মুখোমুখি

মুখোমুখি

 কর্নেল মোরামকা রাস্তায় এগিয়ে আশ্রমের ফটকের সামান্য দূরে একটা আকাশিয়া গাছের তলায় অপেক্ষা করছিলেন। হাতে সৌম্যের সেই মারাত্মক ব্রিফকেস। গলা থেকে ঝুলন্ত বাইনোকুলারে মাঝে মাঝে পাখি দেখছিলেন। শীতকাতুরে পাখিরা ডাকাডাকি করছিল গাছের পাতার আড়াল থেকে। আশ্রমের ভেতর থেকে খোল করতাল আর গানের চাপা শব্দ ভেসে আসছিল।

কিছুক্ষণ পরে তিনজন লোক বেরিয়ে এলো আশ্রমের ফটক দিয়ে। সামনে একজন, পেছনে দুজন। সামনের জনের পরনে পট্টবস্ত্র, খালি পা, গায়ে উত্তরীয় জড়ানো, নাদুস নুদুস বেঁটে গড়ন, কপালে ত্রিপুণ্ড্রক, ফর্সা রঙ, সামান্য গোঁফ আছে। পেছনের দুজনের পরনে প্যান্ট, সোয়েটার, চেহারায় উদ্ধত হাবভাব। একজন লম্বাটে রোগা, অন্যজন শক্তসমর্থ গড়নের লোক। চোখের চাউনি চঞ্চল। চিতাবাঘের মতো।

কর্নেল বাইনোকুলারে পাখি দেখার ভান করলেন। তাকে ট্যুরিস্ট বলেই মনে হবে লোকের। কাঁধে একটা ক্যামেরাও ঝুলছে। একহাতে ব্রিফকেস।

ওরা কাছে এলে কর্নেল রাস্তার মধ্যিখানে গিয়ে পট্টবস্ত্রপরা ভদ্রলোকের উদ্দেশে করজোড়ে নমস্কার করে বললেন, নমস্কার স্যার!

ভদ্রলোক থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। পেছনের লোকদুটি দু’পা এগিয়ে এলো। ভদ্রলোক কপালে একটা হাত ঠেকালেন মাত্র।

কর্নেল বললেন, পুজো দিতে গিয়েছিলেন ব্রতীনবাবু?

ভদ্রলোক চমকে উঠে ভুরু কুঁচকে তাকালেন।…ক্যা বোন্ত আপ? কৌন ব্রতীনবাবু?

ব্রতীনবাবু, আপনাকে আমি চিনি।..কর্নেল হাসলেন। পশ্চিমবঙ্গের বোড় অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রতীন্দ্রনাথ দাশকে কে না চেনে? কত ছবি বেরোয় কাগজে!

ভদ্রলোক ডাইনে-বাঁয়ে তাকালেন। দেহরক্ষীদ্বয় সামনে এসে বলল, এই বুড়ো! ঝুটঝামেলা কোরো না। কেটে পড়ো বলছি!

কর্নেল একই সুরে বললেন, এতে বিব্রত হওয়ার কিছু নেই ব্রতীনবাবু। ধর্মে ব্যক্তিগত বিশ্বাস থাকতেই পারে। বিশেষ করে সঙ্কটে পড়লে মানুষমাত্রই দুর্বল হয়ে যায়।

ভদ্রলোক ফোঁস করে উঠলেন।…ক্যা বোলতা হ্যায় জি? হাম ভগবানদাস শেঠ। আপ ভুল করতা।

সরি ব্রতীনবাবু, আপনার হিন্দি উচ্চারণ আর ভুল টেক্সট বলে দিচ্ছে আপনি বাঙালি।

দেহরক্ষীদ্বয় কর্নেলকে ঠেলে সরিয়ে দিল। কর্নেল বাধা দিলেন না। দলটা এগিয়ে চলল। কর্নেল অনুসরণ করে বললেন, ব্রতীনবাবু, আপনি এখনও নিরাপদ নন। সৌম্য চৌধুরি এবং সুভদ্র সিং ধরা পড়েনি। তাছাড়া এটা সুভদ্র সিং-এর এলাকা।

পট্টবস্ত্রধারী ঘুরে দাঁড়ালেন। একজন দেহরক্ষী–যে লম্বা ও রোগা, একটা ড্যাগার বের করলো। পট্টবস্ত্রধারী ইশারায় তাকে নিষেধ করে বললেন, আর য়ু ফ্রম এনি সেন্ট্রাল এজেন্সি—’সি বি আই’ আর ‘র’?

না ব্ৰতীনবাবু।

 দেন আর য়ু আ রিপোর্টার?

কর্নেল একটু হাসলেন শুধু।

 ফ্রম হুইচ পেপার?

দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা।

 মিট মি ইন ক্যালকাটা।

ঘুষ দিয়ে আমার মুখ বন্ধ করতে চান ব্রতীনবাবু? দিস ইজ দা হিউম্যান সাইকলজি। যে একবার জীবনে ব্ল্যাকমেইলড় হয়, সে সবসময় সবকিছুতেই ব্ল্যাকমেইল্ড হওয়ার প্রবণতায় ভোগে। হি সারেন্ডারস্ হিমসেল ইভ টু দা ইমাজিনারি ব্ল্যাকমেইল। যাকে দেখে, তাকেই ভাবে ব্ল্যাকমেইল করতে এসেছে। না স্যার, এভাবে বাঁচা সত্যিই কষ্টকর।

ব্রতীন দাশ আস্তে বললেন, কে আপনি?

আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

ব্রতীন ভুরু কুঁচকে স্মরণ করার চেষ্টা করলেন। তারপর বাঁকা হেসে বললেন, বুঝেছি। সামবডি ইন দা পোলিস্-কে যেন আপনার কথা বলেছিল। য়ু আর দা প্রাইভেট ডিটেকটিভ!

ফিল্মের নেগেটিভটা আশা করি নষ্ট করে ফেলেছেন, ব্রতীনবাবু?

ব্রতীন তাকিয়ে রইলেন। এখন মুখের ভাব নির্বিকার।

কিন্তু সৌম্য চৌধুরি আর সুভদ্র সিং ধরা পড়েনি। মাইন্ড দ্যাট!

দ্যাট ইউ টোল্ড মি। ডোন্ট রিপিটু। বলে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলেন ব্রতীন। তারপর বললেন, প্লিজ মিট মি ইন দা আফটারনুন বাই থ্রি। টু ফোর ও ক্লক।

কোথায়?

 অ্যাট আনন্দভিলা।

কর্নেল একটু হাসলেন।…পুরস্কৃত করবেন কি?

ব্রতীনও হাসলেন।…হোয়াই নট? আফটার অল, ইউ হ্যাঁ সেভৃড় মি ফ্রম দা ডার্টি র‍্যাকেট–আইদার উইলিংলি অর আন উইলিংলি, ইউ হ্যাভ সেভড় মি। আই মাস্ট গিভ.য়ু মাই থ্যাংকস্।

ব্রতীন দাশ হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন ঘাটের দিকে। কর্নেল দাঁড়িয়ে রইনে। কথাটা ঠিক। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যেভাবেই হোক, প্রকারান্তরে ব্রতীন দাশকে। কলেই ব্ল্যাকমেলারদের চক্র থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন তো বটেই! ১৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় স্যুটকেস বদলের ঘটনাটি না ঘটালে ব্রতীন দাশ নিষ্কৃতি পেতেন না। রঞ্জনদের হাত থেকে।

ব্রতীন দাশ একটা বজরায় গিয়ে ঢুকলেন। বজরাটা ইঞ্জিনচালিত। সোজা ভেসে চলেছে ওপারের ঘাট লক্ষ্য করে।

কর্নেল শ্বাস ছেড়ে ঘুরে আশ্রমের দিকে চললেন। তারপর দেখতে পেলেন কেয়াকে। বাঁদিকে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে বিস্ময়, হতাশা আর ক্ষোভের জটিল ছাপ।

কর্নেল ডাকলেন, কেয়া!

কেয়া মুখ নামিয়ে আস্তে বলল, মাইজির আশ্রমের পুজো দিতে এসেছিলুম।

কর্নেল হাসলেন।…তোমার পুজো ব্যর্থ হয়েছে। ব্রতীন দাশ নিরাপদে চলে গেলেন।

কেয়া এতক্ষণে কর্নেলের হাতের ব্রিফকেসটি লক্ষ্য করলো। চমকে উঠলো। শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, ওটা কোথায় পেলেন? ওটা তো

সে থেমে গেল হঠাৎ। কর্নেল বললেন, ঠিক চিনেছো। এটা সৌম্যবাবুর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছি। কারণ বেঁচেবর্তে থাকো এবং ক্ষমা করো, নতুন করে ঘর বাঁধার পথে এই জিনিসটা সাংঘাতিক বাধা হয়ে দাঁড়াতো।

কেয়া ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো।

কর্নেল বললেন, ডার্লিং! আমি প্রফেট নই, মহামানব নই–সামান্য মানুষ। কেঁদো না। মোতিগঞ্জে ফিরে যাও। সৌম্যকে বলেছি তোমার জন্য অপেক্ষা করতে। একটু পরে পুজো শেষ হলে যাত্রীরা ঘাটে ফিরবে। সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে হোটেল পারিজাতে দেখা করো। সৌম্যকে নিয়ে যেও। অবশ্যই যেও।

কেয়া চোখ মুছে বলল, ব্ৰতীনের সঙ্গে আপনি কথা বলেছিলেন!

হুঁ, বলছিলুম। আমাকে তিনটে থেকে চারটের মধ্যে দেখা করতে বলল।

আনন্দভিলাতে?

হ্যাঁ। আনন্দভিলাতে। মোতিগঞ্জে ওই ভিলার মালিক ভগবানদাস শেঠ। যাই হোক, ডোন্ট ওরি! ঘাটে যাও। ওই বোধ করি পুজো শেষ হলো।

কর্নেল আশ্রমের দিকে এগিয়ে গেলেন। ফটক দিয়ে ভক্তরা বেরিয়ে আসছে।…