মৃতেরা কথা বলে না

মৃতেরা কথা বলে না

০১.

চন্দ্রনাথ দেববর্মন একটা ব্লু-ফিল্মের ক্যাসেট চালিয়ে দিয়ে হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিলেন। প্রিন্টটা ঠিক ওরিজিনাল নয়। তবে উজ্জ্বল এবং রঙিন। ছবির শুরুটা এমন স্বাভাবিক আর শালীন যে বোঝা যায় না শেষাবধি কিছু পাওয়া যাবে। একটা সেতুর দৃশ্য। পেছনে পাহাড়ি জঙ্গল। সেতুর ওপর পেছন ফিরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে হাত তুলে ঘড়ি দেখছে। বিরক্তিকর। রঙ্গনাথন ভুল করেছে, নাকি ইচ্ছে করেই তাকে ঠকিয়েছে? লোকটা ধড়িবাজ। হংকংয়ের কারবারি। মাসে অন্তত দুবার কলকাতা আসে। এলেই একটা করে ক্যাসেট দেয় এবং ফেরার সময় চেয়ে নিয়ে যায়।

চন্দ্রনাথের বয়স ষাট পেরিয়েছে। বেঁটে, শক্তসমর্থ গড়নের মানুষ। মোঙ্গলোয়েড চেহারা। মাকুন্দে মুক। যৌবনে পুনঃপুনঃ প্রেমে ব্যর্থ এবং দু দফা লিভ টুগেদার করেছেন। এও ব্যর্থতা। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও সহবাসে এমন কিছু থাকতেও পারে, যা কোনও নারীই সহ্য করতে পারে না। এই তাঁর সিন্ধান্ত। কিন্তু ক্রমশ রক্তমাংসের নারীর প্রতি তার প্রচণ্ড বিদ্বেষ জন্মে গিয়েছিল। সে কারণে বাকি জীবন একা কাটাতে চেয়েছিলেন। কাটাচ্ছেনও তাই। তবু অভ্যাস। এখনও ছায়ায় কায়ার উত্তাপ পেতে চান।

ডিলাক্স মার্কেটিং রিসার্চ ব্যুরোর মালিক চন্দ্রনাথ। এটা তার নতুন কারবার। এই ব্যুরো কোনও কোম্পানির লেজুড় নয়। একেবারে স্বাধীন। কম লোক দিয়ে অনেক বেশি কামানো যায়। ছোট ও মাঝারি কনজুমার গুডস প্রস্তুতকারীরা তার মক্কেল। কোনো মক্কেলের বাজার পাওয়া পণ্যের চাহিদা হঠাৎ পড়তে শুরু করেছে কেন, উপাদানে গণ্ডগোল ঘটছে এবং কেউ বা কারা এটা ঘটাচ্ছে, ট্রেড ইউনিয়নের কোনও নেতার কারচুপি, নাকি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বাজারে ঢুকেছে, কিংবা ডিস্ট্রিবিউটারের বদমাইশি এসব ছাড়াও নতুন কোনও পণ্যের চাহিদার বাজার কেমন, ইত্যাদি অংসখ্য তথ্য চন্দ্রনাথের ব্যুরোকে সংগ্রহ করতে হয়। প্রয়োজনে ডিকেটটিভ এজেন্সির সাহায্য নিতে হয়। আজকার ডিটেকটিভ এজেন্সিরও অভাব নেই। চন্দ্রনাথের সম্পর্ক তিনটির সঙ্গে, যাদের নাম দেখে কিছু বোঝা যাবে না। কেয়ার, ডিয়ার এসকর্ট এবং ফিনিক্স।

একটা বাস এসে থামল সেতুতে। এক তরুণী নামল। চন্দ্রনাথ হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরালেন। বাসটা চলে গেলেই দুজনে পরস্পরের হাত ধরল। মার্কিন উচ্চারণ বুঝতে অসুবিধা হয় না চন্দ্রনাথের। বছর তিনেক আমেরিকায় ছিলেন। অনেক পোড় খেয়েছেন এবং অনেক ঘাটের জল।

তরুণ-তরুণী কথা বলতে বলতে হাঁটছে। জলের ধারে একটা পার্ক। পার্ক জনহীন নয়। কমবয়সীরা খেলা করছে। বিরক্তিকর! অন্তত একটি চুমুও–

টেলিফোন বাজল। ফোন তুলতে গিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে চোখ গেল। রাত দশটা তিরিশ। সাড়া দিলেন অভ্যাসমতো, ইয়া।

মিঃ দেববর্মন? কোনও নারীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল। স্মার্ট ইংরেজি। আপনি কি একা?

চন্দ্রনাথ একুট সতর্ক হয়ে বললেন, হ্যাঁ। আপনি কে?

আপনাকে আমি চিনি।

তাতে কী?

 এই যথেষ্ট নয় কি মিঃ দেববর্মন?

 কী চান আপনি?

একুট গল্প করতে। না, না মিঃ দেববর্মন। এটা জরুরি।

কেন? বলে পর্দায় চোখ বুলিয়ে নিলেন চন্দ্রনাথ, কিছু মিস করছেন কি না। নাহ্। তরুণ-তরুণী পার্কের শেষ প্রান্ত দিয়ে হেঁটে চলেছে। কখনও ক্লোজ শট, কখনও লং। মৃদু আবহসঙ্গীত এবং পাখির ডাক এবং প্রকৃতি।

মিঃ দেববর্মন! আপনি এখন কি করছেন?

উত্তেজনামেশা কৌতূহল চন্দ্রনাথকে ফোন রাখতে দিল না। একটু হাসির সঙ্গে বললেন, এটা কি কোনও ফাঁদ?

না, না মিঃ দেববর্মন! আমি আপনার শুভাকাঙ্খী।

 ঠিক আছে। আনেক ফাঁদ আমি দেখেছি। বলুন।

আমার প্রশ্নের উত্তর দিন প্লিজ!

আমি টি ভি দেখছি এবং হুইস্কি খাচ্ছি। আপনার কোনও প্রস্তাব আমি গ্রহণ করব না। বুঝলেন?

মিঃ দেববর্মন! আপনার কি আগ্নেয়াস্ত্র আছে?

আছে।

 দরজা ঠিকমতো লক করা আছে?

আছে। কিন্তু কেন এসব কথা? আপনি কি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন? কে আপনি?

আপনি উত্তেজিত। শান্ত হোন। আর হাতের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি রাখুন।

তরুণ-তরুণী জলের ধারে হাঁটছে। গতি পাহাড়টার দিকে। আছড়ে পড়া জলের শব্দ এবং আবহসঙ্গীত ক্রমে জোরালো হচ্ছে। চন্দ্রনাথ খাপ্পা হয়ে বললেন, পুলিশ দফতরে আমার লোক আছে। এখনই আপনার নাম্বার জেনে নেওয়ার ব্যবস্থা করছি। আর আমার টেলিফোনে টেপরেকর্ডার ফিট করা থাকে, জানেন তো?

মিঃ দেববর্মন! কেউ দরজায় নক করলেও

হঠাৎ কথা থেমে গেল। চন্দ্রনাথ কয়েকবার উত্তেজিতভাবে হ্যালো হ্যালো করেও আর সাড়া পেলেন না। কোনও শব্দও শোনা গেল না। একটু অপেক্ষা করে ফোন রাখলেন। হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। দৃষ্টিতে শূন্যতা ছিল।

তরুণ-তরুণী পাহাড়ি রাস্তার চড়াইয়ে উঠছে। দূরে গাছপালার ভেতর একটা বাড়ির আভাস। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে এতক্ষণে চুম্বন।

কিন্তু চন্দ্রনাথের মনে অন্য উত্তাপ। উঠে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে পয়েন্ট বাইশ ক্যালিবারের খুদে রিভলবার বের করলেন। ৬টা গুলি ভরে এগিয়ে গেলেন ড্রয়িংরুমের দরজার দিকে, যেটা বাইরে যাওয়ার দরজা এবং চওড়া করিডর আছে। দরজা ঠিকমতো লক করা আছে। আইহোলে দেখলেন আলোকিত করিডর নির্জন। দুধারে দুটো অ্যাপার্টমেন্ট। বাঁদিকেরটা এক বাঙালি অধ্যাপক দম্পতির। ডানদিকেরটায় থাকেন এক পার্শি বৃদ্ধা মিসেস খুরশিদ এবং তার অ্যাংলোইন্ডিয়ান পরিচারিকা। চন্দ্রনাথ বেডরুমে ফিরে এলেন। এখন তরুণ-তরুণী বাড়িটাতে ঢুকছে। খুব পুরনো কাঠের বাড়ি। এবার তাহলে চরম মুহূর্তের দিকে এগোচ্ছে ওরা।

নাহ্। কাট করে একটা রান্নাঘরের দৃশ্য। এক প্রৌঢ়া ওভেনে কিছু রান্না করছেন। বিজ্ঞাপন।

এরা এভাবেই সময় নষ্ট করে। অনেক ঘুরিয়ে তবে ঠিক জায়গায় পৌঁছায়। চন্দ্রনাথের এ বয়সে অত ঘোরপ্যাঁচ অসহ্য লাগে। সোজাসুজি সেক্সের পক্ষপাতী তিনি এবং এসব ব্যাপার পাপ বলে মনে করেন না। শরীর আছে। কাজেই জৈবতার ধর্ম আছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক দান। এত ঢাকঢাক গুড়গুড় করার মানে হয় না। অথচ এই সব ক্যাসেট যারা তৈরি করে, তারা ঝানু ব্যবসায়ী। সেক্সের সঙ্গেও বিজ্ঞাপন। তেল সাবান স্নো, কিংবা রান্নার কড়াই তার সঙ্গেও মিউজিক! অসহ্য!

কিন্তু মেয়েটি কে? কেন ওভাবে হঠাৎ টেলিফোন করে তাকে ভয় দেখাল? হঠাৎ থেমে গেলই বা কেন? চন্দ্রনাথ উদ্বিগ্নভাবে হুইস্কিতে চুমুক দেলেন। অটোমেটিক রিভলভারটা হাতের কাছেই বিছানায় রেখে দিলেন। তার হাত কাঁপছিল।

পুলিশকে জানাবেন কি? তার একটা সুন্দর রাত্রি খুন হয়ে গেল। সেক্সে মন বসবে বলে মনে হচ্ছে না। একটা অনুসন্ধান চলছে মনের ভেতর। কে বা কারা তাকে খুন করতে চাইবে? এ ধরনের কারবারে প্রতিপক্ষ অবশ্যই থাকে। তই বলে সাংঘাতিক কিছু করে ফেলবে? অবিশ্বাস্য। ব্যক্তিগত শত্রুতাও তো তাঁর কারও সঙ্গে নেই।

তরুণটিকে আগে নগ্ন করেছে তরুণী। তাকিয়ে থাকতে থাকতে আবার একটা সিগারেট ধরালেন চন্দ্রনাথ। কিন্তু আবার কাট এবং পোশাকের বিজ্ঞাপন।

সেই সময় টেলিফোন বাজল। চন্দ্রনাথ আস্তে টেলিফোন তুলে সাড়া দিলেন, ইয়া!

আপনি তৈরি হয়ে আছেন তো মিঃ দেববর্মন?

একই কণ্ঠস্বর। চন্দ্রনাথ বললেন, হঠাৎ ফোন ছেড়ে দিয়েছিলেন কেন?

আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।

হ্যাঁ। আমার হাতে সিক্সরাউন্ডার। অটোমেটিক। কিন্তু আমি জানতে চাই, কে বা কারা আমাকে

আপনি নিশ্চয় জানেন।

জানি না। যতটা সম্ভব শক্ত গলায় চন্দ্রনাথ বললেন। আমি বুঝি না।

তাই বুঝি? …একটু বিরতির পর শোনা গেল, মুখোমুখি হলে আভাস দিতে পারতাম যেটুকু আমি জানি। ফোনে তা সম্ভব নয়। আমি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী।

আপনি কোথা থেকে কথা বলছেন?

 কাছাকাছি।

একটু ভেবে নিয়ে চন্দ্রনাথ বললেন, আসতে চাইলে আসতে পারেন।

আমি জানি আপনি শক্তিমান মানুষ মিঃ দেববর্মন! কিন্তু

তাহলে ছেড়ে দিন। বিরক্ত করবেন না।

ঠিক আছে। ঝুঁকি নিয়েই আমি যাচ্ছি। কিন্তু আমাকে রক্ষার দায়িত্ব আপনার।

চন্দ্রনাথ শক্ত গলায় বললেন, আসুন। হ্যাঁ, একটা কথা। আপনি গাড়িতে আসবেন, না হেঁটে আসবেন? এত রাতে সিকিউরিটি স্টাফ আপনাকে ঢুকতে দেবে না।

 তা নিয়ে ভাববেন না মিঃ দেববর্মন! আমি এই হাউসিং কমপ্লেক্সের মধ্যেই আছি।

তা-ই? তাহলে আসুন।

টেলিফোন রেখে ক্যাসেট বন্ধ করলেন চন্দ্রনাথ। হুইস্কিতে আরও দুটো চুমুক দিয়ে আবার একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর ড্রয়িংরুমে গেলেন। হাতে রিভলভার। দরজার আইহোলে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি দরদর করে ঘামছিলেন রাত-পোশাকের ভেতরে।

এটা তিনতলা। অটোমেটিক লিফট আছে। সেটা এখান থেকে দেখা যায় না। বাইরের মুখোমুখি দুটো অ্যাপার্টমেন্টের পর করিডর বাঁদিকে বেঁকেছে। তারপর আবার বাঁদিকে একটা অ্যাপার্টমেন্ট সবগুলোই প্রায় দেড় হাজার বর্গফুটের বেশি। শুধু চন্দ্রনাথেরটা ৯ শো বর্গফুট। কার্পেট এরিয়ার হিসেব। এটা ১৩ নম্বর অ্যাপার্টমেন্ট। আনলাকি থারটিন।

প্রতীক্ষা– এই ধরনের প্রতীক্ষা বড় অসহ্য। চন্দ্রনাথ আলোকিত নির্জন করিডরের দিকে তাকিয়ে আছেন। একটু নেশা হয়েছে। নেশা এবং উত্তেজনা তার দৃষ্টিকে যেন অস্বচ্ছ করে দিচ্ছে ক্রমশ। দরজা খুলে দাঁড়ালেই বা ক্ষতি কী? হাতে আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি।

লিফটের সামনে ১০ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টে গরগর শব্দে মিঃ অগ্রবালের পাজি কুকুরটা গর্জন শুরু করেছে। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে দরজা খুলে বেরুলেন চন্দ্রনাথ দেববর্মন। তিনি চিরকালের দুর্ধর্ষ লড়ুয়া…

.

০২.

ভুবনেশ্বর এয়ারপোর্ট থেকে প্লেন ছাড়ার কথা বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। কিন্তু সেদিনই বিকেলে প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন জনসভায় ভাষণ দিতে। এয়ারপোর্ট পর্যন্ত সারা পথ পুলিশে ছয়লাপ। নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোনও মাছি গলতে দেয়নি। জেনিথ ফার্মাসিউটিক্যালসের চিফ এক্সিকিউটিভ শান্তশীল দাশগুপ্ত এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হয়েই জ্যামে আটকে গিয়েছিল। কোম্পানির লোকাল ব্রাঞ্চের আনকোরা গাড়িতে এয়ারকন্ডিশনিং ছিল অবশ্য। নইলে এই শেষ মার্চেই আবহাওয়া যা তেজী, চামড়া ভাজা-ভাজা হয়। ড্রাইভার নেমে গিয়ে খবর আনল। অন্তত তিন ঘণ্টা আটকে থাকতে হবে। গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে যাওয়া অসম্ভব।

কিন্তু শান্তশীলকে আজ রাতে কলকাতা ফিরতে হবে। কারণ পরদিন সকালেই স্ত্রী মধুমিতাকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি বহরমপুরে যেতে হবে। শ্বশুরমশাই অসুস্থ। তাকে নিয়ে সেদিনই যেভাবে তোক কলকাতা আনতে হবে। নার্সিংহোমে বলা আছে। কার্মব্যস্ত একজন জামাইয়ের পক্ষে এটা একটা উটকো ঝামেলা। কিন্তু উপায় নেই। প্রেম করা বিয়ে।

রাত সাড়ে আটটায় রাস্তা মুক্ত হলো। প্লেনটাও প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে বাঙ্গালোরে অপেক্ষা করছিল। অবশেষে ভুবনেশ্বরে নেমে আবার যখন উড়ল, তখন রাত কাটায়-কাঁটায় পৌনে দশটা।

দমদমে পৌঁছে শান্তশীল একটু অবাক হয়েছিল। তার জিপসি মারুতিতে মউ(মধুমিতা) নেই। ড্রইভার আক্রাম একা এসেছে। সে সেলাম দিয়ে সবিনয়ে জানাল, মেমসাব আসতে পারেননি। কী সব জরুরি কাজ আছে। এবং সে সন্ধ্যা ছটা থেকে গাড়ি নিয়ে এখানে অপেক্ষা করছে।

সানশাইন হাউজিং কমপ্লেক্সের বি-মার্কা বাড়ির দোতলায় শান্তশীলের অ্যাপার্টমেন্ট। ওটার মালিক তার কোম্পানি। মউ দরজা খুলে বলল, এয়ারপোর্টে ফোন করেছি– অন্তত পাঁচবার। কী ব্যাপার?

তার মুখে গাম্ভীর্য ছিল। শান্তশীলের অনুমান, সেটার কারণ মউয়ের বাবার অসুখ। ভুবনেশ্বর যাওয়ার দিন থেকেই এই গাম্ভীর্য এবং অন্যমনস্কতা লক্ষ্য করেছে। শান্তশীল। এখন সে ভীষণ ক্লান্ত। অল্পকথায় দেশের নেতাদের বিরুদ্ধে কিছু বলার পর সে পোশাক না বদলেই সেলার খুলল। আগে এক চুমুক ব্র্যান্ডি।

মউ আস্তে বলল, প্রায় এগারোটা বাজে। কাল মর্নিংয়ে—

 জানি। একটু সামলে উঠতে দাও।

 মউ ঠোঁট কামড়ে ধরে তাকে দেখছিল।

 শান্তশীল বলল, কী? আবার কিছু খবর এসেছে নাকি?

 নাহ্।

তোমাকে বড় উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে মউ!

মউ ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল, ও কিছু না। তুমি দেরি করো না। আমি কিচেনে যাচ্ছি।

সে চলে গেল। শান্তশীল দ্রুত ব্র্যান্ডি শেষ করে চাঙ্গা বোধ করল। পোশাক বদলে সে বাথরুমে ঢুকল। বাথরুমের দরজা বন্ধ করার প্রশ্ন ওঠে না। এটা ড্রয়িংরুম সংলগ্ন বাথরুম। আরেকটা আছে বেডরুম সংলগ্ন। ড্রয়িংরুমে এবং বেডরুমে দুটো টেলিফোন আছে। বেডরুমেরটার নাম্বার একান্তই প্রাইভেট এবং ডাইরেক্টরিতে ছাপা থাকে না। কোম্পানির ব্যাপারে এটা হটলাইন বলা যায়। ড্রয়িংরুমের ফোনটা বেজে উঠতে শুনল শান্তশীল। এত রাতে কার ফোন? বহরমপুর থেকে ট্রঙ্ককল নাকি?

জ্বালাতন! জৈবকৃত্যের সময় বলেও নয়, প্রেমের দাম বড্ড বেশি আদায় করা হচ্ছে– শান্তশীল ইদানীং মউ সম্পর্কে এরকম ভাবে। অথচ মউকে ছেড়ে বাঁচুবে না এমন একটা বিশ্বাসও তাকে ছুঁয়ে আছে যেন। মউকে সে সত্যিই ভালবাসে এবং মউও তাকে প্রকৃতই ভালবাসে, তা নিজের পদ্ধতি অনুসারে সে যাচাই করে নিয়েছে। তবে মউ অভিনেত্রী ছিল, গ্রুপথিয়েটার থেকে কমার্শিয়াল থিয়েটার এবং শেষে টেলিসিরিয়ালে চান্স পেয়ে মোটমুটি নাম করেছিল। হিন্দি ফিল্ম অফার এসেছিল। কেরিয়ারের সেই বাঁকে, জিরো আওয়ারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই শান্তশীল তাকে আশ্চর্য দক্ষতায় করায়ত্ত করেছিল। কিংবা এটা প্রেমের চোরাবালিতে মউয়ের আকস্মিক পতন। অবশ্য শান্তশীলের পক্ষ থেকে কোনও বাধা ছিল না। অথচ মউ তাকে ছেড়ে এক পা কোথাও বাড়াতে চায়নি বা চায় না। কী অসামান্য সেই উচ্চারণ, বাইরে গেলে আমি নষ্ট হয়ে যাব!

নাহ্, অভিনয় মনে হয়নি। শান্তশীলের মধ্যে মেলশোভিনিজম আছে, যা সে সাবধানে চাপা দিয়ে রাখে এবং মউয়ের মধ্যে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ের মানসিকতাসঞ্জাত আত্মসমর্পণের ঝোঁক আছে, শান্তশীলের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তা লক্ষ্য করেছিল। আসলে শান্তশীলের উত্থান ধাপে ধাপে। অনেক ঘা খেয়ে, অনেক অপমান দাঁত চেপে সহ্য করতে করতে এবং অনেক শ্রম বুদ্ধি-স্মার্টনেসের পরিণাম তার কেরিয়ারিস্ট জীবনের এই অবস্থান। সে নিজেকে মার্কিন ভঙ্গিতে বলে ইয়াপ্পি,ইয়ং আরবান অ্যামবিশাস প্রোফেশনাল পার্সন। মাত্র তিরিশ বছর বয়সে জেনিথ ওষুধ সংস্থার প্রধান কার্যনির্বাহক পদে বসা কেরিয়ারিস্ট মধ্যবিত্ত যুবকের পক্ষে একসময় তো অকল্পনীয় ছিল। এখন এটা হচ্ছে। তরুণ রক্ত শিল্প বাণিজ্য মহলে এখনকার স্লোগান।

কিন্তু মউয়ের উত্থানে আছে পর পর কিছু আকস্মিকতা। সেটা স্বাভাবিক অভিনয় জগতে। হঠাৎ কারও চোখে পড়ে যাওয়ার ব্যাপারটাই বেশি কাজ করে। মউ অভিনয়জগতের প্রভাবশালী কিছু লোকের চোখে পড়ে গিয়েছিল। তারা এখনও কেউ কেউ পিছু ছাড়েনি। কিন্তু শান্তশীলের ঝকমকে এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্ব তাদের দমিয়ে দেয়।..

টেলিফোনের রিং বন্ধ হয়েছিল। শান্তশীল দাঁত ব্রাশ করতে করতে (খাওয়ার আগেই এত রাতে দাঁত ব্রাশ করার কারণ আজ ভুবনেশ্বরের ফাইভস্টার হোটেলে এ কাজের সময় পায়নি) পর্দার এক ইঞ্চি ফাঁক দিয়ে দেখল, মউ টেলিফোনে কথা বলছে। কণ্ঠস্বর চাপা। তাছাড়া তখনও কোমোডে জলের কলকল শব্দ। কিছু বোঝা গেল না।

শান্তশীল দাঁত ব্রাশ করে সাবান দিয়ে মুখ ধুয়ে নিল। ভুবনেশ্বরের যে প্রান্তে তার কোম্পানির নতুন কারখানা এবং অফিস, সেখানে প্রচণ্ড ধুলো। লনের ঘাস বৃক্ষলতাকুঞ্জ ধুলোয় লাল। মার্চের শেষে জোরালো হাওয়া দূরের একটা টিলার গায়ের রাস্তা থেকে ক্রমাগত লাল ধুলো উড়িয়ে নিয়ে আসছিল। ম্যানেজার। গোপাল দাস বলেছিলেন সাইট সিলেকশন ঠিক হয়নি। আমার বাংলোয় গেলে দেখবেন কী শোচনীয় অবস্থা! হোলি শেষ হয়নি হাঃ হাঃ হাঃ!

তোয়ালেতে মুখ মুছে ক্রিম ঘষে শান্তশীল বেরিয়ে এল। ড্রয়িংরুমে মউ নেই। খেয়ালবশে অর এক চুমুক ব্র্যান্ডি পান করে ধীরেসুস্থে সে কিচেন কাম ডাইনিংয়ে গেল। অবাক হলো, মউ নেই।

সে আস্তে ডাকল, মউ!

কোনও সাড়া পেল না। টেবিলে থালা সাজানো আছে। জলের গ্লাস খালি। খাদ্যের সুদৃশ্য পাত্রগুলি ঢাকা। শান্তশীল বেডরুমের পর্দা তুলল। মউ নেই। যষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে সন্দিগ্ধ করল এ মুহূর্তে। এগিয়ে গিয়ে বাথরুমের পর্দা সরাল। দরজা বন্ধ। সে ডাকল, মউ!

সাড়া না পেয়ে দরজা খুলল। বাথরুমে মউ নেই। এক মিনিট? কিংবা তারও বেশি। শান্তশীল ড্রয়িংরুম থেকে আবার ডাইনিংয়ে ঘোরলাগা অবস্থায় ঘুরছিল। তারপর হঠাৎ চোখে পড়ল ডাইনিং টেবিলে একটুকরো কাগজ রাখা। কাগজটা তখন তার সহজেই চোখে পড়া উচিত ছিল। পড়েনি। কাগজে খুব তাড়াতাড়ি করে লেখা আছে :

পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করো। আমি আসছি। পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেলেই ই ব্লকের তিনতলায় যাবে। ফিরে এসে সব বলব। ফেরা না হলে–
–তোমার মউ

বাক্যগুলির সঠিক মানে বোঝার আগে তন্মুহুর্তের প্রতিক্রিয়ায় শান্তশীলের মুখ দিয়ে অশালীন একটা কথা বেরিয়ে গেল, ফাকিং হোর!

এমন কুৎসিত গাল মউকে সে আড়ালেও দেওয়ার কথা কল্পনা করেনি কোনও দিন। পরমুহূর্তে তার সম্বিৎ ফিরল। বাক্যগুলির দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকাল। এ একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা। দুঃস্বপ্নের মতো।

অতর্কিতে মউয়ের নেপথ্যজীবন হিংস্র দাঁত বের করেছে যেন। আরও একটু পরে সে বুঝল, ফিরে এসে সব বলব বাক্যটা দ্বিতীয় বাক্য আমি আসছির পর লেখা উচিত ছিল। বেশি তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে গণ্ডগোলটা ঘটেছে। কিন্তু ফেরা না হলে–

মাই গুডনেস! শান্তশীল কাগজটা যেমন রাখা ছিল তেমনিই রেখে ব্রান্ডিতে চুমুক দিল। ইদানীং সিগারেট কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এসময়ে সিগারেট জরুরি। সে ব্র্যান্ডির গ্লাস হাতে নিয়ে ড্রয়িংরুমে এল। শান্তভাবেই অবস্থার মুখোমুখি হবে স্থির করল।

ইজিচেয়ারে বসে সে সিগারেট ধরাল। বুঝতে পারল না মউ কখন বেরিয়ে গেছে যে তখন থেকে তাকে পাঁচ মিনিট গুনতে হবে? পাঁচ…চার…তিন…দুই…এক এইভাবে জিরো আওয়ারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ। এতক্ষণ জিরো আওয়ার হয় তো পেরিয়ে গেছে। আবার শান্তশীলের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল ফাকিং হোর!

