৫. পুজোর চারটে দিনে

০৫.

পুজোর চারটে দিনে আনন্দে কাটাল গার্গী। কাঁটালিয়াঘাটে বারোখানা ঠাকুর হয়। টাউনশিপ এলাকাতেই তিনখানা। সবচেয়ে বেশি জাঁকজমক হয় ঘাটবাজারের ব্যবসায়ী সমিতির পুজোয়। বাজারের পেছনদিকটায় পুরনো স্কুলের খেলার মাঠে কলকাতার যাত্রা সপ্তমী অষ্টমী নবমী তিনটে রাত। গৌতমের সঙ্গে যাত্রা দেখতে পাঠিয়েছিল ঘনশ্যাম। সে বাড়ি পাহারা দেবে। দশমীর দিন তার ছুটি। কিন্তু চুপচাপ বসে থাকা তার ধাতে নেই। কোথায় কোথায় ইঞ্জেকশন দেওয়া আর ছোটখাটো ডাক্তারির করে বেড়াল। বিকেলে গার্গীর টানে সে ঘাটে বিসর্জন দেখতে গেল। গৌতম ক্যামেরায় বিসর্জনের অনেক ছবি তুলল। ঘনশ্যাম আর গার্গীরও কয়েকটা ছবি নিল। ঘনশ্যাম বিব্রত মুখে বলছিল, “আরে! আমার এই কুচ্ছিত চেহারার ছবি তুলে কী হবে?”

পরদিন থেকে আবার অফিস। আবার সেই রুটিনবাঁধা জীবন ঘনশ্যামের। গার্গী আগেভাগে বলে রাখে বিকেলে বেড়াতে যাওয়ার কথা। সে একটু করে সাহসী হয়ে উঠেছে। পঞ্চমুখী শিবের মন্দিরেও ঘুরে এল একদিন গৌতমের সঙ্গে। বাকি ফিল্মগুলো সেখানেই শেষ করে দিল গৌতম।

ছবিগুলো প্রিন্ট করে এনে গার্গীকে দিয়েছিল। গার্গী নিঃসংকোচে স্বামীকে দেখিয়েছিল। দেখে খুব প্রশংসা করেছিল ঘনশ্যাম। একটা ছবি সে বাঁধিয়ে এনে দেবে বলেছিল।

আবার একদিন বিলের ধারে সরকারি জঙ্গলটায় একটা বিকেল কাটাল গার্গী ও গৌতম। সেই সময় জঙ্গলের ভিতরে কিংবা বিলের পশ্চিমে রেলব্রিজের কাছে আবছা গুলির শব্দ শুনতে পেল ওরা। গার্গী বলল, “পাখি মারতে বেরিয়েছে কেউ। কোনও মানে হয়? পাখিগুলো-”

তাকে থামিয়ে গৌতম বলল, “বন্দুকের শব্দ বলে মনে হলো না!”

 “তা হলে কেউ পটকা ফাটালো।”

“নাহ্। কলকাতায় আমি একবার দুদলের বোমাবাজির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলুম। তারপর পুলিশের গাড়ি এল। এক অফিসার রিভলভার থেকে ফায়ার করল। ঠিক সেই রকম শব্দ। ওঠ! এখানে থাকা ঠিক নয়।”

দুজনে বাঁধ ধরে ফিরে এল। তখনও ঘনশ্যাম ফেরেনি। পৌনে ছটায় আজকাল আবছা আঁধার হয়ে যায়। তাতে পুজোর পর আবার লোডশেডিং বেড়ে গেছে। গার্গী হেরিকেন জ্বেলেছে সবে, ঘনশ্যাম সাইকেলের বেল বাজিয়ে ফিরল। গৌতমকে দেখে সে হাসল। “যাক গে! আমি ভেবেছিলাম, তোমার বৌদি একা থাকবে। লোডশেডিং। তাছাড়া ওই ছাতিম গাছটার পেত্নির ভয়।”

গার্গী বলল, “আমার ভয়টায় নেই।”

সে হেরিকেনটা কিচেনের সামনে টেবিলে রেখে কুকার জ্বালাল। গৌতমকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। ঘনশ্যাম বলল, “কী গৌতম? বৌদির সঙ্গে ঝগড়া করেছ নাকি?”

গৌতম আস্তে বলল, “বিকেলে জঙ্গলের ওদিকে রিভলভারের গুলির শব্দ শুনলুম শ্যামদা! কী ব্যাপার কে জানে! আমরা বেড়াতে যাচ্ছিলুম। পালিয়ে এলুম তক্ষুণি।”

ঘনশ্যাম চমকানো স্বরে বলল, “বলো কী? কাকেও দেখতে পাওনি?”

 “নাহ্। শব্দটা ঠিক ট্রেস করতে পারিনি।”

“দেখ আবার কোনও খুনজখম হলো নাকি।” ঘনশ্যাম সিগারেট ধরিয়ে। বলল। “তপুকে মার্ডারের রিভেঞ্জ ব্রতীনবাবুরা নেবে, সে তো জানা। কেলো কতদিন গা ঢাকা দিয়ে বেড়াবে? তবে এখানে পিস্তল-রিভলভার দুই দলেরই আছে শুনেছি। দেখলুমও তো স্বচক্ষে।”

গার্গী একটু হেসে বলল, “গৌতম এত ভীতু জানতুম না। কচি ছেলের মতো ভয়ে সারা!”

গৌতম চুপ করে রইল। ঘনশ্যাম বলল, “তোমার এত ভয়ের কী। তুমি তো কোনও দলে নেই–আউটসাইডার। তাছাড়া এতদিন যখন কেউ তোমাকে জিনিসটা চায়নি, তখন এটা সিওর যে, তপু কাকেও বলে যায়নি। তবে সাবধানে থাকা ভাল। বনবাদাড়ের দিকে যেও-টেও না। বেড়াতে গেলে ঘাটবাজারের ওদিকে যেও। বিউটিফুল স্পট আছে। গঙ্গার নর্থের দিকটা বাজে। সাউথে বরং নিট আ্যান্ড ক্লিন। কেন? গঙ্গার ধারে এত সুন্দর পার্ক করে দিয়েছে মিউনিসিপ্যালিটি। সে কাদের জন্য?”

সে অভ্যাসমতো বকবক করতে লাগল। একটু পরে গার্গী দু’কাপ চা এনে দিল। হেরিকেনটা ঘরের দরজার সামনে রেখে নিজের কাপটা নিয়ে মেঝেয় বসল। গৌতম উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ও কী! তুমি মেঝেয় বসবে আর আমি চেয়ারে বসে থাকব”

ঘনশ্যাম তার হাত ধরে টেনে চেয়ারে বসাল। “ও সব ফর্মালিটি রাখো তো! তোমার বৌদির মেঝেয় বসা অভ্যাস আছে।”

গার্গী বাঁকা হেসে বলল, “অভ্যাস আছে বৈকি। ছোটবেলা থেকে মেঝেয় বসে খেয়ে বড় হয়েছি। আমার বাবা চেয়ারটেবিলে বসে খাওয়া পছন্দ করতেন না। করলেই বা ডাইনিং চেয়ারটেবিল কেনার পয়সা পাবেন কোথায়?”

“কী কথায় কী?” ঘনশ্যাম খিকখিক করে হাসল। “ব্যাপারটা খুলেই বলি গৌতম। আসলে এই কোয়ার্টারটা পরস্মৈপদী। আজ আছি, কাল নেই। তাই সাজানোর জন্য ফার্নিচার কিনিনি। ঠাকুরের কৃপায় বারাসাতে একটুখানি জায়গা কিনে রেখেছি। সেখানেও তো ভাড়াবাড়িতে মানুষ হয়েছিলুম। ইচ্ছে আছে, সামনের বছর থেকে বাড়িটা শুরু করব। মেন্টাল হসপিটালের স্টাফ-কোয়ার্টার নেই। তো কী করব বলো? তোমার বৌদির নিজের ঘরবাড়ি হবে। সেখানেই থাকবে। চেষ্টাচরিত্র করে যদি কলকাতায় কোনও হসপিট্যালে ট্রান্সফার হতে পারি, আর অসুবিধে কিসের? ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করব। মোট কথা, এই হচ্ছে আমার ফিউচার প্ল্যান?” চায়ে চুমুক দিল ঘনশ্যাম। “ভাই গৌতম! এই পৃথিবীতে যার পায়ের তলায় নিজের মাটি নেই, তার কিছু নেই।”

গৌতম বলল, “ঠিক বলেছেন শ্যামদা।”

গার্গী বলল, “বাড়ি হতে হতে আমি বুড়ি হয়ে গঙ্গাযাত্রা করব। হুঁ, বাড়ির কথা শুধু কানেই শুনি!”

আলো এসে গেল। গৌতম চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে উঠল। “চলি শ্যামদা! চলি গার্গী” বলেই সেই জিভ কাটল। “সরি! মাঝেমাঝে গার্গীবৌদি বলে ফেলি।” আসলে সে সামলে নিল।

ঘনশ্যাম বলল, “কী আশ্চর্য! আমাকে শ্যামদা বললে ওকেই বা গার্গীবৌদি বলবে না কেন? শুধু গার্গী বললেও কোনও দোষ দেখি না। আজকাল নাম ধরে ডাকার ফ্যাশান হয়েছে সমবয়সী ছেলেমেয়েদের। দেখ ভাই, আমাকে চেহারা হাবভাবে সেকালে দেখালেও আমি মডার্ন মাইন্ডেড।”

গৌতম সিরিয়াস হয়ে বলল, “হ্যাঁ। সেটা বোঝা যায় তা না হলে

তাকে থামিয়ে ঘনশ্যামও সিরিয়াস হয়ে বলল, “তুমি আমার ভাইয়ের মতো। তা ছাড়া তোমরা সমবয়সী। পরস্পর ফ্রিলি মিশবে। এতে দোষটা কোথায়?”

গার্গী তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে ছিল। কথাটা এতদিনের অভিজ্ঞতায় বিশ্বাস করা চলে। ঘনশ্যামের নির্বিকার মুখ দেখে অবশ্য মনের কথা বোঝা কঠিন। কিন্তু এখনও এমন কোন আচরণ চোখে পড়েনি, যাতে গার্গী ভাবতে পারে, তার স্বামী তার চরিত্র সম্পর্কে সন্দিগ্ধ।

তবু একবার যাচাই করার ইচ্ছে পেয়ে বসল গার্গীকে। গৌতম চলে যাওয়ার পর সে বলল, “শোনো! কাল থেকে আমি আর গৌতমের সঙ্গে মিশব না।”

ঘনশ্যাম তাকাল। “কেন মিশবে না?”

 “এমনি।”

 একটু পরে ঘনশ্যাম আস্তে বলল, “ও কোনও খারাপ ব্যবহার করেছে?”

 গার্গী ঝাঁঝাল স্বরে বলল, “না।”

 “তা হলে?”

একটু চুপ করে থাকার পর গার্গী বলল, “কবে লোকে কী বলবে-টলবে। আমার ভাবতে খারাপ লাগে।”

ঘনশ্যাম সিগারেট ধরাল। ধোঁয়ার সঙ্গে বলল, “লোকের কথার ধার আমি ধারি না। যে যা খুশি বলুক। এই যে তুমি একা থাকো, কে তোমাকে গার্ড দেবে? গৌতম অনেস্ট ছেলে। আমি ওকে স্টাডি করেই তোমার সঙ্গে মিশতে দিয়েছি।”

গার্গী চোখে হেসে বলল, “আমি খারাপ হতে পারি তো?”

ঘনশ্যাম হাসল। “কেউ খারাপ হলে আমার সাধ্য কী ঠেকাই। তবে লোককে স্টাডি করা আমার স্বভাব। ইচ্ছে থাকলেও অনেকে খারাপ হতে পারে না। বিশেষ করে মেয়েরা। কেন জানো? খারাপ হতে গেলে সাহসের দরকার হয়। ভাল হবার জন্য কোনও সাহস লাগে না।”

গার্গী মনে মনে বলল, শালুক চিনেছে গোপালঠাকুর!…

.

সকালে ঘনশ্যাম বাজার থেকে ফিরে বলল, “যা বলেছিলুম! দুই গ্যাংয়ে বেধে গেল বলে! ঘাটের ওদিকে কারা এক পোস্টার সেঁটেছে। সাংঘাতিক সব কথা লেখা।”

গার্গী বাজারের থলে নিয়ে বলল, “কী লেখা?”

ঘনশ্যাম বারান্দায় চেয়ারে বসে মুখে রহস্য ফুটিয়ে বলল, “লাল কালিতে লিখেছে–তপুকে আমরা ভুলছি না। ভুলব না। তারপর লিখেছে–”আমাদের হিটলিস্ট ক খ গ ঘ।”

“তার মানে?”

“কিছু বোঝা গেল না। ভিড় করে সবাই দেখছে। কেউ কেউ বলল, ক-তে কালিচরণ, তার মানে কেলো। খ-তে খোকা। ওর আসল নাম জানি না। গ-তে গোপেশ্বরবাবু এম এল এ, সেটা বোঝাই যায়। ঘ-তে হয়তো আমি!” ঘনশ্যাম হেসে ফেলল।

গার্গী বলল, “বাজে কথা বোল না তো!”

“দাশু হাজরা ঠাট্টা করে বলল, শ্যামবাবু! সাবধান!” ঘনশ্যাম হাসতে গিয়ে গম্ভীর হলো। “অদ্ভুত জায়গা বটে! যা শুনে এসেছিলুম, তার একশো গুণ সাংঘাতিক। হুঁ, ঘ-তে নাকি ঘোঁতন। কে ঘোঁতন জানি না। সবাই বলছে। কেলোর ডানহাত।”

“পুলিশকে খবর দেয়নি কেউ?”

 “কে জানে! মরুক ব্যাটারা খুনোখুনি করে। আমাদের কী?”

কিছুক্ষণ পরে ঘনশ্যাম অফিসে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে, গৌতম এল। তার মুখে ছায়া ছমছম করছে। বারান্দার চেয়ারে ধপ করে বসে বলল, “শ্যামদা! সাংঘাতিক সিচুয়েশন। শুনেছেন? ঘাটের ওখানে মন্দিরের গায়ে পোস্টার পড়েছে।”

ঘনশ্যাম বলল, “দেখেছি। হিটলিস্ট দিয়েছে। ক খ গ ঘ কে কে হতে পারে বলো তো? কতজন তো কতরকম বলছে। তোমার আইডিয়াটা শুনি।”

গৌতম বলল, “ক কেলো, এটা সিওর। বাকিগুলো বুঝতে পারছি না।”

“কেন? খ-তে খোকা। খোকাকে তুমি চিনবে সম্ভবত। ওদের ক্লাবে তো যেতে-টেতে তুমি।”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ। খোকা। মানে শ্যামল। ঠিক বলেছেন।” গৌতম একটু নার্ভাস হাসল। “গ আমি নই তো?”

গার্গী বলল, “নাহ্! আমি।”

সে চোখে হাসছিল। ঘনশ্যাম রসিকতা করে বলল, “বলা যায় না। তপুর চোরাই উইপন লুকিয়ে রেখেছিলে তুমি!”

বেশ করেছি।” বলে গার্গী গৌতমের দিকে তাকাল। “তুমি কি কেলোর গ্যাংয়ের গুণ্ডা যে ভয় পাচ্ছ?”

ঘনশ্যাম একই রসিকতার সুরে বলল, “গৌতমের গ-ও হতে পারে। গৌতমও তপুর উইপন লুকোতে এনেছিল?”

গার্গী চোখ পাকিয়ে বলল, “বাজে জোক কোরো না তো। কে আড়ি পেতে শুনবে।”

ঘনশ্যাম বলল, “গৌতম এখনও বড্ড ছেলেমানুষ। গ-তে গোপেশ্বরবাবু, তা-ও বুঝতে এত দেরি হচ্ছে? ঘ-তে ঘোঁতন। আমি চিনি-টিনি না। লোকে বলছে।”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঘোঁতন।” গৌতম বলল। “লান্টুদার ছোটভাই মৃণাল। সাংঘাতিক ছেলে। খোকা আর ঘোঁতন দুজনেই আগে তপুর গ্যাংয়ে ছিল। ক্লাবে যেতে দেখেছি।”

ঘনশ্যাম বেরিয়ে গেল। সাইকেলটা সবুজ রঙ করে নিয়েছে। নতুন দেখাচ্ছে।

গার্গী চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। বলল, “কিন্তু তুমি ঘন-ঘন এমন করে আসবে না তো! যখন-তখন এসে খালি–”

গৌতম একটু হাসল। “কী খালি? কথাটা পুরো বলো!”

 “ন্যাকা! বোঝ না?”

