একটি প্রতিশ্রুতির লিখন

একটি প্রতিশ্রুতির লিখন

অজ্ঞান অবস্থা থেকে চেতনা ফিরে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আনভারেস ঠিক বুঝতে পারলেন না, তিনি এখন কোথায়। চারপাশে তাকিয়ে তাঁর মনে হল, একটা গুহার মধ্যে শুকনো পাতার বিছানার ওপর তিনি শুয়ে আছেন। কিন্তু, এটা কী করে সম্ভব? জ্ঞান হারানোর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত সব ধীরে ধীরে তাঁর মনে পড়ল। প্রকৃতিবিজ্ঞানীদের দলভুক্ত হয়ে তিনি হিমালয়ের এই অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন। একটা তুষারঝড়ের আঁচ করতে পেরে পরদিন দুপুরের আগে আর না এগোতে বলেছিল তাঁদের গাইড জঙ্গ বাহাদুর শেরপা। তাঁদের দলনেতা বাংলাদেশের মহম্মদ মনোহর গনিও তাই সেখানেই তাঁবু ফেলতে আদেশ দিলেন। ভোরের দিকে কীসের এক আকর্ষণে, তিনি তাঁবু থেকে একাই বেরিয়ে পড়লেন। তাঁর মনে হল, সামনে এক সবুজ অরণ্য। পাহাড়েও লোকে মরীচিকা দ্যাখে নাকি! অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলেন লরেন্স। তাঁর চোখের সামনে থেকে শ্যামল অরণ্য কখন মিলিয়ে গিয়েছে। তারপরেই সেই দুর্যোগ। প্রবল ঝড়ের দাপটে তিনি আর ফিরে যেতে পারলেন না ক্যাম্পে। বাতাসের ধাক্কায় আছাড় খেলেন এক পাথরে। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পাওয়ার পরে আর কিছুই তাঁর মনে নেই।

এখন তাঁর মনে হল, তিনি কি স্বপ্ন দেখছেন? নাকি, লোকে যাকে পরলোক বলে, তিনি এখন সেখানে?

তাঁর চিন্তাস্রোতে বাধা পড়ল। তিনি হতভম্ব অবস্থাতেই দেখলেন, গুহার বাইরে থেকে এগিয়ে আসছে একটা মনুষ্যমূর্তি। কাছে এলে লরেন্স দেখলেন, জটাজুটধারী এক সাধু। লরেন্স তাড়াতাড়ি উঠে বসলেন।

সাধুর হাতে দুটো পাথরের বাটিতে ধূমায়িত কিছু আছে মনে হল। তিনি লরেন্সের কাছে এসে বসলেন। তারপর পরিষ্কার ইংরেজিতে বললেন, এখন কেমন বোধ করছেন মি. আনভারেস? আপনার অজ্ঞান অবস্থাতেই কিছু ওষুধ দিয়েছি। তাতে শরীরটা এখন ঝরঝরে লাগছে তো?

বিস্ময়ের ধাক্কায় কোনও উত্তর দিতে পারলেন না লরেন্স। সাধু সেটা লক্ষ করে বললেন, আপনার পকেটেই আপনার পরিচয়পত্র দেখেছি। নিন, চা-টা খেলে বেশ ভালোই লাগবে, দেখবেন। এই তুষারাচ্ছন্ন নির্জন গুহায় চায়ের ব্যবস্থা দেখে লরেন্স একটু অবাকই হয়েছিলেন। সাধু বোধহয় মনের কথা বুঝতে পারেন। লরেন্স চা দিয়ে তিনি নিজের আরেক বাটিতে চুমুক লাগালেন। তারপর বললেন, প্রকৃতিদেবী চায়ের মালমশলা এই পর্বতের আনাচকানাচে ছড়িয়ে রেখেছেন, যার জন্যে চায়ের নেশাটা এখনও বজায় রাখতে পেরেছি, মি. আনভারেস। এখান থেকে একটু নীচে নেমে গেলেই পাওয়া যাবে বুনো চায়ের গাছ। দরকারমতো পাতা তুলে আনি। দ্রাক্ষাজাতীয় একরকম পাহাড়ি ফলের রস দিয়ে চিনির প্রয়োজন মেটাই। আর দুধ? পাহাড়ি গাইগুলো যেখানে বসে বিশ্রাম করে, সেখানে পাথর আর বরফের গর্তগুলোর মধ্যে তারা নিজেরাই দুধ রেখে যায়। বোধহয় আমার মতন সন্ন্যাসীদের কথা ভেবেই। জল গরম করার জন্যেও ধুনি জ্বালানোর দরকার হয় না। পরিষ্কার জলের উষ্ণপ্রস্রবণ এখানে বিরল নয়।

