2 of 3

একটি মর্মান্তিক মৃত্যু – সমরজিৎ কর

একটি মর্মান্তিক মৃত্যু – সমরজিৎ কর

ভেবেছিলাম ঘটনাটা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করব না। বিদেশের তিনটি এবং ভে দক্ষিণ ভারতের মাত্র একটি দৈনিকপত্রে দুর্ঘটনার ওপরে একটি ছোটখাটো সংবাদ যখন পরিবেশিত হয়, তখন মনে করেছিলাম ব্যাপারটা চেপে যাওয়াই বোধহয় উচিত হবে। কিন্তু কয়েকদিন পূর্বে কলকাতার একটি প্রখ্যাত দৈনিকে সংবাদ বেরোল : “পৃথিবীর আকাশ পারমাণবিক ভস্মে আচ্ছাদিত। আগামী সাত-আট বৎসর ধরে এই নিয়ত বর্ষিত হবে এর বুকে।” সংবাদে এই ভস্মবর্ষণের প্রতিক্রিয়ার কথা বলা হয়নি। কী যে তার প্রতিক্রিয়া হওয়া সম্ভব সাধারণের পক্ষে তা বোঝা কঠিন। সবসময়ে আমাদের পক্ষেও যে সহজ, সে-কথা বলার মতো ধৃষ্টতাও আমার নেই। যদিও জানি ড. লরেন ক্রিশ্চিয়ান মারা গেছেন। আর তার জন্যে দায়ী ওই ভস্মই।

কিন্তু কেন এমন হল? ড. রামস্বামী যে গণনা করেছিলে তাতে কি কোনও ত্রুটি ছিল? ভারতের প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী এবং প্রকৃতিতত্ত্ববিদ ড. মেটা তাঁর আলোড়নকারী গ্রন্থ ‘অ্যাটমিক ফিশন, এ নেগেটিভ অ্যাপ্রোচ টু হিউম্যানিটি’-তে ব্যাখ্যা করেছেন, পরমাণু বিভাজন নিয়ে মানুষের মাথা ঘামানোটা একটু কমানো দরকার। কথাটি তখন আমরা লঘু করেই ধরেছিলাম। কারণ ড. রামস্বামী গত জুন মাসে মালাবার তটভূমিতে যে থোরিয়ামের খনিটি আবিষ্কার করেছেন তার মধ্যে তিনি নাকি এমন একপ্রকারের বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন, যা ট্রান্স-ইউরেনিয়াম পদার্থ কুরিয়াম, আমেরিকিয়াম বা ম্যানডিলিভিয়ামের মতোই নতুন একেবারে সম্পূর্ণ নতুন তেজস্ক্রিয় পদার্থ। তাঁর ধারণা এই পদার্থ থেকে। আমরা যে-শক্তি পেতে পারি তা ইউরেনিয়াম-২৩৫ জ্বালানি থেকে বহুলাংশে বেশি। ব্যাপারটা তিনি প্রথমে জানান আমাকে। পরে এ বিষয়ে আলোচনা করি লস-এঞ্জেলসের প্রখ্যাত পরমাণুবিজ্ঞানী ড. লরেন অ্যালক্সির সঙ্গে। ওঁকে এ-বিষয়ে বিশদ পর্যবেক্ষণের জন্যে বলি। কিন্তু অসুস্থ থাকায় তিনি আমার আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারেননি। ওঁর স্ত্রী লরেন ক্রিশ্চিয়ানা সমস্ত শুনে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করলে ড. রামস্বামী ওঁকে আমন্ত্রণ জানান। ভদ্রমহিলা তরুণী হলেও আইসোটোপের ওপরে তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণাগুলি খুবই মৌলিক বলে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু তখন কি এ কথা ভেবেছিলাম– একটি মানুষকে আমরা ঠেলে দিচ্ছি নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে?

