কালো আলো

কালো আলো

ডাক্তার সালোক্য দত্ত শহরের স্বনামধন্য শিশুমনস্তত্ত্ববিদ। বারো বছর পর্যন্ত ছোট ছেলেমেয়েদের মন নিয়েই তাঁর কারবার।

তাঁর চেম্বারে একটি পাঁচ-ছয় বছরের ছোট্ট ফুটফুটে ছেলেকে নিয়ে ঢুকলেন এক ভদ্রলোক। ডাক্তার দত্ত যথারীতি তাঁর সহকারীকে বললেন ছেলেটিকে পাশের ঘরে একটা পছন্দমতো গল্পের বই দিয়ে বসিয়ে দিতে। এবার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আগন্তুক অভিভাবকের দিকে চেয়ে বললেন, বলুন।

ভদ্রলোকের বয়স বছর পঁয়ত্রিশ। নমস্কার করে বললেন, আমার নাম দীপন মজুমদার। এটিই আমার একমাত্র সন্তান। একে নিয়ে আমরা এক অদ্ভুত সমস্যায় পড়েছি। আমার ছেলে সব দিক দিয়েই স্বাভাবিক। পড়াশোনা, খেলাধুলো–সব কিছুই মন দিয়ে করে। কিন্তু একটা বিষয়ে খুবই অদ্ভুত কথা বলে। সেটা রং নিয়ে। ও বলে, রামধনুর ছবিতে সাতটা রং দেয় কেন? আসল রামধনুতে তো বেগুনির আগেও লালের মতো রং আছে। আবার লালের পরেও সেই রং আছে। আরও বলে, তোমরা কয়লার রংকে কালো, আবার চুলের রংকেও কালো বলো কেন? কয়লা, কাজল–এগুলো কালো হলে চুলের রং তো অন্যরকম।

সালোক দত্ত বললেন, ও আপনাদের সঙ্গে মজা করে না তো?

সজোরে দু-হাত নেড়ে দীপনবাবু বললেন, না, না, ডাক্তারবাবু। ও খুব ছোট্ট বয়স থেকেই এরকম কথাবার্তা বলত। কিন্তু এখন স্কুলে ভরতি হওয়ার পরই সমস্যা হয়েছে। সেখানে গিয়ে বলে, ব্ল্যাকবোর্ডে চকের লেখা ভালো দেখতে পায় না। কারণ, ব্ল্যাক বললেও বোর্ডটা তো আসলে কালো না। ভাবুন তো, কী বলা যায় এ কথায়? সহপাঠী বাচ্চারাও তাকে খ্যাপায়। শিক্ষিকারাও বকাবকি করেন দুষ্টুমি করছে ভেবে। তাতে আজকাল মানসিক দিক দিয়েও গুটিয়ে যাচ্ছে। স্কুলে যেতে চায় না।

ডাক্তার দত্ত বললেন, চোখের কোনও দোষ নেই তো? যেমন, বর্ণান্ধ বা কালার ব্লাইন্ড অনেকেই হয়। বিশেষ করে, কয়েকটি রঙের পার্থক্য তারা করতে পারে না। ছেলেদের মধ্যেই বেশি হয় এটা। আমার ভাইপোই তো–

কথার মাঝখানেই দীপনবাবু দু-দিকে মাথা নেড়ে বললেন, না, ডাক্তারবাবু। দু-জন বড় বড় চোখের ডাক্তারকে দেখিয়েছি। তাঁরা দুজনেই বলেছেন, চোখ সম্পূর্ণ নর্মাল। ভিশন খুবই ভালো। সব চাইতে ছোট অক্ষরও পড়তে অসুবিধা হয়নি। তা ছাড়া, ও তো সব রংই আলাদাভাবে ভালোই বুঝতে পারে। বরং লালের মধ্যেও নানা সূক্ষ্ম প্রভেদও বুঝতে পারে, যা ছেলেদের মধ্যে বেশির ভাগই বোঝে না। শুধুমাত্র কালো রঙের বেলাতেই একটু গোলমাল করল। দু-জন ডাক্তারই এর কারণ খুঁজে পাননি। বললেন, কোনও মানসিক কারণে এটা হতে পারে। সে জন্যই আপনার কাছে এলাম। বাড়িতেও তো রঙের বাক্সের কালো রংটা দেখে মাঝে মাঝে বলে, এটা তো কালো না, একটু নীল নীল। অথবা কোনওটা দেখিয়ে বলে, এটা তো আবার কেমন লালচে। একেবারে কুচকুচে মিশকালো রঙের প্যাস্টেল কালার দেখে আনতে পারো না? বলুন তো ডাক্তারবাবু, এটা কী রকমের পাগলামি?

