গেছো-মাস্টার

গেছো-মাস্টার

ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলাম। এমন সময় নাতি হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল, দাদাই, একটু এসো-না। মানিপ্ল্যান্ট গাছের পাতায় একটা আরশোলা বসেছে। গাছটা ভয়ে কীরকম কাঁপছে। এক্ষুনি ওটাকে ফেলে দাও-না।

আমি উঠে হাসতে হাসতে বললাম, ভয়টা গাছের, না অন্য কারও? গাছ খুব সাহসী, বাঘকেও ভয় পায় না। বলেই একটু থমকে গেলাম। আনমনাভাবে আরশোলাটা ফেলে দিতে দিতে অনেক বছর আগের একটা কণ্ঠস্বর যেন স্মৃতির রেকর্ডে ধ্বনিত হতে শুনলাম –মনে হল, সারারাত্তির ব্যালকনির পাশে রাস্তার কৃষ্ণচূড়া গাছটা কেঁদেছে, নিশা।

কুড়ি-বাইশ বছর কেটে গিয়েছে তারপর। তখন স্কুল ইন্সপেক্টরের কাজ করতাম। কাজের সূত্রে সেবার মহিমপুর যেতে হয়েছিল। আচমকা পরিদর্শন করাই নিয়ম ছিল। জানিয়ে-শুনিয়ে গেলে স্কুলে যে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া চোখে পড়ে, তাতে পড়াশোনা, শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা–এসবের আসল রূপ ধরা পড়ে না। এখনও কি তা-ই হয়? যা-ই হোক, সেইভাবেই বেলা এগারোটা নাগাদ মহিমপুর এইচ ই স্কুলে এসে হাজির হলাম। তখন পুরোদমে ক্লাস চলছে। স্কুলবাড়িটা আশাতিরিক্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নই মনে হল। দারোয়ানকে বলে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে চাইলাম। দারোয়ান একটা স্লিপ দিল। সেটাও একটা ভালো দিক স্কুলের নিয়মশৃঙ্খলার ব্যাপারে।

স্লিপ পেয়ে একটু পরে প্রধান শিক্ষক নগেন্দ্রনাথ পাল নিজেই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। বললেন, আগে জানলে স্টেশনে লোক পাঠাতেন। দারোয়ানকে একটা ডাব আনতে বললেন।

আমি নিষেধ করলাম। ক্লাস একটু আগেই শুরু হয়েছে জেনে তখনই একটা রাউন্ড দিতে চাইলাম। নগেনবাবুও আমার সঙ্গী হলেন। কয়েকটা ক্লাসে ঘুরে দেখলাম, পড়াশোনার মান বেশ ভালোই। রোল নম্বর অনুসারে সবাই রয়েছে। শেষ বেঞ্চের দিকেও সমান নজর দেওয়া হচ্ছে। ব্ল্যাকবোর্ডের এক কোণে ইংরেজিতে P, A এবং T লেখা আর তার পাশে কিছু সংখ্যা দেখে জিজ্ঞেস করাতে নগেনবাবু বললেন, ক্লাসে উপস্থিত, অনুপস্থিত এবং মোট ছাত্রসংখ্যা কত, সেটা রোজ ক্লাস মনিটর লিখে দেয়।

একটা ক্লাসে ঢুকতেই দেখলাম, টেবিলের ওপর ফ্লাস্ক, বিকার ইত্যাদি রাখা আছে। অথচ ক্লাসে ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে। কারণ জিজ্ঞেস করতেই নগেনবাবু একটু অপ্রস্তুতভাবে বললেন, বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই হঠাৎ না-আসাতে ইতিহাসের ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। ওগুলো আগে থেকেই এনে রাখা ছিল। তিনি বেয়ারাকে ডেকে জিনিসপত্রগুলো নিয়ে যেতে বললেন।

পরিদর্শন শেষে প্রধান শিক্ষকের ঘরে এসে বসলাম। বললাম, বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই হঠাৎ না বলে অনুপস্থিত হলেন। তিনি কি দূরে থাকেন? টেলিফোন করেননি। তাঁর শরীর ভালো আছে তো?