কিন্তু তোমার মউ কথাটা বুকের ভেতর নখের আঁচড় কাটছে টের পেল সে। এই নাটকীয়তার অর্থ কী? ই ব্লকের তিনতলায় কার কাছে এভাবে ছুটে গেছে মউ? ওই ব্লকের কোনও বাসিন্দার সঙ্গে আলাপ নেই শান্তশীলের। মাসতিনেক আগে কোম্পানি তাকে এই অ্যাপার্টমেন্টটা দিয়েছে। তার আগে ক্যামাক স্ট্রিটের একটা পুরনো বাড়িতে ছিল। পদোন্নতির পর এখানে। সে সকাল নটায় বেরিয়ে যায়। ফিরতেও রাত প্রায় নটা-দশটা হয়ে যায়। মউ একা থাকে। তাই শান্তশীল কিছুক্ষণ অন্তর ফোন করে তাকে। বাড়িতে না থাকলে কাজের মেয়ে ললিতা ফোন ধরে জানায়, মেমসায়েব মার্কেটিংয়ে গেছেন। ললিতা ভোরে আসে এবং সন্ধ্যায় চলে যায়।

মার্কেটিং! ললিতা আর কিছু বলতে পারে না। শান্তশীল এতদিন তলিয়ে ভাবেনি। এখন তার কাছে স্পষ্ট, ওটা ললিতাকে মুখস্থ করানো একটা শব্দ মাত্র।

ঠিক আছে! পাঁচ মিনিট পরে ফিরে এলে চরম বোঝাপড়া হবে।

কিন্তু ফেরা না হলে

নড়ে বসল শান্তশীল। ঘড়ি দেখল। এগারোটা পনেরো। জিরো আওয়ার নিশ্চয় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ই ব্লকটা কোনদিকে?

ড্যাম ইট! শান্তশীল সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে উচ্চারণ করল। সে রাত এগারোটা পনের মিনিটের পর ই ব্লকের খোঁজে বেরিয়ে পড়বে না। কক্ষনো না। চুল খামচে ধরে সে বসে রইল।

এগারোটা কুড়ি মিনিটে সে সিকিউরিটি অফিসে টেলিফোন করল। আমি শান্তশীল দাশগুপ্ত। বি ব্লকের ৭ নম্বর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বলছি। ফার্স্ট ফ্লোর। প্লিজ পুট মি টু মিঃ রণধীর সিংহ। দিস ইজ আর্জেন্ট।

সিকিউরিটি অফিসার রণধীর সিংহ এক্স-সার্ভিসম্যান। তার সাড়া এল, বলুন স্যার!

ই ব্লকের সেকেন্ড ফ্লোরে কি কিছু ঘটেছে? খোঁজ নিন তো!

জাস্ট এ মিনিট স্যার! দয়া করে একটু ধরুন!..এক মিনিট পরে সাড়া এল। আমাদের লোক গেল। আপনার নম্বর জানাবেন?

শান্তশীল নম্বর বলল। তারপর আড়ষ্ট হাতে ফোন রাখল। অবার একটু ব্র্যান্ডি ঢেলে আনল গ্লাসে। চুমুক দিয়ে চোখ বুজল। হ্যাঁ, জীবনে এই ঘা খাওয়াটা সবচেয়ে জোরালো। সবচেয়ে অপমানজনক। এ অপমান সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। কারণ একটি মেয়ে তাকে প্রতারিত করেছে এবং বিশ্বাসের উপর আঘাত হেনেছে।

কিছুক্ষণ পরে টেলিফোন বাজল। শান্তশীল তাড়াহুড়ো না করে টেলিফোন তুলল।

মিঃ দাশগুপ্ত? ব্লক বি, অ্যাপার্টমেন্ট সেভেন?

হ্যাঁ। বলুন!

আমি রণধীর সিংহ বলছি। ই ব্লকের এক নম্বর লিফটের মধ্যে এক ভদ্রমহিলার বডি পাওয়া গেছে। তাকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করে মারা হয়েছে। পুলিশকে জানানো হয়েছে। দুঃখিত মিঃ দাশগুপ্ত! আপনার সঙ্গে পুলিশ আসার আগেই আমার কথা বলা দরকার। আমি যাচ্ছি। ঠিক আছে?

কেন আমার সঙ্গে কথা বলা দরকার মিঃ সিংহ?

অন্যভাবে নেবেন না স্যার! কারণ আপনিই আমাকে ই ব্লকে খোঁজ নিতে বলেছিলেন।

হ্যাঁ। বুঝেছি। আসুন।

টেলিফোনে হাত রেখে বসে রইল শান্তশীল। সে ভাবতে চেষ্টা করল, এটা একটা বড় স্ক্যান্ডাল এবং এই স্ক্যান্ডাল তার কেরিয়ারের কোনও ক্ষতি করবে কি না! হ্যাঁ। প্রেম ট্রেমের চেয়ে বড় কথা, সে একজন ইয়াপ্পি..

.

০৩.

 কর্নেল নীলাদ্রি সরকার আটটা অব্দি ছাদের বাগান পরিচর্যার পর ড্রয়িংরুমে বসে কফি পান করতে করতে খবরের কাগজে চোখ বুলোচ্ছিলেন। সেই সময় ডোরবেল বাজল। একটু পরে তাঁর পরিচারক ষষ্ঠীচরণ একটা নেমকার্ড এনে বলল, এক ভদ্রলোক দেখা করতে এয়েছেন বাবামশাই!

কার্ডে লেখা আছেঃ এস সোম। মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ। জেনিথ ফার্মাসিউটিক্যালস প্রাইভেট লিমিটেড। ঠিকানাটা চৌরঙ্গি এলাকার। হুঁ, নামকরা ওষুধ সংস্থা। এদের কয়েকটা লাইফ-সেভিং ড্রাগ বিখ্যাত। দেশের সর্বত্র বিজ্ঞাপনের বিশাল হোর্ডিং দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কর্নেল বললেন, নিয়ে আয়।

তিরিশের কাছাকাছি বয়স, অমায়িক হাবভাব, সুদর্শন এক যুবক ঢুকে করজোড়ে নমস্কার করল। পরনে কেতাদুরস্ত টাইট এবং হাতে ব্রিফকেস। সে সোফায় বসে আস্তে শ্বাস ছাড়ল। তারপর মৃদুস্বরে বলল, একটা ব্যক্তিগত ব্যাপারে আপনার কাছে এসেছি। মানে, বাধ্য হয়েই এসেছি।

কর্নেল তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আপনার পুরো নাম বলুন প্লিজ!

শুভ্রাংশু সোম। থাকি লেকগার্ডেনসে। কদিন থেকেই ভাবছিলাম আপনার কথা। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে–

তারপর নিশ্চয় এমন কিছু ঘটেছে যে সিন্ধান্ত নিতে হয়েছে। কর্নেল হাসলেন। যাই হোক, বলুন।

তার আগে একটা অনুরোধ কর্নেল সরকার! প্লি-ই-জ! পুলিশকে আমি এড়িয়ে থাকতে চাই। সেইজন্যই আপনার কাছে আসা। সব শুনলে বুঝতে পারবেন কেন আমি আড়ালে থাকতে চাইছি।

বলুন!

গতরাতে সানসাইন হাউজিং কমপ্লেক্সে আমার খুব পরিচিত এক ভদ্রমহিলা খুন হয়েছেন।

কর্নেল লক্ষ্য করলেন, কথাগুলিতে স্বাভাবিক উত্তেজনা ছাড়াও একটা আর্তির সুর স্পষ্ট। যদিও মুখের রেখায় উত্তেজনাই স্পষ্ট। অবশ্য কথাগুলি সে আস্তে উচ্চারণ করল এবং প্রত্যেকটা শব্দের পর বিরতি ছিল। কর্নেল বললেন, জায়গাটা কোথায়?

ইস্টার্ন বাইপাসের কাছে। চারটে ব্লক নিয়ে হাউজিং কমপ্লেক্স। উচ্চমধ্যবিত্তরাই থাকেন। বেশির ভাগ বিগ কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ছোট কোম্পানির মালিকরাও তো যিনি গতরাতে খুন হয়েছেন, তিনি আমার কোম্পানিরই নতুন চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসারের স্ত্রী। নাম মধুমিতা দাশগুপ্ত। বিয়ের আগে অভিনয় করতেন স্টেজে এবং টি ভি ফিল্মে।

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, কী ভাবে খুন হলেন ভদ্রমহিলা?

শুভ্রাংশু রুমালে মুখ মুছে বলল, ভেরি মিসটিরিয়াস মার্ডার। মউ থাকে বি ব্লকে দোতলায় ৭ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টে।

কর্নেল দ্রুত বললেন, মউ?

মধুমিতার ডাকনাম। শুভ্রাংশুকে একটু নার্ভাস দেখাল। গতরাতে সাড়ে এগারোটায় নাকি ওর বডি পাওয়া যায় ই ব্লকের ১ নম্বর লিফটের ভেতর। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে মাথার ডানপাশে গুলি। অশ্চর্য ব্যাপার, নাইটগার্ড বা অ্যাপার্টমেন্টের কেউ নাকি গুলির শব্দ শুনতে পায়নি। অটোমেটিক লিফট। তার চেয়ে আরও আশ্চর্য, মউয়ের স্বামী শান্তশীল ঠিক ওই সময় টেলিফোনে। সিকিউরিটি অফিসারকে ই ব্লকে কিছু ঘটেছে কি না খোঁজ নিতে বলেন। সিকিউরিটির লোক গিয়ে মউয়ের বডি আবিষ্কার করে।

তখন লিফট কোন ফ্লোরে ছিল?

সেকেন্ড ফ্লোরে। ২ নং লিট খারাপ। ১ নম্বরটা চালু ছিল। সিকিউরিটির দুজন গার্ড ১ নং লিট দিয়ে সেকেন্ড ফ্লোরে উঠতে চেয়েছিল। লিফট নামতেই তারা মউয়ের বডি দেখতে পায়।

ষষ্ঠীচরণ রীতি অনুসারে কফি আনল। কর্নেল বললেন, কফি খান মিঃ সোম। কফি নার্ভ চাঙ্গা করে।

শুভ্রাংশু কফির পেয়ালা তুল বলল, তারপর পুলিশ যায় রাত বারোটা নাগাদ। বুঝতেই পারছেন সানসাইনের বাসিন্দারা সিনিক টাইপ। পরস্পর তত মেলামেশা নেই। তো5

কফি খান।

শুভ্রাংশু কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, এরপর অদ্ভুত ঘটনা সেকেন্ডে ফ্লোরের ১৩ নং অ্যাপার্টমেন্টের এক ভদ্রলোককে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। তার নাম চন্দ্রনাথ দেববর্মন। কী একটা মার্কেটিং রিসার্চ ব্যুরোর মালিক।

তাঁকে অ্যারেস্ট করল কেন?

দুটো লিফটই ১০ নং অ্যাপার্টমেন্টের সামনে। সেখানে থাকেন একজন ব্যবসায়ী। তার অ্যালসেসিয়ান হঠাৎ নাকি খেপে গিয়ে দরজায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কুকুরটা এমন করছে কেন তা বোঝার জন্য তিনি দরজার আইহোলে চোখ রাখেন। তিনিই চন্দ্রনাথবাবুকে দেখতে পান। ওঁর হাতে নাকি ফায়ার আর্মস ছিল। চন্দ্রনাথবাবুকে লিফটের সামনে থেকে দ্রুত চলে আসতে দেখেন।

সেই ব্যবসায়ীর নাম কী?

জানি না।

 আপনি কিভাবে এইসব ঘটনা জানলেন?

কর্নেলের প্রশ্নে তীক্ষ্ণতা ছিল। শুভ্রাংশু আরও নার্ভাস মুখে বলল, আমি– কোম্পানির চিফ এক্সিকিউটিভ মিঃ দাশগুপ্তের সঙ্গে আজ সাতটায় দেখা করতে গিয়েছিলাম। সাড়ে সাতটায় ওঁর বাইরে যাওয়ার কথা। খুলে বলি। আমাকে নর্থ ইস্টার্ন জোনে বদলি করা হয়েছে। বদলি ক্যান্সেল করানোর জন্য ওঁকে অনুরোধ করতে গিয়েছিলাম। হি ইজ এ নাইস অ্যান্ড সিম্প্যাথেটিক পার্সন। হি লাইকস মি। কিন্তু খুব ঠাণ্ডা মাথার লোক।

উনিই কি আপনাকে ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন?

হ্যাঁ। শুভ্রাংশু কফিতে চুমুক দিয়ে ফের বলল, অবশ্য সংক্ষিপ্তভাবে বললেন। আরও অনেক গোপন ব্যাপার থাকতেই পারে, আমাকে যা বলার মতো নয়।

কর্নেল চুরুট অ্যাশট্রেতে রেখে দাঁড়িয়ে ছাই ঝেড়ে বললেন, কিন্তু আপনি আগে থেকেই আমার কাছে আসতে চেয়েছিলেন। সিন্ধান্ত নিতে পারছিলেন না!

শুভ্রাংশু একটু চুপ করে থেকে বলল, গ্রুপ থিয়েটারে অভিনয় করার সখ ছিল আমার। সেই সূত্রে মউয়ের সঙ্গে পরিচয়। খানিকটা হৃদ্যতার সম্পর্কও হয়েছিল। কিন্তু মউ ছিল হঠকারী টাইপের। একটু স্বার্থপরও ছিল। টিভি সিরিয়ালে নাম করার পর আমাকে এড়িয়ে চলত। শেষে আমারই কোম্পানির নতুন চিফ এক্সিকিউটিভ মিঃ দাশগুপ্তকে বিয়ে করে বসল। কিন্তু না কর্নেল সরকার, মউয়ের সূত্রে আমি মিঃ দাশগুপ্তের কাছে কোনও সুযোগসুবিধা নিইনি! ওঁর সঙ্গে আমার সরাসরি সম্পর্ক ছিল।

কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, প্লিজ মেক ইট ব্রিফ!

সরি! শুভ্রাংশু পাংশুমুখে একটু হাসল। গত ২ রা মার্চ রবিবার দুপুরে মউ হঠাৎ আমাকে ফোনে বলেছিল ও বিরাট ভুল করেছে। ওর জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছে ইত্যাদি। আমি কোনও মন্তব্য করলাম না। মউ তারপর আমাকে অবাক করে বলল, কোনও প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির ঠিকানা আমার জানা আছে। কি না। বললাম কেন? মউ বলল, সে একজন ব্ল্যাকমেলারের পাল্লায় পড়েছে। ফোনে সব বলা যাবে না। তারপর লাইন কেটে গেল। আমি রিং ব্যাক করলাম। কিন্তু রিং হতে থাকল। মউ ফোন ধরল না। পরের ফোন পেলাম ২২ মার্চ রাত ৮ টা নাগাদ। মউ বলল, ব্ল্যাকমেলার এবার পঞ্চাশ হাজার টাকা চাইছে। জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় থাকে লোকটা? মউ বলল, হংকংয়ে থাকে। কিন্তু প্রায়ই কলকাতা আসে। সানশাইনে ওর এক বন্ধু আছে। তার কাছে আসে এবং সেখান থেকে মউয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ২৮ মার্চ রাত ৯ টায় তাকে সেই বন্ধুর অ্যাপার্টমেন্ট গিয়ে টাকাটা পৌঁছে দিতে হবে। জিজ্ঞেস করলাম, ব্ল্যাকমেল করে কী ব্যাপারে? মউ শুধু বলল, একটা ভিডিও ক্যাসেট। তারপর লাইন কেটে গেল। আমি আগের মতো রিং করলাম। কিন্তু আর মউ ধরল না।

কর্নেল অভ্যাসমতো টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, কিন্তু মউ গতরাতে খুন হয়ে গেছে বলছেন। ব্ল্যাকমেলারের সোনার হাঁস মারা পড়েছে। কাজেই আর ব্ল্যাকমেলের প্রশ্ন থাকছে না!

শুভ্রাংশু উত্তেজিতভাবে বলল, বাট হু কিল মউ? হোয়াই? মিঃ দাশগুপ্ত গকাল ভুবনেশ্বরে ছিলেন। ওঁর ফ্লাইট দেরি করায় প্রায় রাত পৌনে দশটায় নাকি দমদম এয়ারপোর্টে পৌঁছান। সানশাইনে পৌঁছাতে প্রায় আধঘণ্টা লাগার কথা। ওঁর অ্যালিবাই অবশ্য স্ট্রং। কিন্তু

বাড়ি ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ওঁর?

হ্যাঁ। তারপর নাকি মউ এখনই আসছি বলে বেরিয়ে যায়। মিঃ দাশগুপ্ত আমাকে শুধু এটুকু বলেছেন।

কর্নেল অ্যাসট্রে থেকে আধপোড়া চুরুট তুলে সযত্নে ধরালেন। বললেন, আপনি আমার কাছে ঠিক কী চাইছেন?

শুভ্রাংশু ঠোঁট কামড়ে ধরেছিল। বলল, কে মারল মউকে। কেন মারল? ব্ল্যাকমেলার নয়, এটুকু বলা যায়। তাই নয় কি কর্নেল সরকার? আমার দৃঢ় বিশ্বাস মিঃ দাশগুপ্তের অ্যালিবাইয়ে কোনও ফাঁক আছে।

কর্নেল তার চোখে চোখ রেখে বললেন, পুলিশ তো কিলারকে ধরেছে!

আমার মনে হচ্ছে ভুল লোক। কোথায় একটা গণ্ডগোল ঘটেছে। ই ব্লকের ১০ নম্বরের ব্যবসায়ী লোকটার কথায় পুলিশ ভুল পথে গেছে। আপনিই ঠিক লোককে ধরে দিতে পারেন। আমি জানি।

কী ভাবে জানেন? আমার ঠিকানা কে দিল আপনাকে?

মউয়ের প্রথম ফোন পাওয়ার পর আমি একটা ডিকেটটিভ এজেন্সির খবর। পেয়েছিলাম। ফিনিক্স নাম। লাউডন স্ট্রিটে অফিস। ফিনিক্সের মিনিমাম ফি দশ হাজার। ওদের একজন হ্যাঁ, প্রণয় মুখার্জি ঠাট্টা করে বলেছিলেন, বিনা পয়সায় মিসট্রি সলভ করেন এক ভদ্রলোক। তার কাছে যান।

কর্নেল হাসলেন। প্রণয় বলেছিল? সে এখনও গোয়েন্দাগিরি করছে নাকি?

আজ্ঞে হ্যাঁ। তবে ওঁদের কথাবার্তা শুনে আমার মনে হয়েছে জালিয়াতির ব্যবসা।

কর্নেল আবার ঘড়ি রেখে বললেন, প্রণয় রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার। প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিগুলোতে রিটায়ার্ড পুলিশ আর এক্স-সার্ভিসম্যানদেরই আচ্ছা। তবে ওরা সুশ্রী মেয়েদের ট্রেনিং দিয়ে কাজে লাগায়।

শুভ্রাংশু কাঁচুমাচু মুখে বলল, কর্নেল সরকার! বুঝতেই পারছেন আমার তেমন কিছু সামর্থ্য নেই। স্মল ফ্রাই। অথচ মউয়ের এই শোচনীয় মৃত্যু আমাকে প্রচণ্ড আঘাত দিয়েছে।

কিন্তু তার স্বামী বিগ গাই! কর্নেল হাসলেন। তাকে সব খুলে বলুন।

শুভ্রাংশুর ঠোঁটের কোনায় বিকৃতি ফুিটে উঠল। মিঃ দাশগুপ্ত নিজেকে ইয়াপ্পি বলেন।

ইয়াপ্পি?

হ্যাঁ। ইউ নো দা টার্ম। আমার মনে হয়েছে, স্ত্রীর ব্যাপারে তত মাথাব্যথা নেই। খুব নির্লিপ্ত। তাই আমার সন্দেহ জেগেছে।

আপনি মউয়ের মুখে একটা ভি ডি ও ক্যাসেটের কথা শুনেছিলেন?

আজ্ঞে হ্যাঁ। শুভ্রাংশু চাপা গলায় বলল, যদিও আমি মউকে ততটা নিচে দেখার কথা ভাবতে পারছি না– মানে, কল্পনা করাও অসম্ভব, কিন্তু আমি তার কতটুকুই বা জানতাম? মানি, কেরিয়ার এসব জিনিসের প্রতি তার লোভ তো ছিলই। আপনি বুঝতে পারছেন কী মিন করছি!

হু ব্লু ফিল্মের ক্যাসেট।

একজ্যাক্টলি! নড়ে বসে শুভ্রাংশু। তবে এমনও হতে পারে মউকে ড্রাগের সাহায্যে কর্নেল সরকার! আজকাল এমন সব ড্রাগ বেরিয়েছে, যা খাইয়ে দিলে সে জানবে না কী করছে বা তাকে দিয়ে কী করানো হচ্ছে। এ বিষয়ে আমি কিছু পড়াশুনা করেছি।

কর্নেল নেমকার্ডটা দিয়ে বললেন, এতে আপনার বাড়ির ঠিকানা নেই। পেছনে লিখে দিন। ফোন নাম্বার দিন। দেখা যাক কি করতে পারি।

শুভ্রাংশু তার ব্যক্তিগত ঠিকানা লিখে দিয়ে কুণ্ঠিত মুখে বলল, আমার কাঁধে মোটামুটি একটা বড় ফ্যামিলির বোঝ। তা না হলে

হাত তুলে কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, প্রণয় ইজ রাইট মাই ডিয়ার ইয়ং ম্যান! আমি ফি নিই না। আচ্ছা, আপনি আসুন। আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।

শুভ্রাংশু আড়ষ্টভাবে বেরিয়ে গেল। কর্নেল আবার খবরের কাগজে মন দিলেন। সানসাইন হাউজিং কমপ্লেক্সে কোনও খুনখারাপির ঘটনা আজকের কাগজে নেই। গভীর রাতের ঘটনা। তাছাড়া নামী কোম্পানির প্রধান কার্যনির্বাহী অফিসারের স্ত্রী। স্ক্যান্ডালের ভয়ে আপাতত চেপে দেওয়ার চেষ্টাও থাকা সম্ভব।

নটা দশ বাজে। সাড়ে নটার বেহালায় গাঙ্গুলি নার্শারিতে পৌঁছনোর কথা। অভয় গাঙ্গুলি অপেক্ষা করবেন কর্নেলের জন্য। কয়েকটা বিদেশি ক্যাকটাস এসেছে নার্শারিতে।

উঠে দাঁড়িয়ে আবার বসে পড়লেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। সানশাইন হাউজিং কলপ্লেক্সের ই ব্লকের ১নং লিফটের ভেতর এক যুবতীর মৃতদেহ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। সুন্দরী তো বটেই। টেলিসিরিয়ালে নাম করেছিল।

এবং তাকে নিয়ে একটা ব্লু ফ্লিম!

টেলিফোনে গাঙ্গুলিমশাইকে জানিয়ে দিলেন কর্নেল, জরুরী কারণে আজ যেতে পারছেন না। তবে ক্যাক্টিগুলো যেন বেহাত না হয়।

কর্নেল স্মৃতি থেকে শুভ্রাংশু সোমের বিবরণ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। তার ইন্টারেস্টের কারণ কি নিছক পুরনো প্রেম? মউকে মন থেকে মুছে দিতে পারেনি? মউয়ের স্বামী ইয়াপ্পি বলে নাকি নিজেকে। আজকাল কোন যুবক ইয়াপ্পি নয়? ব্যতিক্রম থাকতেই পারে। কিন্তু শুভ্রাংশুর প্রকৃত ইন্টারেস্ট কি শুধু রহস্যটা জানা? জেনে কী লাভ? সে মউয়ের স্বামীকে যেন সন্দেহ করেছে। কিছুক্ষণ পরে কর্নেল টেলিফোনের দিকে হাত বাড়ালেন। ডি সি ডি ডি অরিজিৎ লাহিড়িকে এখন বাড়িতে পাওয়া যাবে।….

.

০৪.

 মৃতেরা কথা বলে না! হঠাৎ এই বাক্যটা মাথায় ভেসে এল শান্তশীলের। ড্রয়িং ডমের পাশের ঘরে একটা কম্পিউটারের সামনে বসে সে যন্ত্রের মতো কাজ করছিল। অফিসেরই কাজ। আজ এবং আগামিকাল তার অফিস যাওয়ার কথা ছিল না। মউকে নিয়ে বহরমপুর যেত। আগামীকাল ফিরে আসত অসুস্থ শ্বশুরমশাইকে নিয়ে। কিন্তু মউ মরে গেল।

এখন সাড়ে বারোটা বাজে। কিছুক্ষণ আগে ম্যানেজিং ডাইরেক্টরকে তার হটলাইনে সংক্ষেপে জানিয়েছে ঘটনাটা। বলেছে, আপাতত তার কোনও সাহায্যের দরকার নেই। হলে তা অবশ্যই জানাবে। ভুবনেশ্বরের রিপোর্ট দুপুরের মধ্যেই তৈরি করে ফেলবে। দুটোর মধ্যে কেউ যেন এসে নিয়ে যায়।

সেই রিপোর্ট তৈরি করতে করতে অদ্ভুতভাবে লাইনটা মাথায় ভেসে এল, ডেডস ডু নট স্পিক।

কোথায় পড়েছিল স্মরণ হলো না। দেওয়ালে পিকাসোর একটা প্রিন্টের দিকে তাকিয়ে রইল শান্তশীল। ছবিটা উইপিং উওম্যান। ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা এবং অসহায়তা চোখে বেঁধে। ছবি বোঝে না শান্তশীল। এটা কোম্পানিরই ডেকরেটারদের সাজিয়ে দেওয়া। এ মুহূর্তে কয়েকরকম রঙ এবং কালো মোটা রেখা ছাড়া ওই বোধটা ধরা দিল না তার চোখে। মউ বলতো, ছবিটা অসহ্য। সে কি ছবি বুঝত?

নাহ্। ফিল্মের ছবি ছাড়া অন্য কোনও ছবিতে মউয়ের আগ্রহ ছিল না। বেডরুমে সেই পপুলার টেলিসিরিয়ালের কয়েকটা স্টিল কালার প্রিন্ট বাঁধিয়ে রেখেছিল। ড্রয়িংরুমেও বড় করে বাঁধানো আছে একটা। সবই মউয়ের বিভিন্ন মুডের ফটোগ্রাফ। সেগুলো কিছুক্ষণ আগে নামিয়ে প্যাকেটে বেঁধে একটা আলমারির মাথায় রেখে দিয়েছে শান্তশীল। মউ হঠাৎ গতরাত থেকে একটা দুঃসহ স্মৃতি হয়ে গেছে তার কাছে। ব্যর্থতার স্মৃতি। কিংবা একটা পতনের ছবি।

মৃতেরা কথা বলে না। আবার ভেসে এল বাক্যটা। কাজের মেয়ে ললিতাকে আজ এবং আগামীকাল দু দিনের ছুটি দেওয়া আছে। ললিতা কোথায় থাকে, জানে না শান্তশীল। জানার দরকার মনে করেনি। পরশু ললিতা এলে পুলিশকে জানানোর কথা আছে। পুলিশ তাকে জেরা করবে। কারণ চন্দ্রনাথ দেববর্মনের খুনের কোনও মোটিভ পাওয়া যাচ্ছে না। ই ব্লকের কেউ কোনওদিন মউকে ওখানে দেখেনি বলেছে।

কিন্তু একমাত্র ললিতাই বলতে পারে মউয়ের গতিবিধির কথা। মউ মৃত। সে কথা বলবে না। কিন্তু তার হয়ে কথা বলার লোক নিশ্চয় আছে। প্রথম লোক ললিতা।

শান্তশীল আবার কম্পিউটারে মন দিতে গিয়ে বুঝল তার হাত ঠিক মতো কাজ করছে না। এ ঘরে সে সিগারেট খায় না। উঠে ড্রয়িংরুমে গেল। একটা সিগারেট ধরিয়ে ইজিচেয়ারে বসল। স্মৃতির দিকে পিছু ফিরতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে ঘুরল। ড্যাম ইট! জীবনে কতবার ভুল জায়গায় পা ফেলেছে। তারপর সামলেও নিয়েছে। কিন্তু এই ভুলটা একেবারে অন্য ধরনের। খুবই অপমানজনক।

ডোরবেল বাজল। আবার পুলিশ নাকি? বিরক্ত হয়ে শান্তশীল দরজায় গেল। আইহোলে দেখল সিকিউরিটি অফিসার রণধীর সিংহ দাঁড়িয়ে আছেন। তার পাশে লম্বা চওড়া এক বৃদ্ধ ফাদার ক্রিস্টমাস ধরনের চেহারা। বিদেশি বলে মনে হলো। কী ব্যাপার?

