শঙ্খচূড়ের ছায়া

শঙ্খচূড়ের ছায়া

০১.

সদাশিব চক্রবর্তী ঘরে ঢুকে বললেন, কর্নেল সায়েবের কাছে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে এলুম। আপনি বিজ্ঞ বহুদর্শী মানুষ। নানারকমের অভিজ্ঞতা আছে।

তিনি সোফায় বসে তারপর আমাকে দেখতে পেলেন। আরে! জয়ন্তবাবুও আছেন দেখছি। ভালই হলো। সাংবাদিকরাও অনেকরকম খবরাখবর রাখেন। আপনিও বলুন।

চক্রবর্তীমশাই কর্নেলের প্রতিবেশী এবং তার সমবয়সী। হাইকোর্টের ঈদে অ্যাডভোকেট ছিলেন। এখন আর প্র্যাকটিস করেন না। এই শীতে তার পরনে গলাবন্ধ ওভারকোট এবং পাজামা। হাতে একটা কালো ছড়ি। মাথায় মাফলার জড়ানো।

কর্নেল খবরের কাগজ পড়ছিলেন। ভাজ করে রেখে বললেন, বলুন চক্রবর্তীমশাই!

সদাশিব চক্রবর্তী বললেন, কথাটা হলো, শীতকালে সরীসৃপেরা শুনেছি গর্তের ভেতর ঘুমিয়ে থাকে। এটা নাকি তাদের হাইবারনেশন পিরিয়ড। তাই না?

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু আপনার প্রশ্নটা কী?

 প্রশ্নটা হলো, সাপও তো সরীসৃপ। কিন্তু শীতকালে সাপের কামড়ে মৃত্যু তাহলে অস্বাভাবিক কি না?

সব কিছুতেই ব্যতিক্রম আছে চক্রবর্তীমশাই! ধরুন, যে গর্তে কোনো বিষাক্ত সাপ ঘুমোচ্ছে, দৈবাৎ কেউ সেখানে হাত ঢোকালে বা পা পড়লে সহজাত প্রবৃত্তিবশে সাপটা ছোবল দেবেই।

বুঝলুম। কিন্তু খটকা থেকে যাচ্ছে।

 কেন?

চক্রবর্তীমশাই হাসলেন। সাপ কি ড্রাকুলার মতো গলার পাশে দাঁত বসায়?

কর্নেল তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি বললুম, ধরুন। এমন তো হতেই পারে। যাকে সাপে কামড়েছে, সে দৈবাৎ পা হড়কে ঘুমন্ত সাপের কাছে এমন অবস্থায় পড়েছিল, যাতে সাপ তার গলার অংশটাই নাগালে পেয়েছিল।

চক্রবর্তীমশাই মাথা নেড়ে বললেন, নাহ্। তবু খটকা থেকে যাচ্ছে। কারণ পরদিন আরও একজন বিষাক্ত সাপের কামড়ে মারা গেল এবং তারও গলার পাশে ঠিক ড্রাকুলার কামড়ের মতো দুটো ক্ষতচিহ্ন। একই এরিয়ায়।

কর্নেল একটা চুরুট ধরিয়ে বললেন, চক্রবর্তীমশাই! এমন কোনো খবর এখনও কাগজে বেরোয়নি। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, এটা আপনার একেবারে টাটকা অভিজ্ঞতা। এবার ব্যাপারটা খুলে বলুন। শোনা যাক।

এইসময় ষষ্ঠীচরণ কফি আনল। চক্রবর্তীমশাই মাথা থেকে মাফলার খুলে কফির পেয়ালা তুলে নিলেন। তারপর কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, কর্নেলসায়েব ঠিকই ধরেছেন। আমার মেয়ে তপতীর বিয়ে দিয়েছি হাজিগঞ্জে। আমার জামাই অশোক ওখানে নামকরা ডাক্তার। নার্সিংহোম খুলেছে। এদিকে তপতীও ডাক্তার। ওরা দুজনে নার্সিংহোম চালায়।

সাপেকাটা লোক দুটোকে কি সেই নার্সিংহোমে আনা হয়েছিল?

হ্যাঁ। তবে প্রথমে নিয়ে গিয়েছিল সরকারি হাসপাতালে। সেখানকার ডাক্তার বলেছিলেন, তার কিছু করার নেই। তখন অশোকের নার্সিংহোমে এনেছিল। অশোকের কাছে ডেথ সার্টিফিকেট আদায় করেছিল।

বডির পোস্টমর্টেম হয়েছিল?

না। মফস্বলের ব্যাপার। সাপেকাটা ডেডবডির পোস্টমর্টেম করাতে চায় না। প্রথম দিনের বডিটা কুড়ি-একুশ বছরের একটি ছেলের। ওদের একটা ক্লাব আছে। ক্লাব থেকে গঙ্গার ধারে জঙ্গলে একটা পোডড়াবাড়ির কাছে ওরা গিয়েছিল পিকনিক করতে। কিছু ছেলে ওখানে ক্রিকেট খেলছিল। খেলার সময় বলটা পাঁচিলঘেরা পোডড়াবাড়ির ভেতর গিয়ে পড়ে। একজন পাঁচিল ডিঙিয়ে বলটা আনতে যায়। তারপর আর তার পাত্তা নেই। ডাকাডাকি করে শেষে ওরা পাঁচিল ডিঙিয়ে ভেতরে ঢোকে। তারপর দেখে সেই ছেলেটি আগাছার জঙ্গলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে।

দ্বিতীয় দিনের ঘটনাটা বলুন!

ভদ্রলোক একজন রিটায়ার্ড স্কুলটিচার। সেই পোডড়াবাড়ির একটা অংশ গঙ্গায় ধসে পড়েছে। উনি নাকি প্রায়ই সেখানে গিয়ে বসে থাকতেন। শুনলুম, মাথায় একটু ছিট ছিল। পরদিন বিকেলে জেলেরা নৌকোয় ওখানে মাছ ধরতে গিয়ে ভদ্রলোককে দেখতে পায়। উপুড় হয়ে পড়েছিলেন। গলার পাশে সূক্ষ্ম। দুটো ক্ষতচিহ্ন।

আপনার মেয়ে-জামাই দুজনেই ডাক্তার। তাদের কী মত?

অশোকের মতে, আপাতদৃষ্টে বিষাক্ত সাপের কামড়ে মৃত্যুর সব লক্ষণ প্রকট। তপতীর মতে, পোস্টমর্টেম করলে বোঝা যেত। যাই হোক, ওদের দুজনের মতে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ওই এলাকায় নাকি বিষাক্ত সাপের ডেরা। বিশেষ করে একবার ওখানে একটা শঙ্খচূড় সাপ মারা পড়েছিল কোন শিকারির গুলিতে।

কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার ভেতর বললেন, কিন্তু আপনার মনে একটা সন্দেহ দেখা দিয়েছে?

চক্রবর্তীমশাই কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, হাঃ। শঙ্খচুড় হোক কি গোখরো হোক, ড্রাকুলা–মানে ভ্যাম্পায়ারের মতো গলায় দাঁত বসাবে কেন? বলতে পারেন এটা কোইনসিডেন্স। কিন্তু আমার খটকা থেকে গেছে। হাজিগঞ্জ খুব পুরনো শহর। হিস্টোরিক্যাল প্লেস।

কর্নেল হাসলেন। জানি। তবে নামটা হাজিগঞ্জ নয়, হিউজেসগঞ্জ। লোকের মুখে মুখে হাজিগঞ্জ হয়ে গেছে।

চক্রবর্তীমশাই ভুরু কুঁচকে তাকালেন। বলেন কী! আপনি কখনও গেছেন নাকি ওখানে?

বছরখানেক আগে গিয়েছিলুম। আপনি যে জঙ্গলটার কথা বললেন, ওখানে একসময় রেশমকুঠি ছিল! রবার্ট হিউজেস নামে একজন ইংরেজ সেই রেশমকুঠির পত্তন করেন। তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল। আর যে পোড়োবাড়িটার কথা বললেন, ওটার নাম ছিল গঙ্গাভবন। বিক্রম সিংহ নামে একজন রাজপুত বাড়িটা তৈরি করেন। তার বংশধরদের পদবির সঙ্গে পরে পাটোয়ারি শব্দটা জুড়ে যায়। কারণ তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে পড়েন। মোহন সিংহ পাটোয়ারির নাম কি আপনি শুনেছেন?

সদাশিব চক্রবর্তী চোখ কপালে তুলে বললেন, ওরে বাবা! আপনি যে আমার জামাইয়ের দেশের হাঁড়ির খবর রাখেন দেখছি। হ্যাঁ। তাই বলছিলুম না, আপনি বহুদর্শী মানুষ! পাটোয়ারিজিকে বিলক্ষণ চিনি। ওঁদের কলকাতাতেও ট্রেডিং এজেন্সি আছে। সত্যি বলতে কি, ওঁর বাবা ধনপত সিংহ পাটোয়ারি ছিলেন আমার মক্কেল। তার কাছেই তো তপতীর জন্য উপযুক্ত ছেলের খোঁজ পেয়েছিলুম। গত মাসে ধনপতজি মারা গেছেন।

চক্রবর্তীমশাই ঘড়ি দেখে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর চোখ নাচিয়ে বললেন, মোহনজির সঙ্গে আপনার যখন আলাপ আছে, তখন আপনি একবার গিয়ে ওখানে নাক গলান কর্নেলসায়েব! খটকা মোহনজিরও মনে বেধেছে। হাবেভাবে বুঝতে পেরেছি, উনিও ব্যাপারটা স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারেননি। আচ্ছা চলি! এখন এক ভদ্রলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন। নয় তো আরও ডিটেলস আলোচনা করা যেত। জয়ন্তবাবু! এই টোপটা গিলে ফেলুন। অন্য কাগজের হাতে পড়ার আগেই আপনি বাজিমাত করে দিন।

চক্রবর্তীমশাইকে গম্ভীর দেখায় বটে। তবে তিনি আমুদে মানুষ। চোখে-মুখে নানা ভঙ্গি করে বেরিয়ে গেলেন।

কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানছিলেন। বললুম, আপনাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে কর্নেল!

কর্নেল চোখ খুললেন না। বললেন, শঙ্খচূড় সাপের স্বভাব হলো তাড়া করে ছোবল মারা। লেজে ভর দিয়ে ছড়ির মতো সোজা হতে পারে এরা। কাজেই গলায় দাঁত বসানোতে অস্বাভাবিক কিছু দেখছি না। তবে–

তবে?

অর্ধেন্দুবাবুর মৃত্যুটা দুঃখজনক। উনিই আমাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, গঙ্গভবনে বিষাক্ত সাপের আড্ডা। অথচ উনি ওখানে দিব্যি ঘুরে বেড়াতেন। দূর থেকে বাইনোকুলারে ওঁকে দেখেছিলুম।

আর্ধেন্দুবাবু কে?

সেই রিটায়ার্ড স্কুলটিচার! বলে কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন। গত শীতে হিউজেসগঞ্জে বেড়াতে গিয়ে মোহন সিংহ পাটোয়ারির সঙ্গেও আলাপ হয়েছিল। গঙ্গার ধারে ওঁর একটা এগ্রিকালচারাল ফার্ম আছে। সেই ফার্মের পশ্চিমে গঙ্গার অববাহিকায় বিশাল একটা জলা। শীতের সময় নানাদেশের জলপাখি এসে সেখানে জোটে। পাখি দেখতে গিয়ে মোহনজির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। ওঁর অনুরোধে একদিন ফার্মহাউসের বাংলোতে কাটিয়েছিলুম। জয়ন্ত! সরডিহা যাওয়ার প্রোগ্রাম বাতিল করে হিউজেসগঞ্জ গেলে মন্দ হয় না।

শঙ্খচূড়রহস্যের সমাধানে?

কর্নেল হাসলেন। নাহ্। নীলসারস দর্শনে। মোহনজির ফার্মে অনেক গাছপালা আছে। হিমালয়বাসী নীলসারস জলা থেকে উড়ে এসে ফার্মের গাছে বসে থাকে। গতবার অনেক চেষ্টা করেও নীলসারস-দম্পতির ছবি তুলতে পারিনি। এবার গিয়ে

কর্নেল হঠাৎ চুপ করলেন। বললুম, চলে যান।

কর্নেল তুম্বো মুখে বললেন, নাহ। সরডিহার প্রোগ্রাম বাতিল করা ঠিক নয়। কুমারবাহাদুর রাজেন্দ্রপ্রতাপ দুঃখ পাবেন। মনে-মনে চটে যাবেন। ওঁর আমন্ত্রণে রাজি হয়ে যাওয়ার পর আর না করা চলে না। তাছাড়া ওখানে পাহাড়-জঙ্গল নদীর একটা রোমাঞ্চকর আকর্ষণ আছে। তুমি তা হলে আগামী পরশু ট্যাক্সি করে আমার এখানে চলে আসবে। গাড়ি এনো না। নিচের গ্যারাজ আর খালি নেই। সময়টা মনে আছে তো? বিকেল তিনটেয় এখানে পৌঁছানো চাই। হাওড়া স্টেশনে ট্রেন অবশ্য সন্ধ্যা সাড়ে ছটায়। তবে হাতে সময় নিয়ে বেরুনো ভাল। হাওড়া ব্রিজে যা জ্যাম হয়!…

সেদিনই দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার নিউজরুমে টেবিলে গরম চায়ের কাপ। রেখে চুমুক দিচ্ছি এবং পুলিশ সূত্রে পাওয়া একটা ডাকাতি কেসের খবর। লিখছি। তখন রাত প্রায় নটা বাজে। কপিটা শেষ করেই অফিস থেকে কেটে পড়ব। প্রেস ক্লাবে আড্ডা দিতে যাব। এমন সময় কর্নেলের টেলিফোন এল। সাড়া দিয়ে বললুম, বলুন বস্!

কর্নেল বললেন, জয়ন্ত, তুমি কখন বেরুচ্ছ অফিস থেকে?

 মিনিট পনেরো পরে। কেন বলুন তো?

অফিস থেকে সোজা আমার ডেরায় চলে এস।

কী ব্যাপার?

ফোনে বলা যাবে না। তবে ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি। রাখছি।

খবরটা বেশ জমকালো ভাষায় লিখতে শুরু করেছিলুম। সেই সুরটা আর রাখা গেল না। কোনোরকমে শেষ করে চিফ রিপোর্টারের কাছে জমা দিয়ে বেরিয়ে পড়লুম।

রাস্তায় জ্যাম ছিল না। এলিয়ট রোডে কর্নেলের বাড়িতে পৌঁছুতে মিনিট কুড়ি লাগল। পার্কিং জোনে গাড়ি রেখে হন্তদন্ত সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় ওঁর অ্যাপার্টমেন্টের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে টের পেলুম ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠেছি।

ডোরবেলের সুইচ টিপলে ষষ্ঠীচরণ দরজা খুলে চাপা স্বরে বলল, একটা মেয়েছেলে এসে খুব কান্নাকাটি করছে। বাবামশাই একেবারে নাকাল।

ভেতর থেকে কর্নেলের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, জয়ন্ত! চলে এস।

দরজার পর ছোট্ট ওয়েটিং রুমটা ডাক্তারদের চেম্বারে রোগীদের বসার ঘরের মতো। সামনের পর্দা তুলে জাদুঘরসদৃশ বিশাল ড্রয়িং রুমে ঢুকে দেখি, ভিজে চোখে শোকাকুলা এক যুবতী বসে আছে। গায়ে ছাইরঙা কার্ডিগান। পাশে একটা সাদাসিধে ব্যাগ।

সে আমার দিকে একবার তাকিয়ে কর্নেলের দিকে ঘুরল। কর্নেল বললেন, আলাপ করিয়ে দিই। জয়ন্ত! এর নাম মৈত্রেয়ী। হিউজেসগঞ্জের সেই স্কুলটিচার অর্ধেন্দুবাবুর মেয়ে। তাঁর শোচনীয় মৃত্যুর কথা তুমি সকালে শুনেছ। মৈত্রেয়ী, এই আমার স্নেহভাজন বন্ধু সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী।

মৈত্রেয়ী আমাকে নমস্কার করল। আমিও নমস্কার করে সোফার একপাশে বসলুম। কর্নেল বললেন, সরডিহার প্রোগ্রাম বাতিল করতে হলো জয়ন্ত!

বললুম, কী ব্যাপার?

অর্ধেন্দুবাবুর মেয়ে হিউজেসগঞ্জ থেকে ছুটে এসেছে। আর তুমি জিজ্ঞেস করছ কী ব্যাপার? বলে কর্নেল চোখ কটমট করে আমার দিকে তাকালেন।

আমতা-আমতা করে বললুম, মানে সেই শঙ্খচূড়রহস্য?

কর্নেল হেসে ফেললেন। তা বলতে পারো। যাই হোক, ব্যাপারটা হলো, গত শীতে হিউজেসগঞ্জে গিয়ে অর্ধেন্দুবাবুর সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর অভ্যাসবশে তাকে আমার নেমকার্ড দিয়েছিলুম। সেইসঙ্গে বলেছিলুম, কোনো প্রয়োজন হলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। কেন বলেছিলুম কে জানে! দূর থেকে বাইনোকুলারে ওঁর গতিবিধি দেখে এবং পরে মুখোমুখি আলাপ করে হয়তো আমার মনে হয়েছিল, উনি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই গঙ্গাভবন এলাকায় ঘোরাঘুরি করেন। তো মৃত্যুর দিন সকালে অর্ধেন্দুবাবু ওঁর মেয়ে–এই মৈত্রেয়ীকে আমার নেমকার্ডটা দিয়ে বলেছিলেন, দৈবাৎ কিছু ঘটে গেলে মৈত্রেয়ী যেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে।

গমৈত্রেয়ী ভিজে গলায় বলল, তখন বাবার ওই কথাটার মানে নিয়ে কিছু ভাবিনি। আসলে মায়ের মৃত্যুর পর থেকে ক্রমশ বাবা কেমন যেন হয়ে উঠেছিলেন। সবসময় অন্যমনস্ক। ডাকলে চমকে উঠতেন। বিড়বিড় করে আপনমনে কী সব। বলতেন। একটা কথা প্রায় বলতেন! বিষদাঁত উপড়ে দেব! তারপর গত বুধবার বিকেলে বাবার ডেডবডি জেলেপাড়ার লোকেরা দেখতে পেল। সবাই বলল, তরুণ সংঘের স্বপনের মতোই মাস্টারমশাইকে সাপে কামড়েছে। এদিকে এই কার্ডটার কথা কাল অব্দি আমার মনে পড়েনি। আজ সকালে মনে পড়ল। তখনই রেল স্টেশনে চলে গেলুম। তারপর

মৈত্রেয়ী শ্বাস ছেড়ে চুপ করল। কর্নেল বললেন, একটা ভুল হয়েছে। বডির পোস্টমর্টেম করানো উচিত ছিল।

মৈত্রেয়ী আস্তে বলল, আমাদের ওই এলাকায় সাপেকাটা ডেডবডির পোস্টমর্টেম করা হয় না। আমার মাথাতেও তাই এই প্রশ্নটা জাগেনি। তাছাড়া গঙ্গাভবনের ওখানে চন্দ্রনাথকাকু একবার একটা শঙ্খচূড় সাপ মেরেছিলেন বন্দুকে। উনি নামকরা শিকারি। এখন অবশ্য আইনের কড়াকড়িতে শিকার ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর গত তিনদিন উনি বন্দুক নিয়ে শঙ্খচূড়ের জোড়াটাকে খুঁজেছেন।

বললুম, শঙ্খচূড়ের জোড়া মানে?

কর্নেল বললেন, লোকের বিশ্বাস, গঙ্গাভবনের ওখানে এক শঙ্খচুড়দম্পতি ছিল। চন্দ্রনাথবাবু তাদের একজনকে গুলি করে মেরেছিলেন।

মৈত্রেয়ী বলল, আমি চলি কর্নেলসায়েব! রাত হয়ে যাচ্ছে।

কর্নেল বললেন, এখন তুমি কোথায় যাবে?

এন্টালিতে আমার মাসি থাকেন। সেখানে রাত কাটিয়ে সকালের ট্রেনে বাড়ি ফিরব। বাড়িতে তো কেউ নেই। আজকাল চুরি-ডাকাতি বেড়ে গেছে। রিস্ক নিয়েই এসেছি। মৈত্রেয়ী কান্না চাপল।

কর্নেল বললেন, তুমি মাসির বাড়ি চিনতে পারবে?

হ্যাঁ। মাসির বাড়িতে থেকেই আমি এম. এ. পড়েছি।

তাই বুঝি? অবশ্য জয়ন্ত ওর গাড়িতে তোমাকে পৌঁছে দিতে পারে!

মৈত্রেয়ী উঠে দাঁড়িয়ে বলল, জয়ন্তবাবুকে কষ্ট করতে হবে না। আমি চলি আপনি বাবার এক্সারসাইজ খাতাটা রেখে দিন। আর কবে যাচ্ছেন লুন : আমার বাড়িতেই থাকবেন। কোনো অসুবিধে হবে না।

হবে। কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। আমরা ইরিগেশন বাংলো বা অন্য কোথাও। থাকব। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। ঠিক সময়ে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব। তবে একটা কথা। তুমি যে আমার কাছে এসেছিলে বা আমার সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে, এসব কথা কেউ যেন ঘুণাক্ষরে না জানতে পারে।

আপনাকে তো বলেছি। আমি গোপনে এসেছি। মাসিমাকেও এসব কথা বলব না।

মৈত্রেয়ী যাবার সময় আমাকে নমস্কার করে গেল। কর্নেল তাকে এগিয়ে দিয়ে এলেন। তারপর ইজিচেয়ারে বসে বললেন, আমার বরাত জয়ন্ত!

বললুম, মেয়েটিকে মফস্বলের বলে মনেও হয় না। বেশ স্মার্ট। সাহসী।

কী শুনলে? কলকাতায় মাসির বাড়িতে থেকে এম. এ. পাস করেছে। তবে হ্যাঁ, কান্নাকাটি করলেও মনের জোর আছে। দরকার হলে ওকে কাজে লাগানো। যাবে।

কিন্তু কেসটা কী? মানে, আমি বলতে চাইছি, দুটো ঘটনাই কি খুনখারাপি?

আমি কি অন্তর্যামী, ডার্লিং? কর্নেল একটু হেসে বললেন, অর্ধেন্দুবাবুর খাতার পাতা উল্টে কিছু বুঝলুম না। খানিকটা ডায়রি। আবার পদ্য লেখার চেষ্টা। কোথাও হিজিবিজি ছবি। যাই হোক, তবু এটা গুরুত্বপূর্ণ। আমার ওই এক কথা জয়ন্ত! সত্য জিনিসটা এমন যে অনেক সময় তা ফালতু জিনিসের মধ্যে পড়ে থাকে।

কবে যাচ্ছেন হাজিগঞ্জ–সরি, হিউজেসগঞ্জ?

ওখানে গিয়ে তুমি ভুলেও হিউজেসগঞ্জ বলবে না। কেউ বুঝতে পারবে না। ওটা এখন হাজিগঞ্জ। কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুটটা জ্বেলে বললেন, কাল একটা পাঁচে হাওড়া-সাহেবগঞ্জ প্যাসেঞ্জার ট্রেন ধরব। পৌঁচুতে আট ঘণ্টার বেশি লাগতে পারে। ওই ট্রেনটা কাটোয়ার পর ফাঁকা হয়ে যায়। আরামে যাওয়া যাবে। মেল বা এক্সপ্রেস ট্রেনে প্রচণ্ড ভিড় হয়। থাকার ব্যবস্থাটা ইরিগেশন বাংলোতেই করা ভালো। দেখি, মনীশকে বাড়িতে পাই নাকি।

মনীশ মানে ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি সেক্রেটারি মনীশ মিত্র?