নগেনবাবু একটু চিন্তান্বিত হলেন। বললেন, তিনি টেলিফোন নেননি। বলেন, স্কুল ছাড়া বাইরের জগতের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ দেখিনি। তবে চিন্তা হচ্ছে। কোনও দিনই ছুটি নেন না। তবে ইদানীং তাঁর শরীরটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। মাঝে মাঝেই বুকে একটা অস্বস্তি বোধ করেন। কয়েকবার স্কুলের মধ্যেই মাথা ঘুরে গিয়েছে। কতবার বলেছি কলকাতায় গিয়ে একবার চেক আপ করিয়ে নিতে। গা-ই করেন না। দেখি, দারোয়ান হাসান কিছু জানে কি না। সে তিনুবাবুর গ্রাম শিমুলগাছিতেই থাকে।

শিমুলগাছি! নামটা যেন কোথায় শুনেছি! খবরের কাগজেও দেখে থাকতে পারি কোনও ঘটনার ব্যাপারে। জিজ্ঞেস করতে জানলাম, মহিমপুরের পরে পশ্চিমে একটা খাল আছে। নাম, খয়রাপোতা খাল। সেটা পেরোলেই শিমুলগাছি। খুব কাছেই, হেঁটেই যাতায়াত করা যায়। সে জন্যেই চিন্তা হচ্ছে।

হাসান এসে নমস্কার করল। তারপর সব শুনে দাঁত বার করে হেসে বলল, আজ্ঞে না, উনি তো ভালোই আছেন। হয়তো ছেলেপুলের, মানে ওই রোগবিরোগ হয়েছে। সাতসকালে দেখলাম তো, গোপীকে কী সব ওষুধপত্তর তৈরি করতে বলছেন আর ছোটাছুটি করছেন।

তার হাসি দেখে কিছুটা বিরক্ত হয়েই নগেনবাবুর দিকে তাকালাম। দেখলাম, তাঁরও মুখে হাসির আভাস। সেটাকে চেপে রাগের ভান করে হাসানকে বললেন, আঃ হাসান। তিনি কেমন আছেন, জানতে চেয়েছি। যাও তুমি।

মনটা তেতো হয়ে গেল। ভাবলাম, এ কীরকম অমানবিক মনোবৃত্তি একজন প্রধান শিক্ষকের!

একটু বিরক্তভাবেই নগেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, বিজ্ঞানের টিচারের ছেলেমেয়েরা কি স্থানীয় স্কুলেই পড়ে?

নগেনবাবু আর হাসি লুকিয়ে রাখতে পারলেন না। বললেন, ছেলেমেয়ে? তিনুবাবু বিয়েই করেননি। তাঁর বাগানের গাছপালাকেই তিনি সন্তানের মতো যত্ন করেন। হাসান তা-ই বলছিল। ওকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। শিমুলগাছি কেন, মহিমপুরেও অনেকে এই ঠাট্টা করে থাকে। তারপর একটু চুপিচুপি বললেন, ছেলেছোকরা, এমনকী, স্কুলের ছাত্রদের কাছে তিনি খুব প্রিয় হলেও আড়ালে যে তিনুবাবুর একটা নামকরণ হয়েছে, সেটা কি জানেন? গেছো-মাস্টার।

অবাক হলাম। মাস্টারমশাইয়ের পুরো নাম জিজ্ঞেস করতে, নগেনবাবু বললেন, আসলে তিনুবাবু নামেই সকলের কাছে পরিচিত। এখানেই জন্ম আর কাজকর্ম কিনা। ছাত্রজীবনে শুনেছি, কলকাতায়ও পড়াশোনা করেছেন। তার পোশাকি নাম অতীন সমাদ্দার।

মুহূর্তে চোখের সামনে থেকে একটা কুয়াশা সরে গেল। অথবা বলা যায়, সমুদ্রের একটা ঢেউ এসে সময়ের জমা বালিগুলো সরিয়ে দিল। শিমুলগাছি, খয়রাপোতা খাল কতবার শুনেছি টাউন স্কুলের সহপাঠী বন্ধু অতীনের কাছ থেকে। স্কুলের কাছেই হাতিবাগানে মামার বাড়ি থেকে পড়ত। পরে বর্ধমান না মেদিনীপুর কোথায় যেন কলেজে চলে যায়। স্কুলে অনেকগুলো বছর একসঙ্গে পড়েছিলাম। তখন মহিমপুর স্কুল হয়তো ছিল না। আমাদের বাড়ির ছাদে পাথরকুচি গাছের বীজ আমার লিপিমাসি আমেরিকা থেকে পাঠিয়েছে–এই কথা বানিয়ে বলতেই অতীনের হাসি আর থামতে চায় না। বলল, চিরকাল তো বৃন্দাবন পালের গলিতে কাটিয়ে ধান গাছের তক্তার দোলনা বানিয়ে ঝিঙে গাছের ডালে দোল খাওয়ার গুল মারিস। শিমুলগাছি গ্রামে যাস। পাথরকুচি গাছের ঝোঁপ বনেবাদাড়ে খয়রাপোতা খালের ধারে কত চাস, দেখিয়ে দেব।