শান্তশীল দরজা খুলে বলল, বলুন মিঃ সিংহ!

রণধীর বললেন, ইনি আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চান স্যার! আপনাকে বিরক্ত করায় দুঃখিত। কিন্তু আমি নিরুপায়। যাই হোক, ইনি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আমার সুপরিচিত।

শান্তশীল বলল, আসুন!

কর্নেল ভেতরে ঢুকলেন। রণধীর বললেন, আমি কাছাকাছি থাকছি কর্নেল সায়েব! আপনার জন্য অপেক্ষা করব।

রণধীর স্যালুট ঠুকে চলে গেলেন। শান্তশীল দরজা বন্ধ করে একটা চেয়ার দেখিয়ে দিল কর্নেলকে। নিজে বসল ইজিচেয়ারে। কর্নেল ঘরের ভেতর চোখ বুলিয়ে নিয়ে বসলেন। তারপর অমায়িক কণ্ঠস্বরে বললেন, আপনাকে এখন বিরক্ত করার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান।

শান্তশীল আস্তে বলল, আপনি বাঙালি?

 কর্নেল পকেট থেকে নেমকার্ড বের করে দিলেন।

শান্তশীল কার্ডটা পড়ে বলল, আপনি একজন রিটায়ার্ড কর্নেল। তলায় ছাপানো আছে নেচারিস্ট। তো আমার কাছে কী? আমি নেচার-টেচার বুঝি না। আমি নেচার-লাভার নই। যাই হোক, বলুন!

আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।

 কী বিষয়ে?

কর্নেল হাসলেন। নাহ্ নেচার বিষয়ে নয়। আপনার স্ত্রীর শোচনীয় হত্যাকাণ্ড

তা নিয়ে আপনার মাথাব্যথা কেন জানতে পারি?

আমি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী মিঃ দাশগুপ্ত

ওটা আমার প্রশ্নের জবাব নয়। আমার স্ত্রীর ব্যাপারটা পুলিশ দেখছে। আপনি কেন এতে নাক গলাতে চান? বলেই শান্তশীল সংযত হলো। সরি!

কর্নেল আস্তে বললেন, ৭ মার্চ হোটেল কন্টিনেন্টালে আপনার কোম্পানি একটা পার্টির আয়োজন করেছিল। যেখানে আপনি সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন।

শান্তশীল তাকাল। সো হোয়াট?

সেই পার্টিতে হংকংয়ের এক বড় ব্যবসায়ী রঙ্গনাথনের সঙ্গে আপনার আলাপ হয়েছিল!

শান্তশীল কথাটা বাজিয়ে দেখার চেষ্টা করছিল। একটু পরে বলল, হয়ে থাকতে পারে। নামটা চেনা মনে হচ্ছে। কিন্তু এ প্রশ্ন কেন?

কর্নেল চুরুটকেস বের করে একটা চুরুট ধরালেন। তারপর একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, আপনি কি চান না আপনার স্ত্রীর কিলার ধরা পড়ুক?

সে তো ধরা পড়েছে। শান্তশীল সোজা হয়ে বসল। কট উইদ দা মার্ডারউইপন।

হ্যাঁ। চন্দ্রনাথ দেববর্মনের একটা পয়েন্ট বাইশ ক্যালিবারের রিভলভার পাওয়া গেছে। লাইসেন্ডু আর্মস। এক রাউন্ড ফায়ার করেছিল সে, তা-ও সত্য। কর্নেল শান্তশীলের চোখে চোখ রেখে বললেন, কিন্তু মিঃ দাশগুপ্ত, মর্গের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, আপনার স্ত্রীর মাথার ভেতর যে গুলিটা আটকে ছিল, তা পয়েন্ট আটত্রিশ ক্যালিবারের রিভলভার থেকে ছোঁড়া থ্রি নট থ্রি বুলেট।

শান্তশীল উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু উত্তেজনা দমন করে বলল, মর্গের রিপোর্টের কথা এখনও আমি জানি না। বাট নাও আই মাস্ট আস্ক দ্য কোয়েশ্চান, হু আর ইউ?

কর্নেল একটু হাসলেন। সেটা ডি সি ডি ডি অরিজিৎ লাহিড়ির কাছে জেনে নেবেন। তবে আমি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী।

শান্তশীল কর্নেলকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে একবার দেখে নিয়ে বলল, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

আমি বেশিক্ষণ আপনাকে বিরক্ত করব না। এবার বলুন, ৭ মার্চ রাত্রে হোটেলে কন্টিনেন্টালের পার্টিতে রঙ্গনাথন এবং আপনার স্ত্রীকে কি একান্তে কথা বলতে দেখেছিলেন? স্মরণ করার চেষ্টা করুন প্লিজ!

শান্তশীল একটু ভেবে নিয়ে বলল, মউ– আমার স্ত্রী, টেলিসিরিয়ালে। হিরোইন হিসাবে নাম করেছিল। সেই পার্টিতে সি ওয়াজ ন্যাচারালি অ্যান : অ্যাট্রাকটিভ ফিগার। অনেকেই তার অটোগ্রাফ আর ছবি নিচ্ছিল। আর রঙ্গ নাথন? তিনিও মউয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন। পার্টিতে যেভাবে পরস্পর কথা বলে, সেইভাবে।

আচ্ছা মিঃ দাশগুপ্ত, এবার একটা গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন।

 বলুন!

পার্টি শেষ হবার পর আপনার স্ত্রীর মধ্যে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন কি?

সি ওয়াজ টায়ার্ড, ফেরার পথে কলেছিল, এ সব ন্যাস্টি ভিড় তার ভাল লাগে না। আর সে কোনও পার্টিতে যাবে না।

আর কিছু?

 নাহ্। আমি জানতাম তার অভিনয় জীবন যে কোনও কারণে হোক, আর ভাল লাগছিল না। বোম্বের হিন্দি ফিল্মওয়ালাদের অনেক বড় অফার সে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

আপনার সঙ্গে কখন কোথায় মধুমিতা দেবীর প্রথম আলাপ হয়?

শান্তশীল আস্তে শ্বাস ফেলে বলল, আমার কোম্পানির স্টাফ রিক্রিয়েশন ক্লাব একটা নাটক করেছিল। লাস্ট অক্টোবরে। তারিখ মনে নেই। ক্লাবের নাটকে হিরোইনের রোলে মউকে ওরা হায়ার করে এনেছিল। নাটকের আগে একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান হয়। আমি ছিলাম চিফ গেস্ট। ওদের অনুরোধে আমাকে নাটকের শেষ অব্দি থাকতে হয়েছিল।

আপনি মধুমিতা দেবীর অভিনয় দেখে নিশ্চয় মুগ্ধ হয়েছিলেন?

অস্বীকার করছি না। গ্রিনরুমে গিয়ে ওর সঙ্গে আলাপ করি। তাকে আমার নেমকার্ডও দিয়েছিলাম।

শুভ্রাংশু সোমকে তো আপনি চেনেন!

শান্তশীল তাকাল। একটু পরে বলল, হ্যাঁ। নাইস চ্যাপ। আপনি চেনেন নাকি ওকে?

কর্নেল সে-কথার জবাব না দিয়ে বললেন, বাই এনি চান্স শুভ্রাংশু কি মধুমিতা দেবীকে সঙ্গে নিয়ে আপনার কাছে এসেছিল কোনওদিন?

আমি বুঝতে পারছি না কেন এ কথা জানতে চাইছেন?

প্লিজ অ্যানসার দিস কোয়েশ্চান!

ইজ ইট ইমপর্ট্যান্ট ইন দিস কেস?

মে বি। আমরা অনেক সময়েই জানি না যে আমরা কী জানি। শান্তশীল নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, শুভ্রাংশু কী একটা গ্রুপথিয়েটারেও অভিনয় করে। সেই দলে মউও অভিনয় করত একসময়। সো মাচ আই নো– শুভ্রাংশু বলেছিল অবশ্য। তো হ্যাঁ, ইউ আর রাইট। শুভ্রাংশু মউকে সঙ্গে নিয়ে ওদের দলের স্যুভেনিরের বিজ্ঞাপনের জন্য বার দুই এসেছিল। এটা হতেই পারে সে মউ সম্পর্কে আমরা দুর্বলতা টের পেয়েছিল। আমাকে এক্সপ্লয়েট করার উদ্দেশ্য থাকতেই পারে। কিন্তু আমি কোম্পানির ইন্টারেস্ট দেখি। বিজ্ঞাপন দেওয়া যেতেই পারে। তবে কোনও এমপ্লয়ির এফিসিয়েন্সিই আমার কাছে একমাত্র বিবেচ্য। এনিওয়ে, ওদের স্যুভেনিরে আমার কোম্পানির ফুলপেজ বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করেছিলাম।

শান্তশীল হঠাৎ থেমে গেল। কর্নেল বললেন, চন্দ্রনাথ দেববর্মনের সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে?

নাহ্। মর্নিংয়ে ওকে জগিং করতে দেখেছি। একসময় আমারও অভ্যাস ছিল।

 ডিলাক্স মার্কেটিং রিসার্চ ব্যুরোর সঙ্গে আপনার কোম্পানির যোগাযোগ আছে?

শান্তশীল কথাটা চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করল, ডিলাক্স মার্কেটিং রিসার্চ ব্যুরো–এ মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। তবে আমাদের নিজস্ব মার্কেটিং রিসার্চ সেকশন আছে। তারা অনেকক্ষেত্রে বাইরেকার হেল্প নেয়। খোঁজ নেব। কেন?

আচ্ছা মিঃ দাশগুপ্ত, আপনার স্ত্রী পার্সোন্যাল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকার কথা!

শান্তশীল কর্নেলের দিকে তাকাল। একটু পরে বলল, এটা কি একটা প্রশ্ন হলো কর্নেল সরকার?

মিঃ দাশগুপ্ত, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তার মানে, আপনি আপনার স্ত্রীর শোচনীয় মৃত্যুর পর নিশ্চয় তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের কাগজপত্র দেখেছেন। কিছু সন্দেহজনক লেনদেন ওতে লক্ষ্য করেছেন কি না, সেটাই আমার জিজ্ঞাস্য।

শান্তশীল একটু উত্তেজিতভাবে বলল, মউ টেলিসিরিয়ালে এবং ছোটোখাটো অনেক ফিল্ম থেকে তত বেশি টাকা পায়নি। কিন্তু ওর কাঁধে একটা বোঝা ছিল। বহরমপুরে ওর বাবা-মা থাকেন। দুই ভাই আর এক বোন থাকে। আমরা শ্বশুরমশাই রিটায়ার করে ওখানেই বাড়ি করেছেন। আমি কখনও যাইনি। সেখানে। আজ দুজনে যাওয়ার কথা ছিল। শ্বশুরমশাই অসুস্থ বলে সে দম নিল। জোরে শ্বাস ছেড়ে ফের বলল, হ্যাঁ। মউয়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আমি দেখেছি।

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, গত দু-তিন মাসে মোটা অঙ্কের টাকা ড্র করেছিলেন কি মধুমিতা?

মোটা অঙ্ক মানে দুবার দশ হাজার টাকা তুলেছিল। ফেব্রুয়ারি এবং এ মাসে। এটা স্বাভাবিক। শ্বশুরমশাই গতমাস থেকে অসুস্থ।

এখন একজ্যাক্ট ব্যালান্স কি পঞ্চাশ হাজারের ওপরে? নাকি নিচে?

 শান্তশীল হতাশ ভঙ্গিতে বলল, দিস ইজ টু মাচ! পুলিশও আমাকে এত প্রশ্ন করেনি। দে নো মাই সোশ্যাল স্ট্যাটাস! মাই পজিশন! অ্যান্ড ইউ আর আস্কিং মি দিজ ননসেন্স কোয়েশ্চানস! কে আপনি তাও এক্সপ্লেন করছেন না। আপনি কি ব্ল্যাকমেল করতে এসেছেন আমাকে?

কর্নেল একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ। ব্ল্যাকমেল ইজ দা রাইট ওয়ার্ড মিঃ দাশগুপ্ত! আপনার স্ত্রীকে কেউ ব্ল্যাকমেল করছিল।

শান্তশীলের চোখে একমুহূর্ত চমক ঝিলিক দিল। তারপর শান্তভাবে বলল, প্লিজ এক্সপ্লেন ইট–ইফ সো মাচ ইউ নো।

আমার ধারণা, আপনার স্ত্রীর ব্যাঙ্ক পঞ্চাশ হাজারের অনেক নিচে।

থার্টি সিক্স মতো। কিন্তু কে মউকে ব্ল্যাকমেল করছিল? কেন করছিল? করলে আমাকে সে গোপনই বা করবে কেন? আমার ক্ষমতা সে জানত। শান্তশীল দ্রুত একটা সিগারেট ধরাল। হা– তার অতীত জীবনে স্ক্যান্ডালাস কিছু থাকতেই পারে। আমি জানি অভিনেত্রীদের অনেকের জীবনে কী সব ঘটে থাকে। মউ ভালোই বুঝত, আমি তার আগের, জীবনে নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাতে রাজি নই। আই অ্যাম এ মর্ডান ম্যান অ্যান্ড সি নিউ ইট ওয়েল।

মিঃ দাশগুপ্ত! তবু আপনি একজন পুরুষমানুষ। চূড়ান্ত মডার্ন হয়ে ওঠা ওয়েস্টেও কোনও পুরুষমানুষ তার স্ত্রীকে নিয়ে তোলা ব্লু ফিল্ম বরদাস্ত করতে পারে না- দ্যাট আই ক্যান অ্যাসিওর। আপনি আফটার অল ভারতীয়।

ব্লু ফিল্ম বললেন? শান্তশীল ভুরু কুঁচকে তাকাল।

হ্যাঁ ব্লু ফিল্ম।

ইউ মিন, মউকে নিয়ে তোলা ব্লু ফিল্ম?

 ধরুন তা-ই।

সরি কর্নেল সরকার। আমি বিশ্বাস করি না। ক্ষমা করবেন, এ সব উদ্ভট কথাবার্তা শোনার সময় আমার নেই। আমার হাতে জরুরি কাজ আছে। দেড়টা বাজে।

শান্তশীল উঠে দাঁড়াল। কর্নেল অগত্যা উঠলেন। তারপর দেওয়ালে একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন, ওখানে একটা বড় ছবি ছিল সম্ভবত। আপনার স্ত্রীর ছবি হতেই পারে। হ্যাঁ, ওই টেবিলে একটা ছিল। চিহ্ন লক্ষ্য করছি। স্ত্রীর স্মৃতি আপনার পক্ষে আপাতত অসহনীয় হতেই পারে। তবে শিগগির ভুলেও যাবেন। থ্যাঙ্কস্। চলি।

শান্তশীল নিষ্পলক তাকিয়ে শুনছিল। কর্নেল বেরিয়ে যাওয়ার পর এগিয়ে গিয়ে জোরে দরজা বন্ধ করল।…

.

০৫.

 সিকিউরিটি অফিসার রণধীর সিংহ একটা ফলে ভরা গুলমোহরের তলায় পঁড়িয়ে ছিলেন। তার হাতে ওয়াকিটকি। কার সঙ্গে ওয়াকিটকিতে কথা বলছিলেন। কর্নেলকে দেখে কথা বন্ধ করে স্যালুট করলেন। তারপর কর্নেল কাছে গেলে আস্তে বললেন, কথা হলো?

কর্নেল বললেন, স্ট্রং নার্ভের মানুষ। সত্যিই ইয়াপ্পি।

ওঁর অ্যালিবাইও স্ট্রং। কিন্তু চিন্তা করুন স্যার! ী অমন একটা সাংঘাতিক চিঠি লিখে গেছেন। অথচ উনি নিজে খোঁজ নিতে না গিয়ে আমাকে ফোন করেছিলেন। পুলিশ যাই বলুক, আমার খটকা লেগে আছে। চিঠিটা সম্পর্কে কী বললেন উনি?

চিঠিটার কথা তুলিনি। বলে কর্নেল চারিদিকটা দেখে নিলেন। ই ব্লক কোনটা?

ওই তো! বি ব্লকের পেছনে। পাশে একটা ছোট পুকুর আছে। একসময় পুরো তিন একর জলা ছিল। ভরাট করে এই হাউজিং কমপ্লেস গড়া হয়েছিল। পুকুরটা তার চিহ্ন।

চলুন। স্পটটা একটু দেখে যাই।

এ এবং বি ব্লকের মাঝখানে একটা সংকীর্ণ রাস্তা। দুধারে কেয়ারি কার গুল্মলতা। রাস্তাটা গিয়ে বেঁকেছে একটা পাঁচতলা বাড়ির সামনে। সুদৃশ্য একালীন স্থাপত্য। তবে অন্য ব্লকের বাড়িগুলোর চেয়ে এটা ছোট। বোঝা যায়, পুকুরটা টিকিয়ে রাখার প্ল্যান বাড়িটাকে ছোটো করেছে। দুজন সিকিউরিটি গার্ড উর্দি পরে ঘাসে বসেছিল। উঠে দাঁড়িয়ে সেলাম দিল। একটা বিশাল নাগকেশরের গাছ ছায়া ফেলেছে সামনের লনে।

কর্নেল বললেন, এটা শেষ প্রান্ত?

রণধীর বললেন, হ্যাঁ স্যার! ওই দেখুন বাউন্ডারি ওয়াল। কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে আসা যায় না। দেওয়াল যথেষ্ট উঁচু এদিকটায়।

দেওয়ালের ওপারে কি আছে?

মাছের ভেড়ি। কাজেই খুনী বাইরের লোক হতেই পারে না। আপনাকে আগেই বলেছি রাত নটার পর সিকিউরিটি চেকিং ছাড়া কেউ ঢুকতে পারে না সানশাইনে। এদিকে আসুন!

বাড়ির নিচের তলায় গাড়ির গ্যারাজ এবং পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। একপাশে দুটো লিস্ট। লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে কর্নেল চারদিক দেখছিলেন। মাত্র দুটো গাড়ি। তেরপলের কভারে একটা গাড়ি ঢাকা। অন্যটার গায়ে হেলান দিয়ে উর্দিপরা ড্রাইভার দাঁড়িয়ে আছে। সে আপন মনে খৈনি ডলছিল।

রণধীর বললেন, ২ নং লিফট আগামীকাল সারাতে লোক আসবে। আজ এসেছিল। কিন্তু পুলিশ তাদের কাজ করতে দেয়নি।

১ নং লিট ওপরে তিনতলায় আছে। কারণ ২ নম্বরে লাল আলো। কর্নেল বোতাম টিপলেন। লিফট নেমে এল। রণধীর বললেন, একটুখানি রক্ত ছিল, ধুয়ে ফেলা হয়েছে। মিসেস দাশগুপ্তের মাথার ডানদিকে গুলি করা হয়েছিল। লিফটের বাঁ-কোনায় কাত অবস্থায় বডি ছিল। সেকেন্ড ফ্লোর?

কর্নেল মাথা দোলালেন।

তিনতলায় লিফট থেকে বেরিয়েই কর্নেল লিফটের দিকে তাকালেন। সেই সময় উল্টেটাদিকের ঘরে কুকুরের গর্জন শোনা গেল। দরজা বন্ধ হয়ে গেলে কর্নেল বাইনোকুলারে খুঁটিয়ে লিফটের ওপরটা, দুই পাশ এবং নিচের অংশ লক্ষ্য করলেন। তারপর বাঁদিকে সিঁড়ির কাছে গেলেন। দেওয়ালে চৌকো সিমেন্টের ঝরোকা। ফাঁক দিয়ে বিশাল ভেড়ি চোখে পড়ে। ঝরোকার একটা ফাঁকে ইঞ্চিটাক জায়গা খসে গেছে। কর্নেল তিন ধাপ নেমে সেখানটা ছুঁলেন।

রণধীর একটু হেসে বললেন, মিঃ দেববর্মন সত্যিই এক রাউন্ড ফায়ার করেছিলেন। তার ফায়ার আর্মসের গুলি এখান দিয়ে বেরিয়ে জলে ঝাঁপ দিয়েছে। তার মানে, খুনীকে তিনি সত্যিই সিঁড়ি দিয়ে পালাতে দেখেছিলেন।

কিন্তু ১০ নম্বরের অগ্রবালজি কোনও গুলির শব্দ শোনেননি!

কুকুরের গর্জন। তাছাড়া তার মন ছিল কুকুরের দিকে। ওই তো শুনছেন! আমার মতে কুকুরটার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো দরকার। ভদ্রলোককে বলবেন।

রণধীর গম্ভীরমুখে বললেন, বলব।

অগ্রবালজির কীসের কারবার জানেন?

ল্যাক এক্সপোর্ট করেন শুনেছি। আপনি ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে

নাহ কুকুরটা বড় বাজে। নিশ্চয় কোনো অসুখে ভুগছে। আর কুকুর সম্পর্কে আমার অ্যালার্জি আছে।

রণধীর হাসলেন। আমি কিন্তু ডগ-লাভার সোসাইটির মেম্বার স্যার!

কর্নেল সিঁড়ি থেকে উঠে করিডর ধরে এগিয়ে গেলেন। করিডর বাঁক নিয়ে শেষ হয়েছে ১৩ নং অ্যাপার্টমেন্টের সামনে। নেমপ্লেটে লেখা আছে সি এন দেববর্মন। বাঁদিকেরটায় লেখা মিসেস আর খুরশিদ। ডানদিকেরটাতে প্রোফেসর এস কে রায়, এম, এ, পি-এইচ. ডি। লকে একটা কালো প্লেট ঝোলানো। তাতে লেখা আছে প্লিজ ডোন্ট ডিসটার্ব।

কর্নেল ভাবছিলেন চন্দ্রনাথ দেববর্মনের স্টেটমেন্টের কথা। অরিজিৎ লাহিড়ির মুখে সেটা শুনেছেন। মিলে যাচ্ছে। চন্দ্রনাথ মিথ্যা কিছু বলেননি। কিন্তু মউ কেন তাকে টেলিফোন করেছিল এবং কেনই বা ছুটে এসেছিল প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে–তাকে বাঁচতে? এই জটটা ছাড়ানো যাচ্ছে না। চন্দ্রনাথ তাকে নাকি চিনতেনই না। বলেছেন, দেখে থাকতে পারি, আলাপ ছিল না।

রণধীর বললেন, পুলিশ মিঃ দেববর্মনের ঘর সিল করে গেছে।

হুঁ! দেখতে পাচ্ছি। তো এই প্রোফেসর ভদ্রলোকের বয়স কত আনুমানিক?

 ওঁকে খুব কম দেখেছি। ত্রিশ-বত্রিশের মধ্যেই হবে। খুব দাম্ভিক টাইপ।

একা থাকেন?

না স্যার! ওঁর স্ত্রী সানশাইন কালচারাল কমিটির সেক্রেটারি। নাচ গান নাটক এসব নিয়ে থাকেন। এ ব্লকে কালচারাল কমিটির অফিস। এখন ঘরেই থাকার কথা। আলাপ করবেন?

কর্নেল কালো প্লেটটার দিকে আঙুল তুলে সকৌতুকে চাপাস্বরে বললেন, প্লিজ ডোন্ট ডিসটার্ব।

এই সময় বাঁদিকে মিসেস খুরশিদের ঘর থেকে জিনস ব্যাগি শার্টপরা এক তরুণ বেরুল। হঠাৎ দেখলে সাহেব মনে হয়। সে কর্নেলের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে রণধীরকে বলল, হাই সিনহা!

হাই কুমরো!

সে হাসল। মাই গ্র্যান্ডমা ইজ ওয়েট।

ও নটি বয়! সি ইজ অ্যান অনারেবল লেডি, মাইন্ড দ্যাট!

ম্যান! ইউ আর কিলিং লাভূলি গার্লস হোয়াটস হার নেম, আই থিং সি ওয়াজ আ ফিল্মস্টার ইজ ইট? ও কে! বাই!

সে চলে গেল শিস দিতে দিতে। রণধীর বিকৃত মুখে বললেন, ডার্টি জেনারেশন!

মিসেস খুরশিদ পার্শি মহিলা।

হ্যাঁ স্যার! বড় ব্যবসা আছে। ছেলেরা চালায়। বৃদ্ধা মাকে এখানে রেখেছে। একজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলা তার দেখাশুনা করেন।

কর্নেল ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, আশ্চর্য তো!

কী স্যার?

কলকাতার পার্শিরা নিজস্ব এরিয়া গড়ে নিয়েই বাস করেন। তাদের নিজস্ব সোসাইটি আছে। অথচ এখানে এই বৃদ্ধা মহিলাকে নির্বাসনের মতো রাখা হয়েছে। কেন? উনি চলাফেরা করতে পারেন?

হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। পায়ের অসুখ আছে।

আমরা এবার সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাব।

ও কে।

 সিঁড়িতে নামতে নামতে কর্নেল বললেন, সিঁড়ি ধোয়া হয়েছে মনে হচ্ছে?

হ্যাঁ স্যার! তবে গত রাতে আমি নিজে থরো চেক করেছিলাম। পুলিশও করেছিল। সিঁড়িতে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। নাথিং।

ফার্স্ট ফ্লোরটা একটু দেখতে চাই।

এ ফ্লোরে কোনও অ্যাপার্টমেন্ট নেই। নটা ঘর আর একটা কমন বাথরুম আছে। সারভ্যান্টস রুম। কোনওটাতে কারও ড্রাইভারও থাকে। আসলে অফিস হিসেবে ভাড়া দেওয়ার প্ল্যান ছিল। কিন্তু কর্পোরেশন হাউজিংয়ের প্ল্যানেই স্যাংশন করেছে। কাজেই

বুঝেছি।

নিচের লনে পৌঁছে রণধীর বললেন, যদি কিছু মনে না করেন, আপনার লাঞ্চ আমার কোয়ার্টারে সেরে নিলে কৃতার্থ হব।

থ্যাঙ্কস্! আরেকদিন হবে। আজ চলি।

গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে রণধীর বললেন, আমাকে একটু মনে রাখবেন স্যার! তাই অ্যাম নট ফিলিং ওয়েল হিয়ার।

বুঝতে পারছি।

রাতের ঘটনার পর সিকিউরিটি কঠোর করা হয়েছে। বড় রাস্তায় একটা পুলিশভ্যানও দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেলকে খাতায় ফের নাম সই করে ডিপারচার টাইম লিখে বেরুতে হলো। কয়েক পা এগিয়েই একটা ট্যাক্সি পেলেন। কোনও খালি ট্যাক্সি এ পর্যন্ত তাকে না করে না।

ইলিয়ট রোডে তিনতলায় নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরলে ষষ্ঠী বলল, নালবাজারের নাহিড়িসায়েব ফোং করতে বলেছেন।

কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন, করছি ফোং। তুই খাবার রেডি কর।

টেলিফোনে অরিজিৎকে পেয়ে বললেন, নতুন কিছু ঘটেছে?

