একটি অন্যলৌকিক কাহিনি

একটি অন্যলৌকিক কাহিনি

আমি বৈদূর্য রহমান। উত্তরবঙ্গের এক থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার থেকে বর্তমানে কলকাতায় উচ্চপদে বদলি হয়ে এসেছি। উত্তরবঙ্গের শহরটাতে কেটেছে আমার শৈশব থেকে চাকরিজীবনের অনেকখানি। অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে সেখানে কর্মজীবনে। সেসব কেস লিপিবদ্ধ আছে পুলিশের ডায়েরিতে। কিন্তু একটা চুরির কেসের তদন্ত করতে গিয়ে যে মহাবিস্ময়ের মুখোমুখি হলাম তা নিদ্রা-জাগরণে আজও প্রতিনিয়ত আমার মনে ঘাই তোলে। সে দিন মেসোমশাই অর্থাৎ ধীরানন্দবাবুর কাছে যা শুনেছিলাম, সেটাই পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলাম। না-করার কোনও কারণ, কোনও যুক্তি আমি খুঁজে পাইনি। সেই কাহিনি আমি লিখে রাখছি–পুলিশের ডায়েরিতে নয়, আমার নিজস্ব ডায়েরির পাতায়। ভবিষ্যতে যদি কোনও পাঠকের হাতে পড়ে এই ডায়েরি তাঁকে আগাম অনুরোধ করে রাখছি, ইচ্ছে হলে এটাকে আমার কল্পিত অলৌকিক কাহিনি হিসেবে পড়ুন। কিন্তু তুচ্ছ হাসি দিয়ে আমাকে বা ধীরানন্দবাবুকে অপমান করবেন না। ধীরানন্দবাবুকে শুধু আমি না, ওই অঞ্চলের সবাই জানতেন। তিনি একগুঁয়ে অহংকারী অমিষ্টভাষী হতে পারেন, কিন্তু তিনি মিথ্যাবাদী, এমন অপবাদ তাঁর শত্রুও দিতে সাহস করে না। আমি তাঁর পরিবারের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই ঘনিষ্ঠ। মাসিমাকে বিজয়ার প্রণাম করে নারকেল নাড়, মোয়া, মিষ্টি খেয়েছি, দেবলদা আর পেলবও আমাদের বাড়িতে এসে ইদের কোলাকুলি করে পিঠে খেয়েছে, মা-র রাঁধা মাংস টিফিন ক্যারিয়ারে করে নিয়ে গিয়েছে।

সেই ধীরানন্দবাবু যখন একদিন হন্তদন্ত হয়ে থানায় এসে কাতরভাবে আমার কাছে। ভেঙে পড়লেন, আমি অবাক আর উদবিগ্ন হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তাঁকে দু-হাত দিয়ে বসিয়ে দিয়ে ভাবলাম, তবে কি ছেলেদের কাছ থেকে কোনও দুঃসংবাদ পেয়েছেন। সেই সময় অর্থাৎ ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দের শারদোৎসবের ঠিক আগেই শুরু হয়েছে এই বঙ্গে আর ওপারের বাংলাদেশের বিরাট অংশ জুড়ে বন্যার তাণ্ডবলীলা। কলকাতার সঙ্গে পরিবহন যোগাযোগ আর টেলিযোগাযোগ দুইই বিপর্যস্ত। অনেকে থানার শরণাপন্ন হয় কিছু খবর পাওয়ার বা দেওয়ার আশায়। এটা ছাড়া ধীরানন্দবাবু নিজের অন্য কোনও বিপদে বা সমস্যায় কারও শরণ নেবেন না নিশ্চয়। দুই ছেলের একজন আমেরিকায় ও আরেকজন কলকাতা চলে গেলেও বিপত্নীক ধীরানন্দবাবু জেদ করে এখানে পড়ে থাকলেন, কারও কাছে গেলেন না।

আমি তাঁকে শান্ত করে বললাম, কী হয়েছে, মেসোমশাই? পেলবদের কোনও খবর পেয়েছেন?