নগেনবাবুর কাছে কিছু প্রকাশ করলাম না। টিফিনের পরে ছাত্র-শিক্ষকদের অ্যাসেম্বলিতে রুটিনমাফিক কিছু বলে আমি বিদায় নিলাম। নগেনবাবু রিকশা নিয়ে সঙ্গে যেতে চাইলেন। আমি বারণ করে বললাম, আমি একটু তিনুবাবুর বাগানটা দেখতে চাই। আমার নিজেরও একটু শখটখ আছে কিনা। আপনি বরং হাসানকে কিছুক্ষণের জন্য আমার সঙ্গে ছেড়ে দিন। এটুকু হেঁটেই যাব। ওখান থেকেই সন্ধের ট্রেনে আমি ফিরে যাব।

পথে হাসানের কাছে যা শুনলাম, তাতে খুবই অবাক হলাম। অতীন নাকি গাছের সঙ্গে কথা বলে। সে গাছের কথা বোঝেও। গ্রামের লোকে তাকে গেছো-মাস্টার বলে। কথাটা বলেই সে থতমত খেয়ে বোধহয় ভাবল, পেকটার-বাবুর কাছে এসব বলা ঠিক হল না একজন মাস্টারমশাইয়ের সম্বন্ধে।

বাইরে থেকেই দেখলাম, অতীন বারান্দায় চেয়ারে বসে চা খাচ্ছে। আগে থেকে না জানলে চিনতে পারতাম না। সেই ঘন শক্ত চুল, যা কাটতে গিয়ে সেলুনওয়ালারাও বিরক্ত হয়ে যেত, তা সামনের দিকে লুপ্ত–পুরোপুরি ইন্দ্রলুপ্ত না হলেও। হাসান আমার পরিচয় দিতে সে একটু অস্বস্তিতে পড়ল। তাড়াতাড়ি নিজেই উঠে একটা চেয়ার নিয়ে এল আর কাজের লোককে চা করতে বলল। আমি হাসানকে বিদায় দিয়ে মৃদু হাসতে লাগলাম। সে বলল, আজ স্কুলে যাওয়ার সময়েই গাছগুলো হঠাৎ

আমি যে তার বাগান দেখতে এসেছি, হাসান সেটা জানিয়ে দিয়েছে। সে বলল, আপনার গাছপালার শখ আছে, আপনি হয়তো–

আমি বলে উঠলাম, রেখে দে তোর গাছ! ওসব পাথরকুচি আমাদের ছাদেও ছিল।

অতীন আমার কথায় হতভম্ব হয়ে তাকাতেই আমি বললাম, কী রে ওতে, চিনতে পারলি না? আমি সেই বেন্দাবন পাল লেনের নিশাপতি।

আরে, নাসপাতি! তড়াক করে লাফিয়ে উঠে আমাকে জাপটে ধরল অতীন। সে দিন কিছুতেই কলকাতায় ফেরা হল না। অতীন আটকে দিল। কাছের একটা বুথ থেকে কলকাতায় ফোন করে দিলাম।

বিকেলে তার বাগানে ঘুরতে ঘুরতে জিজ্ঞেস করলাম, তোর ছেলেপুলের অসুখ করেছিল নাকি? অতীন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। আমি হাসান-বৃত্তান্ত বলতেই সে বলল, আরে, স্কুলে যাওয়ার জন্যে রওনা হব, তখন দেখি, ঝাউ গাছগুলো একসঙ্গে কাতর হয়ে পড়েছে। পরে দেখলাম, এক ধরনের পোকা পাতাগুলোর রস খেয়ে নিচ্ছে। ওষুধপত্তর তৈরি করে দিতে দিতেই কয়েক ঘণ্টা লাগল। এখন দেখ, গাছগুলো শান্ত। আমি হাসলাম। আমার কাছে তো ঝড়টড় না হলে সব গাছই শান্ত। অতীন একটা গাছের কাছে এসে বলল, আবার কী হল তোর? ও, গোপী ডাল কেটেছে। ঠিক করেছে। পরে তোকে আরও ভালো দেখাবে।

