স্টোনম্যান

স্টোনম্যান

০১.

ধারিয়া ফলসের মাথায় কয়েকটা পাথরের ওপর ওরা বসেছিল। দীপিতা, বিনীতা, রোমেনা এই তিন যুবতী। কিংশুক, রাতুল, সুপর্ণ এই তিন যুবক। আর ছিলেন তাদের কমন মামাবাবু চন্দ্রকান্ত। এই প্রমোদভ্রমণে তিনিই তাদের গার্জেন।

হুল্লোড়বাজ আমুদে মানুষ চন্দ্রকান্ত। বয়স ষাটের কাছাকাছি। কিন্তু প্রাণচাঞ্চল্যে এই যুবক-যুবতীদের চেয়ে কোনও অংশে কম নন।

‘ধারিয়া ফলস’ নামের জলপ্রপাতটি তত কিছু বিখ্যাত নয়। ধারিয়ার ধারা ক্ষীণ বলা চলে। কিন্তু সত্তর ফুট ওপর থেকে নীচের পাথরে আছড়ে পড়ার সময় সেই ক্ষীণতা গুঁড়ো-গুঁড়ো ছড়িয়ে শেষবেলার রোদে বণাঢ্য রামধনু এঁকেছে। দুধারে শরৎকালের সবুজের ঘোরলাগা বৃক্ষলতাগুল্ম স্তরে স্তরে সাজানো। তার ওপর কোথাও কোথাও ফুল ফুটে অর্মত্যমায়া ছড়িয়ে রেখেছে।

রোমেনা পাথরের ফাঁকে গজিয়ে ওঠা ঝোঁপের দিকে এগিয়ে গেল হঠাৎ। সাদা ফুলের ঝাঁক ঝোঁপটার মাথায়। কেউ তাকে লক্ষ্য না করার কারণ চন্দ্ৰকান্তের একটা বাঘ শিকারের রোমাঞ্চকর গল্প। চন্দ্রকান্ত রাঁচি জেলার নামকরা শিকারি ছিলেন। তাঁর গল্পের বাঘটা ছিল এই ধারিয়া এলাকার সাংঘাতিক এক মানুষখেকো।

রোমেনা কয়েকটা ফুল তুলে চুলে খুঁজল। তারপর ফুলপরী হওয়ার আকস্মিক নেশার মতোই তাকে পেয়ে বসল হারিয়ে যাওয়ার নেশা।

সে পাথরগুলোর আড়ালে গিয়ে বসে পড়ল। নিঝুম পরিবেশে শুধু জলপ্রপাতের শব্দ ছাপিয়ে চন্দ্ৰকান্তের চড়া গলায় গল্প বলার শব্দ ভেসে আসছিল। রোমেনা মুখ টিপে হাসছিল। যখন ওরা দেখবে রোমেনা নেই, ওরা নিশ্চয় ভাববে রোমেনাকে বাঘে তুলে নিয়ে গেছে। কী দারুণ হইচই না হবে!

রোমেনা ভাবছিল, আচ্ছা, সত্যি যদি তাকে এখন বাঘে তুলে নিয়ে যায়, সুপর্ণ কী করবে? সুপর্ণের প্রতিক্রিয়া যাচাই করার এমন সুযোগ রোমেনা আর পাবে না। দেখা যাক না সুপর্ণ কী করে। রাতুল, কিংশুক, দীপিতা, বিনীতা সবাই জানে রোমেনার সঙ্গে সুপর্ণর একটা গোপন সম্পর্ক আছে। চন্দ্রকান্তও টের পেয়েছেন। উনি খোলা মনের মানুষ। চলাবলায় নাগরিকতার পালিশ কম। হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “কলকাতা যাওয়া হয়নি অনেকদিন। এবার যাওয়ার একটা চান্স পাব মনে হচ্ছে। সুপু আর রুমুর ঘটকালি না হয় আমিই করলুম।

সবাই হেসে অস্থির। সুপর্ণ ও রোমেনাও। দীপিতা বলছিল, “ভেতরে ভেতরে রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেছে মামাবাবু। আপনার ঘটকালির নো হোপ নো চান্স! তবে ইনফরম্যালি এখনই ওদের মালাবদল ঘটিয়ে দিতে পারেন।”

চন্দ্রকান্ত বলেছিলেন, “ওক্কে! ওকে! চলল, আজই বিকেলে ধারিয়া ফলসে গিয়ে বনদেবীকে সাক্ষী রেখে বুনো ফুলের মালা ফালা গেঁথে–হুঁ, তোমরা ঝিম চাক ঝিম চাক নাচবে। ব্রেক ড্যান্স!”

ধারিয়া ফলসের দিকটা পশ্চিম। ওদিকে অনেকদূর পাহাড় নেই। জঙ্গল আছে। তাই বিকেলের আলো এসে সরাসরি পড়ছে প্রপাতের ওপর। কিন্তু উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বে টিলাপাহাড় উঁচু-নিচু হয়ে ঠেউয়ের মতো চলে গেছে অনেকদূর। উত্তর দিকটায় খোয়া বিছানো রাস্তা। সেখানে সাদা অ্যাম্বাসাডার দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটা চন্দ্ৰকান্তের।

চন্দ্ৰকান্তের গল্পটা হঠাৎ থেমে গেল। “আরে! রুমুটা গেল কোথা?” বলে হাঁক দিলেন, “রুমু! রুমু! বাঘ আছে! চলে এসো!”

রাতুল বলল, “সুপু! খুঁজে আন ওকে। রুমু তোরই লায়েবিলিটি কিন্তু!”

সুপর্ণ গম্ভীর হয়ে গেল। “ওই সব ফানি কথাবার্তা বন্ধ কর তো তোরা।”

“যা বাবা!” দীপিতা বলল। “ফানি ব্যাপারটা এখানেই তো অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা! সুপুদা! ডোন্ট ফরগেট দ্যাট। মামাবাবু দেখুন সুপু কেমন তুম্বো মুখে তাকাচ্ছে!”

চন্দ্রকান্ত আবার ডাকলেন, “রুমু! রুমু! চলে এস, জঙ্গল জায়গা। পোকামাকড় থাকবে।”

বিনীতা, দীপিতার ছোট বোন। সে হাসতে হাসতে বলল, “ভূত আছে বলুন। মামাবাবু! রুমু ভূতকে ভীষণ ভয় পায়।”

কিংশুক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “সুপু! তোর হয়ে আমি খুঁজে নিয়ে আসছি। হারিয়ে গেলে আমি বা রাতুল পস্তাব না। তুই পস্তাবি!”

সুপর্ণ বলল, “সব কিছুর একটা সীমা আছে। তোরা বড় বাড়াবাড়ি করছিস!”

কিংশুক লম্বা পা ফেলে সেই ঝোঁপটার কাছে গেল। রোমেনাকে দেখতে পেল। রোমেনা সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করতে ইশারা করল ওকে। কিংশুক এক লাফে পাথরে উঠে কপট গাম্ভীর্যে ডাকল, “রুমু! ফিরে এসো। সুপু তোমার জন্য কাঁদছে!”

রাতুল কিন্তু লক্ষ্য রেখেছিল কিংশুকের দিকে। সে একটা কিছু আঁচ করে উঠে গেল ওর কাছে। তারপর রোমেনাকে দেখতে পেল। রাতুলও কপট গাম্ভীর্যে ডাকল, “রোমেনা। তুমি যেখানে থাকো, ফিরে এস। সুপর্ণ শয্যাশায়ী।

চন্দ্রকান্ত বুদ্ধিমান মানুষ। হন্তদন্ত হয়ে এসে রোমেনার দিকে আঙুল তুলে বললেন, “পাষাণী অহল্যা হয়ে পড়ে আছিস দেখছি। রামচন্দ্র তো তুম্বো মুখে বসে আছে। কিন্তু ব্যাপারটা হল, পাথরের ফাটলে শঙ্খচূড় সাপ থাকতে পারে জানিস?”

রোমেনা তক্ষুণি লাফ দিয়ে উঠে সরে এল। “যান্! খালি মিথ্যা ভয় দেখাচ্ছেন।” বলে সে হেসে ফেলল।

দীপিতা বলল, “রুমু! সুপু কী স্বার্থপর তাহলে বোঝ। চুপচাপ বসে আছে।”

বিনীতা বলল, “সুপুদা নিশ্চয় দেখেছিল রুমুকে ওখানে যেতে।”

কিংশুক চলে এল। বলল, “মোটে সাড়ে চারটে বাজে। চুপচাপ বসে গেঁজানোর মানে হয় না। আয় সুপু, মাউন্টেনিয়ারিং করি। ফলসের পাশ দিয়ে পাথর বেয়ে নীচে নামি আয়। রাতুল! কাম অন্।”

রাতুল বলল,”নাহ্। বরং চোর-পুলিশ খেলা যাক। রুমু আইডিয়াটা আমার মাথায় এনে দিয়েছে।”

রোমেনা বলল, “হাইড অ্যান্ড সিক গেম, রাতুলদা। পাঁচ মিনিটের মধ্যে খুঁজে বের কর না করতে পারলে ফাইন। ফাইনের রেট ঠিক করে দিন মামাবাবু!”

চন্দ্রকান্ত বললেন, “হাইড অ্যান্ড সিক তো খেলবে! জঙ্গল জায়গা।”

দীপিতা উঠে দাঁড়াল। বলল, “অসাধারণ খেলা হবে। মামাবাবু, দেখেই বুঝেছি স্রেফ নিরিমিষ জঙ্গল। ফাইনের রেট ঠিক করে দিন!”

চন্দ্রকান্ত একটু দ্বিধা দেখিয়ে বললেন, “কিন্তু–আচ্ছা, বেশিক্ষণ নয়। তিনবার খেলবে। পাঁচ মিনিটে চোর খুঁজে না পেলে পাঁচ টাকা ফাইন প্রত্যেকের। আর চোর খুঁজে পেলে চোরের ফাইনও পাঁচ টাকা।”

রাতুল বলল, “আমি চোর হই।”

 রোমেনা বলল, “না আমি।”

 চন্দ্রকান্ত বললেন, “টস করি। আর কেউ চোর হতে চাও?”

রাতুল ও রোমেনা ছাড়া সবাই পুলিশ’ হতে চায়। চন্দ্রকান্ত টস করলেন। রাতুল চোর হল। তারপর শুরু হল এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলা।

রাতুল হনহন করে এগিয়ে একটা পাথরের আড়ালে চলে গেল। চন্দ্রকান্ত বিচারক। পুলিশ হল কিংশুক, সুপর্ণ, দীপিতা, বিনীতা ও রোমেনা। চন্দ্রকান্ত ঘড়ি দেখে পাঁচ মিনিট পরে ঘোষণা করলেন, “সিক অ্যান্ড ক্যাচ হিম!”

