বৃশ্চিক গ্রাস

বৃশ্চিক গ্রাস

ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজতেই চমকে গবেষণাগারের টেবিল থেকে উঠে পড়লেন ডক্টর সুনীল সেনগুপ্ত। তাঁর আবিষ্কৃত ইনসেটেক্স যন্ত্রের ক্ষীণ আলোতেই দেখা গেল তাঁর সারা মুখে তৃপ্তির হাসি। সমস্ত দিনের পরিশ্রমের কোনও চিহ্নই সে মুখে নেই। সফলতার প্রলেপ ক্লান্তির সব রেখা তাঁর মুখ থেকে মুছে দিয়েছে।

ইনসেকটেক্স যন্ত্রের আকারটা ছোট একটা বক্স ক্যামেরার মতো। ব্যাটারি বা প্লাগ লাগালে তার থেকে নির্গত হয় নানা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের শব্দ আর আলো, যা মানুষের কানে পৌঁছোবে না, চোখকেও পীড়িত করবে না। তবে ডক্টর সেনগুপ্তর কুকুর পিংকি প্রথমে একটু ঘেউ ঘেউ করে উঠে পরে বোধহয় ব্যাপারটা বুঝতে পেরে শান্ত হয়ে যায়। তাঁর গবেষণাটা ছিল কীটপতঙ্গের ওপর আলো, তাপ আর শব্দের প্রভাব নিয়ে। তিনি দেখেছিলেন, মশা, মাছি, পিঁপড়ে থেকে সব কীটপতঙ্গ বিশেষ মাত্রার তাপ, শব্দ বা আলোতে বিশেষভাবে সাড়া দেয়। আবহাওয়ার তাপ আর আর্দ্রতা একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় বেড়ে গেলে পিঁপড়েরা ডিম মুখে নিয়ে গর্ত থেকে বার হয়ে আসে। একটা আলট্রাসনিক শব্দমাত্রা মশা থেকে ফড়িং পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ঘরবাড়িকে কীটপতঙ্গ থেকে মুক্ত রাখতে বিষাক্ত ওষুধপত্র না ছড়িয়ে একরকম যন্ত্রের সাহায্য নেওয়া যায় কি না, সেটাই তাঁর গবেষণার বিষয়। বিশেষ করে, আরশোলাকে দূর করাটা একটা ভীষণ সমস্যা। সেই কোন প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে এই জীবটা আজও টিকে আছে। জীবটাকে তিনি নিজে তো একেবারেই সহ্য করতে পারেন না।

আলট্রাসনিক শব্দতরঙ্গ আর ইনফ্রারেড আলোকতরঙ্গের একটা যুগলবন্দি সুরের যন্ত্র এই ইনসেটেক্স বক্স আবিষ্কার করে তিনি তাঁর সাধনায় আজ সম্পূর্ণ সফল হয়েছেন। এই ছোট্ট বাক্সটি ঘরের টেবিলে বসিয়ে রাখলে ত্রিশ ফুট ব্যাসার্ধযুক্ত জায়গায় আর মশা তাড়ানোর ধূপ জ্বালাতে হবে না, ছারপোকার ওষুধও ছড়াতে হবে না। এবার যন্ত্রটির পেটেন্ট নিয়ে হাজার হাজার ইনসেটেক্স বক্স তিনি বাজারে ছাড়বেন। এটা তাঁকে খ্যাতি আর অর্থ দুইই এনে দেবে।

