ঈমানের ঝলক

ঈমানের ঝলক

১৮২৬ এর পহেলা ডিসেম্বর। সূর্যাস্ত হয়নি এখনো। তবে মোগল সালতানাতের অমিত তেজী সূর্য সেই কবে থেকে অস্তাচলের পথে যাত্রা শুরু। করেছে। সালতানাতের রক্ষাকবচ হিসেবে যে কেল্লাগুলো মোগলীয় হস্তে নির্মিত হয়েছিলো সেগুলো এখন তাদের কবরগুলোর মতো উদাস-নীরব দর্শক হয়ে আছে। এর মধ্যে একটি কেল্লা হলো কেল্লায়ে লাহোর। যাকে বলা হয় শাহী কেল্লা। এই কেল্লা এখন শিখদের কজায় রয়েছে।

এই কেল্লার প্রধান অর্থাৎ কেল্লাদার উধাম শিং প্রতিদিনের মতো সান্ধ্য ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। সঙ্গে তার দুই মুহাফিজ। এক শিখকে এদিকে তখন দৌড়ে আসতে দেখা গেলো। মুহাফিজ দুজন এগিয়ে গিয়ে তার পথ রোধ করে দাঁড়ালো।

ব্যাপার কি? দৌড়ে আসছো কেন?– মুহাফিজরা জিজ্ঞেস করলো।

আমি কেল্লার কাসেদ– শিখ বললো।

আসতে দাও ওকেউধাম শিং হুকুম দিলেন–এদিকে এসো হে! কি হয়েছে বলো।

একজন মুসলমানকে পাকড়াও করা হয়েছে মহারাজ! কাসেদ এগিয়ে এসে বললো- সে নাকি ইসলামী ফৌজের কাসেদ। মহারাজার জন্য পয়গাম নিয়ে এসেছে। আপনার এজাযত ছাড়া তো ওকে মহারাজার সামনে নেয়া যাবে না।

ইসলামী ফৌজ? উধাম শিং নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলো-কিসের ইসলামী ফৌজ? … উহ … এ মনে হয় পেশাওয়ারের পাঠান খান্দানের কাসেদ। দাম্ভিক কণ্ঠে বললেন এবার। এ ধরনের কাসেদকে গ্রেফতার করার কি প্রয়োজন ছিলো? সন্ধির প্রস্তাব মনে হয় সে নিয়ে এসেছে। এমন কমজোর লোকদের কাসেদকে ভয় কিসের? … যাও আমি আসছি। ওকেও নিয়ে এসো।

কেল্লার এক জায়গায় কমপক্ষে বিশ বাইশজন শিখ খোলা তলোয়ার নিয়ে এক মুসলিম যুবককে ঘিরে রেখেছে। কেল্লার প্রধান উধাম শিংকে দেখে তারা ঘেরাও হালকা করে দিলো। উধাম শিং দেখলেন, বিশ বাইশ বছরের গৌর বর্ণের সুদর্শন এক যুবক তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তার তলোয়ারটি তার কোষাবদ্ধ রয়েছে। উধাম শিং এর চেহারা থমথমে হয়ে উঠলো। তিনি সহকারী কেল্লাদার কাহেন শিং এর দিকে রাগত চোখে তাকালেন।

মহারাজ! কাহেন শিং কেলাদারের রাগত দৃষ্টির প্রশ্ন বুঝতে পেরে বললল– এ মহারাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছে। কিন্তু ওর তলোয়ার আমাদের কাছে হাওলা করছে না।

কি নাম তোমার? উধাম শিং আগত যুবককে জিজ্ঞেস করলো- কোত্থেকে এসেছো?

আমার নাম হিম্মত খান। আমি আমাদের সালারে আলা সায়্যিদ আহমদের পয়গাম এনেছি মহারাজ রঞ্জিৎ শিং-এর নামে।

উহ! সায়্যিদ আহমদ! উধাম শিং ঠোঁট উল্টে তাচ্ছিল্য করে বললেন সেকি দুচারজন লোক জমিয়ে সালারে আলা বনে গেছে?

তিনি যাই হোক, আমি মহারাজ রঞ্জিৎ শিং-এর নামে উনার পয়গাম এনেছি- হিম্মত খান তার আশপাশের শিখদের বেষ্টনীর দিকে তাকিয়ে বললো– আপনাদের অতি নগণ্য লোকও যদি আমাদের ওখানে যায় আমরা তার সঙ্গে এ ধরনের অস্ত্র আচরণ করবো না যেমন আমার সঙ্গে করা হচ্ছে।

এটা একটি কেল্লা নওজোয়ান! আমাদের কিছু নিয়ম কানুন আছে তোমাকে মহারাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবো। তবে তোমার তলোয়ার আমাদের কাছে হাওলা করতে হবে।

নিয়ম কানুন কিছু আমাদেরও আছে–হিম্মত খান বললো–আমাদের ধর্মে দুশমনের কাছে হাতিয়ার হাওলা করাটা পাপ মনে করা হয়। আমি আপনাদের মহারাজাকে হত্যা করতে আসিনি। তাকে একটি পয়গাম দিতে এসেছি।

কিসের পয়গাম? বন্ধুত্বের মুসলমানরা এখন বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না।

এর মীমাংসা মহারাজ রঞ্জিৎ সিং-এর জবাবের পর করা হবে। তবে অতিরিক্ত কথা বলার অনুমতি নেই আমার। আমার কাজ শুধু পয়গাম শুনিয়ে দেয়া।

তুমি আজ রাতে আমাদের মেহমান- উধাম শিং-এর গলায় এখন মার্জনার ছোঁয়া- আগামীকাল তোমায় মহারাজার কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। তিনি কাহেন শিংকে বললেন- ওকে মেহমানখানায় পৌঁছে দাও। লক্ষ রাখবে, ওর যেন কোন অসম্মান না হয়। ওর তলোয়ারও থাকবে ওর কাছে।

উধাম শিং হিম্মত খানকে মেহমানখানায় পাঠিয়ে রঞ্জিৎ শিং-এর কাছে চলে গেলেন। রঞ্জিৎ শিং-এর অবস্থা তখন কোন গুরু গম্ভীর বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেয়ার মতো ছিলো না। তার সামনে ছিলো মদের বড় সুরাহী। কয়েজন তোষামোদে দরবারীকে নিয়ে তিনি মদের মধ্যে ডুবে ছিলেন। উধাম শিংকে দেখে দুহাত প্রসারিত করে বললেন– আরে আমাদের কেল্লাদারও এসে গেছে।

মহারাজ : উধাম শিং রঞ্জিৎ শিংকে বললেন– এই সায়্যিদ আহমদ কি সেই লোক যার কথা আপনি সেদিন বলেছিলেন? আপনি বলেছিলেন সায়্যিদ আহমদ হিন্দুস্থানের লোক। এখন কান্দাহার থেকে পেশাওয়ার এসেছে। আপনি বলেছিলেন, সে কোন আলেম যালেম কিছুই না। একজন জাদুকর মাত্র। যেখানেই যায় সেখানকার মুসলমান তার হাতে বায়আত হয়ে যায় এবং তার ফৌজে শামিল হয়।

একথা বলার এখনই তোমার সময় হলো উধাম শিং? রঞ্জিৎ শিং কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন- তুমি তো কোন নতুন কথা শোেননি? সায়্যিদ আহমদকে তো আমরা এমন কিছু মনে করি না যে এমন মূল্যবান সময়ে তার আলোচনা নিয়ে বসে থাকবো।

নতুন কথা এই যে মহারাজ! উধাম শিং জরুরী গলায় বললেন- তার এক কাসেদ কোন পয়গাম নিয়ে এসেছে। কাসেদ বলছে, সে তার তলোয়ার নিয়ে আপনার কাছে আসবে।

তুমি এক মুসলমানের সামান্য একটি তলোয়ারকে ভয় পাচ্ছো? কাল সকালে তাকে দরবারে পেশ করো। ওর কাছ থেকে থেকে তলোয়ার নেয়ার দরকার নেই … আর উধাম শিং! সায়্যিদ আহমদকে এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই, যেমন তুমি মনে করছো।

***

উধাম শিং গম্ভীর মুখে সেখান থেকে চলে এলেন। মহারাজা রঞ্জিৎ শিং-এর মদের রঙ্গীন আসর তার মধ্যে কোন পরিবর্তন আনতে পারলো না। তিনি মেহমানখানায় চলে এলেন। হিম্মত খানের কামরায় গিয়ে দেখলেন, হিম্মত খান নামায পড়ছে। উধাম শিং নিস্পলক সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। হিম্মত খান নামায শেষ করে সংক্ষেপে দুআ করলো। তারপর জায়নামায থেকে উঠে দাঁড়ালো।

পেছনে উধাম শিংকে দেখে চমকে উঠলো। কখন উধাম শিং এসেছেন সেটা সে টের পায়নি। উধাম শিং হিম্মত খানের খাটের ওপর বসে পড়লেন।

আমি তোমাদের সালারে আলা সায়্যিদ আহমদ সম্পর্কে জানতে চাই। উধাম শিং বললেন- আমি তার সম্পর্কে সামান্যই শুনেছি।

আপনার এ আশা করা উচিত হবে না যে, যা বলা উচিত নয় তা আমি আপনাকে বলে দেবো- হিম্মত খান বললো কিছুটা শক্ত কণ্ঠে আপনি আমাকে ইযযত করেছেন ঠিক, কিন্তু এজন্য আপনাকে আমি বন্ধু বলে গ্রহণ করতে পারি না। আপনাকে আমি এটা বলতে পারবো না যে, আমাদের সৈন্যসংখ্যা কত? আমাদের অস্ত্র কি কিংবা আমাদের লড়াইয়ের কৌশলই বা কি? শুধু ব্যক্তি সায়্যিদ আহমদ সম্পর্কে আপনাকে আমি বলতে পারবো। তিনি কে? এবং কি তার মিশন।

