৪. কুকুর দুটোর গর্জন

কুকুর দুটোর গর্জন থামছিল না। বিরক্ত হয়ে সুদর্শন বললেন, বুলেট আর। টাইগারকে জাফরান ক্ষেতের কাছে বেঁধে রেখেছি। ছেড়ে দিয়ে আসি। তা নাহলে ওদের চ্যাঁচামেচি থামবে না।

বললুম, হেকিমসায়েবকে আপনার কুকুর দুটো তাড়া করে না তো?

সুদর্শন অনিচ্ছার সঙ্গে একটু হাসলেন। প্রথম প্রথম খুব খাপ্পা হয়েছিল। তবে তাড়া করেনি। ওরা শত্রু-মিত্র চেনে। এই যে এখন ওরা চাচামেচি করছে, ওটা ওদের ফার্স্ট রিঅ্যাকশন। কিছুক্ষণ পরে চুপ করবে। কিন্তু ব্যাপারটা বিরক্তিকর। আমি এখনই আসছি।

বেরিয়ে যাওয়ার সময় উনি একটা বন্দুক আর টর্চ নিয়ে গেলেন। লক্ষ্য করলুম, এখানে বিদ্যুতের ভোল্টেজ খুম কম। সারবন্দি র‍্যাকভর্তি বইগুলোর দিকে তাকিয়ে কর্নেল বললেন, ভেষজ উদ্ভিদ সংক্রান্ত বইয়ের এমন সংগ্রহ কোথাও দেখিনি। ও! তোমাকে বলা হয়নি, ইরানে থাকার সময় মিঃ সিংহরায়। ফার্সি শিখেছিলেন। ওই র‍্যাকে যে প্রকাণ্ড বইগুলো দেখছ, সব ফার্সি বই। ইউনানি চিকিৎসা সংক্রান্ত এ সব বই এদেশে পাওয়া যায় না।

মিঃ সিংহরায়ের অতীত জীবনের গল্প শুনছিলুম রায়সায়েবের কাছে।

কী গল্প?

এই সুযোগে কথাগুলো সংক্ষেপে কর্নেলকে জানিয়ে দিলুম। শেষে বললুম, ব্যবসায়ী তারক দত্তের ভাই শ্যামল দত্ত তারাপীঠে দীক্ষা নিয়ে সাধু হয়ে বাস করতেন। এই সাধুবাবা সম্পর্কে আপনার খোঁজখবর নেওয়া উচিত।

কর্নেল সোফার সেন্টার টেবিলে রাখা একটা ইংরেজি পত্রিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটু হেসে বললেন, রায়সায়েব তোমাকে যা সব বলেছেন, আমার অত ডিটেলস না জানা থাকলেও এটুকু জানি যে, মিঃ সিংহরায় একসময় নকশাল মুভমেন্টে জড়িয়ে পড়েছিলেন। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রায়সায়েবের কাছে এই ব্যাপারটা খারাপ ঠেকতেই পারে। অর্থাৎ তিনি বলতেই পারেন সুদর্শন সিংহরায়ের অতীত জীবন ভালো ছিল না। আসলে সব মানুষই যে কোনো ঘটনা নিজের নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করে। কিন্তু প্রকৃত সত্য যে জানতে চায়, তাকে নির্ভর করতে হয় তথ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা। তথ্যের ওপর।

বুঝলুম না।

ধরো, মিঃ সিংহরায়ের সেই মাদুলি কুড়িয়ে পাওয়াটা একটা তথ্য! কিন্তু এর আড়ালে কয়েকটা তথ্য আছে। প্রথমত, মাদুলিটা ছিঁড়ে পড়েছিল কারও বাহু থেকে। বাহুটা কার? দ্বিতীয়ত

কর্নেলের কথা থেমে গেল। টিপিক্যাল রাঁধুনি ঠাকুর মার্কা একজন রোগা বেঁটে লোক, পরনে খাটো ধুতি আর ফতুয়া, মাথায় টিকিও আছে এবং পৈতেটা গলার কাছে উঁকি দিচ্ছে, হাতে ট্রে নিয়ে চুপচাপ ঘরে ঢুকল। তারপর ট্রে সেন্টার টেবিলে রেখে সসংকোচে বলল, কর্নেলসায়েব কি আমাকে চিনতে পারছেন?