 রঙ্গনাথনকে ট্রেস করেছি।

 কোথায়?

 হোটেল কন্টিনেন্টালে। তবে নজর রাখা হয়েছে মাত্র।

কত নম্বরে?

সুইট নাম্বার ১২৭। সিক্সথ ফ্লোর। আমি বলি কী, প্রথমে আপনি গিয়ে কথা বলুন।

ঠিক আছে। শোনো! সানশাইনে গিয়েছিলাম। এখনই ফিরছি।

 খবর পেয়েছি। কিছু পেলেন নাকি?

নাহ্।

ওঃ ওল্ড বস! হাতের কার্ড এখন শো করবেন না জানি। ও কে!

 আমি ক্ষুধার্ত, ডালিং!

সরি। ছাড়লাম…

 খাওয়ার পর কর্নেল চুরুট ধরিয়ে ড্রয়িংরুমে ইজিচেয়ারে হেলান দিলেন। শান্তশীলকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল কেন সে অমন সাংঘাতিক চিঠি পেয়েও নিজে ছুটে যায়নি ই ব্লকে এবং সিকিউরিটি অফিসারকে বলেছিল খোঁজ নিতে?

সন্দেহের তালিকায় এখন সে এক নম্বরে উঠে এল। চিঠিটা পাওয়ার পর ছুটে গিয়ে বউকে গুলি করে মেরে ভালমানুষ সেজে সে সিকিউরিটিতে ফোন করে থাকবে। তার কোনও লাইসেন্ড আর্মস নেই, তা ঠিক। কিন্তু তার বউ প্রাক্তন ফিল্মস্টার। চরিত্র সম্পর্কে সন্দেহ থাকতেই পারে। মেলশোভিনিস্ট টাইপের ইয়াপ্পি। সুন্দরী মেয়েদের সে কেরিয়ারের অংশ হিসেবেই করায়ত্ত করতে পারে এবং গণ্য করতে পারে এও অর্জিত সম্পদ বলে।

তার ড্রাইভার আক্রাম বলেছে, সকালে সায়েব-মেমসায়েবের বহরমপুরে যাওয়ার কথা ছিল। এটা অবশ্য শান্তশীলের একটা চাল হতেও পারে। ভুবনেশ্বরে বসেই বউকে কোনও ছলে খুন করার প্ল্যান ছকে থাকতেও পারে।

শুধু ওই চিঠিটা

 কিন্তু হঠাৎ চিঠিটা শান্তশীলকে খুন করার দৈবাৎ সুযোগ দেয়নি তো? মার্ডার উইপন পাঁচিলের পেছনে ছুঁড়ে ফেললেই ভেড়ির অগাধ জলে তলিয়ে যাবে।

কর্নেল চোখ বুজে টাকে হাত বুলোচ্ছিলেন। একসময় চোখ খুললেন। নাহ্। ইয়াপ্পিরা খুন-খারাপির পথে কদাচ হাঁটে না। এ যুগের এক প্রজন্মের এই বিচিত্র মানসিকতা! তা শুধু পেশাগত দক্ষতাকেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার অবলম্বন গণ্য করে। পেশাগত দক্ষতাই তার মূলধন। আগের দিনের নিষ্ঠাবান কারিগরদের মতো সে ক্রমাগত কুশলী হতে চায়।

শান্তশীল বলছিল ভুবনেশ্বরের রিপোর্ট তৈরি করতে ব্যস্ত সে। এটাই প্রকৃত ইয়াপ্পির চরিত্রলক্ষণ। নাহ্। কর্নেলের চোখে এযাবৎকাল দেখা অতি ধূর্ত খুনীর আদলেও মেলানো যায় না এক ইয়াপ্পির মুখে।

সন্দেহের তালিকা থেকে নেমে গেল শান্তশীল।

এবার প্রশ্ন, চন্দ্রনাথ কি সত্য কথা বলেছেন পুলিশকে? যাকে চেনেন না, সে কেন তাকে বাঁচানোর জন্য অত ঝুঁকি নিয়ে তার কাছে ছুটে যাবে?

চন্দ্রনাথের জামিন পেতে অসুবিধে হবে না। কোটিপতি লোক। তাছাড়া পাবলিক প্রসিকিউটার পুলিশের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জামিনে আপত্তি করবেন না সম্ভবত। তিনি আপত্তি না করলে ম্যাজিস্ট্রেটেরও আপত্তির কথা নয়। চন্দ্রনাথ সিগগির জামিন পেলেই ভাল হয়। তাঁর সঙ্গে কথা বললে কোনও সূত্র মিলতেও পারে। তার আগে

কর্নেল টেলিফোন তুলে হোটেল কন্টিনেন্টাল ডায়াল করলেন। মহিলা রিসেপশনিস্টের মিঠে গলা ভেসে এল। কর্নেল বললে, প্লিজ পুট মি টু সুইট নাম্বার ওয়ান টু সেভেন।

প্লিজ হোল্ড অন, স্যার।

ওকে!

কিচুক্ষণ পরে রিসেপশনিস্ট বলল, সরি স্যার! রিং হচ্ছে কেউ ধরছেন না।

কর্নেল ফোন রেখে উঠে দাঁড়ালেন। পোশাক বদলাতে গেলেন পাশের ঘরে।..

.

০৬.

হোটেল কন্টিনেন্টাল নতুন পাঁচতারা হোটেল। কর্নেল লাউঞ্জে ঢুকে দেখলেন ইতস্তত সাজিয়ে রাখা সুদৃশ্য আসনে নানা বয়সের পুরুষ এবং মহিলা বসে আছেন। তাঁদের মধ্যে সাদা পোশাকে পুলিশও থাকার কথা। পাশে কাচের দেওয়ালের ওধারে বার। রিসেপশন কাউন্টারে সায়েব-মেমসায়েবদের দঙ্গলও ছিল। কর্নেল গিয়ে এক মহিলা রিসেপশনিস্টকে মৃদুস্বরে বললেন, সুইট নাম্বার ওয়ান টু সেভেনে মিঃ রঙ্গনাথনের সঙ্গে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।

জাস্ট আ মিনিট স্যার! বলে মহিলা পেছনে বোর্ড দেখে নিলেন। তারপর ফোন তুলে ডায়াল করলেন। একটু পরে বললেন, রিং হয়ে যাচ্ছে।

উনি বেরিয়ে যাননি তো?

না স্যার! বেরিয়ে গেলে কি বোর্ডে চাবি দেখতে পেতাম।

 কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, উনি ডাইনিংয়ে থাকতে পারেন কি?

সম্ভবত না। এক মিনিট প্লিজ! ফোনে কান রেখে তরুণী রিসেপশনিস্ট পাশের এক যুবককে বলল, সুজিত! মিঃ রঙ্গনাথনের ঘরে কি লাঞ্চ পাঠানো হয়, নাকি উনি ডাইনিংয়ে খেতে আসেন? আমি তো জানি উনি ডাইনিংয়ে খেতে আসেন না। তা ছাড়া এখন সরি! সাড়ে তিনটে বাজে।

যুবকটি কর্নেলের দিতে তাকিয়ে বলল, মিঃ রঙ্গনাথন জানিয়েছিলেন লাঞ্চ পাঠাতে হবে না শরীর ভাল না।

কখন জানিয়েছিলেন?

অনেকক্ষণ আগে। আপনি কি ওঁর পরিচিত?

হ্যাঁ। বলে কর্নেল নিজের নেমকার্ড দিলেন।

 রিসেপশনিস্ট ফোন নামিয়ে রেখে অন্য কাজে মন দিল। যুবকটি বলল, মিঃ রঙ্গনাথন মর্নিংয়ে বেরিয়েছিলেন। এগারোটা নাগাদ ফিরে আমাকে বলে যান শরীর খারাপ। কেউ এলে যেন ওঁর ঘরে পাঠিয়ে দিই। আপনি যেতে পারেন। সিক্সথ ফ্লোর। ওয়ান টু সেভেন।

কর্নেল লিফটের দিকে এগিয়ে গেলেন। লিফটের সামনে ছোট্ট লাইন ছিল। লিট ছিল এইটথ ফ্লোরে। এবার নামতে শুরু করেছে। কর্নেলের পেছনে একজন এসে দাঁড়াল। কর্নেল ঘুরে দেখেই হাসলেন। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ইন্সপেক্টর বিমল হাজরা। হাজরা খুব আস্তে বললেন, সামথিং রং স্যার। বলছিখন।

সিক্সথ ফ্লোরে লিফট থেকে বেরিয়ে হাজরা বললেন, এক ঘণ্টা আগে আমি মিট করতে চেয়েছিলাম। রিসেপশনিস্ট বলল, রিং হচ্ছে। ফোন ধরছেও না কেউ। আপনি না এলেও এবার আমি চেক করতাম।

১২৭ নম্বর সুইটের দরজায় ল্যাচকি সিস্টেম। হাজরা দরজায় নক করলেন। কোনও সাড়া এল না। আবার কিছুক্ষণ নক করলেন। সাড়া এল না। পশ্চিমি রীতি মেনে চলা হয়েছে সুইটে। কোনও ডোরবেল নেই। এই হোটেলে বিদেশিরাই এসে থাকেন। বেশির ভাগ লোক ব্যবসায়ী।

কর্নেল বাধা দেওয়ার আগেই উত্তেজিত হাজরা ল্যাচকিয়ের হাতল ঘোরালেন। দরজা খুলে গেল। তাহলে খোলাই ছিল দরজা!

প্রথমে বসার ঘর। পেছনে কাশ্মীরি নকশাদার কাঠের পার্টিশান। তার ওধারে চওড়া বিশাল বেডরুম। জানালার দিকে ভারি পর্দা। মেঝেয় পা দেব্যোওয়া কার্পেট। ইজিচেয়ার। কোনায় একটা বড় টি ভি।

বিছানার ওধারে মেঝেয় রক্তিম কার্পেটের ওপর কাত হয়ে পড়ে আছে মধ্যবয়সী বেঁটে একটা লোক। পরনে টাইট, পায়ে জুতো। শ্যামবর্ণ লোকটার মুখে পুরু গোঁফ আছে। তার কঁকড়া চুল রক্তে লাল। কর্নেল, ঝুঁকে দেখে নিয়ে বললেন, মনে হচ্ছে মাথার ডানদিকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করা হয়েছে মিঃ হাজরা! মাথা ঠাণ্ডা রাখুন। রিসেপশনের নাম্বার ফোনের চার্টে পেয়ে যাবেন। নিজের পরিচয় দিয়ে ম্যানেজারকে আসতে বলুন। না অন্য কোনও কথা নয়। শুধু বলুন, এটা আর্জেন্ট।

হাজরা বিছানার পাশে নিচু টেবিলে রাখা ফোনের কাছে বসলেন। ডায়াল করলেন।

কর্নেল ঘরের ভেতরটা দেখছিলেন। মেঝের কার্পেট জায়গায় জায়গায় এলোমেলো হয়ে আছে। রক্তের ছোপ লক্ষ্য করতে করতে বসার ঘরে গেলেন। সোফায় রক্তের ছিটে আছে। কথা বলতে বলতে লোকটাকে খুনী গুলি করেছে। তারপর টানতে টানতে বেডরুমের ওপাশে নিয়ে গেছে।

হাজরা তার পাশ কাটিয়ে দরজা খুলে করিডরে দাঁড়ালেন। কর্নেল মেঝে থেকে একটা নেমকার্ড কুড়িয়ে নিলেন। রঞ্জন রায়। ভিডিওজোন। ২৮/সি সাউদার্ন রো, কলকাতা-১৭ ওপরে ডানকোণে একটা টেলিফোন নম্বর। টেবিলে একটা হইস্কির বোতল। বিদেশি হুইস্কি। দুটো গ্লাস কাত হয়ে মেঝেয় পড়ে আছে। কর্নেল নেমকার্ডটা পকেটে ভরে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। বাথরুমে কেউ নেই।

প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে ম্যানেজার এলেন। লম্বা সুদর্শ মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। মুখে প্রচণ্ড উদ্বেগ থমথম করছে। এনিথিং রং স্যার?

হাজরা তাঁকে ইশারায় ঘরে আসতে বললেন। তারপর ম্যানেজার প্রায় আর্তনাদ করলেন, ও মাই গড!

কর্নেল দ্রুত বললেন, প্লিজ হইচই করবেন না। যা করার পুলিশ করবে। আপনি ততক্ষণ আমরা কিছু প্রশ্নের উত্তর দিন। আপনি হোটেল কন্টিনেন্টালের ম্যানেজার? আপনার নাম বলুন প্লিজ!

 ব্রিজেশ কুমার। বাট–

আপনি চিনতে পারছেন বডিটা কার?

মিঃ রঙ্গনাথনের। বড় ব্যবসায়ী। হংকংয়ে ওঁর কারবার। কলকাতা এলে আমাদের এখানেই ওঠেন।

হাজরা স্থানীয় থানায় ফোন করার পর লালবাজারে ফোন করতে ব্যস্ত হলেন।

কর্নেল বললেন, মিঃ কুমার! আপনাদের কোন বোর্ডারের সঙ্গে কে দেখা করতে আসছে, তার রেকর্ড থাকে কি?

না– মানে, রিসেপশনে কেউ এসে কোনও বোর্ডারের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তার ঘরে রিং করে জেনে নেওয়া হয়। বোর্ডার হা করলে পাঠানো হয়। তবে ওই দেখুন নোটিশ। রাত নটার পর কোনও একা মহিলা বা পুরুষ বোর্ডারের ঘরে কোনও পুরুষ বা কোনও মহিলা ভিজিটারের প্রবেশ নিষেধ।

মিঃ রঙ্গনাথন কি এমন কোনও নির্দেশ কখনও দিয়েছিলেন কিছু ঘটলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে?

হ্যাঁ স্যার। ওটা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মিঃ রঙ্গনাথনের রেফারেন্স আমি রেকর্ড দেখে জানাতে পারি।

আজ শেষবার কখন আপনার সঙ্গে ওঁর দেখা হয়েছিল?

সকাল নটায়। উনি বেরুনোর সময় আমাকে বলে গিয়েছিলে, ১০ টার পর ফিরবেন। কেউ এলে যেন জানিয়ে দিই। অবশ্য তারপর কখন ফিরেছিলেন আমি জানি না। রিসেপশনে জানা যাবে।

উনি কবে হংকং ফিরবেন বলেছিলেন আপনাকে?

 ৩১ মার্চ সকালের ফ্লাইটে।

উনি এখানে ওঠেন কোন তারিখে এবং কখন?

 ২৭ মার্চ ইভনিংয়ে। হংকং থেকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন। বরাবর তা-ই করেন।

আপনার হোটেলে সিকিউরিটি সিস্টেম কী রকম?

ভেরি স্ট্রং স্যার। প্রত্যেক ফ্লোরে দুজন সিকিউরিটি গার্ড আছে। তাদের ওয়াকিটকি আছে। তবে ম্যানেজার কষ্ট করে একটু হাসবার চেষ্টা করলেন। তবে ইউ নো স্যার, দিস ইজ আফটার অল ইন্ডিয়া। আমি ওয়েস্টের হোটেলের সিস্টেম দেখেছি। আমাদের দেশের জাতীয় চরিত্র মানে, কর্তব্যবোধে শৈথিল্য আছে, তা দেখতেই পাচ্ছেন। আমি এই ফ্লোরের গার্ডদের কাছে কৈফিয়ত চাইব। কারণ এতে হোটেলের সুনাম হানি শুধু ঘটল না, নিরাপত্তার প্রশ্নও

ম্যানেজার নার্ভাস হয়ে থেমে গেলেন। এয়ারকন্ডিশনড ঘরেও তার কপালে ঘামের ফোঁটা। আড়ষ্ট হাতে রুমালে মুখ মুছলেন।

কর্নেল বললেন, মিঃ হাজরা। আমি মিঃ কুমারের সঙ্গে রিসেপশনে যাচ্ছি।

 আচ্ছা স্যার…

ব্রিজেশ কুমারকে লিটে ঢুকেই কর্নেল বলেছিলেন, রিসেপশনে এখনই কাকেও কিছু জানাবেন না যেন। অ্যান্ড ফর ইওর ইনফরমেশন, লাউঞ্জে এবং বাইরে রাস্তায় পুলিশ মোতায়েন আছে। পুলিশ যা করার করবে। তার আগেই আমাকে ইনফরমেশনগুলো দিয়ে দেবেন। ডোন্ট ওয়ারি প্লিজ!

কিন্তু রিসেপশন কাউন্টারে ম্যানেজারের চেহারা দেখে কর্মীরা একটা কিছু আঁচ করেছিলেন। কর্নেল স্বাভাবিক ভঙ্গিতে লাউঞ্জের এক কোণে নিরিবিলি জায়গায় বসলেন। লক্ষ্য করলেন, কর্মীরা কেমন চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

একটু পরে মিঃ কুমার কর্নেলের কাছে এলেন। হাতে একশিট কাগজ। বসে চাপাস্বরে বললেন, মিঃ রঙ্গনাথনের রেফারেন্স কম্পিউটারাইজড় করা ছিল। এই নিন। সুজিত চৌধুরি নামে রিসেপশন কাউন্টারে একটি ছেলে আছে। সে বলল, এগারোটায় রঙ্গনাথন ফিরেছিলেন। শরীর খারাপ। লাঞ্চ খাবেন না।

জানি। রঙ্গনাথনের সঙ্গে কেউ দেখা করতে এসেছিল কি না?

ওঁর সঙ্গে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে লিফটে উঠতে দেখেছিল সুজিত।

আপনি সুজিতবাবুকে ডাকুন।

সুজিত তাকিয়েছিল এদিকে। ম্যানেজারের ইশারায় চলে এল। কর্নেল বললেন, রঙ্গনাথনের সঙ্গে যে ভদ্রলোক ছিলেন, তার চেহারা মনে আছে আপনার?

সুজিতকে নার্ভাস দেখাচ্ছিল। বলল, দাড়ি ছিল। চোখে সানগ্লাস। মোটামুটি ফর্সা।

পোশাক?

জিনস, লাল শার্ট

কী বয়সী?

সুজিত একটু ভেবে বলল, অত লক্ষ্য করিনি। তবে আমার বয়সী।

 আপনার বয়স কত?

 ২৮ বছর স্যার!

রঙ্গনাথনের সঙ্গীর হাতে কিছু ছিল?

 হাতে? নাহ্। দেখিনি?

আপনি সিওর?

হ্যাঁ স্যার।

ঠিক আছে। আপনি আসুন।

সুজিত চলে যাওয়ার পর মিঃ কুমার বললেন, কন্টিনেন্টালে এই প্রথম মিসহ্যাপ। আমার কেরিয়ারের ক্ষতি হবে। আমার আগেই সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।

কর্নেল চুরুট ধরাচ্ছিলেন। বললেন, কেন?

ব্রিজেশ কুমার বিব্রতভাবে বললেন, রঙ্গনাথন হংকংয়ের ব্যবসায়ী। রেভিনিউ ইনটেলিজেন্স থেকে আমাদের নির্দেশ দেওয়া আছে, বিশেষ করে হংকং থেকে আসা লোকেদের সম্পর্কে যেন ওঁদের খবর দিয়ে রাখি। আগে যতবার রঙ্গনাথন এসেছেন, খবর দিয়েছি। এবারই দিইনি। কারণ ভদ্রলোককে আমার অনেস্ট বলে মনে হয়েছিল। খুব মিশুকে মানুষ ছিলেন। খুব আমুদে।

কর্নেল কাগজটাতে চোখ বুলিয়ে দেখেছিলেন চন্দ্রনাথ দেববর্মনের নাম ঠিকানা লেখা আছে। কজেই সানশাইনের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের যোগ আছেই। লাউঞ্জে এখনও স্বাভাবিক অবস্থা। শুধু রিসেপশনের কর্মীদের মধ্যে কেমন চাপা চাঞ্চল্য। ওরা এদিকে বরাবর তাকাচ্ছে।

কর্নেল বললেন, মিঃ কুমার! আপনি নিজের জায়গায় যান।

 ম্যানেজার আড়ষ্টভাবে বললেন, আপনার পরিচয় পেলে খুশি হতাম স্যার! 

কর্নেল পকেট থেকে তার নেমকার্ড দিলেন। ব্রিজেশ কুমার চলে গেলেন। এতক্ষণে পুলিশ এল। বেশ বড় একটা দল। অমনই লাউঞ্জে চমক খেলে গেল। যে যেখানে ছিল চুপ করল। পুলিশের দলটি লিফটে উঠে যাওয়ার পর কর্নেল বেরিয়ে পড়লেন।….।

ইলিয়ট রোডে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে কর্নেল ষষ্ঠীকে কফি করতে বললেন। জোরে ফ্যান চালিয়ে দিয়ে টেলিফোন তুললেন।

একটু পরে ডি সি ডি ডি অরিজিৎ লাহিড়ির সাড়া এল। হাই ওল্ড বস!। আপনি আমাকে ডোবাবেন দেখছি! আচ্ছা, সত্যি কথাটা বলুন তো? আপনি কি রক্তের গন্ধ পান ইলিয়ট রোডের তিনতলা থেকে?

তুমি আমাকে অবশ্য ব্লাডহাউন্ড বলে সম্মান দিলে ডার্লিং! জয়ন্ত চৌধুরী আমাকে শকুন বলে!

হাঃ হাঃ হাঃ! আপনার প্রোতেজে ভদ্রলোক কোথায়?

মাস তিনেকের জন্য ইওরোপে ঘুরতে গেছে। ওর কাগজের খরচে।

পিটি! দৈনিক সত্যসেবক একটা বড় রহস্য মিস করল।

অরিজিৎ! চন্দ্রনাথ দেববর্মন কি লকআপে?

নাহ্। ওঁকে ছাড়া হয়েছে। অন কনডিশন, অব কোর্স!

 কোর্ট সঙ্গে সঙ্গে জামিন দিল?

কোর্ট? হাসালেন বস! সঙ্গে সঙ্গে আসামি কোর্টে তোলে পুলিশ? ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোর্টে অবশ্য তুলতে হয়। কিন্তু সেটা কাগজকলমের ব্যাপার। পুলিশ এ ধরনের সিরিয়াস জটিল কেসে ঝটপট কোর্টে তলে না আসামিকে। জেরা, দরকার হলে থার্ড ডিগ্রি না! মিঃ দেববর্মনেকে মর্গের রিপোর্ট পেয়েই সসম্মানে ছাড়া হয়েছে। প্রসিকিউশন উইটনেস তিনি। ব্যাপারটা বুঝলেন কি? ইউ আর নট সিটিং আই।

রাখছি অরিজিৎ! পরে কথা হবে।…

কর্নেল এবার টেলিফোন করলেন চন্দ্রনাথ দেববর্মনকে। রিং হলো অনেকক্ষণ। সাড়া পেলেন না। তখন ফোন করলেন রণধীর সিংহকে। রণধীরকে চন্দ্রনাথ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, লকআপ থেকে ছাড়া পেয়ে ভদ্রলোক ফিরে এসেছিলেন। কলকাতার বাইরে যাবেন বলে বেরিয়েছেন। ওঁর অ্যাপার্টমেন্টের দিকে লক্ষ্য রাখতে বলে গেছেন। তবে রণধীরের ধারণা, বেশি দূরে যাননি চন্দ্রনাথ। কারণ গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছেন। কালই ফিরবেন।

.

০৭.

টিনা মুখার্জি বিকেল সওয়া পাঁচটায় মেট্রো সিনেমার উল্টো দিকে তার ক্রিমরঙের মারুতি দাঁড় করাল। সানগ্লাস খুলে দেখে নিল ওদিকটা। এখনও পৌঁছয়নি রঞ্জন। টিনার পনের মিনিট দেরি হয়েছে পর-পর দুজায়গায় জ্যামের জন্য। রঞ্জনও সাউথ থেকে আসবে। তাই তাকেও জ্যামে পড়তে হয়েছে।

এই ভেবে টিনা তার গাড়ি পার্ক করল সানগ্লাস পরেই বসে রইল ড্রাইভিং সিটে। রঞ্জনের ট্যাক্সি করে আসার কথা। ওর গাড়িটা নাকি গ্যারাজে।

টিনার বাবা অনির্বাণ মুখার্জি খ্যাতিমান ডাক্তার। নিজের নার্সিংহোম আছে নিউ আলিপুরে। টিনা একমাত্র সন্তান। টিনার মা ঋতুপর্ণা সমাজ সেবায় ব্যস্ত স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সারাক্ষণ নিজের নিজের ব্যাপারে মেতে থাকলে যা হয়। টিনা স্পয়েল্ড চাইল্ড হিসেবে বেড়ে উঠেছে। দার্জিলিঙে একটা কনভেন্ট স্কুলের ছাত্রী ছিল। প্রায়ই না বলে পালিয়ে আসত। তারপর আত লেখাপড়ায় তাকে ভেড়ানো যায়নি। হিন্দি ফিল্মের হিরোইনরা তার জীবনের আদর্শ। আয়নায় নিজেকে সে সুন্দর দেখে। অন্যেরা তার রূপের প্রশংসা করে। কিছুদিন আগেও তার এক নেপালি বয়ফ্রেন্ড ছিল। সে তাকে ডায়না বলত। কিন্তু একদিন অতর্কিতে চুমু খেয়ে ফেলায় টিনা তাকে চড় মেরে ভাগিয়ে দিয়েছে। হ্যাভ ফানস, বাট নট এনি সেক্স।

রঞ্জনের সঙ্গে টিনার আলাপ হয়েছিল তাদেরই বাড়িতে। মাঝে মাঝে রঞ্জন তার বাবার কাছে আসত। কেন আসত টিনা জানে না। একদিন কথায় কথায় রঞ্জন বলেছিল, আপনার ফটোজেনিক ফেস। ভয়েস সো সুইট! অভিনয় শিখে নিলে আপনার সাকসেস অনিবার্য!

এইভাবে টিনার একটা স্বপ্ন দেখার সূচনা। রঞ্জনকে দেখলেই সে স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে যায়। ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় রঞ্জন টেলিফোনে জানিয়েছিল, একটা যোগাযোগ ঘটে গেছে। হংকংয়ের এক ভারতীয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার আলাপ হয়েছে। তিনি বিদেশের জন্য টেলিফিল্ম করছেন। বড়রকমের উদ্যোগ। কিন্তু নতুন মুখ চান। ২৮ মার্চ টিনার সঙ্গে তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দেবে। সেদিনই সকালে সে টিনাকে রিং করে সময় জানাবে।

তারপর গতকাল ২৮ মার্চ সারাদিন প্রতীক্ষা করেও রঞ্জনের পাত্তা নেই। তার নাম্বারও জানা ছিল না টিনার। আজ বেলা একটায় রঞ্জনের ফোন। টিনা! আমি দুঃখিত। মিঃ রঙ্গনাথন ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন। আজ বিকেল ৫ টায় তোমার সময় হবে কি?

টিনা কিছু না ভেবেই বলেছিল, কেন হবে না? আমার তো গাড়ি আছে।

তাহলে তুমি মেট্রো সিনেমার উল্টেটাদিকে ঠিক পাঁচটায় আমার জন্য অপেক্ষা করবে। আমার গাড়ি গ্যারাজে। ট্যাক্সি করে যাব। আর একটা কথা। তুমি শাড়ি পরে যাবে কিন্তু!

ঠিক আছে কিন্তু কোথায় নিয়ে যাবে আমাকে?

কেন? মিঃ রঙ্গনাথনের কাছে।

কোথায়?

হোটেল কন্টিনেন্টালে উনি উঠেছেন।

কটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট?

সন্ধ্যা ৬ টায়।

আমি হোটেলের কোনও ঘরে ঢুকব না কিন্তু!