ধীরানন্দবাবু বললেন, ওরা ভালোই আছে। তার জন্য আমি তোমার কাছে আসিনি। আমি এসেছি অন্য কারণে। আমার ঘর থেকে একটা জিনিস চুরি হয়ে গিয়েছে, বদু। এটা মহামূল্যবান আমার কাছে। একজনের স্মৃতিও। এটাকে উদ্ধার করে দিতেই হবে তোমাকে।

আমি তাঁকে আশ্বস্ত করে বললাম, এখনই দেখছি আমি, মাসিমার কোনও গয়নাটয়না কি?

ধীরানন্দবাবু একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিয়ে বললেন, সেসব কিছু না। একটা যন্ত্র বলতে পারো। বৈজ্ঞানিক যন্ত্র।

অবাক হলাম। বাংলা ভাষার শিক্ষক ধীরানন্দবাবু কি বিজ্ঞানের চর্চাও করেন?

ধীরানন্দবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন, তোমাকে বললে হয়তো ভাববে, আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এত দিন কাউকে বলিনি তাই

আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, চলুন মেসোমশাই, আমার বাড়ি গিয়ে সব বলবেন। আপনি যা বলবেন, সব বিশ্বাস করব। কারণ আপনি নিজে যা বিশ্বাস করেন, আমি অন্তত জানি তা সন্দেহাতীত।

রমেনবাবুকে থানার ভার দিয়ে পাশেই আমার কোয়ার্টারে গেলাম ধীরানন্দবাবুকে নিয়ে। সেখানে তিনি যা বললেন, তা সত্যি আপাত অবিশ্বাস্য। আমি অবাক হয়ে শুনে গেলাম। আমার ভাষাতেই লিখছি

সে দিন ছিল এক বর্ষণমুখর রাত। ধীরানন্দবাবু রাত আটটার মধ্যেই খেয়ে নেন। তারপর অনেকক্ষণ ধরে বই পড়েন। কোনও আকর্ষণীয় বিষয় থাকলে টিভি দেখেন বা রেডিয়ো শোনেন। তাঁর সহচর গদাই খায় দেরিতে আর তারপরেই কুম্ভকর্ণর ঘুম লাগায়। সে দিন বিছানায় বসেই সৈয়দ মুজতবা আলীর একটা বই পড়ছিলেন ধীরানন্দবাবু। হঠাৎ মনে হয়, কেউ যেন খুট করে দরজা ঠেলে তাঁর ঘরে ঢুকেছে। প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো গদাই কোনও কাজে ঢুকেছে। কিন্তু এত রাতে তো কুম্ভকর্ণর জেগে থাকার কথা নয়। তাকাতেই অবাক সচকিত হয়ে বসে পড়লেন খাটের ওপর। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। খর্বাকৃতি কিন্তু বেশ রূপবান এক তরুণ। তিনি চমকে উঠে বললেন, কে তুমি? কী চাও?

একটু ভাঙা-ভাঙা বাংলাতে বালকের মতো গলায় ছেলেটি বলল, ভয় পাবেন না, আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলাম। আপনি হয়তো এই পৃথিবী সম্বন্ধে অনেক কিছু বলতে পারবেন। এর আগে যেসব মানুষকে দূর থেকে দেখেছি আমরা টেলিসেরিব্রোমিটারে, মনে হল, তারা অজ্ঞতার জগতেই আছে। আপনাদের এই মানুষদের মধ্যে জ্ঞানের এত বৈষম্য কেন?

ধীরানন্দবাবু হো-হো করে হেসে উঠে বলেন, ওসব ভড়ং ছাড়ো। ভূতের ভয় দেখিয়ে কোনও লাভ হবে না। ওসব অলৌকিকটলৌকিককে আমি বিশ্বাস করি না। আর ভূত সাজতে জার্মান বাংলা না বলে ফরাসি বাংলা মানে নাকিসুরে কথা বলতে হয়। সেটা বোধহয় ভুল করে ফেলেছ! তোমার মতলবটা বলো দেখি।

টিং টিং করে মুখ দিয়ে একটা শব্দ করে আগন্তুক বলল, অলৌকিক! ঠিকই বলেছেন। এই পৃথিবীটাকেই লোক মনে করলে অলৌকিক। তবে অন্যলৌকিক বললেই ভালো হয়। আপনি জংলি দেবতার নাম শুনেছেন? আমি সেই জংলি দেবতা।

