কল্পবিজ্ঞান ছড়া

ছড়া – রেবন্ত গোস্বামী

মাছ ধরার কল

একটুখানি শোন রে ভজা।
আয় দেখে যা একটা মজা– মৎস্য ধরার যন্ত্রটি এই।
 মোর মগজের বুদ্ধি দিয়েই
 তৈরি এ কল নতুনরকম,
খরচা তবে নেই কিছু কম।
তড়িৎ এবং চুম্বকেতে
 এই রেখেছি ফাঁদটা পেতে।
ঘোরাক যে-কেউ চরকিটাকে
ঠিক দেখাবে ভড়কি তাকে।
এই যে দেখিস বঁড়শি বিরাট
অশ্বক্ষুর এক লোহারই বাট– সব কিছুতে তার জড়ানো
চরকি সাথে যোগ করানো।
টোপ ফেলেছি কালকে রাতে
 লৌহ গুঁড়ো মিশিয়ে তাতে।
 বঁড়শি তো নেই, খাদ্য আছে, সব গিলেছে পেটুক মাছে।
পেটটি ভরে মহোল্লাসে
ঘুরছে সবাই আশেপাশে।
 ধর এবারে ছিপখানাকে
জোরসে ঘোরা চরকিটাকে।
দেখবি তখন ম্যাজিকটা কী– বিজ্ঞানেতে নেইকো ফাঁকি।
 চুম্বক হলে বঁড়শিখানি
সব দিক হতেই টানবে জানি।
লৌহখেকো মাছগুলোকে–
 ঘটবে সবই এক পলকে।
 দেখছিস কী হাবার মতন?
জোরসে ঘোরা–বন বন বন।
হচ্ছে এবার। এমনি করে
 চল ঘুরিয়ে… বাপ রে! ওরে!
একটানে যে ফেলল জলে, আটকে গেলাম নিজেই কলে!
 যাচ্ছি ডুবে জলের ভেতর, খুব হয়েছে শিক্ষা যে মোর।
থাম থাম থাম থাম রে ভজা।
হাসছিস যে? হচ্ছে মজা?
দোষ আমারই–তাই তো ভুলি
খুলতে লোহার এই মাদুলি।

[কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান, শারদীয়া ১৩৮৮]

*

হয়নি প্রমাণ

পাঠক-পাঠিকাগণ, শোনো হে সকলে।
 বিবর্তনের ধারা বলি কাকে বলে।
 এককালে মানুষেরা আছিল বানর,
কত যুগে ঘষেমেজে হল আজি নর।
এইভাবে যুগে যুগে দিনে ও বছরে।
কত কী যে বদলায়, পড়ে কি নজরে?
 ডিম থেকে হাঁস হয়, হাঁস থেকে ডিম, শিম থেকে বীজ, ফের বীজ থেকে শিম।
 তিল থেকে তাল হয়, সুচ থেকে ফাল, ডাব নারকেল হয়, এঁচোড় কাঁঠাল।
 ডারউইন, ওপারিন, হলডেন–এঁরা।
এ বিষয়ে লিখেছেন বই সেরা সেরা।
একটি বিষয়ই শুধু হয়নি প্রমাণ– ওল থেকে কচু? নাকি, কচু থেকে মান?

[কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান, শারদীয়া ১৩৮৯]