ওঃ টিনা! আমি জানি তুমি খুব সাবধানী মেয়ে। তবে ভয়ের কিছু নেই। ফাইভস্টার হোটেল। তুমি নিশ্চয় নাম শুনেছ!

আমি লাউঞ্জে বসে কথা বলব।

ও কে! ও কে টিনা তবে উনি ব্যস্ত মানুষ। যদি তখনই তোমার স্ক্রিন টেস্ট করার ব্যবস্থা করেন এবং তুমি যদি পিছিয়ে যাও, তাহলে আমি কিন্তু অপ্রস্তুত হব। ভেবে দেখ।

 কোথায় স্ক্রিন টেস্ট হবে?

পার্ক স্ট্রিট এরিয়ায় ওঁর স্টুডিও আছে।…টিনা? তুমি কি ভয় পাচ্ছ? দেখ, আমি তো সঙ্গেই থাকছি তোমার। আমাকে তোমার বাবা চেনেন। এ একটা বড়, সুযোগ টিনা! তোমার ভবিষ্যৎ কল্পনা করো।

এ সব কথা ইংরেজিতেই হয়েছে। টিনা বাংলা বলে কদাচিৎ। সে রঞ্জনের এই শেষ কথাটাকে গুরুত্ব দিয়েছিল।…

ঘড়ি দেখল টিনা। পাঁচটা কুড়ি বাজে। ফিরে যাবে নাকি?

 সেই সময় হঠাৎ তার মনে হলো, রঞ্জন তার গাড়ি চিনতে না-ও পারে। অজস্র রঙবেরঙের গাড়ি পার্ক করা আছে। একই রঙের মারুতিও কম নেই। টিনা গাড়ি থেকে বেরুল। তারপরই দেখতে পেল রঞ্জনকে। এদিকে-ওদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে বেচারা। টিনা হাসল।

একটু পরে টিনাকে দেখতে পেল রঞ্জন। হন্তদন্ত হয়ে কাছে এসে বলল, কতক্ষণ এসেছ?

অনেকক্ষণ।

 আমি তো খুঁজে হয়রান। শিগগির।

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দক্ষিণে ঘোরালো টিনা। কিছুক্ষণ পরে মোড় পেরিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাস করল, হোটেল কনিটেনেন্টাল এ জে সি বোস রোডে না?

হ্যাঁ। কিন্তু মিঃ রঙ্গনাথন শেষ মুহূর্তে জানিয়েছেন ওঁর স্টুডিওতে দেখা হবে।

পার্ক স্ট্রিট?

ওই এরিয়ায়। সামান্য একটু ভেতরে। তোমার উদ্বেগের কারণ নেই। আমি আছি।

পার্ক স্ট্রিটে রঞ্জনের নির্দেশমতো একটা সংকীর্ণ ঘোরালো রাস্তায় ঢুকল টিনা। তারপর রঞ্জন একখানে বলল, এখানেই রাখো।

গলি রাস্তা আলো কম। কোনও রকমে দুটো গড়ি পাশাপাশি যাতায়াত করতে পারে। গাড়ি লক করার পর টিনা বলল, এ কোথায় আনলে আমাকে?

ওঃ টিনা! একটু সাহসী হও। এস।

বাঁদিকে মিটমিটে আলোয় একটা চওড়া দরজা এবং সিঁড়ি দেখা যাচ্ছিল। রঞ্জন বলল, লিট নেই কিন্তু। আমার হাত ধরতে পারো। দোতলায় স্টুডিও। দেখো, সাবধানে।

আমি পারব।

 ও কে!

দোতলায় একটা ঘরের দরজার সামনে পৌঁছে রঞ্জন বলল, এখনও এসে পৌঁছাননি দেখছি! আমাকে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়েছেন। চলো, অপেক্ষা করা যাক।

টিনা দেখল দরজার মাথায় ফলকে লেখা আছে ভিডিওজোন। রঞ্জন দরজা খুলে বাংলায় বলল, আরে বাবা! বাঘের গুহা নয়। রীতিমতো স্টুডিও। দেখতে পাচ্ছ না? সে সুইচ টিপে আলো জ্বালল।

টিনা একটু দ্বিধার সঙ্গে ঢুকল। রঞ্জন দরজা বন্ধ করে বলল, উটকো লোক ঢুকে পড়তে পারে। দরজা বন্ধ করাই ভাল। ওই দেখ, ক্যামেরা রেডি করা আছে। পাশের ঘরে। সে পাশের ঘরের পর্দা তুলে দেখাল। দরজা খোলা ছিল ওঘরের।

দুটো ঘরের মেঝে কার্পেটে ঢাকা। দেওয়ালে অজস্র ছবি সাঁটা আছে। সবই দেশি-বিদেশি চিত্রতারকাদের ছবি। মাঝে মাঝে কয়েকটা নুড ছবিও।

এ ঘরে সোফাসেট, অফিসের মতো সাজানো চেয়ার টেবিল আলমারি। পাশের ঘরে শুধু একটা ডিভান। সেটা শেষ প্রান্তে রাখা। অন্য প্রান্তে একটা মুভি ক্যামেরা। স্ট্যান্ডে চাকা লাগানো।

রঞ্জন বলল, যে কোনও মুহূর্তে মিঃ রঙ্গনাথন এসে পড়বেন। তুমি ওই ডিভানে বসো।

টিনা একটু আড়ষ্টভাবে বসল।

রঞ্জন হাসল। প্রচণ্ড আলো ফেলা হবে তোমার ওপর। সহ্য করতে পারবে তো? দেখাচ্ছি।

সে পটাপট কয়েকটা সুইচ টিপে দিতেই এক হাতে চোখ ঢাকল টিনা।

সে কী! হাত নামাও! বি স্মার্ট অ্যান্ড বিউটিফুল! একটা পোজ নিয়ে বসো।

পাচ্ছ না একটু দ্বিধার সঙ্গে ঢুকল।ভাল। ওই দেখ, ক্যামেন্থল ছিল ওঘরের।

ভীষণ গরম লাগছে!

ফ্যান চালিয়ে দিচ্ছি। বলে সে সুইচ টিপে ফ্যান চালিয়ে দিল।

তবু বড্ড গরম।

 ওটা কিছু না। সয়ে যায়। তুমি কখনও সুটিং দেখনি মনে হচ্ছে?

 নাহ!

শোনো! তোমার কি ড্রিঙ্ক করার অভ্যাস আছে? কখনও ড্রিঙ্ক করেছ?

কেন?

একটু ব্র্যান্ডি বা ওয়াইন খেলে তোমার আর গরম লাগবে না। আড়ষ্টতাও কেটে যাবে। দুএক চুমুক খেয়েই দেখ। আরে বাবা! ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আলোগুলো নিভিয়ে রঞ্জন ফের বলল, ওই দেয়ালে কত স্ক্রিন টেস্ট করা মেয়েদের ছবি। প্রথম-প্রথম ওরা ঠিক তোমার মতো বিহেভ করে। তারপর দিব্যি স্মার্ট হয়ে যায়। দু-তিন চুমুক ড্রিঙ্ক যথেষ্ট। নেশা হয় না। কিন্তু আড়ষ্টতা কেটে যায়।

রঞ্জন দেয়ালের সেলার খুলে একটা গ্লাস এবং একটা ব্র্যান্ডির বোতল বের করল।

টিনা আস্তে বলল, আই লাইক ব্র্যান্ডি!

সো নাইস গার্ল ইউ! সো বিউটিফুল! টেক ইউ ইজি! একটু জল মিশিয়ে দিই। কেমন?

রঞ্জন একটা বোতল থেকে জল ঢেলে দিল গ্লাসের ব্র্যান্ডিতে। তারপর গ্লাসটা টিনার হাতে তুলে দিল। টিনা চুমুক দিল। তারপর দেয়ালের ছবিগুলো দেখতে থাকল। বলল, ওরা কি চান্স পেয়েছে?

সবাই পায়নি। এই যে দেখছ, নীতা সেন। তার প্রথম স্ক্রিন টেস্টের ছবি এটা।

টিনা চোখ বড় করে বলল, নীতা সেন? ইউ মিন–

ইয়া! হাসল রঞ্জন। এখন যার বাজারদর সেভেনটি ফাইভ টু এইট্টি লাখ! বাট মানি ইজ নট দা কোয়েশ্চান!

টিনা পর-পর দুবার চুমুক দিল। তারপর হাসল। লাইট প্লিজ! নাও লেট মি সি, হোয়াট আই ফিল।

রঞ্জন সুইচ টিপলে সেই জোরালো আলোগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল টিনার ওপর। এবার সে চোখ ঢাকল না। রঞ্জন বলল, একটু কাত হয়ে বসো তো! লেন্সে দেখে নিই। হ্যাঁ, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। আর শোনো, তোমার হ্যান্ডব্যাগটা ডিভানের ওপাশে নামিয়ে রাখো। দ্যাট লুকস অড!

সে এগিয়ে টিনাকে একপাশে কাত করে বসিয়ে দিল। তারপর ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে বলল, লেন্সের দিকে তাকিয়ে থাকো। হাসি চাই! ওয়েলডান! এবার গ্লাসে চুমুক দাও!…ও কে!…এবার হ্যাঁ, লজ্জার কিছু নেই। আঁচলটা এমনভাবে ফেলে দাও, যেন নিজে থেকে খসে যাচ্ছে। আই মিন, তুমি তোমার শরীর থেকে মনকে আলাদা করে দাও। কিপ দেম সেপারেট। ও কে?..নাও, ওপেন দা ব্লাউজ! ইয়েস! শো ইওর ভিগারাস র‍্যাদার আই সে ডেঞ্জারাস বডি! অ্যান্ড নাও থিঙ্ক! ইওর মাইন্ড ইজ ইওর বডি। ও কে? ওপেন দা ব্রা ইয়া! গুড! ওয়ান্ডারফুল!…নাও। ওপেন ইওরসেলফ অ্যাজ ইফ এ ফ্লাওয়ার ইজ ব্লসমিং। আন্ডারস্ট্যান্ড?..ও কে! ফাইন! নাও লাই ডাউন অন দা ডিভান কিপ দা লেফট নী আপ!..আপ! আপ! আপ! ওকে!

মুভি ক্যামেরার সুইচ অন করে রেখে রঞ্জন তৈরি হলো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় কামেরার দিকে পেছন ফিরে সে এগিয়ে গেল ডিভানের দিকে। কোনও বাধা পেল না। টিনার চোখ বন্ধ।

একটু পরে রঞ্জন উঠে এসে ক্যামেরা বন্ধ করল। ফিল্মের ক্যাসেটটা বের করে নিল। এটা আসলে ভি ডি ও ক্যামেরা ও পোশাক পরে সে জোরালো আলোগুলো নিভেয়ে দিল। টিনার কাছে গিয়ে প্যান্টি, ব্রা, সায়া, ব্লাউজ, এবং তারপর শাড়িটা পরানোর চেষ্টা করল। পারল না। শাড়িটা কোনও রকমে জড়িয়ে দিল একুশ বছরের তরুণীর শরীরে।

তারপর সে স্ট্যান্ড থেকে ক্যামেরাটা খুলে একটা ব্যাগে ভরল। কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে এল স্টুডিও থেকে। দরজা ভেজিয়ে রেখে সাবধানে নেমে গেল নিচে।

গলি রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে বড় রাস্তায় পৌঁছে রঞ্জন ট্যাক্সি খুঁজতে থাকল।

পাশের ঘরে টেলিফোন বেজে উঠল। কিছুক্ষণ বাজার পর বন্ধ হয়ে গেল। আবার স্তব্ধতা। শিলিং ফ্যানটা শোঁ শোঁ শব্দ করলেও সাউন্ডপ্রুফ স্টুডিওর গভীর স্তব্ধতা সেই শব্দকে গ্রাস করছে। এয়ারকন্ডিশন করার প্ল্যান ছিল রঞ্জনের। কিন্তু রঙ্গনাথন মৃত। মৃতেরা কথা বলে না।

প্রায় আধঘণ্টা পরে টিনা তাকাল। খুব দুর্বল বোধ হলো শরীর। কোথায় শুয়ে আছে বুঝতে পারল না সে। কী একটা স্বপ্ন দেখছিল যেন, ঠিক ফিল্মে যেমন হয়। তার মাথার ওপর একটা ফ্যান ঘুরছে। ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সহসা তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় সচকিত হলো।

উঠে বসার চেষ্টা করল টিনা। কিন্তু মাথা টলমল করছে। দৃষ্টিতে আচ্ছন্নতা। সে দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল। ক্রমে তার স্মৃতি ফিরে এল। রঞ্জন রায় তাকে এখানে এনেছিল। এই ডিভানে বসে সে কয়েক চুমুক ড্রিঙ্ক করেছিল। তারপর?

 তারপর আর কিছু মনে পড়ছে না। তবে পরনের শাড়ি, ব্রেসিয়ার, প্যান্টি, ব্লাউজ যে ঠিক মতো সে পরে নেই, এটা বুঝতে পারছে। বুঝতে পারছে আরও কী ঘটেছে।

টিনা সহসা নিজের ওপর খেপে গেল। সেই ক্ষিপ্ততা তার চেতনা প্রখর করল ক্রমশ। এবার সে সাবধানে উঠে দাঁড়িয়ে চাপা হিংস্র কণ্ঠস্বরে বলল, রঞ্জন! ইউ ডার্টি সোয়াইন! সন অফ এ বিচ!

সে পোশাক গুছিয়ে পরে নিল। তারপর দেখল ক্যামেরার স্ট্যান্ডটা আছে মাত্র। তা হলে সে একটা ফাঁদে পা দিয়েছিল।

কিন্তু এখন আর অনুশোচনার মানে হয় না। সাবধানে পা ফেলে টিনা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সেইসময় মনে পড়ল হ্যান্ডব্যাগটার কথা। ওতে তার গাড়ির চাবি আছে।

ডিভানের ওপাশে মেঝে থেকে ব্যাগটা কুড়িয়ে নিয়ে টলতে টলতে বেরিয়ে গেল টিনা। নিচের রাস্তায় নেমে তার গাড়ির কাছে গিয়ে সে দম নিল। তারপর লক খুলে গাড়িতে ঢুকল। এতক্ষণে সে সুস্থবোধ করল।

কিন্তু টিনা মুখার্জি হয়তো তত সুস্থ ছিল না। তার পায়ের চটি ফেলে এসেছে। স্টুডিওতে। চটি আনতে যাওয়ার অবশ্য মানে হয় না।…

.

০৮.

কর্নেল ঘড়ি দেখলেন, সাড়ে সাতটা বাজে প্রায়। হোটেল কন্টিনেন্টাল থেকে সোজা গিয়েছিলেন ভিডিওজোন-এর ঠিকানায়। দরজায় তালা দেওয়া ছিল। অন্যপাশে কয়েকটা ছোট কোম্পানির অফিস। খোঁজ নিয়েছিলেন। কেউ জানে না ওই ঘরটা কার, তবে মাঝে মাঝে কেউ-কেউ আসে। পুরুষ এবং মহিলা। ওটা ছবি তোলার ঘর, নাকি ক্যাসেটে গান রেকর্ডিংয়ের, সে-বিষয়ে নানা মত। শুধু একটা বিষয়ে সবাই একমত যে, বেশির ভাগ সময় ঘরটা বন্ধই থাকে। বাড়ির মালিক থাকেন। বোম্বেতে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে তার নামে ভাড়া জমা দেয় ভাড়াটেরা।

কর্নেল ফিরে এসে একবার পাঁচটা পনেরোতে এবং একবার প্রায় সাতটা নাগাদ ফোন করেছিলেন। রিং হচ্ছিল। কেউ ধরেনি। তারপর লালাবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ইন্সপেক্টর নরেশ ধরকে ঠিকানা দিয়ে খোঁজ নিতে অনুরোধ করেছেন।

এখন নরেশবাবু কী খবর দেন, তার প্রতীক্ষা। কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানছিলেন। চন্দ্রনাথ দেববর্মন ছাড়া পেয়ে হঠাৎ কোথায় গেলেন? কেন? প্রাণভয়ে গা ঢাকা দিলেন কি– আততায়ী তার চেনা লোক বলেই?

টেলিফোন বাজল।

কর্নেল ফোন তুলে সাড়া দিলেন। তারপর নরেশবাবুর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।…আমি ধর কইতাছি স্যার!

বলুন নরেশবাবু।

ভিডিওজোন থেক্যা কইতাছি। আইয়া দেখি, ডোর ইজ ওপেন। কিন্তু মানুষ নাই। হাঃ হাঃ হাঃ

আচ্ছা!

তিনখান পাও লইয়া স্ট্যান্ড খাড়াইয়া আছে। ক্যামেরা নাই। হাঃ হাঃ হাঃ!

 বলেন কী! তারপর?

ফ্যান ঘুরতাছে! হাওয়া খাওনের মানুষ নাই। হাঃ হাঃ হাঃ!

 হু। আর?

 ট্যার পাইয়া কাটছে আর কি! হা– একখান গ্লাস কাত হইয়া আছে কার্পেটে। এইটুকু খানি তরল পদার্থ আছে গ্লাসে। অ্যাঁ? হোয়াট ইজ দিস? লেডিস জুতা? দুইখান জুতা!

নরেশবাবু! শুনুন প্লিজ।

কন স্যার!

গ্লাসটা দরকার। গ্লাসের তরল পদার্থ ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করাতে হবে। দিস ইজ ভেরি ইমপর্ট্যান্ট! বুঝলেন?

হঃ! আর জুতা?

 জুতা জোড়াও নিয়ে যান। ওটাও ইমপর্ট্যান্ট।

ভেরি ইমপর্ট্যান্ট! অ কাশেম মিয়া! জুতাজোড়া প্যাকেটে বান্ধো! ওই তো কত পেপার।

নরেশবাবু! দরজা সিল করে দেবেন যেন!

হ্যান্ডকাফ পরাইয়া দিমু। হাঃ হাঃ হাঃ!

ডি সি ডি ডি সায়েবকে এখনই গিয়ে রিপোর্ট দেবেন। ছাড়ছি।…

ফোন রেখে কর্নেল হাঁকলেন, ষষ্ঠী? আর এক কাপ কফি দিয়ে যা বাবা।

সাদা দাড়ি আঁকড়ে ধরলেন কর্নেল। একটু ভুল হয়ে গেছে। হোটেলের ঘরে রঞ্জন রায়ের কার্ড পেয়েই পুলিশকে ওই ঠিকানায় নজর রাখতে বলা উচিত ছিল।

হঠাৎ মনে হলো শুভ্রাংশু সোম অভিনয় করে। ফিল্মের লোকেদের সঙ্গে তার চেনাজানা থাকা সম্ভব। তাকে জিজ্ঞেস করা যায় রঞ্জন রায় এবং ভিডিওজোন সম্পর্কে খবর রাখে কি না।

ষষ্ঠী কফি এনে দেওয়ার পর কর্নেল শুভ্রাংশুর কার্ড দেখে টেলিফোন করলেন। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর মহিলাকণ্ঠে সাড়া এল, হ্যালো!

শুভ্রাংশু সোম আছেন কি?

 দাদা নেই। বাইরে গেছে। আপনি কে বলছেন?

চিনবেন না। আপনি কি শুভ্রাংশুবাবুর বোন?

হ্যাঁ। আপনার নাম বললে দাদা ফিরে আসার পর জানাব। দাদার বলা আছে কেউ ফোন করলে

আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

এক মিনিট। লিখে নিই।…হ্যাঁ, বলুন!

কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আপনার তোমার নাম কী ভাই?

সুস্মিতা সোম।

বাহ্। আচ্ছা, তোমার দাদা কখন বাইরে গেছেন?

 দাদাকে তো প্রায়ই বাইরে যেতে হয়। মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ।

 আজ কখন গেছেন?

 দুপুরে অফিস থেকে ফোন করে বলল, বাইরে যাচ্ছে। আজ না-ও ফিরতে পারে।

কোথায় যাবেন বলেননি?

 নাহ্। মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের যখন তখন বাইরে যেতে হয়। ছাড়ছি।…

কর্নেলের অনুমান, শুভ্রাংশুর বোন কিশোরী। কফিতে চুমুক দিয়ে ভিডিওজোন-এর কথা ভাবতে থাকলেন। মেঝেয় গড়িয়ে পড়া গ্লাস, একটা ডিভান, দু পাটি লেডিজ জুতো, খালি ক্যামেরাস্ট্যান্ড এবং শিলিং ফ্যানটা ঘুরছিল।

শুভ্রাংশুর কথাগুলো মনে ভেসে এল এবার। মউ তাকে টেলিফোনে জানিয়েছিল, হংকংয়ের এক ব্যবসায়ী মউকে ব্ল্যাকমেল করে। আর একটা ভিডিও ক্যাসেট তার ব্ল্যাকমেলের অস্ত্র! হুঁ, ব্লু ফিল্ম। শুভ্রাংশুর দৃঢ় বিশ্বাস, মউকে নিয়ে সেই ব্লু ফিল্ম তোলা হয়েছিল।

শুভ্রাংশু একরকম ড্রাগের কথা বলছিল! কেউ সেই ড্রাগের ঘোরে থাকলে বোঝা যায় না সে কী করছ বা তাকে দিয়ে কী করানো হচ্ছে। শুভ্রাংশু এই কথাটা বলেছিল, এ বিষয়ে আমি কিছু পড়াশোনা করেছি। কেন সে পড়াশোনা করেছে এ বিষয়ে? জেনিথ ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে সে চাকরি করে। এই কোম্পানি কি গোপনে সেই ড্রাগ তৈরি করে এবং শুভ্রাংশু তা জানতে পেরেছিল?

কর্নেল কফি শেষ করার পর টেলিফোন তুললেন ফের। ডায়াল করলেন। সাড়া এল।

মিঃ দাশগুপ্ত?

 কে বলছেন?

কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আপনাকে একটু বিরক্ত করছি।

 একটু পরে শান্তশীল বলল, হ্যাঁ, বলুন!

 রঞ্জন রায় নামটা কি আপনার পরিচিত?

 হু ইজ দ্যাট গাই?

 ফিল্মমেকার।

চিনি না।

নামটা কি কখনও আপনার স্ত্রী কাছে শুনেছেন? প্লিজ, একটু স্মরণ করুন।

 নাহ। শুনিনি।

 ভিডিওজোন শব্দটা?

হোয়াটস্ দ্যাট?

 কখনও শুনেছেন কি না কথাটা?

 শুনিনি।

 সিওর?

ড্যাম ইট!..সরি! আমি ওরকম কোনও শব্দ শুনিনি কারও কাছে।

মিঃ দাশগুপ্ত, একটা অনুরোধ! আপনার স্ত্রীর কাজিপত্রের মধ্যে কোথাও যদি রঞ্জন রায়ের নেমকার্ড বা ভিডিওজোন মার্কা কোনও কাগজ খুঁজে পান, অনুগ্রহ করে আমাকে জানাবেন।

জানাবো।

আর একটা কথা মিঃ দাশগুপ্ত! আপনি একটা নামী ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা। মেডিসিন, তার মানে, যে-কোনোরকম ড্রাগ সম্পর্কে আপনার জ্ঞান থাকার কথা। কী উপাদানের কী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, এ বিষয়েও মোটামুটি ধারণা থাকা উচিত।

সো হোয়াট?

এমন ড্রাগ থাকা খুবই সম্ভব, যা কেউ খেলে টের পাবে না সে কী করছে বা তাকে দিয়ে কী করানে হচ্ছে।

ওটা নার্কোটিক্স। নিষিদ্ধ ড্রাগ। উই ডু নট সেল দোজ ডার্টি থিংস।

বলছি না। আমি জাস্ট আপনার কাছে জানতে চাইছি, অমন ড্রাগ থাকা সম্ভব। কি না?

খুবই সম্ভব। এল এস ডি-জাতীয় ড্রাগ তো এখন আউট অব ডেট হয়ে গেছে।

মিঃ দাশগুপ্ত! শুনেছি, বহু নিষিদ্ধ ড্রাগ আজকাল ছদ্মনামের আড়ালে বিক্রি হয় তাই না?

হতেই পারে। হয়। বাট ইউ ডু নট প্রোডিউস অর সেল দেম। জেনিথের রেকর্ড ক্লিন। ইউ হ্যাভ পোলিস-কন্ট্যাক্ট কর্নেল সরকার। ইউ মে আস্ক দেম। বাট হোয়াই

প্লিজ মিঃ দাশগুপ্ত! অফেন্স নেবেন না। আমি আপনার সহযোগিতা চাইছি শুধু।

ওরকম কোনও ড্রাগের ব্যাপারে আমার সহযোগিতা আশা করবেন না।

কর্নেল হাসলেন। না, না মিঃ দাশগুপ্ত! আমি আপনার স্ত্রীর খুনীকে খুঁজে বের করার জন্য আপনার সহযোগিতা চাইছি।

মউয়ের মার্ডারের সঙ্গে নার্কোটিকসের কী সম্পর্ক আমি বুঝতে পারছি না।

আছে। বাই দা বাই, আপনার কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ শুভ্রাংশু সোম

তাকে চেনেন নাকি?

চিনি। আজ সকালে সে আপনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। আমাকে বলেছে। সে-ও চাইছে আপনার স্ত্রীর খুনি ধরা পড়ুক।

একটু পরে শান্তশীল শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, আই ডু নট লাইক হিম।

আজ শুভ্রাংশুকে বাইরে কোথায় পাঠানো হয়েছে জানেন?

ওটা আমার জানার কথা নয়। কেন?

ওকে একটু দরকার ছিল। ওর বাড়িতে শুনলাম বাইরে গেছে হঠাৎ।

 সেটা স্বাভাবিক।…ও কে! আমি একটু ব্যস্ত কর্নেল সরকার!

সরি! রাখছি। ধন্যবাদ।….

কর্নেল টেলিফোন রেখে নিভে যাওয়া চুরুট ধরালেন। শুভ্রাংশুকে খুবই দরকার ছিল এ মুহূর্তে। সে নিশ্চয় ওরকম কোনও ড্রাগের খবর রাখে। তার কাছে এটা জানা গেলে একটা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যাবে। হংকংবাসী ভারতীয় ব্যবসায়ী যে সত্যিই ব্লু ফিল্মের কারবারি, তাতে সন্দেহের প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু সে খুন হয়ে গেছে। শুভ্রাংশুর কথামতো সে মধুমিতার ব্ল্যাকমেলার ছিল। কিন্তু নিছক ব্লু ফিল্মের কারবারি ব্ল্যাকমেল করবে কেন? তাহলে তো তার কারবারই বন্ধ হবে যাবে।

একটু চঞ্চল হলেন কর্নেল। রঞ্জন রায়ের সাহায্যে রঙ্গনাথন ব্লু ফিল্ম তৈরি করতেন তা স্পষ্ট। রঞ্জন কি সেই ফিল্মের কপি হাতিয়ে বিত্তবান এবং বিশিষ্ট লোকেদের ব্ল্যাকমেল করে এসেছে? এ সব ঘটনা গোপনে ঘটে থাকে। স্ক্যান্ডালের ভয়ে কেউ পুলিশকে জানাতে চায় না। সম্ভবত রঞ্জন এবার এমন কাউকে ব্ল্যাকমেল করছিল, যার সঙ্গে কোনও সুত্রে রঙ্গনাথনের ঘনিষ্ঠতা আছে। রঙ্গনাথন রঞ্জনের কুকীর্তি টের পেয়ে বোঝাপড়া করতে চেয়েছিলেন বলেই হয়তো খুন হয়ে গেলেন। আর একটা পয়েন্ট। ১২৭ নং সুইটে কোনও ফিল্মের ক্যাসেট পাওয়া যায়নি। তবে রঙ্গনাথনকে হত্যার এই মোটিভটা যুক্তিযুক্ত বলা চলে।

টেলিফোন বাজল। কর্নেল সাড়া দিলেন।

 কর্নেল সরকার! দাশগুপ্ত বলছি। শান্তশীল দাশগুপ্ত।

 বলুন? আপনার স্ত্রীর কাগজপত্রের মধ্যে তাহলে

না কর্নেল সরকার! আপনার সঙ্গে একটু আগে কথা বলার পর হঠাৎ আমার মনে হলো, আপনার সঙ্গে বসা দরকার। অনেক কথা বলা দরকার। কাল মর্নিংয়ে আপনার সময় হবে কি? আমি যেতে চাই আপনার কাছে।

আমিই বরং আপনার কাছে যাব। দ্যাটস দা বেস্ট ল্পেস টু টক। অন দা স্পট।

বাট কর্নেল সরকার, ডেডস ডু নট স্পিক, ইউ নো!