“একটা পদ্যে আছে, রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন আশা করেনা কী যেন! সম্ভবত রবিঠাকুরের। অবশ্য সিচুয়েশন খারাপ। কালীপুজো অব্দি কাটিয়ে যাব ভেবেছিলুম। কী করব কে জানে।”

“তুমি যাবে না।”

 “আঁচলে বেঁধে রাখবে? শ্যামদা টের পেলে তোমাকে ডিভোর্স করবে।”

“যদি তা-ই করে, আমাকে তুমি–”

গৌতম দ্রুত বলল, “কী বলছ? সবসময় আজকাল তুমি কেন যেন বড্ড সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছ গার্গী।”

গার্গী শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, “হাঁ, আমি সিরিয়াস। আবার মাঝেমাঝে ভয় হয়, দৈবাৎ ও টের পেলে কী হবে? যদি সত্যি আমাকে তাড়িয়ে দেয়, কোথায় যাব আমি? কার কাছে যাব?”

গার্গীর চোখে জল দেখে গৌতম বলল, “তুমি কেন ওসব ভাবছ? আমি তো আছি?”

“এখন বলছ। তখন–” গার্গী হঠাৎ দু’হাতে মুখ ঢেকে ঘরে ঢুকে গেল। খাটে বসে বালিশে মুখ গুজল।

গৌতম গিয়ে তার পিঠে হাত রেখে বলল, “গার্গী! শোনো! প্লিজ—কাঁদে না! আহ্! আমার কথাটা তো শোনো!”

গার্গী সোজা হয়ে বসল। চোখ মুছে বলল, “আমার ভীষণ ভয় করে, গৌতম! একজনের কাছে বিশ্বাস হারানো পাপ মনে হয়। যদি সত্যি জানাজানি হয়, আমার ওই ছাতিম গাছে ঝুলে মরা ছাড়া উপায় থাকবে না।”

গৌতম তার ঠোঁটে চুমু খেয়ে হাসতে হাসতে বলল, “পাগলী কোথাকার! মরতে হলে ঝুলে মরবে কেন? আমি পটাসিয়াম সায়ানাইড এনে দেব। মরছ তা জানতেও পারবে না?”

“তুমি ব্যাপারটা লাইটলি নিও না গৌতম! আমার মনে হয়, এবার আমাদের পরস্পর দূরে যাওয়া ভালো।”

গৌতম ভুরু কুঁচকে তাকাল! “আমাকে আর সহ্য হচ্ছে না এই তো?”

 “আহ্। তুমি একটু বুঝতে চেষ্টা করো।”

“দেখ গার্গী। তুমি আর আমি বাচ্চা নই। তুমি আমি দু’জনে জেনেশুনেই একটা খেলা খেলে চলেছি।”

“খেলা? তুমি একে খেলা বলছ?”

 “ওক্কে! জীবন-মরণ খেলা বলা যাক্। তো হা–একটু বাড়াবাড়ি হচ্ছে, আই এগ্রি। আমরা বড় বেশি শরীর নিয়ে খেলছি। এখানেই কি তোমার ভয়? দেখ গার্গী, হিউমান বডিকে কেন্দ্র করেই মানুষের সবকিছু। কাজেই এতে ওখান ও পাপ-টাপ নেই। আসল কথাটা হলো, আমরা পরস্পরকে ভালবাসি কি না। যদি আমার কথা বলো, আমি তোমাকে ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি, গার্গী! হিউম্যান বডি ঘেঁটে ছ’টা বছর আমার কাটছে। হিউম্যান বডির মধ্যে কী সব হেভেনলি চার্ম আছে, সেটা তুমিই আমাকে জানিয়ে দিয়েছ।”

গার্গী বাধা দিয়ে বলল, “ফিলসফি ছেড়ে একটু প্রাকটিক্যাল হও। রিস্কটা তুমি বুঝতে চেষ্টা করো আমার দিক থেকে।”

“ঠিক আছে। আমি আর আসব না।”

“আহ্, আমি তা বলিনি। তুমি বড় অবুঝ গৌতম! আমাদের সাবধান হওয়া। দরকার।”

গৌতম হাসল। “ওক্কে! শরীরের খেলাটা কমিয়ে দেব। বডিগার্ডের চাকরিই করব।”

গার্গী উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি বসো। আমি স্নান করে নিই। রান্না চাপাতে হবে।”..

এদিনও সন্ধ্যায় লোডশেডিং। গৌতম কিছুক্ষণ ঘনশ্যামের অপেক্ষা করে চলে গেল। বলে গেল, “ভয় পেয়ো না। টর্চটা হাতের রাছে রাখো। শ্যামদা এখনই এসে যাবে। আমার একটা কাজ আছে। না হলে থাকতুম।”

চারদিক জুড়ে আঁধার। গুমোট গরম। হেরিকেনের আলো বারান্দায় রেখে দাঁড়িয়ে রইল গার্গী। তার গা ছমছম করছিল। এত দেরি করছে কেন লোকটা?

কিছুক্ষণ পরে ঘনশ্যাম ফিরল। বলল, “ডেঞ্জারাস ব্যাপার! কিছুক্ষণ আগে করালী কবরেজমশাইকে কে গুলি করে মার্ডার করেছে। পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে। একা বসেছিলেন গঙ্গার ধারের পার্কে। দেখ তো কী সাংঘাতিক কাণ্ড! বুড়ো মানুষ। দূরসম্পর্কে গোপেশ্বরবাবুর কাকা। এই অপরাধ।” সে শ্বাস ছেড়ে ফের বলল, “তবে এই কাঁটালিয়াঘাটে কে কেমন লোক, বলা কঠিন। নিশ্চয় কোনও সিক্রেট ব্যাপার আছে। তা না হলে বুড়ো মানুষকে মারবে কেন? মাথার পেছনে গুলি। বুঝলে? দেখতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। পুলিশ এসে গেছে।”

গার্গী চা করতে গেল। সেই সময় আলো এল…

.

০৬.

 কাঁটালিয়াঘাটে মারামারি খুনোখুনি লোকের গা-সওয়া। ভোটের রাজনীতির হাওয়া উঠলে এটা বেড়ে যায়। কিন্তু এই শরতে ভোটের হাওয়া নেই। তপু খুন হওয়ার পর চাপা উত্তেজনা থাকলেও লোকে আশঙ্কা করেছিল, যে-কোনও সময় মুখোমুখি সংঘর্ষ বাধতে পারে বড়জোর। কিন্তু এমন করে পাঞ্জাবের সন্ত্রাসবাদী রীতিতে খুনোখুনি হওয়ার কথা কেউ কল্পনাও করেনি। পদ্ধতিটা একেবারে নতুন। তাই সন্ত্রাসের শিহরন ছড়িয়ে পড়েছিল প্রতিটি মানুষের মনে। সন্ধ্যার আগেই ঘাটবাজার খাঁ খাঁ হয়ে যাচ্ছিল। রাস্তাঘাটে কদাচিৎ মানুষজন দেখা যাচ্ছিল। এম এল এ বাবুর আত্মীয় ছিলেন করালী কবিরাজ। সত্তরের ওপর বয়স। লাঠি হাতে চলাফেরা করেন। তাকে খুন করার একটা কারণ অবশ্য আঁচ করেছিল লোকে। তার ছোটছেলে গোপাল কেলোর দলে ভিড়েছিল। তপু খুন হওয়ার পর সে গা ঢাকা দিয়েছে। পুলিশের খাতায় সে অন্যতম আসামী। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সব দিক বজায় রেখে চলতে হয়। কাঁটালিয়াঘাটে পরদিনই বাইরে থেকে আরও পুলিশ এনে মোতায়েন করা হয়েছে। গঙ্গার ধরে নেতাজি পার্কে পুলিশ রাইফেল হাতে টহল দিচ্ছে। গলিঘুজির মোড়েমোড়ে সশস্ত্র পুলিশ। তবু লোকের স্বস্তি নেই। হিটলিস্টের ক যে কবরেজমশাই, কেউ কল্পনাও করেনি। এবার দ্বিতীয় নামের আদ্যক্ষর খ। যাদের নামের গোড়ায় খ আছে, তারা আতঙ্কে কাঠ হয়ে গেছে। যারা নির্দল নির্বিরোধী খ, তারাও খুঁটিয়ে চিন্তাভাবনা করছে, কোনও সূত্রে দুই শিবিরের সঙ্গে অতীতেও দৈবাৎ কোনও সম্পর্ক ছিল কি না।

দিনের বেলায় ততকিছু আতঙ্ক নেই অবশ্য। কিন্তু সন্ধ্যার মুখে ওই লোডশেডিং বড় বিপত্তিকর। বিদ্যুৎ সাবস্টেশনে গোপেশ্বরবাবু এবং পুলিশ আফিসাররা এ নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যুৎ অফিসাররা জানিয়েছেন, তাদের কিছু করার নেই। কখন কোন ট্রান্সমিশন লাইন ট্রিপ করবে, আগে থেকে বলা কঠিন তবু তাঁরা চেষ্টা করবেন, যাতে লোডশেডিং যতটা সম্ভব কমানো যায়।

কবরেজমশাই খুন হওয়ার পর তিনটে দিন আর কিছু ঘটল না। ঘনশ্যাম বিকেলে বেড়াতে যেতে নিষেধ করেছিল গার্গীকে। একটা লুডো কিনে এনে দিয়েছিল। বলেছিল, “বরং ঘরে বসে লুডো খেলবে। গৌতম না এলে একা একা খেলবে। সময় কেটে যাবে। আমি সকাল-সকাল ফিরতে চেষ্টা করব।”

গৌতম এই তিনটে দিন কম এসেছে। গার্গী অভিমান দেখিয়েছে। অভিমান ভাঙাতে অনেক আদর করেছে গৌতম। বলেছে, “আসলে মা বড্ড কড়াকড়ি শুরু করেছেন। সবেধন নীলমণি আমি। এনিওয়ে, রাগটাগ ছেড়ে লুডো বের করো। খেলি।”

লুডো খেলতে খেলতে হঠাৎ একসময়

যৌবন যৌবনের কাছাকাছি হলে হয়তো এটাই অনিবার্য। শরীরে-শরীরে সাপলুডো খেলা।

সেদিন বিকেলে গার্গী জেদ ধরল, “চলো কিছুক্ষণ ঘুরে আসি। বাড়িতে থেকে হাঁপ ধরে গেল। এখানে আসার পর কী যে হয়েছে, বিকেলটা বাইরে ছুটোছুটি করে বেড়াতে ইচ্ছে করে।”

গৌতম বলল, “আমারও। কলকাতায় থাকলে একরকম। এখানে এলে অন্যরকম। খালি টো টো ঘুরতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তোমার বর জানতে পারলে চটে যাবে যে।”

“বেশি দূর যাব না। বাঁধের ওপর কিছুক্ষণ ঘুরব।”

 দুজনে বেরুল। ছাতিম গাছটার পাশ দিয়ে গিয়ে বাঁধে উঠল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে কী এক নেশায় পেয়ে গেল গার্গীকে। বলল, “চলো, সুইস গেটে গিয়ে কিছুক্ষণ বসি।”

ডাইনে গঙ্গা, গাছপালার ফাঁকে। বাঁ-দিকে পোভড়া ইটভাটার খাল আর ঝোঁপঝাড়। একটা জলনিকাশী নালা এসে গঙ্গায় মিশেছে। সেখানে সুইস গেট। ছোট্ট ব্রিজ। ব্রিজের কালভার্টে পাশাপাশি দু’জনে বসল।

ওরা কথা বলছিল। নির্জন প্রকৃতিতে প্রেমিক-প্রেমিকারা যে-সব কথা বলে, চপল মাদকতাময় সেইসব কথা। হাতে সঙ্গে হাতের খেলা। প্রকৃতিতে সে স্বাধীনতা ছড়িয়ে আছে, সেই স্বাধীনতা ভূতের মতো পেয়ে বসেছিল।

একবার বাঁ-দিকে, যে পথে এসেছে ওরা, ঘুরে গার্গী দেখেছিল, দূরে বাঁধের নিচে একটুকরো ঘাসের জমিতে মাথায় টুপিপরা একটা লোক দু হাঁটুতে হাত রেখে ঝুঁকল। তারপর সোজা হলো এবং হঠাৎ মাটিতে মাথা ঠেকাল। বাঁধের ওপর একটা সাইকেল দাঁড়িয়ে আছে। গার্গী বলল, “ও কী করছে লোকটা?”

গৌতম হাসল। “নামাজ পড়ছে। তুমি মুসলমানদের নামাজ পড়া দেখনি?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ। দেখেছি।”

“আমার বেশ লাগে এই ব্যাপারটা। নির্জনে কারও কাছে সারেন্ডার করা।”

“আমরা প্রণাম করি। সে-ও সারেন্ডার।”

“আমি করি একমাত্র তোমার কাছে।”

 “ছি! ও কী কথা!”

 “সত্যি গার্গী! ওসই ঈশ্বর-টিশ্বরে আমার বিশ্বাস নেই। তবে হ্যাঁ, একটা ন্যাচারাল ব্লাইন্ড ফোর্স আছে ফিল করি।”

“ব্লাইন্ড বলছ কেন?”

“অব কোর্স ব্লাইন্ড! তা না হলে মানুষ যা খুশি করতে পারছে কেন? তুমি ভেবে দেখ, এত খুনোখুনি এত সব যুদ্ধ–একেকটা যুদ্ধ কী সাংঘাতিক ব্যাপার কল্পনা করো। তারপর ফ্লাড। আমি মেডিকেল টিমে কতবার কত জায়গায় ফ্লাডের সময় গেছি। ওঃ! হরিফাইং! ব্লাইন্ড ফোর্স ছাড়া কী?”

আজ এলোমেলো বাতাস বইছিল। দিনশেষের ধূসরতা ঘনিয়ে এসেছে কখন, কথায় কথায় দু’জনেরই খেয়াল হয়নি। গৌতম বলল, “এই! এবার উঠে পড়ো।”

দুজন বাঁধের উপর দিয়ে ফিরে আসছিল। গার্গী গুন গুন করে কি গান গাইছিল। গৌতম বলল, “বাহ্! তুমি এত ভালো গাইতে পারো, অথচ চেপে রেখেছ? গলা ছেড়ে গাও!”

গার্গী বলল, “ভ্যাট! ও কিছু না।”

বাঁ-দিকে গঙ্গার ধারে গাছপালায় পাখিরা তুমুল চ্যাঁচামেচি করছে। দূরে রেল লাইনে একটা মালগাড়ির শব্দ কতক্ষণ। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে কাঁটালিয়াঘাট টাউনশিপে আলো জ্বলে উঠেছে এখনই। আজ হয়তো লোডশেডিং হবে না। বাঁক ঘুরে ধূসর আলোয় সেই সাইকেলটা দেখা গেল। একই ভাবে বাঁধের উপর দাঁড় করানো আছে।

কিছুটা এগিয়ে যাবার পর গৌতম থমকে দাঁড়াল। গার্গী বলল, “কি ব্যাপার?”

গৌতম বলল, “লোকটা–এসো তো দেখি।”

সে চলার গতি বাড়াল। গার্গী একটু পিছিয়ে পড়ল। গৌতম সাইকেলটার কাছে গিয়ে আবার থমকে দাঁড়িয়েছে। তারপর গার্গী দেখল, সে নীচের ঘাস জমিতে নামল।

গার্গী তখনও বুঝতে পারেনি, কী হয়েছে।

কাছাকাছি গিয়ে সে থমকে দাঁড়াল। সেই নামাজপড়া লোকটা উপুড় হয়ে পড়ে আছে ঘাসে। দুটো হাত সামনে ছড়ানো। তার টুপিটা খসে পড়েছে। মাথার একটা পাশ থেকে টাটকা রক্ত গড়িয়ে তার কাঁধ এবং পিঠ অব্দি জামাকে রাঙিয়ে দিয়েছে। গার্গী মুখ ফিরিয়ে নিল।

গৌতম কঁপা কাঁপা গলায় বলল, “মার্ডার! এখানে থাকা উচিত নয় আর। চলো!”

দু’জনে হন্তদন্ত হাঁটতে থাকল। গার্গী হাঁটতে পারছিল না। আতঙ্কে তার গলা শুকিয়ে গেছে। কোনও কথা বলতে পারছিল না সে।

ছাতিমতলায় পৌঁছে গৌতম বলল, “কী করা উচিত, বুঝতে পারছি না। পুলিশকে খবর দিতে গেলে জেরার চোটে অস্থির করবে। এস তো!”

ঘনশ্যাম বাড়িতে ছিল। গৌতম ও গার্গীর মুখের দিকে তাকিয়ে সে হাসল। “পেত্নীটা তাড়া করেছে নাকি?”

