সমুদ্রে মৃত্যুর ঘ্রাণ

সমুদ্রে মৃত্যুর ঘ্রাণ

০১.

 পূর্বাচল হোটেলের ব্যালকনিতে বসে চা খেতে খেতে সমুদ্র দেখছিলাম। অক্টোবর মাসের বিকেল। দুপুরে কিছুক্ষণ ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়েছিল। এখন উজ্জ্বল সোনালি রোদ। যদিও পূর্বের সমুদ্র দিগন্ত ঘন ধূসর মেঘে ঢাকা। আমার ডানদিকে বালিয়াড়ির ওপর ঝাউবন। বালিয়াড়ি আর ঝাউবনের ভেতর বড়-বড় পাথরের চাঁই পড়ে আছে। সেই সব পাথরে প্রেমিক-প্রেমিকারা বসে আছে। এখানে সি-বিচ সংকীর্ণ এবং কিছুটা ঢালু। পূর্বাচলের নীচে পিচের রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা কম। কারণ এই এলাকায় খুব খরুচে হোটেল আর ধনবানদের বাড়ি। এখানকার নাম নিউ চন্দনপুর। পিচের রাস্তাটা আমার বাঁদিকে সোজা উত্তরে এগিয়ে সমুদ্রের ব্যাকওয়াটারের ওপর ব্রিজে মিশেছে। ব্রিজের ওধারে ওল্ড চন্দনপুর। সবমিলিয়ে ‘চন্দনপুর-অন-সি’ নামেই পরিচিত।

বাঁদিকে তাকিয়ে দেখলুম আমার বৃদ্ধ বন্ধু প্রকৃতিবিজ্ঞানী কর্নেল নীলাদ্রি সরকার একটা পাথরে বসে বাইনোকুলারে সমুদ্র দর্শন করছেন। উত্তরের ব্যাকওয়াটার পর্যন্ত এই অংশটা ত্রিভুজের মতো। পিচ রাস্তার ডাইনে ঘাসে ঢাকা মাটি। তারপর মাটিটা উঁচু হয়েছে এবং সেই উঁচু অংশে বুনো কুলের ঝোপঝাড়, কেয়াবন, শীর্ষে ঘন কাশবন। এদিকটাতেও নানা ধরনের কালো পাথর পড়ে আছে। পাথর সমুদ্রেও ছড়িয়ে আছে। হঠাৎ দেখে মনে হয়, পালে পালে হাতি সমুদ্রস্নানে নেমেছে। জোরালো হাওয়ার জন্য সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এসে ফেনায় ফেনায় ঢেকে ফেলছে পাথরগুলো এবং তারপর আছড়ে এসে ছড়িয়ে যাচ্ছে বিচে। আর সে কী ভয়াল গর্জন। মনে হচ্ছিল, সমুদ্র থেকে যেন মৃত্যুর গন্ধ ভেসে আসছে।

ত্রিভুজাকৃতি জমিটার শেষপ্রান্তে ব্যাকওয়াটারের মাথায় কোন যুগের পাথরের একটা দুর্গ প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। সেখানেও প্রেমিক-প্রেমিকার মূর্তি চোখে পড়ল। বিকেলের সোনালি রোদ ক্ৰমে রক্তিম হচ্ছিল। মনে হল সর্বত্র যেন অপরূপ প্রাকৃতিক ভাস্কর্য ছড়িয়ে আছে।

একটু পরে দেখলুম, কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ঢালু বালিয়াড়ি দিয়ে নেমে পিচ রাস্তার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে ডাইনে ঘাসজমির দিকে ঘুরলেন এবং হঠাৎ গুঁড়ি মেরে ফুলের ঝোপ-ঝাড়ের কাছে গিয়ে ক্যামেরা তাক করলেন। নিশ্চয় কোনো বিরল প্রজাতির প্রজাপতির দর্শন পেয়েছেন এবং তাকে উনি ক্যামেরাবন্দি করতে চান।

কিন্তু যা বুঝলুম, প্রজাপতিটা মহা ধূর্ত। কর্নেল আবার গুঁড়ি মেরে মুখ তুলতেই ওঁর টুপিটা ঘাসে পড়ে গেল এবং চওড়া টাক ঝলমলিয়ে উঠল।

প্রজাপতির ছবি তুলতে পারলেন কি না জানি না, এবার তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং ঘাস থেকে টুপিটা কুড়িয়ে মাথায় পরলেন। তারপর কেন যেন স্থির হয়ে দাঁড়ালেন।

এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দৃশ্যটা আমার চোখে পড়ল। কিছুটা দূরে ঘাসজমিতে একটা গাধা চরছে এবং নোংরা জীর্ণ স্যুট-টাই পরা সেই পাগল ভদ্রলোক হেসে ঝুঁকে পড়ছেন। বারকতক লেজে টান পড়ার পর গাধাটা এবার জোরে পা ছুঁড়েছিল নিশ্চয়! তা না হলে ভদ্রলোক পড়ে যাবেন কেন? উনি উঠে গাধাটার দিকে আঙুল তুলে হুমকি দিতে থাকলেন। গাধাটা সম্ভবত হুমকির চোটে ঝোপের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল।

কর্নেল এতক্ষণে হোটেলের দিকে আসছিলেন। রাস্তা পেরিয়ে তিনি একটুখানি চড়াইপথে এই হোটেলের গেটে পৌঁছেছেন, এমন সময় সেই পাগলাবাবু এসে গেলেন। তারপর কর্নেলকে বললেন, এই যে স্যার! এক কাপ কফি হবে নাকি? তার বদলে গান শোনাব। মাইরি! মা কালীর দিব্যি। শুনুন না একটুখানি জাস্ট স্যাম্পল।

বলে তিনি বিদঘুটে সুরে আমার ছেলেবেলায় পড়া এই পদ্যটা গানের মতো গাইতে শুরু করলেন–

‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল
 কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল
ও ভাই, সকলি ফুটিল
মাইরি, সকলি ফুটিল..’

 তার সঙ্গে মাথায় এক হাত আর কোমরে এক হাত রেখে তিনি নাচ জুড়ে দিলেন। কর্নেল তুম্বো মুখে দাঁড়িয়ে গেছেন। পাগলাবাবু তেমনি সুর ধরে গাইছেন :

‘রাতি পোহাইল, মাইরি রাতি পোহাইল
ও ভাই রাতি পোহাইল…’

হোটেলের দারোয়ান গেটে গিয়ে পাগলাবাবুকে ধমক দিল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, কর্নেল ওঁকে ইসারায় ডেকে রাস্তার ধারে অর্থাৎ একটা রোডসাইড কাফেতে নিয়ে গেলেন। তারপর দেখলুম, কর্নেল একটা পেপার কাপে ভর্তি কফি ওঁকে দিয়ে নিজেও একটা পেপারকাপে কফি নিলেন। তারপর পাগলাবাবুর সঙ্গে কী সব কথাবার্তা বলতে থাকলেন। পাগলাবাবু এক হাত নেড়ে ফুঁ দিয়ে কফি পান করতে করতে কথা বলছিলেন।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরে আচমকা ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টি এসে গেল। অমনি পাগলাবাবু দৌড়ে হোটেলের নীচের রাস্তা দিয়ে কোথায় উধাও হয়ে গেলেন। কর্নেল হন্তদন্ত হোটেলে ফিরে এলেন। একটা হিড়িক ফেলে দিয়েছিল আকস্মিক বেসুরো বৃষ্টিটা। সর্বত্র প্রেমিক-প্রেমিকারা মাথা বাঁচাতে ছত্রভঙ্গ হচ্ছিল।

দোতলায় কর্নেল ওঠার আগেই স্যুইটের দরজা খুলে দিলুম। বৃদ্ধ প্রকৃতিবিজ্ঞানী একটু হেসে বললেন, জয়ন্তের ভাতঘুমটা আশা করি ভালোই হয়েছে।

বললুম, হয়েছে। কিন্তু পাগলাবাবুর গানে মুগ্ধ হয়ে তাকে আপনি কফি খাইয়ে দিলেন দেখে মুগ্ধ হয়েছি।

কর্নেল ব্যালকনিতে বসতে গিয়ে পিছিয়ে এলেন। বৃষ্টির ছাঁট আসছিল। সুইচ টিপে আলো জ্বেলে, ঘরেই বসলেন। বললেন, এককাপ কফির জন্য ভদ্রলোক অত পরিশ্রম করলেন! কী আর করা যাবে। তারপর তিনি চুরুট ধরালেন। তোমার সাংবাদিক বন্ধুরা কি সবাই চলে গেছে?

হাঁ। গতকাল আপনাদের প্রকৃতি-পরিবেশ সম্মেলন শেষ। আজ থাকতে হলে নিজের পয়সা খরচ হত। আমি থেকে গেলুম আপনার গেস্ট হিসেবে।

কর্নেল চুপচাপ কিছুক্ষণ চুরুট টানার পর বললেন, বিজ্ঞানী ভদ্রলোকরাও অনেকে চলে গেছেন। অনেকে আছেন। বিশেষ করে জৈব রসায়ন বিজ্ঞানী ডঃ বিক্রমজিৎ পাণ্ডে আছেন। উনি চলে যাবেন আগামীকাল। আর দেখলুম ডঃ কৌশল্যা বর্মন আছেন। উনি ডি এন এ নিয়ে রিসার্চ করেন। আর আণবিক জীববিজ্ঞানী ডঃ পরিমল হাজরাকে দেখলুম।

ডঃ কৌশল্যা বর্মন জিনোম-তত্ত্ব নিয়ে কী পেপার পড়লেন একবর্ণ মাথায় ঢোকেনি।

কর্নেল হাসলেন। ও সব তো তোমার দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার পাঠকরা খাবে না। যা খাবে–

ওঁর কথার ওপর বললুম, তা হল রহস্য-রোমাঞ্চ। ধরুন, সমুদ্রতীরে হত্যাকাণ্ড! অথবা বিজ্ঞানীর রহস্যময় অন্তর্ধান। বিশেষ করে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার যদি সেখানে থাকেন!

কর্নেল সাদা দাড়ি থেকে কী একটা পোকা বের করে ব্যালকনির দিকে ছুঁড়ে ফেললেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, নাহ্। আর রহস্য-টহস্য নয়। কারো ব্যাপারে নাক গলানোর ইচ্ছে নেই।

একটু নড়ে বসলুম। তার মানে কারো কোনো ব্যাপার আপনার চোখে পড়েছে?

 কর্নেল নির্বিকার মুখে বললেন, জয়ন্ত! তুমি যেখানেই যাবে, কোনো-না কোনো ব্যাপার তোমার চোখে পড়বেই। চন্দনপুর-অন-সিতে আমি আগেও এসেছি। পুরো এলাকা আমার চেনা। আর আমার এই বাইনোকুলার দিয়ে উঁচু জায়গা থেকে চারদিক লক্ষ্য করলে–হ্যাঁ, কিছু কিছু দৃশ্য আপাতদৃষ্টে রহস্যময় মনে হতেই পারে। কিন্তু খোঁজখবর নিলে দেখা যাবে ওতে কোনো রহস্যই নেই। যেমন ধরো, জিনোম বা ডি এন এ বিজ্ঞানী ডঃ কৌশল্য দুর্গপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। তারপর কেন যেন তক্ষুণি পা চালিয়ে চলে এলেন। তারপর দেখলুম, ডঃ পরিমল হাজরা ওখানে এক মহিলার পাশে বসে আছেন। কিন্তু সেই মহিলা তার স্ত্রী নন। তাঁরই ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্টান্ট শ্রাবন্তী সেন! কাজেই

হাসতে হাসতে বললুম, পরকীয়া প্রেম বা অবৈধ প্রণয়?

দাড়িতে হাত বুলিয়ে প্রকৃতিবিজ্ঞানী বললেন, না জেনে দুম করে সিদ্ধান্তে পৌঁছুনো ঠিক নয়, জয়ন্ত!

ডঃ হাজরার স্ত্রীকে দেখতে পাননি কোথাও?

মিসেস মালবিকা হাজরা সি-বিচে বিকেলে ডঃ বিক্রমজিৎ পাণ্ডের সঙ্গে, হাঁটছিলেন। বলেই কর্নেল মাথা নাড়লেন। নাহ্। এ থেকেও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। জযন্ত! সমুদ্রই একমাত্র প্রাকৃতিক পটভূমি, যেখানে এলে মানুষের মন স্বাধীন হয়ে ওঠে। তবে মাত্র কিছুক্ষণের জন্য। কারণ প্রত্যেকের নিজস্ব কাজকর্ম আছে। যেমন, ডঃ পাণ্ডে। উনি হঠাৎ মিসেস হাজরাকে নিঃসঙ্গ করে চলে আসছিলেন। মিসেস হাজরারও সম্ভবত স্বামীকে মনে পড়ায় তার খোঁজে চলে এলেন।

বৃষ্টিটা হঠাৎ থেমে গেছে কখন। নিউ চন্দনপুরে সি-ব্রিচ কিছুটা বিপজ্জনক বলে বিচের মাথায় ইতস্তত লাইটপোস্ট। এখন বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। ডানদিকের বালিয়াড়িতে ঝাউবনের ভেতর বাতিগুলো লুকোচুরি খেলছে যেন। হাওয়া এখন আরো জোরালো। সন্ধ্যার সমুদ্র আরো ভয়াল এবং হিংস্র। মনে

কর্নেল বললেন, রোডসাইড কাফেতে কফি খেয়ে তৃপ্তি পাইনি। তুমি সুইচ টিপে হোটেল বয়দের ডাকো। এক প্লেট গরম পকৌড়া আর এক পট কফি আনতে বলো!

আমি সুইচ টিপতে যাচ্ছি, দরজায় কেউ নক করল। দরজা খুলে দেখি মহীতোষ বিশ্বাস। তিনি বললেন, একটু বিরক্ত করতে এলুম জয়ন্তবাবু! কর্নেল সায়েব ফিরেছেন?

কর্নেল ডাকলেন, আরে মহীতোষবাবু যে। আসুন, আসুন! জয়ন্ত তুমি তিনটে কাপ আনতে বলবে।

সুইচ টেপার মিনিট দুয়েকের মধ্যে মধ্যবয়স্ক হোটেলবয় নব এসে সেলাম দিল। তাকে শিগগির কফি পকৌড়া আনতে বলে দরজা খোলা রাখলুম। মহীতোষবাবু ধনবান বাঙালি ব্যবসায়ী। তার মাছের আড়ত আছে ওল্ড চন্দনপুরে। কিন্তু বাস করেন নিউ চন্দনপুরে। কর্নেলের তিনি পূর্বপরিচিত। সেই সূত্রে আমার সঙ্গেও তার আলাপ হয়েছে।

মহীতোষবাবু কর্নেলের পাশে চেয়ার টেনে বসে বললেন, কর্নেল সায়েবের কনফারেন্স তো শেষ। আমি এলুম আপনাদের নেমন্তন্ন করতে। হোটেলে খামোকা পয়সা খরচ না করে–

কর্নেল তার কথার ওপর বললেন, আজকের দিন-রাতের খরচও সরকারি পরিবেশ দফতর দেবে।

মহীতোষবাবু বললেন, ঠিক আছে। কাল সকালে আমার গেস্ট হোন আপনারা। আমি নিজে এসে গাড়িতে আপনাদের তুলে নিয়ে যাব। কটা নাগাদ আসব বলুন?

কর্নেল তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন, সেবার আপনার গেস্ট হয়ে এসেছিলুম একটা বিশেষ কারণে। এবারও কি কোনো বিশেষ কারণ আছে?

 মহীতোষবাবু হাসি মুখে বললেন, না, না কর্নেল সায়েব! আপনি কি ভাবছেন নিজের স্বার্থের জন্য আপনাকে নেমন্তন্ন করতে এসেছি? আপনি আমাকে সেবার কী বাঁচা না বাঁচিয়েছিলেন! আমার শত্রুদের চিরদিনের জন্য ঢিট করে দিয়েছিলেন। কৃতজ্ঞতাবোধ কি আমার থাকতে নেই? তবে আপনারও ভালো লাগবে। আমার বাগানে কয়েকটা বিদেশি ক্যাক্টাস এনে রেখেছি। পছন্দ হলে আপনি দু-একটা নিয়ে কলকাতা ফিরবেন। আর আমার মালী চরণদাস কথায়-কথায় বলছিল, মাসান্ডার পাহাড়ি জঙ্গলে সে কী সব অদ্ভুত অর্কিড দেখে এসেছে। সেগুলোতে নানা রঙের ফুল!

কর্নেল বললেন, আপনি লোভ না দেখালেও কাল ভোরে মাসান্ডা ফরেস্টে আমি যেতুম। এই হোটেলের মালিক ট্যুরিস্টদের জন্য জিপ বা কার ভাড়ার ব্যবস্থা রেখেছেন।

নব ট্রেতে পকৌড়ো-কফি রেখে গেলে দরজা এঁটে দিলুম। মহীতোষবাবু অভিমানী মুখে বললেন, তা আপনি যদি এ গরিবের পর্ণকুটিরে পায়ের ধুলো না দেন, জোর করতে তো পারি না!

কর্নেল তার কাঁধে হাত রেখে একটু হেসে বললেন, ঠিক আছে মহীতোষবাবু! আপনার গেস্ট হওয়া নিশ্চয় আমার কাছে আনন্দের ব্যাপার। সকাল আটটা নাগাদ বরং আসবেন।..

কিছুক্ষণ পরে মৎস্যব্যবসায়ী ভদ্রলোক চলে গেলেন। আমি কর্নেলকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছি, কেন ওঁর বাড়ি যেতে আপনার আপত্তি ছিল, এমন সময় দরজায় কেউ জোরে কয়েকবার নক করল। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলুম। আমার পাশ কাটিয়ে মহিলাবিজ্ঞানী কৌশল্যা বর্মন ঘরে ঢুকে কর্নেলের পাশে গিয়ে বসলেন। তাকে উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। কর্নেল বললেন, কী হয়েছে কৌশল্যাদেবী?

কৌশল্যা বর্মন চাপা স্বরে বললেন, আশ্চর্য ঘটনা কর্নেল সরকার! আমার ঘরে একটা ব্রিফকেসে খুব ইমপর্ট্যান্ট রিসার্চ ডকুমেন্ট ছিল। ব্রিফকেসের তালা ভেঙে ফাইলটা কেউ চুরি করেছে। এইমাত্র ডঃ আচারিয়ার কাছ থেকে স্যুইটে ফিরে দেখি, দরজা ঠিকই লক করা আছে। অথচ টেবিলে ব্রিফকেসের তালা ভাঙা।

আপনি তো তিনতলায় সতের নাম্বার স্যুইটে আছেন?

হ্যাঁ। ডাবলবেড সুইট। আমার স্যুইটে ডঃ পরিমল হাজরার অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়েটিকে থাকতে দিয়েছিলুম। ডঃ হাজরার অনুরোধে।

শ্রাবন্তী সেনের কাছে ডুপ্লিকেট চাবি ছিল কি?

ছিল। দরজায় ইন্টারলকিং সিস্টেম। ভেতর থেকে চাবি ছাড়াই দরজা খোলা যায়। কিন্তু বাইরে থেকে দরজা খুলতে চাবির দরকার হয়।

শ্রাবন্তীর খোঁজ নিয়েছেন?

কৌশল্যা আরও চাপা স্বরে বললেন, বিকেলে দুর্গপ্রাসাদের ওখানে ডঃ হাজরার পাশে শ্রাবন্তী বসে ছিল। বসে থাকার ভঙ্গিটা অশালীন। তাই আমি ওখান থেকে তক্ষুণি সরে এসেছিলুম।

হুঁ। আমি তা লক্ষ্য করেছিলুম। কিন্তু শ্রাবন্তীর খোঁজ নিয়েছেন কি?

সে নাকি এখনও হোটেলে ফেরেনি। ডঃ হাজরা আর তার স্ত্রী মালবিকা ক্যান্টিনে বসেছিলেন। তাদের জিজ্ঞেস করেছি। মিসেস হাজরা শ্রাবন্তীকে দেখেননি। ডঃ হাজরা আমার মুখের ওপর মিথ্যা বললেন। তিনিও নাকি তাকে দেখেননি। আমার রাগ হয়েছিল। তবু মাথা ঠাণ্ডা রাখতেই হল। আমি চাই না ওঁদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ শুরু হোক। তো হোটেলবয়রা কিংবা রিসেপশনের কেউ-ই বলতে পারল না শ্রাবন্তী কোথায়! এখন আমি কী করব, তা নিয়ে আপনার সঙ্গে পরামর্শ করতে এলুম। আমি কি ঘটনাটা পুলিশকে জানাব?

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, আর আধঘণ্টা অপেক্ষা করে দেখুন শ্রাবন্তী ফিরছে কি না। তবে আমি এখনই আপনার স্যুইটে যেতে চাই।

কথা অবশ্য ইংরেজিতে হচ্ছিল। কৌশল্যার মুখে উত্তেজনার পর বিষণ্ণতার ছাপ পড়েছে এবার। তিনি বললেন, আমি আপনার অন্য পরিচয় জানি কর্নেল সরকার। তাই আপনার কাছেই প্রথমে ছুটে এসেছি। পুলিশের ওপর আমার আস্থা নেই। ওই ফাইলটা কোনো জিনোমবিজ্ঞানীর হাতে গেলে তিনিই আমার আবিষ্কারের কৃতিত্ব কেড়ে নেবেন। তাছাড়া আমার ফরমুলাটাও যেমন খুব ভালো, তেমনি সাংঘাতিক খারাপ।

কর্নেল আমার দিকে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে বললুম, প্লিজ কর্নেল! আমিও যেতে চাই!

কৌশল্যা বললেন, আসুন! আপনি সাংবাদিক। আপনারও পর্যবেক্ষণ শক্তি থাকা উচিত। কিন্তু দয়া করে ঘটনাটা যেন আপনার পত্রিকায় প্রকাশ করবেন না। আমি সরকারের বেতনভোগী বিজ্ঞানী। ঝামেলায় পড়ব।

তাকে আশ্বস্ত করে ব্যালকনির দিকের দরজা এবং বাইরে যাওয়ার দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেলুম। তিনতলায় সতের নম্বর সুইট সিঁড়ির মাথায় বাঁদিকে। কৌশল্যা চাবি দিয়ে দরজা খুললেন। ঘরে আলো জ্বলছিল। আমরা ঘরে ঢুকলে কৌশল্যা দরজা এঁটে দিলেন।

কর্নেল মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মেঝেয় নারকেল ছোবড়ার রঙিন কার্পেট। হঠাৎ তিনি ঝুঁকে একটা খুদে লাল ফুল তুলে নিলেন। ফুলটা দেখতে কতকটা সন্ধ্যামণি ফুলের মতো। কিন্তু বেঁটে। কৌশল্যা বললেন, কী ওটা?

এগুলো বুনো ফুল। দুর্গপ্রাসাদ পর্যন্ত এই বুনো ফুলের ঝোপ আছে।

হ্যাঁ। দেখেছি।

 আপনি কি খোঁপায় এই ফুলের একটা গুচ্ছ তুলে গুঁজেছিলেন?

নাহ্। ফুল আমি ভালবাসি। কিন্তু বুনোফুল খোঁপায় গুঁজে রাখার মতো রোম্যান্টিক মন তখন ছিল না।

কোন খাটে শ্রাবন্তী শোয়?

এই বাঁদিকের খাটে। ওই দেখুন ওর স্যুটকেস আর ব্যাগ।

 তাহলে শ্রাবন্তী পালিয়ে যায়নি।

গেলেই বা কী? ওই ফাইলটা কোনো জিনোমবিজ্ঞানীকে বেচলে সে প্রচুর টাকা পাবে। বলে কৌশল্যা তাঁর খাটের মাথার দিকে টেবিলের ওপর খোলা ব্রিফকেসটার ডালা তুললেন। ভেতরে একগাদা কাগজ আছে। কৌশল্যা কাগজের শিটগুলো তুলে বললেন, এগুলোর তলায় লাল রঙের ফাইলটা ছিল। আট ইঞ্চি লম্বা, চার ইঞ্চি চওড়া। চেন আঁটা যায়।

কর্নেল পকেট থেকে খুদে টর্চ বের করে কৌশল্যার খাটের তলা দেখে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ব্রিফকেসটার তালা পরীক্ষা করে বললেন, শক্ত কিছু দিয়ে সম্ভবত ছোট ভ্রু ড্রাইভার দিয়ে জোরে টানার ফলে তালাটা উপড়ে গেছে ব্রিফকেসের নীচের অংশ থেকে। অত গুরুত্বপূর্ণ ফাইল এখানে রাখা উচিত হয়নি কৌশল্যাদেবী।

কৌশল্যা বললেন, আসলে ভেবেছিলুম, অমন একটা জিনিস এই সাধারণ ব্রিফকেসে রাখার কথা কেউ ভাবতে পারবে না।

আপনি কি কথাপ্রসঙ্গে কারও কাছে আপনার আবিষ্কার সম্পর্কে আভাসে কিছু বলেছিলেন?

যেটুকু বলার, তা তো সম্মেলনে পেপার পড়ার সময় বলেছি। আপনার মনে থাকতে পারে।

হ্যাঁ। আপনি বলেছিলেন, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী ওয়াটসন ডি এন এ-র গঠন আবিষ্কার করেছিলেন। আপনি সেই প্রাকৃতিক গঠনকে অদলবদল করার সম্ভাবনা সম্পর্কে আভাস দিয়েছিলেন। ডি. এন. এ-র স্ট্রাকচার বদলে দিয়ে কিম্ভুতকিমাকার উদ্ভিদ বা প্রাণী সৃষ্টি হতে পারে।

হ্যাঁ। আমার আবিষ্কারটা ফরমুলার আকারে লেখা ছিল ফাইলে।

আপনার দিল্লির ল্যাবরেটরিতে কি থিয়োরিটা প্রয়োগ করে ফল পেয়েছেন?

পেয়েছি। খুদে কয়েকটা পিঁপড়ের ডিম থেকে ভীমরুলের মতো মোটা পিঁপড়ের জন্ম হয়েছে। সাংঘাতিক বিষাক্ত সেগুলো।

কর্নেল তুম্বো মুখে বললেন, যাই হোক, আমি বিকেলে বাইনোকুলারে দূর থেকে দেখেছিলুম, ডঃ হাজরা তার ল্যাব-অ্যাসিস্ট্যান্টের খোঁপায় এই বুনো ফুলের গুচ্ছ গুঁজে দিচ্ছেন। অতএব এটা ঠিক, শ্রাবন্তী ফিরে এসে এই ঘরে যখন ঢুকেছিল তখন আপনি ঘরে ছিলেন না। বৃষ্টির সময় কোথায় ছিলেন। আপনি?

