১. ফিরে এলাম

ফিরে এলাম। 

নানা অনুভূতি নানান সুরে বুকের মধ্যে নাকি বাজে। এত দিন মনে করেছি, সে সব শুধু কথার কথা। আজ ফিরে আসার পথে, সারাটিক্ষণ আমার বুকের মধ্যে কী এক বিচিত্র রাগিণী যেন বেজেছে। এখনও বাজছে। তারে তারে ঝংকারের মতো সেই সুর। শুধু যে আমার বুকে, আমার মনে সে রাগিণী বদ্ধ হয়ে আছে, তা নয়। সে যেন বাতাসে নাচছে তাল দিয়ে দিয়ে। ছড়িয়ে গেছে আকাশ ভরে। 

আমার দেহের, ইন্দ্রিয়ের রক্তবাহী শিরা-উপশিরাগুলি বুঝি আজ বীণার তার হয়ে গেছে। কে তাকে বাঁধলে কষে। টংকার দিয়েছে। রাগিণীর ঝংকারে প্রসন্নতা ও আনন্দ। তাতে আমি যত ব্যাকুল হয়েছি, উদ্বেল হয়ে উঠেছি, ততই আমার বুকের মধ্যে কেন যেন টনটনিয়ে উঠেছে। যাকে আমি দু হাত দিয়ে বেঁধে রাখতে চেয়েছি হৃদকোটরে, সে আমার চোখের দরিয়ায় আকুল হয়ে উঠেছে। সে আমার শাসন মানেনি। 

যদি বলো, এ রাগিণীর নাম কী? আমি বলতে পারব না। হাসতে গিয়ে যখন দু চোখ জলে ভেসে যায়, মনে তখন কী রং ফোটে, আমি তার নাম জানিনে। সে যে বাজছে, আমি শুধু এইটুকুই জানি। আরও শুনি, এই মিশ্র সুরের মধ্যে কে যেন থেকে থেকে বিরতি টানছিল। আর সেই বিরতিটুকু ভরে উঠছিল গম্ভীর শঙ্খের মতো একটি গুরুগুরু ধ্বনিতে। সে ধ্বনি যেন মহাকালের বিষাণ। সে ধ্বনি যেন আমার সুখ দুঃখের মাঝখানের সেতু। মহাকালের সেই স্বর আমাকে আহ্বান করছে সাহস দিয়ে। তবু পুরোপুরি নিঃসংশয়ের ভরসা নেই তার ধ্বনির গভীরে। সাহস সংশয় ভয়, সব মিলিয়ে জীবন-মৃত্যুর মতো সে নির্বিকার গম্ভীর।

বিরতিতে সেই ধ্বনি শুনতে পাই, কারণ সে নিরন্তর আছে। জীবন বাসরে যে রাগিণী প্রতি দিন বাজে, সুর বদলায়, তাল ফেরত দেয়, সে আমাদের প্রত্যহের জীবনধারণের রাগ-বিচিত্রা। তার রূপান্তর আছে, বিরতি আছে। মহাকালের অবিরত ধ্বনিকে সে অগোচরে রেখে দেয়। 

সারাদিনের কাজে ও অকাজে, ফিরে না তাকালে, ভুলে থাকলেও আকাশ থাকে আমার ওপরে। মহাকালের ধ্বনি বাজে তেমনি। সারাদিনের আকাশচারী বিহঙ্গটাকে যেমন দিনের শেষে সন্ধ্যার মুখোমুখি হতে হয়, মহাকালের শঙ্খ তেমনি জীবনের অমোঘ নিয়মে কখনও কখনও কানে আসে। 

শিশু যে দিন প্রথমে হাঁটতে শিখল, সে কি মহাকালের আহ্বান শুনতে পেয়েছে। যে মেয়েটি প্রথম পিত্রালয় ছেড়ে স্বামীর অপরিচিত সংসারে প্রবেশ করে, মহাকালের ডাক তার বুকে ভয়ের দুরু দুরু শব্দে বাজে। জীবন-লীলার জন্য মহাকালের নিরন্তর আহ্বান। 

সেই আহ্বানের যুগপৎ সাহস ও সংশয়, ভয় ও নির্ভয়ের দোলায় আমি যেন আড়ষ্ট হয়ে উঠছিলাম। কিন্তু সে মুহূর্তের বিরতি মাত্র। যে রাগিণী আমাকে হাসির উচ্ছ্বাসে কাঁদিয়ে ব্যাকুল করছিল, সে কেন আমার ভুবন জুড়ে বাজছিল, তা আমি জানি। 

আমি ফিরে এলাম তাই। তাই সে আমার মনের রাগরঙ্গে বাজছে। আমি চল্লিশ মাস পরে ফিরে এলাম আমার জন্মভূমি গ্রামে। প্রায় সাড়ে তিন বছর বাদে। বন্দিশালা থেকে মুক্তি পেয়ে এলাম।

গিয়েছিলাম বিয়াল্লিশ সালে। ফিরে এলাম পঁয়তাল্লিশ সাল শেষ করে। কেন গিয়েছিলাম, আজও তার কোনও কৈফিয়ত নেই আমার কাছে। শৈশবের উন্মেষ থেকে যৌবনের এই বিকাশে, এর কোনও কারণ কিংবা যুক্তি দেখিনে। 

কিন্তু প্লাবনে কেন ভেসে যায় গ্রাম জনপদ? অনেক শক্তি দিয়ে বাঁধা বাঁধ কেন ভেসে যায় বন্যায়? তেমনি সহসা বন্যায় আমার বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। প্লাবনে আমি ভেসে গিয়েছিলাম। আমি যেন রাশি রাশি ফণা তুলে ফুঁসে উঠেছিলাম। যে বিক্ষোভ ও ঘৃণা আমার প্রাণের অন্তঃপুরে ছিল, সে আমাকে বিস্মিত করে, সদরে এসে ফেটে পড়েছিল। 

বিস্ময়, কারণ দেশোদ্ধারের সদর আঙিনায় এসে দাঁড়াব, এ কথা কোনও দিন চিন্তা করিনি। সেইজন্যে জেলে যাওয়াটা আমার কাছে জীবনের একটি মুহূর্তের আকস্মিকতা। তাই কারাবাসের গৌরবের চেয়ে বন্দি-জীবন আমার কাছে নিয়ত নিষ্ঠুর মনে হয়েছে। আমি প্রতি পলে পলে মুক্তি কামনা করেছি। জেলকে আমি কোনও দিন, কোনও মুহূর্তে সাময়িক বাসা মনে করতে পারিনি।

তাই ছেচল্লিশ সালের শুরুতে এই শীতের অপরাহ্নে গ্রামের স্টেশনের প্ল্যাটফরমে দাঁড়িয়ে, যত আনন্দের উচ্ছ্বাস আমার বুকের মধ্যে, তত আমার চোখের দরিয়াতেও উচ্ছ্বাস। সমগ্র দেশকে কোনও দিন মা বলে ডেকেছি কিনা মনে করতে পারিনে। কিন্তু আমার এই আজন্ম চেনা গ্রামখানিকে আমি মা বলে ডেকেছি। অদর্শনের অভ্যাসে আমি যখন পাথরের দেয়ালে এ রূপময়ীকে খুঁজে পাইনি, তখন আমি জেলের অন্ধ কুঠুরিতে মাথা কুটে মরেছি। এ রূপময়ীর যে ছলনা ছিল, তা আমি ভাবতে পারিনে, তবু মনে হত আমাকে যেন সে ছলনা করত। ছলনা করে কষ্ট দিত। মেঘচাপা সূর্যের মতো। 

তারপর সে আমার নিরন্তর পাথর-চাপা স্মৃতির মেঘ কাটিয়ে, উদ্ভাসিত হয়ে উঠত দু চোখের দিগন্ত জুড়ে। মেয়েটির অভিমানহত ছায়া মুখে চকিত দুষ্ট হাসির মতো। তখন বুঝেছি, সে শুধু আমার মা নয়। আমার খেলার জুটিও বটে। আমার চিরখেলার সঙ্গিনী। আমাকে শুধু স্নেহ করে আর তার মন ভরে না। তার গভীর অন্তস্রোতের নানান কৌতুকে ও বিচিত্র রঙ্গে চঞ্চল করে। অপাঙ্গে তাকিয়ে আমাকে রহস্য করে। আমার মন ভার করে তোলে বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে। লজ্জান নত মুখে সে আমার গৌরবকে তোলে জাগিয়ে।

আজ আমি আমার সেই গ্রামে ফিরে এলাম। তোমরা যা বলল, তাই বলল, এর ধুলায় আমার জুড়ে বসতে ইচ্ছে করছে। দু হাত দিয়ে তার বুকের ধূলি নিয়ে মুঠি মুঠি ছড়াতে ইচ্ছে করছে মাথায়, গায়ে। কিন্তু তা আমি পারিনে। লোকের সঙ্গে চলি আমি। লোকে আমাকে পাগল বলবে। তাই ধূলি-মুঠির এ ধুলোট উৎসব আমি লোকচক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে করব।

আর নয়, এই পাথর-পাতা প্ল্যাটফরমে এ যেন পুরোপুরি মাটির সঙ্গে যোগাযোগ নয়। তার চেয়ে মাটিতে যাই নেমে।

স্টেশন আমাদের ছোট। চির দিন ধরেই ছোট। আনাগোনা আছে গাড়ি ও মানুষের। কিন্তু ঘড়ি ঘড়ি গাড়ি নেই। আনাগোনা নেই কর্মব্যস্ত ভিড়ের। সারা দিন দুটি গাড়ি যেতে থামে। দুটি গাড়ি আসতে থামে। বাকিরা শুধু চলে যায়, থামে না। 

এ স্টেশন তাই আমাদের সঙ্গে চির দিন ধরে একাত্ম। মানুষ হিসেবে আমাদের যদি বা বয়স বাড়ে, দিগন্ত ব্যাপ্ত হয়, আমাদের ছেলেবেলাটা ওর কোনও দিন ঘোচেনি। ও যেন আজও সেই পতনোম্মুখ ইজের চেপে ধরা, অবাক-চোখো পাড়াগাঁয়ের ছেলেটি। যে গাড়ি থামে, তাকে ও তাকিয়ে দেখে না। যে থামে না, তার দিকে চির দিন ধরে তাকিয়ে আছে।

এই তো সংসারের নিয়ম। যার হদিস পাই, তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করিনে। যার হদিস পাইনে, তার পথ চেয়ে থাকি।

আমাদের এই স্টেশনে যিনি কৃষ্ণ, তিনিই শিব। যিনি স্টেশনমাস্টার, তিনিই টিকেট কলেক্টর। কিন্তু যাঁর মুখ দেখব আশা করেছিলাম, তিনি নেই। পরিবর্তে দাঁড়িয়ে আছেন আর একজন। ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। পাশেই বাইরে যাবার দরজা। উদ্দেশ্য, আমি এগিয়ে গেলে টিকেটখানি চেয়ে নেবেন। 

কিন্তু যাত্রী কই? যাত্রী নেই আর। যে দু-চারজন ছিল, তারা চলে গেছে। সবাই তারা হাটুরে বাটুরে লোক। দু-একজন আদিবাসী মেয়ে পুরুষ বুঝি ছিল। তাকিয়ে দেখিনি ভাল করে। তাদের টিকেট নেওয়া হয়ে গেছে। উনি এখন দাঁড়িয়ে আছেন আমার জন্য। মাস্টার মশাই তাকিয়ে আছেন আমার দিকেই। মুখ দেখে বোঝা যায়, বয়স কম ভদ্রলোকের। কিন্তু এর মধ্যে মাথার চুল ঝরতির দিকে। অল্প বয়সে যাদের চুল ঝরে, তারা চির দিনই চুলের দেবতা কিংবা দেবী কে জানে, তার দুয়ে মতি ও মনের দিকে তাকিয়ে থাকে ভ্রু কুঁচকে। অন্যথায়, চুলওয়ালা মাথার দিকে। তাই বোধ হয়, আমার চেহারা নয়, রাক্ষুসে অবিন্যস্ত অস্নাত রুক্ষ মাথার দিকে তাকিয়ে ছিলেন নয়া মাস্টারমশাই। চেহারাটা আমার যেমনই হোক, চুল দিয়েই বুঝি আমার চেহারার বিচার হল। কিংবা আমিই অবিচার করলাম আমাদের নবীন স্টেশনমাস্টারের প্রতি, এ কথা ভেবে। ভদ্রলোকের গায়ে গলাবন্ধ সাদা রেলের কোট। মুখে বসন্তের দাগ। 

কিন্তু আমি যেতে চাইলেই যাওয়া হয় না। সঙ্গে আমার ট্রাঙ্ক বিছানা। তুলে স্টেশনের বাইরে যেতে পারি। তার বেশি নয়। 

ভদ্রলোক এবার পায়ে পায়ে কাছে এলেন। আমাকে আর আমার লটবহর দেখে বললেন, কুলি খুঁজছেন? 

নেই তা জানি। কিন্তু আমাদের সেই শিবের যিনি নন্দী-ভৃঙ্গি তুল্য ছিলেন কিংবা কৃষ্ণের বলরাম, সেই বচন মাহাতত কোথায়? তাকে আমরা ছোটবাবু বলে ডাকতাম। সে খুশি ছিল তাতে। আসলে বাতি জ্বালানো, হুকুম মতো সিগন্যাল দেখানো, ঘন্টা বাজানো আর ফাইফরমায়েশ খাটা ছিল তার কাজ। কিন্তু বচনের একটা ন্যায্য দাবি ছিল। সে একজন এ. এস. এম-এর চেয়ে কম কীসে? সে তো এখানে মাস্টারমশাইয়ের নীচেই। 

বটেই তো। অতএব আমরা তাকে ছোটবাবু বলে ডাকতাম। সে খুব খুশি ছিল। আসলে বচন বোকা ছিল না। আমাদের বিদ্রূপটাকেই সে বুঝি তার স্নেহের মূল্যে কিনেছিল। 

বললাম, কুলি তো নেই জানি। বচন কোথায় বলতে পারেন?

ভদ্রলোক একটু অবাক হলেন। বললেন, আপনি আমাদের স্টেশনের বচনের কথা বলছেন? 

–আমি বচন মাহাতোর কথা বলছি।

ভদ্রলোক আর একবার আমার আপাদমস্তক দেখে বললেন, আছে। কিন্তু এখন কোথায় আছে, তা বলতে পারিনে। হয়তো কোথাও। 

কথা শেষ করলেন না। বোধ হয় ভাবলেন, কোথা থেকে আসছি আমি, কী পরিচয়, জানা নেই। হঠাৎ কথাটা বলা ঠিক হবে কি না। 

আমিই হেসে বললাম, হোটবাবুর নেশাভাং বুঝি আজকাল আর একটু বেড়েছে?

নতুন মাস্টারমশাই একটু যেন আশ্বস্ত হলেন। বললেন, চেনেন বুঝি? 

–হ্যাঁ।

–আপনার বাড়ি কি?

–এখানেই। 

–এখানে মানে তো এই মাইলখানেক বিজানীর মাঠ পার হয়ে তবে গ্রাম। নাকি পশ্চিমের ওই গ্রাম গড়াইয়ে আপনার বাড়ি? 

বললাম, না, পুবেই। শালঘেরি। যে নামে এই স্টেশন।

নতুন মাস্টারমশাই একটু অবাক হলেন। বললেন, স্টেশন শালঘেরি এটাই বটে। কিন্তু গ্রাম শালঘেরি যেতে হলে তো আপনার আগের স্টেশনে নেমে যাওয়া উচিত ছিল। কিছুটা রাস্তা কম হত। 

মিথ্যে নয় কথাটা। আর আমার কৈফিয়তটা পাগলের মতো শোনাবে। তবু বললাম, তবু এটাই যে আমাদের গাঁয়ের স্টেশন। 

ভদ্রলোক আমার চোখের দিকে দেখে কী ভাবলেন জানিনে। বললেন, তা বটে। সেইজন্যেই শুধু এতখানি কষ্ট স্বীকার করলেন? তা হলে আগে খবর দিয়ে রাখেননি কেন বাড়িতে। অন্তত গোরুর গাড়ি আসত আপনাকে নিয়ে যেতে। এখন কী করে যাবেন? আজকাল অবশ্য দু-তিনখানা সাইকেল রিকশা হয়েছে এখানে। কিন্তু তারাও নিয়মিত আসে না। রিকশায় চাপবার প্যাসেঞ্জার কোথায়? 

খবরটা আমার কাছে নতুন। বললাম, সাইকেল রিকশা হয়েছে এখানে? কই, দেখে যাইনি তো। শালঘেরি গাঁয়েও কি রিকশা যায়? 

