ভূতুড়ে বাগানবাড়ি

ভূতুড়ে বাগানবাড়ি

০১.

হারাধন মল্লিক কর্নেলকে তার জয় মা তারা নার্সারির নতুন ক্যাটালগ উপহার দিতে এসেছিলেন। ডিসেম্বরের সেই সকালে আমি কর্নেলের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়েছিলুম। কাজেই আমিও এক কপি ক্যাটালগ উপহার পেলুম।

আর্টপেপারে ছাপা রঙিন সচিত্র ক্যাটালগ। রঙবেরঙের ফুল আর বিচিত্র সব. উদ্ভিদের ছবিতে ভরা প্রায় একশো পাতার বইটি কর্নেলের মতো প্রকৃতিপ্রেমিকদের পক্ষে লোভনীয়। কিন্তু আমি খবরের কাগজের ক্রাইমরিপোর্টার। আমি এই বই নিয়ে কী করব? ভদ্রতার খাতিরে হারাধনবাবুর রুচির তারিফ করলুম শুধু।

হারাধন মল্লিক বললেন, রুচি-টুচির ব্যাপার নয় জয়ন্তবাবু! আমি আমার বিজনেসের স্বার্থে এই ক্যাটালগটা ছেপেছি। সরকারি অফিস, বড়-বড় কোম্পানি আর কর্নেলসায়েবের মতো ফেমাস লোকেদের কাছে পাঠাব। তাই এটা আমার একটা ইনভেস্টমেন্ট বলতে পারেন।

কর্নেল ক্যাটালগটার পাতায় চোখ বুলেচ্ছিলেন। একটু পরে বললেন, তাহলে এতদিনে আপনার ইচ্ছা পূর্ণ হলো মল্লিকমশাই?

হারাধন মল্লিক মুচকি হেসে বললেন, কিন্তু কী ভাবে হলো সেটা লক্ষ্য করেছেন কি?

হুউ। আপনার পার্টনার ভদ্রলোকের নাম ছাপেননি। তার মানে—

 মল্লিকমশাই তার কথার ওপর বললেন, আপনি তো জানেন রাজেনের সঙ্গে মানিয়ে চলতে আমার কত অসুবিধে হচ্ছিল। সবসময় আমার প্ল্যান প্রোগ্রামে বাগড়া দিচ্ছিল। ওর উদ্দেশ্য কী প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝে ফেললুম।

এইসময় যষ্ঠিচরণ কফি আনল। কর্নেল বললেন, কফি খান মল্লিকমশাই! আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে।

হারাধন মল্লিক কফির পেয়ালা তুলে নিয়ে চুমুক দিলেন। তারপর একটু হেসে বললেন, আসলে গতরাত্রে ভালো ঘুম হয়নি। রাজনকে তার শেয়ার বাবদ নগদ পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে রফা করেছিলুম। সেইমত কাগজপত্রও রেজেস্ট্রি করা হয়েছিল। কাল সকালে এসে সে আরও এক লাখ টাকা দাবি করল। তাই নিয়ে ঝামেলা।

টাকা দিলেন?

মাথা খারাপ? তক্ষুনি থানার কোয়ার্টারে ফোন করে আমার মাসতুতো ভাই নবারুণকে খবর দিলুম। নবারুণ গত মাসে গোপালনগর থানার ওসি হয়ে এসেছে। বেগতিক দেখে রাজেন আমার পায়ে ধরতে এল। ব্যাপারটা হলো, রাজেন মধ্যমগ্রামের ওদিকে একটা বাগানবাড়ি কিনেছে। চিন্তা করুন কর্নেলসায়েব! তিন একর বাগানবাড়ি। তার মধ্যে একটা পুকুর আছে। ছকামরা একতলা একটা বাড়ি আছে। আর আছে কয়েকরকম ফলের বাগান। তার মালিক এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। রাজেন কোন্ ফুসমন্তরে তাঁকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে মাত্র ছলাখ টাকায় বাগানবাড়িটা হাতিয়েছে! পাঁচ লাখ আমি রাজেনকে দিয়েছি। সেই টাকা অ্যাডভান্স করে দলিলপত্র সব রেডি করেছে। বাকি এক লাখ রেজিস্ট্রেশনের দিন দেবার কথা। মল্লিকমশাই হাসতে হাসতে বললেন, নবারুণ আসবার আগেই রাজেন কেটে পড়ল। কিন্তু আমি তো ভেবেই পাচ্ছি না, বাগানবাড়ির মালিক ভদ্রলোকের এমন মতিভ্রম হলো, কেন? ওই এলাকায় এখন শুধু জমির যা দর, তাতে ওই বাগানবাড়ির দাম কমপক্ষে তিরিশ লাখ হওয়ার কথা!

নবারুণবাবু এসেছিলেন নাকি?

হ্যাঁ। খুলে সব বললুম ওকে। ও বলল, এই এরিয়ায় রাজেনকে দেখামাত্র আমি যেন থানায় খবর দিই। অন্য অফিসারদের বলে রাখবে।

কর্নেল ক্যাটালগের পাতায় দৃষ্টি রেখে বললেন, রাজেনবাবুর উদ্দেশ্য টের পেয়েছিলে বললেন। কী সেটা?

নার্সারিতে ওর পোযাচ্ছে না। একা অন্য কোনো কারবারে নামতে চায়। প্রায়ই বলত, আমার পাল্লায় পড়ে ওর জীবনটাই নাকি হেল হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু মধ্যমগ্রামের ওদিকে ওই বাগানবাড়ি কিনে রাজেনবাবু কি স্বাধীনভাবে নার্সারি করবেন?

হারাধন মল্লিক কিছুক্ষণ চুপচাপ কফি খাওয়ার পর আস্তে বললেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কোনো নির্বোধ বৃদ্ধকে ঠকিয়ে বাগানবাড়িটা কেনার পর পাঁচ-ছগুণ দামে কাকেও বেচে মুনাফা কামাবে। রাজেনকে তো দেখেছেন! মুখের কথায় সবসময় মধু ঝরে। কিন্তু ভেতরে কূটবুদ্ধি। মহা ধড়িবাজ লোক!

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, রাজেনবাবু যে ছলাখ টাকায় তিন একর বাগানবাড়ি কিনছেন, আপনি সে-খবর কোথায় পেলেন?

মল্লিকমশাই সহাস্যে বললেন, কাল রাজেন নিজের মুখে আমাকে বলেছে। তবে সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকের নামটা বলেনি। তিনি কোথায় থাকেন, তা-ও বলেনি। বাগানবাড়ি কিনে কী করবে তা জিজ্ঞেস করেছিলুম। শুধু বলল, পুকুরে মাছের চাষ করবে। আর ফলের বাগান তো আছেই। বলে কফি শেষ করে উনি কর্নেলের দিকে একটু ঝুঁকে পড়লেন। কর্নেলসায়েব! যা-ই বলুন, ব্যাপারটা মিসটিরিয়াস।

কর্নেল হাসলেন। কিন্তু আপনি শিয়োর হচ্ছেন কী করে যে, রাজেনবাবু আপনাকে সত্যি কথা বলেছেন?

হারাধন মল্লিক তাঁর ব্রিফকেস খুলে খবরের কাগজের একটা কাটিং বের করে কর্নেলকে দিলেন। বললেন, বলছি। আগে এটা দেখুন। এই বিজ্ঞাপনটা গত রবিবার জয়ন্তবাবুদের দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় বেরিয়েছিল। আমি ঠিকানা অনুসারে চিঠিও লিখেছিলুম। আসলে আমাদের গোপালনগর থেকে মধ্যমগ্রাম ততকিছু দূরে নয়। এদিকে কলকাতার বহর যে-হারে বেড়ে চলেছে, ওই এরিয়ায় একর তিনেক জমি এখন কিনে রাখলে ভবিষ্যতে কাজে লাগানো যাবে। আপনার কাছে স্বীকার করছি, তিরিশ লাখের মধ্যে দর হলে আমি অবশ্যই কিনে নিতুম। কিন্তু আজ রবিবার পর্যন্ত উত্তর পাইনি।

কর্নেল বিজ্ঞাপনের কাটিংয়ে চোখ বুলিয়ে নিয়েছেন। বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন মল্লিকমশাই! রহস্যজনকই বটে। বিজ্ঞাপনের ভাষাটা কেমন অদ্ভুত মনে হচ্ছে।

এতক্ষণে আমার আগ্রহ জাগল। বললুম, দেখি বিজ্ঞাপনটা।

কর্নেল কাটিংটা আমাকে দিলেন। দেখলুম, লেখা আছে :

মধ্যমগ্রাম সন্নিকটে যশোর রোড হইতে হাফ কি.মি. দূরে সুলভে পুকুর একতলা দালান ফলের বৃক্ষাদিসহ তিন একর বাগানবাড়ি ক্রয়ের সাহস থাকিলে সরাসরি সাক্ষাৎ না করিয়া শুধু পত্র লিখুন : এম আর। প্রযত্নে শ্রীহরি অটোমোবাইলস। ৭/১ রামচন্দ্র মিস্ত্রি লেন। কলিকাতা-৪৬।

বিজ্ঞাপনটা পড়ে বললুম, ভাষা অদ্ভুত বলেই মনে হচ্ছে। অবশ্য সাহস থাকিলে এই কথাটা কেন লেখা হয়েছে তার একটা ব্যাখ্যা করা যায়।

হারাধন মল্লিক বললেন, কী ব্যাখ্যা?

সম্ভবত দাম খুব চড়া হবে, তার আভাস দেওয়া হয়েছে।

হ্যাঁ। আমিও তা-ই ভেবেছিলুম।

বিজ্ঞাপনটার দিকে তাকিয়ে বললুম, পুরো নাম না লিখে এম আর কেন, এটা কিন্তু সত্যিই গোলমেলে।

আরও গোলমেলে ব্যাপার হলো, সরাসরি দেখা না করে চিঠি লিখতে বলা হয়েছে।

কর্নেল বিজ্ঞাপনটা আমার হাত থেকে নিয়ে বললেন, আচ্ছা মল্লিকমশাই, আপনি কি কাল রাজেনবাবুকে এই বিজ্ঞাপনের কথা বলেছেন?

নাঃ। বলব কী? ওর কথা শুনেই বুঝতে পেরেছিলুম এই বাগানবাড়িই সে হাতিয়ে ফেলেছে। তবে ওই যে বলেছি, গতরাত্রে ভালো ঘুম হয়নি। সেটা এই গোলমেলে বিজ্ঞাপনের জন্যেই। রাজেনের কাছে কৌশলে আনরেজিস্টার্ড ডিডের একটুখানি দেখে নিয়েছি। ব্যাটাছেলে আমাকে বোঝাতে চেয়েছিল, আরও এক লাখ তার কত দরকার।

বললম, টাইপ করা ডিড?

হ্যাঁ। কিন্তু নামটা পড়ার সুযোগ পাইনি। শুধু অ্যামাউন্টটা রাজেন দেখাল। বলে হারাধন মল্লিক কর্নেলের দিকে ঘুরলেন। তা হলেই বুঝুন কী ভাবে আমি, শিয়োর হয়েছি যে সত্যিই রাজেন ছলাখ টাকার মধ্যমগ্রাম এরিয়ায় একটা বাগানবাড়ি কিনছে।

কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চুরুট টানতে থাকলেন। তাঁর হাতে বিজ্ঞাপনের কাটিং। মল্লিকমশাই সম্ভবত কাটিংটা ফেরত চাইতে ঠোঁট ফাঁক করেছিলেন। আমার মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি খেলে গেল। বললুম, মল্লিকমশাই! গোটা ব্যাপারটাই গোলমেলে শুধু নয়, রীতিমতো রহস্যজনক। আপনি কোনো প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির সঙ্গে যোগযোগ করুন। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরুতে পারে। আপনার প্রাক্তন পার্টনার রাজেনবাবুকেও ঢিট করতে পারবেন।

কথাটা মনে ধরল হারাধন মল্লিকের। চিন্তিত মুখে বললেন, হ্যাঁ। আসল ব্যাপারটা জানতে আমার খুব আগ্রহ হচ্ছে। প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির বিজ্ঞাপনও মাঝেমাঝে কাগজে দেখি। কিন্তু যা অবস্থা হয়েছে, কাকেও বিশ্বাস করা কঠিন।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, জয়ন্ত আপনাকে তাতিয়ে দিতে চাইছে মল্লিকমশাই! সাবধান!

হারাধন মল্লিকও হাসলেন। না কর্নেলসায়েব! জয়ন্তবাবু আমাকে নতুন করে তাতিয়ে দেবেন কী, আমি নিজেই অলরেডি তপ্ত হয়ে আছি। বললুম না, গতরাত্রে ঘুমুতে পারিনি। শুধু ঘুরে-ফিরে একই চিন্তা। রাজেন এমন দাঁও মারল কী করে?

বেশ তো! বরং নিজেই গিয়ে শ্রীহরি অটোমোবাইলসের ঠিকানায় খোঁজখবর নিন। আপনি বুদ্ধিমান মানুষ। নিশ্চয় কিছু আঁচ করতে পারবেন।

ঠিক বলেছেন। বলে মল্লিকমশাই তখনই উঠে দাঁড়ালেন। বিজ্ঞাপনটা দিন! এখনই গিয়ে একটু ঢু মেরে দেখি। কিন্তু ঠিকানাটা কোন্ এরিয়ার হতে পারে?

কর্নেল বিজ্ঞাপনটা তাকে দিয়ে পাশের টেবিলের ড্রয়ার থেকে স্ট্রিট ডাইরেক্টরি বের করলেন। তারপর পাতা উল্টে দেখে নিয়ে বললেন, পূর্ব কলকাতার গোবরা এলাকায়। আপনি কি গাড়ি এনেছেন?

হ্যাঁ। নিজের গাড়ি ছাড়া ট্যাক্সির ভরসায় আজকাল কোথাও সময়মতো পৌঁছুনো কঠিন।

তাহলে তো আপনার শ্রীহরি অটোমোবাইলসে যাওয়ার একটা শক্ত অজুহাত আছে। আপনার গাড়িটা তো অ্যাম্বাসাডার। নাকি অন্য গাড়ি কিনেছেন?

হারাধন মল্লিক বললেন, মাথা খারাপ? আমার অ্যাম্বাসাডার কত বছরের সঙ্গী।

আপনি গাড়ির মেরামতি কাজ করানোর ছলে কথা শুরু করবেন।

মল্লিকমশাই সহাস্যে বললেন, ইঞ্জিন বড় তেল-মবিল খাচ্ছে। ওভারলিং করানো এমনিতেই দরকার। কাজেই কথা বলার অসুবিধে হবে না।

ফিরে গিয়ে আমাকে টেলিফোনে জানাবেন কিন্তু!

তা আর বলতে? বলে জয় মা তারা নার্সারির প্রোপ্রাইটার আমাদের বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, তুমি প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাইকে একজন বাঘা মক্কেল জুটিয়ে দিতে চাইছিলে জয়ন্ত! হা, হারাধন মল্লিক এই কেসে সত্যিই একজন বাঘা মক্কেল। কারণ মধ্যমগ্রাম এলাকার একটা বাগানবাড়ি তার মাথার ভেতর ঢুকে গেছে। বিশেষ করে রাজেন মুখার্জি ওটা প্রায় ফোকটে গ্রাস করেছেন, এটা উনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। কিন্তু হালদারমশাই কখনও একসঙ্গে দুটো কেস হাতে নেন না। গতরাত্রে আমাকে টেলিফোনে জানিয়েছেন, একখানা সাংঘাতিক কেস ওঁর হাতে এসেছে। আমার সঙ্গে পরামর্শ করতে চান। একটু বোসো। সাড়ে দশটা বাজতে চলল। যে-কোনো মুহূর্তে উনি এসে পড়বেন।

প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদার মশাই-এর পুরো নাম কৃতান্তকুমার হালদার। সংক্ষেপে কে কে হালদার। গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউতে একটা তেতলা বাড়ির ছাদে অ্যাসবেস্টস চাপানো ছোট্ট ঘরে ওঁর অফিস। উনি একসময় পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন। রিটায়ার করার পর প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন। হঠকারী, বেপরোয়া আর খেয়ালি চরিত্রে মানুষ। ঢ্যাঙা গড়ন। মাথার চুল খুঁটিয়ে ছাঁটেন। ছদ্মবেশ ধরতে পটু। তবে অতি উৎসাহে বা হঠকারিতাবশে বহুবার বিপদেও পড়েছেন। আবার ঘটনাচক্রে অক্ষত শরীরে উদ্ধারও পেয়েছেন।

ওঁকে কর্নেলের দেখাদেখি আমিও হালদারমশাই বলি। এইরকম নামের পিছনে একটা ঘটনা আছে। কর্নেলের মুখেই সেটা শুনেছিলুম।

কলকাতার কোনো বনেদি বাড়িতে বিয়ের রাত্রে ডাকাতির আভাস পেয়ে গৃহকর্তা তার বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে আমন্ত্রণ করেছিলেন এবং কর্নেলের সাহায্যে পুলিশ মোতায়েনও করেছিলেন। কে কে হালদার তখন সবে ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন এবং একটা কেসের সূত্রে কর্নেলের সঙ্গে তার আলাপও হয়েছে। কর্নেল তার কনের মামা সাজিয়ে বিয়েবাড়িতে তৈরি রেখেছিলেন। ডাকাতরা বরযাত্রীদের ভিড়ে ঢুকে ওত পেতে বসে ছিল। সালংকারা কনেকে সবে বিয়ের আসরে আনা হয়েছে, অমনই ডাকাতরা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর জন্য তৈরি হয়েছে কর্নেল আগে থেকে সংকেতবাক্য শিখিয়ে রেখেছিলেন কে কে হালদারকে। হালদারমশাই! হালদারমশাই! আপনার ভাগনির চোখে পোকা পড়েছে।

সংকেতবাক্যটা শুনেই নাকি কে কে হালদার কর্নেলের অন্য নির্দেশ ভুলে গিয়ে পাঞ্জাবির ঝুল পকেট থেকে লাইসেন্ডু ফায়ার আর্মস বের করে তাঁর নিজস্ব ভাষায় চেঁচিয়ে ওঠেন, কোন্ হালায় কইন্যার অলংকার লইতে চাও, পাও বাড়াও দেহি! ব্যাবাক খুলি উড়াইয়া দিমু!

বলে তিনি মাথার ওপর এক রাউন্ড ফায়ারও করেন। শোরগোল পড়ে যায়। বেগতিক দেখে সেই সুযোগে ডাকাতরা পালিয়ে যায়। বাড়ির লনে প্যান্ডেল তৈরি হয়েছিল। কে কে হালদারের রিভলভারের গুলি চাঁদোয়া ফুটো করে দিয়েছিল।

যাই হোক, সেই থেকে কর্নেল রসিকতা করে ওঁকে হালদারমশাই বলতে শুরু করেছিলেন।..

এগারোটা নাগাদ ডোরবেল বাজল এবং কর্নেল যথারীতি হাঁক দিলেন, ষষ্ঠী!

তারপর প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাই কর্নেলের ড্রয়িংরুমে আবির্ভূত হলেন। তার সঙ্গে একজন রুণ চেহারার প্রৌঢ় ভদ্রলোক এবং একজন যুবতী। ছিমছাম গড়ন এবং স্মার্ট হাবভাব। চেহারায় তীক্ষ্ণ লাবণ্য আছে।

হালদারমশাই আমাকে দেখে মুচকি হেসে বললেন, আরে! জয়ন্তবাবুও আছেন দেখছি! দ্যাখবেন মশায়! কাগজে য্যান কিছু ফঁস করবেন না। বলে তিনি কর্নেলের দিকে ঘুরলেন। কর্নেলস্যার! আলাপ করাইয়া দিই। ইনি মি. তপেশ মজুমদার। একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। রিটায়ার করছেন। আর এনার ডটার মিস শ্রীলেখা মজুমদার। বাবার কোম্পানিতে চাকরি করে। মিস মজুমদারই আমার ক্লায়েন্ট।

কর্নেল বললেন, আপনারা বসুন।…

রীতি অনুসারে ষষ্ঠীচরণ কফি দিয়ে গেল। তারপর শ্রীলেখা হালদারমশাইয়ের নির্দেশে মুখ খুলল। তার মুখে ঘটনার যে বিবরণ শুনলুম, সংক্ষেপে তা এই :

এন্টালির ডা. সুরেশ সরকার রোডে শ্রীলেখা আর তার বাবা একটা ভাড়ার ফ্ল্যাটে দোতলায় থাকেন। শ্রীলেখার মা বছর দুই আগে মারা গিয়েছেন। সে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ওই ফ্ল্যাটেই তার জন্ম। বাড়িটা তিনতলা। প্রতি তলায় তিনটে করে ফ্ল্যাট। বাড়ির মালিক মহেন্দ্রনাথ রায় আগে দমদম এলাকায়। থাকতেন। বছর পাঁচেক আগে দোতলার এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ভাড়াটেকে উচ্ছেদ করে নিজে সেই ফ্ল্যাটে এসেছিলেন। উচ্ছেদের ব্যাপারে বাড়ির অন্য ভাড়াটেরা বরং খুশিই হয়েছিলেন। কারণ ওই পরিবারটি প্রতি রাত্রে মদ খেয়ে নাচগান হইহল্লা করত।

মহেন্দ্রনাথ তাঁর ফ্ল্যাটে একা থাকতেন। তার লম্বাচওড়া তাগড়াই শরীর আর সায়েবি চালচলন। তাকে শ্রীলেখা প্রথম-প্রথম একটু এড়িয়ে থাকত। বিশেষ করে তাঁর ফ্ল্যাটে সঙ্গী ছিল একটা প্রকাণ্ড অ্যালসেশিয়ান। রাতের দিকে তার ঘরে বন্ধুবান্ধব আসত এবং মদের আসরও বসত। তবে কোনো হইহল্লা ছিল না। ভাড়াটেদের কাছে তিনি রায়সায়েব নামে পরিচিত ছিলেন। কারও সঙ্গে তার অসদ্ভাব ছিল না।

মাঝে মাঝে রায়সায়েবের মেয়ে-জামাই এসে একবেলা কাটিয়ে যেত। ক্রমে তাঁর মেয়ে শর্বরীর সঙ্গে শ্রীলেখার আলাপ-পরিচয় এবং বন্ধুতা গড়ে ওঠে। এর পর রায়সায়েবের সঙ্গেও শ্রীলেখার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। রায়সায়েব শ্রীলেখাকে মেয়ের চেয়েও বেশি স্নেহ করতেন। কখনও তার কাছে চা খেতে চাইতেন। কখনও বলতেন, মা! এবেলা তোর হাতের রান্না খাব।

গতবছর হঠাৎ মেয়ের বাড়ি গিয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়ে একটা নার্সিংহোমে ভর্তি হন তিনি। শর্বরীর কাছে ফোনে খবর পেয়ে শ্রীলেখা তাকে দেখতে গিয়েছিল। নার্সিংহোম থেকে সুস্থ হয়ে সরাসরি তিনি নিজের ফ্ল্যাটে চলে আসেন। শর্বরী একজন আয়া রেখে গিয়েছিল। কিছুদিন পরে সেই আয়া চলে যায়। তারপর রায়সায়েবের খোঁজখবর নিত শ্রীলেখা। কোনো হোটেল থেকে তার খাবার আসত তিনবেলা। একদিন শ্রীলেখাকে ডেকে রায়সায়েব বলেন, জীবনে ঘেন্না ধরে গেছে। রে মা! আমি সেলফ-মেড ম্যান। পুরোনো গাড়ি বেচা-কেনার ব্যবসা করে প্রচুর কামিয়েছি। কিন্তু এই সত্তর বছর বয়সে বেশ বুঝে গেছি, সংসারে কেউ কারও আপন নয়। টাকার সঙ্গেই যত সম্পর্ক।

শ্রীলেখা অবাক হয়ে যায়। কথায়-কথায় রায়সায়েব তাকে বলে ফেলেন, শর্বরী তার নিজের মেয়ে নয়। তার কোনো সন্তানাদি নেই। শর্বরীকে এক অনাথ আশ্রম থেকে পুষ্যি নিয়েছিলেন। এখন ক্রমশ তার মনে সন্দেহ জেগেছে, শর্বরী আর তার জামাই প্রদোষ তাকে স্লোপয়জন করে মেরে ফেলতে চায়। তারা দুজনে তাকে তার সব সম্পত্তি আর টাকাকড়ি তাদের নামে উইল করে দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছে। তাকে তারা এরকম পীড়াপীড়ি না করলেও তিনি অন্তত কিছু সম্পত্তি দিতেন। বাকিটা দিতেন সেই আশ্রমের নামে। কিন্তু তাদের আচরণে তিনি এমন ক্ষুব্ধ হয়েছেন যে, তাদের একটি কানাকড়িও দেবেন না।

গত মাসে এক সন্ধ্যায় শর্বরী আর প্রদোষ এলে শ্রীলেখা আড়ি পেতে শুনেছিল, রায়সায়েবকে ওরা প্রচণ্ড শাসাচ্ছে। কোথাকার একটা বাগানবাড়ি তাদের নামে লিখে দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছে। পরদিন সকালে শ্রীলেখা দেখেছিল, রায়সায়েব তার কুকুরটাকে দুহাতে বুকের কাছে চেপে ধরে গাড়িতে তুলছেন। সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে সে তার বাবার কাছে জানতে পারে, রায়সায়েবের কুকরটা মারা গেছে।

পরের ঘটনা অদ্ভুত। শর্বরী টেলিফোনে শ্রীলেখাকে হুমকি দিয়ে বলেছিল, তার বাবার সঙ্গে শ্রীলেখার অবৈধ সম্পর্কের কথা নাকি সে জানতে পেরেছে। শ্রীলেখা লজ্জায় দুঃখে অস্থির। সে আর রায়সাহেবের ঘরে যেত না। তিনি ডাকলেও এড়িয়ে যেত। তার বাবা তপেশবাবুই তাঁকে সঙ্গ দিতেন।

গত শুক্রবার রাত আটটা নাগাদ ডোরবেল বাজে। তপেশবাবু পাড়ার একটা সমাজকল্যাণ সমিতির মিটিংয়ে গিয়েছিলেন। আইহোলে চোখ রেখে শ্রীলেখা দেখতে পায়, রায়সায়েব তাদের দরজায় সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সে দরজা খুলে বলে, কিছু দরকার আছে জ্যাঠামশাই?

 রায়সায়েব জোর করে ঘরে ঢুকে নিজেই দরজা এঁটে দেন। তাঁর হাতে ছড়ি এবং ব্রিফকেস ছিল। তিনি সোফায় বসে চাপা স্বরে বলেন, আমি সব জানি রে মা! হারামজাদি মেয়েটার এত সাহস! আমাকে আজ সকালে টেলিফোনে তোর সম্পর্কে অকথ্য যা খুশি বলছিল। ও নিয়ে মাথা ঘামাসনে। তুই আমার মেয়ে। ছিলিস পূর্বজন্মে। এবার যা বলি শোন। এই ব্রিফকেসটা কোথাও লুকিয়ে রেখে দে। ঘুণাক্ষরে কাকেও যেন বলবিনে। এমন কি তোর বাবাকেও না।

শ্রীলেখা বিমূঢ় হয়ে বলে, এতে কী আছে জ্যাঠামশাই?

 রায়সায়েবকে কেমন বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল। তিনি বলেন, যা-ই থাক; এটা তুই লুকিয়ে রাখ। কাল সকালে আমি এটা নিয়ে যাব।

শ্রীলেখা জিজ্ঞেস করে, এতে টাকা আছে নাকি জ্যাঠামশাই?

 রায়সায়েব বলেন, হ্যাঁ। আছে। তারপর উঠে দাঁড়ান। পা বাড়িয়ে বলেন, তোর বিছানার তলায় রাখবি মা! কেমন?

শ্রীলেখা নার্ভাস হয়ে পড়েছিল। সে বলে, কিন্তু আমার যে বড্ড ভয় করছে। জ্যাঠামশাই!

রায়সায়েব বলেন, আমার নিজেরই যে ভয় করছে। দ্যাখ মা! আমার কাছে লাইসেন্সড গান আছে। তবু রিস্ক নিতে সাহস পাচ্ছি না। লোকে আমাকে টাইগার রায় বলত। এখন আমি নখদন্তহীন। এই দ্যাখ না! সবসময় হাত দুটো কাপে। হারামজাদা-হারামজাদি কবে থেকে আমাকে স্লোপয়জন করে আসছিল, এতদিনে। তার লক্ষণ ফুটে বেরুচ্ছে। আগের শরীর থাকলে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা আমার ট্যাকেই গোঁজা থাকত। বলে তিনি ছড়িতে ভর করে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ফের বলেন, তিরিশ-চল্লিশ লাখের জায়গায় মাত্র ছয়। টলু ব্যাটাচ্ছেলে যদি আর এক লাখ নাও দিতে পারে, কিছু যায়-আসে না। পাঁচ দিয়েছে, ওতেই ডিডে। সই করে দিয়েছি। ঠ্যালা সামলাতে হয়, টলু সামলাক। ওই দুই হারামজাদা-হারামজাদি কপাল চাপড়ে মরুক না! এতেই আমি খুশি হব।

রায়সায়েব চলে যান। শ্রীলেখা ব্রিফকেসটা তার ঘরে ম্যাট্রেসের তলায় রেখে দেয়। সারারাত তার ঘুম হয়নি। গতকাল ভোরে উঠে অভ্যাসমতো তপেশবাবু পার্কে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। সেইসময় সে দরজা খুলে লক্ষ্য করেছিলেন, রায়সায়েবের ফ্ল্যাটের দরজা একটু ফাঁক হয়ে আছে। তাদের ফ্ল্যাট এবং ওই ফ্ল্যাটটা মুখোমুখি। মাঝখানের ফ্ল্যাটে এক তামিল দম্পতি থাকেন। তারা কোথায় বেড়াতে গিয়েছেন। রায়সায়েবের ফ্ল্যাটের দরজার কাছে শ্রীলেখা নিছক কৌতূহলের বশেই গিয়েছিল। সে দেখতে পায়, দরজা ভেতর থেকে আটকানো নেই। তাই সে দরজা ঠেলে ডাকে, জ্যাঠামশাই! কিন্তু সাড়া পায় না। তারপরই তার চোখে পড়ে, বসার ঘরের সংলগ্ন বাথরুমের মধ্যে রায়সায়েব উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। পরনের রাতপোশাক মলমূত্রে নোংরা হয়ে আছে।

শ্রীলেখার ডাকাডাকিতে নিচের এবং ওপরের ফ্ল্যাটের লোকজন ছুটে আসেন। রায়সায়েবকে চিত করে শোয়ানো হয়। তিনি তখনও বেঁচে ছিলেন। কিন্তু কথা বলতে পারছিলেন না। শিগগির পাড়ার সেই সমিতি থেকে অ্যাম্বুল্যান্স এনে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। শ্রীলেখা নিচের তলার মনীশ পাত্রকে শর্বরীর ফোন নাম্বার দিয়েছিল। খবর পেয়ে শর্বরী ও প্রদোষ যখন হাসপাতালে আসে, তখন রায়সায়েব মারা গিয়েছেন।

কিন্তু এর পরের আরও সাংঘাতিক। শ্রীলেখা রায়সায়েবের ঘরে তাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সেই সুযোগেই হয়তো ঘটনাটা ঘটে যায়। শ্রীলেখা তাদের ফ্ল্যাটে ফিরে তার বিছানার তলায় সেই ব্রিফকেসটা আর খুঁজে পায়নি। তার বাবা তখনও মর্নিংওয়াক থেকে ফেরেননি। তপেশবাবু মাঠে হাঁটাচলার পর একেবারে বাজার করে নিয়ে আটটা নাগাদ বাড়ি ফেরেন। তখনও আটটা বাজেনি। কাজেই তার বাবাকে কেমন করে সে সন্দেহ করবে? কেনই বা করবে? তবু সে তন্নতন্ন করে তাদের ফ্ল্যাটের ভেতর খুঁজে দেখে। কিন্তু ব্রিফকেসটার পাত্তা নেই।

তপেশবাবু ফিরে এলে অগত্যা তাকে ব্রিফকেসের কথা খুলে বলে শ্রীলেখা। এই ঘটনা পুলিশকে জানানো নিরাপদ নয়। তাই তপেশবাবু অনেক চিন্তাভাবনা করে হালদারমশাইকে টেলিফোন করেন। প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার তপেশবাবুর এক পুলিশ অফিসার আত্মীয়ের সূত্রে তার পরিচিত। সেই আত্মীয় পুলিশ অফিসার রিটায়ার করে এখন চেতলায় আছেন।

শ্রীলেখা কথা শেষ হলে হালদারমশাই বললেন, এনার লগে ছয় বৎসর আগে আলাপ।…

.

০২.

