শ্যামল পালের সমস্যা

শ্যামল পালের সমস্যা

বছর দশেক আগে ভোরবেলায় টালা পার্কে গেলে একজন দীর্ঘকায় বৃদ্ধকে একটা মুলুওয়ালা লাঠি হাতে পার্কের ভেতরের বৃত্তাকার রাস্তা ধরে গটগট করে হেঁটে যেতে দেখা যেত। হাতে লাঠি থাকলেও ওটাকে ঠকঠক করে হাঁটা বলা যাবে না। কারণ এই ক্রিয়া বিশেষণটা অশক্ত বৃদ্ধের চলার ইঙ্গিত বহন করে। শ্যামল পালের বয়স তখন সত্তরের ঘর পেরিয়ে ওপরদিকে উঠতে থাকলেও বৃদ্ধ বলতে আমাদের চোখের সামনে যেরকম একটা ছবি ভেসে ওঠে, তার সঙ্গে তাঁর চেহারা বা চালচলনের মিল খুব কমই ছিল। অবলম্বনের জন্যে লাঠিটার কোনও প্রয়োজন ছিল না তাঁর। ওটা ছিল যেন তাঁর একটা অলংকার। তাঁকে যেন আরও বীরত্বব্যঞ্জক করত–যেমন হাতের বন্দুকটা শিকারিকে করে। নইলে শ্যামলবাবুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে তাল রেখে হেঁটে যাওয়া অনেক তরুণের পক্ষেও কষ্টকর বোধ হত। বাস টার্মিনাসের ভোরবেলার কর্মীরা, রাস্তায় জল ছড়াতে আসা কর্পোরেশনের লোকেরা বা পার্কে জগিং করতে আসা তরুণরা তাঁর এই প্রাতভ্রমণ দেখত আর বলাবলি করত, লর্ড মাউন্টব্যাটেন যাচ্ছেন।

যে দিন থেকে তাঁকে আর কখনও পার্কে সেই ঋজুদেহে লাঠি দুলিয়ে বড় বড় পা ফেলে হেঁটে যেতে দেখা গেল না, সে দিন যারা তাঁকে চিনত না, তারা হয়তো আলোচনা করেছিল তাঁর এই আকস্মিক অদর্শন নিয়ে। শীতকালে মর্নিং ডিউটি দিতে আসা তেত্রিশ নম্বর বাসের কনডাক্টর গলায় মাফলার জড়াতে জড়াতে প্রথম প্রথম হয়তো সহকর্মীকে। জিজ্ঞেস করত, ক-টা বাজল পার্টনার? লর্ড মাউন্টব্যাটেন না-থাকাতে সাড়ে পাঁচটা বাজল কি না বোঝাও যায় না।

সত্যিই, শ্যামলবাবু একেবারে কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে পাঁচটায় পার্কে পদার্পণ করতেন।

অ্যাম্বারিশ ব্রাদারস লিমিটেডের অবসরপ্রাপ্ত পাবলিক রিলেশনস অফিসার শ্যামল পাল দশ বছর আগে যখন মারা যান, তখন প্রায় সব খবরের কাগজেই তাঁর মৃত্যুসংবাদ বেরিয়েছিল। তবে খুব ছোট করে, আর খেলার পাতাটায়, কারণ শ্যামলবাবুর আরেকটি পরিচয় ছিল। তরুণ বয়সে ফুটবল খেলোয়াড় হিসাবে শ্যামল পালের বেশ নামডাক ছিল। কলকাতার এক বড় টিমে খেলেছেনও কয়েক বছর। সেই সুবাদেই ভালো চাকরি পেয়েছিলেন। ফুটবল নিয়ে তাঁর মতামতকে আগেকার বড় বড় খেলোয়াড় আর ক্রীড়াবিদরা বিশেষ মূল্য দিতেন। কিন্তু, শেষজীবনে ক্রীড়াজগতের তরুণ আগন্তুকরা যখন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে ব্যাকডেটেড, খালি পায়ের যুগের ব্যাপারস্যাপার–এইসব আখ্যা দিতে লাগল, তখন তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিলেন। যেচে আর কাউকে উপদেশ দিতে যাননি।

চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার আগেই শ্যামলবাবু শহরের উত্তরাঞ্চলে ছোট্ট বাড়িটা করেছিলেন। তাঁর মা-বাবার নামে বাড়িটার নাম শান্তিকুঞ্জ। একমাত্র ছেলে অতীন ব্যাংকে কাজ করে, মেয়ের শ্বশুরবাড়ি সুদূর বোম্বাইয়ে। মেয়ে প্রায় প্রতি বছরই একবার ঘরে যায় বাবার কাছে। অবসরজীবনের কর্মহীনতার ক্লান্তি শ্যামলবাবুকে অবসন্ন করতে পারেনি, কারণ শরীরটাকে চালু রাখা ছাড়াও মনটাকে ব্যাপৃত রাখতেন ক্রীড়াজগৎ নিয়ে চর্চা করে, বই পড়ে আর ছোট্ট নাতি বাপ্পার সঙ্গে নানারকম গল্প করে। খেলতে খেলতে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটেছে তাঁর তরুণ বয়সে। সে তো প্রতি খেলোয়াড়ের জীবনেই ঘটে থাকে। নইলে অসুখবিসুখে খুব একটা ভোগেননি শ্যামল পাল সারাজীবনে। ইদানীং রক্তচাপটা একটু ঝামেলা করছে, তা ছাড়া শারীরিক গোলযোগ তাঁর তেমন নেই এই বয়সেও।

তবুও প্রথম বয়সে খেলতে গিয়ে সেই এক দুর্ঘটনা, বৃদ্ধ বয়সে এই রক্তের উচ্চচাপ–এগুলো শ্যামলবাবুর জীবনের এক চাপা পড়ে যাওয়া রহস্যের ওপর বিদুতের ঝিলিক মেরে রহস্যটাকে আরও অন্ধকার করে ফেলেছিল। কিন্তু অপরিচিত এক ফরাসি ভদ্রলোকের জীবনের সঙ্গে শ্যামলবাবুর জীবনের এক তারহীন যোগাযোগের ঝিলিকটা দেখিয়েছিল তো সেই পুরোনো দিনের পত্রিকাটাই। শ্যামলবাবুর হাতে পত্রিকাটা না পড়লে এই গল্পটাও হয়তো লেখা হত না।

মেয়ে অনেকদিন ধরে বাবাকে বলছিল ক-দিনের জন্যে বোম্বাইয়ে ঘুরে যেতে। আবদার ঠেলতে না পেরে তিনি মেয়ের কাছে গেলেন। গিয়ে ভালোই লাগল। এখানে টালা পার্ক না থাকলেও প্রাতভ্রমণের জন্যে বাড়ির কাছেই শিবাজি পার্ক আছে। উপরি পাওনা দাদরের সমুদ্রসৈকত। মঝে মাঝে মনোরম আবহাওয়ায় দুপুরেও বেরিয়ে পড়তেন একা। একদিন দুপুরে শহরের মাঝখানে আজাদ ময়দানে ছেলেদের ক্রিকেট খেলা দেখছিলেন তিনি। মাঠের কিনারায় কিছু লোক চেয়ারে বসে। তাদের মধ্যে একজন বৃদ্ধ তিরস্কারের ভঙ্গিতে কাছের ফিল্ডারকে কী যেন বললেন। ছেলেটি ছুটে তাঁর কাছে এসে নিচু হয়ে কিছু শুনল। তারপর আবার ছুটে জায়গায় ফিরে গিয়ে খেলতে লাগল। বৃদ্ধের মুখটা চেনা-চেনা লাগাতে শ্যামলবাবু কাছে গিয়ে দেখলেন, তিনি আর কেউ নন–এককালের বিখ্যাত ক্রিকেটার বিজয় মার্চেন্ট। কী এক তৃপ্তিতে তাঁর বুকটা ভরে উঠল। কলকাতার কোনও ফুটবল মাঠের ছেলেরা কি–

সমস্ত ক্ষোভ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ওই বিনত ছেলেটার চেহারা মনে ধরে রেখে শ্যামলবাবু দাদরের বাসে চড়ে বসলেন। কিন্তু মেয়ের বাড়িতে যে তাঁর জন্যে একটা চরম চমক অপেক্ষা করছিল, সেটা তাঁর স্বপ্নের বাইরে ছিল। সেই ষাট বছরের পুরোনো অতীতের ঘটনা বৃদ্ধ বয়সে এসে নিঃশব্দ ঝড়ের মতন তাঁর মনের শান্তি যেন উড়িয়ে নিয়ে গেল।

