সুবর্ণদ্বীপ রহস্য

সুবর্ণদ্বীপ রহস্য

০১.

সমুদ্রে এখন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। তার মধ্যেই ভাসমান মাছের মতন সাবলীল গতিতে এগিয়ে চলেছে ছোট্ট জাহাজটি–এম. ভি-লা পেতিৎ মারমাদ। জাহাজ না বলে লঞ্চ বলাই ঠিক। যাত্রী মাত্র চারজন। লঞ্চের মালিক আলবার্তো মেনেজিস। কলকাতার একটি বড় কলেজের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ডক্টর অর্ণব চৌধুরী। তাঁর বাল্যবন্ধু প্রখ্যাত সাংবাদিক সুদীপ্ত সান্যাল। আর আলবার্তোর স্টিমার কোম্পানির একজন কর্মী ফিলিপস বুলান্ডি।

অর্ণব জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক হলেও শখের রহস্যসন্ধানী। তিনি সুদীপ্তর সঙ্গে যুগ্মভাবে ইংরেজিতে একটা বই লেখেন–গুপ্তভাষা এবং তার সৃষ্টি ও বিকাশের ইতিহাস। বইটি খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে। সাধারণকে গোপন করে নির্দিষ্ট ও অভীষ্ট কোনও ব্যক্তিবিশেষ বা দলকে কোনও বার্তা জানানো যায় যে ভাষাতে, সেটাই হল গুপ্তভাষা বা সিক্রেট ল্যাঙ্গুয়েজ।

উপনিষদে প্রজাপতি ব্রহ্মা শুধু দ অক্ষরটা উচ্চারণ করেছিলেন দেবতা, মানুষ আর দৈত্যের সামনে। তারা তার আলাদা আলাদা অর্থ বুঝেছিল, দেবতা বুঝেছিল দান করো। মানুষ বুঝেছিল, দমন করো। আর দৈত্য অর্থ নিয়েছিল, দয়া করো। উপনিষদ কী বলতে চাইছে, ধর্মের বাণীও বিভিন্ন মানুষের কাছে তার মনের মতো অর্থ নিয়ে দেখা দেয়? যা-ই হোক, এই গুপ্ত বা সাংকেতিক ভাষা নানাভাবে ব্যবহার হয়েছে এবং হচ্ছে। যুদ্ধে, রাজনীতিতে, পুলিশি ব্যবস্থায়–এমনকী ব্যাবসাবাণিজ্যেও। অর্ণবরা অনেক উদাহরণ দিয়েছেন তাঁদের বইয়ে। গুপ্তধনের স্থাননির্দেশেও গুপ্তভাষার ব্যবহার হত আগে, সকলের কাছে জায়গাটা গোপন রাখার জন্যে। এই নিয়ে কত রহস্য উপন্যাস আর গল্প যে লেখা হয়েছে, তার বোধহয় হিসেব নেই। নিজেদের জীবনেও যে গুপ্তভাষার পাঠোদ্ধার করে গুপ্তধন উদ্ধারের সুযোগ হয়েছে, সেই ঘটনাও বেশ সরসভাবে লিখেছেন তাঁরা।

আলবার্তো মেনেজিস বইটা পড়েছিলেন। তিনি ছেলেবেলা থেকেই রহস্য বিষয়ক বইয়ের পোকা। সেটা গায়ে কাঁটা-দেওয়া উপন্যাসই হোক, কিংবা নীরস প্রবন্ধই হোক। আলবার্তোর বয়স পঁয়ত্রিশের এদিক-ওদিক। অর্থাৎ অর্ণব সুদীপ্তদেরই সমবয়সি। বইটা পড়েই তিনি অর্ণবের সঙ্গে কলকাতায় যোগাযোগ করেন। আলবার্তো কোটিপতি। আফ্রিকার জাম্বিয়া দেশের তামার খনির অংশীদার তিনি। তা ছাড়া অ্যাঙ্গোলাতেও আছে জাহাজের ব্যাবসা। তিনি অর্ণবের ঠিকানায় চিঠি লিখে প্রথমে লেখকদ্বয়কে জানালেন অভিনন্দন। তারপর লিখলেন আসল কথাটা। তার হাতে এসেছে একটা গুপ্তসংকেত। এই ব্যাপারে তিনি অর্ণবের সাহায্যপ্রার্থী।

এরপর বেশ কিছুকাল কেটে গেল। কিন্তু আলবার্তো নাছোড়বান্দা। তাঁরই প্রচেষ্টায় আর খরচে অবশেষে একদিন অর্ণব-সুদীপ্ত দুই বন্ধুই পাড়ি দিলেন আফ্রিকা মহাদেশে। প্রথমে এলেন কেনিয়ায়। তখন রাত হয়ে এসেছে। একটা রাত্রি হাইলে সেলাসি অ্যাভিনিউয়ের প্যান আফ্রিকান হোটেলে কাটিয়ে পরদিনই আবার জাম্বিয়ার উদ্দেশে যাত্রা।