শ্রীলেখার কথা শুনতে শুনতে উত্তেজনা অনুভব করছিলুম। কারণ তার কথার সঙ্গে জয় মা তারা নার্সারির হারাধন মল্লিকের কথা টায়ে-টোয়ে মিলে যাচ্ছে। হালদারমশাই ঝটপট একটিপ নস্যি নিয়ে আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কর্নেল সেই সময় শ্রীলেখাকে বললেন, তুমি বলছি। রাগ কোরো না যেন।

শ্রীলেখা বলল, রাগ করব কেন? হালদারজ্যাঠার কাছে আপনার পরিচয় পেয়েছি।

তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। আশা করি সঠিক উত্তর পাব।

তপেশবাবু বললেন, আপনি আমাকেও প্রশ্ন করতে পারেন। টাকাভর্তি ব্রিফকেস হারানোটা আমার কাছে বড় কথা নয়। এটা আমাদের বাবা-মেয়ে দুজনকারই বিবেকের দায়।

কর্নেল বললেন, আচ্ছা শ্রীলেখা, রায়সায়েবকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর কি তার ফ্ল্যাটের দরজা খোলা ছিল?

 শ্রীলেখা বলল, না। ওঁর শোবার ঘরে ঢুকে আমি বালিশের তলায় চাবির গোছ পেয়েছিলুম। সেই চাবি–

এক মিনিট। তুমি কি জানতে রায়সায়েব তার ফ্ল্যাটের দরজার চাবি ওখানেই রাখতেন?–

জানতুম। কারণ কত সময় লক্ষ্য করেছি, আমার সামনেই উনি বাইরে বেরুবেন বলে বেডরুম থেকে চাবি নিয়ে এলেন। বসার ঘরের ভেতর থেকে জানালার পর্দার ফাঁকে ওঁর বেডরুম দেখা যায়।

তো তুমি ওঁর ফ্ল্যাটে তালা এঁটে দিয়ে চাবির গোছা নিজের কাছে রেখেছিলে?

হ্যাঁ। তারপর বাবা ফিরে এলে বাবাকে ওটা দিয়েছিলুম।

 তপেশবাবু বললেন, চাবি নিয়ে আমি তখনই হাসপাতালে রায়সাহেবকে দেখতে গিয়েছিলুম। ঘণ্টা দেড়েক পরে ওঁর মেয়ে-জামাই এল। তখন ওঁর মেয়েকে চাবি দিলুম। রায়সায়েব মারা গেছেন। দশটা-সওয়া দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরে শ্রীলেখাকে খবরটা দিলুম।

শ্রীলেখা বলল, রায়সায়েবের মৃত্যু খবর পেয়ে সত্যি বলতে কী, আমার দুর্ভাবনাটা কেটে গিয়েছিল। কারণ আর তো উনি ব্রিফকেস চাইতে আসবেন না। যাই হোক, তখনই বাবাকে ব্রিফকেসের ঘটনাটা বললুম। বাবা প্রথমে আমাকে খুব বকাবকি করলেন। কেন আমি টাকাভর্তি ব্রিফকেস নিয়েছিলুম? নিয়েছিলুম যদি, কেন রায়সায়েবকে ওই অবস্থায় দেখার পর ফ্ল্যাটের দরজায় তালা বন্ধ করে আসিনি?

তপেশবাবু বললেন, বড় বোকামি করেছিল শ্রীলেখা।

কর্নেল শ্রীলেখার দিকে তাকিয়ে বললেন, রায়সায়েবের মেয়ে বা জামাই কাল কখন ওঁর ফ্ল্যাটে এসেছিল?

শ্রীলেখা বলল, শর্বরী হাসপাতাল থেকে বাবা আসার কিছুক্ষণ পরেই এসেছিল। আমি তো ওর সঙ্গে আর কথা বলতুম না। বাবা বলতেন। ব্রিফকেসের ঘটনা শোনার পর বাবা আমাকে বকাবকি করে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেলেন।

তপেশবাবু বললেন, শর্বরী তখন তার বাবার ফ্ল্যাটে ঢুকেছে। আমি বাইরে। থেকে তাকে ডাকলুম। শর্বরী দরজার ফাঁকে মুখ বের করে আমাকে হঠাৎ রুক্ষ মেজাজে বলে উঠল, বাবার একটা লাইসেন্সড রিভলভার ছিল। পাচ্ছি না। নিশ্চয় ওটা আপনার মেয়ে হাতিয়েছে। আপনার মেয়েকে বলুন, এক্ষুনি ওটা ফেরত দিয়ে যাক। না দিলে আমি পুলিশকে জানাব।

শ্রীলেখা বলল, কথাটা আমার কানে গিয়েছিল। বেরিয়ে গিয়ে বললাম, তোমার বাবার রিভলভার যদি হারিয়ে গিয়ে থাকে, পুলিশকে জানাতে পারো। শর্বরী আমাকে যাচ্ছেতাই বলতে শুরু করল। অন্য ফ্ল্যাটের অনেকে এসে শর্বরীকেই বকাবকি করলেন। বাবার প্রতি যদি এত মায়ামমতা, তাহলে এখানে একা এভাবে ফেলে রেখেছিলে কেন? শর্বরী হুমকি দিয়ে বলল, এই বাড়ির মালিক এখন আমি। সব্বাইকে উচ্ছেদের নোটিশ দেব।

মেয়েলি কলহ আর কী! তপেশবাবু বললেন। আজ সকালে দেখে এলুম, শর্বরী আর প্রদোষ রায়সায়েবের ফ্ল্যাটে এল। সঙ্গে এক কালো কোটপরা। ভদ্রলোককে দেখলুম। নিশ্চয় কোনো ল-ইয়ার।

কর্নেল শ্রীলেখাকে বললেন, রায়সায়েবের রিভলভার হারানো সম্পর্কে তোমার কী ধারণা?

শ্রীলেখা বলল, আমি রায়জ্যাঠামশাইয়ের রিভলভার দেখিনি। শুক্রবার রাত্রে ওঁর মুখেই যা শুনেছি।

শনিবার সকালে বেডরুমে ওঁর বালিশের তলায় বা বিছানায় কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না?

শ্রীলেখা মাথা নাড়ল। বলল, না। তবে আমি অত খুঁটিয়ে কিছু লক্ষ্য করিনি।

শনিবার ভোরে তুমি যখন রায়সায়েবকে ওই অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলে, তখন কি তোমার মনে হয়নি তার ফ্ল্যাটের দরজা কেন ভোলা আছে?

শ্রীলেখা একটু চমকে উঠল যেন। বলল, আপনি ঠিক বলেছেন। শুধু আমার মনে নয়, বাবা বা বাড়ির কারও মনে এ প্রশ্ন এখনও ওঠেনি। অথচ-সত্যিই তো! এটা আমার মনে ওঠা উচিত ছিল। আসলে এমনও হতে পারে-ধরেই নিয়েছিলুম উনি খুব ভোরে দরজা খুলেছিলেন। মর্নিংওয়াকের অভ্যাস রায়জ্যাঠামশাইয়েরও ছিল। তবে প্রত্যেকদিন নয়। অ্যালসেশিয়ান কুকুরটা যখন ছিল, তখন কুকুরটাকে সঙ্গে নিয়েই বেরুতেন অবশ্য।

তপেশবাবু বললেন, রায়সায়েবের দরজা খোলা ছিল, এই পয়েন্টটা আসলে আমাদের কারও কাছে তত ইমপর্ট্যান্ট বলে মনে হয়নি।

এতক্ষণে প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদার মশাই বললেন, কর্নেলস্যার! রায়সায়েব মরছেন, এটা আমাগো কেস না। কেস হইল গিয়া–

ব্রিফকেস! বলে কর্নেল হেসে উঠলেন।

গোয়েন্দাপ্রবর সায় দিলেন। হঃ! ব্রিফকেস। আমার সন্দেহ, শনিবার রাত্রে ওই বাড়িরই কেউ রায়সায়েবেরে তপেশবাবুর ফ্ল্যাটে ব্রিফকেস হাতে লইয়া ঢুকতে দেখছিল। তারপর ওনারে ব্রিফকেস ছাড়া বাইরাইতে দেখছিল। আমি বাড়ির সব ফ্ল্যাটের লোকজনের লিস্ট করছি।

বলে তিনি তার বুকপকেট থেকে একটা ভাজ করা কাগজ বের করে কর্নেলকে দিলেন। কর্নেল বললেন, বা! এটা একটা কাজের মতো কাজ করেছেন হালদারমশাই!

তপেশবাবু চাপাস্বরে বললেন, নিচের তলার একটা ফ্ল্যাটে থাকেন গণেশ নাগ। একা থাকেন। রায়সায়েবের সঙ্গে খুব ভাব তার। বাড়ির কেয়ারটেকারের দায়িত্ব গণেশবাবুকেই দিয়েছিলেন রায়সায়েব। কিন্তু গণেশবাবু শুক্রবার রাত্রের ট্রেনে নাকি বর্ধমান গিয়েছেন। পাম্পে জল তোলার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন তার পাশের ফ্ল্যাটের হরিহরণবাবুকে। তিনি অবশ্য গণেশবাবুর মতো নিজে পাম্প চালাচ্ছেন না। তার কাজের লোক চালাচ্ছে।

কর্নেল বললেন, গণেশবাবুকে সন্দেহের কোনো কারণ আছে কি?

আছে স্যার! মি. হালদারকে কথাটা বলেছি।

 হালদারমশাই বললেন, গণেশ নাগ সাট্টাবাজ। সাট্টাডন কইতে পারেন। জানি না, তারে রায়সাহেব অত পাত্তা দিতেন ক্যান?

কর্নেল লিস্টে চোখ বুলিয়ে বললেন, তিনতলায় ননম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন ঘনশ্যাম নন্দী। তাঁর নামের পাশেল লাল কালিতে টিক মেরেছেন কেন হালদারমশাই?

গোয়েন্দামশাই বলার আগেই শ্রীলেখা বলে উঠল, আমার সন্দেহ কিন্তু ঘনশ্যামবাবুর ওপরই। বাবা অবশ্য গণেশবাবুকে সন্দেহ করেছেন। ঘনশ্যামবাবুর মেয়ে রেখার কাছে কিছুদিন আগে শুনেছিলুম, ওর বাবার যে গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ আছে, সেই জায়গাটা এক মারোয়াড়ি ভদ্রলোক কিনে নিয়েছেন ল্যান্ডলর্ডের কাছে। ল্যান্ডলর্ড ভাড়া নেওয়া বন্ধ করেছেন। তাই ঘনশ্যামবাবু রেন্টকন্ট্রোলারের কাছে ভাড়া দিচ্ছেন। কিন্তু আজকাল যা অবস্থা, মারোয়াড়ি ভদ্রলোক আর ল্যান্ডলর্ড পাড়ার মস্তান লাগিয়ে যে-কোনো সময় উচ্ছেদ করতে পারেন। তাই ঘনশ্যামবাবু নতুন জায়গা খুঁজছেন। রেখা বলছিল, দরগা রোডের ওদিকে একটা গ্যারেজ বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু দশ লাখ টাকা দর হেঁকেছে। মারোয়াড়ি ভদ্রলোক আর ল্যান্ডলর্ডের সঙ্গে রায়সায়েব নাকি কথা বলেছেন। রায়সায়েবের কথায় মারোয়াড়ি ভদ্রলোক লাখ পাঁচেক দিয়ে রফা করতে চান। কাজেই–

শ্রীলেখার কথার ওপর আমি বলে ফেললুম, ঘনশ্যামবাবুর গ্যারেজের নাম কি শ্রীহরি অটোমোবাইলস?

কর্নেল আমার দিকে কটমটিয়ে তাকালেন। শ্রীলেখা বলল, আপনি জানেন?

অগত্যা বলতে হলো, হ্যাঁ। মানে, একবার ওখানে আমার গাড়ির কাজ। করিয়েছিলুম।

শ্রীলেখা কর্নেলের দিকে তাকিয়ে বলল, বেশ কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করেছি, ঘনশ্যামবাবু দুবেলা রায়সায়েবের ঘরে বসে কথা বলছেন। দুজনে একসঙ্গে বেরুচ্ছেন। কাজেই আমার ধারণা, রায়সায়েব সম্ভবত ঘনশ্যামবাবুকে বলে থাকবেন, বাগানবাড়ি বিক্রি করে টাকা পেলে তাকে ধার দেবেন। কিংবা পার্টনার হয়ে দরগা রোডের গ্যারেজটা কিনে নেবেন।

কর্নেল বললেন, তুমি বুদ্ধিমতী শ্রীলেখা!

 প্রাইভেট ডিটেকটিভের গোঁফ উত্তেজনায় তিরতির করে কাঁপছিল। বললেন, নোটবইয়ে ঘনশ্যাম নন্দীর গ্যারেজের ঠিকানা রাখছি। শিগগির সেখানে যাইয়া ওত পাতব।

কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, ঠিক আছে। হালদারমশাই যখন ব্যাপারটা হাতে নিয়েছেন, একটা কিনারা করে ফেলবেন। আপাতত শ্রীলেখার কাছে শর্বরী ও প্রদোষের ঠিকানাটা জানা দরকার। হালদারমশাই! ঠিকানাটা লিখে নিন।

শ্রীলেখা বলল, এগজ্যাক্ট ঠিকানা আমি জানি না। শুধু এটুকু জানি রায়সায়েবের দমদমের বাড়িতে ওরা থাকে। নাগের বাজার এরিয়া, না কোথায়, মনে পড়ছে না।

তপেশবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ওরা এখন তো আমাদের ওখানেই আছে। আমার সঙ্গে প্রদোষের কোনো ঝগড়াঝাটি হয়নি। আমি সুযোগমতো ওদের দমদমের ঠিকানা জোগাড় করে মি. হালদারকে দেব।

শ্রীলেখাও উঠে দাঁড়িয়েছিল। বলল, দেখুন কর্নেলসায়েব! আপনি যেন কখনও ভাববেন না টাকার লোভে আমি বা আমার বাবা এই প্রাইভেট ডিটেকটিভদ্রলোকের সাহায্যে নিয়েছি। রায়জ্যাঠামশাইয়ের টাকা যদি উদ্ধার করা যায়, তা হলে সেই টাকা আপনার নির্দেশমতো কোনো আশ্রম বা ওয়েলফেয়ার সোসাইটিতে দান করব। আর টাকা যদি উদ্ধার না করাও যায়, কে আমার ঘর থেকে তা চুরি করল, সেটা জানতে পারলেও আমি তৃপ্তি পাব।

কর্নেল হাসলেন। তাকে শাস্তি দেবে না?

সম্ভব হলে দেব। না হলে আপনারা তো আছেন। পারবেন না তাকে শাস্তি দিতে?

তপেশ মজুমদার মেয়ের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ও সব কথা পরে। আগে চোর ধরা পড়ুক। তবে না শাস্তির প্রশ্ন? মিঃ হালদার! আপনি কি এখন কর্নের্লসায়েবের কাছে থাকবেন?

থাকব। আপনারা যান গিয়া। দরকারমতো টেলিফোন করবেন। বলে হালদারমশাই নস্যির কৌটো বের করলেন।…

বাবা-মেয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর বললুম, আশ্চর্য ব্যাপার! শ্রীলেখার চোখে জল বেরিয়ে গেল দেখলুম।

হালদারমশাই বললেন, মাইয়াডা বড় তেজি। বোঝলেন না? ভ্যানিটিতে লাগছে।

কর্নেল আবার একটা চুরুট ধরালেন। একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, হালদারমশাই নিশ্চয় আপনার ন্যায্য ফি-র কথা ক্লায়েন্টকে বলেছেন এবং অ্যাডভান্সও নিয়েছেন?

গোয়েন্দাপ্রবর জিভ কেটে মাথা নেড়ে বললেন, তপেশবাবুর মাসতুতো ভাই বিভূতি সি আই ডি-তে আমার কলিগ ছিল। বুজম ফ্রেন্ড কইতে পারেন। ফিয়ের কথা কই নাই। শ্রীলেখা কইছিল, কত লাগবে। আমি কইয়া দিচ্ছি, ফিয়ের কথা পরে। আগে পাওখান বাড়াইয়া দেখি জল কতটা ডিপ।

জল সত্যিই ডিপ হালদারমশাই! আপনি আপনার প্ল্যানমতো ঘনশ্যাম নন্দীর শ্রীহরি অটোমোবাইলসে গিয়ে ওত পাতুন।

বললুম, বরং ছদ্মবেশে গিয়ে গ্যারাজের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করুন। গোবরা এরিয়ার ফকির সেজে যাওয়াই ভালো।

হালদারমশাই খি-খি করে হেসে উঠলেন। তা মন্দ কন নাই!

এইসময় টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিয়ে বললেন, ..বলুন মল্লিকমশাই!… বলে কী! ভূতুড়ে বাড়ি? …কী সর্বনাশ!.না, না। ঠিক করেছেন। …বলুন। লিখে নিচ্ছি। বলে কর্নেল টেবিলের ওপর প্যাডে কিছু লিখে নিলেন। ঠিক আছে। ছাড়ছি। পরে আপনার নার্সারিতে যাব।…হ্যাঁ। আগে খবর দিয়ে যাব। থ্যাংকস। কর্নেল রিসিভার রেখে কাগজটা প্যাড থেকে ছিঁড়ে ড্রয়ারে ঢোকালেন।

জিজ্ঞেস করলুম, মল্লিকমশাই কী বললেন? বাগানবাড়িটা ভূতুড়ে?

হালদারমশাই ব্যগ্রভাবে বললেন, বাগানবাড়ি? রায়সাহেবের বাগানবাড়ি নাকি?

কর্নেল একটু হেসে বললেন, তা জানি না। জয় মা তারা নার্সারির হারাধন মল্লিককে আপনি চেনেন না। ওঁর নার্সারি থেকে মাঝে মাঝে ক্যাকটাস উপহার। পাই। ভদ্রলোক নার্সারির এরিয়া বাড়াতে একটা বাগানবাড়ি কিনতে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আজ বিশ্বস্তসূত্রে খবর পেয়েছেন, ওখানে ভূতের অত্যাচারে কেউ বাস করতে পারে না।

প্রাইভেট ডিটেকটিভ বাঁকা মুখে বললেন, ভূতটুত বোগাস! চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি। কত বনবাদাড় শ্মশান কবরস্তানে অন্ধকার রাত্রে ঘুরছি। কর্নেলস্যার! কী নার্সারি কইলেন য্যান–তার প্রোপাইটারেরে আমার নাম ঠিকানা দিলেন না ক্যান? আমি ভূত ভাগাইয়া ছাড়তাম।

পরে মল্লিকমশাইয়ের কেসটা নেবেন। আগে এই কেসটা নিয়ে লড়ে যান।

 হালদারমশাই হঠাৎ চাপা স্বরে বললেন, আমার একটা খটকা বাধছে।

বলুন!

শ্রীলেখা আমারে যা-যা কইছিল, আপনারেও তা-ই কইল। কিন্তু এমন যদি হয়, ধরেন–সে কাইল ভোরে দরজা খোলা দেইখ্যা রায়সায়েবের ঘরে ঢুকছিল। তারপর ওনার বেডরুমে গিয়া চাবি লইছে। তারপর আলমারি খুইলা ব্রিফকেস চুরি করছে। নিজের ঘরে সেটা রাইখা তারপর বাড়ির লোকজনের ডাকছে। এদিকে কেউ তার কীর্তি লক্ষ্য কইরা সুযোগমতন চোরের ওপর বাটপারি করছে।

আপনার এই থিয়োরিও মজবুত।

আমি বললুম, কিন্তু হালদারমশাই, তা হলে সে চেপে না গিয়ে তার বাবাকে বলে আপনার সাহায্য নিল কেন?

গোয়েন্দাপ্রবর গুলিগুলি চোখে তাকিয়ে ছিলেন। ফিক করে হেসে বললেন, জয়ন্তবাবু শ্রীলেখার প্রেমে পড়ছেন য্যান! হঃ! চেহারাখান সেইরকমই।

বললুম, ভ্যাট! কী যে বলেন!

কর্নেল সহাস্যে বললেন, হালদারমশাই জয়ন্তের আঁতে ঘা দিয়েছেন। এটা যৌবনের ধর্ম! জয়ন্তের কোনো দোষ নেই। তবে বাস্তব জগৎ বড় কদর্য। সৌন্দর্যের আড়ালে কদর্যতা ওত পেতে থাকে।

ক্ষুব্ধ হয়ে বললুম, কী আশ্চর্য! আমি যে পয়েন্টটা তুলেছি, তার পিছনে যুক্তি নেই বুঝি?

আছে। কিন্তু চিন্তা করো ডার্লিং! প্রায় পড়ে পাওয়া পাঁচ লাখ টাকা ঘর থেকে বাটপাড়ি হয়ে গেল বিশেষ করে শ্রীলেখার মতো স্মার্ট আধুনি মেয়ে চুপচাপ মেনে নেবে কোন্ যুক্তিতে? সে এক্ষেত্রে প্রতিশোধে মত্ত হয়ে উঠবেই।

হালদারমশাই ঘড়ি দেখে বললেন, কী কাণ্ড! প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে। আমি যাই গিয়া কর্নেলস্যার! আপনার লগে যোগাযোগ রাখব। জয়ন্তবাবু! আমার কথায় রাগ করছেন না তো? মশয়! লাইফে থ্রিল যেমন ভালোবাসি, তেমনই একটুকখান জোকও দরকার মনে করি। জোক করছিলাম।

বলে প্রাইভেট ডিটেকটিভ সবেগে বেরিয়ে গেলেন। আমি ওঁর কথা বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেলেছিলুম। কর্নেল বললেন, জয়ন্ত! সত্যি বলছি, তুমি সাবধান। শ্রীলেখা বা তোমার মনের কথা বলতে পারছি না। তবে তপেশবাবু মাঝে মাঝে তোমার দিকে কেমন চোখে তাকাচ্ছিলেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ভদ্রলোক তার জামাই হিসেবে তুমি উপযুক্ত কি না, তা-ই সম্ভবত ভাবছিলেন।

বেগতিক দেখে বললুম, উঠি। প্রায় দশ কিলোমিটার ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরতে হবে।

কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন, শাট আপ! আমার সঙ্গে তুমি লাঞ্চ খাবে। তারপর দুজনে মধ্যমগ্রাম এরিয়ার রায়সায়েবের সেই ভূতুড়ে বাগানবাড়িতে যাব। মল্লিকমশাই শ্রীহরি অটোমোবাইলসে গিয়েছিলেন। মালিকের নাম ঘনশ্যাম নন্দীই বটে। তার কাছে শুনেছেন, বাগানবাড়িটা ভূতুড়ে বলে বিক্রি হচ্ছিল না। সম্প্রতি মালিক কাকে বেচে দিয়েছেন। তারপর নাকি বাগানবাড়ির ভূতটা খাপ্পা হয়ে তাকে মেরে ফেলেছে। এসব শুনে মল্লিকমশাই ঘনশ্যামবাবুকে বলেছেন, মালিকের সঙ্গে তাঁর পাকা কথা হয়েছিল। ভাগ্যিস অ্যাডভান্স করে ফেলেননি। যাক গে! তুমি ডিভানে গুঁড়িয়ে নাও কিছুক্ষণ। আমি একটা জরুরি টেলিফোন করি।…

দেড়টার মধ্যে লাঞ্চ সেরে নিয়ে দুটো নাগাদ আমরা বেরিয়েছিলুম। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস হয়ে ভি আই পি রোড।.তারপর যশোর রোড ধরে মধ্যমগ্রামের চৌরাস্তায় পৌঁছুতে প্রায় সওয়া তিনটে বেজেছিল। বাঁদিকে আমাকে গাড়ি দাঁড় করাতে বলেছিলেন কর্নেল।

একটু পরেই হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলেন একজন তাগড়াই গড়নের মধ্যবয়সি ভদ্রলোক। পরনে জ্যাকেট এবং জিনস। মুখে পাকানো কঁচাপাকা গোঁফ। তিনি নমস্কার করে কর্নেলকে বললেন, আমাকে চিনতে পারছেন তো স্যার? আমি প্রশান্ত ব্যানার্জি। বড়বাবু আমাকে বললেন, আপনি তিনটের মধ্যে আসছেন।

কর্নেল বললেন, যাক গে! তোমাকে পেয়ে ভালো হলো প্রশান্ত! ব্যাকসিটে বসো। আমার এই তরুণ বন্ধুর পরিচয় তোমাকে আশা করি দিতে হবে না।

প্রশান্ত ব্যানার্জি যে পুলিশ অফিসার, তা তখনই বুঝে গেছি। তাঁর নির্দেশে কিছুটা এগিয়ে একটা সংকীর্ণ রাস্তায় মোড় নিতে হলো। তারপর ক্রমশ বসতি এলাকা ছাড়িয়ে আবার মোড় নিয়ে একটা মোরামবিছানো রাস্তায় পৌঁছুলুম। দুদিকে পাকা ধানের জমি। মোরাম রাস্তাটা ধনুকের মতো বাঁক নিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। একটা বাঁশঝাড় বাঁদিকে রেখে ডাইনে একটু এগিয়ে যাওয়ার পর প্রশান্তবাবু বললেন, এসে গেছি। গেটের সামনে দাঁড় করান জয়ন্তবাবু।

দেখলুম, একটা ঝিলের ধারে পাঁচিলঘেরা একটা বাগান। বাগানের ফাঁকে পুকুর দেখা যাচ্ছিল। পুকুরের পাড়ে একটা পুরোনো একতলা বাড়ি। গেটের একপাশে ফলকে লেখা আছে নন্দনকানন।

প্রশান্তবাবুর ডাক শুনে একজন কালো কুচকুচে এবং বেঁটে লোক এসে গেটের ওধারে দাঁড়াল। তার পরনে খয়েরি রঙের ফুলপ্যান্ট, গায়ে একটা নীল ফুলহাতা সোয়েটার। মাথার চুল চুড়োবাঁধা। মুখে গোঁফদাড়ি। চোখ দুটো লাল। তার এক হাতে লাঠি, অন্য হাতে টর্চ। এই তো আস্ত ভূত!

দেখলুম প্রশান্ত ব্যানার্জিকে সে চেনে। করজোড়ে প্রণাম করে সে বলল, খবর খারাপ ছোটবাবু! রায়সায়েব মারা গিয়েছেন। সকালে দমদম থেকে ওনার জামাই লোক দিয়ে খবর পাঠিয়েছিলেন। এদিকে আরেক ঝামেলা! রায়সায়েবের এক বন্ধু দুপুরবেলা মোটরসাইকেলে চেপে এসে হাজির। তিনি নাকি এই বাগানবাড়ি কিনেছেন।

প্রশান্তবাবু বললেন, গেটের তালা খোলো রঘু! তারপর তোমার কথা শুনব।

রঘু তালা খুলে গেট দুটো টেনে সরাল। প্রশান্তবাবুর ইঙ্গিতে গাড়ি ভেতরে নিয়ে গেলুম। তিনি বললেন, গাড়ি একেবারে বাড়ির সামনে নিয়ে চলুন। আমি রঘুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে যাচ্ছি।

বাগানের পর বিশৃঙ্খল ফুলের ঝোপঝাড় পেরিয়ে পুকুরের পশ্চিমপাড়ে বাড়ির লনে পৌঁছুলুম। বাড়িটা পূর্বমুখী। চারদিকে উঁচু খোলা বারান্দা। সামনে কয়েক পা এগোলে পুকুরের শানবাঁধানো ঘাট। স্বচ্ছ জলে এখনই ছায়া থমথম করছে। পাখিদের তুমুল চ্যাঁচামেচি চলেছে। প্রকৃতিপ্রেমিকদের পক্ষে হয়তো জায়গাটা নন্দনকানন। কিন্তু আমার কেন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল।

কর্নেল পুকুরের ঘাটের মাথায় দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে তিনদিক দেখে নিলেন। তারপর একটু হেসে বললেন, রঘু নিশ্চয় ভূত বশকরা মন্ত্র জানে। কেমন। তান্ত্রিকের মতো চেহারা। তাই না?

বললুম, লোকটাকে রাতবিরেতে হঠাৎ দেখলে ভূত ভেবে অনেকে ভিরমি খাবে!

কথা বলতে বলতে ততক্ষণে প্রশান্তবাবু এসে গিয়েছেন। রঘু এক লাফে বারান্দায় উঠে গেল। তারপর একটা ঘরের দরজা খুলে একটা-একটা করে তিনটে। চেয়ার এনে দিল। আমরা বসলুম।

রঘু বলল, ছোটবাবু! সায়েবরা এসেছেন। আমি চায়ের জোগাড় করি।

 প্রশান্তবাবু বললেন, কর্নেলসায়েব! আপনারা চা খাবেন নিশ্চয়?

 কর্নেল বললেন, থাক। বেশিক্ষণ বসব না। রঘুর সঙ্গে দুটো কথাবার্তা বলে চলে যাব।

রঘু আমাদের সামনে ঘাসের ওপর বসল। তারপর বলল, মাঠাকরুন বেঁচে থাকতে এই বাগানবাড়ির কী রূপ ছিল আর কী রূপ এখন হয়েছে। আমি অত খাটতে পারিনে। বয়স হয়েছে। খেটেই বা কী করব? রায়সায়েব আগে প্রায়ই বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসতেন বছর দুই হলো, আসা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। মাঝে মাঝে দিদি-জামাইবাবু আসে। তবে রাত-বিরেতে তারা থাকতে চায় না। আসলে খুলে বলি সার, ভূতুড়ে বলেই রায়সায়েব এ বাড়ি বিক্রি করতে পারেননি।

কর্নেল বললেন, রায়সায়েব তার কোন বন্ধুকে এই বাগানবাড়ি বেচেছেন, তাকে তুমি চেনো?

হ্যাঁ সার! চিনব না কেন? রাজেনবাবু তো মধ্যমগ্রামেরই লোক। পরে কলকাতা চলে গিয়েছিলেন। রাজেনবাবুই রায়-সায়েবকে মাঝে মাঝে এখানে টেনে আনতেন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিয়ে রঘু চাপা স্বরে ফের বলল, ওই দেখুন মন্দির ভেঙে জঙ্গল গজিয়েছে। দেবতার অভিশাপ স্যার! সতীলক্ষ্মী গিন্নিমা মনের দুঃখে সুইসাইড করেছিলেন। মরা মানুষ। তার ওপর মনিব। রায়সায়েবের নিন্দে করব না। এই বাড়িতে বাইজির আসর বসাতেন। বেশি কী বলব?

আচ্ছা রঘু! এই বাড়িতে নাকি দিনদুপুরেও ভূতের উপদ্রব হয়?

রঘু মাথা নেড়ে বলল, আজ্ঞে স্যার! কথাটা মিথ্যে নয়। মহাগুরু ধরেছিলুম। তাঁর দয়ায় আমার কোনো ক্ষতি হয় না। রাতবিরেতে পুকুরের জলে কতরকম শব্দ শুনি। বাগানে কে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। কখনও বাড়ির ছাদে ঢিল পড়ে। দিনদুপুরেও রেহাই নেই সার! তবে ওই যে বললুম, আমার গুরুর কৃপা। জোরে মন্ত্র পড়ি। অমনি সব থেমে যায়। রায়সায়েবের যে বন্ধু এ বাড়ি কিনেছেন, তিনি সব জেনেশুনেই কিনেছেন।

প্রশান্তবাবু হাসি চেপে কী বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ আমাদের পিছনে কোনো ঘরের ভেতর থেকে একটা চাপা তীক্ষ্ণ গোঙানির শব্দ শোনা গেল। রঘু লাফিয়ে উঠে অঙ্গভঙ্গি করে মন্ত্র পড়তে পড়তে বারান্দার দিকে গেল। গোঙানির থেমে গেল একটু পরে। কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীরমুখে বললেন, প্রশান্ত! এখানে আর নয়। চলো! ফেরা যাক।

প্রশান্তবাবু খুব অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু কর্নেল তখন গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন।…

.

০৩.

গাড়ি লক করা ছিল না। কর্নেল সামনের সিটে বসে পড়লেন। প্রশান্তবাবু আমার সঙ্গে এসে ব্যাকসিটে বসলেন। আস্তে বললেন, ব্যাপার কী কর্নেলসায়েব?

কর্নেল তেমনই গম্ভীরমুখে বললেন, আমরা আরও কিছুক্ষণ বসলে আরও বিদঘুঁটে কিছু ঘটতে পারে। কাজেই কেটে পড়াই উচিত।

প্রশান্তবাবু হাসতে হাসতে বললেন, কী আশ্চর্য! ওটা কোনো রোগা কুকুরের ডাক ছাড়া কিছু নয়। রঘুর একটা কুকুর ছিল। হয়তো সেটাই গোঙাচ্ছিল। আপনি রঘুকে তো চেনেন না। আমি ভালোই চিনি! ব্যাপারটা আপনাকে বলতে আপত্তি নেই।

কর্নেল বললেন, চলো! যেতে-যেতে শুনব।

গাড়ি স্টার্ট দিয়েছি, এমন সময় রঘু এসে গেল। গাড়ির পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, আপনারা এইটুকুতেই ভয় পেয়ে চলে যাচ্ছেন সার? এই ভূতুড়ে বাগানবাড়িতে একা থাকি। কথা বলার মানুষ পাইনে। আরও কিছুক্ষণ থাকলে টের পেতেন আমি কী অবস্থায় এখানে থাকি।

প্রশান্তবাবু হাসি চেপে বললেন, সায়েব সেজন্যেই কেটে পড়ছেন রঘু!

