রূপোর চাবি

রূপোর চাবি

পরিষ্কার আকাশ। বাতাসও বেগবান। ফ্রান্সিসদের জাহাজ দ্রুতগতিতে চলেছে সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে। জাহাজের পালগুলো ফুলে উঠেছে। কাজেইদাঁড় টানতে হচ্ছেনা। ভাইকিংরা ডেকের এখানে-ওখানে শুয়ে বসে আছে। গোল হয়ে বসে ছক্কা-পাঞ্জা খেলছে। আর। একদল বসে নিজেদের মধ্যে দেশবাড়ির গল্প করছে। সকলের মধ্যেই বেশ একটা ছুটির মেজাজ।

ফ্রান্সিসদের কেবিনঘরে ফ্রান্সিস বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে। মারিয়া সেলাই ফেঁড়াইয়ের কাজ করছে বিছানায় বসে।

হ্যারি কেবিনঘরে ঢুকল। ওকে দেখে ফ্রান্সিস উঠে বসল। হ্যারি বিছানায় বসতে বসতে বলল, ফ্রান্সিস, এবার কী করবে?

–তোমরা সবাই তো দেশে ফেরার জন্যে আকুল। কাজেই ফ্লেজারকে বলেছি উত্তরমুখো চালাও। ফ্রান্সিস বলল।

সে তো হলো, হ্যারি বলল, কিন্তু কোথায় এলাম, আমাদের দেশই বা কত দূরে কিছুই বুঝতে পারছি না।

মারিয়া বলল, দেখ হ্যারি, আমার যা জ্ঞানগম্যি তাতে বুঝেছি আমরা জিব্রলটার প্রণালী পার হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পড়েছি।

–সেটা বুঝলে কী করে? ফ্রান্সিস বলল।

-খুব সহজে। লক্ষ্য করলে বুঝবে গত কদিন জাহাজের দুলুনি খুব বেড়ে গেছে। ভূমধ্যসাগর অঞ্চলটা অনেক শান্ত। তাই জাহাজের দুলুনি খুব বেশি ছিল না। মারিয়া বলল।

–তাহলে রাজকুমারী, আমরা কি স্পেনের কাছাকাছি এসেছি? হ্যারি বলল।

–আমার তো তাই মনে হচ্ছে। তবে এই এলাকায় কোনো দ্বীপ নেই। ডাঙা পেলেই। বুঝবো কোনো দ্বীপ নয়, স্পেনে এসেছি। মারিয়া বলল।

ফ্রান্সিস বলল, একবার চলো তো ফ্লেজারের কাছে যাই। ও কী বলে শুনি।

 হ্যারি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, চলো।

মারিয়া ওর সেলাই-ফোঁড়াইয়ের জিনিসপত্র একটা চামড়ার থলিতে রাখতে রাখতে বলল, আমিও যাবো। সূর্যাস্ত দেখবো।

তিনজনে একটু পরেই ডেক-এ উঠে এলো। চলল জাহাজচালক ফ্লেজারের কাছে। ফ্লেজার হুইলে হাত রেখে সামনে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। ফ্রান্সিস বলল, ফ্লেজার, আমরা কোথায় এলাম সেটা কিছু আন্দাজ করতে পেরেছো?

–আমরা ভূমধ্যসাগর থেকে বেরিয়ে এসেছি এটা বুঝতে পারছি। কিন্তু ডাঙার দেখা না পাওয়া পর্যন্ত কিছুই বোঝা যাবে না। ফ্লেজার বলল।

–এখন তো তাহলে শুধু জাহাজ চালিয়ে যাওয়া। হ্যারি বলল।

–হ্যাঁ। ফ্লেজার বলল, উত্তর দিকটা ঠিক রেখে জাহাজ চালিয়ে যাওয়া। হ্যারি বলল।

ফ্লেজারের সঙ্গে কথা বলে তিনজনে ফিরে এসে রেলিং ধরে দাঁড়াল। পশ্চিম দিকে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সূর্যের আলোর গভীর কমলা রঙ মাঝ আকাশ পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। এবং রং সূর্য অস্ত যাওয়ার পরেও রইল। তারপর আস্তে আস্তে রঙ মুছে গেল। সন্ধ্যা নেমে এলো।

সেদিন ভোর ভোর সময়ে নজরদার পেড্রোর চড়া গলা শেনা গেল, ডাঙা, ডাঙা দেখা যাচ্ছে। যে ভাইকিংরা ডেকে শুয়েছিল তারা উঠে বসল। একজন ছুটল ফ্রান্সিস হ্যারিকে খবর দিতে।

একটু পরেই ফ্রান্সিস আর হ্যারি ডেক-এ উঠে এলো। পেছনে মারিয়াও এলো। ওরা রেলিং ধরে দাঁড়াল। ভোরের নরম রোদে উত্তরদিকে দেখা গেল একটা বন্দর। বেশ কয়েকটা জাহাজ নোঙর করে আছে। জাহাজগুলোতে নানা রঙের বিভিন্ন দেশের পতাকা উড়ছে।

ফ্রান্সিস বলল, হ্যারি, আমরা বন্দরে জাহাজ ভেড়াবো না। এখানেই নোঙর করবো। শুধু শাঙ্কো নৌকোয় চড়ে বন্দরে যাবে। এটা কোন্ দেশের কোণ বন্দর, লোকজন কেমন–এসব জেনে আসবে।

ফ্রান্সিসরা কথা বলছে, তখনই দুই রাঁধুনি ভাইকিং ফ্রান্সিসদের কাছে এলো। বলল, খাদ্য আর জল ফুরিয়ে এসেছে। এই বন্দর থেকেই খাদ্য আর জল নিতে হবে। নইলে কখন ঝড়বৃষ্টিতে জাহাজ কোণদিকে চলে যাবে। আবার কোনো বন্দর পাওয়া যাবে কিনা কে জানে।

ফ্রান্সিস একটু ভেবে বলল, কথাটা ঠিক। তখন অনেক ভাইকিং বন্ধু ফ্রান্সিসকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডাকল। বলল, শাঙ্কো, তুমি একা নৌকোয় চড়ে বন্দরে যাও। সব জেনে এসো। যথেষ্ট খাদ্য আর জল পাবো কিনা সেটাও জেনে এসো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শাঙ্কো তৈরি হয়ে নিল। দড়ির মই বেয়ে নৌকোয় নেমে নৌকো ছেড়ে দিল। শাঙ্কো শুধু ছোরাটা জামার নীচে নিয়েছে। তলোয়ার নিতে ফ্রান্সিস মানা করেছে। তাই তলোয়ার নেয়নি।

ততক্ষণে ঘরঘর শব্দে নোঙর ফেলা হয়েছে। ফ্রান্সিসদের জাহাজ থেমে রইল। সমুদ্রের বড়ো বড়ো ঢেউয়ের ধাক্কায় দুলতে লাগল।

রেলিং ধরে ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।

কিছুক্ষণ পরে দুরেশাঙ্কোর নৌকো আসছে দেখা গেল। ফ্রান্সিস তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে শাঙ্কোর নৌকোর দিকে তাকিয়ে রইল। ভাবতে লাগল, আমাদের বিপদ হতে পারে এমন কিছু হলে শাঙ্কো নিশ্চয়ই নৌকোয় উঠে দাঁড়িয়ে সঙ্কেত করবে। কিন্তু দেখা গেল শাঙ্কো আস্তে আস্তে ঢেউয়ের ধাক্কা বাঁচিয়ে নৌকো চালিয়ে আসছে।

জাহাজে নৌকো বেঁধে শাস্কো দড়ির মই বেয়ে ডেকে উঠে এলো। ভাইকিং বন্ধুরা এ ওকে ঘিরে দাঁড়াল। একুট হাঁপাতে হাঁপাতে শাঙ্কো বলল, এটা স্পেনের দক্ষিণ ভাগ। # বন্দরটার নাম ক্যামেরিনাল। এখানকার রাজার নাম গার্সিয়া। এখানে যথেষ্ট খাদ্য আর জল পেতে কোনো অসুবিধা নেই। রাজার যোদ্ধারা কেউ কেউ আমাকে দেখেছে। বুঝেছে আমি বিদেশি। তবু কিছু বলেনি।

এবার ফ্রান্সিস বলল, শাঙ্কো তুমি বিস্কো আর রাঁধুনি বন্ধুদের নিয়ে যাও। খাদ্য-জল আনার জন্যে বস্তা-পীপে সব নাও। সঙ্গে যে নৌকোটা নেবে সেটাতেই থাকবে এসব।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শাঙ্কোরা একটা নৌকোয় চড়ে অন্য একটা নৌকো দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে ক্যামেরিনাল বন্দরের দিকে চলল।

দুপুরের একটু আগেই শাঙ্কোরা ফিরে এলো। খাদ্য-জল সব রসুইঘরের পাশে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা হলো। ফ্রান্সিস মনে মনে বলল, যাক–কয়েক মাসের জন্যে নিশ্চিন্ত।

দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর ভাইকিং বন্ধুরা ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল, ফ্রান্সিস, এখানে পড়ে থেকে শুধু দেরিই হবে। জাহাজ বিকেলেই ছেড়ে দিতে বলো।

ফ্রান্সিস বলল, ঠিক আছে। ফ্লেজারকে গিয়ে বলো আমি বলেছি বিকেলে জাহাজ ছেড়ে দিতে।

বন্ধুরা খুশিতে ছুটল ফ্লেজারকে কথাটা বলতে।

সূর্যাস্ত হবার আগেই জাহাজের নোঙর তোলা হলো। ভাইকিংরা পালের দড়িদড়া ঠিক করল। জোর বাতাসে পালগুলো ফুলে উঠল। জাহাজ পূর্ণবেগে বড়ো বড়ো ঢেউ ভেঙে চলল।

তীরভূমির কাছ দিয়েই জাহাজ চলল।

 দু’দিন পরেই জাহাজ এলো কাদিজ বন্দরে। এখন ফ্রান্সিসরা অনেকটা নিশ্চিন্ত। ওরা কাদিজ বন্দরের জাহাজঘাটায় জাহাজ নোঙর করল। কাদিজ বেশ বড়ো বন্দর। অনেক জাহাজ জাহাজঘাটা নোঙর করা আছে।

ফ্রান্সিস ডেক-এ দাঁড়িয়েছিল। বিস্কো ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল, এই কাদিজ বন্দর বেশ বড়ো। এখানে জাহাজ মেরামতি করা যাবে।দুদিন থেকে আমাদের জাহাজের মেরামতির কাজটা সেরে নাও। এখনও এই জাহাজে চড়ে আমাদের অনেক দূরে যেতে হবে।

বেশ তাই করো, ফ্রান্সিস বলল।

দু’দিন মেরামতির কাজটাজ চলল। সেদিন সন্ধেবেলা মারিয়া বলল-চলো কাদিজ নগরবন্দরটা দেখে আসি।

–অচেনা অজানা জায়গা–এখানে যাওয়া কি ঠিক হবে? ফ্রান্সিস বলল।

–আমরা তো একটু ঘোরাঘুরি করবো। তারপর রাত বেশি হওয়ার আগেই চলে আসবো। মারিয়া বলল।

–ঠিক আছে চলো। দিনরাত শুধু সমুদ্রের জল দেখে দেখে তোমার একঘেয়ে লাগারই কথা। চলো শাঙ্কোকেও নিয়ে যাবো। তুমি তৈরি হয়ে নাও। আমি শাঙ্কোকে ডাকতে যাচ্ছি।

মারিয়া ওর ভাঙা আয়নাটা নিয়ে বসল। নিজের মুখ দেখে বুঝল–ওর মুখের দুধে আলতার রং এখন তামাটে হয়ে গেছে। মাথার চুলও জট পাকাচ্ছে। মারিয়া আয়না রেখে চলল পোশাক বের করতে। নিজের গাউনটা বের করল আবার ফ্রান্সিসের পোশাকটাও বড়ো চামড়ার বাক্স থেকে বের করল। গাউনটা পরল। গাউনটা একটু ঢিলে লাগল। বুঝল ওর জাহাজী জীবন ওর শরীর রোগা করে দিয়েছে। কিন্তু এসব ভেবে আর কী হবে। মারিয়া চুল আঁচড়াতে বসল।

ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে নিয়ে কেবিন ঘরে এলো। মারিয়ার সাজের বহর দেখে মুখ টিপে হাসল। কিন্তু কিছু বলল না। এই সাজ পোশাক নিয়ে রসিকতা করলে মারিয়া মনে দুঃখ পাবে। ফ্রান্সিস চুপ করে রইল।

মারিয়ার সাজগোজ শেষ হল। এবার মারিয়া ফ্রান্সিসের নতুন পোশাকটা বের করল। বলল–এই পোশাকটা পরো। ফ্রান্সিস বলল–কী পাগলামো! আমরা কিনাচের আসরে যাচ্ছি নাকি?

-না–তোমাকে আজ নতুন পোশাক পরতে হবে। মারিয়া বলল।ফ্রান্সিস বলল– কি কাণ্ড!

–না কোনও কথা শুনবো না–তোমাকে পরতেই হবে। মারিয়া বলল।

–ঠিক আছে। তুমি যখন অত করে বলছো। পোশাকটা দাও। ফ্রান্সিস বলল।

মারিয়া ফ্রান্সিসের পোশাকটা দিল। ফ্রান্সিস নিজের পোশাকের ওপরেই নতুন পোশাকটা পরল। মারিয়া ভাঙা আয়নাটা ফ্রান্সিসের মুখের সামনে ধরল। বলল দ্যাখো–তোমাকে কী সুন্দর দেখাচ্ছে। ফ্রান্সিস আয়নাটায় মুখ দেখল।

–মুণ্ডু। ফ্রান্সিস মারিয়াকে আয়নাটা ফিরিয়ে দিল। এবার শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস তাহলে আমিও নতুন পোশাকটা পরে আসি।

–বেশ তো–ফ্রান্সিস বলল।

মোটামুটি একটু ফিটফাট হয়ে ফ্রান্সিস, মারিয়া আর শাঙ্কো জাহাজ থেকে নেমে এলো।

ওরা দেখল রাস্তায় লোকজনের খুব একটা ভিড় নেই। ফ্রান্সিসরা একটু এগিয়েই একটা ছোটো দুর্গ দেখল। দুর্গ ঘিরে পাথরের দেয়াল। তার বাইরে পরিখা। দুর্গের সদর দরজায় ওরা এলো। চার-পাঁচজন সৈন্য পাহারা দিচ্ছে। কাঠের বিরাট দরজা বন্ধ।

ওরা দুর্গার চারদিকে একবার ঘুরে এলো ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। দুতিন জায়গায়। জোরে কয়েকটা ধাক্কা দিলে ওখানকার পাথুরে দেয়াল সবটা না হলেও কিছু অংশে ধস নামবে। দেয়ালের ঐ জায়গাগুলো সুরক্ষিত নয়।

সদর দেউড়ির সামনে পরিখার ওপর কাঠের সেতু। ফ্রান্সিস বলল–চলো একটু খোঁজ-খবর নেওয়া যাক। সেতু পার হয়ে ওরা সদর দরজার কাছে এলো।

তখনই একজন লম্বা মতো সৈন্য চড়া গলায় বলে উঠল–তোমরা কারা! ওখানেই থাকো। দরজার কাছে আসবে না। ফ্রান্সিস বলল–আমরা জাতিতে ভাইকিং। জাহাজে দেশ-বিদেশ বেড়িয়ে বেড়ানোই আমাদের কাজ। আমরা দুৰ্গটা দেখছি।

–তা দেখো তবে পাহারাদার সৈন্যদের ফাঁকি দিয়ে দুর্গে ঢোকার চেষ্টা করবে না। সেরকম কিছু করতে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত। লম্বামতো লোকটা বলল।

ফ্রান্সিস বুঝল ঐ লম্বামতো লোকটিই দলনেতা। ফ্রান্সিস একটু এগিয়ে দলনেতার কাছে গেল। বলল–এই দুর্গা কার? কে থাকে এই দুর্গে?

 –এই দুর্গে থাকেন এখানকার আলতোয়াইফ–মানে রাজা গার্সিয়ারের প্রতিনিধি। দলনেতা বলল।

–ও। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল।

দুর্গ দেখার পর এলো সবচেয়ে ব্যস্ত এলাকায়। বেশি ভিড়। গাড়ি ঘোড়া চলছে।

ফ্রান্সিস বলল–চলো কিছু খাওয়া যাক। একটা খাবার দোকানে ওরা ঢুকল। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দোকানটি। দোকানদার ফ্রান্সিসদের দেখে এগিয়ে এলো। হেসে বলল– আসুন–আসুন। ফ্রান্সিসরা বলল।

ফ্রান্সিস মারিয়াকে বলল–বলো কী খাবে?

মারিয়া বলল-মিষ্টি পিঠে আর পাউরুটি কেটে দিন। দোকানদার বলল–দুধ থেকে একটা বিশেষ মিষ্টি আমরা তৈরি করি। আপনাদের দেব? অনেক লোক আমাদের এই বিশেষ খাবারটি খেতে আসে।

–দিন তাহলে। শাঙ্কো বলল।

কিছু পরে কাঠের লম্বা টেবিলে পাতা পেতে খেতে দেওয়া হল। ফ্রান্সিসরা খেতে লাগল। মারিয়া খেতে খেতে দোকানদারকে বলল–সত্যি আপনার এই খাবারটা বেশ খাওয়ার মতো। আরো দুটো দিন। আমাদের তিনজনকেই। খাবার দেওয়া হল। খাবার খেয়ে তিনজনই খুশি।

খেতে খেতে ফ্রান্সিস দোকানিকে ডাকল। দোকানি এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিস বলল– এখানে দেখবার মতো কী আছে?

-দুৰ্গটা দেখেছেন? দোকানদার বলল।

–হ্যাঁ দেখেছি। তবে বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। ফ্রান্সিস বলল।

বছরে মাত্র দু’দিন বাইরের লোকেরা দুর্গের ভেতর ঢুকে দেখার অনুমতি পায়। দোকানদার বলল।

–আর কী আছে? দেখবার মতো? ফ্রান্সিস বলল।

–উত্তরের দিকে মাইল কয়েক দূরে আছে একটা বিরাট হ্রদ। এখন অন্ধকারে তো ভালো করে দেখতে পারবেন না। দোকান থেকে বেরিয়ে ফ্রান্সিস বলল–চলো হ্রদটা দেখে আসি। ওরা একসময় হ্রদটার কাছে এলো। চাঁদের আলো অনুজ্জ্বল। হ্রদের জল অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হ্রদের জলের ওপর নীলচে কুয়াশা ছড়িয়ে আছে। তাই ওপার দেখা যাচ্ছে না। চারপাশের ঝুঁকে পড়া গাছগাছালির গায়ে মাথায় কুয়াশামাখা চাঁদের নিষ্প্রভ আলো–এতেই হ্রদের সৌন্দর্য বেড়ে গেছে।

এবার ফেরা। রাত বেড়েছে। ফ্রান্সিসরা ফিরে আসতে লাগল। একটা মোড়ে এলো তিনজনে। ফ্রান্সিস বলল–ডানদিকের রাস্তা দিয়ে যেতে গেলে দুর্গা ঘুরে যেতে হবে। তাতে পরিশ্রম বেশি সময়ও নষ্ট। বাঁ রাস্তাটা দিয়ে গেলেই রাস্তাটা যেভাবে গেছে। দেখছি–তাতে এই রাস্তা দিয়ে গেলেই অল্পসময়ের মধ্যে জাহাজঘাটায় পৌঁছতে পারবো।

–কিন্তু এই রাস্তাটা বনের মধ্যে দিয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এই অন্ধকারে বনের মধ্যে দিয়ে যাবো? শাঙ্কো বলল।

–তাতে কী হয়েছে। আমরা তাড়াতাড়ি যেতে পারবো। শাঙ্কো আর আপত্তি করল না। রাস্তা কিছুদূর এসে বনের মধ্যে ঢুকে গেছে। ফ্রান্সিসা বনে ঢুকল। এখন রাস্তাটা পায়ে চলা পথের মতো সরু।

অন্ধকারেই সরু রাস্তাটায় পা টিপে টিপে চলল ওরা। অন্ধকারে চলতে চলতে হঠাৎ ফ্রান্সিস বুঝল ওরা পায়ে চলা পথটা হারিয়ে ফেলেছে। ঝোঁপ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ওরা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল–দাঁড়াও। শাঙ্কো আর মারিয়া দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস বলল

–সমস্যায় পড়লাম। আমরা পথ হারিয়েছি। কোণদিকে জাহাজঘাটা বুঝতে পারছি না।

–কী করবে এখন? শাঙ্কো বলল।

চলো যেদিকে যাচ্ছি সেদিকেই যাই। দেখা যাক কোথায় গিয়ে পৌঁছুই। ফ্রান্সিস বলল।

তারপর তিনজনেই অন্ধকারেই চলল।

হঠাৎ ঝোপেঝাড়ে শব্দ তুলে তিন-চারজন লোক ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। ওদের পরনে কানঢাকা জোব্বামতো পোশাকে। কোমরের ফেট্টিতে তলোয়ার গোঁজা।

একজন এগিয়ে এসে বলল–তোমরা কারা? কোথায় যাচ্ছো?

আমরা জাতিতে ভাইকিং বিদেশি। আমরা জাহাজে চড়ে এখানে এসেছি। এই বনের মধ্যে দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি জাহাজটায় পৌঁছবো এই ভেবেই এই রাস্তায় এসেছি।

তাহলে তোমরা জাহাজঘাটায় যাবে। সৈন্যটি বলল।

–হ্যাঁ। কিন্তু মনে হচ্ছে আমরা পথ হারিয়েছি। ফ্রান্সিস বলল।

–হ্যাঁ–তোমরা জাহাজঘাটার উল্টোদিকে যাচ্ছিলে। জাকগে–তোমরা এখানকার আলতোয়াইদের গুপ্তচর। আমাদের ব্যাপারে খোঁজখবর করতে এসেছো। ফ্রান্সিস বুঝল–ভীষণ বিপদ। ও বলে উঠল–আমাদের সঙ্গে আমাদের দেশের রাজকুমারী আছেন। তাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা গুপ্তসংবাদ সংগ্রহে আসবো এত বোকা আমরা নই।

যাক গে–তোমাদের বন্দি করা হল। আমাদের বিদ্রোহী নেতা খাতিব কাল রাতে আসবেন। উনি যদি বলেন তোমাদের ছেড়ে দিতে তাহলে তোমরা ছাড়া পাবে। এখন বন্দি থাকতে হবে। সৈন্যটি ইঙ্গিতে ফ্রান্সিসদের আসতে বলল।

ফ্রান্সিসরা সৈন্যদের পাহারায় চলল। ঝোঁপঝাড় জঙ্গল দু’হাতে সরিয়ে ফ্রান্সিসরা চলল। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কানের কাছে মুখ এনে মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস আমরা এই অন্ধকারে পালাতে পারি।

–মারিয়া রয়েছে। পালাবার চেষ্টা করলে ধরা পড়ে যাবো। তখন বিপদ বাড়বে। তার চেয়ে চলোকয়েদখানা তো আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। কয়েদঘরে আটক থাকা আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে। চিন্তা মারিয়াকে নিয়ে। ওর তো অত কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা নেই। ফ্রান্সিস বলল।

সবাই ঝোঁপঝাড় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলল। বনের বেশ ভেতরে ঢুকল যোদ্ধারা। তখনই অন্ধকারে দেখা গেল একটা পাথরের বাড়ি। বেশ বড়ো! ভাঙা বাড়ি।

যোদ্ধারা বাড়ির দরজার কাছে গেল। অন্ধকারে দেখা গেল ভাঙা পাথরের দরজা। সবাই ঘরটায় ঢুকল। ঘরটা বেশ বড়ো। ফ্রান্সিস ওপরে তাকিয়ে দেখল আকাশ দেখা যাচ্ছে। তারায় ভরা আকাশ। ছাদ বলে কিছু নেই।

ফ্রান্সিস দেখল অনেক যোদ্ধা। শুয়ে বসে আছে। সঙ্গের যোদ্ধাটি ফ্রান্সিসদের বলল– তোমরা এ ঘরে থাকবে। তোমাদের হাত পা বাঁধা হল না। পালাবার চেষ্টা করলে মরবে।

ফ্রান্সিস ঘরটার কোণায় দেয়াল ঘেঁষে বসল। মারিয়া শাঙ্কোও বসল–এখন কী করবে?

–বন্দি জীবন মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এখন দেখা যাক বিদ্রোহী নেতা খাতিব এসে আমাদের কী করে। এখন কিছু করা যাবে না। ফ্রান্সিস বলল।

প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে যোদ্ধাদের মধ্যে তিন-চারজন যোদ্ধা এসে দাঁড়াল। যোদ্ধারা সব উঠে বসল। আগত যোদ্ধাদের হাতে বড়ো বড়ো কাঁচা পাতা। একজন যোদ্ধা সকলের সামনে পাতা পেতে দিল। যোদ্ধাকে অন্য যোদ্ধাটি একটা বড়ো ঝুড়ি থেকে প্রত্যেককে চারটে করে কাটা রুটি দিল। অন্য যোদ্ধাটি কাঠের বড়ো পাত্র থেকে পাখির মাংস ঝোল দিতে লাগল।

খাওয়া শুরু হল। ফ্রান্সিস বরাবর যা বলে তাই বলল–পেটপুরে খাও। ভালো না লাগলেও খাও। এতেই শরীর ভালো থাকবে। সব সময় নিজেকে তৈরি রাখো।

খাওয়াদাওয়া শেষ হল। একজন যোদ্ধা এঁটো পাতাগুলো নিয়ে গেল। ঘরের বাঁ কোণায় জলের জালাটা থেকে কাঠের গ্লাস দিয়ে জল তুলে তুলে খেল সবাই।

একজন দু’জন করে আস্তে আস্তে সবাই শুয়ে পড়ল। মেঝেয় লম্বা লম্বা শুকনো ঘাস পাতা। তার ওপরে শোয়া।

ফ্রান্সিস ঘুমোতে পারল না। অনেক চিন্তা মাথায়। কী করে অক্ষত শরীরে পালানো যায় তার উপায় ভাবতে লাগল। ফ্রান্সিস দু’হাতের তেলোতে মাথা রেখে আকাশের দিকে তাকাল। ঘরটার ছাদ বলে তো কিছু নেই। কালো আকাশে অজস্র তারার ভিড়। সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফ্রান্সিসের দেশের বাড়ির কথা মনে পড়ল। কতদূরে সেই দেশ বাড়ি। পাখির পালকে তৈরি শুভ্র বিছানা। নরম বালিশ। আঃ কী আরাম। ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে ফিরে উঠে বসল। মারিয়া তখনও ঘুমোয় নি। মারিয়াও উঠে বসল। বলল–কী হল ফ্রান্সিস? কিছু না-আজেবাজে চিন্তা। ফ্রান্সিস বলল।

–আর রাত করো না। ঘুমিয়ে পড়ো। মারিয়া বলল।

 ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করলে। ততক্ষণে মারিয়াও শুয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন ফ্রান্সিসরা সকালের খাবার খেল। দুপুরেও খেল। সন্ধে হল। রাত নামল। রাত বাড়তে লাগল।

বেশ রাতে বিদ্রোহী নেতা খাতিব এলো। সঙ্গে আট-দশজন যোদ্ধা। ওরা পাশের ঘরটায় গিয়ে বসল।

তখনই দলপতির সেই যোদ্ধাটি ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল–খাতিব তোমাদের ডাকছেন।

–বেশ চলো। ফ্রান্সিস উঠে বসল। শাঙ্কো বলল–তুমি একা যাবে?

