সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে (১৯৮৫:১৩৯২)

সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে
হুমায়ুন আজাদ

সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে

আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে মানবিক
সব সংঘ পরিষদ;–চলে যাবে অত্যন্ত উল্লাসে
চলে যাবে এই সমাজ সভ্যতা–সমস্ত দলিল
 নষ্টদের অধিকারে ধুয়েমুছে, যে-রকম রাষ্ট্র
আর রাষ্ট্রযন্ত্র দিকে দিকে চলে গেছে নষ্টদের
 অধিকারে। চলে যাবে শহর বন্দর গ্রাম ধানখেত
কালো মেঘ লাল শাড়ি শাদা চাঁদ পাখির পালক
 মন্দির মসজিদ গির্জা সিনেগগ নির্জন প্যাগোডা।
অস্ত্র আর গণতন্ত্র চলে গেছে, জনতাও যাবে;
চাষার সমস্ত স্বপ্ন আঁস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন
 সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।

আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
 কড়কড়ে রৌদ্র আর গোলগাল পূর্ণিমার রাত
নদীরে পাগল করা ভাটিয়ালি খড়ের গম্বুজ
 শ্রাবণের সব বৃষ্টি নষ্টদের অধিকারে যাবে।
রবীন্দ্রনাথের সব জ্যোৎস্না আর রবিশংকরের
 সমস্ত আলাপ হৃদয়স্পন্দন গাথা ঠোঁটের আঙুল
 ঘাইহরিণীর মাংসের চিৎকার মাঠের রাখাল
 কাশবন একদিন নষ্টদের অধিকারে যাবে।
 চলে যাবে সেই সব উপকথা : সৌন্দর্য-প্রতিভা
 মেধা;–এমনকি উন্মাদ ও নির্বোধদের প্রিয় অমরতা
নির্বোধ আর উন্মাদদের ভয়ানক কষ্ট দিয়ে
অত্যন্ত উল্লাসভরে নষ্টদের অধিকারে যাবে।

আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
 সবচে সুন্দর মেয়ে দুই হাতে টেনে সারারাত
চুষবে নষ্টের লিঙ্গ; লম্পটের অশ্লীল ঊরুতে
 গাঁথা থাকবে অপার্থিব সৌন্দর্যের দেবী। চলে যাবে,
কিশোরীরা চলে যাবে, আমাদের তীব্র প্রেমিকারা
ওষ্ঠ আর আলিঙ্গন ঘৃণা করে চলে যাবে, নষ্টদের
 উপপত্নী হবে। এই সব গ্রন্থ শ্লোক মুদ্রাযন্ত্র
শিশির বেহালা ধান রাজনীতি দোয়েলের ঠোঁট
 গদ্যপদ্য আমার সমস্ত ছাত্রী মার্কস-লেনিন,
 আর বাঙলার বনের মতো আমার শ্যামল কন্যা
 রাহুগ্রস্ত সভ্যতার অবশিষ্ট সামান্য আলোক
আমি জানি তারা সব নষ্টদের অধিকারে যাবে।

*

আমি কি ছুঁয়ে ফেলবো?

আমি খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বস্তু ভালোবাসি।
ভোরের আকাশ, পদ্ম, ধবধবে পাঞ্জাবি, খাদহীন সোনা,
 শাড়ির উজ্জ্বল পাড়, অনভিজ্ঞ অমল কিশোরী আমার পছন্দ।
কিন্তু আমি যা-ই ছুঁই, তা-ই ঘিনঘিনে নোংরা হয়ে যায়
দেখে নাড়িভুড়ি উগড়ে ফেলার মতো বমি আসে।

ছেলেবেলায় সদ্য-ছাঁই-মাজা একটা ঝকঝকে পেতলের
 প্লেট দেখে আমার ছোঁয়ার খুব ইচ্ছে হয়,
কিন্তু আমি ছুঁতে-না-ছুঁতেই সে-উজ্জ্বল পেতল
পচা ইঁদুরের মতো নোংরা হয়ে যায়।

আপা, তখনো অমল জ্যোৎস্না, জ্যোৎস্নার মতোই শাড়ি
পরেছিলো একবার; দেখে আমার ছোঁয়ার খুব
 লোভ হয়; আর অমনি মরা রক্তে ভিজে ওঠে সেই
 জ্যোৎস্না-শাদা শাড়ি।

ভোরের আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছিলাম একবার
সে থেকে আকাশ কুষ্ঠরোগীর মুখের মতোই কুৎসিত।

ইস্কুলে, ১৯৬২-তে, নবম শ্রেণীর শালোয়ার-পরা স্বপ্ন
আমাকে দিয়েছিলো টকটকে লাল একটি গোলাপ;
আমি ধরতেই গোলাপের পাপড়ি থেকে পুঁজ ঝরতে থাকে
 তারপর থেকে আর পৃথিবীতে গোলাপ ফোটে নি।

এখন আমার মুখোমুখি তুমি মেয়ে
বিশশতকের দ্বিতীয়াংশের সবচে পবিত্র পদ্ম-শুভ্র নিষ্কলঙ্কতা
এতো কাছাকাছি মেলছে দীর্ঘ শত-দল; ভীষণ কষ্ট পাচ্ছি
তোমাকে কি আমি ছুঁয়ে ফেলবো–ছুঁয়ে ফেলবো
ছুঁয়ে ফেলবো?

*

অন্ধ যেমন

অন্ধ যেমন লাঠি ঠুকেঠুকে অলিগলি পিচ্ছিল সড়ক
বিপজ্জনক বাঁক ঢাল ট্রাকের চক্রান্ত পেরিয়ে
অবশেষে পৌঁছে তার অনিবার্য গন্তব্যে
 উদ্ধারহীন খাদে–

আমিও কি তেমনি বহু খাদ পরিখা দেয়াল
প্রান্তর সভ্যতা অ্যাকাডেমি অ্যাংলোস্যাক্সন আলিঙ্গন
 পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছোলাম
তোমাতে?

*

তুমি সোনা আর গাধা করো

একবার দৌড়োতে দৌড়োতে ঢুকে গিয়েছিলাম তোমার ছায়ায়,
 তাতেই তো আমি কেমন বদলে গেছি।

কিন্তু অই লোকটি, যে তোমার ছায়ায় বাস করে রাতদিন,
তোমার সঙ্গে এক রিকশায় যায়,
একই খাটে ঘুম যায়, সে কেনো এমন হচ্ছে দিন দিন!

তোমার ছায়ায় ঢুকে গিয়েছিলাম,
আমাকে ছুঁয়ে ফেলেছিলো তোমার অন্যমনস্ক আঙুল
তাতেই তো আমার বুকের বাম ভূখণ্ড জুড়ে জন্ম নিয়েছে জোহান্সবার্গের
সোনার খনির থেকেও গভীর ব্যাপক এক জোহান্সবার্গ!

কিন্তু অই লোকটি, যে তোমাকে বৃষ্টি না নামলেও আধঘণ্টা আদর করে,
সে কেনো এমন হচ্ছে দিন দিন? গালে তার চালকুমড়োর মতো মাংস
 জমছে, দেখা দিচ্ছে চটের বেল্টের মতো গলকম্বল;
 পেট বেরিয়ে পড়ছে ট্রাউজার ঠেলেঠুলে; এবং দিন দিন
আহাম্মক আহাম্মক হয়ে উঠছে।

আমি তো একবার শুধু স্বপ্নে তোমাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম,
তাতেই তো আমার ৭০০০, ০০০, ০০০, ০০০.০০০, ০০০, ০০০ বাহু ওষ্ঠ
ঝকেঝকে সোনা হয়ে গেছে!

কিন্তু অই লোকটি, যে তোমাকে নিয়ে শোয় প্রতিরাত
 কিন্তু অই লোকটি, যে তোমাকে কাছে পায় প্রতিদিন
কিন্তু অই লোকটি, যে তোমাকে জমজমাট গর্ভবতী করে বছর বছর
সে কেনো একটা আস্ত গাধা হয়ে যাচ্ছে দিন দিন!

তুমি যাকে দেহ দাও, তাকে গাধা করো।
তুমি যাকে স্বপ্ন দাও, তাকে সোনা করো!

*

না, তোমাকে মনে পড়ে নি

সাত শতাব্দীর মতো দীর্ঘ সাত দিন পর নিঃশব্দে এসে তুমি
জানতে চাও : ‘আমাকে কি একবারও মনে পড়েছে তোমার?’
–না; শুধু রক্তে কিছু মুমূর্ষা ও গোঙানি দেখা দিয়েছিলো
রোববার ভোর থেকে; ট্রাকের চাকার তলে ভিন্ন প্রজাপতির মতোন রিকশা
আর শিশুটিকে দেখেও কষ্ট পাই নি; বুঝতে পারি নি কিংকর্তব্যবিমূঢ়
 আঙুলে আবার কখন উঠেছে সিগ্রেট। চারটি ইন্দ্রিয় সম্পূর্ণ বিকল
 হ’য়ে খুব তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিলো শ্রুতি–পৃথিবীর সমস্ত পায়ের শব্দের
বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য বুঝেছি, শুধু একজোড়া স্যাণ্ডালের ঠুমরি শুনি নি।
বুঝেছি যা-কিছু লিখেছে পাঁচ হাজার বছর ধরে মানুষ ও তাদের
দেবতারা–সবই অপাঠ্য, অন্তঃসারশূন্য, ভারি বস্তাপচা। আর অই
শ্রীরবীন্দ্রনাথকে মনে হয়েছে নিতান্তই গদ্যলেখক, শোচনীয় গৌণ এক কবি।
জীবন, বিজ্ঞান, কলা, রাজনীতি–সমস্ত কিছুকে মনে হয়েছে সে-অভিধানে
সংকলিত শব্দপুঞ্জ, যাতে প্রত্যেক শব্দের অর্থ–‘শূন্যতা, নিরর্থ প্রলাপ’।
–না; সাত শতাব্দী ধরে তোমাকে একবারও মনে পড়ে নি।

