পিছনে পায়ের শব্দ

পিছনে পায়ের শব্দ

০১.

 অরীন্দ্র হাতের কালো ছড়িটি তুলে বললেন, ওই দেখ!

সাবর্ণী আস্তে বলল, কী? তার কণ্ঠস্বরে অন্যমনস্কতা ছিল। জঙ্গুলে জায়গায় একটা জরাজীর্ণ দোতলা বিশাল পোড়ো বাড়ির ভাঙাচোরা সিঁড়ি বেয়ে উঁচু ছাদে ওঠার ক্লান্তিও ছিল। তাছাড়া সে যথেষ্ট বিরক্তও। টাউনশিপের কাছাকাছি কোনও সুন্দর বাংলোই সে আশা করেছিল। তার বদলে প্রিয়গোপাল পুরনো বসতি এলাকায় তার দাদামশাইয়ের বাড়িতে তুলেছে। তারপর অফিসের কাজের নামে যখন-তখন উধাও। আর এই দাদামশাইও ঘত অদ্ভুত, তত বিরক্তিকর। কথায়-কথায় ফিসফি এবং রঙচড়ানো কোনও স্থানীয় বৃত্তান্ত নিয়ে বকবক করেন। সমস্যা হল, এই মফঃস্বলি বৃদ্ধ ভদ্রলোক বোঝেন না, যে-জিনিসগুলিকে তিনি প্রচণ্ড গুরুত্ব দিতে চাইছেন, তা একেবারেই অকিঞ্চিৎকর। সম্ভবত একটা বয়সে মানুষ নিজের প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে খুব মূল্যবান মনে করে। অরীন্দ্র নাতবউকে এক দিনে তত বুঝতে পারেননি এবং এ মুহূর্তে লক্ষ করছিলেন না। তার দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী। ছড়ি তুলে ধরে উদাত্ত স্বরে বললেন, মরুভূমি এবং সমুদ্রের আশ্চর্য সহাবস্থান। তারপর একটু হাসলেন! তুমি বোধ করি জান না, এখানে অনেক ফিল্মের শুটিং হয়েছে। সবে তো ডিসেম্বর চলেছে। মরশুমি হাঁসের মতো ওদের আসারও সময় হয়ে এল। তখন কিন্তু লোকে লোকারণ্য। ওই রাস্তার দু’ধারে মেলা বসে যায়। পুলিশ আসে। লাঠিও চলে।

অগত্যা সাবর্ণী একটু আগ্রহের ভান করল। নদীটা বেশ বড় দেখছি। নাম কী এ নদীর?

অরীন্দ্ৰ হা হা করে হাসলেন। গঙ্গা! গঙ্গা ছাড়া আর কী হতে পারে? ওই দেখ, এখনই কুয়াশায় ঢেকে গেছে, বড় একটা চর। চরে বসতিও আছে। কাল নৌকো করে ঘুরে আসা যাবে বরং। তোমার পি জি আসুক। বলছি!

প্রিয়গোপালকে পি জি করেছে পিউ। সাবর্ণীর বোন। পিউ বুদ্ধিমতী এবং তার অবশ্য সুযোগও ছিল অরীন্দ্রের হাত থেকে পালানোর। সামান্য দূরে ইরিগেশন ক্যানেলের ব্রিজের ওদিকে গেছে। রাণুদি, সাত্যকি এবং পিয়ালির সঙ্গে। ওদের গাইড ভগীরথ তার কর্তার মতোই বুড়ো এবং শক্তসমর্থ মানুষ।

কিন্তু অরীন্দ্রের বড়ো ইচ্ছা ছিল নাতবউকে উনিশ শতকের রেশমব্যবসায়ী ক্লিপটন সায়েবের এই বিখ্যাত কুঠিবাড়ি দেখাবেনই। বাড়িটি যত না দেখার, ছাদটি নাকি তত বেশি দেখার যোগ্য। সিঁড়ির দিকটা ভেঙে পড়েছিল। ধ্বংস্কৃপ সরিয়ে সিঁড়িটি পরিষ্কার রেখেছেন পর্যটন দফতর, তাতেই নাকি এর গুরুত্ব বোঝা যায়। এই হল অরীন্দ্রের অভিমত। তবে সাবর্ণীর অবাক লাগছিল, সত্তরের কাছাকাছি বয়স এমন একজন মানুষ প্রায় হাফ কিমি পায়ে হেঁটে এক দমে পাথরের সিঁড়ি বেয়ে এত উঁচু ছাদে উঠতে পারলেন!

সাবর্ণী পশ্চিমের রেলিঙের দিকে পা বাড়াল! পিউদের দলটাকে দেখার ইচ্ছা ছিল। অরীন্দ্র বললেন, ওদিকে কী? এদিকটায় এস। আসল জিনিসটাই তো এদিকে। কিন্তু সাবধান, বেশি ঝুঁকবে না।

সাবর্ণী ঘুরে আস্তে বলল, কী ব্যাপার?

হাসলেন অরীন্দ্র। মূর্তিমান ভয়ঙ্কর বলতে পারো। আমার দেখে দেখে সয়ে গেছে। কিন্তু সত্যিই ভয়ঙ্কর। তোমার বিচ্ছু বোনটি আমাকে ফিলসফারদাদু বানিয়ে ফেলেছে। হাত ফসকে না পালালে ওকে হাতেনাতে বুঝিয়ে দিতুম, নেচারই মানুষকে ফিলসফার বানিয়ে ছাড়ে।

সাবর্ণী আস্তে এগিয়ে যাচ্ছিল উত্তরের আলিসার দিকে। অরীন্দ্র তার পাশে গেলেন। ফের বললেন, এক মিনিট। খাদ দেখলে অনেকের মাথা ঘুরে ওঠে। এও দেখেছি, কেউ-কেউ হিস্টেরিক হয়ে পড়ে। সাবধান!

এদিকে খাদ বুঝি?

নিছক খাদ বলা ঠিক হবে না। একটা গভীর দহ। অরীন্দ্র সাবর্ণীর আগে গেলেন। একটু হেসে ফের বললেন, তোমার পি জি আমাকে তোমার বডিগার্ড বহাল করেছে। তোমার ভালমন্দের দায়িত্ব…..।

আলিসার হাত চারেক তফাতে থমকে দাঁড়াল সাবর্ণী। ভুরু কুঁচকে অরীন্দ্রের কথার ওপরে বলে উঠল, তার মানে?

অরীন্দ্র কথাটা হাসিতে উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে বললেন, তোমার সামনেই তোমার বোন বলছিল, এই মহিলা সম্পর্কে সাবধান। ইনি বড্ড খেয়ালি। যাই হোক, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি তোমার বডিগার্ড, এটা রূঢ় সত্য। কারণ সামনে রাক্ষুসে খাদ। আমি এও জানি না, অমন একটা ভয়ঙ্করের মুখোমুখি তোমার কী রিঅ্যাকশন হবে। এস!

সাবর্ণী জেদ করেই এগিয়ে আলিসায় বুক রেখে ঝুঁকল। তার খুব কাছে অরীন্দ্র। মুখে মিটিমিটি হাসি। সাবর্ণী নীচের খাদের দিকে তাকাল। কিন্তু দৃষ্টিতে শূন্যতা ছিল। খাদটা খুবই গভীর আর ভীষণ কালো, এর বেশি কিছু মনে হল না তার। অবশ্য সোজা নেমে যাওয়া পাথরের দেয়াল দেখে একটু অস্বস্তিকর অনুভূতি হচ্ছিল এই যা। দেয়ালের ফাটলে ঝোপঝাড় গজিয়েছে এখানে। ওখানে। সাবর্ণী দৃষ্টি সামনে রাখল। দূরে ও কাছে বালিয়াড়ির ওপর হিম বিকেলের নরম রোদ পড়েছে। বুনো হাঁসের ঝাক ওড়াওড়ি করছে। এত উঁচুতে ধীরে যে বাতাস বইছিল, তা ক্রমে কনকনে ঠাণ্ডা হিম হয়ে উঠেছে। বুটিদার নীলচে স্কার্টটা আলতো হাতে গায়ে জড়িয়ে সাবর্ণী একটু বাঁকা হাসল। আমার কোনও রিঅ্যাকশন হচ্ছে না কিন্তু!

হচ্ছে না, তার কিছু ব্যাখ্যা আছে। অরীন্দ্র ভরাট গলায় বললেন। চাইলে দিতে পারি। চাও কি?

সাবর্ণী শুধু তাকাল।

আলোর অভাব। বিকেল গড়িয়ে গেছে, তাতে শীতের বিকেল। অরীন্দ্র খাদের দিকে একটু ঝুঁকে বললেন, সবটাই কালো রঙে ঢেকে গেছে তাই। আমি বলছিলুম, দেখে দেখে সয়ে গেছে। কিন্তু সব সময় নয়। অক্টোবরে আমার এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলুম। তিনি একজন রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার। তো তখন দুপুর। উজ্জ্বল রোদ ছিল। ঝুঁকে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ল…

উনি হঠাৎ থেমে গেলে সাবর্ণী বলল, কী দেখলেন?

— নাহ্। থাক। অরীন্দ্র পা বাড়ালেন। চলো, ফেরা যাক।

সাবর্ণী তাঁকে অনুসরণ করে চেষ্টাকৃত কৌতুকে বলল, ভুতুড়ে ব্যাপার নয় তো?

হাসলেন অরীন্দ্র। বলতেও পারো। আসলে ভয়ঙ্কর কোনও শূন্যতার সামনে পড়লে কোনও কোনও মুহূর্তে মানুষের মাথা খারাপ হয়ে যায়। পতনেরও একটা টান আছে বোঝা যায়। ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করে।

আপনার ইচ্ছে করছিল বুঝি? সাবর্ণী একটু হাসল।

আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রশ্ন নয়। অরীন্দ্র গম্ভীর হলেন। এ বয়সে অন্তত এই একটা ব্যাপার বুঝে গেছি, আমার নিজের আড়ালে কেউ আছে, আমি তার হাতে ধরা আছি। তুমি তোমার বোনের মতো আমাকে ফিলসফার বলতেও পারো। তবে এটা ফিলসফি নয়, সামথিং ন্যাচারাল। কেউ আড়ালে থেকে কাজ করছে, টের পাই।

সিঁড়ির মাথায় গিয়ে ছড়ির ডগায় ঘেঁড়া শুকনো একটুকরো গুল্ম সরিয়ে অরীন্দ্র ফের বললেন, গত অক্টোবরে তোমার বয়সী একটি মেয়ে আশাপুরা থেকে এখানে বেড়াতে এসেছিল। হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে তাকে ওই খাদের জলে পাওয়া গেল। জেলেদের জালে বডিটা আটকেছিল। নইলে কেউ জানতেই পারত না।

সাবর্ণী এবার একটু চমকে উঠল, সে কী!

 পুলিশ অনেক কিছু বলেছিল। কিন্তু আমি জানি কী ঘটেছিল।

আপনি জানেন?

সিঁড়িতে সাবধানে নামতে নামতে অরীন্দ্র বললেন, জানি মানে প্রত্যক্ষদর্শী নই। কিন্তু আমি কারেক্ট। ব্যাপারটা নিয়ে আমার সেই বন্ধুর সঙ্গে ডিটেলস আলোচনা করেছিলুম। তিনিও সায় দিয়েছিলেন। এমনটি খুবই সম্ভব। কথায় কথায় ওঁর কাছে শুনেছিলুম, দিল্লিতে কুতুবমিনারে নাকি একা ওঠা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বুঝতে পারছ?

হুঁ। সাবর্ণী একটু হাসল। কিন্তু যে সুইসাইড করবে, সে এই পোডড়া কুঠির ছাদে উঠে জলে ঝাঁপ দেবে কেন? আরও তো কত সহজ উপায় আছে।

দ্যাটস দ্য পয়েন্ট। তুমি নিজেই নিজের কথা থেকে উত্তর খুঁজে নাও। অরীন্দ্র একটু দাঁড়িয়ে আগের মতো সহজ সুরে বললেন। তুমি কলকাতার মেয়ে। নিশির ডাকের গল্প জান না। সন্ধ্যার আসরে বলব’খন। ব্যাপারটা সাইকলজিক্যাল। নিজেই নিজেকে মৃত্যুর দিকে ডেকে নিয়ে যায় মানুষ। সে দিক থেকে ওই খাদটার একটা ভূমিকা আছে।

সাবর্ণী পাশ কাটিয়ে একটু জোরে নামতে থাকল। সহসা তার মধ্যে বালিকার চাঞ্চল্য এসে গিয়েছেল। পিউ দেখলে অবাক হত। দুই বোন পরস্পর উল্টো। নীচের চত্বরে দুধারে গুছিয়ে রাখা পাথরের স্তূপে জঙ্গল গজিয়ে আছে। থোকা-থোকা ফুল বেশি করে চোখে পড়ে। সাবর্ণী কয়েকটা ফুল ছিঁড়ে নিয়ে দেখল অরীন্দ্র আবার দাঁড়িয়ে গেছেন। সে বলল, আসুন। রাণুদিরা কোথায় দেখি।

অরীন্দ্র ছড়ি তুলে বললেন, ওই যে ক্লিফটনের কবর। ক্রস আর ফলকটা চোরে উপরে নিয়ে গেছে। দেখবে চলল!

কবর দেখার কী আছে?

 ক্লিফটন ওয়াজ আ পয়েন্ট। ফলকে সুন্দর করে একটা কবিতা খোদাই করা ছিল। নিজের এপিটাফ নিজেই লিখে গিয়েছিলেন। অরীন্দ্র অগত্যা এগিয়ে এলেন সাবর্ণীর দিকে। গাইডের ভঙ্গিতে বললেন, জনসাধারণের এই স্বভাব। ক্লিফটনগঞ্জকে লিটনগঞ্জ করে ছেড়েছে। তুমি নিশ্চয় জানতে না লিটনগঞ্জ আসলে ক্লিফটনগঞ্জ?

তাই বুঝি?

কিন্তু তুমি এত কম কথা বলো কেন? অরীন্দ্র হাসলেন। দম্পতি হিসেবে তোমাদের জুটিটি খাসা। উভয়েই মৌনী সাধু-সাধুনী। নাহ্, এও তোমার বিচ্ছু বোনের মন্তব্য। তবে প্ৰিয়টা এমন কাজের ছেলে হয়ে উঠেছে, অবিশ্বাস্য! তোমার বোনের মতে, কথা কম কাজ বেশি। আমি তোমার বোনের প্রেমে পড়ে গেছি। দোষ নিও না।

গেটের বাইরে গিয়ে সাবর্ণী বলল, রাণুদিরা কোথায় গেলেন বলুন তো?

ছড়ি তুলে অরীন্দ্র বললেন, ওই দেখ। আমি বুড়ো মানুষ। তুমি নবযুবতী। তোমার চেয়ে আমার দৃষ্টিশক্তি কত প্রখর দেখ।

পশ্চিম ও দক্ষিণে নীলচে টিলাপাহাড়গুলি এখন রঙিন দেখাচ্ছে দিনশেষের আলোয়। একটু দূরে আবছা দেখা যাচ্ছে ইরিগেশন ক্যানেলের ব্রিজ। সেখানে সাদা রঙের একটা মোটরগাড়ি। সাবর্ণী বলল, আপনি কিন্তু ওই সাদা গাড়িটা দেখতে পাননি!

গাড়ি? কোথায় গাড়ি?

 ওই তো।

অরীন্দ্র লক্ষ করে দেখে বললেন, কেউ বা কারা বেড়াতে এসেছে। মেলামেশা দেখে মনে হচ্ছে বাঙালি এবং সম্ভবত…হঁউ, সবাই গাড়িতে উঠেছে দেখছি। চেনাজানা কারও গাড়িই হবে।

সাবর্ণী একটু বিরক্ত হয়ে বলল, কোনও মানে হয়?

হয়। তোমার পি জি তো তার গাড়ি নিয়ে নিখোঁজ। তোমরা যে একটু চক্কর মেরে বেড়াবে, সেদিকে লক্ষ নেই হতচ্ছাড়ার। এখানে এসেও কাজ। রোসো, দেখাচ্ছি মজা।

গাড়িটা ওদিকে কোথায় যাচ্ছে?

আমার প্রেমিকাকে তুলে নিয়ে পালাচ্ছে। রসিকতা করলেন অরীন্দ্র। পালাক না রাণু আছে। সাত্যকিকেও কম ভেবো না। রোজ দু’বেলা বালির বস্তার সঙ্গে ঘুসোঘুসি করে। পিয়ালিটা অবশ্য ছিচকাঁদুনে। কিন্তু ও যত কাঁদবে, সাত্যকি তত লড়ার জোর পাবে।

অরীন্দ্র গলা নামিয়ে ফেল বললেন, তুমি কি টের পাওনি, ওরা প্রেমিক প্রেমিকা?

তার চোখে ঝিলিক এবং মুখে দুষ্টুমির জলছবি। সাবর্ণী একবার তাকিয়ে দেখে দৃষ্টি দূরে সরাল। সাদা গাড়িটা ক্রমশ অস্পষ্ট হতে হতে কুয়াশার ভেতর হারিয়ে গেল। বুনো ফুলগুলি রাগ করে ফেলে দিয়ে সে আস্তে বলল, চলুন, ফেরা যাক। ঠাণ্ডা লাগছে।

অরীন্দ্র তার স্কার্ফের দিকে তাকিয়ে বললেন, ক্লিফটনগঞ্জের ডিসেম্বর আর কলকাতার ডিসেম্বর এক জিনিস নয়। বেরুনোর সময় আমার লক্ষ করা উচিত ছিল। কিন্তু আমার প্রেমিকা তোমার চেয়ে বুদ্ধিমতী। পাতলুন জ্যাকেট পরে বেরিয়েছে। আবার বলে কী, মাই ডিয়ার গ্রান্ড ওল্ড ফেলো! আই অ্যাম আ পার্সন। মেয়ে-ফেয়ে বলা চলবে না। কী অদ্ভুত!

সাবর্ণী অন্যমনস্ক হাঁটছিল। অরীন্দ্র পুরুষ এবং মেয়ে নিয়ে সমানে কথা বললেন, সে শুনছিল না। রাস্তা তত চওড়া নয়। পিচের মোড়ক ফেটে কালো কালো পাথরকুচি ছড়িয়ে পড়েছে। দুধারে ঝোপঝাড়, একটা করে গাছ। তাকালে ভীষণ জ্যান্ত লাগে। একটু পরে সাবর্ণী বুঝতে পারল, যে চাপা অস্বস্তিটা সে কলকাতা থেকে এতদূরে বয়ে এনেছে, ক্রমশ সেটাই জোরালো হয়ে তাকে উত্ত্যক্ত করছে। তাই এখানকার কোনও কিছুতে সে মন দিতে পারছে না।

কোম্পানির কাজে প্রিয়গোপাল প্রায়ই বাইরে যায়। কিন্তু কাজের জন্য বাইরে গেলে সাবর্ণীকে কোনওবার সঙ্গে নেয় না। ব্যাপারটা এই প্রথম। দুদিন আগে সন্ধ্যা ছটায় যখন অফিস থেকে ফিরল, তখন পিউ ছিল ফ্ল্যাটে। এখানে আসার প্রস্তাব সে সরাসরি পিউকে দিল। স্মার্ট পিউ অবশ্য তক্ষুনি চার্জ করেছিল, এই লোভনীয় অফার পি জি সায়েবের বউয়েরই পাওনা। ম্যানার্স জানা উচিত। তারপর তীক্ষ্ণ হাসিতে ফালাফালা করে ফেলেছিল প্রিয়গোপালকে। কিন্তু তখন খটকা লাগেনি, এখন কেন যেন লাগছে। পিউকে কেন সঙ্গে আনল প্রিয়গোপাল? সাবর্ণীকে এড়িয়ে থাকবে বলে? তা হলে কি ডাকে আসা সেই চিঠিটা কোনওভাবে তার চোখে পড়েছে?

সাবর্ণী একটু চমকে উঠল। স্ত্রীর চিঠি পড়ার অভ্যাস প্রিয়গোপালের আছে কি? অন্তত এ তিনমাসে তেমনটি দেখেনি সাবর্ণী। তাই চিঠিটা একটা পত্রিকার ভেতর রেখে দিয়েছিল, আরও খুঁটিয়ে পড়বে বলেই। তা ছাড়া ওটা একটা অপমানজনক ক্ষত। জানে জ্বালা করবে। তবু ক্ষত বারবার দেখা এবং একটু খোঁচাখুঁচি করা যেন মানুষের অভ্যাস।

স্মৃতি যদি গণ্ডগোল না করে, চিঠিটা রাখা ছিল মেয়েদের পত্রিকার শরীরচর্চা। ফিচারটির ভেতর। অথচ এখানে আসার জন্য গোছগাছ করার সময় সেটা। ফিল্মস্টারদের পাতার ভেতর আবিষ্কার করেছিল।

পিউয়ের কাজ? পিউ নাকগলানে স্বভাবের মেয়ে। দিদির চিঠি সে কি পড়েছে?

 কিন্তু অমন চিঠি পড়লে পিউয়ের একটা দারুণ প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা। অনির্বাণকে পিউ ভাল চেনে। যা যা ঘটেছিল, সবই জানে। পিউকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল সাবর্ণীর।

একটা ব্যাপার এ মূহুর্তে অদ্ভুত লাগছে। গাড়িতে সারা পথ যেমন, তেমনই গতরাতে এখানে পৌঁছুনোর পর থেকে প্রিয়গোপাল কেমন অন্যমনস্ক আর গম্ভীর। রাতে গায়ে হাত রাখলে হঠাৎ কেন বলে উঠল, ভীষণ টায়ার্ড? সাবর্ণী বুঝতে পারছিল, প্রিয়গোপাল ঘুমুনোর ভান করে জেগেই আছে।

সকালে তাড়াহুড়োয় ব্রেকফাস্ট করে বেরুনোর আগে সাবর্ণীর সামনে দৃষ্টিকটুভাবে পিউকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে আদর করারও কি অন্য অর্থ আছে? কেন শ্যালিকাকে সঙ্গে আনার জন্য এত আগ্রহ হল প্রিয়গোপালের?

আরও একটা কথা। দাদামশাইকে বলে গেল, রেশমকুঠির বিখ্যাত ছাদটা দেখিয়ে আনবেন! তারীন্দ্রের কাছে জানা গেল ছাদটার পিছনে একটা ভয়ঙ্কর খাদের কথা! প্রিয়গোপাল ‘বিখ্যাত’ কথাটা যোগ করেছিল, এখন স্পষ্ট মনে পড়ছে।

এবং অরীন্দ্র বলছিলেন, তাঁকে সাবর্ণীর বডিগার্ড করে গেছে প্রিয়গোপাল! সত্যিই, নাকি নিছক কৌতুক?

দিনশেষের ধূসরতা, কুয়াশাও ক্রমে গাঢ়, হোঁচট খেল সাবর্ণী। অরীন্দ্র পাশ থেকে ধরে ফেললেন। পরনারীর অঙ্গস্পর্শ করতে হল! তিনি পূর্ববৎ রসিকতায় হাসলেন। তবে ভয়ের কিছু নেই রে ভাই! তোমার বোন হলে খুশি হওয়া যেত! লাগল নাকি?

নাহ।

তুমি…মানে তোমার চেহারা এক, আর তুমি অন্যরকম। বড্ড নিষ্প্রাণ! কেন? আমার সংসর্গ তোমার খারাপ লাগছে?

সাবর্ণী হাসবার চেষ্টা করল। খারাপ লাগবে কেন?

অরীন্দ্র একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, জানো? তোমার বয়সী একজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়ে ছিল। রোজি ভেজিয়ার নাম। বড্ড ভাল মেয়ে। আমাকে ডাকত আঙ্কল অরা বলে। বয়স নাকি আমাকে অরা অর্থাৎ জ্যোতি উপহার দিয়েছে! তো ভেরি স্যাড। বেচারিকে খেল।

সাবর্ণী আনমনে বলল, কে?

অরীন্দ্র বিষণ্ণ এবং খসখসে গলায় বললেন, আবার কে? ওই রাক্ষুসে খাদ।

 সে কী!

সাবর্ণীর গলায় চমক লক্ষ করে অরীন্দ্র হাসতে হাসতে বললেন, তা হলে ব্যাপারটা তুমি বুঝতে পেরেছ এবার। না, এতে ভয়ের কিছু নেই। আমি তোমার বডিগার্ড। আমার প্রেমিকার জন্য কিন্তু আমার মাথাব্যথা নেই। সে নিজেই ডেঞ্জারাস।

অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়েটির কথা বলুন।

ওরা ফিরুক। সান্ধ্য আসরে জমিয়ে বলা যাবে।

আমি ভয় পাইনি কিন্তু।

অরীন্দ্র চুপ করে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে বললেন, রোজির বাবার কাছে তোমাদের নিয়ে যাব’খন। প্রায় আমার বয়সী মানুষ। রেলের গার্ড ছিলেন। অ্যাকসিডেন্টে একটা পা গেছে। কিন্তু ক্রাচে ভর করে তল্লাট চষে বেড়ান। তবে চেহারা দেখে মনে হবে একেবারে অথর্ব। ওই যে দেখছ আলো। দেখতে পাচ্ছ? ওইটে ওল্ড জেভিয়ারের বাংলো। বাংলো মানে ঝাঁঝরা কুঁড়েঘর এখন। কিন্তু গার্ডেনিংয়ের ভীষণ নেশা। ফুলে-ফুলে ছয়লাপ করে রেখেছে। সবই কিন্তু গেলাপ। বুঝলে কিছু?

একটু দেরি করে সাবর্ণী বলল, ওঁর মেয়ের নাম রোজি ছিল বললেন।

হুঁউ, তুমি ধরেছ। অরীন্দ্র শুকনো হাসির সঙ্গে বললেন, মেয়ের ট্রাজিক ডেথের পর জেভিয়ার একটু পাগলাটে হয়ে গেছেন। একমাত্র মেয়ে। জামাই ঝগড়া করে অস্ট্রেলিয়া চলে গিয়েছিল। আহ্! তুমি কিন্তু দেখে হাঁটছ না! আমাদের এদিকটায় মিউনিসিপ্যালিটির নজর কম। নতুন টাউনশিপে খুব নজর। তেলা মাথায় তেল।

সাবর্ণী হোঁচট সামলে নিয়ে বলল, আপনি কতদিন কলকাতা যাননি?

মনে নেই। বছর দশ-বারো হতেও পারে।

 গেলে দেখতেন, আমরা আজকাল কীভাবে হাঁটি।

নেচে-নেচে! অরীন্দ্র রসিকতা করলেন। হুঁ, আমার প্রেমিকার কাছে ডিটেলস শুনেছি। তার নাচুনি হওয়ার নাকি সেটাই বড় কারণ। রোসো! আজ সান্ধ্য আসরে তাকে নাচাব। মুজরো দিতে কার্পণ্য করব না। দেখবে’খন।

সংকীর্ণ একফালি পথ উঁচু জমিতে বাঁদিকে উঠে গেছে। দুধারে ঘন গাছ। সামনে পুরনো ফটক থেকে একটা বা হলুদ আলো ফেলেছে। কুয়াশায় সে আলো মলিন ও অমসৃণ। এই পথটা পাথরের ইটে বাঁধানা। সাবর্ণী এগিয়ে ছিল, হঠাৎ পেছনে থপ থপ শব্দে চমকে ঘুরল। অরীন্দ্র জুতো ঠুকে ধুলো ঝাড়ার চেষ্টা করছেন। রাস্তায় ধুলো ছিল না। হয়তো নেহাত বাতিক।

সকালে ভেতরে বাইরে ঘোরাঘুরি করে এসে পিউ বলেছিল, বিবি, জানিস তোর বরের বংশ খাঁটি লর্ড? কলকাতায় বোঝাই যায় না আমাদের পি জির পূর্বপুরুষ ব্যারন ছিলেন। আমি ভড়কে গেছি, রিয়্যালি! প্রিয়গোপাল সামনে ছিল। তার চিবুকের দাড়িতে খুঁচিয়ে পিউ বলছিল, জামাইবাবু, তোমাকে আদর, করা যাক। উরে ধ্বস! ভগীরথদা বলল, তোমার মায়ের নামেও তিনটে গোল্ডমাইন ছিল! পিউয়ের চুল টেনে প্রিয়গোপাল বলেছিল, গোল্ডমাইন! ক্লিফটনগঞ্জে গোল্ডমাইন! মাইকা। আর তখন আমার জন্মই হয়নি। বরং আমি এখন গোল্ডমাইনের মালিক। কটাক্ষটা সাবর্ণীর দিকে।

সুশীলা নামে কাজের মেয়েটি গরম জল করে দিলে সাবর্ণী বাথরুমে হাত পা এবং মুখ ধুল। ঘরে গিয়ে কাপড় বদলে এবং সামান্য প্রসাধন সেরে দোতলায় বাড়ির সামনের দিকের প্রকাণ্ড ব্যালকনিতে এল। চেয়ারে আলোয়ান মুড়ি দিয়ে বসেছেন অরীন্দ্র। বললেন, বসো। কড়া চা খাওয়া যাক। ওরা ফিরলে তখন আবার একদফা হবে। সুশি! জলদি করুনা ভাই! সাবর্ণীর দৃষ্টি বাইরে রাস্তার দিকে। কুয়াশা আর আঁধারে জমাট প্রকৃতি। দূরে ও কাছে একটি দুটি আলোর বিন্দু। সে গাড়ির আলো খুঁজছিল। বলল, ওরা ওদিকে কোথায় গেল বলুন তো? গাড়িটাই বা কার?

ওয়াটার ড্যামে ছাড়া আর কোথায় যাবে? আর গাড়িটা নিশ্চয় চেনা লোকের। অরীন্দ্র পা তুলে বসে আলোয়ান আরও জড়ালেন। কিন্তু ওই দেখ, তোমার নামটা গুলিয়ে যাচ্ছে। খুলে বলি। আজকাল ওইসব ভজকট নাম মনে রাখা কঠিন। তাই তোমাকে নাম ধরে ডাকছি না, লক্ষ করেছ? নাকি করোনি?

বিবি বলুন। সবাই বলে।

অ্যাহ! অসহ্য। বিবি কী? ফরগেট বিবি-টিবি। মেমসায়েব বলতুম। কিন্তু এটি আমার প্রেমিকার জন্য বরাদ্দ। দময়ন্তী! কেমন ভুলিনি দেখছ তো? তুমি কী যেন?

সাবর্ণী।

হ্যাঁ, তাই বটে। বোঝা যাচ্ছে, তোমার বাবা বিদ্বান মানুষ। সাবর্ণী। কিন্তু অস্যার্থ।

সাবর্ণী একটু হাসল। আমি জানি না।

ডিকশনারি ঘাঁটিয়ে ছাড়বে। ঠিক আছে। সুশীলা এসে টেবিলে ট্রে রাখলে অরীন্দ্র নিজেই চা করতে ব্যস্ত হলেন। তারপর সাবর্ণীর হাতে চায়ের কাপপ্লেট তুলে দিয়ে বললেন, জীবনে আমার এই একটা সুখের ব্যাপারই টিকে রইল। বাইরে ঘুরে এসে এক পেয়ালা কড়া চা। দারুণ না?

এই সময় গাড়ির শব্দ শোনা গেল। প্রিয়গোপালের গাড়ি নয়। সেই সাদা গাড়িটা গেটের কাছে সদ্য এসে থেমেছে। প্রথমে ভগীরথ, তারপর দলটা নামল। গাড়িটা পিছু হটতে হটতে রাস্তায় চলে গেল। নীচের হলঘরে কাঠের সিঁড়িতে নানারকম শব্দ। তার ভেতর নিজের বোনের পায়ের শব্দ সাবর্ণী খুঁজে নিতে পারে।

পিউ সোজা ব্যালকনিতে এল। পরনে জিনস, জ্যাকেট এবং মাথায় রেশমি স্কার্ফ জড়ানো। অরীন্দ্রের পাশের চেয়ারে শব্দ করে বসে বলল, থ্রিলিং। অসাধারণ!

অরীন্দ্র বললেন, তার চেয়ে অসাধারণ ব্যাপার তুমি মিস করেছ ডিয়ারি! দিদিকে জিজ্ঞেস করো! এটা আরও থ্রিলিং!

পিউ সাবর্ণীর দিকে তাকিয়ে নির্বিকার মুখে বলল, ফর ইওর ইনফরমেশন বিবি! গণাদার গাড়িতে খুব ঘোরা হল। ছবির লোকেশন খুঁজতে এসেছে গণাদা। আমরা এসেছি শুনে ভীষণ, ভীষণ খুশি। কাল মনিঙে আসবে। তবে ওর সঙ্গে যে এসেছে, সে এখানে আসবে কিনা তার গ্যারান্টি আমি দিতে পারছি না। জাস্ট ইমাজিন, হু ইজ দ্যাট ফেলো।

সাবর্ণী শুধু তাকাল।

শ্বাস-প্রশ্বাসে মিশিয়ে এবং ঠোঁটের কোনায় আলপিনহাসি রেখে পিউ বলল, আনুদা। জাস্ট থিং!

বলেই হঠাৎ সে উঠে গেল। অরীন্দ্র তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। সাবর্ণীর হাতে চায়ের পেয়ালা কেঁপে উঠেছিল। মাথার ভেতর একটা ঠাণ্ডা হিম ঢিল গড়িয়ে যাচ্ছে, টের পেল সে। অনির্বাণ হঠাৎ এখানে কেন? এমন একটা জঘন্য চিঠি লেখার পর এখানে চলে এসেছে ফিল্মমেকার গণনাথের সঙ্গে!

অজানা আতঙ্কে সাবর্ণী নিঃসাড় হয়ে গেল। তা ছাড়া ওই টোনে কথাটা বলেই পিউয়ের চলে যাওয়ার মধ্যে কী একটা রেড সিগন্যাল আছে যেন। সাবর্ণীর চারপাশ থেকে বাস্তবতাগুলি সহসা অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে। কাপ-প্লেটটা রাখতে গিয়ে শব্দ হল। হঠাৎ সেই কালো খাদটা তার খুব কাছে এসে পড়েছে, পায়ের একেবারে কাছাকাছি।..

.

০২.

 চিয়ার্স বলে গণনাথ গেলাস তুলে ধরলেন। চশমার পুরু কাচ ভেদ করে চোখ থেকে উজ্জ্বল হাসি ঠিকরে পড়ছিল। চুমুক দিয়ে বললেন, কী হল রে তোর? উত্তর না পেয়ে ফের চুমুক দিলেন। রাশভারি বেঁটে গাব্দা মানুষ। অনির্বাণ দু হাতের মুঠোয় গেলাস চেপে ধরে বসে ছিল। দৃষ্টি সোনালি পানীয়ের দিকে। গণনাথের দ্বিতীয় চুমুকের পর সে নিজের গ্লাসে চুমুক দিল। তারপর বলল, শুওরের বাচ্চা!

আমাকে বলছিস?

নাহ। অনির্বাণ টেবিলে রাখা গণনাথের বিদেশী সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার টেনে নিল। সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়ার রিঙ তৈরির চেষ্টা করে বলল, আমার মুড নষ্ট হয়ে গেছে, বিলিভ মি গণাদা!

গণনাথও সিগারেট ধরালেন। তোর মুড বলে কোনও বস্তু আছে নাকি? কিন্তু ব্যাপারটা কী?

অনির্বাণ আরেক চুমুক টেনে শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে বলল, আই মাস্ট কিল দা ডার্টি ডগ।

গণনাথ একটু ঝুঁকে এলেন টেবিলের ওপর। তুই কি প্রিয়র কথা বলছিস?

বলছি।

কিন্তু তার সঙ্গে তোর দেখাই হয়নি! তা ছাড়া সে-বেচারা হঠাৎ ভূতের মতো তোকে পেলই বা কেন?

অনির্বাণ তেতোমুখে বলল, তুমি মাইরি যত নাটের গুরু! আই ভেরি মাচ ডাউট, তুমি ওকে জানিয়েছিলে এখানে আসছ। আমার আসার কথাও বলেছ।

শাট আপ! গণনাথ ধমক দিলেন। মাতলামি করবিনে। ড্যামের জলে ছুঁড়ে ফেলে দেব।

বাট দিস ইজ সিরিয়াস গণাদা! প্রিয় এখানে কেন?

সে আমি কেমন করে জানব? বলে গণনাথ খিক খিক করে হাসলেন। আনু! আপন গড়, প্রিয়র শালীকে আমি কুসমির রোলটা দেব।

তোমার পাঠা। তুমি ন্যাজে কাটবে না মুড়োয়, সে নিয়ে আমি ডোন্ট বদার। তৃতীয় চুমুক দিল অনির্বাণ। এবার সিগারেটের ধোঁয়ার রিঙ বানাতে পারল। বাঁকা হাসল সে। লুকিও না গণাদা! প্রিয়র বস তোমার ছবির ফাইন্যান্সার। পিউ আমাকে বলেছে।

প্রিয়র সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

অনির্বাণ আস্তে বলল, বোঝা যাচ্ছে তুমি আমার কথা ওদের বলেছ।

গণনাথ বিরক্ত হয়ে বললেন, প্রিয়র সঙ্গে তোর ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমার ব্যাপারটা জড়াবিনে আনু! 

অনির্বাণ একটা জোরালো চুমুক দিয়ে হেলান দিল। সিলিংয়ের দিকে দৃষ্টি রেখে বলল, শুওরের বাচ্চা ঘুঘু দেখেছে, ফাঁদ দেখেনি, শালীকে টোপ করতে নিয়ে এসেছে।

ফিক করে হাসলেন গণনাথ। তুই তো দিব্যি টোপ গিলে ফেলেছিস প্রায়।

 ধুস! কে কাকে গিলতে পারে?

বিবিকে গোঁয়ার্তুমি করে হাতছাড়া করেছিস। পিউকে করিসনে। গণনাথ. হাসতে লাগলেন। আমার ধারণা, পিউ তার দিদির মতো ট্রেচারাস নয়। স্ট্রেইট অ্যান্ড ওপেন। আমার তেমন বয়স আর ইমোশন থাকলে..না রে! পিউ সত্যি। বড়ো ভাল মেয়ে।

মাতলামি তুমিই করছ কিন্তু!

তুইও কর। বাপের জন্মে স্কচ খেয়েছিস? খা। এই নে! গণনাথ ওর গেলাসটা প্রায় কেড়ে নিয়ে খানিকটা ঢাললেন। সোড়া-ওয়াটার যত্নে মিশিয়ে বললেন, আমার মেজাজ চাঙ্গা হয়ে গেছে লোকেশন দেখে। ওয়াটার ড্যাম, টিলা-পাহাড়, নদীর চর, হাঁসের ঝাক। নেচারকে কীভাবে ছবিতে আনি দেখবি।

অনির্বাণ বলল, মর্নিঙে তুমি পিউদের ওখানে যাবে নাকি?

 যাব। পিউ যা বলল, ওই রকম একটা পুরনো বাড়িও তো আমার চাই।

বুঝতেই পারছ আমার যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

গণনাথ একটু গম্ভীর হলেন। না। বিবি না থাকলে কথা ছিল। তুই আমাকে তত ক্যালাস ভাবছিস কেন?

তারপর ওই শুওরের বাচ্চাটার এই ইরিগেশন বাংলোয় যাতায়াতের চান্স বাড়বে। অনির্বাণ সোজা হয়ে বসল। কাজেই আমি মর্নিঙে কাট করছি।

হাত বাড়িয়ে ওর জ্যাকেট আঁকড়ে গণনাথ বললেন, তোর মাথা খারাপ? আমাকে একা ফেলে চলে যাবি?

অনির্বাণ গলার ভেতর বলল, তোমার ব্যাপার বোঝা যাচ্ছে না কিছু।

 মিটিমিটি চোখে হেসে গণনাথ বললেন, তুই থাকলে ওই ফেঁপরদালাল প্রিয় আমার তত কাছে ঘেঁসবে না। ক্লিয়ার?

নাহ্। আমি ওসবে নেই। বুঝি না।

হাঁদা! মোহনলালজি, ধর কথার কথাই বলছি, প্রিয়কে আমার ব্যাপার। স্যাপার বুঝে নিতেও পাঠাতে পারেন। মানে, সত্যিই আমি ছবি করতে চাইছি, নাকি অসীম হারামজাদার মতো মুভি ক্যামেরা দেখিয়েই হাজার দশেক…ও! তুই তো ব্যাকগ্রাউন্ড জানিস না। লেট মি এক্সপ্লেন।

অনির্বাণ বলল, ছাড়ো! মাইরি গণাদা, তুমি পেটে-পেটে এত! শ্বাস ছাড়ল সে। সিগারেট অ্যাসট্রেতে ঘসটে নিভিয়ে বলল, ওকে। প্রিয়কে আমি তোমার ত্রিসামানায় ঘেঁসতে দেব না।

তোর কিছু করার দরকার না হতেও পারে। তুই আমার সঙ্গে আছিস, এই যথেষ্ট।

অনির্বাণ মাতালের হাসি হাসল। কিন্তু ভেবে দেখ, তোমার ফাইন্যান্সারকে শালা গিয়ে বিগড়ে দিলে?

গণনাথ হেসে ফেললেন। অতটা এগোলে তুই আছিস কী করতে?

অনির্বাণ আরেকটা সিগারেট টেনে নিয়ে বলল, বিবিকে পুরো বিধবা করাটা ঠিক হবে না। তবে হাফ-বিধবা করা চলে। সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এল গণনাথের দিকে। চোখ নাচিয়ে ফের বলল, বলো তো কালই ওকে কলকাতায় ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারি। দেব নাকি?

 মাতাল হয়ে গেছিল তুই! চুপ কর। গণনাথ নিজের গ্লাসে হুইস্কি ঢাললেন। অন্য কথা হোক। লোকেশন, স্যুটিং প্রোগ্রাম। হারে, তুইতো চিত্রনাট্য পড়েছিস। কুসমির রোলে পিউ চলে না?

চলে। যদি শুওরের বাচ্চা বেগড়বাই না করে।

ভ্যাট। পিউকে তুই কী বুঝেছিস?

শি ইজ চার্মিং অফ কোর্স! অনির্বাণ সিরিয়াস ভঙ্গি করে বলল। একটু জংলি-জংলি ভাবও আছে। তবে তুমি তো গুরুদেব মাইরি! কত বেড়ালকে বাঘিনী বানিয়েছ। কই, ঢালো!

আর খাসনে।

ছাড়ো। তিন পেগও হয়নি। ঢালো!

গণনাথ অল্প একটু ঢেলে প্রায় আধবোতল সোডা-ওয়াটার মিশিয়ে দিলেন। তারপর নিজের গেলাস হাতে নিয়ে পশ্চিমের জানালায় গেলেন। পর্দা সরাতেই ঠাণ্ডা হাওয়া তাকে ছুঁল। ওদিকটায় নীচে ড্যাম। কাছে ও দূরে এদিক-ওদিকে কুয়াশার ভেতর আলো জুগজুগ করছে। ড্যামের জলে নক্ষত্রের অজস্র টুকরো। গুনগুন করে গান গাইতে থাকলেন গণনাথ।

একটু পরে টের পেলেন অনির্বাণ নিজেই হুইস্কি ঢালছে। বললেন, মারা পড়বি। ডিনারে হেভি মুর্গির মাংস আছে, ডোন্ট ফরগেট।

অনির্বাণ হাসল। দুটো দিন বৈ তো নয়, গুরু। কলকাতায় তুমি আমাকে স্কচ খাওয়াচ্ছ, এ দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না।

তুই নেমকহারাম! বলে গণনাথ ড্যামের দিকে ঘুরলেন। একটু পরে মুখ না ঘুরিয়েই বললেন, হ্যাঁ রে আনু! বিবি তোর হাত ফসকাল কী করে? প্রিয় কেড়ে নিল, দ্যাট আই ডোন্ট বিলিভ!

প্লিজ গণাদা! আর তেতো করো না। মুড এসে গেছে। শি ইজ আ হোর!

গণনাথ ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন, তুই বিবিকে…ছিঃ!

হুঁউ, তুমি বড়ো মর‍্যালিস্ট। অনির্বাণ মাতালের হাসি হাসল। গায়ে ফোস্কা পড়ল যেন। কিন্তু হোরকে কী দেবী বলে পুজো করব? তুমি কী জানো ওর? পুঁথি খুলব?

গণনাথ কাছে এসে বললেন, পিউকে সব বলে দেব।

বয়ে গেল! বুড়ো আঙুল নাড়ল আনির্বাণ। সে মাতাল হয়েছে একটু। জড়ানো গলায় বলল, পিউয়ের সঙ্গে বড় জোর ওপর-ওপর একটু…আই মিন জাস্ট ফ্লার্টিং…তবে রিয়্যালি শি ইজ লাভলি! সো সিম্পল! জান গণাদা, তখন ঝাউগাছগুলোর আড়ালে হঠাৎ আমার সঙ্গে একা পড়ে যেতেই…ওঃ! ওই যে কী বলে, সে একটা চরম মুহূর্ত এসে গিয়েছিল।

গণনাথ মুখে দুষ্টুমি এনে চাপা স্বরে বললেন, বিবিকে প্রিয় লুঠে নিয়েছে। তুই পিউকে নে। আমি কথা দিচ্ছি, কোঅপারেট করব।

সে-কথায় কান না দিয়ে অনির্বাণ বলল, চরম মুহূর্ত বললুম। তুমি মাইরি ধরতেই পারলে না। আমি বলতে চাইছিলুম, কোনও-কোনও সময়ে সুন্দর। ইনোসেন্স গুঁড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে। সে শুকনো হাসল হা হা শব্দে। তোমায় যদি বলি, বিবির মধ্যেও এটা ছিল? সে নিজের বুকে বুড়ো আঙুল ঠেকাল। আমিই গুঁড়িয়ে দিয়েছিলুম।

গণনাথ তার চুল খামচে ধরে বললেন, আর একটা কথা নয়। দে, গেলাস দে। আমারই ভুল হয়েছে।

কিসের ভুল? কেমন গ্লাসনস্ত চালিয়ে যাচ্ছি দেখ তুমি! সে চুল ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল। আহ্, জেন্টলম্যান হও, গুরু। বসো ভদ্রলোকের মতো।

গণনাথ ওর গেলাসের পানীয় ঝটপট নিজের গেলাসে ঢেলে একটু তফাতে গেলেন। বললেন, শীত না হলে এখন তোকে কুঠিবাড়ির ছাদে গিয়ে তুলতুম। মাথা ঠিক হয়ে যেত।

আবার একটা সিগারেট ধরিয়ে অনির্বাণ বলল, সেটা আবার কী জিনিস?

সুইসাইড করার জায়গা।

মাই গড! তুমি আমায় মরতে বলছ?

 বলাই ষাট! গণনাথ হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁলেন। কাল দুপুরে ওই লোকেশনটাও তোকে দেখিয়ে আনব। মাথা ঘুরে যাবে। কুঠিবাড়ির পেছনকার দেয়ালের নীচেই গঙ্গা! অজিতদা ক্রেনের সাহায্য একটা মারপিটের সিকোয়েন্স তুলেছিল। সে এক হরিবল এক্সপিরিয়েন্স।

অনির্বাণ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, দম আটকে আসছে। একটু বাইরে ঘুরে আসি।

 যাসনে। ভীষণ ঠাণ্ডা। ড্যামের হাওয়া ডিসেম্বরে। হাড় খুলে যাবে।

অনির্বাণ দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। সে টলছিল। পর্দা জোরে দুলতে থাকল। গণনাথ ঘড়ি দেখে গেলাস শেষ করতে মন দিলেন। একটু পরে অনির্বাণের হাক শোনা গেল, কে এখানে? চৌকিদার! দেখ তো ওটা কে?

গণনাথ উঠে কিটব্যাগ থেকে টর্চ নিয়ে বেরুলেন। লনের শেষে নিচু পাঁচিলের দিকে টলতে টলতে এগিয়ে যাচ্ছে অনির্বাণ। বললেন, কী রে আনু?

চৌকিদার টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে দৌড়ে গেল। বাংলোর বারান্দার আলো লনের খানিকটা ছুঁতে পেরেছে মাত্র। কুয়াশার পর্দা চারদিকে। গণনাথ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলেন।

চৌকিদার রামলাল নিচু পাঁচিলের ওপর দিয়ে ঝুঁকে কাউকে ধমকাচ্ছিল। হেঁয়াপর ক্যা করতা এত্তা রাতমে? ভাগো! ভাগো!

অনির্বাণ ফিরে এসে লনের মাঝামাঝি দাঁড়াল। গণনাথ বললেন, কে?

কে জানে!

চৌকিদার হাসতে হাসতে বলল, পাগলা সাহাব স্যার! দিন ঔর রাত সবহি এক বরাবর। খালি ঘুমতে রহে! লেংড়া আদমি। ক্রাচপর নকলি পাও! হায়রে মালুম হোয় কি, আসলি পাঁও রনেসে ক্যা করতা উও?

গণনাথ বললেন, ও। সেই বুড়ো সায়েব।

জি। বেলিংটান সাহাব। পুরানা টৌন কি পাস ছোটিসি কোঠি। কভি হোঁশ, কভি বেহেশ…

তুম খানাকা বন্দোবস্ত করো রামলাল!

 জি, জরুর।

চৌকিদার পেছনের দিকে কিচেনে চলে গেল। গণনাথ বললেন, কী রে? তুই বুঝি ভেবেছিলি প্রিয় এসে ওত পেতেছে?

অনির্বাণ জুতোর ডগায় একটা নুড়ি ঠেলে দিয়ে বলল, তা হলে তো বিবি বিধবা হতই।

তুই কিন্তু সত্যি ভয় পেয়েছিলি! তোর গলার স্বরে বোঝা যাচ্ছিল।

কী আশ্চর্য লোক তুমি মাইরি! আনির্বাণ চটে গেল। অন্ধকার রাতে ওই পাঁচিলের ওপর একটা মানুষের মাথা। চুপ করে থাকব?

হিম পড়ছে। উঠে আয়। বলে গননাথ ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।…

অনির্বাণের নিয়মিত মদ খাওয়ার নেশা নেই। কদাচিৎ সংসর্গ কি পরিবেশে তার খাওয়াটা হয়ে যায়। বেশি খেয়ে ফেললে সহ্য করতেও পারে না। তখন কিছুদিন প্রায় একটা প্রতিজ্ঞায় অটল থাকে। এ রাতে তত বেশি না খেলেও যেন অনেকটা নেশা হয়েছিল। মুর্গির মাংসের ডিনারে কিংবা আর কোনও কথা বলতেই বড়ো অনিচ্ছা, সে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছিল। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় গণনাথ তাঁর ছবির স্ক্রিপ্ট পড়ছিলেন, হাতে জটার পেম। মাঝে মাঝে তার দিকে ঘুরে বলছিলেন, ঘুমোলি? ও আনু! ঠিক আছে। ঘুমো।

অনির্বাণ চিত হয়ে চোখ বুজে শুয়েছিল। সে দেখেছে, মদ্যপানের পর অনেকেই বেশ ঘুমিয়ে পড়ে। তার একেবারে উল্টো। অবশ্য বেশি নেশা হয়ে গেলে অন্য কথা এবং সে-অবস্থাকে ঠিক ঘুম বলা চলে না, একটা কদর্য ধরনের আচ্ছন্নতা। তা হলেও এ রাতে তেমনটা দরকার ছিল। উঠে গিয়ে আবার খাবে কি না, তাও ঠিক করতে পারছিল না। সমস্যা হল, যতবার অন্য কিছু ভাবার চেষ্টা করছে, তার ফাঁকে হঠাৎ-হঠাৎ প্রথমে পিউ এবং তার পিছনে বিবি এসে যাচ্ছে। ব্রিজের কাছে পিউকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার এখানে আসার আনন্দ আর আনুষঙ্গিক সমস্তটাই অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। পিউ বিবির প্রতীক। দুই বোনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তার জানা। হঠকারিতায় অমন একটা চিঠি লিখেছিল বিবিকে। বিবি সেটা পিউকে জানাবেই, ধরে নিয়েছিল অনির্বাণ। কিন্তু এখানে আজ তাকে দেখামাত্র পিউয়ের তীক্ষ্ণ চিৎকার ‘আনুদা’ এবং ছুটে আসা, পাখি যেভাবে কোনও গাছের দিকে উড়ে যায়! নাহ, পিউ চিঠির ব্যাপারটা জানে না। জানলে তার হাত ধরে ড্যামের ধারে ছুটোছুটি করত না। হুঁ, অনির্বাণকে পেয়ে বসেছিল পিউ। বিকেলের আলোয় নরম ও সুন্দর একটা ইনোসেন্স অনির্বাণকে ভাবাচ্ছিল, জীবনের কিছু কিছু ভাল ব্যাপার এখনও আছে, আবিষ্কার করে নিতে হয় অথবা দৈবাৎ আবিষ্কৃত হয়ে যায়।

পিউয়ের সঙ্গে যারা ছিল, নিশ্চয় বিরক্ত হয়েছে পিউয়ের ওপর। মফস্বলের ছেলেমেয়ে সব। বিশেষ করে ওই মহিলা, পিউ বলছিল রাণুদি, কেমন, চোখে অনির্বাণকে দেখছিলেন। দৃষ্টিটা ছুরির ডগার মতো ধারালো। পিউ জানে, অনির্বাণ ওদের আত্মীয়বাড়িতে যাবে না। তবু চোখে ঝিলিক তুলে অবাধে বলল, আনুদা! তুমি তো বরাবর আনপ্রেডিক্টেবল পার্সন। কাজেই তুমি যদি মাই ডিয়ার গণাদার সঙ্গে চারুভবনে হাজির হও, নাথিং উইল হ্যাঁন। তোমার ইচ্ছে। রাণুদি মানে মহিলাটি কী ভাবলেন কে জানে! এই সব মফস্বলি মহিলা ধুরন্ধর এবং নীতিবাগীশ। অনির্বাণ ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল।

গণনাথ ঘুরে বললেন, ঘুম হচ্ছে না? আর পেগটাক খাবি নাকি?

অনিবাণ সাড়া দিল না। আচ্ছা, যদি প্রিয়গোপালের হাতে পড়ে থাকে চিঠিটা? পড়তেও পারে। ওর এ ধরনের স্বভাব আছে, অনির্বাণ বুঝতে পারে। বিবি ওর সঙ্গে বিয়ের আগে একদিন কথায়-কথায় আভাসে বলেছিল, নিজের কোম্পানিকে ব্ল্যাকমেল করে প্রিয়গোপাল। ঠিক ব্ল্যাকমেল কথাটা বলেনি। বলেছিল, কোম্পানির ভেতরকার অনেক কিছু ও জানে। তাই ওর কোম্পানিতে এত দাপট এবং প্রমোশনের পর প্রমোশন। হুঁ, ব্যাপারটা ব্ল্যাকমেলই দাঁড়াচ্ছে। একজন ব্ল্যাকমেলার নিজের স্ত্রীর নামে যাওয়া চিঠিপত্র, বিশেষ করে বিবির মতো স্ত্রীর, নিশ্চয় না পড়ে ছাড়বে না। তো পড়ে থাকলে আরও ভাল। জ্বলে মরুক ভেতর-ভেতর। তারপর একটা কিছু ঘটুক। ঘটে যাক।

এই সময় বাইরে কাছাকাছি গাড়ির শব্দ শোনা গেল। তার একটু পরে লনের নুড়িপাথরে পায়ের শব্দ। অনির্বাণ চোখ খুলল। গণনাথের মন স্ক্রিপ্টে। দরজায় টোকার শব্দে চমকে উঠে বললেন, রামলাল?

দাদা, আমি।

 গণনাথ ব্যস্তভাবে উঠে বললেন, কে?

আমি প্রিয়গোপাল।

গণনাথ হাসিমুখে এগিয়ে দরজা খুললেন। অনির্বাণ দ্রুত ঘুরে কম্বল মুড়ি দিল। প্রিয়গোপাল ঘরে ঢুকে বলল, আশাপুরায় গিয়েছিলুম। লালজির সঙ্গে ট্রাঙ্ককলে কথা বলছিলুম। শুনলুম আপনি ক্লিফটনগঞ্জে ইরিগেশন বাংলোয় উঠেছেন। প্রিয়গোপাল একটু হাসল। রাত এগারোটায় জ্বালাতন করতুম না। কিন্তু জানালায় আলো দেখলুম। চৌকিদারকে ডেকে জিজ্ঞেস করার পর সিওর হয়ে তবে নক করেছি।

না, না। তোমায় অত কৈফিয়ত দিতে হবে না। গণনাথ টেবিলের কাছে এলেন। বসো। তবে দুঃখিত, শীতের রাতে চাকফির বদলে স্কচ দিয়ে রিসিভ করতে চাইলে দোষ দিও না। কাম অন!

চেয়ারে বসে হাত নাড়ল প্রিয়গোপাল এবং একই সঙ্গে জিভ কেটে বলল, আমার চলে না, ইউ নো দ্যাট। আর ইয়ে, বেশিক্ষণ ডিসটার্ব করব না।

গণনাথ ভুরু কুঁচকে বললেন, তোমার লালজির কোনও মেসেজ আছে মনে হচ্ছে?

জাস্ট একটা কথা। সে কাল হলেও চলে। এমন কিছু জরুরি নয়।

 সিগারেট খাও।

থ্যাঙ্কস। ছেড়ে দিয়েছি।

ব্রিলিয়্যান্ট! গণনাথ হাসলেন। বলো শুনি!

 প্রিয়গোপাল ঘরের ভেতরটা দেখছিল। অনির্বাণের বিছানার দিকে তাকিয়ে আস্তে বলল, কে?

গণনাথ সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, আমার এক অ্যাসিস্ট্যান্ট। হু, তোমার লালজির কথাটা বলো।

হাই তুলে প্রিয়গোপাল বলল, তেমন কিছু না। আপনার টাকাকড়ির দরকার হলে আমায় লক্ষ রাখতে বলেছেন। আমি উঠি, গণাদা!

সে উঠে দাঁড়ালে গণনাথ বললেন, বউ-শ্যালিকাসহ এসেছ। তোমার বউয়ের সঙ্গে এখনও দেখা হয়নি। শ্যালিকাকে ছিনতাই করেছিলুম। লোকেশন স্পটে খুব ছুটোছুটি হল। তোমার দাদামশাইয়ের বাড়িটার কথা শুনে ভাল লাগল। মর্নিঙে যাচ্ছি। থেকো।

প্রিয়গোপাল জিভ কেটে বলল, এই রে! আমাকে ভোর ছটায় আমিনগঞ্জে যেতে হবে। ঠিক আছে। আপনার কোনও অসুবিধে হবে না। বিবি আছে। পিউ আছে। দাদামশাইও অসাধারণ মানুষ! সে দরজার দিকে এগিয়ে ঘুরে বলল ফের, দুপুরের দিকে দেখা হবে। বলে যাব, আপনারা ওখানেই লাঞ্চ খাবেন। আচ্ছা চলি!

একটু পরে বাইরে গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার শব্দ হলে তখন কম্বল থেকে অনির্বাণ মুখ বের করল। গণনাথ মুচকি হেসে বললেন, কী বুঝলি?

তুমি ওকে বললেই পারতে কে আমি!

তোকে প্যাঁচার মতো লুকোতে দেখলুম যে!

ওর মুখ দেখতে আমার ঘেন্না হয়। অনির্বাণ রুষ্টভাবে বলল। কিন্তু তোমার মাইরি মাথায় কিছু নেই। ব্যাটাচ্ছেলে তো পিউয়ের কাছে জানবে তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট কে।

এক্সপ্ল্যানেশন আমি দেব। তুই ঘুমো।

ধুশ ঘুম। অনির্বাণ উঠে পড়ল। আজ রাতেই আমার সাংঘাতিক কিছু করে ফেলতে ইচ্ছে করছে।

সে জোরে দরজা খুলে বেরুলে গণনাথ ডাকলেন, আনু!

অনির্বাণ সাড়া দিল না। লনের ঠাণ্ডা নুড়িতে তার পায়ের এলোমেলো শব্দ শোনা গেল। গণনাথ চাপাস্বরে বললেন, আমারই ভুল! তারপর শান্তভাবে স্ক্রিপ্টের পাতা ওল্টালেন। বাইরে ড্যামের দিকে এতক্ষণে একটা রাতপাখি ডেকে উঠল। তার একটু পরে শেয়ালের ডাক ভেসে এল। ঘরের ঠাণ্ডা বেড়ে যাচ্ছে টের পেয়ে গণনাথ দরজায় গেলেন। পর্দা তুলে আস্তে ডাকলেন, আনু! কিন্তু কোনও সাড়া না পেয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

.

০৩.

 সাবর্ণী অরীন্দ্রের জমাট আসর থেকে কখন উঠে গেছে, পিউ ছাড়া কেউ লক্ষ করেনি। খানছয়েক মারাত্মক ভূতের গল্পের পর তিনি বললেন, কিন্তু এগুলো তত কিছু না। ক্লিফটন সায়েবের কুঠিবাড়িতে একবার জ্যোৎস্নার রাতে…সাবর্ণী, খাদটা তো দেখেছ?

তারপর সাবর্ণীর চেয়ার খালি দেখে বললেন, কী আশ্চর্য! কখন উবে গেল?

পিউ হাসল। এমনও হতে পারে, ওখানে যে বসে ছিল, সে আপনার সেই পোড়ো খনির পেত্নী। আই মিন, আপনি বেড়াতে গিয়ে রিয়্যাল নাতবউকে মিস করেছেন। ভগীরথদাকে খুঁজতে পাঠান।

সবাই হেসে উঠল। তারপর অরীন্দ্র বললেন, তোমরা গাড়িতে ঘুরেছ। ও পায়ে হেঁটে ঘুরেছে। টায়ার্ড হওয়া স্বাভাবিক। তো যা বলছিলুম।

রাণু বললেন, রাত হয়ে গেছে। পিয়ালিদের বাড়িতে ভাববে। বুড়ো, তুই। যাবি, না ভগীরথদাকে পাঠাব?

পিয়ালি নার্ভাস হাসল। কাকেও যেতে হবে না!

পিউ বলল, তোমায় দেখে বোঝা যাচ্ছে অবস্থা শোচনীয়। মাইন্ড দ্যাট, ছ’খানা ভূত!

পিয়ালি বলল, ভ্যাট! সব বানানো। হাজারবার শোনা পেটেন্ট গল্প।

অরীন্দ্র কপট শাসিয়ে বললেন, গল্প? ঠিক আছে। রাস্তায় একা বেরিয়ে দেখ। কী হয়।

রাণু উঠে বললেন, আর নয়। খুব হয়েছে। বুড়ো, তুই যা বরং। আমি দেখি, সুশি কী করছে।

রাণু কর্ত্রীর গাম্ভীর্যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। পিয়ালি উঠে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ পিউ তার কাঁধে হাত রেখে বলল, বাড়িতে রিং করে বলে দাও না আমার। কাছে থাক।

অরীন্দ্র প্রায় অট্টহাসি হাসলেন। সাত্যকি বলল, এই এরিয়ায় ফোন কোথায়? টাউনশিপে সবে এক্সচেঞ্জ হয়েছে।

সরি। পিউ পা বাড়িয়ে বলল, তা আপনি ওদের বাড়ি খবর দিয়ে আসুন না, ও আমার কাছে থাকছে।

সাত্যকি একটু হাসল। আপনি কলকাতায় নেই, প্লিজ ডোন্ট ফরগেট দ্যাট। এতক্ষণে মাসিমা বোধহয় ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।

পিউ ওদের অনুসরণ করে বলল, ব্যস্ত হবার কী আছে? পিয়ালি, তুমি কিছু বলে আসনি?

পিয়ালি শুধু মাথা দোলাল। অরীন্দ্র শব্দ করে আসন ছেড়ে বললেন, একটা ব্যাকগ্রাউন্ডও আছে ডিয়ারি! বলব’খন। সে যা দিন গেছে, বলার নয়। তোমাদের বয়সী মেয়েরা দিনদুপুরেও একা বেরুতে পারত না।

সাত্যকি বিরক্ত হয়ে বলল, আপনার সবতাতেই বাড়াবাড়ি।

পিউ ঘুরে বড় চোখে তাকিয়েছিল অরীন্দ্রের দিকে। অরীন্দ্র একটু গম্ভীর। ছড়ি হাতে অন্যদিকের দরজা দিয়ে বাথরুমে গেলেন। পিউ সিঁড়ির দিকে চলতে চলতে আস্তে বলল, কী ব্যাপার সাত্যকিদা?

পিয়ালি হেসে ফেলল। বুড়োদা বলো। খুশি হবে।

ওক্কে। বুড়োদা। পিউ এগিয়ে পিয়ালির কাঁধে হাত রাখল। মেয়েরা বেরুতে পারত না, এতেও কড়া ভূতের গন্ধ! সত্যিই! ক্লিফটনগঞ্জে এভরিথিং থ্রিলিং। বুড়োদা, বলুন না!

সাত্যকি কাঠের সিঁড়িতে নেমে বলল, ভূতটুত নয় পরপর দুটো সুইসাইড ঘটলে যা হয়। এরিয়াটা তো দেখলেন। সুপারস্টিশনের ডিপো। আর আমার ঠাকুর্দা ভদ্রলোকের পরিচয় নিশ্চয় পেয়ে গেছেন।

সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে পিউ বলল, আপনাদের সঙ্গে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু যাচ্ছি না আই মিন, আই শুড নট!

পিয়ালি দ্রুত বলল, চলে এস। বুড়োদার মতো বডিগার্ড সঙ্গে।

তার চোখে ঝিলিক ছিল। সাত্যকি ঘুসি পাকিয়ে আস্তে তার পিঠে ছুঁল। গেটের বাইরে আমি কিন্তু যাচ্ছি না। মাইন্ড দ্যাট। তারপর খাদের ভূত তোমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে জলকেলি করুক।

অসভ্য!

 পিয়ালি কাঠের সিঁড়িতে প্রায় দৌড়ে নামতে থাকল। সাত্যকি ঘুরে পিউয়ের দিকে হাসিমুখে একবার তাকিয়ে আস্তে পা বাড়াল। নীচের হলঘরে ওরা অদৃশ্য হলে পিউ একটা চাপা শ্বাস ছেড়ে সরে এল।

অরীন্দ্র তাকে ডাকছিলেন। কিচেন ডাইনিং ঘর দোতলায়। জাস্ট আ মিনিট বলে পিউ সাবর্ণীর ঘরে ঢুকল। এ ঘরটা দক্ষিণমুখী বিশাল বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে। সেকেলে ছাদের খড়খড়ি দেওয়া প্রকাণ্ড জানালা। আষ্টেপৃষ্ঠে অলঙ্কৃত খাটটাও বেশ উঁচু।

পিউ দেখল সাবর্ণী খাটের ওপর পশ্চিমের একটা জানালার কাছে চেয়ার পেতে বসে আছে। পায়ের শব্দে ঘুরেছিল সে। টেবিলল্যাম্পের আলোর বাইরে থাকায় সে অস্পষ্ট। পিউ সুইচ টিপে উজ্জ্বল আলোয় ঘর জ্বালিয়ে দিলে সে বিরক্ত হয়ে বলল, আহ্! নিভিয়ে দে।

পিউ গিয়ে পিছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, সামথিং ইজ রং বিবি!

 বকিস না। মাথা ধরেছে। আহ, ছাড়!

তুই কি পি জি-র গাড়ির হেডলাইট দেখার জন্য সময় গুনছিস? পিউ পাশ কাটিয়ে জানালার গরাদ ধরল এবং ইশ বলে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিল। ঠাণ্ডা লাগছে না তোর? কী? কথা বলছিস না কেন?

বলছি তো মাথা ধরেছে।

পিউ হাসল। আনুদার এখানে আসার চান্স নেই। আর যদি আসে, আসবে। সে তোর সঙ্গে কথা বলবে না, তুইও তার সঙ্গে বলবি না। ব্যস! একটু পরেফের বলল, তোর পি জি একটু চমক খাবে অবশ্য। তবে ভয় পাবে না। কারণ বুঝতে পারছিস তো? পি জির বস গণাদার ছবির ফাইন্যান্সার।

সাবর্ণী আস্তে বলল, তোকে কে বলল?

পি জি স্বয়ং। আবার কে?

আমি জানতুম না!

সে কী! পিউ অবাক হয়ে তাকাল দিদির দিকে। মর্নিঙে আমাকে বলে গেল গণাদা আসার কথা। ইরিগেশন বাংলো বুক করেছে। ছবির লোকেশন দেখতে…মাই গুডনেস! মনে হচ্ছে পি জি যেভাবে হোক সম্ভবত জানত, আনুদা আসতে পারে গণাদার সঙ্গে। তাই তোকে ব্যাপারটা বলেনি। পি জি তোকে ভয় পায়, জানিস তো? তুই যেমন আনুদাকে।

সাবর্ণী উঠে দাঁড়িয়ে বলল, সবতাতে তোর ফোপরদালালি। বেরো! কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।

সাবর্ণী কোণের ওয়ার্ডরোব থেকে নাইটি বের করছিল। পিউ তাকে লক্ষ করছিল। একটু পরে বলল, আনুদাকে তোর সম্পর্কে একটু খোঁচা দিয়েছিলুম। রিঅ্যাক্ট করল না। আনুদা…

শাট আপ! থাপ্পড় খাবি।

 বিবি! তুই মিথ্যা ভয় পেয়েছিস।

 সাবর্ণী চটে গিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, দরজার দিকে রাণুর সাড়া এল। কই গো সব, খেতে আসবে না কি? সাড়ে দশটা বেজে গেল।

ঘরে এলেন রাণু। ফের বললেন। প্রিয় এখনও ফিরল না যখন, মনে হচ্ছে আশাপুরায় থেকে যাবে। আজকাল রাতবিরেতে রাস্তায় একা গাড়ি নিয়ে কেউ বেরুতে সাহস পায় না। তোমাদের ওয়েস্ট বেঙ্গলের অবস্থা জানি না। এই সেদিনই তো এক মারোয়াড়ি ভদ্রলোকের গাড়ি আটকে রাহাজানি করল। লোকাল পুলিশ দেখেও কিছু দেখে না। এস তোমরা!