কী বললেন?

 মৃতেরা কথা বলে না।

কর্নেল হাসলেন। আসাধারণ উক্তি মিঃ দাশগুপ্ত। কিন্তু আমার কাজটাই হলো মৃতদের কথা বলানো। ডেডস স্পিক টু মি।

ও কে! আপনি আসুন। আমি অপেক্ষা করব। শুধু সময়টা জানিয়ে দিলে ভাল হয়।

সকাল নটা।

 দ্যাটস ও কে। ছাড়ছি।…

ফোন রেখে কর্নেল বুকশেলফের কাছে গেলেন। নার্কোটিকস্ সংক্রান্ত একটা বই তাঁর সংগ্রহে আছে। তবে সেটা নার্কোটিকস্ স্মাগলিংয়ের রেকর্ড। বলা চলে, অপরাধবৃত্তান্ত। তবে ওতে নানা ধরনের নিষিদ্ধ ড্রাগ এবং তার গুণাগুণেরও উল্লেখ আছে।

বইটা এনে ইজিচেয়ারে বসলেন। টেবিলবাতি জ্বেলে দিলেন। কিছুদিন থেকে রিডিং গ্লাস ব্যবহার শুরু করেছেন। চোখের দোষ নেই। বয়স থেমে থাকে না।

পাতা ওল্টটাতে গিয়ে শান্তশীলের কথাটা মাথায় ভেসে এল, মৃতেরা কথা বলে না। হু, এটা সব হত্যাকারীই ধরে নেয়। কিন্তু মৃতেরা কথা বলে। চুপিচুপি কথা বলে। অরণ্যে মর্মরধ্বনির মতো কণ্ঠস্বর …

.

০৯.

 ঋতুপর্ণা দরজা খুলে আস্তে বললেন, আমি সন্ধ্যা ছটায় এসে অপেক্ষা করছি। এখন নটা বাজে। তাছাড়া হঠাৎ একটু আগে টিনা এসেছে।

টিনা এখানে আসে নাকি? চন্দ্রনাথ একুটু হকচকিয়ে বললেন। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁঝালো সুগন্ধ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার ওপর। ফের বললেন টিনা–

আসে। ওর কাছে এ ফ্ল্যাটের একসেট চাবি আছে। ঋতুপর্ণা শ্বাস ফেলে বললেন, ভেতরে এস।

চন্দ্রনাথ একটু দ্বিধার সঙ্গে বললেন, নাহ। থাক।

ঋতুপর্ণার চোখ উজ্জ্বল দেখাল। মুখে কড়া প্রসাধন। কিন্তু চোখের ওই উজ্জ্বলতা তীব্র ক্ষোভের। ঠোঁটের কোনা বেঁকে গেল। বললেন, তুমি আমার তিনটে ঘণ্টা নষ্ট করেছ। দাম দিয়ে যাও।

কথা হচ্ছিল ইংরেজিতে। চন্দ্রনাথ ভেতরে ঢুকে বললেন, আসার পথে আমার অ্যাডভোকেটের বাড়ি হয়ে এলাম। আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখল সে। ছারপোকা! যাই হোক, আমার একটা সাংঘাতিক মিসহ্যাপ হয়েছে।

তোমার জীবনটাই তো মিসহ্যাপে ভর্তি। বলে ঋতুপর্ণা কোণের দিকে সোফায় বসলেন। বলো!

হাল্কা স্যুটকেসটা পাশে রেখে চন্দ্রনাথ মুখোমুখি বসলেন। টিনা কী করছে?

কিছু ঘটে থাকবে, কিংবা কারো পাল্লায় পড়ে ড্রিঙ্ক করে সামলাতে পারেনি। নিউ আলিপুরের বাড়িতে গিয়ে আমাকে পায়নি। তারপর তো ওকে একটা সেডাটিভ দিয়েছি। কিছু খেতে চাইল না। ঘুমোচ্ছে! ঋতুপর্ণা একটা সিগারেট ধরালেন। তোমার কথা বলো।

টি ভি-র শব্দ কমিয়ে দাও।

ঋতুপর্ণা শব্দ কমিয়ে বললেন, আমি ওয়াইন খাচ্ছিলাম। হুইস্কি আছে, খাবে?

এনেছি। জনি ওয়াকার। চন্দ্রনাথ সুটকেস থেকে হুইস্কির বোতল বের করলেন। আইসকিউব আনন।

কোথায় পেলে?

 রঙ্গনাথনের উপহার। কিন্তু আজ বেচারা হঠাৎ খুন হয়ে গেছে। পরে বলছি। উত্তেজিত হয়ো না।

ঋতুপর্ণা উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। ঘরে আলো কম। কিন্তু তার চোখে চমক ছিল। একমুহূর্ত চন্দ্রনাথের দিকে তাকিয়ে থাকার পর ডাইনিং কাম-কিচেনে ঢুকলেন। সঙ্গে সুগন্ধ নিয়ে ঘুরছেন ঋতুপর্ণা।

চন্দ্রনাথ তাঁর সিগারেট প্যাকেট বের করে টেবিলে রাখলেন। সিগারেট ধরিয়ে ঘরের ভেতরটা লক্ষ্য করলেন। সল্টলেকের এই ফ্ল্যাটে এক মাস আগে একদিন এসেছিলেন। তেমনই সাজানো আছে। কোণে প্রায় তিন ফুট উঁচু নগ্ন যক্ষীর ভাস্কর্য নির্লজ্জ দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালে একটা ফ্রেস্কো। চুম্বনরত দুটি মুখ। ঈষৎ বিমূর্ত। ডাঃ মুখার্জি কি এই ফ্ল্যাটে কখনও আসেন? নিশ্চয় সময় পান না। একবার একটা পার্টিতে স্বামীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন ঋতুপর্ণা। অবশ্য বলেননি– বলা সম্ভবও ছিল না, চন্দ্রনাথ দেববর্মনের সঙ্গে ঋতুপর্ণা বাইশ বছর আগে লিভ টুগেদার করেছিলেন।

ঋতুপর্ণা এলেন সোডা, আইসকিউব এবং গ্লাস নিয়ে। টেবিলে একটা প্লেটে কিছু স্ন্যাক্স ছিল আগে থেকে। নিপুণ হাতে জনি ওয়াকারের ছিপি খুলে গ্লাসে ঢেলে দিলেন ঋতুপর্ণা। সোডাওয়াটার এবং তিন টুকরো আইস দিয়ে একটু হাসলেন। আমার লোভ হচ্ছে। কিন্তু নাহ। এ বয়সে আর কেলেঙ্কারি শোভা পায় না। তবে ওয়াইন আমার রাতের বন্ধু! আমার স্বামী বিদেশি ওয়াইন উপহার পায়। এটা ইতালির জিনিস। স্কচ দিয়ে আমাকে উঁট দেখাতে পারবে না কিন্তু!

চন্দ্রনাথ গ্লাস তুলে বললেন, কাল সারারাত ঘুমোইনি। আজ সারাদিনও একটু বিশ্রাম পাইনি।

চিয়ার্স! ঋতুপর্ণা তার গ্লাস দিয়ে চন্দ্রনাথের গ্লাস স্পর্শ করলেন। তুমি তো আমার স্বামীর চেয়েও বেশি ব্যস্ত মানুষ।

গ্লাসে চুমুক দিয়ে চন্দ্রনাথ বললেন, কাল দুপুর রাত থেকে আজ বিকেল অব্দি আমি পুলিশ হাজতে ছিলাম।

সে কী! কেন?

খুনের দায়ে।

ঋতুপর্ণা উঠে এসে কাছে বসলেন। রঙ্গনাথন খুন হয়েছে বলছিলে। তুমি খুন করেছ নাকি?

সব বলছি পর্ণা! আমাকে একটু চাঙ্গা হতে দাও।

ঋতুপর্ণা উত্তেজিতভাবে বললেন, আমার ভয় হচ্ছে, তুমি আমাকেও নোংরা খুনখারাপির ব্যাপারে জড়াবে। পুলিশ তোমার ওপর নজর রেখেছে কি না তুমি নিশ্চিত?

 জানি না।

ঋতুপর্ণা প্রায় আর্তনাদ করলেন, ও ডনি! এভাবে তোমার আসা উচিত ছিল না। তুমি জানো আমি সোশ্যাল ওয়ার্ক করি। আমার ইমেজের দাম তোমার জানা উচিত, ডনি!

উত্তেজিত হয়ো না পর্ণা! আগে সব শোনো।

বলো! উত্তেজনায় ঋতুপর্ণা চন্দ্রনাথের একটা হাত আঁকড়ে ধরলেন। চিরোল রক্তিম নখ চন্দ্রনাথের কবজির চামড়ায় বিধে গেল যেন। তবে চন্দ্রনাথের চামড়া অনুভূতিহীন।

হুইস্কিতে কয়েকটা চুমুক দেবার পর চন্দ্ৰনাথ শান্ত কণ্ঠস্বরে গতকাল রাত দশটা পনের থেকে যা-যা ঘটেছে, সব বললেন। কিছু গোপন করলেন না। পুলিশ তাকে রঙ্গনাথনের লাশ সনাক্ত করতে নিয়ে গিয়েছিল। তা-ও বললেন। তিনি যে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছেন, তা বলতেও দ্বিধা করলেন না।

ঋতুপর্ণা জোরে শ্বাস ফেলে বললেন, তুমি ওই মহিলার বডি তো তখনও লক্ষ্য করোনি বলছ। শুধু একটা লোককে লিফট থেকে বেরুতে দেখেছিলে। কিন্তু দেখামাত্র তাকে গুলি করতে গেলে কেন?

করিডরের বাঁকে যেতেই দেখি, সে লিট থেকে বেরুচ্ছে। তখন আমার মাথার ঠিক ছিল না। আসলে ওই মহিলা, মিসেস দাশগুপ্ত আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, কেউ আমাকে খুন করতে আসছে। তাছাড়া লোকটা আমার অচেনা। তাই তাকে দেখামাত্র রিভলভার তাক করেছিলাম। অমনই সে সিঁড়ির দিকে প্রায় ঝাঁপ দিয়ে পালাতে গেল। আমি গুলি ছুড়লাম। তাকে মিস করলাম। বলে চন্দ্রনাথ হুইস্কিতে চুমুক দিলেন।

ঋতুপর্ণা সোজা হয়ে বসে বাঁকা হাসলেন। ডনি! আমি বিশ্বাস করতে পারছি না ওই মহিলা তোমার অচেনা। এটা তোমার বানানো গল্প। আলবাৎ সে তোমার প্রেমিকা। চালাকি করো না ডনি! আমি তোমাকে চিনি।

চন্দ্রনাথ কষ্ট করে হাসলেন। আমি বুড়ো হয়ে গেছি পর্ণা! ভদ্রমহিলা সুন্দরী যুবতী।

কিন্তু তুমি চিরকালের শিকারি, ডনি! চিরযুবক।

 চন্দ্রনাথ একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, আমি সেক্সের জন্য আসিনি।

 তুমি নির্বোধ! অসভ্য! জানোয়ার!

 পর্ণা! কোনও-কোনও সময় বুঝতে পারি, আমি একা একা! তাই

 চুপ করো! তোমার টাকার অভাব নেই। এ বয়সেও তুমি অনায়াসে কোনও তরুণীকে বিয়ে করতে পারো। বলো! তুমি চাইলে আমি আমার অনাথ আশ্রমের কোনও তরুণীর সঙ্গে বিয়ের ঘটকালি করতে পারি। চাও?

আহ্! এই দুঃসময়ে বড় বাজে তামাশা করছ!

ঋতুপর্ণা তার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি এখানে সত্যিই রাত কাটাতে এসেছ?

ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তোমার মেয়ে এসে গেছে।

 টিনা এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। তাছাড়া ওকে সেডাটিভ দিয়েছি। ঘুম ভাঙতে দেরি হবে। তুমি খুব ভোরে চলে যেতে পারো। ওয়াইনে চুমক দিয়ে ঋতুপর্ণা আস্তে ফের বললেন, কোনও-কোনও সময়ে আমিও এত একা হয়ে পড়ি! জীবনের মানে খুঁজে পাই না। হ্যাঁ, তোমার জন্য ডিনার এনে রেখেছি। দুজনে একসঙ্গে খাব।

তুমি খেয়ে নাও। আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।

প্রিয় উনি! আমার প্রাণ! ঋতুপর্ণা সহসা সরে এসে চুম্বন করলেন চন্দ্রনাথকে। নাহ্ কোনও কথা শুনব না। তুমি আমার সঙ্গে খাবে।…

চন্দ্রনাথ ক্ষুধার্ত ছিলেন। কিন্তু অন্যমনস্কতা তাকে খাদ্যের স্বাদ থেকে বঞ্চিত করল। ঋতুপর্ণার শরীর বরাবর যেন একই সুরে বাঁধা। মেদহীন, ঋজু এবং শীর্ণ। কড়া প্রসাধনে কৃত্রিম মানবী দেখায় যদিও। মৃদু আলোয় সহসা যুবতী বলে ভ্রম হয়। কিন্তু একটু পরে বয়সের ছাপ ধরা পড়ে যায়। মূল্যবান সেন্ট একটা গোপন আর্তি মনে হয়।

খাওয়ার পর রাত-পোশাক পরে এলেন ঋতুপর্ণা। চন্দ্রনাথ একটু দ্বিধার পর তাঁর রাত-পোশাক পরে নিয়েছিলেন ড্রয়িংরুমে। সোফায় প্যান্ট শার্ট রেখেছিলেন। ঋতুপর্ণা তা গুছিয়ে রাখলেন। পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে বললেন, আর হুইস্কি খেও না।

চন্দ্রনাথ হাসলেন। নাহ্। বলে তার সুটকেসের ভেতর থেকে সেই ব্লু ফিল্মের ক্যাসেটটা বের করলেন। কাল রাতে পুরোটা দেখা হয়নি। তোমার ভি সি আরটা আছে তো?

আছে। তোমার দেখার মতো ফিল্মও আছে। তবে তোমারটা দেখা যাক। একঘেয়ে লাগলে আমার একটা চালিয়ে দেব। ঋতুপর্ণা ক্যাসেটটা নিয়ে টি ভি-র কাছে গেলেন। তারপর ঘুরে বললেন, এটাই কাল রাতে দেখছিলে নাকি?

হ্যাঁ। রিমোটটা আমাকে দাও। গোড়ার দিকটা বাজে। তেমন কিছু নেই। ঋতুপর্ণা হাসলেন। তুমি এখনও সেই অভ্যাসটা ছাড়তে পারোনি দেখছি। সরাসরি আঁপ দিতে চাও!

দেখছ তো, দিচ্ছি না। আজকাল আমার শরীর কেন জানি না বরফের চেয়ে ঠাণ্ড। আমি আসলে জীবিতদের মধ্যে এক মৃত মানুষ।

ফিল্মটা রিওয়াইন্ড করে পাশে এসে বসলেন, ঋতুপর্ণা। চন্দ্ৰকান্তের কাঁধে হাত রাখলেন। চন্দ্রকান্ত রিমোটের বোতাম টিপে রিওয়াইন্ড বন্ধ করে দিলেন। ফাস্ট ফরোয়ার্ড বোতাম টিপলেন। বললেন, তোমাকে বললাম না? গোড়ার দিকটায় কিছু নেই।

ঋতুপর্ণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে বললেন, আমারও আজকাল এসব অসহ্য লাগে। কিন্তু অভ্যাস!

চন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে বোতাম টিপে পর্দায় দেখে নিচ্ছিলেন কী ঘটছে। হঠাৎ বললেন, এ কী!

কী?

ছেলে-মেয়ে দুটো বদলে গেল। দৃশ্যও আলাদা। ভারতীয় মনে হচ্ছে। লক্ষ্য করো! বাঙালি চেহারা না? অবশ্য একটা ক্যাসেটে শর্ট ফিল্মও থাকে। কিন্তু মেয়েটিকে চেনা মনে হচ্ছে!

ঋতুপর্ণা চমকে উঠলেন। বললেন, ছেলেটিকেও আমার চেনা মনে হচ্ছে! হ্যাঁ, ও তো রঞ্জন।

তুমি চিনতে পারছ?

হ্যাঁ। রঞ্জন। আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে আসে মাঝে মাঝে।

 চন্দ্রনাথ বললেন, মেয়েটিকে চিনতে পারছি। কাল রাতে যার বডি লিফটে পড়ে ছিল। হ্যাঁ– সেই। চেহারায় তত পরিবর্তন হয়নি। আশ্চর্য! কিন্তু রঞ্জন কে?

বললাম তো! আমার স্বামীর কাছে মাঝে মাঝে আসে। টিনা ওকে পছন্দ করে। একদিন গাড়িতে লিফ্ট দিয়েছিল। তুমি তো জানো, আমি আমার স্বামীর বা মেয়ের ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাই না। তবে টিনাকে ওর সম্পর্কে সাবধান করে দেব। আশ্চর্য! রঞ্জনকে প্রথম দেখার পরই মনে হয়েছিল, বাজে ছেলে।

আমার অবাক লাগছে। জেনিথ ফার্মাসিউটিক্যালসের চিফ এক্সিকিউটিভের স্ত্রী চন্দ্রনাথ ফিল্ম বন্ধ করে উত্তেজিতভাবে বললেন, পর্ণা! আমি যার দিকে গুলি ছুঁড়েছিলাম, সে তোমার চেনা রঞ্জনই। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মুখটা দেখেছি। কিন্তু আমি নিশ্চিত। এই ছবিতে যাকে দেখলাম, তারই মুখ আমি দেখেছি। আমি একটা টেলিফোন করতে চাই।

ঋতুপর্ণা তার কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, এই সুন্দর রাতটাকে নষ্ট করো না। সব ভুলে যাও। হুইস্কি ঢেলে দিচ্ছি। আমিও এক চুমুক খাব। প্রিয় উনি। আমার প্রাণ!

 চন্দ্রনাথ সিগারেট ধরিয়ে বললেন, এবার বুঝতে পেরেছি ওই শুওরের বাচ্চা আমার কাছে এই ক্যাসেটটা হাতাতেই আসছিল। মিসেস দাশগুপ্ত জানত তার উদ্দেশ্য কী। তাই আমাকে সাবধান করে দিয়েছিল। কিন্তু আমি তাকে গ্রাহ্য করছি না বুঝতে পেরে সে আমার অ্যাপার্টমেন্টে আসছিল। লিম্ফটে ওঠার পর ওই শুওরের বাচ্চা তাকে গুলি করে মুখ বন্ধ করে দেয়। এর পর সে আমার ঘরে আসছিল। আমার হাতে রিভলভার না থাকলে সে আমাকেও গুলি করে–ওঃ!

ঋতুপর্ণা গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে দিলেন। সোড়া এবং আইসকিউবসহ চন্দ্রনাথের হাতে গ্লাসটা তুলে দিলেন। তারপর নিজের গ্লাসেও একটু হুইস্কি ঢাললেন।

চন্দ্রনাথ অনিচ্ছাসত্ত্বেও চিয়ার্স করে হুইস্কিতে চুমুক দিলেন। তারপর বললেন, রঞ্জন কেমন করে জানতে পারল এই ক্যাসেটে তার এবং মিসেস দাশগুপ্তের মিলনদৃশ্য আছে? রঙ্গনাথন আমাকে ক্যাসেটটা দিয়েছিল। রঞ্জন কি রঙ্গনাথনের পরিচিত? রঙ্গনাথন কি তাকে বলেছিল এই ক্যাসেটটা এখন আমার কাছে আছে?

তুমি চুপ না করলে আমি গিয়ে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ব ডনি!

অগত্যা চন্দ্রনাথ ঋতুপর্ণার কাঁধে হাত রেখে আলতোভাবে চুম্বন করলেন। বললেন, ঠিক বলেছ। সব কিছু ভুলে যাওয়ার জন্যই তোমার কাছে এসেছি পর্ণা!

ঋতুপর্ণা চন্দ্রনাথের হাত থেকে রিমোটটা নিয়ে সুইচ টিপলেন। একটু হেসে বললেন, রঞ্জনের কীর্তি দেখি। তুমিও দেখ। কানও-কোনও সময় সেক্স জীবনকে অর্থপূর্ণ করে। প্রকৃতির উপহার। তাই না প্রিয় উনি?

ইয়া।

দুজনে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলেন। ঋতুপর্ণা চাপা চঞ্চল কণ্ঠস্বরে বললেন, ড্রিঙ্ক শেষ করো শিগগির! আমার ঘুম পাচ্ছে। হুইস্কি আমার সহ্য হয় না। শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে।

কথাটা চন্দ্রনাথ বুঝলেন। ঋতুপর্ণা এই বয়সেও একই আছে। এই আতিশয্যই চন্দ্রনাথের কাছে বাইশ বছর আগে লিভ টুগেদারকে অসহনীয় করে ফেলেছিল। এখন চন্দ্রনাথ নিরুত্তাপ। নিজের শরীর থেকে পৃথক হয়ে গেছেন দিনে দিনে। হঠাৎ অসহায় বোধ করলেন। কিন্তু ইচ্ছে করেই বাঘিনীর খাঁচায় ঢুকেছেন।

ছবিটা বন্ধ করে ঋতুপর্ণা উঠে দাঁড়ালেন। চন্দ্রনাথকে টেনে ওঠালেন। চন্দ্রনাথ বলতে চাইছিলেন, ক্যাসেটটা বের করে নিই। বলার সুযোগ দিল না। বাঘিনী শিকারের ঘাড় কামড়ে ধরে নিয়ে যেতে চাইছে আড়ালে।

ঠিক সেই সময় টেলিফোন বাজল। ঋতুপর্ণা খাপ্পা হয়ে একটা অশালীন শব্দ উচ্চারণ করলেন। তারপর বললেন, রিং হোক। একটু পরে থেমে যাবে। কিন্তু বেডরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছেন, তখনও রিং হয়ে যাচ্ছে। চন্দ্রনাথ বললেন, তুমি এখানে আসছ তোমার স্বামী জানেন?

না।

অন্য কেউ?

মলিনা জানে। এখানে এলে তাকে বলে আসি। বিশ্বাসী মেডসারভ্যান্ট। টিনা তার কাছে শুনেই এখানে এসেছে।

মনে হচ্ছে, তোমার ডেসারভ্যান্টের জরুরি ফোন। তা না হলে এখনও রিং হতো না। ফোনটা ধরো।

আমার মেজাজ নষ্ট করে দিল! কী এমন জরুরি যে আমি মেয়েটাকে তাড়াব।

ফোনটা ধরো। বাইরের ফোন হলে থেমে যেত। তা ছাড়া এখন রাত সাড়ে দশটা বাজে।

ঋতুপর্ণা কুঁসতে ফুঁসতে ড্রয়িংরুমে গেলেন। চন্দ্রনাথ তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন।

ঋতুপর্ণা ফোন তুলেই ধমকের সুরে বললেন, মলি?

 পুরুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। সরি টু ডিসটার্ব ইউ ম্যাডাম!

 হু দা হেল ইউ আর?

আমি নিউ আলিপুর পুলিশ স্টেশন থেকে অফিসার-ইন-চার্জ শোভন চ্যাটার্জি বলছি। আপনি কি মিসেস ঋতুপর্ণা মুখার্জি?

হ্যাঁ। কী ব্যাপার? চমকে উঠে ঋতুপর্ণা চন্দ্রনাথের দিকে তাকালেন।

আপনাকে একটু কষ্ট করে আপনাদের নিউ আলিপুরের ফ্ল্যাটে আসতে হবে ম্যাডাম। একটু অপেক্ষা করুন। পুলিশভ্যান পাঠিয়েছি। আপনাকে এবং আপনার মেয়েকে এসকর্ট করে আনবে।

 ঋতুপর্ণা প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, কেন? কী হয়েছে? পুলিশভ্যান এসকর্ট করতে আসছে কেন?

ডাঃ মুখার্জি–আই মিন, ইওর হাজব্যান্ড ইজ ডেড।

মুহূর্তে ঋতুপর্ণা অস্বাভাবিক শান্ত এবং শক্ত হয়ে গেলেন। কিন্তু কণ্ঠস্বর ঈষৎ বিকৃত। শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যে বললেন, ডেড? ইউ মিন–

হ্যাঁ ম্যাডাম! ডাঃ মুখার্জি ফেল্ড অ্যান আনন্যাচারাল ডেথ। আই অ্যাম। সরি টু

সুইসাইড করেছে?

 হি ইজ মার্ডারড।

 হোয়া-ট? দ্যাটস ইমপসিবল! অনির্বাণকে কে মার্ডার করবে? কেন করবে?

আমি জানি আপনার নার্ভ স্ট্রং। হ্যাঁ, আধঘণ্টা আগে কেউ ওঁকে খুন করেছে। আপনার মেয়েকে কথাটা বলার দরকার নেই। আপনি অপেক্ষা করুন। পুলিশভ্যান না পৌঁছালে আপনি যেন বেরুবেন না, প্লিজ!

ঋতুপর্ণার হাত থেকে চন্দ্রনাথ ফোন কেড়ে নিয়ে রেখে দিলেন। তারপর দ্রুত প্যান্ট-শার্ট পরে নিলেন। রাত পোশাক স্যুটকেস ভরলেন। ভি সি আর থেকে ক্যাসেটটা বের করে নিয়ে এলেন। স্যুটকেসের ভেতর ঢুকিয়ে রিভলভার বের করলেন। অস্ত্রটা প্যান্টের পকেটে ভরে একটু ভাবলেন। স্কচের বোতল, সিগারেট প্যাকেট, লাইটার পড়ে আছে। সেগুলো যথাস্থানে ভরে নিয়ে নিজের হুইস্কির গ্লাসটা ডাইনিংয়ের বেসিনে ধুলেন। গ্লাসটা টেবিলে রেখে এসে দেখলেন, ঋতুপর্ণা পাশের ঘরে মেয়েকে জাগানোর চেষ্টা করছেন।

এখন সেন্টিমেন্টের প্রশ্ন অবান্তর এবং বিপজ্জনক। পুলিশভ্যান আসছে মা-মেয়েকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যেতে। আর একমুহূর্ত দেরি করা ঠিক নয়। চন্দ্রনাথ বেরিয়ে গিয়ে ডান হাতে পকেটের রিভলভার স্পর্শ করলেন। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে এগিয়ে গেলেন সিঁড়ির দিকে।

নিচের গ্যারাজের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকালেন। এখনও বাড়িটা সম্পূর্ণ তৈরি হয়নি। সামনেটা ভোলা এবং স্টোনচিপস, ইট, হরেক সরঞ্জন এলোমেলো রাখা আছে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দ্রুত এলাকা ছাড়িয়ে গেলেন চন্দ্রনাথ।

রিভলভারটা বাঁ পাশে সিটের ওপর ফেলে রেখে চন্দ্রনাথ দেববর্মন ড্রাইভ করছিলেন। সল্টলেকের রাস্তা গোলকধাঁধা। কিন্তু তাঁর নখদর্পণে। ই সেক্টরের একটুকরো জমি কেনা আছে। সেখানে কোনোদিনই বাড়ি করবেন না আর ভাল দাম পেলে বেচে দেবেন।

এবং ঠিক এই কথাটা মাথায় এলে কেন যেন তার মনে হলো, বেঁচে থাকার দরকার আছে তার। জীবনের অন্য অনেক রকম মানে আছে। কেউ-কেউ বোঝে না। কেউ-কেউ বোঝে না। কেউ-কেউ বোঝে….