*

তোমাকে ছাড়া কী ক’রে বেঁচে থাকে

তোমাকে ছাড়া কি ক’রে যে বেঁচে থাকে জনগণ!
তুমি যার পাশে নেই কী উদ্দেশ্যে বেঁচে থাকে তারা?
আমি, কিছুতেই, বুঝতে পারি না কীভাবে তোমাকে ছাড়া
–উদ্দেশ্যবিহীন বেঁচে আছে এ-দুর্দশাগ্রস্ত গ্রহের
দেড় হাজার মিলিয়ন মানুষ। অনাহার, রোগ, শোক,
খরা, ঝড়, ভূমিকম্প আর ব্যাপক মানবাধিকারহীনতায়
তারা যতো কষ্ট পায় তারও বেশি কষ্ট পায়
তোমার অভাবে। তুমি যার পাশে নেই, মেয়ে, সে-ই ভোগে
 রক্তচাপে হৃদরোগে। দেশে ও বিদেশে যে শ্রমিকেরা
এতো ক্লান্ত তার মূলে তোমার অভাব, আর শতাব্দীপরম্পরায়
কৃষকেরা যে দুরারোগ্য হতাশায় ভোগে তারও কারণ
 তুমি পাশে নেই কৃষকের। আমলার অনিদ্রার মূলে তুমি,
আইনশৃঙ্খলারক্ষীবাহিনী যে সামান্য উসকানিতে এতো হিংস্র
হয়ে ওঠে তারও কারণ তুমি, মেয়ে, তাদের মুখের
দিকে চোখ তুলে তাকাও নি কখনো, মন্ত্রীরা বিমর্ষ
 কারণ তাদের তুমি একযোগে প্রত্যাখ্যান করেছো।
সে তো অন্ধ যে তোমাকে অন্তত একবার চোখ ভরে কখনো দেখে নি।
 যার সাথে অন্তত একবার তুমি কথা বলো নি, সে কখনো
 শোনে নি সুর অথবা গান। তুমি যার মুঠো নিজের মুঠোতে
একবারও ধরো নি, সে কখনো জীবনচাঞ্চল্য আর
 হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বোঝে নি। আর যে তোমাকে ডানা-মেলা
 ইস্কুটারে শহর পেরিয়ে নিয়ে একঝোপ কাশের গুচ্ছের পাশে
 দু-হাতে জড়িয়ে ধরে অসাধারণ সূর্যাস্ত দ্যাখে নি,
সে কখনো অমরতার আস্বাদ পাবে না।

*

আমাকে ভালোবাসার পর

আমাকে ভালোবাসার পর আর কিছুই আগের মতো থাকবে না তোমার,
যেমন হিরোশিমার পর আর কিছুই আগের মতো নেই
উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত।
 যে-কলিংবেল বাজে নি তাকেই মুহুর্মুহ শুনবে বজ্রের মতো বেজে উঠতে
এবং থরথর করে উঠবে দরোজাজানালা আর তোমার হৃৎপিণ্ড।
পরমুহূর্তেই তোমার ঝনঝন-করে-ওঠা এলোমেলো রক্ত
ঠাণ্ডা হয়ে যাবে যেমন একাত্তরে দরোজায় বুটের অদ্ভুত শব্দে
নিথর স্তব্ধ হয়ে যেতো ঢাকা শহরের জনগণ।

আমাকে ভালোবাসার পর আর কিছুই আগের মতো থাকবে না তোমার।
রাস্তায় নেমেই দেখবে বিপরীত দিক থেকে আসা প্রতিটি রিকশায়
 ছুটে আসছি আমি আর তোমাকে পেরিয়ে চলে যাচ্ছি
 এদিকে-সেদিকে। তখন তোমার রক্তে আর কালো চশমায় এতো অন্ধকার
 যেনো তুমি ওই চোখে কোনো দিন কিছুই দ্যাখো নি।

আমাকে ভালোবাসার পর তুমি ভুলে যাবে বাস্তব আর অবাস্তব,
 বস্তু আর স্বপ্নের পার্থক্য। সিঁড়ি ভেবে পা রাখবে স্বপ্নের চুড়োতে,
ঘাস ভেবে দু-পা ছড়িয়ে বসবে অবাস্তবে,
 লাল টকটকে ফুল ভেবে খোঁপায় গুঁজবে গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্ন।

না-খোলা শাওয়ারের নিচে বারোই ডিসেম্বর থেকে তুমি অনন্তকাল দাঁড়িয়ে
থাকবে এই ভেবে যে তোমার চুলে ত্বকে ওষ্ঠে গ্রীবায় অজস্র ধারায়
ঝরছে বোদলেয়ারের আশ্চর্য মেঘদল।

তোমার যে-ঠোঁটে চুমো খেয়েছিলো উদ্যমপরায়ণ এক প্রাক্তন প্রেমিক,
আমাকে ভালোবাসার পর সেই নষ্ট ঠোঁট খুঁসে পড়ে
সেখানে ফুটবে এক অনিন্দ্য গোলাপ।

আমাকে ভালোবাসার পর আর কিছুই আগের মতো থাকবে না তোমার।
 নিজেকে দুরারোগ্য ব্যাধিগ্রস্ত মনে হবে যেনো তুমি শতাব্দীর পর শতাব্দী
শুয়ে আছো হাসপাতালে। পরমুহূর্তেই মনে হবে
মানুষের ইতিহাসে একমাত্র তুমিই সুস্থ, অন্যরা ভীষণ অসুস্থ।

শহর আর সভ্যতার ময়লা স্রোত ভেঙে তুমি যখন চৌরাস্তায় এসে
ধরবে আমার হাত, তখন তোমার মনে হবে এ-শহর আর বিংশ শতাব্দীর
জীবন ও সভ্যতার নোংরা পানিতে একটি নীলিমা-ছোঁয়া মৃণালের শীর্ষে
তুমি ফুটে আছো এক নিষ্পাপ বিশুদ্ধ পদ্ম
পবিত্র অজর।

*

তোমার পায়ের নিচে

আমার থাকতো যদি একটি সোনার খনি
তাহলে দিনরাত খুঁড়েখুঁড়ে আমি মুঠো ভরে ভরে তুলে আনতাম
সূর্য আর চাঁদ-জ্বলা সোনার কণিকা,
সোনায় দিতাম মুড়ে শহরের সমস্ত সড়ক
অন্যমনস্ক তুমি হেঁটে যেতে তীক্ষ্ণ স্যান্ডলের শব্দ তুলে তুলে।

আমার থাকতো যদি মুক্তোয় ভরা একটা উপসাগর
তাহলে দিনরাত আমি ডুবুরির মতো মুঠো ভরে ভরে তুলে আনতাম
সবুজ আর লাল আর নীল আর উজ্জ্বল আর ঝলমলে মুক্তো,
 মুক্তো ছড়িয়ে দিতাম শহরের সমস্ত সড়কে
 অন্যমনস্ক তুমি হেঁটে যেতে তীক্ষ্ণ স্যান্ডলের শব্দ তুলে তুলে।

একটি পদ্মদিঘি থাকলেও আমি মধ্যরাতে
 মুখে করে তোমার দরোজায় নিয়ে আসতাম শুভ্র পদ্মের কেশর।

পৃথিবীর শেষ প্রান্তে আমার থাকতো যদি
একটা লাল টকটকে গোলাপ বাগান, যাতে ফোটে শতবর্ষে একটি গোলাপ
 তাহলে চোখের মণিতে গেঁথে নিয়ে আসতাম গোলাপ পাপড়ি,
বিছিয়ে দিতাম তোমার সড়কে
অন্যমনস্ক তুমি হেঁটে যেতে তীক্ষ্ণ স্যান্ডলের শব্দ তুলে তুলে।

আমার কিছুই নেই
আছে শুধু করুণ কম্প্র টলোমলো একরাশ বিষণ্ণ স্বপ্ন
সেই স্বপ্নগুলো আমি বিছিয়ে দিয়েছি শহরের সমস্ত সড়কে
 তুমি আস্তে হাঁটো-তোমার পায়ের নিচে
 ডুকরে ওঠে দীর্ঘশ্বাসের চেয়েও কোমল কাতর আমার বিষণ্ণ স্বপ্ন।

*

কতোবার লাফিয়ে পড়েছি

কতোবার লাফিয়ে পড়েছি ঠোঁটে ছাই হয়ে গেছি।
 গ্রীবা জুড়ে শত্রু শহরের মতো ঝলোমলো মানিক্যখচিত তিল,
ঝাঁপিয়ে পড়েছি কতোবার আত্মহত্যালুব্ধ কামিকাজি বোমারু বিমান।
 চৌরাস্তায় বিনামেঘে ঝলসানো রৌদ্রে কালো চুলে
 আকাশের এপারওপার ফেড়ে ঝনঝন করে ছিটকে পড়েছি বজ্রপাত।
জংঘাস্রোত তোলপাড় করে অতল মধ্যসাগরের দিকে
কতোবার পেখম ছড়িয়ে ছুটে গেছি উত্তেজিত লাল রুই,
জড়িয়ে পড়েছি কতোবার আদিম আগুনের লতাগুল্মজালে।
 হাতুড়ি পেরেক ঠুকে, পিছলে পড়ে, আবার দাঁড়িয়ে, পুনরায় পিছলে পড়ে
এবং দাঁড়িয়ে আসন্ধ্যাসকাল শ্রমে সময়ের শেষ পারে
 কতোবার একলা চড়েছি থরোথরো দ্বৈতশৃঙ্গে,
–এক শৃঙ্গ থেকে অন্য শৃঙ্গ অনন্তকাল দূরবর্তী
ফসকে পড়েছি কতোবার মৃত্যুর প্রবালপান্নার অসমভূমিতে।
 নখে ছিঁড়ে হলদে মোড়ক তামাটে টফির মতো
 কতোবার ছুঁড়েছি জিভের খসখসে তলে,
 চুষতে গিয়ে কতোবার আটকে গেছো তালুতে মূর্ধায়।
শুধু একবারই ঢুকে গিয়েছিলাম হৃৎপিণ্ডে–গেঁথে আছি
জীবনের বাট-পরা জংধরা মুমূর্ষ ছুরিকা।