সকাল হতেই তাঁরা দেখলেন, স্বয়ং আলবার্তো হোটেলে এসে হাজির হয়েছেন তাঁদের সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। আলবার্তোর চেহারা দেখে মনে হয় না তিনি একজন জবরদস্ত শিল্পপতি। গ্রিক ভাস্কর্যের মতন দেহাবয়ব। একমাথা সোনালি চুল। চোখে-মুখে বালকের সারল্য। ঠোঁটে হাসি লেগেই আছে।

জাম্বিয়ান এয়ারলাইনসে তাঁরা তিনজনে যখন লুসাকায় পৌঁছোলেন, তখন প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঠিক যেন কালবৈশাখী। অথচ এখন তো অক্টোবরের মাঝামাঝি। সুদীপ্তর মনে পড়ল, আরে, এটা তো দক্ষিণ গোলার্ধ। এখনই তো এখানে গ্রীষ্মের শুরু। আলবার্তোর গাড়িতে করে শহরে যাওয়ার পথে কয়েকটি আম গাছে কাঁচা আম ধরেছে দেখা গেল। দু-পাশে বিস্তীর্ণ প্রান্তর। মাঝে মাঝে ঝাঁকড়ামাথা বাবলা, বাওবাব বা শিরীষ। সুদীপ্ত ভাবলেন, একসময় এই প্রান্তরেই হয়তো ছুটে বেড়াত সিংহের দল।

আলবার্তোর বাড়িতে অর্ণব আর সুদীপ্ত যখন এলেন, তখন লুসাকা শহরে সন্ধ্যা নেমেছে। সুদীপ্ত চুপিসারে অর্ণবকে বললেন, তোর ভাগ্যে আমারও বিদেশ ঘোরা হয়ে গেল।

অর্ণবও আড়ালে তাকে ধমক দিয়ে বললেন, গুপ্তভাষা বইটার বেশির ভাগ অংশ কে লিখেছিল? আমি তো শুধু কয়েকটা ডেটা সরবরাহ করেছি। বইটার রয়্যালটির পঁচাত্তর শতাংশ যার পাওয়া উচিত, সে হল বেঙ্গল টাইমসের বাঘা সাংবাদিক সুদীপ্ত সান্যাল। বুঝলি হাঁদারাম!

আলবার্তোর বাড়িটা সুন্দর বাংলো ধরনের। চারপাশ বাগান দিয়ে ঘেরা। সামনের তিনদিক খোলা বৃত্তাকার লাউঞ্জে গোল টেবিল ঘিরে টকটকে লাল রঙের নাইলনের ফিতে দেওয়া চেয়ার। টেবিল আর চেয়ারের ধাতুও লাল। অর্ণবকে হাত বুলিয়ে দেখতে দেখে আলবার্তো হেসে বললেন, চেয়ার-টেবিলগুলো তামার তৈরি। এখানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তামার খনিগুলো আছে। একটা বড় খনির অংশীদার আমি যে নিজে!

রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পর আলবার্তো একটা কাগজ হাতে নিয়ে অর্ণবদের ঘরে এলেন। কোনও লেখার একটা জেরক্স কপি। পোর্তুগিজ ভাষায় লেখা। সুদীপ্ত কলকাতায় আলিয়াস ফ্রাঁসোতে ফরাসি শিখলেও পোর্তুগিজ জানেন না। অর্ণব নিজেও পোর্তুগিজ ভাষায় কয়েকটি শব্দমাত্র জানেন।

আলবার্তো বুঝতে পেরে নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিলেন। সুদীপ্ত সঙ্গে সঙ্গে লিখে নিলেন সেটা। আলবার্তো বললেন, এটা তাঁর পিতামহের হাতের লেখা। মূল লেখাটা ছিল অবশ্য সেই ঠাকুরদারও ঠাকুরদা। সেই বৃদ্ধপ্রপিতামহ জোকিমসন মেনেজিস একবার জলদস্যুদের হাতে পড়েছিলেন। জলদস্যুরা অবশ্য দয়াপরবশ হয়ে তাঁকে মেরে সমুদ্রে ফেলে না দিয়ে একটা তৃণবৃক্ষহীন পাথুরে দ্বীপে ছেড়ে দেয়। অনাহারে, তৃষ্ণায় সেখানে এমনিতেই তো তিনি মারা যাবেন।

