বাউরি পুকুরের বিভীষিকা

বাউরি পুকুরের বিভীষিকা

শব্দের আক্রমণ থেকে নিজেকে ক-দিনের জন্য সরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই আমলায় বেড়াতে এসেছে কলকাতা কলেজের জীববিজ্ঞানের তরুণ অধ্যাপক সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়। বেড়াতে আসাও বটে, আবার বন্ধুর ডাকে সাড়া দেওয়াও বটে। স্কুলের অন্তরঙ্গ বন্ধু গৌতম অনেকদিন ধরে তাড়া লাগিয়ে যাচ্ছে। শেষমেশ সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে কালীপুজোর আগেই গৌতমদের ঘুঘু-ডাকা, ছায়ায় ঢাকা আমলা গ্রামে হাজির হয়েছিল সায়ন।

সায়নের মর্নিং ওয়াক করার অভ্যেস ছিল। গৌতম অবশ্য আলসে, ঘুমকাতুরে। বেশ কিছু দিন গ্রামে কাটিয়ে যাবে যখন ঠিকই করল, তখন ভোরে গ্রামে প্রাতভ্রমণের লোভ সামলাতে পারল না সায়ন। সে দিনও গৌতমকে জোর করে ঘুম থেকে তুলে তার সঙ্গে ঘুরতে বেরোল সে গ্রামের পথে।

বটতলা ছাড়িয়ে রথতলার দিকে যেতে যেতে সে দেখল, প্রায় বেঁকে-যাওয়া এক বুড়ি বিড়বিড় করতে করতে তাদের দিকে আসছে। সামনে আসতেই বুঝতে পারল, বিড়বিড় বলে যাকে ভাবছিল, সেটা গঙ্গাস্তোত্র আবৃত্তি। খুব ছোটবেলায় সায়ন শুনেছিল তার দিদিমার কাছে। এখনও কিছু কিছু মনে আছে–দেবী সুরেশ্বরী ভারতী গঙ্গে, ত্রিভুবন তারিণী তরল-তরঙ্গে…। ।

তরল-তরঙ্গ-লিকুইড ওয়েভ! সায়ন অবাক হয়ে ভাবে, আশ্চর্য, কবি কি জানতেন, তরল পদার্থ ছাড়া অতীন্দ্রিয় পদার্থেও তরঙ্গ আছে!

গৌতম বুড়িকে ডেকে বলল, কী দিদিমা, শীতের শুরুতেই এই ভোরে চান করতে চলেছেন–ঠান্ডা লাগবে যে!

বুড়ি তার দিকে ফিরে দন্তহীন মুখে একগাল হেসে বলল, কে, উকুন নাকি? সঙ্গে ওড়া কে?

সায়নের পরিচয় দিতে বুড়ি বলল, তা বেশ, বেশ। একদিন আসিস রে উকুন তোর বন্ধুকে নিয়ে। হ্যাঁ, দাদু, এইটুক বেলাতে বাপের বাড়ি থাকতেই রাসপূর্ণিমার ভোরে চানটান করে পুজো করার অভ্যেস। ও আর ছাড়তে পারিনে ভাই, যে কডা দিন আছি। চলি ভাই।

বুড়ি চলে যেতেই তার ডাকনামের রহস্য প্রকাশ করল গৌতম। কুসুমপিসিমা তাদের বাড়ির কাছেই থাকে। বাবা-কাকা আর তাঁদের সমবয়সিদের কাছে তিনি কুসুমপিসিমা। তা-ই দেখে ছোটরাও কুসুমপিসিমা বলে ডাকত। আর তাতে খেপে যেত কুসুমবুড়ি। গৌতমই সবচেয়ে বেশি পেছনে লাগত বলে বুড়ি তার নাম দিয়েছিল উকুন। এখনও সামনে দিদিমা বললেও আড়ালে কুসুমপিসিমা বলা অভ্যেস ছাড়তে পারেনি।