সালোক্য দত্ত সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবলেন। তারপর সহকারীকে ডেকে ছেলেটাকে আনিয়ে সামনে বসালেন। মিষ্টি হেসে ছেলেটিকে বললেন, তোমার নাম কী, খোকা?

ছেলেটি গম্ভীরভাবে উত্তর দিল, আলোকদীপ্ত মজুমদার।

ডাক্তার দত্ত বললেন, বাঃ! ভারী সুন্দর নাম তো! নির্বাণহীন আলোকদীপ্ত তোমার ইচ্ছাখানি। বলো তো, এটা কার লেখা?

সেইভাবেই গম্ভীরভাবে বলে, জানি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গানটা মা-র কাছে। শুনে আমিও করতে পারি।

ডাক্তার দত্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলেন, অসাধারণ! এই বয়সে এরকম চটপট উত্তর আমি আশা করিনি। আপনারা মিছিমিছি ওকে নিয়ে ভাবছেন, মিস্টার মজুমদার। তা ছাড়া কালো রং তো সবসময় একরকম হয় না। একটা কালো লোকের গায়ের রং কি আর কালো চুলের মতো অত কালো হয়? আমরা এমনি ওরকম বলি। তা-ই না আলোক?

আলোকদীপ্ত বলল, চুল তো কালো হয় না। কয়লা তো কালোলা। আমাদের স্কুলের বোর্ড কেমন গোলাপি রঙের। কালো রঙের ব্ল্যাকবোর্ড হলে কোনও অসুবিধেই হত না।

একটু থমকে থেকে ডাক্তার দত্ত বললেন, ঠিকই তো। তারপর কিছুক্ষণ ছেলেটির বাবার দিকে চেয়ে বললেন, আলোকদীপ্তকে আগামী রবিবার বিকেল চারটের সময় আমার এখানে নিয়ে আসতে পারবেন? সে দিন আমার চেম্বার বন্ধ। শুধু আলোকদীপ্তর জন্য আমি আসব। আমি একে আমার এক বিজ্ঞানী বন্ধুর কাছে নিয়ে যাব। আমার চাইতে বয়সে ছোট। আপনার বয়সি হবে। নাম সাত্যকি সোম।

দীপনবাবু বিস্মিত হয়ে বললেন, সাত্যকি সোম! আপনি কি ডক্টর সোমের কথা বলছেন, যিনি অ্যাটমোস্ফেরিক পলিউশন অ্যাবজর্ভার যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন? তাঁর নাম তো এখন বিশ্ববিখ্যাত। কিন্তু তিনি কি মনস্তত্ত্বের

দীপনবাবুকে থামিয়ে সালোক্য দত্ত বললেন, আমার মনে হয়, আপনার ছেলের সমস্যা কোনও মামুলি মনের ব্যাধি নয়। এটা সাত্যকিই সমাধান করতে পারবে বলে আশা রাখি। তাহলে রবিবার এখানে আসার আধ ঘণ্টা আগে আমাকে একটা ফোন করবেন। না না, কোনও ফি দিতে হবে না এখন। আসলে এই কেসটা একেবারে অন্য ধরনের। আমি নিজেই এ বিষয়ে উৎসুক। এই ক-দিন রং নিয়ে কিছু বলবেন না। ওকে স্কুলেও পাঠাবেন না। খুবই বুদ্ধিমান আপনার ছেলে। এই ক-দিন যে রং পাও, তা-ই দিয়ে মনের মতো ছবি আঁকতে পারো, আলোকদীপ্ত। আমি কিন্তু একটা ছবি নেব। কেমন?