‘পাঁচ পুলিশ’ এদিকে-ওদিকে চোর খুঁজতে ছুটে গেল।

ধারিয়া নদী ও প্রপাত পশ্চিম দিকে। ছোট্ট নদী এবং তার বুকে অজস্র পাথর পড়ে আছে। পাথরগুলো পিচ্ছিল। কাজেই নদী পেরিয়ে ওপারের ঘন জঙ্গলে রাতুলের লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা নেই। বাকি তিন দিকে উঁচু-নিচু টিলা। সমতলে নানা সাইজের পাথর আর ঘন জঙ্গল। পূর্বের জঙ্গল ও পাহাড় ভেদ করে একফালি খোয়া বিছানো রাস্তা প্রপাতের শ’দুই গজ দূরে বাঁক নিয়ে চলে গেছে দক্ষিণে। রোমেনা গেল রাস্তাটার দিকে। সে ভেবেছিল, রাতুল গাড়ির আড়ালে গিয়ে লুকিয়েছে।

দীপিতা গেল উত্তরে ঢালু টিলার দিকে। টিলাটা শালবন এবং গুল্মলতায় ঢাকা। গুল্মলতাগুলো পাথরের চাই ঢেকে সবুজ স্কুপের মতো দেখাচ্ছে। সে ভেবেছিল, এই সব স্কুপের আড়ালে রাতুল লুকিয়ে আছে।

বিনীতা গেল উত্তর-পূর্বে দুই টিলার মাঝখানে শুকনো গিরিখাতের দিকে।

কিংশুক উত্তর-পশ্চিমে নদীর ধারে ঝোঁপঝাড় খুঁজতে গেল।

সুপর্ণের এই খেলার ইচ্ছে তত ছিল না। সে নেহাত দায়সারাভাবে দক্ষিণ পশ্চিমে প্রপাতের কিনারা ধরে এগিয়ে গিয়ে একটা পাথরের ওপর উঠল। অনিচ্ছার দৃষ্টিতে ‘চোর’ খুঁজতে থাকল।

সুপর্ণের মনে গত রাত থেকে একটা দ্বিধা এসে ঢুকেছে। রোমেনার সঙ্গে তার অনেক দিনের সম্পর্ক ঠিকই। কিন্তু রোমেনাকে সে কখনই বিয়ে করার কথা ভাবেনি। রোমেনাও ভেবেছে কি না সে টের পায় না। একথা ঠিক, সে একবার রোমেনাকে চুমু খেয়েছিল। রোমেনা তার চুমুতে সাড়া দিয়েছিল। কিন্তু আজীবন সঙ্গিনী হিসেবে সূপর্ণ তাকে কল্পনা করতে পারে না। রোমেনার মধ্যে কী একটা দূরত্ব আছে বলে তার ধারণা। রোমেনা যেন একটা অদ্ভুত উঁচু বাড়ির মতো, যে-বাড়ির উঁচুতলায় ওঠার কোন সিঁড়ি নেই। সেন্ট পলস কলেজে পড়ার সময় দুজনের মধ্যে ওই সম্পর্কটা গড়ে উঠেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটা ঘনিষ্ঠতর হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে সুপর্ণ একটা কোম্পানির পারচেজ অফিসার হয়েছে এবং রোমেনা হয়েছে একটা খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন বিভাগের সহকারী ম্যানেজার। দুজনেই মোটামুটি সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সুপর্ণের বাবা-মা বেঁচে নেই। দাদার সঙ্গে থাকে। রোমেনার বাবা-মা বেঁচে আছেন। তবে রোমেনার বাবা রিটায়ার্ড আইনজীবী এবং মা চিরগৃহিণী। তাদের একমাত্র সন্তান রোমেনা।

গত রাতে দীপিতা হঠাৎ সুপর্ণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। চন্দ্ৰকান্তের এক বোনের দুই মেয়ে দীপিতা আর বিনীতা। চন্দ্ৰকান্তের বাড়ির বিশাল লনে কিছু উঁচু বিদেশী গাছ আছে। সুপর্ণ মাঝে মাঝে কেন যেন বিষণ্ণ বোধ করে। সে জ্যোৎস্নায় একটা গাছের ছায়ায় একা দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ দীপিতা পেছন থেকে পা টিপে পা টিপে এগিয়ে তার দুচোখ চেপে ধরেছিল। নিছক কৌতুক? কিন্তু দীপিতার মধ্যে কী একটা টান অনুভব করেছিল সুপর্ণ। দীপিতা যেন রোমেনার কাছ থেকে তাকে কেড়ে নিতে চাইছে।

নাকি মনের ভুল? দীপিতা অবশ্য একটু গায়েপড়া স্বভাবের মেয়ে।

কিংশুক ও দীপিতার মধ্যে আবেগময় সম্পর্ক ছিল বলে সুপর্ণের ধারণা। কিংশুককে আজ সকাল থেকে যেন এড়িয়ে থাকতে চেষ্টা করছে দীপিতা। কিংশুক বিনীতার সঙ্গে বেশি কথা বলছে। কিছু কি ঘটেছে?

এদিকে রাতুল চন্দ্ৰকান্তের দূর সম্পর্কের এক বোনের ছেলে এবং সেই হিসেবে চন্দ্ৰকান্তের ভাগনে। রাতুল কাল থেকে রোমেনার সঙ্গে যেন ভাব জমানোর চেষ্টা করছে। অথচ তাতে সুপর্ণের আর ঈর্ষা হচ্ছে না। নিজের এই আকস্মিক পরিবর্তনে সুপর্ণ নিজেই বিস্মিত।

সে পাথরে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাল। ঠিক এই সময় উত্তরে রোমেনার চিৎকার শোনা গেল, “পেয়েছি! পেয়েছি! রেডহ্যান্ডেড কট।”

সুপর্ণ দেখল, রাতুলের শার্টের কলার ধরে নিয়ে আসছে রোমেনা। দুজনের মুখে উজ্জ্বল হাসি। চন্দ্রকান্ত ঘোষণা করলেন, “রাতুলের পাঁচ টাকা ফাইন!”

সবাই চন্দ্ৰকান্তের কাছে দৌড়ে গেল। এবার রোমেনা আর কিংশুক চোর হতে চায়। কিন্তু টসে জিতল কিংশুক। রোমেনা বাঁকা মুখে বলল, “ভ্যাট। আমার লাকটাই বাজে।”

কিংশুক দৌড়ে গিয়ে উত্তর-পূর্বের টিলার জঙ্গলে গা ঢাকা দিল। পাঁচ মিনিট লুকোনোর সময় চন্দ্রকান্ত আগের মতো হাঁকলেন, “হাইড অ্যান্ড সিক!” রোমেনা, দীপিতা, বিনীতা, সূপর্ণ ও রাতুল খুঁজতে দৌডুল।

রাতুল দক্ষিণ-পশ্চিমে কিছু দূর এগিয়ে একটা গাছের তলায় দাঁড়াল। একটা আশ্চর্য শিহরন খেলে গেল তার শরীরে। রোমেনা একটা ঝোঁপের আড়ালে খুঁড়ি মেরে এগোচ্ছিল। তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল রাতুল। তারপর কী এক হঠকারিতায় রোমেনার মুখটা দুহাতে ধরে সে চুমু খেয়ে ফেলল। আশ্চর্য ব্যাপার! রোমেনা সাড়া দিল। মাত্র আধ মিনিট। অথচ কী দীর্ঘ সময় ধরে যেন .. ওই চুম্বন। রোমেনার শরীরের সুঘ্রাণ এখনও রাতুল টের পাচ্ছে। শরীর কাঁপছে।

দীপিতার চিৎকার শোনা গেল গাড়িটার কাছে। “পেয়েছি! পেয়েছি!”

দীপিতা কিংশুকের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এল চন্দ্ৰকান্তের কাছে। চন্দ্রকান্ত ঘোষণা করলেন, “পাঁচ টাকা ফাইন কিংশুকের।”

এবার শেষ খেলা। সুপর্ণ ‘চোর’ হতে চাইল। সবাই কিছুটা ক্লান্ত। রোমেনা এবার ‘চোর’ হতে চাইল না। একটু অবাক হল সুপর্ণ। কিংশুক বলল, “চোর হওয়ার চাইতে পুলিশ হওয়াই ভাল। অসাধারণ অ্যাডভেঞ্চার হয়।”

কি রোমেনা সাড়া দিয়ে বলল, “ঠিক বলেছ কিংশুকদা। ডিসকভারের আনন্দ অনেক বেশি।”

আগের মতো খেলা শুরু হল। সুপর্ণ দক্ষিণে ছুটে গিয়ে অদৃশ্য হল। পাঁচ মিনিট পরে চন্দ্রকান্ত ঘোষণা করলেন, “হাইড অ্যান্ড সিক!” সবাই দৌড়ে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ল জঙ্গল আর পাথরের আড়ালে।

দিনের আলো কমে আসছে। জঙ্গলে পাখিদের ডাক শোনা যাচ্ছে এবার। একটা হাওয়া উঠেছে এতক্ষণে। বৃক্ষলতাগুল্মে আলোড়ন শুরু হয়েছে। প্রপাতের শব্দ অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

পাঁচ মিনিট পর চন্দ্ৰকান্তের চিৎকার শোনা গেল, “কাম ব্যাক! কাম ব্যাক অল দ্য পোলিস ফোর্স। তোমরা হেরে গেছে।”

একে একে এল রাতুল, কিংশুক, দীপিতা, বিনীতা ও রোমেনা। প্রত্যেকটি মুখে ব্যর্থতার কাঁচুমাচু হাসি। চন্দ্রকান্ত হাঁক দিলেন, “সুপু! কাম ব্যাক! তুমি খেলা জিতেছ!”

দীপিতা বলল, “রুমু! রেডি হও। বিজয়ীকে বরমাল্য দিয়ে রিসিভ করবে তুমি!” তারপর সে ঝোঁপটার কাছে গিয়ে উৎসাহে সাদা বুনো ফুল ছিঁড়তে গেল।

কিন্তু সুপর্ণের সাড়া নেই।

চন্দ্রকান্ত চিৎকার করে ডাকলেন, “কী হচ্ছে সুপু, এবার আমরা বাড়ি ফিরব। কাম ব্যাক!”

কোনও সাড়া এল না।

রোমেনা ভুরু কুঁচকে বলল, “কোনও মানে হয়?”