কৌশল্যা বললেন, আমি হোটেল দ্য শার্কে পরিবেশবিজ্ঞানী ডঃ রঘুবীর আচারিয়ার সঙ্গে গল্প করছিলাম। উনি আজ রাতেই দিল্লি যাবেন। আমার যাবার কথা কাল দুপুরের ট্রেনে। এখন দেখুন, কী সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেল!

কর্নেল আবার ঘরের ভেতর চোখ বুলিয়ে ব্যালকনির দিকের দরজার কাছে গেলেন। তারপর বললেন, এই দরজাটা বন্ধ নেই দেখছি!

কৌশল্যা চমকে উঠে বললেন, সে কী! শ্রাবন্তী বেরিয়ে যাওয়ার পরে আমি বেরিয়েছিলুম। তখন ওই দরজার ছিটকিনি এঁটে দিয়েছিলুম!

কর্নেল ভেজানো দরজা খুলে বললেন, ব্যালকনির আলোটা জ্বেলে দিন!

 কৌশল্যা সুইচ টিপে আলো জ্বাললেন। তারপর তার কাছে গেলেন।

কর্নেল ব্যালকনি থেকে আর একটা খুদে লাল ফুল কুড়িয়ে নিয়ে বললেন, শ্রাবন্তী এই ব্যালকনিতে এসেছিল। তারপর তিনি গুঁড়ি মেরে নীচেটা দেখে বললেন, নীচের লনে ফুলের ঝোপঝাড় আছে। ফাইলটা সে প্রকাশ্যে নিয়ে যেতে পারেনি সম্ভবত–যদি অবশ্য শ্রাবন্তীই ফাইলচোর হয়!

কৌশল্যা একটু উত্তেজিত হয়ে বললেন, যদি কী বলছেন কর্নেল সরকার? আমার অনুপস্থিতিতে সে দুর্গপ্রাসাদ থেকে সুইটে ফিরেছিল, এর প্রমাণ তো বুনো ফুল!

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, হ্যাঁ। তো ফাইলচোর ফাইলটা এখান থেকে নীচে ছুঁড়ে ফেলেছিল কি না বলা কঠিন। কারণ তাতেও ঝুঁকি আছে। দোতলার ব্যালকনি এবং নীচে ক্যান্টিনের জানালা দিয়ে কারও-না-কারও ব্যাপারটা চোখে পড়ার কথা। তবে শুধু এটা স্পষ্ট, শ্রাবন্তী এই ব্যালকনিতে এসেছিল। তারপর বোঝাই যাচ্ছে, ব্যালকনির দরজা বন্ধ না করে শুধু ভেজিয়ে রেখে সে বেরিয়ে যায়। তা থেকে আমার সিদ্ধান্ত, সে শিগগির ফিরে আসবে ভেবেছিল। কিন্তু কোনো কারণে সে এখনও ফিরছে না। এটা সরল পাটিগণিত কৌশল্যাদেবী!

কৌশল্যা ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছু ভাবছিলেন। বললেন, এবার বলুন আমার কী করা উচিত!

কর্নেল বললেন, আপনি বরং আপাতত একটা কাজ করতে পারেন। অবশ্য সেটা আপনার স্বাধীন ইচ্ছা। আমার মতে, আপনি ডঃ হাজরার সঙ্গে দেখা করে শুধু তাকে জানিয়ে দিন, তার ল্যাব-অ্যাসিস্টান্ট শ্রাবন্তী সেন এখনও স্যুইটে ফেরেনি। তাই আপনি উদ্বিগ্ন। এ কথা শুনে তিনি কী বলেন, সেটা আমার মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ। তারপর ডঃ হাজরার প্রতিক্রিয়া আমাকে টেলিফোনে জানান। পি বি এক্স অপারেটরের সাহায্য নেওয়ার দরকার নেই। এই হোটেলে প্রত্যেক স্যুইটে সরাসরি ফোন করা যায়। আমার স্যুইটের ইন্টারলিংক ফোন নাম্বার ২১। আপনার?

বত্রিশ।

 হাঁ। আগে জিরো ডায়াল করে ডায়ালটোন পেলে তবে সরাসরি ফোন করা যাবে।

জানি।…

আমরা দোতলায় আমাদের স্যুইটে ফিরে এলুম। কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, মোটে ৭টা ১৫ মিনিট। জয়ন্ত! তাহলে তোমার ইচ্ছে পূর্ণ হল। একটা রোমাঞ্চকর স্টোরির লেজ দেখতে পেলে। তবে আমার দুর্ভাগ্য, যেখানে যাই, সেখানেই একটা ঝামেলায় পড়ি।

বললুম শ্রাবন্তী এত বোকামি করবে বিশ্বাস হয় না। একই ঘরে থেকে এমন সাংঘাতিক চুরি করে বসবে? ধরুন, নিজের জিনিসপত্র ফেলে পালালেও তো তার জানা উচিত, পুলিশ তার নামে হুলিয়া জারি করবে!

কর্নেল চুপচাপ বসে চুরুট ধরালেন। চোখ দুটি বন্ধ করে হেলান দিলেন।

ব্যালকনির দরজা খুলেই কানে এল পাগলাবাবুর গান। নীচের রাস্তায় নেচে নেচে গাইছেন :

‘রাতি পোহাইল–মাইরি! রাতি পোহাইল…’

পাগলাবাবুর নাচগান কিছুক্ষণ শুনে ঘরে এলুম। এই সময় ফোন বাজল। কর্নেল ফোন তুলে সাড়া দিয়ে বললেন, বলুন কৌশল্যাদেবী!…অ্যাঁ? বলেন কী?…ঠিক আছে। অপেক্ষা করুন!..হ্যাঁ। চুপচাপ অপেক্ষা করুন। ফোন রেখে কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন, ডঃ হাজরা কৌশল্যাদেবীর কথা শুনেই এবার সর্বনাশ বলে সবেগে বেরিয়ে গেছেন।..

.

০২.

 রাত নটায় আমরা দুজনে নীচে ক্যান্টিনে গেলুম। কর্নেল দুবার কৌশল্যাদেবীর স্যুইটে সরাসরি ফোন করেও সাড়া পাননি। বোঝা যায়, তিনি স্যুইটে তখনও ফেরেননি।

পূর্বাচল থ্রি-স্টার মার্কা হোটেল। বিত্তবানরাই এখানে ওঠেন। নীচের ক্যান্টিনহলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছেন বোর্ডাররা। বাইরের লোকেদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তবে বোর্ডারের গেস্ট হিসাবে বাইরের লোক আসতে পারেন। ক্যান্টিনে বসে প্রবীণেরা এখনই ডিনার খাচ্ছেন। বেশির ভাগই দম্পতি। তবে যুবক যুবতীদের দেখে বলা কঠিন, তারা দম্পতি না নিছক প্রেমিক-প্রেমিকা। কেউ কেউ চা বা কফির কাপ টেবিলে রেখে চাপাস্বরে কথা বলছে।

কর্নেল ক্যান্টিনের ভেতর চোখ বুলিয়ে লাউঞ্জে গেলেন। লাউঞ্জের শেষপ্রান্তে বার। সেখানে শুধু কজন নানাবয়সী পুরুষ বিয়ার বা হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে।

লাউঞ্জের অন্যপ্রান্তে একা বসেছিলেন ডঃ বিক্রমজিৎ পাণ্ডে। কর্নেলকে দেখে মৃদুস্বরে বলে উঠলেন, হ্যালো-ও!

কর্নেল বললেন, আজ রাতের আবহাওয়া চমৎকার ডঃ পাণ্ডে!

 তিনি কাছাকাছি একটা ভেলভেটে মোড়া চেয়ারে বসলেন। আমি বসলুম একটা কারুকার্যখচিত থামের পাশে বসানো চেয়ারে। হাতের কাছে অ্যাশট্রে দেখে সিগারেট ধরালুম।

ডঃ পাণ্ডে বললেন, আবহাওয়া চমৎকার, নাকি দূষিত কর্নেল সরকার?

 কেন ডঃ পাণ্ডে?

মিসেস হাজরা কিছুক্ষণ আগে বলছিলেন, তাঁর স্বামীর ল্যাব-অ্যাসিস্টান্টকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!

কর্নেল একটু হেসে বললেন, বিকেলে আপনি আর মিসেস মালবিকা হাজরা বিচে ঘুরছিলেন।

ডঃ পাণ্ডেও হাসলেন। স্বামীকে খুঁজে না পেয়ে ভদ্রমহিলা রাগ করে বিচে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাকে সঙ্গ দিলুম। তবে এ বয়সে আমার মধ্যে রোম্যান্টিসিজম বলতে আর কিছু নেই।

ডঃ কৌশল্যা বর্মনকে দেখেছেন কি?

হাজরা বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পরে ভদ্রমহিলা বেরিয়ে গেছেন। লক্ষ্য করেছি, উনি একটা অটো রিকশাতে চেপে কোথাও গেলেন।

ডঃ হাজরা কি পায়ে হেঁটে গেছেন?

 হ্যাঁ। হাতে টর্চও দেখেছি। সম্ভবত সি-বিচে গেছেন।

ওখানে তো যথেষ্ট আলো আছে।

ডঃ পাণ্ডে চোখে হেসে বললেন, আলোর তলায় অন্ধকার থাকে। কাল বিকেলের অধিবেশন শেষ হওয়ার পর সি-বিচের দিকে যাচ্ছিলুম। হঠাৎ চোখে পড়েছিল, মেয়েটি–মানে হাজরার ল্যাব-অ্যাসিস্টান্ট ওই ঝাউবনের শেষ দিকটাতে একজন যুবকের সঙ্গে কথা বলছে। না–দুজনেই দাঁড়িয়েছিল। তারপর যুবকটি, সোজা এদিকে চলে এল। মেয়েটি বিচে নামল। আমি কাছাকাছি যেতেই সে আমাকে হাই সম্ভাষণ করে উল্টো দিকে চলে গেল।

আপনার পর্যবেক্ষণশক্তি অসাধারণ ডঃ পাণ্ডে!

ডঃ পাণ্ডে গম্ভীর হয়ে গেলেন। যুবকটিকে আমি সমুদ্রবিজ্ঞানভবনে আমাদের কনফারেন্স হলে দেখেছি। ফিল্মের হিরো টাইপ পোশাক ও চেহারা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সে হাজরার ল্যাব-অ্যাসিস্ট্যান্টের প্রেমিক। সম্ভবত হাজরার অজ্ঞাতসারে সে তার প্রেমিকাকে অনুসরণ করে এখানে এসেছে।

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, আপনি মুখে বললে কী হবে ডঃ পাণ্ডে? আপনি ভেতরে ভেতরে রোম্যান্টিক।

না, না। উল্টোটা। আমি কোনো ঘটনার বাস্তব দিকটাই বিচার করি। হাজরার এসব লক্ষ্য রাখা উচিত। কারণ-ধরুন, সে কোনো নতুন কিছু আবিষ্কার করল, বিশেষ করে ওর সাবজেক্ট হল আণবিক জীববিজ্ঞান তার ল্যাব অ্যাসিস্টান্ট, কী যেন নামটা?

শ্রাবন্তী সেন।

হ্যাঁ। শ্রাবন্তী সেটা জানতেই পারে এবং কথাপ্রসঙ্গে তার প্রেমিকের কানে কথাটা তুলতে পারে। এসব ক্ষেত্রে গোপনীয়তা খুব দরকার। কারণ সারা বিশ্বে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখন সহযোগিতার তুলনায় প্রতিযোগিতাই বেশি। আমার ল্যাব-অ্যাসিস্ট্যান্টদের দিয়ে আমি কাজ করিয়ে নিই। তাদের বেশি পাত্তা দিই না। সেইজন্য তাদের কাউকে সঙ্গে আনিনি।

কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, আপনি ডিনার খাবেন কখন?

একজন গেস্ট আসবার কথা। তার জন্য অপেক্ষা করছি। ও! আপনি তো তাকে চেনেন! সমুদ্রবিজ্ঞানী ডঃ উমেশ ঝা।

ডঃ ঝা সম্ভবত আপনাকে তার কোয়ার্টারে একবেলা খাইয়েছেন।

ডঃ পাণ্ডের গাম্ভীর্য কেটে গেল। ঠিক ধরেছেন। তবে সেজন্যও না, ওঁর সঙ্গে আমার কিছু কথা আলোচনা করারও দরকার আছে। গোপন কিছু নয়। জেলি ফিশ সম্পর্কে কিছু নতুন তথ্য ডঃ ঝা এখানে পেয়েছেন। আপনি নিশ্চয় জানেন, জেলি ফিশে মানুষের চামড়ার পক্ষে ক্ষতিকর উপাদান প্রচণ্ড! তো– বাহ্! ডঃ ঝা এসে গেছেন। উঠলুম কর্নেল সরকার!

খোলা বিশাল দরজা দিয়ে দেখলুম, একটা গাড়ি এসে হোটেলের লনে ঢুকল। রোগা ঢ্যাঙা এক ভদ্রলোক ব্রিফকেস হাতে নামলেন। গাড়িতে ড্রাইভার আছে। সে গাড়িটা পার্কিং জোনে নিয়ে গেল। ডঃ পাণ্ডে গিয়ে ডঃ ঝায়ের সঙ্গে করমর্দন করলেন। তারপর দুজনে ক্যান্টিনহল অর্থাৎ ডাইনিং হলে ঢুকলেন।

কর্নেল বললেন, আমরা দশটায় ডিনার খাব জয়ন্ত। নাকি তোমার খিদে পেয়েছে?

বললুম, নাহ্। পকৌড়া এখনও হজম হয়নি।

কর্নেল চুপচাপ চুরুট টানতে থাকলেন। মিনিট পাঁচেক পরে একটা অটো– রিকশা এসে নীচের রাস্তায় দাঁড়াল। দেখলুম, কৌশল্যাদেবী এতক্ষণে ফিরলেন।

লাউঞ্জে ঢুকে উনি কর্নেলকে দেখতে পেয়ে কাছে এলেন। ডঃ পাণ্ডে যে চেয়ারে বসেছিলেন সেটাতেই বসে পড়লেন। তারপর চাপাস্বরে বললেন, হোটেল দ্য শার্কে পরিবেশবিজ্ঞানী ডঃ রঘুবীর আচারিয়ার কাছে আবার গিয়েছিলুম। উনি আমাকে বোনের মতো স্নেহ করেন।

কর্নেল দ্রুত বললেন, তাকে কি ঘটনাটা জানিয়েছেন?

জানাতে বাধ্য হলুম। আমার মাথার ঠিক নেই।

ডঃ আচারিয়া কী পরামর্শ দিলেন?

উনি বললেন–আপনি যা বলছিলেন, এখনই হঠাৎ করে পুলিশকে জানাতে নিষেধ করলেন। পুলিশ হইচই বাধাবে এখানে এসে। আর মুখ নিচু করে কৌশল্যা আরও আস্তে বললেন, উনি আপনার সাহায্য নিতে পরামর্শ দিলেন। ডঃ আচারিয়ার থেকে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু দিল্লীতে একটা বড়ো সেমিনার হবে। ওঁর থাকা খুবই নাকি জরুরি। উনি কাল বারোটা পাঁচের ট্রেনে চলে যাচ্ছেন। তো ডঃ হাজরা ফিরেছেন?

নাহ্।

কৌশল্যার মুখে হতাশার ছাপ ফুটে উঠল। তা হলে মেয়েটা পালিয়ে গেছে। পুলিশকে বললে হয়তো ওরা রেল স্টেশন বা বাসস্টেশনে লক্ষ্য রাখতে পারত। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই।

আচ্ছা কৌশল্যাদেবী, আপনি কি শ্রাবন্তীর সঙ্গে কোনো যুবককে কোনো সময় দেখেছেন?

কৌশল্যা তাকালেন। একটু পরে বললেন, না তো! তবে সমুদ্রবিজ্ঞান ভবনে কনফারেন্সের প্রথম দিন দুপুরে ব্যুফে লাঞ্চের সময় এক যুবক শ্রাবন্তীর আগে ছিল। সে পেছন ফিরে শ্রাবন্তীর প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিল দেখেছি। এটা ভদ্রতা হতে পারে। কেন?

আর কোনো সময়ে যুবকটিকে দেখতে পাননি?  

হ্যাঁ। কনফারেন্স হলে তাকে বসে থাকতে দেখেছি। আমি ভেবেছিলুম কোনো সাংবাদিক। তার হাতে প্যাড আর কলম ছিল। জয়ন্তবাবু চিনতে পারেন।

বললুম, নাহ্। কলকাতা থেকে যে-সব সাংবাদিক এসেছিল, সবাই আমার চেনা। তাছাড়া আমাদের জন্য আলাদা প্রেস লেখা জায়গা ছিল। তাকে কি সেখানে দেখেছিলেন?

না। আমন্ত্রিত শ্রোতাদের আসনে দেখেছি।

 তা হলে সে সাংবাদিক নয়।

 বেশ স্মার্ট চেহারা। ফিল্ম হিরোর মতো দেখতে।

কর্নেল বললেন, চলো জয়ন্ত! ডিনার সেরে নেওয়া যাক। কৌশল্যাদেবী! আপাতত আমাদের টেবিলে যোগ দেবেন চলুন। এখন মাথা ঠিক রাখা দরকার। প্লিজ, কাকেও যেন জানতে দেবেন না কী ঘটেছে। আসুন! স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুন।

ক্যান্টিনহলে গিয়ে শেষপ্রান্তে চারজনের বসার জায়গা পাওয়া গেল। পাশে খোলা জানালা। সামুদ্রিক হাওয়া এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। কারণ পূর্বাচল উঁচু জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেলের দাড়ি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। তবু তিনি জানালা বন্ধ করলেন না।

চুপচাপ আমরা ডিনার খেয়ে উঠে পড়লুম। কৌশল্যা বর্মন বললেন, আমি স্যুইটে যাই। কাপড় চোপড় বদলাতে হবে। দরকার হলে আমরা পরস্পরকে টেলিফোন করব।

পাণ্ডে এবং ঝা তখনও ডিনার শেষ করেননি। দুজনেই কথা বলছেন আর একটু-আধটু করে খাচ্ছেন। আমাদের ওঁরা লক্ষ্য করলেন না।

সিঁড়িতে দেখা হল মালবিকা হাজরার সঙ্গে। কর্নেল বললেন, ডঃ হাজরাকে দেখছি না?

মালবিকা গম্ভীর মুখে বললেন, ল্যাব অ্যাসিস্টান্টকে সি-বিচে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

 বলেন কী? দেখতে পেয়েছেন বুঝি?

সি-বিচে আলো আছে, দেখতে পাওয়া যায়।

 গেল কোথায় মেয়েটি?

নরকে। বলেই মিসেস হাজরা দ্রুত নেমে গেলেন।

আমাদের স্যুইটে ঢুকে হাসতে হাসতে বললুম, ভদ্রমহিলা সম্ভবত তার স্বামীর সঙ্গে শ্রাবন্তীর অবেধ সম্পর্কের কথা জানেন।

কর্নেল চুরুট জ্বেলে কী জবাব দিতে ঠোঁট ফাঁক করেছেন, বদ্ধ দরজায় জোরালো ধাক্কার শব্দ হল। দরজা খুলতেই ডাঃ কৌশল্যা বর্মন ঝোড়ো কাকের মূর্তিতে ঘরে ঢুকে হাঁফাতে হাঁফাতে বলে উঠলেন, মার্ডার! কর্নেল সরকার, আমার সুইটের বাথরুমে মার্ডার!

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে তার দুধে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, শ্রাবন্তীর ডেডবডি?

ঝাঁকুনিতে কৌশল্যাদেবীর উন্মাদিনীর ভাবটুকু ঘুচে গেল। ভাঙা গলায় বললেন, হ্যাঁ। শ্রাবন্তীর ডেডবডি! বীভৎস দৃশ্য কর্নেল সরকার। চিত হয়ে পড়ে আছে। চোখ খোলা। আমি বাথরুমের দরজা ঠেলছিলুম। খুলছিল না। শেষে জোরে ঠেলার পর দরজা একটু ফাঁক হল। অমনি দেখলুম–হা ঈশ্বর! এবার আরও সর্বনাশ হল!

কর্নেল বললেন, আপনি এখানে চুপচাপ বসুন। জয়ন্ত! তুমি থাকো। আমাকে আপনি চাবি দিন!

কৌশল্যা বললেন, চাবি তো বিছানায় ফেলে এসেছি। তাহলে দরজা খোলা যাবে না। আমি ম্যানেজারকে ডুপ্লিকেট চাবি আনতে বলছি। বলে কর্নেল টেলিফোন ডায়াল করলেন। সাড়া এলে বলেন, সুইট নাম্বার সেভেন থেকে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি। ম্যানেজার মিঃ মহাপাত্রকে দিন।…মিঃ মহাপাত্র! আমি কর্নেল সরকার বলছি। তিনতলায় ১৭ নম্বর সুইটের ডুপ্লিকেট চাবি…ও হ্যাঁ! দুই বোর্ডারকে দিয়েছেন। …তা হলে মাস্টার কি নিয়ে এখনই আসুন। আমি আমার দরজার সামনে অপেক্ষা করছি। …হ্যাঁ। একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এখন কোনো উত্তেজনা বা হইচই নয় প্লিজ! শুধু আপনি আসুন মাস্টার কি নিয়ে।…ধন্যবাদ।

দরজা খোলা রইল। একটু পরে দেখলুম মিঃ মহাপাত্র হন্তদন্ত এসে গেলেন। তারপর দুজনে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেন।

কৌশল্যাদেবীকে বললুম, আপনি বরং ব্যালকনিতে গিয়ে বসুন। সিঁড়ি দিয়ে বোর্ডার বা হোটেলবয়রা ওঠানামা করতে পারে। আপনাকে এভাবে এখানে বসে। থাকতে দেখে তাদের কৌতূহল হতে পারে।

কৌশল্যা রুমালে চোখ মুছে ব্যালকনিতে গিয়ে বসলেন। আমি দরজার দিকে ঘুরে বসে সিগারেট ধরালুম।

একটু পরে ডঃ বিক্রমজিৎ পাণ্ডে আপনমনে এসে সিঁড়ি বেয়ে তেতলায় নিজের ঘরে চলে গেলেন। এ ঘরের দিকে তাকালেন না।

পাঁচ মিনিট পরে কর্নেল এবং মিঃ মহাপাত্র ফিরে এলেন। কর্নেল তাকে বললেন, যে নাম্বারটা দিলুম, ওটা ও সি রণবীর জেনার ব্যক্তিগত নাম্বার। আমার নাম করে বলবেন কী ঘটেছে এবং তিনি যেন সম্ভব হলে ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর কল্যাণ পট্টনায়ককে সঙ্গে নিয়ে আসেন। আমার ঘর থেকে সরাসরি বাইরে ফোন করা যাবে না। পি বি এক্স অপারেটর চমকে উঠবে। কাজেই…

ও কে কর্নেল সরকার। বলে ম্যানেজার নেমে গেলেন।

কর্নেল দরজা এঁটে ব্যালকনিতে গিয়ে কৌশল্যাদেবীকে স্যুইটের চাবি এবং আরো এক গোছা চাবির রিং দিয়ে বললেন, একটা কথা। আপনার চুরি সম্পর্কে পুলিশকে আজ রাতে কিছু বলবেন না। আপনি বলবেন, বিকেলে সি বিচ থেকে ফিরে স্যুইটে ঢুকেছিলেন। কিন্তু বাথরুমে যাননি। তারপর নিচে গিয়ে ডঃ হাজরাকে বলেন, শ্রাবন্তীকে দেখতে পাচ্ছেন না। সে আপনার স্যুইটে থাকে। কাজেই তার খোঁজ আপনি নিতেই পারেন। তারপর আপনি হোটেল দ্য শার্কে ডঃ আচারিয়ার কাছে একটা ব্যক্তিগত মেসেজ দিতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে আমাদের সঙ্গে ডিনার করে হ্যাঁ, এর পরের অংশটা ঠিক-ঠাক বলবেন।

কৌশল্যাদেবী রুমালে আবার চোখ মুছলেন। আমি ভাবতে পারিনি এমন কিছু ঘটবে।

ঘটে যখন গেছে, ঠাণ্ডা মাথায় তার মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে।

বলে কর্নেল এসে বসলেন। চুরুট ধরিয়ে আস্তে বললেন, খুনী শ্রাবন্তীর গলায় নাইলনের দড়ির ফঁস আটকে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরেছে। দড়িটা লম্বা। আমার ধারণা শাওয়ারে তাকে ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল–যাতে আত্মহত্যা বলে মনে হয়। খুনী পারেনি। শ্রাবন্তী ছিপছিপে গড়নের মেয়ে। ততকিছু ওজন নয় তার শরীরের। আমার অনুমান পঞ্চাশ কিলোগ্রামও ওজন নয়। বড় জোর পঁয়তাল্লিশ থেকে সাতচল্লিশ কেজি।

নাইলনের দড়িটা কি এখনও গলায় জড়ানো আছে?

হ্যাঁ। ঝোলানোর চেষ্টা করেছিল কোমোডে উঠে। কোমোডের নীচে বালি পড়ে আছে। জুতো খুলে রেখে কোমোডে চড়েছিল খুনী। ব্যর্থ চেষ্টার পর পালিয়ে যায়। দরজা তো ভেতর থেকে খোলা যায়। দরজার সামনে একই বালি। অবশ্য আমাদের অনেকের জুতোর তলায় সামুদ্রিক বালি ছিল।

আমার ছিল না।

কর্নেল হাসবার চেষ্টা করে বললেন, হ্যাঁ। তুমি এ বেলা বেরোওনি।

আস্তে বললুম, কর্নেল! মিসেস হাজরা খুনী নয় তো?

হতেই পারেন। তবে যতক্ষণ না কোনো প্রমাণ পাচ্ছি, চুপচাপ থাকাই উচিত। কর্নেল একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, অদ্ভুত! আমার ইনটুইশনের বড়াই করি। অথচ তখন কৌশল্যাদেবীর খাটের তলায় উঁকি দিলুম। বাথরুমে গেলুমই না। এমন তো হতেই পারে, আমরা ঘরে ঢোকার সময় খুনী বাথরুমের দরজা বন্ধ করে তখনও ভেতরেই ছিল। আসলে তখন ফাইল চুরির ব্যাপারটা নিয়েই ব্যস্ত ছিলুম।

শ্রাবন্তীর খোঁপা লক্ষ্য করেছেন?