রাতে বাড়ি ফিরেই তিনি কয়েকটি চিঠির মধ্যে পেলেন দিলীপের চিঠিটা। আশ্চর্য হলেন ডক্টর সেনগুপ্ত। চিঠি খুলেও তিনি প্রথমে বুঝতে পারেননি কার চিঠি। কিছুটা পড়ার পর আর নীচে নামটা দেখেই তিনি বুঝলেন এই চিঠি তাঁর এক সময়ের বন্ধু দিলীপ পাঠকের। অতীতের এক সময়ের বন্ধু ঠিকই, তবে অনেক বছর তাঁর সঙ্গে দিলীপের যোগাযোগ নেই। দিলীপের তো এমনিতেই বাবা-মা, ভাইবোন কেউ ছিল না। কাকাদের বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করত। পরে পারিবারিক কী গোলমালে বাড়ি ছেড়ে চলে এসে কিছু দিন মেসে থাকে। দিলীপ অবশ্য পৈতৃক টাকাকড়ি কিছু পেয়েছিল। কিন্তু কেমন যেন অমিশুকে আর রূঢ় স্বভাবের ছিল, যার জন্যে কারও সঙ্গেই তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি, এক সুনীলবাবু ছাড়া। সুনীলবাবু বুঝতেন, তাঁর বন্ধু দিলীপের এই মনোভাব আশৈশব পিতা মাতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত থাকার জন্যেই গড়ে উঠেছে। সংসারের ওপর এক বিতৃষ্ণা যেন দিলীপের মনের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই ছিল, যা বড় হয়ে ওঠার পরেও একটুও কমেনি। ইস্কুলে বাংলা বইয়ে একটা কবিতা পড়তে পড়তে তার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠত, এটা ডক্টর সেনগুপ্তর মনে আছে। কবিতাটার আরম্ভটা ছিল–

সর্বদাই হু হু করে মন,
 বিশ্ব যেন মরুর মতন।
চারিদিকে ঝালাপালা,
 উঃ, কী জ্বলন্ত জ্বালা!
অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গ পতন।

কাজেই দিলীপ যখন পরে উত্তর ভারতে কোনও পাহাড়ে নির্জন জায়গায় বাড়ি করে বরাবরের মতন চলে গেল, তখন তার জন্যে কেউ দুঃখ পেয়েছিল বলে ডক্টর সেনগুপ্তর মনে হয়নি। সে কাউকে প্রায় না বলেই চলে যায়। আর এত বছরের মধ্যে ডক্টর সেনগুপ্তকে একটা চিঠি দিয়ে তার ঠিকানা জানায়নি, তাঁকে সেখানে যাওয়ার নিমন্ত্রণ করা তো দূরের কথা। কাজেই চিঠিটা পেয়ে ডক্টর সেনগুপ্ত বেশ অবাক হলেন। সেই বিস্ময় চরম রূপ নিল, যখন তিনি চিঠিটা পুরো পড়লেন। এটা কি আমন্ত্রণপত্র? একেবারে শেষ সময়ে বন্ধুকে দেখতে পাওয়ার বাসনা? নাকি, কোনও গোপন কথা বলার আকুলতা!

কিছুই বুঝতে পারেন না তিনি।

 রহস্যময় অংশটা আরেকবার পড়লেন ডক্টর সেনগুপ্ত–

‘সুনীল, যে ব্যাধিতে আজ আমি মৃত্যুর সম্মুখীন, তার চিকিৎসা নেই। আজ আমি কণ্ঠহারা, বাকশক্তিহীন।

কলকাতায় বা ভারতের কোনও বড় শহরে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। আমার কেউ নেই, সে তো তুই জানিস। একটা চাকর আছে, সে-ও এখন নিজের তালে আছে। স্থানীয় ডাক্তাররা কেউ আমার কথা শোনে না। ভাবে, আমি পাগল হয়ে গেছি। ওরা বলছে, আমার গলায় আর ফুসফুসে ক্যানসার হয়েছে। আমি জানি তা নয়। তুই যদি আসিস, তবে বলব এক অদ্ভুত রোগের কথা, যার ওষুধ নেই। আশা করি, আসবি। আমার ভৃত্য ব্রিজলালকে দিয়ে চিঠিটা পোস্ট করতে দিলাম।

আজকাল সে-ও আমার মাথা খারাপ হয়েছে বলে সন্দেহ করে। জানি না চিঠিটা ডাকে দেবে কি না!