–হা হা–তোমরা ঘুমোও। ফ্রান্সিস বলল।

ঘরের পাথরের দেয়ালের খাঁজে মশাল জ্বলছে। সেই আলোয় দেখে দেখে ফ্রান্সিস পাশের ঘরে এলো। দলনেতা ওকে খাতিবের কাছে নিয়ে এলো। খাতিব ফ্রান্সিসকে বসতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিস বসল। খাতিব বলল–শুনলাম তোমরা ভাইকিং?

–হ্যাঁ দেশে দেশে জাহাজে চড়ে ঘুরে বেড়াই। কোনো ঝুট ঝামেলায় আমরা থাকি না। আমরা কাউকে অবিশ্বাস করি না। আমরা মনে করি সব মানুষই আমাদের বন্ধু।

–শুধু জাহাজে ঘুরে বেড়াও? খাতিব বলল।

–হ্যাঁ। তবে একটা কাজ করি। যদি কোনো দেশে দ্বীপে গুপ্তধন থাকে বুদ্ধি খাঁটিয়ে তা উদ্ধার করি। ফ্রান্সিস বলল।

তারপর খুঁজে পাওয়া গুপ্তধন নিয়ে পালিয়ে যাও। খাতিব বলল।

ফ্রান্সিস একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল–আপনার মতো অনেকেই আমাদের এরকম সন্দেহ করেছে। আমরা কিছু মনে করিনি। নিঃস্বার্থভাবে আমরা পরিশ্রম করে বুদ্ধি খাঁটিয়ে গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধার করি আর যাদের মধ্যে গুপ্তধন প্রাপ্য তাদের হাতেই দিই। এটা মানুষ সহজে বিশ্বাস করে না। তারা আমাদের অবিশ্বাস করে। তাই বলে আমরা কোনো মানুষকে বিশ্বাস করব না? আমরা সবাইকে বিশ্বাস করি। এতে কিন্তু আমরা কখনো খুব ঠকি নি।

–ঠিক আছে–খাতিব বলল–তোমার সঙ্গে কারা আছে?

–আমার একজন বন্ধু আর আমাদের দেশের রাজকুমারী। ফ্রান্সিস বলল।

–সে কি! রাজকুমারী রাজপ্রাসাদের আরাম আয়েস ছেড়ে তোমাদের সঙ্গে এলেন কেন? খাতিব জিজ্ঞেস করল।

–আমি রাজকুমারীর স্বামী। আমি যেখানে যাবো তিনিও সেখানে যাবেন। যত কষ্টকর জীবনই হোক আমি তা মেনে নি, বলে উনিও মেনে নেন। ফ্রান্সিস বলল।

–হুঁ। তোমার সঙ্গী আর কেউ নেই? খাতিব জিজ্ঞেস করল।

–আছে। আমার পঁচিশজন বন্ধু এখানকার কাদিজ জাহাজঘাটায় আমাদের জাহাজে আছে। ফ্রান্সিস বলল।

তুমি যা বললে সেসব সত্যি কিনা–আমরা খোঁজ করে দেখবো। ততদিন এখানেই

বন্দি থাকতে হবে। খাতিব বলল।

এবার ফ্রান্সিস বলল–আমার সঙ্গে রাজকুমারী রয়েছেন। তিনি এই বন্দিদশায় অসুস্থ হয়ে পড়বেন। রাজকুমারীকে অন্য কোথাও রাখুন।

–দেখছি সেসব। এখন তোমরা এখানেই থাকবে। খাতিব বলল।

 ফ্রান্সিস শাঙ্কোদের কাছে চলে এলো।

শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস–কী কথা হল?

–আমাদের এখন মুক্তি দেওয়া হবে না। এখানেই বন্দি হয়ে থাকতে হবে। আমাদের খোঁজখবর নিয়ে তবে আমাদের মুক্তি দেবে। ফ্রান্সিস বলল।

–তাহলে তো এখন এই বন্দি জীবনই চলবে। শাঙ্কো বলল।

–হ। মারিয়াকে অন্য কোথাও রাখার জন্যে অনুরোধ করলাম। খাতিব অনুরোধ রাখল না। মারিয়াকে এভাবেই থাকতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।

সন্ধেবেলা খাতিব এলো। খাতিব ফ্রান্সিসদের পাশের ঘরে রইল।

রাত গম্ভীর হল। সবাই ঘুমিয়ে আছে। ফ্রান্সিসও ঘুমিয়ে পড়েছে। নিঃশব্দ চারদিক। শুধু কখনও কখনও রাতজাগা পাখির ডাক। হঠাৎ প্রচণ্ড চিৎকার স্তব্ধতা ভেঙে খান খান হয়ে গেল। আলতোয়াইফের সৈন্যরা খোলা দরজা দিয়ে চিৎকার করতে করতে ঢুকল। নিরস্ত্র খাতিবের যোদ্ধাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। খাতিবের যোদ্ধারা ঘরের কোণায় জড়ো করে রাখা তলোয়ার বর্শা নেবার জন্যে ছুটে গেল। তারা অনেকেই অস্ত্রাঘাতে মেঝেয় পড়ে গেল। দু’চারজন কোনোরকমে তলোয়ার বর্শা হাতে নিয়ে লড়াইয়ে নামল।

ফ্রান্সিস বুঝল এই লড়াইয়ের সময়ই পালানো ভালো। কারো নজরে পড়বে না। ফ্রান্সিস শাঙ্কো আর মারিয়াকে বলল–পাশের ঘরে ঢুকে পালাতে হবে। চলো।

অন্ধকারে ওরা পাশের ঘরে এলো। সেখানেও লড়াই চলছে। ফ্রান্সিসরা ঘরটা থেকে ভাঙা দরজা পার হয়ে ছুটল। কিন্তু কিছুটা গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়তে হল। খোলা তলোয়ার হাতে আলতোয়াইফের সৈন্যরা এগিয়ে এলো। বোঝা গেল সারা বাড়িটাই ওরা ঘিরে ফেলেছে।

একটা গাছের তলায় ফ্রান্সিসদের আনা হল। দেখা গেল আগে থেকেই কয়েকজন। খাতিবের যোদ্ধাকে ওখানে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ফ্রান্সিসদেরও হাত বেঁধে ওখানে রাখা হল। আলতোয়াইফের সৈন্যরা মারিয়ার হাত বাঁধতে গিয়ে বেশ আশ্চর্য হল। মেয়েটি কে? ওখানে এলো কী করে? ওরা মারিয়াকে কিছু বলল না। হাতও বাঁধল না।

ততক্ষণে লড়াই শেষ। বিদ্রোহী খাতিবের যোদ্ধারা হেরে গেল। অনেক যোদ্ধা মারা গেল। অনেকে বন্দি হল। খাতিবও বন্দি হল।

ভোর হল। সূর্য উঠল। বনের ডালপাতার ফঁক দিয়ে উজ্জ্বল রোদের আকাশ দেখা গেল।

আলতোয়াইফের সৈন্যরা বন্দিদের সারি দিয়ে দাঁড় করাল। তারপর হুকুম দিল– এবার চলো।

বনজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বন্দিরা চলল। পেছনে সৈন্যরা। সৈন্যদের দলপতি গলা চড়িয়ে বলে উঠল–কেউ পালাবার চেষ্টা করবে না। পালাতে গেলে মরবে।

বেশ কিছুক্ষণ পরে বন্দিরা বনের বাইরে এলো। দেখল আলতোয়াইফের ছোটো দুর্গটার কাছে এলো।

পরিখা পার হয়ে বন্দিদের দুর্গের বিরাট কাঠের দরজার সামনে আনা হল। ঘর ঘর শব্দে দরজা খুলে গেল। বন্দিরা ঢুকল। পেছনে সৈন্যরা।

দুটো টানা পাথরের ঘর। বোঝাই গেল কয়েদখানা। কাছে আসতে দেখা গেল কয়েকজন সৈন্য পাহারা দিচ্ছে। তলোয়ার খোলা নয়। কোষবদ্ধ।

কয়েদখানার লোহার দরজা–ঢং ঢং শব্দে খোলা হল। ফ্রান্সিসরা ঘরটায় ঢুকল। দেখল–ঘরটায় জানলা বলে কিছু নেই। ছাদটার কোণায় ছাদ একটু ভাঙা। খোদলমতো। ওখান দিয়েই আলো হাওয়া আসছে।

এই সকালেও দেয়ালের খাঁজে রাখা মশাল জ্বলছে। তাতে অন্ধকার ভাবটা কেটেছে। মেঝের বিছানা বলে কিছু নেই। কাঠের পাটাতন পরপর পাতা। এটাই বিছানা।

ফ্রান্সিস দরজার কাছাকাছি বসল। মারিয়া শাঙ্কোও বসল। একটু হাঁপাতে হাঁপাতে

মারিয়া বলল–আমার জন্যেই তোমাদের এত ভোগান্তি।শাঙ্কো বলল–রাজুকমারী A এসব ভাববেন না। এতে আপনার মন খারাপ হবে। সহ্যক্ষমতা কমে যাবে। দেখা

যাক–আমরা মুক্তি পাই কি না। এখন শুধু মুক্তির কথা ভাবতে হবে। ফ্রান্সিস কী ভাবতে ভাবতে বলল–শাঙ্কো–আমরা যখন দুৰ্গটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম তখন কোনদিকের পাথরের দেয়ালের একটা জায়গা বেশ ভাঙা ছিল দেখেছিলাম। শাঙ্কো একটু ভেবে বলল-দক্ষিণ দিককার দেয়ালটার মাঝামাঝি পাথরের পাটাগুলো খসে পড়েছে। সবটা নয়। তবে পাথরের পাটাগুলো আলগা হয়ে গেছে।

–ঠিক ঠিক বলেছো শাঙ্কো। এখন আমার মনে পড়ছে। ফ্রান্সিস বলল।

ফ্রান্সিস চারদিকে ভালো করে দেখল। বুঝল এখান থেকে পালাতে হলে দরজা দিয়েই পালাতে হবে। ফ্রান্সিসের নজরে পড়ল দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে খাতিব বসে আছে। দু’চোখ বোজা। ফ্রান্সিস উঠে আস্তে আস্তে খাতিবের কাছে এলো। গলা নামিয়ে বলল– খাতিব–আপনারা সাহায্য করলে আমরা এই কয়েদঘর থেকে পালাতে পারি। খাতিব চোখ খুলল। বলল–কীভাবে?

–পাহারাদাররা যখন খাবার নিয়ে দুপুরবেলা আসবে তখন ওরা কীভাবে খেতে দেয় সেটা লক্ষ্য করতে হবে। তখনই আমি ঠিক করবো কখন কীভাবে পালাবো।

–বেশ–উপায় ভাবুন। খাতিব বলল। ফ্রান্সিস নিজের জায়গায় চলে এলো। অপেক্ষা করতে লাগল কখন দুপুরের খাবার খেতে দেয়।

দুপুরে সৈন্যরা তিনজন খাবারের ঝুড়ি হাতে আর কাঠের গামলায় ঝোল নিয়ে এলো। পাহারাদার দু’জন দরজার কাছে খোলা তলোয়ার নিয়ে দাঁড়াল। দরজা খোলা হল। সৈন্যরা খাবার নিয়ে ঢুকল।

খেতে খেতে ফ্রান্সিস নিম্নস্বরে বলল–শাঙ্কো তিনজন ঢোকে। দু’জন পাহারায় থাকে। রাতে খাবার দেবার সময় তুমি একজন পাহারাদারকে কাবু করবে আমি অন্যটাকে ধরবো। যারা খাবার দেবে তাদের সামলাবে খাতিবের যোদ্ধারা।

সন্ধের একটু পরে ফ্রান্সিস খাতিবের কাছে গেল। বলল–পরিকল্পনা ছকে ফেলেছি।

–কী পরিকল্পনা করলেন?

–খাবার দিতে তিনজন সৈন্য ঘরের মধ্যে ঢোকে। তাদের আপনারা আটকাবেন। তাদের যেভাবেই হোক এই ঘরেই বন্ধ করে রাখা হবে। ততক্ষণ আমি আর আমার বন্ধু দু’জন পাহারাদারকে আহত করবো যাতে আমাদের পেছনে ছুটতে না পারে। এ সবের মধ্যেই আপনাদের আমাদের পালাতে হবে।

খাতিব মাথা ওঠানামা করে বলল–পরিকল্পনা খুবই ভালো আর কার্যকরী। দাঁড়ান আমাদের যোদ্ধাদের বলছি।

খাতিব উঠে দাঁড়াল। বলল–সবাই শোনো। খাতিবের সৈন্যরা এগিয়ে এলো। খাতিব বলল–রাতে যখন তিনজন সৈন্য খাবার দিতে আসবে তখন তোমরা ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের কোমরে গোঁজা তলোয়ার কেড়ে নেবে। তারপর খোলা দরজা দিয়ে বাইরে এসে দরজার লোহার হুড়কো টেনে দেবে যাতে সৈন্য তিনজন পালাতে না পারে। এবার সবাই তৈরি থেকো।

রাত হল। তিনজন সৈন্য খাবার নিয়ে এসে দরজায় দাঁড়াল। দু’জন পাহারাদারের একজন দরজা খুলে দিল। ঢং শব্দ তুলে দরজা খুলে গেল।

তিনজন খাবার নিয়ে ঢুকল। তখনই খাতিবের কয়েকজন যোদ্ধা সৈন্য তিনজনের এ ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ওদের খাবারের ঝুড়ি কাঠের গামলা সব ছিটকে গেল। ওরা কাঠের মেঝের ওপর উবু হয়ে পড়ল। খাতিবের যোদ্ধারা তিনজন সৈন্যের কোমর থেকে ঝোলানো তলোয়ার খাপ থেকে খুলে ফেলে যোদ্ধাদের একজন বলল–কেউ কোনোরকম শব্দ করবে না।

ওদিকে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো খোলা তলোয়ার হাতে দু’জন সৈন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস একজনের কাঁধে–এক রদ্দা কষাল। ওর হাত থেকে তলোয়ার খসে পড়ল। শাঙ্কো অন্যটার পেটে ঢু মারল। সেই সৈন্যটি দু’হাত উঁচু করে চিৎ হয়ে মেঝেয় পড়ে গেল।

ফ্রান্সিস মারিয়াকে ডাকতে যাবে তখনই পেছন ফিরে দেখল মারিয়া দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস মারিয়ার ডান হাত ধরে বলে উঠল-শাঙ্কো–ছোটো দক্ষিণের দেয়ালের দিকে।

তিনজনে অন্ধকার মাঠে নেমে এলো। তারপর ছুটল দক্ষিণদিকের দেয়ালের দিকে। খাতিব আর যোদ্ধারাও সেদিকেই ছুটল।

ফ্রান্সিস ভাঙা দেওয়ালের জায়গায় এলো। লাথি মেরে কয়েকটা আলগা পাথরের পাটা ভাঙল। এখন পার হওয়া সহজ হল।

ফ্রান্সিসরা দেয়াল পার হয়ে বাইরে অন্ধকার রাস্তায় এলো। ফ্রান্সিসদের দেখাদেখি খাতিব আর খাতিবের যোদ্ধারাও ভাঙা দেয়াল পার হল। তখনই দুর্গে হৈ হৈ চিৎকার শোনা গেল। আলতোয়াইফের সৈন্যরা চিৎকার করতে লাগল–কয়েদী পালাচ্ছে। সাবধানে। ধরো সবাইকে। অন্ধকার মাঠে সৈন্যরা মশাল হাতে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতে লাগল। ফ্রান্সিসরা কোণদিক দিয়ে পালিয়েছে সৈন্যরা অন্ধকারে তা দেখতে পায় নি।

এবার ফ্রান্সিসরা একটু সমস্যায় পড়ল। জাহাজঘাটা কোণদিকে? ফ্রান্সিস খাতিবের এক যোদ্ধাকে থামাল। বলল–জাহাজঘাটটা কোণদিকে। যোদ্ধাটি ডানহাত দক্ষিণের দিকে তুলে বলল–ঐদিকে।

ফ্রান্সিসরা দক্ষিণমুখো ছুটল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–মারিয়া ছুটতে পারবে তো?

–কিছু ভেবোনা। তোমাদের মতো ছুটতে না পারলেও আমি আমার মতো ছুটবো।

ফ্রান্সিসরা হাঁপাতে হাঁপাতে জাহাজঘাটায় পৌঁছল।

পাটাতনের ওপর দিয়ে ছুটে ওরা জাহাজে উঠল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে প্রথমেই ছুটে গেল নোঙরের কাছে। পেছনে শাঙ্কো। দু’জনে নোঙরের দড়ি টেনে টেনে তুলল। জাহাজ হাওয়ার ধাক্কায় ঘুরে যেতে লাগল। ফ্রান্সিস ছুটে গিয়ে জাহাজ থেকে পাতা পাটাতনটা তুলে ফেলল। জাহাজটা ঘুরে গেল।

ওদিকে মারিয়ার ডাকাডাকিতে হ্যারি বিস্কোরা জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। হ্যারি ছুটে গিয়ে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। ভাইকিং বন্দুরা উঠে আসতে লাগল। ফ্রান্সিস, মারিয়া আর শাঙ্কোকে ঘিরে দাঁড়াল। ধ্বনি তুলল–ওহোহো।

ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব, আমাদের এক্ষুণি এই বন্দর থেকে পালাতে হবে। পাল খুলে দাও দাঁড়িয়া দাঁড় ঘরে যাও। জাহাজ যত জোরে পায়রা চালাও।

ভাইকিং বন্ধুরা কাজে নেমে পড়ল। অল্পক্ষণের মধ্যে জাহাজ মাঝ সমুদ্রে চলে এলো।

তখনই পুবদিকে গভীর কমলা রঙের সূর্য উঠল। আলো ছড়ালো সমুদ্রে জাহাজে।

 জাহাজ চলল।

দিন তিনেকের মাথায় ফ্রান্সিসদের জাহাজ এলো হুয়েনভা বন্দরে। কাদিজ বন্দরেই এই হুয়েনভা বন্দরের নাম ওরা জেনে এসেছিল। ওরা নিশ্চিন্ত মনেই ওদের জাহাজ বন্দরে ভেড়াল। তখন সকাল। জাহাজ থেকে কাঠেরতক্তা তির পর্যন্ত পাতা হলো। কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু বন্দর শহরটা দেখতে নেমে গেল।

দুপুরে খাওয়াদাওয়ার সময় হয়ে গেল তখনও বন্ধুরা ফিরল না। আরো সময় গেল। দুপুর পেরিয়ে বিকেলের মুখোমুখি সময় তখন। ফ্রান্সিসরা কেউ তখনও খেল না।

বিকেলের দিকে দেখা গেল বন্ধুদের বন্দি করে একদল যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠে আসছে। কেন ওর বন্ধুদের বন্দি করা হয়েছে, ফ্রান্সিস তার কোনো কারণই বুঝতে পারল না। মাথায় শিরস্ত্রাণ, বুকে বর্ম,হাতে খোলা তলোয়ার, যোদ্ধারা ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠল। ফ্রান্সিস,হ্যারি এগিয়ে গেল। যোদ্ধাদেরদলনেতা সবার আগে ছিল।একটু লম্বামতো। মুখে দাড়ি-গোঁফ। দেখেই ফ্রান্সিস বুঝল লোকটা চড়া মেজাজের মানুষ।

হ্যারি বলল, কী ব্যাপার বলুন তো?

দলনেতা বলল, শুনলাম তোমরা ভাইকিং। ক্যামেরিনাল বন্দর হয়ে এখানে এই হুয়েনভা বন্দরে এসেছে।

হ্যারি বলল, হ্যাঁ।

তোমরা জানো কি এই অঞ্চলের রাজা হচ্ছেন ফার্নান্দো? দলনেতা বলল।

–সেটা আমরা কী করে জানবো? হ্যারি বলল।

–ক্যামেরিনাল অঞ্চলে এখন রাজত্ব করছে ফার্নান্দোর ভাই গার্সিয়া।

–হ্যাঁ, শুনেছি। হ্যারি বলল।

–ফার্নান্দো আর গার্সিয়ার মধ্যে ভীষণ রেষারেষি।

 –ও। হ্যারি মুখে শব্দ করল।

যে কোনোদিন দুই ভাইয়ে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে।

–আমরা এসব কিছুই জানি না। হ্যারি বলল।

–তোমরা সব জানেনা। দলনেতা চিৎকার করে বলে উঠল।

–না, আমরা জানি না। ফ্রান্সিস বলল।

 দলনেতা আবার চিৎকার করে উঠল, তোমরা গার্সিয়ার গুপ্তচর। গার্সিয়া তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে গোপনে সব খবর নিতে আমাদের ক’টা যুদ্ধজাহাজ, সৈন্যসংখ্যা কত, কোন্ কোন্ জায়গা আমরা সুরক্ষিত রেখেছি, কোণগুলি আমাদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা।

ফ্রান্সিস বুঝল, খুবই বিপদে পড়েছে ওরা। এই দলনেতাকে কিছু বলে লাভ নেই। দলনেতার এখন যা মনের অবস্থা,ফ্রান্সিসরা এসব ব্যপারে যে জড়িত নয় সেটা কিছুতেই বোঝানো যাবে না। তবু ফ্রান্সিস হাল ছাড়ল না। যুক্তি দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করল। বলল, দেখুন, আমরা বিদেশি। আপনাদের কোনো ব্যাপারেই আমরা জড়িয়ে নেই। জড়াবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও নেই।

–আমি বিশ্বাস করি না। দলনেতা বলল।

–গুপ্তচরবৃত্তি করে আমাদের কী লাভ বলুন! হ্যারি বলল।

–গার্সিয়া তোমাদের অনেক স্বর্ণমুদ্রা দিয়েছে। দলনেতা বলল।

–বেশ, আপনারা জাহাজে তল্লাশি চালিয়ে দেখুন। ফ্রান্সিস বলল।

–সেসব পরে হবে। এখন তোমাদের সবাইকে বন্দি করা হলো। দলনেতা বলল। তারপর যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে বলল, এই জাহাজের কোথাও থেকে দড়ি নিয়ে আয়। টুকরো করে দড়ি কেটে সকলের হাত বাঁধ। তারপর কয়েদখানায় নিয়ে চল।

ফ্রান্সিস বলল, আমাদের কয়েদখানায় না রেখে এই জাহাজেই বন্দি করে রাখতে পারেন। আপনাদের যোদ্ধারা পাহারায় থাকবে।

না না, তোমাদের সবাইকে কয়েদখানায় থাকতে হবে। দলনেতা মাথা নেড়ে বলল।

–তাহলে একটা অনুরোধ, আমাদের সঙ্গে রয়েছেন আমাদের দেশের রাজকুমারী। তিনি কয়েদখানার অত কষ্ট সহ্য করতে পারবেন না। তাকে এই জাহাজেই বন্দি করে রাখুন। ফ্রান্সিস বলল।

দলনেতা বলল, সেসব রাজা ফার্নান্দোকে বলো।

–রাজা ফার্নান্দোকে কোথায় পাবো? ফ্রান্সিস বলল।

রাজা সেভিল্লায় আছেন। দলনেতা বলল।

সেভিল্লা কোথায়? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

–এই হুয়েনভা থেকে মাইল কুড়ি উত্তরে। দলনেতা বলল।

–তাহলে কি আজ রাতে আমাদের সেভিল্লায় নিয়ে যাওয়া হবে? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।

–না, কাল সকালে রওনা হবো আমরা। দলনেতা বলল।

এবার ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে হ্যারি আর শাঙ্কোর কাছে সরে এলো। নিজেদের দেশীয় ভাষায় বলল, আমি পালাচ্ছি। কেউ লড়াইয়ে নামবে না। সময়-সুযোগমতো সব করবো। তোমরা এগিয়ে এসে আমাকে আড়াল করে দাঁড়াও।

ফ্রান্সিসের বন্ধুরা আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসকে আড়াল করে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ডেক-এ বসে পড়ল। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে কিছুটা এসেই গড়িয়ে গিয়ে মাস্তুলের পেছনে চলে এলো। হাঁপাতে হাঁপতে একটুক্ষণ দাঁড়াল। তারপর ডেক-এর ওপর শুয়ে পড়ে দ্রুত গড়িয়ে সিঁড়িঘরের পেছনে চলে এলো। রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা আর ওকে দেখতে পাবে না। ফ্রান্সিস দ্রুত পায়ে ছুটে গিয়ে হালের কাছে। এলো। হাল জড়িয়ে ধরে হালের কাঠের খাঁজে খাঁজে পা রেখে জলের কাছে নেমে এলো। তারপর হাল ধরে জলের মধ্যে আস্তে নিজের শরীরটা ডুবিয়ে দিল। জলে কোনো শব্দ হলো না।

ওদিকে ভাইকিং বন্ধুরা গজরাতে লাগল। ওরা এভাবে কাপুরুষের মতো বিনা যুদ্ধে বন্দিদশা মেনে নিতে পারছিল না। হ্যারি দেশীয় ভাষায় বলল, ভাইসব, ফ্রান্সিস পালিয়েছে। ও বলে গেছে আমরা যেন লড়াই না করি। সব মেনে নিই। হ্যারি থামল। তারপর বলল, ফ্রান্সিস মুক্ত। এখন আমাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফ্রান্সিস আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করবেই। ভাইকিং বন্ধুরা একটু শান্ত হলো।

ফার্নান্দোর সৈন্যরা ভাইকিংদের হাত বাঁধার জন্যে দড়ি জোগাড় করে নিয়ে এলো। এবার হ্যারি দলনেতার দিকে তাকিয়ে বলল, দেখুন, আমাদের বন্ধুরা ফিরে আসছে না দেখে আমরা কেউ এখনও পর্যন্ত খাইনি। আগে আমাদের খেতে দিন। তারপর যেখানে নিয়ে যেতে চান নিয়ে যাবেন।

একটু ভেবে নিয়ে দলনেতা বলল, বেশ, খেয়ে নাও। আমার সৈন্যরা পাহারায় থাকবে। কেউ পালাবার চেষ্টা করলেই মরবে।

ভাইকিংরা সিঁড়ির দিকে চলল। সৈন্যরাও পেছনে পেছনে চলল। ভাইকিংরা খেতে গেল। সৈন্যরা পাহারায় রইল।

খেতে খেতে মারিয়া বলল, হ্যারি, আমার জন্যেই তোমাদের এত কষ্ট।

হ্যারি হেসে বলল, কী যে বলেন! আপনি না থাকলেও এই রাজা ফার্নান্দোর যোদ্ধারা আমাদের বন্দি করতো। যাকগে, আপনি এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না।

খাওয়াদাওয়া সেরে হ্যারি ডেক-এ উঠে এলো। দেখল দলনেতা আরো সৈন্য আনিয়েছে। ভাইকিংরা ডেক-এ উঠে আসতে লাগল। সবাইকে সারি দিয়ে দাঁড় করানো হলো। তারপর তাদের দু’হাত দড়ি দিয়ে বাঁধা হতে লাগল। সবার হাত বাঁধা হলো শুধু মারিয়ার হাত বাঁধা হলো না।

দলনেতা গলা চড়িয়ে ভাইকিংদের বলল, সবাই জাহাজঘাটায় গিয়ে দাঁড়াও।

হ্যারিরা একে একে পাটাতনের ওপর দিয়ে নেমে এলো। রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরাও নেমে এলো। হ্যারিদের ঘিরে দাঁড়াল।

দলনেতা হাত তুলে পুবদিক দেখিয়ে গলা চড়িয়ে বলল, চলো। হ্যারিরা হাঁটতে শুরু করল। সৈন্যরাও ওদের দু’পাশ থেকে ঘিরে হাঁটতে লাগল।

তখন সন্ধে হয়েছে। হুয়েনভা বন্দরের রাস্তায় লোকজনের তেমন ভিড় নেই। রাস্তার এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। দু’পাশের বাড়িঘরেও আলো দেখা যাচ্ছে। বন্দি হ্যারিদের দেখে পথচলতি অনেকেই দাঁড়িয়ে পড়ে দেখল ওদের।

একসময় বাড়িঘর শেষ হলো। ডানদিকে একটা প্রান্তর। সেটা পার হয়ে হ্যারিরা এখটা পাথরের বাড়ির কাছে এলো। বাড়িটা তেমন বড়ো না। দরজার কাছে মশাল জ্বলছে। হ্যারি মশালের আলোয় দেখল লোহার দরজা। তাতে তালা ঝুলছে। বুঝল আবার কয়েদঘরের বন্দিজীবন।

লোহার দরজা ঠং ঠং শব্দে খোলা হলো। হ্যারিদের ঠেলে ঠেলে ঢোকানো হলো। ঘরের মধ্যে দেয়ালের খাঁজে দুটো মশাল আটকানো। মশাল দুটো জ্বলছে। হ্যারি চারদিকে তাকাল। কয়েদঘর যেমন হয় তেমনি ঘর। ছাদের কাছে দু’দিকে দুটো ঘুলঘুলির মতো। মেঝেয় পুরু করে শুকনো ঘাসের বিছানা। হ্যারি দেখল আগে থেকেই বন্দি হয়ে আছে। জনা দশেক লোক।

হ্যারি মারিয়াকে বলল, রাজকুমারী, আমার সঙ্গে আসুন। ঘরের এক কোণায় হ্যারি না এলো। মারিয়াকে বসতে বলল। নিজেও বসল। হ্যারির শরীর বরাবরই দুর্বল। ক্লান্তিতে সে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারল না। শুয়ে পড়ল। বাঁধা হাত রাখল কপালের ওপর। মারিয়া আস্তে আস্তে বলল, এ তো কষ্টের শুরু। কপালে আরও দুর্ভোগ আছে। তবে সান্ত্বনা একটাই, ফ্রান্সিস মুক্ত। ও আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারবে।

-হ্যাঁ, এখন ওটাই একমাত্র ভরসা। হ্যারি বলল।

.