এবার ভয় পেলাম। অতীনের হাবভাব স্বাভাবিক লাগল না। সন্ধেবেলা ঘরে বসে কথা বলতে বলতে সন্দেহটা প্রকাশই করে ফেললাম। অতীন গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, শুধু তুই কেন, সবাই তা-ই ভাবে। অথচ গাছের যে অনুভূতি আছে, তা তো ল্যাবরেটরিতেই প্রমাণিত। আমি শুধু সেই অনুভূতির ভাষাটা যন্ত্র ছাড়াই কিছুটা বুঝতে পারি।

আমি বললাম, তা-ই বলে গাছের কষ্ট-আনন্দ, খিদে-তেষ্টা তুই বুঝবি কী করে? গাছ তো আর মানুষের মতো কথা বলতে পারে না।

অতীন বলল, বাড়ির পোষা বেড়াল-কুকুরের মনোভাব বোঝা যায় না?

আমি প্রতিবাদ করলাম, আরে, তারা তো মুখ দিয়ে নানারকম আওয়াজ করতে পারে। মুখ ঘষতে পারে, ল্যাজ নাড়তে পারে।

অতীন ধীরে ধীরে বলে চলল, পঞ্চেন্দ্রিয়ের অতীতও অনেক কিছু আছে। তুই তো জানিস, আলট্রাসনিক বা ইনফ্রাসোনিক স্বরেও অনেক জীব ডাকে, কথা বলে। মৌমাছিরা অঙ্গভঙ্গি বা গন্ধের মাধ্যমে একে অন্যের সঙ্গে বার্তা বিনিময় করে। এমনকী, কোনদিকে কত দূরে ফুলের সন্ধান পাওয়া যাবে, সে খবরও। তিমি সমুদ্রের নীচে থেকেই হাজার কিলোমিটার দূরের অন্য তিমির কণ্ঠস্বর–যদি তাকে কণ্ঠস্বর বলিস–শুনতে পায়, যা আজও মানুষের কাছে এক বিস্ময়। গাছের বার্তা অবশ্য অন্য ভাষায়। সেটা কী জানি না। সমগোত্রীয় গাছই সেটা শুনতে পায়। আমি কিছু কিছু অনুভব করি। তুই কি জানিস, একটা উইলো গাছে পোকার আক্রমণ হলে সে আকাশবাণী পাঠিয়ে দূরের অন্য সব উইলো গাছকে সতর্ক করে দেয়? হয়তো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য। বলে অতীন মুচকি হাসল। তারপর বলল, তবে যে কানের ব্যাপার, তা-ই বা ভাবছিস কী করে?

ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়?

অতীন সেরকমই মুচকি হেসে উত্তর দিল, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় শব্দটা অতিব্যবহৃত। সেটা অন্য অর্থেও ব্যবহৃত। এই ক্ষমতায় কেউ কেউ নাকি আগাম বিপদের আঁচও পায়। যাকে বলে বিপদের গন্ধ পাওয়া। অর্থাৎ দ্বিতীয় নাসিকা? যা-ই হোক, এটা সেরকম কিছু না। আমার শরীরের স্নায়ু হয়তো কিছু গাছের বার্তার সঙ্গে অনুরণন সৃষ্টি করে। তা-ও সেটা শুধু তাদের কষ্ট বা যন্ত্রণা হলেই। এটা কত নম্বর ইন্দ্রিয় জানি না। কম কথায় অনুপ্রাস দিয়ে যেতে পারে, এটা একরকম অতীন্দ্রিয় অনুভূতির অনুরণন।

আমি অবাক হয়ে ভাবি, অতীনের কথাগুলো কি বিশ্বাস্য! নাকি কোনও মনের রোগে অলীক ভাষা শোনার কল্পনা করে! হ্যালুসিনেশন! যা নিয়মিত হলে স্কিজোফ্রেনিয়া বলা যায়। মুনিঋষিদেরও তো এরকম ক্ষমতার কথা শুনিনি। অতীনের এই অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা থাকা কি সম্ভব!