*

আমি যে সর্বস্বে দেখি

তুমি কি গতকাল ভোরে ধানমণ্ডি হ্রদের স্তরে স্তরে
বিন্যস্ত ঢেউয়ের সবুজ সিঁড়ির ধাপে ধাপে পা ফেলে আনমনে
হেঁটে গিয়েছিলে?
–না
গতকাল দুপুরে তুমি কি শহর পেরিয়ে গিয়ে দিগন্তপারের
 সব গাছ, তৃণ, লতা, গুল্ম, প্রতিটি পল্লব
 ছুঁয়েছিলে–যেমন আমাকে ছোঁও–তোমার ওই দীর্ঘ শ্যামল আঙুলে?
–না
তুমি কি মধ্যাহ্ন বৃষ্টির পর গতকাল আকাশের এপারেওপারে
 টাঙানো রঙধনুতে ঝুলিয়ে দিয়েছিলে
তোমার শরীরের রঙে ঝলমল করা একান্ত ব্যক্তিগত শাড়ি?
-না
তুমি কি গতকাল পদ্মার পশ্চিম প্রান্তে নারকোল বনের আড়ালে
 টেনে এনে ওই লাল তীব্র ঠোঁটে চুমো খেয়েছিলে
 সূর্যাস্তকে?
–না
তুমি শুধু বলো না-না-না-না;
কিন্তু আমি যে সর্বস্বে দেখি তোমাকেই।
ধানমণ্ডি হ্রদে যদি তুমি না-ই গিয়ে থাকো
 তবে আমি কেনো ওই জলধির ঢেউয়ের সিঁড়িতে সিঁড়িতে
দেখি তোমার পায়ের দাগ? শহর পেরিয়ে যদি না-ই গিয়ে
 থাকো তুমি দিগন্তপারের বৃক্ষের প্রান্তরে
 তাহলে সেখানে কেনো লেগে আছে তোমার ত্বকের
 একান্ত শ্যামল বর্ণ? রঙধনুতে তোমার শাড়ি না ঝুললে কেনো আমি
 ওই সাতরঙে অত্যন্ত স্পষ্ট দেখি একটি অষ্টম রঙ?
 আর যদি তুমি চুমো না-ই খেয়ে থাকো সূর্যাস্তকে,
তবে তার সারা মুখে ভ্যানগগের তুলির
 বিশাল পোচের মতো কেনো লেগে ছিলো তোমার ঠোঁটের
গাঢ়-ভেজা লাল রেভলন?

*

কবিতা–কাফনে-মোড়া অশ্রুবিন্দু

পংক্তির প্রথম শব্দ, ডানা-মেলা জেট,
 দাঁড়িয়ে রয়েছে টার্মিনালে। শব্দের গতির চেয়ে দ্রুতবেগে
 বায়ু-মেঘ-নীল ফেড়ে উড়াল মাছের মতো নামে
পংক্তির শেষ শব্দের বন্দরে। অতল সমুদ্রপারে, দ্বিতীয় পংক্তির
 সম্মুখ জুড়ে, ভিড়ে আছে সাবমেরিন, ডুবে যায়
 কালো তিমি, প্রবাল তুষার ভেঙে অসংখ্য সূর্যাস্ত দেখে
ভুশভুশ করে ভেসে ওঠে দ্বিতীয় স্তবকের দিকচিহ্নহীন
মধ্যসাগরে। তৃতীয় স্তবকে আচমকা
জ্যোৎস্না ঠেলে ঝনঝনাৎ বেজে ওঠে নর্তকীনূপুর
 দশদিগন্তে মঞ্চেমঞ্চে ডানা মেলে বর্ণাঢ্য ময়ূর!
ব্লাউজ-উপচে-পড়া কিশোরীর ব্যাপ্ত বুক।
রোধ করে পঞ্চম স্তবকের পথঘাট, উত্তেজিত ক্ষিপ্ত
 ট্রাক রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাল দেয় লাল
 টয়োটাকে। একনায়কের কামান মর্টার স্টেনগানে
 বধ্যভূমি হয়ে ওঠে দ্বাদশ পংক্তির
 উপান্তে অবস্থিত বিদ্রোহী শহর,
 লাল গড়িয়ে গড়িয়ে স্বয়ং রচিত হয়ে ওঠে
ত্রয়োদশ-চতুর্দশ-পঞ্চদশ পংক্তি, এবং
 টলমল করতে থাকে সমগ্র কবিতা
 কাফনে-মোড়া এক বিন্দু
অশ্রু!

*

বাঙলা ভাষা

শেকলে বাঁধা শ্যামল রূপসী, তুমি-আমি, দুর্বিনীত দাসদাসী
একই শেকলে বাঁধা পড়ে আছি শতাব্দীর পর শতাব্দী।
আমাদের ঘিরে শাঁইশাঁই চাবুকের শব্দ, স্তরেস্তরে শেকলের ঝংকার।
তুমি আর আমি সে-গোত্রের যারা চিরদিন উৎপীড়নের মধ্যে গান গায়
 হাহাকার রূপান্তরিত হয় সঙ্গীতে-শোভায়।

লকলকে চাবুকের আক্রোশ আর অজগরের মতো অন্ধ শেকলের
মুখোমুখি আমরা তুলে ধরি আমাদের উদ্ধত দর্পিত সৌন্দর্য :
আদিম ঝরনার মতো অজস্র ধারায় ফিনকি দেয়া টকটকে লাল রক্ত,
চাবুকের থাবায় সূর্যের টুকরোর মতো ছেঁড়া মাংস
আর আকাশের দিকে হাতুড়ির মতো উদ্যত মুষ্টি।

শাঁইশাঁই চাবুকে আমার মিশ্র মাংসপেশি পাথরের চেয়ে শক্ত হয়ে ওঠে
 তুমি হয়ে ওঠো তপ্ত কাঞ্চনের চেয়েও সুন্দর।
সভ্যতার সমস্ত শিল্পকলার চেয়ে রহস্যময় তোমার দু-চোখ
যেখানে তাকাও সেখানেই ফুটে ওঠে কুমুদকহলার
হরিণের দ্রুত ধাবমান গতির চেয়ে সুন্দর ওই ভ্রূ-যুগল
তোমার পিঠে চাবুকের দাগ চুনির জড়োয়ার চেয়েও দামি আর রঙিন
তোমার দুই স্তন ঘিরে ঘাতকের কামড়ের দাগ মুক্তোমালার চেয়েও ঝলোমলো
তোমার ‘অ, আ’ চিৎকার সমস্ত আর্যশ্লোকের চেয়েও পবিত্র অজর

তোমার দীর্ঘশ্বাসের নাম চণ্ডীদাস
 শতাব্দীকাঁপানো উল্লাসের নাম মধুসূদন
তোমার থরোথরো প্রেমের নাম রবীন্দ্রনাথ
বিজন অশ্রু বিন্দুর নাম জীবনানন্দ
তোমার বিদ্রোহের নাম নজরুল ইসলাম

শাঁইশাঁই চাবুকের আক্রোশে যখন তুমি আর আমি
আকাশের দিকে ছুড়ি আমাদের উদ্ধত সুন্দর বাহু, রক্তাক্ত আঙুল,
 তখনি সৃষ্টি হয় নাচের নতুন মুদ্রা; ফিনকি দেয়া লাল রক্ত
সমস্ত শরীরে মেখে যখন আমরা গড়িয়ে পড়ি ধূসর মাটিতে এবং আবার
দাঁড়াই পৃথিবীর সমস্ত চাবুকের মুখোমুখি,
তখনি জন্ম নেয় অভাবিত সৌন্দর্যমণ্ডিত বিশুদ্ধ নাচ;
এবং যখন শেকলের পর শেকল চুরমার করে ঝনঝন করে বেজে উঠি
আমরা দুজন, তখনি প্রথম জন্মে গভীর ব্যাপক শিল্পসম্মত ঐকতান
আমাদের আদিগন্ত আর্তনাদ বিশশতকের দ্বিতীয়ার্ধের
 একমাত্র গান।

*

ব্যাধিকে রূপান্তরিত করছি মুক্তোয়

একপাশে শূন্যতার খোলা, অন্যপাশে মৃত্যুর ঢাকনা,
পড়ে আছে কালো জলে নিরর্থ ঝিনুক।
 অন্ধ ঝিনুকের মধ্যে অনিচ্ছায় ঢুকে গেছি রক্তমাংসময়
আপাদমস্তক বন্দী ব্যাধিবীজ। তাৎপর্য নেই কোনোদিকে
না জলে না দেয়ালে– তাৎপর্যহীন অভ্যন্তরে ক্রমশ উঠছি বেড়ে
 শোণিতপ্লাবিত ব্যাধি। কখনো হল্লা করে হাঙ্গরকুমিরসহ
ঠেলে আসে হলদে পুঁজ, ছুটে আসে মরা রক্তের তুফান।
আকস্মিক অগ্নি ঢেলে ধেয়ে আসে কালো বজ্রপাত।
যেহেতু কিছুই নেই করণীয় ব্যাধিরূপে বেড়ে ওঠা ছাড়া
নিজেকে ব্যাধিকে–যাদুরসায়নে রূপান্তরিত করছি শিল্পে
একরত্তি নিটোল মুক্তোয়।

*

নাসিরুল ইসলাম বাচ্চু

 বাহাত্তরে, স্বাধীনতার অব্যবহিত-পরবর্তী কয়েক মাস,
একটি প্রতীকী চিত্রকল্প–রাইফেলের নলের শীর্ষে রক্তিম গোলাপ
 আমাকে দখল করে থাকে। সেই চিত্রকল্পরঞ্জিত কোনো এক মাসে,
 মধ্য-বাহাত্তরে, এখন আবছা মনে পড়ে, আমি
 প্রথম দেখেছিলাম নাসিরুল ইসলাম বাচ্চুকে। সদ্য গ্রাম থেকে আসা
ওই ঝলমলে সবুজ তরুণকে দেখে আমার স্বাধীনতালব্ধ
চিত্রকল্প আরো জ্বলজ্বল করে উঠেছিলো, এবং এখন ব্যাপক
স্মৃতিবিনাশের পরেও আমার মনে পড়ে সংক্রামক আশাবাদের
 বাহাত্তরে আমিও কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম।
 স্বপ্ন দেখেছিলাম রাজিয়ার নখের মতো উজ্জ্বল লাল দিন,
 সব ভুল সংশোধিত হবে, সংশোধিত হবে, সংশোধিত হবে
ব’লে আমিও অন্তর্লোকে জপেছিলাম অত্যন্ত অসম্ভব মন্ত্র।