.

১০.

 কর্নেল নীলাদ্রি সরকার দুঘণ্টা ছাদের বাগান পরিচর্যা করে এসে কফি খেতে খেতে খবরের কাগজে চোখ বুলাচ্ছিলেন। হোটেল কন্টিনেন্টাল এবং সানশাইনে দুটো খুনের খবর ছোট্ট করে ছেপেছে। পুলিশ সূত্রের খবর। কাকেও গ্রেফতার করা হয়নি। শুধু দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা জানিয়েছে, সানশাইনের খুনে সন্দেহক্রমে জনৈক বক্তিকে জেরা করা হচ্ছে। দুটো খুনের খবর আলাদা ছাপা।

টেলিফোন বাজল। কর্নেল সাড়া দিলেন। শুভ্রাংশুর কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কর্নেল সরকার! কাল আপনি রিং করেছিলেন শুনলাম। আমাকে দুপুরে ব্যারাকপুর যেতে হয়েছিল। ফিরেছি প্রায় রাত এগারোটায়। অত রাতে আপনাকে ডিসটার্ব করতে চাইনি।

কর্নেল বললেন, একটা কথা জানতে চেয়েছিলাম।

 বলুন স্যার!

আচ্ছা, আপনি রঞ্জন রায় নামে কাউকে চেনেন?

 রঞ্জন রায়?

হ্যাঁ। ফিল্মমেকার।

কই না তো! এ নামে কোনও ফিল্মমেকারের কথা শুনিনি। তবে ফিল্মসার্কেলে আমার কিছু জানাশোনা লোক আছে। খোঁজ নেব?

নিন। আর ভিডিওজোন কথাটা কি আপনার পরিচিত?

কী বললেন? ভিডিওজোন? নাহ্। কী সেটা?

একটা স্টুডিও। মানে, ভিডিও ক্যাসেট তৈরি হয় সেখানে।

 কোথায় সেটা?

পার্ক স্ট্রিট এরিয়ার একটা গলিতে।

 তাই বুঝি? তো স্যার, কোনও ক্লু পেলেন?

 কর্নেল হাসলেন। ক্লু বলতে রঞ্জন রায় এবং ভিডিওজোন।

আই সি! আচ্ছা স্যার, তাহলে কি রঞ্জন রায়ই মউকে নিয়ে ব্লু ফিল্ম তুলেছিল?

আপনার কী ধারণা?

আমার তা-ই সন্দেহ হচ্ছে। কিন্তু মউ বলেছিল, হংকংয়ের এক ব্যবসায়ী ওকে ব্ল্যাকমেল করত। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, রঞ্জন রায় এবং সেই ব্যবসায়ীর মধ্যে কোনও যোগাযোগ আছে। তাই না স্যার?

আপনি বুদ্ধিমান মিঃ সোম! আজকের কাগজ দেখেছেন?

 এখনও দেখা হয়নি। কেন স্যার?

মধুমিতার খুনের খবরের তলায় আরেকটা খবর আছে দেখবেন। হোটেল কন্টিনেন্টালে হংকংয়ের ব্যবসায়ী রঙ্গনাথন খুন।

বলেন কী! মউ যার কথা বলত–

হ্যাঁ। সেই ব্যবসায়ী। যাই হোক, আপনি আপনার চেনাজানা ফিল্মমহলে রঞ্জন রায় সম্পর্কে খোঁজ নিন। খোঁজ পেলেই আমাকে জানাবেন।

একটা কথা স্যার! রঙ্গনাথন না কী বললেন, তার কাছে কোনও ভিডিও ক্যাসেট পাওয়া যায়নি?

নাহ্।

 ভেরি মিসটিরিয়াস! ক্যাসেটটা তার কাছে থাকা উচিত ছিল। স্যার! দুটো খুনের মধ্যে লিঙ্ক তো স্পষ্ট।

ঠিক বলেছেন। আপনি বুদ্ধিমান!

 রঞ্জন রায় রঙ্গনাথনকে খুন করে ক্যাসেটটা হাতিয়েছে সিওর।

 আমি সিওর নই অবশ্য।

 স্যার! সেই ক্যাসেটে মউয়ের মেলপার্টনার যদি রঞ্জন হয়, তাহলে?

বাহ্! আপনি সত্যিই বুদ্ধিমান মিঃ সোম! আপনি মূল্যবান একটা ক্লু ধরিয়ে দিলেন। আমি এটা ভাবিনি। ধন্যবাদ!

আর একটা কথা স্যার! যাকে হাতে নাতে ধরা হয়েছিল, হ্যাঁ চন্দ্রনাথ দেববর্মন, তার অ্যালিবাই কী?

পুলিশ নিশ্চয় কোনও স্ট্রং অ্যালিবাই পেয়েছে। তাই পুলিশ রঞ্জন রায়কে খুঁজছে! আচ্ছা! রাখছি। আপনি যেন রঞ্জন রায় সম্পর্কে

সিওর! কিন্তু স্যার, আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে।

বলুন!

 চন্দ্রনাথবাবুর ঘর ভালভাবে সার্চ করা উচিত ছিল পুলিশের।

কেন?

 এমন হতে পারে, মউ তারই কাছে যাচ্ছিল।

 হুঁ। কেন যাচ্ছিল বলে আপনার ধারণা?

আমি সিওর নই। তবে এমন হতেই পারে, মউ জানতে পেরেছিল তার কাছে ওর ব্লু ফিল্মের ক্যাসেট আছে। বোঝাপড়া করতে যেতেই পারে। আমি ডিটেকটিভ নই কর্নেল সায়েব! কিন্তু আমার ইনটুইশন বলছে, রঙ্গনাথন এবং চন্দ্রনাথের মধ্যে চেনাজানা থাকা সম্ভব। রঙ্গনাথন চন্দ্রনাথের ঘরে গিয়েই মউকে ব্ল্যাকমেল করতে পারে! মউ বোঝাপড়া করতে যাচ্ছিল। সেইসময় তার স্বামী কে ফলো করে গিয়ে খুন করেছে। এটা কি সম্ভব নয়? আপনি একটু ভেবে দেখবেন এটা।

দেখবখন। রাখছি মিঃ সোম!

ফোন রেখে ঘড়ি দেখলেন কর্নেল। নটায় শান্তশীল দাশগুপ্তের কাছে তার যাবার কথা। এখনই বেরুনো উচিত।…

সানশাইনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কড়া করা হয়েছে। রণধীর সিংহ সিকিউরিটি অফিসে ছিলেন। কর্নেলকে দেখে স্যালুট ঠুকলেন। কর্নেল বললেন, বি ব্লকে মিঃ দাশগুপ্তের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে রণধীর।

চলুন স্যার! আমি পৌঁছে দিয়ে আসি।

ধন্যবাদ রণধীর! তুমি তোমার ডিউটি করো! কর্নেল হঠাৎ থেমে চাপাস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, চন্দ্রনাথ দেববর্মন কি ফিরেছেন?

হ্যাঁ স্যার। গত রাতে সাড়ে এগারোটা নাগাদ ফিরেছেন। পুলিশ ওঁর গতিবিধি সম্পর্কে খবর দিতে বলেছিল। আমি দিয়েছি।

ঠিক আছে।…

শান্তশীল অপেক্ষা করছিল। ড্রয়িংরুমে কর্নেলকে বসিয়ে বলল, এনি ড্রিঙ্ক?

 ধন্যবাদ। কফি খেয়ে বেরিয়েছি।

শান্তশীল একটু চুপ করে থাকার পর বলল, আমি বলেছিলাম মৃতেরা কথা বলে না। আপনি বলেছিলেন, তারা আপনার কাছে কথা বলে। আপনি আমার স্ত্রীর কাগজপত্র খুঁজতে বলেছিলেন। খুঁজে কিছুক্ষণ আগে একটা নেমকার্ড পেলাম। কার্ডটা দেখে যেন, মনে হলো, ডেডস সামটাইম রিয়্যালি স্পিক। হা আপনি রঞ্জন রায় এবং ভিডিওজোন বলেছিলেন। সেই কার্ড। এই নিন।

কর্নেল কার্ডটা দেখে পকেটস্থ করলেন এবং চুরুট ধরালেন।

শান্তশীল বলল, তবে এটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনাকে কাল ফোন করেছিলাম। বলেছিলাম, আপনার সঙ্গে কথা বলা দরকার এবং সেটা আমার অ্যাপার্টমেন্টেই বলা দরকার। কেন, তার আভাস দিচ্ছি। এই অ্যাপার্টমেন্টে বসলে আমার স্ত্রী সম্পর্কে অনেক কথা স্মরণ হতে পারে, যা বাইরে কোথাও বসে কথা বললে হবে না। কোনও কোনও ঘটনা তুচ্ছ মনে হয়েছে কত সময়। এখন মনে হচ্ছে, সেগুলোর তাৎপর্য ছিল।

সে চুপ করলে কর্নেল বললেন, যেমন?

 কিছুক্ষণ আগে বেডরুমের একটা জানালার নিচে বাংলায় কি যেন একটা কথা আছে, ওই জায়গাটা–ওই যে বনসাই টবটা আছে

কর্নেল হাসলেন। হুঁ। পুরনো বাংলা শব্দ। গোবরাট।

হ্যাঁ। গোবরাট। সেখানে একটু ছাই দেখেছিলাম। সিগারেটের ছাই। আমি একসময় বেশি সিগারেট খেতাম। এখন খুবই কম। তাহলে ও সিগারেটের ছাই আমি চিনি। আমি ভুলেও সিগারেটের ছাই বাইরে ফেলি না। বেডরুমে সিগারেট খাই না। খেলে এখানে বসে খাই। যাই হোক, মউকে জিজ্ঞেস করিনি। আসলে ব্যক্তিগত জীবনে একটুও ডিসটার্বড় হওয়া আমার পছন্দ নয়। তাতে আমার কাজের ক্ষতি হয়।

আপনার স্ত্রী সিগারেট খেতেন না?

 নাহ্। শান্তশীল আবার একটু চুপ করে থাকার পর বলল, গত সপ্তাহে অফিস থেকে দুপুরে মউকে ফোন করেছিলাম। রিং হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফোন তুলে বলল, তোমার এই জেকিল-হাইড গেমটা বলেই হ্যালো। ও! তুমি? ইত্যাদি। কর্নেল সরকার তোমার এই জেকিল-হাইড গেমটা–এই কথাটা ফোন তুলেই কেন বলবে? তাই না? অন্য কাউকে বলছিল। ডিবেটিং টোন। উত্তেজনা ছিল।

আপনি জিজ্ঞেস করেননি কিছু?

নাহ্। তখন গুরুত্বই দিইনি। গত একমাস ধরে লক্ষ্য করছিলাম একটু হিস্টেরিক টাইপ হয়ে যাচ্ছে মউ। সব সময় নয়। যে রাতে ও খুন হয়ে গেল, ভীষণ শান্ত মনে হচ্ছিল আপাতদৃষ্টে। কথা বলছিল আস্তে। কিন্তু চাপা উত্তেজনা ছিল সেটা পরে মনে হয়েছে।

কর্নেল চোখ বুজে কথা শুনছিলেন। চোখ খুলে বললেন, জেকিল-হাউড গেম?

হ্যাঁ।

ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড! ডুয়াল পার্সোনালিটি!

বইটা পড়েছি। ফিল্মেও দেখেছি। শান্তশীল একটা সিগারেট ধরাল। একটু পরে বলল, আমাদের কাজের মেয়েটি– ললিতার আগামীকাল আসার কথা। গতকাল এবং আজ তাকে ছুটি দিয়েছিল মউ। কারণ বহরমপুর যাওয়ার কথা ছিল আমাদের। কাল ললিতা এলে পুলিশ ওকে জেরা করলে সব জানা সম্ভব, হু ওয়াজ দ্যাট গাই? ললিতার না জানার কথা নয়। সমস্যা হলো, মেয়েটা কোথায় থাকে জানি। সানশাইন হাউজিং কমিটির নির্দেশ আছে, কাজের লোকেদের ফটো এবং ঠিকানা অফিসে জমা রাখতে হবে। আমি এত ব্যস্ত যে ওসব দিকে মন দিতে পারিনি।

আর কিছু?

শান্তশীল সোজা হয়ে বসল। কর্নেল সরকার! মউয়ের ফিল্ম কেরিয়ারের আমি একটুও বাধা সৃষ্টি করতে চাইনি। সে তা ভাল জানত। কিন্তু বোম্বে থেকে কয়েকবার বড় অফার এলা এবং ওরা বারবার এসে ওকে সেধেছিল। অথচ মউ ওদের মুখের ওপর না করে দিত। ফিল্ম সম্পর্কে হঠাৎ একটা যেন প্রচণ্ড অ্যালার্জি। তখন ভাবতাম, সে হাউসওয়াইফ হওয়াটাই প্রেফার করেছে এবং আমার মুখ। চেয়েই এটা করেছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, দেয়ার ওয়াজ সামথিং রং ইন ইট। কোনও তিক্ত– কুৎসিত অভিজ্ঞতা।

মিঃ দাশগুপ্ত! আপনাকে কাল ব্লু ফিল্মের কথা বলেছিলাম।

হ্যাঁ। আমি তখন বিশ্বাস করিনি আপনার কথা। এখন ঠিক ওই কথাটা আমিই আপনাকে বলছি। ব্লু ফিল্ম অ্যান্ড ব্ল্যাকমেলিং।

আপনাকে একটা ড্রাগের কথাও বলেছিলাম!

শান্তশীল তাকাল। কয়েক মুহূর্ত পরে বলল, আমি কোম্পানির কেমিস্ট ডিপার্টমেন্টের চিফ ডঃ রণেন্দ্র বোসের সঙ্গে কথা বলেছি। হি ইজ এ ফেমাস মেডিক্যাল সায়েন্টিস্ট। আন্তর্জাতিক সুনাম আছে। উনি বললেন, ওরকম ড্রাগ আছে। তরল পদার্থে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গলে যায়। হ্যালুসিনেটরি পার্সেপশন তৈরি করে ব্রেনের নার্ভে। এক মিনিট! পেটেন্টের ছদ্মনাম বলছি। বলে সে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা কাগজ বের করে দিল কর্নেলকে।

কর্নেল পড়ে বললেন, নাইটেক্স থ্রি।

সেডাটিভ ওষুধ লেখা থাকে। কিন্তু অ্যাকচুয়্যালি নিছক ঘুমের ওষুধ নয়। চোরাপথে হংকং থেকে এ দেশে আসে।

কর্নেল হাসলেন। হংকং শব্দটা বলতেই এখন আমার কাছে রঙ্গনাথন।

আমার কাছেও। বাট হু ইজ দিস গাই রঞ্জন রায়?

 পুলিশ খুঁজছে তাকে। দেখা যাক। আমি উঠি মিঃ দাশগুপ্ত।

 শান্তশীল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমার যেন আরও কিছু বলার কথা ছিল। মনে পড়ছে না।

মনে পড়লে জানাবেন। তবে আমার মনে হচ্ছে, আপাতত এই যথেষ্ট।…

কর্নেল নমস্কার বিনিময় করে বেরিয়ে এলেন। তারপর ই ব্লকের দিকে হাঁটতে থাকলেন। বাড়িটা নির্জন নিঝুম হয়ে আছে। দোতলায় নটা ঘরের কর্মীরা এখন কাজে চলে গেছে। অটোমেটিক লিফটে তিনতলায় পৌঁছুলেন। সেই কুকুরটার হাঁকডাক শুরু হয়ে গেল। কর্নেল করিডর ঘুরে সোজা এগিয়ে ১৩ নম্বরে নক করলেন।

প্রথমে আইহোলে একটা চোখ। তারপর চেন আটকানো দরজা একটু ফাঁক হলো। মঙ্গলোয়েড চেহারার একটা মুখ। শীতল চাহনি।

কর্নেল তার নেমকার্ড এগিয়ে দিলেন। চন্দ্রনাথ বাঁ হতে সেটা নিয়ে দেখার পর বললেন, ইয়া?

কর্নেল তার নেমকার্ড এগিয়ে দিলেন। চন্দ্রনাথ বাঁ হাতে সেটা নিয়ে দেখার পর বললেন, ইয়া?

কর্নেল একটু হেসে বললেন, আপনার ডানহাতে একটা ফায়ার আর্মস আছে। মিঃ দেববর্মন! তবে আপনি আমার এই সাদা দাড়ি টেনে দখতে পারেন, এটা রঞ্জন রায়ের ছদ্মবেশ নয়। আমি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী।

আমি ব্যস্ত।

প্লিজ মিঃ দেববর্মন! আপনি বরং লালবাজারের ডি সি ডি ডি অরিজিৎ লাহিড়ি কিংবা আপনাদের সিকিউরিটি অফিসার রণধীর সিংহকে ফোন করে আমার সম্পর্কে খোঁজ নিতে পারেন।

কী চান আমার কাছে?

 রঞ্জন রায় সম্পর্কে কথা বলতে চাই।

 তাকে আমি চিনি না।

ওয়েল মিঃ দেববর্মন, অনেক সময় আমরা জানি না যে আমারা কী জানি। আপনি যে এখনও বিপন্ন, তা ভুলে যাবে না।

চন্দ্রনাথ একটু ইতস্তত করে দরজা খুলে বললেন, ওকে! কাম ইন!

কর্নেল ভেতরে ঢুকলে চন্দ্রনাথ দরজা লক করলেন। চন্দ্রনাথের হাতে খুদে আগ্নেয়াস্ত্র। ইশারায় সোফায় বসতে বললেন। তারপর একটু দূরে একটা চেয়ারে বসে বললেন, আপনি একজন রিটায়ার্ড কর্নেল?

হ্যাঁ। তবে রহস্য জিনিসটা আমাকে টানে। রহস্য ভেদ করা আমার একটা হবি। আপনার জীবনে সদ্য যা ঘটেছে, তা কি একটা জটিল রহস্য নয়?

ইয়া।

কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট জ্বেলে একটু হেসে বললেন, রঞ্জন রায় জানে আপনার কাছে একটা ব্লু ফিল্মের ক্যাসেট আছে। আমার ধারণা, ওটা মিঃ রঙ্গ নাথন আপনাকে দিয়েছিলেন!

ইয়া।

আমার আরও ধারণা, ওই ক্যাসেটে মিসেস দাশগুপ্ত এবং তার মেল পার্টনারের ছবি আছে।

ইয়া।

অ্যান্ড দা মেলপার্টনার ইজ রঞ্জন রায়?

ইয়া।

আমি রঞ্জন রায়কে একবার দেখতে চাই।

 চন্দ্রনাথ কষ্ট করে হাসলেন। আপনি কি কখনও ব্লু ফিল্ম দেখেছেন?

নাহ্। কিন্তু প্রয়োজন আমাকে দেখতে বাধ্য করবে। প্লিজ স্টার্ট!…

.

১১.

 রঞ্জন-মধুমিতার এপিসোড় মাত্র এক মিনিট দেখেই কর্নেল বললেন, স্টপ ইট প্লিজ! দ্যাটস এনাফ।

ক্যাসেট থামিয়ে চন্দ্রনাথ বললেন, এই ছবির রঞ্জন রায়কেই আমি দেখেছিলাম। সিওর।

কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, স্বীকার করছি আপনি দুঃসাহসী মানুষ মিঃ দেববর্মন! কিন্তু রঞ্জন এখন মরিয়া। আপনি আপনার ফায়ারআর্মসের ওপর বড্ড বেশি নির্ভর করছেন। সে রাতে রঞ্জন তৈরি হয়েই আসছিল। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তার হাতে গুলিভরা পয়েন্ট আটত্রিশ ক্যালিবারের ফায়ারআর্মস রেডি ছিল। কিন্তু আপনি দুটো কারণে বেঁচে গেছেন। প্রথম কারণ, সে আপনাকে হঠাৎ ১০ নং অ্যাপার্টমেন্টের সামনে লিফটের মুখোমুখি দেখার আশা করেনি। দ্বিতীয় কারণ, কুকুরের চেঁচামেচি। সে পোশাদার খুনী নয়। তাই হকচকিয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া তখন তার দিকে আপনার ফায়ারআর্মসের নল। আত্মরক্ষার সহজাত বোধে সে সেই মুহূর্তে সিঁড়ির দিকে ঝাঁপ দিয়েছিল। আপনি দৈবাৎ বেঁচে গেছেন। হ্যাঁ- এখানে গুলির লড়াই করার হিম্মত রঞ্জনের ছিল না। এটা একটা অ্যাপার্টমেন্ট হাউস। নিচে সিকিউরিটি গার্ডরা টহল দিয়ে বেড়ায়।

চন্দ্রনাথ শীতল কণ্ঠস্বরে বললেন, আপনি কী বলতে চান?

রঞ্জন এখন মরিয়া এবং এই ক্যাসেটটাই আপনার পক্ষে ভীষণ বিপজ্জনক। এটা আপনি আমাকে দিতে না চান, এখনই পুলিশকে দিন। আমি পুলিশকে ডাকছি।

পুলিশ আমাকে ফাঁসাবে। আপনি জানেন, এ সব ক্যাসেট বে-আইনি।

কর্নেল হাসলেন। বে-আইনি! কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জঘন্য বে-আইনি কাজ নরহত্যা। আফটার অল, আপনি আসলে পুলিশকে সহযোগিতা করছেন। তাই না? মিঃ দেববর্মন! আপনার গায়ে আঁচড় লাগতে আমি দেব না। সব দায়িত্ব আমার। আমার ওপর নির্ভর করুন।

একটু ভেবে নিয়ে চন্দ্রনাথ বললেন, ও কে। বাট ফার্স্ট লেট মি টক টু সিকিউরিটি অফিসার।

চন্দ্রনাথ সিকিউরিটিতে ফোন করে রণধীরকে এখন আসতে বললেন। কর্নেল বুঝতে পারছিলেন, এই লোকটি পোড়খাওয়া এবং নানা ধরনের অভিজ্ঞতা আছে। তাই খুব সাবধানী।

কিছুক্ষণ পরে দরজায় কেউ নক করল। চন্দ্রনাথ উঠে গিয়ে আইহোলে দেখে নিলেন। তারপর দরজা খুলে রণধীরকে ভেতরে ঢোকালেন। রণধীর উদ্বিগ্নমুখে বললেন, এনিথিং রং স্যার!

চন্দ্রনাথ বললেন, এই ভদ্রলোককে আপনি চেনেন?.

রণধীর ঢুকেই কর্নেলকে দেখে স্যালুট ঠুকেছিলেন। বললেন, হ্যাঁ। উনি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

উনি পুলিশকে ফোন করতে চান।

পুলিশ চিফরা ওঁকে সম্মান করেন স্যার! এমন কি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের বহু ডিপার্টমেন্টের চিফরাও ওঁর হেল্প নেন।

চন্দ্রনাথ কর্নেলকে বললেন, ও কে! আপনি ফোন করুন। মিঃ সিনহা! আপনি একটু বসুন।

কর্নেল ডি সি ডি ডি অরিজিৎ লাহিড়ির কোয়ার্টারে ফোন করলেন। লালবাজার গোয়েন্দা দফতরের অফিসাররা এগারোটার পর অফিসে যান। ফোনে সাড়া পেয়ে বললেন, অরিজিৎ! আমি সানশাইন থেকে বলছি।

হাই ওল্ড বস! নতুন কিছু বাধালেন নাকি? গতরাতে আবার এক কেলো নিউ আলিপুরে–

রঞ্জন রায়?

হ্যাঁ। সাম ডাক্তার অনির্বাণ মুখার্জিকে তার বসার ঘরে শুইয়ে দিয়ে পালিয়েছে। মাথায় গুলি। ওঁর মেড সারভ্যান্ট প্রত্যক্ষদর্শী। সে রঞ্জনকে চেনে। গুলির শব্দ শুনে ছুটে এসেছিল মেয়েটি। রঞ্জনকে পালিয়ে যেতে দেখেছে। তাকে সে চেনে।

ডাঃ অনির্বাণ মুখার্জি কি ডেড?

স্পট ডেড।

অরিজিৎ! আমি সানশাইনে মিঃ চন্দ্রনাথ দেববর্মনের ঘরে আছি। একটা ভিডিওক্যাসেট তোমাদের হাতে তুলে দিতে চাই। ওতে রঞ্জনের ছবি আছে। এই ক্যাসেটটা নিতে আমার চেনা কোনও রেসপনসিবল অফিসার পাঠাও। কুইক ডার্লিং! রঞ্জন মরিয়া, মাইন্ড দ্যাট! বিশেষ করে নিউ আলিপুরের ঘটনা শুনে মনে হচ্ছে, সে চূড়ান্ত ডেসপারেট হয়ে উঠেছে। আর একটা কথা। ক্যাসেট নিতে যাকে পাঠাবে, তিনি যেন পুলিশ ড্রেসে আসেন। উইথ আর্মস।

কর্নেল ফোন রাখলে চন্দ্রনাথ আস্তে বললেন, আপনি কার সঙ্গে কথা বললেন?

ডি সি ডি ডি অরিজিৎ লাহিড়ি।

নিউ আলিপুরের ডাক্তার মুখার্জিকে আমি চিনি। নাইস ম্যান। তাকে বাস্টার্ড রঞ্জন খুন করল কেন?

কর্নেল সে-প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রণধীরকে বললেন, তুমি এখনই কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ড এই ব্লকের সামনে মোতায়েন করো। দুজন গার্ড নিচে লিফটে সামনে থাকে যেন। পুলিশ আসবে উর্দিপরে। সাদা পোশাকের কেউ যেন পুলিশ পরিচয় দিয়ে এই ব্লকে ঢুকতে না পারে।

রণধীর সিকিউরিটি অফিসে ফোন করে বললেন, আমি নিজে বরং লিফটের সামনে থাকছি।

বাট উইথ আর্মস!

 ইয়েস স্যার! আই হ্যাভ মাই আর্মস।

স্যালুট করে বেরিয়ে গেলেন সিকিউরিটি অফিসার রণধীর সিংহ। তারপর চন্দ্রনাথ ভি সি পি থেকে ক্যাসেটটা বের করলেন। কর্নেল বললেন, ক্যাসেটটা একটু দেখতে চাই মিঃ দেববর্মন!

চন্দ্রনাথ ক্যাসেটটা দিলেন। কর্নেল সেটা দেখেই বলেন, মাই গুডনেস্!

চন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করলেন, কী?

ক্যাসেটটার নাম ডেডস ডু নট স্পিক! আশ্চর্য তো!

মোটেও অশ্চর্য নয় কর্নেল সরকার! সব বু ফিল্মের ক্যাসেটের এ রকম অদ্ভুত নাম হয়। হরর ফিল্মের সঙ্গে মানানসই নামই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বেছে নেওয়া হয়। প্রথমে কিছু সেই রকম ঘটনা থাকে। তারপর সেক্স সিন এসে পড়ে। আমি একটা ব্লু ফিল্ম দেখেছিলাম দা নেকেড আই নামে। অর্থহীন নাম। কিন্তু চমক। আছে। কিংবা ধরুন, দা ফ্লাইং কার্পেট অর্ধেকটা অব্দি দেখেও বোঝা যায় না সেক্স সিন আছে।

কর্নেল বললেন, আমি একটা ফোন করতে চাই। আর্জেন্ট!