মনের ভাব চেপে তাকে বললাম, তাহলে তো রাস্তাঘাটে আর বনেবাদাড়ে গাছের ওপর যে হরদম অত্যাচার হয়, হত্যালীলা চলে আমাদের নিজেদেরই স্বার্থে, তাতে তো তাদের হাউমাউ আর বাবা গো, মা গো শুনে তুই কান পাততে পারবি না।

আমার কথায় অতীন হেসে ফেলল। বলল, না, সব গাছের ভাষা আমি বুঝি না। ছোট আকারের গাছের তো নয়ই। আমিই তো কত আগাছা পরিষ্কার করি। শুধু আমার পোষা কিছু বিশেষ গাছের ভাষা জানি। তবে সেই জাতীয় গাছের কান্না বাইরে শুনলেও–আচ্ছা নিশু, তোর বাড়ির কুকুরের পায়ে ক্ষত হলে যেমন চিকিৎসার ব্যবস্থা করবি, রাস্তার কুকুরের বেলায়ও কি তা-ই করবি, তেমন পশুপ্রেমী না হলে? বড়জোর একটু আহা-উঁহু।

আমি এবার অন্যদিকে কথা ঘুরিয়ে বললাম, তবে কিছু অপকারী গাছও আছে, যারা অনেক রোগের কারণ হয়। সেরকম কিছু দুধ-কলা দিয়ে পুষিসনি তো?

আমার ঠাট্টা গায়ে না মেখে অতীন বলল, আমি উদ্ভিদবিজ্ঞান বা ভেষজবিজ্ঞানের চর্চা করি না। যে কুকুর পোষে, সে সাপও পোষে নাকি? তাই জ্ঞানত ওসব গাছ কিছু নেই বাগানে। তবে কী জানিস, সেসব গাছও হয়তো শত্রুর বেশে বন্ধু। সাপের বিষ থেকেও তো ওষুধ হয়। তা ছাড়া গাছের তো দোষ নেই। বিছুটি বা কাঁটাঝোঁপ তো গোরু-ছাগলের হাত থেকে বাঁচার প্রকৃতিগত অস্ত্র নিয়েই জন্মেছে।

আমি বললাম, আর পার্থেনিয়াম গাছের তো সুখে থাকতে ভূতে কিলিয়েছে। বদগুণটা না থাকলে লোকে বাগানে লাগাত থোকা ফুলের জন্য।

অতীন ওপরের দিকে হাত তুলে বলল, জানি না। সবই সেই অসীম বুদ্ধিধর রহস্যময় অজ্ঞাত সত্তার ইচ্ছা হয়তো। কোনও কিছুই উদ্দেশ্যহীন নয়। সব যেমন নিয়মের রাজত্ব, সেরকম সবই উদ্দেশ্যযুক্ত। তার বলার ভঙ্গি দেখে মনে হল, যেমন সাধারণ লোকে বলে, সবই তাঁর ইচ্ছা!

এবার সম্পূর্ণ অন্য প্রসঙ্গে চলে এলাম। নগেনবাবুর কাছে শোনা তার অসুস্থতার কথা তুলতে সে কোনও পাত্তাই দিল না। বলল, আরে, মাথাঘোরাটা স্পন্ডিলোসিসের জন্যে হয় বোধহয়। আমি তো মুন্ডুর এক্সারসাইজ করি। আর বুকের অস্বস্তিটা অনেকদিন ধরেই আছে। এত তাড়াতাড়ি অক্কা পাব না। হতে পারে, কোনও কোণে ঘাপটি মেরে থেকে, তোর ওই অপকারী গাছই আমার পেছনে লেগেছে।

বলেই প্রাণ খুলে হেসে উঠল অতীন। তারপর আমার হাঁটুতে একটা চাপড় মেরে বলল, ওসব গাছটাছ বাদ দে। এবার তোর বাঘের গল্প বল–মানে বাগবাজারের। এখনও কি ওখানে থাকিস? আমার হাতিরা অবশ্য অনেক আগেই হাতিবাগান কেন, বাংলাই ছেড়েছে। মামারা তো নেই। বাড়ি বিক্রি করে মামাতো ভাইবোনেরা সব দিল্লি, মুম্বই, এমনকী, দেশের বাইরেও। এখন কারও কেউ নইকো আমি, কেউ আমার নয়। বলেই আবার বলে উঠল, থুড়ি, আমার অনেকেই আছে। স্কুলের ছাত্ররা, মাস্টারমশাইরা, তুই আর আমার ওইসব আপাতশান্ত ছেলেপুলে। বলেই সেই প্রাণখোলা হাসি।