গৌতম ব্যস্তভাবে বলল, “আবার মার্ডার। এক মুসলমান ভদ্রলোককে নামাজ পড়তে দেখেছিলুম। ফেরার সময় দেখি, মাডার্ড হয়ে পড়ে আছেন। একটা সাইকেল-”

ঘনশ্যাম চমকে উঠেছিল। দ্রুত বলল, “সর্বনাশ! খয়রুল হাজি নয় তো? ফেরার সময় দেখা হয়েছিল। বলল, মাঠে ধান দেখতে যাচ্ছি।”

গৌতম বলল, “কী করা উচিত বলুন তো শ্যামদা।”

ঘনশ্যাম একটু ভেবে নিয়ে বলল, “পুলিশ–নাহ্! ওদিকটা লোকজন ছিল?”

“নাহ্। কাকেও তো দেখলুম না।”

“মুসলমানপাড়ায় খবর না হয় দিলে। কিন্তু ওরা পুলিশকে তোমার কথা বলবে। সে-ও এক বিপদ। পুলিশ জেরা করবে, ওদিকে কেন গিয়েছিলে।”

“আমিও ঠিক তা-ই ভেবেছি।”

ঘনশ্যাম গম্ভীরমুখে বলল, “তোমার বৌদি সঙ্গে ছিল। কাজেই স্ক্যান্ডালেরও রিস্ক আছে। বরং চেপে যাও। কেউ না কেউ বডি দেখতে পাবে।”

গার্গী দরজার কাছে মেঝেয় বসে পড়েছিল। ঘনশ্যাম তাকে বলল, “তোমাদের বলেছিলুম, বাইরে যেও-টেও না। বড্ড জেদ তোমার। আর গেলে গেলে, ওই নিরিবিলি শ্মশানমশান জঙ্গল এলাকায়। যাও, হাতেমুখে জল দাও। ঘাড়ে জল দিও। নার্ভাসনেস কেটে যাবে। একটা ট্যাবলেট দিচ্ছি। খেয়ে নিও। মার্ডার ফার্ডার দেখলে প্রচণ্ড শক লাগে নার্ভে। বিশেষ করে মেয়েদের। ওঠ, আমি চা করে দিচ্ছি। গরম-গরম চায়ের সঙ্গে ট্যাবলেটটা খেয়ে নেবে।”

গৌতম বলল, “আমি যাচ্ছি শ্যামদা।”

“নো, নো! ঘনশ্যাম হাত নাড়ল। “আগে ব্রেন ঠাণ্ডা করে নাও। হাতমুখ ধোও। চা খাও। কিছুক্ষণ বসো।”

সে কিচেনের সামনে গেল চা করতে। কুকার জ্বেলে কেটলি চাপিয়ে এসে দেখল, গার্গী বাথরুমে ঢুকেছে। সে গৌতমকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, বন্ধ বাথরুমের ভেতর গার্গীর ওয়াক ভোলার শব্দ শোনা গেল। বাথরুমের দরজায় গিয়ে সে বলল, “বমি হচ্ছে নাকি? নিজের জেদে খালি কষ্ট পাবে। মার্ডার্ড বডি দেখলে আমারও ভীষণ গা ঘুলোয়।”

একটু পরে গার্গী বেরিয়ে ঘরে ঢুকল। তারপর বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘনশ্যাম দরজার কাছ থেকে বলল, “বমি বন্ধের ট্যাবলেট দেব?”

গার্গী আস্তে বলল, “না।”

বমিভাবটা নতুন নয়। ক’দিন থেকে এটা হচ্ছে। সে একটা কিছু আঁচ: করেছে, শরীরে যেন কী একটা পরিবর্তন ঘটেছে। মুখ ফুটে বলতে বেধেছে স্বামীকে। গৌতমকেও বলেনি। শরীর জুড়ে কী এক নতুন অনুভূতি।

গৌতম হাতমুখ ধুয়ে এসে চেয়ারে বসল। ঘনশ্যাম চা করে আনল। গৌতমকে দিয়ে সে ঘরে গেল গার্গীকে চা দিতে। গার্গী হাত নেড়ে বলল, “নাহ্। বমি হয়ে যাবে।”

“কিচ্ছু হবে না। ওটা নার্ভাসনেস। একটা ট্যাবলেট দিচ্ছি।”

“আহ্ চা খাব না।” গার্গী পাশ ফিরে শুল।

ঘনশ্যাম বাইরের চেয়ারে বসে বলল, “খয়রুল হাজিকে কী ভাবে মেরেছে দেখলে।” গৌতম চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “মাথার বাঁ-দিকে গুলি করেছে মনে হলো।”

“গুলি? তার মানে কবরেজমশাইয়ের মতো?”

“হ্যাঁ। সম্ভবত মাটিতে মাথা লুটিয়ে নামাজ পড়ার সময় গুলি করেছে। বাঁ দিকে ঝোঁপের আড়াল দিয়ে মার্ডারার এসে গুলি করেছে। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জেও হতে পারে।”

“তোমরা কোথায় ছিলে? কত দূরে?”

 “সুইস গেটে বসেছিলুম।”

“গুলির শব্দ শুনতে পাওনি?”

“নাহ্। উল্টোদিকে বাতাস। তাছাড়া মালগাড়ির শব্দ হচ্ছিল।”

ঘনশ্যাম একটা সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ টানতে থাকল। তারপর বলল, “তা হলে খ-তে খয়রুল হাজি। হাজিসায়েবও গোপেশ্বরবাবুর পার্টির লোক কিন্তু আমার ভাবনা হচ্ছে, এই থেকে না কমিউন্যাল কিছু বেধে যায়।”

গার্গী দ্রুত বেরিয়ে এসে বাথরুমে ঢুকল। আবার বমির শব্দ। ঘনশ্যাম হন্তদন্ত গিয়ে বলল, “ধরব? দেখো, মাথা ঘুরে পড়ে যেও না।”

গৌতম চায়ের কাপ রেখে উঠে দাঁড়াল। শ্যামদা! আমি চলি।” বলে সে বেরিয়ে গেল।

সে রাতে বিছানায় শুয়ে হঠাৎ ঘনশ্যাম সন্দিগ্ধস্বরে বলল, “এ মাসে তোমার পিরিয়ড হয়নি?”

গার্গী আস্তে বলল, “না।”

“তাই বলো!” ঘনশ্যাম খিকখিক করে হাসল অন্ধকারে। তারপর দু’হাতে গার্গীকে বুকে টেনে বলল, “বোকা মেয়ে! বুঝতে পারছ না তুমি এতদিনে মা হতে চলেছ?”

গার্গী কোনও সাড়া দিল না …

.

অনেকদিন বৃষ্টি হয়নি। ধানক্ষেতে জল শুকিয়ে গেছে। খয়রুল হাজি বিকেলে সাইকেলে চেপে উত্তরের মাঠে জমি দেখতে বেরিয়েছিলেন। পরদিন পাম্পসেট বসিয়ে পোড়ো ইটভাটার খাল থেকে জলসেচের ব্যবস্থা করার ইচ্ছা ছিল। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল, তখনও ফিরলেন না। দিনকাল খারাপ। তাঁর ছেলেরা লোকজন নিয়ে অস্ত্রশস্ত্র আর টর্চ নিয়ে খুঁজতে বেরিয়েছিল তাকে। বাঁধে সাইকেল দাঁড় করানো দেখে তারা ছুটে যায়। মাথায় রক্ত মেখে হাজি সাহেবকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখে।

আবার কাঁটালিয়াঘাটে ঝিমিয়ে পড়া সন্ত্রাস ফিরে এল। হিট লিস্টে খ ছিল। খয়রুল হাজির বডি বড়ল। লোকেরা তার ছেলেদের বকাবকি করল। নামে খ আছে, অথচ বাবাকে তারা সাবধান করে দেয়নি কেন? তারা আসলে ভেবেছিল। এটা হিন্দুপাড়ার বাবুদের দলাদলি।

আজকাল সব দলাদলিই রাজনীতির। রাজনীতিতে হিন্দুমুসলমান নেই। আর রাজনীতিরই চাপে ই এফ আর পর্যন্ত এসে গেল। দৈবাৎ না হিন্দু-মুসলমান বেধে যায়। কাঁটালিয়াঘাট পুলিশেবন্দুকে আবার ছয়লাপ। সন্ধের পর টহলদারি। ১৪৪ ধারা জারি। ঘাটবাজার খাঁ খাঁ করে।

কিন্তু কালীপুজোর দিন এসে গেল। কোনও গ-এর মৃত্যু হলো না। কাঁটালিয়াঘাটে কালীপুজোরই ধুমটা বেশি। লক্ষ টাকার বাজি পোড়ে। বাইশখানা ঠাকুর হয়। শ্মশানকালীর পোডড়া মন্দিরের ভোল ফেরানো হয়। ততদিনে সন্ত্রাস কিছুটা থিতিয়ে এলেও এবার তত বেশি ধুম হলো না। গঙ্গার ধারে বাজি অবশ্য পুড়ল। শ্মশনকালীতলায় তান্ত্রিক মোনাখ্যাপা মড়ার খুলিও নাচাল। পুলিশের নির্দেশে যাত্রার আসর বন্ধ।

ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার দিন সকালে গৌতম এল। “শ্যামদা! আমার ছুটি ফুরুল। আগামীকাল মর্নিংয়ে কলকাতা যাচ্ছি। এবার সামনে একজামিনেশন। কোনও দিকে মন দেবার উপায় থাকবে না।”

ঘনশ্যাম বলল। “এঃ হে! বড় ভুল হয়ে গেছে। তুমি কাল যাবে জানলে একসঙ্গেই যেতুম।”

“কলকাতা যাবেন নাকি?”

“যাব কী! এক্ষুণি খেয়েই ট্রেন ধরতে যাব। আজ বারাসাতে পিসেমশাইয়ের বাড়িতে থাকব। কাল মর্নিংয়ে কলকাতা যাব। রাইটার্সে জরুরী কাজ। খুলেই বলি, তোমার বাবার চিঠি নিয়ে যাচ্ছি ট্রান্সফারের তদ্বিরে।”

“বৌদি যাচ্ছে তো সঙ্গে?”

ঘনশ্যাম একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “ওর শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। এই অবস্থায় ট্রেনজার্নির ধকল রিস্ক নেওয়া উচিত হবে না। তাছাড়া পিসেমশাইয়ের বাড়ি তোমার বৌদি যেতে চায় না।”

গার্গী রান্না করছিল। গৌতম তার দিকে তাকিয়ে বলল, “বৌদি রাত্রে একা থাকতে পারবে? পাড়ার কাকেও–”

গার্গী বলল, “না। আমার জন্য পাহারার দরকার নেই।”

ঘনশ্যাম বলল, “জাস্ট একটা রাত। তোমাকে থাকতে বলতুম। কিন্তু তোমার বাড়িতে কী ভাববে? বরং একটু রাত অব্দি তুমি থেকো। ভোরে এসে খোঁজ নিও।”

গার্গী ঝাঁঝালো স্বরে বলল, “আমার পাহারার দরকার নেই।”

 “আহা! দিনকাল খারাপ। যা চলছে এখানে!”

 গৌতম কৌতুকে বলল, “এবার হিটলিস্টে গ। সাবধান!”

গার্গী হেসে ফেলল, “তুমিও গ। তুমি সাবধান।”

ঘনশ্যাম খিকখিক করে খুব হাসল। “তারপর ঘ-তে আমি। পরপারে গিয়ে তিনজনের দেখা হবে।” বলে সে বাথরুমে স্নান করতে ঢুকল।…

সারা দুপুর গার্গী ও গৌতম লুডো খেলে আর কথা বলে কাটাল। গৌতম আজ শেষদিন শরীরের খেলা খেলতে চাইছিল। গার্গী তার চোখে চোখ রেখে, বলল, “তুমি জানো? আমি মা হতে চলেছি।”

“মাই গুডনেস!” গৌতম চটাস করে একটা চুমু খেল। “অ্যাদ্দিন বলোনি?”

“তুমি তো ডাক্তারি পড়ছ। তোমার বোঝা উচিত ছিল।”

গৌতম একটু চুপ করে থেকে বলল, “ক্রেডিটটা কার? তোমার বরের, না আমার, এটাই প্রশ্ন।”

“শাট আপ! খালি অসভ্যতা!” বলে গার্গী উঠে দাঁড়াল। “এই! চলো না আজ শেষদিনের বেড়ানোটা বেড়িয়ে নিই। বেশি দূর যেতে পারব না। কাছাকাছি গঙ্গার ধারে বসে থাকব।”

গৌতম একটু দ্বিধার সঙ্গে বলল, “বেশ তো! চলো!”

দরজায় তালা এঁটে দু’জনে বেরুল। ছাতিমতলা পেরিয়ে বাঁধে উঠে গার্গী বলল, “ওখানটা ফাঁকা জায়গা। চলো, ওখানে গিয়ে বসি।”

গঙ্গার ধরে এখানে কারা অনেকগুলো গাছ কেটে নিয়ে গেছে। গোড়াগুলো খোঁচার মতো দেখাচ্ছে। ঘন দূর্বাঘাসে দু’জনে বসল। একটু পরে গৌতম বলল, “তোমার মায়ের রূপটা মনে ভেসে আসছে। ফিরে এসে দেখব”

গার্গী তার হাতটা নিয়ে বলল, “ওসব কথা থাক। গিয়েই তো তুমি গার্লফ্রেন্ডের পাল্লায় পড়ে আমাকে ভুলে যাবে।”

গৌতম কী বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ একটা তীব্র তীক্ষ্ণ শব্দ, বারুদের গন্ধ। সে পড়ে গেল। গার্গী মুখ ঘুরিয়েছিল সহজাত বোধে। আবার তেমনি একটা শব্দ। তার কপালে কী ঢুকে গেল। সে-ও গড়িয়ে পড়ল।…’

.

০৭.

কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বাইনোকুলারে বুনোহাঁসের একটা ঝাক দেখছিলেন। মরসুমী পারিযায়ী পাখিদেরও এই স্বভাব আছে। যুদ্ধে অগ্রগামী রক্ষীদের ছোট্ট দল শত্রুপক্ষের অবস্থান বুঝে নিতে গোপনে এগিয়ে যায়। বুঝে নিতে চায় পরিবেশের হালচাল। পরিযায়ী পাখিদেরও তাই। অক্টোবর শেষ হয়ে এসেছে। এখনই হিমালয় ডিঙিয়ে গাঙ্গেয় অববাহিকায় বিক্ষিপ্ত কিছু ঝাঁক আগাম এসে পড়েছে।

কয়েক মাইল জুড়ে বিশাল এই জলা পশ্চিমে রেলব্রিজের কাছে কিছুটা অপরিসর। তারপর গঙ্গা অব্দি ছড়িয়ে গেছে চওড়া হয়ে। জলজ দামের আড়ালে হাঁসের ঝাঁকটা লুকোচুরি খেলছে। মাঝে মাঝে উড়ে গিয়ে অন্যখানে বসছে। হাঁসগুলোকে অনুসরণ করতে গিয়ে দক্ষিণের জঙ্গলটা বাইনোকুলারে ধরা দিল। জলার ধারে গাছপালা থাকলে সারসজাতীয় পাখিদের আড্ডা থাকা স্বাভাবিক। সাদা একঝাঁক বক একটা ঝুঁকেপড়া গাছে ফুলের মতো ফুটে আছে। আর একটা গাছের ওপর একলা শামুকখোল ধ্যানে বসেছে। হঠাৎ একটা উড্ডাক দেখতে পেলেন। অত্যন্ত বিরল প্রজাতির এই পাখি। দেখতে অবিকল ছোট্ট হাঁসের মতো। কিন্তু এরা স্থলচর। কর্নেল জলার উত্তর দিকে ধানক্ষেত আর ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গঙ্গার ধারে বাঁধে পৌঁছুলেন।

বিকেলের নরম গোলাপী আলো ছড়িয়ে আছে সবখানে। বাঁধে হন্তদন্ত হাঁটছিলেন কর্নেল। উড্ডাকটার ছবি তুলবেন। সুইস গেটের কাছে পৌঁছে টেলিলেন্স পরালেন ক্যামেরায়। সুইস গেটটা খোলা আছে। তলা দিয়ে জেলেদের নৌকো যাতায়াত করে। জলাটা ফিসারিজ কো-অপারেটিভের।