দীপিতা বলল, “নিশ্চয় সুপুদা গাড়িতে বসে আছে। চলুন মামাবাবু, গাড়ির কাছে যাই।”

সবাই গাড়ির কাছে গেল। সেখানে সুপর্ণ নেই। এতক্ষণে মুখগুলি একটু গম্ভীর হল। রোমেনা খাপ্পা হয়ে বলল, “ও বরাবর এমনি। সবটাতে বাড়াবাড়ি করা চাই।”

বিনীতা আস্তে বলল, “সুপুদাকে রাস্তায় পেয়ে যাব। নিশ্চয় রাস্তার ধারে কোথাও বসে আছে।”

চন্দ্রকান্ত গাড়িতে উঠে বললেন, “এস তো দেখি।” সবাই গাড়িতে উঠে। বসল। কিংশুক, বিনীতা, দীপিতা ব্যাক সিটে। সামনে রাতুল, রোমেনা এবং চালক চন্দ্রকান্ত। শ’ চারেক গজ এগিয়ে রাস্তার বাঁ পাশে আদিবাসীদের একটা থান। পাথরের সমতল চৌকো ও চওড় বেদি। তার ওপর একগাদা ছাই। নীচে কবেকার পশুপাখি বলির রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে।

গাড়ি থামিয়ে চন্দ্রকান্ত বললেন, “আমি থানটা একবার দেখে আসি। তোমরা বসো।”

চন্দ্রকান্ত জঙ্গলের একফালি পায়ে চলা রাস্তা ধরে থানে গেলেন। গাড়ি থেকে রোমেনা বেরুল। থানটা দেখা যাচ্ছে এখান থেকে।

হঠাৎ চন্দ্রকান্ত থানের উল্টোদিকে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। তারপর চেঁচিয়ে উঠলেন, “কিংশুক! রাতুল! তোমরা এস তো শিগগির!”

কিংশুক ও রাতুল ছুটে গেল। তিন যুবতীও তাদের পিছনে হন্তদন্ত ছুটে গেল।

থানের উল্টোদিকে ঝোঁপের ধারে উপুড় হয়ে পড়ে আছে সুপর্ণ। মাথাটা রক্তাক্ত এবং থ্যাঁতলানো। পাশে এক টুকরো রক্তমাখা কালো পাথর পড়ে আছে। কেউ ওই পাথরটা দিয়ে সুপর্ণের মাথাটা তেঁতলে দিয়েছে। তিন যুবতীই আর্তনাদ করে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

চন্দ্রকান্ত সুপর্ণকে চিত করে শোয়ালেন। দুটি চোখ বিস্ফারিত। মুখ রক্তে লাল হয়ে আছে। চন্দ্রকান্ত পরীক্ষা করে দেখে আস্তে বললেন, “হি ইজ ডেড। বাট হু ডিড ইট!”

কিংশুক চেঁচিয়ে উঠল, “স্টোনম্যান! স্টোনম্যান?”

রাতুলও শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, “স্টোনম্যান!”

 চন্দ্রকান্ত ব্যস্তভাবে বললেন, “তোমরা ধরো। গাড়িতে নিয়ে যাই।”

সেই সময় সামনের টিলা থেকে ঝোঁপ ঠেলে বেরিয়ে এলেন এক টুরিস্ট বেশী ভদ্রলোক। মুখে সাদা দাড়ি। মাথায় টুপি। গলায় ঝুলন্ত বাইনোকুলার ও ক্যামেরা। গম্ভীর স্বরে বললেন, “জাস্ট আ মিনিট।”

.

০২.

 চন্দ্রকান্ত আগন্তুককে দেখে ভাঙা গলায় বলে উঠলেন, “কর্নেল সরকার আপনি এখানে?”

কর্নেল নীলাদ্রি সরকার থানের পিছনে ঢালু হয়ে উঠে যাওয়া কতকটা ত্রিভুজাকৃতি টিলার মাথায় দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে একটা পাখি খুঁজছিলেন। সেই সময় ধারিয়া ফসে দলটি তার চোখে পড়েছিল। চন্দ্রকান্ত রায় তার পুরনো বন্ধু। রাঁচি এলাকায় এলে তার বাড়িতেই উঠতেন। এবার উঠেছিলেন গালা গবেষণাকেন্দ্রের সরকারি গেস্ট হাউসে। অভ্যাসমতো বিকেলে বেড়াতে এসে প্রায় চার কি মি পাহাড়-জঙ্গল ভেঙে নাকবরাবর হেঁটে এই টিলার কাছে। আসতেই একটা বিরল প্রজাতির পাখির ডাক শুনতে পেয়েছিলেন। পাখিটির ছবি তোলার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকায় প্রপাতের মাথায় চন্দ্রকান্ত এবং এই যুবকযুবতীদের দিকে তত লক্ষ রাখেননি। একটু পরে চন্দ্ৰকান্তের গাড়ি আসতে দেখে কর্নেল টিলা থেকে নেমে আসছিলেন। তারপর হঠাৎ আদিবাসীদের থানের দিকে চোখ পড়ে চমকে উঠেছিলেন।

চন্দ্ৰকান্তের কথার জবাবে কর্নেল বললেন, “হাউ ইট-হ্যাপন্ড মিঃ রায়?”

চন্দ্রকান্ত বললেন, “চলুন। যেতে যেতে বলছি। এখনই একে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার।”

 “হি ইজ স্টোনডেড মিঃ রায়!” কর্নেল সুপর্ণকে পরীক্ষা করে দেখে বললেন। “হাসপাতালে অবশ্য নিয়ে যেতে হবে। তবে পুলিশকে আগে খবর দেওয়া দরকার। বডি এখানেই থাক। পুলিশ এসে নিয়ে যাক। তা না হলে আপনাদের ঝামেলায় পড়ার চান্স আছে। মিঃ রায়! এঁরা থাকুন এখানে। আপনি এখনই গাড়ি নিয়ে থানায় খবর দিন।”

চন্দ্রকান্ত তখনই গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।

কিংশুক বলল, “এ নিশ্চয় স্টোনম্যানের কাজ।”

দীপিতা কান্না-জড়ানো গলায় বলল, “কলকাতা থেকে স্টোনম্যান এখানে এসেছে আই ডোন্ট বিলিভ দ্যাট।”

রাতুল কর্নেলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি মামাবাবুর পরিচিত। কে আপনি জানতে পারি?”

“আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আপনাদের মামাবাবু আমার বন্ধু।”

রোমেনা একটা পাথরে বসে দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিল। দীপিতা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল।

“এমন সাংঘাতিক ঘটনা কীভাবে ঘটল বুঝতে পারছি না!” কিংশুক একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, “তবে এটা ঠিক, কলকাতার স্টোনম্যানের সঙ্গে অদ্ভুত মিল দেখছি। এই দেখুন, পাথরটার ওজন অন্তত পনের-কুড়ি কেজির কম নয়।”

কর্নেল একটা চুরুট ধরিয়ে বললেন, “আগে বলুন ইনি কে? তারপর আপনাদের পরিচয় দিন প্লিজ!”,

দীপিতা কান্না দমন করে সংক্ষেপে সব কথা বলল। তারা পরস্পর বন্ধু। কলকাতা থেকে তারা গতকাল মামাবাবু চন্দ্ৰকান্তের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। তারপর ধারিয়া ফসে এসে চোরপুলিশ বা হাইড অ্যান্ড সিক গেম খেলার থার্ড রাউন্ডে এই সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে।

রাতুল শ্বাস ছেড়ে বলল, “আমার ধারণা আদিবাসী কোনও উইচ আচমকা পেছন থেকে সুপর্ণের মাথায় এই পাথরটা ছুঁড়ে মেরেছে। সুপর্ণ উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। মামাবাবু ওকে চিত করেছেন। তার মানে পা টিপে টিপে এসে কোনও আদিবাসী ওঝা ওর মাথায় পাথরটা মেরে সেই রক্ত-মাই গড! ওই দেখুন থানের বেদিতে টাটকা রক্ত মাখানো!”

কর্নেল দেখে এসে বললন, “হ্যাঁ। মার্ডারার রক্ত মাখিয়েছে বটে!” তারপর একটু হাসলেনও। “রাতুলবাবু আর কিংশুকবাবুর হাতের রক্ত দেখছি। আপনারা সুপর্ণবাবুর বডি তুলতে হাত লাগিয়েছিলেন বোঝা যাচ্ছে!”

কিংশুক বলল, “হোয়াট ডু য়ু মিন বাই দ্যাট!”

 রাতুলও বলল, “ইওর রিমার্ক হিন্টস সামথিং অড কর্নেল সরকার!”

 “ও নো নো মাইডিয়ার ইয়ং মেন!” কর্নল বললেন। আপনারা দুজনেই বডি ওঠাতে সাহায্য করেছিলেন, সেটাই বলছি।”

রোমেনা ততক্ষণে একটু শান্ত হয়েছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে ধরাগলায় বলল, “কর্নেল সরকার! আমি যদি ভুল না করি, আপনি কি সেই গোয়েন্দা কর্নেল দ্য ফেমাস প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর? আপনার কথা কাগজে পড়েছি।”

কর্নেল জিভ কেটে সাদা দাড়ি থেকে চুরুটের ছাই ঝেড়ে বললেন, “নাহ্। আমি গোয়েন্দা নই। আমি একজন নেচারিস্ট। প্রকৃতিপ্রেমিক মাত্র। প্রকৃতির রহস্যভেদে আমার আগ্রহ আছে। তবে যেহেতু মানুষও প্রকৃতির অংশ, তাই মানুষের মধ্যেও প্রাকৃতিক রহস্য আছে। মাঝে মাঝে সেই রহস্য ভেদ করতে নাক গলাই এই যা।”

রোমেনা বলল, “আমার অনুরোধ কর্নেল সরকার! সুপর্ণকে কেন মরতে হল–”।

রাতুল বাধা দিয়ে বলল, “রুমু! তুমি কী বলতে চাও?”

রোমেনা জবাব দিল না। কিংশুক বলল, “মাথা খারাপ কোরো না কেউ। ব্যাপারটা ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করো।”

বিনীতা বলল, রাতুলদা! তুমিই চোর-পুলিশ খেলার প্রোপোজ্যাল দিয়েছিলে। না না। আমি খারাপ কিছু মিন করছি না। বলতে চাইছি, এই খেলাই সুপুদার মৃত্যুর কারণ।”

রাতুল খাপ্পা হয়ে বলল, “আমি কেমন করে জানব, কে সুপুকে মার্ডার করবে? আমিও চোর হয়েছিলাম। আমাকেও তো মার্ডার করতে পারত মার্ডারার। পারেনি। কারণ আমি এত দূরে থানের কাছে লুকোতে আসিনি।”

রোমেনা বলল, কর্নেল সরকার! মার্ডার কেসে প্রত্যেককে সন্দেহ করার নিয়ম। য়ু আস্ক কোশ্চেনস টু এভরিবডি!”

কর্নেল আস্তে বললেন, “পুলিশ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত মিস রোমেনা–”

 “রোমেনা চৌধুরি!”

