অস্ত্র – ফ্রেডরিক ব্রাউন

অস্ত্র – ফ্রেডরিক ব্রাউন

সন্ধ্যা নামছে। ঘরের ভেতরে আলো-আঁধারি। ড. জেমস গ্রাহাম নিজের চেয়ারে বসে । গভীর চিন্তামগ্ন। অতি গোপন প্রোজেক্টের দায়িত্ব ওঁর কাঁধে। পাশের ঘরে পুত্রের একের পর এক ছবির বইয়ের পাতা ওলটানোর শব্দ ভেসে আসছে।

সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পরে সন্ধেয় আপন ঘরে স্বল্প আলোয় চুপ করে বসে থাকাটাই ওঁর সবচেয়ে প্রিয়। সৃজনীচিন্তার অবসরও এই সময়ে। আজ কিন্তু ওঁর মন জুড়ে রয়েছে। একমাত্র সন্তান। জন্মাবধি মানসিক প্রতিবন্ধী সে। দুশ্চিন্তা নয়… বরং অতীতে পুত্রকে ঘিরে নানান মধুর স্মৃতির রোমন্থন। ওঃ, সেদিনের কথা কি ভোলা যাবে কোনওদিন! মানসিক প্রতিবন্ধকতার কথাটা যেদিন জানতে পারা গেল! কিন্তু সদা খুশি বালক… কোনও ঝাট নেই। দেহের বয়স বাড়লেও মানসিক বয়স ওর কোনওদিনও বাড়বে না। চিরকাল ও অবুঝ শিশু হয়েই থাকবে। আলাদা ঘর সংসার ওর কোনওদিনই হবে না… কোনওদিনই সে পিতাকে পরিত্যাগ করে যাবে না… এই চিন্তাই এখন গ্রাহামের সান্ত্বনা। কিন্তু এই সান্ত্বনা কি কারোর কাম্য? বা কাম্য হওয়া উচিত! এমন সময়ে কলিংবেল বেজে উঠল।

চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরের আলো জ্বালালেন গ্রাহাম… তারপর এগিয়ে গেলেও দরজা পেরিয়ে হলঘরের শেষে দরজা। কেন জানি না নিঃসঙ্গতার সময়ে অতিথির আবির্ভাবে মনে মনে খুশি হয়ে উঠলেন।

দরজার সামনে এক অপরিচিত অতিথি।

–ড. গ্রাহাম, আমার নাম নিয়েমান্ড। আমার কিছু কথা আছে আপনার সঙ্গে! ভেতরে আসতে পারি কি?

অতিথির আপাদমস্তক দেখলেন ভালো করে তিনি। খুবই সাধারণ… ছোটখাটো… না। বিপদের কোনও সম্ভাবনা নেই। মনে হয় কোনও সাংবাদিক নয়ত ইনস্যুরেন্সের এজেন্ট!

–ভেতরে আসুন মি. নিয়েমান্ড। নিঃসঙ্গতা, মানসিক প্রতিবন্ধী… আজীবন শিশুই থাকবে… এই সব চিন্তার হাত থেকে কিছুক্ষণ অন্তত মুক্তি পাবেন তিনি।

…মনে মনে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন অতিথিকে। দরজা বন্ধ করে বসার ঘরে নিয়ে এলেন তিনি অতিথিকে।

–বসুন… বসুন… কী খাবেন? চা না কফি?

–না না… ওসবের কিছু প্রয়োজন নেই। আপনি ব্যস্ত না হয়ে বসুন। মৃদু অথচ ভরাটকণ্ঠে কথাগুলো বললেন অতিথি।

উল্টোদিকে চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন গ্রাহাম।

ছোটখাটো মানুষটি গ্রাহামের দিকে তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। দুই হাতের আঙুলগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর টেবিলের সামনের ঝুঁকে পড়ে বললেন– ড. গ্রাহাম, আপনি একজন প্রথিতযশা বিজ্ঞানী… আমি যতদূর জানি আপনার যুগান্তকারী আবিষ্কার পৃথিবীর বুক থেকে মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।

পাগল নাকি! মনে মনে হতাশ হলেন গ্রাহাম। কী ভেবে অতিথিকে সাদরে আহ্বান জানিয়েছিলেন আর বাস্তবে হল ঠিক উল্টো। কিন্তু এখন তো আর করার কিছু নেই। এখন যত তাড়াতাড়ি বিদায় করতে পারা যায় ততই মঙ্গল। না, বেশ বিরক্তিকর হবে ইন্টারভিউটা। মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠলেও বাইরে কিছু প্রকাশ করলেন না। এবং এ-ও বুঝলেন রূঢ় ব্যবহার না করলে সহজে নিষ্কৃতি পাবেন না।

