১. জীবনে কোন মুহূর্তে

ভালবাসার অন্ধকারে

০১.

জীবনে কোন মুহূর্তে হঠাৎ কী যে ঘটে যায়, আগে থেকে আঁচ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ যেন আজীবন অন্ধকারে পথ হাঁটছে। আশপাশের অস্পষ্টতা থেকে তবু তো কিছু আন্দাজ করে নেওয়া যায় এবং সেইমতো জীবনটাকে গুছিয়ে নেওয়া চলে। কিন্তু সামনে অদূরে কী কাছে, কিছুই জানা নেই। হঠাৎ হয়তো খাদে পড়ে সে তলিয়ে যায় চিরকালের মতো।

গার্গীর জীবনে এক শরৎকালের দুপুরবেলায় সেই রকম একটা পতন ঘটে গেল। এই হটকারিতার জন্য সে এতটুকু প্রস্তুত ছিল না। তই আত্মরক্ষার সহজাত বোধকে সে কাজে লাগাতে পারল না। নিঃসহায় আত্মসমর্পণ করতে হলো তাকে একটা অনিবার্যতার কাছে।

অনিবার্যতা? পরে অবশ্য তাই মনে হয়েছিল গার্গীর। আরও অনেক কিছু মনে হয়েছিল। চোর পালালে গেরস্থের বুদ্ধি বাড়ে বলে একটা কথা আছে। কিন্তু তখন আর পস্তানিতে লাভ নেই। শুধু নিজের ওপর রাগে জ্বলে মরা ছাড়া কিছু করার নেই। অথচ ভালবাসার পথ এমনি পিছল যে আছাড় না খেয়েও নিস্তার নেই যেন।

নতুন টাউনশিপের শেষদিকটায় গঙ্গার ধারে ছড়ানো-ছিটোনো সব সরকারি কোয়ার্টার। নিচু বাঁধের ওপর গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানের সূত্রে বনদফতর থেকে লাগানো গছপালা জঙ্গল হয়ে আছে। খানিকটা দূরে পুরনো শিবমন্দির আর শ্মশান। গার্গীদের কোয়ার্টারটা বাঁধের কাছাকাছি। পেছনে এলোপাতাড়ি ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে একটা ছাতিম গাছ দাঁড়িয়ে আছে। জানালা থেকে ছাতিম গাছটা দেখা যায়। সেই গাছের তলায় একা গৌতমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গার্গী একটু অবাক হয়েছিল।

এখানে আসার পর থেকে গার্গী গাছটার অনেক বদনাম শুনেছে। কোন এক পানু চক্কোত্তির বউ কবে ওই গাছে ঝুলে প্রাণ দিয়েছিল। রাতবিরেতে প্রেতিনী ঠাকরুনকে নাকি মাঝেমাঝে দেখা যায়। চাঁদতারণ সিঙ্গির মেয়ে বিনু নাকি দিনদুপুরেই তাকে দেখে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। তারপর থেকে ঠাকরুনের ভূত তাকে পেয়ে বসেছে। অনেক ওঝা-হোমিওপ্যাথি করে শেষে গার্গীর স্বামী ঘনশ্যামের তাগিদ্রে তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘনশ্যাম এই কাঁটালিয়াঘাটে নতুন মানসিক হাসপাতালের ওয়েলফেয়ার অফিসার! বহরমপুর থেকে মাস তিনেক আগে এখানে বদলি হয়ে এসেছে সে। গার্গীকে সে পইপই করে সাইকোলজি বোঝায়। ভূতপ্রেত বলে কিছু থাকতে পারে না। এই রোগকে বলে হিস্টিরিয়া।

ঘনশ্যাম একটু গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। শ্যামবর্ণ মাঝারি গড়নের সাধারণ চেহারা। রোগা দেখালেও হাড়ের কাঠামো শক্ত। পঁয়ত্রিশ বছর বয়স। গার্গীর চেয়ে প্রায় বছর দশেকের বড়। গার্গী ছিপছিপে গড়নের যুবতী। গায়ের রঙ ফর্সা। চোখে পড়ার মতো লালিত্য তাকে ঘিরে আছে। সে উত্তর কলকাতায় বড় হয়েছে। বারাসাতের ঘনশ্যামের মতো একজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিয়ে এবং এই মফস্বলী জীবনযাত্রা তার স্বপ্নে ছিল না। কিন্তু গরিব স্কুলশিক্ষকের মেয়ের এটাই ভাগ্য। এই ভাগ্যকে সে কালক্রমে মেনে নিয়েছে। বিয়ের পর বহরমপুরে গিয়ে বছরখানেক মোটামুটি মন্দ লাগেনি। শহরের পরিবেশ ছিল। কিন্তু কাঁটালিয়াঘাট নতুন টাউনশিপ। এখনও এর গা থেকে গ্রামের গন্ধ ঘোচেনি। আর এই নিরিবিলি প্রত্যন্ত এলাকা। সরকারি কোয়ার্টারের বাসিন্দাদের মধ্যে পুরস্পর কেমন যেন ঈর্ষা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা থাকে। ঘনশ্যামের ডেজিগনেশনে ‘অফিসার’ শব্দটা থাকলেও সে এত সাদাসিধে আর অতিসাধারণ মানুষ, দরকার ছাড়া তাকে কেউ পাত্তা দেয় না বিশেষ। আর গার্গী যে মন খুলে কারও সঙ্গে মিশবে, তাতে বাধা তার নিজেরই স্বভাব। প্রতিবেশিনীদের কথাবার্তা চালচলন তার একটুও পছন্দ হয় না। সবাই টিভি, ফ্রিজ, শাড়ি, গয়না এবং স্বামীদের সরকারি গাড়ির গৌরবে আটখানা। গার্গীর গোপন দুঃখ এখানেই। ঘনশ্যাম একটু কিপটে স্বভাবের লোক। কিস্তিতেও অন্তত একটা টিভি কিনতে পারত। সে সারাদিন হাসপাতাল অফিসে থাকবে এবং তার বউ কেমন করে সময় কাটাবে, এ নিয়ে তার চিন্তাভাবনা আছে বলে মনে হয় না। ওই একটা ট্রানজিস্টার কবে কিনেছিল। সেটাই জানালার ধারে বসে বাজায় গার্গী। এতেল বেতোল ভাবনা ভাবে।–

এদিন দুপুরে ছাতিমতলায় গৌতমকে দেখে সে ট্রানজিস্টারের শব্দ কমাল। গৌতম অন্যদিকে ঘুরে সিগারেট টানছে। গৌতমকে এতদিন ধরে দেখে আসছে। গার্গী, অথচ যেভাবে দেখল, এটা যেন একটা আবিষ্কার। ফিল্মের হিরোরা ঠিক ওই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু ঠিক এই বোধটা নয়, হঠাৎ মনে হলো গার্গী একটা অপার্থিব সৌন্দর্য দেখছে। প্রকৃতি মানুষকে কাছে পেলে কি এমনি করে বদলে দেয়? গার্গীর মনে একটা চাপা ছটফটানি জাগল। কেন এদিকে তাকাচ্ছে না গৌতম?

গৌতমের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল ঘনশ্যামই। তার হাসপাতালের বস সাইক্রিয়াট্রিস্ট ডাক্তারের একমাত্র ছেলে। কলকাতায় ডাক্তরি পড়ে। এটা তার শেষ বছর। পুজোর ছুটিতে এখানে এসেছে মাত্র দিন পনের আগে। সে এখানে এলেই টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। এদিকটা নিরিবিলি এলাকা। কোয়ার্টারের পেছনদিকটায় দৈবাৎ তাকে দেখতে পেয়ে ঘনশ্যাম ডেকেছিল। গৌতম আলাপী স্বভাবের ছেলে। ঘনশ্যাম ভেতরে না ডাকলেও সে সটান ঢুকে পড়েছিল। অগত্যা ঘনশ্যাম বসের ছেলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয় গার্গীর। আর সেই আলাপ থেকেই প্রায়ই গৌতম ঘনশ্যাম থাক বা না থাক কোয়ার্টারে, সোজা চলে আসে। সে প্রথম প্রথম বৌদি বলে ডাকত ঘনশ্যামের অনুপস্থিতিতে। হঠাৎ একদিন একটু হেসে বলে উঠেছিল, “বৌদি বলার মানে হয় না আপনাকে! বয়সে আমার সমান বলেও তো মনেই হয় না। আপনি এইটুকু মেয়ে। আপনি-টাপনিটা বড় বাজে। দূরত্বের সৃষ্টি করে। তুমি বলব– আপত্তি আছে?”

গার্গী আস্তে বলেছিল, “নাহ।”

“এবং শ্যামদার অ্যাবসেন্সে নাম ধরেই ডাকব।”

গার্গী মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে একটু পরে বলেছিল, “ডাকবেন।”

“গার্গী! ডাকবেনটা উইথড্র করো।”

গার্গীর বুকটা ধড়াস করে উঠেছিল। তারপর সে সামলে নিয়েছিল একটু : নার্ভাস হেসে বলেছিল, “করলুম।”

এমনি করেই গার্গীর জীবনে একটা ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল সেদিন। ঘনশ্যাম কোনও-কোনও দিন দুপুরে খেতে এসে দেখত গৌতম ও গার্গী গল্প করছে। কিন্তু তার হাবভাবে বোঝা যেত না সে কিছু সন্দেহ করছে। কোনওদিন বিকেলে অফিস থেকে ফিরেও দেখত গৌতম ও গার্গী কোয়ার্টারের পেছনে ঘাসে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। গৌতম বলত, “চলুন শ্যামদা, বৌদিকে নিয়ে তিনজনে গঙ্গার ধারে বেড়িয়ে আসি।”

ঘনশ্যাম বলত, “বড় টায়ার্ড ভাই। বরং তোমরা যাও। ঘুরে এস। তোমার বৌদির তো ঘরে বসে থেকে দম আটকে যায়। একটু ঘোরাঘুরি করলে রিলিফ পাবে।”

এভাবে একদিন ঘনশ্যাম তাদের সিনেমা দেখতে যেতেও তাগিদ দিয়েছিল। গার্গী স্বামীর মধ্যে কোনও ভাবান্তর টের পায় না। রাতের শয্যায় একই আদর ভালবাসার তাল কাটে না। অথচ মাঝেমাঝে গার্গীর মনে হয়েছে, কেন তার স্বামী তাকে সন্দেহ করছে না? কেন এমন অবাধ মেলামেশায় বাধা দিচ্ছে না? এ কি চাকরির স্বার্থে বসকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য বসের ছেলেকে এমন প্রশ্রয় দেওয়া? গার্গীর গৌতমকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হতো, তার বাবার কাছে ঘনশ্যাম গৌতমকে কোনও সুপারিশ করতে বলেছে কি না? কিন্তু মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করতে বেধেছে।

তবে এতগুলো দিন অবাধ মেলামেশা সত্ত্বেও গৌতম গার্গীকে ছোঁয়নি বা কোনও ভালবাসার সংলাপও উচ্চারণ করেনি। শুধু দুদিন আগে সন্ধ্যায় গঙ্গার ধার থেকে ফেরার সময় গৌতম আলতোভাবে তার একটা হাত হাতে নিয়েই ছেড়ে দিয়েছিল। গার্গীর বুকটা ধড়াস করে উঠেছিল। তারপর কতক্ষণ ধরে সঙ্গীতের সুরের মতো একটা সূক্ষ্ম অনুরণন স্নায়ুকোষে ধীরে মিলিয়ে গিয়েছিল। সে রাতে ঘনশ্যাম গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, গার্গী জেগেই ছিল। হঠাৎ মূহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল গৌতম তত সাহসী নয় কেন? অথবা এ তার একটা নিছক খেলা! নাকি সে চাইছে গার্গী তার কাছে আত্মসমর্পণ করবে? নাহ্, গার্গী অত সস্তা নয়। মনে মনে রাগে জ্বলে উঠেছিল গার্গী।

.

