2 of 3

বৈজ্ঞানিক আলোচনায় মানব-সৃষ্টি : ডারউইনের বিবর্তনবাদ

বৈজ্ঞানিক আলোচনায় মানব-সৃষ্টি : ডারউইনের বিবর্তনবাদ

ডারউইনের আবির্ভাব ঘটেছিল লামার্ক-এর অর্ধশতাব্দী পরে। ডারউইন তাঁর মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে লামার্ক-এর ধারাতেই আরো অনেক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেন; এবং এই মতবাদের অনেক অগ্রগতি সাধন করেন। তবে, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, ডারউইন মনে করতেন, প্রকৃতির নির্বাচন-সংক্রান্ত মতবাদ শুধু স্বতঃসিদ্ধ নয়, বরং এই মতবাদ সর্বব্যাপক; এবং এই থিওরি দিয়ে যাবতীয় বিষয়ে ব্যাখ্যা সম্ভব।

এছাড়াও, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, ডারউইন তাঁর গবেষণায় সমাজ-বিজ্ঞানের তত্ত্ব বা থিওরি দ্বারা অধিকমাত্রায় প্রভাবিত হন। অথচ, সমাজ বিজ্ঞানের তত্ত্বগত কোন উপাদান বিজ্ঞানের মৌল গবেষণায় আদৌ কোন গুরুত্বের দাবিদার হতে পারে না। তবে, এতকিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দোষ-দুর্বলতা সত্ত্বেও এ কথা মানতেই হবে যে, ডারউইনের থিওরি আধুনিক যুগের সর্বাপেক্ষা পরিচিত থিওরি। এই থিওরির এই সুযশী তথা ডারউইনের এই সুখ্যাতির পেছনে যে-সব বিষয় কাজ করছে, তার বিবরণ নিম্নরূপঃ

ডারউইনের থিওরির যুক্তিসমূহ চরম চাতুর্যের সাথে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। যুক্তির ‘ধার যাই থাকুক, কৌশলগত ভারের’ দরুন সেই যুক্তিকেই সর্বাধিক কার্যকর বলে মনে হয়। এই সঙ্গে আরো একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না যে, এক শ্রেণীর বিজ্ঞানী, মানুষের মূল উৎস-সম্পর্কিত বাইবেলের বক্তব্যকে এবং প্রাণিজগতের অপরিবর্তনশীলতা-সংক্রান্ত বাইবেলীয় শিক্ষাকে হেয়প্রতিপন্ন করার স্বার্থে ডারউইনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আত্মপ্রসাদ লাভ করতে চান।

এ কথা সত্য যে, প্রাণিজগতে বিবর্তনের যে ধারা বিদ্যমান, সেই একইধারায় মানুষ যে বানরের বংশধর, তা প্রতিপন্ন করার কাজেই সাধারণত ডারউইন-থিওরিকে ব্যবহার করা হয়। তবে, মূলকথা এই যে, মানুষ যেকোন এক জানোয়ারের বংশধর, এই ধারণা আদৌ ডারউইনের নয়। বরং, প্রথম ১৮৬৮ সালে হেকেল এই ধারণার কথা ব্যক্ত করেন। অধুনা, প্রায় সবাই সাধারণভাবে ডারউইনের মতবাদের সাথে বিবর্তনবাদকে গুলিয়ে ফেলেন। অথচ, এই গুলিয়ে ফেলার ব্যাপারটি ঘটে থাকে এতদ্‌সংক্রান্ত ভুল ধারণার দরুন।

এই দুই মতবাদের (ডারউইনবাদ ও বিবর্তনবাদ) মধ্যে এ ধরনের গুলিয়ে ফেলার ব্যাপারটা আদতেই বিভ্রান্তিজনক ও বিরক্তিকর। কারণ, ডারউইন নিজেই তাঁর মতবাদকে উপস্থাপন করে গেছেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে।

উল্লেখ্য যে, ডারউইনের পুস্তকটির নাম হল : “অন দ্য অরিজিন অব স্পেসিস বাই মিনস অব নেচারাল সিলেকশন অব দি প্রিজারভেশন অব ফেভার্ড রেসেস ইন দা স্ট্রাগল ফর লাইফ।” এটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম, ১৮৫৯ সালে।