রবিবার যথাসময়ে ডাক্তার সালোক্য দত্ত দীপনবাবু আর তাঁর ছেলেকে নিয়ে সাত্যকি সোমের বাড়িতে এলেন। আগেই বলা ছিল। সাত্যকি নিজেই দরজা খুলে বললেন, আসুন সালোক্যদা। আসুন আপনারা। এই বুঝি আলোকদীপ্ত? সত্যিই এর আলোকদৃষ্টি অসাধারণ। বলতে গেলে, অলোকসাধারণ। যদি আমার ধারণা সঠিক হয়।

বসার ঘরে এসে বসতেই তাঁদের জন্য চা এবং টা আর আলোকদীপ্তর জন্য জলখাবার চলে এল। সাত্যকি দীপনবাবুকে বললেন, আপনার ছেলের অসাধারণ ক্ষমতার কথা সালোক্যদার কাছে শুনেছি।

বারবার অলোকসাধারণ, অসাধারণ শব্দগুলো শুনে কিছুটা হতবাক হয়ে যান দীপনবাবু। বিজ্ঞানী কি ঠাট্টা করছেন! তা কি হতে পারে? তিনি প্রায় বিড়বিড় করে বললেন, অসাধারণ ক্ষমতা?

ডক্টর সোম হেসে বললেন, হ্যাঁ, মনে হয়, আমি ঠিকই বলছি। তার আগে আলোকদীপ্তকে আমার ল্যাবরেটরিতে নিয়ে যেতে চাই কিছুক্ষণের জন্য। এসো আলোকবাবু, একটা ম্যাজিকের ঘরে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।

দু-জনে চলে যেতেই দীপনবাবু আশঙ্কার স্বরে ডাক্তার দত্তকে বললেন, ওর কোনও ক্ষতি হবে না তো, ডাক্তারবাবু? শুনেছি, অকারণে এক্সরে-টেক্সরে করলে বাচ্চাদের ক্ষতি হতে পারে।

সালোক্য দত্ত হেসে বললেন, আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। এসব ব্যাপারে সাত্যকির জ্ঞানের পরিধি আমার চাইতে অনেক বেশি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই উজ্জ্বল মুখে ডক্টর সাত্যকি সোম বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে হাসিমুখে আলোকদীপ্ত। তার মুখ দেখে মনে হল, এত দিনে সহমর্মী একজনকে পেয়েছে, যে রংবিচারের ব্যাপারে তার সঙ্গে একমত।

সাত্যকি সোফায় বসে হেসে বললেন, আমার কথাই ঠিক, সালোক্যদা, মিস্টার মজুমদার। একটু ব্যাখ্যা দরকার। ক্ষমতার সীমাভেদ জীবভেদে বিভিন্নরকম, আপনি জানেন। যেমন, আমরা মানুষরা একটা নির্দিষ্ট তরঙ্গের সীমারেখার মধ্যে দেখতে পাই। লাল, অর্থাৎ এক মিলিমিটারের ১৩৩০ ভাগ থেকে বেগুনি, অর্থাৎ তার প্রায় দ্বিগুণ ২৬৩০ ভাগ পর্যন্ত। তার বাইরে নয়। এটাই সাত ভাগ করে নাম দিয়েছি উলটোভাবে VIBGYOR বা বেনীআসহকলা। সেরকম একটা নির্দিষ্ট তরঙ্গের সীমারেখার মধ্যেই শব্দ শুনতে পাই। যেমন, মোটামুটি ধরুন, কুড়ি হার্জ থেকে তার হাজারগুণ, কুড়ি হাজার হার্জ। তার নীচের শব্দ শুনতে পাই না বলে নাম দিয়েছি, ইনফ্রাসনিক। আবার ওপরে বেশির দিকে আলট্রাসনিক। কুকুরের ক্ষমতা কিন্তু বেশি। দেখবেন, তাদের কান অনবরত নড়ছে। বাড়ির পোষা কুকুরটা হঠাৎ অকারণে ডেকে উঠে ধমক খাচ্ছে। আসলে অকারণে নয়। তারা এমন কিছু শুনতে পায় বা দেখতে পায়, যা আমরা পাই না। না, আমি ভূতপ্রেতের কথা বলছি না। বলে হেসে উঠলেন ডক্টর সোম। আবার বললেন, হাতির যেমন ঘ্রাণশক্তি অসাধারণ। কুকুরেরও, সে তো আপনারা দেখছেনই, বিশেষত পুলিশের কাজে। চিল শকুনের চোখে আবার আক্ষরিক অর্থে দূরদৃষ্টি। হাজার মিটার ওপরের আকাশ থেকেও মাঠে একটা ইঁদুরের নড়াচড়া বাজপাখির নজরে পড়ে। আবার দেখুন, বেড়াল রাত্তিরে প্রায় আলোকহীন অবস্থাতে দেখতে পেলেও তারা জিনিসের রং দেখতে পায় না। অনেকে বলে, ষাঁড়কে লাল কাপড় দেখালে নাকি খেপে যায়। সাপ যেমন বাঁশির সুর শুনতে পায় না, ষাঁড়ও সেরকম লাল রং বুঝতে পারে না। তার কাছে লালও যা, নীলও তা-ই। ওরা একেবারে বর্ণান্ধ। ওদের কাছে সবই সাদা-কালো।