সেই ছোট্ট দ্বীপে, দ্বীপ না বলে ডুবন্ত গ্রানাইট পাহাড় বলাই ভালো, যেখানে দু-দিন ছিলেন জোকিমসন মেনেজিস, সেই সময় তিনি যখন তৃষ্ণায় কাতর হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাঁর চোখে পড়ল একটা ছোট ঝরনা। কাছে যেতেই গরম বাষ্প গায়ে লাগল তাঁর। বুঝলেন, এটা একটা উষ্ণপ্রস্রবণ। আরও একটু এগিয়ে যেতেই তিনি দেখলেন, প্রবাহের জল ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসছে। তিনি সেখান থেকে কিছুটা জল পান করলেন। বিস্বাদ জল। গলাটা ভিজতে-না ভিজতেই যেন বমি এসে গেল। ভয়ে ভয়ে তিনি আর বেশি জল পান করলেন না।

তারপরে মুখ তুলে জলের স্রোতের দিকে তাকাতেই যে দৃশ্য তিনি দেখলেন, তাতে ক্ষুধা-তৃষ্ণাও তাঁর যেন তখনকার মতো চলে গেল। তিনি দেখলেন, অজস্র সোনার রেণু কোথা থেকে জলের স্রোতে আবির্ভূত হচ্ছে। তারপর ঘুরপাক খেতে খেতে তলিয়ে যাচ্ছে ছোট্ট হ্রদটাতে। আর সেই জলে ওপর থেকে সূর্যের আলো পড়ে যেন পরির রাজ্য রচনা করেছে। হায় রে! এই সোনার জন্যেই জলদস্যুরা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছে। এই সোনার ঝরনা এখানে, অথচ কেউ জানবেও না! আর কিছু দিন পরে সেই সোনার স্রোতের পাশেই পড়ে থাকবে একটা ভাঙাচোরা মানুষের কঙ্কাল, যার সঙ্গে সমুদ্রের ধারে পড়ে থাকা ওই তারামাছের কঙ্কালটার কোনও তফাত থাকবে না–পরিচয়ে, মর্যাদায়!

অর্ণব বুঝলেন, আলবার্তোর সেই বৃদ্ধপ্রপিতামহ নিজেও জলদস্যু ছাড়া কিছু ছিলেন না। হয়তো লুণ্ঠিত ধনরত্নের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ঝগড়া বা অন্য কোনও কারণে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সহকর্মী জলদস্যুরা তাঁকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। ওসব জঘন্য কাজে এরকম তো চিরকালই হয়ে এসেছে, আর এখনও হচ্ছে।

আলবার্তো বলে চলেন, জোকিমসনের সৌভাগ্য, দু-দিন পরে একটা বাণিজ্য জাহাজ ওই পথ দিয়েই যাচ্ছিল। জামাটা খুলে হাতে নাড়াতে নাড়াতে তিনি পাগলের মতন লাফাতে আর চিৎকার করতে লাগলেন। সেটা ছিল একটা ব্রিটিশ জাহাজ। তাদের নজরে পড়তে তারা জোকিমসনকে নিজেদের জাহাজে তুলে নিয়ে আফ্রিকায় নামিয়ে দেয়। তারপর দেশে ফিরে কিছু দিনের মধ্যেই উদরাময় রোগে মারা যান তিনি।

জোকিমসন মারা যাওয়ার আগে সংকেতে সেই সুবর্ণদ্বীপের নিশানা দিয়ে যান তাঁর বালকপুত্রকে। আর বলে যান, বড় হয়ে নিজে বুদ্ধি করে দ্বীপটা বের করতে, কিন্তু কখনওই অন্য কাউকে না দেখাতে। সেই ছেলে বড় হয়ে চেষ্টা করেছিল কি না, সেটা এখন জানা সম্ভব নয়। শুধু এটা ঠিক যে, গত চার পুরুষ এটা পড়েই ছিল তাঁদের পরিবারে। আগ্রহী বংশধরদের কেউ কেউ কপি করে নিয়েছিল। তার বেশি কিছু নয়।

কারণ, তাঁদের পরিবারে এটা প্রায় স্বীকৃত হয়ে গিয়েছিল যে, বিষাক্ত জল খেয়ে জোকিমসনের মস্তিষ্কবিকৃতি দেখা দিয়েছিল। তাই তিনি হ্যালুসিনেশনে ভুগছিলেন। আর মৃত্যুর পূর্বে মস্তিষ্কবিকৃতির কথা তো জোকিমসনের স্ত্রী-ই বলে গিয়েছেন। তিনি তো অতিবৃদ্ধ বয়সে মারা যান। তা ছাড়া এটা তো ঠিক, ঝরনার জলে সূর্যের আলো পড়লে নবরত্নের মণিমাণিক্যও ফুটে ওঠে।

আলবার্তো কিন্তু মনে করেন, তাঁর বৃদ্ধপ্রপিতামহ সত্যিই সোনার ভাণ্ডার দেখেছিলেন কোনও পাথুরে দ্বীপের ঝরনার খাদে। এই সংকেতও হয়তো নিরর্থক নয়।