আমি এটাই জানতে চাই- উধাম শিং সামান্য হেসে বললেন।

আমার কথা হয়তো আপনার কাছে ভালো লাগবে না– হিম্মত খান বলে। গেলো এটা মাযহাব আর ধর্মের ব্যাপার। প্রত্যেকেই তার ধর্মকে সত্য বলে মনে করে। তারপরও আপনি যা জানতে চান তা আমি সংক্ষেপে বলছি …

উনার নাম সায়্যিদ আহমদ। হিন্দুস্তানের বেরলভী শহরের লোক। আল্লাহ তাআলা তাকে অন্তরলোকের আলো দান করেছেন। দিয়েছেন এক মঞ্জিলের রাহনুমা। যা হক ও সত্যের মঞ্জিল। সায়্যিদ আহমদ অনেক বড় বিদ্বান-আলেম। কিন্তু তিনি কামরায় বসে আল্লাহ আল্লাহ করা আর মিম্বারে উঠে ওয়াজ নসীহতকারী আলেম নয়। তিনি আল্লাহর পথে সংগ্রামের শিক্ষা দেন। মুসলমানের জন্য আল্লাহর পথে সংগ্রাম অন্যতম এক ইবাদত…।

হিন্দুস্তান ইসলামী রাষ্ট্র। কিন্তু মুসলিম রাজা বাদশাহরা যখন আল্লাহর পথ থেকে সরে গেছে তখন তো দেখেছেনই ইসলামী ঝাণ্ডাও মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর সমুদ্রের ওপার থেকে ফিরিঙ্গিরা এসে এদেশ দখল করেছে। সায়্যিদ আহমদ আমাদের সবক দিয়েছেন যে, কুরআনের শিক্ষা মতে মুসলমান কারো গোলাম হতে পারে না। কারণ, গোলামি মানুষের ভেতরের সব কল্যাণবোধও স্বকীয়তাবোধ নষ্ট করে দেয়। সায়্যিদ আহমদ তাই হিন্দুস্তানে আল্লাহর হুকুম কায়েম করতে চান। গোলামি করতে হলে একমাত্র আল্লাহর গোলামি করতে হবে। কোন মানুষের গোলামি করা যাবে না …

বর্তমানে দেশের যে অবস্থা তাতে লড়াই আর জিহাদ ফরজ হয়ে গেছে। এজন্যই তিনি জিহাদের শিক্ষা দেন। কাফেরদেরকে প্রথমে তিনি সত্যের পথে দাওয়াত দেন। তিনি বলেন, মানুষের ওপর মানুষের আইন চলবে না, চলবে আল্লাহর আইন। কুরআনে যা আছে তাই বলেন আমাদের সালারে আলা। তিনি গ্রামের পর গ্রাম শহরের পর শহর ঘুরে এসেছেন। সর্বপ্রথম তিনি পথহারা মুসলমানদেরকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেন। তিনি বলেন, কুফুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অনেক বড় ইবাদত। আর আল্লাহর পথে তলোয়ার চালনা আর। তীরন্দাযী ছাড়া দীনী ইলম- ইসলামের শিক্ষা পূর্ণ হতে পারে না।…

তিনি যে দিকেই যান সেখানকার মুসলমানরা তার শিষ্য বনে যান। তার বলার সুরে এমন এক তন্ময়তা আছে যে, কোন মুসলমান তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। তার আওয়াজে যেন আল্লাহর গায়েবী আওয়াজ আছে। অসংখ্য বিধর্মীও তার হাতে বায়আত হয়েছে এবং মুসলমান হয়ে গেছে …।

আমি খুব শিক্ষিত ছেলে নই। অতি সাধারণ এক লোক। আমি তাঁর মতো বলতে ও পারবো না এবং আমার ভাষায় আপনি সেই মুগ্ধকর স্বাদও পাবেন না। আপনি কখনো তার কথা শুনলে অজান্তেই বলে উঠবেন। এটা মানুষ নয় খোদাপাক যেন বলছেন। তখন আপনিও আমার মতো তীর বৃষ্টি আর দুশমনের তলোয়ারের ছায়ায় নিশ্চিন্ত মনে নামায পড়তে পারবেন। যদি জিজ্ঞেস করেন আমাদের লড়াইয়ের কৌশল কি? এর জবাবে আমি শুধু এতটুকু বলবো যে, আমরা একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে লড়াই করি।

শিখেরা সুসংগঠিত কোন জাতি ছিলো না। গোত্র আকারে এরা অস্তিত্বমান হয়। যাদের ইতিহাসে শাসন-ক্ষমতা আর লড়াই-যুদ্ধের নাম নিশানাও ছিলো না। এজন্য রণাঙ্গনের ব্যাপারে তাদের অভিজ্ঞতা একেবারেই ছিলো না। তবে ব্যক্তিগতভাবে এরা লড়তে জানতো। কারণ, তাদের পেশা ছিলো ডাকাতি আর রাহাজানি। দলবদ্ধ হয়ে এরা ছিনতাই রাহাজানি করতো।

মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর হিন্দুস্তানের অবস্থা বড়ই শোচনীয় হয়ে উঠে।

ইংরেজরা পুরো ভারতবর্ষ গ্রাস করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কেন্দ্রীয় কোন শাসন ক্ষমতা ছিলো না। নৈরাজ্য আর বিশৃংখলাই ছিলো আসল হুকুমত। এই নৈরাজ্যজনক অবস্থা থেকে ফায়দা উঠায় শিখেরা। তারা পাঞ্জাব দখল করে নেয়। এদের রাজত্বের সময়সীমা ছিলো চল্লিশ বছরের। তবে এর মধ্যে তারা যুদ্ধ বিগ্রহহীন নিরাপদ সময় খুব একটা উপভোগ করতে পারেনি। ইংরেজ কিংবা মুসলমানদের সঙ্গে তাদের লড়াই লেগেই থাকতো। এমনকি হিন্দুদের সঙ্গেও তাদের লড়াই হয়।

মুসলমানদেরকে এ সময় হযরত সায়্যিদ আহমদ শহীদ (র.) তাহরীকে মুজাহিদীন-এর প্লাটফর্মে সমবেত করার চেষ্টা করেন।

শিখদের মধ্যে যদিও বোধ বুদ্ধি ও দূরদর্শিতা কম ছিলো এবং উগ্রতা আর অবাধ্যতাই ছিলো বেশি; কিন্তু লাহোরের কেল্লাদার উধাম শিং রাশভারী লোক ছিলেন। তিনি ভাবনা চিন্তা করতে জানতেন। তিনি কাসেদের কাছ থেকে সায়্যিদ আহমদের চেতনা-দর্শন শুনে অন্যদের মতো ঠাট্টা বা বিদ্রূপ করলেন না। নীরবে মেহমানখানা থেকে বেরিয়ে গেলেন। তার আনত মাথা ও চলার ভঙ্গি বলে দিচ্ছিলো, তিনি গভীর চিন্তায় ডুবে গেছেন।

***

পরদিন সকালে মহারাজ রঞ্জিৎশিং তার শাহী সিংহাসনে বসেছিলেন। এ সিংহাসন ছিলো কোন মুসলমান বাদশাহর স্মৃতিখণ্ড। রঞ্জিৎশিং-এর চেহারা ফেরআউনি দম্ভে ফেটে পড়ছিলো। তার সামনে বসা ছিলো দরবারীরা। পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলো দুই মুহাফিজ। এক পাশে তার মহারানী। সবাই কেমন স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলো। কারণ, মহারাজাকে দেখে মনে হচ্ছিলো, তিনি কোন ব্যাপারে বেশ ক্ষুব্ধ। কুচকুচে চোখে তিনি দরজার দিকে বার বার তাকাচ্ছিলেন। যেন কারো অপেক্ষায় আছেন।

এসময় হিম্মত খান দরবারে প্রবেশ করলো। তার ডানে বামে বর্শা উঁচিয়ে দুই শিখও প্রবেশ করলো। হিম্মত খান রঞ্জিৎ শিং-এর সামনে গিয়ে দৃঢ় পায়ে দাঁড়িয়ে বললো- আসোলামু আলাইকুম।

মহারাজা মাথা ঝটকা দিয়ে দরবারী ও মুহাফিজদের ওপর চোখ ঘুরিয়ে গর্জে উঠলেন–

ওকে কি কেউ বলেনি যে, এটা মহারাজা রঞ্জিৎ শিং-এর দরবার। এখানে ঝুঁকে পড়ে সালাম করতে হয়?

মহারাজা! হিম্মত খান সোজা কণ্ঠে বললো–কেউ আমাকে বললেও আমি ঝুঁকে সালাম করতাম না। আমি এই পয়গাম নিয়েই এসেছি যে, কোন মানুষের এতটুকু অধিকার নেই যে, সে অন্য কোন মানুষকে তার সামনে ঝুঁকতে বাধ্য করবে। আল্লাহর বান্দা শুধু আল্লাহর সামনেই মাথা ঝোকায়।

সায়্যিদ আহমদের যে পয়গাম তুমি নিয়ে এসেছে সেটা শুনে তোমার ভাগ্যের ফয়সালা করবো- রঞ্জিৎ শিং বললেন তোমাকে যে এখানে পাঠায়েছে সে কি বলেনি যে, রঞ্জিৎ শিং-এর নাম শুনে ইংরেজ ও পাঠানরাও কেঁপে উঠে! তোমার বয়স তত কম। এজন্য যৌবনের আবেগ তোমাকে মুগ্ধ করে দিয়েছে তিনি ধমকে উঠলেন– শুনাও তোমার পয়গাম।

হিম্মত খান ভাঁজ করা একটা কাগজ খুললো এবং উঁচু আওয়াজে পড়তে শুরু করলো,

আল্লাহর নগণ্য বান্দা সায়্যিদ আহমদের পয়গাম, পাঞ্জাবের হাকিম মহারাজা রঞ্জিৎ শিং-এর নামে

