৫. লিপির সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট

গত পরশু। সময় রাত্রি আটটা বাজতে পাঁচ। স্থান চৌরঙ্গি এলাকা। লিপির সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল, পৌনে সাতটা থেকে সাতটার মধ্যে বাস স্টপে আসবে। আজকের সন্ধেটাই আমাদের চলে যাবার আগে শেষ দেখা। আমি পায়চারি আর ছটফট করে মরছিলাম। আমার সামনে দিয়ে একটা মেয়েও বোধ হয় চলে যেতে পারেনি, প্রত্যেকের মুখের দিকে দেখেছি। লিপি এল হন্তদন্ত ভাবে, আটটা বাজতে পাঁচে। কয়েক পা হেঁটেই একটা রেস্তোরাঁ, দ্বিতীয় শ্রেণীর দেশীয় বলা যায়। পরদা ঢাকা কেবিনে লিপির চোখ চক চক করছে, একটা কীসের হালকা গন্ধ লিপির নিশ্বাসে। একেবারে অচেনা না, মদ। লিপির পক্ষেও এটা প্রথম না। লিপির মা ড্রিংক করে, এটা ওর আরও তিন ভাই বোন ছাড়া, বাবাও জানেন এবং ভোদকামুখো লোকটিও ড্রিংক করেন–মানে ওর বাবা। ভাই বোনদের মধ্যে একমাত্র লিপি-ই, যত দূর জানি, ওর মায়ের ইচ্ছা অনুসারে। এ সম্বন্ধে আমি রিজিড–অর্থাৎ করাল গ্রাসে পতিত হওয়া বা একটা ভয়ংকর কিছু মনে করি না, মদ সম্পর্কে এক একজনের যেমন থাকে, প্রায় একটা ধর্মীয় গোঁড়ামির মতো, সরাব হারাম হ্যায়। মদ খেয়ে কোনও আনন্দ ঠিক আমার হয় না। খেতে ভালবাসি না, কিন্তু খাইনি কখনও, আর খেলে খানিকটা ভূতগ্রস্ত বলে মনে হয় নিজেকে। তবে লিপি না খেলেই আমি খুশি হই।

লিপি: কী, ওরকম করে কী দেখছ?

আমি: না, মানে—

লিপি: (ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে) দ্যাখ না, খুকুদিটা ছাড়ল না।

আমি: খুকুদি?

 লিপি: পরিমলদার ফিয়াসি।

আমি: (চমকে, ভয় পেয়ে) খুকু জানে নাকি আমাদের চলে যাবার কথা?

লিপি: (রুমাল দিয়ে চেপে চেপে ঘাম মোছে) মাথা খারাপ, ও তো একটা গেজেট। তা নয়, বাড়ি থেকে বেরিয়েই খুকুদির সঙ্গে দেখা, কিছুতেই ছাড়ল না, পেছনে পেছনে এল। ওরে সঙ্গে আরও দুটো মেয়ে ছিল। ওরা সবাই ঠিক করল, এয়ারকনডিশনড তুষারে গিয়ে দোতলায় বসে লাইম উইথ জিন খাবে। খুকুদি আবার বলল, চুক চুক করে। খুকুদির কাছে আমি ধরা পড়তে চাই না, তাই খানিকক্ষণ বসে, একটু খেয়ে চলে এলাম। খুকুদি বেশ আছে।

আমি: (বিমর্ষ। পরিমলের কথা ভেবে দুঃখিত। পরিমল কী করে এরকম মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে, ঘোরে, আমি কিছুই বুঝি না। লিপিও খুকুকে বেশ পছন্দ করে) আমি তো তা জানি না, আমার ভীষণ ভয় উদ্বেগ হচ্ছিল। তুমি আরও দেরি করলে আমার বমি হয়ে যেত।

লিপি: (আমার গালে চিমটি কেটে) খোকন। (আমার ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে চুমো খেল, যেটা প্রায় ঘটে না–অর্থাৎ লিপি আগে খায় না, আমি খেলে খায়।) হয়েছে? ভয় আর উদ্বেগ কেটেছে? আমার মুখের মধ্যে বমি করে দেবে না তো। (আবার চুমো খেল, জিভে জিভ ঠেকে যাবার সময়ে, আমার জিভে একটা কী চলে এল।) হয়েছে তো?

আমি: (কুচিটা চিবোতে চিবোতে মুখে আঙুল দিয়ে বের করে নিয়ে এলাম, একটা ছোট ভোঁতা মাছের কাঁটার মতো চিকেনের হাড়।)

লিপি: কী ওটা?

আমি: তোমার মুখ থেকে এল।

লিপি: (আমার আঙুল থেকে নিজেই ফেলে দিল) নিঘিন্নে কোথাকার। জান, যতই সময় এগিয়ে আসছে, আমি ততই একসাইটেড হয়ে উঠছি।

আমি: আমিও।

লিপি: তোমার আবার কী, তোমার তো কারোকে ভয় নেই। তোমার মা বাবা-(হঠাৎ চোখে রাগ ফুটল) তোমার বোন খুকুর মুখে আমি ইয়ে করে দিই। কালকের মেয়ে ও, হাফ ডজন ছেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে বলে নিজেকে কী ভেবেছে। আমাকে যেখানে সেখানে যা তা বলে বেড়াচ্ছে। তোমার মায়ের আর ওর মুখ আমি একদিন ভেঙে দেব।

আমি: (মনে মনে, কী খারাপ কথা, খুকুর মুখে লিপি ইয়ে করবে, মায়ের মুখ ভেঙে দেবে, এর কোনও জবাব আমি দিতে চাই না, ঝগড়া লেগে যাবে, প্ল্যান ভেস্তে যাবে। মা আর খুকুর মুখে লিপির বিষয়ে আমিও অনেক খারাপ খারাপ কথা শুনেছি, কিন্তু তখন তাঁদের যেমন ভাল লাগে না, লিপিকেও তেমনি না। এখন এই রেগে ওঠা লিপির মুখ, একেবারে আলাদা, যেন চেনা-ই যায় না। এরকম দেখলেই আমার মনে হয়, মানুষের অনেকগুলো মুখ, পরতে পরতে ঢাকা, এক এক সময় এক একটা ফুটে ওঠে।)।

লিপি: কী হল, কথা বলছ না যে?

 আমি: কী বলব বলল, এ সময়ে এ সব বিষয় নিয়ে কথা বলবার সময় আছে কী?

লিপি: কিন্তু সত্যি আমার রাগ হয়ে যায়, এমন সব কথা বলে আমার নামে, বিশেষ করে তোমার ওই বোনটা। এর মধ্যেই তো পোঁদ পেকে বরানগর চলে গেছে, (আজ পর্যন্ত এ কথাটার মানে জানতে পারলাম না, পাকেই বা কী করে, আর বরাহনগরেই কেন বিশেষ করে যায়) একটি পাকা ছেনাল হবে তোমার বোনটি, আগেই বলে দিচ্ছি।

আমি: (মনে মনে, এটা কি ননদ সম্পর্কে ভ্রাতৃবধূর ভ-ভ-ভ-ভবিষ্যৎবাণী, বুঝতে পারছি না, তবে এটা বুঝতে পারছি, লিপি যতটা কম খেয়ে এসেছে বলছে, ততটা কম না, ও বেশ উত্তেজিত, কথা বলার ঝোঁক, চোখ বেশ লাল। এ লিপি আমার খুব বেশি চেনা না, এক-আধবারের দেখা। ওর উচিত না, আমার মা বোন সম্পর্কে এরকম বলা, ওর ভাষাগুলোও ভদ্রোচিত না। আমি যদি ওর মা সম্পর্কে এরকম বলি, তা হলে আর রক্ষে থাকবে না, অথচ ওর–)

লিপি: চুপ করে রইলে যে?

আমি: কী বলব বলল। আর মাত্র একটা দিন আমাদের হাতে। আর সে একটা দিন–মানে, আগামীকাল আমরা কেউ কারোর সঙ্গে দেখা করছিনা, একেবারে পরশু দুপুরে আমরা চলে যাব। এখন মা আর বোনের বিষয় নিয়ে কথা বলবার মতো মনের

লিপি: হ্যাঁ হ্যাঁ, সত্যি, আমি সে কথাই তো বলছিলাম, জান, আমি ভীষণ একসাইটেড ফিল করছি। পরশু দিন বেলা একটা, ঠিক জায়গাতে থেকো কিন্তু।

আমি: ঠিক জায়গাতেই থাকব। ট্রাম রাস্তার ওপারে, ইস্টার্ন নার্সি হোমের উলটো দিকে।

 লিপি: হ্যাঁ। আর পরিমলদাকে সব বলে দিয়েছ তো।

আমি: দিয়েছি। কাল ও তোমাদের বাড়ি যাবে, দুজনে আর একটু কথাবার্তা বলে নিয়ো।

লিপি: (হাসি, চোখে ঝিলিক) তারপরে তুমি হয়তো দেখলে, লিপি আর এল না।

আমি: (বুক ধকধক) কেন?

 লিপি: (হেসে আমার ঘাড়ে মুখ, আমি ওর মুখ দেখতে পাচ্ছি না) যদি মরে যাই?

আমি: তার মানে?

লিপি: (আমার ঘাড়ে মুখ চেপে, আমার শরীরে শরীর ছুঁইয়ে শরীর!) বাহ, আমি আজ রাত্রে বা কাল সকালে মরে যেতে পারি না?

আমি: (লিপির মুখটা আমার দিকে টেনে তুলি, ওকে এখন দারুণ সুন্দর লাগছে না, তুমি কিছুতেই মরতে পার না।

লিপি: (হাসতে হাসতে) তা হলে ধর, মা হয়তো সব জেনে ফেলল, তারপরে আমাকে কোথাও গুম করে রাখল।

আমি: (লিপির মুখের দিকে চেয়ে থাকি। লিপি খিলখিল করে হেসে ওঠে, অসম্ভব সুন্দর লাগছে ওকে। বগলের কাছ থেকে ঘামের ভেজা ছাপটা বুকের পাশ দিয়ে দিয়ে এগিয়ে এসেছে।) কী করে জানবে তোমার মা?

লিপি: তা কি বলা যায়। কোনওরকমে হয়তো জেনে ফেলল, জান তো দেয়ালেরও কান আছে। আর মা যদি জানতে পারে…(লিপির মুখ শক্ত হয়ে ওঠে, সুন্দর মুখটা অন্যরকম দেখায়) আর আমাকে যদি আটকাতে চায়, তা হলে সাংঘাতিক কাণ্ড হবে। মাকে আমি ঘেন্না করি, ভীষণ ঘেন্না করি, ওকে আমার ছিঁড়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা করে। আজ না হোক, একদিন ওর সঙ্গে (মায়ের) লাগবেই আমার…

আমিঃ লিপি, এ সব কথা থাক, আর একটা দিন

লিপি: (হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে আমার বুকে মুখ চেপে ধরল) না, তুমি জান না, মা আমার জীবনটা নষ্ট করে দিচ্ছে। মা আমাকে একটা বেশ্যা তৈরি করতে চায়। আমি যা করি, ওর (মায়ের) তাঁবে থাকব, কেন। ওর কথায় আমি সব করব কেন।

আমি: (একটা অস্পষ্ট ভয় অথচ মনে মনে খুশি, ওর মাকে গালাগাল দেবার জন্য। ওর মুখটা তুলে, গালে ঠোঁটে চুমো খাই, গলায় নাকে চোখের পাতায় খাই, চোখের জল চেটে খেয়ে ফেলি।) আর তো তোমাকে মায়ের তাঁবে থাকতে হবে না। কালকের দিনটা, তারপরেই তো আমরা চলে যাব, লিপ, লিপ। (লিপি আমাকে জোরে চেপে ধরে, দুজনের ঠোঁট জিভ মিলমিশ করে থাকে।)

.