কর্নেল সহাস্যে বললেন, অবশ্যই পারছি। কেমন আছেন ঠাকুরমশাই?

আজ্ঞে, ঈশ্বরের কৃপায় চলে যাচ্ছে একরকম।

শুনলুম এক মুসলমান হেকিমসাহেব এসে আপনাকে বিব্রত করছেন?

পাগলা! একেবারে মাথাপাগলা! দেখুন, সব জীবই ঈশ্বরের সৃষ্টি। তবে একেক জীব একেক পথে হেঁটে ঈশ্বর খোঁজে। আমি এইরকম বুঝি স্যার! তাই বলে অন্যের পথে হুট করে এসে অনাছিষ্টি বাধানো কি উচিত?

কর্নেল কফির পেয়ালা তুলে নিয়ে বললেন, আপনার ঠাকুরঘরে ঢুকেছিলেন। হেকিমসায়েব! গোপালবাবুর কাছে শুনেছি।

শুধু ঢুকলে কথা ছিল। দেবতার গায়ে হাত? আমি ঠিক সময়ে গিয়ে পড়েছিলুম। তখন কীসব আবোল-তাবোল বলতে শুরু করলেন। জিভ কেটে হিন্দিতে বললেন, ক্ষমা চাইছি। ভুল হয়ে গেছে। তো কী আর করা যাবে? ঠাকুরঘর শুদ্ধ করতে হলো। দেবতারও শুদ্ধিকরণ হলো। শাস্ত্রে সে ব্যবস্থা আছে।

হরিঠাকুর কথাটা বলে হঠাৎ ব্যস্তভাবে বেরিয়ে গেলেন। মিঃ সিংহরায়ের ডাক শোনা গেল, পাঁচু! পাঁচু!

চেরা গলায় কেউ সাড়া দিল, আজ্ঞে-এ-এ!

হ্যাসাগ দুটো রেডি রাখ। একটু পরেই কারেন্ট চলে যাবে। ভোল্টেজ বাড়ছে।

রেডি আছে আজ্ঞে।

বিদ্যুতের উজ্জ্বলতা বেড়েছে লক্ষ্য করলুম। টর্চের আলোর ঝলক দেখা যাচ্ছিল গাছপালার আড়ালে। একটু পরে সুদর্শন সিংহরায় এসে গেলেন। ঘরে ঢুকে বললেন, কুকুর দুটো নিয়ে সারা ফার্ম একবার চক্কর দিয়ে এলুম। আকাশে মেঘ জমেছে দেখলুম। গোপালবাবু আর শিউশরণ এখনও ফিরল না। খুব অস্বস্তি হচ্ছে।

কর্নেল বললেন, ওদের পাঠানোর দরকার ছিল না। আপনার হেকিমসাহেব অভিজ্ঞ লোক।

সুদর্শন বন্দুক ঠেস দিয়ে রেখে বসলেন। কফির পট থেকে খালি কাপে লিকার ঢেলে চিনিছাড়া লিকারে চুমুক দিলেন। আস্তে বললেন, আপনাকে সন্ধ্যায় আসতে বলার কারণ আছে। আজ দুপুরে লেটারবক্সে কে একটা চিঠি রেখে গেছে। লেটারবক্স গেটের বাইরে পিলারে আটকানো। ফর্মের ভেতর থেকে চোখে পড়ে না।

বলে ডান পা একটু ছড়িয়ে প্যান্টের পকেট থেকে একটা ভাজ করা চিঠি বের করলেন মিঃ সিংহরায়। কর্নেলকে দিলেন। চিঠিটা ছোট। কর্নেলের কাছাকাছি বসে ছিলুম। উঁকি দিয়ে দেখলুম। কয়েকটা লাইন মাত্র। তলায় আগের চিঠির মতো জনৈক হিতৈষী লেখা নেই।

চিঠিটা পড়ে কর্নেল আমাকে দিলেন। দেখলুম লেখা আছে :

আর ধৈর্য ধরতে পারছি না। তুমি কলকাতা থেকে গোয়েন্দা এনেছ। তাদের সাধ্য নেই তোমাকে বাঁচায়। শেষ সুযোগ। আজ রাত দশটায় অট্টহাসে দেখা করো।

