটলেন। নিশ্চয় খাবারের ব্যবস্থায়। কুয়োতলায় পা বাড়িয়েছি। এমন সময়, দরজার কাছ থেকে হাঁক, এইস্যে পড়লাম গ টোপনদাদা।

আমি ফিরে অবাক হয়ে বললাম, আরে, ছোটবাবু যে? তুমি একেবারে সাত সকালে মাথায় মাল চাপিয়ে হাজির?

শালঘেরির বচন মাহাতত মাথায় মাল সুদ্ধই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আগে একগাল হাসল। বলল, ধরে না লামালে যে ঢুইকতে পারছি না। একবারটি ধর এইসে।

আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে ট্রাঙ্কের হাতল ধরলাম।

পিসি বেরিয়ে এসে বললেন, একেবারে দালানে এনে তোল বাবা, উঠোনে আর নামাসনে।

কিন্তু নামাতেই হল। কারণ, দরজা দিয়ে সব ঢুকবে না বলে, একে একে দালানে আনতে হল সব। এই শীতের মধ্যেও বচনের ঘাম দেখা দিয়েছে।

বললাম, হ্যাঁরে ছোটবাবু, তুই এ সব মাথায় বইতে গেলি কেন? আমি তো এখুনি গোরুর গাড়ি পাঠাচ্ছিলাম সব আনতে। আর এ কি একটা মানুষের কাজ?

বচন পিসির দিকে ফিরে, বেশ একটু শ্লেষ ভরেই বলল, দ্যাখো দিকি ঠাকরুন কথার ছিরি? এ্যাটটা মানুষের কাম না তো কি দুটো মানুষ বয়ে আনছে? এনেছি যখুন, তখন এ্যাটটা মানুষেরই কাম বইলতে নাগবে, আঁ? কী বল গ?

পিসি বললেন, বটেই তো। ওরা বাবা সবই উলটা বোঝে।

বচন মাহাতো সঙ্গে সঙ্গে বলল, বটে না? মিছিমিছি এ্যাদ্দিন জেল খেট্টে আসলে, বান্ধবহারা হলে, স্বরাজ তো ঢু ঢু।

বলে বচন মাহাতো এতক্ষণে আমাকে এসে প্রণাম করল। সে বরাবরই এরকম। বক্তৃতা সে দেবেই দেবে। শালঘেরির প্রাক্তন স্টেশনমাস্টার মহাদেববাবু এইটি শিখিয়েছেন বচনকে।

বললাম, বিয়াল্লিশের নেতারা এবার সব ছাড়া পাচ্ছে, স্বরাজ আসবে এবার, দাঁড়া। তা তুই কেমন আছিস ছোটবাবু?

আর সকলের মতো বচনও জানাল, আর থাকা না থাকা। দেশখানা তো ফের মন্বন্তরের দেশ হয়ে গেল। সে যাক গা, আমার এ্যাটটা প্যাট, পরিবার নাই, ছেলেপিলে নাই, কাঁসি পিটে কাটিয়ে দেব। উদিকে তোমাদের মাস্টেরের কীর্তিকলাপ শুনেছ তো?

-কোন মাস্টার?

মাহাদেববাবু গ, মাহাদেববাবু, তোমাদের শালঘেরির ইষ্টিশন মাস্টার।

শুনেছি। তিনি তো গড়াইয়ে নাকি আখড়া খুলেছেন।

আখড়া? কীসের আখড়া, তা শুনেছ কি?

–বৈষ্ণবের আখড়া।

 –হুঁ। তার সঙ্গে কিশোরী-ভজনও চলেছে।

–কিশোরী-ভজন?

 বচনের মুখের ভাব দেখে আমার হাসি পেল। বোধ হয়, ওর মুখে তামাক পাতা পোরা আছে। তাই ঠোঁট দুটি অমন টিপে শক্ত করে রেখেছে। কালো কুচকুচে চেহারা। ইঁদুরের মতো কালো কুতকুতে দুটি চোখ। পেশিবহুল প্রৌঢ় শরীর। কাঁচাপাকা চুলের মাথার পিছনের অর্ধেক প্রায় কামানো। গায়ে নীল কুর্তা। পরনে একটি ছেঁড়া, তালি মারা খাকি প্যান্ট।

ঘাড় দুলিয়ে দুলিয়ে বলল সে, হাঁ, উনি যা করছেন, তাকে নিকি অই বলে। অই কিশোরী-ভজন। গড়াইয়ের ডোমপাড়ার ছেউটি রাড়ি, আতি ডোমনি নিকি আধা (রাধা) হইয়েছেন। আর মাহাদেব আর মহাদেব নাই, উনি কেট্ট হইয়েছেন। লাগ ভেলকি লাগ।

কুসুম খিলখিল করে হেসে উঠল। পিসি ধমকালেন, এ্যাই ছুড়ি, চুপো।

কিন্তু আমার কাছে ব্যাপারটা অভাবিত মনে হচ্ছে। মহাদেববাবুর কথা শুনে বরাবরই মনে করেছি, জীবন সম্পর্কে ভদ্রলোকের তিক্ততা অপরিসীম। কোথাও কোনও আকর্ষণ নেই। বরং সংসার-বৈরাগী বলা যায়।

আমার হতচকিত বিভ্রান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে, হাত তুলে যেন সান্ত্বনা দিল বচন। বলল, আরও আছে। লীলা এখানেই খতম লয়। উদিকে, এই বুড়া বয়সে মামলায় পড়তে হয়েছে মাহাদেববাবুকে। ওয়ার ইস্তিরি খোরপোষের দাবি করে মামলা করেছেন। যাও, ইবারে দাঁতন কাটি ফেলে মুখ ধুয়া আস, তাপরে কথা হবেন।

তাই যেতে হয় এর পরে। বচনের কথা যদি সত্য হয়, তা হলে খবর খুবই খারাপ। মহাদেববাবু কতখানি মন্দ, সেটাও বিচার্য। ভিতরের ব্যাপার তো কিছুই জানিনে। মহাদেববাবুর অত্যন্ত সংসারবিদ্বেষী কথাবার্তা শুনেও কোনওদিন ভদ্রলোককে আদতে খারাপ মনে হয়নি। কিন্তু এ সব কিশোরী-ভজনের সাধ এই প্রৌঢ়ত্বের অন্তিমে এসে কেন হল তাঁর?

তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে এলাম। বললাম, ছোটবাবু কিছু খা আগে।

বা! না খেয়ে যাব নিকি? পেরথমটাতে বিসেই করতে পারি না, তুমি আসছ। মালপত্রগুলন দেখে টুকুস বা পেত্যয় হল। তাপর এখন যিটি আছেন ইস্টিশনে, সিটিও তো পাগল।

-পাগল?

–হুঁ। বদ্ধপাগল। মাহাদেববাবু খালি পাঠ শুনাতেন। আর ইনি মৌনীবাবা। সারাদিনে কথাটি নাই। তাকিয়ে আছে তো তাকিয়ে আছে। বসে আছে তো আছেই। কাছে বসে থাকলে টের পাবার জো নাই, মানুষ বসে আছে। দশটা কথা জিজ্ঞেস করলে, এ্যাটার জবাব পাওয়া যায়। ইদিকে মেজাজখানিও সুবিধার লয়কো মোটে। বড় রাগ। ভয়ে মুখ খুলতেও পারি না। কী গেরো বল দিকিন। মাহাদেববাবু কথা বলা অভ্যেস করিয়ে গেলেন, ইনি বোবা করতে চান।

কুসুম আবার খিল খিল করে হেসে উঠল। আমারও হাসি পেল। সত্যিই তো। দুই দেবতার টানাপোড়েনে বচন মাহাতোর প্রাণ যাচ্ছে। একজন কথা বলতে শিখিয়েছে। আর একজন চুপ করতে শেখাচ্ছে। শালঘেরি স্টেশনের এও এক বৈচিত্র্য দেখছি।

বচন আবার বললে, কাল রাতে আমাকে বোবা মাস্টের বললে, তোমার জিনিসপত্তর লেবার জন্য গাঁ থেকে লোক যাবে সকালে। অ মা! ভোর রাতে আমার গা থেকে কম্বল টেনে নিয়ে বলে কিনা, মালগুলন পৌঁছে দিয়ে এস। আমি বলি, কেন? এত সাত সকালে কী হল?না, ভদ্দরলোকে, মানে তুমি, ভদ্দরলোকের জামাকাপড় সব এখানে পড়ে রইছে, গায় দিতে অসুবিধা হবে। এখুনি লিয়ে যাও। লিয়ে যাও তো লিয়ে যাও। এ হুকুমের আর লড়চড় হবার জো নাই। আর অত সকালে কুথা গোরুর গাড়ি, কুথা রিশকা, কে খোঁজে। অবিশ্যি—

বচনের কয়েকটি দাঁতশূন্য কালো মাড়ির হাসিটি এতক্ষণে দেখা গেল। বলল, আমারও আসবার জন্যে মনখানি বড় আঁকপাক করছিল। কিন্তুন কী জান টোপনদা, আমার আসতে মন করছে জানলে ও বোবা মাস্টার আমাকে আর আসতে দিত না।

কুসুম হেসে লুটিয়ে পড়ল। বলল, কেন? লোকটা সত্যি সত্যি পাগল নাকি গো?

পিসিও হেসে বাঁচছিলেন না বচনের কথায়। আর আমি যেন শালঘেরির যত সুখ-দুঃখ হাসি-বেদনার কথা আকণ্ঠ পান করে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছিলাম।

বচন কুসুমকে বলল, তবে আর বলছি কী গ খুকি দিদি। বচন মাহাতোর কপাল এমনি। পাগল নিয়ে আমার বাস, তানারাই আমার মুরুব্বি।

কুসুম বলে উঠল, ও জেটি, লোকটাকে আমি দেখতে যাব।

আমার বিস্ময়ের আগে পিসির চোখ দেখলাম কপালে উঠেছে। বললেন, কী বললি রাক্ষুসী, এই ইস্টিশন মাস্টারটাকে দেখতে যাবি তুই?

কুসুম বলল, হ্যাঁ।

পিসি খেপে উঠে বললেন, ঠেঙিয়ে তোর পা খোঁড়া করব আমি। পাগল যাবে আবার পাগল দেখতে।

কুসুম ছুটে পালাল রান্নাঘরের দিকে।

সেইটিই সত্যি। কুসুমের বিচিত্র দাবি। আসলে স্টেশনমাস্টার বিজন ঘোষ যে সম্পূর্ণ আলাদা লোক, সে ধারণা ওর নেই। বচন একজন পাকা শিল্পী। কোন লোক কেমন, সেটা ওর কাছে কিছু নয়। লোকটাকে ওর নিজের কেমন লেগেছে, সেইটিই বড় কথা। নিজের যেমন লাগে, ও তার তেমনি রূপদান করে। হয়তো এর পরে ও বিজনবাবুকে গিয়ে বলবে, টোপনদাদাদের বাড়ির খুকিদিদি তোমাকে দেখতে আসতে চেয়েছে। কেন? কে জানে? তোমাকে দেখতে আসার জন্যে সে পাগল। ব্যস। বিজনবাবুর মাথাটি যাবে খারাপ হয়ে।

অথচ আমি তো একটু দেখেছি বিজনবাবুকে? যে ছায়া বচন দেখতে পায়নি তাঁর মুখে, সে ছায়া নির্বাসিতের বেদনা। ভদ্রলোকের বয়স অল্প। উৎসাহ করলে, কোথাও যে বদলি হয়ে যেতে পারেন না, তা নয়। হয়তো স্বেচ্ছায় এ নির্বাসন বেছে নিয়েছেন। তাঁর সে কথাটি তো ভোলবার নয়, সময় পেলে এ বিজনে আসবেন মাঝে মাঝে।

বচনকে পিসি ধামা ভরতি মুড়ি মুড়কি বাতাসা দিলেন। শালঘেরির ময়রা পাখির দোকানের ছানার মিষ্টিও দেখলাম পড়েছে বচনের পাতে। বচন জল চেয়ে মুখ ধুয়ে, উঠোনের রোদে বসে গেল ঠ্যাং ছড়িয়ে।

কুসুম বলল, টোপনদা, তোমার চায়ের জল ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।

বললাম, আবার গরম কর।

পিসি রাশিখানেক খাবার এগিয়ে দিলেন সামনে। দেখে আমার চক্ষু-স্থির।

বললাম, পিসি, তুমি কি ভেবেছ, জেল থেকে আমি একটা রাক্ষস হয়ে ফিরে এসেছি।

পিসি বললেন, ওরে, না না, রাক্ষস ক্যানে হবি। ওটুকুন খেতে পারবি।

পারি না পারি, আমাকে বসতে হবে। যা পারি খাব। চিরদিন তাই খেয়েছি। এই সাড়ে তিন বছরে সে অভ্যেসটা একেবারে কাটিয়ে দিয়েছে জেলখানা।

ট্রাঙ্কটার দিকে চেয়ে আমি কৃতজ্ঞতা বোধ করলাম বিজনবাবুর কাছে। বচনের কাছেও। জামাকাপড়ের অসুবিধা তো ছিলই। বইপত্রগুলির জন্যে মনটা ভিতরে ভিতরে ব্যস্ত হয়ে পড়ছিল।

কুসুম চা করে নিয়ে এল। আমাকে জিজ্ঞেস করল, টোপনদা, তোমার ওই ছোটবাবুকেও চা দেব নাকি?

–দিবি না? ও চায়ের যম।

 কুসুমের চোখে একটু চিন্তার ছায়া। সে গলা নামিয়ে পিসিকে জিজ্ঞেস করল, ওকে কীসে করে চা দেব জেটি?