শ্যামলবাবুর জামাইয়ের সংগ্রহে ছিল বাঁধানো অবস্থায় পুরোনো দিনের অনেক মাসিকপত্র। সবই তাঁর বাপ-ঠাকুরদার আমলের। প্রবাসী, ভারতবর্ষ, সবুজপত্র, ছোটদের মুকুল, সন্দেশ–এইসব বই নিয়ে মেয়ের বাড়িতে তাঁর দিনগুলো ভালোই কাটছিল। শ্যামলবাবু অবশ্য গল্প-উপন্যাসের ভক্ত কোনওকালেই ছিলেন না। এইসব বইয়ে তাঁকে সবচেয়ে যা আকর্ষণ করত, সেটা হল তখনকার দিনের খেলাধুলোর কথা। পুরোনো দিনের কথা আর ছেলেবেলার চেনা সেই শিবদাস আর সারদারঞ্জনের ছবি দেখতে দেখতে কানে যেন শুনতে পান সুদূর অতীত থেকে ভেসে আসা চিৎকার–গো-ও-লা… হা-উ-জ দ্যাট!

শিবদাস ভাদুড়ির ছবিটার নীচেই বিশ্বের বিচিত্র সংবাদ শিরোনামায় একটা ছোট্ট খবর পড়ে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে তিনি একদৃষ্টে চেয়ে থাকেন পত্রিকার পাতাটার দিকে। পাতার হরফগুলো তখন একদঙ্গল পিঁপড়ের মতন ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে যেন তাঁর চোখের সামনে। এ কী পড়লেন তিনি! মেয়ে তাঁর জন্যে চা করে আনছিল। ইজিচেয়ারে শায়িত বাবার সেই বিস্ফারিত চক্ষু দেখে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে উঠল, কী হয়েছে, বাবা! শরীর খারাপ?

কিছুক্ষণ নিশ্চলভাবে মেয়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলেন তিনি। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে জোর করে হেসে বললেন, না, আমার শরীর বেশ ভালোই আছে। কলকাতায় একটা জরুরি কাজ ভুলে এসেছি, হঠাৎ মনে পড়ল। যাক গে, ও নিয়ে ভাবিসনে।

মেয়েকে মিথ্যে কথা বলে চায়ের কাপটা তুলে নিলেন তিনি। সত্যি কথাটাই বা কী বলবেন! এত দিন তো নিজেও জানতেন, ওটা একটা অর্ধচেতন অবস্থার স্বপ্ন। স্ত্রী-কেও হয়তো বলেছিলেন একদিন, তিনিও তা-ই ভেবেছিলেন। তাঁর স্ত্রী বেঁচে থাকলে হয়তো খবরটা তাঁকেও হতবুদ্ধি করে দিত–শ্যামলবাবু ভাবলেন। ছেলেমেয়েরা অবশ্য বাবার ছোটবেলাকার সেই ঘটনার কথা জানে না। এখন নতুন করে তাদের বললে তারা বাবার মাথাটার দিকে তাকিয়ে হয়তো ভাববে, কোনও গোলমাল বোধহয় শুরু হয়েছে ওখানে।

ব্যাপারটা ঘটেছিল তাঁর কৈশোরে। তখন তিনি বোধহয় ফোর্থ বা থার্ড ক্লাসে পড়তেন। তখন এইভাবেই বলা হত। ফার্স্ট ক্লাস মানে ক্লাস টেন। অর্থাৎ, তিনি সে সময় স্কুলে সেভেন-এইটে পড়তেন। স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলা হচ্ছিল। বরাবরের মতো রাইট আউটে খেলছিল শ্যামল পাল। খেলোয়াড়দের মধ্যে তার বয়সই বোধ করি সবচেয়ে কম। কয়েকজনের বয়স তো তার দ্বিগুণ না হলেও দেড়গুণ তো বটেই। যেমন, বিপক্ষ দলের নিমাই বিশ্বাস। নীচের ক্লাস থেকেই শ্যামল নিমাইদাকে ফার্স্ট ক্লাসেই পড়তে দেখছে। তার চেহারা দেখলে শ্যামলের মনে হত, ফুটবল না খেলে কুস্তি করলেই মানাত ভালো।