আবার কে? বলে কর্নেল টেলিফোন ডায়াল করতে থাকলেন।

আমি হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে অর্ধেন্দুবাবুর খাতাটা তুলে নিলুম। মলাট খুলতেই চোখে পড়ল, সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা আছে :

এই খাতা খুলে পড়লে তোর বাবার বাবা কর্তাবাবা চৌদ্দপুরুষ নরকস্থ হবে। ওরে মূর্খ! তুই এর কী বুঝবি? খাতা বুজিয়ে রেখে প্রণাম কর। নতুবা সর্পাঘাতে তোর মৃত্যু অনিবার্য।

এর তলায় ফণাতোলা একটা সাপ আঁকা আছে। হাসি পাচ্ছিল। কয়েক পাতার পর দেখি, নদীর বুকে নৌকো আঁকা। তার তলায় দুলাইন পদ্য।

ফুটো বোট করে ফ্লোট গ্যাঞ্জেস রিভারে
রাজপুত হলো ভূত ম্যালেরিয়া ফিভারে।

 একেবারে শেষ পাতা উল্টে দেখি, আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা আছে : বুধবার দুপুরে চরম বোঝাপড়া। বিষদাঁত ভেঙে দেব বাছাধনের।

লাইনটা পড়েই কর্নেলের দিকে তাকালুম। কর্নেল ততক্ষণে ফোন রেখে চুপচাপ বসে ছিলেন। আস্তে বললেন, দেখেছি। গত বুধবার কার বিষদাঁত ভাঙতে গিয়ে অর্ধেন্দুবাবু মারা পড়েছেন।…

.

০২.

এমন বিরক্তিকর ট্রেনজার্নির অভিজ্ঞতা ছিল না। তাতে দেড়ঘণ্টা লেট। রাত সাড়ে দশটায় হাজিগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছেছিলুম। তবে কর্নেলের ভক্তরা সর্বত্র বিরাজমান। সেচবাংলোর কেয়ারটেকার সাধনবাবু জিপ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। কাজেই কোনো অসুবিধে হয়নি।

সেচবাংলো শহর থেকে প্রায় দু কিলোমিটার দূরে। কর্নেল যে বিশাল জলার কথা বলেছিলেন, তার উত্তর প্রান্তে গঙ্গার ধারে একটা উঁচু জায়গায় অবস্থিত। বিদ্যুৎ এবং টেলিফোনের ব্যবস্থা আছে। রাতের খাওয়া শেষ করে কর্নেল দক্ষিণের বারান্দায় বসে চুরুট টানছিলেন। বারান্দায় শীতের হাওয়ার উপদ্রব নেই। কিন্তু শীতের উৎপাত আছে। সাধনবাবু সপরিবারে বাংলোর পেছনদিকের কোয়ার্টারে থাকেন। কর্নেল তার সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমি ঘরের ভেতর থেকে বেরোইনি। ওঁদের কথাবার্তা কানে আসছিল। তখন রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা।

সাধনবাবু বলছিলেন, গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান সুইস গেটের দিকটা পাথর ফেলে মজবুত করা হয়েছে। নৈলে গঙ্গা যেভাবে মাটি খাচ্ছিল, এই বাংলো আস্ত থাকত না। অথচ দেখুন, পাটোয়ারিজিদের ফার্মের দিকটা নিরাপদ। কারণ ওঁদের পূর্বপুরুষের তৈরি গঙ্গাভবন গঙ্গার ভাঙন রুখে দিয়েছে। রেশমকুঠির জঙ্গলও ভাঙনরোধের কাজ করছে।

কর্নেল বললেন, ট্রেনে আসবার সময় হাজিগঞ্জের কিছু লোকের সঙ্গে আলাপ হলো। তারা বলল, গঙ্গাভবনের ওখানে নাকি শঙ্খচূড় সাপের কামড়ে দুজন লোক মারা গেছে।

হ্যাঁ। আপনাকে বলতে ভুলে গেছি। আপনি তো পাখির পেছনে ছোটাছুটি করে বেড়ান। ওই এরিয়ায় যেন যাবেন না।

এই শীতে সাপের উপদ্রব হওয়ার তো কথা নয় সাধনবাবু!

আমিও তো তাই জানতুম। কিন্তু অনেকে বলছে, শঙ্খচূড় নাকি শীতে কাবু। হয় না। এদিকে আরেক কাণ্ড!

বলুন! 

জনসাধারণের চাপে পড়ে পাটোয়ারিজি গত পরশু কোথা থেকে দুজন বেদে ডেকে এনেছিলেন। তারা মন্ত্রতন্ত্র পড়ে সাপটাকে খুব খোঁজাখুঁজি করেছিল। তারপর বলেছিল, গতকালই সাপটাকে তারা ধরে ফেলবে। পাটোয়ারিজি তাদের ফার্মহাউসে রেখেছিলেন। আজ সকালে নাকি দুজনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বলেন কী!

সাধনবাবু হাসতে হাসতে বললেন, আসলে ভোরের বাসে তারা কেটে পড়েছে। যে বাসে তারা পালিয়েছে, তার কন্ডাক্টর বাদলের মুখে শুনলুম। বাদল তাদের চিনতে পেরেছিল। বাদলকে তারা বলেছে, পাহাড়ি মুলুক থেকে তাদের ওস্তাদকে আনতে যাচ্ছে। কারণ এমন সাংঘাতিক সাপ ধরা তাদের সাধ্য নয়। বাদল বলেছিল, হাবভাব দেখে তার ধারণা, ওরা খুব ভয় পেয়ে পালাচ্ছে।

আচ্ছা সাধনবাবু! আপনি তো এখানে অনেকদিন আছেন?

চার বছর হয়ে গেল সার!

গতবার আপনি বলেছিলেন গঙ্গাভবনের দোতলায় মাঝে মাঝে ভুতুড়ে আলো দেখা যায়।

সাধনবাবু চাপা গলায় বললেন, আলো এখনও দেখা যায়। এই তো কিছুদিন আগে এখান থেকে দেখতে পেয়েছিলুম। খুব বেশি দূরে তো নয়। নাকবরাবর বড়জোর হাফ কিলোমিটার দূরত্ব। টাউন এরিয়া আরও হাফ কিলোমিটার দক্ষিণে। মধ্যিখানে কুঠিবাড়ির জঙ্গল। কাজেই আমার চোখের ভুল নয়। তা ছাড়া আলোটা এক জায়গায় স্থির ছিল না। কে যেন লণ্ঠন হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।

নাহ্। এবার শুয়ে পড়া যাক। শীতটাও বেড়ে যাচ্ছে।

হ্যাঁ। লম্বা ট্রেনজার্নি করেছেন। শুয়ে পড়ুন সার! বলে বারান্দায় জুতোর শব্দ করতে করতে সাধনবাবু চলে গেলেন।

কর্নেল ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বললেন, জয়ন্ত, জেগে আছ দেখছি।

আপনাদের কথা শুনছিলাম।

কী বুঝলে?

রাজপুতদের পোড়োবাড়িটা ভূতের ডেরা। সদাশিববাবু ড্রাকুলা এবং ভ্যাম্পায়ারের কথা বলছিলেন। সম্ভবত ওখানে ওইরকম কোনো হিংস্র প্রেতাত্মা আছে।

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, যা বলেছ! বেদেরা হয়তো তাই কেটে পড়েছে। কিংবা সত্যিই পাহাড়ি মুলুকে তাদের ওস্তাদকে ডেকে আনতে গেছে। বেদেরা অবশ্য ভূতের মন্ত্র জানে! কি না জানি না….।

ঘুম ভেঙেছিল সকাল আটটায়। চৌকিদার বেড-টি দিয়ে গিয়েছিল। কর্নেল যথারীতি প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু তখনও চারদিক কুয়াশায় ঢাকা। কিছুক্ষণ পরে কুয়াশা কেটে গিয়ে রোদ ফুটল। তখন বারান্দায় গিয়ে দেখলুম, দক্ষিণে নিচের দিকে একটা জলা। জলজ উদ্ভিদ গজিয়ে আছে কিনারায়। বাংলোর সামনের অংশটা তত চওড়া নয়। কিন্তু পশ্চিমে ক্রমশ চওড়া হতে হতে দিগন্তে কুয়াশার মধ্যে মিশে গেছে। সমুদ্রের মতো বিশাল দেখাচ্ছে। বাঁদিকে পূর্বে স্লুইস গেট। তার ওধারে গঙ্গা দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণে কিছুটা দূরে কাটাতারের বেড়া এবং একটা সুদৃশ্য বাংলো দেখা যাচ্ছিল। গাছপালার ভেতর। ওটাই তাহলে পাটোয়ারিজির ফার্ম।

কর্নেল ফিরলেন সাড়ে নটা নাগাদ। জিজ্ঞেস করলুম, হানাবাড়ির দিকে গিয়েছিলেন নাকি?

কর্নেল ওভারকোট এবং টুপি খুলে বললেন, গিয়েছিলুম উল্টোদিকে। গঙ্গার বাঁকের মাথায় একটা পুরনো শিবমন্দির আছে। সেখানে এক সাধুবাবার আবির্ভাব হয়েছে। এই শীতে খালি গায়ে ছাই মেখে ধুনির সামনে বসে ধ্যানস্থ। কথা বলার জন্য চেষ্টা করলুম। ধ্যান ভাঙল না। ফেরার সময় একটা জেলে-নৌকো দেখে তাদের ডাকলুম। অবশ্য তারা কিনারার কাছাকাছি ছিল। তাদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে কথায় কথায় জানা গেল, গত রাত থেকে তারা মাছ ধরে বেড়াচ্ছে। শেষ রাতে তাদের বস্তিতে ফেরার কথা। কিন্তু গঙ্গাভবনের পেছন দিকে ভুতুড়ে আলো দেখে তারা আর সাহস করে এগোতে পারেনি। ছোট্ট নৌকো নিয়ে মাঝগঙ্গায় যাওয়ার ঝুঁকি আছে। বস্তিতে ফিরতে হলে কিনারা ঘেঁষেই যেতে হবে। তাই সকালের রোদ ফোঁটার প্রতীক্ষায় আছে তারা।

বললুম, বড্ড ভিতু তো! আসলে কুসংস্কার–

কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন, কুসংস্কার বলো আর যাই বলো, এলাকার লোকেরা প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে বোঝা গেল। নিছক শঙ্খচূড় সাপের ভয় নয়। প্রেতাত্মার ভয়। সেই প্রেতাত্মাই নাকি সাপের রূপ ধরে দুটো মানুষের প্রাণ নিয়েছে।…

ব্রেকফাস্টের পর কর্নেল আমাকে নিয়ে বেরোলেন। সুইস গেটের ব্রিজে পৌঁছে বললুম, গতরাত্রে আমরা কোন পথে এসেছিলুম?

কর্নেল বললেন, এই পথে। তুমি জিপের পেছনে ছিলে বলে বুঝতে পারোনি। ওই দেখ, বাঁদিকে সেই হানাবাড়ি দেখা যাচ্ছে। তারপর রেশমকুঠির ধ্বংসাবশেষের ওপর গজিয়ে ওঠা জঙ্গলটাও দেখতে পাচ্ছ। সেচদফতর এই পিচ রাস্তাটা তৈরি করেছে। আমরা কুঠির জঙ্গলের ভেতর দিয়েই যাব। জঙ্গলটা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের হাতে গেছে। তারা আরও গাছ লাগিয়ে একটা দুর্ভেদ্য জঙ্গল গড়ে ফেলেছে।

কিছুটা এগিয়ে সাধনবাবুর সঙ্গে দেখা হলো। তিনি সাইকেলে চেপে আসছিলেন। ক্যারিয়ারে প্রকাণ্ড থলে ভর্তি শীতের সবজি উঁকি দিচ্ছিল। আমাদের দেখে সাইকেল থামিয়ে বললেন, গিয়েছিলুম জিপে। আসছি সাইকেলে। ইঞ্জিনিয়ার সায়েব ফরাক্কা যাবেন। তাই জিপ ফেরত দিয়ে এলুম। সাইকেলটা জিপে চাপিয়ে নিয়ে গিয়েছিলুম। তা আপনারা বেড়াতে বেরিয়েছেন?

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। গতবছর নীলসারস দেখেছিলুম। এবার তারা এসেছে নাকি দেখা যাক।

সাধনবাবু হাত নেড়ে বললেন, উঁহু-হুঁ! পাখি দেখতে ভুলেও যেন জঙ্গলে ঢুকবেন না সার! এই যে আমি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সাইকেলে এলুম, প্রাণ হাতে করে এসেছি। শঙ্খচূড় সাপ নাকি মাটিতে পায়ের শব্দ শুনেই তাড়া করে আসে। কদিন থেকে এই এলাকায় লোকজন দেখা যাচ্ছে না।

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, আমি বাইনোকুলারে দূর থেকে পাখি দেখব। জঙ্গলে ঢোকার কী দরকার?

সাধনবাবু সাইকেলে চেপে চলে গেলেন। কর্নেল ডানদিকে কিছুটা দূরে পাটোয়ারিজির ফার্ম হাউসটা বাইনোকুলারে দেখে নিলেন। তারপর পা বাড়িয়ে বললেন, চলো! ফার্মহাউসে মোহন সিংহ আছেন নাকি দেখি।

কিছুদূর চলার পর এই পিচ রাস্তা থেকে সংকীর্ণ একটা মোরাম বিছানো রাস্তা বেরিয়ে ফার্মহাউসের দিকে এগিয়ে গেছে। আমরা সেই রাস্তা ধরে ফার্মহাউসের গেটে গেলুম। একজন তাগড়াই চেহারার লোক এগিয়ে এসে সেলাম দিয়ে বলল, কর্নেলসাব কখন আসলেন?

গত রাত্রে।

সে গেট খুলে বলল, আসেন! অন্দরে আসেন কর্নেলসাব!

মোহনজি আছেন কি?

উনহি তো আজ ফজিরে কলকাত্তা চলিয়ে গেলেন। দো দিন বাদ আসবেন।

 ঠিক আছে রাজু! আমি কয়েকটা দিন আছি। মোহনজি ফিরলে বলবে, আমি ইরিগেশন বাংলোয় উঠেছি।

রাজু নামে লোকটি হঠাৎ আস্তে বলল, কর্নেলসাব! থোড়া হোশিয়ারিসে যাবেন! জঙ্গলে ঘুষবেন না।

শুনেছি। বিষাক্ত সাপের কামড়ে দুজন নাকি মারা গেছে।

 রাজু ফিসফিস করে বলল, উয়ো সাপ না আছে কর্নেলসাব! উয়ো মোহনজির চাচা মহেন্দরজির পেরেতাত্মা আছে। মহেন্দরজি দশ-বারা সাল আগে গঙ্গায় নাহান করার সময়ে ভেসে গেছলেন। উনহির লাস পাওয়া যায়নি।

কে বলল তোমাকে?

হাম শুনা। লেকিন কর্নেলসাব, ইয়ে বাত আপনি আমার কাছে শুনেছেন বলবেন না। আমার নোকরি চলিয়ে যাবে। আমি আপনা আঁখসে দেখেছি সাব! রাতমে পেরেতাত্মা আলো জ্বালে।

কর্নেল তাকে আশ্বস্ত করে পা বাড়ালেন। জঙ্গলের রাস্তায় পৌঁছে বললুম, কত সব অদ্ভুত কথা জানা যাচ্ছে!

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। আলোটা তাহলে মোহনজির কাকা মহেন্দ্রজির প্রেতাত্মাই জ্বালেন এবং সম্ভবত কিছু খুঁজে বেড়ান।

গুপ্তধন নয় তো?

কর্নেল তার প্রসিদ্ধ অট্টহাসি হাসলেন। তারপর বাইনোকুলারে হানাবাড়িটা দেখে নিয়ে হাঁটতে থাকলেন।

প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটার পর বাঁদিকে টালির চালের ছোট ছোট বাড়ি দেখা গেল। শীতের রোদে জাল শুকোতে দেওয়া হয়েছে। বুঝলুম, এটা জেলেবস্তি।

জেলেবস্তির পর শহরের চেহারা ভেসে উঠল। এদিকটা বেশ ছিমছাম পরিচ্ছন্ন। কর্নেল বললেন, এটা নতুন টাউনশিপ! পুরনো হিউজেসগঞ্জ যেতে সাইকেল রিকশ চাপতে হবে।

একটা সাইকেল রিকশ ডেকে কর্নেল বললেন, আরোগ্য নার্সিংহোমে চলো।

এবার মফস্বল শহরের ঘিঞ্জি রাস্তা, ভিড়ভাট্টা দেখতে পেলুম। অনেক ঘুরে গঙ্গার তীরে ঈষৎ পরিচ্ছন্ন এবং নিরিবিলি এলাকায় দোতলা নার্সিংহোমে পৌঁছলুম।

কর্নেল বললেন, আজকাল সব মফস্বল শহরে অজস্র নার্সিংহোম দেখা যাবে। কলকাতার নার্সিংহোমগুলোর চেয়ে এগুলোর চাকচিক্য বেশি। ওই দেখ! রিসেপশনে সুন্দরী মেয়ে বসে আছে। কেমন হাসিখুশি আর স্মার্ট। লক্ষ্য করো!

বললুম, এটা তাহলে চক্রবর্তীমশাইয়ের মেয়ে-জামাইয়ের নার্সিংহোম!

তা আর বলতে?

রিসেপশনের তরুণীর কাছে কর্নেল এগিয়ে যেতেই সে হাসিমুখে বলল, বলুন সার!

তপতী–মানে ডক্টর তপতী ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে চাই।

তপতীদি তো এখন ব্যস্ত। কী ব্যাপার বলুন?

কর্নেল নেমকার্ড বের করে তাকে দিয়ে বললেন, এটা ওর কাছে পাঠিয়ে দিলে খুশি হব।

রিসেপশনিস্ট মেয়েটি কার্ডটা দেখে একজনকে বলল, এই কার্ডটা দিদিকে দিয়ে বলে এসো, উনি ওঁর সঙ্গে দেখা করতে চান। আপনারা বসুন সার!

মিনিট পাঁচেক পরে ফর্সা ছিপছিপে চেহারার সুশ্রী এক যুবতী, গয়ে সাদা ডাক্তারি কোট এবং গলায় স্টেথিস্কোপ, হন্তদন্ত এসে কর্নেলকে বললেন, কী আশ্চর্য! কর্নেলকাকু এখানে?

বলেই ঢিপ করে কর্নেলের পায়ে একটি প্রণাম। কর্নেল বললেন, আমি জানতুম না তুমি এখানে এসে জাঁকিয়ে বসেছ। তোমার বাবার কাছে সব শুনেছি। আলাপ করিয়ে দিই। জয়ন্ত চৌধুরী।

সৌজন্যপ্রকাশের পর তপতী আমাদের দোতলায় তার চেম্বারে নিয়ে গেলেন। বললেন, বাবা সম্প্রতি এসেছিলেন। এখানে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটেছে। বাবা বলছিলেন, ফিরে গিয়ে আপনাকে বলবেন। তপতী একটু হাসলেন। তারপর চাপাস্বরে বললেন, আপনি নিশ্চয় রহস্যের পেছনে ছুটে এসেছেন?

কর্নেল জোরে মাথা নেড়ে বললেন, না। আমার এখানে আসবার প্রোগ্রাম আগে থেকে ঠিক করা ছিল। গত শীতেও তো এসেছিলুম। তখন জানতুম না তুমি এখানে আছ!

এক মিনিট। কফি বলি!

থাক তপতী! ইরিগেশন বাংলোয় উঠেছি। সেখানে প্রচুর কফি খেয়ে বেরিয়েছি। তোমার সঙ্গীটি কোথায়?

অশোক ও-টিতে ঢুকেছে। একটা সিরিয়াস অপারেশন আছে।

তা হলে তো অসময়ে এসে পড়েছি!

না, না। পরে অশোকের সঙ্গে আলাপ হবে। কাল দুপুরে আপনি আমাদের বাড়িতে খাবেন। আপনাকে দুজনে গিয়ে নিয়ে আসব।

আমরা কালকের দিনটা নৌকো করে ঘুরতে বেরুব। নেমন্তন্ন পরে এসে খাব। তো তুমি রহস্য কথাটা বললে। তোমার বাবাও প্রায় একই কথা বলেছেন। কেন রহস্য বলছ?

তপতী একটু চুপ করে থেকে বললেন, অশোকের মতে, দুটো বডিতেই আপাতদৃষ্টে বিষাক্ত সাপের কামড়ের লক্ষণ ছিল। কিন্তু আমি কথাটা মেনে নিতে পারিনি।

কেন?

কমন সেন্স। শঙ্খচুড় হোক, কিংবা অন্য কোনো বিষাক্ত সাপ হোক, একবার কাউকে কামড়ানোর পর তার বিষদাঁত গজাতে এবং বিষ জমতে সময়। লাগে। কাজেই ধরে নিতে হয়, দুটো সাপ দুজনকে কমড়েছে। তার চেয়ে বড় কথা, এখন সাপের হাইবারনেশন পিরিয়ড।

হ্যাঁ। তোমার পয়েন্টটা নির্ভুল। তবে কোইনসিডেন্স–

তপতী কর্নেলের কথার ওপর বললেন, না কর্নেলকাকু! একটা পয়েন্ট নিয়ে পরে অশোকের সঙ্গে আলোচনা করেছি। দুটো বডিতেই ছড়ে যাওয়ার দাগ ছিল। স্বপন নামে যে ছেলেটির বডি এনেছিল, তার হাঁটুতে একটু দাগ দেখেছি। সোয়েটারের গলার কাছটা একটু ছেঁড়া ছিল। আর অর্ধেন্দুবাবুর হাঁটুতেও একই দাগ। তার চিবুকে একটু ক্ষত ছিল। যেন পালাতে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়েছিলেন। স্বপনও। এদিকে অর্ধেন্দুবাবুর ডান হাতের তালুতে সাদা পাওডারের। মতো একটু চিহ্ন লক্ষ্য করেছিলুম। লোকের কুসংস্কার। সাপেকাটা বডি পোস্টমর্টেম করতে দেবে না। পুলিশকে জানালে অবশ্য বাধ্য হয়ে পোস্টমর্টেম হতো। কিন্তু অশোক বলল, পুলিশের হাঙ্গামায় জড়ানো ঠিক হবে না।

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, তাহলে সত্যিই ঘটনাটা রহস্যময়।

হ্যাঁ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দুটোই হোমিসাইডাল কেস!

বলো কী!

তপতী আস্তে বললেন, আপনি গোপনে তদন্ত করে দেখুন না! দুটো ঘটনার। মধ্যে নিশ্চয় কোনো লিঙ্ক আছে।

অর্ধেন্দুবাবুর একটি মেয়ে আছে শুনেছি।

হ্যাঁ। মৈত্রেয়ী। ডানপিটে মেয়ে। লেখাপড়ায় অবশ্য ভাল। এম. এ. পাস করেছে বাংলা নিয়ে। আমি সঠিক জানি না। তাকে কেন্দ্র করেও কিছু তপতী চুপ করলে কর্নেল বললেন, কী বলতে চাও বুঝতে পেরেছি। কিন্তু এ সব ক্ষেত্রে খুনখারাপি হলে সাপে কামড়ানোর মোডুস অপারেন্ডি কেন? খুনী এমন জটিল প্রক্রিয়া হাতে নেবে কেন?

তা অবশ্য ঠিক। তবে—

বলো!