কর্নেল দুপুরের ট্রেনে কাঁটালিয়াঘাটে এসেছেন আজ। রেললাইনের কাছাকাছি ফরেস্ট বাংলোয় উঠেছেন। একসময় কাঁটালিয়াঘাটের উত্তরে ওই জঙ্গলটা সত্যিকার জঙ্গল ছিল। বাঘের উপদ্রবও ছিল। এখন আর বাঘের নামগন্ধ নেই। সরকারের বনদফতর ছিন্নভিন্ন পুরনো জঙ্গল নতুন করে গাছ লাগিয়ে জমজমাট করেছেন। রেললাইনের দিকটায় পিকনিক স্পট। কিন্তু এদিকটায় অবাধ নির্জনতা।

একটু অস্বাভাবিক মনে হলো এই নির্জনতাকে। কোথাও কোনও লোক নেই। হঠাৎ মনে পড়ে গেল বাংলোর চৌকিদার হারাধন তাঁকে সকাল সকাল ফিরতে বলছিল। সন্ধ্যার পর নাকি চোরাগোপ্তা খুনখারাপি শুরু হয়েছে। কাঁটালিয়াঘাটে। প্রচণ্ড সন্ত্রাস চলেছে। সন্ধ্যার আগেই লোকেরা বাড়ি ঢুকে পড়ে।

তবে খুনোখুনিটা দুই দলের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে। চৌকিদার হারাধন আরও একটা অদ্ভুত কথা বলছিল। প্রকাশ্যে নাকি পোস্টার লটকে দিয়েছিল কোনও এক ব্রতীনবাবুদের দল। হিটলিস্ট কথাটাও বলছিল স্বল্পশিক্ষিত চৌকিদার “ক খ গ ঘ দিয়ে চারটে নাম স্যার।” রসিক হারাধন হাসতে হাসতে বলছিল, “ও-তে নাম হয় না বলেই হয়তো হিটলিস্টে নেই। তবে ক খ ফিনিশ হয়েছে। কয়ে করালী কবরেজ। খ-য়ে খয়রুল হাজি। এবার গ-য়ে কে ফিনিশ হয় দেখা যাক।

উড্ডাকটা হঠাৎ উড়ল। কর্নেল বাইনোকুলারে তাকে অনুসরণ করলেন। পুবদিকে সোজা উড়ে গিয়ে গঙ্গার ধারে একটা তরুণ আকাশিয়া গাছের ডালে বসল। কিন্তু তাকে আর দেখতে পেলেন না। বেলা পড়ে আসছে। মিনিট কুড়ি পঁচিশের মধ্যে সূর্য ডুবে যাবে এবং টেলিলেন্সে ছবি আসবে না। বাঁধটা গঙ্গার সমান্তরালে বাঁক নিয়েছে। এখান থেকে বাইনোকুলারে আকাশিয়া গাছটা দেখা যাচ্ছে না। বাঁক পেরিয়ে চোখে পড়ল ডানদিকে একটা পোড়ো ইটভাটা। এক মুহূর্তের জন্য কাকে ঝোঁপের আড়ালে বসে পড়তে দেখলেন কর্নেল। ভাবলেন, মফস্বলি গ্রাম্য স্বভাব। কেউ জৈবকর্মে বসল নিশ্চয়।

মন পড়ে আছে পাখিটার দিকে। আকাশিয়া গাছটা আর চিনতে পারলেন না কর্নেল। আরও অনেক ছোট-বড় আকাশিয়া অসংখ্য গাছের ভিড়ে মিশে আছে। গঙ্গাতীরের ভূমিক্ষয়বোধে ঘন করে গাছ লাগানো হয়েছে। ডাইনে এবার বসতি এলাকা শুরু। সরকারি একতলা স্টাফ কোয়ার্টার বলে মনে হলো। একটু এগিয়ে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন কর্নেল। চমকে উঠলেন।

একজন মানুষ আরেকজন মানুষের ওপর পড়ে আছে।

তলার জন যুবক। সে একপাশে কাত হয়ে আছে ওপরের জন যুবতী। সে। যুবকটির পেটের ওপর চিত হয়ে পড়ে আছে। মুখটা রক্তাক্ত।

কর্নেল বাঁধ থেমে নেমে গেলেন। একটু ঝুঁকে দেখেই সোজা হলেন। দুজনেরই কপালে বুলেটের ক্ষত। এখনও রক্ত জমাট বাঁধেনি। তিনি এসে পড়ার বেশ কিছুক্ষণ আগেই কেউ এদের গুলি করেছে।

হারাধন চৌকিদারের কথা যদি সত্যি হয়, এদের একজন সম্ভবত গ।

কর্নেলের মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করে। যুবকটির নামের আদ্যক্ষর গ হওয়া সম্ভব। যুবতীটি নিশ্চয় ঘাতককে দেখেছিল, তাই তাকেও মরতে হয়েছে। যুবতীর সিঁথিতে সিঁদুরকি রক্ত? আবার একটু ঝুঁকে দেখে নিলেন, সিঁদুরই বটে। এরা স্বামী-স্ত্রী হওয়াই সম্ভব। চেহারায় মফস্বলী ছাপ নেই। এরা কি এখানে নবাগত?

কর্নেল চারদিকে ঘুরে দেখলেন, কোথাও কোনও লোক নেই। বাঁধে গিয়ে উঠলেন। মুহূর্তের জন্য নিজের নিয়তির প্রতি ক্ষুব্ধ হলেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। বরাবর এমনটা হয়ে আছে। তিনি যেখানেই যান, কোন অদৃশ্য প্রতিপক্ষ তাঁর সামনে রক্তাক্ত মৃতদেহ ছুঁড়ে দিয়ে তাঁকে যেন চ্যালেঞ্জ করে। সেই চ্যালেঞ্জ তাঁকে নিতে হয়।

আগাছার জঙ্গলের ভেতরে সংকীর্ণ পায়ে চলা পথ দিয়ে হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন কর্নেল। সামনে প্রথমে যে বাড়িটা পড়ল, সেটার দরজা-জানালা বন্ধ। বাড়িটা ঘুরে গিয়ে পিচের একফালি পথ। দুধারে সারবন্দি একতলা কোয়ার্টার। একটা বারান্দার গ্রিলের ভিতর এক প্রৌঢ় ভদ্রলোককে দেখতে পেলেন। বললেন, “শুনুন প্লিজ একটু বাইরে আসবেন?”

ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে কর্নেলকে দেখছিলেন। বললেন, “আপনি কাকে চান?”

“আপাতত আপনাকে। একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে।”

 “ঘটনা? সাংঘাতিক? মানে মামা-মার্ডার নাকি?”

“হ্যাঁ। ওখানে দুটো ডেডবডি পড়ে থাকতে দেখলুম। আপনি অন্যদের ডেকে নিয়ে–”।

“ওরে বাবা! আমি ওতে নেই মশাই। আপনি কে? কোথায় থাকেন?”

কর্নেল বিরক্ত হয়ে বললেন, “আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। কলকাতায় থাকি। প্লিজ আপনি”।

“চেপে যান মশাই! কার ডেডবডি কোথায় পড়ে আছে, ওসব নিয়ে মাথা ঘামাতে যাবেন না। এ সব এখানে হরদম হচ্ছে।”

এক ভদ্রমহিলা আর, দুটি মেয়ে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। ভদ্রলোক বললেন, “শুনছ? আবার বডি পড়েছে। এই ভদ্রলোক দেখেছেন।”

কর্নেল বললেন, “একটা নয়, দুটো। দুজন যুবক-যুবতী!”

একটি মেয়ে চমকে উঠে বলল, “তাহলে ঘনাবাবুর বউ আর মেন্টাল হসপিটালের অরু ডাক্তারের ছেলে। কী যেন নাম, মা?”

ভদ্রমহিলা নাকমুখ কুঁচকে বললেন, “গৌতম। জানতুম”

ভদ্রলোক বাধা দিয়ে বললেন, “ছাড়ো তো! আমাদের পাঁচকথায় কাজ কী? আপনি মশাই থানায় খবর দিন গে। এসব ঝামেলায় আমাদের জড়াবেন না!”

সাইকেলে এক ভদ্রলোক আসছিলেন। কর্নেল তাঁকে ডাকলেন। প্রৌঢ় ভদ্রলোক চেঁচিয়ে বললেন, “সন্টুবাবু! আবার বডি পড়েছে। এবার কে জানো? গ-য়ে গৌতম। অরু ডাক্তারের ছেলে। সেইসঙ্গে ঘনাবাবুর ব্যাডক্যারেক্টার বউটাও”—

সাইকেলের ভদ্রলোক বললেন, “ওরে বাবা!” বলেই ওপাশের কোয়ার্টারে ঢুকে গেলেন।

প্রৌঢ় ভদ্রলোকের সেই কন্যাটি বলল, “ও মা! গ-য়ে গার্গী। দুজনেই গ!”

আশেপাশের কোয়ার্টারের বারান্দায় ইতিমধ্যে পুরুষ ও মেয়েরা বেরিয়েছে। কেউ বাইরে বেরুতে রাজি নয় যেন। কর্নেল হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন সামনে চওড়া রাস্তাটার দিকে।

দিনশেষের ধূসরতা চারদিকে। সব আলো জ্বলে উঠল। চওড়া রাস্তা ধরে কিছু দূর চলার পর টাউনশিপের ছড়ানো-ছিটানো বাজার এলাকা। বাঁ-দিকে পুরনো বসতি। সেখানে একটা সাইকেল রিকশা পেলেন কর্নেল। সে কিছুতেই যাবে না। দশ টাকা ভাড়ার লোভে এবং গন্তব্য থানা শুনে সে শেষপর্যন্ত রাজি হলো।…

.

রাত নটার ঘণ্টা বাজল থানার ঘড়িতে। অফিসার ইনচার্জ তারক মুখার্জির ঘরে বসেছিলেন কর্নেল। দাঁতে কামড়ানো চুরুট। সামনে কফির পেয়ালা। একপাশে ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর তাপস রুদ্র, অন্যপাশে সাব-ইন্সপেক্টর রঞ্জিত মিত্র। দুটো বডি মর্গে চলে গেছে। গৌতমের বাবা ডাঃ অরিন্দম চৌধুরী একটু আগে চলে গেছেন। তার কাছে জানা গেছে, ওয়েলফেয়ার অফিসার ঘনশ্যাম রায় সকালের ট্রেনে কলকাতা গেছেন। তিনি বারাসাতের লোক। ওখানে এক আত্মীয়ের বাড়ি আজকের দিনটা কাটিয়ে আগামীকাল রাইটার্সে যাবেন। ফেরার কথা সন্ধ্যা নাগাদ। অরিন্দমবাবু বলেছেন, গৌতম ছুটিতে এসেছিল। তপনদের তরুণ সংঘ ক্লাবে যাতায়াত করত। এই মাত্র। তাকে কে মারতে পারে, তার মাথায় আসছে না। হ্যাঁ, ঘনশ্যামের স্ত্রীর সঙ্গে তার মেলামেশার কথা কানে এসেছে তার। কিন্তু নিজের ছেলেকে তিনি চেনেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস, ভুল করে গৌতমকে মারা হয়েছে এবং দৈবাৎ একটা গুলি ঘনশ্যামের স্ত্রীকে লেগে সে-ও মারা পড়েছে। কিংবা ঘনশ্যামের স্ত্রী হয়তো খুনীকে চিনতে পেরেছিল বা চিনে রাখবে ভেবেও তাকে খুন করা হতেও পারে।

কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে হেলান দিলেন। অভ্যাসমতো চোখ বুজে সাদা দাড়িতে হাত বুলোতে থাকলেন। টুপিটি টেবিলে রাখা। টাকে আলো পড়ে চকচক করছিল।

ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর তাপস রুদ্র একটু হেসে বললে, “আমার ঘোরতর সন্দেহ, গোপেশ্বরবাবু কর্নেল সায়েবকে এখানে ডেকে এনেছেন।”

কর্নেল চোখ খুলে মাথা নাড়লেন। “নাহ্ মিঃ রুদ্র! আমি কাঁটালিয়াঘাটে এমনি এসে পড়েছি। ট্রেনে যেতে যেতে ওই জলা আর জঙ্গলটা একবার চোখে পড়েছিল। তা ছাড়া ফরেস্ট বাংলোটাও অসাধারণ সুন্দর।”

ও সি তারক মুখার্জি বললেন, “যাই হোক, এতদিন বড়কর্তাদের মুখে আপনার অনেক নাম শুনেছি। কাগজেও কত খবর পড়েছি। আমার সৌভাগ্য, আপনার সঙ্গে মুখোমুখি আলাপ হলো।”

তাপসবাবু বললেন, “আমরা একটা অ্যাঙ্গল থেকে দেখছিলুম ব্যাপারটা। এবার সব ঘুলিয়ে গেল। অবকোর্স, ডাঃ চৌধুরী মে বি কারেক্ট। আই মিন, ঘনশ্যামবাবুর স্ত্রীর মৃত্যুটা দুটি কারণেই হতে পারে। স্পটে যা দেখলুম, উত্তরের ঝোঁপের আড়াল থেকে গুলি করেছে! দূরত্ব প্রায় কুড়ি ফুট। আগের দুটো ছিল পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে গুলি। এ ক্ষেত্রে কুড়ি ফুট দূর থেকে গৌতমবাবুর কপালে গুলি ছোঁড়ায় বোঝা যাচ্ছে, খুনীর হাতের টিপ চমৎকার। পজিশন দেখে মনে হলো, ভদ্রমহিলা মুখ ঘুরিয়ে ছিলেন গৌতমবাবুকে গুলি করার সঙ্গে সঙ্গে।”

কর্নেল বললেন, “দ্যাটস রাইট।”

“তার মানে এ-ও হতে পারে কিলারকে উনি দেখতে পেয়েছিলেন।”

তারক মুখার্জি বললেন, “কেন? পরপর গুলি ছুঁড়ে থাকবে কিলার। কারণ, কুড়ি ফুট দূর থেকে গুলি করলে একটা গুলিতে ভিকটিম না মরতেও পারে। আমার ধারণা, ঘনশ্যামবাবুর স্ত্রীকে গুলিটা লেগেছে দৈবাৎ!”

কর্নেল বললেন, “আগের দুটো ভিকটিমের মাথায় পয়েন্ট ২২ রিভলভারের গুলি পাওয়া গেছে?”

“হ্যাঁ।” তারক মুখার্জি জোর দিয়ে বললেন, “সেজন্যই মনে হচ্ছে পর-পর দুবার গুলি করে নিশ্চিত হতে চেয়েছে কিলার। পয়েন্ট ৩৮ রিভলভার হলে ওই ডিসট্যান্সে একটা বুলেটই এনাফ। পয়েন্ট থ্রি-নট-থ্রি বুলেট।”

তাপস রুদ্র বললেন, “ডাঃ চৌধুরী ছেলের সম্পর্কে ক্লিন সার্টিফিকেট দিলেন বটে, আমার ধারণা ওঁর ছেলে দলাদলিতে জড়িয়ে পড়েছিল। কাজেই গৌতমবাবুর ব্যাকগ্রাউন্ড তদন্ত করা জরুরি।”

“কারেক্ট।” কর্নেল বললেন। “কিন্তু নেক্সট টার্গেট ঘ। ঘ দিয়ে কতগুলো নাম আছে এখানে, খোঁজ নেওয়া দরকার।”

এস আই রঞ্জিতবাবু হাসলেন। “একজন ঘ-এর স্ত্রী মারা পড়ল। ঘনশ্যাম রায়। কিছু বলা যায় না, ভদ্রলোকও ভেতর ভেতর ইনভলজ্ঞ কি না। কিছুদিন আগে ওঁর বাড়িতে একটা অদ্ভুত চুরি হয়েছিল।”

কর্নেল বললেন, “অদ্ভুত চুরি মানে?”