রঘু হেসে অস্থির। বলল, আহা! আমি থাকতে ভূতপেরেতের বাবার সাধ্যি নেই–

হঠাৎ সে চুপ করে গেল এবং পিছনের দিকে তাকাল। আমি আস্তে গাড়ি ড্রাইভ করছিলুম। তার হঠাৎ চুপ করে যাওয়ার কারণ তখনই বুঝতে পারলুম। বাড়ির দিকে থেকে আবার সেই তীক্ষ্ণ গোঙানি শোনা যাচ্ছিল।

প্রশান্তাবু বললেন, জয়ন্তবাবু! প্লিজ একটু থামুন! ভূতের নিকুচি করেছে।

গাড়ি দাঁড় করালুম বাগানের ভেতর। শীতের সূর্য ততক্ষণে গাছপালার আড়ালে নেমে গিয়েছে। বাগানের ভেতর ছায়া গাঢ় হয়েছে। প্রশান্তবাবু গাড়ি থেকে নেমে পুলিশের মূর্তি ধরলেন। রঘুর সোয়েটারের কলার ধরে ধমক দিয়ে বললেন, এই ব্যাটা রোঘো! চল! তোর কুকুরটার অবস্থা দেখি। কুকুরটার নিশ্চয় কিছু হয়েছে। তাই গোঙাচ্ছে।

রঘু কাঁদো-কাঁদো মুখে বলল, না স্যার! আমার সেই কুকুরটা গত সপ্তায় মারা গিয়েছে। আপনি সার্চ করবেন তো চলুন!

প্রশান্তবাবু প্যান্টের পকেট থেকে তার সার্ভিস রিভলভার বের করে রঘুর টর্চটা কেড়ে নিলেন। তারপর বললেন, কর্নেলসায়েব! এক মিনিট! আমি আসছি রোঘো! চল! সব ঘরের তালা খুলে আমাকে দেখাবি! আগে তোর ঘরে ঢুকব।

উনি রঘুকে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন। কর্নেল বললেন, পুলিশের খেয়াল! চলো জয়ন্ত! আমরা গেটের কাছে খোলা জায়গায় গিয়ে অপেক্ষা করি। রঘু গেটে তালা আটকে রেখেছে।

গেটের কাছে পৌঁছে আমি গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালুম। কর্নেল গাড়িতেই বসে রইলেন। এখান থেকে গাছপালা-ঝোপঝাড়ের ফাঁকে একতলা বাড়িটা দেখা যাচ্ছিল। দেখলুম, প্রশান্তবাবু রঘুর সঙ্গে একটা ঘরে ঢুকলেন। তারপর সেই ঘরে আলো জ্বলে উঠল। বললুম, বাগানবাড়িতে বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে দেখছি।

কর্নেল চুরুট ধরাচ্ছিলেন। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, নাঃ! তুমি কী করে যে সাংবাদিক হলে আজও বুঝতে পারলুম না। তোমাকে বরাবর বলে আসছি, খাঁটি সাংবাদিক হতে হলে প্রথমে দরকার তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের স্বভাব।

কথাটা বেজায় বাসি কর্নেল! আসলে আমি বাগানবাড়িটার পরিবেশ লক্ষ্য করছিলুম।

তোমার চোখে পড়া উচিত ছিল বারান্দার মাথায় কভার্ড ল্যাম্প আছে আর ওই দ্যাখো, বাড়ির পশ্চিম দিক থেকে ইলেকট্রিক লাইন এসেছে। বাইরে কাঠের পোলটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

প্রশান্তবাবু ফিরে এলেন মিনিট দশেক পরে। রঘু তার পিছনে কথা বলতে বলতে আসছিল। গেট খুলে দিয়ে হাসিমুখে বলল, ছোটবাবু সব ঘর সার্চ করলেন। বাড়ির পেছনেও খুঁজলেন। কুকুর থাকলে তো?

প্রশান্তবাবু তাকে ধমক দিয়ে বললেন, রোঘো! তোকে আবার সাবধান করে যাচ্ছি। গাঁজার আসর বসাবিনে। গাঁজার আসরে নেলোর কোনো শাগরেদ ঢুকে তোর গলা কেটে পুকুরে ফেলে দেবে। তারপর কী করবে জানিস? যা-সব দামি আসবাব আর চিনেমাটির জিনিসপত্র দেখলুম, লুঠ করে নেবে।

রঘু বলল, সার! আপনার সাহসে সাহস।..

পথে যেতে যেতে প্রশান্তবাবু বললেন, রঘু আমাদের ইনফরমার। এই বাগানবাড়িতে স্মাগলাররা মাঝে মাঝে এসে উৎপাত করে। চোরাচালানি। জিনিসপত্র পাঁচিল গলিয়ে ঝোপের মধ্যে ফেলে দেয়। কখনও ওকে হুমকি দিয়ে কোনো ফেরারি স্মাগলার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। কয়েকবার আমরা হানাও দিয়েছি। তবে এটা ঠিক, রঘু গাঁজাখোর হলেও খুব ধূর্ত। তেমনই সাহসীও বটে। ওর চেহারা দেখে বোঝা যাবে না কিছু। প্রশান্তবাবু হঠাৎ ঝুঁকে চাপা স্বরে বললেন, ব্যাটার কাছে আনলাইসেন্ড পিস্তল আছে। পুলিশ নিজের স্বার্থে ওটা নিয়ে ঝামেলা করতে চায় না।

কর্নেল চুপ করে থাকলেন। আমি জিজ্ঞেস করলুম, আপনি পিস্তলটা কি দেখেছেন?

না। তবে ওটা আছে, তা জানি..

মধ্যমগ্রাম চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছে কর্নেল বললেন, প্রশান্ত! এই শীতের সন্ধ্যায় কফি খাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমার তাড়া আছে। তোমার সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ। বড়বাবুকেও আমার ধন্যবাদ জানাবে।

প্রশান্ত ব্যানার্জি নেমে গেলেন। তারপর কর্নেলের কাছে এসে চাপা স্বরে বললেন, কেন রায়সায়েবের বাগানবাড়ি গিয়েছিলেন, জানতে চাইনে। কিন্তু অমন করে হঠাৎ উঠে এলেন কেন, জানতে ইচ্ছে হচ্ছে।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, তখন তো বলেছি ডার্লিং। ভূতে বারবার বিরক্ত করলে আমার অসহ্য লাগে।

ঠিক আছে কর্নেলসায়েব। সময়মতো আসল কারণটা ঠিকই জানতে পারব। বলে হাসতে হাসতে নমস্কার করে প্রশান্তবাবু চলে গেলেন।

কর্নেল পকেট থেকে একটা ছোট্ট নোটবই বের করে রাস্তার আলোয় কিছু দেখে নিয়ে বললেন, চলো জয়ন্ত! তাড়াহুড়োর দরকার নেই। যে-পথে এসেছি, সেই পথেই ফেরা যাক।..

ফেরার পথে নন্দনকাননে শোনা সেই অদ্ভুত গোঙানি সম্পর্কে কর্নেলকে প্রশ্ন করেও কোনো সদুত্তর পেলুম না। উনি শুধু একটা কথাই বললেন, যে-কথাটা বহুবার ওঁর মুখে নানা প্রসঙ্গে শুনেছি। জয়ন্ত! প্রকৃতিতে রহস্যের শেষ নেই।

এমন কথার কোনো জবাব নেই। কাজেই বরাবরকার মতো চুপ করে গেলুম।

উল্টোডিঙির মোড়ে পৌঁছে কর্নেল বললেন, ব্যস! এখানে আমাকে নামিয়ে দিয়ে তুমি সল্টলেক তোমার ফ্ল্যাটে চলে যাও। আমি ট্যাক্সি করে নিই।

বললুম, কেন? আমার গাড়িতে যথেষ্ট তেল আছে।

কর্নেল হাসলেন। তেল আছে, তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কেসটা তো আমার নয়। হালদার মশাইয়ের।

ততক্ষণে বাঁদিকে ঘুরে ই এম বাইপাসে ঢুকে পড়েছি। বললুম, আপনার কেস না হলে রায়মশাইয়ের বাগানবাড়িতে হানা দিতে গিয়েছিলেন কেন?

বাড়িটা সত্যি ভূতুড়ে কি না জানার ইচ্ছে ছিল। কারণ বিজ্ঞাপনে ওই কথাটা–সাহস থাকিলে–এর অর্থ আমার কাছে এরকম কিছুই মনে হয়েছিল! তুমি আর মল্লিকমশাই এর অর্থ করেছিলে চড়া দাম। মনে পড়ছে তো?

হ্যাঁ। আসলে আজকাল লোকে ভূতপ্রেতের তোয়াক্কা না করে যেখানে খুশি জমিজায়গা কিনে নিচ্ছে। তাই সাহস থাকার ওই অর্থই করেছিলুম।

এখন শ্রীহরি অটোমোবাইলসের ঘনশ্যাম নন্দী মল্লিকমশাইকে যখন ভূতের উৎপাতে বাগানবাড়িটা বিক্রি হচ্ছিল না বলেছেন, তখন আমার কৌতূহল জেগেছিল। তবে দ্যাখো, ওখানে গিয়ে একটা নতুন কথা জানা গেল।

বাড়িটাতে স্মাগলারদের উৎপাতের কথা। তাই না?

তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, জয়ন্ত! হালদারমশাইয়ের এটা কাজে লাগবে। রাজেন মুখুজ্জে রায়সায়েবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ওখানে মাঝে মাঝে যাতায়াত করতেন।

রাজেনবাবুকে দুঃসাহসী বলতে হবে। জেনেশুনেও অমন জায়গা কিনেছেন। বলেই আমার টনক নড়ল। কিন্তু কর্নেল, সেল-ডিড তো আনরেজিস্টার্ড থেকে গেল! রায়সায়েব মারা গেছেন। এবার ওই ডিডের জোরে কি রাজেনবাবু নন্দনকাননের মালিকানা পাবেন?

আইনজ্ঞরা অবশ্য অনেক ফ্যাকড়া বের করতে পারেন। তবে আমার মনে হয়, রায়সায়েবের সই যদি জেনুইন হয় এবং সাক্ষীদেরও সই থাকে–সাক্ষীরা নিশ্চয় জীবিত, তাছাড়া রেজেস্ট্রি অফিসের স্বীকৃত কোনো ডিডরাইটার যদি ডিডটা তৈরি করে থাকেন, তাহলে সম্পত্তি পেতে অসুবিধে হবে না।

কর্নেল কথাটা বলেই বাঁদিকে এবং ডানদিকে তাকিয়ে নিলেন। তারপর কিছুটা এগিয়ে যাবার পর বললেন, সামনে কোথাও আইল্যান্ড পেরিয়ে ডানদিকে আসতে হবে। পেছনের মোড়ে রাইট টার্ন করা নিষেধ দেখলুম।

জিজ্ঞেস করলুম, ওদিকে কোথায় যাবেন?

বেলেঘাটা এরিয়ায় ঢুকতে হবে। ততবেশি দূরে নয়।

ডানদিকে ঘুরে আবার যেদিক থেকে আসছিলুম, সেদিকেই চললুম। তারপর কর্নেলের নির্দেশে বাঁদিকে একটা রাস্তায় ঢুকলুম। কিছুদূর চলার পর কর্নেল জ্যাকেটের পকেট থেকে সেই খুদে নোটবইটা বের করে রাস্তার আলোয় দেখে নিলেন। বললেন, হ্যাঁ। ডানদিকে ঢুকতে হবে।

দুটো গাড়ি যাতায়াতের মতো সংকীর্ণ রাস্তা। তবু নামে রোড। বি সি শেঠ রোড। একটা দোতলা এবং গেটওয়ালা বাড়ির কাছে গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন কর্নেল। তারপর উনি নেমে গেলেন। আমি একটু এগিয়ে গাড়ি ব্যাক করে উল্টোদিকে একটা পাঁচিলের কাছে রাখলুম। তারপর গাড়ি লক করে কর্নেলের কাছে গেলুম। কর্নেল গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বুঝলুম, ইতিমধ্যে ডোরবেলের বোতাম টিপেছেন। একটা লোক এসে কর্নেলকে দেখে নিশ্চয় বিদেশি সায়েব ভেবে সেলাম ঠুকল।

কর্নেল তাকে অবাক করে বাংলায় বললেন, রাজেনবাবু আছেন?

 আপনারা কোথা থেকে আসছেন সার?

আহা! উনি আছেন কি না?

দোতলা থেকে ভরাট গলায় কেউ বলল, কে রে বিশু?

কর্নেল একটু পিছিয়ে এসে মুখ তুলে বললেন, হ্যাল্লো রাজেনবাবু!

 কী সর্বনাশ! কর্নেলসায়েব যে!

একটু পরে বলিষ্ঠ গড়নের এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক এসে গেট খুলে বললেন, আসুন! আসুন! আমার কী সৌভাগ্য! আপনি যে আমার মতো সামান্য লোকের বাড়িতে পায়ের ধুলো দেবেন কল্পনাও করিনি।

বাড়ির একটুরো লনের সাজসজ্জা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, রাজেন মুখার্জি নার্সারির হালহদিস কতখানি জানেন। বাড়িটা অবশ্য পুরোনো। বনেদিয়ানার ছাপ রাতের আলোয় অস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হচ্ছিল। বসার ঘরের আসবাবে সেকাল-একালের লক্ষণও স্পষ্ট। আমাদের বসিয়ে রাজেনবাবু বিশুকে কফি আনতে বললেন।

কর্নেল বললেন, আকস্মিক ঘটনাচক্রে আপনার কাছে এসে গেলুম।

 রাজেনবাবু অমায়িক হেসে বললেন, এসেছেন এই যথেষ্ট। কেন এসেছেন তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।

আলাপ করিয়ে দিই। জয়ন্ত চৌধুরি। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সাংবাদিক। জয়ন্ত, ইনিই জয় মা তারা নার্সারির পার্টনার–

ছিলুম। মল্লিকদা আপনাকে বলেননি কিছু?

হ্যাঁ। আজ সকালে মল্লিকমশাই নতুন ক্যাটালগ উপহার দিতে গিয়েছিলেন। দুঃখ করে বললেন, আপনি নাকি অন্য কোনো কারবারে নামবেন বলে পার্টনারশিপ ছেড়ে দিয়েছেন।

ছেড়ে এমনি-এমনি দিইনি কর্নেলসায়েব! মল্লিকদার খেয়ালের কথা তো জানেন! কোন মুল্লুকে কী ক্যাকটাসের খবর পেয়ে অর্ডার দিলেন। চিন্তাও করলেন না এখানকার সয়েল বা ক্লাইমেটে তা বাঁচবে কি না। যদি বা বাঁচে, তার খদ্দের পাবেন কি না ঠিক নেই। প্রতিবছর এই সব বেহিসেবি কাজে মোটা টাকা লোকসান হচ্ছিল। আরও কত বেয়াড়া খেয়াল ওঁর মাথায় চাপাছিল, বলে লাভ নেই। শেষ পর্যন্ত কেটে পড়তে পেরেছি বাপের ভাগ্যি। খুব সামান্য টাকায় পার্টনারশিপ ছেড়েছি। জায়গার দামই এ বাজারে বিশ লাখ!

মল্লিকমশাই বলছিলেন আপনি নাকি পাঁচ লাখে রফা করেছেন।

করলুম। আমারও তাড়া ছিল। এদিকে মল্লিকদা এর বেশি দিতে পারবেন না বললেন। না-পারতেন। আমি ছ্যাচড়ামি পছন্দ করিনে। কোর্টকাছারি করা আমার ধাতে নেই।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, এবার আকস্মিক ঘটনাচক্রটা কী শুনুন। মধ্যমগ্রামে আমার চেনা এক ভদ্রলোক থাকেন। কথায়-কথায় তার কাছে শুনেছিলুম, ওই এলাকায় নন্দনকানন নামে একটা বাগানবাড়ি আছে। কোনো এক রায়সায়েবের বাগানবাড়ি। সেখানে তিনি নাকি অদ্ভুত ধরনের পরগাছা দেখেছেন। আমার ব্যাপার তো জানেন! দুপুরে জয়ন্তকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলুম। চৌরাস্তায় হঠাৎ আমার এক দূরসম্পকের ভাগনের সঙ্গে দেখা হলো। সে ওখানকার থানায় সম্প্রতি বদলি হয়ে এসেছে। প্রশান্ত ব্যানার্জি নাম। না–আমি বামুন নই। তবে বামুন আত্মীয় কি থাকতে নেই? তাতে সে একজন পুলিশ অফিসার। বাগানবাড়িটা তার সাহায্যে খুঁজে বের করলুম। তারপর অবাক হয়ে শুনলুম রাজেন মুখার্জি নামে কলকাতার এক ভদ্রলোক নাকি নন্দনকানন কিনেছেন। কেয়ারট্রেকার বলল, নতুন মালিক মোটর সাইকেলে চেপে এসেছিলেন। তবে নন্দনকাননে নাকি ভূতের খুব উৎপাত।

এই সময় বিশু ট্রেতে কফি আর স্ন্যাক্স আনল। লক্ষ্য করছিলুম, রাজেনবাবু কর্নেলের কথা শুনে যাচ্ছেন, কিন্তু কোনো ভাবান্তরের চিহ্ন নেই মুখে। বিশু চলে গেল তিনি জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন, কফি খান কর্নেলসায়েব!

কর্নেল কফির কাপ তুলে চুমুক দিয়ে বললেন, কেয়ারটেকার নতুন মালিকের চেহারার যে বর্ণনা দিল, আপনার সঙ্গে মিলে যায়। তাই জয়ন্তের সঙ্গে বাজি রেখে বললুম, আপনিই নন্দনকাননের নতুন মালিক।

রাজেনবাবু আস্তে বললেন, আমার দুবুদ্ধি কর্নেলসায়েব! কেয়ারটেকার আর কিছু বলেনি?

বলেছিল, পুরোনো মালিক রায়সায়েব হঠাৎই মারা গেছেন। আপনার সঙ্গে তার নাকি চেনাজানা ছিল।

ছিল। বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড়। তবে খুলেই বলছি, একসঙ্গে মদ্যপান করতুম। আপনি জানেন কর্নেলসায়েব, আমি স্পষ্ট কথা বলি। হা-নন্দনকানন আমি জলের দরে পেয়েছি। রায়দা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আর ভূতের উৎপাত বললেন। তা-ও মিথ্যা নয়। ওই বাগানবাড়িতে আমি রায়দার সঙ্গে রাত কাটিয়েছি। নানারকম অদ্ভুত-অদ্ভুত শব্দ শুনেছি। কিন্তু না-ভূতের ভয় আমার নেই।

সুযোগ পেয়ে বললুম, ঘরের ভেতর থেকে দুবার গোঙানি শুনেছি! কর্নেল তো তক্ষুনি কেটে পড়লেন। পরগাছার খোঁজ নিলেনই না।

রাজেনবাবু বললেন, আমার প্রব্লেম ভূত নয় কর্নেলসায়েব! মানুষ।

কর্নেল বললেন, কে সে?

তা জানি না। জানলে তো মুখোমুখি লড়া যেত।

কী প্রব্লেম বাধাচ্ছে সে?

অলরেডি বাধিয়েছে। রায়দা–পুরো নাম মহেন্দ্রনাথ রায়–মারা গিয়েছেন শনিবার। শুক্রবার রাত্রে আমি ওঁকে ডাঃ সরকার রোডে পৌঁছে দিয়েছিলুম। অবশ্য উনি নিজেই নিজের গাড়ি ড্রাইভ করেছিলেন। পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারটা খুলে বলি। পাঁচ লাখ টাকা ক্যাশ ওঁকে ল-ইয়ারের বাড়িতে বসে দিয়েছি। উনি ডিডে সই করেছেন। রেজিস্ট্রি হওয়ার কথা আগামী কাল সোমবার। তো অত ক্যাশ টাকা নিয়ে একা বাড়ি ফিরবেন রায়দা! আমি তাই ওঁর সঙ্গে গিয়েছিলুম। দোতলায় ওঁর ফ্ল্যাট। উনি বললেন, এবার তুমি এসো রাজেন! আমি চলে এলুম। সেই রাত্রে ওঁর হার্ট অ্যাটাক হলো। গতকাল হাসপাতালে গিয়ে শুনলুম, উনি ডেড।

খবর পেলেন কার কাছে?

 রায়দার বাড়িতে এক ভাড়াটে থাকে। নাম ঘনশ্যাম নন্দী। রায়দা একসময় সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি বেচা-কেনার কারবার করতেন। পুরোনো বা ভাঙাচোরা গাড়ি শস্তায় কিনে ভোল বদলে নতুন করে ফেলতেন। ওই ভোলবদলের কাজটা করে দিত ঘনশ্যাম। গোবরার ওদিকে ওর একটা গ্যারাজ আছে। শ্রীহরি অটোমোবাইলস। তো মাঝে মাঝে রায়দার সঙ্গে ওখানে আড্ডা দিতে যেতুম। রায়দা আমাকে সেকেন্ড হ্যান্ড একটা ভালো গাড়ি কম টাকায় দিতে চেয়েছিলেন। রাজি হইনি। আমার মোটর সাইকেলই ঠিক আছে।

ঘনশ্যামবাবু আপনাকে খবর দিয়েছিলেন?

হ্যাঁ। বলে রাজেনবাবু চাপা শ্বাস ছাড়লেন। একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, ডিড আনরেজিস্টার্ড। ওটা কোনো প্রব্লেম নয়। কিন্তু গত রাত্রে এবং আজ সকালে দুবার টেলিফোনে কেউ আমাকে হুমকি দিয়েছে, রায়সায়েবকে নাকি আমিই মার্ডার করে আমার দেওয়া টাকা হাতিয়ে পালিয়ে এসেছি।

কী আশ্চর্য! মার্ডার হলে তো হাসপাতালের ডাক্তাররা—

 কর্নেলের কথার ওপর রাজেনবাবু বললেন, ডাক্তাররা ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েছেন, হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু। এর আগেও দুবার রায়দার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল।

লোকটা কি আপনার কাছে টাকাকড়ি চাইছে?

হ্যাঁ। আড়াই লাখ টাকা তাকে না দিলে সে রায়দার জামাইকে বলে আমার পিছনে পুলিশ লেলিয়ে দেবে।

কর্নেল হাসলেন। কিন্তু রায়সায়েবের বডি তত পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে।

রাজেনবাবুও হেসে উঠলেন। তিনি বললেন, রাস্কেলটা বলছে, রায়দা নাকি একটা চিঠি লিখে গিয়েছেন, রাজেন মুখার্জি আমার বুকে ঘুষি মেরে ব্রিফকেস ভর্তি পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছে। চিঠিটা নাকি তার হাতে এসেছে। কী ভাবে এসেছে, তা সে বলতে রাজি নয়।

কিন্তু টাকাটা আপনার কাছে সে কী ভাবে নেবে, বলেছে, কিছু?

গতরাত্রে ব্যাটাকে পাত্তা দিইনি। আজ সকালে কিছুক্ষণ মিষ্টি কথা বলেছি। টাকা কখন কোথায় কী ভাবে তাকে দিতে হবে, তা সে কাল সোমবার জানাবে। কখন জানাবে তা বলেনি।

বললুম, কর্নেল! পুলিশকে আপনি জানিয়ে দিলে কোন ফোন নাম্বার থেকে রাজেনবাবুকে সে ফোন করছে, তা টেলিফোন এক্সচেঞ্জে আড়ি পেতে জানা সম্ভব।

রাজেনবাবু মাথা নাড়লেন।লোকটা মহা ধূর্ত। দুবারই পাবলিক বুথ থেকে ফোন করেছে। গাড়ি চলাচলের শব্দ শুনে তা বুঝতে পেরেছি। বুথটা কোনো বড় রাস্তার ধারে।

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, রাজেনবাবু! লোকটা যে-ই হোক, সে রায়সায়েবের চেনা কেউ। আপনার কী ধারণা?

ঠিক বলেছেন। সে জানে আমি রায়দাকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই টাকা তাহলে ওঁর মেয়ে-জামাইয়ের পাওয়ার কথা। টাকা ঘরেই থাকবে। তাই না? কারণ রায়দার ফ্ল্যাটে ওরা আছে।

আপনি ওঁর মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাগানবাড়ি আপনাকে বেচে দেওয়ার কথা জানিয়েছে কি?

কাল হাসপাতালে গিয়েই জানিয়েছি। তখন ওরা কোনো মন্তব্য করেনি। তারপর গতরাত্রে উড়ো ফোনে হুমকি শুনে তখনই শর্বরী–মানে, রায়দার মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছি টাকাভর্তি ব্রিফকেস পেয়েছে কি না। এটাই আশ্চর্য! ওরা পাঁচ লাখ টাকাভর্তি কোনো ব্রিফকেস পায়নি। রাজেনবাবু একটু হাসলেন। শর্বরী আসলে রায়দার পালিতা কন্যা। কোনো অনাথ আশ্রম থেকে দত্তক নিয়েছিলেন। বাজে টাইপ মেয়ে। টাকা পেয়েও অস্বীকার করছে। তার মানে কী বুঝতে পারছেন? পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাধাতে তৈরি। ওর বাবাকে টাকা না দিয়ে ডিডে সই করিয়ে নিয়েছি বলে কেস করবে। পরে অবশ্য ফেঁসে যাবে। তাতে কী? আমাকে হ্যারাস করানো তো হবে। রায়দার জামাই প্রদোষ আসল বজ্জাত। রায়সায়েব মেয়ে-জামাইকে পছন্দ করতেন না বললে কম বলা হবে। ওদের বিশ্বাসই করতেন না। তাই দমদমের বাড়ি থেকে এন্টালি এরিয়ায় নিজের আর একটা বাড়িতে চলে এসেছিলেন। আপনাদের বলছি–প্লিজ কথাটা যেন গোন থাকে, মাঝে মাঝে রায়দা আমাকে বলতেন, শর্বরী আর প্রদোষ সম্পত্তির লোভে। তাকে নাকি স্লোপয়জন করছে। তাই ওঁর স্বাস্থ্য ক্রমশ ভেঙে পড়ছে।

আমার মনে পড়ল, আজ সকালে শ্রীলেখা ঠিক একই কথা বলছিল। কর্নেল এবার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, রায়সায়েবকে আপনি টাকা দিয়েছেন। তাকে বাড়ি পৌঁছেও দিয়েছেন। তা হলে রায়সায়েবের ওরকম কোনো চিঠি লিখে রেখে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আপনি উড়ো ফোন পেয়ে–

রাজেন মুখার্জি উঠে দাঁড়িয়ে তার কথার ওপর সহাস্যে বললেন, ও রকম কোনো চিঠির অস্তিত্ব নেই। রায়দা কেন আমার বিরুদ্ধে মিথ্যামিথ্যি তেমন কিছু লিখবেন? কাজেই আমি ভয় পাইনি। বরং বলতে পারেন খাপ্পা হয়েছি। এত সাহস কার? লোকটা কে? কর্নেলসায়েব! আমার প্রব্লেমটা অন্যরকম। মল্লিকদাকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন, এই রাজেন মুখার্জি যা বলে, ঠিক তা-ই করে। আমি যত ভদ্রলোক, তত ছোটলোক। প্লিজ কর্নেলসায়েব! আপনার সামনে এ কথা বলছি বলে যেন কিছু মনে করবেন না। জয়ন্তবাবু! আপনিও যেন কিছু মনে করবেন না। নন্দনকাননের ভূতগুলোকে শায়েস্তা করার আগে এই ভূতটাকে কীভাবে শায়েস্তা করব, তাই নিয়ে আমি প্রব্লেমে পড়েছি।

রাজেনবাবু আমাদের সঙ্গে এইসব কথা বলতে বলতে গেট পর্যন্ত এলেন। কর্নেল রাস্তায় নেমে হঠাৎ ঘুরে বললেন, একটা কথা। নিছক কৌতূহল। আপনি শুক্রবার রাত্রে কি রায়সায়েবের গাড়ি থেকে নেমে ওঁর কথামতো তখনই চলে গিয়েছিলেন? নাকি উনি দোতলায় ওঠা অব্দি অপেক্ষা করেছিলেন?

রায়দা নিচের তলায় সিঁড়ির কাছে পৌঁছুনো পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলুম। খুলে বলি। বাড়ি ফেরার পথে আমরা দুজনে মাত্র তিনি পেগ করে হুইস্কি খেয়েছিলুম। দেখলুম, উনি সুস্থভাবে হাঁটতে পারছেন। তাই চলে এলুম। কিন্তু হঠাৎ একথা কেন কর্নেলসায়েব?

 আমার ধারণা, তখন কেউ সেখানে কোথাও ছিল এবং ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিল। সে জানত, আপনি নন্দনকানন কিনছেন। রায়সায়েবের হাতে ব্রিফকেস এবং আপনাকে দেখে সে একটা অঙ্ক কষেছিল।

রাজেন মুখার্জি হাসলেন। হ্যাঁ। লোকটা যে ওই বাড়ির, তা কি আমি বুঝিনি? কর্নেলসায়েব! যথাসময়ে আপনাকে জানাব, রাস্কেলটাকে কী শাস্তি দিয়েছি।…

.

০৪.

সে-রাত্রে ই এম বাইপাসের দিকে যেতে যেতে কর্নেল আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কী বুঝলে জয়ন্ত?

বলেছিলুম, রাজেনবাবুর কথাবার্তা গোলমেলে মনে হচ্ছে।

কেন?

যদি ওঁর কথাগুলো সত্য হয় তাহলে ওই উড়োফোনের ব্যাপারে উনি অত উত্তেজিত কেন? তা ছাড়া আর একটা কথা আমার কানে বিঁধেছে। নন্দনকানন কেনার ব্যাপারে আমারই দুর্বুদ্ধি বলারই বা মানে কী?

হুঁ। মাঝেমাঝে তোমার পর্যবেক্ষণশক্তি এভাবেই টের পাই।

ওঃ কর্নেল! আবার আপনি আমার আঁতে ঘা দিচ্ছেন।

মোটেই না ডার্লিং! তুমি দুটো ভাইটাল পয়েন্ট তুলেছ। বলে উনি মুখ বাড়িয়ে ডেকে উঠেছিলেন, ট্যাক্সি! ট্যাক্সি!

ট্যাক্সি কেন? আমি পৌঁছে দেব বলেছি–

কর্নেল আমার কথা থামিয়ে গাড়ির দরজা খোলার চেষ্টা করতেই ব্রেকে পায়ের চাপ দিয়েছিলুম। উনি আমাকে অবাক করে তক্ষুণি নেমে নিয়ে একটা ট্যাক্সিতে চেপেছিলেন। ট্যাক্সিটা চলে গেলে আমি বাঁদিকে ঘুরে সল্টলেকে আমার বাড়ির দিকে চলেছিলুম। মাঝে মাঝে কর্নেল এমন খামখেয়ালি হয়ে ওঠেন, তা আমার জানা। তাই ওইভাবে হঠাৎ তার চলে যাওয়ায় অবাক হইনি।

আসলে ইলিয়ট রোডে ওঁর তিনতলার অ্যাপার্টমেন্ট গিয়ে জানার ইচ্ছে ছিল, প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাইয়ের কোনো খবর আছে কি না।…

পরদিন সকালে কর্নেলের কাছে যাবার ইচ্ছে তীব্রই ছিল। যাবার আগে ওঁকে টেলিফোন করেছিলুম। তখন প্রায় আটটা বাজে। কিন্তু ষষ্ঠীচরণ জানিয়েছিল, তার বাবামশাই ছাদের বাগান থেকে নেমে শুধু কফি খেয়ে বেরিয়ে গেছেন। বলে গেছেন, বাইরে কোথাও ব্রেকফাস্ট করে নেবেন।

হালদারমশাইয়ের বাড়িতে ফোন করেছিলুম। রিং হচ্ছিল। কেউ ফোন ধরেনি। সবে ব্রেকফাস্ট করে সেদিনকার দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার পাতায় অন্যমনস্কভাবে চোখ বুলোচ্ছি, টেলিফোন বেজে উঠেছিল। কর্নেলের ফোন ভেবেছিলুম। কিন্তু আমার উৎসাহে জল ঢেলে আমাদের নিউজ ব্যুরোর চিফ সত্যদার নির্দেশ এসেছিল, জয়ন্ত এখনই নিউ আলিপুরে চলে যাও। ফ্ল্যাটে ডাকাতি হয়েছে। দুদুটো মার্ডার। থানার সোর্স থেকে এইমাত্র খবর পেয়েছি। তুমি সোর্সকে চেনো। আগে ফোনে কনট্যাক্ট করে নাও। বাড়ির নাম্বার পেয়ে যাবে। শোনো! আমরা বড় করে কভারেজ দেব। ভিকটিম আমাদের চিফ এডিটরের বাবার বন্ধু ছিলেন। বুঝলে কিছু? ওঃ জয়ন্ত! আই রিপিট-ভিকটিম রত্নেশ অরোরা আমাদের চিফ এডিটরের বাবার মানে, বু…বু… বুজম—

 উত্তেজনা এলে তোতলামি এসে যায় সত্যদার। দ্রুত বলেছিলুম, বুঝেছি দাদা! বুজ ফ্রেন্ড।…

দিনটা যা গেল, বলার নয়। চিফ এডিটরের বাবার প্রাণের বন্ধু বলে কথা। কর্নেলের সঙ্গগুণে গোয়েন্দাদের রীতিনীতি আমার করায়ত্ত। এদিকে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা আমার কাছে কী ধরনের কভারেজ আশা করে তা-ও জানা। অতএব অফিসে ফিরে প্রায় সাড়ে তিন কলাম পরিমাণ একখানা রোমহর্ষক রহস্যকাহিনি দাঁড় করালুম। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ কফি শেষ করে সত্যদাকে দিলুম। তারপর টেবিলে ফিরে এক কাপ চা নিয়ে বসেছি, টেলিফোন বাজল। রিসিভার তুলে সাড়া দিতেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাইয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। জয়ন্তবাবু? আমি হালদার কইতাছি।

বলুন হালদারমশাই!