সে দিনই একটু বেলায় ব্যাপারটা জানা গেল। অনেকক্ষণ পরেও কুসুম বুড়ি ফিরল না দেখে, বাড়ির লোকে পুকুরঘাটে গিয়ে দ্যাখে, পইঠাতে বুড়ির ঘটিটা রাখা আছে। কী হয়েছে, বুঝতে কারও বাকি রইল না। কেউ কেউ ঘাটের কাছ বরাবর অনেক দূর পর্যন্ত ডুব দিয়েও তার চিহ্নমাত্র পেল না। দুপুরে পুকুরে জাল ফেলা হল। কিছু মাছই উঠল তাতে। সবাই বুঝল, বুড়ি তলিয়ে গিয়েছে অনেক গভীরে। বেঁচে থাকার প্রশ্নই আর নেই। একসময় ভেসে উঠবে।

একের পর এক দিন চলে গেল। বুড়ির দেহ আর ভেসে উঠল না। কেউ কেউ রহস্য করে বলল, হয়তো হঠাৎ মনে বৈরাগ্য দেখা দেওয়াতে গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছে অনেক দূরে। কেউ বলল, শান্তিপুরে কি নবদ্বীপে খোঁজ করলে হয়।

তবে সে চেষ্টা বাড়ির লোকেও করল না। কয়েক মাসের মধ্যেই গ্রামের লোক ভুলে গেল কুসুম বুড়ির কথা–সে কথা গৌতমের চিঠিতেই জেনেছিল সায়ন।

তারপরে শীত কেটে গিয়ে গরম পড়ল। পুকুরে চান করছিল সাহাপাড়ার দুটো ছেলে বাদল আর নিবু। হঠাৎ নিবু বলল, আয়, কে কতক্ষণ ডুবে থাকতে পারি, পরীক্ষা হবে। বাদল পত্রপাঠ প্রতিযোগিতায় ভঙ্গ দিয়ে বলে উঠল, না, বাবা, আমি একদম পারি না। সে বড়জোর কয়েক ধাপ নীচে একটুখানির জন্যে ডুব দিতে পারে। তাতেই তার কান কটকট করে, নাক শ্যাওলা জলের গন্ধে জ্বালা করে।

নিবু হেসে বলল, ঠিক আছে। আমি ওই ওখানে মাঝপুকুরে গিয়ে ডুব দিচ্ছি। তুই এক-দুই করে গোন।

নিবু ডুব দিতেই বাদল গুনতে শুরু করল। একশো, দু-শো, তিনশো ছাড়িয়ে গেল। খুব অবাক হল বাদল। নিবু যে এতক্ষণ ডুবে থাকতে পারে, কই, আগে সে তো জানত না। আরও অনেক পরে তার মনে একটা ভয় এসে দেখা দিল। সে গোনা বন্ধ করে নিবু নিবু বলে ডাকতে লাগল। যদিও সে জানে, জলের নীচে কিছু শোনা যায় না।

আরও কিছুক্ষণ পরে সে ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটল লোক ডাকতে। এই ভরদুপুরের গরমে ঘাটের কাছাকাছি তারা ছাড়া আর কেউ ছিল না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকজন জড়ো হয়ে গেল বাউরি পুকুরের ঘাটে। আবার সেই আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি। নিবুর দেহ মিলল না।

.

ঘটনার দিন সন্ধেবেলায় বটতলায় জড়ো-হওয়া প্রবীণদের বৈঠকে নন্দবাবু বললেন, আচ্ছা, আজ কী তিথি বলো তো? তারাপদবাবু এসবের হিসেব রাখেন। বললেন, তিথিটা ভালো–বৈশাখী পূর্ণিমা। আত্মার সদ্গতি হবে।

নন্দবাবু লাফিয়ে উঠে বললেন, আরে রাখো। একটা বাচ্চা ছেলের আত্মা–তার আবার সদ্গতি-অসঙ্গতি! কুসুমপিসির ডোবার দিন ছিল রাসপূর্ণিমা। ব্যাপারটা বুঝেছ?

পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন স্কুলের অঙ্ক তথা বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই প্রমোদবাবু। সঙ্গে তাঁর সহকর্মী বাংলার আশু হালদার। প্রমোদবাবুকে ডেকে নন্দবাবু বললেন, এই যে, তোমরা তো সব বিজ্ঞান পড়ে কিছুই মানতে চাও না। রাসপূর্ণিমায় গেল কুসুম বুড়ি, বৈশাখী পূর্ণিমায় বিষ্ণুর ছেলেটা–এটা যে বরুণদেবের গ্রাস না, এটা তুমি বোঝাতে পারো তোমার কাঁটা কম্পাস দিয়ে?

প্রমোদবাবু হেসে বলেন, বরুণদেবের যে পূর্ণিমাতে খিদে পায়, সেটা জানতাম না। তাহলে খবরের কাগজে জানিয়ে দিন, কেউ যেন পূর্ণিমাতে জলে না নামে।

প্রমোদবাবুরা চলে যেতেই নন্দবাবু বললেন, দেখলে, কী কথার কী উত্তর!

আশুবাবু একটু ভিতু প্রকৃতির। তিনি প্রমোদবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কী মনে হয়, প্রমোদদা? পূর্ণিমাতে তো, কী বলে, চাঁদের আকর্ষণটাকর্শন আছে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় নিবেদিতকে কুসুম বুড়ির–

প্রমোদবাবু আগেই বুঝতে পেরে আশুবাবুকে কথার মাঝখানেই থামিয়ে বললেন, আপনি দেখছি নন্দবাবুরও এক ধাপ ওপরে। আরে দূর, হয়তো পুকুরের নীচে কোনও চোরা গর্ত আছে। নদী-পুকুরে এরকম থাকতেই পারে। তার কাছাকাছি কেউ গেলে টেনে নিতেও পারে। চোরাবালি যেমন করে।

স্কুলের কমন রুমেও হঠাৎ বাউরি পুকুরের ঘটনার কথা উঠল। কারণ নিবেদিত, অর্থাৎ নিবু এই স্কুলেই ক্লাস সেভেনে পড়ত। তার মৃত্যুতে স্কুল একদিন বন্ধ ছিল। শোকসভাও করা হয়েছিল।

মোহিনীবাবু নতুন চাকরি নিয়ে এসেছেন। তাঁর নেশা হল বই পড়া। তিনি বললেন, আমার মনে হয়, পুকুরে একটা ত্রিভুজ আছে।

মোজাহার মিয়াঁ ফোড়ন কাটলেন, বাউরি পুকুর তো বর্গক্ষেত্রই জানি। কী বলেন প্রমোদবাবু?

অজিতবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ত্রিভুজের ব্যাপারটা কী?

 মোহিনীবাবু হেসে বলেন, বারমুডা ত্রিভুজের কথা শোনেননি? তবে শুনুন

তাঁর গল্প শুরু হওয়ার আগেই টিফিন শেষের ঘণ্টা পড়ে যেতে সবাইকে উঠতে হল ক্লাস নিতে। গল্পটাও মুলতুবি থাকল।

এরপর মাত্র মাস দুয়েক কেটেছে। এখন অবশ্য সত্যিই কেউ পূর্ণিমা তিথিতে চান করতে আসে না। আর একাও আসে না কখনও।

সে দিন অবশ্য পূর্ণিমা ছিল না। চান করতে গিয়ে আদ্যিবাবুর দামি হিরের আংটি আঙুল থেকে খুলে জলে পড়ে গেল। আংটিটা শুধু দামিই ছিল না, এর দৌলতে নাকি তাঁদের পরিবারের ভাগ্যও ফিরে গিয়েছিল। চা-বাগানের শেয়ার কিনে আজ যে তাঁরা এত ধনী হয়েছেন, সে তো এই আংটির জন্যেই!