হঠাৎ থেমে গিয়ে সাত্যকি সোম হেসে উঠলেন। বললেন, দেখুন কাণ্ড, সালোক্যদা! ক্লাসে লেকচার দিয়ে দিয়ে এমন বদভ্যাস হয়ে গিয়েছে যে, এখানেও…

দীপনবাবু আপত্তি জানিয়ে বললেন, না, না, বলুন। খুব ইনটারেস্টিং লাগছে আমার কাছে। ডাক্তারবাবুর জানা থাকলেও আমার অনেক কিছুই জানা নেই। যেমন সাপের ব্যাপারটা জানলেও ওই লাল কাপড়ের ব্যাপারটা আমার কাছে নতুন। সত্যিই কত ভুল ধারণা নিয়েই বসে থাকি আমরা। ওকে দেখুন, কেমন অবাক হয়ে শুনছে।

সাত্যকি হেসে বললেন, ওর বুদ্ধি ওর বয়সি ছেলেমেয়েদের তুলনায় বেশি, সে তো সালোক্যদাই দেখেছেন। যা-ই হোক, এবার ওর কথাতেই আসি। আমরা আলোকতরঙ্গের দৈর্ঘ্যের একটা সীমারেখার মধ্যেই দেখতে পাই, সে তো বললামই। তার নীচের বা ওপরের তরঙ্গ, যাদের আমরা বাংলায় অবলোহিত আর অতিবেগুনি বলি, সেটা কিন্তু আমরা দেখতে পাই না। সেসবই আমাদের কাছে কালো। কিন্তু প্রকৃতির খেয়ালে কেউ যদি সেই সীমারেখার বাইরেও কিছুটা রং বুঝতে পারে? হরিদাস পালদের জগতে হঠাৎ যদি একজন আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মায় তাহলে তাকে হেনস্থা হতে হবে আবোল তাবোল বকুনির জন্যে। অতীতে হয়েছেন অনেকে। যেমন আলোকদীপ্ত হচ্ছে তার ক্লাসে। একটু থেমে সালোক্য দত্ত ও দীপন মজুমদারের অবাক দৃষ্টির দিকে চেয়ে সাত্যকি সোম বললেন, হ্যাঁ, আলোকদীপ্তর দৃষ্টিক্ষমতা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চাইতে একটু বেশি। হয়তো আইনস্টাইন, স্টিফেন হকিং.. এঁদের মস্তিষ্কের স্নায়ুর মতো আলোকদীপ্তর চোখের স্নায়ু অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন। বিজ্ঞানী হিসাবে নিজের নাম উল্লেখ না করায় দীপনবাবু মজা বোধ করলেন। তিনি শুনে চললেন সাত্যকি সোমের কথাগুলি –আলোকদীপ্ত ইনফ্রারেড আর আলট্রাভায়োলেট-এর কিছুটা অংশ দেখতে পায়। আমি আলোর ফ্রিকোয়েন্সি রেগুলেটর যন্ত্রের সামনে বসিয়ে দু-দিকে সামান্য কমিয়ে-বাড়িয়ে সেটা পরীক্ষা করেছি। সবচাইতে মজার ব্যাপার কী জানেন? ও বলল, লাল রঙের নীচের তরঙ্গে আবার নাকি একটু বেগুনি ছটা দেখতে পাচ্ছে–যা মানুষের চুলের মতো, মানে কালো চুলের কথা বলছি। আবার বেগুনি রঙের বেশি তরঙ্গে আবার ব্ল্যাকবোর্ডের লালচে রং।