বাইরাইবেন কখন?

চায়ের কাপ শেষ হলেই বেরুব। আপনি কোথা থেকে বলছেন?

কর্নেলস্যারের ঘরে আছি। কর্নেলস্যার এখনও ফেরেন নাই। ওয়েট করতাছি। আপনি ওনার খবর জানেন? মানে–উনি কোথায় গেছেন?

কিছুই জানি না। আপনার খবর আছে কিছু?

আছে। সেইজন্যই কর্নেলস্যারের ওয়েট করতাছি। আপনি আইবেন না?

চা খেয়েই বেরুচ্ছি।…

ইলিয়ট রোডে কর্নেলের তিনতলার অ্যাপার্টমেন্ট পৌঁছে দেখলুম, কর্নেল ফিরেছেন এবং হালদারমশাইয়ের কথা মন দিয়ে শুনছেন। আমাকে দেখে কর্নেল একটু হাসলেন। কেন হাসলেন বুঝতে পারলাম না।

হালদারমশাই বললেন, তো যা বুঝলাম, ঘনশ্যামবাবুর কারখানা শ্রীহরি। অটো-মোবাইলস শিগগির দরগা রোডে রিপ্লেসড হবে। আমারে কইলেন, দুসপ্তাহ বাদে গাড়ি লইয়া যাইবেন। দরগা রোডের নতুন ঠিকানাও দিলেন।

কর্নেল বললেন, আপনি কি গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন?

হালদারমশাই হাসলেন। গাড়ি পামু কই? প্রাইভেট কার ভাড়া পাওয়া যায়। কিন্তু খামোখা খরচ কইর‍্যা লাভ কী? ওনারে কইছি, গাড়ি ব্রেকডাউন ভ্যানে লইয়া যামু। অ্যাক্সেল ভাইঙ্গ্যা গেছে।

তা হলে দরগা রোডের গ্যারেজটা কিনে ফেলেছেন ঘনশ্যামবাবু?

প্রাইভেট ডিটেকটিভ গম্ভীর হয়ে বললেন, কইলেন, অ্যাডভান্স করছেন। সামনের সপ্তায় রেজেস্ট্রি কইর‍্যা লইবেন। দর জিগাইলাম। শুধু হাসলেন। শ্যাষে কইলেন, দরদাম জিগাইবেন না। মাথা খারাপ হইয়া যাইব।

ষষ্ঠী আমার জন্য কফি আনল। কর্নেল বললেন, জয়ন্তর ওপর আজ খুব ধকল গিয়েছে। বিকেল চারটে নাগাদ বারাসত থেকে তোমার কাগজের অফিসে ফোন করেছিলুম। তুমি নেই শুনে সত্যবাবুকে লাইনটা দিতে বললুম। সত্যবাবু বললেন, জয়ন্তকে একটা ডাকাতি আর খুনের পিছনে লড়িয়ে দিয়েছি। বলেই তোমাদের ব্যুরো চিফ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন, চিফ এডিটরের বাবার বন্ধু আর তার চাকর খুন। বহু লক্ষ টাকার অলংকার লোপাট। চিফ এডিটর নাকি আমার সাহায্য চান।

বললুম, ভ্যাট! পুলিশ অলরেডি জেনে গেছে বাড়ির লোকের কাজ।

কর্নেল হাসলেন। সে যাই হোক, আমি তোমার ব্যুরো চিফকে বলেছি, কাল মর্নিংয়ে দুতিন সপ্তাহের জন্য রাজস্থানে যাচ্ছি।

আপনি বারাসত গিয়েছিলেন? হঠাৎ সেখানে কী?

মধ্যমগ্রামের কাছে বারাসত।

 হালদারমশাই বললেন, আমি উঠব কর্নেলস্যার! এবার ভাইটাল পয়েন্টে আসতাছি।

বলুন।

দরগা রোডের গ্যারাজের ঠিকানায় মালিকের খোঁজ করলাম। মালিক এক মুসলিম ভদ্রলোক। তেনারে কইলাম, শুনছি আপনি জমিসুদ্ধ গ্যারেজ সেল করবেন। আমার কেনার ইচ্ছা আছে। উনি কইলেন, অলরেডি এক পার্টি অ্যাডভান্স করছে। কইলাম, তাতে কী? সেই পার্টি যা দর দেবে, আমি তার বেশি দিমু। ভদ্রলোক কইলেন, সাড়ে তিন কাঠা জমিতে টিনের শেডসমেত গ্যারেজ। পনেরো লাখ দর উঠেছে। হালদারমশাই হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে হাতের কৌটো থেকে এক টিপ নস্যি নিলেন। তারপর গুলিগুলি চোখে তাকিয়ে বললেন, ঘনশ্যাম নন্দী পনেরো লাখ টাকা জোগাড় করছে!

আপনাকে বাড়িয়ে বলতেই পারেন উনি।

শ্রীলেখা ঘনশ্যাম নন্দীর মাইয়ার কাছে শুনছিল দশ লাখ। যাই হোক, দশ লাখ কি পনেরো লাখ। এত টাকা ঘনশ্যাম নন্দী পাইল কই? কর্নেলস্যার! ঘনশ্যামই শ্রীলেখার ঘর থিক্যা ব্রিফকেস চুরি করছে।

আপনি প্রমাণ করবেন কী ভাবে?

প্রাইভেট ডিটেকটিভ কাঁচুমাচু মুখে হাসলেন। আরও কিছু ইনফরমেশন জোগাড় কইর‍্যা আমি একখান থিয়োরি খাড়া করব। তারপর আপনার ডিরেকশন মতন চলব।

কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে বললেন, আপাতত আপনি একটা কাজ করতে পারেন।

কন?

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, আপনি বলেছেন শ্রীলেখাই আপনার ক্লায়েন্ট।

হঃ। রায়সায়েব তারেই টাকাভর্তি ব্রিফকেস দিচ্ছিলেন। তার বাবারে তো দেন নাই। তাই আইনত শ্রীলেখা আমার ক্লায়েন্ট।

তা হলে তার বাবা তপেশ মজুমদারের গতিবিধির ওপর নজর রাখুন।

গোয়েন্দাপ্রবর গুলিগুলি চোখে তাকালেন। এট্ট হিন্ট দিন অন্তত। নজর রাখব ক্যান?

কারণ জানতে চাইবেন না হালদারমশাই! আপনি কাল খুব ভোরে ডা. সুরেশ সরকার রোডে ওঁদের বাড়ির কাছাকাছি কোথাও ওত পেতে থাকবেন। না–জয়ন্তের মতো ঠাট্টা করছি না। আপনাকে ছদ্মবেশ ধরতে হবে। কারণ দৈবাৎ আপনি তপেশবাবু চোখে পড়ে যেতে পারেন। আমি চাই, ওঁর অজ্ঞাতসারে ওঁকে ফলো করবেন। শুভস্য শীঘ্রম। অন্তত কাল এবং পরশু দুটো দিন আপনাকে একটু কষ্ট করতে হবে। ভোর ছটা থেকে রাত্রে তপেশবাবু তার ফ্ল্যাটে ফিরে শুয়ে পড়া। পর্যন্ত নজর রাখতে হবে। শুয়ে পড়লেন কি না, তা নিশ্চয় বুঝতে পারবেন। তারপর আপনি পদ্মপুকুর পার্কে গিয়ে পোশাক বদলে বাড়ি ফিরে যাবেন। বলুন! পারবেন কি?

হালদারমশাই হাসলেন। এ আর কী এমন কাম? পুলিশলাইফে বনবাদাড়ে ঘন্টার পর ঘণ্টা মশার কামড় খাইছি। বৃষ্টিতে ভিজছি। শীতে হাড় বরফ হইয়া গেছে।

আর একটা কথা। রাত্রে বাড়ি ফিরেই আমাকে টেলিফোনে তপেশবাবুর গতিবিধি জানাবেন।

প্রাইভেট ডিটেকটিভ যেন এবার কাজের মতো একটা কাজ পেয়েছেন, এই ভঙ্গিতে সটান উঠে দাঁড়ালেন এবং যাই গিয়া বলে সবেগে বেরিয়ে গেলেন।

অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলুম। বললুম, কী অদ্ভুত!

কর্নেল বললেন, নন্দনকাননের ভূতের চেয়ে মোটেও অদ্ভুত নয়। প্রাইভেট ডিটেকটিভরা কেন, পুলিশের ডিটেকটিভরাও এ ধরনের কাজ করে থাকেন। হালদারমশাই এতে অভ্যস্ত। তা ছাড়া তুমি তো জানো, উনি অসাধারণ অ্যাডভেঞ্চারার।

যাক গে! হঠাৎ আপনি বারাসতে দিন কাটিয়ে এলেন কেন?

বলেছি তো ডার্লিং! মধ্যমগ্রামের কাছে বারাসত।

ওঃ কর্নেল! হেঁয়ালি করবেন না।

 হেঁয়ালি নয় জয়ন্ত! সমস্যা হলো, তুমি অনেকসময় কোনো ব্যাপার তলিয়ে লক্ষ্য করো না! কোনো সম্পত্তি যদি মধ্যমগ্রাম এরিয়ায় থাকে, তা কেনাবেচার রেজিস্ট্রেশন কোথায় হবে?

হ্যাঁ। বারাসত রেজিস্ট্রি অফিসেই হবে।

অতএব ডিডরাইটার সেই অফিসেরই স্বীকৃত কেউ হবেন। কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বললেন, প্রশান্তর সাহায্যে ডিডরাইটার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টকে খুঁজে বের করেছি। তারপর যিনি নন্দনকাননের সেল-ডিড তৈরি করেছেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেরি হয়নি। ছলাখ টাকার ডিড। প্রচুর টাকার স্ট্যাম্প কিনতে হয়েছে রাজেনবাবুকে। গোপালনগরের জয় মা তারা নার্সারির অন্যতম প্রোপ্রাইটার হিসেবে রাজেন মুখার্জিকে বারাসতেও অনেকে চেনেন। তো ডিডরাইটার ইসমাইল হোসেন খবর পেয়ে গেছেন, রায়সায়েব শনিবার মারা গেছেন। কাজেই ডিড রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে না। অবশ্য রায়সায়েবের মতো নামজাদা লোক না হয়ে অন্য কোনো সাধারণ লোক বা গরিবগুরবো হলে কাউকে বিক্রেতা সাজিয়ে রেজিস্ট্রেশন করানোর অসুবিধে ছিল না।

কিন্তু এসব খবর নতুন করে জানার জন্য পুরো একটা দিন খরচ করে ফেললেন?

 খরচ করে লাভ হয়েছে জয়ন্ত!

একটু ঝেড়ে কাশুন বস!

কর্নেল চোখ খুলে হাসতে হাসতে বললেন, এখনও সেই সময় আসেনি। অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে বেড়াচ্ছি।

তবে যে বলছেন লাভ হয়েছে?

তা হয়েছে। অন্তত কিছু তথ্য পেয়ে গিয়েছি। স্থানীয় সিভিল কোর্টের ল-ইয়ার কুমুদ সেনগুপ্ত গত শুক্রবার ছুটির পর বাড়িতে ছিলেন। সেই সময় রাজেন মুখার্জি এবং রায়সায়েব ডিডরাইটার ইসমাইল হোসেনকে রেজিস্ট্রি অফিস থেকে কুমুদবাবুর বাড়িতে নিয়ে যান। রায়সায়েব গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন। সেখানে কুমুদবাবুর ডিকটেশন অনুসারে ইসমাইল সায়েব ডিড টাইপ করেন। কুমুদবাবু এবং তার জুনিয়র শৈবাল ঘোষ সাক্ষী হিসেবে সই করেন। সেখানেই রাজেনবাবু একটা ব্রিফকেস খুলে পাঁচশো টাকার নোটের বান্ডিল গুনে টেবিলে রাখেন। রায়সায়েবের জন্য রাজেনবাবু বারাসত বাজার এলাকা থেকে একটা দামি ব্রিফকেস কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন। রায়সায়েব টাকার বান্ডিলগুলো সেই ব্রিফকেসে ভরে তালা এঁটে দুটো চাবি পকেটে ঢোকান। বাঁকা হেসে তিনি বলেন, এ আমার হাতের ময়লা! রাজেন খামোখা ব্রিফকেস কিনল। বারণ করলুম। শুনল না। কত লাখ-লাখ টাকা আমার এই প্যান্টের পকেট আর জ্যাকেটের ভেতর-পকেটে থেকেছে। যাই হোক, এর পর রায়সায়েব তার জ্যাকেটের ভেতর জামার ওপর বাঁদিকে বেল্টে আটকানো একটা ছোট্ট রিভলভার কেস দেখিয়ে বলেন, বুড়ো হয়েছি। কিন্তু দরকার হলে চোখের পলকে এটা বের করে গুলি চালাতে পারি। তিনি রিভলভার বের করে দেখানও বটে। কুমুদবাবুর বাড়ি থেকে বেরুতে প্রায় সাড়ে ছটা বেজে যায়। কুমুদবাবুর জুনিয়র শৈবালবাবু থাকেন সল্টলেকে। আসার পথে এয়ারপোর্ট হোটেলের বারে তিনজনে তিন পেগ করে হুইস্কি খেয়েছিলেন। শৈবালবাবুর সঙ্গে কথায়-কথায় ব্যাপারটা জানতে পারলুম। কিন্তু এবার টাইম ফ্যাক্টর এসে যাচ্ছে। অন্তত নটার আগে রায়সায়েবের ডা. সুরেশ সরকার রোডের ফ্ল্যাটে পৌঁছুনো অসম্ভব। শ্রীলেখা সম্ভবত ঘড়িতে সময় না দেখেই আটটা বলেছে।

কর্নেল চুপ করলেন। একটু পরে বললুম, এইসব তথ্য থেকে কি ব্রিফকেস হারানোর সূত্র পাবেন বলে আশা করছেন?

কর্নেল হাসলেন। আশা? কোথায় যেন পড়েছিলুম আশা ছলনাময়ী–নাকি কুহকিনী। তবু আশা করতে দোষ কী? আসলে পাঁচ লাখ টাকা সত্যি রাজেনবাবু রায়সায়েবকে দিয়েছিলেন কি না এবং সেই টাকা কোনো ব্রিফকেসে ভরা হয়েছিল কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পেরেছি।

শ্রীলেখাকে ফোন করে টাইম ফ্যাক্টরের গণ্ডগোলটা শুধরে নেওয়া যায় কি না দেখুন।

করব। আগে রাজেনবাবুকে ফোন করা দরকার। আজ সেই উড়ো ফোন এসেছিল কিনা শোনা যাক। বলে কর্নেল টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করতে থাকলেন।

কিছুক্ষণ পরে বললেন, হ্যালো! মি. রাজেন মুখার্জি আছেন?…এখনও ফেরেননি?… শুনুন! উনি ফিরলে বলবেন, কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে যেন রিং করেন।…হ্যাঁ। কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। বরং কর্নেলসায়েব বললেও …ধন্যবাদ। রাখছি।

রিসিভার রেখে কর্নেল বিরক্ত মুখে বললেন, কোনো মহিলা ধরেছিলেন। না–কাজের মেয়ে নয়। বেশ ধারালো কণ্ঠস্বর। কিন্তু আমার নামটা উচ্চারণ করতে হোঁচট খাচ্ছিলেন। ষষ্ঠী! আর এক রাউন্ড কফি দিয়ে যা বাবা! আজ ঠাণ্ডাটা একটু বেড়েছে মনে হচ্ছে।

ষষ্ঠীচরণ কফি আনল। আমার আর কফি খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু কর্নেলের বরাবর ওই একটাই ধুয়ো কফি ব্রেনকে চাঙ্গা করে।

কফি খেতে খেতে বললুম, নার্ভ চাঙ্গা হয়েছে। শ্রীলেখার কাছে জেনে টাইম ফ্যাক্টরের গণ্ডগোলটা এবার মিটিয়ে নিন।

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, শ্রীলেখাকে ফোন করার চাইতে বরং কাল মর্নিংয়ে তুমি চলে এসো। তোমাকে শ্রীলেখা দর্শন করাব।

হেসে ফেললুম। ওর কাছে পাত্তা পাব না। ওর প্রেমিক না থেকে পারে না।

 সেইসময় ডোরবেল বাজল এবং কর্নেল যথারীতি হাঁক দিলেন, ষষ্ঠী!

একটু পরে ষষ্ঠীচরণ এসে বলল, এক ভদ্রলোক বাবামশাই! রঞ্জনবাবু–না কী যে নামটা।

কর্নেল চোখ পাকিয়ে বললেন, শিগগির এক কাপ কফি। আমি দেখছি।

বলে উনি ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। এঘরের দরজার পর একটা ছোট্ট ঘর আছে। ডাক্তারদের চেম্বারে ওয়েটিং রুমের মতো। সদর দরজায় ইন্টারলকিং সিস্টেম। বাইরে থেকে খোলা যায় না। ভেতর থেকে খোলা যায়। দরজা খোলার শব্দ এবং কর্নেলের আপ্যায়নমাখা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। আরে! আসুন! একটু আগে আপনার বাড়িতে রিং করেছিলুম। শুনলুম আপনি বেরিয়েছেন।

ষষ্ঠী রাজেনবাবুকে রঞ্জনবাবু করেছে। কর্নেলের পেছনে রাজেন মুখার্জি ঢুকলেন। মুখে সেই অমায়িক হাসি। সোফায় বসে তিনি সহাস্যে বললেন,

সোজা বারাসত থেকে আসছি! আচ্ছা কর্নেলসায়েব! আপনি আমার পিছনে লেগেছেন কেন বলুন তো? মল্লিকদার কাছে আপনার সম্পর্কে কিছু কথা শুনেছিলুম বিশ্বাস করিনি। কিন্তু যা শুনেছিলুম। তা সত্যি!

কর্নেল বললেন, কী সর্বনাশ! আপনার পিছনে কী ভাবে লেগেছি বলুন তো?

বারাসত আমার লইয়ার কুমুদবাবুর জুনিয়র শৈবাল ঘোষের কাছে সব শুনলুম। ডিডরাইটার ইসমাইলদাও বলল। যাই হোক, প্লিজ আমাকে বলুন। শর্বরী বা প্রদোষ কি আপনাকে অ্যাপ্রোচ করেছে? বেশ! তা যদি হয়, আমার ক্ষোভের কোনো কারণ নেই। আপনি বারাসতে খোঁজখবর নিতে গিয়েছিলেন, সত্যি আমি রায়দাকে ছলাখের মধ্যে পাঁচ লাখ দিয়েছিলুম কি না। এই তো? এবার বলুন, এর বিপরীত কথা কি কিছু শুনে এসেছেন?

রাজেনবাবু! পাঁচ লাখ টাকা আপনি রায়সায়েবকে দিয়েছেন, তা সত্য। আবার একথাও সমান সত্য, টাকাভর্তি সেই ব্রিফকেসটা রায়সায়েবের ঘরে পাওয়া যাচ্ছে না।

বাড়ির কোনো ফ্ল্যাটের কোনো লোক সুযোগ বুঝে ব্রিফকেসটা হাতিয়ে নিয়েছে। ঘনশ্যামের কাছে শুনেছি, রায়দা বাথরুমে পড়েছিলেন। সেই সময় অনেক লোক তার ফ্ল্যাটে ঢুকেছিল। গোলমালের মধ্যে ব্রিফকেস হাতানো কী এমন কঠিন কাজ?

মানছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পাঁচ লাখ টাকা ভর্তি ব্রিফকেস রায়সায়েয়েব ঘরের মধ্যে যেখানে-সেখানে ফেলে রাখবেন?

রাজেনবাবু দুহাত চিতিয়ে কাঁধ নাড়া দিয়ে হতাশার ভঙ্গি করে বললেন, রায়দা ব্রিফকেস বিছানায় ফেলে রাখলেও অন্তত আমি অবাক হব না। উনি দশ-বিশ লাখ টাকাকে হাতের ময়লা বলতেন। কতদিন লক্ষ্য করেছি, গাদা গাদা নোট ওঁর বিছানার চাদরের তলায় ছড়ানো আছে।

আপনি ডাঃ সুরেশ সরকার রোডের ফ্ল্যাটে নিশ্চয় গিয়েছেন?

গিয়েছি বইকি। শুধু আমি একা নই, রায়দার বন্ধুর সংখ্যা তত কম ছিল না।

ষষ্ঠী রাজেনবাবুর জন্য কফি আনল। কর্নেল বললেন, কফি খান। আমি আমার ভূমিকাটা ব্যাখ্যা করছি।

ভেবেছিলুম, রাজেনবাবু খাপ্পা হয়ে উঠবেন ক্রমশ। কিন্তু ওঁকে এতটুকু উত্তেজিত দেখাচ্ছে না। মুখে পরিচ্ছন্ন হাসি আঁকা আছে। কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, বেশিক্ষণ বসব না। লনে মোটর সাইকেল রেখে এসেছি। সিটে হেলমেটও আটকে রেখেছি। কর্নেলসায়েবের বাড়ি সেফ বলে জানি।

কর্নেল চুরুট ধরালেন। তারপর আস্তে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, উড়ো ফোনের খবর বলুন!

ফোন এসেছিল। স্কাউন্ট্রেলটা লেজে খেলাচ্ছে। কাল সকালে বলবে, কোথায় কীভাবে আড়াই লাখ টাকা দিতে হবে।

কেউ জোক করছে না তো আপনার সঙ্গে?

না! রীতিমতো হুমকি। আমি গায়ে মাখছি না। বলেছি, ঠিক আছে দেব।

কর্নেল একটু পরে বললেন, ঘনশ্যাম নন্দীর শ্রীহরি অটোমোবাইলস উঠে যাচ্ছে। জয়ন্তের এক বন্ধু ওখানে গাড়ির কাজ করিয়েছিল। তাই জয়ন্ত আজ ওখানে তার গাড়ির কাজ করাতে গিয়েছিল। জয়ন্ত! তুমি রাজেনবাবুকে ব্যাপারটা বলল!..

কর্নেল আমার দিকে অর্থপূর্ণ কটাক্ষ করলেন। বললুম, ঘনশ্যামবাবুর গ্যারাজের জায়গা যার, তিনি এক মারোয়াড়ি ভদ্রলোককে বেচে দিয়েছেন। আমার মনে হলো, টাকা-পয়সা নিয়ে রফা হয়েছে। কারণ ঘনশ্যামবাবু বললেন, শ্রীহরি অটোমোবাইলস দরগা রোডে চলে যাচ্ছে। সেখানে একটা সাড়ে তিন কাঠার ওপর শেড দেওয়া পুরোনো গ্যারেজ পেয়েছেন। অ্যাডভান্সও করেছেন। এবার ভাড়ায় নয়, নগদ টাকায় কিনছেন। টাকার পরিমাণ না বললেও আমার ধারণা ওই। এলাকায় জমির দরই অন্তত কাঠাপ্রতি তিন থেকে পাঁচ লাখ।

রাজেনবাবু তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। ফিক করে হেসে বললেন, তা হলে লটারিতে টাকা পেয়েছে ঘনশ্যাম। কিংবা সাট্টাবাজটার সঙ্গে জুটে মোটা টাকা কামিয়েছে। কর্নেল-সায়েবকে বলা উচিত। রায়দার কারবার ছিল যতসব বজ্জাতদের সঙ্গে। সুরেশ সরকার রোডে এরিয়ার কুখ্যাত সাট্টা ডন গণেশকে উনি ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে গেছেন। আবার কেয়ারটেকারের দায়িত্বও গণেশ পেয়েছিল। ভাড়া থেকে ওয়ান-থার্ড বাদ দিতেন রায়দা।

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, ঘনশ্যামবাবু রায়সায়েবের ব্রিফকেস

তাকে থামিয়ে রাজেনবাবু বললেন, কিছু বলা যায় না। ঘনশ্যামও হাতাতে পারে। আমি কয়েকদিনের মধ্যে ঠিকই জেনে যাব, ওর টাকার সোর্স কী। উঠি কর্নেলসায়েব! শর্বরী-প্রদোষকে জানিয়ে দিয়েছেন তো কথাটা–টাকা আমি সত্যি রায়দাকে দিয়েছিলুম?

জানাবো। ও নিয়ে কিছু ভাববেন না। আমি আপনার হিতৈষী রাজেনবাবু!

রাজেনবাবু হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর দুজনকে নমস্কার করে বেরিয়ে যাচ্ছেন, হঠাৎ কর্নেল বললেন, একটা কথা জানতে বাকি আছে রাজেনবাবু। শুক্রবার আনরেজিস্টার্ড ডিড আপনি আপনার লইয়ার কুমদবাবুর কাছে রেখে এসেছিলেন কেন?

 রাজেনবাবু ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন, কী আশ্চর্য! ডিডটা তত বারাসতেই রেজিস্ট্রি হতো। কাজেই কুমুদবাবুর কাস্টডিতে রাখা সেফ ছিল। ওঃ কর্নেল! আপনি সত্যি অদ্ভুত মানুষ! ..

বলে রাজেন মুখার্জি দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।…

.

০৫.

পরদিন সকালে কর্নেলের সঙ্গে ডা. সুরেশ সরকার রোডে শ্রীলেখাদের ফ্ল্যাটে গেলুম। রায়সায়েবের এই বাড়িটার চওড়া গেট আছে। কিন্তু হাট করে খোলা। উঠোনের মতো একটুকরো জায়গায় একটা লাল মারুতি ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। ওপরে টিনের শেড। বাড়িটার কোনো নাম নেই।

রাস্তার ধারে গাড়ি রেখে দুজনে ভেতরে গেলুম। শ্রীলেখা কথামতো দোতলার জানালায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। দেখতে পেয়েই হন্তদন্ত নেমে এল। নিচে সংকীর্ণ করিডরের বাঁদিকে সিঁড়ি। শ্রীলেখাকে উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। সে চাপা স্বরে বলল, একটু আগে কর্নেলসায়েবকে ফোন করেছিলুম। শুনলুম, আপনারা বেরিয়েছেন।

বাড়িটা স্তব্ধ এবং কেমন যেন পোডড়া বাড়ির মতো দেখাচ্ছিল। অথচ তিনটে ফ্লোরে মোট নটা ফ্ল্যাটে লোকজন বাস করে। সিঁড়িতে ওঠার সময় কর্নেল বললেন, কিছু কি ঘটেছে?

ঠোঁট আঙুল রেখে শ্রীলেখা ডানদিকের ফ্ল্যাটটা দেখাল শুধু। মধ্যের ফ্ল্যাটটা তালাবন্ধ দেখলুম। শ্রীলেখা বলেছিল, এই ফ্ল্যাটে এক তামিল দম্পতি থাকেন এবং তাঁর কোথায় যেন বেড়াতে গিয়েছেন। এখনও ফেরেননি তা হলে!

দোতলায় ডানদিকের ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। লক্ষ্য করলুম, চৌকাঠের ওপর কালো রঙে ইংরেজিতে শুধু লেখা আছে : এম আর। সেই বিজ্ঞাপনটার কথা মনে পড়ল।

কর্নেল রায়সায়েবের ফ্ল্যাটের দরজার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকালেন। শ্রীলেখা চাপা স্বরে ডাকল, ভেতরে চলে আসুন।তার কথায় ব্যস্ততা এবং উত্তেজনা ছিল।

বসার ঘরটা ছিমছাম সাজানো। সোফাসেট আছে। কাচের আলমারিতে পুতুল আর নানারকম লোকশিল্পের নমুনা সাজানো আছে। একটা ছোট র‍্যাকে বই ভর্তি এবং র‍্যাকের মাথায় কয়েকটা রঙিন ফোটো দেখতে পেলুম। শ্রীলেখার বালিকা বয়সের ফোটো। তার বাবা-মায়ের ফোটো।

দরজা আস্তে বন্ধ করে শ্রীলেখা আস্তে বলল, এতক্ষণ খুব হইহল্লা চলছিল শর্বরীদের ফ্ল্যাটে। প্রদোষ থানায় গেছে। শুনলুম, ফোনে পুলিশ ডেকেছিল। পুলিশ পাত্তা দেয়নি। তাই নিজের গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে। দেখলুম, ঘনশ্যামবাবুও তার সঙ্গে গেলেন।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, কিন্তু ঘটনাটা কী?

সেই ব্রিফকেসটা রায়সায়েবের গাড়ির তলায় পাওয়া গিয়েছে।

বলো কী!

হ্যাঁ। বলে শ্রীলেখা মুখ বিকৃত করল। আমার বাবাকে কী বলব? সর্বঘঁটের কাঁটালি কলা। ভোরে মর্নিংওয়াকে বেরুনোর সময় বাবার ওটা চোখে পড়ে। প্রথমে ভেবেছিলেন রাস্তার কুকুর শুয়ে আছে। বাবার এক অভ্যাস! রাস্তার কুকুর দেখলে তাড়া করেন। তো ছড়ির গুতো মারতে গিয়ে দেখেন, কুকুর নয়। একটা ব্রিফকেস।

তারপর?

শ্রীলেখা উত্তেজনায় দম নিতে থেমেছিল। বলল, উনি ব্রিফকেসটা ছড়ি দিয়ে টেনে আনার চেষ্টা করছিলেন। নিচের ফ্ল্যাটের মনীশবাবু দেখতে পেয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। গণেশজ্যাঠা কাল রাত্রে বর্ধমান থেকে ফিরেছে।. সে-ও দেখতে পেয়েছিল। এবার কল্পনা করুন।

হইচই শুরু হয়েছিল?

শ্রীলেখা আস্তে শ্বাস ছেড়ে বলল, হ্যাঁ। শর্বরীই নেমে গিয়ে বেশি চ্যাঁচামেচি করছিল। আমিও দরজা লক করে নিচে গেলুম। আশ্চর্য কর্নেলসায়েব! সেই ব্রিফকেসটা। সে-রাত্রে দেখেই বুঝেছিলুম, নতুন আর দামি ব্রিফকেস। হাতলের মাথায় কোম্পানির রঙিন স্টিকার সাঁটা ছিল। রায়সায়েবের সেই ব্রিফকেস।

তালা আঁটা ছিল কি?

 তাই কি থাকে? তালা ভাঙা। ভেতরে কিছু নেই।

তার মানে টাকা হাতিয়ে নিয়ে খালি ব্রিফকেস রেখে গিয়েছে চোর!

আমি বললুম, কিন্তু বাইরে কোথাও না ফেলে দিয়ে গাড়ির তলায় রাখল কেন?

শ্রীলেখা বাঁকা হেসে বলল, শর্বরীকে খেপিয়ে দিয়ে মজা করতে চেয়েছে। শর্বরী থানায় ডায়েরি করেছিল শুনেছি। অবশ্য পুলিশ আসেনি। এলে জানতে পারতুম।

কর্নেল বললেন, তোমার বাবা কোথায়?