*

 অক্সিদাদার দুইটি ধাঁধা

অক্সিদাদা, শুনুন বলি– বলল শ্রীমান হাইড্রোজেন, একতার কী মর্যাদা, তা আপনি
মশাই ছাই বোঝেন।
এমনিতে আর কী দাম মোদের? কিন্তু যখন জোট বাঁধি– জল পেয়ে প্রাণ বাঁচায় পশু, নর,
পাখি, গাছ ইত্যাদি।
 এসব জেনেও আমার সাথে মিলতে কেন চান না ভাই?
 কাছে গেলেই হেড দিয়ে দেন, ভাবলে আসে কান্না তাই!
 অক্সি বলে, আর কেঁদো না, ছোলা দেব, উজান হে– জোট বেঁধে তুই কাজে লাগিস,
 সেই কথা সবাই জানে।
 কার্বনকে সঙ্গে নিয়ে কীর্তি তো জগৎজোড়া
অন্নবস্ত্র কাগজপত্র সব কিছু বানাই মোরা।
কে বলে তুই কথার বেলুন? কে তোর শক্তি কম বলে?
 সবাই জানে তুই রয়েছিস চাটনি, দই আর অম্বলে।
একটা কথাই জানিস না তুই–আসল গুণী সব কালে
একলা চলার ব্রত নিয়েও ধরার মাঝে দীপ জ্বালে।
বল তো কাকে আদর করে বক্ষে ভরে সবসময়
 জীবজন্তু পোকামাকড় গাছপালা এই বিশ্বময়?
 জলের নামই জীবন না রে-বাতাসকেও জীবন বলে।
বলতে পারিস, এ নামটা তার কার মহিমায়, কোন বলে?
তেলটাকে ঘি করার ফাঁকে আমার কথার দে উত্তর।
বুঝব তবে, বড়র তরে শ্রদ্ধা আছে বহুত তোর।

[কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান, শারদীয়া ১৩৯০]

*

উত্তর পাচ্ছি না

পিচ-ঢালা পথে কেন চাঁদিফাটা রৌদ্রে
চোখের সমুখে নড়ে কেবলই ক্যাথোড রে?
বর্ষাতে কেন বলো কাদা-মাখা রাস্তায়
 ফ্রিকশন কমে আর জির ভ্যালু বেড়ে যায়?
কানের আর নাসিকার কোন সম্বন্ধে
ঢাকের আওয়াজ পাই শিউলির গন্ধে?
সূর্যটা দক্ষিণে গেলে কত ডিগ্রি
বাজারেতে কপি ওঠে–বলে ফেল শিগ্রি।
 শীতে গায়ে যদি জল ঢালি মগ পাঁচ-ছয়
 সুর ভেঁজে দেহ কেন টিউনিং ফর্ক হয়?
ফুলভরে বসন্ত যত ভালো হোক সে, আমাদের কেন বলো জ্বালা দেয় পক্সে?
এইসব ভাবি বারো মাস ছয় ঋতুতেই,
উত্তর পাচ্ছি না কারও কাছে কিছুতেই।

[কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান, শারদীয়া ১৩৯১]

*

লিমেরিক

উদ্ভিদবিজ্ঞানী আমাদের নারুদাদা
বাগানে লাগিয়েছেন তেঁতুল-ওল গাদাগাদা।
গাছে গাছে মারামারি
দেখে তাঁর মজা ভারী
বললেন, বুনে দেখি কাঁচকলা আর আদা।

 [কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান, শারদীয়া ১৩৯২]

 গ্রীষ্মেতে পেতে চাও শরতের আনন্দ?
ক্যাসেটে চালিয়ে দাও শিউলির গন্ধ।
হয়তো বা তার সাথে।
চাঁদার খাতাটা হাতে
আসবে পাড়ার দল–সেইটা যা মন্দ।

 [কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান, শারদীয়া ১৩৯৩]

*

কিনবে যদি আসতে পারো

জীবজন্তুর খিচুড়ি তো জানোই আবোল তাবোল-এ, আনাজ-ফলের এই খিচুড়ি উদ্ভট নয়
 তা বলে।
সজারুটা হাঁস ছিল কি? বলতে পারে ব্যাকরণ।
পালংশাকে লংকার স্বাদ–বিজ্ঞানই দেয় সেই ফোড়ন।
 অনেকদিনের পরীক্ষা আর গবেষণা আজ সফল,
 আমার খেতে চাষ করেছি সন্ধি-করা আনাজ-ফল।
 এক আনাজে দুই উপকার, এক ফলেতে ডবল স্বাদ- গুণগুলি সব নিচ্ছি বেছে,
দোষগুলোকে দিচ্ছি বাদ।
পেঁপেয়ারায় দুই ফলেরই সব ভিটামিন রয় ভরা; আতালেতে আঁশ পাবে না। শাঁস খেয়ে
 নাও,আর বড়া।
পেটটা গরম হল খেয়ে এগ রোল আর চিংড়ি-চাউ?
ঠান্ডা করো ঝোলে খেয়ে আমার খেতের কাঁচকলাউ।
 করোলা বা উচ্ছে দেওয়া লাউ খেতে কি মনটা চায়?
 সেই লাউয়েরও চাষ করেছি–ঝুলছে দ্যাখো ওই মাচায়।
 না যদি খাও পেঁয়াজলপাই জীবনটাই যে হায় বিফল– তাই বেচি রোজ ঝাঁকায় নিয়ে
জোড়-লাগানো সবজি-ফল।
সব কিছুরই লিস্ট দেওয়া তো সম্ভব নয় এই পাতায়–
 কিনবে যদি আসতে পারো শ্যামবাজারের পাঁচ মাথায়।

[কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান, শারদীয়া ১৩৯৪]

*

ভাবীকালের ছড়া

হারুর পড়ার ঘরে আছে কম্পিউটার, সেই তার ডাক্তার, সেই তার টিউটার।
অঙ্ক করলে ভুল
 নেমে আসে অটো-পুল, কান টেনে টেস্ট করে মগজের ঘিউ তার।

মাথায় গামছা বাঁধা, মিশকালো রং গায়
রোবট চালায় বোট, পেনেটির গঙ্গায়।
পাছে দেখে তেলা দেহ
কেউ করে সন্দেহ
 উচ্চৈঃস্বরে তাই ভাটিয়ালি সং গায়।

[সন্দেশ, অগ্রহায়ণ ১৩৯৪]

*

রোবটীয় সংলাপ

ক-রোবট ডেকে বলে, খ-রোবটভাই, মানুষের ব্রেন বলে কিছুই কি নাই!
সব কাজে আমাদেরই করে নির্ভর, ওদের মাথাতে ভরা শুধু কি গোবর?
খ-রোবট বলে, শুধু তা-ই কি, ক-দাদা?
ওদের দেহটা যেন পলিথিন ও কাদা!
কেউ বাঁশ, কেউ ঢেঁকি, কেউ মোটা গাড়– কারও মাথা পাকা বেল, কারও
ফুলঝাড়ু।
ক-রোবট বলে, ওরা থাকে শুধু বেঁকে, শরীরটা রাখে সদা তন্তুতে ঢেকে।
চলাফেরা করাটারও বাহবা কী ছিরি!
 ফোঁস ফোঁস শ্বাস ফেলে ভাঙতে দু-সিঁড়ি।
খ-রোবট বলে, আর দেখেছ কী দাদা- ইনপুটে ফিড করে কী যে গাদা গাদা!
কিছু নাকি শর্করা, কিছু নাকি স্নেহ।
কেউ খায় পশুপাখি, নিরামিষ কেহ।
 ক-রোবট বলে, ওরা জানে একই কাজ আউটপুটেতে শুধু কথার আওয়াজ।
তাই ওরা করে যায় শুধু সারা বেলা
বকবক বকা, আর গপগপ গেলা।
খ-রোবট বলে, দাদা, ওই দ্যাখো আসে, ও দু-জন দাঁড়িয়েছে তোমারই বাঁ পাশে।
চলবে এখনই দেখো আদেশের ধুম
আমরা কি ক্রীতদাস? এত যে হুকুম!
 ক-রোবট বলে, ওরা করছে কী, ভায়া?
 কম্পিত হয় কেন কম্পুট-কায়া।
কেন ওরা খুলে নিল মাথার বোতাম?
 গুলিয়ে যাচ্ছে ঘিলু, ভুলে যাই নাম!
খ-রোবট বলে, দাদা, বলো হরিবোল।
চলেছ এখন তুমি তুলতে পটোল!
করবে নতুন করে ওরা প্রোগ্রাম রোবট-জীবনে দাদা এই পরিণাম!

[সন্দেশ, কার্তিক ১৩৯৭]

*

সাত্যকি সোমের ব্যাপারস্যাপার

রকেট চেপে সাত্যকি সোম যাচ্ছেন মঙ্গল।
থামল রকেট মাঝপথে যে? কীসের গণ্ডগোল?
লাগিয়ে চোখে–পেরিভিশন।
দেখলেন সোম–ব্যাপার ভীষণ
পথ-অবরোধ আন্দোলনে ফ্লায়িং রোবটদল!