ওদিকে ফ্রান্সিস সাঁতার কেটে সমুদ্রতীরে এলো। পেছল পাথরে সাবধানে পা রেখে রেখে তীরে উঠে এলো। ভেজা পোশাক নিয়েই একটা বড়ো পাথরের চাইয়ের ওপর বসল। ওখান থেকে জাহাজ-ডেক, মানুষজন দেখা যাবে।

রাত হলো। ফ্রান্সিস তখনও বসে আছে। তাকিয়ে আছে ওদেরজাহাজের দিকে। জাহাজের কাঁচটাকা আলোয় দেখল হ্যারিদের সারি দিয়ে দাঁড় করানো হলো। তারপর হ্যারিরা হাত বাঁধা অবস্থায় জাহাজ থেকে নেমে এলো। সামনে-পেছনে রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা।

ফ্রান্সিস পাথরটা থেকে উঠে দাঁড়াল। চলল বড়ো রাস্তার দিকে। ঝোঁপঝাড়। গাছগাছালি বাড়িঘর পার হয়ে সদর রাস্তায় এলো। রাস্তায় এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। তারই আলোয় দেখল হ্যারিরা চলেছে। দেখল মারিয়ার হাত দড়ি দিয়ে বাঁধা নয়। ফ্রান্সিস এই ভেবে আশ্বস্ত হলো যে মারিয়ার বেশি কষ্ট হবে না।

ফ্রান্সিস হ্যারিদের পেছনে কিছু দূরে থেকে হাঁটতে লাগল। হ্যারিদের কয়েদঘরে ঢোকানো পর্যন্ত সবই ফ্রান্সিস দেখল। এবার চিন্তা কী করে বন্ধুদের মুক্ত করা যায়।

এখন তো কিছু করার নেই। ফ্রান্সিস বেশ দুর্বল বোধ করতে লাগল। সারাদিন কিছুই খাওয়া হয়নি।

ফ্রান্সিস জাহাজঘাটার দিকে চলল। জাহাজঘাটায় পৌঁছে দেখল ওদের জাহাজটায় আলো জ্বালা হয়নি। ও খুব সাবধানে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। আশপাশের জাহাজগুলো থেকে আলো পড়েছে ওদের জাহাজে। সেই সামান্য আলোতে দেখল ডেক-এ কোনো পাহারাদার সৈন্য নেই। ফ্রান্সিস হাঁফ ছাড়ল। ও নিজের কেবিনঘরে নেমে এলো। ভেজা পোশাক পালটাল। তারপর রসুইঘরে এলো।

রসুইঘরের টেবিলে ঢাকনা দেওয়া পাত্রগুলোর ঢাকনা খুলে দেখতে লাগল ফ্রান্সিস। মশলা নুন এসব রাখা। হঠাৎ দেখল টেবিলের ধারে রাখা একটা ঢাকা দেওয়া বড়ো পাত্র। ফ্রান্সিস ঢাকনা খুলল। দেখল রুটি মাংস আলুভাজা পরিপাটি রাখা। রাঁধুনি ভাইকিং বন্ধুটি জানতো ফ্রান্সিস পালিয়েছে। ফ্রান্সিস অভুক্ত থাকবে। এই জাহাজে ও নিশ্চয়ই আসবে। তাই রাঁধুনি বন্ধুটি সব খাবার সাজিয়ে রেখে গেছে। একে ক্ষুধার্ত, সামনেই খাবার আর রাঁধুনি বন্ধুটির ভালোবাসা–ফ্রান্সিস আবেগে চোখ বুজল। মনে মনে গভীর ভালোবাসা জানাল বন্ধুটিকে। তারপর খেতে বসল। গোগ্রাসে খেতে লাগল সে। খিদে যা পেয়েছে!

 .

ভোর হলো। হ্যারির ঘুম ভেঙে গেল। ও উঠে বসল। দেখল বন্ধুরাও কেউ কেউ ঘুম ভেঙে উঠে বসেছে। মারিয়া তখনও ঘুমোচ্ছে। হ্যারি মারিয়ার ঘুম ভাঙাল না। ভালোমতো ঘুম আর বিশ্রাম রাজকুমারীর এখন অবশ্য প্রয়োজন।

বেলা হলো। ঢং ঢঙাস্ শব্দে কয়েদঘরের লোহার দরজা খুলে গেল। সকালের খাবার নিয়ে ঢুকল পাহারাদার সৈন্যরা। বন্দিদের হাতে বাঁধা দড়ি খুলে দেওয়া হলো। লম্বাটে সবুজ পাতায় গোল করে কাটা রুটি, আনাজের তরকারি আর মাংসের ঝোল। হ্যারি একটু অবাকই হলো–সকালের খাবারে এত কিছু! হ্যারিরা খাচ্ছে তখনই শুনল একজন পাহারাদার সৈন্য বলল, একটু পরেই তোমাদের সেভিল্লো নিয়ে যাওয়া হবে। পথে তেমন খাবার নাও জুটতে পারে। কাজেই যতটা পারো পেট পুরে খেয়ে নাও।

একটু বেলা হতেই ঢং ঢং শব্দে কয়েদঘরের দরজা খুলে গেল। দলনেতা ভেতরে ঢুকল। গলা চড়িয়ে বলল, সবাই বেরিয়ে এসো। সবাইকে হেঁটে সেভিল্লা যেতে হবে। বাইরে গিয়ে সারি দিয়ে দাঁড়াও।

হ্যারি বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল, চলো সবাই।

দু’জন ভাইকিং বন্ধু ঘাড় নাড়ল। একজন বলল, এখান থেকে আমরা যাবো না। এখানেই থাকবো। ফ্রান্সিস এখানে আছে। ওর সাহায্যেই আমরা মুক্ত হবো।

হ্যারি বলল, জেনো, ফ্রান্সিস সবসময় আমাদের সঙ্গে সঙ্গে আছে। এখনই বাইরে গেলে দেখবে ফ্রান্সিস বড়ো রাস্তায় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। সেভিল্লো যাওয়ার পথে ফ্রান্সিস আত্মগোপন করে ঠিক আমাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। হ্যারি থামল। পরে বলল, ফ্রান্সিস বলে গেছে আমরা যেন দলনেতার কথামতো চলি। এখন দলনেতার কথামতো সেভিল্লো যেতেই হবে। তার কথা না মানলে আমরাই বিপদে পড়বো।

সব বন্দি বাইরে এলো। সার বেঁধে দাঁড়াল। দেখা গেল চারটে ঘোড়া আনা হয়েছে। হাতের খোলা তলোয়ার কোষবদ্ধ করে দলনেতা একটা ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল। তিনজন সৈন্য বাকি তিনটে ঘোড়ায় উঠে বসল। দলনেতা তার সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমরা চারজন এই গুপ্তচরদের পাহারা দিয়ে সেভিল্লো নিয়ে যাচ্ছি। তোমরা হুয়েনভা বন্দরে খুঁজে বের করো রাজা গার্সিয়ার গুপ্তচরদের। ধরতে পারলেই কয়েদঘরে বন্দি করে রাখবে। আমি ফিরে এসে যা করার করবো।

দলনেতা ঘোড়া চালিয়ে একটু এগিয়ে গেল। তারপর হ্যারিদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার পেছনে পেছনে এসো। হ্যারিরা এগিয়ে এলো। তখনই তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে হ্যারিদের দেখতে দেখতে দলনেতা বলল, তোমাদের মধ্যে একজন আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল সে-ই তোমাদের নেতা। তাকে তো দেখছি না।

হ্যারি বলল, আমরা সবাই তো আছি। আপনি কার কথা বলছেন বুঝতে পারছি না।

দলপতি মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, সে নিশ্চয়ই চালাকি করে আমাদের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছে। চিন্তা নেই–আমরা ঠিক খুঁজে বের করবো। এবার চলো সবাই।

দলনেতা ঘোড়া চালাল। হ্যারিরা পেছনে পেছনে চলল। সবার পেছনে চলল তিনটি ঘোড়ায় তিনজন সৈন্য।

হুয়েনভা বন্দর শহর ছাড়িয়ে হ্যারিরা একটা টানা রাস্তায় পড়ল। বালি আর পাথরের টুকরো ছড়ানো রাস্তাটা বেশ চওড়া। এই রাস্তাটাই বোধহয় সেভিল্লা গেছে।

বেলা বাড়তে লাগল। রোদের তেজও বাড়তে লাগল। হ্যারিদের সবচেয়ে কষ্ট দিতে লাগল মাঝেমধ্যে ছুটে আসা জোর বাতাস। সঙ্গে ধুলোবালি উড়ে এসে গায়ে মাথায় পড়ছে। এজন্যে ওদের চোখ-মুখ হাত দিয়ে ঢাকতে হচ্ছে। দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। এভাবেই হ্যারিদের হাঁটতে হচ্ছে সেভিল্লার দিকে।

বেলা বাড়তে লাগল। রোদের তেজও বাড়তে লাগল। হ্যারিরা কাহিল হয়ে পড়ল। সেই সকালে খেয়েছে। তারপর এখনো পর্যন্ত একফেঁটা জলও খেতে পায়নি। সবচেয়ে কষ্ট হতে লাগল মারিয়ার। দু’হাত খোলা থাকলে কি হবে, এতক্ষণ হাঁটা, রোদের তেজ, ধুলো ওড়ানো দমকা হাওয়া–এত সব মারিয়া সহ্য করতে পারছিল না। বেশ দুর্বল পায়ে সে হাঁটছিল। হ্যারি মারিয়ার কষ্ট বুঝতে পারল। কিন্তু মারিয়াকে কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। হ্যারি ভাবল, এক পাত্র জল খেতে পেলে মারিয়া আর বন্ধুদের কষ্ট একটু কমবে। সে দ্রুতপায়ে হেঁটে দলনেতার কাছে এলো। বলল, আমাদের জলতৃষ্ণা পেয়েছে, জলের ব্যবস্থা করুন।

দলনেতা বলল, আর কিছুক্ষণ হাঁটলেই একটা গ্রাম পাওয়া যাবে। সেখানে ইঁদারা আছে। পেটভরে জল খেও।

হ্যারি কিছু বলল না। ফিরে এলো বন্ধুদের কাছে। গলা চড়িয়ে বলল, ভাইসব, সামনেই একটা গ্রামে ইঁদারা আছে। জল পাওয়া যাবে।

হ্যারিরা হাঁটতে লাগল। হাঁটার গতি অনেকটা কমে গেছে। হ্যারি মারিয়াকে বলল, রাজকুমারী, আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি।

মারিয়া হেসে বলল, ফ্রান্সিসও কি কম কষ্ট সহ্য করছে! ওর কথা ভেবেই আমি সব কষ্ট সহ্য করছি।

কিছুটা এগিয়েই একটা গ্রাম পাওয়া গেল। পাথর আর কাঠ দিয়ে তৈরি ঘরদোর। পাঁচ-সাতটা বাড়ি নিয়ে গ্রাম। দলনেতার নির্দেশে হ্যারিরা গ্রামে ঢুকল। গ্রামটার মাঝামাঝি জায়গায় একটা বড়ো ইঁদারা। গ্রামের বৌ-ঝিরা দড়ি বাঁধা কাঠের পাত্র ডুবিয়ে জল তুলছে। হ্যারিদের দেখে ওরা সরে দাঁড়াল। বিস্কো হাঁদারার ধারে গেল। কিন্তু দু’হাত তো বাঁধা। জল তুলবে কী করে! মারিয়া এগিয়ে এলো। কাঠের পাত্র ইঁদারায় ডুবিয়ে জল তুলতে লাগল। তৃষ্ণার্ত ভাইকিংরা দু’হাত পেতে অঞ্জলির মতো জল ধরে খেতে লাগল। গায়ে-মাথায় জল ছিটোতে লাগল। সাত-আট পাত্র জল তুলতেই মারিয়া হাঁপাতে লাগল। কয়েকজন ভাইকিং বাঁধা দু’হাত তুলে দলপতিকে বলল, আমাদের হাত খুলে দিন। রাজকুমারী একা সবাইকে জল খাওয়াতে পারবেন না। দলপতি দু’জন সৈন্যকে ইঙ্গিত করল। সৈন্য দুজন ঘোড়া থেকে নেমে দারার ধারে এলো। কাঠের পাত্রে জল তুলে ভাইকিংদের জল খাওয়াল। নিজেরাও খেল।

আবার পথ চলা শুরু হলো। ছোটো ছোটো নুড়িপাথর আর ধুলোভর্তি রাস্তা। মাঝে মাঝেই দমকা হাওয়া বইতে লাগল। ধুলো উড়তে লাগল। হ্যারিদের তখন হাত দিয়ে চোখ ঢাকতে হচ্ছে। দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। হ্যারিদের মাঝে মাঝেই এরকম দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে বলেই চলার গতি কমে যাচ্ছে। এভাবেই চলল হ্যারিরা।

হ্যারিরা একটা জায়গায় এলো। বাঁ দিকে ঝুঁকে পড়া পাথরের চাঁই, ডান দিকে সবুজ ঘাসে-ঢাকা উপত্যকা মতো। হ্যারিরা কিছু বোঝবার আগেই একজন ভাইকিং বন্ধু চিৎকার করে বলে উঠল, আমি দেশে ফিরে যাচ্ছি। কথাটা শেষ করেই বন্ধুটি দল থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর ছুটল ডান দিকের উপত্যকার ওপর দিয়ে।

দলপতি সঙ্গে সঙ্গে ভাইকিং বন্ধুর দিকে ঘোড়া ছোটাল। এতটা পথ হেঁটে হেঁটে ক্ষুধার্ত-তৃষ্ণার্ত বন্ধুটি বাঁধা দু’হাত নিয়ে বেশি দূর যেতে পারল না। দলপতি ঘোড়া ছুটিয়ে অল্পক্ষণের মধ্যেই তাকে ধরে ফেলল। তলোয়ার কোষমুক্ত করে মুহূর্তে ঢুকিয়ে দিল বন্ধুটির পিঠে। বন্ধুটি মুখে একটা শব্দ করল। তারপর ঘাসে-ঢাকা জমির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ল।

ঘটনাটা খুব দ্রুত ঘটে গেল। ভাইকিংদের চোখের সামনে। ওরা প্রথমে বুঝে উঠতে পারল না কী করবে। পরক্ষণেই শাঙ্কো চিৎকার করে উঠল, ও-হো-হো। সঙ্গে সঙ্গে ভাইকিং বন্ধুরাও চিৎকার করে উঠল, ও-হো-হো। প্রথমে শাঙ্কো ছুটে চলল দলপতির দিকে। পেছনে আরো কয়েকজন। হ্যারি বুঝল ভীষণ বিপদ। হ্যারি চিৎকার করে বলল, শাঙ্কো মাথা গরম করো না। কথা শোনো৷ বাঁধা হাত নিয়ে লড়াই হয় না। এবাবে লড়ইয়ে নামলে আমার কেউ বাঁচবো না। ফিরে এসো।

ঘোড়ায় বসা দলপতিকে শাঙ্কো হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, আপনি আমাদের বন্ধুকে মারলেন কেন? ও তো ধরা পড়তই। তবে কেন ওকে মেরে ফেললেন?

দলপতি বলল, এইরকম মৃত্যু দেখে আর কেউ পালাতে যাবে না।

শাঙ্কো আর অন্য বন্ধুরা মৃত বন্ধুটির কাছে এসে তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তার মুখের দিকে চেয়ে কেঁদে ফেলল। অন্য বন্ধুদের চোখেও জল এলো। ততক্ষণে হ্যারি ছুটে এসেছে। মৃত বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে হ্যারি কেঁদে ফেলল। জলে-ভেজা চোখে দলপতির দিকে তাকিয়ে বলল, আমাদের নিরস্ত্র বন্ধুটিকে এভাবে হত্যা করলেন কেন? ও তো আপনাদের কাউকে আক্রমণ করেনি।

দলপতি বলল, ওসব বলে লাভ নেই। কাউকে পালাতে দেখলেই মেরে ফেলবো। চলো সব, দলে ঢোকো।

–না, বন্ধুটি শেষকৃত্য না করে আমরা যাবো না। হ্যারি বলল।

দলপতি খোলা তলোয়ার শূন্যে ঘুরিয়ে বলল, সবাই দলে যাও। আজ সন্ধের আগেই আমাদের সেভিল্লে পৌঁছেতে হবে।

হ্যারি চেঁচিয়ে বলল, না, আমাদের মৃত বন্ধুকে ফেলে আমরা যাবো না।

সব ভাইকিং বন্ধুরা চিৎকার করে উঠল, ও-হো-হো।

 দলপতি ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠল, আমি যা বলবো তাই মানতে হবে। নইলে সবকটাকে মেরে ফেলবো।

শাঙ্কো, বিস্কো ছুটে দলনেতার সামনে এলো। শাঙ্কো চিৎকার করে বলল, মারুন আমাদের।

সব ভাইকিং বন্ধুরা চিৎকার করে উঠল, ও-হো-হো।

দলপতি বেশ ঘাড়বে গেল। বুঝল, এরা এত ক্রুদ্ধ হয়েছে যে মরবে জেনেও খালি হাতে তাদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামতে ইতস্তত করবে না। তারা মাত্র চারজন। কেউই রেহাই পাবে না।

রূপোর চাবি দলপতি ডান হাত ওঠাল। ভাইকিংদের চিৎকার-চেঁচামেচি বন্ধ হলো। দলনেতা বলল, তোমরা কী চাও?

হ্যারি বলল, আমরা আমাদের মৃত বন্ধুর শেষকৃত্য করে তবে যাবো।

তার মানে বন্ধুকে কবর দিয়ে যাবে, এই তো? দলপতি বলল।

–হ্যাঁ। তার আগে আমরা এখান থেকে নড়বো না। হ্যারি বলল।

–ঠিক আছে, কোথায় কবর দেবে দেখো। দলনেতা বলল।

ভাইকিং বন্ধুরা এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল এমন জায়গা যেখানে মাটি না খুঁড়েও পাথর চেপে সাজিয়ে কবর দেওয়া যায়। ভাইকিংরা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ল।

দলনেতা চিৎকার করে বলে উঠল, কেউ পালাবার চেষ্টা করলে বন্ধুর দশা হবে।

একজন ভাইকিংহ্যারিকে ডেকে বলল, হ্যারি, এই জায়গাটা দেখো তো।হ্যারি সেদিকে গেল। দেখল জায়গাটা ছোটো গুহার মতো। হ্যারি ভেবে দেখল এখানে কবর দেওয়া যেতে পারে। সে শাঙ্কোদের বলল সে কথা।শাঙ্কোরা পাঁচ-ছ’জন মিলে গেল বন্ধুর মৃতদেহের কাছে। দেহটা কাঁধে করে নিয়ে এসে আস্তে আস্তে গুহার কিছুটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। হাতে হাতে পাথরের বড়ো বড়ো টুকরো এনে মৃতদেহের ওপর চাপিয়ে দিল। বন্ধুর কবরের দিকে তাকিয়ে অনেকেই কেঁদে ফেলল। এই বিদেশে এক অপরিচিত পরিবেশে ওরা এক বন্ধুকে হারাল। তখনই হ্যারি শুনল ফ্রান্সিসের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর, হ্যারি, তোমরা কোনো কিছুর প্রতিবাদ করো না। হ্যারি বুঝল ঐ ঝুঁকে পড়া পাথরের চাঙড়ের ওপাশ থেকেই কথাটা ভেসে এলো। হ্যারি চিৎকার করে ওদের দেশীয় ভাষায় বলল, ভাইসব, ফ্রান্সিস। আমাদের কাছাকাছিই আছে। কোনো ভয় নেই। ভাইকিং বন্ধুরা ধ্বনি তুলল, ও-হো-হো। দলপতি হ্যারির কথা কিছুই বুঝল না। ওরা কেন ধ্বনি তুলল তাও বুঝল না।

ফ্রান্সিস আবার চাপাস্বরে বলল–বন্ধুর মৃত্যুতে আমি শোকাহত। কেঁদেছি। এখন তোমাদের উত্তেজিত হওয়া চলবে না। এখন মাথা ঠাণ্ডা রেখে চিন্তা করে বুদ্ধি দিয়ে সব ভাবতে হবে। তারপর পালাতে হবে।

ওদিকে কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে হ্যারিরা যখন রাজা ফার্নান্দোর দলপতি ও তিনজন সৈন্যের পাহারায় সেভিল্লোর দিকে যাত্রা শুরু করল, তখন থেকেই কিছুটা দূরত্ব রেখে ফ্রান্সিসও ওদের পেছনে পেছনে আসতে লাগল।

রাস্তায় সেভিল্লো থেকে আসা লোকজন ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চড়ে আসছে দেখা গেল। এদিক থেকেও লোকজন, গাড়ি-ঘোড়া যাচ্ছে।

রাস্তা দিয়ে বেশ কিছুটা আসার পর ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল একটি লোক হ্যারিদের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে হেঁটে চলেছে। লোকটি কখনো হ্যারিদের দলের কাছে যাচ্ছে। না বা ওদের পার হয়েও যাচ্ছে না। ফ্রন্সিস বুঝল লোকটি ওর মতোই এই বন্দি দলকে অনুসরণ করছে। লোকটির পরনে চাষির পোশাক। গায়ে ঢোলাহাতা জামা। ফ্রান্সিস বুঝল ঐ লোকটির কোনো বন্ধু বা আত্মীয় এই বন্দিদের মধ্যে রয়েছে। একবার ভাবল লোকটির সঙ্গে পরিচিত হবে। জানবে সে এই বন্দিদের পেছনে পেছনে যাচ্ছে কেন। পরক্ষণেই ফ্রান্সিস ভাবল আরো কিছুদূর যাই। দেখি ও আমার মতোই বন্দিদের অনুসরণ করছে কিনা।

রূপোর চাবি বন্দির দল চলেছে। নিরাপদ দূরত্ব রেখে ফ্রান্সিসও চলেছে।

হ্যারিরা থেমে যে গ্রাম থেকে জল খেল, ফ্রান্সিসও সেখানে জল খেল। ও কিছুটা জলে মাথা ভেজাল, হাতমুখ ধুল। কাঁধে গলায় যখন জল ছিটিয়ে দিচ্ছে তখনই দেখল সেই সাদা ঢোলাহাতা জামাপরা লোকটা ইঁদারার ধারে এলো। ফ্রান্সিস এবার ভালো করে লোকটাকে দেখল। লোকটা বয়েসে ফ্রান্সিসের চেয়ে ছোটো। ফ্রান্সিস জল তোলার পাত্রটা লোকটির হাতে দিয়ে বলল, যা গরম, কিছুতেই তেষ্টা মিটছে না। লোকটি বলল, ঠিকই বলেছেন। চড়া রোদ, ধুলোবালির ঝাপটা, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।

ফ্রান্সিস আর কোনো কথা বলল না। তৃষ্ণার্ত লোকটা আগে জল খেয়ে তৃষ্ণা মেটাক। লোকটা প্রথমে পাত্রের জল সমস্তটাই মাথায়-ঘাড়ে ঢালল। আবার জল তুলল। কপাল মুখ ধুয়ে ঢক ঢক করে জল খেল। আবার জল তুলে খেল। সবটা জল খেতে পারল না। জামার বোতাম খুলে গলায় বুকে জলটা ছিটিয়ে দিল।

ফ্রান্সিস এবার বলল, তুমিও কি সেভিল্লা যাচ্ছো?

–হ্যাঁ। লোকটি বলল। তারপর ফ্রান্সিসকে আর ওর পোশাক দেখে বলল, মনে হচ্ছে তুমি বিদেশি।

–হ্যাঁ। বলল ফ্রান্সিস।

–তোমাদের দেশ কোথায়? লোকটি জিজ্ঞাসা করল।

–আমরা ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।

-বলো কি! তোমাদের জাহাজ চালানোর দক্ষতার কথা, বীরত্বের নানা কাহিনী আমরা শুনেছি।

ফ্রান্সিস বলল, চলো রাস্তায় নামি। হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা যাবে।

বেশ, চলো। লোকটি বলল।

দু’জনে রাস্তায় এলো। ফ্রান্সিস দেখল হ্যারিরা অনেকটা এগিয়ে গেছে। ফ্রান্সিস বলল, ভাই, একটু তাড়াতাড়ি পা চালাও। কথাটা বলে ফ্রান্সিস জোরে হাঁটতে লাগল। লোকটিও ফ্রান্সিসের সঙ্গে তাল রেখে হাঁটতে লাগল।

একটু পরেই দু’জনে বন্দির দলের কাছাকাছি এলো।ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। লোকটিও দাঁড়িয়ে পড়ল। দু’জনেই বেশ হাঁপাচ্ছে তখন।

আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে লোকটি বলল, দেশ ছেড়ে এই স্পেনে এসেছো কেন?

–নানা দেশে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে তাই। ফ্রান্সিস বলল।

–সেভিল্লা যাচ্ছো কেন?