পরবর্তীতে ‘অন দি অরিজিন অব স্পেসিস’ পুস্তক থেকেই ডারউইনের এতদ্‌সংক্রান্ত নিজের বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছে। এখানে ডারউইনের ওই পুস্তকের যে উদ্ধৃতি তুলে ধরা হল, তা ১৯৮১ সালে ‘পেঙ্গুইন বুকস্’ হিসেবে প্রকাশিত পেলিক্যান ক্লাসিক্স সংস্করণ থেকে গৃহীত :

“অতএব, যতজনের টিকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে তারচেয়ে বেশিজন যখন জন্ম নেবে, তখন প্রতিটি ক্ষেত্রেই টিকে থাকার জন্য শুরু হয়ে যাবে সংগ্রাম। একে বলা হয় অস্তিত্বের লড়াই। এ লড়াই দেখা দেবে একই প্রজাতির প্রতিটি প্রাণীর মধ্যে, অপরাপর নির্দিষ্ট কোন প্রজাতির বিরুদ্ধে অথবা জীবনের প্রাকৃতিক অবস্থার সঙ্গেই।… এই অবস্থায় দেখা যায়, মানুষের উপযোগী পরিবর্তন ঘটে চলেছে সন্দেহাতীতভাবেই। এবং জীবনযুদ্ধের বিরাট ও ব্যাপক জটিলতায় কোন-না-কোন পরিবর্তন কোন-না-কোনভাবে কারো-না-কারো জন্যে অধিকতর উপযোগী হয়ে ধরা দিয়ে থাকে। সুতরাং, হাজার হাজার প্রজন্মেরধারায় এইরকম কোন অবস্থার সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় কি? বরং, সম্ভাবনার ঐতিহ্যকেই স্বীকার করে নিতে হয়। আর এরকম অবস্থা যখন দেখা দেবে (মনে রাখতে হবে যে, এটা হচ্ছে সেই অবস্থা যখন যতজন টিকে থাকা সম্ভব তারচেয়েও অধিকসংখ্যক জন্ম নিয়ে সেরেছে) তখন এটা সন্দেহ করা কি অমূলক হবে যে, যারা অন্যদেরচেয়ে–যত সামান্যই হোক–অধিক সুবিধা লাভ করবে, তারাই তখন টিকে থাকার এবং নিজস্বধারায় প্রজনন বৃদ্ধির সর্বাধিক সুযোগ পেয়ে যাবে? পক্ষান্তরে, এটাও আমরা নিঃসন্দেহে ধরে নিতে পারি যে, অনুরূপ কোন পরিবর্তনে তা যত সামান্যই হোক, কেউ যদি প্রতিকূলতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে তাহলে তার বা তাদের ধ্বংসই হবে অনিবার্য। এই যে অনুকূল পরিবর্তনের ধারায় সংরক্ষণ আর ক্ষতিকর পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত হওয়া, এটাকেই আমি নেচারাল সিলেকশন বা প্রকৃতির নির্বাচন বলেছি।”

প্রকৃতপক্ষে, এখানে ডারউইন যা-কিছু বোঝাতে চেয়েছেন, তাতে তার উদ্দেশ্য ছিল একটাই। আর তা হল, প্রকৃতির নির্বাচনে কিংবা জীবন-সংগ্রামে পরিবর্তনের আনুকূল্যপ্রাপ্তির মাধ্যমে জাতিসমূহের টিকে যাওয়ার ধারা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন প্রজাতির অরিজিন বা আদি উৎস সম্পর্কে একটি থিওরি দাঁড় করানো। অথচ, তাঁর এই থিওরিকেই নিজেদের পতাকা হিসেবে লুফে নিয়েছিলেন বিবর্তনবাদীরা। শুধু তাই নয়, বিবর্তনবাদীরা এরপর ডারউইনের সেই থিওরিকে ব্যবহার করে চললেন ধর্মীয়-বিশ্বাসের বিরুদ্ধ-সংগ্রামে বস্তুবাদী চিন্তাধারার হাতিয়ার হিসেবে। এখনো ডারউইনের মতবাদের সেই পতাকা বস্তুবাদী দার্শনিকদের সমান উদ্দীপনার সঙ্গে আন্দোলিত করে।

