৩. রাত বারোটা থেকে দুটো

রাত বারোটা থেকে দুটো

সোমনাথ শ্রীলেখার কাঁধে আঙুল রেখে ঠেলল। শ্রীলেখা–আশ্চর্য, ঘুমোয়নি, জেগেই ছিল। চোখ খুলল। চমকের ছাপ আছে দৃষ্টিতে। পরমুহূর্তে সে অস্ফুট স্বরে বলল, কী সোমনাথদা?

সোমনাথ বলল, কথা আছে। একবার বাইরে আসবে?

শ্রীলেখা উঠে গেল। …কী ব্যাপার?

এস–বাইরেই বলব।…বলে সোমনাথ টর্চ নিয়ে বেরলো। যাবার সময়ে হারিকেনের মৃদু বাতিটা আরো কমিয়ে দিয়ে গেল।

শ্রীলেখা তার পিছন পিছন এল।

আকাশ পরিষ্কার। অজস্র নক্ষত্র ঝকমক করছে। কবরখানার গাছ থেকে টুপটাপ জল ঝরছে তখনও। সোমনাথ গাড়ির চাবি এনেছিল। পিছনের দিকে ঢুকে ডাকল–এখানে এসে বসো।

…ওরা বেরিয়ে গেলে শান্ত চোখ খুলল। সে দেখল, স্মিতা যেন এইমাত্র চোখ বুজল। শুধু সায়ন্তনের নাক ডাকছে। আলো খুব কম। একচিলতে ছটা সাপের মতো স্মিতার মুখে পড়েছে।

শান্ত একটা সিগারেট ধরাল। তারপর চাপা হেসে ডাকল, স্মিতা, ঘুমোলেন?

স্মিতা সাড়া দিল–না। বাইরে গিয়ে ঘুম আসে না আমার।

আমারও।

একটু চুপচাপ থাকার পর স্মিত হেসে বলল, ওঁরা বাইরে কী কথা বলতে গেলেন?

হ্যাঁ।

 একবার ভাবুন তো– কী কথা!

প্রেমভালোবাসা নয় নিশ্চয়!

আপনি বড্ড দুর্মুখ!

 শান্ত খসখসে গলায় হাসল। একটু পরে বলল, স্মিতা, আপনি নাচতে জানেন?

একটু-একটু। কেন?

ভীষণ ভয়ের মধ্যে আপনি নাচতে পারেন?

 ভীষণ ভয়? ভেবে দেখিনি। কিসের ভয়?

শত্রুর।

হিন্দী ফিল্মে শত্রুর চাবুকের ভয়ে নাচতে দেখেছি।

 ধরুন, ফিল্মে নয় বাস্তব। আপনি হলে নাচতেন?

 ক্ষতি কী?

 স্মিতা, আপনি কে?

স্মিতা চমকে মুখ খুলল। …তার মানে?

শান্ত দাড়ি চুলকে বলল, সায়ন্তবাবু প্রচণ্ড ঘুমোচ্ছেন দেখছি। জেব্রার মুখে গোঁফ থাকলে এবং জেব্রারা ঘুমোলে হয়তো এমনি দেখায়। …একটু হেসে সে ফের বলল, আমাকে ঘুমোলে নাকি ভোদড় দেখায়। একজন বলছিল। দীঘার বালিয়াড়িতে একবার ঘুমিয়ে পড়েছিলুম গল্প করতে করতে। রাতটা ছিল জ্যোৎস্নার।

স্মিতা বলল, আপনি অদ্ভুত!

শান্ত এবার উঠে বসল।–ওই মেয়েটা বুড়োর বউ, বলছিল যে এখানে থাকলে আমাদের বিপদ হবে শয়তানের হাতে। শয়তান সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা আছে স্মিতা?

স্মিতাও উঠে বসল। চুল সামনে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, একটা সিংহের নাম ছিল নাকি শয়তান। সেই শুনে আমার কেবল সিংহের কথাই মনে হয়।

স্মিতা, ধরুন–হঠাৎ এ বাড়িটা ভেঙে পড়ল হুড়মুড় করে।

এই! যা তা বলবেন না।–স্মিতা ছাদের দিকে সংশয়াকুল চোখে তাকাল। ফের বলল, বুডোর বউ বলছিল? ওর কোন অসুবিধে হয়েছে হয়তো আমরা এসে পড়ায়! এসব টাইপের মেয়েরা কী হয়, আমি জানি!

