সাক্ষাতে রেবন্ত

সাক্ষাৎকার

সাক্ষাতে রেবন্ত

রেবন্ত গোস্বামীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় টিম কল্পবিশ্ব।

কল্পবিশ্ব: আপনার লেখালেখির শুরুর দিকটায় যেমন ধরনের কিশোর গল্প-উপন্যাস লিখেছেন, যেমন দেশভাগের পটভূমিতে বাবলা ফুলের গন্ধে, বা পাঁচ বা সাতের দশকের পটভূমিকায় অরুমিতুদের কথা আর কচিপাতার রং, পরের দিকে আপনি মূলত সরে এলেন কল্পবিজ্ঞানের গল্পের দিকে। এর পিছনে কি কোনও বিশেষ কারণ আছে?

রেবন্ত গোস্বামী: কিছুই নয়। সন্দেশ-এ এমন কোনও বিষয় নেই, যা নিয়ে আমি লিখিনি। একমাত্র ক্রীড়াজগৎ ছাড়া–উপন্যাস, গল্প, কবিতা, রম্যরচনা থেকে ছদ্মনামে ভাষাতত্ত্ব, সত্যজিতের পরে এই ধাঁধার আঙ্গিকে শব্দজব্দ–যা একমাত্র আমি করেছি। তা ছাড়াও নামহীনভাবে ধাঁধা, গ্রাহকদের জন্য প্রতিযোগিতার বিষয় করা। সেরকমই কল্পবিজ্ঞান। হ্যাঁ, শেষের দিকে সন্দেশ-এর পাঠকরা আমার কল্পবিজ্ঞান লেখাই পছন্দ করত বা করতেন। আবার বুনো রামনাথ-এর লেখা পছন্দ করেও চিঠি লিখেছেন।

কল্পবিশ্ব: আপনি যখন কল্পবিজ্ঞানের লেখা লিখছেন, তত দিনে বাংলা কল্পবিজ্ঞানের জগতে যে আলোড়ন উঠেছিল, তার অনেকটাই স্তিমিতপ্রায়। আশ্চর্য! বা  বিস্ময়-এর মতো পত্রিকা আর নিয়মিত বেরুচ্ছে না। কোথাও কি আক্ষেপ আছে এই পত্রিকাগুলিতে না লিখতে পারার জন্য?

রেবস্ত গোস্বামী: আমি সন্দেশ এবং শারদীয়া শুকতারা ছাড়া কল্পবিজ্ঞান কোথাও লেখার চেষ্টা করিনি। হ্যাঁ, অন্যান্য প্রধানত মানবিক বোধের গল্পের ফাঁকে দু-একটা কল্পবিজ্ঞান শারদীয়া কিশোর ভারতীতে লিখেছি। বরং তখনকার সন্দেশ-সম্পাদিকার গুণী পুত্র অমিতানন্দ দাশই তখন কল্পবিজ্ঞান পত্রিকা আন্দোলনে যোগ দেন। তাই আক্ষেপের প্রশ্ন নেই।

কল্পবিশ্ব: অদ্রীশ বর্ধনকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন? চিনলে ওঁর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল?

রেবস্ত গোস্বামী: না, চিনতাম না। পরে জেনেছি, আমার বৈবাহিক মহাশয় সোমেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গতা ছিল। তবে তাঁর লেখা পড়তাম। শুনেছিলাম, কিছু দিন তিনি প্রকাশনা সংস্থাও শুরু করেছিলেন।

কল্পবিশ্ব: হ্যাঁ, ফ্যানটাসটিক পাবলিশার্স। আচ্ছা, ফ্যান্টাসটিক ম্যাগাজিন তো অনেকদিন চলেছিল। ২০০৭ সাল পর্যন্ত, যদিও অনিয়মিত। ফ্যানটাসটিক-এ লিখলেন না কেন?

 রেবন্ত গোস্বামী: এই প্রশ্নের উত্তর তো আমি দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরেই বলেছি।

কল্পবিশ্ব: আপনি যখন কল্পবিজ্ঞানের গল্প লিখছেন, অর্থাৎ আটের দশক থেকে শূন্য দশক, তখন বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের চাহিদা কেমন ছিল? পাঠক বা সম্পাদকদের উৎসাহ বা আগ্রহ কতটা ছিল কল্পবিজ্ঞানের ব্যাপারে?