লরেন্স চা খেতে খেতে অবাক হয়ে সাধুর কথা শোনেন।

সাধুর পরের কথায় লরেন্সের বিস্ময়ের মাত্রা আরও বাড়ল। সাধু বললেন, আপনার পরিচয় আমি জানি, মি. আনভারেস। আপনার লেখা নোয়া, নৌকোতে একটি ডোডো রেখো কবিতাটি আমার চোখে জল এনেছিল। মরিশাসের একটি পাখিকে মাংসের লোভে নিশ্চিহ্ন করেছিল নাবিকরা। অ্যালবাট্রস নামে এক সামুদ্রিক পাখিকেও করত। কিন্তু যখন তারা বুঝতে পারল, পাখি তাদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানিয়ে দেয়, তখন তাদের মধ্যে একটা সংস্কার গড়ে উঠল। সেটা হল, যেসব নাবিক সমুদ্রবক্ষে মারা যায়, তারাই অ্যালবাট্রস পাখি হয়ে জন্মায়। তাতে বেঁচে গেল অ্যালবাট্রস। সংস্কার সবসময়ে খারাপ নয়, কী বলেন মি. আনভারেস? বলে সাধু হাসলেন।

লরেন্স যেন কথা বলতে ভুলে গিয়েছেন। সেই একই রকম নির্বাক হয়ে তিনি সাধুর কথা শুনতে থাকলেন। সাধু রহস্যময় হাসি হেসে বললেন, আপনার বন্যপ্রাণী আর বনসংরক্ষণের আন্দোলনের কথাই শুধু শুনিনি, মি. আনভারেস। আপনার সঙ্গে আমার পরিচয়ও হয়েছিল।

এবার তাঁর বিস্ময়ভরা চাহনিটা দিয়ে সাধুর মুখের দিকে ভালোভাবে তাকালেন লরেন্স। তারপর বাঁধভাঙা জলের তোড়ের মতোই তাঁর বাঁধভাঙা বিস্ময় এতক্ষণের স্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, কে আপনি? আপনিই কি?

সাধু ডান হাতটা তুলে তাকে থামিয়ে বললেন, সন্ন্যাসীদের পূর্বাশ্রমের নাম বলতে নেই। আমার পরিচয় এখন প্রকৃত্যানন্দ। তবে আপনাকেই শুধু বলছি, আপনার অনুমান ঠিক। আমিই সৌনক সমাদ্দার।

লরেন্স প্রায় লাফিয়ে উঠে বললেন, ডক্টর সমাদ্দার, তবে কি আপনি–

এবার ডান হাত না তুলে লরেন্সের দিকে সেটা বাড়িয়ে প্রকৃত্যানন্দ বললেন, আপনি কথা দিন, আমার সঙ্গে এই সাক্ষাঙ্কারের ব্যাপারটা আপনি গোপন রাখবেন। আমি জীবিত আছি, এই খবরে হয়তো দু-চার দিন হইচই হবে। কারও কোনও লাভ হবে না তাতে। হলে হবে আমারই ক্ষতি। হয়তো কিছু উৎসাহী অভিযাত্রী এখানে এসে আমার শান্তি চিরদিনের মতো নষ্ট করে দেবে। প্রমিস! লরেন্স সাধুর হাতটা ধরে বললেন, প্রমিস! আপনার শান্তিকে ডোডো হতে দেব না।