একসময় বলটাকে সোজাসুজি তার কাছে নীচের দিকে নেমে আসতে দেখে শ্যামল মাথাটাকে এগিয়ে দেয়, হেড করে বলটাকে তার দলের জহীরকে দেওয়ার জন্যে। যেই লাফ দিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল, মাথায় যেন পাহাড় ভেঙে পড়ল। স্কুলের মাঠ, লোকজন, আকাশ, মাটি সব যেন একটা বিরাট সামদ্রিক ঢেউয়ে ধুয়ে-মুছে গেল। পরে শুনেছিল, নিমাই বিশ্বাস একই সঙ্গে হেড করতে উঠলে দু-জনের মাথায় প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়, আর তাতে সে কিছুক্ষণের জন্যে জ্ঞান হারিয়ে ফ্যালে।

শ্যামল যখন চোখ মেলে চাইল, তখন দ্যাখে, সে একটা ঘরে শুয়ে আছে। কিন্তু তাদের নিজেদের বাড়ির ঘর নয়। কতকগুলো মুখ তার খাটের চারপাশে ঝুঁকে আছে। কিন্তু এরা কারা? তার বাবা-মা, ভাইবোন, বন্ধুবান্ধবদের কেউ না। গায়ের রং আর চেহারা দেখে বুঝতে পারল, যাদের তারা সাহেব-মেম বলে, এরা তারাই।

শ্যামল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, আমি কোথায়!

তার প্রশ্নে ঘরসুদ্ধ সবাই যেন অবাক হয়ে এ ওর দিকে চাইতে লাগল।

একজন মহিলা তার হাত দুটো ধরে কেঁদে উঠে কী সব বললেন। শ্যামল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ তার নিজের হাতের দিকে নজর পড়তে চমকে ওঠে সে। এ কার হত! তার গায়ের রং তো ঘরের আর সকলের মতনই। সেই রোদে পোড়া শ্যামবর্ণ তো নয়!

সঙ্গে সঙ্গে একটা পাতলা পর্দা যেন তার মনের ওপর থেকে উঠে গেল। সে চিনতে পারল সামনের মহিলাকে–তার মা-কে। তার নিজের নাম আঁদ্রে। ওই তো তার বোন এলেন। এবার তার মা-র কথা সব বুঝতে পারল। এ যে তার মাতৃভাষা ফরাসি। শুনল, সে নাকি অজ্ঞান অবস্থায় অর্থহীন প্রলাপ বকছিল। এইমাত্র ফরাসি ভাষা বললেও তার কোনও মাথামুন্ডু নেই। মনে হল যেন বলল, পোড়া বন্ধু!

এখন কেমন বোধ করছ?

মা জিজ্ঞেস করতেই সে হেসে ফরাসিতেই বলল, খুব ভালো।

তার হাসি দেখে আর স্বাভাবিক উত্তর শুনে সবাই খুশিতে হাসল। কিন্তু গোমড়ামুখো এক ভদ্রলোক– আঁদ্রে চিনতে পারল ডাক্তার বিশ্যেকে–তিনি বললেন, এখন কিছুক্ষণ না ঘুমোলে শরীর সুস্থ হবে না। তিনি চামচ করে কী একটা ওষুধ আঁদ্রেকে খাইয়ে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আঁদ্রে ঘুমিয়ে পড়ল।

হঠাৎ চোখে-মুখে জলের ছিটে লাগাতে আঁদ্রে চমকে চোখ মেলে চাইল। দ্যাখে, সবুজ ঘাসের ওপর সে শুয়ে আছে। আশপাশে অনেক বিজাতীয় লোক। লম্বাচওড়া একটা ছেলে প্রচণ্ড জোরে পাখা দিয়ে তার মাথায় হাওয়া করছে। তানপুরার তার কাঁপতে কাঁপতে যেমন থেমে যায়, তার মাথাটা সেরকম ঝিমঝিম করতে করতে একসময় শান্ত হয়ে এল। তার মনের ওপর থেকে পর্দাটা এবার যেন উলটোদিক থেকে টেনে সরিয়ে দেওয়া হল। জ্ঞান ফিরে পেয়ে শ্যামল উঠে বসল। কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল সে সবার দিকে। নিমাইদা জিজ্ঞেস করল, কেমন লাগছে রে এখন?