একটু ভেবে সাত্যকি বললেন, তবে কি সংগীতের সরগমের মতো সাতটা রং ঘুরে ফিরে আসে? আমরা শুধু রঙের মুদারাটা দেখতে পাই। আলোকদীপ্ত উদারার শেষ শ্রুতি থেকে তারার প্রথম শ্রুতি পর্যন্ত রঙের বৈচিত্র্য দেখতে পায়।

দীপনবাবু অসহায়ভাবে বললেন, কিন্তু এতে যে ভয়ানক সমস্যা…

সাত্যকি হেসে বললেন, হ্যাঁ। সমস্যা তো নিশ্চয়। মনুষ্যসমাজে থাকলে, বেশি প্রতিভা থাকলেই কত বিপদে পড়তে হয়, সে তো আপনারা জানেন। পাগলা বাদশা থেকে ধর্মবিরোধী অনেক বিশেষণই তাদের প্রাপ্য হয়েছে। আর এরকম ক্ষমতা, এ তো অমার্জনীয়। গল্পে পড়েছিলাম, একজন গরিব লোক আরও বেশি কাজ করার ক্ষমতা পাওয়ার জন্য দেবতার কাছে দুটো বাড়তি হাত চেয়েছিল। যখন সেটা পেল, তখন গাঁয়ের লোক তার ওই অদ্ভুত চতুর্ভুজ মূর্তি দেখে তাকে পিটিয়েই মেরে ফেলল। দেবতা নারায়ণের মূর্তিতে যা মানায়, রক্তমাংসের মানুষের বেলায় তা কি সহ্য হয়!

দীপনবাবু হতাশ হয়ে বললেন, তবে কি…

সাত্যকি হেসে বললেন, না, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। চোখের যে স্নায়ুতন্ত্র মস্তিষ্কের বিশেষ অংশে গিয়ে বর্ণবিচার করে, তার এক অস্বাভাবিকত্বই, বলা উচিত, অসাধারণত্বই এই দৃষ্টিসীমা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ক্ষমতাটাকে খর্ব করলেই আলোকদীপ্তর দৃষ্টিশক্তি সাধারণ হয়ে যাবে।

সালোক্য দত্ত এতক্ষণে মুখ খুললেন। বললেন, আমারও এরকম সন্দেহ হয়েছিল, সাত্যকি। যার জন্য তোমার কাছে ওকে নিয়ে এলাম। এটা যে মানসিক প্রতিবন্ধকতা নয়, সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। আর সাধারণ কোনও চোখের অসুখ নয়, সেটা তো অপথ্যালমিক অপটিশিয়ানরাই বলেছেন। এটা সাধারণ কোনও প্রতিবন্ধকতা বা বর্ণান্ধতা নয়।

সাত্যকি বললেন, প্রতিবন্ধকতা কী বলছেন, সালোক্যদা। বরং আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যে প্রতিবন্ধকতা আছে, সেটা ওর নেই বলেই এই সমস্যা। ওকে একটু প্রতিবন্ধী করলেই তার সমাধান হয়ে যাবে। সেই কাজটা আমিই করব। সপ্তাহখানেক সময় লাগবে। আপনি এদের নিয়ে আগামী রবিবার আসতে পারবেন?