কাছাকাছি হাতড়ে আংটিটা খুঁজে না পেয়ে আদ্যিবাবু লোক জোগাড় করলেন। বললেন, যে খুঁজে দিতে পারবে, তাকে তিনি পাঁচশো টাকা পুরস্কার দেবেন। ছ-জন এসে বলল, তারা খুঁজবে। আর তাদের মধ্যে যে-ই খুঁজে পাক-না কেন, টাকাটা তারা সবাই মিলে ভাগ করে নেবে।

পুকুরের ধারে মজা দেখতে বেশ ভিড় জমে গেল। কোনও দরকার ছিল না, তবুও নন্দবাবু ওদের উৎসাহ দিতে বলে উঠলেন, নেমে পড়। ভয় নেই। আজ তিথি দেখে এসেছি-সপ্তমী।

আংটিটা অবশ্য ওপরের ধাপেই পাওয়া গেল। মহানন্দে তারা জল থেকে উঠল। আদ্যিবাবু খুশি হয়ে তাদের একজন সুবল হালদারের হাতে পাঁচশো টাকা তখনই দিয়ে দিলেন।

তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন। সুবল ডাকল, বাবু, একটা কথা। আদিবাবু দেখলেন, সুবল কর গুনে কিছুর হিসেব করছে।

সুবল বলল, আর যদি চারটে টাকা দেন, ভালো হয়।

আদ্যিবাবু হেসে বললেন, কেন রে, হঠাৎ চারটে টাকা কী হবে?

সুবল লজ্জিতভাবে বলল, আমরা ছ-জনা আছি। তাহলে ভাগটা সমান হয়।

আদ্যিবাবু হো-হো করে হেসে উঠলেন তা-ই শুনে। বললেন, তাহলে আর চার টাকা কেন, দশ টাকাই দিচ্ছি। ভাগটাও সমান হবে, আর যাকে বলে রাউন্ড ফিগারও হল।

সুবল খুশি হয়ে সবাইকে ডাকল। বলল, নাড়ু, টাকাগুলো নিয়ে যা তো ভাঙিয়ে আনতে– বলেই চারদিকে তাকিয়ে দেখল, নাড় সেখানে নেই। বাকি চারজন আছে। সে বলল, নাড় এখনও পুকুরে কী করছে?

বেশ কিছু সময় যেতেই বোঝা গেল, বাউরি পুকুরে আরও একজন হারিয়ে গেল। এরপর থেকে আর কেউ সেই পুকুরে চান করতে নামে না।

সায়ন গৌতমের চিঠিতে প্রত্যেক ঘটনার কথাই জানতে পারল। শেষের ঘটনাটা অবশ্য কলকাতার কাগজে ভেতরের পাতায় বড় করে বেরিয়েছিল, আগের ঘটনা দুটোর উল্লেখ করে। কিন্তু এরকম গাঁজাখুরি গল্প তো প্রায়ই কাগজে বেরোয়। কোথাকার অসুরের চোখ দিয়ে জল পড়ছে, কোথায় কোন দু-বছরের মেয়ে আগের জন্মের নামধাম বলে যাচ্ছে। –এ নিয়ে মাঝে মাঝেই তো চমক দিয়ে কাগজের বিক্রি বাড়ায়। বাউরি পুকুরের ঘটনাও তা-ই হবে। বাসে একজন বলল, হতেও পারে। কোথায় নাকি কী নামে এক গ্রাম আছে। সেখানে কোন মাসের যেন কোন তারিখে সব পাখি আত্মহত্যা করে।

সহযাত্রী অবাক হয়ে বলেন, আপনি বেশ অনুপ্রাস দিয়ে কথা বলেন তো!

