ট্রাইম ট্রাভেল – পরিচ্ছেদ ১৩

১৩.

 আঙ্কেল জ্যাক, টেলিফোনে বলল রবিন, শুনলে তুমি বিশ্বাস করবে না।

রিসিভারে ভেসে এল আঙ্কেল জ্যাকের বিমল হাসি। কি বিশ্বাস করব না?

অংক পরীক্ষায় আমরা সাংঘাতিক ভাল করে ফেলেছি, উত্তেজিত কণ্ঠে জানাল রবিন। যে ওষুধটা তুমি আমাদের দিয়েছিলে, কাজ করেছে ওটা।

জোরে জোরে হাসলেন আঙ্কেল। আমার কি মনে হচ্ছে জানিস? ওষুধে আসলে কিছু হয়নি। হয়েছে তোদের মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখার কারণে।

রবিনের দুই পাশে দাঁড়ানো মুসা আর কিশোর। টেলিফোনে কি বলছেন আঙ্কেল শোনার জন্যে রিসিভারের কাছে ঝুঁকে এল দুজনে।

রবিনের কাছ থেকে রিসিভারটা কেড়ে নিয়ে কিশোর বলল, উঁহু, পড়ালেখার জন্যে কিছু হয়নি। আপনার ওষুধই আমাদেরকে বুদ্ধিমান বানিয়ে ছেড়েছে। নিশ্চিন্তে আপনি এটাকে বোতলজাত করে বাজারে ছাড়তে পারেন। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ধনী হয়ে যাবেন।

হু, সে-রকম ওষুধ ছাড়তে পারলে সত্যিই হব।…তরে তোমাদের উপকার হয়েছে শুনে খুশি হলাম, আঙ্কেল জ্যাক জবাব দিলেন। কিন্তু তাই বলে পড়ালেখা যেন আবার বন্ধ করে দিও না। পরীক্ষায় ভাল করার জন্যে ওটাই হলো সবচেয়ে জরুরী।

আরও কিছুক্ষণ উত্তেজিত তিন কিশোরের সঙ্গে কথা বলে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন আঙ্কেল জ্যাক। স্ত্রীর দিকে ফিরলেন।

অংক পরীক্ষায় অসাধারণ ভাল করে ফেলেছে ওরা, হাসতে হাসতে বললেন তিনি। আত্মবিশ্বাস মানুষকে কোথায় নিয়ে যায় এই ঘটনাটাই তার প্রমাণ। আমি দিলাম ওদেরকে আঙুরের রস, আর ওরা ভাবছে…! হাহ হাহ হা!

.

পরদিন স্কুল বাসে চড়ার আগে দুই সহকারীকে বলল কিশোর, সাবধান, আমরা যে বদলে গেছি এটা যাতে কেউ বুঝতে না পারে। বুঝতে দেয়া ঠিক হবে না।

কিন্তু রবিন সামলে নিলেও মুসা সামলাতে পারল না। বুদ্ধিমান হয়ে গিয়ে তার আচার-আচরণই পাল্টে গেছে।

গাড়িতে সীটে বসে নিত্যদিনকার মতই নিউ ইয়র্ক টাইমস ক্রসওয়ার্ড পাজলের সমাধান করছে ওরা। আজ ওদের পাশের সীটে বসেছে মুসা। ইচ্ছে করেই। জানে, সে, রবিন কিংবা কিশোর যে-ই ওদের পাশে বসুক না কেন, সমস্যায় ফেলে মজা করতে চাইবে। রোজই তাই করে। ওরা যে ভাল ছাত্র, সেটা যে কোন ভাবেই হোক জাহিরের চেষ্টা করে।

অপেক্ষা করতে লাগল মুসা।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। ফিরে তাকাল রয়। জিজ্ঞেস করল, এই, বলো তো চার অক্ষরের একটা গাধার নাম, যেটার প্রথম অক্ষর এম  দিয়ে শুরু।

হেসে উঠল পাশে বসা শারিয়া। টেরিয়ার ডয়েল সহ আরও অনেক ছেলেমেয়েই হেসে উঠল।

আজ রয়কেই গাধা মনে হচ্ছে মুসার। রোজ একই রকম প্রশ্ন করে। নতুনত্ব নেই। কোন রকম জড়তা কিংবা আড়ষ্টতা না রেখে শান্তকুণ্ঠে জবাব দিল মুসা, চার অক্ষরের পারব না, তবে তিন অক্ষরের গাধার নাম বলতে পারব। যেটার প্রথম অক্ষর আর দিয়ে শুরু।