অনেক বছর ধরে উত্তরে পাহাড় এলাকায় জংলি দেবতার কথা শুনে আসছেন। ধীরানন্দবাবু। সেই দেবতার নাম করে ছেলেটা তাঁকে ভয় দেখাতে চাইছে দেখে তিনি খেপে উঠলেন। কিন্তু তার আগেই সেখানে হাঁটু গেড়ে দু-হাত জোড় করে বসে পড়ল আগন্তুক। বলল, আমি পৃথিবীর নিয়মে আপনার দয়া ভিক্ষা করছি। আগে আমার কথা শুনুন। তারপরে যা ইচ্ছে হয় করবেন।

ধীরানন্দবাবু খাটে উঠে বসলেন। তারপর বললেন, বেশ, বলো। ইচ্ছে করলে এই চেয়ারে বসতে পারো। তবে বেশি কাছে আসার চেষ্টা কোরো না।

আগন্তুক আবার একটা টিং টিং শব্দ করে বলল, আমরা আপনাদের মতন বসি না, দাঁড়িয়েই বলছি। আমি যেখান থেকে এসেছি, আলোর গতিতে সেখানে যেতে লাগবে আড়াই হাজার বৎসর। আমি আলোর গতিতেই এসেছি।

ধীরানন্দবাবু হাততালি দিয়ে বললেন, বাঃ! বাঃ! কিন্তু ভাই, কল্পবিজ্ঞানের গল্পে এসব তো পুরোনো হয়ে গিয়েছে, তাহলে তোমার বয়স কত? আড়াই হাজারেরও বেশি, কী বলো? তা-ও বেঁচে আছ, তার চাইতে নতুন কিছু ছাড়ো।

আগন্তুক বলল, না, আলোর গতিতে এলে দেহটা আর বুদ্ধিশীল মরণশীল থাকে না। অবশ্য আমাদের আয়ুও আপনাদের চাইতে অনেক বেশি, প্রায় দশগুণ। আপনাদের সময়ের মাপে এক হাজার বছর বাঁচলে মোটামুটি দীর্ঘজীবী বলা হয় আমাদের গ্রহে।

ঠিক আছে, তুমি বলে চলো। কল্পবিজ্ঞান আমার ভালোই লাগে। তারপরে না-হয় আসল পরিচয়টা দিয়ে।

আগন্তুক বলে চলল, যদিও আপনার যা বয়স, সেটা আমাদের গ্রহের একটি শিশুর বয়স, তবুও আপনি আমাকে তুমিই বলবেন। আপনারা বলেন-না যে–যস্মিন দেশে যদাচার। তা ছাড়া তুমি বললে শুনতে ভালোই লাগে। যা-ই হোক, আমি যখন এই পৃথিবীতে আসি, সেটা আজ থেকে আপনাদের সময়ের মাপেই বলছি–পঁয়তাল্লিশ বছর আগে। আমি আপনাদের দেশের পূর্বদিকে যেখানে নেমেছিলাম, সেখানে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রবল ভূমিকম্প হবে জানতে পেরে একরাত্তিরে চলে এলাম আপনাদের এই পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলের এক গুহায়। সেই রাত্তিরে কেউ আমার মহাকাশযান দেখে ফেললেও হয়তো চোখের ভুল মনে করে থাকবে। সেই ভূমিকম্পটা ঠিক দিনেই হয়েছিল সন্ধেবেলায়। সে দিন বোধহয় আপনাদের কিছু একটা উৎসব ছিল।