এই চিঠিটা খুব তাড়াহুড়ো করে লেখা। বড়-ছোট অক্ষর। আঁকাবাঁকা লাইন। চিঠিটা নিয়ে কর্নেল তার কিটব্যাগ থেকে আতস কাঁচ বের করে দেখতে থাকলেন। একটু পরে বললেন, এই চিঠিটা ডান হাতে লেখা। সম্ভবত কলকাতার জি পি ও-তে পোস্ট করা চিঠির খামে যে লোকটা আপনার নামঠিকানা লিখেছিল, এটা তারই লেখা। তার মানে, দুজন লোক আপনার পেছনে লেগেছে।

সুদর্শন সিংহরায় একটু চুপ করে থাকার পর শ্বাস ছেড়ে বললেন, আমি অট্টহাসের মন্দিরে যেতে চাই, যদি আপনি আমাকে আড়াল থেকে গার্ড করেন। আমি অন্য কারও ওপর আস্থা রাখতে পারব না। সেরাত্রে পুলিশবাহিনীর কাণ্ড দেখে আমার পুলিশের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে গেছে। বাঘের গর্জন শুনেই ওরা–হঠাৎ থেমে তিনি একটু হাসলেন। নকশাল মুভমেন্টের সময় অবশ্য পুলিশকে ভালোই চিনেছিলাম। রামকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া ওদের গুলি শ্যামের গায়ে লাগত। আমাদের দেশের পুলিশ একটুতেই উত্তেজিত হয়ে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অ্যামেরিকায় দেখেছি, প্রত্যেকদিন পুলিশ একঘণ্টা করে টার্গেট প্র্যাকটিস করে। যত বিপজ্জনক ঘটনা ঘটুক, ওরা মাথা ঠাণ্ডা রাখে।

বাইরে থেকে কেউ বলল, আজ্ঞে, হ্যাসাগদুটো জ্বালিয়ে রেখেছি।

সুদর্শন বললেন, ঠিক আছে। কিন্তু ব্যাপার কী রে পাঁচু? ভোল্টেজ বাড়ল! তবু তোর লোভুবাবু এখনও এলেন না?

দরজার সামনে বেঁটে মোটাসোটা এবং হাফপ্যান্ট-গেঞ্জি পরা একটা গুঁফো। লোককে দেখতে পেলুম। এই সেই পাঁচু, যার ভাই কিনু ছিঁচকে চোর?

পাঁচু হাসল। আজ্ঞে, লোডুবাবুর আসতে দেরি হবে মনে হচ্ছে। সকালে বাজারে গিয়ে শুনেছিলুম, ইলেকটিরি আপিসে ঘেরাও হয়েছে। লোকে আর কত সহ্য করবে বলুন?

কর্নেল বললেন, লোডশেডিং মানে লোডুবাবু? বাহ্!

পাঁচু কাচুমাচু মুখে বলল, আজ্ঞে স্যার! এখানকার লোকে লোডুবাবু বলে!

তোমার ভাই কিনুর খবর কী?

পাঁচু তখনই ভড়কে গিয়ে বলল, আজ্ঞে কি? কি-কিনুর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রায় ছ-সাত মাস তার খবর নেই। হয়তো জেল খাটছে। কিনুর খবর কেন জিজ্ঞেস করছেন স্যার?

বছর তিনেক আগে আমি এখানে এসেছিলুম তোমার মনে পড়ছে?

আজ্ঞে।

সেবার এসে আহিরগঞ্জে কিনুর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তখন সে সাইকেল রিকশ চালাত।

আজ্ঞে হ্যাঁ। চালাত বটে। তবে সঙ্গদোষে বুদ্ধিনাশ। সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়–

এইসময় বাইরে কারা কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছিল। পাঁচু বলল, ম্যানেজার বাবুরা ফিরে এলেন।

কুকুর দুটোকে ঝোপের আড়াল থেকে আলোয় বেরিয়ে আসতে দেখলুম। সুদর্শন সিংহরায় বেরিয়ে গিয়ে শিস দিলেন।

বুলেট! টাইগার! গো অ্যাওয়ে! গো অ্যাওয়ে!

ধমক খেয়ে কুকুর দুটো উধাও হয়ে গেল। কালো অ্যালসেশিয়ানটা একেবারে বাঘের মতো প্রকাণ্ড। টেরিয়ারটা লম্বাটে। ভেবে পেলুম না এরা থাকতে চোর ঢোকে কী সাহসে?