প্রকৃত্যানন্দ হেসে বললেন, সত্যিই আপনি কবি, মি. আনভারেস। আমি বিশ্বাস করি, আপনি ইয়েতিকেও ডোডো হতে দেবেন না। ডাইনোসররা গিয়েছে প্রকৃতির হাতেই। সেটা দরকার ছিল প্রাকৃতিক নিয়মে। কিন্তু আমরা মানুষরা নিজে যাদের নিশ্চিহ্ন করছি, তারা তো আমাদের কোনও ক্ষতি করছে না। প্রকৃত্যানন্দর চোখ দুটো এবার ধুনির আগুনের মতোই ধকধক করতে থাকে।

একটা প্রশ্ন লরেন্সের মনের মধ্যে খোঁচা মারছিল। তিনি আর ধৈর্য ধরতে না পেরে বললেন, বলুন ডক্টর সমাদ্দার, ইয়েতি কি সত্যিই আছে? আপনি কি

প্রকৃত্যানন্দ আবার হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, ধৈর্য, মি. আনভারেস। আমি জানি, আপনি আপনার ব্রতে কত আন্তরিকভাবে আস্থাবান। তাই আপনাকে বলব আমার কাহিনি।

লরেন্স একদৃষ্টে সাধুর দিকে তাকিয়ে আবেগজড়িত স্বরে বললেন, আমার প্রাণ নিয়ে একটা ডোডো ফের ডানা ঝাপটাক–এটা নিছক কবিত্ব নয়, ডক্টর সমাদ্দার। আপনার কাহিনি সভ্যজগতের দ্বিতীয় ব্যক্তি জানবে না–এই হিমালয় সাক্ষী।

প্রকৃত্যানন্দ শান্তভাবে মৃদু হেসে বললেন, আমি জানি, মি. আনভারেস।

একটু চুপ করে থেকে কী ভাবলেন তিনি। তারপর বললেন, প্রকৃতি অনেক জীবের আত্মরক্ষার জন্যে সবচেয়ে বড় অস্ত্র কী দিয়েছে, জানেন? গা-ঢাকা দেওয়ার কৌশল। মেরুদেশের শ্বেতভল্লুক বরফের সাদা রঙের মধ্যে নিজেদের রং মিশিয়ে ফেলে হত্যাকারীদের চোখে ধুলো দেয়। ফড়িঙের কাঠ-কাঠ রং ডালপালা আর ঘাসের সঙ্গে মিশ খেয়ে যায়। তাই পাখিদের নজর তারা অনেকেই এড়াতে পারে। একরকম পাখি আছে, তারা কোনও বিপদের আঁচ পেলেই মাটির ওপর এমনভাবে শুয়ে পড়ে, যে মনে হয়, এক টুকরো ন্যাকড়া পড়ে আছে। বড় মাছগুলোর রং-বিচার করে দেখছেন? পিঠের ওপরটা কালচে। গভীর জলে কালোর সঙ্গে মিশে যায়। আবার জলের গভীরে গিয়ে সেই মাছের দিকে তাকান। জলের ওপর সূর্যের আলো পড়ে যে সাদাটে রং দেখায়, মাছের পেটের সাদা রং তার সঙ্গে মিশ খেয়ে যায়। ডোডো পাখিদের জন্যে প্রকৃতি যদি এরকম কিছু ব্যবস্থা করত, তাহলে হয়তো ওরা এত তাড়াতাড়ি লোপ পেয়ে যেত না।

লরেন্সের বিস্ময়ভরা চোখের দিকে চেয়ে প্রকৃত্যানন্দ যেন একটু লজ্জা পেলেন। বললেন, আপনার মতন একজন পণ্ডিতের সামনে এসব কী বলছি আমি! আপনি কিছু মনে করবেন না, মি. আভারেস। এবার আমার কথাই বলি।

