৪. জিপের খোলের মধ্যে

রাত, বাতি, দোকান, ট্রাম বাস ট্যাক্সি প্রাইভেট গাড়ি রিকশা লোকজন, সকলেই বাইরে, আমি একটা জিপের খোলের মধ্যে চলেছি, পুলিশের জিপে। ভিতরটা অন্ধকার, তেমন বাতাসও লাগছে না। পিছন থেকে মাঝে মাঝে অন্য গাড়ি বাতি জ্বেলে সিগনাল দিচ্ছে, তাকাতে গিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। যারা সিগনালের আলো দিচ্ছে, তারা নিশ্চয় আমাকে চিনতে পারছে না। এখন আর আমি যেন রাস্তা-ঘাটগুলো ঠিক চিনে উঠতে পারছি না, এবং জিপটা যেন কয়েকটা আচমকা মোড় ঘুরে একটা প্রকাণ্ড বিল্ডিং-এর চত্বরে ঢুকে পড়ল। একেবারে একটা বড় দরজার সামনে গিয়ে, জিপটা জোরে ব্রেক করল, থামল। ইনস্পেক্টর নেমে, সিটটা নামিয়ে দিয়ে আমাকে বলল, এসো।

লোকটা আর আমাকে কিছুতেই আপনি বলতে পারল না। নেমে, বাড়িটার দিকে তাকিয়ে কিছুই যেন বুঝতে পারলাম না। আশেপাশে অনেকগুলো জিপ, ওয়্যারলেস ভ্যান আর এমনি ভ্যান-মানে পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটাকে যেন চেনা চেনা লাগছে, অথচ চিনতে পারছি না। ইনস্পেক্টর আমার কোমরের কাছে খোঁচা দিয়ে বলল, চলো।

ইনস্পেক্টরের সঙ্গে দরজা দিয়ে ঢুকলাম। একটা ঘর, তার পাশে আর একটা ঘর। চেয়ার টেবিল ফাইলপত্র ইত্যাদি দেখে এটাকে অফিসের মতোই মনে হচ্ছে, এবং কলকাতা পুলিশের পোশাক পরে অনেকে বসে আছে, কাজ করছে, টেলিফোন করছে, কথাবার্তা বলছে। বোঝা যাচ্ছে, রাত্রেও অফিসের কাজকর্ম চলছে। ঘরের পরে ঘর পার হয়ে একটা বারান্দা দিয়ে আর একটা ঘরে ইনস্পেক্টর আমাকে নিয়ে গেল। সে-ঘরটায় ভিড় মন্দ না। কয়েকটা লোককে দেখলাম, তাদের কোমরে দড়ি বাঁধা, এবং একটা দড়ি দিয়েই তাদের সবাইকে বেঁধেছে বলে মনে হচ্ছে যেন একসঙ্গে কয়েকটা গোরুকে বেঁধেছে, যাতে তারা ছুটতে না পারে, কারণ দড়ি বাঁধা অবস্থায় একসঙ্গে সবাই ছোটা যায় না। আমার চেহারাটা কেমন দেখাচ্ছে কে জানে, এদের দেখে আমার চোখে ভেসে উঠছে, মধ্য এশিয়ার কোনও হাটে দড়ি দিয়ে বেঁধে যেন ক্রীতদাসদের বিক্রি করতে নিয়ে এসেছে। এরা ছাড়াও লোক ছিল। সার্জেন্ট বা ইনস্পেক্টর যাই হোক, আমি চিনি না, দুজন চেয়ারে বসে ছিল। কয়েকজন কনস্টেবল রয়েছে। ইনস্পেক্টর আমাকে ঠেলে নিয়ে টেবিলের কাছে গেল। চেয়ারে বসা একজন আমার দিকে তাকিয়ে দেখল, ইনস্পেক্টরের দিকে চেয়ে বলল, আসামিকে নিয়ে এসেছেন?

ইনস্পেক্টর বলল, হ্যাঁ স্যার।

 চেয়ার বসা লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে এক বার দেখল, তারপরে আমার হাতের দিকে তাকাল, বলল, ঘড়িটা খুলে দাও। পকেটে যা যা আছে, মায় রুমাল পর্যন্ত সব এখানে দিয়ে দাও।

আমি অবাক হয়ে ইনস্পেক্টরের দিয়ে তাকালাম, জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

 ইনস্পেক্টর আমাকে ধমক দিয়ে বলে উঠল, যা বলছে, তাই করো না।

চেয়ারে বসা লোকটা একটা খাতায় কী লিখতে লিখতে বলে উঠল, মিশির, আসামির মালপত্রগুলো সব লিস্ট করে নাও তো।

বলেই যে-খাতাটায় লিখছিল, সেটা ইনস্পেক্টরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, সই করে দিয়ে যান তো ভাই। কবে কোর্টে প্রডিউস করবেন?

ইনস্পেক্টর সই করতে করতে বলল, কাল বোধ হয় হয়ে উঠবে না, পরশু। আমি তবে যাই?

চেয়ারে বসা লোকটি এক বার এদিক ওদিক তাকাল, তার মধ্যেই বলল, হ্যাঁ যান। তারপরে একদিকে তাকিয়ে বলল, পাণ্ডে, এই আসামিকে একটু দেখো তো ভাই। সব কিছু সার্চ করে বের করে নাও।

ইনস্পেক্টর চলে গেল, আর কোমরে বেল্ট বাঁধা কলকাতা পুলিশের একজন সেপাই আমার কাছে এগিয়ে এল। সমস্ত ব্যাপারটাই আমার কাছে এত নতুন আর বিভ্রান্তিকর আর অনিশ্চিত আর একটা

-জানা ভয়ের, কিছুই বুঝতে পারছি না। এখানে এসেই প্রথম শুনতে পেলাম, আমি আসামি। আমার বোধ হয় এখন আর নামধামের কোনও প্রয়োজন নেই, আমি একটা আসামি এটাই আমার পরিচয়, এবং সত্যি কথা বলতে কী, লোকাল থানার ইনস্পেক্টর চলে যাবার পরে, এই প্রথম আমার মনে হল, ও লোকটা আমাকে যা-ই বলুক, তবু ওর কাছে আমার যা তোক একটা পরিচয় ছিল। আমাকে সে যে ধরনের অপরাধীই মনে করুক, তথাপি সে আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল, পরিবারকে দেখেছে, আমার বিষয়ে অন্যান্য ব্যাপারও কিছু কিছু জানে, যেমন আমি রাজনীতি করি বা আমি একজন লেখাপড়া জানা ভদ্রঘরের–যাই হোক, ভদ্রঘরের কথাটা আর আমার ভাবতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু এখানে আমি অনেক আসামির মধ্যে একটা আসামি মাত্র। পাণ্ডে বলে যাকে ডাকা হল, কী করে তার এত বড় একটা ভুড়ি হয় বা চোখ লাল থাকে, বুঝতে পারি না! সে আমার কাছে এল যেন নাচতে নাচতে, আর এসেই তার থ্যাবড়া বড় বড় দুটো থাবা আমার প্যান্টের দু পকেটে ঢুকিয়ে দিল। এটা কী ধরনের অসভ্যতা, আমি নিজেই তো পকেট থেকে সব বের করে দিতে পারতাম। আমি বললাম, দিচ্ছি!

তাতে পাণ্ডে বলে লোকটার কিছুই এল গেল না, সে খুব অসভ্যের মতো তিন বার আমার প্যান্টের পকেটে হাত দিল, এমনকী ভিতরে হাত রেখে বাইকটা ধরেও টানাটানি করল, আর এই মুহূর্তেই তলপেটে চাপ এবং মূত্রত্যাগের ইচ্ছা হল কিন্তু সে কথা এখানে কারোকে বলা যাবে বলে মনে হচ্ছে। না। পাণ্ডে আমার পকেট থেকে রুমাল আর সিগারেটের প্যাকেট দেশলাই বের করে হাত দিয়ে পার্সটা বের করল, খুলে দেখল, তারপর টেবিলের ওপর ফেলে দিল, আর মিশির বলে লোকটা পার্স খুলে টাকা গুনল, দুশো তিন টাকা। এত টাকা আমার কাছে থাকবার কথা না, কিন্তু আজ লিপিকে নিয়ে যাই হোক, সে কথা আর এখন ভেবে লাভ নেই। মিশির টেবিলের ওপর সব উপুড় করে ফেলল, খুচরো পয়সাগুলো গুনল, ছিয়াশি পয়সা, দুটো কাগজের টুকরো, আর–আর–ওহ আমি এখন আর ওটার দিকে তাকাতে চাই না, একটা স্ট্যাম্প সাইজ ফটো, লিপির লিপির–লিপি হাসছে, আর এ ফটোটা তুলেছিল পরিমল তার জাপানি ক্যামেরায় যখন লিপি নীচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে হাসছিল, লিপির–লিপির ফটো। কিন্তু তাতে কারওই কিছু যায় আসে না, মিশির কেবল সব লিখে নিচ্ছে, পেনসিলের বড় বড় ইংরেজি অক্ষরে। যাই হোক, হাজারবার লিখুক, লিখে আবার আমাকে ফেরত দিলেই হল। পাণ্ডে আমার বুক পকেট থেকে কলমটা নিয়ে নিল, বেল্টের বাঁধন থেকে সান গ্লাস নিল, তারপরে বলল, ঘড়িটো খুলো।

আমি পাণ্ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো লিখে নেওয়া হচ্ছে কেন?

পাণ্ডে সে কথার কোনও জবাব না দিয়ে আমার দুটো হাত টেনে নিল। ডান হাতের আঙুলে আংটিটা দেখিয়ে বলল, ইসকো খুলল।