তপতী আবার একটু চুপ করে থেকে বললেন, আচ্ছা কর্নেলকাকু, এমন কি হতে পারে না যে, দুজনের গলাতে সাপের দাঁতের চিহ্ন দুটো নেহাত মিসগাইড করার কৌশল? দুজনকে অন্য কোনোভাবে মারা হয়েছে?

তুমি তো ডাক্তার। তুমিই বলো, আর কী ভাবে মারা যায়, যাতে বাইরে থেকে বোঝা যাবে না মার্ডার উইপন কী ছিল?

তপতী একটু হেসে বললেন, পুলিশের লোকেরা এটা ভাল জানে। কমাস আগে পুলিশ হাজতে একটা মৃত্যুর কেস এসেছিল আমাদের হাতে। পোস্টমর্টেম করে তারপর দেখা গেল হার্ট আর লাংয়ে জমাট রক্ত। পিঠের ওপর কম্বল ভাঁজ করে রেখে ভোতা কিছু দিয়ে মারা হয়েছে। এখনও মামলা চলছে। অবশ্য এ দুটো কেসে কী হয়েছে বলা কঠিন। পোস্টমর্টেমের সুযোগ পাইনি। কর্নেলকাকু, আপনি অর্ধেন্দুবাবুর মেয়ের সঙ্গে কথা বলুন।

কর্নেল বললেন, দেখা যাক, এবার উঠি। পরে অশোক বাবাজির সঙ্গে কথা বলব।…

.

০৩.

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বললুম, তপতীর ধারণা, ব্যাপারটা প্রণয়ঘটিত। তার মানে, মৈত্রেয়ীর কোনো প্রেমিকের মাথায় খুন চড়েছিল। এই তো?

কর্নেল আমার কথার কোনো উত্তর দিলেন না।

বললুম, তপতীর পয়েন্টটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ধরুন, তার প্রেমিক যদি হয় কোনো ডাক্তার?

কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকালেন।

উৎসাহে বললুম, খুনী যদি ডাক্তার হয়, সে বিষ ইঞ্জেকশন করে মানুষ মারতে পারে। পারে না কি?

হুঁ।

স্বপন নামে ছেলেটি ক্রিকেট বল কুড়োতে গিয়ে মৈত্রেয়ী আর তার প্রেমিককে পোড়োবাড়িতে আপত্তিজনক অবস্থায়–মানে একটা সম্ভাবনার কথা বলছি!

কর্নেল একটু হেসে একটা সাইকেল রিকশ ডাকলেন। তারপর রিকশতে চেপে বললেন, ইরিগেশন বাংলো।

অমনি রিকশওয়ালা তড়াক করে সিট থেকে নেমে বলল, না সার। ওদিকে যেতে পারব না।

কেন হে? যা ভাড়া চাও, পাবে।

না সার। আপনি একশো টাকা দিলেও ওই রাস্তায় যাব না।

কেন? খুলে বলো তো!

কুঠির জঙ্গলের ওদিকে একটা খ্যাপা শঙ্খচূড় সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষ দেখলেই তাড়া করছে।

কী আশ্চর্য! কিছুক্ষণ আগে আমরা তো ওই রাস্তায় এলুম!

রিকশওয়ালা গোঁ ধরে বলল, আপনাদের বরাত ভাল সার! আমি ওদিকে যাব না। শুধু আমি কেন, কোনো রিকশই ওই রাস্তায় যাবে না। আপনি চেষ্টা করে দেখুন।

ঠিক আছে। জেলেপাড়ার মোড় অব্দি চলো!

হ্যাঁ। ওই পর্যন্ত যাব। বলে সে আবার সিটে চাপল। প্যাডেলে পায়ের চাপ দিয়ে সে ফের বলল, কথায় বলে, বাঘের দেখা আর সাপের লেখা। বাঘ দেখা হলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর কপালে লেখা থাকলে তবেই সাপে দংশায়। আপনাদের কপালে লেখা নেই। তাই বেঁচেছেন। তবে সাবধানে যাবেন সার!

জেলেবস্তির মোড়ে পৌঁছুতে আবার প্রায় আধঘণ্টা লাগল। রিকশওয়ালাকে কর্নেল দশটা টাকা দিতেই সে কপালে হাত ঠেকিয়ে পড়ি-কি-মরি করে রিকশ নিয়ে উধাও হয়ে গেল। কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, অবস্থাটা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলুম।

সাধনবাবু তাহলে সাহসী মানুষ। চাকরির দায় মানুষকে সাহসী হতে বাধ্য করে। বলে কর্নেল পা বাড়ালেন।

এখন সামনে থেকে শীতের হাওয়া এসে ধাক্কা দিচ্ছে। জঙ্গলের গাছপালায়। অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে। হলুদ পাতা ঝরে পড়ছে রাস্তার ওপর। দুধারে জঙ্গলের ভেতরও হলুদ শুকনো পাতার ভূপ। আসবার সময় এ সব লক্ষ্য করিনি। মনে হলো, সত্যি কোথাও যেন হাজার হাজার শঙ্কচূড় সাপ রাগে ফুঁসছে। গর্জন করছে। কেন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল আমার।

কর্নেল কিন্তু নির্বিকার। মাঝে মাঝে বাইনোকুলারে পাখি খুঁজছেন। থমকে দাঁড়িয়ে কিছু দেখছেন।

না বলে পারলুম না, আচ্ছা কর্নেল! তখন কিছু মনে হয়নি। কিন্তু এখন ফেরার সময় কেমন একটা আনক্যানি ফিলিং হচ্ছে।

কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে ঘুরে চুরুট ধরালেন। তারপর বললেন, ভয় পেলে জোরে চেঁচিয়ে গান গাইতে হয়। তুমি গান গাও।

হেসে ফেললুম। নাহ! ভয় পাব কেন? জাস্ট একটা অদ্ভুত ফিলিং! মানে—

কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিলেন। ওসব কথা থাক। এস। জঙ্গলে ঢোকা যাক।

এদিকে কোথায় যাবেন?

চুপচাপ এস। সাবধানে পা ফেলবে। শুকনো পাতায় যতটা সম্ভব কম শব্দ যেন হয়। বলে কর্নেল কীভাবে হাঁটতে হবে দেখিয়ে দিলেন। চাপাস্বরে ফের বললেন, সাপের ভয় কোরো না। শীতকালে সাপেরা সত্যিই নির্জীব হয়ে পড়ে।

সাপের গর্তে যদি পা পড়ে?

কর্নেল হাসলেন। তোমার জুতো আর জিনসে দাঁত বসানোর ক্ষমতা এখন সাপের নেই।

মনে অস্বস্তি নিয়ে কর্নেলকে অনুসরণ করলুম। কর্নেল যেখানে পা ফেলে এগোচ্ছেন, আমিও সেখানে পা ফেলছি। প্রায় আধঘণ্টা হাঁটার পর গাছপালার ফাঁকে গঙ্গা দেখা গেল।

গঙ্গার ধারে সমান্তরাল একটা পাথরের বাঁধ দেখে বুঝলুম, গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানের কীর্তি। সেই বাঁধের পথে আরও মিনিট দশেক হাঁটার পর সেই হানাবাড়িটা চোখে পড়ল। বাড়ির পেছন দিকটা গঙ্গায় তলিয়ে গেছে। প্রকাণ্ড। সব লাইমকংক্রিটের চাবড়া মাথা উঁচু করে আছে। এদিকের পাঁচিলের অনেকটা অংশ ভেঙে পড়েছে। কর্নেল সেদিকে পা বাড়ালে বললুম, কী সর্বনাশ!

চুপচাপ এস।

বাড়িটার উঠোনে ঘন আগাছার জঙ্গল। মধ্যিখানে ভাঙা একটা ফোয়ারা। ফোয়ারার কাছে গিয়ে কর্নেল ডাইনে ঘুরে দোতলা বাড়িটার দিকে তাকালেন। দরজা-জানলাগুলো নেই। কোনো-কোনো ছাদের বিম বিপজ্জনকভাবে ঝুলে আছে। যে-কোনো মুহূর্তে বাড়িটা ধসে পড়তে পারে বলে মনে হচ্ছিল।

কর্নেল আস্তে বললেন, এই তাহলে আলো জ্বালানো ভূতের ডেরা?

বললুম, শঙ্খচূড় সাপেরও ডেরা। কারণ এক শিকারি ভদ্রলোক নাকি এখানে একটা শঙ্খচূড় সাপকে গুলি করে মেরেছিলেন।

কর্নেল সামনে একটা ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। আমি দাঁড়িয়ে রইলুম। ওঁকে অনুসরণের সাহস হলো না।

ঘরটার দরজা-জানালা নেই। কারা উপড়ে নিয়ে গেছে। তাই অস্পষ্টভাবে ভেতরটা দেখা যাচ্ছিল। কর্নেল সেই ঘরে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলুম।

দীর্ঘ পাঁচ মিনিট কেটে গেল। কর্নেলের পাত্তা নেই। আতঙ্কে অস্থির হয়ে ডাকলুম, কর্নেল, কর্নেল!

কোনো সাড়া এল না।

কী করব ভাবছি, এমন সময় অন্য একটা ঘর থেকে কর্নেল বেরিয়ে এলেন এবং তার পেছনে মৈত্রেয়ী!

কর্নেলকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। বললুম, সর্বনাশ! মৈত্রেয়ী এখানে কী করছিলেন?

মৈত্রেয়ী বলল, সাপটাকে খুঁজছিলুম।

কর্নেল বললেন, আমার স্পষ্ট কথা মৈত্রেয়ী! যদি তোমার বাবার মৃত্যুরহস্যের সমাধান তুমি নিজেই করতে চাও, আমার কোনো সাহায্য পাবে না।

মৈত্রেয়ী দুহাতে মুখ ঢেকে বলল, আমি তো বললুম আপনাকে। আমার মাথার ঠিক ছিল না। আপনি এসে পড়ার আগেই খুঁজে দেখতে চেয়েছিলুম–

কর্নেল রুষ্টমুখে বললেন, কথা শোনো! তুমি সাহসী মেয়ে। কিন্তু সর্বত্র সাহস দিয়ে কিছু করা যায় না। তুমি আর কখনও এখানে আসবে না।

মৈত্রেয়ী চোখ মুছে বলল, তাই হবে।

 চলো! তোমাকে রাস্তায় পৌঁছে দিই।

দক্ষিণের ভাঙা পাঁচিলের ওপর দিয়ে আমরা হানাবাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলুম। তারপর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সোজা হাঁটতে হাঁটতে সেই রাস্তায় পৌঁছলুম।

কর্নেল বললেন, ভাগ্যিস বাইনোকুলারে দূর থেকে তোমাকে দোতলায় দেখতে পেয়েছিলুম! তুমি জানো না কী বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে তুমি ছিলে!

মৈত্রেয়ী তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টে তাকাল।

কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, আমি গিয়ে না পড়লে তোমার অবস্থা তোমার বাবার মতো হতো।

আমি বলে উঠলুম, সে কী!

মৈত্রেয়ী বলল, কিন্তু আমি তো কাকেও দেখতে পাইনি?

বিষধর সাপ থাকে গর্তে লুকিয়ে। কর্নেল চুরুটটা ফেলে দিয়ে জুতোয় ঘষে নিভিয়ে ফেললেন। ফের বললেন, জয়ন্ত! তুমি বাংলোয় ফিরে যাও। মৈত্রেয়ীকে এখানে একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। আমি ওকে জেলেবস্তি পর্যন্ত পৌঁছে। দিয়ে আসি। চলো মৈত্রেয়ী!

দুজনে উল্টোদিকে চলে গেলে আমি একা হাঁটতে থাকলুম। সুইস গেটের কাছে পৌঁছে হঠাৎ মনে হলো, মৈত্রেয়ী অভিনয় করছে না তো? কর্নেলকে বোকা বানানো অবশ্য সহজ নয়। তাহলেও কিছু বলা যায় না। মৈত্রেয়ী হয়তো তার প্রেমিকের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করতে এসেছিল। কর্নেল গিয়ে পড়ায় প্রেমিকটি গা-ঢাকা দিয়েছে এবং কর্নেল সম্ভবত ভেবেছেন মৈত্রেয়ী তার দ্বারা আক্রান্ত হতো!

হ্যাঁ–কর্নেল নিশ্চয় তার পালিয়ে যাওয়া টের পেয়েছিলেন!

সেচবাংলোয় পৌঁছুতে সাড়ে বারোটা বেজে গেল। সাধনবাবু এসে বললেন, কর্নেলসায়েবকে কোথায় ফেলে এলেন?

উনি পাখির পেছনে ছুটেছেন!

কাজটা ঠিক করেননি। তো আপনি স্নান করতে হলে করে নিন। গরম জলের ব্যবস্থা আছে বাথরুমে।

 বাথরুমে ঢুকে স্নান করার পর ক্লান্তি ঘুচে গেল। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে বারান্দার রোদে বসলুম। তারপর দেখলাম, এতক্ষণে কর্নেল ফিরে আসছেন।

বাংলোর গেট খুলে লনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে উনি বাইনোকুলারে দিগন্তবিস্তৃত জলার দিকটা দেখে নিলেন। তারপর বারান্দায় উঠে বললেন, বাহ! তুমি স্নান করেছ দেখছি।

আপনি স্নান করে নিন।

আজ নয়। বলে কর্নেল পাশের চেয়ারে বসলেন।

বললুম, মৈত্রেয়ীর ব্যাপারটা খুব আশ্চর্য! মেয়েটি বেপরোয়া এবং জেদী। কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, গঙ্গাভবনের নিচেই একটা নৌকো বাঁধা ছিল। আপাতদৃষ্টে জেলে-নৌকো। ছইয়ের ভেতর একটা লোক কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়েছিল।

তাকে সন্দেহ করার কারণ কী?

লোকটা যে-ই হোক, জেলে নয়। কারণ তার মাথার একটু অংশ বেরিয়ে ছিল।

সাধনবাবুকে আসতে দেখে কর্নেল চুপ করলেন। সাধনবাবু বললেন, আপনি পাখির পেছনে ছুটেছেন শুনে অস্বস্তি হচ্ছিল।

কর্নেল হাসলেন। আমি সর্পবশীকরণ মন্ত্র জানি সাধনবাবু!

সাধনবাবুও হেসে উঠলেন। আপনি কী যে জানেন না! ইঞ্জিনিয়ার সায়েব বলছিলেন, কর্নেলসায়েব এসে পড়েছে যখন, তখন শঙ্খচূড় এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাবে! তো লাঞ্চ কখন খাবেন?

আর মিনিট পনেরো পরে।

সাধনবাবু চলে গেলে বললুম, লোকটার মাথা দেখে বুঝলেন জেলে নয়? মাথা দেখে বোঝা যায়?

যায়। তবে তার চেয়ে বড় কথা মৈত্রেয়ীকে একটা ঘরে দেখে তাকে চার্জ করলুম। অমনি জানলার ফোকর দিয়ে দেখলুম, নৌকোটা ভাটার টানে ঘুরপাক খেতে খেতে দক্ষিণে ভেসে গেল। তার মানে, আমার সাড়া পেয়েই লোকটা কাছি খুলে ফেলেছিল।

বুঝলুম। কিন্তু মাথা দেখে–

কর্নেল চোখ কটমটিয়ে উঠে গেলেন। ঘরে ঢুকে পোশাক বদলাতে ব্যস্ত হলেন।…

খাওয়ার পর অভ্যাসমতো ভাতঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল। কম্বলের তলায় ঘুমে তলিয়ে যেতে দেরি হয়নি। চৌকিদারের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। সে চা এনেছিল।

জিজ্ঞেস করলুম, কর্নেলসায়েব কখন বেরিয়েছেন?

চৌকিদার বলল, এখন চারটে বাজে। সার বেরিয়েছেন দুটোর সময়।

 কোনদিকে যাচ্ছেন দেখেছ?

 টাউনের দিকে গেছেন মনে হলো।

বারান্দায় শেষ বেলার লাল রোদ বাঁকা হয়ে পড়েছে। বেতের চেয়ারে বসে চা শেষ করার পর একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে হলো। সিগারেট ছাড়বার চেষ্টা করছি বলে নিজের পয়সায় কিনি না।

চৌকিদার লনে মালীর সঙ্গে গল্প করছিল। তাকে ডেকে বললুম, সাধনবাবু কি আছেন?

সে বলল, হ্যাঁ সার।

সাধনবাবু সিগারেট খান না?

খুব খান সার।

 তাহলে ওঁর কাছ থেকে আমার জন্য একটা সিগারেট এনে দাও।

চৌকিদার চলে গেল পেছনদিকে। একটু পরে সাধনবাবু হাসিমুখে হন্তদন্ত এসে বললেন, আমি সার সিগারেট প্রচণ্ড খাই। কিছুতেই ছাড়তে পারলুম না। তো ভেবে দেখলুম, ক্যান্সার যদি হয়, তাহলে বাজে সিগারেট কেন, দামী সিগারেট খেয়েই থোক। এই নিন পুরো প্যাকেট।

অবাক হয়ে দেখলুম, দামী বিদেশি সিগারেট। বললুম, এ সিগারেট এখানে পাওয়া যায়?

সাধনবাবু বললেন, হাজিগঞ্জে বিদেশি সব জিনিস পাওয়া যায়। সাবান, পারফিউম থেকে শুরু করে টিভি। স্মাগলিং সার! এখানে স্মাগলারদের বড় একটা ঘাঁটি আছে। আপনি পুরো প্যাকেটটা রাখুন।

আমেরিকায় থাকার সময় কিংসাইজ মার্লবরো আমার প্রিয় ব্র্যান্ড ছিল। সেই সিগারেটের লোভ সম্বরণ করা গেল না। অনেকদিন পর সিগারেট টানতে টানতে মন চাঙ্গা হয়ে উঠল।

বাংলোয় টেলিফোন আছে ভুলে গিয়েছিলুম। চৌকিদার এসে বলল, আপিস ঘরে আসুন সার! আপনার টেলিফোন এসেছে।

বাংলোর পেছনদিকে অফিসঘর। টেলিফোন তুলে সাড়া দিতেই কর্নেলের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। জয়ন্ত! আমার ফিরতে সাতটা বেজে যাবে। তোমার চিন্তার কারণ নেই।

আপনি কি হেঁটে আসবেন?

মোটেও না। চক্রবর্তীমশাইয়ের মেয়ে-জামাইয়ের দু-দুটো গাড়ি আছে। অবশ্য অশোক আমাকে পৌঁছে দেবে। কারণ ওদের একজনকে নার্সিংহোমে থাকতে হবে। তুমি যদি নিঃসঙ্গ বোধ করো, সাধনবাবুর সঙ্গে গল্প করতে পারো। ভদ্রলোক চমৎকার সব গল্প বলেন।

সাধনবাবু আমাকে চমৎকার একটা জিনিস উপহার দিয়েছেন।

কী জিনিস?

কিংসাইজ মার্লবরো সিগারেট। পুরো এক প্যাকেট।

 বলো কী!

আপনি হাজিগঞ্জে সবরকম বিদেশি জিনিস পাবেন। খাঁটি হাভানা চুরুটও।

বাহ। এ তো সুখবর। কিন্তু পাব কোন দোকানে?

অশোকবাবুকে জিজ্ঞেস করুন। উনি খোঁজ না দিতে পারলে ফিরে এসে সাধনবাবুকে বলবেন। ঠিক পেয়ে যাবেন।

অসাধারণ সুসংবাদ ডার্লিং! রাখছি।…

আমাদের ঘরে ফিরে গিয়ে দেখি, সাধনবাবু বারান্দায় বসে সিগারেট টানছেন। আমাকে দেখে বললেন, কর্নেলসায়েবের ফোন?

হ্যাঁ। ওঁকে আপনার দেওয়া সিগারেটের কথা বললুম। উনি বললেন, তাহলে সাধনবাবুকে বলে রাখো, আমার এক বাকসো খাঁটি হাভানা চুরুট চাই।

সাধনবাবু হাসতে হাসতে বললেন, খুঁজে দেখবখন। গত শীতে কর্নেলসায়েব যখন এখানে বেড়াতে এসেছিলেন, তখন ভেবেছিলুম ওঁকে এক বাকসো বিদেশি চুরুট প্রেজেন্ট করব। কিন্তু তখন পুলিশ আর কাস্টমসের লোকেরা খুব ধরপাকড় চালাচ্ছিল। সুযোগ পাইনি। এখন স্মাগলাররা তাদের মুখ বন্ধ করে রেখেছে।

কর্নেলের কাছে শুনেছি, আপনি নাকি চমৎকার সব গল্প জানেন?

জানি। তবে সব গল্পই ভূতের। আপনি কি ভূত বিশ্বাস করেন?

কখনও ভূত দেখিনি। আপনি দেখেছেন?

অনেক। আসলে এই নিরিবিলি জায়গায় থাকি। ওদিকে একটা পুরনো শিবমন্দির আছে। আবার এদিকে ওই গঙ্গাভবন। রাতবিরেতে ভূতপ্রেত দেখেছি।

একটা গল্প বলুন।

 গল্প নয়। সত্যি ঘটনা।

এই সময় চৌকিদার এসে বলল, বাবু! আপনার টেলিফোন এসেছে।

 হ্যাত্তেরি! কার ফোন?

 ইঞ্জিনিয়ার ব্যানার্জি সায়েবের।

সাধনবাবু বিরক্ত হয়ে উঠে গেলেন। তার কিছুক্ষণ পরে বাংলোর আলো জ্বলে উঠল। সেই আলোয় দেখলুম, সাধনবাবু সাইকেল নিয়ে বেরুচ্ছেন। জিজ্ঞেস করলুম, কোথায় চললেন হঠাৎ?

সাধনবাবু মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে বললেন, আর বলবেন না। ইঞ্জিনিয়ার সায়েব ডেকেছেন। উনি টায়ার্ড। কাজেই আমাকেই যেতে হবে। ওদিকে সর্বনাশা সাপের ভয়। এই চাকরি আর আমার সইবে না।…

.

০৪.

বারান্দায় ঠাণ্ডা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছিল। তাই ঘরে ঢুকে গরম চাদর মুড়ি দিয়ে একটা ইংরেজি থ্রিলার পড়ে সময়ে কাটাচ্ছিলুম। চৌকিদার উঁকি মেরে বলল, চায়ের ইচ্ছে হলে বলবেন সার!

তোমার নামটা ভুলে গেছি!

আজ্ঞে শ্রীধর।

 হ্যাঁ, শ্রীধর। তুমি কি হাজিগঞ্জের লোক?

না সার! আমার বাড়ি ফরাক্কার ওদিকে।

এখানে তুমি একা থাকো?

আজ্ঞে।

আমাদের জন্য রান্না কি তুমিই করছ?

না সার! সাধনবাবুর ওয়াইফ করছেন! বাংলোর রাঁধুনী কান্তঠাকুর ছুটি নিয়েছে।

সাধনবাবুর ছেলেমেয়ে আছে তো?

শ্রীধর একটু হেসে বলল, আজ্ঞে না। থাকলে তো ভালই হতো। বাবু একটু সমঝে চলতেন।

তার মানে?

ছোটমুখে বড় কথা বলতে নেই সার! দিদিঠাকরুন মাটির মানুষ। তাই সহ্য করে থাকেন। শ্রীধর চাপাস্বরে বলল, বাবু রাতদুপুরে মাতাল হয়ে বড় ঝামেলা করেন। আমাকে আর মালী হরকে গিয়ে সামলাতে হয়। তবে বাংলায় গেস্ট বা অফিসার থাকলে বাবু লক্ষ্মীছেলেটি হয়ে থাকেন। ওপর-ওপর দেখে বুঝতে পারবেন না বাবুকে।

সাধনবাবু কিন্তু খুব সাহসী লোক।

হ্যাঁ। সে কথা ঠিক। রাতবিরেতে প্রায় আড্ডা দিতে যান হাজিগঞ্জে। মাতাল হয়ে ফিরে আসেন। এ সব কথা বাবুর কানে যেন না ওঠে সার! আমি সামান্য লোক

না, না। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।

সারকে তাহলে চা এনে দিই?