লিপির সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা, আর শেষ কথা, এবং সে সব কথা থেকে কী মনে হয়। ইস্টার্ন নার্সিং হোমের উলটো দিকে আমি অপেক্ষা করব, এটা স্পষ্ট বলা ছিল, যদি বা, ইস্টার্ন নার্সিং হোমের ঠিক উলটো দিকেই দাঁড়িয়েও, নার্সিং হোমের দিকে আমার মোটেই লক্ষ ছিল না, কিন্তু তাতে লিপি বা পরিমলের ভুল হবার কোনও কারণ নেই। এখন ভাববার বিষয় হল, লিপির কয়েকটা কথা, ধর লিপি এল না বা হঠাৎ মরে যেতে পারি বা হয়তো গুম করে রাখল বা মাকে ঘেন্না করি অথবা মা আমাকে একটা বেশ্যা তৈরি করতে চায়। তারপরেই কান্না। এর থেকে কী মনে হতে পারে, অর্থাৎ কী একটা সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে। মা ওকে গুম করে ফেলতে পারে, মা ওকে বেশ্যা তৈরি করতে চায় (ভাবা যায় না), সমস্ত ব্যাপারটাকে এই কথার মধ্যে কেন্দ্রীভূত করলে এবং সেই সঙ্গেই লিপির কেঁদে ওঠা, অর্থাৎ ভয় আর অসহায়তা, সব মিলিয়ে একটা–একটা যাকে বলে, একটা ভয়াবহ সম্ভাবনাই কি জেগে উঠছে না। না না, আমার বুকের মধ্যে এখন এরকম করলে হবে না, শিরদাঁড়াটাকে দম আটকে অনড় রাখা দরকার। এ রকম ভয়ানক কিছু ঘটেছে কি না ভাববার আগে এ কথা মনে রাখা উচিত, গতকাল লিপি সারা দিন বাড়িতেই ছিল, এমনকী সন্ধেবেলাও বাড়ি থেকে বেরোয়নি। পরিমলের মুখ থেকেই শুনেছি, এবং গতকাল সন্ধেয় পরিমলের সঙ্গে লিপির কথাও হয়ে গিয়েছে, কী ভাবে কখন ওরা বেরিয়ে আসবে। তা হলে, যা ঘটবার, তা আজ সকালের দিকেই ঘটে গিয়েছে। কিন্তু পরিমল? পরিমল কোথায় গেল? একটা কোনও খবর আমাকে দেওয়া উচিত ছিল। এখন আমি বেশ যুক্তি দিয়েই বুঝতে পারছি না না না, কোনও যুক্তিই খাটছে না, কারণ, লিপি আমার সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলে চিঠি লিখে রেখে গিয়েছে। তা হলে কী দাঁড়াতে পারে ব্যাপারটা।

না, কোনও কিছুই. স্থির করা যাচ্ছে না। সেই একই বিভ্রান্তি, অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা। একটা ঠ্যাঙ আমার কোলের ওপর এসে পড়ল। কিন্তু পিছনে, কোমরের কাছ থেকে ঠ্যাঙটা সরে গিয়েছে। আর দেরি না, আমি তাড়াতাড়ি চিত হয়ে শুয়ে পড়লাম। কয়েক বার থানার ঘণ্টা বেজেছে। কবার কতগুলো ঘন্টা বাজিয়েছে, খেয়াল করিনি। তা হলে এখন একটাই ভাবনা, কাল বা পরশু-পরশুই বোধ হয় আমাকে কোর্টে নিয়ে যাবে, জামিন পাবার কোনও আশা নেই, কিন্তু আমি কোর্টে দাঁড়িয়ে নিশ্চয় এ কথা বলতে পারি, কমরেড–থুড়ি, য়ুর অনার, আপনি আমাকে যে কোনও শাস্তি দিতে চান দিন, তার আগে লিপিকে উদ্ধারের জন্য পুলিশকে অর্ডার দিন, আপনি বিশ্বাস করুন, আমি লিপিকে নিয়ে নাটুকে, একদম নাটুকে ব্যাপার, এ সব কথা হয়তো আমাকে বলতেই দেবে না। তবে, যেমন করে থোক, বিচারককে আমার সব কথা জানানো দরকার। ইনস্পেক্টর যে আমাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে এসেছে, সে বা তারা তো পাঁকে পড়া শুয়োরের মতো ঘোঁৎ ঘোঁৎ করবেই, তাদের ওপর কোনও ভরসা নেই, অতএব…ঘুম আসছে, আশ্চর্য, চেষ্টা করেও ঘুমটাকে আটকে রাখা যাচ্ছে না, অতএব পুলিশের ওপর ভরসা না করে…ঘুম আসছে, আশ্চর্য কেন, আমি তো ঘুমোতে চাইনি, তথাপি…এখন ধৃতির মুখটা কেন আবার ভেসে উঠছে, কী রকম করে বলছিল, ধৃতিময়ী মুখার্জি, সাংঘাতিক…আশ্চর্য, ঘুম আসছে, এবং এখনও আমার কোলের ওপর একটা ঠ্যাঙ।

.

ঘুম ভাঙল, উৎকট দুর্গন্ধ। আমি ছাড়া সবাই জেগে গিয়েছে, ল্যাট্রিনের ফাঁকটার কাছে কয়েকজন ভিড় করে আছে। চমকে উঠে ভাববার কিছু নেই, আমি জানি, কোথায় আছি। আমি উঠে গরাদের দরজার দিকে তাকাতেই একজন নতুন পাহারাদারকে দেখতে পেলাম, আর সে আমাকে আঙুল নাড়িয়ে ডেকে বলল, নাস্তা কর লো।

নাস্তা, মানে সকালবেলার জলখাবার। আমি উঠে দরজার কাছে গেলাম। পাহারা দরজা খুলে দিল। বাইরে গিয়ে দুর্গন্ধের হাত থেকে বাঁচলাম। দেওয়ালের কাছে, কলের জলে মুখ ধুয়ে, কানে মাথায়ও একটু জল ছিটিয়ে নিলাম। কাল রাত্রে যে লোকটা খেতে দিতে এসেছিল, সেই দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের কাছে। বড় মোটা বাদামি রঙের এক ধরনের দেশি বিস্কুট আর ভাঁড়ে করে চা। জালের ঘেরা থেকে দিনের আলো দেখা যাচ্ছে, রোদ এবং উঁচু বাড়ি দেখতে পাচ্ছি, এমনকী বাস ট্রামের শব্দও শুনতে পাচ্ছি। চা খেতে খেতেই দেখলাম, কয়েকজন কনস্টেবল এল, নাম ধরে লোক ডেকে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে চলে গেল। ঘরটা ফাঁকা হচ্ছে। যে লোকটা খেতে দেবার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল, নোংরা জামা গায়ে ময়লা ধুতি পরা, সে জিজ্ঞেস করল, আমি আরও চা নেব কি না। ভাঁড়টা বাড়িয়ে দিলাম। চেহারা আর পোশাক দেখে মানুষের বিচার হয় না, আমি লোকটার কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে উঠলাম। বুটের শব্দে চোখ তুলে দেখলাম, সিঁড়ির পাশের ফালি বারান্দার ওপর দিয়ে পাণ্ডে আসছে। এই সময়ে আবার কয়েকজন কনেস্টবল এল, কাগজ দেখে, নাম ধরে ধরে ডেকে, কয়েদিদের বাইরে নিয়ে এল, কিন্তু কোমরে দড়ি বাঁধল না, দুজন দুজনকে এক-একজন দু হাতে ধরে নিয়ে চলে গেল। আমার মনে হল, এখন হাজতের চেহারাটা যেন বদলে গিয়েছে। আজকের সকালের এই সব মানুষেরা যেন গতকাল রাত্রের মানুষেরা নয়। রাত্রি, অন্ধকার, আবছায়া আলো, এ সব অনেক কিছুর চেহারাই বদলে দিতে পারে। এখন দিনের আলোয় সমস্ত চেহারাটাই বদলে গিয়েছে, কেবল দুর্গন্ধের তীব্রতা ছাড়া। পাণ্ডে আমার সামনে এসে একটা সিগারেট আর দেশলাই বাড়িয়ে দিল। যুগ যুগ জিও। চায়ের পরেই সিগারেট, আর, সেইরকম কয়েকটা মুহূর্ত আসছে বোধ হয়।

সিগারেট ধরিয়ে, কয়েক টান দিতে না দিতেই, একজন ইনস্পেক্টর-মনে হল ইনস্পেক্টরই, সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল। আমাদের দিকে না এসে, সোজা পাহারাওয়ালার কাছে গিয়ে যেন কী বলল। পাহারাওয়ালা গরাদের দরজার মধ্যে উঁকি দিয়ে চেঁচিয়ে ডেকে উঠল, নারাইন হালদার কোন আছে।

নারাইন হালদার। নীরেন না? পাণ্ডে আমার দিকে ফিরে তাড়াতাড়ি বলল, সিগ্রেট ফেক দো।

আমি তাড়াতাড়ি সিগারেট ফেলে দিলাম। পাণ্ডে বলে উঠল, তুমকো মাংতা। তুমকো নাম নারাইন হালদার হ্যায় না?

আমি বললাম, নীরেন হালদার।

পাণ্ডে ঘাড় দুলিয়ে বলল, ওহি একই হ্যায়। স্যার, ও ইধর হ্যায়।

ইনস্পেক্টরের দিকে তাকিয়ে বলল, এবং ইনস্পেক্টরও আমার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এল, জিজ্ঞেস করল, নীরেন হালদার?

আমি ঘাড় নেড়ে সায় দিলাম। আবার কোনও একটা বিপদ ঘনিয়ে আসছে বোধ হয়, তা না হলে, সিগারেটে সবে টান দিতেই, লোকটা হঠাৎ এল কেন। লোকটা আমার আপাদমস্তক দেখল, বেশ একটা রুক্ষ অসন্তুষ্ট দৃষ্টিতে। বলল, লোকেশ্বর চক্রবর্তী এসেছে, ওকালতনামা সই করাতে। নীচের অফিসে এক বার যেতে হবে।

কিছুই বুঝতে পারলাম না, লোকটা কী বলছে। ওকালতনামা মানে, যতদূর জানি, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, কিন্তু আমার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক। লোকেশ্বর-হঠাৎ আমার মস্তিষ্ক আর চিন্তার মধ্য দিয়ে যেন বিদ্যুৎ হেনে গেল। লোকেশ্বর চক্রবর্তী মানে, সেই লোকেশ্বর চক্রবর্তী, এম এ বি এল উকিল, যাকে আমরা তোকদা বলি–মানে, বলতাম। সে তো একটা অত্যন্ত বাজে লোক, অ্যান্টিপার্টি, অথচ বিশ বছর আগে নাকি বামপন্থী রাজনীতি করত। এখন কোনও পার্টিই করে না, কিন্তু গালাগাল দেয় সবাইকে। ক্রিমিনাল ল্যইয়ার হিসেবে বেশ নামডাক আছে, তবে যাকে বলে সেই মদে আর মেয়েমানুষে ডুবে থাকা, তা-ই নাকি আজকাল থাকে। দুর্মুখ লোক, অনেক পড়াশোনাও নাকি আছে, আমি নিজে তার কিছুই জানি না, কেন না, লোকদার সঙ্গে আমার কোনওদিন তেমনভাবে কোনও কথা হয়নি। আমাদের অঞ্চলে সবাই লোকদা বলে, আমিও বলি, কয়েক বার পার্টির চাঁদাটাদাও চাইতে গিয়েছি, চাঁদা দিয়েছে, তবে অনেক কথা শুনিয়ে। লোকটাকে কেউ ঘাঁটাতে চায় না, শুধু তার কথার জন্যই, কিন্তু সেই লোক, মানে লোকেশ্বর চক্রবর্তী, লোকদা, আমার কাছে কেন এসেছে!

ইনস্পেক্টর সিঁড়ির কাছে চলে গিয়ে, পিছন ফিরে, ভুরু কুঁচকে রাগ রাগ ভাবে আমার দিকে ফিরে বলল, কী হল, নীচের অফিসে আসতে বললাম যে?

পাণ্ডে সঙ্গে সঙ্গে আমার ঘাড়ে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, যাও না।

যাবার জন্য আমি উঠে দাঁড়ালাম, কিন্তু ব্যাপারটা মাথায় কিছুই আসছে না, আবার একটা অস্থিরতা, অজানা অনিশ্চয়তার ভয় আমার মধ্যে জাগছে, অথচ আমাকে লোকেশ্বর চক্রবর্তী পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সই করাতে এসেছে। ইনস্পেক্টর তো তা-ই বলল। ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারছি না, নতুন কোনও বিপদ ঘটতে যাচ্ছে কি না, কে জানে। আমি ইনস্পেক্টরের পিছনে পিছনে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলাম। গতকালের সেই ঢাকা বারান্দা দিয়ে গিয়ে, আমাকে অন্য একটা ঘর নিয়ে গেল, দেখলাম, হ্যাঁ ঠিক, লোকেশ্বর চক্রবর্তীই তার সেই ছ ফুট লম্বা শরীরটা নিয়ে একটা চেয়ারে বসে আছে। সেই বড় বড় ড্যাবা লাল চোখ, চোখা নাক, আর তামার পাত্র অনেক দিন উনুনে পুড়লে যেরকম রং হয় সেই রকম রং। সেকেলে ধরনের বড় বড় চুলগুলোও কেন তামাটে, আমি বুঝতে পারি না, যে-চুলগুলো ঘাড়ে এবং কপালে ছড়িয়ে পড়ে আছে, হয়তো মাথার ওপরে পাখার বাতাসেই। সাদা শার্টের শক্ত কলারে টাইয়ের নট বাঁধা, তার ওপরে কালো কোট। সামনের টেবিলে বড় একটা ব্যাগ। আমি ঘরে ঢুকতেই, একটা চোখ বুজে, কী যেন ইশারা করতে চাইল, যে ধরনের ইশারাকে মোটেই ভাল বলা চলে না, অনেকটা কী বলে, ভদ্রলোকেরা যাকে ভালগার বলে, সেইরকম, তারপরেই লোকেশ্বর উকিল তার স্বভাবসিদ্ধ গমগমে বাজখাঁই গলায় বলে উঠল, এই যে নীরেন, কী যে করো তোমরা, (আবার এক চোখ বুজে ইশারা) এসো, এদিকে এসো, এই কাগজটায় এখানে সই করে দাও। কাম হিয়ার।

আমি বুঝতে পারলাম, লোকদা আমাকে একটা কিছু ইশারা করতে চাইছে, যা পুলিশকে জানানোর ইচ্ছা নেই। আমি টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলাম। তার মধ্যেই আবার লোকদা বলে উঠল, বাড়িতে বলে এলেই তো সব হয়ে গেল না, একটা চিঠিতে সব কথা জানিয়ে রেখে আসা উচিত ছিল। তারপরে আবার খবর পাঠিয়েছ, কী যেন সেই মেয়েটার নাম, ধীরা, ধীরা মুখার্জিকে দিয়ে। কিন্তু আইন তো ও সব শুনবে না। যাই হোক, আমি আজই তোমার বেল মুভ করছি, তুমি সইটা করে দাও।

ইনস্পেক্টর নোকটা ঘরের অন্য এক পাশে চলে গেল। আমি তোকদার একটা কথাও বুঝতে পারছি না। আমি আবার ওর বাড়ি গেলাম কখন, কাকেই বা কী বলে এসেছি, এবং ধীরাধীরাই বা কে। আমি বললাম, ধীরা মানে?