হ্যাঁ, স্বাধীনতা দিবস ছিল। সেই হিসেবটা ঠিকই করেছ। বলে যাও।

আগন্তুক বলল, আমি এসে নানান সমস্যায় পড়লাম। যে উদ্দেশ্যে এসেছি, তাতে আমাকে এই পৃথিবীর, বিশেষ করে এই অঞ্চলের ভাষা জানতে হবে। আমার চেহারা অন্যরকম। তাকে পৃথিবীর মানুষের মতো করতে হলে বিশেষ ধরনের সিন্থেটিক মেকআপ লাগাতে হবে। দৈর্ঘ্যটা অবশ্য বেশি বাড়ানো যাবে না। তাতে আপনাদের হিসেবে দু-শো বছর নষ্ট হবে। আমার বয়স বেড়ে যাবে। তার চাইতে কিছুটা বাড়িয়ে মোটামুটি এক বেঁটেখাটো মানুষ হওয়া গেল। একজন জঙ্গল এলাকার মানুষের কাছে ধরা পড়ে গেলাম একদিন। আমি তখন কিছুটা মানুষের সাজ লাগিয়েছি। সেই অদ্ভুত চেহারা দেখে মানুষটা তো ভয় পেয়ে আর্ত-চিৎকার করতে করতে দৌড় লাগাল। সেটা আমার কাছে শাপে বর হল। তাদের কাছে আমি জংলি দেবতা বনে গেলাম। আমার এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করল নিজেরাই। দূর থেকে দূরবিন দিয়ে দেখতাম, ওরা মাঝে মাঝে পাহাড়ের তলায় নানা খাদ্যসামগ্রী, হাঁস-মুরগি, ফুল–এইসব রেখে যেত। রাত্তিরে নীচে গিয়ে হাঁস মুরগিগুলোর বাঁধন খুলে ছেড়ে দিতাম। খাদ্যসামগ্রী কৌতূহলভরে পরীক্ষা করতাম। হাইড্রোজেন, অক্সিজেন আর কার্বনের নানারকম যৌগ। নাইট্রোজেনও আছে। কিন্তু ধাতুর ভাগ কখনও লেশমাত্র, কখনও একেবারেই নেই। আমি নিজে যে টেলিভিশন আর রেডিয়ো বানিয়ে নিয়েছিলাম, তার মাধ্যমে জেনেছিলাম যে, চিনি, গুড়, মিষ্টি–এসব স্বাদ আপনাদের খুবই প্রিয়। মুখ দিয়েই অবাক! থু থু করে ফেলে দিয়ে ভাবলাম, আমাদের শিশুদের মুখে এসব দিলে তারস্বরে কাঁদতে আরম্ভ করবে। বুঝলাম আপনাদের একমাত্র জিবে স্বাদবোধ আলাদা।

মহাকাশযান থেকে নানারকম সরঞ্জাম এনে গুহায় অনেক কিছু যন্ত্র বানিয়ে নিলাম। রেডিয়ো-টেলিভিশন ছাড়াও টেলিসেরিব্রোমিটার, ভাষাশিক্ষক ইত্যাদি। যন্ত্রশিক্ষকের মাধ্যমে তিনটে ভাষা মোটামুটি শিখেছি। ভালো ইংরেজি আর হিন্দি। বাংলা তো বেশ ভালোই বলতে পারছি, তা-ই না? তবে ওইসব দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমে কিছু কিছু হরফ শিখলেও ভাষাগুলো পড়তে শেখা এখনও সম্ভব হয়নি। পৃথিবী সম্বন্ধে কিছু জ্ঞান আমি সেইসব যন্ত্র মারফতই বেশি পেয়েছি। অবশ্য আমার নিজস্ব কম্পিউটারেও অনেক কিছু পেয়েছি। তবুও সেসব যথেষ্ট নয়। তাই প্রথমেই আপনার কাছে এসেছি। টেলিসেরিব্রোমিটারের নামটা অবশ্য পৃথিবীর ভাষায় অনুবাদ করেই বলছি–সেই যন্ত্রে আপনার মস্তিষ্কে পাচ্ছি বিশেষ গভীরতা। বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি না জেনেও বিজ্ঞানমনষ্ক। আপনি আমার পরিচয়ের প্রমাণ চেয়েছেন। সেটাও আমার ভালো লেগেছে। আমার ছোট মহাকাশযানটা আপনার ঘরের পেছনের বাগানে রাখা রাছে, দেখতে পারেন।

ধীরানন্দবাবু জানলা দিয়ে অবাক হয়ে দেখলেন, সত্যিই পোখরাজের পুঁতির মতো অসংখ্য খাঁজকাটা অথচ গোলাকার একটি দেড় মিটার উচ্চতার গোলক বাগানের এক কোণে চাঁদের আলোয় হাজার হাজার জোনাকির মতো ঝিকমিক করছে।