ছেলের মস্তিষ্কে শল্যচিকিৎসা হওয়ার সম্ভাবনায় দীপনবাবু আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। সেই ভয়ার্ত ভাব তাঁর চোখে-মুখে ফুটে উঠল। তাঁর আশঙ্কার কথা শুনে ডক্টর সোম হেসে উঠলেন। বললেন, ওসব তো আমার কাজ নয়। সালোক্যদাকেই জিজ্ঞেস করুন। মূষিকবাহন বটব্যালের মতো ডাক্তাররা ওসব মাথা কাটার কাজ করেন। আমি বেচারা পদার্থবিজ্ঞানের লোক। ওসব ব্যাপারে তাই অপদার্থ।

দীপনবাবুর মুখ মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। স্থির হল, পরের রবিবার সকাল দশটায় সবাই মিলে ডক্টর সোমের বাড়িতে আসবেন।

দীপনবাবু বাড়ি গিয়ে শুনলেন, আলোকদীপ্ত তার মা-কে বলছে, জানো মা, সাত্যকিকাকু বলল যে, কাকুও আমার মতন সব রংকে কালো দ্যাখে না। তাই আমাকেও সাত্যকিকাকুর মতন একটা চশমা নিতে হবে। শুনলেন, আলোকদীপ্তর মা ছেলেকে বলছেন, ছি, বাইরের লোককে বলল বলতে নেই। বললেন বলতে হয়। আলোকদীপ্ত প্রতিবাদ করে, বাঃ। সাত্যকিকাকু তো বলল, আমার কাকু হয়। তবে বাইরের লোক নাকি?

মা-ছেলের যুক্তিতর্ক শুনে দীপনবাবু আড়াল থেকে হেসে ফেললেন। অনেকদিন পরে ছেলের সেই মনমরা গম্ভীর ভাবটা নেই দেখে খুশি হলেন।

পরের রবিবার তাঁরা যেতেই সাত্যকি একটি ছোট চশমা নিয়ে আলোকদীপ্তকে কাছে ডাকলেন। একরকম বিশেষ কাঁচ দিয়ে তৈরি চশমাটি তার চোখে পরিয়ে দিতেই আলোকদীপ্ত অবাক হয়ে সবার মাথার দিকে তাকাতে লাগল। দীপনবাবুকে বলল, বাবা, তোমাদের চুল এমন কালো দেখতে লাগছে কেন? দীপনবাবু খুশিতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।

সাত্যকি দেওয়ালের দিকে দেখিয়ে বললেন, ওটা কী বলো তো?

 আলোকদীপ্ত আনন্দে বলে উঠল, ওটা তো সত্যিকারের ব্ল্যাকবোর্ড। কালো রঙের।

সাত্যকি সোম বললেন, এবার থেকে তোমাদের স্কুলের বোর্ডও এরকম কালো দেখবে। এই চশমাটা সবসময় পরে থাকবে। এটা পরলেই তোমার চোখ ভালো হয়ে যাবে।

তারপর তিনি সালোক্য দত্ত ও দীপনবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, এই চশমার কাঁচ বিশেষভাবে তৈরি করা। এতে কালো আলো এর দৃষ্টিগোচর হবে না।

কালো আলো! দীপনবাবু বিস্ময় প্রকাশ করলেন।

 হ্যাঁ। আমাদের পরিচিত সাত রঙের সীমার বাইরের তরঙ্গকেই ব্ল্যাক লাইট বা কালো আলো বলে। আমি লিখে দেব, যাতে ভবিষ্যতে যখন দরকার হবে, এক জায়গা থেকে এই বিশেষ ধরনের লেন্স করিয়ে নেওয়া যাবে। আশা করি, আলোকদীপ্ত বড় হয়ে গেলেই চোখ আপনা-আপনিই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। ও চশমা খুলে রাখার সময়টুকুতেই তখন পার্থক্যটা বুঝতে পারবে না। যদি না-ও হয়, চোখের ন্যাচারাল ইন্ট্রাঅকুলার লেন্সটা, যেটা ওর চোখের মধ্যে রয়েছে, সেটাকে বদলে দিতে হবে, এই চশমার ধরনের লেন্স দিয়ে।