তারপরে এই ঘটনার কথাও ভুলে গেল লোকে অন্য খবরের প্রবাহে। সায়ন ভুলতে পারল না। সে লেখালেখি আরম্ভ করল নানা দফতরে। অবশেষে একদিন টনক নড়ল সরকারি কর্তৃপক্ষের।

দেখা গেল, আমলা গাঁয়ে বড় পাম্প যন্ত্র নিয়ে এল একদল লোক। সায়নও এল সঙ্গে। ঠিক হয়েছে, পুকুরের সব জল পাম্প করে ফেলা হবে তেঁতুলতলার নালায়, যেটা আধ কিলোমিটার দূরে সাগরখালি নদীর সঙ্গে যুক্ত আছে। একঘেয়ে গ্রামজীবনে আবার একটা মজা দেখতে ভিড় করল সবাই।

ভকভক করে জল গিয়ে পড়তে লাগল নালায়। মুখে জাল রাখা হয়েছে, যাতে মাছ বেরিয়ে যেতে না পারে। কিন্তু ছোট মাছই জালে পড়তে লাগল বেশি।

আদ্যিবাবু বললেন, বড় মাছগুলো গেল কোথায়? সেবার জাল ফেলা হলেও তো অনেক উঠেছিল। পরে ছেড়েও দেওয়া হয়েছিল জলে। এত দিনে তো আরও বড় হওয়ার কথা।

জল শেষ হয়ে কাদা বেরিয়ে পড়ল একসময়। কিন্তু কোনও গর্ত চোখে পড়ল না। হঠাৎ দেখা গেল, অনেকখানি জায়গা জুড়ে কাদার স্তরটা যেন সরে যেতে লাগল একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে। প্রথমে মনে হয়েছিল, জলের টানে এরকম হচ্ছে। কিন্তু ক্রমাগত এলোমেলো এই নড়াচড়া চলতে থাকায় সবাই হইহই করে উঠল।

সায়ন অবাক হয়ে বলল, আশ্চর্য, কুমিরও না! মনে হচ্ছে, শংকর মাছের মতন চ্যাপটা কিছু। কিন্তু তা-ই বা কী করে হবে? আর এত বড়!

সে জালে ধরা একটা মাঝারি আকারের মাছ নিয়ে ছুঁড়ে মারল সেই জায়গাটায়। হঠাৎ একটা অবাক কাণ্ড হতে দেখে আবার হইহই রব উঠল। কাদাটার মাঝখানে একটা গর্ত হয়ে গেল, আর মাছটা তার মধ্যে ঢুকতেই গর্তটা বন্ধ হয়ে গেল।

সায়নের মানা সত্ত্বেও সবাই ইট-পাটকেল ছুঁড়তে লাগল কাদাটার দিকে। কেউ কেউ জ্বলন্ত মশাল এনেও ছুঁড়তে লাগল। পুকুরের মাঝখানে প্রায় সিকি ভাগ জুড়ে একটা আলোড়নে জলকাদা তোলপাড় হতে লাগল। মাঝে মাঝে একটা সাদাটে অংশও দেখা গেল। একসময় নড়াচড়াটা বন্ধ হয়ে গেল।

একজন সাহসী লোক তো মালকোঁচা বেঁধে যা হয় তোক বলে নেমে গেল নীচে। হাতে একটা বাঁশ কাটার দা। হুংকার দিয়ে বলল, আজ এটার মাংসের ঝোল বেঁধে খাব। নইলে আমার নাম সুবল না। এরই এক বন্ধু জলদানবের শেষ গ্রাস।

সায়ন আরেকবার নিষেধ করার চেষ্টা করল। কিন্তু সমবেত লোকজনের কোলাহলে তার গলার স্বর ডুবে গেল। সে অসহায় ভঙ্গিতে গৌতমের দিকে তাকাল।

সুবল তখন দা বসিয়ে দিয়েছে জন্তুটার দেহে। কিন্তু এ কী! চামড়ার তলায় কি হাড় মাংস কিছুই নেই! গলগল করে আঠার মতো একটা সাদাটে তরল পদার্থ বেরোতে লাগল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রাণীটা বেলুনের মতন চুপসে গিয়ে কাদার সঙ্গে মিশে গেল। শুধু উঁচু হয়ে থাকল তিনটি কাদা-মাখা নরকঙ্কাল।