শ্রীলেখা রাগ করে বলল, বাবা এক ফোঁপরদালাল। থানা থেকে প্রদোষের আসতে দেরি হচ্ছে দেখে কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেলেন। এত নিষেধ করলুম। শুনলেন না। আপনারা বসুন। চা আনি। নাকি কফি খাবেন? কফি আছে। বাবা শীতকালে কফি খান।

থাক। কফি খেয়েই বেরিয়েছি। বলে কর্নেল চুরুট বের করলেন। শ্রীলেখা উঠে গিয়ে পাশের ঘর থেকে একটা মাটির খুদে ভঁড় এনে সেন্টার টেবিলে রাখল। চুরুট ধরিয়ে কর্নেল বললেন, ধোঁয়া ছাড়া আমার ব্রেন কাজ করে না। গন্ধটা তোমার অসহ্য লাগতে পারে।

শ্রীলেখা বলল, না। আমাদের অফিসে অনেকে সিগারেট খায়। আমাদের সেলস-একজিকিউটিভ সেনসায়েব পাইপ টানেন।

তুমি কদিনের ছুটি নিয়েছ যেন?

পাঁচ দিনের। আজ মঙ্গলবার। কাল অব্দি ছুটি। শনিবার থেকে ছুটি নিয়েছিলুম।

কর্নেল হাসলেন। তোমার প্রাইভেট ডিটেকটিভদ্রলোককে কি খবর দিয়েছ, ব্রিফকেস পাওয়া গেছে?

আপনাকে টেলিফোন করার পর ওঁকে করেছিলুম। রিং হয়ে গেল। কেউ ধরল না।

 আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, আচ্ছা কর্নেল! ওঁকে তো এখানে কোথাও দেখলুম না? থানায় গিয়েছেন নাকি?

কর্নেল আমাকে অগ্রাহ্য করে তুম্বো মুখে বললেন, তো শ্রীলেখা, সেদিন তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলুম।

শ্রীলেখা বলল, বলুন!

শনিবার ভোরে তুমি রায়সায়েবের ঘরের দরজা খোলা দেখে ভেতরে ঢুকেছিলে। ঘরে কি আলো জ্বলছিল?

আলো? শ্রীলেখা একটু ভেবে নিয়ে বলল, না। বসার ঘরে আলো জ্বলছিল না। বাথরুমে জ্বলছিল। সেজন্যই তো ওঁকে দেখতে পেয়েছিলুম।

এবার একটু ভেবে এই প্রশ্নের উত্তর দাও। বসার ঘরে সোফার সেন্টার টেবিলে কি গ্লাস বা-ধরো, মদের বোতল এসব কিছু লক্ষ্য করেছিলে?

শ্রীলেখা বলল, না। ওসব কিছুই ছিল না। সেন্টার টেবিলের দিকে আমি প্রথমেই তাকিয়েছিলুম। কারণ আমার সন্দেহ হয়েছিল, বেশি মদ খেয়ে রায়জ্যাঠামশাই হয়তো নেশার ঘোরে পড়ে আছেন। তবে দরজা খোলা থাকার ব্যাপারটা নিয়ে বাবা এবং মি. হালদারের সঙ্গে আলোচনা করেছি। উনি সেই রাত্রে সম্ভবত দরজা আটকাতে ভুলে গিয়েছিলেন। কারণ আরও একবার বাবা ভোরে বেরিয়ে দেখেছিলেন, ওঁর ফ্ল্যাটের দরজা ফাঁক হয়ে আছে এবং ওঁর কুকুরটা সেখানে বাইরে মুখ বের করে বসে আছে। বাবা কুকুরকে খুব ভয় করেন।

এবার বলল, রায়সায়েবকে যখন তুমি শুক্রবার রাত্রে দরজা খুলে দাও, তখন কি ঘড়ি দেখেছিলে?

শ্রীলেখা একটু অবাক হল। না তো!

তা হলে তখন রাত আটটা, তা তুমি কী ভাবে জানলে? মনে করে দ্যাখো। তুমি আমাকে বলেছ, রাত আটটায় রায়সায়েব কলিং বেল বাজিয়ে তোমাকে ডাকেন।

শ্রীলেখা বিব্রত বোধ করল। একটু পরে বলল, আসলে বাবা রোজ ওঁদের সমিতি থেকে বাড়ি ফেরেন রাত নটা-সওয়া নটায়। তাই

বুঝেছি। কিন্তু এমন হতে পারে তোমার বাবা সেরাত্রে দশটা-সওয়া দশটায় বাড়ি ফিরেছিলেন!

বাবা বলতে পারেন। শ্রীলেখা তারপরই বলল, হ্যাঁ। কোনো-কোনো রাত্রে বাবার ফিরতে দেরি হয়, তা ঠিক।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, শীতের ভোরে তোমার বাবা মর্নিংওয়াকে বের হন। বিছানার আরাম ছেড়ে উঠে দরজা আটাকাতে তোমার বিরক্তি লাগে না?

শ্রীলেখা আড়ষ্টভাবে হাসল। বিরক্ত হই না বললে মিথ্যে বলা হবে। রাগ করে কোনো-কোনো দিন শুয়েই থাকি। একটু দেরি করে দরজা আটকাই। বাবা গ্রাহ্য করেন না। আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়েই বেরিয়ে যান।

এই সময় নিচে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। শ্রীলেখা উঠে গিয়ে জানালায় উঁকি মেরে বলল, প্রদোষরা ফিরে এল।

কর্নেল বললেন, পুলিশ এসেছে কি?

দেখতে পাচ্ছি না। আপনারা বসুন। আমি গিয়ে দেখি বরং।

যাও। তবে প্রদোষবাবুদের সামনে তোমার বাবাকে বোলো না আমরা এসেছি। বলে কর্নেল তাকে ডাকলেন। হ্যাঁ–একটা কথা। তোমার বাবা কি ম্যাগাজিন পড়েন না? ম্যাগাজিন দেখছি না।

বাবা শুধু নিউজপেপার পড়ে। বলে শ্রীলেখা বেরিয়ে গেল। দরজার কপাট টেনে বন্ধ করে দিল বাইরে থেকে। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ এবং চাপা কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল। কর্নেল হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, এক মিনিট। বাথরুম থেকে আসছি।

এই ঘরের সংলগ্ন বাথরুমটা রাস্তার দিকে। কর্নেল বাথরুমে গিয়ে ঢুকলেন। আমি উঠে গিয়ে রাস্তার দিকের জানালায় উঁকি দিলুম। হালদারমশাই যে-বেশেই থাকুন চিনতে পারব। কিন্তু কাছাকাছি রাস্তায় তেমন কাউকেও চোখে পড়ল না।

ফ্ল্যাটের দরজার সামনে চাপা স্বরে কথাবার্তা চলেছে। হঠাৎ কোনো মহিলা কর্কশ স্বরে বলে উঠল, থাক। আর ন্যাকামি করবেন না। আপনার মেয়েকে জিজ্ঞেস করুন।

শ্রীলেখার কথা কানে এল। বাজে কথা বলবে না শর্বরী! পারো তো নিজে গিয়ে আমার নামে থানায় ডায়রি করে এসো!

পাল্টা হুমকি শোনা গেল। এখনও করিনি শুধু তপেশকাকুর খাতিরে।

কর্নেল বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন। চাপা স্বরে বললুম, রায়সায়েবের মেয়ে শ্রীলেখার সঙ্গে ঝগড়া করছে।

কথাটা বলেই চোখে পড়ল, কর্নেল পিঠে আটকানো তার কিটব্যাগ এবং গলা থেকে ঝুলন্ত ক্যামেরা আর বাইনোকুলার নিয়েই বাথরুমে ঢুকেছিলেন। উনি ওই অবস্থায় সোফায় বসেছিলেন, তা-ও মনে পড়ল। এটা অবশ্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। বাইরে গেলেই তাঁর গলা থেকে বাইনোকুলার আর ক্যামেরা ঝোলে। পিঠে আটকানো থাকে ওই কিটব্যাগটা। কিটব্যাগের শীর্ষে বেরিয়ে থাকে প্রজাপতিধরা নেট-স্টিক। আজ অবশ্য ওটা দেখিনি। তবে ক্যামেরা-বাইনোকুলার সঙ্গে নিয়েছিলেন।

আমি তাকিয়ে আছি দেখে কর্নেল বললেন, বাইরে ঝগড়া হচ্ছে। কিন্তু তুমি আমার দিকে তাকিয়ে কী দেখছ?

বললুম, কিটব্যাগসুদ্ধু বাথরুমে ঢুকেছিলেন? ওতে এমন মূল্যবান কি কিছু আছে?

তা তো আছেই।

এখানে রেখে গেলে কি সেটা আমি চুরি করতুম?

কর্নেল হাসলেন। কী আশ্চর্য! হঠাৎ বাথরুম পেল। ওটা খুলে রাখার তর সইল না। এ নিয়ে তোমার গোয়েন্দাগিরি দেখছি হালদারমশাইকেও হার মানায়।

কী মুশকিল! গোয়েন্দাগিরি নয়। কিটব্যাগের কথা ছেড়ে দিচ্ছি, বাইনোকুলার আর ক্যামেরাও গলায় ঝুলিয়ে কারও বাথরুমে ঢোকা অদ্ভুত লাগে না?

কর্নেল সকৌতুকে বললেন, কাল রাত্রেই রাজেনবাবুর মুখে শুনেছ আমি একজন অদ্ভুত লোক! এরকম অদ্ভুত আচরণ এবার থেকে ইচ্ছে করেই করব দেখতে পাবে।

দরজা খুলে শ্রীলেখা এবং তার বাবা তপেশবাবু ঢুকলেন। তপেশবাবু করজোড়ে বলে উঠলেন, নমস্কার স্যার! শ্রীলেখা, বলবি তো কর্নেলসায়েবরা এসেছেন! মি. হালদার এলেন না?

কর্নেল বললেন, ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। যাই হোক, শ্রীলেখার মুখে শুনলুম—

 তপেশবাবু সোফায় ধপাস করে বসে বললেন, ভেরি মিসটিরিয়াস ঘটনা কর্নেলসায়েব! বলে চাপা কণ্ঠস্বরে ইনিয়ে-বিনিয়ে উনি ঘটনাটা বর্ণনা করলেন। শ্রীলেখার মুখে যা আমরা শুনেছি, তা অবশ্য উনি একটু রঙ চড়িয়ে বললেন। তাছাড়া একটা কুকুরই নাকি ব্রিফকেসটার পাশে শুয়েছিল এবং তার লেজ বেরিয়ে ছিল বলেই ওঁর চোখে পড়ে ব্রিফকেসটা। কুকুরটা ছড়ির গুঁতো খেয়ে পালিয়ে যায়। তারপর ব্রিফকেসটা উনি দেখতে পান।

কর্নেল বললেন, থানায় গিয়েছিলেন। পুলিশ কী বলল?

তপেশবাবু ফিক করে হেসে চাপা স্বরে বললেন, যেমন প্রদোষ তেমনই শর্বরী মিথ্যকের মিথ্যক। বলেছিল, পাঁচলাখ টাকা ভর্তি ব্রিফকেস হারানোর ডায়রি করেছে থানায়। আজ গিয়ে শুনলুম, পুলিশ ডায়রিই নেয়নি। কেন নেবে বলুন? ডায়রি করতে গিয়েছিল বটে; কিন্তু পুলিশ জেরা করে জানতে চেয়েছিল, ব্রিফকেসটা এবং তার ভেতরে সত্যিই টাকা ছিল কি না, প্রদোষ বা শর্বরী কি দেখেছে? দুজনেই গবেট। জেরার চোটে স্বীকার করেছিল, তারা ব্রিফকেস দেখেনি। রায়সায়েবের এক বন্ধুর কাছে শুনেছে। সেই লোকটাকে রায়সায়েব নাকি মধ্যমগ্রামের বাগানবাড়ি বিক্রি করেছেন। ওরা সেই লোকটাকে থানায় ডেকে আনতে চেয়েছিল। সে নাকি মহা ধূর্ত লোক। এই গণ্ডগোলে কেন জড়াতে আসবে? তা ছাড়া পুলিশ কোনো থার্ড পার্টির কথা শুনবে কেন? সে তো বাইরের লোক। কাজেই ডায়রি নেয়নি পুলিশ।

আজ কী বলল, পুলিশ?

থানায় গিয়ে দেখলুম, ডিউটি অফিসার পাত্তা দেয়নি। বড়বাবুর জন্য প্রদোষ আর ঘনশ্যাম অপেক্ষা করছিল। আমি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে বড়বাবু এলেন। সব কথা শুনে বড়বাবু বললেন, রায়সায়েব মানে মহেন্দ্র রায় তো? তার ব্যাকগ্রাউন্ড পুলিশের জানা। চোরাই গাড়ি কেনা-বেচার কারবার করত। প্রদোষকে কী অপমান না করলেন বড়বাবু! শেষে ঝুলির বেড়ালও বের করে দিলেন। গুজব শুনতুম, শর্বরী রায়সায়েবের নিজের মেয়ে নয়। বড়বাবু খুলে বলে দিলেন কথাটা।

শ্রীলেখা বলল, শর্বরীর থোতা মুখ ভোঁতা হবে। কিন্তু পুলিশ কেসটা নিলে ভালো হতো। কর্নেলসায়েব আর মি. হালদার একদিকে, পুলিশ অন্যদিকে তদন্তে নামলে চোর শিগগির ধরা পড়ত।

তপেশবাবু বাঁকা মুখে বললেন, ছেড়ে দে। চোর কে, তা না হয় কর্নেলসায়েবরাই গোপনে তদন্ত করে জানতে পারলেন। কিন্তু টাকাগুলো কি উদ্ধার করতে পারবেন? আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ঘনা–ওই ঘনশ্যাম নন্দীই তো বিছানার তলা থেকে ব্রিফকেস চুরি করে টাকাগুলো হাতিয়ে গতরাত্রে খালি ব্রিফকেসটা ফেলে দিয়েছে। এটা সে ইচ্ছে করেই করেছে। ভেবেছে তুই আর আমি খালি ব্রিফকেস দেখে শোকে আকুল হব।

তপেশ মজুমদার কথাগুলো বলে ঠোঁট কামড়ে ধরলেন। মনে হলো, ছেড়ে দে বললেন বটে, কিন্তু ওঁর মনে প্রচণ্ড ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।

শ্রীলেখাও ঠোঁট কামড়ে ধরেছিল। শ্বাস ছেড়ে বলল, অতগুলো টাকা অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করবে ঘনশ্যামকাকু?

তপেশবাবু বললেন, তোরই বোকামি। তবে টাকাটা তোর বা আমার নয়। তা ছাড়া রায়সায়েবও আর বেঁচে নেই। তখন অবশ্য ভেবেছিলুম বিবেকের দায় বলে। কথা। এখন মনে হচ্ছে, পাপের কড়ি পাপেই খায়। রায়সায়েবের লাইফ হিস্ট্রি থানার বড়বাবুর মুখে শুনে আর তার ওপর আমার কোনো সিমপ্যাথি নেই।

বলে তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কর্নেলসায়েবদের চা-কফি খাইয়েছিস?

কর্নেল বললেন, শ্রীলেখাকে নিষেধ করেছি। আমরা কফি খেয়েই বেরিয়েছিলুম। যাই হোক, এবার উঠি।

শ্রীলেখা বলল, কর্নেলসায়েব! বাবা যা-ই বলুন, আমি কিন্তু পিছিয়ে আসছি না। বাবা আমাকে চেপে যেতে বলেছিলেন। আমিই পুলিশকে জানানোর জন্য ইনসিস্ট করেছিলুম। তখন বাবা বললেন, পুলিশকে এসব কথা জানানো ঠিক হবে না। বরং তার পরিচিত একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ আছেন–

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে তাকে থামিয়ে বললেন, ঠিক আছে। মি, হালদারকে যখন তোমার বাবা তোমার পক্ষ থেকে লড়িয়ে দিয়েছেন, তখন তিনি এর কিনারা না করে থামবেন না। তার চেয়ে বড় কথা, মি. হালদার গত রবিবার আমার বাড়িতে জোর দিয়ে বলেছিলেন, শ্রীলেখাই আমার ক্লায়েন্ট। তার মানে কি বুঝতে পারছ? তোমার বাবা ওঁকে নিষেধ করলেও উনি থামবেন না।

আমি হাসি চেপে বললুম, হালদারমশাইকে শ্রীলেখা দেবীও যদি থামতে বলেন, উনি থামবেন না।

তপেশবাবু চিন্তিত মুখে বললেন, শ্রীলেখার পীড়াপীড়িতে অকারণ একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি। পাঁচ লাখ টাকার ব্যাপার। ঘনাবাবু হোক কিংবা যে-ই, হোক, গায়ে পড়লে সে ফোঁস করে ছোবল মারবে। যা দিনকাল পড়েছে!

শ্রীলেখা রুষ্ট মুখে বলল, তুমি চুপ করো তো! তোমার সমিতি নিয়ে থাকো তুমি। আমার ব্যাপার আর নাক গলাবে না বলে দিচ্ছি।..

আমরা রাস্তায় পৌঁছেছি, সেই সময় দেখলুম উল্টো দিকে গোড়াবাঁধানো একটা বটগাছের তলায় একজন খাটো লুঙি এবং ফুলহাতা সোয়েটার পরা লোক ঠেলাওয়ালাদের সঙ্গে কথা বলছে। মুখে গোঁফদাড়ি। মাথায় মাফলার জড়ানো। আমাদের দিকে লোকটা একবার ঘুরে আবার কথা বলতে থাকল। চিনতে পারলুম। গোয়ন্দাপ্রবর এই রাস্তার সাধারণ লোকজনের সঙ্গে নিজেকে একাকার করতে পেরেছেন।

তপেশবাবু আমাদের বিদায় দিতে এসেছিলেন। আমরা গাড়িতে উঠে বসলে তিনি কর্নেলকে মিনতি করে বললেন, নির্বোধ মেয়ের কথা কানে নেবেন না স্যার। আপনি মি. হালদারকে একটু বুঝিয়ে বলবেন। আমিও গোপনে ওঁকে বলব। খামোখা ঝামেলা করে আর লাভ নেই। ঘনা বেয়াড়া লোক। তাকে গণেশের শাগরেদ। আমাকে বা শ্রীলেখাকে প্রাণে মেরে দেবে।

কর্নেল বললেন, বলব। আপনি চিন্তা করবেন না। হ্যাঁ–একটা কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছি।

তপেশবাবু সাগ্রহে বললেন, বলুন স্যার।

শুক্রবার রাত্রে আপনি ঠিক কটা নাগাদ বাড়ি ফিরেছিলেন?

তা সওয়া নটা হবে। ওই যে পার্কের মোড়ে আমাদের সমিতির অফিস দেখছেন। ওখান থেকে হেঁটে আসতে যেটুকু সময় লাগে।

এই বাড়িতে ঢোকার সময় কি কাউকে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলেন?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। তপেশবাবু চঞ্চল হয়ে উঠলেন।দেখেছিলুম। মনে পড়ছে বটে।

তাকে চিনতে পেরেছিলেন?

স্ট্রিট-লাইটে পেছনদিকটা দেখেছিলুম তবে চেনা মনে হয়েছিল আসলে সে-রকম চেনা নয়। রায়সাহেবের কাছে অনেকেই আসত। তাকেও দেখেছি সম্ভবত। তা না হলে চেনা মনে হবে কেন?

তারপর আপনি সোজা সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকেছিলেন?

তপেশবাবু একটু অবাক হলেন। হ্যাঁ। কিন্তু সেদিন তো এসব কথা জিজ্ঞেস করেননি! আজ কেন জিজ্ঞেস করছেন কর্নেলসায়েব?

কর্নেল হাসলেন। মি. হালদার তদন্ত করে জানতে পেরেছেন, সে-রাতে ঠিক ওই সময় একজন বাইরের লোক এ বাড়িতে ঢুকেছিল। দেখা যাচ্ছে, মি. হালদার ঠিক জেনেছেন তা হলে। আর একটা কথা। আপনি নিজের ফ্ল্যাটে ঢোকার সময় রায়সায়েবের ফ্ল্যাট কি বন্ধ দেখেছিলেন?

তপেশবাবু কর্নেলের প্রশ্নে ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিলেন। বললেন, মনে পড়ছে না।

কোনো কারণে কি অন্যমনস্ক ছিলেন?

না, না। মানে–সবসময় সব ব্যাপার লক্ষ্য থাকে না তো!  

ফ্ল্যাটটা তালাবন্ধ থাকলে সিঁড়িতে দোতলায় ওঠার মুখে চোখে পড়ার কথা।

 তপেশবাবুকে নার্ভাস দেখাচ্ছিল। একটু ইতস্তত করে বললেন, তালাবন্ধ দেখিনি মনে পড়ছে।

তার মানে, রায়সায়েব ঘরে ছিলেন?

সম্ভবত।

তপেশবাবু! এই গেটের কাছ থেকে দেখা যায়, রায়সায়েবের ঘরে আলো জ্বলছিল কি না।

তপেশবাবু এতক্ষণে, যেন জলের ভেতর থেকে মাথা তুললেন। শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। মনে পড়েছে। ওঁর ঘর আলো জ্বলছিল। আপনি এই কথাটা না বললে মনে পড়ত না।

আপনি রাত্রে কখনও ওঁর ঘরে ঢুকেছেন?

না। রাত্রে মদের আসর বসত। তা ছাড়া রায়সায়েব একা থাকলেও মাতাল অবস্থায় আছেন ভেবে রাত্রে পারতপক্ষে ওঁর ঘরে কখনও ঢুকিনি।

হঠাৎ শ্রীলেখার আবির্ভাব হল। রাগে ফুঁসে উঠে তপেশবাবুকে বলল, কর্নেলসায়েবের সময়ের দাম নেই? তুমি ওঁকে সাধাসাধি করতে এসেছ যেন উনি এ ব্যাপার আর মাথা না ঘামান। তাই না? কর্নেলসায়েব! বাবার কথা শুনবেন না। বাবাকে আমি বিশ্বাস করি না। নিশ্চয় রেখার বাবার সঙ্গে কোনো কথা হয়েছে।

তপেশবাবু বললেন, আঃ! কী হচ্ছে? রাস্তায় সিন ক্রিয়েট করতে এসেছিস তুই?

কর্নেল আমাকে বললেন, চলো জয়ন্ত! দেরি হয়ে গেল।

পদ্মপুকুর পার্কের কাছে গিয়ে কর্নেল আমাকে গাড়ি থামাতে বললেন। কেন বললেন, একটু পরে বুঝতে পারলুম। ছদ্মবেশী হালদারমশাই হন্তদন্ত এসে পড়লেন। বললেন, খবর আছে কর্নেলস্যার!

কর্নেল বললেন, গাড়িতে উঠে বসুন। আপনাকে আর কষ্ট করে তপেশবাবুর গতিবিধি জানতে হবে না।…।

.

০৬.

হালদারমশাই গাড়িতে ওঠার সময় তার বগলদাবা একটা নোংরা মোটাসোটা কাপড়ের ব্যাগ দেখতে পেলুম। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বললুম, আপনি কি এই বেশেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন?

প্রাইভেট ডিটেকটিভ পিছনের সিটে বসে ততক্ষণে গোঁফ-দাড়ি ওপড়াতে শুরু করেছেন। বললেন, নাঃ! ভোর সাড়ে পাঁচটায় পদ্মপুকুর পার্কে নামছিলাম। তারপর পার্কে গিয়া এই ড্রেস ধরছিলাম।

কেউ ছিল না পার্কে?

প্রচণ্ড শীত। মধ্যিখানে ওই চত্বর দেখলেন? ওখানে ভবঘুরেরা আগুন জ্বালছিল। আমি ঝোপের ফাঁকে লুঙ্গিখান শুধু পরলাম। গোঁফ-দাড়ি আটকাইয়া দিলাম। তিন মিনিটের কাম। বলে হালদারমশাই কর্নেলের পিঠের পাশে মুখ আনলেন। খবর এখন কমু কর্নেলস্যার?

কর্নেল বললেন, খবরটা যদি হয় রায়সায়েবের গাড়ির তলায় পাওয়া। ব্রিফকেস, তা হলে বলার দরকার নেই।

হালদারমশাই ব্যগ্রভাবে বললেন, সে-খবর তো আপনি লইছেন, গেটের বাইরে জয়ন্তবাবুর গাড়ি দেইখ্যাই বুঝছিলাম। আমি কই অন্য কথা।

বলুন তা হলে।

গোয়েন্দাপ্রবর এবার চাপা স্বরে বললেন, শ্রীলেখাদের বাড়ির উল্টোদিকে বটতলায় বইয়া ছিলাম। ঠেলাওয়ালারা আগুন জ্বালছিল। তখন ছয়টা বাজে। সবে। ওখানে গিয়া বইছি। হঠাৎ শ্রীলেখাদের বাড়ির ছাদ থেইকা কীসব জিনিস পড়ল। বটতলার কেউ লক্ষ্য করে নাই। তখনই গিয়া দেখি, আবর্জনার গাদার ওপর দড়ি দিয়া গোল কইর‍্যা বান্ধা–দেখাইতাছি আপনারে।

বলে তিনি ব্যাগের ভেতর হাত ভরলেন। কর্নেল তার দিকে না ঘুরেই বললেন, রঙিন পত্রিকা।

অ্যাঃ? হালদারমশাই চমকে উঠলেন। আপনি জানেন?

কর্নেল এবার ঘুরে তার হাত থেকে পত্রিকার বান্ডিলটা নিলেন। আমি অবাক হয়ে বললুম, পত্রিকার বান্ডিল ওভাবে কে ফেলল? ইংরেজি পত্রিকা মনে হচ্ছে!

কর্নেল বললেন, এখন আর কোনো কথা নয়। বাড়ি ফিরে আগে কফি।

হালদারমশাই আস্তে বললেন, হেভি মিস্ট্রি!..

অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে কর্নেল ষষ্ঠীচরণকে কফি আনতে বললেন। আমি পত্রিকার মোটাসোটা বান্ডিলটা খুলে দেখার জন্য উসখুস করছিলুম। কিন্তু কর্নেল ওটা তার টেবিলের নিচের ড্রয়ারে চালান করে দিলেন। তারপর তার কিটব্যাগের চেন খুলে একই মাপের আরও একগাদা পত্রিকা বের করে সেই ড্রয়ারে ঢোকালেন। বললুম, আপনিও দেখছি অনেকগুলো ম্যাগজিন পেয়েছেন। একই ম্যাগাজিন মনে হলো। কোথায় পেলেন? আমি তো আপনার সঙ্গেই ছিলুম। দেখতে পেলুম না কেন?

কর্নেল হাসলেন। এগুলো আমার ব্যাগেই ছিল।

তাহলে হালদারমশাইয়ের কুড়োনো ম্যাগাজিনগুলোর সঙ্গে রাখলেন কেন?

একই পত্রিকা। তাই একসঙ্গে রাখলুম।

হালদারমশাই বললেন, কর্নেলস্যার! বাথরুমে যাব।

হ্যাঁ। আপনার হাত-মুখ ধুয়ে ফেলা দরকার। যান। গরম জলও পাবেন। পোশাক ঠিকঠাক করাও দরকার। ফ্রেশ হয়ে আসুন।

হালদারমশাই ড্রয়িংরুম-সংলগ্ন বাথরুমে গিয়ে ঢুকলেন। দেখলুম, কর্নেল চোখ বুজে সাদা দাড়ি মুঠো করে ধরে টানছেন। বললুম, আপনি এভাবে চোখ বুজে দাড়ি টানাটানি করলেই বুঝতে পারি, অঙ্কটা মিলছে না।

কর্নেল চোখ খুললেন না। বললেন, অঙ্ক নয় জয়ন্ত! আতঙ্ক বলতে পারো।

বলেন কী! কিসের আতঙ্ক?

প্রাণের।

আপনার প্রাণের? বলে হেসে ফেললুম। আপনার প্রাণ যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে যখন যায়নি, তখন কারও সাধ্য নেই আপনার প্রাণের ওপর হামলা করে।

কর্নেল আমার কথায় কান না দিয়ে আপনমনে বললেন, লোকটা কি এত বোকা হবে?

কোন্ লোকটা?

কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। কিছুক্ষণ পরে বললেন, রিং হয়ে যাচ্ছে। কেউ ধরছে না। বাড়িতে লোকজন কেউ নেই নাকি?

ষষ্ঠীচরণ কফি আর স্ন্যাক্সের ট্রে রেখে গেল। কর্নেল রিসিভার রেখে কফির পেয়ালা তুলে নিলেন। কাকে ফোন করেছিলেন, জানতে চাইলাম না। কারণ ওঁর মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম কোনো প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব পাব না।

হালদারমশাই প্যান্ট-শার্ট জ্যাকেট পরে তার স্বাভাবিক চেহারা নিয়ে ফিরে এলেন। বললেন, কনেলস্যারের কাছে একখান পুরানো নিউজপেপার লমু।

কর্নেল বললেন, দিচ্ছি। আপনার ছদ্মবেশভর্তি ব্যাগটা কাগজে জড়িয়ে নেওয়া উচিত। চেহারা এবং পোশাকের সঙ্গে ফিট করছে না।

ঠিক কইছেন। বলে হাসিমুখে গোয়েন্দাপ্রবর বসলেন। তারপর কফির পেয়ালা তুলে যথারীতি ফুঁ দিয়ে চুমুক দিতে থাকলেন।

একটু পরে টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। হ্যাঁ, বলছি। শুনুন। কিছুক্ষণ আগে আপনাকে রিং করেছিলুম। বাড়িতে কোনো লোক থাকে না বুঝি?…ও!…শুনুন! আমি আপনার সাড়া না পেয়ে ভেবেছিলুম, আপনি হয়তো আমার কথা গুরুত্ব দেননি।…হ্যাঁ, ব্যাপারটা সিরিয়াস। আপনি বরং কয়েকদিন জন্য বাইরে কোথাও ঘুরে আসুন।…হ্যাঁ–আশা করি, শিগগির একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে।…না, না। রিস্ক নেবেন না। রাখছি।

রিসিভার রেখে কর্নেল স্বগতোক্তি করলেন, লোভ অনেকসময় মানুষকে অন্ধ করে।

হালদারমশাই জিজ্ঞেস করলেন, কারে অন্ধ করল?

কর্নেল তাঁর কথায় কান দিলেন না। বললেন, হালদারমশাই! আপনাকে এবার একটা কাজ করতে হবে।

কন?

দরগা রোডে ঘনশ্যাম নন্দীকে যে ভদ্রলোক জমিসমেত গ্যারেজ বিক্রি করছেন, তার নাম কী?

হালদারমশাই জ্যাকেটের ভেতর থেকে একটা খুদে নোটবই বের করে পাতা উল্টে দেখে বললেন, সাহিল খান। নন-বেঙ্গলি মুসলিম।

কোনো তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। আপনি আপনার নিজের বুদ্ধি অনুসারে কাজ করবেন। আবার বলছি, তাড়াহুড়ো করবেন না।

কাজটা কী কন কর্নেলস্যার!

সহিল খানের সঙ্গে কথাবার্তা বলে জেনে নেবেন, ঘনশ্যাম নন্দী একা ওঁর গ্যারাজ কিনছেন, নাকি কোনো পার্টনার আছে। সেই পার্টনারের নাম কী?

হালদারমশাইকে একটু চিন্তিত দেখাচ্ছিল। বললেন, সাহিল খান বেশি কথা কইতে চান না। কেমন য্যান বাঁকাচোরা কথাবার্তা। পাত্তা দিতেই চান না।

বললুম, আপনাকে ভদ্রলোক ইনকাম ট্যাক্স অফিসের লোক ভেবেছিলেন সম্ভবত।

কর্নেল হাসলেন। জয়ন্ত ঠিক ধরেছে মনে হচ্ছে। আপনাকে টিপিক্যাল ওই লাইনের লোক সাজতে হবে। না–পোশাকে নয়। কথাবার্তায়। আপনি বরং এক কাজ করবেন। থিয়েটার রোড এরিয়ায় একটা গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ আছে। আমার যখন গাড়ি ছিল, ওখানেই কাজ করাতুম। এক মিনিট।

বলে উনি টেবিলের একটা ড্রয়ার টেনে কতকগুলো কার্ড বের করলেন। সেগুলো টেবিলে রেখে আবার কতকগুলো বের করে খুঁজতে থাকলেন। ড্রয়ারটা অজস্র নেমকার্ড ভর্তি। কিছুক্ষণ খোঁজার পর একটা কার্ড হাতে নিয়ে কর্নেল বললেন, চার বছর আগে আমার ল্যান্ডরোভার গাড়িটা বেচেছি। তারপর থেকে জয়ন্তের কাঁধে চেপে বেড়াচ্ছি। অবশ্য জয়ন্ত এসব ব্যাপারে খুব উদার।

বললুম, মোটেও না। এক্সকুসিভ একেকটা থ্রিলিং স্টোরি ছেপে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার পসার বেড়েছে। আমার গাড়ির ফুয়েল খরচের ব্যাপারে তাই কর্তৃপক্ষ একেবারে মুক্তহস্ত। আমি কি নিজের স্ট্যাকের পয়সা খরচ করি?