করুন।

কর্নেল শান্তশীলের নম্বার ডায়াল করলেন। সাড়া এলে বললেন, আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।

বলুন!

 আপনি বলেছিলেন আমাকে ডেডস ডু নট স্পিক। তাই না?

হ্যাঁ। কী ব্যাপার?

কথাটা আপনি কোথাও পড়েছিলেন, নাকি—

মে বি ইটস আ ফ্রেজ। মনে পড়ছে না।

একটু ভেবে বলুন। দিস ইজ আর্জেন্ট মিঃ দাশগুপ্ত!

 সময় লাগবে।

আচ্ছা মিঃ দাশগুপ্ত, কথাটা আপনার স্ত্রীর মুখে শোনেননি তো?

অ্যাঁ?..হ্যাঁ, হ্যাঁ। দ্যাটস রাইট। এক দিন রাতে আমি কম্পিউটাররুম থেকে বেরিয়ে আসছিলাম। সেই সময় মউ টেলিফোনে কথা বলছিল। ওই কথাটা তারই মুখেই শুনেছিলাম। তবে আপনাকে বলেছি, মউকে আমি–

থ্যাঙ্কস। রাখছি। বলে টেলিফোন রেখে কর্নেল একটা চুরুট ধরালেন। একটু হেসে চন্দ্রনাথ বললেন, এটাই একটা পয়েন্ট মিঃ দেববর্মন! অনেক সময় আমরা জানি না যে আমরা কী জানি। বাই দা বাই, আপনি তো অনেক ভিডিও ক্যাসেট দেখেছেন। এই ক্যাসেটের প্রিন্ট সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

এটা ওরিজিন্যাল প্রিন্ট নয় তবে ভাল প্রিন্ট। প্রথম অংশটা-ইয়াঙ্কি বয় এবং তার গার্লফ্রেন্ডের এপিসোড ওরিজিন্যাল প্রিন্ট নয়। হংকংয়ের ব্যাকগ্রাউন্ডে ভোলা। লোকেশানটা আমার চেনা।

হংকং গিয়েছিলেন নাকি?

ইয়া। চন্দ্রনাথ সিগারেট ধরিয়ে বললেন, কজওয়ে বের ধারে তোলা ছবি। টাইগার বাম গার্ডেনসের একটা অংশ দেখা যায়। এই গার্ডেনসের মালিক অ বুন হ। মলম বেচে কোটিপতি হওয়া লোক। ওকে ইউরোপীয়ানরা বলে টাইগার বাম কিং। বি এ এল এম বাম। অ্যান্ডারস্ট্যান্ড? ছবিতে উল্টেটাদিকের হ্যাপি ভ্যালি রেসকোর্স দেখেছি। লোকেশানটা আমার পরিচিত। অবশ্য সেক্স সিন স্টুডিওতে তোলা।

মিঃ রঙ্গনাথনের আমন্ত্রণে গিয়েছিলেন?

ইয়া। আপনি শুনে থাকবেন আমার মার্কেটিং রিসার্চের কারবার আছে। একটা কোম্পানির কাজ নিয়ে গিয়েছিলাম। রঙ্গনাথনের বাড়িতে ছিলাম। শেক-ও বিচের ধারে ওর বাড়ি। রঙ্গনাথন ওয়াজ এ বিলিওনেয়ার। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা আছে ওর।

কর্নেল হাসলেন। কাজেই তিনি কাউকে দশ হাজার টাকার জন্য ব্ল্যাকমেল করতে কলকাতা আসবেন কেন?

চন্দ্রনাথ তাকালেন। ব্ল্যাকমেল? রঙ্গনাথন ব্ল্যাকমেল করবে কোন দুঃখে? তবে সে ছিল হাড়ে হাড়ে ব্যবসায়ী। আরব দেশগুলোতে ভারতীয় যুবক-যুবতাঁকে নিয়ে তোলা ব্লু ফিল্মের চহিদা আছে। এ কথা সে আমাকে বলেছিল। আপনি জানেন ভারত থেকে আরব কাছে এবং হংকং থেকে দূরে। কিন্তু ব্যবসার ব্যাপারে আরব হংকং থেকে খুবই কাছে। নেডোর নেবার।

কথা বলে সময় কাটাতে চেয়েছিলেন কর্নেল। চন্দ্রনাথকে যতটা শীতল দেখায়, তিনি তত শীতল নন। ইংরেজিতে যাদের বলা হয় গুড টকার সেই রকম মানুষ। কর্নেলের মনে হচ্ছিল, তবু লোকটির জীবনে কোথাও একটা ক্ষত আছে। সেই ক্ষত তাকে নিঃসঙ্গ এবং শীতল করে ফেলে মাঝে মাঝে।

প্রায় আধঘণ্টা পরে ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ হাজরা এলেন পুলিশের। পোশাকে। সঙ্গে দুজন আর্মড কনস্টেবল। ডেডস ডু নট স্পিক নামের ভিডিও ক্যাসেটটা নিয়ে গেলেন।

চন্দ্রনাথকে সাবধানে থাকতে বলে কর্নেল তার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরলেন ট্যাক্সি চেপে। ড্রয়িংরুমে ফ্যান চালিয়ে ইজিচেয়ারে বসেই বললেন, ষষ্ঠী! কফি!

টুপি খুলে টাকে হাওয়া খেতে খেতে কর্নেল ভাবলেন, শুভ্রাংশুর কথায় চন্দ্রনাথ দেববর্মনের দিকে আন্দাজে ঢিল ছুঁড়েছিলেন। ঢিলটা লেগে গেছে। শুভ্রাংশু সত্যিই বুদ্ধিমান। তার হিসেব কাঁটায় কাটায় মিলে গেল।

শুভ্রাংশুকে এখন বাড়িতে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ওর বোনকে জানিয়ে রাখা উচিত, সে বাড়ি ফিরলেই যেন কর্নেলকে রিং করে কিংবা সোজা চলে আসে।

কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর সাড়া এল। কর্নেল বললেন, সুস্মিতা?

হ্যাঁ। আপনি কে বলছেন?

 কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

দাদার সঙ্গে কথা বলবেন তো? দাদা অফিস থেক একটু আগে ফিরে এসেছিল। ওকে ডিমাপুরে ট্রান্সফার করেছে। সব গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল। আপনাকে রিং করেছিল। পায়নি।

ও! আচ্ছা! কীসে গেল? প্লেনে নিশ্চয়?

হু, কোম্পানি ওকে অত টাকা দেবে, তা হলে হয়েছে। ট্রেনে যাবে, কোন ট্রেন আমি জানি না। রাখছি।…

ষষ্ঠী কফি আনল। কর্নেল বললেন, আমাকে কেউ ফোন করেছিল?

 ষষ্ঠী নড়ে উঠল। কাঁচুমাচু মুখে বলল, ওই যাঃ। বলতে ভুলে গেছি। একটা ফোং এয়েছিল বটে। কিন্তু নাম বলল না। আপনি নেই শুনেই ছেড়ে দিল।…

তা হলে শুভ্রাংশু ট্রান্সফার অর্ডার ঠেকাতে পারল না! মউ বেঁচে থাকলে কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে উচ্চারণ করলেন, ডেডস ডু নট স্পিক। মৃতেরা কথা বলে না।

ষষ্ঠী যেতে যেতে ঘুরে বলল, আজ্ঞে বাবামশাই?

কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন, তোর মুণ্ডু!

ষষ্ঠীচরণ বেজার হয়ে চলে গেল কিচেনের দিকে। কর্নেল চুপচাপ কফি খাওয়ার পর চুরুট ধরালেন। রঞ্জন তার চালে একটা গুরুতর ভুল করল কেন? একটা ব্যাপার স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, রঙ্গনাথনকে সে ওই ভি ডি ও ক্যাসেটটা আগেই বিক্রি করেছিল। রঙ্গনাথন বিদেশে তার প্রিন্ট বিক্রি করেছেন, এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। একটা প্রিন্ট রঞ্জনের প্রাপ্য ছিল। হোটেল কন্টিনেন্টালের ম্যানেজারের বিবরণ অনুসারে রঙ্গনাথন এবার কলকাতা আসেন ২৭ মার্চ সন্ধ্যায়। প্রিন্টটা রঞ্জনের জন্যই এনেছিলেন। কিন্তু তাঁর কাছে রঞ্জন যাওয়ার আগেই রঙ্গনাথন প্রিন্টটা তার বন্ধু চন্দ্রনাথকে দেখার জন্য দেন। চন্দ্রনাথ থাকেন সানশাইনে, যেখানে মৌ থাকে। এবার রঙ্গনাথন রঞ্জনকে বলে থাকবেন–নিশ্চয় বলেছিলেন, ওটা একজনকে একদিনের জন্য দেখতে দিয়েছেন। রঞ্জন জানতে চাইতেই পারে, কাকে ওটা দেওয়া হয়েছে। কারণ কলকাতার তার সেক্স সিন দেখানোর ঝুঁকি আছে। দৈবাৎ এমন। কারও চোখে পড়তে পারে, যে রঞ্জনেকে চেনে। কাজেই রঞ্জন রঙ্গনাথনের কাছে কাকে ক্যাসেট দেওয়া হয়েছে, তার নাম জানতে চাইবে এটা স্বাভাবিক। রঙ্গনাথন অত ভাবেননি। চন্দ্রনাথের নাম ঠিকানা দেন! রঞ্জন শোনামাত্র উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। বি ব্লকের পেছনেই ই ব্লক!

হ্যাঁ। এই ডিডাকশনের যুক্তি স্বতঃসিদ্ধ।

আর একটা ব্যাপার স্পষ্ট। মউকে যখন সে ব্ল্যাকমেল করত, তখন ক্যাসেট তার হাতে ছিল না। এবার ক্যাসেট এসে গেছে। অতএব টাকার অঙ্ক বাড়ানো যায়। রঞ্জন ২৮ মার্চ সন্ধ্যা থেকে শান্তশীল ফিরে না আসা পর্যন্ত মউয়ের কাছে ছিল। পঞ্চাশ হাজার টাকা দাবি করতেই গিয়েছিল এবং ক্যাসেট যে পাশের ই ব্লকে চন্দ্রনাথের কাছে আছে, তা-ও বলেছিল। চন্দ্রনাথের জবানবন্দিতে এটা জানা গেছে। মউ বুঝতে পেরেছিল। রঞ্জন তার কাছে টাকা না পেয়ে রুষ্ট এবং চন্দ্রনাথের কাছ থেকে ক্যাসেটটা যে-কোনও ভাবে আদায় করে এবার উল্টেট শান্তশীলকেই ব্ল্যাকমেল করবে। শান্তশীল স্ত্রীর সম্মান রক্ষার জন্য বাধ্য হবে রঞ্জনের দাবি মেনে নিতে। কিন্তু মউ নিজের সম্মান বাঁচাতে নিজেই তৎপর হয়ে উঠেছিল। চন্দ্রনাথকে ফোনে সাবধান করিয়ে দিয়ে শেষে ঝুঁকি নিয়েই ই ব্লকে ছুটে গিয়েছিল। বেগতিক দেখে মরিয়া রঞ্জন তাকে মেরে মুখ বন্ধ করে দেয়। ডেডস ডু নট স্পিক। এবার তার ব্ল্যাকমেলের শিকার হতো শান্তশীল দাশগুপ্ত।

কর্নেল তাঁর এই তত্ত্বে নিশ্চিত হলেন। কোনও ফঁক নেই ঘটনার এই ছকে। রঞ্জন জানত না চন্দ্রনাথ কেমন প্রকৃতির লোক এবং তাঁর হাতে ফায়ার আর্মস রেডি! প্ল্যান ভেস্তে যাওয়ার পর রঞ্জন একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছিল।

মরিয়া এবং দিশেহারা রঞ্জনের পক্ষে এই ভুল স্বাভাবিক। ভুলটা হলো রঙ্গনাথনকে হত্যা।

চন্দ্রনাথ রঞ্জনকে দেখে ফেলেছিলেন। রঞ্জন আশঙ্কা করেছিল, চন্দ্রনাথ তার হংকংবাসী বন্ধু রঙ্গনাথনকে জানিয়ে থাকবেন, তাঁর দেওয়া ক্যাসেটের পুরুষচরিত্র সশরীরে তাকে খুন করার জন্য হানা দিয়েছিল এবং সে তার ফিমেল পার্টনারকে হত্যাও করেছে। কর্নেলের মনে পড়ল, হোটেল কন্টিনেন্টালে রঙ্গনাথনের সুইটে দুটো মদের গ্লাস উল্টেট পড়েছিল কার্পেটের ওপর। তার মানে, তর্কাতর্কি থেকে একটু হাতাহাতি, তারপর

রঙ্গনাথন কি তর্কাতর্কির সময় রঞ্জনকে শাসিয়েছিলেন, তাই রঞ্জন ক্রোধোন্মত্ত হয়ে তাকে গুলি করে?

আবার সেই কথাটা এসে পড়ছে, মৃতেরা কথা বলে না।

 কিন্তু কার্পেটে পড়ে থাকা দুটো মদের গ্লাস কথা বলছে। বলছে হাতাহাতি হয়েছিল।

কর্নেল টেলিফোন তুলে অরিজিৎ লাহিড়িকে অফিসে ফোন করলেন। অরিজিৎ! একটা কথা জানতে চাইছি।

বলুন বস্। সি পির ঘরে কনফারেন্স। একটু তাড়া আছে।

হোটেল কন্টিনেন্টালে রঙ্গনাথনের সুইটে নাইটেক্স থ্রি নামে কোনও ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল পাওয়া গেছে?

রঙ্গনাথনের বডির পাশে ইজিচেয়রের তলায় দশটা ক্যাপসুলের একটা ফাইল পড়ে ছিল। আমাদের ড্রাগ এক্সপার্টরা বলেছেন ঘুমের ওষুধ।

ফোরেন্সিক ল্যাবে পাঠাও। ওটা ঘুমের ওষুধ নয়। আর ক্যাসেটটা…

পেয়ে গেছি।

ক্যাসেট থেকে রঞ্জন রায়ের একটা ছবি প্রিন্ট করিয়ে– শুধু মুখের ছবিই যথেষ্ট, ছবিটা সব দৈনিক কাগজে ওয়ান্টেড-এ হেডিং ছাপানোর ব্যবস্থা করো। কালকের কাগজেই যেন বেরোয়।

ও কে বস্।…

ফোন রেখে কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরালেন। তা হলে নিশ্চিত হওয়া গেল। নাইটেক্স থ্রি রঞ্জনকে যোগাতেন রঙ্গনাথন। তাকে মেরে রঞ্জন তাড়াহুড়োয় যতটা পারে হাতিয়ে নিয়ে গেছে।

বিকেলে কর্নেল ছাদের বাগান পরিচর্যা করছিলেন। ষষ্ঠীচরণ গিয়ে বলল, বাবামশাই ফোং।

অন্য সময় হলে বিরক্ত হয়ে ভেংচি কাটতেন। এখন একটা ঘটনার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন। দ্রুত নেমে এসে সাড়া দিলেন। চন্দ্রনাথ দেববর্মন ইংরেজিতে বললেন, আপনাকে বলার দরকার মনে করিনি। এখন বলতে হচ্ছে। নিউ আলিপুরের ডাঃ অনির্বাণ মুখার্জির স্ত্রী ঋতুপর্ণা আমার পরিচিত। এইমাত্র সে আমাকে জানাল, সেই জারজসন্তান রঞ্জন টেলিফোনে তাকে হুকুম দিয়েছে। তার মেয়ে টিনার একটা ব্লু ফিল্ম নাকি রঞ্জনের কাছে আছে। এক লাখ টাকা নগদ পেলে সে ক্যাসেটটা ফেরত দেবে। আর নমুনা-স্বরূপ একটা সেক্স সিনের স্টিল ছবি ইতিমধ্যেই লেটার বক্সে রেখে এসেছে। ঋতুপর্ণা আমাকে বলল, লেটার বক্সে সত্যিই খামের ভেতর টিনার ছবি পেয়েছে। তবে মেলপার্টনারের পেছন দিক দেখা যাচ্ছে। তাই তাকে চেনা যাচ্ছে না।

মিসেস মুখার্জি তাঁর মেয়েকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি?

করেছে। টিনা শুধু কাঁদছে। খুলে কিছু বলছে না। কাজেই ব্যাপারটা সত্য।

 কখন কোথায় টাকা দিতে হবে রঞ্জন বলেছে?

বলেছে। একটা ঠিকানা দিয়েছে। বেলসুইচ টিপলে একটি মেয়ে দরজা খুলবে। তার পরনে থাকবে জিনসব্যাগি শার্ট। ঘরে ঢুকে তাকে টাকা গুনে দিতে হবে। সে ক্যাসেটটা ফেরত দেবে। ইচ্ছে করলে ক্যাসেট চালিয়ে দেখে নিতে পারে ঋতুপর্ণা। কিন্তু মেয়েটিকে পুলিশের হাতে দিয়ে লাভ হবে না। মেয়েটি কলগার্ল। সে-ও জানে না রঞ্জন কোথায় আছে এবং কখন টাকা নিতে আসবে। হ্যাঁ। রঞ্জন আরও বলেছে, মেয়েটিকে ধরিয়ে দিয়েও লাভ নেই। কারণ ক্যাসেটের আরও প্রিন্ট রঞ্জনের কাছে আছে। সে কথা দিচ্ছে, টাকা পেলে সে সেই প্রিন্টগুলো এদেশে বেচবে না। বিদেশে যাওয়ার জন্যই তার টাকাটা দরকার।

কর্নেল আস্তে বললেন, কখন টাকা নিয়ে যেতে হবে?

 রাত নটায়।

 ঠিকানাটা কী?

ঋতুপর্ণা ফোনে বলেনি। আমাকে পরামর্শের জন্য ডেকেছে। তো আমার মনে হলো, ব্যাপারটা আপনাকে জানোনো উচিত। পুলিশ হঠকারী, আমি জানি। তা ছাড়া আজকাল পুলিশের মধ্যে আগের দিনের দক্ষতা দেখি না। মনে রাখবেন আমার বয়স ষাট পেরিয়েছে। আমার যৌবনে পুলিশের যে দক্ষতা

মিঃ দেববর্মন! আপনি কি ঋতুপর্ণার সঙ্গে যাবেন, যদি উনি টাকা দিতে রাজি হন?

আমি একটু দূরে গাড়িতে অপেক্ষা করলে অসুবিধে কী?

 আপনি যাবেন না প্লিজ। মিসেস মুখার্জির বাড়িতে অপেক্ষা করবেন।

আমি ওই জারজসন্তানের পরোয়া করি না।

 প্লিজ মিঃ দেববর্মন! রঞ্জন চূড়ান্ত মরিয়া। আমার কথা শুনুন। বাকিটা আমার হাতে ছেড়ে দিন।

একটু পরে চন্দ্রনাথ বললেন, ও কে। ঋতুপর্ণার বাড়ি থেকে রিং করে আপনাকে ঠিকানাটা জানিয়ে দেব বরং।

কর্নেল হাসলেন। রঞ্জনের দেওয়া ঠিকানাটা আমি সম্ভবত জানি মিঃ দেববর্মন! রাখছি।

চন্দ্রনাথকে আর কথা বলার সুযোগ দিলেন না কর্নেল। পোশাক বদলে এলেন। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। বেরুনোর আগে ডি সি ডি ডি অরিজিৎ লাহিড়ীকে ব্লিং করলেন। পেলেন না। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে নরেশ ধরকে পাওয়া গেল। নরেশবাবু কর্নেলের কথা শোনার পর মন্তব্য করলেন, হালা ঘুঘু দ্যাখছে, ফা দ্যাখে নাই।…

বড় রাস্তার মোড়ে ট্যাক্সি পেতে একটু দেরি হয়েছিল। পাঁচটা বেজে গেছে। সারাপথ জ্যাম। পৌঁছোতে এক ঘণ্টা লেগে গেল। সংকীর্ণ রাস্তায় দূরে দূরে ল্যাম্পপোস্ট এবং জোট-বাঁধা-উঁচু-নিচু ফ্ল্যাটবাড়ি। সেই বাড়িটার তলায় সারবদ্ধ দোকান। পানের দোকানে নরেশ ধর পানের অর্ডার দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পান, মুখে দিয়েই কর্নেলকে দেখতে পেয়ে তৎক্ষণাৎ মুখ ঘুরিয়ে আরও একটু চুন চাইলেন। মিঠাপাতা দিবার কইছিলাম না? তোমাগো কারবার!

কর্নেল দোতলায় উঠে কলিংবেলের সুইচ টিপলেন। ঘরের ভেতর থেকে মেয়েলি গলায় কেউ বলল, কে?

আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

দরজা একটু ফাঁক হলো। ব্যাগি শার্ট-জিনস পরা আঠারো-ঊনিশ বছরের একটি শ্যামবর্ণ মেয়ে, ঠোঁটে রঙ, নকল ভুরু, চোখের পাপড়ি গোনা যায়, দ্রুত বলল, দাদা তো ডিমাপুরে চলে গেছে।

কর্নেল দরজা ঠেলে ঢুকে রিভলভার বের করলেন। শুভ্রাংশু সোম ওরফে রঞ্জন রায়! চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো। একটু নড়লেই ঠ্যাং ভেঙে দেব। আমার পেছনে পুলিশ আছে।

মেয়েটি দরজা দিয়ে পালাতে যাচ্ছিল। ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর নরেশ ধরের গাঢ় আলিঙ্গনাবদ্ধ হলো। ফান্দে পড়ছ খুকি! হাঃ হাঃ হাঃ! খুব যে সেন্ট মাখছ দেখি! এইটুকখানি বডিতে কয় গ্যালন সেন্ট ঢালছ? না–না! কান্দে না! অ জগদীশ! মাইয়াডারে লইয়া যাও!

নরেশ ধর ভেতরে ঢুকে আসামির জামার কলার ধরলেন। কর্নেল তার প্যান্টের পকেট হাতড়ে পয়েন্ট আটত্রিশ ক্যালিবারের রিভলভারটা বের করে বললেন, রঙ্গনাথনের উপহার মনে হচ্ছে!

রিভলভারের বুলেটকেস খুলে কর্নেল দেখলেন তিনটে গুলি আছে। বাকি তিনটে যথাক্রমে মধুমিতা, রঙ্গনাথন এবং ডাঃ মুখার্জির মাথার ভেতর ঢুকেছে।

.

 সকালে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার কফি খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। রঞ্জনের ছবিটা ওয়ান্টেড শিরোনামে আর ছাপার দরকার হয়নি। তাকে গ্রেফতারের খবর ছাৈট করে ছাপা হয়েছে। পুলিশ সূত্রের খবর। দৈনিক সত্যসেবক অবশ্য বিশ্বস্তসূত্রে বিখ্যাত রহস্যভেদী কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের কৃতিত্ব উল্লেখ করেছে। গত রাতে ওদের রিপোর্টার ফোন করেছিল। কর্নেল বলেছিলেন, নো কমেন্ট। সেই রিপোর্টারের অভিমানী কণ্ঠস্বর কানে লেগে আছে। জয়ন্তদা হলে স্যার অনেক কমেন্ট করতেন এবং একটা এক্সক্লসিভ স্টোরিও আমরা পেতাম।

জয়ন্ত চৌধুরি ফিরবে জুন মাস। বোকা! বোকা! পুরো গরমটা ইওরোপে কাটিয়ে আসা ওর উচিত।

টেলিফোন বাজল। কর্নেল সাড়া দিলেন।

 কর্নেল সরকার। আমি শান্তশীল বলছি।

 মিঃ দাশগুপ্ত! কাগজে দেখেছেন কি আপনার স্ত্রীর খুনী ধরা পড়েছে?

দেখেছি। কিন্তু যেজন্য আপনাকে ফোন করলাম, বলি। আমাদের কাজের মেয়ে ললিতা এসেছে। খুব কান্নাকাটি করল। আমি ওকে পুলিশের ভয় দেখালাম। চুপ করল তখন। তারপর আমার জেরার জবাবে যা বলল, ভারি অদ্ভুত ব্যাপার! ২৮ মার্চ বিকেল থেকে আমার কোম্পানির মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ শুভ্রাংশু সোম এখানে ছিল। ললিতা বাড়ি ফেরে ছটায়। ললিতা বলল, দুজনে খুব তর্কবিতর্ক হচ্ছিল। তাছাড়া শুভ্রাংশু প্রায়ই আমার অ্যাপার্টমেন্টে এসেছে। ললিতা মউয়ের নিষেধ থাকায় আমাকে বলেনি। আই মাস্ট ডু সামথিং!

মিঃ দাশগুপ্ত! রঞ্জন রায় আপনার স্ত্রীর খুনী।

 হ্যাঁ, কাগজে তা তো দেখলাম।

 রঞ্জন রায় এবং শুভ্রাংশু সোম একই লোক।

হোয়াট?

ডঃ জেকিল অ্যান্ড মিঃ হাইড মিঃ দাশগুপ্ত! আপনি মধুমিতা দেবীর মুখে দৈবাৎ শুনেছিলেন, তোমার এই জেকিল অ্যান্ড হাইড গেমটা–যাই হোক, সে আমার হেল্প নিতে গিয়েছিল। আপনার ওপর যাতে সন্দেহ জাগে এবং সে সেফসাইডে থাকে। অনেক কেসে এভাবে অপরাধীরাই সাধু সাজার জন্য আমার দ্বারস্থ হয়।

মাই গড!

 ফিল্মমেকার হিসেবে শুভ্রাংশু রঞ্জন রায় ছদ্মনাম নিয়েছিল। দুরকম পেশার জন্য দুটো নাম। বাই দা বাই, ডাঃ অনির্বাণ মুখার্জির সঙ্গে তার পরিচয় মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে। শুভ্রাংশু স্বীকার করেছে, তার মেয়ে টিনাকে দেখার পর সে ডাঃ মুখার্জিকে তার ফিল্মি নামটা জানিয়েছিল। ক্লিকে ফিল্মে অভিনয়ের সুযোগ দেবে বলেছিল। তাই ডাঃ মুখার্জি শুভ্রাংশুকে রঞ্জন রায় বলেই স্ত্রীর এবং মেয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। টিনা ইজ এ প্রবলেম-চাইল্ড। টিনার ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে তাঁর দুশ্চিন্তা থাকা স্বাভাবিক। তাই ভেবেছিলেন, ফিল্মকেরিয়ার টিনার পক্ষে ভালই হবে।

কিন্তু শুভ্রাংশু ডাঃ মুখার্জিকে মারল কেন?

একমাত্র তিনিই জানতেন শুভ্রাংশুর আর এক নাম রঞ্জন রায়। তাই শুভ্রাং শু যখন জানল, রঞ্জন রায়ই দু-দুটো খুন করেছে বলে পুলিশ তাকে খুঁজছে, তখন ডাঃ মুখার্জির মুখ বন্ধ করতে তাকেও মারল। সে ভেবেছিল, ডেডস ডু নট স্পিক।

.

লাইন কেটে গেল। কর্নেল বুঝলেন, জেনিথ ফার্মাসিউটিক্যালসের নবীন চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার শান্তশীল দাশগুপ্ত আবার এতক্ষণে ইয়াপ্পি হয়ে গেল। মৃতদের কথা শুনতে তার আর আগ্রহ থাকার কথা নয়। তার কাছে যারা মৃত, তারা মৃতই এবং মৃতেরা কথা বলে না।…