আমিও এখন ভবানীপুরের বাসিন্দা। তাই দু-জনেরই ফেলে-আসা জায়গা আর স্কুলের সেই বাল্য-কৈশোরের দিনগুলোতে আমরা ডুবে গেলাম। সে দিন রাতটা শিমুলগাছিতে কাটিয়ে পরদিন সকালের ট্রেনে কলকাতায় রওনা দিলাম।

এর মাস তিনেক পর অতীনের একটা চিঠি পেলাম। লিখেছে, নিশা, ভাবছি একবার কলকাতায় গিয়ে কোনও কার্ডিয়োলজিস্টকে দেখিয়েই আসি। এখানে কাছাকাছি শহরেই দেখানো যায়। তবে হেডমাস্টারমশাই কলকাতায় পাঠানোর জন্যই পেছনে লেগে আছেন। কিন্তু আমার তো এখন তেমন জানাশোনা নেই সেখানে। মামার বাড়িরও কেউ কলকাতায় নেই। তুই এ ব্যাপারে কিছু যোগাযোগ করতে পারিস?

পত্রপাঠ রেজিস্ট্রি চিঠি লিখে অতীনকে সোজা আমার বাড়িতে চলে আসতে বললাম। স্কুলের টেলিফোন নম্বরটাও যদি আনতাম! অতীন অবশ্য চিঠি পেয়ে আমাকে ফোন করল। যে দিন বিকেলে সে এল, সে দিন প্রচণ্ড কালবৈশাখী। রাস্তার ধারে ব্যালকনির লাগোয়া ঘরটায় অতীনের থাকার ব্যবস্থা করলাম। ওর ভালো লাগবে। পরদিন সকালে চা খেতে খেতে অতীন বলল, বেশ ঠান্ডা পড়লেও ঘুমটা ভালো হল না। মনে হল, সারারাত্তির ব্যালকনির পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছটা কেঁদেছে। রাস্তায় গাড়ির শব্দ না-থাকায় আরও তীব্র লাগল। দেখতে হবে একবার।

আমি আর আমার স্ত্রী অবাক হয়ে অতীনের দিকে তাকালাম। ভাবলাম, অতীনকে কোথায় নিয়ে যাওয়া বেশি জরুরি হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, না মনোরোগ বিশেষজ্ঞ!

একটু পরে ব্যালকনি থেকে অতীনের হাঁক শুনলাম, ওই দেখ, ইলেকট্রিকের তারটা ছিঁড়ে গাছটার গায়ে লেগেছে। শিগগির একটা লাঠি দে তো। ওই ঝুলঝাড়াটা হলেই হবে।

ঝুলঝাড়া দিয়ে তারটা সরিয়ে ঘাড় কাত করে অতীন কিছুক্ষণ যেন কান পেতে কিছু শুনল। তারপর মৃদু হেসে বলল, থেমেছে। এরকম থাকলে গাছটা মরেই যেত।

আমি আর কোনও কথা না বলে চলে এলাম। যা-ই হোক, অতীনকে নিয়ে কার্ডিয়োলজিস্টের কাছেই এলাম। ডাক্তার মিশ্র দেখে বললেন, হার্টটা বেশ ড্যামেজ হয়েছে। শুনলাম, ব্লাড শুগার বেশি বলে মেথির জল খান। ওতে হবে না। ব্লাড প্রেশারও ওপরে। ভালো করে চেক-আপ করে সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে, আর মাঝে মাঝে দেখাতে হবে। মাথাঘোরাটাও হার্টব্লকের জন্য। ওটা অবশ্য সামান্য একটা অপারেশন করে চামড়ার তলায় যন্ত্র বসিয়ে একেবারে ঠিক করা যায়। বেশ একটা খরচের ব্যাপার আর কী। তবে রাস্তাঘাটে মাথা ঘুরে পড়ে গেলে ফেটাল হয়ে যেতে পারে। তাই এখন একা যাবেন না কোথাও। ভয় নেই, আপনার সঙ্গে গল্প করতে করতেই অপারেশনটা হয়ে যাবে, বুঝবেনই না।

ভেবেছিলাম, অতীন একটু ভয় পেয়ে যাবে। কিন্তু বেরিয়ে এসে হাসতে হাসতে বলল, না, এসব গাছের কীর্তি বলে মনে হয় না। ঠিক আছে, ভরতি হয়ে যাচ্ছি। খরচার জন্য ভাবিস না। বাবার আর আমার টাকা গাছের লালনপালন ছাড়া তো আর কোনও অপব্যয় করিনি। খরচ যা শুনলাম, তাতে কিছুই অসুবিধা হবে না। দু-একদিন লাগবে শুধু সেটার ব্যবস্থা করতে। তুই শুধু আমার লোকাল গার্জেন হবি। নগেনবাবুকে আমি ফোনে জানিয়ে দিচ্ছি।