দীপনবাবু সজল চোখে আবেগে প্রথমে সাত্যকি সোমের এবং পরে সালোক্য দত্তর হাত জড়িয়ে ধরে বলে উঠলেন, আপনাদের এই ঋণ জীবনে শোধ করতে পারব না; শোধ করা যায় না। ডাক্তার দত্ত দুটো রবিবার নিজের কাজ, বিশ্রাম সব বাদ দিলেন আমার জন্য। আর ডক্টর সোমের মতো একজন বিজ্ঞানী তাঁর কাজে কত ক্ষতিস্বীকার করলেন, অর্থব্যয় করলেন। আমি অর্থ দিয়ে কতটাই বা পূরণ করতে পারি? আর কতই বা আমার ক্ষমতা! আমি…

সাত্যকি সোম হেসে উঠে তাঁকে থামালেন। বললেন, আমার প্রতিটি কাজই বিজ্ঞানের জন্য নিবেদিত। আর আলোকদীপ্ত তো আমার বন্ধু। বন্ধুর জন্য হাত বাড়িয়ে দেব না, কী বলো আলোকদীপ্ত? সালোক্যদাও রবিবার দুটো ভালোই কাটালেন। কে জানে যে, ভবিষ্যতেও এ ধরনের রোগী আসবে না? সে হয়তো অশ্রুত শব্দও শুনতে পেয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে মাস্টারমশাইয়ের বকুনি খায়। তাই টাকাপয়সার প্রশ্নও আসছে না। এই চশমাটা আমাদের দুজনের পক্ষ থেকে আমাদের নতুন বন্ধুকে উপহার দিচ্ছি। তবে আলোকবাবু, এই চশমা পরে বল না খেলে দেখো তো। তবে ক্যারম, লুডো খেলার সময় পরবে কিন্তু। না হলে সেই আবোল-তাবোলের মতো কালোকে বলবে লাল।

অনেকদিন পরে দীপনবাবুকে অবাক করে দিয়ে আলোকদীপ্ত খিলখিল করে হেসে উঠল। বাবা আর ডাক্তারজেঠুর সঙ্গে সাত্যকিকাকুর বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় চশমাধারী হাসিখুশি আলোকদীপ্ত অবাক হয়ে দেখল, বাবার চোখ একেবারে জলে ভরে আছে।

কয়েকদিন পর সালোক্য দত্ত ও সাত্যকি সোম দু-জনেই ডাকে একটা বড় খাম পেলেন। দু-জনেই খুলে দেখলেন কচি হাতের লেখা একটা ছোট চিরকুট আর সঙ্গে সাদা কাগজে কালো প্যাস্টেলে আঁকা ছবি। চিঠিতে আলোকদীপ্ত লিখেছে, তোমাদের দু জনকেই পাঠালাম। তুমি বললে মা বকবে না বলেছে। ডাক্তারজেঠু তো আগেই ছবি চেয়েছিল। প্রণাম নিয়ো। ইতি, আলোকদীপ্ত।

চিঠির দ্বিতীয় বাক্যটার অর্থ ভালোভাবে বুঝতে পারলেন না দু-জনের কেউই। তাঁরা কী বললে মা বকবেন না? তবে সাত্যকি সোম মনে মনে হাসলেন। সালোকদা সত্যিই শিশুমন বোঝেন, তাই তাকে উৎসাহ দিতে তার আঁকা ছবি চেয়েছিলেন। তিনি ছবিটা দেখলেন–পাহাড়, নদী, নৌকো, সূর্য। ছোটদের প্রিয় কল্পনা। নীচে শিল্পীর নাম আলোকদীপ্ত মজুমদার। এত দিন হয়তো এই রংটা ব্যবহার করেনি। তাই গাছের পাতা, সূর্য সব কালো। এখন পুষিয়ে দিচ্ছে। সাত্যকি সোম ভাবলেন, সত্যিই, সাদা আর কালো সব রঙের সমাহার আর সব রঙের অবলুপ্তি। এর এক আলাদা তাৎপর্য। তাই বোধ করি, মহাকাল ও মহাকালীর রূপ সাদা আর কালো।

[শুকতারা, শারদীয়া ১৪১৬
এই গল্পটি সন্দেশ বইমেলা ১৪০৮-এ প্রকাশিত আলোকদীপ্তর আলোকদৃষ্টি গল্পের পরিমার্জিত রূপ।]