কর্নেল ততক্ষণে টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করছিলেন। লাইন পেয়ে বললেন, সরলবাবু? আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।…হ্যাঁ। ভালো আছি। আপনি না, না। গাড়ি কিনিনি। একটু মন দিয়ে শুনুন। আমার খুব আপনজন মি. কে কে হালদার। খুলেই বলি। উনি একজন প্রাক্তন পুলিশ অফিসার। বর্তমানে প্রাইভেট ডিটেকটিভ।…না। কোনো গোলমেলে ব্যাপার নয়। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। একটা কেসের ব্যাপার মি. হালদারের গাড়ি মেরামত এবং গ্যারেজ সংক্রান্ত ট্রেনিং দরকার। আপনাকে শুধু একটু কোঅপারেট করতে হবে। উনি আপনাদের কাজকর্ম ওয়াচ করবেন। কথাবার্তা শুনবেন।…হ্যাঁ। ঠিক ধরেছেন। মি. হালদার বুদ্ধিমান এবং অভিজ্ঞ মানুষ। দুদিনই যথেষ্ট। তবে ওঁর পরিচয় যেন গোপন থাকে।…হ্যাঁ। অসংখ্য ধন্যবাদ। উনি আমার নেমকার্ড নিয়ে আপনার কাছে যথাসময়ে যাবেন। ছাড়ি। কেমন?

রিসিভার রেখে কর্নেল হালদারমশাইকে একটা নেমকার্ড দিলেন। তারপর সরলবাবুর গ্যারেজের ঠিকানা লিখে দিলেন। হালদারমশাই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। তখনই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, কর্নেলস্যারের কী কমু? থিয়োরিটিক্যালি জানি, ডিটেকটিভরে সর্ববিদ্যাবিশারদ হইতে হয়। এই ট্রেনিংটা আমার প্রফেশনে সত্যই দরকার ছিল। কর্নেলস্যার! জয়ন্তবাবু! যাই গিয়া।

 গোয়েন্দাপ্রবর সবেগে প্রস্থান করলেন। হাসতে হাসতে বললুম, কে বা কারা একটা গাড়ি মেরামতের জায়গা কিনছে, তার জন্য হালদারমশাইকে এভাবে লড়িয়ে দিলেন বস? রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, রহস্য কীসের? হালদারমশাইয়ের এ ধরনের ট্রেনিং ভবিষ্যতের কাজে লাগতেই পারে। কলকাতার এইসব গ্যারেজের মধ্যে পরস্পর এলাকাভিত্তিক যোগযোগ আছে। কাজেই আমি যা জানতে চাইছি, তা হালদারমশাই ওখানেও দৈবাৎ জেনে যেতেও পারেন।

বললুম, আপনি আজ আর কোথাও বেরুবেন নাকি?

কিছু ঠিক নেই। তবে আপাতত আমিও আর তাড়াহুড়ো করছি না। দরকার হলে তোমাকে খবর দেব।

বললুম, একটা কথা। রায়সায়েবের রিভলভার হারানোর ব্যাপারে ওঁর মেয়ে-জামাই পুলিশকে কি কিছু জানায়নি? আপনি তপেশবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন না কেন?

কর্নেল হাসলেন। তপেশবাবু যখন রিভলভার সম্পর্কে কোনো কথা বললেন না, তখন ধরেই নিয়েছি, প্রদোষ ও শর্বরী পুলিশের কাছে এ ব্যাপারটা চেপে গেছে।

চেপে যাওয়ার কী কারণ থাকতে পারে, রিভলভারটার যদি লাইসেন্স থাকে?

বোঝা যাচ্ছে, লাইসেন্স ছিল না। তা থাকলে রায়সায়েবের ফ্ল্যাটে কোনো নিরাপদ জায়গায় পাওয়া যেত। ধরো, আলমারির লকার কিংবা এ ধরনের কোনো জায়গায়। বার্ষিক রিনিউয়্যালের কাগজপত্রও থাকত।

তাহলে ওটা বেআইনি অস্ত্র?

 তাছাড়া আর কী? বলে কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন।…

সেদিন সন্ধ্যায় দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা থেকে কর্নেলকে টেলিফোন করেছিলুম। ষষ্ঠীচরণ সাড়া দিয়ে বলেছিল, বারামশাই বিকেলে বেরিয়েছেন। কিছু বলতে হবে?

বলেছিলুম, বলবে, আমি ফোন করেছিলুম।

রাত্রে সল্টলেকে ফিরে ভেবেছিলুম কর্নেলকে টেলিফোন করি। কিন্তু করিনি। একটু অভিমান হয়েছিল। ঠিক করেছিলুম, উনি নিজে থেকে ফোন না করলে ওঁকে আমিও এড়িয়ে থাকব। আমার ধারণা, এই কেসের ব্যাপারে কোনো কারণে উনি আমাকে হয়তো এড়িয়ে থাকছেন।

পরে মনে পড়েছিল কর্নেল বলেছিলেন, তাড়াহুড়ো না করে আস্তেসুস্থে এগোতে চান। তাই হয়তো উনি কোথাও পাখি-প্রজাপতি বা অর্কিডের খোঁজে ঘুরতে বেরিয়েছেন। কলকাতা ছেড়ে অনেকসময় কর্নেল দূরদূরান্তে পাড়ি জমান। আমাকে সবক্ষেত্রে সঙ্গী করেন, এমন তো নয়।

শুক্রবার সন্ধ্যায় অফিসে বসে পুলিশসূত্রে পাওয়া বড়রকমের একটা ছিনতাইয়ের খবর জমকালো করে লিখছি, টেলিফোন বেজে উঠল। সাড়া দিতেই কর্নেলের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। জয়ন্ত! বাড়ি ফেরার পথে ষষ্ঠীর হাতের এক পেয়ালা কফি খেয়ে যেয়ো!

বললুম, আপনার গতিবিধি এই কদিনে যত রহস্যজনক হোক, তা নিয়ে আমি কিন্তু মাথা ঘামাইনি।

ঠিক করেছ ডার্লিং! খামোকা হয়রান হতে। যাই হোক, এসো কিন্তু!

কিছু খবর আশা করছি কর্নেল!

পেতে পারো। বলে কর্নেল টেলিফোন ছেড়ে দিলেন।

কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্ট পৌঁছুতে সাড়ে সাতটা বেজে গেল। ড্রয়িংরুমে হালদারমশাইকে দেখে বললুম, বাঃ! ট্রেনিং শেষ করে হালদারমশাইও এসে গেছেন দেখছি!

প্রাইভেট ডিটেকটিভ হাসতে হাসতে বললেন, ট্রেনিং একদিনেই শেষ।

সে কী!

কর্নেলস্যারেরে জিগান।

কর্নেল চুরুট টানছিলেন। একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, ট্রেনিং একদিনে শেষ হওয়ার কথা নয়। তবে হালদারমশাই একদিনেই জেনে ফেলেছিলেন, দরগা রোডে সাহিল খানের গ্যারেজের খদ্দের কারা। কারা বলছি। কারণ যা অনুমান করেছিলুম, মিলে গেছে।

হালদারমশাই বলে উঠলেন, সরলবাবুর হেডমেকানিক খোকন রঙের মিস্তিরিরে কইছিল, দরগা রোডে সাহিল মিয়ার গ্যারাজ আবার খুলবে। নতুন মালিক একজন ভালো রঙের মিস্তিরি খুঁজছেন। সরলবাবু পেমেন্ট ঠিকমতো করেন না। রঙের মিস্তিরি কইল, তুমি এখানে কাজ ছাড়লে আমিও ছাড়ব। দুইজনের কথা আমার কানে আইতেই ওত পাতছিলাম।

বললুম, বুঝলুম। কিন্তু নতুন মালিকদের একজন তো ঘনশ্যাম নন্দী। অন্যজন?

কর্নেলকে মুখ খোলার সুযোগ দিলেন না হালদারমশাই। বললেন, রায়সায়েবেরে দেখলাম অরা ভালোই চেনে। খোকন কইল, রায়সায়েবের জামাই তার বাড়িতে গেছিল। তখনই বুঝলাম প্রদোষ আর এক পার্টনার। কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলার পর হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিলেন।

কর্নেল বললেন, এটা স্বাভাবিক। রায়সায়েবের ফ্ল্যাটে প্রচুর নগদ টাকা থাকতেই পারে। দশ-বিশ লাখ টাকা নাকি ওঁর হাতের ময়লা ছিল।

বললুম, কিন্তু ঘনশ্যাম নন্দীকে তা হলে অর্ধেক টাকা দিতে হয়েছে। সাহিল খান পনেরো লাখে গ্যারেজ বেচছেন বলেছিলেন। ঘনশ্যামবাবু যদি মারোয়াড়ি ভদ্রলোকের কাছে পাঁচ লাখ আদায় করতে পারেন, বাকি আড়াই লাখ জোগাড় করা তার পক্ষে হয়তো অসম্ভব নয়।

হালদারমশাই বললেন, কী কন জয়ন্তবাবু! আমার ক্লায়েন্টের কাছে রায়সায়েবের ব্রিফকেসে পাঁচ লাখ টাকা ছিল। ঘনশ্যাম তা চুরি করছিল। কাজেই আড়াই লাখ টাকা দেওয়ার প্রব্লেম কীসের?

ষষ্ঠীচরণ আমার জন্য কফি আনল। কর্নেল বললেন, কফি খেয়ে নার্ভ চাঙ্গা করে নাও জয়ন্ত!

কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম, নার্ভ চাঙ্গা করে আমার লাভ নেই। চোর কে, তা জানা গেছে। কিন্তু প্রমাণ করা যাবে না। রায়সায়েবের রিভলভার কে চুরি করেছে, তা-ও জানার উপায় নেই। সত্যসেবক পত্রিকায় যে একটা চমকপ্রদ এক্সকুসিভ স্টোরি করব, তার আইনসম্মত ভিত্তিও তো নেই।

কর্নেল কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, এই সময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল হাঁক দিলেন, ষষ্ঠী!

একটু পরে গোপালনগর জয় মা নার্সারির সেই হারাধন মল্লিক ঘরে ঢুকলেন। কর্নেল বললেন, আসুন মল্লিকমশাই! বসুন!

মল্লিকমশাই সোফায় বসে হালদার-মশাইয়ের দিকে তাকালেন। ওঁকে চেনা-চেনা মনে হচ্ছে?

কর্নেল বললেন, আমার ঘরেই দেখেছেন। উনি মি. কে কে হালদার। আপনাকে যেমন মল্লিকমশাই বলি, ওঁকে তেমনই হালদারমশাই বলি। হালদারমশাই! বলুন তো ইনি কে?

গোয়েন্দাপ্রবর ফিক করে হাসলেন। চিনছি। আপনারে উনি কুমড়োপটাশ দিতে আইছিলেন!

মল্লিকমশাই হাসলেন না। কিন্তু কর্নেল ও আমি হেসে ফেললুম। কর্নেল বললেন, হ্যাঁ–জয়ভের ভাষায় কুমড়োপটাশ। ওগুলো একরকম ক্যাকটাস। প্রজাতির নাম লাতিন ভাষায় পারোদাইয়া সাঙ্গুইনিক্লোরা। লাল রঙের চমৎকার ফুল ফোঁটায়।

মল্লিকমশাই বললেন, কুমড়ো নয়, বরং আনারস বা গোল এঁচোড়ের সঙ্গে মিল আছে খানিকটা।

মল্লিকমশাইয়ের জন্য ষষ্ঠীচরণকে কফি আনতে বলে কর্নেল তার দিকে ঘুরলেন। কলকাতা এসেছিলেন কোনো কাজে। নাকি–

হারাধন মল্লিক মাথায় জড়ানো মাফলার খুলতে খুলতে কর্নেলের কথার ওপর বললেন, হ্যাঁ। কলকাতা এসেছিলুম নিজের কাজে। ফেরার পথে আপনাকে খবরটা দিতে এলুম।

বলুন। এঁদের সামনেই বলতে পারেন, যত গোপনীয় হোক।

হারাধন চাপা স্বরে বললেন, রাজেন মধ্যমগ্রামের সেই বাগানবাড়ি কিনছে বলেছিলুম। গতকাল বিকেলে বারাসতে গিয়ে বিশ্বস্ত সূত্রে শুনলুম, সেদিনই ডিড রেজেস্ট্রি হয়েছে। আজ সকালে ওর বাড়ি হয়ে এসেছি। কথায়-কথায় রাজেন স্বীকার করল, বাগানবাড়িটা কিনে বড় ভুল করেছে। গতরাত্রে ওখানে থাকতে গিয়েছিল। ভূতের উৎপাতে রাতদুপুরে মোটরসাইকেলে চেপে পালিয়ে এসেছে। বাগানবাড়িটা নাকি সত্যিই ভূতুড়ে। রাজেন ওটা বিক্রি করে দেবে। ওর কথা শুনে আমি একটু লোভে পড়ে গিয়েছিলুম। ঈশ্বরের আশীর্বাদে আমি যাকে গুরু ধরেছি, তিনি বিরাট শক্তিধর তান্ত্রিক। তাই আমার মনে বরাবর জোর আছে।

আপনি কিনতে চাইলেন?

হ্যাঁ। কিন্তু রাজেনের তো চক্ষুলজ্জার বালাই নেই। মুখের ওপর বলে দিল, তার হাতে তিরিশ লাখ টাকার অফার আছে। আমি কিনলে পঁচিশ লাখে দেবে। হাড়েবজ্জাত আর কাকে বলে। কিনেছে মাত্র পাঁচ কিংবা ছলাখ।

আমি চমকে উঠেছিলুম মল্লিকমশাইয়ের কথা শুনে। রায়সায়েব তো গত শনিবার মারা গিয়েছেন। তা হলে গতকাল ডিড রেজিস্ট্রি হলে কী করে? প্রশ্নটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। আচ্ছা মল্লিকমশাই! সম্পত্তি কেনা-বেচার ডিড রেজিস্ট্রি হয়ে কী ভাবে?

কর্নেল আমার দিকে চোখ কটমটিয়ে বললেন, আশ্চর্য জয়ন্ত! তুমি একজন সাংবাদিক। তা ছাড়া নিজে সল্টলেকে ফ্ল্যাট কিনেছ! তোমার জানা উচিত কী ভাবে রেজিস্ট্রেশন হয়।

বুঝলুম, প্রশ্নটা তোলা ঠিক হয়নি। কিন্তু মল্লিকমশাই বলে উঠলেন, মফস্সলে প্রপার্টি ডিড রেজিস্ট্রেশনে হাঙ্গামা নেই। ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার বা সাবরেজিস্ট্রার বিক্রেতার দিকে তাকিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করেন, টাকা পেয়েছেন? ব্যস! কেউ হয়তো আর একটা কথা জিজ্ঞেস করেন, কতখানি জমি বেচলেন? এইমাত্র।

হালদারমশাই সায় দিয়ে বললেন, ঠিক কইছেন। আমি দেখছি। বেশি কিছু জিগায় না।

ষষ্ঠী কফি দিয়ে গেল। মল্লিকমশাই কফি খেতে খেতে সহাস্যে বললেন, গুরুদেবকে বলে রাজেনের কেনা বাগানবাড়িতে আরও এক ডজন ভূত লেলিয়ে দেবার ব্যবস্থা করব।

কর্নেল বললেন, মল্লিকমশাই! ওই বাগানবাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপনের কথাগুলো নিশ্চয় ভুলে যাননি?

না। বড্ড গোলমেলে।

 শুধু ভূতের জন্য গোলমেলে নয় মল্লিকমশাই! আমার ধারণা শরিকি ঝামেলা আছে।

আলবাত আছে। রাজেন এখন তা জেনে গিয়েছে বলেই ভূতের বদনাম রটাচ্ছে। বুঝুক ঠ্যালা।

 কফি খাওয়ার পর হারাধন মল্লিক বিদায় নিলেন। এবার বললুম, আচ্ছা কর্নেল তা হলে রাজেন মুখার্জি একজন জাল রায়সাহেবকে রেজেস্ট্রি অফিসে হাজির করেছিলেন। তাই না?

কর্নেল চোখ বুজে কিছু ভাবছিলেন। বললেন, সে তো বোঝাই যাচ্ছে।

 এবার রায়সায়েবের মেয়ে-জামাই ডাক্তারের ডেথ সার্টিফিকেটের সাহায্যে রাজেনবাবুর বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা করলেই তো কেলেংকারি।

হালদারমশাই গুলিগুলি চোখে তাকিয়ে ছিনেল। বললেন, কর্নেলস্যার! এট্ট বুঝাইয়া কন তো!

কর্নেলকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। চোখ খুলে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে টেলিফোনের রিসিভার তুলে তিনি ডায়াল করতে থাকলেন। সাড়া এলে বললেন, শ্রীলেখা? আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।…হ্যাঁ। শোনো। রায়সায়েবের ফ্ল্যাটে ওঁর মেয়ে-জামাই এখনও আছে কিনা জানো?…তোমার বাবা ঠিক জানেন?… কখন?…আচ্ছা, রাখছি। …না, না। তোমার এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই।

রিসিভার রেখে কর্নেল ব্যস্তভাবে বললেন, জয়ন্ত! হালদারমশাই! কুইক! জিজ্ঞেস করলুম, কোথায় যাবেন?

দমদম এরিয়ায়। এক মিনিট। তোমার নিচে অপেক্ষা করো। আমি আসছি। বলে কর্নেল ভেতরের ঘরে চলে গেলেন।..

.

০৭.

কোথায় চলেছি, তা বুঝতে পেরেছিলুম। কিন্তু দমদম এলাকা আমার একেবারে অচেনা বললেই চলে। কর্নেলের সঙ্গে বারদুয়েক এই এলাকায় এসেছিলুম। কর্নেলের নির্দেশ অনুসারে অনেক ছোট-বড় রাস্তা এবং গলিতে ক্রমাগত বাঁক নিতে নিতে মোটামুটি চওড়া একটা রাস্তায় পৌঁছেছিলুম। কর্নেল বললেন, সামনে বাঁকের মুখে বাঁদিকে গাড়ি দাঁড় করাবে।

এই রাস্তার দুধারে কদাচিৎ দোকানপাট দেখা যাচ্ছিল। বাঁকে একটা পানের দোকানের কাছে ফুটপাত ঘেঁষে গাড়ি দাঁড় করালুম। স্ট্রিট-লাইট থেকে ফুটপাতে আলো ছড়াতে বাধা দিয়েছে সারবন্দি ঝাঁকড়া বেঁটে গাছ। গাড়ি লক করে কর্নেলকে অনুসরণ করলুম। বোঝা যাচ্ছিল, কর্নেল বাড়িটা চেনেন। তার মানে, আমার অজ্ঞাতসারে রায়সায়েবের আদত বাড়িটাতে এসেছেন।

বাঁদিকে একটা গেটের মাথায় আলো জ্বলছিল। কর্নেল সেখানে গিয়ে আস্তে ডাকলেন, ধরমবীর!

পাশের একতলা ছোট্ট ঘরের বারান্দা থেকে বেঁটে, ফো এবং মোটাসোটা একটা নোক এগিয়ে এল। তার মাথায় গেল ছাইরঙা টুপি, পরনে খাকি প্যান্ট এবং গায়ে জড়ানে আস্ত কম্বল। সে একবার অকারণ টর্চ জ্বেলেই নিভিয়ে দিল। তারপর কর্নেলকে দেখে সেলাম ঠুকে দাঁড়াল। হাসিমুখে বলল, আইয়ে কর্নিলসাব!

কর্নেল বললেন, তোমার সায়েব-মেমসায়েবের সঙ্গে দেখা করব ধরমবীর! শুনলুম, ওঁর এন্টালি এরিয়ার বাড়ি থেকে এ বাড়িতে ফিরেছেন।

জি হ্যাঁ কর্নিলসাব! আপনারা কৃপাসে এক মিনিট থামবেন। আমি খবর ভেজে আসছি।

ধরমবীর! তুমি আমার এই কার্ডটা নিয়ে যাও।

ধরমবীর কার্ড নিয়ে এগিয়ে গেল গাড়িবারান্দার দিকে। গাড়িবারান্দার ভেতরে আলো জ্বলছিল। দুধারে দুটো থাম। একটা গাড়ি দেখা যাচ্ছিল। দোতলার দুটো আলো জ্বলছিল।

হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন, এমন অভদ্র ক্যান? গেট খুলল না।

কর্নেল বললেন, গেট খুলে ধরমবীর ভেতরে নিয়ে গেল না। বোঝা যাচ্ছে ওর মালিকের নিষেধ আছে। তবে আমি যা আশঙ্কা করে ছুটে এলুম, তা ভুল মনে হচ্ছে।

জিজ্ঞেস করলুম, খুনখারাপির আশঙ্কা নয় তো?

কর্নেল গলার ভেতরে বললেন, চুপ!

অন্তত পাঁচ মিনিট পরে ধরমবীর ফিরে এসে ভেতরে থেকে গেটের তালা খুলে দিল। বলল, আসুন কর্নিলসাব!

আমরা ভেতরে ঢুকলে সে তালা আটকে দিল। তারপর আমাদের পাশ কাটিয়ে সামনে গেল। চাপা স্বরে বলল, রাজেনবাবু এসেছেন কর্নিলসাব! রাজেন মুখার্জি।

কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, উনি কখন এলেন?

সাব-মেমসাব আসলেন বিকালে। উনি আসলেন ছটার সময়ে। মোটরসাইকেলে আসলেন।

গাড়িবারান্দার কাছে গিয়ে দেখলুম, একটা মোটরসাইকেল দাঁড় করানো আছে। ধরমবীর আমাদের যে ঘরে বসতে বলল, সেটা বনেদি রীতির হলঘর। ভেতর থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। আমরা সোফায় বসলুম। ধরমবীর বলল, ছোটাসাব এক্ষুণি আসবেন।

দোতলায় কুকুরের ডাক শোনা গেল। তারপর একটা প্রকাণ্ড অ্যালসেশিয়্যান কুকুরের গলায় বাঁধা চেন হাতে ধরে বলিষ্ঠ গড়নের এক যুবক নেমে এল। কুকুরটা সম্ভবত হালদারমশাইকেই সহ্য করতে পারছিল না। তার দিকে ঝাঁপ দেবার ভঙ্গি করছিল।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, প্রদোষবাবু! কুকুরের উপদ্রবে যা বলতে এসেছি, তা বলা হবে না। কুকুরটাকে সরান। আর রাজেনবাবু এসেছেন, তাকেও ডাকুন।

প্রদোষ ভুরু কুঁচকে বলল, রাজেনকাকুকে আপনি চেনেন?

 চিনি। আপনিও আমাকে চেনেন–মানে, ডা. সুরেশ সরকার রোডে আপনার শ্বশুরের বাড়িতে আমি নিশ্চয় আপনার চোখে পড়েছিলুম। বিশেষ করে আমার এই মার্কামারা চেহারা সহজেই চোখে পড়ার কথা।

এই সময় সিঁড়ির ওপর থেকে রাজেনবাবুর কথা শোনা গেল। প্রদোষ! কাকে কুকুরের ভয় দেখাচ্ছ? কর্নেলসায়েবের আসল পরিচয় তুমি জানো না! কুকুর সরাও শিগগির।

প্রদোষ কুকুরের চেনটা ধরমবীরের হাতে দিয়ে বলল, জনিকে ওপরে রেখে এসো।

ধরমবীর কুকুরটাকে টানতে টানতে ওপরে নিয়ে গেল। ততক্ষণে রাজেন মুখার্জি নেমে এসেছেন। প্রদোষ একটু তফাতে বসল। তাকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলুম, এতক্ষণে মদের আসরে ছিল। রাজেনবাবু কর্নেলের মুখোমুখি বসে হাসতে হাসতে বললেন, আপনার কার্ড দেখামাত্র বুঝে গিয়েছি, আপনি আসলে আমাকেই ফলো করে এসেছেন। আচ্ছা কর্নেলসায়েব! আপনি আমাকে উড়োফোনের হুমকি থেকে বাঁচাবেন এই ভরসায় আছি। আর আপনি উল্টে আমাকে বিপদে ফেলার তালে আছেন। খুলে বলুন তো আমার অপরাধটা কী?

কর্নেল বললেন, রাজেনবাবু! আমি আপনার কাছে আসিনি। এসেছি প্রদোষবাবুর কাছে। আপনার সঙ্গে কথা বলার দরকার হলে টেলিফোনে বা আপনার বাড়িতে গিয়েই বলব। অন্যত্র নয়।

আপনার মেজাজ ভালো নেই মনে হচ্ছে। ঠিক আছে। প্রদোষের সঙ্গে কথা বলুন। আমি কেটে পড়ি।

বলে রাজেন মুখার্জি উঠে দাঁড়ালেন। প্রদোষ বলল, রাজেনকাকু! তুমি ওপরে গিয়ে বসতে পারো। এখনই চলে যাবে কেন?

আর বসব না। প্রায় সাড়ে নটা বাজে। কাল আমার অনেক কাজ।

রাজেনবাবু বেরিয়ে গেলেন। প্রদোষ তাকে বিদায় দিতে গেল। ততক্ষণে ধরমবীর কুকুর বেঁধে রেখে এসেছে। সে-ও দ্রুত বেরিয়ে গেল। তাকে গেটের তালা খুলে দিতে হবে।

হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন, কর্নেলস্যার! কেমন অভদ্র দ্যাখেন! আপনি একজন অনারেবল পার্সন। আপনারে রায়সায়েবের জামাই নমস্কার পর্যন্ত করল না?

কর্নেল একটু হেসে বললেন, আমি অন্য একটা কথা ভাবছি। এখানে প্রদোষ ও শর্বরী সায়েব-মেমসায়েব। এমন একটা বনেদি বাড়িতে বাস করে। গেটে দারোয়ানও আছে। অথচ এন্টালি এলাকার রায়সায়েবের ওই বাড়িতে তারা নিছক সাধারণ লোক হয়ে ওঠে। থানার পুলিশ পর্যন্ত পাত্তা দেয় না। তার মানে, মানুষের দরদাম বাড়ে-কমে পরিবেশ অনুসারে।

এই সময় প্রদোষ ফিরে এল। তারপর একটু তফাতে আগের মতো বসে কর্নেলকে বলল, আপনাকে সুরেশ সরকার রোডে তপেশবাবু আর তার মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলুম। তখন ভেবেছিলুম আপনি ওদের অফিসের লোক-টোক কেউ হবেন। এখন রাজেনকাকুর কাছে শুনলুম আপনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ।

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, না। রাজেনবাবু আপনার সঙ্গে জোক করেছেন। আসলে আপনার শ্বশুর রায়সায়েবকে আমি চিনতুম। আপনি আমাকে তপেশবাবু ও শ্রীলেখার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছেন, তা ঠিক। তপেশবাবুর সঙ্গে আমি আপনার শ্বশুর সম্পর্কে খবর নিচ্ছিলুম। যদি বলেন, আপনার বা আপনার স্ত্রীর সঙ্গে কেন দেখা করিনি, তাহলে বলব আপনাদের মানসিক অবস্থার কথা বুঝেই ডিসটার্ব করতে চাইনি।

প্রদোষ কর্নেলের কথা গ্রাহ্য করল বলে মনে হলো না আমার। সে বলল, ঠিক আছে। আমার কাছে কেন এসেছেন বলুন!

মধ্যমগ্রাম এলাকায় রায়সায়েবের একটা বাগানবাড়ি আছে।

প্রদোষ তার কথার ওপর বলল, শ্বশুরমশাই রাজেনকাকুকে বেচে দিয়েছেন।

কত টাকায় বেচেছেন? সেলডিড নিশ্চয় আপনি দেখেছেন?

দেখুন, শ্বশুরমশাই ছিলেন খেয়ালি লোক। যাকে পছন্দ করতেন, তাকে স্বর্গে তুলে দিতেন। রাজেনকাকুকে মাত্র ছলাখ টাকায় নন্দনকানন বেচেছেন, এতে অবাক হইনি। তবে পাঁচ লাখ অ্যাডভান্স দিয়ে ডিড করিয়েছিলেন, রাজেনকাকু। সেই টাকাগুলো শ্বশুরমশাইয়ের ফ্ল্যাট থেকে চুরি গিয়েছে। এতেও কিন্তু আমি অবাক হইনি। শ্বশুরমশাই নেশার ঘোরে দরজা খুলে রাখলে চুরি যেতেই পারে।

আপনি সেলডিড কি দেখেছেন?

দেখেছি। কিন্তু আপনি এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন?

বলছি। আগে বলুন, সেলডিড কি রেজিস্টার্ড ডিডের কপি? কারণ এত শিগগির রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ওরিজিন্যাল রেজিস্টার্ড ডিড পাওয়া যায় না।

প্রদোষ কর্নেলের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকাল। জানি। রাজেনকাকু আমাদের ল-ইয়ার মুকুন্দ হাজরার সামনে আমাকে যে ডিড দেখিয়েছেন, তা আনরেজিস্টার্ড। শ্বশুরমশাই মারা যাওয়ার দিন তাতে সই করেছিলেন। রাজেনকাকু বলেছেন, বাকি এক লাখ টাকা একমাসের মধ্যে দেবেন।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, এবার আমার কথাটা বলি। আমি প্রাইভেট ডিটেকটিভ নই। তিনি হালদারমশাইকে দেখিয়ে ফের বললেন, ইনি একজন বিগ বিজনেসম্যান। ইনি তিরিশ লাখ টাকায় নন্দনকানন কিনতে চান। রায়সায়েব যদি উইল করে তার সব সম্পত্তি আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর নামে দিয়ে থাকেন, নন্দনকাননের মালিকানা আপনাদেরই।

এই সময় সিঁড়ির ওপর থেকে কোনো মহিলার কর্কশ কণ্ঠস্বর শোনা গেল। বাবার উইলে সম্পত্তির মালিক আমি।

দেখলুম, নাইটির ওপর শাড়ি পরা গোলগাল গড়নের এক যুবতী চটি ফটফটিয়ে নেমে আসছে। সে প্রদোষের পাশে এসে দাঁড়াল। কর্নেল বললেন, আপনিই কি রায়সায়েবের মেয়ে শর্বরী?

হ্যাঁ। তখন থেকে শুনছি নন্দনকানন নিয়ে কথা হচ্ছে। বাবার উইল কোর্টে প্রোবেট করতে দিয়েছি। ওতে বাবার স্থাবর-অস্থাবর সব প্রপার্টি আমার নামে দেওয়া হয়েছে।

কর্নেল বললেন, বাঃ! এরকম স্ট্রেটকাট কথাবার্তাই আমি পছন্দ করি। আচ্ছা শর্বরী দেবী, উইলে কি নন্দনকাননের উল্লেখ আছে?

আছে। সেইজন্যই তো রাজেনকাকু রোজ এসে তেল দিচ্ছে আমাকে। ল-ইয়ার মুকুন্দবাবু বলেছেন, একবার উইল করার পর সেই উইল না বদলে কেউ তার কোনো স্থাবর সম্পত্তি বেচে দিতে পারে না। নন্দনকানন বেচে বাবা উইলের শর্ত ভেঙেছেন।

প্রদোষ বলল, আঃ শর্বরী! তুমি আকরণ মামলা-মোকদ্দমায় জড়ানোর প্ল্যান করেছ। আমি আরও দুজন বড় ল-ইয়ারের সঙ্গে কথা বলেছি তারা বলেছেন, উইলকারী নিজের প্রয়োজনে প্রপার্টির কোনো অংশ বেচতেই পারেন।

কর্নেল বললেন, শর্বরী দেবী! এই ভদ্রলোক নন্দনকানন কিনতে চান। তিরিশ লাখ টাকা দেবেন। আপনি রাজেনবাবুকে চাপ দিন। হা–আর একটা কথা। বলে তিনি আমাকে দেখালেন। এই ভদ্রলোক থাকেন বারাসতে। ইনিই মধ্যমগ্রাম এরিয়ায় রায়সায়েবের বাগানবাড়ির খোঁজ দেন আমার বিজনেসম্যান বন্ধুকে। দুজনেই এখানে উপস্থিত। তো যা বলছিলাম। বারাসাত রেজিস্ট্রেশন অফিস থেকে আজ কী খবর জেনেছেন, বলুন মি. চৌধুরি!

একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলুম। সামলে নিয়ে বললুম, গতকাল নন্দনকাননের মালিক রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে জনৈক রাজেন মুখার্জিকে–মানে, ফাঁকে কিছুক্ষণ আগে এখানে দেখলুম, তাকেই নন্দনকানন বেচে দিয়েছেন। ছলাখ টাকার দলিল রেজেস্ট্রি হয়ে গিয়েছে।

প্রদোষ কিছু বলতে যাচ্ছিল। শর্বরী চেঁচিয়ে উঠল আগেকার মতো কর্কশ কণ্ঠস্বর। কী? গতকাল বাবা রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে নন্দনকানন রেজেস্ট্রি করে দিয়েছেন? বাবা মারা গিয়েছেন গত শনিবার। রাজেনকাকু বাবার ভূতকে হাজির করিয়েছিল রেজেস্ট্রি অফিসে?