কিন্তু আশা–অন্ধ আর নির্বোধের দুঃস্বপ্ন–টেকে নি; আরেক ডিসেম্বর
আসতে-না-আসতেই আমার স্বাধীনতালব্ধ প্রতীকী চিত্রকল্প
নষ্ট হয়ে যায়। আমি স্বেচ্ছানির্বাসনে যাই, আর তিন বছরে
বাঙলাদেশ অনাহার, হাহাকার, অসুস্থতা, পরাবাস্তব খুনখারাবিতে
 ভরে ওঠে অ্যালান পোর গল্পের মতোন। ফিরে এসে দেখি
বাঙলাদেশে বিদ্রোহ-বিপ্লব-স্বপ্ন ও আশার যুগের পর গভীর ব্যাপক
এক অপ্রকৃতিস্থতার যুগ শুরু হয়ে গেছে। এবং তখনি
 এক দিন রাস্তায় আবার দেখা হয় নাসিরুল ইসলাম বাচ্চুর সাথে :
দেখি সেও নষ্ট হয়ে গেছে আমার স্বাধীনতালব্ধ চিত্রকল্পের
মতোই–সূক্ষ্ম তন্তুর এপারের বাস্তবতা পার হয়ে বাঙ্গু অনেক দূরে
চলে গেছে তন্তুর ওপারে। এরপর তার ক্রমপরিণতি, অনেকের
 মতো, আমিও দেখেছি। সে আবর্তিত হতে থাকে রোকেয়া হলের
স্বপ্নদরোজা থেকে নীলখেতের দুঃস্বপ্ন পর্যন্ত– বিড়বিড়
 করতে করতে হাঁটে আর ভাঙা দেয়ালের ওপরে বসে ‘প্রেম, প্রেম,
বিপ্লব, বিপ্লব’ বলে চিৎকার করে থুতু ছুঁড়ে দেয় শহর-স্বদেশ
সভ্যতা-স্বাধীনতা প্রভৃতি বস্তুর মুখে। কয়েক বছরে
যৌবন জীর্ণ হয়ে নাসিরুল ইসলাম বুড়ো হয়ে যায়,
 (এ-সময়ে, আমি লক্ষ্য করেছি, যুবকেরাই যৌবন হারিয়েছে
 দ্রুতবেগে, আর বাতিল বুড়োরা সে-যৌবন সংগ্রহ করে
বেশ টসটসে হয়ে উঠেছে দিন দিন) তার চোয়াল দিকে দিকে
ভেঙে পড়ে, মাথায় জন্ম নেয় বাঙলাদেশের মতো এক ভয়ংকর জট,
 আর সে বাঁ-হাতে আস্তিনের তলে বইতে থাকে একখণ্ড ইট।

পাঁচ বছরে আমার বর্ণাঢ্য চিত্রকল্প–রাইফেলের নলের শীর্ষে
 রক্তিম গোলাপ–রূপান্তরিত হয় একমাথা ভয়ংকর জট আর
আস্তিনের তলে একখণ্ড ইটে। স্বাভাবিক বাস্তবতা পেরিয়ে যারা
অস্বাভাবিক বাস্তবতায় ঢুকে পড়ে, তারা নতুন বাস্তবতায় ঢোকার
আশ্চর্য মাসগুলোতে সবখানে দেখতে পায় নিজের প্রভাব। নাসিরুলও
 তার দ্বিতীয় বাস্তবতায় ঢোকার প্রথম পর্যায়ে বাঙলা ভাষার
 সমস্ত গদ্যেপদ্যে দেখতে পেতো নিজের প্রভাব। কলাভবনে একদিন
সে আমার ঘরে ঢুকে পড়ে, এবং টেবিল থেকে সঞ্চয়িতা
তুলে ওই অমর গ্রন্থের প্রত্যেকটি ছত্রে সে নিজের সুস্পষ্ট প্রভাব
দেখে প্রচণ্ড চিৎকার করে ওঠে। বুদ্ধদেব, সুধীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের
সমস্ত কবিতা ওর কবিতার অক্ষম নকল বলে দাবি করে। আমি
ওর দিকে আমার একটি কবিতা বাড়িয়ে দিয়ে জানতে চাই
 কবিতাটি ওর কোনো কবিতা নকল করে লেখা কি না?
নাসিরুল কবিতাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে, দ্বিতীয় স্তবকে
 ‘ভালোবাসি’ শব্দটি পেয়েই শোরগোল করে বলে, ‘এইটা আমার শব্দ,
আমার কবিতা থেকে মেরে দিয়েছেন।’ খলখল করে হাসে নাসিরুল।
 আমি জানি নাসিরুল ইসলাম বাচ্চুর কবিতার কোনো প্রভাব পড়ে নি
কারো ওপরেই– কিন্তু আজকাল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, রাস্তায়
 হাঁটি, ক্লাবের আড্ডায় বসি, বন্ধুর সংসর্গে আসি, খবরের কাগজ
 পড়ি, টেলিভিশনের বাক্স খুলি, তখন বুঝতে পারি চারদিকে কী গভীর
তীব্রভাবে পড়ছে নাসিরুল ইসলাম বাচ্চুর ব্যক্তিগত প্রভাব।
 নাসিরুলকে অনুসরণ করে দলে দলে লোকজন চলে যাচ্ছে তন্তুর ওপারে।
 একুশের উৎসবে বাঙলা একাডেমিতে এক স্টলের সামনে
 দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা কয়েকজন, দেখলাম রিকশা থেকে নামছেন
এক অর্ধপল্লী অর্ধআধুনিক কবি,–লাল টাই অদ্ভুত জাকেট
 গায়ে তাঁর, সব কিছু অবহেলা করে আমাদের কাছাকাছি এসে
কিছুক্ষণ এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন যেনো বাঙলা একাডেমির
বুড়ো বটের শাখায় দেখতে পাচ্ছিলেন গোটা দুই ফেরেশতার ডানা।
তিনি কথা শুরু করতেই আমি দেখলাম সরু সুতো পেরিয়ে যাচ্ছেন তিনি,
রূপান্তরিত হচ্ছেন–তাঁর বিকট মাথায় জড়ো হয়ে উঠছে জট, জামা
ছিঁড়ে যাচ্ছে, দড়িতে রূপান্তরিত হচ্ছে টাই, এবং বাঁ-হাতে আস্তিনের
কাছাকাছি ধরে আছেন একখণ্ড হলদে ইট। কলাভবনের বারান্দায়
প্রিয় কবিতার খণ্ড খণ্ড পংক্তি বিড়বিড় করতে করতে
আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন এক তরুণ অধ্যাপক, কুশলবিনিময় ছাড়াই
বললেন, ‘আমার যে-লেখাটিতে আমি এক নতুন তত্ত্ব…আপনি
সেটা’…অমনি দেখতে পেলাম আমি তরুণ অধ্যাপক রূপান্তরিত
 হচ্ছেন জট-ছেঁড়া শার্ট-ইটখণ্ডের সমষ্টিতে। অত্যন্ত আতংকে
দৌড়ে আমি ঘরে ঢুকে হাঁপাতে লাগলাম। বেইলি রোডে এক আমলার
সাথে দেখা হলো, দীর্ঘ সিগারেট বের করে যেই তিনি আত্মপ্রকাশ
 আরম্ভ করলেন, অমনি তাঁর অভ্যন্তর থেকে এক মাথা জট, বাঁ-হাতে
হলদে ইট নিয়ে বেরিয়ে পড়লো নাসিরুল ইসলাম বাচ্চু।

 এক জনতাজাগানো রাজনীতিকের সাথে দেখা হলো পানশালায়।
 ‘নাসিরুল এখানেও আসে?’ আমি বিস্মিত হয়ে যেই স’রে পড়ছিলাম,
 তিনি চিৎকার করতে লাগলেন, ‘হেই ডকটর আজাদ, আমাকে কি
চিনতে পারছেন না?’ আমি দেখলাম নাসিরুল আমার পেছনে ছুটছে,
 আর বাঁ-হাতের ইট তুলে আমাকে ডাকছে। পানটান ভুলে আমি
 লাফিয়ে রাস্তায় নামলাম। আমার একটি ছাত্রী, ‘আসি স্যার’
বলতেই দরোজা জুড়ে দেখলাম এক স্ত্রীলিঙ্গ নাসিরুল;
আমার ক্লাশের বিনম্র ছেলেটি একদিন এমনভাবে তাকায় আমার
 দিকে যে আমি তার জট আর ইট দেখে দৌড়ে বেরিয়ে
আসি, সাত দিন আমি আর ক্লাশে যাই না।

এখন যখনি রাস্তায় হাঁটি, খবরের কাগজ উল্টোই, টেলিভিশনের
চব্বিশ ইঞ্চি বাক্সটা খুলি, ক্লাবে বা বাজারে যাই,
সচিবালয়ে ঢুকি, আলোচনা কক্ষে বা সভায় গিয়ে বসি, দেখতে পাই
আমাকে ঘিরে ফেলছে অসংখ্য নাসিরুল ইসলাম বাচ্চু
মাথায় বাঙলাদেশের মতো জট, ছেঁড়া শার্ট, বাঁ-হাতে হলদে ইটের খণ্ড।
সেদিন সন্ধ্যায় তিনটা আধাশিক্ষিত কবি, দুটি দ্বান্দ্বিক
 প্রবন্ধকার, একটা দালাল, তিনটি লুম্পেন, দুটি এনজিও, পাঁচটি আমলার
 সাথে সমাজ ও শিল্পের সম্পর্ক, শিল্প আর জীবনের বৈপরীত্য,
 অর্থের মূলতত্ত্ব, তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতির নোংরা ব্যাকরণ,
 গণতন্ত্র, জলপাইরঙের উত্থান ইত্যাদি বিষয়ে অজস্র বাক্য ছুঁড়ে
যখন রাস্তায় একা হেঁটে ফিরছিলাম, তখন চমকে উঠে টের পাই :
আমার মাথায় শক্ত হয়ে উঠছে জট, শার্ট ছিঁড়ে যাচ্ছে, গাল ভাঙা,
বাঁ-হাতে অত্যন্ত যত্নে আমি ধরে আছি একখণ্ড হলদে ইট।

*

কবির লাশ

উদ্যত তোমার দিকে একনায়কের পিস্তল বেয়নেট ছোরা।
 স্বপ্নসৌন্দর্যের চেয়ে বহু দামি দেশলাই, ক্লিপ, চটিজোড়া,
অন্তর্বাস। তুমিই চিহ্নিত শত্রু;–তাই দানবিক ট্রাক
 গাল ভরে রক্ত চায়। শহরের পথেপ্রান্তে হিংস্র দশলাখ
 বৈদ্যুতিক তার ঝুলে পড়ে তীব্র তেজে! দীর্ঘ বিক্ষুব্ধ মিছিল
চণ্ডস্বরে গর্জে ওঠে, ‘আমরা চাই ছন্দোবদ্ধ, যতি আর মিল
দেয়া কড়া পদ্য, কবিতার দরকার নাই।’ মাংসল যুবতী
দশটা গুণ্ডার সাথে ঘুম যায়, তবুও কী বিস্ময়কর সতী!
 তার কৌমার্য ক্ষুণ্ণ হয় কবিতায়। সমাজের কালো কুকুরেরা
 চিৎকারে সন্ত্রস্ত করে স্বপ্নলোক, আতঙ্কিত পদ্ম-জ্যোৎস্না-ঘেরা
পশু ও মানুষ। অন্ধ রাজধানি ভরে রটে প্রচণ্ড উল্লাস
 সদর রাস্তায় চাই রক্তমাখা ছিন্নভিন্ন ঘৃণ্যতম লাশ।