–দেখো, ঐ বন্দি দলে আমার ভাইকিং বন্ধুরা রয়েছে। ওদের বিচারের জন্যে সেভিল্লায় রাজা ফার্নান্দোর দরবারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি যাচ্ছি যদি কোনো উপায়ে বন্ধুদের মুক্ত করা যায় তার জন্যে।

আমার ব্যাপারটাও তাই। লোকটি বলল, তুমি বন্ধুদের উদ্ধার করতে যাচ্ছো, আমি শুধু আমার বাবাকে মুক্ত করতে যাচ্ছি।

আগে তোমার নামটা বলো, তারপর সমস্ত ঘটনাটা বলো তো। ফ্রান্সিস বলল। লোকটি বলল, আমার নাম বারাকা। সমস্ত ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে গেলে এই দক্ষিণ স্পেনের কিছুটা ইতিহাস তোমায় বলতে হয়। একটু থেমে বারাকা বলতে লাগল, প্রায় একশো বছর আগে এই অঞ্চলে রাজত্ব করতেন খলিফা ইবন আবি আমীর। তার রাজত্বে রাজধানী ছিল কারডোভা। সেভিল্লা থেকে বেশ কিছুটা দূরে। খলিফা ইবন আবি আমীর কারডোভা থেকে কিছুদূরে নতুন প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন। বারাকা থামল। তারপর বলতে লাগল, খলিফা বিপুল ধনসম্পদের অধিকারী ছিলেন। আমাদের একজন পূর্বপুরুষ তার কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। উত্তর স্পেনের এক রাজা কারডোভা আক্রমণ করেছিলেন। প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধে খলিফা নিহত হন। তখন জয়ী রাজা খলিফার ধনভাণ্ডারের খোঁজ করেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে রাজা আর তার অমাত্যরা পুরোনো প্রাসাদ, নতুন প্রাসাদের কোষাগার তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছু স্বর্ণমুদ্রা ছাড়া আর কিছুই পাননি। বারাকা থামল।

-তারপর? ফ্রান্সিস বলল।

–আমাদের পূর্বপুরুষ বিপদ আঁচ করে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করেন। খলিফা আমীরের ধনসম্পদের খোঁজও পেল না কেউ। বারাকা থামল।

–আচ্ছা, মৃত্যুর পূর্বে খলিফা কি কাউকে বলে গিয়েছিলেন তার ধনসম্পদ তিনি কোথায়, কার জন্যে রেখে যাচ্ছেন? ফ্রান্সিস বলল।

–না, খলিফা আমীর কাউকে কিছু বলে যাননি।

–কোনো চিহ্ন, কোনো-নকশা, কোনো চিঠি? ফ্রান্সিস জিগ্যেস করল।

–না, এসব কিছুই কেউ পায়নি। বারাকা বলল।

 ফ্রান্সিস দ্রুত চিন্তা করতে লাগল-খলিফা আমীর কোথায় গোপনে রেখে যেতে পারেন তার ধনসম্পদ? আচ্ছা, এওতো হতে পারে–ফ্রান্সিস ভাবল, ধনসম্পদ যেখানে থাকার কথা সেখানেই রেখে গেছেন অর্থাৎ রোজকোষাগারে। কিন্তু কোন্ রাজপ্রাসাদের কোষাগারে? নতুন যে প্রাসাদটি নির্মাণ করিয়েছিলেন, না পুরনো রাজপ্রাসাদ? ফ্রান্সিস ভেবে দেখল এটা একটা অনুমান মাত্র। সঠিক বুঝতে গেলে পুরনো নতুন দুটো রাজপ্রাসাদই খুঁটিয়ে দেখতে হবে।

দু’জনে হাঁটতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল, তোমার বাবাকে বন্দি করা হয়েছে কেন?

আমাদের পূর্বপুরুষ আমীরের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। রাজা ফার্নান্দোর কেমন বিশ্বাস হয়েছে ইবন আবি আমীর নিশ্চয়ই আমাদের পূর্বপুরুষকে কোনো সঙ্কেত-নকশা বা সূত্র দিয়ে গেছেন তার গুপ্তধনের।

সত্যি কি তোমাদের পুরুষানুক্রমে সংগৃহীত জিনিসের মধ্যে তেমন কিছু আছে? ফ্রান্সিস বলল।

 কিচ্ছু না। রাজা ফার্নান্দোর এই দলপতি আমাদের হুয়েনভার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে কিছুই পায়নি। এবার সেভিল্লায় আমাদের বাড়ি তল্লাশি হবে। জানি না কিছু না পেলে বাবাকে মুক্তি দেবে কিনা। বারাকা বলল।

ফ্রান্সিস বলল, বুঝলে বারাকা, সমস্ত ব্যাপারটা আমাকে চিন্তা করতে হবে। কিছু– কিছু জায়গা দেখতে হবে। তবেই আমি বলতে পারবো খলিফা ইবন আবি আমীরের গুপ্ত ধনভাণ্ডারের হদিস পাওয়া যাবে কিনা।

বিকেল হলো। রোদের তেজ কমল। দলপতি হ্যারিদের দিকে তাকিয়ে হুকুম দিল, তোমরা বাঁ দিকের ঐ জঙ্গলটার কাছে বসে বিশ্রাম নাও। আমি একটু গ্রামটা ঘুরে আসি। হুকুমমতো হ্যারিরা রাস্তা থেকে নেমে চলল জঙ্গলটার দিকে। জঙ্গলের গাছের ছায়ায় বসল হ্যারিরা। কেউ কেউ ঘাসের জমিতে শুয়ে পড়ল। ক্ষুধায়-তৃষ্ণায়-পথশ্রমে ক্লান্ত হ্যারিরা বিশ্রাম করতে লাগল।

কয়েকটা কাঠ আর পাথর দিয়ে তৈরি বাড়ি। ওটাই একটা গ্রাম। দলপতি ঐ বাড়িগুলোর কাছে এসে ঘোড়া থেকে নামল। প্রথম যে বাড়িটা পড়ল তার দরজায় আঙুল দিয়ে টোকা দিল। দরজা খুলে গেল। দেখা গেল একজন বুড়ি দাঁড়িয়ে। বুড়ি ফোকলা মুখে হাসল। বলল, কী চাইছেন?

দলনেতা বলল, রান্না করা কিছু খাবার আছে?

রান্না করা খাবার তো দুপুরেই খাওয়া হয়ে গেছে। বুড়ি বলল।

–পিঠে-টিঠে এমন কিছু নেই? দলনেতা জিগ্যেস করল।

-হ্যাঁ, আছে। আজকে আমার নাতির জন্মদিন। তাই বেশ কিছুপিঠে তৈরি করেছি। গাঁয়ের লোকজনকে নেমন্তন্ন করেছি। বুড়ি বলল।

–পিঠে কোথায়? নিয়ে এসো। দলপতি বলল।

 বুড়ি ঘরের মধ্যে ঢুকল। একটু পরে একটা কাঠের পাত্রে পিঠে নিয়ে এলো। দলনেতা আট-দশটা পিঠে ওখানে দাঁড়িয়েই খেয়ে নিল। তারপর জামার হাতার ভেতর থেকে একটা রুমাল বের করে বেশ কিছু পিঠে রুমালে বেঁধে নিল। বাড়িটার বাইরে এসে ঘোড়ায় উঠে সে আবার জঙ্গলটার কাছে ফিরে এলো। এসে অন্য সৈন্যদের হাতে পিঠে-বাঁধা রুমালটা দিল। দলপতি নিজে ও সৈন্যরা পিঠে খেতে লাগল।

হ্যারিরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল ওদের পিঠে খাওয়া। পিঠে খাওয়া শেষ করে দলপতি হাত ঝাড়ল। হ্যারি আশা করেছিল হয়তো এক-আধটা পিঠে ওদের দেবে। হ্যারি নিজের জন্যে চায় না। ক্ষুধার্ত মারিয়ার কষ্টের কথাই ভাবছিল।

ফ্রান্সিস আর বারাকা দূর থেকে দলপতি আর সৈন্যদের পিঠে খাওয়া দেখল। বারাকা বলল, চলো ঐ বাড়িটায়। কিছু খাবার নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।

ফ্রান্সিস বলল, বারাকা, আমার বন্ধুরা এখনও উপবাসী। আমি কিছু খাবো না। তুমি খেয়ে এসো।

বারাকা তখন ক্ষুধায় অস্থির। ও ছুটল সেই বাড়িটার দিকে, যে বাড়িটায় দলপতি ঢুকেছিল। ফ্রান্সিস রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।

কিছুক্ষণ পরে বারাকা রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে এলো। হেসে বলল, এক বুড়ি তার নাতির জন্মদিনের অনুষ্ঠানের জন্যে পিঠে তৈরি করে রেখেছিল। দলপতি অনেক পিঠে খেয়েছে, নিয়েও এসেছে। বাকি পিঠেগুলো আমিই সাবাড় করে এলাম।

তখন সন্ধে হয়ে এসেছে। পিঠে খেয়ে পরিতৃপ্ত দলপতি ও সৈন্যরা ঘোড়ায় উঠল। দলপতি গলা চড়িয়ে বলল–এবার চলো সবাই। শাঙ্কোরা সকলেই বনের কাছে ঘাসের ওপর শুয়ে বসেছিল।

শাঙ্কো দলপতিকে বলল–আমরা অত্যন্ত পরিশ্রান্ত। এখনও খাওয়া জোটে নি। আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে যাবো।

–না-না–দলপতি মাথা নেড়ে বলল–আমাদের তাড়াতাড়ি সেভিল্লানগরে পৌঁছতে হবে।

–তাহলে আপনারা আগে সেভিল্লানগরে চলে যান। আমরা পরে যাচ্ছি। বিস্কো বলল।

ইয়ার্কি হচ্ছে না? দলপতি বলল–এক্ষুণি তলোয়ারের এক ঘায়ে মাথা উড়িয়ে দিতে পারি।

–তা পারেন। আমাদের বন্ধুকেও মেরেছেন–এজন্যে আপনার মনে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। বেশ তারিয়ে তারিয়ে পিঠে খেলেন। শাঙ্কো বলল।

ভালো করেছি–দলপতি বলল। তারপর বলল ঠিক আছে আর আধঘণ্টা সময় দিচ্ছি। তারপর আর দেরি করা চলবে না। সেভিল্লানগরে যেতে হবে।

—-বেশ–তাই হবে। শাঙ্কো বলল।

 আসলে শাঙ্কো চাইছিল আরো অন্ধকার নামুক।

 চারদিক অন্ধকার হয়ে এলো।

এবার শাঙ্কো হ্যারির কাছে এলো। ফিসফিস্ করে বলল–আমার গলার কাছে। জামার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে আমার ছোরাটা বের করো। শাঙ্কো বলল–ছোরা ঘষে ঘষে আমার হাতে বাঁধা দড়িটা কাটো।

হ্যারি ছোরাটা কোনোরকমে ধরে শাঙ্কোর হাত বাঁধা দড়িটা ঘষে ঘষে কাটতে লাগল। একটু পরেই দড়ি কেটে গেল। শাঙ্কো এবার ছোরাটা হাতে নিল। তারপর অন্ধকারের মধ্যে সবাইর হাতের দড়ি কাটল।

তখনই দলপতি চেঁচিয়ে বলে উঠল–অনেক বিভ্রাম হয়েছে–এবার ওঠো চলো।

অন্ধকারের মধ্যে শাঙ্কো বিদ্যুৎগতিতে ছুটে গেল দলপতির ঘোড়াটার কাছে। দলপতি কিছু বোঝার আগেই শাঙ্কো ছোরার এক পোঁচে ঘোড়ার জিন-এর চামড়ার ফিতেটা কেটে ফেলল। জিন খুলে মাটিতে পড়ে গেল। দলপতিও মাটিতে ছিটকে পড়ল। শাঙ্কো এক লাফে দলপতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আর দ্রুত ছোরাটা দলপতির বুকে বসিয়ে দিল। দলপতির গলা থেকে শব্দ হল–আঁক। দলপতি বারকয়েক মাথা এপাশ-ওপাশ করে স্থির হয়ে গেল। দলপতি মারা গেল। ছোরাটা খুলে নিয়ে ছোরাটা ডানহাতে উঁচু করে ধরে শাঙ্কে চিৎকার করে উঠল–বন্ধুহত্যার প্রতিশোধ নিলাম। ভাইকিং বন্ধুরা চিৎকার করে ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো।

শাঙ্কো অন্ধকারের মধ্যে চিৎকার করে বলল–বিস্কো–ফ্লেজার–বাকি সৈন্যদের আহত করো। পালাতে দিও না। দলপতির হাত থেকে ছিটকে পড়া তলোয়ারটা বিস্কো তুলে নিল। ছুটল একজন সৈন্যের দিকে। সৈন্যটি তলোয়ার চালাবার আগেই বিস্কো সৈন্যটির উরুতে তলোয়ারের ঘা বসাল। সৈন্যটি লাফিয়ে উঠে মাটিতে পড়ে গেল। আহত উরু ধরে ও গোঙাতে লাগল।

ওদিকে সাত-আটজন ভাইকিং একটা সৈন্যকে ঘিরে ফেলল। সৈন্যটি ঘোড়ার দু’পা উঁচু করাতে লাগল। ভাইকিংরা সরে সরে যেতে লাগল। এবার বিস্কো তলোয়ার হাতে ছুটে এসে ঘোড়াটার কোমরে তলোয়ারের কোপ বসাল। ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠল। সৈন্যটি ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল।

অন্য সৈন্যটি অবস্থা বেগতিক দেখে জোরে ঘোড়া ছোটাল। কয়েকজন ভাইকিংও ছুটল ঘোড়াটার পেছনে পেছনে। কিন্তু ঘোড়ার দ্রুত গতির সঙ্গে ভাইকিংরা পারবে কেন? অল্পক্ষণের মধ্যেই সৈন্যটি ঘোড়া ছুটিয়ে পালিয়ে গেল।

অন্ধকারে হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–আমরা এখনও বিপদমুক্ত নই। যে সৈন্যটি পালিয়ে গেল সে নিশ্চয়ই সেভিল্লায় গিয়ে সংবাদ দেবে। আরও সৈন্য আমাদের আক্রমণ করতে আসবে। এখন আমরা কী করবো সেটা ভেবে ঠিক করতে হবে।

শাঙ্কো বলল–এখন আমরা তৃষ্ণার্ত ক্ষুধার্ত। বেশি দূর যেতে পারবো না। এই বনের মধ্যেই আমরা আত্মগোপন করে থাকবো।

কিন্তু ঐ সৈন্যটি সেভিল্লা গেল। ওদের সেনাপতি সৈন্যদের নিশ্চয়ই এখানে নিয়ে আসবে। এবার ওরা চারদিকে আমাদের খুঁজে বেড়াবে। এই জঙ্গলেও ওরা নিশ্চয়ই তল্লাশি চালাবে। আমরা আবার ধরা পড়বো। হ্যারি বলল।

–কিন্তু এখন এই বনে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় দেখছি না। তারপর ভাগ্যে যা আছে হবে। শাঙ্কো বলল।

হ্যারি বলল–আমরা সারাদিন কিছু খাইনি। তিনটে ঘোড়া আমরা পেয়েছি। ঘোড়ায় চড়ে সেভিল্লা থেকেই হোক বা অন্য গ্রাম-ট্রাম থেকেই তোক কিছু খাবার আর জলের ব্যবস্থা তো করতে হয়।

-ঠিক আছে। আমি বিস্কো আর পেড্রো যাবো খাবার আর জলের খোঁজে। তোমরা বনের মধ্যে ঢুকে পড়ো। শাঙ্কো বলল।

হ্যারিরা বনের মধ্যে ঢুকে গেল। অন্ধকারে গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে চলল। বন খুব ঘন না। ছাড়া ছাড়া ওক গাছ চেস্টনাট গাছ। লতাপাতা। বড়ো বড়ো ফার্ন গাছ। একটা ফাঁকে জায়গা পেয়ে হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল–তোমরা এখানেই বসো। শাঙ্কোদের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। সবাই ঘাসে ঢাকা মাটিতে বসল। কয়েকজন শুয়ে পড়ল।

হ্যারিও বসল। শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে। হ্যারি হাত পা ছেড়ে শুয়ে পড়ল। এটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তখনই হঠাৎ দেখল উত্তরদিকে কিছু গাছগাছালির পরেই একটা টিলামতো। হ্যারি উঠে পড়ল।ডাকল–ফ্লেজার। ফ্লেজার এগিয়ে এলো।হ্যারিবলল–দ্যাখো তোওটা কী? ফ্লেজারও অন্ধকারের মধ্যে উঁচু টিলামতো দেখল। বলল–মনে হচ্ছে টিলা। খুব বড়ো নয়।

–চলো তো–দেখে আসি। হ্যারি বলল।

 –টিলা দেখে কী হবে। ফ্লেজার বলল।

ভুলে যেও না আমরা বন্দিদশা থেকে পালিয়েছি। এখনও আমাদের জীবন নিরাপদ নয়। প্রয়োজনে লুকিয়ে আশ্রয় নিতে পারি এমন জায়গা ওটা কিনা দেখতে হবে। চলো। হ্যারি বলল।

হ্যারি আর ফ্লেজার চলল টিলাটার দিকে। কাছে এসে অন্ধকারেও দেখল টিলাটা কালো ছায়ার মতো। ফ্লেজার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টিলাটা দেখতে লাগল। হ্যারি টিলাটা চারদিক থেকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। পশ্চিম দিকে দেখল টিলাটার মধ্যে একটা ছোটোমুখ গুহার মতো। হ্যারি গুহামুখে এসে দাঁড়াল। দেখল ছোটো গুহামুখ দিয়ে একজন মানুষ হামা দিয়ে ঢুকতে পারে। কিন্তু কতদূর ঢুকে যেতে পারবে তা বোঝা যাচ্ছে না। হ্যারি বলল–ফ্লেজার-গুহার ভেতরে একটু যেতে পারবে?

–এটা না পারার কী আছে। ফ্লেজার বলল। তারপর এগিয়ে গেল গুহাটার দিকে। হামা দিয়ে গুহাটার ভেতরে ঢুকল। তখনই ঝটপট শব্দ তুলে একপাল চামচিকে গুহাটা থেকে বেরিয়ে এসে এদিক-ওদিক পালাতে লাগল। প্রথমে ফ্লেজার চমকে উঠল। পরক্ষণে একটু পিছিয়ে এসে গুহা মুখটা খোলা রাখল। চামচিকেগুলোরও বেরিয়ে আসতে অসুবিধে হল না।

এবার ফ্লেজার হামা দিয়ে ঢুকল। নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে হামা দিয়ে চলল। হঠাৎ ওর মনে হল এখন গুহাটা বড়ো লাগছে। ফ্লেজার উঠে দাঁড়াল। বুঝল গুহার মুখটাই ছোটো। ভেতরটা অনেক বড়ো।

নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে ফ্লেজার পাথুরে দেয়ালে হাত বুলোতে বুলোতে এগিয়ে চলল। হঠাৎ সামনে মনে হল নিরেট পাথর। ফ্লেজার হাত বাড়িয়ে দেখল এবড়ো খেবড়ো পাথরের দেয়াল যেন। ফ্লেজার বুঝল গুহাটা এখানেই শেষ।

ফ্লেজার ফিরে চলল। হামা দিয়ে গুহামুখ থেকে বের হল। তখন ও বেশ হাঁপাচ্ছে। হ্যারি এগিয়ে এলো। বলল–কী দেখলে?

–কিছুই না–একটা লম্বা বড়ো গুহা। মুখটা ছোটো হলে কি হবে ভেতরটা বেশ বড়ো। অনায়াসে হেঁটে এগোনো যায়। কিছুদূর গিয়ে গুহাপথ শেষ। সামনে নিরেট পাথুরে দেয়াল। ফ্লেজার বলল।

 দু’জনে বন্ধুদের কাছে ফিরে এসে বসল। বন্ধুরা জানতে চাইল হ্যারিরা কোথায় গিয়েছিল। হ্যারি টিলার কথা গুহার কথা বলল।

ওদিকে শাঙ্কো বিস্কো আর পেড্রো বড়ো রাস্তা ধরে ঘোড়ায় চড়ে চলল। কতকটা আন্দাজেই সেভিল্লানগরের দিকে চলল।

পাশে তিনটে গ্রাম পেল। বাড়িঘর ঘোর অন্ধকার। এসব গ্রামে একসঙ্গে অত খাবারদাবার পাওয়া যাবে না।

একসময় সেভিল্লানগরে এসে ওরা পৌঁছাল। নগরের নির্জন পথে পথে কোথাও কোথাও মশাল জ্বলছে। বাড়িঘরদোরে আলোর চিহ্নও নেই। সবাই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। শাঙ্কো একটা সরাইখানা খুঁজছিল। ওদের কপাল ভালো। একটা সরাইখানা পেল। সরাইখানার মধ্যে মোমবাতির আলো জ্বলছে।

ওরা সরাইখানার বন্ধ দরজার সামনে এসে ঘোড়া থেকে নামল। কাঠের দরজায় গিয়ে ধাক্কা দিল। দরজা খুলে গেল। মোমবাতির আলোয় দেখা গেল পাকা ও দাড়িগোঁফওয়ালা এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক এসে দাঁড়াল। শাঙ্কো এগিয়ে গেল। বলল দেখুন–আমরা খুব দূর থেকে আসছি। আমাদের বন্ধুরা সেভিল্লার বাইরে অপেক্ষা করছে। আমরা ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত পরিশ্রান্ত। আমাদের জন্যে কিছু খাবারের ব্যবস্থা করতে পারেন?

–নিশ্চয়ই পিরবো। আপনারা ভেতরে আসুন। প্রৌঢ় বলল। শাঙ্কোরা সরাইখানার মধ্যে ঢুকল। দেখল কয়েকজন লোক একতাল ময়দা ঠাসছে। রুটি হবে। এবার প্রৌঢ় বলল–আপনারা সংখ্যায় ক’জন?

ছাব্বিশ জন। বিস্কো বলল।

–ঠিক আছে। এই ময়দা দিয়ে কালকে সকালের জন্যে রুটি তৈরি হবে। এখন আমরা দোকানের সেই খাবার করবো না। আপনাদের জন্যে রুটি করে দেব। লোকটি বলল।

–রুটির সঙ্গে মাংস করে দিতে পারেন? বিস্কো বলল।

-মাংস রাঁধতে দেরি হবে। আপনারা ক্ষুধার্ত। বেশি দেরি করা চলবে না। আলু আর আনাজপত্র দিয়ে একটা খাবার করে দিচ্ছি। এটা খুব তাড়াতাড়ি হবে।

–ঠিক আছে। শাঙ্কো বলল। তারপর তিনজনে টানা কাঠের বেঞ্চে বসল।

প্রথমে রাঁধুনিরা রুটি তৈরি করল। একটা বুনো লতা দিয়ে তৈরি বেশ বড়ো ঝুড়িতে রুটি রাখল। এবার আলু আনাজপত্র দিয়ে তরকারিমতো করল। শাঙ্কো এগিয়ে এলো। বলল তরকারির ঝোলটা কমাও। ঘোড়ার পিঠে করে নিয়ে যেতে হবে। চলুকে না পড়ে।

রাঁধুনিরা কিছুক্ষণ তরকারিটা ফুটিয়ে ঝোল কমিয়ে আনল।

এবার শাঙ্কো প্রৌঢ় দোকানির কাছে এলো। কোমরের ফেট্টি থেকে একটা স্বর্ণমুদ্রা বের করে প্রৌঢ় দোকানদারকে দিল। বলল–এবার আমাদের এক পীপে জল দিন। প্রৌঢ় রাঁধুনিকে বলল–এক পীপে জলের ব্যবস্থা কবো। একজন রাঁধুনি চলে গেল।

শাঙ্কো প্রৌঢ়কে বলল–ঐ রুটির ঝুড়ি তরকারি রাখার কাঠের পাত্র আর জলের পীপে–সব আমরা নিয়ে যাবো। ফেরৎ দিতে পারবো কিনা–বলতে পারছি না। তবে স্বর্ণমুদ্রা দিলাম। এতেই আপনার সবকিছুর দাম উঠে যাবে। প্রৌঢ় খুশির হাসি হাসল।

এবার রাঁধুনি জলভরা পীপে নিয়ে এলো। শাঙ্কোরা দোকানের বাইরে এলো।

ওরা একটা ঘোড়ার পিঠে রুটির ঝুড়িটা রাখল। বিস্কো ঘোড়াটার পিঠে উঠে রুটির ঝুড়িটা ধরল। পেড্রো নিল জলের পীপেটা। ঘোড়ার পিঠে উঠে পীপেটা বাঁ হাতে চেপে ধরে ডানহাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে রইল। শাঙ্কো অন্য ঘোড়াটায় উঠল। রাঁধুনিকে ডাকল। রাঁধুনিদের একজন এলো। শাঙ্কো বলল-তরকারির কাঠের পাত্রটা তুলি দিতে। রাঁধুনি পাত্রটা শাঙ্কোর হাতে তুলে দিল।

তিনজনে খাবার আর জল নিয়ে অন্ধকারে সদর রাস্তা দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে চলল।

কিছুক্ষণ চলার পর পেড্রো বলল–এভাবে চললে তো পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

–উপায় নেই। এর চেয়ে জোরে ঘোড়া ছোটালে সব ধাক্কা খেয়ে খেয়ে মাটিতে পড়ে যাবে। শাঙ্কো বলল।

–ঠিক আছে আস্তে আস্তেই চলা যাক। বিস্কো বলল।

ওরা ঘোড়ার গতি বাড়াল না। ঘোড়া চলল টুক টুক করে।

সেভিল্লা নগর শেষ হল। তখনই আকাশে চাঁদ দেখা গেল। জোছনা অনুজ্জ্বল। সামনেই টানা রাস্তা চলে গেছে। সবকিছুই অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

ওরা রাস্তা ধরে ঘোড়া চালাল। কিন্তু গতি বাড়াল ।

একটু দেরিই হল। শাঙ্কোরা সেই জঙ্গলের কাছে পৌঁছাল। ঘোড়া থেকে নামল। খাবার আর জলের পীপে নিয়ে ওরা বনে ডুল। খুব ঘন বন নয়। এখানে ওখানে অস্পষ্ট জোছনা পড়েছে।

হঠাৎ শাঙ্কো দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল–নিঃশব্দে এগোলে বন্ধুরা আমাদের শত্রু ভাবতে পারে। কাজেই হ্যারির নাম ধরে ডেকে ডেকে এগোতে হবে।

তিনজন আবার চলল। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে ডাকল–হ্যারি–হ্যারি। বিস্কোও ডাকল–হ্যারি। ডাকতে ডাকতে একটু পরেই হ্যারির ডাক শুনল-শাঙ্কো–তোমরা এদিকে এসো।

হ্যারির ডাক শুনে অন্ধকারে দিক আন্দাজ করে শাঙ্কোরা হ্যারিদের কাছে এলো। শাঙ্কো বলল–আগে সবাইকে জল খেতে দাও। জলের পীপেটা মাটিতে নামিয়ে কাঠের গ্লাসগুলো বিস্কো নিল। পীপের ছিপি খুলে গ্লাস গ্লাস জল সবাইকে দিতে লাগল। তৃষ্ণার্ত ভাইকিং বন্ধুরা জল খেয়ে যেন নতুন জীবন পেল। শাঙ্কো চেঁচিয়ে বলল–সবাই শুকনো পাতা নিয়ে এসো। পাতাগুলো একত্র করে থালার মতো বানাও। তারপর রুটি তরকারি নিয়ে খাও। সবাই জঙ্গলের এদিক-ওদিক গিয়ে শুকনো বড়োপাতা কুড়িয়ে আনল। লাইন দিয়ে বসল। হ্যারি বলল–শাঙ্কো তোমরাও খেতে বসো। আমি আর ফ্লেজার। তোমাদের খেতে দিচ্ছি। তোমরা এখন ক্লান্ত।

হ্যারি আর ফ্লেজার সবাইকে রুটি তরকারি দিতে লাগল। মারিয়া কিন্তু খেতে বসল না ক্ষুধার্ত ভাইকিং বন্ধুরা খেতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সকলের খাওয়া হয়ে গেল। রুটি তরকারি জল খেয়ে ভাইকিং বন্ধুরা তৃপ্ত হল। গায়ে নতুন শক্তি পেল যেন। এবার মারিয়া এগিয়ে এলো। বলল হ্যারি খেতে বসো। হ্যারি আর ফ্লেজার খেতে বসল। মারিয়া ওদের খাবার এগিয়ে দিল। দু’জন খেতে লাগল। দু’জনের খাওয়া হতে মারিয়া খেতে বসল।

খাবার ও জল খেয়ে পরিতৃপ্ত ভাইকিংরা ঘাসে ঢাকা মাটিতে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। শুধু হ্যারি জেগে রইল। ওর মন বলতে লাগল এখনও বিপদ কাটেনি। একজন সৈন্য পালিয়েছে। ও সেভিল্লা গিয়ে নিশ্চয়ই সেনাপতিকে সব কথা বলবে। সেনাপতি অনেক সৈন্য নিয়ে এই বনের ধারে চলে আসবে। দেখবে– দলপতি মারা গেছে আর দু’জন সৈন্য আহত হয়ে পড়ে আছে। সেনাপতি সবই বুঝবে। বনে ঢুকে ওদের তল্লাস করবে। ওদের পেলে সেনাপতি কোনো কথা শুনবে না। সঙ্গে সঙ্গে বন্দি করবে।

এসব ভাবতে ভাবতে হ্যারির একটু তন্দ্রা এসেছিল। তখনই বনের দক্ষিণ দিকে অনেক ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ পেল। জেগে থাকা হ্যারি চমকে উঠল। ডাকল–শাঙ্কো– বিস্কো। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। চাঁদের আলোয় দেখল সবাই ঘুমিয়ে আছে।

শাঙ্কো বলল–আক্রমণ হবেই। ঘুম ভেঙে শাঙ্কো বিস্কো হ্যারির কাছে এলো। শাঙ্কো বলল–হ্যারি–আমি দক্ষিণদিকে যাচ্ছি। বনের আড়াল থেকে দেখে আসি– ঘোড়ায় চড়ে কারা আসছে।

-যাও–তবে খুব সাবধানে। হ্যারি বলল।

 শাঙ্কো চলে গেল। হ্যারিদের কথাবার্তার শব্দে অনেকেরই ঘুম ভেঙে গেল। মারিয়া উঠে হ্যারির কাছে গেল। বলল–কী ব্যাপার হ্যারি?