হঠাৎ শান্ত চমকে উঠে তাকাল দরজার দিকে। চটটা টানটান হয়ে টাঙানো আছে। যেন একবার কেঁপে উঠেছিল। কে খুলতে চাইছিল ভিতরে আসার জন্যে–এই রকম মনে হয়েছে। শান্ত হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে একটু তুলে ফাঁক করল। তারপর বলল, কে?

তারপর বেরিয়ে গেল।

 স্মিতা বলল, কোথায় যাচ্ছেন, ও শান্তবাবু? বারান্দায় থামের কাছে শান্ত দাঁড়িয়ে আছে দেখল। স্মিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকাল। চারদিকে সামনে কবরগুলো রাতের এক অলৌকিক ছটায় ধবধব করছে। কাঞ্চনতলায় গাড়ির ভিতর থেকে খুব চাপা ফিসফিস কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। ডাইনেবাঁয়ে বড়ো বড়ো থামের দিকে তাকাল স্মিতা। যে-কেউ লুকিয়ে থাকতে পারে ওখানে। তারপর আচমকা তার মনে হল, পিছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে এবং তার প্রশ্বাস। এসে কানের দিকে লাগল। সে অমনি শান্তর দিকে এগিয়ে তার পিঠটা ছুঁল। শান্ত প্রচণ্ড চমক খেয়ে বলল, কে?

আমি!

স্মিতা।

ঘরে একা থাকতে পারলুম না। ও ভদ্রলোক তো ঘুমোচ্ছেন?

আকাশ পরিষ্কার। বেশ লাগছে। আমার সঙ্গে ওপরের বারান্দায় যাবেন, স্মিত?

ওপরে? কেন?

ভাল লাগবে। জানেন? আমার একপাল পোষা বাঁদর আছে। এখন এখানে তাদের ছেড়ে দিয়ে তারিয়ে-তারিয়ে ছুটোছুটি দেখা যায়। আসুন না।

স্মিতা হেসে উঠল। শান্ত তার হাত ধরে টানল। সিঁড়ি লক্ষ্য করে এগলো দুজনে।…

.

গাড়ির ভিতর থেকে শ্রীলেখা গুম হয়ে বেরিয়ে এল। সোমনাথ চাপা গলায় একবার বলল, খুব ভুল করছ, শ্রীলেখা।

শ্রীলেখা কোন জবাব দিল না। সে হতবুদ্ধি হয়ে গেছে। সোমনাথ তাকে এমন একটা প্রস্তাব দেবে, সে কল্পনাও করেনি। তার সারা শরীর অবশ হয়ে পড়েছিল। একমুহূর্ত তবু একটু ইতস্তত করে সে পা বাড়াল। সামনে বারান্দায় ওঠার পথে তিনটে কবর। তার ধারে সঙ্কীর্ণ পথে পা ফেলে যেতে কয়েকবার ঠোক্কর খেতে হল। বারান্দায় ওঠার সময় আচমকা এতক্ষণে কবরের ভূতের ভয় পেয়ে বসল তাকে। তখন সে পড়ি-কি-মরি করে ছুটে চটের পর্দা তুলে ঘরে ঢুকে পড়ল।

একটু অবাক হল শ্রীলেখা। একা সায়ন্তন ঘুমোচ্ছে। নিজের বিছানায় বসে বুকের কাপুনি থামাতে মন দিল। তারপর ধুপ করে শুয়ে পড়ল। তখন কান্না পেল তার। চুপিচুপি কাঁদতে থাকল সে। আগে সবটা স্পষ্ট জানলে সোমনাথের ইউনিটে. কক্ষনো আসত না সে! উঃ, কী সাংঘাতিক কথা! কাজ নেই আর, ফিল্মের অভিনেত্রী হয়ে। কখন সকাল হবে, সে অকুতোভয়ে কেটে পড়বে এখান থেকে।

শ্রীলেখার মনে হল, সোমনাথের ইউনিটে আরও অনেক আজগুবি ও মারাত্মক ব্যাপার আছে। শান্তবাবু আর স্মিতা, দেখা যাচ্ছে, এই সুযোগে কোথাও গিয়ে প্রেমালাপ করছে। প্রেমালাপ ছাড়া কী? সবই খাপছাড়া লাগছে। শান্তবাবুর সঙ্গে স্মিতার নাকি আজ সকাল-অব্দি পরিচয় ছিল না! ইউনিটের প্রত্যেকটা লোক মিথ্যেবাদী!