না, এ আংটি আমি খুলতে পারব না, লিখে নিতে হয়, এমনি দেখেই লিখে নেওয়া যায়। তিন মাস আগে আংটিটা আমি তৈরি করেছিলাম, লিপিকে হ্যাঁ লিপিকে দেব বলে, যাকে বলে আমাদের এনগেজমেন্ট রিং, কিন্তু ওর পক্ষে আংটিটা পরে থাকা সম্ভব ছিল না, ধরা পড়ে যাবে বলে। আমি আংটিটা ওকে পরিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, হাতে না রাখ, কোথাও রেখে দাও, এটা আমি তোমার জন্যই করিয়েছি। লিপি যেন ভয়ে ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল, বলেছিল, না না, কোথাও রাখবার জায়গা নেই আমার, মা ঠিক বের করে ফেলবে। তোমার কাছে রেখে দাও। যখন চলে যাব, তখন এটা সবসময়ের জন্য পরে থাকব।আংটিটা লিপির খুব পছন্দ হয়েছিল, সরু একটা সোনার রিঙের ওপরে একটি পোখরাজ পাথর বসানো। পাথরটার দামই বেশি, সোনা আর মেকিং চার্জটা সেই তুলনায় কিছুই না। আমি জানতাম, এরকম আংটি লিপির পছন্দ, আর লিপি আংটিটা পরে, অনেক বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছিল, ওর চোখে যেন পাথরের ঝিলিক খেলছিল, ও একেবারে চোখের সামনে নিয়ে পাথরটা দেখেছিল, যেন নাকে খুঁকেছিল, ঠোঁটে, ওর সেই একটু ফোলা ফোলা লাল ঠোঁটে চুঁইয়েছিল, যা দেখে আমার বুকের মধ্যে যেন থরথর করে উঠেছিল, আমি ওর ঠোঁটের কাছে আমার ঠোঁট এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। লিপি আংটিটা আমার ঠোঁটে চুঁইয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তখন পাথরের স্পর্শ আমার ভাল লাগছিল না, ওর ঠোঁটের স্পর্শের জন্যই লালায়িত হয়েছিলাম, আর লিপি ওর ঠোঁট দুটো কুঁকড়ে ছুঁচোলো করে আমার ঠোঁটে যেন আঘাত করার জন্যই জোরে চুঁইয়ে দিয়েছিল আর একটা শব্দ করেছিল, কিন্তু আমার, যাকে বলে তৃষ্ণা, সেটা আরও বেড়ে উঠেছিল, আমি ওর গলা জড়িয়ে ধরে, ওর দুটো ঠোঁটই আমার মুখের মধ্যে নিয়ে অনেকক্ষণ চুমো খেয়েছিলাম, আর মাঝে মাঝে ওর গরম জিহ্বার স্পর্শ লেগে আমার গায়ের মধ্যে শিরশির করে উঠেছিল। ছেড়ে দেবার পরে লিপি বলেছিল, এরকম করে খেয়ো না, মা ঠোঁট দেখলে ধরে ফেলবে। মা মা আর মা, মাকে যেন লিপি যমের মতো ভয় পায়। অবিশ্যি পাবারই কথা, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম, ওর ঠোঁটের রংটা তখন আমার চোখে। মাতাল যাকে বলে আর কী, মদ খেলে মানুষের চোখ যেমন লাল হয়ে ওঠে তেমনি। লিপি আমার দিকে চেয়ে হেসে উঠেছিল, আর ভুরু নাচিয়ে নাচিয়ে বলেছিল, কী কী? কী চাই। খোকনের খিদে লেগেছে? বলেই খিলখিল করে হেসে উঠেছিল, এবং তাতে আমার আরও বেশি ভাল লেগেছিল ওকে, যে কারণে, আবার ওকে জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিলাম। ও মুখে ভয়ের আর সাবধান করার ভাব ফুটিয়ে তুলেছিল, মা এসে পড়বে, ওরকম করো না। বলে আংটিটা আমার হাতে পরিয়ে দিয়েছিল, বলেছিল, আমিও পরলাম, এখন তোমাকে পরিয়ে দিচ্ছি, পরে আবার…।

কী হল, আংটিটা দিতে বলা হল যে।

আমি চমকে উঠলাম, দেখলাম, চেয়ারে বসা সেই লোকটি, ইনস্পেক্টরই হবে বোধ হয়, আমার দিকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, দেখুন–মানে, এই আংটিটা আমি খুলতে চাই না।

লোকটা একেবারে খ্যাঁক করে উঠল, ও সব পিরিত অন্য জায়গায় গিয়ে মারবে, এখানে না। রুল দিয়ে পিটিয়ে খোলাব। খোলো তাড়াতাড়ি।

কোনও মানে হয় এভাবে বলবার। আমি অবিশ্যি আংটিটার আসল ব্যাপার এদের বলতে চাই না, কিন্তু খুলতেই হবে কেন, জানি না। তবে যেভাবে বলছে, না খুললে হয়তো সত্যি রুল দিয়ে পেটাতে আরম্ভ করবে। সেরকম কোনও ঘটনার মধ্যে আমি যেতে চাই না। অত্যন্ত অনিচ্ছা আর দুঃখের সঙ্গে আংটিটা আমি খুলে দিলাম, আর মিশির আংটিটা নিয়ে নেড়ে-চেড়ে বলল, সোনার?

হ্যাঁ। বললাম, যেন দেখে চেনা যায় না, সোনা না পেতল।

 মিশির আবার জিজ্ঞেস করল, পাথর না কাচ?

উল্লুক। পুলিশের কাজ করে, পাথর আর কাচও চেনে না। আমি বললাম, পোখরাজ পাথর!

মিশিরের যেন তাতেও সন্দেহ গেল না, পেনসিল দিয়ে খস খস করে কী লিখল। জিজ্ঞেস করল, পাণ্ডে, আসামির কাছে আর কিছু নেই তো?

পাণ্ডে আমার দিকে ফিরে বলল, অওর কুছ হ্যায়? হ্যায় তো দে দো।

আর কিছু আছে বলে তো মনে করতে পারছি না, একমাত্র জামা প্যান্ট, আর শরীরটা ছাড়া। সে কথা বলবার অবসর না দিয়েই পাণ্ডে আবার আমার গায়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখল। মিশির খাতাটা এগিয়ে দিয়ে বলল, সই করে দাও।

মিশির লোকটা বেশ ভাল বাংলা বলতে পারে, যদি বা দেখে মনে হচ্ছে, অন্য কোনও প্রদেশেরই লোক হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

মিশির আমার দিকে তাকাল, যেন আমি একটা জানোয়ার, এইরকমভাবে দেখছে। বলল, সই করবে না তো কি সব এমনি ফেলে রেখে যাবে।

ফেলে রেখে যাব কেন। এগুলো নিয়ে যাব না আমি?

মিশির এক বার চেয়ারে বসা লোকটার দিকে তাকাল। চেয়ারে বসা লোকটা, অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এবং কিছু লিখতে ব্যস্ত থাকলেও, এদিকেও লক্ষ ছিল। আমার দিকে চেয়ে বলে উঠল, গাড়ল কোথাকার। ওগুলো তোমার নিয়ে যাবার জন্য না। তুমি এখন হাজতে গিয়ে ঢুকবে। যা যা লেখা আছে, দেখেটেখে সই করে দাও।

হাজতে যেতে হলে যে সব রেখে যেতে হয়, জানা ছিল না। সেটা বুঝিয়ে বলে দিলেই হত, তার জন্য গাড়ল বলবার দরকার ছিল না। কিন্তু এখানে দেখছি, সবাই এক সুরে স্বরে কথা বলছে, সবাইকে একই ভাষায় গালাগাল দেওয়া হচ্ছে, কারোকেই বিশেষ কোনও চোখে দেখা বা সম্বোধনের ব্যাপার নেই। লোকগুলো, মানে সেপাই বা কনেস্টবল, ইনস্পেক্টর বা সার্জেন্ট, যাই হোক, সকলেই কাজ করে যাচ্ছে। নিরাসক্ত মুখ, তাতে কোনও ভাবটাবের ব্যাপার নেই, কেবল মাঝে মাঝে হঠাৎ রেগে ওঠা ছাড়া। আমি পেনসিলটা হাতে নিয়ে লেখাগুলো পড়লাম, আমার জিনিসপত্রের হিসাবগুলো ঠিকই ছিল। আমি যখন সই করছি, তখন মিশির আমারই ঘাম মোছা রুমালের মধ্যে সব জিনিসগুলো রেখে একটা ছোট পুঁটলি করে ফেলল, আর আমার সইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, আজকের তারিখটা দিতে হবে।

আমি তারিখটা বসাতে গিয়ে তারিখ মনে করতে পারছিলাম না, পাণ্ডেই সেটা আমাকে বলে দিল, এবং চেয়ারে বসা লোকটি পাণ্ডের দিকে চেয়ে বলল, যাও।

পাণ্ডে আমার হাত ধরে টান, বলল, চলো।

পাণ্ডে বেশ জোরেই আমার হাত ধরল, আমি তার সঙ্গে সঙ্গে চললাম। আমি তা হলে এখন হাজতে যাচ্ছি। পাণ্ডে আমাকে একটা চওড়া ঢাকা বারান্দা দিয়ে নিয়ে চলল, আর তার ভারী বুটের শব্দ গম গম করে বাজতে লাগল। এরকম জায়গায় আমার হাত ধরে রাখার কারণ কী, এরা কি ভেবেছে আমি পালিয়ে যাব। সেটা আমি ভাবতেই পারছি না। এখানকার হাজত-মানে গরাদবন্ধ ঘর আবার কেমন হবে কে জানে। এখন আমি বুঝতে পারছি, আগের থানার স্যার টেলিফোনে বলেছিল, আমার এখানে ফুল হাউস, তার মানে, ওখানে আমাকে রাখবার জায়গা ছিল না, তাই এখানে পাঠিয়েছে। আমি পাণ্ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার জিনিসপত্রগুলো কখন ফেরত পাব?

পাণ্ডে বাংলা বোঝে, জবাব দিল, যব খালাস হোগা।

আমি জানি না, কবে কী ভাবে আমি ছাড়া পেতে পারি। আমাকে বোধ হয় পরশু কোর্টে হাজির করা হবে, এদের কথা থেকে মনে হয়েছে, কোর্টে হাজির করলেই বোধ হয় ব্যাপারটা জানা যাবে, আমি লিপিকে নিয়ে যাইনি বা নাবালিকা হরণ করিনি। লিপিই হয়তো তখন এসে যাবে, কিংবা এতক্ষণে হয়তো লিপি বাড়ি ফিরে এসেছে, আর আমি হাজতে, ভাবা যায় না। পাণ্ডে ডান দিকে ঘুরে, চওড়া সিঁড়ি দিয়ে আমাকে নিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। এখানে আবার দোতলায় হাজত। আমি যেন একটা মোটা মেয়েলি গলা শুনতে পাচ্ছি, যেন কেউ বক বক করে যাচ্ছে, কিংবা খানিকটা গজর গজর করার মতো, কথাগুলো যদিও শুনতে পাচ্ছি না। ওপর দিকে চেয়ে দেখলাম, সিঁড়ির ঠিক ওপরেই বড় গোঁফওয়ালা ঢ্যাঙা হাফ প্যান্ট পরা একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। এখানে সবাই পুলিশ, আর কার কী পোস্ট বা পরিচয় আমি কিছুই জানি না বা বুঝি না। ওপরের লোকটা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছিল। পাণ্ডে বলল, খুল হো।