আমি আপনার সামনে তিনটা দিক পেশ করছি। প্রথম হলো- ইসলাম কবুল করে নিন। সেক্ষেত্রে আমরা পরস্পর ভাই ভাই বনে যাবো। তবে এতে জোরজবরদস্তির কিছুই নেই। দ্বিতীয়তঃ ইসলাম গ্রহণ না করলে আমাদের আনুগত্য গ্রহণ করে নাও এবং জিযিয়া প্রদান করতে থাকো। সে ক্ষেত্রে আমরা যেমন আমাদের জান মালের হেফাজত করি তোমাদের জান মালেরও সেভাবে হেফাজত করবো।

তৃতীয়তঃ ওপরের দুটি প্রস্তাব মেনে না নিলে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে নাও। আর শুনে রাখো, পুরো ইয়াগিস্তান ও হিন্দুস্তানের প্রতিটি মুসলমান আমাদের সঙ্গে আছে। আর শহীদ হওয়া আমাদের কাছে যতটা প্রিয়, রক্তে স্নাত হওয়া আমাদের কাছে যতটা আকর্ষণীয়; তোমাদের কাছে শরাব আর রূপবতী নারীও এতটা প্রিয় নয় …

সায়্যিদ আহমদ
সালারে আলা
লশকরে মুহাজিদীন

 মহারাজা রঞ্জিৎ শিং যেন আগুনের অঙ্গার হয়ে উঠলেন। মুহাফিজদের হাত চলে গেলো কোমরে বাঁধা তলোয়ারের ওপর। দরবারীরা দাঁড়িয়ে গেলো চরম উত্তেজিত হয়ে। হিম্মতখানের মুখে তার স্বভাবজাত হাসিটি ঝুলে রইলো। দরবারীদের নীরব হম্বিতম্বি তার গায়ে সামান্য আচরও কাটতে পারলো না। রঞ্জিৎ শিং দেখলেন, দরবারীদের চেহারা থমথম করছে। সবার হাত তলোয়ারের ওপর শক্ত হয়ে আছে। শুধু একজন শিখ-এর ব্যতিক্রম। যার চেহারা ছিলো ভাবলেশহীন। তিনি এমনভাবে বসেছিলেন যেন এর সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। তিনি হলেন কেল্লাদার উধাম শিং।

এই ছেলে অনেক দূর থেকে এসেছে– রঞ্জিৎ শিং কর্কশ গলায় বললেন এজন্য আমি ওর মার প্রতি রহম করছি। তাকে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেয়া হবে। তবে তার মাথার চুল, দাড়ি, গোঁফ কামিয়ে তাকে লাহোর থেকে বের করে দাও।

কাহেন শিং সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে হিম্মতখানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। কোষ থেকে তলোয়ারটি ছিনিয়ে নিলো। পাঁচ ছয়জন মুহাফিজ হিম্মতখানকে ঘেরাও করে ধাক্কাতে ধাক্কাতে দরবার থেকে বের করে নিয়ে গেলো।

সায়্যিদ আহমদ! রঞ্জিৎ শিং বিদ্রূপ করে বললেন- আহ … হাহ! সায়্যিদ আহমদ, … এই জাযাবর মুসলমানরা বরবাদ হয়ে গেলো। কিন্তু এখনো তাদের মাথা থেকে হিন্দুস্তানের বাদশাহীর ভূত নামলো না। মোল্লাদের মতো ওয়াজ করনেওয়ালা সায়্যিদ আহমদ শিখ রাজাদের সঙ্গে লড়তে এসেছে। ওকে কেউ কি বলেনি যে, এখন রাজত্ব করবে শুধু শিখ রাজারা?

মহারাজা! উধাম শিং গম্ভীর গলায় বললেন–না দেখে যাচাই না করে দুশমনকে দুর্বল মনে করা ঠিক নয়। কাসেদ এসেছে নও শহরা থেকে। এর অর্থ হলো, মুসলমান লশকর নও শহরা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সায়্যিদ আহমদ সম্ভবত ঠিকই লিখেছেন যে, পুরো ইয়াগিস্তান তার সঙ্গে আছে …

আমি এও জানতে পেরেছি, হিন্দুস্তান ও পাঞ্জাবের মুসলমানরাও নও শহরা ও পেশোয়ার যাচ্ছে। সায়্যিদ আহমদ তাদের মধ্যে নতুন কোন প্রাণের সঞ্চার করেছেন যেন। ওখানে গিয়ে আমাদের অবরোধের মতো অবস্থান নেয়া উচিত। না হয় শিখ রাজ্য বেশি দিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। আর আমাদের উচিত মুসলমানদেরকে আকোড়া ও নও শহরার পাহাড়ে লড়ানো। যদি ওরা লাহোরের ময়দানে আসার সুযোগ পায়, লড়াই তাদের জন্য সহজ হয়ে উঠবে এবং আমাদের জন্য ওরা কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে। যা করার এখনই করতে হবে।

বুধ শিং এখন কোথায় আছে? রঞ্জিৎ শিং জিজ্ঞেস করলেন- তার সঙ্গের সৈন্য সংখ্যা কত?

তিনি নদীর এপারে- দেওয়ান উঠে জবাব দিলো তার সঙ্গে আছে সাত হাজার সৈন্য।

যথেষ্ট। উন্নত জাতের মোড়ায় করে এখনই কাসেদ পাঠিয়ে দাও। সে যাতে বুধ শিংকে এই পয়গাম দেয় যে, এখনই আকোড়া পৌঁছে যাও এবং সুবিধাজনক কোথাও ছাওনি ফেলল। তবে সৈন্যদের সব সময় প্রস্তুত রাখতে হবে। সেখানে আমাদের ওফাদার কোন মুসলমানকে পাঠিয়ে জেনে নিতে হবে সায়্যিদ আহমদের সৈন্যসংখ্যা কত? হামলার ব্যাপারে বুধ শিং নিজেই সিদ্ধান্ত নিবে এবং সায়্যিদ আহমদকে তার লশকরসহ খতম করে দেবে।

***

কাহেন শিং হিম্মত খানকে নিয়ে যাচ্ছিলো। সঙ্গে আছে আরো দুতিনজন সিপাহী। হিম্মতখান এখন নিরস্ত্র। হিম্মতখানের ওপর রাগে জ্বলে যাচ্ছিলো কাহেন শিং। কারণ, প্রথমে কেল্লায় প্রবেশের সময় তাকে বলার পরও তার তলোয়ার কাহেন শিং-এর কাছে হাওলা করেনি।

সে এক সিপাহীকে হুকুম দিলো, ওকে বড় ফটকের দিকে নিয়ে যাও। আর আরেকজন গিয়ে নাপিতকে নিয়ে এসো।

এসব কথায় হিম্মত খানের কোন ভাবান্তর হলো না। নির্বিকার-নিস্পৃহ মুখে শিখদের বেষ্টনীতে হাটছিলো হিম্মত খান। কাহেন শিংয়ের হয়রানির শেষ ছিল, হিম্মত খান কেন তার কাছে অনুনয়, বিনয় করছে না যে, তার চুল দাড়ি যেন না ফেলা হয়।

আরে এ দেখি মিটি মিটি হাসছেও। বেটা তো দেখি মহা শয়তান!

আরে ঐ মুসলে (মুসলমানের বাচ্চা)! কাহেন শিং হিম্মতখানের পেটে খোঁচা দিয়ে বললো– মহারাজার কাছে মাফ চাইলি না কেন? আমার পায়ে পড়ে যা। তোকে মাফ করে কেল্লার বাইরে সসম্মানে পাঠিয়ে দেবো।

হিম্মত খান হেসে বললো– আল্লাহর পথে আমাদের হাত পা কেটে গেলেও আফসোস করি না আমরা। আর আমার মাথার তুচ্ছ চুলের জন্য তোমার মতো এক গর্দভের কাছে মাফ চাইবো!

কাহেন শিং পেরেশান হয়ে গেলো। খুব কষ্ট করে নিজের হাত সংযত রাখলো। এই মুসলের যে সাহস। তারপর আবার দূত হয়ে এসেছে। একে কিছুই বলা যাচ্ছে না। রাখ শালা, নাপিত এনে নাপিতকে বলে দেবে। তোর মাথার চুল কাটার সময় যেন মাথাটা আঁচড়ে দেয়। এসব সে মনে মনে বললো, মুখে কিছুই বললো না।

কাহেন শিং ফটকের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো এবং এক সিপাহীকে নাপিত ডেকে আনার জন্য পাঠিয়ে দিলো। কেল্লার ফটক খুললো। ভেতরে দুজন সওয়ারী এসে ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ালো। আর ঘোড়া দুটি ওখানেই দাঁড় করিয়ে রেখে কিছু জিজ্ঞেস করতে প্রহরীর দিকে এগিয়ে গেলো। ফটক খোলাই রইলো। কারণ, বাহির থেকে দুটি গরুর গাড়ি ভেতরের দিকে আসছিলো।

কাহেন শিং গরুর গাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলো। হিম্মত খান দেখলো, কাহেন শিং-এর মনোযোগ এখন অন্য দিকে। এই সুযোগ। মুহূর্তেরও কম সময়ে কাহেন শিং-এর চোয়ালে ও পেটে দুটি দশাসই ঘুসি পড়লো।

ওরে বাবারে বলে কাহেন শিং চিত হয়ে পড়ে গেলো সঙ্গে সঙ্গেই, আর হিম্মত খান তখন উঠে গিয়ে একটি ঘোড়ায় গিয়ে চড়লো এবং সজোরে ঘোড়ার পেটে খোঁচা দিলো। ঘোড়া এক লাফে ফটক পেরিয়ে ছুটতে শুরু করলো উধ্বশ্বাসে।

কাহেন শিং হাউমাউ করে উঠলো, কে কোথায় আছিসরে! ঐ সিপাহীরা! ঐ মুসলমানের বাচ্চা পালালো যে! সিপাহীরা দৌড়ে এসে এই দৃশ্য দেখে দ্বিধায় পড়ে গেলো, কাহেন শিং-এর এমন মজাদার তামাশা দেখবে, না ঘোড়ায় চড়ে মুসলমানের পিছু নেবে। কাহেন শিং-এর রক্ত চক্ষু দেখে তাড়াতাড়ি দুই সিপাহী ঘোড়ায় চড়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো। কিন্তু হিম্মত খান ততক্ষণে অনেক দূরে চলে গেছে।