সেদিন ১২ জুলাই। মাট্টানচেরির উপকূলে ড. লরেন ক্রিশ্চিয়ানা এবং ড. রামস্বামী দুইটি পৃথক তাঁবুতে বসে নতুন আবিষ্কৃত পদার্থটির ওপরে পর্যবেক্ষণ ব্যাপারে ব্যস্ত। দুপুরের দিকে ড. লরেন বললেন, ড. রামস্বামীর ধারণাই হয়তো, ঠিক। একটি নতুন কোনও মৌলিক পদার্থের সন্ধান যে তিনি পেয়েছেন এতে আমার কোনও সন্দেহ নেই। তবে সম্পূর্ণ নতুন এবং অভিনব এমন একটি সংবাদ আপনাদের দেব যাতে বিশ্বের সকলেই চমকে উঠবেন।

কথাটা তখনকার মতো আর ভাঙলেন না তিনি।

রাত ৮টার সময়ে আবার মিলিত হলাম আমরা। সকলেই ক্লান্ত। বিশেষ করে প্রচুর পরিমাণে থোরিয়াম শোধন করার পরে আমরা সকলেই খুব পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাঁবুর বাইরে যে স্থানটিতে আমরা বসেছিলাম, তার পাশেই আরব সাগরের জলরাশি। আকাশ পরিষ্কার এর চারপাশে উজ্জ্বল আলো। এর মধ্যে নিজেদের মনে হচ্ছিল কোনও নতুন দেশের মানুষ। ড. লরেন বললেন, যে থোরিয়াম-পিণ্ডটি আজ শোধন করেছি তার মধ্যে আমি একটি অদ্ভুত বস্তু লক্ষ করলাম। ভাবতেও পারছি না, এ-ও কি সম্ভব?

ঔৎসুক্য নিয়ে প্রশ্ন করলাম, আপনার বক্তব্য ঠিক বুঝতে পারছি না, ড. লরেন। উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাঁর দুটি চোখ। বললেন, বলার চেয়ে চোখেই দেখবেন। অপেক্ষা না করে আমি ও ড. রামস্বামী ড. লরেনের সঙ্গে তাঁর তাবুতে গেলাম আর সরাসরি গিয়ে দাঁড়ালাম ড. লরেনের টেবিলের সামনে। আর সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠতে হল। এ যে পরশমণি! লক্ষ করলাম– হ্যাঁ, উজ্জ্বল বিদ্যুতের আলোয় কোনও কিছু দেখতে ভুল হয়নি। টেবিলের এক কোণে একটি বিশেষ ধাতুসংকরের বাক্সের মধ্যে রাখা আছে ড. লরেনের আবিষ্কার সেই নতুন পদার্থ। তা থেকে ফুলঝুরির মতো বেরিয়ে আসছে তেজস্ক্রিয় কণিকা। আর টেবিলের আর এক প্রান্তে জমা হচ্ছে তেজস্ক্রিয় ভস্ম। সেই ভস্মের দুষিত বিপজ্জনক শক্তি শোষণ করছে একটি ছোট্ট কালো রঙের পিণ্ড।

আমার আর রামস্বামীর তখন কথা বলার মতো ক্ষমতা নেই।

এক হাসলেন ড. লরেন। সাফল্যের হাসি। এগিয়ে গেলেন কালো পিণ্ডটার কাছে। কতকগুলি ছোটখাটো যন্ত্র ঠিক করলেন, তার সঙ্গে ইলেকট্রোমিটারটিও। একটা কাঁচের রড দিয়ে পিণ্ডটিকে আর একটু এগিয়ে দিলেন বাক্স থেকে নির্গত বিকিরণের দিকে। তারপর মৃদু হেসে বললেন, কাজটা যে এত সহজে হতে পারে স্বপ্নেও কি ভেবেছিলাম?

কতকটা স্বগতোক্তির মতো ড. রামস্বামী প্রশ্ন করলেন, জিনিসটি পেলেন কোথায় ড. লরেন?

–আপনার আবিষ্কার করা পদার্থটির পাশেই। দেখছেন,–চারপাশের তেজস্ক্রিয় ভস্মকে ও কেমনভাবে শোষণ করছে? পরমাণুর অফুরন্ত শক্তি আজও আমরা ব্যাপকভাবে কাজে লাগাতে পারিনি ওই ভস্মগুলির জন্যেই। মানুষের ভয়, শক্তি হয়তো সে পাবে, কিন্তু পরমাণু-বিভাজনের সময়ে যে তেজস্ক্রিয় ভস্ম বা বিকিরণ বেরিয়ে আসবে তা তার জীবনকে করে তুলবে বিপন্ন। আর বিপদ থেকে বাঁচার জন্যেই তাকে যে সব কৌশল বের করতে হচ্ছে তার ঝক্কি ও ব্যয় কত বেশি। কিন্তু এই কালো পদার্থ সম্ভবত সেই সমস্যা থেকে আমাদের মুক্তি দিল ড. রামস্বামী। অফুরন্ত পারমাণবিক শক্তি অবাধে এখন আমরা ব্যবহার করতে পারব।