সিঁড়ির ওপরে লোকটা তাতে নড়ল না। আমরা ওপরে উঠলাম, সে এক বার আমার দিকে তাকাল, আর তখনই আমি কয়েকটা গলার স্বর শুনে, ডান দিকে তাকিয়ে দেখলাম, একটা ঘর, অন্ধকার, ভিতরে কারা যেন ছায়ার মতো নড়াচড়া করছে। আমরা যেখানে দাঁড়ালাম, সেটা একটা চওড়া বারান্দা। বারান্দার পাশেই লোহার গরাদ দেওয়া ঘর, কিন্তু আগের ঘরটা থেকে অনেক বড়, এবং ভিতরে কোনও আলো নেই। বারান্দার আলোটা অনেক নীচে নামানো, ওরই আলো ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়েছে। ভিতরে কত লোক আছে কিছুই বুঝতে পারছি না। মানুষ আর তাদের ছায়াগুলো সব এমন একাকার হয়ে আছে। যে, কিছুই ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আমাকে কি এরা একলা একটা ঘরে থাকতে দিতে পারত না। আমি তো পালাবার লোক না, বা আমাকে যে কারণে ধরে আনা হয়েছে, তাতে পালানো চলে না। লোকটা, মানে যাকে আমার হাজতের পাহারা বা সেন্ট্রি বলে মনে হচ্ছে, সে লোহার গরাদের আংটায় চাবির গোছা দিয়ে শব্দ করে তালা খুলতে লাগল। সেই মোটা মেয়েলি গলায় বকবক এখন আরও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, আর কথাগুলো যে এত খারাপ খারাপ কথা, তখন বুঝতে পারিনি…অ্যাঁ, তুই মাগি কোন শোরের বাচ্ছার সঙ্গে মারাতে গেলি, অ্যাঁ, বল এক বার তোর বাকসো প্যাঁটরা কার ইয়ের (উচ্চারণের অযোগ্য) মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে নাং করাতে গেলি, আর এখন আমার পোঁদে…যাক গিয়ে, এ সব শুনতে চাই না, কিন্তু ব্যাপারটা কী, এ সব কোথায় শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, কাছেই যেন কোথায় কেউ বলছে, আর দেওয়ালে ধাক্কা লেগে কথাগুলো এদিকে ভেসে আসছে। তালাটা যখন ভোলা হয়ে গেল, তখনই আমি একটা চড়া গলায় ধমকের শব্দ শুনতে পেলাম, এবং সেই মেয়েলি মোটা গলাটা এক বার থেমেই, হঠাৎ আবার শোনা গেল, তা হবে না, আমায় মুখ থাবড়ি দিয়ে তোমরা রাখতে পারবে না, সেই ছেনালকে… থাক গিয়ে, এ সব না শোনাই উচিত। আমি পাণ্ডের দিকে ফিরে বললাম, আচ্ছা, আমাকে আলাদা কোনও একটা ঘরে দেওয়া যায় না, মানে সেটা

আমার কথা শেষ হবার আগেই পাণ্ডে আমাকে ভিতরে ঠেলে দিল, শুনতে পেলাম, খালি বকবকাতা এবং তারপরেই লোহার গরাদ ঝনঝন শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। আমি হাজতের মধ্যে, কোনওদিন যা ভাবতে পারিনি। ঘরের কোন দিকে পা বাড়াব, সেটা ঠিক করবার আগে, আমি চারদিকে তাকালাম। কত লোক, আমি এখনও ঠিক বুঝতে পারছি না, কেবল এক জায়গায়, দেখলাম, কয়েকজন একসঙ্গে ঝুঁকে আছে, আর বারান্দার আলোয়, মেঝের ওপরে একটা অস্পষ্ট ঘর কাটা দেখতে পেলাম। ঘর মানে, যাকে বলে বাঘবন্দি খেলার ঘর কাটা, সেইরকম এবং আলো আসবার পথ ছেড়ে দিয়ে, কয়েকজন সেই ঘর কাটা ছক ঘিরে বসেছে। বসেছে এমন ভাবে, কার কোনটা হাত পা, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, এমনকী কোন ঘাড়ের ওপর কোন মাথা, তাও না। একটু আগেই, বাইরে থেকে এ ঘরটাকে দেখে, চিড়িয়াখানার খাঁচার কথা যেন আমার মনে পড়ছিল, অথচ, এর ভিতরেই বাঘবন্দি খেলা হচ্ছে, যদি বা, ভিতরে এসে এখন আর আমার ঠিক চিড়িয়াখানার খাঁচার মতো মনে হচ্ছে না, ওটা বোধ হয় বাইরে থেকে দেখলেই মনে হয়। যারা খেলছে তারা কেউ আমার দিকে ফিরে তাকাল না। মনে হচ্ছে, যারা এই ঘরের মধ্যে আছে, তারা সবাই দেওয়াল ঘেঁষে রয়েছে, কেন না, দেওয়ালের কাছে ফাঁক প্রায় নেই। মনে হচ্ছে, কেউ কেউ শুয়ে আছে, এবং আমি ঢোকার পরে, দু-একজন উঠে বসে আমার দিকে তাকাল। যারা বসে ছিল তারাও কেউ কেউ আমার দিকে তাকাল, আর আবছা আবছা অন্ধকারে, তাদের যেন ঠিক মানুষের মতো মনে হচ্ছিল না, আবার আমার সেই রকের ছেলেদের কথা মনে পড়ে গেল। নিশ্চয়ই এর পাশে আর কোনও ঘর নেই, এদের সঙ্গেই আমাকে থাকতে হবে, একেই হাজত বলে, যদি বা এরা আমাকে কেউ চেনে না, আমার বিষয়ে কিছু জানে না, কিন্তু ঘরের অন্য দিকে ওটা কী, যেন পাল্লা নেই অথচ একটা দরজার মতো। একজন যেন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। খুব তীব্র না হলেও, ঘরের মধ্যে প্রস্রাবের আর ময়লার গন্ধ আছে। কে যেন কোথা থেকে বলে উঠল, কে রে, খোকন নাকি।

আমাকে বলল কি না, বুঝতে পারলাম না। আমার নাম খোকন না, জবাব দেবারও কিছু নেই। আর একটা গলা শোনা গেল, নয়া চিড়িয়া মনে হচ্ছে। শালা মুরগির মতো করছে।

এ সব কি আমাকে বলছে। মনে হয় না, আমাকে শুধু শুধু ও সব বলতে যাবে কেন। এখন আমার চোখে আর একটু স্পষ্ট হল। দেখলাম, আরও দু জায়গায় দুটো দল ঠিক যেন দলা পাকিয়ে রয়েছে। তারা নিজেদের মধ্যে কী সব বিষয় নিয়ে কথা বলছে। ঘরটা মোটেই চুপচাপ নেই, যেন একটা ছোটখাটো হলের মধ্যে বিভিন্ন দলে সব ভাগাভাগি করে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে। একলা একলা শুয়ে বা বসে থাকা লোক খুবই কম। মাটিতে বসে যাত্রা বা থিয়েটার দেখতে গেলে যেমন নিচু হয়ে এপাশ ওপাশ করে আমি সেভাবেই ঢুকলাম। আমি এখন বসতে চাই। এখন নিশ্চয় আমাকে কেউ বসতে বাধা দেবে না, এবং সারাদিনে, কয়েক খেপে দেড় ঘণ্টা বসবার পরে এই প্রথম আমি বসতে পাব। এ ঘরে যারা আছে, তারা কী ধরনের অপরাধী ঠিক বুঝতে পারছি না। এমনও হতে পারে, আমার মতো অপরাধ না করেই কারোকে হাজতে আসতে হয়েছে। সেরকম কোনও লোক থাকলে তার কাছাকাছিই আমি থাকতে চাই, মানে যাকে বলে সমব্যথী, সেইরকম কারোকে পেলে একটু কথা বলা যেতে পারে। এরা যে রাজনৈতিক কোনও কারণে এই হাজতে এসেছে, তা আমার মনে হচ্ছে না, যদি বা সঠিক কিছুই বলতে পারি না। ভিতরের দিকে যেতে এবার কেউ কেউ আমার দিকে ফিরে তাকাল, মানে দেখল মাত্র। হঠাৎ আমার পিছনে কোমরের নীচে কে যেন একটা চড় মারল, আমি পিছন ফিরে তাকালাম। কেউ আমার দিকে দেখছে না। কে মারতে পারে, আমার চেনাশোনা কেউ আছে নাকি এখানে, আমার সঙ্গে যাকে বলে ইয়ার্কি করছে। কিন্তু সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, কেবল আমার কাছ থেকে বেশ একটু দূরে একটা গ্রুপ, আমার দিকে প্রায় সবাই তাকিয়ে দেখছে। তাদের হাতের নাগালের মধ্যে আমি নেই, আর তাদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে, আঠারো কুড়ির বেশি কারোই বয়স না, এবং এখানে যেন তারা খানিকটা বেমানান। মনে হয় কলেজের ছাত্রটা হবে। তা হোক, কিন্তু আমার পা-পা-পাছায় এরকম চাঁটি মারল কে। আমার সেই অশুভ আর অমঙ্গল বোধটা যেন আবার জেগে উঠল, একটা ভয়ের ভাব। সবাই মিলে আমাকে এরকম মারতে আরম্ভ করবে না তো!

কিন্তু না, ঘরটার ভিতর দিকে যতই ঢুকছি, দুর্গন্ধটা যেন ততই বাড়ছে, বিশেষ করে কোথা দিয়ে যেন মাঝে মাঝে বাতাস আসছে, ততই দুর্গন্ধটা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। আমি আর একটু এগিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম, একটা জায়গা দেখতে হবে। দেওয়ালের দিকটাতেই আমার লক্ষ্য, কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি কেন সবাই দেওয়ালের দিকটা আগে দখল করতে চেয়েছে। সকলেই হেলান দিতে চায়, হেলান দিয়ে বসতে চায়, যেটা আমিও এখন চাইছি। বারান্দার আলো যে পর্যন্ত পড়েছে, সেই আলোর সীমানার মধ্যেই আমি থাকতে চাইছিলাম। আলোর সীমানা সবই দখল হয়ে গিয়েছে। এবার আমার কাছেই বসে থাকা একজন বলে উঠল, দাদা কি নকশু?

তাকিয়ে দেখলাম, লোকটা আমার দিকেই চেয়ে রয়েছে, আর তার দাঁতগুলো যেন কেমন ঝকঝক করছে, চোখগুলো চকচক করছে। লোকটার কি ল্যাজ আছে, কেনো, ঝকঝকে দাঁতের ফাঁক দিয়ে প্রায়ই তার জিভটা বেরিয়ে পড়ছে। কিন্তু নকশু মানে কী। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে বলছেন?

লোকটা জিভ দেখিয়ে বলল, হ্যাঁ। নকশু হন তো ওদিকটায় চলে যান।

বলে যেদিকে আঙুল দেখাল, সেদিকটাতেই সেই আঠারো কুড়ি বছরের ছেলেগুলো বসে ছিল। ছেলেগুলো আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না, জিজ্ঞেস করলাম, নকশু মানে, নকশু মানে কী?