যায়। রাস্তা তো নতুন তৈরি হয়েছে। মোটর যাবার রাস্তা। এই গড়াইয়ে মিলিটারিদের একটা ঘাঁটিও হয়েছিল। মাস দুয়েক হল উঠেছে। 

পশ্চিমে গড়াইয়ের দিকে ফিরে তাকালাম। চিরদিনের দেখার মধ্যে কোনও বদল পেলাম না। সেই ইতস্তত ছড়ানো শাল গাছ। মাঝে মাঝে তালগাছের জটলা। পশ্চিম সীমানায় ধাপে ধাপে উঠতি জমির বুকে বুকে গাছেরাও উঁচু হয়েছে। আর অনিরুদ্ধদের পাড়ার দেবদারু কৃষ্ণচূড়া আছে তেমনি। আজও তাদের দূর থেকে দেখলে চিনতে পারি। যদিও এই শীতের মরশুমে গাছেরা সব নিষ্পত্র হয়েছে। কিন্তু সাজের সমারোহের আগে, তাদের এ ধড়াচূড়া ছাড়া ন্যাড়া রূপও আমার চেনা। কেবল স্টেশন থেকে যে রাস্তাটি গ্রামের দিকে গিয়েছে, দক্ষিণ থেকে পশ্চিমের বাঁকে হারিয়ে গিয়েছে গাছগাছালির আড়ালে, সেই রাস্তাটি ছিল লাল। এখানকার মাটির স্বাভাবিক রং রক্তাভ। রাস্তাটা এখন হয়েছে মরা সাপের গায়ের মতো কালো।

তাকাতে গিয়ে সহসা চোখ ফেরাতে পারলাম না। মিলিটারি ঘাঁটি হয়েছিল বলে মন খারাপ লাগছে। কিনা, বুঝতে পারছিনে। কিন্তু গড়াইয়ে আর কোনও দিন যাব না বুঝি। কারণ অনিরুদ্ধ নেই।

যে কারণে চল্লিশ মাস ধরে কারাবাস করেছি, তার প্রথম সূত্রপাত করেছিল অনিরুদ্ধ। অনিরুদ্ধই সে দিন ডাক দিয়েছিল ঝাঁপ দিতে। যেমন তেমন বন্ধু তো নয়। সারা মহকুমার লোকে জানত আমাদের তিন জনকে। আমি, ভবেন, অনিরুদ্ধ। আমি আর ভবেন শালঘেরির। অনিরুদ্ধ ছিটকে এসেছিল গড়াইয়ে। শালঘেরিতে উচ্চ বিদ্যালয়। সেইখানে আলাপ।

শালঘেরির গাঁয়ে কত ছেলে ছিল। ভবেনকে কেন ছাড়তে পারিনি, তা কি জানি? শালঘেরির হাই স্কুলে কত বাইরের ছেলে পড়তে আসত। শালঘেরির স্কুল ডিস্ট্রিক্ট হাই স্কুল ছিল না বটে, নামডাক ছিল সারা জেলায়। আশেপাশে আর ভাল হাই স্কুল ছিল না বলে, শালঘেরিতেই আসত সবাই। বোর্ডিং-এ থাকত। তাদের মধ্যে অনিরুদ্ধকেই কেন ভালবেসেছিলাম, তাও কি জানি? জানিনে। মন গুণে ধন, দেয় কোন জন?

শুধু এইটুকু মনে আছে, ক্লাস টেন-এ পড়ার সময়, অনিরুদ্ধ এক দিন সবাইকে ক্লাসের বাইরে আসার ডাক দিলে। আমরা সবাই বেরিয়ে এলাম। অঙ্কের মাস্টারমশাই গিরিজাবাবু একটি ছেলেকে ঘুষি মেরেছিলেন। তাতে তার চোয়াল বেঁকে গিয়েছিল। আমাদের শালঘেরি স্কুলে অনেক মার দেখেছি। কোনও কোনও মার তার মধ্যে ঐতিহাসিক আখ্যা পেয়েছিল। কিন্তু তার জন্যে কেউ কখনও কর্তৃপক্ষের কাছে বিচারপ্রার্থী হবার সাহস করেনি। শুধু আমাদের কৈশোরের নীতি-ভীত রক্তে দুঃখের ও বিক্ষোভের দাপাদাপি শুনেছি কান পেতে।

সেই চাপা দাপাদাপিকে আমরা প্রথম প্রকাশ হতে দেখেছিলাম সেই দিন। তাতে আমরা নিজেরাও কম অবাক হইনি। আমাদের আতঙ্ক ভয় এক ডাকে ভেঙে গেল কেমন করে? মনে হয়েছিল, মাস্টারমশাইদের সঙ্গে বাবার ঝগড়া হলে, বাবা এসেও যদি ডাকতেন ক্লাসের বাইরে যাবার জন্যে তা হলেও বোধ হয় পারতাম না।

কিন্তু রোগা, লম্বা, ঝকঝকে দুটি চোখওয়ালা ওই গড়াই-এর ছেলেটার ডাক যে আমাদের রক্তে লেগেছিল। ওই ঝাঁপ দিতে ডাক দেবার অধিকারটা যেন ও নিয়ে জন্মেছিল। বিচার হয়েছিল গিরিজাবাবুর। লিখিতভাবে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু গিরিজাবাবুর সেই ঘুষিটাই অনেক দিন নানান ছদ্মবেশে অনিরুদ্ধর চোয়াল লক্ষ্য করে, ঘাপটি মেরে বেড়িয়েছে। যদিও কখনও সার্থক হতে পারেননি।

তারপর একই সঙ্গে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে, অনিরুদ্ধ আর পড়েনি। জীবনে ওর একটি বড় রকমের ফাঁক ছিল, যেটা বোধ হয় কেউ দিতে পারে না। সেটা হল বাবা মায়ের স্নেহ। মা ওর মারা গিয়েছিলেন শৈশবেই। তারপরেও ওর বাবা আরও দুবার বিয়ে করেছেন।

আমি আর ভবেন যখন কলকাতায় পড়ি, তখন ও রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কলকাতার পড়া সাঙ্গ করে, গাঁয়ে এসে যখন জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তিত, সেই সময়ে ভবেন আর আমি সপ্তাহে প্রায় দু দিন করে এসেছি এই গড়াইয়ে।

আমার আর ভবেনের সাহিত্য ইতিহাস পুরাণ-প্রত্ন আর পুরাতত্ত্বের ঝোঁক ছিল। অনিরুদ্ধর সঙ্গে আলোচনায় আমাদের লোকসান ছিল না। বরং, আজ বুঝতে পারি, অনিরুদ্ধ ছিল বলেই সে দিন তথ্য ছাড়িয়ে তত্ত্বের প্রতি সচেতন হতে পেরেছিলাম। যে কারণে তখন আমাদের পুরাণ-প্রত্ন-পুরা পেয়ে বসেছিল, সেই কারণেই অনিরুদ্ধ অঙ্গুলি নির্দেশ করেছিল নৃতত্ত্বের দিকে। ওর সবকিছুতে একটা শব্দ ছিল, কেন? আর তাই ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সব ইচ্ছে এবং ঝোঁকের মূলে গিয়ে পৌঁছুত।

সেই অনিরুদ্ধ আমাদের ডাক দিয়েছিল বিয়াল্লিশে। আমাদের ডাক দিয়ে সে মারা গিয়েছিল পুলিশের গুলিতে।

নতুন মাস্টারমশাই একটু অবাক হয়ে বললেন, কী ব্যাপার। মহাদেববাবুর কথা ভাবছেন নাকি গড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে? মানে আপনাদের পুরনো স্টেশনমাস্টারের কথা বলছি।

কী কথায় কী কথা। অনিরুদ্ধের কথা মনে করে সব ভুলে গেছি। আমাদের শালঘেরির সেই পুরনো মাস্টারমশায়ের নাম মহাদেবই ছিল বটে। মহাদেব চক্রবর্তী। কিন্তু গড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে তাঁর কথা ভাবব কেন?

জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কি গড়াই-এ আছেন নাকি?

–হ্যাঁ, রিটায়ারের পর তো আর কোথাও যাননি। শালঘেরিতেই চাকরি শেষ হয়েছে। আলাপ হয়েছে ভদ্রলোকের সঙ্গে। এখন গড়াইতেই আছেন।

আশ্চর্য! মহাদেববাবুর কোথায় বাড়ি, পরিবার পরিজন আছে কি না, কোনও দিনই আমাদের কিছু বলেননি। কথার টান শুনে এটুকু বুঝেছিলাম, বীরভূমের মানুষ হওয়া বিচিত্র নয়। আমাদের চেয়ে বয়সে ছিলেন অনেক বড়। স্ত্রী-পুত্রের কথা জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ভায়া, আমার বয়সের মানুষদের স্ত্রী-পুত্র সকলেরই থাকে। সেইটে তার আসল পরিচয় নয়। আমার আর কী আছে, বরং সেইটেই খোঁজ করো।

বলতাম, তা হলে সেইটিই বলুন।

বড় বিচিত্র জবাব দিতেন মহাদেববাবু। বলতেন, সারা দিন অনেকগুলো গাড়িকে নিশান দেখাই। বেশির ভাগই দাঁড়ায় না। চারটে থামে যেতে আসতে। শুধু এই কারণে বেঁচে আছি ভাবলে কেমন লাগে বলো দিকি?

আমরা সহসা জবাব দিতে পারতাম না। তখন তিনি হেসে বলতেন, একটা চিন্তা নিয়ে আছি ভায়া। সংসারে জোর করে এই বেঁচে থাকার এত চেষ্টা কেন?

নতুন পাশ করা বিদ্যেয়, তর্কের ঢেউ তখন আমাদের জিভে ফেনিলোচ্ছল। একটু বিক্ষুব্ধ হয়েই বলতাম, জোর করে বেঁচে থাকার মানে?

মহাদেববাবু মহাদেবের মতোই হাসতেন তাঁর ঢুলুঢুলু চোখে। বলতেন, খুবই রাগ হচ্ছে তো আমার কথা শুনে? হবেই। কিন্তু ওটা ভায়া আসলে সত্যি কথার জ্বালা। তোমরা নিজেরাও হয়তো জান না। এই ধর, আমি তুমি, আমরা না থাকলে কী আসবে যাবে? কত লোক মরছে প্রতি দিন, কত লোক জন্মাচ্ছে। কী আসছে যাচ্ছে তাতে? এ যেন একটা যন্ত্র ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর সে ঘুরছে তো ঘুরছেই। জন্মাচ্ছে মরছে, মরছে জন্মাচ্ছে। একবার মরে গিয়ে দেখ না, সংসারের কতটুকু ক্ষতি হচ্ছে? কিছুমাত্র না। দেখবে, পৃথিবীর সবাই যে যার নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এমনকী তোমার আত্মীয়স্বজনেরা দু দিন একটু মুখ কালো করে থেকে, আবার হেসে খেলে বেড়াবে। তারা মরলেও তুমি তাই করবে। আমাদের বেঁচে থাকায় কিছুই যায় আসে না। আমরা কতগুলো মনগড়া কারণ তৈরি করে নিয়েছি, যেন আমার না বাঁচলেই নয়। আসলে, আমরা অনাহুত, অযাচিত। কেউ আমাদের সাধ করে, ভেবে চিন্তে ডেকে আনেনি।

পাগলের প্রলাপ ভেবে শান্তি পাওয়া যেতে পারত। কিন্তু যেন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসত আমাদের তিন জনেরই। ভবেন তো রীতিমতো শিউরে উঠত মহাদেববাবুর কথা শুনলে। আমার রাগ এবং ভয়, দুই-ই হত। একেবারে খেপে যেত অনিরুদ্ধ।

কেবল বচন মাহাতো মহাদেববাবুর মুখের ওপরেই বলত, অই, এইজন্য বলি বড়বাবু গো, যাদের কেউ নাই, তাদের টুকুস নিশা ভাং করতে নাগে। নইলে অই আকথা কুকথাগুলান মাথায় এইসে তানানা লাগাবে।

মহাদেববাবু ধমক দিতেন বচনকে। বচন চুপ করত। কিন্তু জীবনের এই অদ্ভুত তত্ত্ব বিশ্লেষণ ছাড়া, অন্যান্য কথায় গল্পে তাঁর সঙ্গ উপভোগ্য ছিল খুব।

কিন্তু তিনি কেন গড়াইয়ে? জিজ্ঞেস করলাম, কী করেন ওখানে?

–শুনি, আখড়া করেন।

–আখড়া? কীসের আখড়া?

–বোধ হয় বৈষ্ণবের আখড়া। যাইনি কোনও দিন। বচনের কাছেই সব শুনি।

এতক্ষণে নতুন মাস্টারকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কত দিন এসেছেন?

কেমন যেন ক্লান্ত গলায় বললেন, মহাদেববাবুর পরের পরে। মাঝে আর একজন মাস কয়েকের জন্য এসেছিলেন। তিনি বদলি হয়ে গেছেন। শালঘেরিতে আমি বছর দেড়েক আছি।

ভদ্রলোকের কথা শুনে মনে হল, চাকরি নয়, যেন নির্বাসনে আছেন শালঘেরির এই নির্জনে। স্বাভাবিক। হয়তো কোনও শহর থেকে এসেছেন। বিদেশ জায়গা। বয়সও বেশি নয়।

তিনি এবার জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, আপনার নামটা জানতে পারি?

বললাম, বিলক্ষণ। না জানাবার মতো কোনও আভিজাত্যই নেই। আমার নাম সীমন্তভূষণ চট্টোপাধ্যায়।

–ও! আপনিই সে? আপনি তো এত দিন জেলে ছিলেন।

জানলেন কেমন করে?

 –আপনার বন্ধু ভবেন ঘোষালের কাছে।

 এত দিন জেলে থেকে কেমন হয়েছি কে জানে। আমি যেন অবিশ্বাস্য চোখে তাকালাম ভদ্রলোকের দিকে। যেন সহসা ওঁকে আমার বেশি আপন মনে হল। বললাম, আপনি ভবেনকে চেনেন?

-চিনি একটু। আসেন মাঝে মাঝে।

–আসে?

আমার এতদিনের পাথর-চাপা প্রাণে যেন নতুন করে বাতাস লাগল। ব্যথা পেয়ে আনন্দ আমার তখন ভার হয়ে উঠেছে বন্ধুদের জন্যে।

ভাবতে ভাবতেই কী হল আমার। যেন হঠাৎ মুখটা পুড়ে আমার ছাই হয়ে গেল। ভবেনের হাসির আড়ে, চোখের ছায়ায় কী এক তীক্ষ্ণ শ্লেষ ও ষড়যন্ত্রী জয়ের ঝিলিক হানতে দেখলাম। আরও একটি মুখ, যার চোখ নেই, মুখ নেই। বোবা ও অন্ধ। পরমুহূর্তেই ছি ছি করলাম নিজেকে। তবু কে যেন আমার হাসিটুকু মুখোশের মতো ছিঁড়ে নিয়ে গেল মুখ থেকে। নিজেকে লুকোবার জন্যে, চকিতে মুখ ঘোরালাম আমি।

নতুন মাস্টারমশায় তখন বলছেন, হ্যাঁ আসেন। হয়তো এ অভাগাকে দয়া করতেই আসেন। একেবারে একলা থাকি। কোথায় যাই, ভেবে পাইনে। ভবেনবাবু এলে একটু কথাবার্তা বয়ে বাঁচি।

ফিরে দাঁড়িয়েছি শালঘেরির মুখোমুখি। এত দিন পরে ফিরে যদি এলাম, তবে মনটাকে এমন ছোট কৌটোয় পোরা পোকার মতো নিয়ে এলাম? কেন? আমি তো সব জানি, আমি তো সব জেনেছি ভবেনের কথা। সব দ্বন্দ্ব ঘুচিয়ে আমি এসেছি সেই চিরচেনা কোলের গন্ধে। সেই ধুলোয়, সেই বাতাসে। তবে?