হিম্মতখান ঘোড়া ছুটাচ্ছিলো ঠিক; কিন্তু সে নিরাপদ ছিলো না। একে তো সে নিরস্ত্র ছিলো। দ্বিতীয়ত শিখদের কাছে দূর পাল্লার রাইফেল ছিলো। তার পিছু ধাওয়াকারীরা তাকে গুলি করে ফেলে দিতে পারে। যদিও সাধারণ সিপাহীদের কাছে তখন রাইফেল দেয়া হতো কম, তাই সে নিয়মিত রাস্তা থেকে সরে জঙ্গলের পথে ছুটতে লাগলো। রাবী পর্যন্ত পুরো এলাকাটাই ঘন জঙ্গলে ছাওয়া ছিলো তখন।

শীতের মৌসুম হওয়াতে যেখানে নদীর প্রান্ত চওড়া সেখানে পানির গভীরতা অনেক কম। হিম্মত খান দক্ষিণ দিক ঘুরে গিয়ে ঘোড়া নদীতে নামিয়ে দিলো। পানি ঘোড়ার হাঁটু পর্যন্তও পৌঁছছিলো না। নির্বিঘ্নে নদী পার হয়ে আবার উধ্বশ্বাসে ঘোড়া ছুটালো। তার সামনে এখন বড় লম্বা সফর।

***

অটাক থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত পুরো এলাকায় ছিলো শিখদের শাসন ক্ষমতা। আসলে এ ছিলো জুলুম, অত্যাচার আর লুটপাটের রাজত্ব। শিখেরা তাদের এলাকাগুলো ত্যাগ করে ঠিকাদারির ভিত্তিতে কিছু বদ লোকদের দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলো। ঠিকাদাররা গরীব প্রজাদের কাছ থেকে অর্থকরি নিয়ে ফসল ফলাদিরও খাযনা আদায় করতে আর শিখদের ধনভাণ্ডার ভরে তুলতো। জায়গায় জায়গায় শিখ ফৌজ মোতায়েন থাকতো।

যেখানেই প্রজারা অতিষ্ঠ হয়ে বিদ্রোহ করতে চেষ্টা করতে শিখ ফৌজ তাদের ওপর টুটে পড়তো। কোন মুসলমানই সেখানে নিরাপদে থাকতে পারতো না। মুসলিম মেয়েদের আবরু ইজ্জত শিখদের কাছে যিম্মি হয়ে পড়েছিলো। মুরগির খোয়াড়ের মতো মেয়েদের ঘরের ভেতর ভরে রাখতে হতো। শিখ ফৌজের ঘোড়ার দানা পানির রহস্যও প্রজাদের ফসলি যমিন কেটে নিয়ে যাওয়া হতো। এজন্য লোকেরা আনাজ-তরকারি বাড়ির পেছনে গর্ত খুড়ে তাতে লুকিয়ে রাখতো।

পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ শত্রুতা পোষণ ও ক্ষমতার লড়াই ইত্যাদি কারণে মুসলমানরা শিখ ও পাঠানদের হাতে নিগৃহীত হচ্ছিলো। এমনকি চারদিক থেকে কোণঠাসা হওয়ার পরও তারা ঐক্যের পথে অগ্রসর হয়নি। বরং একে অপরের ওপর ক্ষমতাবল প্রয়োগের জন্য শিখদের পা চাটা শুরু করে দিলো। শিখদের জন্য এছিলো না চাইতেই হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। তারা পাঠান মুসলমানদের মধ্যে চোরা বিশ্বাস ঘাতক আর গাদ্দার তৈরী করতে পারলো খুব সহজে।

শত্রুতা আর চাটুকারিতার প্রতিযোগিতা ছিলো সরদার ও নেতৃস্থানীয়দের কাজ। কিন্তু এর শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছিলো সাধারণ লোকদের। পাঠান মুসলমানরা শিখদেরকে নিজেদের শাসক হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলো না কোন ক্রমেই। কিন্তু ঐক্য ও সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া জুলুম অত্যাচার সহ্য করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না।

এ অবস্থায় সে এলাকায় এলেন সায়্যিদ আহমদ শহীদ। তিনি দেখলেন, দুশমনের অনবরত জুলুম অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে লোকজন নিজেদের পরিবার পরিজন নিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে গিয়ে আত্মগোপন আর জাযাবরের জীবন যাপন করছে। লোকদেরকে তিনি শিখদের বিরুদ্ধে ঐক্যের পথে আসার দাওয়াত দিলেন। মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পেলো। মসজিদ থেকে আবার কালেমা ও আযানে সুর মাধুরী ভেসে আসতে লাগলো।

***

হিম্মত খান যখন নওশহরা পৌঁছলো তখন তার অবস্থা মুমূর্ষ প্রায়। তার চেহারা মরা লাশের মতো ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করেছিলো। তাকে তখনই সায়্যিদ আহমদ শহীদের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। হিম্মত খনি হাঁপাতে হাঁপাতে ক্ষীণ কণ্ঠে জানালো রঞ্জিৎ শিং তার পয়গামের সঙ্গে ও তার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন। সায়্যিদ আহমদ আগে হিম্মত খানের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। তারপর ফৌজকে লড়াইয়ের জন্য তৈরী হওয়ার হুকুম দিলেন।

সেদিনই অটাকে বুধ শিং-এর ছাউনিতে লাহোর থেকে এক কাসেদ পৌঁছলো। পয়গামে বুধ শিংকে মহারাজা রঞ্জিৎ শিং হুকুম দিয়েছেন যে, সায়্যিদ আহমদ ও তার দলবলকে কোন সুযোগ না দিয়ে মৃত্যুর ঘাটিতে পৌঁছে দাও। আর যদি ওরা ফৌজের মতো প্রস্তুত হয়ে থাকে তাহলে হামলা করে খতম করে দাও ওদের।

অবশ্য এর আগে বুধ শিংও লাহোরে রঞ্জিৎ শিং-এর কাছে এক পয়গাম পাঠায়। লাহোরের কাসেদ বুধ শিং-এর কাছে পৌঁছার পরই বুধ শিং-এর কাসেদ লাহোরে রঞ্জিৎ শিং এর দরবারে পৌঁছে যায়।

পয়গামে লেখা ছিলো, সায়্যিদ আহমদ তার বাহিনী নিয়ে নওশহরা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আমাদের ওয়াফাদার মুসলমান সরদাররা তার ব্যাপারে আমাকে যে খবর দিয়েছে এতে আমরা তাকে সাধারণ লোক বলে মনে করতে পারি না। আবার তাকে বড় কোন দরবেশ বা সুফীও বলতে পারবো না। আমাকে বলা হয়েছে, তিনি খুব যুদ্ধবাজ লোক, কাবুল কান্দাহার ও আশপাশের এলাকায় তিনি তার যুদ্ধ-নৈপুণ্যের চমৎকার ঝলক দেখিয়েছেন। গুপ্তচররা আমাকে জানিয়েছে, সায়্যিদ আহমদ আপনার দরবারে এক পয়গাম পাঠিয়েছে। যদি আপনি সে পয়গাম গ্রহণ করেন তাহলে তা শিখ সাম্রাজ্যের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। আর যদি কাসেদকে প্রত্যাখ্যান করেন তাহলে মুসলমানরা সায়্যিদ আহমদের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে আমাদের ওপর হামলা করে বসবে। পাঠানরাও সেই ঝাণ্ডার নিচে সমবেত হচ্ছে।

বুধ শিং পয়গামে জানালো, আঁকোড়ার রঈস আমীরখান আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে। কিন্তু তার ভাই ফায়রুজখানের ছেলে খাসখান আবার আমীর খানের বিরোধী। তিনি আমাকে আকোড়া ডাকিয়েছেন। তিনি চাচ্ছেন। আমি আমার সেনাবাহিনী নিয়ে যেন আকোড়ার কাছে ছাউনি ফেলি এবং তার চাচা আমীর খান ও সায়্যিদ আহমদকে সেখানেই খতম করে দেই। এজন্য মহারাজার কাছে আমার আবেদন, অতি সত্বর যেন লাহোর থেকে সেনা সাহায্য পাঠানো হয়। কারণ, সায়্যিদ আহমদের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় যদি আমাদের ওয়াফাদার কোন পাঠান সরদার মুসলমানদের সঙ্গে হাত মিলায় তাহলে আমরা বড় বিপদে পড়ে যাবো। তখন অতিরিক্ত সৈন্য না থাকলে আমরা খতম হয়ে যাবো।

মহারাজা রঞ্জিৎ শিং তখনই লাহোরের কেল্লাদার উধাম শিং ও আরেক কমাণ্ডার হরি শিংকে ডেকে আনলেন। তাদেরকে বুধ শিং-এর পয়গাম শুনিয়ে হুকুম দিলেন, তারা যেন অতি ক্ষিপ্রগতিতে প্রয়োজনীয় সৈন্য নিয়ে আকোড়া রওয়ানা হয়ে যান।

সায়্যিদ আহমদ যখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির হুকুম দিচ্ছিলেন বুধ শিং তখন আকোড়ার কাছে পৌঁছে গেছে। আর উধাম শিং ও হরি শিং তাদের বাহিনী নিয়ে অটাকের কাছের এক নদী অতিক্রম করছিলেন।

***

সায়্যিদ আহমদ শহীদের জন্য এজায়গাটি নতুন। লোকেরা তার আহ্বানে তার ঝাণ্ডাতলে সমবেত হচ্ছিলো। কিন্তু তিনি সতর্কও ছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন, এদের মধ্যে সন্দেহভাজন ও গাদ্দার থাকতে পারে। যখন উভয় পক্ষ তীব্র লড়াইয়ে নেমে পড়বে তখন যেন এক মুসলমান আরেক মুসলমানের পিঠে খঞ্জর না চালায়- সায়্যিদ আহমদ এটাই চাচ্ছিলেন না। এজন্য নতুন লোকদের যাচাই বাছাইয়ে অনেক সময় চলে যায়।