ক্যানে, গোয়াল ঘরে পুব তাকে একখান পেতলের গেলাস আছে না? রাখালের গেলাসটা? ওতে করেই দে।

চা নিয়ে গেল কুসুম বচনের কাছে। বচন প্রায় একটি উল্লসিত হুংকার ছাড়ল, চা? আরে বাপরে বাপরে! তা টোপনদাদার যে ছোট বুইন আছে, তা তো জানতাম না?

আমিই বললাম দালান থেকে, আমার সব খবরই বুঝি তুই জানিস ছোটবাবু?

 বচন বলল, তা শালঘেরির সকলের খবরই আমার কিছু কিছু জানা আছে টোপনদাদা। আমি জানতাম, তুমি এক ছেলে।

বললাম, তবে জেনে রাখ, একটা বোনও আছে।

–বেশ, বেশ। খুকুদিদির রাজপুত্তুর বর হোক।

আবার রাজপুত্ত্বর? শুনতে পেলাম কুসুমের ভ্যাংচাননা, ই হি হি।

বচন বলল, তা ভ্যাংচালে কী হবে গ। অই যা বলে দিলাম, তা দিলাম।

কিন্তু কুসুমের মন এখন সেদিকে নয়। সে আবার পুরনো প্রসঙ্গটা টানল। বলল, কী করে তোমাদের ওই ইস্টিশন মাস্টারটা? গালে হাত দিয়ে চুপ করে বসে থাকে?

–হ্যাঁ।

–বিড়বিড় করে বকে?

 বচন দ্বিধাহীনভাবে বলল, তা কি আর না বকে? খুব বকে। বিড়বিড় করে ছড়া কেটে বকে।

–ছড়া কাটে?

-হ্যাঁ। সে ছড়া তুমি আমি বুঝতে লারব। সমসকেতর ছড়া। আবার পকেটে বই রাখে। সে বই বের করে, পড়ে পড়ে ছড়া কাটে। অই তোমার গে যাত্রার পাঠ বলার মতন।

বচনের কথা শুনে বুঝতে পারি, বিজনবাবু কবিতা আবৃত্তি করেন। আর হয়তো, পকেট থেকে যে বইগুলো বের করে তিনি ছড়া কাটেন, সেগুলোই ওঁর একমাত্র সঙ্গী। মনে হচ্ছে, ভদ্রলোক আমার দলের লোক।

তারপরেও কুসুমের বিস্মিত প্রশ্ন, একা একা আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসেও?

 বচন নির্বিকারভাবে বলল, হাসে বইকী খুকিদিদি।

কুসুমের বিস্ময় এবং উৎসাহ ক্রমেই বাড়ছে। জিজ্ঞেস করল, কামড়ে কামড়ে দেয়?

বচন আরও উৎসাহিত। বলল, খেপেটেপে গেলে, তা কি আর না দেয়?

কুসুম। ও মা। ও তো খ্যাপা পাগল।

বচন। খ্যাপাই তো খুকিদিদি।

এর পরেই কুসুমের যুক্তিবাদী প্রশ্নটা শোনা গেল, তবে লোকটাকে ইস্টিশন মাস্টার করে রেখেছে কেন?

কিন্তু বচন তাতেও দমবার পাত্র নয়। বলল, অই, বোঝ। সরকারের খেয়াল। সব তো পাগল। সরকারও পাগল।

এবার বোধ হয় কুসুমের একটু সন্দেহ হয়েছে? কিন্তু না। কুসুম হাসছে।

সব পাগল এ সংসারে। মস্তিষ্ক ভাল শুধু বচন আর কুসুমের। আমার খাওয়া তখন সাঙ্গ হয়েছে। বাইরে এসে বচনের দিকে এক বার ভাল করে তাকালাম। তারপরে জিজ্ঞেস করলাম, তারপর তোমার খবর কী ছোটবাবু?

বচন তখনও আমার মতলব টের পায়নি। তাই স্বচ্ছন্দভাবেই বলল, কেটে যাচ্ছে টোপনদাদা। আমাদের আবার খবর।

বললাম, না না, সে সব খবর জিজ্ঞেস করছি না। তোর গুণপনার কথা জিজ্ঞেস করছি। ওদিকে কেমন চলছে টলছে।

একেবারে জোঁকের মুখে নুন। বেগতিক বুঝে বচন হো হো করে হাসি জুড়ে দিল।

পিসি কিছু বুঝলেন না। কুসুমও না। তারা তাকিয়ে রইল বচনের দিকে।

আমি বললাম, না না, হাসিনয় ছোটবাবু। তোর মাইনের টাকাগুলো যায় কোথায়, সেটা বল। রকে তো পাগল বলা হচ্ছে, নিজে তুই কী, সেটা বলে যা। মাসের শেষে মাইনে পেয়েও তোকে ধার করে চাল কিনতে হয়, কেন?

বচন তখন খাবার আর চা শেষ করে, কুয়োতলায় গেছে গ্লাস ধোবার জন্যে। আর বোকার মতো হাসছে।

পিসি বললেন, ক্যানে র‍্যা টুপান, কী করে ও টাকা দিয়ে।

জিজ্ঞেস করো না বাবুকে।

কুসুমই তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, কী কর ছোটবাবু?

বচন বলল, অই টোপনদাদার যেমন কথা। ওতে কান দিতে নাই।

কান দিতে নাই?

 আমি বললাম, জান পিসি, কলসি কলসি তাড়ি গিলে মরে।

–ও মা! নেশুড়ে?

 –শুধু তাড়ি নয় পিসি, বাবুর মদ ভাং গাঁজা কিছুটি বাকি নেই।

একেবারে অপোবদন বচন। কে বলবে, সে এতক্ষণ এত কথা বলছিল। কুসুম ততক্ষণে হেসে গড়িয়ে পড়েছে। পিসি কী বলতে যাচ্ছিলেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে আমি তাকে দেখতে পেলাম। দেখে যেন আমি কেমন থতিয়ে গেলাম। আমার সকালবেলার রোদ বুঝি চকিতে কালকুটি মেঘে ঢেকে যাচ্ছিল। যে এসেছে, সেও দরজায় দাঁড়িয়েছে থমকে। চোখ তার পুরোপুরি আমার দিকে নয়।

এক বার, এক মুহূর্ত আমার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। একটা হিংস্র বিদ্বেষ আর ঘৃণা আমার ভিতরে শাণিত হয়ে উঠল। আমি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে চাইলাম তৎক্ষণাৎ। আমার গলার কাছে একটি তীব্র গর্জনের কটু অপমানকর সম্বোধন উথলে উঠতে চাইল।

কিন্তু আর এক বার দরজায় তার প্রতি চোখ পড়তেই, আমি যেন চমকে সংবিৎ ফিরে পেলাম। আমার ভিতরে কে যেন ছি ছি করে ধিক্কার দিয়ে উঠল। মুহূর্তে আমি ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম তাকে। বুকে টেনে নিয়ে বললাম, ভবেন, ভব, তুই এসেছিস? এসেছিস?

মুখ তুলে আমি ভবেনের চোখের দিকে তাকালাম। ভবেন যেন লজ্জিত বিষণ্ণ। ভাল করে চোখ তাকাতে পারছে না। আমাকে জড়িয়ে ধরা তার হাত দুটি যেন কাঁপছে। বলল, জোর করে চলে এসেছি।

হে মহাকালের বিষাণধ্বনি, আমাকে সাহস দাও। আমাকে সাহস দাও। ভবেন আমার বুকে। আমার আবাল্যের বন্ধু। ওর সঙ্গে কথা বলবার সাহস আর ভাষা দাও।

সহজ গলাতেই বললাম, কেন রে, জোর করে কেন?

ভবেনের ঠোঁটও কাঁপছে। চওড়া শ্যামল পুরুষ ভবেন। মাথার চুল ওলটানো, বড় বড়। দেখলেই বোঝা যায়, তার মোটা চুলের গোড়া অত্যন্ত শক্ত। দৈর্ঘ্যে আমার চেয়ে কিঞ্চিৎ খাটো। কিন্তু আমার চেয়ে শক্তিশালী নিঃসন্দেহে। গেরুয়া পাঞ্জাবি আর ধুতি তার পরনে। নতুন শুধু একটি জিনিস দেখছি। ভবেন গোঁফ রেখেছে।

দেখলাম, ভবেনের সেই চিরদিনের ঈষৎ রক্তাভ চোখ দুটিতে কেমন এক সংকোচ ও অপরাধের ছায়া। জানি নে, ওর চোখে জল আসছে নাকি।

সে আমাকে প্রায় ফিস ফিস করে বলল, কেন জানি না টোপন। আমি সাহস পাচ্ছিলাম না।

আমারও গলার স্বর বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। তবু জোর করে, স্বাভাবিক গলায় তাড়াতাড়ি বললাম, ছি ছি ভব, ও কথা বলিস না। তুই একটা উল্লুক।

থেমে থেমে, অনেকটা যেন চুপি চুপি বলল ভবেন, আমাকে তাই বল টোপন, তাই তুই আমাকে বল। কিন্তু তুই এসেছিস শুনে আমি কেমন করে ঘরে বসে থাকি?

আমার বুকে উথলে কী যেন ঠেলে আসতে চাইছে। কিন্তু তা আসতে দিলে চলবে না। শালঘেরি। আমি তোমার বুকে ফিরেছি। এখানে আমার চিরদিনের অধিকার। এখানকার ধুলোয় লুটিয়ে হেসে খেলে বেড়ানো আমার রক্তগত দাবি। আমাকে তুমি বাদ সেধো না।

বললাম, তুই ঘরে বসে থাকলেই বুঝি সব মিটে যেত। আমি যেতে পারতাম না তোদর বাড়ি? আমার বুঝি পা নেই। না, আমার দাবি নেই?

ভবেন তেমনি চাপা গলায় বলে উঠল, রাস্কেল, তুই একটা রাস্কেল। দাবিদাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করছিস তুই? কিন্তু তুই কি আর সত্যি যেতিস টোপন?

নিজের কাছে নিজেকেই জিজ্ঞেস করি, যেতাম কি? আমি যে অনেক ছোট, অনেক হীন। হয়তো যেতাম না। কারণ, আমি যে কাল থেকে বারে বারে ভবেনের প্রসঙ্গ উঠতে না দেবার চেষ্টা করেছি। বিদ্বেষই বোধ হয় নয় শুধু। ভয়ে, আমার অক্ষমতা, আমার ছোট প্রাণের, আমার শামুকের মতো গুটিয়ে যাওয়া মনের ভয়ে, ভবেনের নাম কাল আমি এক বারও উচ্চারণ করিনি।

বোধ হয় তাই আমি বন্ধুর সঙ্গে লুকোচুরি করে কথা বললাম আজ, যেতাম কি না, না এসে পরীক্ষা করে দেখতিস। আয়, ঘরে আয়।

বুঝতে পারছিলাম, উঠোনের ওপর বাকি তিনটে লোক অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। পিসি, কুসুম আর বচন। জানিনে, আমাদের কথাবার্তা তারা কতখানি শুনতে পেয়েছে।

আমরা ফিরতেই বচন বলে উঠল, ই দেখ, কাকে বলে বন্ধুত্ব।

কুসুম হাসছিল আগে থেকেই। পিসি বললেন, হ্যাঁ, এ্যাদ্দিনে ভবেন ঠাকুরের দেখা পাওয়া গেছে টুপান চাটুজ্যের বাড়িতে। বন্ধুটি গিয়ে ইস্তক, ইদিকে আর ছায়াটি মাড়ায় নাই, বুঝলি টুপান। পিসি মল কি বাঁচল, কোনও খোঁজ নাই।

ভবেন তাড়াতাড়ি প্রতিবাদ করে বলল, সে কথা বললে চলবে না পিসিমা। বিজয়া দশমীর দিন প্রত্যেক বছরে এসেছি।

পিসিমার ঠোঁট দুটি একেবারে বেঁকে উঠল। বললেন, উঃ উঃ, বাপুস র‍্যা। শালঘেরির দখিনপাড়া থেকে উতরপাড়ায় আসা কি চাট্টিখানি কথা? বলে বিশ কোশের তফাত।

ভবেন অসহায় হয়ে পড়ল। বেচারি! কী করবে। নানান কারণে আসতে পারেনি। তা ছাড়া মন নিয়ে কথা। পিসির সঙ্গে কী কথা বলতে আসবে ভবেন। ওর জীবনে পরিবর্তনও এসেছে। ওর ঘরে এখন…। আবার আমার ভিতরে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। আমি মনে মনে বললাম, চুপ! চুপ কর।

তবু পিসির দিক থেকে এ অভিযোগটুকু শুনতেই হবে তাকে। পরিত্রাণ নেই।

 ভবেনকে নিয়ে ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিলাম। বচন বলল, অই গ টোপনদাদা, দাঁড়াও। এখন তো আর আমাদের মুখ তাকাবে না। বোরা মাস্টেরের সাইকেলটা দাও, লিয়ে যাই। আর যোবা মাস্টের বারে বারে বলে দিয়েছে, কী যেন বইললে? ইহঁ, বলে দিয়েছে, বেজনে যেইও। তা বেজনটা কুথা গ?

হেসে বললাম, সে তুই চিনবি না।

বচন বলল, বেশ, না চিনলাম। কিন্তুক বেজনে যাও না যাও, বলে যাই, মাঝে মধ্যে টুকুস ইস্টিশনে যেইও।

যাব।

 বলে দালান থেকে তাকে সাইকেলটা বার করে দিলাম। বললাম, বিজনবাবুকে বলিস, শিগগিরই যাব একদিন।

বচন সবাইকে নমস্কার জানিয়ে চলে গেল। কেবল কুসুম না বলে পারল না, আবার এসো ছোটবাবু।

আসব গ খুকিদিদি।

ভবেনের দিকে ফিরলাম। হাত ধরে বললাম, আয়, ঘরে আয়। চা খাবি?