“থ্যাংকস! তো আপাতত একটা প্রশ্ন শুধু করতে চাই। একে একে বলুন। আগে বলুন কিংশুকবাবু! আপনিও চোর হয়েছিলেন। এত দূর পর্যন্ত লুকোতে এসেছিলেন কি?

কিশুক বলল, “নাহ।”

“রাতুলবাবু?”

 “নাহ্।”

 “কিংশুকবাবু পুলিশ হওয়ার সময় কি এর কাছাকাছি এসেছিলেন?”

 “নাহ্।”

 “রাতুলবাবু, আপনি?”

“নাহ।”

 “দীপিতা?”

 “না।”

 “বিনীতা?”

“না।”

“রোমেনা?”

রোমেনা একটু চুপ করে থেকে বলল, যে পর্যন্ত এসেছিলুম, সেখান থেকে এই থানটা দেখা যায়।”

“থানের কথা বলেছিলেন কাউকে?”

রোমেনা আবার একটু চুপ করে থেকে বলল, “মনে পড়ছে না। তবে আসার পথে মামাবাবু এই থানটার কথা বলেছিলেন।”

 দীপিতা বলল, “হ্যাঁ। বলেছিলেন।”

রাতুল বলল, “আমি শুনিনি। খেয়াল করিনি।”

কিংশুক বলল, “কী জানি! আমি সুপর্ণের সঙ্গে ফিল্ম নিয়ে আলোচনা করছিলুম। ডকু মুভি তোলার নেশা আছে আমার।”

বিনীতা বলল, “আমি মামাবাবুর কথা শুনিনি। ফিল্ম নিয়ে ওদের আলোচনা শুনছিলুম। তবে আমি জানতুম, ফসের এদিকে আদিবাসীদের থান আছে। জেলা গেজেটিয়ারে পড়েছি, মাঝে মাঝে নাকি নরবলি দেওয়া হত এক সময়।”

“আপনি কি ছাত্রী এখনও?”

“হ্যাঁ। অ্যানথ্রোপলজির ছাত্রী।”

 “দীপিতা কি ছাত্রী?”

 ‘দীপিতা বলল, “নাহ্। আপনি স্বচ্ছন্দে আমাদের তুমি বলতে পারেন।”

কিংশুক বলল, “অবশ্যই পারেন।”

রাতুল সিগারেট ধরাল। বলল, “আমিও আপত্তি করব না। কিন্তু এখানে থাকতে আমার অসহ্য লাগছে। আমি রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছি।”

সে চলে গেল রাস্তার দিকে। কিংশুক বলল, অসহ্য আমারও লাগছে। বাট আই মাস্ট ফেস ইট!”

রোমেনা বলল, “হ্যাঁ–এটা একটা চ্যালেঞ্জ।”

দীপিতা কেঁদে উঠল। “কিন্তু আমি পারছি না। গা ঘুলোচ্ছে।” বলে সে রাতুলের মতো চলে গেল রাস্তার দিকে।

বিনীতা কান্না চেপে বলল, “ইটস আ রিচুয়াল কিলিং। নৃবিজ্ঞানে এমন অনেক কেস স্টাডি করেছি। আদিবাসীদের মধ্যে এই কাস্টম আছে কোথাও কোথাও! আমার ধারণা, রাতুলদা ইজ কারেক্ট। ওদের কোনও ওঝা এখানে ওত পেতেছিল।”

রোমেনা বলল, “অ্যাবসার্ড! এই পাথরটা মেয়েরাও আচমকা কারও মাথায় এই টিলার ওপর থেকে ফেললে যত শক্তিমান লোক হোক, মারা পড়তে পারে। আমাদের যে-কেউই এটা করতে পারে।”

কিংশুক হাসবার চেষ্টা করে বলল, “হোয়াটস দ্য মোটিভ? ভুলে যেও না, সব কিলিংয়ের একটা মোটিভ থাকে।”

রোমেনা গলার ভেতর বলল, “মোটিভ একটা থাকা কি অসম্ভব?”

“কী মোটিভ?”

“কিংশুকদা, আই মাস্ট বি ফ্র্যাংক নাও।” রোমেনা শক্ত মুখে বলল। “আমাদের মধ্যে পরস্পরের একটা এমোশন্যাল সম্পর্ক আছে। আমি ও সুপর্ণ, রাতুল ও দীপিতা, তুমি ও বিনীতা”।

বিনীতা বলে উঠল বিকৃত স্বরে, “স্টপ ইট! অল দ্য ন্যাস্টি থিংস।”

সে হন হন করে চলে গেল রাস্তার দিকে। কিংশুক আস্তে বলল, “য়ু আর ম্যাড রুমু!”

রোমেনা বলল, “নাহ্। আমার মাথা খারাপ হয়নি। একটু আগে তুমি বলেছিলে, আই মাস্ট ফেস ইট। নাও ফেস ইট কিংশুকদা! এমোশন্যাল সম্পর্ক কখনও এক জায়গায় থাকে না। এমন তো হতেই পারে আমি ও রাতুল, সুপর্ণ ও দীপিতা, রাতুল ও বিনীতা, তুমি ও দীপিতা–এভাবে এমোশনের চাকা ঘুরপাক খেতে খেতে প্রত্যেকে প্রত্যেকের শত্রু হয়ে উঠতে পারি? পারি না?”

কিংশুক জবাব দিল না। রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।

কর্নেল চুপচাপ শুনছিলেন। বললেন, “রোমেনা, তুমি এক্সেপশন্যালি ইনটেলিজেন্ট। আই এগ্রি উইদ ইওর পয়েন্ট। দ্য হুইল অব লাভ। পরশুরাম — রাজশেখর বসুর গল্পটা আশা করি পড়েছ। সেটা এক হাসির গল্প অবশ্য। কিন্তু — হা ডার্লিং দিস ইজ আ পাবলিসিটি।”

কিংশুক কর্নেলের দিকে তাকাল।

কর্নেল তাকে বললেন, “রোমেনার বক্তব্য সম্পর্কে তোমার কী মত কিংশুক?”

“অ্যাবসার্ড। শি ইজ ম্যাড। এটা কোনও আদিবাসী স্টোনম্যানের কাজ। রিচুয়্যাল কিলিং।”

কর্নেল হাসলেন। “জানো? কলকাতার স্টোনম্যান সম্পর্কে আমার মত জানতে চাওয়া হয়েছিল। আমি বলেছি, রিচুয়্যাল কিলিংস। হত্যাকারীকে সম্ভবত কোনও তান্ত্রিক বলেছে, অন্তত তেরোটি নরহত্যা করতে পারলে মনোবাসনা পূর্ণ হবে। কিন্তু হত্যা তত সহজ কাজ নয়। সবার পক্ষে সম্ভবও নয়। কিন্তু একটা পদ্ধতিতে সহজে সম্ভব। ফুটপাতে ঘুমন্ত কোনও নিরীহ লোককে হত্যা করলে তদন্ত এগোবে না। কারণ সে তো ভবঘুরে, অজ্ঞাত পরিচয় কোনও ভিখারি ভিখারিনী, পঙ্গু কিংবা রুগ্‌ণ লোক। ধারালো অস্ত্র ধরা যাক, ভোজালির এক কোপে হত্যা করা সম্ভব না হতেও পারে। এ ক্ষেত্রে ভারী পাথর খুব সহজ মার্ডার উইপন। আমি এ-ও বলেছি, হত্যাকারী স্টোনম্যানের নিশ্চয়ই গাড়ি আছে।”

রোমেনা বলল, “বুঝেছি। এক্সট্রিমলি রিচুয়্যাল কিলিংস। নিরাপদে নরহত্যা।”

“এ ক্ষেত্রেও স্টোনম্যান পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে, আপাতদৃষ্ট মনে হচ্ছে।

কিংশুক বলল, “আপনার এই ডার্লিং বলাটা অদ্ভুত!”

রোমেনা বলল, “কাগজে পড়েছি উনি ম্যান-উওম্যান নির্বিশেষে যাকে স্নেহ করেন, তাকে ডার্লিং বলেন।”

“তুমি” কিংশুক একটু অবাক হয়ে বলল, “য়ু আর সো কোল্ড রুমু! তুমি এত শিগগির সামলে উঠেছ!”

“কী বলতে চাও?”

কিংশুক হঠাৎ ফেটে পড়ল। “আমার ধারণা, তুমিই সুপুকে মার্ডার করিয়েছ।” বলেই সে হন হন করে রাস্তার দিকে চলে গেল।

রোমেনা রুষ্ট চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল।

 কর্নেল ডাকলেন, “রোমেনা!”

রোমেনা কেঁদে ফেলল। বিকৃতস্বরে বলল, “উই আর অল ম্যাড, কর্নেল সরকার। আমরা শিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। আমরা কী বলছি, কী করছি, আমরা নিজেরাই জানি না। রিয়েল-আনরিয়েল ঘুলিয়ে গেছে আমাদের কাছে।”

 “ফরগেট ইট, ডার্লিং!” বলে কর্নেল সুপর্ণের ডেডবডির কাছে গেলেন। একটু পিছিয়ে এলেন আবার। বললেন, “আবার প্রশ্নটা করছি। রাতুল চোর পুলিশ খেলার প্রোপোজাল দিয়েছিল?”

“হ্যাঁ। কিন্তু আমিই প্রথমে লুকিয়ে থেকে হারিয়ে যাওয়ার ভান করেছিলুম।” রোমেনা আস্তে বলল, “আসলে আমি সুপর্ণের রিঅ্যাকশন দেখতে চেয়েছিলুম।”

“কী রিঅ্যাকশন দেখেছিলে?”

“নাথিং! ও নির্বিকার ছিল।” রোমেনা একটু থেমে আবার বলল, “এখানে গতকাল আসার পর সুপর্ণের মুডে কেমন একটা চেঞ্জ লক্ষ করেছিলুম। গতরাতে লনে আড্ডা দেওয়ার সময় ওকে অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। একবার হঠাৎ উঠে চলে গেল গাছপালার আড়ালে। জ্যোৎস্নার মধ্যে একবার”

রোমেনা থেমে গেল। কর্নেল বললেন, “ফ্র্যাংকলি বলল রোমেনা!”

“মনে হল–আমার ভুল হতেও পারে–ওর সঙ্গে সম্ভবত দীপুকে দেখেছিলাম।”

“দীপিতাকে?”

“হ্যাঁ। দীপুও উঠে গেল, বলল আসছি। কিন্তু সে বাড়ির দিকেই গিয়েছিল। তারপর অন্য পথে”জানি না কর্নেল! আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না এমন কিছু কী ভাবে সম্ভব? সুপর্ণ জানত, দীপুর কিংশুকের সঙ্গে সম্পর্ক আছে।” রোমেনা রুমালে চোখ মুছে বলল, “আজ সারা দিন সুপর্ণকে আন্যমনস্ক দেখেছি।”

কর্নেল থানটার চারপাশে ঘুরে এলেন। তারপর বাইনোকুলারে চারদিক খুঁটিয়ে দেখলেন। বললেন, “এখানে সুপর্ণকে খুঁজতে আসার কথা কে প্রথম বলল?”