–ড. গ্রাহাম আপনি যে অস্ত্রের ওপরে কাজ করছেন…

খোলা দরজার ওপারে হলঘরের দিকে দৃষ্টি পড়তেই কথা বন্ধ করলেন অতিথি। বছর পনেরো বয়সের এক বালক এসে ঘরে ঢুকল। নিয়েমান্ডের দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে সটান। গ্রাহামকে জড়িয়ে ধরল।

–বাবা… গল্প পড়ে শোনাও না? মজার মজার গল্প… হাততালি দিয়ে খিল খিল করে হেসে উঠল বালক.. .কে বলবে ওর বয়েস পনেরো… ঠিক যেন চার বছরের কোনও অবুঝ শিশুর হাসি।

পুত্রকে জড়িয়ে বুকে টেনে নিলেন গ্রাহাম। অতিথির দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন… পুত্রের মানসিক অবস্থার কথা অতিথি জানেন কিনা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু নিয়েমান্ডের মুখে বিস্ময়ের কোনও চিহ্ন নেই। তাহলে পুত্রের বিষয়ে অতিথি নিশ্চয় অবগত আছেন ভাবলেন গ্রাহাম।

–হ্যারি… আমার সোনা ছেলে… আমি এখন ব্যস্ত আছি তো… কাজ শেষ করেই তোমার ঘরে আসব… বই পড়ে শোনাব… যাও সোনা… তোমার ঘরে গিয়ে ছবির বই দেখ। বাৎসল্যের সুরে পুত্রকে বুঝিয়ে বললেন গ্রাহাম।

–না না… এখনই পড়তে হবে… সেই যে ছোট ছোট মুরগির ছানার গল্প…

–শোনো… শোনো হ্যারি… আমি তো এখন কথা বলছি… এসো তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই… উনি হলেন মি. নিয়েমান্ড… আর এই হল আমার পুত্র হ্যারি… এবার তুমি ঘরে যাও।

অতিথির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল হ্যারি। গুড ইভনিং বলার সঙ্গে সঙ্গে হ্যারির দুই হাত ধরে উষ্ণ করমর্দন করলেন নিয়েমান্ড। গ্রাহাম এবার স্থির নিশ্চিত হলেন যে, নিয়েমান্ড হ্যারির বিষয়ে খুব ভালোই অবগত আছেন… অবুঝ বালকের উদ্দেশে নিয়েমান্ডের হাসি আর ব্যবহারই গ্রাহামকে আরও নিশ্চিত করল।… শারীরিক নয় মানসিক বয়সটাই নিয়েমান্ডের ব্যবহারে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে।

বালকও নিয়েমান্ডের হাত ধরে কাছে চলে গেল, মনে হল শিশুর মতো হয়তো কোলেই উঠে বসবে। গ্রাহাম সস্নেহে হ্যারিকে নিজের কাছে নিয়ে এলেন, আদর করে বললেন– খুব ভালো ছেলে তুমি… এবার তোমার ঘরে যাও হ্যারি।

বালক কোনও কথা না বলে নিঃশব্দে নিজের ঘরে ঢুকে গেল… বসার ঘরের দরজা খোলাই রইল।

নিয়েমান্ড এবার ড. গ্রাহামের দিকে তাকিয়ে বললেন– দারুণ সুন্দর… আমার বেশ লাগে ওকে… আচ্ছা, আপনি যা ওকে পড়ে শোনান তা সবই কি বাস্তবসম্মত?

গ্রাহামের কাছে অর্থ পরিস্ফুট হল না।

–ছোট ছোট মুরগির ছানা… আমি এই সম্বন্ধেই বলছিলাম… ‘ছোট ছোট মুরগি’ গল্পে আপনার ভেঙে পড়াটাই তো অবাস্তব!