শ্যামল যেন একটু আগে বলা একটা কথারই প্রতিধ্বনি করে বলে উঠল, ত্রে বিয়। অর্থাৎ খুব ভালো।

নিমাই বলল, কী যা-তা বকছিস? কার বিয়ে আবার?

সবাই হো-হো করে হেসে উঠল তার কথায়। শ্যামল লজ্জিত হয়ে আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে পড়ল নিমাইদার কাঁধে ভর দিয়ে।

তারপর কত বছর কেটে গেল। শ্যামল বাড়িতে বলেছে, বন্ধুদের বলেছে সেই অজ্ঞান অবস্থায় দেখা স্বপ্নের কথা। সবাই হেসেছে, ঠাট্টা করেছে। ক্লাসের ফার্স্ট বয় অমলেন্দু শুনে বলেছে, এবার একটা বই লিখে ফেল–শ্যামল ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড।

পরিণত বয়সে শ্যামলবাবুও বিশ্বাস করেছিলেন, ওটা অর্ধচেতন মনের অবাস্তব স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়। একসময় প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন ঘটনাটার কথা। আজ এই শেষবয়সে আর-এক দৈব যোগাযোগে সেই কৈশোরের ঘটনাটাই তাঁর সব শান্তি যেন তছনছ করে দিল। মান্ধাতার আমলের মাসিক পত্রিকাটার পাতায় বিচিত্র সংবাদটি এইভাবে ছাপা ছিল:

জাতিস্মর!

প্যারিসের অর্জুদহুই পত্রিকার এক সংবাদে প্রকাশ যে, তদ্দেশের লিওঁ নগরে আঁদ্রে নিকোলাস নামীয় এক দ্বাদশবর্ষীয় বালক গৃহমধ্যে সহসা জ্ঞান হারাইয়া পড়িয়া যায়। অজ্ঞান অবস্থায় তাহার মুখ হইতে বিচিত্র সব উক্তি শোনা যায়। সে বলে, তাহার নাম নাকি স্যামুয়েল পল। নিবাস ভারতের পূর্ব প্রান্তে বোঁয়াশি গ্রাম নামে একটি গ্রামে। সঙ্গীদের সহিত ফুটবল খেলিতে গিয়া মস্তকে আঘাত লাগায় সে জ্ঞান হারাইয়া ফেলিয়াছে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

জ্ঞান ফিরিয়া পাইবার পর বালকটি অবশ্য নতুন কিছু জানাইতে পারে নাই। অজ্ঞান অবস্থায় সে ফরাসি এবং অবোধ্য ভাষার মিশ্রণে যাহা বলিয়াছিল, তাহাই সে পরে পরিষ্কারভাবে ফরাসিতে বিবৃত করে। অনেকের বিশ্বাস যে, ইহা পূর্বজন্মের স্মৃতির ক্ষণিকের জন্য পুনরাবির্ভাব। কেহ আবার ইহাতে কোনও প্রকার গুরুত্ব আরোপ না করিয়া বলিয়াছেন যে, ইহা অসুস্থ বালকের মানসস্বপ্ন মাত্র। ভারতসম্পৰ্কীয় কোনও উপকথা বা কাহিনিপাঠের পর অসুস্থ মস্তিষ্কের ক্রিয়ায় ইহা ঘটিতে পারে, মনোবিজ্ঞানীরা তাহা স্বীকার করেন।

স্যামুয়েল পল যদি শ্যামল পাল হয়, আর বোঁয়াশি গ্রাম যদি তাঁর ছোটবেলার বৈঁচিগ্রাম হয়–তবে তাঁর সে দিনের স্বপ্নের সঙ্গে আঁদ্রে নিকোলাসের স্বপ্নটা যে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তা ছাড়া আঁদ্রে নামটাও তো শ্যামলবাবুর স্পষ্ট মনে আছে।

তিনি কোনও দিনই ভূতপ্রেত, জাতিস্মর বা অলৌকিক ঘটনা–এসবে বিশ্বাস করতেন না। বলতেন, কিছু দুর্বল স্নায়ুর লোক ওগুলো বানায়, অন্যদেরও নিজেদের মতন দুর্বল করে তুলে দলে টানতে।