“প্রথমে বিনীতা বলল রাস্তায় ওকে পেয়ে যাব। পরে মামাবাবু বললেন–”

“চন্দ্রকান্ত রায় কি তোমার আত্মীয়?”

 “নাহ। উনি দীপিতা-বিনীতার মামা। রাতুলেরও দূর সম্পর্কের মামা।”

“এখানে বেড়াতে আসার প্রপোজাল কার?”

 “ধারিয়া ফসে? দীপিতার।”

 “রাঁচি আসার প্রোপোজ্যাল?”

“রাতুলের।”

 “রাতুল কী করে?”

“স্মলস্কেল ইন্ডাস্ট্রি। ওর একটা ছোট কারখানা আছে।”

 রাস্তার জিপের হর্ন শোনা গেল। পুলিশের গাড়ি এসে গেছে। চন্দ্ৰকান্তের গাড়ির পেছনে একটা অ্যাম্বুল্যান্স। পুলিশ অফিসার এবং কনস্টেবলরা আগে দৌড়ে এল। পুলিশ ইন্সপেক্টর হরিশ পাণ্ডে কর্নেলকে দেখে বললেন, “হাই ওল্ড বস! যেখানে আপনি, সেখানেই ডেডবডি– দ্যাট ইজ দ্য পোভা।”

কর্নেল একটু হেসে বললেন, “আই কান্ট হেল্প ইট মিঃ পাণ্ডে! হয়তো এটাই আমার নিয়তি।…”

.

০৩.

 যে কোনও খুনের ঘটনায় পুলিশের কিছু ধরাবাঁধা ছক আছে, যেগুলি আইনের সূত্র ধরে তৈরি। পুলিশ দলটির সঙ্গে একজন ডাক্তার এবং একজন ফোটোগ্রাফার ছিলেন। ডাক্তার বাঙালি। রণধীর অধিকারি নাম। সুপর্ণের বডি পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করলেন তিনি। ফোটোগ্রাফার সুরেন্দ্র সিং নানা অ্যাংগলে কয়েকটি ছবি তুললেন ক্যামেরায়। সেই ফাঁকে কর্নেলও ছবি তুললেন। পুলিশ ইনসপেক্টর হরিশ পাণ্ডে চটপটে মানুষ। বেলা পড়ে এসেছিল। অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে দুজন ডোম এসেছিল। তাদের বডি উঠিয়ে নিয়ে যেতে হুকুম দিলেন। বললেন, “বডি রেখে এসে এই পাথরটাও নিয়ে যাও।”

চন্দ্রকান্ত, রাতুল, কিংশুক, দীপিতা, বিনীতা পুলিশের সঙ্গে রাস্তা থেকে আবার ঘটনাস্থলে এসেছিল। হরিশ পাণ্ডে পুলিশি হাসি হেসে বললেন, “রায় সায়েব! এঁদের স্টেটমেন্ট নিতে হবে। সেটা এখানে সম্ভব নয়। থানায় যেতে হবে।”

চন্দ্রকান্ত গম্ভীর মুখে বললেন, “হ্যাঁ। চলো সব! কর্নেল সরকার! আপনি কি আমাদের গাড়িতে আসবেন?”

কর্নেল একটু হেসে বললেন, “জায়গা হবে না মিঃ রায়। আমি একা দুজনের জায়গা নেব।”

মিঃ পাণ্ডে বললেন, “কর্নেল সরকার আমার জিপে যাবেন। আপনারা চলুন।

“থ্যাংকস্ মিঃ পাণ্ডে!” কর্নেল বললেন। “ধারিয়া ফল্‌সের ধারে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত না দেখে আমি যাচ্ছি না। আপনারা চলুন!”

রোমেনা বলল, “আমি কর্নেল সায়েবের সঙ্গে গেলে আপত্তি আছে মিঃ পাণ্ডে?”

চন্দ্রকান্ত বললেন, “তোমার থাকার কি কোনও বিশেষ কারণ আছে রুমু?”

“কর্নেল সায়েবের সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।”

চন্দ্রকান্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, “কথা পরে বললেও চলবে। থানায় যাওয়াটা আগে দরকার।”

রাতুল বলল, “শি ইজ ম্যাড।”

 “শাট আপ!” রোমেনা প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।

দীপিতা এসে ওর হাত ধরল। “প্লিজ রুমু! মাথা ঠাণ্ডা রাখো! সিন ক্রিয়েট করো না!”

মিঃ পাণ্ডে বাঁকা হেসে বললেন, “আপনারা সবাই আন্ডার সাসপিসন। চলুন! রায়সায়েব! প্লিজ, এদের বুঝিয়ে দিন আইনত আমাকে যা করার করতেই হবে।”

চন্দ্রকান্ত তাড়া দিলেন, “চলো সব।”

রোমেনা গোঁ ধরে বলল, “আমাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে চলুন তা হলে বাই ফোর্স। কিন্তু আমি বলছি, থানায় নিশ্চয় যাব। যা বলার বলব। এখন কর্নেল সায়েবের সঙ্গে আগে কিছু কথা বলা আমার খুবই দরকার। প্লিজ আন্ডারস্ট্যান্ড ইট, মিঃ পাণ্ডে!”

কর্নেলের দিকে তাকালেন হরিশ পাণ্ডে। বর্নেল আস্তে বললেন, “আমি রোমেনার সিওরিটি, মিঃ পাণ্ডে। আমি ওকে থানায় নিয়ে যাব। যদি আমার ওপর আপনার আস্থা থাকে”।

মিঃ পাণ্ডে হাসলেন। “দ্যাটস ওক্কে কর্নেল সরকার!”

 কিংশুক রোমেনাকে কিছু বলবে বলে ঠোঁট ফাঁক করেছিল। বলল না। হন হন করে এগিয়ে গেল। ডোম দুজন ফিরে এসে মিঃ পাণ্ডের কথামতো রক্তমাখা পাথরটা নিয়ে গেল। পাথরটা কুড়ি কেজি হওয়া আশ্চর্য নয়, কর্নেলের মনে হল। একটু পরে গাড়িগুলো চলে যাওয়ার পর আসন্ন সন্ধ্যার বনভূমিতে শুধু বাতাসের শব্দ। পাখিদের চ্যাঁচামেচি কমে যাচ্ছিল। কর্নেল বেদির একটা পাশে ঘাসের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে ঘাস সরালেন। তারপর আরও দু পা এগিয়ে গেলেন। রোমেনা কাছে গিয়ে বলল, “কী দেখছেন?”

কর্নেল একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, “রাবর দেখে আসছি, বিশেষ করে আজকাল পুলিশ রুটিন ওয়ার্কসের বাইরে কিছু করে না। আসলে খুনোখুনি প্রচণ্ড বেড়ে যাচ্ছে। তাই একটা খুনের পেছনে বেশি সময় দেওয়ার সুযোগও পুলিশের কম।”

রোমেনা ঝাঁঝালো গলায় বললো, “আপনি কি দেখলেন অমন করে?”

“স্টোনম্যানের পায়ের রক্তের ছাপ।”

রোমেনা তাকিয়ে রইল।

শেষ রোদের লালচে ছটা ক্ৰমে ফিকে হতে হতে ধূসর হচ্ছে। কর্নেল আবার দু পা এগিয়ে পায়ের জুতোয় ঘাস সরিয়ে বললেন, “এই পথে স্টোনম্যান ফিরে গেছে।”

আরও খানিকটা এগিয়ে ছোট্ট একটা ডোবা। কিছু জল জমে আছে। রোমেনার চোখে পড়ল, জলের ধারে বালিতে জুতোর খুব আবছা ছাপ। কর্নেল জুতোর ছাপের কাছে গিয়ে বললেন, “সাবধানী স্টোনম্যান এখানে রক্ত ধুয়েছে জুতোর। ছাপটা দেখে মনে হচ্ছে সে একজন বেঁটে মানুষ।”

দুটো উঁচু পাথরের মাঝখান দিয়ে কিছুটা এগিয়ে ঢালু ঘাসের জমি। জমিটার নীচেই ধারিয়া ফসের ওপরের অংশ। রোমেনা বিস্ময়ে বলে উঠল, “এটা শর্টকাট দেখছি!”

 “হ্যাঁ। সুপর্ণ এই শর্টকাটে এসে লুকিয়ে ছিল থানের কাছে। জানি না স্টোনম্যানও শর্টকার্ট করে একই পথে এসেছিল, নাকি টিলা বেয়ে নেমেছিল।”

রোমেনা চমকে উঠল। “কিন্তু ফল্‌সের মাথায় আমরা ছিলুম! দেখতে পেতুম তাকে।”

“তখন ছিলে না। তোমার বর্ণনা অনুসারে সবাই ব্যস্তভাবে সুপর্ণকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলে।”

“মামাবাবু ছিলেন!”

“মিঃ রায় সম্ভবত অন্য দিকে ঘুরে বসে ছিলেন। তাই দেখতে পাননি স্টোনম্যানকে।”

কর্নেল ফল্‌সের মাথায় গিয়ে দাঁড়ালেন। রোমেনা একটু ইতস্তত করে বলল, “আমার কিছু কথা বলার ছিল!”

“হু, তুমি বলেছিলে বটে। এবার বলতে পারো!” কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুটটা ধরালেন।

রোমেনা চারদিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, “এখানে আমার কেন কে জানে অস্বস্তি হচ্ছে। বরং চলুন রাস্তায় যেতে যেতে বলব।”

কর্নেল হাসলেন। পাঁচ মাইল রাস্তা। তোমার হাঁটার অভ্যাস নেই। শর্টকাটে দু মাইল নাক বরাবর। কিন্তু চড়াই ভাঙতে হবে। জঙ্গল আর পাথর প্রচুর।

রোমেনা একটু ভেবে নিয়ে ধরা গলায় বলল, “আজ আমি সব কষ্ট সহ্য করত পারব। আমার জীবন শূন্য হয়ে গেছে কর্নেল!”

“বুঝতে পারছি।” বলে হঠাৎ কর্নেল এগিয়ে গেলেন সেই পাথরের ফাঁকে ঝোঁপটার দিকে, যেখানে রোমেনা লুকিয়ে ছিল এবং ঝোঁপটায় সাদা ফুলের ঝক।

রোমেনা দেখল, কর্নেল পিঠের কিটব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট স্টিক বের করলেন। স্টিকটা টেনে বড় করলেন। তারপর স্টিকের ডগায় একটা সূক্ষ্ম সবুজ রঙের জাল ছাতার মতো ছড়িয়ে গেল। ঝোঁপের ফুলে একটা প্রজাপতি অবেলায় ছটফট করে উড়ছিল। সেটা জালে আটকানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু ধূর্ত প্রজাপতিটা পালিয়ে গেল। জালটা গুটিয়ে স্টিকটা ছোট করে পিঠের কিটব্যাগে ভরে কর্নেল বললেন, “এস!”