–খাব।

আমি গলা তুলে বললাম, কুসুম, আর একটু চা দিবি আমাদের?

–দেব।

ঘরের মধ্যে ঢুকলাম। কিন্তু প্রতি মুহূর্তেই বুঝতে পারছি, ভাল করে তাকাতে পারছিনে ভবেনের দিকে। ভবেনও পারছে না। আমার কোনও অপরাধবোধ নেই, তবু কী এক লজ্জা, কী এক সংকোচ আমাকে ঘিরে ধরছে।

জানি, ভবেনেরও অপরাধবোধ থাকা উচিত নয়। তবু ওর চোখেমুখে সর্বাঙ্গে যেন একটি অপরাধীর আড়ষ্টতা।

আমি ভয় পাচ্ছি, ভবেন কী বলবে। পারলে আমি দুহাত দিয়ে আমার হৃৎপিণ্ডের দ্রুত তালকে কঠিনভাবে চেপে ধরতাম।

তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলাম, বল ভব, শালঘেরির খবর বল।

না বললেও অন্তত আশা ছিল, ভবেন আমাকে আমার নিজের কথা বলতে বলবে। কিন্তু, দেখলাম সে খাটের বাজু ধরে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আমি কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই সে মুখ ফিরিয়ে রেখেই বলল, টোপন, ঝিনুক তোকে যেতে বলেছে।

ঝিনুক। ঝিনুক।নাম হিসেবে খুবই অদ্ভুত। বিচিত্র। কেউ বুঝি কোনওদিন শোনেনি এমন নাম। কিন্তু ওই নামটি শুনতে চাইনি আমি। বারে বারে এড়িয়ে যেতে চেয়েছি। কারণ, মানুষ সকলের সঙ্গে ভান করতে পারে। নিজের সঙ্গে পারে না। মানুষ মা বাবা বন্ধু স্ত্রী, সকলের সঙ্গে ভান করতে পারে। এমনকী, তার আরাধ্য ভগবানের সঙ্গেও বুঝি পারে। পারে না কেবল নিজের সঙ্গে।

আমিও পারি না। পারিনি।

আমি মহাকালের বিষাণে কান পেতেছি। তার সেই গুরু গুরু সুরের মধ্যে চেয়েছি তার বাণী পাঠ করতে। জীবনের চলার পথের নিয়ম রাগিণী যখনই তার ছিঁড়ে বের হয়েছে, তখনই বেজেছে বিষাণ। তখনই আমি অভয় চেয়েছি তার কাছে।

কিন্তু ঝিনুকের নাম শোনামাত্র আমার মনে হল, সেই বিষাণে যেন অট্টহাসি। আমার মুখখানি পুড়ে বুঝি ছাই হয়ে গেল।

তবু ভেঙেও না মচকে আমি হেসে বললাম, যাব, নিশ্চয়ই যাব। সে কথা কি আমাকে বলতে হবে নাকি।

বলে আমি মুখ ফেরাবার অছিলায় জানালা খুলতে যাচ্ছিলাম। সহসা ভবেন উঠে, তার শক্ত দুহাতে, আমার দুটি হাত চেপে ধরল। বলল, রাস্কেল, তুই কিছু বলছিস না কেন আমাকে।

একটা প্রচণ্ড নাড়া খেয়ে, আমি যেন কোথায় একটু শক্তি পেলাম। পরীক্ষায় পাশ করার জোর পেলাম যেন কেমন করে। আমি আমার পূর্ণদৃষ্টি মেলে তাকালাম ভবেনের দিকে।

ভবেনের চোখে তবু সেই অপরাধী অনুসন্ধিৎসা।

বললাম, ভব, কথা কি কিছু বলার আছে? এ সব কি বলার?

ভবেন বলল, তোর নেই টোপন, আমার বলার আছে।

না ভব, এতে কারুর কিছু বলার থাকতে পারে না। যা হয়েছে, সেটা শুভ হোক, এ ছাড়া আর সব কথাগুলোই আসল কাহিনীর মধ্যে বাড়তি হয়ে যাবে।

হেসে আবার বললাম, তুই একটা বাংলার সেকেন্ড ক্লাস এম.এ.। তুই কেন বুঝবিনে!

ভবেন বলল, ভুল হল টোপন। বাংলার সেকেন্ড ক্লাস দিয়ে জীবনের পাঠ হয় না। মনে যত কালি জমেছে, তাকে ধোয়া যায় না। বাইরে গেলে একটা কলেজের চাকরি, আর না হয় শালঘেরির এই স্কুলে মাস্টারি, এই হয়। তুই চুপ করে থাকবি, হয়তো তুই এবার সত্যি আমাকে ভালবাসতে ভুলেছিস টোপন। কিন্তু আমি কিছু না বলে পারব না।

ভবেনের গলার স্বরে, আমার বুকের মধ্যে যেন টনটনিয়ে উঠল। বললাম, বল তা হলে।

ভবেন প্রথমেই বলল, আমার অপরাধ হয়তো ক্ষমার অযোগ্য। তবু আমাকে তুই ক্ষমা কর টোপন। ক্ষমার কথা শুনে, আমার ভিতরে যেন কেউ বিদ্রূপ করে হেসে উঠল। বললাম, ক্ষমার প্রশ্ন আসছে কেন ভব?

–আসবে। আসবেই তো। যা করেছি, তা বলতে বাধছে। প্রশ্ন আসে, কারণকারণ ঝিনুককে আমি বিয়ে করেছি।

একটা তীরবিদ্ধ যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে গিয়েই, আমি যেন হেসে উঠলাম। বললাম, করবিনে কেন? ঝিনুক তো আইবুড়ো মেয়েই ছিল ভব।

ভবেন শুধু আমার হাতটা বেঁকে দিয়ে বলল, রাস্কেল!

 কিন্তু আমার গলায় যেন আর শক্তি নেই। বুক থেকে সমস্ত কথাকে নিংড়ে শুষে নিতে চাইছে। শ্বাসরুদ্ধ করছে আমাকে। তবু এ প্রসঙ্গ থেকে আর নিরস্ত করবার উপায় নেই ভবেনকে।

সে আবার বলল, কিন্তু টোপন, ঝিনুক, ঝিনুক কার ছিল?

ভবেনের কথাগুলি কথা নয় একটিও। ছুঁড়ে মারা আগুন। আমি প্রায় ধমকে উঠলাম ভবেনকে, কী যা তা বলছিস, ছি! ঝিনুক তো স্বৈরিণী নয় যে, কখনও সে কারুর ছিল, এখন সে আর একজনের হয়েছে। ঝিনুক উপীনকাকার মেয়ে, এখন তোর বউ।

ভবেন যেন দমবন্ধ করে বলে উঠল, দ্যাখ, দ্যাখ টোপন, আমাকে এড়িয়ে যাবার, ছলনা করবার জন্যে কী সব বলছিস তুই। যে কথা জানে সারা শালঘেরির লোক, সে কথা না জানার ভান করছিস তুই আমার কাছে। তোর কত কাহিনী যে আমার কাছেও জমা হয়ে আছে। কত রাত জেগে জেগে যে তুই নিজে আমার কাছে ঝিনুকের কথা বলেছিস, ভান করতে গিয়ে সে কথাও চাপতে চাইছিস তুই। কেমন করে চাপবি? এমন কথাও কি হয়নি টোপন, তোর বিয়েতে, তোর বাবার পরেই দ্বিতীয় বরকর্তা হব আমি। তোর আর ঝিনুকের কান মলে দেব আমি।

আমার বুকের মধ্যে কোথায় চাপা পড়ে থাকা আগুনে যেন ক্রমেই ভবেন ফুঁ দিয়ে উসকে দিচ্ছিল। যাকে আমি জয় করতে চেয়েছিলাম, সেই মেঘ ভার হয়ে নেমে এল আমার মুখে। আমি বললাম, ভব, এ সব কথা নিরর্থক। কেন আমি শুনব?

ভবেন বলল, শুনবি, কারণ তুই লুকোতে চাইছিস। টোপন, স্বয়ং উপীনকাকারও কি জানতে বাকি ছিল, তুই হবি ঝিনুকের বর? ঝিনুকেরও কি বাকি ছিল? ঝিনুক নিজেও কি তা কোনওদিন কারুর কাছে চাপতে চেয়েছে? তোর জন্যে কি ও দুর্নাম পায়নি শালঘেরিতে? সেই দুর্নাম নিয়ে, তোতে আমাতে মন খারাপ করে কত দিন কত কত কথা বলেছি। কিন্তু শালঘেরিতে কুমারী মেয়ের প্রেম প্রথম নয়। ইতিপূর্বেও হয়েছে। লোকে কথা বলেছে। বিয়ের পর সবাই চুপ হয়ে গেছে আবার। এও তাই হত। সেই ভেবে আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম। এও জানাজানি ছিল, উপীনকাকা তোর বাবার সঙ্গে কথাও বলেছিলেন। প্রথমে মন কষাকষি হলেও, পরে দুজনেই রাজিও হয়েছিলেন মোটামুটি। না হলেই বা কী আসত যেত? ঝিনুককে কি কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারত তখন? টোপন!

ডাক শুনে ফিরে তাকালাম ভবেনের দিকে। কিন্তু আমি যেন ভবেনকে চিনতে পারলাম না। আমি ভুলে গিয়েছি, কাল রাত্রে আমি সাড়ে তিন বছর বাদে ফিরে এসেছি জেল থেকে। যেন দেখছিলাম, শালঘেরির পুবপাড়ায়, এক অস্পষ্ট জ্যোৎস্না রাতে আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার সেই প্রিয় হিন্তাল গাছটির তলায়। আমার ছায়ার কোলে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে এক মেয়ে। আমার জামা টেনে ধরে রেখেছে। সে। দু চোখ তার দুঃসাহসিনী অভিসারিকার নির্ভয় প্রেমে চকিত। সন্ধ্যাবেলার বোয়া শরীর ও সদ্য বাঁধা চুলে তার, যেন কোনও ভোরের ফোঁটা ফুলের গন্ধ। আমরা কোনও কথা বলিনি। আমরা শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম। সামনে আমাদের তামাইয়ের মাঠের কুহকী আলোর বিস্তার।

ভবেনের ডাকে আমি যেন অনেক দূর থেকে ফিরে এলাম। বললাম, অ্যাঁ?

ভবেন বলল, মনে নেই, টোপন, ঝিনুক আর তোর সঙ্গে, তিন জনে আমরা তামাইয়ের ওপারে শালবনে চলে গেছি কত বার। আমি তোদের একলা থাকতে দিয়ে, ঘুরে এসেছি জঙ্গলে। এসে দেখেছি, শুকনো পাতায় বসে তোরা মুখোমুখি কথা বলছিস। তোদের দুজনকেই কত ঠাট্টা করেছি আমি। দুজনেই তোরা লজ্জা পেতিস। তারপরে, ভাবনা দেখা দিত, ঝিনুক বাড়ি ফিরে গিয়ে কী বলবে? এতক্ষণ তো নিশ্চয় খোঁজ পড়ে গেছে। তারপর স্থির হয়, আর দেরি নয়। তিন জন তিন দিক দিয়ে যাব। শুধু ঝিনুককে নজরে নজরে রাখতে হবে। একলা মেয়ে, তাই। তামাইয়ের হাঁটুজল হেঁটে পার হয়ে আসতাম আমরা।…

আমি হাত তুললাম। প্রায় পায়ে ধরার মতো করে বললাম, থাক ভব। কী হবে এ সব কথা বলে।

ভবেন চোখ নামাল। গলার স্বর নামল আরও। বলল, বলতাম না। কিন্তু তুই বললি। তুই যে বললি ঝিনুক স্বৈরিণী নয়। তা নয়, সে কথা যে আমি জানি। তাই বললাম। কার ঝিনুক বলায় তুই যে প্রতিবাদ করলি, তাই বললাম।

আমি বললাম, সেটা আমি এখনও প্রতিবাদ করব ভব। এ কথা তোর বলা উচিত নয়। ভব, এ সব কথা কখনও আমাদের বলাবলি করা সাজে না আর। কী ছিল, কী ঘটত, সেটা বড় নয়। যা ঘটেছে, সেটাই সত্যি। সেই সত্যের সঙ্গে আমাদের এ সব কথা শুধু আঁধার সৃষ্টি করবে। সত্যিটা সংশয় হয়ে দাঁড়াবে। আমরা মানুষ, তার উর্ধ্বে নয়। কথা বলে মনে ভাঙাভাঙি হয় যদি?

ভবেন বলল, না থোক, তাই চাই টোপন। কিন্তু না বলেও যদি মন ভাঙে, তখন কী করব। আজকে যে তোর সামনে এসেছি, হলপ করে কি বলতে পারি, কোথাও কিছু ভাঙেনি? চিড় খায়নি একটুকুও? তবু যদি সামলে নেওয়া যায়, তাই অনেক চেষ্টা করে এসেছি তোর কাছে। বলে যদি পুরো ভাঙে, ভাঙুক। তবু তুই জেনে নে, কেন এমন ঘটল? কারণ, এ কথা তোকে আর কেউ বলবে না। বলতে পারবে না।

ভয় আমাকে আবার গ্রাস করতে উদ্যত হল। আবার কী বলবে ভবেন?