শ্রীলেখা একসময় সামলে নিল। সোমনাথের মনে কী ছিল, আগে যদি জানত! সেই আক্ষেপটা অবশেষে রয়ে গেল এবং ঘুমোতে দিল না তাকে। সে চোখ বুজে রইল।

হারিকেনটা খুব মৃদুভাবে জ্বলছিল–শ্রীলেখার মাথার দিকে একেবারে ঘরের এক কোনায়! হঠাৎ সেটা নিভে গেছে কখন, সে টের পায়নি। কারণ একবার চোখ খুলে শ্রীলেখা দেখল, ঘর অন্ধকার এবার তার ভয়টা বেড়ে গেল। সে অস্ফুটকণ্ঠে ডাকল, শান্তবাবু!

কোন সাড়া পেল না। সায়ন্তনের নাক ডাকছে যথারীতি। স্মিতা এলে সে জানতে পারত এবং তার পাশেই স্মিতার শোবার কথা তাহলে সোমনাথই নিভিয়েছে এসে। যেহেতু শ্রীলেখা তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, সেও নিশ্চয় শ্রীলেখার ওপর রেগে আছে–তাই সাড়া দিচ্ছে না। শ্রীলেখা এবিষয়ে মনে মনে নিশ্চিত হল। সেইসময় তার মনে হল, ঘরে একটা অস্পষ্ট শব্দ হচ্ছে। কাগজপত্র নড়াচড়ার খসখস শব্দ। হয়তো সোমনাথ কিছু করছে। শ্রীলেখা একটু অস্বস্তি নিয়েই পাশ ফিরে শুল। ঘুমোবার চেষ্টা করল।

সেই সময় সায়ন্তনের নাকডাকাটা থেমে গেল। তার একটু পরে সে ঘুম থেকে জেগে ওঠার সাড়া টের পেল শ্রীলেখা। হ্যাঁ, সিগারেট জ্বালল সায়ন্তন। দেশলাইয়ের আলো এতো চকিত আর দ্রুত যে ঘরের ভিতর কিছু স্পষ্ট দেখা গেল না। শ্রীলেখা আস্তে ডাকল সায়ন্তনবাবু!

সায়ন্তন জবাব দিল কে স্মিতা?

না।

স্যরি, আপনি শ্রীলেখাদি। এখনও গলা শুনে বোঝা মুশকিল আমার পক্ষে। …সায়ন্তন হাসল একটু।

আপনি তো ভীষণ ঘুমোতে পারেন দেখছি!

আমি? আমি ঘুমিয়েছি?

আজ্ঞে না। নাক ডাকাচ্ছিলেন।

তাই বুঝি! কটা বাজল? …বলে সিগারেটের আগুনে ঘড়ি দেখে নিল সায়ন্তন। …একটা চল্লিশ! তাহলে নির্ঘাত ঘুমিয়েছি। কোন মানে হয় না! একটা রাত আনায়াসে সবাই জেগে কাটাতে পারতুম! তাই না শ্রীলেখাদি?

হারিকেনটা জ্বালুন না!

থাক। কারো ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে। …বলে সায়ন্তন অন্ধকারে উঠে। বসল। …একবার বাইরে যেতুম। টর্চটা…থাক্। দেশলাই যথেষ্ট।

হারিকেন জ্বেলে নিন বরং।

উঁহু, না না। থাক্।

 সায়ন্তনবাবু, আরেকবার দেশলাই জ্বালুন তাহলে।

 কেন বলুন তো?

জ্বালুন না।

সায়ন অগত্যা দেশলাই জ্বালল। সেই আলোয় দুজনে দ্রুত ঘরের ভিতরটা দেখে নিল। তারপর দুজনেই অবাক হল। ঘরে কেউ নেই। সায়ন বলল, আরে! এঁরা সব গেলেন কোথায়?

শ্রীলেখা প্রথমে গম্ভীর হয়ে বলল, ভূতের কাছে আড্ডা দিতে। পরে একটু হেসে বলল, সোমদা গাড়িতে গিয়ে শুয়েছে মনে হচ্ছে। আর শান্তবাবু স্মিতা…

সায়ন্তন এগিয়ে হারিকেন জ্বালাতে জ্বালাতে বলল, শান্তবাবু আর স্মিত?