দাও। তো চা কি সাধনবাবুর স্ত্রী তৈরি করে দেবেন?

না সার। চায়ের সরঞ্জাম, তাছাড়া কফি-টফি এগুলো আপিসঘরের পাশের কিচেনে ব্যবস্থা আছে। হিটার জ্বেলে আমিই চা-ফা করব।

শ্রীধর চলে গেল। মনে হলো, সাধনবাবুর ওপর চাপা রাগ বা ক্ষোভ আছে। মুখ ফসকে আমার কাছে তা জানিয়ে একটু বিব্রত বোধ করছে।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সে চা আর বিস্কুট নিয়ে এল। তারপর বলল, দরকার হলে ডাকবেন সার। আমি হরদার ঘরে থাকব। ওর কোয়ার্টার কাছেই।

সময় কাটতে চাইছিল না। পৌনে আটটায় বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। বারান্দায় গিয়ে দেখলুম, বাংলোর নিচের রাস্তায় একটা মারুতি এসে থামল। তারপর কর্নেল নেমে এলেন। গেটের আলোয় আবছা ওঁকে দেখা যাচ্ছিল। গাড়িটা ব্যাক করে জোরে চলে গেল!

কর্নেল লনে ঢুকে আমাকে দেখতে পেয়ে বললেন, একটু দেরি হয়ে গেল। অশোকের তাড়া আছে। পরে তোমার সঙ্গে আলাপ করতে আসবে। তো তুমি একা দেখছি। সাধনবাবুর গল্প শোনা এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেল?

বললুম, ইঞ্জিনিয়ার সায়েবের আর্জেন্ট ফোন পেয়ে সাধনবাবু পাঁচটায় সাইকেলে চেপে বেরিয়েছেন। এখনও ফেরেননি। পাঁচটা মানে তখন সন্ধ্যা। ভদ্রলোকের সাহস আছে বটে!

কর্নেল ঘরে ঢুকে মুচকি হেসে বললেন, তা হলে এক বাকসো বিশুদ্ধ হাভানা চুরুটের আশা করা চলে।

চৌকিদার এসে সেলাম দিল কর্নেলকে। বলল, কফি আনব তো সার?

হ্যাঁ। আজ ঠাণ্ডাটা একটু বেশি মনে হচ্ছে। আবার এক পেয়ালা কফি দরকার।

চৌকিদার চলে গেল। বুঝলুম, সে কর্নেলের অভ্যাসের সঙ্গে পরিচিত।

কর্নেল চেয়ার টেনে বসে টুপি খুললেন। তারপর প্রশস্ত টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, অশোকের চেম্বার থেকে তোমাকে ফোন করেছিলুম। তারপর অশোক আমাকে নিয়ে গিয়েছিল হিউজেসগঞ্জের পুরনো জমিদার-বংশধর চন্দ্রনাথ রায়চৌধুরীর কাছে। শঙ্খচূড়ের হালহদিস শুনলুম।

বললুম, ভদ্রলোক কি সত্যিই গঙ্গাভবনে একটা শঙ্খচূড় মেরেছিলেন?

উনি স্বীকার করলেন, সর্পবিশারদ নন। তবে সাপটা ছিল প্রায় সাত ফুট লম্বা। প্রকাণ্ড ফণা। লেজে ভর করে কুঁসছিল। ওঁর হাতে ছিল দোনলা বন্দুক। পাখিমারা ছররা গুলি ভরা ছিল। পর-পর দুটো গুলিতেও সাপটা কাবু হয়নি। শেষে কয়েকটা ইট ছুঁড়ে তাকে ঢিট করেন। গাভবন এবং কুঠির জঙ্গলে নাকি এর আগেও উনি কয়েকটা বিষাক্ত সাপ মেরেছেন। তবে এই সাপটা দেখে ওঁর মনে হয়েছিল, হামাড্রায়াড অর্থাৎ শঙ্খচুড়।

ওঁকে জিজ্ঞেস করেননি একই সাপ দুজনকে কামড়াতে পারে কি না?

কর্নেল হাসলেন। দুজনকে কেন, এক ডজন লোককে কামড়াতে পারে। তপতীর প্রশ্নটা হলো, কামড়ালে বিষদাঁত ভেঙে যায়। আবার বিষ জমতে দেরি হয়। চন্দ্রনাথবাবুর মতে, দুজনকে দুটো সাপে কামড়েছে।

এই শীতকালেও?

চন্দ্রনাথবাবুর বক্তব্য হলো, বিষাক্ত সাপের ওপর পা দিলে বা দৈবাৎ আছাড় খেয়ে পড়লে কামড়াবেই।

অশোকবাবুর কী ধারণা? উনি তো ডাক্তার।

চন্দ্রনাথবাবুর সঙ্গে উনি একমত। গলায় কামড় নিছক কোইনসিডেন্স।

কিন্তু আপনি আজ নৌকোয় বিষাক্ত সাপের মতো একজন মানুষকে দেখেছেন! আপনার বক্তব্য, আপনি হঠাৎ গিয়ে না পড়লে মৈত্রেয়ী মারা পড়ত তার হাতে।

কর্নেল একটু চুপ করে থেকে বললেন, আমি কি বলেছি সে মৈত্রেয়ীর গলায় সাপের মতো দাঁত বিধিয়ে দিত?

হেসে ফেললুম। না। তা বলেননি বটে!

চৌকিদার কফি নিয়ে এল ট্রেতে। বলল, সাধনবাবু এখনও ফিরলেন না। আপনারা ডিনার কখন খাবেন সার?

অসুবিধে না হলে সাড়ে নটায়।

চৌকিদার চলে গেল। কর্নেল বললেন, আর ওসব কথা নয়। বুদ্ধিসুদ্ধি গুলিয়ে যাবে, যত বেশি মাথা ঘামাবে। কফি খাও। নার্ভ চাঙ্গা হবে।

বলেই কর্নেলের দৃষ্টি গেল মার্লবরো সিগারেটের প্যাকেটের দিকে। ওটা টেবিলে রেখেছিলুম। কর্নেল প্যাকেটটা দেখে রেখে দিলেন।

বললুম, সাধনবাবু আপনাকে নিরাশ করবেন না।

কর্নেল বললেন, বাহ্! সাধনবাবু তোমাকে একটা দেশলাইও দিয়েছেন। তবে দিশি জিনিস।

চৌকিদার বলছিল, সাধনবাবু প্রচণ্ড মাতাল হয়ে বউয়ের সঙ্গে ঝামেলা বাধান।

জানি। গত শীতে এসে শ্রীধরের কাছে কথাটা আমিও শুনেছিলুম। তবে ওসব ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলিয়ে লাভ নেই।

কনেলকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। চুপচাপ কফি শেষ করে চুরুট ধরিয়ে চোখ বুজে টানতে থাকলেন। আমি একটা মার্লবরো সিগারেট ধরিয়ে সেই বইটা পড়ার চেষ্টা করছিলুম। একটু পরে বাংলোর গেটের দিকে গাড়ির আলো এবং হর্ন শোনা গেল।

দরজা খোলা ছিল এবং গেটটা আমার চেয়ার থেকে দেখা যায়। দেখলুম, শ্রীধর দৌড়ে গিয়ে গেট খুলে দিয়ে সেলাম ঠুকল। একটা জিপগাড়ি এসে পোর্টিকোর তলায় দাঁড়াল। তারপর ওভারকোট এবং হনুমানটুপি পরা এক বেঁটে ভদ্রলোক জিপ থেকে বেরিয়ে বারান্দায় উঠলেন। মাথার টুপি খুলে ঘরে ঢুকে সম্ভাষণ করলেন, কর্নেল সরকার! আশা করি কোনো অসুবিধে হচ্ছে না?

কর্নেলের দিকে তিনি হাত বাড়িয়ে ছিলেন। কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে বললেন, বসুন মিঃ ব্যানার্জি! আমার মনে হচ্ছিল, জরুরি কাজে আটকে গেছেন বলে দর্শন পাচ্ছি না।

ভদ্রলোক একটা চেয়ার টেনে বসে বললেন, ঠিক তা-ই। আজ ফরাক্কায় গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানের ব্যাপারে জরুরি মিটিং ছিল। কাল প্রায় দুপুররাত্রি অব্দি কাগজপত্র তৈরি করতে হিমশিম খেয়েছি। ইচ্ছে ছিল ট্রেনেই যাব। কিন্তু রিস্ক নিইনি। সাধনকে ফোনে জিপটা নিয়ে যেতে বললুম। আশা করি, আপনি এজন্য কিছু মনে করেননি?

কর্নেল হাসলেন। না, না। আপনি তো জানেন, গাড়ির চেয়ে আমি পায়ে হাঁটতেই ভালবাসি। কারণ গাড়ি নিয়ে সর্বত্র যাওয়া যায় না। আলাপ করিয়ে দিই। জয়ন্ত চৌধুরী। আমার স্নেহভাজন বন্ধু। সাংবাদিক। আর জয়ন্ত! ইনি এখানকার ইরিগেশন ইঞ্জিনিয়ার মিঃ এস ডি ব্যানার্জি।

নমস্কার বিনিময়ের পর মিঃ ব্যানার্জি বললেন, কিছুক্ষণ আগে ফরাক্কা থেকে ফিরেছি! কাল আবার আর এক জায়গায় ছুটতে হবে। বনমালীপুরে একটা ওয়াটারড্যামের প্ল্যান করা হয়েছে।

বলে তিনি ডাকলেন, শ্রীধর!

 বাইরে থেকে চৌকিদার সাড়া দিল, সার!

সাধনকে ডেকে আনে।

শ্রীধর অবাক হয়ে বলল, বাবু তো সন্ধের মুখে আপনার টেলিফোন পেয়ে সাইকেলে চলে গেছেন। এখনও ফেরেননি।

আমার টেলিফোন পেয়ে? আমি তো ওকে ফোন করিনি।

 বাবু তো তাই বলে গেলেন সার!

মিঃ ব্যানার্জি একটু হেসে বললেন, সাধনটা মহা আড্ডাবাজ হয়ে উঠেছে। অন্য কেউ ডেকেছে। ওর কোনো বন্ধুই হবে। ওকে একটু ধাতানি দিতে হবে। পই পই করে বলেছিলুম, বাংলোয় বিশিষ্ট গেস্ট আসছেন। সারাক্ষণ নাগালের মধ্যে থাকবে। যেন কোনো অসুবিধা না হয়।

কর্নেল বললেন, না, না, মিঃ ব্যানার্জি। কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। শ্রীধরই যথেষ্ট।

শ্রীধর বলল, চা-কফি খাবেন সার?

মিঃ ব্যানার্জি বললেন, নাহ। এখনই চলে যাব। বলে তিনি কর্নেলের দিকে ঘুরলেন। আপনি যা খেয়ালি মানুষ। হঠাৎ কখন হুট করে কেটে পড়বেন। তাই একবার চোখের দেখা দেখে গেলুম। কোনো বিশেষ প্রয়োজন থাকলে সাধনকে বলবেন। একটু-আধটু বদ অভ্যাস থাকলেও লোকটি খুব কাজের। শ্রীধর! এঁদের যেন কোনো অসুবিধা না হয়।

শ্রীধর বলল, আমি সবসময় আছি সার!

কর্নেল বললেন, আচ্ছা মিঃ ব্যানার্জি! গঙ্গাভবন আর কুঠির জঙ্গল এলাকায় এত রাত্রে যাতায়াত করতে আপনার অস্বস্তি হচ্ছে না?

ব্যানার্জিসায়েব হাসলেন। ও! সেই সাপের ব্যাপার! ছাড়ুন তো! যত সব সুপারস্টিশন! তবে সাপের গায়ে পা পড়লে সাপ তো কামড়াবে। তা সে শীতে হোক আর যখন হোক!

কিন্তু গলায় কামড়াবে?

পা হড়কে সাপের গর্তের কাছে মাথা পড়লে সাপ যদি নাগাল পায়, গলাতেও ছোবল দেবে।

দুদিনে দুটো লোকের গলাতেই সাপের ছোবল?

দেখুন কর্নেল সরকার! ওই এরিয়াটা দুশো বছরের পুরনো ঘরবাড়ির ধ্বংস স্তূপে ঢাকা ছিল। পরে জঙ্গল গজিয়েছে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টও প্রচুর গাছ লাগিয়েছে। কিন্তু মাটির তলায় বহু ফাটল বা গর্ত আছে। ওখানে বিষাক্ত সাপ প্রায় দেখা যায়। বলে ব্যানার্জি সায়েব উঠে দাঁড়ালেন। হা–আপনার আবার পাখি প্রজাপতির পেছনে ছোটাছুটি করার অভ্যাস আছে। একটু সাবধানে চলাফেরা করবেন। তবে আমি বলি কী, সোজা এই ন্যাচারাল ওয়াটারড্যামের ধারে ধারে চার কিলোমিটার পশ্চিমে রেলব্রিজ আর হাইওয়ে ব্রিজের মাঝামাঝি জায়গায় যদি যান, সেখানে প্রচুর হিমালয়ান ডাক দেখতে পাবেন। আজ সকালে যাওয়ার সময় দেখেছি। এমন কি অজস্র ক্রেনও গাছে-গাছে বসে আছে লক্ষ্য করেছি।

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, বাহ্। এ একটা সুসংবাদ।

ব্যানার্জিসায়েব আমার দিকে বাও করে মাথায় হনুমানটুপিটি পরে নিয়ে বেরুলেন। কর্নেল তার সঙ্গে বেরিয়ে পোর্টিকোর কাছে গেলেন।

শ্রীধর এই ফাঁকে চাপা গলায় আমাকে বলল, তাহলে সাধনবাবুর কাণ্ড দেখুন সার!

কথাটা বলেই সে বেরিয়ে গেল। ব্যানার্জি সায়েবের গাড়ির পাশ দিয়ে দৌড়ে সে গেটটা আবার খুলে দিল।….

রাত সাড়ে নটায় আমরা ডাইনিং রুমে খেতে গেলুম। সেই সময় কোনো মহিলার চেঁচামেচি শুনতে পেলুম। শ্রীধরকে বললুম, কে চেঁচামেচি করছে?

শ্রীধর বলল, দিদিঠাকরুন সার!

তাহলে সাধনবাবু ফিরেছেন?

আজ্ঞে না। দিদিঠাকরুনের ওই অভ্যেস! রাগ হলে আপনমনে বাবুকে গালাগালি করেন। মাথা ক্রমে ক্রমে গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। প্রায়ই ফিট হন। ফিটের ব্যারামও আছে।

কর্নেল বললেন, সাধনবাবুর স্ত্রীর রান্নার প্রশংসা করো জয়ন্ত! ভদ্রমহিলা চমৎকার রাঁধেন। বাংলোর রাঁধুনির রান্না নেহাত দায়সারা!

বললুম, সাধনবাবু এত রাত অব্দি আড্ডা দিয়ে একা ফিরবেন? সত্যি! ওঁর সাহসের প্রশংসা করা উচিত।

শ্রীধর একটু ইতস্তত করে বলল, তখন ফোন করেছিল একজন মেয়েছেলে। সে বলল, ইঞ্জিনিয়ার সায়েব সাধনবাবুকে ডেকেছেন। জরুরি কাজ আছে। ওঁকে ডেকে দাও। এদিকে সায়েব বলে গেলেন, তিনি ডাকেননি। সাধনবাবুর কিছু বোঝা যায় না।

সাধনবাবুর আড্ডাটা কোথায় জানো শ্রীধর?

একটা আড্ডা জমিদারবাড়িতে।

চন্দ্রনাথবাবুর কাছে?

আজ্ঞে। আর একটা আড্ডা ঘাটবাজারে কালীকেষ্টবাবুর গদিতে।

কর্নেল আমার দিকে চোখ কটমটিয়ে বললেন, খাওয়ার সময় কথা বলতে নেই।

অতএব চুপ করে গেলুম!…

সকালে শ্রীধরের ডাকে ঘুম ভেঙেছিল। সে বেড-টি টেবিলে রেখে চলে যাচ্ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করলুম, সাধনবাবু ফিরেছেন?

শ্রীধর গম্ভীর মুখে বলল, আজ্ঞে না। বোধ করি নেশার ঘোরে রাত্তিরে ফিরতে পারেননি। একেবারে বাজার করে ফিরবেন।

সাধনবাবু তা হলে কোনো-কোনো রাতে বাড়ি ফেরেন না?

আজ্ঞে। তবে বাংলোয় গেস্ট বা অফিসার থাকলে এমন করেন না। কে জানে কী ব্যাপার!

শ্রীধর চলে গেল। কর্নেল ঘরে নেই। যথারীতি প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন। কিন্তু আজও বাইরে ঘন কুয়াশা। নিচের জলার ওপর কুয়াশার গাঢ় ধূসর পর্দা টাঙানো আছে।

কর্নেল ফিরলেন নটা নাগাদ। ঘরে ঢুকে বললেন, এখনই ব্রেকফাস্ট করে বেরুব। তৈরি হয়ে নাও।

বললুম, সাধনবাবু এখনও বাড়ি ফেরেননি জানেন?

কর্নেল কথাটা কানে নিলেন না। বেরিয়ে গিয়ে এধরকে ডেকে এখনই ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করতে বললেন। তারপর ওভারকোট খুলে পোশাক বদলাতে ব্যস্ত হলেন। ছাইরঙা জ্যাকেট গায়ে চড়ালেন।

গতরাত্রি থেকে কর্নেলকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। এখন তো আরও গম্ভীর এবং যেন কিছুটা অন্যমনস্ক। অথচ উনি কৌতুকপ্রিয় মানুষ। জটিল রহস্যের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতেও ওঁকে রসিকতা করতে দেখেছি।

ব্রেকফাস্ট করে আমরা বেরোলুম। বাইরে তখনও কুয়াশা পুরোটা কাটেনি। নিচের রাস্তায় গিয়ে কর্নেল আস্তে বললেন, আবার একটা মানুষ মরেছে জয়ন্ত! গলার কাছে একই রকমের দুটো সূক্ষ্ম ক্ষতচিহ্ন।

চমকে উঠে বললুম, কোথায় মরেছে? কখন?

হইচই হবে বলে শ্রীধরকে বলিনি। মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে প্রথমে গিয়েছিলুম শিবমন্দিরের সেই সাধুদর্শনে। তাঁকে আজ দেখতে পাইনি। তারপর হাঁটতে হাঁটতে স্লুইস গেট পেরিয়ে গঙ্গাভবনের দিকে যাচ্ছিলুম। তখন কুয়াশা খুব ঘন ছিল। গঙ্গভবনের কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎ দেখি রাস্তার ধারে শুকনো পাতার ওপর একটা টর্চ পড়ে আছে। ওটা চোখে পড়ত না। কিন্তু টর্চটার বা মিটমিট করে জ্বলছে। তারপর একটু তফাতে একটা সাইকেল পড়ে থাকতে দেখে–

কর্নেলের কথার ওপর বলে উঠলুম, সাইকেল?

হ্যাঁ। সাইকেলটার উল্টোদিকে নিবুনিবু টর্চ। আর পাশেই একটা ঝোঁপের মধ্যে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে একটা মানুষ। গায়ে সোয়েটারের ওপর জ্যাকেট। মাথায় জড়ানো মাফলার খানিকটা খুলে গেছে! পরনে প্যান্ট, মোজা এবং জুতো। বুটজুতো বলে খুলে পড়েনি। কর্নেল ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লেন। খানিকটা বাপ। বেরিয়ে গেল।

ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলুম। বললুম, মানুষটা কি সাধনবাবু?

হ্যাঁঃ।

সর্বনাশ! তারপর?

সম্ভবত শেষ রাতের ঘটনা। হন্তদন্ত হাঁটতে হাঁটতে থানায় খবর দিলুম। পুলিশ এসে বডি তুলে নিয়ে গেছে। ঘটনাটা আমি চেপে রাখতে অনুরোধ করেছি পুলিশকে। পোস্টমর্টেমের পর সাধনবাবুর স্ত্রীকে খবর দেওয়া হবে।

হতবাক হয়ে কর্নেলকে অনুসরণ করলুম।…

.

০৫.

 ঘটনাস্থলে পৌঁছে কর্নেল বললেন, একটা ব্যাপার স্পষ্ট। সাইকেলে চেপে আসার সময় সাধনবাবু এখানেই তার আততায়ীকে সামনে দেখতে পেয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য টের পেয়ে তিনি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। এখানে সাইকেল থেকে নেমে পড়েন। ওখানে তাঁর টর্চ পড়ে ছিল। লক্ষ করো, তিনি পাটোয়ারিজির ফার্মহাউসের দিকে ছুটে পালাতে চেয়েছিলেন। কারণ আর কয়েক পা এগোলেই ফার্মহাউসে যাওয়ার রাস্তা। কিন্তু আততায়ী তাকে ধরে ফেলে। হাতে টর্চ ধস্তাধস্তিতে ছিটকে পড়ে। তারপর তার গলায় শঙ্খচূড়ের বিষাক্ত দাঁত বিঁধে যায়।

বললুম, শঙ্খচূড়ের দাঁত মানে?

এখনও বুঝতে পারছ না? অন্য কেউ সাধনবাবুর ডেডবডি এখানে ওই অবস্থায় দেখলে স্বাভাবিক বুদ্ধিতেই ধরে নিত, শঙ্খচূড় সাপ তাকে তাড়া করেছিল। তার সাইকেলের চাকায় সম্ভবত সাপটা জড়িয়ে গিয়েও থাকতে পারে। তাই তিনি সাইকেল থেকে লাফ দিয়ে নামেন। বাকিটা কল্পনা করে নিতে লোকের অসুবিধে হতো না।

বলে কর্নেল এবার গতি বাড়ালেন। অনেক প্রশ্ন আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কোনো মেয়ে সাধনবাবুকে কাল সন্ধ্যায় ফোন করে বলেছিল, ইঞ্জিনিয়ারসায়েব ডেকেছেন। তারপর সাধনবাবুর তো ইঞ্জিনিয়ারসায়েবের কাছে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে তিনি যাননি। অন্য কোথাও গিয়েছিলেন এবং সেখানে শেষ রাত অব্দি ছিলেন। কী করছিলেন সেখানে? তাছাড়া শেষ রাতেই বা ফিরে আসছিলেন কেন?

শ্রীধরের বক্তব্য অনুসারে ধরে নেওয়া যায়, তিনি মদের আড্ডায় জমে গিয়েছিলেন। শেষ রাতে নেশা কেটে যায় এবং যেহেতু বাংলোয় গেস্ট আছে, তাই ফিরে আসছিলেন।

হ্যাঁ। এটাই সম্ভবত ঘটেছিল। কিন্তু কেউ তাকে হত্যার জন্য এই প্রচণ্ড ঠাণ্ডা রাতে এখানে অপেক্ষা করবে কেন, যদি না সে জানে কখন তিনি বাড়ি ফিরবেন?

নাহ। যত ভাবব, মাথার ভেতরটা জট পাকিয়ে যাবে। সঙ্গে বৃদ্ধ রহস্যভেদী আছেন। তিনিই এসব নিয়ে ভাবুন।

জেলেবস্তির মোড়ে পৌঁছে একটা সাইকেল রিকশ পাওয়া গেল। কর্নেল রিকশতে উঠে বললেন, থানায় চলো!