তবে কিছুই নয়। আমার বুকের মধ্যে আজ যে সুর বাজছে, সেই সুরের বিরতিতে এ শুধুমহাকালের বিষাণের ধ্বনি। তাকে যে শুধু বিরতিতেই শোনা যায়। নিরন্তরের কোলাহলে সে থাকে অগোচরে। ভ্রষ্ট চোখের দুর্নিরীক্ষ্য দরজার সামনে সে ধ্বনি বিদ্যুৎ চমকের মতো। সহসা শোনা যায়। পরখ করে যায় আর নিজেকে বাজিয়ে নিয়ে ফেরার কথাটা যায় স্মরণে এনে দিয়ে। সে সব আমাকে অগ্নি-শুদ্ধ করে, ফিরিয়ে দিয়ে গেল আমার ফেলে যাওয়া ফিরে আসা সেতুর বুকে।

ওই তো দেখা যায়, শালঘেরির সীমা ঠেকে আছে আকাশে বাতাসে যেন ছোট ছোট ঢেউ। সেই ঢেউয়ে আমি শুনতে পাচ্ছি, আমার প্রাণের ছলছলানি। ফিরে এসেছি আমার গ্রামে। যে আমার মা শুধু নয়, খেলার সঙ্গিনী নয় কেবল। যে রূপময়ীর মৃত্তিকা স্তরে স্তরে, কোষে কোষে এক কালনাশী জীবনপ্রবাহের, আবিষ্কারের ইশারা পেয়েছি। সেটুকু আমার কাজের জীবনের এক ব্যাপক পরীক্ষার অপেক্ষা। মাটির সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠের জীবন বিচিত্রকে এক বার খুঁজে দেখব আমি।

না, আমার হাসিকে শুধু মুখের মুখোশ হতে দেব না। এত দিন যাকে দেখব বলে এত কাজল মেখেছি মনে মনে, আজ কোনও গ্লানি দিয়ে আমি কালিমা করব না সেই কাজলকে।

নতুন মাস্টারমশাই যেন একটু থতিয়ে গেলেন। তিনিও চুপ করে ছিলেন। তারপর বললেন, আপনি ভাবছেন কেমন করে গাঁয়ে ফিরবেন। আর আমি যা তা বকে চলেছি।

তাড়াতাড়ি বললাম, না না। ফিরে এসেছি তাতেই নিশ্চিন্ত। এখন আপনার সঙ্গে একটু ১১২

কিন্তু তিনি বিশ্বাস করলেন না বোধ হয়। বললেন, বুঝেছি। আপনার আর কিছুতেই স্টেশনে পড়ে থাকা উচিত নয়। এত দিন পরে এসেছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, গড়াইয়ে না গেলে রিকশাওয়ালাদের পাওয়া যাবে না। বচনেরও দেখা নেই। আপনি একটা কাজ করতে পারেন।

বলুন।

–যদি আপত্তি না থাকে, আর বিশ্বাস করেন, তবে এ সব মালপত্র আমার কাছে আজকের মতো রেখে দিতে পারেন। কেন না, সন্ধেও তো হয়ে এল প্রায়। বচনটা হয়তো আসবেই না। আপনিও আজকেই লোক পাঠাতে পারবেন না সব নিয়ে যেতে। তাই কালকেই সকালে সব নিয়ে যেতে পারবেন।

–তা হলে আমি চলে যাব বলছেন?

–হ্যাঁ, কিন্তু হেঁটে নয়। আমার একটা সাইকেল আছে। চালাতে যদি পারেন। এক মুহূর্তে এ প্রস্তাব সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করলাম। বললাম, খুব পারি সাইকেল চালাতে। আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন আপনি।

–তবে আসুন, দুজনে ধরাধরি করে এগুলো ঘরে তুলে ফেলি।

 তাই করলাম। দরজায় এসে বসে থাকব, তা কেমন করে হয়। জিনিসপত্র ভোলা হয়ে গেলে, ভদ্রলোক স্টেশন ঘর থেকেই সাইকেল বের করে দিলেন। সাইকেলে হাত দিয়ে পা যেন সুড়সুড়িয়ে উঠল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই মনে হল কপালটা যেন চড় চড় করছে। অনভ্যাসের ফোঁটায়। তাড়াতাড়ি নামতে যাচ্ছিলাম সিঁড়ি দিয়ে। জিজ্ঞেস করলাম, আপনার সাইকেলটা পাঠাব কেমন করে?

উনি আমার দিকেই তাকিয়েছিলেন। বললেন, বচন গিয়ে নিয়ে আসতে পারে। নয় তো কাল যে আপনার মাল নিতে আসবে।

–ঠিক, ঠিক। তার সঙ্গেই পাঠিয়ে দেওয়া যাবে।

আমি বলে উঠলাম। সে-ই তো সোজা কথা। নামতে গিয়ে আবার থেমে গেলাম। বললাম, আপনার নামটা কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয়নি।

ভদ্রলোক হেসে বললেন, সেটা সত্যি ভুল বটে। আমার নাম বিজন ঘোষ।

 বললাম, চলি তা হলে বিজনবাবু।

বিজনবাবু বললেন, আসুন। সময় পেলে মাঝে মাঝে এই বিজনে আসবেন।

নিশ্চয়।

 বলে হাসতে গিয়ে কোথায় যেন একটু চকিত বিষণ্ণতার রেশ লেগে গেল। আবার মনে হল, শালঘেরি স্টেশনের এই বিজনে ছেলেটি সত্যিই নির্বাসনে আছে। আমি আবার বললাম, নিশ্চয়ই আসব। এই তো সবে শুরু।

সাইকেলে উঠলাম। শালঘেরির রাস্তায় কালো আলকাতরার পোঁছড়া দেয়নি। মাটির সড়কটাকে ঝামা পিটিয়ে উঁচু করেছে। এমনিতে বোঝা যায় না, কিন্তু কয়েক মাইলব্যাপী, পুবদিকে মাটি ক্রমেই ঢালুর দিকে। যেন অতি সন্তর্পণে নেমেছে পা টিপে টিপে। তারপরে আবার গিয়ে উঠেছে একটু একটু করে। কেবল দক্ষিণের ঢালুটা আর বাধা মানেনি কোথাও।

ঝামা-পেটানো রাস্তা বটে। অঞ্চলের রং ছাড়েনি। বাতাসে বাতাসে লাল মাটির ধুলো এসে ছড়িয়েছে। নিজেকে ছড়িয়ে সে যেন আঞ্চলিক পরিচয়কে রেখেছে ধরে। ততোধিক না হলেও গোরুর গাড়ির চাকার দাগ পড়েছে নতুন রাস্তায়। না পড়াটাই অস্বাভাবিক।

সব ধান কাটা হয়ে গিয়েছে মাঠের। থাকার এক রূপ। না থাকার আর এক রূপ। আসন্ন এ সন্ধ্যার ছায়ায়, পুরবী রাগিণী বাজছে যেন এ রিক্ত মাঠের বুক জুড়ে। হরিতের সোনা গিয়েছে, এ রুক্ষ পাংশু পরিত্যক্ত বুকে তবু পাখিরা দল বেঁধে দানা খুঁজছে। আজকের পুরবী শুধু কালকের মিলনরাগের প্রস্তুতি। এ শুধু প্রসবের বিরতিতে রূপের হেরফের। নতুন গর্ভসঞ্চারের কামনা তার শিরায় শিরায়। প্রতীক্ষা শুধু অনাগত বর্ষার।

মাঠ ছাড়বার সময় হয়েছে পাখিদের। অনেকে উড়ে চলেছে আমার মাথার উপর দিয়ে। আরও কত দিন এমনি গিয়েছে ওরা। ওদের আয়ুষ্কালের হিসেব আমার জানা নেই। কিন্তু প্রতিদিনের যাওয়া আসার দলের কেউ কি আমায় চেনে না? কেউ কি অবাক হয়ে গেল না ওদের সেই প্রত্যহের পুরনো মানুষটিকে দেখে?

পশ্চিমে লেগেছে লাল, তার কিছু ছায়া পড়েছে পুবে। উত্তরে অস্পষ্ট সেই চিরচেনা বোম্বা বুড়োর কালো ছায়া লেপটে আছে আকাশে। আসলে ওটা পাহাড়। আর সব পাহাড়ের মতো ওটা বুড়ো তো বটেই। কিন্তু বোম্বা নাম ওর ভূগোলে লিখতে সাহস করেননি ভূ-বিশারদেরা। শুধু আমাদের শালঘেরির মায়েদের সেই সাহস ছিল। শালঘেরি থেকে ওকে দেখা যায়। যখন খুদে দস্যিদের আর কোনও রকমেই সামলানো যায়নি, তখন ওই বোম্বা বুড়োকে ডাকাডাকির মহড়া চলত। কিছু নয়, বোম্বা বুড়ো আসবে, আর পিঠে ফেলে নিয়ে চলে যাবে।

ভাবো একবার কী ভয়াবহ কাণ্ড। কিন্তু তারপর? তারপর কী হবে?

খুদেগুলির এদিক নেই, ওদিক আছে। তারপর কী হবে, সেইটি জানবার ঔৎসুক্য তার। কিন্তু তার পরেরটুকু যখন জানতে চেয়েছে, তখন বুঝতে হবে, দস্যিটা ভুলেছে। এবার বোম্বা বুড়োর সম্পর্কে যা খুশি তাই বলা যেতে পারে কুটনো কুটতে কুটতে, খুন্তি চালাতে চালাতে, পিদিমের সলতে পাকাতে পাকাতে।

মায়ের মুখখানি মনে পড়ে গেল। সেই বোম্বার ভয়ে উদ্দীপ্ত চোখ, ফোলানো ঠোঁট, আর আজ বুঝতে পারি, মায়ের নাকছাবিখানি যে ঝিলকে উঠত, সে শুধু চোরা হাসির রেশ।

মা আমাকে বোম্বার রূপকথার নায়ক দেখে গেছে। বোম্বাকে পাথর বলে জানা, ডাগর ছেলেকে দেখবার জন্য অপেক্ষা করেনি।

এবার দক্ষিণে বাঁক। শালঘেরির ঘেরাওয়ে এলাম। বেশ তাড়াতাড়ি এসেছি। দড়ি ঘেঁড়ার দৌড় যে! সামনে বাগদিপাড়া। কারা যেন জটলা করছে বসে–পাড়ার মুখে বসে। ওরা আমাকে চিনতে পারলে না। মতি, শরৎ আরও যেন কে কে। আমি নামলাম না। হাসিটুকুও চেপে গেলাম। কথা হলেই নামতে হবে। চল্লিশ মাসে আমার কী পরিবর্তন হয়েছে কে জানে। ওরা শুধু তাকিয়ে রইল ভিনদেশি মানুষকে দেখার মতো।

বাগদিপাড়ার পরেই সেই চিরকালের ছোট ছোট বাবলা আর আঁসশেওড়ার জঙ্গুলে জমি। তার পরেই, গোপালের মন্দির। শুধু গোপালের নয়, আরও কয়েকজনের ঠাঁই ছিল। কালের জটা ঝুলছে প্রায় সকলেরই শিরে ও হৃৎপিণ্ডে, বট কিংবা অশ্বথের তলগামী শিকড়ে। পোড়া ইটের চিত্ৰকাহিনীর নায়ক নায়িকারা পা বাড়িয়েছে লয়ের দিকে। তবু তাদের যৌবন মরেনি। সেই একই ভঙ্গিতে তারা লীলায়িত। মাকড়সার ঝুলে ও নোনার ঝাপসায় চোখের দৃষ্টিতে এখনও ধ্যান জ্ঞান দর্প বিলোলতা। অশ্বসওয়ারের তরবারির শাণ নেই, উদ্যোগ আছে। নৃত্যের তাল আছে সুরদাসীর, উচ্ছ্বাস নেই।

প্রাচীন শালঘেরি গ্রাম। প্রাচীন মন্দির আর যোড়শ শতাব্দীর রাজকীয় গড় প্রাসাদের ভাঙা জীর্ণ ভুতুড়ে ইমারতের ছড়াছড়ি। খানে খানে উঁচুনিচু খেয়ালি রিক্ত রক্ত রক্ত বালি বালি জমির বিস্তার। অসম্পূর্ণ ভোগের দীর্ঘশ্বাস বিদ্ধ শুধু কাঁটা ঝোঁপের রুক্ষ জটায় জটায়।

শাঁখ বাজছে। আমার বুকের মধ্যে যেন কেমন করে উঠল। এক নয়, দুই নয়, শঙ্খনাদ ঘরে ঘরে। বাড়ির দরজার সামনে এসে আমি দাঁড়িয়েছি। কেউ নেই আশেপাশে। দরজাটা খোলা, উঠোনটা ফাঁকা। তুলসীতলায় বাতি দেওয়া হয়ে গেছে। সে বাতির শিখা যেন আমার দিকে বিষণ্ণ বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। আমি জানি, এ শুধু সাঁঝের নয়। মহাকালের বিষাণ বাজছে। সে আমাকে সাহস দিয়ে আহ্বান করছে ভিতরে। তবু যে ডাক সারাক্ষণ আমার ভিতরে অনুচ্চারিত স্তব্ধতায় থমকে ছিল, প্রদীপের দিকে তাকিয়ে সেই ডাক আমার ঠোঁটে অস্ফুটে ফুটে উঠল, বাবা! বাবা!…

আমি সাইকেল নিয়ে উঠোনে ঢুকলাম। ডাকলাম, পিসিমা! পিসিমা গো!

–কে? কে?

দেখলাম, দালান সংলগ্ন বারান্দার থামের আড়াল থেকেই পিসিমার মূর্তি দেখা দিল। তিনি যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না। দেখলাম, রুদ্রাক্ষের মালাখানি ঝুলে পড়েছে হাতে। জপে বসেছিলেন বোধ হয়। কয়েক মুহূর্ত যেন পিসিমা সন্ধ্যা-জপের ঝোঁকে এক অবিশ্বাস্য অশরীরী রূপের মায়া দেখলেন। তারপরে নেমে এলেন ধাপ বেয়ে।

আমি এগিয়ে গিয়ে সাইকেল রাখলাম বারান্দায় ঠেস দিয়ে। বললাম, পিসিমা, আমি এসেছি। আমি টোপন।

বলে তাঁর পায়ে হাত বাড়ালাম। পিসিমা আমাকে দুহাতে ধরে একেবারে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, অর‍্যা, অর‍্যা, তুই টুপান এসেছিস র‍্যা? অ মা গ, আমি কী করব গ, তুই টুপান এসেছিস?

দুহাতে আমার চুলের মুঠি ধরে ফুঁপিয়ে উঠলেন পিসিমা, অ মা গ, আমি কী করব গ। ইবারে আমি চলে যাব গা, ইবারে আমি চলে যাব ই বাড়ি ছেড়ে। আর আমি থাকব না।

বলবেনই, এ কথা তো বলবেনই পিসিমা। আমি দুহাতে জড়িয়ে ধরলাম পিসিমাকে। ডাকতে গিয়ে টের পেলাম, আকণ্ঠ আমার ভরে গেছে কীসে। তবু আমি ডাকলাম, পিসিমা, পিসিমা।

পিসিমা সে ডাক মানলেন না। তেমনি রুদ্ধ কান্নায় গলা তুলেই বললেন, ই বাড়িতে তোর বাবা নাই। তুই আসলি, আমি আর থাকব না, আমি আর থাকব না।

এই সাহসটুকুই তো চেয়েছিলাম। এ বাড়িতে ঢোকবার সাহস। যিনি বসেছিলেন আমার ফিরে আসার প্রতীক্ষায়, তিনি গত হয়েছেন আজ ছমাস। জেলে পাওয়া সেই চিঠিখানির কথা আজও মনে পড়ে। পিসি লেখেননি। পাড়ার কবিরাজ মশাই একখানি পোস্টকার্ড পাঠিয়েছিলেন, কল্যাণীয় টোপন, তোমার পিতৃদেব স্বর্গলাভ করিয়াছেন।…তোমাকে দেখিতে বড় বাসনা ছিল।

কিন্তু আমার কথা আমি কাকে বলব? বাবাকে একটি বার দেখবার জন্যে যে আমার দু চোখ দুরাশায় মরেছে। সে কথা আমি কাকে বলব।

কাউকে বলব না। কারণ, সে দুরাশা যুক্তিহীন। সে চির দিন থাকবে আমার বুকের পিঞ্জরে। আমি শুধু বললাম, পিসি, আমি তবে যাই কোথায়?

কিন্তু পিসিমা কি আমার কথা শোনবার পাত্রী। তিনি তখন আমাকে আলগা দিয়ে, গলা ফাটিয়ে চিৎকার জুড়েছেন, অলো অ কুসু। কু-সি!…

কাছাকাছি কোথা থেকে মেয়ে গলার জবাব এল, কী বলছ জেটি!

অরে শিগগির আয়, শিগগির আয়, দ্যাখসে, কে এসেছে।

বলতে বলতে পিসিমা দালানে গেলেন ছুটে। পিদিম হাতে নিয়ে অদৃশ্য হলেন অন্য এক ঘরে। কিন্তু ও কথাটি তখনও মুখে আছে, থাকব না, আর থাকব না।

আমি যেন অপরাধীর মতো অন্ধকার দালানে ঢুকে বাবার ঘরের বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানে বাতাস নেই। শীতার্ত অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। দরজায় হাত দিয়ে দেখলাম, ভেজানো। ঠেলতেই খুলে গেল। কিন্তু ঘরে অন্ধকার নেই। বাবার সেই পুরনো জার্মান হ্যারিকেনটাই টিমটিমে করে নেভানো। পুরনো খাটে বিছানা পাতা। ঘরের সব জিনিস একরকমই আছে।

বাবার সামনে চির দিন মাথা নুইয়ে থেকেছি। চোখ তুলে তাকাইনি। ভালবেসেছিলাম কি না, কোনও দিন মনে আসেনি সে চিন্তা। আজ আমি হাত বাড়িয়ে তাঁর বিছানায় বুলিয়ে দিতে লাগলাম। মাথা নুয়ে এল। চোখ ঝাপসা হল। মনে মনে বললাম, আজ থেকে আমি আপনার বিছানায় শোব।

.