বললুম, প্লিজ! উত্তেজিত হবেন না। বরং কাল রেজেস্ট্রি অফিসে গিয়ে হেডক্লার্কের কাছে খবর নিন। নিজের পরিচয় দেবেন না যেন।

এতক্ষণে প্রদোষ বলে উঠল, শর্বরী! রাজেনকাকু আমাকে বলে গেলেন, এই কর্নেল ভদ্রলোক প্রাইভেট ডিটেকটিভ। তুমি এসব কথায় কান দিয়ো না। কাল সন্ধ্যায় নন্দনকাননে পার্টি দিচ্ছেন রাজেনকাকু। ওখানেই বাকি এক লাখ টাকা মিটিয়ে দেবেন।

শর্বরী খাপ্পা হয়ে বলল, তুমি চুপ করে থাকো! পার্টিতে তুমি গিয়ে স্ফূর্তি করবে। আমি কাল সকালে মুকুন্দবাবুকে সঙ্গে নিয়ে যাব। বাবার ডেথ সার্টিফিকেট দেখাব রেজেস্ট্রি অফিসে। তারপর থানায় গিয়ে জালিয়াতির কেস ঠুকে দেব রাজেন মুখার্জির নামে।

কর্নেল বললেন, শর্বরী দেবী! যা কিছু করবেন, সব যেন গোপনে করেন। রাজেন মুখার্জিকে আমি চিনি। সাংঘাতিক লোক।

শর্বরী বলল, আমার হাতেও সাংঘাতিক লোক আছে। গণেশকাকুকে এখনই ফোন করে সব জানাচ্ছি।

প্রদোষ বলল, শর্বরী! খামোখা ঝামেলা বাড়িয়ো না। রাজেনকাকু বাগড়া দিলে দরগা রোডের গাড়ির গ্যারেজ হাতছাড়া হয়ে যাবে। ঘনশ্যামবাবু আর আমি পঞ্চাশ হাজার করে এক লাখ টাকা অ্যাডভান্স দিয়েছি মনে রেখো।

শর্বরী ধমক দিল। রাখো তোমার গ্যারেজ! বলে সে আগের মতো চটি ফটফটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল।

প্রদোষ বলল, কোনো মানে হয়? ও মশাই! আপনারা এবার আসুন তো! খামোখা একটা অশান্তি বাধিয়ে দিলেন। বলে সে উঠে দাঁড়াল এক্ষুনি না গেলে আমি জনিকে লেলিয়ে দেব। চলে যান বলছি!

কর্নেল তুম্বো মুখে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, আপনাকে একটা কথা বলে যাওয়া উচিত প্রদোষবাবু! রাজেনবাবুর ফাঁদে পা দেবেন না। আপনার স্ত্রী বুদ্ধিমতী মহিলা। তাকে আপনি সাহায্য করুন। তা না হলে দুজনেই বিপদে পড়বেন।

প্রদোষ প্রায় গর্জন করল। থাক! কেটে পড়ুন এবার।…

গেটের বাইরে গিয়ে বললুম, আপনি সত্যিই একটা ঝামেলা বাধিয়ে এলেন। কর্নেল! পাঁচলাখ টাকা কে চুরি করেছে, এটাই ছিল মূল কেস। আপনি কেন যে বেলাইনে পা বাড়ালেন বুঝতে পারছি না।

হালদারমশাই উদ্বিগ্নভাবে বললেন, কিছু বুঝলাম না।

 কর্নেল বললেন, যথাসময়ে বুঝবেন।

 গাড়ি স্টার্ট করার পর কর্নেল বললেন, যে-পথে এসেছি, ওপথে নয়। সিধে চলো জয়ন্ত! সিঁথির মোড় হয়ে যাব। এত রাত্রে শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে ট্রাফিক জ্যামের ভয় নেই।

কিছুক্ষণ পরে তিনি চুরুট ধরালেন। চুরুটটা নিভে গিয়েছিল। হালদারমশাই বললেন, নস্য লই। ব্যাবাক ভুইল্যা গিছলাম। একখান ড্রামা দ্যাখলাম য্যান! মাথা ভোঁ ভোঁ করতাছে।

কর্নেল বললেন, জয়ন্ত বেলাইনে যাওয়ার কথা বলছিলে! বাইরে থেকে ট্রেনে হাওড়া স্টেশনের দিকে আসবার সময় অসংখ্য লাইন চোখে পড়ে। তাই না? তুমি জানো না, ট্রেন কোন্ লাইন ধরে গেলে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে পৌঁছোবে।

উপমা দিয়ে কর্নেল চুপ করে গেলেন। সারাপথ একেবারে চুপ।…

.

শীতকালে আমি পারতপক্ষে সাড়ে সাতটার আগে শয্যাত্যাগ করি না। ঘুম ভাঙলেও কম্বল মুড়ি দিয়ে পড়ে থাকি। পরদিন ঠিক ওই সময়টাতেই বিরক্তিকর টেলিফোনের শব্দ। মশারির ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে রিসিভার টেনে বলে দিলুম, রং নাম্বার!

রাইট নাম্বার ডার্লিং!

 গুড মর্নিং কর্নেল!

মর্নিং জয়ন্ত! বুঝতে পারছি বিছানা ছেড়ে ওঠোনি!

কোনো খবর আছে নিশ্চয়?

একটুখানি আছে। তবে আমার ইচ্ছে, তুমি এখনই বেরিয়ে পড়ো। কারণ আমার এখানে তোমার ব্রেকফাস্টের নেমন্তন্ন।

এখনই বেরুব? মানে, বাথরুম ইত্যাদি—

 তোমার ইচ্ছে।…

কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্ট সওয়া আটটা নাগদ পৌঁছে দেখি, তপেশ মজুমদার আর তার কন্যা শ্রীলেখা গম্ভীরমুখে বসে আছেন।

কর্নেল বললেন, হালদারমশাইও এসে পড়বেন। বোসো। পটে এখনও প্রচুর কফি আছে। তৈরি করে নাও।

কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম, আবহাওয়া গম্ভীর মনে হচ্ছে। নতুন কিছু কি ঘটেছে?

শ্রীলেখা বলে উঠল, আমি কী বলব? বাবাকে জিজ্ঞেস করুন। সবতাতে বাবার নাক গলানো চাই-ই। কিসে কী ঘটতে পারে একটুও চিন্তা করে না।

তপেশবাবু বললেন, ভুল যা হবার হয়ে গেছে। স্বীকার করছি, কথাটা আমার বলা উচিত ছিল। কিন্তু তখন যা অবস্থা, কথাটা বললে হিতে বিপরীত হবে ভেবেই বলিনি। গত রাত্রে ঠিক করলুম, চেপে রাখা ঠিক হচ্ছে না। তাই তোরবেলা তোকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলে দিলুম।

এই সময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল যথারীতি হাঁকলেন, ষষ্ঠী!

প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার হন্তদন্ত ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়ালেন। তার মক্কেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, গতরাত্রে ভাবছিলাম শ্রীলেখাকে ফোন করুম।

কর্নেল বললেন, বসুন হালদরমশাই! কফি খেয়ে আগে নার্ভ চাঙ্গা করুন।

হালদারমশাইকে কফি তৈরি করে দিয়ে কর্নেল বললেন, শ্রীলেখাকে কেন ফোন করবেন ভেবেছিলেন হালদারমশাই?

গোয়েন্দাপ্রবর বললেন, রায়সায়েবের গাড়ি এখনও ওখানে আছে, না লইয়া গেছে, তা জানবার ইচ্ছা ছিল।

শ্রীলেখা বলল, শর্বরী গাড়ির চাবি ঘনশ্যামকাকুকে দিয়ে এসেছিল। এখানে আসবার সময় দেখে এলুম, ঘনশ্যামকাকু গণেশকে গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে কোথায় গেল।

বললুম, তা হলে শর্বরী সদলবলে বারাসত যাবে। প্রদোষের তোয়াক্কা করবে না।

কর্নেল বললেন, ওসব কথা থাক। তপেশবাবু! আপনি এবার হালদারমশাইকে কথাটা জানিয়ে দিন।

তপেশবাবু একটু কেশে নার্ভাস ভঙ্গিতে বললেন, কথাটা আগে বলা উচিত ছিল।

শ্রীলেখা রুষ্টমুখে বলল, ভণিতা না করে সোজাসুজি বলো!

বলি। তপেশবাবু আবার একটু কাশলেন। শুক্রবার রাত্রে সমিতি থেকে ফিরে সিঁড়ি বেয়ে উঠছি, সেইসময় দেখলুম রায়সায়েব আমাদের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকতে যাচ্ছেন। আমাকে দেখে উনি বললেন, আসুন। একটু গল্প করা যাক। পরে বুঝতে পেরেছিলুম, উনি শ্রীলেখাকে টাকাভর্তি ব্রিফকেস লুকিয়ে রাখার জন্য সময় দিতে চেয়েছিলেন। তো আমি ওঁর ঘরে ঢুকে টের পেলুম, নেশা করে এসেছেন। জিজ্ঞেস করলুম, শ্রীলেখার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন বুঝি? উনি বললেন, হ্যাঁ। আপনার মেয়েকে বলছিলুম, শর্বরীর নামে প্রপার্টি উইল করে রেখেছি। কালই উইল বদলাব। তুই পূর্বজন্মে আমার মেয়ে ছিলিস। অন্তত এই বাড়িটা তোর নামে দিয়ে যাব। বলে উনি হঠাৎ পেট চেপে ধরে বললেন, পেটের ভেতরটা কেমন করছে। বসুন। বাথরুম থেকে আসি। তারপর যে-পোশাকে ছিলেন, সেই পোশাকেই বাথরুমে ঢুকে পড়লেন। মিনিট পাঁচেক পরে বেরিয়ে এসে বললেন, পেটের গণ্ডগোল হলো কেন বুঝতে পারছি না। ওঁকে হজমের ট্যাবলেট খেতে বললুম। উনি বেডরুমে গিয়ে পোশাক বদলে এলেন। বললেন, দুপুরে খাওয়াটা বড্ড বেশি হয়ে গেছে। তারপর আবার বাথরুমে ঢুকলেন। কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এসে টেবিলের ড্রয়ার থেকে দুটো ট্যাবলেট খেলেন। আমি বললুম, বরং ডাক্তারকে ফোন করুন। রায়সায়েব বললেন, দেখা যাক, এই ট্যাবলেটে কমে নাকি। মদের গন্ধ আমার সহ্য হয় না। উঠে চলে এলুম। বলে এলুম, দরজা আটকে দিন। উনি বললেন, দিচ্ছি।

হালদারমশাই কান খাড়া করে শুনছিলেন। এবার বললেন, রাত্রে আর খোঁজ লন নাই?

না। শীতের রাত্রে লেপের তলায় ঢুকলে আর বেরুতে ইচ্ছে করে না।

শ্রীলেখা বলল, আজ ভোরের ব্যাপারটা বলো!

তপেশবাবু বললেন, হ্যাঁ। আজ ভোরে নিচে নেমে দেখি, সেই কুকুরটা রায়সায়েবের গাড়ির তলায় শুয়ে আছে। তাকে ছড়ির খোঁচা মেরে তাড়িয়ে দিলুম। তারপর দেখি, কী একটা সাপের মতো জিনিস। ওখানে সাপ আসবে কোথা থেকে? তো

কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে ব্রাউন রঙের বেল্টসহ একটা ফায়ার আর্মর্স ঢোকানো চামড়ার কেস বের করে সহাস্যে বললেন, রায়সায়েবের হারানো রিভলভার!

চমকে উঠেছিলুম। হালদারমশাই বললেন, দেখি, দেখি!

কর্নেল খুদে একটা আগ্নেয়াস্ত্র বের করে বললেন, এ সত্যিকার রিভলভার নয় এবং পিস্তলও নয়। নেহাত একটা টয় পিস্তল। যাত্রা-থিয়েটারে বা সিনেমায় ব্যবহার করা হয়। নিছক খেলনা। এটা দেখিয়েই রায়সায়েব কত লোককে তটস্থ রাখতেন। চোর ব্যাপারটা টের পেয়ে সেই ব্রিফকেসটার মতোই এটা ফেলে দিয়েছে।

বললুম, সেই ব্রিফকেসটার মতোই মানে? মতোই বলছেন কেন?

কর্নেল একটু হেসে বললেন, নিজেই বুঝে নাও এর মানে কী?

 হালদারমশাই ফোঁস শব্দে শ্বাস ছেড়ে বলে উঠলেন, হঃ! বুঝছি।…

.

০৮.

তপেশবাবু ও শ্রীলেখা চলে যাওয়ার পর কর্নেল বললেন, হালদারমশাই! আপনাকে আজ একটা কাজের দায়িত্ব দেব।

হালদারমশাই বললেন, কন কর্নেল-স্যার!

একটু ঝুঁকি আপনাকে এ কাজে নিতেই হবে।

লমু! আমার লাইসেন্সড ফায়ার আর্মস আছে। খেলনার জিনিস না, সিক্স রাউন্ডার খাঁটি রিভলভার।

জানি। তাই বলে আপনাকে মানুষ খুন করতে বলছি না। আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুন। কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চোখ বুজে বললেন, মধ্যমগ্রাম এরিয়ার রায়সায়েবের বাগানবাড়ি নন্দন-কাননে যাওয়ার ম্যাপ এঁকে দিচ্ছি। আপনি সেখানে চলে যান। নন্দনকাননের কেয়ারটেকারের নাম রঘু। সাধুসন্ন্যাসীর মতো চেহারা। তবে প্যান্টশার্ট-সোয়েটার পরে থাকে। গাঁজা খায়। হা–ও বাড়িতে ঢুকলে দিনদুপুরেও ভূতের সাড়া পাবেন। কিন্তু ভয় পাবেন না। গ্রাহ্যও করবেন না। আপনি রঘুর সঙ্গে ভাব জমাবেন। আর ভাব জমাতে হলে আপনাকে সাধুসন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ ধরতে হবে। আপনি তো এ কাজ খুব দক্ষ এবং অভিজ্ঞ।

হঃ! আপনি দ্যাখছেন। জয়ন্তবাবুও দ্যাখছেন। কতবার সন্ন্যাসী সাজছি!

আজ সন্ধ্যায় নন্দনকাননে রাজেন মুখার্জি পার্টি দেবেন। কাজেই আপনার এখনই চলে যাওয়া দরকার। আপনি বাগানবাড়িটার কাছাকাছি গিয়ে জোরে ওং হ্রীং ক্রীং–এই রকম মন্ত্রটন্ত্র হুঙ্কার দিয়ে আওড়াবেন। আশা করি, রঘু আপনাকে খাতির করে নন্দনকাননে ঢোকাবে। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আছে। ঝোপজঙ্গল আছে। রঘুকে বলে আপনি ওখানে ঢুকে আসন করে বসবেন। শীতকালে সাপের ভয় নেই। রঘুকে বলবেন, গোপনে সাধনা করতে এসেছেন। এই জায়গাটা আপনার পছন্দ।

উত্তেজনায় গোয়েন্দাপ্রবরের গোঁফের দুই ডগা তিরতির করে কাঁপছিল। বললেন, ওসব যা করার আমি করব। আমার আসল কাজটা কী, তা-ই কন কর্নেলস্যার!

বলছি। আপনি এমন জায়গায় আসন করবেন—

 ধুনি জ্বালব না?

না। ধুনি জ্বাললে রাজেনবাবুর চোখে পড়বে। শুধু তা-ই নয়, অন্য কারও চোখে পড়বে। তো যা বলছিলুম। আপনি এমন জায়গায় আসন করবেন, যেখান থেকে মোটামুটিভাবে অনেকটা জায়গা চোখে পড়ে। কারও সন্দেহজনক গতিবিধি চোখে পড়লে লক্ষ্য রাখবেন। একটা কথা। সন্ধ্যায় বাগানবাড়িতে পার্টি হবে। কিন্তু বাড়িটা আলো দিয়ে সাজানো হবে কি না জানি না। আপনি তা টের পাবেন। যদি বাড়ির চারধারে আলো জ্বালা না হয়, আপনি বাড়ির কাছাকাছি লুকিয়ে থাকার মতো ঝোপঝাড় পাবেন। না–দিনে নয়, সন্ধ্যার সময় আপনি গোপনে ডেরা থেকে বের হবেন।

কিন্তু আমার আসল ডিউটিটা কী কইলেন না?

আপনি বিচক্ষণ মানুষ। আপনার প্রচুর অভিজ্ঞতা আছে এসব লাইনে। নিজের কাজ নিজেই বুঝতে পাররেন। দরকার শুধু তীক্ষ্ণ-দৃষ্টে নজর রাখা।

শুধু এই? আর কিছু না?

কর্নেল চোখ খুলে বললেন, বললুম না? কারও সন্দেহজনক গতিবিধি বা কাজকর্ম দেখলে উপস্থিত বুদ্ধি খাঁটিয়ে যা করা উচিত, তা-ই করবেন।

আপনারা ওখানে থাকবেন কি?

রাজেন মুখার্জি আমাদের নেমন্তন্ন করেননি। যদি করেন, থাকব। যদি না-ও করেন, আমরা থাকব।

আমি বললুম, কিন্তু হালদারমশাই কি বাড়ি থেকেই সন্ন্যাসী সেজে যাবেন?

প্রাইভেট ডিকেটটিভ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, অসুবিধা নাই। গেরুয়া কাপড়ের ঝুলি আছে। মড়ার খুলি আছে। আর যা দরকার, সবই সঙ্গে লমু। চিন্তা করবেন না।

কর্নেল বললেন, এক মিনিট। ম্যাপ এঁকে আপনাকে জায়গাটা কোথায়, তা বুঝিয়ে দিই। ওদিকটায় কাছাকাছি বসতি নেই। বাঁশঝাড়, পোড়া ইটখোলা, আমবাগান আর ধান বা সবজিখেত আছে।

কিছুক্ষণ পরে গোয়েন্দাপ্রবর যথারীতি যাই গিয়া বলে সবেগে বেরিয়ে গেলেন।…

ব্রেকফাস্ট করার সময় কর্নেল একটু হেসে বললেন, আজ সন্ধ্যার নাটকটা জমে উঠত, যদি ওখানে তপেশ মজুমদার আর তার মেয়ে উপস্থিত থাকত।

কেন?

এই সময় ড্রয়িংরুমে টেলিফোন বেজে উঠল। ডাইনিং রুমের পাশে কর্নেলের বেডরুমে টেলিফোন লাইনের এক্সটেনশন আছে। ষষ্ঠীচরণ টেলিফোন ধরতে পা বাড়িয়েছিল। কর্নেল নিজেই দ্রুত বেডরুমে গিয়ে ঢুকলেন। তার কথা শোনা যাচ্ছিল। হ্যাঁ, বলছি।…ঠিক আছে। আপনার চিন্তার কারণ নেই।…। একটু রিস্ক। তো নিতেই হবে।…ঠিক বলেছেন। ধড়িবাজ লোক। সবাইকে হাতে রেখেছে। বোঝা যাচ্ছে।…না, না। কিছু মনে করিনি। প্রথমে আপনাকে ভুল বুঝেছিলুম। পরে বুঝলুম, আপনি আমাকে মিথ্যা বলেননি। এ ধরনের জোক করা স্বাভাবিক। কারণ লোকটা তো প্রকাণ্ড লোভী।… আচ্ছা। ছাড়ছি। জাস্ট এ মোমেন্ট। আপনাকে গার্ড। দেওয়ার লোক থাকবে। কাজেই রিস্ক নিন।.থ্যাংকস।

কর্নেল ফিরে এলে বললুম, কার সঙ্গে কথা বলছিলেন?

 উনি চোখ কটমটিয়ে বললেন, খাওয়ার সময় কথা বলতে নেই।…

ব্রেকফাস্টের পর ড্রয়িংরুমে গিয়ে কর্নেল চুরুট ধরালেন। নিয়মমতো ষষ্ঠীচরণ কফি দিয়ে গেল। চুরুট এবং কফি পর্যায়ক্রমে সেবন করা কর্নেলের অভ্যাস।

কিছুক্ষণ পরে বললুম, এখন কি কোথাও বেরুবেন?

কর্নেল এ প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে টেবিলের নিচের ড্রয়ার খুলে একগুচ্ছের রঙিন ইংরেজি পত্রিকা বের করলেন। পত্রিকাগুলো দেখমাত্র চিনতে পারলুম, হালদারমশাই এগুলো সুরেশ সরকার রোডে শ্রীলেখাদের বাড়ির নিচের রাস্তায় আবর্জনার গাদায় কুড়িয়ে পেয়েছিলেন।

দেখলুম, কর্নেল পত্রিকাগুলো দুভাগ করে টেবিলে রাখছেন। বললুম, এগুলোর কথা ভুলেই গিয়েছিলাম কি ভাগাভাগি করছেন কেন?

কর্নেল হাসলেন। হালদারমশাইয়ের কুড়িয়ে পাওয়া পত্রিকাগুলো আমার। আর এইগুলো তুমি আমার কিটব্যাগ থেকে বের করতে দেখেছিলে। এগুলো তোমাকেই দিচ্ছি। এগুলো তোমার মতো যুবকের কাছেও লোভনীয়।

উনি খানছয়েক পত্রিকা আমার সামনে সোফায় সেন্টার টেবিলে ফেলে দিলেন। ওপরের পত্রিকাটার নাম দেখেই চমকে উঠলুম। এ সেই কুখ্যাত বা সুখ্যাত মার্কিন সেক্সম্যাগাজিন প্লেবয়! তখনই বাকি পত্রিকাগুলোর নাম দেখে নিয়ে দ্রুত পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে নগ্ন নারীদেহ, এমনকি জঘন্য অশালীন ও পাশবিক যৌনবিষয়ক ছবি চোখে পড়ার পর সশব্দে বুজিয়ে রাখলুম। বললুম, কর্নেল! আপনি আমার সঙ্গে এ ধরনের কদর্য রসিকতা করতে পারলেন? ছ্যা ছ্যা!

কর্নেলকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। বললেন, এই বৃদ্ধবয়সে আমার মতিচ্ছন্ন দশা ঘটেনি। কিংবা আমি মানসিক বিকারগ্রস্তও হইনি। সেই বয়সটা আমি পার হয়ে এসেছি জয়ন্ত!

তাহলে এগুলো রেখেছেন কেন? আমাকেই বা দেখতে দিলেন কেন?

গতরাত্রে তোমাকে হাওড়া স্টেশনগামী ট্রেনে বসে জটিল রেললাইনের উপমা দিয়েছিলুম। মনে করো, এটা তারই অন্তর্গত একটা রেলওয়ে ট্র্যাক।

প্লিজ কর্নেল! আর হেঁয়ালি নয়।

এগুলো আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলুম। হালদারমশাই যেমন ওগুলো কুড়িয়ে পেয়েছিলেন।

ওই পত্রিকাগুলোও কি এমনি সেক্স-ম্যাগাজিন?

নাঃ! তুমি এগুলোও দেখতে পারো! বলে কর্নেল পত্রিকাগুলো আমাকে দিলেন।

অবাক হয়ে দেখলুম, এই পত্রিকাগুলো সবই হর্টিকালচার এবং নার্সারি সংক্রান্ত। এদেশে এবং বিদেশে ছাপা রঙিন ছবিতে ভরা। কত রকমের ফুল, ক্যাকটাস, অর্কিড এবং বিচিত্র প্রজাতির উদ্ভিদের ছবি।

দেখে নিয়ে বললুম, রায়সায়েবের বাড়ির ওপরতলা থেকে এগুলো রাস্তায় পড়তে দেখেছিলেন হালদারমশাই। কিন্তু এই সেক্সম্যাগাজিনগুলো আপনি কোথায় কুড়িয়ে পেয়েছিলেন?

কর্নেল এবার একটু হেসে বললেন, ওই বাড়িতে একজন লোকের কাছে সবগুলো পত্রিকাই ছিল। হর্টিকালচার বা নার্সারি সংক্রান্ত পত্রিকার প্রতি তার অনুরাগ না থাকবারই কথা। তা ছাড়া এগুলো প্রকাশ্যে রাখলে বাড়ির লোকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। অত ঝুটঝামেলার চেয়ে এগুলো জানালা গলিয়ে ফেলে দেওয়াই ভালো। কাগজকুড়ুনিরা লুফে নেবে।

কিন্তু তাহলে সেক্সম্যাগাজিনগুলো সে কোন্ সাহসে রেখেছিল?

লোকটার মধ্যে স্বাভাবিক যৌনপ্রবৃত্তি আছে। তাই এগুলো সে রেখে দিয়েছিল।

আপনি পেলেন কোথায়?

কর্নেল কিছুক্ষণ মিটিমিটি হাসলেন। তারপর বললেন, বইয়ে পড়েছি, স্বাভাবিক যৌনশক্তি কমে যাওয়ার পর নাকি মানুষের অবচেতনায় যৌনবিকার সৃষ্টি হয়। তার চাপে মানুষ নানা উপায়ে যৌন অতৃপ্তি চরিতার্থ করতে চায়। এ নিয়ে বিশদ আলোচনা আমার রুচিতে বাধে। যাই হোক, আমাদের এই লোকটা সেক্সম্যাগাজিনের ছবি দেখে আনন্দ পেত। তাই এগুলো ফেলে দেয়নি। অর্থাৎ এগুলো রাখার লোভ সম্বরণ করতে পারেনি।

বিরক্ত হয়ে বললুম, কিন্তু আপনি এগুলো পেলেন কোথায়?

 কুড়িয়ে পাইনি। চুরি করেছি।

বলেন কী! কোথা থেকে চুরি করলেন, তা বলতে এত লুকোছাপা করার মানে হয় না।

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, সেদিন আমি পিঠে কিটব্যাগ আর ক্যামেরা-বাইনোকুলারসহ তপেশবাবুর বাথরুমে ঢুকেছিলুম দেখে তুমি অবাক হয়েছিলে!

সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলুম, কী আশ্চর্য! তা হলে আপনি তপেশবাবুর বাথরুম থেকে এই সেক্সম্যাগাজিনগুলো চুরি করেছিলেন?

ঠিক ধরেছ।

কিন্তু আপনি কেমন করে জানলেন যে বাথরুমে–

কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আমি অন্তর্যামী নই। আমার সত্যি বাথরুমে যাওয়ার দরকার হয়েছিল। তাই বলে দৈবাৎ বাথরুমে এগুলো চোখে পড়েছিল, এমন নয়। খুলেই বলি। ওই ফ্ল্যাটে দুটো বাথরুম আছে। ভেতরকার বাথরুমটা শ্রীলেখা ব্যবহার করে, এটাই স্বাভাবিক। আর, বসার ঘরের সংলগ্ন বাথরুমটা তপেশবাবু করেন, এ-ও স্বাভাবিক। তাই তপেশবাবুর বাথরুমটা আমার দেখার দরকার ছিল।

কিন্তু কেন?

আমি খুঁজছিলুম পত্রিকাগুলো তপেশবাবু কোথায় রেখেছেন? পত্রপত্রিকা লোকে বসার ঘরে সোফাসেটের সেন্টার টেবিলের ওপরে বা তলায় রাখে। সেখানে খবরের কাগজ ছাড়া কোনো পত্রিকা দেখিনি।

আপনি কেমন করে জানলেন তপেশবাবুর কাছে এই পত্রিকাগুলো আছে?

অঙ্ক জয়ন্ত! স্রেফ অঙ্ক!

ওঃ কর্নেল! আপনার মুখে অঙ্কটঙ্ক শুনলে মাথার ভেতরটা তালগোল পাকিয়ে যায়।

তুমি সেদিন একটু কান খোলা রাখলে শুনতে পেতে, আমি শ্রীলেখাকে জিজ্ঞেস করেছিলুম, তার বাবার ম্যাগাজিন পড়ার অভ্যাস আছে কি না। শ্রীলেখা বলেছিল, তার বাবা শুধু নিউজপেপার পড়েন।

এই সময় টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। ততক্ষণে আমার মনে পড়ে গেল, সেদিন কর্নেল শীলেখাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তার বাবা ম্যাগাজিন পড়েন কি না। শ্রীলেখা বলেছিল, বাবা শুধু নিউজপেপার পড়ে।

টেলিফোন কর্নেলকে বলতে শুনলুম, ..মল্লিকমশাই! আপনি যা ভালো বুঝেছেন, তা-ই করেছেন। আপনি তো জানেন, জমিজমা বা প্রপার্টির ব্যাপার আমার কোনো জ্ঞানগম্যি নেই।…কুড়ি লাখ?…অ্যাডভান্স করেছেন। নাকি?…বলেন কী! বাগান-বাড়িটার নাম তো সুন্দর। নন্দনকানন। বাঃ! খুব ভাল।…আজ সন্ধ্যায়? কিন্তু আমাকে তো রাজেনবাবু নিমন্ত্রণ করেননি। বিনা নিমন্ত্রণে পার্টিতে যাই কী করে?…হ্যাঁ। তখন যাব। আপনি কিনে বরং নিজেই একটা পার্টি দেবেন। না হয় পিকনিক।…দশ লাখ অ্যাডভান্স? বেশ তো! কিন্তু ডিড রেজিস্টার্ড কিনা জেনে নিয়েছেন তো?…রেজিস্টার্ড ডিডের কপি হলে আর কথা কী?…হ্যাঁ। নিজের ল-ইয়ার সঙ্গে নিয়ে যাওয়া উচিত।…আচ্ছা! ছাড়লুম।

রিসিভার রেখে কর্নেল আমার দিকে তাকালেন। বললুম, সর্বনাশ! হারাধন মল্লিককে কুড়ি লাখে নন্দনকানন বেচছেন রাজেনবাবু? মল্লিকমশাইকে আপনি নিষেধ করলেন না?

কর্নেল বললেন, মল্লিকমশাইকে নিষেধ করলেও শুনবেন বলে মনে হয় না। বিজ্ঞাপন দেখার পর থেকেই ওঁর মাথায় ওই বাগানবাড়িটা ঢুকে গিয়েছে। আর, নিষেধ করতে হলে সব কথা খুলে বলতে হয়। টেলিফোনে অত কথা বলা সম্ভব নয়। যাই হোক, এতক্ষণে বোঝা গেল রাজেনবাবু নন্দনকাননে পার্টি দিচ্ছেন কেন এবং এ-ও বোঝা গেল, কাউকে জাল রায়সায়েব সাজিয়ে এত শিগগির ডিড রেজিস্ট্রি করালেন কেন। রেজিস্টার্ড ডিডের নকল বের করেছেনও খুব তাড়াতাড়ি। মল্লিকমশাই খুলে না বললেও বোঝা যাচ্ছে, রাজেনবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। রাজেনবাবু এই দাঁও ছাড়তে চাননি। যত শিগগির হাতে কুড়ি লাখ টাকা আসে, তত ওঁর সুবিধে। আকাশে পাখা মেলবেন।

বললুম, তা বুঝলুম। কিন্তু রায়সায়েবের মেয়ে-জামাইকে রাজেনবাবু নেমন্তন্ন করতে গেলেন কেন?

ওরা উপস্থিত থাকলে মল্লিকমশাইয়ের মনে আর কোনো সন্দেহের ছিটেফোঁটাও থাকবে না। ভেবে দ্যাখো জয়ন্ত, আমি যদি শর্বরীকে খুঁচিয়ে না দিতুম–অর্থাৎ কাউকে জাল রায়সায়েব সাজিয়ে ডিড রেজিস্ট্রি করার কথা না বলে দিতুম, শর্বরী ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাত না। যদি বা ঘামাত, রাজেনবাবু আর প্রদোষ আইনের ফ্যাকড়া দেখিয়ে তাকে চুপ করিয়ে রাখত।

সবাই বোঝা গেল। কিন্তু শ্রীলেখার বিছানা থেকে ব্রিফকেস ভর্তি টাকা চুরি করল কে?

তপেশবাবু আর তার মেয়ের দৃঢ় বিশ্বাস, ঘনশ্যাম নন্দীই চোর।

আপনার বিশ্বাসটা কী, তা-ই বলুন!

কর্নেল আবার একটা চুরুট ধরিয়ে একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, আশা করি, আজ সন্ধ্যায় এই রহস্যের পর্দা তুলতে পারব।…

কথামতো সেদিন বিকেল তিনটেয় আমার সল্টলেকের ফ্ল্যাটে কর্নেল ট্যাক্সি চেপে পৌঁছুলেন। আমি তৈরি ছিলুম। গ্যারাজ থেকে আমার গাড়ি বের করে বললুম, ইতিমধ্যে নতুন কিছু ঘটেনি তো?

গাড়িতে চেপে কর্নেল বললেন, সাড়ে বারোটায় প্রদোষ টেলিফোন করেছিল।

তার মানে, আপনাকে খুব ধমক দিল? গণেশকে আপনার পিছনে লেলিয়ে দেবে বলল?