খোঁপার যেটুকু দেখতে পেয়েছি, তাতে বুঝেছি, ফুলগুলো সে বাইরে কোথাও ফেলে দিয়ে এসেছিল। শুধু দুটো ফুল খোঁপায় আটকে ছিল। একটা পড়েছিল ব্যালকনিতে। একটা খাটের পাশে।

সে তো দেখেছি। আপনি কুড়িয়ে নিলেন।

এবার বোঝা যাচ্ছে, মেয়েটা ঘরে ফিরে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে খুনীর সঙ্গে কথা বলছিল। খুনী তাকে ভেতরে কোনো ছলে ডেকে আনে। তারপর ব্যালকনির দরজা ভেজিয়ে দেয়। সম্ভবত কোনো গোপন কথা আলোচনার ছল করেছিল।

মেঝের কার্পেট লক্ষ্য করেছেন?

খুন করেছে মেঝেতে। দুই খাটের মধ্যিখানে। কিন্তু নারকেল ছোবড়ার কার্পেট মেঝের সঙ্গে সেঁটে আছে দেখে এলুম। শুধু একটুখানি জায়গা কুঁচকে আছে। ওটা তখন কৌশল্যা দেবীর সঙ্গে গিয়েও লক্ষ্য করেছিলুম। কিন্তু গুরুত্ব দিইনি। এই দেখ! জুতোর ডগা দিয়ে কার্পেটটা একটু কুঁচকে দিলুম। লক্ষ্য করছ? গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে কি দেখলে পরে?

নাহ্।

কর্নেল ডাকলেন, ডঃ বর্মন! ঘরে এসে বসুন এবার।

কৌশল্যাদেবী ঘরে এসে কর্নেলের বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসলেন। তাকে এখন শান্ত এবং কিছুটা নির্বিকার দেখাচ্ছিল। বললেন, আমি আপনার মেয়ের বয়সী কর্নেল সরকার। আমাকে আপনি নাম ধরে ডাকবেন।

কর্নেল শান্তভাবে হাসলেন। ঠিক আছে। তুমি আমার মেয়ে। তবে আমি চিরকুমার। সামরিক জীবন আমাকে যদি গিলে না খেত, তা হলে আমি হয়তো বিয়ে করতুম এবং আমার মেয়ে জন্মালে এতদিনে তোমার বয়সী হত। তুমি– আমার অনুমান, বড়জোর পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী।

কৌশল্যা মুখ নামিয়ে বললেন, আমি এ মাসে পঁয়ত্রিশ পেরিয়ে ছত্রিশে পড়েছি।

জয়ন্ত! দেখ, কেমন নির্ভুল আমার হিসেব। তুমি কত ভেবেছিলে?

বললুম, আমার অনুমান ছিল কৌশল্যাদেবীর বয়স তিরিশের বেশি নয়।

কৌশল্যা বললেন, আমি বাংলা বলতে পারি না। যদিও আমার জন্ম হয়েছিল ত্রিপুরার আগরতলায়। আমি বড় হয়েছি দিল্লিতে মামার বাড়িতে। আমার মামা জগদীপ সিনহাকে আপনি ভালো চেনেন। তিনি আপনার বন্ধু। তাই না? তো মামী মার্কিন মহিলা। তাই আমার বাংলা শেখা হয়নি। আর জয়ন্তবাবু! আপনি আমাকে কৌশল্যাদিদি বললে খুশি হবো।

কর্নেল শুধরে দিলেন। বাঙালিরা কৌশল্যাদি বলবে। দিদি অবশ্য সম্ভাষণে।

টেলিফোন বাজল। কর্নেল দ্রুত রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। মিঃ মহাপাত্র?… মিঃ জেনা আসছেন?…মিঃ পটনায়ক? ঠিক আছে।… একটা হইচই উত্তেজনা তো হবেই। হত্যাকাণ্ড। না, না। আপনি কী করতে পারতেন? কোনো সমস্যাই নয়। পুলিশ এলে বোর্ডাররা জানবে। অনেকে অবশ্য দরজা এঁটে শুয়ে পড়েছেন। কাজেই ততকিছু ভিড় হবে না। ডঃ হাজরা এইমাত্র ফিরলেন? ঠিক আছে। ওঁরা স্বামী-স্ত্রী খেয়ে নিন। এখন ওঁদের কিছু বলবেন না। যথাসময়ে পুলিশই ওঁদের জানাবে। ঠিক আছে। কোনো চিন্তার কারণ নেই। রাখছি।…

কর্নেল উঠে গিয়ে দরজা খোলা রাখলেন। বললুম, কী ব্যাপার? দরজা–

বৃদ্ধ রহস্যভেদী আমার কথার ওপর বললেন, স্পিকটি নট। চুপচাপ বসে থাকো।

দু-তিন মিনিটের মধ্যেই ডঃ পরিমল হাজরা এবং তার স্ত্রী মালবিকা হাজরাকে দরজার সামনে দেখা গেল। মালবিকা আমাদের ঘরের দিকে না তাকিয়ে চটির শব্দ তুলে চলে গেলেন। ডঃ হাজরা থমকে দাঁড়ালেন। বললেন, একটু কথা আছে কর্নেল সায়েব!

কর্নেল বললেন, স্বচ্ছন্দে ভেতরে এসে কথা বলতে পারেন।

একটু দ্বিধার সঙ্গে পরিমল হাজরা ঘরে ঢুকলেন। কৌশল্যাদিকে দেখে ইংরেজিতে বললেন, আপনি আছেন এখানে? ভালোই হল। আপনি তখন শ্রাবন্তীকে খুঁজছিলেন–

কৌশল্যাদি বললেন, খুঁজছিলুম–মানে, তাকে অনেকক্ষণ আমার ঘরে বা নীচে কোথাও দেখিনি। তাই একটু উদ্বিগ্ন হয়েছিলুম। সে একজন যুবতী মেয়ে।

ফিরেছে কি শ্রাবন্তী?

না। সে ফিরে এলে এখানে কেন আড্ডা দেব?

আমি কোথাও তাকে খুঁজে না পেয়ে ফিরে এলুম। ভাবলুম, এতক্ষণে নিশ্চয় ফিরেছে। মালবিকা বলছিল, না ফিরে থাকলে আপনি হোটেলের ম্যানেজারকে নিশ্চয় জানাতেন। ম্যানেজার কার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত দেখে চলে এলুম। রাত এগারোটা কখন বেজে গেছে।

তাপনি তামার কথা শুনে তখন সর্বনাশ বলে ছুটে গেলেন কেন জানতে পারি?

উঃ হাজরা আস্তে বললেন, এখানে শ্রাবন্তী আমার সঙ্গে আসার পর অচেনা-অজানা এক যুবককে গায়ে পড়ে তার সঙ্গে আলাপ করতে দেখেছিলুম। বখাটে ধরনের যুবক। তাই ভেবেছিলুম, শ্রাবন্তী তার ছলনায় পড়ে সি-বিচে গেছে। আজকাল তো সর্বত্র মানে, নারীধর্ষণ আর খুন-খারাপি হচ্ছে। তাই আমার প্রচণ্ড আতঙ্ক জেগেছিল। ওই বখাটে ছোকরার ফাঁদে পা দিয়ে শ্রাবন্তী হয়তো বিপদে পড়েছে।

কর্নেল বললেন, ডঃ হাজরা! কিছু মনে করবেন না। বিকেলে দুর্গপ্রাসাদের ধ্বংসস্তূপের কাছে আপনি আর শ্রাবন্তী পাশাপাশি বসেছিলেন। আমি দেখেছি।

কৌশল্যাদি বললেন, আমিও দেখেছি। আপনি তার খোঁপায় ফুল গুঁজে দিচ্ছিলেন।

ডঃ হাজরা নিমেষে ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ওটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার! কর্নেল একটু হেসে বললেন, নিশ্চয় আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে এখনও শ্রাবন্তী ফিরে এল না। আপনি পুলিশকে জানাননি কেন?

এখনই স্যুইটে ফিরে জানাচ্ছি। আমি আপনার পরামর্শ নিতে চেয়েছিলুম।

ঠিক এই সময় সিঁড়িতে কয়েক জোড়া জুতোর শব্দ হল। তারপর কয়েকজন পুলিশকে দেখা গেল। একজন পুলিশ অফিসার কর্নেলকে দেখে বলে উঠলেন, এই যে, কর্নেল সরকার! চলুন। লাশটা দেখি।

লক্ষ্য করলুম, ডঃ হাজরা পাথরের মূর্তিতে পরিণত।

.

০৩.

 এ যাবৎ কর্নেলের সঙ্গী হয়ে অনেক খুন-খারাপি দেখেছি। তা ছাড়া সাংবাদিকদের তো কত বিচিত্র বা বীভৎস দৃশ্য দেখতে হয়। তাই শ্রাবন্তীর মৃতদেহ দেখে তৎক্ষণাৎ আমার মনে কোনো বিকার জাগেনি। পুলিশের সঙ্গে ফোটোগ্রাফার এবং ডাক্তার এসেছিলেন। ফোটোগ্রাফার যথারীতি বাথরুমে ঢুকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ক্যামেরার শাটার টিপছিলেন। ফ্ল্যাশবালব ঝিলিক দিচ্ছিল। তারপর ডাক্তার লাশ পরীক্ষা করে শ্রাবন্তীকে মৃত ঘোষণা করেছিলেন। ডঃ হাজরা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি লাশ শনাক্ত করেছিলেন। কৌশল্যাদিও পুলিশের কাছে কর্নেলের কথামতো বিবৃতি দিয়েছিলেন। তারপর ও সি মিঃ জেনা এবং ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ পট্টনায়ক স্যুইটের ভেতরটা তন্নতন্ন খুঁজে কোনো ক্লু বের করার চেষ্টা করেছিলেন। জানি না তারা কিছু পেয়েছিলেন কি না। ব্যালকনিতে গিয়ে দুই পুলিশ অফিসার কর্নেলের সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলার পর ম্যানেজার মিঃ মহাপাত্রকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কাল সকাল নটা পর্যন্ত হোটেলের কোনো বোর্ডার যেন চেক-আউট না করেন তা তিনি যে-ই হোন বা তার ট্রেন-বাস ফেল হোক। রাতভর হোটেল ঘিরে পাহারা দেবে পুলিশবাহিনী।

ততক্ষণে অ্যাম্বুলেন্সে শ্রাবন্তীর লাশ চালান দেওয়া হয়েছিল। কৌশল্যাদি ওই স্যুইটে থাকতে পারবেন না বলায় ম্যানেজার দোতলায় একটা খালি সিঙ্গল স্যুইটের ব্যবস্থা করেছিলেন। নীচের লাউঞ্জে পুলিশ অফিসারদ্বয় ডঃ হাজরাকে একান্তে ডেকে তার বিবৃতি নেওয়ার পর তিনি তিনতলায় তার ১৯ নম্বর স্যুইটে চলে যান। শ্রাবন্তীর বাড়ির ঠিকানা তার কাছে জেনে পুলিশের পক্ষে থেকে কলকাতায় খবর যাবে।

শ্রাবন্তীর বিছানায় বালিশের তলায় তার পার্স ছিল। কিন্তু সুইটের ডুপ্লিকেট চাবি পাওয়া যায়নি। স্যুইটের দরজায় ইন্টার লকিং সিস্টেম। তাই চাবি ঢোকানোর ছিদ্র ও সি মিঃ জেনা গালা দিয়ে বন্ধ করে সিল করে দিয়েছিলেন। দরজার সামনে দুজন কনস্টেবল দুটো চেয়ারে বসে বাকি রাতের জন্য পাহারা দিচ্ছিল। অত রাতে শ্রাবন্তীর ব্যাগেজ পরীক্ষার মেজাজ ছিল না পুলিশের।

রাত সাড়ে বারোটায় কর্নেল আর আমি নিজেদের স্যুইটে ফিরে শুয়ে পড়েছিলুম। আমার ঘুম আসতে চাইছিল না। বারবার জীবিত শ্রাবন্তীকে মনে পড়ছিল। তাকে তত খুঁটিয়ে লক্ষ্য না করেও এটুকু বুঝতে পেরেছিলুম ওই ছিপছিপে গড়নের মোটামুটি সুন্দরী মেয়েটি মেধাবী এবং নিশ্চয় আণবিক জীববিজ্ঞানে তার উচ্চস্তরের ডিগ্রি আছে। হয়তো নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। অনেক লড়াই করে তাকে মাথা তুলতে হয়েছিল। ডঃ হাজরা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী। তার সহকারী হওয়ার যোগ্যতা তো তার থাকার কথা। হা-ডঃ হাজরার চরিত্রদোষ আছে। প্রায় বাবার বয়সী এই বিজ্ঞানীর পাল্লায় পড়ে হতভাগিনী শ্রাবন্তীকে অনেক বজ্জাতি হাসিমুখে সহ্য করতে হয়েছে। স্পষ্ট বোঝা যায়, সে কেরিয়ারের স্বার্থেই ডঃ হাজরার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে কিংবা চাকরি ছেড়ে দিতে পারেনি।

হঠাৎ কর্নেলের একটা কথা মনে পড়েছিল। পাগলাবাবুকে কফি খাইয়ে এসে কথাপ্রসঙ্গে কর্নেল বলছিলেন যে, কারো ব্যাপারে তার নাক গলানোর ইচ্ছে নেই। তারপর আমার প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন বিজ্ঞানী কোথায় ঘুরছেন, সেই বিবরণ দিয়ে প্রশ্নটা প্রকারান্তরে চেপে দিয়েছিলেন।

তা হলে দেখা যাচ্ছে, নিশ্চয় তার চোখে অর্থাৎ বাইনোকুলারে কোনো রহস্যজনক ব্যাপার ধরা দিয়েছিল।

তারপর কৌশল্যাদির গুরুত্বপূর্ণ ফাইল উধাও হয়ে গেল এবং বাথরুমে শ্রাবন্তীর লাশ দেখা গেল।

ধুরন্ধর বৃদ্ধকে কাল সকালে উত্ত্যক্ত করতেই হবে। তার চেয়ে বড় অদ্ভুত ব্যাপার, এখানে আসার পর কিংবা হয়তো কলকাতা থেকে রওনা হওয়ার আগেই তিনি স্থানীয় পুলিশ কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। কেন?

কেউ দরজায় নক করছিল। উঠে বসে দেখি, খোলা ব্যালকনি দিয়ে ঝলমলে রোদ ঢুকছে ঘরে। সাতটা বাজে। কখন ঘুম এসেছিল কে জানে! কর্নেলের বিছানা খালি। দরজা খুললে হোটেল বয় নব বেডটি দিয়ে গেল। বললুম, নীচে কী হচ্ছে নব?

নব বলল, পুলিশ বোর্ডারদের একে-একে ডেকে জেরা করছে। নাম-ঠিকানা জেনে নিচ্ছে। স্যার! এমন ঝামেলা পূর্বাচলে কখনও হয়নি।

কর্নেলকে দেখেছ?

 উনি ভোরে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। পুলিশ অফিসাররা ওঁকে বেরুতে বাধা দেয়নি।

অন্যদের বেরুতে দিয়েছে?

না স্যার! আপনাদের দুজনকে দিয়ে মোট এগারোজন বোর্ডার। দোতলা থেকে চারতলায় সিঙ্গল আর ডাবল সুইট মিলে মোট বারোটা। তিনতলার ১৭ নম্বর এখন খালি। দরজায় পুলিশ পাহারা দিচ্ছে।

বোর্ডাররা কি ক্যান্টিনে এখন?

 কেউ কেউ ক্যান্টিনে, কেউ-কেউ লনে বসে আছেন।

 ঠিক আছে। তুমি এস।

নব পা বাড়াতে গিয়ে ঘুরল। আস্তে বলল, একটা কথা পুলিশকে বলতুম। কিন্তু ম্যানেজার সায়েব বলেছেন, হোটেলের কোনো স্টাফ কোন বেফাঁস কথা পুলিশকে না বলে। তাই বলিনি। কিন্তু আপনি কর্নেল সায়েবের সঙ্গে এসেছেন। আপনাকে বলছি। কর্নেল সায়েবকে বলার হয়তো সুযোগ পাব না। আপনি আমার হয়ে বলবেন। তবে স্যার, আমি সামান্য স্টাফ। কথাটা যে আমিই বলেছি, তা যেন পুলিশের কানে না যায়।

তুমি আমাকে বিশ্বাস করে বলতে পারো।

নব উঁকি মেরে দরজার বাইরে করিডর দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, কাল সন্ধ্যার একটু আগে যখন বৃষ্টি পড়ছিল, তখন খুন হয়ে যাওয়া ভদ্রমহিলা ভিজতে ভিজতে লাউঞ্জে এসে ঢুকলেন। তার পেছন-পেছন আপনার বয়সী এক ভদ্রলোক ঢুকল। তারপর দুজনে রিসেপশনে গেল। আমি রিসেপশনে বোর্ডারদের অর্ডার মতো চা-কফি-পাকৌড়ার স্লিপ নিচ্ছিলুম। কানে এল ভদ্রমহিলা বলছেন, আপনাদের একটা সিঙ্গল স্যুইট খালি আছে দোতলায়। সেটা এঁকে দিন। রিসেপশনে কমলাদি আর দাসবাবু ছিল। তারা বলল, ওটা রিজার্ভ আছে। দেওয়া যাবে না। ভদ্রলোক চলে গেল।

জিজ্ঞেস করলুম, সিঙ্গল সুইটটা কি সত্যি রিজার্ভ ছিল? ওখানে তো গতরাত থেকে কৌশল্যাদি আছেন।

নব বলল, সেই কথাটাই তো বলছি স্যার! ওই ভদ্রলোককে নাকি কমলাদি আর দাসবাবু দুজনেই চেনে। দুজনেই বলছিল, লোকাল ছেলে। নিউ চন্দনপুর টাউনশিপে বাড়ি ওর। স্ফুর্তি মারতে চায়। মহিলা ওর পাল্লায় পড়েছে। সাবধান করে দিতে হবে।

নব চলে গেলে শ্রাবন্তীর যে ইমেজ মনের ভেতর গড়ে তুলেছিলুম, তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। শ্রাবন্তী কি তা হলে খারাপ মেয়ে ছিল?

দরজা বন্ধ করে ব্যালকনিতে বসলুম। চা শেষ করে সিগারেট ধরিয়ে নীচের লনে উঁকি দিলুম। দেখলুম, ডঃ পাণ্ডে তাঁর বয়সী এক ভদ্রলোকের সঙ্গে বেঞ্চে বসে কথা বলছেন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আরও কয়েকজন পুরুষ ও নারী। কেউ পায়চারি করছেন। কেউ গম্ভীর মুখে বসে আছেন।

মেঘ ফুঁড়ে সূর্য নরম রোদ ছড়াচ্ছে। এখন হাওয়া কম। তবু এখানকার সমুদ্র সবসময় বিক্ষুব্ধ। দুরে সমুদ্রের জলে রোদ প্রতিবিম্বিত হয়ে তরল সোনার লাবণ্যে পরিণত। অনেক দূরে একটা সাদা জাহাজ একবার দেখা দিচ্ছে, একবার। ঢেউয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ছে। বিচে এবং ডানদিকের বালিয়াড়িতে যারা আছে। তারা অন্য সব হোটেলের লোক।

একটু পরে বাঁদিকে দুর্গপ্রাসাদের ধ্বংসস্তূপের উত্তরপ্রান্তে বৃদ্ধ প্রকৃতিবিজ্ঞানীকে আবিষ্কার করলুম। তিনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে খাড়ির নীচে ব্যাকওয়াটার দেখছেন মনে হল। তারপর চোখে পড়ল কাল বিকেলে দেখা একই দৃশ্য। পাগলাবাবু গাধাটার পেছনে লেগেছেন। গাধাটা উত্ত্যক্ত হয়ে কেয়াঝোপের ভেতর ঢুকে গেল। পাগলাবাবুও ঠুকলেন। তারপর সম্ভবত কালকের মতো গাধাটার লাথি খেয়ে দৌড়ে বেরিয়ে এলেন। পিচ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে তিনি আঙুল তুলে হুমকি দেওয়ার পর কর্নেলকে দেখতে পেলেন। অমনি ঝোপঝাড় কাশবনের ভেতর দিয়ে চড়াই ভেঙে তিনি কর্নেলকে সহাস্যে কিছু বলে হাত বাড়ালেন। অবাক হয়ে দেখলুম, কর্নেল তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছেন।

তাদের ওপর সরাসরি রোদ পড়ায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

পাগলাবাবু কর্নেলকে দুহাত নেড়ে কিছু বোঝাচ্ছিলেন। তারপর কর্নেল সোজা ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে নেমে এলেন। পাগলাবাবু তার পেছনে। একটু পরে ওখানে উঁচু ও ঘন কেয়াবনের ভেতর দুজনেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

খানিক পরে দুজনকে পিচরাস্তায় দেখতে পেলুম। হোটেলের নীচে বাঁদিকে রাস্তার ধারে বিচে যাওয়ার পথের সঙ্গমস্থলে রোডসাইড কাফে। কর্নেল পাগলাবাবুকে এক কাপ কফি দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে হোটেলের গেটে এলেন।

গেটের নীচে পুলিশভ্যান এবং গেটে পুলিশ প্রহরী। কর্নেলকে তারা স্যালুট ঠুকল। তারপর কর্নেল হোটেলের নীচে অদৃশ্য হলেন।

কিন্তু তিনি ওপরে এলেন না। কিছুক্ষণের মধ্যে কফি পান শেষ করে পাগলাবাবু পেপার কাপটিকে কিক করে দূরে ফেললেন। তারপর শুরু হল তার নাচ-গান :

‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল
মাইরি রাতি পোহাইল।
কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল।
মাইরি, সকলি ফুটিল
পাখি সব করে রব, মাইরি বলছি–রাতি পোহাইল’—

 রোড-সাইড কাফে এবং পুলিশভ্যানের লোকেরা দৃশ্যটা ভিড় করে উপভোগ করছিল।

কিছুক্ষণ পরে নাচ-গান থামিয়ে পাগলাবাবু ঊধ্বশ্বাসে দৌড়ালেন। কেন দৌড়ালেন বুঝতে পারলুম। গাধাটা কেয়াঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে ছবির মতো দাঁড়িয়ে আছে। গাধাটা কি বেওয়ারিশ?

দৃশ্যটা দেখা হল না। দরজায় নক করল কেউ। দুবার নক মানে কর্নেল। দরজা খুলে দেখলুম, তিনিই বটে। অভ্যাসমতো বললেন, মর্নিং জয়ন্ত। আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে।

একটু হেসে বললুম, মর্নিং বস্! দুর্গপ্রাসাদের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ব্যাকওয়াটারে কি আবার কোনো লাশ দেখছিলেন?

কর্নেল ক্যামেরা আর বাইনোকুলার টেবিলে রেখে বসলেন। বললেন, ব্যাকওয়াটারে জেলেদের মাছধরা দেখছিলাম।

আস্তে বললুম, একটু গোয়েন্দাগিরি করার সুযোগ পেয়েছি। অবশ্য এতে আমার কৃতিত্ব নেই। নবচন্দ্রের ভলান্টারি কনফেসন। কাল সন্ধ্যার আগে বৃষ্টির সময় শ্রাবন্তীর সঙ্গে সেই যুবক

আমাকে হতাশ করে ধুরন্ধর রহস্যভেদী বললেন, ম্যানেজার মিঃ মহাপাত্র আমাকে জানিয়েছেন। যুবকটি নিউ চন্দনপুরের বাসিন্দা। তার চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, সে মাছব্যবসায়ী মহীতোষ বিশ্বাসের ভাগনে অমল রায়। কলেজে নাকি কেমিস্ট্রিতে ভালো রেজাল্ট করেছিল। কিন্তু ফিল্মের নেশায় আর এগোতে পারেনি। সে থাকে ভুবনেশ্বরে। মাঝে মাঝে বাড়ি বেড়াতে আসে। মামার সাহায্যে সে সমুদ্রবিজ্ঞান অফিস থেকে তার ডিগ্রির ডকুমেন্ট দেখিয়ে কনফারেন্সের ডেলিগেট কার্ড জোগাড় করেছিল।

বললুম, ভেবেছিলুম আপনাকে চমকে দেব। আমার দুর্ভাগ্য!

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, এবার তোমাকে একটু চমকে দিই। একটুখানি চমক মাত্র। কৌশল্যার ডাবলবেড সুইট অর্থাৎ ১৭ নম্বরের ব্যালকনির ঠিক নীচে ফুলের ঝোপে ডুপ্লিকেট চাবিটা পড়েছিল। ছটায় বেরিয়ে গিয়ে আমি ওটা আবিষ্কার করেছিলুম! এখন দিয়ে এলুম ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ পটনায়ককে।

ওখানে চাবি কেন ছুঁড়ে ফেলেছিল খুনী?

খুনীর চাবি ছুঁড়ে ফেলার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। তাই আমার ধারণা, ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে খেলার ছলে চাবিটা শ্রাবন্তী আঙুলের ডগায় নাচাচ্ছিল। হটাৎ হাত ফসকে পড়ে গিয়েছিল। অনেকের এই চাবি নাচানো অভ্যাস থাকে। তবে এ থেকে সিদ্ধান্ত করা যায়, খুনী তার সঙ্গেই ঢুকেছিল এবং শ্রাবন্তী সদ্য দরজা খুলে ব্যালকনিতে গিয়ে লক্ষ্য করছিল কৌশল্যাকে। কারণ কৌশল্যা দুর্গপ্রাসাদ থেকে নেমে রাস্তার উল্টোদিকে হোটেল দ্য শার্কে ডঃ আচারিয়ার সঙ্গে গল্প করছিলেন। তখন বৃষ্টি পড়ছিল।

হ্যাঁ। কৌশল্যাদি বলছিলেন মনে পড়ছে।

এখন কথা হল, অমল সুইট খালি নেই শুনে তখনই বেরিয়ে যায়। রিসেপশনকর্মী কমলাদেবী আর দণ্ডধর দাস অমলকে চেনেন। অমলকে তারা তাদের রাত নটা পর্যন্ত ডিউটির সময়ে আর দেখতে পাননি। কাজেই অমল খুনী হতে পারে না। বলে কর্নেল বাথরুমে ঢুকলেন।

একটু পরে তিনি বেরিয়ে এসে বললেন, চলো! আটটা দশ বাজে। ক্যান্টিনে গিয়ে কফি খাওয়া যাক। মহীতোষবাবুকে ভোরবেলা রিসেপশন থেকে ফোনে হোটেলের ঘটনা সংক্ষেপে জানিয়ে দিয়েছি। আজকের দিনটা হোটেলেই থাকছি। কাল সকালে ওঁকে ফোনে জানাব, ওঁর বাড়ি যাওয়া হচ্ছে কি না।

প্যান্ট-শার্ট পরে নিয়ে বললুম, পুলিশ বোর্ডারদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে কোথায়?