ডারউইন তাই এখনও নাস্তিক্যবাদী শিবিরের একজন হিরো–পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। বস্তুবাদীগণ যখন তাঁদের মতবাদের যাতাকলে কোনকিছুকে গুঁড়িয়ে দিতে বা উড়িয়ে দিতে চান, তখনই তারা ডারউইন এবং তাঁর এই থিওরির দোহাই পাড়েন। অথচ, পাঠক-পাঠিকাবর্গ ‘অন দি অরিজিন অব স্পেসিস পুস্তকের অধ্যায়ের পর অধ্যায় পড়ে গেলে দেখতে পাবেন, ডারউইনের বিবর্তনবাদ আদৌ ধর্মবিরোধী কোন বিষয় নয়। এমনকি, সে বিবর্তন যদি মানব প্রজাতিরও হয়, তাহলেও তা ধর্মীয় বিশ্বাসকে হেয়প্রতিপন্ন করে না।

মূলত, জীবকোষের জৈবপ্রক্রিয়া-সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার সর্বশেষ ফলাফল বিবর্তনবাদকে সত্য বলে প্রমাণিত করেছে, তবে তা ভিন্নধারায়। এতকাল এই কথাটিকে কেউ কেউ ক্ষীণকণ্ঠে উচ্চারণ করেননি এমন নয়। তবে যেহেতু তাদের কথিত সেই বিবর্তনবাদ ছিল ভিন্নধারার, সেহেতু, বিবর্তনবাদীরা তাঁদের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় বহাতে এতটুকু কার্পণ্য করেননি। কিন্তু, আধুনিক সর্বশেষ বিজ্ঞান-গবেষণা বিবর্তনবাদকে জীবন সাংগঠনিক পদ্ধতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বিষয় বলে রায় দিয়েছেন। আধুনিক বিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত এই সত্য অবশ্য তথাকথিত বিবর্তনবাদীদের ধ্যান-ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। তবুও, অতীতে বিবর্তনবাদ নিয়ে যে ধরনের বিতর্ক ও বাদানুবাদ চলত, আধুনিক বিজ্ঞানের এই আবিষ্কারের দরুন সেই বিতর্কের অবসান সূচিত হয়েছে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন পর্যায়ে, বলতে গেলে, সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে থেকেও এই বিবাদকারীরা এখন একটি অভিন্ন ঐক্যমত্যে একত্রিত হতে পারছেন।

যাহোক, এ কথা মানতেই হবে যে, ডারউইনের মতবাদ বা তত্ত্ব খুবই স্পষ্ট। ডারউইন তাঁর গবেষণাকর্মের দ্বারা এক সাধারণ সত্যের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন, আর তা হল, নির্দিষ্ট কোন প্রজাতির প্রতিটি প্রাণীর স্ব-স্ব চরিত্রের মধ্যেই রয়েছে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভিন্নতার এবং বৈচিত্র্যের দিকথেকে তা ব্যাপক। এই বৈচিত্র্য ও ভিন্নতার যে-সব কারণ ডারউইন উল্লেখ করে গেছেন, তা স্পষ্টতই লামার্ক-এর নির্দেশিত কারণের কাছাকাছি। ডারউইন বর্ণনা করেছেন যে, পরিবেশের পরিবর্তনের দরুন প্রাণিজগতের প্রজনন-কোষসমূহের আকৃতির পরিবর্তন ঘটে থাকে এবং এর ফলে গুণগত যে পরিবর্তন সাধিত হয় তা বংশানুক্রমে সঞ্চারিত হয়। ডারউইন অবশ্য একটি দিক থেকে লামার্ককেও ছাড়িয়ে গেছেন। সে দিকটি হল, প্রকৃতি তার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোন কোন প্রাণীকে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আনুকূল্য প্রদর্শন করে থাকে। এভাবে, প্রকৃতির একটি নিষ্ঠুরপন্থায় যারা দুর্বলতর, তাদের বিনাশ ঘটে; আর প্রকৃতির আনুকূল্যপ্রাপ্তরা টিকে যায়। ডারউইনের আরো অভিমত, প্রকৃতির এই নির্বাচনীয়ধারার পাশাপাশি প্রাণিজগতে যৌনসঙ্গী নির্বাচনের একটা ধারাও অব্যাহত রয়েছে। এই ধারায় স্ত্রী-জাতীয় প্রাণিরা তাদের যৌনসঙ্গী নির্বাচনে শক্তিশালী পুরুষ প্রাণীকেই বাছাই করে থাকে।