উঠোন থেকে আবার সেই মেয়েগলা শোনা গেল, কী বলছ জেটি, কী হয়েছে?

 ঘর থেকে জবাব দিলেন পিসিমা, অলো অ কুসু, বাতি ফাতি গুলোন সব কুথাকে গেছে দ্যাখ, খুঁজে পাচ্ছি না। বাতি জ্বালা, বাতি জ্বালা বাড়িতে।

পিসিমার শ্বশুরবাড়ি ছিল রামপুরহাটে। বিধবা হয়ে এখানে আছেন বিশ বছর। এযুগে আমাদের কথা অনেক বদলেছে। কিন্তু পিসিমার কথা আর সুর কোনও দিন বদলাল না।

গলা যার শোনা গেল, নাম তার কুসুম থেকেই কুসু বলেই বোধ হল। শুনতে পেলাম তার ভীতবিস্মিত গলা, কেন গো জেটি? কিছু বেরিয়েছে নাকি?

–মর মুখপুড়ি। বেরুবেটা আবার কী? এসেছে, এসেছে যে। বাতি জ্বালা, বাতি জ্বালা সব। আজ আমার দেয়ালি লল!

হাসি পেল আমার। চোখের জল তবু শুকোল না। পিসি চলে যাবেন? চলে যাবেন বলে বুঝি এখন বাতি খুঁজে মরছেন? আমার নিজেরই যেতে ইচ্ছে করল বাতি খোঁজবার জন্যে।

কুসুমের চুপি চুপি চাপা গলা শুনতে পেলাম, কী এসেছে? কে এসেছে জেটি?

ক্যানে, উঠানে দেখতে পালি না?

না তো।

কী বলছিস লো ছুড়ি। টুপান, অ টুপান।

ওই আমার ডাকনাম। কিন্তু টুপান নয়, টোপন। তবে ওকার আকার নিয়ে পিসির চিরদিনের গোলমাল। তাতে নাম আলাদা শোনাতে পারে। পিসির উচ্চারণ বদলানো যায় না। সাড়া না দিলে পিসি যে কী কাণ্ড করবে, বলা যায় না। বাবার ঘরের বাইরে এসে বললাম, এই যে পিসি, আমি বাবার ঘরে গেছলাম।

অমনি পিসির কান্না-ভরা গলা আবার শোনা গেল, ক্যানে? আর ক্যানে রে? অরে ডাকা, অরে খাঁড়া, আর ক্যানে।

বলতে বলতে পিসি বাইরে এলেন। হাতে বাতি। বাতির আলো পড়েছে পিসির গায়ে। পিসির মুখ দেখতে পেলাম আবার ভাল করে। বাবার ছায়া তাঁর মুখে। যৌবনের মেয়েলি চটকটুকু গিয়ে এখন লোলরেখা মুখে পিসি যেন তার ভাইয়েরই ছাপ পেয়েছেন।

কেন গিয়েছিলাম, সে কথার জবাব দিতে পারলাম না। কিন্তু আমার মুখে কী ছিল, কে জানে। পিসি তার কথা থামালেন। কাছে এলেন আমার আরও। বাতি তুললেন আমার মুখের দিকে। বললেন, নামা দেখি মুখোন, আমি একবারটি দেখে নিই।

নির্দেশমাত্র মুখ নামিয়ে নিয়ে এলাম। পিসি আবার আমার মাথায় হাত দিলেন। আর এবার কিছুই বললেন না। কেবল আপন মনেই মাথাটি নাড়তে লাগলেন, আর আমার সারা গায়ে হাত বোলাতে লাগলেন।

কেন জানিনে, আমার প্রাণখানিও যেন জুড়িয়ে যাচ্ছিল। শালঘেরিতে এসে, এমনি একটু স্পর্শ পাব, সেজন্য যেন আমার সকল ইন্দ্রিয় পিপাসিত হয়ে ছিল।

তারপরে পিসি বললেন, তোর মুখখানি আমাদের বোঠানের মতন।

অর্থাৎ আমার মায়ের মতো। পিসি আবার বললেন, সেই টিকোলো নাকখানা, ফাঁদি তরাসে চোখ, আর যত রাজ্যের চুল। বাবারে বাবা। কী চুল তোর মার মাথায় ছিল। বিরক্ত ধরে যেত না ও চুল বাঁধতে? আমার তো হাত সরত না।

মায়ের মুখখানি মনে করবার চেষ্টা করলাম। যে বয়সে দেখলে মানুষের মুখ মনে থাকে, তার অনেক আগেই আমি মাকে হারিয়েছি। শুধু মায়ের ছবিখানি মনে পড়ে। সেই ছবিখানি, বারো বছরের এক মেয়ে, ভেলভেটের জামা আর বিষ্ণুপুরি রেশমি শাড়ি পরা। নাকে নোলক, মাথায় টিকুলি, গলায় মোটা বিছে হার। আমার জন্মের দুবছর আগের সেই ছবি। মারা গেছে উনিশ বছর বয়সে। সেই থেকে বাবা আর বিয়ে করেননি।

ইতিমধ্যে পিসির বুঝি হুঁশ ফিরে এল। আবার গলা তুলে ডাকলেন, অ কুসু।

 এবার পিসিমার ছায়ার আড়াল থেকেই একটি সলজ্জ চাপা গলার জবাব এল, এই যে জেটি, আমি এখানে।

পিসি ফিরলেন আলো নিয়ে। কুসুমকে দেখতে পেলাম। বড় যেন লজ্জা পেল সে আমাকে দেখে। যদিও লজ্জা পাবার বয়স তায় হয়নি এখনও। হয়তো বছর চোদ্দো বয়স হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মেয়ে, তায় দুর পাড়াগাঁয়ের। ডুরে শাড়িখানি জড়িয়ে, এর মধ্যেই সে গিন্নিবান্নি সেজে বসেছে। শরীরে যে ছায়াটুকু পড়েছে, সেটা বয়সের চেয়ে, কিশোরীর মনের রং বেশি। এর মধ্যেই সে শালীন হয়ে উঠেছে। চোখের পাতায় নেমেছে লজ্জার ভার। যে-ভার তার শরীরের রেখায় উদ্যত হয়ে আছে প্লাবনের জন্য। মাজা মাজা রং, তাতে সদ্য বেড়ে ওঠার মুখে দীঘল কচি ডাঁটাটির গায়ে যেন নতুন কিশলয়ের চিকন শ্যামলিমা। নাকখানি বুঝি একটু চাপা-ই। বড় বড় চোখ। অপরিচিত পুরুষের সামনে এখনও তার চোখে যেন একটু ভয়ের ইশারা। কিন্তু লজ্জার অবকাশ এসেছে পুরোপুরি। তার চেয়েও বেশি, যা তার গভীরে থমকে যাচ্ছে আবর্তিত বন্যার মতো, সে তার রুদ্ধ হাসি। সেটাই টের পাওয়া গেল পরে।

পিসি বললেন, দ্যাখ, দ্যাখ ক্যানে কুসু, কে এসেছে। ই আমাদিগের টুপান লো, টুপান। আজ আমার বাড়ির কুথাও আঁধার থাকতে পারবে না। শিগগির বাতি জ্বালা, বাতি জ্বালা। বুক আমার ধড়াস্যে দিয়েছে মেয়েটা। বলে কিনা, উঠানে কাউকে দেখতে পেলাম না। সি আবার কী গ, আমি কি স্বপ্ন দেখলাম নাকি?

দেখলাম, কুসুর শরীর কাঁপছে। পরমুহূর্তে তার আঁচল উঠল মুখে, আর চকিতে এক বার আমাকে দেখে নিল। তারপরেই ধুপ করে আমার পায়ে হাত বুলিয়ে নমস্কার করে নিল একটি।

আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, ও কী, ও কী হচ্ছে? পিসি বলে উঠলেন, তা করবে বইকী বাবা। পেন্নাম করবে না বড়কে? তোদের ইংরাজি জেলের কী নিয়মকানুন, তা তো আমরা জানি না। আমরা দেশের লোক, দেশের মতন করি।

আমি বললাম, ও। পিসি, আমি বুঝি বিদেশের লোক হয়ে ইংরেজের জেলে গেছলাম।

–তা কী জানি বাপু।

 কিন্তু কুসুমকে চিনতে আমার একটু ভুল হয়েছে। দেখলাম, সে আমার দিকে বেশ ভাল করেই নিরীক্ষণ করছে। আমি তবু পিসিকেই জিজ্ঞেস করলাম, পিসি, এ মেয়েটিকে তো চিনতে পারলাম না।

পিসি ফিরে যাচ্ছিলেন বাতি নিয়ে। ফিরে বললেন, অ মা। ওকে তুই চিনিস না?

 জবাবটা কুসুমই দিল। বলল, আহা! আপনি বুঝি সব ভুলে গেছেন?

তা বটে! কুসুমের ঠোঁট যেরকম ফোলবার লক্ষণ দেখা দিল, তাতে বোঝা গেল, ভুলে যাওয়াটা আমার অন্যায় হয়েছে। কিন্তু মনে করতে পারছি না কিছুতেই। এবং সব বলতে কুসুম কোন ভুলে যাওয়া কাহিনীর ইঙ্গিত করছে, ধরতে পারলাম না।

বললাম, একটু মনে করিয়ে দাও তো।

কুসুমের দু চোখে একটি ক্ষমাহীন অভিমান স্ফুরিত হতে দেখা গেল। বলল, আপনাকে পুলিশে ধরবার আগের দিন, সন্ধেবেলা সেই বাড়িতে এলেন। চিঠি লিখে পাঠালেন ঝিনুক-দিকে। আমি গিয়ে দিয়ে এলাম?

এ কথা কখনও মিথ্যে হতে পারে না। কিন্তু গোলমালটা হয়ে গেছে মন নিয়ে। সেদিন কুসুমের মন আর আমার মন, এক জায়গায় ছিল না। ঝিনুককে কী লিখেছিলাম, সে কথাও বুঝি মনে নেই। কুসুমের জীবনে যা ঘটনা, আমার জীবনে তখন সেটা একটা দুর্ঘটনার কোলাহলে মুখর। সেই সন্ধ্যাটা বালিকার মনে আছে, আমার নেই। তাতে কুসুমের রাগ হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এবং মেনে নিতে হল।

বললাম, ও। তুমিই বুঝি সে?

তবে?

যেন অধিকার রক্ষার্থেই কুসুমের জবাবে একটু জোর পড়ল। বলল, আমার খুব মনে আছে, আপনাকে কেমন যেন পাগলের মতো দেখাচ্ছিল।

–পাগল?

হ্যাঁ, সত্যি পাগলের মতো। ওই যে সেই, আপনার বন্ধু কে একটা ছিল গড়াইয়ের লোক, পুলিশের গুলিতে মরে গেছল সদরে, তার জন্যে নাকি অমন হয়ে গেছলেন। আমি জানি।

এবার হাসতে গিয়ে পারলাম না। কুসুমের দিকে তাকিয়ে বললাম, সে কথাটাও তুমি জান না কি?

সবাই জানে।

ঠোঁট উলটে জবাব দিল কুসুম, শালঘেরির কে না জানে? আপনি তো বন্ধুর শোধ তোলবার জন্যে পুলিশকে মারতে গেছলেন।

তাই নাকি? মানুষও দেখছি, সত্যি কিংবদন্তি সৃষ্টি করতে ভালবাসে। শোধ নিতে পারি, এ সব ক্ষমতা ছিল না, ভাবিওনি। কিন্তু যার ডাকে সেদিন ঘর ছেড়েছিলাম, তার মৃত্যু সংবাদে চিরদিনের জন্য ঘর ছাড়তে চেয়েছিলাম।

এবার পিসি বললেন, ওকে তুই চিনিস না বুঝি? ও আমাদের হরলালের মেয়ে। হরলাল বাঁড়ুজ্যে, ওই তো দক্ষিণ দিকের বাড়ি।

আমি যেন অনেকখানি সহজ হতে পারলাম। আর পরমুহূর্তেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, তুই মানে, হরকাকার মেয়ে?

কুসুম খিলখিল করে হেসে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে পালাল। পিসির হাত থেকে আলো টেনে নিয়ে বলল, দাও জেটি, আলো দাও, আর তোমরা পিসি ভাইপোতে বসে বসে গল্প করো।

পিসি বললেন, আগে বাতিগুলান বার কর সব। দ্যাখ, কেরোসিন তেল আছে টিনে।

কুসুম যেন বিরক্ত হয়ে বলল, তোমাকে আর বলতে হবে না। কোথায় কী আছে, সে তোমার চেয়ে আমি বেশি জানি।

দ্যাখ, দ্যাখ, দেখছিস, রাতদিন ঘুড়ি আমাকে অমন চোপা করবে।

বলতে বলতেই পিসির মুখে মেহের হাসি লক্ষ পড়ল। আমার কাছে এসে, কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, হরলালটা তো বদের ধাড়ি। এই নড়ায়ের সময়, গড়ায়ে না অ্যাট্টা ঘাঁটি মাটি কী হয়েছিল? সেখানে যে ডাক্তার ছিল, হরলাল তার কম্পাউন্ডার হয়েছিল। মদ ভাং তো বরাবরই চলত। তারপর সেখানে বুঝি কী চুরি করে পালিয়ে গেছিল। তা সে সব গেছে, এখন বাড়িতে এসে বাবু বসেছেন। উদিকে জমিজিরেত সব খাজনার দায়ে লাটে। ঘর ভরতি বাচ্চা বাচ্চার কাউমাউ দিনরাত্তির। আর উনি উদিকে নেশা করে বেড়াচ্ছেন।

হরলাল বাঁড়ুজ্যে কাকাকে গাঁয়ের সকলের মতো আমিও জানতাম, লোক তিনি সুবিধের নন। অবশ্য ওই একদিকেই। মুচিপাড়ায় অস্পৃশ্য-আড্ডার ব্যাপারে আর নেশাভাং-এ হরকাকার চিরদিনেরই দুর্নাম। চুরির অপবাদটা নতুন শুনতে হল। তার চেয়েও দুর্ঘটনা জমিজমা বেহাত হওয়া।

পিসি আবার বললেন, আর মাথার পরে এই সোমত্ত মেয়ে, আজ বাদে কাল বে দিলেই হয়। সি কথাটি ভূতটার মনে নাই। বউটা এ বাড়ি ও বাড়ি ধার করে সারা। তাই, বুঝলি টুপান, কুসুকে আমি আমার কাছেই রেখে দিয়েছি একরকম বলা যায়। পারিও তো না একা একা সব দেখতে।

বড় সংকোচ হল পিসির কথা শুনে। তাঁর কথার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হচ্ছে, কুসুমকে এ বাড়িতে তার অধিকৃত স্থানে যেন আমি থাকতে অনুমতি দিই। কারণ, পিসি যে ভাবছেন, এ বাড়িতে আর তিনি কেউ নন। গৃহকর্তা ফিরে এসেছে, সুতরাং সবই তার অনুমতি নিয়ে করতে হবে।

বললাম, পিসি, তুমি ভাবছ, আমি তোমাকে বারণ করব?–তুমি যে ওকে রেখেছ, সেটা তো ধর্ম।

অমনি পিসির চাপা স্বরের মধ্যেই একটু বিক্ষুব্ধ গলা শোনা গেল, ছাই! ওকে রাখায় আবার ধমমো। আমার হাড় মাস কালি করে ছাড়ছে। একখানা করতে দশখানা। ডেকে ডেকে সাড়া পাই না। আর আমাকে যেন বউকাটকি শাশুড়ির মতন ধমকায় গ। তবে

গলা আবার আর একটু নামল পিসির। বললেন, কাজে বড় দড়। যখন করে মন দিয়ে, তখন একেবারে দুগগোর মতন দশ হাত দিয়া করে। দেখতে পাবি, থাকলেই দেখতে পাবি।

বুঝলাম, সন্তানহীনা পিসিমার সঙ্গে, এ শূন্য বাড়িটিতে, কুসুমের একটি খেলাঘর পাতা হয়েছে। এ খেলার কোনও দর্শক ছিল না এত দিন। আজ আমি এসেছি। শুধু দর্শক হয়েই যে আমার কাজ ফুরাবে, এমন ভরসা নেই। শ্রোতাও হতে হবে। চাই কী, মাঝে মাঝে বিচারকের আসনও নিতে হবে বোধ হয়। আর সেই মামলায়, পিসি সবসময় থাকবে বাদি, কুসুম আসামি।

কিন্তু কুসুমের কাজের প্রশংসার উল্লেখে, পিসির আবার সেই অনুমতি চাওয়াটাই ফুটে উঠল। বোধ হয়, আমার আগের কথায় তাঁর তুষ্টি হয়নি।

বললাম, পিসি, তুমি যেমনটি চাইবে, এ বাড়িতে তেমনটিই হবে। আমিও তোমার হুকুমেই চলব।

 পিসি ভারী খুশি। বললেন, দেখব, কেমন পিসির হুকুম মেনে চলিস।

তারপরেই গলা তুলে বললেন, কুসি, ও কুসি।

কোন ঘর থেকে যেন জবাব এল, কী বলছ?