বারের কাছে। হ্যাঁ–ব্যালকনির দরজা বন্ধ করে দাও। ঘরে আমার দামি ক্যামেরা ইত্যাদি আছে।

তা দিচ্ছি। তবে দিনদুপুরে দোতলার ব্যালকনিতে পুলিশের চোখের সামনে চোর ঢুকবে না।

কর্নেল হাসলেন। সমুদ্র থেকে ভূত এসে ঢুকতে পারে। কত চোর এই সমুদ্রে ডুবে মরে যে ভূত হয়নি, তা কে বলতে পারে? সেই ভূত সব লণ্ডভণ্ড করে পালাক, এটা ঠিক নয়।

সিঁড়িতে নামবার সময় আমার বুদ্ধিসুদ্ধি খুলে গেল। বললুম, হ্যাঁ। মাঝে মাঝে এই সমুদ্র সত্যি ভুতুড়ে হয়ে ওঠে। আচমকা প্রচণ্ড হাওয়া এসে ঘরের জিনিসপত্র উল্টে ফেলে। পরশু অ্যাশট্রেটা উল্টে পড়েছিল। অত ভারি পাথরের অ্যাসট্রে!

তুমি বোঝো সবই জয়ন্ত! তবে একটু দেরিতে!

লাউঞ্জের দক্ষিণপ্রান্তে বারের সামনে পুলিশের রীতিমতো অফিস বসেছে। টেবিলের তিনদিকে তিনটে চেয়ার! ও সি এবং ডিটেকটিভ ইন্সপেকটর দুটো চেয়ারে বসেছেন। একটা চেয়ারে বসে আছেন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক। পরনে টাইট–সম্ভবত কোনো ব্যবসায়ী বোর্ডার।

ক্যান্টিনে ঢুকে দেখলুম, ডঃ হাজরা এবং পাণ্ডে গম্ভীর মুখে চাপা গলায় কথা বলছেন। মিসেস মালবিকা হাজরা অন্য একটা টেবিলে একা বসে চুলের ক্লিপ দিয়ে কানে সুড়সুড়ি দিচ্ছেন। চোখ বন্ধ। খুব আরাম পাচ্ছেন মনে হল।

কৌশল্যাদি শেষপ্রান্তের টেবিলে জানালার ধারে একা বসে চা বা কফি পান করছেন। আমাদের চোখের ভাষায় কাছে ডাকলেন। কর্নেলকে দেখে ডঃ পাণ্ডে বললেন, কী সর্বনাশ হল দেখুন কর্নেল সরকার! আমি সাড়ে নটার ট্রেন মিস করব।

কর্নেল বললেন, আপনার স্টেটমেন্ট দেওয়া হয়ে গেছে?

স্টেটমেন্ট কী বলছেন? জেরা। আর উদ্ভট সব প্রশ্ন। আমি থাকি পাটনায়। আমি কস্মিনকালে শ্রাবন্তীকে দেখিনি। ডঃ হাজরার সঙ্গেও এখানে এসে পরিচয় হয়েছে।

জেরা শেষ হলে তো বোর্ডারদের চলে যেতে অসুবিধা নেই! আপনি কি ওঁদের জানিয়েছেন সাড়ে নটার ট্রেনে আপনি ফিরবেন?

বলেছি। ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর সোজা বললেন, সব বোর্ডারের সঙ্গে কথা বলার পর সকলের বক্তব্য একসঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করা হবে। তারপর আমরা যেতে পারব। আমরা দেখছি কয়েদি!

ডঃ হাজরা বললেন, আমার ট্রেন ছিল আজ সাড়ে বারোটায়। কিন্তু মিসেস বায়না ধরেছেন, দুদিন থাকবেন।

কর্নেল বললেন, আসলে মার্ডার কেস। পূর্বাচল হোটেলের মালিকরা সুনামহানির ভয়ে সম্ভবত পুলিশের ওপরমহলে চাপ দিয়েছেন। আমার অবস্থাও তা-ই।

ডঃ পাণ্ডে বললেন, তবু তো আপনাকে বেরুতে দিয়েছিল। আপনি রিটায়ার্ড সামরিক অফিসার। অবশ্য আমার কানে এসেছে, আপনি নাকি সি. বি. আইয়ের সঙ্গে যুক্ত।

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ভুল শুনেছেন ডঃ পাণ্ডে! তবে এটা ঠিক, কোনো রহস্যজনক ঘটনা ঘটলে তাতে আমি নাক গলাই।

ডঃ হাজরা বাঁকা হেসে বললেন, আমি কলকাতার লোক। আমি জানি কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের অন্য পরিচয়। কাজেই আশা করছি, আমার ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের খুনী ধরা পড়বে।

কর্নেল শুধু বললেন, দেখা যাক।

আমরা দুজনে কৌশল্যাদির টেবিলে গেলুম। কর্নেল তার পাশে বসলেন। আমি উল্টোদিকের চেয়ারে বসলুম। কৌশল্যাদি আস্তে বললেন, পুলিশকে সব বোর্ডারের জিনিসপত্র সার্চ করতে বললে আমার ফাইলটা হয়তো পাওয়া যেত।

কর্নেল একটু হেসে বললেন, খুনী সম্ভবত এত বোকা নয় যে, তোমার ফাইল হোটেলে রেখে দেবে। সে তা বাইরে পাচারের প্রচুর সুযোগ পেয়েছিল। কারণ কাল সন্ধ্যার আগে বৃষ্টির সময় তুমি হোটেল দ্য শার্কে ডঃ আচারিয়ার কাছে গিয়েছিলে।

কৌশল্যাদির মুখে বিষাদের ছাপ পড়ল। আমি বললুম, কৌশল্যাদি। আপনি তো নিজেই রিসার্চ করে ওই ফরমুলা-ফরমুলাই বলছি, উদ্ভাবন করেছেন। কাজেই ফরমুলা আপনার জানা। আপনার ফরমুলা চোর তা নিয়ে মুখ খোলার আগেই আপনি সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে জানিয়ে দিন যে, এই ফরমুলা আপনার উদ্ভাবিত।

কৌশল্যাদি তেমনি চাপাস্বরে বললেন, আমার উদ্ভাবিত প্রক্রিয়া খুব সাংঘাতিক। ভারতের কোনো শত্রুরাষ্ট্রের হাতে তা পড়লে ওই প্রক্রিয়ার সাহায্যে কত ভয়ঙ্কর ভাইরাস ভারতের মাটিতে তারা ছড়িয়ে দেবে। হয়তো রাতারাতি দেখা যাবে দেশের কোথাও কিলবিল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে কোটি কোটি বিষাক্ত পোকামাকড়। তাদের বিষ দ্রুত সংক্রামিত হবে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

শিউরে উঠে বললুম, কী সর্বনাশ! এ ধরনের গবেষণা করা উচিত হয়নি। কৌশল্যাদি।

আমি তো ভাবিনি আমার গবেষণা কোথায় পৌঁছবে। জিনোমতত্ত্ব অনুসারে খুদে প্রাণীর কোষের মধ্যে জিন নামক জিনিসে থাকে ডি এন এ অপু। জিনগুচ্ছ কোষে মালার মত সাজানো থাকে। তা থেকে ডি এন এ নিষ্কাশন  করে তার আণবিক গঠন ওলটপালট করে দেখতে চেয়েছিলাম কী দাঁড়ায়। বহু উদ্ভাবন বিজ্ঞানের ইতিহাসে দেখা যাবে দৈবাৎ হয়ে গেছে। আমি অসহায় জয়ন্ত!

কর্নেলের ইশারায় নব এল। তাকে তিনি একপট কফি আর বিস্কুট আনতে বললেন। তারপর কৌশল্যাদিকে বললেন, সম্মেলনে আরেকজন জিনোমবিজ্ঞানী এসেছিলেন। ডঃ অশোক সাঠে। তিনি তো পরশু বিকেলে চলে গেছেন। ডঃ সাঠে তোমার পেপার সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, ভারতের মতো অনুন্নত দেশে ডি এন এ-র গঠন পরীক্ষার মতো সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি নেই। ল্যাবরেটরিও নেই। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ওয়াটসনের কাজকর্মের স্তরে পৌঁছতে আমাদের দুশো বছর অপেক্ষা করতে হবে।

কৌশল্যা বললেন, অশোক ব্যঙ্গ করেছিল। সে থাকে বাঙ্গালোরে। আমি দিল্লিতে। কাজেই আমি অনেক বেশি সুবিধা পাই তার চেয়ে। তাছাড়া আমার বাড়িতে নিজস্ব ল্যাব আছে। মামী যখনই তাঁর দেশে যান, আমার কথামতো কিছু কিছু ল্যাব সরঞ্জাম কিনে আনেন। একটু-একটু করে কোনো সরঞ্জামের খুদে টুকরো আনলে কাস্টমস কিছু টের পাবে না।

অশোক সাঠে তোমার পরিচিত মনে হচ্ছিল?

খুবই পরিচিত। একসময় সে দিল্লিতে আমার সঙ্গে কাজ করত।

নব কফির ট্রে রেখে গেল। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, অশোক সাঠে ছিলেন হোটেল দ্য শার্কে। ডঃ আচারিয়া এখনও সেখানে আছেন। তুমি রিসেপশনে গিয়ে তাকে ফোন করে জেনে নিতে পারো, অশোক সাঠের স্যুইটে যিনি ছিলেন, তিনি চলে গেছেন কি না। অথবা তিনি সিঙ্গল স্যুইটে থাকলে কার সঙ্গে তার বেশি ঘনিষ্ঠতা লক্ষ্য করেছেন ডঃ আচারিয়া এবং সেই লোকটি এখনও আছে কি না। আমার কথা বুঝতে পারছ?

কৌশল্যাদি তখনই উঠে গেলেন। আমি বললুম, ডঃ আচারিয়ার অন্তত একবার এখানে এসে কৌশল্যাদির খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল। কাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত ভদ্রলোক একবারও সময় পেলেন না এখানে আসার?

ফোনে খোঁজখবর নিয়েছেন। কৌশল্যা ভোরে বলছিল।

কিন্তু সশরীরে আবির্ভূত হচ্ছেন না কেন?

কর্নেল ভুরু কুঁচকে বললেন, ছা! ছ্যা! তুমি না সাংবাদিক? লক্ষ্য করোনি তাঁকে? দুদিন ধরে সম্মেলনে ছিলে তুমি। ফ্যাক্সে কলকাতায় সম্মেলনের খবর পাঠিয়েছ। অথচ সম্মেলনের প্রধান বক্তা পরিবেশবিজ্ঞানী ডঃ রঘুবীর আচারিয়াকে দেখনি?

কেন দেখব না? বসে পেপার পড়ছিলেন। বক্তৃতাও দিয়েছিলেন।

 সবাই দাঁড়িয়ে পড়ছেন। আর উনি বসে কেন, মাথায় এল না?

অসুস্থ বুঝি?

কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন, ডঃ আচারিয়ার একটা পা নেই। ক্রাচে ভর করে চলাফেরা করেন। হিমালয়ে প্রকৃতি পরিবেশের রূপান্তর দেখতে গিয়ে হঠাৎ খাদে পড়ে যান।

আমি ওইসব পেপার তত বুঝিনি বলে কারো দিকে তত লক্ষ্য রাখিনি।

কর্নেল হেসে ফেললেন। হায় জয়ন্ত! তুমি যদি শ্রাবন্তীর সঙ্গে ভাব জমাতে পারতে, তাহলে মেয়েটা বেঘোরে প্রাণ হারাত না।

আমার তো ফিল্মহিরোর মতো চেহারা নেই। তত স্মার্টও নই।

এই সময় নীচের রাস্তা থেকে পাগলাবাবুর জোরালো গলার গান শোনা গেল।

‘সকলই ফুটিল, ভাই! সকলি ফুটিল
কাননে কুসুমকলি।
মাইরি, সকলি ফুটিল…’

 বললুম, এ কী গান! পাগলাবাবুটি আর গান খুঁজে পেল না?

কর্নেল আস্তে বললেন, গান বা নিছক পদ্য নয় জয়ন্ত! এটা একটা কূটাভাষ। এর নিশ্চয় অর্থ আছে।

চমকে উঠে তার দিকে তাকালুম। কর্নেল আর মুখ খুললেন না।

.

০৪.

 কৌশল্যাদি ফিরে এসে বলেছিলেন, ডঃ আচারিয়া বললেন, অশোক সাঠে চার তলায় সিঙ্গল স্যুইটে ছিল। তার সঙ্গে কারো ঘনিষ্ঠতা তিনি লক্ষ্য করেননি। অশোক সাঠে, তাঁর মতে, অহঙ্কারী লোক। কারো সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলত না। তার সঙ্গেও না।– বেলা নটায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছিল এবং পূর্বাচলের বোর্ডাররা

মুক্তি পেয়েছিলেন। ব্রেকফাস্টের পর কর্নেল দুই পুলিশ কর্তার সঙ্গে নীচের রাস্তায় দাঁড়িয়ে যখন কথা বলছিলেন, তখন আমি আমাদের স্যুইটের ব্যালকনিতে বসে সিগারেট টানছি। ডঃ পাণ্ডেকে দেখলুম, খালি হাতে একটা অটোরিকশাতে চেপে চলে গেলেন। তিনি যে আবার নতুন করে ট্রেনের টিকিট কাটতে স্টেশনে ছুটে গেলেন, তা স্পষ্ট। বেচারার ট্রেনভাড়াটা গচ্চা গেছে। কারণ সাড়ে নটার ট্রেন ততক্ষণে চলে গেছে। রেলস্টেশন এখান থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। তার ওপর স্টেশনগামী রাস্তাটা গেছে ওল্ড চন্দনপুরের ভেতর দিয়ে। সেখানে যানবাহনের প্রচণ্ড ভিড় হয়।

কৌশল্যাদি বিষণ্ণভাবে নিজের স্যুইটে ফিরে গেছেন। ডানদিকে ঝাউবন এবং সামনের বিচে রোজকার মতোই ট্যুরিস্টদের চলাফেরা দেখা যাচ্ছিল। তারপর বাঁদিকে দুর্গপ্রাসাদের ধ্বংসস্তূপে পাগলাবাবুকে দেখতে পেলুম। চুপচাপ দাঁড়িয়ে সমুদ্রদর্শন করছিলেন তিনি। হঠাৎ করজোড়ে সম্ভবত সমুদ্রকে প্রণাম করলেন। নীচের ঘাসজমিতে বেওয়ারিশ গাধাটা নিরুপদ্রবে ঘাস খাচ্ছে।

পুলিশ অফিসাররা তাদের বাহিনী নিয়ে চলে গেলেন। কর্নেল ফিরে এসে নীচে অদৃশ্য হলেন। একটু পরে দরজায় দুবার নক করার শব্দ হল। দরজা খুলে বললুম, পুলিশ এত কাণ্ড করে কিছু ব্লু খুঁজে পেয়েছে কি না বলুন।

কর্নেল বললেন, দরজায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা করতে বলছ বুঝি?

হেসে ফেললুম। না। ভেতরে ঢুকেই বলবেন। আসলে আপনি অতক্ষণ ওঁদের সঙ্গে গুজ-গুজ ফুসফুস করছিলেন। তাই আপনাকে সামনে দেখেই প্রশ্নটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ করে চেয়ারে বসে কর্নেল টুপি খুলে টেবিলে রাখলেন। তারপর টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, তিনতলার ১৭ নম্বর স্যুইট এখনও বন্ধ এবং দুজন কনস্টেবল পাহারা দিচ্ছে। কাজেই পুলিশের তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। বোর্ডারদের জেরা করে মিঃ পটনায়ক কোনো ক্লু পেয়েছেন কি না, তা আমাকে কেন জানাবেন? উল্টে আমাকেই বলে গেলেন, এবার যেন নিজস্ব পদ্ধতিতে স্বাধীনভাবে তদন্ত করে ওঁদের সাহায্য করি। আশ্চর্য!

বলে কর্নেল চুরুট ধরালেন। আমি বললুম, পাগলাবাবু দুর্গপ্রাসাদের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে সমুদ্রকে প্রণাম করছেন দেখলুম। আপনি বলছিলেন, ওঁর ওই গান বা পদ্যটার নাকি বিশেষ কোনো গোপন অর্থ আছে। কেন একথা বলছিলেন জানতে পারি?

কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, আজ সকালে ওঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল।

হ্যাঁ ব্যালকনি থেকে দেখছিলুম।

আবোল-তাবোল কথাবার্তা বলছিলেন। মাথামুণ্ডু বোঝা যায় না। আমাকে কেয়াবনের ভেতর একটা মজার জিনিস দেখাবেন বলে ডেকে নিয়ে গেলেন। তারপর হঠাৎ বলে উঠলেন, কিছু নেই। এমনি-এমনি ডেকে ব্লাফ দিলুম। বলেই চোখ নাচালেন। তার গানের মধ্যে নাকি এরকম ব্লাফ নেই। আমাকেই খুঁজে বের করতে হবে তার গানের মানে। তা হলেই নাকি আমার চোখ খুলে যাবে। যাই হোক, তার নাম-ধাম পরিচয় জানতে চাইলুম। বললেন, এককাপ কফি খাওয়ালে বলবেন। কফি খাওয়ালুম। কিন্তু ওই পদ্যটা বিদঘুটে সুরে গাইতে গাইতে নাচ জুড়ে দিলেন।

হ্যাঁ। তা দেখছিলুম।

আমার কেন যেন মনে হল, এ পাগল সেয়ানা পাগল।

 এখানকার কেউ ওঁকে চেনে না শুনেছি। হঠাৎ কোত্থেকে এসে জুটেছেন।

কর্নেল বললেন, আমিও খোঁজ নিয়েছি। পাগলাবাবু প্রকৃতি-পরিবেশ সম্মেলনের আগেরদিন এখানে এসেছেন। ভদ্রলোককে রোডসাইড কাফের মালিকই পাগলাবাবু। নাম দিয়েছেন। তবে উনি ওই গাধাটা ছাড়া কাকেও উত্ত্যক্ত করেন না।

গাধাটা কার কে জানে?

নব বলছিল, গাধাটাকে কিছুদিন থেকে এখানে দেখা যাচ্ছে। কে তার মালিক কেউ জানে না। বলে কর্নেল চুরুট অ্যাশট্রেতে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। পিঠের সঙ্গে ওঁর কিটব্যাগ এঁটে বললেন, তুমি চুপচাপ ঘরে বসে না থেকে এবার বাইরে চলো!

আপনার কিটব্যাগ থেকে প্রজাপতিধরা জালের স্টিক বেরিয়ে আছে। এই রোদে প্রজাপতির পেছনে ঘুরবেন। আর আমাকে কোথাও খামোকা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সি-বিচে ঘুরতেও আমার গা ছমছম করে। যা ঢালু বিচ! মনে হয় এখনই সমুদ্র এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে টেনে নিয়ে যাবে।

সমুদ্র কিছু নেয় না। নিলেও ফিরিয়ে দেয়। অবশ্য জ্যান্ত জয়ন্ত চৌধুরিকে নিয়ে একটু পরে মৃত জয়ন্ত চৌধুরিকে ছুঁড়ে ফেরত দেবে।

তা হলে?

সি-বিচে তুমি নামবে না। আমিও না। ডানদিকে বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে কিছুদূর গিয়ে আমরা পোড়ো লাইটহাউসের পেছনে নামব। ওখানে একটা জঙ্গল আছে। প্রচুর বুনো ফুল ফোটে। হ্যাঁ–ফুল যেখানে, প্রজাপতি সেখানে। তবে তোমার দৃষ্টিশক্তি থাকলে কোনো প্রেমিক-প্রেমিকাকে আবিষ্কার করতেও পারো।

কী যে বলেন! লুকিয়ে প্রণয়লীলা দেখতে বলছেন?

আহা! ইচ্ছে না হলে লাইটহাউসের চুড়ো দেখবে। চলো! বেরিয়ে পড়ি।

কিছুক্ষণ পরে বালিয়াড়ির ওপর ঝাউবনে কয়েকজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকাকে পেরিয়ে গিয়ে ফাটল ধরা প্রাচীন লাইটহাউসটি চোখে পড়ল। তার পেছন দিকে ঘন উঁচু-নিচু গাছ আর ঝোপ-ঝাড়। ঝোপের ভেতর বড়-বড় পাথর পড়ে আছে। একটু দূরে উত্তরদিকে একটা টিলার মাথায় মন্দির দেখা গেল। লাইটহাউসটা আমার দেখা। তবে এত কাছে আসিনি। তাই টিলা বা মন্দিরটা চোখে পড়েনি। এখন দেখতে পেয়ে বললুম, বরং চলুন, মন্দির দর্শন করে আসি।

এক মিনিট! দেখি, ওই প্রজাপতিটা ধরতে পারি নাকি। ওটার নাম জগন্নাথ প্রজাপতি। ডানায় অবিকল পুরীর মন্দিরের দেবতা জগন্নাথের ছবি আছে মনে

কর্নেল কিটব্যাগ থেকে প্রজাপতিধরা জাল বের করে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেলেন। আমি একটা উঁচু পাথরে উঠে লাইটহাউসটা দেখতে থাকলুম। একটু পরে দেখি, লাইটহাউসের নীচের এক বড় পাথরের আড়াল থেকে একজন শিখ ভদ্রলোক বেরুলেন। তারপর তিনি হনহন করে হেঁটে জঙ্গলের ভেতর অদৃশ্য হলেন। বললুম, কর্নেল! প্রণয়লীলা কোথায়? এইমাত্র এক শিখ ভদ্রলোক লাইটহাউসের নীচে থেকে বেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকলেন।

জগন্নাথ প্রজাপতি ধরতে ব্যর্থ প্রকৃতিবিজ্ঞানী সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। শিখ ভদ্রলোক? বলে তিনি একটা পাথরে উঠে বাইনোকুলারে তাকে খুঁজতে থাকলন। কিছুক্ষণ পরে বললেন, হ্যাঁ। পিচরাস্তার মোড়ে একটা অটোরিকশা দাঁড়িয়ে আছে। শিখ ভদ্রলোক সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। ভদ্রলোক হয়তো লাইটহাউসে চড়তে গিয়েছিলেন। দরজা আটা দেখে ফিরে যাচ্ছেন।

অটোরিকশাতে চেপে উনি উল্টোদিকে যাচ্ছেন। হা–মোরামরাস্তায় বাঁক নিয়ে অটোরিকশা চলেছে মন্দিরের টিলার দিকে। পার্বতীর মন্দির ট্যুরিস্টদের দেখার মতো। চারশো বছরের পুরনো মন্দির। বলে কর্নেল পাথর থেকে নামলেন। বললুম, লাইটহাউসের গায়ে কি ওটা, ফলক?

হ্যাঁ। পোর্তুগিজ বণিকদের তৈরি লাইটহাউস। ফলকে রোমান অক্ষরে কী সব লেখা আছে, পড়া যায় না। সমুদ্রের নোনা হাওয়ার উপদ্রবে ক্ষয়ে গেছে।

চলুন না। দেখে আসি।

চলো! দেখি, ওটার কোথাও জগন্নাথ প্রজাপতি থাকতে পারে। তা ছাড়া শিখ ভদ্রলোক ওখানে কী করছিলেন দেখা যাবে।

ঝোপঝাড় এবং গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আমরা লাইটহাউসের কাছে গেলুম। তারপর কর্নেল বললেন, লাইটহাউসের গোড়ায় কত বালি জমেছে। দেখছ? লোহার ফ্রেমে আটকানো কপাটের প্রায় অর্ধেকটা বালিতে ভরে গেছে। ঘাস গজিয়েছে প্রচুর। অ্যাঁ? এখানটা যেন কেউ খুঁড়েছিল। ভেজা বালি। ঘাস নেই।

কর্নেল হাঁটু ভাঁজ করে বসে সেই জায়গাটা খুঁড়তে শুরু করলেন। তারপর টেনে বের করলেন হাত তিনেক লম্বা নাইলনের মোটা দড়ি। বললুম, কী অদ্ভুত! শিখ ভদ্রলোকই কি এখানে দড়িটা পুঁতে রেখে গেলেন?

কর্নেল দড়িটা ঝেড়ে বালি পরিষ্কার করে গম্ভীর মুখে বললেন, জয়ন্ত! অবিকল এরকম দড়ির ফঁসে শ্রাবন্তীকে মারা হয়েছে। হা–একই দড়ি!

কিন্তু সেই দড়ি তো পুলিশের কাছে আছে।

হ্যাঁ।

তা হলে?

কর্নেল দড়িটা কিটব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে বললেন, খুনী শ্রাবন্তীকে মেরে ফেলার জন্য যে দড়ি কিনে এনেছিল, এটা তারই অংশ। দড়িটা শ্রাবন্তীকে শাওয়ারে ঝোলানোর পক্ষে বেশি লম্বা ছিল। তাছাড়া পুরো দড়িটা প্যান্টের পকেটে ঢোকানো যাচ্ছিল না বলেই এই অংশ কেটে রেখেছিল খুনী। পুলিশ পূর্বাচল হোটেল সার্চ করেনি। কিন্তু পরে যদি প্রত্যেক বোর্ডারের ঘর সার্চ করে, সেই ভয়ে বাকি দড়িটা লুকিয়ে রেখে গেল খুনী। বাইরে কোথাও ছুঁড়ে ফেললে কারো চোখে পড়তে পারে। তার চেয়ে এই জায়গাটা নিরাপদ। কারণ লাইটহাউসে নাকি সামুদ্রিক অজগর সাপের আড্ডা! সেই ভয়ে পারতপক্ষে কেউ এদিকে পা বাড়ায় না।

বললুম, তা হলে ওই শিখ ভদ্রলোকই তো খুনী!

কিন্তু পূর্বাচলে কোনো শিখ ভদ্রলোক ওঠেনি। বলে কর্নেল হন্তদন্ত হাঁটতে থাকলেন। পিচরাস্তায় পৌঁছে তিনি বাইনোকুলারে মন্দিরের টিলাটা দেখে নিলেন। বললেন, নীচের চত্বরে কয়েকটা অটোরিকশা আর দুটো প্রাইভেটকার দাঁড়িয়ে আছে। সিঁড়িতে পুণ্যার্থীরা কেউ নামছেন কেউ উঠছেন। কিন্তু শিখ ভদ্রলোককে দেখতে পাচ্ছি না।

মন্দিরের দূরত্ব কত এখান থেকে?

