2 of 3

ডিম্বাণুর রোপণ প্রক্রিয়া

ডিম্বাণুর রোপণ প্রক্রিয়া

পুরুষের শুক্রকীট দ্বারা উর্বরতাপ্রাপ্ত ডিম্বাণুটি যথাসময়ে নারীর জরায়ুতে অবস্থান গ্রহণ করে। কোরআনের বেশ কয়েকটি আয়াতে এ বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। এই প্রসঙ্গে কোরআনে যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, তা হল আরবী ‘আলাক’। এই ‘আলাক’ শব্দের সঠিক অর্থ হল? এমন কিছু যা দৃঢ়ভাবে সংলগ্ন’, ‘দৃঢ়ভাবে জড়ানো’, ‘দৃঢ়ভাবে আটকানো’। এতদ্‌সংক্রান্ত শুধু দুটি আয়াত নিচে তুলে ধরা হল :

“(মানুষ) কি সেই সামান্যতম শুক্র ছিল না–যাহা সজোরে নিক্ষিপ্তনির্গত হইয়াছিল?–সূরা ৭৫ (কিয়ামা), আয়াত ৩৭ ও ৩৮ :

অতঃপর সে হইয়াছিল এমনকিছু যাহা দৃঢ়ভাবে আটকানো ছিল; ইহার পর (আল্লাহ্ তাহাকে গঠন করিয়াছেন যথাযথমাত্রায়, সামঞ্জস্যপূর্ণ করিয়া।”

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, শুক্র দ্বারা নিষিক্ত হওয়ার পর ডিম্বাণুটি মোটামুটিভাবে ষষ্ঠ দিবসে নারীর জরায়ু গর্ভস্থ শ্লৈষ্মিক ঝিল্লিতে অবস্থান গ্রহণ করে। শারীরবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকেই বলা হয়, ডিম্বাণুর রোপণকর্ম। অন্যকথায়, এই ষষ্ঠ দিবসের পরে ডিম্বাণুটি জরায়ুগর্ভে দৃঢ়ভাবে আটকানো হয়। দৃঢ়ভাবে জড়ানো কিংবা দৃঢ়ভাবে আটকানো’ এটাই হচ্ছে এই আয়াতে এবং কোরআনের অন্যত্র ব্যবহৃত ‘আলাক’ শব্দের আদি ও প্রকৃত অর্থ। গৌণ অর্থে ‘আলাক’ শব্দকে ‘রক্তপিণ্ড’ বা ‘জমাট বাঁধা রক্ত’ বলা যায় বটে; কিন্তু এই ব্যাখ্যাজাত অর্থ এখানে আদৌ খাটে না। কারণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রজনন-প্রক্রিয়ার কোন পর্যায়েই ভ্রূণ তথা শিশুটিকে কখনই ‘জমাট বাঁধা রক্ত’ কিংবা রক্তপিণ্ডের অবস্থা অতিক্রম করতে হয় না। অথচ, আধুনিককালেও কোরআনের বিভিন্ন অনুবাদে বিভ্রান্তিকরভাবেই ‘আলাক’ শব্দের তরজমা করা হচ্ছে : ‘রক্তপিণ্ড’ কিংবা ‘জমাট বাঁধা রক্ত’।

প্রকৃতপক্ষে, মানব-প্রজনন-সংক্রান্ত প্রচলিত ভুল ধারণার কারণে সেই প্রাচীনযুগের তাফসীরকারগণ ‘আলাক’ শব্দের এই ব্যাখ্যাজাত গৌণ অর্থ চালু করেছেন। একইভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণা তথা সঠিক তথ্য-প্রমাণের অভাবে সেই প্রাচীনযুগের তরজমাকারী ও তফসীরকারগণ বুঝতেও পারেননি যে, ‘আলাক’ শব্দটির আদি বা মূল অর্থটিই কোরআনের এতদূসম্পর্কিত বক্তব্য প্রকাশের জন্য যথেষ্ট ছিল? ব্যাখ্যাজাত গৌণ অর্থে ব্যবহার এক্ষেত্রে ছিল বিভ্রান্তিকর।