নেচারাল সিলেকশন বা প্রকৃতির নির্বাচনের এই যে মতবাদ, তা প্রচারিত হওয়ার পরপরই চারদিকে প্রচুর সাড়া পড়ে যায়। এমনকি এখনও ডারউইনের অনুসারীরা প্রকৃতির নির্বাচন-মতবাদের প্রবক্তা হিসেবে ডারউইনকে এ যাবতকালের সেরা প্রকৃতিবিজ্ঞানী বলে বিবেচনা করেন। জীববিজ্ঞানী হিসেবেও ডারউইন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। মৃত্যুর মধ্যদিয়েই যেন তিনি এ বিষয়ে সর্বাধিক গৌরব অর্জন করেছেন। ডারউইনের রচনাবলী যদিও ধর্ম ও বিজ্ঞানের সংঘাতে নাস্তিক্যবাদের পক্ষে যুক্তি যুগিয়েছিল এবং এ বিষয়টি ঊনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে সর্বত্র উম্মার সঞ্চার করেছিল, কিন্তু তবুও ব্রিটিশ জাতি তার মতদেহ ওয়েস্ট মিনিস্টার এ্যাবোতে সমাহিত করতে কোন দ্বিধা বা কুণ্ঠাবোধ করেনি।

প্রকৃতপক্ষে, ডারউইনের মতবাদের দুটো আলাদা দিক রয়েছে। প্রথমটি বিজ্ঞানভিত্তিক। স্বীকার করতে বাধা নেই যে, ডারউইন তাঁর গবেষণায় গ্রহণযোগ্য সুপ্রচুর তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করেছেন। তবে এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এতদ্সত্ত্বেও তিনি তাঁর পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্তের ভিত বৈজ্ঞানিক দিক থেকে তেমন মজবুত করতে সক্ষম হননি। বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, খোদ বিবর্তনবাদ সম্পর্কেও গ্রহণযোগ্য খুব বেশিকিছু তিনি দিয়ে যেতে পারেননি। অবশ্য, তা আলাদা ব্যাপার। তবে মানতেই হবে যে, বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে বিবর্তনের ধারা-সম্পর্কিত বিষয়ে তাঁর যে পর্যবেক্ষণ, তা খুবই আকর্ষণীয়।

ডারউইনের মতবাদের দ্বিতীয় ধারাটি হচ্ছে দর্শনভিত্তিক। এই বিষয়ে ডারউইন সমধিক গুরুত্ব আরোপে সমর্থ হয়েছেন এবং তাঁর দর্শন-সংক্রান্ত বিষয় ও বক্তব্যের প্রকাশ আকর্ষণীয় ও স্পষ্ট।

মালথাসের মতবাদ এবং…

ডারউইন প্রকৃতির নির্বাচন-সংক্রান্ত তত্ত্ব উদ্ভাবনার ক্ষেত্রে তার ওপরে মালথাসের প্রভাবের কথা অস্বীকার করেননি। নিচে এ বিষয়ে তাঁর যে বক্তব্য তুলে ধরা হল, সেটি পি. পি, গ্রাশের ‘ম্যান স্ট্যান্ডস এ্যাকিউজড’ পুস্তক থেকে উদ্ধৃতি :

এতে দেখানো হয়েছে, কিভাবে এই প্রাণিকূল জ্যামিতিক হারে তাদের বংশবিস্তার ঘটিয়ে থাকে। এই তত্ত্ব মালথাসের এবং এই তত্ত্ব প্রাণিজগৎ ও সবৃজি-জগতের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। উল্লেখ্য, ডারউইনের এই স্বীকৃতি পরিবেশিত হয়েছে তাঁর “অন দি অরিজিন অব স্পেসিস” পুস্তকের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায়, ১৮৬৯ সালে।

