2 of 3

মানুষ ক্রীতদাস হবে – সিদ্ধার্থ নারলেকার

মানুষ ক্রীতদাস হবে – সিদ্ধার্থ নারলেকার

আমি তখন উন্মাদের মতো জিম্বোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কখনও সানডিয়াগোতে আI কখনও বা কেনিয়ার গহন অরণ্যে। কিন্তু জিম্বার পাত্তা মেলেনি। টানা আড়াই মাস অক্লান্ত পরিশ্রমের পর সাহাপুরে ফিরে এলাম। আর সে দিনেই যা খবর পেলাম তা শুনে আমি এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিলাম।

‘উন্মাদ বৈজ্ঞানিকের রেডিয়ো কন্ট্রোল শিম্পাঞ্জি নিউক্লিয়ার প্রজেক্ট-এর মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং বিস্ফোরক পদার্থের সাহায্যে পারমাণবিক রিঅ্যাকটরের এক অংশ উড়িয়ে দেয়। শব্দ শুনে ভারপ্রাপ্ত অফিসার ডক্টর নটরাজন ছুটে আসেন বটে, কিন্তু তেজস্ক্রিয় পদার্থে সম্পৃক্ত হবার ফলে মারাত্মক রকমে আহত হন। ডক্টর নটরাজনকে স্থানীয় হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের ধারণা প্রতিরক্ষা বিভাগের কিছু গোপন দলিলপত্রের ব্লপ্রিন্ট শত্রুপক্ষের হাতে পড়ার ব্যাপারে জিম্বার কিছু যোগসাজস আছে। বৈজ্ঞানিক পলাতক। তবে আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ আশঙ্কা প্রকাশ করছে তিনি কোথাও লুকিয়ে থেকে জিম্বোকে অপারেট করছেন।

আমার প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, জিম্বার বিস্ময়কর নিরুদ্দেশ সম্পর্কে আপনাদের যা জানাচ্ছি তা যদি একটু ধৈর্য ধরে পর্যালোচনা করেন,তা হলে বুঝবেন এটা একটা জঘন্য ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। জেনে রাখুন, আমার মতো শান্ত এবং আত্মকেন্দ্রিক বৈজ্ঞানিকের পক্ষে ওরকম ধরনের ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব নয়। সেদিন রাত্রেই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। সমস্ত শুনে তিনি খানিকক্ষণ গুম হয়ে রইলেন, তারপর বললেন– মাপ করবেন মিস্টার নারলেকার, তার মানে আপনি বলতে চাইছেন এটা একটা চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়?

ঠিক তা-ই স্যার!

জিম্বোর সঙ্গে রেডিয়ো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় ১৩ এপ্রিল। আজ জুনের কুড়ি তারিখ। এই আড়াই মাস আপনি কোথায় ছিলেন?

মন্ত্রীমশাইয়ের সোজাসুজি প্রশ্নে কেঁপে উঠেছিলাম। কথা বলার ধরন দেখে মনে হয়েছিল তিনি আমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না। সামান্য সন্দেহের ছায়া বুঝি বা তাঁর গম্ভীর কণ্ঠে। জিম্বোকে খুঁজছিলাম সে কথা জানাতেই তিনি বলে ওঠেন– আশা করি আপনার কথাগুলি প্ৰমাণভিত্তিক।

নিশ্চয় বলে আমি আমার পকেট থেকে বিভিন্ন জায়গায় টিকিট (যা আমি চেকারকে ফাঁকি দিয়ে জমিয়ে রাখতে ভালোবাসি) দেখাতেই মন্ত্রীমশাইয়ের মুখ থেকে সন্দেহের ছায়াটা মিলিয়ে যায়।

বিশাল এবং চকচকে টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে বললেন- “হ্যালো, রাঘবন স্পিকিং। মিস্টার নারলেকারকে পাঠাচ্ছি। তিনি দলিলপত্র পাচারের ব্যাপারে ইনভেসটিগেশন করবেন। আশা করি আপনি তাঁকে সবরকম সাহায্য দিয়ে বাধিত করবেন।” কথা শেষ করে তিনি ফোনটা ক্লেডেলে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসতে লাগলেন।