ফৌজ প্রস্তুত মোটামুটি করে ফেললেন হযরত সায়্যিদ আহমদ। ঐতিহাসিকদের মতানুযায়ি এর সৈন্যসংখ্য ছিলো কেবল দেড় হাজার। শিখ সৈন্য ছিলো প্রায় দশ হাজার। এর মধ্যে উধাম শিং ও হরি শিং-এর সেনাদলও ছিলো।

সায়িদ আহমদ তার এই অল্প সংখ্যক সৈন্যদলকে যুদ্ধের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ি চার ভাগে ভাগ করলেন। ডান ব্যুহের কমাণ্ডার ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ (রা)। বাম ব্যুহের কমাণ্ডার সায়্যিদ মুহাম্মদ ইয়াকুব। তবে আকুড়ার যুদ্ধে সায়্যিদ ইয়াকুব থাকতে পারেননি। তার স্থলে নেতৃত্ব দেন সহকারী কমাণ্ডার শায়েখ বাতান। অগ্র বাহিনীর কমাণ্ডার ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল। আর চতুর্থ পদাতিক বাহিনীর কমাণ্ডার ছিলেন আল্লাহ বখশ খান। তিনি জমাদার আল্লাহ বখশ নামে পরিচিত ছিলেন।

১৮২৬ সালের ২১ ডিসেম্বর (১২৪২ হিজরীর ২০ জমাদিউল আউয়াল) সায়্যিদ আহমদ শহীদ এই চার কমাণ্ডারকে নিয়ে আলোচনা সভা করেন। বৈঠক শুরু হয় জোহরের নামাযের পর।

***

এই বৈঠকে চার কমাণ্ডার ছাড়াও অন্যান্য সেনা উপদেষ্টারাও উপস্থিত ছিলেন, সায়্যিদ আহমদ শহীদ উপস্থিত সমবেতদের উদ্দেশ্যে বলেন–

আমাদের গুপ্তচররা খবর দিয়েছে, শিখেরা সংখ্যায় প্রায় দশ হাজার। ওরা ওদের ছাউনির আশেপাশে পাথরের দেয়াল দাঁড় করিয়ে রেখেছে। এরা একে বলে সঙ্গর। এর সঙ্গে এর আশেপাশে কাটাদার ঝোঁপ-ঝাড় দিয়ে এমনভাবে বেষ্টনী তৈরী করে রেখেছে যে, ঘোড়াও সেখান দিয়ে যেতে পারবে না। শিখেরা তাদের তাঁবু এভাবে সংরক্ষণ করে থাকে। আবার তাদের ছাউনির আরেক দিকে আছে নদী।…

অথচ আমাদের মোট সৈন্যসংখ্যা দেড় হাজার মাত্র। মহান আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের ঐ ফরমানের কথা স্মরণ করুন যে- যদি ঈমানদাররা দৃঢ় পদ থাকে তাহলে তোমাদের বিশজন তাদের দুইশ জনের ওপর বিজয় লাভ করবে। মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা সব সময়ই কম ছিলো। এই অপূর্ণতা পূরণ করতে হবে ঈমানী শক্তির তীব্রতা দিয়ে …

আপনারা সবাই হয়তো ভেবে থাকবেন এত অল্প সংখ্যক সৈন্য এত বড় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করতে পারবে না। এজন্য আমাদের নৈশ হামলা ও গুপ্ত হামলা চালাতে হবে। গুপ্ত হামলা চালিয়েই আমাদের এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়তে হবে গেরিলা হামলার পদ্ধতিতে। আপনাদের মধ্যে কে। আজ রাতে গুপ্ত হামলা চালাতে প্রস্তুত।

কে ছিলো এমন যে বলবে সে প্রস্তুত নয়। কিন্তু সায়্যিদ আহমদ শহীদের দৃষ্টি পড়লো জমাদার আল্লাহ বখশের ওপর। জমাদার আল্লাহ বখ্শ হিন্দুস্তানের আনাও জেলার লোক। তিনি ইংরেজ সেনাবাহিনীতে জমাদার ছিলেন। সায়্যিদ আহমদ শহীদের তাহরীকে মুজাহিদীনের ঝাণ্ডা যখন উচ্চকিত হচ্ছিলো তখনই জমাদার আল্লাহ বখশ এসে তার হাতে বায়আত হন।

প্রিয় মুজাহিদীন! সায়্যিদ আহমদ শহীদ বললেন– খোদায়ে যিলজাল আমাদের নিয়ত ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানেন। আমরা আমাদের ব্যক্তিগত শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দেশ ত্যাগ করিনি। আমরা ইসলামের নির্দেশিত শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দেশ ত্যাগ করেছি। হিন্দুস্তানকে কুফরের অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করতে হবে।

এখানে যারা উপস্থিত ছিলো তাদের জন্য এ ধরনের ওয়াজের প্রয়োজন ছিলো না। তারা ঘর থেকে বেরই হয়েছে প্রাণ বিসর্জন দেয়ার জন্য। বৈঠকে বসার পূর্বে তারা সায়্যিদ আহমদের পেছনে জোহরের নামায আদায় করে। তারা যখন দুআর জন্য হাত উঠালো তাদের চোখগুলো অশ্রুতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো। মুক্তাদীরা জানতো, তাদের ইমাম আল্লাহর দরবারে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন এবং বিজয় ভিক্ষা চাইছেন। অনেক মুক্তাদীর চোখও অশ্রু বন্যায় ভেসে গেলো।

বৈঠকে সায়্যিদ আহমদ শহীদ ঈমানদীপ্ত বক্তৃতার পর জমাদার আল্লাহ বশকে গুপ্ত হামলা সম্পর্কে কিছু দিক নির্দেশনা দিলেন। কিছু আলোচনা পর্যালোচনার পর গুপ্ত হামলার স্কিম তৈরী হয়ে গেলো কতজন গুপ্ত হামলায় যাবে তাও ঠিক করা হলো। এর মধ্যে হিম্মত খানও ছিলো। হিম্মত খান স্বেচ্ছায় এই গেরিলা দলে যোগ দেয়। মহারাজা রঞ্জিৎ শিং-এর দরবারে ওর সঙ্গে যে অপমানজনক আচরণ হয়েছে এর পতিশোধ নেয়ার জন্য সে অধীর হয়ে ছিলো। লাহোর থেকে ফিরতি সফর তার জন্য বড়ই কঠিন ছিলো। অনবরত ঘোড় সওয়ারি, বিশ্রামহীনতা ও কয়েক দিনের ক্ষুধার্ত অবস্থা তার কোমর ভেঙ্গে দিয়েছিলো। কিন্তু তার পরও সে অনেক বলে কয়ে গুপ্ত হামলায় নিজের নাম লেখাতে সমর্থ হয়।

***

আরে মুসলমানরা সংখ্যায় এত নগণ্য যে, আমাদের ছায়ারও তো মোকাবেলা করতে পারবে না ওরা।

আকোড়ার নিকটবর্তী ছাউনিতে রাতে হরি শিং, বুধ শিং ও উধাম শিং এসব বলাবলি করছিলো। ওদের আওয়াজ বলে দিচ্ছিলো, ওরা মদের নেশায় চুর হয়ে যাচ্ছে।

হরি শিং বলে উঠলো– বুধ শিং তুমি তো সায়্যিদ আহমদের নাম শুনে ভয় পেয়ে গিয়েছিলে। না হলে কি আর সেনা সাহায্য চেয়ে পাঠাও!

আরে হরি শিং! বুধ শিং হরি শিং-এর রানে চাপড় মেরে বললো- ঠিক আছে লড়াই না হলেও কিছু দিন তো এখানে মৌজ করে যেতে পারবে। আর আমি সায়্যিদ আহমদের নাম শুনে ভয় পায়নি … তুমিও ভেবে দেখো … এই মুসলে (মুসলমান শালারা) … এদের ওপর ভরসা করা যায় নাকি? … শালারা অনেক দিন এদেশে হুকুমত করেছে। এরা যদি একবার উঠে দাঁড়াতে পারে তাহলে না হরি শিং থাকবে না থাকবে বুধ শিং। তোমাদের মহারাজা রঞ্জিৎ শিং তো মুসলমানদের কিছুই মনে করছে না।

কাছে বসে উধাম শিং হাসছিলেন। তিনিও বললেন, মুসলমানরা যদি নিজেদের আত্মহত্যা করতে না চায় তাহলে এই সামান্য সংখ্যক ফৌজ নিয়ে আমাদের মোকাবেলা করতে আসবে না।

এই শিখ কমাণ্ডাররা যখন মদের নেশায় পুরো মাতাল হয়ে আবোলতাবল বকছিলো তখন শিখ ছাউনির পাথর বেষ্টনী ও কাটাদার ঝোঁপের আড়াল থেকে এক নওজোয়ান তাঁবুগুলোর ভেতরে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছিলো। কখনো পায়ের পাতার ওপর দাঁড়িয়ে কখনো চাপা পায়ে পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে তাঁবুর ভেতরে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছিলো সে। রাতের জমাট অন্ধকারে কিছুই তার চোখে পড়ছিলো না। পুরো তাবুপল্লী নীরব- শব্দহীন। এ ছিলো গভীর ঘুমের আলামত। কখনো ঘোড়ার আওয়াজ কখনো প্রহরীর বুটের খট খট খট আওয়াজ সেই নিঃশব্দ ভেঙ্গে দিচ্ছিলো। আবার সব নীরব হয়ে যাচ্ছিলো।

এই নওজোয়ান শিখ পুরো তাঁবু ছাউনির আশপাশ ঘুরে যেদিক থেকে এসেছিলো সেদিকে চলে গেলো। কিছু দূর যাওয়ার পর সে আওয়াজ শুনতে পেলো- এসে গেছে হিম্মত খান?