 ঝিনুক ওকে যেচে বিয়ে করতে চেয়েছিল, ও তাই বাধ্য হয়ে করেছিল? নাকি উপীনকাকা অনুরোধ করেছিলেন ওকে, তাই ও বিয়ে করেছে ঝিনুককে।

যা খুশি তাই সত্যি হতে পারে। জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে আমার। এ সব ছায়া সেখানে যেন আর না পড়ে।

কিন্তু ভবেন থামল না। বলল, টোপন, উপীনকাকার কথা জানিনে, ঝিনুকের কথা বলতে পারি। বলতে পারি, ঝিনুক যে নিতান্ত মানবী, এটা জানতে পেরেছি। শুধু মানবী নয়, ঝিনুক যে একান্ত এই শালঘেরিরই এক মেয়ে, বাইরের জগৎ যার একেবারে অচেনা, বাহ্য সংসার নিয়ে যার অনেক সংশয়, ভয়, তাও আমার কাছে ধরা পড়েছে। কিন্তু কিন্তু টোপন, বিশ্বাস কর, কাব্য করার সাধে বলছি না, সেই একান্ত মানবী যে চিররহস্যে ঢাকা, চির অচেনা, চির দুর্বোধ্য, সেটাও আবিষ্কার করেছি। আবিষ্কারের পর তখন তাকে একান্ত মানবী বলে আর চিনতে পারি না। নিতান্ত শালঘেরির মেয়ে বলে আর তাকে একটুও বোঝা যায় না। সেই আবিষ্কারের দিকে অবাক হয়ে, চুপ করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই।

বলতে বলতে ভবেনের গলার স্বর আস্তে আস্তে ডুবে গেল। আর সে যেন বহু দূর শূন্যে পরম বিস্ময়েই তাকিয়ে রইল তার সেই আবিষ্কারের দিকে। আমি যেন ঠিক অনুধাবন করতে পারলাম না ওর কথার অন্তর্নিহিত বক্তব্য। কিন্তু ওর শূন্যে নিবদ্ধ চোখের বিস্ময়ে, একটা আহত পাখির পাখা ঝাপটানো যন্ত্রণা যেন দেখতে পেলাম।

ভবেন হঠাৎ আমার দিকে ফিরে বলল, টোপন, মন নিয়ে মানুষ বেহুশ হয়, জানিস?

জানি।

 ভবেন মুখ ফিরিয়ে নিয়ে, দ্রুত উচ্চারণে বলে উঠল, মানুষ যখন অসহায় হয়, বিভ্রান্ত হয়, হতাশায় দুঃখে ঝিমিয়ে থাকে, তখন মানুষের হুশ থাকে না। টোপন, ঝিনুক আর উপীনকাকার মনের এমনি অবস্থায় প্রস্তাব করলাম, ঝিনুককে আমি বিয়ে করতে চাই।

আমি চকিতে একবার ভবেনের মুখের দিকে তাকালাম। ওর গলার শিরগুলি স্ফীত। চোখ দুটি আরও রক্তাভ। গলার স্বর ওর ক্রমেই রুদ্ধ ও স্তিমিত হয়ে আসছে। বলল, টোপন, আমার অবস্থাও তখন ভাল নয়। অনিরুদ্ধ মারা গেছে। তুই জেলে চলে গেলি। কবে ফিরবি, কোনও ঠিক নেই। যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ যেন জীবনের সব বিশ্বাস আর স্বপ্নের পরদা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিলে। দেখলাম, শালঘেরি গ্রামটা মরো মরো হয়ে খাবি খাচ্ছে। আমাকে কেমন একটা ভয় চেপে ধরল। আমি ভয় পেলাম, যে ভয় মানুষকে কাপুরুষ করে তোলে, অস্থির করে তোলে। মনে হল, জীবনটা নিতান্ত ছোট, সবকিছু শেষ হয়ে এল বলে। এমনি একটা হতাশা তখন সকলের মধ্যে। না, আর দেরি নয়, আর দেরি করলে সব হারাব। উপীনকাকার মনের অবস্থাও তাই ছিল। তাই তিনি রাজি হয়ে গেলেন। আর ঝিনুক-ঝিনুক, তার মন কি আমি সত্যি জানি!

ভবেন যেন আবার স্তব্ধতার গভীরে ডুবে গেল। আর এই নির্মম স্বীকারোক্তির সামনে দাঁড়িয়ে কী বলা উচিত, বুঝতে পারলাম না। তবু বললাম, ভব, পরে হবে এ সব কথা।

 ভবেন তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আর পরে নয় টোপন। মুখ যখন খুলেছে, তাকে বন্ধ করব না। নইলে আর কোনওদিনই হয়তো বলা হবে না। এ সব কথা রোজ রোজ বলা যাবে না। তুই ফিরে এসেছিস, টোপন, তুই ফিরে এসেছিস, আর ভয় নয়, মিথ্যে নয়, তোর সঙ্গে আমার মুখোমুখী, সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে হোক। তোর সঙ্গে তো আমি কখনও মিথ্যাচার করিনি। শোন, শোন টোপন–

ভবেন নিচু স্বরে প্রায় ফিসফিস করে বলল, টোপন, ঝিনুককে তুই ভালবাসতিস, তাতে আমার অসাধ ছিল না। কিন্তু তোর ভালবাসা দেখে, কবে যেন আমারও একদিন ভালবাসতে সাধ হল ঝিনুককে। তোকে দেখে দেখে,কবে যেন একদিন আমারও সাধ হল, ঝিনুকের দিকে আমি তোর মতো করে তাকাই। তোর মতো ওর হাত ধরি, ওর কাছে যাই। সাধ হল, ঝিনুক আমার দিকে অমনি করে তাকাক। অমনি করে হাসুক, হাত ধরুক, নির্ভয়ে অসংকোচে আমার পাশে আসুক। কবে কোনদিন এ সব কথা আমার মনে হয়েছিল, হিসেবে রাখিনি। বোধ হয়, অনেক দিন ধরে, একটু একটু বিষক্রিয়ার মতো শুরু হয়েছিল। যেদিন তার জ্বালা টের পেলাম, সেদিন আমি সরতে পারিনি টোপন।

আমি ভবেনের গায়ে হাত রাখলাম। ভবেন বলতে লাগল, ঝিনুককে পাওয়ার সাধে সরতে পারিনি। নিজেকে অনেক জিজ্ঞেস করেছি টোপন, কে এর জন্যে দায়িত্ব নিজেকে নিষ্টেপিষ্টে ধরেছি, মেরেছি, খুলেছি। কিন্তু ঝিনুককে আমি ভালবেসেছি। আর ঝিনুক? আমি জানিনে। শুধু ও তখন ব্যক্তিত্বহীনা বিভ্রান্ত। উপীনকাকা হতাশ। বিয়ের ব্যবস্থা আমিই করলাম। তোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি বলে আমার মনে হয়নি। শুধু একটি অসহায় জবাব পেয়েছি নিজের কাছে, ঝিনুককে আমি ভালবেসেছি। অন্ধ ক্রুর স্বার্থপর হয়তো, নিজের কাছ থেকে ছাড়া পেলাম না আমি। টোপন, ত্যাগ করবি আমাকে?

আমি ভবেনের একটি হাত তুলে নিলাম। কী বলব! ফুলকে কত লোকে ভালবাসে। আমিও কেন বাসি? কোকিলের ডাক শুনতে সবাই চায়। আমিও চাই কেন? ভবেনকে আমি কী বলব! কিছু বলব না। কোনও অস্পষ্টতা তো নেই। কোনও জটিলতা তো নেই। জীবনরহস্যের রংমহলের দরজাটা কোনও সমারোহ না করেই খুলে দিয়েছে ভবেন আমার চোখের সামনে। সেই অপরূপ মহলের রূপহীন অরূপের দিকে তাকিয়ে, কোন দ্বন্দ্বযোদ্ধা কবে অসিমুক্ত করেছে?

ঝিনুক কেমন করে সকল পূর্বস্মৃতি ভুলেছিল, তা ভবেনের জানবার কথা নয়। যদি কেউ ভুলে যায়, তবে এ ক্ষেত্রে তাকে খাতকের মতো গলা টিপে ধরতে পারিনে। এখানে সুদ-আসলের প্রশ্ন নেই। মন নিয়ে যেখানে লেনদেন সেখানে হিসেবের তমসুক কে কবে লিখেছে। সে যে বড় গ্লানি। ব্যর্থতার অপমান!

ঝিনুকের মন, ঝিনুকেরই প্রাণের সিদ্ধান্তে চলবে, আমরা তা মেনে নেব। এইটুকু আমার সাহস। আমি তাই ফিরে এসেছি।

বললাম, তোর কথা তোকে ফিরিয়ে দিই ভব, তুই একটা রাস্কেল। ত্যাগ করব কেন? সেইজন্যে কি শালঘেরিতে ফিরে এসেছি?

তবে কিছু বল টোপন। জেলে যখন সংবাদ পেয়েছিলি?

–ও কথা জিজ্ঞেস করে লাভ কী? তোর হলেও যা হত, আমারও তাই হয়েছিল। কিন্তু আমি ফিরে এসেছি ভব।

–তবু তুই কিছু বল টোপন। এই দিনটার জন্য আমি তিন বছরের ওপর অপেক্ষা করছি।

 –তুই আর ঝিনুক সুখী হ।

ভবেন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সহসা। আমাদের পুরনো বাড়ি কেঁপে উঠল তার উচ্চ হাসির ঝংকারে। আর দরজায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল কুসুম। দু হাতে তার দুটি পাথরের গেলাসে ধূমায়িত চা। চোখ কপালে তুলে সে চমকে উঠে বলল, বাবারে বাবা! ওকী হাসি!

ভবেন থামল। কুসুমকে দেখে সামলে নিয়ে বলল, অ্যাঁ? কী বলছিস কোসোম? চা আনছিস নিকি?

যেন হাসির দমকটা তখনও থামেনি ভবেনের।

 কুসুম ভ্রূ কুঁচকে, ঠোঁট মুচকে হাসল। বলল, বেশ তো ভদ্দরলোকের মতো কথা হচ্ছিল, আবার কুসুমকে দেখে গেঁয়ো কথা কেন? নাও, তাড়াতাড়ি ধরো, হাত পুড়ে গেল।

চা নিয়ে সেই হাসির উচ্ছ্বাসেই ভবেন বলল, বাবারে, তু য্যা খুব বড়া হয়্যা গিছিস কোসোম।

 কুসুম বলল, চিরকাল ছোট থাকব বুঝি? কিন্তু অমন দস্যির মতো হাসছিলে কেন?

ভবেন বলল, ক্যানে? দেখছিস না, পুরনো দোসর ফিরা আসছে।

কিন্তু কুসুমের কিশোরী চোখে বিস্ময়ের ছোঁয়া লেগে রইল ভবেনের দিকে তাকিয়ে। কারণ, এখন যে দেখবে ভবেনকে, সে-ই বুঝবে, তার চোখ মুখ হাসি, সবটাই অস্বাভাবিক। আমার মুখও স্বাভাবিক ছিল না। হাসতে পারছিলাম না, কথাও বলতে পারছিলাম না। কুসুম এক বার আমার দিকে তাকিয়ে চলে গেল। বোধ হয় বুঝতে চাইল, কী হয়েছে।

দেখলাম ভবেনের হাসির রেশটা তখনও যায়নি। যেন মাতালের মতো। হাসতে হাসতে খানিকটা আপন মনেই বলতে লাগল, সুখী হব। সুখী হব। কেন, আমি কি অসুখী নাকি?

চমকে উঠলাম ভবেনের কথায়। তাড়াতাড়ি বললাম, না না, সে কথা বলিনি রে। আমি আন্তরিকভাবে কামনা করি।

ভবেন যেন রুদ্ধ হাসির তরঙ্গে ফুলে ফুলে উঠে, বলে উঠল, আমরা যেন সুখী হই। বুঝলাম টোপন, ভেতরের দরজাটা তোর খুলল না। এত সহজে খোলে না জানি। অনেক দিন ধরে চাবি এক পাকে ঘুরে ঘুরে বন্ধ হয়েছে। উলটো পাকে অনেক দিন না ঘুরলে খুলবে না। কিন্তু টোপন, তত দিন আমাকে যেন দূরে সরিয়ে রাখিসনে। তা হলে আমার শালঘেরির বাস উঠে যাবে।

বলে সে, আমার দিকে তাকিয়ে চায়ের গেলাসে চুমুক দিল।

আমি বললাম, তুই দেখছি সত্যি রাস্কেল। আমার জন্যে তোর শালঘেরির বাস উঠবে, এ কি কখনও সম্ভব!

–দেখা যাক।

ভবেন হাসল। চুপ করে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আবার বলল, অনেক দিন তোর জন্যে অপেক্ষা করেছিলাম টোপন। ক্ষমা হয়তো কোনওদিন করবিনে। কিন্তু তাড়িয়ে দিতে পারবিনে। এবার একদিন বেড়াতে যাব টোপন।

জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় রে।

–তামাইয়ের ধারে, শালবনে। যাবি তো টোপন!