গলার টাকরায় ফ্যাক করে শব্দ করল লোকটা, এক ধরনের হাসি, কেনো, এই শব্দের সঙ্গে, কেউ কেউ যাকে বলে হাসি, সেইভাবেই হেসে উঠল, আর শোনা গেল, পগারে মাল মাইরি।

কথাগুলো বাংলা বলেই মনে হচ্ছে, তবে আমার কাছে প্রায় হিব্রুর মতো লাগছে, একটা কথারও মানে বুঝতে পারছি না। নকশু পগারে মাল এ সবের মানে কী। কিছুটা আলো আর অনেকটা আবছা অন্ধকারে, সকলের দিকেই তাকাতে লাগলাম। ভয়ের ভাবটা বাড়ছে। পরিমল আমাকে বলেছিল, আমি একটু কাওয়ার্ড আছি। বিশেষ বিশেষ জায়গায়, একলা থাকলে আমি ভীরু হয়ে উঠি, যদি বা, ভিতরে ভিতরে একটা জোর পাবারও চেষ্টা করতে থাকি, যেটাকে জলে ডুবে যাবার সময় জোরে ঠেলে ওঠার চেষ্টার মতো বলা যায়, যেমন করে হোক, একটু নিশ্বাস। এখানে আমার নিজেকে একলা মনে হচ্ছে, জানি না, বাকি লোকগুলো সব এককাট্টা কিনা। এই সময়ে একজনের গলা শোনা গেল, নকশু মানে নকশাল।

নকশু মানে নকশাল। এ কি বিমলকে বিমু বলে আদর করে ডাকার মতো নাকি, বুঝতে পারছি না। ইতিমধ্যে বন্ধুদের কল্যাণে অনেক রকম কথাই শুনেছি, নকশু কথাটা শোেনা হয়নি। এটা আদর না ঠাট্টা না বিদ্রূপ, কিছুই বুঝতে পারলাম না, তা হলে তো এরকম অনেক হতে পারে, সিমু, সিপু, অরু, ফরু, বলু, বংকু, মেলাই। কিন্তু যাই হোক, আমি নকশাল নই।

আমি সেই ছেলেগুলোর দিকে ফিরে তাকালাম, ওরা এখনও আমার দিকে চেয়ে আছে, আর নিজেদের মধ্যে কী যেন বলাবলি করছে, দু-একজন হাসছে। আমি অন্য একটা বামপন্থী দলের সঙ্গে আছি, যদি বা এখন আমি হাজতের রাজনৈতিক ভাগাভাগির মধ্যে যেতে চাই না, কারণ, আমি কোনও রাজনৈতিক কারণে এখানে আসিনি। অন্য একটা অপরাধের নাম করে আমাকে এখানে আনা হয়েছে, যে-অপরাধ আমি করিনি, এবং সে কথাটা এখানে আমি আর বলতে চাই না। আমার একলা থাকাই ভাল। কারোকে কিছু না বলে, আমি আবার একটা যাকে বলে ঠেস দিয়ে বসবার জায়গা দেখতে লাগলাম। আলো ছেড়ে আবছা অন্ধকারের দিকেই আমাকে যেতে হচ্ছে। অন্ধকারটা আমি চাইনি, জায়গা নেই, তাই সেদিকেই এগোতে হচ্ছে।

কেস কী?

আমাকে জিজ্ঞেস করছে নাকি। সে কথা তো আমি বলতে পারব না, কারণ, আমি জানি, বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না যে, সে অপরাধ আমি করিনি। অবিশ্যি এ কথা আমি বলি না, বাবা মা, অর্থাৎ যারা জন্ম দিয়েছে, তারাই সন্তানকে সবথেকে বেশি চেনে, যদি বা তাদের দাবিটা সেই রকমেরই, যেমন, তোর পেটে আমি জন্মাইনি, আমার পেটেই তুই জন্মেছিস ধরনের কথা মায়েরা বলে থাকে, বা বাবারাও জন্ম দেবার জন্য খুব বুক ফুলিয়ে কথা বলে, কিন্তু এটা একটা জঘন্য মিথ্যা কথা, যারা জন্ম দিয়েছে, জন্মিতকে তারাই বেশি চেনে। একটা বিশেষ সময় পর্যন্ত তারা চিনতে পারে, তারপরে তাদের মধ্যে অপরিচয়টাই বাড়তে থাকে, কেনো, জন্মিত তখন নিজের মন আর চরিত্র নিয়ে, আর একটা শেপ মানে যাকে বলে রূপ, তাই পেতে থাকে। তাই ভাবছি, এরা, মানে এই হাজতের এরা আমাকে চিনতে বা বিশ্বাস করতে পারবে না, কারণ আমার বাবা মা-ই আমাকে বিশ্বাস করেনি, এরকম কথা বলতে চাই না। তবে, আমি কিছুই বলতে চাই না, কারণ আমি জানি, এমন একটা অপরাধে আমাকে ধরা হয়েছে, আর সব মানুষের মন এমনিই, কতগুলো ধরাবাঁধা ছকের মধ্যে ঘোরাফেরা করে, এবং বিশেষ করে শাসন ব্যবস্থা যখন আমার বিরুদ্ধে পরোয়ানা হাজির করেছে, তখন আমাকে এরাও বিশ্বাস করবে না। আমি জবাব না দিয়ে একটা আবছা অন্ধকার দেওয়ালের দিকে এগোতে লাগলাম।

ছিনতাই?

 চুরি?

পিকপকেট?

মস্তানি?

কটা গলায় জিজ্ঞাসাগুলো শোনা যাচ্ছিল, বুঝতে পারছিলাম না। একটা হতে পারে, একের বেশিও বা, তবে এ ঘরের অধিকাংশ লোকই নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় ব্যস্ত, বা চুপচাপ ঘুমোতে চাইছে বা বসে আছে। ভয়ের ভাবটা আমি কাটিয়ে উঠতে চাইছি। কয়েকজন এ সব কথা বলছে বাকিদের কাছে। আমি কিছুই না, কেউ না, কোনও কারণ না, যেমন নীচের অফিসে সবাই যে যার কাজ করছে। নিরাসক্ত, কোনও বিষয়েই, কারোর প্রতিই বিশেষ করে কোনও কৌতূহল নেই, সব, সবাই সমান, সবাই এক। আমি দেওয়ালের কাছে এগিয়ে গেলাম।

মাগিবাজি?

মাল খুব ঘাঁতিয়াল।

আমি দেওয়ালের কাছে গিয়ে নিচু হয়ে দেখলাম। একটুখানি ফাঁক আছে, একজন বেশ ভালভাবেই বসতে পারে। আমি যতটা ঠাসাঠাসি ভাবছিলাম, ততটা না। একটা লোক, তা পঞ্চাশের ওপর বয়স হবে, একটা গেঞ্জি গায়ে, লুঙ্গি পরনে, দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। পা দুটো ছড়িয়ে দিয়েছে সামনে। কালোমোটা মতো লোকটাকে দেখে আমি প্রায় চমকেই উঠেছিলাম। দুপুরবেলা আমি যখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেখানকার চায়ের দোকানওয়ালার মতো লোকটার চেহারা। লোকটা আমার দিকে তাকালও সেইভাবে, এবং আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম, চোখাচোখি হতে, সে হাসল। হাসলই তো, নাকি, কেন না, আমি তার দাঁত দেখতে পেলাম, নাকের পাশটা কোঁচকাতেও দেখলাম। তবু আমি হাসতে পারলাম না। লোকটার পরে ফাঁকা জায়গাটা ছেড়ে দুজন শুয়ে আছে দেখলাম। শুয়ে থাকলেও, তারা যেন নড়াচড়া করছিল, মনে হচ্ছিল, জাপটাজাপটি করে শুয়ে থাকলেও তারা হাত পা ছুড়ছে। তা হোক, এবার আমি বসব, এবং সেই ভেবে বসতে যেতেই, যারা শুয়েছিল, তারা যেন কেমন মারামারি করছে বলে মনে হল। আমি অবাক হয়ে কালো মোটা লোকটার দিকে তাকালাম। লোকটা আবার সেইরকম দাঁত দেখাল, তার মানে কী, হাসছে? আবার আমি মোয়া মূর্তি দুটোর দিকে তাকালাম, ওরা যেন একজন একজনকে চেপে ধরে কুস্তি খেলছে, আর একটা চাপা গোঙানো স্বর আমার কানে এল, সশালা হারামি…তারপর যা বলল, সেগুলো খুবই খারাপ কথা। কালোমোটা লোকটা আমার হাঁটুর কাছে খোঁচা মেরে বলল, বসো না।

আমি চমকে উঠেছিলাম হাঁটুর কাছে খোঁচা খেয়ে। লোকটার দিকে ফিরে তাকালাম, একটু যেন ভরসাও পেলাম। লোকটা বাঙালি না বোধ হয়, কথার সুরটা যেন কেমন। যে-দুজন জাপটাজাপটি কুস্তির মতো করছে, তাদের অন্য পাশেও ছায়ার মতো মূর্তি দেখা যাচ্ছে, বসে আর শুয়ে আছে। আমি আস্তে আস্তে বসলাম, সত্যি, কোমরের কাছটা টনটন করে উঠল, ব্যথা আর আরাম, একসঙ্গেই। হাঁটুটা একটু মুড়তে গিয়ে মনে হল, বাঁকানো যাবে না। হাত দিয়ে, আস্তে আস্তে বাঁকিয়ে নিলাম, কয়েকবার মট মট করে শব্দ হল, আর আমার ডান পাশে আবার সেই গোঙনো স্বরে খারাপ গালাগাল শোনা গেল, সেই সঙ্গে যেন দম আটকে কেউ হাসল, কিন্তু হাসতে গিয়ে দমটা চাপবার জন্য, এরকম খ্যাস খ্যাস শব্দ হল। আমি ডান পাশে আবছায়ায় ভাল করে দেখতে চাইলাম, সেই সময়েই, আমার কুচকির কাছাকাছি, ঠ্যাঙের ওপর বেশ একটু জোরেই থাবার চাপ পড়ল। ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, কালো গেঞ্জি গায়ে লোকটি, দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছে, হাসিই বোধ হয় এটা, কেন না, তারপরেই সে আমার ঠ্যাঙের ওপর মাংসে আরও জোরে চাপ দিয়ে, অনেকটা খামচে ধরার মতো করে যেন কিছু ইশারায় বোঝাতে চাইল, বলল, সসসালারা সসয়তানি করছে, তুমি আপন মনে বসো না।

তার কথা শেষ হবার আগে, তার পাশের লোকটা, নাকি আর কেউ হেসে উঠল, আর আমার পাশের লোকটা, আমার উরুতের ওপরে একই ভাবে চাপ দিয়ে দিয়ে, মাঝে মাঝে একটু চাপড় মারতে লাগল, যেন আমাকে সে সান্ত্বনা দিতে চাইছে, বা ওই জাতীয় কিছু, যদি বা ব্যাপারটা আমার মোটই ভাল লাগছে না। সে এরকম করে যাবে কেন। আর ওরা কী শয়তানি করে যাচ্ছে, তাও আমি জানি না, বা এতে হাসির কী আছে, তাও জানি না। লোকটা এমন একটা ভাব করছে যেন সে আমার খুবই ঘনিষ্ঠ, তা না হলে কেউ কোলের ওপর হাত দিয়ে ওরকম করতে পারে না। অথচ অস্বস্তির কথাটা বলতেও পারছি না, একটা ভাল লোককে সামান্য কোনও কারণে দুঃখ দেওয়া উচিত না, কিন্তু আমি প্রায় চমকে উঠলাম, নোকটার হাত অন্যদিকে যাচ্ছে। এ আবার কী রকম ব্যাপার, এটা একটা থানার হাজত, দরজায় পুলিশ পাহারা, আশেপাশে এতগুলো লোক, তার মধ্যে এরকম ব্যাপার কেউ করতে পারে নাকি। আমি কি দু বছরের শিশু যে, আমার দু উরুতের মাঝখানে সে হাত দিচ্ছে, এবং এটা বোধ হয় কাউকেই বলে দিতে হয় না, হাতের ভাবভঙ্গি এমনই, অর্থাৎ যাকে বলে মুদ্রা, সেটা একভাবে বুঝিয়ে দেয়, ব্যাপারটা মোটেই ভাল না। আর এটা এক ধরনের কী বলব, নিষ্ঠুরতা ছাড়া আর কিছু না, আমি একটা লোক সারাদিন বাদে একটু দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসবার সুযোগ পেয়েছি, সেই সময়ে এ ধরনের একটা ব্যাপার। আমি লোকটার দিকে ফিরলাম, দাঁত দেখা যাচ্ছে, বোধ হয় হাসি-ই, কিন্তু আবছা অন্ধকারে এ হাসিটা এক ধরনের নেকড়ের হাসির মতোই মনে হল। আমি লোকটার হাতটা কনুই দিয়ে ঠেলে দিলাম, বললাম, হাতটা সরান।