সে আওয়াজ লক্ষ্য করে এগিয়ে গেলো।

নওজোয়ান শিখ নয়, হিম্মত খান। শিখদের ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলো। শিখ হিসেবে ওকে চমৎকার মানিয়েছিলো। শিখের ছদ্মবেশে সে দুশমনের ছাউনি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়েছিলো। তার অপেক্ষায় জমাদার আল্লাহ বখশ এখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হিম্মত খান জমাদার আল্লাহ বখশকে ছাউনির বিস্তারিত অবস্থা জানালো এবং বললো, হামলার জন্য পরিবেশ বেশ চমৎকার।

এর আগে এই গুপ্ত হামলাকারী জানবাজরা স্থানীয় পাঠানদের সাহায্যে ছোট ছোট নৌকায় নদী পার হয়। কারণ, শুকনো পথে জায়গায় জায়গায় শিখসৈন্যরা টহল দিচ্ছিলো। আর সংখ্যায়ও তারা ছিলো অনেক। এজন্য নদী পথ ছাড়া উপায় ছিলো না। নদী পার হয়ে হিম্মত খানকে দুশমনের তাঁবুপল্লীর অবস্থা দেখে আসার জন্য পাঠানো হয়। হিম্মত খান কাটাদার ঝোঁপঝাড় ও পাথর দেয়ালের বেষ্টনীর মধ্যেও একটা জায়গা আবিষ্কার করে, যেখান দিয়ে ভেতরে যাওয়া যাবে।

জামাদার আল্লাহ বশ তার জানবাজ নৈশ হামলাকারীদের শেষ দিকনির্দেশনা দিলেন–

আমরা সবাই পরস্পরকে পরস্পরের মনোমালিন্য, দুঃখ কষ্ট মাফ করে দিলাম। আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, কে জীবিত ফিরে আসতে পারবে। শুধু এটা মনে রাখবে, আজকের এই গুপ্ত হামলা তোমাদের আখেরী ফরজ শেষ কর্তব্য। এরপর তোমরা আল্লাহর দরবারে চলে যাবে। এখন এই ফয়সালা নিজেরা করে নাও আল্লাহর সামনে আনন্দচিত্তে উপস্থিত হবে, না কর্তব্যে অবহেলা করে অভিশপ্তরূপে নিন্দিত হয়ে যাবে!

কারো মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ বের হলো না। কারণ, তাদের নীরবতা বজায় রাখার জন্য কঠিন নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। তারা আল্লাহু আকবার শ্লোগান বুকের মধ্যে এমনভাবে চেপে ধরে রেখেছিলো যেমন করে খাঁচায় প্রতাপশালী উন্মত্ত কোন প্রাণী বন্দি করে রাখা হয়। আর সে খাঁচা ভাঙ্গার জন্য খাঁচার শিকে থাবা মারতে থাকে।

***

দশ হাজার শিখের তাঁবু পল্লী মরণ ঘুমে বেহুশ হয়েছিলো। দেশী মদের কড়া ঝাঁজ তাদেরকে গভীর ঘুমের দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলো। মদ ছাড়া শিখেরা এমন অথর্ব হয়ে পড়ে যেমন পানি বিহীন চারা নেতিয়ে পড়ে। এজন্য শিখদের পানির আগে দেয়া হয় মদ। মদের তোড়ে নেশাকাতর হয়ে তারা লড়াই করে।

নৈশ প্রহরীরা জেগে ছিলো। তারা টহল দিচ্ছিলো। ও দিকে হিম্মত খানের পেছন পেছন নৈশ হামলাকারীরা ছাউনির পাথর বেষ্টিত ঐ স্থানে পৌঁছলো যেখান দিয়ে ভেতরে যাওয়ার কথা ছিলো। জমাদার আল্লাহ বখশ সে জায়গাটা দেখলেন এবং পাথর বেস্টনের বাইরের কাটাদার ঝোঁপঝাড় এক দিকে ঠেলে দিলেন। সেখান দিয়ে দুজন জানবার্য হাল্কা পায়ে ভেতরে লাফিয়ে পড়লো। এরা ভেতরের ঝোঁপগুলো সরিয়ে দিলো।

এবার আরো কিছু জানবায ভেতরে চলে গেলো। চারজন তলোয়ার তাক করে এক জায়গায় লুকিয়ে পড়লো। যাতে কোন প্রহরী আসলে তাকে নিঃশব্দে খতম করা যায়। হিম্মত খান যখন একলা এসেছিলো তখন এটা দেখতে পায়নি যে, প্রহরীদের হাতে কোন ধরনের অস্ত্র রয়েছে। তাদের কাছে বর্শা নয়, ছিলো দুইনলা বন্দুক।

জানবাদের পুরো দল একে একে ভেতরে চলে গেলো। তারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তাঁবুগুলোর রশি কেটে দিলো এবং ওপর থেকে বর্ষ মারতে লাগলো। তাবুর নিচে চাপা পড়া শিখেরা মরণ চিৎকার ছাড়া আর কিছুই করতে পারছিলো না। হাঙ্গামার আওয়াজ শুনে এক প্রহরী বন্দুক দিয়ে এদিকে ফায়ার করলো, সবগুলো গুলি মাওলানা বাকের আলী আজীম আবাদীর বুকে গিয়ে গাঁথলো। তিনি বুক চেপে ধরে উঁচু গলায় আওয়াজ দিলেন

বন্ধুরা! আমার কাছ থেকে হাতিয়ার নিয়ে নাও। এটা আল্লাহ তাআলার আমানত। দুশমনের হাত যেন এতে না লাগে- তিনি পড়ে গেলেন এবং শহীদ হয়ে গেলেন।

এই গেরিলা হামলার তিনি ছিলেন প্রথম শহীদ।

এরপর ভেঙ্গে পড়তে লাগলো এক গজবের পাহাড়। চার দিকে কেয়ামতের বিভীষিকা জ্বলে উঠলো। মুজাহিদরা তাঁবুর রশি কাটতে লাগলো আর বর্শা মারতে লাগলো পড়ন্তু তাঁবুতে। জানবাদের এক দল এক তাঁবুতে আগুন লাগিয়ে দিলো। দশ হাজার শিখের এই বিশাল সেনাবাহিনী। হড় বড় করে জেগে উঠলো। কিন্তু কয়েকশত জাগার আগেই চির নিদ্রায় চলে গেলো। সঙ্গীদের আর্তনাদ ত্রাহি ত্রাহি আওয়াজ এবং আল্লাহু আকবারের গর্জন শুনে তারা পালানো ছাড়া আর কোন কিছুই ভাবতে পারছিলো না।

খুব কম শিখই ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করলো। তারা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হলো ঠিক। কিন্তু লড়বে কার সঙ্গে। সেখানে পলায়নপর শিখ ছাড়া আর কাউকেই তাদের চোখে পড়ছিলো না।

জমাদার আল্লাহ বশের নজর ছিলো শিখদের তোপখানার দিকে। তার সঙ্গে কয়েকজন জানবায পৃথক করে রেখে ছিলেন। তাদেরকে নিয়ে এক শিখ অফিসারকে পাকড়াও করলেন। তোপের মজুদ কোথায় এটা জানানোর বিনিময়ে তাকে প্রাণে বাঁচিয়ে দেবেন। এভাবে তার কাছ থেকে ওয়াদা নিলেন। শিখ অফিসার তাকে তোপের মজুদ যে তাঁবুতে ছিলো সেদিকে নিয়ে গেলো। আল্লাহ বখশ তাকে ভাগিয়ে দিলেন। এই তোপগুলো এখন মুজাহিদদের।

একটু পরই তাবু পল্পীর কয়েক জায়গায় আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলে উঠতে দেখা গেলো। ঘোড়ার ভয়ার্ত চিহি চিহি রব পরিবেশ আরো ভয়ংকর করে তুললো। ছাড়া ছাড়া গুলিও চলতে লাগলো।

***

জমাদার আল্লাহ বখশ দেখলেন, যে উদ্দেশ্যে এই গেরিলা হামলা চালানো হয়েছে তার সে উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হয়েছে। তাই তিনি কয়েকজন কাসেদকে বললেন, চিৎকার করে করে মুজাহিদদের ডেকে বলল, তাঁবু পল্লী থেকে বের হয়ে নদীর তীরে পৌঁছতে। জমাদার নিজেও উঁচু আওয়াজে নির্দেশ দিতে লাগলেন। কিন্তু মুজাহিদরা নিজেদের সফলতায় এতই পরিতৃপ্ত ছিলো যে, কারো কোন দিক নির্দেশনা মানছিলো না।

দশ হাজার সৈন্যের ছাউনির পরিধি ছিলো দুই মাইল এলাকা জুড়ে। হাজার হাজার ঘোড়া, গরু, মহিষ ও এগুলোর গাড়ি, হাতিয়ার, বন্দুক, বারুদ এসব মুজাহিদরা একত্রিত করছিলো।

অবশেষে আকবর খান নামে সহকারী এক কমাণ্ডারের প্রচেষ্টায় মুজাহিদদের তবু পল্লী থেকে বের করা সম্ভব হলো। তখনো বন্দুকের ফায়ার হচ্ছিলো। কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন লড়াই হচ্ছিলো।

জমাদার আল্লাহ বশ মুজাহিদদের তাঁবু পল্লী থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার জন্য ছুটাছুটি করছিলেন। হঠাৎ এক বন্দুকের ফায়ার তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিলো। তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে সহকারী কমাণ্ডার আকবর খান মুজাহিদদের নেতৃত্ব নিয়ে নিলেন নিজ হাতে।