অর্ণবকে জেরক্স কাগজটা দিয়ে চলে যাওয়ার আগে আলবার্তো বললেন, কোনও তাড়াহুড়ো নেই। আপনারা চেষ্টা করুন, যদি অর্থ বের করতে পারেন। যদি পারেন, তবে সবাই মিলে আমরা সেই সুবর্ণদ্বীপের অভিযানে বেরোব। ছোট জাহাজ, স্টিমার, লঞ্চ সবই আমার কাছে। না, না–সোনার লোভ কিছু নেই। তামাই আমার কাছে লাল সোনা। আসলে একটা অ্যাডভেঞ্চারের নেশা আর কী। ছোটবেলা থেকেই ওইসব বই পড়েছি। পূর্বপুরুষের রক্তেও ছিল সেই নেশা। আমাদের পূর্বপুরুষের বংশের একজন তো ভারতেও গিয়েছিলেন। মারা যান আপনাদের বেংগালাতে।

.

০২.

 আলবার্তো চলে যেতেই অর্ণব বললেন, বল তো দিপু, ব্যাপারটাতে তোর কী মনে হচ্ছে?

সুদীপ্ত বললেন, আলবার্তোর মতন লোক না হলে বলতাম, সেই সনাতন স্বর্ণতৃষা। চ্যাপলিন সাহেবের ভাষায়–গোল্ডরাশ। তবে আলবার্তো সহজ দিলখোলা ধনীর দুলাল। মনে হয়, তাঁর কাছে এটা রহস্য-নেশা।

অর্ণব মৃদু হেসে বলল, স্বর্ণতৃষা! কথাটা ঠিক বলেছিস। স্বয়ং রামচন্দ্রও এর প্রভাবে পড়েছিলেন বলেই তো সাতকাণ্ড রামায়ণ। তবে সোনার হরিণের মতো সোনার ঝরনাও আছে বলে শুনিনি–কবির রচনায় ছাড়া। এই স্বর্ণতৃষা নিয়ে রূপকথা, রহস্যকাহিনি থেকে কল্পবিজ্ঞান পর্যন্ত কত কী সৃষ্টি হয়েছে। ছোটবেলায় পড়েছিস তো সেই মিডাসের গল্প? সোনার নেশায় মেতে ওঠার ফলে যখন নিজের আদরের মেয়েটা পর্যন্ত সোনায় পরিণত হল, তখন নেশা কাটল। রবীন্দ্রনাথের গুপ্তধন পড়েছিস। সেই–পায়ে ধরে সাধা, রা নাহি দেয় রাধা। বাস্তব ক্ষেত্রেও সোনার জন্যে লোকে কী না করেছে? সুবর্ণরেখা নদীর ধারে বালি খুঁড়েছে। ভণ্ড অ্যালকেমিস্টের খপ্পরে পড়ে সব কিছু খুইয়েছে। পারদের পরমাণুর পরিবর্তন ঘটিয়ে পারাকে সোনা করার চেষ্টা হয়েছে। এমনকী গাছের মধ্যেও সোনার খোঁজ হয়েছে। কলা গাছে লোহা, কুঁতে গাছে তামা যদি থাকতে পারে, সেরকম কিছু গাছে সোনাও তো থাকতে পারে।

একটু থেমে অর্ণব মৃদু হেসে বলল, তবে কবিরা অনেক সময় সত্যি কথাও কিছু বলে। যেমন কথা আছে না–যাহা চকচক করে তা-ই নয় স্বর্ণ? তা-ও না-হয় হল। এবারে দেখি তোর অনুবাদকর্ম।

সুদীপ্ত এর মধ্যে আলবার্তোর সাংকেতিক ভাষার ইংরেজি অনুবাদের আবার বাংলা অনুবাদও করে ফেলেছে। একেবারে ছন্দে। সব কটা কাগজই হাতে নিয়ে অর্ণব বলল, প্রত্যেক ভাষারই একটা নিজস্বতা আছে। সেটা অনুবাদে ঢাকা পড়ে যায়। শুনেছি, বিবেকানন্দ কবিতার অনুবাদকে বলতেন কাশ্মীরি শালের উলটোদিক। সেলাইয়ের কাজটাই নজরে পড়ে, সৌন্দর্যটা নয়। আবার তোর মতন ডবল অনুবাদ তো, বক কীরকম দেখতে? না, জলের মতন। অর্থাৎ বক থেকে দুধ, আবার দুধ থেকে জল। গুপ্তধনের সংকেতে এই অনুবাদকর্ম বেশির ভাগ সময়ই মর্মার্থটা নষ্ট করে দেয়। মনে পড়ে, আমাদের সেই পদ্মসাগর রহস্যের কথা? পদ্মেতে আকার দেহ, বাদ্য নিরাকার। পদ্মের আরেক নাম কমল। ইংরেজি অনুবাদে কি এটা ধরা পড়ত? তাই হয়তো অনুবাদের মাধ্যমে গুপ্তভাষার অর্থ উদ্ধার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় পণ্ডশ্রম। যাক গে, আগে দেখিই তো, কেমন করেছিস!