বোধহয় আরও কিছু বলতে চাইছিলেন ড. লরেন। কিন্তু একেবারে আকস্মিক। অমন কিছু যে একটা হবে কেউ কি আমরা ভাবতে পেরেছিলাম? আমাদের সকলের আপাদমস্তক বিশেষ ধরনের পোশাকে ঢাকা থাকলেও, মনে হল ড. লরেনের চোখে যে সোনার ফ্রেমের চশমাটি ছিল, সেই ফ্রেমের একটি অংশ দুমড়ে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। টেবিলের ওপরকার বাতিটি নিভে গেল। সমস্ত তাঁবু বিভিন্ন রঙের আভায় হল পরিপূর্ণ। ড. লরেন ছিটকে এসে পড়লেন আমারই পাশে। আমি আর ড. রামস্বামী ওঁকে ধরাধরি করে ছুটতে লাগলাম ফাঁকা জায়গা সাগরের উপকূলের দিকে। বিস্ফোরণের শব্দে ড. লরেনের প্রাইভেট সেক্রেটারি মি. হল আর আমাদের সঙ্গীরাও রীতিমতো ভয় পেয়ে গেছে। তারাও তাঁবু ছেড়ে এসে দাঁড়াল আমাদের কাছে। দূর থেকে দেখলাম, ড. লরেনের তাঁবু দাউদাউ করে জ্বলছে।

কিন্তু ড. লরেন?

চিৎকার করে ডাকতে লাগলাম আমরা। কিন্তু ওঁর কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। শহরে লোক পাঠানো হল ডাক্তারের খোঁজে। ডাক্তার এলেন। পরীক্ষা করলেন। তারপর জানালেন ড. লরেন অজ্ঞান হয়ে রয়েছেন। সম্ভবত শক্‌ পেয়েছেন।

সে এক দারুণ কাণ্ড! কোথায় যে গলদ সেটা আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু বলার উপায় নেই। মনে মনে ভাবলাম, হায় ঈশ্বর, শেষ পর্যন্ত আমরা হলাম নিমিত্তের ভাগী।

আর অপেক্ষা না করে সেই রাত্রেই আমাদের হেলিকপ্টারে ড, লরেনকে এনে তুললাম বোম্বাই-এ মালাবার হিলস-এ ড. রামস্বামীর আস্তানায়। রেডিয়োফোনে যোগাযোগ করলাম বন্ধু ড. লরেন অ্যালেক্সির সঙ্গে। বেচারা অসুস্থ৷ জানি আমরা তাঁর ওপরে অত্যাচার করেছি, কিন্তু এ ছাড়া আমাদের করার কী থাকতে পারে? একটা নৈতিক দায়িত্ব তো রয়েছে?

১৪ জুন চার্টার্ড প্লেনে করে স্যান্টাক্লজে উপস্থিত হলেন অ্যালেক্সি। বিমানবন্দরে নেমে সে কী কান্না তার কিন্তু সে ওই পর্যন্তই। এরপর প্রিয়তমা স্ত্রীকে সারিয়ে তোলার জন্যে যে অমানুষিক চেষ্টা তিনি করলেন তার তুলনা হয় না। আমি এবং ড. রামস্বামী প্রতিমুহূর্তের জন্যে তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম তার চিকিৎসাপদ্ধতি।

প্রয়োজনীয় ওষুধ আর যন্ত্রপাতি তিনি সঙ্গেই এনেছিলেন। ওষুধের সঙ্গে কার্বন-১৪ আইসোটোপ মিশিয়ে ইনজেক্ট করলেন পত্নীর দেহে। তারপর যন্ত্রের সাহায্যে পরীক্ষা করতে লাগলেন, ওষুধ দেহের কোন কোন অংশে গেছে। কী কী প্রতিক্রিয়া করছে। এক ফাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলাম– ড. লরেন, প্রতিবারই নতুন নতুন ওষুধ আপনি ওঁর দেহে ঢোকাচ্ছেন আর তার সঙ্গে তেজস্ক্রিয় কার্বন-১৪ দিচ্ছেন, এর কারণ দয়া করে বলবেন কী?