চেম্বার ফিরে এসে আগাগোড়া ভাবতে লাগলাম, কী হতে পারে, হওয়া উচিত এবং কীভাবে দলিলপত্রের ব্লপ্রিন্টগুলো শত্রুপক্ষের হাতে পড়ছে। শেষে ঠিক করলাম ডক্টর মালহোত্রার সঙ্গে দেখা করব। ডক্টর মালহোত্রা আমাদের সিনিয়র অধ্যাপক ছিলেন। প্রাগৈতিহাসিক জীবের অবলুপ্তির ওপরে তাঁর মৌলিক গবেষণা দেশেবিদেশে আদৃত হয়েছে। বাস্তবিকপক্ষে ফসিল ইত্যাদি নানারকম পরীক্ষা করেও অবলুপ্তির উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ডক্টর মালহোত্রা প্রমাণ করেছিলেন সুপারনোভার বিস্ফোরণের ফলেই হঠাৎ প্রাগৈতিহাসিক জীবের বিলুপ্তি ঘটেছিল। কোনও সাধারণ তারার বিস্ফোরণে সুপারনোভা সৃষ্টি হলে এক হপ্তায় যে-পরিমাণ এক্স রশ্মি ও গামা-রে ছড়িয়ে পড়ে তা সূর্যের ২০ কোটি বছরের সম্পূর্ণ বিকিরণের সমান। কয়েক কোটি বছর অন্তর পৃথিবী থেকে একশো আলোকবর্ষের কম দূরত্বের কোনও-না-কোনও তারায় বিস্ফোরণ হয়। এই বিস্ফোরণের শক্তির হাজার পরার্ধের এক ভাগ পৃথিবীতে এসে পড়েছিল। আর তার ফলেই পৃথিবীর আবহাওয়া পালটে দিয়ে বানিয়ে দিয়েছিল শ্মশান।

একটা জটিল পরীক্ষা চালাবার সময়ে সহকারী নীনা মাথুরের মৃত্যু হয়। তার পরেই ডক্টর মালহোত্রা কোনও এক অজ্ঞাত কারণে গবেষণা ছেড়ে দেন, এখন প্রতিরক্ষা বিভাগের দলিলপত্রের রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিযুক্ত আছেন।

আমার প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, ডক্টর মালহোত্রার সঙ্গে দেখা করার আগে কয়েকটা জিনিস আপনাদেরকে জানিয়ে রাখি, তা যদি একটু তীক্ষ্ণভাবে বিশ্লেষণ করেন তা হলে দেখবেন। হয়তো আমার সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে মেনে নিতে পারবেন। শুধু তাই নয়, জিম্বোর নিরুদ্দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষীণ একটা যোগসূত্রও হয়তো আবিষ্কার করতে পারবেন।

জিম্বো যেদিন হারিয়ে যায় সেদিনটা ছিল ১৩ এপ্রিল, ১৯৭১। উজ্জ্বল সোনালি আলোর দিন। তীক্ষ্ণ বর্শার ফলকের মতো ঝকঝকে রোদ্দুর গাছের পাতায়-পাতায় দোলা খেয়ে আমেজ ধরিয়ে দিচ্ছিল মনেপ্রাণে। খাঁচাটা বাইরে রেখে ফিরে এলাম ল্যাবরেটরিতে। বসলাম সুইচ প্যানেলের সামনে। বোতাম টিপতেই স্বয়ংক্রিয় খাঁচার পাল্লাটা খুলে যায়। জিম্বো একলাফে বাইরে বেরিয়ে এসে এপাশ-ওপাশ দেখতে লাগল। নয় সেকেন্ড বিরতি। বি. ডবলু. সি. যেটা একটা ট্রান্সমিটারের খুদে সংস্করণ ছাড়া আর কিছুই নয়, তার বোতাম টিপে কয়েকটা সংকেত পাঠালাম। জিম্বার মাথার ভিতরে থ্যালামাস অঞ্চলের বসানো মিনি রেডিয়ো রিসিভার বিভিন্ন মাত্রার কম্পন তুলে টেলিস্ক্রিনের পাশে বসে জিম্বার গতিপথ লক্ষ রাখতে লাগলাম। দশ মাইল ছোটার পরে ঘটল অপ্রত্যাশিত ঘটনা। দপ করে টেলিস্ক্রিনের সবুজ আলোর বিন্দুটা নিভে যায়। সেই মুহূর্তে রেডিয়ো-যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। হুমড়ি খেয়ে বি. ডবলু, সি-র উপর ঝুঁকে পড়ে সংকেত পাঠাতে লাগলাম। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। জিম্বো উধাও। সেদিন বিকেলেই ডক্টর মালহোত্রা ল্যাবরেটরিতে এসেছিলেন।