সাবর্ণী নরম একটু হেসে বলল, রাণুদি প্লিজ! আমি রাত্তিরে কিছু খাব না। ভীষণ মাথা ধরেছে।

রাণু ব্যস্ত হলেন। মাথা ধরেছে বলে খেতে হবে না? ট্যাবলেট খেয়ে নাও।

না রাণুদি! প্লিজ।

পিউ বাঁকা হাসল। বুঝলেন না রাণুদি? বিয়ে করলেই মেয়েরা মহিলা হয়ে যায় এবং পতিদেবতা না খেলে পত্নীদেবীর খাওয়া বারণ হয়।

রাণু হাসি চেপে বললেন, সে-সব আগের দিনে ছিল-টিল। এই যে আমাকে দেখছ! বুড়োর জামাইবাবু ছিলেন নামকরা শিকারী। বাঘের খবর পেলে সেই বাঘ যতক্ষণ না মারতে পারছেন, বাড়ি ফিরছেন না। খাওয়া-দাওয়া তো দূরের কথা। আমি কিন্তু দিব্যি খেয়েদেয়ে পান চিবোতুম। আর এখনও তো দেখছ, নিয়ম-টিয়ম মানি না। সবই খাচ্ছি-টাচ্ছি। এস।

সাবর্ণী মুখে কাকুতি ফুটিয়ে বলল, বিশ্বাস করুন, কিছু খেলে বমি হয়ে যাবে।

পিউ কোনও কথা না বলে রাণুর পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। রাণু একটু চুপ করে থাকার পর শ্বাস ফেলে বললেন, ঠিক আছে। তা হলে তোমরা দু বোনে এ ঘরে শোবে। প্রিয়র আসার চান্স নেই আর। যদি আসে, তখন বরং পিউ আমার ঘরে চলে যাবে।

সাবর্ণী আস্তে বলল, একা থাকতে আমার অসুবিধে হবে না।

না, না। শরীর খারাপ। তোমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। একা শোবে না। রাণু দরজার দিকে এগিয়ে হঠাৎ ঘুরলেন। আর একটা কথা। দরজা-জানালা ঠিকমতো বন্ধ করে শোবে। কেউ ডাকলে হুট করে দরজা খুলে দিও না। পাশের ঘরে আমি শুই। ঘুম কবে চলে গেছে চোখ থেকে। দরকার হলে ডেকো। কেমন?

সাবর্ণী তাকিয়ে রইল। রাণু চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে সে শাড়ি ছেড়ে পুরু নীল নাইটিটা পরে নিল। একটু ইতস্তত করে সায়া খুলে কোনার দিকে টুলে রাখা প্রকাণ্ড সুটকেসটার ওপর ছুঁড়ে ফেলল। দম আটকানো অবস্থা হঠাৎ। ব্রেসিয়ারের পেছনকার ক্লিপ খুলে জোরে শ্বাস ফেলল সে। তারপর আবার পশ্চিমের সেই জানালার ধারে গিয়ে বসল। বাইরে হিম অন্ধকারে চেনাজানা পৃথিবী নিশ্চিহ্ন, আবছা সেই কালো খাদটা মনে ভেসে এল, খুব কাছে চলে এসেছে যেন। ঠোঁট কামড়ে ধরল সে। হঠাৎ আবার সেই অস্বস্তিকর অনুভূতি, পিছনে অনির্বাণ এসে দাঁড়িয়েছে, সামনে খাদ। দ্রুত ঘুরল পিছনে। ভাবল, দরজা বন্ধ করবে নাকি। পিউ এসে ডাকলে খুলবে।

উঠতে গিয়ে দূরে গাড়ির হেডলাইট চোখে পড়ল সাবর্ণীর। কামনা করল, যেন প্রিয়গোপাল হয়। এ রাতে প্রিয়গোপাল তার কাছে চরম আশ্রয় হয়ে উঠেছে। তার ইচ্ছা করছিল, প্রচণ্ডভাবে একটা আত্মসমর্পণের পর যা ঘটে ঘটুক, অনির্বাণের চিঠিটা প্রিয়গোপাল পড়ুক বা না পড়ুক, সব কিছু খুলে বলবে সে। আবেগে অস্থির সাবর্ণী আলোটা দেখছিল। ক্রমশ বেঁকে এদিকে আসছে। অসহ্য রকমের দেরি করছে পৌঁছুতে। অবশ্য রাস্তাটা ভাল না। বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের বাউন্ডারি ওয়ালের ওধারে পোড়ো জমি, ঝোপঝাড় এবং কিছু উঁচু গাছ। তার ওধারে রাস্তাটা। চাপা গরগর শব্দে গাড়িটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল। অন্ধকারে। তখন সাবর্ণী দক্ষিণের জানালায় গেল। কিন্তু গাড়িটা তাকে হতাশ করে বসতি এলাকার ভেতর ঢুকে গেল। শব্দে মনে হল খালি ট্রাক।

সাবর্ণী রাগ করে দরজা বন্ধ করল।

কিছুক্ষণ পরে বাইরে পিউয়ের গলা শোনা গেল। কপাটে একটু খুটখুট শব্দও। বিবি!

তুই কিন্তু একা শুচ্ছিস। আমি রাণুদির ঘরে চললুম। বিবি! শুনলি কি বললুম?

সাবর্ণী দরজা খুলে বলল, শুবি তো অত চেঁচানোর কী আছে?

পিউ হাসল। তোকে সাহস দিচ্ছি আর কী! রাণুদি ইনসিস্ট করছিলেন। ম্যানেজ করেছি। ওঁর ঘরে আলাদা বেড়ে নির্ঝঞ্ঝাট শোব বাবা! বিবাহিতা মহিলাদের পাশে শাওয়ার কথা ভাবা যায় না! গুড নাইট!

সে চলে গেলে রাণু এলেন। তোমার বোন তোমার কাছে শোবে না। আবার, আমি যে তোমার কাছে শোব, তাতেও ওর আপত্তি! বলে, ক্লিফটনসায়েবের ভূত ঘাড় মটকাবে। তো বললুম, তা হলে তোমার দাদামশাইয়ের ঘরে গিয়ে শোও…হাসতে লাগলেন রাণু। চাপাস্বরে বললেন, ফের, বলে কী, বুড়োমানুষের প্রেমের চেয়ে ক্লিফটনের ভূত অনেক ভাল। তো এক কাজ করা যায়। তুমিও আমার ঘরে আসতে পারো। আমার খাটটা বড়। অসুবিধে হবে না। কী?

নাহ। আপনারা শোন। আমার অসুবিধে হবে না।

রাণু একটু ইতস্তত করে বললেন, নীচে ভগীরথ থাকে। প্রিয় এলে গেট খুলে দেবে। যা বলেছি, হুট করে দরজা খুলে দিও না। এ তোমাদের কলকাতা শহর নয়, জংলি এলাকা।

হঠাৎ জোরালো মিউজিক শোনা গেল ওপাশের ঘরে। রাণু বললেন, বুড়োর টেপ বাজানো শুরু হল। শুনতে শুনতে ঘুমোবে। নাও, দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ো। পিউ! কোথায় যাচ্ছ?

বুড়োদার ঘরে নাচতে।

সাবর্ণী উঁকি দিয়ে দেখল, পিউ ওপাশের একটা ঘরে ছটফটিয়ে ঢুকে গেল। এখানে এসে বড় বেশি মাতামাতি করছে পিউ। সাবর্ণী একটু বিরক্ত হয়ে দরজা বন্ধ করল। নিঝুম শীতের রাতে এমনিতেই সব কিছু অস্বাভাবিক নিষ্প্রাণ লাগে এবং এ ধরনের স্তব্ধতার সঙ্গে পরিচয়ও নেই সাবর্ণীর। আবছা মিউজিকের শব্দটা ঠাণ্ডা জমাট স্তব্ধতাকে করাতচেরা করছে। সে সেদিকে কান রাখল। ওয়েস্টার্ন কিছু বাজছে টেপে। পিউ কি সত্যিই নাচবে? সাত্যকি ছেলেটিকে ভাল লেগেছে সাবর্ণীর। ভোরে কুয়াশার ভেতর জগিং করে এসে ঝুলন্ত বালির বস্তায় দমাদ্দম ঘুসি চালাচ্ছিল। পিউ প্রশংসার চোখে দেখছিল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দৃশ্যটা চোখে পড়েছিল সাবর্ণীর। কাল ভোরে পিউ ওর সঙ্গে জগিং করতে বেরুলেও অবাক হবে না সাবর্ণী। কিন্তু পিউ সত্যি বাড়াবাড়ি করছে। আর একটা দিন থাকলে পিয়ালির রিঅ্যাক্ট করার সম্ভানা। সাবর্ণীর খারাপ লাগল ভাবতে! একে তো নিজের একটা বিচ্ছিরি সমস্যা। পিউ বাড়তি ঝামেলা বাধাতে চলেছে।

ঘরের পশ্চিম ও দক্ষিণে দুটো করে জানালা। দক্ষিণে দুটো জানালার মাঝামাঝি ডিমালো সেকেলে আয়না লাগানো ড্রেসিংটেবিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে আলগোছে চিরুনি টানতে থাকল সাবর্ণী। তারপর মুখে ক্রিম ঘরে নিজেকে কিছুক্ষণ দেখার পর সুইচ টিপে উজ্জ্বল দেয়ালবাতিটা নেভাল। টেবিলের আলোটা এতক্ষণ ধরে জ্বলেছে! এগিয়ে গিয়ে সুইচ অফ করে নিজের সাহস যাচাই করতে চাইল সে।

গাঢ় অন্ধকার সহসা তাকে গিলে নিয়েছিল এবং যেন সেই খাদটাতে সে পড়ে যাচ্ছে, এমন আতঙ্কে সুইচ অন করল। তারপর পশ্চিমের খোলা জানালাটা সশব্দে বন্ধ করে দিল। দক্ষিণের জানালার ওধারে চওড়া ব্যালকনি। উঁকি মেরে দেখল নীচের লনে হলুদ আলো পড়েছে। আলোর ছটা গেটের দিকে এগিয়ে মিলিয়ে গেছে। গেটটা স্পষ্ট দেখা যায় না। ব্যালকনি অন্ধকার দেখে খারাপ লাগল সাবর্ণীর। আলোটা সারারাত জ্বালিয়ে রাখলে কী এমন বেশি খরচ হয়! দুটো জানালাই বন্ধ করে খাটে এসে বসল সে। পা দুটো হিমে জমে গেছে। মোজা পরবে কি না ভাবল। কিন্তু পরল না। কম্বলের ভেতর পা ঢুকিয়ে খাটের বাজুতে হেলান দিল। সাত্যকির ঘর থেকে পপ মিউজিক শোনা যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে ভোকাল উন্মাদনা। ওর ঘরে গিয়ে সময় কাটালে ভাল হত, যতক্ষণ না প্রিয়গোপাল আসে।

সাবর্ণীর বিশ্বাস, সে আসবে। পিউ যা বলল, তাতে তা-ই মনে হয়। অনির্বাণ এখানে আসতে পারে। প্রিয়গোপাল তা যদি আঁচ করে থাকে, সাবর্ণীর কাছাকাছি থাকাই তার পক্ষে স্বাভাবিক। নেহাত কাজের দায়ে বেরুতে হয়েছে। তাই দাদামশাইকে আভাসে কিছু বলে গেছে, এতে সাবর্ণী নিঃসন্দেহ। বিকেলে অরীন্দ্র ভালমন্দ দেখা, ‘বডিগার্ড’ এসব কথা তুলেই হঠাৎ থেমে গেলেন। কিন্তু কী বলেছে সে অরীন্দ্রকে? যা-ই বলুক, অরীন্দ্রই বা কী ভাবে তা নিয়েছেন? গল্পের আসর থেকে হঠাৎ সাবর্ণী চলে গেল। তারপর আর খোঁজখবর করার তাগিদ নেই ওঁর। হঠাৎ সাবর্ণী ওঁর মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছে যেন। তাকে ঘৃণা করা চলে এমন কিছু কি?

উত্তেজনায় সাবর্ণী নড়ে উঠল। ঠিক এ ধরনের আচরণের জন্যই সে প্রিয়গোপালকে মনে মনে ঘৃণা করে। ওর চেহারা হাব-ভাব দেখে কিছুতেই বোঝার উপায় নেই কত কুটিল প্রকৃতির মানুষ। দাদামশাই ভদ্রলোকটিও কি। তাই?

কতক্ষণ পরে দরজার ধাক্কার সঙ্গে পিউয়ের গলা শুনে সাবর্ণী সাড়া দিল। তারপর দরজা খুলতেই প্রিয়গোপাল ধুড়মুড় করে ঢুকে মাতালের মতো টলতে। টলতে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। হাতের ব্রিফকেস সশব্দে নীচে রাখল। পিউ চোখে ঝিলিক তুলে চলে গেলে প্রিয়গোপাল দম আটকানো গলায় বলল, দরজা বন্ধ করো! নাহ্! আগে এক গ্লাস জল এনে দাও।

টেবিলে জগভর্তি জল আর গেলাস ছিল। সাবর্ণী জলের গেলাস দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। কী একটা ঘটেছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে সাহস পাচ্ছিল না। প্রিয়গোপাল জল খেয়ে খালি গেলাস সাবর্ণীর হাতে দিয়ে কাতর একটু হাসল। একটা টেরিফিক এক্সপিরিয়েন্স হল! আই কান্ট এক্সপ্লেন ইট। বলে সে প্যান্টের বেল্ট ঢিলে করে দিল। দাদামশাই বরাবর বলেন। আমি বিশ্বাস করতুম না। বাপস!

সাবর্ণী ভুরু কুঁচকে বলল, কী হয়েছে?

ইরিগেশন বাংলোয় গণাদা আছে খবর পেয়ে মিট করতে গেলুম। প্রিয়গোপাল মুখে একটা ভয়ের ভঙ্গি এনে বলল। ফেরার সময় ক্লিফটনের কুঠিবাড়ির কাছাকাছি এসে হঠাৎ দেখি ব্রেক কাজ করছে না। ভাগ্যিস রাস্তা খারাপ, তাই স্পিড খুব কম ছিল। রাস্তার ধারে ঝোপে ঢুকিয়ে দিলাম। ধাক্কা বিশেষ লাগেনি। কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে কী করব ভাবছি, হঠাৎ কুঠিবাড়ির দিকে কী একটা হরি চিৎকার…আই কান্ট এক্সপ্লেন ইট, ফেরোসাস অ্যান্ড ক্র্যাকড ভয়েস। এনিওয়ে, আমি গাড়ি ফেলে রেখে চলে এসেছি। কাকেও কিছু বললুম না। তুমিও বলবে না। জাস্ট পথে গাড়ি খারাপ হেঁটে এসেছি। যাও, দরজা বন্ধ করো। একটা আনক্যানি ফিলিং হচ্ছে।

সাবর্ণী একটু হাসল শুধু। শব্দহীন এই হাসিতে অবিশ্বাস ছিল।

 প্রিয়গোপাল চাপাস্বরে বলল, বিলিভ মি বিবি! আরও একটু আছে। টর্চটা গাড়িতে থেকে গেছে। সেটা যে নেব, সে খেয়ালও নেই। কিছুটা এগিয়েছি, হঠাৎ পিছনে পায়ের শব্দ। থমকে দাঁড়ালুম। অন্ধকার। ঘুরে কাকেও দেখতে পেলুম না। আবার হাঁটছি। কিছুক্ষণ পরে আবার পায়ের শব্দ। সাহস করে বললুম, কে? সাড়া পেলুম না। নাহ, কানের ভুল নয়। বিলিভ মি প্লিজ, বাড়ির গেটে ঢুকছি, তখনও। সামবডি ওয়াজ ফলোয়িং মি। সিওর বিবি! আপন গড় বলছি। ঠিক শুকনো পাতায় পা ফেললে যেমন শব্দ হয়…

তুমি পোশাক ছাড়ো। আমি সুশিদিকে ওঠাচ্ছি। জল গরম করে দেবে। বলে সাবর্ণী পা বাড়াল দরজার দিকে।

প্রিয়গোপাল উঠে দাঁড়াল। বলল, একা বেরিও না। চলো, আমিও যাই।

সাত্যকির ঘরে মিউজিক থেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সারা বাড়িটা ভীষণ স্তব্ধ হয়ে গেল…

.

০৪.

ভোর ছটায় গেট থেকে জগিংয়ের শুরুতে পিউ বলল, হেভি ফগ বুড়োদা।

এই হেভি? সাত্যকি বলল। জ্যানুয়ারিতে তো…হেই! ইউ অর গোয়িং ক্যাস্ট।

ইউ আর টপ টু বটম ইয়াংকি!

তালে পা ফেলতে ফেলতে সাত্যকি ঘুরে ওর মুখের দিকে তাকাল। ইয়াংকি কেন?

জ্যানুয়্যার বললেন! ফ্যাস্ট বললেন!

 ও! সাত্যকি হাসল। বাট…নো টক প্লিজ! উই মাস্ট ফলো দা নর্মস্।

ইয়া!

কুয়াশা এত গাঢ় যে কয়েক হাত দূরে কিছু দেখা যায় না। যে-সব গাছ রাস্তার ওপর ডালপালা মেলেছে, বৃষ্টির ফোঁটার মতো শিশির ঝরাচ্ছিল। কিছুটা এগিয়েই সাত্যকি বুঝতে পারছিল তার গতি কমাতে হবে এবং পিউ নিয়মিত জগিংয়ে সম্ভবতঅভ্যস্ত নয়।

একটু পরে পিউ গতি বাড়াল। মুখে ধারালো হাসি। কাম অন ম্যান!

 উই আর জাস্ট রানিং!

 নো টক প্লিজ! দা নর্মস।

ইয়া! বাট…দ্যাটস্ নট জগিং।

ওক্কে। পিউ অগত্যা গতি কমাল।

একটা গাছের তলা দিয়ে যাওয়ার সময় এবার ঝরঝরিয়ে বৃষ্টির মতো শিশির পড়ল। পিউ আপনমনে বলল, বৃষ্টি! ফাইন!

সাত্যকি বলল, নাহ। শিশির!

 অ্যাত্তো বেশি? আই ডোন্ট বিলিভ!

এগেন ব্রেকিং দা নর্মস

পিউ দাঁড়িয়ে গেল হঠাৎ সাত্যকি ঝোঁকের মুখে এগিয়ে গিয়েছিল। টের পেয়ে সেও থামল। হাসতে হাসতে বলল, রেস্ট নিন। আই অ্যাম কামিং ব্যাক।

পিউ আঙুল তুলে বলল, জামাইবাবুর গাড়িটা।

দেখেছি! কিন্তু আপনি হাঁপিয়ে পড়েছেন। :

 ভ্যাট! কলকাতায় রোজ লেকের ধারে পাক্কা দু রাউন্ড বাঁধা। পিউ এগিয়ে যাচ্ছিল গাড়িটার দিকে। হঠাৎ চমকানো গলায় বলল, এ কী! এমন করে গাড়ির কাচ ভাঙল কে? দেখুন, দেখুন!

সাত্যকি ঝোপের দিকে এগিয়ে এল। গাড়ির সামনে পেছনে পাশে সব কাচ ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। সে বলল, প্রিয়দা লুকিয়েছে, বুঝলেন? পাছে আমরা। হইচই করি। সাংঘাতিক অ্যাকসিডেন্ট করেছিল। দৈবাৎ বেঁচে গেছে। দেখছেন ব্যাপারটা? আমার ধারণা, ট্রাক-ফ্রাকের সঙ্গে কলিসন। তাই না?

আমার তা মনে হচ্ছে না!

কেন বলুন তো?

চারদিকের কাচ ভাঙল কী ভাবে?

সাত্যকি হাসল। একই ট্রাক ব্রেক ফেল করা গাড়িটাকে চারদিক থেকে চুঁ মেরেছে আর কী! জাস্ট ইমাজিন দা সিন।

পিউ গাড়িটার চারদিকে ঘুরে এসে বলল, বড়িতে ধাক্কার কোনও চিহ্নই নেই। তা ছাড়া জামাইবাবুর ভার্সানের সঙ্গে মিলছে না। গাড়ির মুখ রাস্তার দিকে ঘুরে গেছে। এটা মিস্টিরিয়াস না? ওই ঝোপটা দেখুন। ওখানে গিয়ে আটকেছিল। স্ট্যাম্পড়।

ধাক্কা খেয়ে ঘুরে গেছে। একটা পর একটা ধাক্কা। ট্রাক ড্রাইভার ড্রাংক ছিল আর কী!

ভ্যাট! আপনি ব্যাপারটা ভাল করে দেখছেন না!

সাত্যকি সিরিয়াস ভঙ্গিতে গাড়িটার চারপাশ ঘুরে দেখে বলল, একটা এক্সপ্ল্যানেশন মাথায় আসছে। বলব?

কী? পিউ আনমনে প্রশ্নটা করল।

 কেউ বা কারা রাস্তার ধারে গাড়ি পড়ে থাকতে দেখে চুরির চেষ্টা করেছিল। না পেরে রাগে কাঁচ-ফাচ গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে। আনাড়ি চোরেদের কীর্তি! হয়তো ভেতরে মালফাল আছে ভেবেছিল।

পিউ ব্যাখ্যাটি মেনে নিয়ে বলল, ভাগ্যিস পরে কোনও এক্সপার্টকে এনে এঞ্জিন খুলে নিয়ে যায়নি! পি জি সায়েবের কোম্পানি যা কিপটে।

সাত্যকি মুখ দিয়ে একরাশ ভাপ ছেড়ে বলল, তা হলেও প্রিয়ার কোম্পানির গাড়ি! ডোন্ট ওরি! চলুন, অন্তত ক্যানেল অব্দি ঘুরে আসি। পা নিসপিস করছে।

সে একখানে দাঁড়িয়ে জগিংয়ের ভঙ্গি শুরু করল। পিউ গাড়ির কাছ ঘেঁসে দাঁড়িয়েছিল। রাস্তার পিচে ঘন ঘাস ঠেলে এসেছে। হঠাৎ পায়ের সামনে ঘাসের ওপর ঝুঁকে পড়ল পিউ। বুড়োদা! দেখুন তো! আমার মনে হচ্ছে…ও মাই! ব্লাড নাকি?

ব্লাড? ইমপসিবিল! প্রিয়দার গায়ে কোনও আঁচড়ই লাগেনি।

আহ্! দেখুন না প্লিজ!

অগত্যা সাত্যকি দেখতে গেল। শিশিরভেজা ঘন ঘাসের ওপর কয়েক জায়গায় একটু করে লালচে ছোপ টলটল করছে। সাত্যকি পরীক্ষা করে দেখে বলল, দিস অলসো আই ক্যান এক্সপ্লেন!

ব্লাড মনে হচ্ছে না?

পিউয়ের কণ্ঠস্বরে ছটফটানি ছিল। সাত্যকি হাসতে হাসতে বলল, ব্লাড হোক বা নাই হোক, উই আর গেটিং এক্সাইটেড। এনিওয়ে, কাচ ভেঙেছে যারা, তাদেরই কারও ব্লাড।

কিন্তু গাড়ির গায়ে ব্লাড নেই কেন?

 ভাঙা কাচ ছিটকে এসে ওদের কারও হাতে-টাতে লেগেছিল। ছেড়ে দিন। সময়মতো প্রিয়দা এসে গাড়ির ব্যবস্থা করবে। চলুন, ক্যানেল-ব্রিজে ঘুরে আসি ততক্ষণ।

 আবার দুজনে জগিং শুরু করল। কুয়াশা একটু ফিকে হয়েছে। কনকনে হিম মুখে ঝাপটা মারছে। পিউ মাথায় জড়ানো রেশমি স্কার্ফটা বরাবর টেনে দিচ্ছিল মুখের দুপাশে। সাত্যকির মতো ভাপ ছাড়ছিল। সাত্যকি ইচ্ছে করেই গতি কমিয়েছে। কিন্তু পিউয়ের পক্ষে আর জোর দেখানো সম্ভব ছিল না। অভ্যাস নেই নয়, পরিবেশ আলাদা হলে মন এবং শরীরও অন্যরকম হয়ে যায় যেন।

ক্যানেলের ব্রিজের মুখে কুয়াশায় একটা মূর্তি ভেসে উঠল। মাথায় জাবদা মাংকি ক্যাপ, গলায় আঁটো করে মাফলার জড়ানো, হাতে দস্তানা, চোখে চশমা, পরনে জ্যাকেট এবং আঁটো প্যান্ট। বেঁটে মোটাসোটা মানুষ।

পিউ নাকি?

ডাক শুনে পিউ থমকে দাঁড়াল। সাত্যকি থামল না। ব্রিজের দিকে এগিয়ে গেল। পিউ বলল, গণাদা! মাই গুডনেস! তুমি মর্নিংওয়াক করো নাকি? ভবে যায় না। এই হেভি ফগের মধ্যে তুমি…!

পিউ একটু হাঁফাতে হাঁফাতে জোরালো একখানা হাসি দিল। গণনাথ হাসলেন না। চাপাস্বরে বললেন, হ্যাঁ রে! তোদের ওখানে রাত্তিরে কোনও গণ্ডগোল হয়নি তো?

পিউ অবাক হয়ে বলল, গণ্ডগোল! কেন? তুমি কি বলছ বুঝতে পারছি না।

আনু রাত প্রায় সওয়া এগারোটা নাগাদ মাতাল অবস্থায় বাংলো থেকে বেরিয়েছে। গণনাথ ভাঙা গলায় বললেন। তারপর আর পাত্তা নেই। হোল নাইট আমি জেগে আছি ওর জন্য।

পিউ ঠোঁট কামড়ে ধরেছিল। একটু পরে বলল, আনুদা তো আমাদের ওখানে যায়নি!

তুই সিওর? মানে তুই ঘুমিয়ে পড়ার পর..

হাত নাড়ল পিউ। নাহ্। যায়নি। জামাইবাবু ফিরল, তখন প্রায় বারোটা।

বারোটা! কিন্তু আমাকে মিট করে গেল জাস্ট এগারোটায়। এটুকু রাস্তা গাড়িতে যেতে একঘণ্টা লাগল? তুই ভুল করছিস।

পিউ জোর দিয়ে বলল, নৌ। নীচের হলঘরের ওয়ালক্লকে তখন বারোটা বাজছিল। ভগীরথদা ওকে ওপরে রেখে গেল। তবে একঘণ্টা লাগার কারণ আছে। বুঝতে পেরেছি।

গণনাথ সিগারেট বের করে বললেন, পথে কিছু…।

বলছি। পিউ বিরক্ত হয়ে বলল। বলতে দেবে তো? গাড়ির ব্রেক ফেল করেছিল, ঝোপে ধাক্কা মারে। খুব বেঁচে গেছে জামাইবাবু। তারপর হেঁটে ফিরেছে। তুমি তা জান, পি জি সায়েব এক পা হাঁটতে পারে না!

সিগারেট জ্বেলে গণনাথ বললেন, কিন্তু আমি ভেবে পাচ্ছি না আনু কোথায় যেতে পারে?

পিউ হাসল। বিবির মুখ দেখার চান্স আছে বলে কেটে পড়েছে। ট্রেনে বা বাসে।

কী বলছিস? ওর ব্যাগ-ফ্যাগ সব পড়ে আছে বাংলোয়।

আনুদাকে তুমি এখনও চেন না দেখছি! হি নাথিং কেয়ারস ফর। বিশেষ করে ব্যর্থ প্রেমে ফিউরিয়াস।

অনিচ্ছায় হাসলেন গণনাথ। তুই বড্ড পেকে গেছিস।

বাট দিস ইজ টুথ। আই নো।

হুঁ, তুই তো জানবিই। কিন্তু কোনও মানে হয় বল পিউ? গণনাথ পা বাড়ালেন। আয়, বড্ড ঠাণ্ডা। বাংলোয় গিয়ে কফি খাবি। তারপর তোকে নিয়ে গাড়ি করে বেরুব। তোর পি জি সায়েব বলেনি আমাকে লাঞ্চের নেমন্তন্ন করে এসেছে?

কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে পিউ একটা ভঙ্গি করল শুধু।

আয়, তোর সঙ্গীকেও ডেকে নে। নাইস চ্যাপ। কী যেন নাম?

 বুড়োদা। সরি, সত্যকি। কিন্তু একটা কথা গণাদা, ওকে তুমি ডাকবে। ও যদি যায়, তবে আমি যাব। কেন বুঝতে পারছ তো? পিউ চোখে হাসল। ম্যানার্স, গণাদা!

গণনাথ আবার গম্ভীর হলেন। ব্রিজে সাত্যকি রেলিঙে একটা কনুই রেখে নীচের দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিল। গণনাথ এবং পিউকে দেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। গণনাথকে নমস্কার করে বলল, দাদা মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছেন?

না রে ভাই! আমার গরুটি হারিয়েছে। খুঁজতে বেরিয়েছিলুম।

 পিউ হেসে উঠল। থামো! কলকাতা ফিরে আনুদাকে বলব, গণাদা তোমায় গরু বলেছে।

সাত্যকি বলল, এনিথিং রং?

গণনাথ বলার আগে পিউ বলে দিল, আনুদা রাত্তিরে উধাও।

 হু ইজ হি?

 নাও বোঝাও। কাল বিকেলে যাকে বক্সিং বোঝাচ্ছিলেন, তাকে এরই মধ্যে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। কারণ সে আপনাকে রাগিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, বক্সিং-টক্সিং রিয়্যাল লাইফে ইউজলেস!

সাত্যকি শুকনো হাসল। ও! অনির্বাণবাবু। তবে ইউ আর নট কারেক্ট পিউ। আমি রাগিনি। উনিই রেগে অস্থির। একটু অ্যাংগ্রি টাইপ যেন।

 ইয়া। অ্যাংগ্রি ম্যানরা যা হয়। গণাদার সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করে….

গণনাথ বাধা দিলেন। নাহ্। একটুও ঝগড়াঝাটি হয়নি। সাত্যকিবাবু, বাংলোয় আসুন। স্ট্রং কফি খেয়ে আপনাদের গাড়িতে পৌঁছে দেব।

সাত্যকি বিনয়ে বলল, দাদা! চা কফি-সিগারেট আমার চলে না। তবে বললেন যখন, যাচ্ছি। অবশ্য গাড়িতে আমি চাপব না। পেছন পেছন দৌডুব।

বাংলোয় পৌঁছে গণনাথ রামলালকে ডেকে কফি করতে বললেন। তারপর ঘরে ঢুকে পিউকে অনির্বাণের বিছানা দেখালেন। জাস্ট লুক! হতচ্ছাড়া যেমন বেখে গেছে তেমনি অবস্থায় আছে।

পিউ লক্ষ করে বলল, কম্বলটার অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছে নিশ্চয় ঝগড়া হয়েছে। তুমি না বললেও শুনব না। বুড়োদা! দেখছেন? হঠাৎ রেগে গিয়ে কম্বল থেকে বেরুলে তবেই কম্বলের পজিশন এমন হতে পারে!

গণনাথ বিরক্ত হয়ে বললেন, তুই মহা গোয়েন্দা!

পিউ অনির্বাণের বিছানার চারদিকে ঘুরে বলল, আই হ্যাভ মাই আইজ মাই ডিয়ার গণাদা!

সাত্যকি সায় দিয়ে বলল, আছে। বুঝলেন দাদা? প্রিয়দার গাড়িটা যেখানে পড়ে আছে, সেখানে ঘাসের ওপর রক্তের দাগ। অ্যান্ড পিউ ডিসকভার্ড ইট! আমি তো দেখতেই পেতুম না।

গণনাথ চমকে উঠে বললেন, রক্তের দাগ?

পিউ বলল, গাড়ির কাচ-ফাচ কিচ্ছু নেই। ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে কারা। বুড়োদা বলছে চোর। তা-ই হবে।

কাচ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে? খুব আস্তে টেনে কথাগুলি উচ্চারণ করলেন গণনাথ।

সাত্যকি হাসল। সমস্ত কাচ। কিন্তু সিওর, অ্যাকসিডেন্ট নয়। প্রিয়দা ইনট্যাক্ট আছে। ব্রেক ফেল করে ঝোপে ধাক্কা মেরেছিল। তারপর পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরেছে।

গণনাথ চশমার ভেতর থেকে নিষ্পলক তাকিয়ে বললেন, প্রিয় কাচ ভেঙে যাওয়ার কথা বলেনি? ধাক্কা মারলে তো কাচ ভাঙতেই পারে।

পিউ ড্যামের দিকের জানালায় গিয়ে বলল, যাবার পথে দেখে যেও।

 কিন্তু রক্তটা এল কোত্থেকে?

সাত্যকি হাতের গ্লাভস খুলে টেবিলে রেখে আঙুলের ব্যায়াম করতে করতে বলল, দ্যাট ইজ অলরেডি এক্সপ্লেনড। চোরেরা গাড়ি নিয়ে না যেতে পেরে রাগের চোটে কাচ ভেঙেছে। কাঁচের টুকরো ছিটকে এসে হাতে-ফাতে লেগেছে। সিওর!

গণনাথ চুপ করে রইলেন। রামলাল ট্রেতে কফি দুধ চিনি চামচ কাপ-প্লেট সুন্দর করে সাজিয়ে এনেছিল। পিউ হাতের পশমি গ্লাভস খুলে বলল, আমার ব্ল্যাক কফি। বুড়োদা, আমার অনারে জাস্ট ওয়ান অর টু সিস্! প্লি-ই-জ!

সাত্যকি মাথা নাড়ল। আপনার অনারে এখন ড্যামে সাঁতার কাটতে বলুন, আই উইল ডু দ্যাট।

পিউ চোখে হাসি এনে বলল, বাট ইউ আর টপ টু বটম ইয়াংকি! ব্ল্যাক কফি ছাড়া ইয়াংকি হয় না!

আপনি স্টেটসে ছিলেন মনে হচ্ছে?

গণনাথ অন্যমনস্কভাবে কফিতে দুধ মেশাচ্ছিলেন। চেষ্টাকৃত কৌতুকে বললেন, ওর দাদা-বউদির কাছে দিন-চারেক ছিল শুনেছি। কোথায় যেন রে?

শাট আপ! পিউ ফুঁসে উঠল। মাসকে দিন কোরো না।

গণনাথ একটু রিলিফ চাইছিলেন রাতের টেনশন থেকে। বললেন, এনিওয়ে, চার মাসেই ও ইয়াংকি-ফিয়াংকি চিনে গেছে। তবে ফেরার পর আরও মাস চারেক ওর ইন-ডেথ নলেজের চোট খেতে খেতে আমরা অনেকেই জেরবার হয়েছিলুম।

সাত্যকি পিউকে দেখছিল। বলল, সেই! তো মাত্র চার মাস কেন?

শোনা কথা। গণনাথ কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, ওর দাদা নিয়ে গেল পড়াশুনোর জন্য আর ও নাকি হলিউড-হলিউড করে অস্থির। কোথায় ওয়েস্ট কোস্টে হলিউড, কোথায় ইস্ট কোস্টে…জায়গাটার নাম কী যেন? বল্ পিউ!

পিউ কাপ তুলে বলল, ছুঁড়ব গণাদা! তুমি বলেছিলে আমি হিস্টেরিক টাইপ। ডোন্ট ফরগেট দ্যাট!

 সাত্যকি কাপে একটু লিকার ঢেলে ফর ইওর অনার বলে চুমুক দিল। তারপর তেতো গেলার ভঙ্গি করল মুখে। কাঁধে ঝাঁকুনি দিল।

গণনাথ আবার গম্ভীর হয়ে গেলেন। বুঝলি পিউ? আমার মনে হচ্ছে না আনু কলকাতা চলে গেছে। বলে উঠে গেলেন অনির্বাণের বিছানার দিকে। বালিশ তুলে দেখে বললেন, এই দেখ ওর সিগারেট দেশলাই! এক মিনিট। ওর কিটব্যাগটা দেখাচ্ছি তোকে।

কিটব্যাগের চেন খুলে কয়েকটা গোটানো জামা-প্যান্ট, একটা পুলওভার বের করলেন গণনাথ। পাশের চেন খুলে একটা ছোট্ট নোটবই, জটার পেন, দুটো চিঠি বেরুল। তারপর বেরুল মানিব্যাগ। গণনাথ শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, পিউ! আনু কলকাতায় যায়নি এগুলো তার প্রমাণ।

সাত্যকি সায় দিয়ে বলল, হ্যাঁ! মানিব্যাগ রেখে কলকাতা যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। দাদা, আমার মনে হচ্ছে, এখনই টাউনশিপে গিয়ে পুলিশকে জানানো দরকার। এরিয়ায় ক্রিমিনালদের প্রচণ্ড উৎপাত হয়েছে আজকাল। কিছু বলা যায় না। সঙ্গে টাকা থাকা বরং সেইফ। টাকা না পেল তো রেগে স্ট্যাব করে গঙ্গায় ফেলে দিল।

পিউ বলল, ইউ আর গোয়িং টু-উ ফার! গণাদা! বুড়োদা আনুদাকে জানে না, বাট ইউ নো হিম ওয়েল।

গণনাথকে উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। বললেন, কিন্তু ও ড্রাঙ্ক ছিল, সেটাই প্রবলেম।

একটু ইতস্তত করে পিউ আস্তে বলল, আনুদার আছে ফায়ার আর্মস দেখেছি।

থাকতে পারে। আমি দেখিনি। গণনাথ এসে কফিটুকু এক চুমুকে শেষ করলেন। তারপর পা বাড়িয়ে বললেন, ফায়ার আর্মস পকেটে নিয়ে কেউ বিছানায় শুতে যায় না।

পিউ উঠে গিয়ে অনির্বাণের বিছানাটা খুঁজতে শুরু করল। তন্ন তন্ন করে খোঁজার পর হতাশ ভঙ্গিতে বলল, যত দোষ তোমার গণাদা! যাকে ট্যাক্স করতে পারবে না, তাকে সঙ্গে কেন আনলে? যদি বা আনলে, তাকে ড্রাঙ্ক অবস্থায় বেরিয়ে যেতে দিলে কেন? সমস্ত রেসপন্সিবিলিটি কিন্তু তোমার।

তুই ঠিকই বলেছিস, পিউ! কিন্তু…..

 গণনাথ থেমে গেলে পিউ বলল, কিন্তুটা কী? আনুদা ফিল্মের কী বোঝে যে তাকে সঙ্গে না আনলে চলত না? তোমার একটা কিছু মোটিভ ছিল। নিশ্চয় ছিল।

মাথা খারাপ করিস নে পিউ! আমাকে ভাবতে দে।

 সাত্যকি উঠে দাঁড়িয়ে গ্লাভস পরছিল। বলল, আপনি থানায় খবর দিন, দাদা। দেরি করা ঠিক নয়।

রামলাল বারান্দায় বসে রোদের প্রতীক্ষা করছিল। ওরা বেরুলে সে একটু কেশে গণনাথের উদ্দেশে বলল, স্যার! কৈ বুরা না সমঝাইয়ে তো হম কুছ বোলনে চাহতা।

গণনাথ তার দিকে তাকালেন। পিউ থমকে দাঁড়াল। সাত্যকি লনে নেমে নুড়ির ওপর জগিংনাচ নাচতে থাকল। নুড়িগুলি খড়খড় শব্দে নড়তে লাগল।

কাঁচুমাচু মুখে রামলাল বলল, রাতমে হম কিনিকি আওয়াজ শুনা।

গণনাথ অবাক হয়ে বললেন, কিচনি?

জি হাঁ। লিটনসাবকা কোঠিকি বিচমে কিনি রতি স্যার। পানিমে ছুপা রহতি। কভি কভি চিল্লাতি! রামলাল করুণ হাসল। সবকো পুছকে দেখিয়ে সাচ কি ঝুট। তো কিচনি জব চিল্লাতি, কোই না কোই আদমিকা জান জাতা। উনহিকো পুছিয়ে। মালুম হো জায়গা! সে তর্জনী তুলল সাত্যকির দিকে।

সাত্যকি শুনছিল। একটু হেসে বলল, সুপারস্টিশন দাদা! কিচনি হচ্ছে জলের পেত্নী! ঠাকুর্দার কাছে শুনবেন।

পিউ দ্রুত বলল, হুঁ, কাল রাত্তিরের সাত নম্বর গল্পের জাস্ট ইনট্রো। কিন্তু আনুদা নাম্বার ওয়ান মামদো। ডোন্ট ওরি গণাদা! এমনও হতে পারে, টাউনশিপে কোনও বন্ধু আছে ওর। তোমার সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করে…

আহ। বলছি ঝগড়া হয়নি। বলে গণনাথ লনের ওধারে গ্যারেজঘরের দিকে গেলেন। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গেটের কাছে এলেন। রামলাল গিয়ে গেটটা পুরো খুলে দিল। পিউ সামনে উঠে বসল। সে উইন্ডোতে মুখ বার করে সাত্যকির দিকে তাকাল। সাত্যকি গাড়িতে যাবে না। পেছন থেকে গলাটা চড়িয়ে বলল, দাদা! সোজা থানায় চলে যান।

রাস্তায় পৌঁছে গণনাথ বললেন, হুট করে থানায় যাওয়াটা ঠিক হবে না। বুঝলি পিউ? আমি অন্য একটা অ্যাঙ্গল থেকে চিন্তা করছি। আগে প্রিয়র সঙ্গে কথা বলে দেখি, সত্যি কী ঘটেছিল রাত্তিরে। খামোকা হইচই বাধানো উচিত নয়। বিশেষ করে তোর এ পয়েন্টটা আমার মনে ধরেছে। বাউণ্ডুলে হতভাগার কোথায় যে বন্ধু নেই, বলা কঠিন। গতবার কিরিবুরুতে গেলুম বাঙালি উদ্বাস্তু নিয়ে ডকুমেন্টারি তুলতে। গিয়ে অবাক। অন্তত এক ডজন বন্ধু বেরুল ওর।

পিউ মাথায় জড়ানো স্কার্ফ ঠিক করে নিয়ে বলল, আনুদা বরাবর তোমার বডিগার্ড।

সে কথায় কান না করে গণনাথ বললেন, প্রিয়র গাড়িটা দেখিয়ে দিবি। লক্ষ রাখ।

কুয়াশা কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে। বাঁদিকে সূর্য ওঠার আভাস। ক্লিফটনের কুঠিবাড়ি টিলা পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। পিউ বলে উঠল, রোখো। রোখো! এখানেই তো গাড়িটা ছিল। ম্যাজিক? যা বাব্বা! গাড়িটা উধাও হয়ে গেল?

গণনাথ গাড়ি দাঁড় করালেন। পিউ ব্যস্তভাবে নেমে গেল। সেই ছত্রখান ঝোপঝাড়। অজস্র কাঁচের টুকরো আর কুচি ছড়ানো অনেকটা জায়গা জুড়ে। গণনাথ নেমে গিয়ে বললেন, হুঁ! কিন্তু রক্তের দাগ কোথায় দেখেছিলি?–

পিউ ঝুঁকে ঘাস দেখছিল। সোজা হয়ে বলল, ম্যাজিক! কিছু নেই। আশ্চর্য তো!….

.

০৫.

গণনাথের গাড়ি দেখতে পেয়ে সাবর্ণী নেমে এসেছিল। পিউ গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে বলল, পি জি সায়েবের গাড়ি ভ্যানিশ, বিবি! তার চাইতে মিসটিরিয়াস ব্যাপার….

তাকে থামিয়ে সাবর্ণী বলল, গ্যারেজে নিয়ে গেছে। সবতাতেই চ্যাঁচামেচি করিস না তো।

গণনাথ গাড়ি থেকে বেরিয়ে বললেন, ইশ! একেবারে মেটামরফসিস, সক্কালবেলায় বুঝি পরী সাজতে হয় আজকাল?

সাবর্ণী তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করল।

আরে! গণনাথ একটু হাসলেন। হুঁ, বিয়ের বাসি প্রণাম। তবে আশীর্বাদ অলরেডি আগাম বাই পোস্ট পাঠিয়েছিলুম। আসলে তখন আমার লেটেস্ট ছবির এডিটিং চলছে। প্রাণান্তকর অবস্থা।

পিউ প্রিয়গোপালের গাড়ির ভাঙা কাচ এবং রক্তের ব্যাপারটা বলতে উগ্রীব। কিন্তু বলার মুখেই বাধা পেয়ে রেগে গেছে। পোর্টিকোর সিঁড়িতে জোরালো পায়ের শব্দ তুলে ভেতরে ঢুকে গেল। সাবর্ণী বলল, আমার ঘরে চলুন। প্রিয় বলে গেছে, আপনারা আসবেন।

অনেক আগে এসে গেলুম। গণনাথ তাকে অনুসরণ করে বললেন। একটা ঝামেলায় পড়েছি। বলছি। হ্যাঁ রে, বাড়ির লোকজন এখনও ঘুমুচ্ছে নাকি?

নাহ। দাদামশাই তার নাতনিকে নিয়ে গঙ্গাস্নানে গেলেন। ও! তুমি রাণুদিকে তো দেখেছ কাল বিকেলে। আমাকে তাতাচ্ছিল। আমার অত পুণ্যটুন্যের দরকার নেই বাবা! কী সাংঘাতিক শীত এখানে!

প্রিয় কতক্ষণ আগে বেরিয়েছে?

প্রায় ঘণ্টাখানেক। সঙ্গে ভগীরথকে নিয়ে গেছে টাউনশিপের কোন গ্যারেজে যাবে।

 গণনাথ ওপরে উঠে ব্যালকনিতে গেলেন। বললেন, বাড়িটা বনেদি। ছবির কাজে লাগানোর উপযোগী। কিন্তু যা অবস্থা, ছবিটবি করার প্ল্যান, হয়তো শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যাবে।

কেন?

গণনাথ বললেন, গত রাত থেকে আনু হঠাৎ নিপাত্তা। খুব ভাবনায় পড়ে গেছি।

সাবর্ণী আগ্রহ দেখাল না। বলল, ঘরে এসে বসুন। আমি চায়ের কথা বলে আসি।

গণনাথ ঘরে ঢুকে বললেন, পরে হচ্ছে। তোর সায়েব না ফেরা পর্যন্ত ডিসিশন নিতে পারছি না।

কিসের?

আনুর ব্যাপারে থানায় যাব কি না। গণনাথ দক্ষিণের জানালার কাছে একটা চেয়ারে বসে সিগারেট ধরালেন।

ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, প্রিয় তোকে ওর গাড়ির অ্যাকসিডেন্টের ব্যাপারে কী বলেছি, বলবি?

সাবর্ণী উঁচু খাটে হেলান দিয়ে শান্ত চোখে তাকাল। বলল, ব্রেক ফেল করায় ঝোপে গাড়ি ঢুকিয়েছিল। তারপর হেঁটে বাড়ি ফিরেছে। বলে সে বাঁকা হাসল। একটু ভৌতিক টাচ অবশ্য দিয়েছে। কী একটা অদ্ভুত চিৎকার শুনেছিল নাকি। টেরিফিক ক্র্যান্ড ভয়েস!

ইজ ইট? গণনাথ সোজা হয়ে বসলেন। প্রিয় বলছিল তোকে? আশ্চর্য তো! বাংলোর চৌকিদারও বলল রাত্তিরে ভুতুড়ে চিৎকার শুনেছে। আচ্ছা, প্রিয় তোকে বলেছিল ওর গাড়ির কাঁচ-ফাচ ভেঙে গেছে?

নাহ। কে বলল কাচ ভেঙেছে?

পিউ আর সাত্যকি দেখেছে। আমিও ভাঙা কাচ পড়ে থাকতে দেখলুম। প্রিয় কি উন্ডেড হয়েছিল?

সাবর্ণী একটু অবাক হয়ে বলল, নাহ্। গায়ে এতটুকু আঁচড় লাগেনি। কেন বলুন তো?

পিউ আর সাত্যকি দুজনেই রক্ত দেখেছিল ঘাসে। গণনাথ উদ্বিগ্ন মুখে বললেন। কিন্তু এখন দেখে এলুম রক্তের চিহ্ন নেই। গাড়ি নিশ্চয় গ্যারেজে নিয়ে গেছে প্রিয়। কিন্তু রক্তের দাগ….তুই পিউকে ডেকে জিজ্ঞেস কর।

সাবর্ণী নড়ল না। বলল, এ সবে আমার মাথাব্যথা নেই। প্রিয় ফিরুক। জিজ্ঞেস করবেন।

গণনাথ সিগারেটে জোরে টান দিয়ে বললেন, অবশ্য গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় চাকায় রক্তের দাগগুলো মুছে যেতেও পারে। কিন্তু আমার প্রচণ্ড অস্বস্তি হচ্ছে। রাত্তিরে প্রিয় আমার সঙ্গে দেখা করে বাংলো থেকে চলে আসার একটু পরে আনু বেরুল। মোটামুটি ড্রাঙ্ক। তারপর আর ওর পাত্তা নেই।

সাবর্ণী ভুরু কুঁচকে এবং ঠোঁট কামড়ে ধরে শুনছিল। ফেস করে শ্বাস ছেড়ে বলল, তা হলে প্রিয় ওকে মার্ডার করেছে।

আহ্। আমি কি তা-ই বলছি?

 থানায় যাচ্ছেন না কেন? কেউ নিপাত্তা হলে লোকে তো আগে থানায় যায়।

গণনাথ কিছুক্ষণ চুপচাপ সিগারেট টানার পর আস্তে বললেন, তোর বোঝা উচিত কেন যাচ্ছি না। গেলে পরে যা জেনেছি, সমস্তটা আমাকে পুলিশের কাছে বলতে হবে। আফটার অল, আনুর ব্যাপারে আমি কম্পপ্রামাইজ করতে পারব না, ইউ শুড় নো দ্যাট বিবি! আনু আমাকে অনেক সাংঘাতিক ব্যাপার থেকে বাঁচিয়েছে। আনুর একটা কিছু হওয়া মানে আমি বিপন্ন। সো মাচ আই ক্যান টেল ইউ। কাজেই প্রিয়র মুখ থেকে আমি জানতে চাই অ্যাকচুয়্যালি হোয়াট হ্যাঁপ!

সাবর্ণীর চোখ দুটো জ্বলে উঠেছিল। একটু চুপ করে থাকার পর গলার ভেতর বলল, আপনি ইনডিরেক্টলি আমাকেই শাসাচ্ছেন কিন্তু!

তুই যদি গায়ে পেতে নিস, আমার বলার কিছু নেই। গণনাথ হাসবার চেষ্টা করলেন। আর যাই করি, আনুর সঙ্গে তোর সম্পর্কের কথা আমি পুলিশের কাছে তুলব না। তবে রাতের ব্যাপারটা আমার কাছে খটকা লাগছে।

পিউ ট্রেতে চা আর স্নাক্স আনল। সাত্যকিকে দরজায় দেখা গেল। সে উঁকি মেরে বলল, দাদা! এসে গেছি। জাস্ট আ মিনিট। আমি আসছি।

পিউ গণনাথ এবং সাবর্ণীকে দেখে নিয়ে বলল, এত বেশি সিরিয়াস হবার মতো কিছু ঘটেনি। বিবি! আমি চা-ফা করতে জানি না। কতটা লিকার কতটা দুধ কতটা চিনি এসব হিসেব মহিলারা জানেন। তা ছাড়া আমি চা খাই না।

সে বেরিয়ে গেলে সাবর্ণী চা তৈরি করে গণনাথকে দিল। গণনাথ বললেন, তুই খাবি না।

নাহ্। কিন্তু তুমি তো ভারি অদ্ভুত খবর নিয়ে এলে!

রাগ করিস না বিবি! সত্যি আনুর কিছু একটা ঘটলে আমি বিপন্ন। গণনাথ চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, কেন বিপন্ন, তোকে তা বলা যাবে না। প্রত্যেকের জীবনে কিছুনা-কিছু প্রাইভেট ব্যাপার থাকে। এনিওয়ে! গ্যারেজটা কোথায় জানতে পারলে ভাল হত। প্রিয়র সঙ্গে মিট করা দরকার। খোঁজ নিয়ে দেখ তো, তোদের সেই ভগীরথ ফিরেছে নাকি।

ফেরেনি। ফিরলে সাড়া পেতুম। সাবর্ণী দক্ষিণের জানালায় গিয়ে অকারণ উঁকি দিল। তারপর ঘুরে বলল, আচ্ছা গণাদা!

বল।

ওই লোকটার বিপদের কথা তুমি ভাবছ কেন? সে তো নিজেই একটা সাংঘাতিক বিপদ।

আমার কেন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে! আনু আনপ্রেডিক্টেবল এলিমেন্ট, তা ঠিক। কিন্তু প্রিয় তোকে বলেছে ওখানে একটা অদ্ভুত চিৎকার শুনেছে। বাংলোর চৌকদারও বলছিল শুনেছে। আমি ভাবছি, চিৎকারটা আর্তনাদ কিনা! তাছাড়া প্রিয়র গাড়ির কাছে রক্তের দাগ ছিল।

সাবর্ণী আঙুল খুটতে খুঁটতে বলল, চিৎকার শুনে প্রিয় খুব ভয় পেয়েছিল। এল যখন, তখন ভীষণ নার্ভাস দেখাচ্ছিল ওকে। জল খেল। অবশ্য এটাকে যদি কাকেও মার্ডার করে আসার লক্ষণ বলতে চাও, বলতে পার। শুনেছি, মরিয়া। হয়ে উঠলে যে-কেউ বাইচান্স মার্ডার করে ফেলতেই পারে। প্রিয় যদি তা-ই করে থাকে, আমি কিন্তু খুশি হব।

গণনাথ ওর চোখে চোখ রেখে বললেন কেন? প্রিয়র সঙ্গে তোর বিয়েতে আনু তে বাধা দেয়নি। বিয়ের পরও তোর পিছনে লাগতে আসেনি।

এসেছিল! তুমি তো ওর মালিক। তোমায় দেখানো উচিত।

সাবর্ণী শক্ত মুখে কথাটা বলে কোনার টেবিলের দিকে গেল। একটা কিটব্যাগের ভেতর থেকে হ্যান্ডব্যাগ বের করে খুলল। তারপর হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠল সে। হ্যান্ডব্যাগটা তন্নতন্ন খুঁজে কিটব্যাগের ভেতরটা খুঁজতে থাকল।

গণনাথ বললেন, কী খুঁজছিস?

 চিঠিটা…অদ্ভুত তো! চিঠিটা কাল মনিঙেও দেখেছি। নেই কেন?

কার চিঠি?

তোমার পোষা জানোয়ারের। সাবর্ণী ঠোঁট কামড়ে ধরল। তারপর হ্যান্ডব্যাগ আর কিটব্যাগ সশব্দে মেঝেয় ছুঁড়ে ফেলল। আগুনজ্বলা চেহারা।

গণনাথ বললেন, সিন ক্রিয়েট করিস না। এখানে আয়। বোস! কাম অন! বিবি!

এ ঠিক পিউয়ের কাজ। দেখাচ্ছি মজা! বলে সাবর্ণী জোরে বেরিয়ে গেল।

পুবের ছোট্ট ব্যালকনিতে বালির বস্তায় সাত্যকি দমাদ্দম ঘুসি চালাচ্ছিল। পিউ দাঁড়িয়ে তাকে নিঃশব্দে লড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করছিল। সাবর্ণীকে দেখে ঘুরল। সাবর্ণী রাগী মুখে বলল, শুনে যা। কথা আছে।

পরে শুনব। ফোর্থ রাউন্ড হয়ে গেল!

সাবর্ণী তাকে হিড়হিড় করে টেনে সাত্যকির ঘরে ঢুকিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, আমার একটা চিঠি নিয়েছিস তুই?

পিউ চোখ বড় করে বলল, চিঠি! আমি তোর চিঠি…ইমপসিবল! কী বলছিস তুই?

নিশ্চয় নিয়েছিস। লুকিয়ে আমার চিঠি পড়া অভ্যাস তোর আছে।

শাট আপ বিবি! আই অ্যাম হিস্টেরিক, ইউ নো।

সাবর্ণী একটু দমে গিয়ে বলল, কিন্তু চিঠিটা যাবে কোথায়! আমার হ্যান্ডব্যাগে তুই ছাড়া হাত দেবে কে?

পি জি দেবে। বলে পিউ বারান্দায় চলে গেল। সাত্যকির অন্যদিকে মন নেই। ঘুরে পিউকে দেখে একটু হাসল শুধু। আসলে এতক্ষণ পরে সে পিউকে দেখতে পেয়েছিল। এর আগে পিউ ছিল তার কাছে অস্তিত্বহীন।

সাবর্ণী তার ঘরে ফিরলে গণনাথ বললেন, তুই সত্যি সিন ক্রিয়েট করে বেড়াচ্ছিস! এ বাড়ির লোকেরা কী ভাববে? বলছি, চুপচাপ বস। তারপর….অবশ্য সেটা তোরই ইচ্ছে, আভাসে বলতে পারিস আনু কী এমন কথাবার্তা লিখেছিল তোকে।

গণনাথ ঘড়ি দেখলেন। সাবর্ণী বসল না। টুলে রাখা সুটকেসটা খুলতে ব্যস্ত হল। সাবর্ণীর এমন হয়, একখানে রাখা জিনিস অন্যখান থেকে বেরিয়ে পড়ে। এই আনমনা স্বভাব তার ছোটবেলা থেকেই আছে। কখনও কখনও এটা বেড়ে যায়। অনির্বাণের চিঠিটা পাওয়ার পর থেকে তো বেড়েছেই। সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে।

গণনাথ বললেন, একটা কথা আমি বুঝতে পারছি না বিবি! আনুর চিঠিটা যদি এত খারাপ, তা হলে ওটা ছিঁড়ে না ফেলে সঙ্গে নিয়ে বেড়াচ্ছিস কেন?

সাবর্ণী আস্তে বলল, ও শাসিয়েছিল চিঠিতে। জানো তুমি?

 তোকে, নাকি তোর পি জি সায়েবকে? মার্ডার করবে লিখেছিল নাকি?

দুজনকেই। তা ছাড়া লট অব ডার্টি ওয়ার্ডস। সাবর্ণী কেঁদে ফেলল। ও জানোয়ার। নীচ!

গণনাথ শুকনো হাসলেন। কোনও মানে হয়?

হয়। প্রিয়র কোনও ক্ষতি হলে চিঠিটা আমি পুলিশকে দেব বলে রেখেছিলুম।

গণনাথ আবার সিগারেট ধরালেন। গলার মাফলারটা খুলে ফেললেন। সাবর্ণী কান্না সামলে স্যুটকেসের কাপড়চোপড় একটার পর একটা মেঝেয় ফেলতে থাকল। একটু পরে দরজার বাইরে ভগীরথের সাড়া পাওয়া গেল। সে বলল, উনহি সিংজির গারিজ থেকে দুসরা গাড়ি লিয়ে আমিনগঞ্জ চলিয়ে গেলেন। আমাকে বললেন কী, মেমসাবকে বোলো, কখন ফিরব কুছু ঠিক না আছে।

গণনাথ উঠে দাঁড়ালেন সঙ্গে সঙ্গে। ভগীরথ এতক্ষণে তাকে দেখতে পেয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে সেলাম দিল। গণনাথ ব্যস্তভাবে বললেন, চলে গেল প্রিয়!

ভগীরথ হাসল। আপনার কথা ভি বললেন আমাকে। সেনিমার ডারেক্টর সাব আসলে দেখভাল করতে বললেন। কুছু অসুবিস্তা হবে না বড়াসাব! দাদামোশা ভি আমাকে বলেছেন আপনার কথা।

সে চলে গেলে গণনাথ ধপাস করে বসলেন চেয়ারে। মুখে হতাশা ও বিরক্তির গাঢ় ছাপ। ডাকলেন, বিবি!

সাবর্ণী ফেলে দেওয়া কাপড়চোপড় আবার মোটামুটি ভাজ করে সুটকেসে ভরছিল। চিড় খাওয়া গলায় আস্তে আস্তে বলল, বলো!

প্রিয় ইজ টু সমার্ট। গণনাথ রুষ্টভাবে বললেন। কাল রাত্তিরে সিওর একটা কিছু ঘটেছিল। গাড়ির কাচ ভাঙা, রক্ত-উক্ত….আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দুজনে মারামারি করেছে। আনু ড্রাঙ্ক অবস্থায় একেবারে ফর্মে থাকে না। না। আমি বলছি না প্রিয়র কাকেও মার্ডার করার ক্ষমতা আছে, বিশেষ করে আনুকে। তবে এমনও হতে পারে, চোট খেয়ে আনু ওখানেই কোথাও অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। আমার আগে সেটা খুঁজে দেখা দরকার। তুই সাত্যকিকে ডেকে দে! ওকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। লোকাল ছেলে। এরিয়াটা চেনে।

সাবর্ণীকে এখন বিবর্ণ দেখাচ্ছিল। নিষ্প্রাণ মূর্তি হয়ে বেরিয়ে গেল।

সাত্যকির ঘরে টিভি দেখছিল পিউ। ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছে। ভলম কমানো। সাবর্ণীকে গ্রাহ্য করল না। সাবর্ণী বলল ঠাকুরপো কোথায়? জবাব দিল না পিউ। নির্বিকার মুখ, দৃষ্টি টিভির দিকে। সাবর্ণী পুবের ব্যালকনিতে সাত্যকিকে দেখতে পেল না। তখন সে কিচেনে গেল।

কিচেনে সাত্যকি একটা কাঁচের গেলাসে হলুদ রঙের গাঢ় এবং তরল কী খাদ্য চামচ দিয়ে ঘাঁটছিল। সাবর্ণীকে দেখে একটু হাসল সে। সাবর্ণী বলল, অরেঞ্জ স্কোয়াশ?

গেলাস তার দিকে বাড়িয়ে সাত্যকি বলল, নাহ্। খাবেন নাকি?

গন্ধ টের পেয়ে সাবর্ণী নাকে হাত রাখল। সাত্যকি হাসতে হাসতে বলল, এগ-স্কোয়াশ বলতে পারেন। আমার মর্নিং ড্রিঙ্ক। সে তার পায়ের কাছে, আবর্জনা রাখা প্ল্যাস্টিকের বড় বালতিটা দেখিয়ে দিল। কয়েকটা ডিমের টাটকা খোসা।

সাবর্ণী অবাক হয়ে বলল, কাঁচা ডিম খাও তুমি?

 ইয়া! সাত্যকি বাঁ-হাত তুলে চারটে আঙুল দেখাল। বলল, চারটে ডিম, একটু নুন। আমার জামাইবাবুর ট্রেনিং। উনি তো জঙ্গলে গিয়ে খিদে পেলে কাঁচা মাংসও খেতেন। আপন গড়!

তোমায় গণাদা ডাকছেন। শিগগির এস।

সরি! দেখছেন? দাদার কথা এক্কেবারে মনে নেই। বলে সাত্যকি গেলাসে চুমুক দিল।

সাবর্ণীর বমিভাব এসে গেল। সে ডিম খায়। কিন্তু এভাবে চারটে কঁচা ডিম খাওয়ার কথা সে ভাবতেও পারে না। কিচেন থেকে বেরিয়ে সে দেখল, রাণু গঙ্গাস্নান করে ফিরছেন। পেছনে অরীন্দ্র। রাণুর পরনে সরু নকশিপাড় কোরা তাঁতের শাড়ি। অরীন্দ্রের পরনে পাটভাঙা ধবধবে ধুতি আর গায়ে ঘিয়ে রঙের কাশ্মিরী শাল জড়ানো। সাবর্ণীকে দেখে তিনি চোখ নাচিয়ে বললেন, গেলে না মেমসায়েব। গঙ্গাস্নানে পুণ্য না হোক, কোনও-না-কোনও দিন কিছু থ্রিল পাওয়া যায়। বঞ্চিত হলে। কৈ, আমার পুঁচকি মেমটা কোথায়? শি উইল বি ইন্টারেস্টেড।

রাণু চোখ বড় করে বললেন, আজ আবার একটা খেয়েছে। আমরা দেখতে গিয়েছিলুম। তাই একটু দেরি হল। পুলিশ এসে গেছে। হুজুগে লোকও আছে। বটে বাবা! বডিটা যে ভাল করে দেখব….

বডি! সাবর্ণীর মুখ দিয়ে কথাটা ঠেলে বেরিয়ে গেল বুদবুদের মতো এবং ফেটে গেল।

অরীন্দ্র মুচকি হেসে বললেন, ক্লিফটন সায়েবের প্রেতাত্মার কীর্তি। অজ্ঞ লোকেরা বলে, কুঠিবাড়ির নীচের সেই ভয়ঙ্কর খাদে কিচনি আছে। লোক্যাল টার্ম। জলের পেত্নী আর কী! তবে এবারকারটা মেয়ে নয়, পুরুষমানুষ।

সাবর্ণী চুপচাপ একটু দাঁড়িয়ে থাকার পর ঘরে ফিরে এল।

গণনাথ বললেন, সাত্যকিকে পেলি?

সাবর্ণী কোনও জবাব না দিয়ে পশ্চিমের জানালায় চলে গেল। দু হাতে ঠাণ্ডা হিম রড মুঠোয় চেপে ধরল।

গণনাথ উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্তভাবে বললেন, তোর কিছু বোঝা যায় না। আমি যাচ্ছি।

সাবর্ণী না ঘুরে বলল, কুঠিবাড়ির নীচে গঙ্গায় একটা বডি পাওয়া গেছে।

কী বললি? গণনাথ গলার ভেতর বললেন, বডি? মানে ডেডবডি?

সেই সময় পিউ ঝোড়ো হাওয়ার ঝাপটানি তুলে ঘরে ঢুকল। বলল, গণাদা! খবর আছে। রাণুদিরা গঙ্গার ধারে একটা ডেডবডি দেখে এসেছেন। তোমার এক্ষুণি গিয়ে দেখা উচিত। কিছু বলা যায় না।

গণনাথ বেরিয়ে গেলেন। পিউ তাকে অনুসরণ করল। সিঁড়ির মাথায় পৌঁছুলে পিছন থেকে সাত্যকির সাড়া এল। সে হন্তদন্ত আসছিল। সঙ্গ নিয়ে বলল, দিদি যা ডেসক্রিপশন দিল, মনে হচ্ছে অনির্বাণবাবু। সিওর….

.

০৬.

ফোন রেখে মোহনলাল চেয়ারে হেলান দিলেন। চোখ বন্ধ। বাঁহাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুলে কপাল টিপে ধরলেন। টেবিলের সামনে ফাইল হাতে প্রসাদজি দাঁড়িয়েছিলেন। একটু কাশলেন। তখন মোহনলাল চোখ বন্ধ রেখেই বললেন, আধা ঘন্টা বাদ আইয়ে ভাই! ঔর দেখিয়ে…নেহি! আপ যাইয়ে! আধা ঘণ্টেকি বাদ।

সিনিয়র ক্লার্ক প্ৰসাদজি বিরক্তি চেপে চলে গেলেন। এতক্ষণ ফোনে একতরফা বাতচিত শুনে আঁচ করেছিলেন, কোথাও কী একটা ঘটেছে। আবার কোনও খতরনাক। এ কোম্পানিতে খতরনাক লেগেই আছে। কিন্তু পাঁচটা বাজে। আরও আধ ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখল মালিক। একটা জরুরি কাজ ছিল।

মোহনলাল ফোন তুলে ইন্টারন্যাল ডায়াল করলেন। সাড়া এলে বললেন, দত্ত? একবার আসবেন? হ্যাঁ। এখনই। ওঁকে একটু বসতে বলুন। দিস ইজ ইমপর্ট্যান্ট।

একটু পরে বরুণ দত্ত হন্তদন্ত ঢুকল। মুখে উজ্জ্বল হাসি। বলল, মজুমদার ট্রেডার্সের কেস প্রায় সেট, লালজি! কনগ্রাচুলেশন পাওনা রইল।

মোহনলাল গম্ভীর হয়ে বললেন, কিন্তু আর এক মজুমদার ঝামেলা বাধিয়েছে! বসুন।

বরুণ বসে বলল, প্রিয় নয় তো?

আবার কে? মোহনলাল টেবিলের সামনে ঝুঁকে এলেন। আমিনগঞ্জ থেকে বনোয়ারি ট্রাঙ্ককলে জানাল, মজুমদার ইজ অ্যারেস্টেড।

বরুণ চমকে উঠল। বলল, কিন্তু এক্সপোর্ট লাইসেন্সটা তো জেনুইন। এগ্রিমেন্ট পেপার্সও জেনুইন।

নাহ্। কোম্পানির কোনও ব্যাপারে নয়। কাকে নাকি মার্ডার করেছে।

বরুণ নড়ে বসল এবং হেসে ফেলল। প্রিয় মার্ডার করেছে? লালজি, দিস ইজ ইমপসিবল! প্রিয়র মাথায় কিছু গণ্ডগোল আছে। কিন্তু আমি জানি, ওর। মতো ভিতু আর কাওয়ার্ড আর একটিও নেই।

আপনার জানা বা আমার জানাতে কিছু যায়-আসে না বরুণবাবু। মোহনলাল হাসবার চেষ্টা করলেন। যাই হোক, তার ব্যাপার সে বুঝবে। বনোয়ারি বলল, ক্লিফটনগঞ্জে তার কোন আত্মীয় আছে। কাজেই আমাদের দিক থেকে কিছু করার দরকার হবে না। কিন্তু মজুমদারের গ্যাপ ফিলআপ করতেই হবে। ডিসেম্বরেই আমিনগঞ্জ ফ্যাক্টরির মাল আশাপুরায় পৌঁছে দিতে হবে, মাইন্ড

বরুণ মনে মনে খুশি হল। বলল, ঠিক আছে। কিন্তু প্রিয়র ব্যাপারটা ডিটেলস কিছু বললেন বনোয়ারিজি?

 কী সব মেয়েঘটিত ব্যাপার। মোহনলাল ড্রয়ার থেকে পানের ডিব্বা বের করে বললেন, এনিওয়ে, ডোন্ট বার অ্যাবাউট হিম। আর একটা কথা। ক্লিফটনগঞ্জ ইরিগেশন বাংলোয় গণনাথবাবু আছে। ফিল্মমেকার। ইউ নো হিম। ওঁর সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করবেন। বললেন হি মে প্রসিড উইথ হিজ ওয়ার্ক অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল! দরকার হলে ট্রাঙ্ককলে কথা বলতে বলবেন।

মোহনলাল বাঙালির মতোই বাংলা বলেন। কথা শুনলে বোঝা যায় না তিনি অবাঙালি। বরুণ উঠে দাঁড়ালে ফের বললেন, ক্যাশে যান। বলে দিচ্ছি। টাকাকড়ি যা দরকার মনে করেন, নেবেন। আর….এক মিনিট। গণনাথবাবুর জন্য কিছু টাকা নিয়ে যান। একটু বেশি ক্যাশমানি হবে। ডোন্ট ওরি! স্যুটকেসের ভেতর সাবধানে রাখবেন। আপনি আগে যাবেন ক্লিফটনগঞ্জে এবং গণনাথবাবুকে টাকাটা দেবেন। ইরিগেশন বাংলোয়। কেমন তো! তারপর বাসে চলে যাবে আমিনগঞ্জ। বনোয়ারিকে বলে দিয়েছি, আপনি যাচ্ছেন।

বরুণ একটু ইতস্তত করে বলল, ভাবছিলুম গাড়ি নিয়ে যাব।

না। সঙ্গে এত টাকা নিয়ে গাড়ি নয়। রিভলভিং চেয়ারসুদ্ধ ঘুরে মোহনলাল পেছনের ছোট্ট আয়রন চেস্ট খুললেন। গাড়ি আপনি পেয়ে যাবেন আমিনগঞ্জে। মজুমদার যে গাড়িটা নিয়ে গেছে, সেটা নাকি অ্যাকসিডেন্ট করে কোন গ্যারেজে আছে। আপনাকে তো বেশ কিছুদিন থাকতে হবে ওখানে। কাজেই ওই গাড়িটা আপনি নিয়ে নেবেন। ঠিক আছে?