নিয়েমান্ড এখন আর অবাঞ্ছিত নয়… বরং পুত্রের প্রতি তার সহানুভূতি প্রদর্শন গ্রাহামকে অনেক মানসিক শান্তি দিল। পরক্ষণেই মনে হল ইন্টারভিউটা তাড়াতাড়ি শেষ করার দরকার… কথায় কথা বাড়ে… গোপন কথা যত কম আলোচিত হয় ততই মঙ্গল। সুতরাং চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন গ্রাহাম।

–মি. নিয়েমান্ড, আমার মনে হয়, আমরা অযথা সময় নষ্ট করছি… আপনার প্রশ্ন, আপনার যুক্তি সব আমার জানা আছে। এসব কথা হাজার বার শুনেছি। হয়তো আপনার চিন্তার মধ্যে সত্য আছে… তাতে আমার কিছু যায় আসে না। ভুলে যাবেন না আমি বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানীর কাজ একটু আলাদা হওয়াই স্বাভাবিক। আর আপনি কেন, জনসাধারণ সবাই জানে যে, আমি এক ভয়ঙ্কর অস্ত্রের ওপরে কাজ করছি। বলা যায় এটাই শেষ অস্ত্র। আমি কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, আমার গবেষণায় বিজ্ঞানের অগ্রগতি হয়েছে আর অগ্রগতির বাই-প্রোডাক্ট হিসাবে অস্ত্রের জন্ম হয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারের পরে কী হবে সে কথা ভাবা আমার কাজ নয়। শুধু আবিষ্কার করাটাই আমার একমাত্র কাজ।

–কিন্তু মি. গ্রাহাম, মানব সমাজ কি এই আলটিমেটর্ন অস্ত্র সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল? আর মানুষই যদি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তবে বিজ্ঞানের অগ্রগতি কোন কাজে লাগবে?

গ্রাহামের মুখমণ্ডল থমথমে হয়ে উঠল।

-–মি. নিয়েমান্ড। আমার বিশ্বাস, আমার চিন্তার কথা একটু আগেই বলেছি… সেটাই আমার শেষ কথা।

ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন নিয়েমান্ড।

–বেশ, আপনি যদি আলোচনা না করতে চান তবে আমি আপনাকে জোর করব না। নিজের কপালে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে আবার বললেন– তাহলে আমি চলে যাচ্ছি ড. গ্রাহাম… আমি শুধু অবাক হচ্ছি… না থাক… আপনি আমাকে চা না কফির কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন… তাই না?

মুহূর্তের মধ্যে বিরূপ মনোভাব দূর হয়ে গেল।

গ্রাহাম বললেন, নিশ্চয়। কী নেবেন বলুন? হুইস্কি চলবে?

–বাঃ, হুইস্কি নিশ্চয় চলবে।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দু’গ্লাস হুইস্কি নিয়ে এসে টেবিলে রাখলেন গ্রাহাম। দুটো করে বরফের টুকরো ছেড়ে দিলেন গ্লাসের মধ্যে। এই অবসরে নিয়েমান্ডও হ্যারির ঘর থেকে ঘুরে এলেন। হ্যারিও ঘরের মধ্য থেকে গুড নাইট বলে বিদায় সম্ভাষণ জানাল।

হুইস্কির গ্লাস অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। দ্বিতীয় গ্লাসে নিয়েমান্ড সায় দিলেন না। বিদায় নেবার প্রাক্কালে বুললেন– গ্রাহাম, আপনার বিনা অনুমতিতে হ্যারির জন্যে একটা উপহার এনেছিলাম। আপনার হুইস্কি ঢালার অবসরে আপনার পুত্রকে সেটা দিয়ে এসেছি… আশা করি আপনি কিছু মনে করবেন না!

–না না… কোনও কিছু মনে করিনি মি. নিয়েমান্ড।

অনেক ধন্যবাদ… গুড নাইট।

গ্রাহাম দরজা বন্ধ করে দিলেন। হল ঘর পার হয়ে হ্যারির ঘরে ঢুকলেন।

–এই দেখ, আমি এসে গেছি। এবার গল্প পড়ে শোনাব…

মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠল। অনেক কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে পুত্রের বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালেন।

–হ্যারি… আমাকে একটু দেখতে দেবে? নিঃশব্দে পিতার হাতে উপহারটা তুলে দিল হ্যারি। উপহারটা হাতে নেবার সঙ্গে সঙ্গে সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। শীতল স্রোত বয়ে গেল মেরুদণ্ডের মধ্যে দিয়ে।

মনে মনে ভাবলেন, একমাত্র উন্মাদই পারে নির্বোধ শিশুর হাতে গুলি ভরা রিভলবার তুলে দিতে।