সকলের বিস্ময়কে ছাপিয়ে গেল সায়নের বিস্ময়। সে গৌতমের কাঁধ চেপে ধরল উত্তেজনায়। তারপর তাকে নিয়ে ছুটতে লাগল বাড়ির দিকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা পরিষ্কার শিশি নিয়ে দু-জনে আবার এসে হাজির হল পুকুরঘাটে। ভিড়ের মধ্যে তখনও চলছে উত্তেজনা, তুমুল তর্ক, আলোচনা আর কয়েকজনের বাড়ির লোকের বুকফাটা কান্না। মৃতদের শেষকৃত্য কীভাবে সম্পন্ন হবে ওই দেহাবশেষগুলো নিয়ে, সে বিষয়েও বৈঠক বসেছে একপাশে।

সায়ন শিশিটা হাতে নিয়ে কাদা ঠেলে নেমে গেল নীচে। তারপর আঠালো তরল পদার্থের কিছুটা শিশিতে ভরে নিয়ে উঠে এল ওপরে। ছিপি বন্ধ করে গৌতমকে জিজ্ঞেস করল, এখানে কাছাকাছি অণুবীক্ষণ যন্ত্র কারও আছে?

গৌতম বলল, কাছেই ম্যালেরিয়া ডিটেকশন সেন্টারে আছে। সেখানে চিত্তদা আছেন, বললেই ব্যবস্থা করে দেবেন।

সায়ন গৌতমকে নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে সেন্টারে এল। প্যাথোলজিস্ট চিত্তবাবুও বোধহয় বাউরি পুকুরে গিয়েছিলেন। একটু পরেই ফিরে এলেন।

স্লাইডে কয়েক ফোঁটা তরল পদার্থ নিয়ে যন্ত্রের তলায় রাখল সায়ন। তারপর লেন্সে চোখ লাগিয়ে অনেকক্ষণ দেখতে লাগল। তার মুখের রেখায় ফুটে উঠেছে বিস্ময়।

একটু পরে মুখ সরিয়ে নিয়ে গৌতমকে বলল, চল। আমাকে এক্ষুনি কলকাতায় যেতে হবে। যদিও তাতে কোনও ফল হবে না জানি। প্রথমত, জিনিসটা এর মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাবে। আর দ্বিতীয়ত, এটা দেখিয়েও কাউকে বিশ্বাস করানো যাবে না।

গৌতম কিছুই বুঝতে না পেরে বলল, ব্যাপারটা কী বল তো?

বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে সায়ন বলল, অ্যামিবার নাম শুনেছিস? পৃথিবীর আদি প্রাণের আধুনিক প্রতিভূ। এরকম এককোশী জলজ প্রাণীই আমার-তোর থেকে বাঘ-সিংহ, কাক-চিল, এমনকী ডাইনোসরেরও পূর্বপুরুষ। অ্যামিবা আমাদের কাছাকাছি নদীনালা পুকুরে আছে সবার অলক্ষে।

একটা দলকে সামনে আসতে দেখা গেল। তার একমাত্র বক্তা নন্দবাবু। তিনি বলে চলেছেন, এটা জলদেবতারই বাহন। দেখলে না, দেহ থেকে শুধু জলই বেরোল? একে মেরে ঠিক করা হয়নি। বরং ওই পুকুরে চান না করে, মাঝে মাঝে ছাগ-মুরগি উৎসর্গ করা উচিত ছিল। অভিশাপটভিশাপ না লাগলেই হয়। শুনে অনেকের মুখ শুকিয়ে গেল।