ছোটবেলায় ঠাকুমার কাছে শুনতাম রামায়ণের গল্প। রামায়ণে বিভীষণ আর হনুমান এই দু-জনে অমর। এরা এখন কোথায়–এ কথা জিজ্ঞেস করলে ঠাকুমা বলতেন, বিভীষণ আছে পাতালে আর হনুমান হিমালয়ে।

বড় ইয়েতির নাম শুনে ঠাকুমার কথা মনে পড়ত। আপনি তো জানেন, অনেক অভিযানে আমি যোগ দিয়েছি। অভিযানের উত্তেজনাকর আনন্দটাই আমার কাছে বড় ছিল। আপনার মতন জ্ঞানের তৃষ্ণা হয়তো অতটা ছিল না তাতে। তাই যখন হেনরি উডবার্ন তাঁর ইয়েতি অভিযানের দলে আমাকে নিতে চাইলেন, আমি সানন্দে তাতে যোগ দিলাম।

লরেন্স আপন মনে একটু মাথা দোলালেন। তারপর বললেন, হ্যাঁ, ডক্টর উডবার্ন তাঁর দল নিয়ে প্রায় বিধ্বস্ত অবস্থায় বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। একমাত্র আপনিই ফিরলেন না। শুধু কলকাতায় কেন, লন্ডনেও পর্বত আরোহণ ক্লাবে আপনার জন্যে শোকপ্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল।

প্রকৃত্যানন্দ হো-হো করে হেসে উঠে বললেন, আমাদের দেশে একটা সংস্কার আছে, কী জানেন? কারও নামে ভুল করে মৃত্যুসংবাদ রটলে সে নাকি অনেকদিন বাঁচে। সে যা-ই হোক, শুনুন আমার কথা।

ইয়েতি সম্বন্ধে অনেক কথাই আগে শুনেছি। নেপালি ভাষায় ইয়া মানে পাহাড়, আর তে মানে জন্তু। অর্থাৎ পার্বত্য জন্তু। আবার কেউ কেউ বলে, সংস্কৃত যাতি বা য়াতি শব্দ থেকে এসেছে ইয়েতি। সে সবসময় চলে বেড়ায়, তাই এই নাম। দু-শো বছর আগে তিব্বতীয় চিকিৎসার বইয়ে এরকম জন্তুর উল্লেখ আছে। তা ছাড়া, মি. ক্র্যাম, মি. ডন উইলিয়াম, ডক্টর অ্যালেন–এঁদের কথা আপনি তো জানেনই। কেউ বলেছেন, ইয়েতির পায়ের ছাপ দেখেছেন। কেউ আবার নাকি স্বয়ং ইয়েতি মহারাজকেই দর্শন করেছেন।

যা-ই হোক, আমাদের দল এভারেস্টের প্রায় তিরিশ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে একটা উপত্যকা দিয়ে চলেছে। সামনে একটা চড়াই। সবই বরফে ঢাকা। এবার সেই চড়াইয়ে আরোহণ করতে হবে। অতিকষ্টে এগোচ্ছি আমরা। এর পরেই সেই তুষারঝড়। ডক্টর উডবার্নের রিপোর্টেই জানেন, কীভাবে আমাদের দলটা তছনছ হয়ে গিয়েছিল।

তুষারঝড়ের প্রকোপ যখন কমল, তখন দেখলাম, আমি সঙ্গীহীন অবস্থায় একটা পাথরের খাঁজে আটকে আছি। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলার দিয়ে চারপাশে দেখে নিলাম। কাউকে দেখতে পেলাম না। ওয়াকি-টকি যন্ত্রটাকে ব্যবহার করতে গিয়ে দেখি, তুষারঝড়ে সেটাও অকেজো হয়ে গিয়েছে। কী করব ভাবছি, ঠিক এমনি সময়ে…