 তা প্রায় দু’কিলোমিটার।

বাপস। এই খর রোদে অতদূর হাঁটতে পারব না। বালিয়াড়ি আর খোলা পাথুরে মাঠ। সারা পথে কোনো গাছ নেই যে, ছায়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নেব।

কর্নেল শ্বাস ছেড়ে বললেন, হু। আজ মেঘ নেই। বড় চড়া রোদ। আমার টাক ঘামতে শুরু করেছে। চলো! নিউচন্দনপুরের কাছে বাঁকের মুখে শিরিসগাছটার তলায় গিয়ে দাঁড়াই। বাইনোকুলারে লক্ষ্য রাখব। শিখ ভদ্রলোককে নিয়ে অটোরিকশাটা এলেই রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে তাকে থামাব। দরকার হলে ফায়ার আর্মস বের করেও থামাব। কুইক জয়ন্ত! চলে এস।

একটু পরে শিরিসগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কর্নেল বাইনোকুলারে টিলার মন্দির দেখতে থাকলেন। আমি দরদর করে ঘামছিলুম। গাছের ছায়ায় জোরালো হাওয়া ছিল। কর্নেল টুপি খুলে বগলদাবা করেছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সামুদ্রিক হাওয়ায় শরীর জুড়িয়ে গেল। প্রায় আধঘণ্টা পরে একটা অটোরিকশা ফিরে এল। তাতে শিখ ভদ্রলোক নেই। এক দম্পতি ছিলেন। বললুম, কর্নেল! শিখ ভদ্রলোক যদি প্রাইভেট কারে চেপে আসেন, আগে দেখতে পাবেন কী করে?

কর্নেল বললেন, বাইনোকুলারে টিলার নীচের চত্বর সবটাই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এখনও কোনো শিখ ভদ্রলোককে দেখতে পাচ্ছি না।

আরো আধঘণ্টায় তিনটে অটোরিকশা ফিরে এল। কোনোটাতেই শিখ ভদ্রলোক ছিলেন না। আমার উত্তেজনা ততক্ষণে থিতিয়ে গেছে। বললুম, বরং আমি পূর্বাচল হোটেলে গিয়ে ও সি বা ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টরকে টেলিফোনে আপনার কথা জানিয়ে দিই। ওঁরা প্লেন ড্রেসের পুলিশ নিয়ে পার্বতীর মন্দিরে হানা দেবেন।

এই সময় একটা খালি অটোরিকশা নিউচদনপুরের বসতি এলাকা থেকে বেরিয়ে আসছিল। কর্নেল হাত তুলে রিকশাটা ডাকলেন। অটোরিকশার ড্রাইভার হিন্দিতে বলল, মন্দির দর্শনে যাবেন স্যার? তাহলে কুড়ি টাকা লাগবে।

কর্নেল বললেন, আমরা যাব। ধরো, আধঘণ্টা পরে ফিরে আসব। পূর্বাচল হোটেলে নামিয়ে দেবে। কত নেবে?

সেভেনটি ফাইভ।

 বুঝলাম, সে মওকা বুঝে দর হাঁকছে। দরাদরি করে ষাট টাকার নীচে তাকে নামানো গেল না। কর্নেল অটোরিকশাতে চেপে বসলেন। আমাকেও বসতে হল। এতগুলো টাকা খরচ করে গোয়েন্দাগিরির মানে হয় না। কিন্তু কর্নেলের। মাথায় ঝোঁক চেপেছে। তিনি যেন আমার মনের কথা আঁচ করে হাসতে হাসতে বললেন, জয়ন্ত! চারশোবছরের পুরনো মন্দির। আর পার্বতীর বিগ্রহ নাকি আরও প্রাচীন। তোমাকে আমার ক্যামেরায় মন্দির আর বিগ্রহের ছবি তুলে দেব। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় একটা ফিচার লিখে অন্তত আড়াই-তিনশো টাকা পাবে। তা থেকে আমাকে যাট টাকা উসুল করে দেবে।

ওঁর কথায় আমারও হাসি এল। বললুম, ছবির দরুন আমাদের কাগজ আরও দুশো টাকা দেবে।

ব্যস! তাহলে আর কথা কী? তুমি ভাবো, আমি বুঝি ঘরের খেয়ে বনের মোষ হাঁকিয়ে বেড়াই? মোটেও না। অর্কিড, প্রজাপতি, ক্যাকটাস বা নিদেনপক্ষে পাখির ছবি সমেত একটা ইংরেজি ফিচার লিখলেই সব খরচ উসুল হয়ে যায়। তুমি তো জানো, মার্কিন মুলুকের নেচার পত্রিকায় ছবিসমেত তিন পাতা ছাপানো লেখার জন্য আমি পাই কমপক্ষে একশো ডলার।

জানি, জানি! আপনি রথ দেখেন এবং কলাও বেচেন।

কর্নেল আবার গম্ভীর হয়ে বাইনোকুলারে লক্ষ্য রাখলেন। সংকীর্ণ মোরামরাস্তা। একটা প্রাইভেট কারকে আমাদের অটোরিকশা সাইড দিল। দেখলুম, গাড়ি ভর্তি মহিলা-কাচ্চা বাচ্চা এবং দুজন মাথা ন্যাড়া প্রৌঢ় ভদ্রলোক। পার্বতীর মন্দিরে বোধ হয় মানত সেরে মাথা ন্যাড়া করে এলেন।

পনের মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলুম। টিলাটার নীচের চত্বরে কয়েকটা অটো আর দুটো প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে। কিছু ফুল বিক্রেতা চিৎকার করে ওড়িয়া ভাষায় কিছু বলছে। দুটো ট্রলিতে খাবার বেচছে মিঠাইওয়ালা। ভিড়ে চোখ বুলিয়ে কর্নেল বললেন, চলো! সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরে ওঠা যাক। জুতো খুলে রাখতে হবে নীচে। জুতো পাহারার লোক আছে। কিছু পয়সা তার প্রাপ্য।

জুতো জিম্মা রেখে সিঁড়িতে উঠলুম। আগে কর্নেল পেছনে আমি। সিঁড়িটা বেজায় খাড়া। নামতে লোকেদের কষ্ট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু উঠতে অনেকেই হাঁপিয়ে পড়ছে। বিশ্রাম নিতে নিতে উঠছে। মাঝামাঝি গিয়ে কর্নেল বললেন, একটু রেস্ট নেওয়া যাক। চড়া রোদ বলে এই অবস্থা। তা ছাড়া বয়স–

তিনি হঠাৎ থেমে গেলেন। দেখলুম, ডঃ পরিমল হাজরা তার স্ত্রী মালবিকার একটা বাহু ধরে সাবধানে তাকে নামিয়ে আনছেন। কর্নেলকে দেখে ডঃ হাজরা একটু আড়ষ্ট হেসে বলে উঠলেন, আর বলবেন না! আমার ধর্ম টর্মে মতি নেই। কিন্তু আমার মিসেস পার্বতী দর্শন না করে জলগ্রহণ করবেন না।

মালবিকা হাজরা কর্নেলের দিকে কেন যেন রুষ্ট দৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, যান কর্নেল সায়েব! গেলে পুণ্যি হবে। মানত করে থাকলে চুল-গোঁফ-দাড়ি সব কামাতে হবে কিন্তু!

কর্নেল হাসলেন। তারপর টুপি খুলে বললেন, মানত করলে এই টাকের আনাচে-কানাচে যেটুকু চুল আছে, তাতে দেবী তুষ্ট হবেন না। আর গোঁফ দাড়ির যা অবস্থা, তা দেখতেই পাচ্ছেন। সব সাদা হয়ে গেছে। বুড়োর গোঁফ দাড়ি কি দেবীর পছন্দ হবে?

মিসেস হাজরা আর কথা বললেন না। স্বামীর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নামতে শুরু করলেন। ডঃ হাজরা বললেন, ডঃ পাণ্ডে আমার মিসেসকে পার্বতীর মন্দিরের খবর দিয়ে আমাকে বিপদে ফেলেছেন।

ডঃ পাণ্ডের সঙ্গে দেখা হয়নি? ট্রেনের টিকিট পেয়েছেন উনি?

এখানে এসে দেখা হল। রাত নটা পঁয়ত্রিশের টিকিট পেয়েছেন। ডঃ পাণ্ডের সঙ্গেই তো মিসেস আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডঃ পাণ্ড কখন বেরিয়ে এসেছেন। অগত্যা মিসেস জেদ ধরলেন আমাকে পার্বতীর মন্দিরে নিয়ে আসতে হবে।

ডঃ পাণ্ডে এসেছেন এখানে?

 হ্যাঁ। দেখলুম এখনও লাইনে আছেন। আমি তো পুজো দিতে যাইনি। ম্যান উওম্যান সেপারেট লাইন। বলে ডঃ হাজরা গম্ভীর মুখে নেমে গেলেন।

চূড়ার মন্দির প্রাঙ্গণে দুটো লাইন। পুরুষ ও মহিলা আলাদা লাইনে পুজোর উপচার শালপাতায় দুহাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তারপর কর্নেল যাঁকে হ্যালো ডঃ পাণ্ডে বলে সম্ভাষণ করলেন, তাঁকে দেখে আমি অবাক।

পরনে মটকার ধুতি, গলায় জড়ানো মটকার চাদর, খালি গায়ে পৈতে শোভা পাচ্ছে। পাদুটোও খালি। কপালে একপোঁচ সিঁদুর। ডঃ পাণ্ডে বিষণ্ণভাবে বললেন, বারোটা পাঁচের ট্রেনে ফার্স্ট ক্লাস নেই। প্যাসেঞ্জার ট্রেন। একটু পরে একটা মেলট্রেন আছে। তাতে ফার্স্ট ক্লাস আছে। কিন্তু সব বার্থ রিজার্ভড়। বসে পাটনা যাওয়া যায়। কিন্তু ওই ট্রেনে ফার্স্টক্লাসে নাকি সেকেন্ড ক্লাসের যাত্রীরাও ঢুকে পড়ে। তাই রিস্ক নিলুম না, রাতের ট্রেনই ভালো।

কর্নেল বললেন, পুজো দিলেন তা হলে?

দেব না? ব্রাহ্মণ সন্তান। তাছাড়া যা ফঁড়া গেল! বলে তিনি সিঁড়ির দিকে। এগিয়ে গেলেন।

কর্নেল প্রাঙ্গণের দক্ষিণে পাঁচিলের কাছে গিয়ে নীচে উঁকি দিলেন। দেখলুম, নীচের দিকটা আরো খাড়া এবং ঝোপ জঙ্গল পাথরে ভর্তি।

বাইনোকুলারে তিন দিকটা দেখে নিয়ে কর্নেল ক্যামেরায় মন্দিরের ছবি তুললেন। কয়েকটা ছবি বিভিন্ন দৃষ্টোকোণে তুলে তিনি বললেন, চলো! নেমে যাই।

লক্ষ্য করলুম, এখানে পাণ্ডাদের উপদ্রব নেই। ছোট মন্দির। ভক্তের সংখ্যা যথেষ্ট নয় বলেই হয়তো পাণ্ডা নেই। নীচে গিয়ে দেখলুম, হাজরা দম্পতি ডঃ পাণ্ডের প্রতীক্ষা করছিলেন। দুটো অটোরিকশা ওঁদের ভাড়া করা ছিল। ডঃ পাণ্ডের অটোরিকশাকে অনুসরণ করল হাজরা দম্পতির অটোরিকশা।

কর্নেল বললেন, কোথায় শিখ ভদ্রলোক? এ তো আশ্চর্য ব্যাপার!

বললুম, দক্ষিণের মাঠ দিয়ে হয়তো কেটে পড়েছে। আমার সন্দেহ হচ্ছে, দৈবাৎ সে আপনাকে দেখে ফেলেছিল।

তার অটোরিকশার নাম্বার কাদায় অস্পষ্ট ছিল। পড়তে পারিনি। এটাই সমস্যা! বলে কর্নেল আমাদের অটোরিকশাতে চেপে বসলেন।

আমিও বসলুম। অটোরিকশা স্টার্ট দিয়ে চলতে শুরু করলে বললুম, পেছনে তিনদিক খুঁজে দেখা উচিত ছিল।

কর্নেল আস্তে বললেন, আমার বাইনোকুলার কিছু মিস করে না।

পূর্বাচল হোটেলে ফিরে দেখি, লাউঞ্জে বসে আছেন কৌশল্যাদি। আমাদের দেখতে পেয়ে উঠে এলেন তিনি। বললেন, ওপরে চলুন। কথা আছে।

দোতলায় আমাদের সুইটে ঢুকে কৌশল্যাদি বসলেন। আমি ব্যালকনির দরজা খুলে দিলুম। ঝাঁপিয়ে এল সামুদ্রিক হাওয়া। কর্নেল কিটব্যাগ, বাইনোকুলার এবং ক্যামেরা রেখে আরাম করে বসে বললেন, আমার মাথায় হাওয়া দরকার। ফ্যানের সুইচ টেপো জয়ন্ত!

কৌশল্যাদি বললেন, আমি ডঃ আচারিয়াকে রেলস্টেশনে বিদায় দিতে গিয়েছিলুম। এইমাত্র ফিরেছি। ম্যানেজার মিঃ মহাপাত্র বললেন, কিছুক্ষণ আগে ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ পটনায়ক এসে তিনতলার ওই ডাবলবেড ১৭নং স্যুইটের সিল ভেঙে তদন্ত করে গেছেন। কনস্টেবলরা চলে গেছে। বিকেলে তিনি আবার এসে আমার সঙ্গে কথা বলতে চান।

কর্নেল বললেন, তাতে কী? তুমি যা বলেছ, তা-ই বলবে। শুধু ফাইল চুরির কথাটা চেপে যাবে।

আমার মনে হয়, কথাটা বলা উচিত। কারণ পুলিশ মার্ডারের কোনো মোটিভ খুঁজে না পেয়ে অকারণ আমাকে হয়রান করে ছাড়বে। সকালে আমাকে ওঁরা কিছু প্রশ্ন করেছিলেন, যা আমার পক্ষে অপমানজনক। তা ছাড়া পুলিশের যা সর্বত্র রীতি, যার-তার কাঁধে দায় চাপিয়ে মিথ্যা মামলা সাজিয়ে দায়িত্ব পালন করা।

এই সময় টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। ..হ্যাঁ, দিন। …বলুন মহীতোষবাবু? …আপনার ভাগনেকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে? কেন? …কী আশ্চর্য! কী নাম ওর? …অমল রায়? …আচ্ছা আচ্ছা! আমি দেখব, কী করা যায়। ..আপনি উদ্বিগ্ন হবেন না। …আমি দেখছি কী করা যায়। ছাড়ছি।

কর্নেল টেলিফোন রেখে বললেন, কৌশল্যা! সেই যুবকটিকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। তবে এটা মন্দের ভালো। জেরার চোটে যদি অমল এমন কিছু বলে, যা আমার থিয়োরিকে শক্ত করবে।

কৌশল্যাদি অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন। আমি বললুম, আপনার থিয়োরিটা কী?

কর্নেল হাসলেন। পাগলাবাবুর গানের মতো। পাখি সব করে রব…ইত্যাদি।

কৌশল্যাদি তাঁর বাক্যের বাংলা অংশটুকু বুঝতে না পেরে বললেন, পাখি? সেটা কী?

কর্নেল পাগলাবাবু সম্পর্কে এবং তার বিদঘুটে সুরে গাওয়া বাংলা পদ্যটার ইংরেজি অনুবাদসহ তাকে বুঝিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, তুমি পাগলাবাবুকে দেখে থাকবে?

হ্যাঁ। দেখেছি, গত পরশু বিকেলে কনফারেন্স শেষ হওয়ার পর বেরিয়ে আসছিলুম। নীচের রাস্তায় পাগলাবাবু আমার সামনে দাঁড়িয়ে স্মার্ট ইংলিশে বলছিলেন, এক কাপ কফি খাওয়ালে তিনি আমাকে একটা গোপন তথ্য (সিক্রেট ইনফরমেশন) দেবেন। একটু অবাক হয়েছিলুম। যাই হোক, পাগলের হাত থেকে বাঁচতে একটা পাঁচ টাকার নোট দিলুম। তারপর পাগলাবাবু চাপা গলায় বললেন, ম্যাডাম। ভূতের হাত লম্বা হয়। জিজ্ঞেস করলুম, তার মানে? পাগলাবাবু জবাব দিলেন না। একটা রোডসাইড কাফের দিকে ছুটে গেলেন।

কর্নেল আওড়ালেন, ঘোস্টস্ হ্যাভ লং হ্যান্ডস্!

 হ্যাঁ। ঠিক এই কথাটাই বললেন।

তারপর আর দেখা হয়নি তার সঙ্গে?

না। আমি তাকে দেখলেই এড়িয়ে গেছি।

কর্নেল সোজা হয়ে বসে বললেন, কৌশল্যা! পাগলাবাবু যে-ই হোন, তিনি সম্ভবত তোমাকে সতর্ক করতে চেয়েছিলেন। এবার দেখা হলে তুমি তাকে বলবে, ভূতের লম্বা হাত তোমার ঘরে ঢুকেছিল। লক্ষ্য করবে, এ কথা শুনে পাগলাবাবুর কী প্রতিক্রিয়া হয়। আসলে পাগলারা কোনো-কোনো সময় সুস্থ মানুষের মতো আচরণ করে। তাই দেখবে, কোনো পাগল রাস্তায় কখনও গাড়ি চাপা পড়ে না। পাগলরা কখনও আত্মহত্যাও করে না।

কৌশল্যাদি চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। আমি বললুম, আপনিই বলছিলেন সেয়ানা পাগল।

.

০৫.

স্নানাহারের পর অভ্যাসমতো ভাতঘুম দিতে শুয়ে পড়েছিলুম। হঠাৎ সেই ঘুম ভেঙে গেল। দেখলুম, কখন ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর কল্যাণ পটনায়ক এসেছেন। কর্নেলের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি। দুজনের কথাবার্তা শোনার জন্য চোখ বুজে পড়ে রইলুম।

হ্যাঁ। অমল, রায় তা-ই বলছে। মিঃ পটনায়ক বলছিলেন। মহীতোষ বিশ্বাস প্রভাবশালী লোক। তার ভাগনে হচ্ছে এই অমল। তাই আমাদের একটু সংযত থাকতে হয়েছে।

কর্নেল বললেন, অমলের সহপাঠিনী ছিল শ্রাবন্তী। এটার প্রমাণও তো আপনারা পেয়েছেন।

তা অবশ্য পেয়েছি। মহীতোষবাবু আমাদের টেলিফোন পেয়ে অমলের কলেজের ডিগ্রি ইত্যাদি প্রমাণপত্র দিয়ে গেছেন।

ডঃ হাজরাও তো বলেছেন, শ্রাবন্তী প্রেসিডেন্সি কলেজে বিজ্ঞানের ছাত্রী, ছিল?

হ্যাঁ। টেলিফোনে বলেছেন। শ্রাবন্তীর জিনিসপত্রের মধ্যে অবশ্য ওর পড়াশুনোর ডিগ্রি সংক্রান্ত কোনো ডকুমেন্ট পাইনি।

যাই হোক, ভুবনেশ্বরের অমল কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বিজ্ঞানের ছাত্র ছিল। এর প্রমাণ পেয়ে গেছেন। কাজেই সহপাঠিনীর সঙ্গে অমলের, এমোশনাল সম্পর্ক থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

মিঃ পটনায়ক বললেন, কিন্তু অমল এই হোটেলে এসে থাকতে চেয়েছিল কেন, এই প্রশ্নের জবাব পাইনি। তার মামার বাড়ি তো নিউচন্দনপুরেই।

কর্নেল হাসলেন। যুবক-যুবতীদের মধ্যে এমোশনাল সম্পর্ক গড়ে উঠলে তারা কাছাকাছি থাকতে চাইবে।

আমার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা কর্নেল সরকার। অমলের চরিত্র সম্পর্কে যতটুকু খোঁজ পেয়েছি, সে অসচ্চরিত্র লম্পট প্রকৃতির যুবক। সিনেমায় একবার চান্স পাওয়ার পর সে নিজেই সিনেমার পরিচালক হতে চেয়েছে। কিন্তু ওটা তার একটা অছিলা। আসলে নিজের লাম্পট্য প্রবৃত্তি চরিতার্থ করাই তার উদ্দেশ্য।

এর সঙ্গে সহপাঠিনী বা ধরা যাক–প্রেমিকা শ্রাবন্তীকে সে… মিঃ পটনায়ক। হঠাৎ থেমে সিগারেট ধরালেন। চোখের ফাঁক দিয়ে দেখলুম, তিনি সিগারেটের ধোঁয়ার রিং তৈরির ব্যর্থ চেষ্টা করছেন।

কর্নেল বললেন, মিঃ পটনায়ক! তাহলে বলতে হয়, অমল যেন আগেই জানত যে শ্রাবন্তী তার কুপ্রস্তাবে রাজি হবে না, তাই সে সঙ্গে নাইলনের দড়ি নিয়ে ঘরে ঢুকেছিল!

মিঃ পটনায়ক একটু পরে বললেন, হ্যাঁ। আমি তা ভেবে দেখেছি! তবে–

তার কথার ওপর কর্নেল বললেন, হোটেলের রিসেপশন স্টাফের সাক্ষ্যে দেখা যাচ্ছে, শ্রাবন্তী নিজেই অমলের জন্য একটা স্যুইট চেয়েছিল।

কোনো পুরনো প্রতিহিংসার ব্যাপার থাকতে পারে না কি কর্নেল সরকার? শ্রাবন্তী হয়তো মনে রাখেনি। কিন্তু অমল ভোলেনি।

কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন, জয়ন্ত! চোখ বুজে শুয়ে না থেকে উঠে পড়ো! আমরা মিঃ পটনায়ককে এবার ম্যাজিক দেখাব।

মিঃ পটনায়ক হাসলেন। কাগজের লোক, তাই নিজেই আড়িপাতা যন্ত্র সেজেছেন জয়ন্তবাবু! কিন্তু ম্যাজিকটা কী?

অগত্যা উঠে পড়লুম। কর্নেল তার কিটব্যাগ থেকে সেই হাত তিনেক নাইলনের দড়িটা বের করে বললেন, এই দেখুন ম্যাজিক।

ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর ঝটপট দড়িটা হাতে নিয়ে বললেন, একই দড়ি মনে হচ্ছে?

হ্যাঁ। খুনী লম্বা দড়ি কিনেছিল। কিন্তু এই অংশটা কেটে বাদ দিয়েছিল। তাড়াহুড়ো করে কাটা। তাই এই প্রান্তটার বুননি খুলে ছেতরে গেছে। শেষ প্রান্তে গিট।

কী আশ্চর্য! শ্রাবন্তীর গলায় বাঁধা দড়িটার একপ্রান্তে গিট। অন্যপ্রান্ত ঠিক এইরকম কাটা। কোথায় পেলেন এটা?

কর্নেল সংক্ষেপে দড়ি উদ্ধার এবং পার্বতীর মন্দিরে ছুটে গিয়ে সেই শিখ ভদ্রলোককে খুঁজে বের করার ব্যর্থ চেষ্টার বিবরণ দিলেন। শেষে বললেন, জয়ন্তই প্রথমে লোকটাকে দেখতে পেয়েছিল!

মিঃ পটনায়ক কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে থাকার পর বললেন, তা হলে অমলের একটা কথাকে এখন গুরুত্ব দেওয়া চলে।

কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, কী কথা?

শ্রাবন্তী কাল সন্ধ্যার একটু আগে তাকে নাকি বলেছিল কথাটা। ডঃ কৌশল্যা বর্মনের সঙ্গে একই স্যুইটে তার থাকতে ভয় হচ্ছে। কারণ সে নাকি এইমাত্র একটা উড়ো চিঠি পেয়েছে। সেই চিঠিতে কেউ তাকে লিখেছে, মহিলাবিজ্ঞানীকে খুন করা হবে। তার সঙ্গে থাকলে তুমিও খুন হয়ে যাবে।

কর্নেল নিষ্পলক দৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, কিন্তু শ্রাবন্তী কেন সে কথা কৌশল্যাকে বলেনি?

অমলও তাঁকে বলতে বলেছিল। ডঃ বর্মনকে জেরা করে তেমন কোনো কথা শ্রাবন্তী বলেছিল কি না জানবার জন্যই এ বেলা আমি এসেছি। এটা জরুরি ব্যাপার। তাই ডঃ বর্মনকে বলে রেখেছি, তার সঙ্গে আরো কথা বলতে চাই।

 কৌশল্যা এমন কথা শুনে থাকলে সতর্ক হত এবং আমাকে অবশ্যই বলত। আমার মনে হচ্ছে, শ্রাবন্তী যে-কোনো কারণেই হোক, তাকে কথাটা বলেনি। সেই উড়ো চিঠিটা কি অমলকে দেখিয়েছিল শ্রাবন্তী?

না। অমল বলেছে, চিঠিটা শ্রাবন্তী ভয় পেয়ে ছিঁড়ে ফেলেছিল।

 কর্নেল একটু ভেবে নিয়ে বললেন, এটা অদ্ভুত মনে হচ্ছে।

মিঃ পটনায়ক বললেন, হ্যাঁ। তবে অমল নাকি ওই কথা শুনেই তাকে রাত্রে গার্ড দেবার জন্য এই হোটেলে থাকতে চেয়েছিল। তাই শ্রাবন্তী তার হয়ে দোতলার খালি সিঙ্গল স্যুইটটা রিসেপশনে এসে বুক করতে চেয়েছিল। কিন্তু রিসেপশনের দাসবাবু এবং কমলাদেবী অমলকে চেনেন। তাই

কর্নেল তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, জানি। তারপর নিভে যাওয়া চুরুট জ্বেলে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে তিনি ফের বললেন, ডঃ হাজরা শ্রাবন্তীর এমপ্লয়ার। শ্রাবন্তী তারই ল্যাব-অ্যাসিস্টান্ট। ওই সাংঘাতিক কথাটা শ্রাবন্তীর ডঃ হাজরাকে তো বলা উচিত ছিল?

ডাঃ হাজরা চেপে গেছেন সম্ভবত। তাকেও আবার জেরা করতে হবে।

তার আগে চলুন, আমরা কৌশল্যার ঘরে যাই। কর্নেল উঠলেন। জয়ন্ত! তুমি আর শুয়ে পড়ে না। তিনটে বাজে। তুমি ব্যালকনিতে বসে সমুদ্র দর্শন কর! আমি আসছি।

আমারও ওঁদের সঙ্গে যেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু না ডাকলে যাই কী করে? অগত্যা ব্যালকনিতে বসে সিগারেট টানতে থাকলুম।

কিছুক্ষণ পরে কেউ দরজায় নক করল। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখি ডঃ পরিমল হাজরা। তাঁকে একটু উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলেন, কর্নেল সায়েব কোথায়?