আমি বললাম, সেই জন্যে তো এসেছি আরও। সারা তামাইয়ের ধারেই তো আমার কাজ।

ভবেন ফিরে তাকাল। ঠিক যেন মদ খেয়েছে ভবেন, এমনি রক্তাক্ত তার চোখ। মনে হয়, চোখের কোলগুলিও এর মধ্যেই বসে গেছে অনেকখানি। বলল, কাজ নয় টোপন, বেড়াতে যাব তামাইয়ের ওপারে শালবনে। তুই, আমি, ঝিনুক।

ঝিনুক? কেমন করে এত সহজে বলছে ভবেন। কিন্তু ওর দিকে দেখে, ওর কথার সুরে, আমাকে আঘাত করার ইচ্ছে টের পাইনে। ভবেন যেন দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে। আর আমি অসাড় হয়ে পড়ছি। বললাম, বেশ বেশ, যাওয়া যাবে।

ভবেন বলল, যাওয়া যাবে-টাবে নয়। মন রেখে বলিস, আর যা-ই করিস, যেতে হবে।

 কেন বলছে এ কথা ভবেন। ঝিনুক শিখিয়ে দিয়েছে নাকি বলতে? পুরনো দিনকে ফিরে পেয়ে, আমি একটু আনন্দ পাব, তাই? বন্ধু আর বন্ধুপত্নীর উদার সাহচর্যের অনুকম্পা? যেন ওরা একটা অপরাধ করে ফেলেছে। তামাইয়ের শালবনে বেড়াতে গিয়ে, তার প্রায়শ্চিত্ত করবে। এতটা নিষ্ঠুর কেন হবে ওরা। সে যে অনেক বড় অপমান করা হবে আমাকে। শালঘেরিতে ফিরে আসার সব আনন্দ, সব সাহস যে আমার নিভে যাবে আস্তে আস্তে।

ভবেন আবার বলল, যেতেই হবে কিন্তু একদিন তাড়াতাড়ি। অনেক দিন বলেছি ঝিনুককে, ও যায়নি।

আমি ফিরে তাকালাম ভবেনের দিকে। ভবেন চোখ নামিয়ে বলল, অনেক দিন ধরে যাবার ইচ্ছে।

কেমন যেন রহস্যময় অস্পষ্ট লাগল ভবেনকে। অনেক পরিবর্তন হয়েছে তার। চেহারার তো হয়েছেই। মানুষ হিসেবেও অনেক বদলেছে বলে আমার মনে হল। শুধু বয়স বাড়ার অতিরিক্ত ছাপটুকু নয়। কী একটি জিনিস যেন নেই আর ভবেনের মধ্যে। যার নাম জানিনে, অথচ অনুভব করছি, তা হারিয়ে গেছে ভবেনের কাছ থেকে।

তার কথা শুনে মনে হয়, একদিন তামাইয়ের ধারে শালবনে যাওয়াটাই জীবনের শেষ নিশানা হয়ে আছে।

বললাম, বেশ তো, যাব। চল, এবার বেরোই।

–আমাদের বাড়ি যাবি তো? ঝিনুক বলে দিয়েছে, আজ ওখানেই খাবি।

আমি বললাম, ওরে বাবা! পিসি তা হলে আমাকে খেয়ে ফেলবেনা? সেই ভোর থেকে একে তাকে দিয়ে নানান রকম বাজার দোকান হচ্ছে।

ভবেন বলল, সেটা আমিও আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু ওবেলা, অর্থাৎ রাতে তোকে আমাদের ওখানে খেতেই হবে। নইলে আমার যে ঘরে টেকা দায় হবে।

মনে মনে ভাবলাম, আর সেই ঘরের ঘরনি ঝিনুক। এমন খেলার ইচ্ছে কেন ঝিনুকের মনে যে, ভবেনেরও ঘরে টেকা দায় হবে?

বললাম, তা হলে পিসিকে এক বার বলতে হয়।

 ভবেন বলল, আমিই বলছি।

বলেই গলা তুলে ডাকল, পিসিমা। পিসিমা।

কুসুমের গলা ভেসে এল, জেটি জপে বসেছে।

 কিন্তু কুসুমের কথা শেষ হবার আগেই, পিসির গলা শোনা গেল, যাই র‍্যা।

অর্থাৎ জপ শেষ হয়েছে পিসির। বলতে বলতেই এলেন। কী বলছ ভবেন?

টোপন, আজ রাতে আমাদের বাড়িতে খাবে পিসিমা।

পিসিমার মনঃপূত হল না। বললেন, এ্যাই তো আসছে রে বাড়িতে। দুটো দিন যাক না।

ভবেন বলল, না পিসিমা। এ বেলাটা আপনার, ও বেলাটা আমার।

ভবেনের কথায় পিসি হেসে ফেললেন। আমারও মনটা খুশিতে ভরে উঠল ভবেনের কথা শুনে।

পিসি বললেন, খুব ছেলে যা হোক তুমি। তা তোমার কথা আলাদা। এখানে আমি না বলতে পারি না।

যদিও পিসির আমি এতখানি বাধ্য নই। কিন্তু এত দিন পরে এসে, তাঁর মনে আমি কোনও গ্লানি সৃষ্টি করতে চাইনে। তাই তাঁর অনুমতি।

পিসি বেরিয়ে গেলেন। আমার সহসা মনে পড়ল। বললাম, ভব, তুই স্কুলে যাবিনে আজ?

ভবেন বলল, না। আজ আমার ছুটি।

কীসের?

–তুই এসেছিস।

 হেসে ফেললাম। বললাম, শুধু শুধু স্কুল কামাই করলি।

–তা বটে।

বলেই, আবার কী যেন মনে পড়ল ওর। বলল, শোন টোপন, স্কুলের ছেলেরা আর মাস্টারমশাইরা আসবেন তোর কাছে।

কেন?

–তোকে কাল গ্রামের স্কুলের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে।

আমি একেবারে কাঠ হয়ে গেলাম। বললাম, কেন ভব?

 ভবেন হেসে বলল, কেন আবার? শালঘেরির দেশপ্রেমিক ছেলে তুই। তোর জন্য শালঘেরি গৌরব বোধ করছে। তাই

-না না না।

আমি প্রায় পা দাপিয়ে বলে উঠলাম। সন্দিহান চোখে তাকালাম ভবেনের দিকে। বললাম, তুই এ সব পরামর্শ দিয়েছিস বুঝি? কিন্তু এ সব আমি কিছুতেই পারব না। এখানে আবার ও সব কী?

ভবেন ভান করল কি না জানি না। সে বলল, কী আশ্চর্য! আমি রামর্শ দিতে যাব কেন? শালঘেরির লোক কি বোকা নাকি? না, তাদের মর্যাদাবোধ নেই যে, আমার পরামর্শে তারা কাজ করবে? গড়াইয়ে অনিরুদ্ধ শহিদবেদি কি তোর আমার পরামর্শে করেছে গড়াইয়ের লোকেরা।

অনিরুদ্ধ শহিদবেদি করেছে, করতে পারে। কারুর সম্মান কিংবা শ্রদ্ধা দেখানোকে কটাক্ষ করতে চাইনে। অনিরুদ্ধকে আমি অন্য মানুষ হিসেবে জানতাম। বললাম, দ্যাখ ভবেন, অনিরুদ্ধ অনেক বড়, তার জন্যে লোকে শহিদবেদি করতে পারে। কিন্তু আমাকে নিয়ে কেন?

ভবেন বলল, এ বিষয়ে তুমি আমাকে মাফ করো। যাঁরা আসবেন, তাঁদের সঙ্গে যত খুশি তর্ক করো, আমি কিছু বলব না।

–তুই তাদের বোঝাতে পারিস।

–তারা কেউ অবুঝ নন।

—কিন্তু বিশ্বাস কর ভবেন, শালঘেরিতে সংবর্ধনায় কথা ভাবলে এখনি লজ্জায় আমার হাত পা অবশ হয়ে আসছে।

লজ্জায় হাত পা অবশ?

ভবেন হাসল। বলল, জেলে যখন গেছিস, এটুকু সামলাতে হবে।

বললাম, যেচে যাইনি। ধরে নিয়ে গেছল।

–সেইজন্যেই লোকের শ্রদ্ধা।

পথে বেরিয়ে সে সব কথা ভুলে গেলাম। পথে যার সঙ্গে দেখা হয়, তার সঙ্গেই কথা। এখানে ওখানে জটলা হয়ে যায়। পাড়ায় ঢুকলে বাড়িতে বাড়িতে ডাক। যার কোনওদিন কথা বলতে ইচ্ছে করেনি, সেও আজ ডেকে জিজ্ঞেস করছে।

পাখি ময়রা চিৎকার করে ছুটে এসেছে, উরে বাবা, টোপনঠাকুর, তুমি? তুমার ফাঁসি হয় নাই তবে? আর গোটা শালঘেরি জানে, তুমার ফাঁসি হয়্যা যেইছে। আস, আস, এটটু মিষ্টিমুখ করা যাও।

কেন যে পাখি ময়রার নাম পাখি রাখা হয়েছিল, বুঝিনে। কালো নধর ওই বিশাল বপুর নাম যদি পাখি হয়, তবে রোগা লোকগুলির নাম ফড়িং রাখা উচিত। যদিও ফড়িং নামের এমন ট্র্যাজেডিও দেখেছি।

বললাম, তোমার খাবার আজ সকালে বাড়িতেই খেয়েছি পাখি খুড়ো। আর একদিন দিয়ে, খাব।

শালঘেরির স্কুলের মাস্টারমশাইরা ঘিরে ধরলেন। ছাত্ররা কৌতূহলী হয়ে সব তাকিয়ে রইল। সেই সময়েই প্রস্তাবনা গেয়ে রাখলে ক্লাস নাইন-টেনের ছেলেরা।

আজ যেন শালঘেরির এ দিনটি শুধু আমার জন্যে। সকল ঘরের, সব মানুষের। কোথাও কোনও পরিবর্তন দেখতে পেলাম না। প্রায় একই রকম আছে সব। শুধু পোস্ট অফিসের মাস্টারমশাইয়ের পরিবর্তন হয়েছে। তিনি আমাকে চেনেন না।

শালঘেরির পথে বিপথে শাল মহীরুহ। আর পাড়ায় পাড়ায় প্রাচীন মন্দিরের ছড়াছড়ি। কোনও মন্দিরেই পোড়া ইটের কারুকার্যের অভাব নেই। সে কারুকার্যে লৌকিক ও অলৌকিক কাহিনীর বিস্তার। অক্ষরে নয়, চিত্রে। রামায়ণ মহাভারতের পুরাণ থেকে প্রাচীন ও মুসলমান যুগের নরনারীদের ভিড় টেরাকোটার অঙ্গসজ্জায়।

ক্রমেই ঘুরতে ঘুরতে এলাম তামাইয়ের ধারে। ভবেন আমার সঙ্গে সঙ্গেই আছে।

তামাইয়ের তীরে তীরে প্রকৃতির খেয়ালে, যেখানে মাটি, সেখানেই আমন ধান কাটা রিক্ত মাঠের পাঁশুটে ছবি। পাথর খুব বেশি নেই। কিন্তু পাথরকুচি ও বালিমাটি দেখলেই বোঝা যায়।

তামাইয়ের ধারে গাছপালা বেশি। তালগাছ যেন প্রায় লাইনবন্দি নদী সীমানার প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। খেজুরগাছের ভিড়ও কম নয়।

তামাইয়ে এখন হাঁটুজল। কয়েক হাত সরু নিঝর। স্বচ্ছ জলের তলায় লাল মাটি দেখা যায়। কোথাও কোথাও ছোটখাটো পাথর দেখা যায় নদীর বুকে। বর্ষার টানে গড়িয়ে এসেছে। সেই সব পাথরে বাধা পেয়ে, তামাই গান গাইছে কলকল সুরে।

শালঘেরির মানুষকে শতাব্দী ধরে তামাই অনেক বার ঘরছাড়া করেছে। শালঘেরি অনেক বার রুদ্রাণী তামাইয়ের থাবার তলায় ডুবেছে।

তিন মানুষ সমান উঁচু একটি কালো পাথরের চাঁই, তামাইয়ের ধারে আমাদের আজন্মকালের চেনা। ওর ঘাড়ে পিঠে চড়ে আমাদের শৈশব কেটেছে। ও কখনও হাতির হাওদা হয়েছে। কখনও বিশ-পঁচিশ সওয়ারি পক্ষিরাজ হয়ে উড়েছে আমাদের সবুজ আকাশে। কখনও সবুজ নদীর বুকে ভেসেছে সপ্তডিঙা হয়ে।

পাথরটিকে ঘিরে গুটিতিনেক তালগাছ। দেখলে মনে হয়, তিনটি ছাতা ধরে আছে কেউ পাথরটার মাথায়।

শৈশব কাটিয়ে যৌবনেও এসে আমরা এই পাথরে ঘা দিয়ে অনেক দিন বসেছি ঘাসের ওপর। আজও এসে দাঁড়ালাম পাথরটির গায়ে। শালঘেরির এই নিরালা কোণটিতে কত দিন এসে বসেছি মনে মনে, সেই প্রেসিডেন্সি জেল থেকে।

ভবেন আমার দিকে তাকাল। আমিও ভবেনের দিকে তাকালাম। তারপর দুজনেই বসলাম সেই পাথরের গা ঘেঁষে। কথা বলতে আমার ভয় হল। অনেক দিন পরের এই নির্জনতা পাছে ভেঙে যায়।

তবু না বলে পারলাম না, সব ঠিক তেমনি আছে।

ভবেন ওপারের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে বলল, না।

আমি ফিরে তাকালাম ওর দিকে। ও আমার দিকে না তাকিয়ে হাসল।

একটু পরে ভবেন জিজ্ঞেস করল, এখন কী করবি ভাবছিস? বাইরে কোনও কলেজে চাকরিবাকরি নিয়ে চলে যাবি নাকি?

বললাম, গেলে তো আগেই যেতাম। এখন আর একটুও ইচ্ছে নেই।

কী করবি?