লোকটা হাত সরিয়ে নিল এমনভাবে যেন তার কোনওরকম খেয়ালই ছিল না, বা একটা ভুল হয়ে গিয়েছে। তা অবিশ্যি হতে পারে, কিন্তু এরকম ভুল না হওয়াই উচিত, বিশেষ করে সেটা যখন একটা লোকের বিশেষ জায়গা নিয়ে ভুল করা। ইতিমধ্যে আমার ডান পাশের হুডযুদ্ধ থেমেছে, একজন উঠে বসেছে, আর একজন শুয়েই আছে উপুড় হয়ে। যে উঠে বসছে, তার বয়স খুব বেশি মনে হল না, পনেরো-ষোলো বছর হতে পারে। মনে হল, সে তার প্যান্টটা কোমরের দিকে টেনে তুলছে আর গোঙানো স্বরে সেই সব ভাষায় গালাগাল দিয়েই যাচ্ছে। আমি ছেলেটার দিকে এক বার ফিরে তাকালাম। সে আমার দিকে ফিরে তাকাল না। আশেপাশের আরও দু-তিন জন ওর দিকে চেয়ে দেখল। আমার বাঁ দিকে যেন আবার সেই খেয়াল নেই ভুল করার ব্যাপারটা ঘটতে যাচ্ছে, কারণ আমার উরুতে হাতের চাপ লাগছে। আমি এবার বিরক্ত হয়ে লোকটার দিকে তাকালাম, সেই দাঁত, এবং পরমুহূর্তেই চোখে পড়ল, লোকটা তার অন্য হাত দিয়ে নিজের দুই উরুতের মাঝখানে, শিশুদের মতো খেলা করছে। লোকটার কি খেয়াল নেই ভুল করে এরকম করছে জানি না, কিন্তু আমি কি সত্যি ব্যাপারটা দেখছি–মানে দেখতে পেলাম। সেই দাঁত ঠিক আছে, এখন আর হাসি বলে মনে করতে পারছি না, এবং সে যেন ভুরু তুলে তুলে আমাকে একটা কিছু ইশারা করছে, অবাক হচ্ছি, তার আশেপাশে কেউ যদি ব্যাপারটা দেখে, তা হলে সে কী করবে। আবার একটা অস্থির বিভ্রান্তি আর অনিশ্চিত অবস্থা আমার মধ্যে জেগে উঠল, হাজত মানেই চুপচাপ স্থির হয়ে বসে ভাববার জায়গা না। ভেবেছিলাম, লিপির সঙ্গে কয়েকদিন ধরে আমার যে সব কথাবার্তা হয়েছে, তার একটা

নীরেন হালদার।

আমার নাম, আমার নাম। আমার নাম ধরে কে যেন ডেকে উঠল, আমি চমকে উঠলাম, গরাদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, পাহারাদারের চেহারাটা একটা মূর্তির মতো দেখাচ্ছে। আবার ডাক শোনা গেল, নীরেন হালদার কোন আছে ইধর আও।

মুক্তি। মুক্তি নাকি। লিপির খবর পাওয়া গিয়েছে? পরিমল ফিরে এসে কিছু জানিয়েছে? অথবা অন্য কোনওরকম দুঃসংবাদ–অর্থাৎ লিপির কোনও দুঃসংবাদ। আমি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালাম, এবং তার মধ্যেই আর একবার ডাক শুনতে পেলাম, নীরেন হালদার।

আমি বলে উঠলাম, এই যে, যাচ্ছি।

আমার মনে হল, আরও কেউ যেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, কারণ একটা বেশ বড় ছায়া পড়েছে। বারান্দার মেঝেয়। পরিমল এল নাকি, নাকি আর কেউ, পার্টির প্রিয়তোষদানা, মনে হয় না। তার বা তাদের আমার ওপরে অন্য কারণে, নিতান্তই পার্টিগত, আর সে রাগ কোনও কারণেই কাটবে কি না সন্দেহ। আমার বাবা আসবেন, এটা তো ভাবাই যায় না। আমি সবাইকে ডিঙিয়ে বাঁচিয়ে লোহার বন্ধ গরাদের কাছে গেলাম। পাহারাদারের পিছনে, একটু দূরে, সেই পাণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে, যে আমাকে কিছুক্ষণ আগেই নিয়ে এসেছিল। পাহারাদার পাণ্ডের দিকে ফিরে তাকাল, পাণ্ডে কাছে এসে ঘাড় নাড়িয়ে বলল, হাঁ।

ঝনঝন শব্দে তালাটা খোলা হল, পাহারাদার আমাকে বলল, বাহার আও।

আমি বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। ছাড়া পেলাম তা হলে, কিন্তু কেন বা কেমন করে, এইটুকু সময়ের মধ্যে কী ঘটে যেতে পারে। যাই হোক, রাত্রিটা যে এই নরকে–ভাবনাটা শেষ করতে পারলাম না, পাণ্ডে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, যাও, খানা খা লেও।

খানা–মানে খাবার। পাণ্ডে যেদিকে হাত দেখাল, দেখলাম সেদিকেই বারান্দারই এক পাশে একটি লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। সামনের টেবিলে কলাপাতা আর মাটির ভাঁড় দেওয়া রয়েছে, নেমন্তন্নর বাড়িতে যেমন থাকে, অতিথিদের খাবার জন্য। তা হলে মুক্তি না, খাবার জন্য ডেকেছে। প্রথমটা খুব হতাশ হলেও, খাওয়ার কথাটা যেন হঠাৎ আমার মস্তিষ্কে গিয়ে, যাকে বলে গদাম করে একটা লাথি কষাল, খিদে খিদে খিদে–ভীষণ খিদে পেয়েছে। আমি টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলাম। যে-লোকটা খেতে দিতে এসেছে, বাঙালি না অবাঙালি বুঝতে পারলাম না। একি থানারই লোক, না অন্য কোথাও থেকে খাবার আনিয়ে দেয়, কিছুই জানি না। লোকটা আমার দিকে একবার তাকিয়ে দেখল মাত্র, তার বেশি কিছু না। দেখেই কলাপাতা ঢাকা দেওয়া পাত্র খুলে, আমার সামনে পাতা কলাপাতায় ভাত ঢেলে দিল। আমি মাটির ভাঁড়ের জল দিয়ে হাতটা ধুতে গেলাম, পাণ্ডে অন্যদিকের দেওয়ালে লাগানো একটা কল দেখিয়ে দিল। যতই ধুই, হাতের তেলতেলে ভাবটা কিছুতেই গেল না, সাবানও নেই, আর খচ্চরেরা তা ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়, পকেটের রুমালটা পর্যন্ত নিয়ে নিয়েছে। হাজতে থাকবার সময় কিছুই রাখা যাবে না। তা হলে আর জামা কাপড়গুলো গায়ে রাখতে দেওয়াই বা কেন, হাজতে ঢোকবার আগে খুলে নিলেই পারে।

আমি বেশ বুঝতে পারছি, আমার মাথার মধ্যে যেন কেমন দপ দপ করছে, আমি এখন যার তার মা বোনকে নিয়েও গালাগাল দিয়ে উঠতে পারি। কিছুই বলা যায় না। আমি যখন কলাপাতায় ঠাণ্ডা ভাতগুলোতে হাত দিলাম, তখন আমার গলার কাছে কিছু একটা যেন আটকে গিয়েছে মনে হল, সেটাকে জোর করে গিলতে গিয়ে বুকের কাছেও লাগছে, আশ্চর্য, কান্না পাচ্ছে নাকি, মনে হচ্ছে, চোখ দুটো ভিজে যাবে। জঘন্য, এমন ভিজে জ্যাবজ্যাবে ভাত আমার একেবারেই ভাল লাগে না। কিন্তু আমাকে একলা খেতে দিল কেন, বাকি কয়েদিরা কি খাবে না, ভেবে আমি পাণ্ডের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ওরা খাবে না?

জবাবে পাণ্ডে তার গোঁফ-সুদ্ধ ঠোঁটটা বাঁকিয়ে বলল, আরে তু খা, দুসরে কি ইনতেজার ন কর।

অর্থাৎ পরের চিন্তা আমার না করাই উচিত। কিন্তু পাণ্ডে কি আমাকেই তুই বলছে নাকি। অবিশ্যি বললেও আমার কিছু বলবার নেই, কারণ ও তো আমাকে চেনেই না, হয়তো শুধু জানে আমি একটা বাচ্চা মেয়েকে ভাগাতে গিয়ে ধরা পড়েছি। যাক গিয়ে খানিকটা ডাল দিয়ে ভাত মেখে মুখে তুলে দিলাম, স্বাদের কথা ভাবার কোনও মানে হয় না। সকাল নটায় বাড়িতে খেয়েছিলাম, কিন্তু মনে মনে এত উত্তেজিত ছিলাম, ভাত গিলতেই পারছিলাম না। এখন কয়েক গরাস, কিছু না ভেবেই কেবল মুখে দিলাম, আর গিলোম। কী দিয়ে খেলাম না খেলাম, কিছুই বুঝতে পারছি না, তরকারি, ডাল, মাছ না মাংস, বুঝতে পারলাম না। যাকে বলে সাটাসাট সেইভাবে খেয়ে নিয়ে উঠে পড়লাম। যে লোকটা খেতে দিতে এসেছিল, সে বলল, আরও তো ভাত তরকারি রয়েছে।

আমি বললাম, আর খাব না।

পাণ্ডে আমাকে খাবার টেবিলের সামনে থেকে হাতের ইশারায় ডাকল। তার পাশে পাহারাদারও দাঁড়িয়েছিল। আমি তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। পাণ্ডে জিজ্ঞেস করল, সিগ্রেট পিয়েগা?