লালজি! প্রিয়র কাছে কোম্পানির অনেক কাগজপত্র ছিল।

টাকার বান্ডিল ধরা হাতটা তুলে মোহনলাল বললেন, ডোন্ট বার অ্যাবাউট দ্যাট। বনোয়ারি তত বুদ্ধ নয়। যান। আপনার ব্রিফকেস আনুন।

পাঁচটায় ব্র্যাবোর্ন রোডে মোহনলাল গণেশলাল অ্যান্ড কোম্পানির সদর অফিস থেকে বেরুল বরুণ। হাতের ব্রিফকেসে নগদ প্রায় পঁয়তিরিশ হাজার টাকা। এ টাকাকেই কালো টাকা বলা হয়, সে জানে। কিন্তু এত বেশি ক্যাশ টাকা সঙ্গে নিয়ে সে কখনও ঘোরেনি। একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। লিফট থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার ধারে পার্কিং জোনে সে নতুন কেনা লাল মারুতির দরজা খুলল। ব্রিফকেসটা পাশে রেখে গাড়ি স্টার্ট দিল। পেছনে সব গাড়িকেই সন্দেহের চোখে লক্ষ করছিল সে, যেন তাকে ফলো করা হচ্ছে। বারবার জ্যামের বিরক্তিকর বাধা। রেড রোডে পৌঁছে হঠাৎ তার খেয়াল চাপল, ক্যামাক স্ট্রিটে শ্রাবন্তীকে একটুখানি টোকা দিয়ে যাবে। প্রিয়গোপাল সেদিন আভাস দিয়েছিল, কোম্পানির ফিল্ম প্রোডিউসিং ইউনিটটা ফের চালু হচ্ছে। দিয়ে এক্সপেরিমেন্টের একটা তাল। শ্রাবন্তী গণনাথের লেটেস্ট ছবিতে একটা রোল পেয়েছিল, শ্রাবন্তীর নিজের কথায় হাফ-নায়িকা। ছবিটা হিট না করলেও ফ্লপ করেনি এবং শ্রাবন্তী দর্শকের দৃষ্টি কেড়েছে। এবার কি ফুল-নায়িকার চান্স দেবেন তাকে গণনাথ? আনমনে একটু হেসে বরুণ বাঁদিকে গাড়ি ঘোরাল। অভ্যাসমতো সে শিস দিচ্ছিল।

ফিফথ ফ্লোরে লিফট থেকে নেমেই শ্রাবন্তীর বোন সঙ্ঘমিত্রাকে দেখতে পেল বরুণ। বলল, সন্ধ্যাবেলা এমন সেজেগুজে কোথায় বেরুচ্ছিস রে?

সঙ্ঘমিত্রা হালকা হেসে বলল, প্রেম-ট্রেম করতে।

উরে ব্বাস! এরই মধ্যে আওয়াজ দিতে শিখেছিস? ভাল। তোর হবে। বরুণ ওদের ফ্ল্যাটের দিকে পা বাড়িয়ে বলল, মক্ষিরানী আছে তো?

আছে। তবে তোমার প্রতীক্ষা করছে না। ওয়েটিং ফর সাম বেচুবাবু!

বরুণ হাসতে হাসতে কলিং বেল টিপল। শ্রাবন্তী প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলল। তারপর বলল, ও! তুমি?

বেচুবাবু ভেবেছিলে?

শ্রাবন্তী ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি কী করে জানলে? তারপর সে হাসল। বুঝেছি, মিতু বলেছে। মিতু ফোন ধরেছিল।

বরুণ ঘরে ঢুকে সোফার কোনা ঘেঁসে বসে ব্রিফকেসটা পাশে রাখল। তারপর বলল, বেচুবাবু আসছেন। তার মানে তোমার স্বপ্ন সার্থক হতে চলেছে! গণবাবুর নতুন ছবির নায়িকা শ্রাবন্তী গুহ। কনগ্রাচুলেশন!

এখনই হইচই বাধাবে না বলে দিচ্ছি। বসো। আসছি।

চা-ফা খাব না। বরুণ ঘড়ি দেখে বলল, সময় নেই। কপালে অশেষ দুর্ভোগ আছে। তাই একটু হাসিমুখ দর্শন করতে এলুম। মনে হচ্ছে, তোমার শুটিং দেখার সৌভাগ্যে আজ রাতের জার্নির কষ্টটা ভবিষ্যতে পুষিয়ে যাবে।

শ্রাবন্তী সামনাসামনি বসে বলল, কী বলছ বুঝতে পারছি না। তুমি কোথায় যাচ্ছ?

আপাতত ক্লিফটনগঞ্জ।

 সে আবার কোথায়?

 তোমার ডাইরেক্টর-মশাই যেখানে এখন আছেন।

ভ্যাট! জায়গাটা কোথায়?

 বিহারে। পবিত্র গঙ্গাতীরে। সো মাচ আই নো!

তুমি কেন যাচ্ছ সেখানে?

কোম্পানির কাজে। বলে বরুণ সিরিয়াস হল। ওদিকে এক কাণ্ড! প্রিয়, [লাইন মিসিং]

সামান্য। কেন?

বরুণ সোফায় আধশোয়া হয়ে বলল, প্রিয় সঙ্গে বউ আর শ্যালিকাকে নিয়ে গেছে। ক্লিফটনগঞ্জে ওর কে এক আত্মীয় আছে। সেখানে ওদের রেখে কোম্পানির কাজে তার ঘোরার কথা। আজ বিকেলে হঠাৎ খবর এল, ওকে পুলিশ মার্ডারের অভিযোগে অ্যারেস্ট করেছে।

শ্রাবন্তী নড়ে উঠেছিল। চোখ বড় করে বলল, বউকে মার্ডার করেছে?

বরুণ মাথা নাড়ল। তা জানি না। তবে সেইরকম কিছু মনে হচ্ছে।

শ্রাবন্তী তেতো মুখ করে বলল, মনে হচ্ছে কী! তা-ই। সঙ্গে শ্যালিকা ছিল বলছ। চেন তাকে?

হুঁউ। মিতুর বয়সী। ভীষণ স্মার্ট আর সফিস্টিকেটেড টাইপ। বরুণ সিগারেট বের করে একটু হাসল। কিন্তু প্রিয়কে আমি যতটা চিনি, ওর পক্ষে এ একটা অসম্ভব ব্যাপার।

শ্রাবন্তী মাথা নেড়ে বলল, কখনই অসম্ভব নয়। বউ মারার যা হিড়িক পড়েছে আজকাল।

প্রিয়র বউকে তুমি দেখনি। যতটুকু জানি, খুব একটা ক্লিন টাইপ মেয়ে নয়। কিন্তু ভীষণ চালাক। বরুণ সিগারেট জ্বেলে সেন্টার-টেবিল থেকে অ্যাসট্রে টেনে নিল। ওয়েল, তুমি তো অনির্বাণ সোমকে চেন?

নাম্বার ওয়ান রোগ। গুণ্ডা।

বরুণ সোজা হয়ে বসে বলল, আহ, এত বলে না! আনু একটু ফেরোসাস টাইপের বটে, আই এগ্রি। যাই হোক, প্রিয়র বউয়ের প্রাক্তন প্রেমিক অনির্বাণ সোম।

শ্রাবন্তী বাঁকা মুখে বলল, কে কার প্রেমিক তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। তবে তোমার ওই অনির্বাণ বস্তুটি কী আমি হাড়ে-হাড়ে জানি। তুমি তো বললে যেখানে যাচ্ছ, গণাদা আছেন। তমি গণাদাকে জিজ্ঞেস কোরো, হু ইজ হি।

বরুণ ভুরু কুঁচকে হাসল। ব্যাপারটা কী বলো তো?

ছাড়ো! শ্রাবন্তী আলতো হাতে চুল গুছিয়ে নিয়ে বলল, আচ্ছা, তুমি যেখানে যাচ্ছ….

ক্লিফটনগঞ্জ।

হুঁ। গণাদা ক্লিফটনগঞ্জে কী করছেন?

ওঁর নতুন ছবির লোকেশন। কী বলছি তুমি বুঝতেই পারছ না। বরুণ চোখে ঝিলিক তুলে চাপা গলায় বলল, আমার কোম্পানি এ ছবির ফাইন্যান্সার। এটুকু বলছি, লোকেশন দেখতে গিয়ে গণনাথ সেনের শুটিংও শুরু হয়ে যাচ্ছে। ওয়েট! কল এসে যাবে শিগগির। বিশেষ করে বেচুবাবু যখন তোমার কাছে আসছেন তখন তুমি রেডি হও।

শ্রাবন্তী খুশি চেপে বলল, পটানোর চেষ্টা করবে না কিন্তু।

বরুণ শুকনো হাসল। গণাবাবু ছাড়া কার সাধ্য তোমাকে পটায়? আমাদের এক ন্যাড়াদা ছিল। পুরনো কী একটা ফিল্মের গান গাইত, চাঁদ তুমি আকাশে থাকো, আমি তোমায় দেখব খালি…অমন চোখ কটমট করে তাকিও না। বিচ্ছিরি লাগছে। নায়িকাদের অমন করে তাকাতে নেই। বলে বরুণ ঘড়ি দেখে উঠে দাঁড়াল।

শ্রাবন্তী বলল, তুমি গাড়ি নিয়ে যাচ্ছ, না ট্রেনে?

তোমার মাথা খারাপ? কোম্পানির কাজে আমার লাগ্লুটিকে তিন-সাড়ে তিনশো কিলোমিটার চক্কর খাইয়ে প্রাণে মেরে দেব? ট্রেনে।

কটায় ট্রেন?

 সাড়ে নটা।

 দেরি আছে। বসো। কথা আছে।

বরুণ হুকুম মানার ভঙ্গিতে বসল। বলল, হঠাৎ টোন বদলে গেল যে? তোমাকে কিন্তু নার্ভাস দেখাচ্ছে।

শ্রাবন্তী শ্বাস ফেলে আস্তে বলল, তুমি জান গণাদার সঙ্গে ওই গুণ্ডাটা আছে নাকি?

বরুণ একটু অবাক হয়ে বলল, অনির্বাণের কথা বলছ? তুমি হয়তো ভুল করছ শ্রাবন্তী!

তুমি জান কি না বলো।

বরুণ কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, জানি না। কিন্তু ধরো, যদি অনির্বাণ থাকে তুমি কি অফার এলে নেবে না ভাবছ?

শ্রাবন্তী ঠোঁট কামড়ে ধরে রইল। তারপর বলল, জানি না আমি কী করব।

আনুকে তোমার কেন ভয়?

শ্রাবন্তী কী বলতে যাচ্ছিল, টুং শব্দে কলিংবেল বাজল। সে উঠে গিয়ে আই-হোলে চোখ রাখল। তারপর দরজা খুলে দিল। মিষ্টি হেসে বলল আসুন বেচুদা!

বরুণ বলল, আই হোপ, ইউ আর ক্যারিং আ হেভেনলি মেসেজ বেচুবাবু!

হঃ। বলে বিরাটকায় মানুষ বেচু দাশগুপ্ত সশব্দে বসলেন। ঘোলাটে বড় বড় চোখ তুলে বললেন, স্যানসায়েবের ম্যাসেজ আইছে। অ্যাট ওয়ান্স প্রোসিড উইথ দা হোল ইউনিট। বোঝেন অবস্থা। এখন কারে পামু, কারে না পামু….মালক্ষ্মী। কাইল ভোর ছয়টায় রেডি থেইক্যো। বসুম না! ক্যামেরাম্যান ভোম্বলেরে পাইলে হয়। ওদিকে আমার দুইখান গাড়িই গ্যারেজে। সাতটায় পামু। মালক্ষ্মী! যাই গিয়া।

শ্রাবন্তী ব্যস্ত হয়ে বলল, বসুন। এখানে বসে ফোনে কন্ট্যাক্ট করুন সবার সঙ্গে। অসুবিধে নেই।

অট্টহাসি হাসলেন বেচুবাবু। মালক্ষ্মী! এ সোজা কাম না। ফোনে হইব না। তা ছাড়া আইজ কাইল মাইনষের মুড হইছে অন্যরকম। লোকেশনে যাইয়া শ্যুটিং মানেই ঝামেলা। ইনডোর হইলে একজনেরটা অন্যেরে দিয়া ম্যানেজ করন যায়। মালক্ষ্মী, একটা কথা। গরম কাপড় লইবা। হেভি শীত। ডোন্ট ফরগেট দ্যাট।

তেমনই সশব্দে সোফা মচমচিয়ে উঠে দাঁড়ালেন বেচুবাবু। আর কোনও কথা না বলে সোজা গিয়ে দরজা খুললেন এবং বেরিয়ে গেলেন। শ্রাবন্তী আকস্মিকভাবে ধাক্কা সামলে নিতে পারছিল না। একটু দেরি করেই সে গেল দরজা বন্ধ করতে। বরুণ বলল, ভূমিকম্প! বাস্!

শ্রাবন্তী এতক্ষণে সামলে নিয়েছে। সে আবেগময় হেসে উঠল। তুমি জান, বেচুদা নৌকোয় উঠতেই ক্যামেরাসুদ্ধ নৌকো ডুবে গিয়েছিল?

এবার নৌকার ব্যাপার আছে কি?

আমি গপ্পটাই জানি না এখনও। শ্রাবন্তী চঞ্চল হয়ে বলল। অবশ্য গল্প জানা কোনও ব্যাপার নয়।

সে কী! গপ্প জান না, নায়িকা হবে? হোপলেস!

শ্রাবন্তী কপট ঝাঁঝে বলল, বাজে বকো না! আমি একটু ভাবনায় পড়ে গেলুম।

বরুণ ঠোঁট গোল করে দুবার মৃদু শিস দিয়ে বলল আনুর জন্য তো? আমিও তো যাচ্ছি ওই এরিয়ায় এবং থাকছিও। আমি ওকে ম্যানেজ করতে পারি, ইউ নো দ্যাট? আফটার অল আনু ইজ আ স্পয়েল্ড চাইল্ড! একটু আদর পেলেই নেতিয়ে পড়ে। আরে বাবা। তুমি তো অভিনেত্রী।

শ্রাবন্তী কথায় কান না করে বলল ধুস! বেচুবাবু এমনভাবে এলেন যে মাথা ঠিক রেখে কিছু জিজ্ঞেস করব, সুযোগই পেলুম না। সব কিছুতে ওঁর এই ড্রামাটিক ব্যাপার। তুমি জান? কেউ কোনও ব্যাপারে না বললে উনি তা শুনতেই পান না।

তুমি আমার কথা শুনছ না! বরুণ রাগ দেখিয়ে বলল, তুমি জান তোমার ডাইরেক্টর ভদ্রলোকের ওপর আমার খবরদারির কিছু স্কোপ আছে? আমার বসের কান ভাঙালে ওঁর ছবি করা ডকে উঠবে। তোমাকে দেখাচ্ছি। বলে সে ব্রিফকেসের ডালা খুলে চাপা হাসল। এর ভেতর তোমার গণাদার প্রাণভোমরা। জাস্ট লুক!

সে ব্রিফকেসের ভেতরটা দেখিয়েই বন্ধ করল। শ্রাবন্তী আস্তে শ্বাস ছাড়ল। কোনও কথা বলল না।

বরুণ আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, অতএব তুমি নিশ্চিন্ত হও, আনু ইজ নো প্রবলেম।

এই! শ্রাবন্তী আবার চঞ্চল হল। তুমি ট্রেনে না গিয়ে আমাদের সঙ্গে চলো না!

হুঁ, সেই কথাটাই ভাবছি। বরুণ মুখে চিন্তার ছাপ ফেলে বলল। শুধু একটাই প্রবলেম। অত ভোরে ওঠা!

বেচুদাকে বলব তোমাকে পিক আপ করবেন। শ্রাবন্তী চোখে হাসল। এবং একটু হিন্টও দেব যে…

দিতে পার। ব্যাপারটা তো সত্যি। তোমাদের ছবির জন্য আমিই টাকা নিয়ে যাচ্ছি!

শ্রাবন্তী ব্যস্তভাবে উঠল। তুমি বসো। অফিস থেকে আসছ। একটু কিছু খাও।

এ-মুহূর্তে যা খেতে ইচ্ছে করছে, তা কি পাব?

শার্টআপ! অসভ্যতা কোরো না। শ্রাবন্তী চাপাস্বরে বলল। পাশের ঘরে মা আছেন।

প্লিজ শ্রাবন্তী। নায়িকা হয়ে গেলে তো অ-ধরা হয়ে যাবে চিরকালের মতো!

বরুণ তড়াক করে উঠে শ্রাবন্তীর দুকাঁধে হাত রাখলে শ্রাবন্তী ওকে ঠেলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকল। বরুণ শিস দিতে দিতে জানালার ধারে গেল। বিলিতি আমলের বাড়ি। আসবাবপত্র নতুন পুরনোতে মেশা। একটা ফায়ারপ্লেসও আছে। ওপরে শ্রাবন্তীর বাবার বিশাল পোর্ট্রেট। পাশে বেঁটে চীনা ফ্লাওয়ারভাসে একগাদা ঠাসাঠাসি ফুল। শ্রাবন্তীর বাবা নাকি বিখ্যাত গায়ক ছিলেন। ছবির পাশে ওঁর তানপুরাটা ঠাকুরদেবতার মতো সুদৃশ্য বেদিতে রাখা। বরুণ তানপুরাটা ছুঁতে গেল। অমনি ফোন বাজল। একটু ইতস্তত করে বরুণ এগিয়ে এসে ফোন তুলে সাড়া দিল। কোন মহিলা এই ফোনের নাম্বার জেনে নিয়ে বললেন, প্লিজ হোল্ড অন। ট্রাঙ্ককল।

বরুণ গলা চড়িয়ে ডাকল, শ্রাবন্তী! ট্রাঙ্ককল। শিগগির!

শ্রাবন্তী ছুটে এসে ফোন ধরল। শ্রাবন্তী বলছি। কে? দাদা, বলুন! হ্যাঁ, হ্যাঁ, এইমাত্র বেচুবাবু…যাচ্ছি। মর্নিঙে আমরা স্টার্ট করছি। হ্যাঁ, ওকে! ভাববেন না। এই! অমন করে বললে আমি নার্ভাস হয়ে পড়ব….।

বরুণ ব্যস্তভাবে বলল, গণাবাবু? ছেড়ো না। আমি একটু কথা বলব।

শ্রাবন্তীর হাত থেকে সে ফোন ছিনিয়ে নিয়ে বলল, দাদা! আমি বরুণ বলছি।…হ্যাঁ, উইথ মেসেজ অ্যান্ড মানি….একমিনিট দাদা। শুনলুম প্রিয় নাকি…কী? মাই গড!…সর্বনাশ! হ্যালো, হ্যালো…বরুণ ফোন নামিয়ে শ্রাবন্তীর দিকে ঘুরল। ফাসফেঁসে গলায় বলল, কেটে গেল! পুরোটা শোনা হল না। শ্রাবন্তী, প্রিয় আনুকে মার্ডার করেছে। অফ কোর্স, দিস ইজ আ গুড নিউজ ফর ইউ। বাট….হোয়াই অ্যান্ড হাউ?

শ্রাবন্তীর মন নিজের মধ্যে, দৃষ্টি বরুণের দিকে। দুচোখ ঝলমল করছে। বরুণ ধপাস করে বসে বলল, অবিশ্বাস্য! সামথিং রং এনিহোয়্যার। শ্রাবন্তী বলল, কী ব্যাপার? তোমাকে অমন দেখাচ্ছে কেন? বরুণ ঠোঁট কামড়ে ধরেছিল। গলার ভেতর বলল, আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে।

.

০৭.

অস্বস্তি হচ্ছে? কেন? কর্নেল নীলাদ্রি সরকার টেবিলল্যাম্পের সুইচ টিপে ড্রয়ার থেকে একটা আতস কাচ বের করলেন। টেবিলে তাসের মতো সাজানো কয়েকটা রঙিন পোস্টকার্ড সাইজ ছবি। একটা ছবি আতস কাচ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকলেন।

বরুণ একটু বিরক্ত হয়ে বলল, আপনি আমার কথা মন দিয়ে শুনছেন না।

শুনছি। কোম্পানি আপনাকে আমিনগঞ্জে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু সেখানে যেতে আপনার অস্বস্তি হচ্ছে।

আহা! আমি বলতে চাইছি…

জাস্ট আ মিনিট! কর্নেল ব্যস্তভাবে উঠে বুকশেলফের কাছে গেলেন। একটা বই খুঁজতে খুঁজতে বললেন, আমিনগঞ্জে আমি গেছি। পুরনো ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাউন। কাছেই খনি এলাকা। সচরাচর এ ধরনের জায়গা সত্যিই অনেকের পক্ষে অস্বস্তিকর। বিশেষ করে যাঁরা কেতাদুরস্ত ছিমছাম জীবনযাপন করেন। তা ছাড়া আজকাল ট্রেড ইউনিয়নে দলাদলি হাঙ্গামা লেগেই আছে। অ্যান্ড সো-কড় মাফিয়া লিডারস!

কর্নেল একটা প্রকাণ্ড বই টেনে বের করলেন। একটু হেসে ফের বললেন, একটা আশ্চর্য ব্যাপার দেখুন। নেচারের মধ্যেও মাফিয়া লিডার আছে। টেবিলে যে ছবিগুলো দেখছেন, সেগুলো তাদেরই। নিরীহ ভদ্র প্রজাপতিরা রঙবেরঙের ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। আর এরা তাদের মেরে সেই মধু আত্মসাৎ করে। তবে খুব রেয়ার স্পেসিস্। গত অক্টোবরে ক্লিফটনগঞ্জে গিয়ে অন্তত একটাকেও নেটে আটকানোর জন্য কত ফন্দিফিকির করেছিলুম বলার নয়। ভীষণ ধূর্ত। অগত্যা ক্যামেরায় আটকে সন্তুষ্ট থাকতে হল। তা-ও টেলিলেন্সে। পাঁচ সাতমিটার দূর থেকে এরা যেন মানুষের গন্ধ পায়। ভাবতে পারেন?

কর্নেল টেবিলে ফিরে বইটার পাতা ওল্টাতে থাকলেন। বরুণ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনি ক্লিফটনগঞ্জ গিয়েছিলেন? তা হলে তো জায়গাটা চেনেন।

হ্যাঁ। ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জে আমার এক বন্ধুর বাড়ি। কর্নেল বইয়ের একটা ছবির সঙ্গে তার ভোলা ছবি মিলিয়ে দেখে বললেন, আমি ভুল করিনি। একই স্পেসিস্। বড়ো রহস্যময় এদের গতিবিধি। আসলে ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জ এলাকাটাই রহস্যময়। গঙ্গার ধারে পুরনো গঞ্জ ছিল। এখন সবাই নতুন টাউনশিপে গিয়ে ভিড় করেছে। ফলে পুরনো বসতি এলাকা সবসময় নিরিবিলি সুনশান। আর ওই কুঠিবাড়ি! আপনি আমিনগঞ্জ থেকে আশাপুরা জংশন টাউনে নিশ্চয় যাবেন। আমিনগঞ্জে আপনার কোম্পানির ফ্যাক্টরি বললেন। আশাপুরায় কী যেন? যাই হোক, পথে ক্লিফটন সায়েবের কুঠিবাড়ির ছাদটা একবার দেখে যাবেন। ছাদে ওঠা যায়। কিন্তু সাবধান! নীচের দিকে বেশি ঝুঁকবেন না। মাথা ঘুরে যেতে পারে।

বরুণ হতাশভাবে বলল, প্রিয় বলেছিল, আপনি নাকি ট্রাবলশুটার?

 কর্নেল বই বন্ধ করে বললেন, প্রিয়? কোন প্রিয়?

 প্রিয়গোপাল মজুমদার। আপনি আমার কথা একেবারে মন দিয়ে শুনছেন না।

কর্নেল হাঁকলেন, ষষ্ঠী! কফি কোথায়? তারপর টুপি খুলে টেবিলে রাখলেন। টাক ঝলমলিয়ে উঠল। টেবিলল্যাম্পের সুইচ অফ করে বললেন, হুঁ, আপনি বলছিলেন প্রিয়কে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। কারণ সে নাকি আপনার এক বন্ধুকে খুন করেছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না এ ব্যাপারে আপনি একজন ট্রাবলশুটার খুঁজতে বেরিয়েছেন কেন?

প্রিয় আমাকে আপনার কথা বলেছিল। আপনার ঠিকানা দিয়েছিল।

কেন? কর্নেল তাঁর শাদা দাড়ি থেকে একটা পোকা বের করে জানালা দিয়ে ফেলে দিলেন। পোকাটা হঠাৎ ডানা মেলে ফরফর করে উড়ে ঘরে ফিরে এল। কর্নেল দেখলেন, পোকাটা উড়ে গিয়ে দেওয়ালের একটা ছবিতে বসল। তাকিয়ে রইলেন সেদিকে।

বরুণ ঘড়ি দেখে বলল, সরি! আমি হয়তো আপনাকে সব কথা গুছিয়ে বলতে পারিনি। প্রিয় আমাকে বলেছিল, সে কোনও ঝামেলায় জড়িয়ে গেলে আপনাকে যেন খবর দিই। অফিসে খবরটা শোনার পর তত গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু পরে যখন শুনলাম আনুকে মার্ডার করার চার্জে ওকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে, তখন একটু খটকা লাগল। বাড়ি ফেরার পর মনে পড়ল, প্রিয় আপনার কথা বলেছিল।

কিন্তু আপনি বলছিলেন, আমিনগঞ্জ যেতে আপনার অস্বস্তি হচ্ছে।

আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারছি না। মানে, আমার খালি মনে হচ্ছে কী একটা গণ্ডগোল আছে।

ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে কফি রেখে গেল। কর্নেল বললেন, কফি খেয়ে নিন। কফি ঝিমিয়ে পড়া নার্ভকে চাঙ্গা করে। নার্ভ চাঙ্গা না হলে মনের কথা গুছিয়ে বলা যায় না। কফির পেয়ালা তিনি বরুণের হাতে তুলে দিলেন।

বরুণ কফিতে চুমুক দিয়ে আড়ষ্টভাবে একটু হাসল। আসলে আমি পড়েছি একটা টাস্ অব ওয়ারের মধ্যে। প্রিয় এবং আনু দুজনেই আমার বন্ধু। মহিলাঘটিত ব্যাপারে দুজনের মধ্যে শত্রুতা ছিল। পরে প্রিয় সেই মহিলাকে বিয়ে করেছে। আনু তারপর কিন্তু কোনও ঝামেলা করতে যায়নি। এদিকে প্রিয় নিরীহ, ভিতু। অবশ্য কোনও-কোনও ব্যাপারে সে অসাধারণ চতুর। কিন্তু মানুষ খুন করা তার পক্ষে অসম্ভব।

কর্নেল সায় দিয়ে বললেন, হুঁ। প্রিয়কে আমি চিনি। তবে একটু-আধটু। ক্লিফটনগঞ্জে তার দাদামশাইয়ের বাড়ি এবং তিনিই আমার বন্ধু। অক্টোবরে কোম্পানির কাজে প্রিয় ওই এলাকায় গিয়েছিল। দাদামশাইয়ের বাড়িতে একরাত্তির ছিল। তখনই আলাপ হয়। কিন্তু সে আমাকে ট্রাবলশুটার বলেছে?

বরুণ মাথাটা একটু নাড়ল।

কর্নেল প্রায় একটা অট্টহাসি হাসলেন। তারপর বললেন, যাই হোক, প্রিয়র ট্রাবল বুঝতে পারছি। কিন্তু আপনার ট্রাবলটা কী?

আমি কিছু বুঝতে পারছি না। প্রিয় আনুকে খুন করতেই পারে না। তা ছাড়া..

হুঁ, বলুন! এবার আমি মন দিয়েই শুনছি।

ফিল্মমেকার গণনাথ সেনের কথা আপনাকে বলেছি।

বলেছেন। তিনি লোকেশন দেখতে গিয়ে ছবির শুটিংও শুরু করতে চান। এই তো?

বরুণ নড়ে বসল। ঠিক এখানেই আমার অস্বস্তি হচ্ছে। সত্যি বলতে কি, আনুকে গণাবাবু কতকটা বডিগার্ড হিসেবেই সঙ্গে রাখেন। সেই আনু মারা পড়ল। অথচ উনি ছবির কাজ শুরু করতে চলেছেন। আমার কোম্পানি ওঁর ছবির ফাইন্যান্সার! ভেবে দেখুন ব্যাপারটা।

কর্নেল কফিতে লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, হয় তো নতুন বডিগার্ড জোগাড় করেছেন। কিন্তু এতে আপনার অস্বস্তির কারণ কী?

বরুণ একটু ইতস্তত করে বলল, সামথিং রং এনিহোয়্যার। বাট আই কান্ট এক্সপ্লেন ইট।

কর্নেল চুরুটকেস থেকে একটি চুরুট বের করে লাইটার জ্বেলে ধরালেন। তখন বরুণ বলল, প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড! আমি একটা সিগারেট খেতে চাই।

স্বচ্ছন্দে। কর্নেল চুরুট কেস এগিয়ে দিয়ে বললেন, ইচ্ছে হলে একটা নিতে পারেন। তবে একটু কড়া।

থ্যাংস্। বলে বরুণ নিজের সিগারেট ধরাল। আমাকে আপনি তুমি বললে খুশি হব।

হুঁ, তুমি বললে দূরত্ব কমে যায় এবং অনেক স্পষ্টতা আসে। বলো!

একটা ব্যাপার দেখে আমার অবাক লাগছে, জানেন? বরুণ চাপাস্বরে বলল। প্রিয় কোম্পানির অনেক উপকার করেছে। অনেক সিক্রেট ইনফরমেশন প্রিয়র হাতে আছে। অথচ কোম্পানি এই কেসে তাকে ডিফেন্ড করতে চায় না। ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহনলালজি বললেন, ক্লিফটনগঞ্জে ওর আত্মীয় আছে। তারা দেখবে।

হুঁ। প্রিয়র দাদামশাই অরীন্দ্র বসু পাকা লোক। আমার চেয়ে বয়সে বড়। জীবনে অনেক বেশি পোড় খেয়েছেন। ম্যানেজিং ডিরেক্টর ভদ্রলোক ঠিকই বলেছেন। অরীন্দ্রবাবু নাতির ট্রাবলশুটার। আমি নই।

কিন্তু আমি আবার বলছি, সামথিং রং এনিহোয়্যার।

কর্নেল চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। একটু পরে বললেন, আপনাদের আমিনগঞ্জ ফ্যাক্টরিতে কী তৈরি হয়?

বাইসিকল পার্টস্। কোম্পানি দুবাই থেকে আবার আড়াই লাখ পার্টসের অর্ডার পেয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে আশাপুরা জংশনে লোডিং করাতেই হবে। না পারলে সব ওয়াগনের বুকিং ক্যান্সেল হয়ে যাবে। আজকাল রেলের ওয়াগন পাওয়াই সমস্যা।

বাই রোড নয় কেন?

ট্রান্সপোর্ট খরচ বেশি পড়বে। মাল যাবে বোম্বেতে। সেখানে দুবাইয়ের এজেন্ট সব মাল চেক করবে। কাজেই ঠিক সময়ে বোম্বেতে পৌঁছুনো দরকার। গত জুন মাসে এজেন্ট চেক করা সত্ত্বেও দুবাই থেকে মাল ফেরত এসেছিল। বিলো দা গ্রেড় বলে নাকি ডেলিভারি নেয়নি ওরা। তাই এবার কোম্পানি খুব সতর্ক।

এজেন্ট চেক করা সত্ত্বেও….কর্নেল চোখ খুললেন। হুঁ, তখনও প্রিয় কি কনসাইনমেন্টের চার্জে ছিল?

ছিল। বরুণ একটু হাসল। কেম্পানির মালিকদের চরিত্র বোঝা যায় না। প্রিয়র চাকরি যাবে ভেলেছিলুম। উল্টে প্রমোশন হল।

রিজেক্টেড মাল কি লোকাল মার্কেটে বিক্রি করা হয়েছিল?

 হ্যাঁ, আমি কোম্পানির সেলস প্রমোশন অফিসার। আমিই ট্যাক্টফুলি ওই, রদ্দি জিনিস বেচতে পেরেছিলাম। কিন্তু দেখুন, আমার বেলায় প্রমোশন কেন, একটা এক্সট্রা ইনক্রিমেন্টও জোটেনি।

এবার প্রমোশন হল তোমার।

বরুণ তেতোমুখে বলল, কোথায় প্রমোশন? অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছি। মনে হচ্ছে, একটা অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যাওয়াই উচিত ছিল।

কর্নেল দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, না। তুমি ধরে নাও এটা একটা চ্যালেঞ্জ।

আই রিপিট, সামথিং রং এনিহোয়্যার।

তোমার বন্ধুর খুনের ব্যাপারে?

হ্যাঁ, খুনের ব্যাপারে তো বটেই, অন্য কোথাও কী একটা গণ্ডগোল আছে যেন।

কিন্তু তুমি সেটা ধরতে পারছ না। তাই তো?

ঠিক তা-ই।

তুমি কবে যাচ্ছ আমিনগঞ্জ?

প্রথমে যাচ্ছি ক্লিফটনগঞ্জ। আগামীকাল ভোর ছটায় গণনাথ সেনের ফিল্ম ইউনিটের সঙ্গে রওনা হব। দুটো ভ্যান না লিমুজিন, কী যাচ্ছে ওদের। একসঙ্গে যাওয়াই ভাল। কোম্পানি একগাদা টাকা পৌঁছে দিতে বলেছে গণনাথবাবুকে। উনি আছেন ইরিগেশন বাংলোয়। ওঁকে টাকা দিয়ে বাসে আমিনগঞ্জ চলে যাব।

আমিনগঞ্জ ফ্যাক্টরির ম্যানেজার কে?

 বনোয়ারিলাল নামে এক ভদ্রলোক। কোম্পানির মালিকদেরই আত্মীয়।

 জুন মাসে রদ্দি মাল তৈরির দায়িত্বে উনিই তো ছিলেন?

ছিলেন। আমি ভদ্রলোককে চিনি। একেবারে গোমুখটাইপ। আপনি বিশ্বাস করবেন না। বাইসিলে কোন পার্ট কোথাকার, একেবারে জানেন না বনোয়ারিবাবু। অথচ ভীষণ ফোঁপরদালাল।

প্রোডাকশান-ম্যানেজার আছেন নিশ্চয়?

আছেন। গিরিধারীলাল।

কর্নেল হাসলেন। বড্ড বেশি লাল!

গিরিধারীবাবু কিন্তু হাইলি কোয়ালিফায়েড বাইসিলের ব্যাপারে। বনোয়ারিবাবুর সঙ্গে ওঁর বনিবনা নেই। বনোয়ারিবাবু প্রায়ই ওঁর বিরুদ্ধে হেড অফিসে খারাপ রিপোর্ট পাঠান। বলে বরুণ আবার ঘড়ি দেখল। আটটা বাজে। আমাকে ভোরে উঠতে হবে। গোছগাছের তাড়া আছে। প্রায় দুসপ্তাহ ওই এরিয়ায় থাকতে হবে।

উইশ ইউ গুড লাক।

বরুণ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, প্রিয় আপনাকে জানাতে বলেছিল। জানালুম।

 তোমার অস্বস্তির কথাও জানালে।

হ্যাঁ। সামথিং রং এনিহোয়্যার। বলে বরুণ দরজার দিকে এগোল।

কর্নেল বললেন, এক মিনিট! আশাপুরায় তো তোমাদের কোম্পানির অফিস আছে?

বরুণ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, আছে। গোডাউন, সেলস কাউন্টার, শো-রুমও আছে। ওখান থেকে সারা নর্থ ইন্ডিয়ায় মাল যায় বিভিন্ন মার্কেটে।

বাই এনি চান্স, তুমি কেয়া সেন নামে কোনও মেয়েকে চেনো?

বরুণ তাকাল। একটু পরে আস্তে বলল, এক কেয়া সেনকে চিনতুম।

তোমাদের আশাপুরা অফিসে কেয়া সেন নামে কোনও স্টেনোটাইপিস্ট ছিল কি?

ছিল। ওকে সেপ্টেম্বরে আমিনগঞ্জ থেকে আশাপুরায় বদলি করা হয়েছিল। তারপর নাকি সুইসাইড করে। ব্যক্তিগত ব্যাপার বলেই শুনেছি। প্রেমঘটিত বার্থতা। আপনি কি তার কথাই বলছেন?

সম্ভবত।

বরুণ একটু অবাক হয়ে বলল, আপনি তাকে চিনতেন নাকি?

নাহ্! কর্নেল চুরুট কামড়ে ধরে বললেন, কাগজে পড়েছিলুম।

 আচ্ছা, চলি।

বরুণ চলে গেলে কর্নেল হাঁকলেন, ষষ্ঠী! দরজা বন্ধ করে দে।

তারপর আবার টেবিলল্যাম্প জ্বেলে ছবির দিকে ঝুঁকে পড়লেন। ক্লিফটনগঞ্জে অক্টোবরে বেড়াতে গিয়ে এই রাক্ষুসে প্রজাপতি আবিষ্কার করেছিলেন কর্নেল। ক্লিফটনগঞ্জের প্রকৃতিতে অনেক রহস্য আছে। প্রতিবার গিয়ে একেকটি রহস্যের মুখোমুখি হন।

অরীন্দ্রের নাতজামাই বিজয়েন্দু ছিলেন দক্ষ শিকারী। কিন্তু বড় গোঁয়ার মানুষ। সরকারি নিষেধাজ্ঞার পরোয়া করতেন না। বাধা না দিলে দুর্লভ উড্ডাক পাখিটাকে গুলি করে বসতেন। গোঁয়ার্তুমি করে পায়ে হেঁটে মানুষখেকো বাঘ শিকারে গিয়ে মারা পড়েছিলেন বিজয়েন্দু। কুরুডি ফরেস্ট থেকে এসে বাঘটা হানা দিচ্ছিল ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জে। কুঠিবাড়ির জঙ্গলে সে লুকিয়ে থাকত এবং গঙ্গার ঘাটে একলা মানুষ দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ত। আশ্চর্য, সেই মানুষখেকো বাঘ অবশেষে মানুষের তাড়া খেয়ে কুঠিবাড়ির ছাদে উঠেছিল এবং ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়েছিল নীচের গভীর দহে। আত্মহত্যাই বলা যায়। দহের জলে। কুঠিবাড়ির দেয়াল ভেঙে অজস্র পাথরের চাই পড়েছে। সেই পাথরের আঘাতেই সম্ভবত বাঘটা মারা পড়েছিল। কিন্তু স্থানীয় লোকে বলে, দহের পেত্নীর সঙ্গে বাঘটার নাকি দেখার মতো একটা লড়াই হয়েছিল। মোহনলাল গণেশলাল অ্যান্ড কোম্পানির আশাপুরা অফিসের স্টেনোটাইপিস্ট কেয়া সেনের শরীর ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনার কয়েকদিন পরে কর্নেল ক্লিফটনগঞ্জে গিয়েছিলেন। খাদ বা দহটা নিয়ে এলাকায় অজস্র ভুতুড়ে গল্প চালু আছে। আরও কয়েকটা ক্ষতবিক্ষত শরীরও পাওয়া গেছে অতীতে। একটা মৃত্যুর ফাঁদ যেন। কেয়া সেনের আগে রোজি জেভিয়ার নামে একটি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়েও নাকি ওই ফাঁদে পড়ে জীবন হারায়।

ফাঁদ! চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন কর্নেল। ছবি থেকে মন সরে গেছে ক্লিফটনগঞ্জে। আজ একুশে ডিসেম্বর। এবারকার ক্রিসমাসটা ওখানে গিয়ে কাটালে মন্দ হয় না। অরীন্দ্রের পৌত্রী রানুকে বলে এসেছিলেন, রাক্ষুসে প্রজাপতিটা ধরার প্রোগ্রাম নিয়ে কোনও এক সময়ে হঠাৎ গিয়ে পড়তেও পারেন। তবে আরও দুটো দিন কলকাতায় তাঁর থাকা দরকার। হাথিয়াগড় থেকে আনা অর্কিডটার ফুল ফুটেছে আজ। এই অর্কিডের ফুল শীতে ফোটে। উজ্জ্বল নীল পাপড়ি। পরাগ ঝকঝকে শাদা। অর্কিডটাকে এ সময়ে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। অথচ ওই ফাঁদটা…কালো গভীর অতল মরণফাঁদ তাকেও টানছে। একটু শিউরে উঠলেন কর্নেল।…

পরদিন সকালে কর্নেল তাঁর ছাদের বাগানে ফুলগুলো আতস কাচ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন এবং কাগজে নোট করছেন প্রতিটি রেখা ও রঙের বৈশিষ্ট্য, পিছনে ষষ্ঠীচরণ খুক করে কাশল। কোনও সাক্ষাৎপ্রার্থীর খবর থাকে এই ছোট্ট কাশিতে। ঘুরে চোখ কটমটিয়ে বললেন, আমি ব্যস্ত।

ষষ্ঠী বেজায় গম্ভীর হয়ে বলল, হাতে কালো রঙের একটা কি আছে। লাঠি বলব, না ছড়ি বলব ভেবে পাচ্ছি না। পেল্লায় গোঁফ। নাল চোখ। বললুম, বাবামশাইয়ের নামতে দেরি হবে। হুম হাম করে বললেন, বলো গে, আরেক বাবামশাই এয়েছেন।

তোর ন-ল নিয়ে আপত্তি করলেন না?

ষষ্ঠী হেসে ফেলল। নক্ষ করেননি।

 কর্নেল সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চাপাস্বরে বললেন, ওই দ্যাখ, তোকে নক্ষ করছেন। কড়া কফি। শিগগির!

ষষ্ঠী চিলেকোঠার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে আরেক বাবামশাই’কে দেখতে পেল। সসমে না হোক, সভয়ে একটু তফাতে সরে গেল। কর্নেল বললেন, গত রাত্তিরে সবে ঘুমের টান এসেছে, হঠাৎ দেখলুম আপনি ট্রেনে। নাহ্! বাংকে শুয়ে নয়, সিটে বসে আছেন। রিজার্ভেশন পাননি। তবে ট্রেন লেট করেনি, এটাই আশ্চর্য। যষ্ঠী! কফি!

কফি খাব কী! মাথায় আগুন জ্বলছে। ক্লিফটন ব্যাটাচ্ছেলের সর্বনেশে মরণফাঁদে বডি পড়ে জানা কথা। গভমেন্ট ছাদে ওঠা বন্ধ করে দিক। তা না করে খামোখা…

বোসসায়েবের নাতিকে ধরে টানাটানি।

অরীন্দ্র থমকে দাঁড়ালেন। বুড়ো ট্রাঙ্ককল করেছে তাহলে? আমি ওকে বারণ করেছিলুম। বলেছিলুম, আমি তো যাচ্ছি। প্রিয় ওর হেড অফিসে আর্জেন্ট খবর পাঠাতে বলেছে। কিন্তু বুড়ো তো একটা গবেট। ওকে পাঠানো মানে আবার একটা কেলো। আপনি জানেন? বুড়োই পুলিশকে রক্ত পড়ে থাকার কথা বলে প্রিয়র বিপদটা ডেকে আনল! প্রিয়র শ্যালিকা দময়ন্তীও রক্ত দেখেছিল। সে বলেনি কিছু। হতচ্ছাড়া নির্বোধ মাথামোটা। খালি জানে বালির বস্তায় ঘুসি চালাতে।

কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন, বুড়ো ট্রাঙ্ককল করেনি। চলুন, নীচে গিয়ে বসা যাক। সত্যি বলতে কী, আই ওয়াজ এক্সপেক্টিং ইউ।

অরীন্দ্র সঙ্গ ধরে বললেন, আপনার সোর্স অব ইনফরমেশন নিশ্চয় নিউজপেপার? ওরা তো তিলকে তাল করতে ওস্তাদ। আমার ফ্যামিলির স্ক্যান্ডাল! খামোকা! তবে ইউ উইল বি ইন্টারেস্টেড। একটা মিস্টিরিয়াস ব্যাপার আমার চোখে পড়েছে। সেজন্যই আপনাকে খবরটা দিতে আসা। গত অক্টোবরে যে মেয়েটির ওই খাদে ঝাঁপিয়ে পড়ে সুইসাইড করা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছিলুম, সে প্রিয়র কোম্পানির আশাপুরা অফিসে কাজ করত। তার আগে বেলিংটনসায়েবের মেয়ে একইভাবে সুইসাইড় করে। আশ্চর্য ব্যাপার সে-ও আশাপুরায় একই পোস্টে কাজ করত। আবার এই লোকটার সঙ্গেও প্রিয়র কোম্পানির সম্পর্ক ছিল। আমাকে প্রিয় বলেছে তার কোম্পানি ফিল্ম ডাইরেক্টার গণনাথবাবুর বডিগার্ডের মাইনে জোগাত। সেই বডিগার্ড এই লোকটা–অনির্বাণ সোম, যার ডেডবডি পাওয়া গেছে খাদের জলে।

.

০৮.

এক্সকিউজ মি। আর ইউ কর্নেল নীলাদ্রি সরকার?

উ? হুঁ। বাট ফানি! বাইনোকুলারে আকাশে হাঁসের ঝাঁক দেখতে দেখতে ক্লিফটনগঞ্জ স্টেশনে প্ল্যাটফর্মের শেষ দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন কর্নেল। পিঠে আটকানো মোটাসোটা কিটব্যাগ। বুকের ওপর একটা ক্যামেরা ঝুলছে। হাঁসের গতিপথের দিকে ঘুরতেই কামড়ানো চুরুট থেকে ইঞ্চিটাক ছাই খসে পড়ল শাদা দাড়িতে। ক্রিসক্ৰস….জিগজ্যাগ…বাঃ। ক্রিসমাস গেম।

এক্সকিউজ মি। আপনি কি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার?

লো অ্যান্ড বিহোল্ড! আট আট আট আট…ক্রিসমাস গেম, ডার্লিং! লুক, লুক!

মুখ একটু বেশি তুলতে গিয়ে ছাইরঙা টুপিটা পিঠের কিটব্যাগে আটকে গেল। তারপর পা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ থেকে মাটিতে পড়ে গেল। বিকেলের রোদে টাক ঝলমলিয়ে উঠেছিল। পিউ বিরক্ত হয়ে বলল, এক্সকিউজ মি। আপনার টুপি।

কর্নেল একটা হাত বাড়িয়ে দিলেন। অগত্যা পিউ টুপিটি কুড়িয়ে ওঁর হাতে গুঁজে দিল। টুপি পরে বাইনোকুলার চোখ থেকে নামিয়ে কর্নেল উজ্জ্বল মুখে ঘুরলেন। বললেন, থ্যাঙ্কস। তারপর ভুরু কুঁচকে তাকালেন। দময়ন্তী! রাইট?

পিউ একটু হকচকিয়ে গিয়ে বলল, আপনি আমায় চেনেন?

তুমি আমায় চেন?

আপনার চেহারার ডেসক্রিপশান শুনেছি।

 আমিও তোমার সম্পর্কে শুনেছি।

 পিউ একটু হাসল। দাদামশাইয়ের কাছে তো? ওঁর অবশ্য সব কিছুকে ভীষণ কালারফুল করার অভ্যাস আছে। কিন্তু স্টেশনে আপনাকে আমার রিসিভ করতে আসার কথা ছিল না।

কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে বললেন, যার ছিল, সে ব্রুস লি-র ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

পিউ স্টেশনঘরের দিকে তাকাল। সাত্যকি, কোমরে দু’হাত রেখে সত্যিই একটা পোস্টার দেখছে। একেবারে পাথরের মূর্তি। পিউ কর্নেলের দিকে ঘুরে চাপাস্বরে বলল, সরি! ভুলে গিয়েছিলুম আপনি ডিটেকটিভ।

ডিটেকটিভ? কর্নেল হাসলেন। ডিটেকটিভ গল্পের বইয়ে থাকে। তা ছাড়া তুমি কি জান কথাটা একটা গালাগাল?

পিউ অবাক হয়ে বলল, গালাগাল হবে কেন? রাণুদি বলছিলেন আপনি ডিটেকটিভ। দাদামশাই তাই আপনাকে আনতে কলকাতা গিয়েছিলেন। জামাইবাবু যে সত্যি আনুদাকে মাডার করেনি……

ওয়েট, ওয়েট! তুমি কি জান বাংলায় টিকটিকি কথাটা একট স্ল্যাং? কথাটা এসেছে ডিটেকডিভ থেকে। যাই হোক, আমি ডিটেকটিভ নই। তোমার দাদামশাইয়ের বন্ধু।

কর্নেলের মুখে চাপা কৌতুক ছিল। কিন্তু পিউ সিরিয়াস হয়ে বলল, বুঝেছি। ব্যাপারটা আপনি গোপন রাখতে চান।

তার মানে তুমি নিশ্চয় ভাবছ আমার এই দাড়ি নকল দাড়ি? কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন। তাই বলে আমি তোমায় দাড়ি টেনে দেখার অনুমতি দেব না।

পিউ হেসে ফেলল। ভ্যাট! বুড়োদা আমায় বলেছেন সান্তাক্লস আসছেন। ক্লিফটনগঞ্জে। তবে অন দা ইভ অব অ্যান আনহাপি ক্রিসমাস। এক মিনিট! আমি ওকে ডেকে আনি।

উঁহু। এস আমরা চুপিচুপি কেটে পড়ি।

কিন্তু ও আমাকে খুঁজবে!

ডার্লিং! তোমার সঙ্গীর জন্য শীতের বিকেলে একটু রহস্য রেখে যাও।

পিউ অনিচ্ছাসত্ত্বেও কর্নেলের সঙ্গ নিল। সাত্যকি তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। তাকে এড়িয়ে স্টেশনঘরের গেটের কাছে পৌঁছে পিউ বলল, কিন্তু প্রব্লেম কী, জানেন? বুড়োদা ফান বোঝে না। মোল্লার দৌড় মসজিদ। সোজা থানায় গিয়ে উঠবে। সে-ই তো থানা-থানা করে কেলেঙ্কারিটা বাধাল।

ওয়েটিং হলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু দেহাতি মানুষজন কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে আছে। চায়ের স্টলে ছোট্ট একটা নিস্পন্দ ভিড়। শেষ বেলার কনকনে ঠাণ্ডা সব কিছু চুপ করিয়ে রেখেছে। নীচের চত্বরে যাত্রী না পাওয়া একটা এক্কা গাড়ি, কয়েকটা সাইকেল-রিকশো, আর একটা জিপ। কর্নেলকে দেখে কেউ নড়ল না। শুধু জিপের ড্রাইভার আড়ষ্ট গলায় বাঁধা গৎ আওড়াল, কুরুডি ফরেস্ট? ওনলি ফিফটি রুপিজ। হাফ অ্যান আওয়ার। ওয়াটারড্যাম ঔর ভি চিড়িয়া-সেংচুয়েরি টেয়েন্টি রুপিজ। পিরাইভিট লজ ভি হ্যায়। ফিল্মেকি স্যুটিং দেখনে ভি মওকা মিলেগা!

পিউ সাইকেল-রিকশো ডাকতে যাচ্ছিল কর্নেল বললেন, নাক বরাবর শর্টকার্ট করব। চলে এস।

পেট্রল পাম্পের পিছনে একটা টিলা। কর্নেলকে সেদিকে যেতে দেখে পিউ বলল, ওদিকে রাস্তা কোথায়?

তুমি যেখানে পা ফেলে হাঁটবে, সেটাই তোমার রাস্তা।

আমি কিন্তু কিছু চিনি না।

কর্নেল চুরুটটা জুতোর তলায় ঘসটে নিভিয়ে বললেন, জিল্স শার্ট জ্যাকেট পরা নিশ্চয় তোমার ফ্যাশন নয়?

পিউ ফুঁসে উঠল। আই অ্যাম আ পার্সন। দিস ইজ মাই ড্রেস।

কর্নেল হাসলেন। আসলে আমি বলতে চাইছি তোমার এই পোশাক তোমার কাছে অ্যাডভেঞ্চারের স্পিরিট দাবি করে।

পিউ একটু ইতস্তত করে বলল, কিন্তু এখানে দেখেছি খুব শিগগির সন্ধ্যা হয়ে যায়। পথ হারিয়ে ফেললে কেলেঙ্কারি।

সেটাই অ্যাডভেঞ্চার। এস।

 টিলার ওপাশে একটা বস্তি। বাঁদিকে ঝোপঝাড় আর ছোট-বড় নানা গড়নের পাথরে ভরা অসমতল একটা মাঠ। ফিকে সোনালি রোদ কাছে ও দূরে নীল কুয়াশার তলায় নেতিয়ে পড়ে আছে। কর্নেল বইনোকুলার তুলে বললেন, অক্টোবরে এই মাঠে অনেক লালঘুঘু দেখেছিলুম। ঝোপগুলোর পাতার রঙ বদলেছে। ওদের ক্যামোফ্লাজের বড়ো অসুবিধে। জাস্ট আ মিনিট! জাস্ট আ মিনিট।

পিউ দেখল, কর্নেল পিঠের কিটব্যাগের কোনা থেকে কী একটা টেনে বের করলেন। সেটা কী করে হঠাৎ ছাতার বাঁটের মতো লম্বা হয়ে গেল এবং নিঃশব্দে ফিকে হলুদ রঙের একটা সূক্ষ্ম জাল ছাতার মতোই বেরিয়ে পড়ল। কর্নেল পা টিপে টিপে একটু কুঁজো হয়ে একটা বড় পাথরের দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, যাঃ।

পিউ অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার?

প্রজাপতি। কর্নেল বিরসমুখে জাল এবং স্টিক গুটিয়ে কিটব্যাগে চালান করে দিলেন। পা বাড়িয়ে বললেন, রেয়ার স্পেসিস না হলেও একটু বৈশিষ্ট্য আছে। শীতের সময় ডানার রঙ ফিকে হয়ে যায়। আবার শীত ফুরোলে জেল্লা বাড়ে। প্রকৃতিতে যত সৌন্দর্য, তত রহস্য। তবে তার চেয়ে জরুরি কথাটা হল, প্রকৃতির কাছাকাছি গিয়ে মানুষ কেমন যেন হয়ে যায়। এই যে আমরা হাঁটছি, কোন মুহূর্তে কল্পনাতীত কিছু ঘটে যেতে পারে। সেজন্য নিয়ম হল, রেডি স্টেডি-গো পজিশনে থাকতে হয়। প্রতিটি মুহূর্ত রেসের মুহূর্ত।

কিছুক্ষণ চুপচাপ চলার পর পিউ বলল, আপনি প্রজাপতি ধরেন কেন?

তুমি জিনস শার্ট জ্যাকেট পরেছ কেন?

পিউ একটু চটে গেল। কী কথায় কী! আপনার আউটলুকটা বড্ড সেকেলে। বলে সে এদিক-ওদিক দেখে নিল। সন্দিগ্ধভাবে বলল, আমরা ঠিক যাচ্ছি তো?

আমরা ক্লিফটনসায়েবের কুঠিবাড়ির কাছাকাছি পৌঁছেছি। তো আমাদের ঝগড়ার পয়েন্টনটা পিক আপ করা যাক।

নাহ্। মেল শোভিনিস্টদের সঙ্গে আমার ঝগড়ার ইচ্ছে নেই।

 কর্নেল একটা অট্টহাসি হাসলেন। দময়ন্তী, এই ঠাণ্ডায় ঝগড়া কিছুটা তাপ দেবে।

পিউ গলার ভেতর বলল, আমার নাম পিউ। দময়ন্তী আমি পছন্দ করি না।

ওয়েল! পিউ, মেল শোভিনিস্টদের সঙ্গে ফিমেল শোভিনিস্টদের ঝগড়াটা সব সময় বেশ উচ্চাঙ্গের হয় জান কি? ইতিহাস সমাজতত্ত্ব শাস্ত্র-টাস্ত্র। আমাদের সূত্র সামান্য একটা প্রজাপতি।

পিউ ঘুরে তাকাল শুধু। কিছু বলল না।

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, নাহ। সামান্য কী বলছি! বিয়ের কার্ডে একসময় প্রজাপতির ছবি মাস্ট ছিল। একবার এক ভদ্রলোক আমার কাছে হাজির। তাঁর মেয়ের বিয়ে। তিনি জানতে চাইলেন, আমি অন্তত শ’পাঁচেক প্রজাপতি ওঁকে সাপ্লাই করতে পারব কিনা। মেয়ের বিয়ের কার্ডে উনি সত্যিকার প্রজাপতি সেঁটে দেবেন। স্টাড় প্রজাপতি! জাস্ট ইমাজিন!

পিউ আমননে বলল, পৃথিবীটা যত সব অদ্ভুত-অদ্ভুত লোকে ভর্তি।

তার চেয়ে অদ্ভুত, কোনও মেয়ের কাছ ঘেঁসে প্রজাপতি গেলেই নাকি অবধারিত গায়ে হলুদ।

আমি জানি না। শুনিনি।

প্রজাপতিটা তোমার মাথার স্কার্ফ ছুঁয়ে গেছে।

সো হোয়াট? পিউ কাঁধ নেড়ে একটা ভঙ্গি করল।

ডার্লিং! প্রজাপতি সব কিছুকে সুন্দর করে। মিনিংফুল করে। দ্যাটস দা পয়েন্ট।

পিউ বাঁকা হাসল। আপনার এই ডার্লিং বলাটা কি গোয়েন্দাদের ট্যাকটিস্? বুড়োদা বলছিল, আপনি নাকি ওকেও ডার্লিং বলেন।

তুমি এটাকে মেল শোভিনিজম বলতে চাও কি? কর্নেল তার কাছাকাছি এলেন। বললেন, সাত্যকি প্রথম-প্রথম চটে যেত। তখন ওকে ডিকশনারি দেখতে বললুম। দেখে এস বলল, ইউ আর কারেক্ট।

পিউ একটু চুপ করে থাকার পর ছোট্ট এ.; শ্বাস ছেড়ে বলল, বুড়োদার সঙ্গ ধরেছিলুম আপনাকে আগাম কিছু সিক্রেট ইনফরমেশন দেব বলে। আপনি আমার মুডটাই নষ্ট করে দিয়েছেন।

চিয়ার আপ ডার্লিং! চিয়ার আপ!

ভ্যাট! বিচ্ছিরি বনবাদাড়। আপনি অ্যাডভেঞ্চার করুন। আমি রাস্তায় যাচ্ছি।

এখান থেকে সোজাসুজি রাস্তায় যেতে হলে একটা নালা পেরুতে হবে।

 পেরুব।

গভীর জল আছে।

পিউ জেদ করে এগিয়ে গেল। তারপর থমকে দাঁড়াল। বলল, কোনও মানে হয়?

চলে এস ডার্লিং! কুরুডি ফরেস্ট থেকে কোনও-কোনও ছিটগ্রস্ত ভালুক বিকেলে এখানে বেড়াতে আসে। ওই দেখ, নালার ওপারে একটা ঝোপ কেমন নড়ছে।

পিউ দ্রুত কর্নেলের সঙ্গ ধরল। বলল, কিন্তু এদিকটায় তো বড্ড বেশি জঙ্গল।

এই শালবনটা পেরুলেই ক্লিফটনসায়েবের কুঠি। সেখান থেকে পাখি ওড়া পথে চারুভবন। বলে কর্নেল শালবনে ঢুকলেন। শুকনো পাতা ছড়িয়ে আছে সবখানে। কুঠি বাড়ির ভাঙা ফটকটা আবছা দেখা যাচ্ছিল। কর্নেল একটু হাসলেন। সিক্রেট ইনফরমেশন দেওয়ার উপযুক্ত জায়গা! পিউ, এবার স্বচ্ছন্দে তুমি তা আমাকে উপহার দিতে পার।

পিউকে চুপচাপ দেখে ফের বললেন, কী হল ডার্লিং?

 পিউ আস্তে বলল, রাস্তা দিয়ে গেলে জায়গাটা আপনাকে দেখাতুম।

কোন জায়গাটা?

 যেখানে জামাইবাবুর গাড়ি ব্রেক ফেল করেছিল।

 বলেই সে পিছু ফিরল। কর্নেল বললেন, কেউ আড়ি পেতে আছে নাকি দেখছ?

নাহ্। কী একটা শব্দ। পিউ চমকানো গলায় বলল, ওই শুনুন!

কোথাও ঝোপের আড়ালে শুকনো পাতায় মচ মচ শব্দ হচ্ছিল। শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল। কর্নেল বললেন, ছিটগ্রস্ত কোনও ভালুক নয় এটুকু বলতে পারি। পাখিটাখি হবে। চলো!

পিউ কর্নেলের কাছ ঘেঁসে হাঁটতে থাকল। চাপাস্বরে বলল, দিদি আমাকে বলতে বারণ করেছে। তবু বলছি। আপনার জেনে রাখা দরকার। যে রাতে আনুদা মাডার হয়,…সে আবার পিছু ফিরল। কর্নেল! কেউ আমাদের ফলো করছে। আবার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন না?

পাচ্ছি।

পিউ শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে বলল, নিশ্চয় ঝোপের আড়ালে কেউ আমাদের ফলো করছে।

করুক। তুমি কী বলছিলে, বলো।

আপনি জানেন, ব্রেক ফেল করার পর গাড়ি রেখে জামাইবাবু যখন বাড়ি ফিরছিল, তখন পিছনে পায়ের শব্দ শুনেছিল। কেউ ওকে ফলো করেছিল। এবার দেখুন, আমাদেরও ফলো করছে। ব্যাপারটা থ্রিলিং!

কর্নেল হাসলেন। তা হলে দেখ, এভাবে এলুম বলে আমরাও থ্রিলটা পাচ্ছি!

আমার অস্বস্তি হচ্ছে। আচ্ছা, আপনার কাছে ফায়ারআর্মস নেই?

থাকলেও কাজে লাগানোর মতো কিছু ঘটছে না।

ওই শব্দটা!

শব্দটা থেমে গেছে।

 পিউ কান করে শব্দটা শোনার চেষ্টা করল তারপর শ্বাস ছেড়ে বলল, মিসটিরিয়াস।

তোমাকে বলেছিলুম ডার্লিং, প্রকৃতিতে প্রচুর রহস্য আছে।

 শালবন শেষ হওয়া পর্যন্ত পিউ কোনও কথা বলল না। এবার সংকীর্ণ একফালি এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা পড়ল সামনে। রাস্তাটা বাঁদিকে কুঠিবাড়ির ফটকে পৌঁছেছে। ভাঙা ফটকের কাছে একট বিশাল মহুয়া গাছ দেখা যাচ্ছে। রাস্তায় পৌঁছে পিউ বলল, যে রাতে আনুদা মাডার হয়, জামাইবাবু বাড়ি ফেরার পর আবার বেরিয়েছিল। গাড়িতে নাকি কী একটা ইমপর্ট্যান্ট জিনিস ফেলে এসেছে। জিনিসটা কী জানেন? চোখে না দেখলে আমিও বিশ্বাস করতুম না যে, জামাইবাবুর ফায়ার আর্মস আছে। রিভলভার না পিস্তল, জানি না। এইটুকু, ছোট্ট। দিদি ওটা লুকিয়ে রেখেছে। দম নিয়ে পিউ ফের বলল, জামাইবাবুকে দেখলেই বুঝতেন, একেবারে ভীতু গোবেচারা মানুষ। সে সঙ্গে ফায়ার আর্মস রাখে; ভাবা যায় না! কিন্তু সেটা কোনও ব্যাপার নয়। আনুদার বুকে স্ট্যাব করা হয়েছিল। আমি বডি দেখে এসেছিলুম। জামাইবাবুর সঙ্গে ওর যদি মারামারি হত, উল্টে জামাইবাবুই মারা পড়ত। তা ছাড়া আনুদারও ফায়ারআর্মস ছিল, আমি দেখেছি।

কোথায় দেখেছ?

কেন? গণাদার সঙ্গে আমাদের ফ্ল্যাটে প্রায়ই আসত। আনুদা ছিল গণাদার বডিগার্ড, জানেন তো?

ফিল্ম ডাইরেক্টার গণনাথ সেন? তাঁর কেন বডিগার্ড দরকার হত জান তুমি?

জামাইবাবুর কাছে শুনেছি, কোন ফাইন্যান্সারকে ফাঁসিয়েছিল। গণাদা যা কেলো করে না!

গণনাথবাবু শ্যুটিং করছেন শুনেছি?

হুঁ। ওয়াটারড্যামের ওখানে। এত কাণ্ডের পর পারেও বাবা! পিউ মুখ তেতো করে বলল। আমার একটা ব্যাপারে অবাক লাগছে। দাদামশাই প্রথমে জামাইবাবুর কোম্পানির আমিনগঞ্জ ফ্যাক্টরিতে গিয়েছিলেন। ডিফেন্সের ব্যাপারে যদি কোনও হেল্প পাওয়া যায়। ওরা বলেছে, কিছু করার নেই। তারপর তো দাদামশাই কলকাতা গেলেন। আপনার কাছ থেকে জামাইবাবুর কোম্পানির অফিসে গিয়েছিলেন। রাণুদি বলছিল, হেড অফিসেও কোনও রেসপন্স পাননি দাদামশাই। এদিকে নন-বেলেল ওয়ারেন্ট। আজ আশাপুরা জজকোর্টে বেল অ্যাপ্লিকেশনের হিয়ারিং ছিল। ফিরে গিয়ে কী শুনব কে জানে? কর্নেল! আপনি কি কুঠিবাড়িতে ঢুকবেন?

না। দেয়ালের পাশ দিয়ে যাব।

কুঠিবাড়ির ছাদটা কিন্তু অসাধারণ!

নীচের খাদটা দেখেছ?

হুঁউ। ওই খাদের জলেই তো আনুদার বডি পড়েছিল! জেলেরা দেখতে পায়।

খাদে একটা পেত্নী থাকে জান তো? পিউ হাসল।

লোকাল লোকেরা কী যেন বলে। ভেরি পিকিউলিয়ার ওয়র্ড।

কিচনি।

হ্যাঁ, কিচনি। ও! আপনাকে বলা উচিত, আনুদা যে রাতে মাডার হয়, কিচনির ডাক শুনেছিল জামাইবাবু। টেরিফিক ক্র্যাকড ভয়েস। ইরিগেশন বাংলোর চৌকিদার বলেছিল, সেও শুনেছে। কিচনি ডাকলেই নাকি ওই খাদে বডি পাওয়া যায়। তবে জামাইবাবু ভীষণ ভয় পেয়েছিল। আপনি কখনও শুনেছেন কিচনির ডাক?

অক্টোবরে এসেছিলুম। তখন শুনেছিলুম। সত্যিই টেরিফিক ক্র্যাক্ড় ভয়েস।

আমার ধারণা কোনও জন্তুটন্তু হবে। পিউ একটু চঞ্চল হল। জামাইবাবুর গাড়ির কাছে খানিকটা ব্লাড দেখেছিলুম। বুড়োদাও দেখেছিল। আচ্ছা কর্নেল, এমন তো হতে পারে, ওই জন্তুটাই আনুদাকে…..

সে থেমে গেল। কুঠিবাড়ির দিক থেকে আচমকা একটা চিৎকার শোনা গেল। তীক্ষ্ণ জান্তব চিৎকার। কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন। পিউ দ্রুত তাঁর পিঠের কাছে সরে এল। তারপর কাছাকাছি কোথাও কেউ চেরা গলায় আর্তনাদ করে উঠল হে! হে! হে!

কর্নেল কুঠিবাড়ির ফটকের দিকে এগিয়ে গেলেন। পিউ একটু ইতস্তত করে তাঁকে অনুসরণ করল। তারপর দম আটকানো গলায় বলল, কর্নেল! এভাবে যাবেন না। প্লি-ই-জ! জামাইবাবু ঠিক এমনি টেরিফিক ক্র্যাকড় ভয়েস শুনেছিল।

কর্নেল কান করলেন না। সোজা এগিয়ে গেলেন …..

.

০৯.

 ভাঙা ফটকের পর কুঠিবাড়ির চত্বর জুড়ে ইটপাথরের অজস্র স্তূপ। প্রতিটি স্তূপ ঝোপঝাড় এবং রঙিন ফুলে সাজানো। কোনওটিতে বৃক্ষলতার নিবিড় ঝালর। পিউকে অবাক করে কর্নেল ডাকলেন, মিঃ জেভিয়ার! হোয়্যার আর ইউ?

কাছাকাছি কেউ রাগী স্বরে বলে উঠল, কুত্তাকা বাচ্চা! আই মাস্ট শো ইউ হু অ্যাম আই। টেক ইট! টেক ইট!

এবার ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ সর সর শব্দ শোনা গেল। কর্নেল ডানদিকে কয়েকটা স্তূপ পেরিয়ে গিয়ে বললেন, হ্যাল্লো মিঃ জেভিয়ার! আই হোপ ইউ আর অলরাইট?

পিউ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে হাসতে হাসতে বলল, কী আশ্চর্য! এ যে দেখছি সেই পাগলাসায়েব!

বেলিংটন জেভিয়ারের বগলে ক্ৰাচ, হাতে একটা লম্বা ধারালো কাটারি। বুনো কুলের ঝোপে কোপ মারছিলেন। ঘুরে রুষ্টমুখে বললেন, মাত্ হাসো। ঔর মুঝকো পাগল মাত বোলো। হম গির গেয়া ঔর তুম হাসতি? বেশরম লড়কি!

কর্নেল বললেন, মিঃ জেভিয়ার! হোয়াট হ্যাপনড?