আরে ওই তোমাদের বাড়ির নীচের তলায় যারা ভাড়া থাকে। পেন-এর ঢাকনা খুলতে খুলতে লোকদা বলল। ধীরা, মানে ধৃতি। ধৃতি গিয়ে লোকেশ্বর চক্রবর্তীকে খবর দিয়েছে আমার বেল মুভ করার জন্য। সমস্ত ব্যাপারটাই আমার কাছে অবিশ্বাস্য আর অদ্ভুত মনে হচ্ছে। কোনও ভাবনার সঙ্গেই কোনওটা মিলছে না। লোকদার নিচু গোঙানো স্বর শুনতে পেলাম, মেয়েটা সত্যি তোমার সঙ্গে যায়নি তো?

আমি প্রায় বাজে করুণ সুরের মতো গলায় বলে উঠলাম, বিশ্বাস করুন, আমি

আমার কথা শেষ হবার আগেই তোকদার গলাটা গমগম করে বেজে উঠল, যা বলছি তা-ই করো আগে, এখানে নাম সই করে তারিখ বসিয়ে দাও। তারপর হাজতে গিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকো। তোমার কোনও কিছু কনফেস করার নেই, ডিনাই করারও নেই। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে পরিষ্কার বলে দেবে, যা বলবার তা তোমার ল্যইয়ার বলবে, বুঝেছ?

 তা এখন খানিকটা বুঝতে পারছি, কিন্তু মূলে সমস্ত ব্যাপারটাই আমার কাছে বিভ্রান্তিকর বলে মনে হচ্ছে। লোকেশ্বর চক্রবর্তী এখন আর পলেটিকাল ম্যান না, কিন্তু আমাদের পার্টির বিরুদ্ধে খিস্তি করে, অর্থাৎ এখন আমি যে-পার্টিতে আছি। অবিশ্যি সব পার্টিকেই লোকদা খিস্তি করে। লোকদা আমার বেল মুভ করলে সেটা কোনও পার্টি বিরোধী কাজ হবে কি না, কিছুই বুঝতে পারছি না। এটা আবার কোনও রকমের পার্টির ফাঁক নয় তো? কারোকে দিয়ে লোকদাকে ম্যানেজ করে পাঠায়নি তো, পরে যাতে বলতে পারে, একটা অ্যান্টি-পার্টি এলিমেন্ট, মাতাল চরিত্রহীন, তা সে যত বড় ক্রিমিনাল ল্যইয়ার-ই হোক, তাকে দিয়ে কেস করানো মানেই, পার্টির শত্রুর সঙ্গে হাত মেলানো। অথচ আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, ধৃতি–মানে ধৃতি কী করে লোকদার কাছে গেল, আমার বেল মুভ করবার জন্য পাঠাল। না, ধৃতি একলাই বোধ হয় আমার মাথাটা খারাপ করে দিতে পারে। ইতিমধ্যে লোকদা আপন মনে বলে চলেছে, হয়রানি কি কম। আমি তো ভেবেছি, তোমাকে লোকাল থানায় রেখেছে। সেখানে গিয়ে দেখি, তুমি নেই। সকলেই তো বেঁড়ে ওস্তাদ, কেউ মুখ খুলবে না। আরে আমি হলাম লোকেশ্বর চক্কোত্তি, তোমরা বলবে না, তোমাদের বাবা বলবে। তারপরে অফিসার ইনচার্জ এসে আমাকে বলল, জায়গার অভাবে তোমাকে লালবাজারে পাঠানো হয়েছে।

তারপরেই আবার লোকদার গলা নেমে গেল, যেন প্রায় চুপি চুপি বলল, লিপি কতখানি নাবালিকা, তা আমি কোর্টে দেখিয়ে ছাড়ব। আমি ওর বার্থ সার্টিফিকেটের জন্য লোক লাগিয়ে দিয়েছি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি জানেন, লিপি কোথায়?

লোকদা তার বড় বড় লাল চোখ জ্বলন্ত করে আমার দিকে তাকাল, বলল, এটুকু জেনে রাখ, সে যেখানেই থাক, খুব ভাল আছে। তুমি আগে সই করে দাও। আর হ্যাঁ, আজ যদি বেল পেয়ে যাও, তা হলে আফটার লাঞ্চ, মানে ওবেলা, তা না হলে কাল। কোথাও তোমাকে একটি কথাও বলতে হবে না। তুমি খালি বলবে আমি নির্দোষ বুঝেছ?

তা বুঝতে পারছি, কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটার জট ছাড়ানো মুশকিল। লোকদা হঠাৎ আমার উপকার করার জন্য এগিয়ে এল কেন, এবং তাও এত তাড়াতাড়ি। মাত্র তো একটা রাত গিয়েছে। ধৃতি। হ্যাঁ, ধৃতির কথা লোকদা বলেছে। ধৃতির সঙ্গে লোকদার কী সম্পর্ক, ওর কথাতেই এত বড় একটা ডাকসাইটে ক্রিমিনাল ল্যইয়ার আমার হয়ে লড়তে এগিয়ে এল কী করে? টাকা পয়সার ব্যাপারও তো আছে, সে সব কে দেবে?

কী হল, কোথায় সই করতে হবে, বুঝতে পারছ না? এখানে, এই এখানে।

না, এখন আর এভাবে কলম হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ভাববার সময় নেই আমার। আমার মন বলছে, ঘটনা যা-ই ঘটুক আমার বেল পাওয়া দরকার, আমাকে হাজতের বাইরে যেতে হবে। পরিমলের সঙ্গে দেখা করতে হবে। লিপিকে-লিপি কোথায় কী অবস্থায় আছে এখন কে জানে–ওকে খুঁজে বের করতে হবে। অফিসে তিন দিনের ছুটি নেওয়া আছে। আমি নাম সই করে তারিখ বসিয়ে দিলাম।

লোকদা বলে উঠল, গুড, গুড বয়। বাট মোস্ট আনফরচুনেট য়ু আর! তা না হলে এ সব ভোগান্তি পোয়াতে হত না।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, পরিমলের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে?

লোকদা ঘাড় নেড়ে গমগম করে বলল, আই ডোন্ট নো য়ুর পরিমল, ইভন য়ুর ফাদার, অ্যান্ড আই থিংক য়ুর ফাদার ইজ এ মোস্ট ক্যালাস ম্যান। আই নো ওনলি য়ু, অ্যান্ড আই উইল সি দ্যাট সুরূপা ঘোষাল। সে এখনও কতটা কচি খুকির মা আছে, সেটা আমি দেখব। ও কে বয়, বায় বায়।

লোকেশ্বর চক্রবর্তী চলে গেল আর একটি কথাও না বলে, আর আমার মনে পড়ে গেল, সুরূপা হল লিপির মায়ের নাম, এবং কোনও এক সময়ে যেন শুনেছিলাম, সুরূপা ঘোষালের সঙ্গে এই লোকেশ্বর চক্রবর্তীর নাকি–ওই লোকে যা সব বলে, তা-ই ছিল। ইনস্পেক্টর আমার সামনে এসে দাঁড়াল এবং দাঁড়াবার ভঙ্গি আর মুখের ভাব দেখেই বুঝতে পারলাম, আমাকে কাস্টডিতে গিয়ে ঢুকতে হবে। কোনও কথা না বলেই আমি ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। ওপরের বারান্দায় আসতেই, গরাদের দরজা খুলে আমাকে ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। আমার মনে হল একটা খালি বাসায় এসে ঢুকলাম। মাত্র তিন জন লোক, প্রায় তিন কোণে বসে আছে। এদের একজনকেও গতকাল রাত্রে দেখেছি বলে মনে করতে পারি না, অথচ ছিল নিশ্চয়ই। একজন খালি গায়ে, জামাটা মাথায় নিয়ে ঘুমোচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। তাকে একজন সাধারণ শ্রমিকের মতো দেখাচ্ছে। বাকি দুজনকে শহরের বস্তি অঞ্চলের মানুষদের মতো দেখাচ্ছে। কেউ কারোর সঙ্গে কথা বলছে না। আর একটা ব্যাপার, ঘরের মধ্যে দুর্গন্ধটা এখন অনেক কম। সিগারেটটা খেতে পারিনি। তা না হলেও এখন এ সময়টা আমার খারাপ লাগছে না। বারান্দার জাল দিয়ে এক টুকরো নীল আকাশ আমি দেখতে পাচ্ছি, আর শুনতে পাচ্ছি পায়রার বকম বকম ডাক। কোথা থেকে ডাকছে, বুঝতে পারছি না।

গতকাল দুপুরে চিলেকোঠার ছাদে পায়রাগুলোর কথা মনে পড়ছে–হ্যাঁ, তা হলে লিপির কথাটা আর এক বারনা, লিপি না, ধৃতির কথা ভেবে দেখা দরকার।

ধৃতির ব্যাপারটা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। ঝরনা–পরিমলের বোন বলেছিল, লিপি মোটেই নাবালিকা না। ধৃতি শুধু তা-ই বলেনি, আমাকে নার্ভাস হতেও বারণ করেছিল এবং সেটা আমার বাবা মা এবং ইনস্পেক্টরের সামনেই। ওকে আমি এখনও নাবালিকা বলেই জানি, অথচ ওর কথাবার্তা, ব্যবহার একটা সাবালিকাকেও হার মানায়। আমি ওর কিছুই বুঝতে পারছি না। হয় ভীষণ বদ–মানে খারাপ মেয়ে, আর না হয় মাথার গোলমাল আছে। অথবা দুটোই। আমি এরকম সেয়ানা বদমাইশ পাগল দেখেছি। যা খুশি তা-ই করছে, অথচ তলে তলে সব জ্ঞান আছে। কিন্তু ধৃতির কি তা আছে, মনে তো হয় না। ওকে আমার এক ধরনের পাগল বলেই মনে হয়। নিজেই জানে না, কী বলছে আর কী করছে। ও যে সেই আমার একটা ধারণা একেবারে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল, যাকে বলে নওল কিশোরীর পবিত্রতার ধারণা, সে সব কথা এখন আমার মনে পড়ছে। অবিশ্যি, এ ব্যাপারে আমার সাধুতা যে একেবারে খাঁটি, তা আমি বলতে চাই না, কেন না কয়েক বছর আগে, ওর সেই পবিত্র কিশোরী রূপ দেখে, যাকে বলে মুগ্ধ, আমি তাই হতাম। এখন ধৃতির গায়ে একটু বেশি মাংস লেগেছে, কয়েক বছর আগে ও বেশ ছিপছিপে ছিল। ডাগর চোখে যখন তাকিয়ে একটু লজ্জা-লজ্জাভাবে হাসত, আমার মনে হত, ওর পায়ের থেকে মাথা পর্যন্ত একটা পবিত্রতা যেন ঘিরে রয়েছে। ধৃতি জানত না, ওর সেই রূপ দেখে আমি একটা কবিতাও লিখেছিলাম, যদি বা, সেটা কোথাও ছাপা হয়নি, কারণ পরে আমার মনে হয়েছিল, ধৃতির রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে আমি কিশোরী রাধার বর্ণনা দিয়ে ফেলেছি। যেটা সহজেই সম্পাদকেরা ধরে ফেলতে পারত।

ধৃতি আমার কাছে পড়া দেখে নিতে আসত। আমিও মাঝে মাঝে নীচের তলায় ওদের ঘরে যেতাম, ওকে পড়া বলে দেবার জন্যই। অবিশ্যি তখন আমার মাথায় লিপি আছে, তথাপি, ধৃতিকে ভালই লাগত। তবে ধূতি পোশাক-টোশাকের ব্যাপারে বরাবরই একটু অদ্ভুত ধরনের। এমন অদ্ভুত ঢলঢলে জামা গায়ে দিত, আমি–আমি–মানে স্পষ্টই ওর কিশোরী বুক দেখতে পেতাম। তখন ব্রেসিয়ার ব্যবহার করত না, এখনও করে কি না আমার সন্দেহ আছে। ও তো আমার গায়ের কাছ ঘেঁষেই বসত, যখন তখন ছোঁয়াছুঁয়ি হত। আমার ভিতরে কেমন যেন টলটলিয়ে উঠত, হয়তো আমায় চোখমুখের ভাবই বদলে যেত, কিন্তু ধৃতির কিছুই হত না। ও যেন খুবই স্বাভাবিক আর নির্বিকার থাকত। তখন আমার মনেই পাপবোধ জেগে উঠত, আর লিপির মুখ মনে পড়ে যেত, চেষ্টা করতাম ধৃতির কাছাকাছি না যাবার। ধূতিই আসত। এই রকম চলতে চলতে একদিন কী হল, আমি–আমি ধৃতির পবিত্র গালে একটি চুমো খেয়ে ফেললাম। ধৃতি কিছুই বলল না, চোখ নামিয়ে হাসল, আর তাতে আমার আরও ভাল লাগল, সেই ভোলটেজের মতো, অন্যান্য দিকে যতই নিভে আসে, আর একদিকে ততই বাড়তে থাকে। আমি ওর স্বাভাবিক লাল ঠোঁটে চুমো খেয়ে ফেললাম। ধৃতি আমার দিকে এক বার তাকিয়ে, যেন লজ্জিত চোখ নামিয়ে হাসল, আর আমার কী রকম নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, ভিতরে যেন একটা যুদ্ধ চলছিল, ভয় উত্তেজনা আর অন্যায়বোধ, সব একসঙ্গে ঠেলাঠেলি শুরু করে দিয়েছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, রাগ করলে?