“স্ট্রেঞ্জ! কোয়ার্টারটা শেষদিকে। সে তো দেখলেন স্যার!” রঞ্জিতবাবু বললেন, “ঘনশ্যামবাবু সেদিন বাড়ি ফিরতে দেরি করেছিলেন। ওদিকে তাঁর স্ত্রী আর গৌতমবাবু বেড়াতে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় লোডশেডিং। সেই ফাঁকে চোর তালা ভেঙে ঢুকেছিল। ঘরের তালাও ভাঙা। একটা সুটকেস আর বারান্দায় রাখা সাইকেলটা নিয়ে যায় চোর। আলমারির তালা ভাঙতে চেষ্টা করে পারেনি। আমিই গিয়েছিলাম ইনভেস্টিগেশনে। আশ্চর্য ব্যাপার, স্যুটকেসে তেমন কিছু ছিল না। কাজেই সেটা বাড়ির পেছনে ঝোঁপের ভেতর না হয় ফেলে পালায় চোর। কিন্তু সাইকেলটা গঙ্গায় ফেলে দিয়েছিল। মাইলদেড়েক দূরে জেলেদের জালে আটকে যায়। সাইকেলটা অবশ্য পুরনো। প্রথমে ভেবেছিলেন, ঘনশ্যামবাবুর খনখনে বাজে সাইকেলটা রাগ করে ফেলে দিয়েছে। পরে মনে হয়েছিল, ঘনশ্যামবাবুর ওপর কারও রাগ-টাগ আছে।”

তাপস রুদ্র বললেন, “দ্যাটস আ পয়েন্ট। ঘনশ্যামবাবুর ওপর কারও রাগ আছে।”

সায় দিয়ে তারক মুখার্জি বললেন, “ভদ্রলোককে সাবধান করে দেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে তাপসবাবু ওকে আচ্ছাসে জেরা করে দেখুন, কিছু বেরোয় নাকি। লেট হিম কাম ব্যাক। আমার মনে হয়, স্ত্রীর মৃত্যুর দরুন ভদ্রলোক শকড অ্যান্ড নার্ভাস হয়ে কিছু কবুল করে ফেলবেন।”

“সেই পোস্টারটা!” কর্নেল বললেন। “সেটা একটু দেখতে চাই।”

“দেখাচ্ছি।” বলে ওসি তারক মুখার্জি ও যাল-চেস্টের তালা খুললেন। “আমরা পৌঁছুনোর আগে কারা ওটা ছিঁড়ে ক্লোর চেষ্টা করেছিল। একটু অংশ জল দিয়ে ভিজিয়ে তুলে এনেছিলুম।”

ছেঁড়া পোস্টারের একটা টুকরো টেবিলে রাখলেন তিনি। ওপরে ভুলব না’ এবং তলার দিকে ক খ গ ঘ চারটে অক্ষরের অর্ধেকটা টিকে আছে। কর্নেল বললেন, “কত বড় পোস্টার আন্দাজ করেছিলেন?”

“ছোট। এক ফুট চওড়া, ফুট দেড়েক লম্বা হবে।”

তাপস রুদ্র বললেন, “না মিঃ মুখার্জি! আরও একটু বড় হবে মনে হচ্ছে। কারণ এটা লোকাল বাংলা উইকলি কোনও কাগজেরই একটা পাতা।”

তারক মুখার্জি বললেন, “এনিওয়ে, ছোট পোস্টার। লেটারগুলো দেখুন, বেশ বড়। লাল কালিতে লেখা। তুলি দিয়ে লেখা মনে হয় না। শক্ত কাঠি-ফাটি দিয়ে লেখা।”

কর্নেল বললেন, “দু একদিনের জন্য এটা রাখতে পারি? ইফ য়ু প্লিজ–”

 “অবশ্যই। আপনার কো-অপারেশন আমরা চাই।”

কর্নেল ভাঁজ করে জ্যাকেটের ভেত্বর চালান করে বললেন, “উঠি এবার। বাংলোয় ফিরতে হবে।”

“জিপে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করছি! হাইওয়ে দিয়ে ঘুরে একটু দূর হবে। সো হোয়াট?”

একজন কনস্টেবল ঢুকে সেলাম টুকে বলল, “উও ডাক্টরবাবু আয়া স্যার!”

 “ডঃ চৌধুরী?”

 “জি।”

 “নিয়ে এস।”

ডাঃ অরিন্দম চৌধুরী হন্তদন্ত ঘরে ঢুকলেন। পকেট থেকে একটা খাম বের করে বললেন, “এটা দিনে কখন লেটার বক্সে কে ফেলে গিয়েছিল। গৌতমের পার্সোনাল চিঠি ভেবে খোলেনি ওর মা! এইমাত্র শুনে খামটা খুললাম। বাই পোস্টে আসেনি, এই দেখুন।”

তারক মুখার্জি চিঠিটা পড়ে কর্নেলকে দিলেন। তাপর রুদ্র ঝুঁকে গেলেন কর্নেলের দিকে। আঁকাবাঁকা জড়ানো হরফে লেখা আছে :

“জুতোর বাক্স শীঘ্র ফেরত দাও। শ্মশানকালীর মন্দিরের পেছনে কল্কেফুলের ঝোপে ইটচাপা দিয়ে রেখে আসবে।”

তাপস রুদ্র বললেন, “জুতোর বাক্স! হোয়াট ডাজ ইট মিন?”

ডাঃ চৌধুরী বললেন, “আমি তো এর মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না।”

তারক মুখার্জি গম্ভীরমুখে বললেন, “বোঝা খুব সহজ ডাঃ চৌধুরী। আপনার ছেলে কেলোর গ্যাংয়ের সঙ্গে ইনভলভড ছিল। জুতোর বাক্স ওদেরই কোনও সিম্বলিক টার্ম। একালের ছেলেদের চেনা কঠিন।”

“ইমপসিবল!” বলে ডাঃ চৌধুরী রাগ করে বেরিয়ে গেলেন।…

.

সেদিনই সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার ট্রেন বহরমপুর থেকে ফিরছিলেন ঘটহরি ভটচার্য। হাঁপকাশের রুগী। কাঁটালিয়াঘাটের সরকারি হাসপাতালে অনেকদিন চিকিৎসা করিয়েও সারেনি। বহরমপুরে প্রাইভেট ক্লিনিকে দেখাতে গিয়েছিলেন। তিনটে থেকে বসে থেকে নাম লিখিয়ে ডাক পড়ল পাঁচটার সময়। বেরিয়ে ওষুধপত্তর কিনে বাসে চাপতে গিয়ে ভয় পেলেন। আগাপাছতলা ভিড় লাস্ট বাসে। হাঁপের রুগীর পক্ষে বাসে ঢোকা অসম্ভব। অগত্যা ট্রেন।

তা-ও ভাগ্যিস ডাউন ট্রেন লেট করেছিল। লোকাল ট্রেন কাটোয়া অব্দি যাবে। তত ভিড় নেই। কাঁটালিয়াঘাট রোড স্টেশনে নেমে দেখলেন প্লাটফর্ম প্রায় খাঁ খাঁ। দুর্গাপুজোর আগে থেকে এই অবস্থা চলেছে। জনাকতক যাত্রী অবশ্য মেনেছিল। তারা দল বেঁধে লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেল। নাগাল পেলেন না ভটচামশাই।

সেই যাত্রীরা সাইকেল রিকশাগুলোয় চেপে ঝাঁক বেঁধে চলে গেল। একটা রিকশা দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু রিকশাওয়ালাকে দেখতে পেলেন না। স্টেশনের পেছনে দোকানপাট খাঁ খাঁ করছে। হরেনের দোকানে বসে মাটির ভাঁড়ে চা খেলেন ভটচামশাই। হরেন বলল, “ভটচামশাই যাবেন কী করে?”

ভটচায ক্লান্তভাবে হাসলেন। “কষ্ট করে হেঁটেই যাই। পথে যদি রিকশা পাই–”

 “পাবেন বলে মনে হয় না।” হরেন বলল। “সাংঘাতিক অবস্থা। আজও দুটো বডি পড়েছে।”

“বলো কী!”

হরেন ঘটনাটা বলল। ভটচাষ মনে মনে সন্ত্রস্ত, কিন্তু মুখে বললেন, “কর্মফল! আমি কারও সাতে-পাঁচে থাকি না। আমার আর কী? যাই।”

স্টেশনরোড জনহীন। দু’ধারে উঁচু সারিবদ্ধ গাছ। ল্যাম্পপোস্টের আলো চকরাবকরা হয়ে পড়েছে। কিছুদূর এগিয়ে দম নেওয়ার জন্য দাঁড়ালেন। সেই সময় মনে হলো, কে পেছনে আসছে। ঘুরে বললেন, “কে গো?”

লোকটা কাছাকাছি এল। মুখটা চেনা লাগছিল ভটচাযের। কিন্তু আর কিছু বলার সুযোগই পেলেন না। তীক্ষ্ণ তীব্র একটা শব্দ এবং মাথার ভেতরটা জ্বলে গেল ঘটহরি ভটচাযের। টলতে টলতে উপুড় হয়ে পড়ে গেলেন পিচের ওপর। তখন আততায়ী তাকে টানতে টানতে পাশের খালে ফেলে দিল।

.

০৮.

বাইরে গেলে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের চিরাচরিত অভ্যাস ঘণ্টা দুই প্রাতঃভ্রমণ। ভোর ছটায় বেরিয়ে পড়েছিলেন। মনে সেই উড্ডাক পাখিটার ছবি আঁকা হয়ে গেছে। জলার ধারে ঘাসে ঝোপেঝাড়ে চকচকে শিশির। পায়ে হাঁটু অব্দি হান্টিং বুট জুতো। গঙ্গার ধারে বাঁধ ধরে চলতে চলতে সুইস গেটে পৌঁছুলেন। তখনও দক্ষিণের জঙ্গলে কুয়াশা জড়ানো। আসন্ন হেমন্তের পূর্বাভাস। একটু পরে রোদ সেই কুয়াশাকে ক্রমশ ছিঁড়ে ফেলছিল। বাইনোকুলারে উড্ডাকটাকে খুঁজছিলেন কর্নেল। এই পাখিগুলোর স্বভাব, ঘন জঙ্গলে আত্মগোপন। এরা কিছুতেই বসতি এলাকার কাছাকাছি যেতে চায় না।

জঙ্গলে ঢুকে সাবধানে পা ফেলছিলেন কর্নেল। কিছুক্ষণ অন্তর থমকে দাঁড়াচ্ছিলেন উড্ডাকের ডাক শোনার জন্য। অদ্ভুত চাপা শব্দে এরা ডাকে।

কিছুদূর ঘন গাছপালার তলা পরিষ্কার হয়ে আছে। সাল, শিশু, আকাশিয়া। কোনও ঝোঁপঝাড় নেই। তারপর জঙ্গল আরও জটিল হল। বৃক্ষলতাগুল্ম। জমাট বেঁধে আছে। সেখানে সবই স্থানীয় উদ্ভিদ। বনদফতরের লাগানো। আউটসাইডারদের ভিড় নেই। সবে টুই টুই করে কী পাখি ডেকে উঠল পেছনের কোনও গাছের ডগায়। কর্নেল তাকে খুঁজে বের করার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে দেখলেন একটা খালি চারমিনার সিগারেটের প্যাকেট পড়ে আছে। ঘাসে ও শুকনো পাতায় কয়েকটা পোড়া সিগারেটের টুকরোও।

এখানে কে সিগারেট খেতে এসেছিল? খালি প্যাকেটটা কুড়িয়ে নিলেন কর্নেল–নেহাত খেয়ালবশে। তারপর দৃষ্টি গেল সামনে প্রকাণ্ড এবং বেঁটে হিজল গাছের গুঁড়ির দিকে। ফুট পাঁচ-ছয় উঁচুতে কয়েক টুকরো কাদা সাঁটা আছে। গোলাকার কাদার খুদে ঢিবি। কোনও-কোনওটার কিছু অংশ খসে গেছে। কাদাগুলো শুকনো এবং ফাটলধরা। অনেকদিন আগে কেউ সেঁটেছিল বোঝা যায়।

নাকি উই ধরেছে গাছটায়? অসম্ভব। হিজল গাছে উই ধরে না–অন্তত অতটা উঁচুতে। পিছিয়ে এসে বাইনোকুলারে সেগুলো লক্ষ্য করেই চমকে উঠলেন কর্নেল। তখনই গাছটার কাছে গিয়ে জ্যাকেটের পকেট থেকে ছুরি বের করে একটা শুকনো কাদার টুকরো সরালেন। গাছের গায়ে ফুটো। পোড়া দাগ আবছা হয়ে আছে। ছুরির ডগা দিয়ে গুঁড়ি খোদাই করার পর ইঞ্চিটাক ভেতরে খুদে একটা কালো শক্ত জিনিস দেখতে পেলেন।

রিভলভারের গুলি!

কেউ এখানে এসে গোপনে টার্গেট প্র্যাকটিস করেছে। অনেকটা সময় ধরে অনেক পরিশ্রমে মোট ছটা গুলি বের করলেন কর্নেল।

আটটা বেজে গেছে। পশ্চিমে রেললাইনের দিকে এগিয়ে দেখলেন, গভীর খাল জলে ভর্তি। অগত্যা যে পথে এসেছিলেন, সেইপথে ফিরে চললেন। পাখিটার পুনরাবিষ্কার করার মতো সময় পরে পাওয়া যাবে। আপাতত এই আবিষ্কারটা চমকপ্রদ।

গত রাতে আতস কাঁচ দিয়ে ছেঁড়া পোস্টারের হরফ আর বেনামী চিঠির হরফ পরীক্ষার পর সিদ্ধান্তে এসেছেন, হাতের লেখা একই লোকের–যদিও চিঠিতে হাতের লেখায় ইচ্ছে করেই বিকৃতি ঘটানোর চেষ্টা আছে। অন্তত দুটো হরফ না এবং ‘খ’-এর মধ্যে একটা মিল স্পষ্ট। না’-এর পর আকারের মাথাটা ডাইনে একটু বাঁকানো এবং বেড়ে আছে। ‘খ’ হরফেও তা-ই। মোট কথা, যে। এর লেখক, তার অভ্যাস প্রতি শব্দের শেষে মাত্রা দেওয়ার মতো একটা বাঁকা টান দেওয়া।

বাংলোয় ফিরে দেখলেন জিপ নিয়ে ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর তাপস রুদ্র হাজির। কর্নেল সহাস্যে সম্ভাষণ করলেন, “গুড মর্নিং মিঃ রুদ্র!”

তাপসবাবু বিষণ্ণ হাসলেন। “ব্যাড মর্নিং, কর্নেলসাহেব সরি! মাথার ঠিক নেই।”

“আশা করি, নাও দা ভিকটিম ইস সাম ঘ?”

“হ্যাঁ! কিলারের সাহস আর স্পর্ধা আমাকে খেপিয়ে দিয়েছে। স্টেশন রোডের ধারে খালে কিছুক্ষণ আগে একটা বডি পাওয়া গেছে। দা সেইম কেস। মাথায় গুলি। কিন্তু অদ্ভুত লাগছে, ভটচার্য মশাই নিরীহ মানুষ। শুনলুম, হাঁপানির অসুখ ছিল। বহরমপুরে ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন। স্টেশনবাজারের চায়ের দোকানের হরেন বলল, গতরাত্রে সাড়ে সাতটার ডাউন লোকালে নেমে তার দোকানে চা খান। তারপর এক পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। প্রায় দেড়শো গজ দূরে বডি পড়ে ছিল রাস্তার ধারে খালের জলে। হরেন কোনও গুলির শব্দ শোনেনি। অবশ্য রেলইয়ার্ডে শান্টিং ইঞ্জিনের শব্দ সব সময়। তো মার্নিংয়ে রেলের সুইপারের বউ শুয়োর ডাকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। সে দেখতে পায়।”

বারান্দায় বেতের চেয়ার-টেবিল। কর্নেল বললেন, “বসুন মিঃ রুদ্র!” তারপর হারাধনকে ব্রেকফাস্ট আনতে বললেন এবং এক পট কফিও। হারাধন অপেক্ষা করছিল ট্রে সাজিয়ে নিয়ে এল।

তাপস রুদ্র কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, “দেয়াল ইজ সামথিং অড।”

“হ্যাঁ। ভটচামশায়ের নামে যদি ঘ থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই অড।”

 “আছে। ওঁর নাম ঘটহরি ভটচাষ। ওঁর দাদার নাম পটহরি। তিনি গতবছর মারা গেছেন। দু’ভায়ে দেবোত্তর সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা এখনও চলছে। পটহরিবাবুর তিন ছেলে। বড় দুজন বাইরে চাকরি করে। ছোট ছেলের নাম কীর্তিহরি” তাপসবাবু হাসলেন। হরিবংশ বলা চলে। এখানকার রায়রাজাদের মন্দিরের বংশানুক্রম সেবাইত। মন্দিরের বিগ্রহ রাধাবল্লভ। তো জাস্ট একটু লিংক আছে গোপেশ্বরবাবুর দলের সঙ্গে। কীর্তিহরির ডাকনাম ঘোঁতন। নাম্বার ওয়ান ক্রিমিন্যাল। প্রব্লেম হলো, উই আর হেল্পলেস। গোপেশ্বরবাবু রুলিং পার্টির লোকাল লিডার।”

বুঝেছি।” কর্নেল ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে বললেন। “আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ছেলে টার্গেট ছিল। এ ক্ষেত্রেও কবরেজমশাইয়ের মতো ছেলেকে না পেয়ে বাবাকে মেরেছে। বাই দা বাই, এরা তো এফ আই আর-এর আসামী?”