রেবন্ত গোস্বামী: তখন কিশোরসাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের চাহিদা যে ছিল, সেটা তো ফেলুদার মতোই প্রোফেসর শঙ্কুর সমান জনপ্রিয়তা দেখেই বোঝা যেত। কিশোর জ্ঞান-বিজ্ঞানে তো ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ প্রতি বছরই লিখতেন। ভূতাত্ত্বিক সংকর্ষণ রায়ও লিখেছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।

 কল্পবিশ্ব: সন্দেশ-এ যখন বৃশ্চিক গ্রাস, মৃত্যুবাণ, রবিদাস কাহিনি, অনুঘ্রাণ যন্ত্রর মতো কল্পবিজ্ঞান লিখছেন, তখন সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে কোনও পরামর্শ পেয়েছেন? উনি কি কল্পবিজ্ঞানের গল্প লেখার জন্যই মূলত উৎসাহ দিতেন? বিশেষ করে দেখতে পাই, উল্লিখিত প্রথম তিনটি গল্পে সত্যজিৎ রায় নিজে অলংকরণ করেছিলেন।

রেবন্ত গোস্বামী: সত্যজিৎ রায় লেখককে লেখার বিষয় নিয়ে কোনও নির্দেশ দিতেন না। কোথাও তথ্যঘটিত ভুল থাকলে সেটা ঠিক করে দিতেন। তাঁর একটা পরিচয় পরে তৈরি হয়েছে, সেটা হল তিনি ছিলেন বাস্তব সিধুজ্যাঠা, যা পরবর্তী বৈদ্যুতিন যুগে গুগল নামে পরিচিত। হ্যাঁ, সিনেমা ও অন্যান্য কাজের ফাঁকে সময় পেলে আমার বেশির ভাগ গল্পেই অলংকরণ করেছেন। কল্পবিজ্ঞান ছাড়াও।

কল্পবিশ্ব: আপনার কল্পবিজ্ঞানের কাহিনি লেখার পেছনে আর কাদের অনুপ্রেরণা জড়িয়ে আছে, সে বিষয়ে যদি কিছু বলেন।

 রেবন্ত গোস্বামী: সেইভাবে অনুপ্রেরণা পেয়ে কি কিছুই লেখা যায়? অনেকের একটু কথার টুকরো কি ঘটনাও অন্যান্য রচনার মতো কল্পবিজ্ঞানেরও বীজ বপন করে। যেমন, ছোটবেলায় আমাকে ফুল শুঁকতে দেখে এক বন্ধু বলে উঠল, এই, নাকে ঠেকিয়ে শুঁকবি না। ফুলের পোকা নাকে ঢুকে যাবে। ব্যাস, এই সতর্কবাণী আমি জীবনে ভুলিনি। পরবর্তীকালে সেটাই পল্লবিত হয়ে জন্ম নিল বৃশ্চিক গ্রাস। আমার বন্ধু, স্কটিশ চার্চ কলেজের জীববিজ্ঞানের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. সুমন্ত মুখোপাধ্যায় একদিন কথাচ্ছলে বলেছিলেন, গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে বিজ্ঞাপন ইত্যাদি টাঙানো মানুষ বা কোনও জীবের ওপর অত্যাচারের মতোই ঘৃণ্য অপরাধ। গাছের শাপ লাগে। ব্যাস, লিখলাম দুর্বাসা তরু। এখন তো দেখাই যাচ্ছে, আমাজনের অগ্নিকাণ্ডের মতো মনুষ্যসৃষ্ট বৃক্ষধ্বংস কেমন অভিশাপ হয়ে নেমে আসছে। মেয়ের স্কুলের কেশব নাগের অঙ্ক বইয়ের ভূমিকা পড়তে পড়তে মাথায় এসে গেল লীলাবতীর মুক্তো। নারায়ণ সান্যালের একটি লেখা পড়ে মাথায় এল হ্যাঁকোর বীজ। এগুলোকে পরোক্ষ অনুপ্রেরণা ছাড়া কী বলব? তবে কল্পবিজ্ঞান ছাড়াও অন্যান্য গল্পে একটু বিজ্ঞানের, বিশেষত রসায়নের উল্লেখ থাকলে এবং সেই ব্যাপারে কিছু সন্দেহ থাকলেই তার নিরসনের জন্য ছিলেন ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্য। শুধু বিজ্ঞান নয়, তিনি ছিলেন সংস্কৃতেও সুপণ্ডিত। কোনও শব্দপ্রয়োগ সম্বন্ধে সঠিকতায় সন্দেহ হলে যাঁদের শরণাপন্ন হয়েছি, তাঁরা হলেন ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ও গৌরী ধর্মপাল।