আগন্তুক আবার বলল, আরও কিছু প্রমাণ দিই। তাহলে হয়তো আপনার কাছাকাছি গেলেও আর আপত্তি করবেন না। কারণ আপনি বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি। আমি আপনার গ্রহে থাকলে ভূত হতাম ঠিকই। কিন্তু এখন ভূত নই, প্রবলভাবে বর্তমান। ভবিষ্যটা অবশ্য আপনার সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে। আপনাদের প্রতিবেশী হতে পারব কি না– আমি একা নই, আমার গ্রহের আরও অনেকে। তবে জংলি দেবতারূপে নয়, একেবারে আপনাদের মধ্যে। হ্যাঁ, যা বলছিলাম–আমি যে আপনার পরিচিত পৃথিবীর মানুষের মতো নই, তার অন্তত আর-একটি প্রমাণ দেখানো দরকার। আমাদের জিব অনেকগুলো। পৃথিবীর মানুষের মতো যে জিবটা লাগিয়েছি, সেটা নকল। এই দেখুন–

এক টানে তার জিবটাকে খুলে ফেলল আগন্তুক। ধীরানন্দবাবু তাঁর টর্চটা নিয়ে তার কাছে গিয়ে তার হাঁ-করা মুখের মধ্যে ফেললেন। অবিশ্বাস্য দৃশ্য! পরপর অনেকগুলো জিব –মোটা থেকে ক্রমশ সরু হয়ে গিয়েছে হারমোনিয়ামের রিডের মতো। তিনি টর্চ নিবিয়ে বললেন, তোমাকে বিশ্বাস করেছি। আমার কাছে এসে তোমার কথা বলো–

এই বলে তার হাতটা ধরতেই আগন্তুক বলল, আপনি হাতের যেখানে ধরেছেন, সেটাও কিন্তু কৃত্রিম। স্পর্শে বুঝতে পারছেন? একেবারে পৃথিবীর মানুষের মতো হয়নি। আমাদের আসল হাত কিন্তু অনেক ছোট আর দেখতেও অন্যরকম। অনেকটা আপনাদের কৃষ্ণর পায়ের তলার সাপের মতন। বলেই টিং টিং শব্দ করে বলল, দূরদর্শনে দেখেছি। আর একটা কথা। আপনাদের ভাষা শিখলেও পৃথিবীর মানুষের মতো হাসিকান্নার শব্দ আমরা করতে পারি না। আমাদের হাসির শব্দ তাই ওরকম। বলে টিং টিং শব্দ করে হেসে উঠল।

ধীরানন্দবাবু তাকে কাছে টেনে নিয়ে নিজে খাটে বসলেন। আগন্তুক তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, আমি যে জন্য এসেছি, এবার সেটা বলি–আমাদের গ্রহ থেকে যখন রওনা হয়েছি, তারপর থেকে সেখানে আমাদের নিয়মে আড়াইশো বছর কেটে গিয়েছে। তখনই গ্রহটা হয়ে যাচ্ছিল বাসের অযোগ্য। এখন হয়তো আরও খারাপের দিকে গিয়েছে। সেই গ্রহে সবাই তথাকথিত শিক্ষিত। কিন্তু বেশির ভাগেরই ভেতরের মনটা অশিক্ষিত। আপনাদের কোনও এক বোকা লোক গাছের যে ডালে বসেছিল, তারই গোড়া কাটছিল। পরে অবশ্য সে বুদ্ধি লাভ করেছিল। কিন্তু আমাদের গ্রহে তাদের সেই উত্তরণ আর হয়নি। যে যা ইচ্ছে করছে নিজের আপাতসুখের জন্য। তাতে বাতাস, জল সব দূষিত-বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতিকে জয় করার নেশায় ভারসাম্যরক্ষাকারী বন্ধু প্রকৃতিকে হত্যা করছে। তাতে এক দেশ শত্রুতা করে অন্য দেশের জ্বালানিতে আগুন ধরিয়ে ভাবল, সেই দেশের বাতাস বুঝি দেশের বাইরে আর যাবে না। তা ছাড়া নানারকম মারাত্মক মারণ-অস্ত্রের পরীক্ষার প্রতিযোগিতা চলে। যুদ্ধ না হলেও সারা বছরই চলছে যুদ্ধের দূষণ। মানুষের সংখ্যা এত বেড়ে যাচ্ছে যে, গ্রহ জুড়ে শুধু বহুতল। খাদ্য সবই কৃত্রিম উপায়ে সংশ্লিষ্ট করে তৈরি হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক খাদ্যের মতো দেহে নিতে না পেরে অনেক নতুন রোগের জন্ম হচ্ছে। জমির খাদ্য তো অমিল হয়েছিলই। সামুদ্রিক খাদ্যও অমিল সমুদ্র দূষিত হওয়াতে। সামুদ্রিক জীবের মূর্তি জাদুঘরে দেখছে ওখানকার শিশুরা। উঁচু বাড়িতে মাটির স্পর্শ থেকে দূরে থাকা শিশুরা চব্বিশ ঘণ্টার তদারকিতে অনুভূতিহীন জড়বুদ্ধি অথচ বুদ্ধিমান রোবটে পরিণত হচ্ছে। আর আছে এক সনাতন সমাজ পরিচালনব্যবস্থা। সাধারণত আরও বেশি অশিক্ষিত মানসিকতার লোকরাই শাসনব্যবস্থার ভার নেয়। হয় এক দল, নয়তো অন্য দল। তাদের প্রথম নীতিই হল, নিজেদের দল কখনও অন্যায় করতে পারে না। অন্য দলের সব কিছু অন্যায়-অবিচার। আমরা তাই কিছু কিছু সুস্থ মনের গ্রহবাসী আপনাদের এই গ্রহে এসে আপনাদের পাশাপাশি