কিছু অশ্বারোহী সৈন্য আসছে। এরা কারা জানি না। শাঙ্কো দেখতে গেছে। তবে আমার মনে হয় যে সৈন্যটি পালিয়ে গিয়েছিল সেই বোধহয় রাজার সেনাপতিকে সংবাদ দিয়েছে–আমরা লড়াইয়ে জিতেছি ওরা হেরে গেছে। আমাদের খোঁজে নিশ্চয়ই একদল অশ্বারোহী সৈন্য এসেছে।

–এখন কী করবে? মারিয়া বলল।

–দেখতে হবে–আমরা বনে আশ্রয় নিয়েছি এটা ওরা বুঝতে পেরেছে কিনা। হ্যারি বলল।

–যদি বুঝতে পারি? মারিয়া বলল।

–তাহলে আমরা টিলাটার মধ্যে যে গুহাটা আছে সেই গুহায় আশ্রয় নেব। গুহার মুখটা ছোটো। প্রায় হামা দিয়ে ঢুকতে হবে। তারপরে বেশ বড়ো। দাঁড়িয়ে থাকা যায়। হ্যারি বলল।

–তাহলে সেই গুহাতেই চলো। মারিয়া বলল।

–আগে শাঙ্কো ফিরে আসুক। ওর কাছে সবকিছু শুনি। তারপর গুহায় আশ্রয় নেবার কথা ভাববো। হ্যারি বলল।

ওদিকে গাছের আড়ালে আড়ালে চলে শাঙ্কো বনের দক্ষিণ দিকটায় এলো। ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ ঐ দিকেই শোনা যাচ্ছিল।

শাঙ্কো বনের গাছের আড়ালে দাঁড়াল। গাছের ফাঁকি লুকিয়ে দেখল কাছেই প্রায় পঞ্চাশ-ষাটজন ঘোড় সওয়ার সৈন্য ঘোড়া থেকে নামল।

অন্ধকারে কেটে যাচ্ছে। আকাশ সাদাটে হয়ে গেল। বনের গাছগাছালিতে পাখির ডাক শুরু হল।

কিছু পরেই সূর্য উঠল। ঘাসে-ঢাকা প্রান্তরে বনে স্নিগ্ধ রোদ ছড়াল।

তখনও শাঙ্কো ঠিক বুঝতে পারছে না এই সৈন্যরা কারা? এরা এখানে এসেছে। কেন? এদের পরনে ঢোলা হাতা জামা। বুকে বর্ম মাথায় শিরস্ত্রাণ নেই। কোমরের মোটা চামড়ার কোমরবন্ধনী। তাতে তলোয়ার ঝুলছে।

তখনই ঘোড়ায় টানা একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। একজন সৈন্য ঘোড়ার গাড়িটা চালাচ্ছে। সৈন্যরা ধরাধরি করে দলপতির মৃতদেহ আর আহত দুই সৈন্যকে গাড়িতে তুলল। গাড়ি চলে গেল।

এইবার শাঙ্কো বুঝতে পারল সেই পলাতক সৈন্যটিই খবর দিয়েছে। তাই রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা শাঙ্কোদের খোঁজে এসেছে। একজন মোটা গোঁফওয়ালা লোক হাত নেড়ে নেড়ে নির্দেশ দিচ্ছিল। বোঝা গেল এই লোকটাই সেনাপতি।

শাঙ্কো আর দাঁড়াল না। বন্ধুদের খবর দিতে হয়।

শাঙ্কো বনের মধ্যে দিয়ে ছুটল।হ্যারিদের কাছে এসে বলল রাজা ফার্নান্দোর সেনাপতি এসেছে। দলপতি আর আহত দুই সৈন্যকে নিয়ে গেছে। যে ঘোড়া তিনটে আমরা পেয়েছিলাম বনের ধারেই ঐ ঘোড়া তিনটে বেঁধে রেখে এসেছিলাম। এতক্ষণে ওরা নিশ্চয়ই ঘোড়া তিনটে পেয়েছে। বুঝেছে আমরা বেশিদূর যেতে পারি নি। এই বনে আমরা আশ্রয় নিয়েছি এই সন্দেহ ওদের হবেই। কাজেই দেরি না করে এই বন ছেড়ে পালাতে হবে। শাঙ্কো থামল।

-কিন্তু কোণ দিক দিয়ে পালাবো? হ্যারি বলল।

–ওরা রয়েছে বনের দক্ষিণ দিকে। আমরা উত্তর দিক দিয়ে পালাবো। এক্ষুণি। পালাতে হবে। শাঙ্কো বলল।

সবাই উঠেদাঁড়াল। সবার সামনেশাঙ্কো।ওই নিয়ে চলল ভাইকিং বন্ধুদের। মারিয়ার। সঙ্গে হ্যারি চলছিল। দ্রুতই ছুটল সবাই। সাবধানে ছুটতে হচ্ছে গাছগাছালির মধ্য দিয়ে।

উত্তরের দিকের বনভূমি শেষ হল। শাঙ্কো ইঙ্গিতে সবাইকে থামতে বলল। একটা গাছের আড়াল থেকে দেখল দশ-বারোজন অশ্বারোহী সৈন্য উত্তরদিকটা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।

শাঙ্কো চিন্তায় পড়ে গেল। উত্তর দিকটায় পাহারা রাখা হয়েছে যখন তখন পুব পশ্চিমেও পাহারা রাখা হয়েছে। পালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। শাঙ্কো হ্যারির কাছে এলো। বলল–্যারি–আমরা খুবই বিপদে পড়লাম। কোনো দিক দিয়েই আর পালাতে পারবো না। বনটা ঘিরে সৈন্যরা দাঁড়িয়ে আছে।

–এই বনের প্রায় মাঝামাঝি একটা টিলা। টিলার মধ্যে একটা গুহা আছে। সেখানে আমরা আশ্রয় নিতে পারি। এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। হ্যারি বলল।

–তাহলে সবাই সেই গুহায় চলো। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল।

সবাই ফিরে চলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই টিলাটার কাছে এলো। পেড্রো জলের পীপেটা কাঁধে নিয়ে আসছিল। এবার পীপে মাটিতে নামিয়ে কাঠের গ্লাসে সবাইকে জল খাওয়াল।

তারপর শাঙ্কো এগিয়ে এলো। একজন একজন করে হামাগুড়ি দিয়ে গুহাটার মধ্যে ঢুকতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সকলে গুহার মধ্যে ঢুকে গেল। হ্যারি মারিয়ার পেছনে পেছনে ঢুকল। গুহার মুখের কাছেই মারিয়াকে বসাল। নিজেও বসল। শাঙ্কো গুহার মুখেই দাঁড়িয়ে রইল।

সময় বয়ে চলল। শাঙ্কোরা শুধু পাখির ডাক কিচিরমিচির শুনতে পাচ্ছিল।

বেলা বাড়তে লাগল। গুহার মধ্যে আশ্রয় নেওয়া ভাইকিংরা গুহার পাথুরে এবড়ো খেবড়ো দেয়ালে পিঠ রেখে বসে আছে। বাইরে কী হচ্ছে ওরা জানে না! সবাই চুপচাপ বসে আছে।

গুহার গরমে সবাই কমবেশি ঘামছে। কপালের ঘাম নেমে আসছে চোখ পর্যন্ত। ঘাম মুছছে আর অপেক্ষা করছে কখন এই দমবন্ধকরা গুহার বাইরে যাবে।

গুহার মুখে শাঙ্কো সতর্কভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে। কান পেতে শব্দ শুনছে। শাঙ্কো ধরইে নিয়েছিল রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা বনের মধ্যে তল্লাশি চালাবে। কিন্তু তেমন কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না।

হঠাই শাঙ্কোর কানে এলো চড়চডু শব্দ। শব্দটা অস্পষ্ট। শাঙ্কো গুহার মধ্যে মুখ বাড়িয়ে ডাকল–হ্যারি–একবার এখানে এসো তো।

হ্যারি অন্ধকারে আস্তে আস্তে গুহার মুখে এসে দাঁড়াল। শাঙ্কো বলল–কান পেতে শোনতো কীসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। হ্যারি কান পাতল। তারপর চমকে উঠে বলল– শাঙ্কো–আমরা ভীষণ বিপদে পড়লাম।

–কী হয়েছে? কীসের শব্দ? শাঙ্কো বলল। হ্যারি ভীতস্বরে বলল–সৈন্যরা বনে আগুন লাগিয়েছে। কাঁচা পাতা পুড়ছে। চড় বড় শব্দ হচ্ছে।

–সর্বনাশ। শাঙ্কো বলে উঠল। তারপর হ্যারিকে বলল কী করবে এখন?

–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তুমি বনের পশ্চিম দিকে যাও আর বিস্কো থাক পুবদিকে। দেখে এসো ঐ দুই দিকেও আগুন লাগিয়েছে কিন না।

শাঙ্কো আর বিস্কো এক মুহূর্ত দেরি করল না। ছুটে বেরিয়ে গেল।

 মারিয়া এগিয়ে এলো। বলল–হ্যারি কী হয়েছে?

–ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে শব্দটব্দ শুনে মনে হচ্ছে সৈন্যরা বনে আগুন লাগিয়েছে। আমাদের পুড়িয়ে মারবে। হ্যারি বলল।

–কী সাংঘাতিক! এখন কী করবে? মারিয়া বলল।

–পালাবার পথ খুঁজতে হবে। শাঙ্কো আরবিস্কো গেছে খোঁজখবর করতে। হ্যারি বলল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শাঙ্কো আর বিস্কো ফিরে এলো। বলল–পুব পশ্চিম দুদিকেই আগুন লাগানো হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা আগুনের বেড়াজালে পড়ে যাবো। মৃত্যু সুনিশ্চিত।

হ্যারি মুখ নিচু করে ভাবল কিছুক্ষণ। তারপর গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব– আমরা সাংঘাতিক বিপদে পড়েছি। জানি না কী করে এই বিপদ থেকে বাঁচবো। রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা এই বনের চারধারে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। চারদিক থেকে আগুন এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। এমন একটি অবস্থায় আমরা যে ছুটে পালাবো তারও কোনো উপায় নেই। এবার তোমরা কী করতে চাও বলো। হ্যারি বলল।

–আমরা আগুনের মধ্যে দিয়ে পালাতে পারি। একজন ভাইকিং বলল।

–অসম্ভব। হ্যারি বলল। শাঙ্কো বলল–হ্যারি–আমরা এই গুহায় লুকিয়ে থাকতে পারি। আগুন নিভে গেলে পালাবো।

শাঙ্কো ঠিক বলেছে। বিস্কো বলল।

হ্যারি বলল-আমিও এই উপায়ই ভেবেছি। এ ছাড়া অন্য কোনোভাবে আমরা বাঁচতে পারবো না।

–কিন্তু এই গুহার চারপাশে যখন আগুন এগিয়ে আসবে তখন অসহ্য গরমে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়বো। বিস্কো বলল।

-হ্যাঁ। এদিকটাও আমি ভেবেছি। আর একটা কথাও ভাবতে হবে। চারপাশের আগুন একই সময়ে এই গুহাটার বাইরে আসবে না। আগুন আসবে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। কাজেই আমাদের আগুনের উত্তাপ সহ্য করতে হবে দফায় দফায়। সেটা আমরা পারবো। হ্যারি বলল।

হ্যারি–একটা কথা ভেবেছো? শাঙ্কো বলল।

কী কথা? হ্যারি বলল।

লক্ষ্য করে দেখো-এই টিলাটার গায়ে কোনো গাছগাছালি নেই। গাছগাছালি লতাপাতা ঝোঁপ রয়েছে প্রায় পঁচিশ তিরিশ হাত দূরে। অতদূরের আগুন আমাদের খুব ক্ষতি করতে পারবে না। শাঙ্কো বলল।

হ্যারি বলল–তবু আগুনের হলকা এই টিলার গায়ে এসে লাগবেই। প্রচণ্ড উত্তাপ আমাদের সহ্য করতে হবে। হরি বলল। কেউ কোনো কথা বলল না।

বিপদের গুরুত্ব বুঝে সবাই চুপ করে রইল। হ্যারি বলল–আগুনের হল্কা সহ্য করতে হবে দফায় দফায়। কী পারবে সহ্য করতে? ভাইকিং বন্ধুরা আস্তে ধ্বনি তুলল– ও-হো-হো। হ্যারি বলল–আজ আমাদের সহ্যশক্তির পরীক্ষা। আগুন নিভে গেলেই আমরা গুহা থেকে বেরিয়ে আসবো। ফার্নান্দোর সৈন্যরা ধরেই নেবে আমরা আগুনে পুড়ে মরেছি। আগুনের মধ্যে ওরা আর আসবে না দেখতে আমরা বেঁচে আছিনা মরে গেছি। রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা চলে গেলেই আমরা মুক্ত।

তাহলে উপায় নেই–আমাদের ক্ষুধা তৃষ্ণা আগুনের হল্কা সবই সহ্য করতে হবে। একজন ভাইকিং বলল।

–হ্যাঁ-হ্যারি বলল। আরো বলল–আগুন শুকনো গাছপালা লতা ঝোঁপ পাবে। না। কাঁচা গাছপালা লতা ঝোঁপের আগুন খুব ভয়ঙ্কর হয় না। এটাও মেরির আশীর্বাদ। সবাই মনস্থির করে প্রচণ্ড উত্তাপ সহ্য করার জন্যে তৈরি হও। এই উত্তাপ সহ্য করতে পারলেই আমাদের মুক্তি।

সবাই চুপ করে বসে রইল।

এবার কাঁচা গাছের পাতা পোড়ার চটচট শব্দ শোনা গেল! অনেক স্পষ্ট। সবাই বুঝল–আগুন এই টিলাটার চারপাশে চলে আসছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই একদিকে আগুন ছড়াল। আগুনের হল্কা গুহার মধ্যে ঢুকল। সবাই চুপ করে উত্তাপ সহ্য করতে লাগল। চারপাশে আগুন এগিয়ে এলো গুহাটার দিকে। এবার আগুনের হল্কা প্রচণ্ড বেড়ে গেল। সবাই দ দ করে ঘামতে লাগল। কিন্তু কেউ কোনো শব্দ করল না।

হঠাৎ গুহার অন্ধকারে মারিয়ার গোঙানি শোনা গেল। শাঙ্কো বন্ধুদের ঠেলে ঠেলে সরিয়ে মারিয়ার কাছে এলো। বলল–রাজকুমারী–আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?মারিয়া কথা বলতে পারল না। তারপরে অস্ফুটস্বরে বললজ-অল। শাঙ্কো বিস্কোকে ডাকল। বলল–পীপে থেকে এক গ্লাস জল দাও। বিস্কো অন্ধকারে পীপেটা খুঁজে পেল। একটা কাঠের গ্লাসও। গ্লাসে জল ঢেলে বিস্কো শাঙ্কোর দিকে গ্লাসটা এগিয়ে বলল–নাও। শাঙ্কো জলের গ্লাসটা অন্ধকারে হাতড়ে নিল।মারিয়ার হাতে জলের গ্লাসটা দিয়ে বলল রাজকুমারী জল খান। মারিয়া দুর্বল হাতে গ্লাসটা ধরল। হাতে কোনো সাড় নেই যেন। মারিয়া গ্লাসটা ধরে থাকতে পারল না। হাত কাঁপতে কাঁপতে জলসুন্ধু গ্লাসটা গুহার মেঝেয় পড়ে গেল। মারিয়ার মুখ থেকে আর্তস্বর বেরিয়ে এলো। বিস্কো তাড়াতাড়ি আর এক গ্লাস জল ভরে এগিয়ে ধরল। এবার হ্যারি অন্ধকারের মধ্যেই হাত বাড়িয়ে বলল–আমাকে জলের গ্লাসটা দাও। বিস্কো হ্যারির হাতে জল দিল। অন্ধকারে কিছুটা আন্দাজে হ্যারি মারিয়ার কাছে এলো। প্রথমে মারিয়ার মাথাটা ধরে আস্তে আস্তে ওঠাল। মারিয়াকে পাথরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসাল। হ্যারি আস্তে ডাকল–রাজকুমারী? প্রথম ডাকে মারিয়া সাড়া দিল না। হ্যারি আবার ডাকল–রাজকুমারী? এবার বোধহয় মারিয়া হ্যারির ডাক শুনতে পেল। দুর্বল কণ্ঠে বললজ-অ-ল। হ্যারি অন্ধকারেই মারিয়ার মাথাটা ধরল। হ্যারি মাথা থেকে হাত ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে এলো। কপাল ভুরু নাম মুখে এসে আঙ্গুল রাখল। আস্তে বলল-রাজকুমারী, মুখ হাঁ করুন, আমি জল ঢেলে দিচ্ছি। মারিয়া মুখ হাঁ করল। হ্যারি আঙ্গুল দিয়ে মারিয়ার মুখের হাঁ-তে আস্তে আস্তে অল্প করে জল ঢালতে লাগল। মারিয়া জল খেল। আবার পাথরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে গা ছেড়ে দিয়ে বসে রইল।

বাইরে আগুনে হাওয়া হ্যারিদের গুহার মুখে এসে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। হ্যারিরা সকলেই দাঁত চেপে প্রচণ্ড উত্তাপ সহ্য করতে লাগল। আগুনের হল্কা ঢুকতে লাগল গুহার মুখ দিয়ে। মুখ হাত পা যেন ঝসে যেতে লাগল।

হঠাৎ হ্যারি মারিয়ার মৃদুস্বরে ডাক শুনল। মারিয়া কেমন যেন হাঁপাতে হাঁপাতে । থেমে থেমে বলল–হ্যারি–আমি–এই–অসহ্য গরমে শ্বাস নিতে পারছি না। আমার শ্বাসরোধ হয়ে আসছে।

 হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। বলল-বলেন কি। মারিয়া বলল–আমি মরি– ক্ষতি নেই। তোমরা গুহা থেকে বেরিয়ে ধরা দিও না।

হ্যারি একটু গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব, রাজকুমারী সাংঘাতিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাকে এক্ষুণি গুহার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। রাজকুমারীর জীবন বাঁচাতে আমাদের ধরা দিতে হবে।

শাঙ্কো বলল–আমরা তাতে রাজি। এবার রাজকুমারীকে গুহার বাইরে নিয়ে যেতে হবে।

শাঙ্কো অন্ধকারে আন্দাজ করে করে মারিয়ার কাছে এলো। অন্ধকারে মারিয়ার ঘাড়ের নীচে ডান হাত রাখল। বাঁ হাতে হাঁটুর কাছটা ধরল। তারপর রাজকুমারীকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে অন্ধকার গুহার মুখে এলো। তারপর রাজকুমারীকে পাথুরে মেঝেয় আস্তে আস্তে শুইয়ে দিল।

হঠাৎ একঝলক হাওয়া গুহার মুখে ঢুকল। হাওয়ায় সেই প্রচণ্ড উত্তাপটা আর নেই। কিন্তু মারিয়ার হাঁপধরা ভাবটা একেবারে কমল না। শাঙ্কো বলল-রাজকুমারী আপনাকে এবার একা হামাগুড়ি দিয়ে গুহার বাইরে বেরোতে হবে।

মারিয়া আস্তে আস্তে উঠে বসল। মৃদুস্বরে থেমে থেমে বলল–এখন আমার শরীর ভালো লাগছে। তোমরা আমার জন্য ধরা দিও না।

আপনি অসুস্থ হয়েছেন। বাইরে গেলে আপনি ভালোভাবে নিশ্বাস নিতে পারবেন। আপনি সুস্থ হবেন। শাঙ্কো বলল।

আমি বাইরে বেরোলে তোমরা সবাই তো ধরা পড়ে যাবে। আবার সেই বন্দিজীবন। মারিয়া আস্তে আস্তে বলল। তখনও মারিয়ার হাঁপধরা ভাবটা যায় নি।

–আপনি আমাদের জন্য ভাববেন না। ধরা পড়লেও আবার বন্দি হলেও ফ্রান্সিস মুক্ত আছে। ফ্রান্সিস ঠিক একটা উপায় বের করবে যাতে আমরা আবার মুক্তি পাবো।

মারিয়া আর কোনো কথা বলল না। হামাগুড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে গুহার মুখটা পার হল। মারিয়ার পেছনে একে একে সবাই বেরিয়ে এলো। এটুকু পেরোবার পরিশ্রমেও মারিয়া কাহিল হয়ে পড়ল। আগুনের মতো গরম গুহামুখে একটা পাথরে মারিয়া বসে পড়ল। মাথা ঝাঁকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে লাগল। হ্যারি সেটা দেখে বুঝল গুহার ভেতরে থাকলে মারিয়াকে বাঁচানো যেত না। ঠিক সময়েই মারিয়াকে বাইরে আনা গেছে।

বাইরে তখন জঙ্গল পুড়ে সব সাফ। দক্ষিণ দিকে রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা জড়ো হয়ে এতক্ষণ আগুন দেখছিল। সব জঙ্গল পুড়ে যেতে ফার্নান্দোর সেনাপতি ও সৈন্যরা হ্যারিদের দেখতে পেল। ওরা ধরেই নিয়েছিল জঙ্গলের মধ্যে আত্মগোপন করা ভাইকিংরাও পুড়ে মরেছে। তাই তারা বেশ আশ্চর্য হল। আগুনের এত উত্তাপের মধ্যে গুহার মধ্যে থেকে ওরা কী করে বাঁচল।

হ্যারি দু’হাত ওপরে তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গী দেখাল। রাজা ফার্নান্দোর সেনাপতি দেখল সেটা।

আগুন তখনও একেবারে নিভে যায় নি। এখানে ওখানে-তখনও ধিকি ধিকি আগুন জ্বলছে। সেনাপতি একাট ঘোড়ায় উঠল। পোড়া জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে হ্যারিদের কাছে এলো।

একটু হাঁপধরা গলায় বলল–তোমরা আমাদের দলনেতাকে হত্যা করেছে। কয়েকজনকে আহত করেছে। সেভিল্লায় রাজা ফার্নান্দোর রাজদরবারে তোমাদের বিচার হবে। তোমরা সবাই বন্দি হলে।

হ্যারি বলল–আপনাদের দলপতি আমাদের এক বন্ধুকেবিনা কারণে হত্যা করেছিল। আমরা তার বদলা নিয়েছি। সেনাপতি বলল–সে সবের বিচার হবে।

হ্যারি বলল–তাহলে এখন আমরা কী করবো? ক্ষুধায় তৃষ্ণায় আমরা অবসন্ন। আগে আমাদের ক্ষুধা তৃষ্ণা দূর করুন। তারপর আমাদের নিয়ে যা করবার করবেন।

এখনও আগুন সম্পূর্ণ নেভে নি। আগে আগুন নিভুক। এখনই এই পোড়া বন পার হয়ে তোমরা যেতে পারবে না। সেনাপতি বলল।

–তাহলে তো আমাদের এখন অপেক্ষা করতে হয়। বিস্কো বলল।

-হ্যাঁ–আগুন একেবারে নিভে গেলে তোমরা পোড়া বন পার হতে পারবে। সেনাপতি বলল। তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে পোড়া বন পার হয়ে সৈন্যদের কাছে ফিরে গেল।

হ্যারিরা উত্তপ্ত পাথরে বসে রইল। মারিয়া এখন অনেকটা সুস্থ। ওদের আর পালাবার উপায় রইল না।

সন্ধে হয়ে গেল। অন্ধকার নামল। হ্যারি বলল–এবার চলো–পোড়া জঙ্গল পার হয়ে যাই।

–এখনই? বিস্কো বলল।

—-হ্যারি বলল–এখন অন্ধকার হয়ে এসেছে। পোড়া বনের কোথাও আগুন জ্বলা থাকলে সহজেই আমাদের নজরে পড়বে। এখনই পোড়াবন পেরুতে হবে। চলো।

ভাইকিংরা এখানে-ওখানে বসেছিল। হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–পোড়া বন পার হয়ে চলো। দেখে দেখে সাবধানে।

ভাইকিংরা সবাই উঠে দাঁড়াল। শাঙ্কো হ্যারিকে বলল–এই অন্ধকারে আমরা তো পালিয়ে যেতে পারি।

হ্যারি বলল–বনের চারপাশ ঘিরে রেখেছে সৈন্যরা। আমাদের পালাবার উপায় নেই। তখনই বনের চারপাশে মশাল জ্বলে উঠল। উত্তরমুখো মশালের আলোর দিকে লক্ষ্য রেখে হ্যারিরা এগোতে লাগল। পোড়া ছাই পায়ে পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। উড়ছে।

একসময় হ্যারিরা সেনাপতির সামনে এসে দাঁড়াল। সেনাপতি হুকুম দিল–এদের দু’পাশ থেকে ঘিরে নিয়ে চলো। অশ্বারোহী সৈন্যরা হ্যারিদের দু’পাশে দাঁড়াল। সামনে রইল ঘোড়ার পিঠে সেনাপতি। তারপরেই দু’টো মশাল হাতে দুজন। সবাই রওনা হল।

মশালের যেটুকু আলো তারই সাহায্যে হ্যারিরা চলল। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হতে লাগল মারিয়ার। ঐ প্রচণ্ড উত্তপ্ত গুহায় মারিয়া অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। তারপরে এখন হেঁটে যেতে হচ্ছে। মারিয়ার পাশে পাশেই হ্যারি হাঁটছিল। হ্যারি বুঝল মারিয়ার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।

হ্যারি কিছুটা দূরে ছুটে গিয়ে সেনাপতির সামনে দাঁড়াল। গলা চড়িয়ে বলল– আমার একটা কথা ছিল।

সেনাপতি ঘোড়ার পিঠে বসা থেকে বলল–বলো।

আমাদের সঙ্গে রয়েছে আমাদের দেশের রাজকুমারী।

-হা হা একটি মেয়েকে তোমাদের সঙ্গে দেখলাম। সে তো রোদেপোড়া একেবারে তামাটে গায়ের রং।পরেছেও এক অদ্ভুত পোশাক। সেই মেয়েটিই তোমাদের রাজকুমারী। সেনাপতি হেসে উঠল। এই অপমানজনক কথা শুনে হ্যারির গা পিত্তি জ্বলে গেল। হ্যারির আর কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু উপায় নেই। রাজকুমারী এত কষ্ট সহ্য করতে পারবেন না। তাই মাথা ঠাণ্ডা রেখেই বলল–আপনাদের তো অনেক ঘোড়া। একটা ঘোড়া যদি রাজকুমারীকে নিয়ে যাবার জন্যে দেন তাহলে আমরা খুবই উপকৃত হব।

–বন্দিকে ঘোড়ায় চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় না। সেনাপতি বলল।

–এই নিয়মটা পুরুষ বন্দিদের পক্ষে প্রযোজ্য। কিন্তু খুবই অসুস্থ কোনো নারী বন্দির ক্ষেত্রে এই নিয়ম নেই। হ্যারি বলল।

–ঠিক আছে। সেনাপতি একজন ঘোড়সওয়ার সৈন্যকে নেমে আসতে বলল। সৈন্যটি ঘোড়া থামিয়ে নেমে পড়ল। হ্যারি মারিয়ার কাছে গেল। বলল–রাজকুমারী আপনি একা ঘোড়ায় চড়ে যেতে পারবেন?