কয়েকদিনের মধ্যেই অতীন হাসপাতালে ভরতি হল। সেখানে নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষার আর ওষুধপত্র খাওয়ার জন্য দু-একদিন বাদেই স্পন্দনসৃজক যন্ত্রটি বসানো হবে। শুনলাম, তার হৃদযন্ত্রের অবস্থাটা এমনই দাঁড়িয়েছে যে, কোনওরকম বেশি উত্তেজনা, রাগ বা দেহের ওপর চাপ সেটাকে মুহূর্তে বিকল করে মৃত্যুকে ডেকে আনতে পারে। শিমুলগাছির শান্ত পরিবেশে গাছপালা পরিবৃত হয়ে সাংসারিক জটিলতাহীন জীবনে সে অবস্থা ভাগ্যক্রমে হয়নি। কিন্তু কোনও কারণ ঘটলে হতেও পারত। ঠিক সময়েই সে এসেছিল। নগেনবাবুর কাছে তার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, এ কথা তাকে বলতে অতীন বলল, নগেনবাবুর মতো মাস্টারমশাইরা আছেন বলেই কিছু ছাত্র আজও বিদ্যার সঙ্গে মনুষ্যত্ব, সহমর্মিতা–এইসবও শেখে।

বিকেলে তাকে দেখতে গেলে সে বলল, দেখ, এখানেও জানলার বাইরে কৃষ্ণচূড়া। হিন্দিতে গুলমোহর। নামটা কী করে হল, জানিস? গুল-মানে, তোর ওই আমেরিকার পাথরকুচির গুল না। ফারসিতে এটা ফুল। আর মোহরও স্বর্ণমুদ্রা নয়। ময়ূর বা হিন্দি মোর থেকে শব্দটা এসেছে। অর্থাৎ সেই কৃষ্ণের চূড়ারই ব্যাপারস্যাপার।

আমি বললাম, বাব্বাঃ, তুই তো ভাষার ওপরেও গবেষণা করেছিস।

অতীন বলল, সত্যি কথা বলতে, বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়েও দরকার পড়লে মাঝে মাঝে বাংলার ক্লাসও নিয়েছি।

এর পরের দিনই ইন্সপেকশনের কাজে কলকাতার বাইরে যেতে হল। অবশ্য অপারেশনের আগের দিনই ফিরে আসব। এই দু-দিন আমার মেয়ে তার মা-কে নিয়ে অতীনকে দেখে আসবে।

বাড়িতে ফিরেই শুনলাম চরম দুঃসংবাদ। আমার জন্যেই স্ত্রী আর মেয়ে বাড়িতে অপেক্ষা করছিল। আসামাত্র সেই খবরটা পেলাম। মুখে আর কথা জোগাল না। আজ সকালেই হৃদ্‌রোগে অতীনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদেহ আমার আসার অপেক্ষায় রেখে দিয়েছে। খবর পেয়েই সেই অবস্থায় হাসপাতালে ছুটলাম। অতীন তার কোনও আত্মীয়ের কথা বলেনি। মৃতদেহ পরদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করার অনুরোধ জানিয়ে এবং খরচপত্র দিয়ে মহিমপুর স্কুলে ফোন করলাম। ভবিষ্যতে অতীনের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্যে ভাগ্যিস স্কুলের ফোন নম্বরটা রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু স্কুলের ছুটির সময় তো হয়ে গিয়েছে অনেক আগে। না পেলে লালবাজারের মাধ্যমে মহিমপুর থানায়–যদি আদৌ সেখানে থানা থেকে থাকে–খবর পাঠাতে চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু ভাগ্য ভালো, নগেনবাবু এখনও স্কুলে আছেন। সঙ্গে আরও কয়েকজন শিক্ষকও আছেন। নগেনবাবু কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে থাকলেন খবরটা শোনার পরে। তারপর বললেন, পরদিন সকালের মধ্যেই কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় সরাসরি হাসপাতালে পৌঁছোবেন।