দেখলাম সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক বটে অ্যালেক্সি। এমন চরম মুহূর্তে এই প্রশ্ন অন্য কেউ করলে হয়তো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতেন। কিন্তু তার মধ্যে তেমন কোনও ভাবান্তর দেখলাম না। শিক্ষার্থীকে যেমন দরদ দিয়ে শিক্ষক কোনও বিষয় বোঝান, তেমন সুরে বললেন তিনি, তুমি হয়তো জানো মি. কর, আমাদের দেহের মধ্যে যে ওষুধ যায় দেহের বিভিন্ন স্থানে তার প্রতিক্রিয়া ভিন্নতর।

একদিন এটা শুধু অনুমানেই করেছি। আজ তা প্রত্যক্ষ করা সম্ভব। ক্রিশ্চিয়ানার দেহে যে ওষুধ ঢোকাচ্ছি তার সঙ্গের ওই কার্বন-১৪ দেহের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছুচ্ছে। ফলে কোথায় ওষুধ যাচ্ছে, কত তাড়াতাড়ি যাচ্ছে সেখানে কী হচ্ছে– তা তাড়াতাড়ি বোঝা যাবে। কারণ ওষুধের সঙ্গে সঙ্গে যেখানে কার্বন-১৪ যাবে– সেখানটা তেজস্ক্রিয় হয়ে উঠবে।

সত্যিই অদ্ভুত!

তবু সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হল। ১৮ জুন ভোররাতে মালাবার হিলসের প্রতিটি প্রাণী তখন আরব সাগরের ওপারে কোনও এক স্বপ্নরাজ্যে বিচরণ করছে। নীরব। নিস্তব্ধ। অপারেশন টেবিলের ওপরে পড়ে আছেন ড. লরেন ক্রিশ্চিয়ানা। তাঁর সমস্ত মুখ কাগজের মতো সাদা। কী-একটা যন্ত্র ওঁর সমস্ত দেহের ওপরে বোলালেন অ্যালেক্সি। দেখলেন, চোখের পাতার মধ্যে পেন্সিল টর্চ ফেলে। তারপর নীরবে উঠে গিয়ে দাঁড়িলেন জানলার সামনে।

ড. রামস্বামী আমার কাঁধে হাত রাখলেন। আমি তার সঙ্গে পাশের ঘরে গেলাম।

ড. রামস্বামী বললেন, শি ইজ ফিনিশড!

–কিন্তু ব্যাপার কী ড. রামস্বামী?

–প্রতিটি পূর্ণ স্বাস্থ্যের মানুষের মধ্যে অদ্ভুত এক আউন্সের হাজার ভাগের একভাগ। পটাসিয়াম-৪০ নামে এক প্রকারের আইসোটোপ রয়েছে যার ফলে আমরা প্রত্যেকেই খুব সামান্য হলেও যখন তেজস্ক্রিয় ভস্মের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন কিছু কিছু বিকিরণ ওঁর চশমার ফ্রেমের সোনার মধ্যে প্রবেশ করে সোনার পরমাণুকে বিভাজিত করতে থাকে। ওই বিভাজনের ফলে যে তেজস্ক্রিয় রশ্মি বের হয় তা এবং মধ্যেকার পটাশিয়াম-৪০ এর যৌথ বিক্রিয়ার ফলেই এমনটি হল। অর্থাৎ এই বিস্ফোরণে একটি অমূল্য জীবনের সমাপ্তি। ধীরে ধীরে বলে গেলেন ড. রামস্বামী। তা হলে ওই কালো পিণ্ডটি যা ভস্মের মধ্যেকার বিপজ্জনক রশ্মি শোষণ করছিল, তা কি কোনওই কাজে লাগবে না?

–আপাতত তো দেখছি না। কারণ অতিরিক্ত শক্তি শোষণ করে ও নিজেই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।

মনে হল একটি দানবের বিরাট থাবা ক্রমেই এগিয়ে আসছে আমাদের সকলকে গ্রাস করতে। তার থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনওই উপায় নেই।