পরক্ষণেই সুদীপ্তর অনুবাদটা পড়ে অর্ণব চমৎকৃত হয়ে বললেন, বাঃ, সুন্দর হয়েছে। অন্তত ইংরেজির যথাযথ অনুবাদ। তোকে ছন্দাচার্য উপাধি দিলাম। আলবার্তোর অনুবাদের বিশুদ্ধতা যদি ঠিক থাকে, তবে তোর পদ্যটা নিয়েই চেষ্টা করা যেতে পারে।

তারপর অর্ণব গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। সুদীপ্তও ভাবতে লাগলেন।

হঠাৎ একসময় নীরবতা ভঙ্গ করে অর্ণব বলে উঠলেন, জোকিমসনের চাইতে রুদ্রপ্রতাপ যে অনেক বুদ্ধিমান ছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ভাষায় মারপ্যাঁচ তেমন কিছু নেই, যা অনুবাদে নষ্ট হয়ে যায়। একজন জলদস্যুর বুদ্ধি আর কতই বা হবে? আলবার্তো বা তাঁর পূর্বপুরুষের কেউই হয়তো তলিয়ে ভাবেননি। জোকিমসনের নির্দেশ অমান্য করে বাইরের লোককে এই সংকেতবাক্য দেখানো হয়তো আজই প্রথম হল। কিন্তু ভাবলেই বুঝবি, এটা বলতে গেলে ছেলেখেলা।

কাগজটা হাতে নিয়ে অর্ণব আবৃত্তি করে চলেন–

সোনার তীরের দেশের থেকে
চলল রাজা এঁকেবেঁকে।
সব হতাশা যেথায় কাটে
 সেথায় নেমে অনেক হাঁটে।
জিশু আসার দু-মাস আগে
সাধুপে রাতটা জাগে।
রাতদুপুরে এক শিকারির
আকাশ থেকে সাগর পাড়ি।
 লক্ষ রাখে, কোথায় নামে,
সাধুপের কত বামে।
সেদিক পানেই পাল তুলে সে
হপ্তা পরে পৌঁছে শেষে
কালো ঘোড়া দেখল চেয়ে
স্বর্ণ ঝরে ঝরনা বেয়ে।

 পড়া শেষ করে অর্ণব বললেন, কবিতাটার অর্থ বুঝলি দীপু?

সুদীপ্তকে মাথা চুলকোতে দেখে অর্ণব হেসে বললেন, আমিই বলে দিচ্ছি। রাজা এখানে জোকিমসন নিজে। রাজা হওয়ার উচ্চাশাটা হয়তো এই সংকেতবাক্যেই স্থায়ীভাবে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। সোনার তীরের দেশ–অর্থাৎ তখনকার গোল্ড কোস্ট। যার বর্তমান নাম ঘানা। ঘানা থেকেই জোকিমসনের জাহাজ যাচ্ছিল। কোথায় নোঙর ফেলেছিল? সব হতাশা যেথায় কাটে। এটা তো জলের মতন পরিষ্কার। অর্থাৎ তারা নেমেছিল উত্তমাশা অন্তরিপে। সেখান থেকে হেঁটে সাধুস্তূপ অর্থাৎ আলবার্তোর অনুবাদে মাউন্ট সেন্ট। সেখানেই রাত কাটিয়েছিল। হয়তো লুট-করা সোনাদানা ভাগবাটোয়ারা করতে। এইবার দিনির্ণয়ের সংকেত। রাতদুপুরে এক শিকারির আকাশ থেকে সাগর পাড়ি। নিঃসন্দেহে কালপুরুষের কথা বলেছে। যেখানে নক্ষত্র অস্ত গেল, সেইদিকেই। রওনা হয়েছিল পালতোলা জাহাজ। সেই জাহাজে দ্বীপটা বোধহয় এক সপ্তাহের পথ। রওনা হওয়ার তারিখটা লক্ষ করেছিস? জিশু আসার দু-মাস আগে। অর্থাৎ পঁচিশে অক্টোবর।… আজ কত তারিখ রে?

মুগ্ধ সুদীপ্তর উত্তর শোনা গেল, উনিশে অক্টোবর।

অর্ণব হাই তুলে বললেন, অর্থাৎ ছয় দিন বাকি। আর আলবার্তোর জাহাজে তো আর পালতোলা জাহাজের মতন এক সপ্তাহ লাগবে না। সুতরাং নভেম্বরের আগেই আমরা কলকাতায় ফিরতে পারব।… নে, শুয়ে পড়। রাত হয়েছে।-বলেই অর্ণব ঘরের আলো নিবিয়ে দিলেন।

.