ফোন করার পর ডাক্তার ও নার্সের কাছে যা শুনলাম, তাতে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। মৃত্যুর কারণ এবার সত্যি সত্যিই গাছ। নার্সের কথাতে–সকালে ব্রেকফাস্টের পরে বেশ ভালো মেজাজেই ছিলেন পেশেন্ট। হঠাৎ চমকে উঠে বললেন, কী ব্যাপার, কৃষ্ণচূড়া গাছটা আর্তনাদ করছে কেন? কুড়ুলের আওয়াজ শুনছি! পেশেন্টের মাথায় যে গোলমাল ছিল, তা তো রিপোর্টে নেই। আমার নিষেধ না শুনে হল্টার মনিটর লাগানো রোগী ঊধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগলেন আর অতগুলো সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলেন। হাউস স্টাফরাও ছুটেছিলেন আমার চিৎকার শুনে। কিন্তু ধরতে পারলেন না। তার আগেই পেশেন্ট নীচে নেমে গিয়ে যে লোকটা গাছ কাটছিল, তার হাত থেকে কুড়ুল কেড়ে নিয়ে তাকে ধাক্কা দিলেন। কিন্তু নিজেও সামলাতে পারলেন না। পড়ে গেলেন। ওপরে তুলে আনার পনেরো মিনিট পরেই–ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেছেন।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করলাম, গাছটা কাটছিল কেন?

নার্স বললেন, ওখানে আউটডোরের এক্সটেনশন হবে।

পরদিন সকাল এগারোটার মধ্যেই নগেনবাবু বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও স্থানীয় মানুষজনকে নিয়ে এসে পড়লেন। আমিও দু-চারজনকে সঙ্গে নিয়ে আগেই সেখানে ছিলাম। শববাহক গাড়ি এবং মালা ইত্যাদির ব্যবস্থা আগে থেকেই করে রাখা ছিল। অতীনের মৃতদেহ এনে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচেই রাখল হাসপাতালকর্মীরা। গাছের গোড়ার দিকে কুঠারাঘাতের চিহ্ন। ঘটনাটার পরে কাজটা হয়তো আজ বন্ধ রাখবে।

অতীনের মৃতদেহে ফুল-মালা ইত্যাদি দিয়ে সাজানো শুরু করলেন সবাই মিলে। মহিমপুর স্কুলের স্থানীয় ছাত্ররা ভোর থাকতে উঠে প্রচুর ফুল দিয়ে দিয়েছে তাদের প্রিয় মাস্টারমশাইয়ের জন্য। সবই তাদের বাগানের। গোপীও একটি গাছের চারা নিয়ে এক কোণে বসে কাঁদছে। ওর ইচ্ছে, অতীনকে যেখানে দাহ করা হবে, তার ওপর চারাটা পুঁতে দেবে। হায়, ও জানত না, কলকাতার শ্মশানে সে সুযোগ নেই।

হয়তো একটা দমকা হাওয়া এসেছিল। অথবা গাছের ফুল ঝরার অবস্থায় এসে গিয়েছিল। সেই দুটি কারণই যুক্তিগ্রাহ্য। আমাদের দেওয়া শুভ্রকুসুমের ওপর ঝরে পড়ল বেশ কিছু কৃষ্ণচূড়া ফুল। অতীনের মাথায়, বুকে, পায়ে। ব্যাপারটার মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা না দেখেই কয়েকজন তুলে ফেলে দিতে চাইল ফুলগুলিকে। আমি বারণ করলাম।

থাক ও ক-টা ফুল অবোলা উদ্ভিদের অর্ঘ্য হয়ে তার মৃত মানুষ-বন্ধুটির ওপর। হঠাৎ মনে হল, অতীনের ক্রোধ, যন্ত্রণা আর প্রতিবাদ কি গাছটাতেও অনুরণন তুলেছিল? এটা কি পারস্পরিক অনুভূতি! কে জানে! অতীনই হয়তো একমাত্র বলতে পারত। তারই তো ছিল সেই অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা।

[শুকতারা, শারদীয়া ১৪১৫
এই গল্পটি পত্রিকার দফতর থেকে হারিয়ে যাওয়ার কারণে লেখক পরবর্তীকালে আবার নতুন করে লেখেন অতীনের অতীন্দ্রিয় নাম দিয়ে, এবং তা প্রকাশিত হয় সন্দেশ, অগ্রহায়ণ, ১৪০৪ সংখ্যায়। অনেক পরে মূল লেখাটি উদ্ধার হওয়ায় তা আবার শুকতারায় প্রকাশিত হয়।]