ধৃতি প্রথমে মাথা নাড়িয়ে হাসল, তারপরে বলল, আমি ভেবেছিলাম, আরও অনেক দিন আগেই খাবেন।

মস্তিষ্কের মধ্যে বোমা ফাটার মতো কথাটা শুনেছিলাম আমি। ওরকমভাবে বলল কী করে কথাটা! আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, কেন?

ধৃতি সেই পবিত্র ডাগর চোখে তাকিয়ে লজ্জা-লজ্জাভাবে হেসেই বলেছিল, বা রে, এর আগে আপনার আর এক দিনও আমাকে চুমো খেতে ইচ্ছা করেনি?

অসম্ভব, এরকম সোজা কথার মানে কী, বা কেউ বলে নাকি! ধৃতিই আবার বলেছিল, ছেলেরা তো এইরকমই।

আবার চমকে উঠলাম, বুকের মধ্যে কেমন করে উঠল। কোনও পবিত্র কিশোরী এরকম কথা বলে নাকি! একমাত্র কৃষ্ণে সমর্পিত প্রাণ রাধাই কৃষ্ণকে এরকম বলতে পারে, পুরুষেরা এ রকমই হয়। হে কপট হরি, পুরুষ মাত্রই এবপ্রকার, কিশোরীর চন্দ্রবদনে চুম্বনাভিলাষী হয়। কিন্তু ধৃতি তো রাধা না, রাধার একটা স্বামীও ছিল। ধৃতি একটি পবিত্র কিশোরী, ছেলেরা কী রকম হয়, সে কথা ও জানবে কেমন করে। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ছেলেরা কী রকম হয়, তুমি জানলে কী করে?

ধৃতি মুখে হাত চেপে হেসে ফেলেছিল, প্রায় সব ছেলেরাই তো আমাকে চুমো খেতে চায়। অনেক বড় বড় লোকেরাও।

আমি তো প্রায় যাকে বলে থ হয়ে গিয়েছিলাম। আসলে আমি ভেবেছিলাম, ধৃতি ভাববে, আমার চুমো খাওয়াটা একটা নির্দোষ ব্যাপার। তার মধ্যে খারাপ কিছু নেই, কিন্তু ওরে বাবা, এ মেয়ে তো আমার মাথায় গাধার টুপি পরিয়ে দিতে পারে। তাড়াতাড়ি বলে উঠেছিলাম, চায়, কিন্তু কেউ খায়নি তো?

নওল কিশোরীটি ঘাড় বাঁকিয়ে, চোখের তারা কাঁপিয়ে বলেছিল, সে কথা আপনাকে বলব কেন। খেতেও পারে। আপনি কি আমাকে ভালবাসেন যে আপনাকে বলব।

ধৃতির কথাগুলো ঠিক মাকুর মতো আমার মাথায় এদিকে-ওদিকে ধাক্কা মারছিল, কোনও জবাবই দিতে পারছিলাম না। ধৃতি আবার বলে উঠেছিল আমি কিন্তু আপনাকে ভালবাসি।

আমি চমকে উঠে বলেছিলাম, ভালবাস? তারপরেও আমার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, কেন, এবং ভালবাসার তুমি কী বোঝ। কিন্তু ও যা মেয়ে, আমাকে যদি পালটা জিজ্ঞেস করত, ভালবাসা বলতে আমি কী বুঝি, তা হলে কোনও জবাব দিতে পারতাম না। সব জিনিস কি মানুষ ব্যাখ্যা করতে পারে। অনেক ব্যাপার যেমন আছে, মৃত্যুর মত একটা ব্যাপার, চাই বা না চাই, সে তার অমোঘ নিয়মে একদিন আসবেই, কিংবা জীবনকে বারে বারে পরিপূর্ণ (পরিপূর্ণতা কী?) করে চাই, কারণ এ জীবন ফুরিয়ে যাবে, এরকম দুটো অমোঘ কারণের মতোই, ভালবাসা কিনা আমি জানি না, কিংবা অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখার যে তীব্র ইচ্ছা এবং অর্জনের লড়াই, ভালবাসা ব্যাপারটা তার মধ্যেই কোথাও হয়তো আছে। তার চেয়ে বলা ভাল নীরেনের লিপিকে চাওয়াটাই ভালবাসা। তাতেও ঠিক বলা হল না। রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরকে ভালবাসতেন, এটা পরিষ্কার। আমার ঈশ্বর নেই। ঈশ্বরই রবীন্দ্রনাথের কাছে জীবন-মৃত্যু এবং সকল কিছুর নিয়ন্তা, তাঁকে ঠাকুর ভালবাসতেন এটা তো একটা বিশ্বাস এবং এ ভালবাসা তুলনাহীন। আমি আমার স্বপ্নগুলোকে ভালবাসি। সেই স্বপ্নগুলো সবই জীবন বিষয়ক এবং রাজনৈতিক আদর্শগত বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু এ সব অন্য দিকে চলে যাচ্ছে, যাকে বলে নারী পুরুষের ভালবাসা-প্রেম–যাকে প্রেম বলে, তার বিষয়ে

যাক, এ সব চিন্তা এখন থাক, আমার মধ্যে যে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন লোক আছে–অন্ধকারাচ্ছন্ন না বলে, একটি অখণ্ড বজ্জাত বলতেই বা দোষ কী, সে ঠিক করে ফেলল, ধৃতির সঙ্গে খেলা চালিয়ে যাওয়া যাক, অর্থাৎ যেভাবে চলছে, চলুক। যেন তখনও আমার পবিত্র নওল কিশোরী ভাবনাটা গুঁড়িয়ে যায়নি। অবিশ্যি তারপরে, কিছু দিনের মধ্যেই তা গেল, এবং সেটা এক দুপুরের ব্যাপার, ওর বাবা মা ভাইয়েরা কেউ ছিল না। শীতের দুপুরে আমি গেলাম ওদের নীচের তলায়। গিয়ে দেখলাম, ধূতি খাটের ওপরে লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে, ওর মুখ আর ঘাড়ের কাছে রুক্ষু চুল ছড়ানো। আমি গিয়ে খাটে বসলাম, ধৃতিই আমাকে লেপের মধ্যে যেতে বলল। যাবার পরে একটা অন্যায় বোধ আর উত্তেজনা আমার মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু করল। আমি ওর সমস্ত শরীরটাকেই ছুঁতে পারছি, কিন্তু আমার খুব দুরবস্থা বলে মনে হল, ধৃতি বলল, আপনি কি হাঁদা নাকি?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ভয় করে না?

ও বলল, আপনাকে আমার ভয় করে না। আপনার জন্য আমি সব করতে পারি, সব রকম বিপদ মাথায় নিতে পারি।

ধৃতির কথাবার্তা শুনেই আমার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে উঠল, আমি লেপ ছেড়ে উঠে বসে বললাম, তোমার এত পাকা পাকা কথা আমার ভাল লাগে না।

ধৃতি আমার চোখের দিকে চেয়ে বলল, এতে আবার পাকা পাকা কথার কী আছে। আমার বয়স ষোলোসতেরো হয়ে গেল। আমি জানি, আপনি কী চান।

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী চাই।

মেয়েটা অনায়াসে বলল, গল্পের বই না হয় তো সিনেমার নায়িকাদের মতো কথা বলব।

আমি প্রায় রেগেই বললাম, মোটই না। তুমি ছেলেমানুষ আছ, ছেলেমানুষই থাকবে।

ধৃতি ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল, আর আপনি যা করতে বলবেন, তাই করব। আসলে আপনিই ছেলেমানুষ।

তখন আমি রেগে উঠেছি, আমার পবিত্র কিশোরী ভাবনাটা, চোখের সামনে একটা সুন্দর ফুলদানি ভেঙে পড়ার মতো চৌচির হয়ে গেল। বললাম, আমি ছেলেমানুষ!

ধৃতি বলল, তা ছাড়া আবার কী। চলে যাচ্ছেন?

হ্যাঁ।

আপনি আমাকে একটুও ভালবাসেন না। কেঁঝে বললাম, তুমি ভালবাসার কী বোঝ?

আপনারা ভাবেন, আমার বয়সি একটা মেয়ে কিছু বোঝে না। আপনাদের থেকে অনেক বেশি বোঝে। আপনাকে আমি ভালবাসি বলেই লজ্জা পাই না, ভয় পাই না।

ইচ্ছা করছিল ঠাস করে একটা থাপ্পড় মারি, তা না করে চলে এলাম। ধৃতি আবার বলল, লিপিদের বাড়ি যাবেন এখন, না?

কোনও জবাব না দিয়ে চলে এলাম। লিপির নাম করতে সাহস পেল মেয়েটা। সংসারে বোধ হয় কারোকেই ওর ভয় নেই, মানামানি নেই। তারপর থেকে আমি কথা না বললেও, ও ঠিক বলত, জবাব দিতাম না। এখনও ওর কথাগুলো মনে হলে আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। এখন তো আরও। লোকেশ্বর চক্রবর্তীকে পাঠিয়েছে ধৃতি-ই, এখন বেশ বুঝতে পারছি। এখন বোধ হয় উনিশ কুড়ি বছর বয়স হল, কিন্তু এত সব বুঝল কেমন করে।

.

হাজতে আর একটা অকথ্য, ঘুম-ছাড়া, অস্থির আর বিভ্রান্তিকর রাত্রি কাটানোর পরে, সকাল সাড়ে দশটার সময়ে আমাকে নিতে এল সেই ইনস্পেক্টর, যে আমাকে বাড়ি থেকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু কোর্টে গিয়ে, প্রায় দু ঘণ্টা আমাকে পুলিশের গাড়িতে বসে থাকতে হল। তবে আজ ইনস্পেক্টরের ব্যবহার গতকালের মতো খারাপ না যেন। এমনকী এক বার হেসে আমাকে জিজ্ঞেসও করেছিল, লোকেশ্বর চক্রবর্তীকে খবর দেওয়াই ছিল আগে? বেশ আঁটঘাট বেঁধেই নেমেছিলে।

উল্লুক গাড়ল বুন্ধু, এবং পরিমলের কথানুযায়ী রাম ভগুড়ে, যদি বা মানে জানি না, এ ছাড়া লোকটাকে আর কিছুই বলা যায় না। আমি লোকটার কথার কোনও জবাবই দিইনি। পাণ্ডেও এসেছে, যদি আমার বেল হয়ে যায়, তখন আমি টাকা আর জিনিসপত্র ফেরত পাব, আর পাণ্ডের পাওয়ানা মেটাব।

আমাকে যখন এজলাসে নিয়ে যাওয়া হল, তখন সেখানে ভিড় কিছু কম না। শুনতে পেলাম একজন আমার নাম করে যা তা অভিযোগ করে যাচ্ছে। লোকেশ্বর চক্রবর্তী দাঁড়িয়ে শুনছে, আর ম্যাজিস্ট্রেট যেন অন্যমনস্ক ভাবে এজলাসের সামনের দেওয়ালের দিকে চেয়ে রয়েছেন। আমাকে ঠেলে দেওয়া হল একটা লোহার জালে ঢাকা খাঁচার মধ্যে, দুজন সেপাই সামনে পাহারা। বোধ হয় এটাকেই আসামির কাঠগড়া বলা হয়। সেখান থেকেই আমি দেখলাম, লিপির মা আর বাবা পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসে আছে। লিপির মা এত সেজে এসেছে কেন বুঝতে পারছি না, ঠোঁটে রং, চোখে কাজল, মুখে মোটা প্রলেপ, ঘাড়টা একটু তুলে ছোট রঙিন পাখা দিয়ে হাওয়া খাচ্ছে আর ভোদকামুখো স্বামীটি পাশে বসে দরদর করে ঘামছে। কিন্তু সুরূপা ঘোষাল এত সেজে এসেছে কেন? লিপিকে যদি আমিই কোথাও গুম করে রেখে থাকি, যা কখনওই সম্ভব না, বা অন্য কোনও রকমের বিপদও ঘটে থাকতে পারে, কোনও অবস্থাতেই লিপির মায়ের এত সাজগোজ মানায় না। আমি দেখতে পাচ্ছি, লিপির মা তার খাণ্ডার লালচে চোখের কোণ দিয়ে আমাকে মাঝে মাঝে দেখছে, চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠছে, তার মানে দাঁতে দাঁত চিবোচ্ছে। লিপির বাবা হাঁ করে সেই লোকটাকে দেখছে, যে স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আমার নামে যা খুশি তা-ই বলছে, নাবালিকা হরণ, তাকে লুকিয়ে রাখা এবং শিক্ষা আর রাজনীতি আসলে আমার একটা ছদ্মবেশ। শুনতে শুনতে অনেকেই আমার দিকে তাকিয়ে দেখছে, ম্যাজিস্ট্রেটও দু-একবার তাকালেন। লোকেশ্বর চক্রবর্তী এক বার শুধু দেখে নিয়েছিল, আমি ঠিক এসেছি কিনা।