কোথাও গল্প করছেন।

আশ্চর্য তো!..বলে সায়ন্তন বেরিয়ে গেল।

শ্রীলেখা উপুড় হয়ে তাকিয়ে রইল হারিকেনটার দিকে। ব্যাগটা বালিশ করেছে। ঘাড়ে ব্যথা করার পক্ষে যথেষ্টই। না–এসব কোন সম্ভাবনাই বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় তার মাথায় আসেনি। ভেবেছিল, কোন হোটেল টোটেলে মোটামুটি ভাল বন্দোবস্ত হবে রাতে থাকার জন্যে। অনেক লোক ভিড় করবে। আরও সব বিচিত্র ব্যাপার তার মাথায় এসেছিল সোমনাথের গাড়িতে ওঠার সময়। যাক গে, তাও সওয়া যায়। কিন্তু সোমনাথ এ কী প্রস্তাব দিল তাকে? যত ভাবল সে, তত শোকে-দুঃখে ফুলে উঠল। সকাল হতে দেরি। হনহন করে চলে যাবে সবার চোখের সামনে দিয়ে। তার সেই থিয়েটারের অভিনয়ই ভালো।

সময় যেন যেতে চায় না। থেমে রয়েছে। কেউ আসছে না। আবার ভয় করতে থাকল। এই পোড়ো কবরখানায় ভূত না থেকে পারেই না। সে তখন। বিড়বিড় করে ছেলেবেলায় শেখা একটা ভূত তাড়ানো মন্ত্র আওড়াতে থাকল।

শান্ত আর স্মিতা ওপরের বারান্দায় থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। শান্ত ওকে সেই অলীক বাঁদরগুলোর গতিবিধি বর্ণনা করছিল। স্মিতা হাসতে গিয়েও ভয় পাচ্ছিল। একসময় স্মিতার মনে হল, সে সত্যি যেন অজস্র বাঁদর দেখছে। বাঁদরগুলো কবরখানার তিনদিকের উঁচু পাঁচিলে, পাঁচিলের ধারের বড় গাছগুলো থেকে নিঃশব্দে লাফিয়ে পড়ছিল–ছোটাছুটি করছিল। তারা কবরগুলোর ওপরও নেমে পড়েছিল দলেদলে। তাদের কোন-কোনটা শান্তভাবে চুপচাপ কবরের ওপর বসে রইল, কোনটা দৌড়াদৌড়ি করল। শান্ত সিগারেট টেনেছে, কোন কথা বলেনি এবং স্মিতা এইভাবে বিস্ময়ে-ভয়ে-কিছুটা কৌতুকে বাঁদরবাজি দেখেছে। এক সময় স্মিতার মনে হল, একটা বাঁদর বেশ বড়োসড়ো, উঁচু, কবরখানার শেষ দিকটায় ঘুরঘুর করছে।

সে অস্ফুটকণ্ঠে বলে উঠল, ওটা কী?

 শান্ত বলল, কই?

শান্ত অন্ধকারে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করল। কিন্তু কিছু দেখতে পেল না। সেই সময়ে স্মিতা বলল, নাঃ, আমারই চোখের ভুল হয়তো। আর তো দেখতে পাচ্ছি না।

তারপরই সে দ্রুত ঘুরে বলল, কে? কে ওখানে?

শান্ত হেসে উঠল।…আপনি ভূতের পাল্লায় পড়ে গেছেন নির্ঘাত! যান, আপনার দ্বারা কিচ্ছু হবে না। আরে! ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন! স্মিতা!

স্মিতা কিন্তু কথা কানে না নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার পিছন দিকে। পরক্ষণে সিতারার অস্ফুট সাড়া এল, আঃ, ছাড়ুন, ছাড়ুন। আমি

স্মিতা হেসে উঠল।..তা অমন করে তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? আশ্চর্য মেয়ে তো!

শান্ত বলল কে? রহস্যময়ী বেগমসাহেবা! কী ব্যাপার?

সিতারা বলল, আপনারা কী করছেন দেখতে এলুম।

 শান্ত বলল, বাঃ কী দেখলেন সিতারাবেগম?