এরদ্বারা এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বক্তব্য প্রকাশের জন্য কোন কোন শব্দের মূল বা আদি অর্থই যথার্থ। সাধারণ নিয়মেও দেখা যায়, কোরআনে ব্যবহৃত বহু শব্দের আদি অর্থ আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাজাত সত্যের সাথে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। পক্ষান্তরে, কোরআনে ব্যবহৃত বহু শব্দের গৌণ বা ব্যাখ্যাজাত অর্থ শুধু ভুল কিংবা বিভ্রান্তিকর নয়; ক্ষেত্রবিশেষে তা অবান্তর বলেও প্রতিপন্ন। আলাক’ শব্দের প্রচলিত অনুবাদ ‘রক্তপিণ্ড’ বা ‘জমাট বাঁধা রক্ত’ তেমনি একটি বিভ্রান্তি।

ভ্রূণের বিবর্তন

ভ্রূণ সম্পর্কে ইতিপূর্বে কোরআনের যে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে তাতে দেখা যায়, শুক্রবিন্দু দ্বারা নিষিক্ত ডিম্বাণুটি মাতৃজরায়ুতে এমনভাবে অবস্থান গ্রহণ করে থাকে, যাকে বলা যেতে পারে, ‘দৃঢ়ভাবে আটকানো’। এরপর দ্রুণটি এমন একটি পর্যায় অতিক্রম করে –যাকে আক্ষরিক অর্থেই বলা যেতে পারে ‘চিউড ফ্লেশ’ বা ‘চিবানো গোশত’। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নিরীক্ষায় আরো দেখা গেছে, ‘দৃঢ়ভাবে আটকানোর’ পর্যায় অতিক্রম করার পর ভ্রুণটি কমবেশি কুড়ি দিন পর্যন্ত এই চিবানো গোশতের পর্যায়ে থাকে। অতঃপর শুরু হয় ভ্রূণের আরেক পর্যায় এবং এই পর্যায়ে ভ্রূণের মধ্যে দেখা দেয় অস্থিময় পেশী। অতঃপর তা আবৃত হয় গোশতের দ্বারা। ভ্রূণের এই বিবর্তন সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য নিম্নরূপ :

“অতঃপর আমরা সেই (শুক্র) বিন্দুকে দৃঢ়ভাবে আটকাইয়া রাখি (জরায়ুতে), পরে সেই দৃঢ়ভাবে আটকাইয়া রাখা বস্তুটাকে পরিণত করি চিবানো গোশতের পিণ্ডরূপে; এবং সেই চিবানো গোশতের পিণ্ডকে রূপ দেই হাড়-হাড্ডিতে এবং সেই হাড্ডির উপরে দেই আবরণ–অক্ষত গোশতের দ্বারা।” -–সূরা ২৩ (মুমেনুন), আয়াত ১৪ :

ভ্রূণের বিবর্তনের এই বিভিন্নপর্যায়ে বর্ণনায় এখানে কোরআনে দুই ধরনের ‘গোশতের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে, দুটি ভিন্ন শব্দের দ্বারা। ‘চিবানো গোশতের’ জন্য ব্যবহৃত হয়েছে ‘মুদগা’; এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের অক্ষত গোশতের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে ‘লাহম’ যা শরীরে মাংসপেশীর সমার্থক।

পরবর্তী পর্যায়ে ভ্রূণের মধ্যে যে ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও নাড়ীভুড়ি তৈরি হয়, তার কথাও কোরআনে উল্লিখিত হয়েছে এভাবে:

“(আল্লাহ) দিয়াছেন তোমাদিগকে কর্ণ ও চক্ষুর অনুভূতি এবং নাড়ীভুড়ি।”–সূরা ৩২ (সাজদা), আয়াত ৯  :

ভ্রূণের লিঙ্গের গঠন সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। এ বিষয়ে কোরআনের বক্তব্য বরং সুনির্দিষ্ট। যথাঃ “এবং তিনিই (আল্লাহ) বানাইয়া থাকেন দুই মিলাইয়া এক জোড়া পুরুষ ও নারী, সামান্যতম (শুক্রবিন্দু) হইতে যখন উহা স্খলিত/নিক্ষিপ্ত হয়।”–সূরা ৫৩ (নাজম), আয়াত ৪৫-৪৬:

পূর্বোক্ত আলোচনায়, ডিম্বাণুর উর্বরতাপ্রাপ্তির জন্য সামান্যতম পরিমাণ বীর্য বিশেষত উহার মধ্যস্থ কোটি কোটি শুক্রকীট থেকে শুধু একটি শুক্রকীটের প্রয়োজন হয়। কোরআনও সেই বিষয়টির উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণালব্ধ ও প্রমাণিত আরো তথ্যও এই যে, পুরুষের বীর্য তথা শুক্রের মধ্যেই বর্তমান থাকে হেমিক্রোমোজম-এর চরিত্র যা ভ্রূণ তথা সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ করে। ভ্রূণের এই লিঙ্গ নির্ধারণের কাজটি সম্পন্ন হয় ঠিক সেই মুহূর্তে, যে মুহূর্তে শুক্রকীটটি ডিম্বাণুতে অনুপ্রবেশ ঘটায়।

উপরোদ্ধৃত কোরআনের আয়াতেও বলা হয়েছে যে, ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ হয় সামান্যতম তরল পদার্থ থেকে। কোরআনের অন্যত্র বর্ণিত (৩২ : ৮) এই। সামান্যতম তরল পদার্থের সারভাগ’ হচ্ছে সেই শুক্রকীটবাহী পদার্থ যে শুক্রকীটের মধ্যে থাকে হেমিক্রোমোজমের চরিত্র। এই হেমিক্রোমোজমের চরিত্রই গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ করে (যথাঃ ওয়াই = ছেলে; এক্স = মেয়ে)। সুতরাং, দেখাই যাচ্ছে যে, এ বিষয়ে কোরআনের বক্তব্য এবং আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণালব্ধ ফলাফল আশ্চর্যজনকভাবেই অভিন্ন।

প্রকৃতপক্ষে, কোরআনের মানব-প্রজনন-সংক্রান্ত সব বক্তব্য আধুনিক যুগের বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত তথ্যকে নতুন করে সত্য বলে প্রমাণ করছে। অন্যকথায়, কোরআনে বর্ণিত তথ্যাবলী আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণা ও আবিষ্কারের দ্বারা সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এখানেই প্রশ্ন:

মোহাম্মদের (দঃ) যুগে বসে কিভাবে কারো পক্ষে আধুনিক ভ্রূণতত্ত্বের এত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় জানা সম্ভব?

এ কথা তো কারো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ভ্রূণতত্ত্বের এতসব তথ্য-উপাত্ত আবিস্কৃত ও প্রমাণিত হয়েছে কোরআন নাজিলের হাজার বছর পরে একান্ত হালে, আধুনিক যুগে এসে। সুতরাং বিজ্ঞান তথা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের এই ইতিহাসই এখন সবাইকে একটি স্থির-সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিচ্ছে, আর তা হল : “কোরআনের এতদসংক্রান্ত এইসব বাণী ও বক্তব্য কোনো মানুষের বাণী ও বক্তব্য হতে পারে না। এ বক্তব্য নিঃসন্দেহে ঐশী বক্তব্য; এই বাণী নির্ভুলভাবেই আসমানী ওহী।”

উল্লেখ্য যে, কোরআনের সূরা ওয়াকেয়া’র (৫৬নং সূরা) ৫৮নং বাণীতে মানব-সৃষ্টির বর্ণনা প্রসঙ্গে প্রকৃতির বিভিন্ন জিনিসের সৃষ্টি ও কর্মপ্রক্রিয়ার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে; এবং ৭৭-৮১ নং বাণীতে বলা হয়েছে।

“নিশ্চয় ইহা মর্যাদাসম্পন্ন কোরআন;
ইহা এমন এক কিতাবে লিপিবদ্ধ যাহা সুসংরক্ষিত
–পবিত্রতম ব্যতিরেকে কেহ ইহা স্পর্শ করিতে পারে না;
বহুবিশ্বের প্রভু প্রতিপালকের নিকট হইতেই ইহা অবতীর্ণ।
–তবুও কি তোমরা ইহার প্রতি উপেক্ষা/তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করিয়া চলিবে?”