ওরা চলে যেতে সায়ন হেসে বলল, হ্যাঁ, ভদ্রলোক একটা কথা ঠিকই বললেন। ওটাকে মারা ঠিক হয়নি।.. যাক, যা বলছিলাম। এই অ্যামিবা এককোশী প্রাণী, অন্য যে কোনও প্রাণী, কীটপতঙ্গের মতো বহুঁকোশী নয়। কিন্তু আকার এত ছোট যে খালি চোখে দেখা প্রায় অসম্ভব। একপাশ থেকে আরেকপাশ–যাকে ব্যাসই বলিস, আর যা-ই বলিস, এক মিলিমিটারের সিকি ভাগ। ব্যাস বলা যায় না এই কারণে যে, এর কোনও নির্দিষ্ট আকার নেই। যেদিকে যাবে, সেদিকে এলোমেলোভাবে শরীরের অংশটা ঠেলে নিয়ে এগোয়। ছোটবেলায় একটা গল্প পড়েছিলাম–হেমেন্দ্রকুমার রায়ের অমানুষিক মানুষ। অনেকটা সেরকম। আর খাবারও খায় শরীরটাকে বলয়াকৃতি করে খাদ্যবস্তুটাকে ঘিরে ফেলে। বংশবৃদ্ধি হয় দ্বিধাবিভক্ত হয়ে। ঠিক যেমন লম্বা বেলুনের মাঝখানটা চেপে ধরলে দুটো বেলুনের রূপ হয়। শুধু বেলুন দুটো আলাদা হতে পারে না।

একটু থেমে বলল, কিন্তু এই মহা-অ্যামিবা কোনও অজ্ঞাত কারণে কতকাল ধরে কোটি পরাধগুণ বড় হতে হতে এই বিশাল আকার ধারণ করল, এটা সত্যিই একটা বিস্ময়। কিন্তু কেউ জানল না এই রহস্য। শুধু আমি আমার অভিজ্ঞতা আর অনুভূতিতে একে ধরে রাখব সারাজীবন। কলকাতায় গিয়ে বলেও কোনও লাভ হবে না। মাঝখান থেকে কপালে জুটবে শুধু পাগল বিশেষণ। চাকরিবাকরি, সমাজ-সংসার–সব যাবে। কিন্তু এটা প্রকাশ না-করার যন্ত্রণাও যে কী দুর্বিষহ, সেটা তুই বুঝবি না। আমি অণুবীক্ষণে দেখেছি, শিশির এই প্লাজমার মতন তরল পদার্থটা প্রোটোপ্লাজম ছাড়া আর কিছু না–যা প্রতিটি প্রাণী-উদ্ভিদের কোশে থাকে।

হঠাৎ গৌতমকে অবাক করে দিয়ে সায়ন শিশিটা ছুঁড়ে মারল বটতলার পাশে ঝিলের মধ্যে। শালুকপাতার আড়ালে শিশিটাকে দেখা গেল না। সায়ন সেদিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে অন্যমনস্কভাবে গৌতমকে বলল, বরং তুই এক কাজ কর, গৌতম। কলকাতায় তোর পরিচিত কে আছেন বলেছিলি, যিনি সায়েন্স ফিকশন লিখে থাকেন। তুই বরং তাঁকে এটা নিয়ে গল্প লিখতে বল। খবরটা তো অন্যভাবে কাগজে বেরোবে। কতরকম হেডিং থাকবে দেখিস–জলদানব, পুকুরতলের ক্ষুধা ইত্যাদি ইত্যাদি। তুই তাঁকে বল, ব্যাপারটা যদি এইভাবে কল্পনা করা যায়, কেমন হয়? ভদ্রলোক হয়তো খুশিই হবেন প্লটটা পেয়ে। আর জানিস তো, সেখানে গোরুকে হাইড্রোজেন খাইয়ে গাছে তুললেও লেখককে কেউ পাগল বলে না। বরং ওরকম আরেকটা গল্প দেওয়ার জন্যে সম্পাদক তাড়া লাগাবে।

[শুকতারা, শারদীয়া ১৪০২]