 কল্পবিশ্ব: আপনার প্রথমদিকের কল্পবিজ্ঞানের গল্পগুলির মধ্যে ফ্যান্টাসি বা অলৌকিকত্ব, সাসপেন্স ইত্যাদি মিশে আছে। এমনকী সাত্যকি সোমের প্রথমদিককার কাহিনিগুলোতেও বেশ হালকা রসিকতা, মজা ইত্যাদির মিশেল আছে। কিন্তু চন্দ্রাহত সাত্যকি সোম বা তার পরের কাহিনিগুলোতে সামাজিক সমস্যাগুলোর প্রতিফলন এবং দার্শনিক একটা আভাস লক্ষ করা যায়। কোনও কোনও গল্পে হয়তো বিজ্ঞান খুবই কম, বা নামমাত্র, যেমন গেছো-মাস্টার–কিন্তু এর বার্তাটা অনেক বড়। এই যে পরিবর্তন, এটা কি সচেতনভাবেই করা?

রেবন্ত গোস্বামী: না। সম্পূর্ণ অচেতনভাবে করা। যেটা যখন মাথায় আসে। তবে এই প্রসঙ্গে দুটো কথা বলে রাখি। রিউবেন বুশের গল্পটি যখন লেখা হয়, তখন ছোট-বড় কোনও বুশই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হননি। ক্লিনটনের নামই এ দেশে কেউ শোনেনি তখন। পরে লিখলে নাম দুটো পালটে দিতাম। চন্দ্রাহত সাত্যকি সোম লেখার অনেক পরে খবরের কাগজে একটা খবর বেরিয়েছিল যে, মেরু সংলগ্ন দেশগুলিতে নাকি সত্যিই ওরকম পরিকল্পনা নিয়েছিল।

কল্পবিশ্ব: বড়দের জন্য কল্পবিজ্ঞানের গল্প লিখলেন না কেন?

রেবন্ত গোস্বামী: কল্পবিজ্ঞান কেন, বড়দের কোনও গল্পই লেখার চেষ্টা করিনি। আমার যাকে বলে স্কুলে-যাওয়া কিশোর-কিশোরীদের জন্য লিখতে স্বচ্ছন্দ লাগত। যত দূর মনে পড়ে, বড়দের গল্প লিখেছিলাম মাত্র দুটি। একটি তখনকার বিশিষ্ট পত্রিকা শুকসারিতে দ্বিরাগমন, অন্যটি আমেরিকা থেকে প্রকাশিত বিশিষ্ট বন্ধু প্রয়াত প্রভাত দত্ত সম্পাদিত দ্বিভাষিক পত্রিকা অতলান্তিক-এ রিগর মরটিস।

 কল্পবিশ্বঃ এখন যাঁরা কল্পবিজ্ঞান গল্প লিখছেন, তাঁদের লেখা পড়েন?

 রেবন্ত গোস্বামীঃ নানা কারণে নিয়মিত কোনও লেখাই এখন বিশেষ পড়া হয় না। হাতে এলে পড়ি। নানা ধরনের গল্প লেখা হচ্ছে এখন। আগে ছিল মেকানিক্যাল বা যান্ত্রিক যুগ। পরে এল ইলেকট্রনিক বা বৈদ্যুতিন যুগ। লেখার মতো নিয়মিত পড়ারও বিশেষ সুযোগ নেই। আগে স্থানীয় লাইব্রেরিতে গিয়ে নানারকম বই ও পত্রিকা নিয়ে এসে পড়তাম। শারীরিক কারণে সেটাও ছেড়েছি।

কল্পবিশ্ব: আপনার মতে কল্পবিজ্ঞান গল্পের কোন বিশেষ প্যাটার্ন থাকা উচিত–অর্থাৎ বিজ্ঞান কতটা এবং কীভাবে পরিবেশিত হলে কল্পবিজ্ঞান গল্পটি সুখপাঠ্য হয়? একজন অভিজ্ঞ কল্পবিজ্ঞান লেখক হিসাবে আপনার মতামত গুরুত্বপূর্ণ।