হিউজেসগঞ্জের পশ্চিম অংশে থানা কোর্টকাছারি হাসপাতাল। থানায় পৌঁছুতে প্রায় কুড়ি মিনিট লাগল। ততক্ষণে কুয়াশা মুছে রোদ ফুটেছে।

অফিসার-ইন-চার্জ উঠে দাঁড়িয়ে কর্নেলকে সম্মান জানালেন। তার ঘরে দুজন অফিসার বসে ছিলেন। তারা বেরিয়ে গেলেন। কর্নেল আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। অফিসার-ইন-চার্জ বয়সে যুবক বললেই চলে। নাম রমেন্দ্র মণ্ডল। তিনি বললেন, আগে কফি খান কর্নেল সায়েব। তারপর কথা হচ্ছে। আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে।

কর্নেল হাসলেন! ক্লান্ত নয়, উত্তেজিত! যাই হোক, কফি আসুক। তবে তার আগেই কথা বলতে অসুবিধে নেই।

রমেন্দ্রবাবু বললেন, তা নেই। কিন্তু শুনলে আপনি হতাশ হবেন। একটু আগে মর্গের ডাক্তার খবর দিলেন, রক্তে বিয পেয়েছেন। হার্ট বন্ধ হয়ে গেছে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়ে। নেহাত কেবাইটিং কেস। অবশ্য এটা প্রাইমারি ফাইন্ডিং। ডিটেল রিপোর্ট তৈরি করে পরে পাঠাবেন।

গলায় কামড়েছে সাপ?

আপনার কথামতো ওই পয়েন্টটা তুলেছিলুম। ডাক্তারের মতে, ভদ্রলোক সম্ভবত সাইকেলের চাকা স্লিপ করে সাপের মুখের কাছেই আছাড় খেয়েছিলেন। সাপটা ওখানে শুকনো পাতার তলায় কোনো ফাটলে ঘুমোচ্ছিল।

বডি যেখানে পড়ে ছিল, সেখানে কোনো ফাটল দেখিনি!

রমেন্দ্রবাবু হাসলেন। ওখানে চারদিকে শুকনো পাতার তূপ জমে আছে। ফাটল আছে কি না পরীক্ষা করতে হলে সব পাতা সরিয়ে দেখতে হয়। তাই না?

হ্যাঁ। তা ঠিক। কর্নেল সায় দিলেন। গর্ত থাকাও অস্বাভাবিক নয়। কারণ। পুরো এলাকার তলায় অজস্র ধ্বংসাবশেষ আছে। ইরিগেশন ইঞ্জিনিয়ার মিঃ ব্যানার্জি বলছিলেন।

কফি এল। রমেন্দ্র মণ্ডল বললেন, কফি খান। জয়ন্তবাবু! আপনি নিন।

কফি খেতে খেতে রমেন্দ্রবাবু বললেন, সাধনবাবু গত রাতে প্রাক্তন জমিদারবাড়িতে চন্দ্রনাথ রায়চৌধুরীর সঙ্গে দাবা খেলছিলেন। চন্দ্রনাথবাবুকে আমাদের অফিসার খুলে বলেননি, কেন একথা জিজ্ঞেস করা হচ্ছে। শুধু বলেছেন, সকালে উনি বাড়ি ফেরেননি। তাই ওঁর স্ত্রী থানায় এসেছিলেন। চন্দ্রনাথবাবু বলেছেন, সাধনবাবু এগারোটায় চলে যান। কালীকৃষ্ণবাবুর গদিতে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। অতরাতে গদি খোলা থাকে না। যাই হোক, আমাদের অনেক সোর্স আছে। তাদের বলা হয়েছে। সাধনবাবু

কর্নেল তার কথার ওপর বললেন, একটা কথা। মর্গের ডাক্তার মৃত্যুর আনুমানিক সময় সম্পর্কে কিছু বলেছেন?

হ্যাঁ। আপনার ধারণা ঠিক! রাত তিনটে থেকে চারটের মধ্যে ভিকটিম মারা গেছেন।

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, টর্চের ব্যাটারির অবস্থা দেখে আমি একটা হিসেব করেছিলুম। নিছক অনুমান অবশ্য। ব্যাটারিটা প্রায় নতুন মনে হয়েছিল।

রমেন্দ্র মণ্ডল একটু হেসে বললেন, ও! আসল কথাটা বলাই হয়নি। ভিকটিমের পেটে প্রচুর অ্যালকোহল পাওয়া গেছে। তার মানে, চন্দ্রনাথবাবুর সঙ্গে দাবা খেলে সাধনবাবু কোনো মদের আড্ডায় জুটেছিলেন। এখানে আজকাল মদের আড্ডা প্রচুর। বিদেশি মদও পাওয়া যায়। এখন স্মাগলারদের অনেকটা শায়েস্তা করা গেছে। কবছর আগে তো প্রকাশ্যে রাস্তায়, বিদেশি জিনিস বিক্রি হতো।

ড্রাগ–মানে নার্কোটিকস?

হ্যাঁ! তা-ও। এখন কারবারিরা ঘাঁটি সরিয়ে নিয়ে অন্য এলাকায় গেছে। বলে অফিসার-ইন-চার্জ হেসে উঠলেন। জয়ন্তবাবু তো রিপোর্টার! ফিরে গিয়ে নিশ্চয় কাগজে কিছু লিখবেন! তো সত্যি কথাটা যেন লিখবেন। হাজিগঞ্জ একসময়। ছিল নার্কোটিকস আর চোরাই বিদেশি জিনিসের বড় ঘাঁটি। আমি আসার পর সব ঘাঁটি খতম করতে পেরেছি।

বললুম, নিশ্চয় লিখব। তবে পরপর তিনটি স্নেকবাইটিংয়ের ঘটনাও কিন্তু লিখব।

নিশ্চয় লিখবেন। এই এরিয়ায় স্নেকবাইটিং নতুন ঘটনা নয়। প্রতি বছর এক ডজন করে লোক আমার থানা এরিয়ায় মারা পড়ে। হসপিট্যালের অবস্থা বাজে। সাপের বিষের ওষুধ নেই। এটাও লিখবেন।

কিন্তু শীতকালেও কি এখানকার লোককে সাপে কামড়ায়?

রমেন্দ্র মণ্ডল গম্ভীর হয়ে বললেন, আমার ধারণা ছিল শীতকালে সাপে কামড়ায় না। এখন দেখছি, বিষাক্ত সাপের কাছে শীত-গ্রীষ্ম বলে কিছু নেই। এটা একটু অস্বাভাবিক হলেও মেনে নিতে হচ্ছে। গত সপ্তাহের দুটো ঘটনায় হস্তক্ষেপের সুযোগ পাইনি। কর্নেল-সায়েবের সামনে সাধনবাবুর ডেডবডি না পড়লে এটাও পুলিশকে জানানো হতো না। এটা বেআইনি ব্যাপার। কিন্তু লোকাল সেন্টিমেন্ট বলে চুপ করে থাকতে হয়।

কর্নেল বললেন, আমি উঠছি। আপনি এবার সাধনবাবুর স্ত্রীকে খবর দিতে পারেন। আর একটা কথা। মর্গের ডাক্তারকে আবার মনে করিয়ে দেবেন, গলায় সূক্ষ্ম ক্ষতচিহ্ন দুটো সাপের দাঁতের হলে মাইক্রোস্কোপে দাঁত খুঁজে পাওয়া যাবে।

বলে রেখেছি। আবার মনে করিয়ে দেব।…

থানা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বললুম, সাধনবাবুকে কোনো মেয়ে ফোন করে বলেছিল ইঞ্জিনিয়ারসায়েব ডেকেছেন। ও সিকে কথাটা বলা উচিত ছিল। টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অপারেটরের কাছে পুলিশ জানতে পারত–

কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন, এখানকার এক্সচেঞ্জ অটোমেটিক। এমনকি এস টি ডি পর্যন্ত আছে। হিউজেসগঞ্জে কোটিপতি ব্যবসায়ীও আছেন। এটা জেলার একটা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। তাছাড়া উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যাপারে একটা বড় ব্রিজের ভূমিকা আছে হিউজেসগঞ্জের।

কথাটা শুনে দমে গেলুম। একটু পরে বললুম, তবে ও সি-র ওই কথাটা ঠিক নয়। ফরেন গুডসের স্মাগলিং এখানে বন্ধ হয়নি।

কর্নেল হাসলেন। ও সি-কে ভাগ্যিস তুমি মার্লরোর প্যাকেট বের করে সিগারেট অফার করোনি!

বললুম, ওই যাঃ! প্যাকেটটা ফেলে এসেছি।

কর্নেল একটা সাইকেল রিকশ ডাকলেন। আমার কথায় কান দিলেন না। রিকশতে চেপে বললেন, তোপপাড়া চলো!

রিকশা চলতে শুরু করল। জিজ্ঞেস করলুম, তোপপাড়া? সেটা আবার কী?

তোপ চেনো না? কামান। মোগল আমলে ওখানে এক ফৌজদারের। তোপখানা ছিল।

সেখানে কার কাছে যাচ্ছি আমরা?

 মৈত্রেয়ীর সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার।

বড় রাস্তা দিয়ে অনেকদূর এগিয়ে বাঁদিকের একটা গলিতে ঢুকে রিকশওয়ালা বলল, এটাই তোপপাড়া সার! কোথায় নামবেন?

তুমি অর্ধেন্দুবাবুকে চেনো? মানে–স্কুলে মাস্টারি করতেন। সাপের কামড়ে মারা গেছেন।

আমি ওনার বাড়ি চিনি না সার!

ঠিক আছে। জিজ্ঞেস করে নিচ্ছি।

আর একটা গলির মোড়ে গিয়ে রিকশ দাঁড় করালেন। একটা বাড়ির বারান্দায় রোদে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। কর্নেল তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি অবাক হয়ে তাকালেন। তারপর বললেন, অর্ধেন্দু তো বেঁচে নেই। তার মেয়ে আছে অবশ্য। আপনারা কোত্থেকে আসছেন?

কর্নেল বললেন, কলকাতা থেকে। অর্ধেন্দুবাবু আমার দূরসম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়েই আসছি।

অ। তা ওই যে জলের ট্যাঙ্ক দেখছেন, ওখানে বাঁদিকে ঘুরে কয়েকটা বাড়ির পর জিজ্ঞেস করবেন।

ভদ্রলোকের কথামতো এগিয়ে বাঁদিকে ঘুরে কর্নেল রিকশওয়ালাকে থামতে বললেন। তারপর ভাড়া মিটিয়ে পা বাড়ালেন। একটা লন্ড্রিতে জিজ্ঞেস করে বাড়িটার খোঁজ পাওয়া গেল। একতলা পুরনো বাড়ি। বারান্দায় উঠে কড়া নাড়তেই মৈত্রেয়ীর সাড়া পাওয়া গেল। দরজা খুলে সে ব্যস্তভাবে বলল, আসুন! ভেতরে আসুন। আমি দুটো মেয়েকে পড়াচ্ছি। ওদের যেতে বলি। আপনারা এ ঘরে বসুন।

ঘরে তিনটে আলমারি ভর্তি বই। কমদামী একটা সোফাসেট। দেয়ালে সম্ভবত অর্ধেন্দুবাবু ও তাঁর স্ত্রীর ছবি। ছবিতে ফুলের মালা পরানো আছে।

দুটি কিশোরী বইখাতা হাতে এ ঘরে এল এবং কর্নেলের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। মৈত্রেয়ী বলল, মাকে বলবে, কলকাতা থেকে আমার আত্মীয় এসেছেন। কেমন?

তাদের প্রায় ঠেলে বের করে দিয়ে সে দরজা বন্ধ করল। তারপর বলল, কী ভাগ্যে এসেছেন! আগে চা-ফা কিছু খান!

নাহ। কর্নেল বললেন, তুমি বসো। কয়েকটা জরুরি কথা বলে চলে যাব।

মৈত্রেয়ী কর্নেলের মুখোমুখি বসল। তাকে উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল।

 কর্নেল বললেন, একটা প্রশ্ন করছি। আশা করি সঠিক উত্তর দেবে।

কেন দেব না? বলুন?

তুমি কি মাঝেমাঝে চন্দ্রনাথবাবুর বাড়ি যাও?

 হ্যাঁ, যাই। উনি সম্পর্কে আমার কাকা হন। বাবার মাসতুতো ভাই।

কর্নেল হাসলেন। তাহলে তুমি এখানকার জমিদারবংশের এক শরিকের মেয়ে!

আমার ওসব ব্যাপারে কোনো স্মৃতি নেই। বাবার অবশ্য একটু গর্বটব ছিল। তো কেন ওকথা জিজ্ঞেস করছেন?

কারণ আছে। বাই এনি চান্স কাল বিকেলে বা ধরো, পাঁচটা নাগাদ তুমি কি কাকার বাড়িতে ছিলে?

ছিলুম।

এগেন বাই এনি চান্স তোমার কাকা কি তোমাকে টেলিফোন করতে বলেছিলেন কাউকে?

মৈত্রেয়ী হাসল। ও! বুঝেছি! ইরিগেশন বাংলোর কেয়ারটেকার সাধনবাবু ভাল দাবা খেলতে পারেন। কাকুরও খুব দাবার নেশা। তো আমাকে বললেন, বাংলোয় গেস্ট আছে। সাধন আসবে না। তুই ওকে ফোন করে বল তো, ইঞ্জিনিয়ারসায়েব ডেকেছেন। আসছে কি না জেনে নিবি। আমি মোটরবাইকে চেপে ওকে জেলেপাড়ার মোড়ে পিক আপ করব।

তুমি কতক্ষণ ছিলে কাকার বাড়িতে?

ফোন করে শিওর হলুম সাধনবাবু আসছেন। তখন কাকু বেরুলেন। আমাকে বড় রাস্তার মোড়ে নামিয়ে দিয়ে গেলেন।

কর্নেল নিভে-যাওয়া চুরুটটা ধরিয়ে বললেন, অ্যাশট্রে আছে?

এক মিনিট। দিচ্ছি। বলে মৈত্রেয়ী দেয়ালের তাক থেকে একটা অ্যাশট্রে এনে দিল। তারপর জিজ্ঞাসু দৃষ্টে তাকাল।

জানা গেছে, সাধনবাবু রাত প্রায় এগারোটা অব্দি তোমার কাকার সঙ্গে দাবা খেলে চলে যান। তারপর উনি অন্য কোথাও ছিলেন। আজ ভোরে ওঁর ডেডবডি পাওয়া গেছে গঙ্গাভবনের সামনে।

মৈত্রেয়ী শিউরে উঠে বলল, মার্ডার?

না। একই কেস। গলার কাছে দুটো সূক্ষ্ম ক্ষতচিহ্ন। মর্গের ডাক্তারের মতে, বিষাক্ত সাপের কামড়ে মৃত্যু!

মৈত্রেয়ী ফুঁসে উঠল। ডাক্তার ভুল বলেছেন! কেউ বাবার মতো ওঁকেও বিষ ইঞ্জেকশন দিয়ে মেরে ফেলেছে। আমি আপনাকে বলেছি, বাবা নিশ্চয় খুনীর কোনো কুকীর্তি দেখে ফেলেছিলেন। যেমন স্বপন বল কুড়োতে গিয়ে দেখতে পেয়েছিল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সাধনবাবুও একই কারণে তার হাতে মারা পড়েছেন।

সাধনবাবু মারা গেছেন রাত তিনটে থেকে চারটের মধ্যে। উনি তখন বাড়ি ফিরছিলেন। কারণ রাস্তায় ওঁর সাইকেল আর জ্বলন্ত টর্চ পড়েছিল।

ভারি অদ্ভুত তো! খুনী কি জানত কখন সাধনবাবু বাড়ি ফিরবেন?

কর্নেল আস্তে বললেন, তুমি বুদ্ধিমতী। একই প্রশ্ন আমারও।

মৈত্রেয়ী একটু চুপ করে থাকার পর বলল, এমন হতে পারে খুনী তাঁকে ফলো করে যাচ্ছিল।

হ্যাঁ। তাহলে সে-ও সাইকেলে যাচ্ছিল ধরে নিতে হয়।

সে তো বটেই।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, এমনও হতে পারে খুনী সাধনবাবুর চেনা লোক। ওঁকে এগিয়ে দেবার ছলে ওঁর সঙ্গ ধরেছিল।

মৈত্রেয়ী মাথা নেড়ে সায় দিল। হ্যাঁ। তা-ও সম্ভব। খুবই সম্ভব। বলে ফের একটু চুপ করে কিছু ভেবে নিল সে। বলল, সাধনবাবুর মদ্যপানের অভ্যাস ছিল। চন্দ্রনাথকাকুর সঙ্গে ওঁকে মদ খেতে দেখেছি। আমার ধারণা, কাকুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে উনি খুনীর পাল্লায় পড়েন। সে ওঁকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে কোথাও শেষরাত্রি অব্দি মদের আসর বসিয়েছিল। কাকুর কাছে শুনেছি, বিদেশি মদের গন্ধ পেলেই সাধনবাবু মেতে উঠতেন। এখানে ফরেন লিকার পাওয়া যায়। কাকুর মুখে শুনেছি।

কর্নেল চুরুট অ্যাশট্রেতে ঘষে গুঁজে দিলেন। তারপর বললেন, তোমার অনুমান যুক্তিসম্মত। শুধু একটাই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সাধনবাবুকে হঠাৎ এতদিনে মেরে ফেলার দরকার কেন হলো?

মৈত্রেয়ী স্মার্ট মেয়ে। তখনই উত্তর দিল, হয়তো সাধনবাবু তাকে ব্ল্যাকমেল। করতেন বা ভবিষ্যতে করবেন ভেবে লোকটা আর রিস্ক নিতে চায়নি।

থাক এসব কথা। তোমার বাড়ি এসে একটা অন্য কৌতূহল জাগছে। বাড়িতে তুমি একা থাকো। ভয় করে না?

নাহ্। ভয় কেন করবে?

হ্যাঁ–তোমার সাহসের পরিচয় পেয়েছি। তোমার ভবিষ্যৎ প্ল্যান কী? এম এ পাস করেছ। নিশ্চয় চাকরি-টাকরি কিছু করবে?

বাংলায় এম এ। মৈত্রেয়ী হাসল। কে দেবে চাকরি? এখানে একটা মহিলা সমিতি আছে। সেখানে গ্রামের পুরনো সব কুটিরশিল্প নিয়ে কাজকর্ম চলছে। গ্রাম থেকে মেয়েরা এসেই করে। আমি সমিতিতে যোগ দিয়েছি। অর্গানাইজারের কাজ করছি। একজিবিশান হয়েছে গতবছর। ভবিষ্যতে বিদেশে যাওয়ারও সুযোগ পেতে পারি।

বাহ। ভাল। বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। আমি চলি। তুমি কিন্তু সাবধানে চলাফেরা কোরো।….

গলিরাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তায় পৌঁছলুম। কর্নেল বললেন, আজ বাংলোয় লাঞ্চের আশা নেই। এখানকার বিখ্যাত হোটেল জাহ্নবীতে খেয়ে নেব। চলো! একবার চক্রবর্তীমশাইয়ের মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে দেখা করা যাক। অশোক সাপ সম্পর্কে ভালভাবে আবার পড়াশুনা করতে চেয়েছে। দেখি, কী বলে সে।

এইসময় একটা মারুতি আমাদের পাশে এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে উজ্জ্বল। ফর্সা রঙের এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক বলে উঠলেন, হ্যাল্লো কর্নেলসায়েব! কলকাতা থেকে ফিরে শুনলুম আপনি এসেছেন। রাজু বলল। তো ইরিগেশন বাংলোয় গিয়ে শুনলুম, আপনারা বেরিয়ে গেছেন। ওদিকে সাংঘাতিক ঘটনা। বাংলোর কেয়ারটেকারকে নাকি কোথায় সাপে কামড়েছে। মারা গেছেন। উঠে পড়ুন। আপনার খোঁজেই বেরিয়েছি বলতে পারেন। উঠে পড়ুন গাড়িতে।

কর্নেলও বললেন, হ্যাল্লো মোহনজি! তারপর মোহন সিংহ পাটোয়ারির দিকে হাত বাড়ালেন। শেকহ্যান্ডের সময় মোহনজি তাকে টেনে গাড়িতে ঢুকিয়ে পাশে বসালেন।

কর্নেল বললেন, তুমি সামনে বসো জয়ন্ত!..

.

০৬.

 মোহনজির পরনে ধুতি, সার্জের পাঞ্জাবি আর জহরকোট। চেহারায় রাজপুত ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু তিনি বাংলা বলেন বাঙালির মতোই।

এটা স্বাভাবিক। সাতপুরুষ ধরে তারা হিউজেসগঞ্জের অধিবাসী। এখন পুরোপুরি বাঙালি হিন্দু হয়ে গেছেন। দুর্গাপুজো কালীপুজো করেন বাড়িতে। গাড়িতে যেতে যেতে আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলে মোহনজি নিজেই আমাকে এসব কথা জানালেন।

গঙ্গাভবনের পাশ দিয়ে যাবার সময় তিনি বাড়িটা দেখিয়ে বললেন, বাড়িটা তৈরি হয়েছিল রাজস্থানী স্থাপত্যশৈলীতে। কালক্রমে ভেঙেচুরে এমন অবস্থা হয়েছে, সেই শৈলীর চিহ্নমাত্র নেই। তবে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করলে ঝরোকা আর পঙ্খের কিছু চিহ্ন চোখে পড়বে।

তাঁর ফার্মহাউসে পৌঁছে সেই তাগড়াই লোকটিকে দেখতে পেলুম। মোহনজি তাকে বললেন, রাজু! তুমি কর্নেলসায়েবের সঙ্গে ইরিগেশন বাংলোয় যাও। ওঁদের ব্যাগেজপত্তর নিয়ে এস। আমি ততক্ষণ জয়ন্তবাবুর সঙ্গে গল্প করি।

ফার্মহাউসের একতলা বাংলোটি দেখে ভাল লাগল। রঙবেরঙের ফুল আর বিদেশি গাছে সাজানো। সেচবাংলোর চেয়ে সুদৃশ্য। বারান্দায় রোদে বসে মোহনজি বললেন, তিরিশ একর জমি নিয়ে এই ফার্ম। বছরে সবরকমের ফসল ফমূল হয়। সরকারের আইন বাঁচিয়ে ফ্যামিলির পাঁচজনের নামে জমি কেনা হয়েছিল। মাথাপিছু জমির ঊর্ধ্বসীমা সরকার বেঁধে দিয়েছেন, তা আপনি নিশ্চয় জানেন। তবে এই ফার্ম আমার নেহাত শখের জিনিস বলতে পারেন। ব্যবসা বাণিজ্য করতে করতে চুল পেকে গেল। ওসব আর ভাল লাগে না। ছেলেদের হাতে সব ছেড়ে দিয়ে এখানে নেচারের মধ্যে পড়ে থাকি। স্বস্তি পাই।

বললুম, সাপের উৎপাত যা শুরু হয়েছে, আর স্বস্তি পাবেন বলে মনে হচ্ছে না।

মোহনজি হেসে উঠলেন। তা যা বলেছেন! মজার ব্যাপার দেখুন না! দুজন বেদে এনে শঙ্খচুড় বা বিষধর যে সাপই হোক, ধরতে বলেছিলুম। একশো টাকা। বখশিস দিতে চেয়েছিলুম। ওরা মন্তর-তন্তর পড়ে গঙ্গাভবনের ওখানে খুব খোঁজাখুঁজি করল। তারপর রাতটা কাটিয়ে কেটে পড়ল। রাজু বলেছিল, ওদের ওস্তাদকে আনতে গেছে। কিন্তু কোথায় তারা আর তাদের ওস্তাদ? আজ অব্দি তারা ফিরল না। বলে মোহনজি গলার স্বর চাপা করলেন। আমার কিন্তু সন্দেহ জেগেছে। সাপ না অন্যকিছু?