–দিলীপ।‘

অনেক দিন যোগাযোগ না থাকলেও বন্ধুর আকুতিভরা এই চিঠি ডক্টর সেনগুপ্তর মনকে নাড়া দিল। সত্যি বলতে কী, এক প্রবল কৌতূহল তাঁর মনকে অধিকার করে থাকল। তা ছাড়া অনেক দিন বাইরে কোথাও যাওয়া হয়নি। ভেবেছিলেন, এর মধ্যে সপরিবারে একবার উত্তর ভারতে ঘুরে আসবেন। কিন্তু ছুটি’ নামক বস্তুটির সাক্ষাৎ তিনি গত কয়েক বছর পাননি–হয়তো নিজের দোষেই। দিলীপের চিঠি পাওয়ার পর তিনি একাই আপাতত ঘুরে আসবেন ঠিক করলেন। স্ত্রী-ছেলেমেয়ের মুখ একটু ভার হল। তাদের বুঝিয়েসুঝিয়ে রওনা হতেও আরও কিছু দিন কেটে গেল। বন্ধুর ওপর রাগও হল বেশ। হতভাগা অসুস্থ হয়ে এখন ঠ্যাকায় পড়েছে, তাই তাকে চিঠি লিখেছে। এত দিনে একবার বলেওনি যে, তোরা সপরিবারে একবার আমার এখানে ঘুরে যা। এই তো সংসার! সুসময়ে অনেকেই বন্ধু বটে হয়–না কী যেন! ক্লাস টু-তে পড়া কবিতাটা ড. সেনগুপ্তর আর মনে পড়ে না। যদিও বুঝতে পারলেন, উদ্ধৃতিটা ঠিক লাগসই হল না এখানে।

হাওড়া স্টেশন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এইসব দার্শনিক চিন্তা তার মন থেকে উবে গেল। যাওয়ার আগে সামান্য জিনিসপত্রের সঙ্গে একটা ইনসেটেক্স বক্স আর ব্যাটারিও স্যুটকেসে ভরে নিলেন তিনি। সেখানে গিয়ে মশার কামড় খেয়ে ম্যালেরিয়ায় ভুগতে রাজি নন। কাগজে তো সে দিনই পড়লেন যে, কলকাতার মতো উত্তর ভারতেও কোথাও কোথাও ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব হয়েছে অনেক বছর পর।

চিঠিতে দিলীপের বাড়ির পথনির্দেশ ছিল। অনেক চড়াই-উতরাই ভেঙে একে-ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সুনীলবাবু যখন সেখানে পৌঁছোলেন, তখন তাঁর মনে হল, এভারেস্ট অভিযানকে কলকাতায় থাকতে যত সোজা কাজ ভেবেছিলেন, আসলে হয়তো তত সোজা নয়। ছোট্ট বাগানবাড়ি। বাইরে বাংলা হরফে বাড়ির নাম লেখা–’প্রকৃতির আহ্বান’। নামটা খুব চেনা-চেনা মনে হল ড. সেনগুপ্তর। একটু ভাবতেই মনে পড়ল–স্কুলের বাংলা বইয়ে বিহারীলালের সেই কবিতাটির নাম।