বাতি জ্বালান তোর হবে আজ, না কি? করছিস কী?

 –পা ছড়িয়ে বসে গেজেট করছি।

আমি অবাক হলাম। হাসিও পেল। পিসি সাক্ষী মানলেন, দেখলি তো, দ্যাখ, এই রকম করে আমার সঙ্গে। আয় টুপান, আমার কাছে এসে বসবি আয়।

বাবার ঘরের পাশের ঘরেই পিসির ঠাঁই। কুসুমও সেখানেই বাতি জ্বালাতে ব্যস্ত। পিসি আসন পেতে দিতে উদ্যত হলেন।

আমি বললাম, ও কী করছ পিসি, আমি মেঝেয় বসব।

বলে বসতে না বসতেই কুসুমের প্রশ্ন, তোমাকে ধরে ধরে খুব মারত জেলে?

 যাক, আপনি থেকে তুমি হওয়া গেছে কুসুমের কাছে। তাতে বুঝতে পারছি, আমি আমার সেই শালঘেরির সীমানার মধ্যেই এসেছি।

বললাম, মারলে বুঝি তুই খুশি হতিস?

–ও মা! তাই কি বললাম না কি?

 কিন্তু প্রশ্নটা যে পিসির মনেও। বললেন, হ্যাঁরে, সত্যি মারধর করে নাই তো? শালঘেরির চাটুজ্যে বাড়ির ছেলের গায়ে পুলিশ হাত তুলেছে, এমন হয়?

বাধা কিছু নেই। গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ যে একেবারেই আঘাত করেনি, তা নয়। কিন্তু সেটুকু না বললে যদি পিসি খুশি হন, কেন বলি?

বললাম, না পিসি, মারধোর করেনি।

-পাথর ভাঙতে হত?

চিমনি মুছতে মুছতে কুসুমের পরের প্রশ্ন।

হেসে বললাম, না।

তবে কী করতে সারাদিন? খালি রান্না আর খাওয়া?

 পাথর যদি ভাঙিনি, তবে রান্না-খাওয়া ছাড়া আর কী করবার থাকতে পারে। কুসুম কুসুমের মতোই। জিজ্ঞেস করেছে। আর, প্রশ্নটা দেখলাম, পিসির চোখেও জ্বলছে। বললাম, খেয়েছি, রান্না করিনি।

-কে রান্না করত?

–লোক ছিল।

 সহসা যেন পিসির কী মনে পড়েছে। তিনি তাড়াতাড়ি উঠে, একটি বাতি নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, অ মা, সব ভুলে বসে আছি, মাথার ঠিক নাই।

কিন্তু কুসুমের প্রশ্ন শেষ হয়নি। বলল, খালি খেতে আর শুয়ে থাকতে?

 বললাম, একটু পড়াশোনোও করতাম। শুধু খেয়ে শুয়ে কি দিন কাটে?

–কিন্তু সারাদিন তো একটা কুঠরির মধ্যে বন্ধ করে রাখত?

না। সকালে বিকালে একটু মাঠে বেরুতে দিত।

–মাঠ। মাঠ আবার কী? ওটা জেল নয়?

–জেলেরও মাঠ আছে কুসুম।

ও মা, তাই নাকি।

–হ্যাঁ। ছোট মাঠ, কিন্তু খেলাধুলো করা যায়।

বেশ তো।

 কুসুমের বড় বড় চোখ দুটি যেন এ সংবাদে খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে এক মুহূর্ত আমার দিকে। তাকিয়ে রইল। তারপর মুখ নামাল।

বললাম, তুই যাবি কুসুম?

-কোথায়?

জেলে?

কুসুম ফস করে দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে বাতি ধরাল। তারপরে বলল, যেতে ইচ্ছে করে।

জবাব শুনে আমিই অবাক হলাম। বললাম, কেন রে?

–দেখতে।

–ও, জেল খাটতে নয়?

বলে, হাসতে গিয়ে লক্ষ পড়ল, কুসুম আর একটি বাতি জ্বালাতে জ্বালাতে, মুখ টিপে টিপে হাসছে। যেন বলতে চাইছে কিছু।

জিজ্ঞেস করলাম, কী কুসুম, কী হয়েছে?

কুসুম ছোট। তার কিশোরী মুখখানিতে তবু যেন আশ্বিনের আকাশের খেলা। দেখলাম, সহসা তার মুখখানি গাঢ় ছায়ায় গেছে ভরে। সে বলল, আমি তো রোজ মেলোমশায়ের কাছে আসতাম। আর মেসো খালি তোমার কথা বলত।

মেলোমশায় মানে আমার বাবা। হাসিটুকু আমারও গেল। বললাম, কী বলতেন কুসুম?

কুসুম ছেলেমানুষ, কিন্তু সংসার তার অন্তরকে বিস্তৃত ও গভীর করেছে। বলল, বলত, তুমি কত দুষ্টু ছিলে আর সেই দুষ্টুমি তোমার নাকি কোনওদিন ঘুচল না। আমি যদি বলতাম, মেসো, টোপনদা তো এখন জেলে, তাতে দুষ্টুমির কী আছে? মেসো বলত, এটাও দুষ্টুমি, তোরা জানিস না। আমার সঙ্গে দুষ্টুমি করে ও জেলে গিয়ে বসে আছে। জান টোপনদা, তোমাকে দেখতে না পেয়ে মেসো মরে গেল।

কুসুম!

রুদ্ধ গলায় ডাক দিয়ে আমি থামিয়ে দিলাম কুসুমকে। কিন্তু কুসুম যেন কত বড়। আমার দিকে এক বার তাকিয়ে, নিজের চোখ মুছে বলল, এখন রোজ কেঁদো বসে বসে।

পিসি এলেন। হাতে একটি তামার জলপাত্র। তার থেকে জল নিয়ে আমার মাথায় ছিটিয়ে দিয়ে বললেন, নানান জাতের মধ্যে ছিলি বাবা, একটু গঙ্গাজল দিয়ে দিলাম।

আপত্তি করার উপায় নেই। কুসংস্কার বলে, আর যাকে তোক বুড়ি পিসির কাছে প্রতিবাদও নিরর্থক। পিসি যদি শান্তি পান, সেটুকুই লাভ।

বাতি জ্বালানো শেষ। পিসি বললেন, ও কুসু, ঘরে যে কটা আলু ছাড়া আর কিছুটি নাই লো? টুপানকে আজ খেতে দেব কী?

আমি বললাম, কী আবার দেবে পিসি। এসেছি সন্ধে করে, আগে খবরও দিতে পারিনি। শালঘেরিতে এখন কী পাওয়া যায়, না যায়, তা আমিও জানি। তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না। যা আছে, তুমি তাই করো।

খিদে আমার সত্যি নেই। কেন, তা জানিনে। জীবনের নতুন লগ্নে এসে যেন পৌঁছেছি। আজ প্রত্যহের চাহিদাটা সীমানার বাইরে।

কিন্তু কুসুমের চোখমুখের ভাব খুব সুবিধের বোধ হল না। দেখলাম, মুখখানি গম্ভীর করে, জ কুঁচকে সে আঁচল খুঁটল। আঙুল কামড়াল, আর কিছু বললে বোধ হয় এখুনি উঠোনে নিয়ে গিয়ে, বোম্বাবুড়োকে দেখিয়ে ভয় দেখাবে।

তারপরেই সে একটি বাতি হাতে নিয়ে, বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, আমি এখুনি আসছি।

অ লো, কোথা যাচ্ছিস লো? অ কুসু। না, আর পারি না এ ছুড়িকে নিয়ে।

আমি একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলাম, ও কোথায় গেল পিসি?

কী জানি! ও মুখপুড়িই জানে। কী একটা মাথায় এসেছে, অমনি ছুটল। তুই বস, বস। তা হাঁ রে টুপান, তোর সঙ্গে কি কোনও জিনিস-পত্তর নাই র‍্যা? সাইকেলে এলি কোত্থেকে?

এতক্ষণে পিসির সে কথা মনে পড়েছে। বললাম সব কথা। এমন সময়, বাড়িতে যেন ডাকাত পড়ল একেবারে। একরাশ ছেলেমেয়ে দালানে এসে ঢুকল দুড়দাড় করে।

পিসি হেঁকে উঠলেন, কে রে, কে তোরা?

 দরজায় দেখি এক ঝাঁক ছোট ছোট মুখ আর কৌতূহলিত চোখ।

পিসি বলে উঠলেন, এ্যাই দ্যাখ, এ্যাই! কুসি বাইরে গেছে, আর গোটা শালঘেরিময় এতক্ষণে বুঝি রাষ্ট্র হয়ে গেল, তুই এসেছিস। এ সব কুসির ভাই-বোন।

বলতে বলতেই একটি বয়স্ক মহিলার গলা শোনা গেল, টোপিন নাকি এসেছে সেজদি?

পিসি বললেন, কে, হরর বউ? আয়। হ্যাঁ, টুপান এসেছে। আয়, দেখবি আয়।

পিসির মাথার ঠিক নেই। যেন হরলাল কাকার স্ত্রী আমাকে কোনওদিন দেখেননি। তিনি এলেন ঘরের মধ্যে। শুধু যে এতদিনের অদর্শনেই কাকিমা এমন ঘোমটা টানছেন লজ্জায়, তা আমার মনে হল না। তাঁর চেহারা, পরিধেয়ের দারিদ্র্য, সর্বোপরি জীবনধারণের গ্লানির লজ্জাকেই যেন তিনি তাঁর ময়লা জীর্ণ শাড়িখানি দিয়ে ঢাকবার চেষ্টা করলেন। তা ছাড়া বয়সও তাঁর এমন কিছু বেশি নয়। কুসুমই প্রথম সন্তান।

আমি উঠে পায়ের ধুলো নিলাম। তিনি আমাকে স্পর্শ না করে, ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে, চুম্বনের শব্দ করলেন। বললেন, বেঁচে থাকো বাবা। এ বাড়িখানি তোমার জন্যে যেন খাঁ খাঁ করছিল।

পিসি বললেন, বস হরর বউ।

না সেজদি, উনুনে ভাত রয়েছে আমার। কুসি গিয়ে বলল, তাই ছুট্টে এসেছি। এই দেখুন না, আমি এসেছি তো সব সঙ্গে সঙ্গে এসেছে। মালতীটা রয়েছে একলা, কী কুরুক্ষেত্তর না জানি হবে।

পিসি বললেন, তা বটে। তবে যা। কিন্তু কুসি গেল কোথা?

কী জানি। কিছু তো বললে না। বাতি নিয়ে ছুটল কুথা।

দ্যাখ দেখি, আমি আর পারি না ছুঁড়িকে নিয়ে। রাত বিরেতে এত বড় মেয়ে, দুমদাম করে কুথাকে দৌড়ল।

কুসুমের মা বললেন, গেছে হয়তো কিছু আনতে টানতে, আসবে এখুনি।

পিসি ঝামটা দিলেন, তোর আর কী? তুই তো বলে খালাস।

তা তো বটেই। কুসুমের মা হতে পারেন হরকাকার স্ত্রী। কিন্তু কুসুম যাঁর, তাঁরই সাজে এ কথা বলা। কথা শুনে মনে হয় না, কাকিমার কোনও দাবি-দাওয়া থাকতে পারে মেয়ের ওপর।

কাকিমা হাসলেন। আমাকে বললেন, যাই বাবা।

–হ্যাঁ, আসুন।

বলেও আমি যেন নিয়ম রক্ষার জন্যেই বলে ফেললাম, হরকাকা ভাল আছেন তো?

কাকিমা যেতে গিয়ে দাঁড়ালেন। এবার লক্ষ করলাম, কুসুমের মায়ের মুখখানি কুসুমের মতোই। বয়স বুঝি বত্রিশ-তেত্রিশের বেশি নয়। কিন্তু এর মধ্যেই বয়সের ছাপ পড়েছে মুখে। ভঙ্গিতে ক্লান্তি, তবু কোথায় যেন একটি রুদ্ধ কান্না থমকে আছে। সিদুরের মেঘ দেখা গাভীর মতো কী এক সর্বনাশের ভয় যেন তাঁর দুটি চোখ জুড়ে।

একটু করুণ হেসে বললেন, সেটা বাবা দেখলেই বুঝবে। কেমন যে আছেন উনি, সে আমরা জানি না, উনিও জানেন কি না জানি না।

বলে এক মুহূর্ত ইতস্তত করে চলে গেলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ছেলেমেয়েরাও। আমি বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। পিসি বললেন, সহ্যও আছে বউটার। তাই বলি, লোকে যদ্দিন দাঁতে চিবিয়ে খায়, তদ্দিন দাঁতের কথা মনে থাকে না।

পিসিমা হরকাকার কথাই বলছিলেন। আমি বললাম, কিন্তু অযত্নে সেই দাঁত মাঝে মধ্যে ব্যথা করেও ওঠে পিসি।

পিসি বললেন, আ, বাবা, সে বোধ কি হরর আছে।

পরমুহূর্তেই পিসির একটি দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল। আপন মনেই বলে উঠলেন, কী করে এত কষ্ট সহ্য করে বউটা কে জানে। এমনিই হয়তো হয়।

পিসিমার কথায় মনটা চমকে উঠল। মনে পড়ল, তিনি আঠারো বছর বয়সে বিধবা হয়েছিলেন। একটি অচেনা বিস্ময় ও ব্যাকুল জিজ্ঞাসা বোধ হয় চিরদিন তাঁর বন্ধ দুয়ারে চাপা পড়ে আছে।

আবার বসতে না বসতেই কুসুমের ঝটিতি আবির্ভাব। বলল, পেয়েছি জেটি।

কী পেলি?

 ডিম।

–আ মুখপুড়ি লো, আ মুখপুড়ি, সব নিয়মকানুনের মাথা খেয়েছিস তুই। ডিম নিয়ে তুই আমার ঘরে ঢুকেছিস?

কুসুম খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, ও গো, না না, এখানে নিয়ে আসি নাই, সে আমি আঁশের হেঁসেলে রেখে এসেছি। জেটিটা ভারী বকবক করে।

কিন্তু ডিমের নাম নেওয়া হয়ে গেছে। পিসি যেন শান্তি পাচ্ছেন না আর। হাত নেড়ে বললেন, যা যা, তুই যা দেখি আঁশঘরে। আমি চাল দিয়ে আসছি। কাঠ জ্বালাগা তুই।

কুসুম গেল রান্নাঘরে। পিসি গেলেন চাল আনতে। বুঝলাম, রান্নার দায়িত্বটা কুসুমের ওপরেই। আমি ঘরের বাইরে এসে পা বাড়ালাম। সাইকেলটা দালানে তুলে আনতে।

অমনি পিসির গলা শোনা গেল, যাচ্ছিস কুথা টুপান?

পিসির নজর এড়ায় না। বললাম, সাইকেলটা তুলে রাখছি পিসি।

অনুমতি হল, রাখ, কিন্তু আজ আর কোথায় বেরোস না বাবা।

 বললাম, না পিসি, আজ কোথাও বেরুব না।

সাইকেলটা তুলতে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। অন্ধকার উঠোন। আমার নড়তে ইচ্ছে করল না।

রাত বুঝি কৃষ্ণপক্ষের। হালকা কুয়াশায় ঢাকা নক্ষত্রেরা কী এক গুপ্ত আসরে বসে যেন নিজেদের মধ্যে কানাকানি করছে। আর হাসছে মিটিমিটি করে। ছায়াপথ রেখাঁটি মাঝ আকাশের কাছ থেকে, কোন এক দূর পথের অজানায় গেছে হারিয়ে।

আমাদের পাকা বাড়ি, কিন্তু মাটির পাঁচিল। পাঁচিলের বাইরে গাছের ঝুপসি ঝাড়। খানকয়েক বাড়ির খড়ের চালের মাথা দেখা যায়। আমি যেন চারদিক এঁকে এঁকে দেখতে লাগলাম।

শেয়াল ডেকে উঠল। ও ডাক কেউ কোনওদিন কান পেতে শোনেনি। আমি শুনিনি কোনওখানে। আজ আমার শুনতে ইচ্ছে করছে। শুনে আমার প্রাণ জুড়োচ্ছ। আমি যে অনেক দিন ওই ডাক শুনিনি। যে আমার প্রত্যহের মাঝে সত্তায় মিশে ছিল, সে আজ জানান দিয়ে যাচ্ছে এতদিনের অনুপস্থিতিতে।

সাইকেলটায় হাত দিতে যাব। কুসুমের কীর্তির আর একটি পরিচয় পাওয়া গেল। বাইরে থেকে ডাক শোনা গেল, টোপন! টোপন এসেছ নাকি হে?