সিতারা হঠাৎ দ্রুত চলে গেল–অন্ধকারে ওর চোখ সম্ভবত সব দেখতে পায়। স্মিতা বলল, মেয়েটা ছিটগ্রস্তা। প্রথমে দেখেই সেইরকম মনে হয়েছিল। তাই না শান্তবাবু?

শান্ত বলল, কে জানে! কিন্তু আমাকে ও ভয় দেখাচ্ছিল তখন।

 ভয়! কী ভয় দেখাচ্ছিল?

এখানে থাকলে বিপদ হবে

সে কী?

স্মিতা, চলুন–আমরা নেমে যাই। এবার শুয়ে পড়া যাক।

চলুন।

সিঁড়িতে সাবধানে দুজনে নেমে আসার পর নিচের বারান্দা থেকে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। ইয়াকুবের ঘরে একটা লম্ফ জ্বলছে। বিছানায় ইয়াকুব নেই। আর সায়ন্তন উঁকি দিচ্ছে দরজার পাশ থেকে। এদের পায়ের শব্দে সে চমকে উঠল। কাছে এসে অপ্রস্তুত হেসে সে বলল, জল তেষ্টা পেয়েছিল– তাই ভাবলুম, বুড়োকে ডাকি। কিন্তু দরজা হাট করে খোলা। ঘরে কেউ নেই। এরা সব গেল কোথায়?

ভূতের সঙ্গে মিটিঙ করতে। বলে শান্ত এগলো। তার সঙ্গে ওরা দুজনও।

নিজেদের ঘরের সামনে যখন গেছে, সোমনাথের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল কবরখানা থেকে স্মিতা শুনে যাও! তারপর টর্চ জ্বলে উঠল।

স্মিতা সেই আলোয় সাবধানে কবরের পাশ দিয়ে সোমনাথের কাছে চলে গেল।

এরা দুজনে চটের পর্দা তুলে ঘরে ঢুকে পড়ল।

শ্রীলেখা ঘুমিয়ে পড়েছে কি না বোঝা যাচ্ছিল না। সায়ন্তন গিয়ে তার বিছানায় শুয়ে পড়ল। সোমনাথের পাশে শান্তর শোবার জায়গা। শান্ত বিছানায় বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ তার চোখ চলে গেল দরজায় টাঙানো চটের পর্দার নিচে। কী একটা ভাজকরা কাগজ পড়ে রয়েছে। যখন এ ঘরে প্রথম তারা ঢোকে, তখন যা অবস্থা ছিল, এমন কোন কাগজ পড়ে থাকার কথা নয়। অতএব এটা নির্ঘাত তাদের কারো কীভাবে পড়ে গেছে।

শান্ত কাগজটা হাত বাড়িয়ে তুলে নিলে সায়ন্তন পাশ ফিরে বলল, কী?

কী জানি! একটা কাগজ–ভাঁজ করা।

সায়ন্তন বলল, কারো পড়ে গেছে তাহলে! চিঠি?

শান্ত কাগজটা খুলে পড়ছিল। পড়তে-পড়তে বলল, নাঃ–আমাদের কারো নয়। খুব পুরনো নোটপেপারকী সব হিস্টরিক্যাল ব্যাপার!

হিস্টরিক্যাল–ঐতিহাসিক?

হ্যাঁ। একজামিনের খাতার কাগজ মনে হচ্ছে।

কী কাণ্ড!

শান্ত কাগজটা হাতে নিয়ে বসে রইল কয়েক মুহূর্ত। ফেলবে ভাবল–কিন্তু শেষ অব্দি ফেলল না। সায়ন্তনের অজান্তে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর শুয়ে পড়ল। পায়ের ওপর পা তুলে নাচাতে থাকল সে।

একটু পরে স্মিতা হন্তদন্ত হয়ে এসে ঘরে ঢুকল। শান্ত মুখ তুলে অস্পষ্ট আলোয় দেখল, তার মুখ গম্ভীর, চোখ ছলছল, নাসারন্ধ্র কঁপছে। শান্ত বলল, কী হল?

কিছু না। বলে স্মিতা ধুপ করে শুয়ে পড়ল।

পরমুহূর্তে শ্রীলেখার খিকখিক হাসির শব্দ শোনা গেল। শান্ত আর সায়ন্তন দুজনেই মাথা তুলল। সায়ন্তন বলল, কী ব্যাপার হঠাৎ? হাসছেন যে?