উত্তেজনার স্মৃতিতে মানুষের চোখ যেমন মুহূর্তের জন্যে চকচক করে ওঠে, সাধুর চোখ দুটো যেন সেরকমই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন, ঠিক এমনি সময়ে সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাতেই মনে হল, তার ওপর দিয়ে কালো ছায়ার মতন কী চলে গেল। সেই মুহূর্তের উত্তেজনা আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন, মি. আনভারেস। কোথায় গেল সব শ্রান্তি! বুকের মধ্যের হাতুড়ির আওয়াজ যেন কানেই শুনতে পেলাম। ইয়েতি! সামনে একটা পাহাড়। পাহাড় না বলে বরফ-ঢাকা শৃঙ্গ বললেই ঠিক হয়। একেবারে খাড়া নয়। আমি ওপরে উঠতে লাগলাম। ওপরে উঠেই দুটো জিনিস চোখে পড়ল। প্রথমটা হচ্ছে, আমি যেদিক দিয়ে উঠেছি, তার উলটোদিকে পাহাড়টা খাড়া নেমে গিয়েছে যেন পাতালপুরীতে। অনেক নীচে সেই খাদে দেখা যাচ্ছে তরঙ্গহীন সবুজ সমুদ্র-গভীর অরণ্য। কিন্তু দ্বিতীয় যে জিনিসটি দেখলাম, তার কাছে ওই প্রাকৃতিক দৃশ্যের সৌন্দর্য বা অতলস্পর্শী খাদের আতঙ্ক আমার কাছে তুচ্ছ মনে হল। আমি স্পষ্ট দেখলাম, একটু দূরেই সামনে একটা বড় পাথরের আড়ালে বসে আছে গোরিলার মতন এক রোমশ জন্তু। একটা হাত আর মাথা ছাড়া দেহটা অবশ্য পাথরের আড়ালে ছিল।

অস্ফুট বিস্ময়ে লরেন্সের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা শব্দ, ইয়েতি!

প্রকৃত্যানন্দ হেসে বললেন, হ্যাঁ, ইয়েতি। আমি তো আর আপনার মতন একজন নিঃস্বার্থ চিন্তাশীল দার্শনিক ছিলাম না তখন। আবিষ্কারের উত্তেজনায় আমার কাণ্ডজ্ঞান যেটুকু ছিল, তা-ও লোপ পেয়েছে। জ্যান্ত না পারি, ইয়েতির মৃতদেহ দেখিয়ে আমি পৃথিবীতে অমর নাম রেখে যাব, এই ভেবে পিস্তল হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে লাগলাম পাথরটার দিকে।

কিন্তু আমার উপস্থিতি কী করে ঠিক টের পেয়ে গেল সে। হঠাৎ দেখি, ম্যাজিকের মতন ইয়েতিটা অদৃশ্য হয়ে গেল। চোখের পলকে সে কোথায় গেল! তবে কি আমি ভুল দেখেছিলাম? আমি অবাক হয়ে পাথরটার কাছে গিয়ে হতভম্বের মতন দাঁড়িয়ে আছি। বড় পাথরটার পাশে আরেকটা বরফ-ঢাকা পাথরের নীচে হতাশ হয়ে বসে পড়েছি। সমস্ত ক্লান্তি যেন দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এসেছে দেহে-মনে। আমার তখনকার অবস্থা আপনি কল্পনা করতে পারেন, মি. আনভারেস। সঙ্গীদের কাছে ফিরে গিয়ে যদি ইয়েতির কথা বলি, তারা হয়তো অবিশ্বাসের হাসি হাসবে। কেউ হয়তো মাথার দিকে তাকাতে পারে। তুষারঝড়ে অনেকক্ষণ থাকলে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতেও পারে। অসহনীয় দুঃখে একটা পাথরের হেলান দিতেই যেন বিদ্যুতের শক খেয়ে লাফিয়ে উঠলাম। কীসে হেলান দিয়েছি আমি? এ তো পাথর নয়! পাথরের কাঠিন্য নেই, নেই বরফের শীতলতা। কিছু ভাবার আগেই বিরাট পাথরটা গড়িয়ে পড়ল প্রচণ্ড বেগে। আমার জুতোর তলাকে ছুঁয়ে সেটা গড়াতে গড়াতে পাহাড়ের কিনারা থেকে পড়ে গেল সেই গভীর খাদের নীচের বনভূমিতে। এক চুলের জন্য বেঁচে গেলাম আমি। ভয়ে-আতঙ্কে শিউরে উঠলাম। একটু হলেই আমার চূর্ণবিচূর্ণ হাড়গুলোকে সঙ্গে নিয়েই পাথরটা পড়ত সেই কয়েক হাজার ফুট নীচে।