মুহূর্তে হাসি মুছে গেল রয়ের। কালো হয়ে গেল মুখ। বাহ, কালটুসটার তো মুখ খুলে গেছে আজ। সেই সঙ্গে একটু যদি বুদ্ধি খুলত।

টান দিয়ে রয়ের হাত থেকে ভাজ করা খবরের কাগজটা কেড়ে নিল মুসা।

 আরে আরে কি করছ। চিৎকার করে উঠল শারিয়া! দাও, দাও।

দিল না মুসা। তোমরা যে জিনিসটার সমাধান করতে পারো না, দেখাও আমাকে। বলে দিচ্ছি। নাকি সবই বলে দেব?

বলপেন বের করে কাগজের ওপর লিখতে শুরু করল মুসা। এত দ্রুত, চোখ কপালে উঠে গেল শারিয়া আর রয়ের।

খসখস করে লিখে কাগজটা ফিরিয়ে দিল মুসা। নাও, দেখো এবার।

কাগজের দিকে তাকানোর জন্যে ঝুঁকে এল রয় ও শারিয়া। মাথায় মাথায় ঠোকাঠুকি হয়ে গেল। অস্ফুট একটা চিৎকার বেরিয়ে এল শারিয়ার মুখ থেকে। চোখ বড় বড় করে তাকাল রয়। চোখে অবিশ্বাস। কি করে করলে?

হাসিমুখে কাঁধ ঝাঁকাল মুসা। সহজ। একেবারেই সহজ। অক্ষরজ্ঞান যদি ভাল থাকে তোমার, ক্রসওয়ার্ড পাজল মেলানো কোন ব্যাপারই না।

.

স্কুলে সেদিন ক্লাসে তিন গোয়েন্দাকে অংক পরীক্ষায় বসালেন মিস্টার ক্রেগ। বাকি সবার জন্যে অন্য পড়া।

তিন গোয়েন্দাকে অভয় দিয়ে বললেন, তাড়াহুড়া নেই। ভাবনা-চিন্তা করে সুন্দরমতই জবাব দাও। কোনটা যদি না পারো, ফেলে রাখো, পরে আমার কাছ থেকে জেনে নিও। ঠিক আছে?

প্রশ্নপত্র আর খাতা নিয়ে যার যার ডেস্কে ফিরে এল কিশোর, মুসা ও রবিন।

ডেকে বললেন মিস্টার ক্রেগ, আন্দাজে করলে কিন্তু হবে না। পরে ধরব। কি ভাবে করলে বুঝিয়ে বলতে হবে আমাকে। এগুলো যদি পেরে যাও, আরও কঠিন প্রশ্ন দেয়া হবে। কি, বুঝলে?  

মাথা ঝাঁকাল তিনজনেই।

দশ মিনিট পরই মিস্টার ক্রেগের কাছে টেস্ট পেপার নিয়ে হাজির হলো কিশোর। কিছু কিছু সমীকরণ তিন ভাবে করে দেখিয়েছে সে।

সব প্রশ্নের জবাব দিতে রবিনের লাগল বারো মিনিট, মুসার চোদ্দ। ওরাও কিশোরের মত একই কাজ করেছে। মোট কথা যতভাবে করা যায় এই অংকগুলো, সব ভাবেই করেছে।

অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকালেন মিস্টার ক্রেগ। খাতার দিকে তাকালেন। কি ব্যাপার? পারছ না? খুব কঠিন মনে হচ্ছে?

করেছি তো, স্যার?  শান্তকণ্ঠে জবাব দিল কিশোর।

খাতার দিকে তাকালেন মিস্টার ক্রেগ। প্রথমে দ্রুত দেখলেন ফলগুলো। তারপর ধীরে ধীরে।

আ-আবার তো সেই একই কাণ্ড করেছ।  কথা আটকে যেতে শুরু করল মিস্টার ক্রেগের। সবগুলোই তো কারেক্ট। ভাল, ভাল। তারমানে সারারাত বসে পড়াশোনা করেছ তোমরা?

পড়িইনি, স্যার, কোন কিছু না ভেবেই বলে ফেলল মুসা। বইয়ের দিকেই তাকাইনি একবারও। অংক একটা অতি সহজ সাবজেক্ট।

.