অন্যকিছু বলতে কী?

কোনো হিংস্র উড়ো প্রাণী। ধরুন, ভ্যাম্পায়ার।

এদেশে ভ্যাম্পায়ার আছে বলে জানি না। ব্রাজিলের জঙ্গলে নাকি আছে। তবে সেই ভ্যাম্পায়ারের কামড়ে মানুষ মরে না। তারা খানিকটা রক্ত চুষে খায় ঘুমন্ত মানুষের শরীর থেকে। এইমাত্র!

মোহনজি একটু চুপ করে থেকে বললেন, কর্নেলসায়েব একটা কথা বলেন। প্রকৃতির রহস্যের কতটুকু আমরা জানি? ওই কথাটা আমিও বলি। ধরুন, এমন হতে পারে যে, বিষধর সাপের মতো কোনো প্রজাতির ভ্যাম্পায়ার যেভাবে হোক এই তল্লাটে এসে জুটেছে! রক্ত চুষে নেয় দুটো দাঁত দিয়ে। আর দাঁতের বিষে মানুষও মারা পড়ে! বলবেন, এখনও তেমন কোনো প্রাণী এদেশে দেখা যায়নি। হা–এতদিন যায়নি। এখন দেখা যাচ্ছে। কিছু বলা যায় না। হয়তো শিগগির উড়ো প্রাণীটি কবে চন্দ্রনাথবাবুর বন্দুকের গুলিতে মারা পড়বে। তখন হইচই পড়ে যাবে। উনি তো তক্কেতক্কে আছেন–

বলে মোহনজি হাঁক দিলেন, রঘু! রঘু!

একটু তফাতে সারিবদ্ধ একতলা ঘরের বারান্দা থেকে একটা লোক সাড়া দিল, আজ্ঞে?

বাড়িতে দুধ পাঠানো হয়েছে?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

মোহনজি আমার দিকে ঘুরে বললেন, গরুও পুযি! বুঝলেন? দুধের জন্য গাই-গরু। আর চায়ের জন্য বলদ। ওইদিকে টালির চালের লম্বা ঘর দেখছেন। ওট! গোয়ালঘর। আমি মেকানাইজড এগ্রিকালচার পছন্দ করি না! সাবেক পদ্ধতিতে চায়ের ব্যবস্থা করি। কেমিক্যাল সার একফোঁটা না।

এইসব কথাবার্তা হতে হতে কর্নেল এসে গেলেন। গাড়ি থেকে রাজু আমার এবং কর্নেলের ব্যাগেজ নামিয়ে আনল। মোহনজি বললেন, গতবার কর্নেলসায়েব যে ঘরে ছিলেন, সেই ঘরে রেখে এস।

কর্নেল এসে চেয়ার টেনে বসে বললেন, ওদিকে একটা অদ্ভুত ব্যাপার।

কী? কী?

বাংলোয় হর মালী একা আছে। পুলিশের গাড়িতে শ্রীধর গেছে সাধনবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে। হর বাংলোর সামনের বারান্দায় বসে ছিল। সেই সুযোগে কখন চোর গিয়ে সাধনবাবুর কোয়ার্টারের তালা ভেঙেছে। কী চুরি গেছে হর জানে না। তবে আমি দেখলুম, দুটো ঘর তছনছ করে চোর যেন কিছু খুঁজেছে।

অ্যাঁ? সে কী কথা?

আমি বাংলো থেকে পুলিশকে ফোন করে এলুম।

মোহনজি ভুরু কুঁচকে বললেন, এ চোর হাজিগঞ্জের নয়। বাজি রেখে বলতে পারি। গঙ্গার উজানে একটা গ্রাম আছে দোগাছিয়া। দোগাছিয়া হলো চোরেদের ঘাঁটি।

মোহনজি উঠে দাঁড়ালেন। এত বেলায় আর কফি খাবেন কি? রান্নার ব্যবস্থা কতদূর হলো দেখি। বলে উনি বাংলোর পাশে একটা একতলা ঘরের দিকে চলে গেলেন!

কর্নেল আস্তে বললেন, চোর নৌকোয় চেপে গিয়েছিল!

কী ভাবে বুঝলেন?

বাংলোয় যাবার সময় সুইস গেটের একটু আগে বাইনোকুলারে দেখছিলুম, উজানে শিবমন্দিরের কাছ থেকে সদ্য একটা ছই দেওয়া নৌকো মাঝগঙ্গার দিকে চলেছে। দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটারের বেশি। চাদর মুড়ি দিয়ে চোর নৌকোর হাল ধরে বসে আছে। হিউজেসগঞ্জে ফিরে চলেছে।

তার চেহারা দেখতে পেয়েছেন কি?

কর্নেল হাসলেন। নাহ। মারুতি ততক্ষণে বাঁক নিয়ে নিচের রাস্তায় নেমে গেছে। আমি তখন কেমন করে জানব সে সাধনবাবুর ঘরে হানা দিতে গিয়েছিল? হর মালীর মুখে ঘটনাটা শোনার পর বুঝলুম সেই নৌকোয় চোর গিয়েছিল এবং দূরে আমাদের গাড়ি দেখামাত্র চাদরমুড়ি দিয়েছিল।

কাল বলছিলেন, নৌকোতে খুনীর মাথা—

 কর্নেল চোখ কটমট করে বললেন, তোমার মুণ্ডু!

মোহনজি এসে বললেন, আধঘণ্টার মধ্যে লাঞ্চ রেডি হয়ে যাবে। এখন বারোটা বাজে। তো মাথামুণ্ডু না কী বলছিলেন কানে এল?

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, সাপের মাথামুণ্ডু কিছু বোঝা যাচ্ছে না।

বিশেষ প্রজাতির ভ্যাম্পায়ার। মোহনজি চেয়ারে বসে বললেন। জয়ন্তবাবুর সঙ্গে তাই নিয়ে আলোচনা করছিলুম। আপনিই তো বলেন, প্রকৃতিতে রহস্যের সীমা নেই।

হ্যাঁ। তবে ভ্যাম্পায়ার শুনলেই ড্রাকুলার কথা মনে পড়ে যায়।

মোহনজি হেসে উঠলেন। যা বলেছেন! কে বলতে পারে কাউন্ট ড্রাকুলার মতো গঙ্গাভবনের প্রতিষ্ঠাতা আমার পূর্বপুরুষ রাজা রাজেন্দ্র সিংহও ভ্যাম্পায়ার হয়েছেন?

রাজু পিছন থেকে বলল, আভি পুলিশের জিপগাড়ি ইরিগেশন বাংলোমে গেল।

গেল নাকি? মোহনজি উঠে দাঁড়ালেন। কর্নেলসায়েব! আপনারা স্নান করে নিন। আমি গিয়ে দেখে আসি কী ব্যাপার। তা ছাড়া হর লোকটি গোবেচারা। পুলিশ আবার তাকে ধরে না পেটায়!

বলে মোহনজি বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মারুতি গাড়িতে উঠে বসলেন। ড্রাইভার একটু তফাতে দাঁড়িয়েছিল। সে দৌড়ে এসে গাড়িতে চাপল এবং স্টার্ট দিল। রাজু ছুটল গেট খুলে দিতে।

বললুম, মোহনজি লোকটি বেশ মজার!

কর্নেল বললেন, মজার লোক বলতে তুমি কী বোঝাতে চাইছ জানি না। ওঁর সবদিকে ছোটাছুটি এবং নাক গলানোর অভ্যাস আছে। খুব চটপটে মানুষ। দরকার হলে লাঠি বা বন্দুক নিয়ে আখের জমিতে শেয়াল তাড়াতে ছোটেন।

কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। টুপি বগলদাবা করে ফের বললেন, আজ আমি স্নান। করব। তুমি?

বললুম, নাহ্। একটু গড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করছে।

কর্নেলকে অনুসরণ করলুম। বাংলোর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উত্তর ও পশ্চিমে সেই জলাটা দেখা যাচ্ছে। জলার উত্তরে সেচবাংলোর লনে পুলিশের জিপ সবে গিয়ে দাঁড়াল।

কর্নেল পোশাক বদলে স্নান করতে ঢুকলেন সাধনবাবুর দেওয়া মার্লবরো সিগারেটের কথা মনে পড়ে গেল। ব্যাগেজ খুলে সেটা পাওয়া গেল দেশলাইসমেত। আজ সকালে প্যাকেটটা নিতে ভুলে গিয়েছিলুম।

সিগারেট ধরিয়ে একটা ইজিচেয়ারে হেলান দিলুম। সেই সময় পশ্চিমের জানালা দিয়ে চোখে পড়ল একটা মোটাসোটা শেয়াল সত্যি আখের খেতের দিকে চুপিচুপি চলেছে। মোহনজি থাকলে নিশ্চয় তাড়া করতেন ভেবে হাসি পেল। উনি ফিরে এলে এই খবরটা দিতেই হবে।

কিন্তু মোহনজি ফিরলেন না। সাড়ে বারোটায় রাজু এসে সেলাম ঠুকে বলল, কর্নেলসাব! ভোজন করিয়ে লিন। পাটোয়ারিজি পুলিশের গাড়ির সঙ্গে চলিয়ে গেলেন।

কর্নেল স্নান করে ততক্ষণে তৈরি। বললেন, চলো জয়ন্ত! বলেছিলুম না মোহনজির সবতাতে নাক গলানো আর ছোটাছুটির অভ্যাস আছে?

বললুম, একটু আগে ফার্মের আখের জমির দিকে একটা শেয়ালকে যেতে দেখলুম। মোহনজিকে খবর দিলে পুলিশের সঙ্গ ছেড়ে ফার্মে ছুটে আসতেন!

কর্নেল হাসলেন। বলা কঠিন। শেয়ালের চেয়ে পুলিশ সম্ভবত এখন ওঁর কাছে জরুরি।

কেন বলুন তো?

 তা জানি না। যা দেখছি, তাই বলছি।…

খাওয়ার পর অভ্যাসমতো বিছানায় শুয়ে কম্বলমুড়ি দিয়েছি, কর্নেল তখনও চোখ বুজে চুরুট টানছেন পশ্চিমের জানালার পাশে, গাড়ির শব্দ কানে এল। তা হলে মোহনজি এতক্ষণে ফিরলেন।

কিন্তু রাজু এসে বলল, কর্নেলসাব! পাটোয়ারিজি বাড়িতে গেছেন। ড্রাইভার বলল, উনহি আপনাদের জন্য গাড়ি ভেজলেন।

কর্নেল বললেন, ঠিক আছে। ড্রাইভার যদি এখনও না খেয়ে থাকে, খেয়ে নিতে বলো। আমরা তিনটেয় বেরুব।

রাজু বাইরে গিয়ে বলল, মুকুন্দ! আভি তুমি খানা খাও। সাবলোগ তিন বাজে ঘুমতে যাবেন।

ঘুমের রেশ ছিঁড়ে গিয়েছিল। আস্তে ডাকলুম, কর্নেল!

বলো।

রাজু বলছিল, গঙ্গাভবনে মোহনজির কাকা মহেন্দ্রজির প্রেতাত্মা দেখেছে!

দেখতেই পারে।

আহা! আমার কথাটা হলো, গতরাতে সে ওদিকে কিছু দেখেছে বা কোন চিৎকার শুনেছে কি না ওকে জিজ্ঞেস করা উচিত।

হুঁ। বলে কর্নেল আবার ধ্যানস্থ হলেন।

অগত্যা ভাতঘুমে মন দিলুম। কিন্তু কখন তিনটে বেজে গিয়েছিল। কর্নেলের ডাকে ঝিমধরা শরীর নিয়ে উঠতেই হলো। তার নির্দেশে প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটার জ্যাকেট-মাফলার ইত্যাদি বর্মে সাজতে হলো। বুঝলুম, ফিরতে রাত হতে পারে।

ড্রাইভার মুকুন্দ বাঙালি। তার কাছে জানা গেল, মোহনজির অনুরোধে পুলিশ হর মালীকে ধরে নিয়ে যায়নি। সেচবাংলোয় দুজন কনস্টেবল রাখা হয়েছে। সেচ দফতরের স্থানীয় অফিসে পুলিশ খবর দেবে।

মুকুন্দের মতে, হর মালী তার চেনা লোক। সে চোর-চোট্টা নয়। তবে সাধনবাবু সম্পর্কে তার কিছু সন্দেহ বরাবর ছিল। উনি মদ খেতেন, এজন্য নয়। হাজিগঞ্জের স্মাগলারদের সঙ্গে ওঁর নাকি খুব মাখামাখি ছিল। কালীকৃষ্ণবাবুর গদি একসময় ছিল স্মাগলারদের ডেরা। পুলিশের এবং কাস্টমসের বারবার হানা কালীকৃষ্ণবাবুকে জব্দ করে ফেলেছিল। এখন উনি ধর্মকর্মে মন দিয়েছেন।

কুঠির জঙ্গলের ভেতর এখনই গা ছমছম করা অন্ধকার ঘনিয়ে উঠেছে। এতক্ষণে কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, মেহনজি হঠাৎ বাড়ি চলে গেলেন কেন?

মুকুন্দ বলল, থানার ওসির কাছে মোহনজি খবর পেয়েছিলেন, ওঁদের ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির একটা ট্রাক হাইওয়েতে অ্যাকসিডেন্ট করেছে! ট্রাকটা কোনো কোম্পানির মাল নিয়ে ফরাক্কা হয়ে শিলিগুড়ি যাচ্ছিল। ওঁর দুই ছেলে। একজনকে গদিতে থাকতেই হবে। অন্যজন আজ ব্যবসার কাজে কাতা গেছে। তাই মোহনজি গদিতে বসবেন! ছেলে যাবে অ্যাকসিডেন্টের জায়গায়।

আচ্ছা মুকুন্দ, একটা কথা।

 বলুন সার!

সাপের কামড়ে তিনজন মানুষ মারা পড়ল। এ সম্পর্কে তোমার মত কী?

মুকুন্দ একটু দ্বিধার সঙ্গে বলল, গঙ্গাভবনের ওখানে অনেক সাপ আছে সার!

কিন্তু এখন তো শীতের সময়। শীতও পড়েছে প্রচণ্ড!

সার! শঙ্খচূড় সাপের জন্ম পাহাড়ি মুলুকে। মোহনজি দুজন বেদে ডেকে এনেছিলেন। তাদের কাছে শুনেছি, শঙ্খচূড় তাই শীতে কাবু হয় না। তাছাড়া দৈবাৎ গায়ে পা পড়লে তো দংশাবেই।

শুধু গলায় কেন?

মুকুন্দ একটু ভেবে বলল, আমি কথাটা ভেবেছি সার! আমার মতে, যে তিনজন মারা গেল, প্রত্যেকের গায়ে শীতের পোশাক ছিল। পায়ে জুতো মোজা। পরনেও প্যান্ট শার্ট সোয়েটার। কিন্তু গলার কাছটা খোলা। কাজেই গলাতেই ছোবল দিয়েছে। শঙ্খচূড় বড়ই ধূর্ত সার! হাড়ের জায়গায় কামড়ালে মুখে ব্যথা পাবে। তাই না?

কর্নেল বললেন, বাহ! ঠিক বলেছ! তুমি বুদ্ধিমান মুকুন্দ! হা–মোক্ষম মার মারতে হলে খোলা গলার কাছটাই ঠিক জায়গা। রক্ত-মাংসে বিষ সহজে ঢুকে যাবে! তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করছি, মুকুন্দ!

আমি অবাক হয়ে কর্নেলের দিকে তাকালুম। উনি কথাগুলো মোটেও কৌতুক করে বললেন না। ওঁর মুখের ভাবভঙ্গি রীতিমতো সিরিয়াস।

আমার দিকে ঘুরে কর্নেল বললেন, এইজন্য আমি বলি জয়ন্ত, সত্য জিনিসটা অনেক ফালতু জিনিসের মধ্যে পড়ে থাকে। খুঁজে বের করতে হয়। মুকুন্দ তা করতে পেরেছে। হ্যাঁ–খোলা গলা। তা ছাড়া সেখানে রক্তবাহী শিরা-উপশিরা আছে? দ্রুত বিষ মাত্র ছ-সাত ইঞ্চি দূরে হার্টে চলে যাবে।

ওঁর দিকে তাকিয়ে রইলুম। স্বীকার করছি, এটা আমারও মাথায় আসা উচিত ছিল। এই শীতে শরীরের খোলা অংশের মধ্যে গলার একটুখানি আততায়ী সহজে নাগালে পাবে। মাফলার জড়ালেও একটু ফাঁক থেকে যাবে। শ্বাসরোধের ভয়ে কেউ তো আঁটো করে মাফলার জড়ায় না। চলাফেরার সময় মাফলার একটুখানি ঢিলে হয়ে নেমে আসে।

কর্নেল বললেন, মুকুন্দ! কয়েক মিনিটের জন্য একবার থানায় ঢুকব।

থানার সামনে গিয়ে মুকুন্দ গাড়ি দাঁড় করাল। কর্নেল নেমে গিয়ে থানায় ঢুকলেন।

নেহাত সময় কাটানোর জন্য বললুম, আচ্ছা মুকুন্দ, শঙ্খচূড় যদি পাহাড়ি সাপ হয়, তা হলে এখানে এসে জুটল কী করে?

মুকুন্দ বলল, আমি ততকিছু লেখাপড়া জানি না সার! তবে আমার সামান্য বুদ্ধিতে যা মনে হয়েছে বলি। ফ্লুইস গেট থেকে গঙ্গার বাঁধ ধরে প্রায় এক কিলোমিটার গেলে ইটের চাঙড়ের মধ্যিখানে একটা মস্তবড় বটগাছ দেখতে পাবেন। ওটা একসময় শিবমন্দির ছিল। এখন, শঙ্খচূড় হলো শিবের মাথার ভূষণ! মন্দির নেই। থাকার জায়গা নেই। শিবকে তুলে নিয়ে এসে গঙ্গভবনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পাটোয়ারিজির পূর্বপুরুষ। রাতারাতি ধস ছেড়ে সেই নতুন মন্দির আর শিব গেলেন গঙ্গার বুকে তলিয়ে। এদিকে মা-গঙ্গার পতি হলেন শিব। পতি পত্নীকে ছেড়ে ওঠেন কী করে? তো–

গল্পটা বড্ডবেশি পৌরাণিক হয়ে যাচ্ছে দেখে তার কথার ওপর বললুম, বুঝেছি। এবার একটা কথা জিজ্ঞেস করি। এখানে এসে শুনেছি, মোহনজির এক কাকা নাকি ন করতে গিয়ে গঙ্গায় ভেসে যান!

মুকুন্দ বলল, সেই কথাই বলতে যাচ্ছিলুম সার।

বলো! শোনা যাক।

মোহনজির কাকা ছিলেন মহেন্দ্রজি। তিনি ইচ্ছে করেই ভেসে গিয়েছিলেন গঙ্গায়। ও মা গঙ্গা! আমার পূর্বপুরুষের দেবতা ফিরিয়ে দে! নৈলে এই আমি তোর সঙ্গে চললুম।

ওঁরা তো রাজপুত।

হলে কী হবে সার? ওঁদের আদি গৃহদেবতা ছিলেন শিব। আর এখন তো ওঁরা বাঙালি হয়ে গেছেন। দুর্গাপুজো-কালীপুজো সব পুজোই করেন।

মহেন্দ্রজি ফিরে পেয়েছিলেন দেবতাকে?

মুকুন্দ চাপাস্বরে বলল, এ খুব গোপন কথা সার! মহেন্দ্রজিকে মা গঙ্গা বললেন, তুই আত্মবিসর্জন দিয়ে আমার পতিকে নিয়ে যা। উনি তাই করলেন।

তার মানে?

মহেন্দ্রজির আত্মা শিবকে পেলেন! মাঝে মাঝে রাতবিরেতে তিনি গঙ্গাভবনে প্রদীপ জ্বেলে শিবপুজো করেন। এক রাত্রে গাড়ি নিয়ে ফার্ম যাবার সময় আমি স্বচক্ষে গঙ্গাভবনে আলোর ছটা আর সাধুবেশী মহেন্দ্রজিকে দেখেছি সার! বলে ড্রাইভার করজোড়ে চোখ বুজে প্রণাম করল।

এই সময় কর্নেল এসে গেলেন। গাড়িতে ঢুকে বললেন, চলো মুকুন্দ! জমিদারবাড়ি যাব।

মুকুন্দ জিজ্ঞেস করল, চন্দ্রনাথবাবুর বাড়ি সার?

হ্যাঁ। একটু তাড়াতাড়ি যেতে পারবে কি না দেখ। তবে সাবধানে গাড়ি ড্রাইভ করো।…

.

০৭.

 মুকুন্দ দক্ষ ড্রাইভার। শেষবেলায় রাস্তায় অসংখ্য সাইকেল রিকশ, টেম্পো, ম্যাটাডোর, ট্রাক, বাস আর মানুষজনের গাদাগাদি ভিড়। মাঝে মাঝে হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য জ্যাম। অবশেষে বুঝতে পারলুম, কেন কর্নেল সাবধানে যেতে বলেছিলেন। যখন-তখন গাড়ির সামনে আচমকা লোক এসে পড়ছে। যানবাহনকে কেউ গ্রাহ্য করছে না।

মুকুন্দ বলল, এটাই মেন রোড সার! এই সময়টা তাড়াতাড়ি এ রাস্তায় যাওয়া কঠিন। তার চেয়ে একটু ঘুরপথে গেলে ভাল হয়।

কর্নেল বললেন, তাই চলো! চন্দ্রনাথবাবুর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। উনি সাড়ে চারটে নাগাদ বিশেষ কাজে বেরিয়ে যাবেন। তার আগে পৌঁছানো দরকার।

মুকুন্দ বাঁদিকে একটা গলিতে গাড়ি ঢোকাল। ঘিঞ্জি ঘোরালো গলি। এখনই গলির দুপাশে আলো জ্বলে উঠেছে। গলিতেও ভিড় ছিল। অনেক ঘুরে অপেক্ষাকৃত কম ভিড়ের একটা রাস্তায় পৌঁছে মুকুন্দ বলল, জমিদারি এলাকা শুরু হলো। এখন সব মারোয়াড়ি আর রাজপুত ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়েছে। বাড়ি করেছে। গোডাউন করেছে।

এবার দুধারে আমবাগান পড়ল। কর্নেল বললেন, চন্দ্রনাথবাবুর শখের বাগান। এই রাস্তার শেষে ওঁর বাড়ি। একেবারে গঙ্গার মাথায়।

বললুম, গঙ্গার ধস ছেড়ে তাহলে জমিদারবাড়িরও খানিকটা ভেঙে গেছে। বলুন?

নাহ্। গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান বাড়িটাকে বাঁচিয়েছে। বাঁধ আছে এবং বাঁধের বুকে পাথরের চাঙড় ফেলা হয়েছে। চন্দ্রনাথবাবু আমাকে সব দেখিয়েছেন।

আমবাগানের শেষদিকটায় আলো দেখা যাচ্ছিল। গাড়ির হেডলাইটে ক্রমশ একটা পুরনো ধূসর রঙের গেট চোখে পড়ল। গেটের মাথায় বুগেনভিলিয়ার ঝাড়। তার তলায় একটা বা ঝুলছে।

গাড়ির হর্ন শুনে একটা লোক গেট খুলে দিল। সে সেলাম ঠুকে কর্নেলকে বলল, বাবু আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন সার!