মুখোমুখি হতেই চমকে উঠেছিলাম। এ কী চেহারা হয়েছে ড. মালহোত্রার! ঊনপঞ্চাশ বছরের সুঠাম শরীরের ওপরে নেমে এসেছে অকালবার্ধক্য। নিষ্প্রাণ চোখ। থুতনিটা অনেকখানি ঝুলে পড়েছে। মাত্র দু-দিনে তিনি যেন বেশ কিছুটা বুড়িয়ে গেছেন। পকেট থেকে সিগারেট দ্বার করে কাঁপা কাঁপা হাতে তা ধরিয়ে বললেন, ব্যাপারটা কি ভালো হচ্ছে?

খারাপ তো দেখছি না।

আপনি কি বিশ্বাস করেন আপনার পরীক্ষা সফলতা লাভ করলে মানুষ ক্রীতদাস হয়ে পড়বে?

কথাটা আংশিক সত্য, তবে ডক্টর মালহোত্রা, আমি সবিনয়ে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম– আমাদের পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়বে। প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রায় কেঁপে উঠব আমরা।

মনে করেছিলাম আমার উত্তর শুনে ডক্টর মালহোত্রা কনগ্রাচুলেশন জানাবেন। কিন্তু তার ধারেকাছেও গেলেন না ভদ্রলোক। এবার তিনি প্রশ্ন করলেন, মাপ করবেন মিস্টার নারলেকার, আপনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে ক্রমাগত ব্রেন প্রজেকশনের ফলে মস্তিকের কার্যক্ষমতা দারুণভাবে হ্রাস পাবে? মানুষ হয়ে পড়বে জড়পদার্থ?

জিম্বোর ওপরে যে-পরীক্ষা চালানো হচ্ছে তা যদি সফল হয় তা হলে অদূর ভবিষ্যতে মানুষের মস্তিষ্কের বিদ্যুত্তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। অর্থাৎ ব্যাপারটা কতকটা এরকম দাঁড়ায় যে, জীবদেহের রাসায়নিক উপায়ে সৃষ্ট বিদ্যুত্তরঙ্গের চেহারা পালটে দিয়ে ইচ্ছামতো চালনা করব। কিন্তু এখনও আমরা অতদূর পৌঁছতে পারিনি সেকথা ডক্টর মালহোত্রাকে জানাতেই তিনি বোমার মতো ফেটে পড়লেন। এমনিতে তিনি শান্ত এবং সমাহিত পুরুষ। হঠাৎ যেন তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়েছিল সেদিন। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে ওঠেন–“কিন্তু একদিন নিশ্চয়ই পৌঁছতে পারবেন। সেদিন– উঃ হরিবল!”

আমি চুপ করে রইলাম। রাগে উত্তেজনায় তিনি থরথর করে কাঁপতে লাগলেন।

জিম্বো কোথায়?

তাকে খুঁজে পাচ্ছি না।

আশ্চর্য! ও যদি শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়ে, তা হলে?

একটা হিমেল স্রোত স্পাইনাল কর্ড বেয়ে নেমে যায়। সেই মুহূর্তে আমি কেমন অসহায় বোধ করলাম। কোনওরকমে মাতালের মতো অপ্রকৃতিস্থভাবে চেয়ারে বসে পড়লাম বটে, কিন্তু ঘণ্টাখানেক বাদে যা খবর পেলাম তা শুনে চমকে উঠলাম। ডক্টর মালহোত্রা নাকি গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। ভয়ঙ্কর অন্যমনস্ক ও উত্তেজিতভাবে রাস্তা পার হবার সময়ে এ-দুর্ঘটনা ঘটে। সম্ভবত মস্তিষ্কে অপারেশন করতে হবে। স্থানীয় হাসপাতালের ডাক্তার বললেন, একটা আর্টারি ছিঁড়ে গেছে।