আমার বিরুদ্ধে যে-লোকটা বানিয়ে বানিয়ে নানারকম খারাপ কথা ভাল ভাষায় বলে যাচ্ছিল, তার মূল উদ্দেশ্য, আমাকে যেন জামিন না দেওয়া হয়, কেন না, আমার মতো অপরাধী জামিন পেলেই আবার কোনও অপরাধ করব। কিন্তু লোকেশ্বর চক্রবর্তী আরও উঁদে, তার চেহারার মতোই গমগমে গলায় ইংরেজিতে শুরু করতে গিয়ে, পৃথিবীর ইতিহাসের কথা তুলে ফেলল, এবং মিথ্যা দিয়ে আজ পর্যন্ত দিনকে রাত বা রাতকে দিন করা যায়নি, মামলা চলাকালীন বিচারক মহাশয়কে সে নানানভাবেই প্রমাণ করে দেবে, নীরেন হালদারের বিরুদ্ধে সমস্ত ব্যাপারটাই একটা সাজানো ঘটনা, এর মধ্যে সত্যের বিন্দুবিসর্গ নেই, এবং রাতারাতি কোনও কিছুই বদলে যেতে পারে না, নীরেন হালদারও না, আজ এই মুহূর্ত পর্যন্ত। একটি মিথ্যা ঘটনার মধ্যে তাকে জড়ানো ছাড়া, তার প্রতিবেশী, শহরবাসী, বিদ্যালয় কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়, কোথাও তার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ ছিল না..ইত্যাদি ইত্যাদি। ইতিমধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে একটি চিরকুট পাঠানো হয়েছিল আর সেটা লিখেছিল সেই সরু গোঁফ ইনস্পেক্টর, যে আমাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে এসেছিল, আমি লক্ষ করেছি। লিপির মায়ের হাতের পাখা খুব ঘন ঘন চলছে, তথাপি ঘামছে, মুখের ভাব অত্যন্ত অস্বস্তিকর আর উদ্বিগ্ন, অথচ লিপির বাবা যেন একটি ছেলেমানুষের মতো হাঁ করে সকলের মুখের দিকে দেখছে। ম্যাজিস্ট্রেট লোকেশ্বরকে বললেন, লিপি ঘোষাল নিজের হাতে চিঠি লিখে রেখে গিয়েছে যে, আসামির সঙ্গে সে গৃহত্যাগ করছে। জবাবে লোকদার বক্তব্য এই রকম, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে অনেকেই অনেক কিছু লিখে রেখে গৃহত্যাগ করতে পারে, তার দায়িত্ব তার মক্কেল নিতে পারে না। সে একজন জেনুইন লোক, শান্তিপ্রিয় নাগরিক, তাকে জামিন দিয়ে, কেস ফাইট করার সুযোগ নিশ্চয়ই বিচারক মহাশয় দেবেন।…তারপরেই দু-এক মিনিটের নীরবতা। ম্যাজিস্ট্রেট কয়েকটা কাগজপত্র ঘেঁটে দেখলেন, এবং শেষ পর্যন্ত আমার জামিন মঞ্জুর করে লাঞ্চের অবকাশ ঘোষণা করে, আসন ছেড়ে চলে গেলেন। লোকদা আমার দিকে ফিরে বললেন, এদিকে এসো।

এখন আমি লোকদার কাছে খানিকটা মন্ত্রমুগ্ধবৎ এগিয়ে গেলাম, আমাকে সেপাইরা কিছু বলল না। সেই ইনস্পেক্টরও আমার দিকে এগিয়ে এল, রুমালের পুঁটলি আর খাতা এগিয়ে দিল, বলল, নিজের জিনিসপত্র দেখে নিয়ে, অল রিসিভড বলে সই করে দিতে হবে।

আবার সেই আপনি বা তুমি না, অ্যাও হয়ে ও-ও হয়, এমনিভাবের কথা, গাধা রাসকেল কোথাকার। লোকদা আবার বলল, টাকাপয়সা সব গুনে দেখে নাও, একটা আংটিও রয়েছে দেখছি, আঁ? এনগেজমেন্ট রিং নাকি?

আমি অবাক হয়ে লোকদার দিকে তাকালাম। ইনস্পেক্টর এবং আরও কয়েকজন উকিল হাসল। আমি পিছন ফিরে দেখলাম, লিপির বাবা মায়ের চেয়ার খালি। আমি সব দেখেশুনে ফিরে পেয়ে সই করে দিলাম। পার্স থেকে একটা দশ টাকার নোট আলাদা করে পকেটে রাখলাম। লোকদা গমগম করে ডাকল, এসো, বাইরে এসো। তার আগে এটা সই করে দাও।

আর একটা কাগজে সই করলাম, লোকদা সেটা পেশকার না কী বলে, তার হাতে এগিয়ে দিল, আর আমার পিঠে হাত দিয়ে ঠেলে বাইরের দিকে নিয়ে চলল। এজলাসের বাইরে এসে দেখলাম, পাণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে দশ টাকার নোটটা গুঁজে দিলাম, সে হাতটা কপালে ঠেকাল, দেখে আমি ভীষণ অবাক হলাম, এবং টাকাটা দিতে পেরে, কেমন যেন একটা স্বস্তি আর শান্তি বোধ করলাম। বাইরে এসে লোকদা বলল, নাউ গো হোম, বা যেখানে তোমার খুশি। তবে দাড়িটাড়িগুলো কামিয়ে জামাকাপড় বদলাও। আর এই নাও কার্ড, কার্ডে যে ঠিকানা লেখা আছে, সেখানে এসে আমার সঙ্গে সন্ধে সাতটায় দেখা করবে, পজেটিভলি।

এর আর বলাবলির কী আছে, আমাকে যেতেই হবে, কিন্তু আমার মাথায় এখন অন্য কথা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, বলতে পারেন, কাগজে আমার কথা কিছু লিখেছে নাকি।

লোকদা তার আরক্ত বড় চোখ দিয়ে আমাকে যেন খোঁচা দিল, কী আবার লিখবে?

মানে– এই, আমার এইসব কথা।

লোকদা যেন অনেকটা অসুরের মতো হাত ঝাপটা দিয়ে বললেন, আমি দেখিনি, আর খবরের কাগজ এ সব নিয়ে আজকাল চিন্তা করবার সময় পায় না। তোমাদের পার্টির কাগজে যদি কিছু লিখেটিখে থাকে, বলতে পারি না।

না না, পার্টির কাগজে ও সব কথা বেরোয় না। বুর্জোয়া খবরের কাগজগুলোতেই ।

আমার মনে হল, কানের কাছে একটা বাজ ফাটল, আসলে তোকদার ধমক, চুপ করো হে ছোকরা, মোরগার গলায় এখন আওয়াজ দিচ্ছে। যাও যাও, যা বললাম তাই করো গে, সন্ধে সাতটায় এসে দেখা করবে। আর হ্যাঁ শোনো

পাশে ধুতি আর শার্ট পরা একজনকে দেখিয়ে বলল, এর হাতে দশটা টাকা দিয়ে যাও, কাগজপত্র স্ট্যাম্পের খরচ খরচা। তারপরে এখন কাটো দিকিনি।

আমার মনটা আবার খারাপ হয়ে উঠেছে। লোকেশ্বর চক্রবর্তীর কথাবার্তা যেন কী রকম বদলে যাচ্ছে। মোরগার গলায় আওয়াজ দিচ্ছে মানে কী। লোকদা যেন উকিল না, একটা মিল মালিক। আমি পার্স থেকে দশটা টাকা বের করে সেই লোকটার হাতে দিলাম। তবু আমি লোকাকে আর একটা কথা না জিজ্ঞেস করে পারলাম না, আচ্ছা, মানে বলছিলাম কী, লোকদা, লিপির খবর কি আপনি কিছু জানেন?

লোকদা মুখটা কী বলব, যাকে বলে ভেটকে দেওয়া, তাই দিল, বলল, বোকাচ্চিও।

আমার কানটা যেন জ্বলে উঠল। কী বলল লোকদা, একটা যেন খারাপ গালাগাল, তাও এত বড় একটা উকিল, কোর্টে দাঁড়িয়ে। আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে, আবার বলল, ওহে ক্যালানে, তোমাকে আমি একজন লেখকের নাম করে বললাম, বোকাচ্চিও, ওতে যা বোঝার বুঝে নাও। তোমার লিপি কোথায় গেছে তা আমার জানে।

আবার কানটা জ্বলে উঠল। পুরুষাঙ্গকে খারাপ কথায় যা বলে, তা-ই বলল লোকদা। আমি আবার অস্থির আর অনিশ্চয়তা বোধ করছি, ভয় করছে। মনে হচ্ছে, আবার একটা-একটা, কী বলে সেই, গ্যাড়াকলে পড়লাম যেন। যে লোক আমাকে ওই রকম বক্তৃতা দিয়ে জামিনে ছাড়িয়ে নিয়ে আসতে পারে, সে লোক এরকম কথা বলে কী করে। অবিশ্যি আমি জানতাম, বিশ বছর আগে লোকদা রাজনীতি করত, এখন একেবারে যাচ্ছেতাই হয়ে গিয়েছে, আর কী আশ্চর্য, সেই লোকই আমার রক্ষক হয়ে এসেছে। অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা এবং ভয়ের সঙ্গে একটা দুঃখও আমার হল, আমি কোনও কথা বললাম না। লোকদা আবার বলল, এখন যা বললাম তা-ই কর দিকিনি, আমার আর দাঁড়াবার সময় নেই।

লোকদা কালো কোট গায়ে একটা অসুরের মতো দুপদাপ করে একদিকে চলে গেল। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, আমার চেনাশোনা সেখানে আর কেউ নেই। কেউ আমার দিকে দেখছে না, সবাই ব্যস্ত, তাড়াতাড়ি চলাফেরা করছে, কেউ কেউ দৌড়চ্ছে। তাদের মধ্যেই একটা মেয়েকে দেখে আমি থমকে গেলাম, লিপি! লিপি নাকি? সে আমার দিকে তাকাল, খুব তাড়াতাড়ি চলে গেল। না, লিপি না। আমি কি সেই রাধা হয়ে গিয়েছি নাকি। কৃষ্ণ মথুরাতে, আর রাধা যা দেখে, সবই কালো। কালো দেখলেই, ফিনিশ। আমারও, মেয়ে দেখলেই, লিপি। আমি কোর্ট থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সিতে উঠলাম, আর শেষ পর্যন্ত আমাদের বাড়ির রাস্তার নামটাই বললাম, কেন না, আমার জামাকাপড়গুলো সেখানেই আছে।

.

বাড়িতে, সিঁড়ি দিয়ে উঠে, দরজায় শব্দ করলাম। বিপিন, অর্থাৎ চাকর এসে দরজাটা খুলে একটু ফাঁক করল। আমাকে দেখেই চমকে উঠল। দরজাটা পুরোপুরি খুলবে কি না, ভাবছে। উল্লুক। আমি নিজেই দরজাটা ঠেলে ভিতরের বারান্দায় ঢুকলাম। মায়ের গলা শোনা গেল, কে রে বিপিন?

বিপিন যেন কেমন ভয়ে ভয়ে জবাব দিল, দাদাবাবু।

আমি আমার ঘরের দিকে গেলাম। বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগানো ছিল। আমি ঘরে ঢুকে ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলাম, আর সমস্ত জামাপ্যান্ট খুলে ফেললাম। আয়নার কাছে এক বার দাঁড়ালাম, পেট পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। গোটা মুখে দাড়ি, পরশু সকাল থেকে গজিয়েছে। চোখের কোলে কালি, চোখের কোণে পিচুটিও জমে শক্ত হয়ে গিয়েছে। রোগা কালো শরীরটাকে আয়নায় দেখে আমার নিজেরই করুণা হচ্ছে। কেমন একটা তেলতেলে ভাব, ঘষে দিলেই ময়লা বেরোবে। আমি কয়েক সেকেন্ড সবকিছু ভুলে নিজের মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। নিজেকে এই প্রথম আর একজনের মুখ হিসাবে দেখলাম, যেন অন্য কোনও একটা মুখ, এবং মাতৃমুখ, এ কথা আমার মনে হল, এবং সুখ–অর্থাৎ মাতৃমুখী পুত্র সুখী হয়। হঠাৎ আমার দাঁতে দাঁত বসে গেল। আর হাত তুলে, নিজের গালেই একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলাম, রাসকেল। ছিটকে সরে এলাম আয়নার কাছ থেকে, চোখ পাকিয়ে শরীরের নীচের দিকে তাকালাম, মনে হল, একটা শয়তান গুটিসুটি হয়ে, খুব নিরীহভাবে পড়ে আছে। লিপির কথা মনে পড়ে গেল, তাড়াতাড়ি চোখ তুললাম, আর হঠাৎ আমার মনে হল, আমি যেন কোথায় চলে যাচ্ছিলাম, হারিয়ে যাবার মতো। একটা বড় তোয়ালে টেনে নিয়ে পরলাম। পরিমল। তাড়াতাড়ি চান। করে এখনই এক বার পরিমলের কাছে যেতে হবে। এক বার অফিসেও যাওয়া দরকার। কিন্তু এটা কী, ভিতরটা যেন রাগে ফুঁসছে, ছেলেমানুষের মতো, কেঁঝে কেঁদে উঠলেই যেন ভাল হয়। আমি প্রায় ছুটেই বারান্দা দিয়ে বাথরুমের দিকে গেলাম, আর শুনতে পেলাম মায়ের গলা, হ্যাঁ, নিজের ঘরে গেছে। আমার সঙ্গে কোনও কথা হয়নি…অর্থাৎ টেলিফোনে স্ত্রী তার স্বামীকে সকল বিষয় অবগত করাচ্ছে। আমি বাথরুমে চলে গেলাম। হঠাৎ মনে পড়ল, দাড়ি কামাইনি। পরে হবে, আগে চান করি। বাথরুমেও দাড়ি কামাবার সব সরঞ্জাম আছে, মালিক স্বয়ং গৃহকর্তা।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে যাবার পথে দেখলাম, বিপিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। মা হয়তো ঘরেই কিংবা কোথায় কে জানে। আমি আমার ঘরে গিয়ে, তোয়ালে পরা অবস্থাতেই দাড়ি কামিয়ে নিলাম। দু-এক মিনিটের মধ্যেই জামা প্যান্ট পরে বেরোবার মুখেই, দরজায় বিপিনকে দেখতে পেলাম। বিপিন আমার দিকে তাকিয়ে যেন কথা বলতে ভরসা পেল না, তারপরে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ভাত খাবেন?