জেভিয়ার তাঁর মাথা থেকে পা অব্দি দেখে নিয়ে বললেন, হম ঠিক হ্যায়। আই ওয়াজ ট্রাইং টু প্লাক দা প্লামস ইউ সি। ওয়াইল্ড প্লামস। লেকিন বহুত মিঠা। আ যাইয়ে! লড়কি, তুম ভি আ যাও। লেকিন মুঝকো পাগল মাত বোলো।

পিউ ওঁর হাতের কাটারিটার দিকে ভয়ে-ভয়ে তাকিয়ে বলল, সরি মিঃ জেভিয়ার! প্লিজ ট্রাই টু রিমেম্বার, দা আদার ডে উই মেট ইচ আদার নিয়ার দা ওয়াটার ড্যাম।

ইজ ইট? জেভিয়ার ঢোলা নোংরা কোটের দু’পকেটে পাকা কুল ছিঁড়ে ভরতে ব্যস্ত হলেন। তুম মুঝকো পাগল বোলি। হাঁ, কভি কভি এইসা হো জাতা। বলে কর্নেলের দিকে ঘুরলেন। চাপাস্বরে বললেন, আপ শুনা স্যার কিচনিকি আওয়াজ? হম শুনা। জেরাসা নার্ভাস হুয়া। হম যব ইহা পর চুঢ়নেকা। কোশিশ কিয়া, উও চিল্লায়ি! মাই গড! দেন শি ওয়াজ ট্রাইং টু পুশ মি। হমনে গির গেয়া ঔর চিল্লায়া। কিঁউ কি, দেয়ার মে বি সামওয়ান টু হেল্প। ইউ নো, দা ট্যুরিস্টস।

জেভিয়ার বুকে ক্রস আঁকলেন। আই মাস্ট নট স্ট্যে হেয়ার। যব কিচনি চিল্লাতি, কিসিকো জান জাতা। লেট আস লিভ দা প্লেস। লড়কি, তুম ভাগো! বলে ক্রাচে ভর দিয়ে এগিয়ে এলেন। তারপর কর্নেলের কাছে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। জাস্ট নাও আই রিমেম্বার! ইউ…আই থিংক আ রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার। ব্রিগেডিয়ার? অর মেজর..লেফটন্যান্ট?

কর্নেল।

হাঁ হাঁ। কর্নেল! ইউ ওয়েন্ট টু মাই প্লেস উইথ দ্যাট ওল্ড বেঙ্গলি জেন্টলম্যান। হম শুনা, উনকা কোই গ্র্যান্ডসন পকড় গেয়া! ফানি! জেভিয়ার হেসে উঠলেন।

কর্নেল বললেন, হোয়াই ইউ সে ফানি মিঃ জেভিয়ার?

আই নো। দেখ লিয়া। ফানি চ্যাপ!

 উড ইউ প্লিজ এক্সপ্লেন মিঃ জেভিয়ার?

 কিচনি চিল্লাতি ঔর উও কার ছোড় কর ভাগতা। কুত্তাকা মাফিক ভাগ জাতা।

হোয়াট ওয়্যার ইউ ডুইং দেয়ার?

দ্যাস্টস মাই পার্সোনাল বিজনেস। কিসিকো নেহি বোলেগা হম্‌।

কর্নেল প্যাকেটের পকেট থেকে চুরুটকেস বের করে সামনে খুলে ধরলেন। মাই গিফ্ট টু ইউ অন দা ইভ অব হ্যাপি ক্রিসমাস।

জেভিয়ার চুরুটগুলোর দিকে অন্তত আধ মিনিট তাকিয়ে রইলেন। তারপর ফিক করে হাসলেন। থ্যাংকস্ স্যার! লেকিন হম দোঠো লেগা। টু! বলে দুটো আঙুল দেখালেন। ওয়ান ফর ক্লিফটন। সমঝা? উও মেরা দোস্ত হ্যায়!

ইউ মে টেক মোর মিঃ জেভিয়ার!

নো। ওনলি টু। বলে জেভিয়ার দুটো চুরুট তুলে নিলেন। একটা কোটের ভেতর শার্টের পকেটে চালান করে দিলেন। অন্যটা কামড়ে ধরে ফের বললেন, থ্যাংকস্!

কর্নেল লাইটার জ্বেলে ওঁর চুরুটটি ধরিয়ে দিলেন। তারপর নিজে একটা চুরুট ধরিয়ে বললেন, ওয়েল মিঃ জেভিয়ার। দা ফানি চ্যাপ ইজ নট সো মাচ বোল্ড টু কমিট আ মার্ডার!

হাঁ। মার্ডার অফুল্যি নিডস্ সাম কারেজ। জেভিয়ার খক খক করে কাসতে কাসতে ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে থাকলেন। কয়েক পা এগিয়ে হঠাৎ ঘুরে বললেন, বাট আই অ্যাম নট সো সিওর।

হোয়াই?

জেভিয়ার পাগলাটে হাসি হেসে বললেন, জেসাস নোজ হোয়াট হ্যাঁনড। বহুত আন্ধেরা থি। লেকিন হম ফায়ার আর্মস কি আওয়াজ শুনা। হম ভাগা। ইউ সি, আই ক্যান্ট ট্যাকল আ পার্সন উইথ ফায়ার আর্মস।

বাট দা ভিকটিম ওয়াজ স্ট্যাবড টু ডেথ।

বুড়ো আঙুল কাঁধের ওপর তুলে কুঠিবাড়ির দিকটা দেখিয়ে জেভিয়ার বললেন, দা ক্রোকোডাইলস। দে আর অলওয়েজ হাংগ্রি ইউ নো। কোই বডি মিলতা তো খা লেতা। ঔর পানিমে বহুত পাথর ভি হ্যায়।

জেভিয়ারকে অনুসরণ করে কর্নেল বললেন, অ্যান্ড হোয়াট অ্যাবাউট দা কার? অল দা গ্লাসেস ওয়্যার স্ম্যাশড।

জেভিয়ার গতি বাড়িয়ে বললেন, মাই ডটার রোজি ওয়াজ স্ট্যান্ডিং দেয়ার। গো টু হার গ্রেভ অ্যান্ড পুছিয়ে আই অ্যাম নট সিওর। অ্যান্ড মাই ফ্রেন্ড ক্লিফটন। এভরি নাইট আই গো দেয়ার ফর আ চ্যাট উইদ দা ফেলা। উসকো ভি পুছিয়ে। বাট নট নাও। কিচনি চিল্লায়ি। শি ইজ হিজ মিসট্রেস! সামটাইমস শি বিকামস্ ভায়োলেন্ট। লড়কি। জলদি ভাগো!

জেভিয়ার দ্রুত উধাও হয়ে গেলেন। কর্নেল একটু দাঁড়িয়ে থাকার পর পিউকে বললেন, কী বুঝলে?

পিউয়ের মুখে বিস্ময় আর বিরক্তির ছাপ ওতপ্রোত। চাপা শ্বাস ছেড়ে বলল, শুধু বুঝলুম, আপনি জানতেন হে হে বলে কে চাঁচাচ্ছে।

কর্নেল কুঠিবাড়ির বাউন্ডারিওয়ালের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, এই হে্লপ হেলপ্ চ্যাঁচানির সূত্রেই গত অক্টোবরে ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়। কুরুডি ফরেস্টের দিকে যাচ্ছি, হঠাৎ এই আর্তনাদ। খোঁড়া মানুষ। গর্তে পড়ে গিয়েছিলেন। তবে লক্ষ করেছি, লোকজনের সাড়া পেলে অনেক সময় ইচ্ছে করেই এটা করেন। জাস্ট ফর আ ফান।

পিউ একটু পরে বলল, লোকটাকে আমার খারাপ লাগে। ওয়াটারড্যামের ওখানে একটা পার্ক আছে। সেখানে আনুদা আর আমি কথা বলছি, হঠাৎ ঝোপের মধ্যে একটা মুখ। চোখ দুটো জন্তুর মতো।

মিঃ জেভিয়ার?

হ্যাঁ। হি ওয়াজ ফলোয়িং আস। আনুদা ভাগিয়ে দিল। কুৎসিত গাল দিতে থাকল আনুদাকে। শাসাল। বলেই পিউ হঠাৎ চমকানো স্বরে ডাকল, কর্নেল!

উ? হুঁ! বলো।

হি ইজ আ মিসটিরিয়াস ম্যান। আপনি জানেন? রাণুদি বলছিল, পাগলাসায়েবের মেয়েকে কে মার্ডার করে কুঠিবাড়ির নীচে গঙ্গার ওই খাদে ফেলে দিয়েছিল। রাণুদিই বলছিল, সুইসাইড নয়। মার্ডার।

শুনেছি। লম্বা টাড় জমিতে উঠে কর্নেল অন্যমনস্কভাবে বললেন। তারপর আবার চোখে বাইনোকুলার।

ওর হাতের কাটারিটা লক্ষ করেছেন?

তুমি কি বলতে চাইছ জেভিয়ারসায়েব তোমার আনুদাকে খুন করেছেন?

পিউ জোর দিয়ে বলল, কিছু অসম্ভব নয়। সেদিনই মনে হচ্ছিল আনুদাকেই ও ফলো করে বেড়াচ্ছে। এমন তো হতেই পারে, ভুল করে আনুদাকেই ওর মেয়ের কিলার ভেবেছিল। তারপর দেখুন, বুড়োদা আর আমি জামাইবাবুর গাড়ির কাছে খানিকটা রক্ত দেখেছিলুম।

কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে বললেন, সরি ডার্লিং! তোমার থিওরির ভিত্তিটা নড়বড়ে। জেভিয়ারসায়েব রোগাভোগা বুড়োমানুষ। ক্রাচ ছাড়া এক পা চলতে পারেন না। অনির্বাণবাবুকে কাটারির কোপে খুন করাটা, ধরে নিচ্ছি, ওঁর পক্ষে সম্ভব হতেও পারে। কিন্তু…

রিভেঞ্জ। পিউ শক্তমুখে বলল। অন্ধকারে আচমকা কাটারির কোপ মেরেছিল বুকে।

তারপর বডিটা বয়ে নিয়ে গিয়ে জলে ফেলে দিয়েছিলেন! কর্নেল হাসলেন। দৃশ্যটা কল্পনা করো, ডার্লিং!

পিউ একটু দমে গিয়ে বলল, ওয়েল! এমন হতে পারে, জামাইবাবু গাড়ি থেকে তার ফায়ার আর্মস নিতে এসে দেখেছিল আনুদা মার্ডারড। তখন জামাইবাবুই নিজেকে মার্ডারের দায় থেকে বাঁচাতে বডিটা ফেলে দিতে গিয়েছিল।

তাহলে তোমার জামাইবাবুর পোশাকে প্রচুর রক্তের দাগ থাকা উচিত।

পিউ গম্ভীর হল। একটু ভেবে বলল, লক্ষ করিনি। আচ্ছা, এমন যদি হয়, জামাইবাবু বডির পা দুটো ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল?

সেক্ষেত্রে সারা পথে প্রচুর রক্তের ছোপ থাকার কথা।

হুঁ। কিন্তু পুলিশ এসব কথা ভাবেনি। খুঁজেও দেখেনি। পিউ উৎসাহে বলতে থাকল। গাড়ির কাছে আমি আর বুড়োদা রক্ত দেখেছি শুনেই পুলিশের মাথা খারাপ হয়ে গেল। জামাইবাবু তখন আমিনগঞ্জে। জিপ হাঁকিয়ে গণাদার সঙ্গে গিয়ে দুম করে অ্যারেস্ট করে ফেলল। আর দিদিও পুলিশের জেরার চোটে নার্ভাস হয়ে বলে দিল, দু’জনের মধ্যে শত্রুতা ছিল। তাও ভাগ্যিস ফায়ার আর্মসটার কথা বলে ফেলেনি। কর্নেল! আমার ধারণা, বডিটা শর্টকাটে নিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। আপনি মর্নিঙে এসে ওইদিকটা খুঁজবেন। আমিও আসব আপনার সঙ্গে।

পিউ আঙুল তুলে সম্ভাব্য শর্টকাটটা দেখাল। কর্নেল টাড় জমি থেকে নেমে বললেন, গপ্পের ডিটেকটিভদের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকা চাই-ই। তোমার সে কোয়ালিফিকেশন আছে।

পিউ চটে গেল। আপনি আমার কথা সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না! স্টিল ইউ আর জোকিং, কর্নেল।

উঁহু! তোমার এই থিওরিটা মন্দ না। তবে কি জান, কাটারিতে কারও হুঁড়ি ফাসালে অকুস্থলেও প্রচুর রক্ত থাকার কথা। কিন্তু তুমি আর সাত্যকি সামান্য একটু রক্ত দেখেছিলে। তাই না?

হেভি ফগ ছিল। তা ছাড়া গাড়ির সমস্ত কাচ ভাঙা। খুঁটিয়ে লক্ষ করার মতো মনের অবস্থা ছিল না। আই ওয়াজ টেরিবলি এক্সাইটেড। বলে পিউ থমকে দাঁড়াল। সামনে নিচু জমিটা একটা জলা। সে বলল, আপনার শর্টকাট করা হল না। মনে হচ্ছে, রাস্তাটা অ্যাভয়েড করা যাবে না।

কর্নেল জলায় একটা সারস পাখি দেখছিলেন। তারপর জলার ধারে ধারে হাঁটতে থাকলেন। পিউ বলল, এই মার্শল্যান্ডটা না থাকলেও শর্টকাটে আমরা গিয়ে বাড়ির পেছনদিকে উঠতুম। ওদিকটা ঢোকা যাবে না। ডাকলেও কেউ শুনতে পাবে না। বাইরে-ভেতরে বিচ্ছিরি জঙ্গল। আমাদের রাস্তা দিয়ে ঘুরে গেটে যেতেই হবে।

তা তো হবেই। তবে অ্যাডভেঞ্চারটা মন্দ হল না। কী বলো? পিছনে পায়ের শব্দ এবং কিচনির গর্জন।

পিউ খানিকটা দূরে উঁচু রাস্তাটা দেখছিল। হঠাৎ হেসে ফেলল সে। ওই দেখুন, বুড়োদা আমাদের দেখতে পেয়েছে। ও জানে না কী হারাল।

হুঁ। পিছনে পায়ের শব্দ এবং কিচনির গর্জন!

অ্যান্ড দ্যাট মিসটিরিয়াস ম্যান! বলে পিউ সাত্যকির উদ্দেশে হাত নাড়তে থাকল।

সাত্যকি সাইকেলের সিটে বসে রাস্তার পিচে একটা পা ঠেকিয়ে এদিকে তাকিয়ে আছে। পিউয়ের হাত নাড়ায় তার কোনও সাড়া নেই। কর্নেল চাপা স্বরে বললেন, সাবধান পিউ! ওর মধ্যে এখন দু-দুটো লি-র সমাবেশ। মহম্মদ আলির লি এবং ব্রুস লির লি।

পিউ এতক্ষণে মন খুলে হাসতে পারল। আপনি দারুণ বলেছেন কিন্তু। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ভায়োলেন্ট হয়ে আছে। হি ইজ আনপ্রেডিক্টেবল, ইউ নো! গেল আপনাকে রিসিভ করতে, পড়ল ব্রুস লির পাল্লায় এবং ফরগট হিজ মিশন। কিন্তু আমি খালি ভাবছি, থানায় গিয়েছিল কি না।

কাছাকাছি গিয়ে কর্নেল বললেন, হ্যাল্লো ডার্লিং! তোমার সঙ্গিনীকে চুরি করেছিলুম। ইনট্যাক্ট ফেরত দিলুম। এরপর আর তোমার উদ্বেগের কোনও কারণ থাকা উচিত নয়।

পিউ একটা ঝোপ আঁকড়ে ঝটপট রাস্তায় উঠে গেল। বলল, নিশ্চয় থানা থেকে আসছ?

সাত্যকি গম্ভীর মুখে বলল, এবার যেতুম। সিওর।

কিন্তু তুমি কি গুরু বদলালে?

অভ্যাসমতো সে বলল, সিওর। বলেই চার্জ করল, তার মানে? কর্নেল আস্তেসুস্থে রাস্তায় উঠে বললেন, সাত্যকি, তুমি কিচনির গর্জন মিস করেছ। পিউকে জিজ্ঞেস করো। কী দারুণ অ্যাডভেঞ্চার সারাটা পথ। অবশ্য তোমারও কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। গণনাথ সেনের ছবির শুটিংয়ে নিশ্চয় ব্রুস লি-টাইপ মারপিট ছিল?

সাত্যকি হেসে ফেলল। আপনারা আসুন! আমি গিয়ে দিদিকে খবর দিই। গিয়েই তো বলবেন, আগে কফি, তারপর কথাবার্তা। নো কফি নো টক।

সে প্যাডেলে পা রাখলে পিউ বলল, ওয়েট! তুমি শুটিং দেখছিলে?

কী করব? ভাবলুম তুমি স্টেশন থেকে ওখানে গিয়ে জুটেছ।

পিউ খাপ্পা হয়ে বলল, আশ্চর্য! তুমি কী করে ভাবলে আমি নির্লজ্জের মতো ওই ছাইপাঁশ দেখতে যাব?

কর্নেল তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, নো কফি নো টক। সাত্যকি, তুমি এগোও। রাণুকে বলো, কড়া কফি। সাংঘাতিক একটা অ্যাডভেঞ্চারের পর কফিটা একটু কড়া হওয়া দরকার।

সিওর। বলে সাত্যকি সাইকেলে প্রায় উড়ে গেল।

পিউ গম্ভীর হয়ে বলল, বুড়োদা শুটিং দেখছিল আপনি কী ভাবে টের পেলেন?

কর্নেল হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ধ্যান ভেঙে স্টেশন থেকে এখানে পৌঁছুতে ওর এত বেশি সময় লাগার কথা নয়। সাইকেল নিয়ে তোমার খোঁজে ওর বনবাদাড় ভেঙে ছোটাছুটির সম্ভাবনা নেই। তুমি থানার কথা বলছিলে। থানা উল্টোদিকে টাউনশিপ এরিয়ায় এবং সে থানায় যায়নি বলল। কাজেই এতখানি সময় কোথায় সে কাটাতে পারে? আমাকে রিসিভ করতে গিয়ে যে ব্রুস লি-র পাল্লায় পড়ে, ফেরার পথে ওয়াটারড্যামে শুটিং তার পক্ষে সমান একসাইটিং ব্যাপার। হিসেব ডার্লিং, হিসেব!

গেটে রাণু দাঁড়িয়েছিলেন। কর্নেলকে প্রণাম করে বললেন, সুশীলাকে বলছিলুম ট্রেন লেট। বুড়ো এসে বলল, ট্রেন লেট ছিল না। আপনি পিউকে নিয়ে উধাও হয়েছিলেন! রাণু হাসলেন। বুড়োর জামাইবাবুও বাড়ি ফিরে বলত, কর্নেলসায়েবকে জঙ্গলে হারিয়ে এলুম। খুঁজতে লোক পাঠাও। আমি বলতুম, পাখির বাসায় বসে চুরুট টানছেন। কোথায় চলে গেল সে সব দিন! রাণু শ্বাস ফেললেন। তাকে নিস্তেজ দেখাচ্ছিল। পোর্টিকোর দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, পিউ! তুমি ওপরে যাও তো ভাই। সুশীলাকে বলো, কর্নেলসায়েব এসে গেছেন। তারপর পিউ চলে গেলে আস্তে বললেন, এবার হয়তো আপনার একটু অসুবিধে হবে। আপনার ঘরটাতে প্রিয়রা উঠেছে। নীচের গেস্টরুমটা অবশ্য খারাপ লাগবে না। বেশ নিরিবিলি ওদিকটা। ঘরে বসেই প্রচুর পাখি দেখতে পাবেন। সেবার এসে ওদিকটা দেখে আপনি বলেছিলেন, চিড়িয়াখানা!

গেস্টরুমটা বাড়ির নীচের তলায় উত্তর-পশ্চিম কোণে। উত্তরে এক টুকরো খোলা বারান্দা। বারান্দার নীচে একসময় ফুলের বাগান ছিল। এখন খিড়কির দরজা পর্যন্ত ঘন জঙ্গল। লতাগুল্মের ঘন বুনোটে সন্ধ্যার রঙ লেগেছে। ওদিকের দরজাটা খুলে তখনই বন্ধ করে দিয়ে রাণু সুইচ টিপে আলো জ্বাললেন। কর্নেল পিঠ থেকে কিটব্যাগ খুলে টেবিলে রেখে বললেন, অক্টোবরে এসে চলে যাওয়ার দিন তোমাকে বলেছিলুম, খুব শিগগির হয় তো আবার আমাকে ক্লিফটনগঞ্জে আসতে হবে। মনে পড়ছে?

রাণু বললেন, পড়ছে। তবে আপনার প্রজাপতি ধরার প্রোগ্রাম জেনে রাখুন বাতিল। ঠাকুর্দা আপনাকে সে-সুযোগ দেবেন না। প্রিয় এসে যা উটকো ঝামেলা বাধিয়েছে, বলার নয়। কিন্তু ঠাকুর্দা পারেনও বাবা এ বয়সে। প্রিয় অ্যারেস্ট হওয়ার পর নিজেই কলকাতা দৌড়ুলেন আপনার কাছে। আমি বললুম, বুড়োকে পাঠান। নয় তো ট্রাঙ্ককল করুন। শুনলেন না। তারপর সারাটা দিন একবার থানা একবার সেই আশাপুরায় কোন উকিলের বাড়ি। এই বয়সে এমন ছুটোছুটির ধকল। আমার বড্ড ভয় করছে কর্নেল!

বলে রাণু দরজায় একবার উঁকি মেরে এলেন। ফিসফিস করে বললেন, প্রিয়র বউকে দেখামাত্র বুঝেছিলুম কী একটা গণ্ডগোল আছে। ঠিক তা-ই। আপনি ওকে চেপে ধরুন, সব বেরিয়ে পড়বে। আমি বলছি না প্রিয়র খুনখারাপি করার ক্ষমতা আছে। একেবারে বোকা ছেলে। বোকা বলেই ওর বউ ওকে ফাঁসিয়েছে। আপনি জানেন? পুলিশ ঠাকুর্দাকে বলেছে, যে লোকটা খুন হয়েছে, তার সঙ্গে প্রিয়র বউয়ের খারাপ সম্পর্ক ছিল। শুনে তো আমি অবাক। ছি ছি। কী ঘেন্নার কথা! পুলিশই বলেছে, লোকটা বিবিকে এখানে ফলো করে এসেছিল। আপনি তো এসব বিষয়ে এক্সপার্ট মানুষ। তা হলে বুঝুন কী হয়েছে।

কর্নেল ইজিচেয়ারে আরাম করে বসে বললেন, কী হয়েছে বলে তোমার ধারণা?

রাণু আগের মতো চাপা গলায় বললেন, প্রিয়র বউয়ের সঙ্গে রাজ্যের সব ছেলেছোকরার আলাপ। কিছুক্ষণ আগে একজন এসেছিল। দু’জনে চুপিচুপি কী সব কথাবার্তা হল। তারপর চলে গেল। জিজ্ঞেস করলে বলল, প্রিয়র অফিসের। লোক। তা হলে দেখুন মক্ষিরানীর পেছনে-পেছনে আরও অনেকে এসে জুটেছে। আমার মনে হচ্ছে, যে লোকটা এসেছিল, তাকে দিয়েই প্রিয়র বউ খুনটা করিয়েছে। করিয়ে প্রিয়কে বিপদে ফেলেছে। রাণু বিকৃত মুখে ফোঁস করে। জোরে শ্বাস ছাড়লেন।

সুশীলা হন্তদন্ত এল এতক্ষণে। টেবিলে কফি আর স্ন্যাক্সের ট্রে রেখে কর্নেলকে প্রণাম করে বলল, ভাল আছেন তো কর্নিলসাব?

কর্নেল কফির পেয়ালা তুলে বললেন, দেখি কেমন কফি করেছ। তারপর বলব কেমন আছি।

সুশীলা ঘোমটা টেনে কাচুমাচু হাসল। রাণু ব্যস্তভাবে বললেন, দেখি ভগীরথ ফিরল নাকি।

সুশীলা বলল, আভি ফিরল দিদি। আপনি আসেন। আপনাকে জলদি যেতে বলছে।

কর্নেল বললেন, তোফা! সুশীলা, বহুত আচ্ছি কফি বানাতি তুম।

সুশীলা খুশি হয়ে রাণুকে অনুসরণ করল। একটু পরে পিউ এল। সে ধুপ করে একটা চেয়ারে বসে বলল, অদ্ভুত ব্যাপার! দিদি বলল, কিছুক্ষণ আগে জামাইবাবুর অফিসের এক কলিগ এসেছিল। বরুণ দত্ত নাম। আমারও খুব চেনা। কিন্তু সে এখানে কেন? দিদি আমাকে বলল, এমনি দেখা করতে এসেছিল। আমার তা মনে হয় না।…

.

১০.

 হোটেল পারিজাতের কার পার্কে গাড়ি রেখে বরুণ লাউঞ্জে গিয়ে ঢুকল। বেচুবাবু বিশাল লাউঞ্জের এককোণে বারের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। হাতে গ্লাস। বরুণকে দেখে হাসলেন। এটু গরম হইয়া লন দত্তসায়েব! তারপরে আমার মা লক্ষ্মীরে দর্শন দিবেনখন। ক্যান কী হালার ঠাণ্ডায় প্রাণ খুলিয়া কথা কওন যায় না।

বরুণ ব্যস্ততা দেখিয়ে বলল, নাহ্ বেচুবাবু! আমাকে আমিনগঞ্জে ফিরতে হবে। রাউন্ড দা ক্লক কাজ চলেছে। শ্রাবন্তী কত নম্বরে?

দুইশো দুই। সেকেন্ড ফ্লোরে দুই নম্বর। কী কারবার। এক ফ্লোরে দশখান করিয়া রুম। তার লগে হান্ড্রেড জুড়িয়া গ্ল্যামার দ্যাখাইতে চায়। বেচুবাবুর প্রকাণ্ড শরীর হাসির ধাক্কায় নড়বড় করতে থাকল।

এক পেগ পেটে পড়লে বেচুবাবুর মেজাজ খুলে যায়। এমনিতে সব সময় ব্যস্ত এবং কাজের লোক। সব কিছুতে কড়া নজর। গণনাথ সেন বরাবর যোগ্য লোককেই বেছে নেন। বরুণের ইচ্ছে করছিল কিছুক্ষণ কথা বলতে এবং গরম হতেও। কিন্তু প্রায় ছটা বাজে। এখনই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। সে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

চারতলা এই হোটেলটা টাউনশিপের উত্তরপ্রান্তে ওয়াটারড্যামের কাছাকাছি। এদিকটা নিরিবিলি সুনসান। কিন্তু জল ছুঁয়ে আসা বাতাস প্রচণ্ড হিম ছড়াচ্ছে। তাছাড়া কুয়াশা। চওড়া রাস্তার ধারে আলোগুলো যেন ভূতের চোখ।

শ্রাবন্তী নীলচে হাউসকোট পরে করিডরে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলছিল। বরুণকে দেখে বলল, আমি ভাবছিলুম এতক্ষণ তুমি আমিনগঞ্জে। গাড়ি ডেলিভারি পেলে?

বরুণ বলল, হ্যাঁ। সেজন্যই একটু দেরি হয়ে গেল। পুলিশের হাতে কিছু পড়লেই ঝামেলা। ফের গ্যারেজে নিয়ে যেতে হল। এখন সব ঠিক।

শ্রাবন্তী মেয়েটিকে বলল, ওক্কে ববি! ট্রাই ইওর লাক এগেন!

ঘরে ঢুকে বরুণ বলল, কে ও?

শ্রাবন্তী একটু হাসল। এই হোটেলে রিসেপশনে থাকে। ফিল্মে নামবার সখ হয়েছে। বসো! চা বলব, না কফি?

বরুণ বসে বলল, কিছু না। যাওয়ার আগে তোমাকে ফের একবার দেখতে এলুম। তখন কথা বলার সুযোগ পাইনি। এভরিথিং অলরাইট তো?

শ্রাবন্তী গম্ভীর হয়ে বলল, নাহ। তুমি যা বলেছিলে। সামথিং রং এনিহোয়্যার!

 তার মানে?

বিকেলে এতক্ষণ তো শুটিং দেখলে। কিছু বুঝতে পারনি? শ্রাবন্তী বিছানায় বসে চাপাস্বরে বলল, গণাদার কিছু বুঝতে পারছি না, জানো? সত্যিই কি ছবি করবেন, নাকি তোমার কোম্পানিকে ব্লাফ দিয়ে টাকা মারার মতলব?

বরুণ সিগারেট ধরিয়ে বলল, কেন একথা মনে হচ্ছে তোমার?

ছবির কী স্টোরি, মাথামুণ্ডু কিছু বোঝা যায় না। শ্রাবন্তী হতাশ ভঙ্গিতে বলল। সারাটা দিনে মাত্র তিনটে শট। স্ক্রিপ্ট আছে। দেখতে দেবেন না গণাদা। তাছাড়া বলছেন, ছবিতে হিরো-হিরোইন বলে কোনও ব্যাপার নেই। তার চেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার, একটা আজেবাজে লোকের খবরদারি।

কে সে?

চিনি না। লোকাল লোক বলে মনে হল। অবাঙালি। বলেই শ্রাবন্তী নড়ে উঠল। এই! তুমি তো ওর সঙ্গে কথা বলছিলে তখন। তোমাকে সিগারেট দিল। বেঁটে, হোঁতকা মতো। ভিলেনটাইপ চেহারা।

তুমি মিঃ শর্মার কথা বলছ? বরুণ হেসে উঠল। আরে! উনি তো রাজেশ শর্মা। আমাদের আশাপুরা ব্রাঞ্চের ম্যানেজার। কী খবরদারি করছিলেন উনি?–

শ্রাবন্তী বিরক্ত মুখে বলল, ছাড়ো! যাই হোক, পুরো ব্যাপারটা মনে হচ্ছে। হোক্স।

বরুণ মিটিমিটি হেসে বলল, আমি ইচ্ছে করলেই গণাবাবুকে বসিয়ে দিতে পারি, জান?

থামো! খালি মুখেই রাজাউজির মারতে ওস্তাদ। শ্রাবন্তী হঠাৎ কণ্ঠস্বর বদলাল। এই! তুমি গণাদার কাছে কায়দা-ফায়দা করে জেনে নাও না, আমার সত্যিকার রোলটা কী। আজ আর আমিনগঞ্জ না-ই বা ফিরলে?

তোমার মাথা খারাপ? তোমাকে বলেছিলুম, বনোয়ারিজির সঙ্গে আমার টোক্কর লাগবে। অলরেডি লেগে গেছে। বরুণ সিগারেটের ধোঁয়ার রিঙ পাকাল এবং রিঙটার দিকে তাকিয়ে বলল, তবে আমি প্রিয় নই এবং আমার পক্ষে আছেন গিরিধারীজি। এক্সপোর্ট কোয়ালিটির মাল বলতে কী বোঝায়, বনোয়ারি ব্যাটাছেলের কোনও ধারণাই নেই।

শ্রাবন্তী যথারীতি ওর গোঁফ টেনে দিল। স্টপ ইট! পিকিউলিয়ার অফিসগিরি সবসময়। আমি দেখেছি, কিছু কিছু লোক থাকে, সবসময় অফিস নিয়ে বকবক করে।

বরুণ গোঁফে হাত বুলিয়ে বলল, আমার যন্ত্রণা তুমি কী বুঝবে! বলেছিলুম, সামথিং ইজ রং এনিহোয়্যার এবং একটু আগে তুমিও তা-ই রিপিট করলে। এই দু’দিনেই আমার অস্বস্তি বেড়ে গেছে আরও। কোম্পানি…

আহ্! আবার সেই কথা।

বরুণ হাসল। ওকে! গণাবাবুকে আমি দেখছি। দেখব। আমি ওর কাছে পুরো স্ক্রিপ্ট দাবি করব। বলব, লালজির অর্ডার। গণবাবুর টিকি আমার হাতে বাঁধা। ডোন্ট ওয়ারি।

শ্রাবন্তী একটু আশ্বস্ত হয়ে বলল, আচ্ছা, তোমার বন্ধুর মার্ডার কেসের কী হল?

প্রিয়কে এখনও জামিন দেয়নি। বরুণ আস্তে বলল, ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জে প্রিয়র বউয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলুম। আনু, মার্ডার হয়েছে, এতে বিবি খুব খুশি। বিবি একটা বাজে মেয়ে। আর ওর মুখোমুখি জীবনে হব না। গেলুম তো ইনসাল্টিং টোনে কথাবার্তা। তক্ষুনি চলে এলুম।

প্রিয়বাবুকে জামিন দিচ্ছে না কেন?

মার্ডার কেস। নন-বেলেবল। তবে তার চেয়ে সিরিয়াস পয়েন্ট হল, কোম্পানির ওই গাড়িটা প্রিয় যে গ্যারেজে দিয়েছিল, সেই গ্যারেজের লোকেরা গাড়ির ভেতর একটা ফায়ারআর্মস পায়। পুলিশকে গোপনে খবর দেয়। এবার বুঝতে পারছ, প্রিয়র বাঁচার চান্স নেই?

কিন্তু গণাদা বলছিল অনির্বাণবাবু ওয়াজ স্ট্যান্ড টু ডেথ।

ও জানে না। বরুণ উত্তেজিত হয়ে উঠল। গণাবাবু তো নিজের তালে আছে। একটা আনু গেলে ওর কী? আরেকটা জুটিয়ে নেবে। হয়তো নিয়েছে। থানার ও সি ভদ্রলোক বললেন, মর্গের রিপোর্ট আজ পাওয়া গেছে। বুকের ভেতর হাড়ের খাঁজে ফায়ারআর্মসের একটা গুলি আটকে ছিল। জাস্ট ইমাজিন হোয়াট হ্যাড হ্যাপন্ড!

শ্রাবন্তী শিউরে উঠল। সর্বনাশ! গুলি করে মেরেছিল?

হুঁ, বড্ড গোলমেলে ব্যাপার। বরুণ ঘড়ি দেখে বলল, উঠি। বরং যাবার পথে ঘুরে একবার গণাবাবুকে ইরিগেশন বাংলোয় মিট করে যাই। তোমার ব্যাপারটা ক্লিয়ার করে নেওয়া দরকার। তাছাড়া কোম্পানির অফিসার হিসেবে আমারও একটা দায়িত্ব আছে। তুমি হোক্স বললে!

এই! তুমি যেন ওকে বোলা না আমিই তোমাকে অতিয়েছি বা হোক্স ফোক্স বলেছি। শ্রাবন্তী ফিসফিসিয়ে উঠল। প্লি-ই-জ, এমন কিছু কোরো না, যাতে গণাদা…।

তাকে থামিয়ে বরুণ বলল, আরে! আমাকে অত বোকা ভাবছ কেন? যাতে সত্যিকার একটা ছবি হয় এবং তুমিই হিরোইন হও, আমি ট্যাক্টফুলি সেই লাইনে এগোব। আচ্ছা, চলি।

নীচে লাউঞ্জে গিয়ে বরুণ দেখল, বেচুবাবু বারের একটা চেয়ারে বসে আছেন তুলোর বস্তার মতো। হাতের মুঠোয় গেলাস। তার কাছে একবার যাবে ভাবল বরুণ, গেল না। হোটেলটা পশ্চিমী আভিজাত্যে রঙচঙে। দেশী-বিদেশী সায়েবসুবো-মেমদের আনাগোনা আছে। বিদেশীরা সম্ভবত ট্যুরিস্ট। বেরুতে গিয়ে হঠাৎ বরুণের মনে হল, এখান থেকে কলকাতায় ট্রাঙ্ককল করে মোহন। লালজিকে একটু আভাস দিয়ে রাখা উচিত। নইলে পরে যদি কোনও গণ্ডগোল বাধে, তাকে কৈফিয়ত দিতে হবে। বনোয়ারিলাল কোম্পানিকে ফাঁসাবে।

কিন্তু সে এ হোটেলে বাইরের লোক। শ্রাবন্তীর সাহায্য ছাড়া ফোন করা যাবে না। আবার শ্রাবন্তীর কাছে ফিরে যেতে হয়। বরুণ অন্যমনস্কভাবে। রিসেপশনের দিকে তাকাল। সেই মেয়েটিকে দেখতে পেল, যে একটু আগে শ্রাবন্তীর সঙ্গে কথা বলছিল। কী নাম যেন…ববি! বরুণ স্মার্ট হয়ে রিসেপশনে গেল। বলল, হাই!

ববি বলল, হাই!

বরুণ অমায়িক হেসে বলল, আই থিংক, ইউ ওয়্যার টকিং উইথ দা. ফিল্মস্টার শ্রাবন্তী গুহ।

ইয়া। আই স ইউ দেয়ার। ক্যান আই হেল্প ইউ স্যার?

বরুণ অন্তরঙ্গ হওয়ার ভঙ্গিতে বলল, শ্রাবন্তী আপনার কথা বলছিল। আপনি তো বাঙালি? বাংলা ছবিতে নামতে চান যখন, আই অ্যাম সেন্ট পার্সেন্ট সিওর।

হুঁউ। আমার নাম ববি রায়।

আমি বরুণ দত্ত। যে কোম্পানি গণনাথ সেনের ছবির ফাইন্যান্সার, তারই একজন অফিসার।

ববির চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মিষ্টি হেসে বলল, বলুন কী করতে পারি আপনার জন্য?

আমার কোম্পানিকে কলকাতায় একটা আর্জেন্ট ট্রাঙ্ককল করতে চাই। যদি প্লিজ…

শ্রাবন্তীদির ঘর থেকেও করতে পারতেন। নো প্রব্লেম।

 কথাটা এইমাত্র মনে পড়ল। ও বড্ড ক্লান্ত তাই ওকে গিয়ে আর বিরক্ত করতে চাইনে।

ববি ব্যস্তভাবে বলল, নো প্রব্লেম। আমি অপারেটরকে বলে দিচ্ছি।

সে রিসিভার তুললে বরুণ পকেট থেকে একটা নেমকার্ড বের করে তার সামনে রাখল। বলল, সাড়ে সাতটা পর্যন্ত ম্যানেজিং ডাইরেক্টর অফিসে থাকেন। কাজেই পাওয়া যাবে।

ববি অপারেটরকে কিছু বলে রিসিভার নামিয়ে রাখল। বলল, আপনি প্লিজ ওখানে একটু ওয়েট করুন। লাইন পেয়ে যাবেন। দা হোটেল পারিজাত ইজ আ ফাইভ স্টার হোটেল, ইউ নো আমরা কিছু সুবিধে পেয়ে থাকি। আপনি বসুন না প্লিজ!

রিসেপশন কাউন্টারের কাছাকাছি একটা প্রকাণ্ড থাম ঘিরে সুদৃশ্য গোলাকার আসন। বরুণ এমন জায়গায় বসল, যেন বেচুবাবুর চোখে না পড়ে। ববির হাবভাবে সে বুঝতে পারছিল, মেয়েটি ফিল্মের স্বপ্নে অস্থির। হায়, বেচারা যদি জানত ওর চেহারা তেমন কিছু আহামরি নয়! বড়ো জোর ঝিয়ের রোলে মানাবে। রং মেখে সেজে আছে। এই যা।

একদঙ্গল সায়েব-মেম এল। ববি তাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তাদের বিদায় করার পর বরুণকে বলল, আপনার অসুবিধে হচ্ছে না তো? এখনই লাইন পেয়ে যাবেন। সে ফের এক ঝলক হাসল এবং হাসলে অবশ্য তাকে মন্দ দেখায় না। আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

স্বচ্ছন্দে।

আপনারা তো ফাইন্যান্সার। আপনারা কাকেও রেকমেন্ড করতে পারেন না–জাস্ট কথার কথা বলছি, ধরুন…

বরুণ ঝটপট বলল, শ্রাবন্তী আপনার কথা আমাকে অলরেডি বলেছে।

 প্লিজ একটু দেখবেন।

 নিশ্চয়। এখনই তো আমি গণনাথবাবুর কাছ হয়ে যাব। আপনার কথা ওঁকে বলে যাব।

ববি রায় আহ্লাদে বিহ্বল হল। আবার রিসিভার তুলে চাপা স্বরে অপারেটরকে বকাবকি করতে থাকল। এই সময় বেচুবাবু বরুণের কয়েক হাত তফাত দিয়ে হাতির মতো চলে গেলেন। বরুণ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তাকে দেখতে পেলে বেচুবাবু আর এখান থেকে উঠতেন না এবং ট্রাঙ্ককলে যা বলতে চায়, শুনে ফেলতেন। ধূর্ত লোক।

বরুণ জানে, বাইরে এমন এলেবেলে চালচলন, কিন্তু অসম্ভব চতুর মানুষ। কলকাতায় সম্প্রতি একটা দশতলা সৌধ বানিয়েছেন।

একটু পরে রিং হতেই ববি রিসিভার তুলে উত্তেজিত হয়ে বরুণের দিকে একটা হাত নাড়ল। বরুণ গিয়ে ফোন নিল। কোম্পানির অফিসেই লাইন দিয়েছে। সে বলল, আমি দত্ত বলছি ক্লিফটনগঞ্জ থেকে। দত্ত…বরুণ দত্ত। …হ্যাঁ, মোহনলালজিকে দিন। আর্জেন্ট।..লালজি? বরুণ বলছি। ছবির ব্যাপারটা..না, না। প্লিজ কথাটা শুনুন আগে। সামথিং ফিশি…কিছু বোঝা যাচ্ছে না। অজিতবাবুর মতো…হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ। আপনি পারমিশন দিন, আমি চার্জ করে স্ক্রিপ্টের একটা জেরক্স কপি..শর্মাজিকে? কিন্তু উনি তো…আচ্ছা। বাই দা বাই, বনোয়ারিজি আবার বিলো দা গ্রেড…আচ্ছা ঠিক আছে। রাখছি।

বরুণ আস্তে ফোন রেখে দেখল, ববি তার দিকে তাকিয়ে আছে। বলল, এনিথিং রং স্যার?

বরুণ আড়ষ্টভাবে হাসল। নাহ! আচ্ছা, চলি।

আমার কথাটা মনে রাখবেন কিন্তু।

বরুণ জোরে বেরিয়ে এল। লনে নামতেই তীব্র হিম তাকে ঘিরে ধরল। কিন্তু মেজাজ গরম হয়ে গেছে মালিকের কথা শুনে। যা চলছে, চলবে–এর মানেটা কী? স্ক্রিপ্ট নাকি রাজেশ শর্মা দেখেছেন। উনি কী বোঝেন ফিল্মের? বোঝা যাচ্ছে, মালিক শর্মাজিকে সত্যিই খবরদারির দায়িত্ব দিয়েছে। আবার বনোয়ারির ব্যাপারে নাক না গলাতে বলল। তোমার পাঁঠা, তুমি লেজে কাটবে না কোথায়, বরুণ দত্তের কী? শুধু শ্রাবন্তীর লাক ভেবে দুঃখ হচ্ছে।

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বরুণের মনে হল, ভাগ্যিস গাড়িটা আজ পাওয়া গিয়েছিল। নইলে এই এলাকার বাসের যা কদর্য অবস্থা, খুব অসুবিধেয় পড়ত। আগে কাঁচগুলো বসানোর পর গ্যারেজের মেকানিকরা ব্রেক এবং ইঞ্জিন মেরামত করেছিল। তখনই নাকি ফায়ারআর্মসটা আবিষ্কার করে এবং পুলিশকে জানায়। পুরো মেরামত তখন হয়ে গিয়েছিল। তা না হলে বরুণ এ অবস্থায় গাড়ি ফেরত পেত না। এটাই শেষ পর্যন্ত তার সান্ত্বনা।

থানায় পুলিশের সঙ্গে কথা বলে সে একটা ব্যাপার বুঝতে পেরেছে। গোড়ার দিকে পুলিশ তত গা করেনি। করলে সেদিনই গাড়িটা সিজ করত। ফায়ারআর্মস পাওয়ার পর পুলিশ একটু মন দেয়। শেষে আজ সকালে মর্গের রিপোর্ট পেয়ে এবার তৎপর হয়ে উঠেছে। কোম্পানির গাড়ি। তাই ফেরত দিল। কোনও সাধারণ লোকের হলে অনেক ঝামেলা করত পুলিশ। তবে এই এলাকায় লালজিদের খুব প্রভাব আছে, টের পেয়েছে সে।

ড্যামের ধারে চওড়া নতুন রাস্তায় আস্তে গাড়ি চালাচ্ছিল বরুণ। মোড়ে পৌঁছে হঠাৎ তার মেজাজ চড়ে গেল। মালিক যা বলল, বলুক। গণনাথকে একটু থ্রেট করে এলে গায়ের ঝাল মেটে। অজিত ভদ্র সেবার মাত্র দশ হাজার। হাতিয়েছিলেন। গণনাথ সেন তার কয়েকগুণ হাতাবেন মনে হচ্ছে। সত্যি বলতে কী, বিকেলে মিনিট কুড়ি ড্যামের পেছন দিকটায় শ্যুটিং দেখে তার মনে হচ্ছিল, ছেলেখেলা না কী? রোদ ফুরিয়ে যাচ্ছে, অথচ স্পট ঠিক হচ্ছে না। শেষে একটা স্টিল ছবি নিল শ্রাবন্তীর। পেছনে জল, গাছের ডালে একটা হাত। চালাকি! মুভি ক্যামেরা আর কিছু লোকজন দেখিয়েই টাকা মারার তাল।

বরুণ ব্রেক কষল। সামনে পুরনো ঝড়ঝড়ে সেই রাস্তাটা। স্টেশন রোড। তা হলে ইরিগেশন বাংলোর কাছে চলে এসেছে ঝোঁকের মাথায়।

বাংলোর বাইরে গাড়ি রেখে সে লনের নুড়িতে ইচ্ছে করেই বিচ্ছিরি শব্দ তুলে এগিয়ে গেল। রামলাল বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। সায়েব লোক দেখে সেলাম দিল। বরুণ বলল, গণনাথ সেন কৌন ঘরমে হ্যায়?

রামলাল ঘরটা দেখিয়ে দিল।

দরজা খোলা ছিল। বরুণ পর্দার এধারে দাঁড়িয়ে বলল, আসতে পারি গণনাথবাবু?

কে?

আমি বরুণ দত্ত।

 গণনাথ পর্দা সরিয়ে বললেন, আরে দত্তসায়েব যে! আসুন, আসুন। আমি ভাবছি, এতক্ষণ আপনি আমিনগঞ্জে।

ঘরের ভেতর ক্যামেরাম্যান ভোম্বলবাবু এবং একজন অচেনা যুবক। বরুণ ধরেই নিল, নতুন বডিগার্ড গণনাথ সেনের। সে গম্ভীর মুখে বসল।

গণনাথ তার আপ্যায়নের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। বরুণ বলল, নাহ্। জাস্ট একটা প্রাইভেট কথা বলেই চলে যাব। কনফিডেন্সিয়্যাল।

ভোম্বলবাবু এবং সেই যুবকটি বেরিয়ে গেল। গণনাথ বললেন, শট ডিভিসনে ব্যস্ত ছিলুম। কাল চরে শ্যুটিং প্রোগ্রাম। আপনি থেকে যান দত্তসায়েব। পিকনিক এবং শ্যুটিং। খুব এনজয় করবেন।

গণনাথ বরুণকে সিগারেট দিতে এলে সে বলল, থ্যাংকস। তারপর আস্তে বলল, গণনাথবাবু, আপনি কি সত্যিই ছবি করছেন, না এটা একটা ফাঁদ?

গণনাথের চোখ দুটো চশমার ভেতর জ্বলে উঠল। হোয়াট ডু ইউ মিন?

আনুকে আপনি এখানে মারতে এনেছিলেন। আবার কাকে মারতে চান গণনাথবাবু?

আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না। কী বলতে চান আপনি?

যা বলতে চাই, আপনি নিজেই বুঝতে পারছেন।

গণনাথ একটু পরে শ্বাস ছেড়ে বললেন, আমি আপনার এসব কথা শর্মাজিকে বলছি। বরং তাকে ডেকে আনি। আপনার কোম্পানি ফাইন্যান্সার। সেজন্য কোম্পানির হয়ে শর্মাজি আছেন এখানে। কিন্তু আপনার এভাবে ইন্টারফেয়ার করার পয়েন্টটা কী। আই অ্যাম রিয়্যালি শকড়। ওয়েট আ মিনিট প্লিজ!

গণনাথ বেরিয়ে গেলেন। বরুণ শক্ত হয়ে বসে রইল। শর্মাজির সামনা সামনি ফয়সালা হোক, ক্ষতি কী? কোম্পানির স্বার্থেই তো সে এটা করছে।

একটু পরে গণনাথ ফিরে এলেন। সরি! শর্মাজি একটু আগে বেরিয়েছেন। যাই হোক, আপনি আগে মাথা ঠাণ্ডা করুন। খুলে বলুন, কী হয়েছে। আমি ফ্র্যাঙ্কলি কথাবার্তা বলা পছন্দ করি। বলুন।

যা বলার, বলেছি। ইউ আর ব্ল্যাকমেলিং মাই কোম্পানি। আই নো দো সিক্রেট টুথ। বলে বরুণ উঠে দাঁড়াল এবং বেরিয়ে এল ঘর থেকে।

ওয়াটারড্যাম বাঁদিকে, দুধারে গাছের সার। চওড়া মসৃণ রাস্তায় আলো আছে। কিন্তু কুয়াশায় ধূসর। সামনে কিছু দূর গেলে আমিনগঞ্জের হাইওয়ে পেয়ে যাবে বরুণ। খুব স্পিডে এগোচ্ছিল সে। মোড়টা সামনে। ব্রেকে পায়ের চাপ দিয়েই চমকে উঠল। ব্রেক কাজ করছে না। সঙ্গে সঙ্গে সে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল। তারপরই টের পেল, স্টিয়ারিংও অকেজো। গাড়ির চাকা পিচ ছেড়ে নামতেই সে দরজা খুলে ঝাঁপ দিল। সহজাত বোধজনিত প্রতিক্রিয়া।

যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল সে। ঠাণ্ডা হিম শক্ত পিচের প্রচণ্ড আঘাতে তার শরীরের একটা দিক অবশ, অন্যদিকে তীব্র যন্ত্রণা। সে উঠবার চেষ্টা করল। ডান হাত ডান পা নিঃসাড়। শুনল, গাড়িটা ড্যামের জলে গিয়ে সশব্দে পড়ছে। নিঝুম প্রকৃতিতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা আলোড়ন। তারপর আবার গাঢ় স্তব্ধতা।

মাথার বাঁদিকটা কেটে রক্ত গড়াচ্ছে। বরুণ বাঁ হাতে রক্ত মুছে রক্ত দেখতে থাকল। সেই সময় পিছনে গাছপালার আড়ালের কোথাও কী শব্দ! শব্দটা চাপা এবং কেউ শুকনো পাতায় হেঁটে এলে যেমন শব্দ হয়। ঘুরে দেখার চেষ্টা করল বরুণ। শরীর ঘোরানো যাচ্ছে না। মাথা ঘোরাতেও যন্ত্রণা। অদ্ভুত শব্দটা তার দিকে এগিয়ে আসছে পিছন থেকে। তার আততায়ী ছাড়া আর কে হতে পারে? সে সত্যিই ফাঁদে পা দিয়েছিল।

আততায়ীর হাতে মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়ে বরুণ চোখ বুজল। শব্দটা তার পিঠের কাছে এসে থেমেছে। সে মৃত্যুর তীব্র গন্ধে আচ্ছন্ন। কিছু বলার চেষ্টা করল। কিন্তু বলতে পারল না। মৃত্যুর গন্ধটা কুয়াশা হয়ে তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরল।…

.

১১.

সাত্যকি ঘরে ঢুকে বলল, হাই ফাদার ক্রিসমাস! গ্র্যান্ডপা এসে গেছেন। পামকিন ফেস। সুবিধে করতে পারেননি মনে হচ্ছে। বলে সে পিউয়ের দিকে তাকাল। তোমাকেও পামকিন দেখাচ্ছে। হোয়াটস রং? চলে এস। হাসতে হাসতে মারা পড়বে। সিওর।

পিউ দুই কাঁধ নেড়ে একটা ভঙ্গি করল। কর্নেল বললেন, যাও পিউ। সাত্যকি নিশ্চয় টিভির কথা বলছে। টিভি জিনিসটা অনেক দুঃখে মানুষ মাথা খাটিয়ে বের করেছে। নিরানন্দ পৃথিবীতে হাসির একটি বোমা। জাস্ট ক্র্যাক দা নব অ্যান্ড লাফ! হা হা হো হো হি হি–এনতার হাসো। রামগরুড়ের ছানাদের জন্য ব্রহ্মাস্ত্র ডার্লিং!

সাত্যকি হাসল। ওর জামাইবাবুর জন্য স্টার্ভ টু ডেথ ব্যাপার। সত্যি বলছি। প্রিয়দা শুনলে খুশি হবে। এমন শ্যালিকা দেখা যায় না।

পিউ ফুঁসে উঠল, জোক করবে না বুড়োদা!

সরি! বলতে ভুলে গেছি। পিয়ালি তোমাকে ডাকতে বলল।

সে নিজে আসতে পারল না?

সাত্যকি চাপাস্বরে বলল, ফাদার ক্রিসমাসের ঘরে আউটসাইডারদের ঢোকা বারণ। দিদির অর্ডার। চলে এস। আরে! সত্যি পিয়ালি তোমাকে ডাকছে।

পিউ উঠে দাঁড়াল এবং চুপচাপ বেরিয়ে গেল। সাত্যকি বলল, কর্নেল! আমার সাইকেলটা নিয়ে প্রব্লেমে পড়েছি।

কী প্রব্লেম?

সাত্যকি হাসল। প্রিয়দার গিফট। ওর কোম্পানির তৈরি। নাকের ডগা কুঁচকে সে ফের বলল, এক্সপোর্ট কোয়ালিটির সাইকেল নাকি। বোগাস। সাইকেল চাপা পছন্দ করি না। কিন্তু প্রিয়দা রাগ করত না নিলে। ওরে বাবা! যখনই চাপি, কী সব ভুতুড়ে সাউন্ড হয়। প্রথম প্রথম পাত্তা দিতুম না। এখন মনে হচ্ছে। সামথিং রং!

কাল সকালে তোমার সাইকেলটা একবার দেবে তো। চেপে দেখব।

মাই গুডনেস! সাত্যকি চোখ বড় করে বলল। আপনি চাপলে তো ওটা মড় মড় করে ভেঙে যাবে। সিওর।

কর্নেল হাসলেন। সিওর নয় ডার্লিং! যাই হোক, তোমার ঠাকুর্দা আসার আগে সুশীলাকে বলো আরেক রাউন্ড কফি দিতে।

এটা সিওর। বলে সাত্যকি চলে গেল। ধুপ ধুপ শব্দ হচ্ছিল। সব সময় জগিং ওর।

একটু পরে অরীন্দ্র এলেন। সঙ্গে সুশীলা। অরীন্দ্র বললেন, কোনও অসুবিধে হয়নি তো!

কর্নেল সে-কথার জবাব না দিয়ে বললেন, সুশীলা! আজ হম কোঠিবাড়িকি জঙ্গলমে কিচনিকি আওয়াজ শুনা।

সুশীলা চমকে উঠে বলল, হায় রাম! তব কুছু তো খতরনাক হবে। কোই আদমির জানভি যাবে কর্নিলসাব। যব কিচনি চিল্লাতি, তব জরুর কিসিকা খুন গিরেগা।

অরীন্দ্র রুষ্ট মুখে বললেন, নাও! ওর রামকদুনি শুরু হল। এবার সারা বাড়ি হুলুস্থুল বাধিয়ে বেড়াবে। যাও, রাণু একলা আছে।

সুশীলা কাঁচুমাচু মুখে চলে গেল। কর্নেল বললেন, ওকে বকলেন বটে। তবে মনে হচ্ছে, আপনিও ভয় পেয়ে গেছেন বোসসায়েব!

অরীন্দ্রর হাতে প্রকাণ্ড কাপে কফি। চুমুক দিয়ে বললেন, ভয় নয় রাগ। প্রিয়র জামিন দিল না সেসনকোর্ট। আপনাকে বলেছিলুম বডিতে স্ট্যাব করার চিহ্ন ছিল। ওটা মেছো কুমির বা বোয়াল জাতীয় মাছের কামড়। জলের ভেতর পাথর পড়ে আছে। তারও চোট লেগেছে। মর্গের রিপোর্টের কপি পাওয়া গেছে। বুকের ভেতর একটা হাড়ের খাঁজে গুলি আটকে ছিল।

গুলি! কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন। রিভলভার না পিস্তলের?

তা লেখা নেই। অ্যাডভোকেটের কাছে কপি আছে। দেখলুম লেখা আছে, শট ডেড বাই ফায়ার আর্মস। হার্টে গুলি ঢুকেছিল। ইনস্ট্যান্ট ডেথ। অরীন্দ্র মাথা নাড়লেন। শিবের সাধ্য নয়, বাঁদরটাকে বাঁচায়। কেন বলছি, তা-ও শুনুন। এফ আই আর দু’বার লিখেছে পুলিশ। দ্বিতীয়টা আরও তদন্তের পর লিখেছে। প্রিয়র গাড়ির ভেতর নাকি পিস্তল না রিভলভার পাওয়া গেছে। এখন কেসটা নিয়েছে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট। মিশাইল এক্সপার্টরা গুলিটা নিয়ে গেছে পাটনায়। যদি একই পিস্তল বা রিভলভারের গুলি হয়, প্রিয় গেল।

কর্নেল সুশীলার রেখে যাওয়া কফির পেয়ালা তুলে বললেন, প্রিয়র বউয়ের সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই। পিউকে ডাকতে পাঠিয়েছিলুম। ফিরে এসে বলল, মাথা ধরেছে। শুয়ে আছে।

অরীন্দ্র চাপাস্বরে বললেন, মেয়েটা ভাল নয়। রাণু আসা অব্দি বলছে। আমিও স্টাডি করেছি। প্রিয় ভুল করেছে। তবে পিউ খুব ভাল মেয়ে। সরল এবং ইনোসেন্ট। বলে নড়ে বসলেন অরীন্দ্র। আরেকটা সাংঘাতিক কথা আপনাকে বলাই হয়নি। অনির্বাণ সোম বিবি আর প্রিয় দুজনকেই শাসিয়ে একটা চিঠি লিখেছিল এখানে আসার আগে। আমিনগঞ্জে প্রিয়কে অ্যারেস্ট করার পর ওর পকেটে নাকি সেটা পাওয়া গেছে। কাজেই পুলিশের দিক থেকে মার্ডারের মোটিভ ইজ এসটাব্লিশড়। প্রিয়কে আর আমি বাঁচাতে পারব না। তবে আই অ্যাম আ ম্যান অফ স্ট্রং প্রিন্সিপল, আপনি জানেন। প্রাইমা ফেসি কেসে দেখা যাচ্ছে, প্রিয় মার্ডারার। যদি সত্যিই তা-ই হয়, তার ফাঁসি হোক। কিন্তু রোজি জেভিয়ার এবং কেয়া সেনের মৃত্যুর ঘটনা কি মিসটিরিয়াস নয়?

কর্নেল একটু হাসলেন। মর্গের রিপোর্টে নিশ্চয় কোনও সন্দেহজনক কিছু ছিল না। কাজেই আপনার সন্দেহ অমূলক হতেই পারে। সবই হয়তো কোইনসিডেন্স বোসসায়েব!

আমি বিশ্বাস করি না।

কেন?

কেউ রোজি এবং কেয়াকে কুঠিবাড়ির ছাদ থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতেও তো পারে। সেটা মার্ডার হলেও মর্গের রিপোর্টে সন্দেহজনক কিছু থাকার কথা নয়। বলুন, ঠিক বলছি কি না?

হুঁ, তা অবশ্য ঠিক। দহের জলে প্রচুর পাথর পড়ে আছে।

অরীন্দ্র শক্ত মুখে বললেন, তা ছাড়া প্রিয় আমাকে বলেছে, অনির্বাণ সোমের মাইনে জোগাত ওদের কোম্পানি। এখানেই স্টার্টিং পয়েন্ট, কর্নেল! আমার ধারণা, অনির্বাণ ব্ল্যাকমেইল করত প্রিয়র কোম্পানিকে। ওই ফিল্মডাইরেক্টার ভদ্রলোকের সঙ্গে আপনি ভাব জমান। আপনি তো ভাব জমাতে ওস্তাদ। আপনি ওই ভদ্রলোককে বাজিয়ে দেখুন। এমন তো হতেই পারে, উনি আনুকে এখানে মার্ডার্ড হওয়ার সুযোগ দিতেই সঙ্গে এনেছিলেন। আশ্চর্য ব্যাপার দেখুন। বডিগার্ড বলুন বা যা-ই বলুন, কাছের মানুষ। সে বেঘোরে মারা পড়ল, আর ভদ্রলোক দিব্যি নির্বিকার হয়ে শ্যুটিঙে মেতে উঠলেন?

কর্নেল চুরুট জ্বেলে বললেন, বরুণ দত্তও তা-ই বলছিল।

কে সে?

প্রিয়র কোম্পানির এক অফিসার। শুনলুম সে প্রিয়র স্ত্রীর সঙ্গে আজ বিকেলে দেখা করতে এসেছিল।

অরীন্দ্র শ্বাস ছেড়ে বললেন, আই সি! রাণু বলল কে একজন এসেছিল প্রিয়র কোম্পানি থেকে। আমি এ বাড়িতে আর আউটসাইডার অ্যালাউ করব না।

বোসসায়েব! বরুণ আমাদের সহযোগী। প্রিয় তাকে বলে রেখেছিল আমার। সাহায্য নেওয়ার কথা। প্রিয় আঁচ করেছিল সে কোনও বিপদে পড়বে। আপনি কলকাতা যাবার আগে বরুণের কাছেই আমি অনির্বাণকে খুনের দায়ে প্রিয়কে গ্রেফতারের কথা শুনেছিলুম।

অরীন্দ্র তাকিয়ে রইলেন। একটু পরে বললেন, সমস্যা হল, আপনি সব কথা একসঙ্গে বলেন না। অর্ধেক আপনার পেটে থেকে যায়। নাকি ও একরকম খেলা?

বয়স বোসসায়েব, বয়স! আপনারও কি একই ব্যাপার হয় না? বয়স স্মৃতিকে গুলিয়ে দেয়।

অরীন্দ্র হাসবার চেষ্টা করলেন। আমার চেয়ে আপনার বয়স কম।

দু-তিন বছরের তফাত এ বয়সে তফাতই নয়। কর্নেল একরাশ ধোঁয়া ছাড়লেন। আসলে আপনার মন একমুখী। আমার বহুমুখী। আমি জ্যাক অব অল ট্রেডস। তাই সমস্যা। প্রকৃতিরহস্য থেকে অপরাধ রহস্যে ছোটাছুটি..অবশ্য দুটোর মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। আমরা, মানুষেরা যা ক্রাইম মনে করি, প্রকৃতিতে তা স্বাভাবিক ঘটনা। এই যা পার্থক্য।

অরীন্দ্র কফিতে লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, আজ সারাটা দিন যা গেছে আপনার ফিলসফি শোনার মুড নেই। চলুন, প্রিয়র বউকে বাজিয়ে দেখবেন। আমার তর সইছে না। খালি মনে হচ্ছে, কোনও ভাইটাল ব্লু বিবির কাছেই আছে। হয় সে জেনে গোপন করে আছে, নয় তো বুঝতে পারছে না সেটা কী? উঠুন!

কর্নেল অগত্যা উঠলেন। একটু হেসে বললেন, অনেকে এমন থাকে। সে জানে না যে, সে কী জানে।

অরীন্দ্র সায় দিয়ে বললেন, ঠিক তা-ই। তবে আগে বলে রাখি, প্রিয়র বউ খুব কম কথা বলে। আর ওই মাথা ধরার ছল। রোজই যখন-তখন মাথা ধরে। চালাকি বুঝি না?

ওপরতলায় উঠতে অন্দরমহলের ভেতর একটা আলাদা সিঁড়ি আছে। সেটা হলঘরেরটার মতো কাঠের নয়, কংক্রিটের এবং নতুন। সংকীর্ণ করিডরের দুধারে ঘর। সাত্যকির ঘরে টিভির আওয়াজ এবং সাত্যকির চড়া গলায় কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল। কর্নেল অন্তত বার তিনেক “সিওর’ শুনলেন। অরীন্দ্র যেতে যেতে হল্লাটা শুনে বিরক্ত হয়ে চাপাস্বরে বললেন, পালোয়ান! পৃথিবী ডুবলেও ওর হাঁটু জল। এদিকে বুদ্ধির ঘরে ঢুটু। যতীন ওকে মিশনারি স্কুল কলেজে পড়িয়ে সায়েব বানাতে চেয়েছিল। সায়েব হয়েছে বটে, তবে ছাতুখোর সায়েব।

কর্নেল বললেন, খুব ছাতু খায় নাকি? ছাতু এই এরিয়ার লোকেরা খুব খায় দেখেছি।

ডিমের ছাতু। অরীন্দ্র তুম্বো মুখে বললেন, রোজ সকালে চারটে করে কঁচা ডিম খায়। আর বালির বস্তায় ঘুসি। কিন্তু আজ অব্দি তো দেখলুম না কোথাও ঘুসি লড়ে একটা অন্তত ট্রফি আনল। ইনভিজিবল প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে। ভাবতে পারেন? আমার ধারণা, এটা এক ধরনের মানসিক ব্যাধি। বিজয়েন্দু ওর মাথাটা খেয়ে গেছে।

অরীন্দ্র সাবর্ণীর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, বিবি! আমরা তোমার সাক্ষাৎপ্রার্থী। তার চোখে ধূর্ত হাসির ঝিলিক। কর্নেলের দিকে তাকালেন। অর্থপূর্ণ দৃষ্টি। ফের বললেন, সঙ্গে গেস্ট আছেন বিবি!

ভেতর থেকে সাড়া এল, আসুন দাদামশাই!

অরীন্দ্র প্রথমে, তারপরে কর্নেল ঢুকলেন, সাবর্ণী খাটে সদ্য উঠে বসেছে। চুল গোছাতে গোছাতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, বসুন। আমার আবার মাথা ধরেছে। তাই চুপচাপ শুয়ে ছিলুম।

আলাপ করিয়ে দিই। ইনিই আমার সেই প্রখ্যাত বন্ধু–যাঁর কথা তোমাকে বহুবার বলেছি। স্বনামধন্য কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

সাবর্ণী নমস্কার করল। কর্নেল একটা চেয়ারে বসে সহাস্যে বললেন, বোসসায়েবের নাতবউকে আমি কিন্তু তুমিই বলব। আর একটা কথা। জান তো, তুমি আমারই ঘরটা দখল করে আছ?

সাবর্ণী আস্তে বলল, একটু আগে রাণুদি আমাকে আপনার আসার কথা বলেছেন। আপনি এসে এ ঘরেই থাকতেন, তা-ও বলেছেন। আপনি আপনার ঘর দখল করতে পারেন। এ ঘরটা আমার পছন্দ নয়।

অরীন্দ্র ভুরু কুঁচকে কপট হেসে বললেন, পছন্দ নয়? বাড়ির এটা সব চাইতে ভাল ঘর। দক্ষিণ এবং পশ্চিম খোলা। শীতের দিনে টু-থার্ড সময় ধরে রোদ্দুর। তুমি তো ভারি অকৃতজ্ঞ মেয়ে!

কর্নেল বললেন, যার মাথা ধরেছে, তাকে বকাবকি করতে নেই বোসসায়েব। তাতে মাথাব্যথা আরও বেড়ে যায়। তবে শ্রীমতী বিবির এ ঘর পছন্দ না। হওয়ার কারণ আমি বুঝতে পেরেছি।

অরীন্দ্র কৌতুকের ভঙ্গিতে বললেন, কী কারণ?

 এই ঘর থেকে কিচনির গর্জন শোনা যায় রাতবিরেতে।

শুনেছ নাকি বিবি?

 সাবর্ণী বলল না। আমি ওসব বিশ্বাস করি না। গেঁয়ো সুপারস্টিশন।

কর্নেল মুখে গাম্ভীর্য এনে বললেন, কিচনিটা যদি তোমাকে রাতবিরেতে আক্রমণ করতে আসে, তোমার ভয়ের কারণ নেই। তোমার কাছে প্রিয়র একটা ফায়ার আর্মস আছে গুলি ছুঁড়বে।

অরীন্দ্র নড়ে উঠলেন। সাবর্ণী চমকে উঠে তাকাল। তার নাসারন্ধ্র স্ফীত। দম আটকানো ভাব মুখে। তারপর অরীন্দ্র চার্জ করলেন, প্রিয়র ফায়ার আর্মস আছে তোমার কাছে? তুমি আমাকে বলেনি!

সাবর্ণী চুপ করে রইল। মুখটা নিচু। কর্নেল একটু হেসে বললেন, বিবি, অস্ত্রটা আমি একবার দেখতে চাই। উঁহু, তোমার অত অবাক হওয়ার কারণ নেই। আমি অন্তর্যামী নই। আমার নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট পিউ এই খবর পাচার করেছে।

অরীন্দ্র ব্যস্তভাবে বললেন, পিউ? কী আশ্চর্য কথা! কই, বের করে দেখি। কিন্তু কর্নেল, তা হলে প্রিয়র গাড়ির ভেতর যে অস্ত্রটা পাওয়া গেছে, সেটা কার? সব যে আরও জট পাকিয়ে গেল।

সাবর্ণী খাটের গদির তলা থেকে কাগজের মোড়কে জড়ানো অস্ত্রটা বের করে কর্নেলকে দিল। কর্নেল খুলে দেখে বললেন, পয়েন্ট টোয়েন্টি টু রিভলভার দেখছি। এটার লাইসেন্স থাকা সম্ভব নয়। কারণ এটা চীনা। বোঝা যাচ্ছে, প্রিয় আত্মরক্ষার জন্য এটা জোগাড় করেছিল। একটু অবাক হয়ে বললেন, কিন্তু একটা বুলেট ফায়ার করা হয়েছে। আশ্চর্য তো! প্রিয় তোমাকে কি বলেছিল সে কাকেও গুলি করেছে?

সাবর্ণী শক্ত মুখে আস্তে বলল, সে রাতে ও আবার বেরিয়ে গিয়েছিল। টর্চ ফেলে এসেছে নাকি। কিন্তু ফিরে এসে বলল, টর্চটা পায়নি। তবে সে টর্চের জন্যই যায়নি, গিয়েছিল এইটে আনতে।

অরীন্দ্র রুষ্ট হয়ে বললেন, কাকে গুলি ছুঁড়েছিল হতভাগা বলেনি সে কথা?

 সাবর্ণী একটু পরে বলল, স্কাউলেটাকে গুলি করে মেরেছে বলেছিল।

অরীন্দ্র আরও খাপ্পা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তোমাদের দু বোনের পেটে পেটে এত কথা। আমাকে কিছু বলেনি। এদিকে আমি খামোকা ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছি। মরুক হতচ্ছাড়া। কর্নেল! ছেড়ে দিন। লেট হিম গো টু দা হেল। বলে তিনি জুতোর শব্দ তুলে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। জুতোর শব্দটা বেশ জোরালো।

কর্নেল বললেন, প্রিয় তোমাকে বলেছিল গুলি ছুঁড়েছে?