কে তুমি বান্ধব ওহে শ্রীমধুসূদন–প্রায় এরকম একটা ভাব আমার মনে এসে গেল। শেষ সিগারেট খেয়েছিলাম, বোধ হয়, সেই রাস্তার ধারে, চা খাবার পরে, তারপরে আর মনেই ছিল না। মনে হয়, আমার মতো অবস্থায় কেউ পড়লে, আর এরকম একটা অবস্থা কয়েকদিন চললে, সিগারেট খাওয়ার কথা সে একদম ভুলেই যাবে, তাকে আর চেষ্টা করে সিগারেট ছাড়তে হবে না। পাণ্ডের কথা শুনে আমার নিজেকেই যেন বোকা মনে হল, যাকে বলে, করুণ অথচ ব্যস্ত, সেইভাবে বললাম, আমার কাছে সিগারেট নেই।

পাণ্ডে পাহারাওয়ালার সঙ্গে চোখাচোখি করে হাসল, তারপরে পকেট থেকে এক প্যাকেট সিগারেট বের করল। একটা সিগারেট বের করে দেশলাই সহ, আমাকে দিল, আমি কী বলব, গ্রেটফুল, কৃতজ্ঞ সত্যি, কিন্তু সেটা মুখে না বলেই, গরাদের দরজার দিকে পা বাড়ালাম। পাণ্ডে খপ করে আমার শার্টের কলার পিছন থেকে টেনে ধরে হ্যাঁচকা মারল, প্রথমে খুব একটা খারাপ হিন্দি খিস্তি করে বলল, …শালা, ইধার পিয়ো, তু উধার কহাঁ যাতা?

আমি অবাক হয়ে বললাম, ভেতরে যাব না?

আরে শালা চুতিয়া কাঁহিকা, হাজত কা অন্দর মে বিড়ি সিগ্রেট পিনা মনা হ্যায়, নহি জানতা?

পাণ্ডে দাঁতে দাঁত পিষে কথাগুলো বলল, যেন সে আমাকে দু ঘা কষিয়ে দেবে, এবং তারপরেই পাহারাওয়ালাকে আমার সম্বন্ধে আর একটা খারাপ খিস্তি করল। আমি এখন আর এ সব গালাগাল নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না, কারণ এ সব নিয়ে এখন আমার মাথা ঘামাবার সময় নেই, লাভও নেই। সে যে আমাকে, একটা কয়েদিকে এভাবে সিগারেট খাওয়াচ্ছে, এটাই তো অনেকখানি। পুলিশ হলেও এদের মধ্যে মায়া মমতা আছে, না হয় একটু গালাগাল দিলই, গায়ে না মাখলেই হল। আমি বললাম, আমি, মানে জানতাম না কিনা, তা-ই।

পাণ্ডে আর পাহারাওয়ালা হাসল, আর আমি সিগারেট ধরিয়েই টান দিলাম। পাণ্ডে আমার হাত থেকে দেশলাইটা নিয়ে নিল। সিগারেটে টান দিতে পেরে আমি খুব আরাম বোধ করলাম। এমনকী, আমার যেন একটু ঘুমের ভাব আসছে, সে রকম জায়গা পেলে, ঘুমিয়ে পড়তেও পারতাম, কিন্তু সেই দৃশ্যটা আমার মনে পড়ে গেল, আমার বাঁ পাশের লোকটার, লুঙ্গি সরিয়ে সেই শিশুর মতো খেলা, অথচ সে শিশু না। পাণ্ডে তার গোঁফে কয়েক বার আঙুল বুলিয়ে আমার সিগারেট খাওয়া দেখল, তারপরে বলল, হাজত ছোড়কে যানে কা টাইম মেয়াদ রহেগা তো?

এ কথা কখনও ভুলতে পারি, পাণ্ডে এভাবে নিজে যেচে আমাকে সিগারেট খাওয়াল। এরকম একটা কথা সহজে ভুলতে পারে না কেউ। আমি বললাম, নিশ্চয় মনে থাকবে।

পাণ্ডে বলল, হাঁ, য়্যাদ রাখো। যানেকো টাইম মে কমসে কম দশঠো রুপয়া দেগা, হাঁ? তুমকো বেগ মে বহুত রুপয়া হ্যায়।

সিগারেটের ধোঁয়াটা হঠাৎ গলা আর বুকের সংযোগের কাছে আটকে গিয়ে, যাকে বলে, একটি আক্ষেপের সৃষ্টি হল, এবং খানিকক্ষণ ধরে কাশিটা চলল। একটু সামলে নিয়ে আমি আবার সিগারেটে টান দিলাম। পাণ্ডে জিজ্ঞেস করল, অওর একঠো পিয়েগা?

আমি মাথা নেড়ে জানালাম, আর পিয়েগা নহি এবং একঠো দশ রুপয়া কো নোট…থাক, আমার মনটাই বোধ হয় ছোট। এমন অসময়ে যে একটা সিগারেট খাওয়াতে পারে, সে না-হয় দশটা টাকা নেবেই। পাণ্ডের কথায় আগে কিছু বুঝতে পারিনি, এবং অনেক কিছুই আমি বুঝতে পারি না, তা না হলে, আমার আগেই মনে হওয়া উচিত ছিল, পাণ্ডে এখানে একটা ছোেট ছোঁকরি ভাগানেওয়ালাকে কেন সিগারেট খাওয়াতে যাবে। এখন আমার অস্পষ্টভাবে মনে পড়ছে, হাজত, পুলিশ জেল সেন্ট্রি ইত্যাদি বিষয়ে কখনও কখনও বন্ধুদের মুখে শুনেছি, এবং তাতেই আমার মনে হল, পাণ্ডেকে যখন আমি দশটা টাকা দেব, তখন সেটা শুধু পাণ্ডের একলার না, আরও কয়েক জনের মধ্যে ভাগাভাগি হবে, অন্তত এ পাহারাওয়ালাকে তো ভাগ দিতেই হবে। কিন্তু আমি জানি না কত দিন আমাকে হাজতে থাকতে হবে। শুনেছি পরশু দিন বোধ হয় আমাকে কোর্টে হাজির করাবে। তখন আমাকে কী করতে হবে, কিছুই জানি না। কোন কোর্টে নিয়ে যাবে, তা-ও জানি না। কোর্টে নিয়ে গিয়ে, হয়তো আরও তদন্ত সাপেক্ষে, আমাকে আবার হাজতে পাঠাবে, কিন্তু কিন্তু ইয়েস, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আমাকে জামিন দেওয়া হবে কি না, সেটাই আগের বিচার। আমি জানি না, আমাকে কে জামিন দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে। বাবা পারেন, কিন্তু নেবেন না। একমাত্র পরিমল, জামিন দিতে হলে যে পরিমাণ টাকা সম্পত্তি থাকা দরকার, তা ওর আছে, আরও অনেকেরই আছে, কেউ আসবে কি না, কে জানে। পরিমলকে হয়তো পার্টি–মানে প্রিয়তোষ দা-ই আমাকে জামিন দিতে বারণ করবে, কিন্তু পরিমল তো আসল ব্যাপারটা জানে। আমি তো সমস্ত ব্যাপারটার মাথামুণ্ডু কিছুই এখনও ভেবে স্থির করতে পারলাম না। পরিমল কোথায়? ও কি এখনও বাড়ি ফিরে আসেনি। লিপিই বা–আমি হলুম গে সাত ভাতারি বেশ্যা, হ্যাঁ বলছি তো আমি রাঁড়, তা বলে আমাকে চোর বলা… বিশ্রী, সেই মোটা মেয়েলি গলাটা আবার শোনা যাচ্ছে, এবং একটা জোর ধমক শোনা গেল, তারপরে চুপ, কিন্তু লিপিই বা কোথায় গেল। আবার অশুভ অমঙ্গল চিন্তাটা শিরদাঁড়ার কাছে এসে পাকে পাকে জড়াতে লাগল। তার মানে একটি নাবালিকাকে হরণ করে, তাকে আমি তাকে আমি গুম করে রেখেছি, অতএব আমার মুক্তি নেই। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ফেলে দিতেই পাহারাওয়ালা বলল, চল।

.

হ্যাঁ, বেশ খানিকটা সময় বাইরে কাটানো গেল, কিন্তু ভিতরে, সেই আগের জায়গায় কোনওরকমেই ফিরে যাওয়া চলবে না। একটা আধবুড়ো কালো মোটা লোক লুঙ্গি খুলে শিশুর মতো খেলবে এবং চোখ নাচিয়ে নাচিয়ে আমাকে সেই খেলা দেখাবে, আর ডান দিকে কী ধরনের জাপটাজাপটি কেন গালাগাল, এবং তারপরে কোমরের ওপর টেনে টেনে প্যান্ট-পরা কাণ্ডকারখানা চলবে, ওখানে কিছুতেই সারা রাত থাকা চলে না। পাহারাওয়ালা আমাকে ঢুকিয়ে দিয়ে, আবার গরাদের দরজায় তালা বন্ধ করে দিল। সেই দুর্গন্ধ, মলমূত্র, ঘাম ইত্যাদির সঙ্গে, ভিতরে যেন আমি বিড়ির গন্ধও পেলাম। হতে পারে, সিগারেট খেয়েছি বলে গন্ধটা আমার নাকেই রয়েছে। তবে গন্ধটা একেবারে তাজা বিড়ির গন্ধ, এমন না যে কিছু জানি না বলে বিড়ির গন্ধটাও জানা নেই। তার মানে, তা হলে হাজতের মধ্যেও বিড়ি খাচ্ছে কেউ, কোনও ভয় ডর নেই। আমি যেখানে বসেছিলাম, সেদিকটায় এক বার তাকালাম, আর সেই দাঁতের ঝিলিক যেন দেখতে পেলাম, সেই কালো মোটা লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা লোকটা যেন আমার দিকেই চেয়ে রয়েছে।

আমি ডান দিকে তাকালাম, দু-তিন জন শুয়ে আছে, তারপরেই সেই আঠারো-কুড়ি বছরের ছেলে কটি বসে আছে। মাঝখানের ফাঁকে একজন লোক বসতে পারে। সেই ফাঁকের দিকেই পা বাড়ালাম, ছেলেগুলো আমার দিকে ফিরে তাকাল। ওদের চোখে যেন সন্দেহের ছায়া, আর কে একজন আমার হাঁটুর নীচে একটা জোরে চাপড় দিয়ে বলে উঠল, কোন সসালা রে, আমার গায়ে পা দিচ্ছে।

অথচ আমি মোটেই পা দিইনি। বললাম, আমি তো আপনার গায়ে পা দিইনি।

 লোকটা আচমকা চেঁচিয়ে উঠে বলল, আমি কি মিথ্যে কথা বলেছি, গায়ে পা না লাগলে

বাইরের পাহারাওয়ালা ধমক দিয়ে উঠল, এ্যাইয়োপ, চোপ রহো।

 দেখিয়ে না সিপাইজি, সালা আমাকে গায়ে লাথ মারছে, আবার বলছে মারিনি।

এরকমভাবে যখন বলছে, তা হলে বোধ হয় সত্যি মেরেছি, কিন্তু নিজের কাছে দিব্বি গাললে যদি কথাটা সত্যি হয়, তা হলে বলতে পারি, আমি একেবারেই টের পাইনি। তাও আবার লাথ, জ্ঞানত কারোকে মেরেছি বলে মনে করতেই পারি না, বরং খেয়েছি। আমি কিছু বলবার আগেই, পাণ্ডে সামনে এসে বলল, ঠিক হ্যায়, আভি চুপ যা বেটা, নহি তো নতিজা খারাপ হোগা।