০৩.

দু-দিনের মধ্যেই আলবার্তো সব ব্যবস্থা করে ফেললেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় মাউন্ট সেন্ট নামে ছোট টিলাটা খুঁজে বের করতেও দেরি হল না। ভাগ্যক্রমে সেখানেই একটা ভালো হোটেল আছে। রাত্তিরে তাঁদের ঘরের পশ্চিমের ব্যালকনি থেকে তাঁরা দেখলেন কালপুরুষের অস্তাচল যাত্রা। ভাগ্য ভালো, আকাশে মেঘ ছিল না। কম্পাসের সাহায্যে দিচিহ্ন নোট করে নিলেন আলবার্তো।

এর মধ্যে স্টিমারেরও ব্যবস্থা করে ফেললেন তিনি। তবে চতুর্থজনকে দেখে সুদীপ্তর ভালো লাগল না। তার অস্তিত্ব যেন একটা অস্বস্তির মতন বিরাজ করতে লাগল। নাম– ফিলিপস বুলান্ডি। আলাদিনের দৈত্যের মতো এই নিগ্রো সহযাত্রীর তাকানো আর হাসি দেখলে মনে হয়, নিষ্ঠুর কোনও মতলব ভাঁজছে সে। স্টিমারের স্টিয়ারিং তার হাতে। তাই সুদীপ্তর আরও অস্বস্তি লাগে। অর্ণবের মুখ দেখে সে কোনও ভাবান্তর বুঝতে পারে না। আলবার্তোও মাঝে মাঝে লঞ্চ চালাচ্ছেন। তিনি মোটর থেকে প্লেন সব কিছুই চালাতে পারেন।

মনের অস্বস্তি কাটাতে সুদীপ্ত ফিলিপসের দিক থেকে তাঁর দৃষ্টি সরিয়ে নীল সমুদ্রের দিকে তাকালেন। সামনে দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। লক্ষ লক্ষ তরঙ্গশিশু যেন নাচছে আর হাততালি দিচ্ছে। দিগন্তে নীল আকাশ নেমে এসে মিশেছে সফেন সমুদ্রে। সুদীপ্তর কবিমন আবেগে গেয়ে উঠল-নীলের কোলে শ্যামল সে দ্বীপ প্রবাল দিয়ে ঘেরা..।

গান শুনে আলবার্তো হেসে অর্ণবের দিকে চাইলেন। অর্ণব তাঁকে বললেন তাগোরের গানের অর্থ। তারপর বললেন, তবে আপনার কাছে যা শুনেছি, সেই দ্বীপ মোটেই শ্যামল নয়। সাগরবিহঙ্গেরা সেখানে নীড় বাঁধে কি না জানি না।

তারপর সুদীপ্তর দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠাকুরবাড়ির ওই ভদ্রলোক সব বিষয়েই গান লিখে গিয়েছেন।

এমনকী আমাদের অভিযান নিয়েও।

সুদীপ্তকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতে দেখে অর্ণব বললেন, না না, তোর ওই বাণিজ্যের গানের কথা বলছি না। আমার মনে অন্য গান ঘুরছে। এই বলে অর্ণব গেয়ে উঠলেন– তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই…

.

০৪.

 রাতটা আসতেই আলবার্তো অর্ণবের কাছে এসে তাঁর হাতে কিছু গুঁজে দিলেন। অর্ণব দেখলেন, দুটো রিভলভার। আলবার্তো হেসে বলেন, দুটো বাড়তি এনেছিলাম। আপনার জন্যে একটা, আর আপনার বন্ধুর জন্যে একটা। ফিলিপস লোকটাকে আমার তেমন সুবিধের মনে হচ্ছে না। ওর চাউনির মধ্যে একটা শয়তানির গন্ধ পাচ্ছি। ওকে না বললেও ও হয়তো আমাদের অভিযানের উদ্দেশ্য আঁচ করতে পেরেছে। রাতটা একটু সতর্ক থাকবেন। তবে এই অস্ত্রের ব্যবহার একেবারে চরম মুহূর্তেই করবেন। নইলে ঝামেলার মধ্যে পড়ে যেতে পারি।

অর্ণব অবশ্য আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, তিনি আর সুদীপ্ত দু-জনে একসঙ্গে চোখ বুজবেন না। ভাগাভাগি করে জেগে থাকবেন।

তবে বিপদ কিছু হল না। রাত্তিরে ফিলিপস স্টিমার ঠিকই চালিয়ে নিয়ে এল। সকালে সবাই মিলে ব্রেকফাস্ট খেল, দুপুরেও একসঙ্গে লাঞ্চ। বিকেলে স্টিয়ারিং-এ বসে ফিলিপস হঠাৎ তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, দেখুন, সামনে একটা আইল নোয়া-কালো দ্বীপ।