ডারউইন প্রাণিজগৎ পর্যবেক্ষণে প্রচুর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণজাত-তত্ত্বকে আর্থ-সামাজিক তত্ত্বের আলোকে ঢেলে সাজিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু, ‘আর্থ-সামাজিক তত্ত্বে’র সংজ্ঞাই। বলে দেয় যে, কোন আর্থ-সামাজিক বিষয়ের সঙ্গে প্রাণিজগতের কোন সম্পর্ক নেই। অবশ্য, এর আগেপর্যন্ত ডারউইন তাঁর প্রাণিজগতের এই পর্যবেক্ষণকে প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যায় অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ডারউইন প্রকৃতিবিজ্ঞানী হিসেবে ১৮৩১ থেকে ১৮৩৬ সাল পর্যন্ত বিগলে জাহাজের মিশনের দক্ষিণ আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাসমূহ পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান। তিনি এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন সম্পূর্ণভাবে। তখনই ডারউইন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে, এসব এলাকায় যেসব প্রাণীর বসবাস, পরিবেশগত কারণে তাদের আকৃতিগত পরিবর্তন কত ব্যাপক। এ থেকেই তিনি এই ধারণায় উপনীত হন যে, প্রাণিজগৎ অপরিবর্তনীয় নয়। তিনি এই বিষয়টিকে কৃত্রিম প্রজনন-পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষ কর্তৃক গৃহপালিত পশুর উন্নতি বিধানের প্রয়াস-প্রচেষ্টার সঙ্গে তুলনা করেন। এই পর্যায়ে তার মনে যে প্রশ্নের উদ্ভব ঘটে, তাহল, প্রকৃতির রাজ্যে প্রাণিজগতের আকৃতিগত কাঠামোর ওপরে এ ধরনের নির্বাচন-পদ্ধতির প্রয়োগ কিভাবে সম্ভব?

এই প্রশ্নের দ্বারা ডারউইন যা বুঝাতে চেয়েছেন, তাহল, মানুষ যেভাবে উন্নতজাতের পশু উৎপাদনে ক্রস-ব্রিডিং পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। প্রকৃতির রাজ্যেও প্রাণিকুলের জন্য তেমনিধারায় প্রাকৃতিক কোন পদ্ধতি বিদ্যমান। লক্ষ্য করলেও স্পষ্ট বুঝা যায়, প্রকৃতির রাজ্যে প্রাণিজগতের মধ্যে একধরনের প্রাকৃতিক-নির্বাচন রয়েছে, এবং তা স্বতঃস্ফূর্ত। ডারউইনের মাধ্যমে এভাবেই একসময় একটি জিজ্ঞাসার উদ্ভব ঘটেছিল এবং একটি ধারণাভিত্তিক তত্ত্ব গড়ে উঠার পথ হয়েছিল প্রশস্ত। কিন্তু জিজ্ঞাসার জবাব যে ধারায় এগিয়ে গেছে, তা সঠিক কোন ভিত্তি বা বাস্তবতা খুঁজে নিতে পারেনি।

ডারউইন যে কিভাবে মালথাসের ধারণাকে তার তত্ত্বের যৌক্তিকতা প্রমাণের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন, তা বুঝে উঠা সত্যি মুশকিল। মালথাস ছিলেন একজন এ্যাংলিক্যান পাদরি। অর্থনীতিতে জনসংখ্যা এবং জনসংখ্যার বৃদ্ধি কি পরিণতি বয়ে আনে, গোড়া থেকে সে বিষয়টার ওপরে মালথাসের ছিল দারুন আগ্রহ। ১৭৯৮ সালে মালথাস বেনামিতে একখানা পুস্ত ক প্রকাশ করেন। “এসে অন দি প্রিন্সিপাল অব পপুলেশন” শীর্ষক এই পুস্তকে তিনি জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সমস্যার ব্যাপারে বিভিন্ন সমাধানের পন্থা নির্দেশ করেন। যেমন, ‘পুওর ল’।

তাঁর প্রস্তাবিত এই আইনের মূলবক্তব্য হচ্ছে, যে-সব ব্যক্তি নিজে কিছুই উৎপাদন করে না এবং ধনীদের দান-খয়রাতে বেঁচে থাকে, তাদের সকলরকম সাহায্য-সহযোগিতা বাতিল করা উচিত। মালথাসের বক্তব্য ছিল, মানুষেরা নিজেরাই নিজেদের টিকে থাকার ব্যাপারটা বেছে নেবে; উৎপাদনে যারা সক্রিয় ও সক্ষম শুধু তাদেরই বেঁচে থাকার অধিকার থাকবে। পক্ষান্তরে, প্রকৃতিগতভাবে যারা অক্ষম অথবা দুর্বল তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