দরজা খোলাই ছিল। সোজা ভেতরে চলে এলেন সুনীলবাবু। আশ্চর্য, ঘরের দরজাও খোলা। কিন্তু কারও সাড়াশব্দ নেই। দিলীপ তো চিঠিতে লিখেছিল যে, এখন বাড়িতেই আছে। তবে কি…। একটা অশুভ আশঙ্ক তাঁর মনে উঁকি দিল। সুনীলবাবু কয়েকবার ডাকাডাকি করলেন, কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কী করবেন ভাবছেন, এমন সময় পাশের ঘর থেকে তিনি যেন একটা নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলেন। ঘরটাতে ঢুকেই সুনীলবাবু প্রায় আঁতকে উঠলেন। সামনের অগোছালো বিছানাটায় শায়িত ওটি কী? তাঁর বন্ধু দিলীপ পাঠক না একটি কঙ্কাল? হাপরের মতন নিঃশ্বাস ফেলছে দিলীপ। কয়েকবার ডেকেও কোনও সাড়া পেলেন না তার।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্রিজলাল ফিরে এল, সঙ্গে স্থানীয় ডাক্তার শর্মা। ডা. শর্মার সঙ্গে পরিচয় হল। বেশ ভদ্র ও সহৃদয় ভদ্রলোক। পুরোনো পরিচয়ের খাতিরে বিনা ভিজিটেই তিনি দিলীপকে মাঝে মাঝে দেখে যান। এবার দেখে গম্ভীর হলেন। সুনীলবাবুকে পাশের ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন সব কথা। ক্যানসারের শেষ অবস্থা দিলীপবাবুর। প্রথমদিকে শহরে গেলে চিকিৎসায় হয়তো কিছু ফল হত। কিন্তু এখন আর কোনও আশাই নেই। বললেন দিলীপবাবুর বাতিকের কথা। কিছুতেই হাসপাতালে গেলেন না। বলতেন, এ তো ক্যানসার নয় ডাক্তারবাবু, এ রোগ স্করপিয়ন। আমার কর্কট রাশি নয়, বৃশ্চিক রাশি–আমার তো এ রোগ হবেই। ডাক্তারবাবু চলে যাওয়ার পরে জ্ঞানহীন বন্ধুর দিকে চেয়ে ড. সেনগুপ্তর মনটা খারাপ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে ঘরের বাইরে এলেন তিনি।

বাড়ির পেছনে ছোট্ট ফুলের বাগান। নানারকম ফুল। তিনি উদ্ভিদবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না। অনেক ফুলের নামই তিনি জানেন না।

বাগানে ঘুরতে ঘুরতে একটা লতাগাছে সাদা থোকা ফুল দেখে তিনি অন্যমনস্কভাবে একটা থোকা ছিঁড়ে শুঁকলেন। অত্যন্ত বিটকেল গন্ধ। এই ফুল দিলীপ কেন লাগিয়েছে, বুঝতে পারলেন না।

ব্রিজলাল একটু দূরেই ছিল। সেখান থেকেই চিৎকার করে যা বলল, তার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়–ওই ফুল ছোঁবেন না। ওটা অলক্ষুনে ফুল। ওর গন্ধে বিছে আসে। তাই পাহাড়ি লোকেরা ওই গাছ দেখলেই পুড়িয়ে ফ্যালে।

হাসনুহানা বা কেয়ার গন্ধে সাপ আসে, এরকম একটা কথা ড. সেনগুপ্ত শুনেছিলেন। নিজের কোনও কুসংস্কার না থাকলেও ব্রিজলালের হাউমাউ চিৎকারে প্রায় এক লাফে পিছু হটে এলেন। আর ঠিক সেই সময় সত্যিই দেখলেন, গাছটার লতা বেয়ে উঠে যাচ্ছে ছোট একটা বিছে।

রাত্তিরে বাইরের ঘরে শুয়ে সুনীলবাবুর একটু শীত-শীত করতে লাগল। চৈত্র মাসে কলকাতায় গরম পড়লেও এখানে এখনও শীতের আমেজ। কিন্তু রাত্তিরে গলার মধ্যে সুড়সুড় করতে লাগল আর তার সঙ্গে কাশিও।