অর্ণব, সুদীপ্ত আর আলবার্তো তিনজনই নিজের নিজের দূরবিন চোখে ধরলেন। সত্যিই দূরে একটা দ্বীপ। গাছপালাহীন ন্যাড়া। অর্ণব বলল, এই সেই দ্বীপ। দেখছেন মিস্টার আলবার্তো, দাবার কালো ঘোড়ার মতনই দেখতে লাগছে দ্বীপের ওপরের রকটাকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্বীপটা কাছে এসে গেল। একটা উপযুক্ত স্থান দেখে স্টিমারকে নোঙর ফেলল ফিলিপস। তারপর একে একে চারজনই নেমে পড়লেন দ্বীপে।

কিছু দূর আসতেই একটা গন্ধ নাকে এল তাঁদের। পাথরের আড়ালে বাষ্পের আভাস দেখা গেল। সেখানে এসেই চোখে পড়ল উষ্ণপ্রস্রবণ। আলবার্তো দু-হাত দিয়ে অর্ণব আর সুদীপ্তর পিঠে চাপড় মারলেন সহাস্যমুখে। ট্রেজার আইল্যান্ডের সংকেতের পাঠোদ্ধার যে ভুল হয়নি, সেটা প্রায় প্রমাণিত। প্রস্রবণের জলধারার পথ ধরে তাঁরা এগিয়ে যেতে লাগলেন। একসময় ধোঁয়া কমে এল। জল ঠান্ডা হয়ে আসছে। কিছু পরেই এক জায়গায় এসে দেখলেন, জলের ধারা নেমে যাচ্ছে একটা জলাশয়ের মধ্যে। আর বিকেলের সেই সোনার রোদে যা চোখে পড়ল, তাতে কিছুক্ষণের জন্যে তাঁরা শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন জলের দিকে। বুঝলেন, অনেক বছর আগে এই দৃশ্য দেখেই জোকিমসন সাহেব ক্ষুধা-তৃষ্ণাও ভুলে গিয়েছিলেন। তাঁরা দেখলেন, জলের ধারার সঙ্গে কোথা থেকে এসে জুটেছে অজস্র সোনার টুকরো। জলের তালে তালে তারা নাচছে, দুলছে, ঘুরপাক খাচ্ছে। তারপর শেষে ধীরে ধীরে থিতিয়ে যাচ্ছে জলের তলায়।

এরপর একের পর এক যা ঘটল, তার জন্য সুদীপ্ত-অর্ণব তৈরি ছিলেন না।

আলবার্তো হঠাৎ দু-হাতে দুটো রিভলভার নিয়ে তিনজনের দিকে তুলে বললেন, খুবই দুঃখিত, আঁসিয়ে শোধুরি, মঁসিয়ে সানিয়াল আর মনামি ফিলিপস। আমি চাই না, আমার এই সম্পদের কোনও ভাগীদার থাকুক। শুধু তা-ই নয়, এই দ্বীপের সন্ধান জানে এমন কোনও সাক্ষীও আমি রাখতে চাই না। তাই আপনাদের মরতে হবেই। অবশ্য আমি জলদস্যু নাবিকদের মতো অত নিষ্ঠুর নই যে, তিলে তিলে আপনাদের মরতে এখানে ফেলে যাব। আপনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তাই সবচেয়ে কম যন্ত্রণাই আপনারা পাবেন। না না, মঁসিয়ে সানিয়াল, আমার দেওয়া ওই রিভলভার বার করে কোনও লাভই হবে না। ও দুটোর কোনওটাতেই কার্তুজ নেই।… যা-ই হোক, আপনাদের পাঁচ মিনিট সময় দেব। আপনারা যদি চান, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে নিতে পারেন। আর, হ্যাঁ… ফেরার সময় আমার স্টিমার ডুবে যাবে। আমি বেতারে এসওএস পাঠিয়েই স্টিমার ডুবিয়ে দেব আর লাইফবোট নিয়ে ভেসে পড়ব। সবাই উদ্ধার করতে এসে জানতে পারবে, আপনাদের মৃত্যু হয়েছে। আমার ভারতীয় বন্ধুদের বাড়িতে যথেষ্টই ক্ষতিপূরণ পাঠানো হবে। আর ফিলিপস, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। তোমার বিধবা স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে যে অর্থ দেব, সেটা তুমি দুটো জন্মেও রোজগার করতে পারতে না। এবার আপনারা প্রার্থনা সেরে নিন।