গোপালবাবু বারান্দায় উঠে ক্লান্তভাবে বললেন, ডাকাডাকি করে গলা ভেঙে গেল। কোনো সাড়া পেলুম না। তারপর অট্টহাসের মন্দিরতলায় টর্চের আলো ফেলতেই–বাপস!

শিউশরণ বলল, আমি দেখিনি স্যার! দেখলে গেলি চালিয়ে দিতুম।

গোপালবাবু বললেন, মাত্র এক পলকের দেখা। বাঘটা ঝোপের আড়ালে চলে গেল। আর এগোতে পারলুম না। তবে হেকিমসায়েবকে ওখানেও ডাকাডাকি করেছি। সাড়া পাইনি।

সুদর্শন হঠাৎ কেন যেন খাপ্পা হয়ে বললেন, বাঘ তোমাদের মাথার ভেতর ঢুকে বসে আছে। আমি বলেছিলুম বাঁধের পথে নদীর ধারে গিয়ে খুঁজতে।

বাঁধের ওপর দিয়ে ডাকাডাকি করতে করতেই তো এলুম আমরা। শিউশরণকে জিজ্ঞেস করুন।

শিউশরণ বলল, স্যার! মালুম হচ্ছে, হেকিমসাব আহিরগঞ্জে বিমারী লোককে দেখতে গেছেন। আমি গেট থেকে তখন দেখলুম, উনি বাঁধে দাঁড়িয়ে একটা লোকের সঙ্গেতে বাতচিত করছেন।

সুদর্শন বললেন, লোকটাতে চিনতে পারোনি?

না স্যার। ধোতি-পাঞ্জাবি পরা লোক। দূর থেকে চেহারা মালুম হয়নি।

 কথাটা আগে বলেনি কেন?

আপনি অট্টহাস মন্দিরে তালাশ করতে বললেন। তাই শোচ করলাম—

ঠিক আছে। বলে সুদর্শন ঘরে ঢুকলেন।

বারান্দা থেকে গোপালবাবু বললেন, আমি অফিসে থাকছি স্যার! কিছু কাজকর্ম বাকি আছে।

সুদর্শন আস্তে বললেন, কর্নেল সরকার! আপনি ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টের জিপটা ছেড়ে দিন। ড্রাইভারকে বলুন, আজ রাত্রের ডিনার এখানে খাবেন। বাংলোয় ফিরতে একটু রাত হবে। আমি আমার জিপে আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসব।

কর্নেল ঘড়ি দেখে নিয়ে বললেন, তার চেয়ে বরং আমি বাংলোয় নটায় ডিনার সেরে নিয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করব। আপনি জিপ নিয়ে যাবেন। তারপর কী করতে হবে আমি বলব।

আপত্তি কিসের?

অপরপক্ষ জেনে যাবে আমরা আপনাকে গার্ড দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি–মানে, যদি এখান থেকে যাই! তার চেয়ে আমার প্ল্যানটা আপনার পক্ষে নিরাপদ। প্ল্যানটা সময়মতো জানাব।

সুদর্শন সিংহরায় গলার ভেতর বললেন, ও কে!…

আমরা বাংলোয় পৌঁছুনোর পর টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হলো। চৌকিদার ঘরে তালা এঁটে রেখেছিল। খুলে দিয়ে বলল, কফি লাগবে কর্নিলসাব?

আধঘণ্টা পরে। আর শোনো! আমরা ঠিক নটায় ডিনার খাব। অসুবিধে নেই তো?

কুছু অসুবিধা নেই স্যার!

চৌকিদার সেলাম ঠুকে চলে গেল। কর্নেল বললেন, মিঃ সিংহরায় হঠকারী স্বভাবের মানুষ। বৃষ্টির কথাটা ভাবেননি। ছাতি মাথায় দিয়ে ওঁর বডিগার্ড হওয়া সম্ভব নয়। কর্নেল হেসে উঠলেন। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, লোকদুটো ওঁকে মেরে ফেলার জন্য ডাকেনি। একটা রফা করতে চায় মুখোমুখি। তা ছাড়া ওরা যারাই হোক, তত সাহসী নয়।