স্কুল ছুটির পর রবিনদের বাড়ির পেছনের খোলা জায়গায় বল খেলছে তিনজনে। খেলছে মানে এ ওর কাছে ছুঁড়ে দিয়ে লোফালুফি করছে।

বেশ কয়েক দিন মেঘে ঢাকা থাকার পর মেঘ কেটে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে সূর্য। আকাশের ধূসর রঙ আর নেই। বাতাস চমৎকার। বসন্তকালের মত।

স্কুল ছুটি হওয়ার আগেই সমস্ত হোমওঅর্ক করে ফেলেছি আমি, মুসা বলল। রবারের বলটাকে রবিনের দিকে ছুঁড়ে মারল সে।

মিস করল রবিন। ধরতে পারল না। বলটা চলে গেল পাতাবাহারের বেড়ার দিকে। পেছন পেছন দৌড়ে গেল সে।

কিন্তু তোমাকে তো বলেছিলাম সাবধানে থাকতে, কিশোর বলল। আমরা যে বুদ্ধিমান হয়ে গেছি অত তাড়াহুড়া করে জানান দেয়ার কি প্রয়োজন ছিল? আর মিস্টার ক্রেগের অত ভুল ধরারই বা কি দরকার ছিল?

তাই তো, বল নিয়ে ফিরে এসেছে রবিন। যতবার তিনি ভুল করছিলেন, হাত তুলছিল সে।

কিন্তু এত ভুল করতে থাকলে না তুলে কি করব? মুসা বলল। বোর্ডে লিখতে গিয়ে ম্যাসাচুসেটস বানানও তিনি ভুল লিখলেন। বলব না? কাউকে না কাউকে তো ভুলটা ধরিয়ে দিতেই হবে। টিচার বলে কি মাপ?

কিন্তু, মুসা… বলতে গেল কিশোর।

শুনল না মুসা। তার কথা বলে গেল, সিভিল ওঅর কবে শুরু হয়েছে, সালটা পর্যন্ত তিনি ভুল বললেন। শুধরে দেব না?

কিন্তু তোমার বার বার হাত তোলা দেখে কি রকম ভঙ্গি করছিল সবাই খেয়াল করেছ?  রবিন বলল। ভাবখানা যেন টিচারের ভুল ধরিয়ে দিয়ে তুমি মস্ত অপরাধ করে ফেলছ। আসলেই তোমার চুপ করে থাকা উচিত ছিল। তোমার ভয়ে শেষে। পড়ানোই বাদ দিয়েছেন তিনি। এ রকম পর্যদস্ত করাটা অবশ্য ঠিক হয়নি তোমার।

কিশোর আর মুসার মুখে ঠিক হয়নি শুনতে শুনতে রাগ হয়ে গেল মুসার। এত জোরে ছুঁড়ে মারল বলটা, আবারও ধরতে পারল না রবিন। দৌড় দিল ঝোঁপের দিকে। বল খুঁজতে ঢুকে পড়ল ঝোঁপের মধ্যে। খানিক পরেই শোনা গেল তার চিৎকার, কিশোর, জলদি এসো।

কি হলো? বলে দৌড় দিল কিশোর। পেছনে ছুটল মুসা।

ওরা দুজনও ঝোপে ঢুকল।

মাটির দিকে দেখাল রবিন, দেখেছ? জুতোর ছাপ।

ঝুঁকে বসে ভালমত দেখে গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর, হু। তাজা ছাপ। অনেক বড় পা। ঘটনাটা কি? আমাদের ওপর নজর রাখছিল নাকি?

ওই দেখো, মুসা বলল, ওদিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে ছাপগুলো।

 ছাপ অনুসরণ করে ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল ওরা।

পেছনের উঠান পার হয়ে রবিনদের লিভিং রূমের জানালার কাছে এসে শেষ হয়েছে। মাটিতে গম্ভীর হয়ে বসা ছাপগুলো প্রমাণ করে ওখানে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেছে ছাপের মালিকেরা। উঁকিঝুঁকি মেরেছে ঘরের ভেতর।

আর কোন রকম সূত্র পাওয়া গেল না।

এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর, কিন্তু আমাদের ওপর নজর রাখতে এল কে? এবং কেন?

বুকমার্ক করে রাখুন 0