–আমি ঘোড়ায় চড়তে জানি। কিন্তু আমার এখন শরীরের যা অবস্থা সাহস পাচ্ছি না। মারিয়া বলল। হ্যারি শাঙ্কোকে ডাকল। বলল–তুমি ঘোড়ায় চড়ে রাজকুমারীকে নিয়ে যাও।

–বেশ। শাঙ্কো এগিয়ে এলো। শাঙ্কো লাফিয়ে ঘোড়াটার পিঠে উঠল। তারপর বলল–হ্যারি তোমরা রাজকুমারীকে তুলে আমার সামনে বসিয়ে দাও। হ্যারি বিস্কোরা কয়েকজন মারিয়াকে তুলে ঘোড়ায় বসিয়ে দিল। শাঙ্কো মারিয়াকে বাঁ হাতে ধরে রেখে ঘোড়া চালতে শুরু করল।

প্রায় ঘণ্টা দুয়েক চলার পর হ্যারিরা সেভিল্লানগরে পৌঁছল। রাস্তার দু’পাশে বাড়িঘর দোর। এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। বাড়িগুলোর জানালা দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে।

হ্যারিদের কয়েদঘরের সামনে নিয়ে আসা হল। কয়েদঘরের পাহারাদার দু’জন এগিয়ে এলো। অন্য পাহারাদারটি ঢং-ঢং শব্দে লোহার দরজা খুলল। ভাইকিংরা সবাই ঢুকল। শাঙ্কো মারিয়াকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে নিয়ে এলো। মারিয়া এলোমেলো পা ফেলে কয়েদঘরের দরজার দিকে চলল। তাই দেখে হ্যারি দ্রুত সেনাপতির কাছে গেল বলল আমাদের রাজকুমারী খুবই অসুস্থ। তাকে যদি রাজার অন্দরমহলে নজরবন্দি রাখা হয় তাহলে খুবই ভালো হয়। কয়েদঘরের ঐ পরিবেশে তিনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়বেন।

–আমার কিছু করার নেই। রাজাজ্ঞায় তোমাদের বন্দি করেছি। এখন কালকে রাজদরবারে রাজা ফার্নান্দো যে আদেশ দেবেন তাই প্রতিপালিত হবে। সেনাপতি বলল।

হ্যারি বন্ধুদের কাছে ফিরে এলো। এক এক করে ভাইকিংরা কয়েদঘরে ঢুকতে লাগল।

কয়েদঘরে জানালা বলে কিছু নেই। সেই উঁচুতে দু’দিকে দুটো বড়ো খোদল। ঐ খোঁদল দুটোই জানালা। কয়েদঘরের পাথুরে দেয়ালের গর্তে দুটো মশাল রাখা হয়েছে। সেই মশালের আলোয় হ্যারি ঘরটা ভালো করে দেখল। পালাবার উপায় নেই।

মেঝেয় শুকনে ঘাস পাতার বিছানা। ভাইকিংরা কেউ কেউ বসল, কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। পাথুরে দেয়ালের গায়ে মারিয়াকে হ্যারি ঠেস দিয়ে বসাল। তারপর চলল জলের খোঁজে। এককোণায় দেখল বেশ বড় একটা পীপে। হ্যারি পীপের ঢাকনা খুলে দেখল জল ভরা। ও বন্ধুদের ডেকে বলল–এখানে যথেষ্ট জল আছে। তোমরা জল খাও।

হ্যারির কথা শুনে ভাইকিংরা উঠে দাঁড়াল। সবাই জল খেতে এলো। বেশ ভিড় হয়ে গেল। পীপের পাশে রাখা কাঠের গ্লাস দিয়ে জল তুলে সবাই খেতে লাগল। কয়েকজন জল খেল আর জল তুলে ঘাড়ে মাথায় ঢালল। তৃষ্ণার জল পেয়ে সবাই বাঁচল যেন।

ভিড় কমলে হ্যারি পীপেটার কাছে গেল। কাঠের গ্লাসে জল ভরে নিয়ে এলো মারিয়ার কাছে। মারিয়া ঢক ঢক করে জল খেয়ে নিল। আরও জল নিয়ে এলো। মারিয়া খেল। বাকি জলটা মাথায় কপালে ঢালল। মারিয়া এতক্ষণে একটু সুস্থ বোধ করল।

হ্যারি এবার পরপর তিন গ্লাস জল খেল। তারপর চলল দরজার দিকে। লোহার গরাদে মুখ চেপে ডাকল–পাহারাদার–ও পারাহাদার। একজন পাহারাদার এগিয়ে এলো। হ্যারি বলল–আমরা খুবই ক্ষুধার্ত। আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করো। পাহারাদার কোনো কথা না বলে চলে গেল। এ রকম অভব্য ব্যবহার পেয়ে হ্যারির মাথায় রক্ত চড়ে গেল। হ্যারি সহজে রেগে যায় না। এখন ভীষণ রাগ হল ওর। হ্যারি লোহার দরজায় ঝাঁকুনি দিল। ঝন্ ঝন্ শব্দ উঠল। আবার ঝাঁকুনি দিয়ে চলল। বন্ধুরা অবাক। হ্যারির মতো ঠাণ্ডামাথার মানুষ রেগে গেছে। নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। ওরা হ্যারির কাছে এলো। বিস্কো বলল–হ্যারি কী ব্যাপার?

–ঐ একটা পাহারাদারকে ডেকে খেতে দিতে বললাম–লোকটা কোনো কথাই শুনল না। একটাও কথা না বলে চলে গেল। হ্যারি বলল।

দাঁড়াও–দেখাচ্ছি মজা। শাঙ্কো বলল। তারপর সবাইকে ডেকে বলল– ভাইসব–এই লোহার দরজা সবাই মিলে ঝকাও। সবাই দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। একসঙ্গে দরজাটা ধরে কঁকাতে লাগল। প্রচণ্ড শব্দ উঠল। দু’জন পাহারাদারই ছুটে এলো। এক পাহারাদার আবার নাকি সুরে কথা বলে। সে চাঁচাতে লাগল–কী হচ্ছে। চলল দরজা ঝাঁকানো। একজন পাহারাদার এবার লোহার মোটা গরাদের ফাঁক দিয়ে তলোয়ারের খোঁচা দিতে লাগল। দু’জন ভাইকিং ঘায়েল হল। শাঙ্কো চেঁচিয়ে বলল– ভাইসব দরজা থেকে সরে এসো। সবাই দ্রুত পিছিয়ে গেল। দরজায় ধাক্কা বন্ধ হল।

হ্যারি শরীরের দিক থেকে বরাবরই দুর্বল। অতক্ষণ আগুন-ঘেরা গুহায় থাকা পথ হাঁটা এত ধকল হ্যারি সহ্য করতে পারল না। শুকনো ঘাসপাতার বিছানায় হাত পা ছেড়ে শুয়ে পড়ল। ওর মুখ থেকে গোঙানির শব্দ বের হতে লাগল। মারিয়াই প্রথম শুনল সেটা। মারিয়া তাড়াতাড়ি হ্যারির কাছে এলো। বসে পড়ল। হ্যারির মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে মারিয়া ডাকল–শাঙ্কো–এ দিকে এসো। শাঙ্কো কাছে এলো। মারিয়া বলল-হ্যারি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। শিগগির জল নিয়ে এসো। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে জলের জালার কাছে গেল। এক গ্লাস জল নিয়ে ফিরে এলো। গ্লাসটা নিয়ে মারিয়া মুখ নিচু করে বলল–হ্যারি খাবার জল। আস্তে আস্তে ঢালছি। খেয়ে নাও। হ্যারি আস্তে আস্তে মুখ খুলল। মারিয়া অল্প অল্প করে হ্যারির মুখে জল ঢালতে লাগল। হ্যারি জল খেতে লাগল। গ্লাসের জল শেষ হল। শাঙ্কো আবার জল নিয়ে এল। মারিয়া আধ গ্লাস জল খাওয়াল। বাকি জলে হ্যারির কপাল চোখ ধুইয়ে দিল।

একটু পরে হ্যারি চোখ মেলে তাকাল। গোঙানির শব্দ বন্ধ হল। মারিয়া ঝুঁকে পড়ে বলল–হ্যারি এখন কেমন লাগছে?

হ্যারি অল্প হাসল। আস্তে বলল–ভালো লাগছে। মারিয়া ও অন্য বন্ধুরা এতক্ষণে হাসল।

শাঙ্কো বিছানায় উঠে দাঁড়িয়ে বলল–ভাইসব–সারাদিন আমরা কিছু খাই নি। ক্ষুধায় আমাদের শরীর টলছে। রাতের খাবার আমরা এখুনি খাবো। ভাইকিং বন্ধুরা হৈ হৈ করে শাঙ্কোর কথা সমর্থন করল।

এবার শাঙ্কো লোহার দরজার কাছে এলো। দেখল এখন চারজন পাহারাদার পাহারা দিচ্ছে। সেই থুতনিতে দাড়িওয়ালা পাহারাদারটিও আছে। শাঙ্কো তাকেই বলল–ও ভাই–আমাদের খিদে পেয়েছে। খেতে দাও। দাড়িওয়ালা পাহারাদারটি কথাটা কানেই তুলল না। শাঙ্কো আবার বলল। পাহারাদারটি কোনো কথাই বলল না।

ততক্ষণে কয়েকজন ভাইকিং উঠে এসে শাঙ্কোর পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে ছিল নজরদার পেড্রো। পেড্রো বন্ধুদের পেছনে লাগতে ওস্তাদ। পেড্রো দেখল ব্যাপারটা। ও প্রচণ্ড জোরে চেঁচিয়ে বলল–এই ছাগলদাড়ি। চিৎকার শুনে পাহারাদার দু’জন, দাঁড়িয়ে পড়ল। আরো কয়েকজন ভাইকিং দরজার কাছে এলো।

দাড়িওয়ালা পাহারাদারটি তলোয়ার উঁচিয়ে ছুটে এলো। নাকিসুরে বলল–কেঁ? কেঁ বলেছে কথাটা? পেড্রো এগিয়ে এসে নাকিসুরে বলল–আমি–আমি বলেছি কথাটা।

পাহারাদারটি একবার সঙ্গীদের দিকে আর একবার পেড্রোর দিকে তাকাতে লাগল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না।

এবার পেড্রো নাকিসুরে বলল–এই ব্যাটা ছাঁগলদাঁড়ি খেতে দে তাড়াতাড়ি।

এবার ভাইকিংরা কয়েকজন পেড্রোর সঙ্গে গলা মেলাল–এই ব্যাটা ছাগলদাঁড়ি– খেতে পেঁ তাড়াতাড়ি। আস্তে আস্তে সব ভাইকিংরা দরজায় এসে ভিড় করল। সমস্বরে বলতে লাগল–এই বাঁচা ছাগরদাঁড়ি-ঘেঁতে দে তাড়াতাড়ি।

এবারে দাড়িওয়ালা পাহারাদারটি বলল–দাঁড়াও–দেখাচ্ছি মজা। ও সিঁড়ি দিয়ে নেমে ছুটল। ভাইকিংরাও চুপ করল।

কিছু পরে দেখা গেল সেনাপতি আসছে। সঙ্গে সেই পাহারাদার।

ওরা লোহার দরজার সামনে এলো।

সেনাপতি বলল–আমাদের প্রহরীকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করছো কেন?

–খিদের জ্বালায়। শাঙ্কো বলল।

তার মানে? সেনাপতি বলল।

হুয়েনভা থেকে এই সেভিল্লায় হাত বাঁধা অবস্থায় আমাদের হটিয়ে আনা হয়েছে। আমরা তৃষ্ণার্ত ক্ষুধার্ত। এখানে খাবার জল পেয়েছি। কিন্তু এখনও খাবার পাই নি। আপনার প্রহরীকে এই কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ও আমাদের কথা কানেও তুলল না। বিস্কো বলল।

সেনাপতি একটু ভাবল। তারপর বলল–তোমাদের রাতের খাবার এখনই দেওয়া হবে। কোনোরকম গোলমাল পাকালে চাবুক খেতে হবে। মনে থাকে যেন।

সেনাপতি দরজার কাছ থেকে সরে গেল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। দলপতি চলল তার পেছনে পেছনে। ভাইকিংরাও গিয়ে বিছানায় বসল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল।

দাড়িওয়ালা পাহারাদারের জায়গায় অন্য এক পাহারাদারকে দেখা গেল।

সেনাপতির হুকুমেই বোধহয় হ্যারিদের তাড়াতাড়ি খেতে দেওয়া হল। খাবার খেয়ে হ্যারিরা শুয়ে বসে বিশ্রাম করতে লাগল।

ওদিকে ফ্রান্সিস আর বারাকা গাছের আড়াল থেকে হ্যারিদের দেখছিল। হ্যারিরা তখন বনের পাশের ঘাস-ঢাকা প্রান্তরে শুয়ে বসে বিশ্রাম করছিল।

বারাকা বলল–এখন এখানে থেকে কোনো লাভ নেই। তোমার বন্ধুদের এখন মুক্ত করা যাবে না। তাই বলছিলাম চলো আমরা সেভিল্লা নগরে চলে যাই। ওখানে কয়েদঘরের কাছে গিয়ে অপেক্ষা করি। দলপতি নিশ্চয়ই ওদের কয়েদঘরে বন্দি করে রাখবে। ফ্রান্সিসও ভেবে দেখলো এখন কিছুতেই বন্ধুদের মারিয়াকে মুক্ত করা যাবে না। বরং সেভিল্লা নগরে গিয়ে কয়েদঘরের কাছে অপেক্ষা করা ভালো। কয়েদঘরের পাহারাদারদের পাহারা দেওয়ার নিয়ম জানা যাবে হ্যারিদের কীভাবে মুক্ত করা যায় তাও ভেবে ঠিক করা যাবে। ফ্রান্সিস বলল–চল–আমরা আগেই চলে যাই।

ফ্রান্সিস আর বারাকা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে চলল সেভিল্লা নগরের দিকে।

সেভিল্লা নগরে যখন এসে পৌঁছল তখন সন্ধে হয়েছে। সদর রাস্তায় কোথাও কোথাও মশাল জ্বলছে। বাড়িঘরদোরে মোমবাতির আলো।

বারাকা কয়েদঘরের কাছে ফ্রান্সিসকে নিয়ে এলো। কয়েদঘরের দরজায় দুটো মশাল জ্বলছে। দু’জন সশস্ত্র পাহারাদার খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছে।

ফ্রান্সিস কয়েদঘরের সামনে মাঠটায় বসল। বারাকাও ওর পাশে বসল।

সময় বয়ে চলল। কিন্তু হ্যারিদের দেখা নেই।

বারাকা বলল–চলো তোমার বন্ধুদের আসার আগে আমরা কিছু খেয়ে আসি গে। ফ্রান্সিস হেসে মাথা নাড়ল। বলল–বন্ধুরা এখনও উপবাসী। আমি কী করে খাবো? ওরা আসুক–এখানে খাবার খা জলটল খা–তবেই আমি খেতে যাবো।

বারাকা একটু আশ্চর্যই হল। বলল–তোমার বন্ধুদের সঙ্গে তুমিও উপোস করে থাকবে?

–হ্যাঁ–আমি এখন কিছু খাব না। তুমি খেয়ে এসো। ফ্রান্সিস বলল। বারাকা কী ভাবল। বলল–না তোমার বন্ধুরা না খাওয়া পর্যন্ত আমিও কিছু খাবো না।

দু’জনে মাঠটায় বসে রইল।

রাত বাড়তে লাগল। বন্ধুদের দেখা নেই।

একসময়ে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল-বারাকা এখানে বসে থেকে বন্ধুদের খোঁজ পাওয়া যাবে না। আমাদের সেই বনের কাছে যেতে হবে। ঐ বনের ধারেই বন্ধুরা বিশ্রাম করছিল।

–বেশ চলো। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে হুয়েনভা থেকে হেঁটে এখানে এসেছি। আবার হাঁটবে? বারাকা বলল।

–উপায় নেই। বন্ধুরা কোথায় আছে কেমন আছে এটা না জানা পর্যন্ত আমার স্বস্তি নেই। ফ্রান্সিস বলল।

–তুমি বন্ধুদের জন্যে খুব ভাবো তাই না? বারাকা বলল।

বন্ধুরাও আমার জন্যে ভাবে। ফ্রান্সিস বলল। বারাকা উঠে দাঁড়াল। বলল– চলো তাহলে।

দু’জন সদর রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। বেশ রাত হয়েছে। রাস্তাঘাট নির্জন।

একসময় ফ্রান্সিস বলল-বারাকা–তোমার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে। তুমি এখানে খেয়ে নিতে পারো।

না। বারাকা মাথা নেড়ে বলল–তুমি তোমার বন্ধুরা যখন খাবে আমিও তখন খাবো।

নগর ছাড়িয়ে দু’জনে চলল সেই বনভূমির দিকে।

প্রায় ঘণ্টা দেড়েক হাঁটার পর দু’জন সেই বনভূমির কাছে এলো।

 অন্ধকারে যতটা দেখল তাতে বুঝল বন্ধুরা এখানে নেই। তবে ওরা গেল কোথায়?

হঠাৎই গোঙানি শুনল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। গোঙানির শব্দটা যেদিক থেকে আসছিল ফ্রান্সিস অন্ধকারে সেইদিকে চলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিস দেখল অন্ধকারে কে ঘাসের ওপর শুয়ে আছে। ফ্রান্সিস কাছে গেল। এবার অন্ধকারে দেখে ও বুঝল লোকটি রাজা ফার্নান্দোর সৈন্য।

ফ্রান্সিস মাটিতে বসল। সৈন্যটিকে জিজ্ঞেস করল–কী ব্যাপার ভাই? তুমি আহত হয়েছ। এখানে কি লড়াই হয়েছে? সৈন্যটি জিজ্ঞেস করল–তুমি কে?

–আমি ভাইকিং। আমার বন্ধুদেরই তোমরা বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছিলে। তারা কোথায়? তাদের কী হয়েছে? তোমরা কি আমার নিরস্ত্র বন্ধুদের মেরে ফেলেছো? সৈন্যটি মাথা নেড়ে বলল-না। তোমার বন্ধুরাই দলপতিকে হত্যা করে আমাদের আহত করে গেছে। শুধু একজন সৈন্যই পালিয়ে যেতে পেরেছিল।

–আমার বন্ধুরা কোথায়?

সৈন্যটি বলল–তা জানি না। অন্ধকারে কিছুই চোখে পড়েনি।

–ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–তাহলে তোমাদের মধ্যে যে সৈন্যটি পালাতে পেরেছিল সে নিশ্চয়ই সেনাপতিকে এই সংবাদ দেবে। সেনাপতিও সৈন্য নিয়ে আমাদের বন্ধুদের খুঁজতে আসবে।

–আর এসে কী হবে? সবাই পালিয়ে গেছে। সৈন্যটি বলল।

—-কোনদিকে পালালো?

কাঁধে তলোয়ারের ঘা লেগেছে। এই অবস্থায় আমি আমার কথাই ভাবছি কতক্ষণে ওষুধ পড়বে–আমি অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবো। আর কারো কথা ভাবি নি। সৈন্যটি বলল।

ফ্রান্সিস বলল-বারাকা–বন্ধুরা নিশ্চয়ই হুয়েনভা বন্দরে আমাদের জাহাজে চলে গেছে। আমার ফেরার জন্যে ওরা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে। চলো আমাদের হুয়েনভা বন্দরে যেতে হবে।

–বেশ–চলো। আবার সেই হেঁটে। আমি তো তবু কিছু খেয়েছি পেটপুরে, জলও খেয়েছি। তুমি তো নির্জলা উপোসী। পারবে হেঁটে যেতে। বারাকা বলল।

নিশ্চয়ই পারবো। পারতেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।

–তুমি বন্ধুদের খুব ভালোবাসো–তাই না? বারাকা বলল।

–হ্যাঁ–প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। ওরাও আমাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। ফ্রান্সিস বলল।

এবার দু’জনে চলল হুয়েভা বন্দরের দিকে। যখন ওরা হুয়েভা বন্দরে পৌঁছল তখন ভোর হল। ফ্রান্সিসের চোখে রোদ পড়তে চোখ দুটো জ্বালা করে উঠল। রোদ ছড়াল চারদিকে।

ফ্রান্সিস বেশছুটেই ওদের জাহাজের কাছে এলো। ও হাঁপাচ্ছে তখন। জাহাজ জনশূন্য। কেউ কোথাও নেই। তার মানে বন্ধুরা জাহাজে ফেরে নি। তবে কোথায় গেল ওরা?

জাহাজের মাস্তুলের আড়াল থেকে কে যেন মুখ বাড়াল। তাহলে একজন তো আছে। বন্ধুটি মাস্তুলের আড়াল থেকে আবার মুখ বের করল। আরে! এ তো ভেন।

ফ্রান্সিস বারাকাকে ডাকল–চলোজাহাজে উঠবো। দু’জনে পাতা কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে জাহাজে উঠল।

 ভেন মাস্তুলের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিস ভেনকে জড়িয়ে ধরলো। বলল–ভেন–তোমার খোঁজ রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা পায় নি।

–আমি আটা ময়দার বস্তার পেছনে লুকিয়েছিলাম। আমাকে তাই ধরতে পারে নি। ভেন হেসে বলল। ওরা ডেক-এ বসল।

এবার ফ্রান্সিস ভেনকে সব ঘটনা বলল। শেষে বলল–এখনও বন্ধুদের কোনো খোঁজ পেলাম না। এবার সেই বনের ধারে যেতে হবে। বনেও ঢুকতে হবে। হয়তো হ্যারিরা বনে আশ্রয় নিয়েছে।

–ঠিক আছে। তাই যাও। তার আগে উপোস তুমি কিছু খেয়ে যাও। ভেন বলল।

–অসম্ভব। বন্ধুরা মারিয়া কেউ খায় নি এখনও। ফ্রান্সিস বলল।

–ফ্রান্সিস–আমি একজন চিকিৎসক। আমি বলছি–এই উপোসে থাকা আর এইসব দুশ্চিন্তা তোমার দেহের ক্ষতিই করবে। তুমি এতে অসুস্থ হয়ে পড়বে। তুমি অসুস্থ হলে আমরা দিশেহারা হয়ে যাবো। একটু থেমে ভেন বলল–ফ্রান্সিসকথা শোনো। তোমাকে সুস্থ থাকতেই হবে। খেতে এসো। আমার খাবার তৈরিই আছে। তোমরা খাবে এসো।

তিনজনেই খাবার ঘরে এলো। ভেন দু’জনকে কাঠের থালা গ্লাস দিল। খাবার দিল। জল দিল। ফ্রান্সিস পরপর তিন গ্লাস জল খেল।

ফ্রান্সিস হেসে বলল–ভেন–এতক্ষণে আমি বুঝতে পারছি আমি কতখানি তৃষ্ণার্ত আর ক্ষুধার্ত। ভেন বলল–ফ্রান্সিস–আমরা সবাই তোমার নির্দেশেই চলি। সেই তোমাকে এখন সুস্থ সবল থাকতে হবে।নাও খেতে শুরু করো। মোটা রুটি আর মাংসের ঝোল। ফ্রান্সিস হাপুস হাপুস্ খেতে লাগল। বারাকাও সমান আগ্রহে খেতে লাগল।

খাওয়া শেষ হল। ফ্রান্সিস বলল–তোমার খাবার আমাদের দিলে।

–তাতে কি? আমি বেঁধে নেব। ভেন বলল–তোমাকে এই বিপদের সময় সুস্থ থাকতে হবে সবল থাকতে হবে।

তিনজনে জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। তারপর পাতা পাটাতনের ওপর দিয়ে হেঁটে তীরে উঠল।

এবার দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে চলল সেভিল্লার দিকে। একসময় বারাকা বলল তোমার বন্ধুরা কোথায় আছে বলে তোমার ধারণা।

–ঐ বনে। ওরা দলপতির সৈন্যদের লড়াইয়ে হারিয়ে ঐ বনেই আত্মগোপন করে আছে। এটা আমি আগে ভাবিনি। এখন ভাবছি। ফ্রান্সিস বলল।

–তোমার কী মনে হয়? তোমার বন্ধুরা ঐ বনে লুকিয়ে আছে এই সংবাদটা কি সেনাপতি পেয়েছে? বারাকা বলল।

নিশ্চয়ই পেয়েছে আর এতক্ষণে সেই বনভূমিতে তল্লাশি শুরু করেছে। বন্ধুরা ধরা পড়বেই। আমি ধরে নিয়েছিলাম ওরা লড়াইয়ে জিতেই জাহাজে ফিরে আসবে। কিন্তু ওরা তা করে নি। ফ্রান্সিস বলল।

–এটা তো বোকামির কাজ হল। বারাকা বলল।

ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল-বারাকা–আমরা পরস্পরকে ভাইয়ের মতো ভালোবাসি। আমাকে না নিয়ে ওরা জাহাজে ফিরবেই না।

–তোমাদের মধ্যে এত বন্ধুপ্রীতি? বারাকা বলল। ফ্রান্সিস হাসল।

দু’জনে রাস্তার এমন একটা জায়গায় এলো যেখান থেকে ঐ বনটা দেখা যায়। সেখানে এসে দু’জনে দেখল বনের মাথায় ধোঁয়ার কুণ্ডুলি। তার মানে বনে আগুন লাগানো হয়েছে। ফ্রান্সিস অস্ফুটস্বরে বলল–কি মর্মান্তিক। তারপর দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে বলল-বারাকা তাড়াতাড়ি এসো। বারাকা গতি বাড়াল। ও ভেবে আশ্চর্য হল–সেই কাল রাত থেকে ওরা হাঁটতে শুরু করেছে। এখনও হাঁটছে। অথচ ফ্রান্সিসের এখনও কোনো ক্লান্তি নেই কোনো কষ্ট নেই। সটান হেঁটে চলেছে। শুধু ওর জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে।