রেবন্ত গোস্বামী: আমার দাদা প্রবীর গোস্বামী সাহিত্যজগতে শ্রীপারাবত নামে খ্যাত। তাঁর মৃত্যুর পরেই তাঁর পাঁচটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নিয়ে একটি বই প্রকাশিত হল। নামও তা-ই। তার ভূমিকা লিখতে হল আমাকেই। তাতে এক জায়গায় লিখেছিলাম, সার্থক ঐতিহাসিক উপন্যাস সৃষ্টি একদিক থেকে ক্ষুরস্য ধারার মতোই শানিত পথে চলা। তথ্য থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসা যাবে না, অথচ নীরস ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক হলেও চলবে না.. ইত্যাদি। কল্পবিজ্ঞান থেকেও একই কথা বলা যায়। পুরোনো যুগের একজন নমস্য সাংবাদিক একটা কল্পবিজ্ঞান গল্প লিখেছিলেন। তাতে ছিল গ্যাস-বেলুনে চেপে মহাকাশযাত্রা। স্কুলপড়ুয়ারাও সে গল্প পড়লে হাসবে। প্যাটার্নটি হবে লেখকের নিজস্ব, যা অন্যরা বলে দিতে পারে না। তবে আমার মত, কিশোরপাঠ্য সব কল্পবিজ্ঞান গল্পেরই অনুক্তভাবে একটা মরাল থাকা উচিত।

কল্পবিশ্ব: কল্পবিজ্ঞান লিখতে গিয়ে আপনি নিশ্চয়ই বিদেশি কল্পবিজ্ঞান পড়েছেন। আপনার কোনও দিন অনুবাদ করার ইচ্ছে হয়নি?

 রেবন্ত গোস্বামী: আইজ্যাক আসিমভ, আলেকজান্ডার ক্লার্ক এবং ছাড়া-ছাড়াভাবে অনেক লেখা পড়েছি। লেখক এবং লেখার নাম ভুলে গেছি, কিন্তু গল্পের বিষয়বস্তু মনে আছে– এরকম অনেক লেখাই পড়েছি। কিন্তু নিজের লেখায় সেগুলোর প্রভাব পড়তে দিইনি। মৌলিক লেখাতেই আমার আগ্রহ বেশি ছিল।

কল্পবিশ্ব: আপনার পড়া সেরা কয়েকটি কল্পবিজ্ঞান গল্পের নাম বলতে পারেন? আপনার হিসাবে সেরা পাঁচটা বলুন। পুরাতন-আধুনিক, দেশি বা বিদেশি সবই চলতে পারে।

 রেবন্ত গোস্বামী: এইভাবে বলা মুশকিল। ছোটবেলা থেকেই যাঁদের লেখা পড়েছি, তার অনেকগুলিই কল্পবিজ্ঞান বা কল্পবিজ্ঞান আশ্রিত গল্পের ছায়া অনুবাদ। যেমন, হেমেন্দ্রকুমার রায়ের মানুষের গড়া দৈত্য বা প্রেমেন্দ্র মিত্রর ময়দানবের দ্বীপ। মৌলিক লেখা থেকে কোনও প্রভেদ বুঝিনি। কল্পবিজ্ঞান শব্দটির তখন জন্ম হয়নি। ছোটবেলায় দেব সাহিত্য কুটীর-এর যে ঝকমকে বার্ষিকীটি হাতে পেয়েছিলাম, তার নাম অঞ্জলি। লেখকরা সবাই তখন জীবিত। তাতে ঘনাদার গল্প ছাড়াও বনফুলের একটি সুন্দর গল্প ছিল। তাতে ছিল, একটি ছেলে কালোকে ঘৃণা করত। যেমন কয়লা। শুনেছিল, কয়লা শুধু কার্বন দিয়ে গড়া। মানে কার্বন একটা ঘৃণ্য জিনিস। রাতে স্বপ্ন দেখল, সবেতেই কার্বন থিকথিক করছে। সে যা খায়, যা পরে সবেতেই কার্বন। খাট-বিছানাময় কার্বন তাকে ঘিরে ধরেছে। সকালে আঁতকে উঠে ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল, কানের কাছে আংটির হিরেটা টিকটিক করেছে। গল্পটি বনফুলের গল্পসমগ্রতে দেখিনি। তাই এত যুগ পরে কিছু স্মৃতিভ্রম হতে পারে। যা ই হোক, এখন এটাকেও কি কল্পবিজ্ঞান ধরা হত না? সেই বইয়ে ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণের সরস বিজ্ঞানের লেখাও ছিল।

পরে তো অনেক গল্পই পড়েছি। সেভাবে কল্পবিজ্ঞান বা যে-কোনও বিষয়েই সেরা পাঁচটি বাছাই করা কঠিন এবং অন্যায়ও। এতে অন্যদের প্রতি অবিচারও হয়। বাংলা ভাষায় পাঁচটি সেরা ছোটগল্প বা সেরা পাঁচটি রবীন্দ্রসংগীত বাছাই করা যায়?