থামো থামো! প্রায় চিৎকার করে উঠলেন ধীরানন্দবাবু। এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো আগন্তুকের কথা শুনে যাচ্ছিলেন। এবার বললেন, তুমি এতক্ষণ কী বললে, গ্রহান্তরের অধিবাসী? এ যে আমাদের পৃথিবীরই কথা। আমাদের এই গ্রহেরও দূষণে প্রচণ্ডরকম দুর্যোগ হচ্ছে। হয়তো যুগান্তকারী ধ্বংসলীলার পায়ের শব্দও শোনা যাচ্ছে। যা তাপ উৎপন্ন হচ্ছে, তাতে মেরুদেশের বরফ গললে সমুদ্রের জল বেড়ে তা ডুবিয়ে দেবে অনেক দেশ। আকাশে দূষণের আবরণ পৃথিবীর তাপকে বেরিয়ে যেতে দিচ্ছে না। তাতে সমুদ্রে তাপ বেড়ে ফেঁপে-ফুলে উঠে প্লাবন ঘটাতে পারে একদিন। কে জানে, আমাদের প্রতিবেশী মঙ্গল গ্রহও এইভাবে ধ্বংস হয়েছিল কি না একদিন। পৃথিবীর জ্বালানি তেলের ভাণ্ডার ফুরিয়ে আসছে। তবুও এক দেশ অন্য দেশের তেলের ভাণ্ডার দিল জ্বালিয়ে। তাতে সমগ্র পৃথিবীর কয়েক বছরের প্রয়োজন কয়েকদিনেই ধোঁয়া হয়ে শুধু মিলিয়েই গেল না, আমাদের বাতাসকেও দূষিত করে দিল। সমুদ্রের ওপর একটা দেশের সমান এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সেই তেল। বোকা কালিদাসেই চারদিক গিজগিজ করছে। তারা দিনরাত নিজের নাক কেটে চলেছে। আর লোকসংখ্যা! এই গ্রহে এক মহাপুরুষ জন্মেছিলেন, নাম গৌতম বুদ্ধ

আগন্তুক বলল, শুনেছি তাঁর কথা। তিনিই প্রথম মানুষ, যিনি পৃথিবীকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন। শোষণ, অসাম্য, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ।

ধীরানন্দবাবু অবাক হয়ে গেলেন আগন্তুকের কথায়। বললেন, বুদ্ধর সময় সমগ্র পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল পাঁচ কোটি, যা এখন পাঁচটা বড় শহরের লোকসংখ্যার সমান। এই হার বেড়েই চলেছে।

আগন্তুক বলল, এটাই স্বাভাবিক। একটা পদ্ম রোজ দ্বিগুণ হতে হতে অর্ধেক পুকুর ভরতে বেশ কিছু দিন লাগবে। কিন্তু পুরোটা দখল করতে লাগবে আর মাত্র এক দিন।

ধীরানন্দবাবু বললেন, আর দুঃখটা কী জানো? এইসব দূষণ-ক্ষতি সবচাইতে বেশি করছে শিক্ষিত সমাজ আর দেশের মাথারা। ওইসব জংলি লোক নয়। ওরাই–