সাবর্ণী বলল, হুঁ। বেশ করেছে, মেরেছে। আনুদা একটা জানোয়ার।

 কিন্তু ডেডবডি গঙ্গার দহে কীভাবে পড়ল? প্রিয় ফেলে দিয়ে এসেছিল?

প্রিয় বলেছিল, গুলি করেই পালিয়ে এসেছে।

 তা হলে ডেডবডি সে গঙ্গায় ফেলতে যায়নি?

 নাহ। সাবর্ণ নির্বিকার মুখে বলল। আমার স্বামীকে আমি জানি। বাই চান্স, হয়তো কেঁকের বশে বা আত্মরক্ষার জন্য সে গুলি ছুঁড়তে পারে। কিন্তু তার নার্ভ অত শক্ত নয় যে বডি গঙ্গায় ফেলতে যাবে। তা ছাড়া আনুদার বডি বয়ে নিয়ে যাবার ক্ষমতা ওর নেই।

প্রিয়র পোশাকে রক্তের ছাপ দেখেছিলে?

 নাহ্।

প্রিয় কেন গুলি করেছিল বলেনি তোমাকে?

সাবর্ণী একটু পরে শান্তভাবে বলল, প্রিয় গাড়ির কাছে ফিরে গিয়ে দেখেছিল কে টর্চ জ্বেলে তার গাড়ি দেখছে। গাড়ির কাচ ভাঙা। ঝোপের আড়ালে গিয়ে সে আনুদাকে চিনতে পেরেছিল। আনুদা তার গাড়ির কাচ ভেঙেছে ভেবে রাগ হয়েছিল। কিন্তু সাহস করে সামনে যেতে পারেনি। তারপর আনুদা গাড়ির কাছ থেকে চলে যাচ্ছে, তখন প্রিয় চুপিচুপি গিয়ে ফায়ার আর্মসটা বের করে। কিন্তু আনুদা টের পেয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। টর্চের আলো ফেলে। ভয় পেয়ে প্রিয় গুলি করে। তবে ওকে মেরে ফেলতে চায়নি। ভয় পাইয়ে দিতেই গুলি ছুঁড়েছিল। কিন্তু গুলি আনুদার গায়ে লাগে। পড়ে যায়। প্রিয় তখুনি পালিয়ে আসে।

কর্নেল রিভলভারটা কাগজে মুড়ে বললেন, টর্চটা কোথায় গেল তা হলে? সাত্যকি আর পিউ কোনও টর্চ পড়ে থাকতে দেখেনি ওখানে।

সার্বণী বলল, ভোরে গাড়ি গ্যারেজে পাঠাতে প্রিয় ভগীরথকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। টর্চটা কুড়িয়ে পায় কিন্তু ভগীরথ কোনও রক্তের ছোপও দেখেনি। দেখলে বলত। পিউ আর সাত্যকি শুধু রক্তের ছোপ দেখেছিল।

তুমি জেল হাজতে প্রিয়র সঙ্গে দেখা করতে যাওনি?

সাবর্ণী মাথা নাড়ল। তারপর বলল, দাদামশাই যেতে দিচ্ছেন না। বলছেন, স্ক্যান্ডাল বাড়বে।

তোমার দেখা করতে ইচ্ছে হয় না?

 হয়। আসলে ও আমাকে সতর্ক থাকতে বলে। ওকে আমি ভুল বুঝেছিলাম। সেজন্য ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করে। কিন্তু দাদামশাই সেকেলে মানুষ। কিছুতেই যেতে দেবেন না। বলছেন, স্ক্যান্ডাল রটবে। বুঝি না। আপনি ওঁকে বলুন না প্লিজ।

বলব। কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। এটা তোমার কাছে থাকা ঠিক নয়। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট তদন্তে নেমেছে শুনলুম। এটা আমি রাখছি। গভর্মেন্টকে সাহায্য করি বলে আমার কিছু অফিসিয়্যাল ইমিউনিটির ব্যবস্থা আছে।

রাখুন। আমার বড্ড অস্বস্তি হচ্ছিল ওটা নিয়ে। ভাবছিলুম কোথাও ফেলে দিয়ে আসব।

নাহ্। তাতে রিস্ক ছিল। আচ্ছা, চলি। আবার দেখা হবে।

শুনুন।

কর্নেল ঘুরে দাঁড়ালেন।

বরুণ দত্তকে তো আপনি চেনেন। আজ সে এসেছিল। আপনি আসবেন বলছিল। তাড়া ছিল বলে চলে গেল। বরুণকে আমি কিছু বলিনি। কিন্তু ও নিজে থেকেই বলল, প্রিয় নাকি তাকে বলেছিল, তার এবার কোনও বিপদ হতে পারে। তাই আপনার নাম-ঠিকানা দিয়ে এসেছিল। সত্যি কি?

সত্যি।

সাবর্ণী শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, আনুদা একটা স্কাউন্ড্রেল। তাকে প্রিয় মেরেছে। আমি খুশি। কিন্তু প্রিয়র বিপদ হওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। আনুদার দিক থেকে বিপদের সম্ভাবনা ছিল, সেটা ঠিক। কিন্তু বরুণ বলল, প্রিয় নাকি ওর কোম্পানির দিক থেকে বিপদের ভয় করেছিল। তবে…সে থেমে গেল হঠাৎ।

হুঁ, বলো।

সাবর্ণী চাপাস্বরে বলল, আপনাকে বলা দরকার। আমার বরাবর সন্দেহ, কোম্পানিকে প্রিয় ব্ল্যাকমেল করত। সম্ভবত কোনও গোপন ইনফরমেশান তার। হাতে ছিল। বরুণও তাই বলল। সেজন্যই নাকি কোম্পানি ওকে ডিফেন্ড করছে না। প্রিয় জেলে আটক থাকলে নাকি কোম্পানি নিরাপদ। বরুণই বলল। দায়ে না ঠেকলে প্রিয় তো সব কথা খুলে বলে না আমাকে।

বরুণ বলল, প্রিয় জেলে আটক থাকলে কোম্পানি নিরাপদ?

সাবর্ণী মাথা নাড়ল। একটু পরে বলল সে, বরুণ কিছু টের পেয়ে থাকবে। আপনি তার সঙ্গে দেখা করুন। ও বলছিল আপনার কথা। কিন্তু তার আগে আপনি খুঁজে বের করুন কে আনুদার বডি গঙ্গায় ফেলল। কেনই বা ফেলল?..

.

১২.

 এদিন ভোরেও গাঢ় কুয়াশা। কর্নেলের পরনে ওভারকোট, মাথায় পুরু মাংকি ক্যাপ। বাইনোকুলার, ক্যামেরা আর প্রজাপতি-ধরা নেট-স্টিক তাঁর নিসর্গভ্রমণে সঙ্গে থাকাটা অবধারিত। অরীন্দ্রের গত রাত থেকে মনমেজাজ খারাপ। নইলে সঙ্গী হতেন। অবশ্য কর্নেল একাই বেরুতে চেয়েছিলেন।

গেট পেরিয়ে পুরনো সড়কে কয়েক পা হাঁটতে পিছনে ধুপ-ধুপ শব্দ। দ্রুত ঘুরে দুটি ছায়ামূর্তি দেখতে পেলেন। সাত্যকি আর পিউ জগিংয়ে বেরিয়েছে। পাশ কাটিয়ে যাবার সময় তাকে লক্ষ করল না ওরা। করলেও চেনার সম্ভাবনা ছিল না। দাড়িটা পুরো ঢাকা।

একটু গম্ভীর হলেন কর্নেল। পিছনে ধুপ ধুপ শব্দ শুনেই চমকে উঠেছিলেন। বয়স কি তার সেই তীক্ষ্ণ বোধটিকে ক্রমশ ভোতা করে দিচ্ছে? কোথাও কোনও শব্দ শুনতে পেলেই শব্দটা কিসের এবং কতটা দূরত্বে, সঙ্গে সঙ্গে আঁচ করতে পারেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বর্মার জঙ্গলে একটা মার্কিন গেরিলাবাহিনী ‘লং রেঞ্জ পেনিট্রেশন গ্রুপ’ এল আর পি জি-কে জঙ্গলযুদ্ধের তালিম দিতেন। জঙ্গলে শব্দ একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। রাণুর শিকারী স্বামী বিজয়েন্দুকেও প্রচুর তালিম দিয়েছিলেন। এক সেকেন্ডের অন্যমনস্কতা সাংঘাতিক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, কতবার বোঝাতেন তাকে। বিজয়েন্দু তবু বেঘোরে প্রাণ খোয়াল। আসলে কোনও কোনও মানুষের কাছে সব শিক্ষা বাইরে থেকে চাপানো জিনিসের মতো। কিছু মানুষের বেলায় যে-কোনও ধরনের শিক্ষার ব্যাপারে একটা সহজাত বোধ থেকে যায়। সেই বোধ তাকে স্বভাব-শিক্ষিত করে তোলে। একেই কি অশিক্ষিতপটুত্ব বলা হয়? জঙ্গলবাসী সব মানুষই কিন্তু ‘ট্র্যাকার হতে পারে না। কেউ কেউ হতে পারে। সহজাত বোধ। কাল কুঠিবাড়ির জঙ্গলের শুকনো পাতার ওপর সন্তর্পণ শব্দটা? সত্যিই কি কোনও পাখি কি খরগোসজাতীয় প্রাণীর? তখন ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাননি। রাতে বিছানায় শুয়ে হঠাৎ মনে হয়েছিল, শব্দটা হয়তো কোনও মানুষের চুপিচুপি পা ফেলার। কিন্তু কে সে? সত্যিই কি কেউ তাকে অনুসরণ করছিল?

আর ওই তথাকথিত কিচনির চিৎকার? স্থানীয় লোকেরা তার সঙ্গে মৃত্যুকে জড়িয়ে ফেলেছে, সেটা হয়তো কুসংস্কার। কোইনসিডেন্স বলা চলে। কুসংস্কারের উদ্ভব এ ধরনের দুটি ঘটনার জোড়াতাপ্পি থেকে। ওই তীক্ষ্ণ চেরা গলার চিৎকার কোনও জন্তুর হওয়াই সম্ভব। সুশীলা বলছিল, কিচনি চিৎকার করলে কোনও মানুষের প্রাণ যায় নাকি। যদি আজ সত্যিই তেমন কিছু ঘটে থাকে, একটু ভাববার কথা। প্রিয়ও নাকি সেই চিৎকার শুনেছিল এবং অনির্বাণ সোম খুন হয়ে গেল। তার চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, ডেডবডিটা গঙ্গার দহে ফেলল কে? কিচনির কীর্তি? কর্নেল আপন মনে একটু হাসলেন। ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জে এখনও প্রাগৈতিহাসিক আদিমতার কিছু লক্ষণ তিনি লক্ষ করেছেন। মানুষজন এবং প্রকৃতিতে কী এক রহস্য মাঝে মাঝে ছায়া ফেলে বেড়ায়।

এটা স্টেশন রোড। ইরিগেশন ক্যানেলের ব্রিজের একটু আগে বাঁদিকে চওড়া নতুন রাস্তা। একধারে ওয়াটার ড্যাম, অন্যধারে অসমতল উঁচু-নিচু জঙ্গল। পুরনো এবং নতুন ক্লিফটনগঞ্জের মধ্যে এই জঙ্গলটাই এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। মসৃণ নতুন রাস্তার ধারে উঁচুতে কুয়াশার মধ্যে এখনও জুগজুগে আলো। দূরে নিউ ক্লিফটনগঞ্জ টাউনশিপেও আলোর ফুটকি। সওয়া ছটা বাজে। কুয়াশার পর্দা ঝুলে আছে ড্যামের জলে। ক্যানেল ব্রিজের ওধারে নিচু টিলার ওপর ইরিগেশন বাংলোর আবছা আভাস। ফিল্মমেকার গণনাথ সেন এখনও হয়তো ঘুমোচ্ছেন। কর্নেল ড্যামের রাস্তায় চলতে থাকলেন। বার্ড-স্যাংচুয়ারি এলাকা পর্যন্ত গিয়ে কিছু পাখি দেখবেন এবং তারপর গণনাথ সেন। ততক্ষণে রোদ্দুর ফুটবে।

সামনে কুয়াশার ভেতর একটা ছায়ামূর্তি ফুটে উঠল। এবং ধুপ-ধুপ শব্দ। থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন কর্নেল। সাত্যকি একা ফিরে আসছে। পিউ কি পিছিয়ে গেছে? পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করতেই কর্নেল সকৌতুকে মিলিটারি হাঁক ছাড়লেন, হল্ট।’

সাত্যকি দাঁড়িয়ে গেল। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, ও! ফাদার ক্রিসমাস। মর্নিং!

মর্নিং! কর্নেল হাসলেন। আবার কি সঙ্গিনীকে হারিয়ে ফেললে?

 সাত্যকি দম নিয়ে বলল, শি ইজ ড্যাম টায়ার্ড। কিন্তু আমি যাচ্ছিলুম আপনাকে একটা খবর দিতে।

কর্নেল কৌতুকে বললেন, কোনও ডেডবডির নয় তো?

সিওর।

মাই গড! কী বলছ তুমি? কর্নেল চমকে উঠেছিলেন। ফের বললেন, কোথায় ডেডবডি দেখেছ?

সাত্যকি হাসল। নাহ্। নো ডেডবডি। এগেন আ কার উইথ স্ল্যাশড গ্লাস অ্যান্ড হেভি স্পট অব ব্লাড।

সে কী! কোথায়?

পিউ আপনার জন্য ওয়েট করছে। গো দেয়ার অ্যান্ড সি। পিউয়ের নার্ভ দেখে অবাক হয়ে যাবেন।

সাত্যকি আবার জগিংয়ের ছন্দে পা ফেললে কর্নেল বললেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ? থানায় নাকি?

সিওর। বলে সাত্যকি ধাবমান হল।

কর্নেল হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন। একটু দূর থেকে পিউকে দেখতে পেলেন, ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেলকে দেখে সে সোজা হল। কর্নেল তাকে না ডাকলে চিনতে পারত না।

পিউ ছটফট করে বলল, আবার তা-ই কর্নেল! ওই দেখুন, জামাইবাবুর সেই গাড়িটা জলে পড়েছে। আর এখানে কত রক্ত। দেখুন! দেখুন! অনেক বেশি রক্ত। সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে।

রাস্তা থেকে ঢাল বেয়ে নেমে জলের ধারে গেলেন কর্নেল। গাড়িটার ডানদিকের দরজা খোলা। ভেতরে জল ঢুকেছে। পেছনকার দুপাশের দরজা। আটকানো। কিন্তু প্রায় সমস্ত কাঁচই ভাঙা। কর্নেলের কাছে নেমে গেল পিউ। বলল, গাড়িটা আমার চোখে পড়েছিল। বুড়োদা তো কিছু দেখেও দেখে না। কর্নেল, আমার মনে হচ্ছে, আবার ব্রেক ফেল করেছিল। এবারও কাচ ভাঙা। অদ্ভুত ব্যাপার নয় কর্নেল?

কর্নেল আস্তে বললেন, হুঁ।

 কিন্তু এই গাড়িটা তো পুলিশ সিজ করেছিল, বুড়োদা বলল। এখানে এল কী করে?

কর্নেল জলের কিনারা থেকে ঘাস ও নরম মাটিতে চাকার দাগ অনুসরণ করে রাস্তায় উঠলেন। বললেন, চলে এস, পিউ। রক্তটা দেখা যাক।

পিউ দ্রুত এগিয়ে গেল। রাস্তায় প্রায় তিরিশ মিটার এগিয়ে সে থামল। এই দেখুন, পিচের ওপর কত রক্ত।

অনেকটা জায়গা জুড়ে কালচে রক্তের ছোপ। কর্নেল খুঁটিয়ে দেখার পর বললেন, গাড়িটা আসছিল আমরা যেদিক থেকে এসেছি সেদিক থেকে। ব্রেক ফেল করাটা টের পেয়ে ড্রাইভার এখানেই ঝাঁপ দিয়েছিল।

ড্রাইভার…কর্নেল! বরুণদা নয় তো? পিউ উত্তেজিতভাবে বলল। কাল বরুণদা দিদির সঙ্গে কিন্তু গাড়ি চেপেই দেখা করতে এসেছিল। দিদি বলেছে আমাকে।

তোমার দিদি গাড়িটা দেখেনি?

নিশ্চয় তত লক্ষ করেনি। করলে চিনতে পারত ওর হাজব্যান্ডের গাড়ি। রেগে যেত।

গাড়িটা তো কোম্পানির।

 তাতে কী? বলে পিউ অন্যমনস্কভাবে এদিক-ওদিক তাকাল। বুড়োদা বলে গেল থানাতেও খবর দেবে। কিন্তু থানা তো দূরে। বাড়ি ফিরে সাইকেল নিয়ে বেরুবে। ওদিকে একটা রাস্তা আছে নাকি একটু শর্টকার্ট করা যায়।

কর্নেল লক্ষ করছিলেন। রক্তের দাগ উল্টোদিকের জঙ্গলের ঢালেও রয়েছে। প্রচণ্ড আহত হয়েছিল লোকটি এবং ঝপ দেবার সঙ্গে সঙ্গে মারা পড়েনি, এটা তার প্রমাণ। কিন্তু জঙ্গলের দিকে কেন গেল ক্ষতবিক্ষত দেহে?

পিউ বলল, ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন?

নীচে ঝোপের ভেতর ঘাসে আরও খানিকটা রক্ত। কর্নেল হাঁটুতে হাত রেখে ঝুঁকে রক্তটা দেখছিলেন। পিউ গিয়ে বলল, সর্বনাশ! নিশ্চয় বরুণদা। অ্যান্ড হি ইজ ডেড।

কিন্তু ডেডবডি কোথায়?

খুঁজলে জঙ্গলে কোথাও পাওয়া যাবে। আসুন, খুঁজে দেখি।

কর্নেল সোজা হয়ে চারদিকটা দেখে নিয়ে বললেন, ব্রেক ফেল করা গাড়ি থেকে যে কঁপ দিয়েছিল, তার আহত অবস্থায় রাস্তাতেই পড়ে থাকার কথা। যদি জ্ঞান থাকে, সে অপেক্ষা করবে সাহায্যের জন্য। কিন্তু এখানে ঝোপের আড়ালে আসবে কেন?

কর্নেল! কোনও জন্তুর কবলে পড়েছিল বরুণদা। এই জঙ্গলে নিশ্চয় জন্তুটন্তু আছে। আপনি কাল ভালুকের কথা বলছিলেন।

ভালুক হিংস্র বটে, মানুষে রুচি নেই ডার্লিং। মাংস জিনিসটা ভালুকের স্বাভাবিক খাদ্য নয়। ভালুক রীতিমতো বাবু। খায় মধু, নানা রকমের ফল এবং বিশেষ করে মহুয়া–যা থেকে এই এলাকায় উৎকৃষ্ট মদ তৈরি হয়। কিন্তু বডিটা খোঁজা দরকার।

ততক্ষণে কুয়াশা কিছুটা ফিকে হয়েছে। কর্নেল বাইনোকুলার বের করে চোখে রাখলেন। একটু পরে বললেন, চলে এস পিউ! আবার একটুখানি অ্যাডভেঞ্চার হয়ে যাক।

পিউ অনিচ্ছায় পা বাড়াল। জঙ্গলের ভেতর মাঝে মাঝে নানা গড়নের পাথরের চাই। এতক্ষণে পাখিদের মুখ খুলেছে। কুয়াশা দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জঙ্গলের ভেতর রাতের ছোপ এখানে ওখানে লেগে আছে। কিছুক্ষণ পরে একটা খোলা জায়গায় অড়হরের খেত দেখা গেল। তারপর একটা রুক্ষ জমি উঁচু হয়ে আছে। হঠাৎ ডানা ঝটপট করে একদল বুনো পায়রা উড়ে গেল। কর্নেল বাইনোকুলারে ঝকটাকে দেখে বললেন, লালঘুঘু ভেবেছিলাম। আমার ব্যাড লাক ডার্লিং!

পিউ মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলল, আপনি সত্যি বড় অদ্ভুত মানুষ।

কেন বলো তো?

 এখন কি পাখি-ফাখি দেখার সময়? বরুণদার জন্য ভাবনা হচ্ছে।

কর্নেল ঘুরে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, কাল সন্ধ্যায় বরুণ সম্পর্কে কথা বলার সময় তোমার টোনটা অন্যরকম ছিল। মনে হচ্ছিল, তুমি তার আসাটা পছন্দ করোনি।

করিনি। কারণ বরুণদা খুব অ্যামবিশাস টাইপ। জামাইবাবুর প্রতি বরাবর জেলাস ছিল। আমি জানি।

কর্নেল হঠাৎ হাত তুলে নাড়তে থাকলেন। তারপর গলা চড়িয়ে বললেন, হ্যাল্লো মিঃ জেভিয়ার! গুড মর্নিং!

পিউ দেখল এই উঁচু জমির ঢালের নীচে খানিকটা জলা জায়গা ঘন দামে ঢাকা! তার ওধারে ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেই পাগলাসায়েব বেলিং টন জেভিয়ার। তাদের দেখছেন। পিউ আস্তে বলল, কর্নেল। প্লিজ অ্যাভয়েড হিম। লোকটাকে দেখলেই আমার কেমন ভয় করে। তাছাড়া এখন ওর পাগলামি দেখার মুড নেই।

কর্নেল বললেন, চলে এস ডার্লিং। জেভিয়ারসায়েবের গোলাপবাগান দেখলে অবাক হয়ে যাবে।

কী অদ্ভুত আপনার কথাবার্তা! এখন আপনি গোলাপ-টোলাপ নিয়ে…আরও বিরক্ত হয়ে পিউ থেমে গেল।

জেভিয়ার নিষ্পলক চোখে তাকিয়েছিলেন। তার হাতে সেই ধারালো কাটারি। কর্নেল কাছে গিয়ে বললেন, মিঃ জেভিয়ার! উই কেম টু সি ইওর লাভলি রোজ গার্ডেন। শি ইজ ভেরি মাচ ইন্টারেস্টেড, ইউ সি!

জেভিয়ার একটু হাসলেন। ঝুট! বিলকুল ঝুট স্যার। আই অ্যাম সরি– লেকিন হম সমঝ গেয়া, ইউ আর আ গুড ট্র্যাকার।

আই কুড নট আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট আর ইউ টকিং অ্যাবাউট।

জেভিয়ার চোখ নাচিয়ে বললেন, দা কার স্যার। অ্যান্ড দা ব্লাড। হাঁ, দা। ম্যান ওয়াজ সিরিয়াসলি উন্ডেড। কিচনি উসকো উঠাকে লে গেয়ি। ম্যয় রাতভর ঘুমতে রহে। দেখুকার ভাগা! হোয়াট ক্যান আই ডু? লেংড়া বুঢ়ঢ়া আদমি। বাট আই ট্রায়েড টু সেভ হিম। লেকিন উও কিতনি…..সরি স্যার! আই মাস্ট নট টক মোর।

কর্নেল চুরুট কেস বের করলেন। আস্তে বললেন, মিঃ জেভিয়ার! ডু ইউ নোট দ্যাট ইওর ডটার ওয়াজ মার্ডার্ড?

মার্ডার্ড! জেভিয়ার জোরে মাথা নাড়লেন। ও নো, নো। শি হ্যাড কমিটেড সুইসাইড।

মিঃ জেভিয়ার, শি ওয়াজ ব্লুট্যালি মার্ডার্ড।

জেভিয়ারের হাত কাঁপছিল, যখন একটা চুরুট তুলে নিলেন। কর্নেল তারটা ধরিয়ে দিয়ে নিজেরটা ধরালেন। তারপর জেভিয়ার কাসতে কাসতে বললেন, আর ইউ আ ডিটেকটিভ অফিসার?

নো। বাট আই ওয়ান্ট টু ফাইন্ড আউট দা ট্রুথ।

ইউ আর আ রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার। কর্নেল। ইজ ইট?

ইয়া।

হোয়াস্ ইওর ইন্টারেস্ট দেন?

জাস্ট আ হবি। আই লাইক টু স দা মিট্রি।

জেভিয়ার হাসবার চেষ্টা করে বললেন, প্লিজ স্যার, ডোন্ট ট্রাই টু ইনভলভ মি ইন ইওর ডেঞ্জারাস হবি। লড়কি! তুম কভি ইনকা সাথ মাত ঘুমো! কিচনি ইজ ওয়াচিং য়ু! ভাগো!

বলে জেভিয়ার ক্রাচে ভর করে পা বাড়ালেন। কর্নেল বললেন, মিঃ জেভিয়ার! ইওর ডটার রোজি ওয়াজ রিয়্যালি মার্ডার্ড! দা কিলার হ্যাভ পুশড হার ফ্রম রুম্ অব দা ক্লিফটন-হাউস।

জেভিয়ার ঘুরে চোখ কটমট করে বললেন, গো অ্যাওয়ে! গো অ্যাওয়ে! তারপর জঙ্গলের ভেতর উধাও হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে তার আন্দোলিত ধূসর টুপিটি অদৃশ্য হল গাছপালার আড়ালে।

পিউ বলল, অদ্ভুত লোক। মনে হচ্ছে, অনেক কিছু জানেন। অথচ বলবেন না। পাগলামি!

কর্নেল বাইনোকুলারে চারদিক দেখে নিয়ে আস্তে বললেন, এস।

ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জের একটা বিচ্ছিন্ন টুকরোর মতো ঘিঞ্জি বসতি দেখা যাচ্ছিল। একটা গির্জা, পোড়ো এবং ভাঙাচোরা কিছু ইটের বাড়ি ঘিরে যথেচ্ছ। জঙ্গল। পিউ ফেস করে বলল, আমি টায়ার্ড।

ডার্লিং, তুমি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট।

 প্লিজ! আর জোক করবেন না। সত্যি আমার কিছু ভাল লাগছে না আর!

জেভিয়ার সায়েবের গোলাপবাগান দেখলে আবার পৃথিবীকে ভাল লাগবে।

পিউ থমকে দাঁড়িয়ে গেল। আপনি কি পাগলাসায়েবের বাড়িতে যাচ্ছেন? কিন্তু সে তো ওদিকে কোথায় চলে গেল।

আমরা ট্রেসপাস করব।

পিউ আর কোনও কথা বলল না। কর্নেলকে অনুসরণ করল। যেতে যেতে সে পিছু ফিরে দেখছিল জেভিয়ার তাদের দিকে লক্ষ রেখেছেন কি না। তার অস্বস্তি হচ্ছিল। জেভিয়ারের হাতের কাটারিটা তার মনে পড়ছিল।

একটা জরাজীর্ণ বাংলোবাড়ি। তিনদিকে ভাঙা ইটের পাঁচিলের বুকে ঘন ঝোপ বেড়ার কাজ করছে। বসতির একটেরে এই বাড়িটা। কুয়াশা ভেঙে আবছা হলুদ খানিকটা রোদ গড়াচ্ছে। চারদিক খাঁ খাঁ নিঝুম। কর্নেল শিশিরে ভেজা ঝোপ গলিয়ে বাড়িটাতে ঢুকলেন। পিউ একটু দ্বিধার ভঙ্গিতে ঢুকল। ছোট্ট চত্বর জুড়ে গোলাপবাগান হঠাৎ রক্তাক্ত দেখাল তার চোখে। সে ফিসফিসিয়ে উঠল, যদি পাগলাসায়েব এসে পড়ে?

কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে বললেন, জেভিয়ার এখন ড্যামের রাস্তায় উঠেছেন। মনে হচ্ছে গাড়িটার কাছেই যাচ্ছেন। কাজেই তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।

কিন্তু আপনি এখানে এলেন কেন?

তোমাকে গোলাপবাগান দেখাতে। কর্নেল মিটিমিটি হাসলেন। তুমি এই গোলাপবাগানে দাঁড়িয়ে হতভাগিনী রোজিকে খুঁজে বের করো, পিউ! আমি আসছি। জেভিয়ারকে যদি দেখতে পাও, আমাকে ডাকবে।

আমার কিন্তু ভয় করছে। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

 রোজির সঙ্গে আলাপ করো। এখনই আসছি।

কর্নেল এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে বারান্দায় উঠলেন। পাশাপাশি দুটো ঘর। বারান্দার খানিকটা বেড়া দিয়ে কিচেন করা আছে। টিনের দরজাটা বন্ধ। অরীন্দ্রের সঙ্গে এসে জেনেছিলেন কোন ঘরটায় রোজি থাকত। সেই ঘরের দরজায় জীর্ণ মরচে ধরা সাধারণ একটা তালা ঝুলছে। কর্নেলের হাতে দস্তানা। কয়েকবার মোচড় দিলে তালার বদলে একটা কড়া উপড়ে এল। ভেতর থেকে ভ্যাপসা গন্ধ বেরিয়ে ধাক্কা দিল। জেভিয়ার তার মেয়ের ঘরে ঢোকেন না মনে হচ্ছে। কষ্ট পাবেন বলেই কি? কর্নেল পকেট থেকে ছোট্ট টর্চ বের করে জ্বাললেন। একটা লোহার খাটে ঝুলকালিতে ময়লা বিছানা। একটা ছোট্ট টেবিল, দুটো চেয়ার। সবই ধুলোময়লায় নোংরা। কোনার দিকে ইটের ওপর বসানো, একটা কালো তোরঙ্গ। দেয়ালের ব্র্যাকেটে ঝুলছে কয়েকটা পোশাক। টেবিলের ড্রয়ার টেনে দেখলেন একগাদা টুকিটাকি জিনিস, কিছু চিঠি, একটা নোটবই। নোটবইটার পাতা ওল্টাতে গিয়ে একটা ভাজ করা হলদে কাগজ পেলেন। কাগজটা ইংরেজিতে লেখা একটা চিঠি। তলায় নামের বদলে একটা হরফ মাত্র।

চিঠিটা সম্বোধনহীন। জড়ানো, প্রায় দুর্বোধ্য লেখা। কিছু না ভেবেই কর্নেল চিঠি আর নোটবইটা পকেটে ঢোকালেন। তোরঙ্গটা তালা বন্ধ। খুলে দেখার দরকার ছিল। কিন্তু আর ঝুঁকি নেওয়া যায় না। পাগলাসায়েবের গাল খাওয়ার ভয়ে কেউ নাকি বাড়ির ত্রিসীমানায় আসে না। তবু কিছু বলা যায় না। দেখলে হইচই বাধাবে।

বাইরে থেকে পিউ চাপাস্বরে ডাকছিল, কর্নেল! কর্নেল!

বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে কড়াটা ঘেঁদা দিয়ে ঢুকিয়ে চাপ দিলেন কর্নেল। আগের মতো আটকে গেল। তারপর বারান্দা থেকে নেমে একটু হেসে বললেন, কিচনি দেখতে পাচ্ছ কি?

পিউ তেতো মুখে বলল, দিস ইজ টু মাচ। একটা লোক আমাকে দেখে গেল।

দেখলেও কিছু ভাববে না। ইউ লুক মেমসায়েব। জেভিয়ারের কোনও আত্মীয় মনে করবে। কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে ফের বললেন, অ্যান্ড আই লুক ফাদার ক্রিসমাস। চলো। কেটে পড়া যাক।

খ্রিস্টান বসতি এড়িয়ে সর্যে আর অড়হর ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে একফালি ঝরঝরে রাস্তায় পৌঁছে পিউ বলল, গোয়েন্দাগিরি করে নিশ্চয় কিছু ব্লু পেলেন?

কে জানে ক্লু কি না। কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বললেন, তবে আমার থিওরি হল, এক পা এগোনোর আগে দু’পা পিছোনো। তুমি কোনও উঁচু জায়গায় উঠতে হলে পিছিয়ে এসে দৌড় দাও। পিউ, সব ঘটনার খাঁটি ব্যাখ্যা পেতে হলে ঘটনার পিছনদিকটা খুঁজতে হয়। আমার স্টার্টিং পয়েন্ট হল রোজি।

পিউ চুপ করে থাকল। এতক্ষণের উত্তেজনা তাকে এবার যথেষ্ট ক্লান্ত। করেছে।

চারুভবনের গেটে সাবর্ণী দাঁড়িয়েছিল। কর্নেলকে দেখে এগিয়ে এল। ব্যস্তভাবে বলল, বরুণ গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করে হসপিটালে আছে। সাত্যকি খবর দিল। ভগীরথ রিকশো ডাকতে গেছে।…

.

১৩.

 সুশীলা ব্রেকফাস্ট নিয়ে এল। মুখটা গম্ভীর। কর্নেল বললেন, সুশীলা! খবর পেয়েছ তো কিচনি কী করেছে?

সুশীলা ভয় পাওয়া মুখে আস্তে বলল, শুনা কর্নিলসাব! এক আদমিকা জান লেনেকা কোশিশ কি। বহত খুন গিরা। হম বোলি কর্নিলসাব, জব কিচনি চিল্লাতি, কোই খতরনাক হো জাতা।

তোমাদের বুড়োবাবু কি এখনও ঘুমোচ্ছেন নাকি?

 গঙ্গা-আস্নান করতে গেছেন রাণুদিদির সোঙ্গে।

ছোট বুড়োবাবু এখনও ঘুসি লড়ছে বুঝি? ওকে বলো আমি ডাকছি।

 সুশীলা একটু হাসল। আজ বহত লড়তে হে। বালু টুট গেয়া কর্নির্লসাব।

সে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে সাত্যকি এল। বসে তেতেমুখে বলল, অকারণ ছুটোছুটি করে মরলুম। থানা অলরেডি খবর পেয়ে গিয়েছিল। বডি হসপিটালে।

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর আস্তে বললেন, মারা গেছে নাকি?

নাহ্! তবে জেনে রাখুন পাগলাসায়েবের মতো একটা ঠ্যাং কাটা যাবে। সিওর।

তুমি সব তাতেই সিওর।

সরি! অভ্যাস হয়ে গেছে। বলে সাত্যকি একটু সিরিয়াস হল। ক’জন জেলে রাত্তিরে লুকিয়ে ড্যামে মাছ ধরতে গিয়েছিল। ফেরার সময় ওঁকে জঙ্গলে উন্ডেড অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছিল। তখন জ্ঞান ছিল না ভদ্রলোকের। তারাই বডিটা তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে দেয়। হাসপাতালের ডাক্তার খবর দেয় থানাতে। পুলিশ এখন, লোকগুলোকে নাকি খুঁজছে। বুঝুন অবস্থা! একটা মানুষের প্রাণ বাঁচাল, সেটা কোনও ব্যাপার নয়। ড্যামের ওখানে জঙ্গলে তারা কী করছিল, এই নিয়ে মাথাব্যথা। শেষে পুলিশের কনফ্লুশন, নিশ্চয় চুরি করে মাছ ধরতে গিয়েছিল। কাজেই তারা ক্রিমিন্যাল!

তুমি হাসপাতালে যাওনি?

 গিয়েছিলুম। অবস্থা সাংঘাতিক। তবে জ্ঞান ফিরেছে। দেখেই চলে এলুম।

 তোমার সাইকেলটা নিয়ে এস এবার।

 আনছি। তবে মিস্ট্রিটা সলভ করতে হবে কিন্তু!

করব। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, এক্সপোর্ট কোয়ালিটির সাইকেল?

সাত্যকি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, প্রিয়দার গুলতাপ্পি। এক্সপোর্ট কোয়ালিটি না হাতি! বিদঘুঁটে স্ট্রাকচার। বিচ্ছিরি ভুতুড়ে আওয়াজ দেয়। পালিশ চটে গিয়েছিল। প্রিয়দা বলেছিল, শিগগির রঙ করে নিস। শেষে ভগীরথদাকে দিয়ে রঙ করিয়ে নিয়েছি তাতে ভুতুড়ে আওয়াজটা আরও বেড়ে গেছে।

কী রঙ করিয়েছ?

কাল লক্ষ করেননি?

 মনে পড়ছে না। বয়স ডার্লিং, বয়স! কর্নেল প্রায় অট্টহাসি হাসলেন।

 ব্ল্যাক।

 হুঁ, ব্ল্যাক ঘুসিলড়িয়ে মহম্মদ আলি তোমার গুরু।

 নাহ্। টাইসন আমার হিরো এখন। ব্রুনোকে শুইয়ে দেবে দেখবেন। বলে সাত্যকি জগিংয়ের তালে বেরিয়ে গেল।

কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরালেন। রোজির নোটবইটাতে কিছু কেনাকাটার হিসেব আর ঠিকানা লেখা। হলদে কাগজটার পাঠোদ্ধারে আবার মন দিলেন। হাতে আতস কাচ নিলেন এবার।

ডাক্তারি প্রেসক্রিপশনের মতো হস্তাক্ষর। তলাকার অক্ষরটা আর অথবা কে। কিন্তু আতস কাচ এতক্ষণে কথাগুলোর আভাস দিতে পারল। সি মি নিয়ার দা সি এইচ অ্যাট সিক্স ও ক্লক। কাম অ্যালোন। দিস ইজ আর্জেন্ট। পেমেন্ট ইজ রেডি।

কাগজটা পকেটে ঢোকালেন কর্নেল। আতস কাঁচটাও। সি এইচ কি ক্লিফটন হাউস? তা হলে এই চিঠি পেয়েই রোজি যায় এবং…

কর্নেল চমকে উঠলেন। কেয়া সেনকেও কি একইভাবে ডেকেছিল আততায়ী? কেন? কে সে? অথবা যেমনটা ভাবছেন, তেমন নয়। হরফটা যদি কে হয় এবং সে কেয়া সেন হয়? কেয়া তাকে কোনও গোপন পেমেন্টের জন্য ডেকেছিল এবং কেয়া কারও হাতের পুতুল ছিল এবং পরে কেয়া বেগড়বাঁই করায় সে-ও মারা পড়ে–এমনও তো হতে পারে! নিশ্চিত হওয়া যাবে কেমন করে? একটা গুরুত্বপূর্ণ রহস্যজট নিঃসন্দেহে। এটা ছাড়াতে পারলে অনেকটা এগোনো যায়। তবে এটা ঠিক, রোজি চিঠিটা রেখে দিয়েছিল। হেঁড়েনি। টাকার লোভে না জেনে সে ফাঁদে পা দিতে গিয়েছিল। কিন্তু কোনও বিপদ ঘটতেও পারে ভেবে একটা সূত্র রেখে গিয়েছিল। যুক্তির দিক থেকে এ সিদ্ধান্ত সঠিক। এবার কেয়া সেনের দিকে এগোনো দরকার। রোজির নোটবইয়ে কেয়ার বাড়ির ঠিকানা লেখা আছে। সে ছিল আমিনগঞ্জের বাঙালি পরিবারের মেয়ে। অক্টোবরে যখন কর্নেল এসে ঘটনাটি শুনেছিলেন, তখন যদি এতটুকু আভাস পেতেন যে, রোজির মতো কেয়াও আত্মহত্যা করেনি, ওটা হত্যাই, তা হলে হয়তো আরও একটা হত্যা এবং হত্যার চেষ্টা পর্যন্ত ব্যাপারটা গড়াত না। কিন্তু এ-ও আশ্চর্য, রোজির বাবা কেন বিশ্বাস করেন না যে তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছিল?

সাত্যকি সাইকেলটা দরজার সামনে রেখে বলল, আপনার কলকাতার জাদুঘরে নিয়ে রেখে দেবেন। আ স্ট্রেঞ্জ বাইসি!

অ্যান্ড মিসটিরিয়াস। দেখেই বুঝতে পারছি।

সিওর। সাত্যকি অভ্যাসে বলেই জানতে চাইল, মিস্ট্রিটা কী বলুন তো?

আগে এটা ঘরে ঢোকাও।

সাত্যকি দু-হাতে তুলে ঘরে ঢোকাল।

কর্নেল বললেন, যে-কোনও কালো জিনিসই রহস্যময় ডার্লিং! তিনি সাইকেলটা দেখতে থাকলেন। দেখতে দেখতে পকেট থেকে আতস কাচ বের করলেন।

সাত্যকি ভুরু কুঁচকে বলল, ফানি।

সাত্যকি! সাইকেলটা সত্যিই ফানি। এটা আমার জাদুঘরে রাখার উপযুক্ত জিনিস।

ওক্কে! আপনি নিয়ে যাবেন। তবে ভগীরথদা একটু ক্ষুণ্ণ হবে। ঠাকুর্দার ফাইফরমাস খাটতে এটা তার খুব কাজে লাগে। ঠাকুর্দা আপনার ফ্রেন্ড, ওঁকে ম্যানেজ করবেন। ভগীরথদাকে অ্যায়সা দাবড়ানি দেবেন ঠাকুর্দা, সিওর!

কর্নেল বললেন, সুশীলাকে বলল এঘরের দরজায় তালা এঁটে রাখে যেন। আমি বেরুচ্ছি।

সত্যি মিসটিরিয়াস তা হলে। বলে সাত্যকি ধুপ ধুপ পা ফেলে চলে গেল। কর্নেলের পরনে এখন আঁটো পাতলুন, জ্যাকেট, মাথায় নীলচে রোদটুপি। গলায় ঝুলছে ক্যামেরা এবং বাইনোকুলার। হাতে প্রজাপতি ধরা জালের স্টিক। স্টেশন রোডে পৌঁছে বাইনোকুলারে দেখে নিলেন ইরিগেশন বাংলোর সামনে একটা ছোট ভিড়। দুটো লিমুজিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। একটা পুলিশভ্যান সবে চলে গেল। শ্যুটিং আজ বন্ধ তা হলে।

ক্লিফটনের কুঠিবাড়ির ছাদে গিয়ে উঠলেন কর্নেল। কিছুক্ষণ গঙ্গার চর এবং হাঁসের খেলা দেখলেন। খাড়া দেয়ালের দিকে ঝুঁকে নীচের দহ দেখতে থাকলেন। সর্বনাশা মৃত্যুফাঁদটা দেখলেই গা শিরশির করে। তারপর ঘুরলেন ইরিগেশন বাংলোর দিকে। লিমুজিন দুটো চলে যাচ্ছে ওয়াটার ড্যামের পাশের রাস্তা দিয়ে টাউনশিপের দিকে। লনে দুজন দাঁড়িয়ে কথা বলছে। হুঁ, গণনাথ সেন আজ শুটিং বাতিল করেছেন।

কর্নেল ছাদ থেকে নেমে ইরিগেশন বাংলোর দিকে হাঁটতে থাকলেন। ক্যানেলব্রিজে পৌঁছেছেন, তখন বাংলোর লনে দাঁড়িয়ে থাকা লোক দুটি একটা গাড়িতে চেপে গেট দিয়ে বেরুচ্ছে। চৌকিদার গেটের পাশে দাঁড়িয়ে সেলাম ঠুকল। গাড়িটা উতরাইয়ে নামলে সে গেট বন্ধ করে দিল।

পিউয়ের কাছে গতকাল সন্ধ্যায় গণনাথের চেহারার বর্ণনা পাওয়া গেছে। বেঁটে, উজ্জ্বল, খাড়া নাক, চোখে পুরু কাঁচের চশমা। কিন্তু যে-দুজনকে দেখলেন, প্রায় একই গড়নের লোক এবং দুজনেরই চোখে চশমা। আজকাল নিছক চেহারা দেখে বাঙালি-অবাঙালি চেনা সহজ নয়। গাড়িটা পাশ কাটিয়ে চলে গেল। কর্নেল বাংলোর গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন। একজোড়া দোয়েলের ছবি তোলার ভঙ্গিতে ক্যামেরা তাক করলেন। তারপর চোখে বাইনোকুলার রেখে এদিক-সেদিক দেখা, গেটে পৌঁছুনোর জন্য নেচারিস্ট-সুলভ কয়েকরকম হাবভাব রামলাল হাঁ করে তাকিয়ে এক বুড়ো সায়েবলোকের মধ্যে এখানকার পাগলা সায়েবকেই দেখছিল যেন। সে ফিক করে হাসলও।

কর্নেল গেটের সামনে গেলে সে বলল সাব! মেরাভি এক তসবির খিঁচিয়ে।

 কর্নেল সত্যিই তার দিকে ক্যামেরা তাক করে শাটার টিপলেন।

রামলাল খুশি হয়ে বলল, একঠো হমকো ভেজ দেনা, সাব! তো আপ কঁহাসে আতা?

কালকাত্তাসে।

 মালম, আপ ট্যুরিস্ট হেঁ?

হাঁ। কর্নেল তার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বললেন, তুম রামলাল সিং?

চৌকিদার হাসল। জি। লেকিন আপ ক্যায়সে জানতা সাব?

তুম ডিফেন্সমে থে রামলাল?

রামলাল অবাক হয়ে গেল। জি হাঁ। তো আপ ক্যায়সে..

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, তুম উও সাবলোগোকে স্যালুট দিয়া–হম দেখা। মিলিটারি স্যালুট হম পছনতা, রামলাল! উও সিরফ দুসরা কিসিমকি স্যালুট। তো বাত ইয়ে হ্যায় কি, হম এক রিটায়ার্ড কর্নেল। ইয়ে দেখো মেরা কার্ড।

নেমকার্ডটা হাতে নিয়ে দেখার পর রামলাল এবার জোরালো একখানা স্যালুট ঠুকল। তারপর সসম্ভমে গেট খুলে বলল, আইয়ে কর্নিলসাব! অন্দর আকে বৈঠিয়ে।

 কর্নেল লনে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, তাজ্জব রামলাল! তুম মিলিটারিমে থে। লেকিন ইয়ে মামুলি নোকরি করতা। ইয়ে ঠিক নেহি।

শ্বাস ফেলে রামলাল বলল, বদ নসিব হুজুর কর্নিলসাব। থোড়াসা গলতি কিয়া তো মেরা সার্টিফিকেটমে কালা দাগ দে দিয়া। জো কামমে থে, উও কাম নেহি মিলে। তো ক্যা করু? ঔর দেখিয়ে, ম্যায় হু কেয়ারটেকার। লেকিন সবহি মুঝকো চৌকিদার বোলতে হেঁ।

ডিফেন্সমে ক্যা কাম করতে থে তুম?

ভেহিকলসমে মেকানিক থে হুজুর কর্নিলসাব!

 কর্নেল তার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকালেন। মেকানিক?

 জি।

আফসোস কি বাত।

রামলাল কাকুতিমিনতি করে বলল যে, সে তার সব ‘পেপ্পার-উপ্পার’ নিয়ে হুজুর কর্নিসাবের কাছে যাবে। উনি যেন তার সার্টিফিকেটটা শুধরে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এই ‘ছোটা আদমিকে নোকরি’ তার বরদাস্ত হচ্ছে না। কিন্তু বউ কাচ্চা বাচ্চার মুখ চেয়ে তাকে অপমান সহ্য করে এখানে পড়ে থাকতে হয়েছে। এটাই যে জুটেছে, সে তার ভাগ্য। আশাপুরার এক সাইকেল কোম্পানির ‘মেনিজারসাব’ তাকে এটা জুটিয়ে দিয়েছিলেন। এই তো এখনই ফিল্মওয়ালা সেনসাবের সঙ্গে উনি হাসপাতালে গেলেন। ওঁদের কোন এক জানপহচান আদমি গতরাতে গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করে হাসপাতালে আছেন। রামলালের মতে, আজকাল সায়েব-লোকেদের খুব পয়সা হয়ে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালালে অ্যাকসিডেন্ট হবে না? দিনভর ফিল্মের শুটিং হচ্ছে আর রাতের বেলা বাংলোয় মদের আসর। তো রামলালের কী করার আছে? সে বখশিস পায়। মদ এনে দেয় টাউনশিপ থেকে। তবে সায়েবলোকেরা তাকে গাড়ি দেয় মদ আনতে। পাক্কা তিন-সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরত্ব।

এরপর রামলাল তার ডিফেন্সে থাকার সময় থোড়াসা গলতি নিয়ে পট খুলল। কর্নেল নিচু দেয়ালের কাছে গিয়ে বাইনোকুলারে ওয়াটার ড্যামের পাখি দেখতে থাকলেন। বার্ড স্যাংচুয়ারি সরাসরি দেখা যাচ্ছে না। সেটা অনেক দূরে উত্তর-পশ্চিম কোণে। জলের মধ্যে টিলাগুলো দেখার পথে আড়াল তুলেছে। সামনের টিলায় অক্টোবরে একটা সেক্রেটারি বার্ড দেখেছিলেন। ক্যামেরায় টেলিলেন্স জুড়তে গিয়ে পাখিটা উধাও হয়ে যায়।

হুজুর কর্নিলসাব! জেরা কৃপাসে…

 হাত তুলে কর্নেল আশ্বস্ত করলেন রামলালকে। জরুর! কালকাত্তা জাকে দেখা করো এক হপ্তাকা বাদ।

কর্নেল গেটের দিকে হাঁটতে থাকলেন। রামলাল তার পেছনে। তার আর্জি শেষ হচ্ছে না। কর্নেল বুঝলেন, লোকটা এখান থেকে যেন চলে যেতে পারলে বেঁচে যায়। গেটের কাছে গিয়ে কর্নেল বললেন, সাইকেল কোম্পানিকি মেনিজারসাবকা নাম?

শর্মাজি, স্যার! রাজিশ শর্মা। বহত বড়া আদমি।

কব আয়া শর্মাজি?

 ফিল্মওয়ালা সেনসাব জোদিন আয়া! এহি বাংলো উনহিনে বন্দোবস্ত কিয়া। রামলাল চাপাস্বরে বলল, মালুম, সেনিমা-উনিমা বানানেকা সব রূপেয়া উনহি দেতে হেঁ।

কর্নেল দাঁড়ালেন। বললেন, হম শুনা রামলাল, সেন-সাবকা কোই আদমি খুন হো গেয়া! সাচ?

কিচনি, কর্নিলসাব! রামলাল মুখে ভয়ের ছাপ এনে বলল। লিটন-সাহাবকা উও কোঠিকি বিচমে কিচনি রহতি। আদমিকা খুন পিতি। তো জব কিচনি চিল্লাতি, তব কোই আদমিকা জান জাতা। স্যার! হম শুনা, কাল সামকোভি কিচনি চিল্লায়ি। ঔর দেখিয়ে এক আদমিকা অ্যাকসিডেন্ট হুয়া। জান জাতে জাতে বাঁচ গেয়া। লেকিন বহুত খুন পি লিয়ি কিচনি।

রামলালের কিচনিবৃত্তান্তে কান ঝালাপালা। কর্নেল চলে এলেন। রামলা আবার তার আর্জি স্মরণ করিয়ে দিল। প্রায় পঞ্চাশ মিটার লম্বা ঢালু রাস্তার ধারে দোয়েল দুটো আবার পোজ দিচ্ছিল ঝোপের উগায়। কর্নেলের ছবি তোলার আগ্রহ নেই দেখে উড়ে গেল। গণনাথ সেনের সঙ্গে আলাপের সুযোগ হল না। পরে সুযোগ পাওয়া যাবে। তবে রামলালের সঙ্গে আলাপ হল, এটা মন্দ না। কর্নেল অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে এবড়োখেবড়ো স্টেশন রোডে পৌঁছুলেন। হঠাৎ মনে হল, সত্য জিনিসটাই হয়তো এমন, আরও পাঁচটা ফালতু জিনিসের মধ্যে পড়ে থাকে।

ওয়াটারড্যামের রাস্তাটার কাছে এসে একটু দাঁড়ালেন। সেক্রেটারি বার্ডটিকে দেখার প্রবল ইচ্ছে দমন করতে একটু সময় লাগল। আজই আমিনগঞ্জ যাওয়া জরুরি। কেয়া সেনের বাড়ি, তারপর একবার প্রিয়র কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে প্রোডাকশন ম্যানেজার গিরিধারীজির সঙ্গে আলাপ করে আসতে হবে। কিন্তু বরুণ বাঁচবে তো? ওই গাড়িটাকে কিচনিতে পেয়েছে যেন। তবে ভাববার কথা, পিচে পড়ার পর বরুণ কেন আহত অবস্থায় নীচের জঙ্গলে ঝোপের আড়ালে গিয়েছিল। লুকোতে গিয়েছিল কি? তা-ই যদি হয়, সে আঁচ করেছিল শিগগির তার আততায়ী এসে পড়বে। সাবর্ণীর কাছে খবর পাওয়া মাত্র হাসপাতালে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল। অথচ সে-মুহূর্তে রোজির নোটবই এবং সেই চিঠিটা তাকে বেশি টানল। হিসেবে ভুল হওয়াটা এতক্ষণে টের পাচ্ছেন– ওই বাংলোয় যাওয়ার পরে। কিন্তু সত্যিই তো তিনি অন্তর্যামী নন। তাছাড়া বরুণের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে রোজির সূত্র অবশ্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটা ঘটনা ঘটে। কিন্তু তার পিছনে থাকে অজস্র উপাদান এবং ঘটনাটি সেগুলিরই পরিণতি। বরাবর তার এই তত্ত্ব চমৎকার কাজ দিয়েছে। কোনও হত্যাকাণ্ডের পর হত্যাকারীর পিছনে দৌড় নোর চেয়ে নিহত লোকটির পিছন দিকে হাঁটলে দেখা যাবে, হত্যাকারী আসলে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।

বাইনোকুলারে অরীন্দ্র ধরা পড়লেন। কালো ছড়িটি হাতে হন্তদন্ত আসছিলেন। কর্নেলকে দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন।

কাছাকাছি পৌঁছে কর্নেল বললেন, একই গাড়ির পরপর দুবার ব্রেকফেল এবং খুনখারাপি। কাজেই বোসসায়েবের উত্তেজনার কারণ আছে।

অরীন্দ্র গম্ভীর মুখে বললেন, ঘটনাটা শুনলুম। কিন্তু আমি আপনাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলুম। চলুন, আশাপুরায় জেল হাজতে বোকা বাঁদরটাকে জেরা করবেন। সাড়ে এগারোটায় ট্রেন। আশাপুরায় খেয়ে নেওয়া যাবে।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, আপনি রাতে বলছিলেন, ছেড়ে দিন। লেট হিম গো টু দা হেল। না, না–আপনি মন থেকে বলেননি। আফটার অল আপনার একমাত্র মেয়ের একমাত্র ছেলে। মেয়ে বেঁচে থাকলে অমন কড়া কথা শুনে দুঃখ পেত।

অরীন্দ্রের চোখের কোণে জলের ফোঁটা। হাতের চেটোয় মুছে আস্তে বললেন, আই অ্যাম আ ম্যান অব স্টং মর্যাল প্রিন্সিপল। কিন্তু কেন যেন মনে। হচ্ছে, প্রিয় সত্যিই খুন করেনি। বউয়ের কাছে বীরত্ব জাহির করতে মিথ্যা করে বলেছে, গুলি ছুঁড়েছে। কেন এসব কথা মনে হচ্ছে জানেন? প্রিয় ছোটবেলা থেকে ভীষণ ভীতু। তা ছাড়া আমার নাতি! আমি তাকে স্টাডি করেছি। আর যা-ই করুক, নরহত্যা তার পক্ষে অসম্ভব।

কিন্তু মর্গের রিপোর্টে গুলির কথা আছে।

অরীন্দ্র জোর দিয়ে বললেন, সেটা অন্য ফায়ার আর্মসের। পাটনা থেকে রিপোর্ট আসুক। দেখবেন, আই অ্যাম কারেক্ট। খুনি হারামজাদা ওর গাড়ির ভেতর যে অস্ত্রটা রেখেছিল, গুলিটা তা থেকেই ছোঁড়া হয়েছিল। সেটা নাকি পয়েন্ট বত্রিশ ক্যালিবারের। আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলুম।

প্রিয়র রিভলভারটা আনলাইসেন্সড। কর্নেল চুরুট বের করে ধরালেন। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, তবে যদি বডিতে পাওয়া গুলিটা পয়েন্ট বত্রিশ ফায়ার আর্মসটার না হয় প্রিয় বেঁচে যাবে।

অরীন্দ্র ছড়িসুদ্ধু হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন, ঠাকুরের ইচ্ছা। চলুন!

বোসসাহেব! প্রিয়র কাছে আগামীকাল যাব বরং। এখনই একবার হসপিটালে যাওয়া দরকার। বরুণ দত্তের কাছে একটা কথা যেভাবেই হোক, আমার জানা দরকার। পিউরা যখন গেল, তখন আমিও গেলে পারতুম। কিন্তু…আরে! আপনি…প্লিজ বোসসায়েব! আমার কথা শুনুন।

অরীন্দ্র পিছন ফিরে গোঁ ধরে বললেন, নাহ্। আমি গিয়ে হতভাগাকে চার্জ করব। কাল রাত থেকে আমার মাথাখারাপ। একটা হেস্তনেস্ত হওয়া দরকার।

বলে তিনি হনহন করে হাঁটতে শুরু করলেন। কর্নেল জানেন, ওঁর বরাবর এই গো-ধরা স্বভাব। এমনিতে সজ্জন, আলাপী, রসিক। কিন্তু রেগে গেলে বেপরোয়া।

রিকশো ছাড়া হসপিটালে যেতে সময় লাগবে। কর্নেল ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জের দিকে চললেন। চারুভবনের গেটের কাছাকাছি পৌঁছুলে সাত্যকি চেঁচিয়ে তাকে ডাকল, হাই ফাদার ক্রিসমাস!

সাবর্ণী লনে দাঁড়িয়ে আছে। পিউ, পিয়ালি এবং সাত্যকি গেট থেকে রাস্তায় এল। সাত্যকি কিছু বলার আগে পিউ বলে উঠল, কর্নেল! বরুণদা ইজ ডেড। আমার বড্ড খারাপ লাগছে, জানেন?

.

১৪.

বরুণ মারা গেছে? কর্নেল নীলাদ্রি সরকার থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। বরুণ তাকে বলেছিল, কোম্পানি যেখানে তাকে পাঠাচ্ছেন, সেখানে যেতে তার অস্বস্তি হচ্ছে। কারণ এনিথিং রং সামহোয়্যার। কর্নেল তাকে বলেছিলেন, এটা বরুণ একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিক। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এটা এমন একটা চ্যালেঞ্জ, যার মোকাবিলা করার ক্ষমতা বা বুদ্ধিসুদ্ধি বরুণের ছিল না। নিভে যাওয়া চুরুটটা। জুতোর তলায় ঘসটে নেভালেন কর্নেল। আহ, বরুণের নয়, এ তারই একটা ব্যর্থতা। কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের দিকেই যেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া। কিন্তু কে সেই অদৃশ্য প্রতিপক্ষ?

পিউ কর্নেলকে লক্ষ করছিল। ধরা গলায় বলল, আমি বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে। খালি ভাবছি, জামাইবাবুর ভাগ্যে কী ঘটত। এখন আমার কী মনে হচ্ছে জানেন? আসলে কোম্পানির গাড়িটাই বাজে। ঠিকমতো সারানো হয়নি।

সাত্যকি বলল, সিওর। ওদের সাইকেলের মতোই রদ্দি মাল। পুলিশকে খবর দিতে গেলুম যখন, ওরা ঠিক তা-ই বলল। বরুণবাবু নাকি গাড়িটা ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। নিয়েই স্টার্ট দিয়ে কাট করেন।

কর্নেল লনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা সাবর্ণীর কাছে গেলেন। বললেন, তুমি তো হাসপাতালে গিয়েছিলে। বরুণের তখন জ্ঞান ছিল?

সাবর্ণী আস্তে বলল, ছিল, আমাকে চিনতে পারল।

কী বলল?

ডাক্তার ওকে কথা বলতে বারণ করছিলেন। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। সাবর্ণী কাঁপা কাঁপা একটা নিঃশ্বাস ফেলল। ওর কথা থেকে বুঝতে পেরেছি, গণাদার সঙ্গে ইরিগেশন বাংলোয় দেখা করে ফিরে যাচ্ছিল। পথে হঠাৎ ব্রেক ফেল। স্টিয়ারিংও কাজ করছিল না। তখন ঝাঁপ দেয়।

সাবর্ণী অন্যমনস্কভাবে চুপ করলে কর্নেল বললেন, আর কিছু?

পিছনে কাকে আসতে শুনেছিল। তারপর নাকি কে তাকে জঙ্গলের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তারপর কী হয়েছিল জানে না। ডাক্তার আর কথা বলতে দিলেন না। অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেলেন।

পিউ কাছে এসে বলল, বুড়োদা আর পিয়ালিকে নিয়ে আমি যখন গেলুম, তখন বরুণদা ডেড। আর, দ্যাট স্কাউন্ডেল গণাদা বিবির সঙ্গে নির্লজ্জের মতো কথা বলছে। বিবির উচিত ছিল ওকে অ্যাভয়েড করা।

সাবর্ণী চটে গিয়ে বলল, শাট আপ! সব তাতে ফোঁপরদালালি করবিনে।

 পিউ গ্রাহ্য করল না। বলল, আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছিল গণাদা। আমি কিন্তু কথা বলিনি।

কর্নেল সাবর্ণীকে বললেন, গণনাথবাবু তোমাকে কী বলছিলেন?

একটু চুপ করে থাকার পর সাবর্ণী বলল, সেই একই কথা। কিছু করার ছিল না। পুলিশ কেস। পুলিশই নাকি প্রিয়কে ফাঁসিয়েছে। গণাদা নাকি বিশ্বাস করে না প্রিয় মার্ডার করেছে। আনুদার অনেক শত্রু ছিল।

পিউ ফুঁসে উঠল, হিপোক্রিট!

কোথাও গাছপালার আড়ালে কুক কুক করে একটা পাখি ডাকছিল। কর্নেল বাইনোকুলারে পাখিটা খুঁজতে থাকলেন। একটা ব্যর্থতার বোধ খচ খচ করছে। মনের ভেতর। বরুণ কেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করল না, নাকি সময় পায়নি–কোনও কারণে ব্যস্ত ছিল? আহত অবস্থায় রাস্তা থেকে জঙ্গলে ঝোপের আড়ালে কেউ তাকে নিয়ে গিয়েছিল। কেন? জেভিয়ার বলছিলেন, তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি খোঁড়া বুড়ো মানুষ। পালিয়ে যান। কেউ বরুণকে খতম করে ফেলতে চাইলে রাস্তার ওপরই কাজটা করতে পারত। ঝোপের আড়ালে টেনে নিয়ে গেল কেন? তারপর সম্ভবত সে জেলেদের সাড়া পেয়ে পালিয়ে যায়। তা হলে সে-ই কি “কিচনি”? পিউ গতকাল বলছিল, কিচনি হয়তো কোনও বুনো হিংস্র জন্তু। হতেও পারে। কিন্তু হিংস্র জন্তুর মোটরগাড়ির ওপর আক্রোশ কেন? কাচ ভাঙচুর করে কেন সে? দুবার গাড়ির ব্রেকফেল করার ব্যাপারটার মধ্যে দুটো মিল। দুবারই ইরিগেশন বাংলো থেকে ফেরার পথে ঘটনাটি ঘটে এবং অদ্ভুতভাবে কাচ ভাঙা হয়। অবশ্য বরুণের ক্ষেত্রে থানায় আটকে রাখা গাড়ি ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার পর দুর্ঘটনা ঘটেছে। এমনও হতে পারে, গাড়িটা ঠিকমতো সারানো হয়নি। গ্যারেজ থেকে পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল গাড়িটা। তারপর বরুণ ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। ঠিকঠাক চলছে দেখে আবার গ্যারেজে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করায়নি। নাকি করিয়েছিল? এবার কর্নেলকে খুব সাবধানে এগোতে হবে। কাচ ভাঙাটা বড়ো অদ্ভুত। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে জল ঘোলা করার মানে হয় না।

পাখিটা কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কর্নেল হতাশ হয়ে বাইনোকুলার নামালেন। বুকের ওপর ঝুলতে থাকল। দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিলেন রাণু। মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর গম্ভীর। বললেন, ঠাকুর্দার সঙ্গে দেখা হয়নি আপনার?

কর্নেল একটু হাসলেন। হয়েছে। তোমার ঠাকুর্দা আমার ওপর খাপ্পা হয়ে একা স্টেশনে চলে গেলেন।

ওঁর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কী গণ্ডগোল বাধাবেন কে জানে! বলে রাণু ডাক দিলেন, ভগীরথ! চেয়ারগুলো দিয়ে এস। আর সুশিকে বলো, কফি দিয়ে আসুক কর্নেল সায়েবকে।

কর্নেল বললেন, বসব না। বেরুব। তবে কফি খাব।

পিউ চঞ্চল হয়ে বলল, আমরা বসব। রোদ্দুরটা অসাধারণ। পিয়ালি, চলে এস। বুড়োদা! কাম অন! কর্নেল, কোথায় বেরুবেন আবার? বসুন না প্লিজ। মুড চটে গেছে। লেটস টক অ্যাবাউট সাম আদার থিংস। আপনার মিলিটারি লাইফের গপ্প বলুন কর্নেল!

ভগীরথ কয়েকটা বেতের চেয়ার এনে দিল। সাবর্ণী চলে গেল দেখে পিউ ঠোঁট উল্টে কঁধ নাড়া দিল। চাপাস্বরে বলল, শি ইজ অলওয়েজ স্ট্রেঞ্জ। কর্নেল, প্লিজ আপনি বসুন।

কর্নেল বসে বললেন, কফিটা বসেই খাওয়া যাক। এগারোটা বাজে। একটা ড্রাগন প্রজাপতি না ধরে ফিরছি না।

ড্রাগন প্রজাপতি! পিউ জিজ্ঞেস করল। সে আবার কী?

মাফিয়া লিডার বলতে পারো। নিরীহ প্রজাপতিদের মৌভাণ্ডার লুঠ করে।

সাত্যকি বলল, এই শীতে প্রজাপতি? ফাদার ক্রিসমাস? হাসালেন!

পিউ বলল, কাল বিকেলে আমি প্রজাপতি দেখেছি। কর্নেল ধরতে পারলেন না।

সাত্যকি বলল, ফাদার ক্রিসমাসের পাল্লায় পড়লে তুমি অনেক কিছু দেখতে পাবে। কাল কিচনির ডাক শুনেছ। এরপর সত্যিই কিচনিও দেখতে পাবে।

পিয়ালি একটু হেসে বলল, “সিওর’ বললে না?

সাত্যকি তার দিকে তাকাল। চোখে হেসে বলল, ওক্কে। সিওর।

সুশীলা হন্তদন্ত কফি আনল। মুখটা রাণুর চেয়ে গম্ভীর। কর্নেলকে সসম্ভ্রমে কফির পেয়ালা দিয়ে একটু ইতস্তত করে বলল, হম বোলি কর্নিলসাব! শুনা? উও আদমি মর গেয়া।

হ্যাঁ সুশীলা। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন। কিচনি বেচারার রক্ত চুষে খেয়েছে। তো আমার ঘর তালাবন্ধ করে রেখেছ তো?

সুশীলা মাথা নাড়ল। সাত্যকি চাপাস্বরে সকৌতুকে বলল, ভগীরথদা ভেতর ভেতর রেগে গেছে, জানেন? পায়ে হেঁটে বাজারে যেতে হয়েছে আজ। সারাক্ষণ গজগজ করছে, আজিব বাত!

পিউ একটু অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার?

সাত্যকি হাসল। ফাদার ক্রিসমাস তার জাদুঘরের জন্য আমার সাইকেলটা সিলেক্ট করেছেন। কলকাতায় ফিরে ওঁর জাদুঘরটি অন্তত দেখে এসো। ফুল অফ স্ট্রেঞ্জ থিংস। ছাদের বাগানটিও তাই। স্ট্রেঞ্জ প্ল্যান্টসে ভর্তি। অর্কিড কাকটাস। হরিব সব গড়ন। দেখলে আনক্যানি ফিলিং হয়।

পিউ অন্যমনস্কভাবে বলল, সত্যি, আমার খুব বোর করছে এখানে। তোমরা না থাকলে আমি কেটে পড়তুম। বিবিকে তার বরের জন্য অবশ্য থাকতেই, হত। তবে কিছু বলা যায় না। জামাইবাবুর জামিন পেতে দেরি হলে দেখবে সে কাট করেছে।

কর্নেল কফি শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, চলি। তোমরা গপ্প করো।

পিউ বলল, সত্যিই কি প্রজাপতি ধরতে যাচ্ছেন আপনি?

সত্যিই।

 আমি যাব আপনার সঙ্গে।

 সরি ডার্লিং! এধরনের কাজে সঙ্গী থাকলেই প্রবলেম। তোমরা গল্প করো।

আপনার একবার হাসপাতালে যাওয়া কিন্তু উচিত ছিল। সম্ভবত গণাদা এখনও সেখানে আছে। পিউ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল। গণাদার সঙ্গে আপনার কথা বলা উচিত।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, যথাসময়ে বলব।

আমিনগঞ্জ যাবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি গিয়ে মত বদলালেন কর্নেল। খ্রিস্টান বসতির দিকে হাঁটতে থাকলেন। আসন্ন ক্রিসমাসে রাস্তায় রঙিন কাগজের ঝালর টাঙাচ্ছে যুবক-যুবতীরা। বেশির ভাগই আদিবাসী। কিছু অ্যাংলো ইন্ডিয়ান আছে এখনও। তারা স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে চেয়েছে। এক সময়ের আভিজাত্য ক্ষয়টে হয়ে গেছে, তবুও। বাংলো ধাঁচের বাড়িগুলি প্রকৃতির করতলগত এবং জরাজীর্ণ। রাস্তা ছেড়ে মাঠ ঝোপ-জঙ্গল হয়ে বেলিংটন জেভিয়ারের বাড়ির কাছে পৌঁছলেন কর্নেল।

জেভিয়ার তার গোপালবাগানের শেষ দিকটায় কাঁটার বেড়া মজবুত করছিলেন। ঢালু দিকটায় নীচের জলায় যাওয়ার জন্য ছোট্ট গেট। সেখানে গিয়ে কর্নেল একটু কেসে সাড়া দিলেন। জেভিয়ার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে পেলেন। নিষ্পলক নীলচে চোখ।

একটু পরে খিক খিক করে হেসে উঠলেন। ইউ! ওয়েল, আ যাইয়ে। রোজ গার্ডেন দেখনা চাহতা তো দেখিয়ে। লেকিন উও লড়কি কঁহা?

কর্নেল ভেতরে গিয়ে ইংরেজিতে বললেন, ও আপনাকে খুব ভয় পায় মিঃ। জেভিয়ার!

জেভিয়ার আরও হেসে বললেন, হ্যাঁ। আমাকে দেখে কেউ কেউ ভয় পায়। তিনি অভ্যাসমতো হিন্দি-ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলছিলেন। আসলে আমার চেহারায় জংলি ছাপ ক্রমশ গাঢ় হয়ে পড়ছে। পড়ারই কথা। আর, হাতের এই ধারালো কাটারি। মহাশয়, বনজঙ্গলে ঘুরতে হলে নিরস্ত্র থাকা উচিত নয়।

মিঃ জেভিয়ার, তখন আপনি ওই রাস্তায় কী দেখতে গিয়েছিলেন?