*

ভেতরে ঢোকার পর

এক সময় বাইরে ছিলাম;–যা কিছুর অভ্যন্তর,
দরোজাজানালা আছে, যথা–অট্টালিকা, নারী, সংঘ,
পরিষদ, সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র, সভ্যতা প্রভৃতি
 প্রবেশাধিকার ছিলো না সে-সবে। দাঁড়িয়ে থেকেছি
বাইরে–শিলাবৃষ্টিতে, ঘূর্ণিঝড়ে, বোশেখি আঁধিতে,
আভালাঁসে, দাবানলের চেয়েও ক্রুদ্ধ হিংস্র রৌদ্রে,
ক্ষুধার্ত রাস্তায়। আমার বর্বর গোড়ালি-ঘর্ষণে
 পিচে জ্বলতো কর্কশ আগুন; ট্রাউজার ছিঁড়ে ফেড়ে
দিগ্বিদিক বেরিয়ে পড়তো বিভিন্ন অশ্লীল অঙ্গ
 অশীল, উদ্ধত, রাগী, বেয়াদব। ঝড়ে লণ্ডভণ্ড
নৌকোর পালের মতো ছেঁড়া শার্ট তোলপাড় করে
 দেখা দিতে অসভ্য পাঁজর। যতোবার আমি গেছি
 অভ্যন্তরসম্পন্ন সামগ্রীর কাছে–দূর থেকে
 উন্মুক্ত দরোজা দেখে, খোলা দেখে জানালাকপাট
 ততোবার সেই সব স্বয়ংক্রিয় দরোজাজানালা
 ধাতব ক্রেংকার তুলে মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে গেছে।
নারী–সুপরিকল্পিত অট্টালিকা, স্ফটিকে গঠিত,
চতুষ্কোণ, দুর্গম, কারুকার্যমণ্ডিত। চারদিক
সাজানোগোছানো, সামনে বাগান, গম্বুজ-সূড়ঙ্গ
 ঘেরা; ঝাড়লণ্ঠনসজ্জিত বৈঠকখানায় তীব্র
 উৎসব; কক্ষে কক্ষে দ্বৈতশয্যা;–আমাকে দেখলেই
 নিভতো সমস্ত বাতি, বন্ধ হতো আলোঝলকিত
 ওই রঙিন ক্যাসল। সমাজ–নোংরা ডাস্টবিন;
প্রকট দুর্গন্ধে বোঝা যায় ওই আবর্জনাস্তূপে
 জমে আছে উন্মাদের পাতলা মল, মরা ব্যাঙ, বমি,
গর্ভস্রাব, প্লেগের ইঁদুর, হিসি, অশনাক্ত লাশ;
 তবু ওই আবর্জনা বেড়া দিয়ে বসে আছে ঝানু
মলের সম্রাট। পরিষদ–অভিজাত গোরস্তান;
দেয়ালে গিলাফে সুরক্ষিত কতিপয় মাননীয়
মৃতদেহ মেপে যায় অমরতা; জীবনে জীবিত .
ছিলো না বলেই ঠিকঠাক করে তারা কবরস্থ
হওয়ার পরে গর্তে চিরকাল  বাঁচার কৌশল।
পরস্পরের দিকে উদ্যত ছুরিকা নিয়ে শক্ত
দেয়ালের অভ্যন্তরে ঘাতকেরা গড়ে যা, তাইতো
সংঘ;–ফিনকি-দেয়া রঙিন রক্তের চেয়ে মনোরম
দৃশ্য নেই, সংঘবদ্ধ ঘাতকেরা দরোজাজানালা
সেঁটে মনপ্রাণভরে রক্তের দৃশ্য দেখে যায়।
 রাষ্ট্র–দেয়াল, প্রহরী, গুপ্তচর, ভয়াল পরিখা,
রক্ষী, সুড়ঙ্গ ও ঘনঘন ষড়যন্ত্র; মধ্যরাতে
বুটের অদ্ভুত শব্দ, পিস্তলের জঘন্য উল্লাস।
সভ্যতা–সম্ভ্রান্ত পতিতাপল্লী, যাতে আশ্লেষের
অধিকার পায় তারা যারা কোনো দিন দুঃস্বপ্নেও
দ্যাখেনি বর্বর রৌদ্র, গোখরোর দুর্দান্ত মস্তক।

আমি, প্রবেশাধিকারহীন ওই দরোজাজানালা
অভ্যন্তরমণ্ডিত সামগ্রীতে, বাইরে থেকেছি
যুগযুগ। যা কিছুর অভ্যন্তর, দরোজাজানালা
 নেই, যা কিছু আপাদমস্তক বাইর, বহির্দেশ
 আমি সে-সবে থেকেছি। এক পা রেখেছি টলোমলো
শিশিরবিন্দুর শিরে, অন্য পা রাখার স্থানাভাবে
প্রসারিত করে তাকে পাঠিয়েছি অনন্তের দিকে।
 ক্ষুধা ছিলো আমার খাদ্য ও পানীয়; দিনরাত
একশো ইন্দ্রিয় দিয়ে খেয়েছি ক্ষুধার মতো অসম্ভব সুধা।
 ক্ষুধা–সুধা–ক্ষুধা–সুধা; সারা রাত্রি জেগে থেকে
 সর্বস্বে ঢেলেছি বীর্য–ওই মেঘ, তন্বী চাঁদ, পাখি,
 শস্যকণা, পলিমাটি, উপত্যকা, মগ্ন মহাদেশ,
 নগ্ন নদী, টাওয়ার, নর্তকী ঝরনা, কাছে-দূরে
স্বপ্নে দ্যাখা কিশোরী যুবতী, সবাই আমার বীর্যে
 কমবেশি গর্ভবতী। প্রাগৈতিহাসিক নদী ছিলো
আমার শিরায়; বন্য মোষের মতো সারাক্ষণ
গোঁ-গোঁ করতো আমার প্রচণ্ড রক্ত আমার জীবন।
এক দিন সব কিছু খুলেছে দরোজা বন্ধ নারী,
অট্টালিকা, সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র, সংঘ, পরিষদ,
সভ্যতা–যা কিছু দরোজাসম্পন্ন, অভ্যন্তরমণ্ডিত।
আমি আরো অভ্যন্তরে যাবো বলে পা বাড়াই, দেখি
আর অভ্যন্তর নেই, আছে শুধু গাঢ় অন্ধকার।

আমার চারদিকে আজ ভারি পর্দা দোলে, ভারি পর্দা
দোলে, ভারি পর্দা দোলে; জীবনের দারুণ গর্জন
 শোনা যায় পর্দার ওপারে। আমি অন্ধকার ঘরে
বসে আছি–ক্ষুধা নেই, রক্ত নেই; বহু দিন ঝড়,
 নৌকোর উদ্দাম নাচ, যুবতীর উত্তেজিত স্তন,
 শস্য, বর্ষণ দেখি নি। একদা আমার ক্ষিপ্ত বীর্য
বন্ধ্যা পাথরকেও করেছে পুষ্পবতী; সেই আমি,
 এখন সংরার্গহীন, নপুংসক, নিরুত্তাপ, জীর্ণ,
প্রতিভাবঞ্চিত, ম্লান; না, আমি বেরিয়ে পড়বো;
এই পর্দা, দেয়াল, সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা লণ্ডভণ্ড করে
আবার বর্বর ঝড় রৌদ্র ক্ষুধাভরা বাইরে বেরোবো।

*

অনুপ্রাণিত কবি আর প্রেমিকের মতো
রবীন্দ্রনাথ

নিজেকে ঈগল, রহস্যের যুবরাজ, নীলিমায় ডানা-ঝাপটানো
 দেবদূত ভাবা দূরে থাক, অধিকাংশ সময় নিজেকে মানুষও
 ভাবতে পারি না। বোধ করি আমি কুকুর-শুয়োর-তেলেপোকা
প্রভৃতি ইতর পশু আর পতঙ্গের বংশোদ্ভূত;–ওদের সাথেই
গোত্রভুক্ত হয়ে উল্লাসে হাহাকারে প্রাণবন্ত করে রাখি আদিগন্ত
আবর্জনাসস্তূপ। বিষ্ঠার অতলে পাই সুখ; অন্ধকার আমার গোত্রের
 প্রিয় ব’লে ডুবে যাই অত্যন্ত পাতালে, যাতে কোনো জ্যোৎস্নারৌদ্র
আমাদের ছুঁতেও পারে না। দুঃস্বপ্ন ব্যতীত কোনো স্বপ্ন দেখি না;
খুলি আর বুকের ভেতরে যে-সামান্য সোনা ছিলো, সে-সমস্ত ঝেড়ে
ফেলে ওই শোচনীয় শূন্যস্থান ভরেছি জঞ্জালে। কখনো সৌন্দর্য
দেখি নি, দেখবো এরকম সাধও পুষি না। শিল্পের ঐতিহ্য শুধু
রক্ষা করি ছুরিকায়, অর্থাৎ খুনোখুনিই আমাদের শুদ্ধ শিল্প;
 রাস্তায় ফিনকি দিয়ে ঝরে পড়া রক্তের কারুকাজই প্রশংসিত
 চিত্রকলা; দিকে দিকে ধর্ষণই আমাদের থরোথরো প্রেম।
জানি না মেধার কথা; কখনো মহত্ত্ব মনুষ্যত্ব প্রীতি অমরতা
শিহরণ দেয় নি রক্তে। শুধু ভালোবাসি ক্রীতদাসের চেয়েও
 ঘৃণ্য অধীনতা–দাও দাও চতুর্দিকে স্বৈরাচারী, পাড়ায় অজস্র
গুণ্ডা, রাশিরাশি লাশে আর গাঢ়তম লাল রক্তে সাজাবো সভ্যতা।
অর্থাৎ আমি নই তোমার উত্তরাধিকারী, রবীন্দ্রনাথ; পতঙ্গ
পশুর বংশোদ্ভূত আমি–আবর্জনাবাসী, যেখানে কখনো কোনো
 রৌদ্র আর জ্যোৎস্না জ্বলে না। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময় আর পীড়া বোধ
করি যখন অতল আবর্জনা-অন্ধকার ভেদ করে এই নোংরা
 পতঙ্গেরও অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে তোমার অজর রৌদ্র এবং
লোকোত্তর জ্যোৎস্না, আর এ-পতঙ্গ পঙ্কপুঞ্জে থরোথরো কাঁপতে থাকে
 অমর অনুপ্রাণিত কবি ও উন্মথিত প্রেমিকের মতো।