এদিন দুপুরে একটু আগে ধনশ্যাম খেয়ে অফিসে ফিরে গেছে। গার্গী খাওয়ার পর ফ্যানের নিচে ভিজে চুল শুকিয়ে কপালে একটা টিপ পরেছে। সিঁথিতে একচিলতে সিঁদুর দিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে তার বুকের ভেতর একটা চাপা যন্ত্রণা টের পেয়েছে। কী নিঃসঙ্গ এই জীবন! এই প্রায়-গ্রাম্য জঙ্গুলে পরিবেশে তাকে কাটাতে হচ্ছে। গৌতম না থাকলে তার জীবনে বেঁচে থাকার মানেটাই হারিয়ে যেত।

কিন্তু গৌতমের ছুটি ফুরিয়ে এলে সে তো কলকাতা চলে যাবে। তারপর? আবার সেই একলা হয়ে থাকা কষ্টকর দিন ও রাতের একঘেয়েমি! ওই ছাতিম গাছে ঝুলে মরতে ইচ্ছে করে গার্গীর পানু চক্কোত্তির সেই বউটার মতো!

জানলার ধারে বসে গৌতমকে দেখে গার্গী নিজের অজ্ঞাতসারে একটা হঠকারিতায় আক্রান্ত হয়েছিল। ট্রানজিস্টারের শব্দ হঠাৎ সে খুব বাড়িয়ে দিল গৌতমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই।

তখন গৌতম এদিকে তাকাল। তারপর সোজা আগাছার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে জানালার ধারে চলে এল। গার্গী ট্রানজিস্টার বন্ধ করে দিল। সে মুখ টিপে হেসে বললস “ওখানে কী করছিলে? কোনও হিরোইনের জন্য ওয়েট করছিলে বুঝি?”

গৌতম হাসল, “আমার হিরোইন তো তুমি!”

 ‘বাজে কথা বলো না!” গার্গী কপট রাগ দেখাল। “নিশ্চয় কারও জন্য ওয়েট করছিলে!”

“করছিলুম সেটা ঠিক। দরজা খোলো বলছি।”

গার্গী বসার ঘরের দরজা খুলে দিলে গৌতম শোবার ঘরে চলে গেল। খাটে বসে রুমালে মুখের ঘাম মুছল। গার্গী দরজা বন্ধ করে এ ঘরে এল। গৌতম বলল, “এক গ্লাস জল দাও।”

গার্গী বাঁকা হাসল। “দিচ্ছি। আগে বলল কার জন্য”

গৌতম তার কথার ওপর বলল, “তোমাকে আজ এত সেক্সি দেখাচ্ছে কেন গার্গী?”

“কী দেখাচ্ছে!”

“অসাধারণ সুন্দরী।”

 “শাট আপ!”

“কী আশ্চর্য! সত্যি কথাটা বললুম, অমনি শাট আপ? যাও, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গেছে। তপুর জন্য একঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি। ওর পাত্তা নেই। কে জানে পুলিশের পাল্লায় পড়ল নাকি!”

গার্গী একটু অবাক হয়ে বলল, “তপু কে?”

 “আহ! আগে জল দাও।”

গার্গী রান্নাঘরে যখন জল আনতে গেল, তার শরীর জুড়ে একটা অস্থিরতা। গৌতমের ‘তোমাকে আজ এত সেক্সি দেখাচ্ছে কেন এই কথাটা তানপুরার মতো ঝংকৃত হচ্ছিল মনে। কুঁজো থেকে জল ঢালবার সময় তার হাত কাঁপছিল। খানিকটা জল মেঝেয় ছলকে পড়ল। সে ঠোঁট কামড়ে ধরল। কী এক সাংঘাতিক ঘটনার দিকে যেন তার নিয়তি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল।

তার হাত থেকে জলের গ্লাস নিয়ে গৌতম বলল, “তোমাকে অমন দেখাচ্ছে কেন?”

গার্গী কোন জবাব দিল না।

গৌতম জল খেয়ে গ্লাসটা হাত বাড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলে রাখল। তারপর গার্গীর হাত ধরে টেনে তাকে খাটে বসিয়ে দিল। আস্তে বলল, “তোমাকে বলা উচিত।” একটু হাসল সে। “আমার ধারণা, তোমার পেটে কথা থাকে। না, না–রাগ কোরো না। বলতে চাইছি, তোমাকে বিশ্বাস করা যায়।”

গার্গী বাঁকা হাসল। “এত ভূমিকার দরকার কী? আমি শুনতে চাইনে।”

“একটু আগে শুনতে চাইছিলে।” গৌতম চাপা স্বরে বলল, “শুনতে না চাইলেও হঠাৎ মনে হলো, তোমাকে বলা উচিত। কারণ তোমার সাহায্য দরকার।”

এবার গার্গী একটু আগ্রহ দেখিয়ে ভুরু কুঁচকে বলল, “কী ব্যাপার?”

“তুমি তপনকে চেনো না বললে, শুনে অবাক লাগছিল। এখানে ওকে সবাই চেনে। এক সময় পলিটিক্স করত। এখন ভোটের পলিটিক্সে মার্সেনারি যোগান দেয়।”

“মার্সেনারি মানে” বলে গার্গী একটু হাসল। “ও! তুমি ওই গুণ্ডাটার কথা– বলছ? তোমার শ্যামদার কাছে শুনেছি, ওদের কাছে হসপিটালের দামি-দামি ওষুধ পাচার করে স্টাফরা। ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারে না। পুলিশ নাকি ওদের হাতে।”

গৌতম গম্ভীর হয়ে বলল, “আমি প্রব্লেমে পড়ে গেছি। তপু শত খারাপ ছেলে হোক, খুব আলাপি। ওর মধ্যে বন্ধুত্ব করার মতো অনেক গুণ আছে। তা ছাড়া শিক্ষিত ছেলে। গ্র্যাজুয়েট। বাবা এখানে ট্রান্সফার হয়ে আসার পর তপুর। সঙ্গে আমার আলাপ। এখন মনে হচ্ছে আলাপ না হলেই ভাল ছিল।”

গার্গী অস্থির হয়ে বলল, “আহ্! আসল কথাটা বলবে তো?”

গৌতম আস্তে বলল, “কোন সোর্সে তপু খবর পেয়েছে, ওদের বাড়িতে পুলিশ রেড হবে শিগগির যে-কোনও সময়ে। আসলে ওর কোনো রাজনৈতিক দাদা কী কারণে চটে গেছে! পুলিসকে প্রেশার দিচ্ছেন ভদ্রলোক। তপুর একটা বিদেশী রিভলভার আছে। ক’দিনের জন্য ওটা সে আমার কাছে লুকিয়ে রাখতে চায়। এখন প্রব্লেম হলো, আমি ওকে না করতে পরিনি। আজ দুপুর বারোটা একটার মধ্যে ওটা তার আমাকে ওই ছাতিম গাছটার ওখানে দিয়ে যাবার কথা। একটা বেজে গেছে। তবু এল না। হয় তো কোনও কারণে দেরি করছে। আমি যাই।” গৌতম উঠে দাঁড়াল। “গার্গী, যদি তপু ওটা আমাকে দেয়, আমি তোমার কাছে বরং লুকিয়ে রাখতে চাই। রাখবে লক্ষ্মীটি? আমাদের বাড়ির ব্যাপার তো জানেনা!”

গার্গী ওর হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিল খাটে। “ছাড়ো! একটা অব্দি ওয়েট করতে বলেছিল। তুমি করেছ। তোমাকে ও তো আর দোষ দিতে পারবে না।”

“কিন্তু”। বাধা দিয়ে গার্গী বলল, “কিন্তু কিসের? ওসব বাজে ঝামেলায় পড়তে যেও না আর।”

 গৌতম হাসল। “বাজে ঝামেলা তোমার এখানেও কম নয়!”

 “তার মানে?”

 “তোমাকে দেখে ভীষণ লোভ হচ্ছে।”

“একদম অসভ্যতা করবে না বলে দিচ্ছি।”

 “গার্গী, তুমি জানো না তুমি কত সুন্দর।”

 “হুঁ, আমি ডানাকাটা পরী!”

গৌতম হঠাৎ তার দুধ ধরে তাকে কাছে টানল। গার্গী মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার আগেই সে তাকে চুমু খেল। কয়ে মুহূর্তের আচ্ছন্নতা। গার্গী তারপর আত্মরক্ষার চেষ্টা করল। কিন্তু সেই মুহূর্তে তার আর শরীর যেন আলাদা হয়ে গিয়েছিল। নিবিড় চুম্বনের এই অমর্ত্য স্বাদ তার জীবনে প্রথম। পুরুষের বুকের এই উত্তাপও কখনও এমন করে সে টের পায়নি। এই চুম্বনের উন্মাদনা তাকে অবশ করে দিচ্ছিল। একটু পরে সে জড়ানো গলায় কোনও ক্রমে উচ্চারণ করতে পারল “আহ্! জানলা-দরজা খোলা!”

গৌতম উঠে গিয়ে উত্তরের খোলা জানলাটা বন্ধ করে দিলো। তারপর দরজা বন্ধ করতে গিয়ে শুনল, গার্গী চাপা আর্তস্বরে বলছে, “আহ! ও কী করছ। তুমি?”

দরজা বন্ধ করে গৌতম গার্গীর ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল।

এক শরৎকালের উজ্জ্বল দুপুরে এভাবে যে আকস্মিকতা ঘটে গেল, কিছুক্ষণ গার্গীর কাছে তা পতন বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু মানুষের শরীরে প্রকৃতি কী। ঐশ্বর্য থরেবিথরে সাজিয়ে রেখেছে, এই পঁচিশ বছর বয়সে তার প্রথম অনুভূতি গার্গীকে আবিষ্ট করেছিল। সে বুঝতে পারছিল, স্বামীর কাছে এভাবে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করতে পারেনি। এমন নিঃশেষে চরম আত্মসমর্পণের মধ্যেই যেন নারীর যৌবনের সার্থকতা।

শেষ মুহূর্তে গভীর আশ্লেষে আর দুরন্ত আবেগের ঘোরে সহসা গার্গী অনুভব করল, তার মধ্যে এতদিন ধরে মাতৃত্বের গোপন কাকুতি ছিল। সেই কাকুতিই কি তাকে এই হঠকারিতায় পৌঁছে দিল?

ঘরের ভেতর আবছা আঁধার। গার্গীর নগ্ন শরীরের সবখানে গৌতমের উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ। জড়ানো গলায় গার্গী স্থলিত ও আর্তস্বরে অতিকষ্টে উচ্চারণ করল, “আমি মরে যাব গৌতম! এবার ছাড়ো!”…

কিছুক্ষণ পরে গৌতম বেরিয়ে গেল।

গার্গী বন্ধ জানলাটা খুলতে সাহস পেল না। সে কাঁপা কাঁপা হাতে চুল আঁচড়ে ঘষে যাওয়া টিপটা মুছে আবার পরল। ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে শরীর শুকিয়ে নিল। তারপর ট্রানজিস্টারটা আস্তে চালিয়ে বারান্দায় গেল। কেউ লক্ষ্য করেনি তো? একটু দ্বিধার সঙ্গে সে বাথরুমে ঢুকল।

গার্গীর মনে হচ্ছিল একটা নতুন শরীর সে পেয়েছে, যার সঙ্গে আগেরটার কোনও মিল নেই। সেই নতুন শরীরের সঙ্গে পুরনো মনকে মেলানো যাচ্ছে না। পুরনো মন বারবার বলছে, গার্গী! এ তুই কী করলি? তার নতুন মুন এসে বলছে, বেশ করেছি। আমার খুশি।

ঘরে ঢুকে সে খাটের বেডকভার নতুন করে পাতল। তারপর শুয়ে পড়বে ভাবল। সেই সময় উত্তরের জানালায় খটখট শব্দ হলো। গার্গী বলল, “কে?”

গৌতমের সাড়া এল। “শিগগির খোলো!”

গার্গী উঠে গিয়ে জানালা খুলে দেখল, গৌতম একটা জুতার বাক্স হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সে বাক্সটা জানালা গলিয়ে ভেতরে ঢোকাল। বলল, “এটা খাটের তলা-টলায় লুকিয়ে রাখো। তপু এসেছিল।”

বলেই সে চলে গেল। গার্গী দড়িবাঁধা বাক্সটা খুলতে গিয়ে খুলল না। খাটের তলায় ঢুকিয়ে রাখল। আজ থেকে নিজেকে তার মরিয়া ও সাহসী লাগছিল। এতক্ষণে সে খেতে গেল কিচেনে।…

.