 আপনি খুব কৌতূহলী।

আশা করি, দুর্ঘটনায় পড়া গাড়িটা দেখতেই গিয়েছিলেন?

হ্যাঁ। আপনার বাইনোকুলার আছে। আপনি দূরদর্শী।

 লোকটি মারা গেছে হাসপাতালে। শুনেছেন কি?

জেভিয়ার বুকে ক্রশ এঁকে বললেন, প্রভু যিশু তার আত্মাকে শান্তি দিন।

লোকটি মৃত্যুর আগে বলেছে, দুর্ঘটনার পর কেউ তাকে টানতে টানতে জঙ্গলে নিয়ে যাচ্ছিল।

জেভিয়ার একটু হাসলেন। কিচনি, মহাশয়, কিচনি।

জেলেরা এসে পড়ায় কিচনি ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়।

 লোকটা বলেছে?

হ্যাঁ।

 জেভিয়ার একটু চমকে উঠে বললেন, কিচনিকে কি সে দেখতে পেয়েছিল?

পেয়েছিল।

 জেভিয়ার চটে গেলেন। মিথ্যা! একেবারে মিথ্যা।

 কেন মিথ্যা মিঃ জেভিয়ার?

কিচনিকে কেউ দেখতে পায় না। আমি সারারাত ঘুরে বেড়াই। তার ডাক শুনেছি। একবারও দেখতে পাইনি। জেভিয়ার গলার ভেতর বললেন, কিচনি যখন জানতে পারে, কারও কোনও বিপদ ঘটতে চলেছে, তখন সে ডাকে। সাবধান করে দেয় মানুষকে।

আপনার মেয়ে যখন মারা যায়, কিচনি ডেকেছিল কি?

জেভিয়ার মুখ নামিয়ে বললেন, ডেকেছিল।

আপনার মেয়ের এক সহকর্মী কেয়া সেনের মৃত্যুর সময়?

 ডেকেছিল। কিন্তু কেন এসব কথা, মহাশয়? আপনার উদ্দেশ্য কী?

আপনার মেয়ের খুনিকে ধরা।

জেভিয়ার মুখ তুললেন। আপনি মিলিটারি অফিসার। কর্নেল। আপনি পুলিশ নন। আর আমার মেয়ে যদি সত্যি খুন হয়েই থাকে, পুলিশ তার খুনিকে ধরবে না। পুলিশকে আমি বিশ্বাস করি না। দয়া করে আমাকে আপনি ঘাঁটাবেন না। পুলিশ কেন খুনিকে ধরবে না মিঃ জেভিয়ার? বোসসায়েবের নাতিকে তো ধরেছে!

এসব বিষয়ে আর একটি কথাও নয়। আপনি দয়া করে আসুন, মহাশয়।

 মিঃ জেভিয়ার দু’বারই গাড়ির কাঁচগুলো কেউ ভেঙেছে। কিচনি কেন কাচ ভাঙে? গাড়ির ওপর তার কেন রাগ?

জেভিয়ার হাত নেড়ে বললেন, চলে যান! চলে যান! নইলে আপনি আমার মৃত্যুর কারণ হবেন। আমাকে বাঁচতে দিন দয়া করে। তাঁর কণ্ঠস্বর বিকৃত হল। আমি স্বাভাবিক মৃত্যু চাই। আর কদিনই বা বেঁচে আছি? আমাকে শান্তিতে মরতে দিন। আপনি আর আমার কাছে আসবেন না, আপনি যে-ই হোন। ঈশ্বরের দোহাই! প্রভু যিশুর দোহাই! চলে যান।

জেভিয়ার দু-হাতে মুখ ঢাকলেন। শিশুর মত কাঁদতে থাকলেন। কর্নেল একটু দাঁড়িয়ে থেকে চলে এলেন। লোকটির জন্য কষ্ট হয়। খোঁড়া মানুষ। দেখাশোনার কেউ নেই। কিন্তু এবার উনি নিজের মৃত্যুর আশঙ্কা করছেন। এটা একটা ভাববার কথা। ক্লিফটনকুঠির কাছে গিয়ে কর্নেল দেখলেন, ছাদে একঝাক ট্যুরিস্ট দাঁড়িয়ে আছে। ছবি তুলছে। ভাঙা ফটকের ধারে মহুয়াগাছের তলায়। একটু দাঁড়ালেন। তারপর চত্বর পেরিয়ে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেলেন। ধ্বংস ক্রুপের একটা অংশ ঢালু হয়ে গঙ্গায় নেমেছে। সেখানে ঘনঝোপ, উঁচু-নিচু গাছ, লতাপাতার ঝালর। ওখানেই অক্টোবরে ড্রাগন-প্রজাপতি দেখেছিলেন।

খুঁজতে খুঁজতে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকলেন। একখানে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। বড় বড় পাথরের চাই পড়ে আছে। তার মধ্যিখানে একটা গাছ। গাছটা থেকে একটা কাঠবেড়ালি নেমে এল। সেদিকে তাকালেন কর্নেল। তারপরই একটু অবাক হলেন।

গাছটার গুঁড়িতে জায়গায়-জায়গায় শুকনো কাদার ছোপ। উই ধরেছে জ্যান্ত গাছে? কাছে গিয়ে আরও অবাক হলেন। দু-তিনটে জায়গায় গোল করে কাদা সাঁটা এবং শুকিয়ে গেছে। বাকিগুলো ঝরে পড়েছে। একটাকে ছাড়িয়ে নিতেই সরু-ফাটল এবং গর্তের চিহ্ন চোখে পড়ল। দুপাশে কালচে ছোপ। আতস কাচ বের করে সেটা দেখেই চমকে উঠলো। প্যান্টের পকেট থেকে ছুরি বের করে সেই অংশটা খুঁড়তে থাকলেন। ছুরির ডগায় একটা সরু প্রায় তিনকোনা সিসের– টুকরো বেরিয়ে এল। হাতের চেটোয় রেখে আতস-কাচ দিয়ে পরীক্ষা করার পর বুঝলেন পয়েন্ট থ্রি নট থ্রি বুলেটের ডগা। রিভলভারের গুলি!

হুঁ, কেউ টার্গেট প্র্যাকটিস করেছে এই গাছটাতে। কে সে? প্রিয়গোপাল নয় তো?

চোরা রিভলভার কিনেছিল যে, তার পক্ষে গোপনে এভাবে লক্ষ্যভেদে হাতপাকানো কখনই অসম্ভব নয়। আত্মরক্ষার জন্যই কি? নাকি প্রতিহিংসাবশে বউয়ের প্রাক্তন প্রেমিককে হত্যার জন্য?

পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে টার্গেট প্র্যাকটিস করেছে। ঘন ঘাস চারপাশে। কোনও জুতোর চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেল না। তবে হাত পাকানোর উপযুক্ত জায়গা। এই জঙ্গল থেকে স্টেশন রোড দূরে। কুঠিবাড়িও একটু দূরে। দহের পেত্নীর ভয়ে এখানে কারও আসার সম্ভাবনাও নেই। কাছাকাছি কোনও বসতিও নেই।

 ভবনে যখন ফিরলেন, তখন কর্নেল ক্লান্ত। এ বয়সে উত্তেজনা মানুষকে ক্লান্ত করে। রহস্যের জট আরও পাকিয়ে গেল। খেই ধরে এগোতে গিয়ে আরেকটা খেই বেরিয়ে এল। দুটোকে মেলানো যায় না। অথচ একই জটের জন্য ওতপ্রোত হয়ে রয়েছে।

দরজার তালা খুলে সুশীলা জানতে চাইল কর্নিলসায়েব স্নান করবেন কি না। কর্নেল একটু হেসে বললেন, তুমি ভুলে গেছ সুশীলা, জলকে আমি বিল্লির চেয়ে বেশি ভয় পাই। আমার স্নানের শুভদিন আগামী কাল। আর জলটা খুব বেশি গরম হওয়া চাই।

সুশীলা যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করে দিলেন কর্নেল। বাড়িটা ভীষণ স্তব্ধ। টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে সিসের টুকরোটার সঙ্গে প্রিয়র রিভলভারের একটা বুলেট বের করে ডগাটা মিলিয়ে দেখলেন। নাহ, পয়েন্ট থ্রি নট থ্রি বুলেট হলেও এই রিভলভারের বুলেট নয়। গাছের বুলেটটা অন্য রিভলভারের। কর্নেল টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে নিভিয়ে জিনিসগুলো কিটব্যাগে সামলে রেখে দরজা খুললেন। টুপি এবং জ্যাকেট হ্যাঁঙ্গারে রেখে ইজিচেয়ারে বসলেন। তারপর একটা চুরুট ধরিয়ে চোখ বুজলেন। মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে। সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে।

পিউ এল। সাত্যকির নকল করে বলল, ফাদার ক্রিসমাস কি ড্রাগন বাটারফ্লাই ধরতে পারলেন?

নাহ ডার্লিং! ওরা অসম্ভব ধূর্ত।

পিউ সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে বলল, ওটা কি সত্যি কলকাতা নিয়ে যাবেন আপনি?

দেখা যাক।

সে সাইকেলটার কাছে গিয়ে হ্যাঁন্ডেল ধরে নাড়াচাড়া করে বলল, ফিনিশিংটা বাজে। কিন্তু এটা জাদুঘরে রাখার যোগ্য ভাবছেন কেন? ইট ইজ জাস্ট অ্যান অর্ডিনারি টাইপ।

সাত্যকির সাজেশন।

বুড়োদা একটা পাগল। পিউ চাপাস্বরে বলল, পাগল এবং গোঁয়ার। একটু আগে রাণুদির সঙ্গে কী নিয়ে ঝগড়া করছিল। কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাতে চাইনে। তবে প্রথমে এদের ফ্যামিলিকে যতটা অ্যারিস্ট্রোক্র্যাট ভেবেছিলুম, এরা তা নয়।

কর্নেল তাকালেন। কেন?

পিউ একটু চুপ করে থাকার পর আস্তে বলল, বাইরে মডার্ন, ভেতরে মিনমাইন্ডেড অ্যান্ড সেলফিশ। দিদির সম্পর্কে বড় বাজে আলোচনা করে। কানে আসে। আমি আর এখানে থাকছি না।

কর্নেল হাসলেন। তুমি পুরোপুরি আর্বান পার্সন! তোমার এখানে ভাল না লাগারই কথা।

পিউ ক্ষুব্ধভাবে বলল, দিদির নামে রাণুদি স্ক্যান্ডাল রটাচ্ছেন। আর পিয়ালির কাছে শুনেছি, রাণুদির নামেও যে একসময় খুব স্ক্যান্ডাল রটেছিল?

.

১৫.

বিজয়ের সঙ্গে রাণুর সম্পর্ক ভাল ছিল না, কর্নেল জানেন। রাণু তেজী মেয়ে। এদিকে ঘরজামাই বিজয়েন্দুও তেমনই গোঁয়ার এবং জংলি স্বভাবের মানুষ। কর্নেলের মনে হত বন্দুকবাজ বিজয়ে নিজের জীবনকে এক অলীক বাঘের খোঁজে লেলিয়ে দিয়েছে, যে বাঘটি প্রকৃতির খুব গভীরে থেকে গর্জন করে সাড়া দেয়। একমাত্র ছেলে যতীন্দ্রের মৃত্যুর পর অরীন্দ্র পৌত্রীর জন্য এক বন্দুকবাজ যুকে বেছে নিয়েছিলেন, তার গুঢ় কারণ সম্পত্তির তদারকি। বিহার মুলুকের দেহাতে এটাই রেওয়াজ। কিন্তু অরীন্দ্রের কাজে আসেনি বিজয়েন্দু। খনিগুলো একে একে হাতছাড়া হয়ে যায়। জমিজিরেতও রাগ করে বেচে দেন অরীন্দ্র। কোম্পানি আর সরকারি ঋণপত্রে লগ্নী করেন টাকাকড়ি। একমাত্র মেয়ে সুরঞ্জনার বিয়ে কলকাতার এক মোটামুটি সচ্ছল পরিবারে দিয়েছিলেন। প্রিয়গোপালের বাবা জয়গোপাল ছিলেন সরকারি অফিসার। অমায়িক সাদাসিধে মানুষ। অরীন্দ্রের মুখে তার জামাইয়ের খুব প্রশংসা শুনেছেন কর্নেল।

একের পর এক মৃত্যু অরীন্দ্রকে ধাক্কা দিয়ে-দিয়ে যেন আরও শক্ত মানুষ করে তুলেছে কালক্রমে। কর্নেলকে বলেছিলেন, ওদের আয়ু নিয়েই বেঁচে আছি। ছেলে, বউমা, জামাই, মেয়ে, শেষে নাতজামাই বিজয়েন্দু–ক্রমাগত মৃত্যু। এই বৃদ্ধের মুখ দেখে বোঝা যায় না, কতগুলো ক্ষতচিহ্ন বুকের ভেতর রয়ে গেছে।

বছর তিনেক আগে কুরুডি বনবাংলোয় থাকার সময় বিজয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল কর্নেলের। বিজয়েন্দু তাকে নিয়ে আসে এ বাড়িতে। অরীন্দ্রের সঙ্গে ভাব জমে ওঠে কর্নেলের। বন্ধুত্ব হতে দেরি হয়নি। তবে বিজয়েন্দু ছিল অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ। জঙ্গলে সবসময় সে বাঘ দেখত এবং ব্যাপারটা তার একটা অবসেসনে পরিণত হয়েছিল। একবার একটা ভালুককে বাঘ ভেবে গুলি করল একেবারে দিনদুপুরে। কর্নেল যখন বললেন, কুরুডি জঙ্গলের বাঘগুলো কালো রঙের কি না, বিজয়ে চিন্তিতমুখে বলল, কিছু বলা যায় না। এবং তারপর মরা ভালুকটাকে দেখে খুব অবাক হয়ে বলল, আমি তো এটাকে বাঘই দেখছিলুম! কেন এটা ভালুক হয়ে গেল বলুন তো?

পরে ঘটনাটা শুনে অরীন্দ্র হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ওর মগজে বাঘ ঢুকে সবসময় হালুম হালুম করছে।

পিউ বলছিল, রাণুদির নামে স্ক্যান্ডাল রটেছিল। রটতেই পারে। বনচর এবং প্রায়-জংলি স্বামীর সঙ্গে তার মনের মিল থাকা সহজ ব্যাপার নয়। কর্নেল লক্ষ করতেন, বাড়ি ফিরে যতক্ষণ বাড়িতে থাকত বিজয়েন্দু, ততক্ষণ সে তার ট্রফিতে ঠাসা ঘরটাতে কাটাত। ঘরভর্তি স্টাফড় জন্তু-জানোয়ার। আলমারিতে কয়েকটা রাইফেল আর শটগান। নতুন ধরনের কোনও রাইফেলের খবর পেলেই সে কলকাতা চলে যেত। শিকারি হিসেবে খ্যাতি থাকায় আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে তার অসুবিধে ছিল না। তা ছাড়া বিহার মুলুকে আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি লাইসেন্সের তোয়াক্কা করে না কেউ। বিজয়েন্দুর অত আগ্নেয়াস্ত্রের সবগুলোই লাইসেন্স করা কি না, সেটা বলা কঠিন। অরীন্দ্র বসু এলাকায় ‘বোসসায়েব’ এবং পয়সাওয়ালা মানুষ বলে পরিচিত। পুলিশ তার বাড়ি সার্চ করেনি। শুধু সাবর্ণীকে জেরা করে চলে গেছে। কিন্তু এবার নাকি সি আই ডি তদন্তে নেমেছে। অরীন্দ্রকে সতর্ক করে দেওয়া দরকার। যদি বিজয়ের কোনও চোরা আগ্নেয়াস্ত্র থাকে, উটকো ঝামেলা বাধবে। অবশ্য অরীন্দ্র বিচক্ষণ মানুষ।…..

আমিনগঞ্জে পৌঁছুতে প্রায় একঘণ্টা লাগল। বাসটা সারাপথ থামতে থামতে এসেছে। তার ওপর ভিড়। কর্নেল ঘড়ি দেখলেন, তিনটে বাজে। সাইকেল রিকশো করে বাঙালি পাড়ায় অনেক খুঁজে বাড়িটায় পৌঁছুলেন। এক প্রৌঢ়া। মহিলা কর্নেলকে দেখে একটু ভড়কে গেলেন প্রথমে। তারপর কর্নেলের অমায়িক ভাবভঙ্গি দেখে একটু আশ্বস্ত হলেন। তাকে বসার ঘরে নিয়ে গেলেন। বললেন, আপনি কোথা থেকে আসছেন?

 কর্নেল তাকে নিজের নেমকার্ড দিলেন। বললেন, আমি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই। আপনি কি কেয়ার মা?

অমনি ভদ্রমহিলা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। সে কান্না আর থামতেই চায় না। কর্নেল অপ্রস্তুত।

শেষে অনেক সান্ত্বনাবাণী আওড়ে তাকে একটু শান্ত করলেন কর্নেল। ভদ্রমহিলা চোখ মুছে ভাঙা গলায় বললেন, আমি কেয়ার পিসিমা। ছোটবেলায় ওর বাবা-মা মারা যায়। আমরা ওকে কলকাতা থেকে এখানে এনে মানুষ করেছিলুম। ওর পিসেমশাই যে-কোম্পানিতে কাজ করেন, সেই কোম্পানিতে চাকরিও জুটিয়ে দিলেন। তারপর হঠাৎ আশাপুরায় বদলি করল। পুজোর ক’দিন আগে খবর এল অ্যাকসিডেন্ট করেছে কেয়া।

অ্যাকসিডেন্ট?

হ্যাঁ। পুলিশ তাই বলেছিল। ক্লিফটনগঞ্জে একটা পুরনো কুঠিবাড়ি আছে। সেখানে কার সঙ্গে বেড়াতে এসেছিল। ছাদ থেকে পা হড়কে নীচের খাদে পড়ে যায়। ওর পিসেমশাই গিয়েছিলেন। কেয়ার পিসিমা কার্ডটা ফের খুঁটিয়ে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি মিলিটারি থেকে আসছেন? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।

আমি একজন রিটায়ার্ড কর্নেল। কেয়াকে আমি চিনতুম।

চিনবেন বৈকি। খুব আলাপী মেয়ে ছিল। কিন্তু..

কর্নেল দ্রুত বললেন, আশাপুরায় আলাপ হয়েছিল। গতকাল কলকাতা থেকে এসে খবরটা শুনে মন খারাপ হয়ে গেল। তাই খোঁজ নিতে এলুম। কর্নেল মুখে দুঃখের ছাপ এনে বললেন, কিন্তু আমি তো শুনে এলুম কেয়া নাকি সুইসাইড করেছিল?

কেয়ার পিসিমা একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, কত কথা রটে! মানুষের মুখ। পুলিশও প্রথমে বলেছিল সুইসাইড। শেষে বলল, না। আকসিডেন্ট। সুইসাইড করলে কিছু লিখে রেখে যেত। তেমন কিছু পাওয়া যায়নি।

আপনারা গিয়েছিলেন নিশ্চয়?

কেয়ার পিসেমশাই গিয়েছিলেন। আমার তখন প্রচণ্ড জ্বর। সে যা দিন গেছে। বলার নয়।

উনি কি এখন অফিসে?

হ্যাঁ। ওঁর কাছে গেলে সব শুনতে পাবেন। বলে কেয়ার পিসিমা হঠাৎ ব্যস্ত হলেন। কিন্তু উনি তো এখন কারখানার ভেতরে। দেখা করতে কি দেবে? খুব কড়া নিয়ম ওঁদের। বরং আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। গরিবের বাড়ি পায়ের ধুলো দিয়েছেন আপনার মতো মিলিটারি অফিসার। একটু চাফা করে দিই। চারটের মধ্যে উনি এসে যাবেন।

কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, নাহ্। আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি আপনার কাছে একটা কথা জানতে চাই। কেয়ার কি সুইসাইড করার কোনও কারণ ছিল? জাস্ট কথার কথা। জানতে ইচ্ছে করছে।

কেয়ার পিসিমা মাথা নাড়লেন। অসম্ভব কথা। কেন সুইসাইড করবে? হাসিখুশি মেয়ে। ভাল মাইনে পেত। এক পয়সা বাজে খরচ করত না। তেমন শৌখিন মেয়ে তো ছিল না। সাদাসিধে থাকত। আপনি তো দেখেছেন। আপনিই বলুন কর্নেল সায়েব! জানেন? ওর এক দূর সম্পর্কের দাদা সিনেমা করে। সে ওকে সিনেমায় নামাতে চেয়েছিল। নামেনি। বলত, সিনেমায় নামলে নষ্ট হয়ে যাবে। তা হলেই বুঝুন!

কর্নেল সায় দিয়ে বললেন, আচ্ছা, কেয়ার কোনও নোটবই, ডায়েরি বা চিঠি কিছু কি আছে? আমার দেখতে ইচ্ছে করছে। আহা, বড় ভাল মেয়ে ছিল। অন্তত স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ওর একটা কিছু নিয়ে যেতে চাই। জানেন? আমার এই একটা সেন্টিমেন্ট আছে। খুলেই বলি, আমার ঠিক কেয়ার মতোই একটি মেয়ে ছিল। সে-ও অকালে ঝরে গেছে। কেয়াকে দেখেই মনে হয়েছিল, সে-ই যেন পুনর্জন্মে কেয়া হয়ে ফিরে এসেছে।…বলে কর্নেল একটা আবেগে ঠাসা কাহিনী বুনলেন। এতে কাজ হল।

কেয়ার পিসিমা সমবেদনা জানিয়ে একটু ইতস্তত করার পর বললেন, দেখাচ্ছি। বলে তখনই ভেতরে চলে গেলেন। একটু পরে একটা কিটব্যাগ নিয়ে। এলেন। বললেন, দেখুন আপনি। আমি চা করে আনি। কত ভাগ্যে আপনার মতো একজন মানুষ এসেছেন।

কিটব্যাগটা দামী এবং বিদেশী। ভেতরে এলোমেলো ঠাসা কয়েকটা ইংরেজি পত্রিকা, খবরের কাগজও। দুটো ডায়রি বই। দুটোই মোহনলাল গণেশলাল। অ্যান্ড কোম্পানির তলায় কয়েকটা বিদেশী প্রসাধনের কৌটো। বাহ্, কেয়া সাদাসিধে ছিল বলা যাবে না। কিন্তু এই প্রসাধনীগুলো কি তার কোনও প্রেমিকের উপহার? একটা ডায়রি বইয়ে কোনও আঁচড় পড়েনি। অন্যটাতে রোজির মতোই টাকাকড়ির হিসেব লেখা। কিন্তু টাকার অঙ্কটা রোজির তুলনায় বেশি। এ থেকে কোনও সূত্র পাওয়া কঠিন, যে-সূত্র খুঁজছেন। রোজির মতো কোনও রহস্যময় চিঠি নেই কারও। কিংবা আছে–অন্য কোথাও? বেশি এগোনোয় ঝুঁকি আছে। আপাতত কেয়ার চরিত্রের একটা আভাস তার দরকার। কিটব্যাগের একদিকের চেন খুললে একতাড়া চিঠি বেরুল। ডাকে আসা চিঠি। বেশিরভাগই পিসিমা-পিসেমশাইয়ের লেখা। একটা চিঠিতে কেয়াকে টাকা পাঠানোর তাড়া দিয়েছেন পিসেমশাই। বাড়ি মেরামতের টাকা পাঠাতে দেরি হচ্ছে কেন? দ্রুত চিঠিগুলো দেখে নিলেন কর্নেল। কোনও প্রেমপত্র নেই কারও। মনে পড়ল, বরুণ বলেছিল, ব্যর্থ প্রেমের জন্য কেয়া সেন নাকি আত্মহত্যা করেছিল–অন্তত এটাই বরুণ শুনেছিল। কিন্তু সেই প্রেমের কোনও সূত্র রেখে যায়নি কেয়া। নাকি নষ্ট করা হয়েছে? তবে তার চরিত্রের আভাস ফুটে উঠল কর্নেলের সামনে। বিলাসী, কিন্তু হিসেবি স্বভাবের মেয়ে ছিল কেয়া সেন। একটা সুন্দর গার্হস্থ্য জীবনের স্বপ্নও যেন ছিল। কর্নেল আবার চিঠিগুলো একটার পর একটা দেখতে থাকলেন। হঠাৎ একটা চিঠি দেখে একটু অবাক হলেন। সেটা জ্যাকেটের ভেতর চালান করে নিলেন। সত্য জিনিসটা সত্যিই বাজে জিনিসের মধ্যে লুকিয়ে থাকে।

ভাঁজ করা খবরের কাগজগুলো খুলে বিজ্ঞাপনে ডটপেনের চিহ্ন দেখে বুঝতে পারলেন, কেয়া অন্যত্র চাকরি খুঁজছিল। কেন? কাগজগুলোর তারিখ গত সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরের। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে তার মৃত্যু। আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা, অথবা অরীন্দ্রের বিশ্বাস অনুযায়ী হত্যা। কোনটা সত্য? সত্যকে জানতে হলে নানাদিক থেকে বাজিয়ে দেখতে হয়।

একটু অন্যমনস্ক হলেন কর্নেল। হত্যা ধরে নিয়েই তো তিনি সূত্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন। রোজিকে কেউ টাকা দেওয়ার ছলে ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল, তা যদি সত্য হয়, তাহলে রোজির জায়গায় কোম্পানির পরবর্তী স্টেনো-টাইপিস্ট কেয়ার একইভাবে মৃত্যু হত্যা নয় কেন? এর পরের প্রশ্নটা হল, সব হত্যার পেছনে একটা মোটিভ থাকে। এখানে মোটিভটা কী? চিঠিটা কি কোনও মোটিভের আভাস দিচ্ছে?

কেয়ার পিসিমা এলেন একটা ট্রে নিয়ে। সুন্দর কাপ-প্লেট, একটা প্লেটে সন্দেশ, আর একটায় চানাচুর। ধরা গলায় বললেন, কেয়ার পছন্দ করে কেনা কাপ-প্লেট, কর্নেল সায়েব!

কর্নেল রুমাল বের করে চোখ মোছার ভঙ্গি করলেন এবং ফোঁস করে একটি দীর্ঘশ্বাসও ছাড়লেন। তিনি চা-খাওয়া পছন্দ করেন না। কফিই তার প্রিয় পানীয়। কিন্তু এ মুহূর্তে উষ্ণ কোনও পানীয়ের দরকার ছিল। সন্দেশ সবিনয়ে সরিয়ে রেখে কয়েকটা চানাচুর আলতো হাতে তুলে নিলেন। চিবুতে চিবুতে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, আশাপুরায় কেয়ার অফিসের ম্যানেজার শর্মাজিকে আপনি চেনেন?

কেয়ার পিসেমশাই চিনতে পারেন। আপনি কিন্তু সন্দেশ খেলেন না কর্নেল সায়েব!

কর্নেল একটু হাসলেন। এ বয়সে সন্দেশ খাওয়া মানা। চা-ও মানা। তবে কেয়ার কেনা কাপে চা দিয়েছেন। খাচ্ছি। তো দেখুন, আমার একটু তাড়া আছে। চারটের বাস ধরে ক্লিফটনগঞ্জ ফিরতে হবে। আমার অনুরোধ, আমার মেয়ের একটা স্মৃতিচিহ্ন যদি নিয়ে যেতে দেন, খুশি হব।

নিন না। আর কী হবে ওসব নিয়ে? আপনার যেটা ইচ্ছে, নিন।

কর্নেল হিসেব লেখা ডায়রিটা নিয়ে বললেন, কেয়ার আর কোনও জিনিস ছিল না?

ছিল। সুটকেস, জামাকাপড়, বিছানাপত্তর। আশাপুরা থেকে উনি কিছু কিছু জিনিস নিয়ে এসেছিলেন। সেগুলো আমরা রাখিনি। গরিব-দুঃখীদের বিলিয়ে দিয়েছি।

স্যুটকেসটাও?

কেয়ার পিসিমা শুধু বললেন, হুঁউ। কিন্তু মুখ দেখে কর্নেলের মনে হল, কথাটা সত্য নয়। তবে এর বেশি এগোনো ঠিক নয়। নিজের চেহারা, হাবভাব এবং নেমকার্ড দিয়ে সাদাসিধে এক মহিলাকে যথেষ্ট করায়ত্ত করে ফেলেছেন। কিন্তু স্যুটকেসে কি কোনও সূত্র ছিল, এটাই প্রশ্ন।

কর্নেল উঠে পড়লেন। বললেন, অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। দেখি, যদি সুযোগ পাই, কেয়ার পিসেমশাইকে মিট করে যাব। ওঁর কোম্পানির অফিসটা কি বেশি দূরে?

কেয়ার পিসিমা কর্নেলকে বিদায় দিতে বেরিয়ে বললেন, তা একটু দূরে। আপনি আর একটু বসলে ওঁর দেখা পেতেন। বসলেন না। তবে একটা অটোরিকশো করে নেবেন বরং। আপনার মতো মানুষকে দেখা করতে দেবে না? আপনি মিলিটারি অফিসার। কার্ড দেখালেই দেবে।…

বড় রাস্তার মোড়ে একটা অটোরিকশা পাওয়া গেল। মোহনলাল গণেশলাল অ্যান্ড কোম্পানির সাইকেল কারখানাটি বেশ বড়। গেটে তাগড়াই চেহারার সিকিউরিটি গার্ড আছে দুজন। গেটের লাগোয়া সিকিউরিটি অফিস। কর্নেল তার নেমকার্ড দিয়ে ইংরেজিতে বললেন, ম্যানেজার মিঃ বনোয়ারিলালের সঙ্গে দেখা করতে চাই।

সিকিউরিটি অফিসার প্রাক্তন ডিফেন্সকর্মী ঝটপট সেলাম ঠুকে ফেললেন এবং ফোনে কথা বললেন। এরপর বনোয়ারিলালের সঙ্গে দেখা করতে অসুবিধে হল না। কারখানাটি ভেতর দিকে। সামনে একতলা কয়েকটা ঘরের আড়াল। এগুলো অফিস ঘর এবং সুদৃশ্য, ছিমছাম। কিন্তু কিছু সেকেলে আদলও চোখে পড়ে। বনোয়ারিলাল সম্পর্কে বরুণের কাছে যেমনটি শুনেছিলেন, তেমনটি নন। মোটাসোটা, টাই-স্যুট পরা অমায়িক চেহারার ভদ্রলোক। যেন কত দিনের পরিচিত, এমন ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন। দিব্যি ইংরেজিতে কথাবার্তাও বলতে পারেন। কর্নেলকে বসিয়ে জানতে চাইলেন, হট না কোল্ড? তারপর বিদেশী সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিলেন।

ধন্যবাদ মিঃ লাল! কর্নেল চুরুট বের করে ধরালেন।

 বনোয়ারি বললেন, বলুন, কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?

আমার শ’তিনেক রেসের সাইকেল দরকার। আমার একটা খেলাধুলোর ক্লাব আছে। তাই…

বনোয়ারিলাল হাসলেন। এটা কারখানা। দুঃখিত কর্নেল সরকার। এখান থেকে সরাসরি আমরা কোনও অর্ডার নিই না। এজন্য আপনাকে কষ্ট করে আশাপুরায় যেতে হবে। ওখানে আমাদের সেলস কাউন্টার। ঠিক আছে। আমি ওখানে ফোনে বলে দিচ্ছি। আপনার অসুবিধে হবে না।

দেখুন, আপনার কাছে আসার উদ্দেশ্য, এক্সপোর্ট কোয়ালিটির সাইকেল মানে, যেগুলো বিদেশে বাতিল হয়ে ফিরে আসে…আমি শুনেছি, সেগুলো আপনারা বিক্রি করেন!

বনোয়ারিলালের হা হা হাসিতে কর্নেল থেমে গেলেন। বনোয়ারিলাল বললেন, শুনেছেন। তবে সঠিক শোনেননি। হাজার-হাজার সাইকেলের মধ্যে বড় জোর বিশ-পঁচিশটা কখনও-কখনও বাতিল করে বিদেশি কোম্পানি। এটা সব রফতানিতেই ঘটে থাকে। বোম্বেতে ওদের এজেন্ট কোয়ালিটি টেস্ট করে পাস করল। কিন্তু তাতে কী? মাল যখন পৌঁছুল, তখন হ্যান্ডলিঙে কিছু মালের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে দেখা গেল। স্বাভাবিক ব্যাপার। সেগুলো ফেরত আসে এবং স্থানীয় বাজারে আমরা বেচি।

শুনলুম, কয়েক মাস আগে অনেক এক্সপোর্ট কোয়ালিটির সাইকেল আপনারা বিক্রি করেছেন?

মাত্র শ’খানেক। হ্যান্ডলিঙে একটু-আধটু ড্যামেজ হয়েছিল, এই মাত্র!

 সেগুলো তো মেরামত করেই বেচতে হয়েছে?

হ্যাঁ। আবার কারখানায় এনে পার্ট বাই পার্ট খুলে মেরামত করে তবে বেচেছি।

কর্নেল দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, আপনাদের স্থানীয় বাজারে বিক্রির সাইকেল আমি দেখেছি। আমাদের পক্ষে তত কাজের হবে না। রেসের সাইকেল…।

বনোয়ারিলাল তার কথার ওপর বললেন, হ্যাঁ। স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য রেসের সাইকেলও আমরা তৈরি করি। আপনি আশাপুরায় পেয়ে যাবেন। দরদামে সুবিধে করেই দেওয়া হবে।

কিন্তু আপনাদের এক্সপোর্ট কোয়ালিটির সাইকেল সত্যি ভাল। আমরা সেজন্য অপেক্ষা করতে রাজি আছি।

বনোয়ারিলাল ফের তুমুল হেসে বললেন, তা হলে এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু কোনও নিশ্চয়তা নেই। এবার আমরা দুবাই থেকে অর্ডার পেয়েছি। শেখরা বড্ড খুঁতখুঁতে। তাই আমরা এবার খুব সতর্ক। লোডিং আনলোডিংয়ের জন্য নতুন কোম্পানির সঙ্গে কনট্র্যাক্ট করেছি। সরকারের রফতানিমুখী নীতি যথেষ্ট উদার। আমরা চাই না, ভারতের ভাবমূর্তি বিদেশে ক্ষুণ্ণ হোক।

বনোয়ারিলালের বক্তৃতার মাঝামাঝি কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। বরুণের দুর্ঘটনার কথা বলতে গিয়ে সংযত হলেন। বললেন, আপনাদের আশাপুরা সেলস অফিসে একটি বাঙালি মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। কেয়া সেন। তার কাছেই খবর পেয়েছিলুম…

সে তো দুর্ঘটনায় মারা গেছে। খুব দুঃখের ব্যাপার।

 মারা গেছে? সেকি!

বনোয়ারি দুঃখিতভাবে বললেন, বন্ধুদের সঙ্গে ক্লিফটনগঞ্জে পিকনিক করতে এসেছিল গত অক্টোবরে। ওখানে একটা পুরনো বাড়ি আছে গঙ্গার ধারে। পাথরের বাড়ি। তার নীচে খাদ। ছাদ থেকে পা হড়কে নীচে পড়ে যায়।

শুনে দুঃখিত হলুম। কর্নেল একটু ইতস্তত করে বললেন, তার কোনও আত্মীয় আপনার এই কারখানায় চাকরি করেন শুনেছিলুম?

হ্যাঁ। নগেনবাবু।

তাকে এখন কোথায় পাব বলতে পারেন? একটু সমবেদনা জানিয়ে যেতে চাই। কেয়া আমাকে দাদু বলে ডাকত। একটা স্নেহের সম্পর্ক ছিল ওর সঙ্গে।

ঘড়ি দেখে বনোয়ারিলাল বললেন, তিনটেয় শিফট ডিউটি শেষ। চলে গেছেন। এখন ওঁকে বাড়িতে পেতে পারেন। এক মিনিট ঠিকানা দিচ্ছি।

রাস্তায় একটু দাঁড়িয়ে কর্নেল ভাবলেন নগেনবাবুর বাড়ি আবার যাবেন কি না। কিন্তু আর গিয়ে নতুন কিছু জানার চান্স কতটুকু? তা ছাড়া লোকটি কেমন এবং কীভাবে তাকে নেবেন, বলা যায় না। একটা বড়ো ব্যাপার জানা হয়ে গেছে। আপাতত এটাই যথেষ্ট। কর্নেল বাসস্ট্যান্ড যাওয়ার জন্য একটা অটোরিকশোর প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলেন।

সন্ধ্যার মুখে বাসে আর তত ভিড় নেই। আজ শীতটা বেড়ে গেছে। সাড়ে পাঁচটায় গাঢ় ধূসরতা চারদিকে। টাউনশিপ থেকে সাইকেল রিকশো করে ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জের দিকে আসছেন, রাস্তায় বেলিংটন জেভিয়ারকে দেখতে পেলেন। রিকশা থামিয়ে সেখানেই নামলেন। ডাকলেন, মিঃ জেভিয়ার!

জেভিয়ার তাঁকে দেখে গম্ভীর মুখে বললেন, আই মাস্ট নট টক টু ইউ। গো অ্যাওয়ে! তারপর রাস্তার ধারে ঝোপের দিকে এগিয়ে গেলেন। হাতে সেই কাটারি।

কর্নেল বললেন, নাও দিস ইজ অ্যাবাউট মিস কেয়া সেন, মিঃ জেভিয়ার।

 গো অ্যাওয়ে! কিচনি হামকো মানা কিয়ি। আই মাস্ট নট টক টু ইউ।

 কেয়া সেন ওয়াজ অলসো মার্ডার্ড অ্যান্ড দা মার্ডারার ওয়াজ দা সেম ম্যান। মিঃ জেভিয়ার, রোজি অ্যান্ড কেয়া, বোথ অব দেম নিউ অ্যাবাউট সাম সিক্রেট ডিল অব দেয়ার কোম্পানি।

জেভিয়ার মুখ ঘোরালেন। হিংস্র জন্তুর মতো মুখ। হিসহিস শব্দে বললেন, অ্যান্ড নাও ইওর টার্ম, ম্যান! কিচনি হমকো বোলি।

বেলিংটন জেভিয়ার ঝোপের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কর্নেল একটু দাঁড়িয়ে থাকার পর হাঁটতে থাকলেন। জেভিয়ার এখনও টের পাননি, রোজির ঘরে চোর ঢুকেছিল।

চারুভবন এ-সন্ধ্যায় প্রচণ্ড স্তব্ধ। সাত্যকির ঘর থেকে মিউজিক বা টিভির কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ভগীরথের কাছে জানা গেল, অরীন্দ্র এখনও ফেরেননি আশাপুরা থেকে। রাণুর শরীর খারাপ। শুয়ে আছে। সাত্যকি পিয়ালিদের বাড়ি গেছে। সুশীলার কাছে কর্নেলের ঘরের চাবি। খবর পেয়ে সে ছুটে এল। তার মুখও গম্ভীর। বলল, আভি কফি লেকে আতি কর্নিলসাব। রাণুদিদির বুখার হয়েছে। রোজ-রোজ বিহানমে গঙ্গা আস্নান!

সে চলে যাওয়ার একটু পরে পিউ এল। বলল, আপনি কোথায় গিয়েছিলেন? থাকলে পরে এদের কীর্তিকলাপ স্বচক্ষে দেখতেন যত্তো সব ওয়াইল্ড অ্যানিমাল! বুড়োদা নিজের দিদিকে ঘুসি মারল! হরিবল! আমি আর পিয়ালি ওকে আটকাতে পারছিলুম না। শেষে ভগীরথদা এসে ট্যাকল করল। আই হেট সাত্যকি! হি ইজ আ ব্রুট।

কর্নেল আস্তে বললেন, ঝগড়াটা কী নিয়ে?

পিউ নাকের ডগা কুঁচকে বলল, কে জানে! দেয়ার ইজ সামথিং মিস্টিরিয়াস।….

.

১৬.

কেয়ার ডায়রিটা বন্ধ করে কর্নেল চুরুট ধরালেন। কালো সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ন্যায়শাস্ত্রে অবভাসতত্ত্ব বলে একটা কথা আছে। যা যেমনটি দেখাচ্ছে, তা বস্তুত তেমনটি নয়। এটা একটা ডায়রি বই। কিন্তু এতে কোনও ডায়রি নেই। আছে কিছু টাকার অঙ্ক লেখা। কেনাকাটা, পিসেমশাইকে টাকা পাঠানো, ব্যাঙ্কে কত জমা দেওয়া হল, এইসব হিসেব। হিসেব প্রবণতা কি সব চাকুরে মেয়েরই থাকে? এটা একটা সমীক্ষাযযাগ্য বিষয়। শোনা যায়, মেয়েরা নাকি পুরুষের তুলনায় হিসেবি। সত্যি কি? অরীন্দ্রের সংসার চালায় রাণু। তার কি কোনও হিসেবের খাতা আছে?

অবভাসতত্ত্বের প্রশ্নটা ফিরে এল। কেয়া সেন এবং রোজি জেভিয়ারের হিসেব বই আর ওই কালো সাইকেলটার মধ্যে আপাতদৃষ্টে সুদূরতম সম্পর্ক থাকার কথা নয়। অথচ…

বন্ধ দরজায় শব্দ এবং অরীন্দ্রের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল, কর্নেলসায়েব কি শুয়ে পড়েছেন?

কর্নেল দরজা খুলে বললেন, রাত নটায় আমার শুয়ে পড়ার কথা নয়। কখন ফিরলেন?

অরীন্দ্র বসলেন। একটু পরে বললেন, আধ ঘণ্টা আগে। প্রচণ্ড টায়ার্ড হয়ে পড়েছিলুম। বাসে গেলে ভাল করতুম। দু’ঘণ্টা ট্রেন লেট। আজ ঠাণ্ডাটাও বেড়েছে। ফিরে এসে ধকল সামলাতে সময় গেল।

প্রিয়র সঙ্গে দেখা হল?

অরীন্দ্র আরও গম্ভীর হয়ে বললেন, হ্যাঁ। আপনাকে বলতে এলুম, লিভ ইট। প্রিয়র ফাঁসি হোক। আমি আর এসবের মধ্যে নেই। যে পাপ করেছে, হি মাস্ট বি পানিল্ড।

কর্নেল হাসলেন। প্রিয় বলল সে গুলি ছুঁড়েছিল?

হ্যাঁঃ। তার নাকি মাথার ঠিক ছিল না। গাড়ির কাচ ভাঙা দেখে…ছেড়ে দিন। ও মরুক। ওর বউকে বলছি, বাবাকে গিয়ে ধরুক, জামাইকে বাঁচাবেন। অরীন্দ্র তেতো মুখে বললেন, আপনি ব্যাপারটা ভাবুন একবার। ভদ্রলোককে খবর দেওয়া হয়েছে। অথচ এ পর্যন্ত সাড়াশব্দ নেই। আফটার অল, জামাই!

আমার ধারণা, মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভাল নয়।

জানি। মেয়ে তার অমতে প্রিয়কে বিয়ে করেছে। তাই বলে এমন একটা বিপদে…উনি আবার নাকি অধ্যাপক! সায়েবি চালে থাকেন। ইউরোপ-আমেরিকায় লেকচার দিতে যান। ছোট মেয়েকে আমেরিকায় পড়তে পাঠিয়েছিলেন। বলে অরীন্দ্র এতক্ষণে সাইকেলটা দেখতে পেলেন। খাপ্পা হয়ে বললেন, এ ঘরে সাইকেল ঢোকাল কে? নিশ্চয় ভগীরথ? ওই আরেক মাথামোটা গবেট! এত বড় বাড়িতে ওই রদ্দি জিনিসটার জায়গা হল না। শেষে আপনার ঘরে ঢোকাল। দেখাচ্ছি মজা।

অরীন্দ্র উঠতে যাচ্ছিলেন, কর্নেল বললেন, সাইকেলটা আমিই রেখেছি। বোসসায়েব!

অরীন্দ্র হাসবার চেষ্টা করে বললেন, আপনি সাইকেল চেপে প্রজাপতি ধরতে যাবেন নাকি?

দেখা যাক।

ওটা কি একটা সাইকেল? বুড়ো ওটা ভগীরথকে দিয়েছে। ভগীরথ যখন সাইকেল চেপে যায়, মনে হয় ঠ্যাং-ভাঙা টাট্ট! অরীন্দ্রের স্বাভাবিক মেজাজ ফিরে এল। প্রিয়র কোম্পানির রিজেক্টেড মাল। বুড়োকে প্রেজেন্ট করেছিল। বুড়ো নিজেই সাইকেল। দুটো ঠ্যাং দুই চাকা, লক্ষ করেছেন? সবসময় গড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কী যেন কথাটা?

জগিং।

হ্যাঁ, জগিং! বলে আবার একটু গম্ভীর হলেন অরীন্দ্র। যাই হোক, বড় টায়ার্ড। আমি শুয়ে পড়ব সকাল-সকাল। আপনি আর প্রিয়র ব্যাপারে মাথা ঘামাবেন না। আপনি তো জানেন, আই অ্যাম আ ম্যান অব স্ট্রং মর্যাল প্রিন্সিপল।

রোজি জেভিয়ার এবং কেয়া সেনের মৃত্যুরহস্যের কথা আপনি বলেছিলেন বোসসায়েব!

অরীন্দ্র উত্তেজিতভাবে বললেন, ওটা আর রহস্য রইল কোথায়? অনির্বাণের মৃত্যুরহস্য যখন জানা গেল, তখন ও-দুটো ঘটনার আর কি ইমপর্টান্স রইল? কোনও লিংক রইল কি? ভেবে দেখুন। প্লিজ লিভ ইট।

অরীন্দ্র উঠে দাঁড়ালেন। কর্নেল বললেন, রাণু হঠাৎ অসুস্থ হয়েছে শুনলুম?

বাথরুমে পা হড়কে পড়ে সামান্য উন্ডেড। অরীন্দ্র গলার ভেতর বললেন। যেমন বুড়ো তেমনি রাণু। দুজনেই সবসময় জগিং করে বেড়ায়।

অরীন্দ্র বেরুলে কর্নেল বললেন, একটা কথা বোসসাহেব।

বলুন।

প্রিয় কি বলল কোর্টে কবুল করবে?

অরীন্দ্র বাঁকা হাসলেন। চার্জ করেছিলুম, সে সৎসাহস আছে তোর? কোর্টে বলতে পারবি কথাটা? তখন বলল, অ্যাডভোকেট বারণ করেছেন। অ্যাডভোকেটের সঙ্গে কথাটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উনি বললেন, আত্মরক্ষার জন্য গুলি ছুঁড়লে সাজার চান্স কম। কিন্তু প্রব্লেম হল, রিভলভারটার যে লাইসেন্স নেই!

মিসাইল এক্সপার্টদের রিপোর্ট এসেছে পাটনা থেকে?

 অ্যাডভোকেট বললেন, দু’একদিনের মধ্যে এসে যাবে।

অরীন্দ্র চলে গেলে কর্নেল দরজা বন্ধ করে দিলেন। টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে রোজিকে লেখা সেই চিঠিটায় মন দিলেন। রোজি এবং কেয়ার ব্যাপারে অরীন্দ্রের ধারণা সত্যি হত, যদি না এই চিঠিটা আবিষ্কার করতেন কর্নেল। কেউ রোজিকে টাকা দিতে ডেকেছিল। তার নামের আদ্যক্ষর কে অথবা আর। আর যদি হয়, তা হলে কি রাজেশ শর্মা–আশাপুরা ব্রাঞ্চের ম্যানেজার? একবার আশাপুরা যাওয়া দরকার। কেয়া কার সঙ্গে বেড়াতে এসেছিল এখানে, এ-ও একটা জরুরি প্রশ্ন। সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। আবার অবভাসতত্ত্ব মাথায় এল। কর্নেল সাইকেলটার দিকে তাকালেন। বনোয়ারিলাল বলছিলেন, হাজার হাজার সাইকেলের ভেতর কিছু সাইকেল লোডিং-আনলোডিংয়ের সময় ড্যামেজ হয়ে যায়। খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এটাও তা-ই, কিন্তু গড়নটা কেমন বেঢপ। কালো। রঙে ঢাকা পড়লেও বোঝা যায়, ফিনিশিং ভাল ছিল না। অসংখ্য এক্সপোর্ট কোয়ালিটির সাইকেলের মধ্যে ড্যামেজ এবং বাতিল হওয়া সাইকেলগুলো সবই কি এই সাইকেলটার মতো বেঢপ গড়নের? কর্নেল হতাশ বোধ করলেন। জীবনে কখনও এমন জটিল গোলকধাঁধায় ঢোকেননি। চোখ বুজে দাড়িতে আঁচড় কাটতে থাকলেন। কামড়ানো চুরুট থেকে ধোঁয়ার ফালি জানালার দিকে যেতে যেতে এঁকেবেঁকে মিলিয়ে যাচ্ছে। জলার দিক থেকে কোনও শীতকাতুরে শেয়ালের ডাক ভেসে এল…

কর্নেল ভোরে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে পিচরাস্তায় পা দিয়েছেন, পিছনে পিউয়ের সাড়া পেলেন। আজ কুয়াশা নেই তত। বললেন, তুমি কি আজ আমাকেই তোমার জগিংয়ের সঙ্গী করতে চাও, ডার্লিং?

পিউ বলল, নাহ্। মুড নেই।

সাত্যকিকে তুমি ত্যাগ করলে, নাকি সাত্যকি তোমাকে ত্যাগ করল?

হি ইজ আ ব্রুট, আই টোল্ড ইউ দ্যাটু। সত্যি বলছি কর্নেল, আমি ভীষণ ভী-য-ণ শম্।

মাই গুডনেস! তুমি কি ওর সঙ্গে কথা বলাও বন্ধ করেছ নাকি?

 আমি তত আনসিভিলাইজড নই।

সাত্যকি তোমাকে ডাকেনি?

ডেকেছিল। বললুম, মুড নেই। পিউ আস্তে বলল, চলুম। আপনাকে দেখিয়ে দিই কোথায় জামাইবাবুর গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করেছিল। জায়গাটা আপনার দেখা। দরকার।

হাঁটতে হাঁটতে কর্নেল বললেন, ভাই-বোনে কাল কী নিয়ে বেধেছিল জানতে পেরেছ?

কারও পার্সোনাল ব্যাপারে আমার মাথাব্যথা নেই। এদের ফ্যামিলিটা কেমন অদ্ভুত। বাইরে বাইরে মডার্ন পালিশ, ভেতরে একেবারে প্রিমিটিভ–গাঁইয়া! আমি কল্পনাও করতে পারিনি…পিউ থেমে গেল হঠাৎ।

কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে বললেন, ক্রিসমাস গেম! ক্রিসমাস… জিগজ্যাগ! অসাধারণ!

হাঁসের ঝাঁক দেখে আপনি কী আনন্দ পান?

আনন্দ অনির্বচনীয়, ডার্লিং! হিমালয় অঞ্চলের হাঁস সাইবেরিয়ান হাঁসের মতো পালাই পালাই ভাব নিয়ে দায়সারা তীর্থ করতে আসে না। লুক, লুক! ভোরের আকাশকে চাবুক মারছে কেউ।

কর্নেল! চলুন না আজ বার্ডস্যাংচুয়ারি দেখে আসি। সেদিনই গণাদার গাড়িতে যাওয়া যেত। রাণুদি বললেন, ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। চান্স মিস করলুম। তারপর তো আনুদা মার্ডার হয়ে গেল। পিউ শ্বাস ছাড়ল জোরে।

কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে বললেন, গণনাথবাবুর গাড়িতে যাওয়া যেত কবে?

যে-রাতে আনুদা মার্ডার হয়, সেদিন বিকেলে ইরিগেশন ক্যানেলের ওখানে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ দেখি গণাদার গাড়ি। লোকেশন দেখতে এসেছে বলল। আপনাকে তো অলরেডি বলেছি সে-কথা।

বয়স! কর্নেল একটু হাসলেন। আজকাল সব কথা মনে থাকে না। হুঁ, তুমি বলছিলে বটে, ওয়াটারড্যামের পার্কে খুব ছোটাছুটি করেছ! সাবর্ণী তোমার আণুদাকে দেখে রিঅ্যাক্ট করেনি?

বিবি আমাদের সঙ্গে যায়নি। দাদামশাই তাকে ওই কুঠিবাড়ি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। গণাদার গাড়িতে আমাদের বাড়ি পৌঁছে দিল। বিবি আর দাদামশাই তার অনেক আগে বাড়ি ফিরেছিলেন।

তোমার আনুদা সঙ্গে আসেনি নিশ্চয়?

 নাহ। বিবিকে দেখতে আসবে নাকি? পিউ বাঁকা হাসল। বিবি ওকে প্যাক দিয়েছে, আর ও আসবে বিবিকে দেখতে? আর, গণাদা তো পুরো ব্যাপারটা জানে। আনুদা আনপ্রেডিক্টেবল এলিমেন্ট ছিল ঠিকই। কিন্তু গণাদা তাকে আসতে দেবে কেন? সিন ক্রিয়েট হওয়ার চান্স ছিল না? তাছাড়া গণাদাও আনুদাকে ভয় পেত। রাণুদি আর আমি আসতে বললুম গণাদাকে। বলল, পরে যাবে। তার মানেটা বুঝতে পারছেন?

গণনাথবাবুর ড্রাইভার পৌঁছে দিয়েছিল তোমাদের?

 গণাদার ড্রাইভার নেই। নিজেই ড্রাইভ করে। ভীষণ কিপটে।

 তাহলে কে পৌঁছে দিয়েছিল?

কে একটা লোক। চিনি না। জাস্ট অ্যান অর্ডিনারি টাইপ। তবে ভাল ড্রাইভ করে।

রামলাল?

 পিউ তাকাল। একটু পরে বলল, হ্যাঁ। গণাদা রামলাল বলে ডাকছিল মনে পড়ছে। আপনি চেনেন?

কর্নেল আবার আকাশ দেখতে দেখতে বললেন, বড্ড বেশি লাল। তবে রামলালেও একটি আর আছে। কিন্তু সে কি ইংরেজিতে চিঠি লিখতে পারে? প্রব্লেম!

বুঝলুম না।

আমিও বুঝি না। চেজিং আফটার সো মেনি রেড হেরিংস।

ভ্যাট! আপনার সবসময় হেঁয়ালি। বলে পিউ থমকে দাঁড়াল। ডাইনে তাকিয়ে রইল।

কর্নেল ঘুরে বললেন, রহস্যজনক কিছু দেখতে পাচ্ছ কি?

সেই জায়গাটা খুঁজছি। পিউ এগিয়ে গেল রাস্তার ধারে ঘন ঝোপগুলোর দিকে। তারপর এক টুকরো কাচ কুড়িয়ে নিয়ে বলল, এই যে এখানে। দেখতে পাচ্ছেন তো এই ঝোপগুলো না থাকলে জামাইবাবুর কী সাংঘাতিক অবস্থা হত?

কর্নেল তার কাছে গেলেন। অজস্র কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে আছে ঘাসে। চারপাশটা দেখে নিয়ে বললেন, প্রিয় বুদ্ধিমান। কিন্তু এই ঝোপগুলোও তাকে বাঁচাতে পারত না, যদি স্টিয়ারিংও অকেজো হয়ে থাকত। স্টিয়ারিং তাকে বাঁচিয়েছে। তা না হলে কী ঘটত লক্ষ করো! লুক ডার্লিং!

কর্নেল ঝোপের ভেতর গিয়ে দাঁড়ালেন। পিউ তার কাছে গিয়ে বলল, কী?

রাস্তাটা ওখানে বেঁকে গেছে। বাঁকের মুখে সব রাস্তার বাঁপাশ একটু ঢালু রাখা হয়। গতিশীল কোনও জিনিস হঠাৎ বেঁকে গেলে ব্যালান্স হারায়। সেই ব্যালান্স বজায় রাখতেই এই ব্যবস্থা। প্রকৃতির নিয়ম আমরা বদলাতে পারি না, পিউ! নিয়মটা জেনে তাকে নিয়ন্ত্রণ করি।

পিউ হাসল। আপনি মাঝে মাঝে বড্ড ফিলসফি আওড়ান।

জিভ কেটে মাথা নেড়ে কর্নেল বললেন, সায়েন্স ডার্লিং, সায়েন্স!

কিন্তু ব্যাপারটা কী?

বাঁকের বাঁদিকে জলাটা দেখতে পাচ্ছ না? ওই জলার ধার দিয়ে আমরা সেদিন রাস্তায় উঠেছিলুম। পিউ দেখে নিয়ে একটু চমকে ওঠার ভঙ্গিতে বলল, জামাইবাবু জোর বেঁচে গেছে!

হুঁ! স্টিয়ারিং অকেজো হয়ে গেলে গাড়িটা এই ঝোপে ঢোকানো যেত না। বাঁকের মুখে গিয়েই টাল খেয়ে জলে পড়ার চান্স ছিল। কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রাখলেন ফের। একটু পরে সেটা নামিয়ে বললেন, প্রিয় বেঁচে গেল দেখে যে তাকে অ্যাকসিডেন্ট ঘটিয়ে মারতে চেয়েছিল, সে একটা জিনিস শেখে। স্টিয়ারিংকেও অকেজো করে দিতে হবে। বরুণের বেলায় দুটো কাজই সে করেছে। তাই বরুণ বাঁচেনি।

পিউ তার মুখের দিকে তাকিয়েছিল দম আটকানো গলায় বলল, জামাইবাবুকে মারতে চেয়েছিল? কী বলছেন আপনি!

কর্নেল কোনও জবাব না দিয়ে ঝোপঝাড়ের আরও ভেতরে ঢুকলেন। বাইনোকুলারে জলাটা দেখে নিয়ে ফিরে এলেন পিউয়ের কাছে। বললেন, বড্ড বেশি শিশির।

আপনি আমার কথার উত্তর দিলেন না!

 দিয়েছি।

পিউ জেদি ভঙ্গিতে বলল, আনুদা ছাড়া জামাইবাবুর আর কোনও শত্রু ছিল না। কিন্তু বরুণদার অ্যাকসিডেন্টের আগেই আনুদা ডেড। সত্যিই ইউ আর চেজিং আফটার আ রেড হেরিং।

কর্নেল রাস্তায় হাঁটতে থাকলেন।

পিউ সঙ্গ নিয়ে বলল, কোম্পানির গাড়ি মানেই রদ্দি জিনিস। এদের সাইকেলটার মতো, পোলিশ ইজ কারেক্ট।

কুঠিবাড়ির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালেন কর্নেল। বললেন, সাত্যকি ফিরে আসছে।

পিউ শক্ত মুখে বলল, আই ডোন্ট বার অ্যাবাউট হিম।

ডার্লিং! ঘুসি-লড়িয়েরা একটু গোঁয়ারটাইপ হয়।

 তাই বলে দিদির গায়ে হাত তুলবে?

আমার ধারণা, ঘুসি-লড়িয়েদের মধ্যে একটা অন্ধ শক্তি কাজ করে। অন্ধ এবং আদিম শক্তি কোনও-কোনও সভ্য মানুষের মধ্যে এখনও থেকে গেছে। অ্যানথ্রপয়েড গ্রুপ যে ক্রমশ হোমোসেপিয়েন এবং তারপর হোমোসেপিয়েন সেপিয়েন হতে পেরেছে, তা শুধু দুটো হাতের সাহায্যে। মানুষের হাত সভ্যতার মূল উপাদান। মানুষের হাত থেকেই ইনটেলিজেন্সের উদ্ভব। লেট মি এক্সপ্লেন…।

পিউ বিরক্ত হয়ে বলল, ও-ও কর্নেল! প্লি-ই-জ!

সাত্যকি পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে হাত নেড়ে গেল। কর্নেল হাসলেন। দেখলে তো? সাত্যকি হাত দিয়ে আমাদের সম্ভাষণ করে গেল। হাত কথা বলে ডার্লিং! হাত জিনিসটা সামান্য ভেবো না। যে পৃথিবীকে তুমি দেখছ, মানুষের হাতের ছাপ তার আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে আছে। মানুষ যা কিছু করে, তাতে তার হাতের ছাপ থেকে যায়।

ইউ আর আ স্ট্রেঞ্জ পার্সন, ইনডিড।

সরি ডার্লিং! কর্নেল আবার হাঁটতে থাকলেন। সবে হাল্কা সোনালি আলোর রঙ পড়েছে পারিপার্শ্বিক ধূসরতায়। একটু পরে বললেন, তুমি বার্ড-স্যাংচুয়ারি। দেখতে যেতে চাইছিলে। যাব। তবে তার আগে একবার ইরিগেশন বাংলোয় যেতে চাই। গণনাথবাবুর সঙ্গে আলাপের ইচ্ছা।

পিউ দাঁড়িয়ে গেল। আমি আপনার সঙ্গে যাব না। ক্যানেল ব্রিজে ওয়েট করব।

ঠিক আছে।

আপনি বেশি দেরি করলে আমি কাট করব কিন্তু।

নাহ্। দেরি হবে না।

 পিউ ব্রিজে পৌঁছে জলের দিকে ঝুঁকে রইল। কর্নেল বাংলোর দিকে এগিয়ে গেলেন। গেটের কাছে পৌঁছুলে রামলাল হন্তদন্ত এসে স্যালুট ঠুকল। পরনে খাকি পশমি ওভারকোট। মাথায় আঁটো মাফলার। আইয়ে, আইয়ে কর্নিলসাব!

ফিল্ম ডাইরেক্টর সেনসাব উঠা?

জি। আজ শ্যুটিং হোগি, মালুম।

 শর্মাজি?

 রামলাল তাকাল। একটু পরে বলল, কাল শৰ্মাসাব আশাপুরা গয়ে হেঁ।

হাম সেনসাবকা সাথ মিলনা চাহতা, রামলাল!

এক মিনিট ঠর যাইয়ে!

রামলাল চলে গেল বাংলোর বারান্দায়। কর্নেল গেটের ভেতরে ঢুকলেন। গণনাথ সেনকে বেরুতে দেখলেন বারান্দায়। কর্নেল এগিয়ে গিয়ে সহাস্যে। বললেন, নমস্কার মিঃ সেন! অসময়ে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। কিন্তু আপনার মতো প্রখ্যাত মানুষের সঙ্গে আলাপের সুযোগ ছাড়তে পারলুম না।

বারান্দায় উঠেই কর্নেল তাকে একটি কার্ড দিলেন। গণনাথ কার্ডটায় চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘দা নেচারিস্ট’ মানে?

নেচার অবজার্ভার। কর্নেল বারান্দার বেতের চেয়ারে বসলেন। প্রকৃতিপ্রেমিক বলতে পারেন।

আপনি কোথায় উঠেছেন?

ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে। বনজঙ্গলে টো-টো করে ঘুরতে আসি।

রামলাল কর্নেলকে আপ্যায়নের জন্য কিচেনের দিকে চলে গেল। গণনাথ একটু হেসে বললেন, আপনি রিটায়ার্ড কর্নেল। নর্থ ইন্ডিয়ায় দেখেছি সামরিক অফিসাররা রিটায়ার করে ফার্ম-টার্ম করেন কান্ট্রিসাইডে। আপনি এই এরিয়ায় তেমন কিছু করলেও পারেন। করে ফেলুন। সিরিয়াসলি বলছি। সত্যিই বিউটিফুল ন্যাচারাল স্পট। ছবিতে ডিটেলস ধরতে চাইছি।

আপনার ছবির কাজ কতদূর এগোলো?

 সামান্যই। মধ্যে দুটো মিসহ্যাপের জন্য…

শুনলুম। আপনার ইউনিটের এক ভদ্রলোক নাকি খুন হয়েছেন এবং খুনি নাকি ধরাও পড়েছে। কী ব্যাপার বলুন তো?

গণনাথ অন্যমনস্কভাবে বললেন, আজকাল যা হচ্ছে। নারীঘটিত ব্যাপার। মাঝখান থেকে আমার টাইম অ্যান্ড মানি দুই-ই লস। ফাইন্যান্সার বিগড়ে গেলেই প্রব্লেম। ওঁদের এক অফিসার আবার গত পরশু রাত্তিরে অ্যাক্সিডেন্টে মারা পড়েছেন। ড্রাংক অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন। আমি ভাবনায় পড়ে গেছি। পর-পর দুটো মিসহপ।

কর্নেল হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। আস্তে বললেন, শুনলুম দুটো কেসেই একটা কমন ব্যাপার পুলিশ লক্ষ করছে–গাড়ির ব্রেক ফেল। আপনি আপনার গাড়ি সম্পর্কে সাবধান হোন, মিঃ সেন!

গণনাথ চমকে উঠেছিলেন। বললেন, কী বলতে চান আপনি?

 কর্নেল আরও আস্তে বললেন, আপনি বিপন্ন মিঃ সেন!

তারপর বারান্দা থেকে নেমে লনের নুড়িতে শব্দ তুলতে তুলতে চলে এলেন। গণনাথ পাথরের মূর্তি হয়ে বসে আছেন! রামলাল কিচেনে কর্নিলসাবের জন্য কফি তৈরিতে ব্যস্ত..

.

১৭.

 কর্নেলকে দেখে পিউ ঠোঁটের কোনায় হাসল। পাত্তা দিল না তো? আমি। জানতুম।

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, ভড়কে দিয়েছি।

 পিউ ভুরু কুঁচকে তাকাল। হোয়াট্‌স দ্যাট?

দ্যাটস্ দ্যাট, ডার্লিং! চলো দেখি, টাঙা বা সাইকেলরিকশো পাই নাকি। বার্ড-স্যাংচুয়ারি অনেকটা দূরে।

পিউ বাংলোর দিকে ঘুরে চাপাস্বরে বলল, কর্নেল! গণাদা কামিং!

কর্নেল পালানোর ভঙ্গি করে বললেন, জগিং পিউ! কোনও কোনও সময়ে জগিং খুব কাজে লাগে।

তার মুখে কৌতুক ঝলমল করছিল। পিউ বলল, আপনাকে কিন্তু সার্কাসের জোকার দেখাচ্ছে! আপনি কি সত্যি জগিং করবেন নাকি?

কর্নেল তার হাত ধরে টানলেন। বার্ড-স্যাংচুয়ারি পরে। আপাতত ক্লিফটন হাউস চলো!

পিউ গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে গেল। লেট মি ফেস হিম।

গণনাথ ক্যানেলব্রিজে পৌঁছে ডাকছিলেন, ও মশাই! শুনুন, শুনুন।

কর্নেল বাইনোকুলারে আকাশ দেখতে থাকলেন। গণনাথ কাছে এলে পিউ হিসহিস করে বলল, একটু ভদ্রতা করে তোমার কথা বলা উচিত গণাদা! জানো উনি কে?

গণনাথ শক্ত মুখে বললেন, প্রিয়কে বাঁচানোর জন্য তোমরা প্রাইভেট ডিটেকটিভ এনেছ। কিন্তু ভদ্রলোকের কী সাহস যে আমাকে থ্রেটন করতে যান?

কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে বললেন, ছি ছি মিঃ সেন! ডিটেকটিভ কথাটা বিচ্ছিরি গালাগাল। আমি একজন নেচারিস্ট।

থামুন মশাই! আপনার নেমকার্ড আমি পুলিশকে দিচ্ছি। একজন কর্নেল বলে নিজের পরিচয় দেওয়া সাংঘাতিক ক্রাইম, সেটা আপনার জানা উচিত। গণনাথ দুপা এগিয়ে বললেন, আর এই ছদ্মবেশ!

কী সর্বনাশ। আপনি কি আমার দাড়ি মেড ইন চিৎপুর ভাবছেন নাকি?

গণনাথ রুক্ষস্বরে বললেন, আমি ফিল্মমেকার। মেক-আপের ব্যাপার আমাকে বোঝাতে আসবেন না।

পিউয়ের নাসারন্ধ্র স্ফীত। ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছিল। ফেস করে বলল, গণাদা, ইউ আর গোয়িং টু ফার।

গণনাথ তাকে গ্রাহ্য করলেন না। কর্নেলকে চার্জ করলেন, আমায় ভয় দেখিয়ে কাজ হবে না মশাই। বলুন কেন?

তাকে থামিয়ে কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, জানি। আপনার এক ভাই এস এন সেন বোম্বে ডক এরিয়ার হাইর্যাংকিং কাস্টম্স্ অফিসার। কাজেই মোহনলাল গণেশলাল অ্যান্ড কোম্পানি আপনাকে ঘটাবে না। কিন্তু মানুষমাত্রেই একচক্ষু হরিণ মিঃ সেন।

গণনাথের তেজ উবে গেল। ন্যাতানো কাকতাড়ুয়ার মতো দেখাচ্ছিল তাকে। একটু পরে আস্তে বললেন, দেন ইউ আর আ প্রাইভেট ডিটেকটিভ।

আবার আপনি আমাকে গাল দিচ্ছেন কিন্তু!

গণনাথ ভাঙা গলায় বললেন, দেন হু আর ইউ?

 কার্ডে যা লেখা আছে, আমি তা-ই।

আপনি দেখছি ডিপওয়াটার ফিশ! ওক্কে! গণনাথ কঁপা কাঁপা হাতে সিগারেট ধরিয়ে বললেন, দেখুন, ফ্র্যাংকলি বলছি। প্রিয়র মতো আমি এই কোম্পানিকে ব্ল্যাকমেল করি না। কোম্পানি আমাকে ছবি করার টাকা দিচ্ছে, তা ঠিক। আর এও ঠিক, আমি একটা আর্টফিল্ম করতে চাই। কোম্পানির সঙ্গে আমার রফা হয়েছে গিভ অ্যান্ড টেক প্রসেসে। ওরা মাল এক্সপোর্ট করবে। বোম্বেতে কাস্টমস্ আজকাল বড় ঝামেলা করে। সেটা যাতে না হয় আমি সত্যেনকে যেন একটু বলে রাখি। দ্যাটস মাছ। এর মধ্যে কোনও লুকোচুরি নেই।

 কোম্পানি কি ঠিক এই রফা অনুসারেই আপনার বডিগার্ড অনির্বাণবাবুর মাইনে জোগাত?

দ্যাটস্ আ টোটাল লাই। আপনার সোর্স মিথ্যাবাদী।

কর্নেল চুরুট বের করে ধরালেন। বললেন, কেন আপনার বডিগার্ড দরকার হয় মিঃ সেন?

গণনাথ মাথা নেড়ে বললেন, এগেন ইউ আর মিসইনফর। আনু আমার বডিগার্ড ছিল না। সে বেকার ছেলে। তাকে স্নেহ করতুম। হ্যাঁ আনু ফেরোসাস টাইপ ছিল। পিউ চিনত ওকে। জিজ্ঞেস করুন। কিন্তু আমি বডিগার্ড রাখব কেন? পিউ, বল্ তুই!