দুধারে অন্ধকারে ঝোপঝাড় গাছপালার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। এবড়োখেবড়ো খোয়া বিছানো রাস্তাটা ঘুরে পোর্টিকোর তলায় ঢুকেছে। দেখলুম, এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে প্যান্ট-সোয়েটার-কোট। মাথায় টুপি এবং গলায় মাফলার জড়ানো। পাকানো সাদাকালো গোঁফ এবং চিবুকে সাদা একটুখানি দাড়ি। মুখে পাইপ।

তিনি কর্নেলকে বললেন, পাটোয়ারিজির গাড়ি মনে হচ্ছে? বাহ্। আমি একটু লিফ্ট পাব আশা করি! কারণ আমার মোটরবাইক হঠাৎ বিগড়েছে। আমাকে পায়ে হেঁটে গিয়ে রিকশ ধরতে হতো।

কর্নেল নেমে গিয়ে বললেন, জয়ন্ত, ইনিই বিখ্যাত শিকারি চন্দ্রনাথ চৌধুরী। তোমার কথা ওঁকে আগেই বলেছি।

নমস্কার করলুম। চন্দ্রনাথবাবু বললেন, ভেতরে আসুন। আমি মশাই বুনো। লোক। বনেজঙ্গলেই জীবন কেটেছে। ফরম্যালিটির ধার ধারি না।

বসার ঘরটা বেশ বড়। ঘরভর্তি স্টাফকরা বুনো জন্তুর মাথা এবং শরীর। এককোণে টেবিলের ওপর একটা স্টাফকরা আস্ত চিতাবাঘ। দেয়ালে একটামাত্র টিউব লাইট জ্বলছে। তাই ঘরটা কেমন রহস্যময় দেখাচ্ছে। সোফায় বসে চন্দ্রনাথবাবু বললেন, কফি-টফি খাওয়াতুম। কিন্তু সময় কম। কিছু মনে করবেন না কর্নেলসায়েব। তো বলুন কী ব্যাপার?

 সেচবাংলোর কেয়ারটেকার বেচারা–

কর্নেলের কথার ওপর চন্দ্রনাথবাবু বললেন, উঁহু। মোটেও বেচারা নয়। ওকে আপনি চিনতেন বাইরে-বাইরে! আমি চিনতুম ভেতরে-ভেতরে। যেমন কর্ম তেমনি ফল পেয়েছে। বলুন!

কাল রাত এগারোটায় সাধনবাবু আপনার বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন শুনলুম।

হ্যাঁ। দাবা জমে উঠেছে, হঠাৎ ব্যাটাছেলে পশুপতি এসে ওকে ডাকল।

পশুপতি কে?

কালীকৃষ্ণবাবুর গদিতে খাতা লেখে। কিন্তু এ ব্যাপারে আপনার আগ্রহের কারণ? কিছু মনে করবেন না কর্নেল সায়েব! আমার তো দেখেছেন, সবসময় স্ট্রেটকাট কথাবার্তা!

বুঝতে পারছিলুম, চন্দ্রনাথবাবুর পেটে কিঞ্চিৎ উত্তেজক পানীয় পড়েছে। আমরা না এলে হয়তো পুরো ডোজ পান করেই বেরুতেন।

কর্নেল হাসলেন। এইজন্যই আপনাকে আমার পছন্দ। আপনিই পারেন এই শঙ্খচূড় রহস্যের মীমাংসা করতে।

চন্দ্রনাথবাবুও হাসলেন। রহস্য! বলেছেন ভাল। কিন্তু আমি ভেবে পাচ্ছি না এতে আপনার কী স্বাহা

আপনি ভুলে গেছো চন্দ্রনাথবাবু! আমার কার্ডে লেখা আছে নেচারোলজিস্ট। প্রকৃতিই আমার চিন্তাভাবনার বিষয়। তাই এভাবে মাঝে মাঝে ফিল্ডে নামতে হয়। এখন প্রশ্ন হলো, শীতে বিষাক্ত সাপে কামড়ানোর ঘটনা খুব বিরল। তাই আমি শঙ্খচূড় রহস্যের ব্যাপারটা বুঝতে চাই।

যথেষ্ট, যথেষ্ট! বুঝে গেছি। হাত তুলে ফণার মতো করে চন্দ্রনাথবাবু বললেন, কর্নেলসায়েব! বিষাক্ত সাপের গায়ে মানুষ পড়লে সে ছোবল দেবেই। এই একটা কথা আপনি কেন বুঝতে পারছেন না জানি না।

ঠিক আছে। আর একটা কথা।

বলুন!

 মোহনজির কাকা মহেন্দ্রজিকে আপনি তো চিনতেন?

 হু-উ। ধর্মকর্মের বড্ড বেশি বাতিক ছিল। তাই সন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছিলেন।

সে কী! উনি গঙ্গায় স্নান করতে গিয়ে নাকি ভেসে যান?

চন্দ্রনাথবাবু আবার হাসলেন। গুজব! স্রেফ গুজব! মোহনজি কী বলেছেন। আপনাকে?

গঙ্গায় ডুবে মরেছিলেন। বডি পাওয়া যায়নি।

বোগাস! আমি মশাই বনজঙ্গলে ঘোরা লোক। আজকাল আর তত জঙ্গল। নেই।. কবছর আগে দোগাছিয়ার কাছে জঙ্গলের ভেতর যে শিবমন্দির আছে আছে, মানে ছিল–এখন ধ্বংসস্থূপে বটগাছ গজিয়েছে, সেখানে মহেন্দ্রজিকে দেখেছি। ধ্যানে মৌনী সাধু। ধ্যান ভাঙালুম না। কিন্তু চিনলুম।

মোহনজিকে বলেছিলেন?

কী প্রকার? আসল কথাটা বলি। চন্দ্রনাথবাবু চাপাস্বরে বললেন, গঙ্গা ভবনে ওঁদের পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠা করা সোনার শিবলিঙ্গ ছিল। তার গায়ে ফণাতোলা সাপ। সেটাও খাঁটি সোনার। মহেন্দ্রজির সন্দেহ ছিল, সেই সোনার দেবতা মোহনজি লুকিয়ে রেখেছেন। তাই নিয়ে মনোমালিন্য। শেষে মহেন্দ্রজি মনের দুঃখে সাধু হয়ে যান। মোহনজিকে আপনি তো এসব কথা বলতে পারবেন না! আপনি তার গেস্ট হয়েছেন।

চন্দ্রনাথবাবু উঠে দাঁড়ালেন। ঘড়ি দেখে বললেন, আমার সময় হয়ে গেছে।

কর্নেলও উঠে দাঁড়ালেন। চন্দ্রনাথ সিঁড়ি দিয়ে নেমে বললেন, কী রে মুকুন্দ? কেমন আছিস? চল্! বড় রাস্তা অব্দি তোর পাশে বসে যাই।

মুকুন্দ নমস্কার করে বলল, আসুন!

যেতে যেতে চন্দ্রনাথবাবু মুখ ঘুরিয়ে কর্নেলকে বললেন, সাধনকে আমি নেবার সাবধান করে দিয়েছিলুম, দাগী হারামজাদাদের সঙ্গে মেলামেশা কোরো না।

কর্নেল বললেন, কিন্তু সাধনবাবু তো বিষাক্ত সাপের কামড়ে মারা পড়েছেন!

তা ঠিক। তবে এত রাত্রি পর্যন্ত টাউনে তার থাকা উচিত ছিল না। আমি তো ওকে মোটরবাইক আর বন্দুক নিয়ে বাংলোতে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলুম। ও ব্যাটাছেলে পশুপতির ডাকে গেল কেন মদের আড্ডায়?

বড় রাস্তায় একখানে মুকুন্দকে গাড়ি থামাতে বলে চন্দ্রনাথ নামলেন। কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি বাইরে কোথাও যাচ্ছেন চন্দ্রনাথবাবু?

হ্যাঁ। বলে চন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী সন্ধ্যার আলো-আন্ধকারে ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হলেন।

মুকুন্দ মুচকি হেসে বলল, বাজি রেখে বলতে পারি সার! বাবু গেলেন কারও বাড়ি দাবা খেলতে। ওঁর বাড়িতে দাবা খেলতে সহজে কেউ যেতে চায় না। কেন জানেন? খেলতে খেলতে খামোকা ঝগড়া করেন। আর ওই মদ! মদ যে খায় না, তার সঙ্গে বাবু দাবা খেলবেন না। তো এবার কোথায় যাবেন সার?

একপাশে গাড়ি দাঁড় করাও। আমি আসছি। জয়ন্ত! একটু অপেক্ষা করো!

গাড়ি একটা বড় ওষুধের দোকানের ধারে দাঁড় করিয়েছিল মুকুন্দ। কর্নেল সেই দোকানের পাশে একটা গলিরায় ঢুকে গেলেন।

মুকুন্দ বলল, এই যে ওষুধের দোকান দেখছেন সার! এটা কালীকেষ্টবাবুর ছোটভাই হরেকেষ্টবাবুর। দুই ভাইয়ে বনিবনা নেই। পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে মামলা-ফ্যাসাদ খুব হয়েছে। কিন্তু কালীকেষ্টবাবু লোক ভাল! হরেকেই হাড়ে বজাত লোক। মুকুন্দ ফের চাপাস্বরে বলল, চোরাই ড্রাগের কারবার করত। পুলিশ একবার ধরেছিল! টাকাকড়ি দিয়ে বেঁচে যায়। শেষে তরুণ সংঘ ক্লাবের ছেলের পেছনে লাগল। তাদের ভয়ে এখন জব্দ হয়েছে।

বললুম, হিউজেসগঞ্জে নাকি সবরকম বিদেশি জিনিস পাওয়! যায়?

তা যায়। তবে দালাল ধরতে হয়। কবছর থেকে সরকার খুব কড়াকড়ি করছেন কিনা!

মুকুন্দ সবিস্তারে চোরাচালানের কথা বলতে থাকল। সর্বত্র যা ঘটছে, এখানেও তাই। বিশেষ করে বর্ডার এখান থেকে বেশি দূরে নয়। মুকুন্দের কাছে জানা গেল, পদ্মা থেকে রাতের অন্ধকারে চোরাই জিনিস নদীনালা দিয়ে এসে পৌঁছায়। আবার এখান থেকেও অনেক জিনিস বর্ডার পেরিয়ে চলে যায়।

মিনিট পনেরো পরে কর্নেল ফিরে এসে গাড়িতে ঢুকলেন। বললেন, চলো মুকুন্দ! থানায় যাব আবার। সেখান থেকে তোমাদের মালিকের ফার্মহাউসে ফিরব।

আস্তে বললুম, কোথায় গিয়েছিলেন বলতে অসুবিধে আছে?

কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, নাহ! অশোক সোম বুধ শনি এই তিনদিন গলির ভেতর একটা চেম্বারে চারটে থেকে ছটা অবধি বসে। নার্সিংহোম করার আগে সে ওখানেই বসত। কাজেই এখনও বসতে হয়। কাছেই বড় ওষুধের দোকান কমলা ফার্মেসি। রোগীদের সুবিধে হয়।

দোকানটা কার আমি কিন্তু জেনে গেছি।

 মুকুন্দের কাছে তো?

এতক্ষণে কর্নেলের মুখে হাসি ফুটল। বললুম, আরও কিছু জানি।

 দু ভাইয়ের বিরোধ।

আপনি জানেন?

 মুকুন্দের কানে গিয়েছিল কথাটা। সে বলল, একথা সার রাজ্যসুদ্ধ জানে।

কর্নেল সামনের সিটের দিকে ঝুঁকে মুকুন্দকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা মুকুন্দ, হরেকৃষ্ণবাবুকে আমি দেখিনি! কী বয়সের লোক?

মুকুন্দ বলল, আজ্ঞে সার, চল্লিশ-বেয়াল্লিশ হবে। দেখলে বুঝতেই পারবেন না—

আর একটা কথা জিজ্ঞেস করি!

বলুন সার!

হরেকৃষ্ণবাবুর মাথার চুল নাকি লাল?

মুকুন্দ হেসে উঠল। হ্যাঁ সার! চুলের হিস্ট্রি আছে একটা।

বলো!

প্রথম পক্ষের বউ মারা গেলে ফের বিয়ে করেছেন। এদিকে চুলে পাক ধরেছে ওই বয়সেই। কেন জানেন? বেশি মদ খেলে চুল শিগগির পেকে যায়।

ঠিক বলেছ।

হরেকেষ্টবাবু চুলে কী বিলিতি কলপ মাখতেন। শেষে চুল খাপচা-খাপচা উঠে গেল। বাকিটুকু লাল হয়ে গেল। রাগ করে কলপ ছেড়ে দিলেন। অশোকবাবুর কাছে চিকিৎসা করেও কিছু হলো না। মাথা ন্যাড়া করেছিলেন। আশ্চর্য ব্যাপার সার! আবার লাল চুল বেরুল।

বললাম, পরচুলা পরেন না কেন উনি? আজকাল সুন্দর পরচুলা কিনতে পাওয়া যায়।

মুকুন্দ হাসতে হাসতে বলল, লোকে ঠাট্টা করবে না? একি আপনাদের কলকাতা সার? টাউন হলেও পাড়াগাঁয়ের স্বভাব।

থানার সামনে গিয়ে সে গাড়ি দাঁড় করাল। কর্নেল বললেন, এবার সঙ্গে আসতে পারো জয়ন্ত! শঙ্খচূড় রহস্য সবিস্তারে লিখতে হলে তোমার আসা দরকার।…

ও সি রমেন্দ্র মণ্ডল বললেন, আসুন কর্নেলসায়েব! পাঁচ মিনিট পরে এলে আমাকে আর পেতেন না।

কর্নেল বললেন, শঙ্খচূড়ের পাল্লায় পড়তেন বুঝি?

রমেন্দ্রবাবু বিকট হা-হা হেসে বললেন, কিছু বলা যায় না। দোগাছিয়ায় জমির ফসল নিয়ে হাঙ্গামা হয়েছে। এক গাড়ি ফোর্স পাঠিয়ে দিয়েছি। দুজন অফিসারও গেছেন। এখন একা গঙ্গাভবনের সামনে দিয়ে আমার যাওয়ার কথা। কাজেই সাধনবাবুর মতো–যাক গে। কফি বলি?

থ্যাঙ্কস্। ফার্মহাউসে ফিরে কফি খাব। একটা কথা জানতে এলুম।

বলুন!

সাধনবাবুর স্ত্রী বাংলোর কোয়ার্টারে ফিরে গিয়ে কোনো জিনিস চুরি যাওয়ার কথা বলেছেন?

এখন অবধি বলেননি। এস আই অমলবাবু সাধনবাবুর ভাই এবং আরও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে লক্ষ্মীরানী দেবীকে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন। অমলবাবু টেলিফোনে একটু আগে জানালেন, এখনও ভদ্রমহিলা সুস্থ হতে পারেননি। তাই ধৈর্য ধরে অমলবাবু ওখানে অপেক্ষা করছেন।

ইরগেশন অফিস থেকে কেউ বাংলোর চার্জ বুঝে নিতে যাননি?

অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার নীরদবাবু গেছেন। ইঞ্জিনিয়ার মিঃ ব্যানার্জি এখনও ফেরেননি বাইরে থেকে।

মর্গের ডাক্তারবাবুর ফাইনাল রিপোর্ট পেয়ে গেছেন?

হ্যাঁ। ফাইনাল রিপোর্ট পেয়েই বডি দাহ করার অনুমতি দিয়েছি।

 ডাক্তারবাবু কোনো নতুন পয়েন্ট দিয়েছেন?

রমেন্দ্রবাবু মাথা দোলালেন। নাহ্। ওঁর বক্তব্য হলো, ছোবল দিলেও সব সময় সাপের বিষদাঁত ভাঙে না। দাঁত ভেঙে ক্ষতস্থানে আটকে থাকাটা নির্ভর করে কতকগুলো অবস্থার ওপর। বরং একটা জেরক্স কপি আপনাকে আমি পাঠিয়ে দেব।

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ডাক্তার অধিকারী কী করে নিশ্চিত বলেন। যে রক্তে সাপেরই বিষ আছে? সাপের বিষের উপাদান পরীক্ষা করার মতো ল্যাবরেটরি তো হাসপাতালে নেই।

অফিসার-ইন-চার্জ বললেন, সমস্যা হল, আমাদের ওঁর রিপোর্ট মেনে নিতেই হবে, যতক্ষণ না কেউ চ্যালেঞ্জ করছে। চ্যালেঞ্জ করলে কলকাতার ফরেনসিক ল্যাবে রক্তের নমুনা পাঠাতুম!

কর্নেল বললেন, যাকগে। যা হবার হয়ে গেছে। আপনি কি দোগাছিয়া যাবেন?

যাব।

তাহলে আমাদের গাড়ির সঙ্গে চলুন কয়েক মিনিটের জন্য সেচবাংলোয় যাব। আপনিও যাবেন!

কী ব্যাপার?

চলুন তো। আমার হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল। যথাস্থানে বলব।

পুলিশের জিপকে অনুসরণ করল আমাদের মারুতি। কর্নেল মুকুন্দকে বললেন, আমরা সেচবাংলোয় যাব। তারপর সেখান থেকে ফার্মহাউসে ফিরব।

সেই ভয়ঙ্কর নির্জন জঙ্গল আর গঙ্গভবন পেরিয়ে যাবার সময় দুপাশে যেন হাজার-হাজার শঙ্খচূড়ের ছায়া দেখতে পাচ্ছিলুম। হেডলাইটের আলোর দুপাশে শুকনো পাতার স্তূপে সন্ধ্যার হিম বাতাস সাপের মতোই হিস-হিস শব্দে গর্জন করছিল।

সেচবাংলোর সামনে গিয়ে হর্ন দিতেই শ্রীধর গেট খুলে দিল। তার চেহারায় আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। সেচ দফতরের অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার নীরবাবু পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর অমলবাবুর সঙ্গে পেছনের অফিসঘরে বসে গল্প করছিলেন।

আমাদের দেখে ওঁরা উঠে দাঁড়ালেন। রমেন্দ্র মণ্ডল জিজ্ঞেস করলেন, তামলবাবু, মিসেস ভট্টাচার্য কি জানিয়েছেন কিছু চুরি গেছে কি না?

না। ভদ্রমহিলার ঘনঘন ফিট হচ্ছে। ডাক্তার ডাকতে চেয়েছিলুম। সাধনবাবুর ভাই বললেন, কিছুক্ষণ পরে ঠিক হয়ে যাবে। বউদির হিস্টিরিয়া আছে।

রমেন্দ্রবাবু বললেন, বলুন কর্নেল! কী কথা মনে পড়েছে আপনার?

কর্নেল বাঁদিকে র‍্যাকের কাছে এগিয়ে গেলেন। তারপর বললেন, এই ফাইল দুটো লাইন থেকে বেরিয়ে আছে। থানায় সাধনবাবুর কোয়ার্টারে চুরির খবর জানাবার সময় চোখে পড়েছিল। কিন্তু গ্রাহ্য করিনি। দেখা যাক, এ দুটোর অবস্থা এমন কেন?

বলে কর্নেল দুটো ফাইলই টেনে বের করলেন। দেখা গেল একটা আনুমানিক ছ ইঞ্চি-পাঁচ ইঞ্চি সাইজের নীলরঙের ছোট্ট বক্স দাঁড় করানো আছে। দেখতে ঠিক গয়নার বাক্সের মতো। কালো মোটা সুতো দিয়ে বাঁধা পিসবোর্ডের বাকসোটা খুলে দেখা গেল একটা রঙিন কাগজের মোড়ক। মোড়ক খোলার পর ঘরসুদ্ধ আমরা চমকে উঠলুম। রমেন্দ্র মণ্ডল বললেন, কী সর্বনাশ! এটা যে সাপের ফণা মনে হচ্ছে!

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। সোনার সাপের ফণা। চোর এটাই হাতাতে এসেছিল। ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে। আর এটার জন্যই সাধনবাবু বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি পেয়েছেন।

.

০৮.

সোনার সাপের ফণাটা দেখেই আমার মনে পড়েছিল চন্দ্রনাথবাবুর কথা। উনি পাটোয়ারিজিদের গৃহদেবতা সোনার শিবলিঙ্গে জড়ানো সাপের কথা বলেছিলেন। এটাই তাহলে সেই সাপ। পুরো সাপটা নয়। লিঙ্গ থেকে ফণার অংশটা ভেঙে নেওয়া হয়েছে। অনুমান করেছিলুম, ফণাটা নিরেট সোনার এবং বেশ ভারী।

সোনার সাপের ফণাটা অমলবাবুর জিম্মায় দিয়ে ও সি মিঃ মণ্ডল তাকে থানায় ফিরতে বলেছিলেন। কনস্টেবলরাও অমলবাবুর সঙ্গে ফিরে গিয়েছিল। ও সি কর্নেলের সঙ্গে একান্তে কিছু আলোচনা করে দোগাছিয়া রওনা হয়েছিলেন।

ফেরার পথে কর্নেল ড্রাইভার মুকুন্দকে কথায়-কথায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, পশুপতি কতদিন থেকে কালীকৃষ্ণবাবুর গদিতে কাজ করছে জানো?

মুকুন্দ বলেছিল, বছর দুই হবে হয়তো।

তার আগে সে কী করত?

আঢ্যি জুয়েলার্সে স্বর্ণকারের কাজ করত। চুরি করেছিল শুনেছি। তাই চাকরি যায়। আসলে ওর বাবা আঢ্যিবাবুদের কাজ করত। বাবার খাতিরে ওকে পুলিশে দেননি ওঁরা।

এখন সে গদিতে খাতা লেখে। তার মানে, লেখাপড়া ভালই জানে।

মুকুন্দ হেসেছিল। না সার! তামার ক্লাসফ্রেন্ড ছিল। ক্লাস এইট তাব্দি দুজনেরই বিদ্যা। গদিতে বাংলায় হিসেবের খাতা লেখা এমন কী কাজ! কিন্তু আর বেশিদিন এই চাকরি তার বরাতে নেই। আমি বলে দিচ্ছি!

কেন?

প্রথম কথা, পশুপতি রাতের বেলায় মদ না খেয়ে থাকতে পারে না। তার চেয়ে খারাপ কথা, কালীকেষ্টবাবুর ভাই হরেকেষ্টবাবুর বাড়িতে ওর মদের আচ্ছা। কালীকেষ্টবাবুর কানে গেলেই ওর চাকরি যাবে।

কর্নেল অন্যমনস্কভাবে বলেছিলেন, তাহলে পশুপতি স্বর্ণকারের কাজ জানে!

ভাল জানে। কিন্তু হাজিগঞ্জে ওকে এ কাজ আর কেউ কি দেবে? আঢ্যিবাবুদের ঘরে যার চুরির বদনাম হয়েছে, তাকে অন্তত এখানে কেউ স্বর্ণকারের কাজ দেবে না…।

ফার্মহাউসের বাংলোয় ফিরে কর্নেল কড়া কফি আনতে বললেন রাজুকে। কিছুক্ষণ পরে রাজু কফি আর স্ন্যাক্স নিয়ে এল।

কর্নেল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, মোহনজি টেলিফোন করেননি?

করেছিলেন সার! আমি আপনাকে সেই বাত আভি বলত। তো আপনি নিজেই পুছ করলেন। বলে রাজু হাসল। হাঁ–উনহি আজ রাতে বাংলোতে আসবেন না। কাল সুবামে আসবেন। মুকুন্দকে বলতে হবে। সুবামে উনহিকে লিয়ে আসবে।

কর্নেল কফি খেতে খেতে বললেন, রাজু! আজ রাতে আমি ক্যামেরায় পাচার ছবি তুলতে বেরুব। তুমি রাত বারোটায় আমাকে গেট খুলে দেবে। তোমাকে ডেকে ঘুম থেকে ওঠাব। কেমন?