সময় নেই, বলে বেরিয়ে গেলাম। ধৃতি, ধৃতির কথা আমার মনে পড়ল সিঁড়ির নীচে এসে। কারোকেই দেখা গেল না। ধৃতি কাল সকালে বা পরশু রাত্রে লোকদাকে কী বলতে গিয়েছিল, সেইটা আমার শোনবার ইচ্ছা ছিল। বিপিনটা খাবার কথা জিজ্ঞেস করল, সময় নেই বললাম বটে, তবে সেই যাকে বলে, পেটে যেন ছুঁচো ডাকছে। আসলে এ বাড়িতে আমার খেতে কী রকম খারাপ লাগছে। আমি বেশ বুঝতে পারছি, এ বাড়ির সঙ্গে নিজেকে আমার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বোধ হচ্ছে, বাবা বা মায়ের সঙ্গে নিজেকে আমি কখনওই তেমন একটা অবিচ্ছিন্ন বোধ করিনি, শেষের দিকে খুকুর সঙ্গেও। আজ এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, পরিবারটির সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই। আমি জানি মা হয়তো আড়াল থেকে আমাকে দেখছিল, কোনও দিকেই আমার তাকাতে ইচ্ছা করেনি। ধৃতিকে পেলে আমি ওর সঙ্গে কথা বলতাম। ধৃতি কি সাবালিকা হয়েছে। বোধ হয়, যখন ও ওর ষোলো বছর বয়স বলেছিল, তখন থেকে সময় কম যায়নি, অবিশ্যি তাতেও আমার কিছু করার নেই, আমি ওকে বেশ ভয়ই পাই।

আমাদের বাড়ির রাস্তা থেকে বেরিয়ে, ট্রাম রাস্তায় পড়েই, মোটর মেরামতি শেডটা পেরিয়ে গেলে, অন্যদিকের ফুটপাতে একটা সুপ্রিয়া না কী নামে যেন রেস্তোরাঁ আছে, আসলে হোটেল। আমি ঘড়িতে দেখলাম, প্রায় আড়াইটা। সুপ্রিয়া না, দেখলাম সুজাতা। সেখানে ঢুকে খেয়ে নিলাম। খাদ্যাখাদ্যের বিচারের সময় নেই, লিপির খবরটাই আগে দরকার। খেয়ে নিয়ে সোজা গেলাম পরিমলের বাড়িতে। ও বাড়িতেই ছিল, আমাকে দেখে ঠোঁটে আঙুল টিপল। এ আবার কী রকম ইয়ে মানে যাকে সবাই আজকাল নকশা বলে। ওর ভাবভঙ্গি সিনেমার নায়কের মতো। পায়জামার ওপরে পাঞ্জাবি চড়িয়ে বাইরে এল। আমি প্রথমেই জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার, লিপি কোথায়?

পরিমল খুব অবাক হয়ে বলল, আমি কী করে জানব, তোর সঙ্গে যায়নি নাকি!

এর মানে কী, পরিমলও আমার মাথাটা খারাপ করে দিতে চায় নাকি। আমি কিছু বলবার আগেই, পরিমলের মুখের ভাব খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখাল, বলল, পরশু দিন দুপুরে ওদের বাড়িতে যেতে আমার একটু দেরি হয়েছিল। গিয়ে দেখলাম, লিপি বেরিয়ে গেছে। ভাবলাম, আমার দেরি দেখে বেরিয়ে গেছে, তা হলে তোর সঙ্গে গিয়ে মিট করেছে, তোরা নিজেদের জায়গায় চলে গেছিস। তারপরে আমি ভাবলাম, ক্লাইভ স্ট্রিটে একটা কাজ আছে, সেটা মিটিয়ে নিই গিয়ে। মেটাতে মেটাতে অনেক দেরি হল। বাবা এক বার গদিতে মানে আমাদের হেড অফিসে যেতে বলেছিল, সেখান থেকে ফিরতে ফিরতেই প্রায় রাত্রি এগারোটা, তারপরে পাড়ায় এসে… ।

আমি আর পরিমলের কথা শুনছিলাম না, কেন না, সমস্ত বিষয়টা আমার মাথার মধ্যে এখন কোনও কাজই করছে না। আমি দু হাত শূন্যে তুলে কেবল জিজ্ঞেস করলাম, লিপি তা হলে কোথায় গেল?

পরিমল বলল, আমারও তো সেটাই অবাক লাগছে। ইস্টার্ন নার্সিহোমের উলটো দিকে গিয়ে তোর সঙ্গে তা হলে দেখা করেনি?

এ কথার কোনও জবাব থাকতে পারে বলে আমার মনে হল না, কারণ পরিমলের কাছে আমার আর কিছু শোনার নেই। আমি যে জিজ্ঞেস করব, ও যখন দেখল, লিপি ওর আগে বেরিয়ে গিয়েছে, সেই সংবাদটা ও আমাকে দিল না কেন, সেটাও অর্থহীন। তার মানে, পরিমলের সঙ্গে পরশু দেখা হলে, আমাকে বাঁচাবার জন্য কোনও কথাই ও বলতে পারত না। পরিমল ওর আগের কথার জের টেনে তখন বলে চলেছে, সেটা আজ সকালে পার্টি অফিসেই জানলাম। মোটামুটি লোকাল লিডারশিপ তোকে পার্টি থেকে তাড়িয়ে দেওয়াই..।

আমি চলতে আরম্ভ করলাম। পরিমল জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছিস? শোন, লোকেশ্বর চক্রবর্তীর সঙ্গে বেশি জমাসনে, সেটা…

একটা খালি ট্যাকসি ডেকে থামালাম। উঠে বললাম, ডালহৌসি স্কোয়ার। তারপরে হঠাৎ মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল, লোকেশ্বর চক্রবর্তীর কথা পরিমল বলল কেন। আমাকে কে জামিন দিয়ে ছাড়িয়ে এনেছে, সেটা এর মধ্যেই ও জানলে কী করে। জানলেও, পার্টি থেকে তাড়াবার এটাই কোনও কারণ হতে পারে না। কারণটা আমি জানি, এবং এও বুঝতে পারছি, একটা ভীষণ অমঙ্গল আর অশুভ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু এখন আর সে কথা ভেবে লাভ নেই। ডালহৌসিতে এসে আমি আগে অফিসে গেলাম, দেখলাম, আমার টেবিলের সামনের চেয়ারটা খালি। আমি অফিসে ঢুকতেই, অনেকে আমার দিকে ফিরে তাকাল। দু-একজন হিড়িকও দিল, ওটাকে হিড়িকই বলে, ওরকম ভাষায় আওয়াজ দেওয়া। অবিশ্যি আমি এখনও ছুটিতেই আছি, আমার আসবার বিশেষ উদ্দেশ্য, এ চাকরিটা আমি আর করতে চাই না। এই সিদ্ধান্তটা এই মুহূর্তেই আমি করলাম। দু-একজন কাছে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল লিপির কথা। সমস্ত অফিসটাই ব্যাপারটা জানে দেখছি। দু-একজন দুঃখ প্রকাশ করে বলল, নাবালিকা নিয়ে কাজটা ঠিক হয়নি, অবিশ্যি ওতে যাই হোক, বছর খানেকের বেশি জেল হবে । মনে হচ্ছে, পৃথিবীটা কাত হয়ে পড়েছে, সবাই একদিকে হুড়মুড় করে ঢলে পড়ছে, অর্থাৎ সকলেই এক রকম কথা বলছে। কথা যা, তা এক, এখানে দুই পাবে না।

ধর্মদাস আমার সামনে এল। সে একজন সাচ্চা কর্মী। ইউনিয়নের মধ্যে আমাদের পার্টির স্বার্থ দেখাটা তারই কাজ। সে আমাকে তার টেবিলে ডেকে নিয়ে গেল, আর গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করল, আপনার সঙ্গে আমার কয়েকটা কথা আছে।

বলুন।

আপনার সম্পর্কে একটা ঘটনা জানা গেছে–

নাবালিকা হরণ।

হ্যাঁ, একজন পার্টি কর্মী হিসাবে এটা খুবই দুর্নামের ব্যাপার।

কিন্তু ব্যাপারটা আদৌ ঘটেনি, এটা বোধ হয় আপনি

আমার কথা শুনুন, আপনার লোকাল পার্টিই জানিয়েছে, তারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আপনাকে বিতাড়িত করার। আপনি কিছুকাল ধরেই পার্টির নামে কুৎসা প্রচার করছেন

ওটাকে কুৎসা বলে না, ক্রিটিসাইজ।

 আপনার কাছ থেকে আমি কিছু শিখতে চাই না, আপনি এ কথা বলেছেন কি না, আমাদের পার্টির মধ্যে দক্ষিণপন্থী সংশোধনবাদ–

সুবিধাবাদ বলেছি, তাও দু-একজন বন্ধুর কাছে।

 ওই হল, একই কথা, কিন্তু আমাদের পার্টি কোনওরকম সুবিধাবাদকেই প্রশ্রয় দেয় না।  

আমি বললাম, প্রশ্রয়ের চেয়ে বেশি, সুবিধাবাদকে বেশ ভাল হাতেই–মানে, আমি দেখছি তাই, যাকে বলে আশ্রয় করে আছে।

ধর্মদাসের চোখগুলো লাল টকটকে হয়ে উঠল, জানি না, তার প্রেশার কী রকম। সে এত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছে যে, হঠাৎ কোনও কথাই বেরোল না। আমিই বলে চললাম, নীতি বা আদর্শ বা এমনকী শ্লোগানগুলোও ঠিক আছে, কিন্তু গোটা যন্ত্রটা কাজ করছে অন্যভাবে, যেটাকে আমি সুবিধাবাদ বলতে চাইছি, যেটা আছে প্রতিটি স্তরেই, আর এ সবই হচ্ছে, সংশোধনবাদের খপ্পরে যাবার সদর রাস্তা।

ধর্মদাসের গলায় চাপা গর্জন শোনা গেল, এ সব আপনি ভেবে আর বিশ্বাস করে বলছেন?

পুরোপুরি এটা আমার পুরনো অভিজ্ঞতার ফল। মধ্যবিত্ত–মানে পাতি বুর্জোয়া চরিত্র আপনিও বোঝেন বলে আমি আশা করি….

আপনিও তা-ই।

একশো ভাগ, সর্বহারার কোনও দাবিই আমার নেই, এবং সর্বহারার পার্টির শামিয়ানার বাইরে হয়তো আছে, ভেতরে নেই।

ধর্মদাস এবার বেশ একটু জোরেই ধমক দিয়ে উঠল, বলল, থামুন, আপনার কাছ থেকে রাজনীতি শিখতে হলে আমার গঙ্গায় ডুবে মরা উচিত। যদি মনেই করেন, আপনিও মধ্যবিত্ত পাতি বুর্জোয়া–

নিশ্চয়ই।

আরে শুনুন আগে, তা হলে আপনার এই বিদ্রোহটা কীসের?

বিদ্রোহটা–অ্যাাঁ, বিদ্রোহটা।

 ধর্মদাস সাদা ঝকঝকে দাঁতে হাসল, যেন সে খোঁয়াড়ের মধ্যে শুয়োরটাকে ঢোকাতে পেরেছে, কিন্তু আমি একটা শুয়োর না, খোঁয়াড়ে ঢোকারও কোনও প্রশ্ন নেই। বললাম, বিদ্রোহটা একজন মধ্যবিত্ত ইনডিভিজুয়ালের।

সেটা কী?