০২.

ঘনশ্যাম কোনও-কোনও দিন দেরি করে বাড়ি ফেরে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সে ইঞ্জেকশন দেওয়ার কল অ্যাটেন্ড করতে যায় এবাড়ি ওবাড়ি। সে ডাক্তার নয়। কিন্তু ডাক্তার হাসপাতালের সংসর্গে ওষুধপত্র এবং ইঞ্জেকশনের অভিজ্ঞতা আছে তার। গার্গী বোঝে ঘনশ্যাম বাড়তি রোজাগারের ধান্দায় থাকে। কখনও তার এমন সন্দেহও হয়েছে, তার স্বামী হাসপাতালের ওষুধ-পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত কি না। কিন্তু ঘনশ্যাম এমন সিরিয়াস প্রকৃতির মানুষ তাকে জিজ্ঞেস করতেই বাধে গার্গীর। তা ছাড়া ঘনশ্যামের হাবভাব বা কথাবার্তায় কোনও লুকোচুরির ছাপ সে এ পর্যন্ত লক্ষ্য করেনি।

এদিন বিকেলে গার্গী মনে মনে গৌতমের প্রতীক্ষা করছিল। জীবনে প্রথম ভালবাসা তীব্র মাদকতাময় প্রতীক্ষা। কিন্তু বিকেল গড়িয়ে গেল, গৌতম এল না। হঠকারিতার জন্য সেকি লজ্জা পেয়েছে? গার্গী অস্থির হয়ে ঘরবার করছিল। সন্ধ্যার মুখে ঘনশ্যাম বাড়ি ফিরল। বলল, “ভেবেছিলুম, আমার দেরি দেখে বেড়াতে বেরিয়েছ। গৌতম আসেনি?”

গার্গী ঝাঁঝালো স্বরে বলল, “না। সবসময় খালি গৌতম-গৌতম কোরো না তো!”

“কী আশ্চর্য!” ঘনশ্যাম একটু হাসল। মুখে ক্লান্তির ছাপ। “ইয়ে–এক কাপ চা পেলে ভাল হতো।”

 “এমন করে বলছ কেন? কোনও দিন আমি চা করে খাওয়াই না?” গার্গী চটে গেল।

ঘনশ্যাম বারান্দায় একটা চেয়ার এনে বসে বলল, “আজ বড্ড ঝামেলা গেল। গ্রাম থেকে একটা মেন্টাল পেশেন্ট এসেছিল। সে এমন ভাঙচুর শুরু করল, আটকানো কঠিন! আমাকে বোতল ছুঁড়েছিল। একটুর জন্য বেঁচে গেছি। সেই নিয়ে তারপর এদিকে এক কাণ্ড। হরবাবুর ইনসমনিয়া। ঠিক ঘুমের ওষুধ নয়, নার্ভ ঠাণ্ডা রাখার জন্য ট্রাংকুলাইজার দিতুম। কাল দিয়েছিলুম নাইট্রাজেপাম। ১০ মিলিগ্রাম। ভদ্রলোক দুটো ট্যাবলেট খেয়ে কেলেংকারি করে বসেছিলেন। আসলে আনঅফিসিয়াল ডাক্তারি করার বিপদ আছে।”

গার্গী কিচেনের বারান্দায় একটা টেবিলে কুকার জ্বেলে কেটলি চাপাচ্ছিল। কথাগুলো শুনে বলল, “কী হয়েছে হরুবাবুর?”

“হয়নি, হতে পারত। খামোকা হরুবাবুর ভাইপো তপু আমাকে গালমন্দ করল।”

 “তপু?” গার্গী চমকে উঠেছিল। “সেই গুণ্ডাটা?”

ঘনশ্যাম শ্বাস ছেড়ে বলল, “হ্যা! ছেড়ে দাও। দেশে আইন-কানুন বলে তো আজকাল কিছু নেই। আমার চৌদ্দপুরুষের ভাগ্য, গায়ে হাত তোলেনি।”

গার্গী ফুঁসে উঠল। “তপুকে ইচ্ছে করলে পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারি জানো?”

ঘনশ্যাম তাকাল।

 গার্গী চাপা স্বরে বলল, “চা খেয়ে নাও, সব বলছি।”

ঘনশ্যামের যেন কোন ব্যাপারে কৌতূহল নেই, গার্গী বরাবর দেখে আসছে! ওর কেঠো নীরস চেহারার মতো যেন ওর মন। তবে নিজের কথাটা বেশি করেই বলার স্বভাব আছে। অন্যর কথায় তত কান করে না।

একটু পরে চায়ের কাপ ওর হাতে তুলে দিয়ে গার্গী আস্তে বলল, “তুমি এত গৌতম গৌতম করো। গৌতমের খাতিরেই জিনিসটা নিতে হলো। কী জিনিস জানেনা?”

ঘনশ্যাম আবার নিষ্পলক চোখে তাকাল শুধু।

গার্গী ফিসফিস করে বলল, “তপুর রিভলভার। একটা জুতোর বাক্সয় ভরে গৌতম দিয়ে গেল। খাটের তলায় লুকিয়ে রেখেছি।”

“রিভলভার।”

“তাই বলল গৌতম। তপুদের বাড়িতে নাকি পুলিশ-রেড হবে।” গার্গী দম নিয়ে বলল, “আমি সাহস পাইনি খুলে দেখতে। তুমি দেখবে তো দেখ গিয়ে। আর শোন! গৌতমকে বলে দিও, এভাবে যেন কক্ষণো”

ঘনশ্যাম কেমন হাসল। “ছেড়ে দাও। গৌতম ভাল ছেলে। রেখে গেছে। নিয়ে যাবে’খন।”

বাড়িতে বেআইনি সাংঘাতিক একটা চোরাই জিনিস থাকলে সব নিরীহ মানুষের মনে একটা দুরুদুরু ভয় আর উৎকণ্ঠা থাকা স্বাভাবিক। গার্গীর মনে সেটা ছিল না, তা নয়। কিন্তু গৌতমের কাছে নিঃশেষে আত্মসমর্পণে আর নিষিদ্ধ ভালবাসার গোপন সুখ সেটা চাপা দিয়ে রেখেছিল। ঘটনাটা ঘনশ্যামকে ঝোঁকের বশে বলে ফেলে সে গৌতমের ওপর রাগ দেখিয়ে আসলে কৈফিয়ত দিতেই চেয়েছিল। কিন্তু ঘনশ্যামের এই নির্বিকার ভাব তাকে আশ্বস্ত করল।

তবু গার্গী না বলে পরল না, “গৌতম যদি এত ভাল, তা হলে গুণ্ডাদের সঙ্গে মেশে কেন? আমার কিন্তু বড্ড ভয় করছে।”

ঘনশ্যাম চায়ে চুমুক দিয়ে ফের সেইরকম কেঠো হাসি হাসল। “যখন ওটা নিয়েই ফেলেছ, তখন আর ভয় কিসের? জেনেশুনেই তো নিয়েছ।”

“কী করব?” গার্গী আবার ঝাঁঝালো স্বরে বলল, “তোমার খাতিরের লোক। তুমি ওকে পাত্তা দাও বলেই–এখন তো বেশ বলছ! যদি ওকে না করে দিতুম, তুমি বলতে”

ঘনশ্যাম বলল, “ছেড়ে দাও।”

গার্গী স্বামীর এতখানি নির্বিকার আচরণ আজ সহ্য করতে পারছিল না। “না। তুমি শোনো, ওকে ডেকে নিয়ে এস। ওটা নিয়ে যেতে বলো। যদি কোনভাবে পুলিশ জেনে যায়, কী হবে বুঝতে পারছ? সেই দুপুর থেকে আমি তোমার এথ তাকাচ্ছি তুমি এলে আপদটা বিদায় করব ভেবে। না, না! তুমি এক্ষুণি যাও। ওকে বুঝিয়ে বলল, অন্যকে খামোকা বিপদের মুখে ফেলে দেওয়া কি ভাল?”

ঘনশ্যাম গা করল না। আস্তেসুস্থে চা খেয়ে সিগারেট ধরাল। তারপর একটু হাসল। “কই, চলো তো জিনিসটা দেখি।”

গার্গী দ্রুত ঘরে ঢুকে খাটের তলা থেকে জুতোর বাক্সটা বের করল। মশার উৎপাতের জন্য সব জানলা বন্ধ। ঘনশ্যাম ঘরে ঢুকলে সে দরজাটাও বন্ধ করে ফ্যান চালিয়ে দিল। ঘরে ষাট ওয়াট বাল্বের আলো। বলল, “তুমি খুলে দেখ। আমার ভয় করছে। সাবধানে খুলবে কিন্তু! যদি গুলি বেরিয়ে যায়, কেলেংকারি হবে।”

ঘনশ্যাম দড়িটা সাবধানেই খুলল। তারপর বাক্সটা খুলতেই দেখা গেল, ভেতরে দুটো বুট জুতো ঠাসাঠাসি করে রাখা।

গার্গী একটু অবাক হয়ে বলল, “জুতো! তবে যে গৌতম বলল–” বলেই সে হেসে ফেলল। “গৌতমের চালাকি! কোনও মানে হয়? মিছিমিছি ভয় দেখিয়ে গেল। সবসময় স্টান্ট, আর দুষ্টুমি।”

ঘনশ্যাম একটা জুতো বের করে ভেতরে হাত ভরল। তারপর একটা রুপোলি ছোট্ট আগ্নেয়াস্ত্র বের করল। গার্গী চমকে উঠে তাকিয়ে রইল। ঘনশ্যাম খুঁটিয়ে অস্ত্রটা দেখে আস্তে বলল, “চীনা রিভলভার।”

শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে গার্গী বলল, “কী করে বুঝলে?”

 “এই যে চীনা ভাষায় কী সব লেখা আছে। হ্যাঁমার নেই। কাজেই অটোমেটিক।” বলে সে গুলির কেসটা অনেক টেপাটেপি করে খুলল। কেসে গুলি ভরা নেই। কেসটা বন্ধ করে সে অন্য জুতোয় হাত ভরে কাগজের একটা মোড়ক বের করল। মোড়কের ভেতর অনেকগুলো খুদে গুলি। নেলপালিশের শিশির গড়ন। মাথায় সুচালো কালো একচিলতে জিনিস দেখিয়ে সে বলল, “এই কালচে অংশটা দেখছ, এটাই আসল গুলি। সিসের টুকরো। ট্রিগার টানলে এইটে বেরিয়ে যায়। মানুষের গায়ে লাগলে কী হয় জানো? মাংসের ভেতর ঢুকে চক্কর মেরে বেড়ায়। স্পিড শেষ হলে একখানে আটকে থাকে।”

গার্গী রুদ্ধশ্বাসে শুনছিল। বলল, “তুমি কী করে জানলে গো?”

তার কণ্ঠস্বরে ছটফটানি ছিল। ঘনশ্যাম একটু হাসল। “আমার এক ক্লাসফ্রেন্ড শ্যামল বউবাজার থানায় পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিল। আমার তো জানো সবতাতে আগ্রহ আছে। পিস্তল কাকে বলে, রিভলভারই বা কাকে বলে, সব বুঝিয়ে দিয়েছিল। পিস্তলে আঠারোটা পর্যন্ত গুলি থাকে। কিন্তু পিস্তলের গুলি বডিতে সোজা ঢুকে যায়। আর রিভলভারের নলের ভেতরটা ঘোরানো স্কুর প্যাঁচের মতো। তাই গুলি ঘুরতে ঘুরতে বেরিয়ে গিয়ে বডিতে ঢোকে। ঢুকেও কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ায়।

 “চুপ করো! আমার ভয় করছে।” গার্গী ব্যস্তভাবে বলল।

“যেমন ছিল, তেমনি রেখে দাও। আর শোনো, এক্ষুণি গিয়ে গৌতমকে ডেকে আনো।”

ঘনশ্যাম বাক্সটা আগের মত দড়ি দিয়ে বেঁধে বলল, “গৌতম কি আমাকে কিছু বলতে বারণ করেছিল?”