কিন্তু এই ঘটনাটা তো ওগুলোর মধ্যে পড়ে না! এ যে এক অদ্ভুত রহস্য! মনটা তাঁর এমনই চঞ্চল হয়ে উঠল যে, তিনি আর বোম্বাইয়ে থাকতে পারলেন না। কলকাতায় চলে এলেন। এসেই তাঁর কর্তব্য ঠিক করে ফেললেন।

শ্যামলবাবু ফরাসি ভাষা জানেন না। তাঁর প্রতিবেশী বদ্যিবাবু এককালে আলিয়াঁস ফ্রাঁসেজে ফরাসি শিখেছিলেন। তাঁর কাছে জানলেন, অর্জুদহুই মানে আজ, বানানটাও লিখে নিলেন। আঁদ্রে, লিওঁ এসব শব্দের বানানও লিখে নিলেন। বৈদ্যনাথবাবু ভাবলেন, পরের ওয়ার্ল্ড কাপের খেলাটা বোধহয় লিওঁ শহরেই হবে। নইলে শ্যামলবাবু কি আর বুড়ো বয়সে নতুন করে ফরাসি ভাষা শিখতে যাবেন?

পরদিনই এরোগ্রাম কিনে এনে শ্যামলবাবু তাঁর টাইপরাইটারে টাইপ করে ইংরেজিতে একটা চিঠি লিখলেন প্যারিস শহরের অর্জুদহুই পত্রিকার সম্পাদকের নামে। এই চিঠিটা তো আর বদ্যিবাবুকে দিয়ে ফরাসিতে অনুবাদ করিয়ে নেওয়া যায় না। নইলে ফরাসিতে লিখলেই ভালো হত। অবশ্য ওসব দেশে এটা কোনও সমস্যাই নয়। তারা নিজেরাই অনুবাদ করিয়ে নেবে।

সেই বিশ্বের বিচিত্র ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বছর-মাসের উল্লেখ করে আঁদ্রের বর্তমান ঠিকানা জানতে চাইলেন তিনি। চিঠি ডাকে দিয়ে অনেকগুলো আশঙ্কা আর হতাশায় ডুবে গেলেন। অতকাল আগের রিপোর্টের কোনও রেকর্ড কি কাগজের অফিসে থাকা সম্ভব? থাকলেই বা কে ঘেঁটে দেখছে এক অজ্ঞাত বিদেশি পত্রলেখকের আজব অনুরোধে? যদি তা-ও তারা করে, তবুও যে আঁদ্রের সঙ্গে যোগাযোগ হবে, তার স্থিরতা কী? সে অন্য কোথাও চলে গিয়ে থাকতে পারে। এমনকী, না-ও বেঁচে থাকতে পারে। কারণ, আঁদ্রে তো তাঁরই সমবয়সি।

একটা অস্থিরতার মধ্যে বেশ কিছু দিন কেটে গেল। তারপরেও কোনও উত্তর না পেয়ে শ্যামলবাবু হাল ছেড়ে দিলেন। ওরা নিশ্চয় চিঠিটাকে পাগলের প্রলাপ ভেবে ভেঁড়া কাগজের বাক্সে ফেলে দিয়েছে। শ্যামলবাবু ঠিক করলেন, ওসব নিয়ে আর চিন্তা করবেন না। কাকতালীয় ঘটনাও তো হতে পারে। এর পেছনে লেগে থেকে লাভ তো কিছুই হবে না, শুধু দেহ-মনকে দুর্বল আর অক্ষম করে দেবে।

কিন্তু সবসময় চিন্তাটা তাঁর মনের ভেতর যেন নাছোড়বান্দা এক মাছির মতন ভনভন। করতে থাকে। প্রাতভ্রমণকালে মনটা চলে যায় কয়েক হাজার মাইল দূরে এক অপরিচিত দেশে। তাঁর ঋজুদেহ নুইয়ে পড়ে, দৃঢ় পদক্ষেপে আর গটগট শব্দ হয় না। লাঠিটাতে ভর না দিলে চলতে কষ্ট হয় এই ক-দিনের মধ্যেই। বই নিয়ে বসলেও মন বসে না। অক্ষরগুলো যেন ধুয়ে যায় অদৃশ্য সমুদ্রের জলে। শ্যামলবাবুর মনে হয়, জাদুকর যেমন টেবিলের ওপরে রাখা দুটো পাত্রের দুটো জিনিস ফুসমন্তরে পালটাপালটি করে ফ্যালে, সেরকম কোনও এক ম্যাজিকে অনেক বছর আগে হঠাৎ কার সঙ্গে যেন কয়েক মুহূর্তের জন্যে তাঁর জীবনটা ওলট-পালট হয়ে গিয়েছিল। তিনি মন থেকে চিন্তাটা তাড়াতে বেশির ভাগ সময় ছোট্ট নাতিটাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাকে পড়ান, গল্প বলেন।