বললুম, উনি ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টরের সঙ্গে বেরোলেন।

 ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টরের সঙ্গে কোথায় গেলেন জানেন?

ইচ্ছে করেই বললুম, বলে যাননি। আপনি ভেতরে আসুন না!

ডঃ হাজরা অনিচ্ছার সঙ্গে ভেতরে এলেন। দরজাটা নিজেই বন্ধ করে দিলেন। তারপর চেয়ারে বসে বললেন, কর্নেল সায়েবের সঙ্গে একটা বিষয়ে পরামর্শ করতুম।

আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, শ্রাবন্তী আপনাকে একটা উড়োচিঠির কথা বলেছিল, সেই বিষয়ে?

ডঃ হাজরা চমকে উঠলেন। উড়োচিঠি? কিসের উড়োচিঠি?

আপনাকে শ্রাবন্তী কিছু বলেনি তা হলে?

না তো!

আমার মধ্যে যেন কর্নেল ভর করেছেন তখন। বললুম, শ্রাবন্তী আপনাকে কি বলেনি ডঃ কৌশল্যা বর্মনের সঙ্গে একই ঘরে থাকতে তার ভয় করছে?

ডঃ হাজরা মাথা নেড়ে বললেন, ভয় করার কথা বলেনি। তবে বলেছিল, ভদ্রমহিলা তাকে পাত্তা দেন না। তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন। তাই ওঁর সঙ্গে তার থাকতে ভালো লাগছে না। আমি বলেছিলুম, আর তো দুটো দিন কিংবা বড় জোর তিনটে দিন থাকছি। তার আগেই ডঃ বর্মন চলে যাবেন। একটু সহ্য করে থাকো। কিন্তু আপনি উড়ো চিঠিফিটির কথা বলছেন। কে বলেছে আপনাকে?

মাথায় বুদ্ধি ফিরে এল এবার। বললুম, গুজব শুনেছি।

ডঃ হাজরা বললেন, কত গুজব শোনা যাবে এখন। সব বাজে কথা! আমি কর্নেল সায়েবের সঙ্গে একটা বিষয়ে পরামর্শ করতে চাই।

একটু হেসে বললুম, আমাকে বলতে আপত্তি কিসের? কর্নেল আমাকে কোনো কথা গোপন করেন না। আমি বরং কর্নেলকে বলে রাখব আগে থেকে। তাতে উনি ভাবনা-চিন্তার সময় পাবেন। তারপর আপনি কথা বলবেন।

আমার ল্যাব-অসিস্ট্যান্ট শ্রাবন্তীর ব্যাগ অ্যান্ড ব্যাগেজ সবই পুলিশ কাস্টডিতে আছে। শ্রাবন্তীর কাছে আমার কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ রিসার্চ পেপার রাখতে দিয়েছিলুম। সেগুলো আমার দরকার। কারণ ডঃ পাণ্ডে তো রাতের ট্রেনে পাটনা ফিরে যাবেন। তার আগে কর্নেল সায়েব যদি পুলিশকে বলে সেগুলো আমাকে ডেলিভারি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন, ভালো হয়।

শ্রাবন্তীর জিনিসপত্র পুলিশ আপনাকে দিতে চাইছে না নাকি?

সকালে ও সি এবং ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টরকে কথাটা বলেছিলুম। কিন্তু ওঁরা বললেন, সব সার্চ করে দেখা হবে। তারপর শ্রাবন্তীর বাবা বা গার্জেন এলে তার জিনিসপত্র তার হাতে তুলে দেওয়া হবে। আপনি তার কাছে আপনার কী আছে-না-আছে, চেয়ে নেবেন। এটা পুলিশের বজ্জাতি নয়? বলুন।

শ্রাবন্তীর বাবা আছেন?

হ্যাঁ। খবর পাওয়ার পর তার আসতে দেরি হতে পারে। তারপর তো তাঁর মানসিক অবস্থা কী হবে বুঝতেই পারছেন। পুলিশ কাস্টডি থেকে জিনিসপত্র ডেলিভারি পাওয়া–ওদিকে শ্রাবন্তীর শেষকৃত্য কোথায় তার বাবা করবেন, এ সব নিয়ে তিনি ব্যস্ত থাকবেন। ওই অবস্থায় আমার রিসার্চ পেপার চাওয়া কি উচিত? বরং তিনি আসবার আগেই আমি আমার পেপারগুলো পেলে ভালো হয়।

শ্রাবন্তীর বাবা কী করেন?

শুনেছি রিটায়ার্ড সরকারি কর্মচারী। বয়স প্রায় ৬৫-৬৬ বছর। একবার নাকি স্ট্রোক হয়ে গেছে। এমন মানুষ এসে পৌঁছুতে দেরি হতেই পারে। তা ছাড়া ট্রেনের যা অবস্থা!

একটু অবাক হয়ে বললুম, খবর তো কাল রাতেই পুলিশ কলকাতার লালবাজার পুলিশ হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়েছে শুনেছি। এখনও এসে তিনি পৌঁছুতে পারলেন না?

তা হলেই বুঝুন!

শ্রাবন্তীর বাবার নাম কী?

 মৃগাঙ্ক সেন। আমি তাকে অবশ্য দেখিনি। বলে ডঃ হাজরা ঘড়ি দেখে উঠে দাঁড়ালেন। দেখি, কর্নেল সায়েব নীচে লাউঞ্জে আছেন নাকি।

ডঃ হাজরা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আণবিক জীববিজ্ঞানী পরিমল হাজরার মাথায় হঠাৎ তার রিসার্চ পেপারের চিন্তা এল কেন? গত চারদিনে ডঃ পাণ্ডের সঙ্গে তার অসংখ্যবার দেখা হয়েছে। আজ ডঃ পাণ্ডে চলে যাবার দিন বিকেলে ডঃ হাজরা তাঁর সঙ্গে নিজের রিসার্চ বিষয়ে আলোচনা করতে চান।

ওটা কৌশল্যাদির চুরি যাওয়া সেই রিসার্চ পেপারটা নয় তো? এমন তো হতেই পারে, শ্রাবন্তীকে যে খুন করেছে, সে কৌশল্যাদির ফাইলটা চুরি করেনি অর্থাৎ শ্রাবন্তী খুন হয়েছে অন্য কোনো কারণে? আর কৌশল্যাদির রিসার্চ পেপারের ফাইল শ্রাবন্তীই ডঃ হাজরার নির্দেশে চুরি করেছিল?

কর্নেলকে এখনই বলা উচিত আমার এই থিয়োরিটা। কিন্তু এখনও হয়তো কর্নেল এবং মিঃ পটনায়ক কৌশল্যাদির স্যুইটে বসে কথা বলছেন। আমার এ সময় সেখানে যাওয়া ঠিক হবে না।

ব্যালকনিতে গিয়ে বসলুম। তারপর চোখে পড়ল মজার দৃশ্য। দুর্গপ্রাসাদের ধ্বংসস্তূপের কাছে ডঃ পাণ্ডে হাত তুলে মারতে যাচ্ছেন পাগলাবাবুকে। পাগলাবাবু অমনি সরে গিয়ে তর্জনী তুলে তাকে কিছু বলছেন। বারকতক হাত তোলার পর ডঃ পাণ্ডে যেন খেপে গেলেন। একটা পাথর তুলে তাড়া করলেন পাগলাবাবুকে। অমনি পাগলাবাবু সবেগে নীচের কেয়াবনের ভেতর উধাও হয়ে গেলেন।

ডঃ পাণ্ডে রাশভারি মানুষ পাগলের পাগলামি তিনি বরদাস্ত না করতেই পারেন। তবে তার মতো সিরিয়াস লোককে পাগলের পাগলামিতে এত বেশি। খেপে যেতে দেখে কৌতুক অনুভব করলুম। তারপর একটু অস্বস্তিও হল। পাথরটা গায়ে লাগলে পাগলাবাবু নির্ঘাত মারা পড়তেন।

ডঃ পাণ্ডে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে নিচে নেমে গেলেন।

দরজায় কেউ নক করল। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখি নব চা এনেছে। চারটে বেজে গেল এর মধ্যে? বললুম, কর্নেল সায়েবকে দেখেছ?

নব বলল, আজ্ঞে, উনি আর সাদা পোশাকের পুলিশ অফিসার একটু আগে ক্যান্টিনহলে গিয়ে কফি খাচ্ছেন।

কৌশল্যাদি–মানে ডঃ কৌশল্যা বর্মন ওঁদের সঙ্গে নীচে যাননি?

না। বর্মন দিদিমণিকে চা দিয়ে এলুম ওঁর ঘরে।

একা আছেন উনি?

 আজ্ঞে হ্যাঁ।

 হাজরা সায়েব আর তার মিসেসকে দেখেছ?

হাজরা সায়েবকে দেখিনি। ওঁর ওয়াইফ একা হোটেল থেকে বেরিয়ে গেলেন দেখলুম।

আচ্ছা নব! এই এলাকায় কোনো শিখ ভদ্রলোককে তুমি আজ কোনো সময় দেখেছ?

নব গাল চুলকে বলল, এই হোটেলে তো দেখিনি!

হোটেলে নয়, রাস্তায়। অটোরিকশা চেপে যাচ্ছিলেন এমন কাউকে?

আমি তো বেরোই কম। লক্ষ্য করিনি স্যার!

ঠিক আছে।

নব চলে গেলে দরজা আটকে ব্যালকনিতে গিয়ে বসলুম। চা জুড়িয়ে গেছে। প্রায়। এবার টের পেলুম আমাকে গোয়েন্দার ভূতে ধরেছে। নিজের ওপর খাপ্পা হয়ে চা শেষ করে সিগারেট ধরালুম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলুম, আর ওইসব ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাব না। তবে কর্নেলকে শুধু ডঃ হাজরার ব্যাপারটা জানিয়ে দেব।

বিচের দিকে তাকিয়ে দেখলুম কালকের মতোই ডঃ পাণ্ডের সঙ্গ ধরেছেন। মিসেস মালবিকা হাজরা। তারপর বাঁ দিকে ঘুরতেই চোখে পড়ল একই দৃশ্য। গাধাটার পেছনে লেগেছেন পাগলাবাবু।

ঠাণ্ডা চা খেয়ে মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিল। প্যান্ট-শার্ট পরে ব্যালকনির দরজা এঁটে বেরিয়ে গেলুম। সুইটের দরজা আপনা-আপনি লক হয়ে গেল।

নীচে গিয়ে ক্যান্টিনে দেখি, আর কেউ নেই। শুধু কর্নেল আর মিঃ পটনায়ক বসে চাপাস্বরে কথা বলছেন। ডঃ হাজরা লাউঞ্জে চুপচাপ বসে আছেন। কর্নেল হাত তুলে আমাকে ডাকলেন।

কাছে গিয়ে বললুম, ঠাণ্ডা চা খেয়ে মেজাজ খারাপ। তাই গরম চা খেতে এলুম।

কর্নেল হাসলেন। নব তো প্রচণ্ড গরম চা দেয়। চা তাহলে তোমার নিজের দোষেই ঠাণ্ডা হয়েছে। কিছু দেখতে অন্যমনস্ক ছিলে কিংবা নবর সঙ্গে কথা বলছিলে!

ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ পটনায়কও মুচকি হেসে বললেন, কাগজে লেখার মতো বিষয় চোখে পড়েছিল জয়ন্তবাবুর।

সঞ্জয় নামে তরুণ হোটেলবয় কর্নেলের ইশারায় ততক্ষণে হাজির হয়েছিল। তাকে আমার জন্য কফির অর্ডার দিয়ে কর্নেল বললেন, চুপ করে না থেকে বলো জয়ন্ত, কেন চা ঠাণ্ডা হল?

এবার আমিও হেসে ফেললুম। আপনি ঠিকই ধরেছেন। নবর সঙ্গে কথা বলছিলুম।

কিছু মিলল তার কাছে?

নাহ্। তবে তার আগে ডঃ হাজরা আপনার খোঁজে গিয়েছিলেন।

মিঃ পটনায়ক ঘড়ি দেখে বললেন, তা হলে উঠি কর্নেল সরকার। শ্রাবন্তীর জিনিসপত্রের মধ্যে ডঃ হাজরার কোনো পেপার থাকলে সেটা আমাদের লোক আগে আপনার মাধ্যমে কৌশল্যাদেবীকে গোপনে দেখাবে। তারপর আপনিই সিদ্ধান্ত নেবেন। প্রয়োজনে সঙ্গে সঙ্গে রিং করবেন আমাকে।

ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর চলে যাওয়ার পর বললুম, কৌশল্যাদির ফাইল চুরির কথা তা হলে শেষ পর্যন্ত বলেছেন পুলিশকে?

কর্নেল বললেন, আমি বলিনি। কৌশল্যাই হঠাৎ বলে ফেলল। আসলে ওকে দোষ দেওয়া উচিত হবে না। ভীষণ মানসিক চাপের মধ্যে ছিল বেচারি।

দড়িটা দিয়েছেন মিঃ পটনায়ককে?

হ্যাঁ। শিখ ভদ্রলোকের কথা বলেছি। মিঃ পটনায়ক বুদ্ধিমান। ওঁর মতে, খুনী শিখের ছদ্মবেশ ধরেছিল এবং পার্বতীর মন্দিরে কাকেও দেখা করতে গিয়েছিল। তারপর ওখানেই ঝোপঝাড়ের আড়ালে মাথার পাগড়ি মুখে গোঁফ দাড়ি, হাতের বালা ইত্যাদি খুলে ব্যাগে ভরে রাখে। তাই আমরা গিয়ে তাকে আর দেখতে পাইনি।

কিন্তু আপনার থিয়োরি কী?

একই। কর্নেলের চুরুট জ্বলতে জ্বলতে শেষ হয়েছিল। অ্যাশট্রেতে ঘষে নিভিয়ে বললেন, আসলে আমার থিয়োরি মিঃ পটনায়কের মুখ দিয়ে যাচাই করে নিয়েছি। একই অঙ্ক দুজনে আলাদাভাবে কষে একই ফল বেরিয়েছে।

কৌশল্যাদি কি বললেন যে, তাকে শ্রাবন্তীর উড়োচিঠির কথা বলেছিল, কিংবা কোনোভাবে তাকে সাবধান করে দিয়েছিল–অন্তত পরোক্ষভাবে?

নাহ্। তবে শুনলে অবাক হবে, শ্রাবন্তীর বিছানার ম্যাট্রেসের তলায় একটা ভ্রু-ড্রাইভার আর একটা ছোট্ট সাঁড়াশি উদ্ধার করেছেন ও সি মিঃ রণবীর জেনা।

কখন?

আজ বেলা সাড়ে এগারোটায় যখন তিনি এসে দ্বিতীয়বার ঘর সার্চ করেন, তখন ওই দুটো জিনিস পাওয়া গেছে। তখন আমরা ছিলুম না হোটেলে।

তা হলে শ্রাবন্তীই ফাইল চোর?

 তা বলা কঠিন। খুনীই ওই জিনিস দুটো তার ম্যাট্রেসের তলায় রেখে তাকেই ফাইল চোর সাব্যস্ত করতে চেয়েছে–এমনও তো হতে পারে।

কিন্তু শ্রাবন্তীকে খুন না করে ভয় দেখিয়েও তো কেউ ফাইল চুরি করে পালাতে পারত?

ওহ্ জয়ন্ত! তুমি ভুলে গেছ আমার থিয়োরি। খুনী শ্রাবন্তীর চেনা। তাই তার মুখ চিরতরে বন্ধ করার জন্যই ফাইলচোর তাকে হত্যার প্ল্যান করেছিল। ইন্টারলকিং সিস্টেমের সমস্যা আছে। ১৭ নম্বর স্যুইটের লক ভাঙার ঝুঁকি প্রচুর। করিডরে যে-কোনো মুহূর্তে কেউ না কেউ এসে পড়বে। কাজেই ফাইলচোর ওত পেতে ছিল কখন শ্রাবন্তী একা স্যুইটে ঢুকবে। তার সঙ্গে কথা বলার ছলে সে ভেতরে যাবে।

যদি শ্রাবন্তীর না ঢুকে একা কৌশল্যাদি ঢুকতেন?

কৌশল্যারও হয়তো একই অবস্থা হত কি না বলা কঠিন। কারণ শ্রাবন্তী যে কোন সময় এসে পড়ত। তবে ফাইলচোর আগে কৌশল্যা কোথায় আছে সে বিষয়ে শিওর হয়েছিল। মনে করে দেখ, তখন কৌশল্যাই ছিল হোটেল দ্য শার্কে ডঃ আচারিয়ার কাছে। অতএব সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল ফাইলচোর।

কিন্তু শ্রাবন্তী উড়োচিঠি পেয়েও সতর্ক করেনি কেন কৌশল্যাদিকে–এটা অদ্ভুত মনে হয় না?

কর্নেল মাথা নাড়লেন। না, ব্যাপারটা টাইমিং ফ্যাক্টরের। অর্থাৎ সময়টা হিসেব করতে হবে। তা হলেই সমস্যার জট খুলে যাবে। অমলের স্টেটমেন্টও জট খোলার ব্যাপারে সাহায্য করেছে।

এতক্ষণে কফি আনল সঞ্জয়। বলল, স্যার! দেরি হয়ে গেল। পারকোলেটারে গণ্ডগোল হয়েছিল।

ঠিক আছে। বলে কর্নেল তাকে চলে যেতে ইশারা করলেন। সে চলে গেলে তিনি বললেন, বৃষ্টির আগে শ্রাবন্তীকে ডঃ হাজরা দুর্গপ্রাসাদের ধ্বংস ভূপে গোপনে প্রেম নিবেদন করতে ডেকে নিয়ে যান। কৌশল্যা তাদের দেখেই ফিরে আসে। তার কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টি শুরু হয়। ডঃ হাজরা ও শ্রাবন্তী মাথা বাঁচাতে ছুটে আসেন এবং ডঃ হাজরার স্ত্রীর ভয়ে একা হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। তাই না?

ঠিক বলেছেন।

ঠিক এই সময় শ্রাবন্তী দুর্গপ্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ থেকে ছুটে এসে রোডসাইড কাফের বিশাল ছাতার তলায় যদি আশ্রয় নেয়? এটাও তো স্বাভাবিক। সেখানে আরো অনেকে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই ভিড়ের মধ্যে কেউ তার হাতে একটা চিঠি যদি গুঁজে দেয়? এরপর চিঠিটা পড়ে সে অমলকে খুঁজে বের করতে পারে। তারপর অমল তাকে গার্ড দেবার জন্য এই হোটেলে একটা সুইট বুক করার প্রস্তাব দিতে পারে।

বললুম, দিতে পারে কী? দিয়েছিল। কিন্তু দাসবাবু আর কমলাদেবী না করে দেন।

কর্নেল বললেন, এরপর শ্রাবন্তী স্যুইটে ফিরে যায় এবং খুনীও তাকে ফলো করে।

হাসতে হাসতে বললুম, আপনার অঙ্কটা ঠিক আছে। তবে আকস্মিকতা বড্ড বেশি।

জয়ন্ত! সব হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্ল্যান থাকে। কিন্তু হত্যার ঘটনা আচম্বিতে। মওকা পেলেই ঘটে যায়।

.

০৬.

আমার কফি খাওয়া শেষ হলে কর্নেল বললেন, চলো জয়ন্ত! সমুদ্র দর্শন করে আসি। আজ আকাশ বেশ পরিষ্কার। আশা করি বৃষ্টিতে ভিজতে হবে না।

আমরা লাউঞ্জে যেতেই ডঃ হাজরা উঠে এসে বললেন, কর্নেল সায়েব! আমার পেপারগুলো পুলিশ শিগগির পাঠাবে তো?

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। সন্ধ্যা ছটার আগেই পেয়ে যাবেন।

পরিমল হাজরা বললেন, ডঃ পাণ্ডে সি-বিচে বেড়াতে গেছেন। যাই! ওঁর সঙ্গে একটু আগাম আলোচনা সেরে নিই।

কর্নেল লনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ডঃ হাজরা রাস্তা পেরিয়ে নিচু বালিয়াড়ির মধ্যে দিয়ে বিচে নেমে গেলেন। তারপর কর্নেল পা বাড়ালেন। আস্তে বললেন, চলো! দুর্গপ্রাসাদের ধ্বংসস্তূপে গিয়ে উঁচু থেকে সমুদ্র দর্শন করব।

বাঁদিকে রাস্তার পূর্বে ত্রিভুজ ভূমির নীচে ঘাসজমিতে গাধাটা চরছে। কিন্তু পাগলাবাবুকে দেখতে পেলুম না। ঝোপ-জঙ্গল আর পাথরের মধ্যে দিয়ে আমরা কাশবনটা ডানদিকে রেখে ধ্বংসস্তূপের কাছে পৌঁছলুম। কর্নেল বললেন, এটা একটা ক্যাসল। আমরা দুর্গপ্রাসাদ বলছি। ওড়িশার কোনো সামন্তরাজা এখানে থাকতেন শুনেছি। তবে স্থাপত্যটা মোগল-ধাঁচের। এখানে দাঁড়িয়ে সমুদ্রে সূর্যোদয় দেখলে অবাক হয়ে যাবে।

এই সময় হঠাৎ একটা স্কুপের আড়াল থেকে একজন শিখ ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। থমকে দাঁড়িয়ে গেলুম। কর্নেলও প্যান্টের পকেট থেকে দ্রুত তার সিক্স রাউন্ডার রিভলভার বের করেছিলেন। পরক্ষণে অস্ত্রটা পকেটস্থ করে তিনি তার বিখ্যাত অট্টহাসি হাসলেন।

এবার দেখলুম, শিখের পাগড়ি আর নকল গোঁফদাড়ি খুলে পাগলাবাবু আর্তস্বরে বলে উঠলেন, মাইরি মরে যাব! ওরে বাবা! এ কি বিপদ হল?

কর্নেল হাসি থামিয়ে বললেন, এই পাগড়ি আর গোঁফদাড়ি কোথায় পেলেন আপনি?

পাগলাবাবু ভয়ার্তমুখে বললেন, এখানে বালিতে পোঁতা ছিল। ভিজে বালি দেখে ভেবে ছিলুম যখের ধন পুঁতে রেখে গেছে কেউ। মাইরি স্যার! কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল কি না? পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল কি না? বলুন?

হ্যাঁ। রহস্যের অন্ধকার রাত আর নেই। সকাল হয়েছে।

পাগলাবাবু হাসলেন খিটখিট করে। হয়েছে তো? বলুন স্যার? রাতি পোহাইল তো?

অবশ্যই। এবার দিন ওগুলো। হ্যাঁ–কঙ্গন আর কৃপাণটাও দিন।

 কফি খাওয়াবেন বলুন?

 নিশ্চয় খাওয়াব।

তা হলে চুপিচুপি দিই। চুপিচুপি নিন!

কর্নেল জিনিসগুলো নিয়ে বললেন, রাত্রি অনেক আগেই পুইয়ে সকাল হয়েছিল। আমি বুঝতে পারিনি এই যা!

পাগলাবাবু হাত পেতে হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন। কর্নেল তার হাতে একটা পাঁচ টাকার নোট দিলেন। পাগলাবাবু নোটটা পেয়েই ছিটকে কেয়াঝোপের ধারে গেলেন। তারপর বুড়ো আঙুল নেড়ে বললেন, ব্লা দিয়েছি। মাইরি কেমন ব্লা দিয়েছি! রাতি এখনও মোটেও পোহায়নি! পাখি সব রব করলে তবে। তো?

কর্নেল বললেন, আরো পাঁচ টাকা দেব যদি রাতি পোহায়।

পাগলাবাবু খিটখিট করে হাসতে হাসতে বললেন, তোমার কাছে রিভলভার আছে। ওরে বাবা! তুমি ডেঞ্জারাস লোক। তোমার কাছে আর যাচ্ছি না! বলে তিনি আমার দিকে আঙুল তুললেন, এই যে ভাই! তুমি ওই নোটটা আমাকে দিয়ে যাও না। তোমাকে ব্লাফ দেব না। মাইরি মাকালীর দিব্যি! কাম অন মাই সান! কাম অন!

আমি কর্নেলের হাত থেকে আর একটা পাঁচ টাকার নোট নিয়ে তাঁর কাছে। গেলুম। পাগলাবাবু ফিসফিস করে বললেন, আবার যকের ধন। লেখক হেমেন্দ্রকুমার রায়।

বললুম, যখের ধনটা কোথায় বলুন আগে!

পাগলাবাবু খিটখিট করে হেসে আবার ফিসফিস করে বললেন, গাধার গলায় বেঁধে রেখেছি। মাইরি বলছি! গাধাটাকে আমি তাড়া করে এই জঙ্গলে ঢোকাচ্ছি। ওই বুড়োকে বলো! ওই যে পাগড়ি দিলুম, ওটা খুলে লম্বা করে ব্যাটাচ্ছেলের চারঠ্যাঙে জড়িয়ে কুপোকাত করলেই চিতিং ফক! মাইরি! কী করছ? দাও না টাকাটা। আজ পেটভরে ভাত খাব।

টাকাটা পাগলাবাবুর হাতে দিলুম। উনি তক্ষুনি কেয়াঝোপের ভেতর দিয়ে উধাও হয়ে গেলেন। কর্নেলকে ওঁর কথাটা বললুম। কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, আমাকে কেয়াঝোপে ঢুকিয়ে উনি বলেছিলেন, ব্লাফ দিয়েছি! এ-ও হয়তো তা-ই। তবু চলো! গাধাটাকে দেখি।

কেয়াঝোপগুলো ঢালু হয়ে নেমে গেছে। দুজনে তার ভেতর দিয়ে এগিয়ে বুনোফুলের জঙ্গলের ওধারে গাধাটাকে দেখতে পেলুম। কর্নেল চমকে উঠে বললেন, সত্যি তো গাধাটার গলায় ন্যাকড়ায় বাঁধা কী একটা ঝুলছে! পাগলাবাবু গাধাটাকে কাতুকুতু দিয়ে লেজ টেনে উত্ত্যক্ত করছিলেন। বিরক্ত হয়ে গাধাটা বুনোফুলের ঝোপে ঢুকল। কর্নেল পাগড়িটার ক্লিপ খুলে লম্বা করে একটা প্রান্ত আমাকে ধরতে বললেন। অন্য প্রান্তটা তিনি ধরলেন। দশ-বারো হাত লম্বা পাগড়ি। কর্নেলের নির্দেশমতো সাবধানে গাধাটার পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ালুম। তারপর কর্নেল গাধাটার উল্টো দিক ঘুরে এসে আমার হাত থেকে পাগড়ির একটা প্রান্ত নিলেন এবং দুটো প্রান্ত ধরে হ্যাঁচকা টান দিতেই গাধাটা ঝোপের ভেতর কুপোকাত হল। নিমেষে কর্নেল তার ওপর গিয়ে চেপে বসলেন। তার ওজনদার দেহের ভারে গাধাটা শুধু ঠ্যাং ছুঁড়তে থাকল। কর্নেল তার গলা থেকে ন্যাকড়ার পোঁটলা খুলে নিলেন। গাধার পিঠেনা, পেটে বসেই উনি ছিঁড়ে ফেললেন ন্যাকড়াটা। পলিথিনের একটা প্যাকেট বেরিয়ে পড়ল। প্যাকেটটার মুখ বাঁধা ছিল শক্ত কালো সুতোয়। একটু জায়গা চিরে ফেলে কর্নেল দেখলেন। তারপর বললেন, আবার যকের ধন!