পিউ মুখ ঘুরিয়ে দূরে তাকিয়ে রইল। কর্নেল চুরুট কামড়ে ধরে একটু হাসলেন। এনিওয়ে। মিঃ সেনকে এ বৃদ্ধের সদুপদেশ, যখনই গাড়ি নিয়ে বেরোবেন, ব্রেক-স্টিয়ারিং ঠিক আছে কি-না দেখে নেবেন।

আবার সেই কথা? আমার কোনও বিপদ হবে না।

এবার পিউ আস্তে বলল, আনুদার কাছে শুনেছিলুম, তুমি কোন ফিন্যান্সারকে নাকি ফসিয়েছিলে। সে জন্য ওকে সঙ্গে নিয়ে ঘোরো। আমি দেখেছি আনুদার একটা ফায়ার আর্মস ছিল!

গণনাথ হাসবার চেষ্টা করে বললেন, ছিল তো সেটা গেল কোথায়?

জামাইবাবুর গাড়িতে যেটা পাওয়া গেছে, সেটাই হবে। পিউ চার্জ করার ভঙ্গিতে বলল, নিশ্চয় তুমি সে-রাত্তিরে আনুদার খোঁজে বেরিয়েছিলে। হয় সেটা আনুদার সঙ্গে ছিল, নয় তো তুমি ওর ব্যাগ থেকে নিয়ে এসেছিলে। জামাইবাবুকে ফাঁসানোর জন্য গাড়ির ভেতর রেখে দিয়েছিলে।

তুই একটা পাগলি। প্রিয়র সঙ্গে আমার কিসের শত্রুতা?

কর্নেল হা-হা করে হেসে বললেন, তা হলে পিউয়ের সিদ্ধান্ত, মিঃ সেন ডেডবডিটা ফেলে দিয়ে এসেছিলেন!

গণনাথ সায় পেয়ে বললেন, বলুন আপনি! কী বলছে তা জানে না। আনুর বডি বয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমার আছে? দ্যাখ পিউ তুই আগাগোড়া ছিলি সেদিন। আমি প্রথমে পুলিশকে প্রিয়র কথা বলেছিলুম কি না বল। অনেস্টলি বল! কে বলল রক্তক্ত, গাড়ির কাঁচভাঙা, এসব কথা?

পিউ বলল, বুড়োদার বুদ্ধিসুদ্ধি না থাকতে পারে, তুমি ট্যাক্স করলেই পারতে!

ইম্পসিবল! পুলিশ রক্তের কথা শুনেই জিপ ছোটাল। আই ওয়াজ হেলপূলেস! গণনাথ মুখে দুঃখের ছাপ এনে বললেন। তাও প্রিয় বেঁচে যেত। কারণ গাড়ির ওখানে রক্তের দাগ তখন ছিল না। কিন্তু প্রিয়র পকেটে আনুর লেখা চিঠি, তারপর গাড়ির ভেতর ফায়ার আর্মস! আমি কী করতে পারি?

কর্নেল বললেন, ফায়ার আর্মসটা কি আপনি দেখেছেন মিঃ সেন?

নাহ্। গণনাথ মাথা নেড়ে বললেন, এটা একটা পুলিশ কেস! ভুলে যাবেন না। সবটাই ওদের হাতে।

আপনি অনির্বাণবাবুর ফায়ার আর্মসটা দেখেছেন নিশ্চয়?

নেভার। ছিল, জানতুম–দ্যাটস মাচ। আমি ছবি ছাড়া কিছু বুঝি না। অন্য কিছু নিয়ে মাথা ঘামাই না। আপনি আমাকে যাই ভাবুন। আই অ্যাম টপ টু বটুম্ আ ফিল্মমেকার। গণনাথ সিগারেটটা পিচে ছুঁড়ে ফেলে বললেন, সে জন্যই আপনার হঠাৎ ওই অদ্ভুত কথাটা শুনে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলুম। তারপর আমার রাগ হল। চার্জ করতে ছুটে এলুম। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি!

থ্যাংকস মিঃ সেন! চলি। বলে কর্নেল পা বাড়ালেন। পিউ এগিয়ে গেল।

গণনাথ ডাকলেন, শুনুন।

 বলুন মিঃ সেন।

আনুর কিলারকে আপনি খুঁজে বের করতে পারলে ইউ উইল বি রিওয়ার্ডেড!

আমি নেচারিস্ট, মিঃ সেন! ডিটেকটিভ নই। আই রিপিট, কথাটা গালাগালি।

ইউ আর আ স্ট্রেঞ্জ ম্যান!

আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

বেশ। কিন্তু এই কেসে আপনার কী ইন্টারেস্ট?

 প্রিয়র দাদামশাই আমার বন্ধু।

গণনাথ শুকনো হেসে পা বাড়ালেন। কর্নেল তখনও দাঁড়িয়ে আছেন। পিউ সামান্য এগিয়ে একটা ঝোপ থেকে ফুল ছিঁড়ছে। হঠাৎ কর্নেল ডাকলেন, মিঃ সেন! আর একটা কথা। কেয়া সম্পর্কে।

গণনাথ দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালেন।

কেয়া সেনকে আপনি চিনতেন। সম্পর্কে আপনার বোন ছিল সে।

 কিছুক্ষণ পরে গণনাথ বললেন, ইউ নো মেনি থিংস।

 ইয়া। দ্যাটস মাই হবি–টু নো অ্যাবাউট দা পিপল হু আর কিলড!

 কেয়া ওয়াজ নট কিলড। জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট।

 কেয়াকে ধাক্কা মেরে কুঠিবাড়ির ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ইউ নো দ্যাট ওয়েল!

গণনাথ নিষ্পলক তাকালেন। পুরু চশমার কাঁচে সোনালি রোদ্দুর ঠিকরে পড়ল।

কর্নেল একটু হাসলেন। কেয়া তার কোম্পানির কিছু গোপন তথ্য জানত। মৃত্যুর আগে সেই আপনাকে আপনার ছবির ফিন্যান্সার জুটিয়ে দিয়েছিল। কারেক্ট?

গণনাথ কোনও জবাব দিলেন না।

কেয়ার দেওয়া গোপন তথ্যের জোরে তো বটেই, তা ছাড়া আপনার এক আত্মীয় এস এন সেন বোম্বে ডকে কাস্টমস অফিসার-আপনিও মোহনলাল গণেশলাল কোম্পানিকে দোহন করে আর্ট ফিল্মের খেলায় নেমেছেন এবং এ জন্যই আপনার বডিগার্ড দরকার হয়। কর্নেল আঙুল তুললেন বাংলোর দিকে। আপনার নতুন বডিগার্ড নজর রেখেছে। লুক! কিন্তু মিঃ সেন, মানুষ স্বভাবত। একচক্ষু হরিণ। বড্ড বেশি ঝুঁকি নিয়েছেন। সে জন্যই বলেছি, আপনি বিপন্ন।

গণনাথ একটু কাসলেন। কিছু বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করলেন। কিন্তু বললেন না।

ইটস আ ডেঞ্জারাস গেম, মিঃ সেন!

বলে কর্নেল হন্তদন্ত হাঁটতে থাকলেন। কিছুটা এগিয়ে একবার ঘুরে দেখলেন, গণনাথ ব্রিজের রেলিং ধরে নীচে জলের দিকে তাকিয়ে আছেন। পিউ খুশিখুশি মুখ করে বলল, হেভি দিয়েছেন কর্নেল! সত্যিই আপনি এক আশ্চর্য মানুষ। রাণুদি আপনার সম্পর্কে বলত। আমি ভাবতুম, গল্প! সে হাসতে লাগল। হেভি শ! এক্কেবারে ফ্ল্যাট হয়ে গেছে গণাদা।

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, এ বয়সে উত্তেজনা মানুষকে ক্লান্ত করে। বার্ড স্যাংচুয়ারি আজ বরং থাক, ডার্লিং! খিদেও পেয়েছে। ফেরা যাক।

পিউ বলল, আমারও মুড নেই। বিবিকে গিয়ে কতক্ষণে সব বলব তাই ভাবছি। কিন্তু তা হলে দেখুন, আমি বলেছিলুম গণাদা হিপোক্রিট। মিলে গেল!

কর্নেল রাস্তার ধারে ঝোপে একটা প্রজাপতি দেখে থমকে দাঁড়ালেন। হাতের স্টিক থেকে নেট বেরুতেই প্রজাপতিটা উড়ে গেল। ধূসর রঙের প্রজাপতি, ডানায় কালো এবং লাল ফুটকি।

পিউ বলল, আপনার সেই মাফিয়া লিডার নাকি? ও কর্নেল!

 নাহ।

আপনাকে ভীষণ পামকিন দেখাচ্ছে কিন্তু!

 হোয়াটস দ্যাট, ডার্লিং?

বুড়োদার টার্ম। কী আশ্চর্য! আপনাকেই তো বলছিল ঠাকুর্দার পামকিন ফেস!

হুঁ, মনে পড়ছে। তোমাকেও বলেছিল পামকিন ফেস।

বাট নাও আই অ্যাম হ্যাপি। আমার নাচতে ইচ্ছে করছে। ফিরে গিয়ে বুড়োদার ঘরে টেপ চালিয়ে দেব। ব্রেকড্যান্স, কর্নেল! ফানি বাট একসাইটিং! ড্যান্স টিল ইউ ডাই।

গণনাথ সেনের লেখা চিঠিটা কেয়ার কিটব্যাগ থেকে আত্মসাৎ করার পর থেকে যে উত্তেজনা জমে উঠেছিল, তার বিস্ফোরণ ঘটার ফলে এই ক্লান্তি। ঘরে ফিরে আবার চিঠিটা খুলে পড়লেন কর্নেল! স্পষ্ট করে কিছু না লিখলেও আভাস আছে, কোম্পানির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ছবির জন্য টাকা ঢালতে রাজি হয়েছেন। সে জন্য কেয়াকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তোমাকে বলেছিলাম, ক্যামেরা আমার কলম। দেখবে কী করি। তবে তুমি সাবধানে থেকো। আমিও তোমার কথামতো সাবধানে এগোব। তুমি সত্যেনের কথাও বলেছিলে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, সত্যেন বোম্বের ডাক এরিয়ার চার্জে আছে। তোমার কোম্পানির বড় কর্তা হাতে স্বর্গ দেখলেন। কাস্টমসের এস এন সেন আমার ভাই শুনে প্রচণ্ড খাতির হল। তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ রইলাম। দেখিয়ে দেব আর্ট ফিল্ম বলতে কী বোঝায়…ইনল্যান্ড চিঠিটা সেপ্টেম্বরে লেখা। কেয়া মারা যায় অক্টোবরের গোড়ায়। বোকা মেয়ে!

অরীন্দ্র এলেন। দুঃখিত মুখে বললেন, একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট খাওয়া হচ্ছে না। বেড়ানো হচ্ছে না। মনমেজাজ ভাল নেই। চুপচাপ শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। আজ কতদূর ঘুরলেন?

ইরিগেশন বাংলো পর্যন্ত। রাণুর শরীর কেমন?

অরীন্দ্র আড়ষ্টভাবে হাসলেন। শি ইজ অলরাইট। আসছে দেখা করতে।

আজ গঙ্গাস্নানে যাননি?

সব ছাড়তে পারি, ওটা নয়। রাণুরও তা-ই। আছাড় খেয়ে কপালের একটা পাশ একটু ফুলে উঠেছিল। এখন কমে গেছে। অরীন্দ্র কর্নেলের দিকে তাকালেন। আপনাকে বড় গম্ভীর দেখাচ্ছে। কী ব্যাপার?

কর্নেল পোড়া চুরুটটা অ্যাশট্রেতে ঘসে নিভিয়ে বললেন, একবার আশাপুরা যাব। আপনার সেই অ্যাডভোকেট ভদ্রলোকের নাম-ঠিকানা দরকার।

অরীন্দ্র একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, আপনি সহজে ছাড়তে চাইবেন না, আই নিউ দ্যাট। ঠিক আছে। লিখে নিন, এম আর সিনহা। মহিমারঞ্জন সিনহা। বাঙালি। আপনার কথা বলেছি ওঁকে। হুঁ–এইট, চুড়িওয়ালা লেন, আশাপুরা। এটা বাড়ির ঠিকানা। গিয়ে আর বাড়িতে পাবেন না। কোর্টের বার লাইব্রেরিতে পেয়ে যাবেন। খুব নামকরা ল’ইয়ার। এক সময় হোল বিহারে উকিল ডাক্তার এসব বলতে শুধু বাঙালিই বোঝাত। এখন আর বাঙালির সে রোয়াব নেই। টিমটিম করে জ্বলছে। বুড়ো আর রাণু প্রায়ই আমাকে সাধে, কলকাতায় চলে যাই ঘরবাড়ি বেচে। মাথা খারাপ? আমি মরলে তোরা যাস। তার আগে নয়। আপনি যাই বলুন, কলকাতা আস্ত একটা পাগলা গারদ। গেলেই আমার বোধবুদ্ধি গুলিয়ে যায়। অবশ্য আপনার নার্ভ স্ট্রং।

কর্নেল বললেন, বাসেই যাই বরং।

হুঁ। বাস ভাল। কিন্তু বড্ড ভিড় হয়। সে জন্য আমি ট্রেনে যাই। সময় লাগুক, কমফোর্টেব জানি!

বেরুনোর সময় রাণু এলেন। বাঁ কপালের একখানে ইঞ্চিটাক বাদামি রঙের ছোপ লক্ষ করলেন কর্নেল। সাত্যকির ঘুসির চিহ্ন। ছেলেটা গোঁয়ার। ঘুসি লড়িয়েরা এমনই হয় নাকি। কর্নেল বললেন, সুশীলা বলছিল জ্বর। পরে শুনলুম বাথরুমে আছাড় খেয়েছে। একটু সাবধানে চলাফেরা কোরো। পিউয়ের মতো। জগিং করতে হলে রাস্তাই নিরাপদ।

রাণু একটু হাসলেন। আপনার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?

একটুও না। খাসা রেখেছে। কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন, একবার আশাপুরা। ঘুরে আসি।

অরীন্দ্র গাড়ি বারান্দার ওপর দাঁড়িয়ে রইলেন। রাণু কর্নেলকে এগিয়ে দিতে গেলেন। লনে গিয়ে আস্তে বললেন, প্রিয়র কীর্তি তো শুনেছেন ঠাকুর্দার কাছে। প্রিয় বলেছে, সে-ই গুলি করে মেরেছে লোকটাকে। ঠাকুর্দাকে তো জানেন। খুব টনটনে নীতিবোধ। ওই যে বলেছেন, আমি আর ওতে নেই, তো নেই-ই।

সেই পাখিটা আবার কুক্কু করে ডাকছে কোথায়। বাইনোকুলারে তাকে খুঁজতে থাকলেন কর্নেল। মনে হচ্ছে, মাথার ভেতর দিক থেকে কাকটা আসছে। প্রকৃতি বিস্ময়কর ধ্বনিপুঞ্জ সাজিয়ে রেখেছে সবখানে। মানুষ তা সাধ্যমতো কুড়িয়ে নিয়েছে। মানুষের ভাষা জিনিসটাই আসলে লক্ষ বছর ধরে প্রাকৃতিক ধ্বনিপুঞ্জ থেকে তিলে তিলে সংগৃহীত। পাখিটা এবার অন্য কোথাও ডাকছে। কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে অন্যমনস্কভাবে বললেন, রেয়ার স্পেসিস্? আশ্চর্য লাগে। মানুষের নাকের ডগায় কত বিস্ময়কর জিনিস থেকে যায়, খেয়াল থাকে না।

রাণু কথাটায় কান দিলেন না। আরও চাপাস্বরে বললেন, প্রিয়র আসল কীর্তি এখনও ঠাকুর্দা জানেন না। জানলে. কেলেঙ্কারি ঘটে যাবে। তাই ভয়ে চুপ করে আছি। চলুন, বলছি।

গেটের কাছে গিয়ে কর্নেল তার দিকে তাকালেন। পাখিটা সমানে ডাকছে। অথচ খুঁজে পেলেন না।

রাণু বাড়ির দিকটা দেখে নিলেন। মুখে উত্তেজনা থমথম করছে। ফিসফিস করে বললেন, প্রিয়র ওই পিস্তলটা, বউকে যেটা লুকিয়ে রাখতে দিয়েছিল শুনলুম…

ওটা পিস্তল নয়, রিভলভার।

তা-ই। আমি ওসব চিনি না। রাণু তেতো মুখে বললেন, তবে প্রিয়র দোষ নেই। ওই হারামজাদি মেয়েটাই–প্রিয়র বউ প্রিয়কে তাতিয়েছিল, এখন বুঝতে পারছি। ঠাকুর্দার ওই এক রোগ। কলকাতা থেকে আধুনিকা নাতবউ এল। অমনি তাকে ফ্যামিলির হিসট্রি শোনাতে বসলেন। তারপর এ ঘর থেকে সে ঘর সঙ্গে নিয়ে ধনসম্পত্তি দেখিয়ে বেড়াতে লাগলেন। আপনার অরণ্যদেবের ঘরে পর্যন্ত ঢোকালেন।

বিজয়েন্দুকে কর্নেল ঠাট্টা করে ‘অরণ্যদেব’ বলতেন। রাণু হঠাৎ থেমে গেলে বললেন, হুঁ বলো।

রাণু মুখ আরও বিকৃত করে বললেন, প্রিয় এতদিন এসেছে। জানে ও ঘরে বন্দুক-পিস্তল আছে। কখনও ও ঘরে ঢোকেনি। ওই মক্ষীরানীই জিনিসটা কখন হাতিয়ে প্রিয়কে দিয়েছিল ওই লোকটাকে খুন করতে।

রিভলভারটা? বলে কর্নেল আবার বাইনোকুলারে পাখিটাকে খুঁজলেন। পাখিটা তার সঙ্গে কি লুকোচুরি খেলতে চায়?

আপনি খেয়াল করে শুনছেন না আমার কথা। রাণু অভিমানী স্বরে বললেন। ওটা বুড়োর জামাইবাবুর রিভলভার। সব ঘরের চাবি থাকে আমার কাছে। রাত্তিরে বালিশের তলায় রাখি। কাল ঠাকুর্দার মুখে প্রিয়র কাছে রিভলভার না পিস্তল ছিল শুনে একটু সন্দেহ হল। ঘর খুলে আলমারি দেখলুম। আপনি তো দেখেছেন, কাঁচের আলমারিতে সব সাজানো আছে। রাইফেল তিনটে আছে। দোনলা একনলা বন্দুক দুটো আছে। শুধু ওইটে নেই। প্রথমে সন্দেহ হল পিউকে। সে আমার ঘরে শুয়েছিল। পিউকে দিয়ে চাবি চুরি করিয়ে বিবি ওটা হাতায়নি তো? বিবির যা মেজাজ। কেলেঙ্কারি বাধাবে–চোরের মায়ের বড় গলা! তাই চুপি চুপি বুড়োকে বললুম সব কথা। বললুম, পিউয়ের সঙ্গে তোর খুব ভাব হয়েছে। কোনও ছলে জেনে নে তো পিউয়ের কাছে। আর অমনি বুড়ো রেগে বোম। পিউয়ের সঙ্গে ভাব হয়েছে বলেছি! আমাকে মারতে এল।

কর্নেল হাসলেন। মেরেও বসল, বলো। তোমার কপালের ওই দাগটা।

রাণু গুম হয়ে বললেন, ঠাকুর্দা জানলে সর্বনাশ হবে। আপনি আমার ভরসা। বলে চোখ মুছলেন। কী বলব? নিজের ভাই। ঠাকুর্দার কিছু হলে ও ছাড়া তো এ সংসারে আমার আর কেউ নিজের বলতে নেই… ।

.

১৮.

সাত্যকির সেন্টিমেন্টে লাগতেই পারে। পিয়ালি তার প্রেমিকা। পিউ তার সঙ্গে জগিং করে, তার ঘরে আড্ডা দেয়, কি মেলামেশা করে–পিউয়ের মতো মড টাইপ মেয়ে, যে নিজেকে ‘পার্সন’ ঘোষণা করে কথায় কথায়, সে নিঃসংকোচে তার কাঁধে বা হাতে হাত রাখতেও পারে। তার মানে এই নয় যে, পিউ তার প্রেমে পড়েছে, অথবা সাত্যকিও পিয়ালিকে ছেড়ে পিউয়ের প্রেমে পড়েছে। ভুল বোঝাবুঝি এখানেই হয়েছে সম্ভবত। রাণুর মধ্যে গ্রাম্যতা আছে, কর্নেল লক্ষ করলেন। পিউয়ের সঙ্গে ভাব আছে বলায় সাত্যকি খেপে গিয়েছিল। গোঁয়ার দুর্দান্ত প্রকৃতির ছেলে সে। ঘুসিলড়িয়ে হয়ে ওঠাই তার স্বপ্ন। একজন ঘুসিলড়িয়ের জীবনে তার শরীরটাই হয়ে উঠতে পারে দুটো হাতের মুঠি। এক মুঠি দিয়ে নিজেকে বাঁচাও, অন্য মুঠি দিয়ে অন্যকে মারো। যুগপৎ ডিফেন্স অফেন্স প্রক্রিয়া। গণনাথ যেমন লিখেছিলেন কেয়াকে, ক্যামেরা আমার কলম, তেমনই সাত্যকির বেলায় তার দুটি হাত তার মন। মনে ঘা লাগলেই তার দুটি হাত কাজ করে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। সময়মতো দিদির কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে–অথবা নিয়েছে। তাড়া থাকায় কর্নেল বেশি কিছু জানতে চাননি।

তা হলে প্রিয়র রিভলভারটা বিজয়েন্দুর!

তা যদি হয়, তা হলে গাড়ির ভেতরে পাওয়া রিভলভার বা পিস্তলটা অনির্বাণের কি? পিউ গণনাথকে চার্জ করছিল, উনিই অনিবার্ণের খোঁজে বেরিয়েছিলেন এবং তার কিটব্যাগ থেকে অস্ত্রটা খুঁজে নিয়েছিলেন। এতে একটা যুক্তি আছে। গণনাথ জানেন, যে কোনও মুহূর্তে তার বিপদ হতে পারে। তাই সশস্ত্র বেরিয়েছিলেন। সম্ভবত প্রিয়র গাড়ির কাছে গিয়ে অনির্বাণ সোমের ডেডবডি দেখতে পান। তখন প্রিয়কে ফাঁসানোর জন্য অস্ত্রটা গাড়ির ইঞ্জিনের। ভেতর রেখে দেন। হুঁ, পিউ একটা পয়েন্ট তুলেছে।

আর ব্ল্যাকমেলাররা প্রতিদ্বন্দ্বী পছন্দ করে না। এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। কোম্পানির পক্ষ থেকেও দ্রুত সহযোগিতা পাওয়া খুবই স্বাভাবিক। অনির্বাণের ডেডবডি গণনাথ নিজে বয়ে নিয়ে গিয়ে গঙ্গার দহে ফেলতে না পারেন, কারও সাহায্য নেওয়া কি অসম্ভব? রামলাল আছে। অভাবী লোক। তাগড়াই বলিষ্ঠ গড়ন। বখশিসের লোভে কাজটা তাকে দিয়েও করানো যায়। রাজেশ শর্মাও ছিলেন বাংলোয়। পিউ হয়তো ঠিকই ধরেছে।

প্রিয়র রিভলভারটা চীনা। কাজেই, ওটার লাইসেন্স থাকতে পারে না। বিজয়েন্দুও কি একটা বেআইনি রিভলভার আলমারিতে রেখেছিল? অবশ্য অরীন্দ্র বসু প্রভাবশালী মানুষ ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জে। তা ছাড়া বিহার মুলুকের কারবার। কাগজে প্রায়ই বন্দুকবাজির খবর বেরোয়। জাতপাতের দাঙ্গায় বেপরোয়া বন্দুকবাজি চলে।

কর্নেল জানেন, অস্ত্র আইন অনুসারে লাইসেন্সড আর্মসের লাইসেন্স প্রতি বছরের শেষে রিনিউ করাতে হয়। শিকারী বিজয়ের মৃত্যুর পর অরীন্দ্র তদ্বির করে নাতজামাইয়ের স্মৃতি হিসেবে সেগুলো রাখার জন্য নিজের নামে লাইসেন্স করিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু রিভলভারটা…

চমকে উঠলেন কর্নেল। রিভলভারটা রাণু দেখেননি, অরী তো দেখেছেন। বিজয়েন্দুর অস্ত্র তার চেনার কথা। তিনি যে প্রকৃতির মানুষ, তখনই হই-চই বাধিয়ে বসতেন। অথচ তার প্রতিক্রিয়াটা সেদিক থেকে ঘটল না। কেন?

নাকি চেপে গিয়েছিলেন ব্যাপারটা–কোনও কারণ আছে চেপে যাওয়ার?

কাল আশাপুরা থেকে ফেরার পর থেকে অরীন্দ্র কেমন বদলে গেছেন। বলছেন, ছেড়ে দিন। এটা একটু অস্বাভাবিক। নীতিবোধ যত কড়া হোক, প্রিয় তাঁর মেয়ের একমাত্র সন্তান।…

আ গেয়া সাব। রিকশোওলা রিকশো দাঁড় করাল। উও দেখিয়ে লালজিকা সাইকিলকি দুকান।

পশ্চিমবাংলার মফঃস্বল শহরগুলোর তুলনায় বিহারের শহর আজকাল অনেকখানি আধুনিক জেল্লায় ঝলমলে। অনেক বেশি স্মার্ট। মোহনলাল গণেশলাল অ্যান্ড কোম্পানির সাইনবোর্ডটাও দেখার মতো। একেবারে ওয়েস্টার্ন ডিজাইনের শো-রুম, সেলস কাউন্টার, অফিস নিয়ে লম্বাটে বাড়ি। সামনে খোলা চত্বরে কিছু বাগিচা। এনিটা আশাপুরার এক্সটেনশন এরিয়া। জংশনের রেলইয়ার্ড দেখা যায় সামান্য দূরে। তার ওধারে গঙ্গা।

কর্নেল শোরুমের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন। নানা ধরনের সাইকেল নানা রকমভাবে সাজানো। একেক ভঙ্গিতে একেক গতিছন্দের আভাস। ডিজাইনারের শিল্পবোধ প্রশংসাযোগ্য। এক অনবদ্য ব্যালে রূপ নিয়েছে শোরুমে। কর্নেলের মুখেচোখে মুগ্ধতা ফুটে উঠল। প্রকৃতিতে মাঝে মাঝে যে কারুকর্ম দেখেন, তার প্রতিবিম্ব। মানুষ যা কিছু করে, সবই প্রকৃতির অনুকরণ। সেলগ্রুমে ঢুকলেন। কিছু খদ্দেরের ভিড় আছে। আজকাল সবখানেই দেহাতি মানুষজনের নিদেনপক্ষে একটা সাইকেল চাই-ই। কর্নেলকে দেখে এক সেলসম্যান আইয়ে আইয়ে করে ছুটে এল। সে ধরেই নিয়েছিল এই বুড়ো সায়েব লোক তার নাতি-নাতনীর জন্মদিনে উপহার কিনতে এসেছেন। বাচ্চাদের সাইকেলের শো-রুমের দিকে যেতে অনুরোধ করল। কর্নেল ভারিক্কি চালে বললেন, মিঃ রাজেশ শর্মাকা সাথ দেখা করেঙ্গে।

লোকটিও গম্ভীর হয়ে বলল, অফিস হ্যায়। অফিসমে যাইয়ে!

অফিস ওয়েস্টার্ন মডেলের। কয়েকটি কম্পিউটারও আছে টেবিলে-টেবিলে। সামনে স্মার্ট চেহারার যুবক ও যুবতী। রোবোটের মতো যান্ত্রিক আচরণ। কোনও বেয়ারা নেই দিশি আপিসের মতো। কর্নেল এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছিলেন। আস্তে একটু কাসলেন। তখন এক যুবতী মার্কিন আনুনাসিক উচ্চারণে বলল, ক্যান আই হেল ইউ স্যার?

মিঃ রাজেশ শর্মা…

হি ইজ ন্যাও আউট্রা স্টেশন।

 মিস কেয়া সেন…

যুবতী কলিগদের দিকে তাকিয়েছিল। হু ইজ শি?

সবাই মুখ তাকাতাকি করছিল। এক যুবক একটু হেসে বলল, সরি টু ইনফরম ইউ শি ইজ ডেড।

ও মাই গড! কর্নেল চমকে ওঠার ভঙ্গি করলেন।

 আ ট্র্যাজিক অ্যাকসিডেন্ট, সো ফার আই নো।

 আবার সবাই কাজে মন দিল। কোণের দিকে এক যুবতী আপনমনে টাইপ করছিল। কর্নেল তার কাছে গেলে সে মুখ তুলল। কর্নেল বললেন, আই ওয়ান্ট টু মিট দা অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। তারপর নিজের নেমকার্ডটা দিলেন।

প্লিজ ওয়েট আ মিনিট। বলে সে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের চেম্বারে ঢুকল। কিন্তু এক মিনিট নয়, আধ মিনিট পরেই সে বেরিয়ে কর্নেলকে ভেতরে যেতে ইশারা করল। একটা সুশৃঙ্খল যান্ত্রিকতা ম্যানেজার রাজেশ শর্মাকেই চিনিয়ে দিচ্ছে সম্ভবত।

এ ঘরে ঢুকেই কর্নেল বোর্ডে নামটা দেখে নিয়েছিলেন। বি এন দুবে। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স। টাই-স্যুট পরা গুফো লোক। বনোয়ারিলালের উল্টো বলা চলে। কর্নেলকে একটু অবাক করে ইংরেজিতে বললেন, আমিনগঞ্জ থেকে গতকাল বনোয়ারিজি ফোনে আমাকে বলেছেন, কলকাতার এক কর্নেলসায়েব রেসিং সাইকেল কিনতে আসতে পারেন। আপনি শোরুমে দেখুন। পছন্দ হয়ে যাবে। এক্সপোর্ট কোয়ালিটির চেয়ে স্থানীয় বাজারে আমরা যা বেচি, সেগুলো অনেক ভাল। স্থানীয় প্রতিযোগিতায় না টিকতে পারলে বিদেশের মুখ তাকিয়ে কোনও লাভ নেই। দেশের বাজারে বছরে প্রায় বিশ লাখ বিক্রি হয়। সেখানে বিদেশে আর কত? কদাচিৎ দেড় থেকে দু লাখ। চা বলি?

কর্নেল মাথা নাড়লেন। ধন্যবাদ! আমার পরিচিত একটি মেয়ে কেয়া সেন আপনাদের এখানে কাজ করত। সে বলেছিল, ওর কোম্পানির সাইকেল কিনলে একটু সুবিধে করে দেবে। তো শুনে দুঃখ পেলুম, সে দুর্ঘটনায় মারা গেছে। কী করে দুর্ঘটনা ঘটল জানেন কি? আহা, বড়ো ভাল মেয়ে ছিল।

 দুবে বাঁকা হাসলেন। সে মোটেও ভাল মেয়ে ছিলনা।

সে কী! কেন একথা বলছেন?

কারণ আছে বলেই বলছি। যাই হোক, চলুন। আপনাকে সাইকেল দেখাই। দূরে উঠে দাঁড়ালেন। বনোয়ারিজির চেনা লোক আপনি। দরদামে অসুবিধে হবে না। কেয়া সেনের চেয়ে বোয়ারিজির কথা আমার কাছে মূল্যবান।

দুবে অদ্ভুত শব্দে হেসে উঠলেন। কর্নেল বসে রইলেন। বললেন, কেয়ার ব্যাপারটা…

তার কথার ওপর দুবে ভুরু কুঁচকে বললেন, আপনি সাইকেলের চেয়ে কেয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। বনোয়ারিজি আমাকে বলেছেন।

আমার খুব চেনাজানা মেয়ে ছিল, মিঃ দুবে!

দুবে বসলেন। তারপর টেবিলের ওপর একটু ঝুঁকে এসে আস্তে বললেন, আপনি এলে বনোয়ারিজি আমাকে একটা বোঝাপড়া করে নিতে বলেছেন। তবে আপনার সৌভাগ্য, শর্মাজি বাইরে। না হলে বোঝাপড়াটা অন্য ধরনের হত।

কর্নেল তাকালেন। কোনও কথা বললেন না।

দুবে সেই রকম বাঁকা হাসলেন। কেয়ার ব্যাপারে কিছু প্রমাণ করা যাবে না।

কর্নেল চুরুট বের করে ধরালেন। তারপর বললেন, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

আমরাও বুঝতে পারছি না আপনি কেন এতদিন পরে কেয়ার ব্যাপারে নাক গলাচ্ছেন। দুবে সোজা হয়ে বসলেন। কেয়ার এক আত্মীয় আমিনগঞ্জে ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। কিন্তু তার সাহস নেই বা সাধ্যও নেই ডিটেকটিভ ভাড়া করে।

মিঃ দুবে, আমি ডিটেকটিভ নই। কথাটা একটা গালাগালি। শুনলে দুঃখ পাই।

দুবে একটু মেজাজ দেখিয়ে বললেন, বোঝাপড়ায় আসুন। তবে একটা শর্ত, কে আপনাকে ভাড়া করেছে, জানা দরকার।

তার আগে আমার জানা দরকার, বোঝাপড়া বলতে কী বোঝাচ্ছেন আপনি!

টাকাকড়ি। দুবে ড্রয়ার থেকে একশো টাকার নোটের একটা বান্ডিল বের করে টেবিলে রাখলেন। এবার বলুন!

কর্নেল একটু হাসলেন। তা হলে বোঝা গেল, কেয়া সেনের মৃত্যুর কারণ দুর্ঘটনা নয়।

ও নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ হবে না। কিছুই প্রমাণ করা যাবে না। আমরা শুধু জানতে চাই কে আপনাকে ভাড়া করেছে। দুবে নোটের বান্ডিলটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরলেন। যেন মুখের ওপর ছুঁড়ে দেবেন।

দুঃখিত মিঃ দুবে! ভাড়া কথাটাও গালাগাল।

আপনি দেখছি গভীর জলের মাছ। দুবে নোটের বান্ডিলটা তুলে বললেন, এতে দশ হাজার টাকা আছে। আপনার জন্য রেখে দিয়েছিলাম। আমরাও প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির সাহায্য নিই। সব কোম্পানিই নেয়। কাজেই বুঝতে পারছেন, এর অর্ধেক দিলে আমরা তথ্যটা পেয়ে যাব। আপনি ভুল করলেন। ঠিক আছে। আসুন!

কর্নেল মুখটা যতটা সম্ভব তুম্বো করে বললেন, আপনারাও ভুল করলেন। আমাকে, ডিটেকটিভ বললেন। কথাটা বিশ্রী গালাগালি। অপমানজনক।

তারপর বেরিয়ে এলেন। জোরে হেঁটে সেলস্ কাউন্টার পেরিয়ে চত্বরে নেমেছেন, পিছনে কেউ ডাকল, হ্যাল্লো মিস্টার!

ঘুরে দেখলেন দুবে হন্তদন্ত আসছেন। কর্নেল দাঁড়ালেন। দুবে কাছে এসে চাপাস্বরে বললেন, শিগগির আশাপুরা ছেড়ে চলে যান। আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি। আর কখনও…।

হাত তুলে কর্নেল বললেন, শাসানোর জন্য কষ্ট করে ছুটে আসার দরকার ছিল না মিঃ দুবে! সেটা আমি বুঝে গেছি।

দুবে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, এক ঘণ্টা সময় দিচ্ছি। আমাদের লোক আপনাকে একঘণ্টা পরে আশাপুরায় দেখলে খতম করে ফেলবে। পুলিশের ভরসা করবেন না। চলে যান।

কর্নেল কাচুমাচু মুখ করে ঘড়ি দেখলেন। বললেন, ঠিক আছে। বরং একটা রিকশো করে বাস স্টেশনে চলে যাই দুবেজি। পথে শুধু এক বন্ধুকে দেখা করে যাব। কথা দিচ্ছি, একঘণ্টার বেশি সময় নেব না।

দুবে দাঁড়িয়ে রইলেন। কর্নেল একটা সাইকেলরিকশো থামিয়ে উঠে বসলেন। চাপাস্বরে বললেন, জলদি চনা ভাই। আদালতমে জানা পড়ে।

ঘুরে দেখলেন, দুবে তখনও দাঁড়িয়ে আছেন। মনে হচ্ছে শাসালেন বটে, একটু ধাঁধায় পড়ে গেছেন। কেয়ার মৃত্যু সম্পর্কে কোম্পানির এখনও একটা স্পর্শকাতর জায়গা রয়ে গেছে। সে কি কেয়ার আরেক আত্মীয় বোম্বে ডক এরিয়ার কাস্টমস অফিসার এস এন সেনের কারণেই? গণনাথ সেনকে ছবির টাকা জোগান দিয়ে কোম্পানির দুটো লাভ হচ্ছে। গণনাথের মুখ বন্ধ থাকছে এবং কালো টাকার একটা সদগতি হচ্ছে।

কিন্তু সত্যেন সেন সম্ভবত এখনও জানেন না, কেয়া দুর্ঘটনায় মারা যায়নি এবং তাকে হত্যাই করা হয়েছে। কর্নেল একটু ভেবে নিলেন। দুবাইয়ের কনসাইনমেন্টটা তুরুপের তাস। যথাসময়ে ওটা খেলতে হবে। মালটা বোম্বে ডকে পৌঁছাক আগে। নয় তো সব খেলা ভেস্তে যাবে।

এবং তারও আগে দরকার তার ধারণাটি সত্যি কি না নিশ্চিতভাবে জানা। তা না হলে অপ্রস্তুত হবেন কর্নেল।

একটু পরে লক্ষ করলেন রিকশোর সামনে এবং পেছনে দুজন যুবক সাইকেল চেপে যাচ্ছে। একই সাইকেল, ‘রেডস্টার’। মোহনলাল গণেশলাল অ্যান্ড কোম্পানির তৈরি। একটু সতর্ক হলেন কর্নেল। কোর্ট এলাকায় পৌঁছে দেখলেন, ওরা একটা শিরীষগাছের তলায় সাইকেল দাঁড় করিয়ে চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসল। দু-জনেরই পঁচিশের মধ্যে বয়স। আজকাল বদমাইসির জন্য পালোয়ান দরকার হয় না। রোগাভোগা ছেলে-ছোকরা নির্বিকার মুখে খুনখারাপি করে। দুবে তার মতো বুড়োথুড়ো টিকটিকির জন্য তাগড়াই খুনে পাঠাননি আর কী! কর্নেল আপন মনে একটু হাসলেন। বার লাইব্রেরির দিকে যেতে যেতে একজনকে মহিমাবাবুর কথা জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, উও দেখিয়ে উনকা মুহুরিবাবু। উনকো পুছিয়ে। বার লাইব্রেরির বারান্দায় মহিমারঞ্জন সিনহার মুহুরিবাবু দাঁড়িয়ে একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি বাঙালি। কর্নেলকে ঘুপচি একটা ঘরে নিয়ে গেলেন তিনি। সেটাই সিনহাবাবুর আদালতি আপিস।

খবর পেয়ে অ্যাডভোকেট সিন্‌হা ব্যস্তভাবে এলেন। নমস্কার, নমস্কার! বোসসায়েব আপনার কথা বলেছেন। আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ার সৌভাগ্য হল। বসুন স্যার!

কর্নেল বললেন, বসব না। তাড়া আছে।

সে কী! প্রিয়বাবুর সঙ্গে মিট করে যান এখনই আমার ক্লার্ককে দিয়ে পারমিশান আনিয়ে নিচ্ছি। প্রিয়বাবু আপনার সঙ্গে মিট করতে চান। জেলহাজত বেশি দূরে নয়। ওই যে গির্জাঘর দেখছেন, তার পেছনে।

পাটনা থেকে মিসাইল এক্সপার্টদের রিপোর্ট এসেছে?

সিনহাবাবু বিরক্তমুখে বললেন, সি আই ডি ইন্সপেক্টরের কথায় মনে হল, এসেছে। কিন্তু চার্জশিট দেওয়ার আগে কপি তো পাওয়া যাবে না। এটাই প্রব্লেম। এস ডি জে এমের কোর্ট থেকে নিতে হবে। বোঝেন তো স্যার, আইন কানুনের টেকনিক্যাল ব্যাপার। তবে পয়সা ছাড়লে…যাক গে। তারক, কর্নেল সায়েবের জন্য চা নিয়ে এস।

নাহ্। চা খাব না। একটু নিরিবিলি কথা বলতে চাই, মিঃ সিনহা!

বেশ তো! চলুন! আমারও অবশ্য একটু তাড়া আছে। লাঞ্চের পর এজলাসে একটা হিয়ারিং আছে। আগামীকাল কোর্ট বন্ধ। ক্রিশমাসের পরব।

আদালত এলাকাটি বিশাল। এখানে-ওখানে থকথকে ভিড়। মানুষজনের জীবনের একটা নিষ্ঠুর ও কঠিন বাস্তবতাকে যে-কোনও আদালতের চৌহদ্দিতে পা দিলেই আঁচ করা যায়। মানুষকে বড়ো স্বার্থপর দেখায়। একটা মেহগনি গাছের তলায় গিয়ে কর্নেল বললেন, শুনলুম প্রিয় বলেছে সে গুলি ছুঁড়েছিল?

বলেছেন। তবে কোর্টে তা বলবেন না। আইনজীবী একটু হাসলেন। আমার তো মনে হল, দাদামশাইকে চটিয়ে দিয়ে জোক করছিলেন। বোসসায়েবকে তো জানেন! স্ট্রং মর্যালিস্ট মানুষ। বার বার এসে জিজ্ঞেস করছেন, বল তুই মেরেছিস নাকি। যাই হোক, ওটা কথার কথা।

গাড়িতে যে ফায়ার আর্মস পাওয়া গেছে, বডিতে পাওয়া গুলি সেটার না হলে প্রিয় বেঁচে যাবে। তাই তো?

অবশ্যই। আইনজীবী একটু গম্ভীর হলেন। ওটা পয়েন্ট বত্রিশ রিভলভার। একটু সমস্যা হবে যদি গুলিটা ওটারই হয়। কিন্তু তাতেও পুলিশ বেশি দূর এগোতে পারবে না। গাড়িতে মার্ডার উইপন পেল কখন, এটা দেখতে হবে তো! গাড়ি যখন গ্যারেজে ছিল, তখন পেল এবং পেল কারা? না–গ্যারেজের লোকে। কর্নেল সায়েব! প্রিয়বাবুকে আমি খালাস করিয়ে আনব। সারকামস্টেন্সিয়্যাল এভিডেন্স এই কেসে খুব উইক। প্রিলিমিনারি হিয়ারিঙের পর কেস সেসনে যাবে। যাক না। কেসের ভিত্তিটাই নড়বড়ে। একটা চিঠি দিয়ে মার্ডারের মোটিভ এস্টাব্লিশ করবে? ফুঃ।

কর্নেল একটু ইতস্তত করে বললেন, সি আই ডি পুলিশের কাছে শুধু অন্তত একটা কথা জানতে পারলে ভাল হত। গুলিটা কত পয়েন্ট রিভলভারের? ম্যানেজ করা যায় না এটা? সিনহাবাবু মুচকি হেসে বললেন, খুউব যায়। তবে একটু সময় লাগবে স্যার! আজকাল কত ইমপর্ট্যান্ট ফাইল অফিস থেকে বেমালুম নিপাত্তা হয়ে যাচ্ছে, তো এই সামান্য ব্যাপার। জাস্ট অ্যান ইনফরমেশন। আপনি বোসসায়েবের বাড়িতে বসেই পেয়ে যাবেন।

বোসসায়েব কাল এসেছিলেন শুনলাম। প্রিয়র মামলা আর লড়তে চান না বলছিলেন।

খুব হাসলেন আইনজীবী। বরাবর ওই রকম মানুষ। তিন পুরুষ ধরে ওঁদের তিন পুরুষের আইনের লড়াই লড়ে আসছি স্যার! ওঁদের বংশের মতিগতি এ রকমই। আফটার অল নাতি-একমাত্র মেয়ের একমাত্র ছেলে। তাকে ফেলতে পারেন কখনও? আপনি বোসসায়েবের বুজম ফ্রেন্ড। আপনিও লক্ষ করে থাকবেন। মুখেই নাতি-নাতনীদের শাসান, কাকেও এক পাই পয়সার প্রপার্টি দেব না–সব লিখে দেব কোনও আশ্রমের নামে। তো লাস্ট সেপ্টেম্বরে বললুম, বোসসায়েব, বয়স তো অনেক হল। প্রপার্টির একটা বিহিত করে ফেলুন। বললেন, নাতনী রাণু ছাড়া কাকেও কিছু দেবেন না। কদিন পরে এসে বললেন, উইল লিখুন।

প্রপার্টির উইল রাণুর নামে একা?

না, না। শুনুন তো! উইল লেখা হল। রেজিস্ট্রি হল। কাল এসে বলেছেন, উইল খারিজের অ্যাপ্লিকেশন করুন। নতুন উইল লিখুন। প্রিয় খুনি। ওকে এক পয়সা দেব না।

আইনজীবী আবার হাসতে লাগলেন। কর্নেল বললেন, তাহলে রেজিস্টার্ড উইলে প্রিয়কেও প্রপার্টি দেওয়া আছে?

তিন নাতি-নাতনীর মধ্যে সমান সমান শেয়ার। সিনহাবাবু চাপাস্বরে বললেন। প্রপার্টি কম নয়। বসত বাড়ি ছাড়া সুদে-আসলে লাখ দশেক প্রায়। সব ভাল ভাল জায়গায় লগ্নি করা আছে। বছরে প্রচুর সুদ।

কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, উইলে কোনও বিশেষ শর্ত আছে নাকি?

আছে। বোসসায়েবের জীবদ্দশায় কেউ মারা গেলে বাকি দু’জনে হাফ হাফ পাবে।

চলি মিঃ সিনহা! কর্নেল পা বাড়ালেন। আপনি ওই ইনফরমেশনটা একটু শিগগির পাঠাতে চেষ্টা করবেন…।

কর্নেল একটা রিকশো ডাকতে যাচ্ছেন, তিরিক্ষি চেহারার যুবকটি চায়ের দোকান থেকে উঠে এল তার দিকে। একজন চাপা গলায় বলল, আবে শালে বুঢ়টে! এক ঘণ্টে হো গেয়া জলদি ভাগ।

কর্নেল করুণ মুখে বললেন, ভাস্তা হ্যায় বাবা! কৃপাসে একঠো রিকশা বোলাকে দো না! আভি জরুর বাসস্ট্যান্ড জায়েগা।

সে তখনই একটা রিকশা ডাকল। রিকশোওলা তার চেনা। তাকে হুকুম দিল, আবে ঝাকু! ইয়ে বুঢঢেকো বাসস্ট্যান্ড পচা দো। জাস্তি ভাড়া মাত লেনা বে! এক রুপৈয়া! হাঁ?…

.

১৯.

হাইওয়ের বাঁকের মুখে একটা স্টপে বাস থেকে নেমে পড়লেন কর্নেল। বাঁদিকে উত্তরে খ্রিস্টানপাড়া, সামনে পূর্বে ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জ। খ্রিস্টানপাড়ার ভেতর দিয়ে চলে গেছে সংকীর্ণ আর এবড়ো-খেবড়ো একটা রাস্তা। সেদিকে না গিয়ে সিধে এগোলেন। কাছিমের খোলার গড়ন রুক্ষ উঁচু জমিটা বিকেলের আলোয় বিবর্ণ মড়ার খুলির মতো বিশ্রী দেখাচ্ছে। এখানে-ওখানে গর্ত। ভিতরের মাটিটা লালচে। আদিবাসীরা ঘরের দেয়াল রঙ করতে নিয়ে যায় দেখেছেন। লালঘুঘুর ঝকের ক্যামোফ্লাজের জন্য চমৎকার জায়গা। বাইনোকুলারে একটা ঝাক চোখে পড়ল। পশ্চিম থেকে রোদ্দুর পড়েছে। ওড়ার মুখেই ছবি নিতে হবে। দ্রুত ক্যামেরায় টেলি লেন্স ফিট করে গুঁড়ি মেরে উঠে গেলেন।

কিন্তু ক্যামেরা তাক করার সুযোগই দিল না ওরা। উত্তরে উড়ে গেল খ্রিস্টানপাড়ার ওপর দিয়ে। হতাশ হয়ে আবার বাইনোকুলারে দেখতে থাকলেন উড়ন্ত ঝাকটিকে। কোনাকুনি চলে যাচ্ছে ক্লিফটনের কুঠিবাড়ির দিকে। খ্রিস্টানপাড়ায় আসন্ন ক্রিসমাসের তুলকালাম মাইকের বাজনাই হয়তো কাছাকাছি বসতে দিল না।

একটু পরে বাইনোকুলারে ধরা পড়ে গেলেন বেলিংটন জেভিয়ার। হাতে সেই কাটারি, বগলে ক্রাচ। কিন্তু ঝোপের আড়ালে মাঝে মাঝে গুঁড়ি মেরে বসছেন। আবার একটু উঠে এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছেন। কিছুটা এগিয়ে কোনও গাছের গুঁড়িতে সেঁটে যাচ্ছেন। অমন করছেন কেন? ব্যাপারটা দেখা দরকার।

ক্লিফটনের কুঠিবাড়ির দক্ষিণে বন-জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেলেন জেভিয়ার। কর্নেল সিধে নাক বরাবর হাঁটতে থাকলেন। স্টেশন রোড ধরে এগিয়ে ডাইনে কুঠিবাড়িতে যাওয়ার সরু রাস্তাটা। সেখান থেকে জঙ্গলটা বাইনোকুলারে খুঁটিয়ে দেখলেন। জেভিয়ারকে খুঁজে বের করা গেল না।

কর্নেল ইরিগেশন বাংলোর দিকটা দেখতে থাকলেন। লনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন গণনাথ আর সেই রাজেশ শর্মা। একটা লাল মারুতি গেটের এধারে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলোর গ্যারেজের সাদা গাড়িটা গণনাথের। এখনও যথেষ্ট রোদ আছে। তা হলে কি আজ শুটিং হয়নি, নাকি একটু সকাল-সকাল হয়ে গেছে?

রামলালকে দেখা গেল না। বাংলোর বারান্দায় সাদা বেতের চেয়ারে একটি মেয়ে এবং আরও দুজন পুরুষকে আবছা দেখা গেল। পশ্চিমে ওয়াটারড্যামের কিনারায় উঁচু গাছপালা সূর্যকে আড়াল করেছে। বারান্দায় গাঢ় ছায়া। সিঁড়িতে পা ছড়িয়ে বসে আছে সেই যুবকটি, যাকে কর্নেল গণনাথের বডিগার্ড বলেছিলেন। যেহেতু গণনাথ এ কথার প্রতিবাদ করেননি, ধরে নেওয়া যায় সে তা-ই।

একটু পরে গণনাথ এবং রাজেশ শর্মা গেট খুলে ঢালু রাস্তায় এলেন। তারপর লাল গাড়িটার পাশ দিয়ে দুজনে এসে স্টেশন রোডে পৌঁছুলেন। ক্যানেলব্রিজে দাঁড়িয়ে দুজনে আবার কিছুক্ষণ কথা হল। তারপর এদিকে আসতে থাকলেন। তখন কর্নেল একটা ঝোপে ঢাকা স্থূপের আড়ালে সরে গেলেন। বডিগার্ড গেট পেরিয়ে আসছে এতক্ষণে। একটু দূরত্ব রেখে সে ওঁদের অনুসরণ করছে।

ওঁরা কুঠিবাড়ি ঢোকার রাস্তায় এলে কর্নেল শুনতে পেলেন, শুটিং প্রোগ্রাম। নিয়ে কথা হচ্ছে। রাজেশ শর্মা বাংলায় কথা বলছেন। ক্রেন আমি আনিয়ে দেব। ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দিলে আপনি পুরো ওয়ালটা পাচ্ছেন। ক্রেনের সঙ্গে শালকাঠের সিক্স বাই ফাইভ বাই থ্রি ফিট হাইট বক্স ফিট করা থাকবে। দুজন কেন, তিনজন বসুন না! কিন্তু রিস্ক আছে! হিয়োর ডামি আনিয়ে নিন।

গণনাথ বললেন, অসুবিধে নেই। বেচুবাবুকে যদি বলি একটা বাঘের দরকার, তা-ও এনে দেবেন।

দুজনে হেসে উঠলেন। রাজেশ বললেন, কুরুডি ফরেস্ট থেকে?

বেচুবাবুর পক্ষে তা-ও অসম্ভব নয়। এক হিরোইন গেল। এবার দেখবেন কাকে আনছেন বেচুবাবু।

শ্রাবন্তীজি হঠাৎ চলে গেলেন কেন?

গণনাথ তেতমুখে বললেন, প্রেমিকের মৃত্যুতে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। জীবনে কখনও ও অ্যাকট্রেস হতে পারবে? বলেই একটু হাসলেন। বেচুবাবু বলছিলেন সিলেকশন ঠিক হয় নাই! ঠিক তা-ই।

কুঠিবাড়ির ফটকের কাছে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন রাজেশ শর্মা। জ্যাকেট এবং প্যান্টের পকেট খুঁজে বললেন, সিগারেট ফেলে এসেছি গাড়িতে।

গণনাথ সিগারেটের প্যাকেট বের করে বললেন, নিন!

সরি! ওই ব্র্যান্ড তো আমার চলে না দাদা! বলে পিছনে ঘুরলেন রাজেশ। গণনাথের বডিগার্ডকে বললেন, আমার গাড়ি থেকে সিগারেট প্যাকেটটা এনে দাও। জলদি কর না ভাই।

বডিগার্ড হন্তদন্ত চলে গেল। গণনাথ সিগারেট ধরিয়ে বললেন, আইডিয়াটা আমার মাথায় ছিল না, তা নয়। শুধু রিস্কের কথাটা ভেবেই–তবে ছাদ থেকে ক্যামেরা জুম করে খাদের ওপারের চরে কুসমিকে ধরা যাবে। তার ধনুকের তীরটা সিম্বলিক হবে। মানে, দা অ্যারো ওভার দা ব্ল্যাক ওয়াটার–দা প্রিমিটিভ মোবাইল ফোর্স অফ লাইফ ওভার দা ব্ল্যাক ট্র্যাপ অপ ডেথ।

রাজেশ পা বাড়িয়ে বললেন, রামলালকে বলে যেতাম, সিংজিকে ক্রেনের কথাটা বলে আসত।

গণনাথ বললেন, বউয়ের অসুখ। খবর পেয়ে দেখতে গেছে।

চলুন। রোদ থাকতে থাকতে দেখে নেবেন কোথায় ক্রেন ফিট করলে ঠিক হবে। বলে রাজেশ ব্যস্তভাবে এগিয়ে গেলেন খোলা সিঁড়িটার দিকে। গণনাথ তার ছবির আইডিয়া ব্যাখ্যা করতে করতে তাকে অনুসরণ করলেন।

কর্নেল বেরিয়ে এলেন আড়াল থেকে। ফটক পেরিয়ে কুলঝোপগুলোর পাশ দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে গেলেন। শরীরটার ওজন বেড়ে গেছে। একটু পরে। খোলা ছাদে গণনাথ ও রাজেশকে দেখতে পেলেন। সিঁড়ির দিকে চললেন কর্নেল।

রাজেশ শর্মা পুবের রেলিংয়ে হাত রেখে একটু ঝুঁকে বলেছিলেন, ওয়ান্ডারফুল! ক্রেন এখানে ফিট করলে মাথার দিকটা খাদের ওপর যাবে। অনেকটা কভার করতে পারবেন ক্যামেরায়। দেখে যান পজিশন। আসুন!

গণনাথ দুটো হাত তুলে দুই কানের পাশে রেখে ক্যামেরার লেন্সে দেখার ভঙ্গিতে চরের দিকটা দেখছিলেন। রাজেশের ডাকে কাছে গেলেন। মুখে ফিল্মমেকারের তন্ময়তা গাঢ়। রেলিঙের দিকে ঝুঁকতে যাচ্ছেন, ঠিক সেই সময় নীচের জঙ্গলে কোথাও একটা অমানুষিক চিৎকার শোনা গেল। দুজনেই চমকে উঠে সোজা হলেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা বিভীষিকার শিহরন ছড়িয়ে গেল পারিপার্শ্বিকে। রাজেশ বলে উঠলেন, হোয়াটস দ্যাট?

গণনাথ একটু হাসলেন। রামলাল বলেছিল কিচনির ডাক। কিচনি নাকি জলের পেত্নী।

কেমন টেরিফিক ক্র্যাকড ভয়েস। রাজেশ গম্ভীর মুখে বললেন। সাম অ্যানিম্যাল আই থিংক! আমার একটা আনক্যানি ফিলিং হচ্ছে। এই হন্টেড হাভেলির খুব বদনাম আছে। জলদি দেখে নিয়ে ফেরা যাক। আসুন। এখান থেকে ক্রেন এগিয়ে যাবে ওখানে। নীচে খাদ। বলুন, কেমন হবে?

গণনাথ তাঁর পাশে রেলিং ধরে ঝুঁকেছেন, সিঁড়ির মাথা থেকে কর্নেল বলে উঠলেন, মোটেও ভাল হবে না শর্মাজি!

দুজনে তার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন।

কর্নেল কয়েক পা এগিয়ে একটু হেসে বললেন, আপনাকে বলেছিলুম মিঃ সেন, এটা বিপজ্জনক খেলা।

রাজেশ শর্মা খাপ্পা হয়ে বললেন, হু দা হেল ইউ আর?

কর্নেল বললেন, এইমাত্র কিচনির ডাক শোনা গেল। এলাকার লোকে বলে, কিচনি ডাকলে কারও না কারও প্রাণ যায়। আ ডেথ সিগন্যাল শর্মাজি!

গণনাথ সেন কর্নেলের দিকে নিস্পলক চোখে তাকিয়েছিলেন। হঠাৎ হন হন করে এগিয়ে এসে তার পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। রাজেশ শর্মা কর্নেলের দিকে ঘুসি পাকিয়ে তেড়ে এলেন। ইউ ওল্ড হ্যাঁগার্ড! হু আর ইউ?

আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

আই সি! বনোয়ারিজি ওয়ার্নড় মি! বাট আই ফরগট অ্যাবাউট ইউ। রাজেশ শর্মার চোখ জ্বলে উঠল।

কোয়াইট ন্যাচারাল শর্মাজি! জিরো আওয়ারে কিছু মনে থাকার কথা নয়। কাউন্ট ডাউন শুরু হতে যাচ্ছিল–ওয়ান…টু..থ্রি…হঠাৎ কিচনির ডাক। তারপর দিস ওল্ড হ্যাঁগার্ড! বাধা পড়ে গেল।

রাজেশ শর্মা তার দিকে এক পা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কর্নেল রিভলভার বের করলেন। শক্ত মুখে গম্ভীর স্বরে বললেন, রোজি জেভিয়ার এবং কেয়া সেনের খুনীকে ধরিয়ে দেবার মতো এভিডেন্স আমার হাতে আছে, শর্মাজি! তা ছাড়া আমি রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার। আত্মরক্ষার জন্য গুলি করে কারও ঠ্যাং ভেঙে দিলে সেটা ক্রাইম বলে সাব্যস্ত হবে না।

রাজেশ শর্মা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে আস্তে বললেন, আপনি কত টাকা চান?

বনোয়ারিজির আইডিয়া! অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার দুবেজি আমাকে দশ হাজার টাকা দেখিয়েছেন।

দেন টোয়েন্টি। এগ্রি?

নীচে চলুন। কথা হবে। কর্নেল রিভলভারের নল দিয়ে সিঁড়ির দিকটা নির্দেশ করলেন।

রাজেশ শর্মা সিঁড়িতে পা দিয়ে বারবার পিছনে তাকাতে তাকাতে নেমে গেলেন। তারপর হঠাৎ একলাফে ভূপের আড়ালে উধাও হয়ে গেলেন। কর্নেল একটু সতর্ক হয়েছিলেন তার কাছে ফায়ার আর্মস আছে ভেবে। একটু পরে বুঝলেন, নেই। থাকলে গুলি ছুঁড়তেন। ফটকে গণনাথকে দেখা গেল। তার বডিগার্ড আসছিল হন্তদন্ত। কর্নেল দেখলেন, গণনাথ তাকে চাপাস্বরে কিছু বলমাত্র সে দৌড়ে গেল। কর্নেল ডাকলেন, মিঃ সেন!

গণনাথ ঘুরে দাঁড়ালেন।

শর্মাজিকে ধরতে পারবে বলে মনে হয় না। লোকটির এই এরিং নখদর্পণে। আপনার লোক পৌঁছুনোর আগেই গাড়িতে চেপে উধাও হয়ে যাবে। শর্টকাটে ছুটে গেছে ও।

গণনাথ আস্তে বললেন, এতটা সাহস ওর হবে, কল্পনাও করিনি। আপনি ঠিকই বলেছিলেন, সব মানুষ একচক্ষু হরিণ। বরুণের মতো গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করাবে–এটাই আমার মাথায় ছিল। তাই তপনকে গাড়ির দিকে নজর রাখতে বলেছিলাম। বেলা হয়ে যাচ্ছে, পারিজাত হোটেল থেকে আমার লোকেরা আসছে না। তাই গাড়ি নিয়ে বেরুব ভাবছি। হঠাৎ শুনি বাইরে ধস্তাধস্তি, হইচই। তপন চেঁচাচ্ছে। বেরিয়ে গিয়ে দেখি তপন একজনকে পেটাচ্ছে।

রামলালকে।

গণনাথ একটু অবাক হলেন। আপনি জানেন?

এটুকু জানি যে সে মেকানিক। গাড়ির সব কিছু ওর জানা। টাকার লোভে শর্মার হুকুম তামিল করত।

তপন রামলালকে মেরেই ফেলত। ইতিমধ্যে বেচুবাবু এসে গেলেন আমার লোকজন নিয়ে। রামলালকে থানায় পাঠানো হল। এদিকে আমার ছবির হিরোইন কলকাতা ফিরে গেছে সকালের ট্রেনে। বরুণের সঙ্গে এমোশনাল সম্পর্ক ছিল। শক্ড় হওয়ারই কথা। গণনাথ সিগারেট ধরালেন। উত্তেজনায় তিনি হাঁপাচ্ছিলেন। আর আমার ছবি করা হল না! আপনি ঠিকই বলেছিলেন, ডেঞ্জারাস গেম। ভাবতে বুক কাঁপছে। আপনি গিয়ে না পড়লে এতক্ষণে আমি…ওঃ! আমার মাথা ঘুরছে মশাই!

গণনাথ পা বাড়ালেন। কর্নেল বললেন, আপনি কি কলকাতা ফিরে যাবেন?

গণনাথ পিছু না ফিরে গলার ভেতর বললেন, হাঃ! মনে হল শব্দটা গর্জনমিশ্রিত আর্তনাদ।

অনির্বাণ সোমের খুনী কে, মিঃ সেন?

প্রিয় নয়। ওই শয়তানটা রাজেশ শর্মা।

এক মিনিট মিঃ সেন। কর্নেল এগিয়ে গেলেন। অনির্বাণকে কেন রাজেশ খুন করবে? কোম্পানিরই বা কী স্বার্থ এতে? অনির্বাণও কি কোম্পানিকে ব্ল্যাকমেল করত?

গণনাথ জোরে মাথা নাড়লেন। আনু কিছু জানত না। জানত কেয়া। আমি কিছু জানি। আর জানে প্রিয়। তবে বরুণও কিছু আভাস পেয়েছিল মনে হচ্ছে। তাই শুওরের বাচ্চা রাজেশ নিশ্চয় রামলালকে বলে রেখেছিল…

বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন, তা হলে আনু খুন হল কেন?

গণনাথ ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, ব্যাপারটা আমি ভেবেছি। মনে হয়েছে, খুনী প্রিয় ভেবে ভুল করে আনুকে গুলি করে মেরেছে। এখন মনে হচ্ছে, আমি কারেক্ট। শর্মা ব্যাটাচ্ছেলে সে রাতে পাশের ঘরে ছিল। সে রামলালকে দিয়ে প্রিয়র গাড়ির ব্রেক খারাপ করিয়ে সম্ভবত শর্টকাটে ছুটে আসে। ইতিমধ্যে আনু গিয়ে পৌঁছেছে। অন্ধকারে শর্মা আনুকে প্রিয় ভেবে গুলি করে। তারপর গঙ্গায় বডিটা ফেলে দিয়ে আসে। হয়তো পরে রামলালকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল।

কর্নেল বললেন, হুঁ। আপনার কথায় যুক্তি আছে।

আই অ্যাম সেন্ট পার্সেন্ট কারেক্ট। এবার আপনি এর হেস্তনেস্ত করুন। কিন্তু সরি! আমার মাথা ঘুরছে। চলি। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

গণনাথ চলে গেলেন। কর্নেল দাঁড়িয়ে রইলেন। রাজেশ শর্মার সঙ্গে এখন ফায়ার আর্মস নেই বোঝা গেল। তা হলে প্রিয়র গাড়ির ভেতর পাওয়া। রিভলভারটা তারই। গণনাথ ঠিকই বলেছেন। ভুল করে আনুকে গুলি করেছিল প্রিয় ভেবে। অন্ধকার ও কুয়াশায় ভুলটা স্বাভাবিক। এও ঠিক যে শর্মা প্রিয়র জন্যই আগে থেকে ওই বাংলোয় এসে ওত পেতেছিল। শর্মা কোম্পানির হাতের পুতুল।

কিন্তু ওই জঙ্গলের ভেতর টার্গেট প্র্যাকটিস করত কে? রাজেশ শর্মা আশাপুরা থেকে এত দূরে এসে টার্গেট প্র্যাকটিস করত? গাছের গুঁড়িতে পাওয়া গুলিটা পয়েন্ট বত্রিশ রিভলভারের। রাজেশের এই সব জায়গা পরিচিত, বোঝ যায়। রোজি এবং কেয়াকে নিয়ে সে প্রেমের ফাঁদও পেতেছিল এখানে, সেটা আঁচ করা যায়। কাজেই রাজেশের পক্ষে টার্গেট প্র্যাকটিশ করা–প্রিয়কে মারার জন্য হাত পাকাতেই, অসম্ভব বলা চলে না। উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোনও-কোনও মানুষকে দুর্দান্ত নিষ্ঠুর প্রাণী করে ফেলে।

কর্নেল জঙ্গলের ভেতর ঢুকলেন। সেই গাছটা খুঁজে বের করতে হবে। দিনের আলো কমে আসছে দ্রুত। আসন্ন শীতসন্ধ্যায় পাখিরা তুমুল ঝগড়াঝাটির মতো হল্লা করে। নাকি নিষ্ঠুর শীতরাত্রির বন্দনা? অথবা প্রকৃতি ঠাণ্ডাহিম হতে হতে প্রচণ্ড স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার আগে এই সব শব্দের উত্তাপে নিজেকে উষ্ণ করে নেয়? প্রকৃতি বড়ো রহস্যময়।

পিছনে শুকনো পাতায় মচ মচ শব্দ; কর্নেল চমকে উঠলেন। ধূসর আলোয় বাইনোকুলারে প্রত্যেকটি ইঞ্চি বড় আকারে দেখা যাচ্ছিল। বর্মার জঙ্গলে গেরিলাযুদ্ধের তালিম দিয়েছেন মার্কিন ‘এল আর পি জি’র সৈনিকদের। তারা ব্রিটিশ থার্টিন্থ ডিভিসনের সমান্তরাল জঙ্গলের ভেতর এগিয়ে জাপানি বাহিনীকে পেছন থেকে আঘাত হেনেছে। কোন শব্দ কোথা থেকে আসছে, কী সেই শব্দ এবং বিপজ্জনক না নিরাপদ, বুঝতে পারলেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আবার একটু হাঁটলেন, শব্দটা পরীক্ষা করতেই। আবার মচমচ শব্দ পিছনে।

রিভলভার বের করতে গিয়ে করলেন না। ডাকলেন, মিঃ জেভিয়ার।

কোনও সাড়া এল না।

কর্নেল একটু হেসে ইংরেজিতে বললেন, মিঃ জেভিয়ার! নাকের ডগা দিয়ে আপনার মেয়ের খুনী পালিয়ে গেল।

এবার লতাগুল্মে ঢাকা একটা পাথরের পাশে বেলিংটন জেভিয়ারকে দেখা গেল। নীল চোখে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন। ভিজে চোখ। হাতের চেটোয় মুছে ভাঙা গলায় বললেন, আজ আমার শেষ চেষ্টাও ব্যর্থ হল। প্রভু যিশু চান না, তাঁর শুভ জন্মদিনের প্রাক্কালে একজন ভক্ত খ্রিস্টানের হাতে মানুষের রক্ত ঝরুক।

জেভিয়ার ক্রস আঁকলেন বুকে। কর্নেল বললেন, পাপী শিগগির তার শাস্তি পাবে। আসুন, চুরুট টানা যাক। উত্তেজনা আমাদের দুজনকেই ক্লান্ত করেছে।

একটু পরে চুরুট টানতে টানতে খকখক করে কেসে জেভিয়ার বললেন, রোজির ঘরের তালা ভেঙে চোর ঢুকেছিল।

কিছু চুরি গেছে কি?

বেলিংটন জেভিয়ার গম্ভীর মুখে বললেন, রোজির একটা নোটবুক এবং একটা চিরকুট। রোজির মৃত্যুর কয়েকমাস পরে চিরকুটটা আমি দেখতে পাই। তখন বুঝতে পারি কী ঘটেছিল। কিন্তু শয়তানটাকে আর দেখতে পাইনি এ তল্লাটে। মহাশয়! আমি একজন গরিব বুড়োমানুষ। খোঁড়া। কী করতে পারতুম?

তার চোখ ভিজে গেল আবার। কর্নেল বললেন, বড্ড শীত! আসুন, আমরা একটা আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়ে গল্প করি। জঙ্গলে আগুনের কুণ্ডের কাছে বসে গল্প করা আমার তো দারুণ লাগে। এ বিষয়ে আপনার কী মত?

জেভিয়ার উৎসাহে শুকনো ডালপালা কাটতে থাকলেন। কর্নেলও শুকনো পাতা কাঠকুঠো জড়ো করলেন। জেভিয়ার. বললেন, আমি নিশাচর মানুষ। আমারও এই অভ্যাস আছে। লোকেরা দূর থেকে ব্যাপারটা দেখে ভয় পায়। দ্বিপদ প্রাণীগুলো যত ভয় পায়, তত আমার আনন্দ হয়।

লাইটার জ্বেলে আগুন ধরিয়ে কর্নেল বললেন, লোকেরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, কিচনির ডাককে।

জেভিয়ার বসে আগুনে হাত সেঁকতে সেঁকতে বললেন, কিচনি কিছুক্ষণ আগে ডেকেছিল। শুনেছেন কি?