দু’জনে দূর থেকে দেখল সেই জ্বলন্ত বনটা ঘিরে রাজা ফার্নান্দোর সৈন্যরা দাঁড়িয়ে আছে। কিছু অশ্বারোহী সৈন্যও রয়েছে। সেনানায়ক ঘোড়ায় চড়ে বনের আগুনের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

আশেপাশের গ্রাম থেকেও লোকজন আগুন দেখতে এসেছে। তারা গোল হয়ে সৈন্যদের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস আর বারাকা তাদের সঙ্গে মিশেদাঁড়িয়ে রইল।

আগুন উঁচুতে উঠল। কাঁচা গাছগাছালি লতাপাতা ঝোঁপ পুড়ছে। জোর চট চট শব্দ উঠেছে। শুকনো বন নয়। তাই আগুন খুব একটা তেজি আগুন নয়।

বিছুক্ষণ সময় গেল। ফ্রান্সিস এতক্ষণ একটা কথাও বলেনি। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আগুনের দিকে।

হঠাৎ বারাকা লক্ষ্য করল–ফ্রান্সিসের দু’চোখ জলে ভিজে উঠেছে। ফ্রান্সিস জামার হাতা দিয়ে দু’চোখ মুছল। অঞরুদ্ধস্বরে বলল–যদি আমার একজন বন্ধুও পুড়ে মরে তবে আমি প্রতিজ্ঞা করছি প্রথমে সেনাপতিকে আর পরে রাজা ফার্নান্দোকে আমি হত্যা করবো। তাতে যদি আমার জীবন যায়–পরোয়া নেই।

আস্তে আস্তে আগুনের তেজ কমে আসতে লাগল। গাঢ় ধোঁয়া উঠতে লাগল আকাশের দিকে।

বেশ কিছুক্ষণ পরে আগুন নিভু নিভু হল। এখানে-ওখানে তখনও আগুন। ধোঁয়া উঠছে।

তখনই ফ্রান্সিসের চোখে পড়ল টিলাটা। টিলাটার গায়ে আগুনের কালচে দাগ। ফ্রান্সিস তখন পায়চারি করতে লাগল। আগুন আরও নিভে যাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। এখনও ঐ ছাইচাপা আগুন পার হয়ে দেখতে যাওয়া যাবে না।

তখনই ফ্রান্সিস দেখল হ্যারি টিলাটার সামনে এসে দাঁড়াল। পেছনেশাঙ্কো মারিয়াকে ধরে ধরে একটা পাথরের চাঙ-এর ওপর বসাল। হ্যারি দু’হাত ওপরে তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গী করল।

ফ্রান্সিস জীবিত মারিয়া হ্যারিদের দেখে চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো। সেই ধ্বনি অবশ্য হ্যারিরা শুনতে পেল না।

ফ্রান্সিস বারাকাকে বলল–চলো–মাঠটায় বসি।

দু’জনে এসে মাঠটায় বসলো।

তখন সন্ধে হয়েছে। চারদিকে সৈন্যরা মশাল জ্বালল।

হ্যারিরা পোড়া বনের ছাইয়ের ওপর দিয়ে সাবধানে এলো। আত্মসমর্পণ করল।

সেনাপতির নির্দেশে হ্যারিদের দু’পাশে ঘিরে নিয়ে সবাই চলল সেভিল্লার দিকে।

 অন্ধকারে পেছনে পেছনে ফ্রান্সিস আর বারাকাও চলল।

সেভিল্লা নগর পৌঁছল সবাই।

 হ্যারিদের কয়েদঘরে বন্দি করে রাখা হল।

ফ্রান্সিসরা অন্ধকারে মাঠে বসে রইল।

রাত বাড়ল।

হ্যারিদের যখন খেতে দেওয়া হল তখন ফ্রান্সিস বলল-বারাকা এবার তোমাদের বাড়িতে নিয়ে চলো।

চলো। বারাকা বলল। দু’জনে রাস্তায় এলো। চলল পুবমুখো।

দু’জনে যখন বারাকার বাড়িতে পৌঁছল, অন্ধকারের মধ্যেও দেখে ফ্রান্সিস বুঝল বাড়িটা বেশ বড়ো। কাঠ আর পাথরে তৈরি। কাঠের দরজাটার সামনে এসে বারাকা দাঁড়াল। তারপর দরজায় আঙুল ঠকে শব্দ করল। একটু পরেই দরজা খুলে গেল। বড়ো জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির মুখেচোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। বারাকাকে দেখে ও বলে উঠল, দাদা, বাবা ছাড়া পেল না?

না। বারাকা দরজা পার হয়ে বলল, ফ্রান্সিস, এসো।

 ফ্রান্সিসকে নিয়ে বারাকা ভেতরের ঘরে এলো। দেখল এক শুভ্রশয্যায় একজন ভদ্রমহিলা বসে আছে। বারাকা বলল, মা, বাবাকে এই সেভিল্লায় আনা হয়েছে।

–তাহলে এই বাড়িটাও তল্লাশি করা হবে। মা বললেন।

–হ্যাঁ। এসব তল্লাশি খোঁজখবরের পর হয়তো রাজা ফার্নান্দো বাবাকে মুক্তি দেবেন। বারাকা বলল।

–হ্যাঁ, এখন শুধু অপেক্ষা করে থাকা। মা বললেন।

ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে বারাকা বলল, মা, এর নাম ফ্রান্সিস। আমার বন্ধু। মা একটু শুকনো হাসি হেসে ফ্রান্সিসের দিকে তাকালেন।ফ্রান্সিস মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল। মা বললে, আমার যা মনের অবস্থা, মানে, তোমার সঙ্গে কথা বল মানে–

ঠিক আছে, ফ্রান্সিস বলে উঠল, পরে কথা হবে।

দু’জনে বারাকার ঘরে এলো। বারাকা একটা আবলুশ কাঠের গদিওয়ালা চেয়ার দেখিয়ে বলল, বসো। তখনই বারাকার বোন মোমবাতি হাতে ঘরে ঢুকল। একটা ছ’ কোণা টেবিলের ওপর রুপোর বাতিদানে মোমবাতিটা রেখে বলল, দাদা, বাবার মুক্তির ব্যবস্থা কী করবি?

–দেখি। বারাকা বলল। বারাকার বোন চলে গেল।

 ফ্রান্সিস বলল, বারাকা, যা বুঝতে পারছি, তোমার বাবাকে আর আমার বন্ধুদের কাল সকালেই ফার্নান্দোর সামনে হাজির করানো হবে। ওদের কথা শোনার পরেই আমি রাজার সঙ্গে কথা বলতে চাই। সেটা কী করে হবে বুঝতে পারছি না।

বারাকা বলল, সে ব্যবস্থা করা যাবে। রাজদরবারের নাজির আমার খুবই পরিচিতি। একটা স্বর্ণমুদ্রা দিলেই সে রাজার সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেবে।

–কিন্তু আমার কাছে তো স্বর্ণমুদ্রা নেই। ফ্রান্সিস বলল।

–সে আমি দেব’খন। বারাকা বলল।

–তাহলে এখুনি চলো। নাজিরকে কাল সকালে হয়তো পাবো না। ফ্রান্সিস বলল।

–চলো তাহলে। কিন্তু তার আগে কিছু খেয়ে নিই। সারাদিন তুমি না খেয়ে আছে। বলে বারাকা বোনকে ডেকে তাদের খাবার দিতে বলল।

খাওয়া শেষ করে ফ্রান্সিস বলল, আচ্ছা, বারাকা, তোমার একটা পোশাক দাও তো। দেখি আমার গায়ে ঠিক লাগে কিনা।

–বেশ তো। বারাকা আলমারি খুলে ফ্রান্সিকে ঢোলাহাতা পোশাক দিল। ফ্রান্সিস নিজের পোশাকের ওপরেই পরল সেটা। মোটামুটি লেগে গেল।

দু’জনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। রাস্তার এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। সেসবের আলো রাস্তায় যতটা পড়েছে তাই দেখে চলল দুজনে।

নাজিরের বাড়িতে এলো ওরা।নাজিরের মূর চাকর দরজা খুলে ফ্রান্সিসদের বাইরের ঘরে বসাল।

একটু পরেই নাজির এলো। নাজিরের সাদা দাড়ি-গোঁফ। মাথায় পাতলা কাপড়ের টুপিমতো। তিনি গদি-আঁটা চেয়ারে বসতেই ফ্রান্সিস বলল, আমি যাতে রাজা ফার্নান্দোর সঙ্গে কথা বলতে পারি, আপনি দয়া করে সেই ব্যবস্থাটা করে দেবেন? নাজির রাজি হলো। বারাকার স্বর্ণমুদ্রাও নিল। ফ্রান্সিসের পোশাক দেখে বুঝল ফ্রান্সিস এখানকারই লোক।

পরদিন সকালে দলপতি কয়েদখানায় এলো। হ্যারিদের বলল, তোমরা কয়েকজন এসো। বারাকার বাবাকেও আসতে বলল।

হ্যারি, মারিয়া আর বিস্কো চলল রাজপ্রাসাদের দিকে। বারাকার বাবাও চললেন। দু’পাশে দু’দল সৈন্যও চলল।

রাজদরবারে তখন অমাত্যরা বসেছেন। নাজির বিচারের ব্যাপারটা লিখবে বলে কাগজ কলম নিয়ে বসেছে। হ্যারিরা এসে দাঁড়াল।

একটু পরেই রাজা ফার্নান্দোদরবারে এলেন। নাজির প্রথমে বারাকার বাবাকে ডাকল। রাজা ফার্নান্দো বললেন, খলিফা ইবন আমীরের গোপন ধনভাণ্ডারের হদিস নিশ্চয়ই আপনাদের পরিবারের কোনো কিছুর মধ্যে আছে। আপনাদের সেভিল্লার বাড়ি তল্লাশি করতে হবে। আরো কিছু জায়গা দেখতে হবে। এখনও বন্দি থাকতে হবে।

এবার দলপতি হ্যারিদের নিয়ে এগিয়ে এলো। দলপতি মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে হ্যারিদের গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ প্রকাশ করল। হারির দিকে তাকিয়ে রাজা ফার্নান্দো বললেন, এই অভিযোগের উত্তরে তোমরা কী বলতে চাও বলল।

হ্যারি এগিলে এলো। মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানাল। বলল, মাননীয় রাজা, আমরা ক্যামেরিনাল বন্দর শহরে আমাদের জাহাজ থামিয়েছিলাম জল, খাদ্য সংগ্রহের জন্যে। শুনেছিলাম ঐ অঞ্চলের রাজা গার্সিয়া। এর বেশি আর কিছুই আমরা জানি না।

–ঠিক আছে, হুয়েনভা বন্দর শহরে লোক পাঠানোহবে। খোঁজ নেওয়া হবে আমার ভাই রাজা গার্সিয়া তোমাদের গুপ্তচরবৃত্তির জন্যে পাঠিয়েছিল কিনা। এখন কয়েদঘরে থাকতে হবে। রাজা বললেন।

এবার হ্যারি মৃদুস্বরে বলল, রাজকুমারী, আপনাকে রাজঅন্তঃপুরে রাখার কথা বলি?

মারিয়া মাথা নেড়ে বলল, না, আমি তোমাদের সঙ্গে থাকবো।

হ্যারি বলল, দোহাই, আমার ব্যবস্থাটা মেনে নিন। আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাদের বিপদের শেষ থাকবে না। অনুরোধ করছি, যা বলছি শুনুন।

রাজা ফার্নান্দো বললেন, তোমাদের আর কিছু বলার আছে?

হ্যারি মারিয়াকে দেখিয়ে বলল, ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী। কয়েদঘরের কষ্টকর জীবন ইনি সহ্য করতে পারবেন না। বিনীত প্রার্থনা, রাজকুমারীকে অন্তঃপুরে রাখা হোক।

রাজা ফার্নান্দো দলপতির দিকে তাকালেন। বললেন, এই রাজকুমারীকে অন্তঃপুরে নিয়ে যাও। পরিচারিকাদের বলো এঁর থাকার ব্যবস্থা করে দিতে।

দলনেতা মারিয়ার কাছে এসে বলল, আমার সঙ্গে আসুন।

ঠিক তখনই নাজির ফ্রান্সিসকে নাম ধরে ডাকল। মারিয়া চমকে পেছন ফিরে তাকাল। হ্যারি, বিস্কোও তাকাল এদেশের পোশাক পরা ফ্রান্সিসের দিকে। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে তাদের দেশীয় ভাষায় বলল, আমাকে চেনো না, সবাই স্বাভাবিক থাকো। ভয় নেই।

রাজা ফার্নান্দো ফ্রান্সিসকে বললেন, বলো, তোমার কী বলার আছে।

ফ্রান্সিস একটু মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে বলল, মহামান্য রাজা, আমি শুনেছি যে– একশো বছর আগে খলিফা ইবন আবি আমীর এই অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। এক যুদ্ধে যাবার সময় বা তারও আগে তাঁর বিপুল ধনসম্পত্তি তিনি যে কোথায় লুকিয়ে রাখেন তা কাউকে বলে জাননি। তার গুপ্ত ধনভাণ্ডার নিশ্চয়ই তারপর কোনো কোনো রাজা খুঁজেছিলেন। কিন্তু কেউই তার হদিস পাননি।

–হ্যা, তুমি ঠিকই শুনেছো। রাজা বললেন।

–এখন মাননীয় রাজা আমাকে যদি কিছুদিন সময় দেন তাহলে সবরকম খোঁজখবর করে আমি ঐ গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধারের চেষ্টা করব। ফ্রান্সিস বলল।

তুমি কি জানো আমিও খোঁজখবর চালাচ্ছি? রাজা বললেন।

জানি মান্যবর রাজা। শুধু আমাকে একবার সুযোগ দিন, এই অনুরোধ।

–বেশ। রাজা ফার্নান্দো বললেন।

ফ্রান্সিস বলল, আর একটা অনুরোধ আমাদের স্বাধীন চলাফেরায় কেউ যেন বাধা না দেয়।

–বেশ, তোমাকে রাজপাঞ্জা দেওয়া হবে। রাজা বললেন।

 দলপতি হ্যারিদের নিয়ে চলে গেল। ফ্রান্সিস বারাকার সঙ্গে প্রাসাদের বাইরে এলো। চলল তার বাড়ির দিকে। পথে কিছুটা যেতেই ফ্রান্সিস দেখল পেছনে ঘোড়ায় চড়ে দলনেতা আসছে। দলনেতা ফ্রান্সিসদের সামনে এসে ঘোড়া থামাল। কোমর থেকে গোলমতো একটা পিতলের চাকতি বের করে বারাকার হাতে দিল। বলল, রাজা তোমাদের এই রাজপাঞ্জা দিয়েছেন। দলনেতা ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল।

খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস বলল, বারাকা, আমি সময় নষ্ট করতে পারবো না। এখনই কারডোভা চলো। আজকে থেকেই কাজে নামবো।

-বেশ, চলো। বারাকা বলল।

–কারডোভা কি খুববেশি দূরে। ফ্রান্সিস জানতে চাইল।

–তা একটু দূরে বৈকি। তবে আমাদের আস্তাবল থেকে দুটো ঘোড়া নেব।

–তাহলে তো কোনো সমস্যাই নেই। ফ্রান্সিস বলল।

 বারাকা চলে গেল। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এসে বলল, ঘোড়া তৈরি। চলো।

 বারাকাদের বাড়ির বাইরে দু’জনে এলো। দেখল একজন সহিস দুটো ঘোড়া নিয়ে এসেছে।

দু’জনে ঘোড়ায় উঠল। বারাকা আর ফ্রান্সিস চলল কারডোভার দিকে।

বিকেল নাগাদ দু’জনে কারডোভা পৌঁছল। কারডোভা একসময় রাজধানী ছিল। কাজেই রাস্তার দু’পাশে অনেক বাড়িঘর। যথেষ্ট লোকবসতি এখানে। রাস্তায় বেশ ভিড়। ফ্রান্সিস বলল, বারাকা, আমারশহরটা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি খলিফা ইবন আমীরের তৈরি নতুন রাজপ্রাসাদে, তারপর পুরনো রাজপ্রাসাদে নিয়ে চলো।

বারাকা প্রথমে নতুন রাজপ্রাসাদে এলো। ঘোড়া থেকে নামল দু’জনে। একটা প্রান্তরের মধ্যে পাথরের প্রাচীর ঘেরা প্রাসাদটি। প্রাচীরটার অনেক জায়গাতেই ভাঙন ধরেছে।

দু’জনে প্রধান ফটকে এলো। প্রহরীরা ওদের আটকাল। বারাকা রাজপাঞ্জা দেখাল। প্রহরীরা সরে দাঁড়াল। ভেতরে ঢুকল দুজনে। কিছুটা পাথর-বাঁধানো চত্বর পেরিয়ে প্রাসাদ। ওটা পার হতে হতে বারাকা বলল, এখানে আলতোয়াইফ থাকেন। তার সঙ্গে ই দেখা করতে হবে।

প্রাসাদে প্রবেশের দরজার কাছে দ্বারীরা পাহারায় রয়েছে। তাদের রাজপাঞ্জা দেখিয়ে বারাকা বলল, আলতোয়াইফের সঙ্গে দেখা করবো। তাকে খবর দাও।

একজন দ্বাররক্ষী প্রাসাদে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বলল, আসুন আপনারা। সদর দরজার পরেই একটা পাথরের ঘর। ঘরের মাঝখানে শ্বেতপাথরের গোল টেবিল। আবলুশ কাঠের গদি-আঁটা চেয়ার টেবিল ঘিরে। ফ্রান্সিসরা বসল।

একটু পরেই ঢোলাহাতা দামি কাপড়ের জোব্বা পরা আলতোয়াইফ ঢুকলেন। ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়াল। নিজে বসে ফ্রান্সিসদের বসতে ইঙ্গিত করলেন। ফ্রান্সিসরা বসল।

বারাকা বলল, ফ্রান্সিস, তোমার যা বলার বলল।

ফ্রান্সিস বলল, মাননীয় মহাশয়, খলিফা ইবন আবি আমীর মৃত্যুর পূর্বে তাঁর বিপুল ধনভাণ্ডারের কোনো হদিস কাউকে দিয়ে যাননি। আমরা সেই গোপন ধনভাণ্ডার খুঁজে বের করতে চেষ্টা করছি। এই প্রাসাদেইখলিফা মৃত্যুর পূর্বে ছিলেন। কাজেই এই প্রাসাদের কোথাও খলিফা কোনো চিহ্ন বা নকশা রেখে গেছেন কিনা সেটাই আমরা খুঁজে দেখতে এসেছি। এজন্যে আপনার সাহায্য চাই।

–অন্দরমহল বাদে আপনারা সারা প্রাসাদই খুঁজে দেখতে পারেন। তবে শুনেছি খলিফার ধনসম্পদ অনেকেই খুঁজেছে। কেউ হদিস করতে পারেনি। আলতোয়াইফ বললেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। অন্দরের দিকে চলে গেলেন।

ফ্রান্সিস আর বারাকা এবার প্রাসাদের ঘরগুলো দেখতে লাগল। কোনো ঘরে অস্ত্রশস্ত্র রাখা, কোনো ঘরে বেশ কয়েকটা লোহার সিন্দুক রাখা। প্রায় একশো বছর আগে তৈরি প্রাসাদের বেশ কয়েকটা ঘর এখন ভাঙা পাথরের স্তূপ। সেখানে ফ্রান্সিস পাথরের স্কুপের পাথর তুলে সরাতে লাগল। বারাকাও হাত লাগাল। পাথরের স্তূপ সরিয়ে ওরা দেখল গোপন জায়গা বলে কিছু নেই।

আর একবার সব দেখেশুনে দু’জন বাইরের ঘরে এসে বসল। ফ্রান্সিস বলল, বুঝেছো বারাকা, এই প্রাসাদে গোপনীয় জায়গা বলতে কিছু পাওয়া গেল না। লোহার সিন্দুক যে ক’টা আছে সবই খোলা হয়েছে। কাঠের আলমারিগুলোও দেখা হয়েছে। এবার পুরনো প্রাসাদে চলো।

ঘোড়ায় চড়ে দু’জনে পুরনো প্রাসাদে এলো। এখন নামেই প্রাসাদ। কয়েকটা পাথরের ঘাম শুধু দাঁড়িয়ে আছে। আর সব জায়গাতেই পাথরের স্তূপ।

ঘোড়া থেকে নেমে এলো দু’জন। ফ্রান্সিস পাথরের পাটা ছড়ানো জায়গায় এদিক ওদিক লাফিয়ে লাফিয়ে গিয়ে দেখতে লাগল। বোঝা গেল ধ্বংসের হাত থেকে কোনো ঘর বাঁচেনি। স্তূপের আকারে পাথরের পাটা ছড়িয়ে থাকায় বোঝাও যাচ্ছে না কোথায় কোথায় ঘর ছিল। সেসব ঘর দেখতে গেলে আগে সব পাথরের পাটার স্কুপ সরাতে হবে। তার জন্য লোক চাই অন্তত পঞ্চাশজন। তবেই পাথরের স্তূপ সরানো সম্ভব।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়েছে তখন। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাবে না। দু’জনে ঘোড়ায় উঠল। ফ্রান্সিস বলল, বারাকা, এবার রাতের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করো।

বারাকা জানাল, আমার জানাশুনো একটা সরাইখানা আছে বাজার এলাকায়। সেখানে চলো।

ফ্রান্সিস বলল, তার আগে আলতোয়াইফের সঙ্গে দেখা করে আসি চলো।

ওরা নতুন প্রাসাদে এলো। ভেতরে দ্বাররক্ষীদের একজনকে দিয়ে খবর পাঠিয়ে ফ্রান্সিসরা বাইরের ঘরে বসল। একটু পরে আলতোয়াইফ এলেন।ফ্রান্সিস বলল, মাননীয় মহাশয়, আপনার কাছে একটু সাহায্য চাই।

-বলো কি সাহায্য চাও।

 –এখানে কী বন্দিশালা আছে? ফ্রান্সিস বলল

–হ্যাঁ, একটা ছোটো কয়েদঘর আছে। সেখানে এখন কয়েকজন বন্দি আছে।

আজ রাতেই আপনি সেভিল্লায় দূত পাঠান। রাজা ফার্নান্দোকে অনুরোধ করুন কাল সকালে যেন সেভিল্লার বন্দিশালা থেকে জনা পঞ্চাশেক বন্দি এখানে পাঠিয়ে দেন।

–কেন বলো তো?

–এখানে পুরনো প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ সরাতে হবে। ধ্বংসস্তূপ সরাতে পারলে মেঝেগুলো দেখে মোটামুটি আন্দাজ করা যাবে কোথায় কোথায় ঘর ছিল। এটা জানা খুবই দরকার।

–বেশ, লোক পাঠাচ্ছি। আলতোয়াইফ বললেন।

ঘোড়া চালিয়ে দু’জনে বারাকার জানাশুনো সরাইখানায় এলো। রাতে খেয়েদেয়ে দু’জনে শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিসের মাথায় অনেক চিন্তা। ও ইচ্ছে করেই সেভিল্লা থেকে বন্দি বন্ধুদের এখানে আনার ব্যবস্থা করল। এখন চিন্তা গুপ্ত ধনসম্পদ ঐ ভাঙা প্রাসাদে এ যাওয়া যাবে কিনা।

পরের দিন একটু বেলাতেই ফ্রান্সিসের ঘুম ভাঙল। দেখল বারাকার ঘুম তখনও ভাঙেনি। ফ্রান্সিস ধাক্কা দিয়ে ওকে তুলল। সরাইখানায় সকালের খাবার খেয়েও ওরা ঘোড়ায় উঠল। চল নতুন রাজপ্রাসাদের দিকে।

ফ্রান্সিস দূর থেকেই দেখল প্রাসাদের সামনের প্রান্তরে কিছু লোক বসে-দাঁড়িয়ে আছে। আর একটু এগিয়ে এসে পোশাক দেখেই ফ্রান্সিস বুঝল হ্যারিদের আনা হয়েছে। ফ্রান্সিস বারাকাকে বলল, এই বন্দিদের মধ্যে তোমার বাবা আছেন?