 সেটা আপনি বুঝবেন না।

কী ব্যাপার, বুঝতে পারছি না, এ সব কথা কি আমিই বলছি। আমার যথেষ্ট সাহস বেড়ে গিয়েছে। দেখছি।

ধর্মদাস বলল তা হলে কোন লজ্জায় এখানে চাকরিটা করছেন।

এটা ঠিক বলেছেন, কোন লজ্জায় এ চাকরিটা আমি করছি। এটা সত্যি লজ্জার আর ঘেন্নারই বিষয়, প্রায় সাতচল্লিশ জনকে লেঙ্গি মেরে এ কাজটা আমি পেয়েছিলাম। তার মধ্যে, তিরিশ জনের ওপরে কোনও পার্টির লোক ছিল না, সাধারণ মানুষ, সমস্ত যোগ্যতা নিয়েই তারা এসেছিল, বাকিরা অন্যান্য পার্টির ছিল, কিন্তু আমাদের–মানে, যে-পার্টি আমাকে চাকরিটা দিয়েছে, তাদের জোরটাই বেশি ছিল, বিশেষ করে আপনার জোর। আপনি যথেষ্ট সংগ্রামী, আপনি আমার জন্য খুবই লড়েছেন, কাজটা আমাকে দিতে পেরেছিলেন। আমি না হলে, আপনার পার্টিরই কেউ পেত।

ধর্মদাস আবার গরগর করে উঠল, আমাকে এভাবে সংগ্রামী বলার মানে?

আপনি কি সংগ্রামী নন?

ধর্মদাস আমার চোখে তার লাল চোখ রেখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল, তারপরে গরগরিয়ে বলল, বেশি চালাকি করবার চেষ্টা করবেন না। আমার একটা কথায় এই অফিসের সবাই আপনাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে।

 এটা একটা রোগের মতো, একজনকে সংগ্রামী বললেও সে রেগে যায়। আর এও আমি জানি, ধর্মদাস মিথ্যা কথা বলেনি, তার সহগামী সংগ্রামীরা আমাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারে। আমি সেটা মোটেই চাই না, কেন না, মুহূর্তের মধ্যেই, এ মৃত্যুর চেহারাটা দাঁড়াবে দালালের মৃত্যু, শহিদ হওয়া যাবেনা। আমি বললাম, ঠিক আছে, আপনাকে তা হলে আমি সংগ্রামী বলতে চাইনা। আপনাকে রাগানোর কোনও উদ্দেশ্য আমার নেই। এ চাকরিটা আমি আজই ছেড়ে দিতে চাই। এটা আমার অনেক পাপের সঙ্গেই আর একটা পাপ।

ধর্মদাসের চোখে এক মুহূর্তের জন্য একটা অবাক কৌতূহলের ভাব দেখা গেল, টেবিলের ওপরে পেপার ওয়েট নিয়ে নাড়াচাড়া করল। আমি এপাশে ওপাশে তাকিয়ে দেখলাম, অনেকেই আমাদের তাকিয়ে দেখছে। ধর্মদাস জিজ্ঞেস করল, তা হলে আপনি অনেক পাপ করেছেন, নিজেই বলছেন। কিন্তু এই পাপ-পুণ্য বোধটা কি একটা প্রতিক্রিয়াশীল ধারণা নয়?

চিন্তা ভাবনাকে যান্ত্রিক করে তুললে এরকম কথাই বলতে হয়। আমি বললাম, না। এটা আমার বিশ্বাস। যেমন এই চাকরিটা নেওয়া আমার একটা পাপ।

আর ছেড়ে দিলেই পুণ্যি। ধর্মদাস যেন একটা অদ্ভুত পাগলের প্রলাপের জবাব দিল এবং সেইভাবে হাসল। আবার বলল, এ চাকরিটা ছেড়ে এখন কী করবেন? সি আই এর দালালি?

ধর্মদাসের ভুরু বাঁকা, আর তার সরু গোঁফজোড়া ঠিক সেই ইনস্পেক্টরের মতোই একদিকে ছড়ানো, যার মানে, হাসি। বললাম, কথাটা আপনার মতো আমিও জানি। ভারতবর্ষকে নিয়ে তিনটে দেশ খেলছে, সি আই এর টাকা গলতে গলতে কাদের পকেটের রন্ধ্রে যাচ্ছে, সেটা বুঝতে খুব অসুবিধা হয় না।

তিনটে দেশ মানে?

 তিনটে দেশ, পৃথিবীর তিনটে দেশ ভারতবর্ষকে নিয়ে লড়ছে, পাঞ্জাটা কষছে বাংলার ওপরে বসে, এটা সবাই বোঝে।

সেই তিনটে দেশের নাম কী।

নামগুলো আমি বলতে চাই না।

আর সি আই এর বিষয় কী বলছিলেন?

টাকাগুলো গলতে গলতে, চুঁইয়ে, নানান রন্ধ্রে যাচ্ছে।

 যথা?

আমি ধর্মদাসের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তার চোখ উত্তরোত্তর লাল হচ্ছে, গোঁফজোড়া ছোটবড় হচ্ছে।

বললাম, সকলেরই একটু ভেবে চিন্তে কথা বলা উচিত, কেবল কথার কথা বললেই হয় না।

ধর্মদাস একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি।

তার থেকে আপনি, মানে, কিছুই শিখতে পারবেন না।

 তা জানি। আপনি আমাদের পার্টির সম্পর্কে কী বলতে চান?

জানি না, ধর্মদাস আমাকে কোনদিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে। বললাম, শ্লোগান আদর্শ বা নীতি বা এমনকী তত্ত্ব যা-ই বলা হোক, কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলোতে একটা শ্রেণীরই হাতে নেতৃত্ব, তারা হল নৈকষ্য কুলীন মধ্যবিত্ত, পাতি বুর্জোয়া বললে যদি রাগ না হয়। অন্তত রাজনীতির ক্ষেত্রে তা-ই। তার জন্যই সুবিধাবাদের স্রোত কলকলিয়ে ঢুকেছে। তবে এতে অবাক হবার কিছু নেই, এটা শ্রেণী চরিত্রেরই বৈশিষ্ট্য।

সেই জন্যই আপনি পার্টির নামে কুৎসা ছড়াচ্ছেন?

 কুৎসা ছড়াইনি, বন্ধুদের বলেছি।

কিন্তু আপনি কুৎসা ছড়াচ্ছেন, সেটাই পার্টির ধারণা, সেইজন্য আপনাকে পার্টি থেকে তাড়ানো হচ্ছে।

শুনেছি। কিন্তু কতজনকে তাড়ানো যাবে?

মানে?

তার মানে, আমি তো একলা না, পার্টির মধ্যে আরও অনেকেই এই সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত।

আরও অনেকের কথা ছাড়ুন। আপনি তো এবার অন্য দলে নাম লেখাবেন।

লেখাব না। অনেকে মনে করে, পার্টি তাদের বাবার সম্পত্তি। বিশেষ করে বুড়ো ভদ্রলোক নেতারা আর তাদের কিছু সাঙ্গোপাঙ্গ তা-ই মনে করে। এদের ধারণা, ক্ষমতা দখলের লড়াইটা এ ভাবেই তারা চালিয়ে যাবে। কিন্তু এদের সুখের রাজত্ব থাকতে পারে না। যাদের পার্টি, তারা দখল করবেই। তখন এই বিপ্লবের চেহারাটা থাকবে না। কিন্তু আমি আপনার সঙ্গে এ সব বিষয়ে আর আলোচনা করতে চাই না। আমাকে কি কোনও রেজিগনেশন চিঠি লিখতে হবে?

ধর্মদাস বলল, কোনও দরকার নেই।

এটা অবিশ্যি আমি মনে মনে মেনে নিতে পারলাম না। আমাকে যেভাবেই হোক কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিতে হবে অস্থায়ী কেরানি পদটি আমি ছেড়ে দিয়েছি। জানি না, এর পরে আমি কী করব। কিছু একটা আমাকে করতেই হবে। বাবার কথা আমি আর ভাবতে চাই না। আমার নিজের কথাই আমাকে ভাবতে হবে। হয়তো একটা ইস্কুলে যেমন-তেমন চাকরি পেয়ে যেতে পারি। আমি উঠে যাবার আগে ধর্মদাস আবার প্রশ্ন করল, অন্যান্য বামপন্থী পার্টিগুলোকে আপনি কী মনে করেন?

এ সব প্রশ্ন আমাকে ভিতরে ভিতরে রাগিয়ে তুলছে। লোকটা কেনই বা আমাকে এ সব জিজ্ঞেস করছে। বললাম, সকলের কথা বলতে পারি না, তবে কোনও হিজড়ে যদি নিজেকে পুরুষ অথবা মেয়ে বলে দাবি করে, কী বলবার আছে।

বেরিয়ে আসবার সময় মনে হল, অনেক সাদা ধারালো দাঁত ঝকঝক করছে। অনেক চোখ যেন জ্বলজ্বল করছে। বেরিয়ে এসে, বারান্দা পার হবার আগে, আমি কয়েকটা শ্লোগান শুনলাম। সবই দালালের বিরুদ্ধে। আমার মনে পড়ে গেল, এক বার আলকাতরা দিয়ে দেওয়ালে এইরকম লেখা দেখেছিলাম। আঁকাবাঁকা অপটু হাতের লেখা, মালি কেরদা লালিচ লবেনা। যে হাতে ওটা লেখা হয়েছিল, সে হাতটা বাঁধিয়ে রাখা দরকার, মালিকের দালালি চলবে না এটাই লেখা হয়েছিল, ঠিক মতো সাজানো যায়নি। ভাবনাটা শেষ হবার আগেই, শ্লোগান আমার কানের কাছে গর্জে উঠল, আর মাথায় আঘাত লেগে, বারান্দার সিঁড়ির নীচে পড়ে গেলাম। তারপরে কয়েক ঘা, বুকে পিঠে ঘাড়ে এবং মুখে। এরকম ক্ষেত্রে পালটা মারামারি করা যায় না, আত্মরক্ষার চেষ্টা ছাড়া, কিন্তু এরকম অবস্থায়, সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে পারি না আমি, কেমন যেন লজ্জা করে। এরকম ঘটবে, কেন যেন আমার মনে হয়েছিল। উঠে দাঁড়িয়ে দেখলাম, বারান্দা ফাঁকা, কেবল ধর্মদাস, দাঁত ঝকঝকিয়ে, আমার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ হাসিটা কোনও মাজন কোম্পানি ছবি তুলে বিজ্ঞাপন দিতে পারে। মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, একজন সেপাই দাঁড়িয়ে রয়েছে, আমাকে দেখছে। আমার পা কাঁপছে, তা হলেও চলতে লাগলাম। জামা প্যান্ট আবার ময়লা হয়ে গেল। মুখটা–অর্থাৎ গাল কপাল এবং মাথা যেরকম ব্যথা করছে, একবার ডাক্তারখানায় যাওয়া দরকার।

.

মধ্য কলকাতার একটা বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম। লোকেশ্বর চক্রবর্তী এই ঠিকানাটাই দিয়েছে। গাড়ি ঘোরাবার মতো উঠোন, দু পাশে দুটো বড় বিল্ডিং। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে, আমি একটা বিল্ডিং-এর দোতলায় উঠে দেখলাম, দরজায় লেখা আছে, এস চক্রবর্তী। তার বেশি কিছু না, পেশার কোনও পরিচয় লেখা নেই। বেল টিপলাম। দরজা খুলে গেল, লোকটাকে চাকর বলেই মনে হল। ভিতর থেকে গমগমে গলা শোনা গেল, কে?

চাকর দরজাটা খুলে দিল, আমি লোকদাকে একটা সোফায় বসে থাকতে দেখলাম। লোকদা হাত তুলে ডাকল, এসো, ভেতরে এসো।

ভিতরে গেলাম। বেশ সাজানো গোছানো ঘর। সোফা, ডিভান, পরদা, ফুলদানি, সুন্দরী যুবতী একজন মহিলা পাশের সোফায়। লোকদার স্ত্রী না, তাকে আমি চিনি। লোকদার টেবিলের সামনে হুইস্কির বোতল, গেলাসে ঢালা, সোডা মেশানো। মহিলা কি কোনও ক্লায়েন্ট? যাক, সে সব আমার ভেবে কোনও লাভ নেই। লোকদা আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললেন, একী, তোমার মুখ ফোলা, তুলো গজের তাপপি, কোথাও অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে নাকি। এসো এসো, বসো।

লোকদা পাশের সোফাটা দেখাল। আমি সেখানে বসে ঘটনাটা বললাম। লোকদা গমগম করে উঠলেন, দিস ইজ য়ুর পলেটিকস বয়, আমি অবিশ্যি প্লেখানভের মতো বলতে পারি, আমি যখন রাজনীতি করেছি, তোমরা তখন টেবিলের তলায় খেলা করছিলে। সব ঠাণ্ডা করে দেওয়া যায়, বুঝলে? ভাল করে লড়তে হবে।

আমি বললাম, হ্যাঁ, তা তো বটেই।

তুমি কী ভেবে বলছ আমি জানি না। সবখানেই জানবে, ডাণ্ডাই ঢাণ্ডা। এখন নতুন ঝাণ্ডার যুগ, সেই ঝাণ্ডাটি সারা দেশে তুলতে পারলেই কাজ হাসিল।

তার মানে?

তার মানে, নতুন যুগ, মুসুরির ডাল আর ভাত পেঁদিয়ে, বারো ঘণ্টা কাজ করবে।

 বারো ঘণ্টা?