–যে কাজে হাত দেব ভেবেছিলাম, এবার সেটায় হাত দিয়ে ফেলব।

আমি আমার ভবিষ্যতের কর্মসূচি বললাম ওকে। বললাম, জানিস ভব, জেলে গিয়ে দু একটা এদিককার কাজ হয়েছে। কিছু পড়াশোনা করেছি। দেশি বিদেশি কিছু পণ্ডিতদের বই পড়েছি পুরাতত্ত্ব আর প্রত্নতত্ত্বের ওপর। এখুনি আমার আরও কিছু বইয়ের প্রয়োজন। জেলের পড়াটা ঠিক পড়া নয়। অন্তত আমার ক্ষেত্রে তাই দেখলাম। ওখানে আমার মনটাও বদ্ধ হয়ে থাকত যেন। তবে, তামাইয়ের ধারে, মাটির তলায় কিছু আছে, এ বিশ্বাস আমার আরও বদ্ধমূল হয়েছে। কিন্তু মানে, একদিন যে সন্দেহ করেছিলাম, একটি প্রাগৈতিহাসিক সমাজ ও জীবনধারণের চিহ্ন লুকিয়ে আছে তামাইয়ের মাটির তলায়, তাতে আমার আর সন্দেহ নেই। একজন অ্যানথ্রপলজিস্ট রাজবন্দির সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। তাঁরই কথামতো বই পড়েছি আমি। ওঁর কাছেও জেনেছি কিছু। বলেছি তাঁকে আমার অভিজ্ঞতার কথা। কেন আমার সন্দেহ হয়েছে, তামাইয়ের নদীর ধারে ধারে মাটির তলায় কিছু আছে। আমি যখন তাঁকে বললাম, মাটি, পাথর ও তামার কয়েকটি জিনিস আমি বিশেষ বিশেষ জায়গা থেকে পেয়েছি তামাইয়ের ধারে, তখন তাঁর দু চোখে আমি একটা বিস্ময়ের ছায়া দেখেছিলাম। নাম তাঁর মিহির দস্তিদার। তিনি আগেই রিলিজ হয়েছেন জেল থেকে। বলেছেন, আমি পত্র লিখলে শালঘেরিতে আসবেন। সাহায্য করবেন আমাকে। শুধু তাই নয়, গবর্নমেন্ট আর্কিওলজিকাল সার্ভের সাহায্য যাতে আমি পাই, তার জন্য তিনি সব রকম চেষ্টা করবেন। তার আগে তিনি আমাকে একটা প্রিলিমিনারি রিপোর্ট তৈরি করতে বলেছেন, যাতে সাহায্যের ভিত্তি প্রস্তুত করা যায়।

ভবেন যেন আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, কিছু বলছিস ভব?

ভবেন বলল, হ্যাঁ। বলছিলাম টোপন, সমস্ত ভবিষ্যৎটাকে এ কাজে এইখানে এনে জড়ো করবি?

–হ্যাঁ।

–তোর সারা জীবন যদি ব্যয় হয়ে যায়?

–তার পরেও যদি না পাওয়া যায় কিছু? ভুল হয়েছে বুঝতে হবে তা হলে।

–গোটা জীবন ধরে এমন অন্ধকারে হাতড়ে ফেরা ভুল টোপন? এ যে ভাবতে পারিনে?

 হাসতে গিয়ে ঠোঁট দুটি আড়ষ্ট হয়ে গেল। আমি ওপারের শালবনের দিকে ফিরে তাকালাম। ভাবলাম, অন্ধকার যেখানে, সেখানে হাতড়ে ফেরা ছাড়া উপায় কী! সারা জীবন ধরে তো মানুষ হাতড়েই ফিরেছে। কেউ পেয়েছে, কেউ পায়নি। কেউ পেয়ে না-পাওয়ার ভুল করেছে। কেউ না-পেয়ে ভুল করেছে পাওয়ার।

ভবেন বলল, তবু আমি একটি কথা বলব টোপন।

বল।

তুই শালঘেরির স্কুলে একটা কাজ নে। জানি, তোর বাবা তোর জন্যে অনেক রেখে গেছেন। তবু, এমন করে সব শূন্য করিস না। দিনকালের কথা তো বলা যায় না। তোর কথা শুনে বুঝেছি, তুই তোর সর্বস্ব এই কাজে ঢেলে দিবি। কিন্তু হুট করে কিছু করে বসা ঠিক হবে না। মাস্টারি নিলেই যে তোকে একেবারে দশটা-চারটে করতে হবে, তার কোনও মানে নেই। অনেক মাস্টারমশাইরাই তোর কাজ মিটিয়ে দিতে পারবেন, তুইও তোর কাজে বাধা পাবিনে। তামাইয়ের ধারে মাটি খোঁড়ার ফাঁকে ফাঁকেই না হয় স্কুল করবি।

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ভবেন আবার বলল, তা ছাড়া স্কুলের কাজ, বছরের অনেকগুলো দিনই তো ছুটির মধ্যে পড়ে।

আমি আরও খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, কথাগুলো মন্দ বলিসনি ভব। কিন্তু কী জানিস, একেবারে মন নেই। শুধু মাস্টার সেজে ছেলেগুলোকে ফাঁকি দেব। বিবেকে লাগছে।

ভবেন বলল, খুব বেশি ভাবলে পেছিয়ে যেতে পারিস। কিন্তু শালঘেরির স্কুল তো জেলখানা নয়। ইচ্ছে করলেই ছেড়ে দিতে পারবি। মোটের ওপর আমি চেষ্টা করব, বলে রাখলাম। এবারে ওঠ। বেলা দেড়টা বেজেছে।

ভবেন আর এক বার তার হাতের ঘড়ি দেখল। উঠতে ইচ্ছে করছে না। তবু না উঠলে নয়। ওদিকে পিসি শুধু নয়, কুসুম বেচারি যে-রকম গিন্নি মনোভাবাপন্ন মেয়ে, সেও হয়তো না খেয়ে বসে থাকবে। ভবেনের জন্যও বসে থাকবে একজন।

উঠে দাঁড়ালাম। মনে হল, ওপারের শালবনে ঝিঁঝির ডাক যেন আরও প্রবল হয়ে উঠল। যেন অনেক দিন পরে দেখাশোনা। আর একটু বসতে বলছে।

মনে মনে বিকেলে আবার আসার ইচ্ছে জানিয়ে চলে এলাম। ওপরে উঠে খানিকটা পশ্চিমে এসে পথ চারদিকে গেছে। মানুষের পায়ে হাঁটা, আর লিক রক্তরেখায় ছড়িয়ে গিয়েছে দিকে দিকে। গোরুর গাড়ি এখন তামাই পারাপার করে, বোঝা গেল। ভবেনকে ফের আমার পথের দিকেই ফিরতে দেখে বাধা দিলাম। বললাম, যা তুই, এত বেলায় আর আসিসনে।

ভবেন বলল, চল না আর একটু যাই।

না। এখন যা। শুধু শুধু আবার দেরি করবি।

ভবেন দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, তা হলে সন্ধেবেলা আমি তোকে আনতে যাব।

আমি বললাম, কেন? আমি কি পথ চিনিনে নাকি?

বললাম, ভবা রাস্কেলের বাড়ির পথ আমি কারুর কাছে চিনতে চাই না। নিজেই যেতে পারব।

 ভবেন বলল, তাই তবে যাস। এবার তবে এগো।

তুই আগে যা।

–না, আগে তুই যা।

হেসে ফেললাম দুজনেই। তারপর আমিই আগে পা বাড়ালাম উত্তরে। ভবেন যাবে দক্ষিণে। একটু গিয়ে পিছন ফিরে দেখলাম। ভনে দাঁড়িয়ে আছে। গলা তুলে বলল, তাড়াতাড়ি আসিস।

বলে হাত নাড়িয়ে পিছন ফিরল।

মনে পড়ল, কবে যেন একদিন ঝিনুককে বলেছিলাম, সকালে পুব পাড়া, বিকেলে পুব পাড়া। ঝিনুক, শালঘেরির লোকে খালি ওই করতে দেখছে টোপন চাটুজ্জেকে।

ঝিনুকের চোখ বেশি বলত। জিভ কম বলত। আমার ধারণা, মেয়েদের অধিকাংশেরই তাই। ধারণার কারণ বোধ করি, নারীচরিত্রের অভিজ্ঞতাটা আমার ঝিনুককে দিয়েই। যেটুকুন বলত, সেটুকুরও নাম দিয়েছি আমি সন্ধ্যাভাষা। যে কথার মানে কখনও একটি নয়, একাধিক। এও হতে পারে, তাও হতে পারে। যেদিক দিয়ে তুমি নেবে। বৌদ্ধ চর‍্যাপদের ভাষাকে তাই সন্ধ্যাভাষা বলা হয়েছে।

সেই সন্ধ্যাভাষার মুনশিয়ানা যেটা, সেটা তার ধার ও অব্যর্থতা। মানে, বক্তব্যটি ঠিক জায়গায় গিয়ে কেটে বসে।

ঝিনুক কেমন, সেইটি ভাসছে আমার চোখের সামনে। স্বল্পবাক ঝিনুক, ধীর, প্রসন্ন, টানা টানা দুটি চোখে বুদ্ধির গভীরতা। কিন্তু সে সত্যি ধীর ছিল না। কাজে ক্ষিপ্র, কিন্তু ব্যস্ততা দেখিনি কোনওদিন। গলা ফাটিয়ে হাসতে শুনিনি কোনওদিন, হাসতে বুঝি কমই দেখেছি ঝিনুককে। তবু তাকে হাস্যময়ী মনে হয়েছে সকল সময়। আবেগ আছে, এমন কথা তার কোথাও লেখা নেই। কিন্তু ঝিনুকের আবেগে প্লাবন হওয়াও বুঝি বিচিত্র ছিল না। ঝিনুককে এক নজরে দেখে সবাই গম্ভীর বলে সামলে যাবে। তার চোখে তখন সে কৌতুকটাই খেলা করবে নানান রং-এ ওর ঠোঁটের কোণে যে বাঁকটুকু কঠিন, সেখানেই ওর হাসিটুকুও আবর্তিত।

মনে হবে ঝিনুককে দেখে, ভাবের চেয়ে ওর রাগ বেশি। ব্যাপারটা উলটো। রাগের চেয়ে ভাব বেশি ওর। কিন্তু ঝিনুক দৃঢ়। জোর দিতে জানে বলে, ওর সবকিছুতে আদায় বেশি।

কিন্তু কেন এ সব ভাবছি। শালঘেরির উপীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ে ঝিনুকের চরিত্র এটা নাও হতে পারে। বোধ হয় নয়। এ শুধু আমার চোখে সাড়ে তিন বছর আগের ঝিনুক।

ঝিনুককে কি কোনওদিন কাঁদতে দেখেছি? দেখেছি। ছেলেবেলার কথা জানিনে। কেনো, তখন ওকে চোখে পড়েনি। জেলা শহরের কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়বার সময়, গাঁয়ে এসে প্রথম চোখে পড়েছিল ঝিনুককে। শালঘেরির বালিকা বিদ্যালয়ে ও তখন ক্লাস এইটে পড়ে। উপীনকাকার মস্ত বড় উঠোনে, সদর দরজা বন্ধ করে, পাড়ার মেয়েরা হা-ডু-ডু খেলছিল। দর্শক ছিলেন উপীনকাকা, কাকিমা, ঝিনুকের ঠাকমা, এক ভাই আর রাখাল ছেলেটা।

আমি আসায় খেলা বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু ঝিনুকের অনিচ্ছায় নয়। সেটা ওর চোখ দেখে বুঝেছিলাম। বাবা মা পাছে রাগ করেন, তাই খেলা বন্ধ হয়েছিল। ঝিনুক বাধা পেয়ে, যেন রাগ করে, ঠোঁটে ঠোঁট টিপে বসেছিল উঠোনের ধারে নিচু বারান্দায়। গাছকোমর বাঁধা, আর ঘাড়ে নয়, চুলের ঝুটি মাথায় চুড়ো করা ছিল।

আমি যতক্ষণ বসেছিলাম, ততক্ষণই ও একটা অশ্রদ্ধার ভাব নিয়ে, ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে ছিল। আর বারে বারে তাকাচ্ছিল আমার দিকে। তখন ওর বন্ধুরাও চলে গিয়েছিল। ওর চাউনি যে আমাকে তাড়াতেই চাইছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। নিজেকে অপরাধী ভেবে, আমিও বারে বারে তাকাচ্ছিলাম ঝিনুকের দিকে। অবাক হয়েছিলাম শুধু এই ভেবে, আমি যে একজন কলেজে পড়ো ছেলে গাঁয়ে ফিরেছি, তাতে তো আমার দিকে সশ্রদ্ধ মুগ্ধ চোখে তাকাবার কথা।

কিন্তু ঝিনুক তা তাকায়নি। সেইজন্যই আমি আর চোখ ফেরাতে পারিনি। বুঝতে পারিনি তখন, ওটা ঝিনুকের মেয়ে-চরিত্রের স্বাভাবিক শর-যোজনা। শর নিক্ষিপ্ত হয়েছিল তখন, যখন সন্ধেবাতি দেখাবার জন্যে বলেছিলেন কাকিমা। ভবিষ্যতে যারা সন্ধ্যাভাষাময়ী হয়, অতীতে বোধ হয় তারা একটু জিভ ভ্যাংচাতে ভালবাসে। ঝিনুক সরাসরি আমাকে নয়, উঠোনটাকে জিভ ভেংচে উঠে গিয়েছিল।

আঠারোর সেই তীরটা খেয়ে, উপীনকাকার বাড়িতে সেদিন রাত আটটা অবধি ছিলাম। জীবনে সেইদিন প্রথম চা খেয়েছিলাম।

সেই প্রথম পুবের টান ধরল। কিন্তু ও আবার কেমন নাম? ঝিনুক নাম তো শুনিনি কখনও। ঝিনুককেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা, তোমার নাম ঝিনুক কেন?