অর্ণব আর সুদীপ্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেও ফিলিপস হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করতে লাগল। হঠাৎ একটা চিৎকার দিয়ে আলবার্তো বসে পড়তেই দেখা গেল, ফিলিপস একটা পাথর অব্যর্থ লক্ষ্যে আলবার্তোর কাঁধে মেরেছে। ফিলিপস একজন ক্রিকেটার, সেটা অর্ণবরা জানতেন। দক্ষিণ আফ্রিকার নীতির জন্যে সে ক্রিকেট ছেড়ে দিয়ে জাহাজে চাকরি নেয়। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আলবার্তো বসে পড়ার আগেই তার দুটো রিভলভারই হাত থেকে ছিটকে পড়ল। মুহূর্তে ফিলিপস লাফিয়ে উঠে আলবার্তোর ওপর চেপে বসল আর অর্ণবদের বলল, তার কাঁধের ঝোলা থেকে দড়ি বার করে তাকে দিতে।

আলবার্তোকে বেঁধে ফেলা হল। ফিলিপস তার সাদা দাঁত বার করে হেসে। বলল, আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম, মহাশয়গণ। তাই প্রথম থেকেই নজর রেখে যাচ্ছিলাম। ভয় নেই, আমি ওসব সোনাদানা চাই না। ওতে অভিশাপ লেগে থাকে। তবে এভাবে বেঘোরে মরতেও রাজি নই।

অর্ণব আস্তে আস্তে জলাশয়ের কাছে এলেন। ঝুঁকে নিচু হয়ে আঁজলাভরে স্বর্ণরেণু সমেত জল তুলে নিলেন। তারপর সুদীপ্তকে বললেন, যা ভেবেছিলাম, দিপু। দেখ, তুইও বুঝতে পারবি। হ্যাঁ, গোল্ডেন স্প্যাঙ্গল। সোনা নয়, সোনার মতো। লেড আয়োডায়েড গলিত অবস্থা থেকে ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধলে এরকম দেখতে হয়। অর্থাৎ সোনার গুণ নেই, আছে শুধু চাকচিক্য।

তারপর আলবার্তোর রিভলভার দুটো তাঁদের নিজেদের রিভলভারের সঙ্গে জলের মধ্যে ফেলে দিয়ে ফিলিপসকে বললেন আলবার্তোর বাঁধন খুলে দিতে।

আলবার্তোকে সুবর্ণ-রহস্য বুঝিয়ে বলতে তাঁর মুখ ছোট হয়ে গেল। অর্ণব হেসে বললেন, সোনা না হলেও প্রচুর আয়োডিন হয়তো পেতে পারেন। তার মালিকানা নিতে পারেন আপনি।

ফিলিপস তা-ই শুনে বত্রিশপাটি দাঁত বার করল। তারপর ঝোলা থেকে একটা মলমের টিউব বার করে আলবার্তোর কাঁধে একটু মলম লাগিয়ে ঘষতে ঘষতে বলল, হাড় না ভাঙলে হয়তো এতেই ব্যথা কমতে পারে। ক্ষমা করে দেবেন সঁসিয়ে। আপনার হাতে একটা রিভলভার থাকলে আর কাঁধে মারতে হত না। সেটাকেই ফেলে দিতে পারতাম। সাদা চামড়া না-হওয়াতেই তো ক্রিকেটে উঠতে পারলাম না।

শুনে আলবার্তোর মুখ আরও নিচু হয়ে গেল।

কিছুক্ষণের মধ্যে চারজনকে নিয়েই এম-ভি-লা পেতিৎ মারমাদ ফিরে চলল। আলবার্তোর দিকে তাকিয়ে অর্ণব সুদীপ্তকে বললেন, লুসাকায় তোকে কী বলেছিলাম, মনে আছে দিপু? যাহা চকচক করে, তা-ই নয় স্বর্ণ।

স্টিয়ারিং হাতে ফিলিপসের দিকে তাকিয়ে সুদীপ্ত উত্তর দিলেন, সেই সঙ্গে এটাও জানলাম, কখনও হিরেরও হয় কয়লার বর্ণ।

তারপর অর্ণবের দিকে ফিরে বললেন, আচ্ছা, আমাদের এই ব্যাপারটা নিয়ে রবি ঠাকুর কোনও গান লেখেননি?

অর্ণব হেসে বললেন, আলবাত!

তারপর অস্তগামী সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত সাগরতরঙ্গের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এলেন আলবার্তোর কাছে। এক হাত আলবার্তোর কাঁধে আর অন্য হাত ফিলিপসের কাঁধে রেখে অর্ণব বললেন, তুইও যোগ দে, দিপু।

তার পরপরই তাঁদের দুজনের মিলিত কণ্ঠ অতলান্তিকের হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ল–

আজ নিখিলের আনন্দধারায় ধুইয়ে দাও,
মনের কোণের সব দীনতা মলিনতা ধুইয়ে দাও।
আলোকের এই ঝরনাধারায়…

 স্টিমারটা তখন হালকা নিশ্চিন্ত মনে যেন এগিয়ে চলেছে বাড়ি ফেরার আনন্দে।

[কিশোর ভারতী, শারদীয়া ১৩৯৬]