দুজনে একটা খাত ধরে এগিয়ে একটা ঢালু টিলায় উঠলেন। রোমেনা টিলার মাথায় ওঠার পর থমকে দাঁড়াল। টিলার মাথায় এখনও দিনের আলো আছে। সে শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, “আপনি দা হুইল অব লাভের কথা বলছিলেন?”

কর্নেল বাইনোকুলারে দূরে কিছু দেখতে দেখতে বললেন, “হু।”

“কিংশুক সুপর্ণকে ফসের পাশ দিয়ে নিচে নামার জন্য মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাডভেঞ্চারে ডাকছিল। সুপর্ণ গেল না। কিন্তু আমার কানে কিংশুকের এই কথাটা ধাক্কা দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, সে সুপর্ণকে হয়তো”

রোমেনা থেমে গেলে কর্নেল বললেন, “বুঝেছি।”

রোমেনা মুখ নিচু করে আস্তে বলল, “তারপর হাইড অ্যান্ড সিক গেমের সময় একটা ঝোঁপের আড়ালে ঝাঁপিয়ে পড়ে হঠাৎ রাতুল আমাকে আমাকে কিস করল। আমি বাধা দেওয়ার সুযোগ পেলাম না। কিংশুক হয়তো ব্যাপারটা দেখেছিল। কিংশুক রাতুলের ওপর প্রচণ্ড ইর্ষায় তাকে সুপর্ণের মার্ডারের জন্য যেন দায়ী করতে চায় মনে হচ্ছিল।” রোমেনা বিহ্বলতার মধ্যে বলতে থাকল, “কিংশুকের সঙ্গে দীপিতার প্রেম আছে। দীপিতা গতরাতে সুপর্ণের সঙ্গে লনের গাছপালার ভেতর দাঁড়িয়ে ছিল লক্ষ্য করেছি। কিংশুক তাই সুপর্ণকে মেরে রাতুলের কাঁধে দায় চাপাতে চায়।”

কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন, “তোমার থিওরিতে–আমাকে ক্ষমা করো ডার্লিং ফেমিনিন লজিক কাজ করছে। তুমি হয়তো কেসটাকে জটিল করে ফেলছ।”

রোমেনা হাঁটতে হাঁটতে বলল, “আপনি যা-ই বলুন, সুপর্ণকে রাতুল মেরেছে। কলকাতার স্টোনম্যানের মোডাস অপারেন্ডি অনুসারে কাজটা সেই-ই করেছে।”

আবার ঢাল বেয়ে নেমে জঙ্গলে আদিবাসীদের পায়ে চলা একফালি পথে পৌঁছলেন কর্নেল। তারপর বললেন, “সুপর্ণ এবং তোমার মধ্যে গভীর এমোশনাল সম্পর্ক ছিল। অথচ তোমরা বিয়ে করোনি কেন?”

“সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারছিলুম না।” রোমেনা একটু চুপ করে থাকার পর ফের বলল, “সুপর্ণও পারছিল না। তবে আমার বাবা-মা সুপর্ণকে পছন্দ করতেন না। সুপর্ণ তা জানত।”

“সুপর্ণের বাবা-মা?”

 “ওর বাবা-মা বেঁচে নেই। দাদা-বউদির সঙ্গে থাকত।”

 “কিংশুকের বাবা-মাকে চেনো?”

রোমেনা ঝাঁঝালো স্বরে বলল, “কিংশুকের বাবার ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের কারবার আছে। একবার ওঁদের বাড়িতে রেভেনিউ ইনটেলিজেন্স থেকে রেড হয়েছিল। কালো টাকার যখ। জেল খাটতে হত। আমার বাবা তখন হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করতেন। বাঁচিয়ে দেন। লোকটার অডাসিটি! আমার সঙ্গে কিংশুকের বিয়ের প্রোপোজাল দিয়েছিল। বাবা রাজি হননি।”

“ক্ষমা করো এ প্রশ্নের জন্য। কিংশুক কি তোমার সঙ্গে–”

রোমেনা দ্রুত বলল, “হি ইজ আ লোফার! আমাকে অ্যাপ্রোচ করেছিল। আই হেট হিম!”

“তবু তুমি কিংশুক যে দলে আসছে, সেই দলে এসেছ?”

“সুপর্ণের এবং দীপিতার টানে।” রোমেনা হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়াল। “আপনাকে বলা হয়নি, কিংশুকের সঙ্গে দীপিতার বিয়ের কথা হয়েছে। দীপিতার বাবা স্কুলটিচার। প্রোপোজাল পেয়ে বর্তে গেছেন।”

“কিংশুক ও দীপিতার মধ্যে এমোশনাল সম্পর্ক আছে?”

একটু পরে রোমেনা বলল, “আছে–মানে ছিল। এখানে এসে লক্ষ্য করেছি, কিংশুক ওর ছোট বোন বিনীতার সঙ্গে ভাব জমাতে চাইছে। এদিকে দীপিতা সুপর্ণের সঙ্গে গতরাতের কথা তো বলেছি আপনাকে।”

এতক্ষণে টর্চ জ্বালাতে হল। আবার একটা চড়াই। কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে না তো?”

রোমেনা বলল, “নাহ্।”

কুড়ি মিনিট চড়াই ভেঙে উত্রাই শুরু হল। উত্রাইয়ের শেষে পিচের রাস্তা। কিছু দোকানপাট। সেখানে একটা সাইকেলরিকশো নিলেন কর্নেল। ল্যাক রিসার্চ সেন্টারের গেস্টহাউসে পৌঁছে বললেন, “কফি খেয়ে একটু বিশ্রাম করা যাক। তারপর তোমাকে থানায় পৌঁছে দেব।”

রোমেনা লনে হাঁটতে হাঁটতে দ্বিধাজড়ানো গলায় বলল, “থানায় যেতেই হবে আমাকে?” 

“হ্যাঁ ডার্লিং! তোমার স্টেটমেন্ট পুলিশ নেবে। আমি কথা দিয়েছি।”

রোমেনা আস্তে বলল, “আমি স্ট্রেটকাট বলব, কিংশুক মার্ডার করেছে সুপর্ণকে।”

“কিন্তু তুমি দেখনি!”

 “দেখিনি বাট আই সাসপেক্ট হি ইজ দ্য কিলার।”

“না রোমেনা। যা যা ঘটেছে–মানে যা-যা দেখেছে, তা-ই বলবে পুলিশকে। তোমার কী ধারণা বা সন্দেহ, তা বলবে না। তাতে পুলিশ বিভ্রান্ত হবে।”

রোমেনা চুপ করে থাকল।

গেস্টহাউসের দোতলায় নিজের রুমে ঢুকে কর্নেল কিটব্যাগ, ক্যামেরা ও বাইনোকুলার রাখলেন। বোতাম টিপে বেয়ারাকে ডেকে ক্যান্টিন থেকে কফি আর কিছু স্ন্যাক্স আনতে বললেন। তারপর রোমেনাকে বললেন, “বাথরুমে যাও। মুখে-হাতে জল দিয়ে এস। পা ধুয়ে ফেলো, ক্লান্তি চলে যাবে।”

রোমেনা বাধ্য মেয়ের মতো কথা শুনল। তাকে এবার একটু ফ্রেশ দেখাচ্ছিল। কফি আর স্ন্যাক্স দিয়ে গেল বেয়ারা। কর্নেল বললেন, “কফি নার্ভকে চাঙ্গা করে। কফি খেয়ে নাও।”

কফি খেতে খেতে রোমেনা বলল, “আমার ধারণা, কিংশুককে আপনি মার্ডারার বলে সন্দেহ করছেন না।”

কর্নেল একটু হেসে সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, “নাহ্। করছি না।”

 “কেন?”

“প্রথম কারণ, এই পাথর তুলে এক ঘায়ে সুপর্ণের মতো শক্তিমান যুবককে মেরে ফেলার জন্য যা শারীরিক ক্ষমতা দরকার, তা রোগা কিংশুকের নেই। দ্বিতীয় কারণ, সে ফিল্ম অনুরাগী। ডকু মুভি-মেকার। কাজেই আর্টিস্ট। কোনও আর্টিস্ট যত এমোশনাল হোক, সে খুনের ব্যাপারে রিস্ক নিতে চাইবে না। ব্যতিক্রম থাকতে পারে। তৃতীয় এবং ভাইটাল কারণ, তার খুনের মোটিভ অত্যন্ত অস্পষ্ট। শুধু তাই নয়, যথেষ্ট জোরালো নয়। ডার্লিং! নরহত্যা–অন্তত এই বিশেষ ক্ষেত্রে একটা দুঃসাহসী কাজ।”

রোমেনা মুখ নামিয়ে কফিতে চুমুক দিল। তারপর আস্তে বলল, “তা হলে রাতুল ফিট করে যায় আপনার থিওরির সঙ্গে। হি কিম্ভু মি সাডনলি। আই ওয়াজ সো মাচ শন্ড আই কুডষ্ট রেসিস্ট হিম। আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলুম। বাধা দিতে পারিনি। ভীষণ ভীষণ লজ্জা আর অবাক” সে থেমে গেল। মুখ লাল হয়ে উঠল। নাসারন্ধ্র স্ফীত হল রোমেনার।

কর্নেল প্রায় অট্টহাসি হাসলেন। “নাহ্ রোমেনা! রাতুল তোমাকে পেতে চাইলে সুপর্ণকে তার খুন করার দরকার হবে কেন? তুমি তার এমোশনাল অ্যাটাচমেন্টে বাধা দাওনি। চুপ করে ছিলে। সে এ থেকে ভেবেছে, তোমার সম্মতি আছে। কাজেই সে যত দুঃসাহসী বা গোঁয়ার হোক, কিংবা সুপর্ণকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করুক, তাকে তার খুন করার প্রয়োজন হবে কেন?”

রোমেনা ভাঙা গলায় বলল, “তা হলে কে মারল সুপর্ণকে?”