তখনও আরও বিস্ময় আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল। পেছনে তাকাতেই দেখি, সেখানে কোনও পাথরই নেই। অথচ দুটো বিশালাকার পাথর পাশাপাশি ছিল। পড়ল তো একটাই। দুটো কখনওই না। তবে আরেকটি? আমি কোনটির গায়ে হেলান দিয়েছিলাম?

সেই মুহূর্তে আমার নিজের মস্তিষ্ক সুস্থ আছে কি না, এ বিষয়ে আমার নিজেরই সন্দেহ হয়েছিল, মি. আনভারেস। একটা প্রচণ্ড উত্তেজনার পরেই তার চাইতেও প্রচণ্ডতর একটা হতাশা আর ক্লান্তি আমার শরীর-মনকে আঘাত করল। আপনি তো তুষারঝড়ে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। কিন্তু মনের মধ্যে তুষারঝড়ের চেয়েও বড় অন্য এক ঝড়ের দাপটে আমিও সে দিন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম।

যখন জ্ঞান হল, দেখলাম আমি এক গুহায় শুয়ে। মাথার কাছে এক সৌম্যদর্শন সাধু। তিনিই আমার গুরুদেব। তিনি কী করেই বা আমাকে পেলেন, আর কী করেই বা আমাকে বহন করে তার আশ্রয়ে নিয়ে এলেন, সেটা তখন আমার কাছেও রহস্যময় মনে হয়েছিল। আজ অবশ্য সে রহস্য আমার অজানা নয়। আপনাকেও তিনিই উদ্ধার করেছেন। আপনার ভার আমার ওপরে তিনিই দিয়ে গিয়েছেন।

একটু থেমে প্রকৃত্যানন্দ আবার বলতে থাকেন, মহাভারতে বিশ্বামিত্র নামে এক ঋষির গল্প আছে। তিনি আগে রাজা ছিলেন। বশিষ্ঠ নামে এক ঋষির তপস্যার প্রভাব দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনিও রাজ্যসুখ ত্যাগ করে তপস্যায় বসে ঋষিত্ব লাভ করেন।

লরেন্স অবাক হয়ে ভাবেন, ডক্টর সমাদ্দার কি নিজেকে বিশ্বামিত্রর সঙ্গে তুলনা করলেন? ইয়েতি-প্রসঙ্গ ভুলতে পারেন না লরেন্স। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কি তবে সত্যিই ভুল দেখেছিলেন, ডক্টর সমাদ্দার?

প্রকৃত্যানন্দ একটু হেসে বললেন, না, আমি ভুল দেখিনি। যে পাথরটায় আমি হেলান দিয়েছিলাম, সেটাই ছিল ইয়েতি। প্রকৃতি-প্রদত্ত গা-ঢাকা দেওয়ার কৌশলে সে একটা সাদা নিশ্চল পাথরের আকার নিয়ে পড়ে ছিল। তাতেও যখন আমার কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিল, তখন সে ছুটে পালিয়ে গেল। আর আমার মনোযোগটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যেই আরেকটা পাথরকে ওভাবে গড়িয়ে দিল। ঠিক যেমন আক্রান্ত হলে টিকটিকি তার ল্যাজটা খুলে ফেলে দেয়। খসে-পড়া ল্যাজটা কিছুক্ষণ নড়াচড়াও করে। তাতে আক্রমণকারীর দৃষ্টি যখন সেই ল্যাজের দিকে থাকে, সেই ফাঁকে টিকটিকি পালিয়ে যেতে পারে।