সেদিনই অপারেশন টেবিলের পাশে সার্জনের বেশে দেখেছিলাম অধ্যাপক খালিদকরকে। চোখাচোখি হতেই চমকে উঠেছিলাম। তিন হাজার ভোল্টের তড়িৎপ্রবাহ নিমেষে ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটিয়ে যায় মস্তিষ্কের কোষে কোষে। বিশ্বাস করুন আমার কখনও ভুল হতে পারে না, আমি জানি, যদিও তিনি মুখে মাস্ক এবং সাদা অ্যাপ্রন পরে ছিলেন, তবু মোটা ক্রুকস লেনসের চশমা ও উজ্জ্বল চোখের মালিকটি অধ্যাপক খালিদকর ছাড়া আর কেউ নন, যিনি গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, ১৯৬৬ সালের জেনেভা বিজ্ঞান সম্মেলনে এমন কতকগুলি প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছিলেন যাতে সভাকক্ষের প্রতিটি বৈজ্ঞানিক রাগে এবং উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠেছিলেন– ডক্টর খালিদকর, ডোন্ট স্পিক! স্টপ! স্টপ! আমার পাশে বসা মঁসিয়ে দূপে তো কানের কাছে ফিসফিস করে বলেছিলেন, মিস্টার নারলেকার, দ্যয়ু অ্যাকসেপ্ত হিজ প্রপোজল?

অ্যাবসলিউটলি নট।

ওঃ হরিবল– স্যাত্যানিক প্রপোজাল।

অধ্যাপক খালিদকর কেন হাসপাতালে এসেছিলেন সেদিনে তার কোনও সম্ভাব্য উত্তর খুঁজে পাইনি। বলতে পারেন আমার মানসিক অবস্থার কারণে সে-চেষ্টাও করিনি।

কিন্তু পরে আগাগোড়া ভাবতে ভাবতে দলিলপত্রের ব্লপ্রিন্ট পাচার এবং জিম্বার নিরুদ্দেশের মাঝে একটি ক্ষীণ যোগসূত্র আবিষ্কার করেছিলাম। আর তার জন্যে ডক্টর মালহোত্রার সঙ্গে দেখা না করে পারিনি।

ডক্টর মালহোত্রা আগের মতোই আমাকে অভিবাদন জানালেন। কথা বললেন অন্তরঙ্গভাবে, একান্ত বন্ধুর মতো। কথার ফাঁকে ফাঁকে জানাতে ভুললেন না প্রতিরক্ষা দপ্তর তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছে। গোপন দলিলপত্রগুলো তাঁর হেফাজতেই রাখা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে যে তার হুবহু কপি শত্রুপক্ষের হাতে পড়েছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। যে-ঘরে দলিলপত্র রাখা হয়েছে সেটাকে একটা ছোটখাটো দুর্গ বলা চলে। আড়াই ইঞ্চি মোটা স্টিলের চাদরে মোড়া ঘর। ঘরের ভিতরে যে আয়রনসেফ-টি আছে তাতে সবসময়ে আঠারো হাজার ভোল্টের তড়িৎপ্রবাহ চলাচল করে। যদি কোনওক্রমে স্পর্শ করা যায় তা হলে অকস্মাৎ নেমে আসবে মৃত্যু। শুধু তা-ই নয়, আয়রনসেফ-এর

বাইশ গজের মধ্যে যদি কেউ এসে যায় তা হলে স্বয়ংক্রিয় পাগলাঘণ্টা বাজতে শুরু করে। এতসব সর্তকতা অবলম্বন করেও কী করে যে দলিলপত্রের ব্লপ্রিন্ট শত্রুপক্ষের হাতে পড়ছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। হা ভগবান! তিনি কেমন করে বুঝবেন? আমিই কি বুঝতাম না বোঝা সম্ভব ছিল আমার পক্ষে যদি না অধ্যাপক খালিদকরকে সেদিন হাসপাতালে দেখতাম!