সময়টা ছিল শিল্প-বিপ্লবের প্রাথমিক যুগ। তখন শ্রমিক সমাজের মধ্যে এমনিতেই দুঃখ-দুর্দশার সীমা-পরিসীমা ছিল না। সেই দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে মানবিক দানশীলতাকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করার এই প্রস্তাব জনসমক্ষে পেশ করা হয়। কিন্তু মালথাসের এই অমানবিক প্রস্তাবনার মধ্যেই ডারউইন তাঁর নিজস্ব ‘প্রকৃতির-নির্বাচন তত্ত্বের আকর্ষণীয় উপাদান পেয়ে যান ও মালথাসের ধারণাকে তিনি নিজস্ব তত্ত্বে প্রয়োগ করে ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ সুনিশ্চিত করার কাজে কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েন। তিনি দেখানোর প্রয়াস পান যে, প্রকৃতি নিজেই তার নির্বাচনে দুর্বলদের বাদ দিয়ে শক্তিমানদের সংরক্ষণ করে থাকে।

ইতোপূর্বে যা বলা হল, তার কোনটিই অসত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, কাগজে কলমে ডারউইনের এই স্বীকৃতি যদি আমরা না পেতাম তাহলে কে ভাবতে পারত যে, তিনিও মালথাসের সমাধানের মত এত কঠিন ও নিষ্ঠুর এক মতবাদকে নিজ তত্ত্বের সঙ্গে সংযুক্ত করে নিয়েছিলেন। এভাবে মালথাসের নিকট থেকে গোড়াতে ডারউইনের প্রেরণালাভ এবং পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর মতবাদ দিয়ে সবকিছুর ওপরে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টাকে পি. পি. গ্রাশে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন। গ্রাশে তাঁর “ম্যান স্ট্যান্ডস্ এ্যাকিউজড়” পুস্তকে গোটা ব্যাপারটাকেই দুর্ভাগ্যজনক আখ্যায়িত করে বলেছেনঃ

“এ ধরনের মূলনীতি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কারণেই ডারউইনবাদ এ যাবতকালের সব মতবাদের মধ্যে চরম ধর্মবিরোধী ও চরম বস্তুবাদী মতবাদ হিসেবে বিরাজ করছে।” পি. পি. গ্রাশে এই মর্মে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ডারউইন মতবাদের এই দিকটির ব্যাপারে খ্রিস্টান বিজ্ঞানীরাও তেমন অবহিত নন। তিনি আরো মন্তব্য করেছেন, “ডারউইনের থিওরিই কার্ল মার্কস-কে তাঁর মতবাদে অনেক বেশি আস্থাবান হতে সহায়তা করেছে। ডারউইনের ‘অন দি অরিজিন অব স্পেসিস’ পুস্তকেই কার্ল মার্কস তাঁর বস্তুবাদী ও নাস্তিক্যবাদী তত্ত্বের জোরালো প্রেরণা খুঁজে পাননি এবং এ কারণেই তিনি ডারউইনের এই পুস্তকের প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ। শুধু তাই নয়, ডারউইনের এই পুস্ত ককে কার্ল মার্কস্ তার নিজস্ব মতবাদ প্রতিষ্ঠায় ইচ্ছামত ব্যবহারও করেছেন।”

মানবসৃষ্টি : বাইবেলের আলোকে

বাইবেলে প্রকৃতিবিজ্ঞান-সম্পর্কিত এমন কোন বাণী বা বক্তব্য নেই যা নিয়ে কোন গবেষণা-পর্যালোচনা পরিচালিত হতে পারে। পক্ষান্তরে, পবিত্র কোরআনে প্রকৃতিবিজ্ঞান-সংক্রান্ত এত অধিক বাণী ও বক্তব্য বিদ্যমান যা নিয়ে মানব ইতিহাসের যেকোন পর্যায়েরই গবেষণা চালান সম্ভব। শুধু তাই নয়, কোরআনের সেই গবেষণা-পর্যালোচনায় এমনসব তথ্য ও উপাদান পাওয়া যেতে পারে যা পরম স্রষ্টার সৃষ্টি সম্পর্কে মানুষকে সম্যক ধারণা দিতে সক্ষম। সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে কোরআনে এমনসব বক্তব্য রয়েছে, যা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞান-বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে নিখাদ সত্য হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত।