“আমি ঘটনাস্থল দেখে এবং তোমার মুখে শুনে জাস্ট একটা থিওরি গড়ে তুলেছি–সেটা আপাতত মোডাস অপারেন্ডি সংক্রান্ত। খুনীর চেহারা এখনও তাতে অস্পষ্ট। আমাকে স্ট্রং মোটিভ খুঁজে বার করতে হবে আগে।” কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, “সাইকিক খুনীদের প্রশ্ন উঠছে না। কারণ এই এলাকায় তেমন কোনও খুনখারাপি ঘটেনি। খুনের প্রধানত দুটো উদ্দেশ্য। থাকে — ব্যক্তিগত লাভ এবং প্রতিহিংসা চরিতার্থ। আরেক ধরনের খুন আছে। দৈবাৎ আঘাতে মৃত্যু। ধরো তুমি রাগের বশে কাউকে আঘাত করলে। সে মারা পড়ল। একে বলে ম্যানস্লটার। আবার এমনও হতে পারে, তোমার একটা অসতর্ক কাজের ফলে কেউ মারা পড়ল।”

কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। “চলো, থানায় ওঁরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।”

সাইকেলরিকশোয় থানার দিকে যেতে-যেতে রোমেনা বলল, আমাদের সবাইকে পুলিশ অ্যারেস্ট করবে তাই না?”

কর্নেল বললেন, “দ্যাট ডিপেন্ডস। পুলিশ নিজের পদ্ধতিতে কাজ করে।”

 “মামাবাবুকেও কি অ্যারেস্ট করবে?”

“পুলিশের ইচ্ছা। তবে উনি এলাকার প্রভাবশালী মানুষ। কর্নেল রোমেনার দিকে ঘুরলেন। “কেন এ কথা জিজ্ঞেস করছ?”

রোমেনা আস্তে বলল, “এমনি।”

“ওঁর সঙ্গে তোমার আগে পরিচয় ছিল?”

“নাহ্। এই প্রথম দীপিতার সঙ্গে এসে পরিচয় হল। জলি মানুষ। শিগগির আপন করে নিতে পারেন। তা ছাড়া মডার্ন-মাইন্ডেড।”

“হ্যাঁ চন্দ্রকান্ত রায় চমৎকার মানুষ। এক সময় নামকরা শিকারি ছিলেন। বাই দ্য বাই, সুপর্ণের সঙ্গে ওঁর পরিচয় ছিল?”

“নাহ্। থাকলে আমি জানতে পারতুম।”

থানায় পৌঁছলে পুলিশ ইন্সপেক্টার হরিশ পাণ্ডে সহাস্যে বললেন, “সরি। কর্নেল সরকার! আপনি এ কেসে কোনও রহস্য খুঁজতে গেলে ব্যর্থ হবেন। আই বি থেকে ইনফরমেশন আছে, ধারিয়া এলাকায় আদিবাসীরা আউটসাইডারদের বরদাস্ত করছে না। বিশেষ করে ওদের সম্প্রতি একটা গোপন মিটিং হয়েছে। ধারিয়া ফসের কাছে ওদের দেবতার থানে কোনও নন-ট্রাইবালকে পেলেই ওরা বলি দেবে। অফ কোর্স, মিস চৌধুরী এবং আপনার স্টেটমেন্ট ফরম্যালি নেব। মিস চৌধুরী, চলুন। পাশের ঘরে গিয়ে স্টেটমেন্ট দেবেন। তারপর আপনারা ফ্রি। তবে দরকার হলেই আমরা ডাকব। আপনাদের আসতে হবে।”…

.

০৪.

 কর্নেল তার সংক্ষিপ্ত স্টেটমেন্ট সই করে বললেন, “তা হলে আদিবাসী গ্রামগুলোতে আপনারা ধরপাকড় শুরু করবেন মিঃ পাণ্ডে?”

পাণ্ডে বললেন, “নিশ্চয়। আমরা ওদের সমিতির চাঁইগুলোকে আজ রাতেই ধরে ফেলব। তারপর থার্ড ডিগ্রিতে চড়ালে সব কথা বেরিয়ে আসবে।”

“প্লিজ মিঃ পাণ্ডে!” কর্নেল বললেন, “অন্তত একটা দিন আমাকে সময় দিন। তারপর আপনারা নিজের পথে চলবেন।”

পাণ্ডে হাসলেন। “আপনি রহস্যভেদী মানুষ। সর্বত্র রহস্য খুঁজে পান। আশা করি, কানও ক্লু খুঁজে পেয়েছেন?”

“হয়তো পেয়েছি, কিংবা পাইনি। আমাকে সিওর হতে দিন মিঃ পাণ্ডে। আগামীকাল সূর্যাস্ত পর্যন্ত।”

“কিন্তু ততক্ষণে অপরাধীরা গা ঢাকা দেবে।” পাণ্ডে গোঁফে তা দিয়ে বললেন ফের, “কর্নেল! একটা আদিবাসীদের রিচুয়্যাল কিলিং। থানার রেকর্ডে আছে, একসময় এভাবে ওরা ননট্রাইবালদের বলি দিত দেবতার থানে।”

 “মিঃ পাণ্ডে!” হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন কর্নেল। “পাথরটা একবার আমি দেখতে চাই।”

পাণ্ডে উঠলেন। একটু হেসে বললেন, “তখন তো দেখেছেন!”

“দেখেছি বলেই আবার দেখতে চাইছি। আপনি দেবতার বলি কথাটা বলায় আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসে গেল।”

মহাফেজখানার ভেতর একটা টুলে পাথরটা রাখা ছিল। কর্নেল পকেট থেকে আতস কাঁচ বের করে পাথরের ওপর কী সব খুঁটিয়ে দেখতে থাকলেন। পাণ্ডে বললেন, “ওজন করা হয়েছে। কত ওজন জানেন? প্রায় তেইশ কিলোগ্রাম।”

কর্নেল সাবধানে পাথরটার তলা কাত করে দেখেই বললেন, “মাই গুডনেস!”

 “কী ব্যাপার?”

 “এটা বীভৎস একটা মূর্তির মাথা।”

পাণ্ডে হাসতে লাগলেন। হ্যাঁ স্টোনম্যান বলা চলে তা হলে। তাই না?”

“বলা চলে মিঃ পাণ্ডে!” কর্নেল বেরিয়ে এলেন। ফের বললেন, “আগামীকাল সূর্যাস্তের মধ্যে আমি এ রহস্য জেনে ফেলব মিঃ পাণ্ডে! আই প্রমিজ।”

চন্দ্রকান্ত ওদের নিয়ে লনে অপেক্ষা করছিলেন। কর্নেলকে দেখে বললেন, “মিঃ পাণ্ডে ইজ রাইট, কর্নেল সায়েব! ব্যাপারটা আমিও জানি। এ শহরের সবাই জানে। তবে শিকারি জীবনে এলাকার আদিবাসীদের সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিল, সে তো আপনিও জানেন। তাই আমি এদের ধারিয়া ফসে নিয়ে গিয়েছিলাম।”

কিংশুক বলল, “তাই আমার সন্দেহ হচ্ছিল, ফসে কোনও টুরিস্ট নেই কেন? এলাকার সব ফসে লোকেদের ভিড় হয়। ধারিয়া ফল্স একেবারে নির্জন।”

গাড়িতে উঠতে গিয়ে রোমেনা হঠাৎ বলে উঠল, “বিনু! তোমার আঁচল ছিঁড়ল কী করে?”

বিনীতা আঁচলটা দেখে নিয়ে আস্তে বলল, “লক্ষ্য করিনি তো। কাঁটাঝোপে কখন আটকে ছিঁড়ে গেছে।”

দীপিতা বলল, “তুই যা ছোটাছুটি করছিলি!”

কিংশুক একটু হাসল। “অ্যানথ্রোপোলজি স্টাডি করে বেড়াচ্ছিল।”

 বিনীতা চটে গিয়ে বিকৃত স্বরে বলল, “স্টপ ইট।”

 চন্দ্রকান্ত বললেন, “কর্নেল সায়েব! আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আমরা ফিরব।”

কর্নেল বললেন, “থ্যাঙ্কস মিঃ রায়! আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না। এরা সবাই টায়ার্ড অ্যান্ড টেরিবুলি শচ্ছ! আমি রিকশোয় ফিরব’খন। তো– সুপর্ণের দাদাকে ট্রাঙ্ককল করা হয়েছে কি?

“থানা থেকে চেষ্টা করলাম। সরাসরি লাইন না পেয়ে মিঃ পাণ্ডেকে বললাম লালবাজারে জানিয়ে দিতে। লালবাজার সুপর্ণের দাদাকে মেসেজ পৌঁছে দেবে।”

গাড়ি স্টার্ট দিলেন চন্দ্রকান্ত। কর্নেল তার পাশে এসে বললেন, “একটা রিকোয়েস্ট মিঃ রায়!”

“বলুন!”

“আগামীকাল সকাল নটায় আমি ধারিয়া ফসের কাছে আদিবাসীদের থানে। অপেক্ষা করব! আপনি এদের সবাইকে নিয়ে সেখানে ওই সময় যাবেন।”

“কী ব্যাপার?”

কর্নেল একটু হেসে বললেন, “সুপর্ণকে সত্যিই স্টোনম্যান খুন করেছে। আমি সেটা প্রমাণ করব।”

গাড়ির ইঞ্জিন গরগর করছিল! গাড়ির ভেতর সবাই চুপ। একটু পরে চন্দ্রকান্ত শ্বাস ছেড়ে বললেন, “হ্যাঁ যাব। সবাইকে নিয়ে যাব। আমরাও জানতে চাই কে খুন করল সুপুকে।”

কর্নেল রাস্তায় গিয়ে একটা রিকশো ডাকলেন।

 চন্দ্ৰকান্তের গাড়ি এগোল বাড়ির দিকে। সারা পথ কেউ কোনও কথা বলল না।…

.

আদিবাসীদের থানের পেছনে উঠে গেছে একটা টিলা। টিলার মাথায় একটা ন্যাড়া বিশাল পাথরে বসে অপেক্ষা করছিলেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। দাঁতের ফাঁকে চুরুট, চোখে বাইনোকুলার। উজ্জ্বল শারদ-রোদে দূরে চন্দ্ৰকান্তের সাদা গাড়িটা আসছে। আঁকাবাঁকা খোয়া-বিছানো রাস্তাটার সংস্কার হয়নি কয়েক বছর। এলাকায় ঝাড়খণ্ডীদের আন্দোলন, একটা কারণ। অন্য কারণ এ রাস্তায় টুরিস্ট আসা বন্ধ হয়ে গেছে।

নটা বাজার পনের মিনিট আগেই এসে পৌঁছুলেন চন্দ্রকান্ত। কিংশুক, রাতুল, রোমেনা, দীপিকা, বিনীতা সবাই এসেছে। প্রতিটি মুখে চাপা উত্তেজনা থমথম করছে। চন্দ্রকান্ত আজ সঙ্গে তার রাইফেল এনেছেন।

কর্নেল তাদের অভ্যর্থনার ভঙ্গিতে থানের কাছে নেমে এলেন! “মর্নিং অল অব য়ু!”