কল্পবিশ্ব: গত চার বছর ধরে কল্পবিশ্ব শুধুমাত্র কল্পবিজ্ঞান নিয়ে যেরকম কাজ করে চলেছে বাংলায়, এই উদ্যোগ সম্পর্কে আপনি যদি দু-চার কথা জানান।

রেবন্ত গোস্বামী: আগে তো মোবাইলই আসেনি তো স্মার্টফোন। তাই যা প্রচার হয়েছে, সবই শারীরিক শক্তি ক্ষয় করে। এখন কল্পবিশ্বের হাতে অনেক সুযোগ। কিছু পাঠক আছেন, যাঁরা কল্পবিজ্ঞান নিয়েই আগ্রহী। গত শতকের শেষ অবধি কল্পবিজ্ঞান নিয়ে এইরকম কাজ সম্ভব হয়নি। তাই কল্পবিশ্ব নিঃসন্দেহে। বাংলায় অভিনব কাজ করছে। তার অনুসারীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। তাই এই উদ্যোগ যে সাফল্য পাচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই।

কল্পবিশ্বঃ অবধারিতভাবে যে প্রশ্নটা আসবে, এক দশকের বেশি সময় ধরে আপনি আর গল্প-উপন্যাস লিখছেন না। কেন এই স্বেচ্ছা অবসর?

রেবত গোস্বামী: এটার উত্তর পরিচিত সবারই জানা, আমি দু-বার ডাক্তারদের অবাক করে দিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে উঠেছি। প্রায় চব্বিশ বছর বুকে পেসমেকার। তা ছাড়া কিছু শারীরিক সমস্যা এই বয়সে তো থাকেই। তবুও মস্তিষ্ক সচল রাখার চেষ্টা করি। ছোটখাটো যোগ-বিয়োগ করতে ক্যালকুলেটার না-খোলার চেষ্টা করি। খবরের কাগজে প্রকাশিত ছক ধাঁধা বা শব্দছক অল্প সময়েই সমাধান করি। যদিও সেগুলোতে দেখেছি ভুল থাকে প্রায়ই। কিছু স্মৃতিচারণজাতীয় লেখা লিখেছি মাঝে মাঝে সন্দেশ-এ আর সুনির্মলের ডিঙিনৌকোতে। আমার সমবয়সি বন্ধুবান্ধব বেশির ভাগই নেই। যারা আছে, তারাও প্রায় জড়ভরত। মস্তিষ্ক যে সচল আছে, তার প্রমাণ, এই তিরাশি পার-হওয়া বয়সে প্রথম স্মার্টফোন এলে প্রায় নিজের চেষ্টায় সেটাকে রপ্ত করা–আর কেউ আছে বলে বিশ্বাস হয় ।না তুমি ফেসবুক খুলে দেখোনা, ১৯৩৬-এ জন্ম কোনও বাঙালির প্রোফাইল আছে কি না। কল্পবিজ্ঞানেই সম্ভব। তাই স্বেচ্ছা অবসর নয়, বাধ্যতামূলক অবসর। পেশাদার ছাড়া শৌখিন লেখকের পক্ষে এই বয়সে বেশিক্ষণ ঘাড় গুঁজে লিখতে ডাক্তারই নিষেধ করবেন। তা ছাড়া স্পন্ডিলোসিস, সায়াটিকা দুটোতেই ভুগেছি। আশা করি, আর প্রশ্ন নেই।

 কল্পবিশ্বঃ অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। কল্পবিশ্ব ও আপনার সমস্ত গুণগ্রাহী পাঠকের তরফ থেকে আপনার আনন্দময় সুস্থ জীবন কামনা করি।

[কল্পবিশ্ব, শারদীয়া ১৪২৬]