রাত্রির আর্তনাদ

টুং করে দেওয়াল ঘড়িতে একটা বাজল। সুরেলা শব্দটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। ঘুম আসছে না! যদিও শোবার আগে একটা ওষুধ খেয়েছিলাম, তবু নানারকম চিন্তায় মাথা গরম হয়ে উঠল। খুট করে আওয়াজ হতেই আমি সতর্ক হয়ে উঠি। ঠিক সেই মুহূর্তে দেখি ডক্টর মালহোত্রা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছেন। তারপর আচ্ছন্নের মতো দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। সামনে বিশাল লম্বা প্যাসেজ। একটামাত্র উজ্বল নীল আলো জ্বলছে। সুউচ্চ দেওয়ালে কঠিন নিস্তব্ধতা। ভৌতিক ছায়া ফেলে মালহোত্রা এগিয়ে চললেন সিক্রেট চেম্বারের দিকে। চলন দেখে মনে হল দেহে প্রাণ নেই। একটা মৃতদেহ যেন অলৌকিক কারণে জেগে উঠে এগিয়ে যাচ্ছে কফিনের দিকে। ডক্টর মালহোত্রা গুপ্ত জায়গায় বসানো সুইচ অফ করে ঘরের বিদ্যুৎ-চলাচল বন্ধ করে দিলেন এক মুহূর্ত অন্ধকার। আবার জ্বলে উঠল এমারজেন্সি ল্যাম্প৷ আলো জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে দেখি ড. মালহোত্রা চেয়ারে বসে ঝুঁকে পড়েছেন দলিলপত্রের দিকে। আশ্চর্য! চোখের পলক পড়ছে না। মুখের রেখায় বিন্দুমাত্র অভিব্যক্তি নেই। যেন পাথরে খোদাই করা ইস্পাতকঠিন এক মূর্তি।

আমি বুঝে গেছি কী ঘটতে চলেছে, এক হ্যাঁচকায় দরজাটা খুলে ডক্টর মালহোত্রার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে রুমাল দিয়ে চোখ দুটো চেপে ধরলাম। ভয়ার্ত কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠলেন ডক্টর মালহোত্রা। তার পরই তিনি আমার হাতের ওপরেই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন। হা ঈশ্বর! কী সর্বনাশটাই-না ঘটতে চলেছিল। একটু দেরি হলেই শত্রুপক্ষের হাতে আর-একটা দলিলের ব্লপ্রিন্ট পৌঁছে যেত।

উপসংহার

এর পরের ঘটনা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। হঠাৎ মানসিক আঘাতে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন, ড. মালহোত্রা। টানা আটচল্লিশ ঘণ্টা পরে জ্ঞান ফিরে পেলেন বটে, কিন্তু স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। আমাদের কর্তৃপক্ষ শেষে নিরুপায় হয়ে চোখের ওপরে তীব্র আলোর ফোকাস ফেলে অন্ধ করে দিয়েছিলেন ড. মালহোত্রাকে। তা ছাড়া কোনও উপায়ও ছিল না। হয়তো অপটিক নার্ভকে অক্সিপিটাল লোব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েই তা করা যেত, কিন্তু কর্তৃপক্ষ অপারেশন করবার ঝুঁকি নেননি।

ব্রেন কন্ট্রোলের তথ্য শত্রুপক্ষের হাতে পড়ে জিম্বোর কাছ থেকে। তারপর তারও এক উন্নত ধরনের সংস্করণ সংযোগ করা হয়েছিল ড. মালহোত্রার মাথায়। আর সে কাজটা নিপুণ দক্ষতায় সমাধা করেছিলেন অধ্যাপক খালিদকর। মালহোত্রার মাথায় এমন একটা মাইক্রো-ইলেকট্রনিক টেলিস্ক্রিন বসানো হয়েছিল যার ফলে ড. মালহোত্রা যা দেখতেন তা রেডিয়ো মারফত শত্রুপক্ষের ব্রেন কন্ট্রোল ইউনিটের টেলিস্ক্রিনে ফুটে উঠত। এ কথা পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে জানাতেই তিনি শিউরে উঠে বলেছিলেন– বড়ি তাজ্জব… আপনি বিরাট বিপদ থেকে দেশকে ‘সেভ’ করেছেন। ধন্যবাদ!