ফজরের সময় মুজাহিদরা তাঁবু পল্লী থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে চলে গেলো। একটি ফাঁকা জায়গায় সবাই ঘোড়া থামালো। তারা প্রথমে যে কাজটা করলে সেটা হলো, প্রথমে আযান দিয়ে সবাই ফজরের নামায আদায় করলো। তারপর শহীদদের মাগফিরাত কামনা করে দুআ করা হলো। ফজরের জামাআতে যারা অনুপস্থিত ছিলো তাদের মধ্যে হিম্মত খানও ছিলো। তার ব্যাপারে সাবই ধরে নিলো সে শহীদ হয়ে গেছে।

কমাণ্ডার উধাম শিং-এর তাবু ছিলো একটু দূরে। হামলার আওয়াজ শুনে তিনি হড়বড় করে উঠলেন। সে অবস্থাতেই বাইরে বেরিয়ে এলেন। ভয়ে তিনি কেঁপে উঠলেন। তার দশ হাজার ফৌজকে পাইকারী দরে হত্যা করা হচ্ছিলো। তিনি বুধ শিং ও হরি শিং-এর তাঁবুর দিকে দৌড়ে গেলেন, কিন্তু তাদের তাবু খালি ছিলো। তিনি তো জানতে পারলেন না, মুসলমানদের এই হামলা দেখে তারা ভেবেছে বিরাট এক সৈন্য বাহিনী শিখদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এখন প্রাণ বাঁচানো ছাড়া আর কিছুই করা যাবে না।

উধাম শিং দেখলেন তার ফৌজ সমানে কচু কাটা হচ্ছে। তার করার কিছুই ছিলো না। তিনি কমাণ্ডও নিতে পারছিলেন না। পালাতেও চাচ্ছিলেন না তিনি। তিনি জানতেন, কোন ফৌজের যখন এ অবস্থা হয় তখন কমাণ্ডার তাদেরকে নিজ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে না।

তিনি তার অস্ত্রও কোষমুক্ত করলেন না। একদিকে হাটা ধরলেন। তাঁবুর ধিকি ধিকি আগুন ও মশালের আলোয় দেখা যাচ্ছিলো, তিনি কোন দিকে যাচ্ছেন। শিখ সৈন্যদের লাশের গায়ে কখনো কখনো ঠোকর খাচ্ছিলেন। তখনো বন্দুক থেকে ফায়ার হচ্ছিলো অনবরত। হঠাৎ এক বন্দুকের সামনে তিনি পড়ে গেলেন, অধিকাংশ গুলি লাগলো তার দুই বাহুতে। একটা লাগলো বুকের এক পাশে। আরেকটা মাথার খুলি ছিঁড়ে নিয়ে গেলো। তিনি তাঁবু পল্লী থেকে বের হচ্ছিলেন। এই গুলির আঘাতেও তিনি হাটা থামালেন না। হেলে দুলে সামনে এগুচ্ছিলেন। এক সময় তাঁবুপল্লী থেকে বের হয়ে গেলেন। পাথর বেষ্টনীর গায়ে ধরে ধরে হাটছিলেন। কিন্তু বুলেটের ক্ষত থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ তাকে বেশি দূর এগুতে দিলো না। এক সময় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন।

হিম্মত খান তাঁবু থেকে বের হলো তখন যখন তার সঙ্গীরা সবাই অনেক দূর চলে গেছে। এক জায়গায় দুই শিখ অতর্কিতে তাকে ধরে ফেলেছিলো, সে দুজনের সঙ্গে তার তুমুল লড়াই হয়। বহু কষ্টে হিম্মত খান দুই শিখকে তাবুতে এনে চরম যখমী করে সেখান থেকে সরে আসে। সে তার অপমানের প্রতিশোধ এক প্রকার নিয়ে নিয়েছে। তবুপল্লী থেকে বের হওয়ার সময় তাবুগুলোর ধ্বংস লীলা প্রত্যক্ষ করলো হিম্মত খান। তার কাছে বড় বিস্ময়কর ঠেকলো। তার কাছ দিয়ে শিখেরা পালানোর জন্য ছুটাছুটি করছিলো। তার দিকে কেউ ক্ষেপও করছিলো না যে, তাদের এক মহান শত্রু এখানে দাঁড়িয়ে আছে।

হিম্মত খান পাথর বেষ্টনী ঘেষে এগুচ্ছিলো। যেদিকে বেষ্টনী শেষ হয়েছে সেখান থেকে জমি ঢালু হয়ে নিচের দিকে চলে গেছে। সে নিচের দিকে নামতে লাগলো। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখলো, তার দুপাশে ছোট দুটি টিলা। এক পাশে দেখলো একটি লাশ পড়ে আছে। এতে তার কোন সাথী-সঙ্গীও হতে পারে। সে দৌড়ে সেদিকে গেলো।

না, একতার কোন সঙ্গী নয়। এক শিখ। ঘৃণায় তার মুখ কুচকে যাওয়ার কথা ছিলো। উচিত ছিলো তার সেখান থেকে তাচ্ছিল্য ভরে চলে আসা। কিন্তু একজন মৃত মানুষকে দেখলে আর ধর্মের ভেদাভেদের কথা তার মনে থাকে না।

চারদিক ফর্সা হয়ে আসছিলো। ভোরের আবচ্ছা আলোয় লাশের চেহারা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। কয়েক মুহূর্ত দৃষ্টি লাশের মুখের ওপর আটকে থাকতেই হিম্মত খান সহসা তাকে চিনতে পারলো। তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- উহহু, এতো উধাম শিং।

হিম্মত খান সঙ্গে সঙ্গে তার নাড়ি পরীক্ষা করলো। এখনো বেঁচে আছে। লাহোর কেল্লায় উধাম শিং তার সঙ্গে যে আচরণ করেছিলো এটা তার মনে পড়লো। তার কারণেই হিম্মত খান নিজের সঙ্গে তলোয়ার রাখতে পেরেছিলো। সসম্মানে মেহমানখানায় থাকতে পেরেছিলো। এমনকি রঞ্জিৎ শিং-এর দরবারে হিম্মত খানের দ্ব্যর্থহীন কথা শুনে যখন সমস্ত দরবারীরা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো তখন সে উধাম শিংকে দেখেছিলো যে, উধাম শিং এক মাত্র দরবারী … যে নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজ আসনে বসে ছিলেন, তলোয়ার থেকে তার হাত দূরে রেখেছিলেন। এও কি হিম্মত খানের সম্মানের জন্য নয়? প্রথম রাতে হিম্মত খানের প্রতিটি কথাও তো উধাম শিং বড়। মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন। এছাড়াও হিম্মত খান উধাম শিং-এর মধ্যে দেখছিলো একজন অন্তরঙ্গ মানুষের ছবি।

এসব কারণে উধাম শিংকে তার ভালো লেগেছিলো। সে বললো, উধাম শিং! জীবন মরণ আল্লাহর হাতে। কিন্তু আমি তোমাকে এখানে এভাবে মরতে দেবো না। তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করবো।

উধাম শিং পড়ে ছিলেন বেহুশ হয়ে। শুনতে পাচ্ছিলেন না কোন কিছুই। এত বড় দেহধারী এক লোককে হিম্মত খান উঠিয়ে নিলো তার কাঁধে।

***

উধম শিং-এর জ্ঞান ফেরার পর ধীরে ধীরে চোখ খুললেন। এদিক ওদিক তাকালেন। ওপরে তাকিয়ে দেখলেন তার ওপর ছাদ। তার সামনে স্বল্প পরিচয়ের এক যুবক বসে আছে। উধাম শিং নিজের ডান বাহুও মাথাটি বেশ ভারি মনে হলো। শক্ত ব্যন্ডেজে বাঁধা মাথা ও ডান বাহুটি। তিনি হয়রান হয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বিড় বিড় করে উঠলেন- হিম্মত খান? … আমাকে তুমি এখানে নিয়ে এসেছো?

হিম্মত খান যখন তাকে বললো কিভাবে এখানে উঠিয়ে আনা হয়েছে তখন তো উধাম শিং-এর হয়রানি স্তব্ধতায় রূপান্তরিত হলো। তিনি জানেন, এ এলাকার পথঘাট কেমন কঠিন। তাই তার মতো এমন দেহধারী কাউকে উঠিয়ে আনা সাধারণ ব্যাপার নয়।

আমীরুল মুমিনীন তাশরীফ আনছেন- এ সময় একজন ভেতরে এসে বললো।

হিম্মত খান উঠে দাঁড়ালো। সায়্যিদ আহমদ শহীদ ভেতরে এলেন। উধাম শিং উঠে বসলেন। সায়্যিদ আহমদের দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে রইলেন।

আমাকে বলা হয়েছে আপনার যখম ততটা গভীর নয়- সায়্যিদ আহমদ উধাম শিং-এর মাথায় হাত রেখে বললেন- আশা করা যায় দ্রুতই সেরে উঠবেন। হিম্মত খান আমাকে বলেছে লাহোরের কেল্লায় আপনি তার সঙ্গে খুব ভালো আচরণ করেছেন। আমাদের ব্যবহারও আপনাকে হতাশ করবে না।

আমি আপনার কয়েদী- উধাম শিং বললেন- আমার সঙ্গে যেমন ইচ্ছে তেমন ব্যবহার করতে পারেন আপনি। আমার হতাশার কারণ ঘটলেও আমি আপনার কিইবা বিগড়াতে পারবো।

আপনি আমাদের কয়েদী নন- সায়্যিদ আহমদ স্মিত হাস্যে বললেন যখম সেরে উঠা পর্যন্ত আপনি আমাদের মেহমান। তারপর আপনাকে একজন কেল্লাদারের উপযুক্ত সম্মান দিয়ে বিদায় করা হবে। আমি আপনার জন্য দুআ করবো, আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

তিনি উধাম শিং-এর মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন।

উধাম শিং-এর দৃষ্টি দরজার মধ্যে আটকে রইলো যেখান দিয়ে সায়্যিদ আহমদ বের হয়েছিলেন।

আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন- কথাটার মধ্যে তিনি এক আশ্চর্য নির্ভরতা খুঁজে পেলেন। এক অপার্থিব শক্তিমত্তা যেন তার কথার মধ্যে নিহিত ছিলো। এমনটি আর তিনি কারো মধ্যে দেখেননি। হিম্মতখানের কথায় তিনি চমকে ধ্যানভগ্ন হলেন

ইনিই সায়্যিদ আহমদ। আমাদের সালারে আলা এবং আমীরুল মুমিনীন। যার ব্যাপারে আপনি আমাকে লাহোরের কেল্লায় জিজ্ঞেস করেছিলেন।

হ্যাঁ, এক আশ্চর্য আকর্ষণ টের পেলাম আমি উনার মধ্যে- উধাম শিং বললেন।

উধাম শিংকে যে ঘরে রাখা হয়েছিলো সেটা ছিলো আকোড়া থেকে সামান্য দূরের ছোট একটি গ্রামের দালান বাড়ি। প্রতিদিনই উধাম শিং-এর যখমে নতুন পট্টি লাগানো হতে লাগলো। দেয়া হতে লাগলো খুবই উন্নতমানের খাবার দাবার। সায়্যিদ আহমদ শহীদ তাকে দেখতে আসতেন প্রতিদিনই। উধাম শিং যে, শত্রু পক্ষ বা অমুসলিম-আচার আচরণে কেউ কখনো তা প্রকাশ করেনি। রোজ সকালে তার কানে আসতো বড় সুমধুর সুর ধ্বনি। উধাম শিং বুঝতে পারলেন কেউ কুরআন পড়ছে। আগেও তিনি কুরআন পড়ার আওয়াজ শুনেছেন, কিন্তু এধরনের ভিন্ন ধরনের অনুভূতি কখনো তার হয়নি।

একদিন হিম্মত খান তার কাছে বসাছিলো। উধাম শিং যেন অস্থির হয়ে বলে উঠলেন

হিম্মত খান! আমি শিখ। আমার প্রতি এত মেহেরবান হয় না। আরে আমরা তো মুসলমানদেরকে কষ্ট দিয়ে খুঁচিয়ে খুচিয়ে মেরে আনন্দ বোধ করি। মুসলমান মেয়েদের ইজ্জত লুটে নেচে গেয়ে উঠি। মুসলমান শিশুদের হত্যা করে হো হো করে হেসে উঠি। তাহলে তোমরা আমার সঙ্গে কেন মেহমানের মতো আচরণ করবে।

আমরা আপনার ধর্ম দেখছি না- হিম্মত খান বললো- দেখছি না যে, আপনি শিখ বা অন্য কোন সম্প্রদায়ের। আমরা এটা মনে রাখি যে, আমরা মুসলমান। আমরা যুদ্ধ করি শুধু রণাঙ্গনে। কিন্তু তখনো নারী, শিশু, বৃদ্ধ, নিরস্ত্র ও যখমীদের ওপর হাত উঠাই না। দেখুন, আমাদের সালারে আলা আপনাদের মহারাজাকে ইসলাম গ্রহণের পয়গাম পাঠিয়েছেন। কিন্তু আপনাকে ইসলাম গ্রহণের কথা বলেননি। কারণ, আপনি আমাদের অনুগ্রহে রয়েছেন এখন। আপনাকে কিছু বলার অর্থই হলো জোর জবরদস্তি করা।

যদি নিজ ইচ্ছায় আমি ইসলাম গ্রহণ করি?

তাহলে আগে আমাদের নিশ্চিন্ত হতে হবে যে, আপনি কারো ভয়ে বা কোন কিছুর লোভে ইসলাম গ্রহণ করছেন না।

তারপর আরো কয়েকদিন কেটে গেলো। একদিন উধাম শিং বাইরে খানিক ঘুরে আসতে বের হলেন। সায়্যিদ আহমদ তখন সে এলাকাতেই ছিলেন। উধাম শিং খুঁজে খুঁজে সায়্যিদ আহমদের দেউরী বের করে সোজা তার কামরায় চলে গেলেন এবং তার পায়ে পড়ে বলতে লাগলেন- আমাকে মুসলমান বানিয়ে নিন। আমাকে মুসলমান বানিয়ে নিন। তাকে বলা হলো, তিনি এখন সুস্থ-স্বাধীন। এখন ইচ্ছে করলে চলে যেতে পারেন। কিন্তু তার এক কথা- তাকে মুসলমান বানাতে হবে। অবশেষে সায়্যিদ আহমদ তাকে কালেমায়ে তায়্যিবা পড়িয়ে মুসলমান বানিয়ে নিলেন। তার নাম রাখলেন ইসমাঈল।

মুসলমান হয়ে তিনি জানালেন, তার মা ও একটি ছোট বোনও তার সঙ্গে এসেছিলো। তখন সেনা কমাণ্ডার অফিসাররা নিজেদের পরিবার নিয়েই যুদ্ধ সফরে বের হতো। উধাম শিংও তার বোন ও মাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। তাদেরকে সেনা ছাউনিতে না রেখে আকোড়া থেকে একটু দূরের এক আত্মীয়ের গ্রামে রাখেন। তিনি বললেন, তাদেরকে তিনি এখানে নিয়ে আসতে চান। কারণ, সে এলাকাটি এক জালিম শিখ কমাণ্ডারের হাতে রয়েছে।

উধাম শিং এসব নিয়ে ভাবছিলেন। এসময় মুজাহিদদের এক গুপ্তচর খবর পাঠালো যে, ইসমাঈলের (উধাম শিং) ইসলাম গ্রহণের সংবাদ বুধ শিং পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বুধ শিং হুকুম দিয়েছে, ইসমাঈলের মা ও বোনকে পাকড়াও করে নিয়ে যেতে। উধাম শিং-এর গাদ্দারীর শাস্তি তার মা ও বোনকে দিতে চাচ্ছিলো বুধ শিং। বুধ শিং-এর হুকুমে দশ বারজন শিখ সে গ্রামের দিকে রওয়ানাও হয়ে গেছে।

সায়্যিদ আহমদ শহীদ এ দিক থেকে ইসমাঈলের সঙ্গে দশ বারজন মুজাহিদ পাঠিয়ে দিলেন। মুজাহিদদের এই দল যখন সেখানে পৌঁছলো পুরো গ্রামে তখন আতংক বিরাজ করছে। কারণ, বুধ শিং-এর সিপাহীরা আগেই পৌঁছে গিয়েছিলো। দেখা গেলো, শিখেরা একটি বাড়ি ঘেরাও করে আছে। উভয় দলের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হলো। হিম্মত খান ও ইসমাঈল চেষ্টা করছিলেন বাড়ির ভেতর ঢোকার। কিন্তু তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছিলো। অবশেষে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে উভয়ে ভেতরে ঢুকলেন।

ভেতরে গিয়ে দেখা গেলো, ইসমাঈলের মা তলোয়ারের আঘাতে মরে পড়ে আছে। তার বোন প্রতীম কোড়ের কাপড় ছিন্নভিন্ন। মাথার চুল এলোমেলো। প্রতীম কোড় জানালো, শিখ সিপাহীরা ভেতরে এসেই প্রতীম কোড়কে ধরে তার কাপড় ছিঁড়তে শুরু করলো। এসময় তার মা তলোয়ার বের করে শিখদের ওপর হামলা করে বসলেন। কিন্তু এক মহিলার পক্ষে দুই শিখের বিরুদ্ধে লড়া সম্ভব ছিলো না। দুজনে তাকে শেষ করে দিলো।

তারা প্রতীম কোড়কে বে-আবরু করতে চাচ্ছিলো। এসময় বাইরে মুজাহিদরা এসে হামলা চালায়। তখন ভেতরের দুই শিখ বাইরে গিয়ে শিখদের লড়াইয়ে শরীক হয়। এর পরপরই হিম্মত খান ও ইসমাঈল (উধাম শিং) ভেতরে চলে আসে। এভাবে প্রতীমের আবরু বেঁচে যায়। ওরা প্রতীমকে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়েই বের করে নিয়ে যায়।

মুজাহিদদের মধ্যে দুজন শহীদ হয়। আর শিখদের মধ্যে মারা যায় নয় জন। বাকীরা পালিয়ে যায়।

পরদিন প্রতীম কোড়ও মুসলমান হয়ে যায়। তার নাম রাখা হয়, যায়নাব। ষোড়ষী কন্যা যায়নাব যেমন দেহ সৌন্দর্যে আকর্ষণীয় ছিলো তেমনি ছিলো তার অসাধারণ রূপের ছটা। এক নজর দেখেই হিম্মত খানের ভেতর আলোড়ন শুরু হয়ে যায়। সুদর্শন হিম্মত খান তো যায়নাবের জন্য ছিলো নয়া জীবনদাতা স্বরূপ। ওদের মনের নীরব আকুতি যেন ইসমাঈলকে (উধাম শিংকে)ও ছুঁয়ে যায়। তার অনুরোধে সায়্যিদ আহমদ দুজনকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করেন।

সায়্যিদ আহমদ ইসমাঈলের জন্য কান্দাহারের এক মুজাহিদ কন্যাকে ঠিক করেন। কিন্তু ইসমাঈল জানান, পরবর্তী লড়াইয়ে মুজাহিদদের বিজয়ের পরই তিনি বিয়ে করবেন। কিন্তু পরবর্তী লড়াইয়ে খাদী খান নামে এক মুসলমানের গাদ্দারীর কারণে ইসমাঈল (উধাম শিং) বেকায়দায় পড়ে শহীদ হয়ে যান।

কাজী আবদুল হালিম আসর আফগানী রুহানী কবিতা গ্রন্থে লিখেছেন, অল্প সময়ের মধ্যেই ইসমাঈল সায়্যিদ আহমদ শহীদের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিলেন। তাই তার লাশ দেখে সায়্যিদ আহমদ অঝোর ধারায় কেঁদে উঠেন। রুদ্ধ কণ্ঠে বলেন

হায়! শেষ পর্যন্ত আমার প্রিয় বন্ধুটিও শাহাদাঁতের পাগড়ী পরে নিলো!