সে দিনও এমন গল্প বলছিলেন। পুরোনো দিনের খেলোয়াড়দের গল্প। তারপর দাদু, সবাই তো ভাবছে, ধ্যানচাঁদের স্টিকে নির্ঘাত চুম্বক লাগানো আছে, নইলে বলকে কখনও টেনে আনা যায়! তারা তো হকিস্টিক পরীক্ষা করতে চায়। বোকারা জানে না যে, চুম্বক শুধু লোহা-নিকেলকেই টানতে পারে। যা-ই হোক, পরীক্ষা তো করা হল—

বলতে বলতে থেমে গেলেন তিনি। একটা ব্যথার ঢেউ যেন বুক থেকে ঘাড়ের পেছনে আছড়ে পড়ল।

নাতি অধৈর্য হয়ে বলল, তারপরে কী হল, দাদু?

হাতটা তুলে কী যেন বলতে গেলেন শ্যামলবাবু। কিন্তু তার আগেই তাঁর শরীরটা লুটিয়ে পড়ল ইজিচেয়ারের একপাশে।

জ্ঞান যখন হল, তিনি দেখলেন, বিছানায় শুয়ে আছেন। ঘরের দেয়ালে একটা বড় ক্যালেন্ডার। সালটা পরিষ্কার পড়তে পারলেন–নতুন বছরের।

জানুয়ারি মাসের পাতা। সব মনে পড়ল তাঁর। নাতিকে গল্প বলতে বলতে মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন যে দিন, সে দিনকার তারিখ ছিল ২৫ ডিসেম্বর। তার মানে বেশ কিছু দিন অজ্ঞান ছিলেন তিনি। ক্যালেন্ডারের পাতায় জানুয়ারি মাসের বানানটা দেখে খটকা লাগল তাঁর। জে-এ-এন-ভি-আই-ই-আর। অবাক হয়ে ভালোভাবে দেখার জন্যে উঠতে চাইলেন। কিন্তু, শরীরটা যেন জগদ্দল পাথরের মতন ভারী লাগল তাঁর কাছে। ডান হাত নড়লেও বাঁ হাত একচুলও নড়ল না।

পায়ের শব্দ শুনে তাকাতেই দেখলেন, তাঁর ছেলে অতনুর বয়সি একজন সাহেব ঘরে ঢুকল। হাতে ইনজেকশনের সিরিঞ্জ। তাঁকে চোখ মেলতে দেখে লোকটির মুখে হাসি ফুটে উঠল। তার পেছন পেছন আরেকজন বয়স্ক সাহেব ঘরে ঢুকল। হাতের ব্যাগ দেখে বোঝা গেল, ইনিও ডাক্তার।

বয়স্ক সাহেবটি তাঁর দিকে চেয়ে মৃদু হেসে যা বললেন, শ্যামলবাবুর কানে তা যেন শোনালকম তালের গুড়। কিন্তু তাঁর মুখে মঁসিয়ে নিকোলাস নামটা শুনে চমকে উঠলেন শ্যামলবাবু। তারপর তিনি সঙ্গীকেও ডাকলেন ডক্টর নিকোলাস বলে। ইনজেকশনের সিরিঞ্জটা নিজের হাতে নিয়ে তাতে ওষুধ ভরতে লাগলেন। ইনজেকশনটা নিতেই শ্যমলবাবুর স্বপ্নটা যেন ভেঙে গেল। তিনি দেখতে পেলেন, তাঁর নিজের ঘরে পরিচিত পরিবেশে তিনি শুয়ে আছেন। তাঁর বিছানার চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর নিজেরই ছেলেমেয়ে, এমনকী দাদুভাইও।