“না। জানালা দিয়ে বাক্সটা ঢুকিয়ে রাখতে বলল। তোমার কথা কিছু বলেনি।”

“থাক। রেখে দাও। ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। নিয়ে যাবে’খন।”

গার্গী বাক্সটা খাটের তলায় লুকিয়ে রেখে দরজা খুলে দিল। ঘনশ্যাম খাটে বসে সিগারেট টানতে থাকল। মুখে একই নির্বিকার উদাসীন ভাব।

গার্গী তাকে লক্ষ্য করছিল। একটু পরে বলল, “তুমি এখন কিছু খাবে?”

“নাহ্। ঘাটবাজারে নরেনের পাল্লায় পড়ে দুটো সিঙ্গাড়া খেয়েছি।” ঘনশ্যাম হাত বাড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে সিগারেটটা খুঁজে দিল। বলল, “নরেনেরও একই প্রব্লেম। এখান থেকে ট্রান্সফার হতে পারলে বেঁচে যায়। ওদের হেলেথ সেন্টারে ইউনিয়নবাজি। তার ওপর মস্তানদের গ্যাংয়ের হামলা। পরশু একটা ইনজুরি কেসের পেশেন্ট মারা গেল। তাই নিয়ে ভাঙচুর মারধর। আজকাল ল অ্যান্ড অর্ডার বলে কিছু নেই।”

ঘনশ্যাম হাসপাতালের গল্প করতে লাগল। রোজ তা-ই করে। গার্গীর মনে হয়, একটা রোবোটের সঙ্গে সে সংসার করছে। কোনও আবেগ নেই। জীবনের উত্তাপ নেই। এমন কি, রাতের শয্যায় শরীরে শরীর মেলানোর যে জৈব উন্মাদনা, তাও ঘনশ্যামের মধ্যে যেন নেই। খাওয়া-দাওয়া, অফিস যাওয়া ও ফিরে আসা বা জীবনযাপনের আরও অনেক রীতির মধ্যে তার যে রুটিনবাঁধা আচরণ, দাম্পত্য জীবনেও তা-ই। এ রাতে স্বামীর পাশে শুয়ে সহসা গার্গীর মনে পতনের পাপবোধ জেগে উঠেছিল এবং অনুশোচনায় আক্রান্ত গার্গী মনেপ্রাণে চাইছিল, তার স্বামী তাকে বাঁচাক পাল্টা তীব্র ভালবাসা দিয়ে। সে তার বুকে হাত রেখে গালে ঠোঁট ঠেকাল। কিন্তু ঘনশ্যাম সাড়া দিল না। একটু পরে তার নাক ডাকতে থাকল। তখন গার্গী ঘুরে শুল।

.

সকালে ঘনশ্যাম রোজকার মতো বাজারে গিয়েছিল।

গার্গী গৌতমের প্রতীক্ষা করছিল। একটু পরে সে নিজের আচরণে নিজেই অবাক হয়েছিল। এমন করে সে তো এতদিন কারও প্রতীক্ষা করেনি! ছটফটানি ভরা এই পথ চেয়ে থাকা তার জীবনে একেবারে নতুন। আগে গৌতম এলে তার ভাল লেগেছে। কিন্তু তার পথ তাকিয়ে থাকেনি। গার্গীর মনে হচ্ছিল, হঠাৎ সে নিজে নতুন হয়ে উঠেছে, তেমনি গৌতমও তার কাছে নতুন হয়ে উঠেছে।

আর এই ছটফটানির মধ্যে আনন্দভরা আবেগ আছে। নিষিদ্ধ সৌন্দর্যে সাজানো যৌবনপূর্ণ পৌরুষের প্রতি আহ্বান আছে।

গার্গীর মধ্যে সেই আবেগ ছিল, যে আবেগে বৃক্ষেরা ফুলবতী হয়। নদী হয় স্রোতবতী। আকাশ ভরে মেঘ জমে ওঠে। বৃষ্টির ধারা ভাসিয়ে দেয় ধুলোমাটির জগৎটাকে। এ আবেগ প্রকৃতির খুব গভীর গোপন আবেগ। দিন মাস ঋতু বর্ষচক্র বহমান সেই টানে। রোদ-জ্যোৎস্না-অন্ধকারের খেলা চলে জীবজগৎকে ঘিরে।

গার্গী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিল। গৌতম তাকে অসাধারণ সুন্দরী বলেছিল। সত্যি কি সে তা-ই?

“ওদিকে এক কাণ্ড!” ঘনশ্যামের সাড়া পেয়ে সে বেরুল। ঘনশ্যাম সাইকেল উঠোনে রেখে বাজারের থলে হাতে বারান্দায় উঠল। মুখটা গম্ভীর।

গার্গী বলল, “কী?”

 “কাল রাত্তিরে আবার বেধেছিল দুই গ্যাংয়ে। খুব বোমাবাজি হয়েছে।”

 গার্গী দ্রুত বলল, “হ্যাঁ। অনেক রাত্রে শব্দ শুনেছিলুম যেন।”

ঘনশ্যাম থলেটা তার হাতে গুঁজে দিয়ে একটু হাসল। “তপু হারামজাদা খুব বেড়েছিল। গেল!”

গার্গী চমকে উঠল। “গেল মানে?”

“ডেড। বডি ঝাঁঝরা।” ঘনশ্যাম চেয়ারে বসে সিগারেট ধরাল। “ক্লাব থেকে বাড়ি ফিরছিল। এদিকে কেলোরা ওত পেতে ছিল। বুড়ো শিবতলার ওখানে এসেছে, অমনি বোম চার্জ করেছে। তপুর সঙ্গেও কয়েকজন ছিল। থাকলে কী হবে? আনএক্সপেক্টে অ্যাটাক। পরে বোমাটোমা এনে খুব ফাটিয়েছে। ততক্ষণে কেলোরা ভ্যানিশ। পুলিশের যা নিয়ম–তিনঘণ্টা পরে এসে নিরীহ লোকদের ধরে হম্বিতম্বি–”

 “গৌতম?” গলা কেঁপে গেল গার্গীর। “গৌতমকে ধরেনি তো?”

ঘনশ্যাম আবার হাসল। “গৌতমের কী? সে তো আউট সাইডার। রাস্তায় দেখা হলো। বলল, যাচ্ছি। কথা আছে। আমি কিছু বললাম না অবিশ্যি।”

গার্গী শুকনো মুখে বলল, “তপু মরে গেছে?”

শুনছ কি? বডি প্রায় টুকরো টুকরো। একসঙ্গে কয়েকটা বোমার এক্সপ্লোশন!” ঘনশ্যাম ধোঁয়ার রিঙ পাকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল, “একেই বলে নিয়তি। কাল বিকেলে আমাকে শাসাচ্ছিল ব্যাটাচ্ছেলে। একবার ভাবলুম, যাব নাকি গোপেশ্বরবাবুর কাছে। ওঁরই চেলা ছিল শুওরের বাচ্চা। পরে ব্রতীনবাবার পার্টিতে ঢোকে। পারল ব্রতীনবাবু বাঁচাতে? ওর নাম গলাকাটা কালী। মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে ব্রতীনবাবুর সঙ্গে ঘোরে বডিগার্ড হয়ে। তবে জানো? কাঁটালিয়াঘাটে আবার অশান্তি শুরু হলো। বহরমপুরে থাকতেই শুনেছিলুম ডেঞ্জারাস জায়গা। অনেক চেষ্টা করেও ট্রান্সফার ঠেকাতে পারলুম না।”

গার্গী আস্তে বলল, “তোমার কী? তুমি তো কোনও পার্টিতে নেই।”

 “নেই। তবে কথা কী জানো “।

 “না। এখানকার কোনও ব্যাপারে তুমি নাক গলাবে না।”

ঘনশ্যাম একটু চুপ করে থেকে বলল, “আজকাল প্রব্লেম হলো, কোনও একটা পক্ষে না ঢুকলে মাথা বাঁচানো কঠিন। রাম মারবে, নয়তো রাবণ মারবে। হাসপিট্যাল কমপ্লেক্সে তিনটে ইউনিয়ন। তিনটের সঙ্গে লোক্যাল লিডারদের কানেকশান আছে। আমাদের মতো নিরীহ লোকেদের হয়েছে জ্বালা।”

সদর দরজা খোলা ছিল। গৌতম ঢুকেই দরজা বন্ধ করল।

 গার্গী কিচেনের সামনে মেঝেয় থলে থেকে তরিতরকারি ঢালছিল। একটা আধকেজিটাক পোনা এনেছে ঘনশ্যাম। সেটা নড়ছে। গার্গী গৌতমের দিকে তাকাল।

গৌতমের মুখ গম্ভীর। বারান্দায় উঠে বলল, “পুরো ছুটিটা আর কাটানো হলো না হয়তো।”

ঘনশ্যাম বলল, “কেন?”

 গৌতম গার্গীর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে চাপা স্বরে বলল, “আমি একটা অপকর্ম করে ফেলেছি। অবশ্য বৌদির কোনও দোষ নেই। তা হলেও শ্যামদাকে বলা উচিত ছিল। কাল বিকেলে একটা কাজে জড়িয়ে গেলুম। আসা হলো না। তো”–

গার্গী আস্তে বলল, “তোমার দাদাকে বলে দিয়েছি। আমার ভয় করছিল।”

গৌতম ঘনশ্যামের দিকে তাকাল। ঘনশ্যাম একটু হাসবার চেষ্টা করে বলল, “তপুটা বোকা। উইপনটা সঙ্গে থাকলে বেঁচে যেত হয় তো।”

গৌতম বলল, “আসলে পুলিশ-রেডের ভয়ে–আপনি শুনে থাকবেন, গোপেশ্বরবাবু তপুকে শায়েস্তা করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। রুলিং পার্টির এম এল এ-কে পুলিশ খাতির করতে বাধ্য। এনিওয়ে, এখন আমার প্রব্লেম হলো, আমি জানি না তপু কাকেও জানিয়ে গেছে কি না যে, ওটা আমাকে রাখতে দিয়েছিল।”

 গার্গী বলল, “কাকেও বলে গেলে সে তোমাকে চাইবে। তখন দিয়ে দেবে।”

ঘনশ্যামও সায় দিল। “হাঃ! ফেরত দেবে।” বলে সে গার্গীর দিকে ঘুরল। “চা করো। বেচারাকে বড় নার্ভাস দেখাচ্ছে।” সে খিকখিক্‌ শব্দে অদ্ভুত হাসল। তারপর উঠে দাঁড়াল। বসার ঘরে চলে গেল।

গার্গীর চোখে এই মুহূর্তে ভালবাসা ঝিকমিক করে উঠল। মুখ টিপে হেসে সে কুকার ধরাতে উঠে দাঁড়াল।

গৌতম জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল গার্গী হাসল কেন। কিন্তু ঘনশ্যাম এসে গেল একটা চেয়ার নিয়ে। চেয়ারটা রেখে বলল, “বসো। বি কাম অ্যান্ড কোয়ায়েট। একটা ট্রাংকুলাইজার দেব’খন। রাত্তিরে খেয়ে শোবে।”

গৌতম বসে বলল, “সত্যি শ্যামদা, বড্ড আনইজি ফিল করছি। এখানে এসে এভাবে অ্যান্টিসোস্যালদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ব চিন্তাও করিনি। আসলে তরুণ সংঘ ক্লাবে তপুর সঙ্গে আলাপ। তখনও জানতুম না ও একটা ক্রিমিন্যাল!”