জিজ্ঞেস করলুম, কী ওটা?

 একটা চেন আঁটা ফাইল।

 কৌশল্যাদির সেই–

আবার কী? খুনী এটা এখানেই কোথাও বালিতে পুঁতে রেখে গিয়েছিল। পাগলাবাবু দু-দুবার চোরের ওপর বাটপাড়ি করেছেন।

গাধাটাকে মুক্তি দিয়ে কর্নেল ঝোপের ভেতর দাঁড়িয়ে রাস্তা দেখে নিলেন। পাগলাবাবু ততক্ষণে কেটে পড়েছেন। তাকে কোথাও দেখতে পেলুম না।

গাধাটা নড়বড় করে পা ফেলে ঘাসজমির দিকে চলে গেল। কর্নেল বললেন, জয়ন্ত! আমি জিনিসগুলো নিয়ে ব্যাকওয়াটারের ধারে গিয়ে বসছি। দুই পায়ের ফাঁকে রাখব। তুমি হোটেলে গিয়ে আমার কিটব্যাগটা নিয়ে এস। ব্যাকওয়াটারের ব্রিজের কাছে নেমে আমাকে দেখতে পাবে। কুইক।

তখনই ঘাসজমি পেরিয়ে রাস্তায় গেলুম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে হোটেলে পৌঁছুলাম। পূর্বাচল হোটেলের লাউঞ্জ তখন প্রায় জনশূন্য। বারের সামনে দুজন প্রৌঢ় টুলে বসে বিয়ার পান করছেন। বিয়ার জগ দেখা যাচ্ছিল ওঁদের হাতে। ক্যান্টিনে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। চা বা কফি খাচ্ছেন। বুঝলুম আর সব বোর্ডার এখনও সি-বিচে ঘুরছে। বৃষ্টিহীন সুন্দর বিকেলটা ক্রমে ধূসর হয়ে পড়ছে।

স্যুইটের দরজা খুলে কর্নেলের কিটব্যাগ এবং আমার বালিশের তলা থেকে হ্যান্ডব্যাগে রাখা লোডেড ফায়ার আর্মস প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে বেরিয়ে পড়লুম। ক বছর আগে চিৎপুরে একটা স্মাগলিং র‍্যাকেটের খবর দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় ফাঁস করার পর ক্রমাগত ফোনে আমাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। সেই সময় কর্নেলের পরামর্শ ও সুপারিশে এই অস্ত্রটার লাইসেন্স পেয়েছিলুম। কর্নেলের সঙ্গে বাইরে কোথাও গেলে এটা সঙ্গে নিয়ে যাই।

ব্যাকওয়াটারের ধারে কর্নেলকে খুঁজে বের করতে একটু দেরি হয়েছিল। কারণ উনি একটা ঝোপের আড়ালে বসেছিলেন। কয়েকটা জেলে নৌকো ভেসে ছিল। কিন্তু জেলেরা মাছ ধরতে ব্যস্ত।

জিনিসগুলো কিটব্যাগে ভরে কর্নেল ব্যাগটা যথারীতি পিঠে আঁটলেন। তারপর বললেন, চলো! ফিরে গিয়ে পকৌড়া আর কফি খাব। তারপর অন্য কিছু।

হোটেলে ফিরে নবকে পকৌড়া-কফির কথা বলে কর্নেল সিঁড়িতে উঠছিলেন। সেই সময় কৌশল্যাদি নেমে আসছিলেন। বললেন, আপনাদের দুজনকে দুর্গপ্রাসাদের ওখানে দেখছিলুম।

কর্নেল হাসলেন। পাগলাবাবুকে দেখতে পাওনি?

 হ্যাঁ। কিন্তু আমার কৌতুকের মেজাজ নেই। সত্যি বলছি একটু বিরক্ত হচ্ছিলুম। আপনি যেন সিরিয়াসলি আমার প্রব্লেমটা নেননি মনে হচ্ছিল।

পাগলাবাবুর সঙ্গে আলাপ করতে দেখে?

হ্যাঁ। তারপর চোখে পড়ল, আপনারা পাগলাবাবুর সঙ্গে গাধাটাকে জঙ্গলে ঢুকিয়ে জোক করছেন।

এস কৌশল্যা! পকৌড়া-কফি খাবে এবং আমাদের সঙ্গে জোক করবে!

কৌশল্যাদি কষ্টে হাসলেন, না কর্নেল। আমার কেন যেন বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে। সন্ধ্যা যত এগিয়ে আসছে, তত ঘরে একা থাকতে ভয় পাচ্ছি।

সেই জন্যই তো ডাকছি তোমাকে। এস।

সুইটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে কর্নেল বাতি জ্বাললেন এবং ফ্যান চালিয়ে দিলেন। আমি ব্যালকনির দরজা খুলে দিলুম। কৌশল্যাদি বিষণ্ণ মুখে বসলেন। কর্নেল কিটব্যাগের চেন টেনে বললেন, ম্যাজিক দেখাব কৌশল্যা! চোখ বন্ধ করো।

কৌশল্যাদি বললেন, চোখ বন্ধ করছি না। মুখ ঘোরাচ্ছি।

কর্নেল পলিথিনের মোড়ক চিরে চেন আঁটা লালরঙের ফাইলটা বের করে বললেন, এবার দেখ এটা কী?

কৌশল্যাদি ফাইলটা তক্ষুণি তুলে নিয়ে চেন খুলে দেখার পর বালিকার মতো কেঁদে ফেললেন। আপনি সত্যি আমার পূর্বজন্মের বাবা! কর্নেলের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে তিনি ফাইলটা বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তার চোখ থেকে জলের ধারা নামছিল।

কর্নেল বললেন, কচি মেয়ের মতো কান্নাকাটির কী আছে? এবার যা বলছি, মন দিয়ে শোনো! ফাইলের কথা পুলিশকে বলে ফেলে টেনশন থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলে। কিন্তু তুমি পুলিশকে জানিয়ে দিও না যে ফাইল ফিরে পেয়েছ। কারণ পুলিশ জানতে পারলে আইনত ফাইলটা ওরা কাস্টডিতে নিয়ে যাবে। তারপর তুমি সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে তবে এটা ফেরত পাবে। কাজেই চেপে যাও। ওটা আমার কাছেই নিরাপদে থাকবে। তুমি কবে যাচ্ছ?

আমার তো আজ দুপুরে ডঃ আচারিয়ার সঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল।

পুলিশ তোমার স্টেটমেন্ট নিয়েছে। ঠিকানা নিয়েছে। শ্রাবন্তী মার্ডার মামলায় তোমাকে ভবিষ্যতে কোর্টে আসতে হবে। তুমি কখন গেলে সুবিধে হবে, আমি আজ রাতেই জানিয়ে দেব। যাবার সময় তোমাকে ফাইল ফেরত দেব। তোমাকে স্টেশনে তুলে দিয়ে আসব। চিন্তা কোরো না।

শ্রাবন্তী বেচারির জন্য কষ্ট হচ্ছে। কে তাকে অমন নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল, তাকে এখনও ধরতে পারল না পুলিশ। আপনি কি কিছু আঁচ করতে পেরেছেন?

কর্নেল তাঁর হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে তাঁর প্রকাণ্ড ব্যাগে ঢোকালেন। তালা এঁটে দিলেন। তারপর বললেন, এখনও তার চেহারা স্পষ্ট হয়নি আমার কাছে। দেখা যাক।

দরজা নক করল কেউ। খুলে দেখি, নব পকৌড়া-কফি এনেছে। বললুম, আর একটা কাপ চাই নব!

নব বলল, আনছি স্যার! থানা থেকে এক ভদ্রলোক এসে রিসেপশনে কর্নেল সায়েবের খোঁজ করছেন। বলে সে ঘুরল। এই যে উনি এসে গেছেন!

কর্নেল বললেন, মিঃ সাক্সেনা যে! পটনায়ক সায়েব জিনিসটা পাঠিয়েছেন?

 হ্যাঁ স্যার। এই প্যাকেটে ভরা আছে। প্লিজ, এই রিসিটে সই করে দিন।

কর্নেল সই করে দিয়ে মোড়কটা টেবিলে রাখলেন। মিঃ সাক্সেনা চলে গেলেন কপালে হাত ঠেকিয়ে। কৌশল্যাদি জিজ্ঞেস করলেন, কী ওটা?

কর্নেল বললেন, ডঃ হাজরার কিছু রিসার্চ পেপার শ্রাবন্তীর জিনিসপত্রের মধ্যে ছিল। উনি ফেরত পাওয়ার জন্য খুব ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। যাক গে, পকৌড়া আর কফি খাওয়া যাক। জয়ন্ত একটু পরে খাবে। নব কাপ-প্লেট আনুক।

দরজা খোলাই ছিল। নব এল কাপ-প্লেট নিয়ে। তার পেছনে ডঃ হাজরাকে দেখা গেল। উঁকি মেরে বললেন, কর্নেল সায়েব! পুলিশ আমার পেপার পাঠিয়েছে?

পাঠিয়েছে। একটু আইনের ফ্যাকড়া আছে মিঃ হাজরা! আপনি মিনিট পনের পরে ঘরে বসে আপনার পেপার ফেরত পাবেন।

 ডঃ পাণ্ডে রাত সাড়ে আটটায় চেক-আউট করবেন।

 এখনও সময় আছে। প্লিজ! একটু অপেক্ষা করুন গিয়ে।

ডঃ হাজরা রুষ্ট মুখে চলে গেলেন। আমি উঠে গিয়ে দরজা আটকে দিলুম। কর্নেল কফি খেতে খেতে ডঃ হাজরার রিসার্চ পেপারের প্যাকেটটা খুললেন। কোনো ফাইল নেই। একগাদা ফুলস্ক্যাপ সাইজের কাগজে ডটপেনে কী সব লেখা আছে এবং মাঝে মাঝে কিছু স্কেচ আঁকা–আমার পক্ষে তা দুর্বোধ্য।

কৌশল্যাদি মুখ বাড়িয়ে দেখে নিয়ে বললেন, বস্তাপচা তত্ত্ব। বহুবছর আগে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত আণবিক জীববিজ্ঞানী জাক মোদ বলেছিলেন, এবার তিনি গবেষণাগারে মানুষ তৈরি করে ফেলবেন। তাই নিয়ে খুব হইচই পড়ে গিয়েছিল। তারপর অবশ্য জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং চর্চার সূত্রপাত হয়। কিন্তু এখন জিনোম প্রকল্প সেই চর্চার একটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডঃ হাজরার রিসার্চ অবশ্য উদ্ভিদ নিয়ে। এটা আজকাল অনেক উদ্ভিদ বিজ্ঞানীর কাজে লাগতে পারে। জানি না ডঃ হাজরার উদ্ভিদবিদ্যার ডিগ্রি আছে কি না।

কর্নেল কাগজগুলো আগের মতো সাজিয়ে প্যাকেট করলেন। তারপর বললেন, আমি আসছি! তোমরা বসো। আর জয়ন্ত! একটু সাবধানে থেকো।

তিনি ডঃ হাজরার প্যাকেটটা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বললম, চলুন দিদি, ব্যালকনিতে গিয়ে বসি।

কৌশল্যাদি ব্যালকনিতে গিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার ফাইল তোমরা কোথায় উদ্ধার করলে জয়ন্ত?

বললুম, কর্নেলের মুখে সব শুনবেন। আমার কিছু বলতে মানা।

কৌশল্যাদি শ্বাস ছেড়ে বললেন, কর্নেল সরকার আমার মামা জগদীপ সিনহার বন্ধু। কর্নেলের সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল আমেরিকার হিউস্টনে। মামা ওখানে একটা বড় তেল কোম্পানিতে ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। আরব গেরিলাদের একটা গুপ্ত সংগঠন সেই অয়েল কোম্পানির শোধনাগারে অন্তর্ঘাতের চক্রান্ত করেছিল। মামা কোন সূত্রে তা জানতে পেরেছিলেন। সেই সময় একটা বাঙালি ক্লাবে দৈবাৎ মামার সঙ্গে কর্নেলের আলাপ হয়। মামা প্রাণভয়ে কোম্পানিকে চক্রান্তের কথা জানাতে পারছিলেন না। কিন্তু তিনি কথায়-কথায় কর্নেলকে জানান। কর্নেলের সামরিক জীবনের এক মার্কিন বন্ধু তখন ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের পদস্থ অফিসার। কর্নেল তার সাহায্যে গুপ্ত সংগঠনের সব লোককে পাকড়াও করেন। এবার আমি যখন চন্দনপুর-অন-সিতে প্রকৃতি পরিবেশ সম্মেলনে যোগ দিতে আসছি, তখন মামা কলকাতায় কর্নেলকে ফোন করে তাকে আমার কথা বলেন। কারণ আমার রিসার্চের ব্যাপারটা মামা জানতেন। মামা আমাকে পই পই করে নিষেধ করেছিলেন, যেন ঘৃণাক্ষরে আমার গবেষণার ফলাফলের কথা কাউকেও না বলি। আমি আমার পেপার পড়ার সময় মাঝে মাঝে যে ব্যাখ্যা দিচ্ছিলুম, তাতেই সম্ভবত কেউ জেনে ফেলেছিল আমি কোথায় পৌঁছে গেছি।

বললুম, এতক্ষণে বুঝতে পারলুম কর্নেল কেন সম্মেলনে আসবার আগে এখানকার স্থানীয় পুলিশকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে রেখেছিলেন।

এই সময় নীচের রাস্তায় পাগলাবাবুর চিৎকার শোনা গেল। চিচিং ফাঁক! চিচিং ফাঁক-। এই দরজা খুলল। আলিবাবা ঢুকল। তারপর মাথায় এক হাত কোমরে এক হাত রেখে তিনি সেই বিদঘুটে সুরে পদ্যটা গাইতে শুরু করলেন,

‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল
মাইরি রাতি পোহাইল
 কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল
মাইরি সকলি ফুটিল
 মাইরি মা কালীর দিব্যি
রাতি পোহাইল..।

তারপর হঠাৎ নাচ-গান বন্ধ করে পাগলাবাবু এই পূর্বাচল হোটেলের দিকে তর্জনী তুলে চেরা গলায় আবার চিৎকার করলেন, চিচিং ফাঁক! চি-ই-ই-চি-ই ই-ইং-ফ-আঁ-আক্‌!

দরজায় কেউ জোরে নক করছিল। দরজা খুলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল কনলেন। কর্নেলের কথা। সাবধানে থেকো। তাই আমার প্যান্টের ডান পকেটে পয়েন্ট বাইশ ক্যালিবারের রিভলবারের বাঁট ডানহাতে ধরে বাঁহাতে দরজা খুলে দিলুম।

কিন্তু কোনো আততায়ী নয়, হোটেলের ম্যানেজার মিঃ মহাপাত্র। বললুম, কী ব্যাপার মিঃ মহাপাত্র?

তিনি বললেন, কর্নেল সায়েব আছেন?

না। উনি সম্ভবত তিনতলায় ডঃ হাজরার স্যুইটে গেছেন। কিছু বলতে হবে?

ম্যানেজার আস্তে বললেন, ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ পটনায়ক আমাকে ফোন করে জানালেন, প্লেন ড্রেসে কয়েকজন পুলিশ এখনই হোটেলে আসছে। একজন এস আই তাদের নিয়ে যাচ্ছেন। গাড়ি দূরে রেখে তারা হেঁটে এখানে আসবেন। আইডেনটিটি কার্ড দেখাবেন এস আই। আমি যেন তাদের লাউঞ্জে ঢুকতে দিই। কর্নেল সায়েবকে ওঁর বলা আছে। কিন্তু আমি ভয় পেয়েছি। আবার কী হাঙ্গামা বাধাবে পুলিশ। হোটেলের সুনাম নষ্ট হবে।

কথাগুলো শুনে চাপা উত্তেজনা জেগেছিল মনে। মুখে নির্বিকারভাব ফুটিয়ে বললুম, কী আর করবেন মিঃ মহাপাত্র? হোটেলে একটা মার্ডার হয়েছে। একটু হাঙ্গামা সহ্য করতেই হবে।

ম্যানেজার ভদ্রলোক জোরে শ্বাস ফেলে নীচে নেমে গেলেন। দরজা বন্ধ করে ব্যালকনিতে গিয়ে বসলুন। কৌশল্যাদি জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে জয়ন্ত?

বললুম, আবার পুলিশ আসছে শুনে ম্যানেজার বিব্রত বোধ করছেন।

 পুলিশ আসছে। তার মানে তদন্ত করে কোনো নতুন তথ্য পেয়েছে ওরা।

 সম্ভবত।

কৌশল্যাদি একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, খুনী ফাইলচোর হয়তো এখনও এই হোটেলে আছে।

থাকতেই পারে। আমরা দুজন, আপনি, তারপর হাজরা দাম্পতি এবং ডঃ পাণ্ডে এই ছজন বাদে আর পাঁচজন বোর্ডার এখন হোটেলে আছেন। সেই পাঁচজনের মধ্যে কেউ বলেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আচ্ছা কৌশল্যাদি, আপনি আজ সকাল বা দুপুরে হোটেলের আশেপাশে কোনো শিখ ভদ্রলোককে দেখেছিলেন?

কৌশল্যাদি একটু চমকে উঠে বললেন, শিখ ভদ্রলোক?

হ্যাঁ। মাথায় পাগড়ি, মুখে গোঁফ-দাড়ি, হাতে বালা আর কোমরে কৃপাণ। বেশ বলিষ্ঠ গড়ন।

হা, হ্যাঁ। ব্যালকনি থেকে দেখেছিলুম, এই হোটেলের দক্ষিণে যে ঢিবিটা আছে, সেখানে ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা একটা পথ আছে দেখেছি। সেই পথ ধরে একজন শিখ ভদ্রলোক নেমে আসছিলেন। তারপর নীচের রাস্তায় একটা অটোরিকশা ভাড়া করে ভদ্রলোক চলে গেলেন। তখন দশটা বা সওয়া দশটা হবে। কিন্তু কেন একথা জিজ্ঞেস করছ তুমি?

একটু হেসে বললুম, যথাসময়ে জানতে পারবেন। কিন্তু কথাটা আগে যদি—

কী বলছ বুঝি না! আগে বলার কী কারণ ছিল? তোমরা তো জিজ্ঞেস করনি। তা হলে বলতুম।

দরজায় কেউ নক করল আবার। দুবার। তবু সতর্কভাবে দরজা ফাঁক করে দেখলুম, কর্নেল দাঁড়িয়ে আছেন। সরে এলুম।

কর্নেল দরজা বন্ধ করে বললেন, ডঃ হাজরা তার রিসার্চ পেপার পেয়ে খুব খুশি। আমাকে সঙ্গে নিয়ে পাশেই ডঃ পাণ্ডের স্যুইটে গেলেন। তারপর ডঃ পাণ্ডে রিসার্চ পেপার দেখতে দেখতে হঠাৎ বললেন, ওই পাগলাবাবুটি সাংঘাতিক লোক। বিকেলে দুর্গপ্রাসাদের ওখানে তিনি সমুদ্র দর্শনে গিয়েছিলেন। হঠাৎ পাগলাবাবু একটা পাথরের আড়াল থেকে উঠে একটা বাঁকা ছুরি বের করে হুমকি দিল, পকেটের টাকা আর রিস্টওয়াচ খুলে দাও। নইলে প্রাণে মারা যাবে। ডঃ পাণ্ডে মাথা ঠাণ্ডা রেখে তাকে ঘড়ি খুলে দেবার ছল করে আচমকা একটা পাথর তুলে মারতে যান। তখন বজ্জতটা পালিয়ে যায়।

বললুম, হা, হা দৃশ্যটা আমি ব্যালকনি থেকে দেখেছি।

কর্নেল বললেন, কিন্তু ডঃ পাণ্ডে একটা আশ্চর্য কথা বললেন। সেই বাঁকা ছুরিটা নাকি একটা কৃপাণ। একমাত্র শিখরাই ওই কৃপাণ ব্যবহার করেন। কৃপাণের খাপটা একটা কাপড়ের ফিতের সঙ্গে বাঁধা ছিল। কথাটা শুনে আমি বললুম, ডঃ পাণ্ডে কি এলাকায় কোনো শিখ ভদ্রলোককে দেখেছেন? ডঃ পাণ্ডে চমকে উঠে বললেন, পার্বতীর মন্দিরে যাবার সময় তিনি হোটেলের দক্ষিণ দিকের জঙ্গলের পথে একজন শিখকে আসতে দেখেছিলেন।

কৌশল্যাদি বলে উঠলেন, আমিও দেখেছি। ওই জঙ্গলের পথে সে। আসছিল। জয়ন্তকে বলছিলুম।

.

০৭.

কর্নেল কেন একটু হেসে উঠলেন। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চুরুট ধরালেন। আবার হাসতে হাসতে বললেন, অতিবুদ্ধির গলায় দড়ি বলে বাংলায় একটা প্রবাদবাক্য আছে।

কৌশল্যাদি বললেন, কেন একথা বলছেন?

কর্নেল কিছু বলার আগে আমি বললুম, কিন্তু একটা কথা আমার মাথায় ঢুকছে না। খুনী ফাইলচোর শিখ সাজতে গেল কেন? ইচ্ছা করলে তো সে যে কোন জায়গায় গোপনে বাকি নাইলনের দড়িটা পুড়িয়ে ফেলতে পারত! পাগড়ি, দড়ি, কৃপাণ, কুর্তা, চুত্ত পাজামা আর বালা-টালা পরে শিখ সেজেছিল কেন?

কর্নেল সোজা হয়ে বসে বললেন, আমাকে সে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল।– আমাকে মানে পুলিশকেও। আমার পাটিগণিত জয়ন্ত। তুমি আর আমি যখন ডানদিকে বালিয়াড়ির ঝাউবনের দিকে যাচ্ছিলুম তখনই সে আমাদের বিভ্রান্ত করার সুযোগটা নেয়। আমরা অন্যদিকে গেলেও সে একই সুযোগ নিত।

সুযোগ নিত মানে?

এটুকু তোমার মাথায় আসছে না? ইচ্ছে করেই সে পোড়ো লাইটহাউসের কাছে বালিতে দড়িটুকু পুঁতে রাখতে ছুটে গিয়েছিল। সে লক্ষ্য করেছিল আমরা ওদিকেই যাচ্ছি। অমনি সে হোটেলের পেছনে ঢিবির জঙ্গল থেকে শিখ সেজে রাস্তায় এসেছিল। অটোরিকশা হোটেলের নীচে সবসময় পাওয়া যায়। অটোরিকশা লাইটহাউসের কাছাকাছি রাস্তায় দাঁড় করিয়ে সে দড়িটুকু পুঁতে রাখতে গিয়েছিল এবং লক্ষ্য রেখেছিল, তোমার বা আমার চোখে যেন সে পড়ে। তাতে আমাদের কৌতূহল বা সন্দেহ জাগবেই। জেগেছিল বৈকি! তাই আমরা দেখতে গিয়েছিলুম, সে পোডড়া অজগর অধ্যুষিত লাইটহাউসের কাছে কী করছিল। সে বালি খুঁড়ে জায়গাটা আমাদের চোখে পড়ার মতো করে রেখেছিল। ওটাই তার ফাঁদ। আমরা ঠিকই ফাঁদে পড়লুম। একজন শিখকে খুনী ফাইলচোর সাব্যস্ত করে ফেললুম। অন্তত কয়েক ঘণ্টা সে আমাদের ভুল পথে ছোটাতে পেরেছিল। তাই না?

ঠিক। আপনি ঠিকই বলেছেন, অতিবুদ্ধির গলায় দড়ি।

 কর্নেল হাসলেন। পাগলাবাবুকে কৌশল্যার সাহায্য করা উচিত। অন্তত তাকে কোন মেন্টাল হসপিটালে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত। উনিই তোমার ফাইল উদ্ধার করেছেন!

কৌশল্যা বলল, নিশ্চয় করব। উনি যদি আমার সঙ্গে যেতে চান–তো উনি কী করে আমার ফাইল উদ্ধার করলেন, একটু খুলে বলুন!

কর্নেল সংক্ষেপে ঘটনাটা বললেন। তারপরই টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোন ধরে কর্নেল সাড়া দিলেন। তারপর ক্রমাগত হ্যাঁ, হুঁ, ওকে, ঠিক আছে ইত্যাদি বলে গেলেন। তারপর ঘড়ি দেখে বললেন, সাড়ে সাতটা বাজে। চলো! আমরা নীচে যাই। ও সি মিঃ জেনা এবং ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ পটনায়ক সদলবলে আসছেন।

কৌশল্যাদি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আবার কি জেরা শুরু হবে?