কর্নেল আমার রসিকতায় কান দিলেন না। বললেন, ঘনশ্যাম নন্দী গিয়ে শর্বরীকে বুঝিয়ে দিয়েছে, শ্রীলেখার সঙ্গে রায়সায়েবের অবৈধ সম্পর্কের কথা সে। জানে। তার মেয়ে রেখাও ব্যাপারটা জানে। রায়সায়েবের ব্রিফকেসভর্তি পাঁচ লাখ টাকা শ্রীলেখা হাতিয়ে নিয়েছে। তাই তার বিরুদ্ধে শর্বরী ও প্রদোষ কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা জানবার জন্যই শ্রীলেখা প্রাইভেট ডিটেকটিভ হায়ার করেছে। সেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ শর্বরীকে মিসলিড করতে চায়।

প্রদোষ বলল?

হ্যাঁ। প্রদোষ এইসব কথা বলার পর আমাকে থ্রেট করল। তুমি ঠিকই ধরেছ। আমি যদি ওদের ব্যাপার নাক গলাই, তা হলে গণেশ তার দলবল নিয়ে আমার ওপর হামলা করবে। ইলিয়ট রোডের কাছেই রিপন স্ট্রিট এলাকায় গণেশের লোকজন আছে।

তা হলে শর্বরী বারাসত যায়নি?

না। কাজেই আজ সন্ধ্যায় নন্দনকাননে রাজেনবাবুর পার্টিতে ওরা যে যাবে, তা ধরে নেওয়া যায়। ঘনশ্যাম ও গণেশও সম্ভবত যাবে। কারণ সাহিল খানের গ্যারাজ কেনার ব্যাপারে নাকি রাজেনবাবুর সাহায্য প্রদোষ ও ঘনশ্যামের দরকার। প্রদোষ নিজের মুখেই তা কাল রাত্রে বলছিল। তুমি শুনেছ সে-কথা।

রাজেনবাবুর সাহায্য মানেটা কী?

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, বেরিয়ে পড়ার আগে বেনেপুকুর থানার এক পরিচিত অফিসারকে ফোন করেছিলুম। তিনি বললেন, সাহিল খানের নামে চোরাই গাড়ি সংক্রান্ত একটা মামলা ঝুলছে। তাই তার গ্যারেজের কাজকর্ম বন্ধ। ও দুজন মেকানিককে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছিল। এইসব কারণে সাহিল খানের গ্যারেজে কেউ কাজ করতে চায় না। গ্যারেজ অচল হয়ে গেছে। বেচে না দিয়ে উপায় কী?

কিন্তু রাজেনবাবুর ভূমিকাটা কী?

রাজেন মুখার্জি সাহিল খানের বন্ধু। তার কেস মিটিয়ে দেবার ব্যাপারে রাজেনবাবু অনেকদিন ধরে তদ্বির করছেন। প্রায়ই নাকি তিনি বেনেপুকুর থানায় একজন নামজাদা ক্রিমিন্যাল ল-ইয়ারকে নিয়ে যাতায়াত করেন। আদালতের। বাইরে ওরকম একটা কেস মিটমাট হওয়া নিশ্চয় কঠিন। কিন্তু এতেই সাহিল খানের রাজেনবাবুর প্রতি অনুরক্ত হওয়া স্বাভাবিক।

অনুরক্ত বলে গ্যারেজের দরদাম কমাবেন সাহিল খান?

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, থিয়েটার রোড এলাকার সেই গ্যারাজের মালিক সরলবাবুকে টেলিফোন করে বাকিটুকু জেনেছি। বলেছিলুম না? ওঁদের পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা থাকে। সরলবাবু খবর পেয়েছেন, সাহিল খান তিন লাখ অ্যাডভান্স পেয়েছেন। বাকি বারো লাখ ছমাসের মধ্যে দুই কিস্তিতে নেওয়ার পর সেলডিড রেজিস্ট্রি হবে। ছমাস কাজ চালাতে পারলে টাকা শোধ করা ঘনশ্যামের পক্ষে কঠিন নয়। এদিকে প্রদোষ তো তার পাশে থাকছে। মোদ্দা কথা, রাজেন মুখার্জি ওদের গ্যারান্টার।

প্রদোষের সোর্স অব ইনকাম কী! রায়সায়েব তো তার পালিতা কন্যা আর তার স্বামীকে বিশ্বাস করতেন না।

ওটা তার নিছক পাগলামি ছিল। কিংবা শ্রীলেখা বানিয়ে বলেছে। তুমি একটু চিন্তা করলেই বুঝবে, পালিতা কন্যার প্রতি অমন সাংঘাতিক সন্দেহ থাকলে কি তিনি তার নামে সব সম্পত্তি উইল করতেন?

সত্যিই উইল করে গিয়েছেন কি না কে জানে!

আমি জানি। জেনেছি। তোমাকে বলেছিলুম, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। আস্তে সুস্থে এগোব। মধ্যে দুটো দিন আমি ঠাণ্ডা মাথায় অনেকটা এগিয়ে যেতে পেরেছি। বলে কর্নেল ঘড়ি দেখছেন। তুমি কিন্তু বড্ড বেশি তাড়াহুড়ো করছ জয়ন্ত! আস্তে গাড়ি চালাও। সাড়ে তিনটের মধ্যে এয়ারপোর্টের মোড়ে এসে গেলুম?

এটা কিন্তু স্বাভাবিক স্পিড, বস! এই রাস্তায় এর চেয়ে আস্তে চালালে অ্যাকসিডেন্টের আশঙ্কা ছিল।

তুমি বস বলা ছাড়ো ডার্লিং! লালবাজারের ডি সি ডি ডি ওয়ান অরিজিৎ লাহিড়ির দেখাদেখি তুমি বস বলা শুরু করেছ! অরিজিতের মুখে এটা মানায়। বলে কর্নেল বাঁদিকে ঘুরে কিছু দেখতে থাকলেন।

ডাইনে মোড় নিয়ে যশোর রোড দিয়ে গাড়ি চলেছে। সামনে গাড়ির লম্বা লাইন। যে-কোনো সময় যানজট বেধে যেতে পারে। কর্নেল বললেন, বাঃ! সময় কাটানোর চমৎকার জায়গা। বাঁদিকে গাড়ির চাকা নামিয়ে দাও। অসাধারণ নামটা তো! বন্ধুমহল! হট অ্যান্ড কোল্ড ড্রিংকস-এই শীতে কেউ কোল্ড ড্রিংক খাবে কি? আসলে সাইনবোর্ডের লেখা বদলানোর মানে হয় না। শুধু পানীয় নয়। কেক, প্যাস্ট্রি-সন্দেশ পর্যন্ত! এমন কি চাউমিনও! ডার্লিং! আমরা দুপেয়লা কফি নিয়ে ভেতরে বসব। এখানে গাড়ি রাখার অসুবিধে নেই।

কর্নেল মাঝে মাঝে–যাকে বলে, ফানি হয়ে ওঠেন। আমাদের খুব খাতির করে ঢোকাল বন্ধুমহলে। পিঠে কিটব্যাগ আঁটা এবং গলায় বাইনোকুলার-ক্যামেরা ঝোলানো সাদা দাড়িওয়ালা মাথায় টুপিপরা উজ্জ্বল গৌরবর্ণ বৃদ্ধকে দেখে যে বন্ধুমহলের উর্দিপরা পরিচারকরা বিদেশি ট্যুরিস্ট ভেবেছে, তাতে আমি নিঃসন্দেহ। এ-ও ভেবেছে, প্রেস স্টিকার আঁটা গাড়ি মানেই যখন খবরের কাগজের গাড়ি, তখন এক সাংবাদিক সদ্য এয়ারপোর্টে প্লেন থেকে নামা এই বৃদ্ধ সায়েব ট্যুরিস্টকে কোথাও কোনো দর্শনীয় স্থান দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে।

এর ফলে দুপেয়ালা কফির বিল এল কুড়ি টাকা।

টাকা অবশ্য কর্নেলই দিলেন। তারপর যখন আবার গাড়িতে চেপে স্টার্ট দিলুম, তখন আলো জ্বলে উঠেছে। সাড়ে চারটেতেই ছদ্ম-সন্ধ্যার ঘোর। তাকে জমাট করেছে রাস্তার যানবাহনের চাকা থেকে উৎক্ষিপ্ত ধুলোবালি। একেই বলে ধোঁয়া।….

মধ্যমগ্রামের চৌরাস্তার কাছে সেদিনকার মতো সাদা পোশাকে প্রশান্ত ব্যানার্জি অপেক্ষা করছিলেন। ব্যাকসিটে বসে তিনি চাপা স্বরে কর্নেলকে বললেন, বড়বাবুর কোয়ার্টারের সামনে গাড়ি রাখাটা সেফ। যেখানে-সেখানে গাড়ি রাখা উচিত হবে না। গতকাল এক ভদ্রলোকের বাড়ির সামনে থেকে একটা গাড়ি চুরি হয়েছে।

প্রশান্তবাবুর নির্দেশে আঁকাবাঁকা রাস্তা ও গলি ঘুরে পুলিশ কোয়ার্টারের গেট পেরিয়ে একখানে গাড়ি দাঁড় করালুম। তারপর প্রশান্তবাবু আমাদের দোতলায় নিয়ে গেলেন। ওসি-র সঙ্গে আলাপ হলো। শৈলেশ সিংহ তার নাম। কর্নেলের সঙ্গে তার কথাবার্তা থেকে বুঝতে পারলুম, পুলিশ ফোর্স তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে। ছটার মধ্যে নন্দনকাননের পিছনে গিয়ে ওত পাতবে। আমরা পৌঁছুব সওয়া ছটা নাগাদ।

অবাক হয়ে ভাবছিলুম, এ ধরনের এলাহি কাণ্ডের উদ্দেশ্য কী? একটা বাগানবাড়িতে পার্টি হচ্ছে। সেখানে সেই বাড়িটা বিক্রির ব্যাপারে দশ লাখ টাকা আডভান্স দেওয়া-নেওয়া এমন কি বেআইনি কাজ? এ তো ইনকাম ট্যাক্সের লোকেদের হানা দেওয়া নয়। পুলিশ হানা দেবে। কেন হানা দেবে?

কিছুক্ষণ পরে শৈলেশ সিংহের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লুম। একটু পরে বুঝলুম, অন্যপথে নন্দনকাননের দিকে চলেছি। প্রায় মিনিট কুড়ি পরে (আমার অনুমান মাত্র) সামনে একটু দূরে অনেকগুলো আলো দেখতে পেলুম। তারপর ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে একটা পাঁচিলের কাছে যেই পৌঁছেছি, হালদারমশাইয়ের গর্জন ভেসে এল। হ্যান্ডস আপ। এটুখানি নড়লে হালার খুলি উড়াইয়া দিমু। সেই সঙ্গে টর্চের আলো জ্বলে উঠল।

পাঁচিলটা ফুট ছয়েক উঁচু। পাঁচিল ডিঙিয়ে পুলিশের লোকেরা ঢুকে পড়ল। কর্নেল আমার হাত ধরে টানলেন। কিন্তু তার আগেই পাঁচিলের ওপর মুখ বাড়িয়ে দেখে নিয়েছি, রাজেনবাবুর হাতে ছোরা এবং একটা লোক পিছু হটছে।…

.

০৯.

কর্নেল আমার হাত ধরে টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে গেটের সামনে গিয়ে বলেছিলেন, পুলিশ পাঁচিল ডিঙিয়েছে। কাজেই আমাদের পাঁচিল ডিঙিয়ে যাওয়ার দরকার নেই।

আমি হতবাক। গেটের বাইরে এবং ভেতরে কয়েকটা গাড়ি দেখতে পেয়েছিলুম। বাড়ির সামনের দিকে অনেকগুলো আলো জ্বলছিল। ঘরের ভেতরও। যথেষ্ট আলো। কিন্তু বাকি তিনদিক অন্ধকার।

বারান্দায় ওঠার আগে কর্নেল ডেকেছিলেন, হালদারমশাই! আপনি কোথায়?

বাড়ির পিছন দিক থেকে তার কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছিল।ড্রেস চেঞ্জ করতাছি কর্নেলস্যার!

সামনে চওড়া একটা ঘরের ভেতর বিশাল ডিমালো গড়নের একটা শ্বেতপাথরের টেবিল ঘিরে যাঁরা বসে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে রাজেনবাবুর লইয়ার কুমুদ সেনগুপ্ত, হারাধন মল্লিক, প্রদোষ ও শর্বরীকেই শুধু চিনতে পেরেছিলুম। টেবিলে কয়েকটা হুইস্কি ও রামের বোতল, কয়েকটা ডিশে স্থূপীকৃত মাছভাজা, কষা মাংস, চানাচুর, পাঁপরভাজা ইত্যাদি চোখে পড়েছিল।

সবাই পুতুলের মতো নিস্পন্দ হয়ে বসে ছিল। পাশের ঘর থেকে কয়েকজন লাঠি ও বন্দুকধারী পুলিশ এসে ঢুকল। তারপর রাজেন মুখার্জিকে পেছনে দুই হাতে হাতকড়া পরানো অবস্থায় ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে এলেন প্রশান্ত ব্যানার্জি। তাঁর পিছনে ওসি শৈলেশ সিংহ ছিলেন। তিনি যাকে নিয়ে এলেন, তাঁকে দেখে চমকে উঠলুম। তিনি কুমুদবাবুর জুনিয়র সেই শৈবাল ঘোষ।

শৈবাল ঘোষের মুখে উদ্ভ্রান্ত ভাব এবং পোশাকও এলোমেলো। তিনি ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছিলেন। অতিকষ্টে বললেন, জল খাব।

শৈলেশ সিংহ টেবিল থেকে জলের আস্ত জগটা তুলে তাঁকে দিলেন শৈবালবাবু ঢকঢক করে জল খেয়ে বললেন, আমি বসব।

একজন কনস্টেবল তাকে কোণের দিক থেকে একটা চেয়ার এসে দিল। তিনি ধপাস করে বসে বড়লেন। তারপর দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলেন। শৈলেশ সিংহ, তার পিঠে হাত রেখে বললেন, চিয়ার আপ শৈবালবাবু! কর্নেলসায়েব আপনাকে রক্ষার জন্য উপযুক্ত গার্ড রেখেছিলেন। ছোরাটা দিন প্রশান্তবাবু।…

প্রশান্ত ব্যানার্জির হাতে একটা ছোরা ছিল। ওটাই আমি একপলকের জন্য রাজেনবাবুর হাতে দেখেছিলুম। শৈলেশ সিংহ ছোরাটা দেখিয়ে কুমুদবাবুকে বললেন, রাজেন মুখার্জি এটা দিয়েই আপনার জুনিয়র অ্যাডভোকেটের মুখ চিরকালের জন্য বন্ধ করতে চেয়েছিল।

পারে নাই! বলে সদর্পে হালদারমশাই এসে ঘরে ঢুকলেন। আমি ওত পাতছিলাম। এনারে লইয়া বাড়ির পিছনে কয় পাও গেছে, অমনই টর্চ জ্বালছি। এক সেকেন্ড দেরি হইলে ফাসাইয়া দিত। আচমকা এনার পেটে ধাক্কা মারছিল এই হালায়। ইনি ধাক্কা খাইয়া মাটিতে পড়লে বাঁচার উপায় ছিল না।

শৈবালবাবু হাঁসফাঁস করে জড়ানো গলায় বলে উঠলেন, আমাকে ওই খুনে শয়তান একটা গোপন কথা বলবে বলে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। আসলে আমি কুপেগ হুইস্কি খেয়ে ফেলেছিলুম। তাই।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, থাক। চুপচাপ বসে থাকুন। হালদারমশাই! আপনার চ্যালা কোথায় গেল?

হালদারমশাই চমকে উঠলেন। অ্যাঃ! সে গেল কই? বলে তিনি বেরুতে যাচ্ছেন, একজন কনস্টেবল রঘুকে নিয়ে দরজার সামনে এল।

রঘু কাঁদোকাঁদো মুখে বলল, আমি তো পালাইনি। এই বলাইদার সঙ্গে কথা বলছিলুম। আমি পালাব কেন?

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, রঘু একজন ম্যাজিসিয়ান। ভেনট্রিলোকুইজ অর্থাৎ স্বরজাদুর কথা আপনারা নিশ্চয় জানেন। রঘু সেই বিদ্যায় ওস্তাদ। সেদিন বিকেলে সে আমাদের কাছে বসে স্বরজাদুর খেলা দেখিয়েছিল। সে আমাদের কাছে, অথচ এই ঘরের ভেতর থেকে গোঙানির শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমিও এই বিদ্যাটা জানি। ওর গলার দিকে লক্ষ্য রেখেই টের পেয়েছিলুম। এই বাড়িকে রঘু ভূতের বাড়ি করে ফেলেছে। কিন্তু কার হুকুমে? মিঃ সিংহ! রঘুর কাছে কথাটা জেনে নিন।

শৈলেশ সিংহ তার পেটে রুলের গুতো মারতে এলে রঘু বলে উঠল, রাজেনবাবু আমাকে মাসে-মাসে তিরিশ টাকা করে দিতেন। রায়সায়েবের ওয়াইফ সুইসাইড করার পর থেকে রাজেনবাবু আমাকে এই কাজে লাগিয়েছিলেন জিজ্ঞেস করুন মিথ্যা বলছি, না সত্যি বলছি।

শৈলেশ সিংহ বললেন, এই রাজেনবাবু কেমন করে জানল যে তুই এই ম্যাজিক জানিস?

রাজেনবাবুই তো আমাকে রায়সায়েবের এই বাগানবাড়িতে চাকরি জুটিয়ে দিয়েছিলেন। আমি কলকাতার ফুটপাত ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়াতুম। খুব কষ্টে ছিলুম। তারপর একদিন–

তাকে থামিয়ে কর্নেল বললেন, রায়সায়েবের কাছ থেকে এই বাগানবাড়ি শস্তায় কেনার জন্যই রাজেন মুখার্জি রঘুকে কাজে লাগিয়েছিল। তবে ও কথা থাক। আপনারা সব পুতুলের মতো বসে আছেন কেন? কী মল্লিকমশাই? দশ লাখ টাকা কি অ্যাডভান্স করে ফেলেছেন?

হারাধন মল্লিক বললেন, আজ্ঞে না। এই যে আমার ল-ইয়ার যতীনবাবু। ইনি চুপিচুপি বলেছিলেন, এই মদের আসরে টাকা অ্যাডভান্স করা বা দলিলপত্র সই করানো ঠিক হবে না।

টাকা কি সঙ্গে আছে আপনার?

মল্লিকমশাই হাসবার চেষ্টা করে বললেন, আমার মাথা খারাপ? টাকা আমি গাড়িতে রেখে এসেছি। আমার ছেলে অশোক গাড়িতে বসে আছে।

হালদারমশাই শৈবালবাবুকে দেখিয়ে বললেন, কিন্তু এনারে রাজেন হালায় জবাই করত ক্যান?

কর্নেল বললেন, সংক্ষেপে বলছি। গত সপ্তাহে শুক্রবার সন্ধ্যায় নতুন ব্রিফকেসের ভেতর পাঁচ লাখ টাকা ভরে রায়সায়েব ডিডে সই করেছিলেন। রাজেনের লইয়ার কুমুদবাবু এখানে আছেন। তাঁর বাড়ি থেকে রায়সায়েব সন্ধ্যায় টাকাভর্তি নতুন ব্রিফকেস নিয়ে নিজের গাড়িতে ওঠেন। তার সঙ্গে ওঠে এই রাজেন মুখার্জি এবং কুমুদবাবুর জুনিয়র শৈবালবাবু। শৈবালবাবু ব্যাকসিটে বসে ছিলেন। গাড়ি ড্রাইভ করছিলেন রায়সায়েব। এয়ারপোর্ট হোটেলের বারে রাজেন। রায়সায়েবকে সেলিব্রেট করার প্রস্তাব দিয়েছিল। রায়সায়েব মদে আসক্ত মানুষ। তিনজনে বারে ঢোকেন। টেবিলে তিনজনে হুইস্কি খাচ্ছিলেন। একসময় শৈবালবাবুর চোখে পড়ে, রাজেনের ব্রিফকেসটাও নতুন এবং একই কোম্পানির তৈরি। বয়স্ক এবং ভগ্নস্বাস্থ্য এক বৃদ্ধ মানুষ মহেন্দ্র রায়ের অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে রাজেন দুটো কাজ করে। শৈবালবাবু প্রথমটা দেখতে পেয়েছিলেন। রাজেন টেবিল থেকে ওঠার সময় রায়সায়েবের ব্রিফকেসটা নিয়ে নিজের ব্রিফকেসটা রায়সায়েবের হাতে তুলে দেয়। দ্বিতীয়টা আমি তদন্ত করে জেনেছি। রায়সায়েবের গ্লাসে রাজেন কড়া জোলাপ জাতীয় কোনো তরল ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিল। তার ফলে বাড়ি ফিরে তিনি পেটের অসুখে আক্রান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে গিয়ে হার্টফেল করে মারা যান।

শর্বরী এতক্ষণে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। প্রদোষ বলল, পরে কাঁদবে। কথাগুলো শোনো।

কর্নেল বললেন, রায়সায়েবকে রাজেন যে ব্রিফকেসটা দিয়েছিল, তাতে ভরা ছিল প্রচুর রঙিন বিদেশি ম্যাগাজিন। এক ডজন আর্টপেপারে ছাপা ম্যাগাজিনের ওজন আছে। রায়সায়েবের পক্ষে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বোঝা সম্ভব ছিল না তার ব্রিফকেসে আসলে কী আছে কিংবা তার ব্রিফকেসটা বদল হয়ে গিয়েছে।

প্রদোষ বলল, সেই ব্রিফকেসটা কেউ চুরি করেছিল। পরে তালাভাঙা অবস্থায় শ্বশুরমশাইয়ের গাড়ির তলায় সে ফেলে রেখেছিল ব্রিফকেসটা।

কর্নেল বললেন, হালদারমশাই সুরেশ সরকার রোডে রায়সায়েবের বাড়ির নিচে আবর্জনার গাদায় কতকগুলো রঙিন ম্যাগাজিন কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। সেগুলো হর্টিকালচার এবং নার্সারি সংক্রান্ত দামি ম্যাগাজিন। সেগুলো দেখামাত্র আবার সন্দেহ জেগেছিল, রাজেন এই মল্লিকমশাইয়ের নার্সারির পার্টনার ছিল। এদিকে সেদিনই ব্রিফকেসটা তালাভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে। অমনই আমার সন্দেহ হলো, রাজেন কি কোনো এক সুযোগে শুক্রবার রাত্রে ব্রিফকেস বদল করে রায়সায়েবকে ফাঁকি দিয়েছিল? সেইসময় রাজেনের মুখে শুনলুম, কেউ তাকে পাঁচ লাখের অর্ধেক দেবার জন্য হুমকি দিচ্ছে। সে কে হতে পারে? কেন সে হুমকি দিচ্ছে? আমার মনে পড়ে গেল, শুক্রবার রাত্রে কলকাতা ফেরার সময় শৈবালবাবু সঙ্গে ছিলেন। তাই সোজা তাকে টেলিফোনে চার্জ করলুম। পুলিশের ভয় দেখালুম। এমনকি তাকে রাজেনবাবুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য বাইরে কোথাও যেতে বললুম। প্রথমে শৈবালবাবু লোভে পড়েছিলেন। পরে আমার সঙ্গে গোপনে দেখা করে ব্রিফকেস বদলের ঘটনা বললেন। আমি ফাঁদ পাতার সুযোগ খুঁজছিলুম। পেয়েও গেলুম। মল্লিকমশাইয়ের নন্দনকানন কেনার প্রচণ্ড ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ডিড তো আনরেজিস্টার্ড। তাই রাজেন কাউকে জাল রায়সায়েব সাজিয়ে ডিড রেজিস্ট্রি করেছে। এই খবরও পেয়ে গেলুম। রেজিস্টার্ড ডিডের নকল বের করা সহজ। #জেন এই পার্টির আয়োজন করল। সে ইতিমধ্যে টের পেয়েছিল শৈবালবাবু তার ব্রিফকেস বদল দেখেছেন। কারণ আমি শৈবালবাবুকে পরামর্শ দিয়েছিলুম, আসল ঘটনা বলে রাজেনের ওপর চাপ দিন। রাজেন আজ পার্টিতে তাকে নিমন্ত্রণ করে। রফা করতে চেয়েছিল। শৈবালবাবুকে সে কাঁদে ফেলতে চেয়েছিল কিন্তু শৈবালবাবুকে আমি টোপ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলুম।

শৈলেশ সিংহ বললেন, সাংঘাতিক রফা! অবশ্য আপনার টোপও সাংঘাতিক।

হ্যাঁ। আমি বুঝতে পেরেছিলুম, রাজেন শৈবালবাবুর মুখ চিরকালের জন্য বন্ধ করতে না পারলে এই বাগানবাড়ি কেউ কিনবে না। শৈবালবাবু তাঁর সিনিয়র কুমুদবাবুর কাছে ক্রেতার খোঁজ পাবেন এবং জাল রায়সায়েব সাজিয়ে রাজেনের ডিড রেজেস্ট্রির কথা ফাঁস করে দেবেন।

প্রদোষ বললেন, আমার শ্বশুরমশাইয়ের ফায়ার আর্মস চুরি গেছে।

কর্নেল হাসলেন। ওটা নিছক টয় পিস্তল। যাত্রা-থিয়েটার-সিনেমায় ব্যবহার করা হয়। রায়সায়েবের অনেক বদনাম ছিল পুলিশ মহলে। তাঁর সত্যিকার ফায়ার আর্মসের লাইসেন্স পেতে অসুবিধে ছিল। তাই তিনি ওই টয় পিস্তল দেখিয়ে বহু লোককে তটস্থ রাখতেন। টয় পিস্তলটা আমার হাতে এসে গেছে। আমি ওটা কুড়িয়ে পেয়েছি। এই দেখুন।

বলে কর্নেল ওসি শৈলেশ সিংহকে বেল্ট এবং কেসসুদ্ধ টয় পিস্তলটা পরীক্ষা করতে দিলেন। মি. সিংহ সেটা দেখার পর হেসে ফেললেন। হ্যাঁ। নিছক খেলার অস্ত্র!

শর্বরী কান্নাজড়ানো গলায় বলে উঠল, আমি বুঝতে পেরেছি। তপেশবাবুর মেয়ে শ্রীলেখাই বাবার ব্রিফকেস আর ওই টয় পিস্তল চুরি করেছিল। তারপর সে যখন দেখল, ব্রিফকেসে টাকা নেই, আর ওটা টয় পিস্তল, তখন একে-একে দুটোই ফেলে দিয়েছিল।

কর্নেল বললেন, শ্রীলেখা যে চুরি করেছিল, তা যখন প্রমাণ করা যাবে না, তখন চুরি নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। তার চেয়ে বড় কথা, ফেলে দেওয়া ব্রিফকেসে টাকার বদলে ম্যাগাজিন ভরা ছিল। আর সত্যিকার ফায়ার আর্মসের বদলে আপনার বাবা টয় পিস্তল সঙ্গে রাখতেন। কাজেই যে-ই চুরি করুক, তার চুরি নিষ্ফল হয়েছে। শৈলেশবাবু! আমি এবার বিদায় নিচ্ছি। আপনারা আপনাদের কর্তব্য পালন করুন। আসুন হালদারমশাই! জয়ন্ত! চলে এসো।

প্রশান্ত ব্যানার্জি বললেন, এক মিনিট কর্নেলসায়েব! আপনাদের সঙ্গে দুজন কনস্টেবল দিচ্ছি। পুলিশ কোয়ার্টারে আপনাদের গাড়ি আছে। কনস্টেবলরা সিকিউরিটির লোককে বলে না দিলে গাড়ি বের করার প্রব্লেম হবে।

.

কলকাতা ফেরার পথে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে কে হালদার নন্দনকাননে তাঁর অভিজ্ঞতার বিররণ দিচ্ছিলেন। বিবরণ শেষ হলে তিনি একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন, কিন্তু রায়সায়েবের ব্রিফকেস শ্রীলেখার ঘরে বিছানার তলায় রাখা ছিল। সেই ব্রিফকেস চুরি গেল। মিস্ত্রি সলভ করনের জন্যই শ্রীলেখা আমার সাহায্য চাইছিল। সেই মিস্ত্রি তো সভ হইল না!

কর্নেল বললেন, আপনার মিস্ট্রি আশা করি জয়ন্ত সভ করে দিতে পারবে।

হালদারমশাই অবাক হয়ে বললেন, আঃ! জয়ন্তবাবু? কন কী?

বললুম, হালদারমশাই! শুধু এটুকু বলতে পারি শ্রীলেখার বাবা তপেশ মজুমদার রায়সায়েবের ব্রিফকেসে রাজেন মুখার্জির ভরে রাখা পত্রিকাগুলো হাতিয়েছিলেন।

গোয়েন্দাপ্রবর বললেন, তার মানে, তপেশবাবুই ব্রিফকেস চুরি করছিলেন?

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। তপেশবাবু তাঁদের সমিতি থেকে ফিরে তাঁর ফ্ল্যাটে রায়সায়েবকে কথা বলতে শুনে আড়ি পেতেছিলেন। এটাই আমার অঙ্ক। এছাড়া তার পক্ষে শ্রীলেখাকে রায়সায়েবের ব্রিফকেস রাখতে দেওয়ার খবর কোনোভাবেই জানা সম্ভব নয়।

বললুম, কিন্তু মেয়ের বিছানার তলা থেকে ব্রিফকেস চুরি করে তপেশবাবু কোথায় তা লুকিয়ে রেখেছিলেন?

তার বাথরুমে। শ্রীলেখা তার বাবার বাথরুমে কেন ঢুকবে? ধরা যাক, বাবাকে যদি সে সন্দেহ করেও থাকে, তার বাথরুমে পাঁচ লাখ টাকা ভর্তি ব্রিফকেস রাখার সম্ভাবনা সে আঁচ করতে পারেনি। অত টাকা কি কেউ বাথরুমে রাখে? কিন্তু আসল কথাটা হলো, নিজের বাবাকে শ্রীলেখা সন্দেহই করেনি। ওটা ওর নিছক মুখের কথা। বাবাকে সন্দেহ করলে প্রাইভেট ডিটেকটিভের সাহায্য কি সে তার বাবার মাধ্যমে চাইত? নিজেই গোপনে কোনো প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির কাছে যেত। আজকাল কাগজে এসব এজেন্সির বিজ্ঞাপন প্রায়ই ছাপা হয়।

হালদারমশাই খিক খিক করে হেসে উঠলেন। ব্রিফকেসে টাকার বদলে ম্যাগাজিন দেইখ্যা তপেশবাবুর কী অবস্থা!

কর্নেল বললেন, তবে খানছয়েক ম্যাগাজিন তার দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছিল।

 বললুম, হ্যাঁ। সেক্সম্যাগাজিনগুলো।

হালদারমশাই ব্যাকসিট থেকে ঝুঁকে এলেন। কী কইলেন? কী কইলেন?

বললুম, কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে কফি খেতে খেতে দেখবেন। একটু অপেক্ষা করুন।

কর্নেল বললেন, টয় পিস্তলটা কিন্তু চুরি করেছিল স্বয়ং শ্রীলেখা। এ-ও আমার অঙ্ক।

সে কী! শ্রীলেখা ওটা চুরি করবে কেন?

অঙ্ক কষে দ্যাখো। রায়সায়েব তাকে পাঁচ লাখ টাকা রাখতে দিয়ে মারা পড়েছেন। অতএব সেই টাকা রক্ষা করার স্বাভাবিক তাগিদে রায়সায়েবের বিছানা থেকে ওটা সে চুরি করেছিল। সে ওটা সত্যিকার ফায়ার আর্মস ভেবেছিল। টাকাভর্তি ব্রিফকেস চুরি গেল। তারপর সেটা পাওয়া গেল রায়সায়েবের গাড়ির তলায়। তখন হতাশ শ্রীলেখা ঘনশ্যাম নন্দীকে চোর সন্দেহ করে তাকে গুলি করে মারতে চেয়েছিল। অর্থাৎ মারার প্ল্যান করেছিল, এটা অনুমান করা যায়। কিন্তু ফায়ার আর্মসটা ব্যবহার করতে গিয়েই সে বুঝতে পারে, এটা খেলনা মাত্র। তখন সে রায়সায়েবের গাড়ির তলায় ফেলে দেয়। যাই হোক, আমার অঙ্ক নির্ভুল তার প্রমাণ কাল সকালে পাবে। তপেশবাবু আর শ্রীলেখাকে কাল সকাল নটার মধ্যে আসতে বলেছি।

বললুম, ছেড়ে দিন। বাবা-মেয়েকে আর হ্যারাস করে কী হবে?

 হালদারমশাই শুধু বললেন, হঃ!…

বুকমার্ক করে রাখুন 0