*

তোমার ফটোগ্রাফ
নজরুল

তোমার বেশ কিছু ফটোগ্রাফ বাল্যকাল থেকে
দেখে আসছি পাঠ্যপুস্তকে, দেয়ালপঞ্জিতে, এগারোই জ্যৈষ্ঠের
 ক্রোড়পত্রে, দেয়ালে, ড্রয়িংরুমে, এখানে
সেখানে। ছবিগুলো দেখে বোঝা যায় পোজ দিতে
তোমার বেশ ভালোই লাগতো, রবীন্দ্রনাথের মতো
স্মরণীয় ভঙ্গিতে, একটু নকল করে, ক্যামেরার সামনে
 দাঁড়াতে তুমিও চমৎকার দক্ষ হয়ে উঠেছিলে।
একটি ছবিতে চোখ বুজে কৃষ্ণের মতোই ঠোঁটের একটু
 নিচে ধরে আছো বাঁশির ওষ্ঠ–যেনো তার সুরে কমিল্লা কৃষ্ণনগর
 চট্টগ্রাম মালদহ থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসবে
 যুবতীরা ঘরবাড়ি ছেড়ে।

বিষ্ণুপুরে দলমাদল কামানের পাশে সাংঘাতিক পোজ দিয়েছিলে
একবার। হাবিলদার বেশে বুক টানটান করা ছবিগুলো
 দেখে মনে হয় সুযোগসুবিধা পেলে তৃতীয় বিশ্বের
কোনো মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাতারাতি আবির্ভূত
 হতে পারতে স্বেচ্ছাচারী ত্রাণকর্তারূপে। সুরসাধক,
পিতা, বেদুইন, প্রেমাতুর কবি ও অন্যান্য ভঙ্গিতে যে-সমস্ত
ছবি আছে, তার প্রত্যেকটিতেই চোখে পড়ে
সাংঘাতিক পোজপাজ, ওই সমস্ত ছবিতেই তুমি পরে আছো
 রঙচঙে বিভিন্ন বানানো মুখোশ।

কিন্তু একটি ছবিতে তুমি সম্পূর্ণ মুখোশহীন,
কোনো পোজ নেই তাতে; ওই ছবিটিতে তুমি অত্যন্ত আন্তরিক,
সৎ, প্রসাধনহীন। মৃত্যুর কয়েক বছর আগের একটি ছবিতে
 তুমি তাকিয়ে রয়েছে বিপন্ন, বিমূঢ়, অসহায় উন্মাদের মতো
যেনো এই নষ্ট সমাজ সভ্যতা হাঁ করেছে তোমাকে আপাদমস্তক
গিলে ফেলার জন্যে; আর তুমি অসহায়, নিরস্ত্র,
পালানোর পথহীন, কিংকর্তব্যবিমূঢ় উন্মাদের মতো কুঁকড়ে গেছো
 নিজের ভেতরে। এ-ছবিটিতে কোনো পোজ ও মুখোশ নেই;
এটিতে স্থিরচিত্রিত হয়ে আছে ভয়ংকর এক সত্য :
 যে-নষ্ট অশ্লীল জঘন্য দুশ্চরিত্র চক্রান্তপরায়ণ বদমাশ
 সমাজসভ্যতাকে রূপান্তরিত করার জন্যে তুমি উত্তেজিত
থেকেছো দিনরাত, সে-নষ্ট বিষাক্ত বিশ্বাসঘাতক
 সমাজসভ্যতা পারে শুধু একজন নজরুল ইসলামকে
পঙ্গু ও নির্বাক ও উন্মাদ করে দিতে। যখন তোমার কথা ভাবি
 আমার চোখের সামনে চলচ্চিত্রের মতো দুলে ওঠে ওই ছবি,
বুকের ভেতরে দেখতে পাই অবিকল তোমার ছবির মতোই নিজের
 ফটোগ্রাফ, যাতে আমি এক বিশাল পাগলা গারদে তোমার মতোই
বিপন্ন আক্রান্ত উন্মাদ হয়ে নিঃশব্দে ঠোঁট নেড়ে চলছি দিনরাত।

*

পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে

ক্রাচে-ভর-দেয়া স্টেনগান
হুইলচেয়ারে ধ’সে-পড়া বিধ্বস্ত মর্টার
 ফুটপাতে পড়ে-থাকা বাতিল গ্রেনেড
 নষ্ট বোমা থাবাহীন রয়েলবেঙ্গল

যখন খুঁড়িয়ে চলো পা-আর-ডানা-ভাঙা আলবাট্রসের মতো
শেরেবাঙলা নগরের বাস ট্রাক পুলিশিগাড়ির
বিবেকহীন সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে
 হামাগুড়ি দিয়ে কাৎ হয়ে পড়ে থাকো নাবাবপুরের
ড্রেন কিংবা আবর্জনাস্তূপের পাশে
আলুর বস্তার মতো পড়ে থাকো হৃদস্পন্দনহীন বঙ্গভবনের
দেয়াল আর সান্ত্রীদের পদতলে
যখন প্রচণ্ড ক্রোধে চিৎকার করতে গিয়ে ব্যাকফায়ার করা
 রাইফেলের মতো আর্তনাদ করে ওঠে তোমাদের কণ্ঠস্বর
 বিকল মেশিনগানের নলের মতো একেকবার
ঝিলিক দিতে গিয়ে অসহায়ভাবে ঢলে পড়ে একদা উদ্ধত
মাটি থেকে আকাশে ছড়ানো বাহু
 তোমাদের হাজার হাজার চোখের দুপাশে যখন
ভয়ঙ্কর বিস্ফোরকের মতো বিস্ফোরিত হতে গিয়ে
ভেজা বারুদের মতো গলে পড়ে এক একটা বিশাল অশ্রুবিন্দু
 তখন মনে হয় তোমরা আর যুদ্ধাহত নও
 তোমরা সবাই পঙ্গু, আভিধানিক অর্থেই পঙ্গু!

ক্রাচে-ভর-দেয়া স্টেনগান
এখন তোমরা পঙ্গু
তোমাদের ট্রিগারের সাথে
 কোনো ম্যাগাজিন সংযুক্ত নয়।
 হুইলচেয়ারে ধ’সে-পড়া বিধ্বস্ত মর্টার
এখন পঙ্গু তোমরা
তোমাদের ভেতরে এখন আর
 বারুদ আর ইস্পাতের সংমিশ্রণ নেই।
ফুটপাতে পড়ে-থাকা বাতিল গ্রেনেড
 এখন পঙ্গু তোমরা
তোমাদের ছুঁড়ে দিলে এখন আর
সামান্য শব্দও হবে না।
নষ্ট বোমা
এখন পঙ্গু তোমরা
 দশবছরের প্রতিক্রিয়াশীল বর্ষণে
তোমাদের ভয়ঙ্কর হৃৎপিণ্ড নষ্ট হয়ে গেছে।
 থাবাহীন রয়েলবেঙ্গল
 এখন পঙ্গু তোমরা
তোমাদের থাবা আর ভয়াবহভাবে
ঝকঝক করে উঠবে না।

এক দশকেই যুদ্ধাহত তোমরা সব পঙ্গু হয়ে গেছো।
এখন বাঙলাদেশে সব বাঙালিই পঙ্গু।

যে-বাঙালিকেই কুশল জিজ্ঞেস করি
সে-ই জানায় সে আপাদমস্তক পঙ্গু হয়ে গেছে।
 নদীর ঘোলাটে জলকে জিজ্ঞেস করি : কেমন আছো?
 ছলছল করে জল : আমরা পঙ্গু।
পাখির ঝাঁককে জিজ্ঞেস করি : কেমন আছো?
 চর জুড়ে উত্তর আসে : আমরা পঙ্গু।
বিমর্ষ জোনাকিকে জিজ্ঞেস করি : কেমন আছো?
 নিভে যেতে যেতে জবাব দেয় : আমরা পঙ্গু।
 ধানের হলদে শিষকে জিজ্ঞেস করি : কেমন আছো?
 আর্তনাদ করে ওঠে ধানখেত : আমরা পঙ্গু।
আত্মীয়কে জিজ্ঞেস করি : কেমন আছেন?
উত্তর পাই : আমি পঙ্গু।
স্ত্রীকে কাছে টানলে কান্না শুনিঃ আমি পঙ্গু।
আমার যে-কন্যা সমস্ত প্রতিরোধ সত্ত্বেও জন্মাতে পেরেছে
তাকে জিজ্ঞেস করি : আম্মু, তুমি কেমন আছো?
 তার স্বর শুনিঃ আমি পঙ্গু।
আমার যে-সন্তান ভ্রূণ হয়ে মায়ের অভ্যন্তরে যুদ্ধরত
তাকে জিজ্ঞেস করি : অনাগত, কেমন রয়েছো?
 তার কণ্ঠ শুনিঃ আমি পঙ্গু।
 ছাত্রকে জিজ্ঞেস করি : কেমন আছো?
উত্তর : পঙ্গু।
তার প্রেমিকাকে জিজ্ঞেস করি : কেমন আছো?
উত্তর : পঙ্গু।
 চাষীকে জিজ্ঞেস করি : কেমন আছেন?
উত্তর : পঙ্গু।
 শ্রমিককে জিজ্ঞেস করি : কেমন আছেন?
 উত্তর : পঙ্গু।
 রিকশঅলাকে জিজ্ঞেস করি : কেমন আছেন?
 উত্তর : পঙ্গু।
ঠেলাঅলাকে জিজ্ঞেস করি : কেমন আছো?
উত্তর : পঙ্গু।
 কাজের মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করি : কেমন আছিস?
উত্তর : পঙ্গু।

আমার স্বপ্নকে আলিঙ্গনে বেঁধে ওষ্ঠে ঠোঁট রেখে
নিঃশব্দে জানতে চাই : কেমন রয়েছো প্রিয়তমা?
নিঃশব্দে জানায় সে : পঙ্গু।
পঙ্গু
পঙ্গু
পঙ্গু
পঙ্গু
পঙ্গু
পঙ্গু