আমি জেগে থাকব সার! লেকিন—

তার কথার ওপর কর্নেল বললেন, কেন? গতবছর এসে রাত দুপুরে পেঁচার ছবি তুলতে বেরিয়েছিলুম। ভুলে গেলে?

না সার! লেকিন এখন সাপের ডর করতে হবে। বাংলোর সাধনবাবুকে কাল রাতে সাপ জানে মেরে দিল! বহত খতরনাক সার।

তোমার চিন্তার কারণ নেই। আমি সাপের মন্ত্র জানি।

রাজু অবাক চোখে তাকিয়ে চলে গেল।

 কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, কী বুঝছ বলো জয়ন্ত?

বললুম, সোনার দেবতা আর পশুপতি স্বর্ণকার। শুধু এটুকুই বুঝেছি।

বাকিটা যথাসময়ে বুঝবে। কর্নেল চুরুট ধরালেন। তারপর আপন মনে বললেন, চোরের ওপর বাটপাড়ি করতে গিয়েই সাধনবাবুর প্রাণ গেছে। কিন্তু আমার ধারণা, সোনার সাপের ফণা চুরিতে তাকে পশুপতিই সাহায্য করেছিল। নিশ্চয় সময়মতো আধাআধি বখরার শর্ত ছিল।

কর্নেল! এতকাল পরে মহেন্দ্র সিংহের আরাধ্য দেবতার হদিস ওরা কী করে পেল? দেবতা নাকি বহুবছর আগে মন্দিরের সঙ্গে গঙ্গায় তলিয়ে গিয়েছিলেন।

এর উত্তর এখনও দেওয়া যাচ্ছে না। বলে কর্নেল চোখ বুজে ধ্যানস্থ হলেন।

একটু ভেবে নিয়ে বললুম, চন্দ্রনাথবাবুর কথায় বোঝা যায়, মহেন্দ্রজি তার ভাইপো মোহনজিকে সন্দেহ করেছিলেন!

কর্নেল চুপ করে থাকলেন। বুঝলুম, এখন ওঁর ধ্যান ভাঙানো যাবে না।…

রাত নটায় খাওয়ার পর ঘরে এসে কর্নেল বললেন, ঘুম এলে ঘুমিয়ে নিতে পারো। রাত বারোটায় কিন্তু ওঠাব।

উত্তেজনা চেপে বললুম, ঘুমোব না। আপনার পাচার ছবি তোলা দেখতেই হবে।

কর্নেল হাসলেন। রাজুর ভাষায় কিন্তু বহত খতরনাক ব্যাপার। গলায় আঁটো করে মাফলার জড়িয়ে নিয়ো। শঙ্খচূড় সাপ যেন গলার কোনো অংশ খোলা না পায়।

একটু পরে রাজু এসে বলল, আপনার টেলিফোন কর্নেলসাব!

মোহনজির নাকি?

না। কোই আজিব আদমি। বলল, কর্নেলসাবকে দাও। বাত করব।

কর্নেল তার সঙ্গে চলে গেলেন। বাংলোর সামনের অংশে বসার ঘরে। টেলিফোন আছে। আমি ইংরেজি থ্রিলার বইটার পাতা খুলে বসলুম। কিন্তু মনের ভেতর শুধু শঙ্খচূড়ের সোনালি ফণা ছায়া ফেলছিল। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলুম।

কিছুক্ষণ পরে কর্নেল ফিরে এলেন। জিজ্ঞেস করলুম, কেউ হুমকি দিল নাকি?

বৃদ্ধ রহস্যভেদী হাসলেন। হুমকি বলা চলে। তবে আমাকে নয়! ও সি রমেন্দ্র মণ্ডল শঙ্খচূড় সাপটাকে এক গুলিতে ছাতু করে ফেলবেন।

বললুম, তার মানে আপনি আজ রাতে রীতিমতো একটা অভিযানে বেরুচ্ছেন?

হুঁউ। তবে জানি না, সাপটাকে দেখতে পাব কি না। সে প্রচণ্ড ধূর্ত।

আচ্ছা কর্নেল, নৌকোয় চাদর মুড়ি দিয়ে যে শুয়েছিল–মানে, মৈত্রেয়ীকে যে লোকটা–

চুপ। দেয়ালের কান আছে। বলে কর্নেল বাথরুমে ঢুকলেন।..

সময় কাটছিল না। চূড়ান্ত মুহূর্তের দিকে এগিয়ে যেতে সময়ও যেন বড় বেশি দেরি করছিল। বরাবর আমার এটা হয়। কর্নেল যখন রহস্যের শেষ পর্দাটি তুলতে পা বাড়ান, তখন আমার সারা শরীর জুড়ে অস্বস্তিকর একটা উত্তেজনার স্রোত বইতে থাকে।

অবশেষে রাত বারোটা বাজল। তখন ঘরের আলো নিভিয়ে এবং দরজা ভেজিয়ে দিয়ে আমরা গেটের দিকে এগিয়ে গেলুম। সারা ফার্মহাউস স্তব্ধ। এ রাতে কুয়াশা জমেছে ঘন হয়ে। ফার্মহাউসের বাতিগুলো ভুতুড়ে দেখাচ্ছে। গেটের পাশের ঘরে রাজু জেগে ছিল। গেট খুলে দিয়ে চাপা গলায় কর্নেলকে সে সাবধান করে দিল আবার। হোঁশিয়ারিসে যাইয়ে সার! তারপর আরও আস্তে সে বলল, আমার ভি আপনাদের সঙ্গে যেতে ইচ্ছা করে। লেকিন পাটোয়ারিজি শুনলে মুশকিল হবে। ফার্মের জিম্মাদারি আমার হাতে।

পায়ের কাছে খুদে টর্চ জ্বালতে জ্বালতে কর্নেল হেঁটে যাচ্ছিলেন। সেচবাংলোগামী রাস্তায় পৌঁছে ওঁর টর্চ নিভে গেল। অন্ধকার এবং কুয়াশায়, অন্ধের মতো ওঁকে অনুসরণ করছিলুম।

কিছুক্ষণ পরে কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে রাতপাখির ডাকের মতো তিনবার শিস দিলেন। তারপর সামনের দিকে কোথাও তেমনি তিনবার শিশের শব্দ কানে এল। কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, আমাকে পেছন থেকে ছুঁয়ে এস। তাহলে আছাড় খাবে না। আর–ভুলেও যেন টর্চ জ্বালবে না।

কিছুটা চলার পর বুঝতে পারলুম, গঙ্গভবনের দক্ষিণে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছি। গাছপালা থেকে শিশির ঝরে পড়ছে। ভেজা শুকনো পাতায় সাবধানে পা ফেলে হাঁটতে হাঁটতে কর্নেল বাঁদিকে ঘুরলেন। এবার বুঝলুম, আমরা গঙ্গাভবনে যাচ্ছি। অজানা আতঙ্কে বুকটা ধড়াস করে উঠল।

কর্নেল ঘুরে আমার কানের কাছে মুখ এন ফিসফিস করে বললেন, সাবধান। পা হড়কে আছাড় খেয়ো না। ভাঙা পাঁচিলের ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে হবে।

ঘাস আর আগাছার জঙ্গলে ভরা উঠোনে পা দিয়েই চমকে উঠেছিলুম। কোথায় কোঁস-ফোঁস শব্দ হচ্ছে। কর্নেলের হাত টেনে ধরলুম। কর্নেল আগের মতো ফিসফিস করে বললেন, সাবধানে বারান্দায় উঠবে। পা যেন স্লিপ করে না।

ও কিসের গর্জন?

সাপের।

আবার আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। ক্রমশ ফেস-ফোঁস শব্দটা জোরালো হচ্ছে। সত্যিই শঙ্খচূড় সাপটা কি ক্রোধে গর্জন করছে? বেজির সঙ্গে বিষধর সাপের যুদ্ধে ঠিক এইরকম ফোঁসফোঁস শব্দ শোনা যায়। ফিল্মে দেখেছিলুম।

কর্নেল এতক্ষণে পায়ের কাছে টর্চ জ্বেলে একটা ঘরের দরজা দিয়ে অন্য ঘরে ঢুকলেন। সেই ঘরের মেঝেতে হঠাৎ কেউ একপলকের জন্য আলো ফেলে টর্চ নিভিয়ে দিল। কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, মিঃ মণ্ডল! আগেই এসে গেছেন দেখছি।

ও সি রমেন্দ্র মণ্ডলও ফিসফিস করে বললেন, আপনার জন্য অপেক্ষা করছি শুধু। চলুন।

এ-ঘর থেকে সে-ঘর হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে তিনজনে থমকে দাঁড়ালুম। ফোঁস ফোঁস গর্জন থেমে গেছে। কর্নেলের ইঙ্গিতে গুঁড়ি মেরে বসলুম। তারপর একটা প্রকাণ্ড ফাটল দিয়ে দেখি, নিচের ছোট্ট একটা ঘরে একটা লণ্ঠন জ্বলছে। একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে এবং একজন বসে আছে। তার সামনে কি ওটা ধুনির আগুন?

দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি চাপাস্বরে বলল, আজ রাতের মধ্যে কাজ শেষ করা চাই।

বসে থাকা লোকটি বলল, হাত ব্যথা করছে। কৈ, দিন। আর এক চুমুক খাই।

না। আর খেলে তুমি কাজ করতে পারবে না। শোনো! যেটুকু মাল আছে, আর এক ডজন বিস্কুট হবে। তাই না?

তা হতে পারে।

বজ্জাত সাধনটা খানিকটা না হলে অন্তত আরও হাফ ডজন বিস্কুট হতো। আমার অবাক লাগছে, ও টের পেল কী করে? তুমি নেশার ঘোরে বলে। ফেলোনি তো?

আমার মাথা খারাপ? অর্ধেন্দু মাস্টার টের পেয়েছিল কী করে?

টের পেয়েছিল। কিন্তু সে তো মালটা দেখেনি। তবু রিস্ক নিইনি। নাও  হাত চালাও!

বসে থাকা লোকটা নড়ে বসল এবং কী একটা জিনিসে চাপ দিল। অমনি ফেস-ফোঁস শব্দ করে ধুনির আগুন চাঙ্গা হলো। অমনি বুঝতে পারলুম, সাপের গর্জন নয়। ওটা একটা চামড়ার হাপর।

তারপর দেখি, একটা ভাঙা চকচকে জিনিস সে গরম করে নিয়ে একটা পাত্রে ঢালছে এবং অ্যাসিড জাতীয় কিছু মেশাচ্ছে। কী অদ্ভুত! নিমেষে বুঝলুম কাজটা কী হচ্ছে। সেই সোনার শিবলিঙ্গ আগুন এবং অ্যাসিডে গলিয়ে লোকটা সোনার বিস্কুট তৈরি করছে।

কর্নেলের ইঙ্গিতে আমরা দুজনে বাঁদিকে একটা ভাঙা দরজা গলিয়ে গেলুম। তারপর অন্ধকারে অনুমান করে পা ফেলতে ফেলতে নেমে গেলুম। সামনে একটা প্রকাণ্ড লাইমকংক্রিটের চাঙড়। তার ওধারে সেই ছোট্ট ঘরে সোনার বিস্কুট তৈরি হচ্ছে।

হঠাৎ একটা শব্দ হলো নিচে। তারপর উঁকি মেরে দেখি, এক জটাজুটধারী বৃদ্ধ সন্ন্যাসী ত্রিশূল বাগিয়ে লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকলেন। অমনি দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা কয়েক পা সরে গেল। স্বর্ণকার লোকটি যে পশুপতি, তা বুঝে গেছি। সে যেন তৈরি ছিল। একলাফে ত্রিশূলটা ধরে ফেলল। তার সঙ্গী এবার হুঙ্কার দিয়ে এগিয়ে এল। তার হাতে একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ! সিরিঞ্জটা অদ্ভুত গড়নের। কারণ ওটাতে দুটো সূচ পরানো আছে।

সে হিসহিস করে বললে, তবে রে ব্যাটা! মর তবে শঙ্খচূড়ের ছোবলে।

সাধুর শরীর যে দুর্বল তা বোঝা যাচ্ছিল। তিনি ধস্তাধস্তিতে মাটিতে পড়ে গেলেন। আতঙ্কে চোখ বুজলুম।

তারপরই কর্নেল এবং রমেন্দ্র মণ্ডলের টর্চ জ্বলে উঠল। দুজনেই রিভলভার বের করে ঘরের ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কর্নেল বললেন, হরেকৃষ্ণবাবু! ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জটা আগে দিন। নয় তো গুলি করে হাত ভেঙে দেব।

ওসি এবার হুইসল বাজালেন। নিচে গঙ্গার দিক থেকে একদল পুলিশ। এসে গেল। কর্নেল হরেকৃষ্ণবাবুর হাত থেকে ইঞ্জেকশন সিরিঞ্জটা নিতে গেছেন, হঠাৎ হরেকৃষ্ণবাবু সে টা মাটিতে আছাড় মেরে ভেঙে ফেললেন। কর্নেল তাঁর মাথার হনুমানটুপি খুলতেই বেরিয়ে পড়ল লাল রঙের চুল।

আমার মনে পড়ল, কর্নেল নৌকোয় শুয়ে থাকা লোকটির মাথা দেখেই নাকি চিনতে পেরেছিলেন, সে মৈত্রেয়ীকে মেরে ফেলত। তা হলে কর্নেল লাল চুল দেখেছিলেন।

পশুপতি হাউমাউ করে কাঁদছিল। তাকে নাকি প্রাণে মারার ভয় দেখিয়ে এখানে এনে সোনার বিস্কুট তৈরি করতে বলতেন হরেকৃষ্ণবাবু। দুজন কনস্টেবল তাকে চ্যাঙ-দোলা করে নিয়ে গেল। এস আই অমলবাবু বললেন, পশুপতিকে। নৌকো করে নিয়ে যাক। হরেকেষ্টকে জলের ওপর দিয়ে নিয়ে যাওয়ার রিস্ক আছে। হরেকেষ্ট নৌকো আর জলের ব্যাপারে নাকি ওস্তাদ।

রমেন্দ্রবাবু বললেন, ওর নৌকোটা খুঁজে পেয়েছেন তো?

হ্যাঁ সার! নিচেই বাঁধা ছিল।

অমলবাবু হরেকৃষ্ণবাবু দুহাত পেছনে টেনে হাতকড়া পরিয়ে দিলেন। তারপর কনস্টেবলদের সঙ্গে ওপরে উঠে গেলেন।

কর্নেল সন্ন্যাসীকে ডাকলেন, মহেন্দ্রজি! আপনার দেবতার সোনা আপনি যাতে ফিরে পান, তার ব্যবস্থা করব। আবার আপনি শিবলিঙ্গ তৈরি করিয়ে নেবেন।

সন্ন্যাসী হু-হু করে কেঁদে উঠলেন। কর্নেল তাকে মেঝে থেকে টেনে তুলে বললেন, মিঃ মণ্ডল! আপনি সোনার বিস্কুট, শিবলিঙ্গের টুকরো এবং আর যে সব জিনিস আছে, সাবধানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। ওই যে একটা চটের থলে পড়ে আছে দেখছি! হরেকৃষ্ণবাবু আয়োজন মন্দ করেননি। চলুন মহেন্দ্রজি! এস জয়ন্ত!…

মহেন্দ্রজিকে নিয়ে আমরা তার ভাইপোর ফার্মহাউসে ফিরে গিয়েছিলুম। রাজু তাকে দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল। কর্নেল তাকে মুখ বুজে থাকতে বলেছিলেন। ফার্মহাউসে তখন লোকেরা গভীর ঘুমে অচেতন।

আমাদের ঘরে গিয়ে মহেন্দ্রজি বলেছিলেন, সংসারে বাস করার একটুও ইচ্ছা আমার নেই। আমি মোহনের ওপর রাগ করে চলে গিয়েছিলুম। কারণ তারও দোষ ছিল। দশ বছর আগে আশ্বিন মাসে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল। গঙ্গামাই পাগলী হয়ে গিয়েছিল। ওই বাড়িতে তখন আমি একা থাকতুম। মন্দিরে থেকে তপজপ করতুম। ঝড়বৃষ্টি এবং গঙ্গামাঈজির অবস্থা দেখে আমার ভয় হয়েছিল। মন্দির থেকে বিগ্রহ উপড়ে তুলে ফেলায় আমার পাপ হয়েছিল। তা না হলে দেবতা আমার হাতছাড়া হবেন কেন? তবে সে অনেক কথা।

সন্ন্যাসী মহেন্দ্রজির মুখে যা শুনেছিলুম এবং তার সঙ্গে কর্নেল যেসব মন্তব্য করছিলেন, সংক্ষেপে তার এই বিবরণ দাঁড় করালুম :

মহেন্দ্রজি তার ভাতিজা মোহনজির জিম্মায় বিগ্রহ রেখে তীর্থে গিয়েছিলেন। একবছর পরে ফিরে এসে তিনি শোনেন, দেবতা চুরি হয়ে গেছে। আসলে চুরি যায়নি। মোহনজির তখন বাবা মারা গেছেন। জঙ্গিপুরে গঙ্গার ওপর নৌকোয় মালবোঝাই তার ট্রাক পারাপারের সময় গঙ্গায় তলিয়ে যায়। মোহনজির কারবার অচল হয়ে পড়ে। তাই মোহনজি সোনার দেবতা, গোপনে বন্ধক রাখেন কালীকৃষ্ণবাবুর কাছে। কালীকৃষ্ণবাবুর বাড়ি থেকে সেই দেবতা সত্যিই চুরি যায়। কে চুরি করেছিল, এতকাল পরে জানা গেল। কিন্তু মহেন্দ্রজি গোপনে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, দেবতার সোনা গলিয়ে বিক্রির জন্য হরেকৃষ্ণ স্বর্ণকার খুঁজছেন। পাটোয়ারিজিদের গৃহদেবতার শাপের ভয়ে কোনো স্বর্ণকার রাজি হয়নি। হরেকৃষ্ণরও মনে দ্বিধা ছিল। কারণ হঠাৎ তার বউ মারা যায়। গোপনে সে ড্রাগের কারবার করত। ধরা পড়ে অনেক দুর্ভোগে পড়ে সে। তাই সোনার দেবতা লুকিয়ে রেখে পুজোআচ্চা করত। এ সব কথা, চন্দ্রনাথবাবুর কাছে শুনেছিলেন মহেন্দ্রজি।

অবশেষে এতকাল পরে সে মরিয়া হয়ে ওঠে। বিশেষ করে পশুপতির কথা তার মাথায় আসে। পশুপতি দুকানকাটা লোক। চন্দ্রনাথের পরামর্শে হরেকৃষ্ণ পশুপতিকে মদ খাইয়ে সোনা গলানোর কাজে রাজি করায়। গত সপ্তাহে গঙ্গাভবনের নিচের তলায় একটা কুঠুরিতে কাজ শুরু হয়েছিল। মহেন্দ্রজি শিবমন্দির থেকে লক্ষ্য করতেন, হরেকৃষ্ণ নৌকো চালিয়ে রোজ গঙ্গভবনে যাতায়াত করছে। কিন্তু গত সপ্তাহে তরুণ সংঘের স্বপন নামে একটি ছেলে বল কুড়োতে গিয়ে সাপের কামড়ে মারার পড়ে। তখন মহেন্দ্রজি ভয় পেয়ে যান। তার মনে হয়, শিবের মাথার শঙ্খচূড় সত্যিই ছেলেটিকে দংশন করেছে। তাই তিনি আগের মতো গঙ্গভবনে রাতের বেলায় যাতায়াত বন্ধ করে দেন। তবে দিনে কখনও কখনও যেতেন।

একদিন তার সঙ্গে অর্ধেন্দুবাবুর দেখা হয়েছিল। অর্ধেন্দুবাবু তাকে বলেছিলেন, আপনার দেবতার খোঁজ আমি পেয়েছি। এই গঙ্গাভবনেই তাকে লুকিয়ে রেখেছে হরেকৃষ্ণ।

তারপর অর্ধেন্দুবাবু মারা পড়েন সাপের কামড়ে। তাই মহেন্দ্রজি সতর্ক হয়ে যান। আজ রাতে তিনি দূর থেকে গঙ্গাভবনের নিচে গঙ্গার ওপর টর্চের আলো। দেখে মরিয়া হয়ে ওঠেন। প্রথমে ফোঁস ফোঁস শব্দ শুনে তিনি ভয় পেয়েছিলেন। পরে বুঝতে পারেন কিসের শব্দ।…।

মহেন্দ্ৰজির কথা শেষ হলে কর্নেল বললেন, স্বপন বল কুড়োতে ঢুকে ওই ফোঁস ফোঁস শব্দ শুনেই খুঁজতে গিয়েছিল। সে সম্ভবত পশুপতি ও হরেকৃষ্ণকে। দেখতে পেয়েছিল। তারা কী করছে, তা-ও নিশ্চয় বুঝতে পেরেছিল। তাই সম্ভবত তাকে কথায় কথায় ভুলিয়ে হরেকৃষ্ণ আচমকা গলায় বিষের ইঞ্জেকশন বিঁধিয়ে দেয়। তারপর ডেডবডি তুলে নিয়ে গিয়ে ভাঙা ফোয়ারার কাছে ফেলে রাখে।

বললুম, তাহলে আগে থেকে তৈরিই ছিল হরেকেষ্ট।

হ্যাঁ। সাপে কামড়ানোর ঘটনা সাজিয়ে দৈবাৎ কোনো অবাঞ্ছিত আগন্তুককে মেরে ফেলার আইডিয়া তার মাথায় এসেছিল। কারণ গত বর্ষায় চন্দ্রনাথবাবু গঙ্গাভবনের কাছে একটা প্রকাণ্ড বিষধর সাপ বন্দুকের গুলিতে মেরেছিলেন। কাজেই সাপের কামড়ে মৃত্যু খুব স্বাভাবিক দেখাবে। বিশেষ করে আজ সন্ধ্যায় অশোকের কাছে গিয়ে জানতে পেরেছিলুম, সিরাম অ্যান্টিভেনাম সাপের বিষের ওষুধ। কিন্তু তার সঙ্গে নিকোটিনাইড মিশিয়ে সুস্থ লোকের শরীরে ইঞ্জেকশন দিলে তৎক্ষণাৎ তার মৃত্যু হবে।

মহেন্দ্রজি উঠে দাঁড়ালেন এতক্ষণে। আমাকে যেতে দিন এবার। আমি আমার ডেরায় ফিরে যাই। মোহনকে বলবেন, আর তার ওপর আমার কোনো ক্ষোভ নেই। কর্নেলসায়েব! ওই সোনা দিয়ে মোহন যেন আবার দেবতা তৈরি করে। মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে। তা হলে তার প্রতি আমার আশীর্বাদ থাকবে. মোহন আইনত ওই দেবতার সোনা দাবি করতে পারে না কি?

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ! পারেন। চলুন! রাজুকে গেট খুলে দিতে বলি।

বৃদ্ধ সন্ন্যাসীকে কর্নেল এগিয়ে দিতে গেলেন! এতক্ষণে কোথায় শেয়াল ডাকতে থাকল। ফার্মের গাছপালার ভেতর একটা প্যাচা ক্রাও-ক্রাও করে ডেকে উঠল। দরজায় উঁকি মেরে দেখলুম, রাজু গেট খুলে দিয়ে সন্ন্যাসীর পা ছুঁয়ে প্রণাম করছে। সন্ন্যাসী তাকে আশীর্বাদ করে অন্ধকারে কুয়াশায় লীন হয়ে গেলেন।……

বুকমার্ক করে রাখুন 0