চন্দ্রকান্ত গম্ভীর মুখে বললেন, “মর্নিং!”

 কর্নেল হাসলেন, “রাইফেল কেন মিঃ রায়?”

 চন্দ্রকান্ত গলার ভেতর বললেন, “আই মাস্ট কিল দ্য ব্লাডি স্টোনম্যান।”

“মিঃ রায়! কলকাতায় কোন সাংবাদিক কিংবা পুলিশ অফিসার স্টোনম্যান কথাটা চালু করেছেন। পাবলিক নিয়েছে। কিন্তু এ হল ভাষার ওপর অত্যাচার।” কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট জ্বেলে বললেন, “অবশ্য ভাষা আগে, ব্যাকরণ পরে। স্টোনম্যানের মতো আরেকটি শব্দ আছে, আয়রনম্যান। বাংলায় লৌহমানব বলা হয়। লোহার মতো কঠিন যে মানুষ। সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে ব্যাকরণ এই শব্দটা নিতে পারে। কিন্তু স্টোনম্যান? পাথরের মতো মানুষ অর্থে সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে একেও ব্যাকরণ পাতে নিতে আপত্তি করবে না। অথচ কলকাতার স্টোনম্যান মানে, পাথর দিয়ে যে মানুষ খুন করে। ভাষার ওপর যথেচ্ছ অত্যাচার মিঃ রায়!”

চন্দ্রকান্ত বললেন, “আপনি কী বলতে চাইছেন?”

“ধারিয়া ফলস এলাকার স্টোনম্যানকে আমরা আক্ষরিক অর্থে নিতে চাই! স্টোনম্যান মানে, পাথরের মানুষ। বরং পাথরে তৈরি মানুষ বললে আরও স্পষ্ট হয় কথাটা।” কর্নেল টিলা বেয়ে উঠতে উঠতে বললেন, “আসুন মিঃ রায়! তোমরাও এস। দেখাচ্ছি।”

চন্দ্রকান্ত তাড়া দিলেন, “চলো সব!”

কিংশুক ও রাতুল আগে, তারপর রোমেনা ও দীপিতা, তাদের পেছনে বিনীতা টিলা বেয়ে উঠতে থাকল। ঝোঁপঝাড়ে ঢাকা টিলাটার ঢাল প্রায় পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণ সৃষ্টি করছে সমতল থেকে। প্রায় কুড়ি ফুট ওঠার পর একটা বুড়ো-ঝকড়া গাছ এবং তলায় ঘন ঝোঁপ। ঝোঁপের ধারে টুকরো-টুকরো নানা গড়নের পাথর পড়ে আছে। কর্নেল সেখানে দাঁড়িয়ে বললেন, “বিনীতা তুমি নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী! দেখ তো এগুলো চিনতে পারো কি না?”

সে কিছু বলার আগেই রাতুল বলল, একটা পাথরের মূর্তি-টুর্তি ভেঙে পড়ে আছে।”

“কারেক্ট।” কর্নেল বললেন, “গতকাল বিকেলে আমি যখন তোমাদের জিজ্ঞেস করলুম, কেউ নীচের ওই থানের কাছে এসেছিলে কি না, সবাই বললে, আসোনি। কিন্তু একজন এসেছিলে। তার মানে একজন মিথ্যা বলেছ।”

চন্দ্রকান্ত ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কে সে?”

 কেউ জবাব দিল না।

কর্নেল আস্তে বললেন, “মিথ্যা বলা তার পক্ষে স্বাভাবিক। কারণ সে ভাবতে পারেনি একটুর জন্য এমন সাংঘাতিক অঘটন ঘটে যাবে।”

রোমেনা কান্নাজড়ানো গলায় বলে উঠল, “দ্যাটস অ্যান অ্যাকসিডেন্ট।”

চন্দ্রকান্ত তার দিকে তাকালেন। “তুমি এসেছিলে?”

 রোমেনা দু হাতে মুখ ঢেকে মাথা নাড়ল।

“তবে কে?”

কর্নেল বললেন, “পুলিশ-চোর খেলার পুলিশ হয়ে সে চোর খুঁজতে থানের ওই দিকটায় এসেছিল। সেখান থেকে এই পাথরের মূর্তির ভগ্নাবশেষ তার চোখে পড়ে। সে খেলা ভুলে ঝোঁপের ভেতর দিয়ে এখানে চলে আসে। মূর্তির মাথাটা সে তুলে সোজা করার চেষ্টা করে। সেই সময় তার হাত ফসকে তেইশ কিলো পাথরের মাথা–স্টোনম্যানেরই মাথা বলা উচিত–সোজা নিচে গড়িয়ে যায়। থানের আড়ালে সুপর্ণ লুকিয়ে ছিল। সে খুঁড়ি মেরে বসে ছিল সম্ভবত। তাই পাথরটা গিয়ে তার মাথায় পড়ে। রোমেনা ঠিকই বলেছিল, “দ্যাটস অ্যান অ্যাকসিডেন্ট। সে জানত না সুপর্ণ নীচে আছে।”

চন্দ্রকান্ত ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, “কে সে?”

কেউ জবাব দিল না। কর্নেল পকেট থেকে একটা জিনিস বের করে বললেন, “কী ঘটেছে দেখা মাত্র সে ছুটে নেমে যায় এবং তখন কাটাঝোপে তার শাড়ির আঁচলের এই টুকরোটা–”।

“বিনু! তুই!” চন্দ্রকান্ত চমকে উঠে বললেন।

রোমেনা বিনীতাকে ধরল। সে মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল বিনীতা। “আমি–আমি ভাবিনি এমন হবে।”

রোমেনা ভাঙা গলায় বলল, “রাত্রে আমাকে বিনু সব কথা বলেছে! ওর কোন দোষ নেই।”

কর্নেল বললেন, “অ্যানথ্রোপলজির ছাত্রীর পক্ষে এটা স্বাভাবিক। সে ট্রাইব্যাল দেবতার মূর্তি দেখতে পেয়ে খেলা ভুলে পরীক্ষা করতে এসেছিল। তবে হ্যাঁ, বিনীতার নার্ভ স্ট্রং।”

চন্দ্রকান্ত হতাশভাবে বললেন, “সুপুর মৃত্যু ঘটানোর জন্য আইনত বিনু দায়ী। এখন ওকে কী করে বাঁচাব বুঝতে পারছি না।”

বিনীতা চোখ মুছে বলল, “আমি পুলিশকে সব বলব। আমার শাস্তি হোক।”

রোমেনা বলল, “ফরগেট ইট বিনু! আমিও সুপর্ণের মৃত্যুর কারণ হতে পারতুম।”

রাতুল বলল, “আমিও হতে পারতুম।”

কিংশুকও বলল, “আমিও। অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট। এতে কিছু করার নেই।”

দীপিতা ফুঁসে উঠল। “আমি এখানে এলে পাথর টানাটানি করতুম না। বিনু একটা ইডিয়ট!”

চন্দ্রকান্ত চোখ মুছে বললেন, “হয়তো ট্রাইব্যাল দেবতার অভিশাপ। আমরা নন-ট্রাইবালরা ওদের ওপর যুগ যুগ ধরে উৎপাত করেছি।”

কর্নেল বললেন, “এবার আমারা থানে নেমে যাই চলুন। এই শাড়ির আঁচলের টুকরোর মতো আর একটা জিনিস আপনাদের দেখাব। সেটা ঐ ডোবাটার কাছে ঝোঁপের ভেতর পড়ে আছে।”

বিনীতা বলল, আমার রুমালটা!”

সবাই নামতে থাকল। চন্দ্রকান্ত ক্রুদ্ধস্বরে বললেন, “রুমাল ফেলে রেখেছিস কেন হতচ্ছাড়া মেয়ে?”

কর্নেল বললেন, “বিনীতার নার্ভ স্ট্রং। সে যখন দেখল, যা হবার হয়ে গেছে, তখন সে রুমালে সুপর্ণের মাথার রক্ত মাখিয়ে থানে ঘষে রক্তমাখা রুমালটা ওখানে ফেলে গিয়েছিল। নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী। ট্রাইব্যাল রিচুয়্যাল কিলিং বা বলির খুঁটিনাটি তথ্য তার জানা।”

নীচে নেমে সেই ছোট্ট ডোবার ধারে একটা ঝোঁপ থেকে শুকনো রক্তমাখা রুমালটা কুড়িয়ে নিলেন কর্নেল। শুকনো পাতা কুড়িয়ে আগুন ধরালেন। সেই আগুনে আঁচলের টুকরো আর রুমালটা পুড়িয়ে দিলেন। হাসতে হাসতে বললেন, “প্রমাণ লোপও বেআইনি। কিন্তু অ্যাকসিডেন্ট।”

চন্দ্রকান্ত বললেন, “কিন্তু পুলিশ তো আদিবাসীদের ওপর খামোকা জুলুম চালাবে।”

কর্নেল বললেন, “নাহ্। আমি পুলিশকে বুঝিয়ে দেব, পাথরটা কোনও বুনন জন্তুর পায়ের চাপে হঠাৎ নিচে গিয়ে পড়েছে।”

“এ জঙ্গলে তো বুনো জন্তু নেই!”

“এ জঙ্গলে এখনও সম্বর আছে। আর সম্বরের স্বভাব হল শিঙ দিয়ে পাথর ওপড়ানো। এই দেখুন! গতরাতে এখানে এসে ফলসের কাছে গাছের ডালে আমার ক্যামেরা পেতে রেখেছিলুম। শাটারে নাইলনের সুতো টানা ছিল, জন্তুদের জল খেতে নামার পথে। সম্বরের পায়ে লেগে শাটার ক্লিক করেছে। ফ্লাশে চমৎকার ছবি উঠেছে।” কর্নেল একটা ছবি বের করলেন। “ভোরে ডেভালাপ করে প্রিন্ট করেও ফেলেছি। সব সরঞ্জাম আমার সঙ্গে থাকে, আপনি তো জানেন।”

সবাই ছবিটার দিকে ঝুঁকে পড়ল। একটা সম্বর শিঙ দিয়ে পাথর ওপড়ানোর চেষ্টা করছে ধরিয়া ফলসের ধারে।

চন্দ্রকান্ত বললেন, “হ্যাঁ সম্বরদের এ স্বভাব আছে। তবে ঠিক পাথর ওপড়ানোর চেষ্টা বলা ঠিক হবে না। আসলে ওরা”।

কর্নেল তার কথার ওপর বললন, “আসলে ওরা শিঙ ধারালো করতে চায়। কিন্তু তা-ই করতে গিয়ে পাথর খসে পড়ে পাহাড়ের গা থেকে। আশাকরি, এই ছবি দেখে, মিঃ পাণ্ডে আমার থিওরি মেনে নেবেন। চলুন, এবার ফেরা যাক।”….