বললুম, কেন? অট্টহাসের জঙ্গলে বাঘ সত্যিই যখন আছে–

মানুষখেকো বাঘ নয়। ওরা জানে মিঃ সিংহরায় সশস্ত্র হয়েই যাবেন। বাঘ হামলা করলে একসময়ের বিখ্যাত শিকারি সুদর্শন সিংহরায় সেই বাঘকে খতম করতে পারবেন। আমার অঙ্কটা এইরকম। ওরাই মিঃ সিংহরায়কে গোপনে। অনুসরণ করে জঙ্গলে ঢুকবে। তারপর সম্ভবত আড়াল থেকে কথাবার্তা বলবে।

বলে কর্নেল চুরুট ধরালেন। তারপর বুকপকেট থেকে আজকের চিঠিটা এবং কিটব্যাগ থেকে পুরনো চিঠিটা বের করলেন। আতস কাঁচ দিয়ে খামে লেখা নামঠিকানা এবং আজকের চিঠির অক্ষর মেলাতে ব্যস্ত হলেন। কিন্তু অবাক হয়ে বললুম, খামের ওপর লেখাটা তো ইংরেজিতে। চিঠিটা বাংলাতে। তাহলে কিসের মিল খুঁজছেন?

কর্নেল আমার কথায় কান দিলেন না। বেশ কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে দেখার পর মুখ তুলে বললেন, হস্তলিপি বিশারদের মতে, লেখায়–তা কেউ দুটো-তিনটে বা চারটে ভাষায় লিখুক না কেন, লেখকের একটা সাধারণ প্রবণতা। থাকতে বাধ্য। অক্ষর হলো রেখারই নানান রূপ। রেখার অংশবিশেষ আতস কাঁচে বড় হয়ে ফুটে উঠলে সেই প্রবণতা ধরা পড়ে। তা ছাড়া কাগজের ওপর লেখনীর কতটা চাপ পড়েছে, সেটাও লক্ষ্য করতে হয়। যে লোকটি কলম খুব চেপে লেখে, যত তাড়াতাড়ি সে লিখুক, চাপটা একই থাকে। মনে রেখো, লেখার সময় কেউ এসব নিয়ে কিছু ভাবে না। সে লেখে অভ্যাস অনুযায়ী। আরও লক্ষ্য করো এই চিঠিটা লাইনটানা কাগজে নয়। কাগজটার আয়তন প্রমাণ করছে, এটা কারও নেমপ্যাডের অর্ধেকটা ছিঁড়ে লেখা। পাশের এই চিহ্নগুলো প্যাডের কাগজকে প্রমাণ করছে। প্যাডের বাঁপাশে সচরাচর একটু আঠা মাখানো থাকে। লক্ষ্য করো! আতস কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখ।

দেখে বললুম, হ্যাঁ, আঠার চিহ্ন। কাগজের ফাইবার লেগে আছে।

যে নামছাপানো প্যাড ব্যবহার করে, সে একেবারে ফেলনা লোক নয়। তার কোনো সামাজিক স্বীকৃতি আছে। সেটা শিক্ষাগত ডিগ্রির দিক থেকেও থাকতে পারে। মোটকথা, আত্মপরিচয় ঘোষণার প্রবণতা যার আছে, সে নেমপ্যাড ব্যবহার করে।

ডাক্তাররাও তো করেন?

সামাজিক প্রয়োজনেই করেন। কিন্তু ডাক্তারদের প্যাডও সামাজিক স্বীকৃতির মধ্যে পড়ে। বলে কর্নেল চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। মুখের চুরুট থেকে নীল ধোঁয়া তার টাকের ওপর উঠে মিলিয়ে গেল ফ্যানের হাওয়ায়। এয়ারকন্ডিশনার বন্ধ। কিন্তু এখন আর সেই ছ্যাকা দেওয়া গরমটা নেই। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টির ধারাবাহিক শব্দ শোনা যাচ্ছে।

একটু পরে বললাম, হালদারমশাইয়ের জন্য আমারও অস্বস্তি হচ্ছে।

কর্নেল চোখ বুজেই বললেন, ওঁর প্রাণে মারা পড়ার সম্ভাবনা নেই।

কেন নেই?