ঘনশ্যাম বলল, “চেহারা হাবভাব দেখে মানুষ চেনা যায় না। মেন্টাল হসপিটালে তুমি তো গেছ। দেখেছ তো অত্যন্ত সুস্থ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে য়াকে, সে ভেতরে একজন মেন্টাল পেশেন্ট। তুমি অবিশ্যি পিডিয়াট্রিকের ডাক্তার হতে চলেছ।” আবার অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসল সে। “তোমার মধ্যে শিশু-শিশু ভাব আছে। শিশু চিকিৎসায় এটা কাজ দেবে। কিন্তু সেজন্য শিশু সাইকোলজিও তো পড়তে হয়েছে। মূল কথাটা হলো, সাইকোলজি! তোমার বাবা বলেন–”

গৌতম তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “প্লিজ শ্যামদা! বরং এই নিন, সিগারেট খান।”

“দাও। তবে জাস্ট আ মিনিট। চা খেয়ে ধরাব।”

গার্গী চুপচাপ চা করছিল। দু’পেয়ালা চা এনে দিয়ে আস্তে বলল, “তুমি ওটা। বরং নিয়ে যাও গৌতম। আমার বড্ড ভয় করছে।”

গৌতম বলল, “এখন নিয়ে যাওয়া তো রিস্কি। তাছাড়া রাখব কোথায়?”

 “ওটা তো জুতোর বাক্স। জুতো বলেই বাড়িতে কোথাও রাখবে।”

“মাথা খারাপ? ওটা নিয়ে ঢুকলেই জুতো দেখতে চাইবে বাড়িসুষ্ঠু।”

ঘনশ্যাম বলল, “হ্যাঁ। রিস্ক আছে। বরং দেখ কয়েকটা দিন। যদি তপু কাকেও জানিয়ে গিয়ে থাকে, সে চাইলে গোপনে ফেরত দেবে। ব্যস্! ল্যাঠা চুকে গেল।”

গৌতম বলল, “যদি কাকেও না জানিয়ে থাকে, আমি ওটা নিয়ে কী করব?”

গার্গী শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, “কাছেই গঙ্গা। গঙ্গায় ফেলে দেবে।”

ঘনশ্যাম মাথা নেড়ে সায় দিল। “ঠিক। ঠিক বলেছ। কাছেই মা গঙ্গা। সব পাপ বুকের তলায় লুকিয়ে ফেলবেন।” বলে সে সেইরকম অদ্ভুত শব্দে খিকখিক করে হাসতে লাগল।…

.

০৩.

 দুপুরে খেতে এসে ঘনশ্যাম বলল, “আজ ফিরতে দেরি হবে। আর্জেন্ট ব্যাপার। বহরমপুর যেতে হবে। ডি এম ও অফিস থেকে খবর এসেছে। আগামী পরশু থেকে পুজোর জন্য চারদিন ডি এম ও অফিস বন্ধ। ওদিকে ট্রেজারি ব্যাংক সবই বন্ধ। রিকুইজিশন ফাইল আর পে-বিল আজই চারটের মধ্যে সাবমিট করে আসতে হবে। নইলে কাল মাইনে-টাইনে হবে না। এদিকে আমাদের অফিস শুধু বিসর্জনের দিনটা বন্ধ।” সে হাতমুখ সাবান দিয়ে রগড়ে ধুয়ে এল অন্যদিনের মতো। স্নান করল না। খেতে বসে অভ্যাসমতো বকবক করতে লাগল। “ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো পেয়েছে আমাকে। ক্ল্যারিক্যাল কাজকর্মও করিয়ে ছাড়ে। কি না আমার সঙ্গে ডি এম ও অফিসের খুব খাতির। যখন ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ে ছিলুম, বেশ ছিলুম। ওয়েলফেয়ার অফিসার করে আমার বারোটা বাজালে। যত রাজ্যের পাগল নিয়ে কারবার। আজকাল ভয় করে, আমিও না পাগল হয়ে যাই।” হাসতে গিয়ে তার মুখের ভাত ছিটকে পড়ল।

গার্গী চুপচাপ শুনছিল। কোনও কথা বলল না।

খাওয়া শেষ হলে ঘনশ্যাম বাথরুমে আঁচাতে গেল। গার্গী এঁটো কুড়িয়ে থালা বাটি গেলাস সংলগ্ন কিচেনের ছোট্ট বারান্দায় রাখল। ঘনশ্যাম তোয়ালেতে হাত-মুখ মুছে সিগারেট ধরিয়ে বলল, “দুটো পাঁচে ট্রেন। কিন্তু এ লাইনের কোনও টাইমের বালাই নেই। ট্রেনে গেলে একটু আরামে যাওয়া যেত। বাসেই যাই। বড্ড ঝুলো ঝুলি ভিড়। দেখি।”

গার্গী এতক্ষণে বলল, “কখন ফিরবে?”

“ট্রেনে ফিরলে সাড়ে আটটা-নটা হয়ে যাবে। লাস্ট বাস অবিশ্যি ছটায়। পৌঁছুতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট।” বলে সে ঘরে ঢুকে পোশাক বদলাতে গেল।

গার্গী স্বামীকে দেখছিল। ঘরে ভেতর শুধু আন্ডারওয়্যার পরা ঘনশ্যামের শরীর যেন মানুষের নয়। পুরুষ অবয়বেরই একটা বিকৃতি। পরমুহূর্তে গার্গীর মনে হলো, শরীর সম্পর্কে তার এই অনুভূতি নতুন আর আকস্মিক। এতদিন তো সে তার স্বামীর শরীর সম্পর্কে এমন সচেতন ছিল না! পলকের জন্য গৌতমের সুঠাম শরীরের লাবণ্য তার চেতনায় এসে আছড়ে পড়ল। একটু বিব্রত বোধ করল সে।

প্যান্টশার্ট পরে সব্যভব্য হয়ে ঘনশ্যাম বেরিয়ে এল। বলল, তোমাকে অমন দেখাচ্ছে কেন? শরীর খারাপ নাকি? খেয়ে নাও।”

গার্গী বলল, “খাচ্ছি।”

ঘনশ্যাম সাইকেলটা বারান্দায় নিয়ে এল। ব্যাকসিট থেকে ব্রিফকেসটা খুলে নিয়ে একটু ইতস্তত করে বলল, “জুতোর বাক্সটা আছে, না গৌতম নিয়ে গেছে?”

“আছে।”

“থাক। ও নিয়ে ভেবো না। গৌতম যা করার করবে। তুমি খেয়ে নাও।” বলে ঘড়ি দেখে ঘনশ্যাম তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল।

গার্গী ছোট্ট উঠোনটুকু পেরিয়ে আজ স্বামীকে বিদায় দেওয়ার ভঙ্গিতে সদর দরজায় গেল। ঘনশ্যাম পিছু ফিরল না। সংকীর্ণ পিচ রাস্তা ধরে হনহন করে হাঁটছিল সে। একটু দূরে পার্ক। পার্কের পাশ দিয়ে বড় রাস্তায় অদৃশ্য হলে শ্বাস ছেড়ে গার্গী দরজা বন্ধ করল।

তারপর তার বুক ধড়াস করে উঠল। শরীর ভারী বোধ হলো। আজ দুপুরে যদি গৌতম আসে?

ভাল করে খেতে পারল না গার্গী। এঁটো থালাবাসন রোজকার মতো ধুয়ে রাখল না। ঘনশ্যাম মুখে অবশ্য একটা কাজের মেয়ে রাখতে চেয়েছিল। গার্গীই রাখতে দেয়নি। ছোট্ট একটা সংসারে কী এমন কাজ? বহরমপুরে থাকার সময়ও কাজের মেয়ে ছিল না। গার্গী বারান্দায় কিছুক্ষণ আনমনে দাঁড়িয়ে থাকার পর ঘরে ঢুকল। আয়নার সামনে নিজেকে দেখতে গেল। আর সহসা তাকে একটা উন্মাদনা ভর করল। সে মুখে একটু স্নো ঘষল। কপালে নতুন করে টিপ পরল। তারপর কবে বহরমপুরে কেনা সেন্টের শিশি খুলে গলায় বুকে কাঁধে ছড়াল। তার হাত কাঁপছিল।

সে বিছানায় বসে বালিশে হেলান দিয়ে একটা পুরনো সিনেমা পত্রিকা পড়ার চেষ্টা করল। মন বসল না। সেই দুরুদুরু বুকের প্রতীক্ষা তাকে অস্থির করছিল। ট্রানজিস্টারটা আস্তে বাজছিল। সে মাঝে মাঝে জানলায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ভয়াল ছাতিম গাছটা আজ জৈব হয়ে উঠেছে এবং তার দিকে কেমন চোখে তাকাচ্ছে। আজ বাতাস বন্ধ। গঙ্গার ধারের বনভূমি শ্বাস বন্ধ করে কী যেন ঘটবার প্রতীক্ষা করছে। আকাশ গনগনে নীল। আর সেই ব্যাপক শূন্যতা বেয়ে কী একটা পাখি ওঠানামা করছে। গার্গীর মতো–ঠিক যেন গার্গীর মতোই কোথাও পৌঁছুনোর ব্যাকুলতা।

গৌতম এল যখন, তখন প্রায় সাড়ে তিনটে বাজে। বলল, “ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। শোনো, শ্যামদা ফিরলে নৌকো করে পঞ্চমুখী শিবের মন্দিরে বেড়াতে যাব। দারুণ লাগবে। মাত্র মাইল তিনেকের নৌকোযাত্রা। ফেরার সময় কারেন্টের টানে পনের মিনিটের বেশি লাগবে না।”

গার্গী আস্তে বলল, “আমি যাব না।”

গৌতম তার গাল টিপে দিয়ে বলল, “ব্যাপার কী? শ্যামদার সঙ্গে ঝামেলা হয়ে গেছে নাকি?” বলেই সে হাসল। “সেন্টের গন্ধে জ্বালিয়ে দিলে যে! তার মানে, হাজব্যান্ডের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করেছ।”

গার্গী চোখ পাকিয়ে বলল, “শট আপ! বাজে কথা বোলো না।”

“মাই গুডনেস!” গৌতম নড়ে বসল। “বারান্দায় সাইকেলও দেখলুম। নাহ্, কেটে পড়ি। শ্যামদা কোথাও সুঁই ফোঁটাতে গেছে নিশ্চয়।”

গার্গী তার হাত ধরে টেনে বসাল। তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে বলল, “ও অফিসের আর্জেন্ট কাজে বহরমপুর গেল। ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।”

গৌতম মিটিমিটি হেসে বলল, “বাহ্! তাহলে তো আমরা অনায়াসে নৌকোভ্রমণ করে আসতে পারি। নৌকো বলা আছে। বিলিভ মি, পাঁচটাকা অ্যাডভান্সও করেছি। ওই ছাতিমতলার ঘাটে চারটেয় অপেক্ষা করে ঝাব্বুলাল। ছই দেওয়া নৌকো। রোদ লাগলে ভেতরে বসব।” সে গার্গীকে দু’হাতে টেনে চুমু খেল। গার্গী বাধা দেওয়ার ভান করল মাত্র। গৌতম বলল, “নাও! ঝটপট শাড়ি বদলে নাও। আর শোনো, কক্ষণো ওসব সেন্টফেন্ট মাখবে না। তোমার শরীরের একটা আশ্চর্য সুন্দর গন্ধ আছে। তুমি জানো না।

গার্গীর মনে একটা আবেগ এসেছিল। যৌবন যখন যৌবনকে ছোঁয়, তখন এই আবেগটা আসে একটা বিস্ফোরণের মতো। সে বলল, “তুমি বাইরে যাও।”

“কেন? আমার সামনে শাড়ি বদলাতে লজ্জা! ঠিক আছে। আমি চোখ বন্ধ করছি।”

“না।“

গৌতম হাসল। “কিন্তু জানালা খোলা। অন্য কেউ দেখে ফেলতে পারে।”

গার্গী উঠে গিয়ে জানলাটা বন্ধ করল। বলল, “যাও! বেরোও।”

 গৌতম প্রেমিকের গলায় বলল, “না। প্লিজ গার্গী! আমাকে দেখতে দাও।”

 “কী দেখবে?”

“তোমাকে।”

 “শুধু অসভ্যতা!”

“না গার্গী! তোমার শরীর–ডোন্ট ফরগেট, আমি হাফ ডাক্তার তোমার মতো এমন মিনিংফুল বডি আমি আর দেখিনি। তুমি তো জানো, আমাকে কত ডেডবডি ঘাঁটতে হয়েছে ইভন, তোমার বয়সী কত সুন্দর মেয়ের বডি! সব বডিই নিছক বডি।”

গার্গী চোখে হেসে বলল, “আমার ডেডবডি দেখো!”