কে? পণ্ডিতমশাইয়ের গলা মনে হচ্ছে। তাড়াতাড়ি বললাম, হ্যাঁ, এসেছি। আসুন। পিসি, বাতিটা দাও।

বলে নিজেই ছুটে গেলাম। পিসির থান কাপড়খানি দেখলাম, ঘোমটায় একেবারে কলাবউয়ের অবস্থা করেছে। তাড়াতাড়ি আমাকে ফিসফিস করে বললেন, দালানে বসিস, আমি যাই।

পিসির মধ্যে যে এমন একটি লজ্জাবতী বউ এখনও লুকিয়ে আছে, সে কথা এর আগে বুঝতে পারিনি। কিংবা পুরনো দিনগুলির কথা বুঝি ভুলেই গেছি।

আলো নিয়ে তাড়াতাড়ি বাইরে এলাম। দেখলাম, পণ্ডিতমশাই-ই বটেন। আদিনাথ কাব্যতীর্থ, শালঘেরিরই বাসিন্দা। আমাদের স্কুলের সেকেন্ড পণ্ডিত ছিলেন তিনি। আমি প্রণাম করলাম। বললাম, আসুন পণ্ডিতমশাই।

–আসব কী! চোখে দেখতে পাইনে। গেছলাম একটু লাইব্রেরিতে, বই আনতে। হাল আমলে কী সব বই বেরুচ্ছে, একটু পড়তে ইচ্ছে হয়। ফেরবার সময়, হরর মেয়ের সঙ্গে দেখা। দেখলাম, ছুটছে। ওই বললে, তুমি এসেছ। তাই না এসে পারলাম না।

সে আমি আগেই বুঝতে পেরেছি। এবং এও বুঝেছি, দিনের বেলা হলে, উত্তর দক্ষিণ পুব পশ্চিম, সমস্ত পাড়ায় খবর চলে যেত, আমি এসেছি।

বললাম, ঘরে আসুন, বাইরে বড় ঠাণ্ডা। কিন্তু আপনি কেন রাত্রে কষ্ট করে এলেন পণ্ডিতমশাই, আমিই তো কাল সকালে যেতাম।

আমরা আসতে না আসতেই পিসি মাদুর পেতে রেখেছিলেন। পণ্ডিতমশাই বসে বললেন, আর বসব না। যেতিস তো বটেই, তবু কানে যখন শুনলাম। ভাল আছিস তো?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

পণ্ডিতমশাই এক বার তাকালেন আমার দিকে। পণ্ডিতমশাইয়ের চোখের সেই ভয় দেখানো রক্তাভাটা আজও তেমনি আছে। ওই চোখ দেখলে আমরা চিরদিনই কেঁচো হয়ে থেকেছি। গ্রীষ্মকালে হাতে রাখতেন একটি তালপাতার পাখা। সেইটি আরও মারাত্মক ছিল। পাখার ব্যজনীতে ওঁর প্রাণ জুড়োত, কিন্তু অনেকের প্রাণ খাবি খেত।

পণ্ডিতমশাই বললেন, তোর আর দোষ কী? ছিলি বন্দি। কিন্তু ছ মাস আগে যদি ছাড়ত, তোর বাবা বেচারি শান্তি পেতেন।

শুধু বাবার কথাই ঘুরে ফিরে আসছে। আসবেই। বিশেষ করে, পণ্ডিতমশাইয়ের সঙ্গে বাবার খুবই প্রীতির সম্পর্ক ছিল।

পণ্ডিতমশাই বললেন, অনেক দিন বাদে ফিরলি। এত দিন তো কাউকে আটকে রাখেনি। এ তল্লাটের সবাইকেই তো ছেড়ে দিয়েছে আগে।

আমি বললাম, যাদের দেয়নি, তাদের দলে পড়ে গেছলাম পণ্ডিতমশাই। বোধ হয়, যুদ্ধ থেমেছে বলেই ছাড়া পেলাম।

–তা ঠিক।

একটু চুপ করে থেকে বললেন, যেখানে ফিরে এসেছিস, সেখানেও শান্তি নেই। শালঘেরি আর সে শালঘেরি নেই, বুঝলি টোপন। এখন অনন্তর মাইনর স্কুলে পড়াই। হাই স্কুলে রিটায়ার করেছি। তা সব যেন কেমনধারা হয়ে গেছে। দোষ কারুর দেয়া যায় না অবিশ্যি। কেমন যেন একটা ফারাক হয়ে যাচ্ছে। আমরা বুঝতে পারি না আজকালকার ছেলেপিলেদের। ছেলেপিলেরা চিনতে পারে না আমাদের। মানে, এ শুধু স্কুলের কথা বলছি না। ঘরের ছেলেদের কথাও বলছি। আর মানুষেরাও তেমন নেই আর। কোথায় কী ঘটল, ঠিক টের পেলাম না। মনে হচ্ছে, কী যেন নেই।

আমি অবাক হয়ে পণ্ডিতমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এ তো শুধু সংবাদ দিচ্ছেন না পণ্ডিতমশাই। যেন কী একটি অভাব, কীসের একটি বেদনায় ও হতাশায় ঝিমিয়ে পড়েছেন। আমার ভাববার মতো কিছু আছে বলে মনে হল না।

তিনি নিজেই আবার বললেন, কালই দেখছি সবচেয়ে বড় দেবতা। তিনিই রাজত্ব করছেন। করবেনই। আমরাও তো বুড়ো হলাম।

সে-ই সত্যি কথা। এক কাল যায়, আর এক কাল আসে। যাদের জীবনে, বয়সে ও মনে যাওয়াটাই বড় হয়ে ওঠে, তাদের দীর্ঘশ্বাসে শুধু ফেলে আসার বাতাস। নতুন তার অচেনা। চেনবার ইচ্ছে এবং সাধও চলে যায়।

আমি জিজ্ঞেস করলাম বাড়ির খবর। লোকজনের সংবাদ। বললেন সব। তারপরে হঠাৎ বললেন, যাক, লেখাপড়া শিখেছিস, কিন্তু জীবনের সামনে দাঁড়াবার অবকাশ পাসনি। এবার সময় এসেছে বাবা, ঠিক করে ফেল, কী করবি।

বলে তিনি উঠলেন। পণ্ডিতমশাইয়ের কথায় যেন সেই মহাকালের বিষাণের ধ্বনি। জীবনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি আমি। এইবার আমাকে চলার কথা ভাবতে হবে।

আমি বললাম, হ্যাঁ, কিছু করব।

বাইরে আসতে আসতে বললেন, অবিশ্যি তোর বাবা হয়তো তোর কোনও অভাব রেখে যাননি। কিন্তু, বসে তো থাকতে পারবিনে।

–তা তো নিশ্চয়ই নয়।

বাতি নিয়ে দরজা অবধি গেলাম। বললেন, আসিস বাড়িতে।

যাব। গুরু-মাকে প্রণাম জানাবেন।

জানাব।

 চলে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে পিসির গলা, আগুন একটু চড়িয়ে দে কুসি।

যেন গলা খুলে বাঁচলেন।

দালানের ভিতর দিয়েই আমিষ রান্নাঘরে যাওয়া যায়। দেখলাম, পিসি দালানে বসে, কুসুমকে পরিচালন করছেন। এবং জবাবে কুসুমের ওই এক কথা, হচ্ছে, তুমি থামো দিকি।

তার পরেই পিসির এক প্রস্থ খুসুনি। আবার নির্দেশ।

আমাকে দেখেই পিসি বলে উঠলেন, আর বসিস না টুপান, যা, হাতমুখ ধুয়ে আয়। কুয়ার পাড়ে জল তোলা আছে। তাপরেতে একটু খেয়ে নে।

এখন এ নির্দেশ মানাই ভাল। খাবার মন নেই বটে। কিন্তু মন খাবার খায় না। খাবারে যার তুষ্টি এবং পুষ্টি, সে কাল রাত থাকতেই শুকোচ্ছে। কাল রাত্রে আমাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। যেহেতু, রাত্রে বাড়ি ফেরার উপায় ছিল না, সেই হেতু সকালে বেরুতে হয়েছে। মুক্তির আনন্দেই বোধ হয় কাল আর জেলের ভাত মুখে তুলতে পারিনি। সকালে হাওড়ায় কিছু খাবার নিয়ে নষ্টই করেছি। যে গাড়ি ফেল করবার কোনও কারণ ছিল না, সে গাড়ি হারাবার ভয়ে, প্রাণ ধরে খেতেও পারিনি।

হাত মুখ ধুয়ে এসে পিসির কাছ থেকে একখানি কাপড় চাইলাম। পিসি বাবার ঘর থেকে, বোধ হয় বাবারই একখানি পাড়হীন ধুতি বার করে দিলেন। পরে নিয়ে এসে বসলাম পিসির কাছে, আমিষ ঘরের দরজার মুখোমুখি।

কিন্তু পিসির এটুকু খাবার যে কতটুকু, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। অন্তত ডজন কয়েক নারকেল আর তিলের নাড়ু। নতুন গুড়ের মুড়কি এক পাথর, আর এক পাথর দুধ।

বললাম, পিসি, ইংরেজের জেলখানাটা তো তোমার বাড়ি ছিল না। ওখানে যা খাইয়েছে, তাতে পেটের আর কিছু নেই। এত সব আমি খেতে পারব না।

এত সব খাবার কোথা? সেই সকালে তো বেরিয়েছিস।

–তা বেরিয়েছি। কিন্তু এই যদি এখন খাই, তোমার ওই ভাত আর ডিম আমার খাওয়া হবে না। সঙ্গে সঙ্গে ওদিক থেকে আক্রমণ এল, ইস! এই রাত করে ডিম নিয়ে এসে আমি রাঁধছি, উনি খাবেন না।

পিসির চোখে একটু সংশয়ের ছায়া। কী জানি, আমি যদি আবার কুসুমের ও ধরনের কথায় রেগে যাই। কিন্তু রাগব কার ওপরে। এসে তো একবার দেখেছিলাম, কুসুম যেন লজ্জাবতীটি। তারপরে তো নিজমূর্তি ধারণ করেছে। ওই মূর্তি, এক তো ছেলেমানুষ তার ওপরে পিসিকে উদ্ধার শুধু নয়, যেভাবে ছুটোছুটি করে রান্নার জোগাড়ে বসেছে, তার ওপরে রাগ করব, তেমন যোগ্যতা আমার নেই। এ সব থেকে একটি জিনিস বোঝা যাচ্ছে, কুসুমের জিভে একটু ধার। বয়সের চেয়ে বেশি দেখেছে বলে, কথাও একটু পাকা পাকা। কিন্তু কুসুম এখনও কলি। বরং আমাকেই এখন থেকে তৈরি থাকতে হবে, কুসুমের ওই ধরনের বাণী শুনতে।

কিন্তু উভয় পক্ষের এই আক্রমণে মন আমার যত খুশিতে ভরে উঠছে, উভয়ের মন রক্ষার্থে ততই শঙ্কিত হয়ে উঠছি। একজন বয়সের অনেক উঁচুতে। আর একজন অনেক নিচুতে। দুটিকে এক করলে বোধ হয় একই দাঁড়ায়।

শেষ পর্যন্ত মান রাখলেন পিসি। বললেন, আচ্ছা, যা পারিস খা। কিন্তু ভাত খেতেই হবে। সেই হচ্ছে আসল।

গাছকোমর বাঁধা ছোট কুসুম শিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে নোড়া নিয়ে। এমন সময় সদর দরজায় যেন কে হুমড়ি খেয়ে পড়ল বলে মনে হল।

কুসুমের হাত থমকাল। সে তাকাল পিসির দিকে ত্রস্ত চোখে। পিসিও দেখলাম, ওর দিকেই তাকিয়েছেন। দুজনেরই যেন চোখে কীসের প্রশ্ন আর উৎকর্ণ অপেক্ষা।

পর মুহূর্তেই ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল উঠোনে। আর অস্পষ্ট একটা কাশির আওয়াজ।

কুসুম ত্রস্ত উৎকণ্ঠায় ডাকল, জেটি!

পিসির মুখ দেখলাম কঠিন। বললেন, হুঁ। আজ ওর যম বসে না এখানে? টুপান, বাতি নিয়ে দ্যাখ দেখি, কে?

আমি একটু অবাক হলেও তাড়াতাড়ি বাতি নিয়ে বাইরে গেলাম। দেখলাম, দালানের সিঁড়ির কাছে কে একজন দাঁড়িয়ে। পিছন থেকে আর একজন যেন আমাকে দেখে, চকিতে ছায়ার মতো অদৃশ্য হল বাইরের দরজা দিয়ে।

জিজ্ঞেস করলাম, কে?

প্রায় জড়ানো গলায় জবাব শোনা গেল, তুমি কে বাবা এখানে? কীসের সন্ধানে?

বাতিটা তুলে অবাক হয়ে দেখলাম হরলাল কাকা। কুসুমের বাবা। তাই পিসি আর কুসুমের অমন দৃষ্টি বিনিময় হয়েছিল। দেখলাম, হরলাল কাকার দুই চোখ লাল। মুখে মদের গন্ধ। উনিও ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছেন না। বেতস লতার মতো দুলছেন। বাতিটা উঁচুতে তোলায়, চোখ খুলতে পারছেন না। যেন।

বললাম, আমি টোপন হরকাকা।

–টোপন।

হরকাকার যেন সংবিৎ ফিরে এল। মাথা ঝাঁকিয়ে, রক্তচোখ তুলে তাকালেন আমার দিকে। গলার স্বর বোধ হয় পরিষ্কার করতে চাইলেন। ততটা পারলেন না। কিন্তু মুখের ভাব সম্পূর্ণ বদলে গেল। বললেন, টোপন! তুমি এসে পড়েছ নাকি?

বললাম, হ্যাঁ। আপনার কি শরীর খারাপ নাকি?

মদ খেয়েছেন, এ কথা জিজ্ঞেস করতে আমার বাধল। কিন্তু হরকাকা যেন ছটফট করতে লাগলেন। এমন একটা অভাবিত অবিশ্বাস্য পরিবেশে যে এসে পড়বেন, ভাবেননি। আর কেন এসেছেন, তাও জানিনে এখনও। কেবল এটুকু বুঝেছি, এ আসাটা পিসি কিংবা কুসুমের একেবারেই অপছন্দ।

হরকাকা যেন খুবই সুস্থ, এমনভাবে হেসে বলতে চেষ্টা করলেন, ও, তুমি এসে পড়েছ খালাস হয়ে? বেশ, বেশ। এই কুসিটাকে একটু দেখতে এসেছিলাম। সারাদিন তো দেখা পাইনে

কুসুমের ছুঁড়ে দেওয়া ছুঁচের মতো কথা শুনলাম, মরে যাই আর কী!

হরকাকা তেমনি বলে চলেছেন, সেই জন্যে। আর দিনকাল খুব খারাপ হয়েছে কিনা আজকাল। মানে, এই একটু রুগি দেখতে গেছলাম পুবের পাড়ায়। সেখান থেকেই ফিরছি।

এবার আমারই হকচকাবার পালা। বললাম, রুগি, মানে আপনি কি ডাক্তারি করছেন নাকি আজকাল?

হরকাকা ঘাড় দুলিয়ে বললেন, হ্যাঁ, ওইটেই ধরেছি কিনা আজকাল। শালঘেরিতে তো ভাল ডাক্তার টাক্তার নেই একটাও। আছে যা সব চশমখোর। কলকাতার বিদ্যের দাম চায় সব। কী? না মেডিকেল কলেজের পাশুড়ে।

পাশুড়ে? মানে কী? যে পাশ করেছে? তা হবে। হরলাল কাকার ভাষা হয়তো কিছু বাড়তি কথার দাবি রাখে। কিন্তু তিনি কোথায় পাশ করেছেন, সে কথা জিজ্ঞেস করলে, সারা রাত্রিব্যাপী তিনি সে কাহিনী শোনাতে পারেন হয়তো। সুতরাং সে কথা তুলতে আমি সাহসী হলাম না। বরং বলে ফেললাম, বসবেন একটু হরকাকা?