ওঁকে প্রাণে মেরে মিঃ সিংহরায়ের প্রতিপক্ষের কী উদ্দেশ্য চরিতার্থ হবে? বড়জোর ওঁর নকল গোঁফদাড়ি পরচুলার ওপর দিয়েই ধাক্কাটা যাবে।

আপনাকে যারা হুমকি দিতে সাহস পেল, তারা–

ওটা ঠিক হুমকি নয়। কতকটা অনুরোধ। কারণ, ওরা মিঃ সিংহরায়ের সঙ্গে কোনো পুরনো ঘটনার ব্যাপারে রফা করতে চায়। আর্থিক রফা তো বটেই। তাই ওরা চাইছে, আমি যেন এতে বাগড়া না দিই!

মিঃ সিংহরায় সম্ভবত সব জেনেও আপনাকে কোনো কারণে গোপন কথাটা বলছেন না।

তাও হতে পারে!

উনি যেন শুধু ওঁর জাফরানখেত বাঁচাতেই আপনার সাহায্য চেয়েছেন! দুবছর পরে কোটি টাকার ব্যবসা করবেন।

হুঁ।

ব্যবসায়ী তারক দত্তকে খুন করার কথাটা আপনার তোলা উচিত।

হুঁ।

তারক দত্তের কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা আত্মীয়ের হাতে এমন প্রমাণ আছে, যাতে মিঃ সিংহরায় এখনও ফেঁসে যেতে পারেন।

হুঁ।

 বেগতিক দেখে থেমে গেলুম। বৃদ্ধ রহস্যভেদীর এই হুঁ-গুলোর কোনো অর্থই নেই। ওগুলো নিছক হুঁ। উনি আসলে নিজের অঙ্ক কষে চলেছেন।

আটটা নাগাদ রামভরোসা কফি দিয়ে গেল। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, ঝিমুনি এসেছিল। কফিটা চাঙ্গা করে দিল।

একটু হেসে বললুম, চাঙ্গা অবস্থায় একটা কথা আপনার মাথায় আসা উচিত। সেটা বলার সুযোগ পাচ্ছিলুম না।

বলো ডার্লিং!

সুদর্শন সিংহরায়ের প্রতিপক্ষ আপনার সবিশেষ পরিচয় জানে। আপনার এখানে আসার খবরও রাখে সে।

কর্নেল হাসলেন। তা আর বলতে? তার ইংরেজি লেখার নমুনা থেকে কলকাতায় বসেই বুঝতে পেরেছিলুম, সে রীতিমতো শিক্ষিত লোক। তার নেমপ্যাড আছে। তাই বলছিলুম, তার সামাজিক প্রতিষ্ঠা আছে।

একটু ভেবে নিয়ে বললুম, দ্বিতীয় লোকটা লেফটহ্যান্ডার। সে বাঁ হাতে লেখে। কাজেই আপনি আহিরগঞ্জের রায়সায়েবের কাছে তেমন কোনো লোকের খোঁজ পেতেও পারেন। রায়সায়েব জননেতা ছিলেন। পরে সমাজসেবায় মন দেন। অসংখ্য লোকের সঙ্গে তার জানাশোনা আছে।

কর্নেল অন্যমনস্কভাবে বললেন, তাড়াহুড়ো করা ঠিক হবে না জয়ন্ত! ওরা এখনকার মতো থেমে যাবে। আমি তো অনন্তকাল এখানে থাকছি না। তা ছাড়া প্রকৃত রহস্যটাই চাপা পড়ে যাবে।

প্রকৃত রহস্যটা কী?

মিঃ সিংহরায় অতীতে এমন কী করেছিলেন, যার জন্য তার প্রায়শ্চিত্ত দাবি করছে ওরা! সমস্যা হলো, মিঃ সিংহরায় তেমন কোনো ঘটনা অস্বীকার করছেন। তার মানে, তিনি তা জেনেও আমাকে বলতে চান না। কিংবা তিনি সত্যিই জানেন না। এমন তো হতেই পারে, অতীতে তিনি এমন কিছু করেছিলেন, যার পরিণামে সাংঘাতিক কিছু ঘটেছিল। কিন্তু তিনি সে-সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না! বলে কর্নেল হেসে উঠলেন। তবে সবচেয়ে জটিল রহস্য একটা বাঘ।

এই সময় বাইরে ভাঙা গলায় কেউ ডাকল, কর্নেলস্যার, কর্নেলস্যার!

তারপর রামভরোসার কথা শোনা গেল, কৌন বা?