শুনেছি। তবে আমার ধারণা, কিচনির এই শেষ ডাক।

জেভিয়ার তার দিকে একবার তাকালেন। ঠোঁটের কোনায় একটু বাঁকা হসি। জঙ্গলের ভেতরকার ধূসরতা গাঢ় হয়েছে। পাখিদের ডাক থেমে গেছে। একটু পরে কর্নেল বললেন, মিঃ জেভিয়ার! একটা গাড়ির ওপর আপনার এত আক্রোশ কেন? কেন দু-দুবার একই গাড়ির কাচ ভাঙলেন?

মুখ নামিয়ে জেভিয়ার বললেন, গাড়িটা আমার চেনা। নাম্বার মুখস্থ। ওই গাড়িতে চেপে শয়তান আর রোজিকে নিয়ে আসত। ওর জন্যই ক্যারি রোজিকে ডিভোর্স করে অস্ট্রেলিয়া চলে যায়। গত অক্টোবরে দেখি গাড়িটা অন্য একজন চালাচ্ছে।

সেই ‘ফানি চ্যাপ’। কোম্পানি তাকে গাড়িটা দিয়েছিল।

জেভিয়ার রুষ্ট মুখে বললেন, গাড়িটাকে বাগে পাইনি তখন। তো উনিশে ডিসেম্বর বিকেলে সেচ বাংলোয় শয়তান ‘আর’-কে দেখতে পেলাম। সন্ধ্যার পর চুপিচুপি গিয়ে বাংলোর কাছে ঝোপের ভেতর ওত পেতে রইলাম। হাতে এই কাটারি। কিন্তু সে বাংলো থেকে বেরুচ্ছে না। জেদ চেপে গেল। বসে রইলাম–ওকে বেরুতেই হবে। তখন অনেক রাত। লনের নুড়িতে পায়ের শব্দ শুনে বাংলোর নিচু দেয়ালের কাছে গেলাম। মাথা তুলে দেখি, অন্য একজন। সে আমাকে দেখতে পেয়েই হইচই করল। রামলাল আমাকে ভাগিয়ে দিল। কুঠিবাড়িতে আমার বন্ধু ক্লিফটনের সঙ্গে আড্ডা দিতে গেলুম। ও ঈশ্বর! হঠাৎ স্টেশন রোডে সেই গাড়িটা দেখতে পেলাম–বাংলোর দিকে যাচ্ছে! সোজা চলে গেলাম আবার। গাড়িটা রাস্তায় ঘুরিয়ে রেখে ‘ফানি চ্যাপ’ বাংলোর দিকে গেল। এই তো সুযোগ! কিন্তু দুর্ভাগ্য! বদমাস রামলাল এসে পড়ল। তারপর দেখি, সে বনেট খুলে কী করছে। আমি তখন ঝোপের আড়ালে। দেখলাম, কী একটা করে রামলাল তখনই চলে গেল। তখনও বুঝতে পারিনি ব্যাপারটা কী।

কর্নেল আগুনে কয়েকটা শুকনো কাঠ গুঁজে দিয়ে বললেন, ব্রেক বিগড়ে দিয়েছিল সে।

জেভিয়ার চুপ করে থাকলেন। কাঠের নকল পা ছড়ানো, অন্য পায়ের হাঁটু ভাঁজ করা। চুরুটটা কামড়ে ধরে আগুনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

কর্নেল বললেন, তারপর কী হল বলুন?

‘ফানি চ্যাপ’ বেরিয়ে এল। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেল। এবারও একটা সুযোগ হাতছাড়া হল। বলে জেভিয়ার বুকে ক্রস আঁকলেন। শ্বাস ছেড়ে ফের বললেন, প্রভু যিশুর ইচ্ছা সবই।

কুঠিবাড়ির দিকে শেয়ালের ডাক শোনা গেল। কয়েকবার ডাকাডাকি করে শেয়ালগুলো চুপ করলে কর্নেল বললেন, কিন্তু আপনিই গাড়ির কাচ ভেঙেছিলেন, মিঃ জেভিয়ার! তাই নয় কি?

বেলিংটন জেভিয়ার বিষণ্ণ মুখে বললেন, আমি দুঃখিত। আর কয়েক ঘণ্টা পরে পরিত্রাতা প্রভু যিশুর শুভ জন্মক্ষণ। এটা একজন ভক্ত ক্যাথলিকের কনফেসন বলে ধরে নিন। আমি গাড়ির কাচ ভেঙে পাপ করেছি। আমার কনফেস করা উচিত।

কর্নেল সকৌতুকে বললেন, জানেন কি কেউ কেউ আমাকে ফাদার ক্রিসমাস বলে ডাকে?

আপনাকে ঠিক তা-ই দেখায় বটে! জেভিয়ার কর্নেলকে একবার দেখে নিলেন। কিন্তু কর্নেলের কৌতুক তাকে ছুঁতে পারল না।

গাড়ির কাচ ভাঙার ঘটনাটা বলুন এবার। কনফেসনে সমস্ত কিছু খুলে বলতে হয়, আপনি জানেন মিঃ জেভিয়ার!

একটু চুপ করে থেকে জেভিয়ার বললেন, স্টেশন রোড ধরে ফিরে আসছিলাম। হঠাৎ দেখি, স্টেশন রোডে একটা গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে। কিন্তু গাড়িটা থেমে আছে। সোজাসুজি চলে গেলাম। আশ্চর্য লাগল। গাড়িটা ঝোপের ভেতর আটকে গেছে।

ব্রেক বিগড়ে দিয়েছিল রামলাল। ঝোপে না ঢোকালে ‘ফানি চ্যাপ’ মারা পড়ত।

হ্যাঁ। কিন্তু গাড়িটাকে ভাঙচুর করার এমন সুযোগ ছাড়া যায় না। আমি কিচনির ডাক ডাকলাম। অমনি লোকটা গাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল এবং পালাতে থাকল। ফানি চ্যাপ’! আমি আলোর আড়ালে গাছপালার ভেতর ক্রাচের শব্দ করতে করতে কিছু দূর গেলাম। ওকে আরও ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম। কুত্তাকা মাফিক ভাগা!

জেভিয়ার আবার খিকখিক করে হাসতে লাগলেন। কর্নেল বললেন, তারপর ফিরে গিয়ে গাড়ির কাচ ভাঙলেন?

প্রথমে হেডলাইট। বলে জেভিয়ার হাতের নিভিয়ে দেওয়া চুরুটটা কোটের পকেটে ঢোকালেন। ক্রাচের ঘায়ে আলো খতম করে সমস্ত কাচ চুরমার করলাম। তারপর মনে হল কেউ আসছে। অন্ধকারে আমি জন্তুর মতো দেখতে পাই। রাস্তার উল্টোদিকে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইলাম। সে এসে থমকে দাঁড়াল। গাড়িটা দেখতে পেয়ে কাছে গেল সে। কাচ ভাঙা দেখেও সে অবাক হল না। আশ্চর্য মহাশয়! সে গাড়িটাকে লাথি মারতে থাকল। কিছুক্ষণ পরে সে গাড়িটার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রইল তো রইল! ভারি অদ্ভুত ব্যাপার! জেভিয়ার শ্বাস ছেড়ে বললেন, সময়ের বোধ আমি কবে হারিয়ে ফেলেছি। আমি এক সময়হারা মানুষ, মহাশয়। কতক্ষণ পরে দেখি, সে টর্চ জ্বেলে গাড়ির ভেতরটা দেখছে। এ-ও অদ্ভুত! এতক্ষণ সে টর্চ জ্বালেনি।

হুঁ, টর্চটা গাড়ির ভেতর ছিল শুনেছি।

আরও অদ্ভুত, সে এবার রাস্তায় পায়চারি শুরু করল। মাঝে মাঝে টর্চ জ্বালছিল এদিক-ওদিকে। বেগতিক দেখে আমি গুঁড়ি মেরে ঝোপের আড়ালে চলে গেলাম। কিচনির ডাক ডেকে ওকে ভয় পাইয়ে দিতাম। কিন্তু আমি দেখতে চাইছিলাম তার কী উদ্দেশ্য! আরও কতক্ষণ কেটে গেল। অন্ধকারটা কুয়াশায় ভরে গেল। আপনি দেখে থাকবেন, মেঘের মতো কুয়াশা চলাফেরা করে শীতের রাতে। হঠাৎ শুনি গুলির শব্দ। শুধু দেখলাম জ্বলন্ত টর্চটা আছড়ে পড়ল। অমনি আমি ভয় পেয়ে পালিয়ে গেলাম। আই কান্ট ট্যাল্ উইথ এনি ফায়ার আর্মস!

বলে বেলিংটন জেভিয়ার হঠাৎ ভয় পাওয়া মুখে উঠে দাঁড়ালেন। কর্নেল বললেন, একটা কথা মিঃ জেভিয়ার! ওদিকে একটা গাছে কেউ গুলি ছুঁড়ে হাতের টিপ করত। আপনি বনচর মানুষ। নিশ্চয় আপনার চোখে পড়ে থাকবে।

জেভিয়ার পা বাড়িয়ে বললেন, আর পাপের কথা নয়। শুভ ক্রিসমাস আসন্ন। আমি গির্জায় যাওয়ার জন্য পোশাক বদলাব।

প্লিজ মিঃ জেভিয়ার।

জেভিয়ার ক্রাচে ভর করে চলতে চলতে চাপাস্বরে বললেন, শিগগির এখান থেকে চলে যান। আমার মাননীয় বন্ধু ক্লিফটনের আত্মাকে বিরক্ত করবেন না। গো অ্যাওয়ে! গো অ্যাওয়ে!

বেলিংটন জেভিয়ার জঙ্গলের ভেতর অন্ধকারে উধাও হয়ে গেলেন।

.

২০.

সুশীলা কফি দিয়ে চলে যাচ্ছিল। কর্নেল বললেন, সুশীলা! আজ ফিরভি কিচনি চিল্লায়ি!

সে চমকে উঠে ঘুরে কপালে দু’হাত ঠেকাল। হায় রাম! ফিরভি কিসিকা জান জায়েগা।

হমনে উনকো বাঁচা দিয়া, সুশীলা!

তার মুখে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের টানাপোড়েন খেলছিল। ফিসফিসিয়ে উঠল সে, তব ঔর কিসিকা খতরনাক হোগা, কর্নিলসাব! তারপর একটু ইতস্তত করে বলল, আপভি হোঁশিয়ার রহনা।

বলেই সে চলে গেল। কর্নেল কফিতে চুমুক দিলেন। আজ সারাটা দিন খুব ধকল গেছে। চমকপ্রদ নাটকীয় কিছু ঘটনা ঘটেছে। একেকটি ঘটনায় একটি জটিল রহস্যের একেকটি স্তর উন্মোচিত হয়েছে, তা ঠিকই। কিন্তু ফলের ভেতর শক্ত আঁটির মতো একটা জায়গা রয়ে গেল। বিজয়েন্দুর অস্ত্রটা!

রাণু বলছিল, প্রিয় তার বউয়ের প্রাক্তন প্রেমিককে খুন করার জন্য শালীকে দিয়ে ওটা হাতিয়েছিল। রাণু প্রিয়র পয়েন্ট বাইশ চীনা রিভলভারটা দেখেনি। কিন্তু অরীন্দ্র তো দেখেছেন। নাতজামাইয়ের অস্ত্রগুলো তাঁর চেনার কথা। যদি সত্যিই ওটা বিজয়ের হত, তার মতো মানুষ হইচই বাধিয়ে বসতেন। অথচ তেমন কোনও প্রতিক্রিয়া তার মধ্যে ঘটল না।

নাকি কোনও স্ক্যান্ডালের ভয়ে অরীন্দ্র ব্যাপারটা চেপে গেলেন?

 পিউ বলছিল, পিয়ালির কাছে সে শুনেছে, একসময় রাণুর নামে স্ক্যান্ডাল রটেছিল। তার সহজ মানে রাণু কারও সঙ্গে প্রেম করত। কে সে! পিউকে পিয়ালির পেছনে লাগানো দরকার। কারণ গণনাথ বলেছিলেন, খুনী প্রিয় ভেবেই ভুল করে আনুকে মেরেছে। গণনাথের মতে, রাজেশ শর্মা খুনী এবং আপাতদৃষ্টে এর যুক্তি তো অস্বীকার করা চলে না। কিন্তু বিজয়ের একটা ফায়ার আর্মস নিখোঁজ হওয়া বড় গোলমেলে ব্যাপার।

কর্নেল নড়ে বসলেন। অরীন্দ্রের উইলের কথা মনে পড়ে গেল। তার জীবদ্দশায় একজন ওয়ারিশের মৃত্যু হলে বাকি দুজন সম্পত্তি পাবে। প্রিয় মারা পড়লে সম্পত্তি পাচ্ছে রাণু ও সাত্যকি। রাণু বিধবা অতএব সবটাই কার্যত সাত্যকিই পাচ্ছে। আবার প্রিয় মারা পড়লে তার মৃত্যুর দায় চাপানো যায় তার কোম্পানির ওপর। কারণ কোম্পানির একটা রহস্যময় কারবার আছে এবং প্রিয় সেটার গোপন তথ্য জানত। কোম্পানিকে সে ব্ল্যাকমেল করত। ব্ল্যাকমেলারকে কোম্পানি চুপ করিয়ে দিতে চাইবে, এটা স্বাভাবিক।

প্রিয় যে কোম্পানির গোপন তথ্য জানত এবং কোম্পানিকে ব্ল্যাকমেল করত, সে-কথা কি রাণু বা সাত্যকির জানা সম্ভব? প্রিয় সাত্যকিকে ওই। সাইকেলটা দিয়েছিল। রঙ বদলে নিতে বলেছিল। সাত্যকির পক্ষে কথাটা জানা কি সম্ভব?

কিন্তু সাত্যকি গোঁয়ার, আত্মমগ্ন, নিছক অ্যাথলেট টাইপ ছেলে। তার একমাত্র স্বপ্ন ঘুসি-লড়িয়ে হওয়া। তার সমস্ত বুদ্ধিসুদ্ধি দুটো হাতে গিয়ে জড়ো হয়েছে। দুটো হাতই তার চরম অস্ত্র। কুঠিবাড়ির জঙ্গলে গিয়ে বিজয়ের ফায়ার আর্মস নিয়ে টার্গেট প্র্যাকটিস করা–প্রিয়কে হত্যার জন্য, তার চরিত্রের সঙ্গে মানাচ্ছে না। এই কাজটার মধ্যে একটা নিখুঁত পরিকল্পনা আছে। অনবদ্য চাতুর্য আছে।

প্রিয় সে রাতে আনুকে লক্ষ করে গুলি ছুঁড়েছিল। তার চীনা রিভলভারের একটা ফায়ার করা বুলেটও আছে। ওদিকে বেলিংটন জেভিয়ার মাত্র একবারই গুলির শব্দ শুনেছিলেন।

তারপর আনুর ডেডবডি গঙ্গায় পাওয়া গেল। ঘটনাস্থলে নয়।

কর্নেল হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দিলেন। জীবনে এমন জটিল রহস্যের পাল্লায় পড়েননি। চুরুট ধরিয়ে চোখ বুজে দাড়িতে অভ্যাসমতো আঙুলের চিরুনি টানতে থাকলেন।

 বাইরে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। কেউ নাচের ছন্দে নামছে। চোখ খুলে দরজার দিকে তাকালেন কর্নেল। পিউ ঘরে ঢুকে উত্তেজিতভাবে বলল, দা মিট্রি ইজ সলভড, কর্নেল! আ হ্যাপি নিউজ অন দা ইভ অফ হ্যাপি ক্রিসমাস! দা মার্ডারার ইজ কটু রেডহ্যান্ডেড। দাঁড়ান, বুড়োদাকে ডাকি। সব ডিটেলস শুনবেন।

কর্নেল একটু হাসলেন। তুমি নিশ্চয় রামলালের কথা বলছ, ডার্লিং!

পিউ ধুপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। হতাশ ভঙ্গিতে বলল, ভ্যাট। আপনাকে যে একটা সাসপেন্স দেব, তার উপায় নেই।

রামলাল কি কবুল করেছে সে তোমার আনুদাকে খুন করেছে!

পিউ মাথা নাড়ল। তা কেউ করে? কিন্তু বুড়োদা বলল, পুলিশ খুব ধোলাই দিয়েছে। ধোলাইয়ের চোটে বলে ফেলেছে, সে জামাইবাবুর গাড়ি–তারপর বরুণদা যখন সেই গাড়িটা পেল, দুবারই গাড়ির ব্রেক আর স্টিয়ারিং বিগড়ে দিয়েছিল।

বলেনি সে অন্য একজনের হুকুমে এ কাজ করেছিল?

বুড়োদাকে ডেকে আনি। আমি অত ডিটেলস শুনিনি! বলে পিউ উঠে দাঁড়াল।

বসো। কথা আছে।

পিউ ফের বসে বলল, আপনাকে কেমন যেন দেখাচ্ছে। ভী-য-ণ টায়ার্ড।

হুঁ, টায়ার্ড। কর্নেল মুখটা করুণ করে বললেন, তবে সেজন্যও না। আজ দুই ছোকরার হাতে খুব হেনস্থা হয়েছি। আর বোলো না! আশাপুরায় গিয়েছিলুম। গিয়ে এক বিপদ। তবে হিন্দি ভাষার এই একটা অনবদ্য ঐশ্বর্য আছে, ডার্লিং! কাকেও গালাগালি দিতে হলে হিন্দির তুলনা নেই। আফটার অল, ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের বাহন। গালমন্দও একটা ভাব। তারও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারুকার্য আছে। হিন্দিতে সেটা যত স্পষ্ট ফোটে, পৃথিবীর আর কোনও ভাষায় তা ফোটে কি না সন্দেহ। তোমার মনে পড়তে পারে, পাগলাসায়েব বলেছিলেন, দা ফানি চ্যাপ কুত্তাকা মাফিক ভাগ জাতা! এই হিন্দি অংশটা তুমি ইংরেজি কি বাংলায় বললো। ওই অসাধারণ ব্যঞ্জনাটি ফুটবে না। ডার্লিং! আজ সত্যিই আশাপুরা থেকে ‘কুত্তাকা মাফিক ভাগ জাতা’ ঘটেছে আমার বরাতে। আমার লেজ নেই। কুকুরের মতো লেজ থাকলে লেজ গুটিয়ে যেত! ওঃ! কী অপমান এই বুড়োবয়সে!

পিউ হাঁ করে শুনছিল। বলল, কে তারা?

যারাই হোক, কানাকে কানা খোঁড়াকে খোঁড়া বললে যেমন রাগ হয়, বুড়োকে বুড়ো বললেও হয়তো তেমনই রাগ হয়। কিন্তু বুঢঢে এবং তার সঙ্গে ‘আ বে’ প্লাস ইংরেজির ব্রাদার-ইন-ল ইন হিন্দি!

পিউ হেসে ফেলল। আপনি সত্যিই অদ্ভুত মানুষ। আপনার কাছে ফায়ার আর্মস থাকে। রাণুদির মুখে শুনেছি আপনার গায়ে নাকি ভীষণ শক্তি এ বয়সেও। ওদের মাথা দুটো ঠুকে দিলেন না কেন?

কর্নেল জোরে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, সিন ক্রিয়েট করতে চাইনি। যাই হোক, চারুভবনের খবর বলো।

পিউ গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, অ্যাজ ইট ইজ। দাদামশাই পামকিন ফেস। বেশি কথা বলছেন না। রাণুদি তো কথা বলাই বন্ধ করেছেন। খালি বুড়োদা নৰ্মাল। দিদি আগামীকাল চলে যাবে বলে রেডি হচ্ছিল। বড়োদার কাছে রামলাল ধরা পড়ার খবর শুনে মত বদলেছে। জামাইবাবুর শিগগির নাকি ছাড়া পাওয়ার চান্স আছে। বুড়োদাই বলল।

কর্নেল একটু চুপ করে থেকে বললেন, তুমি রাণুর স্ক্যান্ডাল রটার কথা বলেছিলে।

হুঁ। পিয়ালি চুপি চুপি বলেছিল। পিউ চাপাস্বরে বলল, রাণুদির সঙ্গে একটা লোকাল লোকের প্রেম-ট্রেম ছিল। দাদামশাই তাকে পছন্দ করতেন না বলে তার সঙ্গে রাণুদির বিয়ে দেননি। হি ওয়াজ আ স্কুল টিচার। সেজন্য বুড়োদার জামাইবাবু–শিকারী ভদ্রলোক রাণুদিকে একবার গুলি করতে গিয়েছিলেন।

এখন সে কোথায় আছে বলেনি পিয়ালি!

রাণুদির হাজব্যান্ডের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আপনি পিয়ালির কাছে ডিটেলস শুনবেন। পিউ তেতো মুখে বলল, এদের ফ্যামিলিতে প্রচুর স্ক্যান্ডাল আছে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না। প্রথম দিন এসে তো ভী-য-ণ ভাল লেগেছিল। অথচ… এরা আবার দিদির নামে যা-তা বলে। আমার সম্পর্কেও আড়ালে বিচ্ছিরি রিমার্ক পাস করে। গেঁয়ো সুপারস্টিশাস এলিমেন্টস! পিউ হঠাৎ হাসল। অ্যান্ড দ্যাট কিচনি!

আজ আবার কিচনির ডাক শুনেছি, পিউ!

পিউ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, অ্যান ওয়াইল্ড অ্যানিম্যাল! সিওর।

সাবধান ডার্লিং! তোমাকে সাত্যকির ‘সিওর’ ভূতটা পেয়েছে।

বুড়োদার মুখে কথাটা দারুণ লাগে, বলুন।

হুঁ। কিন্তু তুমি কোথায় যাচ্ছ?

বুড়োদার ঘরে।

নাচতে?

ভ্যাট! টিভিতে আজ ব্রুনো এবং টাইসনের ইন্টারভিউ!

তারা কারা?

 পিউ চোখ বড় করে বলল, আপনি জানেন না! হেভিওয়েট বক্সার। সরি কর্নেল, আপনি সেই মহম্মদ আলির যুগে পড়ে আছেন। আলি ইজ সাফারিং ফ্লম পার্কিনসনস ডিজিস।

আমার ভয় হচ্ছে ডার্লিং, তোমাকেও না সাত্যকি বালির বস্তার সঙ্গে লড়িয়ে দেয়!

নৌ। আই লাইক টু ডান্স। পিউ চোখে উজ্জ্বল হাসল। ড্যান্সিং ইজ দা ভয়েস অব মাই বডি।

বাই দা বাই, যে রাতে অনির্বাণ খুন হয়, তুমি বলেছ, খুব নেচেছিলে!

সো হোয়াট? কর্নেলের মুখে কৌতুক ছিল না দেখে পিউ আবার চার্জ করল, কেন ওকথা বলছেন?

জাস্ট আ কোয়েশ্চন। সে-রাতে যখন শুতে গেলে, মনে আছে?

পিউ একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর বলল, ঘড়ি দেখিনি। জামাইবাবু ফেরার পর মাত্র মিনিট দশেক রাণুদি টেনে নিয়ে গেলেন জোর করে।

সাত্যকি নাচছিল কি?

ভ্যাট! ওর নাচ মানে জগিং। নাচতে জানে নাকি? ওর অ্যাম্বিশন বক্সিংয়ে ওয়ার্লড চ্যাম্পিয়ন হবে। পিউ হাসতে হাসতে পা বাড়াল। অ্যামেরিকা সম্পর্কে ওর প্রচুর ইন্টারেস্ট। বলে কী জানেন? গ্র্যান্ডপার জন্য ওর কিছু হল না। দ্যাট ওল্ড ফেলো ওকে কোথাও যেতে দেবে না।

বাইরে অরীন্দ্রের সাড়া পেয়ে পিউ ঠোঁটে আঙুল রেখে কর্নেলকে ইশারা করেই বেরিয়ে গেল।

অরীন্দ্র ঘরে ঢুকে গম্ভীর মুখে বসলেন। ছড়িটা দুপায়ের ফাঁকে রেখে হাতলটা দুহাতে চেপে ধরে বললেন, সিনহাবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছে?

হ্যাঁ। কর্নেল পোড়া চুরুটটা অ্যাশট্রেতে ঘসতে ঘসতে বললেন, ওঁর মতে কোনও প্রাইমা ফেসি এভিডেন্স থাকলেও সেসনে টিকবে না। পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ দুর্বল। রিভলভারটা তো পুলিশ খুঁজে বের করেনি। করেছে গ্যারেজের লোকে। কাজেই ওটা প্ল্যান্টেড হতে পারে। বাকি রইল চিঠি। যে খুন হয়েছে, ওই চিঠিটা তারই লেখা। ওটা দিয়ে খুনের মোটিভ এস্টাব্লিশ করা যাবে না।

আজ ইরিগেশন বাংলোর চৌকিদার রামলালকে ধরেছে পুলিশ। শুনেছেন তো?

তা শুনেছি। কাজেই প্রিয়র ফাড়া কেটে গেছে, বলা যায়।

অরীন্দ্র একটু কেসে গলা পরিষ্কার করে বললেন, কিন্তু এদিকে একটা মিসটিরিয়াস ব্যাপার ঘটেছে। একত্রিশে ডিসেম্বরে মধ্যে বিজয়ের ফায়ার আর্মসের লাইসেন্স রিনিউ করাতে হবে। আপনি তো জানেন, ওগুলো আমার নামে লাইসেন্স করিয়ে নিয়েছিলুম। বিজয়ের স্মৃতি! তো দুপুরে ওর ঘরে গেলুম। লাইসেন্সের কাগজপত্র ও-ঘরেই আলমারিতে রাখা আছে! কিন্তু…

দেখলেন রিভলভারটা নেই।

অরীন্দ্র চমকে উঠলেন। নিস্পলক তাকিয়ে রইলেন।

রাণু আজ সকালে আমাকে বলেছিল। তবে ওর ধারণা প্রিয়র রিভলভারটাই সেটা।

অরীন্দ্র জোরে মাথা নাড়লেন। রাণু ভুল বলেছে।

 রাণু অবশ্য প্রিয়র রিভলভারটা এখনও দেখেনি।

আমি দেখেছি। অরীন্দ্র চাপাস্বরে বললেন। বিজয়েন্দুরটা হলে আমি তখনই বলতুম।

বিজয়েন্দুর রিভলভারের কি লাইসেন্স আছে!

অরীন্দ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, আপনাকে গোপন করা। অন্যায়। ওটার কোনও কাগজপত্র তন্নতন্ন করে খুঁজে পাইনি। তখন বুঝতে পেরেছিলুম, ওটা বিজয়েন্দু কারও কাছে কিনেছিল। এই এরিয়ায় ফায়ার আর্মস ঘরে-ঘরে। লাইসেন্সের তোয়াক্কা করে না কেউ। কাগজে প্রায়ই দেখবেন জাত পাত জমিজমা নিয়ে বন্দুকবাজি হচ্ছে। যাই হোক, অনেকবার ভেবেছি কোথাও। ফেলে দিয়ে আসব। কিন্তু বিজয়ের স্মৃতি! আপনি তো জানেন, ওকে আমি কী স্নেহ করতুম। তা ছাড়া ওল্ড ক্লিফটনগঞ্জে আমার প্রভাব আছে। আপনি তো দেখলেন, পুলিশ বাড়ি সার্চ করতে পর্যন্ত এল না–আসেনি। আসার পয়েন্টও অবশ্য নেই। নেহাত ওই গবেট বুড়োটা রক্তের কথা পুলিশকে বলে না ফেললে কিছুই হত না–আপনি জেনে রাখুন। পুলিস এসে লনে দাঁড়িয়ে প্রিয়র বউকে দু একটা কথা জিজ্ঞেস করেই চলে গেল। অরীন্দ্র দু’হাতের মুঠোয় ধরা ছড়ির। বাঁটে চিবুক রেখে বললেন, প্রিয়র গাড়িতে অস্ত্র পাওয়া গেছে শুনেও আমার মাথায় আসেনি কিছু। আজ হঠাৎ আবিষ্কার করলুম, ওটা নেই। রাণু কান্নাকাটি করতে লাগল। ওর কাছেই সব ঘরের চাবি থাকে। আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

সাত্যকিকে জিজ্ঞেস করেছেন?

হুঁউ। ও খেপে গেল। ওকে তো জানেন। আস্ত বনমানুষ। দুটো হাতের মুঠো বাগিয়ে বলে কী, হাত থাকতে তার ফায়ার আর্মসের দরকার হবে না।

কর্নেল হাসলেন। সম্ভবত ‘সিওর’-ও বলেছে।

অরীন্দ্র কষ্টে হাসলেন। তারপর বললেন, নাহ্। সাত্যকির বন্দুক-পিস্তলে কোনও নেশা নেই। ওকে বলেছি, অন্তত মাঝে মাঝে তেল-ফেল দিয়ে পরিষ্কার করার কাজটা নে। ও তা-ও করবে না। অগত্যা আমাকেই কাজটা করতে হয়। অস্ত্রগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।

একটু পরে কর্নেল বললেন, এ রহস্যের সমাধান করতে হলে আপনার সাহায্য চাই।

এ কী অদ্ভুত কথা বলছেন! অরীন্দ্র একটু চটে গেলেন। সব রহস্যের সমাধানের জন্যই তো আপনার কাছে গিয়েছিলুম। আমি সাহায্য করব না, ভাবলেন কী করে?

বোসসায়েব, আমার একটা প্রশ্ন আছে। কিন্তু প্রশ্নটা ডেলিকেট বলেই ও-কথা বলেছি।

অরীন্দ্র চার্জ করলেন, করুন প্রশ্ন।

রাণুর সঙ্গে একজন স্কুলটিচারের সম্পর্ক নিয়ে স্ক্যান্ডাল রটেছিল। কে তিনি? অরীন্দ্র আস্তে বললেন, বারীন–বারীন রায়।

তিনি এখন কোথায় আছেন?

কে জানে! তানি খেয়ে কেটে পড়েছিল। বাউণ্ডুলে, লক্ষ্মীছাড়া টাইপ। পদ্য-দ্য লিখত।

কবি বলুন!

অরীন্দ্র রুষ্ট মুখে বললেন, কবি-টবি বুঝি না। আপনার প্রশ্নের উদ্দেশ্য বলুন। ফ্র্যাংকলি আলোচনা করব।

তার সঙ্গে রাণুর বিয়ে দিতে কী বাধা ছিল?

অরীন্দ্র একই মেজাজে বললেন, তখন যতীন বেঁচে নেই। বুড়ো স্কুলে পড়ে। বিহারের মাটি অন্য রকম মাটি। এ মাটি হাতের মুঠোয় রাখতে হলে বন্দুকবাজি করতে হয়। ন্যাকা মেয়েমুখো স্কুল টিচার দিয়ে এ কাজটা চলে না। আমি খুঁজছিলুম একজন বন্দুকবাজ নাতজামাই, যে এসে আমার পাশে দাঁড়াবে। তো পিয়ালির ঠাকুর্দা ছিল ডাক্তার। তার সঙ্গে কনসাল্ট করতুম। তার কাছে। খোঁজ পেলুম বিজয়েন্দুর। ভাগলপুরের ছেলে। ওর বাবাও ছিল নামকরা শিকারী। তখন বাবা-মা বেঁচে নেই। কাকা রেলের গার্ড। তার সঙ্গে…

কর্নেল তার কথার ওপর বললেন, এসব কথা অনেকবার বলেছেন, বোসসায়েব!

অরীন্দ্র ভুরু কুঁচকে বললেন, কোনটা বলিনি?

 বারীনবাবুর কথা।

বলার মতো নয় বলেই বলিনি প্রশ্ন করলেন, বললুম।

 এখনও রাণুর সঙ্গে বারীনবাবুর কোনও যোগাযোগ আছে কি না..

অ্যাবসার্ড! রাণু তা হলে কবে বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। ও নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে।

কিন্তু আমি জানতে পেরেছি, বিজয়েন্দু একবার রাণুকে গুলি করে মারতে গিয়েছিল।

অরীন্দ্র হাসবার চেষ্টা করলেন। আমার সিলেকশন ঠিক হয়নি। বিজয়েন্দু জংলি, গোঁয়ার। আর রাণুকে তো দেখে আসছেন এতদিন। বাঘের সঙ্গে বাঘিনীর লড়াই! এর মধ্যে বারীন-টারীন নো ফ্যাক্টর।

বাইরে সুশীলা সাড়া দিল। ভোজন করতে ডাকল রাণুদিদি। আপনারা আসেন। রাত হয়ে গেল।

অরীন্দ্র উঠে দাঁড়ালেন। চলুন! আজ একসঙ্গে খাব বলে রেখেছি রাণুকে। দরকার মনে করলে ওকে বাজিয়ে দেখতে পারেন। সেজন্য আমি কিছু মনে করব না। ঘর থেকে বেরিয়ে একটু দ্বিধার সঙ্গে বললেন ফের, হঠাৎ কেন এসব কথা, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। একটু আভাস অন্তত দিন।

কর্নেল আস্তে বললেন, কিছু না। নিছক কৌতূহল।

অরীন্দ্র গম্ভীর হয়ে গেলেন।

দোতলার কিচেনের লাগোয়া ডাইনিং রুমে টেবিল সাজিয়ে রাণু দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুখে গাঢ় অন্যমনস্কতার ছাপ। কর্নেল বললেন, পিউ সাত্যকি সাবর্ণী– ওরা খাবে না?

রাণু বললেন, ওরা টিভি দেখছে। আমরা সবাই পরে বসবখন।

অরীন্দ্র বললেন, ক্রিসমাসের রাতে প্রতিবার স্পেশাল মেনু হয়। আমার ক্রিশ্চিয়ান বন্ধুদেরও ডাকি। কিন্তু এবার আমাদের আনহ্যাপি ক্রিসমাস!

কর্নেল সহাস্যে বললেন, কেক দেখতে পাচ্ছি। দ্যাটস অল।

বুড়োকে দিয়ে আনিয়েছি। রাণু ঠাকুর্দার পিছনে দাঁড়িয়ে চেয়ারের দুদিকে হাত রেখে বললেন। আপনি তো কখনও ক্রিসমাসে এখানে আসেননি! খুব ধুমধাম হয়। পুজোর মতোই।

অরীন্দ্র চুপচাপ খাচ্ছিলেন। কর্নেল ব্রিটিশ আমলে কলকাতার ক্রিসমাসের গল্প করছিলেন। কিছুক্ষণ পরে বললেন, আশাপুরা থেকে ফিরে খ্রিস্টানপাড়ার স্টপে নামলুম। ওখানে তিষ্ঠোনো দায়। মাইকের চোটে কান ঝালাপালা। তখন প্রায় সওয়া চারটে বাজে। হঠাৎ একটা লাল ঘুঘুর আঁক দেখতে পেলুম। রেয়ার স্পেসি আজকাল। ঝকটা ফলো করলুম! কুঠিবাড়ির ছাদে গিয়ে বসল। সেখানে গিয়ে আপনার ফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা।

অরীন্দ্র তাকালেন।

বেলিংটন জেভিয়ার। কর্নেল হাসলেন। পাগলা মানুষ। সব সময় টো-টো করে ঘোরেন। আবোল-তাবোল কথাবার্তা। তারপর হঠাৎ বললেন, কুঠিবাড়ির জঙ্গলে একটা অদ্ভুত গাছ আছে দেখবেন। নিয়ে গেলেন দেখাতে।

অরীন্দ্র বললেন, কী গাছ?

চিনতে পারলুম না কিন্তু সত্যিই অদ্ভুত। কেউ রিভলভারের টার্গেট প্র্যাকটিস করেছে গাছটার গুঁড়িতে। ছুরির ডগায় খুঁচিয়ে একটা গুলি বের করেছি।

এলাকার কোনও ডাকু-গুণ্ডা হবে। অরীন্দ্র গলার ভেতর বললেন। বিজয়েন্দু বলত, সে-ও ওইভাবে হাতের টিপ ঠিক করত ছেলেবেলায়। ক্লিফটনগঞ্জে আজকাল ডাকু-গুণ্ডার রাজত্ব।

গুলিটা পয়েন্ট থার্টি টু বোরের রিভলভার থেকে ছোঁড়া হয়েছিল।

অরীন্দ্র রাণুর দিকে তাকালেন। রাণু শুকনো মুখে বললেন, বুড়োর জামাইবাবুর রিভলভার হারানোর কথা আমি কর্নেলসায়েবকে বলেছি।

অরীন্দ্র জল খেয়ে উঠে দাঁড়ালেন। শক্ত মুখে বললেন, ভগীরথ চুরি করে কাউকে বেচেছে–আই ভেরি মাচ ডাউট। ঘরের শত্রু বিভীষণ কথাটা ফেলনা নয়। ওকে চার্জ করব।

কর্নেল বললেন, প্লিজ বোসসায়েব! আপনি ও নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। আমার ওপর ছেড়ে দিন।

একঘণ্টা পরে কর্নেল নেমে এলেন তাঁর ঘরে। তিনি বাড়িতে থাকলে সুশীলা এ ঘরে তালা আঁটে না। ঘরে ঢুকে হঠাৎ কর্নেলের মনে হল, গুলিবিদ্ধ গাছটার কথা বলা কি ঠিক হল? চুরুট ধরিয়ে দরজা বন্ধ করে তিনি সাইকেলটার দিকে তাকালেন। বনোয়ারিজির কথাগুলো মনে ভেসে এল। হাজার-হাজার সাইকেলের মধ্যে বিশ-পঁচিশটা বাতিল করে দেয় বিদেশী কোম্পানি। লোডিং-আনলোডিং-এ ড্যামেজ হওয়া স্বাভাবিক। বাতিল সাইকেল ফেরত এলে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়। ড্যামেজ? নাকি ওই রকম বেঢপ গড়নের জন্যই বাতিল হয়?

চোখে পড়ার মতো গড়ন! ফেরত এলে পার্ট বাই পার্ট খুলে মেরামত করে… কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন। প্রিয় এটা সাত্যকিকে দিয়েছিল এবং রঙ বদলাতে বলেছিল। ফেরত আসবে বলেই কি গড়ন ওইরকম করা হয়? উঠে গিয়ে কিটব্যাগটা খুললেন কর্নেল। একটা রেঞ্জ আর একটা প্লাস বের করলেন। তারপর সাইকেলটা খুলতে শুরু করলেন। শীতের রাতে শরীরে ঘাম জমছে। জ্যাম হয়ে গেছে পার্টগুলো। ক্লান্ত হয়ে একটু জিরিয়ে নিলেন। বড়ো কষ্টসাধ্য কাজ। বরং একজন মেকানিককে ডেকে কাল দিনের দিকে কাজটা করানো উচিত। কিন্তু তীব্র একটা কৌতূহল তাকে পেয়ে বসেছে। আবার একবার বিশ্রাম নিতে এলেন চেয়ারে। ঘড়ি দেখলেন। বারোটা পাঁচ।

হঠাৎ আলো নিভে গেল।

লোডশেডিং। বিরক্ত হয়ে পকেট থেকে ছোট্ট টর্চটা বের করলেন। জঙ্গলে এবং ফেরার পথে অতক্ষণ জ্বলার ফলে আলো কমে গেছে। সুশীলা একটা মোম রেখেছিল। কোথাও নেই। কিটব্যাগে মোম রাখেন কর্নেল। ঝটপটকিটব্যাগ খুললেন। আশ্চর্য, একটাও নেই। সহসা মনে হল, তিনি নিরাপদ নন। পশ্চিমের জানালার একটা কপাট খোলা ছিল। দ্রুত বন্ধ করে দিলেন। প্রিয়র রিভলভারটা সারাক্ষণ তার জ্যাকেটের ভেতর বাঁ পকেটে থাকে। নিজেরটা ডান পকেটে। নিজেরটা বের করার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের দরজায় টোকার শব্দ হল। ওদিকটায় এক টুকরো খোলা বারান্দা। নীচে ঘন উঁচু ঘাস, তারপর খিড়কির দরজা পর্যন্ত গাঢ় জমাট লতাগুল্ম। কর্নেল বললেন, কে?

কোনও সাড়া এল না। আবার টোকার শব্দ হল তিনবার।

একটা চ্যালেঞ্জ! কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এসেছে কেউ! ক্ষীণ আলোয় মরচে ধরা ছিটকিনিটা খুলে আগড়টা নামাতেই বাইরে থেকে প্রচণ্ড চাপ এল। কর্নেল ছিটকে একপাশে সরে গেলেন। একটা মুখোশ-পরা লোক একটু ঝুঁকেই সোজা হল। কর্নেলের রিভলভারের নলটা নিমেষে মুখোশের ওপর যেতেই সে একলাফে পিছিয়ে গেল এবং বারান্দা থেকে নেমে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে বাড়ির আড়ালে উধাও হয়ে গেল। কর্নেল দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। চেয়ারে বসে চুরুট ধরালেন। তারপর মনে পড়ল, মুখোশটা আজকাল প্রচুর দেখা যায়। অরণ্যদেবের মুখোশ।

মিনিট দশেক পরে আলো জ্বলে উঠল। ঘর চুরুটের ধোঁয়ায় ভরে গেছে। পশ্চিমের জানালাটা পুরো খুলে দিলেন কর্নেল।…

.

২১.

ভোরে মর্নিং ওয়াকের জন্য বেরিয়ে কর্নেল পোর্টিকোয় পিউকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। মর্নিং দময়ন্তী শুনে সে ঘুরে দাঁড়াল। একটু হাসল। মর্নিং ফাদার ক্রিসমাস। বাট হোয়াই দময়ন্তী?

কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন, পামকিন ফেস।

 আমার?

হু। একটি চঞ্চল হাসিখুশি মেয়ের মুখে হঠাৎ এই রাশভারী ভাবের সঙ্গে ‘দময়ন্তী’ ফিট করে যায়। কর্নেল বাইনোকুলার তুললেন চোখে। বাউন্ডারি ওয়ালের ধারে ঋজু ও শ্রেণীবদ্ধ গাছ কুয়াশার কম্বল কাঁধে সন্ন্যাসীদের মতো দাঁড়িয়ে আছে।

পিউ আস্তে বলল, রাত্তিরে ঘুম হয়নি। বড্ড বোর করছে, জানেন? আর কী। সব অদ্ভুত শব্দ। সারা রাত!

তুমি কি জগিং ছেড়ে দিলে?

 পিউ তেতো মুখে বলল, ফানি! বুড়োদা আমাকে পিয়ালির ভয়ে অ্যাভয়েড করে চলছে। আসলে এভরিহোয়্যার দা কানট্রিগার্লস আর জেলাস। আইওয়ায় আমার একটা অদ্ভুত এক্সপিরিয়েন্স হয়েছিল, জানেন? স্টুড়স বেশির ভাগই ফার্মারদের ছেলেমেয়ে। ভীষণ কনজারভেটিভ। কর্নেল! আপনি আমার কথা শুনছেন না।

আ মিসটিরিয়াস বার্ড, ডার্লিং! ওই শোনো!

আমি কিন্তু কিছু শুনতে পাচ্ছি না।

ইউরোপে প্রাচীন যুগে ধারণা ছিল মেয়েরা প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলে। প্রকৃতির কথা বুঝতে পারে। বলে কর্নেল পুবের লনে এগিয়ে গেলেন। পাখিটা গাছের আড়ালে কুক্ কুক করে ডাকছে। এদিকে একসময় ফুলবাগান ছিল। বর্মি। বাঁশের সভ্য দেহশ্রীতে বন্যতার হিংস্র চেহারা, পামগাছগুলি ধূসর জীর্ণ স্তম্ভ, লতাগুল্মে মাকড়সার জাল এবং শিশিরের ফোঁটাগুলি প্রাকৃতিক কোমল কারুকার্য। সহসা মনে হয় এই পরিবারের পুরনো আভিজাত্যের চিহ্নগুলি ক্রমে ক্রমে ঢেকে ফেলেছে প্রকৃতি। পতনের স্বরলিপি চারদিকে।

পিউ দেখল কর্নেল ঝোপের ভেতর দিয়ে উত্তরে চলেছেন, চোখে বাইনোকুলার। তারপর থমকে দাঁড়ালেন। বাইনোকুলার নামিয়ে সামনে কিছু দেখতে থাকলেন। একটু পরে ঝুঁকে কী একটা জিনিস কুড়িয়ে নিলেন।

পিউ শিশির বাঁচিয়ে সাবধানে পা ফেলে কাছে গেল। বলল, মাই গুডনেস! এদের গাড়ি ছিল?

ঝোপের ভেতর একটা মোটরগাড়ির কঙ্কাল দেখিয়ে কর্নেল বললেন, পোর্টিকো দেখেই সেটা তোমার বোঝা উচিত ছিল।

আপনার হাতে ওটা কী?

মোমবাতি। কর্নেল হাসলেন। অরণ্যদেব ফেলে দিয়েছে।

হোয়াটস দ্যাট!

 দ্যাটস দ্যাট!

দ্যাটস দ্যাট। কর্নেল ঘুরে খিড়কির দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। জংধরা কবজা, কপাটে মাকড়সার জাল। আগড়টা টুটাফাটা এবং হুকের মাথাটা কবে ভেঙে গেছে। কোনও মতে আটকানো আছে আগড়টা। কর্নেল আগড় নামিয়ে কপাট টানলেন। খানিকটা ফাঁক হল। ঝোপঝাড় ঝাঁপিয়ে পড়েছে দরজার ওপর। কর্নেল কাত হয়ে গলে গেলেন। তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন। দরজার ফাঁকে কবেকার ওপড়ানো কয়েকটা গুল্ম নেতিয়ে পড়ে আছে। দেখার পর পোড়ো জমিটায় হাঁটতে থাকলেন।

পিউ বলল, ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন?

অরণ্যদেবের খোঁজে।

 পিউ দরজা গলিয়ে বেরুল। এদিকটায় বসতি নেই। বাঁদিকে লম্বাটে সেই জলা। কর্নেলের পিছু পিছু হাঁটছিল সে। বলল, আপনি সত্যিই অদ্ভুত মানুষ। আপনি তো রাণুদির হাজব্যান্ডকে অরণ্যদেব বলতেন। তাই না? বাট হি ইজ ডেড।

তুমি নাকি রাত্তিরে বাড়ির ভেতর কী সব অদ্ভুত শব্দ শুনেছ?

শুনেছি। পিউ হেসে ফেলল। আপনি কি বলতে চান সেগুলো রাণুদির হাজব্যান্ডের ভূতের শব্দ?

কী শব্দ শুনেছ বলো?

কাঠের সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। আরও কী সব শব্দ। বিবি জেগেছিল। ওকে বললুম। ও বলল, কিছু না। ঘুমো।

তখন রাত কটা?

ঘড়ি দেখিনি। তবে মিডনাইট। কোথায় মাইক বাজছিল। কারা রাস্তা দিয়ে গান গাইতে গাইতে গেল। বার্থটাইম অফ জেসাস না? এখানে একটা ক্রিশ্চিয়ান কমিউনিটি আছে–ডোন্ট ফরগেট দ্যাট। পিউ হাঁটতে হাঁটতে বলল, কলকাতায় থাকলে কী এনজয় করতুম ভেবে খারাপ লাগছিল। আই মিল্ড দা হ্যাপি ক্রিসমাস।বুড়োদার সঙ্গে রাণুদির ঝগড়া। এদিকে জামাইবাবুর বিপদ। দাদামশাই বলছিলেন, ক্রিসমাসে প্রচুর কেক পাঠায় ওঁর ক্রিশ্চিয়ান ফ্রেন্ডরা। রাত্তিরে স্পেশাল মেনু হয় প্রত্যেক বছর। এবার কিছুই হল না। বুড়োদার কাছে ক্রিসমাস ক্যারলের টেপ আছে। কিন্তু দাদামশাই কাল দুপুর থেকে কেমন ফেরোশাস হয়ে গেছেন। ধমক দিয়ে বললেন, নো নয়েজ। চুপচাপ শুয়ে পড়ো সব। পিউ ফিক করে হাসল। বুড়োদার ঘরে কিন্তু টেপ বাজছিল–আস্তে। আমি যেতুম। কিন্তু বিবি আমাকে যেতে দিল না। আসলে বিবিও ধরে নিয়েছে বুড়োদার সঙ্গে আমি… সিলি! আমি বিবি নই। আই অ্যাম ফ্র্যাংক, কর্নেল! বিবির মতো যেখানে সেখানে ঝুলে পড়ি না। আবার তাকে প্যাক দিয়ে কাট করি না। এখন বিবি হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছে, দ্যাটস আ ডেঞ্জারাস গেম।

জলার উত্তর ঘুরে উঁচু জমিতে দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন, হু। ডেঞ্জারাস গেম ওই দেখ।

কী? পিউ চমকে উঠল।

 সামনে স্টেশন রোড। এবং আমরা কোথায় এসে পড়েছি লক্ষ করো!

 পিউ এগিয়ে গিয়ে বলল, এখানেই তো জামাইবাবুর গাড়িটা ছিল। কাঁচগুলো পড়ে আছে।

সে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল। কর্নেল একটু দাঁড়িয়ে থাকার পর রাস্তায় গেলেন। বললেন, তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছ এবং আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলুম, এই দুটো জায়গায় একটা স্ট্রেইট লাইন টানা যাক। কেমন তো? এবার লেটস্ ড্র আ ট্রাঅ্যাঙ্গল। একটা ত্রিভুজ। এ বি সি কোণ। তুমি ত্রিভুজের শীর্ষ কোণ এ-তে গিয়ে দাঁড়াও। যাও! রাস্তার ধারে পিপুলগাছটার কাছে। পিউ একটু অবাক হয়ে নির্দেশ পালন করছিল। কর্নেল হাতের ইশারায় বললেন, বাঁ দিকের রাস্তার ওপর। ব্যস্। ওখানেই দাঁড়াও। ওটা ‘এ’ কোণ।

ব্যাপারটা কী?

তুমি অনির্বাণ সোম। বলে কর্নেল তাঁর রিভলভার বের করলেন।

পিউ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, হোয়াটস দ্যাট?

দ্যাটস দ্যাট, ডার্লিং! কর্নেল রিভলভার তাক করেই নামিয়ে জ্যাকেটের ভেতর ঢোকালেন।

পিউ শুকনো মুখে বলল, আমার ভীষণ ভয় করছে। আপনি…

কর্নেল হাত তুলে বরাভয়ের মুদ্রা এনে হাসলেন, তোমাকে সাহসী ভেবেছিলুম!

আমার সত্যি ভয় করছে। কিছু বুঝতে পারছি না।

তুমি অনির্বাণ। আমি প্রিয়। কর্নেল তার দিকে এগিয়ে গেলেন। পিপুলগাছটার তলায় একটা পাথর পড়ে আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে গাছটার গুঁড়ি দেখতে থাকলেন। মাটি থেকে ফুট ছ-সাত উঁচুতে একটা সরু ফাটল। দুপাশে কালচে ছোপ। পাথরে উঠে ছুরি বের করলেন। ফাটলটা খুঁচিয়ে একটু চওড়া করে বাঁ হাতের তালু পাতলেন এবং ছুরির ডগা দিয়ে কী একটা বের করলেন।

পিউ দম আটকানো গলায় বলল, কী?

প্রিয়র পয়েন্ট টোয়েন্টি টু রিভলভারের গুলি। কর্নেল পাথরটা থেকে নেমে পিউকে গুলিটা দেখালেন। বললেন, কাজেই বুঝতে পারছ, প্রিয়র গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল।

 পিউ অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।

কর্নেল ডাইনে ঝোপের দিকে আঙুল তুলে বললেন, এবার ত্রিভুজটা কল্পনা করো। ওটা সি কোণ। প্রিয় ছিল বি কোণে। সি কোণে ছিল অরণ্যদেব। গণনাথ সেন কারেক্ট। অরণ্যদেব অনির্বাণকে প্রিয় ভেবেছিল, কারণ তার হাতে জ্বলন্ত টর্চ। প্রিয় এবং অরণ্যদেব ঠিক একই মুহূর্তে গুলি ছোঁড়ে অনির্বাণের দিকে। তাই দুটো গুলির শব্দ একটা মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক। জাস্ট আ কোইনসিডেন্স!

পিউ শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বলল অরণ্যদেব-অরণ্যদেব করছেন। কে সে?

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে একটু হাসলেন। কাল রাতে লোডশেডিংয়ের সময় সে আমার ঘরে হানা দিয়েছিল। মুখে অরণ্যদেবের মুখোশ। নাকের ডগায় রিভলভারের নল সে প্রত্যাশাই করেনি। পালিয়ে গেল।

মাই গড। আমার ভয় করছে।

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, আরও ভয় পাইয়ে দিই। সেরাতে অরণ্যদেব প্রিয়কে গুলি করে মারতে এসেছিল চারুভবনের খিড়কি দিয়ে। সে তক্কে তক্কে ছিল। প্রিয় দ্বিতীয়বার চুপি চুপি গেট দিয়ে বেরিয়ে যায় গাড়ি থেকে তার রিভলভার আনতে। কিচনির ডাক বড়ো ভয়ঙ্কর, সে তো শুনেছ ডার্লিং। প্রিয় বেরুলে সেও চুপি চুপি খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে আসে। ভুল করে অনির্বাণকে গুলি করে পালিয়ে যায়। বাড়ি ফিরে ভুলটা সে টের পায়। প্রিয়কে ফিরতে দেখেছিল। সিওর।

পিউ নার্ভাস হাসল। আই অ্যাম নট সো সিওর। তবে বুড়োদা বলছিল, রামলাল কবুল করেছে…

তার কথার ওপর কর্নেল বললেন, এগেন গণনাথ সেন ইজ কারেক্ট। রাজেশ শর্মা বাংলোয় পাশের ঘরে ছিল। সে অনির্বাণ এবং প্রিয়র সম্পর্কের ব্যাপারটা আড়ি পেতে শুনে থাকবে। এবার ঘটনাটা সাজানো যাক। প্রিয় কোম্পানির আরেক ব্ল্যাকমেলার। রামলালকে দিয়ে রাজেশ তার গাড়ির ব্রেক বিগড়ে দিয়েছিল। কাজেই ধরে নিয়েছিল অ্যাকসিডেন্টে প্রিয় মারা পড়বে। ওই বাঁকের মুখে বাঁদিকে নীচের জলাটা দেখতে পাচ্ছ। যে-গাড়ি ব্রেক ফেল করেছে, সেই গাড়ি বাঁকের মুখে রাস্তার বাঁদিকের ঢালে পৌঁছুলেই গড়িয়ে পড়ার সেন্ট পারসেন্ট চান্স। তোমাকে বলেছিলুম, সব রাস্তা বা রেললাইনেরও বাঁকের মুখে একটা দিক ঢালু রাখা হয়। স্পিডের মুখে ব্যালান্স বজায় রাখাই এর উদ্দেশ্য। যাই হোক, বাংলো থেকে অনির্বাণ বেরিয়ে আসার পর রাজেশ বেরোয়। সে এখানে পৌঁছেই অনির্বাণের ডেডবড়ি দেখতে পায়। রাজেশের ভয় পাওয়ার কথা। কারণ গণনাথের বডিগার্ড মার্ডার্ড! গণনাথের কী রিঅ্যাকশন হবে সে জানে না। সে রামলালকে ডেকে এনে বডিটা গঙ্গার দহে ফেলে দিয়ে যায়। দু-দুটো বডি দহে ফেলার পর এটা তার অবসেশনে পরিণত হয়েছিল। তা ছাড়া দহটার প্রচুর বদনাম। মৃত্যুর ফাঁদ–আর ওই কিচনি।

পিউ চার্জ করল। ইঞ্জিনের ভেতর রিভলভার গেল কী করে?

বলছি। কর্নেল চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, চারুভবনে তখন অরণ্যদেব ভাবনায় পড়ে গেছে। তার চেষ্টা ব্যর্থ। অনেক ভেবে সে ঠিক করে, প্রিয়কে এই মার্ডারের সঙ্গে জড়াতে হবে। সে খিড়কি দিয়ে আবার চলে আসে এখানে। নিশ্চয় ডেডবডিটা না দেখে সে অবাক হয়েছিল অথবা হয়তো লক্ষই করেনি। তার একটাই কাজ ছিল, গাড়ির বনেট খুলে ইঞ্জিনের ভেতর অস্ত্রটা রাখা। ক্লিয়ার?

এমনভাবে বলছেন, যেন সব স্বচক্ষে দেখেছেন।

ডার্লিং! সমস্ত ফ্যাক্ট আমাকে এই থিওরিতে পৌঁছে দিয়েছে। এই কেসে আমি ইনডাক্টিভ এবং ডিডাক্টিভ দুই পদ্ধতিই অবলম্বন করেছি। কারণ আমার চারপাশে প্রচুর তথ্যও ছড়ানো ছিল। কুঠিবাড়ির জঙ্গলের ভেতর একটা গাছ তোমাকে দেখাব। গাছটাতে কেউ টার্গেট প্র্যাকটিস করত। সেটা আবিষ্কার করার পরই আমার দৃষ্টি ঘুরে গেল চারুভবনের দিকে। তারপর চারুভবন থেকে বিজয়ের একটা রিভলভার নিখোঁজ হওয়ার কথা শুনে আমার অনিবার্যভাবে মনে পড়ে গেল বোসসায়েবের উইলের কথা। প্রথমে আমার মনের সামনে এসে দাঁড়াল বারীন রায়–রাণুর প্রেমিক।

কথায় বাধা দিয়ে পিউ শক্ত মুখে বলল, অত বুঝি না। এবার মার্ডারারকে ধরিয়ে দিন।

কর্নেল কিছুক্ষণ বাইনোকুলারে হাঁসের ঝাঁক দেখার পর বিষণ্ণ মুখে বললেন, বড় ডেলিকেট পয়েন্ট পিউ! জীবনে কখনও এমন স্পর্শকাতর অবস্থার মুখোমুখি হইনি। আমার সাপের ছুঁচো গেলার অবস্থা। না পারি গিলতে না পারি ওগরাতে। নাহ্, তুমি তোমার জামাইবাবুর জন্য ভেবো না! প্রিয় বুদ্ধিমান। তাকে বাঁচিয়ে দেবে একটা সাইকেল।

সাইকেল! কী বলছেন?

সাইকেলটা আমার ঘরে আছে। প্রিয় প্রমাণ করতে পারবে, কোম্পানি তাকে বিপদে ফেলার জন্যই একটা লাইসেন্সহীন বেআইনি অস্ত্র তার গাড়ির ভেতর রেখেছিল।

এক্সপ্লেন! অরীন্দ্রের ভঙ্গিতে পিউ চার্জ করল।

কাল রাতে সাইকেলটা পার্ট বাই পার্ট খুলেছি। খোলার সময় অরণ্যদেবের আবির্ভাব। যাই হোক, প্রিয় সাইকেলটা সাত্যকিকে উপহার দিয়েছিল। রঙ বদলে নিতে বলেছিল সতর্কতার জন্য। তুমি নেলপালিশ ব্যবহার করো কি?

নাহ্। বিবি করে।

নেলপালিশের রঙ তোলার জন্য থিনার ব্যবহার করা হয়। সাবর্ণীর কাছে চেয়ে নেব। ঘসলেই মোহনলাল গণেশলাল অ্যান্ড কোম্পানির ‘রেড স্টার’ বেরিয়ে পড়বে। সিওর!

ভ্যাট! আসল কথা বলছেন না! আপনাকে বুড়োদার সিওরে পেয়েছে।

সাইকেলের রডের ভেতর লম্বাটে পুরিয়ায় নার্কোটিক্স ভরা আছে, ডার্লিং! কর্নেল চাপাস্বরে বললেন। মুখে কৌতুক ঝলমল করছিল হাল্কা নরম রোদে। হাজার-হাজার সাইকেল চালান যায় বিদেশে। কিছু সাইকেল চোখে পড়ার মতো বেঢপ গড়নের। বাতিল হয়ে যায়। সেগুলোতে সম্ভবত বিদেশী কোম্পানিরই এজেন্ট নার্কোটিক্স ভরে ফেরত পাঠায়। এখান থেকেও নিশ্চয় কিছু পাঠানো হয়। আফিঙ বা চরস। আগামী মার্চে বোম্বে ডকে তা ধরা পড়বে। সিওর।

বড্ড বেশি সিওর বলছেন। বি কেয়ারফুল, কর্নেল!

হেরোইন, ব্রাউন সুগার, এল এস ডি–এসব কখনও দেখেছ?

পিউ ব্যস্ত হয়ে উঠল। আই নো। আই নো। আমার এক বয়ফ্রেন্ড তো… বলেই সে থেমে গেল। সামনে বাঁকের দিকে আঙুল তুলল। বুড়োদা আজ এত্তো দেরিতে জগিংয়ে বেরুল যে?

কর্নেল বাইনোকুলারে দেখে নিয়ে বললেন, ভগীরথ দৌড়ে আসছে। কী ব্যাপার, এস তো দেখি।

কাছাকাছি হলে ভগীরথ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, রাণুদিদি আপনাকে ডাকল। কী হইয়েছে বড়বাবুর। সবকুছু ভাঙছেন তোড়ছেন। হামি ভি সামহাল দিতে পারল না। এই দেখেন, হামরেভি মারলেন।….

সাবর্ণী লনের রোদে দাঁড়িয়েছিল। কর্নেল বললেন, কী হয়েছে জানো?

 সাবর্ণী বাঁকা মুখে বলল, কে জানে! এদের কিছু বোঝা যায় না। আমি আজই চলে যাব।

হলঘরের সিঁড়িতে উঠতে উঠতে কর্নেল অরীন্দ্রের চ্যাঁচামেচি শুনতে পেলেন। হুলিয়া বের করব। সব এয়ারপোর্টে খবর দেব। ছেড়ে দে রাণু। ছাড় বলছি! সুশি! আভি নিকাল যা!

কর্নেল অরীন্দ্রের ঘুরে ঢুকে থমকে দাঁড়ালেন। ঘরের জিনিসপত্র লণ্ডভণ্ড, ছত্রখান। অরীন্দ্রকে রাণু এবং সুশীলা জাপটে ধরে আছে। দুজনেই কান্নাকাটি করছে। কর্নেলকে দেখে অরীন্দ্র তেড়ে এলেন। ইউ আর হোপলেস কর্নেলসায়েব! আপনাকে আমি ডেকে এনেছিলুম একটা কাজে। আর আপনি খালি পাখির পেছনে ছোটাছুটি করেই কাটালেন।

বলে অরীন্দ্র হাতের মুঠোয় দলাপাকানো একটা কাগজ ছুঁড়ে দিলেন কর্নেলের দিকে। কর্নেল কুড়িয়ে নেবার আগেই বললেন, সাত্যকি পালিয়ে গেছে?

অরীন্দ্র জানালায় গিয়ে দু-হাতে দুটো রড মুঠো করে ধরলেন। এদিকে পিছন ফিরে আছেন। তাঁর মুখের একটা পাশে নরম রোদ পড়েছে। ভিজে চোখ।

রাণু ভাঙা গলায় বললেন, গতকাল ঠাকুর্দা ব্যাংক থেকে দশ হাজার টাকা তুলেছিলেন। অ্যাডভোকেট সিনহাবাবুর মুহুরি কানে ফুসমন্তর ঢেলেছিল। টাকা পেলে নাকি পুলিশ প্রিয়র নামে চার্জশিট আটকে রাখবে।

কর্নেল দলা পাকানো চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে বললেন, সাত্যকি টাকাগুলো নিয়ে পালিয়েছে?

অরীন্দ্র না ঘুরে প্রায় গর্জন করলেন, সায়েবদের সঙ্গে ঘুসি লড়তে গেছে। দিনের পর দিন রাণুকে দিয়ে আমাকে.. ওর পেছনে পুলিশ লেলিয়ে দেব। রাণু, আমার ছড়ি খুঁজে দে!

পিউ বলে উঠল, বুড়োদা অ্যামেরিকা যাবে বলত আমাকে। কিন্তু ফানি! ওই টাকায় কী হবে? হি নিডস আ লট অব মানি!

অরীন্দ্র ঘুরে দাঁড়ালেন। বিকৃত মুখে বললেন, তুমিও কম যাও না! তুমিও ওকে অ্যামেরিকা-অ্যামেরিকা করে তাতে! ই-উ-উ! আঙুল তুললেন অরীন্দ্র। ইউ আর রেসপন্সিবল ফর দিস স্ক্যান্ডাল।

পিউ কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে দু হাত নেড়ে একটা ভঙ্গি করে বলল, সিলি টক! তারপর সে জোরে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

অরীন্দ্র কর্নেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, এখন বুঝতে পারছি বিজয়ের চোরাই রিভলভারটা বুড়োই কোনও ডাকু-গুণ্ডাকে বেচে দিয়েছে। অ্যামেরিকা যাওয়ার খরচপত্তর ও নিশ্চয় পিউয়ের কাছে জেনে নিয়েছিল। রাণু! সুশি! দ্যাখ, ছড়িটা কোথায় ফেললুম। আই মাস্ট রির্পোট টু দা পোলিস।

কর্নেল বললেন, বোসসায়েব! অ্যামবিশন কোনও-কোনও মানুষকে অন্ধ শক্তির হাতের পুতুল করে তোলে। হি বিকামস আ ডেঞ্জারাস অ্যাডভেঞ্চারার!

নো ফিলসফি! বলে অরীন্দ্র নিজেই ছত্রখান জিনিসপত্রের ভেতর ছড়ি খুঁজতে ব্যস্ত হলেন।

 কর্নেল বললেন, বোসসায়েব! আপনি গঙ্গাস্নানে যান। চিত্ত শুদ্ধ করে আসুন। সারা জীবনের অভ্যাস ত্যাগ করা ঠিক নয়। আপনি ফিলসফি বললেন। এটাই ক্রুড রিয়্যালিটি। মানুষের মস্তিষ্কে বুদ্ধি জিনিসটার বিকাশে সাহায্য করেছিল মানুষের দুটো হাত। নরবানর নরে পরিণত হয়েছিল। সেই বুদ্ধির সবটাই যদি আবার হাতে গিয়ে জড়ো হয়, নর তা হলে ফের নরবানরে পরিণত হবেই। ব্যাক টু দা নেচার আর কী! রাণু, ঠাকুর্দাকে গঙ্গাস্নানে নিয়ে যাও। বোসসায়েব! প্লি-ই-জ…

কর্নেল বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। রিভলভারটার লাইসেন্স ছিল না। দ্বিতীয়ত সাত্যকির হাতে গ্লাভস থাকে। তার আঙুলের ছাপ পাওয়া যাবে না। কাজেই আইনত কোনও ভাবেই তাকে অনির্বাণ সোমের খুনী প্রমাণ করা যাবে না। হুঁ, এখন বোঝা যাচ্ছে, সাত্যকি সাইকেল-রহস্যটা জানত। প্রিয় নিজের বিপদের কথা ভেবেই তুরুপের তাস হিসেবে ওটা সাত্যকিকে দিয়েছিল। সাত্যকি নিজেই কর্নেলকে সাইকেলের ভুতুড়ে শব্দের কথা বলেছিল। হঠাৎ একটু শিউরে উঠলেন কর্নেল। কাল রাতে মেইন সুইচ অফ করে সে তাকে কি নিছক ভয় দেখাতেই গিয়েছিল? নিজের দুটো হাত ছাড়া এ বাড়িতে নিঃশব্দে কাকেও হত্যার অস্ত্র এই মরিয়া অবস্থায় আর কী থাকতে পারে তার? সে টের পেয়েছিল, কর্নেলের চোখ পড়েছে তার দিকে। কুঠিবাড়ির জঙ্গলের– সেই গাছটার কথা কাল রাতে খাওয়ার টেবিলে রাণুর সামনে বলেছিলেন রাণুর প্রতিক্রিয়া লক্ষ করার জন্যই। বারীন রায় তাঁর মাথায় ছিল। কিন্তু রাণু যে রাতেই ভাইয়ের কানে কথাটা তুলেছে, তাতে সন্দেহ নেই। তার মানে, রাণুও টের পেয়েছিল তার ভাই কী করেছে। রাণুকে সাত্যকির ঘুসি মারার এটাই তা হলে আসল কারণ। একজন ঘুসিলড়িয়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া মাত্র। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হল, রক্তের কথা সাত্যকিই পুলিশকে বলেছিল!

লনের রোদে সাবর্ণী ও পিউ চুপি চুপি কথা বলছিল। কর্নেলকে দেখে ছবি হয়ে গেল। কর্নেল তাদের দিকে পা বাড়িয়েছেন, সহসা সেই রহস্যময় পাখিটা আবার ডেকে উঠল। অসহ্য! পাখিটা কদিন থেকে তার সঙ্গে অদ্ভুত লুকোচুরি খেলছে। একটা চ্যালেঞ্জ কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে!

গেটের পাশে বর্মি বাঁশের ঝাড়টার পাশ দিয়ে যেতে পায়ে কী একটা জড়িয়ে গেল। বাইনোকুলার নামিয়ে দেখলেন, ঘাসের ভেতর একটা মুখোশ। সেই অরণ্যদেবের মুখোশ।

মুখোশটা মাড়িয়ে দিলেন কর্নেল। পাখিটা কি তাকে ডেকে নিয়ে যেতে চায় প্রকৃতির গভীর, গভীরতর কোনওখানে, যেখানে রক্ত ও অশ্রুর কোনও পৃথক মূল্য নেই।

পিছনে পায়ের শব্দ।

কর্নেল ঘুরে দাঁড়ালেন। বেলিংটন জেভিয়ার। মাথায় ক্রিসমাস ক্যাপ, পরনে পুরনো স্যুট, দুহাতে একটা ছোট্ট ট্রে রঙিন কাগজে ঢাকা। হ্যাপি ক্রিসমাস স্যার! বেলিংটন জেভিয়ার উজ্জ্বল মুখে হাসলেন। মাই হাম্বল গিফ্ট ফর ইউ! আপকে লিয়ে রোজি ইয়ে কেক বানায়িরাত ভর। লড়কি! তুম ভি আ যাও। পিউয়ের দিকে ঘুরলেন জেভিয়ার। কাম অন লড়কি! দিস রোজ-বোকে ফর ইউ। লো! আও, আও!

কর্নেল জেভিয়ারের দিকে এগিয়ে গেলেন। পিউ দৌড়ে গেল গোলাপের তোড়াটি নিতে। অরীন্দ্র ও রাণু পোর্টিকোর বারান্দা থেকে নামছেন এতক্ষণে। গঙ্গাস্নানে যাবেন। সাবর্ণী এখনও ছবি হয়ে আছে…