সাত্যকি সোম তলব পেলেন যেতেই হবে চীনে।
 খবর পেলেন লেট-এ, কারণ ভুল ছিল যে পিন-এ।
হোক না তাতে কীসের ক্ষতি?
পিছিয়ে দিয়ে আলো গতি
 পরের দিন রওনা হয়ে পৌঁছোন ঠিক দিনে।

সোমের আছে একটি রোবট-নামটা নরোত্তম।
স্যায়না বলে মনে হলেও বুদ্ধি কিছু কম।
নুনও সাদা, আটাও সাদা
মাথার সেল-এ পড়লে বাধা।
বলবে রোবট, সাদা হল সমুদ্র আর গম!

[সন্দেশ, শারদীয়া ১৪০৬]

*

পিসি, পুসি আর ওরা

কুন্তিপিসির ভৃত্য দু-জন–রোবি এবং বটা, এই দুনিয়ায় এমন চাকর মিলবে বলো ক-টা?
বিজ্ঞানীর সাত্যকি সোম পিসির কষ্ট দেখে।
তাঁর বাড়িতে এই জোড়াকে তাই দিয়েছেন রেখে।
বটার ভালো হাতের লেখা, অঙ্কেও সে পাকা; কাজ তাই তার চিঠি লেখা এবং হিসেব
রাখা।
(আর বলি ভাই চুপিচুপিওস্তাদ জ্ঞানদানে, চোর পালালে বুদ্ধি জোগায় পিসির কানে
কানে।) অন্য যত বাড়ির কাজ আর ফাইফরমাশ সবই
বুদ্ধু হলেও অকাতরে সেসব করে রোবি।
চলছিল বেশ এমনি করে, পিসিও খুব খুশি; কাজ নেই তাই মালাই জপেন, কোলে ঘুমোয়
পুসি।
 ভুলেই গেছি বলতে যে ভাইজানে পাড়ার লোকে
 পুসিই পিসির সব কিছু যে তামাম বিশ্বলোকে।
 পুসিই পিসির ছেলেমেয়ে, পুসিই চোখের আলো; একটু আড়াল হলেই পিসির জগৎটা হয় কালো।
 একদিন সেই কাণ্ড হল, বলতে ব্যথা জাগে।
 (কাগজে সেই সংবাদটা পড়েছ কি কেউ আগে?) পর্দা চাদর কাঁচতে দিয়ে তিনি হাঁকেন,
রোবে, গায়ের জোরে আছাড় দিয়ে আচ্ছা করে ধোবে।
এই না বলে কুন্তিপিসি রোবির কাছে গিয়ে
পিঠের ওপর খোঁচা দিলেন বুড়ো-আঙুল দিয়ে।
পুসি তখন তুলছিল হাই চোখ দুটো তার বুজে
পাঁচ কিলো তার গতরখানা চাদর স্তূপে গুঁজে।
 গটগটিয়ে এসে রোবি পুসিকে এক টানে
 তুলে ধরেই আছাড় দিল কলতলার ওই শানে।
 গুঁড়িয়ে গেল পুসির মাথা ছিন্নভিন্ন কায়া; একটু ডেকেই ছাড়ল পুসি এই জগতের মায়া। বাক্যহারা কুন্তিপিসি আঁধার দেখেন চোখে; জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে সেথায় পড়েন পুসির
 শোকে।
বলল বটা পিসির কানে, হবেই এ তো জানা।
 সার্ভিস তো হয় না করা সাত মাস একটানা।
ভাবছেন কী, আমারও সব হিসেব বেজায় পাকা?
 হাজার টাকার আয়ে দেখাই জমা দু-লাখ টাকা!
তাই বলছি, আমি যদি রোবের মালিক হতাম
 প্রতি মাসেই সাফ করাতাম পিঠের যত বোতাম।

আরে ছি ছি! আসল কথাই হয়নি বলা খুলে; বয়স তো ভাই কম হল না, যেতেই পারি ভুলে।
তোমাদের যা বলা হয়নি গোড়ায় পষ্ট করে, সেটা হল–রোবট ছিল এ দুই মানিকজোড়ে।

[সন্দেশ, শারদীয়া ১৪১০]