গৌতম উঠে গিয়ে তার মুখ চেপে ধরল। “না! ও কথা বোলো না!” তারপর বারবার চুমুতে তার সারা মুখ, গলা, কাঁধ ভরিয়ে দিল। গার্গী জড়ানো গলায় বলল, “আহ্! কী করছ? দরজা খোলা।”

গৌতম দরজা বন্ধ করল। তারপর কালকের মতোই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল গার্গীর ওপর। দু’হাতে তাকে তুলে নিয়ে খাটে শুইয়ে দিল। গার্গী বাধা দিতে পারল না। যৌবন যৌবনের মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল।

কিছুক্ষণ পরে গৌতম আস্তে বলল, “নৌকো ওয়েট করছে। ছাড়ো!”

গার্গী অস্ফুটস্বরে বলল, “করুক।”

“প্লিজ! ছাড়ো!”

“না। তোমাকে ছাড়তে ইচ্ছে করছে না।”

গৌতম তার কপালে চুমু দিয়ে বলল, “হঠাৎ কেউ এসে পড়তে পারে। ছাড়ো লক্ষ্মীটি!”

“আমার ঘুম পাচ্ছে।”

গৌতম হাসল। “সর্বনাশ! এই অবস্থায় ঘুমোবে নাকি?”

“হুঁউ।“

“আয়নায় দেখ, আমরা কী অবস্থায় আছি।”

গার্গী মুখটা একটু ঘুরিয়ে আয়নার প্রতিবিম্বিত দুটি নগ্ন শরীর দেখেই প্রচণ্ড লজ্জায় গৌতমকৈ ঠেলে দিল। তারপর হাত বাড়িয়ে সায়া কুড়িয়ে নিজেকে ঢাকল।…

.

ছাতিমতলার ঘাটে ঝাঝুলাল মাঝি নৌকো বেঁধে বিড়ি টানছিল। এখানটা পুরনো দহ। তাই স্রোত নেই। গৌতম নৌকোয় উঠে হাত বাড়িয়ে গার্গীকে উঠতে সাহায্য করল। নৌকো চলতে থাকল তীর ঘেঁষে। স্রোতের উজানে হলেও তীরের কাছে স্রোতের গতি মন্থর। বিকেলেও শরৎকালের রোদটা চড়া। কিন্তু গার্গী ছইয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এতদিনের আনন্দহীন একঘেয়ে জীবন এমন করে স্বর্গের দরজা খুলে যাবে সে কল্পনা করেনি। সে মুগ্ধ চোখে আর আবিষ্ট মনে নিসর্গ দেখছিল।

গৌতম পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল। চাপা স্বরে বলল, ভাবতে খারাপ লাগছে, আবার কলকাতা ফিরে যেতে হবে। আবার সেই ন্যাস্টি পরিবেশ, রোগীর ভিড়, যত রকমের কদর্য সব অসুখ। নেচার মানুষকে একটা বডি দিয়েছে। অথচ সেই বডির মধ্যেই যেন হেল অ্যান্ড হেভেন। আনন্দ আর যন্ত্রণা।”

গার্গী বলল, “তোমাকেও দেখছি ওর স্বভাব পেয়েছে। খালি বকবক।”

 “তুমিই হয়তো শ্যামদার মতো আমাকেও ফিলোজফার বানিয়ে ছেড়েছ!”

“তার মানে?”

“তোমাকে লক্ষ্য করে বড় কথা বলতে ইচ্ছে করে। নাকি তুমি প্রতিবাদ করো না বলে?”

“আমি ওসব বুঝি না।”

কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর গৌতম বলল, “তখন একটা কথা ভাবছিলাম।”

“কী?”

“আমার ভবিষ্যৎ পেশা ডাক্তারি। আমি মানুষের বডি সম্পর্কে পড়াশুনা করছি ছ’বছর ধরে। এটা শেষ বছর। কিন্তু মানুষের বডির একটা মিনিংফুল সাইড আছে–তখন যা বলছিলুম, এটা এমন করে বুঝিনি। তুমি আমাকে এই জ্ঞানটা দিয়েছ।”

সে হাসতে লাগল। গার্গী বলল, “চুপ! লোকটা ওভারহিয়ার করছে।”

“নাহ। ও এসব বোঝে না।”

 “বোঝে না। তোমার মত ন্যাকা।”

 “দারুণ বলেছ, আমি এতদিন সত্যি ন্যাকা ছিলুম।”

 “হুঁ, গাল টিপলে দুধ বেরুত। ওসব চালাকি ছাড়ো তো।”

“কেন চালাকি বলছ?”

 গার্গী মুখ ঘুরিয়ে খুব আস্তে এবং চোখে হেসে বলল, “তুমি ওসব ব্যাপারে এত এক্সপার্ট হলে কী করে? নিশ্চয় এক্সপিরিয়েন্স আছে।”

গৌতম দ্রুত বলল, “বিলিভ মি। থিওরিটিক্যাল নলেজ। তাছাড়া ডাক্তারদের সেক্সোলজি পড়তে হয়। পুরো সিস্টেমটা জানা হয়ে যায় কম বয়সেই। তাছাড়া আমাদের কাজটা তো পোশাকের ভেতরকার হিউম্যান বডি নিয়েই। সার্জারির প্রোফেসর চন্দ বলতেন মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণীর প্রথম তফাতটা হলো পোশাকের। এটাই কিন্তু ফান্ডামেন্টাল ডিফারেন্স বিটুইন ম্যান অ্যান্ড অ্যানিম্যাল।”

“আহ্! আবার বকবক?”

“না গার্গী! ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা কর। নেচারে সব কিছু নেকেড। ওই গাছগুলো দেখ।”

“এদিকটা এত জঙ্গল কেন?”

“গভর্মেন্ট প্রজেক্ট। ফরেস্ট ডিপার্টের কীর্তি আর কী?”

 “ওটা কি লেক নাকি?”

গৌতম হাসল। “বলতে পারো। লোক্যাল ল্যাঙ্গুয়েজে বিল বলে। প্রচুর বুনোহাঁস আসে শীতের সময়।”

ঝাব্বুলাল বলল, “এখোনো কুছু কুছু হাঁস দেখতে পাবেন বাবু। সরকার কানুন করল কী, উও হাঁস মারলে জেল হোবে। লেকিন বন্দুকবাজি কৌন রোখেগা? শিকারিলোক দুড়ুম উড়ুম করে বন্দুক মারে।”

গার্গী বলল, “সিনেমায় ঠিক এমনি সিনারি দেখেছি। আচ্ছা, এখানে শুটিং করে না?”

গৌতম হাসতে হাসতে বলল, “তোমার নায়িকা হতে ইচ্ছা করছে বুঝি? ঠিক আছে। আমি নায়ক হব। গান গাইব, আ যা আ যা”

গান থামিয়ে দিয়ে গার্গী বলল, “ওখানে নৌকো যায় না?”

“কেন? ওই তো পঞ্চমুখী শিবের মন্দির দেখা যাচ্ছে। অসাধারণ সাজানো বিউটিস্পট!”

গার্গী গম্ভীর হয়ে বলল, “নাহ্। বরং লেকে চলো!”

 “কী আশ্চর্য! ওটা লেক নয়।”

 “আমি মন্দিরে যাব না।”

 “কেন?”

গার্গী আস্তে এবং ঝাঁঝাল স্বরে বলল, “ন্যাকামি কোরো না। স্নান না করে–”

“আই সি!” গৌতম ওর চোখে চোখ রেখে বলল, “ওসব সুপারস্টিশন ছাড়ো তো! পাপ-টাপ বোগাস ব্যাপার! আমরা তো ধম্ম করতে যাচ্ছি না। জাস্ট সাইটসিইং!”

“না।” গার্গী গোঁ ধরে বলল। “আমি নৌকো থেকে মন্দিরে উঠব না। তুমি একা যেও।”

গৌতম মনে মনে চটে গিয়ে বলল, “সেটা আগে ভাবনি। এতদূর এসে ঠিক আছে ঝাব্বুলাল! বিলে ঢোকা যায় না নৌকো নিয়ে?”

ঝাব্বুলাল বলল, “নেহি বাবু। সুলুইস্ গেটের তলায় নাও ঢুকতে তকলিফ হবে। আউর বহত দাম-উম আছে পানির তলায়। পানিকি জঙ্গল।”

“তাহলে এক কাজ করো। ওখানে ভেড়াও। আমরা বরং ফরেস্টের কাছে একটু বেড়িয়ে আসি।”

ঝাব্বুলাল অবশ্য খাটুনি থেকে রেহাই পেল। সামনের উজানে আধ মাইল প্রচণ্ড স্রোত। সে বাঁ-দিকে ঘাসে ঢাকা জমিতে নৌকো ভেড়াল! জমিটা ঢালু। ওপরে বাঁধ। বাঁধ থেকে বন দফতরের জঙ্গল বিলের সমান্তরালে এগিয়ে গেছে। রেল লাইন অব্দি। রেললাইনের ব্রিজটা শেষ বিকেলের গোলাপি রোদে ঝকমক করছিল।

জঙ্গলের ভেতরটা ফাঁকা। কোনও ঝোঁপঝাড় নেই। বাঁধ থেকে দুজনে হাত ধরাধরি করে নেমে গেল। জঙ্গলের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে গৌতম চাপা হেসে বলল, “তোমাকে আবার যদি অশুচি করে দিই?”

গার্গী চমকে উঠে বিষমুখে বলল, “না গৌতম! প্লিজ। আর ওসব কথা নয়।”…,

এখানে প্রকৃতি। নগ্ন নির্জন নিসর্গভূমি। এখানে যৌবন যৌবনকে কাছে পেলে সময়ের চেতনা মুছে যায়। গার্গী তার পরিবার, তার ছোটবেলা, দুঃখদুর্দশায় বেড়ে ওঠা জীবন আর তার সব গোপন আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যর্থতার কাহিনী মন থেকে উজাড় করে শোনাচ্ছিল গৌতমকে। এতদিন পরে মনকেও প্রকৃতিক নগ্নতার মতো অবাধে নগ্ন করে দিয়ে গার্গী তৃপ্তি পাচ্ছিল। ..

আর এই ভাবেই কখন পঞ্চমীর চাঁদের ফালি আকাশে আঁকা হলো। ঝাবুলালের ডাক শুনে দুজনে নৌকোয় ফিরল। গৌতমের সঙ্গে টর্চ ছিল।

ছাতিমতলায় তাদের নামিয়ে দিয়ে বখসিস নিয়ে ঝাব্বুলাল সদরঘাটের দিকে। চলে গেল।

পৌনে সাতটা বাজে। এখনও ঘনশ্যামের ফেরার সময় হয়নি। সরকারি কোয়ার্টার এলাকা নির্জন। শুধু টিভির চাপা শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিনদিক থেকে আবছা আলো পড়েছে ঘনশ্যামের এল টাইপ একতলা কোয়ার্টারের ওপর। নীচের অংশটা অন্ধকার। প্রত্যেকটা কোয়ার্টারের চারপাশে খানিকটা করে ফাঁকা জমি। কোথাও কিছু গাছ। সদর দরজার ওপর টর্চের আলো ফেলেই গৌতম চমকে উঠল। “এ কী! তালাটা–”

গার্গী দেখল, তালাটা খুলে একটা কড়ায় ঝুলছে। গৌতম ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর টর্চের আলো ফেলে চমকানো গলায় বলল, “সর্বনাশ হয়েছে গার্গী!”

শোবার ঘরের দরজার তালা খোলা এবং ঝুলছে। গার্গী মাথা ঠাণ্ডা রেখে ঘরে ঢুকে সুইচ টিপে আলো জ্বালতে গেল। আলো জ্বলল না। গৌতম টর্চের আলো ফেলে বলল, “এক মিনিট। মেন সুইচ অফ করে গেছে চোর!” সে মেন সুইচ অন করে দিলে আলো জ্বলল। বারান্দায় সাইকেলটা নেই। গৌতম বলল, “আহা! হাঁ করে দাঁড়িয়ে কী দেখছো? আর কী চুরি গেছে দেখবে তো?”