ঝিনুক বলেছিল, মাকে জিজ্ঞেস করো।

কাকিমা, ঝিনুকের নাম ঝিনুক কেন?

কাকিমা বলেছিলেন, সমুদ্রের ধারে অপর‍্যাপ্ত পড়ে থাকে বলে। তাই বাবা ওর নাম ঝিনুক।

উপীনকাকা বলেছিলেন, অবহেলায় পড়ে থাকে বলে। আমি বলি শোন।

তোর কাকিমার ছেলেপিলে হত আর মরে যেত। বেচারির মন গেল ভেঙে। শরীরটাও যায় যায়। এমন সময়ে আবার তোর কাকিমা সন্তানসম্ভবা হলেন। ডাক্তারের পরামর্শে অনেক দিন গিয়ে রইলাম পুরীতে, আমার এক সরকারি কর্মচারী শ্যালকের বাড়িতে। কিন্তু আমাকে ফিরে আসতে হল। ঝিনুকের মা রইলেন। তারপর ঝিনুক হবার সংবাদ পেয়ে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, সবাই ঝিনুককে মুক্তো, মুক্তা, মুক্তামণি, চুনি রানি, এ সব বলে আদর করছে। এ নামের কারণ কী? না সমুদ্রের ধারে হয়েছে, নাম তাই ওর মুক্তা। আমি সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি করে বললাম, না না, মোটেই ও নাম রাখা চলবেনা। ও মুক্তা মানেই আবার চুরি যাবার ভয়। হারিয়ে গেলে মন খারাপ। সমুদ্রে অঢেল ঝিনুক পাওয়া যায়, পড়ে থাকে, কেউ চেয়ে দেখে না, চুরি করে না। ওর নাম থাক ঝিনুক।

ঝিনুককে আমি দুদিন কাঁদতে দেখেছি। ওর একটি পোষা টিয়ে ছিল। সে মরে যেতে কেঁদেছিল। আর একদিন, আমার গ্রেফতার হবার কয়েকদিন আগে, আমাদের বাড়িতে। সেইদিন, সেইদিন

মনে মনে উচ্চারণ করতেও আমার সমস্ত রক্তধারা থমকে আসছে যেন। কুসুমের হাত দিয়ে চিঠি পাঠিয়ে বিদায় চেয়েছিলাম ঝিনুকের কাছে। কুসুমকে ছেড়ে দিয়ে ভিন্ন পথে ঝিনুক এসে উপস্থিত হয়েছিল। সেদিনের মতো বিচলিত হতে আমি কোনওদিন দেখিনি তাকে। সেদিন ঝিনুক বড় কেঁদেছিল।

আমি ভয় পেয়েছিলাম। সেইদিন ঝিনুক সব লজ্জা শালঘেরির অন্ধকারের বুকে ফেলে দিয়ে এসেছিল। সেইদিন ও প্লাবনের সংহারিণী তামাই নদী। আমি ওকে শান্ত করেছিলাম।

শুধু পুবপাড়ায় যাতায়াতে কথাটা যখন বলেছিলাম ওকে, যে, শালঘেরির লোকেরা শুধু টোপন চাটুজ্যেকে ওই করতে দেখছে, তখন বলেছিল, শালঘেরির লোক তো তোমার তুকে অন্ধ হয়নি।

তারপরে ওর ঠোঁটের কোণে হাসিটুকু চেপে, গম্ভীর হয়ে বলেছিল, সত্যেন দত্তর কবিতা পড়েছ?

-কেন বলল তো?

 –পড়েছ কি না বলো না।

পড়েছি বইকী।

মিথ্যে কথা। তা হলে মনে পড়ত।

কী ঝিনুক।

কথাটা তোমার। আমাকে বলতে হবে কেন?

মাঝে মাঝে ঝিনুককে তুই করে বলতাম। বলেছিলাম, একবার বল, তা হলেই মনে থাকবে।

তখন ও কোনও কথা না বলে শুধু কবিতার ওই লাইন দুটি বলেছিল,

ভুল হয়েছিল এক ফুলপানে চেয়ে।
বসন্তে বিকালবেলায় পুর্বপাড়া যেয়ে।

 কেন বলেছিল ঝিনুক সেই কবিতা? সে কেমন ভুল হওয়া? সে কি সেদিনের সব ভোলা-মুগ্ধতা? নাকি আজকের শালঘেরিতে ফিরে এসে এই পুরনো খতিয়ানটার পাতা ওলটানো?

জানিনে, জানিনে কোনটা সত্য। ঝিনুকের কথার বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছিল ওই কবির কবিতায়। সে তার সন্ধ্যাভাষারই অব্যর্থ প্রয়োগ করেছিল সেইদিন। সেদিনও সত্য, এদিনও সত্য।

তাই হোক। আপত্তি নেই। আজ আমি নতুন করে ফিরে এসেছি শালঘেরিতে। ঝিনুকের কবিতা আবৃত্তি করে, আমি নতুন করে শুরু করব। ভুল হয়েছিল এক ফুলপানে চেয়ে।…

তখনও বাড়ি ঢুকিনি। পথেই থমকে দাঁড়ালাম। দরজায় কুসুম দাঁড়িয়ে। বললাম, কীরে কুসুম, দাঁড়িয়ে কেন?

কুসুমের ডান হাতখানি চকিতে গেল আঁচলের আড়ালে। কিন্তু চোখে রীতিমতো শাসনের তিরস্কার। যদিও ঠোঁটের পাশে আচারের দাগ লেগে গেছে এবং টক-মিষ্টিঝালের স্বাদে মুখের ভিতরে জিভটি কিছুতেই শাসন মানছে না। রসের ধারা সামলাতে গিয়ে জিভ গালের এপাশে-ওপাশে নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। তবু সে যে রাগ করেছে, সেটা ওর চোখের চাউনিতেই বোঝা যাচ্ছে।

আর যদিও কথা বলতে গিয়ে জিভ জড়িয়ে যাচ্ছে, তবু তাকে বলতে হল, দাঁড়িয়ে কেন? এই করতে বুঝি শালঘেরিতে আসা হয়েছে?

সত্যি, এ তিরস্কারের অধিকার কুসুমের আছে।

 বললাম, সত্যি, বড় বেলা হয়ে গেছে। তুই খেয়েছিস তো?

খাবে যদি, তবে কুসুমের রাগ করবার অধিকার থাকে কোথায়। তা ছাড়া ও তো প্রায় গৃহকত্রী। বোম্বা পাহাড়টা দেখালেই হয় আমাকে।

বলল, সারাবেলা কাটিয়ে এসে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, খেয়েছিস? যেন সেইজন্য তোমার ঘুম হচ্ছিল না।

বলতে বলতে দুবার ঝোল টানতে হল কুসুমকে। কিন্তু আমার মনটা চকিত ব্যথায় বিষণ্ণ হয়ে উঠল। কুসুম খায়নি। পরের বাড়িতে বলেই, এইটুকু মেয়ে খেতে পারেনি। বললাম, সে কী রে, আমার জন্যে বসে আছিস! ছি, ছি, আর কোনওদিন থাকিস না।

–হ্যাঁ, তা হলে তোমার বড় সুবিধে হয় রোজ রোজ বেলা করে ফেরার, না? জেটি, ও জেটি, এই দেখ, এতক্ষণে টোপনদা ফিরেছে। সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি। রাস্তায় পাঁচিলের ছায়া পড়ে গেল, তবু দেখা নেই।

পিসি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন।–এইছিস? বাবারে বাবা, কোথা গেছিলি র‍্যা? বেলা যে গেল?

উঠোনে ঢুকে বললাম, গাঁয়ের মধ্যেই পিসি।

কুসুম বলে উঠল, ঝিনুকদিদের বাড়ি বুঝি?

আমি চকিতে এক বার কুসুমের দিকে ফিরে তাকালাম। ঝিনুকদিদের বাড়ি বলতে কুসুম ভবেনদের বাড়ির কথাই বলেছে। কেমন করে তাকিয়েছিলাম কুসুমের দিকে জানিনে। ও যেন একটু থতিয়ে গেল।

আমি বললাম, না, ওদিকে যাইনি।

পিসি বললেন, যা যা, জামাকাপড় ছেড়ে তাড়াতাড়ি একটু তেল মেখে দুঘটি জল ঢেলে আয় মাথায়। শীতের এত বেলায় জল ঢাললে শরীরটা ভার লাগবে আবার।

আমি জামাকাপড় ছেড়ে, তেল মাখতে মাখতে বললাম, কিন্তু পিসি, কুসুমটা কেন খায়নি এত বেলা অবধি। ওকে তুমি এবার থেকে খাইয়ে দিয়ো।

পিসি তখন ঘরে। জবাব কুসুমই দিল, আহা, আমি যেন এর থেকে আগে খাই।

আমি বললাম, এত বেলায় খাস নাকি রোজ?

খুবই অবহেলা ভরে বলল কুসুম, আমি আর জেটি রোজ এ সময়েই খাই।

আশ্চর্য! এ শুধু বাংলাদেশে কুসুমেরাই পারে। অবশ্য কুসুমের জিভ তখনও নড়ছিল। ঠোঁটও মোছা হয়নি। এবং আমার সামনে হাতটি এখনও মুক্তি পায়নি আঁচলের আড়াল থেকে।

আমি ওর হাতের দিকে বারে বারে তাকাচ্ছি দেখে, এতক্ষণে কুসুমের সন্দেহ হল, আমি একটা কিছু আঁচ করেছি। গম্ভীর হবার চেষ্টা করে বলল, কী দেখছ বলো তো?

আমি বললাম, কিছু না তো।

 বলে আবার তাকাতেই, কুসুম উদগত হাসিটাকে আঁচলে চাপল। তার ভীরু দুষ্ট চাউনি পিসির ঘরের দিকে পড়ল এক বার। তারপরে, চট করে এক বার আঁচলের বাইরে হাতটি প্রসারিত করে দেখিয়েই আবার লোপাট। চুপি চুপি বলল, আচার।

খুব অবাক এবং গম্ভীর হয়ে বললাম, তাই নাকি?

–হুঁ। ভারী খিদে পেয়েছে যে?

এ করুণ ব্যাপারেও হাসি পেল আমার। বেচারি। আচার খাবার অধিকার ওর আছে। কিন্তু পিসি টের পেলে বকতে পারে, তাই এই গোপনতা। খেয়ে দেয়ে, এ সময়ে আচার নিয়ে কোথায় একটু এবাড়ি ওবাড়ি, বাগানে বাঁশঝাড়ে ঘোরা হবে। তা না ভাত বেড়ে বসে থাকা।

তাড়াতাড়ি স্নান করে এসে, ঠাঁই করে রাখা জায়গায় বসে পড়লাম। কিন্তু সামনে ভাতের থালা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে পিসি। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এর পরে পিসিকে যে আবার স্নান করে তবে খেতে বসতে হবে।

বললাম, পিসি, তুমি কেন এত বেলায়। আবার নাইতে হবে তো।

পিসি ভাত দিয়ে বললেন, ওই একদিন বাবা। আজ আমিই বেঁধেছি। কুসিও বেঁধেছে। ও আজ আমার নিরিমিষ ঘরে বেঁধেছে।

কুসুম মাছের পাত্রটা যখন এনে দিলে আমার সামনে, আমার চোখ কপালে উঠল প্রায়। বললাম, কী ব্যাপার পিসি, শ্যাম সরোবরের একটা গোটা রুইমাছ আমাকে বেঁধে দিয়েছ নাকি।

পিসি বললেন, দূর গাধা। ও একটা ছোট মাছের মুড়ো। তুই খাবি বলে বৈকুণ্ঠ দিয়ে গেছে। ফেলবি না কিছুটি, বসে বসে খা।

কুসুম বলল, আমিও পাহারা রইলাম। টুকে টুকে খাবে।

আসলে ওরই এখনও আচার টুকে টুকে খাওয়া হয়নি। কিন্তু এত বড় মাছের মুড়োটা আমার পক্ষে একলা খাওয়া কোনওরকমেই সম্ভব নয়। কুসুমের দিকে এক বার চকিতে দেখে নিলাম।

কুসুমও প্রায় শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। আমার হাসি পেল। তবু খুব গম্ভীর মুখে মুড়োটার কিছু অংশ ভেঙে নিয়ে বাকিটা আলাদা করে রাখলাম। কুসুম আমার থেকেও বেশি মুখ গম্ভীর করে বলল, ওটা কী হচ্ছে টোপনদা। জেটি।

পিসি ভাত দিয়ে পাশেই বসেছিলেন। বললেন, উ কী করছিস র‍্যা টুপান।

হয়তো কিছুই বলতাম না। কিছু না বললে পাছে পিসি আবার ওটা রাত্রে আমার জন্যই রেখে দেন। তাই খাওয়ায় মগ্ন থেকেই গম্ভীরভাবে বললাম, কুসুম ওটা খাবে পিসি। নইলে তুমি একে বিদেয় করে দিয়ো আজ। কারণ আমার কথার অবাধ্য হলে, আমি ভীষণ রেগে যাই।

বুঝলাম, কুসুম ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আয়ত চোখ দুটিতে বেশ একটি ক্রুদ্ধ তীক্ষ্ণতা। বলল, বটে?

বটে।

তেমনি গম্ভীরভাবেই বললাম, আমাকে একলা বুড়ো করার মতলব আমি বুঝেছি।

কুসুম অবাক হয়ে, চোখ বড় বড় করে বলল, সে আবার কী?

আমি বললাম, মুড়ো খেলে বুড়ো হয়, আমি জানি না বুঝি?

–শুনলে জেটি?