এখন বাবার চাহনিটা স্বাভাবিক লাগছে। মেয়ের কানে কানে বললেও ছেলের কথা তিনি শুনতে পারলেন। ভাবলেন, বলবেন, আগের চাহনিতে তো আমি তাকাইনি, তনু, আঁদ্রে তাকিয়েছিল। কিন্তু কিছুই না বলে চুপ করে থাকলেন।

নাতি কাছে এলে তাঁর হাত ধরে ডাকে, দাদু। তিনিও তাকে আদর করে ডাকলেন, দাদু বলে। কিন্তু মুখ থেকে অস্ফুট জড়ানো স্বরে সেটাকে শোনাল যেন, আদ্যু!

তিন দিন পরে দ্বিতীয়বার স্ট্রোকটা সামলাতে পারলেন না তিনি। দু-সপ্তাহ রোগভোগের পর শ্যামল পাল মারা গেলেন।

.

এখানেই গল্পটা শেষ হতে পারত।

কিন্তু তার এক মাস পরে তাঁর ছেলের হাতে একটা চিঠি দিয়ে গেল ডাকপিয়োন। চিঠিটা লেখা হয়েছে শ্যামলবাবুকে। ওপরে ফ্রান্সের ডাকটিকিট দেখে অবাক হলেন না অতনুবাবু। ক্রীড়া সংক্রান্ত ব্যাপারে এরকম কত চিঠিই আসত শ্যামলবাবুর নামে।

কিন্তু ইংরেজিতে টাইপ-করা চিঠিটা পড়ে অবাক হলেন তিনি। চিঠিটা এইরকম:

‘লা কমুনিকে পত্রিকা অফিস থেকে রিডাইরেক্ট করা আপনার চিঠিটা অনেক ঘুরে গতকাল আমার হাতে এসে পৌঁছেছে। আপনি যে পত্রিকার নামে চিঠিটা পাঠিয়েছিলেন, সেই নামের পত্রিকাটি তিরিশ বছর আগেই বন্ধ হয়ে গিয়াছে। বর্তমান পত্রিকাটি সেই লুপ্ত পত্রিকারই বংশধর বলা যায়।

যা-ই হোক, যে ঘটনাটার কথা আপনি উল্লেখ করেছেন, সেটির ব্যাপার আমি আমার বাবার কাছে শুনেছিলাম। আপনি হয়তো জাতিস্মরতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন বলেই এ বিষয়ে খোঁজখবর করছেন। তবে আমি খুবই দুঃখিত যে, এ বিষয়ে আপনাকে কিছুই সাহায্য করতে পারলাম না। বাবা ছোটবেলায় কী স্বপ্ন দেখেছিলেন, পরিণত বয়সে সেটা নিজেই প্রায় ভুলে গিয়েছিলেন। আমি নিজে একজন চিকিৎসক। আমার মতেও ওটা অর্ধেচেতন অবস্থার মধ্যে উচ্চারিত প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।

বাবা যে আপনাকে কিছু সাহায্য করবেন, সেটাও সম্ভব হল না। কারণ গত বড়দিনের দিনই বাবা গুরুতর সেরিব্রাল থ্রম্বোসিসে আক্রান্ত হন। প্রায় দু-সপ্তাহ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী থেকে, আপনার চিঠি পাওয়ার অনেক আগেই গত মাসের ৮ তারিখে পরলোকগমন করেছেন।

আপনার গবেষণার উদ্দেশে শুভেচ্ছা জানিয়ে

মোরিস নিকোলাস’

বাবা কি শেষ বয়সে জাতিস্মরবাদ সম্বন্ধে আগ্রহী হয়েছিলেন? ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগই বা হল কী করে?

এই প্রশ্নগুলো অতনুবাবুর মাথায় আসার পরেই চিঠির শেষ কটা লাইন তাঁকে হতভম্ব করে দিল। একটু আগেই একজন প্রাক্তন ক্রীড়াবিদের চিঠির উত্তর তাঁকে দিতে হল। তাতে যা লিখেছিলেন, তারই ইংরেজি অনুবাদ যেন এই চিঠির শেষ ছত্রে। চিঠির দিকে তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন।

[সন্দেশ, বৈশাখ, ১৩৯০]