কুসুমেরই গরম তেলে ছ্যাঁকছেকে কথা শোনা গেল, না না, আর বসতে হবে না।

হরকাকা যেন সে কথা শুনতেই পেলেন না। বললেন, না, আর বসব না টোপন, যাব। খেয়েদেয়ে শুই গে, আবার হয়তো রাত করে কোনও রুগির বাড়ির থেকে ডাক আসবে। মানে আমি তো আবার, তোমার ওই নগেন ডাক্তারের মতো জুয়েল হতে পারি নে, যে, রুগি এসে রাত্রে ডাকলে বলব, ওরে যা রে শালা, বাড়ি যা, দু-চার টাকায় নগেন ডাক্তার যায় না।

হরকাকা নগেন বসুর মতোই বোধ হয় হাত-পা ছুঁড়তে গিয়ে, নিজেকে সামলে নিলেন। আমাকে বাধ্য হয়ে এর পরে বলতে হল, তা তো বটেই।

হরকাকা হাসবার চেষ্টা করলেন আবার। বললেন, নয় কী? না হয়, মেডিকেল কলেজেই পড়িনি। গড়ায়ে সাহেব ডাক্তারের শাগরেদি তো করেছি, না কি? সে একটা অত বড় সার্জন তো, তার হাতেই তো আমার হাতে খড়ি, কী বলল? সে সাহেব, অ্যাঁ? আর নগা শুদ্র। আমাকে বলে কিনা, মুকখু?

পিসির গলা এবার পাওয়া গেল, টোপন, ওকে বাড়ি যেতে বল।

যেন আমার অপরাধ কেটে গেল, এমনিভাবে বললাম, আপনাকে পিসি বাড়ি যেতে বলছেন এবার!

হ্যাঁ, যাই।

বলেও হরকাকা দাঁড়িয়ে ঠোঁট চাটলেন বারকয়েক। আবার বললেন, যাক, তুমি তা হলে এসে গেলে? পাড়ায় একটা মানুষ ফিরল অ্যাদ্দিনে। আমার কথায় কিছু রাগ-টাগ করলে না তো টোপন?

বললাম, না না, রাগ করব কেন?

অথচ এই হরকাকা আগে যখন মাতাল হতেন, আমাদের সামনে কখনও আসতেন না। এলেও কথা বলতেন না। আমরাও বলতাম না। বরং উনি আমাদের একটু ভয়ই করতেন।

হরকাকা বললেন, আচ্ছা, আবার আসব। তবে, রোগ-বিরোগ হলে ডেকো আমাকে, কোনওরকম লজ্জাটজ্জা করো না।

হাসতে গিয়েও পারলাম না, কেমন যেন করুণ মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা। এই হরকাকা যেদিন ম্যাট্রিক পাশ করেন, তখন আমরা খুব ছোট। শুধু হরকাকাদের বাড়িতে নয়, গোটা শালঘেরিতে সে দিন উৎসব হতে দেখেছিলাম। অবশ্য, আরও কয়েকজন পাশ করেছিলেন।

আবার পিসির গলা শোনা গেল, দাঁড়াও।

হরকাকা দাঁড়ালেন। হরকাকার সঙ্গে আমার পিসির দিদিভাই সম্পর্কই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু রামপুরহাটে আমার মৃত পিসেমশাইয়ের সঙ্গে কোনওরকম একটা ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল হরকাকার। মেয়েদের যে বলে, পিতার ঘরের চেয়ে শ্বশুরবাড়িই আপন, এ ক্ষেত্রে সেটাই কাজ করেছে। যে মহিলাকে হরকাকা দিদি বলে ডাকতেন, তাকেই এখন বউঠান বলে ডাকতে হয়। সে হিসেবেই, কুসুমেরা পিসিমাকে ডাকে জেটি বলে।

হরকাকা দাঁড়িয়ে বললেন, আমাকে বলছ বউঠান।

–হ্যাঁ।

দেখলাম, পিসিমা অল্প একটুখানি ঘোমটা টেনে দিয়ে, বাটিতে করে কী নিয়ে এসেছেন। কিছু বুঝতে পারলাম না। পিসি এগিয়ে গিয়ে বললে, নাও, বরাদ্দ নিয়ে যাও। আজ বুঝি লজ্জা পাচ্ছ? হা ভগবান!

আশ্চর্য! হরকাকা দেখলাম, বাটিটি নিয়ে, কী খেতে আরম্ভ করেছেন।

 পিসি আমাকে বললেন, নে, তুই বাতিটা রেখে, খেয়েনি গা যা।

এই পিসিই না আমাকে হরকাকার যম বলছিল? যখন হরকাকা প্রথম ঢুকলেন, সেই যমের সামনেই পিসির এমন কীর্তি? যাকে দুর দূর করা, তাকেই বাটি ভরে খাবার?

ওদিকে কুসুমের গলা শুনতে পেলাম। এবার অবশ্য গলার স্বর খুবই চাপা। বলছে, জেটি, তুমিই বাবাকে নাই দিয়ে দিয়ে, এই সন্ধের মৌতাতটি করেছ।

পিসি বললেন, তুই থাম।

-কেন থামব?

কিন্তু থামতেই হল। কেন না, পিসি জল গড়িয়ে নিয়ে এলেন হরকাকার জন্যে।

আমি আবার জিজ্ঞেস করে ফেললাম, আপনার সঙ্গে আর একজন কে এসেছিল হরকাকা?

তারকা।

তারকা? বোঝা গেল সেটা তারক। কিন্তু কোন তারক?

 জিজ্ঞেস করলাম, তারকা কে?

হরকাকার মুখে তখন নাড়ুর ভিড়। বললেন, আ রে, ভূষণ খুড়োর ছোট ছেলে। আমাকে খুব ভালবাসে। কলকেতায় একটা বড় চাকরি করত, তা যুদ্ধ থেমে গিয়ে এখন বেকার হয়ে গাঁয়ে বসে আছে। এসেছিল, মানে, ছেলেমানুষ তো, বছর বাইশ-চব্বিশ বয়স হবে, আমাদের কুসুমকে বে করতে চায়।

এবার দেখলাম, উঠোনে বোমা ফাটল। না, শুধু বোমা নয়, হাউই বোমা। ফাটে, আবার জ্বলেও। কুসুম এবার একেবারে উঠোনে। একে আগুনের আঁচেই মুখখানি লাল হয়েছে। তার ওপরে রাগে একেবারে খ্যাপাঁচণ্ডী। চিৎকার করে বলল, খ্যাংরা! খ্যাংরা, বুঝেছ? ওই বের মুখে খ্যাংরা, আর তোমার ওই নেশুড়ে তারকার মুখেও খ্যাংরা।

হরকাকা আমাকেই সাক্ষী মানলেন, দেখেছ টোপন, আজকালকার মেয়েদের দেখো, কেমন বাপের মুখের ওপর কথা বলছে।

পিসি তাড়াতাড়ি বললেন, এ্যাই, এ্যাই দেখ মুখপুড়িকে, রান্না ফেলে চলে আসছে। যা যা, শিগগির যা। রোজই তো বলে।

কুসুম তেমনি গলাতেই বলল, তা বলে আজও বলবে, টোপনদার সামনে?

তাও তো বটে। আমি আজ এখনও প্রায় নতুন আগন্তুক একজন। আমার সামনে এ সব কথা ফাঁস করা চলে? তাও তারকের মতো নেশুড়ে বর? নিশ্চয়ই আপত্তিকর।

এর মধ্যে দুঃখ আছে, বেদনা আছে। যন্ত্রণা অপমানও কম নেই জীবনের। তবু এ যে শালঘেরি। আমি যে শালঘেরিতে এসেছি, তা যেন মর্মে মর্মে বুঝতে পারছি। সেই আমার মন জুড়ে, আমার দু চোখের দিগন্ত জুড়ে।

কিন্তু হরকাকা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বেশ নির্বিবাদেই খাচ্ছেন। কুসুম চলে গেল রান্নাঘরে। পিসি বললেন, এই নাও জল।

বাটিটা মাটিতে রেখে বললেন হরকাকা, জল খাব না বোঠান, চলি। তবে আপনাকে আমি বলে রাখছি, ও মেয়ে নিয়ে অনেক ভোগান্তি আছে।

পিসি বললেন, আছা, সে বোঝা যাবেখনি।

হরকাকা দরজা অবধি গিয়ে আবার দাঁড়ালেন। বললেন, চলি হে টোপন।

–আসুন।

কিন্তু গেলেন না। আবার বললেন, বুঝলেন বোঠান, মেয়েটার মাথা আপনিই খাচ্ছেন। আপনিই ওকে বুঝিয়েছেন, তারকার সঙ্গে ওর বে হলে, তারকা আমার মদের খরচ জোগাবে।

পিসি এবার অন্য মূর্তি ধরলেন। বললেন, এবার যাবে, না টোপন গিয়ে দরজা বন্ধ করবে?

 কিন্তু সে কথা শোনবার জন্য হরকাকা আর দাঁড়িয়ে নেই। কথা শেষ করেই, অন্ধকারে হারিয়ে গেছেন। আমি আমার ফেলে যাওয়া মুড়কি খেলাম আবার।

পিসি বললেন, রোজ, পিরতিদিন এ সময়ে এসে জ্বালাতন করবে। ওই যে জানে, মেয়েটা রয়েছে আমার কাছে। যেন আমি জোর করে ধরে রাখছি। ও তাই কিছু উশুল নিতে আসে। বদ বামনা কোথাকার!

পিসির গালাগালি বেশ মুখরোচক। বদ বামনা। এমন গালাগাল তো আর কখনও শুনিনি।

কুসুম অমনি ফোঁস করে উঠল, তোমারও দোষ আছে জেটি। চলে যাচ্ছিল। তোমার আবার সোহাগ করে ডেকে খাওয়ানো কেন?

পিসি যেন কেমন অসহায় হয়ে পড়লেন। আমাকেও সাক্ষী মানলেন না এবার। অন্যদিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বললেন, তা কী করব। এসে রোজ রোজ খেতে চায় বোঠান বলে। না দিয়ে কি পারা যায়। তবে, এবারে টুপান আসছে, আর ওর মুরোদ হবে না আসবার।

তা হয়তো আসবেন না হরকাকা। কিন্তু আমি তো জানি, তাতে আমি কতখানি পাপের ভাগী হব। পিসির মনে কতখানি অশান্তি হবে, তা তো খানিকটা অনুমান করতে পারছি। যে মাতালকে বাড়িতে ঢুকতে দিতে তাঁর ইজ্জতে লাগে, ভয় পান, সেই পিসিকেই তো আমি দেখলাম বাটি ভরে খাবার দিয়ে আসতে। এটুকু না দিতে পারলে যে তাঁর রাতের চোখ বুজবে না, সে কথা আমি জানি। আর এও বুঝি সত্যি, মাতালটাকে খেতে দিয়ে পিসি তাঁর ভগবানের কাছে ক্ষমা চান। বলেন, হেই গো বাবা, ওই নষ্টটাকে, ওই ভ্রষ্টটাকে তুমি সুমতি দাও।

সেই তো জীবনের বিস্ময় আমার চিরদিন ধরেই থাকবে। সকল মানুষের থাকবে। কারণ, মানুষের মনের আকাশের চিত্রবিচিত্র তো অমনি করেই দেখা যায়।

পিসি তো শুধু একজন সন্তানহীনা খরখরে বিধবা নন, যিনি সহোদরের গলগ্রহ হয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। তিনিও এক সংসার গড়েছেন বুকে। গড়তে পেরেছেন, সেই আমাদের পরম পাওয়া। সেই সংসারের এক বাসিন্দা হরকাকা। আমিও সেই সংসারেই থাকতে চাই।

আমি বেশ গম্ভীর হয়ে বললাম, তা হরকাকার দোষ আছে ঠিকই, আর সেটা ক্ষমাও করা যায় না। কিন্তু ওঁর খিদের সঙ্গে কী সম্পর্ক ও সবের?

পিসি যেন অকূলে একটা কূল পেলেন। ফিরে তাকালেন আমার দিকে। বললেন, এ্যাই, এ্যাই দ্যাখ দেখি? বল, লোকটা খিদে পেয়ে খেতে চাইলে, আমি কী করি বল দেখি?

আমি বললাম, তুমি ঠিকই কর পিসি।

 পিসি বিজয়িনীর মতো কুসুমের দিকে ফিরে বললেন, শোন কুসি, একবার শোন। এ তোর গোঁয়ারের মতন কথা তো লয়। এ নেকাপড়া জানা ছেলের কথা।

কুসি তখন পাকা গিন্নিটির মতো ডিমের ঝাল রান্না করছে। জবাব দিল, ও সব তোমরা পিসি ভাইপোতে বলগে যাও। আমি শুনতে চাই না। ব্যাটাছেলে, খেটে খাবার মুরোদ নেই, চেয়েচিন্তে খায় কেন?

কুসুমের কথায় বোঝবার উপায় নেই, সেই ব্যাটাছেলে ওর বাবা। আর যুক্তি তো তার কথাতে আছে। তার ওপরেও যেটা আছে, সেটা রাগ দিয়ে ঢাকা বটে। আসলে পিতার অপমানের গ্লানি ও বেদনা।

আমি যেন কুসুমকে একটা সান্ত্বনা দেবার জন্যেই বললাম, পিসিকে তোর বাবা বোঠান বলে মনে করেন, তাই চেয়ে খান।

কুসুম ঠোঁট উলটে বলল, শালঘেরির বাড়ি বাড়ি বাবার অমন অনেক বোঠান আছে। কোথায় চেয়েচিন্তে বেড়ায় না, শুনি?

বুঝলাম, এ সব বিষয়ে কুসুমের চেয়ে আমি কথায় ও অভিজ্ঞতায় কম পারদর্শী।

পিসি বললেন আমাকে, অথচ দ্যাখ টুপান, এ লোক যদিন মন দিয়ে ডাক্তারি করত, তা হলে সত্যি দু পয়সা আসত ঘরে। আসছিলও তো। ওষুধ দিত, সুঁই দিত লোককে। নগেন বোসও তো বলেছে, হরলাল পাশ না করুক, তার এলেম আছে। ইচ্ছে করলে, একটু আধটু পারে। তা কি সে করবে? তা হলে শালঘেরিতে যে মাতালদের আসরই আর থাকবে না।

একটু পরেই কুসুম ঘোষণা করল, রান্না হয়ে গেছে।

ওটা আমি আগেই ভেবে রেখেছিলাম, রান্না হলেই খেতে বসব। কারণ, আমার খাওয়া না হওয়া পর্যন্ত কুসুম বেচারির মুক্তি নেই।

বললাম, খেতে দে কুসুম, আর দেরি করব না।

 পিসি উঠে পড়ে বললেন, এখানেই ঠাঁই কর তবে। তোকে আর উঠতে হবে না টুপানি, সামনেটা একটু মুছে দিলেই হবেখনি। দুধ তো খেলি না। ভাতের পরে খাস। কুসি।

বলো।

বড় বগি থালাখানা বার করে রেখেছি। বোয়া আছে ওটা। একটু জল দিয়ে ধুয়ে, ওতেই ভাত দে ওকে।

আগুনের আঁচে কুসুমের জ্বলজ্বলে মুখখানি দেখে বড় মায়া লাগল। নিজে খেয়ে উঠব, ও বেচারি কোথায় কী খাবে, কিছুই জানিনে এখনও।

জিজ্ঞেস করলাম, তুই খাবিনে কুসুম?

 কুসুম বলল, আমি বাড়িতে খেতে যাব।

 কথাটায় কেমন যেন অপরাধী বোধ হল নিজেকে। বললাম, বাড়িতে খেতে যাবি? তুই এখানে খাস না?

কুসুম বলল, খাই। দিনের বেলা খাই। জেটি তো এ বেলা ভাত খায় না, তাই আর শুধু শুধু এখানে

উনুন ধরাই না। খেয়ে আবার জেটির কাছে চলে আসি রাত্রে। তুমি বসো।

আমি বসলাম। কিন্তু মনে মনে অস্বস্তি হতে লাগল। পিসি বোধ হয় বিছানার ব্যবস্থা করছিলেন আর একটু ভাল করে। ফিরে এসে বললেন, কাল থেকে কুসি এখানেই খাবে। তোর জন্যে তো রান্না হবেই। ওরও রান্না হবে। আমারও একটু হাড় জুড়োয়। ওখানে যা দিই, তাতে তো এ হুঁড়ি পেট ভরে খেতে পায় না।

কুসুম আমাকে ভাত বেড়ে দিয়ে বলল, তোমাকে বলেছি, না?