শ্রীলেখা বলল, কিছু না। এমনি।

শান্ত বলল, তাহলে ঘুমোন। ডিসটার্ব করবেন না, প্লিজ। আমার এখন ঘুম পাচ্ছে।

শ্রীলেখা দমে গিয়ে বলল, কটা বাজল সায়ন্তনবাবু?

সায়ন্তন ঘড়ি দেখে বলল, কাটায়-কাঁটায় দুটো। কিন্তু সোমনাথদা একা কী করছেন? গিয়ে দেখে আসব নাকি?

শান্ত বলল, থাক্। আমাদের ডিরেক্টর মশায় তার স্ক্রিপ্ট ভাবছেন, ওঁকে ঘাঁটাবেন না।

ঠিক সেই মুহূর্তে সোমনাথের আওয়াজ এল বাইরে থেকে–শান্ত! সায়ন্তন। তোমরা শিগগির এদিকে এসো তো!

সোমনাথের কণ্ঠস্বরে একটা ভয়ার্ত চিৎকার। শান্ত আর সায়ন্তন হুড়মুড় করে উঠে বেরিয়ে গেল। শ্রীলেখা আর স্মিতাও উঠে বসল। পরস্পরের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ওরা। অজ্ঞাত ত্রাসে। দুজনেই থরথর কেঁপে উঠল।…

শান্তরা এক দৌড়ে বারান্দা থেকে নামল। সোমনাথ গাড়ির কাছে নেই– খানিকটা দূরে কবরখানার শেষপ্রান্তে তার টর্চ জ্বলছে। শান্ত চেঁচিয়ে বলল, সোমনাথদা! সোমনাথদা!

সোমনাথ ডাকল, এখানে চলে এসো!

দুজনে কবরগুলো ডিঙিয়ে গিয়ে যা দেখল, স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। একটা কবরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে রয়েছে পাহারাওলা ইয়াকুব খাঁ। পাশে একটা শাবল। সবাই ধরাধরি করে চিত করে শোয়াতেই দেখা গেল, তার ঠোঁটের দুধারে চাপচাপ ফেনা। এবং তার গা অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। সায়ন্তন নাড়ি দেখে নিয়ে বলল, নির্ঘাত মারা গেছে!

সোমনাথ ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে উঠল, সিতারা, সিতারাবিবি।

কিন্তু কোন সাড়া নেই। সায়ন্তন একটু এগিয়ে ডাকল শ্রীলেখাদি! স্মিতা! আপনারা আলো নিয়ে আসুন শিগগির!

দরজার চটের পর্দা সরিয়ে বারান্দায় হারিকেন হাতে আসতে দেখা গেল ওদের। মাঝামাঝি আসার পর হঠাৎ শ্রীলেখা চেঁচিয়ে উঠল, সোমদা! সোমদা! সিতারা এখানে পড়ে আছে।

শান্ত, সায়ন্তন দৌড়ে ওদের কাছে চলে গেল। সোমনাথ ইয়াকুবের দেহের কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

অবিকল একই ভঙ্গিতে সিতারাও একটা কবরের ওপর পড়ে রয়েছে। দুকষায় তেমনি চাপচাপ ফেনা। তেমনি ঠাণ্ডা গা। বিস্ফারিত চোখ। মুখে যন্ত্রণার স্পষ্ট চিহ্ন! শিউরে উঠল সবাই। সায়ন্তন অভিজ্ঞ মুখে নাড়ি দেখে বলল, এও মারা গেছে।

সোমনাথ এগিয়ে এল ওদের কাছে। তার মুখ থমথমে গম্ভীর। ভাঙা গলায় বলল, কী অদ্ভুত ব্যাপার। আমি তো মাথামুণ্ড কিছু বুঝতে পারছিনে। স্মিতার সঙ্গে কথা বলার পর স্মিতা চলে গেল, আমি গেলুম খিড়কিটার দিকে–জাস্ট। টু অ্যাটেনড় দি ইয়ে–আর হঠাৎ দেখি–থেমে গেল সোমনাথ।

কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে পরস্পর মুখ তাকাতাকি করল ওরা। তারপর শান্ত বলল, কিন্তু আমরা সম্ভবত খুব বিপদের মুখে পড়ে গেছি, সোমনাথদা।

সোমনাথ কী ভাবতে ভাবতে বলল, কিসের বিপদ?..