“হ্যাঁ। তপনের মার্ডারকেসে এক ডজন আসামী। তাদের মধ্যে ক খ গ ঘ আছে। কিন্তু সবাই ফেরার।”

“ডাক্তারবাবুর ছেলের ব্যাপারটা খোঁজ নিন।”

তাপস রুদ্র একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, “এস আই রঞ্জিত মিত্রের হাতে একটা ইনফরমেশন আছে। গৌতমের সঙ্গে তপনের ঘনিষ্ঠতা ছিল।”

“আর কিছু?”

তাপসবাবু আবার একটু হাসলেন। “যে ভদ্রমহিলা ওর সঙ্গে মারা পড়েছেন, তার সঙ্গে চোখে পড়ার মতো মাখামাখি ছিল। মেন্টাল হসপিটালের ওয়েলফেয়ার অফিসার ভদ্রলোকের বয়স স্ত্রীর চেয়ে অনেক বেশি। কাচ্চাবাচ্চা নেই। নাচার্যালি একটু মাখমাখি থাকতেই পারে। রঞ্জিতবাবুর মতে, ঘনশ্যামবাবুর এতে কোনও আপত্তি ছিল না। কারণ ওঁর বাড়িতে চুরির তদন্তে গিয়ে স্ত্রীকে বকাবকি করতে দেখেননি। ভদ্রমহিলা নাকি একটু তেজী প্রকৃতির ছিলেন। পাড়ার কারও সঙ্গে মিশতেন না। মোদ্দা কথা, রঞ্জিতবাবুর বক্তব্য, ঘনশ্যামবাবু স্ত্রৈণটাইপ লোক।”

“উনি কি ফিরেছেন?”

 “নাহ। ফেরার কথা ওবেলায়। আমরা ট্রাংকলে লালবাজারকে জানিয়েছি। রাইটার্স হেলথ ডিপার্টে একটা মেসেজ দিতে বলেছি। ঘনশ্যামবাবুর ওখানে যাওয়ার কথা। দেখা যাক।”

একটু পরে কর্নেল বললেন, “গৌতম এবং গার্গী দেবীর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেয়েছেন?”

 “কিছুক্ষণ আগে মর্গে গিয়েছিলাম।” তপনবাবু হঠাৎ আস্তে বললেন, “ভেরি স্যাড। শি ওয়াজ পসিবলি প্রেগন্যান্ট। অবশ্য মর্গের ডাক্তার সিওর নন এখনও। তবে ওঁর সন্দেহ তা-ই।”

ব্রেকফাস্ট দ্রুত শেষ করে কর্নেল কফিতে চুমুক দিলেন। চুরুটও ধরালেন। হেলান দিয়ে বললেন, “জুতোর বাক্স ব্যাপারটা সম্পর্কে আপনার কি ধারণা?”

“আমার ধারণা, ওটা চোরা ড্রাগ-ফাগের ব্যাপার। এর পেছনে যুক্তি আছে, কর্নেল সরকার। মেন্টাল হসপিটালে মাদকজাতীয় ওষুধ প্রচুর ব্যবহার করা হয়। মানসিক রোগীকে অনেক সময় ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হয়। যেমন ধরুন, নাইট্রোজেনাস জাতীয় ওষুধ কিংবা মরফিয়া। এ ছাড়া আমাদের হাতে সলিড ইনফরমেশন আছে, জেনারেল হসপিটালে দামী ওষুধ পাচারের একটা চক্র আছে। কাজেই হসপিট্যালের একজন ডাক্তারের ছেলের পক্ষে দৈবাৎ তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া অসম্ভব নয়।”

কর্নেল সায় দিলেন, “দ্যাটস রাইট।”

“এইসব মার্ডার তপনের গ্যাংয়ের কাজ তো বটেই। তবে কিলার একজন। তার একটা পয়েন্ট টোয়েন্টি টু ক্যালিবারের ছোট্ট রিভলভার আছে। এ সব রিভলভার সিক্সরাউন্ডার। ছটা গুলি থাকে। অটোমেটিক উইপন। একটা ফায়ার করলে নেক্সট গুলিটা অটোমেটিক প্রসেসে হ্যাঁমারের সামনে এসে যায়।” বলে তাপসবাবু হাসলেন। “কাকে কী বোঝাচ্ছি! আপনি রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার। য়ু নো মোর দ্যান মি।”

“তপন এবং–হুঁ, কেলো এদের মধ্যে ঝগড়াটা কিসের ছিল? রাজনৈতিক?”

“নাহ্। রাজনীতি-ফিতি নয়। তবে পলিটিক্যাল পার্টি ওদের সাহায্য নিয়ে থাকে। দু’জনের একসময় খুব ভাব ছিল। ঘাটবাজার এরিয়ায় ব্যবসায়ীদের কাছে। সিকিউরিটি মানির বখরা নিয়ে প্রথম ঝগড়া বাধে। সো মাচ ইনফরমেশন আই বি সোর্সে আমাদের জানা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ড্রাগস এবং দামী ওষুধপত্র চোরাচালানের সূত্রেই সম্ভবত বেধেছিল দু’জনে। জুতোর বাক্স! নাও ইটস্ অ্যান ইমপর্ট্যান্ট ফ্যাক্টর ইন দিস কেস।”

“আপনি বলতে চাইছেন তপু দামী ড্রাগস লুকিয়ে রাখতে দিয়েছিল গৌতমকে এবং কেলোকে ঠকিয়ে একা আত্মসাৎ করতে চেয়েছিল?”

“হাঃ। দ্যাটস মাই থিওরি।”

“তাহলে ক খ গ ঘ টার্গেট করল কেন? আইদার তপনের গ্যাংয়ের কেউ ধর কেলো, ওসব পোস্টারের ঝামেলায় যাবে কেন? মিঃ রুদ্র, সাধারণ ক্রিমিন্যাল এ সব ঘোরপ্যাঁচে আজকাল যায় না। য়ু নো দ্যাট ওয়েল। তপুকে তারা বোমা মেরে খতম করেছে। ওদের কাজ ওইরকম বেপরোয়া এবং মোটা দাগের।”

তাপসবাবু কর্নেলের দিকে তাকিয়েছিলেন। বললেন, “হ্যাঁ। দ্যাটস আ পয়েন্ট।”

“আপনি বলছিলেন, দেয়ার ইজ সামথিং অড। হেয়ার ইজ আ থিং–ভেরি পিকিউলার।”

“কী?”

“প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে একই মোডাস অপারেন্ডি–একই পদ্ধতিতে খুন এবং একই মার্ডার উইপন ব্যবহার।”

“নিশ্চয় বাইরে থেকে ভাড়াটে খুনী আনিয়েছে তপনের গ্যাং–যাতে তাদের গায়ে আঁচড় না নাগে।”

কর্নেল হাসলেন। “সেটা অবশ্য সম্ভব। তবে–”

“তবে কী?”

“খুনী যে-ই হোক, সে একটু বেশি বুদ্ধিমান।”,

তাপস রুদ্র হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন। কর্নেলও উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন “জাস্ট আ মিনিট, মিঃ রুদ্র!” তিনি ঘরে ঢুকে গেলেন। নোটবইয়ের একটা পাতা ছিঁড়ে কিছু লিখলেন। তারপর বেরিয়ে এসে বললেন, “খুব গোপনীয়। আপনি ছাড়া কেউ জানবে না। এতে কয়েকটা প্রশ্ন আছে। সেগুলো অবিলম্বে তদন্ত করে লিখিতভাবে আমাকে গোপনে দেবেন। ইটস এ জেন্টলম্যানস এগ্রিমেন্ট বিটুইন য়ু অ্যান্ড মি, মিঃ রুদ্র।”

তাপস রুদ্র একবার চোখ বুলিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন, “ওকে!”…

.

রাইটার্স বিল্ডিংসের স্বাস্থ্যদফতরের অফিসে পৌঁছেই ঘনশ্যাম খবরটা পেয়েছিল। সে তখনই পাগলের মতো বিকট আর্তনাদ করে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। জ্ঞান হওয়ার পরও সে অসম্বন্ধ প্রলাপ বকছিল। “এ হতে পারে না! মিথ্যা! এ অসম্ভব!” তার মাথায় জল ঢেলে অনেক চেষ্টায় শান্ত করার পর দুজন কর্মী ট্যাক্সি করে তাকে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিলেন। সাড়ে বারোটায় ট্রেন। ততক্ষণে ঘনশ্যাম কিছুটা শান্ত হয়েছিল। ট্রেনে তাকে তুলে দিয়ে ওঁরা বলেছিলেন, “দেখুন, সঙ্গে আমরা যাব নাকি।”

ঘনশ্যাম আস্তে বলেছিল, “না। পারব যেতে।” তারপর আবার কেঁদে উঠেছিল। কামরাভর্তি যাত্রীরা জানতে চাইছিল, কী হয়েছে। ঘনশ্যাম কোনও জবাব দেয়নি। তারপর ট্রেন যত এগোচ্ছিল, তত সে নিঃসাড় হয়ে যাচ্ছিল। তার কেঠো চেহারা অপটু হাতে আঁকা ছবির মতো দেখাচ্ছিল।

কাঁটালিয়াঘাট পৌঁছুতে অসম্ভব সময় নিল ট্রেন। সাড়ে ছটায় প্ল্যাটফর্মে সে নেমেই দেখল হাসপাতালের কয়েকজন কর্মী তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে ভাবতে পারেনি, তার মতো একলা স্বভাবের মানুষের বিপদে এত সব মানুষ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে। সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। “আমি আর কেমন করে বেঁচে থাকব? আমার জীবন শ্মশান হয়ে গেল!”

সবাই তাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে সাইকেলরিকশায় চাপাল। তার পাশে একজন বসল। অন্যেরা সাইকেলে এসেছিল। প্রথমে থানায় যেতে হবে। মর্গ থেকে বডি ডেলিভারির পারমিশন নিতে হবে। তারপর শ্মশানযাত্রা।

ও সি তারক মুখার্জি ছিলেন না। ডিউটি অফিসারের কাছে বডি ডেলিভারির পারমিশন নিয়ে মর্গে গেল ঘনশ্যাম। সঙ্গে এস আই রঞ্জিত মিত্রও গেলেন। রঞ্জিতবাবুর এক আত্মীয়া মানসিক হাসপাতালে আছেন। সেই সূত্রে চেনাজানা দু’জনের। তাঁর সাহায্যে বডি ডেলিভারি নিতে দেরি হলো না। নইলে ডোমদের টাকাকড়ি দিতে হতো। নানা ছলছুতোয় দেরি করিয়ে দিত। রঞ্জিতবাবু বললেন, “আজ রাত্তিরে আর দরকার নেই। কাল সকালে অবশ্য করে থানায় আসবেন। বড়বাবুকে সব খুলে বলবেন–যদি কিছু প্রাইভেট কথাবার্তা বলার থাকে, হেজিটেট করবেন না।”

ঘনশ্যাম ভাঙা গলায় বলল, “বলব। সব বলব।”

দাহকর্ম শেষ হতে রাত দশটা বেজে গেল। শ্মশানে ডাঃ চৌধুরীও গিয়েছিলেন। ঘনশ্যাম গঙ্গাস্নান করে দেখল, তখনও তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন, “চলল! তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। একটু কথাও আছে।”

বাড়ি ঢুকে আলো জ্বেলে ঘনশ্যাম দেখল, খাটের উপর গার্গীর সায়া, ব্লাউজ আর একটা শাড়ি পড়ে আছে। বেড়াতে যাওয়ার আগে পোশাক বদলেছিল। সে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলো সেগুলোর দিকে। সবটাই অবাস্তব অবিশ্বাস্য লাগছে।

ডাক্তার চৌধুরী বারান্দায় চেয়ারে বসে ডাকলেন, “শোন ঘনশ্যাম! যা হবার হয়ে গেছে। তোমার আর কত কী–আমারটা দেখ, একমাত্র সন্তান! তুমি। আবার বিয়ে করবে। স্ত্রী পাবে, সন্তান পাবে। আমি-”

ঘনশ্যাম বলল, “অদৃষ্ট স্যার! কী আর বলব!”

 “তুমি যদি একটু কঠোর হতে ঘনশ্যাম!”

 “কেন স্যার?”

 “গৌতমকে তুমি বড্ড বেশি প্রশ্রয় দিয়েছিলে!”

ঘনশ্যাম চুপ করে থাকল। ডাক্তার চৌধুরী একটু কেসে বললেন, “গতকাল একটা বেনামী চিঠি এসেছিল গৌতমের নামে। কেউ লেটারবক্সে ফেলে গিয়েছিল। তাতে লেখা জুতোর বাক্স ফেরত না দিলে–”

ঘনশ্যাম শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, “জুতোর বাক্স?”

“হ্যাঁ। তুমি কি জানো–আই মিন, গৌতম তো প্রায় সবসময় তোমার বাড়ি আসত–সে কিংবা তোমার স্ত্রী কি এমন কিছু আভাস দিয়েছিল–”।

ঘনশ্যাম তার কথার ওপর চাপা স্বরে বলল, “বুঝেছি। ব্যাপারটা আমি, গৌতম আর গার্গী তিনজনে জানতুম। এসব ব্যাপার কাকেও বলা চলে না স্যার! শুনলেই বুঝতে পারবেন।”

সে পুরো ঘটনাটা বলল। তপু গৌতমকে জুতোর বাক্সে জুতোর ভেতর লুকিয়ে রাখা রিভলভার রাখতে দিয়েছিল। গৌতম সেটা গার্গীকে রাখতে দেয়। তারপর সাইকেল আর স্যুটকেসের সঙ্গে ওটাও চুরি যায়। ওটা আর ফেরত পায়নি। পুলিশকে শুধু এই কথাটিই বলেনি ঘনশ্যাম।

ডাঃ চৌধুরী শ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “তুমি এবার পুলিশকে এটা জানাও ঘনশ্যাম! এখন প্রায় পৌনে এগারোটা। এখন তোমার বিশ্রাম দরকার। ট্রাংকুলাইজার খেয়ে নাও। কাল মর্নিংয়ে তুমি থানায় গিয়ে সব বলবে। তুমি যদি না বলল, আমাকে বলতেই হবে।”

ডাঃ চৌধুরী চলে গেলেন। ঘনশ্যাম দরজা বন্ধ করে উঠোনে দাঁড়িয়ে রইল। সে আকাশ দেখছিল। নক্ষত্রলোকে দুটি মানুষের আভাস–গৌতম আর গার্গী! ঘনশ্যাম দু’হাতে মুখ ঢেকে চাপা আর্তনাদ করল, “না, না, না!”..

.

“জুতোর বাক্স? সত্যিকার জুতোর বাক্স?”

“হ্যাঁ স্যার! ভেতরে নতুন দুটো বুটজুতো ছিল। একটা জুতোর ভেতর ছোট্ট একটা রিভলভার। অন্যটার ভেতর কাগজে মোড়া বারোটা গুলি। দেখতে ছোট্ট লিপস্টিকের মতো।” ঘনশ্যাম রুমালে নাক ঝেড়ে চোখ মুছে বলল।

“আপনি কী করে জানলেন ওটা রিভলভার–পিস্তল নয়?”

“আমার এক ক্লাসফ্রেন্ড ক্যালকাটা পুলিশের অফিসার। তার কাছে একবার কথায় কথায়-”

ও সি তারক মুখার্জি প্রশ্ন করছিলেন। এস আই রঞ্জিত মিত্র রেকর্ড করছিলেন। তারকবাবু বললেন, “হ্যাঁ, তো আপনি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জানাননি কেন?”

“গৌতম, আমার বসের ছেলে। তা ছাড়া তাকে আমি স্নেহ করতাম। বুঝতেই পারছেন স্যার, এটা এমন একটা ডেলিকেট ব্যাপার–আমি আসলে ভেবেছিলুম, গৌতম ওটা নিয়ে যাবে। কিন্তু হঠাৎ বাড়িতে চুরি হয়ে গেল। রঞ্জিতবাবু সব জানেন স্যার!”

“আপনি তখনও কথাটা জানাননি আমাদের!”

“ঝামেলার ভয়ে স্যার! আমি নিরীহ মানুষ! কোনও সাতে-পাঁচে থাকি না।”

একটু চুপ করে থেকে তারক মুখার্জি বললেন, “দেখুন ঘনশ্যামবাবু! আপনার স্ত্রী এবং গৌতমবাবু এখন বেঁচে নেই। কাজেই প্রশ্নের সত্যি জবাব দিতে অসুবিধা নেই। বলুন, আপনার স্ত্রীর সঙ্গে গৌতমবাবুর কি কোনও গোপন সম্পর্ক ছিল বলে মনে হয়েছে আপনার?”