থাক থাক। বাধা দিয়ে আগন্তুক বলল, আর বলতে না। আমি ভুল গ্রহে নেমেছি। দেখি, অন্য কোনও জগতে বাসের উপযোগী গ্রহ খুঁজে পায় কি না আমার মহাকাশযানের টেলিবায়োডিটেক্টর। শুধু শুধু সাড়ে চার বছর, মানে পৃথিবীর পঁয়তাল্লিশ বছর নষ্ট হল। তবে এই পৃথিবীতে এসে একটা লাভ হল, সেটা আপনার সাক্ষাৎ পাওয়া। তাই আপনাকে একটি যন্ত্র উপহার দিয়ে যাব, যেটা এই পৃথিবীতে প্রথম ব্যবহার করি, এখানে পদার্পণের পরেই। এই বলে স্কেটিং করার মতো মসৃণ গতিতে দরজা দিয়ে বেরিয়ে বাগানের মহাকাশযানে ঢুকল সে। পরে দরজা দিয়ে আবার বেরিয়ে এল একটা ছোট ক্যালকুলেটারের মতো যন্ত্র হাতে নিয়ে।

ধীরানন্দবাবুর হাতে সেটা দিয়ে সে বলল, এটা ভূমিকম্পের পূর্বাভাস জানাবে। সেই ভূমিকম্প পৃথিবীর যেখানেই হোক-না কেন, যদি তা একটা বিশেষ মাত্রার ওপর হয়। এই পর্দাতে একটা পৃথিবীর প্রতিকৃতি ঘুরে যাচ্ছে। তার কৌণিক গতি পৃথিবীর চাইতে প্রায় দেড় হাজারগুণ বেশি। অর্থাৎ প্রতি মিনিটে একবার ঘোরে। এই পৃথিবীর ছবি আমি নিয়েছি মহাকাশ থেকে। ভূমিকম্প হওয়ার সাত দিন আগে যন্ত্রটা কেঁদে উঠবে একটা মানুষের বাচ্চার কণ্ঠস্বরে। আর ভূমিকম্পের কেন্দ্রে একটা আলো জ্বলবে আর নিববে। কান্নাটা দু-মিনিট স্থায়ী হলেও আলোর জ্বলা-নেবা চলবে চব্বিশ ঘণ্টা ধরে। বিদায় পৃথিবীর বন্ধু!

গ্রহান্তরের আগন্তুক ধীরানন্দবাবুর হাতটা ধরল তার নকল হাত দিয়ে, তারপর হাত-পা আর সারা অঙ্গ থেকে খুলে ফেলল অগুনতি ব্যান্ডেজের মতো টুকরো। ধীরানন্দবাবু নির্বাক হয়ে দেখলেন, একটা ডলফিনের মতো জীব মসৃণ গতিতে চলে গেল তাঁর বাগানে। কিছুক্ষণ পরেই একটা ঝলমলে ক্রিকেট বলের মতো পাক খেয়ে হঠাৎ আলোর ঝলকানি খেলিয়ে চোখের পলকে তারায় ভরা আকাশে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই মহাকাশযান।

তারপর থেকে রোজ ধীরানন্দবাবু ড্রয়ার থেকে যন্ত্রটা বের করে দেখতেন। কারণ কান্নার দু-মিনিট তিনি ঘরে না-ও থাকতে পারেন। আজ সকালে একটা সমাজসেবামূলক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। এসে দেখেন ড্রয়ারে যন্ত্রটা নেই।

ধীরানন্দবাবুর সঙ্গে তাঁর বাড়ি গেলাম। দেখলাম সেই নকল দেহাবরণের টুকরোগুলো। ধীরানন্দবাবু বললেন, মনে হয়, রবারের মতো গাছের রস থেকেই এগুলো তৈরি করেছিল সে। দেখেছ, একেবারে মানুষের মাংসপেশি আর ত্বক বলে মনে হচ্ছে। তবে পচে না গিয়ে এগুলো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। জানি না, সংরক্ষণের কী উপায় সে জানত।

বাড়িতে সর্বক্ষণের বাইরের লোক বলতে গদাই। কিন্তু তার মতো পুরোনো আর বিশ্বস্ত লোককে সন্দেহ করার কথাটা পাত্তাই দিলেন না ধীরানন্দবাবু। তবুও গদাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করলাম। গদাই বলল, যন্ত্র সে দেখেছে। বড় দাদাবাবু আমেরিকা থেকে পাঠিয়েছেন। ছোট দাদাবাবুর পড়ার টেবিলে যে ঘোরানো যায়, এরকম একটা পৃথিবী ছিল, সেরকমই একটা পৃথিবীর ছবি ওটার মধ্যে ঘুরতে দেখা যায়।