পুলিসের। শান্ত জবাব দিল।…এখনই থানায় খবর দিয়ে আসা দরকার।

ঠিক বলেছ! সোমনাথ পা বাড়াল।…তোমরা বরং ঘরে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকো। কেউ বেরিয়ো না। আমি গাড়ি নিয়ে থানায় যাচ্ছি। আমি না আসা অব্দি কিন্তু কেউ বাইরে থেকো না। সাবধান! তোমাদের সব কিছুর দায়িত্ব আমার ওপরে। একটা কিছু হলে… কথা অসমাপ্ত রেখেই দৌড়ে সোমনাথ গাড়ির কাছে গেল।

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সে আবার ভাবল, দেউড়ির দরজাটা খুলতে হবে যে! শান্ত!

শান্ত গিয়ে হুড়কো তুলে বিশাল কপাট দুটো দুপাশে টেনে সরাল। গাড়ি পিছু হটে বেরলো। তারপর বাইরে গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল সোমনাথ। কতক্ষণ ধরে তার গাড়ির শব্দ শোনা যেতে থাকল।

কপাট দুটো বন্ধ না করে ফিরে এল শান্ত। ততক্ষণে ওরা সবাই বারান্দায় চলে গেছে। নীলচে মুখ, ভীত, হতবুদ্ধি কয়েকটি যুবক-যুবতী। ঘরে ঢুকে শান্ত বলল, কিছু বুঝতে পারছিনে! আগাগোড়া সবটা কেমন হেঁয়ালি! তাছাড়া আমার যা মনে হল, ওরা দুজনেই যেন সাংঘাতিক কিছু দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে হার্টফেল করেছে। আপনার কী মনে হয় সায়ন্তনবাবু?

ঠিক তাই। ভয়-টয় পেয়েছিল।

স্মিতা খুব আস্তে বলল, একটু আগেই তো সিতারা ওপরে গিয়েছিল। কেন?

শান্ত সে কথার জবাব না দিয়ে বলল, বুড়োটা শাবল নিয়ে কী করতে গিয়েছিল ওখানে? গুপ্তধন খুঁড়তে।

সায়ন্তন বলল, এ ভুতুড়ে বাড়িতে সবই সম্ভব।

 শ্রীলেখা ম্লান হাসল।…সবই ভাগ্য। ফিল্ম-টিল্ম সব শিকেয় তুলে দিয়ে পালাতে হবে। এখানটা ছাড়া আর লোকেশন ছিল না?

আবার কতক্ষণ চুপ করে থাকল ওরা। পুলিস এলে তো নাস্তানাবুদ করে ছাড়বে সেই অস্বস্তিতে প্রত্যেকে অস্থির হয়ে পড়েছে। বাইরে অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা। কোন হাওয়ার শব্দও আর নেই। আর, ক্রমশ মনে হচ্ছে এই পোড়ো বাড়িটা আস্তে আস্তে জ্যান্ত হয়ে উঠছে। দেয়ালে আলো আঁধারে একটা করে জিভ বেরোচ্ছে ক্রমশ–সবাইকে চাটতে আসছে জিভগুলো লকলক করছে। লালা ঝরছে আর গভীর তলদেশে একটা চাপা রুদ্ধ আক্রোশ থরথর করে কাঁপয়ে দিচ্ছে ঐতিহাসিক দালানটাকে। এই অনুভূতি সবার মনেই এল।

এবং সেই সময় শান্তর সেই কুড়িয়ে পাওয়া কাগজের কয়েকটা ইংরেজি লাইন মনে পড়ে গেল–যার বাংলা মানে দাঁড়ায়ঃ

..হে আলমপানা! তুমি আমাকে ধনদৌলত ইনাম প্রচুর দিয়েছ, কিন্তু তবু আমার মনের মধ্যে লোভের শয়তান নিরন্তর ফোঁসফোঁস করছে। এই নিয়ে তুমি আমাকে কবরে পাঠাতে চাও? তার চেয়ে বরং যদি ইনাম দিতে কোন সুন্দরীর একটুকরো হাড়, আমি পরম শান্তিতে ঘুমোতে পারতুম।…

বুকমার্ক করে রাখুন 0