আমি আবার পা বাড়াবার আগে লোকটার দিকে তাকালাম, সেও আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, এবং তার চোখ, সেই দুপুরে দিগা থেকে যা শুরু হয়েছে, সেইরকমই, নেকড়ের মতো জ্বলজ্বল করছে। ঠোঁট নেড়ে, বকবক করে যাচ্ছে, দু-একটা যা কানে আসছে, তাতেই বুঝতে পারছি, খুব খারাপ খারাপ গালাগাল দিচ্ছে। আসলে লোকটা লোকটা ঠিক না, একটা ছেলেই বলতে গেলে, একটা সরু আর লম্বা ইংরেজি এক্স অক্ষরের মতো পড়ে ছিল, আমার জন্য এখন ওকে ইংরেজি ওয়াই শব্দের মতো হতে হবে। পাশাপাশি অক্ষর, এক্স ওয়াই। হাত দুটো নামিয়ে নিলেই ওয়াই, আর তাই করতে হল তাকে, আমি বসে পড়লাম। আঁট প্যান্টের জন্য এভাবে বসা খুব অসুবিধা। সকালবেলা চান করে যখন জামা প্যান্ট পরেছিলাম, তখন তো জানতাম না, আমাকে হাজতবাস করতে হবে, আর হাজতবাস করতে হলে, বাবার মতো ঢোলা প্যান্ট পরে আসতে হবে, তাও জানতাম না। বসলাম, কিন্তু দেওয়ালটা ঠিক পাচ্ছি না, একজনের ঠ্যাঙ এগিয়ে রয়েছে। ইচ্ছে করলেই ঠ্যাঙটা সরাতে পারে, কারণ যার ঠ্যাঙ, সে বসেই রয়েছে। প্রথম দেখার সময়, এ ঘরের মানুষ আর তাদের ছায়া মিলিয়ে যত লোক ভেবেছিলাম তা না, তার চেয়ে অনেক কম। আমি পাছা ঘষটে ঘষটে, ঠ্যাঙের কাছে গেলাম, একটু ছোঁয়ালাম, যদি ঠ্যাঙটা সরিয়ে নেয়। কারণ আশেপাশে আরও অনেক জায়গা, ইচ্ছা করলে ঠ্যাঙ সরাতে পারে। না সরালেও, ঠ্যাঙটা বাঁচিয়ে পিঠটা দেওয়ালে ছোঁয়াবার চেষ্টা করলাম। এখন এটাকে লড়াই বলা যায়, কোনওরকমে একটু পা ছড়িয়ে হেলান দিয়ে বসে অথবা শুতে পারা। আমি কে, কী রকম পরিবেশে থাকি, এখন এখানে আর সে কথা ভেবে কোনও লাভ নেই। অবিশ্যি কোনও পরিবেশেই নিজেকে আমি ভুলে যাই না, আর ভুলি না বলেই, আমার মন এবং শরীর সবসময়েই কাজ করতে থাকে, এখনও করছে। যাক পিঠটা ছোঁয়ানো গিয়েছে, তবে বড় অসুবিধা। কোমরটা অনেকটা দূরে থাকায় পিঠটাকে ঠিক মতো রাখা যাচ্ছে না, তাই একটু আশায় আশায় বলতে গেলে প্রায় ভিখিরির মতোই, ঠ্যাঙে আস্তে করে হাত ছুঁইয়ে ডাকলাম, দাদা, ও দাদা।

কী দ্যাদ্যা? প্রশ্নের ধরনেই যেন কেমন গোলমাল লাগছে, দাদা না বললেই বোধ হয় ভাল হত। তবু বললাম, ঠ্যাঙটা একটু সরাবেন দাদা?

ন্যা দ্যাদা।

এর থেকে পরিষ্কার কোনও কথা হয় না। এর পরেও ঘ্যানর ঘ্যানর করে, (পাঁচ-ছটি ছেলেমেয়ে নিয়ে বাবু মরে যাচ্ছি বাবু, দুটো পয়সা দিন বাবু–ভিখিরি) যদি বলি, দেখুন দাদা সেই সকাল থেকে দাদা একটু বসতে পাইনি, দাদা যদি দাদা…তা হলে ঠ্যাঙসুদ্ধ ঘাড়ের ওপরে তুলে দেবে হয়তো। সত্যি বলতে কী, আজ সকাল থেকে এ সময় পর্যন্ত, এই হাজতের বাইরের বারান্দায়, ভাত তরকারিগুলো খেয়ে, বেঞ্চের ওপর বসে সিগারেট খাওয়ার সময়টুকু, আমার সবথেকে সুখের হয়েছিল। পাণ্ডের টাকার কথাটা এর মধ্যে আছে, তথাপি যাকে বলে, প্রায় পাঁচ থেকে ছ মিনিট, একটা নিখাদ শান্তির সময়। আমি কে, কী অপরাধ করেছি, এ সব কোনও কিছু নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। এখানে যে কারণে সবাই আসে, আমিও সেইরকম কোনও কারণেই এসেছি, এতে ভাববার কী থাকতে পারে, তবে টাকার বিনিময়ে এইটুকু শান্তি সে দিতে পারে, এবং সম্ভবত জীবনে এই ধরনের কিছু মুহূর্তেই মানুষের মনে একটা আশা জাগিয়ে রাখে। একটা গোটা দিনের হিসাবে, এই কয়েকটি মিনিট, এবং সারা জীবনের হিসাবে, এই মিনিটগুলোর যোগফল, বেঁচে থাকবার পক্ষে কম না। শারীরিক ভাবে এবং মানসিক চিন্তা ভাবনার জগতে, নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকেও, এই মুহূর্তগুলোকেই স্বাধীন বলা যেতে পারে। হাজতের মধ্যে এরকম একটা খারাপ–অর্থাৎ দুঃসময়ে আমার এইরকমই মনে হচ্ছে। আমি আমার রাজনৈতিক ভাবনার সঙ্গে এ চিন্তাটাকে বেখাপ্পা মনে করতে পারছি না। আমার বিশ্বাস এবং স্বপ্নগুলো সার্থক হলে, বলা যায়, মানুষ বহু যুগ ধরে যে শৃঙ্খলের মধ্যে বাঁধা পড়ে আছে, সেই শৃঙ্খলের বাঁধন অনেক শিথিল হয়ে পড়বে, স্বাধীনতার স্বাদ পাবার মুহূর্তগুলো অনেক বেশি পরিমাণে বাড়বে। যদি বা, সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে বা পুরোপুরি স্বাধীনতার কথা আমি ভাবতেই পারি না, পৃথিবীতে কোনও যুগেই তার অস্তিত্ব ছিল না, থাকবে না। অথচ আমি যে সব স্বপ্ন দেখে থাকি, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর সেখানে হয়তো এই স্বাধীনতার প্রশ্নটা আর থাকবেই না, এবং–হ্যাঁ, যা ভেবেছি তাই, আমাকে এখন ল্যাট্রিনে যেতে হবে। বেলা বারোটার পরে, এক বার মাত্র রাস্তার ধারে দেওয়ালে, যা আমি এমনিতে কখনও করি না, প্রস্রাব করেছিলাম, তারপরে অনেকবারই শরীরের ভিতরে, বিশেষ তলপেটে সেটা জানান দিয়েছে, যাওয়া হয়ে ওঠেনি। খানিকটা পিছন দিকে গিয়ে, ডান দিকে গরাদহীন দরজার মতো একটা ফাঁক যেখানে রয়েছে, সেটাই ল্যাট্রিন বলে মনে হচ্ছে। কয়েকজনকে কয়েক বারই ওদিকে যেতে দেখেছি, আর দুর্গন্ধটা ওদিক থেকেই আসছে। জানি না, ওখান থেকে ফিরে আর এ জায়গাটা পাব কিনা, কিন্তু। তার জন্য এখন আর বসে থাকবার উপায় নেই।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। আঠারো কুড়ির ছেলেদের সঙ্গে আমার চোখাচোখি হল। ওরা তিন জন এখনও ঘুমোয়নি, বাকিরা নিজেদের সঙ্গে গায়ে পায়ে ঘাড়ে মাথায় মিলিয়ে শুয়ে পড়েছে। আমি বললাম, একটু বাথরুম থেকে আসছি, জায়গাটা একটু দেখবেন।

কেউ কোনও জবাব দিল না, কেবল একটি গোঙানো স্বর শোনা গেল, শালা বাদরুম মারাচ্ছে।

প্রথমে কথাটার মানে বুঝতে পারিনি, ভিতরে গিয়ে বুঝতে পারলাম। প্রস্রাব পায়খানা করার জায়গাটা এমনভাবে তৈরি, ভিতরে ঢুকে বাঁ দিকে একটা মোড় নিয়ে, জায়গাটাকে আড়াল করে দিয়েছে, যদি বা তাতে, কেউ এসে পড়লে, মুখোমুখি হবার কোনও অসুবিধা নেই।

ফিরে এসে দেখলাম, জায়গাটা এক ভাবেই আছে, ঠ্যাঙ সরেনি। আমি বসতে বসতে নিজেকেই বললাম, নাউ, নীরেন, অ্যাটেনশন। লিপির সঙ্গে কয়েকদিন ধরে যে সব কথাবার্তা হয়েছে, সেগুলো ভেবে দেখো। কারণ, আজ সমস্ত দিনে যা ঘটেছে, লিপির অন্তর্ধানের কথাই ভাবছি, কিছু দিন আগে থেকে মোট ব্যাপারগুলো ভাবলে একটা কোনও হদিস (ভয় পাচ্ছি আবার, লিপি কোথায় গেল, কী বিপদে পড়ল কে জানে) পাওয়া যেতে পারে। গতকাল আমার সঙ্গে লিপির সারা দিন দেখা সাক্ষাৎ হয়নি, আর সেটা আগের ব্যবস্থা অনুযায়ী, অর্থাৎ আমরা চলে যাবার আগের দিন কেউ কারোর সঙ্গে দেখা করব না, যাবার দিন দুজনে একসঙ্গে মিলে, একেবারে সোজা চলে যাব মধ্যমগ্রাম। সেই হিসাবে, দেখা সাক্ষাৎ কথাবার্তা পরশু থেকেই ধরতে হবে। গত পরশু, তরশু এবং তরশুরও আগের দিন, এই তিন দিনের মোট কথাবার্তাগুলো মনে করতে পারলেই, টু ট্রেইল অ্যান্ড টু ট্রেসহ নিজেকেই আমার আতা ক্যালানে বলতে ইচ্ছা করছে, আবার ইংরেজি কেন, এ কি কোনও গোয়েন্দা গল্প ফাঁদা হচ্ছে, ভগলুরাম কোথাকার! ভগলুরামের মানে জানি না, আমাকে কেউ কেউ এই বলেও খিস্তি দিয়েছে। যাই হোক, আজকের সকাল থেকে ঠিক চার দিন আগে:

.