অন্য কাউকে যন্ত্রটার কথা বলেছে কি না জানতে চাইলে গদাই বলল, হরিকে বলেছি। দাদাবাবু আমার জন্যে সোয়েটার পাঠিয়েছেন, সেটা দেখিয়েছি। হরি বলেছে ওর জন্যেও একটা পাঠাতে। বাবুকে বলেছি।

শুনলাম, হরি মাঝে মাঝে এসে বাগানের কাজ করে। গদাইয়ের সঙ্গে তাসও খেলে। হরিকে পাকড়াও করতেই সে কেঁদে ফেলে অপরাধ স্বীকার করল। বলল, সে লোভে পড়ে ওটা চুরি করেছিল। ওরকম জিনিস সে দেখেনি, তাই। বিক্রি করার জন্য নয়। ওটা চুরি করে নিয়ে যখন সাঁকো পার হয়ে বাড়ি যাচ্ছিল, তার মনে হল, পাশে একটা বাচ্চা কাঁদছে। অথচ আশপাশে কেউ ছিল না। সে ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তখন মনে হল, কান্নাটা তার পকেট থেকে আসছে। সে যন্ত্রটা বের করেই বুঝল, সেই যন্ত্রটাই কাঁদছে। তখন এত ভয় পেয়ে গেল সে এই ভূতুড়ে কাণ্ডতে, যে নীচে নদীর জলে ফেলে দিল সেটা। এই বলে দু-জনের পা জড়িয়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল হরি।

ধীরানন্দবাবু হতাশ ভঙ্গিতে ধপ করে বসে পড়লেন চেয়ারে। তারপর হঠাৎ যেন চমকে উঠে বললেন, যন্ত্রে আর কিছু দেখেছিস?

কাঁদতে কাঁদতে হরি বলল, সে একটা তারা দেখেছে, জ্বলছে আর নিবছে।

 কোন দেশে? উৎকণ্ঠিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

 হরি বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকল।

আমি বলাম, এত বুদ্ধি ওর ঘটে নেই, মেসোমশাই, আমি ওর ব্যবস্থা করছি।

 ধীরানন্দবাবু ডান হাতটা তুলে বললেন, থাক, বদু, যা হবার তা হয়েইছে। হরি অজ্ঞ, পেশাদার চোরও নয়। লোভ আর কৌতূহলেই এটা করে ফেলেছে। ওকে ছেড়ে দাও।

লজ্জা আর নিষ্কৃতিতে কাঁদতে কাঁদতে হরি বিদায় নিল।

আজ দু-বছর পরে ব্যক্তিগত স্মৃতিকথার পাতায় যখন এই কাহিনি লিখছি, তখন ধীরানন্দবাবু আর নেই। হরিকে ধরার সপ্তাহখানেক পরে একদিন ছুটতে ছুটতে আমার কাছে থানায় এসেছিলেন। সেই শেষ দেখা। তারপরে হঠাৎ একটা কাজে কয়েক সপ্তাহের জন্য কলকাতায় চলে আসতে হল আচমকা। সেখানে পেলবের টেলিফোনে তাঁর মৃত্যুসংবাদ পাই।

লিখতে ভুলে যাচ্ছিলাম আমি, সেবার আমার কাছে হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিলেন, আজকের খবরটা শুনেছ, বদু?

কাজের চাপে সে সুযোগ হয়নি।

কথাটা জানাতেই তিনি উত্তেজিতভাবে বললেন, বলেছে, বলেছে। আজ ভূমিকম্প হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রাতে! আগে জানলে আমি সেখানকার প্রেসিডেন্টকে টেলিগ্রাম করে সতর্ক করে দিতাম। ক্ষয়ক্ষতি, প্রাণহানি তাতে কমত অনেক। বলেই হতাশভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে তিনি চলে গেলেন।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টকে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর বিশ্বাসযোগ্যতা কীভাবে বোঝাতেন, সেটা আর আমি জিজ্ঞেস করার অবকাশ পাইনি।

[সন্দেশ, শারদীয়া ১৪০৫]