ঘনশ্যাম জোরে মাথা নেড়ে বলল, “অ্যাবসার্ড! সন্দেহ করার মতো কিছু চোখে পড়েনি।”

“তাহলে আপনার স্ত্রীও কেন খুন হলেন বলে আপনার ধারণা?”

“কিছু বুঝতে পারছি না। তবে আমার মনে হয়–” ঘনশ্যাম একটু ইতস্তত করে বলল, “গৌতমকে মারার সুযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছিল মার্ডারার। হয়তো পাচ্ছিল না। তারপর পেয়ে গেল–মানে, জায়গাটা নিরিবিলি।”

“কিন্তু আপনার স্ত্রীকে মারার কারণ কী মনে করেন?”

ঘনশ্যাম একটু ভেবে নিয়ে বলল, “মার্ডারার সাক্ষী রাখতে চায়নি হয়তো। কিংবা কিংবা দৈবাৎ একটা গুলি ওর মাথায় লেগেছিল।”

তারক মুখার্জি বললেন, “ঠিক আছে। দরকার হলে আবার ডাকব আপনাকে।”

রঞ্জিতবাবু বললেন, “এটা পড়ে নিয়ে তলায় সই করুন।”

ঘনশ্যাম স্টেটমেন্ট পড়ল। তলায় ইংরেজিতে নাম সই করে দিল। তারিখও লিখল।…

.

০৯.

কর্নেল নীলাদ্রি সরকার আজ পঞ্চমুখী শিবের মন্দির অব্দি প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। ওদিকে একটা আশ্ৰম আছে। নিসর্গ দৃশ্যও অসাধারণ। ভাবছিলেন, পশ্চিমবঙ্গেই এত সুন্দর সুন্দর জায়গা থাকতে কেন যে লোকে পুজোর সময় বাইরে ছোটে? শরৎকালের বাংলার নিসর্গের কোনও তুলনা হয় না। হয়তো সমতলবাসী বাঙালির সমতলের প্রতি একঘেয়েমি আছে, তা সমতলে যত সুন্দর করে স্বর্গোদ্যান প্রকৃতি সাজাক না কেন! উঁচু জায়গা অর্থাৎ পাহাড়-পর্বত দর্শন একটা বিস্ময়কর বৈচিত্র্যও বটে সমতলবাসীর কাছে।

একটু সকাল সকাল বাংলোয় ফিরলেন আজ। তাঁর কথামতো ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর তাপস রুদ্র বাইরে গেছেন গতকাল। রাত্রে ফিরে থাকলে সকালেই কর্নেলের কাছে চলে আসবেন।

কারও জন্য প্রতীক্ষা মানুষের জীবনে একটা অসহ্য সময়–তা, যার জন্যই প্রতীক্ষা হোক কিংবা যে কারণেই প্রতীক্ষা হোক। নটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ব্রেকফাস্ট খেলেন কর্নেল। তখনও তাপস রুদ্রের পাত্তা নেই। একটু উদ্বিগ্ন হলেন কর্নেল। অতি উৎসাহে কোনও হঠাকারিতা করে বসেননি তো ডিটেকটিভ অফিসার? খুনী যে-ই হোক, তার বুদ্ধিশুদ্ধি আছে এবং অতিশয় ধূর্ত। যদিও এই কেসে তার কিছু বুদ্ধির বাড়াবাড়ি ঘটে গেছে, এখন সে তা দৈবাৎ আঁচ করতে পারলে সতর্ক হয়ে যাবে। গা ঢাকা দেওয়াও অসম্ভব নয়। তা ছাড়া তাপস রুদ্রকে যেসব তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়েছেন কর্নেল, সেগুলো এই কেসে ভাইটাল সাক্ষ্যপ্রমাণ নয়। তা শুধু সহায়ক বা সেকেন্ডারি এভিডেন্স মাত্র।

বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হলো, ছটা বুলেট-নেল পেয়েছেন জঙ্গলের হিজল গাছটার গুঁড়িতে। তার মানে সিক্স রাউন্ডার রিভলভারের ছটা খালি কার্তুজ ফেলে দিতে হয়েছে খুনীকে। কোথায় ফেলেছে এটা খুঁজে দেখা উচিত ছিল। কাল ব্যাপারটা খেলায় হয়নি। এখন মনে হলো, এ-ও একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। পাঁচজনকে খুন করা হয়েছে পাঁচটা গুলিতে। তাহলে তার কাছে সম্ভবত বারোটা গুলি ছিল। এখনও একটা রয়ে গেছে। তাপসবাবুকে সতর্ক করে দেওয়া উচিত ছিল। অবশ্য একজন ডিটেকটিভ অফিসারের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিশুদ্ধির ওপর নির্ভর করা চলে। তবু সব মানুষের মধ্যে কোনও-কোনও মুহূর্তে হঠকারিতার ঝোঁক এসে যায়–আকস্মিক উত্তেজনাবশেও।

সাড়ে নটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে পড়লেন কর্নেল। হারাধনকে বললেন, “কেউ আমার খোঁজে এলে বলবে, লাঞ্চের সময় ফিরব।”

হারাধন বলল, “স্যার, বুনো হাঁসের মাংস খান তো?”

“খেতে আপত্তি নেই।” কর্নেল একটু অবাক হয়ে বললেন, “কোথায় পাবে বুনো হাঁস?”

হারাধন হাসল। “কেন স্যার? ওই জলার জলে ফাঁদ পেতে লোকে হাঁস ধরে। ওই যে দেখছেন পঞ্চমুখী শিবের মন্দিরের কাছে একটা গ্রাম। ওখানে গেলে পাওয়া যায়। রাত্তিরে জালের মতো ফাঁদ পেতে রেখে যায় স্যার।”

 “নাহ্। তুমি বরং কালকের মতো জেলেপাড়া থেকে মাছ এনো।” কর্নেল তাকে টাকা দিয়ে বেরুলেন।

আজ আকাশে টুকরো-টুকরো মেঘ। রোদ-ছায়ার মধ্যে জলার ধার দিয়ে হাঁটতে থাকলেন কর্নেল। মাঝেমাঝে বাইনোকুলারে উড্ডাক পাখিটাকে খুঁজছিলেন। পাখিটা নিপাত্তা হয়ে গেল কেন?

দক্ষিণের জঙ্গলে ঢুকে এগিয়ে গেলেন সেই হিজল গাছটার খোঁজে।

গাছটা থেকে প্রায় কুড়ি ফুট দূরে জলা। চারদিক তন্নতন্ন খুঁজে জলার ধারে গেলেন কর্নেল। জলটা খুব স্বচ্ছ। ঢালু হয়ে নেমে গেছে মাটি। হঠাৎ চোখে পড়ল সোনালি রঙের কী একটা ছোট্ট জিনিস চকচক করছে জলের তলায়। পিঠের কিটব্যাগ থেকে প্রজাপতি ধরা জালের নেট-স্টিকটা বের করলেন। জল হাত দুয়েক গভীর। জিনিসটা টেনে কাছাকাছি এনে আস্তিন গুটিয়ে তুলে নিলেন। যা খুঁজছিলেন, তার একটা পাওয়া গেল।

ছোট্ট বুলেটের নীচের ফাঁপা অংশ। জলে ছুঁড়ে ফেলেছিল লোকটা। দৈবাৎ একটা ধারে পড়ে গিয়েছিল। জাল ফেলার ব্যবস্থা করলে বাকি পাঁচটাও নিশ্চয় পাওয়া যাবে।

সতর্কভাবে বাইনোকুলারে চারদিকে জঙ্গলের ভেতরটা দেখে নিলেন কর্নেল। কেউ লক্ষ্য রাখেনি তাঁর দিকে। এতে খুনী সম্পর্কে একা ধারণা পোক্ত হলো বলা চলে। সে নিজের বুদ্ধিশুদ্ধি সম্পর্কে নিশ্চিন্ত আর আত্মবিশ্বাসী। শুধু তাই নয়, সে জানে, তার পরিকল্পনা নিখুঁত নিচ্ছিদ্র।

অথচ বরাবর দেখে আসছেন কর্নেল, সব খুনীই নিজের অজ্ঞাতসারে কোনও না কোনও একটা ভাইটাল সূত্র রেখে দেয়–একচক্ষু হরিণের গল্পটা সব রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের হত্যাকারীর ক্ষেত্রে সত্য। এই কেসে কি তেমন সূত্র আছে?

হুঁ, গৌতমকে লেখা বেনামী চিঠিটা।

একটু চমকে উঠলেন কর্নেল। চুরুট ধরালেন। প্রত্যেকটি খুন একই লোক একই অস্ত্রে করেছে। অথচ চিঠিটা পাওয়া গেছে, যেদিন গৌতম খুন হয়, সেদিনই। কেন তার আগে নয়?

অবশ্য ‘জুতোর বাক্স’ বলতে কী বুঝিয়েছে, এটা জানার ওপর নির্ভর করছে। এই সূত্রটা সত্যি ভাইটাল কি না।

জঙ্গল পেরিয়ে গিয়ে ধানক্ষেত। তারপর বিদ্যুৎকেন্দ্র। কর্নেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের রাস্তা ধরে হাঁটছিলেন। তাপস রুদ্রকে যেসব তথ্য সম্পর্কে খোঁজ নিতে বলেছেন, তার মধ্যে একটা হলো : কলকাতায় গার্গীর বিয়ের সময় কোনও প্রেমিক ছিল কি না। না থাকলে কাঁটালিয়াঘাটেও তেমন কেউ ছিল কি না, খুঁজে দেখা দরকার। একটা চমৎকার পরিকল্পনা আপাতদৃষ্টে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলেই এই তথ্যটা জানা জরুরি। গার্গীর কোনও প্রেমিক স্থানীয় হাঙ্গামার সুযোগ নিতে পারে।

 আবার কথাটা মাথায় ভেসে এল কর্নেলের : হত্যার অস্ত্র এক। মোস অপারেন্ডি এক। হত্যাকারী ছয় রাউন্ড গুলি ফায়ার করে টার্গেটে হাত পাকিয়েছে। তারপর কাজে নেমেছে। নাহ, ভাড়াটে খুনীর থিওরি টিকছে না। সে এমন, লোক, যে এই প্রথম রিভলভার ব্যবহার করেছে এবং তার হত্যার মোটিভ, প্রতিহিংসা চরিতার্থ।

গার্গীর কোনও প্রেমিক হওয়াই সম্ভব। তার আসল লক্ষ্য ছিল গার্গী ও গৌতম। দুটোই গ। তার ক্ষুরধার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। দুই গ-কে হত্যার জন্য সে হিটলিস্টে ক খ গ ঘ সাজিয়েছে। ঘ-কেও মেরেছে। ক খ ঘ তিনজনই বয়স্ক অসুস্থ মানুষ। প্রতিরোধের ক্ষমতা ছিল না। এই তিনটি হত্যার জন্য সে এদের বেছে নিয়েছে যাতে হত্যার কাজটা খুব সহজ হয়। গ-য়ের ক্ষেত্রে সে একটু ঝুঁকি নিয়েছে অবশ্য। কুড়ি ফুট দূর থেকে গুলি করেছে। যদি মোট গুলি বারোটা হয়, তখন তার রিভলভারে চারটে গুলি ছিল। কাজেই ঝুঁকিটা তত কিছু না। কাছে এসে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জেও গুলি করতে পারত–যদি প্রথম দুটো গুলি দৈবাৎ ফস্কে যেত। নির্জন জায়গা। সন্ত্রাসের আবহাওয়ায় এই নির্জনতা স্বাভাবিক।

টাউনশিপের মোড়ে কর্নেল একটা রিকশা নিলেন। বললেন, “থানায় যাব।”

থানায় ও সি নেই। রঞ্জিত মিত্রও নেই। ডিউটি অফিসার জামাল আমেদ কর্নেলকে দেখে অভ্যর্থনা করে ও সির ঘরে বসালেন। বললেন, “জুতোর বাক্সের ব্যাপারটা জানা গেছে কর্নেল সরকার! ঘনশ্যামবাবু সকালে এসে স্টেটমেন্ট দিয়ে গেছেন। দেখাচ্ছি।”

কর্নেল দ্রুত পড়ে নিয়ে একটু হাসলেন। “মিঃ রুদ্রের খবর জানেন?”

 “উনি আউট অব স্টেশন। এখনও ফেরেননি।”

 “আমি উঠি।”

জামালসাহেব তাঁকে গেট অব্দি বিদায় দিতে এলেন। বললেন, “আজ আবার ঘাটবাজারে হাঙ্গামা। ও সি সায়েব ফোর্স নিয়ে গেছেন। এখানে যা অবস্থা চলছে, কহতব্য নয়। কথায় কথায় বোমাবাজি আর খুনজখম!”…

ঘনশ্যাম অফিস যায়নি। যাবে ভেবেছিল, কারণ এই শুন্য ঘরে কাটানো তার পক্ষে কষ্টকর। কিন্তু ডাঃ চৌধুরী এসে তাকে নিষেধ করে গেলেন। এই মানসিক অবস্থায় তার অফিস যাওয়া উচিত নয়। কাজপাগল মানুষ ঘনশ্যাম। এতদিন ধরে তাকে দেখেছেন ডাঃ চৌধুরী। হাসপাতালে সবসময় ছুটোছুটি, রোগীদের খোঁজখবর করা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাজ–একটুও ফাঁকি দেয় না, সে। এবার তার কয়েকটা দিন বিশ্রাম দরকার। তা না হলে এই সাংঘাতিক মেন্টাল শকে সে নিজেই মানসিক রোগী হয়ে পড়বে।

তাকে রান্না করতেও বারণ করে গেছেন ডাঃ চৌধুরী। বরং ঘাটবাজারের হোটেলে গিয়ে খাবে। নার্ভ শান্ত রাখার জন্য কিছু ট্যাবলেট দিয়ে গেছেন। ঘনশ্যাম খায়নি। চুপচাপ শুয়ে ছিল। দেয়ালে বিয়ের ছবির দিকে তাকাচ্ছিল মাঝেমাঝে। অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল সবকিছু। এখান থেকে চলে যেতে পারলে হাঁপ ছেড়ে বাঁচত। কিন্তু যাওয়ার উপায় নেই। পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া অবধি তাকে থাকতে হবে, ও সি বলে দিয়েছেন।

এতক্ষণে অস্থিরতা তীব্র হলে সে একটা ট্যাবলেট খেল। তার কিছুক্ষণ পরে কেউ বাইরের দরজায় কড়া নাড়ল। ঘনশ্যাম চমকে উঠেছিল। একটু পরে বেরিয়ে সে সাড়া দিল, “কে?”

“আমি ঘনশ্যামবাবুর সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।”

ঘনশ্যাম উঠোনে নেমে গেল। দরজা খুলে একটু অবাক হলো সে। খ্রিস্টান ফাদারের মতো চেহারা, মুখে সাদা দাড়ি, মাথায় টুপি, বুকের ওপর ক্যামেরা আর কী একটা ঝুলছে এবং পিঠে একটা কিটব্যাগ। ঘনশ্যাম বলল, “আপনি কোত্থেকে আসছেন স্যার?”

“কলকাতা। আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে।”

 “আপনাকে তো চিনতে পারলুম না–”

 “আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। এখানে বেড়াতে এসেছি।”

“আপনি ট্যুরিস্ট?”

“বলতে পারেন।” বলে কর্নেল তার পাশ দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন। “ভয় পাওয়ার কিছু নেই ঘনশ্যামবাবু! আপনার সঙ্গে কয়েকটা কথা বলেই চলে যাব।”

ঘনশ্যাম খুব অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। কর্নেল বারান্দার চেয়ারে বসে বললেন, “আসুন। আপনাকে সব বলছি। আমি একজন নেচারিস্ট। পাখি দেখা, প্রজাপতি ধরা, কিংবা জঙ্গল খুঁজে অর্কিড কালেকশন আমার হবি। তবে কোথাও কোনও রহস্যময় খুনখারাপি ঘটলে আমি তাতে নাক গলাই। এ-ও হবি বলতে পারেন। এখানে এসে শুনলাম, পর-পর কয়েকটা রহস্যজনক মার্ডার ঘটেছে এবং আপনার স্ত্রীও–যাই হোক, আমি আপনাকে সাহায্য করতে চাই। আপনি নিশ্চয় চান আপনার স্ত্রীর খুনী ধরা পড়ুক?”

ঘনশ্যাম বারান্দায় উঠে দাঁড়িয়ে রইল। কর্নেলকে দেখতে দেখতে বলল, “কিন্তু পুলিশ–”

কর্নেল হাত তুলে বললে, “পুলিশের ব্যাপার তো আজকাল জানেন! আমার মনে হয়েছে, সমস্ত ব্যাপারটা রহস্যময়। পুলিশের তদন্ত দায়সারা এবং মোটা দাগের। আমি আপনাকে সাহায্য করতে চাই!”