না। বারাকা বলল।

ফ্রান্সিস বুঝল হঠাৎহ্যারিদের সামনে হাজির হলে ওরা চমকে উঠবে। হৈ হৈকরবে। সেটা এই মুহূর্তে বিপদ ডেকে আনতে পারে। ও তাই বারাকাকে বলল, বারাকা, তুমি ঐ বন্দিদের সমানে যাও। বলবে, এদেশীয় একজন লোক নাম ফ্রান্সিস; তোমাদের কিছু কাজের কথা বলবে। তোমরা চুপ করে শুনবে।

বারাকা হ্যারিদের সামনে এসে ফ্রান্সিসদের শেখানো কথাগুলো বলল।ফ্রান্সিস ঘোড়ায় চড়ে হ্যরিদের সামনে আসার সময় বেশ জোরে ওদের দেশীয় ভাষায় বলল, মনে রাখবে তোমরা কেউ আমাকে চেনো না।

হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল, সবাই চুপ। কোনো কথা নয়।

 ফ্রান্সিস এবার বলতে লাগল, এখান থেকে কিছুদূরে কারোভা। ওখানে একটা পুরনো রাজপ্রাসাদ আছে। এখন পাথরের স্তূপ। সেই পাথরের স্তূপ সরিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এই তোমাদের কাজ। সকালের খাবার খেয়ে আমরা করডোভা যাবো।

সকালের খাবারের ব্যবস্থা দেখছিল দলপতি। ফ্রান্সিস বারাকাকে বলল, যে কটা বেলচা জোগাড় করতে পারো, নিয়ে এসো। সকালের খাবার খেয়ে সবাই তৈরি হলো।

সকলের সামনে চলল ঘোড়ায় চড়ে দলপতি। বন্দিদের দু’পাশে প্রায় জনা দশেক অশ্বারহী সৈন্য। হঠাৎ ফ্রান্সিস হ্যারির সামনে এসে ঘোড়া থামাল। নিজে দ্রুত নেমে এসে হ্যারিকে তুলে দিল ঘোড়ার পিঠে। ফ্রান্সিস চুপ করে থাকতে বলেছে তাই হ্যারিও কোনো কথা বলল না। আস্তে আস্তে ঘোড়া চালল। ফ্রান্সিস সবার পেছনে হাঁটতে লাগল।

একটু বেলায় সবাই ভাঙা প্রাসাদের সামনে এলো। ফ্রান্সিস দলপতিকে বলল,সকলের হাতের বাঁধন খুলে দিন। নইলে পাথর সরাবে কী করে! দলপতি একজন সৈন্যকে বলল সব বন্দির হাতের বাঁধন খুলে দিতে।

ফ্রান্সিস চারদিকে নজর বোলাতে বোলাতে দেখল ভাঙা স্তূপের পরে বেশ বড়ো একটা গর্ত মতো। বোঝা গেল এখানে একটা জলাশয় ছিল। এখন শুকনো। ঐ জায়গাটা দেখিয়ে ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল, পাথরের আস্ত বা ভাঙা পাটাগুলো এই গর্তটায় ফেল। সবাই কাজ শুরু করো। ততক্ষণে বারাকা পাঁচটা বেলচা নিয়ে এসেছে।

সব বন্দিরা কাজে নামল। পাঁচজনকে বেলচা দেওয়া হলো। ওরা ভাঙা পাথরের টুকরো একটা জায়গায় জড়ো করতে লাগল। বাকিরা হাত লাগাল পাথরের পাটা সরাতে। ফ্রান্সিস আর বারাকাও কাজে নামল। চলল পাথর ঠোকাঠুকিরশব্দ। এলাকার কৌতূহলী লোকজন এসে ঘিরে দাঁড়াল। চারদিকে অশ্বারোহী সৈন্যরা নজর রাখতে লাগল যাতে কোনো বন্দি পালাতে না পারে।

সূর্য মাথার ওপরে। চড়া রোদের মধ্যে বন্দিরা কাজ করতে লাগল। এবার ফ্রান্সিস দলপতির কাছে এসে বলল, এদের দুপুরের খাবার তো দিতে হয়।

দলপতি বলল, আমি সব ব্যবস্থা করে এসেছি। একটু পরেই খাবার নিয়ে এখানকার কয়েদঘরের প্রহরীরা আসবে।

যাক! নিশ্চিত হলাম। ফ্রান্সিস বলল।

দলপতি এবার একটু হেসে বলল, রাজা ফার্নান্দো হুকুম দিয়েছেন গুপ্তধন উদ্ধারের ব্যাপারে তোমাকে যেন সবসময় সাহায্য করা হয়।

ভালো, তবে এতে দায়িত্বটা বেড়ে গেল। ফ্রান্সিস বলল।

একটু পরেই কয়েকজন প্রহরী খাবার নিয়ে এলো। ফ্রান্সিসের নির্দেশে বন্দিরা সবাই পাশের প্রান্তরে খেতে বসে গেল। ফ্রান্সিস, বারাকা, দলনেতা, সৈন্যরাও খেতে বসল। লম্বাটে পাতায় গোল করে কাটা রুটি, আনাজের ঝোল, পাখির মাংস খেতে দেওয়া হলো।

খাওয়াদাওয়ার পর শুরু হলো পাথর সরানো কাজ।

বিকেল হলো। ফ্রান্সিস সব ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। ভাঙা দেয়ালের অংশ, পাথরের চৌকোলো মেঝে দেখে বুঝল ঘরগুলো কোথায় ছিল। ফ্রান্সিসের উদ্দেশ্য ছিল– রাজকোষাগার খুঁজে বের করা। দেখল অর্ধেকেরও বেশি জায়গা থেকে পাথর সরানো হয়েছে। কালকের মধ্যেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। তখন ঘরগুলোর মধ্যে দেখে আন্দাজ করা যাবে কোথায় কোথায় ঘর ছিল।

ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, আজকের মতো এখানেই কাজ শেষ। সবাই বসে জিরিয়ে নাও।

সন্ধের আগেই সবাই ফিরে চলল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে ঘোড়ায় চড়িয়ে দিল। নিজে আর সব বন্দির সঙ্গে হেঁটে চলল।

দলপতি সব বন্দিকে নিয়ে চলল ওখানকার কয়েদঘরটার দিকে।ফ্রান্সিস আর বারাকা সরাইখানায় ফিরে এলো।

পরদিন আবার পাথর সরানোর কাজ চলল। দুপুরে খাবার খেতে বন্দিরা কাজ থামাল। তারপর আবার শুরু হলো কাজ–পাথর ঠোকাঠুকির শব্দ।

বিকেলের আগেই পাথরের স্তূপ সরানো শেষ হলো। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, এবার সবাই বিশ্রাম করো। বন্দিরা যে যেখানে পারল বসে পড়ল। বিশ্রাম করতে লাগল।

ফ্রান্সিস ঘুরে ঘুরে জায়গাটা দেখতে লাগল। প্রথমে দেখল বড়ো ঘরটা। বোঝা গেল এটা ছিল রাজদরবার। অন্য ঘরগুলোও দেখল। কোনোটা মন্ত্রণাকক্ষ, কোনোটা অস্ত্রশস্ত্র রাখার ঘর, অন্তঃপুরের ঘর কোনগুলো তাও বুঝে নিল। দু’কোণায় দুটো ঘরের কোনটা মহাফেজখানা কোনটা রাজকোষাগার সেটা বুঝতে পারল না।

আলো কমে এসেছে। ফ্রান্সিস উঠে এলো। এখন ভালো করে দেখা যাবে না।

বন্দিদের নিয়ে সবাই চলল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে ঘোড়ায় উঠিয়ে নিজে হেঁটে চলল পাশে পাশে। হ্যারি মৃদুস্বরে ওদের দেশের ভাষায় বলল, ফ্রান্সিস, তুমি যা খুঁজছে তার কিছু হদিস পেয়েছো?

ফ্রান্সিসও গলা নামিয়ে বলল, বলতে পারো সাফল্যের দোরগোড়ায়।

এখানকার কয়েদঘরটা এত ছোটো যে আমরা ভালো করে ঘুমুতে পারছি না।

আজকের রাতটা কোনোরকমে কষ্ট করে থাকো। কালকে সব ঠিক হয়ে যাবে। ফ্রান্সিস বলল। সেইদিন রাতেই হ্যারিদের সেভিল্লা নিয়ে যাওয়া হল। কয়েদঘরে রাখা হল।

পরের দিন সকালেই ফ্রান্সিস আর বারাকা ঘোড়া ছুটিয়ে ভাঙা প্রাসাদে এলো।

ফ্রান্সিস পাথরে ভর রেখে নীচে নেমে এলো। দুকোণার ঘর দুটোর মেঝে দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস ভাবতে লাগল কোণা ঘরটা ছিল রাজকোষাগার। হিসেব করতে গিয়ে দেখল পুবকোণার ঘরটাই প্রধান প্রবেশপথ থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে। তাহলে এটাই ছিল রাজকোষাগার।

ফ্রান্সিস ভাঙা ঘরের পাথরের মেঝেয় পায়চারি করতে লাগল। ভাবতে লাগল এই ঘরের একশো বছর আগেই বন আবি আমীর তার অর্থসম্পদ রাখতেন। কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে তিনি সেসব কোথায় রেখে যান তা কাউকে জানিয়ে যেতে পারেননি। নাকি ইচ্ছে করে জানাননি।

ফ্রান্সিস পায়চারি করছে। হঠাৎ মনে হলো একটা পাথরের পাটা কেমন নড়ে উঠল। ফ্রান্সিস এবার আস্তে হাঁটতে লাগল। নড়ে-ওঠা পাটার ওপর দাঁড়াল। পায়ের চাপ এদিক-ওদিক করল। বুঝল পাটাটা নড়ছে। হিসেব করে দেখল–ঠিক মেঝের মাঝখানের পাটাটা নড়ছে। পাশের পাটাটায় পায়ের চাপ দিল। ওটাও নড়ছে। তবে পাশেরটার চেয়ে কম। ফ্রান্সিস বারাকাকে ডেকে বলল, দ্যাখো তো এই দুটো পাটা নড়ছে কিনা। বারাকা এসে দাঁড়াল ঐ দুটো পাটার ওপর। পা চাপল। তারপর বলল, সত্যি দুটো নড়ছে। একটা বেশি, অন্যটা কম।

ফ্রান্সিস বলল, বারাকা, এই দুটো পাটাই কুড়ুল চালিয়ে তুলতে হবে। তুমি ক’টা কুড়ুল পাও নিয়ে এসো। কয়েকজন শক্তসমর্থ লোকও নিয়ে এসো। বলবে এখানে একটা কাজ করতে হবে। বদলে মজুরি পাবে।

বারাকা খাদ থেকে উঠে চলে গেল।

বারাকা ফিরে এলো। সঙ্গে কুড়ুল হাতে পাঁচটি যুবককেও নিয়ে এসেছে। ফ্রান্সিস ঐ যুবকদের পাথরের পাটাটা তুলতে বলল। দু-তিনজন মিলে পাটা দুটো নাড়িয়ে নাড়িয়ে তোলবার চেষ্টা করল। পারল না। ফ্রান্সিস বলল, কুড়ুলের ঘা মেরে পাটা দুটো ভাঙো। তারপর টুকরোগুলো সরিয়ে ফেল। পাঁচজনে পরপর কুড়ুলের ঘা মারল। পাথরের পাটা ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে গেল। ওরা টুকরোগুলো সরালো। ফ্রান্সিস হাঁটু গেড়ে বসে দেখল লোহার পাত মতো। যুবকদের বলল, অন্য পাটাটাও ভাঙো। যুবকদের আরো দুটো পাটা কুড়ুল মেরে ভাঙাল। ভাঙা পাথরগুলো তুলে সারিয়ে রাখল। এবার ফ্রান্সিস লোহার জিনিসটা পুরো দেখতে পেল। বুঝল এটা একটা লোহার সিন্দুক।যুবকদের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা সিন্দুকটা তুলে আনো। ওরা আরো কয়েকটা পাটা ভেঙে গর্তটা বড়ো করল। তারপর সবাই হাত লাগিয়ে সিন্দুকটা আস্তে আস্তে তুলে এনে মেঝেয় রাখল।

ফ্রান্সিস ঝুঁকে পড়ে সিন্দুকটা দেখতে লাগল। সিন্দুকটা সাধারণ সিন্দুকের মতোই। রঙটা কালো। সিন্দুকটার সামনে-পেছনে দেখতে একই রকম। দু’পাশেই দুটো হাতল আছে। ফ্রান্সিস বুঝল সাধারণ সিন্দুকের মতো দেখতে হলেও এই সিন্দুকটা নির্দেশমতো তৈরি হয়েছে। সিন্দুকটার সামনে বা পেছনে কোথাও চাবির ফুটো নেই। ফ্রান্সিস বেশ আশ্চর্য হলো। বুঝল এই সিন্দুকে মূল্যবান কিছু নিশ্চয়ই আছে। তাই এই ব্যবস্থা।

ফ্রান্সিস যুবকদের দু’ভাগে ভাগ করল। নিজে আর বারাকাও হাত লাগাল। দু’দলে ভাগ হয়ে ফ্রান্সিসরা দুদিকের হাতল ধরে প্রচণ্ড জোরে টানল। সিন্দুকের ডালা খুলল না। এরকম কয়েকবারই টানা হলো। কিন্তু সিন্দুকের ডালা খুলল না।

ফ্রান্সিস মেজেয় বসে পড়ল। সিন্দুকটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল বিশেষভাবে তৈরি সিন্দুকটা যাতে খোলা না যায় তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাজেই কীভাবে সিন্দুকটা খুলবে সেটা আগে বুঝতে হবে।

তখন বেশ বেলা হয়েছে। বারাকা বলল, ফ্রান্সিস, এবার খেতে চললো।

 ফ্রান্সিস চিন্তিতস্বরে বলল, আমি খাবো না তুমি আর ঐ যুবকরা খেয়ে এসো।

–তুমিও এসো। উপবাসে থাকলে তোমার কষ্ট হবে। বারাকা বলল।

 –আমার অভ্যেস আছে। তোমরা যাও।

 বারাকারা খেতে চলে গেল।

ফ্রান্সিস সিন্দুকটার পাশে বসে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। হঠাৎ লক্ষ্য করল একদিকের ডালার ধারে ওপর থেকে নীচে একটা লোহার পাত বসানো। ভালো করে দেখে বুঝল পাতটা পরে বসানো হয়েছে। সিন্দুকের অন্যদিকে এরকম পাত বসানো নেই। ফ্রান্সিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেই লোহার পাতটা দেখতে লাগল। বুঝল ছেনি-হাতুড়ি হলে লোহার লম্বা পাতটা খুলে ফেলা যাবে।

বারাকা আর যুবকরা ফিরে এলো। ফ্রান্সিস যুবকদের বলা, ছেনি-হাতুড়ি আনতে পারবে কেউ?

একটি যুবক বলল, আমি আনতে পারবো।

ফ্রান্সিস বলল, তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো। এতক্ষণে ফ্রান্সিস খাদের ওপরের দিকে তাকাল। দেখল খাদ ঘিরে অনেক লোক জড়ো হয়েছে। ওরা দেখছে ফ্রান্সিস কী করছে।

যুবকটি ছেনি-হাতুড়ি নিয়ে এলে ফ্রান্সিস লোহার পাতের খাঁজে ছেনি বসিয়ে হাতুড়ি চালাল। আশ্চর্য! একটা ঘা পড়তেই লোহার লম্বাটে পাতটা নড়ে গেল। এতক্ষণে ফ্রান্সিস হাসল। বারাকার দিকে তাকিয়ে বলল, বারাকা, আমার অনুমান সত্যি হতে চলেছে। লোহার লম্বা পাতটা উঠে এলেই সিন্দুকের রহস্যটা বোঝা যাবে।

ফ্রান্সিস আবার হাতুড়ি চালাল। লোহার লম্বা পাতটা আরো খুলল। পরপর দু’তিনটে হাতুড়ির ঘায়ে লোহার পাতটা উঠে এলো। দেখা গেল একটা রুপোর চাবি সিন্দুকের গায়ে আটকানো। তার নীচেই একটা চাবির ফুটো। ফ্রান্সিস চাবিটা খুলে নিল। তারপর, ফুটোয় চাবিটা ঢোকাল। ডান দিকে চাপ দিয়ে ঘোরাতেই কট করে একটা শব্দ হলো। সিন্দুকের ডালা খুলে গেল। ডালাটা আটকাবার আগেই চারটে স্বর্ণমুদ্রা পাথরের মেঝেয় পড়ল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ডালাটা সজোরে চেপে বন্ধ করল। যাতে আর কিছু দামি জিনিস বেরিয়ে না আসে। চাবি ঘুরিয়ে ডালা বন্ধ করে সে চারটে সোনার চাকতি কোমরে গুঁজল। খাদের ওপরে তাকিয়ে দেখল অনেক লোক জমে গেছে। দু-তিনজন। লোক ফ্রান্সিসের কাছে এলো। একজন বলল, সিন্দুক থেকে সোনার চাকতি পড়ল দেখলাম। সঙ্গে সঙ্গে ওর সঙ্গীরাও বলে উঠল, হা, হ্যাঁ, আমরাও দেখেছি।

ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, ভাই, ওগুলো স্বর্ণমুদ্রা। আমার কোমরের ফেট্টি থেকে কী করে খুলে পড়ে গেছে। তোমরা সেই স্বর্ণমুদ্রাই দেখেছো। ওরা ঠিক বিশ্বাস করল না। তবে এই সোনার চাকতি নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। চারপাশের কিছু লোক এগিয়ে এলো। জটলা চলল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে ডাকল, বারাকা, কাছে এসো। বারাকা কাছে এলো। ফ্রান্সিস চাপা গলায় বলল, তুমি ঘোড়ায় চড়ে এক্ষুণি আলতোয়াইফের কাছে যাও। বলবে, আমরা আমীরের গুপ্তধন আবিষ্কার করেছি। উনি যত শীঘ্র সম্ভব একদল সৈন্য নিয়ে যেন এখানে আসেন। যাও–জলদি।

ফ্রান্সিস সিন্দুকটার পাশে মেঝের বসে পড়ল। চাবিটা সিন্দুকের নীচে ঠেলে দিল। যে ভয়টা ফ্রান্সিস করছিল, এখন ঘটনা সেদিকেই মোড় নিল। সিন্দুকটা থেকে সোনার চাকতি বেরিয়েছে–খবরটা দর্শকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। চার পাঁচজনের একটি দল খাদে নেমে ফ্রান্সিসের কাছে এলো। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। একজন বলল, আমরা দেখছি তুমি চাবি দিয়ে সিন্দুকটা খুলেছিলে।

ফ্রান্সিস হেসে বলল, ভুল দেখেছিলে, চাবিটা লাগেইনি।

অন্যজন বলল, আমরা দেখেছি সিন্দুক থেকে সোনার চাকতি গড়িয়ে পড়েছে।

ফ্রান্সিস আবার হেসে বলল, ভুল দেখেছো। আমার কোমরের ফেট্টি থেকে কয়েকটি স্বর্ণমুদ্রা পড়ে গিয়েছিল।

আর একজন বলল, তুমি চাবি দিয়ে সিন্দুক খুলেছিলে?

না, সেই চাবিতে সিন্দুক খোলেনি। ফ্রান্সিস বলল।

আর একজন চড়া গলায় বলল, ঠিক আছে, তুমি চাবিটা দাও, আমরা দেখবো সেই চাবিতে সিন্দুক খোলে কিনা।

ফ্রান্সিস এরকম কিছু আগেই আন্দাজ করেছিল। হেসে বলল, সেই চাবি তো আমার কাছে নেই। এখানকার আলতোয়াফের কাছে লোক মারফৎ পাঠিয়ে দিয়েছি।

চড়া মেজাজের লোকটি বলল, না। তুমি মিথ্যে কথা বলছে। চাবিটা তোমার কাছেই আছে।

ফ্রান্সিস দু’হাত তুলে হেসে বলল, ঠিক আছে, আমাকে তল্লাশি করো। চড়া মেজাজের লোকটি এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিসের পোশাক, কোমর সব দেখল। চাবি পাওয়া গেল না। ফ্রান্সিস আগেই ভেবেছিল জড়ো হওয়া লোকগুলো যদি চাবি পেয়ে সিন্দুক খোলে, সব ধনভাণ্ডার অল্পক্ষণের মধ্যেই লুঠ হয়ে যাবে। নিরস্ত্র ফ্রান্সিস কিছুই করতে পারবে না।

ফ্রান্সিস বারবার রাস্তার দিকে তাকাতে লাগল। কিন্তু আলতোয়াইফ আসছেন না। এবার দলে দলে লোকজন খাদে নেমে আসতে লাগল। সিন্দুকটার গায়ে হাত দিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস কাউকে বাধা দিল না। বাধা দিলে ওদের মনে সন্দেহ জাগতে পারে, নিশ্চয়ই সিন্দুকের দামি কিছু আছে।

ফ্রান্সিস তাকিয়ে রইল রাস্তার দিকে। হঠাৎ দেখল ধুলো উড়ছে। অশ্বারোহী সৈন্যদল আসছে। সামনে আলতোয়াইফ আর বারাকা।

সবাই খাদের কাছে এসে থামল। আলতোয়াইফ খাদে নেমে ফ্রান্সিসের কাছে এলেন। সিন্দুকটা দেখিয়ে বললেন, এটাতে কি গুপ্তধন আছে?

ফ্রান্সিস বলল, ঠিক বলতে পারবো না। সিন্দুকটা আপনার প্রাসাদে গিয়ে খুলতে হবে। তখন দেখা যাবে এই সিন্দুকেই গুপ্তধন রাখা হয়েছিল কিনা।

–আমার মনে হয় এই সিন্দুকের মধ্যে কিছু পুরনো দলিল-দস্তাবেজ আছে। আলতোয়াইফ বললেন।

–তাও হতে পারে। ফ্রান্সিস বলল।

আলতোয়াইফ সৈন্যদের দলনেতাকে ডাকলেন। সে কাছে এলে বললেন, একটা ঘোড়ায়টানা গাড়ি জোগাড় করো। এই সিন্দুকটা গাড়িতে তুলে আমার প্রাসাদে নিয়ে এসো। সিন্দুকটা মহাফেজখানায় রাখবে।

আলতোয়াইফ এসে ঘোড়ায় উঠলেন। ফ্রান্সিসরাও এসে ঘোড়ায় উঠল। কিছু সৈন্য দলনেতার কাছে রইল, সিন্দুক গাড়িতে তুলে নিয়ে আসবে বলে।

সবাই চলল নতুন প্রাসাদের দিকে।

সন্ধের আগেই সিন্দুকটা এনে মহাফেজখানায় রাখা হলো। ফ্রান্সিস আর বারাকা প্রাসাদের বাইরের ঘরটায় বসেছিল। সিন্দুক রাখার পর ফ্রান্সিস বারাকাকে বলল, আলতোয়াইফকে বলো আমি তার সামনেই সিন্দুকটা খুলব। বারাকা একজন দ্বাররক্ষী মারফৎ এই আর্জি জানাল আতলোয়াইফকে। দ্বাররক্ষী কিছুক্ষণ পরে এসে বলল, উনি তোমাদের মহাফেজখানায় যেতে বলেছেন।

ফ্রান্সিস আর বারাকা মহাফেজখানায় চলল। ফ্রান্সিস চাবিটা সিন্দুকের তলায় লুকিয়ে রেখেছিল। একসময় সকলের অলক্ষ্যে চাবিটা তুলে নিয়ে কোমরে গুঁজে রেখেছিল।

ওরা মহাফেজখানায় এলো। মশালের আলোয় দেখল আলতোয়াইফ দাঁড়িয়ে আছেন। ফান্সিসদের দেখে বললেন, সিন্দুক খোলার জন্যে এত তাড়াহুড়ো করছো কেন?

ফ্রান্সিস এবার কোমরের ফেট্টি থেকে চারটে সোনার চাকতি খুলে আলতোয়াইফের দিকে এগিয়ে ধরল। আলতোয়াইফ বেশ চমকে উঠলেন। ফ্রান্সিসসের মুখের দিকে তাকালেন।

ফ্রান্সিস বলল, এই সোনার চাকতিগুলো ঐ সিন্দুক থেকেই গড়িয়ে পড়েছিল।

আলতোয়াইফ সোনার চাকতি ক’টা হাতে নিলেন। মনোযোগ দিয়ে দেখলেন।

ফ্রান্সিস বলল, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই সিন্দুকেই গোপনে রাখা হয়েছিল ইবন আবি আমীরের ধনভাণ্ডার।

আলতোয়াইফ সায় দিয়ে বললেন, আমার এখন তাই মনে হচ্ছে। এবার সিন্দুকটা খোল তো।

ফ্রান্সিসে সিন্দুকের সামনে এলো।

সিন্দুকের ফুটোয় চাবি ঢুকিয়ে ঘোরাল। কিছু সোনার চাকতি নীচে ডালার ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ল। এবার ফ্রান্সিস এক হ্যাঁচকা টানে ডালাটা খুলে ফেলল। মুঠো মুঠো সোনার চাকতি মেঝেয় গড়িয়ে পড়ল।

মশালের আলোয় ঝকঝক করতে লাগল সোনার চাকতিগুলো। সিন্দুকের নীচের তাকটায় চেপে ভরা ছিল চাকতিগুলো। এবার ওপরের তাকেও দেখা গেল হীরে, মণিমুক্তোর কত অলংকার। মশালের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল মণি-মাণিক্যগুলো। তিনজনেই হাঁ করে তাকিয়ে রইল সেই দিকে।

কিছু পরে আলতোয়াইফ বললেন, সিন্দুক বন্ধ করো। ফ্রান্সিস আর বারাকা মেঝে থেকে সোনার চাকতিগুলো তুলে সিন্দুকে চেপে চেপে ভরল। তারপর ফ্রান্সিস সিন্দুকের ডালা বন্ধ করে রুপোর চাবিটা আলতোয়াইফকে দিল। বলল, মাননীয় মহাশয়, কাজের সুবিধের জন্য আমি এই দেশের পোশাক পরে আছি। আসলে জাতিতে আমি ভাইকিং। আমার স্ত্রী ও বন্ধুদের নিয়ে ক্যামেরিনাল বন্দর শহর হয়ে হুয়েনভা বন্দরে জাহাজ চালিয়ে এসেছিলাম। সেখানে আমাদের বন্দি করা হয়। রাজা ফার্নান্দো সন্দেহ করেছিলেন আমরা তার ভাই ক্যামেরিনালের রাজা গার্সিয়ার গুপ্তচর। আমার বন্ধুদের সেভিল্লা নগরে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ফ্রান্সিস থামল। তারপর বলল, রাজা ফার্নান্দোর অনুমতি নিয়ে আমি ইবন আমীরের গুপ্তধন উদ্ধার করেছি। এবার আমার স্ত্রী আর বন্ধুদের মুক্তির ব্যবস্থা আপনি করুন।

বারাকা বলল, এইইবন আমীরের গুপ্তধনের হদিস আমার বাবা জানেন, এই সন্দেহে আমার বাবাকেও সেভিল্লায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। আপনি তারও মুক্তির ব্যবস্থা করুন।

আলতোয়াইফ বললেন, কাল ভোরে এই সিন্দুকের গুপ্ত ধনভাণ্ডার নিয়ে আমি সেভিল্লায় যাবো। রাজা ফার্নান্দোকে দেব ধনসম্পদ আর তোমাদের কথা বলবো।

পরের দিন ভোরে আলতোয়াইফের সঙ্গে ফ্রান্সিস আর বারাকা ঘোড়ায় চড়ে চলল। ঘোড়ায় টানা গাড়িতে সিন্দুকটাও নিয়ে চলল।

তখনও রাজদরবার শুরু হয়নি। আলতোয়াইফের নির্দেশে সিন্দুকটা রাজদরবারের মাঝখানে রাখা হলো।

রাজা ফার্নান্দো রাজদরবারে এলেন। সিংহাসনে বসে আলতোয়াইফকে তার সামনে আসার অনুমতি দিলেন। আলতোয়াইফ সামনে এগিয়ে গিয়ে রাজাকে মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাজা ফার্নান্দো বললেন, আপনার পাঠানো দূত মারফৎ কাল রাতেই আমি জানতে পেরেছি ইবন আবি আমীরের গুপ্ত ধনভাণ্ডার আবিষ্কার করা হয়েছে।

আলতোয়াইফ পেছন ফিরে ফ্রান্সিসকে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করলেন। ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে দাঁড়াল। আলতোয়াইফ ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে বললেন, এই যুবকটিই নিজের উ. বুদ্ধিকৌশলে গুপ্তধন আবিষ্কার করেছে।

রাজা ফ্রান্সিসকে বললেন, বলো এর পুরস্কার হিসেবে তুমি কী চাও এই গুপ্ত সম্পদের কিছু অংশ যদি তুমি চাও অবশ্যই তা পাবে।

ফ্রান্সিস বলল, মহামান্য রাজা, আমি অর্থসম্পদ চাই না। আমি চাই আমার স্ত্রী ও বন্ধুদের মুক্তি দেওয়া হোক। বারাকার বাবাকেও মুক্তি দেওয়া হোক।

রাজা ফার্নান্দো সেনাপতিকে ডাকলেন। কিছু আদেশও দিলেন। সেনাপতি ফ্রান্সিসের কাছে এসে বলল, আমার সঙ্গে এসো।

তখন আলতোয়াইফ সিন্দুকটা খুলছেন। রাজদরবারের সবাই গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে সিন্দুকটার দিকে।

সেনাপতি বন্দিশালার সামনে এল।ফ্রান্সিসকে বলল, তোমার বন্ধুদের বলো বেরিয়ে আসতে। সেনাপতির ইঙ্গিতে প্রহরীরা বন্দিশালার লোহার দরজা টং টং শব্দে খুলে দিল।

ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, ভাইসব, তোমরা মুক্ত। বাইরে এসো।

ভাইকিং বন্ধুরা ছুটে বাইরে এলো। প্রহরীরা ওদের হাতের বাঁধন কেটে দিতে লাগল। ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠল, ও-হো-হো।

দেখা গেল রাজপ্রাসাদের দিক থেকে একজন পরিচারিকা মারিয়াকে নিয়ে আসছে। মারিয়ার আর তর সইছিল না। মারিয়া হাসতে হাসতে প্রান্তরটা ছুটে পার হয়ে ফ্রান্সিসদের কাছে এলো। তখনও হাঁপাচ্ছে, মারিয়াকে সুস্থ দেখে ফ্রান্সিস খুশি হলো।

মারিয়া আসতেই আবার ভাইকিংদের ধ্বনি উঠল–ও-হো-হো। ফ্রান্সিস বলল—এবার হুয়েনভা চলো—আমাদের জাহাজে।