পরদিন সকালে উঠে ড. সেনগুপ্ত দেখলেন, কাশিটা বেড়েছে। তা ছাড়া বুকটাও যেন জ্বালা-জ্বালা করছে। ব্রিজলালকে দিয়ে কফ সিরাপ আনিয়ে খেলেন তিনি। এখন গলার সুড়সুড়ানিটা বুকের মাঝেও হচ্ছে। ইনসেটেক্স তো ফ্লু-র ভাইরাসকে তাড়াতে পারে না। ভাবলেন, অসুখে পড়ার আগেই ভালোয় ভালোয় কলকাতায় পৌঁছোত পারলে হয়। বন্ধুকে আরেকবার দেখার জন্যে তিনি দিলীপের ঘরে এলেন। সেই একইভাবে বেঘোরে শুয়ে হাঁপাচ্ছে দিলীপ। এ কষ্ট চোখে দেখা যায় না।

শয্যার একপাশে বসলেন ড. সেনগুপ্ত। বালিশের নীচে একটা কাগজ দেখে কৌতূহল ভরে হাতে নিলেন সেটা। বিস্মিত হয়ে দেখলেন, এটা তাকেই লেখা দিলীপের আরেকটা চিঠি। রুদ্ধশ্বাসে চিঠিটা পড়তেই একটা প্রচণ্ড ভীতি তাঁর মতো শক্ত প্রকৃতির মানুষকেও কাঁপিয়ে দিল।

দিলীপ লিখেছে–

‘সুনীল, জানি না ব্রিজলাল তোকে লেখা চিঠিটা পোস্ট করেছে কি না। তুই যদি সেই চিঠিটা পেয়ে আসিস, তার জন্যে এটা আমি লিখছি। কারণ তখন হয়তো আমি থাকব না। কিংবা, থাকলেও লেখার ক্ষমতা লোপ পেয়ে যাবে তখন।

আমার এই রোগের কথা শর্মাকে বলতে গেলেই ও এড়িয়ে যায়। ভাবে, পার্বত্য উপজাতিদের কুসংস্কার নিয়ে মানসিক রোগে ভুগছি। কিন্তু আমি জানি, বাগানের কোণের ওই গাছটাই আমার এ রোগের কারণ। ব্রিজলালকে গাছটা কাটতে আমি নিষেধ করেছি– তাহলে ওটা নিয়ে গবেষণা হবে কী করে? ওই গাছের গন্ধে বিছে আসে। শুধু তা-ই নয়, বিছেগুলো ওই গাছের ফুলের মধ্যেই ডিম পাড়ে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে। তখন যদি কেউ সে ফুলের গন্ধ শুঁকতে ফুলটা নাকের কাছে ধরে টানে, তবে সেই টানে পরাগের মতো ডিমগুলো সোজা তার ফুসফুসে ঢুকে পড়বে। যা আমার হয়েছে। প্রথম প্রথম খুসখুসে কাশি হবে। গলা সুড়সুড় করবে। তারপর যেই সুড়সুড়ানি বুকে চলে যাবে। কয়েক দিনের মধ্যেই ডিম ফুটে বিছের বাচ্চা হবে। ফুসফুস আর কণ্ঠনালি হবে তাদের বাসা! একদিন জোরে কাশতে গিয়ে একটা ছোট বিছের বাচ্চা আমার মুখ থেকে ছিটকে বাইরে পড়ল। সে দিনই আমি আমার পরিণতি বুঝলাম। আমার স্বরযন্ত্রকে অকেজো করে দিল। উঃ, কী জ্বলন্ত জ্বালা! ডাক্তাররা বলল কর্কট রোগ। হায়, আমি তো জানি, এটা বৃশ্চিক গ্রাস। আমাকে না মেরে ওরা মরবে না। ধীরে ধীরে ওরা আমার মৃত্যু ডেকে আনবে। দংশন করলে আমার এ যন্ত্রণা তাড়াতাড়ি শেষ হয়, কিন্তু কোনও জীব কি তার নিজের বাড়ির দেওয়ালে হুল ফোঁটায়!’