কমদামি স্টিলের আলমারির তালার কাছে কয়েকটা আঁচড়। চোর আলমারিটা খোলার চেষ্টা করেছে। পারেনি। গার্গী কোণে রাখা বাক্স আর সুটকেসের কাছে গিয়ে ভাঙা গলায় বলল, “আমার সুটকেসটা নেই।”

“দামি কিছু ছিল?”

 “না।”

“আর কিছু নিয়েছে নাকি দেখ।”

গার্গী খাটের তলায় উঁকি দিল। গৌতম টর্চ জ্বালল। সেই জুতোর বাক্সটা নেই।…  

.

০৪.

 ঘনশ্যাম বাড়ি ফিরেছিল সওয়া সাতটা নাগাদ। তাকে দেখেই গার্গী কান্না জড়ান গলায় বলেছিল, “সব দোষ আমার। পঞ্চমুখী শিবের মন্দির দর্শনে গিয়ে–”

তাকে থামিয়ে গৌতম সংক্ষেপে ঘটনাটা বলেছিল ঘনশ্যামকে। ঘনশ্যাম ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। কিন্তু সাইকেল হারানোর কথা শুনে সে একটু চ্যাঁচামেচি করেছিল। “মন্দির দর্শনের যাবার আর দিন পেলে না? দেখ তো এবার আমি রোজ কী করে অফিসে যাব? পাক্কা এক কিমি রাস্তা! একটা নতুন সাইকেলের যা দাম হয়েছে। নাহ্, তোমার আর বুদ্ধিসুদ্ধি হলো না এ বয়সেও। একটেরে এই বাড়ি, পেছনে জঙ্গল। কতদিন পইপই করে বলেছি, চোর ডাকাতের জায়গা। মেরে ফেললেও একটা লোক এসে জিজ্ঞেস করবে না কী হয়েছে।”

সেটা ঠিক। তাছাড়া টিভিতে এই সময় কী একটা দারুণ সিরিয়াল চলছে। আশেপাশের কোয়ার্টার থেকে জনপ্রাণীটি বেরুনোর আশা নেই। গার্গীও ততটা মিশুকে স্বভাবের মেয়ে নয়।

গৌতম বলছিল, “থানায় খবর দেওয়া দরকার, শ্যামদা। আমি বৌদিকে, একা ফেলে যেতে পারছিলুম না।”

ঘনশ্যাম বাঁকা মুখে বলেছিল, “পুলিশ কিছু করবে না। তবে সাইকেলটা যদি দয়া করে উদ্ধার করে দেয়। দেখি বড়বাবুকে বলে।”

গার্গী ভাঙাগলায় বলেছিল, “সেই জুতোর বাক্সটা নিয়ে গেছে!”

ঘনশ্যাম চমকে উঠেছিল প্রথমে। পরে বলেছিল, “নতুন জুতো দেখে নিয়ে গেছে। তবে বোঝা যাচ্ছে চোর একা ছিল না। গৌতম তুমি আছ যখন, আরও কিছুক্ষণ থাকো। আমি থানায় যাই।”

ঘনশ্যাম তক্ষুণি টর্চ হাতে বেরিয়ে গিয়েছিল। গৌতম বলেছিল “মাঝখান থেকে আমারই সর্বনাশ হলো হয়তো। তপু যদি কাকে বলে গিয়ে থাকে, আমার কাছে ওর ফায়ারআর্মস আছে, আমার প্রব্লেম হবে। ওর গ্যাংয়ের ছেলেগুলো ডেঞ্জারাস।”

গার্গী ঝাঁঝালো কান্নাজড়ানো গলায় বলেছিল, “তোমার পাপেই তো”

“ভ্যাট! কী পাপ? অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট।”

একটু পরে গার্গী বলেছিল, “সুটকেসটায় আমার অনেক পুরনো জিনিস ছিল। ছোটবেলার কত সব স্মৃতি। সাইকেল-ফাইকেল নিল, নিল। ওটা কেন, নিল?”

কত নির্জন নিরিবিলি সময়ে গার্গী সুটকেসটা খুলে স্মৃতিকে সামনে সাজিয়ে বসে থাকত। পুরনো গন্ধ তাকে আবিষ্ট করত। সে আবার হু হু করে কেঁদে উঠেছিল। গৌতম তার পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। “চোরেদের স্বভাব হলো, যা হাতের কাছে পাবে নেবে।”

পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর রঞ্জিত মিত্র আর দুজন কনস্টেবলকে নিয়ে ঘনশ্যাম এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে এসেছিল। রঞ্জিতবাবু তালাগুলো পরীক্ষা করে বলেছিলেন, “এসব কমন তালা সহজেই খোলা যায়। ঘরের দরজার তালাটা নামী কোম্পানির। কিন্তু এ পর্যন্ত চারটে বার্গলারি কেসে দেখলুম, এই তালাও চোরেরা সহজে খুলে ফেলছে।”

সাইকেলটা অনেক বছরের পুরনো। মোটামুটি একটা বর্ণনা দিয়েছিল ঘনশ্যাম। রঞ্জিতবাবু খুব আশ্বাস আর পরামর্শ দিয়ে গেলেন। কেসডায়েরি থানায় লিখিয়ে এসেছিল ঘনশ্যাম।

সে রাতে গার্গী কিছু খেল না। ঘনশ্যাম তাকে খাওয়াতে পারল না। শেষে রাগ করে নিজেও খেল না। সে নরম স্বভাবের মানুষ, তাতে রাগ করে উপোস থাকার পাত্র নয়। কিন্তু আসার পথে যেটুকু খাওয়া হয়েছে, তাই যথেষ্ট যতক্ষণ সে জেগে থাকল, সাইকেলটা নিয়ে আপন মনে বকবক করছিল। সাইকেলটা তার জীবনের অনেক সুখদুঃখের স্মৃতি।

গার্গীরও ইচ্ছে করছিল, বলে যে, স্যুটকেসটাও তার কাছে তাই। কিন্তু চুপচাপ পাশ ফিরে শুয়ে রইল।

ভোরবেলা গৌতমের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙল ওদের। গৌতম পেছনের জানলা দিয়ে ডাকছিল। এ রাতে ওই জানলাটা বন্ধ ছিল। ঘনশ্যাম মশারি থেকে বেরিয়ে গিয়ে জানালা খুলল। দেখল, গৌতম একটা স্যুটকেস আর সেই জুতোর বাক্সটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চাপাস্বরে সে বলল, “ঝোঁপের মধ্যে পড়েছিল। শিগগির দরজা খুলুন।”

ঘনশ্যাম সদর দরজা খুলে দিলে গৌতম ঢুকল। একটু গলা চড়িয়ে বলল সে, “বৌদি! তোমার সুটকেস! দেখ কিছু চুরি গেছে নাকি।”

গার্গী ছটফটিয়ে বেরিয়ে এল। ঘনশ্যাম গুম হয়ে বলল, “উইপনটা আছে তো?”

গার্গীর হাতে সুটকেসটা দিয়ে গৌতম বিষণ্ণ হাসল। “নাহ্! জুতোসুষ্টু মেরে, দিয়েছে চোরেরা। খালি বাক্সটা পড়েছিল। আসলে আমি সারারাত ঘুমতে পারিনি। খালি মনে হচ্ছিল, এমন কিছু ঘটবে। বিশেষ করে বৌদির স্যুটকেসটা–”

গার্গী সুটকেস খুলে দেখছিল। একটু খুশিমাখা মুখে বলল, “সব আছে। নোবার মতো কিছু তো নেই এর মধ্যে।”

গৌতম বলল, “সাইকেলে নিশ্চয় তালা, দেওয়া ছিল না শ্যামদা?”

 ঘনশ্যাম আস্তে বলল, “নাহ্।”

 “কাজেই সাইকেলে চেপে পালিয়ে যাওয়া সোজা।” গৌতম হাসবার চেষ্টা করল। “আপনার সাইকেলটার যা অবস্থা ছিল দেখেছি। এবার বরং নতুন একটা কেনা হয়ে যাবে।”

কথাটা বলেই সে জুতোর বাক্সটা নিয়ে চলে গেল। গার্গীর মধ্যে এতক্ষণে স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছিল। ডালাভাঙা স্যুটকেসটা ঘরে রেখে এসে সে বলল, “নাও যা হবার হয়ে গেছে। সব আমারই দোষ। আমাকে ইচ্ছে হলে মারো।” বলে সে বাথরুমে ঢুকল।

বেরিয়ে আসার পরও দেখল, ঘনশ্যাম উঠোনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

গার্গী বলল, “আশ্চর্য মানুষ তুমি! সারারাত কিছু খাওনি। মুখ ধুয়ে এসো। লুচি করে দিচ্ছি। আর সাইকেল গেছে–বেশ তো! আমার কাঁকন দুটো বেচে আমিই তোমাকে নতুন সাইকেল কিনে দেব। রাগ করে বলছি না। আমার মায়ের দেওয়া গয়না। আমার গয়না পরতে ভাল লাগে না।”

ঘনশ্যাম গলার ভেতর বলল, “নাহ। ও সব কথা আমি ভাবছি না। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, তপু হারামজাদার গ্যাংয়ের কেউ গোপনে আড়ি পেতে ব্যাপারটা সম্ভবত দেখেছিল। সে-ই এ কাজ করেছে। সাইকেল চুরি বা তোমার স্যুটকেস চুরিটা একটা চালাকি। কে জানে, সাইকেলটা গঙ্গায় ফেলে দিয়েছে। কিনা। হুঁ, শুধু জুতোর বাক্স নিয়ে গেলে তার একটা রিস্ক ছিল। ভেবেছিল গৌতম তপুর চেলাদের জানিয়ে দেবে। গৌতম কথাটা জানালে ওদের মধ্যে পরস্পর সন্দেহ ঝগড়াঝাটি বেধে যাবে। কে জিনিসটা হাতাল?” শ্বাস ছাড়ল ঘনশ্যাম। “ক্রিমিনালদের স্বভাব আমি জানি। স্বার্থের জন্য ওরা জোট বাঁধে। কিন্তু প্রত্যেকে ওরা আলাদা করে নিজের নিজের ফিকির মাথায় নিয়ে ঘোরে। দরকার হলে একজন আরেকজনকে ল্যাং মারতে দেরি করে না।”

“আহ্! আবার বুকনি ঝাড়তে শুরু করলে বাসিমুখে!”

 ঘনশ্যাম গম্ভীর মুখে বাথরুমে ঢুকল।…

.

এদিন সাইকেল নেই বলে ঘনশ্যাম একটু আগেই অফিসের জন্য বেরুচ্ছিল। গার্গী ইতস্তত করে বলল, “আমার একা থাকতে ভয় করবে, জানো? এরপর কখন ডাকাত বদমাশ এসে আমাকে মেরে রেখে গেলেই হলো।”

ঘনশ্যাম বলল, “গৌতমকে বলে যাচ্ছি বরং।”

“খালি গৌতম আর গৌতম!” গার্গী ঝেঁঝে উঠল। “একে তো সবার আমাকে দেখে চোখ টাটায়, তারপর কিছু স্ক্যান্ডাল রটিয়ে ফেললেই হলো। তুমি কোয়ার্টার বদলানোর চেষ্টা করো বরং।”

ঘনশ্যাম হাসল। “কোথায় কোয়ার্টার? মেন্টাল স্টাফের জন্য কোয়ার্টারই নেই। এটা জেনারেল স্টাফের জন্য। লাকিলি খালি ছিল বলে ম্যানেজ করেছি। তা-ও আনঅফিসিয়ালি। যে কোনও দিন জেনারেল স্টাফের কেউ বদলি হয়ে এলে পাত্তাড়ি গুটোতে হবে।”

গার্গী অবাক হয়ে বলল, “সে কী! বহরমপুরে থাকার সময় যে বলেছিল কাঁটালিয়াঘাটে কোয়ার্টার অ্যালট করা আছে?”