অবাক বিস্ময়ে লরেন্স প্রকৃত্যানন্দর দিকে তাকিয়ে থাকেন।

প্রকৃত্যানন্দ এবার উঠে পড়লেন। তারপর বললেন, প্রমিস! তারপর তাঁকেও ধরে তুললেন। লরেন্সের হাতটাকে বাঁ হাতে ধরে একটা শেকড়ের মতন কিছু দিয়ে তাঁর কবজির কাছে কিছু লিখলেন, একটি অক্ষর ফুটে উঠেছে–ইংরেজিতে পি।

লরেন্স হেসে বললেন, আপনার নামের আদ্যক্ষর?

প্রকৃত্যানন্দ উত্তরে হাসলেন। বললেন, না। পি ফর প্রমিস। এই অক্ষর মুছবে না। চিরদিন আপনাকে প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দেবে। এবার চলুন বাইরে। আপনাকে আপনার দলের কাছে পৌঁছে দিলেই আমার কর্তব্য শেষ।

গুহার বাইরে গিয়ে দেখলেন, প্যাকিং বাক্সের মতন একটা কিছু পড়ে আছে। প্রকৃত্যানন্দর কাছে শুনলেন, ওটার ভেতরেই তাকে বসতে হবে। কিন্তু কে নিয়ে যাবে তাকে বহন করে? প্রকৃত্যানন্দ? নাকি তাঁর সেই গুরুদেব?

কোনও প্রশ্ন করার সুযোগ তাঁকে দিলেন না প্রকৃত্যানন্দ। হাত ধরে তাঁকে বাক্সে বসিয়ে দিয়েই বললেন, এই গাছের মূলটি খেয়ে নিন, মি. আনভারেস। এতে আপনার নিদ্রা আসবে। নইলে চড়াই-উতরাইয়ে যেতে আপনার ভয় হতে পারে। বাক্স থেকে লাফিয়ে পড়াও বিচিত্র নয়।

নির্দ্বিধায় শেকড়টি মুখে দিলেন লরেন্স। একটু পরেই বুঝলেন, ঘুমে তাঁর চোখ জুড়িয়ে আসছে। তার আগেই অনুভব করলেন, দীর্ঘকায় কোনও ব্যক্তি এসে তাঁকে সুদ্ধ বাক্সটা কাঁধে তুলে নিল। বাহকের হাতটা একবার মাত্র তাঁর গলা স্পর্শ করল। সেই রোমশ হাতের স্পর্শে শিহরন বোধ করার আগেই তিনি ঘুমে ঢলে পড়লেন।

ঘুম যখন ভাঙল, তখন দেখলেন, তিনি শুয়ে আছেন, সেই একই জায়গায়, যেখানে তিনি তুষারঝড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। এখন প্রকৃতি শান্ত। তাঁর মুখের দিকে ঝুঁকে আছেন মনোহর গনি সাহেব। পাশে দাঁড়িয়ে জঙ্গ বাহাদুর, ল্যাম্বার্ড, নীলাদ্রি রায় ও আরও অনেকে।

জ্ঞান ফিরে এসেছে দেখে গনি জিজ্ঞেস করলেন, এখন কেমন বোধ করছেন, মি. আনুভারেস?

প্রথমে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকেন লরেন্স সঙ্গীদের দিকে। এরকম প্রশ্ন তিনি তো আরেকজনের মুখে শুনেছিলেন, তবে কি এতক্ষণ তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন!

হঠাৎ তাঁর নজর গেল ডান হাতের কবজির দিকে। ছোট্ট অক্ষরটা যেন তাঁর দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে।

তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হ্যাঁ, ভালোই আছি, মি. গনি। আপনাদের অসুবিধে ঘটানোর জন্যে সত্যিই আমি দুঃখিত। চলুন, তাঁবুতে যাই।

[সন্দেশ, শারদীয়া ১৩৯১]