ঘনশ্যাম তার দিকে তাকাল। তারপর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরাল। একটু পরে সে সন্দিগ্ধভাবে বলল, “আপনি আউটসাইডার। আপনি কী করে–আপনি কি ডিটেকটিভ অফিসার?”

কর্নেল হাসতে হাসতে তার হাতে নিজের নেমকার্ড দিয়ে বললেন, “এই বয়সে আমি অফিসার হব কোন দুঃখে ঘনশ্যামবাবু? তা ছাড়া আমি রিটায়ার্ড কর্নেল।”

“কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না আপনি কী করে–”

 “ঘনশ্যামবাবু, আপনি চান না আপনার স্ত্রীর খুনী ধরা পড়ুক?”

“দেখুন স্যার! আমার স্ত্রী দৈবাৎ মারা পড়েছে বলেই আমার ধারণা। এখন কথা হলো, যে যাবার সে চলে গেছে। আর তো তাকে ফিরে পাব না। মাঝখান থেকে গুণ্ডাগুলো আমাকে ফিনিশ করবে। আপনি আউটসাইডার। কে সারাক্ষণ আমার বডিগার্ড হয়ে আমাকে রক্ষা করবে? ভেবে দেখুন, আমাকে তো বেঁচেফৰ্ত থাকতে হবে। এ বাজারে এই চাকরি খোয়ালে আর পাওয়াও অসম্ভব।” ঘনশ্যাম হাত জোড় করল। “আপনি যেই হোন স্যার! খামোকা আমাকে বিপদে ফেলবেন না! আমি যা বলার সব পুলিশকে বলেছি। কিছু গোপন করিনি। পুলিশ যা করার করুক। আমি এখান থেকে ট্রান্সফারের চেষ্টা করছি।”

“একটা প্রশ্ন ঘনশ্যামবাবু! শুধু একটা প্রশ্নের জবাব দিন।”

“কী?”

গৌতম ছাড়া এখানে আর কারও সঙ্গে আপনার স্ত্রীর কোনও সম্পর্ক ছিল কিনা?”

ঘনশ্যাম ক্ষুব্ধভাবে বলল, “না! এ সব পার্সোনাল স্ক্যান্ডাল লোকে রটাচ্ছে!”

“আপনার স্ত্রীর নামে আসা চিঠিপত্র এখন খুঁজে দেখতে আপত্তি কী ঘনশ্যামবাবু? খুঁজে দেখলে–”

“অ্যাবসার্ড। কী সব বলছেন আপনি?”

“প্লিজ ঘনশ্যামবাবু! উত্তেজিত হবেন না। এমন তো হতে পারে, আপনার বিয়ের আগে আপনার স্ত্রীর কোনও সম্পর্ক ছিল কারও সঙ্গে। প্রতিহিংসাবশে সে এতদিনে তাঁকে খুন করেছে।”

ঘনশ্যাম বিরক্ত হয়ে বলল, “আবার একই কথা! আমার স্ত্রী দৈবাৎ মারা পড়েছে। ডাক্তারবাবুর ছেলের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে পাশাপাশি বসেছিল, কাজেই একটা গুলি তার গায়েও লেগেছে!”

“শুনলুম কপালে লেগেছিল।”

“একই কথা। আমি ট্রাংকুলাইজার খেয়েছি। ঘুম পাচ্ছে। আপনি আসুন স্যার!”

 কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ঘনশ্যামবাবু! খুনীর রিভলভারে এখনও একটা গুলি আছে।”

ঘনশ্যাম চমকে উঠে বলল, “সো হোয়াট?”

“একটু সাবধানে থাকা উচিত আপনার। কারণ আপনার নামেও ঘ আছে।”

“আই ডোন্ট কেয়ার ফর এনিথিং! মারলে মারবে।” বলে সে রাগ করে সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরো ছুঁড়ে ফেলল উঠোনে।

“কিন্তু আপনি একটু আগে বলছিলেন, আপনি বেঁচেবর্তে থাকতে চান।”

 “কে না চায়?”

“আপনি বুদ্ধিমান, ঘনশ্যামবাবু! আসি। থ্যাংকস!”

 কর্নেল বেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ করে ঘরে ফিরল ঘনশ্যাম। ওপরের। জানলা দিয়ে দেখল বৃদ্ধ ভদ্রলোক ছাতিমগাছটার কাছে গিয়ে চোখে দূরবীন রেখে কী দেখছেন। পাগল নয় তো? মানসিক রোগী অনেক রকম আছে। এই ভদ্রলোকের ব্যাপার দেখে তা-ই মনে হচ্ছে। লোকের কাছে শুনে হুট করে তার বাড়িতে এসে ঢুকে পড়লেন! যেচে পড়ে নাক গলানো আর থ্রেটন করা। ঘনশ্যাম দেখল, কর্নেল বাঁধে গিয়ে উঠলেন। তারপর হঠাৎ চলার গতি বাড়িয়ে দিলেন। নির্ঘাত মানসিক রোগী। বুড়ো বয়েসে নানাধরনের উৎকট বাতিক অনেকের মাথায় চাগিয়ে ওঠে। ঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে বৃদ্ধ পাগল হয়ে যায়।…

.

কর্নেল বাইনোকুলারে দেখতে পেয়েছিলেন বাংলোর সামনে একটা জিপগাড়ি। স্লুইস গেটের কাছে গিয়ে আবার দেখলেন, বারান্দায় ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর তাপস রুদ্র বসে আছেন।

মিনিট কুড়ি লাগল বাংলোয় পৌঁছুতে। তাপস রুদ্রকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। কর্নেলকে দেখে একটু হেসে বললেন, “ট্রেন লেট করছিল। পৌঁছে স্নানাহার সেরে নিতেও খানিকটা দেরি হলো। এসে শুনলাম, আপনি লাঞ্চের সময় ফিরবেন।”

কর্নেলকে একটা ভাঁজ করা কাগজ এগিয়ে দিলেন তাপসবাবু। কর্নেল কাগজটা খুলে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, “খুব ছোটাছুটি করেছেন দেখা যাচ্ছে। থ্যাংকস মিঃ রুদ্র।”

তাপসবাবু বললেন, “কিন্তু সত্যি বলতে কি, আমার নিজের কাছেও ইনফরমেশনগুলো ভাইটাল মনে হচ্ছে না। যেমন ধরুন, গার্গীদেবীর বাবা-মা দুর্গাপুরে বড় মেয়ের বাড়িতে চলে গেছেন। বাড়িতে নতুন ভাড়াটে। লোকাল থানা যথেষ্ট হেল্প করল। পাড়ার পুরনো বাসিন্দাদের কাছে গার্গীদের সম্পর্কে তেমন কোনও স্ক্যান্ডালের কথা জানা গেল না। বারাসাতে বিয়ের কথা অবশ্য অনেকে জানে। কিন্তু বারাসাতেও একই ব্যাপার। একটা ভাড়াবাড়িতে থাকতেন ঘনশ্যামবাবু। তাঁর স্ত্রীর নামে সেখানেও কোনও স্ক্যান্ডালের খবর নেই। ঘনশ্যামবাবুর দু’কাঠা জমি কেনা আছে ওখানে।”

কর্নেল কাগজটা ভাজ করে পকেটে রেখে বললে, “ইনফরমেশনগুলো সত্যি ভাইটাল, মিঃ রুদ্র!”

“বলেন কী!”

“হ্যাঁ। আমার থিওরি আরও স্ট্রং হলো এবার। কর্নেল চোখ বুজে দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন। “মিঃ রুদ্র, আমার ধারণা, এবার খুনী নিজেই ধরা দেবে।”

তাপসবাবু অবাক হয়ে বললেন, “নিজে ধরা দেবে! কেন?”

“রিভলভারের শেষ গুলিটা–”

“প্লিজ কর্নেল সরকার! আমার কার্ড শো করেছি। আপনারটা এবার শো করুন।”

কর্নেল জঙ্গলের ভেতর টার্গেট প্র্যাকটিসের ঘটনা বর্ণনা করে ছটা গুলির টুকরো এবং একটা ফাঁপা গুলির খোল দেখালেন। জুতোর বাক্স’র ঘটনাও শোনালেন। তাপস রুদ্র বললেন, “আমি থানায় এখনও যাইনি। কাজেই এই এপিসোডটার কথা জানতুম না। যাই হোক, বোঝা যাচ্ছে কিলার তাহলে স্থানীয় লোক। কিন্তু সে নিজে ধরা দেবে কেন বলছেন?”

“শেষ গুলিটা সে নিজের জন্য রেখেছে।”

“ও মাই গড! সুইসাইড করবে নাকি?”

কর্নেল হাসলেন। “যে সুইসাইড করবে, সে পোস্টার সেঁটে ক খ গ ঘ হিটলিস্ট সাজাতে যাবে কেন মিঃ রুদ্র? অপেক্ষা করুন। আমার মনে হচ্ছে, আজ সন্ধ্যার পর যে-কোনও সময় খুনী ধরা দেবে। কোয়ার্টারে ফিরে বিশ্রাম নিন আপনি। যথেষ্ট ছোটাছুটি করেছেন। সন্ধ্যা ছটা নাগাদ থানায় আমার জন্য অপেক্ষা করবেন।”

থানায় ও সি তারক মুখার্জির ঘরে কর্নেল, তাপসবাবু, রঞ্জিত মিত্র ছাড়াও আরও দু’জন অফিসার আড্ডা দেওয়ার মতো বসেছিলেন। আজ আবার ঘাটবাজারে বোমাবাজি হয়েছে। দশ-বারো জনকে গ্রেপ্তার করাও হয়েছে। কুখ্যাত কেলো ধরা পড়েছে। ঘোঁতন একটুর জন্য হাত ফস্কে পালিয়ে গেছে। গল্পে-গল্পে সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেল। অনেক চা কফি-স্ন্যাক্স খাওয়া হলো। তাপস রুদ্র বারবার কর্নেলের দিকে তাকাচ্ছিলেন। সাড়ে সাতটায় তিনি অধৈর্য হয়ে বললেন, “কর্নেল সরকার! আমার মনে হচ্ছে, আপনি”

তাঁর কথায় বাধা পড়ল। কেউ আচমকা ঘরে ঢুকে ভাঙা গলায় পেঁচিয়ে উঠল, “স্যার! স্যার! আমাকে কে গুলি করেছিল! একটুর জন্য বেঁচে গেছি স্যার! জানালা দিয়ে গুলি ছুঁড়েছিল।”

রঞ্জিত মিত্র বললেন, “ঘনশ্যামবাবু! আপনাকে সাবধান করে দিয়েছিলুম?”

ঘনশ্যাম হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “লোডশেডিং বলে জানালা খুলে রেখেছিলুম। হঠাৎ গুলির শব্দ! দেয়ালের একটা ছবিতে গুলি লেগেছে। আবছা দেখলুম স্যার, একটা বেঁটে রোগামতো কে পালিয়ে যাচ্ছে। পরনে গেঞ্জি আর প্যান্ট!”

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “চলুন ঘনশ্যামবাবু! গিয়ে ব্যাপারটা দেখি।”

ঘনশ্যাম কর্নেলকে দেখে অবাক হয়ে গেল। তারপর বলল, “আপনি তখন ঠিকই বলেছিলেন, আমি আপনাকে চিনতে পারিনি স্যার!”

“চলুন মিঃ রুদ্র! আসুন। মিঃ মুখার্জি! আর য়ু ইন্টারেস্টেড?”

 “নিশ্চয়!” তারক মুখার্জি উঠলেন।

পাঁচ জন অফিসার আর জনা চারেক আমর্ড কনস্টেবল বেরুলেন। পুলিশ ভ্যান আর একটা জিপে সবাই ব্যস্তভাবে উঠলেন। কর্নেল জিপের সামনে। পাশে ঘনশ্যামকে নিলেন। ঘনশ্যাম বারবার বলছিল, “আপনাকে চিনতে ভুল হয়েছিল স্যার! আপনি ঠিকই বলেছিলেন। তা ছাড়া দেখুন, আমার নামেও ঘ আছে।”

ঘনশ্যামের কোয়ার্টারের কাছাকাছি গিয়ে জিপ থামল। আশেপাশের কোয়ার্টারের বারান্দায় হেরিকেনের আলো আর ভিড় দেখা যাচ্ছিল। সবাই ঘনশ্যামের চ্যাঁচামেচি শুনেছে। কেউ কেউ গুলির শব্দও শুনেছে। কিন্তু বেরুতে সাহস পায়নি।

ঘরের তালা খুলল ঘনশ্যাম। ভেতরে একটা দম কমানো হেরিকেন জ্বলছিল।

দম বাড়িয়ে দিল সে। বলল, “আমি এখানে দাঁড়িয়ে হেরিকেন ধরাচ্ছিলুম। হঠাৎ গুলি। ওই দেখুন, ছবি ভেঙে কাঁচ গুঁড়িয়ে গেছে!”

কর্নেল টর্চের আলোয় দেখে নিয়ে একটু হাসলেন। “আপনাদের বিয়ের পর ছবিটা তোলা হয়েছিল। তাই না ঘনশ্যামবাবু?”

“হ্যাঁ, স্যার!”

“আপনার স্ত্রীর দুর্ভাগ্য! গুলিটা এবার তার ছবির কপাল ছুঁড়ে দেয়ালে ঢুকেছে।” কর্নেল তার চোখে চোখ রেখে বললেন, “রিভলভারটি কি গঙ্গায় ফেলে দিলে ঘনশ্যামবাবু?”

ঘনশ্যাম তাকাল। “আজ্ঞে?”

“রিভলভারটা গঙ্গায় ফেলে দিয়েছেন। তাই না?” বলে কর্নেল তাপস রুদ্রের দিকে ঘুরলেন।

তাপস রুদ্র ঘনশ্যামের শার্টের কলার ধরে বললে, “পাঁচটা মার্ডারের জন্য আপনাকে গ্রেফতার করা হলো ঘনশ্যামবাবু!”

ঘনশ্যাম শক্ত হয়ে গেল। মেঝের দিকে দৃষ্টি। কর্নেল পকেট থেকে একটা চারমিনারের খালি প্যাকেট বের করে বললেন, “খুব সংসারী মানুষ আমাদের এই ঘনশ্যাম রায়। সিগারেটের প্যাকেটে বাজারের হিসেব লেখার অভ্যাস আছে। নিজের বাড়িতে নিজেই চুরি করে চমৎকার অ্যালিবাই সাজিয়েছিলেন। জঙ্গলে টার্গেট প্র্যাকটিস করার সময় অন্যমনস্কতার দরুন এই প্যাকেটটা ফেলে আসাই আপনার কাল হয়েছিল। ঘুড়ির সুতো ছেড়ে দেওয়ার মতো স্ত্রীকে গৌতমবাবুর সঙ্গে মিশতে দিয়ে আড়ালে লক্ষ্য রাখতেন। হ্যাঁ, অন্তত বিশ্বাসঘাতিনী স্ত্রীকে খুন করতেনই। দৈবাৎ রিভলভারটা হাতে এসে গিয়ে নিরাপদে খুন করার প্ল্যান ছকেছিলেন। ব্যাকগ্রাউন্ড চমৎকার। দুই গ্যাংয়ের বিবাদ খুনজখম। কাজেই পোস্টারে হিটলিস্ট মানিয়ে যায়। আপনার টার্গেট ছিলো গার্গীদেবী এবং গৌতম চৌধুরী। কিন্তু পুলিশকে ভুলপথে চালাতে নিরীহ বৃদ্ধ ক খ এবং ঘ-কে মারলেন। সকাল সওয়া দশটার ট্রেনের টিকিট কেটে ট্রেনে চাপলেন না। সারাদিন কোথাও গা-ঢাকা দিয়ে থেকে তিনটে খুন করে ট্রেনে চাপলেন রাত দশটার ডাউনে। অনবদ্য আপনার ঠাণ্ডা মাথার প্ল্যানিং। আমি জানতুম, শেষ গুলিটা খরচ করে নিজেকে একেবারে নির্দোষ প্রমাণ করতেই হবে আপনাকে। কারণ আপনার নামেও ঘ আছে। তাই মিঃ রুদ্রকে বলেছিলুম, খুনী নিজেই ধরা দেবে।”

এইসময় বিদ্যুৎ ফিরে এল। দু’জন কনস্টেবল হ্যান্ডকাপ পরিয়ে দিল ঘনশ্যামের হাতে।…

বুকমার্ক করে রাখুন 0