এখন বাঙলাদেশে সব বাঙালিই আপাদমস্তক পঙ্গু।

ক্রাচে-ভর-দেয়া স্টেনগান
 এখন বাঙলাদেশ তোমাদের মতোই পঙ্গু
হুইলচেয়ারে ধ’সে-পড়া বিধ্বস্ত মর্টার
এখন বাঙলাদেশ তোমাদের মতোই পঙ্গু

এক দশকেই মুক্তিযোদ্ধা
বাঙালি
আর বাঙলাদেশ
মাথা থেকে হৃৎপিণ্ড থেকে পা পর্যন্ত পঙ্গু হয়ে গেছে।

*

পৃথিবীতে একটিও বন্দুক থাকবে না

নিত্য নতুন ছোরা, ভোজালি, বল্লম উদ্ভাবনের নাম এ-সভ্যতা।
আমি যে-সভ্যতায় বাস করি
যার বিষ ঢোকে ঢেকে গিলে নীল হয়ে যাচ্ছে এশিয়া ইউরোপ আফ্রিকা
তার সারকথা হত্যা, পুনরায় হত্যা, আর হত্যা।

যেদিন আদিম গুহায় পাথর ঘষে ঘষে লাল চোখের এক মানুষ
প্রস্তুত করে ঝকঝকে ছুরিকা, সেদিন উন্মেষ ঘটে এ-সভ্যতার
সে যখন ওই ছুরিকা আমূল ঢুকিয়ে দেয়
প্রতিবেশীর লালরঙ হৃৎপিণ্ডে তখনি বিকাশ শুরু হয়
আমাদের আততায়ী সভ্যতার।

এ-সভ্যতা বাঁক নেয় একটা নতুন অস্ত্র আবিষ্কারের মুহূর্তে
 ভোজালি ছেড়ে বল্লমে উত্তরণ সূচনা করে নতুন যুগের,
বারুদের উদ্ভাবনে এ-সভ্যতা হয়ে ওঠে আপাদমস্তক আধুনিক।
এ-সভ্যতার যে-পর্যায়ে
 মানুষকে খুবই পরিচ্ছন্ন সুচারুরূপে নিশ্চিহ্ন করা যায়,
সে-পর্যায়ই এ-সভ্যতার স্বর্ণযুগ
 আমাদের গৌরব আমরা আজ সভ্যতার অমানবিক স্বর্ণযুগে উপনীত হয়েছি।

 আমাদের সৌভাগ্য আমরা খুনী সভ্যতার
চরম বিকাশ দেখতে দেখতে বিকলাঙ্গ, অন্ধ, বিকৃত
হয়ে চিহ্নহীন গোরে মিশে যাবো,
কিন্তু চমৎকার অক্ষত থাকবে নগর, আসবাবপত্র, পুঁজি, অর্থনীতি।

আমার শ্যামল কন্যা জন্ম নিয়ে দোলনায় উঠতেই দ্যাখে
 তাকে ঘিরে ফেলেছে লাখলাখ সশস্ত্রবাহিনী।
আমার শ্যামল পুত্র জন্ম নিয়ে দোলনায় উঠতেই দ্যাখে
 তার দিকে উদ্যত হয়ে আছে দশ কোটি অশ্লীল রাইফেল।
আমার কন্যা তার জননীর স্তনের দিকে তাকাতেই দ্যাখে
তাকে ছিঁড়ে খাওয়ার জন্যে দশ হাজার ডিভিশন
পদাতিক বাহিনী কুচকাওয়াজ শুরু করেছে আমেরিকায়;
 আমার পুত্র কোলে ওঠার জন্যে বাহু বাড়াতেই দ্যাখে
তিন শো বিমানবাহিনীর দশ হাজার বিমান
 ছুটে আসছে তারই মাথা লক্ষ্য করে;
আমার কন্যার বুক লক্ষ্য করে সমুদ্রে সমুদ্রে
ছোটে আণবিক সাবমেরিন,
আমার পুত্রের মাথা লক্ষ্য করে দশ দিক থেকে
নির্বিচারে নিক্ষিপ্ত হয় ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালাস্টিক মিসাইল।

কিন্তু না, পৃথিবীতে আর একটিও বন্দুক থাকবে না।

মানি কি না মানি
পাঁচ হাজার বছর ধরে পৃথিবীর সমস্ত
হোয়াইট হাউজ, ক্রেমলিন, দশনম্বর ডাউনিং স্ট্রিট আর বঙ্গভবন
দখল করে আছে মাফিয়ার সদস্যরাই
পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রপ্রধান মাফিয়ার সক্রিয় সদস্য।
শিশুর হাসির থেকে
বুলেটের খলখল শব্দ ওদের বহু গুণে প্রিয়,
গোলাপের গন্ধের চেয়ে লাশের গন্ধ ওদের কাছে বেশি প্রীতিকর।
শয়তান ওদের আত্মা গন্ধক বারুদ দিয়ে প্রস্তুত করেছে।

কিন্তু না, পৃথিবীতে আর একটিও বন্দুক থাকবে না।

যখন পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়ার চেয়েও মারাত্মক এক তেজস্ক্রিয়ায়,
 যার নাম ক্ষুধা,
বিকলাঙ্গ হয়ে যাচ্ছে আফ্রিকা
অন্ধ হয়ে যাচ্ছে এশিয়া
বিকৃত হয়ে যাচ্ছে আমেরিকা
পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে ইউরোপ
 তখনো মাফিয়ার সদস্যরা পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়ার দুঃস্বপ্নে উন্মাদ।

মানুষের দুর্ভাগ্য মানুষ একটি মিশ্র প্রজাতি।
চিরকাল গাধার গর্ভে আর ঔরসে জন্ম নেয় গাধা,
গরুর গর্ভে ও ঔরসে জন্ম নেয় সরল শান্ত গরু,
বাঘের ঔরসে আর গর্ভে কখনো কালকেউটে জন্মে না,
যেমন কালকেউটে কোনো দিন কালকেউটে ছাড়া
প্রসব করে না হরিণ বা রাজহাঁস বা স্বপ্নের মতো কবুতর।
 কিন্তু মানুষের ঔরসে আর গর্ভে আমি জন্ম নিতে
 দেখেছি প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গাধা, নর ও নারীর সঙ্গমে
আমি ভূমিষ্ঠ হতে দেখেছি আফ্রিকার নেকড়ের চেয়েও
ভয়াবহ হিংস্র নেকড়ে। ওই নেকড়েরাই চির দিন পৃথিবী চালায়।

কিন্তু না, পৃথিবীতে আর কোনো নেকড়ে থাকবে না।
কিন্তু না, পৃথিবীতে আর একটিও বন্দুক থাকবে না।
পৃথিবীতে আর কোনো শিরস্ত্রাণ থাকবে না
 পৃথিবীতে আর কোনো বুট থাকবে না
 পৃথিবীতে থোকায় থোকায় জলপাই থাকবে
 কিন্তু কোনো জলপাইরঙের পোশাক থাকবে না
আকাশভরা তারা থাকবে কিন্তু কারো বুকভরা তারা থাকবে না
পৃথিবীতে একটিও বন্দুক থাকবে না।

এখন নতুন সভ্যতায় উঠে যেতে হবে পৃথিবীকে
যাতে জন্মেই শিশু শিউরে না ওঠে
তিন বাহিনীর সম্মিলিত কুচকাওয়াজ দেখে,
ট্যাংকের অন্ধ ঘড়ঘড় আর বিমানের কোলাহল শুনে।
জন্ম নেয়ার পর তার দিকে দুলে উঠবে ধান আর গমের গুচ্ছ
তাকে কোলে নেয়ার জন্যে দু-বাহু বাড়াবে আফ্রিকা
দোলনা দুলে উঠবে ইউরোপে
এশিয়ার সমস্ত আকাশে উড়বে লাল নীল রঙিন বেলুন
ঘুমপাড়ানিয়া গান ভেসে আসবে দুই আমেরিকা থেকে
 মনুষ্যমণ্ডল থেকে তার জীবনের মাঠে মাঠে অঝোর ধারায়
ঝরবে মানবিকতার উর্বর মেঘদল

না, পৃথিবীতে আর একটিও বন্দুক থাকবে না।

*

আশির দশকের মানুষেরা

এই দশকের মানুষেরা সব গাধা ও গরুর খাদ্য–বিমর্ষ মলিন,
মাথা থেকে ফাঁড়া দোমড়ানো ভাঙাচোরা আত্মা আর অণ্ডকোষহীন।
নৈর্ব্যক্তিক : রেডিমেইড জামা পরে, শয়তানের বাক্য আর বাজারি বুলিতে
 ঠাণ্ডা রাখে দেহমন; দ্রুতবেগে মল জমে দশকোটি মগজখুলিতে।
পিছমুখো গাড়ি চড়ে, হৃৎপিণ্ড খুঁড়ে ফেলে দুই হাতে ভরে আবর্জনা,
রমণীসন্ত্রস্ত বলে ঘরে বসে মধ্যদিনে স্বহস্তে মেটায় উত্তেজনা।
 আলো নেই কোনো দিকে, ঘেন্না করে চাঁদ তারা জোনাকির দ্যুতি,
 লাউডস্পিকারে গায় দিনরাত পুচকে ছিঁচকে একনায়কের স্তুতি।
স্বপ্ন নেই বুকে ও বগলে : কবিতার চেয়ে পদ্য ভালোবাসে,
 প্রেমিকাকে ধর্ষকের ঘরে ঠেলে তারা পতিতার ঘরে চলে আসে।
চুরি করে ছুরি মারে, হঠাৎ পেছনে ছোরা গেঁথে ভাসে ড্রেনে নর্দমায়,
তারা নায়কের রক্তে হোরি খেলে আর ভিলেনের শোকে মূৰ্ছা যায়।

*

যতোবার জন্ম নিই

যতোবার জন্ম নিই ঠিক করি থাকবো ঠিকঠাক
ঠিক করি শত্রু হবো মানুষের, হবো শয়তানের চেয়েও চক্রান্তকুশল।
 গণতন্ত্রের শত্রু হবো, প্রগতি-সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে থাকবে চিরকাল।
 প্রকাশ্যে করবো স্তব জনতার, গোপনে তাদের পিঠে
অতর্কিতে ঢোকাবো ছোরা : উল্লাসে হেসে উঠবো প্রগতির সমস্ত পতনে।