আরও অনেক কিছু লেখা ছিল। কিন্তু ড. সেনগুপ্ত পড়তে পারলেন না। কাশির দমকে নুইয়ে পড়লেন তিনি। ব্রিজলাল হতবাক হয়ে তাকে ধরে রাখল দু-হাতে, যেভাবে সে তার মনিবকে ধরেছিল একদিন।

ড. সেনগুপ্ত ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গেলেন। মৃত্যু যেন অদৃশ্য রূপ ধরে হুল তুলে এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে। তাঁর ভবিষ্যৎ যেন তাঁরই সামনে শায়িত বাল্যবন্ধুর রূপে। সেদিকে চেয়েই শিউরে উঠলেন ড. সেনগুপ্ত। কী ভয়ানক! একসার লাল পিঁপড়ে মিছিল করে বিছানা বেয়ে এগিয়ে চলেছে দিলীপবাবুর মুখের দিকে। একটি মৃতদেহের সঙ্গে এই শায়িত দেহটির খুব কমই পার্থক্য আছে, শুধু হৃদযন্ত্রের ধুকধুকানি ছাড়া–এটা তারাও যেন বুঝতে পেরেছে। নিজের কথা ভুলে বাল্যবন্ধুকে আরও যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করতে ড. সেনগুপ্ত পাশের ঘর থেকে তাঁর ইনসেটেক্স বক্সটা নিয়ে এলেন। সুইচটা অন করে বন্ধুর শিয়রে রাখতেই পিঁপড়েদের মধ্যে একটা সাড়া পড়ে গেল। তারা এলোমেলোভাবে ছুটে পালিয়ে যেতে লাগল খাটটা থেকে।

কিছুক্ষণ এইভাবে বক্সটা রাখার পর আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। হঠাৎ থরথর করে কেঁপে উঠল দিলীপবাবুর সমস্ত শরীরটা। মানুষের শরীরের ওপর এই যন্ত্রের কোনও ক্রিয়া হওয়া উচিত নয়, কাজেই ব্যাপারটা ড. সেনগুপ্তকে আশ্চর্য করল। তারপরেই দেখলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। তুবড়ির খোল থেকে যেমন আগুনের ফুলকি ছিটকে ছিটকে বেরোয়, সেইভাবে দিলীপবাবুর খোলা মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে একটার পর একটা বিছে। তারপর তরতর করে চলে যাচ্ছে বিছানা ছেড়ে মেঝে বেয়ে ঘরের বাইরের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখ মেলে তাকালেন দিলীপবাবু। বুকে আর সেই হাপরের মতো শব্দ নেই। শ্বাসপ্রশ্বাস প্রায় স্বাভাবিক। ড. সেনগুপ্তর দিকে যে দৃষ্টিতে তাকালেন, তাতে একসঙ্গে মেশানো বিস্ময়, আনন্দ, স্বস্তি আর আরাম।

ড. সেনগুপ্তর মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যন্ত্রটা আবিষ্কার করার দিনও এত আনন্দ পাননি। এটা শুধু তাঁর বন্ধুর প্রাণ বাঁচাল না, তাঁর নিজেরও প্রাণ বাঁচবে। তাঁর বন্ধুর মতো এতটা দৈহিক ক্ষতি তাঁর নিজের বেলায় হবে না। শুধু কিছু দিন ডিম ফুটে বাচ্চা হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হবে। একটু কাশিতে ভুগতে হবে তাঁকে। সে কয় দিন তাঁকে প্রকৃতির আহ্বান’-এই কাটাতে হবে। কলকাতায় গেলে স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা হয়তো ভয় পাবে। আর তা ছাড়া, ডাক্তার শর্মার মতো ডাক্তার তো কলকাতাতেও আছে।

মনস্থির করে ফেলেই তিনি ব্রিজলালকে বললেন বাগানের গাছটা কেটে ফেলতে। এখন বাড়ির মধ্যে দিনরাত্রি চালানো থাকবে তাঁর ইনসেটেক্স যন্ত্র।

[সন্দেশ, বৈশাখ ১৩৮৮]