“তখন আমিও কি জানতুম? তবে বাসার খোঁজ করছি। দেখা যাক্।” বলে সে পা বাড়াল। “গৌতমকে বলে যাচ্ছি। যদি না থাকে বাড়িতে, কী আর করা যাবে? তুমি দরজা ভাল করে এঁটে দিও। অচেনা কাকেও ভেতরে বসতে ডেকো না।”

সে চলে যাওয়ার পর গার্গী আস্তে শ্বাস ছাড়ল। মুহূর্তের জন্য তার মনে একটা পাপবোধ স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বালা দিল। একজন সাদাসিধে ভালোমানুষ তার স্বামী। আজ অব্দি তেমন কোনও খারাপ ব্যবহার করেনি তার সঙ্গে। বাচ্চাকাচ্চা না হওয়ার জন্য নিজেকেই দায়ী করেছে। একবার হাসতে হাসতে বলেছিল, “বাবা-টাবা হওয়ার জন্য যে রকম পুরুষত্ব থাকা উচিত, আমার তা হয়তো নেই।”পুরনো কিছু কথা আলতো ভেসে এল মনে। ঘনশ্যাম মাঝে মাঝে শারীরিকভাবে অপটু হয়ে পড়ে। আপনমনে বলে, “তোমার শরীরে কী যেন আছে। আমাকে নার্ভাস করে ফেলে। এ মুহূর্তে কিছুক্ষণ লোকটার জন্য গার্গী দুঃখবোধ করল। একটু অনুতাপও জাগল। মনে হলো, সে বিশ্বাসভঙ্গ করছে। একটা চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও সে ভাবল। গৌতমকে এবার থেকে এড়িয়ে চলবে।

কিন্তু আরও কিছুক্ষণ পরে সেই অসহ্য একাকিত্ব গার্গীকে ঘিরে ধরল। তরপর সে অনুভব করল, দুটি দুপুরের নিষিদ্ধ গোপন শারীরিক সুখের স্মৃতি তাকে নাড়া দিচ্ছে। বাঘিনী মানুষের রক্তের স্বাদ পেলে যেমন হিংস্র আর ধূর্ত হয়ে ওঠে, তেমনি ক্রুর আর লোভী হঠকারিতার বোধ তরঙ্গের মতো তার ওপর আছড়ে পড়েছিল।

কতক্ষণ পরে গৌতমের সাড়া পেয়ে গার্গী ঠোঁট কামড়ে ধরল। তারপর একটু দেরি করেই সদর দরজা খুলে দিল। গৌতমকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। বলল, “বসব না। একটা কথা বলতে এলুম। তোমার বরের সাইকেলটা পাওয়া গেছে।”

গার্গী ব্যস্তভাবে বলল, “কোথায়? কার কাছে?”.

“সাউথে কোদালিয়া বলে একটা গ্রাম আছে। বেশি দূরে নয়। ওখানে জেলেদের জালে আটকে ছিল। ওরা থানায় জমা দিয়ে এসেছে শুনলুম।”

“ওকে খবর দেওয়া দরকার। সাইকেল-সাইকেল করে পাগল হয়ে গেছে।

“খবর পেয়ে যাবে।”

 “তুমি বসবে না?”

গৌতম একটু হাসল। “বৃসতুম। কিন্তু”

“কিন্তু কী?”

 “কিছু না। আমি একটু ভাবনায় পড়ে গেছি। মন ভালো নেই।”

 “জুতোর বাক্সটা কী করলে?”

 “ছিড়ে গঙ্গায় ফেলে দিয়েছি।”

 “তাহলে ভাবনা কিসের?”

“চোর সাইকেলটা নিল না কেন? রিভলভারটা চুরিই কি কারও মোটিভ ছিল?”

গার্গী আঁচলে মুখের ঘাম মুছে বলল, “আমার বরও ঠিক এই কথাটা বলছিল, জানো? কেউ নিশ্চয় জানত ব্যাপারটা। আড়ি পেতে দেখেছিল সম্ভবত। তপুরই গ্যাংয়ের কেউ হবে।”

গৌতম চিন্তিত মুখে বলল, “আমারও তা-ই মনে হয়েছে। এখন কথা হচ্ছে, তপুর গ্যাংয়ের অন্য কেউ জানতে পারলে, কিংবা ধরো, তপু কাউকে জানিয়ে থাকলে সে আমাকে চার্জ করতে পারে।”

গার্গী বলল, “কিচ্ছু হবে না। এত ভেবো না তো। তপু কাকেও জানিয়ে গিয়ে থাকলে এতক্ষণ সে তোমাকে চাইত। তা ছাড়া যে ওটা চুরি করেছে, সে লুকিয়ে রাখবে। কাকেও জানতেই দেবে না। এস, বড্ড রোদ।”

গৌতম বলল, “পরে আসব’খন। আমি তপুর গ্যাংয়ের ছেলেদের নার্ভ ফিল করে বেড়াচ্ছি।”

“আসবে না?”

“দুটোয় আসব।”

 এখন আসবে না?

 “কী আশ্চর্য! বলছি তো”

 “বুঝেছি। আমাকে ঘেন্না ধরে গেছে!”

 গৌতম উঠোনেই ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে বলল, “তুমি আমার স্বর্গ!”

গার্গী নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “সব সময় অসভ্যতা! কে দেখে ফেলবে, বেরোও! তোমাকে আর আসতে হবে না।”

সে ঠেলে ওকে বের করে দিল। গৌতম হাসতে হাসতে চলে গেল। দরজা বন্ধ করে গার্গী বারান্দায় ফিরল। উঠোনঘেরা পাঁচিল যথেষ্ট উঁচু নেই। বারান্দায় দাঁড়ালে বাইরেটা দেখা যায়। কেউ কোথাও নেই দেখে সে আশ্বস্ত হলো। অন্যদিনের মতো স্নান করে এসে রান্নায় বসল সে।

আজ একটু দেরি করে খেতে এল ঘনশ্যাম। গার্গী তাকে সাইকেলটার কথা বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই ঘনশ্যাম উজ্জ্বল মুখে বলল, “আমার থিওরি!

সাইকেলটা পাওয়া গেছে। থানা থেকে হসপিটালে ফোন করেছিল আমাকে। গিয়ে আইডেন্টিফাই করলুম। ওবেলা ডেলিভারি পাব। পুলিশের হাতে কিছু পড়লে বের করা প্রব্লেম। গৌতমের বাবাকে বলায় ফোন করে বড়বাবুকে বলে দিয়েছেন।”

গার্গী একটু কৌতুক করে বলল, “সাইকেল চুরি গিয়ে না হয় ফেরত পেতে। আমি যদি চুরি যেতম?”

ঘনশ্যাম কৌতুকটা নিল না। সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, “তুমি ইচ্ছে না করলে কেউ তোমাকে চুরি করবে না। হুঁ, রেপ অ্যান্ড মার্ডারের কথা আলাদা।”

গার্গী হঠাৎ চটে গেল। “ছাড়ো তো। হাত-মুখ ধুয়ে এস। ভাত বাড়ছি।”

ঘনশ্যাম একটু হাসল। “তুমি বলেছিলে পুজোর সময় ছুটি নিয়ে বাইরে যেতে। আসতে আসতে কথাটা ভাবছিলাম। বাইরে গেলে এই ঝামেলাটা হতে না। আমারও বড় হাঁপ ধরে গেছে। তো দেখি, পুজোটা যা।”

বসে সে বাথরুমে গিয়ে অন্যদিনের মতো সাবান দিয়ে রগড়ে হাত দুটো ধুল। পা ধুল। মুখে জল ছিটিয়ে মুখ ধুল। তোয়ালেতে হাত-মুখ মুছতে মুছতে ফের বলল, “সাইকেলটা জলে নাকানিচুবোনি খেয়ে কী অবস্থা হয়েছে দেখলে খারাপ লাগে। পার্ট বাই পার্ট খুলে আয়েলিং করাতে হবে। খামোকা একগাদা খরচা করাবে ব্যাটাছেলেরা। যা নেবার, তা তো নিলি। খামোকা এত ছলচাতুরীর কী দরকার ছিল? ঠিক আছে। একটা অজুহাত না হয় সাজালি। তো সাইকেলটা খামোকা গঙ্গায় ফেলতে গেলি কেন? স্রেফ বদমাইশি। থানায় রঞ্জিতবাবু কাল যে এস আই ভদ্রলোক এসেছিলেন, বললে, শ্যামবাবু! আপনার সাইকেলটা বদলান। চোরও এই বাতিল মাল পছন্দ করেনি। রাগ করে গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে গেছে!” অদ্ভুত ফিক ফিক শব্দে হাসতে লাগল ঘনশ্যাম।

ভাত-তরকারি বেড়ে আসন পেতে দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল গার্গী। বলল, “আচ্ছা, তুমি যে বলছ, শুধু জুতোর বাক্স চুরি করতে ঢুকেছিল–তা হলে আলমারির তালা ভাঙার চেষ্টা করল কেন?”

ঘনশ্যাম পাতে বসে বলল, “ওটা অবিশ্যি সিরিয়াস একটা অ্যাটেম্পট। ক্রিমিনালদের সাইকোলজি। যা নেবার, তা নিয়ে ভেবেছিল, কিছু মালকড়ি গয়নাগাঁটি যদি পেয়ে যায়, সেটা উপরি লাভ। রঞ্জিতবাবু কারেক্ট। ব্যাটাচ্ছেলের ওই পুরনো সাইকেল মনে ধরেনি। রাগ করে ফেলে দিয়েছে।” ডাল ঢেলে মাখিয়ে একগ্লাস ভাত তুলে সে ফের বলল, “কে জানে, আমার ওপর রাগ ছিল কি না। হাসপাতালে চাকরির এই এক প্রবলেম আজকাল।”

“খুব হয়েছে। এবার চুপচাপ খেয়ে নাও তো।”

ঘনশ্যাম তার দিকে তাকিয়ে ভাত মুখে দিল। বলল, “বেলা হয়েছে। তুমিও খেয়ে নিলে পারতে।”

“খাচ্ছি। আর বকবক কোরো না। গলায় ভাত আটকে যাবে।”

ঘনশ্যাম বেরিয়ে যাওয়ার পর অন্যমনস্কভাবে খেতে বসল গার্গী। ঘনশ্যামের বেড়াতে যাওয়ার কথাটা তার বুকে ধাক্কা দিয়েছিল। বিয়ের পর সেই একবার ক’দিনের জন্য দীঘায় হনিমুনের নাম করে বেড়াতে গিয়েছিল দুজনে। তখন কত স্বপ্নসাধ জেগে উঠেছিল গার্গীর জীবনে। পরে দিন-দিনে দেখল সে একটা ভুল লোকের সহগামিনী হয়েছে, যে সৌন্দর্য বোঝে না, আনন্দের স্বাদ নিতে জানে না। শুধু এলেবেলে কথার বুকনি ঝাড়ে। পাইপয়সা হিসেব করে সংসার চালায়। কিছু কেনার ইচ্ছে হলে গার্গীকে মুখ ফুটে টাকা চেয়ে নিতে হয়। এ ভাবে বেঁচে থাকার কী মানে হয়?

খাওয়ার পর উত্তরের জানলার ধারে বসে গার্গীর মনে হলো, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কী একটা সর্বনাশা শক্তি তাকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে এবং তাকে যে রক্ষা করতে পারত, সেই মানুষটা বড় বেশি নির্বিকার।

ছাতিম গাছটার দিকে চোখ পড়তেই গার্গীর বুকের ভেতর একটা ঠাণ্ডা হিম ঢিল গড়িয়ে গেল। উজ্জ্বল আশ্বিনের রোদে গাছটাকে ভয়াল আর জৈব দেখাচ্ছে। গাছটা যেন তাকে আকর্ষণ করছে। চোখ ফিরিয়ে নিল গার্গী। ট্রানজিস্টারের নব ঘোরাল। চটুল হিন্দি গানের সুর।

দরজায় আস্তে কড়ানাড়ার শব্দ কানে এল। গার্গী বেরিয়ে গিয়ে বলল, “কে?”

গৌতম।

যৌবন যৌবনকে দরজা খুলে দিল।…

বুকমার্ক করে রাখুন 0