যাহোক, বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বের বিবরণীতে পাওয়া যায়, নিছক কতগুলো অতীত ঘটনার বর্ণনা। এসব তথ্য বিজ্ঞানীদের কৌতূহলী করে বটে, কিন্তু সে সব তথ্যের বিচার-পর্যালোচনা পরিচালনার কোন অবকাশ থাকে না। বরং, প্রাথমিক বিচারেই প্রমাণিত হয়ে যায় যে, বাইবেলের ওইসব তথ্য বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্যের আলোকে মোটেও বাস্তবসম্মত নয়; এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ বাস্তব সত্যের সম্পূর্ণ বিরোধী। সৃষ্টিতত্ত্ব–সম্পর্কিত বাইবেলের বর্ণনা এমনিতেই অপ্রতুল। বাইবেলের সেইসব কৌতূহলোদ্দীপক বক্তব্যের বিবরণ পুস্তকে বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নূহের তুফান সম্পর্কে বাইবেলের বর্ণনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ঠিক কোন্‌সময় এই তুফানরূপী বিপর্যয়টি ঘটেছিল এবং কিভাবে সেই তুফানে দুনিয়ার সবকিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বাইবেলে তার উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের নিরীক্ষা-গবেষণা ও আবিষ্কার বাইবেলের ওই বক্তব্যকে মেনে নিতে পারছে না। অন্যদিকে, হযরত মুসার (আঃ) মিসর ত্যাগের যে বিবরণ বাইবেলে বিদ্যমান, তাতে আমরা এমনকিছু তথ্য পাই যা আধুনিক মিসরীয় স্থাপত্য বিজ্ঞানের দ্বারা সত্য হিসেবে সাব্যস্ত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বাইবেলের ওই বিবরণ থেকে আমরা হযরত মুসা (আঃ) এবং ফেরাউনের সঠিক ইতিহাসও অনেকাংশে সনাক্ত করতে পারি।

যাহোক, বাইবেলের রচয়িতাবৃন্দ মানবসৃষ্টি ও হযরত আদমের (আঃ) বংশধারা এবং ইহুদীদের বিবরণ সম্পর্কে ধর্মীয় যে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে গেছেন, প্রথমেই তা পর্যালোচনা করা উচিত। কেননা, শুধু এইক্ষেত্রেই বিচার পর্যালোচনার কিছু অবকাশ বিদ্যমান। এর প্রথমেই আসে মানুষের আদি উৎসের কথা; দ্বিতীয় পর্যায়ে আসে পৃথিবীতে মানুষের প্রথম আবির্ভাবের ইতিহাস। প্রথমটা সম্পর্কে বাইবেলে মোটামুটিভাবে কিছুটা বিশদ বর্ণনা বিদ্যমান। দ্বিতীয় বিষয়টা সম্পর্কে বাইবেলে সরাসরি কোন বক্তব্য নেই বটে; তবে, বাইবেলে পুরাতন নিয়মে প্রদত্ত সময়কালের হিসেব থেকে পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের সময় সম্পর্কে মোটামুটিভাবে একটা ধারণা খুঁজে নেয়া যায়। সেইসঙ্গে, যদিও অনেকটা ভিন্নভাবে উপস্থাপিত, তবুও বাইবেলের নতুন নিয়মের বিভিন্ন সুসমাচার বিশেষত লুক-রচিত সুসমাচার থেকেও এই বিষয়ের কিছু বরাত বা সূত্র খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

বাইবেল পুরাতন নিয়মের ‘আদিপুস্তকে’ মানুষের আদি উৎস সম্পর্কিত বক্তব্য ওই একইঅধ্যায়ে পরিবেশিত সৃষ্টিতত্ত্বের বিবরণের মধ্যেই বিদ্যমান। তবে, বিষয়টা বিশদভাবে বুঝার জন্য এ বিষয়ে সরাসরি আলোচনা প্রয়োজন। সেই চেষ্টাই এখানে করা হবে।