বলে কুসুম খিলখিল করে হেসে উঠল। পিসিও হাসি চাপতে পারলেন না। চাপতে গিয়ে তাঁর শ্লেষ্মজড়ানো গলার অদ্ভুত শব্দ বেরিয়ে পড়ল। বললেন, আচ্ছা বাপু, রাখ, কুসি খাবেখুনি।

কুসুম কপট রাগে চোখ পাকিয়ে আমাকে বলল, তুমি একটা হিংসুটে।

বোধ হয় ওকেও বুড়ো হবার ভাগ দিয়েছি তাই। তবু কুসুম লজ্জিত হয়ে উঠল।

আমার খাওয়ার শেষে পিসি চান করে এলেন। তারপরে দালানের দুই প্রান্তে দুজনের পাত পড়ল।

পিসি বললেন, উঠোনে শুতে পারতিস রোদে। তা রোদ ঝাঁকি দিয়েই তুই ফিরেছিস। ঘরে গিয়ে শো। ঘুমুবি?

বললাম, না।

কিন্তু ঘুম এল আমার। জাগলাম যখন, তখন পৌষের সন্ধ্যা নেমেছে। তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। আশ্চর্য! এত ঘুম পেয়েছিল। এমনকী সন্ধেবাতি দেখানো হয়েছে। গোটা বাড়িটা নিঝুম। ঠিক কালকেরই মতো দেখলাম, বাবার হ্যারিকেনটা জ্বলছে। কালকের মতো অত টিমটিমে নয়, একটু উজ্জ্বল তার চেয়ে।

হঠাৎ দরজাটা নড়ে উঠল। তারপর খুব ধীরে ধীরে যেন কেউ বাইরে থেকে খুলতে লাগল দরজাটা। খানিকটা ফাঁক হতেই মুখ বাড়াল কুসুম। আমাকে বসে থাকতে দেখে, পুরোপুরি খুলে দিল। বলল, উঠেছ? বাবা, কী ঘুম। বললে ঘুমোবে না, আর আমাদের খাওয়া হতে না হতে এত ঘুম।

আমি যেন অবাক হয়ে বললাম, তাই তো রে। এ যে সন্ধে হয়ে গেছে দেখছি। পিসি কোথায়?

জপে বসেছে। তুমি চা খাবে টোপনদা।

আমি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বললাম, খাব বইকী। তাড়াতাড়ি দে।

হাতমুখ ধুয়ে এসে চা খেলাম। জামাকাপড় পরে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, কেন জানি নে, চোখ দুটি নেমে এল। মনে পড়ল, ভবেনের ওখানে যেতে হবে।

আমি যেন নিজের চোখের দিকে তাকাতে সাহস পেলাম না। এখন বুঝতে পারছি, যত সহজে যাব ভেবেছিলাম, যাওয়াটা তত সহজ নয়। অথচ ভবেনকে যখন কথা দিয়েছিলাম, তখন ভেবেচিন্তেই দিয়েছিলাম। কিন্তু কী করে যাব। ভয়ে কিংবা রাগে কিংবা ব্যথায়, জানিনে, সহসা আমার ভিতরে যেন কেউ অস্ফুটে আর্তনাদ করে উঠল, যাব না। যেতে পারব না। কেন যাব, কী করে যাব! যাব না।

যেন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েই, মুখ তুললাম। নিজের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হল আমার। দৃষ্টি সরাতে পারলাম না। আয়নার ওপারের চোখ দুটি যেন আমাকে মোকাবিলা করার ডাক দিল।

আমরা পরস্পরের দিকে চার চোখ মেলে তাকিয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। আর আমার ভিতর থেকে যেন কেউ অস্ফুট চুপি চুপি উচ্চারণে বলে উঠল, যেতে হবে। যে সাহসের নাম জপ করতে করতে এই শালঘেরিতে এসেছি, সেই সাহসে ভর করে আজ না যেতে পারলে, হয়তো একটা আড়ষ্ট অপমানকর গ্লানিতে চিরকাল ভুগতে হবে। জীব-প্রকৃতির যে-স্বভাব বিদ্বেষ ও ঈর্ষার অন্ধকারে আমাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে, সে অন্ধকারের কালিমা আমার কোনওদিন ঘুচবে না। সে অন্ধকারের কালিমা যেন প্রতি মুহূর্তে আমার বুকের দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। আমার আত্মাকে গ্রাস করবে বলে। আমার অবশিষ্ট জীবনের সকল উদ্যম, আমার চোখের আলো নিভিয়ে দেবে বলে। সহজ করে পাব বলে, যে হাসি হেসেছি, তা মুছে দেবে বলে। আজ তাই আমাকে যেতে হবে। আজই, এই নিমন্ত্রণেই, আমার প্রাণের পাথর সরাবার লগ্ন। এই দরজাটা পার হতে পারলে আমার সকল দরজা খোলা। আমি যাব।

সিদ্ধান্তের পরমুহূর্তেই, আয়না থেকে চোখ ফেরাতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, আমার চোখে একটি অপার কৌতূহলের ঝিলিক। যে কৌতূহল মানুষকে হাতছানি দিয়ে ডেকে নিয়ে যায়।

এমন সময় কুসুম পিছন থেকে এসে বলল, ওটা কী হচ্ছে টোপনদা?

আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। আমি চমকে কুসুমের দিকে তাকালাম। কেন, ও কি অন্তর‍্যামী নাকি? জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে?

-রাত করে আয়নায় মুখ দেখছ যে?

 বলে তাড়াতাড়ি একটি ঢাকনা এনে আয়নার বুকে ফেলে দিয়ে বলল, মিথ্যে কলঙ্ক হবে যে ওতে!

তা বটে! রাতে মুখ দেখতে নেই আয়নাতে। তা হলে মিথ্যে কলঙ্ক হয়। পৃথিবীতে অনেক লোকে দেখে। বাংলাদেশেও দেখে অনেক লোকে। কিন্তু কুসুমদের সামনে দাঁড়িয়ে এত বড় অনাচার চলবে না। কারণ, সংস্কার বলো, যাই বলল, এটা ওদের বিশ্বাস।

জিজ্ঞেস করলাম, সে কেমন কলঙ্ক রে কুসুম।

কুসুম বলল, তা কী জানি। সবাই বলে মিথ্যে কলঙ্ক হয়।

তারপর যেন সহসা মনে পড়েছে, এমনিভাবে বলল, ওই যে রেণুদি আছে না, রেণুদি।

কোন রেণুদি?

 –এই তো এ পাড়ায় বনমালীকাকার মেয়ে, রেণুদি।

 এইবার চিনতে পারলাম। বললাম, হ্যাঁ, বুঝেছি। কী হয়েছে তার?

কুসুম কাছে এসে গলা নামিয়ে বলল, রেণুদিকে রেণুদির বর নেয় না।

 এ দুঃসংবাদ জানা ছিল না আমার। জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

বলে, মেয়ে খারাপ।

–খারাপ।

 –হ্যাঁ। রেণুদি নাকি ভাল নয়। চরিত্র খারাপ।

কথাটা কুসুমের মুখ থেকে শুনতে আমার ভাল লাগল না। মুখ গম্ভীর করে, চুপ করে রইলাম।

কিন্তু কুসুম আমার গাম্ভীর্যের কথা বুঝতে পারল না। বলল, ও তো মিছে কথা। রেণুদি কত ভাল মেয়ে, পাড়ার সবাই জানে। সবাই বলে, রেণুদির মতো মেয়ে হয় না। তবু রেণুদিকে নেয় না তার বর। এটা মিথ্যে কলঙ্ক নয়?

এই যুক্তির পর অবশ্য আমার নীরব থাকা চলে না। খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলাম, হুঁ।

কুসুম বলল, জান টোপনদা, রেণুদি বোধ হয় কোনওদিন রাত করে আরশিতে মুখ দেখে ফেলেছিল।

আমি বললাম, তা হবে।

তারপরেই কুসুমের যেটা বক্তব্য, সেটা হল, রেণুদি খুব ভাল চুল বাঁধতে পারে। অনেক রকম খোঁপা, জান?

–তুই বুঝি তাই যাস রেণুদির কাছে।

সবাই যায়। আমিও কয়েকবার গেছি। পাটনায় তো রেণুদি মেমেদের স্কুলে পড়েছে। তাই মেমেদের মতো চুল বাঁধতে শিখেছে।

যাক, খানিকটা আঁচ করা গেল। বনমালীকাকার মেয়ে রেণুদি তা হলে বাংলাদেশের পাড়াগাঁয়ে একটি সংস্কারগত কলঙ্কে আগেই চিহ্নিত হয়ে আছেন। আমি বললাম, আর তুই তাই মেমসাহেব সাজতে যাস।

দুর।

–কিন্তু কুসুম, এই সব নিয়েই থাকিস বুঝি সারাদিন।

 কুসুম একটু বিব্রত হল। ভয়ও পেল বোধ হয় একটু আমার গম্ভীর গলা শুনে। বলল, কোথায়? আমি তো আজকাল পাড়ায় বেরুই না। জেটি তা হলে আমাকে খুন করবে বলেছে।

সে শান্তিটা একটু গুরুতর হয়ে যাবে অবশ্য। আমি ততটা চাইনে। বললাম, ক্লাস সিকস অবধি পড়েছিস। ক্লাস সেভেনের বই নিয়ে ঘরে বসে পড়লে পারিস তো।

জেটি রাগ করবে না?

–রাগ করবে কেন। পড়লে আবার কেউ রাগ করে নাকি? কাজ করবি, পড়বিও।

বুঝলাম, খুব সহজেই বললাম। কাজ করা আমার নিজের পক্ষেও হয়তো অসাধ্য হত। আর এও বুঝছি, কুসুমের একের ওপরে আর এক অভিভাবক হয়ে কথা বলছি আমি। দুয়ের চাপে মাঝখান থেকে বেচারির ভয়ে ও সংকোচে কোনও কাজই হবে না।

তাই আবার সহজ গলায় বললাম, যখন একটু আধটু সময় পাবি, তখন দেখবি বই।

 কিন্তু কুসুম একটু গুটিয়ে গেছে। তার চোখ দেখে বুঝলাম, আমার রুষ্টতার কারণ অনুসন্ধানে বেচারি আত্মগ্লানি বোধ করছে। খুব অসহায়ভাবে বলল, আচ্ছা।

একটু থেমে আবার বলল, তোমাকে ডাকতে এসেছিল স্কুলের কয়েকজন ছাত্র আর দুজন মাস্টারমশাই। ঘুমোচ্ছ দেখে চলে গেছে। কাল সকালে আসবে।

সেই সংবর্ধনা। গাঁয়ের ছেলে গাঁয়ে ফিরেছি। তা নিয়ে আবার আনুষ্ঠানিক সমারোহ।

কুসুম প্রায় নিষ্প্রভ গলায় আবার বলল, আরও মেলা লোকজন এসেছিল তোমাকে দেখতে।

-তাই নাকি? কারা?

–গাঁয়েরই সবাই।

 জানি, এটা আমারই কর্তব্য, গাঁয়ের সকলের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করা। আগামী কাল থেকে তার শুরু হবে। কিন্তু কুসুমের নিভে যাওয়াটা টের পেয়ে আমিও সংকুচিত হয়ে উঠলাম। কিছু না বলে, বাইরে উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বারান্দার অন্ধকার থেকে পিসির গলা খাঁকারি শুনতে পেলাম।

এ গলা খাঁকারি আমার চেনা। পিসি জপে নিয়ত। কিন্তু এদিকে নজর আছে। মুখে বলতে পারছেন না, দাঁড়া। ওই খাঁকারি দিয়ে জানানো হল, আমার জপ হয়ে এসেছে, দাঁড়া একটু।

বললাম, আমি যাচ্ছি পিসি। তোমার হোক, তারপরে বেরুব।

একটু পরেই পিসি উঠলেন। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, ভবেনদের বাড়ি যাচ্ছিস তো?

–হ্যাঁ।

 পিসি ঘরে গেলেন। বেরিয়ে এসে টর্চ লাইটটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, এটা নিয়ে যা। বড় আঁধার বাইরে। বেশি রাত করিস না। চাদর নিয়েছিস?

–হ্যাঁ।

–আয় গা। এ্যাই তুইও যাবি, সি ডাকাটাও আসবে।

 –কে পিসি?

হরলাল।

জিজ্ঞেস করলাম, আমি থাকব পিসি?

না না, তোকে থাকতে লাগবে না। ওকে আমিই একলা সামলাতে পারব।

দরজাটা বন্ধ করে দাও না।

বন্ধ করলেই বা কী হবে। বাইরে থেকে এসে ধাক্কাধাক্কি আরম্ভ করবে। সে আরও কেলেঙ্কারি। ও তোকে ভাবতে হবে না। তুই আয় গা।

সে আমি বিলক্ষণ জানি, ডাকাটাকে নিয়ে পিসির কত দুশ্চিন্তা। কালকেই বুঝে নিয়েছি সেটা। সামলানো দূরের কথা, যতক্ষণ ডাকাটা না আসবে, ততক্ষণ পিসির কান পড়ে থাকবে বাইরের দরজায়। কারণ পিসি জানেন, ওই উড়নচণ্ডী মাতালটাকে তিনিই যা দুটি হাতে করে খেতে দেন। অন্যথায় ওকে উপোস থাকতে হবে।

টর্চলাইটটা জ্বালিয়ে এক বার দেখে নিলাম। ঠিক আছে। বাবার এটা। অনেক দিনের ব্যবহৃত। কিন্তু ব্যাটারিগুলি প্রয়োজনের জন্যে পিসিমা বদলিয়ে রাখেন, সেটা বোঝা গেল। নতুন ব্যাটারি নিশ্চয়। আলোর বেশ চড়া ঝলক।