যতোবার জন্ম নিই ঠিক করি থাকবো ঠিকঠাক
ঠিক করি জুতো হবো স্বৈরাচারী–চেঙ্গিশ বা অন্য কোনো একনায়কের।
 তার পায়ে সেঁটে থেকে সিঁড়ি বেয়ে উঠবো ওপরে,
বলবো, ‘স্বৈরতন্ত্র ছাড়া মানুষ আর সভ্যতার কোনো বর্তমান-ভবিষ্যৎ নেই।’
 বলবো, ‘চিরকাল অস্ত্রই ঈশ্বর।’
 প্রতিক্রিয়াশীল হবো হাড়েহাড়ে, হৃৎপিণ্ড বেজে যাবে,
 ‘আমি প্রতিক্রিয়াশীল। আমি প্রতিক্রিয়াশীল।’

যতোবার জন্ম নিই ঠিক করি থাকবো ঠিকঠাক
ঠিক করি অত্যন্ত বিনীত হবো, মাথাটাকে তুলতেও শিখবো না।
মেরুদণ্ড খুলে ছুঁড়ে দেবো আঁস্তাকুড়ে, ওই বিপজ্জনক অস্থি
অসাবধান মুহূর্তে উদ্ধতভাবে তুলে ধরতে পারে বিনীত মস্তক।

যতোবার জন্ম নিই ঠিক করি থাকবো ঠিকঠাক
 ঠিক করি হবো ধর্মান্ধ জঘন্যতম, পারলৌকিক ব্যবসা ফেঁদে
 রঙিন বেহেশত্ তুলবো দুনিয়ায়। বলবো, ‘বিধাতাই পুঁজিবাদী।’
 বলবো, ‘তিনি স্বৈরাচারী; গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র তাঁর বিধানে নিষিদ্ধ।’
 শোষণে হবো পরাক্রম; বলবো, ‘শোষণই স্রষ্টার শাশ্বত বিধান।’

যতোবার জন্ম নিই ঠিক করি থাকবো ঠিকঠাক
 ঠিক করি হবো রাজনীতিবিদ : জনতার নামে জমাবো সম্পদ।
জাতির দুর্যোগে পালাবো নিরাপদ স্থানে, সুসময়ে ফিরে এসে
পায়রার মতো খুঁটে খাবো পাকা ধান। কোন্দলে ভাঙবো দল, হবো
বিদেশি এজেন্ট–সারা দেশ বেচে দেবো শস্তায় বিদেশি বাজারে।

যতোবার জন্ম নিই ঠিক করি থাকবো ঠিকঠাক
ঠিক করি আমলা হবো, ঝকঝকে জীবন কাটাবো! বনানীতে বাড়ি করবো,
গাড়ি চড়বো চিরকাল। মাসিক বেতন, ঘুষ, কালোবাজারিতে
কাটবে জীবন। কোনো পাকা প্রতিক্রিয়াশীলের রূপসী কন্যাকে স্ত্রী করে
 ঘরে রাখবো, বাইরে ফষ্টিনষ্টি করে যাবো বন্ধুপত্নীদের সাথে।
স্ত্রী চল্লিশ পেরিয়ে গেলে আমলাদের ঐতিহ্য অনুসারে অধস্তন
 কোনো আমলার যুবতী বউকে ভাগিয়ে তুলবো ঘরে
শুরু করবো কামের জ্বলজ্বলে রঙিন উৎসব।

যতোবার জন্ম নিই ঠিক করি থাকবো ঠিকঠাক
 কিন্তু প্রত্যেক জন্মে আমার জন্যেই থাকে রূঢ় রাস্তা আর ফাঁসিকাঠ।

*

নৌকো, অধরা সুন্দর

একটি রঙচটা শালিখের পিছে ছুটে ছুটে
চক পার হয়ে ছাড়াবাড়িটার কামরাঙা গাছটার
দিকে যেই পা বাড়িয়েছি, দেখি–নৌকো
ভেসে আসে অনন্ত দু-ভাগ করে। পাল নেই
 মাঝি নেই, শুধু ঢেউয়ের ধাক্কায় ভেসে আসে
ধ্রুবতারা আমারই দিকে। রঙধনু একবার খেলে
 গেলো আগ থেকে পাছ-গলুই পর্যন্ত, চাড়টে গুড়ায়
 আছড়ে পড়লো চাঁদ। একটা শাদা-লাল রুই
বৈঠার মতো লাফিয়ে উঠলো পাছ-গলুইয়ের কাছে।
কামরাঙা গাছ থেকে ছুটলাম সেই স্বপ্নের দিকে
 লাফিয়ে উঠতে যাবো দেখি সাতশো বাদামে
 ফুলে উঠেছে লাল-নীল-হলদে বাতাস। বাদামের
দিগন্তে দিগন্তে রাঙা মেঘ, পাঁচশো সূর্যাস্ত ও
উদীয়মান সূর্য, আমার সামনে দিয়ে ভেসে যায়
জ্যোতির্ময়। আমি ছুটছি পেছনে, দেখি দিন অস্ত
 গেলে পাটাতনে ঝনঝন বেজে দুলে কেঁপে ওঠে একঝাঁক
 শাদা নাচ! তাদের শরীর থেকে খসে পড়ে এলোমেলো
রঙিন আকাশ–তখন চোখের চারদিকে শুধু ঢেউ
অন্তহীন। এমন সময় কোথা থেকে উঠে এলো
একদল স্বাস্থ্যবান নর্তক কিষাণ, মেতে উঠলো সকলের
সাথে এক বিস্ময়-খেলায়! ধানে ভরে উঠলো নৌকো
 গানে ভরে উঠলো গলা, ঝলমলালো পাটখেতের
 দুর্দান্ত সবুজ, ইলশের রঙে গন্ধে আপাদমস্তক নৌকো
অবিকল পূর্ববঙ্গ। আমি তখনো ছুটছি সেই নাচ-গান
ইলশের পিছে পিছে, কিন্তু যতো কাছে আসি
ততো দূর ছুটে যায় গতিময় পরম সুন্দর!
থেকে থেকে বদলে যায় রঙ, রূপ বদলায়
পলকে পলকে। কখনো সে মাস্তুলে মাস্তুলে ফাড়ে
 মেঘ, বৃষ্টি নামে ঝড় ওঠে নৌকোর গুড়ায় গুড়ায়,
আবার কখনো পাল নেই মাঝি নেই শুধু নৌকো
 অনন্তের অনন্ত মধ্যে স্থির পদ্ম। ভাটিয়ালি টান
 শোনা যায় কখনো বা, পরমুহূর্তেই আবার বুকের
 রক্তাক্ত তন্ত্রি থেকে ওঠে শর-গাঁথা পাখির চিৎকার।
সেই যে শৈশবে সাত বছর বয়সে নৌকোর পেছনে
পেছনে ছোটা শুরু হয়েছিলো, তারপর
আমার শরীরে একসময় ঝলমল করে উঠেছিলো
স্বাস্থ্য, বহুবার কলকল করেছে অসুখ,
কখনো সমস্ত চোখে নেমেছে অন্ধতা, সব ইন্দ্রিয়ে
ঘনিয়েছে বধিরতা। তবু আজো ছুটছি সেই
নৌকোর পেছনে পেছনে;–আমি ছুটি আর
আমার সামনে দিয়ে ভেসে যায় চিরকাল অধরা সুন্দর।

*

খাপ-না-খাওয়া মানুষ

কারো সাথেই খাপ খেলাম না। এ-ঠোঁট আঙুল
পা থেকে মস্তক ও মধ্যবর্তী হৃৎপিণ্ড যখন যেখানে রাখি
সেখানেই সূচারু শান্তিশৃংখলার মধ্যে জন্ম নেয় ঝড়-ত্রাস-বিপর্যয়।
বাতাস লাফিয়ে ওঠে, লকলকে জিভ দেখা দেয় আগুনের,
গোলাপ রূপান্তরিত হয় বারুদ্যুপে, শক্র গ্রহের হিংস্র রবোটের
মতো ঝাঁপ দেয় চাঁদ। সরষে খেতের হলুদ বন্যার
 মধ্যে এক বিকেলবেলায় একরত্তি মিল হয়েছিলো এক কিশোরীর
ঠোঁটের সঙ্গে, কিন্তু সন্ধ্যার আভাসেই সে দানবীতে
 রূপান্তরিত হতে থাকলে আমাদের বিরোধ বাঁধে।
সূর্যাস্তের সাথে বনিবনা না হওয়ায় চাঁদ ওঠার অপেক্ষায় রইলাম
 আর সারারাত কাটলো আমাদের প্রচণ্ড উত্তেজনা, গালাগাল,
 হাতাহাতিতে। উত্তেজনা এখনো কাটে নি;–গলির অন্ধ
 মোড়ে বা পার্কের ঝোপের আড়ালে কোনো দিন একলা দেখা হয়ে গেলে
ছোরা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি একে অন্যের দিকে।
 পতিতার সাথে খাপ খেলাম না সে-রাতে যেতেতু সে আমার মতো
 সমস্ত সভ্যতা-শাস্ত্ৰ-আসবাবসহ উদ্ধারহীন অতলে পাতালে
নামতে রাজি নয়; সতীর সাথেও মিললো না, কেননা সে
 আমার মতো লিঙ্গ ও যোনিহীন সৎ হ’তে ঘৃণা করে।
বন্দুকের সাথে বন্ধুত্বের সমস্ত সম্ভাবনা নষ্ট হলো যেহেতু সে
 যথেষ্ট হিংস্র হ’তে রাজি নয়; গোলাপের সাথেও জমলো না
কেননা সে আমার সমান কাঁটাহীন ঘ্রাণ হ’তে রাজি নয়।
 সে-সমস্ত রেডিমেইড পাজামা-ট্রাউজার-শার্ট-অন্তর্বাস বাধ্য হয়ে
পরতে হয় সকলকে, তার কোনোটার সাথে মিল হচ্ছে না
জংঘা বা নিতম্ব বা বুকের। ইতরের মলে নোংরা পাজামার মতো
বঙ্গীয় সমাজ পরতে গিয়েই দেখি একমাত্র বিশুদ্ধ বদমাশ
 ছাড়া আর কেউ ওই ন্যাকড়া পরতে পারে না। পুঁজিবাদী ট্রাউজার
 সংঘতান্ত্রিক শালোয়ার পরতেই শোষণ শুরু হয় রক্তনালিতে।
দ্বান্দ্বিক ইউনিফর্মও জ্যোৎস্নায় চেপে ধরে স্বপ্নের স্বরযন্ত্র।
গোলাপ-বন্দুক-সংবিধান ইত্যাদি ব্যবস্থার সাথে
 খাপ না খাওয়ায় ধীরে ধীরে হ’য়ে উঠছি আমি–কবি।