সময় সন্ধ্যা ছটা বেজে পঁয়ত্রিশ। স্থান কালীঘাট ভবানীপুর অঞ্চল। একটি তৃতীয় শ্রেণীর রেস্তোরাঁ। রসুন পেঁয়াজের ঝাঁঝালো গন্ধ। পরদা-ময়লা, অনেকের হাত মোছা পরদা ঢাকা কেবিন, ন্যাতা দিয়ে মোছা ভেজা ভেজা কাঠের টেবিল। আমি আর লিপি বসে, মাথার ওপরে এরোপ্লেনের থেকেও জোর শব্দে একটা ফ্যান ঘুরছে, লিপির কপালে শ্যাম্পু করা চুল ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, এমনকী আমার চুলগুলোও। কল্পনা করা যেতে পারে, আমরা যেন উড়ে চলেছি।

লিপি: কী বিচ্ছিরি, স্টাফি।

 আমি: তুমিই তো এখানে আসতে চাইলে।

লিপি: তা নইলে আবার কোথায় কার চোখে পড়ে যাব, মার কাছে (মাকেই ওর ভয় বেশি) রিপোর্ট চলে যাবে, আমরা সেই চুমো খাওয়া চালিয়েই যাচ্ছি। (নিচু স্বরে হাসি, কাজল মাখা চোখে আমার দিকে চাওয়া)

আমি: তা হলে এখানেই একটু কষ্ট করে বসো, আর তো দু-তিনদিন। তারপরে আর তোমার মায়ের কাছে কোনও রিপোর্টই যাবে না।

লিপি: (হঠাৎ যেন ভয়ে ব্ৰস্ত) সত্যি, ভুলেই যাই খালি। পালাবার কথা মনে হলেই বুকের মধ্যে ক্লিপ ঢিপ করতে থাকে।

আমি: (লিপির বুকে হাত চেপে, ওহ এখন চিন্তা করা যায় না) কই দেখি।

লিপি: ফাজিল। তোমার বুক ঢিপ ঢিপ করে না?

আমি: আমার কেন করবে লিপ, আমি তো তোমাকে, এই পৃথিবীকে সাক্ষী রেখে, বুক ফুলিয়ে

লিপি: বাতেলা, বাতেলা, বাতেলা দিয়ো না তো।

আমি: বাকাতাল্লা না, সত্যি বলছি। তোমাকে তো রাজি করাতে পারছি না, এভাবে পালিয়ে যেতে, বলতে গেলে, আমার লজ্জাই করছে।

লিপি।: (টেবিলের ওপরে চোখ) তা হলে যেয়ো না।

 আমি: (লিপির হাত টেনে ধরে) রাগ করছ? আমার কথাটা বোধ হয় তুমি বুঝতে পারছ না লিপ। আমি বলছি, এটা আমার একার লজ্জা না, তোমারও লজ্জা। লোকে বলবে তুমি নীরেনের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছ।

লিপি: বলুক গে, আমি লোকের কথায় কাঁচকলা দেখাই। তুমি বেশি লেখাপড়া শিখেছ, পার্টি কর, লোকের কথা তুমি ভাব, আমি ভাবি না।

আমি: (লিপির কথা ভাবা এবং বিবেচনার কথা মনে রেখে) যাক গে, এখন এ সব আলোচনা করে। লাভ কী। আমরা যে ভাবে যাব ঠিক করেছি, সে ভাবেই যাব।

লিপি: (চুপচাপ, টেবিলে রং করা বড় ধারালো নখ দিয়ে দাগ কাটা)

আমি: লিপ। (লিপির চিবুক ধরে আমার দিকে ফেরানো, ফুলো ফুলো সুন্দর ঠোঁট, রং লাগানো, আমার তৃষ্ণাবোধ, মুখ এগিয়ে নিয়ে ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াই।)।

লিপি: হুঁ, খালি এই সব। পালাবার আগে বলা, আর পালাবার পরে বলা একই কথা।

আমি: (বলার কিছু নেই। গোলাপি জামার আভা লিপির বুকে, আবার ঠোঁট এগিয়ে নিয়ে যাই, বয়ের প্রবেশ, তিন-চারটে প্লেট সাজিয়ে দেয়। চপ কাটলেট না মাথামুণ্ডু কিছুই জানি না। সাজিয়ে দিয়ে চলে যায়।)

লিপি: (হাসি, তবু চোখ পাকিয়ে) দেখে ফেলত যদি?

আমি: লজ্জা পেতাম।

 লিপি: (নিচু গলায় খিলখিল হাসি) এমন কথা বলো, শুনলেই মনে হয়, তুমি একটি খ চয়-চয়—

আমি: (চুমো খাবার পরে) খাবারগুলো খাও। ব্যাপারটা সব মনে আছে তো?

লিপ: (হাতের ছোট রুমাল দিয়ে ঠোঁট চেপে মুছে) এত খেতে পারব না। মনে আছে। কোথায় যেন বলেছিলে?

আমি: মধ্যমগ্রাম, এক বন্ধুর বাড়িতে।

 লিপি: (হেসে) মধ্যমগ্রাম। আর জায়গা পেলে না।

আমি: কয়েক দিন পরেই তো আমরা কলকাতায় ফিরে আসব।

 লিপি: (উত্তেজিত) উহ, একটা হুলুস্থুল পড়ে যাবে।

আমি: তা যাবে। (চুমোর তৃষ্ণা নিয়ে তাকাই)

লিপি: তবে আমি কিন্তু কলকাতাতেই থাকব। বেশ বড় বাড়ি, গাড়ি, আর তুমি এমন বাজে, টুইস্ট নাচতে পার না। আজকাল সব ছেলেরাই পারে।

আমি: (জবাব নেই, তথাপি) হ্যাঁ, ঠাকুর ভাসানের সময় দেখেছি সবাই টুইস্ট করে।

লিপি: (চোখ পাকিয়ে) আমি মোটেই সেই টুইস্টের কথা বলিনি।

আমি: (হেসে) ভাসানওয়ালারা তা-ই ভাবে কিনা! (কিন্তু বড় বাড়ি আর গাড়ি মানে!)

লিপি: তবে তোমার যদি অনেক টাকা বাড়ি গাড়ি থাকত, তা হলে মা বোধ হয় এমনিতেই বিয়ে দিতে দিত।

আমি: (মনে মনে এস্টাব্লিশমেন্ট)

লিপি: (একটু যেন গভীর রাগ রাগ ভাব) তবে, মায়ের তাঁবে আমি আর থাকতে চাই না। মাকে আমি একবার দেখে নিতে চাই।

আমি: (বিস্ময়, খুশি, যদি বা লিপির হঠাৎ এরকম কথার মানে বোঝা গেল না। লিপির ঘাড়ে হাত, হাত দিয়ে একটু ঘষা, মুখটা কাছে টেনে আনা, উরতে হাত…চুমো)

.

পরশুর আগের দিন। সময় প্রায় সাতটা, স্থান গঙ্গার ধার, দুজনে পাশাপাশি বেঞ্চে। আলো জ্বলছে, গাছের ছায়া আমাদের গায়ে। কয়েকটা নৌকা কাছে পিঠেই নোঙর করে আছে। বাঁ দিকে বড় একটা জাপানি জাহাজ। একটা মাঝির গান এইটুকু কানে এল, দিদি অ দিদি গো, আসতে যদি চান/আমার লায়েতে পা দেন/কুমির বলিয়া দিদি গো ডর না করেন।

লিপি: গানটা শুনছ?

আমি: হ্যাঁ, মনে হচ্ছে ফোক সং।

লিপি: তোমাদের কাছে মাঝির গান হলেই তা ফোক সং, না?

আমি: হ্যাঁ, মানে, এদের মধ্যেই প্রাচীন লোকগীতিটিতিগুলো

লিপি: (আমার কোলের ওপরে থাপড় মেরে) হয়েছে থাক, একটু গেঁয়ো সুরে আর গেঁয়ো কথায় গাইলে বা কইলেই তোমাদের কাছে সব ফোক আর্ট। সব বাতেলা আর বুজরুকি।

আমি: (মনে মনে, একেবারে মিথ্যা না, ভণ্ডামিটা এখন চরম উৎকর্ষ লাভ করেছে। বিশেষ করে কলকাতায়, তবে লিপির মুখ থেকে শুনতেই যা একটু খারাপ লাগছে। ও আবার এ সব ভাবতে বা বলতে যাচ্ছে কেন।) গানটা তোমার খারাপ লাগছে?

লিপি: মোটেই না, বেশ লাগছে। মাঝিকেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, অনেকক্ষণ ধরেই আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখছে, তারপরে গান ধরেছে। আমার তো ওর নৌকায় ভাসতে ইচ্ছা করছে।

আমি: (লিপির কথায় প্রতিক্রিয়া, খেয়াল হল, মাঝিটা বোধ হয় ইচ্ছা করেই ওরকম গান ধরেছে) সত্যিই তোমার যেতে ইচ্ছা করছে নাকি?

লিপি: (হেসে) তা যেভাবে দিদিকে ডাকছে। তা বলে তুমি যাবে না, আমি একলা যাব ওর সঙ্গে।

আমি: (বাঁ হাত দিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরে) ইস, যেতেই দেব না।

লিপি: (আমার দিকে তাকায়, অন্ধকারেও আমি ওর ও আমার চোখ দেখাদেখি করতে পারছে) বদমাইশি হচ্ছে। তোমাকে আমি খুব চিনি।

আমি: যাই হোক আসল কথাটা ভাবা যাক। আর মাত্তর এক দিন আমাদের হাতে আছে।

লিপি: হ্যাঁ। আচ্ছা, না পালালে কী হয়।

আমি: (বুকে ধকধক) তার মানে?

লিপি: পালালে কী হবে।

 আমি: কী না হবে। তুমি আর আমি বিয়ে করব, আমরা

লিপি: সংসার করব। কিন্তু ও তো একটা বস্তাপচা ব্যাপার। আমরা বেশ নিজের নিজের মনে রইলাম। যার যা ভাল লাগবে তা-ই করব।

আমি: কল্পনাবিলাস।

 লিপি: আমার বেশ ভাবতে ভাল লাগে। আহ ওরকম করো না, বুকে লাগছে। ওকি, আবার ওখানে হাত কেন।

আমি: ভাল লাগছে, কিন্তু তোমার এই ভাল লাগা ভাবনাটা কোনও কাজের কথা না। পৃথিবীতে সবাইকেই একটা জাগতিক আর–আর কী বলে, একটা লৌকিক নিয়ন্ত্রণের–উহ লাগছে, উরতে এত জোরে চিমটি কেটো না।

লিপি: তবে তুমি ওখান থেকে হাত সরাও। তোমার এ সব পণ্ডিতি কথা আমার ভাল লাগছে না।

আমি: (মনে মনে, লিপির কাছে আমি পণ্ডিতি করতে চাই না, তবে ও আর একটু গম্ভীর হলে, আর বড় হলে, ওকে আমি অনেক কিছু বলতে পারব) আচ্ছা।

একটু চুপচাপ।

লিপি: (হঠাৎ) না, পালাতে আমাকে হবেই। মা বড় বাড়াবাড়ি শুরু করেছে।

আমি: (মনে মনে জানি, মাকে নিয়েই ওর চিন্তা।)

লিপি: কিন্তু মনে রেখো, আমি তুমি আর পরিমলদা ছাড়া কাক পক্ষীও জানবে না।

আমি: (নিজেকে খুব খুশি আর সুখী বোধ করছি।) নিশ্চয়ই না।

বুকমার্ক করে রাখুন 0