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ফর দ্য গ্রেট কজ, ফর দ্য ফ্লাগ, তখন বারো ঘণ্টা কাজ করলেও মনে সান্ত্বনা থাকবে।

আপনি একদম রিঅ্যাকশনারি কথা বলছেন। সে চেষ্টা তো অনেক দিন চলল, কিন্তু কী হল?

 এক দল হেরে গেল, আর এক দল নতুন ঝাণ্ডা নতুন যুগ নিয়ে আসবে।

 এটা এক ধরনের নিকৃষ্ট প্রতিক্রিয়াশীল ধারণা, যাই বলুন লোকদা। মানুষকে কিছু না দিয়ে, ভাঁড়ামি করে–

আহা, ভাঁড়ামি কেন, কিছু দেওয়া হবে।

আমি চুপ করে রইলাম, জবাব দিতে ইচ্ছা করছে না। ভিতরে ভিতরে রাগ হচ্ছে। বললাম, এ সব আলোচনা থাক।

লোকদা বললেন, হ্যাঁ, বেশি হলে, আবার আমিই হয়তো তোমাকে প্যাঁদাব।

বলেই পাশের সুন্দরী মহিলার গলা জড়িয়ে ধরে, গালে একটি চুমকুড়ি দিয়ে বললেন, তোমার খারাপ লাগছে না তো?

আমার অস্থিরতা আর বিভ্রান্তি বাড়ছে। লোকদার কথাবার্তার ধরন-ধারণ এই রকমই, কিন্তু এই মহিলাকে আমার সামনেই–এর মানে কী। তারপরেই আমার দিকে ফিরে বললেন, তোমার সঙ্গে আমার ছ ঘন্টা আগে কোর্টে দেখা হয়েছিল, তার মধ্যে আমি কী কী করেছি, দেখাই।

বলে নিজেই উঠে, অ্যাটাচি নিয়ে এলেন রেডিওগ্রামের ওপর থেকে। ব্যাগ থেকে খুলে একটি কাগজ আমাকে দেখিয়ে বললেন, এটা কী?

আমি দেখে বললাম, সার্টিফিকেট অব বার্থের নকল।

কার?

অরিন্দম ঘোষালের কন্যা।

মানে লিপি। এ কাগজটা দেখ, এটা কী?

আর একটা কাগজ হাতে নিয়ে দেখলাম, বললাম, ইস্কুল সার্টিফিকেট, মানে লিপির–।

হ্যাঁ, তাতে কী দেখছ?

ভাল করে দেখে বললাম, ইস্কুলের বয়স বাইশ, জন্মের হিসাবে, তেইশ।

 ও-কে। নাউ হিয়ার মি, সুরূপ ঘোষাল ইতিমধ্যেই আমাকে টেলিফোন করেছিল।

বলেই লোকদা হা হা করে হেসে উঠল, বলল, সুরূপা ঘোষাল আমাকে বড় জ্বালিয়েছে, আই উইল পুল ডাউন হার অন মাই ফিট, হা হা হা।

তার মানে, লোকদার লড়াইটা আসলে সুরূপা ঘোষালের সঙ্গে। কিন্তু লিপি, মানে আমার লিপির কী খবর।

জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু লিপির তো কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না।

যাবে যাবে, সব যাবে। লোকদা কাগজগুলো অ্যাটাচিতে রাখতে রাখতে বলল, শুধু একটা কথা জেনে রাখ, আসলে সমস্ত ব্যাপারটাই হচ্ছে, এ ফাইট বিটুইন ডটার অ্যান্ড মাদার।

মানে?

 মানে, সুদীপ্তর কথা শুনেছ?

চিনি, লিপির মায়ের–মানে?

হুম, লিপির মায়ের ছোকরা, কিন্তু আসলে লিপির প্রেমটা সুদীপ্তর সঙ্গেই। তা সে প্রেম-ফ্রেম যাই বলো গে, পালানোর প্ল্যানটাও সুদীপ্তর সঙ্গেই।

মানে?

মানে যা বোঝবার বুঝে নাও, মায়ের ছোকরাকে মেয়ে পাকড়েছে, সহজে কার্যোদ্ধার হয়নি, তাই এইভাবে চলে গেছে।

তা হলে আমি?

তুমি একটা, যাকে আমরা বাঙালরা বলি, শালা একটি ভোন্দাগাজি।

ভোন্দাগাজি?

লোকদার অন্য পাশের সোফায় বসা মহিলাটি খিলখিল করে হেসে উঠল, আর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলল, আপনি যেভাবে লিপির কথা বললেন, তাতে মনে হল, ভাবে গদগদ তেলাকুচু।

কিছুরই মানে বুঝতে পারছি না। এই মহিলা আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছে কী করে। আমাকে ভাবে গদগদ তেলাকুচু বলছে, আর হাসছে। লিপি আমার প্রেমিকা, মানে, আমি ওর কিন্তু ব্যাপারটা কী, ওর মায়ের সেই সে, সুদীপ্ত যার নাম, সে তত লিপির মায়ের প্রেমিক বলেই জানি। তার মধ্যে ফাইট বিটুইন মাদার অ্যান্ড ডটার…। লোকদা আবার বলে উঠল, আর তোমার ওই বজ্জাত বন্ধুটি, রাসকেলটা আজকাল আবার পার্টি করতে ঢুকেছে, সময়টা অবিশ্যি ঠিকই বেছে নিয়েছে, এ সময়ে কোনও পার্টির মধ্যে থাকাই ভাল, আমি ওই পরিমলের কথা বলছি, ও সবই জানত।

আমি বললাম, এটা আমি বিশ্বাস করতে পারি না।

আরে তুমি একটা ভোন্দাগাজি, অনেক কিছুতেই তোমার বিশ্বাস, আবার অনেক কিছুতেই বিশ্বাস নেই। লোকদা গেলাসে চুমুক দিয়ে বলল, বিশ্বাসের পরিণতি তো দেখছি তোমার সর্বাঙ্গেই ছাপা রয়েছে। গোটা মুখে তাপপি। আমি তোমাকে সব প্রমাণ করে দেব। লিপি অবশ্যি ঠিকই করেছে। সুদীপ্তর মতো একটা শক্ত আশ্রয় ওর দরকার ছিল, তা না হলে সুরূপা ওকে বেশ্যাবৃত্তির দিকে ঠেলে দিত, দিচ্ছিলও তা-ই। হ্যাঁ, আর শোনো, সুরূপা মামলা তুলে নেবার চেষ্টা করবে, কিন্তু খবরদার, ছোলটাকে আমি এক বার দেখতে চাই…।

আমি লোকদার সব কথা শুনতে পাচ্ছি না। লিপিদের বাড়ি, ওর মা, সকলের কথাই আমার মনে পড়ছে। লিপির অনেক কথাও মনে পড়ছে। তা হলে, এত দিন ধরে লিপির সঙ্গে আমার, মানে, লিপি আমার সঙ্গে কী করছিল। লোকদা এখন এমন একটা চরিত্র, আমি তাকেই জিজ্ঞেস করে ফেললাম, তা হলে, লিপিমানে, লিপি আমাকে কে?

লিপি তোমার-একটা খারাপ খিস্তি করল লোকদা, উচ্চারণের অযোগ্য। আবার বলে উঠল, সব প্রেম মারাচ্ছে, প্রেম।

আমার বুকের কাছে নিশ্বাস আটকে আসছে যেন। আমি অনেকটা অসহায়ের মতোই আবার জিজ্ঞেস করলাম, লিপি কোথায় আপনি জানেন?

এখনও ঠিক জানি না, কয়েক দিনের মধ্যেই জানতে পারব। কিন্তু তাতে তোমার কোনও লাভ হবে না। শি হ্যাজ অল রাইট টু গো এনিহোয়ার। অবিশ্যি লিপি কারোর কাছেই থাকবার মেয়ে না, লিপি ইজ লিপি।

আমার লিপ, লিপলিপালিপ লিপ, তার সম্পর্কে এ সব যা শুনছি, মানে, আমি কিছুই মেলাতে পারি না। কষ্ট একটা হচ্ছে, তা সে যাই হোক, লিপি তা হলে কোনও বিপদে পড়েনি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতে পারি না, লিপি আমাকে ভালবাসে না। আমি জানি না, এ সব কথা কতখানি সত্যি বা মিথ্যা, আমি জানি না, লিপির দেখা জীবনে কখনও আর পাব কি না। কিন্তু সেই সব দুপুর, নির্জন ঘুমন্ত দুপুর, সন্ধেবেলার ছাদ, আরও অনেক জায়গা, অনেক রকমের, সে সব কি সবই কখনও মিথ্যা হতে পারে? বিশ্বাস করতে পারি না। আমি সমস্ত কিছুই হয়তো একটা বিভ্রান্তির মধ্যে, একটা অনিশ্চিত অস্থিরতার মধ্যে দেখছি। কিন্তু এ সবই কখনও মিথ্যা হতে পারে না। তবে একটা কথা, যদি লিপি সুদীপ্তর সঙ্গেই গিয়ে থাকে বা কারোর সঙ্গেই জীবনে থাকতে না চায়, তা হলে, মামলাটা চালিয়ে লাভ কী। আমি সেই কথাই লোকদাকে বললাম, তা হলে আর মামলাটা চালিয়ে লাভ কী। লিপিকেই যদি না পাওয়া গেল, বা ও যদি

লোকদা একটা বাঘের মতো গর্জে উঠল, খবরদার, যা বলেছ বলেছ, আর ও কথা উচ্চারণ কোরো না। যুহ্যাভ নাথিং টু ফাইট, ইট ইজ ফাইট বিটুইন মি অ্যান্ড সুরূপা। সুরূপাকে আমি কুরূপা করে ছেড়ে দেব।

আমি বললাম, কিন্তু আমার বিশ্বাস!

হ্যাঙ য়ুর বিশ্বাস। তোমার লিপি-টিপির সঙ্গে প্রেমের খেলা খেলতে যাওয়া উচিত ছিল না। তুমি তো আমার মেয়েটার সঙ্গে প্রেম করতে পারতে।

মানে?

সুন্দরী মহিলাটি হেসে উঠল। লোকদা বলল, না না, হাসির কথা না। লোকদা হঠাৎ অনেকটা মদ খেয়ে ফেলল, আবার বলল, বড় ভাল মেয়ে। সুন্দরী শিক্ষিতা গৃহকর্মনিপুণা…।কথাটা শেষ না করেই লোকদা গেলাসে মদ ঢালল। কিন্তু আমার আর এখানে বসে থাকবার দরকার নেই। আমি বুঝতে পারছি, আমার নিজের পথেই আমাকে চলতে হবে। লোকদা মামলাটা নিয়ে যা খুশি তাই করুক, সেটা হচ্ছে, সুরূপা ঘোষালের সঙ্গে লোকেশ্বর চক্রবর্তীর লড়াই। আমি কেউ না। আমি উঠলাম। লোকদা চিৎকার করে উঠল, কোথায় যাচ্ছ?

বললাম, কোথাও। আমাকে আমার জীবনের আর চাকরির জন্য ভাবতে হবে, একটা আশ্রয়ও।

আমার কথা শেষ হবার আগেই তোকদা চেঁচিয়ে বলল, আরে একটু মাল খাও, কোথায় যাবে। সুরূপা ঘোষালকে আমি।

লোকদা কাশতে লাগল। আমি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। আর সেই মুহূর্তেই কলিং বেল বাজল। চাকর আসবার আগে আমিই দরজাটা খুলে দিলাম। ধৃতি। ধৃতি এখানে! আমি ওর ঢোকবার জন্য সরে দাঁড়ালাম। ধৃতি ঢুকে হাত তুলে ঘড়ি দেখল। ওর গায়ে আজও চাইনিজ মেয়েদের পায়জামা আর জামা, চুলগুলো খোলা। বলল, আমি তো আপনার জন্যই এলাম। লোকেশ্বরবাবু বলেছিলেন, আপনি এখানে সাতটায় আসবেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী দরকার?

ধৃতি বলল, মামলাটার ব্যাপারে আলোচনার জন্য।

বললাম, আমি ও সবের মধ্যে নেই। লোকদা কাশছেন, আমি যাচ্ছি।

আমি বেরিয়ে গেলাম। ধৃতি পিছন থেকে ডেকে উঠল, এই নীরেনদা, শুনুন।

আমি রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। জুন মাসের আকাশ, বেশ মেঘ করেছে, বাতাস দিচ্ছে, ধুলো উড়ছে। পিছনে আবার ধৃতির ডাক শুনতে পেলাম। ধৃতির এটা উচিত না, ও আমার কাছে কী চায় বুঝি না। ও হয়তো আমাকে আরও অস্থির আর বিভ্রান্ত করে তুলবে। আমি চৌরঙ্গির ওপর দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। এটাকে বোধ হয় আঁধি বলে, এই ধুলোর ঝড়কে, কিন্তু এটা কোনও কাজের ঝড় না। পিছনে স্যান্ডেলের স্লাপ স্লাপ শব্দ। কিন্তু এখন আমার সেই অশুভ আর অমঙ্গল বোধের ভয়টা আর করছে না। এই সময়টাকে আমার স্বাধীন বলে মনে হচ্ছে। কতক্ষণের জন্য জানি না, আপাতত, এই মুহূর্ত।

বুকমার্ক করে রাখুন 0