কর্নেল তখনই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি দরজার পর্দা তুলে উঁকি দিলুম। তারপর অবাক হয়ে দেখলুম, গেটের বাইরে উজ্জ্বল আক্কোয় বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত মূর্তি। গায়ে ছেঁড়া আর জলে ভেজা একটা আলখাল্লা সেঁটে আছে। পরনে চেককাটা লুঙ্গি। আমাদের হেকিমসাহেব অর্থাৎ মূর্তিমান হালদারমশাই!

কর্নেলের কথায় চৌকিদার ছাতিমাথায় গিয়ে গেট খুলে দিল। হালদারমশাই ঝড়বৃষ্টিতে ভেজা কাকতাড়ুয়ার মতো টলতে টলতে এগিয়ে এলেন। তারপর বারান্দায় উঠেই কঁপা কাঁপা গলায় বললেন, বড্ড শীত! আগে আমারে শুকা পোশাক দিন।

কর্নেল বললেন, বাথরুমে ঢুকুন হালদারমশাই। ওখানে তোয়ালে আছে। সাবান ঘষে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ছেঁড়া গোঁফদাড়ির টুকরোগুলো পরিষ্কার করে নিন আগে।

হালদারমশাই কোমরের কাছে হাত ভরে লুঙ্গির ভঁজে আটকানো তার রিভলবারটি বের করে কর্নেলের হাতে দিয়ে ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, এটা রাখেন। কর্নেলস্যার! তারপর টলতে টলতে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলেন।

কিছুক্ষণ পরে কর্নেলের পাজামা-পাঞ্জাবি পরে প্রাইভেট ডিটেকটিভ করুণ। মুখে বললেন, আমি নদীর দ্যাশের পোলা। কিন্তু এমন নদী দেখি নাই। ওহ! টেরিফিক কারেন্ট!

ইতিমধ্যে কর্নেলের হুকুমে রামভরোসা এক কাপ গরম কফি আর স্ন্যাক্স দিয়ে গিয়েছিল। কর্নেল বললেন, আগে কফি খেয়ে নিন। চাঙ্গা হোন। তারপর সব বলবেন।

চাঙ্গা হওয়ার পর হালদারমশাই বিস্তারিতভাবে যে ঘটনা শোনালেন, তা সংক্ষেপে এই :

বিকেলে আহিরগঞ্জের ব্রিজের দিকে তিনি খেয়ালবশে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। বাঁধের কাছে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয় তার। উনি নাকি হেকিমসায়েবের খবর পেয়েই তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। হালদারমশাই তাকে দেখে সত্যি রোগী ভেবেছিলেন। কিন্তু তার মতলব টের পাননি। নিজের অসুখের বর্ণনা দিতে ভদ্রলোক তাকে নদীর ধারে গিয়ে বসতে অনুরোধ করেন। তাঁর অসুখের পিছনে নাকি গোপন কারণ আছে। হালদারমশাইয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণের মধ্যে তার অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে। হালদারমশাইও কথার ফাঁকে গোয়েন্দাগিরি শুরু করেন। ভদ্রলোকের নাম ভবেশ ঘোষ। তিনি সুদর্শন সিংহরায়ের অতীত জীবনের গল্প শোনান (এই অংশটা আমাদের জানা)। কথায়-কথায় সন্ধ্যা হয়ে আসে। হালদারমশাই একটা পাথরে বসেছিলেন। লক্ষ্য করেননি, কখন সেই পাথরের পেছন থেকে অন্য কেউ আচমকা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ধাক্কা দিয়ে তাঁকে নদীতে ফেলে দেয়। হাতের টর্চ ছিটকে জলে পড়ে যায়। হালদারমশাই প্রচণ্ড স্রোতের মুখে পড়ে অনেক কষ্টে এই বাংলোর কাছাকাছি বাঁধের নিচে ঝোঁপজঙ্গলের শেকড় ধরে পাড়ে ওঠেন। তারপর অনেক হন্যে হয়ে বাংলোটা চিনতে পারেন।…..

তার কথা শেষ হওয়ার একটু পরেই জিপের শব্দ শোনা গেল। কর্নেল বললেন, মিঃ সিংহরায় নটার আগেই এসে গেলেন? ব্যাপার কী?

কর্নেল দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।…

বুকমার্ক করে রাখুন 0