বলবি ক্যানে? বুঝতে তো পারি।

কুসুম জবাব দিল না। সে রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়াল। বোধ হয়, জেল থেকে আসা লোকটার খাওয়া দেখার কৌতূহল।

বললাম, তুই তা হলে খেয়ে আয় না কুসুম।

 কুসুম যেন কতই বড়। আমাকেই যেন ও ছেলেমানুষ ঠাউরেছে। বলল, তুমি খাও দিকি। আমি এঁটো পেড়ে যাব।

অগত্যা। কিন্তু ভাত মুখে দেবার আগেই কুসুমের হঠাৎ হাসি শোনা গেল।

জিজ্ঞেস করলাম, কী হল রে?

কুসুম বলল, তুমি এ রান্না খেতে পারবে না।

কেন?

–তোমার ভাল লাগবে না।

–ও, তুই তা হলে জেলের চেয়ে খারাপ রাঁধিস বল। আচ্ছা, খেয়ে দেখা যাক।

পিসি বলে উঠলেন, হ্যাঁ, হাতের রান্না খেয়ে টেয়ে দ্যাখ দেখি। তারপর একটা ছেলে দ্যাখ। দেখে বে থা দে।

–অ্যা হ্যাঁ হ্যাঁ!

পিসিকে ভেংচে দিল কুসুম। তিনি সেদিকে ফিরেও দেখলেন না। বললেন, হরলাল যা করবে, তা তো বুঝতেই পারছি। ও কাজ আমাকে-তোকেই করতে হবে।

কুসুম চেষ্টা করছিল রান্নাঘরে চলে যাবার। কিন্তু যাওয়া হল না। সঙ্গে সঙ্গেই বলল, তার আগে তালে টোপনদার বে দাও। নইলে তোমাদের দুটিকে এসে খাওয়াবে কে?

আমি হাসতে গেলাম। বুঝি ভাতই আটকাল আমার গলায়। নাকি বুকের মধ্যেই কোথায় খচ করে উঠল, বুঝতে পারলাম না। তবু হাসবার চেষ্টা করে, গম্ভীরভাবে বললাম বটে?

পিসি বললেন কুসুমকে, সে বুদ্ধি আর তোকে দিতে হবে না। এই আসছে সবে, দ্যাখ ক্যানে, লাগালাম বলে।

কিন্তু আমি যে হাসতে পারছিনে? আমি কেন কথা বলতে পারছিনে? শালঘেরিতে যে আমি এমন করে ছুটে এলাম, যদি আসতে পারলাম, তবে আমার আসতে চাওয়ার ইচ্ছেতে কে এমন করে কালি লেপে দিতে চায়? যে-মহাকালের বিষাণের ধ্বনির কাছে আমি সাহস চেয়েছি, সে কেন এমন ভয় দেখায় মাঝে মাঝে?

আমি প্রাণ খুলে হাসতে পারলাম না বলেই বোধ হয় প্রসঙ্গটা হঠাৎ থেমে গেল। চারদিকে নিঝুম। হয়তো আরও খানিকটা সময় গ্রামের স্পন্দন টের পাওয়া যেত। শীতকাল বলেই সব স্তব্ধ হয়ে গেছে। ঝিঁঝির ডাক শুনতে পাচ্ছি। দূরে নয়, কাছেপিঠেই। বোধ হয় দালানের মধ্যেই কোথাও কোনও কোণে কপাটের আড়ালে রয়েছে।

কুসুম বলল, ভাত দিই টোপনদা।

পিসি বললেন, বলার কী আছে? দে আরও দুটি।

সাড়ে তিন বছর পরে, বড় নতুন লাগল কথা কয়টি। কুসুমের মতো মেয়ে এত দিন ভাত দেবে বলে দাঁড়িয়ে থাকেনি। পিসির চাপিয়ে দেওয়া ভাতও এত দিন খেতে পাইনি। আজ বৈদ্যুতিক আলো নেই। কালও ছিল। আজ টেবিল চেয়ার নেই। পুরনো দালানের ভাঙা ফাটা অমসৃণ মেঝেয় আসন পেতে বসেছি আসনপিড়ি হয়ে।

আজ আমি আঁতুড় ঘরে এসে খেতে বসেছি। কুসুমকে বললাম, দে, আরও দে, বড্ড খিদে লাগছে। ডিমের ঝাল যে জোর রান্না করেছিস কুসুম।

পাতে ভাত দিল কুসুম। লজ্জা পেয়ে বলল, যাও। মিছে কথা। মন রাখা কথা, আমি যেন জানি না।

বললাম, কেন, তোকে বুঝি আমি খোসামোদ করব। আমার বয়ে গেছে। জানলে পিসি, তোমার দেওরঝিটি রাঁধে ভালই।

পিসি বললেন, সে আমি জানি। তবে মেয়েটির মুখদোষ আছে তো, তাই একটু ঝাল বেশি। তা ভাল খাবে, ঝাল হলে একটু সয়ে টয়ে নিতে হবে।

পিসির রসিকতায় বুঝলাম, কুসুমের সঙ্গে তার জেটির সখিত্বও আছে। থাকাই স্বাভাবিক। দুজনে সারাদিন একসঙ্গে থাকে। মন খুললে, আর মন দিলে বয়স তো পৌষের কুয়াশা। বেলা বাড়লেই দেখাদেখি। ওদিকে মনের বেলাও বেড়ে যায়। বন্ধুত্ব আছে বলেই একজনের অত চোপা। আর একজনের অত শাসন।

পিসির কথা শুনে কুসুম বলল, আহা!

অস্বস্তি নিশ্চয়ই হচ্ছে কুসুমের। লজ্জা মেশানো অস্বস্তি। কুসুমের চেয়ে ছোট মেয়েকে বললেও, কোথা থেকে যেন লজ্জা এসে জড়িয়ে ধরে তাকে। সে বলে, আহা!

একটু দামাল হলে, এসে দুঘা বসিয়েও দিতে পারে। মেয়ে মাত্রেরই বুঝি ও লজ্জাটা থাকে।

কিন্তু কলকাতা শহর হলে, কুসুম আজ ফ্রক পরে স্কুলে যেত। শালঘেরিতে ফ্রক পরতে না দিলেও, স্কুলে যেতে বাধা ছিল না। কুসুমের মতো কোনও মেয়েই বোধ হয় আজ স্কুলের বাইরে নেই এ গাঁয়ে।

সেইটি আমাদের এ গাঁয়ের গৌরবও বটে। গোটা জেলায় আর কোথাও আমাদের গাঁয়ের মতো পুরনো গার্লস হাইস্কুল নেই। এ জেলার ছেলেরা লেখাপড়া জানা মেয়ে বিয়ে করবার জন্যে শালঘেরিতেই চিরদিন ঘটক পাঠিয়েছে। উঠোন নিকোয়, ধান ভানে, তবু কলম ধরে। এমন মেয়ে যদি চাও তো শালঘেরি যাও।

কিন্তু কুসুমের কোথাও আমি স্কুলের ছাপ দেখতে পাচ্ছিনে। ও যে ঘরের মেয়ে, সে ঘরে তা সম্ভব হয়নি হয়তো। জানি, এক্ষেত্রে অভাবটাই সব নয়। ইচ্ছেটাই বড় কথা। সে ইচ্ছের প্রতিরূপ হরকাকাকে তো চোখের সামনেই দেখলাম।

অথচ, কতটুকু কুসুম। কাব্যের ভাষায় কিশোরী বলা যাবে না, কুসুমের শরীরে সে বর্ষণের প্লাবন এখনও নামেনি। হয়তো শারীরিক পুষ্টির অভাবেই সে প্লাবন থমকে আছে। তবু যে আগন্তুকা তার দীর্ঘ শরীরের রেখায় ধীর পায়ে আসছে, সে মায়াবিনীর নিষ্পাপ মোহ সঞ্চারিত তার আয়ত চোখের গাঢ়তায়। সেটুকু বুঝি তার দেহের চেয়ে মনের ছায়াই বেশি।

কারণ, বয়সটাকে পেরিয়ে গেছে কুসুম। স্কুলে যাবার মনটা ওর অঙ্কুরেই শুকিয়ে গেছে জল না পেয়ে। কে জানে তার অবশিষ্ট আছে কিনা ওর মনের মাটির তলায়। কিন্তু আর একটা কাজও ও পারে। ও একটা বড় সংসার চালাতে পারে, সে বুদ্ধির ছাপ ওর চোখে মুখে। সচ্ছলতার সংসারে মল বাজিয়ে ফেরা নয়। অভাবের সংসারেই কুসুম আজ লক্ষ্মীরূপিণী হতে পারে। মা না হয়েও, মায়ের মন পেয়ে গেছে সে। তাই সংসার না করেও গিন্নি বনে গেছে। এ মনটাকে কারুর জল দিতে হয়নি। এ মনটা কুসুমের অনেক গাছের ভিড়ে, বনলতার মতো বেড়েছে। এ সংসারের এ স্বাভাবিক রোদ বৃষ্টি পেয়ে অনাদরে অবহেলায়।

জিজ্ঞেস করলাম, কুসুম, তুই স্কুলে পড়িসনি কোনওদিন?

কুসুম যেন চমকে উঠে বলল, হ্যাঁ। ক্লাস সিকস অবধি পড়েছি।

অবাক হলাম। সংসারে এমনভাবে ভিড়েছে, পড়ার ছায়াটুকু শুষে নিয়েছে সব। কিন্তু আর কেন পড়েনি, সেটা জিজ্ঞেস করলে ঠাট্টার মতো শোনাবে।

পিসি বললেন, এই তো দু বছর হল, ও সব একেবারে ঘুচেছে। হরলাল বাড়াবাড়ি আরম্ভ করল, ওরও শেষ। নইলে, ভালই তো ছিল নেকাপড়ায়। আর ও সব হবেও না। এখন যেখানে নোয়া বাঁধা আছে, সেখানে গেলেই আখেরটুকু কাটে।

কী আর বলব পিসিকে। কিছুক্ষণ আগেই পণ্ডিতমশাই যে এসে বলে গেলেন, সব যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। আমি কিছু বললেও পিসির তেমনি মনে হবে। মনে হবে, সব যেন কেমনধারা। কিন্তু নোয়া বাঁধার চেয়েও মেয়েরা যে আজ জীবনধারণের অপমান আর গ্লানিটাকে আগে দূর করতে চাইছে। কারণ, নোয়াটিকে নোয়া রাখতে চায় তারা। লোহার বেড়ি নয়।

খাওয়া শেষ করে উঠলাম আমি। পিসি বারণ করলেন আর এই ঠাণ্ডায় বাইরে যেতে। দালানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিলাম। নিতে নিতেই কুসুমের এঁটো পাড়া শেষ।

পিসি বললেন, পান খাবি র‍্যা টুপান?

-না পিসি, অন্য কিছু থাকে তো দাও।

কুসুম জিজ্ঞেস করল, খেয়ে এলে চুল বেঁধে দেবে জেটি?

 পিসি বললেন, হ্যাঁ।

 কুসুম যেন দৌড়ে পালাল। পিসি আমাকে বললেন, শুবি তো শুগা যা। লইলে বস, আমি একটু বসি। জপটা তখন থেমে গেছে। শেষ করে লিই।

আমাকে সুপুরি দিয়ে পিসি বসলেন আবার জপে। ওটুকু না হলে আজ আর দু চোখের পাতা এক হবে না। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড উলটে গেলেও নয়।

আমি বাবার ঘরে গেলাম। পুবদুয়ারি বাড়ি। পশ্চিমে খানিকটা বাগান। জানালাটা খুলে দিলাম আস্তে আস্তে। পিসি টের পেলে বকবেন। বাতাসও শীতার্ত। তবু না খুলে দিয়ে পারলাম না।

মনটা যেন এতক্ষণ ধরে নানান স্রোতের ধারায় ঘোলা হয়ে ছিল। কাল থেকেই এমন হয়েছিল। এবার যেন একটি নিঝুম অচেতনের মধ্য দিয়ে, ফিরে আসাটা আবার ভেসে উঠতে লাগল চোখের উপরে।

প্রথমেই কানে বাজল প্রেসিডেন্সি জেলের ওয়ার্ডারের বুটের খটখট শব্দ। তারপরেই দুরাগত প্রহরা ধ্বনির সেই ডাক। ডাক এবং প্রত্যুত্তর।

ফিরে আসব, এ কথা কোনওদিন ভাবতে পারতাম না। অনেক বন্দি ছিলেন। এখনও কেউ কেউ আছেন। আমি ভাবতাম, আজীবন যেন আমি বন্দি হয়ে থাকব। চিরদিন ধরেই আছি। আমার আর কোনও বাইরের লজ্জা নেই।

শুধু দুটি জিনিস আমাকে আমার সব হতাশার গ্লানি থেকে মানুষ হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এক একদিন আমরা স্বাধীনতা পাব। আর এক ইতিহাস, প্রত্ন এবং নৃতত্ত্বের ওপর কিছু বই। ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক এবং নরতত্ত্বের বইয়ে কিছু জিজ্ঞাসার পিছনে পিছনে ছুটে বেড়ানো। কর্তৃপক্ষের সন্দেহক্রমে, সে সব বইও আমি প্রথমে পাইনি। বিশিষ্ট রাজবন্দিদের চেষ্টায় পরে পেয়েছিলাম। আমার প্রতি মাসের প্রাপ্য টাকায়, শুধু বই কিনতে পেরেছি, সেইটিই আমার পরমভাগ্য বলে জেনেছিলাম।

কীসের যেন শব্দ হল? চুড়ির শব্দ। কুসুম এল, ওরই কাঁচের চুড়ি বাজল। জানালাটা বন্ধ করে দিলাম আমি।

শুনতে পেলাম, পিসি আর কুসুম ফিসফিস করে কথা বলছে। তা হলে পিসির জপ শেষ হয়েছে। ওরা বোধ হয় ভেবেছে, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। তাই চুপি চুপি কথা হচ্ছে।

সত্যি, আমার চোখে যেন এক প্রগাঢ় ছায়া। গভীর ভার। একটি প্রসন্ন অবসাদ আমার সর্বাঙ্গে। তবু ঠিক ঘুম তো আসছে না।

হঠাৎ শুনলাম, চাপা হাসি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে দালানে। পিসির বৃদ্ধ শ্লেম্মাজড়িত হাসির শব্দই বেশি। তারপরেই, ধুপ করে একটি শব্দ। এবং সঙ্গে সঙ্গে পিসির একটু চড়া গলা শোনা গেল, দূর হ মুখপুড়ি, দূর হ আমার সামনে থেকে। দেখি, সোজা হয়ে বস ক্যানে। চুলের জট ছাড়াতে তো আমি হিমসিম খেয়ে গেলাম। সাবাং দিস একটু মাথায়।

একটু পরেই দালানের দরজা বন্ধ হল। পিসি ডাকলেন, টুপান জেগে আছিস?

হ্যাঁ, পিসি। তোমরা শোও। আমি দরজা বন্ধ করছি।

তারপরে সব চুপচাপ। একটু বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পিসি হেঁকে ডেকেউঠবেন। তবু দরজার কাছে এলাম। এসে আমাকে থামতে হল। কে গান করছে?

আমি পা টিপে টিপে দালান দিয়ে এলাম পিসির ঘরের জানালার কাছে। হারিকেন তখনও জ্বলছিল। দেখলাম, কুসুম পিসির গা ঘেঁষে পাশ ফিরে শুয়ে আছে। আর পিসি গুনগুন করে গান করছে।

দোগধোবতী গাভী।
সে যে বড় ভাবী।  
অ’র‍্যা কালো রবি
যদিন ক্ষীর খাবি…

জানিনে, রোজ এ গান পিসি করেন কি না। এ যেন তাঁর মাতৃহৃদয়ের সব আনন্দ, সব বেদনা, সারাদিনের শেষে উৎসারিত হচ্ছে। মনে মনে বললাম, কুসুম আপন ঘরে স্নেহ না পেয়েও তুই স্নেহের সমুদ্রে শুয়ে আছিস। সংসারের সব হতভাগা ছেলেমেয়ের তুই হিংসার পাত্রী।

বাইরে আর গেলাম না। ফিরে এলাম ঘরে। নিঃসাড়ে দরজা বন্ধ করলাম। লেপ টেনে শুয়ে, অন্ধকারে তাকিয়েই মনে হল, বাবার চোখ দুটি সামনে। আমার চোখ যেন আপনি নত হল। আমি বললাম, বাবা, আমাকে ক্ষমা করুন।

যেন শুনতে পেলাম, বাবা বলছেন, জীবন পারাবারের কুলে এসেছিস টোপন। আজ রাতে ঘুমা।