 কর্নেল বললেন, না। একটা নাটক দেখতে পাবে।

বিস্মিত কৌশল্যাদি আমার দিকে তাকালেন। আমি বললুম, চলুন তো।

কর্নেল তার কিটব্যাগ নিয়ে বেরোলেন। বললেন, নাটকের সময় তোমরা চুপ করে থাকবে। আমরা দুজনে তাকে অনুসরণ করলুম। মনে মনে বলুলম, আমি সাংবাদিক, চুপ করে থাকার গ্যারান্টি দিচ্ছি না।

লাউঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকজন অচেনা লোক বসে আছে দেখলুম। বারের সামনে অল্প ভিড়। ক্যান্টিনে কয়েকজন বোর্ডার বসে চা বা কফি খাচ্ছেন। আমরা লাউঞ্জে রিসেপশনের কাছাকাছি এবং হোটেলের দরজার সামনাসামনি বসলুম। ম্যানেজার মিঃ মহাপাত্র এসে চাপা স্বরে বললেন, সঞ্জয়ের ডিউটি শেষ। কিন্তু তাকে যেতে দিইনি।

কর্নেল বললেন, ওকে ওভার ডিউটির টাকা দেবেন। দেওয়া কর্তব্য।

মিঃ মহাপাত্র একটু হেসে বললেন, আপনি যখন বলছেন, তা-ই দেওয়া হবে। তাহলে সঞ্জয় খুশি হবে।

কিছু বুঝলুম না। কিন্তু এখন কর্নেলের হাবভাব অন্যরকম। বাঘ শিকারের ওপর ঝাঁপ দেবার আগে যেমন ঘাপটি পেতে বসে, ওঁর চেহারায় সেই ভঙ্গি।

পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দুই পুলিশকর্তা এসে ঢুকলেন। লক্ষ্য করলুম, লনে সশস্ত্র পুলিশবাহিনী এসে দাঁড়াল। মিঃ জেনা এবং মিঃ পটনায়ক লাউঞ্জে দুটো খালি আসনে বসলেন।

অস্বস্তিকর স্তব্ধতা! মনে হচ্ছিল আমরা চলেছি চূড়ান্ত বিস্ফোরণের জিরো আওয়ারে। কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। দশ… নয়… আট… সাত… ছয়… পাঁচ…

ডঃ হাজরা এবং তার স্ত্রী নেমে এলেন। কোনোদিকে না তাকিয়ে তারা ক্যান্টিনহলে ঢুকলেন। ম্যানেজার পাথরের মূর্তির মতো কাউন্টারে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। রিসেপশনে এক তরুণী টেলিফোন তুলে কাকে বলল, বিল। পাঠিয়ে দিচ্ছি স্যার! ব্যাগেজ আনতে লোক যাচ্ছে।

বুঝলুম, ডঃ বিক্রমজিৎ পাণ্ডে চেক-আউট করছেন। পৌনে আটটা বাজে। ওঁর ট্রেন রাত নটার পর।

কিছুক্ষণ পরে একজন হোটেলবয় ডঃ পাণ্ডের ব্যাগেজ নিয়ে নেমে রিসেপশনের কাছে এল। তারপর ডঃ পাণ্ডে নেমে এসে বললেন, মিঃ মহাপাত্র। পেমেন্ট করব।

ডঃ হাজরা ক্যান্টিনহল থেকে তাঁকে দেখতে পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে এলেন। বললেন, এখনই চলে যাচ্ছেন?

ডঃ পাণ্ডে বললেন, একটু সময় হাতে রেখে যাওয়াই ভালো।

অটোরিকশা বলা আছে তো?

বলা নেই। নীচে পেয়ে যাব। বলে ডঃ পাণ্ডে পার্স থেকে টাকা বের করে ম্যানেজার মিঃ মহাপাত্রের হাতে দিলেন। তারপর রিসিট নিয়ে পা বাড়ালেন। আপনার মিসেস কোথায় মিঃ হাজরা?

ওই তো ক্যান্টিনে বসে আছে। বলে ডঃ হাজরা তার স্ত্রীকে হাতের ইশারায় ডাকলেন।

মালবিকা হাজরা এসে বললেন, চলে যাচ্ছেন মিঃ পাণ্ডে? আমার খুব। খারাপ লাগছে। কয়েকটা দিনের সুন্দর স্মৃতি মনে গাঁথা থাকল। বেড়াতে ভালোই লেগেছে। শুধু ওই হতভাগা মেয়েটির কথা কাটার মত বিঁধছে।

ওঁরা পরস্পর নমস্কার করার পর ডঃ পাণ্ডে দরজার দিকে এগোচ্ছেন, হঠাৎ কর্নেল উঠে গিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, এক মিনিট। আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে।

ডঃ পাণ্ডের কাঁধে একটা ব্যাগ। কয়েক পা সরে গিয়ে তিনি ব্যাগটা দেখিয়ে হাসলেন। এতে কোন চোরাই মাল নেই কর্নেল সরকার!

কর্নেল বললেন, চোরাই মালটা এখন আমার এই ব্যাগে শৰ্মাজি!

ডঃ পাণ্ডে চাপা গর্জে বললেন, কী? শর্মাজি মানে? কী বলতে চান আপনি?

রাহুল শর্মাকে শর্মাজি বললে অপরাধ হয় না।

মিঃ জেনা এবং মিঃ পটনায়ক এগিয়ে এলেন সঙ্গে সঙ্গে। তারপর লাউঞ্জ থেকে কয়েকজন সাদা পোশাকের পুলিশ এসে ঘিরে ধরল ডঃ পাণ্ডে-কে। আমি হতবাক। কৌশল্যাদিও তা-ই। এ কি দুঃস্বপ্ন?

ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ পটনায়ক বললেন, রাহুল শর্মা। তোমাকে একটি হত্যা, চুরি এবং মিসপার্সোনিফিকেশনের অপরাধে গ্রেপ্তার করা হল।

দুজন সাদা পোশাকের পুলিশ ডঃ পাণ্ডে-বেশী রাহুল শর্মার দুটো হাতে হাতকড়ি এঁটে দিল। বার, লাউঞ্জ এবং ক্যান্টিন থেকে বোর্ডাররা এসে ততক্ষণে ভিড় করেছেন। কিন্তু পুলিশের লোকেরা তাদের কাছে আসতে দিল না। সত্যিই এ এক জমাটি নাটক। আমি স্বপ্নেও কল্পনা করিনি ডঃ পাণ্ডে একজন জাল মানুষ।

কর্নেল বললেন, রাহুল শর্মা! আজই আমরা খবর নিয়েছি, পাটনায় ডঃ বিক্রমজিৎ পাণ্ডে এখানে রওনা হওয়ার আগের দিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি নার্সিংহোমে ভর্তি হন। আর সেই সুযোগে তার ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট রাহুল শর্মা তার তৈরি সেমিনার পেপার, আমন্ত্রণপত্র, এমন কি তার এক প্যাকেট নেমকার্ড চুরি করে নিজেই ডঃ পাণ্ডে সেজে এখানে চলে আসে।

আমি অবাক হয়ে শুনছিলুম। এবার সাংবাদিকতার অভ্যাসবশেই বলে উঠলুম, এই সম্মেলনে বহু বিজ্ঞানী এসেছিলেন। ডঃ বিক্রমজিৎ পাণ্ডেকে তাদের চেনার কথা। কেন তারা চুপ করে ছিলেন?

কর্নেল মুখ খোলার আগেই ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর কল্যাণ পটনায়ক সহাস্যে বললেন, আপনি একজন সাংবাদিক। ঠিক প্রশ্নই তুলেছেন। কিন্তু এর উত্তর আমরা পেয়ে গেছি। টেলিফোনে পাটনায় ডঃ পাণ্ডের সঙ্গে আজ দুপুরে যোগাযোগ করেছিলাম। তিনি নার্সিংহোম থেকে বাড়ি ফিরে তাঁর ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের কুকীর্তি জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, সে চন্দনপুর-অন-সিতে প্রকৃতি পরিবেশ সম্মেলনে নিজেই ডঃ পাণ্ডে সেজে যোগ দিতে এসেছে। আমার মুখে কথাটা জানার পর ডঃ পাণ্ডে বললেন, তিনি এই সম্মেলনে আমন্ত্রিত বিজ্ঞানীদের তালিকা দেখে তার সহকারী এই রাহুল শর্মাকে বলেছিলেন, সরকার কী যে করছেন! অজানা-অচেনা সব ভূঁইফোড় বিজ্ঞানীদের নিয়ে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন করছেন। এঁদের মধ্যে বাঙ্গালোরের জিনোমবিজ্ঞানী ডঃ রঘুবীর আচারিয়ার নামটা তার পরিচিত। তবে তার সঙ্গে আজও তাঁর দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। হ্যাঁ, অশোক সাঠের মুখে দিল্লির আরেক জিনোমবিজ্ঞানী ডঃ কৌশল্যা বর্মনের কথা তিনি শুনেছেন। সেই মহিলাবিজ্ঞানী নাকি জিনোমতত্ত্ব ঘেঁটে একটা বৈপ্লবিক ফরমুলা তৈরি করেছেন। অশোক সাঠে এ প্রসঙ্গে তাকে বলেছিলেন, ফরমুলাটা সত্য হলে ভারতের শত্রু রাষ্ট্ররা তো বটেই, বিদেশি রাষ্ট্রও কোটি-কোটি ডলার দাম দিয়ে কিনে নেবে। জয়ন্তবাবু! তা হলেই বুঝুন, কেন এই সুযোগ ছাড়তে চায়নি রাহুল শর্মা। স্বকর্ণে এইসব কথা ডঃ পাণ্ডের মুখে শোনার পর সে তক্কে তক্কে ছিল।

কৌশল্যাদি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কর্নেল তাকে ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললেন, হ্যাঁ। অশোক সাঠে জাল ডঃ পাণ্ডেকে দেখে নিশ্চয় অবাক হয়েছিলেন। কারণ তিনি ডাঃ পাণ্ডের এই সহকারীকে চেনেন। ঠিক এখানেই একটা গোপন চুক্তি হয়ে যায় দুজনের মধ্যে। অশোক সাঠের উপস্থিতিতে কৌশল্যার সেই ফরমুলা ফাইল চুরি হলে কৌশল্যার সন্দেহ হবে অশোক সাঠেকেই। কৌশল্যা পুলিশকে তার পেছনে ছোটাতো। তাই অশোক সাঠে চলে যাবার পর চুরিটা হোক। কৌশল্যা! এবার তুমি বলো, অশোক সাঠে চলে যাবার পরদিনও তুমি তোমার ফরমুলার ফাইল আছে দেখেছিলে কি না?

কৌশল্যাদি বললেন, হ্যাঁ। ছিল আপনাকে তো বলেছি কোথায় এবং কীভাবে রাখা ছিল।

কর্নেল বললেন, অশোক সাঠে চলে যাবার আগে রাহুল শর্মাকে ওই ফাইল চুরির জন্য চরম তাগিদ দিতেই হোটেল দ্য শার্ক থেকে একজন কর্মীর হাতে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই কর্মী চিঠিটা তার নির্দেশ অনুসারে সরাসরি জাল ডঃ পাণ্ডের হাতে দিতে এসেছিল। কিন্তু রিসেপশনে খোঁজ নেবার সময় কর্মীটি বাবু দণ্ডধর দাস যিনি দাসবাবু নামে পরিচিত, তাকে ভুল করে ডঃ পাণ্ডে নামের বদলে ডঃ পণ্ডা নাম বলে। মুখ আঁটা খামে শুধু লেখা ছিল ডঃ পাণ্ডে। এখন মজার ব্যাপার হল, চারতলার ২২ নম্বর সিঙ্গল স্যুইটে আছেন সম্বলপুরের জনৈক ডাক্তার নন্দকিশোর পণ্ডা। ওড়িশায় এই পদবি সুপরিচিত। অন্যমনস্ক দাসবাবু হোটেলবয় সঞ্জয়কে হোটেল দ্য শার্কের কর্মী অনন্তের সঙ্গে ডাক্তার পণ্ডার ঘরে পাঠান। সঞ্জয় এখানে উপস্থিত আছে। যথাসময়ে সে কথা বলবে। এইবার আমি ডঃ নন্দকিশোর পণ্ডাকে অনুরোধ করছি। বাকিটুকু তিনি বলুন।

লাউঞ্জের একপ্রান্তে ভিড় থেকে একজন স্থূলকায় ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। তিনি আড়ষ্টভাবে কষ্টকর ইংরেজিতে বললেন, আমি খামে লেখা নামটা ভালো করে পড়িনি। পি এন ডি এই তিনটে হরফ চোখে পড়েছিল শুধু। কিন্তু খামের মুখ ছিঁড়ে চিঠি পড়ে আমি মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারলুম না। লেখা আছে : লাল ফাইল। এক লক্ষ টাকা পুরস্কার। তলায় শুধু এ এস লেখা। কিছুক্ষণ পরে আমার মনে হল এই অদ্ভুত চিঠি তাহলে অজিত সান্যালের দুষ্টুমি।

কর্নেল বললেন, কে অজিত সান্যাল সে-কথা বলুন!

 ডঃ পণ্ডা বললেন, আপনারা যাকে পাগলাবাবু বলে জানেন, তিনি আমাদের সম্বলপুরেরই আরেক ডাক্তার ছিলেন। জানি না কেন তিনি গতবছর হঠাৎ পাগল হয়ে নিখোঁজ হন। তাঁকে চন্দনপুর-অন-সিতে বেড়াতে এসে আবিষ্কার করেছিলুম। উনি আমাকে দেখেই পালিয়ে যান। তো চিঠিটা পাওয়ার পর ধরেই নিলুম পাগল ডাক্তারের কীর্তি। আজ সন্ধ্যার একটু আগে উনি নীচের রাস্তায় নাচগান করছিলেন। তখন তাঁকে চিঠিটা খামসুদ্ধ দেখিয়ে

আমি সাংবাদিক বলে এখানে পরিচিত। তাই তার কথার ওপর প্রশ্ন করলুম, আপনি চিঠিটা তা হলে রেখে দিয়েছিলেন কাছে?

হ্যাঁ। অজিত আমার বন্ধু। পাগল হয়ে আমার সঙ্গে কেন এই মজা করেছেন, জানতে ইচ্ছে করছিল। পাগলামি তো বটেই। তবু এই সুযোগে যদি তার সঙ্গে কথা বলা যায়। তাই তাঁকে চিঠিটা দেখালুম। বললুম, লাল ফাইল কী অজিত? এক লক্ষ টাকা পুরস্কার আমাকে দেবে কেন? অজিত ডাক্তার আমার হাত ধরে টেনে রাস্তার এক ধারে নিয়ে গেলেন। বাচ্চা ছেলের মতো খিলখিল করে হেসে বললেন, গাধার গলায় লাল ফাইল ছিল। গাধাটা চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে। ওরে বাবা! এক লক্ষ টাকা পুরস্কার? এ কি কম কথা? চলে যাও মাথায় টাক মুখে দাড়ি সান্টা ক্লজের কাছে। জানো না? সান্টা ক্লজ পুরস্কার দেয়? ওকে জিজ্ঞেস করলুম, কে তিনি? তখন অজিত ডাক্তার দুটো হাত গোল করে দুই চোখে রেখে বললেন, পাখি দেখে। প্রজাপতি পেলেই–ওরে বাবা! খ করে ধরে। আমি পালাই। অজিত ডাক্তার দৌড়ে বিচের দিকে গেলেন। তারপর আমার মনে পড়ল, যাঁর কথা অজিত বলল, তাকে তো আমি দেখেছি। এই হোটেলে তিনি আছেন। রিসেপশনের দাসবাবুকে নাম জিজ্ঞেস করলুম। উনি বললেন, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

কর্নেল বললেন, আমি তখন সবে আমার স্যুইট থেকে বেরিয়ে ডঃ হাজরার রিসার্চ পেপার নিয়ে তিনতলায় উঠছি, ডঃ পণ্ডা বললেন, আপনার সঙ্গে কথা আছে। ওঁর কথা শুনে খামসুদ্ধ চিঠিটা পকেটে রেখে দিয়ে বললুম, নীচে ক্যান্টিনে গিয়ে অপেক্ষা করুন। সব বুঝতে পারবেন। এবার হোটেল বয় সঞ্জয়, তার কথা বলুক!

 ম্যানেজার মিঃ মহাপাত্র সঞ্জয়কে ঠেলে বের করে দিলেন। ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ পটনায়ক ওড়িয়া ভাষায় তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হোটেল- দ্য শার্কের অনন্তের সঙ্গে তুমি ডঃ পণ্ডাকে চিঠি দিতে গিয়েছিলে?

সঞ্জয় ওড়িয়াতে জবাব দিল, হা স্যার! আমার সামনে অনন্ত ডঃ পাকৈ চিঠি দিল।

কর্নেল আমাকে অবাক করে ওড়িয়াতে তাকে বললেন, পরশু সন্ধ্যার আগে কী দেখেছিলে, সেই কথাটা এবার বলো?

সঞ্জয় ঢোক গিলে বলল, আমি চারতলার ২১ নম্বরে চা দিতে যাচ্ছিলুম। তিনতলায় ওঠার সময় দেখলুম, উনি ১৭ নম্বর সুইট থেকে বেরিয়ে একটা লালরঙের প্যাকেটের মতো জিনিস হাতে করিডর দিয়ে জোরে হেঁটে চলে গেলেন। তারপর নিজের ঘরে ঢুকলেন।

ও সি রণবীর জেনা ধমক দিলেন উনি কে? দেখিয়ে দাও!

সঞ্জয় জাল ডঃ পাণ্ডে অর্থাৎ রাহুল শর্মাকে তর্জনী তুলে দেখিয়ে দিলেন।

ওসি মিঃ জেনা হাসলেন। রাহুল শর্মা কোন দোকানে দড়ি কিনেছিল, তার খোঁজ আমরা পেয়েছি। কোন অটোরিকশাতে সে শিখের ছদ্মবেশে চেপেছিল, তাও আমরা খুঁজে বের করেছি।

কর্নেল বললেন, আমাদের বিভ্রান্ত করে ভুল পথে ছোটাতে এই রাহুল শর্মা শিখ সেজেছিল। তিনি কিটব্যাগ থেকে শিখের ছদ্মবেশ বের করে মিঃ জেনার হাতে তুলে দিলেন।

ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ পটনায়ক বললেন, স্থানীয় সমুদ্রবিজ্ঞানী উমেশ ঝার সঙ্গে এই জাল ডঃ পাণ্ডে ভাব জমিয়েছিল। ডঃ ঝা ডঃ পাণ্ডেকে কখনও দেখেননি। তিনি রাহুল শর্মাকে নিজের বাড়িতে খাইয়েছিলেন। ডঃ ঝা নিরীহ গোবেচারা ভালোমানুষ। তিনি তখন জানতেন না তাঁর সঙ্গে জাল ডঃ পাণ্ডের ভাব জমাবার উদ্দেশ্য কী? বছর দুই আগে সমুদ্রবিজ্ঞানের এক শিখকর্মী তার অধীনে কাজ করতেন। বদলি হয়ে যাওয়ার সময় শিখকর্মী মহিন্দার সিংহ তার বসের অভিপ্রায় অনুসারে একপ্রস্থ শিখপোশাক তাঁকে স্মারকচিহ্ন হিসাবে উপহার দিয়ে যান। সেই পোশাক ডঃ ঝার বসার ঘরের দেয়ালে সাজানো ছিল। নেমন্তন্ন খেতে গিয়েই তা জাল ডঃ পাণ্ডের চোখে পড়েছিল। আজ সকালে এই জাল ডঃ পাণ্ডে তার বাড়ি গিয়ে কৌতুকের ছলে শিখ সাজতে চেয়েছিল। ডঃ ঝা কৌতুক ভেবেই তাকে শিখের পোশাক দেন। পাগড়ি, কুর্তা, চুত্ত পাজামা, কঙ্গন, বালা আর কৃপাণ। বাকি রইল গোঁফ-দাড়ি গোঁফ-দাড়ি শর্মা সঙ্গে নিয়েই এসেছিল, যদি কোনো প্রয়োজনে লাগে। শিখ সেজে সে ডঃ ঝাঁকে বলেছিল, পূর্বাচলে গিয়ে সে তার বন্ধু ডঃ হাজরা–বিশেষ করে ডঃ হাজরার স্ত্রী মালবিকা হাজরার সঙ্গে কৌতুক করবে। তারপর ডঃ ঝার এই স্যুভেনির সে। ফেরত দেবে।

মিঃ মহাপাত্র বললেন, ডঃ উমেশ ঝা বেলা এগারোটা নাগাদ এসে আমাকে ডঃ পাণ্ডের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি বললুম, ডঃ হাজরা সস্ত্রীক পার্বতীর মন্দিরে যাবেন বলছিলেন। হয়তো ডঃ পাণ্ডে তাদের সঙ্গেই গেছেন। শুনে ডঃ ঝা হাসতে হাসতে আমাকে ডঃ পাণ্ডের শিখ সেজে হাজরা দম্পতির সঙ্গে কৌতুক করার ব্যাপারটা বললেন। আমিও তখন এটা নিছক কৌতুক ভেবেছিলুম। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, বেগতিক দেখে শিখ সেজে পালাবে বলেই শর্মা পোশাক ফেরত দেয়নি ডঃ ঝাকে।

কর্নেল বললেন, শিখ সেজে রাহুল শর্মা পার্বতীর মন্দিরে গিয়ে কোনো গোপন জায়গায় সম্ভবত উল্টোদিকে ঝোপের আড়ালে পোশাক বদলে মটকার ধুতি-চাদর পরে সাত্ত্বিক ভক্ত সেজে নিয়েছিল। তাকে নিয়ে-যাওয়া অটোরিকশার ড্রাইভার তখন তাকে চিনবে কেমন করে? যা-ই হোক, সে খালি অটোরিকশার ড্রাইভারকে তার জন্য অপেক্ষা করতে বলে কুড়ি টাকা অগ্রিমও দেয়। আপনি ঠিক ধরেছেন মিঃ মহাপাত্র। বিপদ বুঝলে শিখ সেজে পালাবে বলেই পোশাক লুকিয়ে রেখেছিল রাহুল শর্মা।

মিঃ পটনায়ক বেটন নাচিয়ে রাহুল শর্মাকে বললেন, তোমার বাঁচবার কোনো উপায় নেই। সেই অটোরিকশার ড্রাইভার একজন সাক্ষী। ডঃ উমেশ ঝা-ও তোমার কীর্তি শুনে আগুন হয়ে জ্বলছেন।

কর্নেল মুখে দুঃখ ফুটিয়ে বললেন, বেচারি কৌশল্যার ফাইলটাই পাওয়া গেল না। বেওয়ারিশ গাধাটা হয়তো সত্যি ওটা চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে। তা খা। আপদ গেছে। কী বলল কৌশল্যা?

কৌশল্যাদি শুধু একটু হাসলেন।

তা হলে আসামী নিয়ে আমরা এবার রওনা হই। এই নাটকের প্রধান কৃতিত্ব কিন্তু একান্তভাবে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের।

বলে ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ পটনায়ক, ও সি মিঃ জেনা এবং সাদা পোশাকের পুলিশের দলটি জাল ডঃ পাণ্ডে অর্থাৎ রাহুল শর্মাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

তারপরই আবার এক নাটক। পাগলাবাবু সবেগে লাউঞ্জে প্রবেশ করে চেঁচিয়ে উঠলেন, চি-ই-চি-ইং ফা-আঁ-আঁক! বাব্বা! ইয়া মোটা পাথর তুলে ছুঁড়ে মেরেছিল দস্যু সর্দার। আলিবাবা বলেই বেঁচে গেছি। কাশিম হলে অক্কা পেতুম। আলিবাবা আর চল্লিশ চোরের গল্প! মাইরি বলছি, এক কাপ কফি খেতে চেয়েছিলুম। বলে কী, তুই তো গাধার সঙ্গী। গাধা কি কফি খায়? হুঁ হুঁ। ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখনি! আমি মাইরি তক্কে তক্কে ছিলুম। ব্যাটাছেলেকে শুনিয়ে গান গাইতুম,

পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল
মাইরি রাতি পোহাইল

পাখি ডাকছে! সব ফর্সা! তোমার কারসাজি সব ফর্দাফাঁই! তাই কি না–

কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল
মাইরি সকলি ফুটিল—

ব্যাটা খু-উ-ব জব্দ হয়েছে! চোরের ওপর বাটপাড়ি করেছিলুম। কিন্তু হায়! হায়! অমন সুন্দর রোগভোগা নিরীহ মেয়েটার গলায় ফাঁস আটকে মারলে গো! ও হো হো হো!

বলে পাগল ডাক্তার অজিত সান্যাল দুহাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে বেরিয়ে গেলেন।

ডঃ নন্দকিশোর পণ্ডা তার পেছনে ছুটে গেলেন। অজিতবাবু! অজিতবাবু! শুনুন!

কৌশল্যাদি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ওঁকে যেভাবে হোক আমি দিল্লি নিয়ে যাব। ওঁর চিকিৎসা করাব।

কর্নেল ডঃ হাজরাকে জিজ্ঞেস করলেন, শ্রাবন্তীর বাবা বা অন্য কেউ আসেননি?

মিসেস মালবিকা হাজরা চোখ মুছে বললেন, হতভাগিনীর বাবা তো রুগী। আর কে আছে যে ছুটে আসবে? আমিই ওর ডেডবডি বুকে করে নিয়ে যাব।

বেঁচে থাকতে মেয়েটাকে দুচোখে দেখতে পারতুম না। এখন কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে!

ডঃ হাজরা বললেন, আমি গিয়ে দেখি, কী করা যায়।

মালবিকা প্রায় গর্জে বললেন, চু-উ-প করে বসে থাকো এখানে। আমিই যাচ্ছি। এক খুনে ডাকাতের সঙ্গে একা ঘুরে বেড়াতে পেরেছি। এটুকু পারব না? দরদ উথলে উঠেছে এতক্ষণে। বলে স্থূলাঙ্গিনী ভদ্রমহিলা চটির শব্দ তুলে বেরিয়ে গেলেন।

ডাঃ হাজরা বিব্রতভাবে স্ত্রীকে অনুসরণ করলেন।

আমি কৌশল্যাদিকে বললুম, মানব চরিত্র সত্যি দুয়ে কৌশল্যাদি!

কৌশল্যাদি আস্তে বললেন, প্রথমে আমার সন্দেহ হয়েছিল চুরির সঙ্গে শ্রাবন্তীর মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই। মিসেস হাজরাই হয়তো প্রতিহিংসাবশে শ্রাবন্তীকে ফঁসে আটকে মেরেছেন।

কর্নেল ভারি গলায় বললেন, আমি তৃষ্ণার্ত! কৌশল্যা! জয়ন্ত! চলো! ঘরে গিয়ে কফি খাওয়া যাক।

নবকে ডেকে তিনি কফির অর্ডার দিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠলেন। দরজা খুলে আমি ব্যালকনির দিকে এগিয়ে গেলুম। ব্যালকনির দরজা খোলার পর সমুদ্রের দিকে তাকালুম। রাতের সমুদ্র যেন পাগলাবাবুর মতো হাহাকার করছে। আর ভেসে আসছে ভিজে উদ্দাম হাওয়ায় ক্রমাগত মৃত্যুর নোনা ঠাণ্ডা হিম গন্ধ।…